Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Atma-jeebancharit
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আত্ম-জীবনচরিতু।
শহরেন্দ্রলাল রায়
।
১৩০৩ সাল
No text on this page.
বিজ্ঞাপন। ? ক্ষিতীশবংশাবলি রচয়িতা স্বর্গীয় দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায়ের জীবনচরিতের কিয়দংশ মাত্র স্বর্গীয় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের দৌহিত্র অশেষ প্রীতিভাজন শ্ৰীমান সুরেশচন্দ্র সমাতি কর্তৃক সুসম্পাদিত “সাহিত্য” মাসিক-পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। এই জীবনচরিত, বিশিষ্ট ব্যক্তির চরিত্র, চিন্তা এবং কার্যাবলী সংশ্লিষ্ট হইলেও, ইহাতে বঙ্গের পঁচাত্তর বৎসর ব্যাপী সামাজিক ইতিহাস প্রতিফলিত। যখন এই জীবন চরিত “সাহিত্যে প্রকাশিত হয়, তখন অনেকে তা আগ্রহ ও ঔৎসুক্যের সহিত পাঠ করেন এবং সংবাদ পত্রাদিতেও বিশিষ্টরূপে উল্লিখিত হয়। ১৮৯৭ সালের ২৬শে মে তারিখের ইণ্ডিয়া মিররে এবং ১৩০৩ সাল বৈশাখের সাহিত্যে এই আত্ম জীবনচরিত সম্বন্ধে যে মন্তব্য প্রকাশিত হয় তাহা নিম্নে উদ্ধত হইল। “The bulk of the Falgoon Number of the journal ( Sahitya ) is taken up by the autobiography of late Babu Karticaychander Roy Dewan of the Nuddca Raj. This is a very interesting contribution in as much as it presents a graphic aocount of the men and manners of a nearly bygone age" Indian Mirror. “নদীয়া জেলার অন্তর্গত কৃষ্ণনগরের সুপ্রসিদ্ধ অধিবাসী নবদ্বীপ রাজ বংশের দেওয়ান স্বর্গীয় কার্তিকেয়চন্দ্র রায় মহাশয় প্রায় পঁচাত্তর বৎসর পুৰ্ব্ব জন্ম গ্রহণ কয়িয়াছিলেন। দেওয়ানজী নিজগুণে, অনেকের শ্রদ্ধা ও প্রীতির পাত্র ছিলেন, তাঁহার স্বলিখিত জীবন চরিত যে তদীয় বান্ধবগণের চিত্ত আকর্ষণ করিবে সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই স্বরচিত জীবনচরিতের আরও একটি আকর্ষণ আছে। ইহাতে গত পঁচাত্তর বৎসরের বঙ্গের সামাজিক অবস্থার একটি সুন্দর চিত্র দেখিতে পাওয়া যায়। নবদ্বীপ রাজ বংশের সহিত দেওয়ানজী মহাশয়ের বংশানুক্রমিক সম্বন্ধ ; সুতরাং তাহার জীবন কাহিনীর সহিত নবদ্বীপ রাজবংশের ইতিবৃতও স্বভাবতঃ আসিয়া পড়িয়াছে। অাত্মজীবন চরিতের এদেশে সম্পূর্ণ অপ্রতুল। স্বর্গীয় বিদ্যাসাগরের অসম্পূর্ণ আত্মজীবনচরিত ভিন্ন এ বিষয়ে এখন ও আর কিছু প্রকাশিত হয় নাই। যে দেশে জীবন চরিত লিখিবার প্রথাই নূতন তথায় পঁচাত্তর বৎসর পূর্বে আবির্ভূত 'একজন বিষয়ী ব্রাহ্মণ আপনার জীবনকাহিনী আপনি লিখিয়া গিয়াছেন, ইহাও অল্প বিচিত্র নহে। রায় মহাশয় এই আত্মজীবনচরিতে প্রসঙ্গ ক্রমে যে সকল মত ও মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন তাহাতে উদারতা ও সূক্ষ্মদর্শনের প্রভূত পরিচয় পাওয়া যায়। পাঠক, এই জীবনচরিতের সঙ্গে অগ্রসর হইলে ক্রমশঃ তাহার পরিচয় পাইবেন।” –সাহিত্য।
০ । এই আত্মজীবনচরিতর সহিত একটি উল্লেখযােগ্য ঘটনা সংযুক্ত। আজন্ম বিশুদ্ধ চরিত্র, দয়ার সাগর প্রাতঃস্মরণীয় স্বর্গীয় দ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত এই “আত্মজীবনচরিত লেখক ঘনিষ্ট বন্ধুত্বসুত্রে আবদ্ধ ছিলেন। দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বন্ধু শ্রদ্ধাস্পদ শ্ৰীযুক্ত ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায় কলিকাতা হইতে কৃষ্ণনগরে আসিয়া,বলেন-“যদি কার্ত্তিক বাবু কোন কাৰ্য্য অপূর্ণ বা অসম্পন্ন রাখিয়া গিয়া থাকেন, তাহা হইলে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিতান্ত ইচ্ছা যে তিনি উহা সম্পন্ন করিয়া যান।” বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই প্রতিপূর্ণ অভিমতি প্রকাশের পর তৎকর্তৃক আদিষ্ট হইয়া, আমি পিতৃদেবের এই “আত্মজীবনচরিত”—এবং বঙ্গভাষায় অনুবাদিত পাশী পুস্তক সমূহ লইয়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট উপস্থিত হই । বিদ্যাসাগর মহাশয়, এই গ্রন্থগুলি গ্ৰহণান্তর অপূর্ণ নয়নে বাষ্পদিগ্ধ গদগদ স্বরে কহিলেন “আমি নিজের মুলাযন্ত্রে ও নিজ ব্যযে ও তত্ত্বাবধানে, আদ্যোপান্ত দেখিয়া শুনিয়া, এই পুস্তকগুলি ছাপাইব। এই কাৰ্য্য পরিশ্রম সাপেক্ষ। কিন্তু কার্ত্তিক বাবুকে বিশেষ শ্রদ্ধাভক্তি করিতাম ও ফুলবাসিতাম বলিয়াই এই আমার বৃদ্ধাবস্থায় ও অসুস্থ শরীরে, তাহার অসমাপ্ত কাৰ্য্য, সম্পন্ন করিতে বাগ্র ও উৎসুক। তবে ইহাও বলিতেছি, যে এ সংসারে কার্তিক বাবু ভিন্ন অর কাহারও জন্য, আমি, এই ভগ্নশরীরে, এবম্প্রকার কার্যে হস্তক্ষেপ করিতে অগ্রসর হইতাম না।” এই কথাবার্তার পর বিদ্যাসাগর মহাশয় পীড়িত হলেন এবং সমগ্র বঙ্গদেশকে কাদাইয়া চলিয়া গেলেন। এই আত্মজীবনচরিত সম্বন্ধে, তাহার অপূর্ণ অভিলাষ, সুসিদ্ধ হইবার অর সম্ভাবনা নাই। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিৎ ও ঐতিহাসিক পণ্ডিত প্ৰণর লালমোহন বিদ্যানিধি আমাকে সন ১৯০০, ৪ঠা আগষ্ট তারিখের পত্রে লিখিয়াছিলেন “স্বর্গীয় বিদ্যাসাগর মহাশয় সর্বদা কাৰ্ত্তিকেয় বাবুর জন্য দুঃখ করিতেন ; কহিতেন, “কবে কার্তিক বাবুর সহিত স্বর্গে দেখা করিব।” আজ তাহারা উভয়েই ভিন্ন। জগতে ;—আবার, হয়তো প্রীতিসূত্রে আকৃষ্ট ও সন্মিলিত। তাহাদিগের উভয়ের আশীর্বাদের উপর নির্ভর করিয়া, এই “আত্মজীবনচরি” জনসমাজে সম্পূর্ণভাধে প্রকাশিত হইতে চলিল। নানা কারণে শতি পদে এই কাৰ্য্যে অগ্রসর হইতে হইল। শহরেন্দ্রলাল রায়।
স্বগীয় দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায়ের আত্ম-জীবনচরিত প্রথম পরিচ্ছেদ এই নবদ্বীপের রাজাদের (অর্থাৎ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রভৃতির) বংশের ইতিহাসের সহিত আমার পূর্ব পুরুষের ইতিহাস এত জড়ীভূত আছে যে, তাহাদের বংশের ইতিবৃত্ত কিঞ্চিৎ মধ্যে মধ্যে বিবৃত না করিলে আমার বংশের সমস্থ অবস্থা জানা যায় না। এ কারণ তাহাদের বংশ বৃত্তান্ত স্থানে স্থানে নিবেশিত করিতে হইয়াছে। আমার পূর্ব পুরুষের বৃত্তান্ত গুরুজনের প্রমুখৎ এই মাত্র শ্রবণ করিয়াছি যে, তাহারা বাঙ্গালার পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী ও ভূস্বামী ছিলেন। কিন্তু কোন পরগণায় কোম্ গ্রামে বাস করিতেন, তাহা শুনি নাই, অথবা স্মরণ নাই, এবং বংশের অতি প্রাচীন দিগের অভাবে ইহা আর এক্ষণে জানিবারও উপায় নাই ইহারা এই নবদ্বীপের বর্তমান রাজাদের পূর্বপুরুষদের সংসারে থাকিতেন। দিল্লীর সম্রাট, আকবর সহি উক্ত বংশােদ্ভব কাকদির জমিদার কাশিনাথ রায়ের কোন অপরাধ শুনিয়া তাহাকে ধৃত করিতে সৈন্য পাঠানতে কাশীনাথ পলায়ন করিয়া এই দেশে আইসেন এবং আন্দুলিয়া গ্রামের নিকট রাজসৈন্য কর্তৃক নিধন প্রাপ্ত হইলে তদীয় গর্ভবতী পত্নী এই জেলার অন্তর্গত বাগােয়ানের জমিদার হরেকৃষ্ণ সমদ্দারের আলয়ে আশ্রয় লন, এবং এক পুত্র প্রসব করেন। হরেকৃষ্ণ নিঃসন্তান বশতঃ ঐ নবকুমারকে পুত্র নির্বিশেষে স্নেহ করেন, এবং তাহার নাম রামচন্দ্র রাখেন। আর পরিশেষে ঐ নননকে স্বীয় সম্পত্তির ও পদবীর উত্তরাধিকারী করিয়া যান। সে সময় আমার তৎকালীন পূর্ব পুরুষেরাও এই অঞ্চলে আসিয়া উপনিবেশ করেন। রামচন্দ্রের পুত্র ভবানন্দ, ঘটনাক্রমে রাজা মান সিংহের অনুগ্রহে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের আদেশে, এ দেশে কয়েকখানি পরগণার জমিদারি পাইলে, ২ আত্ম-জীবনচরিত। বাগােওয়ান হইতে আসিয়া মাটিয়ারিতে বাস করেন। আমার তদানীন্তন পূর্বপুরুষ ও তথায় উপনিবেশিত হন । (১) ভবানন্দের পুত্র ও পৌত্রের সময় তাহাদের সংসারে আমার পূর্বপুরুষগণ চিরদিন দেওয়ানি পদে নিযুক্ত ছিলেন এইরূপ শুনিয়াছি, এবং যখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পূৰ্ব্বে অন্য কোন দেওয়ান বংশের কথা শ্রুতিগােচর হয় না, তখন কেবল আমার পূর্ব পুরুষেরা যে ভবানন্দের সময় হইতে কৃষ্ণচন্দ্রের পিতা রঘুরামের সময় পর্যন্ত ছয়পুরুষের একাদিক্রমে দেওয়ান ছিলেন, তাহাতে আর সন্দেহ বােধ হয় না। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময় প্রথমতঃ ভালুকার কৃপারাম সিংহ ও তৎপরে বিখ্যাত রঘুনন্দন মিত্র দেওয়ান হন। মিত্র দেওয়ানের পরে কৃপারামের পুত্র কালী- সাদ সিংহ দেওয়ানী পদ পান। ভারতচন্দ্র-রচিত অন্নদামঙ্গলে সভাবর্ণনা স্থলে রঘুনন্দন মালের দেওয়ান, আমার প্রপিতামহ মদনগোপাল রায় বকশী সেনাপতি এবং তদীয় অগ্রজ রামগােপাল চক্রবর্তী সহবতের দেওয়ান বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। (২) এই রাজসংসারে মালের দেওয়ানি, সহবতের দেওয়ানি এবং রায় বকশী এই তিন প্রধান পদ ছিল। দেওয়ান চক্রবর্তী বলিয়া আমাদের বংশ এ প্রদেশে প্রসিদ্ধ আছে। কিন্তু আমার প্রপিতামহ রায় বকশী পদাভিষিক্ত হওয়া অবধি তাহার অধস্তন পুরুষদের রায় উপাধি হইয়া রহিয়াছে। পিতামহ দেওয়ান হইলে তঁাহার রায় দেওয়ান উপাধি হয়। তদীয় পিতৃব্য রামগোপাল চক্রবর্তীর বংশীয়দের পদবী চক্রবর্তীই আছে। আমার পূর্বপুরুষদিগের মধ্যে কোন্ জন কোন্ রাজার সময় দেওয়ান ছিলেন, তাহার কোন নিদর্শন পাই নাই। তবে ভবানন্দের প্রপৌত্র রাজা রুদ্রের সময় হইতে রুদ্রের পৌত্র রাজা রঘুরামের সময় পর্যন্ত আমার অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহ ষষ্ঠীদাস চক্রবর্তী ও তাহার পুত্র রামরাম চক্রবর্তী দেওয়ানিপদে নিযুক্ত ছিলেন, এইরূপ বােধ হয়। আমাদের কুলশাস্ত্রে যে যে স্থানে ষষ্ঠীদাস চক্রবর্তী ও রামরাম চক্রবর্তীর নামের উল্লেখ আছে তাহারা দেওয়ান বলিয়া বণিত হইয়াছেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পর রাজা শিবচন্দ্রের, ঈশ্বরচন্দ্রের ও প (১) আমার জ্ঞাতির মধ্যে এক জনের বংশ অদ্যাপি তথায় বাস করিতেছেন। (২) চক্রবর্তী গােপাল দেওয়ান সহবতী। রায় বকশী মদনগােপাল মহামতি।
বংশবৃত্তান্ত। গিরিশচন্ধের সময় কখন আমার পিতামহ রাধাকান্ত রায় ও তাহার অনুজ রত্নেশ্বর রায় কখন কালীপ্রসাদ সিংহের বংশােদ্ভব ব্যক্তি ও কখন অন্য কেহ কেহ দেওয়ান হইয়াছিলেন । আমার পূর্ব পুরুষেরা এই রাজাদের অতি বিশ্বাস ভাজনছিলেন, এবং জ্ঞাতি কুটুম্বের ন্যায় সমাদৃত ও সম্ভাষিত হইতেন। যদি কোন সম্পত্তি বিনামী করিয়া রাখিবার প্রয়ােজন হইত, তবে রাজা ইহাদের নামেই রাখিতেন । এক্ষণে এই রাজাদের যে সকল জমিদারী আছে, তাহার মধ্যে প্রায় সমস্তই আমার খুল্লপিতামহ রত্নেশ্বরের নামে বহুকাল বিনামী ছিল। তাহার প্রতি এত- দুর বিশ্বাস ছিল যে, যখন তরফ মহতপুর, ডিহি কৃষ্ণচন্দ্রপুর, ডিহি বাগরালি এবং ডিহি পাঁচপােতা পত্তনী দিবার প্রয়ােজন হইল, তখন তিনিই পানী পাট্টায় দস্তখত করিলেন, এবং পত্তনীদারগণও তাহার নিকটেই পত্তনী কবুলতি প্রদান করিল। সেই সকল পাট্টা ও কবুলতী অদ্যাপি স্থিরতর রহিয়াছে। বহুকালাবধি আমাদের একদিকে যেমন পদসংক্রান্ত মান আছে, অন্যদিকে তেমনই বারেন্দ্র শ্রেণীর মধ্যে আমার অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ ষষ্ঠীদাস চক্রবর্তী কুলীনের এক নুতন দল স্থাপন করতে মতকর্তার বংশ বলিয়া আমাদের সম্মান রহিয়াছে। রােহেল। পটির মধ্যে মমিনপুর নামে যে এক মত আছে, ঐ মত কুলীনদিগের মধ্যে বিশুদ্ধ ছয় জনকে নির্বাচন করিয়া এই মতের সৃষ্টি হয়, তজ্জন্য ইহারা কুলীন শ্রোত্রিয় ছয়ঘরিয়া মতাবলম্বী বলিয়া খ্যাত হন ! আমা- দেরপূর্ব পুরুষের বিস্তর নিষ্কর ভূমি তালুক ইত্যাদি ছিল, তদনুরূপ সৎক্রিয়া- শালী ছিলেন বালয়া তাহারা এ প্রদেশে বিশেষ সমাদৃত হইতেন এবং বিশে প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। আমাদের বংশের বাৎস্যব গোত্র, কুতব শাখা পঞ্চপ্রবর ও সঞ্জামনি গাঁই। আমার পিতামহের তিন পুত্র ও এক কন্যা। জ্যেষ্ঠ তারাকান্ত, মধ্যম শিবাকান্ত, কনিষ্ঠ উমাকান্ত। কন্যা সকলের জ্যেষ্ঠা, ইহার নাম জগদ্ধাত্রী। পিতামহের প্রথম স্ত্রীর নিঃসন্তানাবস্থায় মৃত্যু হয়। এই সকল দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রীর সন্তান। পিতামহী কৃষ্ণনগরের চৌধুরীর কন্যা, চৌধুরীদিগের সহিত আমাদের এই প্রথম সম্বন্ধ। আমি উমাকান্ত রায় মহাশয়ের পুত্র। ১২২৭ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসের ৪ আত্ম-জীবনচরিত। সংক্রান্তির রাত্রে আমি ভূমিষ্ঠ হই। আমার পিতার প্রথমে এক পুত্র ও তৎপরে তিন কন্যা জন্মে। উপযুপরি তিন কন্যার পরে পুত্র জন্মিলে দীর্ঘায়ু হয় না, এ দেশস্থ লােকের এই সংস্কার আছে। এই পুত্রের দুরদৃষ্ট দুরীকরণ নিমিত্ত জনক জননী বিবিধ প্রকার দৈবকৰ্ম্ম করিয়া থাকেন। আমার কল্যাণার্থ প্রতি অন্যান্য ক্রিয়ার অতিরিক্ত একটা বাড়তি শিবপূজা প্রত্যহ করিতেন, এবং আমার কোন পীড়া হইলে যারপর নাই চিন্তাকুলা হইতেন। এ প্রদেশের তদানীন্তন নিয়মানুসারে পঞ্চমবর্ষে আমার হাতে খড়ি হয় । তাল- পত্রে, কদলি পত্রে ও কাগজে যাহা যাহা লিখিয়া শিখিতে হয় তাহা শিক্ষা করি । পিতাঠাকুরের নিকটেই এই সকল বিষয়ের অধিকাংশ অভ্যাস করিয়াছিলাম । কোন পাঠশালায় কখনও যাইতে হয় নাই। কিছুদিনের জন্য একজন গুরু- মহাশয় আমাদের বাটীতে ছিলেন এবং তিনি শিক্ষা প্রদান করিতেন । কখন কখন আমাদের কর্মচারিরাও শিক্ষা দিতেন। দিবসে লিখিতাম, রাত্রিতে নামতা পড়িতাম সন্ধ্যার পর কখন কখন পিতৃদেব আমাদের বংশাবলি, শ্রেণী, ই, গােত্র, বেদ, শাখা, প্রবর, আমরা কাহার সন্তান, কত দিবসের ব্রাহ্মণ, ইত্যাদি বিষয় সকল শিখাইতেন। যদিও আপনাদের বংশাবলী গাই গোত্র ইত্যাদি শিখিতে কিছুই সময় ব্যয়িত হয় না তথাপি নিষ্প্রয়ােজন বােধে এ সকল বিষয়ের শিক্ষা ইদানীং এককালে উঠিয়া গিয়াছে । পূৰ্ব্বে জিজ্ঞাসিত হইলে যদি কোন বালক স্বীয় পূৰ্বপুরুষের নাম কীৰ্ত্তনে অশক্ত হইত তবে তাহার লজ্জার সীমা থাকিত না। ইদানীন্তন বালকের কথা সুদূরপরাহত, যুবকদের মধ্যেও অনেকে আপনাদের প্রপিতামহ বা মাতামহের নাম জ্ঞাত নহেন, এবং এ বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশে লজ্জিত হন না। অনেকে আপনার জন্মদিনের স্মরণ রাখেন না। ইউরােপের অনেক বংশের ইতিবৃত্ত বলিতে পারেন, কিন্তু আপনাদের বংশবৃতান্ত জিজ্ঞাসিত হইলে নিরুত্তর থাকেন। আমাদের পূর্ধ্বতন জনগণ যে কোন বিদ্যা শিখিতেন না কেবল এই সকল বিষয় শিখিয়া রাখিতেন, এরূপ নহে। তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ বিদ্যা- জ্যোতিতে জগন্ম গুল অালো করিয়া গিয়াছেন, অথচ এ সকল শিক্ষা অনাবশ্যক গাঁই গােত্র । বােধ করেন নাই, এবং আপন সন্তানদিগকে এরূপ শিক্ষাপ্রদানে বিরত হন নাই। যদি এ মহীমণ্ডলে কাহার বংশের বৃত্তান্ত অবগত হওয়া আবশ্যক হয়, তবে সর্বাগ্রে নিজ বংশের বৃত্তান্ত জ্ঞাত হওয়া কর্তব্য হয়। আপনার বংশবৃত্তান্ত জানা থাকিলে বিস্তর উপকার আছে । উন্নত বংশোদ্ভবগণ পূৰ্বপুরুষের চরিতাবলী অবগত থাকিলে উচ্চ থাকিবার যত্ন করিবেন, এবং অবনত বংশাে- ভূত জনেরা পূর্বপুরুষের হীনাবস্থা স্মরণ করিয়া আপনাদিগকে উন্নত করিবার প্রয়াস পাইবেন। বিভিন্ন বংশের সহিত যতই কেন বন্ধুতা হউক না, শােণিত- সম্বন্ধবশতঃ নিজ বংশের ব্যক্তির সহিত তদপেক্ষা অধিক হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। যখন বিদেশীয় ব্যক্তি অপেক্ষা স্বদেশীয় ব্যক্তি আমাদের অধিক প্রিয় হন, তখন আপন বংশােদ্ভূত জনের সহিত অন্য বংশােদ্ভব জন অপেক্ষা অধিক স্নেহ- ভাব জন্মিবে, তাহার সন্দেহ কি ? দেখা যায়, বিদেশে হঠাৎ কোন স্বদেশীয় ব্যক্তির সন্দর্শন হইলে হৃদয়ে কতই আনন্দ উদয় হয়। আবার যদি পরস্পরের পরিচয়ে সে ব্যক্তি স্বসম্পর্কীয় জানা যায়, তাহা হইলে সে আনন্দ আরও কত বুদ্ধি হইয়া উঠে। স্বদেশীয় ব্যক্তি যেমন সহজে জানা যায়, তাহার পরিচয় না জানিলে তিনি স্বসস্পর্কীয় কি না তাহা তেমন জানা যায় না। কিন্তু আপনাপন বংশাবলী অজ্ঞাত থাকিলে সেই সুখের পরিচয়ের সম্ভাবনা কি? যদি আমি আপন প্রপিতামহের নাম অজ্ঞাত থাকি এবং আমার জ্ঞাতিও তাহার প্রপিতামহের নাম অনবগত থাকেন, তবে উভয়ের যে এক প্রপিতামহ, তাহা কিরূপে প্রকাশ পাইবে ? দেখ, আমরা উভয়েই এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকাতে আম-, দের যে এত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে, তাহা কিছুই জানিতে পারা গেল না, এবং পরস্পরের যে আনন্দ হইত অথবা কোন প্রয়ােজন থাকিলে তাহা সিদ্ধ হইত তাহা ঘটিল না। শ্রেণী গাই গােত্র ইত্যাদিও বংশের পরিচয় বিশেষ। একরূপ নাম অনেকের থাকিতে পারে, সুতরাং শুদ্ধ পূৰ্বপুরুষের নামােল্লেখ হইলেই উভয়ই এক বংশাে- দ্ভুত কিনা, তাহা জানিতে পারা যায় না। যদি নামের সঙ্গে গাই গােত্র ইত্যাদি মিলিয়া যায়, তবেই উভয় যে একের সন্তান, তাহাতে আর সন্দেহ থাকে না। আমি দেখিয়াছি যে আমার গুরুজনেরা প্রতিবেশী ভিন্ন শ্রেণীর লােকদের ৬ আত্ম-জীবনচরিত। ও পূর্বপুরুষের নাম কিয়ৎ পরিমাণে স্মরণ রাখিতেন। তাঁহাদের মধ্যে কোন যুবা অপরিচিত থাকিলে তঁহার পিতার নাম জিজ্ঞাসা করিতেন এবং ইহার উত্তর পাইবামাত্র তাহার পিতামহ প্রভৃতির নাম উল্লেখ করিয়া তাহাকে কতই সুখী করিতেন, এবং তাহার সুখে আপনারাও সুখী হইতেন । এক্ষণে আমরা সভ্যতাভিমানী হইয়া এইরূপ অনেক সুখে জলাঞ্জলি দিয়াছি। বিদ্যারম্ভগুরুমহাশয় । তৎকালে প্রায় সকল ভদ্র গ্রামেই একজন গুরুমহাশয়ের পাঠশালা থাকিত। আমাদের গ্রামের ভিন্ন পাড়ায় এক পাঠশালা ছিল। কিন্তু আমাদের পাড়ায় ইহা ছিল কি না তাহা স্মরণ হয় না। কেবল এই মাত্র স্মরণ হয়, যেন কিছু দিনের জন্য একবার একজন গুরুমহাশয় আমাদের বাটীতে ছিলেন। আমা- দের বাটীর সকল বালকেই গুরুজনের অথবা তাহার কোন কর্মচারীর নিকট বাঙ্গালা লেখা পড়া করিত। বােধ হয়, আমরা কর্তাদের সহিত কথন নীল- কুটিতে কখন গােলাবাটীতে থাকিতাম বলিয়া অথবা শৈশবস্থায়ই পারস্য-ভাষায় শিক্ষা আরম্ভ হইবে বলিয়া গুরুমহাশয়ের প্রয়ােজন বােধ হইত না। তদানীন্তন গুরুমহাশয়দের যেরূপ বিগহিত আচরণ এবং শিক্ষা দিবার যেরূপ জঘন্য নিয়ম ছিল, তাহা ইদানীন্তন যুবকবৃন্দের সহজে বিশ্বাস্য হইবার নয় । তাহাদের পাঠশালায় বালবুদ্ধিসুলভ কোন পাঠ্য পুস্তক ছিল না এবং কোন নীতিগর্ভ মিষ্ট গল্প বালকের কর্ণগােচর হইত না। কেবল ক্রোড়ে তালপত্র বা কদলীপত্র, সর্বাঙ্গে মসীরেখা এবং গুৰুমহাশয়ের রক্তবর্ণ চক্ষু ও মুষ্টিবদ্ধ হন্তের বেত্র দৃষ্ট হইত। আর “পড়ে পড়ে ল্যাখ, তুই বেটা বড় হারামজাদা” এইরূপ কর্কশধ্বনি মধ্যে মধ্যে কর্ণকুহরে প্রবেশ করিত। প্রথমে এই সকল দর্শনে ও শ্রবণে শিশুর কোমল হৃদয় কম্পিত হইতে থাকিত, তাহার পর বিদ্যা আরম্ভ হইলে নীরস ও কঠিন অঙ্ক অভ্যাসে মন দিতে হইত। ইহার উপর আবার গুরুমহাশয়ের নির্দয় ব্যবহারে , তাহাদিগকে ব্যথিতহৃদয় করিত। কোন বিষয় ছাত্রের বােধগম্য করিয়া দিবার জন্য গুরুমহাশয় কোমল ভাব অবলম্বন করিতেন না। বালক শিক্ষা বিষয় বুঝিতে না পারিলে তাহার প্রতি নানাবিধ কটুক্তি প্রয়ােগ করিতেন, এবং কখন কখন তাহার সুকুমার গুরুমহাশয়ের পাঠশালা । ৭ শরীরে প্রহার করিতে সঙ্কুচিত হইতেন না। কেহ কাহাকে পীড়া দিলে পীড়িত ব্যক্তি তাহার প্রতীকারের জন্য আত্মীয় স্বজনের নিকট ক্রন্দন করে। আত্মী- য়েরা নিজে অক্ষম হইলে রাজসন্নিধানে উপস্থিত হয় । যদি রাজপদাতিকও কোন ব্যক্তিকে ধৃত করিয়া লইয়া যাইতে থাকে, তাহাকেও উদ্ধার করিবার নিমিত্ত লােক কখন কখন ধাবিত হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্য বালককে যখন বলবান্ ছাত্রগণ আকর্ষণ করিয়া লইয়া যাইত, তখন কেহই তাহার সহায় হইত না, বরং উৎসাহ প্রদান করিত। গুরু মহাশয় বালককে যতই পীড়ন করুন না কেন, গুরুজন তাহার ক্রন্দনে কর্ণপাত করিতেন না। সুতরাং ছাত্রেরা গুরু মহাশয়কে যমস্বরূপ জ্ঞান করিত। কোন কোন বালক পাঠশালা হইতে পলায়নকালে ব্যাঘ্র, সর্প, ভূত, প্রেত কিছুরই ভয় করিত না। আমার সমবয়স্ক স্বসম্বন্ধীয় কয়েকজন বালক কৃষ্ণনগরের চৌধুরীদিগের বাটীর পাঠশালায় শিক্ষা করিতেন। ঐ পাঠশালার গুরুমহাশয় বর্ধমান- অঞ্চল-নিবাসী এবং কায়স্থজাতীয় ছিলেন। তাহাকে যে বালক তাহাকে যে বালক কিছু খাদ্য দ্রব্য দিতে পারিত, তাহার প্রতি সদয় থাকিতেন, এবং তাহার অনুপস্থিতি বা শিক্ষায় অমনোেযােগ জন্য কোন শাস্তি পাইতে হইত না। আমার এক সুচতুর বাল্যসখা তাহার পাঠশালার ছাত্র ছিলেন। তিনি কখন কখন তাহার মাতুলা- লয়ে আসিয়া ২৪ দিন থাকিতেন। প্রতিগমনকালে আমাদের এক প্রসিদ্ধ সুমিষ্ট বিল্ববৃক্ষ হইতে দুই একটি বেল পাড়িয়া গুরুমহাশয়ের নিকট গমন পূর্বক কহিতেন, মহাশয় ! আপনার নিমিত্ত দুইটী উত্তম বেল আনিয়াছি। তিনি আহলাদ প্রকাশিয়া জিজ্ঞাসা করিতেন, তুমি এ কয়েক দিন কেন গাইস নাই? বালক উত্তর করিতেন, মামার বাটী যাইয়া আমার জ্বর হইয়াছিল। ইনি যখনই অনুপস্থিত থাকিতেন, তখনই এইরূপে গুরুমহাশয়ের রাগের শান্তি করি- তেন। কখন তিরস্কৃত বা প্রহরিত হয়েন না। এই পাঠশালায় আমার এক পিসতুত ভ্রাতা ভালরূপ শিক্ষা না করাতে সৰ্ব্বদাই দণ্ডিত হইতেন। প্রথমে মধ্যে মধ্যে পলাইয়া আমাদের বাটীতে আসিতেন। কিন্তু গুরুমহাশয়ের দুতেরা গুপ্তভাবে আসিয়া তাহাকে ধৃত করিয়া লইয়া যাইত। কাহারও বাটীতে রক্ষা পাইবার অনুপায় দেখিয়া একদা এক বাররাওয়ারী-ঘরে মাচার উপর অনাহারে এক দিবা ও এক রাত্রি থাকেন। একদা শীতকালে মাঠে অড়হরের ক্ষেত্র- আত্ম-জীবনচরিত। মধ্যে রজনী যাপন করেন। ঐ গুরুমহাশয় চৌধুরী-বাটীর এক বালকের গও- দেশে এরূপ বেত্রাঘাত করেন যে, তাহার চিহ্ন তাহার যৌবনাবস্থা পর্যন্ত ছিল । দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ বয়স, ৫ হইতে ১২ বৎসর। এক লাল শিক্ষক মাতাল। দুই “ওস্তাদ”, চোর। একজন ( কাষস্থ ) শিক্ষক, বায়ুগ্রস্ত। উপনয়ন। গোলাবাগী ও তালুকের নীলকুঠীতে অবস্থান ও পারস্যবিদ্যারম্ভ। পুনম, গােলস্ত', বুস্তা, জামেজল কওয়ালিন, মতলবু, জোলে খা। তৎকালে কলিকাতা ও তৎসন্নিহিত আট দশ ক্রোশের বহির্দেশে ইংরেজী শিক্ষার বড় প্রথা ছিল না। সে সময় স্কুলের শিক্ষকের ও কেরাণীর পদ ব্যতীত ইংরেজীতে আর কোন কৰ্ম্ম মফঃস্বল দৃষ্ট হইত না ; এবং এই সকল • পদের বেতন বা মান অধিক ছিল না। দেশের সমস্ত জেলার রাজ কাৰ্য পারস্য ভাষায় নিৰ্বাহ হইত। সে সকল পদের বেতন অধিক না হউক ; উংকোচ যথেষ্ট লাভ হইত, এবং পদের ও গৌরব বিলক্ষণ ছিল। এই কারণে মফঃস্বলের প্রধান পরিবারের আপন আপন সন্তানদিগকে ইংরেজী বিদ্যা শিক্ষা না দিয়া পারস্য বিদ্যা শিক্ষা দিতেন। অষ্টম বর্ষে আমার পারস্য বিদ্যারম্ভ হয়। প্রথমতঃ একজন হিন্দুস্থানীয় লালা শিক্ষক নিযুক্ত হন। তিনি তিন টাকা বেতন পাইতেন ও বাটীতে আহা- রাদি করিতেন। আমি ও আমার পিতৃব্যপুত্র মধুসূদন রায় তঁাহার নিকট পাঠীরম্ভ করি। মধুসূদনকে অামি মধ্যম দাদা বলিয়া ডাকিতাম, এবং এক্ষণেও বলিয়া থাকি। কিয়ৎকালানন্তর শিক্ষকের সুরাসক্তি-দোষ প্রকাশ হল । তৎকালে আমিনবাজার ব্যতীত কৃষ্ণনগরের আর কোন স্থানে মদিরা প্রস্তুত বা বিক্রীত হইত না। তিনি প্রত্যহই মধ্যাহ্নে ঐ বাজার হইতে মদ্যপান করিয়া যাইতেন, এবং কখন সামান্য দেয়ে আমাকে পীড়ন করিতেন । এ কারণে গুরুজনেরা তাহাকে বিদায় করিয়া এক মুসলমানকে তাঁহার স্থানে নিযুক্ত করলেন। C নূতন গুরুমহাশয়। ৯ এ ওস্তাদের পান-দোষ ছিল না বটে, কিন্তু বিষম দোষান্তর প্রকাশ হইল। তিনি আহারীয় সামগ্রী ব্যতীত মাসিক তিন কি চারি টাকা বেতন পাইতেন। এবং ভাণ্ডার হইতে কোন কোন খাদ্য দ্রব্য আমাদের দ্বারা চুরি করিয়া লই- তেন। তাহার সন্তোষ সাধন করিতে পারিলে আমাদের প্রতি সদয় থাকিতেন, এ কারণে তিনি যাহাতে সন্তুষ্ট থাকেন, তাহারই চেষ্টা করিতাম। নিবারণ রায় নামক একটি প্রতিবেশী বালক অামাদের সহপাঠী ছিলেন। তাহার উপনয়ন উপস্থিত হইলে আমার অজ্ঞাতসারে মধ্যম দাদার ও ঐ বালকের সহিত পরামর্শ স্থির হয় যে, উপনয়নের লব্ধ ভিক্ষার টাকা হইতে মধ্যম দাদার দ্বারা ৫ টাকা ওস্তাদের নিকট পাঠাইবেন। নির্ধারিত দিবসে মধ্যম দাদা উপস্থিত হইলে নিবারণ কহিলেন যে, বাক্সের চাবি পিতার নিকট আছে। দাদামহাশয় আপন চাবি দ্বারা বাক্স খুলিয়া টাকা আনিয়া ওস্তাদকে দিলেন। পরদিবস বালকের পিতা বাক্সের মধ্যে টাকার সংখ্যা নুন দেখিয়া বালককে তাড়না করাতে, তিন ইহার প্রকৃত অবস্থা পিতাকে জ্ঞাপন করিলেন পিতা আমাদের কর্তৃপক্ষকে বিদিত করিলেন ও মধ্যম দাদাও অপহরণ স্বীকার করিতে বাধ্য হইলেন। সুতরাং ওস্তাদকে দুরীভূত করা হইল। তদনন্তর ক্রমান্বয়ে আর দুই ওস্তাদ নিযুক্ত হন। তাহাদের দোষগুণের কথা স্মরণ নাই। প্রাতঃকাল অবধি বেলা দেড় প্রহর পর্যন্ত ও তৃতীয় প্রহর হইতে রাত্রি দেড় প্রহর পর্যন্ত ওস্তাদের গৃহে থাকিয়া পড়িতে হইত, কিন্তু তিন বৎসরের মধ্যে একখানি পুস্তকেরও পাঠ সমাপ্ত হয় নাই। এই দুই ওস্তাদ অাপনারাই বিদায় হন, কি কর্তারা তাহাদিগকে বিদায় করেন, তাহা স্মরণ হয় না। পঞ্চম ওস্তাদের সময় আমার অগ্রজের বিবাহ উপস্থিত হইলে, ব্রাহ্মণ ভােজ- নের জন্য নানাবিধ খাদ্য দ্রব্য সংগৃহীত হইল। ওস্তাদের আর আনন্দের সীমা থাকিল না। মধ্যম দাদা ভাণ্ডার-গৃহের জানালা দিয়া খাদ্য দ্রব্য আমার হস্তে দিতেন, আমি তাহা ওস্তাদের গৃহে পৌছিয়া দিতাম। বিবাহের তিন চারি দিন পূৰ্বে এক রাত্রিতে ভাণ্ডার হইতে কোন কোন দ্রব্য চুরি করিয়া আনিবার নিমিত্ত আমি প্রেরিত হইলাম। আমি দ্রব্যজাত সহিত প্রত্যাগত হইলে দেখি লাম, ওস্তাদ জ মহা-আনন্দে মধ্যম দাদার সহিত কথােপকথন করিতেছেন।
আত্মজ্জীবনচরিত। । আমাকে দেখিবামাত্র কহিলেন, অদ্য আর পড়িতে হইবে না, তােমাদিগকে ছুটা দিলাম। ওস্তাদজিকে সদয় দেখিয়া বড়ই আনন্দিত হইলাম, কিন্তু তাহার এতাধিক সদয় হইবার কারণ কিছু বুঝিতে পারিলাম না। বিবাহের পর তৃতীয় দিবসের প্রাতে মধ্যম দাদা কৰ্ত্তাদিগকে কহিলেন যে, “ওস্তাদজি আমাকে কহিয়াছিলেন যে, ( বিবাহের পর দিবস যখন পাত্র পাত্রীকে বরণকরণার্থ সম- রােহ হইবেক, তখন তুমি তোমার ভাইয়ের গলা হইতে স্বর্ণহার খুলিয়া আমাকে আনিয়া দিবে।) আমি ভয়ে মত হইয়াছিলাম । কিন্তু তাহার কথামত কাৰ্য করিতে পারি নাই। কল্য রাত্রি তিনি আমাকে অত্যন্ত তাড়না করিয়াছেন। অদ্য তাহার ঘরে যাইলেই কোন ছলে আমাকে পীড়ন করিবেন। অতএব তঁাহার ঘরে যাইয়া পড়িবার সাহস হইতেছে না।” এই বৃত্তান্ত শ্রবণে কর্তারা কি করিবেন বিতেছেন; এমত সময় ওস্তাদ আসিয়া আমাদিগকে ডাকিয়া কহি, ন যে, “আমার ঘরের এ টে। সাফ করিয়াছি, তােমরা আমার সঙ্গে আইস।” ওস্তাদের বাসের নিমিত্ত একখানি তৃণাচ্ছাদিত গৃহ ছিল। তাহার একাংশে তিনি রন্ধন ও ভােজন করিতেন, অপরাংশে একখানি কাষ্ঠাসনের উপর বসিয়া আমরা পড়িতাম। উভয়ংশের মধ্যে একটি সামান্য অবরণ ছিল। অংশে আমরা বসিতাম, তাহা উচ্ছিষ্ট হইবার সম্ভাবনা ছিল না, সুতরাং আমার ঘরের এঁটো সাফ করিয়াছি, তোমরা আমার সঙ্গে আইন,—“শিবের মন্দিরে কে, আমি কলা খাই নাই” ;-সেইরূপ অসঙ্গত কথাতে, মধ্যম দাদার বাক্য সত্য জ্ঞান হইল। ওস্তাদের এ কথা বলিবার কোন প্রয়ােজন ছিল না; যে হেতুক তৎকালে শুদ্ধাশুদ্ধের বিষয়ে আমাদের কোন বিশেষ জ্ঞান হয় নাই। যাহ। হউক, ওস্তাদজি বিদায় হইলেন; এবং অামরাও আপাততঃ নিশ্চিন্ত হইলাম। বােধ হয়, ১২৩৭ বঙ্গাব্দে উপরি উক্ত ঘটনা হইয়াছিল । এই বৎসর আমার উপনয়ন হয়। তখন আমার বয়স ১১ বৎসর। ইদানীং যে যজ্ঞসূত্র যুবকেরা অশ্রদ্ধা বা অনাবশ্যক বােধ করিয়া ত্যাগ করিতেছেন, সেই যজ্ঞসূত্রের জন্য তদানীন্তন বালকেরা লালায়িত হইত, এবং অদ্যাপি : অনেক বালক হইয়া থাকে। গত বর্ষে আমার উপনয়নের দিন স্থির হয়, কিন্তু তাহার পূর্ব দিবস সন্ধ্যাগৰ্জন হওয়াতে উহা ঘটে নাই । এই দুর্ঘটনাতে আমি কতই দুঃথিত হইয়াছিলাম, এবং মাতা ঠাকুরাণীকে, ক্রন্দন করিয়া কতই জ্বালাতন করিয়া- বালকের উপনয়ন। ছিলাম। এই উপলক্ষে আমার জন্য এক জোড়া হরিদ্রাবণের কার্পাসবস্ত্র আনীত হইয়াছিল। উপনয়ন না ঘটাতে তাহা ফেরৎ দেওয়া হইল। এই বস্তু ফেরৎ দেওয়াতে আমার যত দুর দুঃখ হইয়াছিল, বােধ হয়, ব্রাহ্মণ হইতে না পারাতে তত দুঃখ হয় নাই। আহা ! দেশের কি দুর্দশাই ঘটিয়াছে। পূর্ব সুগঠিত দ্রব্য ভগ্ন হইল, অথচ তৎপরিবর্তে কোন উত্তম দ্রব্য পুননিৰ্মিত হইল না। অতি প্রাচীন কালে উপবীত না হইলে বেদাধ্যয়নে অধিকার হইত না বলিয়া বালককে উপবীত ধার! করাইয়া উপযুক্ত গুরু সন্নিধানে প্রেরণ করা হইত, এবং বালক যথোচিত পাঠ সমাপনান্তে পিতৃনিকেতনে প্রত্যাগত হইত। এ বিষয় বহু কালাবধি এ দেশস্থ লােকের চিন্তাতীত হইয়াছে। ইদানীং কেবল ব্রাহ্মণ হইবার জন্য যজ্ঞ- সূত্রের প্রয়োজন, ইহাই সকলের বােধ আছে। কিন্তু কি কি গুণযুক্ত হইলে ব্রাহ্মণ নাম ধারণের উপযুক্ত হওয়া যায়, তাহার বিচার-চক্ষু এক কালে অন্ধ হইয়াছে। পূৰ্ব্ব কালের জ্ঞান লাভের জন্য যে উপনয়নের প্রয়ােজন হইত, তাহা এই কালে কেবল ঠাকুরপূজা করিবার ও ফলাহার লাভের নিমিত্ত হইয়াছে। যাহা হউক, স্কুলের উচ্চ শ্রেণীতে উঠিলে বালকের মনে যেরূপ আনন্দ হয়, সেইরূপ উপবীত হইলে ব্রাহ্মণ হইয়। উচ্চ শ্রেণীতে উঠিব, এই ভাবিয়া, বালকের হৃদয়ে আলাদ উপস্থিত হইয়া থাকে। কর্তাদের মুসলমান শিক্ষকের প্রতি অশ্রদ্ধা জন্মিবাতে, একজন কায়স্থ জাতীয় শিক্ষক নিযুক্ত করিলেন। তিনি অতি শান্তস্বভাব ছিলেন, এবং আমাদের প্রতি সতত সদয় থাকিতেন, কিন্তু কিঞ্চিৎ বায়ুগ্রস্ত ছিলেন। তাহার কৃষ্ণবর্ণ প্রযুক্ত আমাকে কখন কখন কহিতেন যে, “তুমি অধিক দুগ্ধ পান করিতে পাও বলিয়া এত গৌরাঙ্গ হইয়াছ, যদি আমি অন্ততঃ এক পােয়া ও পাই, তথাপি গৌরবর্ণ হইতে পারি।” এইরূপ বুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষকের নিকট যেরূপ.শিক্ষা হইল, তাহা লেখা বাহুল্য। এক বৎসর পরেই তিনি প্রস্থান করিলেন, 'এবং অপেক্ষাকৃত এক, যােগ্যতর মুসলমান শিক্ষক নিযুক্ত হইলেন। যত দিন আমি বাঙ্গালা লেখাপড়া করিতাম, তত দিন প্রায়ই পিতার সহিত তাঁতিমা গ্রামের গোলাবাটীতে থাকিতাম।'; তাহাকে অত্যন্ত ভয় করিতাম, অথচ তাহাকে না দেখিয়া থাকিতে পারিতাম না। যদি কথন আমাকে সঙ্গে না লইতেন, তবে নিরন্তর কঁদিয়া মাতাঠাকুরাণীকে অস্থির করিয়া আত্ম-জীবনচরিত। ; দিতাম । সুতরাং তিনি আমাকে পিতার নিকট পাঠাইয়া দিতেন। এই গােল- বাটী অতি সমৃদ্ধিশালী ছিল, এবং তথায় কৃষিকাৰ্য্যও বাহুল্য পরিমাণে চলিত । পূৰ্ব্বে জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় এই বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি রাজ- বাটীর আমিনী-পদে নিযুক্ত হইলে পিতাঠাকুর এই গোলাবাটীর কারবারের ও কৃষিকার্যের অভিভাবকতা করিতেন। মধ্যমত মহাশয় আমাদের শকদহ ও ভগবানপুর নামে যে দুই দরপত্তনি তালুক ছিল ও তাহাতে যে নীলকুঠী ছিল, তাহার তত্ত্বাবধারণে নিযুক্ত থাকিতেন। আমার পারস্যবিদ্যারম্ভ করণের দুই বৎসর পরে ওস্তাদের সহিত উক্ত কুঠীতে বৎসরের কিয়দংশ কাটাইতাম। বাটী থাকিলে পাছে কেবল খেলা করিয়া বেড়াই, এই জন্য আমাদিগকে কুঠী লইয়া যাওয়া হইত। ঐ দুই তালুকে ইতর জাতি ব্যতীত ভদ্র লােকের বসতি ছিল না। সুতরাং প্রতিবাসী কোন বালকের সহিত সাক্ষাৎ হইত না; দিবারাত্রি বন্দীর ন্যায়, কুঠীতে বদ্ধ থাকি মি। পলদীবিলের উভয় পার্শ্বে এই দুই গ্রাম অবস্থিত। বিলের ধারে এই কুঠী ছিল, এবং তাহার সম্মুখে এক বিস্তৃত মাঠ দৃষ্ট হইত। যখন বর্ষাকালে এই সুবিস্তৃত ক্ষেত্রে নবীন শ্যামল ধবৃক্ষরাজি শোভা পাইত ও যখন পবন-হিল্লোলে এই সকল নৃত্য করিতে থাকিত, তখন কি মনােহর সৌন্দৰ্য দৃষ্ট হইত। অথবা শীত- কালে যখন ঐ মাঠ সর্ষপবৃক্ষসমূহে আচ্ছাদিত হইত, তখন কি আশ্চর্য শােভা ধারণ করিত। বােধ হইত, যেন সমস্ত ক্ষেত্রে স্বর্ণ বৃক্ষরােপিত হইয়াছে । বিস্তু কি উ লতরঙ্গমালাসঙ্কুল সাগর সন্নিধানে, কি অত্যুচ্চ শােভনীয় শৈলশৃঙ্গ, কি বিশাল বৃক্ষ-পূর্ণ রমণীয় গহনকাননে, কি অমরাপুরীসম অতি মনোহর নগরে, কোন স্থানেই বন্দীর সুখানুভব হয় না। আমরা একে বালক, তাহাতে বন্দীর ন্যায় অবস্থিত, সুতরাং আমাদের এ সকল স্বাভাবিক সৌন্দৰ্য্য সন্দর্শনে সুখলাভ হইবার সম্ভাবনা কি ছিল, আমরা বাল্যসখাদের সহবাস মুখে বঞ্চিত হইয়া সৰ্ব্বদাই অসুখে কাল যাপন করিতাম । কত দিনে আবার তাহাদের সঙ্গে সুখ ভোগ করিব, ইহাই ভাবিয়া ম্রিয়মাণ থাকিতাম। একে পাঠ্য পুস্তক আমাদের বুদ্ধির নিতান্ত অগম্য, তাহার উপর আবার শিক্ষকের অপ্রীতিকর ব্যবহার ছিল। সুতরাং যতক্ষণ ওস্তাদ সমীপে থাকিতাম, ততক্ষণ যে আমাদের কি কষ্টে যাইত তাহা বর্ণনা করা যায় না। প্রথমে আমরা সেখ মসলহার্দন পরমেশ্বর-চিন্তা। সাদীর রচিত পদনাম ( উপদেশপুস্তক) নামে নীতিগর্ভ পদ্যপুস্তক একখানি পাঠ করি। এখনি অতিক্ষুদ্র ও অতি সরল ভাষায় লিখিত। ইহার প্রথম অধ্যায়ে ঈশ্বর-বন্দনা, ২য় অধ্যায়ে আত্মােপদেশ, ৩য় অধ্যায়ে দয়ার মাহাত্ম , ৪র্থ অধ্যায়ে দানের গুণ, ৫ম অধ্যায়ে কৃপণতার দোষ, ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে নম্রতার গুণ, ৭ম অধ্যায়ে অহঙ্কারের দোষ, ৮ম অধ্যায়ে বিদ্যার মহিমা, ৯ম অধ্যায়ে মুঢ়- সঙ্গত্যাগ, ১০ম অধ্যায়ে সুবিচার, ১১শ অধ্যায়ে দৌরাত্মোর নিন্দা, ১২শ অধ্যায়ে সন্তোষের গুণ, ১৩শ অধ্যায়ে লোভের দোষ, ৪শ অধ্যায়ে ঈশ্বরের বশ্য থাকেন, ১৫শ অধ্যায়ে কৃতজ্ঞতা, ১৬শ অধ্যায়ে সত্যের মহিমা, ১৭শ অধ্যায়ে মিথ্যায় অযশ, ১৮শ অধ্যায়ে সংসারের অনিত্যতা, ১৯শ অধ্যায়ে সম্পদের অস্থায়িত্ব, এবং ২০শ অধ্যায়ে সংসারাসক্তির দমন কীৰ্ত্তিত হইয়াছে । এই সকল উপদেশ অতি সংক্ষেপে ও অতি সরল ভাষায় পারস্য বালক বৃন্দের নিমিত্ত রচিত হয়। এই- রূপ সরল ভাষায় রচিত বাঙ্গালা ভাষায় পুস্তক যেরূপ বঙ্গীয় বালকের বােধগম্য হয়, সেইরূপ এই পদ নাম পারস্য বালকগণের বােধগম্য হইয়া থাকে, কিন্তু বিদেশীয় বালকের এই পুস্তিকার অর্থ কিরূপে হৃদয়ঙ্গম হবে ও তাহার পাঠেই বা কি লাভ হইবে ? কারণ তৎকালে কোন পারস্য পুস্তকের অর্থ বঙ্গভাষায় শিখান হইত না। উর্দু ভাষায় অর্থশক্ষার পদ্ধতি ছিল। বিশেষতঃ বালককে পদনামার অর্থ অভ্যাস করাইবার প্রথাই ছিল না; কেবল তাহার আবৃত্তি করান হইত। যদি এই পুস্তিকা বাঙ্গালা অর্থের সহিত পড়ান হইত, তাহা হইলে বালকেরা অবশ্যই কিছু উপকার পাইত। আমাদের পন্দনামার কিয়দংশ পঠিত হইলে ঐ সাদীর বিরচিত গােলস্তু। অর্থাৎ গোলাপ ফুল-কানন নামে গ্রন্থের পাঠারম্ভ হয়। এইখানি গদ্যে পদে রচিত এবং অষ্ট অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রতি অধ্যায়ে সত্য অসত্য নানাবিধ গল্পে বিবিধ প্রকার সুনীতি প্রদর্শিত হইয়াছে । উপক্রমণিকার অারম্ভ পারস্যরীত্যনুসারে প্রথমে ঈশ্বরের মহিমা বর্ণন, তৎপরে মহম্মদ ও পয়গম্বরের মাহাত্ম্য কথন, তদনন্তর স্বদেশের রাজার যশঃ কীৰ্ত্তন হইয়াছে। তাহার পর রচয়িতা এই গ্রন্থ-রচনার এইরূপ কারণ লিখিয়া- ছেন যে, সংসাবে লিপ্ত থাকিলে নানাবিধ পাপে মুগ্ধ হইতে হয়, অতএব নির্জনে বসিয়া কেবল ঈশ্বর আরাধনায় জীবনযাপন করিব, একদা এই মনে ১৪ আত্ম-জীবনচরিত। ২ ভাবিয়া গৃহাভ্যন্তরে পয়মেশ্বরের চিন্তায় চিকাৰ্পণ করিলাম। কিছু দিন পরে আমার এক পরম প্রিয়তর বান্ধব আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলে ভৃত্যগণ তাহাকে অস্মদের মানসিক অবস্থা ও প্রতিজ্ঞা জ্ঞাপন করে। তিনি পূৰ্ব্বসখ্যের বলে তাহাদের নিষেধ না মানিয়া আমার সন্নিহিত হইলেন, এবং এইরূপ মিষ্ট ভৎসনা করিতে লাগিলেন যে, কেবল আত্মােপকার লাভে মন নিবিষ্ট করা তােমার ন্যায় পণ্ডিতবরের উচিত হয় না । যাহাতে অন্যের উপকার হয় তদ্বিষয়ে তােমার চিত্ত সংযােগ করা কর্তব্য। তােমার মৌন হইয়া থাকা কোনও মতেই বিধেয় হয় না । কহিবার শক্তি তব আছে হে এখন, আনন্দে করহ ভ্রাতা কথােপকথন। কল্য যবে যমদূত উপনীত হবে, কঠিন আদেশে তার বাকহীন রবে। বন্ধুর এই কথা শ্রবণে আমার যেন চক্ষুরুন্মীলন হইল। আমি তঁাহার হৃদয়-গত ভাবানুসারে এই গ্রন্থ রচনায় প্রবৃত্ত হইলাম। এই গ্রন্থ অষ্ট অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে রাজচরিত্র, ২য় অধ্যায়ে ফকিরের কর্তব্য, ৩য় অধ্যায়ে সন্তোষের উৎকর্ষ, ৪ অধ্যায়ে মোনাবলম্বনের গুণ, ৫ম অধ্যায়ে যৌবন ও (প্রেম, ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে বৃদ্ধাবস্থা, ৭ম অধ্যায়ে বিদ্যাশিক্ষার গুণ, এবং ৮ম অধ্যায়ে জীবনযাপনের সুপ্রণালী অতি সুন্দররূপে বিবৃত হইয়াছে। বিবৃত হইয়াছে। প্রথমে আমরা এই গ্রন্থেরও আবৃত্তি করিতে থাকি। পরে এক অধ্যায় পাঠ হইলে, পুনরায় প্রথম অধ্যায় হইতে উদ্দ, ভাষায় ইহার অর্গ সহিত অধ্যয়ন করিতে আরম্ভ করি। দুই অধ্যায় পঠিত হইলে ঐ গ্রন্থকর্তার বিরচিত বুস্তা (সৌর ভাষার ) নামে একখানি নীতিসার পদ্যপুস্ত- কের পাঠারম্ভ হয়। এই গ্রন্থ সূচনার এইরূপ কারণ প্রদর্শিত হইয়াছে যে, আমি পৃথিবীর অনেক স্থান ভ্রমণ করিয়াছি, এবং বহু ব্যক্তির সংসর্গের ফল প্রাপ্ত হইয়াছি। বিদেশ হইতে প্রত্যাগমনকালে আত্মীয় স্বজনের নিমিত্ত কি মিষ্ট দ্রব্য লইয়া যাই, মনােমধ্যে এই আলোচনা করিয়া দেখিলাম যে, বাক্যের অপেক্ষা কিছুই মিষ্টতর দ্ৰব্য নাই। অতএব তাহাদিগকে উপহার দিবার জন্য এই বুয়াগ্রন্থ রচনা করিলাম।
বালকের নীতিশিক্ষা। • বুন্ত। দশ অধ্যায়ে বিভক্ত। ১ম অধ্যায়ে প্রজাপালনার্থে বিচার, উদ্যোগ, বিবেচনা, প্রজার রক্ষা, ধৰ্ম্ম ভয় ; ২য় অধ্যায়ে ধনবানেব সুখসচ্ছতা জন্য ঈশ্বর সমীপে কৃতজ্ঞতা ; ৩য় অধ্যায়ে স্বাভাবিক প্রেম ; ৪র্থ অধ্যায়ে বিনয় ; ৫ম অধ্যায়ে ঈশ্বরের প্রতি নির্ভর ; ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে সন্তোষ ; ৭ম অধ্যায়ে জ্ঞানার্জন ; ৮ম অধ্যায়ে স্বাস্থ্য জন্য কৃতজ্ঞতা ; ৯ম অধ্যায়ে অনুতাপ ও সৎপথাবলম্বন ; ১০ম অধ্যায়ে ঈশ্বরের উপাসনা । গােলেস্তার ন্যায় এই কয়েক অধ্যায়েও গল্প উপলক্ষে বিবিধ সদুপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে। গােলেস্ত। ও বুস্ত, উভয় গ্রন্থই অতি উচ্চাঙ্গের ও উচ্চ শ্রেণীর পাঠোপযােগী । তথাপি এই দুই গ্রন্থের অর্গ হৃদয়ঙ্গম করাইতে পারিলে বালকদের যথেষ্ট উপ- কার হইতে পারে। কিন্তু উর্দু ভাষায় অর্থ শিখাইবার রীতি থাকাতে যৎকিঞ্চিৎ ভাষাজ্ঞান ব্যতীত বঙ্গীয় বালকগণের নীতি শিক্ষার কোন ফলই লাভ করিবার সম্ভাবনা ছিল না। কারণ, পারস্যের ন্যায় উর্দু ভাষাও বালকের বােধগম্য হইত না। যাহা হউক, তৎকালে গ্রন্থের আবৃত্তি করিতে ও উর্দু ভাষায় তাহার অর্থ বলিতে পারিলেই শিক্ষক বা গুরুজন সন্তুষ্ট হইতেন। পাঠ্য পুস্তকের প্ৰকৃতাৰ্থ পাঠকের হৃদয়ঙ্গম হইল কি না, তাহার প্রতি কাহারও লক্ষ্য হইত না। এবং বালকের সুনীতি শিক্ষা যে বিদ্যার প্রধান অঙ্গ, ইহাও তাহারা জ্ঞান করিতেন না। কতদিনে বালকেরা এই ভাষায় রচনা করিতে পারিবে, ইহাই কেবল চিন্তা করিতেন। বালকেরা গুরুজনের নিকট যে কিছু উপদেশ পাইত, এবং তাহাদের যেরূপ আচার ব্যবহার দেখিত, তাহাই তাহাদের নীতিশিক্ষার প্রধান পুস্তক হইত । সুতরাং গুরুজনের দৃষ্টান্তের উপরূ তাহাদের ভবিষ্যৎ চরিত্রের সৃষ্টি ও স্থিতি অনেক পরিমাণে নির্ভর করিত। এই কারণেই তৎকালে, যে বালকের গুরুজন যেরূপ, সে সেইরূপ হইত। কোন কোন বিষয়ে তদানীন্তন লােকের আচরণ দেবতার স্যায় প্রশংসনীয় ছিল, আবার কোন কোন বিষয়ে তাঁহাদের চরিত্র প্রেতের ন্যায় দূষণীয় দৃষ্ট হইত। দেবভক্তি, পিতৃ মাতৃ ভক্তি, ভ্রাতৃভগিনী স্নেহ, অপত্য স্নেহ, প্রতিবাসী ভালবাসা, অতিথি সৎকার, দান, ক্ষমা ইত্যাদি মহৎ বিষয়ে তাহাদের প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। আবার মিথ্যা কথন, উৎকোচ গ্রহণ, ইন্দ্রিয় দোষ ইতাদি দোষাবহ বিষয় সকল তাহাদের বিবেচনায় যৎসামান্য পাপ বলিয়া বােধ হইত । গোলেস্তা বা বুস্তর কিয়দংশ পাঠ করণানন্তর আমি জামেল কওক্সালিন, মতলুব এবং জোলেখা নামে গদ্য ও পদ্য পুস্তক সকল পড়িতে আরম্ভ করি- ১৬ আত্ম-জীবনচরিত। লাম। একজন সুলেখক তাহার আত্মীয় স্বজনকে যে সকল পত্র লিখিয়াছিলেন, প্রথম পুস্তক তৎসমূহের সঙ্কলন। দ্বিতীয় পুস্তক প্রসিদ্ধ আবুল ফজলের পিতা মুন্সী হাসমিরের কতকগুলি পত্রের সংগ্রহ। পত্রের রচনাশিক্ষার জন্য প্রথমে এই দুই পুস্তক পড়িবার প্রয়ােজন হইত। তৃতীয় পুস্তক জোলেখাতে রাজকন্যা জোলেখার ইউসফ নামে (ইয়াকুবের পুত্র জোসেফ) অদ্বিতীয় সুন্দর পুরুষের প্রেমাভিলাষের উপাখ্যান আছে। নৃপনন্দিনী অষ্টম বর্ষে ইউসফকে স্বপ্নে দেখিয়া পাগলিনী হন্ । রাজা নিয়ােজিত উপায় সমূহ বিফল দেখিয়া শেষে তাহার পদে স্বর্ণ শৃঙ্খল দেন। ইউসফ পিতার প্রিয়তম হওয়াতে সহােদরের হিংসাপরবশ হইয়া তাহাকে কোন ছলে কেনান দেশের এক কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করেন। তথা হইতে কোন বণিক তঁহাকে উদ্ধার করিয়া বিক্রয়ার্থ মিসর নগরে আইসে। তৎকালে জোলেখা মিসরদেশাধিপতির রাজমন্ত্রী আজিজের পত্নী হইয়াছিলেন। তিনি ঘটনাক্রমে ইউসফের রূপদর্শনে তাহাকে আপনার মনচোর বলিয়া স্থির করেন। এবং বহুমূল্য দিয়া ক্রয় করিয়া আনেন। তাঁহার সহচরীগণ তদীয় ক্রীতদাসের প্রতি অতিশয় অনুরাগিণী দেখিয়া তাহাকে ভৎসনা করে। একারণে মন্ত্রীপত্নী একদা কৌশলমে তাহাদিগের কয়েকজনকে এক এক লেবু দিয়া তৎসকল বানাইতে আদেশ দেন। তাহারা এই কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইবামাত্র তিনি ইউসফকে তথায় আনেন। সহচরীরা তাহার অভূতপূর্ব রূপ দর্শনে এককালে মােহিতা হইয়া লেবু কাটিতে আপনা- দের হস্ত ক্ষত বিক্ষত করে । যাহা হউক, জোলেখা ইউসফকে যতই ভালবাসুন, আর যতই তাহার প্রেমাকাঙ্কিনী হউন, ইউসফের ধৰ্ম্ম অটল ছিল । রমণী মনােরথ পূরণে হতাশ হইয়া তাহাকে কোন কৌশলে কারারুদ্ধ করেন। ইউসফ বহুকালের পর আপনার নির্দোষ প্রমাণ পূৰ্ব্বক কারামুক্ত হইয়া মন্ত্রী আজিজের প্রিয়পাত্র হন, এবং তাহার মৃত্যুর পর মন্ত্রী পদ লাভ করেন। এদিকে জোলেখা প্রেমে হতাশা হইয়া কালে বৃদ্ধা, অন্ধ এবং ভিখারিণী হন। পরিশেষে কোন অলৌকিক ঘটনায় তিনি যৌবন দশা পুনঃপ্রাপ্ত হইয়া ইউসফের • ধৰ্ম্মপত্নী হন। কৃত্রিমর। কবিরাজী চিকিৎসা। তৃষ্ণাকষ্ট। কুলীন কন্যা। কৃত্রিম করে সঙ্কট। ভীষণ শিক্ষাপদ্ধতি। ক্রমশঃ আমার বয়ঃক্রম দ্বাদশ বৎসর হইল । পূৰ্ব্বে বলিয়াছি, আমাদের কায়স্থ শিক্ষককে অনুপযুক্ত দেখিয়া কর্তারা পুনরায় মহম্মদীয় শিক্ষক এক ৩ কৃত্রিমত্ত্বর । ১৭ জনকে নিযুক্ত করেন। ইহার গুণাগুণের বিষয় স্মরণ নাই। বােধ হয়, পূর্বতন ওস্তাদগণ অপেক্ষা ভাল কে ছিলেন। সে যাহা হউক, এক্ষণে মধ্যম দাদার বিবাহ হওয়াতে আমার বিষম বিপদ উপস্থিত হইল। তাহার ও আমার এক পাঠ ছিল। তিনি পাঠ্য পুস্তকের যে অংশ পড়িতেন, আমিও সেই অংশ তঁাহার সঙ্গে সঙ্গে পড়িয়া যাইতাম। স্মরণশক্তি তাহার যাদৃশ ছিল, আমার তাদৃশ ছিল না। সুতরাং পাঠের অনেকাংশ আমার মনে থাকিত না। তাহার সঙ্গে সঙ্গে পড়িতাম বলিয়া ওস্তাদ আমার ভুল বুঝিতে পারিতেন না। তিনি শ্বশুরালয় গমন করিলে অামার গুণ প্রকাশ হইয়া বিড়ম্বনার সীমা থাকিবে না, এই ভাবিয়া আমার মনে বিষম উৎকণ্ঠা উপস্থিত হইল। কি উপায়ে এই বিপদ হইতে মুক্ত হইব, দিবারাত্র কেবল এই চিন্তা করিতে লাগিলাম। পরিশেষে এই স্থির করিলাম যে, পীড়ার ছল না করিলে এই দায় হইতে রক্ষা পাইব না। তাহার সম্ভাবিত গমনের পূর্বরাত্রিতে আমার গ্রীবার পশ্চাদ্ভাগে দংশন যন্ত্রণা হইতেছে, পিতাকে পুনঃ পুনঃ কহিতে লাগিলাম। তিনি আমার যন্ত্রণা যথার্থই হইতেছে ভাবিয়া ঘাড় টিপিতে লাগিলেন। যদিও তাহার টিপনিতে আমার বেদনা অনুভব হইতে লাগিল, তথাপি যেন যাতনার নুনতা হইতেছে, এই ভাব প্রকাশার্থে আঃ! আঃ । করিতে লাগিলাম। রাত্রি অধিক হইলে নিদ্ৰা আসিয়া সকল চিন্তা ও যন্ত্রণার শান্তি করিল। প্রত্যুষে নিদ্রা ভঙ্গ হইলে পাছে বৈদ্য আসিয়া আমার শরীরের প্রকৃতাবস্থা বুঝিতে পারেন,-এই ভাবনা উপস্থিত হইল।/বৈদ্যরাজ আসিলেন এবং নাড়ীর চাঞ্চল্য হইয়াছে কহিলেন। ভাবিলাম, আজত বাঁচিলাম ; কল্য এরূপ গেলে আর কোনও চিন্তার বিষয় থাকিবে না। দিবসে অনশনে থাকিলাম। রাত্রিতে গাত্রের উত্তাপ ও শিরঃপীড়া ইত্যাদি জবের অনেক লক্ষণ প্রকাশ হইল। বােধ হয় প্রগাঢ় চিন্তায় ও অকারণ উপব'সে এই জ্বরের আবির্ভাব হইল । পর দিবস বৈদ্য আসিয়া কহিলেন, স্পষ্ট জ্বর হইয়াছে। লােকের জ্বর ত্যাগ হইলে যেরূপ আনন্দ হয়, আমার জ্বর হওয়ায় সেইরূপ আনন্দ হইল । রােগযন্ত্রণা, অনশন ও ঔষধসেবন কষ্ট ইহার যে পরিণাম ফল হইবে, তাহা কিছুই মনে পড়িল না। উপস্থিত বিপদ হইতে যে রক্ষা পাইলাম, এই আনন্দরসে হৃদয় আদ্র হইতে লাগিল। তদানীন্তন সাধারণ বৈদ্যদের মনে এই স্থির ছিল যে, শারীরিক অস্বচ্ছন্দ না হইলে কেহ বৈদ্যকে হাত দেখায় না। সুতরাং কেহ কৃত্রিম অসুস্থ ভাব ধারণ পূৰ্ব্বক তাহাদিগকে হাত ১৮ আত্ম-জীবনচরিত। ছিল। দেখাইলেই তাহারা প্রায়ই কহিতেন যে, নাড়ীর কিঞ্চিৎ চাঞ্চল্য হইয়াছে, অদ্য আহার করিও না । বােধ হয়, তাহারা ভাৰিতেন, একদিন অনাহারে থাকিলে কোন বিশেষ ক্ষতি হইবে না। কিন্তু যদি নাড়ীর চাঞ্চল্য না বলিয়া আহার করিতে বলি, আর পরে জ্বর হয়, তবে আমাকে মূখ চিকিৎসক কহিবে। আমাদের বৈদ্যের নাম নসিরাম দত্ত, এবং বাস কৃষ্ণনগর। ইনি এখানে একজন সুবিজ্ঞ কবিরাজ বলিয়া খ্যাত ছিলেন। ইনি কবিরাজি চিকিৎসা। আমাদিগকে সন্তানের ন্যায় স্নেহ করিতেন ও বাটীতে পীড়া না থাকিলেও প্রায়ই একবার আসিতেন। সে সময়ে প্রথম দিবসে জ্বরের কোন ঔষধ দেওয়া হইত না। বিরেচক ঔষধের ব্যবস্থা অতি বিরল বিরেচক ঔষধের ব্যবস্থার প্রায় প্রথাই ছিল না। পাকস্থলীর রস পরিপাকাৰ্থ স্ত্রীলােকেরা ইসুমূল বিহু বৃক্ষের ত্বক ইত্যাদি কয়েকটা দ্রব্য জল সহিত পেষণ করিয়া সেবন করাইতেন। তৎপর দিবস হইতে পাচন দেওয়া হইত। যদি ৩৪ দিবসের মধ্যে ইহাতেও জ্বর ত্যাগ না হইত তবে বৈদ্য কিঞ্চিৎ সামান্য ঔষধ দিতেন। তাহাতে যদি প্রতিকার না হইত, তবে অষ্টাহ পরে কিঞ্চিৎ বিশেষ ঔষধের ব্যবস্থা হইত কিন্তু পাচনের ব্যবস্থা রহিত হইত না। যদি দ্বাদশ দিবসের মধ্যে রােগের শান্তি না হইত, অথবা অষ্টাহ পরে রােগ ভয়ানক আকার ধারণ করিত, তবে বিষ প্রয়ােগ করা হইত । পীড়ার অবস্থা অনুসারে কখন অষ্টাহ মধ্যেও বিষ প্রয়ােগ করা যাবৎ জ্বর থাকিত, তাবৎকাল ক্ষুধা থাকিলে শুষ্ক লাজ, পরে লাজান্ন, তৎপরে লাজমণ্ড, তৎপরে মুগের ডালের যুষ, মিষ্টান্নের মধ্যে বাতাসা ও মিছরি বা চিনি দেওয়া হইত। পানীয়ের মধ্যে কেবল সিদ্ধ জল ছিল এবং তাহাও কখন বিশ্ব ত্বক দিয়া সিদ্ধ করা হইত। ক্ষুধায় বা তৃষ্ণায় নিতান্ত কাতর না হইলে এরূপ পথ্য বা পানীয় দেওয়া হইত না। যে সকল চিকিৎসা আমি দেখিয়াছি এবং শুনিয়াছি তাহাই বর্ণন করিলাম। 7 হােমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রণালীর সহিত আমাদের বৈদ্যের চিকিৎসায় অনেক বিষয়ে ঐক্য আছে। উপবাস ঔষধের পরিমাণ ও পথ্যের নিয়ম উভয় প্রণালীতে একরূপ, কেবল আমাদের পাঁচন বাড়তি ছিল। নানা রােগের নানাপ্রকার পাঁচন ব্যবস্থা হইত। পীড়ার ননাধিক্যতানুসারে দশমূল চতুর্দশ অষ্টাদশ ইত্যাদি নানাবিধ পাচনের ব্যবস্থা হইত। বিরেচন আবশ্যক হইলে অার কাদি পচন দেওয়া হইত। চিকিৎসার প্রণালী যেরূপই হউক, তৎকালে হইত।
কুলীন কন্যা। ১৯ প্রায় অষ্টাহ মধ্যে জ্বর ত্যাগ হইত। কিন্তু পিপাসায় ও ক্ষুধায় যে কষ্ট বােধ হইত, তাহা ব্যক্ত করা যায় না। পশ্চাল্লিখিত দুইটী বিষয়ে পাঠক বুঝিতে পারিবেন যে, পূৰ্বকালীন বৈদ্য চিকিৎসায় রােগীর কি কষ্ট হইত ও কত অনিষ্ট ঘটিত। তৃষ্ণা-কষ্ট। প্রায় ৬০ কি ৭০ বৎসর পূর্বে নবদ্বীপের রাজসংসারে ন্যায়পঞ্চানন নামক একজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ও ধর্মনিষ্ঠ বৈদ্য ছিলেন। একদা তাহার অতি প্রবল জ্বর হইয়া পিপাসায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। তিনি ইচ্ছামত জলপান করিতে না পাইয়া মল ত্যাগের ছল করিয়া পাইখানায় যা এবং সেখানে বসিয়া একটা গর্তের অপবিত্র ও অস্বাস্থ্যকর জল একগাড়, পান করেন। সে সময়ে তাহার হিতাহিত বা ধৰ্ম্মজ্ঞান কিছু মাত্র ছিল না। আর একটী এমন শােচনীয় ব্যাপার ঘটে, যে তাহা অদ্যাপি আমার স্মৃতিরূঢ় হইলে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়। আমার একটী ভগিনীর ও একটি ভাগিনে- য়ীর এক সময়ে জ্বর হয়। শেষােক্তটার বয়স ৪ কি ৫ বৎসর। সেটা একে দুর্ভাগা কুলীন দুহিতা, তাহার উপর আবার তিন ভাগিনেয়ের কনিষ্ঠা । ভাগিনেয় একে কুলীন পুত্র বলিয়া অতি আদরের ধন, তাহার কুলীন কন্যা। উপর আবার তিন সহােদরের মধ্যে তিনি মাত্র জীবিত। সুতরাং সেইটীর প্রতি সকলের অধিক মনােযােগ ছিল। প্রবল জ্বর তাড়নায় অত্যন্ত তৃষ্ণা হওয়াতে বালিকা ক্রমাগত জল চাহিয়াছিল। কিন্তু শেষ রাত্রি বলিয়া কিছু মাত্র জল দেওয়া হয় নাই, প্রভাত হইলেও বৈদ্যের প্রতীক্ষায় জল দেওয়া হইল না। বেলা চারি দণ্ডের সময় বৈদ্য পিতাম্বর কবিরাজ আসিয়া বালক বালিকার নাড়ী দেখিয়া ঔষধ দিয়া গেলেন। বালা যত বারই জল চাহিল, ততবারেই ঔষধ দিয়া জল দিতেছি প্রবােধ দেওয়া হইল। প্রথমে পুত্রকে ঔষধ সেবন করান হইল, তৎপরে কন্যার মুখে ঔষধ দিতে যাইয়া দৃষ্ট হইল যে, তাহার ঔষধ সেবনের শক্তি জন্মের মত রহিত হইয়াছে। আমি তৎকালে তথায় দণ্ডায়মান ছিলাম, এবং বালিকাও জল জল বলিতেছে, তাহাও শুনিতেছিলাম। সে সময় আমার বয়স ১৩ কি ১৪ বৎসর। তথাপি তাহার অবস্থা বুঝিবার জন্য তাহার গাত্র স্পর্শ কল্পিলাম এবং নাড়ী দেখিলাম। গাত্রের বিলক্ষণ উত্তাপ আছে, কিন্তু নাড়ী কিছুমাত্র বােধ হইল না। তৎকালে পিতা বা অগ্রজ মহাশয় কেহ তথায় ছিলেন না। সুতরাং আমিই তাহাকে লইয়া বাহিরে গমনপূৰ্ব্বক বােধন বিল্ববৃক্ষ তলায় ক্রোড়ে করিয়া বসিলাম। কিন্তু যতক্ষণ ।
আত্ম-জীবনচরিত। তাহার শরীরে উত্তাপ থাকিল, ততক্ষণ আমি তাহাকে ভূমিশায়ী করিতে পারি- লাম না। বৈদ্য যখন তাহাকে দেখিয়াছিলেন, তখন তাহার মৃত্যুর কোন পূৰ্ব্ব লক্ষণ দৃষ্ট হয় নাই, এবং তাহার পরেও অর্ধ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু ঘটিবার উপযুক্ত কোন উপদ্রব দেখা যায় নাই। কেবল জল জল যে শব্দ করিতে- ছিল, তাহাই রহিত হইয়াছিল। আমার বোধ হয় যে, মৃত্যুর ৫ মিনিট পূৰ্ব্বেও তাহাকে কিঞ্চিৎ জল দিলে আর এই দুর্ঘটনা হইত না। ইটি বালিকা না হইয়া যদি বালক হইত, তবে বােধ হয় যে, তাহার পিতা মাতার ও তঁাহাদের আত্মীয় স্বজনের শশাকের সীমা থাকিত না। ধন্য কৌলীন্য ! তােমার অত্যাচারে বঙ্গের অধিকাংশ প্রদেশে যে অস্বাভাবিক ও নৃশংস ব্যাপার ঘটিয়াছে ও অদ্যাপিও ঘটিতেছে, আহা কি মুসলমান, কি মহারাষ্ট্রীয়, কাহার দ্বারায় সম্পাদিত হয় নাই। এই দুঃখাবহ ঘটনার মূল দেশের লােকের বা বৈদ্যের মূখতা তত দূর নহে, যত দুর কৌলীন্যের। কারণ এটি যদি কুলীন বালা না হইয়া কুলীন বালক হইত, তাহা হইলে তাহার যে প্রকার অসহ তৃষ্ণা হইয়াছিল। তাহাকেই অতে ঔষধ দিয়া জল দেওয়া হইত। চিকিৎসার দোষেই হউক, বা পীড়ার গতিক্রমেই হউক, আমার জ্বর ক্রমশঃ ভয়ানক আকার ধারণ করিল। অষ্টাদশ দিবসে আমার কৃত্রিমত্বরে সঙ্কট। চৈতন্য হইলে দেখিলাম, আমার পিতা ও মধ্যম জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় আমার শয্যার উভয় পার্শ্বে বসিয়া আছেন, এবং সজল নয়নে এক দৃষ্টিতে আমার মুখ নিরীক্ষণ করিতেছেন। বেলা ৪ দণ্ড আছে। জ্যেঠা মহাশয় পিতাকে বলিলেন যে “কোন ভয়ের বিষয় নাই, তুমি আহার করগে” । তৎকালে আমার মনের ভাব কি রূপ ছিল, তাহা স্মরণ নাই; দ্বাবিংশ দিবসে অন্ন পথ্য পাইলাম । একে অতিশয় দুর্বল ছিলাম, তাহার উপর জ্বর আটকিয়া গেল, সুতরাং আমার পড়া শুনা আপাতত স্থগিত থাকিল । এত যে ক্লেশ পাইলাম ও পাইতে থাকিলাম, তথাপি কিছু মাত্র অনুতাপ বা দুঃখ হইল না। হায়! সে সময় শিক্ষার কি ভয়াবহ বিকৃত প্রণালী ছিল শিক্ষকের আলয়ে না যাইবার নিমিত্ত যমালয়ে যাইতে প্রস্তুত হইয়া- ভীষণ শিক্ষা পদ্ধতি। ছিলাম। গুরু মহাশয় ও ওস্তাদজি, উভয়েই কৃতান্ত অপেক্ষাও ভয়ানক ছিলেন। পাঠশালায় যেমন প্রথমেই নীরস ও কঠিন অঙ্ক- বিদ্যা শিখাইবার রীতি ছিল। মক্তবেও তেমনই বাল-বুদ্ধির অগম্য পুস্তক সকল সুপণ্ডিত মাতুল। ব্যবহৃত হইত। উভয় স্থলেই ছাত্রগণ শিক্ষকের ইচ্ছানুরূপ শিক্ষা করিতে না পারিলে বা পঠিত বিষয় বিস্মৃত হইলে, অতি নির্দয় রূপে তিরস্কৃত বা প্রহরিত হইত। শিক্ষাতে তাহাদের মনৌযােগ নাই, ইহাই শিক্ষক ও গুরুজন বিবেচনা করিতেন, এবং কেবল মাত্র পীড়ন দ্বারা তাহাদিগকে শিক্ষায় আবিষ্ট করাইতে প্রবৃত্ত হইতেন। কিন্তু তাহারা কি জন্যে শিক্ষায় বিমুখ থাকিত, তাহার প্রকৃত কারণ বুঝিতে একবারও চেষ্টা করিতেন না। শুনিয়াছি, গুরু মহাশয়ের ভয়ে এক বালক খর্জুর বৃক্ষে আরােহণ করিয়াছিল । গুরু মহাশয়ের কোন কোন পড়য়া যাইয়া তাহাকে নামাইবার নিমিত্ত লােষ্ট্র প্রহার করিতে লাগিল। বালক নিরূপায় দেখিয়া অতি কাতরস্বরে কহিল, “হে ঈশ্বর ! যদি তুমি খেজুরের কাটায় আমার চক্ষু দুইটী অন্ধ করিয়া দাও, তবে আর আমায় পাঠশালায় যাইতে হয় না । যে লেখা পড়া জন্য ইদানীন্তন শিশুগণ পর্যন্ত আগ্রহ করে, শিক্ষা- প্রণালীর দোষে সেই লেখা পড়ার ভয়ে ১২/১৩ বৎসরের বালকেরাও প্রাণত্যাগ করিবার ও অন্ধ হইবার বাঞ্ছা করিত। তৃতীয় পরিচ্ছেদ বয়স, ১৩ হইতে ১৬ বৎসর সুপণ্ডিত মাতুল। গ্রন্থপাঠ। এক কুঠিয়াল সাহেব কর্তৃক উৎপীড়ন। তালুক ও নীলকুঠী বিক্রয়। গৃহবিচ্ছে। ভগ্নীদিগের বিবাহ। কৌলিন্ত । আমি ত্রয়ােদশ বর্ষে উপনীত হইলে সৌভাগ্যক্রমে আমার মাতুল মহাশয় আমাদের শিক্ষার ভার গ্রহণ করিলেন। তিনি পারস্য ভাষায় অতি সুপণ্ডিত ছিলেন, ও শিক্ষা প্রণালী সুচারু রূপে জানিতেন। তাহার উপদেশ প্রভাবে আমার শারীরিক ও মানসিক ভাবের অনেক পরিবর্তন হইল । আমি বাল্যাবধি প্রায় প্রতি বৎসরের কার্তিক মাসে জ্বরাক্রান্ত হইয়া মাঘ মাস পর্যন্ত কষ্ট ভােগ করিতাম । তিনি আমার আহারের নুতন ব্যবস্থা করিয়া দিলেন, এবং যেরূপে পাঠে আমার মনােনিবেশ হয়, তাহার যত্ন করিতে লাগিলেন। অতি অল্প- কাল মধ্যে আমার সুস্থ ও সবল শরীর হইল, এবং পাঠেও বিলক্ষণ মন লাগিল। তিনিও গ্রন্থের অর্থ উর্দু ভাষায় অভ্যাস করাইতেন, কিন্তু অর্থে ২২ আত্ম-জীবনচরিত। তাহা বঙ্গভাষায় আমাদের হৃদয়ঙ্গম করিয়া দিতেন। জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় একখানি পুস্তক ক্রয় করিয়া দিয়া মধ্যম দাদাকে ও আমাকে পড়িতে বলিতেন, বস্তুতঃ সে পুস্তকে আমার কোন অধিকার হইত না, মধ্যম দাদার নিকটেই তাহা থাকিত। মাতুল মহাশয় আমার এই অসুগম দেখিয়া দুই একখানি পুস্তক লিখিয়া দিতেন। কিছু কালের মধ্যে আমি বিশেষ শ্রম ও যত্নপূৰ্ব্বক লিখিতে অভ্যাস করিয়া নিজেই পাঠ্য পুস্তক সকল নকল করিতে লাগিলাম। ইহাতে আমার বিশেষ ফল লাভ হইল। লিখন পঠন উভয়েই আমার আয়ত্ত জন্মিল। মাতুল মহাশয় প্রথমে আমাকে ইয়ার মহম্মদ আলমগির, সেকন্দর নাম, এবং মিজান অধ্যয়ন করিতে দেন। এই সকল পুস্তকের কতকাংশ পঠিত হইলে ক্রমশঃ বাহারদানেশ, আল্লাসি জহুরি, আসফি উফি জাহির, হাফেজ এবং মােনশব এই কয়েক খানি গ্রন্থ পাঠে নিযুক্ত করেন। যে সময় দিল্লীর সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র পৌত্রদিগের মধ্যে সাম্রাজ্য অধিকারের জন্য যুদ্ধ হয়, সেই সময় আজিমপ্যানের পক্ষীয় একজন আমির আপন আত্মীয় স্বজন প্রভৃতিকে যে সকল পত্র লেখেন, তাহারই কতকগুলি পত্রের সঙ্কলনে ইয়ার মহম্মদ গ্রন্থ প্রস্তুত হয়। ইহাতে ঐ যুদ্ধ সংক্রান্ত অনেক বিষয় জ্ঞাত হইতে পারা যায়, কিন্তু পাঠকগণ শুদ্ধ পত্রের রচনা শিক্ষার নিমিত্ত ইহা পাঠ করিতেন। আওরঙ্গজেব যে সকল পত্র স্বীয় পুত্র পৌত্র ও আত্মীয় স্বজনকে লিখিয়া ছিলেন, তাহার মধ্যে কতকগুলি লিপি একত্র করিয়া, একজন সমাটের পূর্ব নামে এই আলমগির গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়া- ছেন। এই সকল পত্র সম্রাটের চরিত্রের ও হৃদয়ের অনেক পরিচয় পাওয়া যায়। এ পুস্তক রচনা শিক্ষার জন্য পঠিত হইত। সেকন্দর নামা পদ্য কাব্য। ইহা বীররসে পরিপুর্ণ । পারস্য সম্রাট দারার সহিত সে কন্দরের যে যুদ্ধ ও সন্ধি হয়, তাহা অত্যুজ্জ্বলরূপে বর্ণিত হইয়াছে, এবং গ্রন্থকর্তা তাহাতে যথেষ্ট কাব্যশক্তি প্রকাশ করিয়াছেন। ইহার রচয়িতার নাম সওনানা নেজামি। অন্যান্য ভাষার বীর কাব্য পাঠে যেরূপ উপকার ও আনন্দ লাভ হয়, ইহাতে ও সেই রূপ লাভ হইয়া থাকে। মিজান আরব্য ভাষার ব্যাকরণের প্রথম ভাগ। বাহার দানেশ বৃহৎ গদ্য কাব্য। একটা মুল উপন্যাসে বহু শাখা উপন্যাস যােজনা করিয়া আরব্য উপন্যাসের ন্যায় এই গ্রন্থ রচিত হইয়াছে। মূলােপন্যা- সের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই যে কোন রাজ পুত্র এক তুতী পক্ষীর বাচনিক অসামান্য **** ২৪ আত্ম-জীবনচরিত। লােকে কি না বলিয়া থাকে, তাহারা যখন ঈশ্বরকে জন্মবিশিষ্ট বলিয়াছে এবং • মহম্মদকে কুহকী বলিয়াছে, তখন আমাকে নাস্তিক বলিবে, ইহার আশ্চর্য কি ? যাহা হউক, যাহাদের হৃদয়ে বুদ্ধির ছায়া মাত্র পড়িয়াছে, তাহাদের যে কথা প্রত্যয় হইবার নয়, তাই আপনার ন্যায় উচ্চপদস্থ ও ঈশ্বরের প্রতিনিধি স্বরূপ ব্যক্তির বিশ্বাস্য জ্ঞান হওয়া অতীব আক্ষেপের ও আশ্চর্যের বিষয় ! আমি হিন্দুদিগের মন্দির সকল মসজিদে পরিণত করিয়াছি, এবং যেখানে পৌত্ত- লিকদের শঙ্খধ্বনি হইতেছিল, সেখানে মুসলমানদিগের নোমাজের ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত করাইয়াছি”। অন্য মুসলমান রাজাদের কোপের ভয়ে অথবা তাহাদের সন্তোষের জন্য আকবর যাহাই লিখুন, তিনি মহম্মদীয় ধর্মের পক্ষপাতী ছিলেন না, তাহা উপরি-উক্ত পত্রে কৈফিয়ৎ তলপ হওয়াতে বিলক্ষণ রূপে প্রকাশ পাইয়াছে। আর হিন্দুধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠতা স্বীকার করুন বা না করুন, তাহার প্রতি যে তাহার অশ্রদ্ধা ছিল না, তাহাও জানা গিয়াছে ; তবে এমন হইতে পারে যে, তাহার কোন ধৰ্ম্মই ঈশ্বরের প্রণীত বলিয়া বিশ্বাস ছিল না । যাহা হউক, তিনি হিন্দু ধর্মের বিরােধী না থাকাতেই, এই সুবিস্তৃত ভারতবর্ষের এক অদ্বিতীয় রাজা হইয়াছিলেন। যদি তাহার অধস্তন সমস্ত পুরুষেরা তাহার প্রদর্শিত পথগামী হইতেন, তবে আর তাহার বংশের এরূপ অবস্থা হইত না, আওরঙ্গজেবের হিন্দু ধর্ম নিপীড়নেই তাহার বংশের অধঃপতনের মূল স্থাপন হইয়াছিল। আল্লাসি গ্রন্থ পাঠের পর জহুরি ও তােগর নামে যে দুই খানি পুস্তক পাঠ করি, তাহাতে কি কি বিষয় বর্ণিত আছে, তাহা হাফেজ ও অসকি প্রভৃতি আর এক্ষণে স্মরণ হয় না। এই দুইখানি গদ্য কাব্য গ্রন্থের রচনা প্রণালী। এবং এই দুইয়ের একখানিতে কাশ্মীরের শোভার অনেক বর্ণনা আছে, এই মাত্র স্মৃতিরূঢ় হয়। এই পুস্তক পাঠেই আমি কাশ্মীর দশনের জন্য উৎসুক হই ; ইহা যথাস্থানে বিবৃত হইবে। আসফি উরফি জহির এবং হাফেজ পদ্য গ্রন্থ। ইহাকে খণ্ডকাব্য বা গাথা বলা যাইতে পারে । কারণ, এই সকল গ্রন্থের, বিশেষতঃ আসফি ও হাফেজের অনেক কবিতা সঙ্গীতে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। এই রূপ গ্রন্থের রচনাপ্রণালী সংস্কৃত বাঙ্গালা বা ইংরেজী ভাষায় দৃষ্ট হয় না। এ সকল গ্রন্থের প্রত্যেক পরিচ্ছেদে দুই হইতে সপ্তদশ সংখ্যা পর্যন্ত কবিতা সচরাচর দেখা যায়। বােধ হয়, এজন্য কোনও পদ্ধতি নাই : আর প্রত্যেক অধ্যায়ে এই রূপ অনেক পরিচ্ছেদ, বোধ হয়, ইহাও বালকের অযােগ্য পাঠ্য। (২ রূপলাবণ্য সম্পন্ন এক রাজকন্যার কথা শ্রবণে তাহার প্রেমাকাজী হইয়া ক্ষিপ্ত প্রায় হন। রাজা প্রথমতঃ সদুপদেশ দ্বারা পুত্রের প্রেম রােগের শাস্তি করণে প্রসিদ্ধ পণ্ডিতগণকে নিযুক্ত করেন। তাহাদের যত্ন বিফল হইলে রাজকুমারকে নারীজাতির অসতীত্ব ও বিশ্বাস- ঘাতকতা প্রভৃতি নিন্দনীয় চরিত্রের উপাখ্যান শুনাইতে তাঁহার বয়স্যদিগকে আদেশ দেন। কিছুতেই উপকার না হওয়াতে, পরিশেষে রাজা উক্ত রাজ কুমারীর পিতাকে রাজনন্দিনীর সহিত রাজপুত্রের বিবাহের প্রস্তাব করিয়া পত্র লেখেন। ইহাও নিস্ফল হইয়া যায়। অবশেষে রাজতনয় সন্ন্যাসীর বেশে দেশত্যাগী হন। উপরিউক্ত তুতী মাত্র তাহার সঙ্গী ছিল। এই পক্ষীর মন্ত্রণানুসারে বহুদিনের পর কোন সিন্ধুতটস্থ নিবিড় অরণ্য মধ্যে এক তাপসের কুটীরে উপনীত হন। তথায় একটা সারস পক্ষী ছিল । সে রাজ- পুত্রের দুঃখের বিবরণ শুনিয়া, কোন বিষয়ের আদ্যন্ত না জানিয়া তাহাতে প্রবৃত্ত হইলে যে ফল উৎপন্ন হয়, তদ্বিষয়ক অনেকগুলি উপাখ্যান বলে। যাহা হউক, বহু অলৌকিক ঘটনার পর রাজনন্দন রাজনন্দিনীর সমীপন্থ হন, এবং পূর্ণমনােরথ হইয়া রাজকুমারীর সহিত ৰাটী প্রত্যাগমন করেন। মূল গল্প ও সারস বর্ণিত গল্পনিচয় যেমন সুন্দর, নারীনিন্দার কাহিনীগুলি তেমনি জঘন্য। শেষোক্ত গল্পের ন্যায় অশ্লীল গল্প এই ভাষায় বা অন্য কোন ভাষার গ্রন্থে আছে কিনা, সন্দেহ স্থল। ইহা বালকের পাঠ্য পুস্তক হওয়ার যােগ্য কোন মতেই নয়। আল্লাসি গ্রন্থে তিন অধ্যায় আছে। প্রথম অধ্যায়ে সমাট আকবর ভিন্ন দেশীয় কয়েক রাজাকে আপনার সংসারের বিবরণ অালাসি গ্রন্থের মর্ম। প্রভৃতি প্রধান প্রধান মন্ত্রীদিগকে যে সকল পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহার কয়েক খানি সঙ্কলিত আছে; দ্বিতীয় অধ্যায়ে আবগুল ফজলের অনেকগুলি পত্র আছে ; তৃতীয় অধ্যায়ে অন্যায় বিষয় শিবি৩ হইয়াছে। উপরি-উক্ত পত্রের মধ্যে আকবর যে দুইখানি তুরণদেশাধিপতিকে লেখেন, তাহাতে প্রকাশ আছে যে শেষােক্ত অধিপতি প্রথমোক্তকে লিখিয়াছিলেন যে, “আপনি বিধর্মী হইয়াছেন, অতএব আপনার সহিত আর কোন সম্বন্ধ রাখিবার প্রয়ােজন নাই”। আকবর ইহার উত্তর এই লিখেন যে, “আপনি আমার বিধর্মী হওয়ার কথা যাহা আমার শত্রুর নিকট শুনিয়াছেন, তাহা সম্পূর্ণ অমুলক ; ৪ পারস্য ব্যাকরণ। কোন নিয়মবদ্ধ নহে। প্রত্যেক পরিচ্ছেদের প্রথম কবিতার দুই চরণের শেষে যে শব্দ থাকে, তাহা বাঙ্গালা ভাষার মিত্রাক্ষর পয়ার ছন্দের ন্যায় পরস্পর মিল থাকে। কিন্তু দ্বিতীয় কবিতার বা তাহার পরবর্তী কবিতার উভয় চরণের শেষে আর ঐ রূপ ঐক্য থাকে না। কেবল প্রথম কবিতার শেষ শব্দের সহিত মিল থাকে; আর প্রত্যেক পরিচ্ছেদের শেষ কবিতায় আমাদের পূর্ধ্বতন কবিগণের প্রথামত কবির নামের ভণিতা দেওয়া হয় ; এবং এইরূপ কতকগুলি পরিচ্ছেদে এক এক অধ্যায় সমাপ্ত হয়। আর বাঙ্গালা যেমন সৰ্ব্বপ্রথম শব্দের আদিতে ক অক্ষর আরম্ভ করিয়া ক্ষ অক্ষরে শেষ হয়, সেই রূপ ইহার প্রথম অধ্যায়ের সকল পরিচ্ছেদের সকল কবিতার শেষে এই ভাষার যে শব্দের শেষে আদ্যক্ষর অনেক থাকে, তাহাই দেওয়া হয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ের সকল পরিচ্ছেদের সকল কবিতার অন্তিমে যে শব্দের শেষ “বে” অক্ষরে হয়, তাহাই দেওয়া হইয়া থাকে। এই রূপ ক্রমান্বয়ে সকল অক্ষরের কবিতা হইলে গ্রন্থ শেষ হয়। এই রূপ গ্রন্থের এক কবিতার ভাবের সহিত দ্বিতীয় বা তাহার পরবর্তী কোন কবিতার সম্বন্ধ নাই । প্রত্যেক কবিতারই স্বতন্ত্র ভাব। আর একটা দেখা যায় যে, এইরূপ সকল গ্রন্থের কবিতায় প্রেমভাব ভিন্ন প্রায় ভক্তিভাব নাই। আমাদের দেশের গ্রন্থে যেমন ঈশ্বরকে কখন মাতৃ সম্বােধন কখন পিতৃ সম্বােধন হইয়া থাকে, সেই রূপ এই প্রণালীর গ্রন্থে দৃষ্ট হয় না। প্রেমবিহ্বল নায়ক স্বীয় প্রাণাধিকা প্রণয়ি- ণীর প্রতি যে রূপ প্রেম প্রকাশ করে, সেই রূপ ভাব এই সকল গ্রন্থে বর্ণিত হইয়াছে। ইহার সকল স্থানেই ঈশ্বর প্রণয়িণী বলিয়া সম্বােধিত হইয়াছেন। বােধ হয়, মুসলমানদিগের মনে এই স্থির সিদ্ধান্ত আছে যে, শ্রদ্ধাস্পদ ও ভক্তি- ভাজন গুরুজনের প্রতি যিনি যতদুরই ভক্তি প্রকাশ করুন, কিন্তু রমণী প্রেমে তিনি যত দূর মজিবেন, গুরুজনের ভক্তিতে ততদূরই কখন মজিবেন না; আর প্রেমের জন্য লােকে যে প্রকার পাগল হয়, ভক্তির জন্য সে প্রকার হয় না। মনশব গ্রন্থ• সেখ সাদির কৃত আরব্য ব্যাকরণের দ্বিতীয় ভাগ। ভাষার কোন ব্যাকরণ পূৰ্ব্বে এদেশে প্রচলিত ছিল না। এ ভাষা এতই সহজ যে, তাহা পড়িবার ও বিশেষ প্রয়ােজন হইত না। বিনা ব্যাকরণে লেখাপড়া চলিত। যাহার এ বিদ্যায় বুৎপত্তি লাভের ইচ্ছা হইত, তিনি আরব্য ব্যাকরণ পড়িতেন। আমাদের পাঠারম্ভের কিঞ্চিৎ পূর্বে কোন ২৬ আত্মজীবনচরিত। সাহেবের আদেশানুসারে চাহার গোলজার নামে একখানি পারস্য ব্যাকরণ প্রস্তুত হয়। মাতুল মহাশয়ের আরও কয়েকজন ছাত্র হইয়াছিল। তাহাদের মধ্যে আমাদের ভাগিনেয় সম্পর্কীয় কার্তিকেয়চন্দ্র লাহিড়ীর সহিত আমার অত্যন্ত সৌহাদ জন্মে। যদিও তৎকালে আমাদের সম্পত্তির অবনতি হইতেছিল, তথাপি কর্তারা অন্নদানে কাতর হইতেন না। আমরা পূৰ্ব্বাহে বেলা তৃতীয় প্রহর হইতে সন্ধ্যা পৰ্যন্ত এবং সন্ধ্যা হইতে রাত্রি দেড় প্রহর পর্যন্ত মাতুল সন্নিধানে পড়িতাম । তাহার পর আমি ও আর একজন ছাত্র রাত্রি তৃতীয় প্রহর পর্যন্ত পাঠ করিতাম ও তদনন্তর পূজার কোঠাতেই শয়ন করিতাম । বৃহস্পতিবারে ও শুক্রবারে নুতন পাঠ হইত না। বৃহস্পতি বারের বৈকাল হইতে শুক্র বারের পূৰ্ব্বাহু পৰ্যন্ত পাঠ এক কালে নিষিদ্ধ ছিল। বৃহস্পতি বারের বৈকালে প্রায়ই আমরা কৃষ্ণনগরে আসিতাম । এক বৎসর পরে আমাদের অবশিষ্ট বিভবের এক কালে অবনতি হইল। আমাদের যে দুই দরপত্তনি তালুক ও এক নীলের কুঠী আমাদের অবস্থার ছিল, তৎসমুদয় লইবার নিমিত্ত খাল বােয়া গীয়ার নীল- অবনতি। কুঠীর অধিকারী ফ্রাসিস হারিক সাহেব আমাদের প্রতি নানা প্রকার অত্যাচার করিতে আরম্ভ করিল। কিছুদিন পরে তাহার সহিত একটী হাঙ্গাম হইয়া এক ফৌজদারী মােকর্দম উপস্থিত হইল, এবং মাজিষ্ট্রেট সাহেব তাহার স্বপক্ষ হওয়াতে পরিশেষে তালুক ও কুঠী নীলকরের নিকট বিক্রয় করিতে হইল। দুঃসময় উপস্থিত হইলে যে বিবিধ বিপদ দেখা দেয়, আমাদের তৎকালীন অবস্থা তাহার বিলক্ষণ দৃষ্টান্তস্থল। ঐ সময় আমাদের বহুল নিষ্কর ভূমি যাহা পুরুষানুক্রমে সংসারের বহু সাহায্য করিতেছিল, তাহা গবর্ণমেণ্ট অসিদ্ধ বৃত্তি বলিয়া আত্মসাৎ করিলেন। দশ বারটী গোলাবাটীতে অনেক টাকার ধান্ত আছে, কর্তাদের এইরূপ বােধ ছিল। কিন্তু এক্ষণে অনুসন্ধানে জানিতে পারিলেন যে, কতক ধান্য গােমস্তাগণ হরণ করিয়াছে, কতক অনুপযুক্ত অধ- মণকে ঋণ দেওয়াতে পুনঃপ্রাপ্ত হইবার অনুপায় হইয়াছে। কর্তারা তালুক, কুঠি, ধান্য, বৃত্তি সকলেতেই এককালে বঞ্চিত হইলেন। যে যৎকিঞ্চিৎ সম্পত্তি থাকিল, তাহাতে সংসার যাত্রা নির্বাহ করা অতি কষ্টকর হইল । } অবিবাহিতা দুই ভগ্নী। २१ D দুষ্কর হইল । কর্তাদের তৎকালীন অবস্থা মনে পড়িলে অদ্যাপি হৃদয় বিদীর্ণ হয়। যাহারা - দোল দুর্গোৎসব নিত্য নৈমিত্তিক সমস্ত ক্রিয়া, কত বাহুল্য অতিথি সেবা, অকাতরে দান, আত্মীয় স্বজনের উপকার বাল্যকালাবধি করিয়া আসিতে ছিলেন, তঁাহাদের আজ নিজের পারিবারিক প্রয়ােজনীয় ব্যয় সম্পাদন করাও প্রায় সকল হিন্দু পরিবারের মধ্যে দৃষ্ট হয় যে, যাবৎ অবস্থা উন্নত থাকে, তাবৎ পরিবারগণের মধ্যে বিলক্ষণ সুহৃদ্ভাব থাকে, কিন্তু যেই অবস্থা অবনত হইতে আরম্ভ হয়, অমনই কলহ উপস্থিত হইয়া বিচ্ছেদের সূত্রপাত করে। বাটীর গৃহিণীরা এই বিচ্ছেদের প্রধান প্রবর্তক হন। কর্তাদের মধ্যে যতই স্নেহ ভাব থাকুক, কত্রীরা ইচ্ছা করিলেই গৃহ ভঙ্গিতে হিন্দু পরিবার গণের বিচ্ছে- পারেন। বিশেষতঃ যেখানে সকল সহােদরের উপার্জন- দের কারণ। ক্ষমতা সমান নয়, সেখানে অবিলম্বেই গৃহ বিচ্ছেদের আগমন হয়। উপার্জনক্ষম ব্যক্তির গৃহিণী ভাবেন যে, স্বামী এত পরিশ্রম করিয়া ধন আহরণ করিবেন, আর তঁাহার ভ্রাতারা বসিয়া খাইবেন, ইহা কোন মতেই সহনীয় নয়। তিনি প্রথমে পতির ভ্রাতৃপত্নীদের সহিত অকারণ কলহ করিতে আরম্ভ করেন, ও মর্মান্তিক কথা সকল কহিতে থাকেন। ক্রমশঃ ভ্রাতৃপত্নীরাও নিতান্ত ব্যথিত হৃদয় হইয়া ভাবেন যে এ যন্ত্রণা অপেক্ষা ভিক্ষেপিজীবী হওয়াও ভাল । সহোদরগণ পরিশেষে কত্রীদের উত্তেজনায় পৃথক্ হইতে প্রবৃত্ত হন। পূৰ্ব্বে বলিয়াছি, জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় রাজবাটীতে কৰ্ম্ম করিতেন। এবং মধ্যম তাত মহাশয় তালুকের ও কুঠির কার্যে নিযুক্ত থাকিতেন। সুতরাং তাহাদের । কিঞ্চিৎ সঞ্চিত ধন ছিল। পিতা ঠাকুর প্রায়ই বাটীতে থাকিতেন, সুতরাং তাঁহার হস্তে ধনাগমের কোন সম্ভাবনা ছিল না। আবার তাহারই পরিবার সকলের অপেক্ষা অধিক ছিল। পূৰ্বে বলিয়াছি যে, একপুত্র ও তিন কন্যার পর আমার জন্ম হয়। আমার পরে পিতার আর পাঁচ কন্যা জন্মে। ইহার মধ্যে তিনটার শৈশবাবস্থায় মৃত্যু হয়। অগ্রজের ও জ্যেষ্ঠা তিন ভগ্নীর বিবাহ হইয়াছিল। ভগ্নীপতি তিনজনই প্রায় আমাদের বাটাতে থাকিতেন। তদ্ব্যতীত তাহাদের আত্মীয় স্বজন এবং আমাদের অন্যান্য কুটুম্ব মধ্যে মধ্যে আসিতেন। সুতরাং এক বৃহৎ পরিবার হইয়াছিল। পিতা বহু কষ্টে এই সংসার চালাইতে লাগিলেন। যেদিন নিত্য ব্যয় নিষ্পাদনে অসমর্থ হইতেন, আত্ম-জীবনচরিত। সেদিন মাতাঠাকুরাণী কোন দ্রব্য বন্দক বা বিক্রয় করিয়া আহারের সংস্থান করিতেন। এই কষ্টের উপর আর এক কষ্ট উপস্থিত হইল। আমার অবিবাহিতা দুই ভগ্নির বিবাহকাল উপস্থিত হওয়াতে পিতাঠাকুর অত্যন্ত চিন্তাযুক্ত হইলেন। বহু- কাবধি তাহার পূর্ব পুরুষের কোন কন্যা শ্ৰেত্ৰিয়ে সম্প্রদান হয় নাই। তথাপি মাতাঠাকুরাণী তাহাব কন্যাদ্বয়কে কোন দুই ধনবান কাপ বা শ্ৰোত্ৰিয় সুপাত্রের সহিত বিবাহ দিবার গাঢ় ইচ্ছা করিলেন, কিন্তু তাহাতে স্বামীকে কোন মতেই সম্মত করিতে পরিলেন না। বিজাতীয় রাজার শাসনাধীন হইলে দেশের যে কত প্রকার অমঙ্গল ঘটে, তাহা বর্ণনা হয় না। আমাদের প্রচলিত কুলীনের নিয়ম কৌলীন্য- প্রথ।। যদিও নিতান্ত ভ্ৰমমূলক, তথাপি তাহার উদ্ভাবন বােধ হয় মঙ্গল কামনায় হইয়াছিল । দেশ স্বাধীন থাকিতে বর্তমান কুলীনদের ব্যবহারদর্শনে স্বদেশীয় রাজা অবশ্যই ইহার সদ্বিবান করিতেন । সহস্র দোষে দোষী হইলেও শুদ্ধ কুলীন সন্তান বলিয়া যে কাহারও কোলীন্য মর্যাদা অটল থাকিবে, ইহা কখনই ঘটিত না। বঙ্গবাসিগণ বহুকাল হইতে আপনাদের হিতা- হিত চিন্তা করণে অক্ষম হইয়াছে, এবং রাজাজ্ঞাও ব্যবহার ধর্ম বােধ হইয়া আসিতেছে। সুতরা সেন রাজাদের আদেশও তাহার পােষক ব্যবহার শ্রুতি স্মৃতি অপেক্ষাও মান্য হইয়া রহিয়াছে। পূৰ্ব্বকালীন লােক কৌলিন্য মৰ্যাদাকে সাংসারিক সম্মানের প্রধান বলিয়া জ্ঞান করিতেন। শ্রোত্রিয় শ্রীমান বিদ্বান সচ্চরিত্র রাজপুত্রকেও কন্যা দান না করিয়া কদাকার মুর্থ অসচ্চরিত্র দরিদ্র কুলীন পুত্রকেও দান করিতে ব্যস্ত হইতেন। পিতাঠাকুর অতি শান্তস্বভাব ও দয়াদ্রচিত্ত ছিলেন। তাহার বিবাহিতা তিন কন্যার সন্তান হইল, বু গৃহিণীরা স্বাধীন হইতে পারিলেন না। বাপের বাটী পরাধীন থাকিয়া দিনযাপন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। এ সকল দুর্দশা দেখিয়াও এবং তাহাদের মনটদুঃখ জানিয়াও তিনি আপনার ভ্রান্তিমূলক পূৰ্ব্ব সংস্কার ত্যাগে সমর্থ হইলেন না। গুরুজনেরা সেকালের লোক ছিলেন। তঁাহাদের ত এরূপ ভ্রান্তি হইতে পারে। কিন্তু ইদানীন্তন সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা যে এরূপ কৌলীন্যাভিমানী হন, ইহার অপেক্ষা আক্ষেপের বিষয় আর কি আছে ? ইহার পূর্বকালীন কুলীনের ন্যায় কৌলীন্যের দোহাই দিয়া কি না করিতেছেন? ইহারও কুলীন ব্যতীত অন্য সম্প্রদায়ের পুত্রকে কন্যা দিতে পরায়ুখ রহিয়াছিলেন। পুত্রের বিবাহে বালক বালিকার অপক্ক চরিত্র। ১৮ । • কন্যাকর্তার নিকট যথাসাধ্য ধন লইতেছেন, এবং বৈবাহিক বা শ্বশুরের নিকট নানা বিষয়ের দাওয়া করিতেছেন। আর তৎসমুদায় লব্ধ না হইলে সাতিশয় অসন্তুষ্ট হইতেছেন। পূৰ্বকালীন কুলীনদের ন্যায় ইহাদের ও সকল নীচ স্পৃহাই বলবতী রহিয়াছে। ইহা দেখিয়া যুগপৎ বিস্ময় ও দুঃখ উপস্থিত হয়। মাতুল মহাশয় পিতাঠাকুরকে কহিলেন যে, তােমাদের অবনতি এক্ষণ ও প্রকাশ হয় নাই। কিঞ্চিৎ ধন হইলেই কুলীন পাল মিলিবে, কিন্তু তােমাদের অবস্থা সকলের গোচর হইলে কন্যা পাওয়া দুষ্কর হইবে। তখন আমার বয়স ১৫ বৎসর হইয়াছে। মাতুলের কথা কত দুর ন্যায় বা অন্যায়, কিছুই বিবেচনা না করিয়া বড়ই আলাদিত হইলাম। যদিও তখন আমি পারস্য ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছি, এবং ইংরাজী ভাষা শিক্ষায় প্রবৃত্ত হইয়াছি, তথাপি উপার্জন করিয়া সংসারের সাহায্য করি, এরূপ ক্ষমতা আমার হয় নাই। এ সময় বিবাহ হইলে ধনাভাববশতঃ পিতার আরও কষ্ট হইবে, ইহা একবারও মনে হইল না। কি রূ- পেই বা হইবে ? তৎকালে আমাদের অপেক্ষাও দুরবস্থাপন্ন বাল কবৃন্দের বিবাহ চতুর্দিকে দেখিতেছিলাম ! বাল্য বিবাহের ইষ্টানিষ্ট কিছুই জানিতাম না ; তদ্বি- ষয়ের কোন আন্দোলনও শুনিতে পাইতাম না এবং সকলকেই বালক বালিকার পরিণয়ের জন্য ব্যস্ত দেখিতাম। আমার বিবাহের বিবাহ। জন্য পাত্রীর অন্বেষণ হইতে লাগিল। এক্ষণে যেমন অগ্রে কন্যাটির সৌন্দর্য্য দেখিতে হয় ও পরে তাহার কুল শীল জানিতে হয়, সেরূপ প্রথা সেকালে ছিল না। সে সময়ে প্রথমে কন্যার পিতৃ মাতৃ উভয় কুল নির্দোষ কি না, তাহা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানিতেন। যদি সে বিষয়ে কোন দোষ দৃষ্ট না হইত, তবে কন্যা সুন্দরী কি না, দেখিতেন। উৎকৃষ্ট কুলোদ্ভূতা কন্যা শ্ৰীমতী না হলেও তিনি সাদরে গৃহীত হইতেন। কিন্তু দোষ সংযুক্ত বংশের কন্য', রূপে ভুবনমোহিনী হইলেও তিনি কোন সিদ্ধ শ্রোলিয়ে র গৃহে আদৃত। হইতেন না। কন্যাপক্ষীয় গুরুজনেরাও ঐরূপ প্রণালীতে পাত্র স্থির করিতেন। বিশেষ বিবেচনা করিলে এ রীতি উৎকৃষ্ট তাহার সন্দেহ নাই। যেহেতু বালক বালিকার অপক চরিত্র দেখিয়া, অথবা তাহাদের পিতামাতার ব্যবহার দর্শন করিয়া, তাহাদের ভাবী চরিত্রের বিষয় স্থিয় করা যায় না। অধিকাংশ সন্তান জনক জননীর দোষগুণের অধিকারীও অধিকারিণী হয় বটে, কিন্তু কখন কখন দৃষ্ট হয় যে, কোন কোন সন্তান পিতামহের বা মাতামহের দোষ গুণও পাইয়া থাকে।
আত্মজীবনচরিত। এই হেতু পূৰ্ব্বতন ভদ্রবংশোদ্ভব লােকেরা পাত্র ও পাত্রীর তিন চারি পুরু- ষের পরিচয় লইয়া সম্বন্ধ স্থির করিতেন। এই প্রথানুসারে বিবাহ স্থির করি- লেই যে আশানুরূপ ফললাভ হইয়া থাকে, এরূপও নয়। তবে যতদুর দেখা যাইতে পারে, ততদুর চেষ্টা করা হইত। আমার ভাবী স্ত্রী সুন্দরী না হইলেও তাহার জনক জননীর বংশ দেখিয়া আমার বিবাহের সম্বন্ধ স্থির হইল। যদি ও পাত্র পাত্রীর পূর্ব পূৰ্ব্ব পুরুষের কুলশীল দেখিবার পদ্ধতি ছিল, কিন্তু বর্ণিত কালের সকলেই এই উৎকৃষ্ট পদ্ধতির তাৎপৰ্য ভালরূপে জানিতেন না এবং সন্তানে পূর্ব পুরুষের দোষ গুণ বৰ্ত্তে,-ইহার কারণ ও বিশেষরূপে বুঝিতেন না। সুতরাং তাহাদের পুর্ব পুরুষের স্বভাবের ও ব্যবহারের বিষয় বিশেষরূপে জানিবার চেষ্টা করিতেন না। তাহাদের বংশে কুলকাৰ্য্য হইয়াছে কিনা ও যদি হইয়া থাকে, তবে কয় পুরুষে হইয়াছে, এবং তাহাদের নিকট সম্বন্ধীয় দিগের বংশে ঐরূপ আছে কি না, ইহাই জানিবার জন্য উৎসুক হইতেন। তঁাহাদের আচার ব্যবহার ধৰ্ম্ম সঙ্গত ও শাস্ত্রানুমােদিত কি না, তাহার দিকে দৃষ্টিপাত করিতেন না। আমাদের পূর্বাঞ্চলের বরেন্দ্র শ্রেণীর মধ্যেও এমন কোন কোন কুলীন ও সিদ্ধ শ্রোত্রিয় ছিলেন যে, তাহারা জলে স্থলে দস্যুবৃত্তি কৱিতেন। কিন্তু তথাপি তাহাদের পদ গৌরব বিনষ্ট হইত । সকলে এ বিষয় যেন শুনিয়াও শুনিতেন না, জানিয়াও জানিতেন না। সুতরাং অধিকাংশ স্থলে কৌলিন্য সংশ্রবের পরিমাণ দেখিয়াই বংশের গৌরব বা অগৌরব অবধারিত হইত। হয়। প্রচলিত কৌলিন্য প্রথা বঙ্গের কতই অমঙ্গলের কারণ হইয়াছে। আলোককে অন্ধকার দেখাইতেছে, এবং অন্ধকারকে অলােক দর্শন করাই- তেছে। অতি সচ্চরিত্র বিশিষ্ট সিদ্ধ বা কষ্ট শ্রোত্রিয় ও বংশে অনাদৃত হইতেছে, এবং যৎ সামান্য জঘন্য দুশ্চরিত্রান্বিত কুলীন বংশ অতীব সমাদর পাইতেছে । এমন কি, ইহা ধৰ্ম্মের ও শাস্ত্রের জ্যোতি তমসাচ্ছন্ন করিয়াছে, এবং ধীমান সদ্বিদ্বানের জ্ঞান চক্ষুতেও ধূলি দিতেছে । আমার তৎকালীন ভাবী শ্বশুর (১) আমাদের একজন জ্ঞাতির সহিত দুহিতার বিবাহ স্থির করিতে আসিয়া আমাকে দেখেন, এবং বাটী প্রত্যাগত হইয়া আমাকে কন্যা সম্প্রদান করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। জ্ঞাতি পক্ষের যেটক ইহা শুনিতে পাইয়া তাঁহাকেও তাহার স্ত্রী পরিবারদিগকে কহে যে, (১) ইনি মহাপ্রভু চৈতন্যের সহযােগী অদ্বৈত প্রভুর বংশোদ্ভূত।
জামাই-ষষ্ঠী। তাঁহাদের (অর্থাৎ আমাদের সম্পত্তি দৃষ্ট হইতেছে বটে, কিন্তু ১৪। ১৫ সহস্র টাকা ঋণ আছে। যাহাকে সাদাসিদা লােক কহে, ভাবী শ্বশুর সেইরূপ ছিলেন। তিনি উত্তর করেন যে, যাহাকে লােকে এত টাকা কর্জ দিয়াছে, তিনি কখনই নির্ধন নন। অতএব আমি তাহারই ঘরে কন্যা দিব। বিবাহের সম্বন্ধ স্থির করিবার পূৰ্ব্বে, তৎকালে পালীর পক্ষের লােক আসিয়া শ্রোত্রীয় পাত্রের বিদ্যার পরীক্ষা করিত । সে সময় এ অঞ্চলে ইংরাজী বিদ্যার শিক্ষা প্রায়ই হইত না, এবং পারস্য বিদ্যার চর্চাও অধিক ছিল না। বঙ্গভাষায় একখানি পত্র লিখিতে ও দুই একটা অঙ্ক কসিতে পারিলেই পাত্র পরীক্ষোত্তীর্ণ হইত! সুতরাং যখন। পারস্য ভাষায় আমার ব্যুৎপত্তি জন্মিয়াছে, তখন আর আমার পরীক্ষা দিবার প্রয়োজন কি ? বােধ করি এই বিবেচনায় আমার পরীক্ষা দিতে হইল না। একবাবেই কন্যাপক্ষীয় একজন আসিয়া বিবাহের পত্র করিয়া যাইলেন। কিছুদিন পরে আমার বিবাহের উদ্যোগ হইতে লাগিল। আমার অগ্রজের ও মধ্যম দাদার বিবাহে যে সমৃদ্ধি ও সমারােহ হইয়াছিল, তাহার চতুর্থাংশের একাংশও হইল না, এ কারণ মনােমধ্যে যদিও দুঃখ হইতেছিল, তথাপি যখন বাহকেরা বিবাহের পালকি স্কন্ধে করিল, সম্মুখে ও পার্শ্বে অলোকরাজি নয়ন- গােচর হইল, এবং রােশনচৌকির সুমধুর স্বর কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইতে লাগিল, তখন হৃদয়ে অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হইল, শরীর রােমাঞ্চিত হইতে লাগিল, এবং বােধ হইল, যেন এত সুখ আর কখন হয় নাই। আর এই পরিণয় বৃক্ষে যে কত সুমধুর ফল ফুলই ফলিবে, এই চিন্তায় মন যেন বিল হইল। আহা! মানবজাতি কি অদূরদর্শী। কতই আশা করে ও কতই নিরাশ হয় । কত দেখে ও শুনে, তথাপি আপনার সময়ে সমস্ত বিস্মৃত হইয়া যায় । যে বিষয়ে কত শত লােককে অসুখী হইতে দেখিয়াছে, সেই বিষয়ে আপনি সুখী হইব, মনে করে। অন্যকে পরামর্শ দিবার সময় বিজ্ঞবর হন, কিন্তু নিজের সময় গণ্ডমূখ হইয়া থাকেন। এই পরিণয়-কুণ্ড হইতে অমৃত না উঠিয়া গরলও, উখিত হইতে পারে, এ সন্দেহ আমার মনে একবারও স্থান পাইল না। 'বর বােধ হইল, যেন সংসারের সার পদার্থ পাইলাম, এবং জীবনের সার্থকতা লাভ করিলাম। বিবাহের এক বৎসর পরে জামাই-ষষ্ঠী উপলক্ষে আমি একবার, শশুরালয়ে যাই, এবং অষ্টাহ যাপন করি। এই কয়েক দিন আমার এতই সুখে যায় ৩২ আত্ম-জীবনচরিত। যে, দিবারাত্রি কোথায় দিয়া গিয়াছিল তাহা জানিতে পারি নাই। আমার স্ত্রীর বাল্যসখীরা অরুণােদয় হইতে রজনী দ্বিপ্রহর পর্যন্ত কখন আমার নিকট থাকিতেন, কখন আমার নিমিত্ত নানাবিধ জামাই-ষষ্ঠী। খাদ্য প্রস্তুত করিতেন। তাঁহাদের মধ্যে আমার পত্নীর ভগ্নীসম্পর্কীয় তিন জন ও ভ্রাতৃজায়াসম্পর্কীয় একজন ছিলেন। সে সময় তাহার ভগ্নীদের বয়ঃক্রম দ্বাদশ কি ত্রয়ােদশ এবং ভ্রাতৃবধূর বয়স চতুর্দশ কি পঞ্চদশ। প্রায় প্রতি বৈকালেই আরও অনেক প্রতিবাসিনী বালিকা ও যুবতী আসিয়া আমার সহিত হাস্য পরিহাস করিতেন । আমার শ্বশুরবাটীতে শয়নের ভাল স্থান না থাকাতে রাত্রিতে উপরি উক্ত ভ্রাতৃজায়ার নিকেতনে আমার শয্যা প্রস্তুত হইত মধুবালাপে সুখ যামিনী। তৎকালে তাহার স্বামী ও শাশুড়ী প্রভৃতি কেহই বাটীতে ছিলেন না। রাত্রিতে আমি শ্বশুরবাটীতে আহার সমাপন করিয়া তাহাদের বাটীতে যাইতাম। আমার স্ত্রী ও তাহার ভগ্নীরাও সেই সময় তথায় উপস্থিত হইতেন। তখন আমার স্ত্রী তাহাদের সাক্ষাতে আমার সহিত কথা কহিতে লজ্জা বােধ করতেন। তিনি শয্যার এক পার্শ্বে শয়ন করিয়া থাকিতেন, এবং কখন কখন সহচরীদিগকে দুই একটা কথা বলিতেন। তাহার ভাইজ ভগ্নীরা রাত্র প্রায় তৃতীয় প্রহর পর্যন্ত আমার সহিত নানাবিধ হাস্য পরিহাস করিতেন । কখনও তাহাদের মধ্যে এক বালিকা অতি মৃদুস্বরে গীতও গাইতেন। আমাদের সকলেরই চিত্ত আনন্দে এত অধিক অভিভূত হইত যে, যামিনীর নিয়মিত গতির দিকে কাহারও মনের নয়নপাত হইত না। নিদ্রা যে এক সংজ্ঞা আছে, তাহা আমাদের স্মৃতিপথে আসিত না। আমি যে দিবস প্রত্যুষে শ্বশুরালয় হইতে প্রত্যাগমন করি, সে দিবস অদ্যাপি স্মরণ করিলে হৃদয় হর্ষবিষাদে অভিভূত বিদায়ে হর্ষ বিষাদ । হয়। যাত্রাকালে বর্ণিত বালিকারা সকলেই উপস্থিত হইলেন। কিন্তু কোন কথা কহা দুরে থাকুক, গুরুজন সম্মুখে থাকাতে নিকটবর্তিনীও হইতে পারিলেন না; চক্ষুর জল চক্ষুতেই রাখিতে হইল, এবং তৎকালে মনের কথা মনেই থাকিল। “তােমাদের নিকট এক্ষণে বিদায় হই” একথা আমিও বলিতে পারিলাম না, এবং বহুকষ্টে নয়নজলের পথ রােধ করিয়া রাখিলাম। স্ত্রী পুরুষের পরস্পর আলাপ করিবার যে স্বাভাবিক স্পৃহা আছে, তাহা চরিতার্থ করিতে এ দেশস্থ নর নারী উভয় জাতিই ইচ্ছা করিয়া { 1. আমার চাকুরী। থাকেন; কিন্তু এ বাসনা পূর্ণ করিতে এদেশের পুরুষেরা যেরূপ সক্ষম হইতেন, কুলকামিনীরা সেরূপ সক্ষম হইতেন না। পুরুষেরা বেশ্যাদিগের সহিত আলাপ করিয়া এ অভিলাষ পূর্ণ করিতেন। কুলবালাগণ কেবল নিজ পরিবারের বা অতি জামাতা ও কুলবালাগণ। সন্নিহিত স্বসম্পর্কীয় প্রতিবেশীর নূতন জামাতার সহিত আলাপ করিয়া আমােদিত হইতেন। সে আলাপও আপন ভগ্নীপতি বা স্বামীর ভগ্নীপতি ভিন্ন অন্যের সহিত ঘটিবার অধিক সম্ভাবনা ছিল না। কোন সুশীল সরলস্বভাব ও মিষ্টভাষী জামাতা পাইলে, তাহাদের আর আহলাদের সীমা থাকিত না। তাহারা হৃদয়ের দ্বার তাহার সমক্ষে খুলিয়া দিতেন, এবং সকলেই তাহাকে সন্তুষ্ট করিতে ও তাহার ভালবাসা পাইতে যত্ন করিতেন। আর যে নারীর যে গুণ থাকিত, তাহা ঐ জামাতাকে দেখাইবার প্রয়াস পাইতেন। চন্দ্র দেখিলে চকোর যেমন পুলকিত হয়, বা বহুকালের দরিদ্র অপৰ্যাপ্ত ধন লাভ করিলে যেরূপ আহলাদিত হয়, সেইরূপ কুলস্ত্রীরা সুশ্রী ও তরুণ বয়স্ক জামাতৃদর্শনে আহ্লাদিত হইতেন। জামাতার বয়স অধিক না হইলে প্রেম অনভিজ্ঞ দ্বাদশ এয়ােদশ বৎসরের বালিকাগণও তাহাকে ভাল বাসিত। কি বালিকা, কি যুবতী, কাহারও হৃদয়ে কোন অপবিত্র ভাবের উদয় হইত না। তাহারা অতি নিৰ্ম্মল চিত্তে ঐ জামাতার সহিত আলাপ করিতেন । যখন আমাদের কয়েক জন বন্ধুর মধ্যে পরস্পরের পত্নীর সহিত পরস্পরের সাক্ষাৎ আরম্ভ হইল, তখন আমাদের ও স্ত্রীদিগের অপার আনন্দ লাভ হইত। চতুর্থ পরিচ্ছেদ। বয়স ১৭ হইতে ২২ বৎসর। অামার চাকুরী। ইংরাজী বিদ্যাভ্যাস ও স্কুলে প্রবেশ। ধর্মালােচনা। গীতি শিক্ষা। সুখের অবস্থা। জীবনের প্রথম পরীক্ষা। নানা দেশ ভ্রমণ। মেডিকেল কলেজে প্রবেশ। রাজা ঐশচন্দ্রের শিক্ষার ভারগ্রহণ। বাল্যবিবাহ প্রথা। রেড়ীর চাস। মুন্সেফী পরীক্ষার উদ্যোগ। আমার বিবাহের এক বৎসর কি দুই বৎসর পরে কাছারির কাৰ্য্য শিক্ষার্থ আমি এখানকার জজ আদালতের রিটর নবিশের আমার চাকুরী। সেরেস্তায় লেখাপড়া করিতে লাগিলাম। কিছু ৩৪ আত্ম-জীবনচরিত। দিনের পরে যে একজন নূতন রিটর নবিশ হইলেন, তিনি পারস্যভাষা জানিতেন না। | জজের নিজের লােক বলিয়া তিনি এই কৰ্ম্ম পান। সাহেবের। মনে করিলে মনুষ্য কেন পশুকে দিয়াও কার্য চালাইতে পারেন। তাহার কার্য্য আমিকিরিতাম, তাঁহার বেতন আমাকে দিতেন, উপরিলাভ আপনি লইতেন । "ইহার কয়েক দিন পরেই গবর্ণমেণ্ট গেজেটে প্রকাশ হইল যে এ দেশের সমস্ত রাজকাৰ্য্য দেশীয়ভাষায় চলিবেক। বাঙ্গা- আদালতে ইংরাজী প্রচলন। লীর পক্ষে পারস্য একরূপ অকর্মণ্য হইল, এবং ইহার আদর এক কালে উঠিয়া গেল । বহু যত্নের ও শ্রমের ধন অপহৃত হইলে, অথবা উপার্জনক্ষম পুত্র হারাইলে যেরূপ দুঃখ হয়, সেইরূপ দুঃখ এই সংবাদে আমাদের মনে উপস্থিত হইল। অনেক পরিশ্রমপূৰ্ব্বক যে কিছু শিখিয়া- ছিলাম, তাহা মিথ্যা হইল, এবং বিদ্বান বলিয়া যে খ্যাতি লাভের আশা ছিল, বিলমে ইংরাজী শিক্ষা। তাহা নিৰ্ম্মল হইয়া গেল। পূর্বে আমার পিসতুত ভ্রাতা শ্ৰীপ্রসাদকে আমি পারস্য শিখাইতাম, তিনি আমাকে ইংরাজী পড়াইতেন। কিন্তু এ বিদ্যাশিক্ষায় আমার বিশেষ মনােযােগ ছিল না। এক্ষণে পারস্যবিদ্যার আলােচনায় এককালে বিরত হইয়া ইংরাজী- বিদ্যা শিক্ষায় মনােনিবেশ করিলাম। শ্ৰীপ্রসাদ কলিকাতার মহাত্ম। হেয়ার সাহেবের স্কুলের একজন প্রধান ছাত্র ছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনি কলিকাতা ত্যাগ করিয়া শ্ৰীপ্রসাদের স্কুল। বাটী আসিয়া অবস্থিত হন। বুদ্ধিমান, তেমনই দেশহিতৈষী ও পরােপকারী ছিলেন। তৎকালে গােয়াড়ীতে পাদরী সাহেবদের একমাত্র স্কুল ছিল দূরতাবশতঃ তাহাতে তাহার প্রতিবাসী বালকদের পড়িবার সুবিধা ছিল না। এ কারণে তিনি আপন বাটীতে একটি অবৈতনিক স্কুল স্থাপন করিয়া স্বয়ং শিক্ষা দিতেন। স্কুলে প্রবিষ্ট হইলে বালকদের সঙ্গে পড়িতে হইবে বলিয়া আমি স্বতন্ত্র রূপে পড়িতে লাগিলাম। শৃগাল কুকুরের গল্প পাঠে পাছে আমার ইংরাজী বিদ্যায় বিতৃষ্ণা জন্মে, একারণ এক খানি শিশুবোধক পুস্তক পাঠের পরেই শ্ৰীপ্রসাদ আমাকে টেলিমেকস (Telemachus), ক্যাম্বেলের প্লেজরস অব হোপ (Pleasures of Hope) পড়াইতে লাগিলেন। তিনি পুস্তকদ্বয়ের প্রত্যেক শব্দের অর্থ লিখিয়া দিতেন, এবং অতি সুন্দররূপে তাহার মর্ম বুঝাইতেন। শ্ৰপ্ৰসাদ যেমন বিদ্যায় লজ্জাত্যাগ। এ দেশস্থ তদানীন্তন প্রায় সকলেরই মনে এই ধারণা ছিল যে, ইংরাজীতে পশুর ও বালকের গল্প ব্যতীত উচ্চাঙ্গের কোন সুমধুর গল্প নাই । সে সময় এ অঞ্চলের যে দুই এক জন এ বিদ্যায় পারদর্শী হইয়াছিলেন, তাহারা প্রায়। সম্বৎসরই কলিকাতায় থাকিতেন, এবং তাঁহারা বাটা আসিলেও তাঁহাদের সহিত বহুলােকের আলাপ হইত না। সুতরাং যে দুই একজন কেরাণীকে দেখিতে পাইতাম , তঁাহারা নিতান্ত নিম্ন শ্রেণীর বাকের পাঠ্য পুস্তক দুই এক খানি পড়িয়া, যাহাতে হস্তাক্ষর সুন্দর হয়, তাহাতেই প্রায় মনােযােগ দিতেন। উচ্চাঙ্গের গল্প পাঠের ইচ্ছা থাকিলেও তাহা পূর্ণ করা সহজ ব্যাপার ছিল না। যেহেতু তৎকালে কলিকাতা, শ্রীরামপুর ও হুগলি ব্যতীত, এ প্রদেশে অন্য কোন স্থানে স্কুল ছিল না। নবদ্বীপে, রামকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, কৃষ্ণনগরে কেশবচন্দ্র লাহিড়ী, হরিনারায়ণ পাল, প্রতাপ ইংরাজী ভাষাভি ৪ জন। চন্দ্র পাল, এই কয়েক জন মাত্র আমাদের জানিত ইংরাজীভাষাভিজ্ঞ লােক ছিলেন। ইহাদের মধ্যে মধ্যে কেশবচন্দ্র কেশবচন্দ্র লাহিড়ী আরব্যোপন্যাস ও অন্যান্য কয়েক খানি ভাল ভাল গ্রন্থ পড়িয়াছিলেন, এবং শুদ্ধ রূপে ইংরাজী ভাষায় পত্র লিখিতে পারিতেন। তিনি অসাধারণ বুদ্ধি মা ও মেধাবী ছিলেন। এই কারণেই বোধ হয় তাহার এত দূর বিদ্যা হইয়া- ছিল। তিনি সুবিখ্যাত বাবু রামতনু লাহিড়ীর অগ্রজ ছিলেন। তিনিই রামতনু, রাধাবিলাস, শ্ৰীপ্রসাদ ও কালীচরণ, ভ্রাতৃচতুষ্টয়কে ক্রমশঃ কলিকাতায় লইয়া যাইয়া স্কুলে প্রবিষ্ট করাইয়া দেন। রামতনুবাবুর পূর্বে বা তঁাহার সময়ে, এ জেলার আর কেহ হিন্দু কলেজে প্রবিষ্ট হন কি না, তাহা আমি জানি না। যখন পারস্যভাষা রাজ কার্যে অব্যবহৃত হয় তখন আমি টেলিমেকাস ও ক্যাম্বেলের প্লেজারস্ অব হােপ পড়িতেছিলাম । রীতিমত না পড়িলে এ সখের পাঠে বিদ্যাশিক্ষা হইবে না, এই ভাবিয়া উক্ত দুই পুস্তক ছাড়িয়া দিলাম, এবং নিম্নশ্রেণীর পাঠোপযােগী পুস্তক সকল পড়িতে আরম্ভ করিলাম ; এবং এক বৎসর মধ্যে তিনখানি রিডর ও একখানি “গ্রামার” বিদ্যায় লজ্জাত্যাগ। পড়িলাম। স্কুলের শ্রেণীভুক্ত হইয়া পড়িলে অধিক উপকার হইবে, এইরূপ বিবেচনা করিয়া দ্বিতীয় বর্ষে লজ্জাত্যাগ পূৰ্ব্বক তৃতীয় শ্রেণীতে পড়িতে লাগিলাম, এবং কয়েক মাস পরেই দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠিলাম । ৩৪ মাস গত হইলে প্রথম শ্রেণী ভুক্ত হইলাম। এই শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক আত্ম-জীবনচরিত। কয়েকখানি আমার সহপাঠীরা দ্বিতীয় বার পড়িতেছিলেন। শ্ৰপ্ৰসাদ আমার সুগমের জন্য অল্প অল্প পাঠ দিতে চাহিলেন, কিন্তু তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ আমাকে অপ্রতিভ করিবার মানসে অধিক পাঠ লইতে লাগিলেন। এত অধিক পাঠ অভ্যাস করা আমার পক্ষে দুষ্কর হইল। শ্ৰীপ্রসাদ তাহাদের অভিসন্ধি বুঝিয়া এই শ্রেণীকে দ্বিতীয় শ্রেণী করিয়া আমার নিমিত্ত নুতন একটা প্রথম শ্রেণী করিলেন, আর কহিলেন, যে শ্রেণীভুক্ত কার্তিক { আমি) থাকিবেন, সেই শ্রেণীতে আমার বিশেষ মনােযােগ থাকিবে। যদি ইচ্ছা হয় ত এই শ্রেণীভুক্ত তােমরাও হইতে পার। প্রথমে আমার আত্মীয় তারিণীচরণ রায় ও ভুবনমােহন মল্লিক এই শ্রেণীতে উঠিলেন। কিছু দিন পরে আমার বিদ্বেষী দুই জনও আমাদের সহাধ্যায়ী হইলেন। এই শ্রেণীতে আমাদের সকলেরই অপঠিত পুস্তক ব্যবস্থাপিত হইল । সুতরাং যদিও আমার সহপাঠীরা ছয় সাত বৎসর পড়িতেছিলেন, এবং আমি কেবল দুই বৎসর মাত্র পাঠারম্ভ করিয়াছি, তথাপি আমাদের সকলের পক্ষেই পাঠ্য পুস্তক নূতন হওয়াতে আমি তাঁহাদের সহিত সমান ভাবে পড়িতে লাগিলাম, এবং তাহাদেরও কোন অসদ্ভাবের কারণ রহিল না। শ্ৰীপ্রসাদের কনিষ্ঠ কালীচরণও আমাকে যারপর নাই ভাল বাসিতেন। তিনি কলিকাতা হইতে আমার প্রয়ােজনীয় পুস্তক কালীচরণ ও রামতনু। সকল আনিয়া দিতেন এবং বাটীতে অবস্থান কালে আমার পাঠের বিষয়ে নানারূপ সদুপদেশ দিতেন। তিনি আমার অধীত পারস্য গল্প শুনিতে অতিশয় ভালবাসিতেন। আমি যেমন তাহাকে এই সকল গল্প শুনাইতাম, তিনিও তেমনি আমায় পড়া বলিয়া দিতেন। তিনি কলিকাতায় হেয়ার সাহেবের স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে অধ্যয়ন করিতেন। তাঁহার জ্যেষ্ঠ বাবু রামতনু লাহিড়ী সে সময় হিন্দু কলেজের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি বৎসরের মধ্যে যে কয়েক দিন বাটা থাকিতেন, সে কয়েক দিন মধ্যে মধ্যে আমাদের পরীক্ষা লইতেন ; এবং বহু সদুপদেশ দ্বারা আমাদের ধর্মপ্রবৃত্তির উন্নতিসাধনে যত্ন করিতেন। প্রথমে শ্ৰীপ্রসাদ ও আমার স্বদেশীয় প্রচলিত পৌত্তলিক ধর্মের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল। আমরা যথাবিধি ইষ্টদেবতার পূজা না পৌত্তলিকতা ধর্মে। করিয়া জল গ্রহণ করিতাম না, আমাদের ৩৩ কোটী দেব দেবী মানিতাম, এবং প্রেত প্রেতিনী বিশ্বাস করিতাম। রামত বাবু . শ ~~~ গণিকালয়ের ইতিহাস। ৩৭ যখন পৌত্তলিক ধর্মের অলীকতার বিষয় কহিতেন তখন ভাবিতাম যে, ইংরাজী পাঠ ও ইংরাজী সংসর্গে তাহার মতিভ্রম হইয়াছে । প্রথমে আমরা তাঁহার কথায় মনে মনে উপহাস করিতাম, এবং পুস্তকে পৃথিবীর আকার, গতি, আকর্ষণ প্রভৃতি যাহা পড়িতাম, তাহার কিছুই প্রত্যয় করিতাম না। কুক সাহেবের অবনীভ্রমণ নিতান্ত অমূলক ভাবিতাম । যে সংস্কার পুরুষানুক্রমে চলিয়া আসিয়াছে, যে সংস্কার স্বদেশের সমস্ত লােকের মনে বদ্ধমূল হইয়া রহিয়াছে এবং যে সংস্কার আমারও হৃদয়ে গাঢ় রূপে অঙ্কিত হইয়াছে, তাহা সহসা নিরাকৃত হওয়া সহজ ব্যাপার নহে। কিন্তু কাল সহকারে সকলেরই পরিবর্তন হইতে পারে । ক্রমশঃ আমাদের সকল বিষয়ের তথ্যানুসন্ধানে প্রবৃত্তি জন্মিল, এবং স্বদেশীয় ধর্মের ও আচার ব্যবহারের পক্ষপাতিতা হ্রাস হইতে লাগিল। আত্মীয় বন্ধুর সহিত সৰ্ব্বদাই এই বিষয়ের আলোচনা ও তর্ক বিতর্ক করিতে বিশেষ যত্ন হইল, এবং মিথ্যাকথন, উৎ- কোচগ্রহণ, ইন্দ্রিয়দোষ, ইত্যাদি বিষয়ে অত্যন্ত ঘৃণা জন্মিল। আর ইংরাজী বিদ্যার প্রতি দিন দিন শ্রদ্ধা বাড়িতে লাগিল, এবং ইংরাজী রীতিনীতির অনুকরণে বিশেষ স্পৃহা হইল । আমাদের বাহে বিশেষ পরিবর্তন হউক না হউক, অন্তরে বিস্তর পরিবর্তন ঘটিল। এ প্রদেশে বেশ্যাগমন অতীব অধৰ্ম্ম বলিয়া বিশ্বাস ছিল । গণিকালয়ে প্রবেশকালে প্রবেশকের সঞ্চিত পুণ্য গণিকালয়ের ইতিহাস। সমূহ বহিরে রাখিয়া যাইতে হয়, এবং তজ্জন্য সেই বহিরের ভূমি পুণ্যস্থান বলিয়া তাহার মৃত্তিকা দুর্গাপূজার মহাস্নানে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। বােধ হয়, এই কারণেই প্রাচীনদিগের প্রায় কোন ব্যক্তিকে বারাঙ্গণার গৃহে প্রবেশ করিতে দৃষ্ট হইত না। কৃষ্ণনগরের কেবল আমিনবাজারে বেশ্যালয় ছিল। গােয়াড়ীতে কয়েক ঘর গােপ ও মালে গাড়ার ও অন্যান্য নীচ জাতির বসতি ছিল। পরে যখন ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট এই স্থান প্রশস্ত ও নদীতীরস্থ দেখিয়া ইহাতে বিচারালয় সকল স্থাপন করিলেন, সেই সময় সাহেবের গােয়াড়ীতে পশ্চিম দিকে, ও তাহাদের আমলা উকীল ও মােক্তারের। ইহার পূর্ব দিকে, আপন আপন বাসস্থান নির্মাণ করিতে লাগিলেন। তৎকালে বিদেশে পরিবার সঙ্গে লইয়া যাইবার প্রথা অপ্রচলিত থাকাতে, প্রায় সকল আমলা, উকীল বা মােক্তারের এক একটা উপপত্নী আবশ্যক হইত। সুতরাং তাহাদের বাসস্থানের সম্নিহিত এমন কি ৩৮ আত্ম-জীবনচরিত। না। স্থানে স্থানে গণিকালয় সংস্থাপিত হইতে লাগিল। পূৰ্বে গ্রীস দেশে যেমন পণ্ডিত সকল ও বেশ্যালয়ে একত্রিত হইয়া সদালাপ করিতেন সেইরূপ প্রথা এখানেও প্রচলিত হইয়া উঠিল। যাহারা ইন্দ্রিয়াসক্ত নহেন, তঁাহারাও আমো- দের ও পরস্পর সাক্ষাতের নিমিত্ত এই সকল গণিকালয়ে যাইতেন। সন্ধ্যার পর রাত্রি দেড় প্রহর পর্যন্ত বেশ্যালয় লােকে পরিপূর্ণ থাকিত। বিশেষতঃ পৰ্বোপলক্ষে তথায় লােকের স্থান হইয়া উঠিত না। লােকে পূজার রাত্রিতে যেমন প্রতিমা দর্শন করিয়া বেড়াইতেন, বিজয়ার রাত্রিতে তেমনই বেশ্যা দেখিয়া বেড়াইতেন। বাল্যকালাবধি আমার সঙ্গীতবিদ্যায় অতিশয় অনুরাগ ছিল। ১০/১২ বৎসর বয়সেই আমি ঢােলক ও তবলা কিছু কিছু বাঙ্গাইতে পারিতাম । গীতশ্রবণে বড়ই আনন্দ হইত, কিন্তু স্বয়ং গাইতে কখনও চেষ্টা করিতাম আমার সমবয়স্ক ও সুসম্পর্কীয় শান্তিপুরনিবাসী জনৈক যুবা আমাদের গ্রামে তাহার মাতুলালয়ে আইসেন। তিনি বাঙ্গালা সঙ্গীতানুরাগ। ১০/১২টা গীত কোন গায়কের নিকট শিক্ষা করিয়া- ছিলেন। এবং তাহা অতি সুন্দর রূপে গাইতেন। তঁাহাকে জিজ্ঞাসা করি- লাম, কিরূপে তােমার মিষ্ট স্বর হইল। তিনি উত্তর করেন যে, ওস্তাদের উপদেশানুসারে স্বর সাধিতে আমার ঐ রূপ স্বর হইয়াছে। আমিও তঁাহার উপদেশানুসারে স্বর সাধিলাম । এবং দুই মাস মধ্যে তাঁহার অভ্যস্ত গীত কয়েকটি শিখিলাম। অত্যল্পকাল মধ্যে আমার স্বরের প্রশংসা হইল। স্ত্রী পুরুষ সকলেই আমার সঙ্গীতে আনন্দিত হইতেন। আমাদের তৎকালীন রাজকুমার শ্রীশচন্দ্রকে শ্রীপ্রসাদ যখন ইংরাজী পড়াইতে যাইতেন, তখন আমিও মধ্যে মধ্যে তঁাহার সঙ্গে রাজবাটী খাইতাম। একদিন রাজপুত্র শ্রীপ্রসাদকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, “তােমাদের মধ্যে কেহ গাইতে পারেন ?” শ্রীপ্রসাদ আমাকে দেখাইলেন। রাজনন্দনের অনুরােধে আমি একটা গীত গাইলাম। তিনি আমার স্বরের অনেক প্রশংসা করিয়া বলিলেন, “তুমি আমার গায়ক মাধবচন্দ্র মুখােপাধ্যায়ের নিকট গীত অভ্যাস কর।” মাধবের নিকট ভৈরবী রাগিণীর সারে গম একটী, ভৈরব রাগের খেয়াল একটী, আর আলাইয়া রাগিণীর খেয়াল তিনটা শিখিলাম। যদিও সন্ধ্যার পর রাজবাটী যাইতাম, তথাপি পড়াশুনার ক্ষতি হইবে এ কারণ সঙ্গীতশিক্ষায় বিরত হইলাম। কিন্তু রাজপুত্র অতিশয় ভালবাসিতেন বলিয়া কখন কখন রাজভবনে সখা-সুখ। যাইতাম ও নানারূপ সঙ্গীত শুনিতে পাইতাম। ইহাতে এ শিক্ষায় অনেক ফল হইত। পড়িবার অনেক সময় নষ্ট হয় বলিয়া আপাততঃ সঙ্গীত শিক্ষা রহিত করিলাম বটে, কিন্তু ইহার অভিলাষ এককালে ত্যাগ করিলাম না । বর্ষ পরে পুনরায় মহেন্দ্রচন্দ্র খাজাঞ্চি মহাশয়ের নিকট অনেকগুলি খেয়াল ও টপ্পা শিখি। কয়েক বৎসরস্তর কলিকাতার হচ্ছ খাঁ নামক এক জন গায়কের নিকট ৪০৫০টী খেয়াল শিক্ষা করি। এই পর্যন্তই আমার শিক্ষার সীমা হয়। বোধ হয় এক্ষণে আমায় ২০ বৎসর বয়ঃক্রম হইয়াছিল। যে কয়েক বৎসর আমি ইংরেজী পড়ি সে কয়েক বৎসর আমার বড়ই সুখে অতিবাহিত হয়। শ্ৰীপ্রসাদ, কালীচরণ, তারিণীচরণ রায়, কার্তিকেয়চন্দ্র লাহিড়ী, ভুবন- মােহন মল্লিক, ভগবানচন্দ্র দত্ত, প্রসন্নচন্দ্র চক্রবর্তী ইহারা সকলেই আমাকে যার-পর-নাই ভালবাসিতেন। আমি সর্বদাই সখা-সুখ। তাহাদের নিকট থাকিতাম। দিবসে আহার কবিবার নিমিত্ত একবার বাড়ী যাইতাম। রাত্রিতেও মধ্যে মধ্যে শ্রীপ্রসাদের বাটীতে থাকিতাম ; আমাদের মধ্যে কেবল কালীচরণ কলিকাতায় থাকিতেন। কিন্তু ছুটা পাইলেই বাটী আসিয়া আমাদের সঙ্গে মিশিতেন। আমরা প্রায় সকলেই দিবাযামিনী একত্ৰ থাকিতাম। কয়েকজনই পরস্পরকে সহােদর জ্ঞান করিতেন। কখন কখন অতি প্রত্যুষে বা বৈকালে শ্ৰীবনে বা লাল- বাগানে বেড়াইতে যাইতাম। কখন কখন সেই স্থানে বসিয়া নভেল পড়িতাম, কখন গীত গাইতাম। এক জনের পীড়া হইলে অন্য কয়েক জন দিবারাত্রি তাহার সেবাশুশ্রুষা করিতেন। আমাদের চরিত্র দর্শনে সকলেই ইতেন, এবং আমাদের প্রণয়কে অকপট পবিত্র প্রেম বলিয়া প্রশংসা করিতেন। ইদানীন্তন যুবকগণ আমাদের প্রণয়ের কাহিনী শুনিলে বিস্ময়াপন্ন হইবেন সন্দেহ নাই। শ্ৰীপ্রসাদ আমাকে তাহার অর্ধাঙ্গ কহিতেন। আমাকে সুখী দেখিলে সুখী হইতেন, দুঃখী দেখিলে দুঃখী হইতেন। তাহার যে খাদ্য ভাল লাগিত, তাহার কিয়দংশ আমাকে না দিলে তাহার তৃপ্তিলাভ হইত না। কালীচরণ বড় খােস পােষাকী ছিলেন। তিনি মেডিকেল কলেজে যে ছাত্রবৃত্তি পাইতেন, তাহাতে উত্তম উত্তম ধুতি, উড়ানি ও বিনামা ক্রয় করিতেন। যখন বাটী আসিতেন, তখন! ইহার কোন কোন দ্রব্য আমাকে জেদ করিয়া দিতেন, ৪০ আত্মজীবনচরিত। আর কহিতেন, ছােট দাদা, এ সকল দ্রব্য তােমার অঙ্গে যেমন ভাল দেখায়, তেমন আমার অঙ্গে দেখায় না। আবার কখন কখন আমার মােটা বস্ত্র লইয়া তঁাহার ভাল বস্ত্র আমাকে দিতেন। যদি বিবেচনা করা যায় যে, তাহারা আমার পিসতুতো ভাই, সুতরাং আমাকে ত তাঁহাদের ভালবাসিবার সম্পর্ক, কিন্তু অন্যান্য নিঃসম্পর্কীয় বান্ধবগণ যে আমার কি গুণ দেখিয়া আমাকে এত স্নেহ ভক্তি সৌভাগ্য। ভালবাসিতেন, তাহা আমি এক্ষণে স্থির করিতে পারি না। তাহাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে সহােদরের ন্যায় স্নেহ করি- তেন, এবং গুরুজনের ন্যায় মান্য করিতেন। একই ব্যক্তিতে এতাদৃশ যুগপৎ স্নেহ ও ভক্তি প্রায় দৃষ্ট হয় না। অতি অশান্ত ও সকলের অবাধ্য বাল- কেরাও আমার বশীভূত হইত। যে সময় আমি মেডিকেল কলেজে পড়িবার জন্য কলিকাতায় থাকি, সে সময় আমরা যে বাটীতে থাকিতাম, প্রসিদ্ধ মদনমােহন তর্কালঙ্কারও সেই বাটীর একাংশে অবস্থান করিতেন। রামলাল ও শ্যামলাল নামে তঁাহার দুই বিখ্যাত দুরন্ত খুড়তত ভাই তঁাহার সঙ্গে থাকিত। তাহারা কাহারও বাধ্য ছিল না, কিন্তু আমার বশীভূত হইয়াছিল, এবং আমাকে গুরুর ন্যায় মান্য করিত ও আমার সকল কথা শুনিত। আর একটী এইরূপ দৃষ্টান্ত না লিখিয়া ক্ষান্ত হইতে পারিলাম না । আমার কোন সুসম্পর্কীয় পরিবারের মধ্যে একটা কিঞ্চিৎ বায়ুগ্রস্ত। বধূ ছিলেন। ইনি কাহারও বাধ্য ছিলেন না; সংসারের কার্য্য বায়ুগ্রস্ত কুলবধূ। স্বেচ্ছামত করিতেন। কিন্তু কোন দিন রন্ধন করিবার ইচ্ছা না থাকিলেও, আমি তাহাদের বাটীতে আহার করিব শুনিলে, রন্ধন করিতে যাইতেন। একদিন তিনি রন্ধনকরণে নিতান্ত অ প্রকাশ করাতে, তঁাহার শাশুড়ী কহিলেন, তবে “তােমার ঠাকুরপো উপবাস করিয়া থাকুন।” ইহা শ্রবণ মাত্র তিনি পাকগৃহে যাইয়া রন্ধন করিলেন। কিন্তু পরিবেশন কালে আমাকে না দেখিয়া অত্যন্ত রুষ্ট হইলেন। ইহার পর ইচ্ছা না থাকিলে আর কাহারও কথায় বিশ্বাস না করিয়া আমাকে না দেখিলে রন্ধনশালায় প্রবিষ্ট হইতেন না। এক্ষণে কখন কখন ভাবি যে, সে সময় অপেক্ষা আমার আকার-গত বিস্তর পরিবর্তন হইয়াছে। তাহা দেখিতেছি, কিন্তু যে গুণে আমার প্রতি আত্মীয়দের স্নেহ ও ভক্তিভাব ছিল, তাহার তিরোধান কিরূপে হইল, তাহা বুঝিতে পারি না।
এখন আর তখন। ৪১ আমার স্বভাবের জন্যই হউক, বা আকারের জন্যই হউক, কি স্বরের জন্যই হউক, অথবা এই সকল কারণের সমষ্টিতে হউক, আমাকে স্ত্রীলােকেরা নিরতিশয় ভালবাসিতেন। এমন কি, শুনিয়াছি, রমণীগণের ভালবাসার হেতু। বালিকারাও আমার মত স্বামী হয় আপনাদের মধ্যে বলা কহ করিত। আমার বােধ হয় যে, আমার স্বরের গুণেই কামিনীকুল অামাকে এত ভালবাসিতেন । কোরণ, তৎকালে আমাদের মধ্যে আমা অপেক্ষা অনেক সুপুরুষ ও মিষ্টভাষী ছিলেন। যখন দেখা যায় যে, পুরুষের মধ্যে যাহার হৃদয় যে পরিমাণে কামল, তিনি সেই পরিমাণে সঙ্গীতানুরাগী হন, তখন কোমল রমণীহৃদয় যে সঙ্গীতবিলাসী হইবে, তাহার আর সন্দেহ ক ? পশ্বাদির মধ্যে যে হরিণ জাতি সঙ্গীতে আকৃষ্ট হয়, তাহার ও কারণ বােধ হয় ঐ কোমল স্বভাব। ব্রজবালার শ্রীকৃষ্ণের রূপে ততদুর মুগ্ধ হয় নাই, যত দূর তাহার বংশীর ধ্বনিতে হইয়াছিল। সুকণ্ঠ নিঃসৃত স্বরে কখন কখন পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত হইয়াছে। আমার জ্যেষ্ঠতুতো ভ্রাতার এক মাতুলের অতি সুমধুর স্বর ছিল। তিনি একদা রাত্রিতে প্রসিদ্ধ তঙ্কর বিশ্বনাথের হস্তে পতিত হন। সঙ্গীত ও দস্য। তাহাকে বধ করা স্থির হয়। তিনি মৃত্যুর পূর্বে জন্মের শােধ একবার মায়ের (কালীর) নাম করিবার প্রার্থনা করেন । দরাজ তাহার আবেদন গ্রাহ্য করিলে, তিনি এবার বাজি ভাের হল” এই প্রসিদ্ধ রামপ্রসাদী গীত আরম্ভ করেন। তাঁহার গীত শুনিয়া তস্করদিগের নয়নজলে বক্ষঃস্থল প্লাবিত হইল। তাহারা তাহাকে একটী স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করিল, এবং সঙ্গে লােক দিয়া নিরাপদ স্থানে পৌছিয়া দিল । আমি যেখানেই যাইতাম, সেই খানেই আমি সকলের প্রিয় হইতাম । বন্ধুবর্গের সভায় আমি অনুপস্থিত থাকিলে তাহার। এখন আর তখন। আমার সমাগমাভাবের জন্য কতই বিষাদ প্রকাশ করিতেন। আহা! সে সুখের কাল অনেক দিন বিগত হইয়াছে, এত যে প্রিয়তম পুত্র কা পাইয়াছি, অপেক্ষাকৃত ধন ও মান প্রাপ্ত হইয়াছি, উদ্যান করিয়া বাল্যাভিলাষ পূর্ণ করিয়াছি, কিন্তু কিছুতেই আর সে অভাব দুর হই- তেছে না। এক্ষণে যেন আর এক পৃথিবীতে রহিয়াছি। সে পৃথিবীতে যে সকল নয়নসুখকর ও হৃদয়রঞ্জক বস্তু দেখিয়াছি, এ পৃথিবীতে যেন তাহার কিছুই নাই। পূর্বে যে সকল প্রিয়তম বান্ধব ছিলেন, তাহাদের * sex 82 আত্ম-জীবনচরিত। মধ্যে অদ্যাপি কেহ কেহ জীবিত আছেন; কিন্তু তাহাদের ও ত আর পূর্ব মত প্রণয় দেখিতে পাই না। অথবা আমারই মন আর সে প্রণয়ের সুখানু- ভব করিতে পারে না। কখন ভাবি আমার যে দশা হইয়াছে, তাহাদেরও সেই দুরবস্থা ঘটিয়াছে । বােধ হয়, যেন যৌবনের সঙ্গে সঙ্গে সকল সুখই তিরে - হিত হইয়াছে। পূৰ্ব্ব কালে যে সকল সুখভােগ করিয়াছি, সে সব সুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিব। মাত্র যেন পলাইয়া যায়। ধরিবার সহস্র চেষ্টা করিলেও ধরা যায় না। সেই শ্ৰীবন, সেই লালবাগান অদ্যাপি বর্তমান আছে । কিন্তু তৎসমুদয় ত আর আমাদের কাহারও দেখিতে স্পৃহা হয় না। স্পৃহা দুরে থাকুক, তাহার নামও উল্লেখ করা যায় না। যে কয়েক জন বান্ধব জীবিত আছেন, তাঁহাদের আর বন্ধুদর্শনাভিলাষ দৃষ্ট হয় না; যে রমণীরা আমাদিগকে দেখিবার নিমিত্ত কতই ব্যাকুল হইতেন, এবং আমাদের সহিত আলাপ করিয়া কতই সুখ ও আহলাদ প্রকাশ করিতেন, এক্ষণে তাহারা আর ত আমাদের নামও করেন না। পূৰ্ব্বে তাহাদের বাড়ীতে যাইলে গুরুজনের ভয়ে সহসা আমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিতেন না, তথাপি নানা কৌশল করিয়া আমাদিগকে দর্শন দিতেন। এক্ষণে তাহারাই বাটীর প্রধানা হইয়াছেন, গুরুজনের ভয় করিতে হয় না। তথাপি হঠাৎ চারি চক্ষু একত্র হইলে মুখ ফিরাইয়া যান। শুদ্ধ তাহাদের দোষ দেওয়া অন্যায়, আমাদেরও ত সেই ভাব হইয়াছে। তঁাহাদের দর্শনে ও কথনে আমরা যে স্বর্গলাভ করিতাম, সে স্বর্গের জন্য আর ত এক্ষণে ব্যস্ত হই না। যেমন বসন্তাবসানের সঙ্গে মলয়ানিলের স্নিগ্ধকর হিল্লোল, কুসুমকাননের শােভা, এবং কোকিলের সুমিষ্ট স্বর তিরােহিত হয়, তেমনই বােধ হয়, যৌবনের সঙ্গে জীবনের সকল সুখ পলায়ন করে। বাল্যকাল স্মরণ হইলে কত কথাই মনে পড়ে । এককথা শেষ করিলে আর এককথা স্মৃতিপথে আইসে। হৃদয়ের কত মনােমােহিনী কামিনী। পবিত্রতা ছিল। কোন দুষণীয় ভাবই মনােমধ্যে স্থান পাইত না। মিত্রতার সহিত কিছুমাত্র স্বার্থপরতা ছিল না। প্রেমের সহিত কিছুমাত্র অপবিত্রতা মিশিত না। চিত্তের সকল ভাবই যেন নির্মল রসে পুর্ণ থাকিত। বন্ধুতা ও প্রেমের একই ভাব ছিল। যে কামিনীর মােহিনী মূৰ্তি দিনযামিনী হৃদয়মন্দিরে অধিষ্ঠিত ছিল, সে মূৰ্ত্তিকে দর্শন ব্যতীত স্পর্শ করিতে বাঞ্ছা হইত না। দৈবাৎ স্পর্শ হইলেও শরীরে কোন অপবিত্র ভাবের স্ত্রী-স্বাধীনতা। ৪৩ আবির্ভাব হইত না। দর্শন স্পৰ্শন উভয়েতেই পবিত্রভাব ছিল। আমাদের উভয়েরই বয়ঃক্রম তৎকালে চৌদ্দ কি পনর বৎসর । এ দেশের প্রচলিত প্রথানুসারে নিন্দার ভয়ে তিনি আমার সহিত স্পষ্টরূপে কথা কহিতে পারিতেন । কিন্তু নানা ছলে অন্যকে মধ্যবর্তী করিয়া আমাকে তাহার কথা শুনাইতেন। হাসিলে তাহার মুখমণ্ডলের অপূর্ব সৌন্দৰ্য যেমন নয়নরঞ্জন করিত, হাসির মধুর ধ্বনিতে কর্ণকুহরে তেমনই সুধাবর্ষণ হইত। তিনি আমার সঙ্গীতে যেরূপ পুলকিত হইতেন, আমিও তেমনই তাহার মধুর মনােহর স্বরে মােহিত হইতাম। কিন্তু তিনি যেমন আমার গান ইচ্ছা করিলেই শুনিতে পাইতেন, আমাদের দুর্ভাগা দেশের প্রথাবশতঃ আমি তাহার গীত সেরূপ শুনিতে পাইতাম না। তিনি যখন নিভৃত স্থানে সঙ্গিনীমণ্ডলে মধুকরের ন্যায় মৃদু মধুর স্বরে গান করিতেন, তখন আমি লুক্কায়িত থাকিয়া অতি সঙ্গোপনে তাহার গীত শ্রবণ করিতাম। কখন কখন তিনি আমার সমাগম বুঝিতেও পারিতেন, অথচ যেন জানিয়া ও জানিতেন না। যদি কোন সখী কহিত যে, কেহ চুরি করিয়া তােমার গান শুনিয়াছে, তিনি যেন বিস্ময়াপন্ন হইয়া বলিতেন, “কি লজ্জা! আর ত আমি কখনও গাহিব না।” কিন্তু আমি যেরূপ তাহাকে গান শুনাইতে ভাল বাসতাম, তিনিও তেমনই আমাকে তাহার গান শুনাইতে ভালবাসিতেন। আহা ! দেশ বিজাতীয় শাসনের অধীন হওয়াতে আমরা কত প্রকার সুখেই বঞ্চিত হইয়াছি। ভদ্রমহিলার সঙ্গীত কর্ণ- স্ত্রী-স্বাধীনতা। গােচর হওয়া দূরে থাকুক, তাহাদের মুখমণ্ডল নয়ন- গোচর হওয়াও নিষিদ্ধ। সকল পুরাণ ও নাটক আমাদিগকে স্পষ্টাক্ষরে জানাইতেছে যে, পুরাকালীন রমণীরা বিনা অবগুণ্ঠনে সাধারণ সমক্ষে আসিতেন, কথােপকথন করিতেন। মহােৎসব বা তীর্থদর্শনে যাইতেন, এবং পুরুষদিগের প্রায় সকল আমােদেরই অংশিনী হইতেন। রাজকন্যার জনাকীর্ণ সভায় আসিয়া আপনাদের রূপলাবণ্য দেখাইতেন। এবং দেখিয়া শুনিয়া পাত্রের গলদেশে বরমাল্য দিতেন, নৃত্য গীত অভ্যাস করিতেন, এবং তদ্বিষয়ের নৈপুণ্য দেখাইতেন। মহাভারতের কোন স্থানে বর্ণিত আছে যে, দ্রৌপদী ও সুভদ্রা প্রভৃতি রাজমহিষীরাও কৃষ্ণার্জুন প্রভৃতি পুরুষদিগের সহিত জলকেলি করিতে যমুনায় যান, এবং ইচ্ছামত সুধাপান করিয়া বিবিধ প্রকার আমোদ করেন। তবে ইউরােপীয় কামিনীকুলের যতদূর স্বাধীনতা আছে ততদূর হিন্দু মহিলাগণের ছিল না। শ্বেতাঙ্গনগণ যরূপ স্বাধীন ৪৪ আত্ম-জীবনচরিত। ভাবে ভ্রমণ করিয়া থাকেন, বক্সে, বাজারে পরপুরুষের সহিত আলাপ করেন, এবং যেরূপ অন্য পুরুষের সঙ্গে জড়াজড়ি করিয়া নাচেন, সেরূপ স্বাধীনতা তাঁহাদের ছিল না। ভারতবর্ষের যে যে প্রদেশে মুসলমানদিগের দীর্ঘব্যাপী শাসন ছিল না, সেই সেই প্রদেশে অদ্যাপিও পূর্ধ্বতন নিয়ম অক্ষুন্ন রহিয়াছে। এক্ষণেও মহারাষ্ট্রীয় স্ত্রীলােকদিগের মধ্যে পৌরাণিক প্রথা প্রচলিত আছে। বম্বেতে অদ্যাপি মহারাষ্ট্রীয় কামিনীর রাজত্মে বিনা মণিপুরের রাজমহিষীর নৃত্য। অবগুণ্ঠনে ভ্রমণ করিয়া থাকেন। কেহ কেহ অশ্ব- চালনায় নৈপুণ্য দেখান। সে দিন ঝন্সীর রাণীও এ বিষয়ের কি চমৎকার নিপুণতা দেখাইয়া গিয়াছেন। নিকটের মধ্যে মণিপুর অঞ্চলে এক্ষণেও পূর্ব ব্যবহার চলিয়া আসিতেছে। আমি বারিষ্টার মনােমােহন ঘোষের পিতা বাবু রাম- লােচন ঘোষের মুখে শুনিয়াছি যে, তিনি যৎকালে ঐ অঞ্চলে গবর্ণমেন্টের কোন প্রধান কর্মে নিযুক্ত ছিলেন, সেই সময় একদা মণিপুরের রাজভবনে কৃষ্ণলীলা উপলক্ষে নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। তিনি উপস্থিত হইয়া প্রথমে রাজাকে এক মােহর নজর দেন। রাজা তাহা গ্রহণ করেন। পরে রাণীর সম্মুখে ঐরূপ নজর ধরিলে তাহাও রাজা লন, ও ঘােষ বাবুকে কহেন যে, তঁাহাদের স্ত্রীরা পরপুরুষ স্পর্শ করেন না। কিঞ্চিৎ পরে রাজমহিষী ও রাজ- পরিবারস্থ অন্যান্য কামিনীরা সভামধ্যে নৃত্য গীত করেন। উৎসব শেষ হইলে রাজা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, “আপনাদের দেশে এরূপ আমােদ হইয়া থাকে কি না?” তিনি উত্তর করিলেন, “আমাদের দেশে স্ত্রীদিগের সভামধ্যে আসিবার রীতি কখনও প্রচলিত নাই।” রাজা কহিলেন, “এ রীতি কখনও নাই, একথা কহিবেন না। আপনি বিজ্ঞ হইয়া মহাভারতের কাহিনী কিরূপে বিস্মৃত হইলেন ? ভারতবর্ষে বহুকালাবধি এ রীতি প্রচলিত আছে, তবে যে যে অঞ্চলে যবনের উপনিবেশ করিয়াছে, সেই সেই অঞ্চলে এ রীতি তিরােহিত হইয়াছে।” ঘৃণাস্পদ বারবনিতার গীতে যে আমােদ হইয়া থাকে, তদপেক্ষা পবিত্র কুলকামিনীর সঙ্গীতে কতই অধিক আনন্দ হইতে পারে । যদি কোন উৎসবে গণিকার পরিবর্তে কুলস্ত্রীর সঙ্গীত হইবার নিয়ম হয়, তবে নিধনীর ভবনেও শুভকর্মে এ পবিত্র সুখলাভ হইতে পারে। ইংরেজী রীতির অনুকরণের যেরূপ লালসা হইতেছে, ও স্বদেশস্থ কোন কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের প্রণয়ে জীবনের প্রথম পরীক্ষা। ৪৫ পরীক্ষা। মধ্যে এ পবিত্র প্রথার যেমত সূত্রপাত হইয়াছে, তাহাতে আশা করা যাইতে পারে যে, এ হৃত সৌভাগ্যটীর পুনঃ প্রাপ্তির প্রতিবন্ধক বহুকাল থাকিবে না। পূর্বে যে রমণীর কথা বলিতেছিলাম, তিনি স্বামীকেও যথেষ্ট ভালবাসি- তেন, তাহার সন্দেহ নাই । তবে বােধ হইত, যেন আমাকে কিঞ্চিৎ অধিক ভালবাসিতেন। তিনি যে আমাকে ভালবাসিতেন, তাহা তঁাহার স্বামীও জানি- তেন। হেরির সময় তাহার পতি ও আমি একত্র তঁাহার গাত্রে আবির দিতাম। আমার তের বৎসর বয়স হইতে পনর বৎসর বয়স প্রণয়ে জীবনের প্রথম পর্যন্ত এইরূপ সুখের অবস্থা ছিল। তাহার পর সহসা এ সুখের সাগর শুকাইয়া গেল। বােধ হয়, তঁাহার দুশ্চরিত্রা দাসীর কুসংসর্গে বা কুমন্ত্রণায়, তাহার পবিত্র হৃদয়ে অপবিত্র ভাবের উদয় হইল। কতদিন তাহার মনের এ ভাব হইয়াছিল তাহা আমি জানিবার চেষ্টা করি নাই। তঁাহার চরিত্রের প্রতি আমার অন্তরে কোন সন্দেহ উপস্থিত হয় নাই। আমি তাহাকে পবিত্র নয়নে দেখিতাম, এবং পবিত্র মনে ভাল বাসি- তাম। কিন্তু আমি তাহাকে কেন এত ভালবাসিতাম এবং তিনিই বা আমাকে কেন এত ভালবাসিতেন, তাহা একবারও ভাবিতাম না। এক দিবস তাহার কিঙ্করী সহসা আমাকে কোন কৌশলে তাহার মনের ভাব জানাইল, আমি অত্যন্ত বিরক্ত ভাবে তাহাকে কহিলাম যে, “তাহাকে আমি মায়ের মতন জ্ঞান করিয়া থাকি, তাহার এরূপ অভিলাষ কখনই হইতে পারে না। তুই নিতান্ত মিথ্যা কথা কহিতেছিস; তাহার স্বামীকে তের ব্যবহারের কথা বলিয়া দিব।” আমার কথায় সে অতিশয় ভীত হইল এবং নিজ দোষক্ষালনের জন্য, কি কি কথা বলিয়া প্রস্থান করিল। দাসীটী ও যুবতী ছিল, এ কারণ ভাবিলাম যে, তাহার নিজের অভিলাষপূর্ণ করণার্থ আমাকে এই ফাদে ফেলিবার চেষ্টা করিতেছে; কিন্তু আমার এ সন্দেহ অচিরাৎ দূরীভূত হইল। ইহার পর হইতেই ঐ রমণী আর আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেন না; এবং আমার সম্মুখ দিয়া যাইতেন না। এমন কি, আর আমার নামও করিতেন না। তাহার ভালবাসা গেল, কিন্তু আমার ভালবাসা পূর্ব- মতই রহিল। তঁাহার জন্য বড়ই দুঃখ হইত; কিন্তু তাহার প্রতি ঘৃণা একবারও হইত না। তাহাকে আর পূৰ্ব্বমত বাহিরে দেখিতে পাইতাম না। কয়েক বৎসর পরে যখন তিনি দুইটী সন্তান রাখিয়া ইহলােক ত্যাগ করেন, তখন তাহার মল মুত্র সহিত তাঁহাকে গঙ্গাযাত্রার খাটে তুলিয়া দেই। ; ;
৪৬ আত্ম-জীবনচরিত। উপরি উক্ত ঘটনাটা আমার জীবনের এক প্রধান পরীক্ষা বলিয়া আমি তাহার এত বাহুল্য বর্ণনা করিলাম। আমার সেই বয়সে ও সেই সময়ে, আমি ষে এই প্রলােভন দমনে সমর্থ হইয়া পাপপক্ষে পতিত হই নাই, ইহা অদ্যাপি স্মরণ করিলে মনে আহলাদ উপস্থিত হয় । আমি পূর্বে একস্থানে লিখিয়াছি যে, পারস্য গ্রন্থে কাশ্মীরের স্বাভাবিক শােভার প্রশংসা পড়িয়া, তদ্দেশ দর্শনার্থ অত্যন্ত কাশ্মীর দর্শনেচ্ছা। ব্যাকুল হইয়া ছিলাম। ঐ গ্রন্থের এক স্থানে বর্ণিত আছে যে, সমাট আকবর কাশ্মীরের প্রধান দ্বারের শিরােভাগে এই কবিতা খােদিত করাইয়া দেন যে, ‘যদ্যপি ধরণী পরে থাকে সুরালয়, এই—এই সেই স্বর্গ জানিবে নিশ্চয়।” এতদ্ব্যতীত সম্রাটের পত্রনিচয়ের মধ্যে যেখানেই কাশ্মীরের উল্লেখ আছে সেখানেই তিনি দেশকে স্বর্গসম, চিরবসন্ত ইত্যাদি রূপে বিশেষণ দিয়াছেন। সুতরাং এই আশ্চর্য সৌন্দর্য্যের বিষয়ে যাহার গাঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে, তাহার হৃদয়ে যে ঐ দেশ দর্শনের কৌতূহল জন্মিবে, ইহার অসম্ভাবনা কি? তবে আমি সৰ্ব্বদাই ভাবিতাম যে, যদি কখনও সুবিধা ঘটে, তবে নিশ্চয় ঐ দেশে যাইয়া, নয়ন সার্থক করিব। এক্ষণে বান্ধবদের মধ্যে তারিণীচরণ রায়, ভুবনমােহন মল্লিক ও সীতাপতি মুখােপাধ্যায়ের সহিত অতি সঙ্গোপনে দেশ ভ্রমণের পরামর্শ করিতে লাগিলাম। তৎকালে সীতাপতি গােপনে পরামর্শ। ব্যতীত, আমাদের সকলেরই বয়স ১৮১৯ বৎসর। সীতাপতির বয়স ২৪ কি ২৫ বৎসর। সে সময় তাঁহারই বাটীতে আমাদের মিলন স্থান ছিল। তিনি ইংরাজী পড়েন নাই, কিন্তু অসাধারণ বুদ্ধিমান ছিলেন। তাহার সহিত আমাদের হঠাৎ প্রণয় হয়। একদা রামতনু বাবুর পূর্ব স্ত্রীর সঙ্কটাপন্ন পাড়া হওয়াতে, আমাদের রাত্রি জাগরণের প্রয়ােজন হয়। কিন্তু একটায় মনঃসংযােগ না হইলে রাত্রি কাটান যায় না; একারণ আমি সুশ্রাব্য উপন্যাস বলিতাম। বৈদ্য প্রভৃতি সকলেই তাহা আগ্রহের সহিত শুনিতেন। রজনীর দিকে কাহারও মন থাকিত না। কেহ কেহ সন্ধ্যার সময় আহার করিয়া আসিতেন, কেহ বা অধিক রাত্রিতে বাটী যাইতেন। ৩৪ নিশি এই রূপে অতিবাহিত করা যায়। সীতাপতি এই কয়েক রাত্তিতেই গল্প শুনিতে আসিতেন। এবং আমাদের সংসর্গে সাতিশয় সুখী হন ।
নিষ্ক মণ। ৪৭ ক্রমশঃ তাহার সহিত আমাদের যথেষ্ট প্রণয় হইয়া উঠে এবং গােলযােগ না। থাকাতে তাহার বাটী আমাদের সম্মিলনের স্থান হয়। কিছুদিন পরে আমাদের দেশপৰ্যটনের পরামর্শ স্থির হইলে, তাহার উদ্যোগ আরম্ভ হইল। আমরা বস্ত্র, পুস্তক ও অন্যান্য দ্রব্য স্ব স্ব বাটী হইতে সীতাপতির আলয়ে রাত্রিযােগে লইয়া যাইতে লাগিলাম। কাশী পর্যন্ত জলপথে যাওয়া স্থির হইয়া একখানি নৌকা ভাড়া হইল । আমাদের অভিসন্ধি প্রকাশ না পায়, এ কারণ নিজ নিজ বাটীতে কল্পিত বাক্য বলা গেল । নির্ধারিত রাত্রিতে আমাদের দ্রব্যজাত নৌকায় উঠিল। সীতাপতি ও ভুবন সন্ধ্যার পরেই নৌকায় যাইয়া স্বয়ম্ভ নগরের নীচে থাকিবেন, আমি ও তারিণী একত্রিত হইয়া শেষরাত্রিতে তথায় যাইব, এইরূপ স্থির হইল । ঐ রাত্রে আমি শয়ন করিলে, আমার স্ত্রী আমার দেশান্তরে যাওয়া বুঝিতে পারিয়া, রোদন করিতে লাগিলেন। এবং কোন কথাই বিশ্বাস না করিয়া জাগরিত থাকিলেন। রজনী শেষে উভয়েরই নিদ্রা আসিল। কিঞ্চিৎ কাল পরে জাগরিত হইয়া দেখিলাম প্রভাত হইয়াছে। অমনই ব্যস্ত সমস্ত হইয়া যাত্রা করলাম। পত্নীর প্রতি নেত্রপাত করিবারও সময় পাইলাম নিষ্কমণ। দ্রুতবেগে দৌড়িতে লাগিলাম । অর্ধপথে তারিণীর সহিত একত্রিত হইয়া স্বয়ম্ভু নগরে উপস্থিত হইলাম, কিন্তু তরণী দেখিতে পাইলাম না। অতি কষ্টে খড়িয়ার ধারে ধারে চলিলাম, এবং শেষে নবদ্বীপে সীতাপতির ও ভুবনের সাক্ষাৎ পাইলাম । তথা হইতে অবি- লম্বে নৌকা খুলিয়া দিলাম এবং তৃতীয় দিবসে নাবিকের গ্রাম ডাইহাটে পৌছিলাম। নৌকার সংস্কার ও দাড়ির যােগাড় করিতে, তথায় তিন দিন গত হইল। এক মাসের • প্রয়ােজন মত আহারীয় সামগ্রী সঙ্গে লওয়া হইয়াছিল। প্রাতে নিত্যক্রিয়াসমাপনান্তে আমরা পড়িতে থাকিতাম। মধ্যাহুে একটা চরে রন্ধন করিয়া আহারাদি করিতাম। তাহার পর কিঞ্চিৎ কাল নিদ্রা যাইতাম। কৈকালে পুনৰ্বাৰু পাঠে মনোযােগ দিতাম। সন্ধ্যার অব্যবহিত পূর্বে তীরে উঠিয়া পদব্রজে যাইতাম, তরী পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিত। কখনও দৌড়িতাম, কখনও নৌকার গুণ টানিতাম, কখনও বা ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতাম। সন্ধ্যা হইলে নৌকার ছাতের উপর বসিয়া প্রায় রাত্রি চারি দণ্ড পৰ্যন্ত কখনও গগনমণ্ডলের শােভসন্দর্শনে সৃষ্টিকর্তার মহিমা কীর্তন করিতাম ; কখন বা না।
৪৮ আত্ম-জীবনচরিত। কয় জনে সমস্বরে গীত গাইতাম। কোন রাত্রিতে রন্ধন হইত, কোন রাত্রিতে মিষ্টান্ন দ্বারা ক্ষুধার নিবৃত্তি করা যাইত। এই কয়েক দিবস আমাদের বড়ই সুখে গিয়াছিল । দিবাযামিনী সকলে একত্র থাকা যাইত, পরস্পরের মনের কথা ও ভাব বন্ধুসহ ভ্রমণে সুখ। সঙ্গোপন বিনা পরস্পরের কর্ণগােচর হইত। কাহা- রও নিকট কোন বিষয়ের নিমিত্ত সঙ্কুচিত হইতে বা কোন বিষয় গােপন করিতে হইত না। সকল কথা ও কাৰ্য্য স্বাধীনভাবে চলিত। একখানিও অপ্রিয় মুখ দৃষ্টিপথে আসিত না। একটাও অসুখকর কথা কর্ণে প্রবিষ্ট হইত না। কত দেশ দর্শন করিব, কত প্রকার আচার ব্যবহার ও ধৰ্ম দেখিব, সঙ্গীত শিখিব ; ও পারস্য বিদ্যা অরিও পড়িব, এবং পরিশেষে যদি কোন স্থানে উপযুক্ত কৰ্ম্ম পাওয়া যায়, তবে কয়েক বান্ধবে একত্রে থাকিতে পারিব, ইত্যাদি কত বিষয়ের অভিলাষ রাত্রিতে শয়নাবস্থায় চিত্তে উপস্থিত হইত। অর্থাৎ, অপ্রবীণ যুবক-হৃদয়ে যে যে আশার উদয় হইয়া থাকে, তৎসমুদয়ই আমার মানসক্ষেত্রে বিচরণ করিত। কয়েক দিন পরে পলাশীর সুপ্রসিদ্ধ ক্ষেত্রের নীচে আমাদের নৌকা উপ- নীত হইল। এই স্থান দর্শনে কত প্রকার ভাবই পলাশী-ক্ষেত্র। মনে উদয় হইল। এই স্থানে প্রচণ্ড প্রতাপশালী, দুরাচারী সিরাজউদ্দৌলার সকল দর্পের ও দৌরাত্ম্যের অবসান হইয়াছিল। মীরজাফরের ও তাহার পরিবারের হৃদয়ে কতই সৌভাগ্যের আশা জন্মিয়াছিল, প্রপীড়িত ভূম্যধিকারিদের আশু শান্তির ও ভবিষ্যৎ সুখের কতই ভরসা হইয়া- ছিল, এবং ধূৰ্ত্ত চুড়ামণি ইংরেজ জাতীর চিত্তক্ষেত্রে কতরূপ নবাশার অঙ্কুর উদ্ভূত হইয়াছিল। কিন্তু সকলেরই সকল আশা নিৰ্বাপিত হইয়া গেল । কেবল ইংরেজদিগের দীর্ঘাকাঙ্ক্ষার তেজ ক্রমশই বাড়িতে লাগিল । কৃতঘ্ন- মিরজাফরের বংশের আশাবৃক্ষ ক্রমেই শুকাইতে আরম্ভ হইল, এবং বঙ্গবাসী ভূম্যধিকারীদের আশা ভরসার বিপর্যয় ঘটিল। যাহারা সিরাজদ্দৌলার রাজত্বের উচ্ছেদকরণে উদ্যোগী হল, তাহাদিগকে ইদানীন্তন অনেক কৃতবিদ্যগণ নিতান্ত অসার, পলাশী যুদ্ধ সম্বন্ধে দুই । অধাৰ্মিক এবং অপরিণামদর্শী বিবেচনা করিয়া একটী কথা। থাকেন। কেহ কেহ লিখিয়াও মনের ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন; “পলাশীর যুদ্ধ” প্রণেতা কবিবর রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে নিতান্ত অবিজ্ঞ ।
D ণীয় হয়। পলাশী যুদ্ধ সম্বন্ধে দুই একটা কথা। ৪৯ ও রাণী ভবানীকে অসাধারণ দূরদর্শীনী ও বুদ্ধিমতী বলিয়া বৰ্ণন করিয়াছেন। বর্ণনাটী অতীব হৃদয়গ্রাহিণী হইয়াছে, সন্দেহ নাই। কোমলস্বভাব কামিনী কুলের সুন্দরবদনের রসনাব্যক্ত সামান্য সুবিবেচনার কথাও জনসমাজে আদর- যখন বাঙ্গালা, বেহার ও উড়িষ্যার বিষম বিপদুদ্ধারের গাঢ় মন্ত্রণা হইতেছে, যখন ঐ তিন বৃহৎ রাজ্যের অধীশ্বরকে রাজ্যচ্যুত করণের পরামর্শ চলিতেছে ; তখন রাণী ভবানী ব্যঙ্গচ্ছলে রাজা রাজবল্লভ, জগৎশেঠ ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রভৃতি তৎকালীন প্রসিদ্ধ বুদ্ধিমান ও রাজনীতিজ্ঞ পুরুষদিগের মন্ত্রণাকে সুরুচি ও সুনীতির বিরুদ্ধ বলেন, এবং মহারাষ্ট্রীয় দ্বারা স্বদেশ স্বাধীন হইবে, এইরূপ ভাব প্রকাশ করেন। এইটী অতি সুমধুর রচনা হইয়াছে তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু রচয়িতা যদি সেই সময় এই গ্রন্থ রচনা করিতেন, তবে আর রাণীর রসনা দিয়া উক্ত কথা ব্যক্ত করাইতে পারিতেন না। একালে মহারাষ্ট্রীয়দিগের যেরূপ আচারব্যবহার দেখিতেছেন, সেরূপ সেকালে ছিল না। সে সময় তাহারা এ দেশ পুনঃ পুনঃ লুণ্ঠন করিয়া অধিবাসীদিগকে প্রপীড়িত করিয়াছিল। এ দেশস্থ লােকে তাহাদিগকে রাক্ষসের ন্যায় জ্ঞান করিত। সুতরাং এ অত্যাচারীদের দ্বারা বিপদুদ্ধারের উপায় হইবে, ইহা কাহার মনে উদ্ভাবিত হইতে পারে ? আর এরূপ উদ্ভাবন হইলেই বা কাৰ্যসিদ্ধির কি সম্ভাবনা ছিল। নবাব আলিবর্দির সময় মহারাষ্ট্রীয়গণও বারম্বার এই তিন রাজ্য অধিকারের চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু তাহাতে কি ফল হইয়া- ছিল ? প্রতিবারেই, শেষে পরাজিত ও অপমানিত হইয়া স্বদেশে পলায়ন করিয়াছিল। তাহারা যে এক্ষণে বঙ্গ অধিকার করিয়া আমাদের দুর্দশা দূর করিবে, তাহার কি সম্ভাবনা হইয়াছিল ? কৌশলে নবাবসৈন্যকে অকর্মণ্য করিতে না পারিলে সেরাজের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইবার কোন উপায় ছিল না, এবং মীরজাফরের আনুকূল্য ব্যতীতও এ ব্যাপার সম্পন্ন হই- বার অসম্ভাবনা ছিল। সুতরাং একমাত্র মীরজাফরই সকলের ভরসাস্থল হইয়া উঠেন। মীরজাফর সিরাজদ্দৌলার সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করেন, তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু তাহা বলিয়া কি করিয়া স্থির হইল যে, জগৎশেঠ ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রভৃতিও কৃতঘ্ন ? যখন সিরাজ তাহাদের প্রতি কোন বিশ্বাস স্থাপন করেন নাই, তখন তাহারা বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধী কিরূপে হইতে পারেন? আর যখন তাহারা সিরাজ কর্তৃক পীড়িত ব্যতীত উপকৃত হন নাই, তখন তাহাদের উপর # আত্ম-জীবনচরিত। কৃতঘ্নতা দোষও কিরূপে বৰ্ত্তিতে পারে? এ সকল রাজ্য সিরাজের পূৰ্বাধিকারীর পৈতৃক সম্পত্তি ছিল না। আলিবর্দি, সম্রাটের দুর্বলতা দর্শনে, তঁাহার বশ্যতা হেলন করিয়া একরূপ স্বাধীন হন, এবং রাজ্যের হিতাহিত না চিন্তিয়া অসঙ্গত স্নেহবশতঃ এক দুরাত্মার হস্তে কোটি কোটি লােকের জীবন, মান, ধন ও ধর্ম সমর্পণ করিয়া যান। এই সকল লোকের একমাত্র উপায় জাফরের সহায়তা করা কি স্বাভাবিক নহে? জাফর নেমকহারাম বলিয়া কি ইহারাও নেমকহারাম হইল ? আর, কি পুরাণে, কি ইতিহাসে, কোথায় এরূপ ঘটনা দৃষ্ট হয় না? সে যাহা হউক, যদি নবাবের পরিবর্তে ইংরাজের রাজ্য হওয়াতে আমাদের অমঙ্গল ঘটিয়া থাকে, তাহা বিভিন্ন ঘটনাক্রমে হইয়াছে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রভৃতি কেহই ভাবেন নাই যে, এই সকল অধিকার নবাবের হস্তবহির্ভূত হইয়া ইংরাজকরস্থ হইবে। ইহারা কেন, ইংরাজেরাও ভাবেন নাই যে, তঁাহারা এ সকল দেশের অধিপতি হইবেন। সুতরাং এ সকল দেশের ইংরেজ অধি- কারের নিমিত্ত ইহারা দোষাস্পদ হইতে পারেন না। পলাশী হইতে আমাদের নৌকা মুরসিদাবাদে উপনীত হইল। আমরা কেহই পূর্বে এ বৃহৎ ও বিখ্যাত নগর দেখি নাই । যে নগর বাঙ্গাল, বেহার, উড়িষ্যার রাজধানী ছিল, যে নগরে এই তিন প্রকাণ্ড মুরশীদাবাদ প্রদেশের হর্তাকর্তা বিধাতা বিরাজ করিতেন, যে নগরে কারাগারে, এ কয়েক দেশস্থ বিপুল ভূম্যধিকারী ও বিশাল প্রতাপশালী লােক বন্দী থাকিতেন, যে নগরের রাজসিংহাসনের সম্মুখে ইংরেজ ফরাসিস প্রভৃতি দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিত জাতীয়গণ অবনতশির হইতেন, সেই নগরে কতই অদ্ভুত কাণ্ড দেখিবার আশা ছিল। কিন্তু তথায় নয়নরঞ্জক বা হৃদয়- নন্দদায়ক কি বিস্ময়কর কোন চমৎকার, বস্তু দেখিলাম না। নবাব বাটীতে বড় কুঠী নামে একটা প্রাসাদ মাত্র দর্শনযােগ্য বােধ হইল। আর আর যাহা দেখিলাম, তাহাতে আনন্দ হওয়া দুরে থাকুক, বরং বিষাদে হৃদয় অভিভূত হইল। নগরের যেন আধিপত্যের সঙ্গে জীবন ও বিগত হইয়াছে। কাসিম বাজার দেখিয়া অন্তঃকরণে অতীব অসুখ উপস্থিত হইল। যে সকল বৃহৎ বৃহৎ প্রাসাদে কতই বিষয় কাৰ্য, কতই উৎসব, কাশিমবাজার। এবং কতই নৃত্যগীত হইয়াছে, সে সমুদয় এক্ষণে মৃতদেহের ন্যায় পড়িয়া রহিয়াছে। অনেক বাটীর দ্বার প্রাচীর দিয়া এককালে ভূতের গল্প। বন্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে। রাজপথে যে কয়েক জন অধিবাসী দেখিলাম, তাহাদের সকলেরই শরীর জীর্ণ শীর্ণ ও কুৎসিত। নগরটা যেন যথার্থ ভূতপ্রেতের আবাসস্থল হইয়াছে। সে স্থানে অধিকক্ষণ থাকিতেও ইচ্ছা হইল না । আমরা বাল্যাবস্থা হইতে এই কাসিমবাজারের অনেক ভুতপ্রেতের গল্প শুনিয়া আসিয়াছিলাম । যাহারা কথায় যাইতেন, তাঁহারই আসিয়া নানাবিধ প্রেতসােনির গল্প করিতেন। যদি আমাদের বিশ্বাস থাকিত, তাহা হইলে আমরা অনেক ভূত দেখিতে পাইতাম, এবং ফিরিয়া আসিয়া তাহাদের গল্প সকলকে শুনাই- তাম। কবিকুলই যে কেবল অলৌকিক গল্পের একচেটিয়াকরিয়া রাখেন, এমত নহে। অন্য লোকও, ছন্দে রচিতে না পারুন, সাধারণ বিশ্বাস্য অনেক অদ্ভুতকাহিনী কল্পনা করিয়া প্রকাশ করেন। আমি ঐরূপ যে সকল গল্প শুনিয়াছি, তাহার মধ্যে একটী নিম্নে লিখিতেছি। ইহার বক্তা অতি ভদ্রলােক ছিলেন, এবং তাহার বর্ণিত ভূত তিনি স্বচক্ষে দেখিয়াছেন, ইহা শপথপূৰ্ব্বক কহিয়াছিলেন। ভূতবক্তা কহিলেন যে, “একদা মুরীদাবাদ হইতে আসিবার সময় সন্ধ্যার প্রাক্কালে আমি কাসিমবাজারে উপনীত হইলাম। দুই এক বাটীতে যে লােক দেখিলাম, তাহারা আমাকে স্থান দিল না। এ স্থানের ভৌতিক বৃত্তান্ত পূৰ্বে শ্রুত থাকাতে, আশ্রয় পাইতে যতই বিলম্ব হইতে লাগিল, আমি ততই ভীত ও চিন্তিত হইতে লাগিলাম। শেষে ঠিক সন্ধ্যাকালে একটা বাটীতে প্রবেশ করিয়া অতি উচ্চৈঃস্বরে কহিলাম যে, “স্থানাভাবে ব্রহ্মহত্যা হয় ; আমাকে একটু স্থান দিয়া প্রাণদান করুন।” বাটীর মধ্য হইতে কেহ কহিল যে, আপনি এই দিকে আসুন। আমি আহলাদিতচিত্তে অন্তঃপুরে প্রবিষ্ট হইলাম। কিন্তু ব্যক্তিমাত্র দেখিলাম না। একটা কুঠারি হইতে কেহ কহিল, “ঐ ঘরে অতিথিসেবার সমস্ত সামগ্রী আছে ; আপনি যাইয়া প্রদীপ জ্বলুন ও হাত পা ধুইয়া, বিশ্রাম করুন। ঘরে তামাক টিকা দেসেলাই আছে। আমি পীড়িত ও আমার আর কেহ নাই। এই কথা শুনিয়া ভাবিলাম, যাহাই হউক, ভূতের গ্রামে একটা স্থানও পাইলাম । প্রদীপ আলিয়া পা ধুইলাম ও তামাক সাজিয়া খাইলাম। ভাবিলাম, রাত্রিতে আহার নাই হইল। কিঞ্চিৎকাল পরে ঐ ব্যক্তি কহিল, “আমার বাটী অতিথি উপ- বাসী থাকিতে পারিবেন না। ঐ চালায় গাভা আছে ; তাহার দুগ্ন দুহিয়া আত্মজীবনচরিত। ; ও কুলুঙ্গিতে যে চাল ও চিনি আছে, তাহা দিয়। পরমান্ন রন্ধন কর। দুই জনের মত যেন হয়। আমি উত্তর করিলাম, আমি ব্রাহ্মণ সন্তান, গাই দুহিতে জানি না। তিনি কহিলেন, ‘গরুটি অতি শান্ত, দুহিতে তােমার কোন কষ্ট হইবে না। যদি না পার; তবে প্রস্থান কর। আমি সে রাত্রিতে কোথায় যাই ? সুতরাং গাই দুহিয়া পরমান্ন প্রস্তুত করিলাম, এবং দুই পাথবে ঢালিলাম । পীড়িত ব্যক্তির নাকীস্বর হইয়া থাকে বটে, কিন্তু এ লােকটা একবারও আমার নিকট আসিল ন! ও আমাকেও নিকটে ডাকিল না। ভূতই বা হবে, এইরূপ চিন্তা করিতেছি, এমত সময় ঐ ব্যক্তি কহিলেন যে, “তুমি যাহা ভাবিতেছ, তাহা ঠিক ; কিন্তু তুমি আমার কথা শুনিলে তােমার কোন বিপদ হইবে না। পরমান্ন একপাত্র রােয়াকে রাখিয়া দাও, দ্বিতীয় পাত্র তুমি খাও। ইহা না করিলে তােমার বিপদ ঘটিবে । আমি ইচ্ছা না থাকিলেও আহার করিলাম এবং এবং রােয়াকে সপ্ স শব্দ হইতেছে শুনিয়া বুঝিলাম যে, ভূতমহাশয়ও ভােজন করিতেছেন। হঠাৎ বহির্দিকে দেখি ২৪/২৫ হাত পরিমাণ একখানি হস্ত বােয়াক হইতে নিকটস্থ গর্তের জলে পাথর ধুয়া তুলিতেছে। আমার সব্বশরীর শিহরিয়া উঠিল। যা করেন মা দুর্গা’ বলিয়া শয়ন করিলাম। ভূত মহাশয় পুনরায় কহিলেন, পশ্চিম দিকে আমার ভাইয়ের বাটী আছে । • প্রাতে ৩থায় যাইয়া তাহাকে কহিবে, যেন গয়ায় যাইয়া শীঘ্র আমার পিণ্ড দেয়। আমি উত্তর করিলাম আচ্ছা তাহাই করিব। নিদ্ৰা কিছুমাত্র হইল না । প্রভাত হইবামাত্র যাত্রা করিলাম। কিন্তু গ্রামের বাহিরে যাইবামাত্র এক ভয়ঙ্কর আকার সম্মুখে আসিয়া কহিল, আমার ভাইকে যে কথা । বলিবার অঙ্গীকার করিয়াছিলে ; তাহা বলিয়া আইস ; নতুবা তােমার ঘাড় মটকাইয়া দিব। আমি কহিলাম, ‘ভূত মহাশয় ! তােমরা দিবসেও বাহির হইয়া থাক, তাহা জানিতাম না। যাহা হউক, তােমার ভাইয়ের কাছে চলিলাম। ভূত তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হইল। আমি পুনরায় নগরে যাইয়া ভূতের ভাইকে ঐ কথা বলিয়া প্রস্থান করিলাম।” এই অদ্ভুত গল্প শুনিয়া এক্ষণ কার সকলেই উপহাস করিবেন, তাহার সন্দেহ নাই, কিন্তু শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সকল প্রেতা- সেকাল ও একালের ভুত। আর ব্যাপার ঘটিতেছে, তৎসমুদয় কেহ বা শ্রদ্ধার সহিত শুনিবেন, কেহ বা কহিবেন যে, আমি ইহার সত্যাসত্যের কিছু বুঝিতে সেকাল ও একালের ভুত। । পারি নাই। ফলতঃ অল্প লােকেই ইহাতে অশ্রদ্ধা প্রকাশ করিবেন। যেমন পূৰ্ব্বকালীন লােকেরা ভূতপ্রেত দেখিয়াছেন, এবং তাদের সহিত কথাবার্তা কহিয়াছেন, ইদানীন্তন অনেক সুশিক্ষিত ও সুবিজ্ঞ লােক ও স্পষ্টাক্ষরে সেইরূপ কহিতেছেন। তাহাদের মধ্যে বেমন ভূত’ ও ব্রহ্মদৈত্য আসিত, ইহাদের মধ্যেও তেমনি অশিষ্ট ও শিষ্ট প্রেতাত্মা আসিয়া থাকে। সেকালে যেমন মনুষ্য বিশেষের শরীবে ভূতের আবির্ভাব হইত, একালেও তেমনই মানবদেহে ভূতের আবির্ভাব হইয়া থাকে। তবে তাঁহারা যাহাকে “ভূত” বলিতেন, ইহারা তাহাকে “প্রেতাত্মা” বলিয়া থাকেন ; তাহারা যাকে ভূত-পাওয়া বলিতেন, ইহার। তাহাকে “মিডিয়” নাম দিয়া থাকেন। প্রভেদের মধ্যে এই যে, ভূতে পেলে শীঘ্র ছাড়িত না, প্রেতাত্মা অধিকক্ষণ থাকে না। ইদানীন্তন যেমন এক জন, সুবিখ্যাত, সুশিক্ষিত এবং সুপ্রবীণ কহেন যে, তাঁহার প্রিয়তমা পত্নীর প্রেতাত্মা পূৰ্বস্নেহবশতঃ অদ্যাপি মধ্যে মধ্যে কি প্রতি রাত্রিতেই তাহার শয়না- গারে আসিয়া, তাহার সহিত আলাপ করেন সে কালেও ভালবাসার জণ্ঠ কোন কোন স্ত্রীর প্রেতাত্মারা তাহার স্বামীর শরীরে প্রবেশ করিত, তবে ইনি যেমন স্ত্রীর প্রেতাত্মার সংসর্গে সুখী হন, সে কালের স্বামীরা তাহাদের স্ত্রীর প্রেতাত্মার আবির্ভাবে সুখী হইতেন না, এবং তাহাদিগকে রাখিতে চেষ্টা করিতেন না, বরং তাড়াহবার জন্য ওঝার সহায়তা লইতেন, আর পুরাকালীন ভুতের চরিত্রের প্রশংসা শুনা যাইত না, ইদানীং তাহা শুনা যাইতেছে। কিন্তু এ বিভিন্নতাও অবােধ্য নহে। কারণ এমনও হইতে পারে যে, পূৰ্ব্বে লোকের যেরূপ স্বভাব, জ্ঞান ও চরিত্র ছিল, তাহাদের প্রেতাত্মারও ঐ সকল সেইরূপ হইয়াছিল। একালে লােকের সভ্যতা যেরূপ হইতেছে, তাহা- দের প্রেতাত্মারও সভ্যত। সেই পরিমাণে বাড়িয়াছে। বিবেচনা করিতে গেলে যদি পূৰ্ব্বেকার ভূতগণ আসিয়া আমাদের সহিত ঐরূপ তর্ক করে যে, যদি তােমর। একালের ভূতযােনির অস্তিত্ব স্বীকার কর, তবে কি অপরাধে আমরা অস্তিত্ববিহীন হই আমার সামান্য বুদ্ধিতেত এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর উদ্ভাবিত হয় না। মুরীদাবাদে আমরা এ ক দিবারাত্রি অবস্থান করিলাম ইহার দুই দিবস পরে আমাদের তরণী জঙ্গীপুরের ঘাটে উপস্থিত জঙ্গীপুরে পথরােধ। হইল। এইখানে টোলঘাট থাকাতে আমাদের ছাড় করিবার প্রয়ােজন হইল। তারিণীর এক তারিণীর এক পিসতুত দাদা ঐ ঘাটের একজন ৫৪ আত্ম-জীবনচরিত। মােক্তার ছিলেন। তারিণীর গুরুজনেরা কিরূপে আমাদের অভিসন্ধি বুঝিতে পারেন, এবং অনুসন্ধান দ্বারা আমাদের নৌকার আকার ও মাজির নাম জানিয়া ঐ মােক্তার মহাশয়কে লেখেন। তিনি এই সংবাদ পাইবামাত্র দুই দিবসাবধি উজানবাহিনী সমস্ত তরণী ঘাটের দারােগা দ্বারা বন্ধ করিয়া রাখেন। আমাদের নৌকা যখন ঘাটে পৌছে, তখন তিনি তথায় ছিলেন, এবং দর্শন মাত্র তরী চিনিতে পারিলেন। পরে বলপূর্বক আমাদিগকে স্বস্থানে লইয়া গেলেন, এবং প্রায় নজরবন্দি করিয়া বাটী প্রত্যাগমন। রাখিলেন। আমাদের কোন অনুরােধ শুনিলেন , এবং কয়েকদিন পরে জনৈক লােক সঙ্গে দিয়া ঐ নৌকাতেই আমাদিগকে প্রত্যাগমনে বাধ্য করিলেন। আমাদের সকল কল্পনা ব্যর্থ হইয়া গেল, এবং লজ্জা-নম্র-মুখে বাটী আসিতে হইল। মুরশীদাবাদের সঙ্গে সমান না হউক, জঙ্গীপুরও তৎকালে অস্বাস্থ্যকর ছিল দেখিলাম, সেখানেও অনেক পুরাতন বাটী শূন্য মুরশীদাবাদ ও জঙ্গীপুর। রহিয়াছে, এবং বিধবা রমণীর ন্যায় স্বামী বিরহে দুর্দশাপন্ন হইয়াছে। এ নগরও পূৰ্ব্বে যথেষ্ট সমৃদ্ধিশালী ছিল। অত্যল্প ভাড়ায় বৃহৎ বাটী সকল পাওয়া যাইত। আমাদের কয়েক জনেরই শরীরের ভাবান্তর হইয়াছিল । এই বৎসর আমি কালি বাবুর পরামর্শানুসারে কলিকাতায় মেডিকেল কলেজে প্রবিষ্ট হইলাম ইহার এক বৎসর পূর্বে মেডিকেল কলেজে প্রবেশ। কালি ঐ কলজে প্রবেশ করিয়াছিলেন। কলিকাতায় ও আমি কালীর অক্ষ্মীয়দের অতি প্রিয়পাত্র হইলাম; সুখে কাল কাটাইতে লাগিলাম। নুতন বান্ধবগণের মধ্যে মদনমােহন তর্কালঙ্কার ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়য়ের মিত্ৰতা লাভে বড়ই সুখী হইলাম। ঠনঠনিয়ার একটী বৃহৎ বাটীর কোন অংশে রামতনু বাবু থাকিতেন, কোন অংশে মদন তাহার দুই পিতৃব্যের সহিত অবস্থান করিতেন । আমি রামতনু বাবুর অংশের এক প্রকোষ্ঠে কালীর সহিত একত্রে থাকিতাম। মদনের সহিত প্রণয় হইলে তিনিও আমাদের সঙ্গে থাকিতেন। তিনি ও বিদ্যাসাগর তৎকালে সংস্কৃত । কলেজের প্রথম শ্রেণীতে পড়িতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় বহুবাজারে কোন স্থানে বাস করিতেন সুতারাং তাহার সহিত সাক্ষাৎ না হওয়াতে মদনের সঙ্গে যত শীত্র প্রণয় হয়, তত শীঘ্র প্রণয় হয় নাই।
আমার পীড়া। একালে কলিকাতা যেরূপ স্বাস্থ্যকর হইয়াছে, সে সময় সেরূপ ছিল না। বিশেষত, দেশীয় নগরবাসীদিগের বাসস্থানের অংশ অতীব অস্বাস্থ্যজনক ও অসুখকর ছিল। এই বিভাগের প্রায় সমস্ত বক্সের পার্শ্বস্থ প্রণালীর মলযুক্ত জল হইতে দুর্গন্ধ বাষ্প সৰ্ব্বদা উখিত হইত। অভ্যাসবশতঃ অধিবাসীদের তাহাতে তত বিশেষ কষ্ট বােধ হইত না, কিন্তু বাহিরের লােকের এ সকল পথে গমনাগমন করিতে ও অতিশয় যন্ত্রণা বােধ হইত! এমন কলিকাতার কি, নাসিকা-দ্বার বন্ধ করিয়া চলিতে হইত। রাত্রিতে কোন পুর্বাবস্থা। রূপ আলােক সঙ্গে না থাকিলে গলি রাস্তায় অন্ধের ন্যায় চলিতে হইত, এবং পুলিশের নিয়ম অভাবে দস্যুভয়ে অনেক গলিতে যাইতেও সাহস হইত না। শুনা যাইত যে, তস্করের। কৃত্রিম মত্ততা প্রকাশ করিয়া পথি- কের গাত্রে পরিত, এবং তাহার শাল বা ঘড়ি লইয়া পলায়ন করিত। জাতুবীতীরস্থ স্থানসমূহ অতিশয় অপবিত্র ছিল। জলের স্থলের বহু লােক তথায় নিরন্তর মলমূত্র ত্যাগ করিত। সেখানে দাঁড়াইলে ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের ও দর্শনে- ন্দ্রিয়ের যাতনার সীমা থাকিত না। জলও এতাদৃশ মলময় ও অপরিষ্কার ছিল যে তাহাতে গঙ্গার প্রতি বিশেষ ভক্তি থাকিলেও, তাহাতে প্রফুল্লচিত্তে অবগাহন করা যাইত না। আমি কলিকাতায় যাইয়া অবধি পুষ্করিণীতে স্নান করিতাম । একদা কোন যােগে অাত্মীয়গণের সহিত জগন্নাথের ঘাটে স্নান করিতে গিয়া ছিলাম ; কিন্তু জলের অবস্থা দেখিয়া আমার স্নান করিতে কোন রূপেই প্রবৃত্তি হইল না। সেদিন আমাকে অজ্ঞাত থাকিতে হইল । তৎকালে মফঃস্বলের যে সকল লােক প্রথমে কলিকাতায় যাইতেন,তাহারে মধ্যে অনেকেরই অজীর্ণ রােগ হইত। এ পীড়াকে ‘লােনালাগা লোনা-লাগা কহিত । যাহারা তথায় অল্পকাল থাকিয়াই প্রত্যাগমন করিতেন, তঁাহার বাটী আম্বিয়া লােনা কাটাইবার নিমিত্ত কাচা ঘােড় খাইতেন, ঘোল ও কম্মির ঝোল পান করিতেন,এবং গাত্রে কঁচা হরিদ্রা মাখিতেন। অত্যল্প গুরুপাক দ্রব্যেই আমার অসুখ হইত। একারণ আমি আহারের বিষয়ে অত্যন্ত সাবধান থাকিতাম । তথাপি দুই মাসের মধ্যে আমার অরুচি জন্মিল, এবং ক্রমশঃ বল এক কালে গেল। মৃৎপাত্রে অধিক দিন লবণ থাকিলে যেমন তাহা অামার পীড়া জীর্ণ হইয়া যায়, আমার শরীর ঠিক সেইরূপ হইল । অত্যল্প আঘাতেই আমার গাত্রের ত্বক উঠিতে লাগিল। শরীরের বর্ণ শ্বেত হইয়া গেল। ঔষধসেবনে কোন উপকার না হওয়াতে নৌকাযোগে গৃহাভিমুখে যাত্রা আত্ম-জীবনচরিত। করিলাম। পরদিন হইতেই শরীর সুস্থ হইতে আরম্ভ হইল। চতুর্থ দিবসে, বাটী উপনীত হইলাম, এবং বিনা ঔষধে এক মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া কলিকাতায় পুনর্গমন করিলাম। কিন্তু যে কামনায় তথায় গিয়াছিলাম অবােধতাবশতঃ তাহা পূর্ণ করিতে পারিলাম না। মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ছাত্রগণের মধ্যে অধিকাংশ অতি অবিজ্ঞ ছিলেন। তাহারা কোন কোন বিষয়ে আপনাদিগকে অপমানিত জ্ঞান করিয়া কোন কোন অধ্যাপকের প্রতি অতিশয় বিরক্ত হইলেন, এবং শেষে কলেজ ত্যাগ করিলেন। আর তাহার পর দিবস আপনাদের মনঃ- কল্পিত দুঃখের বিবরণ পত্ৰদ্বারা শিক্ষাসমিতির গােচর মেডিকেল কলেজ করিলেন। মহাত্মা ডেবিড হেয়ার সাহেব তাঁহাদিগকে ত্যাগ ও তাহার কারণ কলেজে লইয়া যাইবার জন্য অনেক যত্ন করিলেন। কিন্তু তাহার সদুপদেশ কেহই গ্রহণ করিলেন না। দুই কি তিন দিন পরে শিক্ষা সভার সভ্যগণ ছাত্রদিগকে এক নির্ধারিত দিবসে কলেজে উপস্থিত হইতে সংবাদ পাঠাইলেন, এবং আপনারাও আগমন করিলেন । তৎকালে সার এডওয়ার্ড রায়ান সাহেব উক্ত সমাজের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছাত্রগণকে কহিলেন যে, তােমাদের অভিযােগের কোন কথাই সঙ্গত নহে, এবং তােমা- দের ব্যবহার ও ভদ্রোচিত নহে। শিক্ষাবিষয়ে আমরা যেরূপ ব্যবস্থা করিব, তাহার বিরুদ্ধে তােমাদের কথা কহিবার কোন অধিকার নাই ;তােমাদের অবস্থা আমরা যেরূপ জানি তাহাতে বােধ হয় যে কোন কোন ছাত্রের ছাত্রবৃত্তি তাহার সংসারযাত্রানিৰ্ব্বাহের প্রধান উপায় । তােমাদের দেশের উপকারার্থ এই কলেজ সংস্থাপিত হইয়াছে। যদি ইহাতে কেহ অধ্যয়ন না করে, ইহা উঠিয়া যাইবে ; তাহাতে গবর্ণমেন্টর কোন ক্ষতি হবে না, যে ক্ষতি তােমাদেরই হইবে । অতএব যাহার ইচ্ছা হয় থাকিবে, যাহার অনিচ্ছা হয় চলিয়া যাইবে। ইত্যাদি অনেক প্রকার ভৎসনা করিলে পর এই গােলযোগের প্রধান প্রবর্তক কয়েক জনের অপরাধের পরিমাণানুসারে ছাত্রবৃত্তি রহিত করিতে আদেশ দিলেন। পূর্বে এই ছাত্রদিগের মধ্যে যাহার সংসারে হতমান হইয়া থাকা অপেক্ষা জীবনত্যাগ করাও কর্তব্য ইত্যাদি মনের মাহাত্ম বিষয়ে সুদীর্ঘ বক্তৃতা করিয়া- ছিলেন,এবং যাহারা আগ্রহের সহিত তাহা শুনিয়া করতালি দিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহাদের মধ্যে এক জনেরও কথা কহিবার সাহস হইল না, সকলেরই মুখ শুষ্ক অপরিপক্ক বুদ্ধির ফল। হইয়া গেল। যাহা হউক, সাহেবেরা গমন করিলে সকলেই প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, কালেজে পুনঃ প্রবিষ্ট হইব না, এবং যদি হই, তবে কেহ কাহারে ছাড়িয়া আসিব না। কিন্তু তৃতীয় দিবসে শুনিলাম যে, রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও তদীয় বন্ধু মাধবচন্দ্র বসাক ব্যতীত, আর আর সকলেই কলেজে গিয়াছে। তথাপি কালীর ও আমার প্রতিজ্ঞা দৃঢ় থাকিল । তৎকালীন ছাত্রগণের অধিকাংশ নীচকুলােদ্ভব অথবা অত্যন্ত দরিদ্রদশা- পন্ন ছিলেন; এবং তাহাদের মধ্যে অনেকে এই চরিত্র অতি অপ্রশংসিত ছিল। একারণ পূৰ্বেই তাহাদের সঙ্গ ত্যাগের নিমিত্ত কালেজ ত্যাগ করিবার ইচ্ছা হইত। এক্ষণে এই ঘটনায় সে ইচ্ছা অারও বলবতী হইয়া উঠিল। কালী ও আমি যাহাতে কালেজ ত্যাগ না করি, তদ্বিষয়ে রামতনু বাবু অনেক সদুপদেশ দিলেন ও বহু যত্ন করিলেন। কালী তঁাহার কথায় অবাধ্য হইতে না পারিয়া কলেজে গমন করিলেন, কিন্তু আমি দুৰ্ব্বদ্ধিপরবশ হইয়া কলেজে আর প্রবিষ্ট হইলাম । সেই সময় আমাদের তৎকালীন রাজকুমার শ্রীশচন্দ্র বাহাদুর কলিকাতায় ছিলেন। তিনি প্রথমে কলেজ ছাড়িতে আমাকে নিষেধ করিলেন । শেষে আমাকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ দেখিয়া কহিলেন, আচ্ছা, তবে আমার সঙ্গে চল, যতদিন আমি আহার পাইব, ততদিন তুমিও পাইবে। কয়েকদিন পরে তাহার সমভিব্যাহারে আমি বাটী আসিলাম । আমার জীবনে যত অবিবেচনার কাৰ্য্য হইয়াছে, তাহার মধ্যে এই কলেজ ত্যাগ করাটি সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক। বিজ্ঞ গুরুজনের অপরিপক্ক বুদ্ধির ফল। উপদেশ তুচ্ছ করিয়া নিজের বিবেচনার উপর নির্ভর করিলে কত কষ্ট সহ করিতে ও কত মনস্তাপ পাইতে হয়, তাহা বলা যায় না। কোনও কোনও যুবক আপন বিবেচনাগুণেও বিদ্যা উপার্জন ও প্রতিপত্তিলাভ করিয়াছেন বটে, কিন্তু ইহার সংখ্যা অধিক নহে। অপূর্ণ বয়সে স্থির প্রতিজ্ঞার ও বিজ্ঞতার প্রায় অভাব থাকে। প্রথমে যে বিষয়ে প্রবৃত্ত হন, সেই বিষয়েই সুসিদ্ধ হইবেন ভাবেন কিন্তু তাহার সাধনে কিছু কষ্ট বা অসুগম হইলে অমনই বিষয়াস্তরে মনঃসংযােগ করেন। দ্বিতীয় বিষয়ে আবার অসুগম বােধ করিলে তৃতীয় বিষয়ে প্রবৃত্ত হন। শেষে সকল বিষয়ে অকৃতকার্য হইয়া পড়েন। যেমন প্রত্যেক বিষয়েই কৃতার্থ হইয়া সুখী হইবেন মনে করেন, তেমনই কোন বিষয়েই পূর্ণমনোরথ হইতে না পারিয়া শেষে হতাশ হন ও অনুতাপ করিতে থাকেন। ইহা অন্যের অবস্থায় যত দুর সঙ্গত হউক না হউক আমার জীবন ইহার আত্ম-জীবনচরিত। জাজ্জ্বল্যমান দৃষ্টান্তস্থল । আমি যখন কলেজে প্রবিষ্ট হইলাম, তখন বিজ্ঞান , শাস্ত্রের উৎকৃষ্ট অঙ্গ পরিজ্ঞাত হইব, ধন ও মান লাভ করিব, উপায়হীন দুঃখী দরিদ্রের পীড়ার শান্তি করিব ইত্যাদি কতই মহদ্ভাব মনে উদিত হইয়াছিল। আবার যখন ইহাতে বিতৃষ্ণা জন্মিল, তখন মুনসী সদর-আমিনী বা ডেপুটি কালেক্টারি পদের ন্যায় চিকিৎসকের পদের সম্মান নাই, সকলের বাটীতেই যাইতে হয়, মলমুত্র পরীক্ষা করিতে হয়, কত লোকের মন যোগাইতে হয়, রাত্রিতেও অবসর নাই, ইত্যাদি নানা রূপ অকিঞ্চিৎকর ভাবে চিত্তবিকৃত হইল। রাজকুমার আমাকে যেরূপ ভালবাসেন ও শ্রদ্ধা করেন, তাহাতে কখনই আমার দুঃখ হইবার সম্ভাবনা নাই, ইহাও মনে হইতে লাগিল। এই রূপ অবিবেচনায় যে লাভ হইল, তাহা শীঘ্রই প্রকাশ পাইবে। কালেজ ত্যাগ করিয়া বাটী আসিবার কথা পূৰ্বে বলিয়াছি। শ্ৰীশচন্দ্র পূর্বে প্রসাদের নিকট যৎকিঞ্চিৎ ইংরেজী পড়িয়ই ক্ষান্ত রাজা শ্রীশচন্দ্রের শিক্ষার হইয়াছিলেন, এক্ষণে আমার নিকট পুনরায় পড়িতে ভার গ্রহণ। লাগিলেন। এক বৎসর এইরূপ গত হইল . সময় রাজসরকারের এরূপ দুরবস্থা ছিল যে, যৎসামান্য বেতন নিয়মিতরূপে পাইবার উপায় ছিল না। বিষয় কৰ্ম্মের ঝাটে কুমারের পড়িবার অধিক সময় হইত না বটে, কিন্তু যাহা হইত, তাহার ও প্রায়াংশ অনর্থক গল্পে কাটাইতেন। সুতরাং এ অবস্থায় আর থাকিতে ইচ্ছা হইল না। রাজবাটী গমনাগমন ত্যাগ করিলাম। সে সময় আমাদের অবস্থাও মন্দ হইয়াছিল। পিতৃদেবের উপার্জনের কাল অতীত হইয়াছিল। অগ্রজ মহাশয় ব্যয় করিতে আমাদিগের এ কালীন ভালবাসিতেন, কিন্তু আয়ের দিকে মনযােগ ছিল অবস্থা । সাংসারিক কষ্টদর্শনে মনােমধ্যে বড়ই দুঃখ হইতে লাগিল; অথচ ইহা দূর করিবার কোনও উপায় ও সাধ্য হইল না। শ্রী প্রসাদ এই সময় এখানকার সরসরী মুন্সীর পদে নিযুক্ত হওয়াতে তাহার অবস্থা কিঞ্চিৎ ভাল হইল কিন্তু আর কয়েক জন বান্ধবের আমার ন্যায় দুর্দশা থাকিল। সকলেরই বিবাহ হইয়াছে, চাকরীর বয়স হইয়া উঠিয়াছে, এবং মধ্যে মধ্যে লজ্জাত্যাগপূৰ্ব্বক নিজ ব্যয়ের জন্য গুরুজনের নিকট কিছু কিছু চাহিতে হইয়াছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই সকল মনের অসুখ বাল্যবিবাহ । সত্ত্বেও, যখন আমরা কয়েক বান্ধবে একত্রিত হইতাম, তখন আর কোন অসু- খই মনে থাকিত না। ভাবতাম, যেন সংসারে আমাদের কোন অভাবই নাই । সে কালের অবস্থা যাহাই স্মরণ হয়, তাহাই না লিখিয়া ক্ষান্ত থাকা যায় না; তাহা লেখাতে কোন ফল না থাকিলেও দাম্পত্য-সুখ লিখিতে ইচ্ছা হয় । তৎকালে আমাদের কাহারও সন্তান হয় নাই। পত্নীদের আমরা সর্বস্ব ধন ছিলাম। তাহার শ্বাশুড়ী ননদের যতই বিষদৃষ্টিতে থাকুন না, গৃহে যতই কেন অসুখ হউক না, জনক জননীর ও ভ্রাতাভগ্নীর স্নেহ যতই কেন মনে পড়, ক না এবং বাল্যসখিদের সুধাময় সখ্যভাব যতই কেন হৃদয়ে উদিত হউক না, স্বামিসন্দর্শনে সকলই বিস্মৃত হইতেন। পতি মেহনয়নে দৃষ্টি করিলে আভরণ পরিচ্ছদ প্রভৃতি কিছুরই অভাবে দুঃখিতা থাকিতেন না। যদি সাংসারিক কোন বিষয়ে বিষা- দিতা হইতেন, তবে যেমন সূর্য উদয়ে অন্ধকার থাকে না, তেমনই পতির দর্শনে মনের সে সকল মালিন্য থাকিত না এবং পুরাকালীন সমুদ্র-নাবিকের ন্যায় কেবল স্বামী-তারার দিকে দৃষ্টি থাকত। থাকত। একারণ নিঃস্বার্থ বান্ধবদিগের সংসর্গে যেমন সুখী থাকিতাম, পতিপরায়ণ পত্নীসহবাসেও তেমনই সুখী হইতাম। এইরূপ সুখের কাল যদি চিরস্থায়ী হইত, তাহা হইলে এই পৃথিবী স্বর্গ হইয়া উঠিত। ইংরেজে রা কহেন যে কোর্টশিপ কালে তাহাদের যত সুখ হয়, বিবাহের পর অার তত সুখ থাকে না। ইহার কারণ বোধ হয় যে প্রথমােক্ত অবস্থায় নায়ক নায়িকার স্নেহ কেবল পরস্পরের প্রতি বদ্ধ থাকে, উভয়ের পরিণত বয়সে বিবাহ হওয়াতে শীঘ্রই বাল্য বিবাহ সন্তান জন্মে, এবং জননীর যে স্নেহ শুদ্ধ জনকের ও কোর্টশিপ অধিকারে থাকে, তাহার কতকাংশ ঐ সন্তান অধি- কার করিয়া লয়। সুতরাং শেষােক্ত অবস্থায় আর নায়কের পূর্বরূপ সুখলাভ হয় না। আমাদের বাল্যবিবাহ প্রথার অনেক দোষ আছে, তাহার সন্দেহ নাই ; কিন্তু এ অবস্থায় যাদৃশ সুখানুভব হয়, কোর্টশিপ অবস্থায় তাদৃশ সুখলাভ হইতে পারে না। কোর্টশিপ কালে “সে আমার, আমি তার” এ ভাব উভয়ের চিত্তে স্থিরনিশ্চয় হয় না। কারণ, কোর্টশিপ কালে নায়ক নায়িকার প্রগাঢ় প্রণয় জন্মিলেও ঘটনাক্রমে কখন কখন উদ্বাহসম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া যায়। সুতরাং আমাদের বিবাহিত অবস্থায় প্রথম কালের সুখের সঙ্গে তাহাদের কোর্টশিপ কালের সুখের তুলনা হয় না।
আত্ম-জীবনচরিত। ৫ ধুর নয়। } কেবল ননন্দন শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা, মধ্যলীলা এবং শেষলীলা ছিল, এরূপ নহে। বর্ণনা করিতে গেলে সকলেরই জীবনের কৃষ্ণলীলা ও মানব ঐরূপ কয়েক লীলা আছে । কৃষ্ণের ব্রজলীলার ভাব যাত্রার তুলনা যত সুমধুর তাহার মথুরার মধ্যলীলার ভাব তত সুম- তাহার কারণ এই যে, ব্ৰজে তাহার হৃদয়-রাজ্যে কেবল সখ্যের ও প্রেমের রাজত্ব ছিল। মথুরায় তাহার চিত্তে স্বার্থপরতা বৈরনিৰ্যাতন প্রভৃতি সাংসারিক বিবিধ ভাব প্রবেশ করিয়াছিল । একারণ তাহার মধুর বাল্যলীলা যতদূর ভক্তবৃন্দের আরাধ্য বস্তু ও কবিকুলের চিন্তস্থল হয় ততদূর মধ্যলীলা হয় নাই। মধ্যলীলা যে সম্পূর্ণ নীরস, তাহাও নহে; তবে বাল্যলীলার কাল যেরূপ একমাত্র সখ্য ও প্রেমরসে পূর্ণ থাকে, সেরূপ মধ্যলীলায় থাকে না। এ মিষ্ট, রসের সহিত সাংসারিক কোন কোন তিক্ত রসও মিশ্রিত হইয়া যায়। আজি আমার যে সময়ের কথা বলিতেছি,সে সময়ে আমার অদ্যলীলা বটে, কিন্তু বাল্য লীলা নহে। যে হেতুক অামার একবিংশ কি দ্বাবিংশ বৎসর বয়স পর্যন্ত এই সুখের স্রোত নিরন্তর রহিয়াছি । তাহার পরও ৪৫ বৎসর পর্যন্ত আমার এ সুখের প্রবাহ রােধ হয় নাই। তবে ২২শ বৎসর পর্যন্ত এ প্রবাহ যেমন সুস্থির ছিল, তাহার পর আর সেরূপ ছিল না। আমার সুখ দুঃখ সুখের শত্রু চিন্তা ও মনস্তাপ বাতাতে কখনও কখনও ইহা আলােড়িত করিত, কিন্তু তাহারা দীর্ঘস্থায়ী হইত না। সুতরাং আমার মধ্যলীলা আদ্যলীলার ন্যায় নিরবচ্ছিন্ন সুখময় না হউক, সুখশূন্য ছিল না। সাংসারিক সুখের প্রধান লােভ আমাকে কখন বশীভূত করিতে পারে কোন বিষয়ের জন্য কখনও কাহারও সঙ্গে বিবাদ বা মনান্তর হয় নাই। আর বহু বংশ-সৌভাগ্য সংহারক মােকদ্দমার জঘন্য ব্যাপারে আমি কখনও প্রবৃত্ত হই নাই। পৈতৃক সম্পত্তির ক্ষতি স্বীকার করিয়াছি, তথাপি কোন অধৰ্ম্ম বা জ্ঞাতির নামে অভিযােগ করি নাই । আমি অল্প লাভেই অধিক সন্তোষ লাভ করিয়াছি। যদিও অপেক্ষাকৃত ধনাগমের উপস্থিত উপায় নিৰ্বোধিতার বা অন্য মিত্ৰতা সুখ। কোন কারণে তাগ করিয়াছি, কিন্তু তজ্জন্য কখনও চিত্তে বিশেষ অনুতাপ হয় নাই। কখনও কখনও হৃদয়াকাশে চিন্তামেঘ উখিত হইয়াছে; কিন্তু অধিক কাল তিষ্ঠিতে পারে নাই। মিত্ৰতা-সুখই আমার মনের প্রধান সুখ ছিল, এবং সৌভাগ্যক্রমে হৃদয় ভাণ্ডারে এ ধনের যথেষ্ট সমাগম নাই।
জীবন-খেলায় লাভালাভ। • হইত । জগতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। সুতরাং মধ্যে মধ্যে ইহার কিছু কিছু অপহৃত হইত বটে,কিন্তু যেমন পূৰ্ব্বসঞ্চিত ধন যাইত,অমনই তাহার স্থানে নূতন ধন আসিত। অর্থাৎ, হৃত বান্ধবের স্থলে নুতন বান্ধবের অধিষ্ঠান হইত। দ্বাদশ মাস বাটীতে থাকিতাম, গুরুজনের দর্শন পাইতাম,সংসারসারভূত সুহৃদরে বেষ্টিত থাকিতাম, প্রাণােপম সন্তান গণিকে সম্মুখে লালনপালন করিতে পারিতাম, প্রভুর ও তদীয় পরিবারবর্গের আদরের ও স্নেহের পাত্র ছিলাম, স্বাভিমত ধৰ্ম্ম পালনে সক্ষম হইতাম, এবং স্বেচ্ছামত কাৰ্য্য করিতে পারিতাম ; বস্তুতঃ, সাংসারিক মানবের সুখের নিমিত্ত যাহা আবশ্যক, প্রায় তৎসমুদায়ই আমার যাহারা বাজার করিতে যান, তাহারা গৃহে আসিয়া কোন্ দ্রব্য ক্রয়ে জিতিয়াছেন ও কোন্ দ্রব্যতে ঠকিয়াছেন, তাহা জীবন-খেলায় লাভালাভ। বিবেচনা করিয়া দেখেন। যােদ্ধা রণবসানে শিবিরে আগমন করিলে সমরের ঘটনা সমূহ স্মরণ করিয়া আপনার কোন কাৰ্য যথাকৰ্তব্য ও কোন্ কাৰ্য্য বিগর্হিত হইয়াছে তাহার আলােচনা করিয়া দেখেন! যিনি সতরঞ্চ ক্রীড়ায় প্রবৃত্ত হন, তিনিও খেলার পর তাহার কোন্ চাল কেমন হইয়াছে, তাহার চিন্তা করিয়া থাকেন। ইহারা সকলেই স্ব স্ব কার্যের ফলাফলানুসারে আনন্দিত আনন্দিত ও বিষন্ন হন। সেইরূপ এই সংসারের সকলেই তাহাদের শেষাবস্থায় কখনও কখনও আপনাদের পূৰ্ব্বকৃত কর্মের বিগত জীবনের সমালােচনে প্রবৃত্ত হন। এক্ষণে আমিও মধ্যে মধ্যে স্বীয়কৃত কার্যের সমালােচনা করিয়া থাকি। আমার নিজ বিবেচনায় আমি যে যে কাযে ঠকিয়াছি, তাহার গড় পড়ত করিলে, এক্ষণ পর্যন্ত জিত ব্যতীত ঠক। বােধ হয় না; কিন্তু এক্ষণও আমার শেষ নীলা সমাপ্ত হয় নাই; সুতরাং ইহার পর কি হইবে, তাহা বলা যায় না । পূৰ্বে বলিয়াছি, যে রাজবাটীতে রীতিমত বেতন না পাওয়াতে ও শ্রীশচন্দ্রের ইংরেজী পাঠে অমনােযােগ দেখতে, রাজবাটী যাওয়া রাজা শ্রীশচন্দ্রের আসা রহিত করিয়াছিলাম। ইহার কিয়ৎকাল পরে, রাজ্যভার গ্রহণ। ১২৪৮ বঙ্গাব্দে রাজা গিরীশচন্দ্র পরলােকে গমন করিলে, শ্রীশচন্দ্র তাহার বিষয়াধিকারী হইলেন। এই ঘটনার সময় আমি স্থানান্তরে ছিলাম। বাটী আসিয়া শুনিলাম, রাজা শ্রীশচন্দ্র আমাকে ডাকিতে বারম্বার লোক ঠাইয়া ছিলেন। আমি তঁাহার সমীপন্থ হইলে তিনি ৬২ আত্ম-জীবনচরিত। কহিলেন, “পিতৃবিয়ােগে অত্যন্ত শোকাকুল হইয়াছি, অতএব তােমার আমার নিকট সৰ্ব্বদা থাকিতে হইবে।” তাহার বসিবার গৃহের পার্শ্বস্থ এক প্রকোষ্ঠ আমার বাসের নিমিত্ত নির্দিষ্ট হইল। আমি দিবসে কেবল একবার মাত্র আহার করিতে বাটী অসিতাম, আর সমস্ত দিবারাত্রি তাহার নিকট থাকিতাম । তিনি আমাকে খাস সেক্রেটরী পদবী দিলেন, এবং যথেষ্ট খাস সেক্রেটারী। অনুগ্ৰহ করিতে লাগিলেন। রাজা গিরীশচন্দ্রের আদকৃত হইয়া গেল। তৎকালে সুখময় সিংহ দেওয়ান ছিলেন । কিন্তু তার প্রতি কোন কার্য্যের ভার ছিল না। কালীপ্রসাদ মুখােপাধ্যায় নামক একজন রাজকুটুম্ব আমিনী পদে নিযুক্ত থাকিয়া সমস্ত বিষয়কাৰ্য করতেন। তাহারা উভয়েই সৰ্বাধিকারী হইবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন! আমি দেওয়ানের বংশােদ্ভূত, কর্মে পারগ এবং রাজার প্রিয়, একারণ রাজা পাছে অামাকে দেওয়ানী পদ দেন, এই আশঙ্কায় তাহারা উভয়েই আমাকে রাজবাটী হইতে দূরীভূতকরণে যত্নবান্ হইলেন। কালীপ্রসাদ বাবু আত্মীয়তা প্রকাশ পূৰ্ব্বক আমাকে কহিতেন, রাজসংসারের যেরূপ দুরবস্থা হইয়াছে, তাহাতে আর কাহারও এসংসারে থাকিয়া মঙ্গল হইবার সম্ভাবনা নাই। আমার কোন বিদ্যা নাই, আর এই বৃদ্ধাবস্থায় কোথায়ই বা যাই, সুতরাং এখানে পড়িয়া রহিয়াছি । তুমি বিদ্বান ও যুবা, তোমার এখানে থাকা উচিত নহে।” তাহার ভাব বিরুদ্ধ ছিল, কিন্তু কথা মিথ্যা নহে। সুখময় আর এক প্রকার সুহৃদ্ভাব প্রকাশ করিতেন। তিনি বলিতেন, “রাজা তােমাকে যথেষ্ট ভালবাসেন বটে, কিন্তু তাহাতে তােমার কোন উপকার হইবার সম্ভাবনা নাই”। কালীপ্রসাদের কথায় কেবল হাসি আসিত, কিন্তু ইহার আত্মীয়তায় শরীর জলিয়া যাইত। যাহা হউক, তাহাদের আশঙ্কা ত্বরায় দূরীভূত হইল। আমি দুই তিন মাসের মধ্যেই রাজবাটী ত্যাগ করিয়া মুন্সেফের পরীক্ষা দিবার জন্য আইন অভ্যাস করিতে প্রবৃত্ত হইলাম । উপরিউক্ত ঘটনার কিছুদিন পূৰ্ব্বে কলিকাতানিবাসী মাধবচন্দ্র মল্লিক নামে হিন্দু কলেজের একজন সুশিক্ষিত ছাত্র এই মাধব চন্দ্র মল্লিক ও তাহার আমাদিগের সহিত সহানুততি জেলায় ডেপুটি কালেক্টর হইয়া আইসেন। রামতনু বাবুর সহিত তাহার বিশেষ বন্ধুতা থাকাতে, তিনি আমাদিগকে যথেষ্ট স্নেহ করিতেন, এবং আমরাও তাহাকে গুরুজনের ন্যায় জ্ঞান করিতাম। তিনি চাদ সড়কে নিজালয়ে শ্রীপ্রসাদের স্কুল লইয়া গেলেন, মুন্সেফী পরীক্ষার উদ্যোগ এবং তাহার উন্নতিসাধনে বিশেষ যত্নবান হইলেন। আর আমরা এখানকার যুবকবৃন্দের কুসংস্কারনিবারণের ও চরিত্রের সংশােধনের জন্য যে উদ্যোগ করিতেছিলাম, সে বিষয়ে বিস্তর সাহায্য করিতে লাগিলেন। তারিণী ভুবন ঐ স্কুলের শিক্ষকের শ্রেণীভুক্ত হইলেন । যদিও ইদানীং আমরা অপেক্ষাকৃত পরিণতবয়স্ক হইয়াছিলাম তথাপি আমাদের কয়েক বান্ধবের মধ্যে এতই প্রগাঢ় প্রণয় রেঢ়ীর চাষ ছিল যে, কেহই কাহাকে ছাড়িয়া স্থানান্তরে যাইতে ইচ্ছা করিতেন না। আমরা সকলেই ভাবিতাম যে অতি সামান্যরূপে জীবিকা নিব্বাহ করিতে পারিলেও, পরস্পর পৃথক হইব না। আমাদের সঙ্কল্প শুনিয়া মাধব বাবু কহিতেন, তােমাদের এ বাসনা কথনই পূর্ণ হইবার নয় । যদি তােমরা সকলেই কৃষিকার্যে প্রবৃত্ত হইতে পার, তাহা হইলে এ মনে। রথ সিদ্ধ হইলেও হইতে পারে । তাহার পরামর্শানুসারে আমিই প্রথম রেঢ়ীর চাষ আরম্ভ করিলাম। ধান্য, সর্ষপ, মীনা, অড়হর প্রভৃতি শস্যের চাষে যে লাভ হয়, তাহাতে ভদ্রলােকের সংসার যা । সুন্দররূপে নিৰ্বাহ হয় না, ইহা পূৰ্বেই জানিতাম ; রেঢ়ীর চাষেও আশানুরূপ লভিবা হইলাম না। এক্ষণে মুন্সেফী পরীক্ষা দিবার মনস্থ করলাম। পরীক্ষার নির্দিষ্ট কালের দুই মাস পূর্বে পরীক্ষার্থীদের আপন আপন জোর মুঙ্গেী পরীক্ষার উদ্যোগ ও জজ সাহেবের নিকট নিজ বংশের ও চরিত্রের হতাশ। প্রশংসাপত্র হতে হইত। প্রথম শ্ৰীপ্রসাদ ও আমি সার্টিফিকেটের নিমিত্ত দরখাস্ত দিতে যাইয়া শুনিলাম যে, সাহেব মঙ্গলবার ভিন্ন অন্য বারে কোন আবেদনপত্র লন না। আগামী মঙ্গল- বারে দুই মাসের ন্যূনতা হইবে দেখিয়া সেবার আর দরখাস্ত দেওয়া হইল ছয় মাস অন্তর এই পরীক্ষ। হইত, এবং দ্বাবিংশবর্ষ পূৰ্বে এ পরীক্ষা দিবার নিষেধ ছিল। এবার আমি উপযুক্ত সময়ে দরখাস্ত করিলাম কিন্তু জজ সাহেব আমাকে ২২শ বৎসরের নূন বয়স্ক অনুমান করিয়া আমার প্রার্থনা অগ্রাহ করিলেন। না।
৬৪ আত্ম-জীবনচরিত । পঞ্চম পরিচ্ছেদ। বয়স ২৩ হইতে ৩৪ বৎসর। কুমার সতীশচন্দ্রের শিক্ষার ভার গ্রহণ। রাজা শ্ৰীশচন্দ্রের ধর্মসংস্করণের চেষ্টা। পৌত্ত- লিকতা। ধর্মে রাজশক্তি। বর্ধমান রাজার সহিত সাক্ষাৎ ও ধর্মসংস্করণের প্রস্তাব ; তাহার ফল। বর্ধমান রাজবংশ। আমার কন্যা বিয়ােগ। কৃষ্ণনগরে ব্রাহ্মধর্মের বিস্তার। কৃষ্ণনগর কলেজ। কলেজে রাজপুত্রের প্রবেশ। রাজসংসারে আমার অন্য চাকুরী। উৎকোচ প্রথা। মুন্সেফী পরীক্ষার পুনরুদ্যোগ। আমার সামাজিক আচার ব্যবহার। আমার দেওয়ানী পদ প্রাপ্তি। সাধারণের বাজেয়াপ্ত লাখেরাজের রাজস্ব হ্রাসের উদ্যোগ ও গ্রাজ। শ্রীশচন্দ্র কর্তৃক তাহার প্রতিকার। পূর্ব পুরুষদিগের রীতি নীতি। জীবনের দ্বিতীয় পরীক্ষা। বারাণসী দর্শন। মধ্যম পুত্রের মৃত্যু। আমার বাগান ও বাটী নির্মাণ। আমার যখন ২৩শ বৎসর বয়স, তখন শ্ৰীশচন্দ্রের পুত্র কুমার সতীশচন্দ্রের বিদ্যারম্ভের সময় উপস্থিত হইল। রাজা আমাকে কুমার সতীশচন্দ্রের শিক্ষার ডাকিয়া বলিলেন, “আর পলাইতে পারিবে না, ভার গ্রহণ। কুমারকে তােমার হস্তে অৰ্পণ করিলাম।” তিনি আমাকে তাহার সংসারে রাখিতে কখনও যত্নের ত্রুটি করেন নাই। তবে অর্থাভাবে নিয়মিতরূপে বেতন দিতে পারিতেন না বলিয়া, আমি না যাইলে দজ্জাবশতঃ আমাকে ডাকিতেন না। ইচ্ছা করিলে তিনি আমার অপেক্ষা উত্তম শিক্ষক পাইতেন, কেবল ভালবাসার জন্যই আমাকে শিক্ষক পদে মনাে- নীত করিলেন। আমি বেল নয় ঘণ্টা হইতে রাত্রি নয় ঘণ্টা পর্যন্ত রাজ- বাটীতে থাকতাম। রাজপুত্র অতি শান্তস্বভাব ছিলেন। তঁাহাকে আমি সাতিশয় ভালবাসিতাম, এবং তাহার শিক্ষাবিষয়ে বিশেষ যত্ন করিতাম । তিনিও আমাকে যথেষ্ট মান্য করিতেন এবং ভালবাসিতেন। তাহাকে কখনও কখনও ভয়প্রদর্শন করিতে হইত বটে, কিন্তু কখনও পীড়ন করিতে হইত না। রাজা অবকাশ পাইলেই আমার নিকট আসিয়া বসিতেন, ইউরােপের ধৰ্ম্ম নীতি, রাজনীতির ও ব্যবহারনীতির বিবরণ শুনি- রাজা শ্রীশচন্দ্রের ধর্থসংস্করণের তেন, আমার মত জিজ্ঞাসা করিতেন, এবং তৎ- সমুদায়ের ফলাফল বিচার করিয়া দেখিতেন। এইরূপে আমাদের দেশের যে সকল কুসংস্কার তাহার চিত্তে বদ্ধমূল হইয়াছিল, সে সকল } চেষ্টা।
পৌত্তলিকতা। ৬৫ ক্রমে ক্রমে উন্ম,লিত হইতে লাগিল। শেষে বহুবিবাহের নিবারণ, বিধবা- বিবাহের চলন, বেদবিহিত ধৰ্ম্মের পুনঃ স্থাপন ইত্যাদি স্বদেশহিতজনক বিষয়ে তাহার আগ্রহাতিশয় হইল। তিনি স্থির করিলেন যে, শাস্তুশাসন ব্যতীত শুদ্ধ কেবল যুক্তি অবলম্বনে কাৰ্যসিদ্ধি হইবে না। এবং ইংরেজী-শিক্ষিত লােকের কথায় কোনও উপকার দর্শিবে না। যাহারা সংস্কৃত জানেন, ইংরেজী পড়েন নাই, এবং প্রচলিত আচার ব্যবহার রক্ষা করিয়া থাকেন, তাহাদের কথায় ও দৃষ্টান্তে সাধারণের পূৰ্ব্ব ভাবের অনেক পরিবর্তন হইতে পারিবে। এইরূপ বিবেচনা করিয়া তিনি নবদ্বীপের গােলােক ন্যায়রত্ন, বহিরগাছির লক্ষ্মীকান্ত তর্কালঙ্কার, ভাটপাড়ার রামচন্দ্র বেদান্তবাগীশ প্রভৃতি কয়েকজন পণ্ডিত আনা- ইয়া তাহাদের সঙ্গে এই সকল বিষয়ের তর্ক বিতর্ক করিতে লাগিলেন; এবং প্রাণকৃষ্ণ ভট্টাচাৰ্য, শ্যামাচরণ চৌধুরী, হরচন্দ্র লাহিড়ী প্রভৃতি কয়েকজন হিন্দুধৰ্ম্মাভিমানী পরিণতবয়স্ক ব্যক্তিকে বেদ ও ভগবদগীতা অধ্যয়নে প্রবৃত্ত করাইলেন । ইহারা রাজার সন্তোষার্থে, বেদের মহিমাকীৰ্ত্তন ও পৌত্তলিকতার দোষ প্রচার করিতেন বটে, কিন্তু তাহাদের সে ভাব আন্তরিক ছিল না। সাকার উপাসনা ব্যতীত যে কেহ নিরাকার উপাসনার অধিকারী হইতে পারেন, ইহা তাহাদের বিশ্বাসের অতীত ছিল। বস্তুতঃ বহু কাল হইতে পুরুষানুক্রমে এদেশস্থ লােকের যে সংস্কার হইয়া আসিয়াছে, সহসা তাহার দূীকরণ সহজ ব্যাপার পৌত্তলিকতা নহে। ভারত-আর্যদের মধ্যে প্রথমে নিরাকার উপাসনারই আধিক্য ছিল ; তবে এই পৌত্তলিকতা কেন প্রবল হইল। ইহা দেশান্তর হইতে আইসে নাই। এই দেশেই ইহা জন্মিয়াছে এবং বেদেরই বংশোদ্ভূত বলিয়া প্রতীত হইয়াছে। আর ক্রমশ: ইহার বংশবৃদ্ধি এত অধিক হইয়াছে যে, তারা ভারতের অধিকাংশ অধিবাসীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায় সংস্থাপন পূৰ্ব্বক বিবিধরূপে অধিবাসীদের চিত্তে রাজত্ব করিতেছে; এবং তাহারা স্ব স্ব সম্প্রদায় মধ্যে এত অধিক প্রিয় হইয়া উঠিয়াছে যে, তাহাদের উপাসক- গুণের মধ্যে যাহারা বেদকে তাহাদের ধর্মের আদি পুরুষ বলিতেছেন, তঁাহারাও বেদের নামও উচ্চারণকরণে বিমুখ হইয়াছেন। যেমন, কেহ কেহ পূৰ্বপুরুষের শ্রদ্ধকে “মরা গরুর ঘাস কাটা” মনে করিয়া থাকেন, তাহারাও তেমনই বেদ বিহিত উপাসনাকে ঐরূপ জ্ঞান করিয়া থাকেন। তাহারা ভাবেন পৌত্তলিক ধৰ্ম্মের দেব দেবীকে চিন্তা করিয়া দেখিতে হয় না, অনায়াসে প্রত্যক্ষীভূত হইয়া আত্ম-জীবনচরিত। থাকে ; তাহাদের সমাগমে যথেষ্ট আমােদ প্রমােদ হয়, সাংসারিক সুখভােগেরও কোন প্রতিবন্ধক নহে , তবে ইহাদের উপাসনা ত্যাগ করিয়া যে দেবতা বাক্য মনের অগোচর, যাহার উপাসনায় কোন অমােদ নাই, যাহার চিন্তা করিতে কষ্ট হয়, তাহার আরাধনা করিবার এত প্রয়ােজন কি ? যে পথে পিতৃ পিতামহ চলিয়াছেন, সেই পথেই চলিব। আর মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ এই বচনটির উল্লিখিত মহাজনের অর্থ আপনাদের ও প্রতিবাসী- দের পূর্বপুরুষ স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। ফলতঃ এদেশীয় লােকের মনে বেদের সহিত পৌত্তলিকতার কল্পিত সংস্রব যেরূপ বদ্ধমূল হইয়া রহিয়াছে, তাহাতে বেদকে ঈশ্বর প্রেণীত বলিয়া দেশে রাখিব, অথচ পৌত্তলিকতাকে নির্বাসিত করিব, এ অভিসন্ধি ষিদ্ধ হইবার নহে। ধর্মে রাজশক্তি। তবে যদি মগধ রাজা অজাতশত্রুর ন্যায়, আমাদের রাজা ও শাক্যসিংহের ন্যায় বৈদিক ধর্মের প্রচারক অবতীর্ণ হন, তবেই এ মহৎ কল্পনা সিদ্ধ হইতে পারে । যেমন উপযুক্ত চিকিৎসক ও উপযুক্ত ঔষধ ব্যতীত কোন রােগের প্রতীকার হয় না, তেমনই উপযুক্ত রাজা ও উপযুক্ত প্রচারক ব্যতীত ধৰ্ম্মের সংস্কার হইয়া উঠে না। এক সময়ে যে প্রায় সমস্ত ভারতবর্ষ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে, তাহা রাজার প্রভাবে ও প্রচারকগণের যত্নে সম্পন্ন হইয়া- ছিল। তৎকালীন নৃপতিগণ ঐ ধর্মাবলম্বী না হইলে, কখনও এ ধৰ্ম্মের এত অধিক বিস্তার হইও না। আবার যখন শঙ্করাচাৰ্য অবতীর্ণ হইয়া ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্মের পুনরুদ্দীপনের যত্ন করিতে লাগিলেন, এবং সেই সাময়িক রাজা ঐ ধৰ্ম্মের সহায় হইলেন, তখন বৌদ্ধধৰ্ম্মের পরাজয় হইয়া ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্মের জয় হইল। প্রচারকের যত্ন থাকিলেও রাজার সহায়তা ব্যতীত এই উভয় ধৰ্ম্মই প্রবল হইত না। অন্যান্য দেশেও রাজা অথবা তন্তু,ল্য ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের সাহায্য ব্যতীত, কোনও নূতন ধর্মের সংস্থাপন বা প্রচলিত ধৰ্ম্মের সংস্কার হয় নাই। ইয়ুরােপে মহা বিদ্বান্ ও ধৰ্ম্মপরায়ণ লুথর ও উযিকালিফ প্রভৃতি মহাজনের প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও, প্রােটেস্টান্ট মত স্থাপন করিতে পরাক্রান্ত রাজাদের কত আনুকূল্যের প্রয়ােজন হইয়াছিল। এই মহৎ কার্য সম্পন্ন করিতে কত শােণিতপাত হই- য়াছে, কত বিপ্লব ঘটিয়াছে, তথাপি ইউরোপের অনেক রাজ্যে অদ্যাপি ক্যাথলিক মত প্রচলিত রহিয়াছে। যে যে রাজ্যে প্রােটেস্টান্ট মত অধিষ্ঠিত হইয়াছে, সেখানেও অনেক পূৰ্ব্বমতাবলম্বী আছেন। অার যখন ধৰ্ম্মবিষয়ে বর্ধমান রাজার সহিত তর্কবিতর্ক। খৃষ্ঠীয়ধর্মের মূল প্রচার স্থাপিত হয়, সে সময়ও যে পর্যন্ত রােমের সম্রাটরা এ ধৰ্ম্ম গ্রহণ না কারয়াছিনে, সে পৰ্য্যন্ত এ ধর্মের প্রায় কোন জেই ছিল না। মহম্মদীয় ধৰ্ম্ম বিস্তারের মূল অন্বেষণ কৰিতে গেলেও গেলেও দেখ। যায় যে, যাবৎ এ ধর্মাবলম্বীদিগের বিক্রম বৃদ্ধি হয় নাই, তাবৎ তাহাদের ধৰ্ম্মেরও বল খৰ্ব্ব ছিল। পরে তাহাদের পরাক্রমের সহিত ধর্মের বিস্তারের বৃদ্ধি হয় । কিন্তু আমরা যে সময়ে হিন্দুধর্মের সংস্কারকরণে প্রবৃত্ত হই, তখন রাজা শ্ৰীশচন্দ্রের এবং অনেকের মনে হইয়াছিল যে, এক্ষণে সুশিক্ষিত যুবকবৃন্দের এ বিষয়ে যেরূপ আগ্রহ হইয়াছে, তাহাতে এ (দেশস্থ ধন ও মান যুক্ত প্রধান প্রধান লোকের সহায়তা হইলে, বেদ প্রণীত সনাতন ধর্মের জ্যোতিঃ অবশ্যই পুনঃ বিকীর্ণ হইবে; এবং পোহক তার তেজ ক্রমেই হ্রাস হইয়া যাইবে। অব সেই সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিহিত প্রথা সমূহও তিরােহিত হইবে । যে সকল পণ্ডিতের সঙ্গে এ বিষয়ের তর্ক বিতর্ক করিতেন, তঁাহারা তাহার অভি- প্রায় শাস্ত্রসম্মত স্বীকার করিতেন, এবং প্রশংসিত বলিতেন; কিন্তু সাধা- রণ-সন্নিধানে তাহারা এই মত প্রকাশ করিলে, পাছে তাহাদের নিমন্ত্রণ রহিত হয়, এইজন্য কুষ্ঠিত হইতেন। একারণ শ্ৰীশচন্দ্র বর্ধমানের ও নাটোরের রাজাকে প্রথমে স্বাভিমতে আনিবার চেষ্টা করিতে আরম্ভ করিলেন। আমি তাহার প্রতিনিধিস্বরূপ বদ্ধ- বর্ধমানাধিপতির সহিত মানে উপস্থিত হইয়া বর্ধমানাধিপতির সহিত সাক্ষাৎ। সাক্ষাৎ করিলাম, এবং শ্রীশচলের পত্র দিয়া তঁাহাকে আমাদের অভিসন্ধির বিষয় জানাইলাম । তিনি প্রথমে কহিলেন যে, “ বদ, কোরাণ ও বাইবে, কিছুই ঈশ্বর প্রণীত নহে, তবে আর কেন ধৰ্ম্মবিষয় লইয়া গণ্ডগোল করা যায় । যেরূপ চলিতেছে তাহার প্রতিবন্ধ- ক হা করিবার কোন ফল দেখি না। কারণ, আমরা বিজাতীয় ধর্মাবলম্বী রাজার অধিকার হইয়াছি। আমরা তাহার ধৰ্ম্ম ধর্মবিষয়ে বর্ধমান রাজার সহিত গ্রহণ করি, ইহাই তাহার আন্তরিক ইচ্ছা। আমা- তর্কবিতর্ক। দের প্রস্তাবিত গুরুতর কাৰ্য্য দেশাধিপতির সাহায্য ব্যতীত, কোনরূপে সম্পন্ন হইবার সম্ভাবনা নাই। সুতরাং এ বিষয়ে আমাদের নিরস্ত থাকাই কৰ্তব্য”। আমি উত্তর করিলাম, “মহারাজ। যাহা কহিলেন, তাহা অযৌক্তিক নহে। আমরা পরাধীন হওয়াতে দেশের মঙ্গলসাধন বড়ই দুষ্কর ৩৮ আত্ম-জীবনচরিত। হইয়াছে তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু রাজার অভাব বলিয়া দেশের যে কিছু, দুর্দশামোচন, দেশের প্রধান প্রধান লােক দ্বারা হইতে পারে, তাহাও কি হইবে না? তঁাহারা কি এ বিষয়ের জন্য একবারও চেষ্টা করিয়া দেখিবেন না? বিবেচনা করিয়া দেখুন সাধারণ অবস্থাপন্ন কয়েক জন স্বদেশীয় লােকের দ্বারা এ বিষয়ের কত দুর উন্নতি সাধন হইয়াছে ! যদি ইহাদের দ্বারা এতদুর কাৰ্য- সিদ্ধি হইয়া থাকে, তবে মহারাজার ন্যায় প্রতাপশালীগণের যত্নে কি পৰ্যন্ত উপকার হইতে পারে !” তিনি প্রত্যুত্তর করিলেন যে, “আমাদের দ্বারাই বা কতদূর কাৰ্য্য হইবে? কর্তাভজা প্রভৃতি যে সকল সম্প্রদায় আছে, সেইরূপ আমাদের আর একটি সম্প্রদায় হইবে, তাহাতে বাঙ্গালার কি উপকার হইবে ?” আমি কহিলাম “সকল কার্যেরই প্রথমে সূত্রপাত হয়, পরে ক্রমশঃ তাহার উন্নত অবস্থা হইয়া উঠে! বৃক্ষ রােপণ করিলে একদিনেই তাহা ফলবান হয় না। সকল বিষয়ই কালে পরিণত হয় । আপনাদের চেষ্টায় যত দূর হইতে পারে তাহা করিয়া যান। পরে আপনাদের পরপুরুষেরা তাহা সমাধা করি- বেন। সৎকৰ্ম্ম যতদূর করিতে পারা যায়, ততদূর করা কি কৰ্ত্তব্য নহে? যদি এক শত লােককে সৎপথে আনা যায়, তাহা কি আনন্দের বিষয় নয়” ? প্রায় এক ঘণ্টা এইরূপ তর্ক বিতর্ক হওয়ার পরে, তিনি এই বলিয়া বাক্য শেষ করি- লেন যে, “আমি কোন ধৰ্ম্ম ঈশ্বর-প্রণীত বলিয়া বিশ্বাস করি না । যথাসাধ্য পরােপকার করিব, কাহারও অপকার করিব না, এবং সত্য কথা কহিব, এই আমার ধর্ম। তাহাকে (রাজা শ্রীশচন্দ্রকে) বল, এক্ষণে আমাদের উভয়েরই মাতা বৰ্তমান আছেন তাঁহাদের জীবদ্দশায় প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপণ কর। হইবে না। তাহাদের পরলােকপ্রাপ্তির পর এ বিষয়ের যথােচিত চেষ্টা করা যাইবেক।” তিনি যাহা বলিয়াছিলেন, তাহা করিয়াছিলেন। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে, তাহাতে কোন ফলােদয় হয় নাই। তিনি বৃক্ষ বর্ধমান রাজবাটীতে রােপন করিয়া বর্ধিত না হইতেই তাহার মূলােৎ ব্ৰহ্মমন্দির। পাটন করিলেন। তদীয় মাতৃবিয়ােগের পর তিনি রাজধানীতে ব্রহ্ম-মন্দির একটি নিজের নিমিত্ত, আর একটি সাধারণের নিমিত্ত, স্থাপন করিলেন; বেদজ্ঞ উপাচার্য নিযুক্ত করিলেন, এবং ব্রাহ্ম-ধৰ্ম্মে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করিতে লাগিলেন। কিয়ৎকাল পরেই তাহার মনের ভাবান্তর হইল। আপনাকে হিন্দুস্থানী দেখান, এবং তাহার পূর্বপুরুষ আবুরায় স্বদেশে যে আমার কন্যা। ৬৯ সম্প্রদায় ছিলেন, সেই সম্প্রদায় ভুক্ত হওয়া, এই বর্ধমান দুই বিষয়ে তাহার বিশেষ আগ্রহ হইল । আর রাজবংশ। আপনাকে বাঙ্গালী বলিতে তাহার লজ্জাবােধ হইতে লাগিল। আবুরায় ও তৎপুত্র বাবুরায় পঞ্জাবী ছিলেন। সুতরাং তাহাদের সেই দেশানুযায়ী নাম ছিল। কিন্তু বঙ্গবাসী হওয়াতে এই রাজ- বংশের পর পুরুষের নাম বাঙ্গলার প্রথানুসারে রাখা হইয়াছিল। যথা, বাবু- রায়ের পুত্র ঘনশ্যাম, তৎপুত্র কৃষ্ণরাম, তৎপুত্র জগৎরাম, তৎপুত্র কার্নিচন্দ্র, তৎপুত্র চিত্রসেন, তৎপিতৃব্য-পূত্র ত্রিলােচন, তৎপুত্র তেজচন্দ্র, তৎপুত্র প্রতাপ- চন্দ্র ও দত্তক-পুত্র এই মহাতাপ চন্দ্র। বাবুরায় হইতে তেজচন্দ্র পর্যন্ত সকল পুরুষেই আপন আপন পুত্রের বাঙ্গালা নাম রাখিয়াছিলেন ; এমন কি, বাবুবায় ও স্বীয় পত্রের বাঙ্গলা নাম রাখিতে লজ্জিত হন নাই। কিন্তু এই মহ!রাজা বাঙ্গালা নাম লজ্জা বােধ করিয়া, পিতার দত্ত নাম মহাতাপ চন্দ্রকে মহতাব চন্দ করিলেন; এবং আপন দত্তক পুত্রের নাম আফতাব মহতাব চন্দ রাখিলেন। রাজা হিন্দুস্থানী নামের অপেক্ষাও আপনার ও তনয়ের নামের গৌরব বৃদ্ধি করণার্থ পারস্য নাম রাখিলেন। পারস্য ভাষায় আফতাব শব্দের অর্থ সূর্য ও মহতাব শব্দের অর্থ চন্দ । বােধ হয়, শুদ্ধ অফিতাব মহতাব থাকিলে নামটি বড় বিশ্রী হয়, এই জন্য চন্দ্রকে চন্দ করিয়া রাখিলেন। যৌবনাবস্থা পর্যন্ত রাজা আপনাকে হিন্দুস্থানী ভাবি- তেন না, এবং বঙ্গবাসীকেও অপাত্র বলিয়া অশ্রদ্ধা করিতেন না। আমি যে সময়ের কথা বলতেছি, সে সময় তিনি বাঙ্গালী ছিলেন, এবং বঙ্গদেশকে আপন দেশ মনে করিতেন । তাহার কথাবার্তায় ও ব্যবহারে আমি নিরতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া আসি । ১২৫০ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে আমার একটা কন্যা জন্মিল। পুত্রলাভ হইয়া প্রথমেই দুহিতা ভূমিষ্ঠ হওয়াতে, স্বদেশীয় আমার কন্যা। কুসংস্কারবশতঃ অতিশয় বিষাদিত হইলাম। কিন্তু কার রূপলাবণ্য দর্শনে অথবা স্বাভাবিক শক্তির প্রভাবে, দ্বিতীয় দিনেই আমার বিষাদ আনন্দে পরিণত হইল । প্রায় দুইমাস অতীত হইলে কন্যাটা পীড়িত হইল। তৎকালে ডাক্তারের মধ্যে কেবল একজন সিবিল সার্জন এখানে ছিলেন। সে সময় এ প্রদেশে আদৌ ডাক্তারি চিকিৎসা প্রচলিত হয় নাই। বৈদ্যেরাও এত অল্প বয়স্ক ৭০ আত্ম-জীবনচরিত। হয় শিশুর চিকিৎসা জানিতেন না, কি করিতেন না। আমি একখানি শিশু চিকিৎসার পুস্তক পাঠ করিয়া যেরূপ বুঝলাম, সেইরূপ চিকিৎসা করিলাম, কিন্তু কোন ফলােদয় হইল না। কন্যার মৃত্যু হইল। তৎকালে কালীবাবু মেডিকেল কলেজ ত্যাগ করেন নাই। তিনি বাটী আসিয়া যদিও কহিলেন যে, এরূপ পীড়া প্রায়ই সাংঘাতিক হইয়া থাকে, তথাপি যথােচিতরূপ চিকিৎসা না হওয়াতে দুঃখ হইতে ত্রাণ পাইলাম না । সে সময় দুই এক মাসের শিশুর চিকিৎসা বৈদ্য দ্বারা হইত কি না, তাহা স্মরণ না। প্রধান। স্ত্রীলোকেরাই সে কালের শিশু এরূপ বালক বালিকার চিকিৎসক ছিলেন। চিকিৎসা। সূতিকাগারে সন্তান পীড়িত হইলে প্রায়ই ওঝার ইস্তে অপত হইত। তাহাবা প্রায়ই কোন ঔষধ দিত না ; কেবল ঝাড়াইত ! আর কিঞ্চিৎ অর্থ লাভের নিমিত্ত নানা প্রকার কোশল ও প্রবঞ্চনা করিত। শিশুর পী৬া হইলে তাহার শরীরে কেঁচো নামে একরূপ ক্ষুদ্র ভূতের আবির্ভাব হইয়াছে, এইরূপ স্থির তথায় কোন পুরুষের যাইবার প্রথা ছিল না। সুতরাং ওঝার ও প্রতাবিত অবাদের দ্বারা যে সকল অলৌকিক কাণ্ডের কথা প্রকাশ হইত, তাহাই সকলে বিশ্বাস করিতেন। শিশুর কোষ্ঠবদ্ধ, উদরস্ফীত, অক্ষুধা বা বিবর্ণ ইত্যাদি হলেই তাহার প্রতি উপরিভাব অর্থাৎ কেঁচোর আবির্ভাব হইয়াছে ভাবিয়া ওঝাকে ডাকিতে হত । ওঝার আদেশে নবপ্রসূত বসিয়াছে, দাড়াইয়াছে, এ দিক ও দিক করিয়াছে, ইত্যাদি কতরূপ আশ্চৰ্য কাণ্ড শুনতে পাইতাম এবং বিশ্বাসও করিতাম । আমাদের বাটীতে এইরূপ অনেক অনেক কাণ্ড অনেকবার হইয়া গিয়াছিল। যে সময় আমার কন্যার পীড়া হয়, সে সময় আমাদের এইরূপ বিশ্বাস ছিল না, কিন্তু বৃদ্ধদিগের ও স্ত্রীলােকদের এ বিশ্বাস বিলক্ষণ ছিল। অামার অজ্ঞাতসারে দুই এক ওঝা আসার কথা পরে শুনিয়াছিলাম। কালীবাবু কৃষ্ণনগরে অবস্থিত হইলে, আমাদের বাটীতে পেচোর বা ওঝার আগমন হয় নাই। তাহার ব্যবস্থানুসারে পীড়িত শিশুকে একটু ক্যাষ্টর অইল দিলে, অথবা উষ্ণ জলে স্নান করাইলে, এরূপ রােগের শাস্তি হইতে আরম্ভ হয়। ইদানীং অনেক বুদ্ধিমতী স্ত্রীলােকও সন্তানের পীড়া হইলে ঐরূপ চিকিৎসা করিয়া থাকেন।
ওঝার কৌশল। ভুতের দৌরাত্ম্য ৩ সে কালে শিশুকে যেমন পেঁচায় পাইত, যুবক প্রাচীন দিগের ভুত যুবতী দিগের শরীরে তেমনই ভূত প্ৰে'তনীর আবি- বিশ্বাস । ভাব হইত, এ বিশ্বাস বাল্যকালে আমাদের মনেও দৃঢ়ীভূত ছিল । বহুকালাবধি আমাদের বাটীর ছাতের উপর কখন যেন কেহ বেড়াইতেছে, কখন যেন ভাট। আমাদের বাড়ীতে খেলাইতেছে, এইরূপ শব্দ গুনা যাইত। কি কারণে এই শব্দ হয়, ইহা জানিবার নিমিত্ত সাহসী কেহ কেহ ছাতের উপর যাইতেন, কিন্তু কখন কিছু দেখিতে পাইতেন না। প্রাচীনদের মধ্যে কেহ কেহ বলিতেন যে, এক জটাধারী ব্রহ্মচারী ব্ৰহ্মদৈত্য নিকটস্থ কাণা-পুষ্করিণী সন্নিহিত গাববৃক্ষে থাকেন। তিনিই রাত্রিতে কখনও কখনও ছাতের উপর আসিয়া বেড়ান। স্ত্রীলােকদের মধ্যে কেহ কেহ কহিতেন যে ঐ দিকে বালকের ক্রন্দন ধ্বনি কখন কখন গভীর নিশিতে শুনিতে পাইয়াছেন। প্রাচীনদিগের মুখে ব্ৰহ্মদৈত, ভূত প্ৰেতিন, শাকিনী, কত প্রকার কাহিনী শুনিতে পাইতাম। ইংরেজী পুস্তক পাঠে ও রাম তনু বাবুর উপদেশে, যখন আমাদের এই সকল বিষয় মিথ্যাজ্ঞান হইল, তখন তাহাদের সহিত এ বিষয়ের তর্ক বিতর্ক করিতে লাগিলাম, এবং যাহাতে তাহাদের মন হইতে ভূতের বিশ্বাস দুর হয়, তাহার যত্ন করিতে লাগিলাম। যে সকল স্থানে ভূতের বাসস্থান বলিয়া তাহারা ভয় করিতেন, সেই সেই স্থানে আমরা রাত্রিতে যাইতাম, এবং তাহাদের ভয়ের অলীকতা জানাইতাম। স্ত্রীলোক গর্ভিণী বা মৃত বৎসা হইলে ভূতের ওঝা আনীত হইত। আমার জেঠী ঠাকুরাণীর সন্তান শৈশবাবস্থায় গতানু হইত বলিয়া, ঐরূপ এক ওঝা আইসে। ইষ্টকালযে ভূতের অবতরণ হওয়ার কোন বাধা আছে বলিয়া, বাহিরের ক খানি তৃণাচ্ছাদিত মৃত্তিকাগৃহে আবশ্যক উদ্যোগ করিল। গৃহের মধ্যে এক পার্শে জেঠী ঠাকুণী একজন ওঝার কৌশল দাসীর ক্রোড়ে বসিলেন ওঝা দ্বারে বসিয়া ভূতকে আহ্বান করিল + গৃহের চারিদিকে ইষ্টক পড়িল, চাল মড় মড় শব্দ করিতে লাগিল ; সকলের শরীর শিহরিয়া উঠিল। গৃহের পিঁড়াতে অনেক লােক বসিয়া ছিলেন। তাহারা এক দৃষ্টিতে দ্বার দেশে ওঝার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। ওঝা কহিল, “বাবা আসিতেছেন, আপনারা সাবধানে থাকিবেন; উপহাস করিলে বিপদ ঘটিবে।” গৃহ মধ্য হইতে কেহ বিকট নাসিকার স্বরে একটি ১০ ৭২ আত্ম-জীবনচরিত। শ্লোক পড়িয়া বলিল, “বাবা আমাকে কেন ডাকিলে ?” ওঝা উত্তর করিল যে, “এই স্ত্রীলােকের সন্তান দীর্ঘজীবী হয় না—ইহার কারণ বল, এবং ঔষধ দাও”। ভূত কহিল, “আমি পারিব না।” ওঝা বলিল, “তবে তুমি যাও ' আবার ইষ্টক নিক্ষিপ্ত হইল, চাল মচ মচ, করিয়া উঠিল। ওঝা পুনরায় কহিল যে, “এবার যিনি আসিতেছেন, তাহার বড় উগ্র স্বভাব। কেহ হাসিলে বা উপ- হাস করিলে, তৎক্ষণাৎ তাহার মুণ্ড ছেদ হইবে।” ক্ষণপরেই কেহ অতি ভয়ানক কর্কশ স্বরে উরূ উরূ উরূ উরূ শব্দ করিয়া কহিল, “বাবা দাসী বেটী হাসিতেছে, তাহায় মুণ্ড পাত করিয়া দেই।” ওঝা কহিল, “তাহার নাম কি ?” ভূত কহিল, “শ্রীমতি ঘােষাণী ।” ওঝ। পুনৰ্ব্বার কহিল, “ঐ ঘােষাণী যাকে কোলে করিয়া বসিয়া আছে, তাহার নাম বল দেখি।” সে তৎক্ষণাৎ বলিল, “হীরামতী”। ওঝা বিনয়ে কহিল, “ঘােষাণীর সামার অপরাধ ক্ষমা কর, আর হীরামতীর সন্তান বাঁচে না, তাহার ঔষধ দাও।” ভূত কহিল “তাহাকে আঁচল পাতিতে বল।” জেঠী অঞ্চল প্রসারণ করিলে, তাহাতে একটি মূল পড়িল । ভূতও বিদায় হইল। সকলে কহিতে লাগিলেন যে যার্গ ভূত না হইলে হীরামতী নাম কিরূপে জানিল, এবং কিরূপেই বা অন্ধকারে ঠিক তাহার অঞ্চলে ঔষধ দিল। তখন আমরা ভূত প্রেত বিশ্বাস করিতাম না, তথাপি বারম্বার গাত্র রােমাঞ্চিত হইয়াছিল। এ সকল কাগু ভৌতিক বলিয়া প্রত্যয় করিলাম না, কিন্তু যে সকল অদ্ভুত ঘটনা হইল, তাহাও বুঝিতে পারিলাম না। কিছু দিন পরে আমাদের গ্রামের আর এক বাটীতে ঐ ওঝা ভূত নামায় ও ঐরূপ অনেক ভৌতিক কাণ্ড করে। সেখানেও এ বিষয়ের প্রকৃত বৃত্তান্ত কেহ বুঝিতে পারে নাই। নানা প্রকার চিন্তা করিতে লাগিলাম, কিন্তু ইহার কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। পর বৎসর কৃষ্ণনগরের চৌধুরী-বাটিতে ঐ ওঝা পূৰ্ব্বমত ভূত অবতরণ করায়। সেখানে এক সাহসী ও বলবান্ পুরুষ, ওঝার কৌশল প্রকাশ ওঝার অগােচরে গৃহমধ্যে প্রবেশপূৰ্ব্বক ভূতকে সাপটিয়া ধরিলে সকলেই বুঝিতে পারিলেন যে, ওঝাই একবার নিজের কাৰ্য্য, একবার ভূতের কাৰ্য্য করিতেছে। ক্রমশঃ ওঝাদের সকল চাতুরী ও কৌশল জানিতে পারিলাম। ওঝা প্রথমে সকলের সমক্ষে দ্বারদেশে আসীন হয়, ও ক্রমে ক্রমে কতকগুলি লৌহশলাকা ব্যাধদিগের আঠার নলার ন্যায় পরস্পর সংযােজিত করিয়া দুই গাছি যষ্টি প্রস্তুত করে ও আপনার উভয় পার্শ্বে ঐ দুই ভূত নয় চোর। গছি পুতিয়া তাহার উপর নিজের গাত্র বস্ত্র রাখিয়া দেয়। যখন ওঝার কাৰ্য্য করে, তখন ঐ বস্ত্রের নিকট বসিয়া কথা কহে,আর যখন ভূতের কর্ম করিতে হয়, তখন গৃহের মধ্যে যাইয়া ভিন্ন স্বরে কথা কহে। সঙ্গে যে এক গাছি চৰ্ম্ম-রজ্জ, থাকে, তাহা ঘবের অাড়ায় বাধাইয়া রাখে। তাহা দ্বারা কথন আড়ায় উঠিয়া সেখানকার দ্রব্য বলপূর্বক নিয়ে নিক্ষেপ করে, কথন পদ দ্বারা সবলে আড়া নড়াইয়া ঘরের মচ মচ, শব্দ করায় এবং কখন তাহা হইতে বিকৃত স্বরে কথা কহে! সকলেই ওঝার বস্তুকে ওঝজ্ঞানে তাহার উপরে বিশেষ দৃষ্টি রাখিতেন। সুতরাং ওঝা যে ভিতরে যায় ও আড়ায় উঠে, তাহা কেহই বুঝিতে পারিতেন না। তাহার দুই তিনজন সঙ্গী গোপনীয় স্থান হইতে গৃহের উপরে ও পাশ্বে ইষ্টক প্রক্ষেপ করিত। ভূত প্রত্যয়ী দর্শকের ভয়ে বিহবল হইয়া ইহার কোন অনুসন্ধান করিতেন না। যখন এই উনবিংশ শতাব্দীতে সভ্য য়ুরােপ ও আমেরিকার এইরূপ মনুষ্যকৃত ভৌতিক কাণ্ড বিশ্বাস হইতেছে, তখন আমাদের দেশস্থ পুরাতন লােকদিগের যে এ সকল কাণ্ডে বিশ্বাস থাকিবে, ইহা আশ্চর্যের বিষয় কি? পূর্বে আমাদের বাটীর ছাতের উপর রাত্রিতে যে নানা রূপ শব্দ হওয়ার কথা বলিয়াছি, তাহারও কারণ এক সময় প্রকাশ পাইল। এই রূপ শব্দ হইলেই আমি ছতে যাইতাম, কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইতাম না। এক জ্যোৎস্না রজনীতে ঐরূপ শব্দ হওয়াতে, কোন স্থানে ভুত নয় চোর। লুক্কায়িত থাকিয়া দেখিলাম যে, একটি বিড়াল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইষ্টক খও পদ দ্বারা তাড়াইতেছে, এবং সে সকল কিছু দূর গড়াইয়া যাইলে পুনরায় ধরিতেছে। এইরূপ পুনঃ পুনঃ করাতেই গড়র গড়র শব্দ হইতেছে। আর এক যামিনীতে এইরূপ দেখিলাম যে, একটা হনুমান বারম্বার এদিক ওদিক বেড়াইতেছে, এবং তাহাতেই নিম্নতলায় বােধ হইতেছে, যেন কোন ব্যক্তি ছাতে বেড়াইতেছে । সাধারণের ভুত বিশ্বাস থাকাতে চোরেরা ও লম্পটেরা ভূতের ন্যায় ব্যবহার করিয়া লোকের অনিষ্ট করিত। আমার এক বন্ধু তারিণী চরণ রায়ের বাটীতে সন্ধ্যার পর ইষ্টক পাড়তে লাগিল। তাহার ভূত বিশ্বাস না থাকাতে তিনি গুরুজনদিগকে বলেন যে, এ কাণ্ড ভুতের নহে, দ্য কর্তৃক হইতেছে। গুরুজনেরা তাহার কথা যুক্তি সঙ্গত বােধ করিলেন না। কর্তারা বাহিরে থাকিতেন, এবং স্ত্রীলাে- কেরা ভয়ে কেহই পৃথক থাকিতেন না। সকলেই রন্ধনশালায় যাইতেন, ৭৪ আত্মজীবনচরিত। ডাইনী । এবং আহারের পর একত্রিত একত্রিত হইয়া শয়নাগারে আসিতেন। তারিণীও আহারের সময় বাটী যাইতেন। এক রাত্রিতে সকলে আহারের পর স্ব স্ব গৃহে যাইয়া দেখিলেন যে, অনেক দ্রব্য অপহৃত হইয়াছে। চোরেরা প্রাচীর উল্ল- জিঘয়া বাটী প্রবেশ করিয়াছিল, ইহা বেশ বুঝিতে পারিলেন, এবং তারিণীর কথা বিশ্বাস করিলেন। আমাদের দৃষ্টান্তে প্রাচীন ও মধ্যবয়স্কদিগের মন হইভে ভূত বিশ্বাস গিয়াছিল কি না, বলিতে পারি না। কিন্তু তাহাদের মুখে আর প্রেত প্রেতিনীর গল্প শুনা যাইত না। সেকালে ডাইনীর প্রভাবের প্রতিও সাধারণের বিলক্ষণ বিশ্বাস ছিল। নরনারী উভয় জাতীর শরীরে তাহার আবির্ভাব হইত। বালক বালিকার জ্বর হইলে পাছে তাহাদের প্রতি ডাইনের দৃষ্টি পড়িয়া থাকে, এজন্য তাহাদিকে সন্ধ্যার পর মন্ত্রপূত জল পান করান হইত। যদি রােগী নিমীলিত নয়নে থাকিত, বা দুই একটি অসঙ্গত কথা কহিত, তাহা হইলে রাত্রিতে ডাইনের ওঝা দ্বারা তাহাকে ঝাড়ান হইত। ভদ্রলােকের মধ্যে? কহ কেহ জলপড়ার মন্ত্র জানিতেন। আমার পিতা কখন কখন আমাদিগকে জল পড়িয়া দিতেন। একটি জলপূর্ণ পাত্রের মধ্যে একটা লৌহদ্রব্য দ্বারা জল আবৰ্তন করিতেন, এবং মন্ত্র পড়িতে থাকিতেন। বোধ হয়, ডাকিনীর অপভ্রংশ ডাইনী শব্দ। ডাইনীরও যে যে অদ্ভুত ব্যাপার দেখি- তাম, তাহাও বিস্ময়কর বােধ হইত। আমার জেঠতুত দাদার যে স্ত্রী ছিলেন, তাহার ন্যায় সুশীলা ও লজ্জাবতী নারী কেহ কখন দেখেন নাই। একদা তঁাহার শরীরে ডাইনীর আবির্ভাব হইয়াছে স্থির হওয়াতে, ওঝা আসিয়া তাহাকে ঝাড়াইতে থাকে। তিনি শ্বশুর, ভাসুর প্রভৃতি সকলের সমক্ষে নিতান্ত লজ্জাহীন হইয়া তাহাদিগকে উচ্চৈস্বরে গালি দেন। দুইজন পুরুষ ওঝার দত্ত মন্ত্রপূত অশ্বথ পত্রের দুইটি খিলি ঐ রমণীর কর্ণদ্বয়ে সংযুক্ত করিয়া ধরিলে, তিনি চীৎকার ধ্বনি করেন, এবং পরিশেষে “ছাড়ি ছাড়ি” বলিয়া মুচ্ছিত হন। ক্ষণপরে চৈতন্য হইলে তিনি তাহার নিলজ্জাবস্থার কথা শুনিতে পাইয়া অত্যন্ত লজ্জিত হন, এবং অশেষবিধ আক্ষেপ করেন। আমাদের বাটীতে আর একটি রমণীর এরূপ অবস্থা হয়। তিনি যদিও পূর্বোক্ত কামিনীর ন্যায় লজ্জাশীলা ছিলেন না, কিন্তু অতি সুশীল। ও লক্ষ্মী ছিলেন। তাঁহাদের কেহই যে ইচ্ছাপূৰ্ব্বক এইরূপ নিলজ্জ ভাব প্রকাশ করেন, ইহা কাহারও বােধ হয় নাই। আরও কয়েক জন স্ত্রী জ্ঞানের প্রভাব। ৭৫ } পুরুষের এইরূপ অবস্থা হইতে দেখিয়াছি, তাহাতেও কোন কৃত্রিম ভাব বোধ হয় নাই। এই সকল ঘটনার সময় আমরা বালক ছিলাম,এবং ডাইনীর কাও বলিয়া বিশ্বাস করিতাম । পরে যখন এ বিষয়ে আমাদের অবিশ্বাস জন্মিল, তখন আমরা ইহার নিগূঢ় তত্ত্ব জানিবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। প্রথমে কেহ কেহ বায়ুরােগ অনুমান করিতে লাগিলেন। কিয়ৎকাল পরে যখন মেসমেরিজমের আশ্চর্য ব্যাপার সকল শুনিতে ও দেখিতে লাগিলাম, তখন ডাইনির কাণ্ডও কোন প্রকার মেসমেরিজম অনুমান করিলাম। শেষে ডাইনীর কাও এককালে স্থগিত হইলে এ বিষয়ের আর আন্দোলন করা যায় নাই। যাহা হউক, এ বিষয়েও আমাদের অবিশ্বাস হওয়াতে ক্রমশঃ অনেকেরই অবিশ্বাস হইল। আমার কন্যার বিয়ােগে আমি সাতিশয় শােকাকুল হই। দিবা রাত্রি হৃদয়ের মধ্যে কেমন এক প্রকার অসুখ হইতে কন্যা-বিয়োগে শােক। লাগিল । সুমিষ্ট নভেল পাঠে মনঃসংযােগ করি- বার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারিলাম না। নিজ গ্রামের যুবকবৃন্দের মধ্যে এমন কেই ছিলেন না যে, তাহার নিকট হৃদয়ের যাতনা জানাইলে কিঞ্চিৎ শাস্তিলাভ করি । কৃষ্ণনগরনিবাসী যে সকল সুহৃদ্ব র আমার সুখ দুঃখের ভাগী ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে প্রায় কেহই আসিলেন না । কালে তাহাদের কেহই সন্তান নিয়ােগ যন্ত্রণা জানিতেন না। পাছে কেহ আমাকে শােকপরবশ দেখিয়া উপহাস করেন, এই আশঙ্কায় তঁহাদের সমপন্থ হইতে আমারও ইচ্ছা হইল ন!। যদি কথাঞ্চৎ ধৈর্য্যাবলম্বন করিতাম, স্ত্রীর ক্রন্দনধ্বনি শুনিলেই শোক উছলিয়া উঠিত। মানসিক যন্ত্রণায়, শারীরিক যন্ত্রণা উপস্থিত হইল । রক্তামাশয়ে ক্লেশ পাইতে লাগিলাম , এক দিবস জনৈক সুহৃদর আসিয়া আমাকে একখানি পুস্তক দিয়া কহিলেন যে, “এই খানির কোন কোন অংশ পাঠ করিলে তােমার জ্ঞানের প্রভাব মনের অনেক কষ্ট দূর হইবে।” ঐ গ্রন্থের নাম স্মরণ নাই। বােমদেশীয় প্রসিদ্ধ পণ্ডিত সিসিররাকে তদীয় এক বন্ধু যে এক পত্র লেখেন, তাহা •ঐ পুস্তকে পাঠ করিলাম। ঐ পত্রের যে একটু ভাব মনে আছে, তাহা এই,--“তােমার (সিসিরাের) প্রিয়তমা দুহিতার পরলােক- গমন সংবাদ শ্রবণে অত্যন্ত ব্যথিতহৃদয় হইলাম, এবং তাহার বিয়ােগে তােমার যে এত অধিক শোেক হইয়াছে, তাহাতে আরও দুঃখ পাইলাম। যাহার উপদেশে সহস্র সহস্র লোকের শোক তাপ দূরীভূত হয়, তাহার আত্ম-জীবনচরিত। নিজের উপর যে শােকের ঈদৃশ প্রভাব হইবে, তাহা কখনও ভাবি নাই ই! কালেতে শােক দুঃখ সকল ভুলিতেও হইবে । অতএব যাহা কালে সম্পাদন করিতে পারে, তাহা যদি জ্ঞান দ্বারা সম্পন্ন না হয়, তবে কি আক্ষে পের বিষয়।” এই পত্র পাঠে আমার শোকের অনেক শান্তি হইল। আহা! পণ্ডিতদিগের সদুপদেশের কতই প্রভা, কতই মােহিনী শক্তি! হৃদয় বেদ- নার এমন ঔষধ আর কিছুই নাই । পর বৎসর (১২৫১ বঙ্গাব্দে) আমার এক পুত্র জন্মিল, এবং কন্যা-বিয়ােগ শােক এক কালে তিরােহিত হইল। রাজবাটীতে আমার প্রতি পূৰ্ব্ব মত গমনাগমন করিতে, এবং রাজপুত্রকে শিক্ষা রাণীর শ্রদ্ধা দিতে লাগিলাম। আমাকে রাজ। যেমন ভাল বাসিতেন, রাণীও রাণীও তেমনই ভালবাসিতে লাগিলেন। তিনি আমাকে পুত্রনিৰ্বিশেষে স্নেহ করিতেন, অথচ পিতার ন্যায় ভক্তি দেখাইতেন। মনের সকল সুখ দুঃখ আমাকে জানাইতেন! স্বামীর প্রতি যদি কখনও বিরক্ত হইতেন, আমি অনুরােধ করিলেই তাহার বিরক্তি দুর হইত। যে সকল খাদ্য দ্রব্য প্রস্তুত করিতেন, তাহার কিয়দংশ আমাকে না দিয়া তৃপ্তি বােধ করিতেন না। ষষ্ঠী-পুজা উপলক্ষে আমাকে কখন কখন বস্ত্র প্রদান করিতেন। পীড়া হইলে রাজকুমারদিগকে আমার নিকট রাখি- তেন। রাণী ঠিক আমার সমবয়স্কা ছিলেন। সুতরাং আমাকে এত ভালবাসেন বলিয়া, পাছে রাজার মনে কোন ঈর্ষা ভাব উপস্থিত হয়, এজন্য আমি কখন কখন অতি কুণ্ঠিত হইতাম। কিন্তু রাজার যেরূপ উন্নত চিত্ত ছিল, ও আমাকে তিনিও যে প্রকার ভালবাসিতেন ও শ্রদ্ধা করিতেন, তাহাতে বােধ হয় যে, কখনও তাহার মনে কোন নীচ ভাবের উদয় হইত। বরং রাণী আমাকে ভালবাসাতে আহলাদ প্রকাশ করিতেন। যখন তিনি রাগীর ক্রোধ শাস্তির কোন উপায় না দেখিতেন, তখন তাঁহাদের কলহে আমি রাজবাটী ত্যাগে উদ্যত হইয়াছি,—এইরূপ ষড়যন্ত্র দ্বারা রাণীর ক্রোধের শাস্তি করিতেন। ইহাদের আমার প্রতি ভালবাসা অতীব সুখের বিষয় ছিল, তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু সে সময় রাজসংসারের যেরূপ দুরবস্থা ছিল, তাহাতে এখানে থাকিয়া আমার চলিবার আশা ছিল না। সুতরাং মনােমধ্যে কখন কখনও বড়ই অসুখ উপস্থিত হইত। আমি কৰ্ম্মান্তরের চেষ্টা করিতে লাগিলাম; এবং যাবৎ স্থানান্তরে সুবিধা না হয়, তাবৎ এখানে থাকিবার মানস করিলাম।
ধৰ্ম্মে অনুরাগ। ৭৭ যদিও আমাকে বর্ধমানের রাজার নিকট পাঠানতে কোন ফল হইল না তথাপি রাজা শ্রীশচন্দ্র ব্রাহ্মধৰ্ম্মের উন্নতিসাধনের জন্য কৃষ্ণনগরে ব্রাহ্ম বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তিনি কতিপয় পণ্ডি ধর্ম বিস্তার (তের সাহায্যে, সন্ধ্যার কাম্যভাগ ত্যাগ করিয়া, নিত্য ভাগ যাহাতে শুদ্ধ ব্রহ্মোপসনা আছে, তাহা স্বতন্ত্র করাইয়া এক পদ্ধতি প্রস্তুত করালেন, এবং তাহার এক এক খণ্ড আমাদিগকে দিলেন। আমি ঐ পদ্ধতি অনুসারে নিয়মিত কালে ভক্তিভাবে সন্ধ্যা করিতাম। কিছুদিন পরে তিনি বলিকাতায় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট হইতে ব্রাহ্মধর্মের নিয়মাবলি আনাইয়া তাহাতে ব্রজনাথ মুখােপাধ্যায়, নীলমনি গড়গড়ি ও আমার স্বাক্ষর করাইলেন। রাজার ইচ্ছানুসারে, ব্রাহ্মধৰ্ম্মবিস্তারের জন্য দেবেন্দ্র বাবু হাজারি লালা নামক এক ব্রাহ্মধর্ম প্রচারককে কৃষ্ণনগরে পাঠাইলেন। এই সময় রাজা নবাবের বিবাহ উপলক্ষে মুরশীদাবাদে গমন করিলেন । আমিও তঁাহার সঙ্গে যাইতাম। কৃষ্ণনগরে ক্রমশঃ ৪০'৫০ জন ব্রাহ্ম ধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইয়াছেন শুনিতে পাইলাম। এক মাসের পর সংবাদ গেল, রাজ- বাটীতে ব্রাহ্মসমাজ সংস্থাপিত হইয়াছে, এবং প্রতি বুধবারে যথানিয়মে উপাসনা হইতেছে। কায়স্থ জাতীয় হাজারি লালা, সমাজের উপাচার্য্য হইয়া বেদ পাঠ করিতেছেন, রাজা ইহা শুনিয়া অত্যন্ত বিরক্ত হইলেন, এবং আর দ্বিতীয় বার সমাজ না হয়, তজ্জন্য আমাকে কৃষ্ণনগরে পাঠাইয়া দিলেন। রাজা প্রত্যাগমন করিলে, আমিন বাজারে ঐ সমাজ অধিষ্ঠিত হইল। আমরা তথায় শ্রদ্ধাপূৰ্ব্বক উপাসনা করিতে লাগিলাম । বাল্যাবস্থা হইতে ঈশ্বরােপাসনায় আমার যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। যখন তান্ত্রিক মন্ত্র গ্রহণ করি নাই, তখন আমি কালীমূৰ্ত্তির ধ্যান ধৰ্ম্মে অনুরাগ করিতাম। আমার এই ভাব দেখিয়া মাতাঠাকুরাণী আমাকে কহিতেন, “ইষ্ট দেবতার মূর্তি প্রকাশ করিতে নাই, কিন্তু তােমার মানস সিদ্ধ হইবে এই পর্যন্ত বলিতে পারি।” ৯৪ কি ১৫ বৎসর বয়সে আমি জননীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করি, এবং নবদ্বীপের লক্ষীকান্ত ন্যায়ভূষণ আমার উপরু হন। আমাদের বংশের এই প্রথা আছে যে, মাতা কেবল মূলমন্ত্র কর্ণে প্রবিষ্ট করেন, এবং উপযুক্ত ইষ্ট দেবতার আবার বলিয়া ও ধ্যান শিখাইয়া দেন। কয়েক বৎ- সর পর্যন্ত গাঢ় ভক্তির সহিত ইষ্ট দেবতার পূজা করিতাম। পরে ইংরেজী নানা- বিধ গ্রন্থ ও রাজা রামমােহন রায়ের ধর্মসংক্রান্ত পুস্তক পাঠে, সাকার উপাসনার ৫ আত্ম-জীবনচরিত। প্রতি অভক্তি জন্মিলে, নিরাকার উপাসনায় প্রবৃত্ত হইলাম। পরমেশ্বরেতে প্রীতি করা ও তার প্রিয়কার্য সাধন করা, এই দুই উপাসনার প্রধান অঙ্গ বােধ হইল। আর, বদ যে ঈশ্বর প্রণীত, ইহাতে সন্দেহ মাত্র রহিল না। যে সময় বর্ধমানাধিপতির ব্রাহ্মধৰ্ম্মবিস্তারের প্রতি বিরাগ জন্মিয়া, নিজের হিন্দুয়ানীর উন্নতি সাধনে আগ্রহাতিশয় হইল সে সময় নবদ্বীপাধিপতিরও সকল উৎসাহ কেবল আমােদ প্রমােদে পরিণত হইল ইঁহাদের দোষ কি দিব ? আমাদের মধ্যে অনেকেরও আর এ বিষয়ে উৎসাহ রহিল না। আদি ব্রহ্ম সমাজের বেদ ঈশ্বর প্রণীত বলিয়া যে বিশ্বাস ছিল, তাহা ক্রমশঃ তিরােহিত হইল। কিছুদিন পরে আমাদেরও ঐ ভাব হইয়া উঠিল । যাহা উক, সমাজের কাৰ্য কোন রূপে চলিতে লাগিল । ১৮৪৬ খৃষ্টাব্দে মহামতি গবর্নর জেনারেল হারডিঞ্জ বাহাদুরের কৃপায় কৃষ্ণ নগরে কলেজ স্থাপিত হইল। তৎকালে কলিকাতা কৃষ্ণনগর কলেজ। ব্যতীত অন্য কোন স্থানে রাজপুত্রদিগের কালেজে বা স্কুলে শিক্ষাপ্রাপ্তির প্রথা ছিল না। তাঁহাদের অন্যান্য বালকের সহিত একাসনে উপবেশন নিতান্ত অসম্মানজনক বােধ হইত। শুদ্ধ ব্রাহ্মণ কায়স্থ সন্তানগণ কলেজে পড়িতেন, এরূপ নহে । অতি নীচ জাতীয় বালকেরাও কালেজে পড়িত। কালেজে প্রবিষ্ট হইলে, চণ্ডালের সন্তানের পুরাতন রাজ কুমারদিগের সহিত একাসনে রাজপুত্রের বসিতে হইবেক। সন্তান শিক্ষাপদ্ধতি। বিদ্বান হইলে ধন, মান, যশ ও খ্যাতিলাভ করিবার যেরূপ আশা সাধারণ লােকের মনে হয়, রাজাদের মনে সেরূপ হইত না। তাহারা ভাবিতেন, সন্তান চাকুরী করিবে না, ইংরেজী পড়িতে ও কহিতে ও লিখিতে পারিলেই যথেষ্ট হইবে। ইহার জন্য মানের হানি করিবার প্রয়োজন কি ? এরূপ ভাব ইয়ুরােপের উচ্চপদস্থ লােকের মনে ও এক সময় উদয় হইত। তাহাদের নিমিত্ত স্বতন্ত্র স্কুল প্রতিষ্ঠিত ছিল। শ্রীশচন্দ্রের পুত্রকে কালেজে দিবার ইচ্ছা হইল। কিন্তু অন্যান্য পুরাতন রাজাদের নিন্দার ভয়ে, ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। শেষে কলেজের অধ্যাপকদিগের সহিত এই নিয়ণ স্থির করিলেন যে, রাজকুমার কোন এক শ্রেণীভুক্ত হইবেন, কিন্তু পৃথক আসনে বসিয়া পড়িবেন। এইরূপ কিয়ৎকাল গত হইলে, একজন কালেজ কুমার সতীশচন্দ্রের ইনস্পেক্টার, রাজ পুত্রকে পৃথক্ আসনে দেখিয়া ও তাহার কারন শুনিয়া ইনস্পেকশন্ রিপাের্টে লিখিলেন আমার প্রতি রাজার বিশ্বাস। ৭৯ যে, “কুমারটি বুদ্ধিমান বােধ হইল, কিন্তু এ নিয়মে পড়িলে কালেজে শিক্ষার পূর্ণ ফল পাইবার আশা নাই।” লেপটেনান্ট গবর্নর এই রিপাের্ট পাঠে কালেজ- অধ্যক্ষকে লিখিলেন যে, “নবদ্বীপের রাজা যেরূপ বুদ্ধিমান ও সদ্বিবেচক, তাহাতে আশা করা যাইতে পারে যে, পৃথক আসনে বসিলে ও স্বশ্রেণীর ছাত্র- গণ হইতে পৃথক থাকিলে যে দোষ হয়, তাহা তাহাকে বিশেষরূপে বুঝাইয়া দিলে তিনি অবশ্যই রাজকুমারকে কালেজের নিয়মপালন করিতে দিবেন।”রাজা উক্ত পত্রের মর্ম অবগত হইয়া, গবর্ণরের অভিপ্রায়ানুযায়ী কাৰ্য্য করিলেন । যখন রাজা রাজকুমারকে কালেজে দেওয়া স্থির করেন, সেই সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, “তুমি শিক্ষকের কার্যাই করিবে, রাজ সংসারে আমার অন্য কি কৰ্ম্মান্তরে প্রবিষ্ট হইবে ?” আমি উত্তর করি যে, চাকুরী। “আমি শিক্ষকের ব্যবসায় চিরদিন কাটাইব, এরূপ সঙ্কল্প করি নাই। ইহা শুনিয়া তিনি প্রফুল্লবদনে কহিলেন যে, “আমার বিশ্বাসী কর্মচারীর নিতান্ত অভাব আছে । যদি তুমি তাহা দুর কর, তবে আমার বড়ই উপকার হয়।” আমি উত্তর করিলাম যে, আপনি আমাকে প্রতিপালন করিতে পারিলে আমার স্থানান্তরে যাইবার কোন প্রয়ােজন হইবে না।” এ কথা শ্রবণে তিনি অতীব আনন্দপ্রকাশ করিলেন; এবং তাহার সংসারের কোন কোন কার্যের ভার আমাকে দিলেন। তৎকালে রাজসংসারে দুইজন প্রধান কর্মচারী ছিলেন। রাজগুরু গােপী নাথ ভট্টাচাৰ্য কতকগুলি মহলের কর সংগ্রহ করিয়া রাজস্ব দিতেন ; এবং রামমােহন চৌধুরী কয়েক মহালের খাজানা আদায় করিয়া সাংসারিক নিত্য নৈমিত্তিক কাৰ্য চালাইতেন। এই সমস্ত ব্যয়ের তত্ত্বাবধায়করূপে আমি নিযুক্ত হইলাম। প্রথম কয়েক মাস গৃহস্থিত বস্ত্র ও অন্য কোন কোন দ্রব্যের তালিকা প্রস্তুত করিলাম। তৎপরে সংসারের ব্যয়ের ন্যায্যান্যায্য বিষয়ের পরীক্ষা করিতে লাগিলাম। প্রথম বৎসরের এক মুদির হিসাবেই পূৰ্ব্ববৎসর অপেক্ষা পাঁচ শত টাকার কেফায়ত হইল। এ বিষয় রাজার জাত করণার্থ আমার মােহরের আমাকে পুনঃ পুনঃ অনুরােধ করিল। কিন্তু এই লাভ সাধনে আমার বিশেষ শ্রম ও যত্ন করিতে হয় নাই বলিয়া, আমি তাহার অনুরােধ রক্ষা করিলাম না। রাজা পরম্পরার ইহা শ্রুত হইয়া সাতিশয় প্রতি প্রকাশ আমার প্রতি রাজার পূৰ্ব্বক আমাকে কহিলেন যে, “দেখ, আমার চাক- বিশ্বাস। রেরাই আমার সর্বনাশ করিতেছে!” কিছু দিন ১১ আত্মজীবন-চরিত। । পরে মোকদ্দমা সমূহের তত্ত্বাবধানের ভারও আমার প্রতি অর্পিত হইল। যদিও রাজার কর্মচারী শ্রেণীভুক্ত হইলাম, তথাপি রাজা ও তাহার সমস্ত পরিবার আমাকে পূৰ্বে যেরূপ মান্য করিতেন, এক্ষণেও সেইরূপ মান্য করিতে লাগি- লেন। রাজসংসারে এই এক চিরপ্রথা ছিল যে, কোন পনির ইজারা বন্দোবস্ত হইলে, প্রধান প্রধান পক্ষের উৎকোচ ব্যতীত দরবার খরচ বলিয়া পত্তনিদার বা ইজারাদার কিছু টাকা দিত। তাহার মধ্যে প্রধান কর্ম দরবারের খরচ কৰ্ত্তা নিজাংশ লইয়া, অবশিষ্টাংশ রাজবাটীর সমস্ত গ্রহণে আপত্তি আমলা ও চাকরকে বিভাগ করিয়া দিতেন । বিষয় রাজার জ্ঞাতসার ছিল। এক দিন গুরু ভট্টাচার্য আমাকে বহু স্নেহ দেখাইয়া কহিলেন, “যে টাকা রাজার জানিত, তাহাকে উৎকোচ বলা যায় না। তাহার অংশ গ্রহণ করিতে কি পাপ হয় ? সম্প্রতি বন্দোবস্তে যে টাকা পাওয়া গিয়াছে তাহার মধ্যে আমি তােমার নামে ১৫ টাকা লিখিয়াছি। ইহা তােমায় লইতে হইবে”। কিন্তু আমি সে টাকা লইলাম না। কয়েক দিন পরে যৎকালে আমি রাজসন্নিধানে উপস্থিত ছিলাম, সেই সময় উক্ত ভট্টাচাৰ্য্য রাজাকে কহিলেন যে, “কার্তিককে দরবার খরচের টাকার অংশ লইবার নিমিত্ত অনেক বুঝাইলাম, তথাপি লইতে চাহেন না। রাজ সংসারে বেতন অল্প হইলেও এইরূপে সকলের চলিয়া থাকে।” রাজা উত্তর করিলেন যে, “ইহাদের মনের স্বতন্ত্র ভাব হইয়াছ।” অতএব ইহার অংশের টাকা আমার নিকট পাঠাইবেন, আমি হাতে করিয়া দিব । এই টাকা আমি গ্ৰহণ করিলাম, কিন্তু তাহাতে লাভ বােধ না হইয়া বরং মনােমধ্যে অসন্তোষ জন্মিল। কয়েকদিন পরে রাজাকে কহি- লাম, “আমি দেখিতেছি যে, যখনই কোন ইজারা বা অন্যরূপ বন্দোবস্ত উপস্থিত হয়, তখনই সকল আমলাই আপনাদের কিঞ্চিৎ লাভের প্রত্যাশায়, প্রভুর লাভালাভের বিষয় কিছু মাত্র চিন্তা করেন না, এবং যাহাতে বন্দোবস্তটির সংঘটন হয়, তাহারই জন্য ব্যস্ত হন। সচরাচর মনুষ্য মাত্রেই স্বার্থপর। আমার অবস্থা স্বচ্ছন্দরূপ নহে। কি জানি যদি আমার স্বভাব পরিবৰ্ত্তন হইয়া আপনার লাভের দিকে মন না থাকিয়া, নিজের স্বার্থের দিকে ধাবিত হয়, এই আশঙ্কা আমার চিত্তে উপস্থিত হইয়াছে। অতএব আমি এই দরবার খরচের টাকা আর লইব না। “তােমার মনে এত সন্দেহও উদয় হয়, এই বলিয়া রাজা কহিলেন, “আচ্ছা, তাহাই হইবে।” গুরু ভট্টাচাৰ্য্য যে প্রস্তাব করেন, তাহা আমার মঙ্গ- লার্থে নহে। কিছুদিন পরে আমি বুঝিতে পারিলাম যে, তাহার প্রস্তাবের আমলার বেতন বৃদ্ধিতে জমিদারের মঙ্গল। ' } অনেক কারণ ছিল। প্রথমতঃ, উৎকোচ বিরােধী বলিয়া আমার যে যশ আছে, তাহা যাইবে; দ্বিতীয়তঃ, উপরি লাভ হইতেছে বলিয়া, আমার বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকিবে না; তৃতীয়ত, আমাকে স্বদল ভুক্ত করিতে পারিলে, তাহার অভীষ্ট সিদ্ধির পথ নিষ্কণ্টক হইবে। আমি আর দরবার খরচের টাকা না লওয়াতে বােধ হয়, তিনি “শিকার যে ফশকিয়া গেল, তাহা বুঝিতে পারিলেন । তৎকালীন সকল লােকের মনেই, উৎকোচ পাপ বলিয়া প্রতীত ছিল । এ কারণ প্রভুরা ভাবিতেন, কর্মচারীদের বেতন উৎকোচ প্রথা। যতই কেন অধিক হউক না, তাহারা উৎকোচ গ্রহণে কখনই বিরত হইবে না। তবে বেতন বৃদ্ধি করিয়া অধিক টাকা ব্যয় করিবার প্রয়ােজন কি ? কিন্তু ভারের উপযুক্ত বেতন দিলে তাহাতে সুফল ফলে কিনা, তাহা একবারও পরীক্ষা করিয়া দেখিতেন না। একজন ধনবান্ ৩ সম্ভ্রান্ত ভূম্যধিকারী, আপনার অবসন্ন অবস্থার উন্নতিসাধন কিরূপে হইতে পারে, তাহার সদুপদেশ আমাকে জিজ্ঞাসা করাতে আমি কহিলাম যে, “দুইশত টাকা মাসিক বেতনে একজন ভদ্রলােক নিযুক্ত করুন, তাহা হইলেই আপনার মঙ্গল হইবে দেখিবেন।” তিনি উত্তর করিলেন যে, অমলার বেতন বৃদ্ধিতে ‘অধিক বেতন দিলেই কি আপনার মত ভদ্র ও জমিদারের মঙ্গল। নিঃস্বার্থ লােক পাওয়া যায় ?” আমি প্রত্যুত্তর করিলাম যে, “উপযুক্ত বেতন দিলে আমার মত শত সহস্র ভদ্রলােক পাইবেন।” আমি এবিষয় তাহার হৃদয়ঙ্গম করিবার জন্য অনেক কথা কহিলাম, কিন্তু বােধ হইল, তাহার পূৰ্ব্বসংস্কার দূর করিতে পারিলাম না। তিনি ক্রমশঃ আরও অবসন্নাবস্থাপন্ন হইলেন, তথাপি আমার উপদেশানুরূপ কাৰ্য্য করিলেন না। আমার বােধ হয় যে, সাক্ষাৎকার ব্যয়ের উপরই তঁাহারা দৃষ্টিপাত করিতেন। অসাক্ষাৎকারে যে কত ব্যয় হইয়া যাইতেছে, তাহার প্রতি দৃষ্টি করিতেন না; ভদ্রলােকের প্রতি ভারাপণ হইলে যে বিষয়ে পঞ্চাশ টাকা ব্যয় হইতেছে তাহা দশ টাকায় নির্বাহ হইবে, অথবা যে যে বিষয়ের আর দশ টাকা আছে, তাহার আয় পঞ্চাশ টাকা হইবে, ইহা তাহাদের বিবেচনায় আসিত না। এদেশীয় লােকদিগের এরূপ ভ্রম ছিল, এমত নহে। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিরও প্রথমে এই ভ্রম ছিল। তাঁহাদের যে সকল কর্মচারীরা অল্প বেতনে নিযুক্ত হইয়া প্রচুর উৎকোচ লইতেন, তাহারাই উপযুক্ত বেতন পাইয়া সৎ হইয়া উঠিলেন। আমার বােধ হয় কোম্পানি আত্মজীবন-চরিত । । যেমন আপনাদের ভুল বুঝিতে পারিয়া অধিকৃত্যদের বেতন বৃদ্ধি করিয়া দিয়া- ছিলেন, সেইরূপ যদি এ দেশস্থ ভূম্যধিকারীগণ করিতেন, তাহা হইলে তঁাহাদের বংশের এ দুর্দশা ঘটিত না। গুরু ভট্টাচার্যের প্রতি যে সকল ভাব ছিল, তাহার স্বতস্ত্র বন্দোবস্ত হইল। এই রাজবংশের পূর্বপুরুষের সময় যে সকল জমিদারী হস্তান্তরিত হয়, তৎসমুদায়ের অধিকাংশ রাজস্ব পরিশােধের ত্রুটীতেই নীলাম হইয়া গিয়াছিল। দেশােধ বিষয়ে রাজবাটীর এতই অসম হইয়াছিল যে, অধিক টাকা আবশ্যক হইলে সহসা হস্তগত হওয়া দুষ্কর • সুতরাং রাজস্ব পরিশোধের পরিমাণ টাকা পাছে মহালে আদায় না হয়, এই আশঙ্কায় রাজা শ্রীশচন্দ্রের মনে অত্যন্ত চিন্তা আমার প্রতি মােকদ্দমা উপস্থিত হইত। একারণ শ্রীনাথ রায় মহাশয়ের তদ্বিরের ভার। সহিত এই বন্দোবস্ত করিলেন যে, রায় মহাশয় মহলের খাজনা হইতে হউক, আর কর্জ করিয়াই হউক, রাজস্ব রীতিমত দিবেন এবং তন্মিমিত্ত মাসিক ৫০ টাকা বেতন ও মহালের খাজানার কিস্তি খেলাপী সুদ সমস্ত পাইবেন। রামমােহন চৌধুরী কৰ্ম্ম ত্যাগ করাতে, গুরু ভট্টাচাৰ্য্য তাহার স্থলাভিষিক্ত হইলেন। এক্ষণে কেবল মােকদ্দমার তত্ত্বাবধান করিবার ও যে সকল দরখাস্ত হইত, তাতে আমার অভিপ্রায় লিখিয়া দিবার ভার আমার প্রতি থাকিল। রাজস্ব যথা নিয়মে দেওয়া এবং সাংসারিক ব্যয় চালান, এই দুই প্রধান কৰ্ম্ম ছিল । কিন্তু এই উভয় কাৰ্য্যেই আমি অক্ষম ছিলাম । নিজের যথেষ্ট টাকা না পাকিলে প্রথমােক্ত কৰ্ম্ম নিৰ্বাহ হইত না। অপ্রতুলতাবশতঃ মিথ্যা কথা ও প্রবঞ্চনা ব্যতীত শেষােক্ত কার্য সম্পন্ন হইয়া উঠিত না। এই দুই কর্ম ব্যতীত যে যে সকল কর্ম ছিল, তৎসমুদয় সামান্য। সুতরাং আমার স্থানান্তরে যাইবার ইচ্ছা হইল। কিন্তু কেমন করিয়া এই কথা রাজাকে কহিব, এই ভাবনায় কাল গত হইতে লাগিল। একদিন শ্ৰীবনে নির্জন স্থানে অতি কষ্টে তাহাকে বলিলাম যে, “আপনি আমাকে যেরূপ অনুগ্রহ করেন, তাহাতে আমার রাজবাটী ত্যাগ করিতে ইচ্ছা করে না । কিন্তু এক্ষণে আমি আপনার কোন কাৰ্যেই আসিতেছি না । কেবল অনর্থক বেতনভােগ করিতেছি। অতএব কৃপা করিয়া আমাকে বিদায় দেন।” রাজা উত্তর করিলেন, “তুমি যে আমাকে ত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছ, মুন্সেফী পরীক্ষার পুনরূদ্যোগ। ইহা আমি পূৰ্বেই শুনিয়াছি। আমার কন্যা অল্প 'আমার কর্মত্যাগের ইচ্ছায় বয়সে গর্ভবতী হওয়াতে প্রসবকালে পাছে তাহার রাজার প্রতিবাদ। জীবন যায়, এই আশঙ্কায় আমি নিরন্তর চিকিত থাকিতাম, এবং পূর্ণাঙা হইলে কখন প্রসব বেদনার সংবাদ আসিবে, এই ভাবনায় যারপরনাই উৎকণ্ঠিত চিত্তে কাল কাটাইতাম। সেই সময় আমার মন যেমন ব্যাকুল হইয়াছিল, এক্ষণে তুমি কখন কৰ্ম্ম ত্যাগের কথা বলিবে, এই ভাবিয়া সেইরূপ অস্থিরচিত্ত হইয়া রহিয়াছি। আমি যদি অকারণেই তােমাকে বেতন দেই, তাহাতে তােমার কি পাপ হইতে পারে ?” আমি উত্তর করিলাম, “ইহাতে পাপ হইতেছে কি না জানি না; কিন্তু অতি অপ্রসন্নচিত্তে আছি।” রাজা কহিলেন, “কিন্তু তোমার দ্বারা আমার যে এক মহৎ কৰ্ম্ম হইতেছে, তাহা আর রাজবাটীর কাহারও দ্বারা হইতেছে না। সকলই আমাকে সন্তোষজনক বাক্য বলিয়া থাকেন, কিন্তু আমার দোষের কথা তুমি ব্যতীত আর কেহই কহেন না । অতএব যদি তোমার আর কোন কার্যই না থাকে, তথাপি এই কাৰ্যটির জন্য থাকিতে হইবে।” তাহার জীবনাধিক কন্যার জীবন সংশয়ের সহিত, আমার বিরহের তুলনায়ও আমি ততদূর বিগলিত হৃদয় হই নাই, যত দূর আমি তাহার শেষ ভক্তিপূর্ণ কথায় হইলাম। তিনি যে ভাব রসনা দ্বারা ব্যক্ত করিলেন, তদতিরিক্ত তাহার মুখমণ্ডলে প্রকাশ পাইল : তাহার বদন শুষ্ক হইল, এবং নয়ন ছল ছল করিতে লাগিল। আহা! এই সকল বন্ধুত্বের কথা স্মরণ হইলে কতই আনন্দ হয়, আবার ইহার তিরে- রাজার স্নেহ। ধান মনে হইলে, কতই বিষাদ হয়। তঁাহার কথার আর উত্তর করিতে পারিলাম না, এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষায় আর সমর্থ হইলাম না। আমি পূৰ্বে এক স্থানে লিখিয়াছি যে, মুন্সেফী পরীক্ষার উপর নিজের আশা ভরসা অনেকটা স্থাপন করিয়া, দুইবার তাহার চেষ্টা মুন্সেফী পরীক্ষার পুনরুদ্যোগ। করিয়াছিলাম, কিন্তু জজ সাহেবের নিকট সার্টিফিকেট না পাওয়াতে পরীক্ষা দেওয়া হয় নাই। এই সময় চট্টগ্রাম প্রদেশের জন্য পুনৰ্ব্বার মুন্সেফী পরীক্ষার ঘােষণা হওয়াতে, শ্ৰপ্ৰসাদ ও আমি, পরীক্ষা দিবার উদ্যোগ করিলাম। যে জজ সাহেব পূৰ্বে সার্টিফিকেট দেন নাই, তিনি রাজার এক আটচালায় থাকিতেন, কিন্তু ভাড়া প্রায় দিতেন না। তিনি রাজার অনুরােধ অবশ্যই রক্ষা করিবেন মনে করিয়া, তাহার এক পত্রের সহিত সার্টিফিকেট পাইবার দরখাস্ত করিলাম ; এবং সাহেবও আমাকে প্রশংসাপত্র পাইবার ৮৪ আত্মজীবন-চরিত। অসৎ সঙ্গের ফল। যোগ্য স্থির করিয়া সদর দেওয়ানীতে লিখিলেন। পরীক্ষার নির্ধারিত দিবসের কয়েকদিন পূৰ্ব্বে, আমি ও কলিকাতাবাসী একজন আত্মীয় ভবানীপুর যাইয়া বাসা করিলাম। সেখানে আর কয়েক পরীক্ষার্থীর সহিত একত্র পড়াশুনা করিতে লাগিলাম। পরীক্ষার তিন দিন পূর্বে নূতন পরীক্ষার তিন দিন পূর্বে নূতন সহপাঠীদিগের মধ্যে এক জন কহিলেন যে, “সকলেই কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ দিলে পরীক্ষার প্রশ্ন সকল পাওয়া যাইতে পারে।” আমি এ প্রস্তাবে সম্মত হইলাম না। ইদানীন্তন প্রকাশিত বিধির বিষয়েই অধিক প্রশ্ন হইবে, এইরূপ ভাবিয়া আমি নূতন বিধি সকল একবার পড়িয়া, পুনরায় পরীক্ষার পূর্ব দিবস বিশেষ মনোেযােগ পূৰ্ব্বক পড়িব, মনে করিয়াছিলাম । পরীক্ষার পূর্বদিন রাত্রিতে এই সকল নববিধি পড়িতেছি, এমন সময় নূতন সহপাঠী তিনজন একটি কাগজে ৩৬টা প্রশ্ন দেখাইয়া কহিলেন যে, ইহারই মধ্যে ১২টি প্রশ্নের পরীক্ষা হবে। পূৰ্ব্ব প্রতিজ্ঞা বিস্মৃত হইযা এই প্রশ্ন কয়টি দেখিতে লাগিলাম । প্রশ্নগুলির অর্থ অতীব উৎকট ছিল । তাহার মর্ম বুঝা বড়ই দুষ্কর হইল । সঙ্গীরা প্রশ্নাবলীর অর্থ বুঝিয়াছেন, এইরূপ তাহাদের ভাবে বােধ হইল, কিন্তু কিছু প্রকাশ করিলেন না। সে রাত্রিতে এই বিষয়ের আন্দোলনে সময় গত হইল। আমি আর নূতন বিধির পুনঃ পাঠে মন দিতে পারিলাম না। এই সহপাঠীদের মধ্যে দিগনগর-নিবাসী একজন ছিলেন। তিনি পর দিবস প্রত্যুষে আমাকে স্বস্থানে লইয়া বাইয়া অতি সঙ্গোপনে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বলিয়া দিলেন। কিন্তু বেলা দ্বাদশ ঘণ্টার সময়ে টাউন হলে উপস্থিত হইয়া যখন প্রশ্নের কাগজ পাইলাম, তখন একটি আমাদের জানিত দৃষ্ট হইল না, সকলই নববিধি সংক্রান্ত দেখিলাম । আমার মস্তিষ্ক যেন ঘূর্ণায়মান হইল, এবং চক্ষু যেন অন্ধ হইয়া গেল। চিত্তের স্থৈর্য, আর সম্পাদন করিতে পারিলাম না। ভাবিলাম, পাপের ফল হাতে হাতে ফলিল। যাহা হউক, অল্প সময় মধ্যে ১২টি প্রশ্নের উত্তর লিখিলাম। কিন্তু ভাবিলাম, ৯টির প্রকৃত উত্তর হইয়াছে, দুইটির উত্তর হইয়াছে, কিন্তু ভালরূপ লিখিতে পারি নাই, এবং আর একটির উত্তর সম্পূর্ণ ভুল হইয়াছে। আমি ইত্যগ্রে কখনও পরীক্ষার প্রথা মােটেই জানিতাম না। আমার বোধ ছিল, সমস্ত প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর দিতে না পারিলে পরীক্ষোত্তীর্ণ হওয়া যায় না। সুতরাং আমার মনে হইল যে, আমার পরীক্ষো- ত্তীর্ণ হইবার আশা নাই। দুর্গোৎসবের কয়েকদিন পূর্মে এই পরীক্ষা হইয়া ৬ ওকালতীতে অনিচ্ছার কারণ। ৮৫ গেল। মৌখিক পরীক্ষার দিন পূজার পর ধার্য্য হইল। পূর্বে সদর দেওয়ানী হইতে এই আদেশ হয় যে, “পরীক্ষোত্তীর্ণগণের মধ্যে কেহ চাটগয়ে যাইয়া মুনসেফী করিতে অসম্মত হইলে, তাহার নাম কাটিয়া দেওয়া যাইবে ।” একে এজন্য পরীক্ষা দিবার বিশেষ ইচ্ছা ছিল না, তাহার উপর উত্তীর্ণ হইবার সম্পূর্ণ ভরসা থাকিল না ; সুতরাং মৌখিক পরীক্ষাতে আর উপস্থিত হইলাম না। যে বুদ্ধিদোষে মেডিকেল কলেজ ত্যাগ করিয়াছিলাম, সেই বুদ্ধি দোষে আবার এই ভুল করিলাম। পরে কোন পরীক্ষোত্তীর্ণ আত্মীয়ের পত্রে জ্ঞাত হইলাম যে, প্রথম পরীক্ষায় আমি উত্তীর্ণ হইয়াছিলাম,এবংমৌখিক ওকালতীতে অনিচ্ছার কারণ। পরীক্ষার দিন আমার দুইবার ডাক হইয়াছিল। অস্থির প্রতিজ্ঞ লােকের যে অনিষ্ট হয়, তাহার দৃষ্টান্ত আমার জীবনীতে বিলক্ষণ আছে । এই পরীক্ষার কিয়ৎকাল পরে এখানে উকীলের জন্য পরীক্ষা উপস্থিত হইল। শ্ৰীপ্রসাদ আমাকে কহিলেন যে, “ওকালতী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবে, তাহার সন্দেহ নাই। অতএব তােমার পরীক্ষা দিতে হইবে। ওকালতী করিলে বাটী থাকিয়া যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করিতে পারিবে, এবং সুখ স্বচ্ছন্দে থাকিবে।” আমি উত্তর করিলাম যে, “যদি আমি ওকালতী ব্যবসা করি, তবে জানিয়া শুনিয়া কথনই অন্যায় পক্ষের উকীল হইতে ও সাক্ষীকে মিথ্যা শিখাইতে বা কৃত্রিম কাগজ প্রস্তুত করিতে উপদেশ দিতে পারিব না। সুতরাং আমাকে ওকালতনামা দিতে কে আসিবে? মনে কর, সাধারণ সম্পত্তির একজন প্রধান অংশী, অন্য এক ক্ষুদ্র অংশী অনাথিনী বিধবা রমণীর স্বত্ত্ব আত্মসাৎ করণার্থ এক মােকদ্দমা উত্থাপিত করিয়া আমার নামে ওকালতনামা দিবেন। আমি কি, দুঃখিনীর সৰ্ব্বনাশ সাধনার্থ, আমার বিদ্যা বুদ্ধি সমস্ত এই মােকদ্দমায় নিযুক্ত করিব ? ইহা কখনই পারিব না। আর যদি আমি ন্যায় পক্ষের ব্যতীত অন্যায় পক্ষের উকীল হইব না, এরূপ প্রতিজ্ঞা করি, তাহা হইলে আমার এমন কি বিদ্যা বুদ্ধি আছে যে, তথাপি আমার ব্যবসায়ের উন্নতি হইবে ?” শ্ৰীপ্রসাদ, তারিণীচরণ ঘােষ, শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণবিহারী মুখােপাধ্যায় ও রামগােপাল মিত্র, প্রভৃতি অনেকেই সেইবার পরীক্ষা দেন, এবং সকলেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই পরীক্ষা না দেওয়াতে অবিবেচনার কার্য হইয়াছিল, তাহাও পরে বুঝিতে পারিয়াছিলাম। কারণ, এই পরীক্ষোত্তীর্ণদিগের মধ্যে কেহ কেহ কিয়ৎকাল ওকালতী করিয়া অতি সামান্য চেষ্টায় মুন্সেফ বা ডেপুটী কলেক্টর হইলেন ।
আত্মজীবন-চরিত। আমার বৈষয়িক বিষয়ে যেমন নানা ঘটনা হইয়াছে আন্তরিক বিষয়েও তেমনই বিবিধ বিপ্লব ঘটিয়াছে। ব্যাবস্থায় যাহা সত্য মনে করিয়াছি তাহাকে আবার যৌবনাবস্থার প্রারম্ভে মিথ্যা ভাবিয়াছি। আবার যৌবনের প্রারম্ভে যাহা সত্য ভাবিয়াছি তাহাও পূর্ণযৌবনাবস্থায় অসত্য বােধ করিয়াছি। পূর্ণ যৌবনে যাহা স্থির করিয়াছি তাহাও আবার কিয়ৎকাল পরে ভিন্নরূপ ভাবিয়াছি। বাল্যকালে পৌত্তলিকধর্মের ও প্রচলিত আচার ব্যবহারের নিতান্ত ধৰ্ম্মে অনিশ্চয়তা। পক্ষপাতী ছিলাম। তাহার অবিশ্বাসী ও বিরুদ্ধাচারি- গণকে কতই নির্বোধ ও অধাৰ্মিক ভাবিতাম। যৌবনের অব্যবহিত পূৰ্ব্বে কয়েকখানি ইংরেজি পুস্তক, রাজা রামমােহন রায়ের কয়েক খানি পুস্তিকা ও তত্ত্ববােধিনী পত্রিকা পড়িয়া, এবং কোন কোন সুশিক্ষিত ধার্মিক ব্যক্তির উপদেশ শুনিয়া, একব্রহ্মবাদী হইলাম । বেদ, ঈশ্বর প্রণীত বলিয়া মানিলাম, এবং পূৰ্বপুরুষের ধর্মকে উপহাস্পদ মনে করিলাম। পূর্ণযৌবনে আবাব এই বেদকে মানব কল্পিত বলিয়া জ্ঞান করিলাম। যখন রাজা রামমােহন রায়ের সঙ্কলিত বেদের উপনিষৎ ভাগ পাঠ করিলাম, এবং কোন কোন বেদজ্ঞ পণ্ডিতের বেদের সারাংশের ব্যাখ্যা শুনিলাম, তখন বেদের প্রতি অসীম ভক্তি জন্মিল। পরে যখন বেদের কর্মকাণ্ড অংশের বাঙ্গালা অনুবাদ তত্ত্ববােধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হইল, এবং যখন বেদান্তদর্শনের মায়া প্রণালীর মর্ম অনুভূত হইতে লাগিল, তখন আর বেদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখিতে পারিলাম না। পরে যতই বুয়ােবৃদ্ধি হইতে লাগিল, যতই নানা মতের বিভিন্নতা জ্ঞান- গােচর হইতে লাগিল,এবং যতই সত্য নির্বাচন পথে বুদ্ধি ধাবিত হইতে লাগিল, ততই মনােমধ্যে নানাবিধ তর্কাবতর্ক ও সংশয় উপস্থিত হইতে লাগিল। শেষে। সকল বিশ্বাসের মূল ছিন্ন হইয়া যেন অবলম্বন শূন্য হইয়া পড়িলাম ও অজ্ঞান সাগরে ভাসিতে ,গলাম। মনে হইল, যাহারা প্রচলিত ধর্মের মধ্যে কোন একটা ধর্মের বিশ্বাস করিয়া আছেন তাহারই সুখী, যাহারা তত্ত্বানুসন্ধানী হইয়া ধৰ্ম্ম নিৰ্বাচন করিবার চেষ্টা করেন তাহারা অসুখী। ধর্ম সম্বন্ধে ত এই হইল, আবার আচার ব্যবহার বিষয়ে কিরূপ ঘটিল, তাহাও বলিতেছি। এক্ষণে য়ুরােপ দেশীয়েরা সভ্যচুড়ামণি হইয়াছেন, এই স্থির সিদ্ধান্ত হইল। সুতরাং সংসারযাত্ৰানিৰ্ব্বাহের যে প্রণালী তাহারা নির্বাচন করিয়াছেন তাহাই উৎকৃষ্ট বলিয়া প্রতীতি জন্মিল ; আচার ব্যবহার।
আচার ব্যবহার। এবং তাহারই অনুকরণ করিবার বিশেষ যত্ন হইয়া উঠিল । আমাদের দেশে বহুকাল হইতে সুরাপান বিশেষ দোষাকর ও পাপজনক বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইছে। এবং মদ্য স্পর্শ করিলে শরীর অপবিত্র হয়,এইরূপ বিশ্বাস,এ দেশস্থ লােকের মনে ধারণা ছিল। কিন্তু আমাদের মনে এই স্থির হইল যে, যখন এমন বুদ্ধিমান বিদ্বান্ ও সভ্য জাতীয়েরা ইহা আদরপূৰ্ব্বক ব্যবহার করিতেছেন, তখন ইহা অহিত- জনক কখনই নহে । অতএব ইহা পান না করিলে সভ্যতাই বা কিরূপে হইবে, আর পূৰ্ব্ব কুসংস্কারই বা কিরূপে যাইবে ? হিন্দু কলেজের সুশিক্ষিত ছাত্রগণের মধ্যে যাঁহারা এ দেশের সমাজ সংস্কার করতে ব্ৰতী হইয়াছিলেন, তাহারা সকলেই সুরাপান করিতেন। পূৰ্বে বলিয়াছি, হিন্দু কলেজের সুশিক্ষিত মাধবচন্দ্র মল্লিক এখানে ডেপুটী কলেক্টর ছিনো এবং আমাদের প্রতি যথেষ্ট স্নেহ করিতেন। আমরা চারি পাঁচ জন আত্মীয় কখনও কখনও তাহার বাসায় আহারের সঙ্গে মৃদু মদিরা পান করিতাম, এবং বড়ই সুখী হইতাম । প্রথমে কেবল সুরার গুণের দিকেই মনােযােগ হইল। অল্প পানে শরীর ভাল থাকে, অধিক শ্ৰম করিতে পারা যায়, ক্ষণবিলম্বে শারীরিক শ্রান্তি ক্লান্তি দূর হয়, মানসিক শক্তি ও বর্ধিত হয়, বিষন্ন হৃদয় প্রসন্ন হইয়া উঠে, অল্পকাল মধ্যে পরস্পর সুহৃদ্ভাব জন্মে, এবং জাতিভেদ সংস্কারের অদ্বিতীয় উপায় হয়। এই সকল বিবেচনায় ইহা আমাদের অতি আদরের ধন হইল। আমরা কেহই প্রত্যহ বা অধিক পরিমাণে পান করিতাম না। যখন দুই চারি বন্ধু একত্র হইতাম, তখন কখনও কখনও মৃদু মদিরা পান করিয়া সুখসাধন করিতাম । আমার স্মরণ হয় না যে, যৌবনাবস্থায় প্রয়ােজন ব্যতীত কখনও একাকী পান করিয়াছি। কিন্তু তাহার পর ইহার ক্ষমতার ও গুণের বিষয় বিলক্ষণরূপে দেখিয়াছি ও বুঝিয়াছি এবং অদ্যাপিও দেখিতেছি। রাজা শ্ৰীশচন্দ্রের ঊর্ধ্বতন দুই পুরুষ, তান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসায়ে মদিরা পান করিতেন, কিন্তু মতাপরবশ হইয়া অতি অশ্রদ্ধাস্পদ হইতেন : তাহাদের দুর্দশা শ্রবণে ও দর্শনে, মহারাজ শ্ৰীশচন্দ্র অত্যন্ত ব্যাথিতহৃদয় হইয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে, এ গরল কখনও স্পর্শ করিব না। কিন্তু যৌবনাবস্থায় আমাদের সংসর্গে ও আমাদের দৃষ্টান্তে তাঁহার রাজার পানাসক্তি। এ প্রশংসিত প্রতিজ্ঞা বিলােড়িত হইয়া গেল, এবং মদিরা তঁাহার সর্বনাশের মূল হইল। তিনি প্রথমে অতি সঙ্গে- পনে কখনও কখনও অাত্মীয়দিগের সহিত পান করতেন, এবং যাহাতে Wws gere ১২ ৮৮ আত্মজীবন-চরিত। ইহার বশতপন্ন না হন, সে দিকে দৃষ্টি রাখিতেন। কিন্তু তাহার স্বগণের মধ্যে কেহ কেহ ঈদৃশ সুরাসক্ত হইলেন যে, তাহাদের অনিষ্ট ঘটনার সম্ভাবনা হইয়া উঠিল । আমাদের দৃষ্টান্তের বিষময় ফলােৎপত্তি দেখিয়া আমি এক কালে মদিরা পানে বিরত হইলাম, এবং তাহাদিগকেও ইহাতে বিরত করাইবার বিশেষ চেষ্টা পাইলাম, আমার পানতাগ। কিন্তু কিছুতেই আর তাহাদের এ প্রবল প্রবাহ ফিরাইতে পারলাম না। এমন কি, তঁাহাদের ও আমাদের মধ্যে একজনও আমার অনুগামী হইলেন না। যাহারা আমাকে গুরুর ন্যায় মানিতেন এবং আমার কথার প্রতি সাতিশয় শ্রদ্ধা করতেন, তাহারাও আমার অনুরােধ এক দিনের জন্যও রক্ষা করিলেন না। কেহ কেহ মতাবস্থায় আমার দিকে দৃষ্টি- পাত করিয়া কহিতেন যে, এ জীবন কখনই চিরস্থায়ী হইবে না, তবে যত দিন সুখে যায়, তত দিনই ভাল । অসুখের দশ বৎসর অপেক্ষা সুখের এক বর্ষও ভাল। এই সকল কাণ্ড দর্শনে মনােমধ্যে অত্যন্ত অনুতাপ উপস্থিত হইত। ভাবতাম, সংসারে কাহারও মঙ্গল সাধনে সক্ষম হইলাম না, প্রতুত অনেকের অমঙ্গল করিয়া তুলিলাম। এই সময় আমি আমিষ ভক্ষণেও বিরত হই। মনুষ্যের আমিষ ভক্ষণ ঈশ্বর-অভিপ্রেত কিনা, তাহার স্থির সিদ্ধান্ত করিতে পারি নাই, কিন্তু যখন এ বিষয়ে সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে, ও যখন আমিষ ত্যাগ করায় কোন দোষ নাই, তখন ইহা ত্যাগ করা উচিত; এই বিবেচনা করিয়া নিরামিষভোজ। হইলাম। সকল বান্ধবেরাই আমিষ ত্যাগ। আমার বিরুদ্ধমতাবলম্বী ছিলেন। আমি এই বিষয়ের কিছু স্থির করিতে পারি নাই বটে কিন্তু জীবাহংসা ব্যাপারটি যেমন বিগর্হিত ও নিষ্ঠুর বােধ হইত, আহংসা ধৰ্ম্মটি তেমনই পবিত্র ও হিতকর অনু- মিত হইত। আমি বন্ধুর্গের সহিত কখনও কখনও এই বিষয়ের ঘােরতর তর্ক বিতর্ক করিতাম । তাহারা স্বপক্ষ সমর্থনাথ এত সুসঙ্গত যুক্তি প্রদর্শন করিতেন যে, আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া যাইতাম। তৎকালীন তত্ত্ববােধিনী সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয় আমিষ ত্যাগ করিয়াছেন শুনিয়া, তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম যে, আপনি কি কি যুক্তিতে আমিষ ভক্ষণ অকৰ্তব্য স্থির করিয়াছেন?” তিনি উত্তর করিলেন যে, “আমি আমার রচিত বাহ্যবস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার পুস্তকের পরিশিষ্টতে আমিষ ভক্ষণ যে ঈশ্বর- দেওয়ানিপদপ্রাপ্তি। ৮৯ অনভিপ্রেত, তাহার অনেক যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছি। ফলতঃ যে কাৰ্য্যে মানবের মনােবৃত্তির ও ধর্মপ্রবৃত্তির মধ্যে সামঞ্জস্য না হয়, তাহা পরমেশ্বরের অভিপ্রেত কখন হইতে পারে না। জীবহিংসা ন্যায়ানুগত হইলে তাহার সাধনে হৃদয়ে আঘাত লাগিত না, অনেক আমিষভােজীরাও নিজ হস্তে জীব- হত্যা করিতে পারে না। মনুষ্য অভ্যাসবশতঃ অনেক নিষ্ঠুর কাৰ্য্য সহজ জ্ঞান করেন বটে, কিন্তু তাহা স্বাভাবিক নহে। অভ্যাসের পূর্বে তাহার এরূপ নির্দয় ভাব কখনই ছিল না। প্রথম জীবহননে তাহার হৃদয় অবশ্যই ব্যথা পাইয়াছিল।” আমি কহিলাম, “এ সকল যুক্তি আমার মনেও উদয় হইয়াছে, কিন্তু আমরা যে কেবল অহারের জন্যই জীবহিংসা করি, এমত নহে, আমরা কত বিষয়ে প্রাণিধ্বংসে লিপ্ত রহিয়াছি। এই যে একখানি পট্টবস্ত্র আপনি পড়িয়া রহিয়াছেন, বিবেচনা করিয়া দেখুন কত শত প্রাণিহত্যাতেই এই বস্ত্র নির্মিত হইয়াছে। কত জীবকে কষ্ট দিয়া আমাদের আহারীয় সামগ্রী প্রস্তুত হইতেছে। কাপাস ও উদ্ভিজ্জবর্জিত দেশে হিংসা না করিলে আহার ও গাত্রাবরণ কিরূপে সম্পন্ন হইবে ?” তিনি এ সকল বিষয়ের যেরূপ উত্তর দিলেন, তাহা আমার বিবেচনায় বিশেষ সবল বােধ হইল না। যাহা হউক, যদিও স্বতঃপরতঃ এ বিষয়ের মনঃপূত মীমাংসা হইয়া উঠিল না, ও অন্যের বাটীতে যাইলে আহারের অসুগম হইতে লাগিল, তথাপি আমি নিয়ম ভঙ্গ করিলাম না। এইরূপ পাঁচ বৎসর গত হইলে, আমার পূর্বসঞ্চিত অম্ল- রােগ অতিশয় বুদ্ধি হইল । কোন ঔষধ সেবনেও উপকার দর্শিল না। কালীকে এ বিষয় জ্ঞাত করাতে তিনি বিরক্তির সহিত বলিলেন যে, “তুমি নিরামিষভােজী থাকিলে তােমার এ রোগের শান্তি হইবে না। যে ভাল আহারে এই বেগ উৎপন্ন হয়, সেই ডালে যে তােমার পীড়ার বৃদ্ধি হইবে না, ইহা কিরূণে আশা করা যাইতে পারে ?” তাহার কথা শুনিয়া ও নানা প্রকার চিন্তা করিয়া পুনমিক হইলাম। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রথমে মহারাজা, পরে মহারাজেন্দ্র বাহাদুর উপাধি, সাহ আলম বাদশাহর নিকট হইতে লন। তাহার পুত্র শিবচন্দ্রকে মুর্শিদাবাদের নবাব মহারাজাধিরাজ বাহাদুর উপাধি দেন, ইংরেজ দেওয়ানীপদপ্রাপ্তি । গভর্ণমেন্ট তাহা মঞ্জুর করেন। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি কলিকাতা প্রদেশের কয়েক জন সুবর্ণ বর্ণিক ও সামান্য বংশােদ্ভূত ধনবানকে রাজোপাধি দেওয়াতে শিবচন্দ্রের পুত্র ও পৌত্র কোম্পানির নিকট অত্মিজীবন-চরিত। হইতে উপাধি লইলে সম্মান বাড়বে না, বরং হ্রাস হইবে ভাবিয়া, উপাধি: গ্রহণ করেন নাই। রাজা শ্ৰীশচন্দ্র তাহাদের অপেক্ষা বিচক্ষণ ছিলেন। সুতরাং তিনি গভর্ণমেন্ট হইতে পূৰ্ব্ব পুরুষের উপাধি পাইবার অভিলাষী হইলেন। এই বিষয়ের সমস্ত উদ্যোগের ভার আমাকে দিলেন। আমি রাজার সঙ্গে কলিকাতায় থাকিয়। যথোচিত উদ্যোগ করিতে লাগিলাম। কিছু দিন পরে শ্রীশচন্দ্র, মহারাজা উপাধি ও তদুপযুক্ত সম্মানসূচক পরিচ্ছদ পাইনে। ইহার কিছু দিন পরে রাজা আমাকে তার দেওয়ানী পদে অভিষেক করিলেন ইহাতে আমার ভার বা বেতন বৃদ্ধি হইল না কেবল মান বৃদ্ধি হইল, এবং এক সম্মানসূচক বস্ত্র লাভ করা গেল। কয়েক মাস পরে আমার বেতন ৩ টাকা হইতে ৫০ টাকা হইল। রাজা শ্রীশচন্দ্র বিধবা বিবাহ প্রচলিত করিবার নিমিত্ত প্রথমে যে আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহা ক্রমশঃ শিথিল হইতে লাগিল। তিনি প্রথমে বহু অর্থ ব্যয় স্বীকার করিয়া কোন কৌশলে নবদ্বীপ পণ্ডিতদিগের নিকট হইতে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা লইবার উদ্যোগ করিতে ছিলেন। ইতিমধ্যে কলিকাতা হইতে বাবু কাীকৃষ্ণ মিত্র নামক আমাদের এক জন সুবিজ্ঞ সুহৃদ্বর কৃষ্ণনগরে আসিলেন। তদীয় প্রীত্যর্থে তাহাকে লইয়া বাবু রামতনু লাহিড়ী, শ্রীপ্রসাদ লাহিড়ী, কালীচরণ লাহিড়ী কার্তিকেয়চন্দ্র লাহিড়ী, তারিণীচরণ রায়, বামাচরণ চৌধুরী প্রভৃতি দশ বার জন আত্মীয় আমি কৃষ্ণনগরের দেড় ক্রোশ পূৰ্ব্ব দক্ষিণ আনন্দ- অনিবাগে বনভােজন। বাগ নামে উপবনে বনভােজন কবিতে যাইলাম । তথা হইতে প্রত্যাগমনকালে নৌকায় আমাদের মধ্যে বিধবাবিবাহের প্রস্তাব হইল । অনেকেই ইহার অনুকূল প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করিতে সম্মত হইলেন, কিন্তু কাৰ্যকালে সকলেই স্থির প্রতিজ্ঞ থাকিবেন, বিধবাবিবাহ। ইহা আমার বিশ্বাস হইল না। কয়েক দিবস পরে কৃষ্ণনগর কলেজ গৃহে এ বিষয়ের জন্য একটি সভা হইল। সভ্যগণের মধ্যে অধিকাংশ কলেজের ও স্কুলের ছাত্র। যে দিবস আমরা আনন্দবাগে বনভােজন করি, তাহার পরদিন কোন হিংস্রক ও দুরাচারী আমার গ্রামস্থ অনেকের নিকট ব্যক্ত করিল যে, আমাদের বাটীর সন্নিহিত কোন স্থানে একটি গাে-বৎসের মস্তক কতকগুলি ইষ্টকে আচ্ছাদিত রহিয়াছে, এবং মাথাটি দেখিলেই বোধ হয়, যেন তাহা অস্ত্র দ্বারা - ।
বিধবাবিবাহ। ছেদিত হইয়াছে। কিঞ্চিৎ পরে, রটনা করিল যে, কোন ব্যক্তির এক গো বৎস পাওয়া যাইতেছে না। পর দিবস কৃষ্ণনগরের কোন স্থানে বহু লােকের সমাগম দেখিয়া গো-বৎস বৃত্তান্ত আর ও কিঞ্চিৎ রঞ্জিত করিয়া কহিল যে, কেহ কেহ বলিতেছে যে, আনন্দ বাগের বনভােজন জন্য এই গােহত্যাটি হইয়াছে। নগর মধ্যে এই বিষয়ের তুমুল আন্দোলন হইতে লাগিল। কলেজে বিধবা বিবাহের জন্য সভা হওয়াতে, যে সকল অমলা মােক্তাব প্রভৃতি বেশ্যাসক্ত ও প্রবঞ্চনা ব্যবসায়ী “ককালে ধৰ্ম্ম বিনষ্ট হইল” বলিয়া চীৎকারধ্বনি করিতে- ছিলেন, তাহারা এই গো-বৎস সংক্রান্ত জনরব শুনিলেন, এবং এই বিষয় তাহাদের অভিসন্ধি যতদূর অনুকূল হইতে পারে, তাহা করিয়া লইলেন । কয়েক দিবসের পর গোয়াড়ীতে এই প্রবাদ উঠিল যে, রামতনু লাহিড়ী ৩ ব্রজনাথ মুখােপাধ্যায় এবং কৃষ্ণনগরস্থ আর কয়েক ব্যক্তি, কালেজে গােহত্যা করিয়া ভােজন কাবযাছে । কৃষ্ণনগরে অতি জঘন্য কয়েক ব্যক্তি যাহাদিগকে । আমরা ঘৃণা করি তাম, তাহারা এই সুযোগে গােয়াড়ীতে লোকের সহযােগী হইলেন; এবং বীরনগরের (উলার) বাবু বামনদাস মুখােপাধ্যায় এই দলের অধিপতি হইলেন । ক্রমশঃ, নবদ্বীপ স্থ পণ্ডিতগণ তাহাদের পক্ষ হইলেন। অবশেষে কৃষ্ণনগরে প্রকাণ্ড দলাদলী উপস্থিত হইল। আমাদের দূরস্থ আত্মীয় কুটুম্বগণের মধ্যেও এ বিষয়ের আন্দোলন হইতে লাগিল। এইরূপ গােলযোগের সময় রাজা এক দিবস বহু স্নেহপূৰ্ব্বক আমাকে কহিলেন যে, “বাপু! তােমার নিন্দাতে আমার নিন্দা হয় । অতএব তাহা নিবারণের নিমিত্ত কিছুদিনের জন্য প্রত্যই একটি শিব পূজা কর, এবং প্রতিবর্ষে একখানি জগদ্ধাত্রী পূজা করিতে থাক। জগদ্ধাত্রী পূজায় যে চারি পাঁচ শত টাকা ব্যয় হইবে, তাহা আমি দিব।” আমি উত্তর করিলাম, “আমি একাহার ও হবিষ্যান্ন করিতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু সাকার উপাসনায় আর প্রবৃত্ত হইতে পারি না।” তিনি আমার উত্তরে কিঞ্চিৎ বিরক্তি প্রকাশপূৰ্ব্বক পুনরার কহিলেন যে, “আমার দেওয়ানের নিন্দায় আমার নিন্দা হয়, এ বিষয় তোমার বিবেচনা করিতে হইবে।” আমি এ কথার উত্তর করিলাম যে, আমার দ্বারা যদি আপনার ক্ষতি বােধ হয়, তবে তাহার উপায় আপনি অনায়াসেই করতে পারেন।” রাজা আর কোন বাক্যব্যয় করিলেন না। রাজা ও রাজকুটুম্বগণ আমাদের স্বপক্ষ থাকাতে, আমাদের কোনও বিশেষ কষ্ট উপস্থিত হইল না। কিন্তু এই গোল- যােগে আপাততঃ বিধবাবিবাহ প্রচলিত করিবার সকল উদ্যোগ স্থগিত হইল । গোল।
আত্মজীবনচরিত। হই। # এই সকল ঘটনার কিয়ৎকাল পরে রাজা ও আমি এক মহদ্বিষয়ে প্রবৃত্ত্ব কয়েক বৎসর পূর্বে এই জেলার প্রায় সমস্ত সাধারণ বাজেয়াপ্ত লাখেরাজের লাখেরাজ, গভর্ণমেন্টের বিচারে অসিদ্ধ স্থির হইয়া, রাজস্ব হ্রাসের উদ্যোগ তাহার উপর রাজকর স্থাপিত হয় ; এবং লাখেরাজ- ভােগীরা এই নিয়মে তাহার বন্দোবস্ত করিয়া লন যে, ভূমির বাৎসরিক খাজনার অর্ধাংশ গবর্ণমেন্টকে দিবেন, এবং বাকী অর্ধাংশ আপনারা পাবেন! কিন্তু রাজপুরুষেরা এই সকল ভূমি এত উচ্চ নিরিখে বন্দোবস্ত করিলেন যে, লাখেরাজদারের নিজাংশ পাওয়া দূরে থাকুক গভর্ণমেন্টের রাজস্বেরও সংস্থান হইয়া উঠে না। সুতরাং অনেক নির্ধন বন্দোবস্তকারীরা বহু পুরুষের বৃতি ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। ক্রমে ক্রমে এইরূপে চার শত নম্বর লাখেবাজ নীলাম হইয়া গেল। অন্য ক্রেতা উপস্থিত না হওয়াতে, গবর্ণমেন্টের পক্ষ হইতে এই সকল ক্রীত হইল । আর যাহারা বহু কষ্টে রাজস্ব দিয়া আপনাদের ভূমি এ • পর্যন্ত রাখিয়াছিলেন, তাহারা আর রাখিতে পারেন না, এমনই হইয়া উঠিল । কত শত পরিবার মধ্যে হাহাকার শব্দ হইতে লাগিল। কলিকাতার কোন কোন বিজ্ঞ আত্মীয়ের সহিত পরামর্শ করিয়া, এই সকল দুঃখের বিবরণ গবর্ণমেন্টে বিদিত করা স্থির করিলাম, এহং প্রত্যাগমন করিয়া এই সঙ্কল্প মহারাজাকে জানাইলাম। তিনি অতি আগ্রহসহকারে এই বিষয় সাধনে প্রবৃত্ত হইলেন। কিছু দিনের মধ্যেই বহু লাখেরাজ বন্দোবস্তকারীর স্বাক্ষরিত এক আবেদন পত্র গবর্ণমেন্ট সমীপে প্রেরিত হইল। পরিশেষে বহু আয়াসে কমিশন কর্তৃক অবধারিত কর কমিয়া গেল ; এবং পূৰ্ব্ব গৃহিত অন্যায্য কর বন্দোবস্তকারীদিগকে প্রত্যর্পণ করিবার আদেশ হইল। রাজার পুনৰ্বন্দোবস্তে পূর্ব নির্ধারিত রাজস্বের তৃতীয়াংশ ও রাজা শ্ৰীশচন্দ্র কর্তৃক নন হইরা গেল, এবং প্রায় চল্লিশ সহ টাকা গবর্ণ- তাহার প্রতীকার মেন্ট হইতে ফেরত পাওয়া যাইল। এই মহৎ কাৰ্য্যে রাজার বিস্তর শ্রম ও ব্যয় হইয়াছিল, তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু আমি এ বিষয়ের উদ্দীপক ও উদ্যোগী না হইলে ইহা উত্থাপিত হইত কি না, তাহা সন্দেহস্থল ছিল । আমি এই কাৰ্যেৰ মূলস্থাপক ছিলাম ও কত যুক্তি ও ভরসা দিয়া তাহাকে এ বিষয়ে প্রবৃত্ত করি ইহা কেবল তিনিই জানিতেন। এ কাৰ্য যে সিদ্ধ হইবে, ইহা তাহার মনে কখনও স্থান পায় নাই। আমি এ বিষয়ের শুদ্ধ উদ্ভাবক ছিলাম, আর কিছুই করি নাই, এমতঃ নহে। আমি বৎসরাবধি ।
সে কালের চিকিৎসা প্রণালী। রাজার সঙ্গে কলিকাতায় থাকিয়া এ বিষয়ের মন্ত্রণা ও উৎসাহ দিয়াছি,এবং মােক্তারের কাৰ্য ব্যতীত আর সকল কাৰ্য্যই করিয়াছি। পূৰ্ব্বকালে সম্ভ্রান্ত পরিবারগণ, নগরে বা রাজবাটীর নিকটে বাস করি- বার ইচ্ছা করিতেন না। যে স্থানের নিজের স্বাধীনতা প্রাচীন সভ্রান্তদিগের বাসস্থান থাকে,প্রতিবাসীদের প্রতি কিঞ্চিং প্রভুত্ব থাকে, এবং নির্বাচন প্রয়ােজন মতে কুটুম্বাদগের বাসােপযােগী স্থান হইতে পারে, এমনই স্থান বাসের জন্য স্থির করিতেন। মাটিয়ারী ত্যাগ করিয়া রাজার। যখন কৃষ্ণনগরে রাজধানী কবেন, সে সময় আমার বৃদ্ধ প্রপিতামহ রাম রাম চক্রবর্তীকে বারুইহুদা গ্রামে তাহার বাসের জন্য এক শত বিঘা ভূমি নি ফর রূপে দেন। এইস্থানে তৎকালে নানাবিধ ফল পুষ্পের উদ্যান ছিল। এই উদ্যানের একাংশে রামরাম আপনার বাটী প্রস্তুত করেন, দ্বিতীয় অংশ পরিচারকের বাসের নিমিত্ত দেন, ও কতকাংশ প্রজা পত্তন করেন। পূৰ্ব্বকার বৃক্ষশ্রেণীর মধ্যে অদ্যাপি দুই একটি আছে। রাজবাটীর গড়ের উত্তরে আমাদের আর একটি বাটী ছিল। পূৰ্বপুরুষদের মধ্যে যাহারা রাজবাটীতে কাৰ্য্য করিতেন, তাহারা এই বাটীতে থাকিতেন,কিন্তু তাহাদের পরিবারের। বারুইহুদার বাটীতেই অবস্থান করিতেন। এ বাটীটি দেওয়ান চক্রবত্তীর বাসাবাটা বলিয়া খ্যাত ছিল। তাহাদের ধন যথেষ্ট ছিল, অথচ অভাব অধিক ছিল না। চিকিৎসার জন্য একজন বৈদ। নিযুক্ত থাকিতেন, এবং বিদ্যাশিক্ষার নিমিত্ত এক জন গুরু মহাশয় বা ওস্তাদ, বাটীতে অবস্থিত হইতেন, চাল, ডাল, তৈল, তরকারী, প্রায় সকল খাদ্য দ্রই গৃহে সঞ্চিত থাকিত, কেবল মৎস্য কথন কখন বাজার হইতে আনিতে হইত। অনেক কুটুম্ব সাক্ষাৎ বাটীতে থাকিতেন ও নানা দেশীয় অতিথির আগমন করিতেন। প্রথমােক্তদিগের সহিত সৰ্ব্বদা আমােদ প্রমােদ কারতেন, এপং শেষোক্ত দিগের সহিত কথােপকথন করিয়া নানা স্থানের রীতি নীতি জ্ঞাত হইয়া আপ্যায়িত হইতেন। সুতরাং সাংসারিক বা মানসিক কোন বিষয়ে তাহাদের কোন অসুখ বা অসুগম হইত না। বরং সততই সুখে কাল যাপন করিতেন। ইদানীন্তন যুবকগণের মধ্যে অনেকের মনে হইতে পারে যে, মুখ বৈদ্যদিগের দ্বারা কি রূপে রােগী রক্ষা পাইত, বা সে কালের চিকিৎসা প্রণালী। উত্তম শিক্ষক অভাবে কি প্রকারেই বা শিক্ষা হইত। আমি পূর্বে একস্থানে বালিয়াছ যে, সে কালে এ দেশে সুচিকিৎসকের ৯৪ আত্মজীবন-চরিত। অভাবে ও চিকিৎসার দোষে রােগীর অতীব কষ্ট হইত । কিন্তু ইদানীং যে পরি- মাণে মৃত্যু হইতেছে, সে কালে সে পরিমাণে হইত না। সে সময় বৈদ্য ব্যতীত আর যে দুই প্রকার চমৎকার ভিষক ছিল, তাহাদের দ্বারাই রোগের প্রকৃত চিকিৎসা হইত, বৈদ্যে। কেবল তাহাদের সাহায্য করিতেন; এই দুই চিকিং- সক, এই দেশের স্বাস্থ্যকর জল ও বায়ু ছিল। দুর্ভাগ্য বশতঃ, এই দুই চিকিৎ- সকের অভাবেই আমাদের দেশ উৎসন্ন যাইবার উপক্রম হইয়াছে ; একালে ওলাউঠা, উদরাময়, অন্ন, বায়ু, হাঁপকাশ, বহুমূত্র প্রভৃতি পীড়ার যেরূপ প্রাবল্য হইয়াছে, সেরূপ সে কালে ছিল না। কেবল জ্বর রােগই প্রবল ছিল। তাহাও এক্ষণ অপেক্ষা নূন পরিমাণে হইত। প্রতি বৎসরের কার্তিকমাসে জ্বরের বিক্রম বাড়িত! পূৰ্ব্বে বলিয়াছি যে, প্রথমে কয়েকদিন রােগী অনশনে থাকিয়া স্বভাবের উপর নির্ভর করিত, এবং যদি ৪৫ দিনের মধ্যে রােগের শান্তি না হইত, তবেই চিকিৎসার প্রয়ােজন হইত। কিন্তু জল ও বায়ুর এমনই গুণ ছিল যে, প্রায় রােগীই বিনা ঔষধে অথবা সামান্য ভেষজে অষ্টাই মধ্যেই নীরােগী হইত । এ কারণ সুচিকিৎসকের অভাবেও কর্তাদের বড় অসুগম হইত না। কৃষিজীবি বা শ্রমজীবিরা জ্বরাক্রান্ত হইলে, প্রায়ই ঔষধ সেবন বা উপবাসও করিত না। তদানীন্তন লােকের আহারের পরিমাণ, পরিপাক শক্তি এবং বলের বিষয় শুনিলে দানীন্তন যুবকেরা বিস্ময়াপন্ন হইবেন। আমার পূর্ব পুরুষদিগের আমার পিতা ঠাকুর যৌবনাবস্থায় কখন কখন সাহস ও শক্তি। প্রাতে পাঁচ সের কঁচা দুগ্ধ, মধ্যাহ্নে ও রাত্রিতে অন্নের সঙ্গে চারিসের পক্ক দুগ্ধ ও এক পােয় ঘৃত পান করিতেন। জ্যেষ্ঠ তাত মহাশয়ও ঐরূপ অপর্যাপ্ত আহার ও পান করিতেন। ঘৃতপ পিষ্টকে তাহার কখন তৃপ্তি হইত না। তিনি কহিতেন যে, “ইহা চর্বণ করিতে করিতে বিরক্ত বোধ হয়, সুতরাং ক্ষুধা থাকিতেও আহারে নিবৃত্ত হইতে হয়।' পিতৃদেবের এরূপ বল ছিল যে, একদা বুলিদানের জন্য অনীত একটা বলবান্ দুরও মহিষকে উৎসর্গের সময় বাম হস্তে তাহার শৃঙ্গ ধরিয়া রাখেন। জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় একদিন কোন কারণে এক অত্যন্ত বলবান লাঠিয়ালের প্রতি বাম হস্তে এক কাষ্ঠ পাদুকা নিক্ষেপ করাতে, সে মূচ্ছাপন্ন হয়, এবং মাসা- ধিক ব্যথিত থাকে। তৎকালীন ভদ্র ও অভদ্র লােকের মধ্যে এরূপ বলশালী অনেক লােক দৃষ্ট হইত। তঁাহারা যেমন অধিক পরিমাণে আহার করিতে বাঙ্গালীর রণপ্রিয়তা। । পারিতেন, তেমনই অকষ্টে অনশনে থাকিতেন। আমার পিতা ও পিতৃব্যদের দুই দিবসের উপবাসে কোন ক্লেশ বােধ হইত না। ইদানীন্তন বাঙ্গালীকে দেখিয়া সকলেই অনুমান করেন যে, এ জাতি কখনই বলবা ও সাহসী ছিল না। মেকলে সাহেব লিখিয়াছেন যে, “ইহার। এতই ভীরু যে, কোম্পানীর সৈন্টমধ্যে একজন বাঙ্গালী নাই।” তাহার একথাটি নিতান্ত অমূলক ও ভ্রমসঙ্কুল। তিনি যেকালে ভারতবর্ষে ছিলেন, সে কালের বাঙ্গালীগণ বীর্যহীন বা সাহবিহীন ছিল না। ভদ্রাভ উভয় শ্রেণীর মধ্যে বহু বলীয়ান্ ও সাহসী পুরুষ ছিল । বাঙ্গালীর রণপ্রিয়তা। তাহার ভারতবর্ষে আসিবার অব্যবহিত পূৰ্বেই নবাব সেরাজদ্দৌলার সময় আপন আপন জমীদারীর রক্ষণাবেক্ষণের ভার জমীদার দিগের প্রতি অর্পিত ছিল। নবদ্বীপের রাজাদের সম্রাটদত্ত ফরমানে ইহা স্পষ্টাক্ষরে লিখিত আছে। এই ভার-নিৰ্বাহাৰ্থ তাহাদের সৈন্য রাখিতে হইত, এবং ঐ সৈন্য মধ্যে অনেক বঙ্গীয় যোদ্ধা তাকিত। তাহারা গদাযুদ্ধে, ধনুর্বিদ্যায়, অসিচৰ্ম্মব্যবহারে, এবং বর্শা-চালনায় অতি সুনিপুণ ছিল , এই নবদ্বীপের রাজাদের সৈন্যের সেনানী পদে হিন্দুস্থানী ও বাঙ্গালী উভয় জাতীয় লােকেই নিযুক্ত থাকি। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময় আমার প্রপিতামহ সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। তৎকালে নবাব সৈন্য মধ্যে মাণিক চাদ ও মােহন লাল প্রভৃতি কয়েকজন বাঙ্গালী সেনা- পতি ছিলেন। সে কালের জমীদাদিগের মধ্যেও অনেকে যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ ছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষের মধ্যে, রামচন্দ্র ও রঘুরাম রায় বীর- পুরুষ বলিয়া বিখ্যাত ছিলেন । জমীদার পুত্রগণ তদানীন্তন রীত্যনুসারে যুদ্ধ বিদ্যা অবশ্য কর্তব্য বলিয়া শিখিতেন। শুনিয়াছি, কুমার শিবচন্দ্র বন্দুক অভ্যাস করেন নাই বলিয়া, তাঁহার পিতা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কয়েক দিন তাহার মুখ দেখেন নাই। • আমাদের বাল্যাবস্থায় যখন জমীদার ও নীলকর সাহেবদের মধ্যে সর্বদা বিবাদ হইত, তখন তাহাদের সংসারে অনেক লাঠিয়াল ও শড়কী- বরদার থাকিত। তাহারা পশ্চিম দেশীয় যােদ্ধা অপেক্ষা, বলে বা সাহসে কিছু মাত্র নূন ছিল না। তবে তাহারা কোম্পানীর সৈন্যভুক্ত হইত না; তাহার বিশেষ কারণ ছিল। প্রথম, তাহারা বড় রণপ্রিয় ছিল না। দ্বিতীয়, তাহ- দের বাটীতেই জীবিকানির্বাহের উপায় থাকাতে, তাহারা বিদেশে যাইবার ইচ্ছা করিত না। আর ইহাও আশ্চর্য্য নহে যে, যারা স্বদেশে ও পরিবারের মধ্যে থাকিয়া জীবনযাত্রানিৰ্বাহ করিতে পারে,তাহারা অল্প ধনাশায় পরের অধীন ।
তাত্ম-জীবন-চরিত। হইয়া বিদেশে কেন যাইবে ? এই কারণেই এ দেশের লেখনী ব্যবসায়ী ব্যতীত অন্য ব্যবসায়ী লােক গৃহত্যাগ করিতে চাহে না। যখন কৃষিকাৰ্য জানিত না, তখন সকলেই ভ্রমণকারী ও অস্ত্রধারী ছিল। কিন্তু যখন কৃষি কার্যের ফলভােগ করিতে শিক্ষা, করিল তখন গৃহী ও হলধারী হইল। অতএব সাহসের অভাবে যে বঙ্গীয় ছােট লােকেরা সৈন্যভুক্ত হয় নাই, তাহা বিবেচনা করা অন্যায়। আমি অনেক বৎসর হইতে ভাবিতেছিলাম যে, দেশীয় সৈন্য ব্যতীত, কোন দেশই বহুকাল স্বাধীনতা রক্ষা করিতে সমর্থ হয় না । যখন বাঙ্গল। দেশ স্বাধীন ছিল, তখন ইহা অবশ্যই স্বদেশীয় সৈনা দ্বারা রক্ষিত হইত। আমাদের এমন উৰ্ব্বর দেশ যে পার্শ্বস্থ রাজাবা অধিকার করিবার চেষ্টা করতেন না, ইহা কখনই সম্ভব নহে; এবং বঙ্গীয় রাজারা যে কেবল বিদেশীয় সৈন্য দ্বারা স্ব স্ব রাজ্য রক্ষা করিতেন, ইহাও বিশ্বাসযোগ্য নয়। ইংরাজেরা ত বলিতেই পারেন, আমাদের দেশস্থ অনেক সুশিক্ষিত ব্যক্তি বা বলিতেন যে, বাঙ্গালী কখন সৈন্য ব্যবসায়ী ছিল না। আমি কেবল যুক্তির উপর নির্ভর করিয়া এ বিষয়ে তর্ক করিতাম ; কিন্তু কোন প্রমাণ দর্শাতে না পারিয়া, বিলক্ষণ ক্ষোভ পাইতাম। ইদানীং রাজকৃষ্ণ মুখােপাধ্যায় মহাশয়র বঙ্গীয় ইতিহাস ও বঙ্গদর্শনের বাঙ্গালীর বীরত্ব প্রবন্ধ পাঠ করাতে, আমার সে গোভ দূরীভূত হইয়াছে। উক্ত ইতি- হাসে ও এ প্রবন্ধে অকাট্য প্রমাণস হত বিবৃত হইয়াছে যে, রঘুবংশের রাজত্ব কাল হইতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বঙ্গের অনেক নরপতি ও জমীদার ভূয়াে- ভূয়ঃ যুদ্ধে জয়ী হইয়া কীৰ্ত্তি-স্তম্ভ াপন করিয়া গিয়াছেন। কেহ কাম্বোজ, কেহ সিংহল প্রভৃতি অতি দূরবর্তী দেশ পর্যন্ত জয় করিয়াছেন। কেহ বা দিগ্বিজয়ে কৃতকার্য হইয়াছেন। সম্রাট আকবরের সময়, প্রতাপাদিত্য প্রভৃতি অনেক রাজা ও জমীদার বিনা যুদ্ধে রাজ্যত্যাগ করেন নাই। আমার পূর্বপুরুষদিগের সময়, শিক্ষা-প্রণালী অতি জঘন্য ছিল ; এবং জ্ঞানলাভের নিমিত্ত কোন শিক্ষাই হইত না, তাহা পূৰ্বেই বলিয়াছি। বিষয়কার্য পরিচালনের শিক্ষা লাভ হইলেই, প্রাচীনদিগের আচার ব্যবহার তৎকালীন লােকেরা শিক্ষার ফল হইল মনে করিতেন। কিন্তু সে কারণে তাঁহাদের সুখের অভাব হইত না। কালে জ্ঞানলাভ করিয়া শিক্ষিত যুবকদের যেরূপ আচরণ হইয়া থাকে, তাহা অপেক্ষা যে তাহাদের ব্যবহার অতি দুষণীয় ছিল, এরূপ নহে। ইহারা যে সকল কর্মকে বিশেষ পাপজনক বলেন, তাহারা সে সকল ।
প্রাচীনদিগের আচার ব্যবহার। ৯৭ কৰ্ম্মকে সেরূপ পাপজনক বলিতেন না । এ কারণ ইহাদের মধ্যে অনেকে লােক-নিন্দা-ভয়ে যে সকল কার্য্য অতি গােপনে করেন, তাহারা সে সকল কাৰ্য প্রকাশ্যরূপে করিতেন। ইহাদের যেমন সত্য অনুরাগ ও ইন্দ্রিয়দোষে বিরাগ আছে, তাহাদের ও তেমনই মাতৃ-পিতৃ-ভক্তিতে অনুরাগ ও সুরাপানে বিরাগ ছিল, ইহাদের কতকগুলি মহৎ গুণ তাহাদের ছিল না, আবার তাহাদের কতকগুলি মহৎ গুণ ইহাদের নাই। তবেই তাহারা যে শিক্ষাভাবে একেবারে প্রেত হইয়াছিলেন, আর ইহার যে শিক্ষা লাভে দেবতা হইয়াছেন, তাহা নহে। ইহাদের মধ্যে যেমন দেব ও প্রেতের ন্যায় উ য় প্রকারেরই লােক আছেন, তেমনই তাহাদের মনেও ছি। বিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখিতে গেলে, তাহাদের ও ইহ'দেব মধ্যে হরে দবে হাঁটু জলই দৃষ্ট হইৰে। পূৰ্ব্বকার যে সকল মহাত্মাকে আমরা দেখিয়াছি, তাহাদের মধ্যে কোনও কোনও ব্যক্তি এমন জিতেন্দ্রিয় ও সত্যবাদী ছিলেন যে, তাঁহাদের জীবনের কোনও কোনও ঘটনা শুনিলে আশ্চর্য্য বোধ হয়। নবদ্বীপের রাজা শিবচন্দ্রের দৌহিত্র হরিপ্রসন্ন রায় ও নন্দ প্রসন্ন রায় কৃষ্ণনগরে দেউলিয়ায় বাস করিতেন । তাহাদিগকে লোকে সচরাচর বড় লালা ও নুতন লা1 কহিত। এই ভাতৃদ্বয়ের কোন দোষ কখন কেই দেখেন নাই ও শুনেন নাই, পরন্তু সকলেই তাহাদের গুণের কথা কীৰ্ত্তন করিতেন বড় লালা কখন কখন রাজবাটীতে এক নির্জন গৃহে রাত্রিযাপন করিতেন। তাহার জিতেন্দ্রিয়তা পরীক্ষার জন্য তাহার কোনও কোনও আত্মীয় এক রাত্রিতে তাহার শয়নকক্ষে এক সৰ্ব্বাঙ্গসুন্দরী যুবতী গণিকা পাঠান। রজনী তখন দ্বিপ্রহর। লালাজী কামিনীকে দেখিবামাত্র শশব্যস্তে উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি এত রাত্রিতে আমার নিকট কি নিমিত্ত আসিয়াছেন?” বারাঙ্গনা হাব ভাব কটাক্ষ করিয়া আপনার মানস জামাইল, পরিশেষে তাহার গাত্ৰস্পৰ্শ করিতে উদ্যত হইল। “তুমি পরস্ত্রী, তুমি আমাকে স্পর্শ করিলেও তােমার ও আমার পাপ হইবে,” এই বলিয়া গৃহের বাহির হইলেন এবং নিজ ভৃত্যকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগিলেন। তিনি যেমন জিতেন্দ্রিয়, তেমনই সত্যবাদী ও দয়াশীল ছিলেন। তাহার অনুজ নুতন লালজী ও ঐরূপ ইন্দ্রিয়শাসন, সত্যনিষ্ঠা ও বদান্যতা ছিল। এক দিন তাহার জনৈক প্রতিবাসী কথাপ্রসঙ্গে তাহাকে আপনার মাতৃবিয়ােগের সংবাদ জানাইল । দুই তিন মাস পরে সেই ব্যক্তি তাহাব সমৗপস্থ হইলে তিনি তাহাকে দশটি টাকা দিয়া কহিলেন, “তুমি যখন তোমার মাতার মৃত্যুর কথা বলিয়াছিলে, ৯ আত্মজীবন-চরিত। ; তখন আমার হস্তে টাকা ছিল না; কিন্তু ভাবিয়াছিলাম, তােমাকে কিছু দিব কল্য তালুক হইতে টাকা আসাতে আমার সেই বিষয় স্মরণ হইল।” তাহার ও তদীয় অগ্রজের এইরূপ কথা অনেক শুনিয়াছি। আমার জ্যেষ্ঠতাত মহাশয়ের এই সকল মহৎ গুণ এত অধিক ছিল যে, তাহার সমতু) 13ক্তি হামরা কখনও দেখি নাই । পুর্বপুরুষদিগের সদগুণ। তিনি এমন মিষ্টভাষী ছিলেন যে, কখনও কাহাকে তুই বলেন নাই। এমন দানশীল ছিলেন যে, সাধ্যাতীত না হইলে কখনও কোন যাচককে নিরাশ করেন নাই । পরস্ত্রী অভিলাষ, বােধ হয়, তাহার হৃদয়কে কথন ও স্পশ করিতে পারে নাই। শত্রু মিত্র-সমান- জ্ঞান, এই দুর্লভ ধৰ্ম্ম কেবল তাহাতেই দেখিয়াছি। যে সকল হিংস্রক জাতিরা তাহার বিলক্ষণ ক্ষতি করিয়াছিলেন ও তঁাহাকে অত্যন্ত কষ্ট দিয়া- ছিলেন, তাঁহাদিগকে কখন একটি কষ্টদায়ক বাক্য বলেন নাই, এবং তাহাদের প্রতি স্নেহ প্রকাশে কখনও ত্রুটি করেন নাই। তাহাদের দুঃসময়ে যথাসাধ্য সাহায্য করিয়াছেন, তাঁহাদের পীর সময় সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিয়াছেন, মৃত্যুকালে তাহাদের গঙ্গাযাত্রার উদ্যোগ করিয়া দিয়াছেন, এবং পরিশেষে তাহাদের শ্রাদ্ধের কালে সহায় হইয়াছেন। তার উদাৰ স্বভাবের দুইটি দৃষ্টান্ত আমার সন্তানদের জন্য লিখিতেছি। তিনি প্রতিবেশী কায়স্থ জাতীয় আত দুর্দশাপন্ন একটি যুবাকে আমাদের রাজবাটার কোন কার্যে নিযুক্ত করিয়া দেন। কিয়ৎকাল পরে সে রাজার প্রিয় খানসান। হইয়া যথেষ্ট ধন সঞ্চয় করে । এক দা আমাদের কয়েক বিঘা ভূমি আত্মসাৎ করিবার চেষ্টা করাতে, আমার অগ্রজ মহাশয় প্রভৃতি কয়েকজন যুবক, তাহার সমুচিত দণ্ডবিধানে উদ্যত হন। খানসামা জ্যেষ্ঠতাত মহাশয়ের শরণাপন্ন হইলে, তিনি তাহাকে ক্লেশ দিতে নিষেধ করিয়া দেন। কিছুদিন পরেই ঐ দুরাচারী কৃতঘ্ন কোন সুযোগ পাইয়া আমাদের আরও কয়েক বিঘা ভূমি অধিকার করিবার জন্য এক মিথ্যা, মােকদ্দমা উত্থাপন করে। ইতিমধ্যে তাহার বাটীতে হঠাৎ ডাকাতি হয়। ডাকাতির সময় আমাদের কয়েকজন চৌকীদারকে তস্কর দলে দেখিয়াছে, এবং জ্যেষ্ঠতাত ও তঁাহার ভ্রাতৃদ্বয় এই ডকাইতির মূলে আছেন, এই রূপ বিচারালয়ে প্রকাশ করিল। কর্তারা অত্যন্ত ভীত হইয়া রাজবাটীতে আশ্রয় লইলেন । গ্রামস্থ লােক তাহার এই অন্যায়াচরণে যারপরনাই বিরক্ত হইয়, দারােগার নিকট ভৃত্য বাৎসল্য। ৯৯ কহিল যে, তাহারা ডাকাইতির বিষয় কিছুই জানিতে পারেন নাই । সুতরাং দারােগা এ ডাকাতি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলিয়া রিপাের্ট করিলেন। মাজিষ্ট্রেটের পেস্কার কর্তাদিগকে কহিয়া পাঠাইলেন যে, “যৎকিঞ্চিৎ উদ্যোগ ও ব্যয় করিলেই তাহার ছয় মাসের নিমিত্ত কারাবদ্ধ হইতে পারে।” তাহারা সমুচিত দণ্ড পায়, ইহা সকলেরই ইচ্ছা হই, কিন্তু জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় কাহারও অনুরােধ রক্ষা না করিয়া কহিলেন, “আমরা বিপদমুক্ত হওয়াতেই আমাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হইয়াছে, এ নির্বোধদিগকে বিপদগ্রস্ত করিলে আর কি ফল লাভ হইবে?” এতাদৃশ ক্ষমাগুণের দৃষ্টান্ত আমি প্রায় দেখি নাই । এক শীত কালের রাত্রিতে তিনি রাজার কিট হইতে বাসস্থানে আসিয়া দেখিলেন যে, তাহার পরিচারক ব্রাহ্মণ, তদীয় শয্যায় শয়ন করিয়া ঘাের নিদ্রা যাইতেছে। প্রতি রাত্রিতেই তিনি আসিলে তঁাহার জলপানের আয়ােজন করিয়া দিত, এবং তাহার আহার সমাপনান্তে নিদ্রা যাইত। জ্যেষ্ঠতাত ভাবিলেন, যখন এ ব্যক্তি আমার আসিবার পূৰ্ব্বেও ভৃত্য বাৎসল্য আমার শয্যায় নিদ্রিত হইয়াছে, তখন বােধ হয় ইহার কোন অসুখ জন্মিয়াছে। কিঞ্চিৎকাল এইরূপ চিন্তা করিয়া, দুইখানি কুশা- সনের উপর শয়ন করিলেন। গাত্রে যে বস্তু ছিল, তাহাই তাহার শীতনিবারণের উপায় মাত্র হইল। নুতন সংবাদে রাজাব বড় আহ্লাদ হইত বলিয়া, একজন প্রভাতকালে এ বিষয় তঁাহার গোচর করিল। রাজ। এই আশ্চৰ্যাবস্থার দর্শ- নােৎসুক হইয়া, তৎক্ষণাৎ জ্যেষ্ঠতাতের সন্নিহিত হইলেন। জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় তখনও স্বচ্ছন্দে নিদ্রা যাইতেছেন। রাজার আগমনে কিঞ্চিৎ গোলযোেগ হওয়াতে, জাগরিত হইয়া শশাস্তে উঠিয়া দাড়াইলেন। রাজা ঈষৎ হাস্যবদনে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, “তােমার শয্যায় পরিচারক সুখে শয়ন করিয়াছিল, আর তুমি এই কুশাসনে পড়িয়া কষ্ট পাইতেছিলে, ইহার কারণ কি ?” তিনি উত্তর করিলেন যে, “আমার কষ্ট হয় নাই, তবে উহার যদি অসুখ হইয়া থাকে, 'তবে উহার কষ্ট হইত।” তাহার এই সহৃদয় ব্যবহারে রাজা বিস্ময়াপন্ন হইয়। সকলকে কহিলেন যে, যদি সংসারে কেই ধাৰ্মিক থাকেন, তবেই তিনিই এই ব্যক্তি। তাহার গুণ বর্ণনায় শেষ হয় না। তাহার সাত আটটি পুত্র অকালে কালকবলিত হয়, তথাপি তাহার বদনে কেহ ক্ষণকালের নিমিত্ত শােকচিহ্ন দেখেন নাই। প্রত্যেক পুত্ৰবিয়ােগ সময় তিনি স্থিরভাবে থাকিতেন । এবং তাহার পর অধৈর্য্য পরিবারগণের শোক-শাস্তির নিমিত্ত বিশেষ চেষ্টা পাইতেন ।
আত্মজীবন-চরিত। যাহার কোমল হৃদয় চির শত্রুর দুঃখে কাতর হই ত, তঁাহার চিত্তকে যে জীবন ধিক পুত্রশােকে ও বিচলিত করিতে পারিত না, এ সামান্য আশ্চর্যের বিষয় নয়। ইনি অতি সরল স্বভাব ছিলেন বটে, কিন্তু বুদ্ধিহীন ও বিদ্যাহীন ছিলেন না। পারস্য ভাষা সুন্দররূপ জানিতেন, এবং রাজবাটীৰ সৰ্বাধিকারীর পদে নিযুক্ত থাকিয়া রাও কার্যে যশস্বী হইয়াছিলেন। পুত্রগণ! তােমাদের বংশে কি মহাপুরুষ জন্মিয়াছিলেন, বােধ হয় তাহা তােমরা জান না। তাহার মাহাত্মেব বিষয় পাঠ করিলে যদি কাহারও আনন্দ না হয়, তােমাদের অবশ্যই হবে। তিনি বেকন, লক্, ষ্টুয়ার্ট, ডি, প্রভৃতি পণ্ডিতদের নামও শুনেন নাই ; এবং বাইবেলের প্রতি ও দৃষ্টিপাত করেন নাই, তথাপি কত বড় মহাত্মা হইয়াছিলেন । তােমাদের পিতা তাহার ক্রোড়ে উঠিয়াছেন, তাহার পদধূলি লইয়ছেন, এবং তাহার গুণকীৰ্ত্তন করিয়াছেন, তাহার দৃষ্টান্তের অনুকরণ করিবার ইচ্ছা করিয়াছেন ও চেষ্টা পাইয়াছেন, কিন্তু প্রায় কিছুই কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। ঈশ্বর-ভক্তি, শত্রু মির-সমান- জ্ঞান, পরােপকার, স্বজন পালন, ইন্দ্রিয় শাসন, অতিথিসৎকার, দয়া-দাক্ষিণ্য, অহিংসা, ধৈৰ্য, ক্ষমা ও ক্রোধ- সহিষ্ণুতা ইত্যাদি গুণ তাহাতে অপর্যাপ্ত ছিল। তােমরা যদি এই সকল মহাধনের কিয়দংশের অধিকারী হইতে পার, তাহা হইলে তোমাদের শিক্ষা সার্থক । তােমাদের পিতা বহু কষ্ট পাইয়া তােমাদের শিক্ষার জন্য যে ধন ব্যয় করিযাছেন, তাহাও সার্থক, এবং তােমাদের জীবন সার্থক হইবে ! কৃষ্ণনগরের মাঝেরপাড়াবাসী নসীরামদবে পুত্র, যে এক পূজার কোঠা প্রস্তুত করেন; তাহার অব্যবহিত সম্মুখের ভূমির অধিকারী, অন্য একজন ছিলেন সেই ভূমি খণ্ড না পাইলে তাহাদের পূজার কোঠা অকর্মণ্য হয় বলিয়া, ঐ পুত্র তাহা বলপূৰ্ব্বক অধিকার করেন । এই অন্যায় অধিকার রহিত করিবার নিমিত্ত, এক মোকদ্দমা উপস্থিত হয়"। বিচারক ইহার তদন্ত জন্য ঐ স্থানে উপস্থিত হইলে, অর্থী কহিলেন যে “যদি প্রত্যর্থী আপনার সাক্ষাতে ‘জুদ্ধ কমে যে, এ ভূমি তঁাহার, তাহা হইলে আর আমি ঐ ভূমির দাবী রাখি না।” নসীরামের পুত্র, পিতার স্বভাব জ্ঞাত থাকাতে, তাহাকে বাটীর মধ্যে রাখিয়াছিলেন । বিচারপতির আদেশে তাহাকে তদন্ত স্থানে আসতে হইল । বিচারকা তাহাকে এ বিষয় জিজ্ঞাসা করিবামাত্র, তিনি অতি ক্রোধভরে উত্তর করিলেন যে, “উহাকে (পুত্রকে) আমি ঐ ভূমি অধিকার করিতে বিশেষরূপ নিষেধ করিয়াছিলাম, প্রভু ও ভৃত্য। ১০১ তথাপি লক্ষ্মীছাড়া আমার কথা শুনে নাই। ঐ ভূমিতে আমার কোন স্বত্ত্ব সেকালে সমাজের যেরূপ আচার ব্যবহার ছি, তাহাতে বারুই হুদায় সুচিকিৎসক সুশিক্ষক ও বাঙর অভাবে পূর্ব পুরুষদিগের কোন কষ্ট বােধ হইত না। তাহারা পুত্র, পৌত্র, জামাতা দৌহিত্র, এবং কুটুম্ব সাক্ষাৎ লইয়া সৰ্ব্বদাই সুখে থাকিতেন। আমার যখন জ্ঞান হইয়াছে, তখন কর্তাদের অবস্থা পৃৰ্ব্বমত উন্নত না থাকুক, তথাপি অামরা যাহা দেখিয়াছি, তাহা মনে পড়িলেও হৃদয়ে আনন্দ উদয় হয়। আর একটা বিষয়ে তাহাদের যথেষ্ট সুখ ছিল । ইংরেজি শিক্ষার বা ব্যবহারের প্রভাবে তাহা উঠিয়া গিয়াছে। এক্ষণে প্রভু ও ভৃত্য আমরা মুখ শূদ্র প্রতিবাসী, লেখা পড়া ছাড়া অন্য ব্যবসায়ী বা ভৃত্যবর্গের সহিত প্রয়ােজন ব্যতীত কোন কথা কহি না, তাহা- দিগের প্রতি প্রায় পশুর ন্যায় ব্যবহার করিয়া থাকি। আমরা কুকুরের বৎসকে আহলাদপূৰ্ব্বক ক্রোড়ে করিব, কিন্তু ভৃত্যের পুত্রের হস্ত ধরিতে পারিব না। পূৰ্ব্বকালীন লােকেরা তাহাদিগের প্রতি সেরূপ ব্যবহার করতেন না। তাহারা লেখা পড়া না জানিলেও, ইহারা তাহাদিগকে মনুষ্য জ্ঞান করিতেন। কারা অধঃশ্রেণীর প্রতিবেশিদিগকে বিলক্ষণ স্নেহ করিতেন। বাটী আসিলে তাহাদিগকে পৃথক আসন দিতেন, তাহাদের কুশল জিজ্ঞাসা করিতেন, এবং তাহাদের সহিত মিষ্টালাপ করিতেন। আপ বিপ কালে তাহাদের তত্ত্ব লইতেন ; এবং বাটীর শুভাশুভ সকল কার্যে তাহাদিগকে আহার করাইতেন। তাহারা আমাদের পরিবারের মধ্যে কাহাকে খুডা ঠাকুর, কাহাকে দাদাঠাকুর, কাহাকে মা ঠাকুরূণ, কাহাকে দিদিঠাকুরূণ ইত্যাদি সম্পর্ক পাতাইয়া ডাকিত। চাকরেরাও ঐরূপ সম্পর্ক পাতাইত। আমরাও বাল্যাবস্থায় পুরাতন চাকরদিগকে দাদা বলিয়া ডাকিতাম। প্রতিবাসীরা ও আমাদিগকে যথেষ্ট স্নেহ করত । ভূতেরা পুরুষানুক্রমে প্রভুর বাটীতে কৰ্ম্ম করিত। আমাদের বাটীতে ক্রমশঃ দুই তিন পুরুষকে চাকুরী করিতে দেখিয়াছি। যদি তাহাদের প্রতি কখন পীড়ন হইত, তবে তাহারা কখন ক্ৰোধ করিয়া অাহার করিত না, অথবা দুই তিন দিন আসিত না; কিন্তু কখন এককালে কম্মত্যাগ কৱিত না। এক্ষণে যেমন বৎসর মধ্যে পুনঃ পুনঃ নূতন দাস দাসী রাখিতে হয়, লোলে এ ১০২ আত্মজীবন-চরিত। অসুগম প্রায় ঘটিত না। কর্তারা তাহাদের প্রতি যেমন স্নেহ করিতেন, তাহারাও তেমনি প্রভুভক্তি দেখাইত। এমন কি যদি প্রাণ দিলে প্রভুর মঙ্গল সাধন হইত, তাহাও তাহারা দিতে প্রস্তুত হইত। যখন পিতৃদেবের সহিত আমি তাতিয়ার গােল। বাটীতে থাকিতাম,তখন সন্ধ্যার পর তঁাহার নিকট কৃষকেরা আসিয়া রাত্রি ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকিত। তিনি তাহাদিগকে নানাবিধ গল্প শুনাইতেন। তঁাহার কথায় তাহারা সাতিশ সুখী হইত, এবং বাটী যাইয়া পরিবারের মধ্যে সেই সকল কথা বলিত। পূৰ্ব্ব কালের এই সমস্ত সদ্ভাব ও সম্প্রীতির কাহিনী মনে হইলে, বৰ্ত্তমানাবস্থা বড়ই অসুখের বােধ হইত। আমার যখন যৌবনাবস্থা হইল, তখন জল, বায়ু, শিক্ষা-প্রণালী, আচার- ব্যবহার, লোক-লোককতা প্রভৃতি অনেক বিষয়ের পরিবর্তন হইয়াছিল এবং জল বায়ু ক্ৰমশঃ দুষিত হওয়াতে তখন আর পূর্বপ্রকার বৈদ্যদ্বারা রােগ শান্তি হয় না, এবং শিক্ষার নূতন প্রথা হওয়াতে গুরু মহাশয় বা ওস্তাদের দ্বারা শিক্ষাকার্য চলে না। ওলউঠার সৃষ্টি হইয়াছে, জ্বরের প্রাদুর্ভাব বাড়িয়াছে, আহারের নিয়ম স্বতন্ত্র হইয়াছে, ইংরেজী শিক্ষা প্রচলিত হইতেছে, এমন কি সাংসারিক সকল বিষয়েই একরূপ বিপ্লব ঘটিয়াছে। আর তাহার উপর আম- দের অবস্থাও অতি মন্দ হইয়া গিয়াছে। সুতরাং বারুইহুদায় যথানিয়মে আর সংসারযাত্রা নির্বাহ হইয়া উঠে না। . বিশেষতঃ চিকিৎসার ও শিক্ষার অত্যন্ত অসুগম হইতে লাগিল । ইহা ব্যতীত পিতৃদেব সহিত বাটীর যেরূপ বিভাগ হইল, তাহাতে আমাদের অংশ অন্য দুই ভাগের মধ্যে পড়াতে আমাদের বাসের বড়ই কষ্ট হইতে লাগিল। তৎকালে কেহই ভদ্রাসন ত্যাগ করতে ইচ্ছা করিতেন না। বাটীর সন্নিহিত যথেষ্ট বাসােপযােগী ভূমি ছিল, তথাপি তিন অংশীই এক বাটীর মধ্যে থাকিয়া কষ্টভােগ করিতে লাগিলেন। একজন বাহির হইলেই আর কাহারও অসুবিধা হইত না। বাসস্থানের দোষ গুণে যে অস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য হয়, তাহা তাঁহাদের অনুভবই ছিল না। নুতন বাটী ও বাগান নির্মাণ ফলতঃ সেই কালের জল, বায়ুর গুণে শরীর সর্বদা সুস্থ থাকাতে এ বিষয়ের চিন্তাই উপস্থিত হইত না। আমি কৃষ্ণনগরে বাসের উপযুক্ত স্থান অন্বেষণ করিতে লাগিলাম ; যে স্থানে বাটীর অব্যবহিত স্থানে একটু উদ্যান করিবার ভূমি থাকে, অথচ আত্মীয়দিগের পড়ার মধ্যে হয়, এমনই স্থান আমার অভিলষিত ছিল। কিন্তু সেরূপ স্থান না পাওয়াতে, এক্ষণে যেখানে বাটী আছে, সেই স্থান মনােনীত করিয়া প্রথমে আমার বাগান ও বৈঠকখানা। ১ পুষ্করিণীটি খনন, ও পরে, একটা দালান বারান্দার সহিত প্রস্তুত করিলাম। কিন্ত আপাততঃ পরিবার রাখিবার উপযুক্ত বাটী আমার বাগান ও বৈঠকখানা। প্রস্তুত করিতে পারিলাম না। যাহা হউক, এই গৃহের চতুষ্পাশ্বে নানাবিধ ফল পুষ্পের বৃক্ষ রােপণ করিলাম। আমার যৌবনের প্রারম্ভ হইতে একটি মনােমত উদ্যান করিবার একান্ত অভিলাষ হইয়াছিল। নানা স্থানের উদ্যান দেখিতাম, এই সংক্রান্ত বিবিধ পুস্তক পড়িতাম, এবং মনােমধ্যে ইহার বহুবিধ কল্পনা করিতাম। অন্যের উদ্যান দর্শনেও আমার আনন্দের সীমা থাকিত না। এতাদৃশ আনন্দ আমার আর কোন বস্তু দেখিলে হইত না। প্রথমে আমি বারইহুদা গ্রামে একটি ফল পুষ্পের উদ্যান করিতে প্রবৃত্ত হই। ডচ প্রণালীতে পুষ্পকাননের পত্তন করিয়া, তাহাতে নানাবিধ পুষ্পবৃক্ষ রােপণ কর। কিন্তু অর্থাভাবে তাহা মনােমত করিতে পারিলাম না। তথাচ যতদুর হইয়াছিল, তাহা দর্শনে সকলেই আনন্দ প্রকাশ করিতেন, এবং বৈকালে সকল আত্মীয় যাইয়া তথায় বসিতেন। তথায় যে একখানি কুটীর প্রস্তুত করিয়াছিলাম, অবকাশ পাইলেই আমি তথায় যাইয়া সময় যাপন করিতাম। যখন আমি সেই যৎসামান্য উদ্যানে আমার অকপট বন্ধুবর্গের সহিত বসিয়া থাকিতাম, তখন আমার সুখের সীমা থাকিত না। কয়েক বৎসর পরে আমি আমার বাটীর উদ্যান করিতে প্রবৃত্ত হইলাম। নানা ফণা পুষ্পের বৃক্ষ কিরূপে রােপণ করতে হয়, কিরূপে তাহার কলম করিতে হয় ও কিরূপে তাহা পােষণ করতে হয়, ইত্যাদি বিষয় সকল শিখিবার নিমিত্ত নানা গ্রস্থ পড়িতাম, ও দেশীয় প্রাজ্ঞ মালিদের নিকট উপদেশ লইতাম, অনেক বিখ্যাত উদ্যান হইতে নানা জাতি আম্র, নিচু প্রভৃতি বিবিধ ফলের কলম, ও নানারূপ পুষ্পের চারা ও কলম বহু যত্নে সংগ্রহ করিয়া উদ্যানে রােপণ করিলাম। আর এই সকল বৃক্ষ বর্ধিত হইলে তৎসমুদায় হইতে নিজে কলম করিয়া কতক রোপণ, কতক বিতরণ এবং কতক বিক্রয় করিতাম । তৎকালে কৃষ্ণনগরের বা তাহার পার্শ্বস্থ কোন গ্রামের মধ্যে দুই তিন স্থান ব্যতীত অন্য কোন স্থানে কলমের গাছ দেখিতে পাইতাম না । কৃষ্ণনগরে কোম্পানীর বাগানে যে কয়েকটি আমের ও নিচুর কলমের গাছ আছে তাহা ইংরেজের দ্বারা রােপিত হইয়াছিল। এখানকার কোন ব্যক্তির এরূপ চেষ্টা ছিল না, এবং কেহই কলম করিতে জানি না। আমারই দৃষ্টান্তে ও ১৪ ১০৪ আত্মজীবনচরিত। শিক্ষায় এক্ষণে এখানে অত অধিক পরিমাণে উৎকৃষ্ট আম কলমের বৃক্ষ প্রস্তুত হইয়াছে। সে যাহা হউক, আমি ধনাভাবে ও গরুর উৎপাতে কি ফলােদ্যান, কি কুসুমােদ্যান, বাসনানুরূপ করিতে পারিলাম না। অর্থাৎ আমার সমস্ত উদ্যান প্রাচীর বেষ্টিত না হওয়াতে ও লােকের গরু যথেচ্ছাক্রমে চরিতে দেওয়াতে, আমার মানসপূর্ণ হইল না। নগরস্থ অনেক ভদ্রাভদ্র লোকের গরুর রক্ষক নাই। তাহারা আপন আপন গাভী প্রাতে দোহন করিয়া ছাড়িয়া দেন। বাগানে গরুর উৎপাত। এই সকল গাভী, সমস্ত দিবস অন্য লােকের উদ্যানে শস্যক্ষেত্র ও বাটীতে চরিয়া গােধূলি কালে স্ব স্ব স্বামীর গৃহে প্রত্যাগমন করে। কেহ কেহ সন্ধ্যার সময়ও দোহন করিয়া পুনরায় তাহাদিগকে বাটী হইতে বাহির করিয়া দেন। তাহাদের গরুর দ্বারা যে লােকের কত ক্ষতি হয়, তাহা একবারও তাহারা ভাবিয়া দেথেন না। আমার অনেক ভদ্রলোকের সহিত এ বিষয়ে কথা হইয়াছে, কিন্তু এরূপ ক্ষতি করিলে যে অধৰ্ম্ম হয়, তাহা তাহারা মনে করেন না। এরূপ গরু ছাড়া প্রথা রহিত হইলে যে কত জনের বাটী ফল পুষ্পের উদ্যান হয়, এবং তাহাতে গৃহস্বামীদের যেমন লাভ হইতে পারে, নগরও তেমনি সুশােভিত হইয়া উঠে, ইহা প্রায় কাহারও হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। অনেকেই কহেন যে, গরু ছাড়া প্রথা রহিত হইলে দুগ্ধ অভাবে অতিশয় কষ্ট উপস্থিত হইবে । কিন্তু নিকটস্থ রাঢ় দেশ এ প্রথা না থাকাতে কোন কষ্ট নাই, তাহা তাহারা দেখিয়াও দেখিতেন না। আমাদের এ প্রদেশস্থ অনেক লােক ফল ভােগের বা লাভের নিমিত উদ্যান করেন, কিন্তু শােভার নিমিত্ত অত্যল্প লােক বাঙ্গালীর বাগানে বিরাগ। ইহা করিয়া থাকেন। অধিকাংশ শিক্ষিত ব্যক্তিরা ইহা সুখের সামগ্রী বোধ করিয়াও কার্যে পরিণত করেন না, এ বিষয়ের অর্থ ব্যয়কে অনর্থক অনুমান করেন । তাহারা প্রয়ােজনাতিরিক্ত বাটা ও শকট ইত্যাদি বিষয়ে বিপুলার্থ ব্যয় করিতে পারেন, কিন্তু এ বিষয়ে কিঞ্চিৎ অর্থাও ব্যয় করিতে কুণ্ঠিত হন। সামান্য ব্যয়ে তাহাদের ও দর্শকদের কত আমােদ হইতে পারে, তাহা এক বারও তাঁহাদের চিন্তা পথে আইসে না ; অন্যের কুসুম কানন দর্শনে বিলক্ষণ আমােদিত হন, অথচ স্বয়ং সমর্থ হইলেও ঐরূপ করিবার ইচ্ছা করেন না। বাহিরে স্থানাভাব হইলেও, ইউরােপীয়গণ গৃহাভ্যন্তরে টবে বৃক্ষ রােপণ করিয়া পুষ্পেদ্যান প্রস্তুত করেন। ইহা দেখিয়াও তাঁহাদের আমার মিতব্যয়িতা। } মনে এ বিষয়ের বাসনা হর না। ইহারা যেমন অন্তের সঙ্গীত শুনিতে ভাল বাসেন, কিন্তু নিজে শিখিয়া আপনার অন্যের সুখসম্পাদনের ইচ্ছা করেন , তেমনই, অন্যের উদ্যান দর্শনে সুখী হইবেন। কিন্তু স্বয়ং গুটীকতক পুষ্পবৃক্ষ রােপণ করিয়া নিজের বা পবের সন্তোষ সাধন করিবেন না। পূর্বে দেবার্চনার নিমিত্ত কেহ কেহ দুই চারটি পুষ্প বৃক্ষ বাটীতে রােপণ করিতেন, এক্ষণে তাহা ও দৃষ্ট হয় না। এ নগরস্থ লােকের মধ্যে বাবু কালীচরণ লাহিড়ীর এ বিষয়ে যথেষ্ট আমােদ আছে, তিনিও আমার মত উদ্যানের জন্য অনেক পরিশ্রম ও যথাসাধ্য ব্যয় করিয়াছেন। অদ্যাপিও তঁাহার এ বিষয়ে অনুরাগ যায় নাই। আমি চিরদিন মিতব্যয়িতার পক্ষপাতী। যে দ্রব্য না হইলে চলে, তাহা আমি প্রায় কখন ও ক্রয় করি নাই। অথচ বংশ- আমার মিতব্যয়িতা। মৰ্যাদা মত সংসারযাত্রা নির্বাহ কবিয়াছি। আত্মীয়েরা আমার সংসার চালনার নৈপুণ্য দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইতেন, এবং অনাত্মীয়ের আর কিছু ভাবিতেন। যখন আমি দুইখানি বাগানবাটী ও পুষ্করিণী করি, তখনও আমার বেতন মাসিক ৫০ টাকা মাত্র ছিল। বাটী প্রস্তুত করিতে, মহারাজা শ্ৰীশচন্দ্র আট শত টাকা আনুকূল্য করেন। এবং ঐ কারণে আমার যে ঋণ হইয়াছিল, তাহা পরিশোধের নিমিত্ত পরে মহারাজা সতীশচন্দ্র নয় শত টাকা দেন। কিন্তু এই সকল সম্পন্ন করিতে নূনাধিক পঞ্চ সহস্র টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু যতই কেন পরিমিত ব্যয়ী হই না, বংশবৃদ্ধির সহিত ব্যয়ের এত বৃদ্ধি হইতে লাগিল যে, ৫০ টাকায় আর কোনমতে চলে না, এরূপ হইয়া উঠিল। রাজাকে পুনঃ পুনঃ জানানতেও কোন ফলােদয় হইল না। সময় মুরশিদাবাদে এক কর্মের প্রস্তাব হইল। মনি সাহেব নামক একজন এই জেলার কালেক্টর ছিলেন। তিনি মুরশিদাবাদের তিনি মুরশিদাবাদের জজ হইলে, এখান হইতে দুইজন আমলাকে সঙ্গে লইয়া যান । তাহার মধ্যে একজনকে আপনার 'সেরেস্তাদারী পদে নিযুক্ত করেন। সাহেব যেরূপ ভদ্র লোক ছিলেন, সেরেস্তা- দার সেরূপ ছিলেন না; এবং সাহেব তাহাকে ষে প্রকার বিশ্বাস করিতেন, তিনি সেরূপ বিশ্বাসের পাত্র ছিলেন না। তিনি যাহা করেন, তাহাই হয়, এইরূপ প্রবাদ হওয়াতে, তাহাকে অর্থী প্রত্যর্থী যথেষ্ট টাকা দিত। শেষে এইরূপ জনরব হইয়া উঠে যে, সেরেস্তাদারের দ্বারা সাহেব টাকা গ্রহণ করিয়া থাকেন। সাহেব, পরম্পরায় এই জনরবের কথা শুনিয়া মদনমােহন তর্কালঙ্কার আত্মজীবন-চরিত । } ডেপুটি কালেক্টর ও শ্যামাচরণ ভট্ট উকিলকে একটি উপযুক্ত ও সৎলােকের অন্বেষণ করিতে বলেন। তঁাহারা এই কৰ্ম্ম গ্রহণ করিতে আমাকে অনুরােধ করেন। এই কৰ্ম্ম কিছুদিন করিলে জজ সাহেবের অনুগ্রহে মুন্সেফী পদ পাইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা আছে, ইহাও তঁাহারা আমাকে সেরেস্তাদারী পদ গ্রহণে লেখেন। তৎকালে আমার রাজার ও তাহার পরিবারের অস্বীকার। সহিত যেরূপ ঘনিষ্ঠতা হইয়াছে, তাহাতে তাহাদের মেহরজু কিরূপে ছেদন করিব, ইহা ভাবিয়া এ বিষয়ে ইতস্ততঃ করিতেছিলাম। ইতিমধ্যে রাজা কলিকাতায় গমন করিলেন। পূর্ণ বাবু তাহার সঙ্গে ছিলেন। তিনি নৌকাতে হঠাৎ রাজাকে এই কর্মের বিষয় কহিলেন। এভ। অত্যন্ত কাতরস্বরে উত্তর করিলেন । “দেওয়ান আমাকে নৌকা সমেত ডুকাইয়া যান।” তাহারা প্রত্যাগমন করিলে পূর্ণ বাবুর মুখে রাজার কথা শুনিয়া আর, এ বিধয় উত্থাপন করিতেও পারিলাম না। জীবন-সতরাঞ্চ খেলায় মেডিকেল কলেজ ত্যাগ করা ও মুন্সফী পরীক্ষা না দেওয়া যে দুইটি ভুল চাল হইয়াছিল, তাহায় উপর আর একটি হইল । আমি পারতপক্ষে কাহারও বাক্যের বা কার্যের অভিসন্ধি মন্দভাবে লইতাম না। ইহাতে আমাকে আত্মীয়গণ ভাল মানুষ বলিতেন। অর্থাৎ কাহার ও চাতুরী আমি সরল বিশ্বাস। বুঝিতে পারিতাম না। ভাল মানুষ শব্দটি যত শ্রবণ মধুর, ইহার অর্থটি তেমন হৃদয়গ্রাহী নহে। সুতরাং এ প্রশংসাটি কেহ স্বচ্ছন্দ- চিত্তে লইতে চাহে না। আত্মীযেরা আমাকে ভাল মানুষ কহিলে আমি তাহাদের সহিত এ বিষয়ে তর্ক বিতর্ক করিতাম । ভাল মানুষ। আমি কহিতাম যে, “যেমন আমি কাহারও ভাল অভিসন্ধি স্থির করিয়া পয়ে তাহার বিপরীত দেখিতে পাই, তেমনই তােমরাও কাহারও অভিসন্ধিকে মন্দ স্থির করিয়া শেষে তাহার বিপৰ্যয়, দেখিতে পাও? এ বিষয়ে আমার যেমন ভুল হইয়া থাকে, তেমনই তােমাদেরও হয়। তােমাদের অপেক্ষা আমার কিছু বেশী ভুল হয় বটে। কিন্তু যখন উভয়েরই ভ্রান্তি হইয়া থাকে, তখন আমার ভ্রান্তিকে নিতান্ত অবােধতা কিরূপে বলিব। আমার ভ্রান্তিতে শেষে লজ্জা পাইতে হয় না। তােমাদের ভ্রান্তিতে তাহা ঘটে। তর্কে আমার আপাততঃ জয় হইল মনে করিলাম বটে, কিন্তু আমার উপস্থিত অবস্থায় তাহাদেরই কথা ঠিক হইল। মুরশিদাবাদের কর্ম গ্রহণ না করাতে যে বিবেচনার ত্রুটি হইল, তাহা অচি- উভয় সঙ্কট। ১০৭ রাৎ বুঝিতে পারিলাম। কয়েক মাস গত হইল, তথাপি বেতন বৃদ্ধির কোন প্রসঙ্গ হইল না । রাজা বিলক্ষণ সাংসারিক ছিলেন। আমার ভদ্রতায় বা নির্বোধতায় তাহার যে লাভ হইত, তাহা স্বচ্ছন্দচিত্তে গ্রহণ করিতেন। এই রূপ ব্যবহার দর্শনে শেষে অতিশয় ব্যাথতহৃদয়ে ভাবিলাম যে, “ইহাদের স্নেহ পিরহার করিয়া রাজবাটী ত্যাগ না করলে আর সংসারযাত্র। নিৰ্বাহ করিতে পারব না।” যে দিন আমি রাজবাটী যাওয়া রাহত উভয় সঙ্কট। করিলাম, সেই দিন রাত্রিতে রাজা, পূর্ণ বাবু ও রাজ- জামাত। শ্ৰীবনের বাটীতে আসিয়া আমাকে ডাকাইলেন, এবং উপস্থিত হইলে কহিলেন যে, “যতই টাকা লাগুক না কেন, আমি তােমাকে ছাড়িতে পারিব না। কে জানে ৮০ টাকা, কে জানে ১০০ টাকা ।” সে রাত্রিতে এ সম্বন্ধে আর কোন কথা হই না । পরদিন প্রাতে আমি রাজপুত্রের দ্বারা তঁাহার নিকট কহিয়া পাঠাইলাম যে, “ভদ্রের রীত্যনুসারে আমার যেরূপে চলে, সেইরূপ বেতন করিয়া দিলেই অামি থাকিতে পারি।” তিনি জামাতার দ্বারা ইহার এই উত্তর পাঠাইলেন যে, “এ খসর তাহার পুত্রের উপনয়নের নিমিত্ত ১৫০ টাকা দিব, পরে আগামী বৎসরে তঁাহার বেতন ধার্য্য করিব।” বৎসরে আর তিন মাসের অধিক নাই; বেতন সহিত মাসিক এক শত টাকা হইবে। এই ভাবিয়া তঁাহার প্রস্তাবে সম্মত হইলাম । পর বৎসরেও বেতন ধাৰ্য্য না করিয়া আমার বাটী নির্মাণের ব্যয় ওলিয়া ৬০০ টাকা দিলেন। আমি বুঝিতে পারলাম যে, রাজা পাকা বন্দোবস্ত না করিবার নিমন্ত এইরূপ কৌশল করিতেছেন। যাহা হউক, আমার মাসিক এক শত টাকা পােষাইবে বলিয়া আমি ইহাতে কোন আপত্তি করিলাম না। পূৰ্ব্বে বলিয়াছি যে, রামমােহন চৌধুরীর প্রতি সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের যে ভার ছিল, তাহা গুরু ভট্টাচায্যের প্রতি অর্পিত হইয়াছিল। কিছু কাল পরে সেই ভার এক স্বজনের হস্তে দেওয়া হইল। এই রাজস্বজনের কর্তৃত্বকালে *একটি সামান্য গ্রামের পত্তনি লইবার নিমিত্ত, গােপাল নামক সরকারের জনৈক আমলার জামাতা প্রার্থী হইলেন। রাজস্বজনের ধূর্ততা ও সহিত পত্তনির জমা ও পর্ণ ধার্য হইল। ইতিমধ্যে অনুতাপ। উক্ত গ্রামবাসী কয়েকজনও আমার নিকট আসিয়া উক্ত পত্তনীর আকাঙ্ক্ষা হইল, এবং অধিক পণ দিতে চাহিল। আমি ইহাদের প্রস্তাব রাজাকে জানাইলাম। পরে উভয় পক্ষ হইতে ডাক হইতে লাগিল, ১০ আত্মজীবন-চরিত। এবং শেষে গ্রামবাসীদের ডাক বলবৎ হইল । কিন্তু রাজা উপরিউক্ত রাজ- স্বজনের সহিত কি পরামর্শ করিয়া কহিলেন যে, তিন দিবসের পর ডাক মঞ্জুর করিবেন। আমি এ বিলম্বের কারণ কিছুতেই বুঝিতে পারিলাম না। যাহা হউক, তিন দিন পরে রাজার নিকট এ বিষয় উত্থাপন করাতে তিনি ঐ রাজ- স্বজনকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “দেওয়ানকে কি সে বিষয় বলা হয় নাই ?” তিনি আমার অগােচরে উত্তর দিবার ইচ্ছা জানাইলেন। রাজা উঠিয়া পৃথক প্রকোষ্ঠে গেলেন। এবং কিঞ্চিৎ পরে আসিয়া কহিলেন যে, “আর একদিন অপেক্ষা করিতে হইবে।” আমি সাতিশয় বিরক্তভাবে কহিলাম যে “আপনার ইষ্ট ব্যতীত অনিষ্ট ইচ্ছা আমার নাই। তবে এই বিলম্বের কারণ আমার নিকট ব্যক্ত হইতেছে না কেন, ইহার কারণ আমি বুঝতে পারি না। গ্রাহকগণ কয়েকদিন অবধি এখানে কষ্ট পাইতেছে, যদি তাহাদিগকে পত্তনী দেওয়া না হয়, তবে তাহাদিগকে আমি বিদায় করিয়া দেই।” রাজা, “যাহা ধাৰ্য্য হয় কল্য জানিতে পারিবে,” এই বলিয়া উঠিয়া গেলেন। আমিও বিষন্নচিত্তে উঠিয়া আসিলাম । দিবস রাঙ্গা অামাকে কহিলেন যে, “গ্রামবাসীদিগকে পণের টাকা সহিত আসিতে কহ। তাহাদিগকে পত্তনী দেওয়া স্থির হইয়াছে।” এই পত্তনীতে লাভ ছিল না, বরং ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা ছিল। গ্রামবাসীরা কেবল সম্মান রক্ষার নিমিত্ত অধিক টাকা ভাকিয়াছিল। অনেক বিষয়ে ডাকের সময় গ্রাহকগণের যে আগ্রহ ও উৎসাহ হয়, তাহা পরে থাকে না। সুতরাং তাহাদের ডাক মঞ্জুর করিতে বিলম্ব হওয়াতে, তাহাদের মনের ভাব পরিবৰ্ত্ত হয়। এক্ষণে তাহারা পত্তনী লইতে অসম্মত হইল, এবং আমার নিকট তাহাদের যে টাকা আমানত ছিল, তাহা তাহারা ফিরিয়া দিতে কহিল : আমি অবধারিত পণের ফিসের পরিমাণ টাকা রাখিয়া অবশিষ্ট টাকা ফিরিয়া দিলাম। এই পত্তনী না ঘটাতে, রাজা আমার প্রতি অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া কহিলেন যে, “আমি কথার অন্যথা করিলে আপনারা আমার কতই নিন্দাবাদ করিতেন, কিন্তু তাহাদের সময় কোন দোষ হইল ' না। আপনি বিজ্ঞ হইয়া তাহাদিগকে এত বিশ্বাস কেন করিলেন ?” আমি উত্তর করিলাম, “আমার কোন দোষ নাই, আপনার ডাক মঞ্জুর করিতে বিলম্ব করাতেই এ বন্দোবস্ত ঘঠিবার ব্যাঘাত হইল। যাহা হউক, আমি ফিসের টাকা রাখিয়াছি, আমি শুদ্ধ কথায় বিশ্বাস করি নাই।” ইহা শ্রবণে রাজা কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হইয়া শান্ত হইলেন। ইহার দুই তিন দিন পরে ঐ রাজ-বিরক্তি ও ষড়যন্ত্র। ১০৯ রাজস্বজন সজল নয়নে আমাকে কহিলেন যে, “লােভে পড়িয়া আপনার সঙ্গে প্রবঞ্চনা করতে আমার মনে অত্যন্ত কষ্ট হইয়াছে। আপনি আমার অপরাধ ক্ষমা না করিলে আমার এ কষ্ট কোন মতে যাইবে না।” আমি উত্তর করিলাম যে, “তােমাকে আমি ভালবাসি, এবং তােমার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। সুতরাং তােমার ব্যবহারে আমি অতিশয় ব্যথিত হৃদয় হইয়াছিলাম। যাহা হউক আমার মনে আর বিরক্তি রহিল না, এবং তুমিও আর এজন্য দুঃখিত থাকিও না।” জগতে লােভ কি ভয়ানক পদার্থ ! ইনি কেবল আমার সঙ্গে প্রবঞ্চনা করেন, এরূপ নহে। ইনি এ বিষয়ে আপন প্রভ ও প্রতিপালক রাজার সহিত বিলক্ষণ ধূর্ততা করেন, ও তঁাহার অনিষ্ট সাধনে প্রবুত হন। বিস্তারিত লিখিতে আর ইচ্ছা হইল না। কিন্তু তাহাব অনুতাপ অকপট, ইহা যেন কেহ মনে না কবেন। এই সামান্য ঘটনা আমার অনেক মনক্লেশের কারণ হয় । সেই জন্য আমার এই বিষয়ের বিবরণ লিখিতে হইল। রাজার সহিত আমার যে সম্প্রীতি ছিল, তাহার বৈষম্য দেখিতে লাগিলাম । তিনি আমার সন্দশনে যেরূপ প্রফুল হইতেন, এবং রাজ-বিরক্তি ও ষড়যন্ত্র। আমার সহিত কথোপকথনে যেরূপ আনন্দ প্রকাশ করিতেন, সেরূপ আর ইদানীং দৃষ্ট হইতে লাগিল না। আমি অতিশয় ব্যাকুল চিত্ত হইলাম, এবং রাজার এই পরিবর্তিত ভাবের নিগুঢ় তত্ত্ব জানিবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। আমার চির সুহৃদ পূর্ণ বাবু এ বিষয় রাজার নিকট উত্থাপন করিলে, তিনি আমাকে ডাকিলেন। আমি সমীপস্থ হইয়া কহিলাম যে, “আমি কয়েক দিনাবধি অনেক চিন্তা করিয়া দেখিয়াছি যে, আপনার অপ্রীতিজনক বা অনিষ্টকর কোন কার্য করি নাই। তবে আপনার এরূপ বিরূপ ভাব কেন হইল বুঝিতে পারি না । যদি আমার বিরুদ্ধে কোন কথা হইয়া থাকে, তাহা শুনিতে পাইলে, তাহার উত্তর দিতে পারি।” রাজা উত্তর করিলেন, “আমার যে দায় উপস্থিত হইয়াছে, তাহা বর্ধমানের রাজার ও ঘটিয়াছিল। আমার ‘স্বজন ও তুমি উভয়ই অত্যাজ্য, সুতরাং তােমাদের পরস্পরের অপ্রণয় হওয়াতে আমার মন বড়ই অসুখী আছে।” আমি বিস্মিত হইয়া কহিলাম, “একি কথা? তঁাহার সঙ্গে আমার ত কোন অসদ্ভাব নাই। যাহা হইয়াছিল, তাহা ত তিনি সে দিন অনুতাপ করাতে গিয়াছে !” এই কথার পর আর কি কি কথা হয়, তাহা আর এক্ষণে স্মরণ হয় না। রাজার কথাতে বিলক্ষণ বুঝিতে পারিলাম যে, আমার বিরুদ্ধে গুপ্তভাবে কথাবার্তা চলিতেছে । ধৰ্ম আত্মজীবন-চরিত। ব্যতীত রাজ বাটীতে আমার পক্ষে কেহই রহিল না, সকলেই রাজ স্বজনের পক্ষ হইল। এই ঘটনার দুই বৎসর পূব্বে রাজবাটীতে একবার একদল যাত্ৰা আইসে। কৃষ্ণনগরের নীচ কুলােদ্ভব একটি বালিকা ঐ দলে সুন্দরী গায়িকা। ছিল। তাহার অতি মধুর স্বর ছিল, এবং কয়েকটি হিন্দিগীত সুন্দররূপে গাইতে পারিত। রাজা তাহাকে যাত্রার দল ছাড়াইয়া রাজবাটীর সঙ্গীত-দলভুক্ত করিলেন। যে দিন রাজবাটীতে আত্মীয় স্বজনের নিমন্ত্রণ হইত, সে দিন সে আমাদের নিকট বসিয়া গীত গাইত। তাহার গানে সকলেই সন্তুষ্ট হইতন। তা অল্প বয়স জন্য এ বিষয়ে আপত্তি হইত না। তাহার যৌবনের আরম্ভে আমি মহারাজাকে কহিলাম যে, “এ গায়িকা এতনি বালিকা ছিল, এ কারণ আমাদের নিকট আসিলে বা বসিলে ক্ষতি ছিল না। কিন্তু এক্ষণে এ প্রায় যোবন সীমায় উত্তীর্ণ হইয়াছে, ইহার আর আমাদের নিকট আসা, বা সঙ্গে কোন স্থানে যাওয়া, ভাল দেখায় না।” রাজা উত্তর করিলেন, “ইহার এখনও যৌবনাবস্থা হয় নাই। আব হইলেই বা ইহার গীত শ্রবগে কি দোষ আছে। কিছু দিন পরে দেখিতে লাগিলাম যে, কেহ কেহ মদির। পানের পর তাহার সহিত হাস্য পরিহাস করিতেন। একে যুবতীর মধুর " স্বরেই মন মােহিত হয়; আবার সুরা তাহার সহচরী হইলে কি না অসম্ভব ঘটনা ঘটিতে পারে ? ইহার একটি চমৎকার ঘটনা নিম্নে বর্ণনা করিতেছি । এক রাত্রিতে, রাজবাটীতে এক অপূঝ রূপসী ও অসাধারণ সুকণ্ঠ। তয়- ফাওয়ালীর নৃত্যগীতে সকলেই বিমােহিত হইলেন। গায়িকার খ্যামটা নাচ। কেই প্রস্তাব করিলেন যে, “এই রমণী সুন্দর খ্যামটা নাচিতে পারে ” তখন সুধাপানে সকলেরই হৃদয় প্রফুল্লিত ছিল, সুতরাং এ প্রস্তাবে দ্বিমত হইল না। এই সুন্দরী যখন পেশওয়াজ ছাড়িয়া একখানি কালা পেড়ে সূক্ষ্ম ধুতি পরিয়া গৃহে প্রবেশ করিল, তখন যেন স্বর্গবিদ্যাধরী অবতীর্ণ হইলেন, এইরূপ দর্শকবৃন্দের ঢুলু ঢুলু নয়নে দৃষ্ট হইল। নিমন্ত্রিত মহাশয়দিগের মধ্যে কি প্রধান, কি বিজ্ঞ, কি পদস্থ, প্রায় সকলেই তাহার নৃত্যে বিমোহিত হইলেন । প্রথমে কয়েক অবিজ্ঞ যুব আপন আপন চরণ নিজ বশে রাখিতে পারিলেন না। তাহারা এই সঙ্গে নৃত্য আরম্ভ করিলেন। প্রাচীন ও পদস্থ এক জনও দণ্ডায়মান হইলেন। এক বিজ্ঞবর , প্রথমাবধি গম্ভীরভাবে ছিলেন, তাঁহার পদও শেষে অস্থির হইয়া উঠিল। তিনি উক্ত গায়িকার অনুরাগ। ১১১ A প্রাচীনকে নাচাইবার ছলে আপনি নাচিতে লাগিলেন। আমি নৃত্য করি নাই বটে, কিন্তু কিঞ্চিৎ দুরে বসিয়া সকলের আমোদ দেখিতেছিলাম, এবং উৎসাহ দিতেছিলাম । যে অর্থ যৌবন। গায়িকার কথা বলিতেছিলাম, তাহার নিমিত্ত আমার বিষম বিপদ উপস্থিত হইল। সে প্রথমে আমার গায়িকার অনুরাগ। সঙ্গীত শুনিতে অতিশয় ভালবাসিত। অন্যের সাক্ষাতে বলিত যে, “দেওয়ানজীর মত মিষ্ট স্বর আর কাহারও নাই।” ইদানীং যখন আমি গান করিতাম, তখন সে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিত। এক রাত্রিতে শ্ৰীবনের বাটীতে আমরা অনেকেই নিমন্ত্রিত ছিলাম। রাজা তৎকালে উপনীত হন নাই। কয়েকজন বান্ধব কোন স্থানে বসিয়া কথােপকথন করিতেছি, এমন সময় ঐ বালা সহসা আমাদের নিকট আসিয়া, আমার চরণ ধরিয়া কাতর স্বরে কহিতে লাগিল যে, আপনার মত মধুর গীত, আর কাহারও শুনিতে পাই নাই। অনেক দিন অবধি এব টি কথা আপনাকে বলিব মনে করিতেছি, কিন্তু বলিতে সাহস হয় নাই। সেই কথাটি বলিব মনে করিয়া আসিয়াছি। আপনি বলুন, আমাকে ভালবাসেন কি না।” আমি বুঝিলাম যে, এ মদ্য পান করিয়াছে। এক্ষণে ইহাকে তিরস্কার করা বৃথা, এই ভাবিয়া কহিলাম, “তাের গান শুনিতে সকলেই ত ভালবাসে, তবে এ কথা কেন জিজ্ঞাসা করিতেছিস ?” তথাপি সে বলিতে লাগিল, “আপনি আমাকে মনের সহিত ভালবাসেন কি না বলুন।” শিশুরা যেমন কোন বিষয়ের জন্য গুরুজনের নিকট আবদার করে, এবং সে বিষয় হাজার অসঙ্গত হইলেও, সে তাহা বুঝে না, বালিকার ভাবে ও স্বরে ঠিক সেইরূপ বােধ হইতে লাগিল। সে গৌরাঙ্গী ছিল না, কিন্তু সুশ্রী ছিল, এবং সঙ্গীতে নিপুণা না হউক, স্বরে সকলের মনোরঞ্জন করিতে পারিত। তাহার বয়স তৎকালে এয়ােদশ কি চতুর্দশ বৎসর। এখনও পূর্ণ যৌবনা নহে। আমার বয়স সে সময় ৩০ কি ৩২ বৎসর হইবে। উভয়ের বয়স বিবেচনা করিলে তাহার প্রতি আমার স্নেহ ব্যতীত, তাহার সহিত প্রণয় হইবার কথা নহে। যাহা হউক, আমি দীন-ভাব-দর্শনে তাহার প্রতি রুষ্টভাব প্রকাশ করিতে পারিলাম না। ছেলে ভুলান ভাবে তাহাকে প্রবােধ দিতে লাগিলাম। ইতিমধ্যে মহারাজা আসিলেন, এবং আমরাও উঠিয়া গেলাম। সে দিবস চাকরগণকে কহিয়া দিলাম যে, “তোমরা ইহাকে মদ্য দিও না, এবং আত্মজীবন-চরিত। গানের সময় ব্যতীত অন্য সময় আমাদের নিকট আসিতে, ইহাকে নিষেধ করিবে।” কিছু দিন পরে শুনিলাম, এবং ইহার ভাবেও বুঝিলাম যে, আমার প্রতি ঐ বালিকার নিতান্ত আসক্তি জন্মিয়াছে। আমার তৎকালীন মনের ভাবের কথা লিখিলে, অনেকেই আমার মন অপবিত্র বলিবেন তাহার সন্দেহ নাই। তথাপি যখন জীবনের ঘটনাবলী লিখিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি, তখন এ বিষয় গােপন রাখা কর্তব্য নয়। ভাবিতাম, এ গায়িকার শরীর অপবিত্র, তাহার হৃদয় অপবিত্র, কিন্তু তাহার ভালবাসা ত অপবিত্র নহে। যদি কোন অপবিত্র স্থানে পুষ্প জন্মায়, তবে স্থান অপবিত্র বলিয়া কি পুষ্পও অপবিত্র হইবে? যদি একটি কুকুরের ভালবাসায় আনন্দ হয়, একটি মানবে ভালবাসিলে, আনন্দ হইবে না কেন ? তাহার অনুরাগে আহলাদ ও বিষাদ দুইই হইত। আমার প্রতি এক জনের অনুরাগ হইয়াছে, ইহাতে আহাদ হইত, আবার তাহার অনুরাগ চরিতার্থ হইবে না, তাহা ভাবিলে বিষাদ উপস্থিত হইত। আহা! স্ত্রীজাতির অবস্থা কি শােচনীয়। পুরুষে ব্যভিচার দোষে দোষী হইলে, তাহাকে ঘৃণা করি বটে কিন্তু তাহার সহিত বসিতে বা মিষ্টালাপ করিতে আপনাকে অপবিত্র জ্ঞান করি না। কিন্তু স্ত্রী ব্যভিচারিণী হইলে, তাহার দিকে দিকে দৃষ্টিপাত করিলেও আপনাকে অপবিত্র মনে করি। এই বিষয় সংক্রান্ত আর একটি ঘটনা নিম্নে লিখিতেছি, তাহা পাঠ করিলে, সহৃদয় মাত্রেই আদ্র হৃদয় হইবেন। রাজবাটীতে আর একটি প্রবীণ গায়িকা আসিত। তাহার গর্ভে আমার এক নিকটস্থ জ্ঞাতির পুত্র জন্মে। সেই বানারী সমাজের অবিচার। একদা অতি আক্ষেপ করিয়া কহিল যে, “স্ত্রীলােক কি অধম ও কি দুর্ভাগা জাতি। আমাদের সহিত যে সকল পুরুষ সহবাস করেন, এবং আমাদের সমান দোষী, তাহারা ভদ্র সমাজে যাইতেছেন, সকলের সঙ্গে একাসনে বসিতেছেন, এবং আমােদ প্রমােদ করিতেছেন। কিন্তু আমরা দুর্ভাগ। সেই সমাজের দিকে নেত্রপাত করিতেও সাহস করি না। আপনার গান শুনিবার নিমিত্ত কতই ব্যাকুল হইয়াছি, কিন্তু কখন ওবাটী যাইতে সাহস হয় নাই। পূজার সময় কখন কখন আপনি প্রতিমা সম্মুখে গাইয়া থাকেন শুনিয়া প্রতি বৎসর আপনাদের বাটীতে গিয়াছি—কখন গীত শুনিতে পাইয়াছি, কখন নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছি। কিঞ্চিৎ লেখা পড়া শিখিয়াছি।
সুধা না গরল। যদি জানিতাম যে, আরও বেশী শিক্ষা করিলে আপনাদের সমাজে যাইতে পারিব, তাহা হইলে দিবারাত্রি পরিশ্রম করিয়া বিদ্যাভ্যাস করিতাম। যদি আঁস্তাকুড়ে কোন আঁটি পড়ে ও তাহা হইতে বৃক্ষ জন্মে, তবে অপবিত্র স্থানের বৃক্ষ বলিয়া তাহার ফল কি অব্যবহার্য হইবে? অতএব যে সন্তানটি এ অভাগিনীর গর্ভে জন্মিয়াছে, তাহাকে ঘৃণিত ভূমির উৎপন্ন বলিয়া ঘৃণা করিবেন না। তাহার কোন দোষ নাই।” এই বেশ্যাটি বেশ্যাগর্ভে জন্মে, এবং গর্ভ- ধারিণীর পথের পথিক হয়। সুতরাং তাহার কুপথগামিনী হওয়ার জন্য তাহাকে বিশেষ দোষ দিতে পারা যায় না। একারণে তাহার বিলাপে আমাদের অতিশয় দুঃখ বােধ হইত । আিমার যৌবনাবস্থায় একদা কলিকাতার পাঁচী ধােপানীর গলিতে রাজার মােক্তারের বাসায় কয়েক সুধা না গরল। মাস ছিলাম। বাসস্থান হইতে সৰ্ব্বদা দেখিতে পাইতাম যে, কি যুবতী, কি প্রবীণ, সকল গণিকাই নিরন্তর হাস্য পরিহাস ও আমােদ আল'দে কালযাপন করিতেছে। ভাবিতাম ইহার কি যথার্থই সুখী? ইহারা কি কুলকামিনীদের অপেক্ষা আপনাদিগকে সৌভাগ্যশালিনী জ্ঞান করে ? কখন কি ইহাদের মনে গৃহ ত্যাগের নিমিত্ত অনুতাপ উপস্থিত হয় না? এই সকল বিষয় জ্ঞাতার্থে কখন কখন তাহাদের সহিত আলাপ করিবারও ইচ্ছা হইত। কিন্তু ঘৃণা ও লজ্জাবশতঃ তাহাদের বাটা যাইতে পারতাম না। শেষে তাহাদের অবস্থার বিশেষ অভিজ্ঞব্যক্তি- দিগের নিকট ক্রমশঃ জানিতে পারিলাম যে, প্রায় বারাঙ্গনাই গিটির আকারে যে উজ্জ্বলতা দেখা যায়, অন্তরে তাহার কিছুই নাই। ঘাের তিমিরাচ্ছন্ন। তাহারা আন্তরিক অসুখ ভুলিবার জন্য এইরূপ সং সাজিয়া থাকে। একাকিনী থাকিতে হইলে যম-যন্ত্রণা হয়। অবস্থা বিশেষে কেহ কে যৌবনাবস্থায় আপনাকে সুখী ভাবে বটে, কিন্তু গত-যৌবনা হইলে মানসিক কষ্ট নিশ্চয় পাইতে থাকে। আপনার বলিবার কেহ থাকে না ; • পুরুষ নহিলে চলে না, অথচ একজনও ধার্মিক ও বিশ্বাসী পায় না। ধূৰ্ত্ত-চূড়ামণি প্রণয়িণীর কত কষ্টের ও পাপের উপার্জিত ধন ও আভরণ হরণ করিয়া পলায়ন করে । পীড়িতাবস্থায় দুঃখের সীমা থাকে না। নায়ক হাস্যানন দেখিতে আইসে, বিরস বদন দেখিলে প্রস্থান করে ; সুতরাং যখন অন্তরে অসুখের সীমা থাকে না, তখনও নায়ক ভুলাইবার নিমিত্ত প্রফুল্ল বদনে থাকিতে হয়। অসতীদিগের মুখে সতত এই কথা শুনা যায় যে, “এই জন্মে • ১১৪ আত্মজীবন-চরিত। { এই ফল, আবার পাপ করিব ?” তাহাদের এই অবস্থা জানিতে পারিলে, তাহাদিগকে কে সুখী মনে করিবে ? আহা এই সকল দুঃখিনীদের অবস্থার সমালােচনা করিলে হৃদয়ে কতই দুঃখ উপস্থিত হয় । কে তাহাদিগকে নির্বাসিত করিয়াছে ? কে তাহাদের আশ্রয় ত্যাগ করিতে প্রবৃত্তি দিয়াছে ? কে তাহাদের স্ত্রী-সৰ্বস্বধন সতীত্ব রত্ন হরণ করিয়া ভিখারিণী করিয়াছে ? স্বার্থপর রাক্ষসাধম পুরুষেরাই ক্ষণিক বা কিয়ৎকালের সুখসাধনের নিমিত্ত এই দুর্দশা করিয়াছে। কালভুজঙ্গ- দংশনে যাতন। অচিরাৎ শেষ হইয়া যায়, কিন্তু বিনষ্ট সতীত্ব ক্লেশ শীঘ্র শেষ হয় না। আর যদি পরকাল থাকে, তবে হয়ত এ দুঃখের অবসানই হয় না । বঙ্গীয় কুল কামিনীকুল সহজে সতীত্ব ত্যাগ করে না। সতা ত্বকে তাহার সৰ্বৰ্ম্মের সার জ্ঞান করিয়া থাকে, এবং লজ্জাকে অবলার পতন হেতু। সকল ভূষণের প্রধান ভূষণ বােধ করে। তাহারা জীবন বিসর্জন করিয়াও সতীত্ব রক্ষা করতে চেষ্টা পায় । তবে যে এত বারাঙ্গনা দৃষ্ট হয়, তাহার কারণ, চুরমণীর বৈধব্যদশা ও কোমল স্বভাব এবং পুরুষের কৌশল। প্রায় পূর্ণমনােরথ হইতে পারে না বলিয়া সধবার প্রেমাকাঙ্ক্ষী অধিক পুরুষে হয় না। আমি জানি, সামান্য দুলিয়া জাতীয় যে সকল স্ত্রীলােক সাংসারিক বিবিধ কাৰ্যানুরােধে ঘাটে, পথে, ও অন্য অন্য লােকের বাটা যাইত, তাহাদের মধ্যে তিনটি নারীকে আমার প্রতিবাসী যুবকেরা কুপথে লইবার জন্য নানারূপ চেষ্টা করিয়াও কৃতকার্য হইতে পারেন দোষ কাহার ? নাই। বিধৰা যুবতীরা শারীরিক ও মানসিক নানা অসুখে কালযাপন করে। পুরুষে আকার ইঙ্গিত দ্বারা অথবা অদৃষ্টিগােচর থাকিলে দুষ্টা কৌশলী স্ত্রীলােক দ্বারা বিধবার নিকট আপনাদের মানস জানায় । যুবতী প্রথমতঃ প্রায়ই বিরক্তিভাব প্রকাশ করে। কিন্তু কোমলস্বভাব অথবা লজ্জাবশতঃ এই বিষয় গুরুজনের বা আত্মীয় স্বজনের গােচর করিতে পারে না; অন্তরেই তাহা গােপন করিয়া রাখে। কখন ভাবে, এ বিষয়। অন্যে জানিতে পারিলে গোলযােগ হইয়া বড় লজ্জার বিষয় হইবে, কখন চিন্তা করে যে, ইহা প্রকাশ হইলে প্রেমাকাঙ্ক্ষীর নিপীড়ন হইবে । নিজেই এ বিষয়ে নিবারণ করিতে পারিবে, ইহাই তাহার দৃঢ় সংস্কার থাকে। এইরূপ কোমল ভাব অবলম্বন তাহার সৰ্ব্বনাশের মূল হয়। আপনার কোমল হৃদয়কে যে এতদুর বিশ্বাস করা উচিত নহে, সে তাহা একবারও চিন্তা করিয়া দেখে না।
ইংরাজি উপন্যাসের দুইটী রমণী । ১১৫ পুরুষের অবিশ্রান্ত চেষ্টায় ও কৌশলে তাহার চিত্ত ক্রমে ক্রমে দুর্বল হইতে আরম্ভ হয়। অগ্রে যাহা ঘৃণা, তাহা পরে কমনীয় হইয়া থাকে। তখন তাহার হৃদয়মধ্যে নিশিদিন নায়কের ভালবাসার ভাব উদয় হইতে থাকে। একদিকে ধৰ্ম্ম ও লজ্জা, দ্বিতীয় দিকে হৃদয়ের প্রেমভাব ও কল্পনা, এই উভয় দলে যুদ্ধ হইতে থাকে; কিন্তু শেষে প্রায় হৃদয়ের ভাবের জয় হইয়া অবলার সব্বনাশ হইয়া যায় । আমরা সকলেই দেখিতে পাই যে, অসঙ্গত স্তবে কেহ সন্তুষ্ট হউন আর না হউন, প্রায় কেহই স্তাবকের প্রতি বিরক্তি হইয়া রুষ্টভাব প্রকাশ করেন । সেইরূপ কেহ কাহারও প্রতি প্রেমভাব প্রকাশ করিলে সে ভাব যত দূরই অন্যায় হউক্ না কেন, * মাকাঙ্ক্ষীর প্রতি বিরক্তিভাব জন্মে না। স্তাবকের অভিসন্ধি বুদ্ধিমানের অজানিত থাকে না, তথাপি তার প্রতি কাহারও বিরাগভাব দৃষ্ট হয় না। বিজ্ঞজনেরাও আপনাদের যথার্থ দোষের কথা শুনিলে বরং কখন বিরক্ত হইবেন, তথাপি মিথ্যা আরােপিত সন্তোষজনক গুণের কথায় বিরক্ত হবেন না, বরং কখন কখন সন্তুষ্ট হইবেন। যদি বিজ্ঞ পুরুষদিগের চিত্তের এরূপ ভাব হয়, তবে অবলা সরলা রমণীদের অন্যের ভাল- বাসার প্রস্তাবে খঙ্গ হস্ত হইবার সম্ভাবনা কি ? তাহারা নায়কের ভালবাসার প্রস্তাব প্রথমে অতি অশ্রদ্ধার সহিত শুনে ; কিন্তু যখন শুনিতে পায় যে, একজন তাহার প্রেমের নিমিত্ত ক্ষিপ্ত প্রায় হইয়াছে, বা আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করি- আছে, তথন তাহাদের সুকোমল হৃদয় কেন না আ হইবে ? আর যখন কোন নায়িকার প্রতি কোন নায়কের অসাধারণ প্রেমের কথা উপন্যাসে পড়িতে ভাল লাগে, তখন নিজে নায়িকা হইয়াছেন, নায়ক গাঢ় ভালবাসা প্রকাশ করিতেছে, ইহা ভাল লাগিবার অসম্ভাবনা কি ? ইউজিন সুরচিত মিস্ত্রীস অব প্যারিস উপন্যাসে দেখিতে পাওয়া যায় যে, ম্যাডাম ডি হারবিলি অতি ধর্মপরায়ণ ছিলেন, ইংরাজী উপন্যাসের দুইটা এবং সতীত্বরত্নকে বিশেষ যত্নপূৰ্ব্বক রক্ষা করিতেন। কিন্তু তাহার নায়কের ও তঁাহার এক স্বার্থপর সঙ্গীর অসাধারণ, কৌশলে যখন তাহার নিশ্চয় বােধ হইল যে, তঁাহার ভালবাসা লাভ না করিলে নায়ক নিশ্চয় প্রাণত্যাগ করিবে, তখন তিনি নায়কের জীবন রক্ষার্থ সতীত্ব ধৰ্ম্ম বিসৰ্জন করিতে সম্মত হইলেন। তঁাহার একান্ত সুহৃদর এক মহাপুরুষ দ্বারা রক্ষিত না হইলে, তিনি নিশ্চয় সতীত্ব হারাইতেন। ডন কুইকসােট, নামে সুবিখ্যাত উপন্যাসের মধ্যে ; রমণী।
আত্মজীবনচরিত। ; দুই বন্ধুর যে কাহিনী আছে, তাহাতেও দেখা যাইতেছে যে, একজন বন্ধু অপর বন্ধুর স্ত্রীর প্রেমাকাঙ্ক্ষী হইলে, প্রথমে ঐ পত্নী যারপর নাই বিরক্ত। হইয়াছিলেন, এবং ঐ বন্ধুকে নিতান্ত অশ্রদ্ধাস্পদ ও বিশ্বাসঘাতক বলিয়া ঘৃণা করিয়াছিলেন; কিন্তু পরে বন্ধুর প্রগাঢ় ভালবাসার ভাব মনে যতই উদয় হইতে লাগিল, ততই তাহার হৃদয় অপ্রকৃতিস্থ হইয়া গেল। প্রথমে যে রমণী আহত সিংহিনীর ন্যায় তর্জন গর্জন করিয়া উঠিয়াছিল, সেই রমণী শেষে মৃদুস্বভাব। মৃগীর ন্যায় বশতপন্ন হইল। কি সভ্য, কি অসভ্য, কি সুশিক্ষিত, কি অশিক্ষিত, সকল দেশেরই কামিনীর সতীত্ব ধৰ্ম্মকে স্ত্রী জাতির প্রধান ধর্ম ও সংসারের সকল ভূষণ অপেক্ষা অধিক শােভনীয় জ্ঞান করিয়া থাকে। নিতান্ত পরবশ না হইলে ইহাতে জলাঞ্জলি দেয় না। সতীত্বহারা হইলে স্ত্রীজাতি যেরূপ ঘৃণাভাজন হয়, যদি পুরুষজাতিও পরদার গমনে সেইরূপ ঘৃণিত ও সমাজ বৰ্জিত হইত, তাহা হইলে ব্যভিচার দোষ প্রায় তিরােহিত হইয়া ব্যভিচারে—নর নারীর যাইত। পুরুষেরাই রমণীদিগকে ভালবাসা জানায়, তুল্যদণ্ড। তাহাদের কোমল হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার করায়, এবং শেষে হাদিগের সব্বনাশ করে। কুলকামিনীগণ প্রায়ই পুরুষদিগকে ব্যভি- চার দোষে লিপ্ত করিবার চেষ্টা পায় না। যে দেশে ব্যভিচার দোষের দু স্ত্রী ও পুরুষের প্রতি তুলরূপ আছে, সে দেশে এ দোষ প্রায়ই দৃষ্ট হয় না। ছােট নাগপুরে যে সকল আদিমনিবাসী জাতি আছে, তাহাদের মধ্যে স্ত্রী পুরুষগণ সৰ্ব্বদা একত্র বাস করে, ও প্রায় বিবস্ত্র থাকে ; তথাপি তাহাদের ব্যভিচার দোষ মােটই ঘটে না। যদি কেই ব্যভিচার দোষ ক খুন করে, তবে তৎক্ষণাৎ তাহার প্রাণদণ্ড হয়। আমার একজন আত্মীয় তদঞ্চলে ডেপুটী কালেক্টর ছিলেন; তাঁহার মুখে শুনিয়াছি যে, অবিবাহিতা ছোট নাগপুরের রমণীগণ। যুবতীরা তাহার নিকট কখন কখন আসিত, এবং বাহু যুগলের দ্বারা তাহার গলদেশ জড়াইয়া ধরিত। তাহারা পিতা ভ্রাতার সহিত যেরূপ সরল ব্যবহার করিয়া থাকে, সেইরূপ তাহার সহিত করিত। যদিও বন্ধু যুবা ও সুন্দর ছিলেন, তথাপি তঁাহার আলিঙ্গনে তাহাদের মনে কোন বিকার জন্মিত না। তাহাদের নির্মল ব্যবহার দর্শনে, তাহার এক লম্পট পাচক ব্রাহ্মণের অপবিত্র হৃদয় বিকার শুন্য হইয়াছিল। সেখানকার স্কুলের জীবনের দ্বিতীয় পরীক্ষা। ১১৭ এক শিক্ষক কোন কামিনীর প্রেমাভিলাষী হইয়াছিলেন । ইহা জানিতে পারিয়া ঐ কামিনীর গুরুজনেরা তাহার প্রাণ সংহার করিতে উদ্যত হয় । ডেপুটী বাবু অনেক কৌশল করিয়া তাহাদিগকে নিরস্ত করেন, এবং শিক্ষককে বিদায় করিয়া দেন । বােধ হয়, যদি পূর্বোক্ত পূর্ণ বয়স্কা গায়িকার পুর্ণ বয়স হইত, কিম্বা বিশেষ বুদ্ধিশক্তি থাকিত, বা আমার উগ্রভাব দেখিত, অথবা রাজবাটীর কোন কোন লােকের উৎসাহ না পাইত, তবে তাহার প্রেমানল জ্বলিব। মাত্র নির্বাপিত হইয়া যাইত। সে যাহা হউক, তাহার প্রণয়-পিপাসা ক্রমশঃই বৃদ্ধি হইতে লাগিল। প্রায় প্রতি বর্ষের বর্ষাকালে যখন খড়িয়া নদীর পূর্ণাবস্থা হইত, তখন কখন কখন জ্যোৎস্নাময়ী রজনীতে মহারাজা সঙ্গীত সম্প্রদায় সহিত জল ভ্রমণ করিতেন এবং মধ্যে মধ্যে আমাকে ও অন্যান্য আত্মীয়গণকে সঙ্গে লইতেন। একদা এক পূর্ণিমা যামিনীতে তিনখানি ক্ষুদ্র নৌকায় আমরা উঠিলাম। একখানিতে রাজা ও তঁাহার কতিপয় স্বজন, দ্বিতীয়খানিতে আমি ও আত্মীয় কয়েক জন। তৃতীয়খানিতে গায়ক সম্প্রদায়। ঐ জীবনের দ্বিতীয় পরীক্ষা। বালিকাও ঐ সঙ্গীত সম্প্রদায়ে ছিল । তরণীত্রয় প্রায় পাশ্ববর্তী হইয়া যাইতেছিল। তৎকলে মন্দ মন্দ সমীরণে ও শশধরের সুৰ কিরণে তরঙ্গিণী যেন পূর্ণ যৌবনা নর্তকীর ন্যায় কাঞ্চন খচিত বেশে সহস্ররূপ। হইয়া নৃত্য করিতেছিল। একে এই মনোহর দৃশ্যতেই সকলে মােহিত হইয়া- ছিলেন, তাহার উপর অতি সুমধুর সঙ্গীত-স্বরে সুধাবর্ষণ হইতে লাগিল । কাহারই রাত্রির দিকে মনােযােগ হইল না। হঠাৎ জানা গেল, রজনী তৃতীয় প্রহর হইয়াছে। সঙ্গীত স্তব্ধ হইল, এবং প্রত্যাগমনের উদ্যোগ হইতে লাগিল। মহারাজা আহার করণার্থ আমাকে নিজ নৌকায় ডাকিলেন। আমরা নৌকার অনাচ্ছাদিত ভাগে বসিয়াছিলাম। আচ্ছাদিত ভাগের মধ্যে অন্ধকার ছিল। । তথা হইতে সহসা এই বালিকা বাহিরে আসিয়া কহিল যে, “আমি দেওয়ানজি মহাশয়ের মুখে একটি মেঠাই দিব, নতুবা জলে ঝাঁপ দিয়া প্রাণত্যাগ করিব।” বালিকা কখন এ নৌকায় আসিয়াছিল, তাহা আমি জানিতে পারি নাই। দেখিলাম সে দিনও সে যথেষ্ট মদ্যপান করিয়াছে। আমি বিরক্তি প্রকাশ করিলে, বালিকা কঁদিয়া কহিতে লাগিল যে, “দেওয়ানজি মহাশয় আমাকে ঘৃণা করেন। রাজা শেষে কহিলেন যে, “যদি ইহার হস্তে কিঞ্চিৎ মিষ্টান্ন খাইলে এ সুখী হয়, তবে তাহাতে তােমার কি পাপ হইবে ?” আমি পূর্বেই * * * * * * * * * * ১১৮ আত্মজীবন-চরিত। বরং বলিয়াছি যে, তাহার প্রণয় প্রকাশে আমার বিশেষ বিরক্তি জন্মিত না। হর্ষ বিষাদ উপস্থিত হইত। প্রথমে বিরক্ত হইয়াছিলাম বটে, কিন্তু শেষে তাহার দুঃখের ভাগী হইলাম, এবং তাহার হস্তু হইতে মেঠাই ইয়া মুখে দিলাম। আর একবার এক পৌষ সংক্রান্তির রাত্রিতে আমাদের সকলের রাজবাটীতে নিমন্ত্রণ ছিল। সঙ্গীত সময় ঐ বালিকা উপস্থিত হইল। আহারের পর রাজা কয়েক আত্মীয়ের সহিত চকের পূজার যাত্রা গােপনে শুনিতে চলিলেন। পাছে এই বালিকা আমার সঙ্গ লয়, এ কারণ আমি তাহাদের সঙ্গে যাইয়া, রাজবাটীর এক গৃহে পূর্ণ বাবু ও আমি শয়ন করিলাম। ১০|২ মিনিট পরে রাজা আমাকে আর এক কক্ষে ডাকাইয়া কোন কোন কথা বলিয়া গেলেন। আমি শয়ন গৃহে পুনর্গমন করিতেছি এমন সময় দেখিলাম, অন্ধকারে ঐ বালিকা দণ্ডায়মান। আমি প্রথমে বড়ই বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিলাম, কিন্তু তাহার কাতরােক্তিতে সে ভাব ভুলিয়া গেণাম। আমার আশা ত্যাগ করাইবার জন্য তাহাকে অনেকরূপ বুঝাইলাম, কিন্তু তাহাতে কোন ফলােদয় হইল না। শেষে সে আমার হস্ত ধরায়, তাহার হাত ছাড়াইয়া পূর্বোক্ত গৃহে শয়ন করিলাম। সেখানে পূর্ণ বাবু থাকাতে সে আর আমার নিকট যাইতে পারিল না। আমি তৎক্ষণাৎ নিদ্রিত হইলাম। পর দিবস পূৰ্ব্ব ঘটনা সকল মনে হওয়াতে, প্রথমতঃ আমার মনের দুর্বলতার জন্য অত্যন্ত অসুখ হইতে লাগিল। পরে আমার রাজবাটীর আত্মীয় স্বজনের ব্যবহারে হৃদয় অত্যন্ত ব্যাকুল হইল । আমি বেশ বুঝিতে পারিলাম যে, আমাকে পাপ-পঙ্কে পতিত করিবার নিমিত্ত চক্রান্ত হইয়াছে । বাজ। যে রাত্রিতে আমাকে ডাকিয়া কোন কোন কথা বলেন, তাহাও কৌশল বোধ হইল। ভাবিলাম, কি ভয়ানক স্থান! উৎকোচ গ্রাহীরা আমাকে আপনাদের দলভুক্ত করিতে চেষ্টা অামার অনুতাপ। করিলেন, আবার ইলিয়াসক্তগণ আমাকে ব্যভিচার দোষে লিপ্ত করিবার নিমিত্ত যত্ন করিতেছেন। একবার ভাবিলাম, এখানে আর থাকা কর্তব্য নহে। আবার ভাবিলাম, রাজার এমন প্রবৃত্তি হইবার সম্ভাবনা নহে। কয়েক দিন অত্যন্ত অসুখে যাপন করিলাম। নিজের প্রতিও অতান্ত ঘৃণা হইল। মনে করিলাম, এই সুধারূপী বিষপূর্ণ মদির। আর পান করিব না, এবং কাৰ্যানুবােধ ব্যতীত রাজবাটী প্রবিষ্ট হইব না। যাহাদের চরিত্র পবিত্র রাখিবার জন্য আমি নিরন্তর চেষ্টা করিয়া থাকি, তাহারাই আমার বারাণসী-দর্শন। ১১৯ চরিত্র কলুষিত করিতে বদ্ধপরিকর হইবেন, ইহা কখনই ভাবি নাই শেষে আমি নিতান্ত অস্থির চিত্ত হইয়া রাজাকে এই মর্মে এক পত্র লিখিলাম যে, “আমি আপনাদের কোন দোষ দেখিলে তাহার সংশােধনের চেষ্টা করিয়া থাকি, কিন্তু কাহারও প্রতি ঘৃণা করি না, বরং স্নেহ করিয়া থাকি। আমাকে দুশ্চরিত্রান্বিত করিলে আপনাদের কি লাভ হইবে ?” রাজা এ পত্রের কোন উত্তর দিলেন না, এবং প্রকাশ্যে ও কোন বিরক্তি ভাব প্রকাশ করিলেন না। কিন্তু বােধ হইল, যেন তিনি এবং স্বজনগণ আমার উপর অতিশয় চটিয়াছেন। কিছু দিন পরে শুনিলাম যে, রাজার নিকট তাহার স্বজনেরা সর্বদাই এইরূপ কহিতেছেন যে, “ইহাদের ( অর্থাৎ আমার ও আত্মীয়দের অন্তরে ) ইন্দ্রিয় সুখের বিলক্ষণ ইচ্ছা আছে, শুদ্ধ লজ্জার ভয়ে তাহা চরিতার্থ করতে পারেন না। ইহারা কেহই সাধু নহেন। তাহাদের সহিত বাহে পূৰ্ব্ব ভাব থাকিল, কিন্তু আন্তরিক সুহৃদ্ভাব এককানো অন্তর্হিত হইল। আমি রাজবাটীতে দুই দল। রাজবাটীর আমােদ প্রমােদে আর মিশিব না শুনিয়া, আমার আত্মীয়েরাও ঐ সঙ্কল্প করিলেন। আমাদের এইরূপ ব্যবহার দেখিয়া রাজা স্থির করিলেন, যে দিন আমাদের সমাগম হইবে, সে দিন কোন গণিকা উপস্থিত থাকিবে না। সুতরাং রাজস্বজনদের ও আমাদের দল পৃথক হইয়া গেল। রাজবাটীতে আমার যে সুখ ছিল, তাহা তিরােহিত হইল, এবং অনিষ্টের আশঙ্কা হইতে লাগিল। রাজ-স্বজনেরা বিবেচনা করিলেন যে, “ইহার প্রতি রাজার যে ভক্তি ছিল, তাহা লুপ্ত করিতে যখন কৃতকার্য হইয়াছি, তখন বারাণসী-দর্শন। তাহার ভালবাসার মূলচ্ছেদ করিতে কতক্ষণ লাগিবে ।” তাহাদের সে সুখের স্বপ্ন আপাততঃ ভঙ্গ হইয়া গেল। রাজার কাশীধাম দর্শনের ইচ্ছা হইল । তিনি আমাকে, পূর্ণ বাবুকে ও কালীকে সঙ্গী করা স্থির কবিলেন । এ বিষয় বিরােধী সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ অগােচর থাকিল । আমরা প্রথমতঃ কলিকাতায় যাইয়া যাত্রার উদ্যোগ সকল করিলাম, এবং তথা হইতে ইল্যাণ্ড ট্রানজিট কোম্পানির তিনখানি মনুষ্য দ্বারা চালিত গাড়ীতে ট্রাঙ্ক রােডে যাত্রা করিলাম। এক শকটে মহারাজা, দ্বিতীয় শকটে পুর্ণ বাবু ও কালী বাবু, এবং তৃতীয় শকটে অমি ও এক রাজজ্ঞাতি। শকটের উপরিভাগে ভৃত্যদের স্থান হইয়াছিল । দিবা রাত্রির মধ্যে আমাদের প্রয়ােজন ব্যতীত শকটের গতিরােধ হইত না। আমি দিবসে কখন রাজার নিকট, ১২০ আত্মজীবনচরিত। কখন পূর্ণ বাবুর নিকট থাকিতাম। বৈকালে ও সন্ধ্যার পর শকটের ছাদের উপরে বসিয়া কালী, পুর্ণ ও আমি, একত্র কখন বন ও শৈলের শােভা সন্দর্শন করিতাম, কখন মিষ্টালাপ, এবং কখন “কি স্বদেশে, কি বিদেশে যথায় কথায় থাকি, তোমার রচনা মধ্যে তােমাকে দেখিয়া ডাকি” ইত্যাদি ব্ৰহ্ম সঙ্গীত গাইতাম। ইতিপূব্বে কেহই আমরা অরণ্য বা পৰ্বত দেখি নাই । সুতরাং এই সামান্য শেখর ও কানন দর্শনেই বিস্ময় আনসাগরে মগ্ন হইতাম। যখন যৌবন প্রারম্ভে আমি অন্য তিন জন বন্ধুর সহিত কাশীর শােভা। নৌকাযােগে ভ্রমণ করিয়াছিলাম, তখনও আমার কয়েক দিবস অত সুখে অতিবাহিত হইয়াছিল, কিন্তু এ সুখের সহিত সে সুখের তুলনা হয় না কারণ সে সুখের দৃশ্য কেবল রমণীয় ছিল। এ সুখের দৃশ্য যেমন মনােহর, তেমনই বিস্ময়কর! এ দৃশ্যের বর্ণনা হয় না; যদি কবি হইতাম, তাহা হইলেও বা কিঞ্চিৎ বর্ণনা করতে চেষ্টা করিতাম। সপ্তম দিবসের প্রাতে আমরা কাশীর পরপারে উপনীত হইলাম। কলিকাতা ও মুরশিদাবাদের শােভা দেখিয়াছি বটে, কিন্তু এ নগরের যেন আর এক নুতন প্রকারের সােন্দৰ্য্য দর্শন করিলাম। একূল হইতে নগরের দিকে নেত্রপাত করিবামাত্র বােধ হইল, যেন আমাদের গমনের পথ ঠিক এই নগরের উপযুক্ত করিয়া প্রস্তুত হইয়াছে। বত্মের উভয় পাশ্বের অরণ্য ও শেখর সন্দর্শনে যেরূপ বিস্ময়াপন্ন হইয়াছিলাম, নগর দর্শনেও সেইরূপ বিস্ময়াপন্ন হইলাম । মনে হইল, এই পথে যাইয়া প্রস্তরময় অট্টালিক-সমন্বিত-নগরের পরিবর্তে যদি কলিকাতার ন্যায় শ্বেতসৌধপূর্ণ নগর দেখিতাম, তাহা হইলে মনােমধ্যে এরূপ সুন্দর ভাবের আবির্ভাব হইতনা। সুরধুনী তাঁর সােপানাজি, ও তৎসন্নি হিত প্রকাও প্রাসাদমালার সৌন্দৰ্য্য ও সুশৃঙ্খলা বিস্ময়বিস্ফারিত লােচনে দর্শন করিতে লাগিলাম । হৃদয় আনন্দ রসে প্লাবিত হইতে লাগিল। জাহ্নবী উত্তীর্ণ হইয়া প্রথমে আমরা সিকরোলে গমন করিলাম ; এবং আহারাদি সমান করিয়া বৈ কালে গঙ্গাতীরস্থ একটি বাটীতে অবস্থিত, হইলাম। নগরটি যেমন নয়ন সুখকর ও হৃদয়রঞ্জক তেমন বাসােপযােগী নহে। তথায় পাঁচদিন থাকিয়া আয্য গােরব অনেক প্রাচীন ও প্রাসদ্ধ কীর্তি দেখিলাম। ষষ্ঠ দিবসে, স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করিলাম। প্রত্যাবর্তন কালে আর এক অপরূপ সৌন্দর্য দেখিতে দেখিতে আসিলাম। এমন সময়ে রজনী জ্যোৎস্নাময়ী ছি,প্রত্যাগমন সময়ে তাহ। তিমিরা- চছন্ন হইল। এক রাতে হঠাৎ দৃষ্ট হইল, যেন অসংখ্য দীপমালা নানা দিকস্থ বারাণসী হইতে,প্রত্যাগমন। যত দিন পর্বতােপরি শােভা পাইতেছে। যে কয়েক দিন পৰ্বত-পদেশ দিয়া আসিলাম সে কয়েক রাত্রিতেই ঐরূপ আলােকরাজি দৃষ্ট হইল। জিজ্ঞাসা করাতে শকট চালকগণ কহিল যে, “কখন বৃক্ষরাজি পরস্পর সংঘর্ষণে ঐ অনলের উৎপত্তি হয়, কখন সন্নিহিত গ্রাম্য লােকে বনে অগ্নি সংযোেগ করিয়া দেয়। বৃষ্টি না হইবে, ততদিন ঐ বত্নি প্রজ্বলিত থাকিবে।” আমাদের যাইবার কালে জ্যোৎস্নাতে যে আমােদ হইয়াছিল, আসিবার কালে অন্ধকাবে তদপেক্ষা অধিক আমােদ হইল । কাশীতে এক দিবস আমার বিরুদ্ধদলের চক্রান্তের কথা উত্থাপিত হইয়াছিল। রাজা কহিলেন, “আমি চক্রান্তের বিষয় কিছুই জানি গায়িকার প্রেম সম্বন্ধে রাজার না। তাহার প্ৰেমাশা পূর্ণ হইবার নহে, ইহা বালি- সহিত আলােচনা। কাকে অনেকরূপ বুঝাইয়াছিলাম। রাত্রিতে তুমি তাহার প্রতি বিরক্তিভাব দেখানতে, সে তােমাকে কোন কোন কথা বলিবে বলিয়া আমাকে নিতান্ত ধরাতে, আমি কৌশলে তােমাকে ডাকিয়া দিয়াছিলাম বটে। অার এক রাত্রিতে তোমাকে না দেখলে সে আত্মহত্যা হইবে নিশ্চয় জানানতে, পূর্ণ বাবুর বাটী হইতে তােমাকে আনিতে লােক পাঠাইয়াছিলাম সত্য, তােমার দেখা না পাইয়া লােক ফিরিয়া আসিলে, সে সে রাত্রিতে রাজবাটীতে থাকে ও পর দিন প্রাতে তােমাকে দেখিয়া তবে বাটা যায়। আর একদিন পরিহাসচ্ছলে বলিয়াছিলাম বটে যে, যদি তুই তাহার প্রণয়িনী হইতে পারি, তবে তােরে পুরস্কার দিব। আমি নিশ্চয় জানি যে, তােমার চিত্ত কখনই বিচলিত হইবে না, এই কারণেই আমি ঐ বালিকার প্রতি কোন কঠোর উপায় প্রয়ােগ করি নাই। কিন্তু তুমি যে, আমাকে তােমা। অনিষ্টাভিলাষী ভাবিয়াছিলে, তাহাতে আমি অত্যন্ত বিরক্ত হইয়াছিলাম।” এই পর্যন্ত বলিয়া শেষে তিনি পরিহাসচ্ছলে আমাকে বলিলেন যে, “ইহার উহার দোষ দেও মিথ্যা, তােমার রূপ আর স্বর, সকল দোষের মূল। নতুবা রাজবাটীতে এত লােক আছে, সকল স্ত্রীলােকেরই তােমার দিকে ঝোক হয় কেন ?” বারাণসী হইতে আমরা প্রত্যাগমন করিলে শুনিলাম যে, আমি মহারাজার এই ভ্রমণের মূল, এবং ইহাতে অনেক অর্থ ব্যয় বারাণসী হইতে প্রত্যাগমন। হইবে, মান সম্রম, যাইবে, ইত্যাদি বিবিধরূপ কল্পিত কথা আমার বিরুদ্ধদল কর্তৃক মহারাণীর গােচর হওয়াতে, তিনি আমার প্রতি ১২২ আত্মজীবন-চরিত। অতিশয় কোপ প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু যখন শুনিলেন যে, রাজা গুপ্তভাবে যাওয়াতে তাহার অধিক ব্যয় বা মানের হানি হয় নাই, তখন তাহার সকল বিরক্তির শান্তি হইল, এবং বৈরদলের আশা-প্রবাহ রুদ্ধ হইয়া গেল। কিন্তু যখন দশচক্রে ভগবানের ভূত হওয়ার প্রবাদ হইয়াছে, তখন আর মনুষ্যের দুর্দশা ঘটিবার অসম্ভাবনা কি ? আবার রাজাকে আমার প্রতি কখন প্রসন্ন, কখন অপ্রসন্ন দেখিতে লাগিলাম। একদা যে সময় আমি কোন রাজ কাৰ্যানুরােধে কলিকাতায় ছিলাম, সে সময় রাজসংসারের একটি মহালের ইজারা বন্দোবস্ত ইজারা বন্দোবস্ত। অতি গােপনে হইতেছিল । আমি ফিরিয়া আসিয়া এই বিষয় জানিতে পারিলাম, এবং ইহাতে রাজার বিস্তর ক্ষতি হইল ভাবিয়া সাতিশয় বিষাদিত হইলাম। কিন্তু এ বিষয় ষ্ট্যাম্পে লিখিত হইতেছে বলিয়া, এ সম্বন্ধে মহারাজাকে কিছু জানাইলাম না। দুই তিন দিবস পরে কোন কথা প্রসঙ্গে রাজা আমার মুখে এই ক্ষতির বিষয় জ্ঞাত হইয়া কহিলেন যে, “যদি ইহার প্রতিকারের সম্ভাবনা থাকে, তবে তাহার চেষ্টা কর। আমি যাবৎ দস্তাবেজে স্বাক্ষর না করি, তাবৎ কোন বন্দোবস্তে বাধ্য নহি।” আমি অবিলম্বে অন্য এক গ্রাহককে এই সংবাদ দিলাম। আমি স্থানান্তরে গিয়াছি ভাবিয়া, তিনি শ্রীনাথ রায় মহাশয়ের দ্বারা রাজার নিকট বেশী জমা দিবার প্রস্তাব করাইলেন। রাজবাটীর প্রায় সমস্ত লােক প্রথম গ্রাহকের পক্ষ ছিলেন, কেবল উক্ত রায় মহাশয় ও আমি, দ্বিতীয় গ্রাহকের পক্ষে হইলাম। উভয় গ্রাহকই পরস্পরের অপেক্ষা ক্রমশঃ অধিক লাভ দিবার প্রস্তাব করিতে লাগিলেন। পরিশেষে দ্বিতীয় গ্রাহকের ডাক বেশী থাকিল । সুতরাং তাহার সহিত বন্দোবস্ত করা স্থির হইল । পর দিন রাজা আমাকে কহিলেন যে, “দ্বিতীর গ্রাহকের অপেক্ষা প্রথম গ্রাহক অধিক লাভ দিতে চাহাতে, তাহারই সহিত বন্দোবস্ত করা স্থির করিয়াছি।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “যে ব্যক্তি উপস্থিত হওয়াতে এত লাভ হইল, তাহাকে একবার এ সংবাদ দেওয়া হইবে কি?” তিনি উত্তর করিলেন, “আমার যথেষ্ট লাভ হইয়াছে, আমি আর সমস্ত পরিবারের ও আমলাদের অনুরােধ ঠেলিতে পারি না। তুমি এ বিষয়ে আর কোন কথা বলিও না।” তথাপি আমি অতি বিষাদিত চিত্তে কহিলাম যে, “এ কম্মটি অতিশয় অন্যায় হইল।” রাজা আর কোন বাক্য ব্যয় না করিয়া প্রস্থান করিলেন। এই অবিবেচনার জন্য আমার এতই কষ্ট ও রাজার সহিত বচসা। লজ্জাবােধ হইল যে, আমি সে দিন আর রাজবাটীতে যাইতে পারিলাম না। যাহা হউক, পূৰ্ব্ব বন্দোবস্ত অপেক্ষা এ বন্দোবস্তে রাজার অনেক লাভ হইল। এই বন্দোবস্ত হওয়ার কয়েকদিন পরে এক রাত্রিতে শ্ৰীবনের বাটীতে আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। পূর্ণ বাবু কি জন্য উপস্থিত হন নাই। তাঁহার পিতৃব্য শ্রীনাথ রায় মহাশয়ের অসন্তোষ জন্য তিনি আসেন নাই, রাজা এই মনে করিয়া রায় মহাশয়ের প্রতি অতি অন্যায় বাক্য বলিতে লাগিলেন। একে পূর্ণ বাবু আমার সােদরসম বান্ধব, তাহার উপর আবার ইজার বন্দোবস্তের সময় রায় মহাশয় ও আমি একপক্ষে ছিলাম। সুতরাং রাজার অন্যায় কথা সকল আমার বড় কষ্টকর বােধ হইতে লাগিল। তথাপি ধৈর্য্য ধরিয়া স্থিরভাবে ছিলাম। কিন্তু তাহার কৰ্ম্মকারক স্বজন যখন তাহার বাক্যের পোেষক হইয়া আস্ফালন করিয়া উঠিলেন, তখন আর আমি অচলচিত্তে থাকিতে পারিলাম না। আমি রাজাকে কহিলাম যে, “রায় মহাশয় আপনার হিতসাধনেরই রাজার সহিত বচসা। চেষ্টা করিয়াছিলেন, অতএব তাহার উপর এত কটুক্তি করা উচিত হয় না। এই ইজারার আর একজন গ্রাহক ছিল, তাহা কি আপনার এই মঙ্গলাভিলাষী স্বজন জানিতেন না? যদি আমি উপস্থিত না হতাম, তবে ত আপনার এই বিপুল ক্ষতি হইয়া যাইত।” এই কথা শুনিয়া রাজা অত্যন্ত ক্রোধপূৰ্ব্বক কহিলেন যে, “উপকার স্বজনের নিকটই লওয়া কৰ্ত্তব্য।” রাজার বাক্যে আমি অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া কহিলাম যে, “এই জন্যই পারস্য কবি সেখ সাদি কহিয়াছেন, “যদি উপদেশ রাজা করহ শ্রবণ, যাহাতে উত্তম শিক্ষা নাহি কদাচন। পণ্ডিত ব্যতীত কারু দিও নাক ভার, যদিও কৰ্ম্ম নহে সুযােগ্য তাহার রাজা পারস্য ভাষা জানিতেন, সুতরাং কবিতার অর্থ বুঝিয়া ক্রোধ নয়নে শম্ভীর ভাবে থাকিলেন। কিঞ্চিৎ পরে আমি সেখান হইতে নিম্নতলায় আসি- লাম। আমার আত্মীয়েরাও ক্রমে ক্রমে তথায় উপস্থিত হইলেন। আমােদ প্রমােদ • তিরােহিত হইল। সে স্থানে আর ক্ষণমাত্ৰ থাকিবার ইচ্ছা রহিল না, কিন্তু আমি আসিলেই আত্মীয়েরাও আসিবেন, কেবল এই জন্য থাকিলাম। ক্ষণকাল পরে রাজা আমাকে ডাকাইয়া আমার বিরক্তিভাব দূরীভূত করিতে যত্ন করিতে লাগিলেন। কিন্তু “উপকার স্বজনের নিকটই লওয়া কৰ্ত্তব্য,” এই কথা যেন ১২৪ আত্মজীবন-চরিত। ওস্তরে এতই উচ্চৈঃস্বরে প্রতিধ্বনিত হইতেছিল যে, বাহিরের কোন কথাই আমার কর্ণকুহরে স্পষ্টরূপে প্রবিষ্ট হইল না। একবার যেন বলিতেছেন যে, (তামার আসিবার পূর্বে ইহাদের সাক্ষাতে তােমারই যশােকীৰ্তন করিতে ছিলাম।” সে রাত্রিতে আর গীতবাদ্য হইল না। এই গােলযােগেই অনেক রাত্রি গত হইল, এবং শেষ রাত্রিতে আহারাদি করা গেল। আহা! উক্ত রাত্রিতে আমাদের কি দৃঢ়ীভূত মধুর প্রেমই প্রকাশ পাইল । আমার হৃদয়ের বেদনা বান্ধবদের হৃদয়েও প্রবিষ্ট হইয়াছিল। আমার অপমানে তাহারা সকলেই অপমানিত বোধ করিয়াছিলেন ; এবং আমার জন্য রাজার সংসর্গও ত্যাগ করিতে প্রস্তুত ছিলেন। সে রমণীয় প্রণয় এখনও স্মরণ হইলে হৃদয় আনন্দ রসে প্লাবিত হইতে থাকে। পর দিবস আমি রাজাকে এই মৰ্ম্মে এক পত্র লিখিলাম যে,“কর্মচারীর উপর প্রভুর শ্রদ্ধা না থাকিলে উভয়েরই অনিষ্ট সম্ভাবনা। কৰ্ম্মত্যাগ ও পুনর্নিয়ােগ । একারণ আমি বিদায় হইলাম । দুই দিবস পরে তাহার মােক্তার (আমার মধ্যম দাদা) আসিয়া কহিলেন, “রাজা তােমার নিমিত্ত অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়াছেন। তুমি না যাইলে তিনি অতিশয় দুঃখিত হইবেন। অতএব তােমায় যাইতেই হইবেক।” আমি কহিলাম, “কৰ্ম্মত্যাগ করিয়াছি বলিয়া যে রাজবাটীও ত্যাগ করিয়াছি, তাহা নহে। তবে আপাততঃ যাইব । পর দিন পুনরায় মধ্যম দাদা আসিয়া আমাকে কহিলেন যে, “রাজ। সেই অবধি শ্ৰীবনেই রহিয়াছেন, তুমি না যাইলে রাজবাটী প্রত্যাগমন করিবেন । আর কহিয়াছেন, যদি তুমি, আমার সঙ্গে না যাও, তবে নিজে এই রোদ্রে হাঁটিয়া তোমার নিকট আসিবেন।” সুতরাং এ কথা শুনিয়া আর থাকিতে পারিলাম না। আমি তাহার সমীপন্থ হইলে কহিলেন, “যথেষ্ট কষ্ট দিয়াছ, আর দিও না।” তৎকালে সেখানে সঙ্গীত হইতেছিল। দুই চার কথার পর একটি গান গাইতে আমাকে অত্যন্ত ধরিলেন। আমি তঁাহার নির্বন্ধ উল্লম্বনে অসমর্থ হইয়া এই গীতটি গাইলাম । “এমন যে হবে প্রেম যাবে এ কভু মনে ছিল না, এ চিতে নিশ্চিত ছিল পিরীতে বিচ্ছেদ হবে না । গীত সমাপ্ত না হইতেই অপূর্ণলোচনে কহিলেন, “তাহা কখন হবে না।” কতক্ষণ পরে কহিলেন, “এবেলা তােমায় রাজবাটী যাইয়া আহার করিতে হইবে।” এই বলিয়া তাহার গাড়ীতে আমাকে লইয়া রাজবাটী আসিলেন।
বাটী ও বাগান নির্মাণ। ১২৫ ' শামিও আপন প্রতিজ্ঞা বিস্মৃত হইয়া আবার তাহাদের মায়ায় মুগ্ধ হইলাম, এবং কিয়ৎকাল সুখেও কাল কাটাইলাম । আমার উদ্যান ও বৈঠকখানা প্রস্তুত হইলে, তথায় প্রত্যহ বৈকালে আমি বারূইহুদা হইতে আসিতাম, এবং আত্মীয়ের কৃষ্ণ পুত্রের মৃত্যু। নগর হইতে যাইতেন। আমরা সকলেই প্রায় চারি দণ্ড রাত্রি পর্যন্ত সেইখানেই থাকিতাম । বৎসর গত হইল, তবু ধনাভাবে পরিবারের বাসের উপযুক্ত স্থান করিতে পারিলাম না। ১২৬০ খ্রীষ্টাব্দে হঠাৎ এক রাত্রিতে আমার মধ্যম পুত্রের ওলাউঠা হইল। কৃষ্ণনগর হইতে ডাক্তার লইয়া যাইতে ও ঔষধ আনিতে দুই ঘণ্টা অতীত হইয়া গেল। সুতরাং যথাকালে ঔষধ সেবন হইলে উপকার হইত কি না, তাহার আর পরীক্ষা হইল না। পর দিন দুই প্রহরের পর তাহার জীবন শেষ হইল । বারূইহুদায় আর বাস করা উচিত হয় না, মনে করিয়া, আমি উপরিউক্ত বৈঠকখানার পশ্চাতে আর কয়েকটি প্রকোষ্ঠ করিয়া তথায় পরিবার আনিলাম। কিয়ৎকাল পরে রামতনু বাবু আমার বাটীর উত্তর দিকে আপন বাটী প্রস্তুত করিলেন। তিনি নিকটে আসাতে আমার বাটীর আরও গৌরব বৃদ্ধি হইল। তিনি মধ্যে মধ্যে আমার বাটীতে আসিতেন, ও নানাবিধ হিতােপদেশজনক বাক্যে সকলের চিত্ত পুলকিত করিতেন। বিদেশীয় বন্ধুগণ ও যাহাদের কৃষ্ণনগরে কোন প্রয়োজন হইত, বাটী ও বাগান নির্মাণ। তাহারা প্রায়ই আমার এই বাটীতে অবস্থিত হইতেন। নগরের অভ্যন্তর হইতে আমার বাটী অনেক স্নিগ্ধকর বােধ হইত, এবং প্রথম কয়েক বৎসর বাটীতে প্রায় কোন পীড়া হইত না। যদি কখন উপস্থিত হইত, তাহাও যৎকিঞ্চিৎ আয়াসে দূর করা যাইত। যে স্থানে নির্মল বায়ুর সঞ্চালন হয়, যে স্থানে দুষণীয় বাষ্পেৎপত্তির কারণ না থাকে, এবং যে স্থানের ভিতর বাহির পরিষ্কার থাকে, সে স্থান যে স্বাস্থ্যজনক হয়, তাহা আমি বিলক্ষণ- রূপে বুঝিয়াছিলাম। যে সকল ইংরেজ, রাজার সঙ্গে আমার বাটীতে আসিতেন, তাহারা আমার বাটীর অবস্থা দর্শনে যথেষ্ট আনন্দ প্রকাশ করিতেন। একবার তৎকালীন কমিশনর চ্যাপম্যান সাহেবের স্ত্রী তাঁহাদের বাটাতে অনেক সাহেবের ও মেমের সাক্ষাতে আমার বাটীর প্রশংসা করিয়া কহিলেন যে, ইহার (আমার) বাটীটি ঠিক আমাদের বাটীর প্রণালীতে প্রস্তুত। আমি বাঙ্গালীর এ প্রকার বাটী অতল্প দেখিয়াছি।” হায়! এক্ষণে যদি সেই মেম ।
১২৬ আত্মজীবন-চরিত। সাহেব আমার বাটী পুনরায় দেখেন, তাহা হইলে কতই আক্ষেপ করেন। রাজাদের সময় আমি পূর্বাহ্রে রাজার কাৰ্য্য করিতাম, উদ্যানে অনুরাগ। অপরান্তে নিজের কাৰ্য্যে থাকিতাম। এক্ষণে প্রায় সৰ্ব্বদাই রাজবাটীতে থাকতে হয়, সুতাং বাটীর কাৰ্য দেখিবার অবকাশ হয় না। উপযুক্ত মালি ছিল না, নিজেই মালির কৰ্ম্ম করিতাম। বাগানী বা ভাণ্ডারী অথবা বেহারা কেবল আমার সাহায্য করিত। আমি নিজ হস্তে পুষ্পবৃক্ষের শাখা ছাটিতাম। আম্রের কলম বাঁধিতাম, এবং কখন কখন ফুল গাছের গোড়া খুড়িয়া দিতাম ও তাহাতে জসেক করিতাম। আর যে সকল বৃক্ষ বাড়িলে জঙ্গল হয়, তাহা দৃষ্ট মাত্র বিনষ্ট করিতাম। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জঙ্গল কাটিবার নিমিত্ত একগাছি যষ্টির নিম্নভাগে একখানি অস্ত্র যােগ করিয়াছিলাম। ঐ যষ্টি হস্তে লইয়া উদ্যানে বেড়াইতাম, এবং কোন স্থানে ক্ষুদ্র জঙ্গল দেখিলেই তৎক্ষণাৎ তাহ। ছেদন করিতাম। এই কাৰ্যটি , প্রায়ই নিজে করিতাম । বৈকালে দুই তিন ঘণ্টা এই সকল কার্যে প্রবৃত্ত থাকিতাম। এরূপ শ্রমে আমার কষ্ট হওয়া দূরে থাকুক, যথেষ্ট আনন্দ হইত। আমার মনে কোন কষ্ট হইলেই আমি এই রূপ কোন কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইতাম, আর তৎক্ষণাৎ তাহা বিস্তৃত হইয়া যাইতাম। এমন সাধের রমণীয় উদ্যান ক্রমশঃ অরণ্যবৎ হইয়া উঠি- আছে। ইদানীন্তন যুবকগণের ঈদৃশ পবিত্র আমােদজনক বিষয়ে উপেক্ষা দেখিয়া বড়ই আক্ষেপ হয়। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। বয়স ৩৫ হইতে ৪৫ বৎসর। কনিষ্ঠ রাজপুত্রের মৃত্যু। মহারাজা শ্ৰীশচন্দ্রের পরলােক গমন ও সতীশচন্দ্রের রাজ্যভার গ্রহণ। তাঁহার সম্পত্তির শ্রীবৃদ্ধি। নূতন চাকুরীতে অস্বীকার। আমার জ্বর। স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য দেশ পৰ্যটন। ম্যালেরিয়া জ্বরের উৎপত্তি। আমাদের কনিষ্ঠ রাজকুমারের উৎকট জ্বর ও প্লীহা হয়। রাজবাটীতে পীড়ার উপশম না হওয়াতে, তাহাকে প্রথমে শ্ৰীবনে কনিষ্ঠ রাজকুমারে পীড়া ও পরে ফরাসডাঙ্গায় লইয়া যাওয়া হইল । পীড়িত সন্তানের প্রতি পিতামাতার যাহা কৰ্তব্য, তাহার আমার জ্যেষ্ঠপুত্র দেওয়ান। ১২৭ ভার আমার প্রতি অর্পিত হইল। আমি দিবসে তাহাকে আহার করাইয়া দিতাম, এবং রাত্রিতে আমার ক্রোড়ের নিকট শয়ন করাইতাম। তিন মাস পরে পূজার সময় তাকে বাটা আনিলাম। পুনরায় রােগ বৃদ্ধি হওয়াতে, আবার তাহাকে ফরাসডাঙ্গায় লইয়া যাওয়া হইল। এবার রাজপুত্রের মাতৃস্বসা তাহার সঙ্গে থাকিলেন। আমি প্রয়ােজন মতে মধ্যে মধ্যে তথায় যাইতাম। আমার আত্মীয় ডাক্তার নবীনচন্দ্র মিত্র তঁাহার চিকিৎসা করিতেন। পীড়া বৃদ্ধি হওয়াতে, নবীন বাবুর অজ্ঞাতসারে অন্য দুইজন ডাক্তারকে দেখান হইল । মহারাজ। তৎকালে কলিকাতায় ছিলেন। আমিও কোন প্রয়ােজনানুসারে ফরাসডাঙ্গা হইয়া তথায় যাই। হঠাৎ মহারাজার সহিত সাক্ষাৎ হওয়াতে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন যে, “ভিন্ন ডাক্তার যাইয়া রাজপুত্রকে দেখাতে নবীন বাবু কি বলিয়াছেন ?” আমি উত্তর করিলাম, “তাহাতে আপনার অবমাননা বােধ করিয়া অত্যন্ত বিরক্ত হইয়াছেন।” রাজা কহিলেন, “তঁাহার এরূপ বােধ করা অতি অন্যায়।” আমি বলিলাম, “তিনি বৎসরাবধি প্রণপণে চিকিৎসা করিতেছেন, তাহাকে না বলিয়া অন্য ডাক্তার লইয়া যাওয়াতে আমাদেরই অন্যায় হইয়াছে। আমি তাহার সহিত সমভাবে তর্ক করাতে, তিনি অত্যন্ত ক্রোধ প্রকাশ পূৰ্ব্বক ‘আমি কাহার চাকর নহি,” এই বলিয়া প্রস্থান করিলেন। এই ঘটনার কয়েকদিন পরে ঐ রাজপুত্রের মৃত্যু হইল । কলিকাতা হইতে বাটী আসিলেন। সকলের সহিত সাক্ষাৎ হইল। আমি সাক্ষাতের প্রার্থনা করিয়া পাঠাইলে কহিলেন, তাহার অবকাশ নাই। ক্ষণাৎ আমার কলিকাতার তর্কের অবস্থা মনে পড়িল। সেই অবধি আমি রাজবাটী গমন করিলাম না। শুনিতে লাগিলাম, রাজা পুত্রশােকে উন্মত্ত প্রায় হইয়াছেন। এইবার রাজবাটী পরিত্যাগ করিবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিলাম। কিন্তু আপাততঃ এই শোকের সময় তঁাহার কৰ্ম্ম ত্যাগ করিলে পাছে নিন্দার ভাজন হই, এই আশঙ্কায় এ ভাব অপ্রকাশ রাখিলাম। কয়েকদিন পরে আমার জ্যেষ্ঠপুত্রকে ডাকাইয়া দেওয়ানী পদ দিলেন, এবং সম্মানসূচক এক পরিচ্ছদ প্রদান করিলেন। বুঝিলাম যে, তিনি আমার জ্যেষ্ঠপুত্র দেওয়ান। নিতান্ত হতবুদ্ধি হইয়াছেন। তাহার শােচনীয় অবস্থায় আমার অতীব মনঃক্লেশ হইতে লাগিল। কয়েক দিন পরে কয়েকজন আত্মীয়ের সহিত আমি বাটীতে বসা আছি, এমন সময় মহারাজা হঠাৎ তথায় আগমন করিলেন, এবং আমার মনােবেদনা দূর করিবার নিমিত্ত অনেক ১২৮ আত্মজীবন-চরিত। সস্নেহ বাক্য বলিলেন। আর গমনকালে আমাকে পর দিবস রাজবাটী যাইতে গাঢ় অনুরােধ করিয়া গেলেন। আমি তাহার শোকবিহ্বল ভাব দর্শনে যার পর নাই ব্যথিত হৃদয় হইলাম। আহা! তাহার এ শােচনীয় অবস্থা বহুদিন দর্শন করিতে হইল না। তিনি কয়েক মাস পরেই ইহলােক ত্যাগ করিলেন। প্রথমে রাজার শােকের জন্য, ও পরে তাহার পীড়ার জন্য, আমি কৰ্ম্মত্যাগ করিতে পারি নাই। এক্ষণে কুমার সতীশচন্দ্র রাজা হইলে, তাহার সম্পত্তির সমস্ত কার্য্যের ভার আমার প্রতি অর্পিত হইল। আমি রাজ। সতীশচন্দ্রের রাজ্যভার এক প্রকার তঁাহার অভিভাবক হইলাম। যে সময় গ্রহণ। রাজা শ্ৰীশ চল আমার উপর বিরক্ত হইয়াছিলেন সে সময় তাহার রাণীও আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন। কৌলীন্য প্রণালীতে আমাদের দেশের কতই অহিত হইতেছে। পাত্র পাত্রী উভয় কুলেরসদৃশ অবস্থা হইলে আদানপ্রদান যে সুখের হয়, উভয় কুলের অস- দৃশ অবস্থা হইলে তাহা সেরূপ সুখের হয় না। প্রায় দেশেই রাজকুমারের সহিত রাজকুমারীর বিবাহ হইয়া থাকে । কুলমৰ্যাদা সৃষ্টির পূর্বে এ দেশেও ঐরূপ প্রথা ছিল। ইদানীং কৌলীন্য বা সিদ্ধশ্রোত্রিয়তা কৌলীন্যে অহিত। রক্ষার্থ, অথবা মানবৃদ্ধি করণার্থ, সাধ্যাতীত না হইলে দুহিতাকে কুলীনে সম্প্রদান করিতেই হইবেক। কুলীন শ্রেণীর প্রায় অনেকেই ধনবান নহেন। সুতরাং ধনীর পুত্রেরা ধনীর কন্যা লাভের সম্ভাবনা প্রায়ই থাকে না। দরিদ্রপুত্র রাজ জামাতা ও দরিদ্রদুহিতা রাজরাণী হন। উভয় বৈবাহিক তুল্যাবস্থাপন্ন না হওয়াতে একজন আশ্রয়, অপর জন আশ্রিত, একজন অনুগ্রাহক, অন্যজন অনুগৃহীত হন। ইহাতে বৈবাহিক যা দাম্পত্য সুখের সম্ভাবনা কিরূপে হইবে ? পূর্বোক্ত মহারাণী পূৰ্ব্বে আমাকে বলিতেন, “আমার তিনটি পুত্র ; তাহার মধ্যে জ্যেষ্ঠ তুমি, অন্য দুইটি তােমার কনিষ্ঠ ও বালক। অতএব যাহাতে তাহাদের বিষয় বজায় থাকে, তাহা তােমার করিতে হইবে।” তখন তাহার কথা মত মনের ভাব রাণীর মৌখিক স্নেহ। ভাব কিনা, তদ্বিষয়ে সন্দেহ করিবার কোন কারণ উপস্থিত ছিল না। এক্ষণে বুঝিতে পারিলাম যে, তিনি পূৰ্বে যত স্নেহ প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহার কিছুই আন্তরিক নহে। যাহা হউক, সতীশচন্দ্রের পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী হওয়ার কিছুদিন পরে, তাহাকে আমি কহিলাম বেতন বৃদ্ধি। ১২৯ যে “এক্ষণে আপনার মাতাঠাকুরাণী আপনার অভিভাবিক। তাহার শ্রদ্ধা আর আমার উপর নাই । যখন শ্রদ্ধা গিয়াছে, তখন বিশ্বাসও গিয়াছে। আমি অনেক দিবসাবধি স্থানান্তরে যাইবার মানস করিয়াছি, কিন্তু আপনাদের বিপদের নিমিত্ত যাইতে পারি নাই। এক্ষণে আপনার আর কোনও বিপদের আশঙ্কা নাই, কৃপা করিয়া আমাকে বিদায় দিন। রাজা ছ ছল নয়নে উত্তর করিলেন যে, “তাহার শ্রদ্ধা থাকুক আর না থাকুক, আমারত সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আছে, তবে কেন যাইবেন ?” আমি তাহার ভাব দর্শনে সে দিন আর কিছু বলিতে পারিলাম না। পর দিবস রজিনাত আমাকে ডাকিয়া কহিলেন যে, “তােমার উপর আমার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস নাই, ইহা তােমার সম্পূর্ণ ভুল,” ইহা বলিয়া কতকগুলি ভৎসনা করিলেন। তার কথায় আমার মনােব্যথার কিছুমাত্র শান্তি হইল না, তবে তাহার পুত্রের ভক্তি ও স্নেহানু- রােধে রাজবাটী ছাড়িতে পারিলাম না। মহারাজা শ্রীশচন্দ্র প্রায় এক লক্ষপঁচাত্তর সহস্র টাকা ঋণ করিয়া যান। বর্তমান মহারাজকে প্রথমে সেই দায় হইতে মুক্ত করিতে আমার বিশেষ যত্ন হইল। ইহাকে পৈতৃক পদবী দেওয়াইতে রাজার ঋণ শোধ। কিছুই প্রয়াস পাইতে হয় নাই, স্বর্গীয় রাজা তাহার পথ মুক্ত করিয়া গিয়াছিলেন। সতীশচন্দ্র অনায়াসেই তাহা পাইলেন। রাজা পৈতৃক ঋণজাল হইতে যে এত শীঘ্র মুক্ত হইবেন, ইহা কেহই ভাবেন নাই। কিন্তু এ দায় এত অল্প কাল মধ্যে তিরােহিত হইল যে, সকলেই তাহাতে চমৎ- কৃত হইলেন। ইহাতে যে আমার একটা বাহাদুরী ছিল, তাহা নহে। আন্তরিক নিঃস্বার্থ-যত্ন থাকিলে প্রায় সকল সম্ভাবিত অভীষ্টই সুসিদ্ধ হয়। অদ্যপি আমার বেতন পঞ্চাশ টাকা ছিল। পূব্বে বলিয়াছি যে, শচন্দ্র বেতন বৃদ্ধি না করিয়া প্রথম বৎসরের তিন মাসে এক শত পঞ্চাশ টাকা, ও দ্বিতীয় বৎসরে ছয় শত টাকা অন্য বিষয়ে দেন। সুতরাং বেতন মাসিক পঞ্চাশ টাকাই অবধারিত থাকে। তৃতীয় বৎসরে তাহার পুত্রের পীড়া, চতুর্থ বৎসরে তাহার পুত্রশােক ও নিজের পীড়া প্রযুক্ত বেতন বৃদ্ধির বিষয় উত্থাপন করিতে পারি নাই। এ সমস্ত বিষয়ই সতীশচল জানিতেন। সুতরাং তিনি রাজা হইয়া আমার বেতন বৃদ্ধি করিবার বেতন বৃদ্ধি। প্রস্তাব করেন। কিন্তু এ বেতন বৃদ্ধির কথা বাহিরে প্রকাশ ছিল না। সুতরাং আপাততঃ এক শত টাকা বেতন নির্ধারিত হইল। ৩ আত্মজীবন-চরিত। সকলে ভাবিতে পারেন যে, আমি রাজাকে বালক পাইয়া আপনার বেতন একেবারে দ্বিগুণ করিয়া লইয়াছি ; এই আশঙ্কায় পূৰ্ব্বমত বেতনই লইতে লাগিলাম। প্রায় দুই বৎসর পরে যথন রাজার ঋণ প্রায় পরিশােধিত হইল, তখন এক শত টাকা বেতন ধার্য করিয়া লইলাম । রাজার ঋণ পরিশােধে যেমন যত্ন করিয়াছিলাম, তাহার আয় বৃদ্ধি কবিতেও তেমনই চেষ্টা করিতে লাগিলাম। ৪৫ বৎসরের মধ্যে রাজসম্পত্তির শ্রীবৃদ্ধি । ১২|১৩হাজার টাকা জমীদারীর কর বৃদ্ধি হইল। রাজ- সংসারের যেমন অবনতি ছিল, তেমনই উন্নতি হইতে লাগিল। যদি কেহ জিজ্ঞাসা করেন যে, “পূৰ্ব্ব বাজার সমযেও তুমি রাজসংসারে ছিলে, তবে ইহার দুর্দশা কেন হইয়াছিল ?” তাহার উত্তর এই যে এ রাজা আমাকে যাদৃশ ক্ষমতা দিয়া- ছিলেন, সে রাজা আমাকে তাদৃশ ক্ষমতা দেন নাই। আর ইনি যেরূপ আমারই প্রতি নির্ভর করিয়াছিলেন, তিনি সেরূপ করেন নাই। যদিও এ রাজাকে বিষয় কার্যে আবিষ্ট করিতে পারি নাই, তথাপি বিষয়ের কোন হানি হয় নাই। কারণ, তিনি আমার কোন উপদেশ হেলন করিতেন না। এবং য'হা করিতাম, তাহাই স্থিরতর রাখিতেন। এক্ষণে আমি সন্তোষের সহিত কার্য্য করিতে লাগিলাম । যখন প্রথমে ইন্কষ্ট্যাক্স স্থাপিত হয়, সেই সময় এ জেলার তৎকালীন কালেক্টর মাজিষ্ট্রেট সর উইলিয়ম হারসেল সাহেব আমাকে কৃষ্ণ নগরের আসেসরি কৰ্ম্ম দিবার জন্য, রাজার ইনকটেক্স এসেসরিতে নিকট আগ্রহ প্রকাশ করেন। রাজা অত্যন্ত অস্বীকার। চিন্তিত হইয়া তাহাকে কহেন যে, “দেওয়ানকে আমি এক শত টাকা বেতন দিই, আসেসরিতে তাহার তিন শত টাকা বেতন হইতেছে ; সুতরাং আমার কৰ্ম্মে থাকিলে তাহার অনেক ক্ষতি হইবে । কিন্তু তিনি যাইলে আমার অনেক কষ্ট হইবার সম্ভাবনা।” হারসে কহিলেন যে, “তােমার দেওয়ানের মত সকলের শ্রদ্ধাস্পদ লোক, আমি আর পাইতেছি না। তোমার দেওয়ানকে দেওয়ানকে এই কৰ্ম্ম দিতে সকলেই বলিতেছেন। এমন কি, এখানকার সদরঅলা, যাহার মুখে কাহারও প্রশংসা শুনা যায় না, তিনিও দেওয়ানের প্রশংসা করিয়াছেন। তাহার এ কৰ্ম্মও থাকে, ও কন্স ও হয় তাহারই জন্য কমিশনরকে লিখিব।” যদিও সাবে নানা যুক্তি দেখাইয়া এ বিষয় কমিশনার সাহেবকে লিখিলেন, কিন্তু দীনবন্ধু মিত্র । কমিশনর তাহার অনুরোধ রক্ষা করিলেন না। তিনি হারসেল সাহেবকে লিখিলেন যে রাজার কর্মত্যাগ না করিলে, গবর্ণমেন্টের কৰ্ম্ম তাহাকে দেওয়া যাইতে পারে না। রাজা নিজে বিষয়কাৰ্যদক্ষ হন নাই, সুতরাং আমার অভাবে তাহার বিস্তর অনিষ্ট হইবে এই বিবেচনা করিয়া আসেসরি কর্ম গ্রহণ করিতে রিলামনা। আমার যে কয়েকটি ভুলের কথা পূৰ্বে লিখিয়াছি তাহার উপর আর একটি বাড়িল। যাই হউক সে সময়ের ধনের অভাবের কোন কষ্ট ছিল না ও মনেরও কোনরূপ অসুখ হইত না। আমাকে রাজা পূর্বে সে রূপ মান্য করিতেন এক্ষণেও সেইরূপ ভাব ছিল, দাসত্বের কষ্ট কিছুই ছিল না। কেননা নিজের কর্মই করিতেছি এরূপ বােধ হইত । রাজবাটীতে যাহার মনে যাহা থাকুক, বাহের কাহারও বৈরিতা ছিল না বরং সকলেই আমাকে সন্তুষ্ট কৱিত। রাজা একশত টাকার উপর আমার আর বেতন বৃদ্ধি করেন নাই বটে, কিন্তু আমার পূর্বেকার যে ঋণ ছিল, তাহা সমস্ত রাজার সাহায্য। পরিশোধ করিয়া দিলেন, এবং মধ্যে মধ্যে নানা- বিধ পারিতােষিক প্রদান করিতেন। আর আমার সন্তোষ সাধনের জন্য সদা যত্নবান থাকিতেন, এবং আমার আত্মীয়গণকে লইয়া সতত আলাদ আমােদ করিতেন। পুরাতন বান্ধবের অতিরিক্ত সে সময় আমার কয়েকজন নূতন বন্ধুলাভ হইয়া- তন্মধ্যে বঙ্গবন্ধু দীনবন্ধু মিত্রের সহিত আমার বিশেষ প্রণয় হয়। এই সময়টি আমার বড় সুখের হইয়াছিল। যেন সুখ- দীনবন্ধু মিত্র। সাগরে নিরন্তর সন্তরণ করিতেছিলাম। “সুশান্তে দুঃখের ভার বহিতে হবে” ইহা মনের নিকটেও আসিতে পারিত না বিষয় কার্যের সময়েও আমাদের ভঙ্গ হইত না। প্রাতে যখন রাজা চা সেবন করিতেন, ও রামতনু বাবু প্রভৃতি অনেক সুহৃদ্বর থাকিতেন, সেই সময় আমি রাজার নিকট বসিয়া চা খাইতাম, এবং বিষয় কার্সের কথা কহিতাম ; কখন বা আত্মীয়দিগের সৃহিত আলাপ করিতাম । কাৰ্যও চলিত, অথচ আমােদও হইত। একদা, আমার আত্মীয় বাবু শ্যামাচরণ ভট্ট উকীল আমাকে লিখিলেন যে, নবাব নাজিমের দেওয়ান রাজ। প্রসন্ননারায়ণ দেব বাহাদুর আপ- নাকে নায়েব দেওয়ানী পদ দিতে ইচ্ছা করেন। যদি আপনার অনুমতি পাই, তাহা হইলে তাহাকে আপনার সম্মতি জানাই। এমন সম্মানীয় নূতন বন্ধু লাভ। ছিল।
আত্মজীবন-চরিত। ও দুর্লভ কৰ্ম্ম আমার মত অল্প পরিচিত লােককে এই দেব বাহাদুর কেন , দিতে চাহেন, তাহা বুঝিতে না পারিয়া, শ্যাম বাবুর পত্রের উত্তর দিলাম যে, “পূজার সময়ের আর বিলম্ব নাই, অতএব তুমি বাটী নবাব নাজিমের নায়েব দেওয়ানী আসিলে তােমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া যথা কৰ্তব্য পদ গ্রহণে অসম্মতি। স্থির করিব।” কিছু দিন পরে শুনিলাম যে, উক্ত দেওয়ান মুরশিদাবাদ হইতে ডাকযােগে কলিকাতায় গমন কালে গােয়াড়ীর ডাকঘরে যখন বিশ্রাম করেন, সে সময় আমার বাটী কত দূর, কোন কোন কোন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। ইহাতে বােধ হইল, আমার আত্মীয়ের প্রস্তাব অমূলক নহে। পূজার পর শ্যাম বাবুর সহিত সাক্ষাৎ হইল, আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম যে, রাজা বাহাদুরের অনেক আত্মীয় বন্ধু অবশ্যই আছেন, তাহাদিগকে এরূপ উচ্চ পদ না দিবার কারণ কি? তিনি উত্তর করিলেন, তাহার আত্মীয় স্বজন সকলই কলিকাতাবাসী, ইনি কলিকাতায় কোন লােককে নেজামতে আনিতে চাহেন না। ইংরেজী ও পারস্য জ্ঞাত থাকেন ও সচ্চরিত্র হন, এমনই একটি মফঃস্বলের লােককে ঐ কৰ্ম্ম দিতে চাহেন। আমি আপনার পরিচয় দেওয়াতে কহিলেন, বেশ, তাহার সহিত আপনার আলাপ আছে, আচ্ছা, তাহাকে এখানে আসিতে লিখুন। আপনার পত্র পাইতে বিলম্ব হওয়াতে তিনি আমাকে কহিয়াছেন যে, যদি তিনি কৰ্ম্ম স্বীকার করেন, তবে পূজার পর আপনি তাহাকে তাহাকে সঙ্গে করিয়া কলিকাতায় আমার নিকট যাইবেন। শ্যামের কথা সাঙ্গ হইলে, আমি কহিলাম, ভাই । আমার বােধ হইতেছে, তিনি চালাক লােককে ভয় করেন, এ কারণ সাদাসিদা লােক চাহেন । তাহার নিকট ধৰ্ম্মের বড় আদর নাই। সুতরাং আমি তঁাহার সহকারী হইতে সাহস করি না। আমার, সহিত সুহৃদ্ভাব অধিক কাল থাকিবার সম্ভাবনা নহে । এ কৰ্ম্ম গ্রহণ না করায় বিবেচনা কি অবিবেচনার কাৰ্য্য হইয়াছিল, তাহা বলিতে পারি না। কিন্তু ইহার জন্য আমার কখন অনুতাপ হয় নাই। এক বর্ষ পরে আবার উপরিউক্ত সুহৃদ্বর মুরসিদাবাদ জেলার লালগােলার জমীদারের দেও- লালগোলার জমিদ'রের দেও- যানীর প্রস্তাব করিয়া আমাকে এইরূপ লিখেন যে, যানী পদ অস্বীকার। উক্ত জমিদার আপনাকে আপাততঃ তিন শত টাকা বেতনে নিযুক্ত করিবেন, এবং এক বৎসর আপনার কার্য পরিচালন দেখিয়া ।
মনুষ্য ভাগ্য। A হইবে । আর দুই শত টাকা বেতন বৃদ্ধি করিয়া দিবেন। আপনি একবার সেখানে আসিবেন। যদি কৰ্ম্ম মনােমত হয়, গ্রহণ করিবেন; নচেৎ ফিরয়া যাইবেন। আপনার গমনাগমনের সমস্ত ব্যয়ের টাকা তিনি দিবেন। এই পত্র যৎকালে আইসে, তৎকালে আমি কলিকাতায় ছিলাম । মহারাজা ঐ পত্র খােলেন, এবং তাহা পাঠ করিয়া অতিশয় চিন্তিত হন। আমি প্রত্যাগত হইলে, ঐ পত্রের প্রসঙ্গ করিয়া কহিলেন যে, আপনি আমার লাভের নিমিত্ত নিজের অনেক ক্ষতি করিয়াছেন। কিন্তু আমার যেরূপ অবস্থা, তাহাতে আমি আপনাকে দুইশত টাকার বেতনের অধিক দিতে পারি না। সুতরাং, আমি আর আপনাকে কিরূপে রাখিতে পারি ? রাজার কাতর ভাব দর্শনে আমি কহিলাম যে, “আমার সমৃদ্ধিশালীর ন্যায় চলিবার অথবা ধনসঞ্চয় করিবার ইচ্ছা নাই। ভদ্রলােকের মত চলিতে পারিলেই আমার বাসনা পূর্ণ অতএব আমি মাসিক দুই শত টাকা পাইলেই সন্তুষ্ট হইয়া থাকিব। সতরঞ্চ খেলার যে চলে পরিশেষে মাৎ হইতে হইবে, তাহা পূৰ্ব্বে জানিতে পারিলে, কেহই সে চাল চালিত না। জয়লাভ সংসারযাত্রা ও সতরঞ্চ ক্রীড়ার আশাতেই সকল চাল চলিয়া থাকে। পরে যখন তুলনা। ঐ চালের দোষে বাজী হার হয়, তখন মনে হয়, এ চাল কেন চালিয়াছিলাম। আমার এক্ষণে ঠিক সেই দশা হই- আছে। বর্তমান অবস্থার প্রতি দৃষ্টি করিয়াছি, ভবিষ্যতের দিকে নেত্রপাত করি নাই। তখন ভাবিয়াছিলাম যে, দূরদেশে যাইলেও নুতন সম্প্রদায়ে পড়িলে ধন- লাভ হইবে বটে, কিন্তু সুখের নূ্যনত হইয়া যাইবে । পুত্র কয়েকটি বিদ্যাভ্যাস করিতেছে। যদিও রাজবাটী হইতে পেশেন্ পাইবার সম্ভাবনা বা স্থিরতা নাই,, তথাপি পূত্র কৃতী হইলে সে অভাব মােচন হইবে । সুতরাং আমি দীর্ঘজীবী হইলেও ভবিষ্যতে অর্থাভাবে আমার আমার কষ্ট • পাইবার সম্ভাবনা নাই। তৎকালে এই রূপ বিবেচনা করিয়াই লাল গােলার কৰ্ম্ম গ্রহণ করিলাম না। ভাবী কাল অন্ধকারময়। তাহার মধ্যে বিচরণ করিতে, কাহার ভাগ্যে কি ঘটিবে, তাহা কেহই নিশ্চয়ই অবধারণ করিতে পারেন না। কেহ বা নিরাপদে উত্তীর্ণ মনুষ্য ভাগ্য। বা প্রতিপাদক্ষেপে পতিত হন, আবার উত্থান করেন, আর কেহ বা পড়িয়া আর উঠিতে পারেন না। হয়। হন ;
১৩৪ আত্মজীবন-চরিত। সুতরাং আমি যে কাৰ্যান্তরে প্রবৃত্ত হইলে আমার আর বর্তমান কষ্ট হইত না। তাহারই বা নিশ্চয়তা কি ? তনয়দিগের কৃতী হইবার সে আশা করিয়াছিলাম, তাহা পূর্ণ হইয়াছে তাহ পূর্ণ হইয়াছে তবে ধন সমাগম আশা পূর্ণ না হওয়াতেই আমার এই ক্লেশ ভােগ হইতেছে । এ আশা অনেকেরই সফল হইয়া থাকে । সুতরাং আমার যে এ আশা নিতান্ত দুরাশ হইয়াছিল, তাহা হে। সমান-অবস্থাপন্ন হইয়াও মনােরথ পূর্ণ করণে কেহ বা সক্ষম হয়, কেহ বা অক্ষম হয়। তুল্যাবস্থান্বিত লােকের কথা দূরে থাকুক, একজন অসাধারণ বুদ্ধি ও ক্ষমতাপন্ন হইয়া সৌভাগ্যের মুখ দর্শন করিতে পায় না ; আর একজন যৎসামান্য বুদ্ধি ও ক্ষমতা স্বত্বেও অনায়াসে সৌভাগাশালী হইয়া উঠে। এই কারণেই ভাগ্যের ফলাফলের কথা প্রবাদিত হইয়াছে। যেহেতুক যখন কোন বিষয়ের কারণ নিৰ্বাদিত হইয়া উঠে না, তখনি সে বিষয় অলৌকিক সংঘটনার মধ্যে পরিগণিত হয়। ১৮৬৪ খৃঃ অব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসে যে সংক্রামক জ্বর কৃষ্ণনগরে দেখা দেয় তাহা প্রথমে যশােহর জেলার অন্তর্গত মহম্মদপুর গ্রামে সংক্রামক (ম্যালেরিয়া জ্বর। দৃষ্ট হয়। তথা হইতে ক্রমে ক্রমে অনেক স্থান উৎসঃ দিয়া : ৮৩২ কি ৩৩ - খৃঃঅব্দে নদীয়া জেলার অন্তঃপাতী গদখালি গ্রামে প্রবেশ করে। সেখান হইতে বহুসংখ্যক গ্রামের মধ্য দিয়া ১২৬৯ বাঃ অব্দে এ নগরের বারুইপাড়া পল্লিতে উপস্থিত হয়। দ্বিতীয় বৎসর অন্য পাড়ায় দেখা দেয়। আমার বাটীতে ১২৭১ বাঃ অব্দে প্রবিষ্ট হয় । সমস্ত পরিবার পুনঃ পুনঃ পীড়িত হওয়াতে দ্বিতীয় বৎসর কার্তিক মাসে বাটী ত্যাগ করিয়া গােয়াড়ীর মালােপাড়ার সন্নিহিত একটি আমার জ্বর। বাটীতে অবস্থান করি। সেখানে যাইয়া পরিবারের অনেকেই সুস্থ হন। কিন্তু আমার রােগ ক্রমশই বৃদ্ধি হইতে থাকে । শেষে জলবায়ু পবিবর্তনের জন্য প্রথমে শান্তি বায়ু পরিবর্তনে নিদ্ভূমণ। পুর যাইয়া ১৫ দিবস থাকি । সেখানেও কোন প্রতিকার বােধ না হওয়াতে পশ্চিমাঞ্চলে যাই । প্রথমে তিন দিন বর্ধমানে থাকি ও পরে ভাগলপুরে যাইয়া অবস্থিত হই। বর্ধমান। ১২৭২ অব্দের ২১শে মাঘ শান্তিপুর হইতে যাত্রা করিয়া ২৬শে ভাগলপুরে উপনীত হই। ডাক্তার কালীবাবু ও আমার অগ্রজ মহাশয় আমার সঙ্গে ছিলেন। আমার অরুচি অক্ষুধা এতাধিক প্রবল ছিল অন্য খােসরােবাগ। ১৫ হইল ? যে ভাগলপুর পৌছিয়। প্রথম দিন অন্ধ্র পােয় দুগ্ধ মাত্র পান করি । সে প্রদেশের জলবায়ুর এমনি গুণ যে ভাগলপুর। সপ্তাহ মধ্যে আমার আহার ও বলবৃদ্ধি পঞ্চদশ দিবসে আমি এক পােয়। পথ ভ্রমণ করিতে পারলাম। এখানে চিকিৎসকেরা আমার আয়ুঃ শেষহইয়াছে এইরূপ ভাবিয়াছিলেন, কিন্তু আমার মনে কিছুমাত্র সে আশঙ্কা হয় নাই। আমার মনে ছিল যে অরুচিকে দমন করিতে পারিলেই জ্বরে কোন অনিষ্ট অনিষ্ট হইবে না। আহার করিতে পারিলেই বল হইবে ও বল পাইলেই জ্বর যাইবে। কিন্তু বৎসরাবধি যে দুর্জয় জর মজ্জাগত হইয়া রহিয়াছে তাহাকে সহসা দূরীভূত করা সহজ নহে। সপ্তদশ দিবসে জ্বর পুনরায় বল প্রকাশ করিল। এই জরের সংবাদ পাইয়া মহারাজ। ২৩শে ফাল্গুন ভাগলপুরে উপস্থিত হইলেন এবং তথা হইতে আমাকে এলাহাবাদে লইয়া গেলেন। এই সংক্রামক জ্বরের যন্ত্রণায় রামতনু বাবু ইহার পূৰ্ব্ব হইতে এলাহাবাদ। ভাগলপুরে ছিলেন। তিনিও আমাদের সঙ্গী হইলেন। তৃতীয় দিবসের প্রত্যুষে আমরা এলাহাবাদে উপনীত হইলাম । মহারাজ। খােসরোবাগ নামে এক রমণীয় উদ্যানে আমাদিকে লইয়া গেলেন এবং তন্মধ্যস্থ একটা উচ্চ মণ্ডপে আমাকে তুলিলেন। খোসরোবাগ। সে সময় অরুণকিরণের আভায় উদ্যানের যেমন পােভা হইয়াছিল, সুগন্ধ গন্ধবহের মন্দ মন হিল্লোণে। তেমনি চতুর্দিক সুস্নিগ্ধ হইয়াছিল। আমার শরীরের ও মনের এতদুর স্মৃর্তি হইল, যেন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়াছি এই রূপ বােধ হইতে লাগিল। হৃদয়ের উল্লাসে “কি স্বদেশে কি বিদেশে যথায় তথায় থাকি, তােমার রচনা মধ্যে তােমাকে দেখিয়া ডাকি” এই ব্ৰহ্ম সঙ্গীতটী গাইতে লাগিলাম। তথায় দুই ঘণ্টা থাকিয়া নির্দিষ্ট বাসস্থানে উপস্থিত হইলাম। দুই দিন পরে মহারাজা আমাকে আগ্রায় ও দিল্লীতে লইয়া যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। কিন্তু গত দিবস হইতে শরীর অত্যন্ত দুর্বল হওয়াতে যাওয়া ঘটিল না । মহারাজ, গৃহাভিমূখে যাত্রা করিলেন, রামতনু বাবু ও আমি একটি দ্বিতল বাটীতে অবস্থান করিতে লাগিলাম। আমার ক্ষুধা ও বল ক্রমশঃ বৃদ্ধি হইতে লাগিল। কলিকাতানিবাসী তৎকালীন ঐ নগরবাসী বাবু নীলকমল মিত্র আমাদের প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ প্রকাশ করেন। আমাদের রাম- ১ আত্মজীবন-চরিত। দাস খ। ভায়া ও হরিশচন্দ্র সরকার তৎকালে ঐ খানে কর্ম করিতেন। আমরা তঁাহাদের বাসায় আহাৱাদি করতাম । তাহারা উভয়ই আমাদিগকে স্বচ্ছন্দে রাকিতে যার পর নাই যত্ন করেন। রৌদ্র বৃদ্ধি হওয়াতে আমরা সেখান হইতে প্রস্থান করিলা রামতনু বাবু ভাগলপুরে রহিলেন। আমি কলিকায় আ স ম । এখানে কথন বাবু, ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাসাতে কথন সাঁতরাগাছির বাবু মথুরামােহন কলিকাতা। ভাদুড়ীর বাটিতে বাস করিতে লাগিলাম। ইহার ৮ কি ৯ বৎসর পূৰ্ব্বে এই মথুরামােহন ভাদুড়ী, সদানন্দ চোধুরী এবং বিহারীলাল ভট্টাচার্যের সহিত আমার আলাপ হয় এবং অনতিবিলম্বে বিশেষ প্রণয় জন্মে। ইহার জন্মে। ইহার আমাকে যেমন শ্রদ্ধা করেন তেমনি ভাল বাসেন। ইহাদের ন্যায় অকপট অকপট আত্মীয় তাতি দুর্লভ। আমার পীড়িত অবস্থায় ইহার। যে স্নেহের সহিত আমাকে সুস্থ করিবার যত্ন করিয়াছেন তাহা আমি কখনও বিস্মৃত হইতে পারিব না। ডাক্তারেবা আমাকে আগামী পৌষ মাস পর্যন্ত বাটা আসিতে নিষেধ করেন। কারণ যদিও রােগের প্রায় শান্তি হইয়াছিল কিন্তু যেমন কৃশ তেমনি দুর্বল ছিলাম । তথাপি রাজ বাটীর কোন বিশেষ প্রয়ােজনানুবোধে বাটী আসিতে হইল। আষাঢ় মাসের দশম দিবসে বাটীতে প্রত্যাগত হইলাম। মহারাজ। বাটী প্রতাগমন । আমার প্রত্যাবর্তন বার্তা শ্রবণ মাত্র আমাকে দেখিতে আসিলেন। এবং কিয়ৎক্ষণ পরেই রাজবাটা লইয়া গেলেন । কাহারও প্রিয়তম পুত্র কালকবল হইতে মুক্তি পাইলে সে যেমন আহলাদিত হয় তিনি আমি সুস্থ শরীরে ফিরিয়া আসাতে তেমন আলাদ প্রকাশ করিলেন। আমাদের এ প্রদেশে ৮০৯০ বৎসর পূর্বে যেরূপ স্ত্রীপুৰুষ জন্মেন তাহার পর আর সেরূপ স্ত্রীপুরুষ ভূমিষ্ট হন নাই। পর পুরুষের আহার, বল, সাহস সকলই . পূর্ব পুরুষদের হইতে নূন হয়। যাহাদের যত পরে পর পুরুষের বীর্যহীনতা। জন্ম হইতে লাগিল তাহাদের সেই পরিমাণে ঐ ' সকল হ্রাস হইয়া গেল। এই সকল বিষয়ে পিতার মত , অগ্রজ হইতে পারেন নাই। আবার আমি হজের মত হইতে পারি নাই। এইরূপ যিনি যত বিলম্বে জন্মিতেছেন তিনি তত কৃশ, অল্প-আহারী ও দুৰ্বল হইতেছেন! কেন দেশের এ দুর্দশা হইল তাহার কোন কথাই পূর্বে ছিল না। পরে যখন আমাদের বয়স্ক লােকদের বিবেচনা শক্তি হইল তখন এ • মৃত্তিকায় ম্যালেরিয়া। বিষয়ের আন্দোলন হইতে লাগিল। কেহ কেহ অনুমান কাতে লাগিলেন যে, বাকদের পূবকার মত খেলাধূলা না থাকাতে ও লেখা পড়ায় মানসিক শ্রম অধিক হওয়াতে শরীর কৃশ ও দুৰ্বল হইতেছে । কেহ ব' বােধ করিলেন যে দপি, দুগ্ধ, ঘৃত প্রভৃতি গব্যরস ইদানীং দুর্মূল্য হয়াতে বালকেরা পুষ্টিকর ও বলকর আহার পায় না বলিয়া দুৰ্বল হইয়া যাইতেছে । এইরূপ নানা বিবেচক নানা প্রকার কারণ কনুভব করিতেন। কিন্তু ইদানীং সংক্রামক জ্বরের উৎপত্তির কারণ এক স্থানে যেরূপ অনুমিত হয় স্থানান্তবে তাহা সঙ্গত বােধ হয় না। সেইরূপ উপরিউক্ত বিষয়ের কোন সংক্রামক (ম্যালেরিয়া জ্বরের স্থিল সিদ্ধান্ত হয় না। যেহেতুক যদি মানসিক উৎপত্তির কারণ। পরিশ্রমে স্কুলের বাকিদের এই অবস্থা হইয়া থাকে তবে যে সকল গ্রারে বা পরিবারের বালকেরা মােটে লেখা পড়া করে না তাহাদের এ দুর্দশা কেন হয় । আর তেজস্কর আহার অভাবে ক্ষীণাবস্থা হইলে ধনাঢ্য ব্যক্তিবৃন্দেব বালকেরা কেন দুর্বল হইয়া থাকে ? আমার বােধ হয় যে কারণেই হউক আমাদের দেশে যে সময় ক্ষুধার ও আহারের অল্পতা ? দৌর্বলের প্রবলতা হইতে আরম্ভ হইয়াছে সেই সময় এই সংক্রামক বীজ জন্মিয়াছে। যেমন বীজ হইতে বৃক্ষ উৎপন্ন হইয়া ক্ৰমশঃ শাখ। পল্লব সহিত বর্ধিত হয ? শেষে ফুল ফল ধারণ করে, সেই রূপ ঐ বীজ হইতে অক্ষুধা ও দাৰ্বল্য জন্মিয়। এখানে জ্বরে পরিণত হইয়াছে। ৮০, ৯০ বৎসর হইতে কেবল আমাদের ক্ষুধা ও বল প্রভৃতি বিষয়ের পরিবর্তন হইয়াছে এমত নহে। তা মাদের যাতুর ও বিকৃতি জন্মিয়াছে। আমাদের ব্যাবস্থায় বৃদ্ধরা কহিতেন যে, পূৰ্বে বিকার রােগে যে ঔষধ ব্যবস্থা হইত তাহা এঙ্গণে সামান্য জরে প্রয়ােগ করলেও সেরূপ ফলোদয় হয় না। তবেই দেখা যাইতেছে যে, দেশের ভূমিগত কান দোষের বীজ বহু দিন পূৰ্বে জন্মিছে। হঠাৎ এ দোষে সৃষ্টি হইছে এরূপ বােধ হয় না। আর দোষে কারণ ভূমিব উপবে রহিয়াছে মৃত্তিকায় ম্যালেরিয়া। তাহাও অনুমানে আইসে না । এ দোষ ভূমির নিম্নস্থানে জন্মিয়াছে। তাহা না হইলে কান বত্মে র এক পার্শ্বস্থ সকল গৃহে এ পীড়া ধরিয়াছে অপর পার্শ্বস্থত কোন গৃহে দৃষ্ট হয় না । উভয় পার্শ্বস্থ লোকের আহার ব্যবহারে কোন বিষয়ে বিভিন্নতা নাই। এই গােয়াড়ীর সাহেবের। যে দিকে অবস্থিত সে দিক যেমন প্রশস্ত তেমনি ০ ১৩৮ আত্মজীবন-চরিত। পরিষ্কার, আর যে দিকে বাঙ্গালীরা থাকেন সে দিক যেমন অপ্রশস্ত তেমনি অপরিষ্কার। আর সাহেবেরা যেরূপ স্বাস্থ্যকর অবস্থায় থাকেন বাঙ্গা- লীরা তেমনি অস্বাস্থ্যজনক অবস্থায় থাকেন। তবে বাঙ্গালীদের অপেক্ষা এই সাহেবদের পীড়া অধিক হইতেছে কেন ? সপ্তম পরিচ্ছেদ। বয়স ৪৬ হইতে ৫০ বৎসর। আমার শূলরোগ। রাজার অস্বাস্থ্য ও অপবায়। ১৯৭৪ সালের ভীষণ ঝটিকা। ম্যালেরিয়ায় দেশের দুর্দশা। রাজার বিদেশ বাস। তাহার মৃত্যু। রাজবাটীতে গােলযোগ। রাণীর অনুগ্রহ। কোর্ট অব ওয়ার্ডসের নবদ্বীপ-রাজ:সম্পত্তির ভার গ্রহণ। আমি বহু আয়াস ও ব্যয় করিয়া জ্বরের হস্ত হইতে মুক্ত হইলাম বটে কিন্তু অধিক কাল স্বাস্থ্য সুপভোগ করিতে শূলরোগ। রিলাম না। ১২৭৩ বা হারে ১২ই অগ্র- হায়ণে শূলরােগগ্রস্ত হইলাম । এতাধিক যন্ত্রণা হইল যে, ' আত্মহত্যার ইচ্ছা হইতে লাগিল । প্রায় ৫ বৎসর পর্যন্ত এই দুর্জয় পীড়াতে মধ্যে মধ্যে যন্ত্রণা পাই । এই রোগগ্রস্ত কেহ কেহ যে কি জন্য আত্মহত্যা করিয়াছে তাহা আমি বুঝিতে পারিলাম। ইহার যন্ত্রণা সহ্য কর। অতীব দুষ্কর । কত প্রকার ঔষধ সেবন করিলাম কিন্তু কিছুতেই রােগের শান্তি হইল না। শেষে দৈনিক অহিফেণ সেবন অভ্যাস করাতে এ যন্ত্রণা দূর হইল । বিধাতা যেমন রােগ সৃষ্টি করিয়াছেন, তেমনি তাহার ঔষধও দিয়াছেন। অহিফেণে আমার অম্লরােগ পর্যন্ত দুরীভূত হইল। এই বােগ পিতা- মহের, পিতার ও অগ্রজের এবং কোন কোন ভগ্নীর ছিল। অহিফেণ না থাকিলে বােধ হয় এ পাড়ার যাতনা সহ্য করিতে পারিতাম না। যখন বেদনা ধরিত তখন যতক্ষণ পরেই হউক শেষে অহিফেণ সেবনে ইহার শান্তি হইবে এই বিশ্বাস থাকাতে জীবন ধ্বংস, না করিয়া ৪৫ ঘণ্টা পর্যন্ত এই যম যন্ত্রণা সহ্য করিতাম। বেদনা উপস্থিত হইলে দুই জন তৈল জল দিয়া আমার বক্ষঃস্থল, উদর, পঞ্জর ও পৃষ্ঠদেশ বলপূৰ্ব্বক , পুনরায় ঋণ। ১৩৯ মর্দন করিত। জল পান করিয়া পুনঃ পুনঃ ৰমন করিতাম । বমন করিতে করিতে যখন উদর মধ্য পরিস্কৃত হইত, তখন অহিফেণ খাই- তাম এবং এক ঘণ্টা পরেই রােগের আক্রমণ শিথিল হইয়া আসিত। আমি পশ্চিমাঞ্চল পশ্চিমাঞ্চল হইতে আসিয়া রাজবাটী যাইয়া দেখিলাম যে, আমার অপেক্ষায় অনেক কাৰ্য্য স্থগিত রহিয়াছে। মহারাজা নিজে কোন্ বিষয় কি কৰ্তব্য তাহা স্থির করিতে পারেন নাই, বা অন্যের বিবেচনার উপর নির্ভর করতে পারেন নাই। আমি সমীপম্ভ হইব। মাত্র সমস্ত চাবি কুঞ্জী আমার হস্তে প্রত্যর্পণ করিলেন। কিছু দিন পরে কিছু দিন পরে ( ১২,৭২ বাঃ অব্দের ভাদ্র মাস) চারি শত টাকা মূল্যের এক স্বর্ণের ঘড়ি চেনসহিত উপঢৌকন স্বরূপ দিলেন। তাহার অনুগ্রহে ও স্নেহে বড়ই অনুগৃহীত ও প্রীত হইলাম বটে কিন্তু তাহার শারীরিক অবস্থা রার শারীরিক অবনতি। দর্শনে অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয় হইতে লাগিলাম । তিনি শারীরিক নিয়ম লঙ্ঘনে অতিশয় কৃশ ও দুৰ্বল হইতেছিলেন। বিষয় ব্যাপারে আমার উপদেশ গ্রহণ করিতেন কিন্তু তাহার শারীরিক সম্বন্ধে সদুপ- দেশ দিলে বিরক্ত হইতেন। তাহার রাণী সাতিশয় উৎকণ্ঠিত হইয়া নিজে ও আত্মীয় স্বজন দ্বার তাহাকে নিয়মাবদ্ধ করণ বিস্তর যত্ন করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাদের সকল চেষ্টাই বিফল হইতে লাগিল। রাজা শরীরের হানি যেরূপ করিতেছিলেন ইদানীং বিষয়ের হানি ০ সেইরূপ করিতে লাগিলেন। তিনি গােপনে ঋণ করতেন এবং যখন তাহা প্রকাশ করিতে বাধ্য হইতেন, তখন তাহা আমার পরিশোধ করিতে হইত। পুনরায় ঋণ। প্রত্যেক বার যখন তঁাহার ঋণ শোধ দেওয়া যাইত তিনি অঙ্গীকার করিতেন যে, আর কখন অধিক ব্যয় বা ঋণ করিবেন । কিন্তু পরে তাহা মনে রাখিতেন না। তাহার এইরূপ অব্যবস্থিত- চিত্তের ন্যায় কাৰ্য্য দেখিয়া তাহাকে পুনঃ পুনঃ কাহতাম যে, “আপনি এইরূপে চলিতে। আপনার সম্পত্তি ক্রমশই ক্ষয় পাইবে, এবং আমাকেও কলঙ্ক-ভাজন হইয়া যাইতে হইবে।” তিনি যখনই এরূপ কথা শুনি- তেন তখনি তাহার চক্ষু ছল ছল হইত এবং ভবিষ্যতে যদি আর এই- রূপ দেখেন তবে যাইবেন” এই রূপ বলিতেন। আমি প্রস্থান করিলেই তাহাব বিষয় ছারখার হইয়া যাইবে এই আশঙ্কায় প্রায় দুই বৎসর কর্ম ত্যাগ করলাম না ।
১৪০ আত্মজীবন-চরিত। একদা কোন কথা প্রসঙ্গে আমার কোন সহকারী কর্মচারিকে কহিলাম যে, আমার এখানে আর থাকা কর্তব্য সহকারী কর্মচারির অনিষ্টের বোধ হইতেছে না”। যখন এই কথা বলি তখন চেষ্টা। আমি নিশ্চয় কৰ্ম্ম ত্যাগ করিব এরূপ স্থির করি নাই। তথাপি তথাপি ঐ কৰ্ম্মচারী কি অভিসন্ধি করিয়া এই কথা রাজার কর্ণগােচর করিলেন। পর দিন রাজা আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে “আপনি কি এই কথা বলিয়াছেন”? আমি উত্তর করিলাম যে “এক্ষণ পর্যন্ত আমি এ বিষয় কিছু স্থির করি নাই। কিন্তু আমি আর আপনার অমঙ্গল দেখিতে পারি না। যদি অামা দ্বারা মঙ্গল সাধন না হয়, তবে আমার এখানে থাকা না থাকা তুলা”। সে সময় তাহার মনের সহজাবস্থা ছিল না। এ কারণ আমি তখনই তাহার নিকট হইতে উঠিয়া কাছারিতে অসিলাম। কিঞ্চিৎ পরেই তঁাহাব একজন আমলা আসিয়া আমাকে কহিল সে, “মহারাজা আপনাকে জানাইতে আদেশ করিলেন যে, যদি তাহার কার্য করিতে আপনার অনিচ্ছা হইয়া থাকে তবে আপনার নিকট যে সকল বি আছে তাহা আমাকে দেন” । আমি কহিলাম “তুমি রাজার একখানি পত্র লইয়া আইস” । সে তৎক্ষপ পত্র আনিল, এবং আমিও চাবি দিয়া বাটী আসিলাম। এবং তাহার ষে দুই চারিটা দ্রব্য আমার নিকট ছিল তাহা পাঠাইয়া কৰ্মত্যাগ ও পু• নিয়োেগ। দিলাম, কিন্তু তিনি তাহা গ্রহণ না করিয়া ফিরিয়। পাঠাইয়া দিলেন । শুনিতে লাগিলাম যে, আমি বিদায় হওয়াতে রাজা অতিশয় দুঃখিত হইয়াছেন এবং ' আক্ষেপ করিতেছে ন! তৎকালে আমার অতি নিকট সম্পর্কীয় কোন ব্যক্তি রাজাব নিজ বংয়ের কর্মচারী ছিলেন। তিনি ৪ দিন পরে আসিয়া আমাকে কহিলেন যে, “তােমার রাজবাটী যাইতে হইবে”। আমি ষাইতে অসম্মত হওয়াতে কহিলেন যে, “তুমি না যাইলে রাজা আহার করিবেন না।” এইরূপ অনেক কথার পরে আমি আর তাহার অনুরােধ ছাড়াইতে পারিলাম না। আমি নিকটস্থ হই। মাত্র ৪ রাজা আমার হস্তে সমস্ত চাবি দিলেন। তৎকালে বাহিরের কোন কোন লােক থাকাতে আমি আর আমার মনের কথা কিছু বলিতে পারিলাম না । পর দিন রাজা নিজ অবিবেচনার কার্যের জন্য অনুতাপিত হইলেন এবং আবার কৰ্ম্মত্যাগ ও পুননিয়ােগ। ১৪১ আমিও ; এই পত্রের । আত্মশোধনের প্রতিজ্ঞা করিতেন। কর্মে পুনরায় প্রবৃত্ত হইলাম । রাজা যখন আমাকে তঁাহার কৰ্ম্ম ত্যাগ করণে উদ্যত দেখিতেন তখনি পরিমিতব্যয়ী হইবার অঙ্গীকার করিতেন এবং তানতিবিলম্বেই তাহা বিস্মৃত হইতেন পূৰ্বে দেখিয়া ছ। তথাপি যার শুভাশুভ হৃদয়ের শোণিতের সহিত মিশ্রিত হইয়াছে, তাহার ইষ্টচিন্তা চিত্তবহির্ভূত করা বড় সহজ ব্যাপার নহে । একবার মনে করিতাম আর এখানে থাকা উচিত নহে, আবার ভাবিত!ম আব কিঞ্চিৎকাশ দেখিয়াই যাই। এই রূপে কয়েক বৎসর গত হইলে শেষে তাহাৰ কৰ্ম্ম ত্যাগ স্থির করিয়া তঁাহাকে এই মৰ্ম্মে এক পত্র লিখিলাম যে আবার কর্মত্যাগ ও “আপনার সকল দিকেই অমঙ্গল দেখিতেছি । পুননিয়োগ। তাহার নিবারণের চেষ্টা যত দূর অধীন জনের দ্বান হইতে পারে তাহা আমি করিয়াছি; কিন্তু কিছুতেই ফলােদয় হইল না । সুতরাং আমি বিদায় হইলাম । এ ক্ষণে : পরমেশ্বর আপনাকে রক্ষা করুণ সহিত কয়েকটচাবিও পাঠাইলাম। শুনিলাম এই পত্র পাঠে প্রথমে রাগান্ধ হইয়া অতীব বিরক্তি প্রকাশ করিয়াছেন ; এমন কি আমাকে কৃতঘ্ন পর্যন্ত বলিয়াছেন প্রধান কর্মচারীরা ইহাতে বিলক্ষণ বাতাস দিতেছেন । আমার উপরিউক্ত স্বজনকে দেওয়ানী দিয়াছেন, এবং তাহাকে দেওয়ান বলিয়া ডাকিতেছেন। ২৩ দিন পরে শুনিতে লাগিলাম যে, তিনি আমার জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়াছেন এবং কখন কখন অশ্রু বিসর্জন করিতেছেন। সংসার কি ভয়ানক! আমারই স্বজন মহাশয় তাহাকে বুঝাইতেছেন যে, আপনি কেন হইয়াছেন। কার্তিক রায় ব্যতীত কি আর কম্ম চলিবে না। যেখানে তিনি নাই সে সংসারের কি কৰ্ম্ম চলিতেছে না। আপনি স্বচ্ছন্দে স্নান ভােজন করুন। আমােদ আহলাদ করুন। টাকা দিতে কত কার্তিক রায় পাওয়া যাইবে"। আমার সহকারী বুদ্ধিমান লােক, তিনি দুই দিক বজায় করিয়া প্রবােধ দিয়াছেন : রাজার নিকট এক রূপ বলিয়াছেন আমার নিকট অন্য রূপ প্রকাশ করিয়াছেন । ৭৮ দিবস পরে আমার জনৈক বন্ধু বাবু দ্বারকানাথ দে হঠাৎ আমার নিকট আসিয়া কৰ্ম্ম ত্যাগের বিষয়ে কোন কোন কথা বলিলেন ১৪২ আত্মজীবন-চরিত। এবং শেষে কালী বাবু ও পূর্ণ বাবু আসিয়াছিলেন কি না জিজ্ঞাসা করিলেন। আমার বােধ হইল তাহারা আমার কৰ্ম্ম ত্যাগের বিষয়ে কোন পরামর্শ করিয়াছেন অথবা তাহাদিগকে রাজা কিছু বলিয়াছেন । “ বুঝি পূর্ণ ও কালী রাজবাটীতে আছেন তিনি এই বলিযা তৎক্ষণাৎ প্রত্যাগমন করিলেন । এক ঘণ্টা গত হইলে তিনি, রাজা, কালী ও পূর্ণ আমার বাটীতে আসিলেন এবং সকলে এক প্রকার বলপূৰ্ব্বক আমাকে গাড়ীতে আরােহণ করাইলেন। যেমন কোন বালককে তাহার আত্মীয় স্বজন ধরিয়া লইয়া যায়, সেই রূপ আমাকে লইয়া গেলেন। আমি কোন কথাই কহিতে পারিলাম না । গাড়ীতে যদিও রাজা পুনঃ পুনঃ কহিতে লাগিলেন “আমি দেওয়ানকে কোন মতেই ছাঙিব না, কিন্তু আমি ভাবিতে লাগিলাম রাজবাটী যাই আর যা করি রাজার কর্ম আর করিব না। গা ী রাজবাটী পেছিল এবং উপরে যাইয়া আমরা সকলে বসিলাম। গৃহ মধ্যে যেন যেন আনন্দোৎসব উপস্থিত হইল। সকল চাকরেরই নয়নেৎফুল্ল ও হাস্থবদন দেখিলাম । সে সময় হৃদয়ে কত প্রকার ভাবেরই উদয় হইতে লাগিল। একবার ভাবি- লাম যতই কেন হউক না আমি আর ইহাদের মায়ায মুগ্ধ হইব না। আবার ভাবিলাম যে, যখন আমার আত্মীয় বন্ধুরা এখানে আমার পুনরাগমনে এত আহলাদ প্রকাশ করিতেছেন, তখন আর এ মায়াবন্ধন কেমন করিয়া ছেদন করিব । শেষে সকল প্রতিজ্ঞা বিস্মৃত হইলাম । চাবি সমস্ত লইলাম এবং সকলের আমােদ মােদে মিশিয়া গেলাম। পর দিবস হইতে পুনৰ্ব্বায় কৰ্ম্ম করিতে লাগিলাম । আহা কি কথাই মহা- জনে বলিয়াছেন “ক্ষণে দৃশ্য ক্ষণে খেদ তুষ্টি রুষ্টি প্রতিক্ষণ”। ১২৭৪ বঃ অব্দের কার্তিক মাসের ১৪শ দিবসে ঝটিকা আরম্ভ হয়। ক্রমশঃ বৃদ্ধি হইয়া ১৮শ দিবসের রজনী দুই ভয়ানক ঝড়। প্রহরের সময় ভয়ানক আকার ধারণ করে এবং পর দিবস দশট। বেলা পর্যন্ত স্থায়ী হয় । ১২৭ অব্দে ২৯শে আশ্বিনের ঝটিকায় যে ক্ষতি হইয়াছিল, প্রায় সেইরূপ ক্ষতি হইল। বাগানের অনেক বৃক্ষ পড়িয়া গেল। তৃণাচ্ছাদিত ঘর প্রায়ই পতিত হইয়াছিল। সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত লােকের সাহায্য নিমিত্ত সার্কেট হেসে জমিদার প্রভৃতির ধন- বান দিগের এক সভা হইয়া চাদা হয়। কমিশনর চ্যাপম্যান সাহেব সভা- পতির আসন গ্রহণ করেন।
সংক্রামক জ্বরে দেশের দুরবস্থা এত। ১৪৩ ১২৭৪ অব্দের চৈত্র মাসে কমিশনর চ্যাপম্যান সাহেব মহারাজার অবস্থা দর্শনে অতিশয় ব্যথিত হৃদয় হইয়া কমিশনর সাহেবের বাজার আমাকে সমস্ত অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলেন। মঙ্গল চেষ্টা। আমি সাহেবকে রাজার যথার্থ মঙ্গলাভিলাষী বুঝিয়া দুঃখবহ বৃত্তান্তসমূহ ব্যক্ত করিলাম। তিনি অতীব আক্ষেপ পূৰ্ব্বক কহিলেন যে, “এ যুবকের (রাজার) বিস্তর গুণ আছে । সাহেব দের সংসর্গে ইহার এইরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে । ইহা ইংরাজ জাতির আক্ষে- পের ও লজ্জার বিষয়। যাহা হউক ইহার উদ্ধারের নিমিত্ত এক বার বিশেষ যত্ন করিতে হইবেক।* শেষে আমার অনেক প্রশংসা করিয়া বিদায় করেন। তাহার যত্নে ও কৌশলে রাজার শারীরিক ও বৈষয়িক বিস্তর উন্নতি হয় , তাহার পদে অন্য কমিশনর আসিলে মহারাজা পুঝে যেমন ছিলেন আবার তেমনি হইলেন। এদিকে বৎসর মধ্যে তিনি ৩৪ মাস কখন কলিকাতায়, কখন ফরাসডাঙ্গায়, কখন পশ্চিমাঞ্চলে থাকিতেন। আমি কৰ্ম্ম ত্যাগ করিলে তাহার সম্পত্তি প্রভুভক্তি। অধিককাল থাকিবে না, এবং আমার কর্তৃত্বাধীনে থাকিলে তিনি দীর্ঘজীবী হইলেও তাহার আর্থিক কষ্ট পাইবার সম্ভা- বনা অল্প। আর তঁাহার শারীরিক অত্যাচারবশতঃ দীর্ঘায়ুরও প্রত্যাশা ছিল না। পবন্তু তাহার সন্তান লাভের আশাও বিগত হইয়াছিল। অতএব তাহার ধনাভাব জনিত কষ্ট আমায় দেখিতে না হয় এই চিন্তার আমি কৰ্ম্মত্যাগ করিবার ইচ্ছা এককালে দূর করিলাম। ভাবলাম সাধারণের নিন্দায় আমার তত কষ্ট হইবে না, যত কষ্ট মহারাজাকে দারস্রাবস্থায় দেখিলে হইবে । পূর্বে যে সংক্রামক জ্বরের কথা লিখিয়াছি এবং আমিও যে রোগে বহু কষ্ট পাইয়াছি, তাহার প্রাদুর্ভাব ১২৭২ বা সংক্রামক রে দেশের অব্দ পর্যন্ত অতীব প্রবল থাকে। ইহাতে নগরের দুরবস্থা এত । প্রায় তৃতীয়াংশ ধ্বংস হইয়া যায় । কত বিস্তৃত পরিবার নির্ধ্বংশ হইয়া গিয়াছে । কত দুর্ভাগা পুরুষ বহু পরিবারের স্বামী হইয়াও সন্ন্যাসীপ্রায় হইয়াছে। কত স্ত্রীলােক পতিপুত্রবিহীন হইয়া অনা- থিনী হইয়াছে। কত নারীর ক্রোড়ে সন্তানের মৃত্যু হইয়াছে অথচ নিজের অচৈতন্য বশতঃ জানিতে পারে নাই। কত উত্থানশক্তিরহিতা মৃতপ্রায়। জননী ১৪৪ আত্মজীবন-চরিত। একাকিনী গভীর রজনীতে মৃত সন্তান বক্ষস্থলে লইয়া নিকটস্থ কোন নিভৃত স্থানে প্রক্ষেপ করিয়াছে। এবং পাছে কেহ জানিতে পারিলে তাহাকে যন্ত্রণা দেয় এজন্য বুক ফাটিয়া গিয়াছে তবু ক্রন্দন করে নাই প্রতিবাসীর কথা দূরে থাকুক, সন্তান পিপাসায় অস্থির, তথাপি জনক জননীর তাহাকে একটু জল দিবার সাধ্য হয় নাই। লোক গৃহ মধ্যে বিগত জীবনে পড়িয়া রহিয়াছে, তাহার সংবাদও পার্শ্বস্থ গৃহবাসীও জানিতে পারে নাই । কঁদিয়া শােকের কিঞ্চিৎ আগু শান্তি করে এরূপ শক্তিও অনেকের ছিল না। ধনে জনে কিছুতেই কাহার বিশেষ সাহায্য হয় নাই। বাটীতে যেই আসিয়াছে সেই অচিরাৎ শয্যাগত হইয়াছে। সুতরাং ধনী নিধন সকলেরই তুল্যাবস্থা হইয়াছিল। যাহারা নগর ত্যাগে সমর্থ হইয়া- ছিলেন তাঁহাদের মধ্যে অনেকে রক্ষা পাইয়াছিলেন। হায়! কালেতে কি না হয়। যে কৃষ্ণগনর কত বিদেশীয় মৃতপ্রায় রােগীর প্রাণদান করিয়াছে সেই নগর এক্ষণে নিজ ক্রোড়বাসীদের জীবন রক্ষা করিতে পারিল না। পূর্ব লিখিত সংক্রামক জয়ের বিক্রম ১২৭৩ বার অব হ্রাস হইতে আরম্ভ হইল এবং ধবংসাবশিষ্ট রােগীদের পীড়ার সাম্য হইতে লাগিল । ১২৭৪ অব্দে আমার কনিষ্ঠ পুত্র ও কন্যা ব্যতীত আর সকল পরিবারই রােগ মুক্ত হইলেন। ১২৭৫ অব্দের শ্রবণ মাসে জলবায়ু পরিবর্তন নিমিত্ত আমার স্ত্রী তনয় তনয়া সহিত শান্তিপুরের এক দ্বিতল বাটীতে অবস্থিত হন। ২৯, ৩০ ও ৩১শে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হইতে থাকে। ৩২ শের রাত্রে এতাধিক বারি বর্ষণ হইতে লাগিল যে রাত্রি দুই প্রহরের পর ছাতের মহাবৃষ্টি। এক স্থান দিয়া হুহু করিয়া সজোরে জল পড়িতে আরম্ভ হইল। আমার গৃহিণী ভয় পাইয়া সকলকে জাগ্রত করাইলেন এবং কিরূপে এদায় হইতে নিস্তার পান তাহার মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন। ইতিমধ্যে পার্শ্বস্থ এক কক্ষ পতিত হইল। আমার স্ত্রী, ভগ্নী, পুত্র, কন্যা ও স্ত্রীর এক ভ্রাতা, এক ভ্রাতুষ্প, এক ভ্রাতৃকা এবং এক দাসী সকগেই ৰাস্ত হইয়া নিম্নতায় আসিলেন। রজনী তখন তৃতীয় প্রহরেরও অধিক। সকলই স্ত্রীলােক ও বালক বালিকা। কেবল দাস একজন পরিণত বয়স্ক ছিল কিন্তু নির্বোধ। যেমন নিবিড় অন্ধকার তেমনি মুসলধারে বৃষ্টি, প্রাঙ্গন জলপুর্ণ। বহির্গত না হইলে তখনি প্রাণ যায় অথচ কোথায় যান ১২৭৬ সালের ঝড় বৃষ্টি। ১৪৫ তাহা কেহ কিছু স্থির করিতে পারেন না। সুতরাং সকলেই অস্থিরচিত্ত হই- লেন। শেষে নিকটস্থ ডাকঘর মনে পড়িল এবং তথায় যেমন উপস্থিত হইলেন অমনি ৰাসবাটীর পতন শব্দ শুনিতে পাইলেন। আর ৫ মিনিট ঐ ৰাটীতে থাকিলে সকলের জীবনাবসান হইত। অবশিষ্ট যামিনী আদ্রবস্ত্রে ডাকঘরে যাপন করিয়া প্রত্যুষে সকলে সকলে গৃহিণীর পিত্রালয়ে আসিলেন। পরে সে ৰাটী ও পতনােন্মুখ দেখিয়া শেষে মতিবাবুর বাটীতে আশ্রয় লইলেন, এবং পরদিন বাটী আসিলেন। কখন দোষ ও গুণ হয়, তাহার এই ঘটনা বিলক্ষণ দৃষ্টান্ত স্থল। আমার স্ত্রী অত্যন্ত ভীরুপ্রকৃতি। তিনি যৎসামান্য কারণে বিপদাশঙ্কা করেন। কিন্তু তাহার এইরূপ স্বভাব ছিল বলিয়াই এই সঙ্কট হতে সকলে রক্ষা পাইলেন। উৎকট বারি বর্ষণে ভীত হইয়া জাগ্রতা না থাকিলে এবং অত উতলা না হইলে নিশ্চয় বিপদ ঘটিত। সে নিশায় প্রায় কেহই বাটির বাহির হন নাই। অনেক অট্টালিকা নিপতিত হয় এবং কোনও কোনও বাটীর সহিত কয়েক লােকেরও জীবন যায়। তৎকালীন অশীতি বৎসরের বৃদ্ধগণও কহেন যে, তঁাহারা এরূপ ভয়ানক দৃশ্য কখন দর্শন বা শ্রবণ করেন নাই। কৃষ্ণনগরের নানা স্থানে এতাধিক জলপূর্ণ হয় যে, অনেক রাস্তা কাটিয়া জল নির্গমের পথ করাতেও ৫ দিন তথায় জলের অবস্থিতি হয় ও তদুপরিস্থিত সমুদয় মৃন্ময় গৃহ পড়িয়া যায় এবং অনেক বৃক্ষ পড়িয়া যায় । ১২৭৬ বাঃ অরে ২৮শে আষাঢ় প্রাতঃকালে ঝড় আরম্ভ হইয়া বেলা পাঁচটা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। আর এই ঝটি- ১২৭৬ সালের ঝড় বৃষ্টি। কার সঙ্গে ভয়ানক বৃষ্টিও থাকে। যদিও ইহা ১২৭১ অব্দের আশ্বিন মাসের ও ১২৭৪ অব্দের কার্তিক মাসের ঝটিকার তুল্য ভয়ানক ও ক্ষতিজনক নহে তথাপি অনেক বৃক্ষ ও গৃহ পতিত হওয়াতে লােকের বিস্তর অনিষ্ট হয় । যেমন কোন পরাক্রান্ত নিষ্ঠুর রাজা অন্যের রাজ্য উৎস করিতে দৃঢ় সঙ্কল্প করিয়া পরাজিত দেশে পুনঃ পুনঃ হনন লুণ্ঠন ইত্যাদি বিবিধ রূপ অত্যাচার করিয়া যায়, স্বভাব যেন সেইরূপ মানস করিয়া এ দেশকে পীড়িত করিতে লাগিল। রােগ শােক ঝড়বৃষ্টি উৎপাত সকল উপর্যুপরি উপস্থিত হওয়াতে লােক অবসন্ন হইয়া উঠিল। এত অল্পকাল মধ্যে এত দুর্ঘটনা এ দেশে যে কখনও হইয়াছে ইহা শুনা যায় নাই।
১৪৬ আত্মজীবন-চরিত। পূৰ্বে লিখিয়াছি যে, চ্যাপম্যান সাহেব দ্বারা মহারাজার যথেষ্ট মঙ্গল হয়, ও তাহার কমিশনারী পদত্যাগ করাতে পুনরায় পূৰ্ব্ব মত অমঙ্গল ঘটিতে থাকে। মহারাণী স্বামীর স্বাস্থ্য সাধনার্থ যারপর নাই চেষ্টা করেন। এবং এ বিষয়ে রায় যদুনাথ রায় বাহাদুরের যথেষ্ট সাহায্য পান। মহারাজা প্রায় বৎসরাবধি উক্ত সাহেবের ভয়ে ইঁহাদের বাধ্য ছিলেন। ১২৭৫ বাঃ অব্দের ফান মাস হইতে আবার স্বাধীন ভাবে চলিতে লাগিলেন। এক্ষণে মহারাণীর ও যদুবাবুর ইষ্ট চেষ্টায় তঁাহার উপকার না হইয়া বরঞ্চ অপকার হইতে লাগিল। যদুবাবুর কর্তৃত্ব তঁাহার অসহনীয় হইয়া উঠিল ও রাজবাটীতে থাকা তাহার যন্ত্রণা বােধ হইতে লাগিল। একারণ বৎসরের অধিকাংশ সময় বিদেশে যাপন করিতে লাগিলেন। আমি তাহাদিগকে এরূপ খুঁচাখুচি করিতে পুনঃ পুনঃ নিষেধ করিতাম কিন্তু তাহারা আমার কথা শুনিতেন না। বরং রাণী প্রভৃতির রাজার মঙ্গল রাজ্ঞী আমার প্রতি বিরক্ত হইতেন। তাহার চেষ্টায় বিফল প্রয়াস। এই রূপ বিবেচনা হইত যে, আমি বিশ্বস্তরূপে কর্ম করাতে রাজা বিষয় কার্যে মন দিতেন না। যাবৎ মহারাজা জীবিত ছিলেন তাবৎ তিনি আমাকে বিষনয়নে দেখিতেন। একবার মহারাণীর কটুক্তিতে আমি অত্যন্ত মনােবেদনা পাইয়া রাজাকে কহিলাম যে, “মহারাণী যেরূপ অপমানের কথা কখন কখন দাসী দ্বারা আমাকে কহিয়া পাঠান তাহা কোন ভদ্রলােক সহ করিতে পারে না। তাহার কথার সমান উত্তর দিলে তাহার এবং আপনার অবমাননা হয়। এ কারণ এ সকল অপমান সহ করিয়া থাকি। কিন্তু আমি সর্বদাই যে ইহা সহ করিব তাহা পারিব না। এবং আমার জন্য যে আপনাদের স্বামী স্ত্রীতে অসদ্ভাব ঘটে ইহাও আমার ইচ্ছা নহে।” এই কথা শ্রবণে তিনি অত্যন্ত বিষাদিত ও ব্যাকুলিত হইয়া আমাকে কহিলেন যে “তাহার দোষে আমাকে ত্যাগ করবেন না, যাতে আপনার এ কষ্ট আর সহ্য করতে না হয় তাহার তাহার বিধান করিব।” আমি ইহাদের শুভ কি অশুভ আকাঙ্ক্ষী তাহ, রাণী রাজার মৃত্যুর পর বুঝিতে পারিলেন। গত বৎসর রাজা আষাঢ় মাসে স্থানান্তরে যান; দুর্গোৎসবের পূর্বে আমি ঘাইয়া তাঁহাকে লইয়া আসি। এ বৎসর এলাহাবাদে তাহার সাক্ষাৎ পাই। * রাজার বাটী আসিতে অনিচ্ছা। ১৪৭ সেখান হইতে আগ্রায় যান। আমিও তাহার সঙ্গী হই। আগ্রায় দুই দিবস থাকিয়া কেল্ল। ও মমতাজ মহল দর্শন করি। যদিও মাজার বিদেশ বাস। মহারাজার অবস্থা দেখিয়া অত্যন্ত মনক্লেশ পাই তথাপি ঐ দুই মহাকীর্তি দর্শনে যারপরনাই আহলাদিত হই। কিন্তু ঐ দুই জগৎ বিখ্যাত কাও একবার দেখিলে মনের সাধ মেটে না। সেখান হইতে এলাহাবাদ দিয়া পূজার অগ্রে পঞ্চমীর দিবস তিন ও আমি রাজবাটী পোঁছি- লাম। ১২৭৭ অব্দের আষাঢ় মাসে মহারাজা পুনরায় উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে গমন করিলেন এবং মসুরী পৰ্বতে যাইয়া অবস্থিত হইলেন। যাত্রাকালে তাহার শরীর অসুস্থ থাকাতে যাহাতে তাহার যাওয়া রাজার মুসুরী পর্বতে না ঘটে তদ্বিষয় তদীয় আত্মীয় স্বজন অনেক চেষ্টা অবস্থান। করেন। কিন্তু কোন মতে কৃতকার্য হইতে পারেন না। রাণী ও যদুবাবু তাহার মঙ্গল চেষ্টা করিতেন বটে, কিন্তু কোন চেষ্টাই সুবিবেচনানুমত না হইলে অভিলাষত ফল দর্শে না, বরং কখন কখন বিপরীত ফল উৎপন্ন হয়। আমি মধ্যে মধ্যে তাহাদিগকে বলিতাম যে, পরিণত বয়স্ক পুত্রের কোন কু অভ্যাস হইলে তাহার জনক জননীও বলদ্বারা নিরাকৃত করিতে পারেন তােমরা যে একজন ৩০'৩২ বৎসরের ধনবান্ যুবকের কু অভ্যাস বলে দুরীভূত করিবে অথবা তাহাকে আয়ত্ত করিয়া রাখিবে, এ আশা কখন পূর্ণ হইবে না। ইনি তােমাদের কর্তৃত্ব অসহ বােধ করিয়া গৃহত্যাগী হইবেন এবং তাহা নিবারণ করিতে কাহারও সাধ্য হইবে না। ইনি বাহিরে গেলে তােমাদের কোন বলই খাটিবে না। বাটী হইতে ধন না পান যেখানে একটু কাগজ লিখিয়া দিবেন সেই খানেই প্রচুর ধনপ্রাপ্ত হইবেন এবং কোন ভৃত্য সঙ্গে না যায় যেখানে ইচ্ছা করিবেন সেই খানে তাহা পাইবেন। তােমাদের এরূপ বল প্রয়ােগে বিপরীত ফল ফলিবে”। এরূপ কথায় মহারাণী বিরক্ত হইতেন ও যদু বাবু অমনােযােগ করিতেন। কিন্তু আমি যাহা বলিতাম তাহাই ঘটিল । রাজা পূজাৰ পুৰ্ব্বে আমাকে বারংবার লেখেন যে “এবার আমি পূজার সময় কোন মতেই বাটী যাইব না। অতএব আপনি রাজার বাটা আসিতে আমাকে লইতে আসিবেন না। আসিলেও আমার অনিচ্ছা। সাক্ষাৎ পাইবেন না। কার্তিক মাস অষ্টমের সময় আমি নিশ্চয় বাটী প্রতিগমন করিব।” এদিকে রাণী রাজাকে আনিবার নিমিত্ত ১৪ আত্মজীবন-চরিত। আমাকে মসুরা যাইতে পুনঃ পুনঃ আদেশ করিতে লাগিলেন। আমি উত্তর করিলাম, যে, “রাজা এবার যেরূপ বিরক্ত হইয়া গিয়াছেন ও যেরূপ বারংবার লিখিতেছেন তাহাতে যে আমি যাইলে তাকে আনিতে পারিব তাহা আমার বােধ হয় না। যখন আপনারা সকলে তাহাকে রাখিতে পারেন নাই, তখন যে একা আমার অনুরােধে আসিবেন ইহা কোন মতেই আমার বিবেচনায় আসে না।” আমি তাহাকে আনিতে গেলাম না বটে, কিন্তু কৌশলে আনবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। রাজাকে লিখিলাম যে “গভর্ণমেন্টের রাজস্ব দিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে। যদি রাজস্বের পরিমাণ কর মহাল হইতে সংগৃহীত না হয়, তবে আমার দ্বারা বিষয় রক্ষা হইবার উপায় হবে না । অতএব এ সময় আপনি রাজধানী না থাকিলে আপনার বিষয়ের ক্ষতি হবে। আপনি রাজস্ব দিবার সময় রাজবাটী উপস্থিত না থাকিলে আমি আর আপনার কাৰ্য্য করিতে পারিব না। আমার এ কোশলে কোন ফলােদয় হইল না। তিনি গােয়াড়ীর এক মহাজনকে এ বিষয় লেখাতে মহাজন আসিয়া আমাকে কহি- লেন যে, “রাজার রাজস্ব জন্য যে টাকা আবশ্যক হইবে তাহা আমি দিব।” আমার অগ্রজ মহাশয় রাজার সঙ্গে ছিলেন। তিনি পূজার পর এক সহস্র টাকা সহিত আমাকে যাইতে লিথিলেন। ভাবি- আমার মুসুল্লী পৰ্বতে গমন। লাম রাজার প্রত্যাগমনের অভিপ্রায় হইয়া থাকিবে। দুই দিন পরে ঐ বিষয়ে তিনি টেলীগ্রাফ, করিলেন। আমি অতিশয় উদ্বিগ্ন- চিত্ত হইয়া পর দিবসই (১২৭৭১১ কার্তিক) যাত্রা করিলাম। কয়েক দিন পরে সাহারামপুরে উত্তীর্ণ হইলীম। তথা হইতে মুসুরি পর্বত দৃষ্ট হইতে লাগিল। যদিও আমার চিত্ত গভীর চিন্তার্ণবে নিমগ্ন ছিল তথাপি ঐ প্রকাণ্ড গগনভেদী দৃশ্য দর্শনে মন যেন উন্নত হইয়া উঠিল। কি আশ্চৰ্যকাণ্ড! যেন ঐ শৈলশ্রেণী মহীমণ্ডলে বসিয়া গগনমণ্ডলকে মস্তকে ধারণ করিয়া রাখিয়াছে। উপযু- পরি কতই শৃঙ্গ শােভা পাইতেছে। শেখরস্থিত মুসুরি পর্বতের সৌন্দৰ্য্য। বাটি সকল স্থানে স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্বেতবিন্দুবৎ দৃষ্ট হইতেছে। যাহারা পৰ্বত প্রদেশ কখন দেখেন নাই তাহাদের নিশ্চয় বােধ হইবে যেন নবীন নীল নীরদের মধ্যে বিন্দু বিন্দু শ্বেত মেঘের দর্শন হইতেছে। সুদূর হইতে ভূধরশ্ৰেণী বিশেষ মনােহর বােধ হইল না। কেবল বিস্ময়কর বােধ হইতে লাগিল। কিন্তু যাহাই হউক নয়ন সুখকর তাহার সন্দেহ নাই । সাহারামপুর হইতে তৃতীয় প্রহরের সময় যাত্রা করিলাম। এবং যতক্ষণ দিবাকর আমাদের স্বদেশ প্রত্যাগমন। ১৪৯ কর প্রদান করিলেন তত ক্ষণ দিকনির্ণয় যন্ত্রের শাক। যেমন উত্তরাভিমুখে থাকে আমার চক্ষু সেইরূপ গিরি দিকে থাকিল । রাত্রে মােহনপাস শেখরে উখিত হইলাম। সাহারামপুর পর্যন্ত রেলগাড়ীতে গিয়াছিলাম। সেখান হইতে অশ্বষনে যাইতে লাগিলাম। পরদিন (৭ই কার্ত্তিক) অতি প্রত্যুষে রাজপুরে উপনীত হইলাম । সেখান হইতে ঝম্পানে পৰ্বত আরােহণ করিতে আরম্ভ করিলাম। উখনকালে পাৰ্বতীয় আশ্চর্য শােভা সন্দর্শনে চিত্তে কতই আহলাদ ও বিস্ময় উপস্থিত হইতে লাগিল। পথপার্শ্বে ও গিরিগাত্রে কত প্রকার মনােহর পুষ্প আলো করিয়া রহিয়াছে। তাহার মূলস্থানে কেহ কর্ষণ বা জলসেচন করিতেছে না। অথচ তৎসমূহ অতি সতেজ রহিয়াছে। অপথ অতিক্রম করিলে শৈলবাসী একজন কহিল, “মহারাজা পীড়িত আছেন।” এই সংবাদ শ্রবণমাত্র আমার মস্তক ঘুরিয়া উঠিল। অগ্রজ মহাশয়ের পত্রের শেষ ভাগে লিখিত ছিল যে, আমরা সকলেই ভাল আছি’ ও টেলীগ্রাফেও কোন অমঙ্গল বার্তা ছিল না। সুতরাং আমার মনে বিশেষ উদ্বেগ ছিল না। তবে রাজার শরীর সর্বদা সুস্থ থাকিত না বলিয়া পাছে তাহাকে পীড়িত দেখিতে পাই এইরূপ চিন্তা মধ্যে মধ্যে হইতেছিল। অনেক দূর আরােহণ করিয়া দেখিলাম একটি বাটী হইতে কেহ কেহ দূরবীক্ষণ-যন্ত্রযােগে আমাকে দেখিতেছে। কিন্তু রাজ। সতীশচন্দ্রের পরলোক পৰ্বতস্থ কুটিল পথপ্রযুক্ত ঐ বাটী কখন দৃষ্ট কথন অদৃষ্ট হইতেছে। বেলা দুই প্রহরের পর ঐ বাটাতে উত্তীর্ণ হইলাম। বাজার অবস্থা দেখিয়া যারপরনাই দুঃখিত ও চিন্তিত হইলাম। তৃতীয় দিবসে ( ৯ই কার্তিক) তাহাকে মৃত্যুশয্যায় দেখিলাম। চতুর্দিক অন্ধকার বােধ হইল এবং সব্ব শরীরের শিরার মধ্যে যেন অগ্নিস্রোত বহিতে লাগিল। মহারাজার দেহ লইয়া সন্ধ্যার পর দারাদুনে উপস্থিত হই- লাম! অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার নিমিত্ত সেই রাত্রেই তাঁহার শব হরিদাবে পাঠাইলাম। আমি ঐ স্থানেই থাকিলাম; হরিদ্বার হইতে লােক ফিরিয়া যাইলে স্বদেশাভি- মুখে যাত্রা করিলাম । অন্তকরণে কতই দুঃখের ও চিন্তার উদয় হইতে লাগিল । যে আন্তরিক ও বাহিক সােন্দৰ্য্য আমাদের স্বদেশ প্রত্যাগমন। ঈশ্বরানুগ্ৰহ ব্যতীত লব্ধ হয় না, যে ঐশ্বৰ্য বহু আয়াস ভিন্ন হস্তগত হয় না, যে সম্মান বিপুল ব্যয় ও আয়াস বিনা পাওয়া যায় না-সে সমুদয় রাজা ভুমিষ্ঠ হইব! মাত্র পাইয়াছিলেন। কিন্তু কি আক্ষেপের গমন।
আত্মজীবন-চরিত বিষয়। নিজ অবিবেচনায় দীর্ঘকাল ভােগ করিতে পারিলেন না। বিজাতীয় সভ্যতা তাহার সর্বনাশের মূল হইল। শুদ্ধ তাহার নহে, পতিপুত্ৰবিয়ােগবিধুর। দুঃখিনী জননীর ও তঁাহার পুত্রহীনা বিধবারমণীর সর্বনাশ হইল । পূর্বে এ দেশে মদিরা পানের প্রথা এক কালে ছিল না এরূপ নহে। বেদেব অবতার । কাল বা তাহার পূর্ব হইতে এ সুরাপানের ফল। গরল পানের কথা রহিয়াছে। কিন্তু ইদানীং ইহাতে যেমন অনিষ্ট দৃষ্ট হইতেছে সেরূপ সেকালে দৃষ্ট হইত না। পূৰ্ব্বকালে ভদ্রসমাজে সুরাপানের ধৰ্ম্মের সঙ্গে সংস্রব ছিল। যিনি সেই ধৰ্ম্মের নিয়মানু- সারে পান করিতে সমর্থ হইতেন তিনিই পান করিতেন। পানের নির্দিষ্ট কাল ছিল। কেহ দিবসে একবার, কেহ রাত্রে একবার, কেহ বা দিবসে একবার ও রজনীতে একবার, নির্জন স্থানে আপনার ইষ্ট দেবতার উপাসনার সময় পান করিতেন। আর তাহাদের পানের পরিমাণও নির্ধারিত ছিল। অধিকাংশ লােক যামিনীযােগেই পান করিতেন। তঁাহার। এত সাবধানে পান করিতেন যে, তাহাদের প্রতিবেশীরাও এ বিষয় জানিতে পারিতেন না। একালের মদ্যপায়ীদের পানের সময় বা পরিমাণ নির্দিষ্ট নাই । যাহার যে সময় ও যতবার অভিলাষ হয় তিনি সেই সময় ও ততবার পান করেন। পরিমাণের ত কথাই নাই। সুতরাং এ অবস্থায় কেন না অমঙ্গল ঘটিবে ? সমাজের কেবলমাত্র যুক্তিপথে চলিবার অসম্ভাবনা দেখিয়া পুরাকালীন ব্যবস্থা- পকগণ সকল কাৰ্যই ধৰ্ম্মের শাসনাধীন করিয়াছিলেন। পাশ্চাত্যবিদ্যা সে শাসনের বন্ধন ছিন্ন করিয়া দিয়াছে। ইদানীন্তন ভদ্র সমাজস্থ শিক্ষিত অশিক্ষিত অনেকেই পূৰ্ব্বকালের শাস্ত্রকারদিগের কোশল বুঝিতে পারিয়াছেন। হিতাহিত বিবেচনা শুন্য লােকের জন্য শাস্ত্রশাসন হইয়াছে বটে, কিন্তু অধুনাতন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অনেকের অনেক বিষয়ে যতই কব্যাকৰ্ত্তব্য জ্ঞান শক্তি হউক, মদ্যপান বিষয়ে পুরাকালীন অজ্ঞ লােকের মত অজ্ঞানই আছেন ; বহু বুদ্ধি- মান পণ্ডিত ও বিজ্ঞ ব্যক্তিকে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ মূখ বা বালকের মত বিবেচনা- বিহীন হইতে দেখা যায়। দুগ্ধপােষ্য শিশু যেমন দুগ্ধ অভাবে অস্থিরচিত্ত হয়, ইহারা মদিরাভাবে সেইরূপ অধীর হইয়া থাকেন। এই রাজাদের যে দুই পূর্ব পুরুষ পানাসক্ত ছিলেন তাহারা তান্ত্রিক নিয়মানুগত থাকাতে তাহা- দের এত অকালে জীবনাবসান হয় নাই। ইদানীন্তন যে দুইজন পানামু- রাগী হইয়াছিলেন, তাহারা কয়েক বৎসরাবধি অস্বচ্ছন্দ শরীরে খাকিয়া মহারাজার উইলে আমার আপত্তি । ১৫১ আপত্তি। শেষে তরুণ বয়সেই মানবলীলা সম্বরণ করিলেন। হায়! ইহারা যদি মদিরার মােহিনীজালে পতিত না হইতেন অথবা পূর্ব নিয়মে পান করিতেন তাহা হইলে সপরিবারে কতই সাংসারিক সুখভােগ করিতেন এবং স্বদেশের কতই উপকার করিতে পারিতেন । রাজাদের অবস্থার সঙ্গে নিজের বিষয়েরও চিন্তা না করিয়া থাকিতে পারি- লাম না। আমার কিছুমাত্র সঞ্চিত ধন নাই। রাজার মৃত্যুতে আমার পৈতৃক সম্পত্তি যে যৎকিঞ্চিৎ আছে চিন্তা। আছে তাহাতে সংসারষাত্রা নির্বাহ হয় না। মহারাণী আমার প্রতি যেরূপ কুপিতা আছেন তাহাতে তিনি যে আমাকে প্রতিপালন করিবেন এরূপ বােধ হয় না । এক্ষণে আমার কি গতি হইবে । এই বয়সে আবার কোথায় চাকুরী করিতে যাইব। মহারাজা যে উইলের কথা বলিয়াছিলেন তাহা কেন করি নাই। তাহা করিয়া রাখিলে তো মহারাজার উইলে আমার এত চিন্তা হইত না। পূৰ্ব্বে রাজা আমাকে কহিয়াছিলেন যে, “আপনি এইরূপ নিয়মে এক উইল প্রস্তুত করুন যে, আমার সমস্ত সম্পত্তির অভিভাবক আপনি হইবেন, এবং আমার বিনা অনুমতিতে অনুমতিতে সমস্ত কার্য্য চালাইবেন। আমি ইংলণ্ডে বা পৰ্ব্বতে বা যেখানেই থাকি সেখানে আমাকে বাৎসরিক ১২ হাজার টাকা দিবেন এবং অবশিষ্ট টাকা হইতে রাজস্ব দিয়া যাহা থাকিবে তাহা হইতে আপনি সাংসারিক সকল প্রয়ােজন সম্পন্ন করিবেন। আর আমার মৃত্যুর পর আপনার অন্যের দ্বারে যাইতে না হয় সেজন্য এই নিয়ম থাকিবে যে আপনি যাবৎ জীবন মাসিক দুই শত টাকা করিয়া পাইবেন।” এইরূপ নিয়মে উইল প্রস্তুত করিতে রাজা যখনি বলিতেন তখনি আমি এরূপ উত্তর করিতাম যে, “আপাততঃ উইল করিবার প্রয়ােজন দেখি না। যখন প্রয়ােজন হইবে তখন অবশ্যই তাই। • করিব।” তিনি কহিতেন “যদি আমি হঠাৎ মরিয়া যাই তবে আপনার উপায় কি হইবে।” আমি তাহার উত্তর করিতাম যে, “আপনি প্রায় আমার সন্তানের বয়স্ক। আমার মরণের পর আপনি আমার সন্তানদিগকে প্রতিপালন করিবেন এই সম্ভাবনা। অতএব আপনার অভাবে আমার কি হইবে তাহার চিন্তা করিবেন না। অন্যান্য বিষয়ের উইল আবশ্যক হইলেই প্রস্তুত করিব।” যদিও এরূপ উইলে আমার মঙ্গল হইত কিন্তু তঁাহার অমঙ্গল २० আত্মজীবন-চরিত। আশঙ্কায় তাহা করিতে আমার কিছুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। কারণ ইদানীং তিনি মহারাণীর ভয়ে বাটীতে থাকিতে চাহিতেন না। তবে এককালে বিদেশে থাকিলে বিষয়কাৰ্য্য চলিবে না এবং ইচ্ছামত টাকা পাইবেন না শুদ্ধ এই বিবেচনায় কখন কখন বাটী থাকিতেন। যখন আমারও ইহাতে লাভ আছে তখন এ উইল অবশ্যই হইবে, বোধ হয় এইরূপ ভাবিয়া এ বিষয়ের জন্য বিশেষ ব্যস্ত হন নাই। এ উইল না হওয়াতে মহারাজারও কোন উপকার হইল না, অথচ আমার বিলক্ষণ অপকার হইল। পূৰ্ব্বে কয়েকবার তাহা- উইল না হওয়াতে আমার দের মঙ্গল আশায় নিজের অমঙ্গল করিয়াছিলাম কিন্তু তাহাতে তাহাদের মঙ্গল হইয়াছিল। এবার নিজের অমঙ্গল হইল, অথচ তাহাদের মঙ্গল কামনাও ব্যর্থ হইয়া গেল। পূৰ্ব কয়েকবরের ভুলে আমার যে ক্ষতি হইয়াছিল, তাহাতে আমার বিশেষ ক্লেশ হয় নাই। কিন্তু এবারের ভূলে বিস্তর কষ্ট পাইতে হইল। যদি এই উইল রীতিমত সম্পন্ন হইত তবে আর আমার এই ৬২ বৎসর বয়সে নরক ভােগ করিতে হইত না। আমার পুত্রাধিক রাজার বিয়ােগে হৃদয়ে যে বেদনা পাইয়াছি তাহার শতগুণ যন্ত্রণা ইদানীন্তন দাসত্ব নিমিত্ত ভােগ করিতেছি। এক্ষণে কোথায় ঈশ্বর আরাধনায় ও বন্ধুসহবাসে নানা সৎপ্রসঙ্গে জীবনযাপন করিব, না কোথায় বিষয়চিন্তায় ও অসৎসংসর্গে কাল কাটাইতেছি । আমার কর্তৃপক্ষের ও নিজের কর্মচারীরা ধর্মপরায়ণ হইলেও আমি ঈদৃশ যমযন্ত্রণা পাই তাম না। সদর কাছারীর কর্মচারিদিগের মধ্যে অনেকেই তালাদপূৰ্ব্বক কৰ্তব্য সাধন করেন না। সেকালের গুরু মহাশয়ের ন্যায় মধ্যে মধ্যে তাড়না করিতে হয়। মফস্বলের কর্মচারিরা আরও ভয়ানক লােক। তাহারা কর্তব্য সংজ্ঞা পর্যন্ত জানে না, পরন্তু প্রবঞ্চনা করিতে বিলক্ষণ পটু। তাহাদের কর্মের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি না রাখিলে প্রভুর বিলক্ষণ অনিষ্ট সম্ভাবনা হয়। কর্তৃপক্ষের কর্মচারিদের মধ্যে কেহ কেহ বড়ই ক্লেশদায়ক হন। রাজবাটী থাকিলে প্রায় দুই বেলায় গাড়ীতে বেড়াতেন বলিয়া রাজবাটী হইতে চওক পর্যন্ত যে বত্ম" আছে রাজবাটীতে প্রত্যাগমন । সংস্কার ভালরূপ হইত না। এ কারণ, রাজ। যখন পশ্চিমাঞ্চলে যান তখন ঐ পথের সম্পূর্ণ সংস্কার আরম্ভ হয়। রাজাকে আনিবার জন্য যে দিন আমি যাত্রা করি সেদিন স্থপতিদিগকে কহিয়া যাই যে, যেন রাজা আসিয়া সমস্ত পথ প্রস্তুত দেখেন। মহারাজাকে বিসৰ্জন করিয়া ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক আমার অনিষ্ট চেষ্টা। চকের মধ্যে (১৭ই কার্তিক) প্রবিষ্ট হইলাম, তখন ঐ সম্পূর্ণ সংস্কৃত বক্সের প্রতি নেত্রপাত করিয়া যে কি মনােবেদনা পাইলাম তাহা ব্যক্ত করা যায় । হৃদয় যেন বিদীর্ণ হইয়া গেল, নয়নদ্বার দিয়া অগ্নিবং অশ্রু বহিতে গিল, এবং মস্তকে যেন অনল জ্বলিয়া উঠিল। রাজবাটী আসিয়া দেখিলাম পুরবাসীদের বক্ষঃ গুন অশ্রুধারায় প্লাবিত হইতেছে, এবং সকলেই হাহাকার করিতেছে। কাছারীগৃহে ভট্টাচার্যের ও ব্রজনাথ বিদাদের সহিত সাক্ষাৎ হইল। ভট্টাচার্য আমাকে নির্জনে লইয়া গিয়া কহিলেন যে, “ভাই আমরা পুরুষানুক্রমে তােমাদের অনুগত। তুমি আমাকে তােমার বামদিকে বসাইয়া কোন কৰ্ম্মের ভারাপণ করিবে ?” এমন শোকের সময় তাহার এই স্বার্থপর- কথা শ্রবণে চমৎকৃত হইলাম। কহিলাম যে, “আমিই থাকিব কিনা তাহার স্থিরতা নাই” ; তিনি উত্তর করিলেন “তােমার কৰ্ম্ম থাকিবে তাহার কোন সন্দেহ নাই। আমি তােমার জন্য মহারাণীকে অনেক ৰলিয়াছি" । “আমার জন্য যদি আপনি না বলিবেন তবে আর কে বলিবে”, এই বায়া আপা ততঃ তাহাকে ক্ষান্ত করিলাম। বেলা তৃতীয় প্রহর হইয়াছে তবু আমার মুখপ্রক্ষালন হয় নাই। সুতরাং আর রাজ বাটীতে থাকিতে পারি। {ম না। পরদিন রাজবাটী যাইয়। কর্তব্যকাৰ্য্য দেখিতে লাগিলাম। ভট্টাচার্য্য কহিলেন, আপনার নিকট যে সকল চাবি আছে ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক আমার অনিষ্ট তাহা রাণী চাহিতেছেন।” আমি উত্তর করিলাম চেষ্টা। “মহারাণী ব্যতীত আর কাহারও হস্তে চাবি দিব না।” আমার কৰ্ম্ম হবার নিমিত্ত ভট্টাচার্য্য আমার বিরুদ্ধে মহারাণীর নিকট নানারূপ কথা উত্থাপন করিতে লাগিলেন। আমার কোন দোষ না পাইয়া শৈষে আমি সমস্ত সম্পত্তি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীন লইয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছি, এইরূপ কথা মহারাণীকে জানাইলেন। একদিন একদিন হঠাৎ রাণী ' অন্দরমহলের দ্বারে আমাকে ডাকাইয়া দাসীদ্বারা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইলেন যে, “বিষয় কোর্ট অর, ওয়ার্ডসের হস্তে দেওয়া কৰ্ত্তব্য কিনা”। আমি উত্তর করিলাম যে, “সম্পত্তি কোর্টের কর্তৃত্বাধীনে থাকিলে মহারাণীর পক্ষে মঙ্গল, আর রাণীর হস্তে থাকিলে চাকরদিগের পক্ষে মঙ্গল।” ক্ষণে । বিলম্বে-ভট্টাচাৰ্য আসিয়া কহিলেন “মহারাণী আপনাকে জানাইতে কহিলেন যে সম্পত্তি হস্তে পাইলে কে তাহা ত্যাগ করিতে চাহে”। যদিও এ কথার মর্ম সম্পূর্ণরূপ ১৫৪ আত্মজীবন-চরিত। মন্ত্রণা। বুঝিতে পারিলাম না তথাপি কহিলাম যে, “বিষয় হস্তে রাখা না রাখার কথা, বলি নাই, প্রস্তাবিত বিষয়ে আমার যে অভিপ্রায় রাণীর নুতন দেওয়ান নিযুক্ত তাহাই ব্যক্ত করিয়াছি” । কয়েক দিন পরে রাণী রাজজামাতা বাবু অঘােরচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে অন্তঃ- পুরে ডাকাইয়া দেওয়ানী কাহাকে দেওয়া কর্তব্য জিজ্ঞাসা করাতে তিনি কহিলেন যে, “ আপনার সংসারে আর কে আছেন যে, তাহাকে এই পদ দিবেন। যাহাকে রাজারা দেওয়ানী দিয়াছেন আপনিও তাহাকেই দেওয়ানী পদে অভিষিক্ত করুন। কিন্তু রাজা তাহাকে যেমন ভক্তি শ্রদ্ধা করিতে আপনি তাহাকে রেপ না করিলে তিনি কৰ্ম্ম করিবেন বোধ হয় না।” রাণী বিরক্ত ভাবে কহিলেন যে, “যদি আমি তাহার মত দেওয়ানের কেঁড়েরা। হহতে না পারি ?” অঘোর বাবু প্রত্যুত্তর করিলেন যে, “আমি কেঁড়ে ধরার কথা বলিতেছি না, তাহার প্রতি অশ্রদ্ধা করিলে যে তিনি থাকবেন না তাহাই বলিলাম। ভট্টাচায্য উপস্থিত হইয়া কহিলেন “যে যাত্রাওয়ালার বালকের কথা রেখে দেও। কার্তিক রায় ব্যতীত কি অার উপযুক্ত লােক পাওয়া যায় না । অঘাের বাবু, ইহার কি উত্তর দেন, তাহা মনে নাই। কিন্তু ভট্টাচায্য নিজ অভীষ্টসিদ্ধির বিষয়ে যত্ন করতে ঐটা করেন নাই তাহা স্মরণ আছে । কিন্তু তাহার বিস্তারিত উল্লেখের প্রয়োজন নাই। উপরি উক্ত ঘটনার কয়েক দিন পরে মহারাণী আমাকে অন্তঃপুরে আহ্বান করিয়া চিকের মধ্য হইতে কহিলেন, “আপনার প্রতি রাণীর অনুগ্রহ। রাজার যেরূপ ভক্তি ছিল আমারও ঠিক সেইরূপ আমার নিকট আপনার বিপক্ষে অনেকে অনেক কথা বলিয়াছেন, এমন কি যাহাকে আপনি নিতান্ত আত্মীয় জ্ঞান করেন তিনিও আপনার বিরুদ্ধে নানা কথা কহিয়াছেন । আপনাকে অন্ততঃ ১৫ দিনের নিমিত্ত পদচ্যুত করিতেও কেহ কেহ পরামর্শ দিয়াছেন। অনেকে যেমন আপনার বিরুদ্ধে আমার নিকট বলিয়াছে, বােধ হয় আমার নিন্দাও তেমনি আপনার নিকট করিয়াছে। অতএব যদি আমার নাম করিয়া কেহ' কোন বেদনা- দায়ক কথা বলিয়া থাকে তাহা আপনি বিশ্বাস করিবেন না। তাহার প্রমাণ এই, যদি আমি আপনাকে অবিশ্বাস করিতাম তাহা হইলে আমি অবশ্যই অপ- নার নিকট হইতে সমস্ত চাবি লইতাম। আমি যেমন কাহারও কথা শুনি নাই, 'আপনি তেমন কাহারও কথা মনে করিবেন না । আপনি যেরূপ বিষয়- কমিশনরের আদেশ। কাৰ্য্য করিতেছেন সেইরূপ স্বচ্ছন্দচিত্তে করিতে থাকুন।” মহারাণীর এই সকল শ্ৰদ্ধাসম্বলিত স্নেহ বাক্যে আমি অশ্রু সম্বরণ করতে পারলাম না, এবং কোন কথা কহিতে সমর্থ হইলাম না । পর দিন হইতে প্রসন্নমনে কৰ্ম্ম করিতে লাগিলাম । ধৰ্ম্মপথে প্রায়ই পদস্থলত হয় ন । এ পথ যেমন সমত তেমনি পরিষ্কার ; ইহাতে কণ্টক ও কোন ভয় নাই। যদিও নিতান্ত দুর্ভাগ্যবশতঃ এ পথে কেহ কখন পতিত হন তিনি অবিলম্বেই উথান করতে পাবে। তাহাকে তুলিবার জন্য কত জন বিনা প্রার্থনায় হস্ত প্রসারণ করেন। পুত্রগণ। যে রমণী তাহার স্বামীর সময় আমাকে দূরীভূত করিবার যত্ন করিয়াছিলেন, তিনিই এক্ষণে কাহার কুমন্ত্রণা না শুনিয়া গামার উপর সকল বিশ্বাস স্থাপন করলেন ( দেখ, ধৰ্ম্মের কত বড় জয় হইল। কমিশনর ক্যাম্বেল হে নদিয়া জেলা কালেক্টব সিসি, ভিন্স সাহেবকে এই মন্মে এক পত্র লিখিনে সে, “শুনা যাইতেছে যে, নবদ্বীপের বাজার মৃত্যু রাণীর বৈষয়িকতা সম্বন্ধে হইয়াছে। তুই কি জন্য অামাকে এই সংবাদ কালেক্টর ও কমিশনরের খে নাই ? রাজার উত্তরাধিকারী কে অাছেন আলোচনা। লিখিবে।” কালেক্টর তাহার উওব এইরূপ দিলেন যে, “রাজার মৃত্যুর রীতিমত সংবাদ না পাওয়াতে আমি আপনাকে এ সংবাদ এ ঘটনা যথার্থ। মহারাণী তাহার উওরাধি- কারিণী।” কামশনর পুনরায় কালেক্টরকে লিখিলেন যে, “রাণী তার স্বামীর ত্যক্ত সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যে সমর্থ। কিন লিখবে।” কালেক্টার লিখিলেন যে, “রাণী তঁাহার সম্পত্তির কাৰ্য্যের পরিচালা করিতে পারিবেন কি না তাহা কিরূপে পরীক্ষা করিব তাহাব উপদেশ দিলেন। এই পর্যন্ত লেখা- লিখ হইয়া কিছুদিন এ বিষয়ের আর কোন কথা হইল না। পৌষ ম সে কমি- শনর সাহেব এখানে আসিয়া মহারাণীকে এইরূপ এক পত্র লিখিলেন যে, “আপনি যেরূপ পুরাতন ও সম্ভ্রান্ত পরিবাবের স্ত্রী তাহাতে আপনার উপযুক্ত দেওয়ানের সাহায্য সত্ত্বেও আপনি যে জি সম্পত্তির কাৰ্য্য সুচারুরূপে চালা- ইতে পারিবেন এরূণ, বােধ হয় না। অাপনাদের ন্যায় উচ্চ পরিবারের প্রতি অতএব আপনি সম্পত্তি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের গভর্ণমেন্টের বিশেষ দৃষ্টি আছে। হস্তে দিবার জন্য কমিশনরের স্বীয় সমন্ত সম্পত্তির ভার কোর্ট অব ওয়ার্ডসের আদেশ। হস্তে অর্পণ করুন। তাহার সম্পত্তি পাছে উক্ত কোর্টের কর্তৃত্বাধীনে যায় এই নিমিত্ত রাণ অতিশয় চিন্তিত ছিলেন। এক্ষণে ।
আত্মজীবন-চরিত। এই পত্র পাওয়াতে অত্যন্ত ব্যাকুলিত চিত্ত হইয়া যাহাতে বিষয় নিজ হস্তে থাকে তাহার বিশেষ চেষ্টা করিতে আদেশ দিলেন। যদিও আমার ঐরূপ ইচ্ছা নহে তথাপি তাহার ইচ্ছামত আমার কাৰ্য্য করিতে হইল। মহারাণীর আদেশানুসারে আমি একজন ব্যারিষ্টার ও দুইজন প্রধান উকীলকে রাজবাটী ডাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম যে, “মহারাণী না দিলে কোর্ট বলপূর্বক তাহার সম্পত্তি আপন হস্তে লইতে পারেন কি না?” তঁাহার। কহিলেন যে, “মহারাণী যে জমিদারীর কাৰ্য্য চাইতে পারেন তাহার কোন নিদর্শন নাই। সুতরাং তাহাকে অযোগ্য ভূম্যাধিকারিণী স্থির করিয়া কোর্ট তাহার সম্পত্তি আপন হস্তে লইতে পারে।” নগরবাসীদের মধ্যে এই রাজপরিবারের হিতাভিলাষী কোন কোন ভদ্রলোক কোর্টের অধীনে এ সম্পত্তি যাওয়ার জন্য গােপনে চেষ্টা করিতেছিলেন। তাহাদেরই চেষ্টায় কমিশনর ও কালেক্টর মহাবাণীকে পত্র লেখেন এবং ব্যারিষ্টার ও উকিলের। উক্তরূপ মত দেন। তখন আমারও ঠিক এইরূপ বিবেচনা ছিল যে কোর্ট ইচ্ছা করিণেই এ বিষয়ের ভার হস্তে লইতে পারেন। সুতরাং সম্পত্তি হস্তে রাখিবার নিমিত্ত মহারাণী আর কোন উদ্যোগ কোর্ট অব ওয়ার্ডস কর্তৃক করিলেন না। তিনি ২৬শে পৌষ, ১২৭৭ সাল সম্পত্তির ভার গ্রহণ। সমস্ত সম্পত্তির ভার কোর্টের হস্তে দিলেন এবং কয়েকদিন পরে আমাকে এই সম্পত্তির কাৰ্য্য ধ্যক্ষ করিতে কালেক্টার সাহেবকে অনুরােধ করিলেন। কালেক্টর আমার বিষয়ে কমিশনর সাহেবকে এইরূপ লিখিলেন যে, “রাজার মুখে দেওয়ানের অনেক প্রশংসা শুনিয়াছি এবং মহারাণী ও ইহার নিমিত্ত অনুরােধ করিয়াছেন। অতএব আমার বিবেচনা হয় যে, দেওয়ানকে ম্যানেজারী পদে নিযুক্ত করিলে আমার মানেজারীতে সম্পত্তির কার্য্য উত্তমরূপে চলিবে। চলিবে। আর যে নিযুক্ত। দুই শত টাকা বেতন ইনি পাইতেছেন তাহাই দেওয়া যাইবে।” কমিশনর সাহেব এই পত্রের উত্তরে কালেক্টরকে লিখিলেন যে “তুম ম্যানেজারী পদের জন্য যে জনকে মনােনীত করিয়াছ তাহা অপেক্ষা আপাততঃ আর উত্তম নির্বাচন হইতে পারে না। অতএব ইহাকে এপদে অভিষেক করা হইল।” এ দিকে আর কোন দুর্ভাবনার বিষয় থাকিল না। কিন্তু পঞ্চ সহস্র টাকার গভর্ণমেন্ট সিকিউরিটা অথবা জমিদারী এই কৰ্ম্মর জামিনীতে আবদ্ধ কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কার্যপ্রণালী। রাখিতে হইবে তাহারই নিমিত্ত অতিশয় উদ্বিগ্নচিত্ত হইলাম। জমিদারী বা সিকিউরিট বা এত টাকা আমার অথবা স্বগণের আমার জামিনের বিষয়। মধ্যে কাহারও ছিল না। সুতরাং কি করিব ভাবিয়া অস্থির হইলাম। একদিন হঠাৎ রায় যদুনাথ রায় বাহাদুর প্রচণ্ড রোদ্রে আমার বাটা আসিয়। হাসিতে হাসিতে আমাকে কহিলেন যে, “আপনি নাকি জামিনীর জন্য অত্যন্ত চিন্তিত হইয়াছেন? আপনি কিছুমাত্র চিন্তা করিবেন না। আমাদের জমিদারী আপনার জামিনীতে আবদ্ধ রাখিব।” আমি কহিলাম “ছে তােমাদের কোন অসুবিধা হয় এ নিমিত্ত আমি তােমার নিকট এ প্রস্তাব করি নাই।” তাহার এই নিঃস্বার্থ পরােপকারে আমার মন কৃতজ্ঞতা রসে এত আদ্র হই যে আমার কণ্ঠ হইতে বাক্য নিঃসৃত হইল না। পর দিবস মহারাণী আমাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন যে, “যদু বাবু নাকি আপনার জামিন হইবার প্রস্তাব করিয়াছেন?” আমি উত্তর করিলাম “আজ্ঞা এ কথা সত্য”। “আমি থাকিতে আপনাব জামিন অন্য লােক হইবেন ইহা আমার সহ হইবে না।” এই কথা বলিয়া মহারাণীর দয়া। তিন পঞ্চ সহস্র টাকার গভর্ণমেন্ট নেট আমার হস্তে দিলেন। তাঁহার এইরূপ কৃপায় ও স্নেহে আমার নেত্রদ্বয় জলপূর্ণ হইয়া গেল । ঐ পাঁচ হাজার টাকায় আমার নামে গভর্ণমেন্ট সিকিউরিটী এক খণ্ড ক্রয় করিয়া কালেক্টরীতে প্রদান করিলাম, এবং ঐ টাকার একখানি ঋণপত্র মহারাণীকে লিখিয়া দিলাম। ঐ সিকিউরিটীর বাৎসরিক যে দুই শত টাকা সুদ পাওয়া যাইবেক তাহা ঐ খতের সুদ অবধারিত হইল। ইহাতে তাহার কোন ক্ষতি হইল না এবং আমারও যথেষ্ট উপকার হইল। গাবার ধৰ্ম্মের জয় দেখ! যিনি পূৰ্বে 'মাকে পরম শত্রু মনে করিতেন তিনিই এক্ষণে আমাকে পরম মিত্রজ্ঞান করিয়া বিনা প্রার্থনায় আমার উপকার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন! মহারাজার পরলােক গমুনে আমার সংসারযাত্রা নির্বাহের যে চিন্তা হইয়া- ছিল তাহা দুরীভূত হইল বটে, কিন্তু এই পঞ্চাশ কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কার্য- বৎসর বয়সে কোর্টঅব ওয়ার্ডসের কাৰ্য্য কিরূপে প্রণালী। সুসম্পন্ন করিব এবং কিরূপে কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করিতে পারিব এই ভাবনা উপস্থিত হইল। তৎকালে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কার্যপ্রণালির কোন বিধি ছিল না। আমাদের কালেক্টর তাহার আম- আত্মজীবনচরিত। লারাও এ বিষয়ে আমার মত অজ্ঞ ছিলেন। সুতরাং তাহাদের নিকট কোন সদুপদেশ প্রাপ্তির আশা ছিল না। শুনিতাম ভিন্ন ভিন্ন ষ্টেটের ম্যানেজার ভিন্ন ভিন্ন প্রণালীতে কাৰ্য করিয়া থাকেন। প্রায় সমস্ত দিবস ও রাত্রি নয় ঘণ্টা পর্যন্ত পরিশ্রম করিয়াও ইচ্ছামত কর্ম নিৰ্বাহ করিতে পারিতাম না । চিন্তায় রাত্রে নিদ্রা হইত না। রাজার মৃত্যুর পর আমার আশঙ্কা। হইতে শেষ রাত্রে বিপুল ঘৰ্ম্ম হইত ও হৃদয়ের অভান্তরে যেন ধড়, ফড় করিত। যেন কি একটা ভয়ানক বিপদ ঘটিবে এইরূপ মনে হইত। রজনী প্রভাত হইলেও প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত ঐরূপ যন্ত্রণা থাকিত। তাহার পর ক্রমে ক্রমে তাহার উপশম হইত। এই অকা রণ চিন্তার শান্তির জন্য মন মধ্যেই কতই চেষ্টা করিতাম কিন্তু কিছুতেই কৃত- কার্য হইতে পারিতাম না। এ রােগ প্রায় দুই তিন বৎসর বলবৎ ছিল এবং এক্ষণে মধ্যে মধ্যে হইয়া থাকে। আমি কখনই সাহসী নহি। বাল্যকালে গুরুজনেরা আমাকে মুখচোরা কহিতেন। অদ্যাপি যখন কালেক্টর কি কমি- শনর সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাই, তখন আমার মন অতিশয় চিন্তা- যুক্ত থাকে। কিন্তু সাক্ষাৎ হইলেই চিন্তাদুর হয় এবং প্রফুল্লচিত্তে প্রত্যাগমন আমার কাৰ্যে কোন দোষ ঘটিলে আমি তাহ। কখন গোপন রাখি আমি তাহা অবিচলিত চিত্তে কর্তৃপক্ষের গোচর করি। মনে ভাবিয়া থাকি যে যখন ভাল কার্য করিলে প্রশংসা পাই তখন মন্দ কৰ্ম্ম করিলে অবশ্যই দণ্ড পাইব। সৎপথে থাকার এমনি গুণ যে আমার ভুলের নিমিত্ত আমি কখন দণ্ডিত বা তিরস্কৃত হই নাই, বরং ভুল সংশােধনের সদুপদেশ পাইয়াছি।
রাণীর দত্তকগ্রহণ। অষ্টম পরিচ্ছেদ। বয়স ৫১ হইতে ৫৮ বৎসর। আমার কাৰ্ষ্যে কর্তৃপক্ষের সন্তোষ। ক্ষিতীশবংশবলিচরিত। রাণীর দত্তক গ্রহণ। পুনৰ্ব্বার পীড়া ও বিদেশ গমন। অম্লরােগের প্রাদুর্ভাব। গীত মঞ্জরী। পূৰ্বসুখের দিন। সম্পাত যে মাসেই কোর্ট অব ওয়ার্ডসের হতে আসুক, বৎসর শেষ হইলে তাহার সালতামামীব কাগজ দিতে হয় । সালতামামী। প্রথম বৎসব ৩ মাসে আমার সালতামামী দিতে তল! অনেক পরিশ্রম ও বিবেচনা করি যা সালতামামীর কাগ প্রস্তুত করিযা দিলাম। দ্বিতীয বৎসরে অর্থাৎ ১২৭৮ বাঃ অব্দে যথােচিত শ্রম ও যত্নপূৰ্ব্বক কার্যনিপাহ কবিলাম। আমার জানিত চল্লিশ হাজার টাকা রাজার সময়ের ঋণ ছিল। কিন্তু তাহার মৃত্যুর পর গার পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা ঋণ প্রকাশ হইল। তাহার 'ধ্যে এই বর্ষে অনেক ঋণ পরিশােধ করা গেল। সালতামামীর রিপাের্টে কালেক্টর সাহেব আমার অনেক সুখ্যাতির কথা লেখার পর এই কথা লিখিয়া রিপাের্ট শেষ করিলেন যে, “এমন ম্যানেজার পাওয়া নদীয়া ষ্টেটের সৌভাগ্যের বিষয় বলিতে হইবেক,” এই অব্দের ৯ই অগ্রহায়ণে মহারাণী দত্তক গ্ৰহণ কৰিলেন। দক গ্রহণ জন্য রাজার সময় আমি কয়েকটা বালক দেখিয়াছিলাম, রাণীর দত্তক গ্রহণ। এবং তাহার মধ্যে দুইটী রাজাকেও দেখাইয়া- ছিলাম, কিন্তু কোন বাধাৰণতঃ কার্য সম্পন্ন হয় নাই। মহারাজা যখন শেষ বারে বহির্গত হন তখন বারাণসী হইতে আমাকে লেখেন যে, “আপনি অব অন্য বালকের অনুসন্ধান করিবেন না। আমি প্রতিগমন করিয়া হর- ধামেব গিরিধর চন্দ খুড়ার পুত্রকে দত্তক লইব আহা! তিনি আর ফিরিলেন না! এবং মনােবাঞ্ছাও পূর্ণকরিতে পাবিলেন না। যদি আমি দূরদর্শীর ন্যায় কাৰ্য্য না কবিতাম, তবে আর দনুক গ্রহণ ও হইত না এব’ এ রাজপরিবারের নাম ও ডুবিয়া যাইত। মহারাজ বিষয়াধিকারী হওয়ার অব্যবহিত পরই আমি তাহা দ্বাবা দুই মহারাণীর দত্তক গ্রহণের অনুমতিপত্র লেখাইয়া রাখিয়াছিলাম। সেই অনুমতি পত্রানুসারে কুমার ক্ষিতীশচন্দ্র দত্তক পুত্ররূপে গৃহীত হইলেন, এবং ভাবী দত্তক পুত্রের যে নাম রাজার সময় স্থির করিয়াছিলাম সেই নাম আত্মজীবন-চরিত। তাহাকে দেওয়া হইল 1 পূর্বে আমি মহারাণীর ষ্টেটের ম্যানেজার ছিলাম এক্ষণে কুমারের সম্পত্তি হওয়াতে তাহার ষ্টেটের ম্যানেজার বলিয়া এক নুতন সন পাইলাম । এই রাজবংশের একটি ইতিহাস থাকে অনেক দিবসাবধি আমার এইরূপ ইচ্ছা হইয়াছিল, কিন্তু আমি কখন কোনরূপ রচনা “ক্ষিতীশ বংশাবলিচরিত।” করি নাই বলিয়া স্বয়ং ইহা লিখিতে প্রথমে সাহস করি নাই। ভাবিয়াছিলাম যদি কোন উপযুক্ত লেখক এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হন তবে এই ইতিহাসের উপকরণ সংগ্রহ করিয়া দেই। প্রথমে আমি রায় যদুনাথ রায় বাহাদুরকে আমার অভিলাষ জানাই। তিনিও ইহা লিখিতে সম্মত হন। এই কথা শুনিয়া রাজজামতা বাবু অঘােরচন্দ্র মুখােপাধ্যায় আমাকে কহেন যে, তাহার পুত্র, বাবু শামাধব যায় তাহার মাতামহের বংশাবলি বলিয়া এই ইতিহাস লিখিতে ইচ্ছা করিয়াছেন। তাহার কথায় আমি সম্মতি প্রকাশ করিলাম বটে, কিন্তু তাহার পুত্রের ন্যায় তরুণ বয়স্ক যুবকের দ্বার, যে ঐ কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইবে এরূপ বিশ্বাস হইল না। রাজার সম্পত্তি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কর্তৃত্বাধীনে আসিলে, বাবু কালীচরণ ঘােষ ডেপুটী কালেক্টর আমাকে লিখি- লেন যে, “কোন কোন ষ্টেটের ম্যানেজার তঁাহার ওয়ার্ডের বংশের ইতিহাস লিখিয়া কালেক্টরিতে দিয়া থাকেন। অতএব আপনি নবদ্বীপের রাজাদের একটি ইতিহাস লিখিয়া দিবেন।” তঁাহীর কথানুসারে একটি সংক্ষিপ্ত ইতি- হাস প্রথমে বাঙ্গালা ভাষায় লিখিলাম ও পবে তাহার ইংরেজী অনুবাদ তৃতীয় কি চতুর্থ সাল-তামামীর রিপোর্টে সন্নিবেশিত করিলাম। কিছু দিন পরে আমার জনৈক সুবিজ্ঞ আত্মীয় এই সংক্ষিপ্ত বাঙ্গালা ইতিহাস পাঠ করিয়া সাতিশয় প্রীত হইলেন এবং কিঞ্চিৎ বিস্তার পূর্বক রীতিমত ইতিহাস লিখিতে গাঢ় অনুরােধ করিলেন। আমিও ভাবিলাম, একজন উপকরণের আয়ােজন করিয়া দিবেন, আর একজন লিখিবেন, ইহা হইলে গ্রন্থ সুচারু হইবে না। অতএব এই বিষয় স্বয়ংই সম্পন্ন কবি। এ দেশে আমাদের বংশের যে কিছু পদ মান আছে, তৎসমুদয় এই রাজা- দের প্রসাদে হইয়াছে। এবং এই রাজবংশের ইতিবৃত্ত আমি যেমন জ্ঞাত আছি তেমন আর কেহই নাই। সুতরাং এ বিষয় আমি নিষ্পন্ন না করিলে আর কাহারও দ্বারা হইবে না। এবং এই বংশের বৃত্তান্ত জানিবার যে স্পৃহা সাধারণের আছে তাহাও পূরিবে না। এই বিবেচনা করিয়া আমার মুদ্রণ ব্যয়ের অর্ধেক টাকা রাজসরকার হইতে দান। অবকাশবিরহেও আমি এই বিষয় নিষ্পদনে প্রবৃত্ত হইলাম। দিবসে বা রাত্রি নয় ঘণ্টা পর্যন্ত রাজবাটীর কার্যের জন্য প্রায় অবকাশ হইত না। রজনী নয় ঘণ্টার পর দুই প্রহব পর্যন্ত এই ইতিহাস লিখিতম। এইরূপে দুই বৎসরে এই বিষয় সম্পন্ন করি। এই ইতিহাসে এই রাজবংশের অনেক উপকার হইবে ভাবিয়া ইহার প্রক টন ব্যয়ের নিমিত কালেক্টর সাহেবকে মুদ্রণ যায় ও কমিশন। জানাইলাম। কালেক্টর কহিলেন, “কমিশনরের নিকট প্রার্থনা কর।” কমিশনর কহিলেন “ইহা নিতান্ত প্রয়ােজনীয় বটে কিন্তু আপাতত নহে ! ষ্টেটের ঋণ পরিশােধিত হইলে এ ব্যয় কর। যাইবেক।” এই বিষয়ে উভয় সাহেবের অমনােযােগ দেখিয়া বিস্ময়ান্ন ইলাম। তাহারা এই জমিদারীর সরভের নিমিত্ত চৌদ্দ সহস্র টাকা বরাদ্দ করিয়া মাসিক প্রায় দুই সহস্র টাকা ব্যয় করিতেন, এবং বাটা সংস্কার প্রভৃতি নানা আবশ্যক অনাবশ্যক বিষয়ে বহু ব্যয় করিতে সম্মতি দিতেছেন, কিন্তু আমার মৃত্যু হইলে যে অত্যাবশ্যক কাৰ্য্য আর সম্পন্ন হইবার সম্ভাবনা থাকিবে না তাহারই নিম্পাদনাথ ৪৩৬ টাকা ব্যয় করিতে কুণ্ঠিত হইলেন। আমি পরিশ্রমের পুরস্কার চাহি নাই। শুদ্ধ ছাপান ব্যয় চাহিয়া- ছিলাম। ইহার পূর্বে উক্ত কমিশনার সাহেবের কোন কথায় আমি সায় না দেওয়াতে অর্থাৎ তাহার বিবেচনা ভ্রমাত্মক বলাতে, তিনি আমার প্রতি অতি শয় বিরক্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু কালেক্টরের নিকট কোন বিষয়ের নিমিত্ত অপরাধী ছিলাম না, তবে ইনি কেন আমার প্রার্থনা গ্রাহ করিলেন না তাহা বুঝিতে পারিলাম না। যাহাহউক, আমি নিজ ব্যয়ে এই ইতিহাস ছাপাইলাম। ছাপানর কিছু দিন পরে আমাদের রাজ দৌহিত্র শ্যা মাধব বাবু, নিজ ব্যয়ে ক্ষিতীশ বংশাবলি- এই গ্রন্থ রচিত হওয়াতে রাজসংসারের বিশেষ চরিত ছাপান। উপকার হইয়াছে, এরূপ উক্ত কালেক্টর ও কমিশনর সাহেবের নিকট ব্যক্ত কবিয়া ইহাব ছাপানর খবচ দিবার নিমিত্ত অনুরােধ করাতে ব্যয়ের অর্ধেক টাকা প্রাপ্ত হইলাম। পেটি- য়ট, প্রভৃতি সংবাদপত্রে এই ইতিহাসের মুদ্রন ব্যয়ের অর্ধেক টাকা যে প্রয়ােজন ও প্রশংসা প্রকটিত ইয়াছিল রাজসরকার হইতে দান। তাহাতে বােধ হয় কালেক্টর ভাবিয়াছিলেন আত্মজীবন-চরিত। । যে, এ পুস্তক অধিক পরিমাণে বিক্রীত হইয়া আমার যথেষ্ট লাভ হইবে। এ টাকা পুরস্কার স্বরূপ দিন। যদি যথার্থই তিনি এইরূপ বিবেচনা করিয়া থাকেন তবে তাহা নিতান্ত ভুল হইয়াছিল। কারণ তাহাদের দেশীয় গােকের মত এ দেশের লােকের প্রবৃত্তি অদ্যাপি জন্মে নাই। যদি কোন কোন লোকের এ প্রবৃত্তি জন্মিয়। থাকে তবে তাহাদের সংখ্যা অতি অল্প। স্কুলের পাঠ্য পুস্তক ক্রয় না ক<িলে চলে না বলিয়া, তাহা আধক পরিমাণে বিক্রীত হইয়া থাকে । উপন্যাস ০ নাটক আশু-প্রীতিকর ও অবকাশরঞ্জনী বলিয়া তাহার গ্রাহক যথেষ্ট হয় । তদ্ব্যতীত অন্য প্রকারের গ্রন্থ যতই জ্ঞাতব্যবিষয়ে পূর্ণ থাকুক না ও যতই জ্ঞা•প্রদ হউক না, তাহা জনসমাজে বড় প্রবেশ করিতে পারে না। এখনও আমাদের দেশীয় লােক যত আমােদপ্রিয়, তত জ্ঞানপ্রিয় হয় নাই, সামান্য পাঁচালীরও পুনঃ পুনঃ সংস্করণ হইতেছে কিন্তু অতি উচ্চাঙ্গের গ্রন্থ অবিক্রীত হইয়া কীটের অহির হইয়াছে । অামার এই ক্ষিতীশৰংবলি চরিতের প্রশংসা শুনিয়া অনেকেই সারবান্ গ্রন্থ অবিক্রীত। তাহা পড়িবার জন্য ব্যর্থ হন, কিন্তু তজ্জন্য ব্যয় করিতে ইচ্ছা করেন না। এমন কি যাহাদের বংশের ইতিহাস তাহারাও এক জোড়া সামান্য বিনামার জন্য যে ব্যয় করিয়া থাকেন তার অর্ধেকও এ পুস্ত- কের নিমিত্ত ব্যয় করতে পারেন না। প্রথমে আমি প্রকাশ করি যে কোন রাজজ্ঞাতিকে ইহা বিনামূল্যে দিব না। কিন্তু শেষে আর সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারি নাই। রাজসরকারের যে ৮৫ সহস্র টাকা ঋণ ছিল তাহা প্রায় তিন বৎসরের মধ্যে পরিগোধিত হইল। এই বারের সালতাম- সালতামামী। মীর রিপোর্টে কালেক্টর সাহেব আমার কাৰ্য্যের ও চরিত্রের বহু প্রশংসা করেন। পূৰ্ব্বে লিখিয়াছি যে কমিশন্সর লর্ড ইউলিক ব্রোন সাহে ের অভিপ্রায় মত কথা না কায়া, ভদ্রলোকের মত স্বাধীন ভাবে যথার্গ কথা কহাতে তিনি আমার প্রতি অপ্রসন্ন কালেক্টরের প্রশংসা। হন । এক্ষণে কালেক্টর সাহেবের রিপাের্ট তাহার নিকট যাইলে তিনি আমার প্রশংসার বিরুদ্ধে কিছু না পাইয়া এইরূপ লিখিলেন যে, হুঁ। আমি জানি যে ম্যানেজার অতি বিশ্বস্ত পুরাতন কর্মচারী এবং তিনি রাজষ্টেটের কাৰ্য যত্ন সহকারে করিতেছেন। রাজার কমিশনরের অসন্তোষ। জমিদারী অধিকাংশ পত্তনি আছে। সুতরাং ইহার কলিকাতা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাটীতে । কাৰ্য্য অতি সহজেই নিষ্পন্ন হয়। নাবালকের অভিভাবকগণের মধ্যে রায় যদুনাথ রায় বাহাদুরের দুর্লভ স হায্যে স্টেটের অনেক উপকার হইতেছে। রায় বাহাদুর যদিও প্রকৃতরূপে বিষয কার্ষের কোন সংস্রবে ছিলেন না, তথাপি তিনি সাহেবের প্রিয়পাত্র বলিযা সম্পত্তির সুচারু কার্যের জন্য প্রশংসাস্পদ হইলেন আর আমি এই সুচাৰু কার্যের কাৰ্যদক্ষ হইয়াও তাহার বিরাগভাজন বশতঃ যশ লাভ করিতে পারিম না। যদিও এ হানুগ্রহ নিগ্রহের কারণ বিক্ষণ বুঝিতে পারিমি, তথাপি দুঃখিত না হইয়া থাকিতে পারিলাম না; যাহা হউক আমার এ দুঃখ দীর্ঘকাল স্থায়ী হই না। বেবিনিট বাের্ডের সাহে- বেবী আমার কার্যে সাতশয় সন্তোষ প্রকাশ করিয়া লিখলেন যে, “ম্যানেজার যেরূপ উত্তমরূপে কৰ্ম্ম করিতেছেন তাহাতে তাকে বাের্ডের সুখ্যাতি। ধন্যবাদ দ ওয় কর্তব্য”। আমি কমিশনরের পত্রে যেমন বিষাদিত হইয়াছিলাম বোর্ডের পত্রে তেমনি আলাদিত হইলাম। দুঃখের পর সুখ হইলে যত আনন্দ হয়, সহজাবস্থায় সুখলাভ হইলে তত আনন্দ হয় না। শতাবসানে বসস্তানিলে সে সুখ বােধ হয়, পুৰ্ব্বে শীতের কষ্ট ন! হইলে বসন্তে সে সুখ হইত না। কমিশনরও যদি কালেক্টরের মত যশ কীৰ্ত্তন করিতেন তাহা হইলে আর বাের্ডের প্রশংসায় এতাধিক অালাদ হইত না। পর বৎসর (১২৮১ অঝাের শ্রাবণ মাসে) আমার ৫০১ বেতন বৃদ্ধি হইয়া ২৫০ টাকা হয় । তাহার পর আমার বেতন ২৫ হইতে ৩০০ টাকা হয়। ১২৮৩ অব্দের আশ্বিন মাসে আমার জ্বর হইল। কার্তিক মাসে আমার পূৰ্ব্বসঞ্চিত শূল রোগ পুনরায় দেখা দিল। মাঘ আমার পুনর্বার জ্বর। মাস হইতে অশেষ যন্ত্রণাভাে। করিতে লাগিলাম। ফাল্গুন ও চৈত্র মাস ভাল থাকিলাম। ১২৮৪ অব্দের প্রথমেই পুনৰ্ব্বার বেদনা ধরিতে লাগিল। কোন ঔষধে রোগের প্রতিকার হই না। জীবন ধারণ কঠিন হইয়া উঠিল। এখানে উপশমের কোন উপায় না দেখিয়া স্থানান্তরে যাইবার নিমিত তিন মাসের ছুটি লইলাম। জ্যৈষ্ঠ মাসে কলিকাতায় চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাটাতে যাইয়া থাকি- কলিকাতা বিদ্যাসাগর মহা- লাম। তিনি আমাকে সুস্থ করিতে ও সুখে রাখিতে শয়ের বাটীতে । যে আন্তরিক যত্ন করেন তাহা কখনই ভুলিতে পারিব না। কলিকাতায় কোন উপকার না পাওয়াতে ৯ দিবস পবে হুগলীতে ঈশ্বর- ++++++ rew ১৬৪ আত্মজীবন-চরিত। লাম। আমাদের রাজদৌহিত্র বাবু শ্যামাধব রায়ের বাসায় হুগলী । উপস্থিত হইলাম , সেখানেও স্বাস্থ্য লাভের কোনও লক্ষণ না দেখিয়া বর্ধমানে বাবু সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবাসে গমন করি- সেখানে ভােলানাথ কবিরাজের কৃত ঔষধ বর্ধমান। লইয়া ৩রা আষাঢ় ভাগলপুরে যাইয়া অবস্থিত হইলাম। এ দিকে আমার কিছুমাত্র বেদনা ধরিত না, কেবল অক্ষুধা ও দৌল্য ছিল। সেখানে এই দুয়ের প্রতিকার দ্রুত ভাগলপুর। ভাবে হইতে লাগিল। ভাগপুর অতি রমণীয় স্থান, পাৰ্বতীয় নয় হাথচ অসমতল ; যাহারা প্রথমে এ দৃশ্যটি দর্শন করেন তারা এই নুতন আকারের নগর দেখিয়া বড়ই অাদিত হন। প্রাতে ও বৈকালে বেড়াইবার অতি প্রশস্ত প্রদেশ। আছে। কর্ণগড়, জাঙ্গিস খাঁর সমাধিস্থান প্রভৃতি অনেক পুরা- ভাগলপুরের কীৰ্ত্তি দর্শন। ও আধুনিক কীৰ্ত্তি দৃষ্টিগোচর হয়। প্রবাদ আছে কর্ণগড় ভারত রচয়িতা ব্যাস বর্ণিত মহারথী কর্ণের নির্মিত। এস্থান উচ্চ ও প্রশস্ত। ইহার চতুর্দিকস্থ খাদের নিদর্শন অদ্যাপি আছে । নাথপুর নামে এক পুরাতন নগর এই গঙের পূধ্বদিকে দৃষ্ট হয়। ভাগলপুর আধুনিক নগর । প্রাতে ও বৈকালে আমি যতদুর পারিতাম ততদুর বেড়াই- তাম । রাত্রে অনেক ভদ্রলােক আমার সঙ্গীত শুনিতে আসিতেন। তঁাহারা গান শ্রবণের জন্য যাদৃশ আগ্রহ প্রকাশ করিতেন, দুৰ্বলতাবশতঃ আমি তঁাহা- দিগকে 'তাদৃশ তৃপ্ত করিতে পারিতাম না। ২২শে আমি মুঙ্গেরে যাইয়া সেখানকার স্কুলের হেড, মাষ্টার বাবু অঘাের- নাথ মুখােপাধ্যায়ের আতিথ্য গ্রহণ করি। তাহার মুদের। পর দিনই আমার ভাগলপুরে ফিরিয়া আসিবার বাসনা থাকে। এ কাবণ অঘাের বাবু আমাকে সীতাকুণ্ড দেখাইরা পীর- পাহাড় লইয়া যান। সেখানে মহারাজা যতীন্দ্রমােহন ঠাকুরের এক অপূৰ্ব্ব প্রাসাদ আছে। আমি বহু কষ্টে ঐ শেখরে আরোহণ করিলাম। চতুর্দকস্থ মনােফর দৃশ্য দর্শনে আমার সকল কষ্ট দূরীভূত হইয়া গেল। এবং হৃদয় বিস্ময় ও আনন্দরসে আদ্র হইল । শেষে প্রাসাদে ব মধ্যে যাইয়া বসিলাম। মনের আহলাদ আর মনে রাখিতে পারিলাম না। একটী ভীমপলাশ রাগিণীর গীত গাহিতে লাগিলাম। অঘাের বাবু ভাগলপুরে প্রত্যাগমন । । আমার সঙ্গীত শ্রবণে সাতিশয় আহলাদ প্রকাশ করিয়া কহিলেন যে, “আমি আপনাকে অষ্টাহের নূন কোন প্রকারে ছাড়িব না।” পরদিন তাহার নিকট বিদায় হইবার অনেক চেষ্টা করিলাম কিন্তু কোন মতেই তাহার অনুরােধ ছাড়াইতে পারিলাম না । ভাগলপুর হইতে আমার পুত্র নবেন্দ্রকেও লইয়া গেলেন । ৯ দিবস আমাকে যারপর নাই সুখে রাখেন । প্রতি রাত্রেই কোন না কোন গায়ক ও বাদ ককে আনাইতেন। দিবসে যেমন নানা- বিধ স্থান দর্শনে আনন্দ হইত রজনীতও তেমনি সঙ্গীতে আমােদ করা যাইত। মূঙ্গেবেও কতিপয় পৌরাণিক ও আধুনিক ঘটনার প্রবাদ আছে । তথায় যে দুর্গে জরাসন্ধ রাজা লক্ষ ভূপতিকে বন্দী রাখেন মুঙ্গেরের কীৰ্ত্তিমালা। তাহা অদ্যাপি বর্তমান আছে। দুর্গের প্রাচীর ও পরীখা অদ্যাপি রহিয়াছে । ইহার উত্তর পূর্ব কোণে “করণ চেওড়া” নামে যে একটি স্থান আছে তাহাতে কর্ণরাজা বাস কয়িতেন। গঙ্গাতীরে একটী ঘাট আছে তথায় ত্রেতাবতাবে রামচন্দ্র বনবাসকালে স্নান করেন বলিযা তাহা তীর্থস্থানের মধ্যে পরিগণিত হইয়াছে। এক্ষণে লােকে সেই স্থান' ক কেল্লার ঘাট বলিয়া থাকে নিষ্ঠুর মিরকাসিম এ দেশস্থ অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে ঐ দুর্গমধ্যে বন্দী রাখেন। এবং শেষে তাহার পশ্চিমদিকস্থ গঙ্গায় অগাধ জলে নিক্ষেপ করেন । ৩রা ভাদ্র আমি মুঙ্গের হইতে ভাগলপুরে প্রত্যাগত হই। সে অঞ্চলের জলবায়ুর গুণে আমার শরীর এত শীঘ্র শীঘ্র সুস্থ ভাগলপুরে প্রত্যাগমন। হইতে লাগিল যে ১২ই আষাঢ় যে শরীরের ওজন একমণ সাড়ে বার সেব হইয়াছিল, ২০শে শ্রাবণ সেই শরীর ওজনে একমণ সাড়ে আঠার সের হইল। আর কিয়ৎকাল সে দেশে থাকিতে পারিলে বড়ই উপকার হইত; কিন্তু চুটী শেষ হওয়াতে ৬ই ভাদ্র বটীতে আসিতে হইল। গতবারের সালতামামীর রিপাের্টে কালেক্টর সাহেব আমার সম্বন্ধে এইরূপ লেখেন যে “ভূম্যপিকারী ও প্রাতে যেরূপ অসদ্ভাব আছে, তাহাতে ম্যানেজার বিনা নালিশে জমিদারীর ষে এতাধিক আয় বৃদ্ধি করিয়াছেন ইহা অতীব প্রশংসার বিষয়। আর রাজার সময় দেওয়ানী অবস্থায় তাহার সচ্চরিত্রের খ্যাতি এতই বিস্তারিত ছিল যে, কমিশনর সাহেব তাহাকে ম্যানে- জারী পদ দিতে কিছুমাত্র বিলম্ব করেন নাই”।
আত্মজীবনচরিত। আমার পুনরায় অম্লববাগের আবির্ভাব হওয়াতে ৩০শে আশ্বিন কুষ্টিয়ায় যাই। তাহার সন্নিহিত গড়ই সেতুর শিল্প কাৰ্য্য অম্লরোগের প্রাদুর্ভাব। দেখিয়া সাতিশয় আহলাদিত হই। কিন্তু এ সেতু যতই সুদৃঢ় হউক না, যমুনা সেতুর ন্যায় সুদৃশ্য নয় । পূজার ছুটাতে হাকিম, উনীল, মােক্তার প্রভৃতি প্রায় সকলেই বাটী গিয়া- কুষ্টিয়া। ছিলেন। সুতরাং অ'ধক লােকের সকিত সাক্ষাৎ হইও না। এক যৎসামান্য বাসস্থানে ছিলাম। কিন্তু স্থানটা এমনি স্বাস্থ্যকর যে, যে আট দিবস তথায় থাকি সে কয়েক দিন আব রোগের চিহ্নমাত্র ছিল না। আমাদের বাবু মহানন্দ মুখােপাধ্যায়ের জামতা গিরীন্দ্র সে সময় তথা সব, ডেপুটা কালেক্টরের পদে ছিলেন। তিনি এই পয়েক দিন আমাকে সুখে রাখিবার অনেক যত্ন করেন। রাজ বাটীব দীঘির পঙ্কে। দ্ধার করিবার কাৰ্য ১০ই মাঘ আরম্ভ হয়। এই ব্যাপারটি নির্বাহ করতে আমার বিস্তর শ্রম দীঘির পঙ্কোদ্ধার। ও তন্নি 'মন্ত সময় সময় বুকের বেদনায় ক্লেশ পাই। রাজবাটীর কোন মােন মার উদ্যোগ করিতে ফাল্গুন মাসে আমি মুরশীদাবাদ যাই , তথায় কয়েক দিন অবকাশ ক্রমে নবাব বাটী কাসিম- বাজারের অন্নদাপ্রসাদ বাবুয় বাটী ও লক্ষ্মীপতি সিংহের উদ্যান দেখি । দিনের পর বাটী ফিরিয়া আসি । আমি পূঝে এক স্থানে লিখিয়াছি যে বাল্যকাল হইতে আমার সঙ্গীত বিষয়ে একটু আসক্তি ছিল। ইহা বয়ঃবৃদ্ধি সহ- সঙ্গীতে অনুরাগ। কারে পরিবদ্ধিত হয়। যে সকল হিন্দি গীত গাইতাম তাতে আত্মীয় স্বজনের বিশেষ সন্তোষ হইত না। তাহারা কহিতেন “যে গানের ভাব বুঝিতে না পারিলে শুদ্ধ সুরে আনন্দ লাভ হইতে পারে না তৎকালে বঙ্গভাষায় রচিত গীতের মধ্যে দেওয়ান বঘুনাথ রায় মহাশয়েব পদ ও রাজা রামমােহন রায়ের রচিত কয়েকটা ব্রহ্মসঙ্গীত প্রচারিত ছিল। কিন্তু পবিত্ৰপ্ৰণয় রসাত্মক গান অত’ল্প শুনা যাইত। তদানীন্তন আদি সাত্মক গীতির মধ্যে অধিকাংশ গাইতে লজ্জাবােধ হইত। তখন দম্পতি-প্রণয় প্রণয় মধ্যেই পরিগণিত ছিল না । সুতরাং সুরসিক রচয়িতাগণও অপবিত্র প্রণয় প্রসঙ্গে গান রচনা করিতেন। প্রথমে আমি ঐ সকল গীতির মধ্যে যাহাতে সুন্দর কবিত্ব দর্শন করতাম তাহার অশ্নীণ ভাব পরিবর্তন পূব্বক পবিত্র ভাবে গীত মঞ্জরী । । পরিগণিত করিয়া গাইতাম। আত্মীয়গণ তাহা শ্রদ্ধা ও তাহলাদের সহিত শুনতেন। কিন্তু বারবার একই গান শ্রবণে শ্রোতৃবর্গের আমােদের ন্যূনতা হইতে আরম্ভ হয়। এ কারণ আমার তাদৃশ কবিত্ব শক্তির অভাবেও আমি যগীত রচনা করিতে প্রবু ও ইই। এই সকল গান নিয়া আত্মীয়গণ অতীব আনন্দ প্রকাশ করিতেন, কিন্তু ইহার রচয়িতা কে তাহা তাহাবা জানতেন না। সঙ্গীতে সন্তোষ। কেহ কখন জিজ্ঞাসা করিতেন “তুমি এ সক। নূতন গান কোথায় প”, আমি উওর করিতাম “রাজারা হাতিঘােড়া যেখানে পায” এ সকল আমার নিজের গীত, ইহা বানাতে যেন লজ্জা বোধ হইত। প্রায় ১০/১২ বৎসব এইরূপ যাওয়ার পর একদা কোন আত্মীয়ের বাটীতে (যে সময় আমি এই সকল গীত গাই, তখন প্রসিদ্ধ নাটক-প্রণেতা বাবু দীনবন্ধু মিত্র, কৃষ্ণনগর কলেজের পণ্ডিত নগোপাল তর্কালঙ্কার, বাবু প্রসাদ বায় প্রভৃতি কয়েকজন বান্ধব উপস্থিত ছিলেন। তঁাহারা পুনঃ পুনঃ ‘জজ্ঞাসা করিয়া ও রচয়িতার নাম না পাওয়াতে, আমার রচনা বুঝিতে পারিলেন এবং সকল আত্মীয়ের নিকট ই প্রকাশ করিয়া দিলেন। প্রথমে আমি কেবল ভালবাসার গীত রচনা করিয়াছিলাম, পরে অ অঁয বিশেযে প্রীত রামচরিত, কৃষ্ণলীলা প্রভৃতি “গীত-মজা।” পোৰাণিক প্রসঙ্গ বলম্বন করিয়া মাতৃস্নেহ, অপত্যস্নেহ, দাম্পত্য প্রণয় লাতৃস্নেহ ইত্যাদি কয়েক বিষয়ে কতিপয় গীত রচনা তাহার পর ঋতু বিশেষে গাইবার জন্য বসন্ত, বর্ষা, হােবির ও শুভ কম্মোপলক্ষে গাইবার নিমিত্ত বিবাহ, পুত্র লাভ, জন্মতিথি বিষয়ের কতকগুলি গীত হিন্দিগানের আদশে প্রস্তুত করি । আত্মীয়গণের মধ্যে কেহ কেহ আমার গণ সকল পুস্তকাকারে চার করিতে বিশেষরূপে অনুরােধ করিতেন। কিন্তু আমি সাধারণের গােচর করিবার আশায় এ সব ল গান রচনা করি নাই। আমি স্বয়ং গাইয়া আত্মীয় স্বজনের আনন্দবর্ধন করিব এই আমার উদ্দেশ্য ছিল । সুতরাং তঁাহাদের অনুরােধের প্রতি মনােযোগ দিতাম না। যাহা- দের নিতান্ত আগ্রহ দেখিতাম তাহাদিগকে কতক গীত লিখিয়া দিতাম। । কিন্তু শেষে আমার যে রূপ বয়স হইল তাহাতে আর আমার উদ্দেশ্য সাধনের প্রত্যাশা রহিল না। সুতরাং আমার গান সমস্ত ১২৮৫ বাঃ অব্দে পুস্তকা- কার প্রচার করিলাম। করি।
আত্ম-জীবনচরিত। র আহা কি সুখের সময়ই বিগত হইয়াছে। যে সময় আমি বান্ধব সমাজে এই সকল গীত গাইতাম, সে সময় বন্ধুদিগের পুর্ব সুখের দিন। আনন্দদর্শনে আমার হৃদয়ে কি অনিব্বচনীয় সুখেরই অর্ভোব হইত ! আমার হৃদয় যেন নৃত্য করিতে থাকিত। আমার গান তাহারা যতদূর মােহিত হইতেন, আমি তাহাদের আনন্দদর্শনে তাহার অধিক মোহিত হইতাম । আমার মনে হইত সে আমার তুল্য সৌভাগ্যশালী দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই । কলিকাতা হইতে কত লােকের এখানে আসিবার কালে তাহাদের বান্ধবের। তঁাহাদিগকে আমার গান শুনিয়ার জন্য বিশেষ করিয়া বলিয়া দিতেন। আমার বয়স যখন ২৫ কি ২৬ বৎসর তখন একবার বাবু রামগোপাল ঘােষ কয়েকজন আত্মীয় সহিত শুদ্ধ আমার গান শুনিবার নিমিত্ত কৃষ্ণনগরে আসিলেন। তিনি কন কখন আমাকে বলতেন “যদি কণ্ঠদেশ বিনিময় করা যাইত তাহা হইলে আমার গলা তোমাকে দিয়া তােমার গলা আমি লইতাম”। মদনমােহন তর্কালঙ্কার, বাবু রামতনু লাহি, বাবু দীনবন্ধু মিত্র, বাবু ক্ষেত্রমােহন ভট্টাচাৰ্য, বাবু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি অনেক আত্মীয়- গণের আমার গীত যেমন মিষ্ট লাগিত সেরূপ আর কাহারও গান লাগত না। একদা রথের সময় বঙ্কিম বাবুদিগের বাটীতে গিয়াছিলাম—একবার সন্ধ্যাকালে আমার গান হইয়া গেল ; রাত্রি ১১টার সময় যখন আমি শয়ন করি তখন ক্ষেত্রবাবু আসিয়া কহিলেন যে, “মহাশয় শয়নাবস্থায় কি পাওয়া যায় না ?” আমি তাহার অভিসন্ধি বুঝিয়া পুনরায় গাইতে আরম্ভ করিলাম। বঙ্কিম বাবুরা চারি ভ্রাতাই তখায় উপস্থিত ছিলেন। তাহাদের বাটীতে সে সময় যাত্রা আরম্ভ হইয়াছিল এবং তাহা শুনিতে অনেক ভদ্রলােক আসিয়াছিলেন । তথাপি আমি যে পর্যন্ত গাইলাম সে পর্যন্ত কোন ভ্রাতাই যাত্রার নিকট গমন করিলেন না। বােধ হইল যেন সকলেই মােহিত হইয়াছেন। এইরূপ সুখের ঘটন। যে কত হইয়াছে তাহা বলা যায় না। প্রায় পঞ্চাশ বৎসর বয়স পর্যন্ত আমার জীবন এইরূপ সুখে গত হইয়াছে । বিপুল ঐশ্বর্যের স্বামী বহুকালের পর সৰ্বস্বান্ত হলে তার মন যেরূপ হয়, এক্ষণে আমার মন ঠিক সেইরূপ হইয়াছে। সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.