Makardah Saraswat Library, Howrah
Sapta Samudrer Ranangane
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সপ্ত সদ্ৰেৱ ৱণাঙ্গন
সন্তোষ কুমার দাশ গুপ্ত
দাশ গুপ্ত এও কোং
৫৪া কলেজ স্ট্রট, কলিকাতা।
প্রকাশক-ঐশচীন্দ্র কুমার সেন গুপ্ত
১৪৯বি, বিবেকানন্দ বােড়
কলিকাতা।
প্রথম মুদ্রণ
১৫ই বৈশাখ, ১৩৫৩।
ঐশচীন্দ্র কুমার সেন গুপ্ত কর্তৃক দাশ গুপ্ত এণ্ড কোং ৫৪৩ কলেজ ষ্ট্রট,
কলিকাতা, হইতে প্রকাশিত ও তাহার তত্ত্বাবধানে গোরচন্দ্র পাল
কর্তৃক নিউ মহামায়া প্রেস ৬৫৭ কলেজ স্ট্রীট
হইতে মুদ্রিত।
:
প্রথম পর্ব
:ম র ?
আটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে
২৭:
৩য় ওর ;
চাচ্চিল কিপলিংএর দেশে
৪র্থ স্তর ;
উত্তর অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে
৫ম ওর ?
মিত্র শক্তির অস্ত্ৰগৃহে
৬ষ্ঠ স্তর ।
পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে
৩ ০ ০
No text on this page.
No text on this page.
--
사
-যাত্রাপথ
• ইংল্যাণ্ড হইতে
* সাবমিেরন
আক্রমন
তা নাৎসী এজার
অমন আডউল
@ নাৎসী বন্দজা
{
নার জাহাজে টোকিও পথ, জাপানীলােতে সাইগন
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে
No text on this page.
১৯৪১ সাল, মে মাস ; রুশ-জাৰ্মাণ যুদ্ধ তখনও শুরু হয় নাই। নাৎসী জাৰ্মাণী মিত্রপক্ষকে বৃটেনের দ্বীপগুলিতে ঘিরে রেখেছে। রণাঙ্গন বলে বাস্তবিক কিছু নাই, রুশ ও ছােট দু একটি দেশ বাদে সমগ্র যুবােপ নাৎসী কবলিত। মিত্রপক্ষীণ জাতিগুলির মনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার মত একটা যুদ্ধক্ষেত্র নাই! আছে কেবল ইংল্যাণ্ডের রাজকীয় বিমান বাহিনীর আকাশ পথে য়ুরােপের এখানে ওখানে কিছু বােমা নিক্ষেপ এবং বৃটিশ ব্রডকাষ্টিং করপােরেশনের তারই বিশদ বর্ণনা। আজ অমুক জায়গায় ১০০০ টন বােমা নিক্ষিপ্ত হয়েছে, কাল ওখানে ৫০০ ট -এবং একখানা বা আধখানা বিমান ছাড়া আর সকলগুলিই নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের সংবাদ । আর ছিল—অ্যাটলান্টিক যুদ্ধের কথা। অ্যাটলান্টিক যুদ্ধে মিত্রপক্ষীয় নাবিকগণের সাহস, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের কাহিনী। সংবাদপত্রে তখন যুদ্ধের কথা পরিবেশন করবার কিছু নাই, যা আছে তাতে জাতির মনে উৎসাহ আসতে পারে না, আসে নৈরাশ্য, অবসাদ। জাৰ্মাণী স্থির করল, ইংল্যাণ্ডের রক্তপ্রবাহের ধমনীগুলি ছিন্ন করে তার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ করে দিতে। ভারতবর্ষ থেকে, আমেরিকা থেকে, উপনিবেশগুলি থেকে এবং নিরপেক্ষ দেশগুলি থেকে খাদ্য ও যুদ্ধোপণ প্রস্তুতের যে সকল সামগ্রী অ্যাটলান্টিক ধমনী দিয়ে ইংল্যাণ্ডে আসছে, সেগুলো যেন ইংল্যাণ্ডে না পৌঁছুতে পারে, সমুদ্র গর্তেই চিরসমাধি হয়।
৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ভূমধ্য সাগর বা ইংল্যাণ্ডের প্রধান ধমনী পথে জীবন-রক্ষার জন্য যে রক্তচলাচলের গতি তা আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অম্লজানবায়ু ফুসফুসে আর স্বাভাবিক ভাবে যেতে পাচ্ছে না— ইংল্যাণ্ডকে সেদিন কৃত্রিম উপায়ে অম্লজান গ্রহণ করতে হচ্ছে। সামান্য কিছু গিয়ে পৌছুবে—জীবনের শিখ যদি আরও কিছুক্ষণ জ্বালিয়ে রাখতে পারা যায়। যদি ইতিমধ্যে বলদর্পিত শত্রু কোন ভুল করে বসে, যদি কুষিয়া-জাৰ্মাণীর সাময়িক চুক্তি পােল্যাও বণ্টনের ব্যাপার নিয়ে কোন প্রকারে ফেঁসে যায়, যদি আটলান্টিকের পরপারে আত্মনির্ভরশীল প্রভূত সম্পদশালী আমেরিকার জনমত প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ইংরাজের পক্ষে যুদ্ধের জন্য গড়ে তুলতে পারেন এবং অবশেষে বিচিত্র রণসম্ভারে প্রস্তুত হয়ে এসে অস্ত্রসংখ্যাবলে জাৰ্মাণীকে অভিভূত করে পতনােন্মুখ ইংল্যাণ্ডকে শেষ নিশ্বাসের সময় তুলে ধরতে পারেন! জাৰ্ম্মাণীতে সাবমেরিন প্রস্তুতের কারখানাগুলি পূর্ণোদ্যমে চলছে। সাবমেরিনের নাবিকদের শিক্ষাকেন্দ্রগুলি অপূৰ্ব পদ্ধতিতে সাবমেরিন- গুলিতে দক্ষ নাবিক যুগিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রবক্ষে কোনপ্রকার বাণিজ্য জাহাজই জাৰ্মাণী দেখতে প্রস্তুত নয়, নিরপেক্ষ জাতিদেরও না। নানা উপায়ে রসদ গিয়ে শত্রুর দেশে পৌছুতে পারে। জীবন মৃত্যুর এ যুদ্ধে যদি তাদের জাহাজ ও নাবিক বাঁচাতে চায় তাে লঙ্গর করে রাখুক আপন আপন বন্দরে ! শত শত সাবমেরিন মৃত্যুদূতের মত সমুদ্রের কোথায় যে আছে জানা নাই। বিশাল সমুদ্ৰবক্ষ দিয়ে একখানি বাণিজ্যপােত হয়তাে চলেছে- দু’দিন, চারদিন বা দশদিন কোথাও কিছু নেই—অকস্মাৎ প্রবল বিষ্ণোরণ! জনচক্ষুর অন্তরালে সমুদ্রের কোন দূরপ্রান্তে নাবিকগণের সঙ্গে জাহাজখানির অতল-জল সমাধি! একটু পরে কোন চিহই নাই অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে কতগুলি মানুষ যে একটু আগেও হয়ত গৃহের কথা ভাবছিল তার কোন নিশানাই নাই। আদি সৃষ্টি থেকে কোটী কোটা ঘটনা যেমন সমুদ্র তার গর্ভে ধারণ করেছে তেমনি এই ক্ষুদ্র ঘটনাও নিতান্ত নিরপেক্ষভাবে গ্রহণ করল। জলরাশির কল্লোল যেমন চলছিল তেমনই চলতে লাগল। দূরে, বহুদূরে, মাটীর ওপর হয়তাে মানুষ তখন আনন্দ করছে, কোলাহল করছে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচনা করছে। শত শত জাহাজ এমনি করে ইংল্যাণ্ডের শ্বাসরােধের অবস্থা উন্মােচন করবার প্রচেষ্টায় সহস্র সহস্র নাবিক নিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়েছে—লক্ষ লক্ষ বর্গ মাইল ব্যাপি জলরাশির ঠিক কোথায়, কবে, কখন, কেমন করে মানুষগুলির কি হ’ল তার আর কোন সংবাদই পাওয়া যায় না। এতে রণক্ষেত্রের উত্তেজনা নাই, তার গৌরব নাই, আছে বন্দর থেকে বেরিয়ে অন্য বন্দরে না পৌঁছান পৰ্য্যন্ত প্রতিটি সেকেণ্ডে গুপ্ত আক্রমণের আশঙ্কা এবং হয়তাে অনন্ত সমুদ্রবক্ষে শেষে একদিন অতি ভীষণ কষ্টকর মৃত্যু! জাৰ্মাণ সাবমেরিন বহরের এই গুপ্ত আক্রমণ উপেক্ষা করে অ্যাটলান্টিক বক্ষ বেয়ে বাণিজ্য জাহাজগুলির ইংল্যাণ্ডে যাতায়াতের প্রচেষ্টা—এরই নাম সেদিন দেওয়া হ’ল ‘অ্যাটলান্টিকের যুদ্ধ। কলকাতায় বসে আরাে সহ নাগরিকের মত সংবাদপত্রে এই সৰ ঘটনা পড়ি ইচ্ছা হয় নিজে এর ভিতর গিয়ে দেখি সত্যিই ব্যাপারটা কি। ভারতবর্ষ তখন ঝঞ্চার কেন্দ্র হতে বহুদূরে। আন্তর্জাতিক রেডিও কনভেনসনের দর অনুযায়ী যে কোন জাহাজে ‘রেডিও অফিসার’ রূপে যাওয়ার একখানি প্রথম শ্রেণীর সাটিফিকেটও আছে। কিন্তু বরাবরই দৃঢ়প্রতিজ্ঞা বৃটিশ জাহাজে সুযােগ পেলেও যাব না ;-কারণ বলা নিষ্প্রয়ােজন।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে নরওয়ের কলকাতাঞ্ছিত কনসল জেনারেল একদিন কথাপ্রসঙ্গে বললেন ‘আইষ্ট (S, S. AUST) নামে ওদের একখানা ১০০০০ হাজার টনের জাহাজ এই প্রথম কলকাতায় এসেছে, জাহাজটির রেডিও অফিসার কেপটাউনে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ওরা একজন লােক খুঁজছে। জাহাজটির নাবিকেরা সকলেই য়ুরােপীয়। জিজ্ঞাসা করলাম ‘ভারতীয় রেডিও অফিসার চলবে কি? আমায় যেন অ্যাটলান্টিক আহবান করছিল। ভদ্রলােক বললেন, কেন নয় ? একটু ইতস্ততঃ করে বললাম, আমি যেতে পারি। ভদ্রলােক বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি এ কাজ জান নাকি?” হেসে বললাম, একটা সার্টিফিকেট আছে, এ পর্যন্ত যাওয়ার সুযােগ হয় নাই। তিনি বললেন, এটা কিন্তু অ্যাটলান্টিক লাইনের জাহাজ। ‘ক্ষতি কি? দেখাই যাক না। জাহাজে গিয়ে কাপ্তেনের সঙ্গে দেখা হ’ল,-অমায়িক নরউইজিয়ান ভদ্রলােক বললেন,-কেপটাউন থেকে রেডিও অফিসারের অভাবে তারই সহকারী একজন কেনেডিয়ান কোনভাবে জাহাজ নিয়ে আসতে পেরেছে। বম্বেতে খুঁজেছেন, পাননি; কলকাতাতেও পাবেন বলে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। এইবার আমাকে পেয়ে ভদ্রলােক মহাখুসী। কেনেডিয়া সহকারীটিকে ডেকে বললেন,—এইবার তুমি দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলে। দিন কুড়ি হাতে ছিল, তারই ভেতর তাড়াহুড়াে করে জামাকাপড় যা পারলাম করে ফেললাম। ইতিমধ্যে ২৩শে জুন প্রাতঃকালে সংবাদপত্রে খবর পেলাম আগেরদিন রুশ-জার্মান যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। বেশ যেন একটু স্বস্তি অনুভব অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে ৭ করলাম—জাৰ্মাণীর সাবমেরিন বহরের অন্তত কিছুটা অংশ এখন তবে অ্যাটলান্টিক মহাসমুদ্র হতে সরে গিয়ে উত্তর সমুদ্রে ব্যাপৃত থাকবে। সেই সময়ে নিরাপত্তার জন্য কবে কোন মূহুর্তে জাহাজ খিদিরপুর ডক ছাড়বে কাউকেই জানান হত না। ২৯শে জুন রাত্রে জাহাজে ঘুমিয়ে আছি, গভীর নিশীথে মনে হল যেন সেটা নড়ছে। ডক থেকে জাহাজ বের করে নিয়ে সমুদ্রে পৌছে দেবার জন্য পাইলট জাহাজে উঠেছে। রাত তখন প্রায়, ইংরাজী হিসাবে ৩০শে জুনের ভাের তিনটে। আজও মনে পড়ে গঙ্গা-বক্ষ দিয়ে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে যেতে যেতে দুপাশের গ্রামগুলি এবং মানুষগুলি দেখে যেন তৃপ্তি আর হচ্ছিল না ; কে জানে আবার কতদিন পরে কি অবস্থায় এই বাংলার মাটি দেখব। বঙ্গোপসাগরে এসে পাইলট যখন আমাদের পৌছে দিয়ে পাইলট বােটে নেমে গেল, ভাবলাম সত্যিই তবে চলেছি দেশ বিদেশে, পৃথিবীর বিভিন্ন সমুদ্রে এবং সেই অ্যাটলান্টিক বক্ষে যেখানে ইতিহাসের আর এক পৰ্ব্ব রচনা হচ্ছে তার মধ্যে। ৫ই জুলাই, সকাল ৭টা। আকাশের গায়ে টুকরাে টুকরাে সাদা মেঘ ছড়িয়ে রয়েছে। সমুদ্রের জলরাশি আজ যেন আরও নীল লাগছে, প্রায় কালো, তেমনি কলরব চলছে অবিশ্রান্ত ভাবে যেমন কাল দেখে শুয়েছিলাম। পৃথিবীর বুকে কত পরিবর্তন যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে, কিন্তু সাগরের বুকে হতে পেরেছে কি ? দিনের চাইতে রাত্রেই ভাল লাগে বেশী। কাল রাতে মনে হচ্ছিল, এই যে ঢেউগুলি অবিরাম গড়ছে আবার ভেঙ্গে পড়ে সাদা ফেনা হয়ে মিশিয়ে পড়ছে, আদিম মানুষ যেমন দেখেছিল, আমিও তেমনই দেখেছি-অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের যােগসূত্র যেন। এই সাগরের বুক বেয়ে বাংলার সেই গৌরবময় যুগের বিজয়সিংহ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে সিংহলে গিয়েছিলেন, তখন তার ভিতর ছিল কত অনির্দেশের আকুলি- বিকুলি। এমনি করে কত রাতে তিনিও হয়ত দেখেছেন ওপরে নীল আকাশে ম্লান চাদের জলের ওপর ছড়িয়ে পড়া আবছা আলো। তার মনের ভেতরও ছিল ভবিষ্যতের আবছা আলো। আজ তিনি নাই, সে বাংলাও নাই, কিন্তু অনন্তকাল, যতদিন পৃথিবীর কোনও ভৌগােলিক পরিবর্তন না হচ্ছে, এই গভীর নীল বঙ্গোপসাগর তার কোলাহল দিয়ে জানিয়ে দেবে ‘আমার এই বক্ষ বহুদিন বহন করেছে জগতের একটা শ্রেষ্ঠ জাতির গরিমা ও মহিমা। আবার নিকট ভবিষ্যতে আমি তাদেরই হব। সমুদ্র দেখি আর ভাবি, সৃষ্টির আদি নাকি এই বিরাট জলরাশি দিয়েই। এই যে অবিরাম কোলাহল--একি তবে প্রথম সৃষ্টির আনন্দ অবিরত উপছে পড়ছে। সমুদ্র যেন আদি শিশু। শিশুর মত অঙ্গ বিচ্ছুরণ, শিশুর মত আর্তনাদ। নবজাত মানব শিশুর অর্থহীন সহস্র কলরবের ভেতর যেমন লুকিয়ে থাকে বিরাট সম্ভাবনা রত্নগর্ভা ও ঠিক তেমন-ই। কলকাতা ছেড়ে আটদিন পরে কলম্বােতে পৌছুলাম। সেখানে দেখি বহু পালের জাহাজকরাচী, বােম্বাই, মাদ্রাজ এবং সুমাত্রা, জাভা পৰ্যন্ত মাল নিয়ে যাতায়াত করে। আজও এর প্রাচীন পদ্ধতির অবশিষ্ট যা এখনও বেঁচে আছে, তারই সাহায্যে সমুদ্রে দিক্ নিৰ্ণয় করে, কোথায় ঠিক তারা আছে হিসেব করে বের করে। কম্পাস নাই, প্যারালাল রুল নাই, ডিভাইডার নাই, সেক্সটা নাই—অথচ বিশাল বারিধিবক্ষে দিশেহারা হয়ে পড়ে না। অপূর্ব নাবিক এরা ! এই পদ্ধতির সঙ্গে বর্তমান পদ্ধতির মিলনে ভবিষ্যৎ ভারতের নৌবিদ্যা কী অতুলনীয় উৎকর্ষ লাভ করতে পারে। ঘুমন্ত ভারতবাসীর উপাধানের নীচেই মহাসম্পদ রয়েছে, একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে তার কিছু নেই-প্রবুদ্ধ হলেই আবার আপন সম্পদ ফিরে পাবে।
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে কলম্বােতে আটদিন থেকে আবার চললাম। গঙ্গার জলের সঙ্গে নিজের সম্বন্ধ এখনও অনুভব করছি। সমুদ্রের তো সীমা নাই, প্রাচীর নাই, কেবল কাল্পনিক রেখা টেনে ভূ-পৃষ্ঠের বিরাট জলরাশিকে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। গঙ্গার জল এবং ভারতমহাসাগরের জল বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে গায়ে গায়ে লেগে রয়েছে, এই সব তেৰে গঙ্গার স্পর্শ যেন অনুভব করছিলাম। শােনা গেল, ভারতমহাসাগরে নাকি একখানা রেইডার’ দু’ একখানা জাহাজ ডুবিয়েছে। তাই কলঘােতে স্থিত নৌ-বিভাগের অফিস থেকে নির্দেশ দেওয়া হ’ল, আমাদের কেপটাউন যেতে হবে প্রথম সিংহল থেকে সােজা বাঁয়ে পশ্চিম মুখে পূর্ব আফ্রিকার প্রায় উপকুল পর্যন্ত টানা একটি সরল রেখা দিয়ে এবং সেখান থেকে কেপটাউন পৰ্য্যন্ত আর একটি সরল রেখা দিয়ে। মানচিত্র দেখলেই বােঝা যাবে কলম্বাে থেকে কেপটাউনের মধ্যকার সরলরেখাই হচ্ছে স্বাভাবিক পথ। বােধ হয় এ পথের কাছাকাছি কোন ‘রেইডার’ ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তাই এ ব্যবস্থা। কেপটাউনে পৌছুবার আগের দিন, প্রায় আঠার দিন বাদে জোহান্সবার্গ রেডিও থেকে শুনলাম রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুসংবাদ। রেডিও ষ্টেশন থেকে তার জীবনী ও কীৰ্ত্তির সংক্ষিপ্ত বিবরণী প্রচারিত হ’ল, মন ভয়ানক খারাপ হয়ে গেল। বাড়ী থেকে বেরুবার সময় তার স্বাস্থ্য খুবই খারাপ যাচ্ছিল শুনেছিলাম, তবু আশা ছিল যখনই ফিরিনা কেন, বর্তমান দুরবস্থা-প্রপীড়িত ভারতবর্ষে বিধাতার অভয় স্বরূপ প্রাচীন ভারতের একখণ্ড নিদর্শন এই ঋষিকে আবার আমাদের মধ্যেই ফিরে পাবে। আঘাতটা সেদিন খুবই লেগেছিল, মর্মে মর্মে তার মহাপ্রয়ানে আমাদের দীনতা অনুভব করেছি, বােধ হয় সেদিন সম্পূর্ণ একা ছিলাম বলেই। জাতিবিশেষের নেতৃত্বে পরিচালিত যে আন্তর্জাতিক সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ষড়যন্ত্র ভারতবর্ষকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে ফেলবার অবিরাম চেষ্টা করছে এবং বর্তমান ভারত আকাশের অভূদিত যে সব জ্যোতিষ্ক ব্যর্থ করছেন তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গুন মর্শে মৰ্ম্মে অনুভব করেছি সেদিন, যখন দেশ হতে, ভারতীয় সমাজ, সভ্যতা ও ভাষা হতে ছিন্ন হয়ে দূরে বিদেশী ও বিজাতীয় আবেষ্টনীর মধ্যে কাল কাটাচ্ছিলাম। তাই নিতান্ত পরিজন বিয়ােগের মতই তঁার মহাপ্রস্থান বহুদিন পর্যন্ত এমন করে অনুভব করেছিলাম। ‘বে’ থেকে কেপটাউন—ঠিক একখানি পাহাড়ের গায়ে চিত্র। পরে পৃথিবীর বহু বন্দরই দেখেছি, এমনটি আর কোথাও চোখে পড়ে নাই। জাহাজের ওপর বসে বসে আফ্রিকার এই নগরীটা দেখায় রূপকথার রাজপুরীর মতনই। আগে আফ্রিকা বলতেই মনে ভীষণতা, দুরতিক্রম্য ঘাের জঙ্গল, কুম্ভীর, বনমানুষ, হায়েনা, নরখাদক, কাফ্রী—দূরত্বের অবগুণ্ঠনের অন্তরাল হতে কে এ সুন্দরী আত্মপ্রকাশ করল! আফ্রিকা এত সুন্দরী! সহর দেখতে গেলাম, মানুষও। ডাচে ও ইংরাজে কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ? ডাচের। ডাচ, ভাষা চালাতে চায়, ইংরাজের ইংরাজী। সুতরাং তার সমাধান হয়েছে দুই ভাষাই পাশাপাশি রেখে। নােটে, ডাকটিকিটে পাশাপাশি ডাচ, ও ইংরাজী। দেশের সকল সরকারী বিজ্ঞপ্তিতেও পরে কানাডাতেও তাই দেখেছি—ফরাসী ও ইংরাজী এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ভাষাই সব কিছুতেই পাশাপাশি রয়েছে। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি হবে কি উর্দ হবে, আসল সমস্যা ছেড়ে দিয়ে এই সব কৃত্রিম সমস্যা রচনা করে ভারতবর্ষের কেউ কেউ গােলকধাধায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ যেটা একটা সাধারণ সমস্যা। আমার সহকারী কানাডিয়ান কর্মচারীটির কাছে আর এক কথা তাই।
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে ১১ শুনলাম-সেখানে ক্যাথলিক ও প্রটেষ্টান্টদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার নগ্নরূপ। সাম্প্রদায়িক বিবাদের সময় ভারতবর্ষের মতই ছুরি চলে, বােতল চলে, পাথর, সবই। তিনি নিজে প্রটেষ্টান্ট, ধর্ম বিদ্বেষের তীব্রতা বুঝলাম, যখন এ বিষয়ে কথায় কথায় ক্যাথলিকদের নিন্দা করতে করতে তিনি ফস্ করে বলে ফেল্লেন, আমি জার্মানদের চাইতেও ক্যাথলিকদের ঘৃণা করি। আশ্চর্য হবার কিছু নেই,-মানব-প্রকৃতি। পাশাপাশি থাকলেই ঝগড়াও করবে, কখন কখন খুননাখুনিও করবে। আবার বন্ধুত্বও হবে, নলামেশাও হবে, বাইরের শত্রুর সঙ্গে সঙ্ঘর্ষের সময় কাধে কাধ মিলিয়ে লড়াইও করবে। বহুদিন ধরে সহস্র অবান্তর কথা নিয়ে ভারতীয়দের ভ্রিান্ত করবার চেষ্টা চলছে। আমাদের কর্তব্য বিভ্রান্ত না হয়ে মূল প্রশ্নের সমাধানে মনপ্রাণ কেন্দ্রীভূত করা। কেপটাউনে থাকাকালীন এক ‘বুয়র’ ভদ্রলােকের সঙ্গে আলাপ হ'ল। বুয়র যুদ্ধের ইতিহাস মনে পড়ায় স্বভাবতঃই তার সঙ্গে এই বিষয়ে একটু আলােচনা করতেই দেখি, বারুদের প! নিৰ্বিবাদে বলে বসলেন ওঁরা নাকি অপেক্ষা করছেন কোনদিন দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘কন্সক্রিপস সুরু হয়, সেই উপলক্ষ্য নিয়ে নাকি “বুয়রেরা সারাদেশে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করে দেবে। ভদ্রলােক বললেন, ভদ্রলােক বললেন,—“দক্ষিণ আফ্রিকা আমাদের সৃষ্টি, কিন্তু আজ যাবতীয় সম্পদ মুষ্টিমেয় অন্যজাতীয় লােকের করতলগত। আশ্চৰ্য্য এই, এরাও এদের সমস্যা সমাধানের জন্য ভারতবর্ষের দিকেই চেয়ে আছেন। আমি কেপ টাউনে যাওয়ার কিছু আগে শুনলাম ভারতীয় সৈন্যদের একটা দল একটি সিনেমায় ( কেবল যুবােপীয়দের জন্য) প্রবেশাধিকার না পেয়ে গুরুতর অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। পরে তাদের সেখান থেকে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে বহু ভারতীয় বণিকের সঙ্গে—সকলেই বােম্বাই এবং পশ্চিম ভারতের অন্য অঞ্চলের মুসলমান—আলাপ হ’লসাম্প্রদায়িকতার নাম গন্ধ নাই। জিজ্ঞাসা করল, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন কতদূর অগ্রসর হচ্ছে সেই কথা। এদের সকলেরই দৃষ্টিভঙ্গী বাঁকা নয়, সােজা—দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের ওপর সহস্র অপমানজনক বিধি নিষেধের উল্লেখে বলেন, আমাদের ঘর অর্থাৎ ভারতবর্ষ স্বাধিকারে এলেই এ সকলের অবসান ঘটবে, তার পূর্বে নয়। কেপটাউনের শ্রেষ্ঠ দৃশ্য টেবল পৰ্ব্বতের ওপর থেকে অন্তরীপ,—মাটি যেখানে ধীরে ধীরে সমুদ্রের আলিঙ্গনে প্রবেশ করে অবশেষে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেছে। সুন্দর বললে অসম্পূর্ণ থাকবে, অদ্ভুত বললেও বলা শেষ হবে না। কেবল প্রথম ইন্দ্রিয় দিয়েই এ সৌন্দর্য্য বােঝা চলে। চিত্রের দ্বারা হয়তো একটু ক্ষীণ, অতি ক্ষীণ, আভাষমাত্র দেওয়া চলে, ছাপার কালির অক্ষরে ফোটাবার চেষ্টা নিরর্থক। আমাদের গন্তব্য লক্ষ্য ইংল্যাণ্ড। কলম্বাে থাকতে শুনেছিলাম কেপটাউন থেকে ‘কনভয়-এ ইংল্যাণ্ডে যাব। কেপটাউনে এসে তার কোন লক্ষণই দেখা গেল না। শুনলাম কেবল দু’একটি কনভয় ইংল্যাণ্ড থেকে সােজা কেপটাউনে গিয়ে থাকে। পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরালিওন অঞ্চলের ফ্রি টাউন তখন ইংল্যাণ্ডগামী জাহাজগুলির ‘কনভয়’এ যাওয়ার প্রধান আড্ডা, অর্থাৎ বৃটিশ জাহাজ সবই। আমাদের জাহাজ নরওয়ের। জার্মানীর নরওয়ে অধিকারের সময় পৃথিবীর বিভিন্ন সমুদ্রবক্ষে ও বিভিন্ন মহাদেশের বন্দরে অবস্থিত নরওয়ের জাহাজগুলি এক বিচিত্র অবস্থার মধ্যে পড়ে গেল। উত্তর সাগর দিয়ে নরওয়েতে ফিরে যাওয়ায় উপায় নাই। নরওয়ের রাজা হাকন তাঁর গভর্ণমেন্ট নিয়ে লণ্ডনে পালিয়ে এসেছিলেন ; তিনি ঘােষণা করে দিলেন, অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে জাহাজগুলি এখন থেকে মিত্রপক্ষের যুদ্ধের কাজে লাগবে। কথাটা স্পষ্ট করে না বললেও সকলেই বুঝল গােপনে যদি কেউ দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে সেটা লক্ষ্য রাখবে ইংলণ্ডের উত্তর সাগরের রণতরী বহর। নরউইজিয়ান নাবিকদের সম্বন্ধে এই অবস্থায় কিছু সন্দেহ থাকার জন্যই বােধ করি আমাদের ফ্রি টাউনের কনভয়ে যাওয়া হল না। আপন দেশ এক শক্তির অধীনে এবং নাবিককুল বিরুদ্ধ শক্তির পক্ষে, এই অদ্ভুত অবস্থা তখন য়ুরােপের অনেক দেশেরই হয়েছিল। আমাদের জাহাজের ডেনমার্ক দেশীয় একজন নাবিক একদিন দুঃখ করে আমাকে বলছিল, “জাৰ্মাণী আমাদের দেশ নিয়েছে আর ইংল্যাণ্ড নিয়েছে। জাহাজগুলি। বৃথা জটিলতার সৃষ্টি না করে বিশ্ব-রাজনীতির মূল কথাই এই লােকটির মুখে যেন বেরিয়ে পড়ল । একদিন সকালে উঠে শুনি পরদিন আমরা ব্রেজিলের ‘পারনামবুকো অভিমুখে রওয়ানা হব ; সেখান থেকে ‘টি নিডাড, গিয়ে নাকি ‘কনভয়’ ধরতে হবে। কাপ্তেনকে জিজ্ঞাসা করে শুনলাম এখনও কিছু ঠিক নেই, আমরা ইংল্যাণ্ডেই যাব, না যুক্তরাষ্ট্রের (আমেরিকা) কোন বন্দরে মাল নামিয়ে এ যাত্রার মত আমাদের দায়িত্ব শেষ হবে। ব্রেজিলে পারনামবুকের নরওয়ের কনসালের কাছ থেকে এ সম্বন্ধে ওখানে পৌঁছে নির্দেশ পাওয়া যাবে। তারপরদিন সত্যই আমরা দক্ষিণ আটল্যান্টিকে বেরিয়ে পড়লাম। কেপটাউন পর্যন্ত দেশের সঙ্গে সম্বন্ধ রাখতে পেরেছিলাম-দিল্লীর রেডিও কেন্দ্র হতে উৎক্ষিপ্ত রেডিও ঢেউ সাহায্যে ভারতীয় ভাষা, গান, সুরলহরী যতদিন ধরতে পারছিলাম। তাই কেপটাউন পর্যন্ত নিজেকে ভারত থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন মনে করিনি। কিন্তু দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের বুক বেয়ে যেদিন দক্ষিণ আমেরিকা মুখে পাড়ি দিলাম সেদিন আর পেলাম না দিল্লীর ভারতীয় করে ১৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে সাহচর্য। সেইদিন হ'তে সুরু হ’ল সম্পূর্ণ একাত্ম জীবন। দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের বিস্তৃত বক্ষে মধ্যে মধ্যে জাৰ্মাণ ‘রেইডার’ জাহাজগুলি উপস্থিত হয়ে যুদ্ধের প্রায় প্রথম দিক থেকেই বাণিজ্য জাহাজগুলির মধ্যে ভীতির সঞ্চার করছিল। গ্রাফ-স্পীর’ কীৰ্ত্তি সকলেরই মনে থাকতে পারে। এ ধরণের একখানি জাহাজ এক বৎসর দেড় বৎসর পর্যন্ত দেশে না ফিরে ক্রমাগত বাণিজ্য পােতের সন্ধানে টহল দিয়ে বেড়াতে পারে, দক্ষিণ আটলান্টিক, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরের বিশালত্বের ‘গ্রাফ-স্পী’র পরেও আরও দু’একখানা রেইডার এ কাজ করে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু যে বিস্তীর্ণতা এদের সাহায্য করে, সেই বিস্তীর্ণতা আবার বানিজ্যপােতগুলিকেও কতকটা এদের এড়াতে সহায়তা করে। নাবিকদের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, এখন কোন রেইডার পথের কোথাও আছে কিনা? তবু বহুদিন পর্যন্ত এ ধরণের আক্রমণ হয়েছে বলে শােনা যায়নি। তথাপি আশঙ্কা আছে। দক্ষিণ অ্যাটলান্টিক ঠিক ‘অ্যাটলান্টিক যুদ্ধের রণাঙ্গন নয়, অর্থাৎ রাশি রাশি জাহাজ এখানে সমুদ্রগর্ভে যায় নি। একে বলা চলে অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের বৃহমুখ। কলকাতা থেকে কেপটাউন পর্যন্ত জাহাজের আলােগুলাের ওপর কোন বিধি নিষেধই ছিল না, স্বাভাবিক অবস্থার মত রাত্রে বৈদ্যুতিক আলােতে আশে পাশের সমুদ্র বক্ষ ঝিকৃমি করে উঠছিল। দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকে সুরু বিধি নিষেধ, জাহাজের ভিতরের ক্ষীণমাত্র আলো যেন বাইরে না আসতে পারে। রাত্রিতে সূচীভেদ্য অন্ধকারের সঙ্গে মিশে গিয়ে জাহাজ চলছে আপন পথে। অন্ধকারের মধ্যেই ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে প্রহরীদের দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে, রাত্রির কৃষ্ণতার মধ্যে আর এক টুকরা কৃষ্ণতর কিছু সমুদ্রের ওপর কখন চোখে পড়ে কিনা। শুধু ‘রেইডারের ভয়ে নয়, অন্য কোন বাণিজ্যপােতের সঙ্গে সংঘর্ষ হবার ভয়েও। বহু অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে দূরের কিছু নজরে আসে না। কাছাকাছি একখানা বাষ্পীয় পােতের মত বৃহৎ কিছু থাকলে আভাষ পাওয়া যায়। কিন্তু মেঘমুক্ত নির্মল আকাশে পৃথিবীর উপগ্রহটি যখন এসে পড়েন তখন এ সাবধানতার কতটুকু মূল্য থাকে জানিনা। তবে অভিজ্ঞ নাবিকেরা বলে, সমুদ্রের ওপর আলােকরশ্মি চট করে বহু, বহু দুরে, কুড়ি মাইল দূরেও, চোখে পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে আঠার দিন পরে ব্রেজিলের ‘পারনামবুকে। নামে বন্দরে পৌঁছুলাম। এ যেন আর একটি বাংলা দেশ। তেমনি কুটির সব চোখে পড়ল। তেমনই শ্যামাঙ্গ মানুষগুলি। বাঙ্গালীর দেহের বর্ণের সৌন্দৰ্য্য যে কতখানি, আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছিল দীর্ঘকাল শ্যামাঙ্গ সাহচর্য হতে বঞ্চিত থেকে। বাঙ্গালী মেয়ের কমনীয়তার উৎস, সে ঐ নবপল্লবের মত শ্যামবর্ণ। অভিসন্ধিপূর্ণ বিদেশী প্রচার কার্যে শ্যাম আর কৃষ্ণবর্ণকে একাকার করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানের শিক্ষা অর্থাৎ বিদেশী প্রচারে অভিভূত আমরাও তাই সত্য বলে ধরে নিয়েছি। কিন্তু অপরূপ দেহের এই স্বাভাবিক বর্ণ না দেখে কিছুকাল কেবল শ্বেতের ভিতর থাকলে, অবশেষে শ্বেত, কৃষ্ণ ও শ্যাম বর্ণের মানুষ দেখলে সহজেই গায়ের রং হিসেবে শ্যামের সৌন্দৰ্য্য ধরা পড়ে—অন্ততঃ আমার পড়েছিল। কিছুকাল পরে কোনরূপ প্রচার কার্যের সঙ্গে অসংশ্লিষ্ট ও এ কাৰ্য্যে অনভিজ্ঞ কয়েকজন সরল বিভিন্ন দেশীয় শ্বেতাঙ্গকে জাৰ্মান জাহাজে বন্দী থাকা কালে দেখেছি নিদারুণ গ্রীষ্মে মধ্যাহ্নের খরতর সূৰ্য্য কিরণে হাচের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দিনের পর দিন। উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করে শুনেছি সখের ‘সা-বাথ’ নয়, গায়ের শ্বেতত্বকে ব্রাউন করা অর্থাৎ সাদা কথায় শ্যামের কাছাকাছি একটা রংএ যদি পৌছতে পারা যায়।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে খালি গায়ে, খালি পায়ে, শিশুরা সব রাস্তায় খেলা করছে। গ্রীষ্মের আবহাওয়াতে আমাদের মধ্যে যে ক্লান্তি ও অবসাদ আনে, এখানেও তাই। জামা কাপড়ের ওপর যে দৃষ্টি, আমেরিকা, ইংলণ্ড বা কানাডায় জন- সাধারনের মধ্যে দেখেছি এদের সে সব কিছুই নেই । কেমন একটা ছাড়া ছাড়া ভাব। আঁটসাট ট্রাউজারের ভেতরে যেন অস্বস্তি লাগছে- যেন ভারতের ধুতির প্রচলন এখানে হলেই স্বস্তি পেত। এখানে আফ্রিকার কৃষ্ণবর্ণ বহু কাফ্রী পেলাম। নােংরা কাজটা এরাই করছে—অর্থাৎ জাহাজে কয়লা বােঝাই। শ্যামাঙ্গ একজন ব্রেজিলিয়ানকেও দেখিনি একাজে। নিগ্রোরা এখানকার অধিবাসী হয়ে গিয়েছে। এদেরই ধৰ্ম্ম, ভাষা, রীতিনীতি গ্রহণ করে কৃষ্ণ ব্রোজিলিয়ানে দাড়িয়েছে। আমেরিকা অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মত নিগ্রো উৎপীড়ন এখানে হয় কিনা, খােজ নিতে পারি নাই ভাষা বিভ্রাটের জন্য । ইংরাজা এখানে অচল ; পথে ঘাটে এমন একজনও পড়ে না যে ইংরাজী দু’টা কথাও জানে। ইংরাজী জানা থাকলে আমাদের মত সাধারণ লােকের পৃথিবীর কোথাও ভাষা বিভ্রাট হতে পারে না, একথা যে কতদুর অসত্য এখানে প্রত্যক্ষ করেছি। কেবল ব্রেজিল নয়—দক্ষিণ আমেরিকার অন্য সব দেশেই এই অবস্থা। পর্তুগীজ বা স্পেনীয় এখানে ভ্রমণের জন্য নিতান্ত প্রয়ােজনীয়। অনেকদিনের ধনীবাড়ীর ভৃত্য যেমন আপন প্রভুকে সকল ধনীর শ্রেষ্ঠ ভাবে ভারতবাসীরও যেন সেই অবস্থা! ভারতবর্ষের বাইরে ইংল্যাণ্ড ছাড়াও যে প্রকাণ্ড ভূভাগ আছে যেখানে ইংরাজ বা ইংরাজী আমরা অপর বিদেশীদের যে সাধারণ চক্ষে দেখি ঠিক সেই ভাবেই দেখে, যুদ্ধের সময় ছাড়া শান্তির সময়ে এই নামটিও সাধারণ লােকের কানেও যায় না, একথা যেন আমরা ভাবতেই পারি না।
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে অলস ব্রেজিল ছেড়ে আমরা যাচ্ছি ওয়েষ্ট ইণ্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের সেণ্টলুসিয়া নামে একটি দ্বীপে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউপাের্টনিউজ যাওয়ার পথে। মন্থর গতিতে প্রশান্ত, সুনীল সমুদ্র বক্ষ দিয়ে চলেছি -- আটদিন লাগবে সেণ্টলুসিয়া পোঁছুতে। পঞ্চমদিন বেলা প্রায় দশটায় ব্রীজের উপর ঘুরে ঘুর নানা রকমের অলস কথা হচ্ছিল, বহুদূরে দিগন্তে যেন একখানা জাহাজ দেখা যাচ্ছে। দূরবীন দিয়ে দু’জনে দেখছি, সেকেণ্ড অফিসার এবং আমি। দূরে কোন বাষ্পীয় পােত সঙ্গীহীন সমুদ্রে কদাচিৎ দেখতে ভাল লাগে। চীফ অফিসারও বেড়াতে বেড়াতে ওপরে এসেছে। সে ও আর একটি দূরবীন তুলে দেখতে দেখতে হঠাৎ কাপ্তেনকে ডেকে নিয়ে 'এল। সে সময় মিত্রপক্ষীয় কোন জাহাজই মাস্তুলে জাতীয় পতাকা ওড়াত না; নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ গুলি পতাকা উত্তোলিত রেখেই সমুদ্রে ঘঘারাফেরা করত। এ জাহাজটায় একখানা পতাকা দেখা যাচ্ছে যেন। অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করে কাপ্তেন শুষ্কমুখে বললেন ফিনল্যাণ্ডের জাহাজ! ফিনল্যাণ্ড তখন জার্মানীর পক্ষে সােভিয়েটের বিরুদ্ধে লড়ছে । আমেরিকার সঙ্গে অ্যাক্সিস-এর যুদ্ধ তখনও শুরু হয় নাই। ফিনল্যাণ্ডের পতাকার আড়ালে একখানি জার্মান রেইডার হওয়া বিচিত্র নয়। আমাদের জাহাজটির গতিশক্তি বাড়াবার জন্য ইঞ্জিনরুমে বলা হল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা, ঘণ্টা খানেক পরে দূরে সেইটি ক্রমেই আমাদের ধরে ফেলছে। উপায়? কিছু করার নেই। কেবল আমাদের গতিমুখ পরিবর্তিত করে অপেক্ষা করা। যদি সত্যিই জাৰ্মান জাহাজ হয়, সে-ও তার গতি বেগ বদলাবে আমাদের পিছু নিতে। রুদ্ধনিশ্বাস না হলেও, কতকটা সেই ভাবে সকলে অপেক্ষা করছি পরবর্তী ঘটনার জন্য। ভীষণ গরম, লাইফ জ্যাকেট কারুরই গায়ে ছিল ২ ১৮ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে , আস্তে আস্তে সবাই পরে নিল। অবশ্য সকলেই আপন আপন কাজ করছে, হৈ চৈ এর নাম গন্ধ নেই। কেউ কারুর কাছে মনের ভীতি প্রকাশ কচ্ছে না, কিন্তু সকলের মুখেই চাপা কিসের একটা ভাব সুস্পষ্ট। দেখি, ফিনল্যাণ্ডের জাহাজখানা আমাদের খুব কাছে, প্রায় মাই চারেকের ভেতর এসে পড়েছে। অকস্মাৎ সেটিও তার গতি ও গতিমুখ পরিবর্তন করে অন্যপথে দ্রুত চলে যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে প্রায় ৯০ ডিগ্রী একটি কোন রচনা করে গভীর সমুদ্রের দিকে। সকলেই বুঝলাম, একই মনস্তত্ত্ব ঐ জাহাজের অধিবাসীদের ভেতরও কাজ কচ্ছে। যুদ্ধের সময় সকল বাণিজ্য পােতই সশস্ত্র করা হয়েছিল। কিন্তু সে কথা না বলাই ভাল। প্রয়ােজনের সময় সে সশস্ত্র সাহায্যে চেয়ে ক্ষতিই করে বেশী—যদি কোন রেইডারের সম্মুখীন হয়ে পড়তে ১৯১৪-১৮ সালের সেই মান্ধাতা আমলের একটি ৪” নৌ-কামান জাহাজের ল্যাজের ওপর ( অ্যাফট) বসান থাকে, আর থাকে ব্রিজের ওপর দুইদিকে দু’টি ‘লুইস’ মেসিন গান বা ‘মালিন’ বিমান বিরােধী মেসিন গান। সমুদ্রবক্ষে সাবমেরিন চোখে পড়লে সাবমেরিনটি টপিডাে ছাড়বার আগেই পিছন ফিরে এঁকে বেঁকে চলতে চলতে তার ওপর বা কাছাকাছি গােল নিক্ষেপ করতে পারলে সাবমেরিনের আক্রমণ থেকে বাঁচা যায় সত্য। কারণ, প্রথমতঃ জাহাজ একে বেঁকে চলার জন্য সাবমেরিন লক্ষ্য স্থির করতে পারে না; দ্বিতীয়তঃ, ওটার নিজেরও আত্মরক্ষার স্পৃহা আছে ; কামান চালাতে থাকলে নিজেকে বাঁচাবার জন্য ডুব মারতে হয় । মধ্যে মধ্যে জার্মানীর কিছু সাবমেরিন এইরূপ শিকার করতে এসে শিকারের দ্বারা নিজেরাই ঘায়েল হয়েছে, বাণিজ্য জাহাজের নাবিকদের উৎক্ষিপ্ত গােলার আঘাতে। ;
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে আর ব্রীজের ওপর মেসিনগান থাকলে, গানার যদি স্থির মস্তিষ্কে এবং তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে আক্রমনকারী বিমানের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে গুলীবর্ষণ করে, তবে বিমানের পাইলট নিজের নিরাপত্তার জন্য একেবারে নীচে নেমে এসে অভ্রান্তভাবে জাহাজটির ওপর বােমা ফেলতে পারে না। আমাদের পেছন ফিরতে দেখে, বােধ হয়, ফিনল্যাণ্ডের জাহাজটি ভাবল, জাহাজের ল্যাজের ওপর কামানটি তার দিকে ঘুরিয়ে লক্ষ্য করবার জন্যই আমরা গতিমুখ বদলেছি। নাগালের ভেতরে এলেই এ জাহাজ থেকে গােলাবর্ষণ শুরু হবে। তাই সেখানা ‘ঘঃ পলায়তি স জীবতি নীতির অনুসরণ করল। কিন্তু মজা এই, আমরা নিজেরাও সে নীতিরই অনুসরনের চেষ্টায় ছিলাম। হিটলারের ঝটিকা-বাহিনীর সংগঠক ক্যাপ্টেন রােয়েম, বাহিনীর সকলকে এই বলে উৎসাহ দিত, ‘ভয় পেয়ো না, বিপক্ষও তােমাদের দেশে এমনি ভয়ই পাচ্ছে। কথাটি অতি সত্য। দু’দিন বাদে কতকগুলি দ্বীপের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছিডানে, বামে, সম্মুখে, পিছনে, ছােট ছােট পাহাড়, বৃক্ষ, লতা সুশােভিত মাটি। পৃথিবীর ঐশ্বৰ্য্য, মাটির স্নিগ্ধতা, বনানীর সঙ্গে মানুষের একান্ত নিবিড়ত্ব মর্মে মৰ্ম্মে উপলব্ধি হয় ধরাপৃষ্ঠের জীবনের সঙ্গে সম্বন্ধবিহীন বহু দিনের সমুদ্র ভ্রমণের পর। নাবিক মাত্রই তখন সুযােগ পেলে ছুটে আসত দেখতে। মাটি তখন তার কাছে হয়ে ওঠে অপরূপ সৌন্দর্য্যের উৎস। কতক্ষণে আবার লােহার পাটাতন থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে অনুভব করবে ভূমির স্পর্শ। এই দ্বীপগুলি আকের জন্য প্রসিদ্ধ। জাহাজের ওপর থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রাম, পাহাড়ের গায়ে আঁকা বাঁকা, সরু সরু পথ। সেন্টলুসিয়া দ্বীপটি খুব ছােট-মনােরম। বার মাস এখানে বসন্ত ঋতুর কাছাকাছি একটা অবস্থা থাকে। দ্বীপবাসী প্রায় সকলেই নিগ্রো ২০ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে এবং কিছু ইংরাজ ঔপনিবেশিক। ভারতবর্ষের পশ্চিম অঞ্চলের ব্যবসায়ী দু’চার জন এখানে আছে। যুদ্ধের নাম গন্ধ এখানে নেই। পরিপূর্ণ শান্তির আবহাওয়া। এখানে নিগ্রো নারী শ্রমিকেরা জাহাজে কয়লা তােলে ঘােট ঘােট চুবড়ী ভ'রে, চুবড়ী পিছু আধ প:সা মত মজুরী পায় । এতটুকু ক্ষুদ্র দ্বীপেও এমিগ্রেসন বিভাগের উচ্চপদগুলি ইংরাজ বংশধরদের জন্যই যেন রক্ষিত দেখলাম---নিগ্রোর জন্য বােধ হয় শ্রমিকের কাজ নিকি করা হয়েছে । ফেরবার পথে এরই কয়েক মাইলের মধ্যে আমেরিকান অধিকৃত সেন্ট- টমাস দ্বীপে কয়লার জন্য গিয়েছিলাম, সেখানকার অধিবাসী নিগ্র কিন্তু এমিগ্রেসন ষ্টাফ নিগ্রোই দেখলাম, বড় বড় দোকানও ওদের আহ -জাহাজে প্রকাণ্ড ক্রেনের সাহায্যে কয়লা দেওয়া হত। কী পার্থক্য। সেন্টলুসিয়া ছাড়বার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া প্রদেশের সুবিখত জাহাজ নির্মাণের ইয়ার্ড নিউপোর্টনিউজের পথে আমরা নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদই ভাবছিলাম। ভারত ত্যাগের পরে এতখানি রাস্তায় কোনও রূপ বিপদের আভাস পাই নাই। এখন একেবারে আমেরিকার বরের দুয়ারে জাৰ্মাণীর আক্রমনের বাহু লম্বিত হবে না বলে ধরেই নিয়েছিলাম উল্লেখযোগ্য কোন কিছুই হয়নি এই চৌদ্দ দিনে। রাতে একদিন (য়ে আছি, প্রায় রাত ১১টা হবে, এক নরউইজিয়ান অফিসার এসে আমার ক্যাবিনের দরজা ধাক্কা দিয়েই নিৰ্বিবাদে ঢুকে বললেন ‘এস, এস, ঘুমুচ্ছ কি ; দেখে যাও কি সুন্দর নগরী ! ভদ্রলােক নিজে মুগ্ধ হয়ে বন্ধুকেও দেখাতে এসেছেন। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে দেখি সমতল ভূমিতে আলােকমালা সজ্জিত সুন্দর এক নগরীর পাশ দিয়ে আমরা বন্দরে প্রবেশ করছি। বে’র মুখে ; অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে ২১ পথ নির্ধারণের জন্য ঘণ্টাধ্বনি হচ্ছে, ভারতের মন্দিরগুলির মত। শমরিকান পাইলট তারই সাহায্যে নিরাপদ গভীরতার মধ্য দিয়ে হাজটিকে বন্দরে নিচ্ছে। কোথায় জলের কত গভীরতা, বাইরের নাকি জানেন এবং সকল দেশেই বন্দরের নিকটবর্তী গভীরতা, বিদেশীর কাছ থেকে গােপন রাখা হয় –উপকুলেরও। তাই এই সমস্ত পথ এসে অবশেষে তত্তর্দেশীয় পাইলটের সাহায্যে পৃথিবীর সব্বত্র সকল জাহাজ লায় প্রবেশ করে। আরও কতকগুলি কারণ আছে, কিন্তু এই মুখ্য কারণ । ভার্জিনিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ রাষ্ট্রগুলির অন্যতম। নিগ্রো ক্রীত- নাদের মুক্তির প্রশ্ন নিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যে যুদ্ধ হয়, গর্জিনিয়া স্বভাবতই তাতে দাসপ্রথা রহিত করবার বিপক্ষ দলেই ছিল। শুধু তাই নয়, ক্রীতদাস প্রথা অটুট রাখবার দলের প্রধান ঘাঁটি ছিল এই প্রদেশটি। ক্রীতদাস প্রথা রহিত বা বহাল রাখার প্রশ্ন নিয়ে রহিতকামী উত্তর রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে যুদ্ধে দক্ষিণ রাষ্ট্রগুলি পরাজিত হলে, সুবিখ্যাত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে যে লােকটি নাটকীয়ভাবে একটি প্রেক্ষাগৃহে হত্যা করেছিল সেই ‘বু এই প্রদেশের লােক। পরের জাহাজ-নিৰ্মান ইয়ার্ডে তখন একখানা বড় ব্যাসিপ তৈরী ইচ্ছ, বহু শ্বেত ও কৃষ্ণ শ্রমিক কাজ কচ্ছিল। জায়গাটি রীতিমত গরম এবং কলকাতার মতনই এখানে দেহ থেকে অনর্গল স্বেদ নিঃসরণ হয়। প্রভেদ এই, রাস্তা, ডক সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ধূলাের নাম গন্ধ নেই তাই, দেহের ঘামের সঙ্গে রাস্তার ধুলাে এটে কলকাতার সাধারণ পথ- চারীদের যে বিরক্তিকর অবস্থা হয় সেটা এখানে নেই। ইয়ার্ডের ভেতর কৰ্ম্মনিরত শ্রমিকদের তৃষ্ণা নিবারণের এবং প্রক্ষালন ক্রিয়ার জন্য লােহার চৌবাচ্চাতে কৃত্রিম উপায়ে শীতল করা জল রক্ষিত।
২২ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে মজুরীর হারে সাদা ও কালার কোন প্রভেদ দেখিনি-জানিনা, সে প্রভেদের অভাব কেবল তখনকার মত যুদ্ধকালীন নীতি কিনা। রাস্তায়, ঘাটে, সিনেমায়, আমােদ প্রমােদের স্থানে এবং গৃহের সর্বত্রই উচ্চ বর্ণের অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের সঙ্গে নীচ বর্ণের কৃষ্ণ আমেরিকানরা, আমেরিকান সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাড়িয়েছে। যে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান ভদ্রলােক আমাদের জাহাজে নিউপাের্টনিউজে খাদ্যাদি ও অন্যান্য প্রয়ােজনীয় জিনিষপত্র সরবরাহ করলেন, তিনি একদিন তার বাড়ীতে জাহাজের অফিসারদের সান্ধ্য ডিনারের নিমন্ত্রণ করেন। পরিচারিকা দেখলাম নিগ্রো, এবং ভারতবর্ষে যেমন গৃহে নিম্ন বর্ণের পুরাতন দাসী চাকরদের বাড়ীর ছেলে মেয়েদের ওপর যথেষ্ট কর্তৃত্ব অনেক সময় দেখতে পাওয়া যায়, ওখানেও তেমনি। শুনেছি, ক্রীতদাস প্রথা রহিত হলেও এখনও বহু নিগ্রো নরনারী তাদের পুরাতন প্রভুদের গৃহ ছেড়ে যেতে রাজী না হয়ে তাদের গৃহেই ছিল, এখনও বংশ পরম্পরা অনেকে আছে। আমেরিকানদের কর্মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা, সুসজ্জিত গৃহগুলি, মনােরম রাজপথগুলি, অতুল বৈভব এবং বিভিন্ন বর্ণের নরনারী নিয়ে গঠিত এই দেশ দেখে মনে হত বুঝি গৌরব মণ্ডিত প্রাচীন ভারতের কাৰ্য্য সভ্যতার ইতিহাস এযুগে নতুন করে অভিনীত হচ্ছে। নিজে চোখে দেখি নাই,কারণ অল্প দিনই আমি এখানে ছিলাম, কানাডার একজন ভদ্রলােক আমায় বলেছিলেন, এখন দক্ষিণ রাষ্ট্রগুলির অনেকাংশে রাস্তায় নিগ্রো আসছে দেখলে, কোন কোন অ-কৃষ্ণ আমেরিকান যাতে তার ছায়াও গায়ে না লাগে সেজন্য নিজেই অপর ফুটপাথে চলে যায়। সকল বর্ণ সমস্যার দেশে এই বােধ হয় দক্ষিনী রীতি।
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে অনেক দিন পরে টোকিও যুদ্ধবন্দী শিবিরে অবস্থান কালে একজন আমেরিকান কর্ণেল আমার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে যখন ইংরাজের টোলে পড়া নতুন শেখা বুলি ভারতের অস্পৃশ্য সমস্যা ইত্যাদি কথার অবতারণা করছিল তাকে আমি তার নিজের দেশের কথা উল্লেখ করে থামিয়ে বি, বলি, চিকিৎসক মহাশয়, আগে নিজের রােগ আরােগ্য করুন। মােটর উপর সাধারণ আমেরিকান নাগরিক বিদেশীর সঙ্গে ব্যবহারে আমাদেরই মত ভদ্র, বিনয়ী এবং নিজ সংসারে অনুরক্ত যেমন অন্য সকল সভ্য সমাজে হয়ে থাকে। প্রায় তিন সপ্তাহ এখানে থেকে আবার বেরিয়ে পড়লাম—এবার কানাডার হলিফ্যাক্স অভিমুখে। ওখান থেকেই নাকি আমাদের কনভয়- এ ইংল্যাণ্ড যেতে হবে। একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছিলাম নিউপােটনিউজে এসে অনেক অফিসার ও রেটিংই ওখানে জাহাজ ছাড়তে চাইলো। নরউইজিয়ান জাহাজগুলিতে সুবিধে এই সাতদিন পূর্বে কাপ্তেনের কাছে ননাটিশ দিয়ে জাহাজ ছাড়া যায়। আমাকেও অনেকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমিও কাজ ছাড়বার নােটিশ দিয়েছি কিনা? কানাঘুষায় শুনলাম সকলেরই আমেরিকা থেকে ইংল্যাণ্ডে যেতে আপত্তি। ২•• পশ্চিম দ্রাঘিমা সহস্র সহস্র নাবিকের জলসমাধি ক্ষেত্র। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এবং অপর দিকে ব্রিটেন, এর মধ্যে অবস্থিত উত্তর অ্যাটলাটিকই হচ্ছে বহু কথিত ‘অ্যাটলান্টিক যুদ্ধে’র রঙ্গভূমি। প্রকাশ্য যুদ্ধে লিপ্ত না থেকেও আমেরিকান গভর্ণমেন্ট নানা ক্ষুদ্র বিষয়ে মিত্রপক্ষকে সাহায্য করছিল। নাবিক পাওয়া তখন দুষ্কর। তাই এমিগ্রেস কর্মচারীরা বলে বসলেন, নরউইজিয়ানরা আবার যদি এ জাহাজেই না যায় তাে ওদের স্থলে একেবারেই আসতে দেবে না-যদিও ১৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে কলের কাছেই আইন সঙ্গত পাসপাের্ট আছে এবং বিধি মত যথেষ্ট অর্থও আছে, এবং ইতিপূৰ্বে এমন কোন বিধানই ছিল না। দিন বারাে পরে হলিফ্যাক্সে পৌছুলাম। ‘বে’তে বহু জাহাজ রয়েছে দেখলাম, সকলেই ‘কনভয়’এর প্রতীক্ষায়। কিন্তু এখানেও তার কোন লক্ষণই দেখা গেল না। হালিফ্যাক্স সহরে আঠার দিন ছিলাম, কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। সহরে একটি হোটেলে অন্য একটি জাহাজের নাবিক লল, ওরা আমাদের বাহশ দিন আগে এসেছে কিন্তু এখনও বসেই আছে। আরও শুনলাম, মাসখানেক আগে গােটা পাচ ছয় ‘করভেটের রক্ষণাবেক্ষণে একটি কনভয় ইংল্যাণ্ডের দিকে গিয়েছে, এসকর্ট করবার মত কোন রকমের রণতরী এখন এখানে নাই। তাই বােধ হয় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে যদ্দিন না পূর্বোক্ত ‘এসকর্ট’ জাহাজগুলি আবার একখানা কনভয়’ নিয়ে ফিরে আসে। সংবাদ শুভ! তার মানে নিশ্চিত মনে আমরা এখানে খাওয়া, ঘুমােন, সিনেমা দর্শন ইত্যাদি করে বেড়াতে পারি আরও মাসাধিক কাল। তবে শােনা কথা—সত্যতা জানি না। ৩০শে জুন কলকাতা থেকে আমরা জাহাজ ছাড়ি এবং এখন প্রায় অক্টোবরের মাঝামাঝি-চার মাস হল, এখনও ইংল্যাণ্ডেই যাচ্ছি। হিসেবে চললে একখানি জাহাজের ইংল্যাণ্ড থেকে ভারতে ফিরে আসতে এক বৎসরের ধাক্কা! চমৎকার ব্যবস্থা ! অ্যাটলান্টিক পথে ইংল্যাণ্ডের ফুসফুসে অতি সামান্য অম্লজান বায়ুই যেতে পারছে ! হালিফা কানাডার অতি পুরাতন সহর। নােভাস্কোসিয়ায় অ্যাটলান্টিকের অপর পার থেকে প্রথম ঔপনিবেশিক দল বাসা বাঁধে। সে প্রায় দুই শত বৎসর পূর্বের কথা। কাজেই সহরটিও সে সময়কার ব্রিটেনের সহরগুলির ছাদে ঢালা। এখনও সেইরূপই আছে।
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনের পথে ০ রেস্তেরাঁতে ও লণ্ডী ব্যবসায় এখানে এবং কানাডার সৰ্ব্বত্রই চীনাদের একচেটে। যে রেস্তেরাতে আমরা প্রায়ই সন্ধ্যের সময় যেতাম, দেখতাম চীনা সত্বাধিকারী এক কোনে কাউন্টারে বসে আছে, কানাডিয়ান পরিচারক ও পরিচারিকারাই সব কাজ করছে। ফলের ব্যবসায়ে যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত জাপানীদের আধিপত্য ছিল। ধীবরের কাৰ্য্যে ও জাপানীরা কানাডায় বেশ দু’পয়সা রােজগার করছিল। এখানে বহু নিগ্রো আছে। কিন্তু কানাডাতে বর্ণ বা জাতি বিদ্বেষ খুব লক্ষিত হয় না। ক্যাথলিক, প্রটেসটান্টে ধৰ্ম্ম বিদ্বেষ মধ্যে মধ্যে মাথা তুলে ওঠে। বাড়াবাড়ি ইলে লাঠি না চালিয়ে টিয়ার গা দিয়ে কর্তৃপক্ষ দমন করেন। আমাদের জাহাজটিকে অবশ্য এখানে আরও একমাস অপেক্ষা করতে হয় নাই। দিন কুড়ি এখানে থাকবার পর আমাদের যেতে হ’ল হ্যালিফ্যাক্সের আরও উত্তরে সিডনী বলে আর একটি বন্দরে। এইখান থেকে একটি ‘কনভ: সপ্তাহের মধ্যেই ইংল্যাণ্ড যাত্রা করবে। আমরাও তার অর্ভুক্ত হব। কনভয়’ ‘কনভয়’ শুনে শুনে একেবারে বিরক্তিই ধরে গিয়েছিল সবার। এ কি ব্যবস্থা ! কলম্বােতে শুনলাম কেপটাউন থেকে, কেপটাউনে ফ্রি টাউন থেকে, শেসে টি নিডাড় থেকে সেন্টলুসিয়ায় শুনলাম যুক্তরাষ্ট্রের কোন বন্দরের বাইরে থেকে, যুক্তরাষ্ট্রে আবার হ’ল হালিফ্যাক্স থেকে, এখন আবার সিডনী থেকে! আশা করা কিছু বিচিত্র নয়, সেখানে বুঝি শুনবাে ঘুরিয়ে নাক দেখাতে দেখাতে এতদূরই যখন একাকী আসা গেল ৰাকী পথটুকু অর্থাৎ ৩৫০০ মাইলের জন্য আর এ ঝঞ্চাট কেন ? দু’দিন পরে সিডনীতে পৌছে জানলাম সেদিনই বেলা দুটোর সময় কনভয় ছাড়বে, তাই আমাকে তার পূর্বে রেডিও অফিসাস কনফারেন্সে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করা হ’ল। এতদিনে সত্যই অ্যাটলান্টিক যুদ্ধের রণাঙ্গনে প্রবেশের আয়ােজন সমাধা হল।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে সিডনীতে বসে বসে তাই ভাবছিলাম, এখান হতে বহু সহস্র মাইল দূরে ভারতবর্ষে খাতে কোনদিন বুঝি নাই, কনভয় যাবার প্রাক্কালে কতই বন্দোবস্ত হয়ে থাকে। অথচ সে বন্দোবস্তের মধ্যে জটিলতা কিছু নাই, নিতান্ত সহজ, অনাড়ম্বর। সাবমেরিন, রেইডার সমাকীর্ণ সমুদ্রগুলিতে মিত্রপক্ষের জাহাজ চলাচল সম্বন্ধে যে সব গল্প, প্রবন্ধ পড়েছি, তাতে যুদ্ধকালে সমুদ্রমণের বিপদের মাত্রা কতখানি কেবল যেন তা-ই দেখাবার চেষ্টাই রূপ পরিগ্রহ করেছে। বিপদ যে আছে, সে কথা অস্বীকার কেউ-ই করতে পারে না, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও আজ বেশ সুস্পষ্ট রূপেই প্রতিভাত হচ্ছে, সত্যিই বিপদের মধ্যে এসে পড়লে মানুষের মনও ক্রমেই ঐ বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, সত্যিকার বিপদ বা বিপদের সম্ভাবনা জীবন যাত্রারই একটা অঙ্গ হয়ে দাড়ায়। সম্মুখে উত্তর আটলান্টিকের জলরাশির দিকে চেয়ে চেয়ে কেবলই ভাবছি, ওপারে ঐ ইংল্যাণ্ডের রাস্তায় আজ সকল যাত্রীরই বহু বিপদ সম্ভাবনা রয়েছে। এখান থেকে বা ইংল্যান্ড থেকে যারা বেরুচ্ছে এ পথে, তাদের ভেতর কেউ নিরাপদে যাত্রাপথ অতিক্রম করতে পাচ্ছে, কেউ বা পাচ্ছে না। তাই আজ যদি শুধু যাত্রাপথে বিপ্ন আছে বলেই মানুষ এ পথের ব্যবহার একেবারেই ছেড়ে দেয় তাে ইংল্যান্ডকে চিরদিনের মত মানচিত্র হতে মুছে যেতে হবে। হল্যাণ্ড বা স্পেনের মত এ দেশ ও বিগত ইতিহাসের মাত্র কয়েক ছত্র পাতা জুড়েই থাকবে। তার বেশী নয়। পৃথিবীর মুক্ত পথে বেরিয়ে পড়লেই ভারতবাসীর সকল সঙ্কোচ, সকল সন্দেহের অবসান হবে।
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে
No text on this page.
কানাডার স্যালিফ্যাক্স বন্দরের কিছু উত্তরে সিডনী থেকে বিরাট এক কনভয়’ উত্তর আটলান্টিক পার হয়ে ইংল্যাণ্ড বাবে, আমাদের জাহাজ সৈই ‘কনভয়”-এর অন্তর্ভূক্ত হ’ল। তাই যাত্রার দিন ২৪শে অক্টোবর (১৯৪১) বেলা ১১টার সময় নেভি অফিসে রেডিও অফিসার কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হয়ে গেলাম। আমি গিয়ে দেখি সকলেই এসে গিয়েছে—বহু জাতির যেন সমাবেশ হয়েছে, কানাডিয়ান, অষ্ট্রেলিয়ান, নরউইজিয়ান, ডেনিস, ইংরাজ, স্কচ, গ্রীক, ডাচ, এবং আমি। ভারতীয় আর কাউকেই দেখলাম না। কারণ, প্রথমত, ইংরাজ বাণিজ্য জাহাজগুলিতে রেডিও অফিসার সবই ইংরাজ, ভারতীয় রাখে না এবং দ্বিতীয়তঃ, অপরাপর বিদেশী জাহাজে সে দেশের লোেকই কাজ করে। জাহাজের সব কাজ থেকেই-লস্করী বাদে---ভারতীয়দের দূরে রাখাই মনে হয় সংশ্লিষ্ট সকলের উদ্দেশ্য। মানুষ যে কাজ করে নাই বা দেখে নাই, দূর থেকে তাকেই ভয়ানক কিছু একটা মনে করে। খুব সহজ, মামুলী কাজ এইরূপে না দেখে দেখে এবং পরের মুখে ঝাল খেয়ে, ভারতবাসীরা সত্যই অনেক সময় বিশেষ কঠিন মনে করে বসে। নেভিগেশন শিক্ষা ব্যাপার নিয়ে তাে ভারত গভর্ণমেন্ট এটাকে একটা বড়ছে লঘুক্রিয়া বিশেষে পর্যবসিত করেছে। এ কথাগুলো উল্লেখ করছি ‘ডাফরিনের তামাসা নিয়ে—যেন নৌ-বিদ্যা এমন একটা জিনিষ যা ভারতীয়দের মগজে ঢুকতে এখনও অনেক কাল লাগবে, যেন নৌ-চালনা সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে কোনদিন তারা করে নাই! অথচ শাসক শাষিত জাতি সম্বন্ধহীন নরওয়ের ‘আউষ্ট জাহাজে অতি নিবিড়ভাবে যা লক্ষ্য করেছি, তাতে এই-ই বলতে পারি যে বেশী দূর যেতে হবে না, আমাদের ভবিষ্যৎ জাহাজ- গুলিতে সব কাজ যখন বাংলা ভাষাতেই চলবে, তখন নৌ-বিদ্যা শিখতে সাধারণ লেখাপড়া জানা বাঙ্গালীর বড় জোর এক বৎসরের বেশী লাগতে পারে না। কতভাবে কত মিথ্যা অবান্তর কথার সৃষ্টি করেই না পৃথিবীর সকল প্রকারের জ্ঞান বিজ্ঞানের স্রষ্টা অতীতের এই ভারতের আর্যদের আত্মজ, পরবর্তী বৰ্তমান তমসাচ্ছন্ন যুগে আমাদের বিভ্রান্ত করে রাখা হচ্ছে। গঙ্গার ও ব্রহ্মপুত্রের উভয় তীরবর্তী সমতল ভূমিতে আবিষ্কৃত ও পূর্ণতাপ্রাপ্ত সকল ব্যবহারিক জ্ঞানের কণামাত্র সম্পদ একদিন পশ্চিম সীমান্ত পথে য়ুরােপে পৌছেছিল। প্রাচীন আমাদের পূর্বপুরুষদের ‘অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী’ নীতি বাক্যের যাথার্থ্য প্রমাণিত করে, সেই য়ুরােপ- বাসীই কণামাত্র জ্ঞানকে নির্বিবাদে আপনার ব’লে আত্মসাৎ করেছে, নিতি বর্তমান আৰ্যদের পিতৃ ও বংশপরিচয় নিয়ে নানা প্রকারের জঘন্যতা, ‘ইতিহাস’ নামে প্রচার করছে। ম্লেচ্ছ জাতিগুলির আৰ্য্যের পুনরুত্থান ভীতিতে তাই বিশেষ করে বাঙ্গালীকে চিহ্নিত করা হচ্ছে অনাৰ্য্য, বর্ণশঙ্করের জাতি বলে! যে বাংলা ভাষার সু-সংস্কৃত রূপই সংস্কৃত ভাষা নামে পরিচিত, তাকেও তাই বলা হচ্ছে বর্ণশঙ্কর ভাষা। বিশেষ করে আজিকার এই দুর্দিনে প্রতি বাঙ্গালীকে নিয়ত স্মরণ রাখতে হবে, যে জাতির অতীত যত বেশী গৌরবমণ্ডিত, কালচক্রে বিজাতি দ্বারা পিষ্ট অবস্থায়, সেই জাতির অতীত ৩৩ বেশী মসীলিপু করা হয়ে থাকে। দুষ্টা সরস্বতীর পূজারীদের লেখনীমুখে তাই আমাদের গৌরবদৃপ্ত আৰ্য পূরবীগণ উৎক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছেন ককেশাশ পর্বতমালার কাছে, অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে চিরতুষার মণ্ডিত উত্তর মেরু প্রদেশে, মধ্য এশিয়ায় অথবা এমনই ধারা বহু অসম্ভব প্রদেশ ! উদ্দেশ্য সু-পরিস্কার। যেমন করেই হােক না কেন, পৃথিবীবক্ষে ভারতবর্ষের স্বাভাবিক নেতৃত্বের ইতিহাস মুছে ফেলতে হবে। মোহাবিষ্ট ভারতবাসী যেন পিতৃপরিচয় ভুলে পূর্ব গৌরব বিস্তৃত হয়, আত্মপ্রতিষ্ঠায় স্ব-চেষ্ট না হতে পারে। বিশেষ করে বাঙ্গালী জাতি যেন নিজেকে নিতান্ত আধুনিক একটা বর্ণশঙ্কর এবং ইতিহাসহীন লোেক- সমষ্টি ভেবে চিরকাল কোন একটি জাতিবিশেষের মুখপানে অসহায়ভাবে চেয়ে থাকে। আমার সৌভাগ্য যে আমি ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্বন্ধহীন বিদেশী জাহাজে যুদ্ধকালে বেরুতে পেরেছিলাম, তাই সকল জিনিষ দেখবার ও শিখবার সুযােগ থেকে কেউ আমাকে বঞ্চিত করে নাই, বা পারে নাই। য়ুরােপীয় ও কানাডার অফিসারদের রেডিও বিভাগে আমার নেতৃত্বে কাজ করতে বাধে নাই, সে প্রশ্নই কোনদিন ওঠে নাই। যুবােপীয় ‘ক্রু’র মধ্যে ভারতীয় অফিসার,ইংরাজদের কাছে বড়ই অস্বস্তিকর লাগছিল। আফ্রিকায় এবং ইংল্যাণ্ডে অনেক নৌ-কর্মচারী কাপ্তেনকে এবং আমাকে অনেকবারই প্রশ্ন করেছে—অবশ্য খুব কৌশলে, কেমন করে আমি এ জাহাজে এলাম। আমাকে প্রশ্ন করলে আমি তার সােজা জবাব কোনদিনই দিই নাই, প্রশ্নের উৎস কোথায় বেশ বুঝছিলাম বলেই। পাল্টা প্রশ্ন করে উত্তর দিতাম, “কেন, তুমি কি এটা পছন্দ কর না? দেশ রক্ষায় নৌ-বিদ্যার স্থান বিবেচনা করলে, ভারতবাসীকে এই সহজ ও স্বাভাবিক বিদ্যা থেকে বলপূৰ্ব্বক বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য বুঝতে বিলম্ব হয় না এবং দেশের অন্যান্য বহু বিষয়ের মত ভক্ষকের নিকট এ বিষয়েও রক্ষা প্রার্থনা করা অরণ্যে রােদন।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে বেলা প্রায় ২টার সময় আমাদের জাহাজ বন্দর ছাড়ল। বন্দরের বাইরে কিছু দূরে সমুদ্রের ওপর নির্দিষ্ট একটা স্থানে সব জাহাজ একত্র হয়ে একট ( প্রহরী) জাহাজগুলির সঙ্গে উত্তর আটলান্টিক পার হবে। ঘণ্টা তিন বাদে নির্দিষ্ট স্থানে পৌছে দেখি কোথাও কিছু নেই। হয়তো অন্য গুলি এখনও এসে পৌঁছায় নাই। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি, কিন্তু কোন চিহ্নই পাওয়া যাচ্ছে না কারাে। কাপ্তেন রেডিও রুমে এসে বেশ একটু উত্তেজিত ভাবেই বললেন, ঠিক যে বিন্দুটিতে এবং যে সময়ে আমাদের আসতে বলা হয়েছিল আমরা ঠিক সেইখানেই এতক্ষণ রয়েছি, অথচ দে মজা, কোন কিছুরই পাত্তা নেই। জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কিছু করতে পারি কিনা ? এখন মুস্কিল এই, কানাডার ও যুক্তরাষ্ট্রের উপকূল থেকে শুরু করে সারা উত্তর অ্যাটলান্টিকের যে কোন স্থানে নাৎসী সাবমেরিনগুলির গতিবিধি। রেডিও ডাইরেকসন্ ফাণ্ডার নামে একটি যন্ত্র আছে, এর সাহায্যে যে কোনও বিশেষ জায়গা হতে রেডিও তরঙ্গ উৎক্ষিপ্ত হলে, কোথা থেকে এ তরঙ্গ আসছে নির্ণয় করা যায়। তাই উত্তর অ্যাটলান্টিকে রেডিও সাহায্যে কোন প্রকারের সংবাদ আদান প্রদান ভীষণ বিপজ্জনক। এমন কি, গভীর নিশীথে কনভয়-এর কোন জাহাজ আক্রান্ত হয়ে জল- সমাধি হলেও রেডিওর সাহায্যে সাহায্য প্রার্থনা নিষিদ্ধ। হয়তো কাছাকাছি দুই চারি শত মাইলের মধ্যে কোন সাবমেরিন বা অন্য কোনরূপ শত্রুর জাহাজ শিকারের সন্ধানে ঘােরা ফেরা করছে, কিছু বলা যায় না—আমাদের রেডিও তরঙ্গ ধরে অনায়াসে খুজে বের করে ফেলবে। অথবা দূরত্বের জন্য তার পক্ষে আমাদের ধরা অসুবিধা হলে, অ্যাটলান্টিকের বিভিন্ন স্থানের সাবমেরিনগুলিকে আমাদের সন্ধান দেবে।
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে আমরা যদি এখন রেডিও সাহায্যে কনভয় এখন সমুদ্রের ঠিক কোথায় আছে খোজ নেবার চেষ্টা করি, এই সব বিপদ সম্ভাবনার জন্য স্বভাবতই কোন উত্তরই কনভয়-এর নায়ক দেবে না। কিন্তু শত্রুপক্ষ বুঝে নেবে, এই মূহুর্তে একটা কনভয় উত্তর আটলান্টিকের ওপর আছে, এবং তার স্থিতিষ্ঠান কানাডার বেশ দূরে নয়। শত্রুপক্ষ আমাদের খুঁজে বের করে হয়তো আক্রমণ চালাবে না, গােপনে অনুসরণ করবে। যদি আমর: কনভয়-এর সঙ্গে মিলিত হতে পারি, তখন একসঙ্গে ৫০/৬০/৭০টি জাহাজ পেয়ে বহু সাবমেরিন সুযােগ মত বহুদিক থেকে একসঙ্গে আক্রমণ সুরু করবে সমস্ত জাহাজগুলির ওপর। কখন কখন সবগুলাে আক্রমণে যােগ দেয় না। দু'তিনটে সাবমেরিন আক্রমণ শুরু করে কনভয়ের কিছু জাহাজ ধ্বংশ করলে, এসকটের দ্রুতগামী ক্ষুদ্র করভেট গুলির এলবােমর দ্বারা আক্রান্ত হয়। তখন এরা জলের বহু নীচ গিয়ে আত্মগােপন করবার চেষ্টা করে। অন্যান্য সাবমেরিন যেগুলাে আক্রমণে যােগ দেয়নি এবং যাদের অস্তিত্ব করভেট- গুলি জানেনা তারা সে সময় অনুসরণ করে চলে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, এবং আবার সুযােগ বুঝলেই সেই প্রণালীতে আক্রমণ শুরু করে দেয়। একবার যদি কোন কনভয় বিশাল অ্যাটলান্টিকের প্রসারতার সুযােগ সত্ত্বেও শত্রুর সাবমেরিন দ্বারা কখন চিহ্নিত হয়ে পড়ে তো আক্রমণ চলে তত দিন, যতদিন পর্যন্ত হতাবশিষ্ট জাহাজগুলি ইংল্যাণ্ড বা স্কটল্যাণ্ডের উপকূলে না পৌঁছায়। তার ওপর আবার আছে বােমাবর্ষী বিমানের আক্রমণ। প্রকাণ্ড বড় কনভয় ইংল্যাণ্ডের দিকে যাচ্ছে, সমুদ্র থেকে সাবমেরিনগুলির কাছ থেকে এ সংবাদ পেলে, জাৰ্মাণীর এবং ইতালীর বােমাবর্ষী বিমান বহর তাদের অ্যাটলান্টিক মহাসমুদ্রের নিকটবর্তী কোন বিমান ঘাঁটির প্রসারিত বাহুর মধ্যে কনভয়টি এসে পড়লে, সুযােগ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে পেলেই বিমান আক্রমণ শুরু করবে। স্কটল্যাণ্ড ও ইংল্যাণ্ডের উপকূলবর্তী সমুদ্রে তাই কনভয় এসে পড়লে, শত্রুর বিমান আক্রমণের পক্ষে প্রশস্ত। এ সম্বন্ধে কাপ্তেনের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট, কাজেই তাকে রেডিও সাহায্যে কনভয়ের বর্তমান স্থিতির সংবাদ নেবার চেষ্টায় যে বিপদ হতে পারে, স্মরণ করিয়ে দিতেই তিনি তা থেকে বিরত হলেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কনভয়ের কোন নিশানাই না পেলে কি করবেন ? সিডনীতেই আবার আমাদের ফিরে যেতে হবে নাকি? তিনি বললেন, ‘ন, চারমাস বাদে এতদিন পর ইংল্যাণ্ড যাবার জন্য সমুদ্রে বেরিয়ে, কনভয় না পাওয়ার জন্য আর আমি ফিরতে রাজী নই। জাহাজের উচ্চতম স্থানগুলির সর্বত্র প্রহরা রেখে সমুদ্রের চতুর্দিকে যতদূর চলে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে রাখতে, আরও কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে যদি কনভয় দেখা না যায় তত বাঁকা পথে, গ্রীনল্যাণ্ড ও আইল্যাণ্ডের উপকূলের কাছ দিয়ে অনেকটা একটি অর্ধবৃত্তের মত রচনা করে বৃটেনে পৌছুবার চেষ্টা করবেন। আবহাওয়া তখন খুবই খারাপ—শীতের সময় প্রায় সর্বদাই উত্তর অ্যাটল্যান্টিকের এ অবস্থা; ঝড়, ঝঞ্চাবাত লেগেই আছে। পাহাড়ের মত বড় বড় ঢেউএর ওপর দিয়ে দুপাশে একেবারে শুয়ে পড়ার মত কাৎ ইয়ে দুলতে দুলতে জাহাজখানি ঘুরে বেড়াচ্ছে। সম্মুখের স্ফীত জলরাশির ওপর জাহাজের সম্মুখভাগ উত্তোলিত হয়ে এক একসময় একে যেন পিছনের ওপর ভর দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আবার, পর মূহুর্তে, পশ্চাতের স্ফীত জলরাশি জাহাজটিকে পাতালপুরীর দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। এক একটি বিপুলাকার ভঙ্গুর তরঙ্গ মধ্যে মধ্যে জাহাজটির গায়ের ওপর ভেঙ্গে পড়ে ব্রীজের ওপর যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদেরও সৰ্বাহ সিক্ত করে দিচ্ছে। সারা সমুদ্রবক্ষে যেন অবিরাম নব নব পরিখা ও প্রাচীরের অ্যাটলাকি রণাঙ্গনে ৰূচনা হচ্ছে। সমুদ্র এখানে উন্মত্ত। এই বিপুলাকার উন্মাদের বিপুল দেহের বিচ্ছুরণে ও অর্থহীন, ক্লান্তিহীন, গর্জনে এবং আকাশের বাধাহীন বায়ুর নি:স্বণে দ্বিতীয় ইন্দ্রিয় অভিভূত হয়ে পড়ে। অরূপের রূপ পরিগ্রহের সে কী আকুলি বিকুলী ! ব্রীজের ওপর যারা দাঁড়িয়ে আছি, পাশের মানুষের স্বাভাবিক গলার কথা কিছু শুনতে পারা যাচ্ছে না। কিছু বলতে হলে কানের কাছে মুখ এনে স্বর সাধনের নলটিকে যতদূর সম্ভব স্ফীত করে ভাষা বের করতে হয়। নতুবা এ দুর্যোগে, মানবমুখ নিঃসৃত শব্দ তরঙ্গ সৃষ্ট হবার অবকাশ পায় না। অপরূপ এই আদি প্রকৃতির রূপ দেখে ক্লান্তি হয় না, শান্তি আসে । বহুবার দেখা এই দুই ভূতের বিরামহীন ক্রীড়া দেখতে দেখতে নাবিকের ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন কেটে যায়। নির্বাক আমরা দু’জন-চিফ নেভিগেটিং অফিসার এবং আমি—ব্রজের ওপর এক কোণে মেশিনগান রাখবার গলা পর্যন্ত উঁচু মােটা ইস্পাতে ঘেরা বন্ধনীর ভেতর পঁড়িয়ে আছি, সুর তরঙ্গগুলি থেকে সিক্ত হবার ভয়ে। সমুদ্র দেখছি, অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গন দেখছি। অনেকক্ষণ ঐভাবে কাটুল—আমার নিজের তখন কাজের পালা নেই, হঠাৎ দেখি, সমুদ্রবক্ষে দূরে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে দেখাতে তিনি কি বলছেন। বলা এবং শােনার ব্যবধানের মধ্যে দ্রষ্টব্য বিষয়টি বিরাট দুই স্ফীত জলরাশির মধ্যকার ফাটলের ভেতর অদৃশ্য হয়েছে। একটু পরে বিপরীত অবস্থা এলে যখন পাশের দুই উন্নত জল প্রাচীর ভেঙ্গে পড়ল এবং ফাটল মিলিয়ে গিয়ে সে জায়গাটি হ’ল সু-উচ্চ, দেখি, কিছু দূরে আরােহীহীন শূ এক জীবনতরী সমুদ্র তরঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে আছাড়ি পিছাড়ী খাচ্ছে।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ঘনঘটাময় এই আবেষ্টনে একক এবং পূর্ণাবয়ব জীবনতরী ! পাশের অফিসারটি দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করে বলে উঠলেন ‘এই তত জীবন। কতক্ষণ পূর্বেও ঘনসন্নিবেশিত এই কাষ্ঠখণ্ডগুলি কোন একটি জাহাজের পার্শ্বদেশে ঝুলছিল, বিপকালে অন্তত সাময়িকভাবেও কতকগুলি মানুষের জীবনরক্ষার জন্য। কিন্তু সমুদের এ অবস্থায় চরম মূহুৰ্ত্তটি যখন সত্যই এসে পড়ল, জাহাজ থেকে ওটিকে নিরাপদে জলে নামাবার সুযােগ হয় নাই। জাহাজখানি অতলে যাবার সময় বুঝিবা জীবনতরীটি তরঙ্গা- যাতে উৎক্ষিপ্ত হয়ে বন্ধনমুক্ত অবস্থায় দূরে পড়েছিলো। অথবা, এর ওপর কয়েকটি মানুষ আসতে পেরেছিলো। কিন্তু ক্ষণকালের মধ্যেই বিশালাকার ভঙ্গুর তরঙ্গের প্রচণ্ড পরিমাপহীন নিম্নমুখী আঘাতে সমুদ্র- ক্রোড়ে অদৃশ্য হয়েছে। কে জানে গুপ্ত আক্রমণকারী সাবমেরিন আমাদের কত নিকটে ? নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ে, কনভয়-এর একটি জাহাজও যে দৃষ্টি পথে পড়ে নাই, তার সঙ্গে এই শূন্য জীবনতরীর কোন সম্বন্ধ আছে কিনা? হয়তাে রণাঙ্গনে প্রবেশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত কনভয় অন্য পথে ঘুরেছে ; আমাদের অপেক্ষায় বিশিষ্ট সময়টি পর্যন্ত থাকে নাই। পাশের ভদ্রলােকটিও সম্ভব এই কথাই ভাবছিলেন, আবার বললেন, এই তাে যুদ্ধকালীন নাবিক জীবন! আরাে কিছু সময় অতিক্রান্ত হ’ল। সন্ধ্যার ম্লান দৃষ্টিকে রাত্রির কৃষ্ণ আচ্ছন্ন করে করে, চার্ট রুম ও রেডিও রুমের ওপরকার ছাদে প্রহরায় নিযুক্ত নাবিকটি সংবাদ দিল, দুর্যোগে সঙ্কুচিত দিকচক্রবালে আমাদের দক্ষিণ পাশে সে জাহাজ দেখতে পেয়েছে—একখানা নয়, অনেকগুলি। কনভয়।
অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে ইঞ্জিনে যত শক্তি রুদ্ধ ছিল সব খুলে দিয়ে জাহাজ ছুটলাে সেদিকে। অন্ধকার সমুদ্রপৃষ্ঠকে গ্রাস করবার পূর্বেই ওদের সঙ্গে মিলিত হতে হবে। নতুবা রাত্রির অন্ধকার কেটে গেলে পরদিন প্রত্যুষে সর্পগতি ‘কনভয় কোন মতেই ধরা যাবে না। যে আহ্নিক গতিতে পৃথিবীর সেই অংশ সরে যাচ্ছে আলাের কাছ থেকে, তারি সঙ্গে যেন বাষ্পীয় শক্তি উদ্ভুত জাহাজের গতির প্রতিযােগিতা চললাে! কনভয়ের একখানা রক্ষী জাহাজও আমাদের দিকে ছুটে আছে তীব্র গতিতে। আগেই সেখানা কোনপ্রকার সঙ্কেত কবে না। আমাদের কে আমরা, ছদ্মবেশী শত্রু জাহাজ কিনা, প্রথমে নির্ধারণ উদ্দেশ্যে। করবে। এটি একখান! ‘করভেট'। ক্ষুদ্র যুদ্ধপােত—মেষপাল রক্ষায় নিযুক্ত শিকারী কুকুর। লম্বায় কমবেশী ১৫০ ফিট ; প্রস্থও তদনুরূপ। অস্ত্র সজ্জা নিতান্ত সাধারণ। গােটা তিন ছােট ৩ ইঞ্চি বা ৪” ইঞ্চি কামান। বৈশিষ্ট্য—-খর গতি এবং গভীরতা আলােড়নকারী জলবােম। ঘণ্টায় ৩০৩৫ সামুদ্রিক মাইল অতিক্রম করতে পারে, দু’পাশের ঢাল পাটাতন সাহায্যে সমুদ্রে দ্রুত জলবােমা নিক্ষেপ করবার যথেষ্ট সুবন্দোবস্ত আছে। অনেকটা লাফাতে লাফাতে এই বামন রণপােতটি আমাদের জাহাজের খুব কাছে এসে পরিচয়াদি নিয়ে তারপর কনভয়ে যােগ দিতে বলল। কথাবার্তা হ’ল দুপক্ষেরই, লাউড স্পীকার দিয়ে। জিজ্ঞাসা করল, জাহাজের নাম কি, কোথা থেকে আসছি, গন্তব্যস্থল ইংল্যাণ্ড বা স্কটল্যাণ্ডের কোন বন্দর, কনভয়ে আমাদের জাহাজ কত সংখ্যক ? সিনী থেকেই রক্ষী জাহাজগুলির নায়ক তাঁর কনভয়ে যারা যাবে, তাদের নাম ধাম গােত্র পরিচয় ইত্যাদি পেয়ে থাকে।
৩৮ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে, লাউড স্পীকারের সাহায্যেই জানিয়ে দিল, কনভয়ের ঠিক কোন শ্রেণীর কোন জায়গাটি আমাদের জন্য নির্দিষ্ট হ’ল। রাত্রির সূচিভেদ্য অন্ধকারে জাহাজগুলি যখন পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষের ভয়ে বহু দূরে দূরে থেকে চলবে, তখন কতরাত্রি পর্যন্ত কি গতিতে কোন দিকে যাবে এবং তারপরেই বা গতিমুখ এবং গতি কোন দিকে কতখানি হবে, নির্দেশ দিল । পরদিন উষার আলােকে দিও,মণ্ডল পুনরায় যখন দৃষ্টিগােচর হবে তখন হয়তাে অনেক জাহাজই দলের মধ্যে পাওয়া যাবে না। ঘন কুয়াশায় অনেকেই যূথভ্রষ্ট হয়ে পড়তে পারে। তাই পরদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে যত ডিগ্রি, মিনিট, দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশের সংযােগ স্থলে আমাদের ব্লদেভু বা মিলন স্থান, তাও জানান হ'ল। সন্ধ্যাহারের সময় আমাদের মধ্যে সেই জীবন তরীটার কথা হচ্ছিল। সকালে যারা প্রাতঃকালীন আহার করছিল, বেচারারা জানতও না সন্ধ্যায় আর তারা খেতে বসবে না! মধ্যাহ্ন আহার হয়েছিলো কিনা, কে জানে ? কিন্তু সকলেরই একটা মহা স্বস্তি বােধ হচ্ছে কনভয় পেয়েছে বলে । একটা কথা কেউ-ই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, সমুদ্রের ওসব জায়গায় জাহাজটাকে অনুসরণ না করে দৃষ্টিগােচর হবার সঙ্গে সঙ্গে জাৰ্মাণ সাবমেরিন ওটাকে ধ্বংশ করলাে কেন? আবার ভাবলাম, সাবমেরিন হয়তাে একটি-ই সমুদ্রের সেই অংশে কয়েক শত মাইলের মধ্যে ছিল। নাগালের বাইরে দুই পাখীর চেয়ে হাতের ভেতর এক পাখা শ্রেষ্ঠ, এই নীতির অনুসরণ করে কাজ করেছে। দুপুর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত, সারাটা সময় নিজের কাজ না থাকা সত্বেও, কেবল কৌতুহলবশে বাইরের দুর্যোগে মাথা থেকে পা পৰ্যন্ত এক বার সুটের আবরণে দাড়িয়ে ছিলাম। খেয়ে উঠে ক্যাবিনে অ্যাটলাটিক রণাঙ্গনে গেলাম, গরম জলে হাত মুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে বিছানায় শুয়ে একটু বিশ্রাম কতে। ভীষণ ঠাণ্ডা। হাতের চেটো, পায়ের তলায় যেন একসঙ্গে লক্ষ লক্ষ সূচ ফুটছে। তুলাে, পশম, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ক্যাবিন উষ্ণ রাখবার জন্য গরম বাষ্পের চেম্বারটি বেশ কয়েক পাক মুচড়ে খুলে দিতে ঘরটি এতক্ষণে আরামপ্রদ হল। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসের পর গরম ঘরে নরম বিছানা, মােটা লেপের আরাম,—বােধ হয় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙ্গলাে ভাের চারটের সময় যখন আমার এলার্ম ঘড়ি বেজে উঠে কাজের পালা এসেছে জানিয়ে দিল। চার্টরুমে খবর নিলাম কোন পথে আমরা যাচ্ছি। জাহাজের গতিমুখ তখন পূৰ্বদক্ষিণ কোণে ; অর্থাৎ সেই মূখে যদি বরাবর চলি কিছু দিনের মধ্যে উত্তর পশ্চিম আফ্রিকায় গিয়ে পড়ব। বাইরে ব্রীজের ওপর সেকেণ্ড অফিসার ঐ গাঢ় কৃষ্ণতার মধ্যে কনভয়ের অন্যান্য জাহাজ নজরে রাখবার বৃথা চেষ্টা করূছে। ঘন তিমির ও কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঘাড়ের ওপর কেউ না এসে পড়ে বা আমরা কারাে ওপর পড়ে আর এক বিভ্রাট না বাঁধাই, তাই জাহাজ হতে, থেকে থেকে, অনেকক্ষণস্থায়ী আওয়াজ দেওয়া হচ্ছে। সকাল হলে দেখা গেল, এত পুরু কুয়াসা, তিন গজ দূরের কিছুও চোখে আসে না। অনবরতঃ এ জাহাজ থেকে আওয়াজ দেওয়া হতে পাগলাে, কাছাকাছি অন্য গুলিও তাই করছে, বুঝলাম কনভয় হতে বিচ্ছিন্ন হই নি। খানিক কুয়াশা কাটুল অনেক পরে। দেখা গেল প্রায় ত্রিশােনা জাহাজ কনভয়ে নাই--বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতগুলি। নির্দিষ্ট মিলন স্থানে পৌছে ওদের জঙ্ক অপেক্ষা করছি অনেকক্ষণ, কোনও চিহ্নই নাই। দু’থানা করভেট কনভয় ছেড়ে বেড়িয়ে গেল ৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে যদি খুজে বের করূতে পারে। আরাে কিছু পরে, অন্য করভেটগুলির সঙ্গে আমরা চলেছি—এবার আমাদের গতিমুখ পশ্চিমের কিঞ্চিৎ গা ঘেঁষে উত্তর দিকে, প্রায় উল্টো মুখে। ঘণ্টা চার বাদে আবার যাচ্ছি সােজা পূর্ব দিকে। সারাদিন ধরে এইরূপ বিচিত্র গতিতে ভেসে ভেসে, আমরা ইংল্যাণ্ডের দিকে এগােচ্ছি না পিছিয়ে পড়ছি অথবা মােটামুটি একই জায়গায় রয়েছি, মানচিত্রের গায়ে দাগ না কেটে বুঝতে হলে অঙ্ক কষার প্রয়ােজন হয়। বিকেলের দিকে দুরে দিগন্তে কয়েকখানা জাহাজ দেখা গেল, কিছু সময়ের মধ্যে মিলিত হ’লাম ওদের সঙ্গে। কাল রাতের যূথভ্রষ্ট দলটি, সঙ্গে সেই দুখানা রক্ষী জাহাজ। তিনখানা পাওয়া যায় নাই, একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এখন যদি ওরা নিরাপদে থাকে তাে কপাল ফুকে আপন আপন ইচ্ছামত পথে ওদের আটলান্টিক পার হবার চেষ্টা করতে হবে। কাল যে শূন্য জীবন তরীটি ভাসতে দেখেছিলাম তার অর্থও পরিষ্কার হ’ল। নবাগতদের মধ্যে একখানি ওলন্দাজ জাহাজ আমাদের পাশে পাশে যাচ্ছিল। দেখি, ওটির একটি জীবন তরী নাই। বােধ হয় বন্ধন সুদৃঢ় ছিল না, তরঙ্গের আঘাতে এবং প্রচণ্ড বাতাসে মুক্ত হয়ে সমুদ্রে পড়েছিল, তাই দেখেছি আমরা। পরদিন আকাশ কতকটা পরিষ্কার। এ কনভয়ে আছে মােট প্রায় ৭০ খানা জাহাজ, পরস্পরের ভেতর প্রায় ১০০ গজ ব্যবধান রেখে কয়েকটি সারিতে শ্রেণীবদ্ধ হয়ে চলেছে। জাহাজগুলির সামনে দু তিন খানা করভেট অনেকদূর এগিয়ে গিয়ে সমুদ্র শুকে শুকে বেড়াচ্ছে শিকারী কুকুরের মত। ওদের কাছে আছে জলের নীচে সাবমেরিন সন্ধানী যন্ত্র। জলের নীচে ইঞ্জিন থামিয়ে যদি চুপ করে বসে থাকে সাবমেরিন, তাে স্বতন্ত্র কথা। নতুবা যদি জলের নীচ দিয়ে চলতে থাকে, অ্যাট লান্টিক রণাঙ্গনে ৪১ তার শব্দ সমুদ্রগর্তে কতকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবেই,—এই শব্দকে ধরবার যন্ত্রই হচ্ছে সাবমেরিন সন্ধানী যন্ত্র হাতী, ঘােড়া কিছু নয়। সাবমেরিন- গুলিও এ যন্ত্র রাখে, নীচে বসে জলের ওপর দিয়ে কোন জাহাজ যেতে থাকলে, জানবার জন্য । সমগ্র দলটির সম্মুখে, দক্ষিণে এবং বামে, এভাবে দু তিনখানা করে করভেট প্রায় দশ মাইলব্যাপী অর্ধবাসে কনভয়টিকে কেন্দ্র করে সারা স্থান পরীক্ষা করতে কতে চলেছে। এদের কেউ সন্দেহজনক কোন গন্ধ পেলে ছুটে এসে পতাকার সাহায্যে সঙ্কেত করে জাহাজগুলিকে হয় অন্য কোনদিকে যেতে বলে পৰা একেবারেই কোনদিকে আর অগ্রসর হতে নিষেধ করে দেয়। তারপর দু’তিন খানা করভেট জাহাঙ্গগুলির আশে পাশে থাকে— বাকীগুলি ছুটে যায় সন্দেহজনক সমুদ্র বিন্দুটির কাছে এবং তার সৰ্বদিকে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে জল বােমা বর্ষণ করতে থাকে। সাবমেরিন জলের নীচ থেকে ওপরে না উঠলে সত্যিই ধ্বংস হ’ল কিনা, বােঝবার ষােলা আনা উপায় নাই। জলের ওপর তেল ভেসে উঠলে এটি নষ্ট হয়েছে মনে করাও অনেক সময় ভ্রমাত্মক। কারণ, ওপরের শত্রুকে বিপথে চালিত করার জন্য অনেক সময় সাবমেরিন নিজেই এ কাজ করে। বােমার আক্রমনের সময় সমুদ্রের অনেক নীচে গিয়ে আত্মরক্ষা করে আক্রমন বন্ধ হলে আবার সাবধানে কনভয় অনুসরণ বা প্রতি-আক্রমণ করতে চেষ্টা করতে পারে। তাই, এরূপ ক্ষেত্রে কনভয় গতি ও গতিমুখ পরিবর্তন করে চলে। ‘কনভয়ের উদ্দেশ্য শক্রর সঙ্গে যুদ্ধ নয়-শত্রুকে এড়িয়ে আপন গন্তব্য স্থানে যাওয়া। সমুদ্রের বিশালতার সুযােগ নিয়ে নিরাপত্তার সঙ্গে যুদ্ধ সাম , এবং খাদ্যসম্ভার যথােপযুক্ত স্থানে পৌঁছে দেওয়া। পৃথিবীবক্ষে সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে মহাসমুদ্রগুলিতে কোনদিনই কোন জাতি বা জাতিসমষ্টির মিলিত সাবমেরিন বহর রিপূর্ণভাবে বাণিজ্য জাহাজগুলির ভ্ৰমণ পথ রােধ করতে পারে না। কাজেই, জাহাজের যাতায়াতের পথ থাকবে । পথ সাতদিনে যাওয়া যেতাে হয়তাে এ অবস্থায় লাগবে চৌদ্দদিন, কুড়িদিন, পঁচিশ দিন বা আরও বেশ। উপকূলের কাছে বা সমুদ্র যেখানে উপসাগরে পরিণত হয়েছে সেইখানে সম্পূর্ণরূপে জাহাজ চলাচলের ওপর দৃষ্টি রাখা চলতে পারে বটে, কিন্তু সে সুবিধা দু’পক্ষই পাচ্ছে । যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য আত্মরক্ষা ; শত্রুকে আক্রমণ করে ধ্বংশ করতে হবে যখন সে দুৰ্বল, তার কাছে অস্ত্র নাই, অথবা যে অস্ত্র আছে তার সাহায্যে প্রতিযােগীর মুখােমুখি সে দাড়াতে পারে না। উভয়েরই সমশ্রেণীর অস্ত্র থাকলে অন্তরালে থেকে অস্ত্র চালাতে হবে—সে যেন আমণকারীকে দেখতে বা ছুতে না পায়। বন্দরের কাছাকাছি যেখানে জলের পরিধি কম, মহাসমুদ্রের ওপর ক্ষুদ্র কতকগুলি জাহাজকে প্রকাণ্ড প্রান্তরে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র পয়সার মত খুঁজে বেড়াতে হবে না সত্য, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আত্মরক্ষাকারী দেশটির কেন্দ্রীভূত শক্তিও সেখানে রয়েছে। কাজেই সেখানে কাউকে আক্রমণ করতে গেলে নিজেকেও ধ্বংশ হবার জন্য প্রস্তুত হতে হবে । মরতে নারাজ পৃথিবীর সকলেই। একথা ভুললে চলবে না, সকল দেশেই সকল কালে সাধারণ মানুষই সেনা বিভাগে, নৌবিভাগে বা বায়ুবিভাগে প্রবেশ করে। তাই সাধারণ মানুষের সহজাত সাহসের এক কাণাকড়ি বেশী শৌৰ্য্য এসব বিভাগে থাকতে পারে না। কিছু কিছু অসম সাহসিক পুরুষ সকল দেশেই সকল কালে জন্মগ্রহণ করে—তারা মুষ্টিমেয়। এদের মধ্যে যারা দেশের সমর, নৌ বা বিমান বিভাগে থাকেন তারাই যুদ্ধের সময় কখন কখন অসম সাহসিক কাজ অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে ৪৩ ; করে সজের সার্থীদের উৎসাহিত এবং জনসাধারণের বিস্ময় উৎপাদন করেন। এই শ্রেণীরই কয়েকজন নাৎসী সাবমেরিন নায়ক বৃটেনের রণতরী বহরের একটি প্রধান কেন্দ্র ‘স্কাপ। ফ্লো’-তে যুদ্ধের প্রথম দিকে হানা দিয়ে বেশ কিছু ক্ষতি করেছিলো, কিন্তু এমন লােক সৰ্ব্বত্রই বিরল। দু’ চারটি অসম সাহসিক কাজে বিস্ময় উৎপাদন চলে কিন্তু যুদ্ধের গতির ওপর এগুলির প্রভাব খুব নাই। সকল যুদ্ধের গতি ও পরিণতি নির্ভর করে সাধারণ মানুষের যতটুকু সাহস বা সামর্থ্য, তা-ই দিয়ে ; এবং সাধারণ মানুষ নিতান্ত ভীরু বলেই তাকে শাস্তির ভয় দেখিয়ে বিপজ্জনক কাজে অনেক সময় বাধ্য করে। অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে মানুষের এই সহজাত আত্মরক্ষা প্রবৃত্তিকেই কার্যকরী করা হয়। অস্ত্রশিক্ষা আনে আত্মবিশ্বাস। যুদ্ধক্ষেত্রে মুখখামুখী শত্রুর সামনে পড়ে গেলে সাধারণ মানুষ রাজানুগত্য, দেশপ্রেম, বা আত্মােৎসর্গের কথা ভাবে না, ভাবে স্বয়ং নিহত হবার পূর্বেই কেমন করে শত্রুকে নিহত করে নিজের প্রাণ রক্ষা করবে। তাই, যে নেতৃত্ব ‘সাধারণের নিকট হতে -সাধারণ গুণসকল প্রত্যাশা না করে, নীতি, অস্ত্র প্রভৃতি সাধারণণাপযােগী করে চলে-শ্বাশ্বত কালে স’র জয় অনিবার্য। বন্দরের বা উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রে সে দেশের রণতরী বা বিমান নিয়ত প্রহরা দিচ্ছে, তাই সাধারণতঃ শত্রুর সাবমেরিন এসব জায়গার একটু দূরেই থাকে জাহাজের প্রতীক্ষায়। অবশ্য এ দেশগুলিতে বন্দর বা উপকূলভাগ সাবধানে রক্ষা করার মত যথেষ্ট রণতরী বা বিমান না থাকলে স্বতন্ত্র কথা ; যেমন ১৯৪২এর প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে হয়েছিলো। কনভয়ে যাবার মােটামুটি এবং সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, প্রথমত, বন্দরের বাইরে জাহাজগুলি বেরিয়ে পড়বার আগে সম্মুখের জলভাগের ৪৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে অনেকটা অংশ ভাল করে পরীক্ষা করা। তারপর মহাসমুদ্রে পড়ে নিয়ত পথ পরিবর্তন। কখন উত্তরে ৫০ মাইল, পরে উত্তর পূর্বে ৪• মাইল, দক্ষিণে ৬০ মাইল আবার হয়তাে পশ্চিমে ৩০ মাইল—এমনি ধারা অদ্ভুত গতিতে অনুসরণকারী কেউ যদি থাকে, তাকে বিভ্রান্ত করে দেওয়া। তাই সমুদ্রগর্তের বিভিন্ন অংশের সাবমেরিনগুলি কনভয় আক্রমণের উদ্দেশ্যে কোথায় কখন মিলিত হবে, স্থির করা ওদের পক্ষে রীতিমত দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। হয়তাে এরা সংবাদ পেলাে, মস্ত এক কনভয় বিশিষ্ট একটি অক্ষরেখার কাছাকাছি দিয়ে পূৰ্বমুখে বৃটেনের দিকে যাচ্ছে। কনভয়ের তখনকার গতির হিসাবে ৩০০ মাইল পূৰ্বে সেই অক্ষরেখার কাছাকাছি পৌঁছুতে এর যে সময় লাগবে, সেই সময়ের ভেতর বিভিন্ন সমুদ্রাংশ থেকে সাবমেরিনগুলি সেখানে গিয়ে অপেক্ষায় রইল। কিন্তু কনভয় ইতিমধ্যে গতি ও গতিমুখ বহুবার পরিবর্তন করবে। বিশিষ্ট অক্ষাংশটি ধরে পূর্ব দিকে ৫০ মাইল গিয়ে হয়তাে সােজা দক্ষিণে ৪০ মাইল গিয়েছে, পরে আবার হয়তাে পশ্চিমেই ২০ মাইল এসে পূৰ্বদক্ষিণ কোন ধরে ৬০ মাইল গিয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে গতিরও বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যে দ্রাঘিমা রেখা ও অক্ষাংশের কাছাকাছি সাবমেরিনগুলি যে সময় এর প্রতীক্ষায় রয়েছে তার হয়তাে অনেক পরে কনভয়টি ওদের সঙ্গে ৬০ • ৭০০ মাইল ব্যবধান রেখে বেরিয়ে চলে গেল। আক্রমণকারীরা স্বভাবতই এসব রীতি জানে। তাদেরও প্রতিনিয়ত নানাভাবে সমুদ্রের বিশালতার মধ্যে কনভয় অন্বেষণের পদ্ধতি বদলাতে হয়। উভয় পক্ষের এই লুকোচুরী খেলার মধ্যে কখন কোনও কনভয় সাবমেরিনের ঝাঁকের ভেতর পড়ে গেল ! কনভয়ে তাই নির্দেশ দেওয়া থাকে, আক্রমণ শুরু হলে সব জাহাজ দল ভেঙ্গে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে ৪৫ পড়বে ; আক্রমণ তীব্র হলে জাহাজগুলি বিভিন্ন গন্তব্যলক্ষ্যে পোঁছুবার চেষ্টা করবে, কিছু অন্ততঃ গিয়ে পৌছুবে। বিচিত্র গতিতে এভাবে কিছুদিন চলবার পর আমরা এসে পড়লাম ২০ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমা রেখার কাছাকাছি। ানটি তখন নাবিকদের নিকট বিশেষ ত্রাসপূর্ণ। শত শত বাণিজ্যতরী এখানে নাৎসী আক্রমণে নিমজ্জিত হয়েছে, সহস্র সহস্র বিভিন্ন দেশীয় নবিক অকালে এখানে প্রাণ হারিয়েছে। মানচিত্র দেখলেই কারণ অনুমান করা কঠিন হবে না। স্পেনের ও আয়ার্লণ্ড উপকূল হতে কিছু দূরে এই অঞ্চল সহজেই নাৎসী অধিকৃত ফ্রান্সের উপকূলবর্তী সাবমেরিন ঘাঁটিগুলির মধ্যে রক্ষিত সাবমেরিনগুলির গতি সীমার মধ্যে পড়ে। সাধারণতঃ সাবমেরিন ৫০০ হতে ৮৫০ টনের মধ্যে হয়ে থাকে। এই ক্ষুদ্র জাহাজটির ভেতর নিতে হচ্ছে, মানুষ, খাদ্যসামগ্রী, রণসম্ভার, তেল এবং আরো অনেক কিছু জিনিষ ! তাই বহুদিন পর্যন্ত সমুদ্রে ঘোরাফেরা করবার সামর্থ্য এদের নেই; অনুসন্ধানকারী বিমান বা অন্য কোন সূত্রে এদের প্রসারিত বাহুর মধ্যে কোন কনভয়ের এসে পড়বার সংবাদ পেলে এই ছোট সাবমেরিন- গুলি পােতাশ্রয়গুলি থেকে বেরিয়ে গিয়ে জাহাজগুলির ওপর হানা দেবার চেষ্টা করে। যে সব সাবমেরিন বহুদিন পর্যন্ত বিভিন্ন সমুদে শিকারের সন্ধানে ফেরে, সেগুলি বৃহদাকার এবং সংখ্যায় খুব কম। এরা দেশে ফিরে ক্রমাগত ধ্বংশকাৰ্য চালিয়ে যেতে পারে এক বৎসর পর্যন্তও - সরবরাহকারী সাবমেরিনগুলি এদের এই সময়ের মধ্যে এসে নিয়মিতভাবে প্রয়ােজনীয় সব কিছু জিনিষপত্র সরবরাহ করে। এ তথ্য মিত্রপক্ষের কর্তারা বহুদিন পর্যন্তই জানতেন না। এইখান থেকে রক্ষীজাহাজগুলি আরাে সাবধান হ’ল। একখানা - ভারী ক্রুজার এবং একটী বিমানবাহী জাহাজকে এখানে আমাদের সঙ্গে ৪৬ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ; এসে মিলিত হতে দেখা গেল। বােধ হয়, এই অঞ্চলে কেবল সাবমেরিন নয়, বিমান আক্রমণেরও বিশেষ ভয় আছে বলেই, নৌ-বিভাগ থেকে পাঠান হয়েছিলাে এদের। সারাদিনই বিমানগুলিকে পালা কোরে আকাশে উঠে সমুদ্রের বহুদূর পর্যন্ত টহল দিয়ে ফিরে আসতে দেখা যেতো। আকাশ পথের বিমানগুলি সাবমেরিনের মহাশত্রু। হয়তো, কোন স্থানে কোন সাবমেরিন সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশ থেকে সামান্য কিছু নীচে বসে বাইরের সমুদ্র দেখবার জন্য পেরিসকোপের চোঙটি চার পাঁচ ফুট বের করে আছে ; দূরে আকাশ থেকে কোন বিমান দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে সে জায়গার ওপরে বােমাবর্ষণ তো করবেই, জলের ওপর আপন দলের রণপােত গুলিকে জানিয়ে দেবে ঠিক জায়গাটির সন্ধান। সকলকেই এই অঞ্চলটায় বেশ একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখা গেল। জাহাজের মধ্যে কোথাও কারুর সঙ্গে দেখা হলে সবাই সেই এক প্রশ্ন করে, “মহাশয়, সাবমেরিনের খবর পেলেন কি ?” আরও তিন চার দিন আছে এখনও বৃটেনের উপকূলে পৌছুতে। আকাশের অবস্থাও বেশ পরিষ্কার ; আয়াণ্ড ছাড়িয়ে উত্তর দিক দিয়ে স্কটল্যাণ্ডের উপকুলের দিকে যাচ্ছি । ঠিক পরের দিন ‘লক ইউ’ পৌছুব। সকাল প্রায় দশটায় অকস্মাৎ আকাশে শক্তবিমানের আবির্ভাব। সংখ্যায় বেশী নয়, ছ’খানি। আকাশপথে মেসিনগানের টটটটট আওয়াজ শুনে দেখি দু’খানা বৃটিশ বিমান এক জার্মান বিমানের সঙ্গে লড়ায়ে লেগে গেছে। অন্য আর এক দিক থেকে চারখানা নাৎসী বিমান আসছে দেখা গেল। ক্রুজারখানি থেকে এবং কনভয়এর মধ্যে যে সব জাহাজে বিমানধ্বংণী কামান ছিল, সবগুলাে থেকে কামান গর্জে উঠল সঙ্গের অন্য জাহাজ- গুলিকে যতদূর সম্ভব আড়াল দেবার জন্য। বােধ হয় প্রতিরােধের প্রচণ্ডতা দেখেই জাৰ্মাণ বিমানগুলি কয়েকটা বােসা এলােপাথারী ফেলেই অ্যাটলান্টিক রণাঙ্গনে ৪৭ আকাশ পথে মিলিয়ে গেল। দু'খানা বিমানকে অনেক উচুতে আমরা ল্যাজ থেকে ধূম উদগীরণ করতে করতে চলে যেতে দেখেছিলাম, দুটোই দেখা যাচ্ছিল যেন ক্রমেই নেমে যাচ্ছে, কিন্তু সেগুলো কোন পক্ষের বােঝ যায় নাই। কনভয়ের কমাণ্ডার জানালেন, আবার বিমান আক্রমণ শুরু হতে পারে। সকলে যেন সাবধানে থাকে। তার পরদিন সকালে ‘লক ইউ’ নামে স্কটল্যাণ্ডের একটি বড় এবং সুরক্ষিত নৌ-ঘাঁটিতে পৌছুলাম। ইতিমধ্যে আর কোনও উৎপাত হ নাই। সারা স্কটল্যাণ্ডের প্রধান উপদ্বীপটির গা ঘেসে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ আছে। সাধারণত, স্কচ, ধীবরের এই সব দ্বীপে বাস করে এবং নিকটবর্তী সমুদ্রে মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। দ্বীপগুলির মধ্যে সমুদ্র সরু হয়ে এসে প্রবেশ করে অনেকটা হ্রদের মত দেখায়। এগুলিকে বলা হয় । এমনই একটি বিশিষ্ট কের নাম ‘হট’। এখানে জাহাজ এসে লঙ্গর করে রইল প্রায় দিন দশ বার। লকের পাশ্ববর্তী গ্রামগুলি পাহাড়ের সারির মধ্যে মধ্যে। ৯ই নভেম্বর এখানে আমরা পৌছি। তখন শীতকাল শুরু হয়ে গেছে। জাহাজ থেকে দেখা যাচ্ছে বহুদূর বিস্তৃত সারি সারি অনত্যুচ্চ পাহাড়গুলির ওপর যেন সাদা তুলাে ছড়ান। স্কটল্যাণ্ডের পাহাড় খুবই সুন্দর বলে আগে শুনেছি-সে কথা মিথ্যা নয়। তবে এমন সারি সারি সুন্দর পাহাড় এবং পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক অবস্থা স্কটল্যাণ্ডের বিশেষত্ব নয়। প্রায় সাতমাস পরে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থায় যখন একখানা জাৰ্মান ক্রুজারে বন্দী হয়ে জাপানে নীত হই, তখন সেখানকার একটি পােতাশ্রয়ের পাশাপাশি পাহাড়জি মুশােভিত যে অঞ্চল জাহাজ থেকে চোখে পড়ে, তাও আমাকে মুগ্ধ করেছিলাে।
৪৮ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে লক ইউতে থাকাকালীন বহুকাল পরে আবার জল থেকে সদ্য ধরা টাটকা মাছ খেলাম । বাঙ্গালীর ছেলে, এতদিন টাটকা মাছ না পেয়ে যেন অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। জাহাজটির কাছাকাছিই দেখি, ধীবরের। মাছ ধরছে। স্টুয়ার্ডকে ডেকে বললাম, “বদলাও তােমার এক ঘেয়ে ডিম, আর ঠাণ্ডা মাংস আর টিনে ভরা মাছ। কেনো এই টাটকা মাছ। দুঃখের বিষয় আমি নিজে কোন দিন রান্না শিখি নাই, না হলে নরউইজিয়ান বাবুর্চি দিয়েই মাছের কালিয়া বেঁধে খেতাম ও খাওয়াতাম। কাজেই সেই ভাজা মাছ হন। তা হােক, সেদিনকার ‘সামন’ ভাজা ঠিক আমাদের রুই মাছ ভাজার মতই লেগেছিলাে। দু’তিন দিন এখানে জাহাজের ওপর থেকে অস্থির হয়ে উঠলাম। কাছে মাটি অথচ নামবার উপায় নাই, পাহাড়গুলির মধ্যবর্তী ছােট ছােট উপত্যকায় লােকের ছােট ছােট বাতি। কাজেই মাটিতে নামবার সুবিধা নাই । কনভয়এ যে সব জাহাজ এসেছে, তাদের মধ্যে যেগুলাের দক্ষিণ ইংল্যাণ্ড গন্তব্যস্থল, সেগুলো একদিন নতুন এক উপকূল-কনভয়ে রওনা হয়ে চলে গেল। আমাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে উত্তরগামী কনভয়ের জন্য। একদিন দুপুরে হঠাৎ নৌ-বিভাগের একজন কৰ্ম্মচারী এসে খবর দিয়ে গেল, সেইদিনই বিকেল ৩টার সময় লক্ ছেড়ে আমাদের জাহাজটিকে স্কটল্যাণ্ডের উপরিভাগ প্রদক্ষিণ করে গন্তব্যস্থলে যেতে। কনভয় যাবে । ইংল্যাণ্ডের সেদিন এমনি দুরবস্থা, যে, সকল জাহাজকে কনভয় নেবার মত তার যথেষ্ট উপযুক্ত রণতরী ছিল না। তবে, স্কটল্যাণ্ডের উত্তরে বৃটেনের বিখ্যাত নৌ-ঘাঁটি স্কাপা-ফ্লো আমাদের পথে পড়বে। জার্মান বিমানগুলিও রাজনৈতিক কারণে আক্রমণের তীব্রতা অনেকটা ইংল্যাণ্ডের ওপর নিবন্ধ রেখেছিল। পরে দেখছি এবং এডিনবরা’ ও ‘লিথ’-এর আটলান্টিক রণাঙ্গনে ৪১ স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে শুনেছি, ওসব জায়গায় তেমন উল্লেখযােগ্য বিমান আক্রমণ একেবারেই হয় নাই। “লিথ'-এর ভক ওলির ওপর ও এডিনবরাতেও দু’একবার যৎকিঞ্চিৎ বােমাবর্ষণ হয়েছিলাে। (म রাতে ‘স্কাপ ফ্লো’ পেছনে রেখে দক্ষিণমুখখা হয়েছি—সে কি ঝড়! উত্তর সাগরের ঝঙ্কা উত্তর আটলান্টিকের চেয়েও যেন শক্তিশালী, জাহাজ কিছুতেই এগােতে পারূছে না। দূরে একটি ডেস্ট্রয়ার উপকূল রক্ষার কাজে নিযুক্ত ছিল, আমাদের জাহাজটিকে দেখতে পেয়ে কাছে এসে পরিচয়াদি নিয়ে নিকটেই একটি পােতাশ্রয়ে যেতে দিল। রাত্রি সেখানেই কাটল। সকালে ঝড়ের কিছু উপশম হলে রওয়ানা হয়ে বেলা প্রায় ২টার সময় ‘মেথিল’এর নৌ-ঘাঁটিতে পৌছুলাম। এখানে আসতে অনেকগুলি ভাসমান মাইন এড়াতে হয়েছিলাে। সমুদ্রতটে ‘মেথিল’ স্কটল্যাণ্ডের একটি ছােট্ট শহর—ঠিক সামনেই খুব চওড়া ‘বে থাকার জন্য বহু জাহাজ থাকতে পারে, তাই এটি একটি নৌ-কেন্দ্র হয়েছে। নৌ-বিভাগের অফিসে আমাদের আগমন সংবাদ দেবার দু’দিন পর জানতে পারলাম, আমাদের জাহাজের মা নামাতে হবে লিথ বন্দরে। সকালে মেথিল ছেড়ে সেদিনই বিকেলে লিথ পৌছুলাম। ৩০শে জুন কলকাতা ছাড়ি, আজ প্রায় পাঁচ মাস পরে পৃথিবীর সকল মহাদেশের মাটি ছুয়ে এতদিনে বৃটেনে এলাম। ইমিগ্রেশন কর্মচারীদের হাঙ্গামা শেষ হলে বেরিয়ে পড়লাম সহরে। কঠোর আলােক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় ঘন কৃষ্ণতার আবরণ সন্ধ্যার পরেই সমগ্র সহরটির ওপর নেমে এলাে। নতুন জায়গা-রাত্রিতে জাহাজে ফেরবার সময় পদে পদে হোঁচট খেয়ে মনে হচ্ছিল, এ অন্ধকারে রাস্তার অন্য মানুষগুলি চলাফেরা করছে কি করে ? রাস্তায় ইংল্যাণ্ডের, এ দেশে ৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে বহু প্রশংসিত, পুলিসের নাম গন্ধও কোথাও নেই। একটি চৌমাথায় আমরা তিনজন ভুল করে অন্য পথ ধরে প্রায় ঘণ্টাখানেক এগিয়ে সন্দেহ হ’ল হয়তো রাস্তা হারিয়েছি। আবার ফিরে সেই চৌমাথায় এসে স্থির করতে পাচ্ছি না, কোন দিকে ডকে যাওয়া যায়। সঙ্গীদের একজনকে বলছি, কি আশ্চর্য, কোন পুলিস দেখছি না কোথাও তাে। তা হলে তত কোন গােলই হত না। সে হেসে উত্তর দিল, ব্ল্যাক-আউট হবার সঙ্গে সঙ্গে ওরাও ব্ল্যাক-আউট হয়েছে আর কি! পুলিস আবার কোন দিন কর্তব্যপরায়ণ হয় নাকি? ঘুষ খাের সব। আমি অবাক ! এত কথা শুনেছি, এখানকার এদের সততা ও কর্তব্যপরায়ণতা সম্বন্ধে ! সৌভাগ্যক্রমে, অন্ধকারের মধ্যেই দেখি একটি লোেক যেতে যেতে আমাদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন জাহাজেই যাচ্ছি নাকি? লােকটি আমাদের জাহাজেরই এক নাবিক। লিথ-এ আগেও অনেকবার এসেছে, পথ-ঘাট ভাল করেই জানে। সবাই একসঙ্গেই ফিরলাম। আমেরিকার আলােকমালা সজ্জিতা নগরীর পর, অ্যাটলান্টিকের এপারে এই অন্ধকারের রাজত্ব, পৃথিবীর এই প্রান্তে আসন্ন তমসাযুগের চিত্র যেন তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
চাচ্চিল-কিপলিংএর দেশে
No text on this page.
যুদ্ধের প্রথম দিকেই ইংল্যাণ্ডের নগরী গুলি যখন কেন্দ্রীভূত নাৎসী- বিমান আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হচ্ছিল, ভারতবর্ষে বসে আমরা শুনতাম বৃটিশ জনসাধারণের অভূতপূর্ব স্থৈর্য, ধৈৰ্য্য ও বীরত্বের কথা। কভেন্টীর অস্তিত্ব নাৎসী বােমায় একেবারে লুপ্ত হয়েছিলাে বললে অত্যুক্তি হবে না, অন্যান্য সহরেও অল্পবিস্তর যথেষ্ট প্রাণহানি হয়েছে। লগুনের বিশালত্বের জন্য বিমান আক্রমণের ক্ষতগুলি কভেন্টির মত অতটা ভীষণ দেখাত না। তার পূর্বে বুটাডা ও ওয়ারশ’র ওপর বিমান আক্রমণের বীভৎসতার সংবাদ আমরা সংবাদপত্রে পেয়েছিলাম। কিন্তু নাৎসী বিমান আক্রমণের সময় তত্ত্ব অধিবাসীদের আচরণ-কাহিনী প্রচারিত হবার পূর্বেই দেশগুলি জাৰ্ম্মেনীর কুক্ষিগত হওয়ায় অ-নাৎসী জপৎ হ'তে পৃথক হয়ে পড়ে। আরও কিছু আগে, স্পেনের গৃহ যুদ্ধের সময় এ যুদ্ধের নব নীতির কাৰ্য্যকারীতা ঘরােয়া লড়াইয়ের আড়াল নিয়ে যখন পরীক্ষিত হচ্ছিল তখনও মাদ্রিদ প্রভৃতি সহরের অধিবাসীদের দৃঢ়তা ও ধীরতা জগতের সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। শেষ পর্যন্ত, জার্মানী ও ইতালীর প্রকাশ্য বিরুদ্ধতায় এবং দুগ্ন মিত্রদের ক্রমান্বয় বিশ্বাসঘাতকতায় স্পেনের গণশক্তির পতন হ’ল। মাদ্রিদ, বার্সিলােনা থেকে একটি চূড়ান্ত শিক্ষা পাওয়া গেল। প্রথম বিমান আক্রমণের সময় জনসাধারণ একটু বিশৃখল হয় বটে, কিন্তু বিমান আক্রমণ নিয়ত চলতে থাকলে জনগণ তাতে অভ্যস্ত ৫৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে হয়ে পড়ে, আক্রমণ কালে বেশ শান্তভাবেই আড়াল নেয় এবং শেষ হয়ে গেলে বৃথা হৈ চৈ না করে আপন আপন কাজে মন দেয়। আরও পাঁচ রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মত এ জিনিষটাও তাদের নিত্যকার জীবনে ভ্যাস হয়ে যায়। কারণ—উপায় নাই। ইংল্যাণ্ডে নাৎসী বিমান আক্রমণের সময় জন- সাধারণ এই প্রথম বহু শত বৎসর পর নিজ গৃহে যখন যুদ্ধের বীভৎসতার নগ্নরূপ দেখতে সুরু করল, ইংল্যাণ্ডের প্রচার বিভাগ সারা পৃথিবীময় এই কথা প্রচার আরম্ভ করল, ইংল্যাণ্ডের জনসাধারণ ব’লেই নাৎসী আক্রমণের তীব্রতা তারা সহ কযুতে পারছে, অন্য কোন দেশ হলে এতদিনে পতন ঘটত। “হিটলারের বােমা সত্ত্বেও আমাদের কাজ যথারীতি চলবে” কয়েকটি দোকানে লাগান এই বিজ্ঞপ্তি ছায়া চিত্রে প্রতিফলিত করে মিত্র পক্ষের সকল দেশের জনসাধারণের মধ্যে পরিবেশন করা হত। এ সম্বন্ধে সকল কথার মধ্যে তখন সেই একই রেশ প্রতিধ্বনিত হত শত্রুর নিৰ্ম্মম আঘাত সহ্য করেও দাঁড়িয়ে থাকবার মত সহনশীলতা ইংরাজ জন- সাধারণের মধ্যে যেমন আছে এমনটি আর কুত্রাপি দেখা যায় না। যুদ্ধকালীন ইংল্যাণ্ডে দু’মাস থেকে সেখানকার স্বাভাবিক জীবনে দোকানপাট ও অন্যান্য বাহ্যিক জিনিষ দেখে নিরাপদে ভারতে ফিরতে পারলে হয়তাে আমারও সেই ধারণাই হত। তবে দেশের মধ্যে বিয়ারের ছড়াছড়ি দেখে এবং বহু বৃটিশ নরনারী আপন আপন সংসারে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে রাত দশটা পর্যন্ত বিয়ার পার্লারগুলিতে মাতলামী করা সম্বন্ধে কয়েকখানি সংবাদ পত্রে যে কঠোর সমালােচনা চলছিল, একদিন কথাচ্ছলে জনৈক ইংরাজ ভদ্রলােকের সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে তিনি বলেন, বিয়ারের এই আতিশয্য ও নৈতিক শথতা যুদ্ধের ফলেই হয়েছে, চীন দেশে যেমন আফিম খাইয়ে দুষ্টেরা জনসাধারণকে ঘুম পাড়িয়ে রাখবার চার্চিল-কিপলিংএর দেশে চেষ্টা করে এসেছে, এখানেও যেন তেমন-ই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। উপযুপরি পরাজয়ের অবসাদ জনগণকে আচ্ছন্ন না করতে পারে। বিচিত্র অবস্থার মধ্য দিয়ে পরে দেখি, জনসাধারণ সকল দেশে সকল কালে একইরূপ। ১৯৪৪।৪৫ সালে রেঙ্গুনে যখন মিত্রপক্ষীয় বােমাবর্ষী বিমান গুলি যথেচ্ছভাবে এলােপাথারী বিস্ফোরক বােমা বর্ষণ করে রেঙ্গুনের প্রধান ভারতীয় মহল কালাবন্তীকে শ্মশানে পরিণত করেছিলাে তখনও সেখানকার অধিবাসীদের অযৌক্তিক ভীতিগ্রস্ত হতে দেখি নাই। ভারতীয় ও ব্রহ্মদেশীয় সাধারণ নরনারী অনেকে মিলে একটা জায়গায় হয়তাে নাচ গান করছে, আসন্ন বিমান আক্রমণের বাঁশ বেজে উঠল, আকাশ পথে বিমানও আসছে দেখে সবাই বেশ ধীরে সুস্থে, কোনও রকমের ‘হায় কি হ’ল’ না করে, আপন আপন গর্তে গেল সঙ্গের বাদ্যযন্ত্রাদি নিয়ে। আধ ঘণ্টা কি এক ঘণ্টা কাল প্রবল বােমাবর্ষণ ও বিমান বিধবংসী কামান গর্জনের পর ‘সব পরিষ্কার’ সঙ্কেত যখন এল, সবাই এরা আবার নিকটবর্তী পূৰ্ব স্থানে ফিরে এসে নাচ গান বা অভিনয় যা হচ্ছিল, চালাতে সুরু করল। ইংল্যাণ্ডে নাৎসী বিমান হানার জন্য সহস্র সহস্র নাগরিক হতাহত হওয়া সত্ত্বেও যে জনসাধারণ তকালিন গভর্ণমেন্টের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটায় নাই, এই তথ্য উপলক্ষ্য করে তখন নিয়ত দেখাবার চেষ্টা হত, সেখানকার জনসাধারণের অন্য দেশের তুলনায় অতুলনীয় দেশ- প্রেম ও সহনশীলতা। বহু শত বর্ষব্যাপী ভারতের এই তামসিক যুগে বৈদেশিক প্রচারে বিভ্রান্ত ভারতবাসী অনেক সময় তাই নিজেকে অন্য দেশের তুলনায় হীন মনে করে বসে। কেউ কেউ তত ইংরাজের নিয়মিত আহারের মধ্যেও ভয়ানক একটা সাহসই দেখে ফেলে! জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে হ’তে দেশাত্মবােধের অনুপ্রেরণা আসে না, ছুটতে হয় জাপানীর দৃষ্টান্ত দেখে দেশকে ভালবাসতে শিখতে। নিজ পূর্বপুরুষ চন্দ্রগুপ্ত, বিক্রমাদিত্য কর্তৃক পুণ্যভূমি ভারতবর্ষ থেকে যবন বিতারণ মনঃপূত হয় না—চাই ম্যাজিনি গ্যারিবী! কিন্তু ঠিক যে কারণে ব্রহ্মদেশের অধিবাসীরা এ যুদ্ধে তাদের সহস্র প্রকারের ক্ষতি সত্ত্বেও জাপানীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তাে করতে পারে-ই নাই, বরং জাপানীদের সমস্ত যুদ্ধকালীন বিধি মেনে চলছিল, সেই একই কারণে ইংল্যাণ্ডের জনসাধারণকেও সব সহ্য করতে হচ্ছিল। ভারতবর্ষের জনসাধারণকে “শিক্ষা দেবার নামে জ্ঞানে এবং অজ্ঞানে এক শ্রেণীর লােক শত শত গল্পে, প্রবন্ধে এবং আরও বহুবিধ রচনায় নিয়ত এই একই মিথ্যা দ্বারা অভিভূত করছে যে, ইংল্যাণ্ড, আমেরিকা, জাপান বা অন্য দেশের লােক ভারতবাসী হতে উৎকৃষ্টতর। তাই এ কথার অবতারণা। লিথ বন্দরে যতদিন ছিলাম কোনও রকমের বিমান উৎপাত হয় নাই। এডিনবরায় দু’চার জন ভারতীয় ছাত্রের সঙ্গে দেখা হল। ওখানে ডাক্তারী পড়া শেষ করেছে, সমুদ্রে বিপদের জন্য দেশে ফিরতে পারছে না। সপ্তাহ দুই পরে লিথ ছেড়ে নিউক্যাসেল রওয়ানা হলাম। সাউথ- শিল্ড আর এক নৌ-ঘাটি। এখানে তিন দিন কাটল। বহু জাহাজ এ স্থানে লঙ্গর করা থাকে প্রায় সব সময়েই, অনেক রণতরীও। প্রতি সন্ধ্যায় এবং রাতে জাৰ্মাণ বিমান এখানে আসত জাহাজ ঘায়েল করবার উদ্দেশ্য নিয়ে। রণতরীগুলির বিমানধ্বংসী কামানগুলি থেকে তখন প্রচণ্ড গােলাবর্ষণ শুরু হ'ত, বিমানগুলি নীচে নেমে এসে লক্ষ্য স্থির করতে পারত না। তা ছাড়া বহু বেলুনও এখানে উড়িয়ে রাখা হত। তার ঝুলত বেলুনগুলি থেকে, যাতে কোন বিমান নীচে আসতে গেলে চার্চিল-কিপলিংএর দেশে ভারের জালে আটকে নষ্ট হয়। নাৎসী বিমানগুলি অবশ্য অনেক সময় এই সব বেলুন আগে মেসিনগানের গুলি দিয়ে নষ্ট করে নীচে নেমে আসত। এখানে কিছু কিছু জাহাজ নাৎসী আক্রমণে নষ্টও হয়েছে। দ্বিতীয় রাত্রে বিমান হানার সময় পর পর দুটি বােমা আমাদের প্রায় গা ঘেঁষে পড়েছে। সামান্য জখমও হয়েছে জাহাজখানা এবং দু’চার জন নাবিক, কিন্তু মােটের ওপর বিশেষ ক্ষতি হয় নাই। টাইন নদীর ওপর অল্পবিস্তর বিমান আক্রমণ প্রায় সব সময়েই আশঙ্কা করা যায়, তাই সাউথশিল্ড থেকে নিউক্যাসেল পৰ্যন্ত দুখানা ডেস্ট্রয়ারের রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের নিয়ে যাওয়া হ’ল। একাদিক্রমে পাঁচমাস কাল পৃথিবীর প্রায় সকল সমুদ্র ভ্রমণের পর জাহাজখানিকে আবার সমুদ্রোপযােগী করবার জন্য শুষ্ক ডকে যাবার খুবই প্রয়ােজন। তাই নিউক্যাসেলের সােয়াণ হান্টারের ‘শুষ্কডকে’ আমাদের জাহাজখানি প্রবেশ করল মাস দেড়েক বিশ্রাম ও মেরামতের জন্য—আমিও ট্রেণ যােগে লণ্ডন, গ্লাসগাে প্রভৃতি দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। ইংল্যাণ্ড সম্বন্ধে অনেক বই-ই বাংলায় আছে। এ সম্বন্ধে কিছু বলা নিষ্প্রয়ােজন। বিশেষ করে, আমার দুর্ভাগ্য, সহস্র চেষ্টা করেও ওখানকার সাধারণ লােকের মধ্যে এমন কোন গুণ দেখি নাই যা ভারতীয় চরিত্রে ই। অনেক জিনিষ বিপরীতই লক্ষ্য করেছি। পৃথিবীর অন্য যত জাতির নিবিড় সংস্পর্শে এসেছি এদেরও ঠিক তেমনই লেগেছে—ভাল মন্দ মিশ্রিত। ভারতবর্ষের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযােগ নিয়ে ইংল্যাণ্ডের যে শ্রেণীর লোেক এ দেশের বুকের ওপর চেপে বসে আছে, মুষ্টিমেয় দুর্বত্ত তারাই ও দেশের জনসাধারণকেও মিথ্যা শিক্ষা ও আইনের শৃঙ্খলে বেঁধে উৎপীড়ন করছে। অনেক অনভিজাত লােকের ৫৮ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে মুখেই শুনেছি “যুদ্ধ শেষ হক, ইংল্যাণ্ডের জনসাধারণ আর অনাহার সহ্য করবে না।” কিন্তু তার দৌড় ঐ লেবার পার্টির নির্বাচন পর্যন্ত । ইংল্যাণ্ডেও কেরানীকুলের দুর্দশা ঠিক এখানকারই মত—গড়ে বেতন •|• টাকার বেশী নয়। মুখে দীনতার নত চক্ষু—পূরণে বহুছিদ্র ট্রাউজার। ভারতবর্ষের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মত ওরাও শত দুর্দশা সত্ত্বেও চেয়ে থাকে ওপরের দিকে। এদেশেরই মত নিতান্ত অসার ব্যক্তি পূজারী এখানকার এই শিক্ষিত কেরানী, স্কুল মাষ্টার, ডাক্তার, আইনজ্ঞ প্রভৃতি। গণশক্তির ওপর অপরিসীম ঘৃণা, যদিও সুসংবদ্ধ অর্থহীন বাক্যবিন্যাসে নিপুণ। চার্চিল, চেম্বারলেন বা বড় জোর এটলির গ্রামােফোন সব। লিথ ও নিউক্যাসেল এই উভয় বন্দরেই জাহাজ পৌঁছুবার পর সেখান- কার সিকিউরিটি সার্ভিসের দুজন অফিসার আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। না, বিশেষ কিছু না, এই এলাম তােমার কাছে। অনেক জায়গা ঘুরেই তাে এলে, কি দেখলে অন্যান্য বিদেশী বন্দরে, আমাদের সম্বন্ধে সে সব জায়গার মনােভাব,—এই ধরণের সব কথা। আর একজন জিজ্ঞাসা করলেন এ কথা সে কথার পর, নরউইজিয়ানরা কেমন লােক, অনেক দিনই তাে কাটালে ওদের সঙ্গে এ জাহাজে, নাৎসীদের ওপর গােপন সহানুভূতি ওদের আছে নাকি ইত্যাদি ইত্যাদি—বলতে বাধ্য হলাম, আমি এ জাহাজেরই একজন কর্মচারী। আমাকে এ ধরণের প্রশ্ন করতে তাদের লজ্জা অনুভব করা উচিত ছিল, এবং পাল্টা প্রশ্ন করলাম, এতদিন এ জাহাজে আছি, জিজ্ঞেস কর নাই আমার নরউইজিয়ান সহ- কর্মীদের আমি কেমন লােক? ব্রিটিশ সম্বন্ধে মনােব কিরূপ, এসব ? , না, হ্যা, হ্যা, সে কি কথা, আমরা তােমরা তাে একই, এই ধরণের আবােল তাবােল বকুতে বকৃতে আস্তে আস্তে তারা বিদেয় হল। দিন দুই পরে সন্ধ্যাহারের সময় কাপ্তেনের কাছে শুনি তাকে ও সেকেন্ড চার্চিল-কিপলিং এর দেশে অফিসারকে ওরা ইতিমধ্যে ঠিক ঐ সব কথাই জিজ্ঞেস করেছিলাে এবং মুখের মত জবাবও পেয়েছিলো। একদিন বাইরের একটা রেস্তেরাতে দুজন নরউইজিয়ান বন্ধুর সঙ্গে বসে আছি, আর এক টেবিলে তিনটি ইংরাজ ভদ্রলােক। নিতান্ত অযাচিতভাবে তাঁদের একজন উঠে এসে আলাপ সুরু করে দিলেন, মাপ করবেন, হয়তাে আপনাদের বিরক্ত কছি, বলতে বলতে এসে সামনের চেয়ারখানা টেনে নিয়ে বসেই পড়লেন। তাই বলতে হল, বিলক্ষণ, বসুন, বসুন। ভদ্রলােক আমাদের আপ্যায়িত করে দিলেন। গায়ের কোটের ওপর ‘এপুলেট’এর দিকে চেয়ে নিজেই কারণ দিলেন। “আপনারা নৌ- কর্মচারী, তাই একটু আলাপ করতে এলাম। এ দুর্দিনে ইংল্যাণ্ডের প্রকৃত বিদেশী বন্ধু আপনারাই ইত্যাদি ইত্যাদি।” আমাদের প্রায় প্রত্যহই দেখেন ওখানে, তাই ইচ্ছে হ’ল.••••• আমার বন্ধুরা ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজী বলেন, তাঁর যেন সুবিধে হ’ল না, আমাকে নিয়েই পড়লেন। পরের দিনও ঠিক সেইখানে দেখা, যুদ্ধের পরিস্থিতির কথাবার্তা হল, সােভিয়েটের প্রশংসা করতে করতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। আবার দুদিন পরে দেখা, সেদিন আমি একা। সুরু করলেন নানা কথা,-যুদ্ধ, সমাজ, এবং আরাে অনেক কিছু। হঠাৎ এদিক ওদিক চেয়ে ফিস্ ফিস্ করে বললেন, যুদ্ধটা হয়ে যাক্, গভর্ণমেন্ট এখন আমাদের জনসাধারণের হাতে অস্ত্র দিতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধ শেযে গভর্ণমেন্ট যদি পূর্বের মতই জনসাধারণকে দুর্দশার মধ্যে রাখে তাে দেখা যাবে । লােকটি কি পাগল? পাগলামী হলে এর ভেতর যেন একটা সুসংবদ্ধ প্রণালী রয়েছে। সারা যুবােপ তখন নাৎসী কবলিত। নাৎসী অধিকৃত সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে দেশগুলির যে সব জাহাজ তখন পৃথিবীর বিভিন্ন সমুদ্র বক্ষে ছিল, সেগুলি আর দেশে যেতে পারে নাই, উত্তর সাগর, ইংলিশ চ্যানেল এবং সুয়েজের মুখের ইংরাজ রণতরীগুলির জন্য। গৃহে, নাৎসী অধিকৃত স্থানগুলিতে, নাবিকদের প্রায় সকলেরই আত্মীয়, প্রিয়জন আছে। এদের সংবাদ এই সব হতভাগ্যেরা কিছুই জানে না বহুদিন পর্যন্ত। এদের মনও তাই দেশের দিকে পড়ে থাকা খুবই স্বাভাবিক। নাৎসী প্রতাপ তখন অপরিমিত। যেখানেই মিত্রপক্ষ জাৰ্ম্মেনীর সম্মুখীন হবার চেষ্টা করেছে সেইখানেই তারা চূর্ণ হয়েছে। ঐ সব নাবিক ইংল্যাণ্ডের বন্দরগুলিতে আছে, আবার কত নিরপেক্ষ বন্দরে যাচ্ছে, কে জানে এদের কার মনের অন্তরতম প্রদেশে কি আছে—বৃটেনের গােয়েন্দা বিভাগের কাজ অকস্মাৎ ভয়ানক রকম বেড়ে গিয়েছে। অনভিজ্ঞ শত শত নতুন লােককে তাই এ কাজে নেওয়া হয়েছে। আসবার পথে উত্তর স্কটল্যাণ্ডের পূর্ব উপকূলে একদিন কাপ্তেন আঙ্গুল দিয়ে সমুদ্রের দিকে দেখাতে দেখাতে বলছিলেন, জান গুপ্ত, ঐ ওপারে, মাত্র দু’দিনের পথ এখান থেকে নরওয়ে। আগেই শুনেছিলাম, পাছে সমুদ্রে নাৎসীদের সঙ্গে বােগাযােগ করে, তাই বহু নরউইজীয়ান বেতার কর্মচারীকে ইংল্যাণ্ডে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে। অবশ্য এ সব কথা কোন দিনই সংবাদপত্রে বের হতে দেওয়া হয় নাই। আবার, এদের সঙ্গে একক ভারতীয়, বিভিন্ন সমুদ্রে, বিভিন্ন দেশে, যুদ্ধের সময় ঘুরে বেড়াচ্ছি, অপরাধী ইংরাজ প্রকৃতির সন্দিগ্ধতা জেনেই সাবধানে চলতাম। ভদ্রলােক হয়তাে অনেকের মত বাচাল অথবা আর কিছু। প্রশ্ন করলাম, কি করবে তােমরা, যদি তােমাদের কর্তারা যুদ্ধের পর পূর্বাবস্থাই বহাল রাখে ?
চাচ্চল-কিপলিংএর দেশে ৬১ একটু না ভেবে ভদ্রলােক জবাব দিলেন, কেন? এইবার আমাদের হাতে অস্ত্র এসেছে, আমাদের ভ্রাতা পুত্রদের সকলেই কেউ এখন সেনা- বিভাগে বা নৌ-বিভাগে বা বায়ু বিভাগে আছে। রুশিয়ার মত আমরাও একটা বিপ্লব করে রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নেব। যতদূর সম্ভব গম্ভীর হয়ে তাকে উপদেশ দিলাম, ছিঃ, ইংল্যাণ্ডের ঐতীহ্য নষ্ট করবে? বে-আইনী কাজ করাে না। শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে থাক,-গরমাগরম কথাও বলতে পার, কিন্তু সাবধান, বিদ্রোহ প্রভৃতি পাজী জিনিষের কথা মাথাতেও এনে না। বিদ্রোহ করে ফেললে গভর্ণমেন্টের দমন করতে কতটুকু সময় লাগবে ? ভদ্রলােক বললেন, কখনই না—ইংল্যাণ্ডের সৈন্যরা কখনই আমাদের ওপর গুলি চালাবে না। বলেছি না তােমাকে? এবার এই যুদ্ধে প্রায় সব ঘর থেকেই কেউ না কেউ সেনাদলে বা অন্য কোন দেশরক্ষা বিভাগে আছে। রহস্যভরে আবার বললাম, না, না, বৃথাই শান্তিভঙ্গ শুধু হবে। তােমাদের গভর্ণমেন্টেরও যে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর মত ভারতীয় মূর সৈন্য আছে, ভুলে গেছ সে কথা? শান্তিপূর্ণ ভাবে, তােমাদের লেবার পার্টির ফতােয়া মেনে আন্দোলন করে যেতে পাক, আজ না হয় একশ’ বছর বাদেও যৎকিঞ্চিৎ পাওয়া যেতে পারে। অকস্মাৎ একজন বিদেশীর কাছে এত বাচালতা, এবং এই সময়ে ? কিন্তু বৃটেনের জনসাধারণের মধ্যে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার ওপর অতি তীব্র একটা অসন্তোষের ভাব স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। লেবার পার্টির প্রভাব যতদিন আছে, এ অসন্তোষ বহ্নি থেকে ইংল্যাণ্ডের আভিজাত্য নিরাপদই থাকবে। তারপর কিছুকাল বাদে আবার একটা মহাযুদ্ধ বাধিয়ে জনসাধারণকে একটা মত্ততার মধ্যে রাখলেই চলবে—কিন্তু ৬২ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে কতদিন? ভারতে বিপ্লববহ্নি প্রজ্বলিত হবার সঙ্গে সঙ্গে যখন সামাজিক আবর্জনা স্তুপের মধ্যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের সােল এজেন্টগণ ভস্মীভূত হবেন, তারপর আর ক-ঘণ্টা বা কতদিন ইংল্যাণ্ডের মাতবরেরা দলিত মথিত জনগণকে সংবরণ করতে পারবেন? প্রকৃতির প্ৰতিশােধ যখন নির্মম হয়ে এদের ওপর পড়বে, এরাই তখন দেশ-বিদেশে পালিয়ে নাকিসুরে কান্না লাগাবেন। আর একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছি এডিনবরার একদিন এক স্কচ ভদ্রলােকের সঙ্গে কথাবার্তার সময়। বলছিলেন, লিথ-এ আমরা এত চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত ছােট ছেলেমেয়েদের খেলবার জন্য একটা উদ্যান করাতে পারলাম না। এ বিষয়েও নাকি পার্লামেন্টের সম্মতি চাই। স্কচদের সংখ্যা সেখানে কম, তাই বহুদিন ধামাচাপা পড়ে থেকে থেকে এখন বলা হচ্ছে যুদ্ধটা আগে শেষ হােক। আমি একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন, ক্ষুদ্র একটা ব্যাপারের জন্য পার্সিয়ামেন্ট ? তিনি বললেন, তাইতো আমরা স্কটিশ হােমরুল চাই। এসব ওদের ঘরের এক টুকরাে ঝগড়া—আমাদের কাছে অবান্তর। হিটলার এই স্কটিশ হােমরুল আন্দোলন থেকেই আশা করেছিলেন, শেষ পৰ্য্যন্ত ইংল্যাণ্ডের ও স্কটল্যাণ্ডের মধ্যে একটা ঘােরর গৃহবিবাদের সূচনা করাতে পারবেন। কিন্তু আসলে দেখা গেল অন্যরূপ। ১২ই ডিসেম্বর সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনি ‘প্রিন্স, অব, ওয়ে’ ও “রিপালস’ মালয় উপদ্বীপের কাছে জাপানীরা নিমজ্জিত করেছে এবং প্রশান্ত মহাসাগরে আমেরিকার প্রধান নৌ-ঘাটি পার্ল-হারবারে আশ্বিক আক্রমণ চালিয়ে আমেরিকান নৌ-বহরের অনেক ক্ষতি করেছে। জার্মানীও সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকার ওপর প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘােষণা করেছে।
চার্চিল-কিপলিংএর দেশে মাত্র দিন সাত আগে ইংল্যাণ্ডের নৌ-বিভাগ হতে জনসাধারণের মধ্যে বহু প্রচারিত, বহু চিত্রে সুশােভিত, এক পুস্তিকায় ‘প্রিন্স অব ওয়েলকে সমুদ্রে বৃটেনের আধিপত্যের রক্ষক বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। এই অতিকায় এবং নিতান্ত আধুনিক রণতরীটি ইংল্যাণ্ডের লােকের কাছে এক মহা গর্বের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছিলাে। ঠিক তখন জাহাজটি পৃথিবীর কোন প্রান্তে কি কছে কেউই জানতাে না। একেবারে ভারতবর্ষের পরের দুয়ারে তার এই পরিণাম ! বৃটেনের সমুদ্ৰাধিপত্যের রক্ষককে একেবারে ভারতীয় জলেই অতলে যেতে হল। জাপান যে এত তাড়াতাড়ি যুদ্ধে অংশ নেবে, কেউ ভাবে নাই। ঘটনা আমাদের কাছে এক নতুন অর্থ নিয়ে উপস্থিত হল। কেবল উত্তর অ্যাটলান্টিক নয়, এখন হতে পৃথিবীর সকল সমুদ্রই বাণিজ্য জাহাজগুলির চলাচলের পক্ষে ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে উঠল। মালয়ের কাছেই যখন ইংরাজ রণতরী বহরের সর্বশ্রেষ্ঠ যুদ্ধ-জাহাজটিকে অন্য একখানিকে সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রতলে যেতে হ’ল, এখন থেকে সারা বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগর জাপানী সাবমেরিন, বিভিন্ন ধরণের রণতরী ও বিমানগুলির ক্রীড়াক্ষেত্র হবে। জানি, কেন্দ্র করে যুদ্ধ সম্বন্ধে কোন খবরই কলকাতা থেকে পাওয়া অসম্ভব, তথাপি সেখানে খবর নিলাম সকলেই ওখানে আছে কিনা। যদি কলকাতায় বিশেষ বিপদের সম্ভাবনা থাকে তবেই বাড়ীর সবাই বাইরে চলে যাবেন, নতুবা যুদ্ধের সামান্য আতঙ্কে তারা যে কিছু করে বসবেন না, জানতাম। উত্তর পেলাম, সবাই ভালই আছেন এবং কলকাতাতেই। জাহাজের সেলুনে বসে এই সব কথাই আলােচনা হচ্ছিল, আমার সহকর বলছিলেন, এ অবস্থায় সত্যিই আমি নিরাপদে ভারতে ফিরতে পারব কিনা? জাহাজের আহাৰ্য্য সামগ্রী সরবরাহকারী ইংরাজ ভদ্র ৬৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে লােকটিও আমাদের সঙ্গে বসে গল্প করছিলেন, তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “ওঃ মাভৈঃ, পীতবর্ণের জারজগুলিকে আমাদের রণতরী বহর গিয়ে কিছু কালের মধ্যেই সাফ করে দিয়ে আসবে।' কথাগুলি অবশ্য ওদেশের এক জন লেবার দলের এম, পি’র প্রতিধ্বনি। এই এম, পি’টি, জাৰ্ম্মেনীর পক্ষে জাপানের যুদ্ধে যােগদানের বিষয় উল্লেখ করে সংবাদ পত্রে লিখেছিলেন, প্রাচ্যের এই ক্ষুদে পীত মর্কটের যুদ্ধে যােগদানে হিটলারের কোন সুবিধেই হবে না। শ্লীলতার অপূৰ্ব উদাহরণ ! ইংল্যাণ্ডে বসেই “প্রাচ্য মর্কটদের” ক্রীয়াকলাপের যে সব সংবাদ পাচ্ছিলাম, লােকটির সস্তা বীরত্বের সঙ্গে সেগুলি মােটেই খাপ খাচ্ছিল । বেশ একটু সন্দেহ রয়ে গেল নিকট ভবিষ্যতে নিরাপদে দেশে ফিরতে পারব কিনা, অথবা একেবারেই সে কাজটি সমাধা হয়ে উঠবে কিনা ? আর এক ঝঞ্চাট—আমাদের জাহাজখানির সাধারণ বাণিজ্য পথ দক্ষিণ আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইংল্যাণ্ডের মধ্যে। এই প্রথম ভারতে গিয়েছিলো। তাই আমাকে দেশে আসবার বন্দোবস্ত করতে হবে নিউইয়র্ক গিয়ে। অন্য কোন নরওয়ের ভারতগামী জাহাজে কাজ নিয়ে অথবা যে কোন জাহাজে যাত্রী হয়ে। গৃহ বিপন্ন, জাপানীদের দ্রুত অভিযানে দেশে হয়তাে কত বিশৃঙ্খলা এসে পড়বে, এখন ত’ দেশ ছেড়ে পৃথিবীর সমুদ্রগুলিতে ঘুরে বেড়ানাে উচিত নয়। বন্ধুরা বললেন, বঙ্গোপসাগর এতক্ষণে নিশ্চয় ‘নক’ হয়ে উঠেছে—তার চেয়ে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসে এই উত্তর আটলান্টিকের জাহাজগুলােতেই কাজ করা যাক। ভাগ্যে থাকলে, যুদ্ধ শেষে সবাই দেশে ফিরব। জার্মানী চেনা শত্রু। বহুকথিত, অজানা বা অজানা শত্রুই মনের ওপর ভীতির ছায়াপাত করে অধিক। সকলেরই এক কথা। নাৎসীদের চাচ্চিল-কিপলিংএর দেশে মন্ত অসুবিধা ওদের সেরকম শক্তিশালী নৌবহর নাই। কিন্তু জাপানের রণতরী বহর যথেষ্ট শক্তিশালী। ‘প্রিন্স অব ওয়েল’এর নাটকীয় সলিল-সমাধি সকলের মধ্যেই জাপানী সম্বন্ধে ভীতি খুবই বাড়িয়ে দিয়েছিল। তুলনামূলক সমালােচনা চলে, ‘বিসমার্ক ও সমুদ্রে ‘বৃটিশ ইজতের রক্ষকের নিমজ্জন নিয়ে । ওরা বলে, ‘বিসমার্ক’কে ঘরের কাছে সমুদ্রগর্তে প্রেরণ করতে গােটা উত্তর সাগর রণতর। বর’ বিমানকে দিনের পর দিন নাজেহাল হতে হয়েছিলাে, আর ঘৃণিত ‘প্রাচ্য মর্কটেরা তাদের দেশ থেকে বহুদূরে একমাত্র বিমান আক্রমণেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রিন্স অব ওয়েলস্এর সমুদ্র জীবনের সমাধা করল । সব ধরণের কথা। ‘কন্তু আমি স্থির করে ফেলেছি, যে দুর্যোগ দেশে আসন্ন-সেখানে সহস্র সাবমেরিন বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রীভূত হলেও এবং জাপানী বিমান আকাশ ছেয়ে ফেললেও। জাহাজ চলাচল একেবারেই বন্ধ হতে পারে না ; দু’ চারখানা গিয়ে পোঁছুবেই। আমার জাহাজও এই দু’চার খানার অন্তর্গত হলেও হতে পারে তাে ! আর যদি ভারতবর্ষের সব বন্দরই বন্ধ হয়ে যায়, তবে তো যুদ্ধের ইতি । ১২ই জানুয়ারী প্রাতঃকালান আহারের সময় কাপ্তেন বললে, তােমায় একটা শুভ সংবাদ দিচ্ছি গুপ্ত। তবে কি ‘আউষ্টের’ ভারত গমন ঠিক হল? একমাত্র শুভ সংবাদ তখন আমার কাছে ঐ বিপদসঙ্কুল ভরতপথ। অপেক্ষা করছি শুনতে সংবাদটি কি! তিনি সেই কথাই বলেন, 'কাল দুপুরে খবর পেলাম আমাদের আবার ভারতে যেতে হবে নিউইয়র্ক থেকে। কলকাতায় নয়--বােম্বতে। বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্য জাহাজের চলাচল এখন যাবই।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে সুখবরটির জন্য ধন্যবাদ জানালাম। তিনি আবার বললেন, সত্যিই কি তুমি জাহাজ ছেড়ে চলে যাওয়া ঠিক করেছ, দেশে পৌছে ? বােধ হয় মাসখানেকেরও বেশী বােম্বে, কলম্বােতে আমরা থাকব। তুমি কেন সে সময়টা কলকাতায় তােমার বাড়ীতে কাটিয়ে ফিরে এল না। জাহাজ ছাড়বার আগে আমি তার করে জানাব তােমাকে। নিতান্ত বিদেশী, পৃথিবীর অন্য কোণে অবস্থিত একটা দেশের এই লােকগুলির সঙ্গে প্রায় আটমাসকাল একসঙ্গে থেকে এবং বহু বিপদ একত্র উত্তীর্ণ হয়ে এদের সঙ্গে কেমন একটা মনের বন্ধন গড়েছিল। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এদের ছেড়ে যাওয়া আমারও ইচ্ছা ছিল না। ভাবলাম, কলকাতায় যদি তেমন কিছু না দেখি এবং ইতিমধ্যে জাপানের ভারতমুখে অগ্রগতি থেমে যায়, তাই হবে। তাকেও সেই কথা বললাম। যাত্রার আয়ােজন শুরু হ’ল। ইংল্যাণ্ডের তখন রপ্তানী করবার অবস্থা নয়। কনভয়ের সব জাহাজ খালি যাবে নিউইয়র্ক বা হ্যালিফ্যাক্সে। ব্যালাষ্ট দিয়ে জাহাজ সমুদ্রে ভাসাতে হবে। ভারসাম্যতা রাখবার জন্য যতটা সম্ভব কয়লা নিয়ে, পাথরের কুঁচি বােঝাই করা হ’ল ডেকের ওপর। ১৫ই জানুয়ারী, ১৯৪২, নিউক্যাসেল ছাড়লাম—নিউইয়র্ক পথে । ইতিমধ্যে উত্তর আটলান্টিকে নাৎসী আক্রমণের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। আরও সংবাদ পাচ্ছিলাম আমেরিকার ওপর যুদ্ধ ঘােষণার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার উপকূলবর্তী সমুদ্রে সাবমেরিন আক্রমণ সুরু হয়ে গিয়েছে। নিউইয়র্ক থেকে মাত্র ১০০ মাইল মধ্যেও জাহাজ ডুবছে। ২০ ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার আতঙ্ক বৃটেনের বন্দরগুলি থেকে আরম্ভ করে আমেরিকার বিভিন্ন বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে।
চার্চিল-কিপলিংএর দেশে টাইন্ নদীর ওপর জাৰ্মান বিমানগুলির উৎপাতও বেড়ে গেছে। খুব বড় আঁকে এরা আসে না, একসঙ্গে চার পাঁচখানার বেশী নয়। কিন্তু যখন তখন আসে। সুবিধে পেলেই জাহাজগুলির উদ্দেশে বােমা ফেলে যায়। অনেক সময় জাহাজগুলির কোনও ক্ষতিই হয় না। কখন কখন দু’চারখানা নষ্ট হয় কিংবা জখম হয়। এ’ও বােধ হয় নাৎসীদের ‘স্নায়বিক যুদ্ধের অংশ বিশেষ। নিয়ত, চব্বিশ ঘণ্টা, মানুষকে একটা বিশ্র অপেক্ষার মধ্যে রাখা। যাতে ক্রমে এদের মধ্যে একটা অবসাদের ভাব এসে যায়, মনের ওপর ব্যাধির মত দুশ্চিন্তা চেপে থেকে একে দুর্বল করে দেয়। নিউক্যাসেল থেকে টাই নদী বেয়ে প্রথম গন্তব্যস্থল ‘মেথিল। পরবর্তী যাত্রা সেখানকার স্থানীয় নৌ-কর্তৃক্ষের নির্দেশ অনুসারে হবে। দু’খানা ডেস্ট্রয়ার ও 'আমরা ধান চারেক জাহাজ চাম টাই নদী দিয়ে। আবহাওয়া তখন আমাদের পক্ষে বিশেষ অনুকূল – ঘন কুয়াশায় দিগন্ত আচ্ছন্ন। বিমান আক্রমণ একেবারেই অসম্ভব। তবু খুব সাবধানে চলতে হচ্ছে। রাত্রির অন্ধকারে অনেক সময় নাৎসী বিমান জলের ওপর মাইন পেতে রেখে যায়। পিপের মত দেখতে ভাসমান মাইনগুলি সাবধানে চললে নজরে পড়ে, জলের কিছু নীচে নিমজ্জিত মাইনগুলি দেখা যায় না। মাইন-সম্মার্জনী ছোট ছােট জাহাজগুলিকে প্রায়ই নদী ঘেঁকে এগুলাে সরিয়ে ফেলতে হয়—বাষ্পীয় শক্তিতে চলা জেলে জাহাজগুলি, সামনে এবং দু’ধারে শক্ত রের জাল এটে মাইন-সম্মার্জনী জাহাজ করা হয়েছে। সাধারণত, নদীতে, নদীর মােহানায়, বে’তে, উপকূলবর্তী সমুদ্রে, মাইন রাখা হয়। মাইন-সম্মার্জনী ক্ষুদ্র জাহাজগুলােকে তাই প্রায়ই এ সব জায়গা পরিষ্কার করতে হয়। যদি কিছু থাকে এবং কোন একটির সঙ্গে লেগে যায় ৭০ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে কিন্তু বিজ্ঞান কোন দেশের বা জাতিরই একাকীর সম্পদ নয় । তাই যদি হত, এক চুম্বক মাইনের প্রয়ােগেই নাৎসী জাৰ্মাণী ইংল্যাণ্ডকে বাকী দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে কৃতকাৰ্যতার সঙ্গে এবং অতি সত্বর এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করতে পারতাে। চুম্বক ও বিদ্যুতের যে ধৰ্ম্ম তারা চুম্বক মাইনে লাগিয়েছেন, ঠিক তারই সাহায্য নাৎসীদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বৈজ্ঞানিকেরা এই আইনকে সংহত করে দিলেন। কোন চুম্বকের ক্ষেত্রে লােহ বা ইস্পাত এসে পড়লে, সেই লােহ বা ইস্পাতও চুম্বকধর্মী হয়। পৃথিবীর মেরুপ্রদেশের চুম্বকশক্তির ক্ষেত্র যতদূর পর্যন্ত কার্যকরীভাবে বিস্তৃত, তার ভেতর কোন ইস্পাতের জাহাজ এসে পড়লে মেরু হ’তে দূরত্বের পরিমাণ অনুযায়ী অল্পবিস্তর চুম্বক ধৰ্ম্ম প্রাপ্ত হবে। পৃথিবীর উত্তর গােলার্ধের ও দক্ষিণ গোলার্ধের চুম্বক শক্তি বিপরীত। উত্তর গােলার্ধে উত্তর মেরুর চুম্বক ক্ষেত্রে সকল জাহাজ একই মেরুধৰ্মী এবং দক্ষিণ গােলার্ধে বিপরীত ধৰ্মী। কাজেই উত্তর গােলার্জের জলরাশিতে অবস্থান কালে ইস্পাতের জাহাজগুলি যে মেৰু ধৰ্মী হবে, সেই চৌম্বিক শক্তির ক্ষেত্রের মধ্যে বিপরীত-মেরুধী স্বভাব প্রাপ্ত দ্বিতীয় কোন ক্ষুদ্র বস্তু থাকলে, চুম্বক ধর্মের বিধি অনুযায়ী বস্তুটি জাহাজের অঙ্গে প্রবলভাবে আকর্ষিত হয়ে অবশেষে, বিস্ফোরক পদার্থ পূর্ণ হলে, বিভ্রাট ঘটাবে। তাই যদি কোন মাইনের ডিটোনেটারের সঙ্গে এই বিপরীত মেরুধৰ্ম্মী কোন ব্যবস্থা রাখা যায় তবেই সেটা চুম্বক মাইনে পরিণত হল। প্রতিষেধ ব্যবস্থা বা “ডি-গস করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইস্পাতময় জাহাজের এই চুম্বক ধর্ম নিবারণ করা। বৈদ্যুতিক-চুম্বক বিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী তামার তারগুলির মধ্য দিয়ে এমন গতিমুখে বিদ্যুৎপ্রবাহ চালিত থাকবে যাতে বিপরীত ধৰ্মী ও সমশক্তির আর এক ঢৌম্বিক ক্ষেত্র চাচ্চিল-কিপলিংএর দেশে ৭১ সৃষ্ট হয়ে অবশেষে মেরুপ্রদেশ হ'তে প্রাপ্ত চৌম্বিক ক্ষেত্র এবং এই নতুন ক্ষেত্র উভয়ই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পৃথিবীর চৌম্বিক শক্তি মেরুপ্রদেশ হতে বিষুবরেখার কাছে ক্রমেই প্রায় অন্তর্হিত হয়ে আসে এবং এই রেখার নিকটবর্তী অঞ্চলগুলিতে কাৰ্যকরীভাবে একেবারে অদৃশ্য হয়। সঙ্গে সঙ্গে ইস্পাত নির্মিত জাজের চুম্বক ক্ষেত্ৰও দুর্বল হতে দুৰ্বলতর হয়ে ঐ অঞ্চলে একেবারেই থাকে না। তাই বিদ্যুৎ প্রবাহের গতিও ক্রমেই ক্ষীণ হ'তে ক্ষীণতর কতে হয় এই ‘ডি-গস’ বন্দোবস্তে, এবং বিষুবরেখা অঞ্চলে বিদ্যুৎপ্রবাহ একেবারেই রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। নতুবা বিদ্যুৎ প্রবাহ হতে সৃষ্ট চৌম্বিক ক্ষেত্র এ সব জাগায় জাহাজের কাছাকাছি চুম্বক মাইন থাকলে বিভ্রাট ঘটাবে। তারপর জাহাজ যদি েিরখা উত্তীর্ণ হয়ে পৃথিবীর অপর অংশে দক্ষিণ গােলার্ধের মধ্যে ক্রয় দক্ষিণ দিকে যেতে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ মেরু হতে দূরত্বের ব্য:ধান অনুপাতে বিদ্যুৎ প্রবাহ ক্রমেই বেড়ে যাবে; কিন্তু এবার এই প্রবাহের গতিমুখ উত্তর গােলার্ধ হতে বিপরীত। কারণ দক্ষিণ গােলার্ধে জাহাজের চৌম্বিক ক্ষেত্রও বিপরীত ধৰ্ম্মী। এরূপে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, বিদ্যুৎ প্রবাহের গতিমুখ ও সুনির্দিষ্ট পরিমাপের বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা কষা একটি তালিকা জাহাজে দেওয়া হয়। তাই দেখে, বিদ্যুৎ প্রবাহের সাহায্যে ও এই প্রবাহ আয়ত্তাধীনে রেখে পৃথিবীর সমগ্র সমুদ্র বক্ষে চুম্বক মাইনের গুরুত্ব নষ্ট করা হল। ‘মেথিল’ পৌছুলাম পরের দিন। রেডিও অফিসারস কনফারেন্সে কনভয়এর জাহাজগুলির মধ্যে যােগসূত্র রাখবার এবং প্রয়ােজন হলে ৭২ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে একক ভ্রমণের জন্য নতুন ব্যবস্থা হল। কনফারেন্স হল থেকে বেরিয়ে অপেক্ষা করছি কাপ্তেনের জন্য। তিনি নিকটেই আর একটি হলে ক্যাপ্টেস্ কনফারেন্সে কি পদ্ধতিতে এবার উত্তর অ্যাটলান্টিক পার হতে হবে সেই পরামর্শে যােগ দিয়েছিলেন। একটু পরেই তিনি বেরিয়ে এলেন। সমুদ্র তীর থেকে দু’জনে একটা মােটর লঞ্চে জাহাজের দিকে যাচ্ছি, শুনলাম সেদিনই বিকেলে আমাদের ‘মেথিল ছেড়ে যেতে হবে। গতবারের মত এবারও বৃটেনের উত্তরগামী কনভয় যাবে না। সমস্ত রক্ষীজাহাজ দক্ষিণ দিকের উপকূল ভাগে ব্যাপৃত , সে দিকে জার্মান বিমান, সাবমেরিন ও ই-বােটের আক্রমণ প্রায় লেগেই থাকে। বেলা প্রায় ২টার সময় আমরা ‘মেথিল’ ছেড়ে উত্তরমুখে রওয়ানা হলাম। কাপ্তেন ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে পূর্ব দিকে চেয়ে রইলেন-উত্তর সাগরের ওপারে তার পরিজনবর্গ যেখানে আছে এখান থেকে দুদিনের পথ সেই নরওয়ের দিকে। যতটা সম্ভব প্রায় উপকূলের নিকট দিয়েই যাচ্ছি। সন্ধ্যা প্রায় ৫টার সময় তীরবর্তী বিমান আক্রমণ সতর্কীকরন কেন্দ্রগুলি থেকে সংবাদ পেলাম কতকগুলি জার্মান বিমানকে উত্তর মুখে যেতে দেখা যাচ্ছে। রেডিও রুমের পাশেই চার্ট রুম ; কাপ্তেন সেখানেই ছিলেন। এই দু’টি ঘরের ভেতর কথাবার্তা বলবার জন্য একটি মােটা রবারের নল আছে। তাঁকে বল্লাম। বিমানবিরােধী ‘মেসিনগান’ ক্রু’কে সতর্ক করে দেওয়া হ’ল। বিমান আক্রমণ যদি হয় এবং শত্রু যদি খুব নীচে নেমে এসে আঘাত হানবার চেষ্টা করে, তবেই এই মেসিনগানে ফল হবে। আর যদি এ’র সীমার বাইরে ওপর থেকে বােমা বর্ষণ করে, জাহাজ একে বেঁকে তো চলবেই আর আমাদের ভাগ্য।
চার্চিল-কিপলিংএর দেশে মিনিট কুড়ি বাদে দ্বিতীয় সতর্কীকরণ সংবাদ এলাে, উত্তর দিকের জাহাজগুলি সব সাবধান। কাপ্তেনকে আবার খবর দিলাম। তিনি সংশ্লিষ্ট অন্য অফিসারদের বললেন, ডেক ও ইঞ্জিনের নাবিকেরা সকলে যেন লাইফ জ্যাকেট পরে থাকে। কাজ যেমন চলছিলো, চলতে লাগলাে। অন্ধকার হতে আর বেশী দেরী নাই। মােটা ইস্পাতের অন্তরালে মেসিনগানগুলির চালকেরা আকাশের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে অপেক্ষায় আছে, কখন কোন মেঘের অন্তরাল থেকে কে অকস্মাৎ গুলি বর্ষণ করতে করতে বেরিয়ে আসে। অনেকক্ষণ কাটল। অন্ধকার আকাশ ও সমুদ্রপৃষ্ঠ আচ্ছন্ন করে ফেলল। আবার সংবাদ এলাে, সব পরিষ্কার, বিমানগুলি পূৰ্বমুখে চলে গিয়েছে। সকলেই বুঝলাম আমাদের অনেক পশ্চাতে পরবর্তী জাহাজগুলির জন্য কিছু মাইন ফেলে গেল। গভীর নিশীথে আর কোনও কিছু হয় নাই। রাত ২টায় ঘুম থেকে উঠে নিজের অফিসে যাচ্ছি, একটু দূরে উপকূল রক্ষী একটি ডেস্ট্রয়ার আলাের সঙ্কেত করে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করছে দেখলাম। ‘স্কাপা ফ্লো’র নিকটবর্তী হয়েছি আমরা। পরদিন সকাল সাতটা আটটা নাগাদ ‘ইউ’ লকে পৌছুব। বেলা ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি। কানাডিয়ান্ বয় প্রাতঃকালিন আহারের সময় দু-তিনবার ডাকতে এসে আমাকে গভীর নিদ্রাগত দেখে ক্যাবিনের ভেতর একটি ফ্লাস্কে গরম কফি এবং মাখন, রুটি, ডিম, পরিজ প্রভৃতি রেখে গেছে। ১২টার সময় মধ্যাহ্ন আহারের জন্য ডাকতে এসে আমাকে সেই অবস্থাতেই আছি দেখে ওর যেন মােক চেপে গেল, খাওয়াবেই। আস্তে আস্তে ডাকতে লাগলাে-আপনি কি অসুস্থ? লাঞ্চের সময়ও যে হল।
৭৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলাম। একটা অন্ধকার ঘরে যেন বন্ধ হয়ে আছি। দেওয়াল ধ'রে ধ'রে হাতড়ে হাতড়ে রাস্তা খুজছি বেরুবার জন্য, রাস্তাও পেয়েছি অন্ধকার একটা সরু বারান্দা দিয়ে। বাইরের আলাের দিকে যেমন বেরুব একটা ভীষণাকৃতি কুকুর তাড়া করে আসে। উঠে দেখি ‘বয়’! ‘ল’এ পৌছেছি কি ? জিজ্ঞাসা করলাম। ‘পৌছে দুটো আহার শেষ হতে চল্লো সে বল্ল। মুখ ধুয়ে জামা কাপড় বদলে বাইরে এসে দেখি, প্রায় শতাধিক জাহাজ কনভয়ে যাবার জন্য লকে অপেক্ষা করছে। তিনদিকে বহুদূর বিস্তৃত শৈলমালা তুষার অলঙ্কার ধারণ করে আছে। ছােট ছােট উপত্যকা- গুলিতে অধিবাসীরা দৈনন্দিন কাজ করছে। নিস্তব্ধ, শান্তিপূর্ণ এই অঞ্চলে উত্তর আটলান্টিকের ঝঙ্কার মধ্যে প্রবেশের জন্য অনেক গুলি মানুষ জাহাজগুলির মধ্যে অপেক্ষায় রয়েছে। নাৎসী আক্রমণ এখন চুড়ান্ত স্তরে উঠেছে।
উত্তর অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে
No text on this page.
কিছুদিন থাকতে হবে ল-এ নিষ্ক্রিয় হয়ে। নিকটবর্তী ধীবরপল্লীর ধাবরদের ধরা টাটকা মাছ, ভাজা খাওয়া হচ্ছে প্রত্যহ-ই। আবার তাে এ জিনিষ সেই নিউইয়র্কে –ওপারে। সারা দিন যেন কাটে না। সকাল থেকে শুরু করে খাওয়া, গল্প এবং মধ্যে মধ্যে রেডিও খুলে পৃথিবীর নানা কেন্দ্র থেকে বীরত্বের আস্ফালন, বক্তৃতা, নানা কণ্ঠের গান শুনতে শুতে বিরক্তি ধরে যায়। যাত্রার আগের সময়টা মানুষের এমনি বটে। যে দেশ বা যাদের ছাড়ছি অজাতে সে দেশের এবং তাদের ছবিগুলাে মনের ওপর অঙ্কিত হয়ে থাকে। বিদেশ হলেও ছেড়ে যেতে কেমন লাগে, তথাপি যাত্রার নামেই মনটি পড়ে থাকে গন্তব্যস্থানের দিকে। তারপর একবার পথে বেরিয়ে পড়ে পেছনের পথটা যত দীর্ঘ হয়ে ওঠে নিকটতম স্মৃতিগুলি ক্রমেই আবছা হয়ে আসে, সম্মুখের আকর্ষণ হয় প্রবলতর। কোথাও তখন পথের মাঝে হঠাৎ অনির্দিষ্ট কালের জন্য অপেক্ষায় শান্তি আসে, বিরক্তি আনে। লক-এ সাত আট দিন একভাবে কেটে গেল। কি করছে ওরা এতদিন বসে বসে। এতগুলাে জাহাজ যে এতদিন ধরে দাঁড়িয়ে আছে ওপারে যাবার জন্য, কর্তৃপক্ষ কি ভুলেই গেল নাকি? সকল স্থানেই, অপেক্ষা আর অপেক্ষা। কী বিরক্তিকর! মনে হয়, এর চেয়ে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও পথের সহ বিপদের সম্মুখীন হওয়া অনেক গুণ বাঞ্ছনীয়।
৭৮ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ইতিহাসে চিরকাল এই অধৈর্য্যের জন্য বহুবার বহু জাতির রণাঙ্গনে পতন হয়েছে। প্রতি যুগে যুদ্ধকালে উভয় পক্ষের মধ্যে ধৈর্যের প্রতি- যােগিতায় জয়ী জাতি সহস্র প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করে অবশেষে আপনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। অধৈৰ্য্য যে, পরবর্তী বহুকালের জন্য তাকে পরাজয়ের গ্লানি, বহন করতে হয়েছে ; নৈতিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বহু স্তর নীচে নেমে আসতে হয়েছে তাকে। যতদিন পর্যন্ত না নিজের অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বা করতে পারা যাচ্ছে, শত্রুর অনুকূল অবস্থার মধ্যে গিয়ে কিছুতেই তার মুখােমুখী দাড়ালে চলবে না, তাকে এড়িয়ে চলতে হবে। শত্রুর স্পর্ধায় বিচলিত হওয়া দুর্বলতা। তার হুঙ্কার উপেক্ষা করে এবং নিজ দলের অসহিষ্ণু বারা তাদের প্ররােচনায় দিশেহারা না হয়ে স্থির মস্তিষ্কে, ত্রিনেত্র উন্মুখ রেখে অপেক্ষা করতে হবে সেই মুহুৰ্ত্তটির জন্য, যখন আমার বল তার চেয়ে বহু অধিক। সেই মূহুর্তে শত্রুর প্রতি দয়া কেবল দুৰ্বলতা নয়, অপরাধজনক ; নির্মম, নিষ্করুণ আঘাতে তার প্রতিরােধ ক্ষমতা শুধু নয়, প্রতিবাদের প্রবৃত্তিকেই স্তব্ধ করে দিয়ে, তারপর দ্বিতীয় কথা । যুদ্ধের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত বীরত্ব প্রদর্শন নয়-আত্মরক্ষা। সমাজের, জাতির, শত্রু সমাকীর্ণ জগতের মধ্যে আত্মরক্ষা। জগৎ মূখের বীরত্বকে প্রশংসা করে না—আত্ম প্রতিষ্ঠ, সুদৃঢ়, নিম্মম জাতিকে ভয় করে, সম্মান করে। ভারতের তামসিক যুগ প্রারম্ভে নীতিশাস্ত্রে শ্রদ্ধাহীন, প্রাচীন আৰ্যদের বংশধরগণ ব্যক্তিগত বীরত্ব দেখিয়ে বিপুল আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন, আপনার অনুকূল অবস্থায় বিজাতীয় স্লেচ্ছ ও যবন শত্রুদের মর্মন্তুদ প্রহারে অভিভূত না করে প্রচণ্ড আত্মগরিমা লাভ করতে পারেন এবং স্বেচ্ছায় তাকে বলবৃদ্ধি করবার সুযােগ দিয়ে অবশেষে শত্রুর অনুকূল অবস্থায় তার সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়ে ব্যক্তিগত বীরত্বের অহঙ্কারের উত্তর আটলান্টিকের রণাঙ্গনে ৭৯ তৃপ্তিসাধন করতে পারেন—কিন্তু সহস্র সহস্র বৎসরের পরীক্ষিত হষ্পত্য নীতিশাস্ত্রে উপেক্ষা করে, তারা পরবর্তীকালের আৰ্য্য বংশধরদের কাছে অপরাধী হয়ে রয়েছেন। সর্বকালের জ? সনাতন এই নীতিশাস্ত্রে প্রাচীন ভারতের আর্যঋষিগণ রাষ্ট্রনীতির, রণনীতির, 'ম হ'তে ২ পর্যন্ত বিশদরূপে বর্ণনা করেছেন, আজ বিদেশী ও বিজাতির পক্ষপুটতলে পুষ্ট ও বর্ধিত এদেশের করুণ রসাত্মক রাজনীতির ধনুর্দ্ধরেরা সেই নীতিগুলিকেই অ-ভারতীয় বলে উল্লেখ করে থাকেন! এই নীতি অনুযায়ী, বাচালতা এবং হঠকারীতা নয়, পরন্তু সত্যম, কৰ্ম্মকুশাত। ও ধৈৰ্যই সকল কাজে সিদ্ধিলাভের উপায়। ধৈৰ্য্য, কৰ্ম্ম- তৎপরতা এবং শত্রুর দুব্বল মূহুর্তে তাকে প্রচণ্ড, নিষ্ঠুর আঘাতে নাতিত করা, নীতিশাস্ত্রের এইসব নিয়ম পালন করাতে আজ প্রাথমিক শত বিপত্তি সত্ত্বেও মিত্রশক্তি এ যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। নিজ দুন মূহুর্তে এই নিয়ত অপেক্ষা, বিভিন্ন সমুদ্রে শত শত নাৎসী মৃত্যুদূতের উপস্থিতি সত্ত্বেও মিত্রপক্ষের বহু জাহাজকে কৃতকাৰ্যতার সঙ্গে বিচরণ করতে সমর্থ করেছে। নতুবা মিত্রপক্ষের সকল জাহাজই নিৰ্মল করে আজ নাৎসীরা পৃথিবী ভােগ করত। অন্যান্য জ্ঞান বিজ্ঞানের মত নাতিশাস্ত্রও শাশ্বত। এই নীতি-ই ইংরাজী ভাষায় গালভরা শব্দ ‘স্ট্রাটেজী। এর মূল কথা বােঝা খুবই সহজ --প্রয়ােগ দুরূহ, চরিত্র সাপেক্ষ। নিয়ত অভ্যাসলব্ধ চরিত্র যার আছে একমাত্র তিনিই নাতি বা স্ট্রাটেজী কার্যকরী করতে সমর্থ। কেবল ‘মেকিয়াভেলি’ পড়ে বা ‘সুইজ’ এবং ‘ফস্ আবৃত্তি করে রাজনীতি বা রণ নীতির প্রয়োগ চলে না—অসাড় এবং হাস্যাস্পদ পাণ্ডিত্যাভিমান চলে সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে অবশেষে একদিন ল থেকে বেরিয়ে উন্মুক্ত সমুদ্রে পড়ে যখন বুঝলাম, অনেকগুলি সাবমেরিন এবং অন্য রণতরীও আমাদের এতবড় এই ঝকটির প্রত্যাশায় ছিল এবং হয়তো এখনও আছে, তখন এই সুদীর্ঘ অপেক্ষার কারণ বুঝলাম। দুখানা বড় ক্রুজার, আটখানা ডেস্ট্রয়ার, অনেকগুলি করভেট সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। স্পষ্টই বােঝা যাচ্ছে, এবার অ্যাটলান্টিক উত্তীর্ণ হওয়া বিশেষ সহজসাধ্য হবে না। বাইরের খােলা সমুদ্রে বােধ হয় অনেক দিন থেকেই শত্রু সাবমেরিন আমদের জন্য বসে আছে। এ’ পক্ষে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও ওদের ধৈর্য্যচ্যুতির কোন লক্ষণই দেখা গেল না, পালা করে ওরা আমাদের যাত্রাপথের দিকে চেয়ে আছে শ্যেনের দৃষ্টি নিয়ে। এ থেকে বেরুতে হই একদিন। পরিষ্কার বােঝা যাচ্ছে, প্রকাণ্ড এক কনভয় যে ‘ইউ’ ছাড়বে অ্যাটলান্টিকের পথে, সে খবর শত্রুপক্ষ ভালমতেই জানে। এত বড় সুবােগ তারা কিছুতেই ছাড়তে পারে না। কেবল সাবমেরিন নয়, বিভিন্ন ধরণের সামুদ্রিক আক্রমণ এই কনভয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত করে একেবারে উৎসন্ন করবার চেষ্টাও হতে পারে। তাই যতদিন কনভয় রক্ষার জন্য যথেষ্ট শক্তি নৌ- কর্তৃপক্ষ সংগ্রহ করতে না পারছিলেন ততদিন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। শীতকাল। নিবিড় কুয়াসার অন্তরালেই যেন নিরাপত্তা অধিক। কিন্তু নাৎসীরা ই-বােট নামে অদ্ভুত এক ক্ষুদ্র রণতরী নিৰ্মাণ করেছে। তার সাহায্যে কুয়াসার সুযােগ নিয়ে রক্ষা ডেস্ট্রয়ারের চোখের সামনেই বাণিজ্য জাহাজগুলির একেবারে কাছে এসে টর্পিডো বা গােলার অভ্রান্ত আঘাতে বহু পােত ধ্বংস করেছে। এক একটি জাহাজকে আঘাত দিয়ে কুয়াশার অন্তরালে আত্মগােপন করে এই ই-বােট ; রক্ষী জাহাজ গুলির সঙ্গে সঙ্ঘর্ষ এড়াবার জন্য। পরে হয়তাে কুয়াশা উন্মােচনী বােমার উত্তর অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে সাহায্যে স্থানীয় কুয়াসা পরিষ্কার করে ডেস্ট্রয়ার ই-বােটের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে নিযুক্ত হয়েছে, কিন্তু এই অদ্ভুত জাহাজগুলির অস্ত্রসজ্জা এত উন্নত, যে অনায়াসেই ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে পারে। জার্মানীর রণতরী বিভাগের কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশ ছিল এই রণতরীগুলির নায়কদের ওপর, যেন কোন ক্রমে কোন ই-বােট শক্তহস্তে নিপতিত না হয়, মিত্রপক্ষীয় রণতরী দ্বারা সম্পূর্ণ অভিভূত হয়ে পড়লে যেন সমুদ্রে আত্মনিমজ্জন করে। -বােটের নির্মাণ কৌশল ও অস্ত্র সজ্জা প্রণালী সম্পূর্ণ গােপনীয় রাখা এই কঠোর আদেশের উদ্দেশ্য । যতদূর জানি, ১৯৪২এর ণাবী পর্যন্তও কোন ই-বােট ধরা পড়ে নাই, যদিও মিত্রপক্ষ অন্ততঃ একটিও ধরবার জন্য চেষ্টা করছিল। ক্ষুদ্র এই পােতগুলি ১৫• ফিটের বেশী লম্বায় নয়, প্রস্থেও তদনুরূপ। একাধিক টর্পিডো টিউবের বন্দোবস্ত আছে, সঙ্গে সঙ্গে রীতিমত শক্তিশালী নৌ-কামানও। এত ক্ষুদ্র জাগজটিতে ক্ষিপ্রতা বজায় রেখে এই রণসজ্জা অভূতপূৰ্ব্ব কৃতিত্বের পরিচায়ক। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছিল, সমুদ্রবক্ষে ডেস্ট্রয়ারে ও ই-বােটের যুদ্ধে কামান শক্তিতে এই নাৎসী বামন রণপােতটি পূৰ্ব্বোক্তের সঙ্গে সমান তো বটেই; খরগতি ও টর্পিডো নিক্ষেপের অধিকতর সুবিধা থাকায় ডেস্ট্রয়ার ই-বােটের সঙ্গে যুদ্ধে সুবিধা করে উঠতে পারে না। একমাত্র বৃহদার কামানের বহুদূরগামী গােলাই একে সায়েস্তা করতে পারে । কিন্তু ডেস্ট্রয়ারের রণসজ্জায় বৃহদাকার কামান বসাতে গেলে এর ডেস্ট্রয়ারত্ব থাকেনা অর্থাৎ ক্রুজারের তুলনায় এর দ্রুত গমন শক্তি। দ্বিতীয়তঃ, বড় কামান বসাতে গেলে অপেক্ষাকৃত ছােট কামান বসাবার জায়গা থাকে না, নিকটতর লক্ষ্যে বড় কামান চালানাে যায় না।
৮২. সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে শুধু তাই নয়, দু-চারখানা ই-বােট একত্র হয়ে এবং কখন কখন একক, ভারী ক্রুজারকে ঘায়েল করেছে এ দৃষ্টান্তও বিরল নয়। ই- বােটের সৃষ্টি নাৎসীদের বৃহদাকার যুদ্ধজাহাজের অভাব ক্ষুদ্রতর এরূপ বহু জাহাজ দিয়ে কতকটা পূরণ করা এবং বাণিজ্য জাহাজ নষ্ট করা। উত্তর সাগর, ইংলিশ চ্যানেল প্রভৃতি অঞ্চলেই এগুলাের ব্যবহার সমধিক। অপেক্ষমান অনুসরণকারী সাবমেরিন ও অনুসন্ধানী নাৎসী বিমানের দৃষ্টি এড়াবার জন্য সন্ধ্যার পর রাত্রির অন্ধকারে প্রায় শতাধিক জাহাজের আমাদের কনভয় সারারাত্রি ধরে বহুবার গতি ও গতিমুখ পরিবর্তিত করে অ্যাটলান্টিক বক্ষে চলতে লাগলো। পৃথিবীতে যে একটা যুদ্ধ চলছে সে সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞান অন্য কোন গ্রহের কোন কল্পিত নাবিক রাত্রির এক সময়ে কনভয়টিকে দেখলে ভাবতাে, জাহাজগুলি বুঝি উত্তর মেরুর বরফ প্রদেশে বহু ঔপনিবেশিক নিয়ে চলেছে। অন্য সময়ে তার মনে হত জাহাজগুলি বুঝি ইংল্যাণ্ডে যাচ্ছে। আরাে পরে জাহাজগুলি তার চোখে পড়লে আমাদের জন্য সহানুভূতিতে পূর্ণ হয়ে উঠত, একই জায়গার মধ্যে চক্রাকারে ঘুরছি দেখে, জাহাজগুলি দিগভ্রান্ত হয়েছে ভেবে। আর সারারাত্রি ধরে সমগ্র ব্যাপারটি পৰ্যবেক্ষণ কলে কল্পিত এই নাবিক নিঃসন্দেহে অনুমান করতে অ্যাটলান্টিক বক্ষে সহসা কি একটা হয়েছে, অকস্মাৎ শতাধিক জাহাজের নাবিকগুলি উন্মত্ত হয়ে পড়েছে, গন্তব্য লক্ষ্য ভুলে গিয়ে সমুদ্রের ওপর খেলা করছে। সকালে উঠে দেখা গেল, গভীর সমুদ্রে মােটামুটি অতি অল্পই অগ্রসর হতে পেরেছি। সারাদিন ধরে কনভয়ের নায়কের রণপােতটির ওপর বিভিন্ন সঙ্কেত পতাকা উঠছে কনভয়ের জাহাজগুলিকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশ দিয়ে। সকল জাহাজ এই পতাকাগুলি দূরত্বের জন্য পড়তে পারে না, অল্প-বিস্তর কুয়াসাও দৃষ্টিশক্তিকে সীমাবদ্ধ করে উত্তর আটলান্টিকের রণাঙ্গনে দেয়। কনভয়ের একশত জাহাজ দশটি পৃথক সারিতে সাজান। সারিগুলির মুখে যারা থাকে তাদের বলা হয় নেতৃজাহাজ। সম্মুখের নির্দেশদানকারী রণপােতটি থেকে সারিগুলির পেছনের দিকের জাহাজ- গুলির দূরত্ব অনেক সময় পাঁচ ছয় মাইলও হয়ে পড়ে। তাই রণপােতটিতে কোন সাঙ্কেতিক পতাকা উত্তোলিত হলে এই নেতৃজাহাজগুলি আবার সেই সঙ্কেত আপন আপন বক্ষে তুলে ধরে। পরবর্তীরাও ক্রমে সেরূপ করে। এই প্রক্রিয়ায় কনভয়ের মধ্যে সকল জাহাজই নির্দেশটি জানতে পায়। আন্তর্জাতিক নৌ-রীতিতে যে বর্ণসমষ্টির পতাকায় যে অক্ষর, এখানেও তা-ই ব্যবহৃত হয়। কতকগুলি অক্ষর নিয়ে গঠিত শব্দ সাঙ্কেতিক কথা। যাত্রার প্রাক্কালে শীলমােহর করা খামের মধ্যে কনভয়ে ব্যবহৃত হবে এমন সব সাঙ্কেতিক শব্দ ও তার অর্থ আমাদের দেওয়া হয়। বন্দর বা লক ছেড়ে গভীর সমুদ্রে আসবার পর এই শীলমােহর ভাঙ্গার নির্দেশ দেওয়া থাকে। অর্থ সুপরিষ্কার। কোনভাবে বাইরের কোনও ব্যক্তির এই সঙ্কেতগুলির অর্থ জানবার উপায় না থাকে। স্বভাবতঃই সতর্কতা সর্বত্রই বাঞ্ছনীয়। আর এ যুদ্ধে তাে ইংল্যাণ্ডে বিভীষণের (কুইসলিং না বলে বিভীষণই বললাম!) অভাব ছিল না। একটা জিনিষ, মিত্রপক্ষের দুর্দিনের সময়, বৃটেনের বন্দরগুলি থেকে বহির্গামী সকল জাহাজই প্রায় লক্ষ্য করেছে, বন্দর থেকে জাহাজ সমুদ্রে বেরুলেই অভাবনীয়রূপে শক্ৰবিমান আকাশ পথে আসতে দেখা যেত। অথচ তার আগে কোন অনুসন্ধানী শত্রু বিমান বন্দরের ওপর দেখা যায় নাই। লকে থাকতে আমরা কোনদিনই কোন শত্রু বিমান দেখি নাই। তাই অনেকেই অনুমান করতেন-এ অনুমান কিছুমাত্র অসঙ্গত নয়—ইংল্যাণ্ড এবং স্কটল্যাণ্ডের ভেতর বিশেষ কতকগুলি জায়গা থেকে, যে উপায়েই থােক, নাৎসীরা জাহাজ চলাচলের অনেক তথ্যই নিয়মিত ভাবে ৮৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে পাচ্ছিল। একমাত্র যারা বিভাগীয় উচ্চ পদগুলিতে থাকেন তাঁরাই এসব গােপনীয় সংবাদ রাখেন এবং অপরকে দিতে পারেন, এ সংসর্গে এই তথ্যটিও বিশেষ অনুধাবনযােগ্য। যুদ্ধ শুরু হ’বার অব্যবহিত পরেই বৃটেনে বহু নরনারীকে যে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিলো সে কথাও মনে রাখা প্রয়ােজন। স্বজাতি কুৎসা রটনাকারী একশ্রেণীর লােক এদেশে এই আটত্রিশ কোটি মানুষের মধ্য থেকে বিভীষণ বেরুলেই সেই উপলক্ষ্যে সারা দেশটিকেই ধিক্কার দিতে সুরু করে। ভারতীয় চরিত্রের জঘন্যতা নিয়ে তারস্বরে কপট বিলাপ সুরু করে এই ঘৃণিত লােকগুলি সমস্ত জাতিকে অবসাদগ্রস্ত করবার চেষ্টা করে। জ্ঞানে কিম্বা অজ্ঞানে এই কুৎসা রটনাকারীরা সকলেই ভারতবর্ষের শত্রুতাই করূছে। তাই বিদেশী ও স্বদেশী অপবাদে আত্মবিভ্রান্ত জাতির আত্মচেতনা প্রবুদ্ধ করবার জন্য তাকে জানান প্রয়ােজন, “বিভীষণ’ সকল দেশে, সকল কালেই জন্মগ্রহণ করে এবং পরাধীন দেশে এই বিভীষণদেরই অনেকে আত্মবিলাপ করে জাতির উত্থান প্রবৃত্তি নষ্ট করতে চেষ্টা প্রথম মহাযুদ্ধের পর কয়েকবৎসর যখন মিত্রশক্তি জাৰ্মানীর অনেক অঞ্চল প্রকৃতপক্ষে শাসন করছিল, একজন উচ্চপদস্থ ইংরাজ সৈনিক কর্মচারী বলেছিলেন, জার্মানীর প্রত্যেক তৃতীয় ব্যক্তি হয় বদমাইস নয়তাে দেশদ্রোহী গুপ্তচর। হিটলারের মেইন ক্যাম্ফে এতটা না হলেও জার্মানীর ভেতর যে বহু লােক অর্থ বা মিথ্যা মােহে ফরাসীদের কাছে নিজ দেশের এবং স্বজাতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করত সে খবর পাওয়া যায়। অথচ ভারতবর্ষের মত এত শতাব্দী ধরে জার্মানীকে বিজাতিয় শাসনের পদচিহ্ন বুকে ধরতে হয় নাই। জার্মানীর অন্ত জীবনে উত্তর অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে মাত্র কয়েকটি বৎসর বিদেশীর হস্তক্ষেপে অবস্থা যদি এতদূর সঙ্গীন হয় যে লােকসংখ্যার এক তৃতীয়াংশকেই বিশ্বাসঘাতক বা দুষ্ট বলে কেউ অভিহিত করতে পারে ভারত সম্বন্ধে কি বলার থাকে? ভারতবর্ষের অপূৰ্ব জীবনীশক্তি। বহু শতাব্দী ব্যাপি সহ বৈদেশিক ষড়যন্ত্রেও তার আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা এখনও পরিপূর্ণরূপে লুপ্ত হয় নাই। অন্য যে কোন দেশ বা জাতি এ অবস্থায় এতদিন থাকলে, তার বিশিষ্ট অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যেত না। অথচ ১৯২৩ সালে যে জার্মানদের এক তৃতীয়াংশই দেশদ্রোহীর পৰ্য্যায়ে গিয়ে পড়েছিলো, ১৯৩৩ সালে সেই জাতিই আবার সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তখনকার একটি মাষকেও তখন মিত্রশক্তির গুপ্তচর বিভাগে কাৰ্যকৰীভাবে পাওয়াই হয়তাে মুস্কিল হয়ে দাড়িয়েছিলাে। সেই জাৰ্ম্মণদেরই অত্যু গ্ৰ দেশপ্রেমে ও জাতিপ্রেমে অন্য দেশ এবং জাতির অস্তিত্ব রাখা সঙ্কটজনক হয়ে পড়ল। সেই মানুষ, সেই দেশ—মােটে দশ বৎসরের মধ্যে একি পরিবর্তন। কোথায় গেল সেই সব বিভীষণ, যাদের জন্য সে দেশের জাতীয় জীবনে ঘােতর বিশৃঙ্খলতা দেখা দিয়েছিল। জাম্মানীর নৈতিক অবনতি দেখে নিতান্ত দুঃখেই যে ইংরাজ কর্ণেলটি জাৰ্মাণদের সম্বন্ধে এতগুড় একটা মন্তব্য করেছিলেন, জানি না দশ বৎসর পরেও তিনি জীবিত ছিলেন কিনা এবং নতুন করে আবার এদের সম্বন্ধে কি ভাবছিলেন। তারপর ধরা যাক রুশদের কথা। জাৰ্মাণ-রুশ যুদ্ধ যখন শুরু হল মিত্রপক্ষের রণপণ্ডিতরাও ভেবেছিলেন মাস তিনেকের মধ্যেই কুশিয়ার কার্যকরী প্রতিরােধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে। বলা বাহুল্য, এদের কচি পাথর ছিল ১৯১৪-১৭ সালের এবং তৎপূৰ্ব্বের রুশ। ইতিপূর্বে কোন যুদ্ধেই রুশিয়া কোনদিনই বিশেষ পারদর্শিতা দেখাতে পারে নাই।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে বিশালবপু এবং সুপ্রচুর লােক সংখ্যা সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও অধিকতর সদ্ব্যবদ্ধশালী দেশগুলির কাছে প্রায়ই পরাজিত হয়েছে। প্রথম মহাযুদ্ধে এই রুশকে মিত্রশক্তি বাষ্পীয় রােলার হিসাবেই ব্যবহার করেছিল। যে কোন যুদ্ধে যেমন ভারতবর্ষের জনবল ও ধনবল শশাষিত হয়, ‘স্বাধীন’ কুশিয়ার অপদার্থ জারতন্ত্রে রুশিয়ার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নিতান্ত অসাড় ও লােভপরতন্ত্র আভিজাত্য প্রাধান্যে রুশিয়ার অবস্থাও ঠিক তেমনই ছিল। অথচ সেই দেশ, সেই জাতি, নাৎসী যুদ্ধযন্ত্রকে বিকল করে দিল। পূৰ্বতন রুশ এখনও পৃথিবীবক্ষে অধিষ্ঠিত থাকলে এতদিনে নিঃসন্দেহে জগতের প্রায় সর্বত্রই স্বস্তিকা চিহ্নিত পতাকা উড়তো। कानि জাতিবিশেষের এবং এদেশের ব্যক্তি বিশেষদের কাছে বড়ই শ্রুতিকটু, কিন্তু অবিসম্বাদী সত্য। নাৎসীরা য়ুরােপের সকল দেশেই পঞ্চম বাহিনী পেয়েছিলাে, কিন্তু এখানে পায় নাই। কাজেই দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর যে কোনও দেশের জনসাধারণের আচরণ ও কর্মদক্ষতা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে নেতৃত্ব ও সুনিপুন নেতৃত্ব প্রসূত সঙ্ঘ্য এবং বিধিব্যবস্থার ওপর। সুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা যখন উপযুক্ত নেতৃত্ব পরিচালিত হয়, তখন বিভীষণের দল নিতান্ত নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পররাষ্ট্রের সঙ্গে জীবনমরণ যুদ্ধের সময় এই সব বিষধর আবার মাথা তুলে ধরে, তাই এদের তখন কারাগারে রাখার প্রয়ােজন হয়। কিন্তু কোন দেশে বিদেশী রাষ্ট্রভার এসে পড়লে এরাই হয় তখন সমাজে প্রধান। কারণ, বিদেশীর স্বার্থ নব অর্জিত দেশের জনসাধারণের মধ্যে নৈতিক অবনতি যতদূর সম্ভব বিস্তৃতি করা। সাধারণ মানুষ উপরে যা বা যাকে দেখে তাই এবং তাকেই অনুকরণ করে। দেশের হীন চরিত্রের ব্যক্তিদের উপরে তুলে ধরে বিদেশী শাসক জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে। ছদ্মবেশী এই বিভীষণ দলের উত্তর আটলান্টিকের রণাঙ্গনে ৮৭ একটা অংশ নিয়ত নানাভাবে বিদেশী মহিমা কীৰ্ত্তন করে দেশের মধ্যে ‘দাসব’ এনে শৃঙ্খল চিরস্থায়ী রাখতে প্রচেষ্ট হয়। ইংল্যাণ্ডের যে সব বিভীষণ যুদ্ধের সময় বেড়াজালে পড়ে নাই তাদের নামও জাৰ্মানীর পরাজয়ের পর সােভিয়েট ও আমেরিকান কর্তৃপক্ষ পেয়েছিলাে। রাষ্ট্রযন্ত্রের ও সমাজের উচ্চ স্থানে বসে এই ‘বড়’ ছােটদের মৃত্যুপথে পাঠাচ্ছিল পূর্বাহ্নেই শত্রুকে এদের গতিবিধির বহু সংবাদ দিয়ে। পাছে এই লােকগুলির নাম প্রকাশে ‘বড়’র ওপর ‘ছােট’র ভক্তির অভাব ঘটে, তাই সেগুলি প্রকাশ করা হবে না বলে ঠিক হয়েছে। ইংরাজ নরনারীর সৌভাগ্য, এ শ্রেণীর লােক বেশীদিন যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রযন্ত্রে আধিপত্য করতে পারে নাহ, নতুবা এতদিনে ইংরাজ শিশু ইংরাজ ঐতিহাসিকদের লিখিত স্কুল পাঠ্য পুস্তকে বিংশ শতাব্দীর প্রায় অৰ্ধকাল পর্যন্ত ইংল্যাণ্ডের বর্বর যুগের পাঠ নিত। সকল দেশে ও সকল কালে একটা পুরাে সমাজ বা দেশ অমর বিভীষণ শূন্য থাকে না বলেই দেশরক্ষা কাজে গােপনীয়তা এত প্রয়ােজন। যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রের এবং জাতির উত্থান পতন সমস্যা, তাই সাঙ্কেতিক ভাষা বিশেষ করে এ সময় চিররীতি। সাঙ্কেতিক ভাষার সাহায্যে বিশাল এই কনভয় সারা দিন বিচিত্র গতিতে চলে সন্ধ্যার একটু আগে নির্দেশ পেলো, অন্ধকারের পর রাত ৮টা থেকে মধ্যরাত্রির ১২টা পর্যন্ত জাহাজগুলি নতুন গতিতে আর একটি নতুন দিকে যাবে। দিকে যাবে। রাত ১২টার পর থেকে ভাের চারটে পর্যন্ত পুনরায় গতিমুখ ও গতি বদলে যাবে এবং তারপর সকাল ৮টায় মিলন- ক্ষেত্র কোথায় হবে সে নির্দেশও পাওয়া গেল। রাত্রিতে আলােকের সাহায্যে দ্বিতীয় কোন উপদেশ দেওয়া চলবে না--তার অর্থ মেষপালের ওপর ক্ষুধার্ত ব্যাকে নিমন্ত্রণ করে আনা।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে রাত দশটায় নিজ কর্তব্যশেষে ক্যাবিনে প্রবেশ করে বাইরের সমুদ্রের পরিবেষ্টন থেকে কিছু সময়ের জন্য স্থলের আবহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে ইচ্ছা হ’ল। ক্যাবিনের দরজা জানালাগুলো বেশ ভাল করেই আঁটা যায় কিনা, ভেতরের সামান্য আলো ক্ষীণতম রশ্মিরূপে বাইরে যেতে পারে কিনা রুদ্ধ এগুলাের কোন ফাঁকের মধ্য দিয়ে, বন্দরে থাকতেই বিশেষ করে পরীক্ষিত হয়েছিলাে। দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরের রেডিওটির সুইচ, মুচরে একে উন্মুখ করে দিলাম, বৃটিশ ব্রডকাষ্টিং করপােরেশনের উৎক্ষিপ্ত বেতার তরঙ্গ গুলিকে সমাদরে গ্রহণ করতে। সময়টা আমাদের স্থানীয়—অর্থাৎ যত ডিগ্রি পশ্চিমে যাচ্ছি আমাদের ঘড়ির কাটাও ইংল্যাণ্ডের সাধারণ সময় থেকে প্রতি ডিগ্রিতে চার মিনিট হিসেবে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জাহাজ যখন সমুদ্রে চলে তখন এই স্থানীয় সময়ও তাই প্রত্যহই পরিবর্তিত হয়। গ্রীউইচের সময়ও রাখা হয় চার্ট রুমে, নােমিটার ঘড়িতে। পৃথিবীর সকল দেশের বেতার কেন্দ্রগুলো থেকে সমুদ্রের জাহাজগুলিকে সাহায্য করবার জন্য প্রত্যহই অনেকবার গ্রীনউইচের সময় জানান হয়—একে বলা হয় টাইম সিগন্যাল। টাইন সিগন্যাল সাহায্যে সকল জাহাজের ক্রনােমিটার ঘড়ির সময় সূক্ষ্মভাবে মেলান হয়। আধুনিক আধুনিক নৌ-বিদ্যায় নাবিকের কাছে ক্রনােমিটার অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্র। পৃথিবীর যে কোনও স্থানে সেক্সটাণ্ট যন্ত্রের সাহায্যে মধ্যাহ্ন নিরুপণ করে, ক্ৰমােমিটারে তখন গ্রীনউইচের যে সময়টি পাওয়া যাচ্ছে তার সঙ্গে বিয়ােগ করে, যত ঘণ্টা, মিনিট, সেকেণ্ড তফাৎ হয় তা-ই থেকে স্থানীয় দ্রাঘিমা রেখা ধরা পড়ে। অক্ষাংশ নির্ণীত হয় একই যন্ত্র দিয়ে সূর্যের মধ্যাহ্ন উন্নতি অর্থাৎ দিগন্তের সঙ্গে সুৰ্য্যের যতখানি কোন রচনা হচ্ছে নৌ- সারনীর কষ হিসেবে সেই কোন তথন কত অক্ষাংশে রয়েছে তাই দেখে।
উত্তর অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে ৮১ বি, বি, সি থেকে ওদের প্রােগ্রাম শুছি-- গান, বাজনা, ঠাট্টা, রহস্য শেষ হয়ে গেছে। এক বক্তা, বাংলায় যাকে বলে ওজস্বিনী ভাষা, সেই ধরণের ভাষাতে বর্ণনা সুৰু “রলেন অ্যাটলান্টিক যুদ্ধের কথা। অ্যাটলান্টিক সমুদ্র ইংল্যাণ্ডের কাছে যে কি জিনিষ তিনি বােঝাচ্ছেন। বলছেন, এই অ্যাটলান্টিকের বুক বেয়ে ইংরাজের কীর্তি দিকে দিকে বিস্তৃতি লাভ করেছে। এই অ্যাটলান্টিকের রিধি সযত্নে লক্ষ ক্ষ ঔপনিবেশিক নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় ইংরাজের এক নতুন বসতি স্থাপন করতে সাহায্য করেছে। সুদূর অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি স্থান ইংরাজ সভ্যতার নব নব কেন্দ্র হয়ে দাড়িয়েছে অ্যাটলান্টিকের কল্যানেই। এই অ্যাটলান্টি দিয়ে তিন চার শতাব্দী পূৰ্বে বৰ্তমান বৃটিশ জাতির পূৰ্বপুরুষগণ ওগারে ঐ আমেরিকাকে শ্বেতাঙ্গের নব, বিচিত্র, লীলাক্ষেত্র করেছিলেন, এখনও আছে অ্যাটল্যান্টিকের অপর পারে সেই দেশ, আজ ধনে, সম্পদে, ঐশ্বর্য্যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠ। ইংরাজের নিতান্ত নিকটতম আত্মীয়,-মামাত, পিসতুত, মাসতুত ভাই ভগ্নী সব। এই অ্যাটলান্টিকের গভীর জলরাশি আছে বলেই তাদের সঙ্গে ইংল্যাণ্ডের সম্বন্ধ রাখা চলছে। অ্যাটলান্টিক বৃনের প্রাণ, গালফ, মের উষ্ণতা বয়ে এনে ইংল্যাণ্ডকে নিদারুন তুষার-শীতলতা থেকে রক্ষা করছে। আজ ইংল্যাণ্ডের সহস্র সহজ নাবিক বৃটেনের প্রাণের প্রাণ এই অ্যাটলান্টিক পথ খােলা রাখছে ভীষণ অবস্থার মধ্যে। তারপর তিনি ডাকলেন একজন নাবিককে। শ্রোতাদের বললেন, ইংল্যাণ্ডের প্রাণ পথ যারা আত্মদান করে উন্মুক্ত রাখছেন, দেশের গর্ব সেই নাবিকদেরই একজন এখন আপনাদের বলবেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা। উত্তর আটলান্টিকে শত্রু সাবমেরিন আক্রমণে কেমন করে তাদের জাজ ধ্বংশ হয়, কেমন করে তিনি জীবনতরীতে প্রায় ১৮২০ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে দিন অনাহারে অনিদ্রায় মৃত্যুর মুখােমুখী দাড়িয়ে কাটিয়েছিলেন এবং নিতান্ত ভাগ্যবশে একটি ইংরাজ রণতরী দ্বারা দৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন, সে সব কথা। নাবিক বক্তা থেমে থেমে সব কথা বলা শেষ করে, তার পর বললেন, শুধু তিনি নন, ইংল্যাণ্ডের নাবিককুলের সকলেই এ বিপদে বারে বারে জাহাজ হারিয়েও যদি বেঁচে:দেশে আসতে পারে তাে আবার সানন্দে সমুদ্রে যাবার জন্য সর্বদাই প্রস্তুত রয়েছে। রেডিও বন্ধ করে আলাে নিবিয়ে একবার বাইরে এসে ঘুমুতে যাবার পূর্বে জাহাজের স্থিতি এখন সমুদ্রের কোথায়, চার্ট রুমে গিয়ে দেখে নিলাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তখনও ভাবছি বি, বি, সি’র কথাগুলি। ওদেশের সকলেই মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে থাকলে কার কাছে বলছে কথাগুলি ? অন্ততঃ একটুও অ-সাধারণ যা তা-ই তাে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়ে থাকে ‘সাধারণের কাছে। পরে বন্দী অবস্থায় পরে বন্দী অবস্থায় যখন বহু ইংরাজ নাবিকের নিবিড় সংস্পর্শে আসি তখন এই ‘সানন্দে সমুদ্র যাত্রার’ নিছক গল্পটিরও সমস্ত তথ্যই জানতে পারি। গভীর রাতে নিদ্রার গভীরতায় আচ্ছন্ন -- জাহাজের এলার্মে ঘুম ভেঙ্গে গেল। শুয়ে শুয়েই অনুভব করবার চেষ্টা করলাম জাহাজখানা ঠিক আছে কিনা! বিছানা থেকে উঠে জামা কাপড় যথােপযুক্ত ভাবে বিন্ন্যাস করে লাইফ জ্যাকেটটা নিয়ে ঘর থেকে বেরুব, তৃতীয় রেডিও অফিসার কানাডিয়ানটি সামনে। কনভয় আক্রান্ত হয়েছে। লােকটি হাঁপাচ্ছিল। ওপরে এসে ব্রীজে দেখি কাপ্তেন এসে গেছেন। সে সময় ব্রীজের ওপর ডিউটি ছিল চিফ, নেভিগেটিং অফিসারের। তিনিও আছেন, আমি গিয়ে দাড়ালাম। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। চিফ অফিসার বললেন, “ভেরী লাইট আকাশে উঠেছিল। কনভয়ে উত্তর আটলান্টিকের রণাঙ্গনে অামাদের অপর প্রান্তে সাবমেরিন আক্রমণ হয়েছে, সেদিককার একটি জাহাজে টপিডাের বিস্ফোরণও হয়েছে। জাহাজটির কি হ’ল জানবার উপায় নাই। কিছুক্ষণ পরে, কিছু দূরে ক্ষুদ্র একটি আলােক পিণ্ড আকাশের গায়ে ফেটে পড়ে খানিকটা সময় জ্বলে, আস্তে আস্তে নিভে গেল। অশান চিতার মত সমুদ্র বক্ষে একটা জায়গায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। এবার নিশ্চয় তেলের জাহাজ। সে নে আশে পাশের সমুদ্রের ওপর আগুন ধরে গেল। ক্ষিপ্ত অ্যাটলান্টিকের বারিধি যেন তারই বুকের ওপর স্বভাব শত্রুর এ স্পর্ধা সহ্য করতে পাছিল না, তরঙ্গের পর তরঙ্গের প্রচণ্ড আঘাতে আবার অন্ধকার টেনে আনলাে। দারুণ বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, পৰ্বত প্রমাণ সমুদ্রের উচ্ছাগুলি, কে জানে কি কচ্ছে হতভাগ্য ঐ দ্বিতীয় জাহাজটির লােকগুলি। হয়তাে, অনেকেই কাল আর দিনের আলো দেখবে না। একখানা ডেস্ট্রয়ার আমাদের বঁদিক দিয়ে এসে বলে গেল লাউড স্পীকার দিয়ে, কোন জাহাজই যেন স্থান পরিবর্তন না করে। হওয়াও বিপজ্জনক। এই কুয়াসার সকলে যদি নানা দিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে পড়বারাচেষ্টা করে, পরস্পরের মধ্যে শারীরিক সংঘর্ষ হয়ে ভীষণতর অবস্থার সৃষ্টি হবে। দু’খানা করভেট একটু পরেই দেখা গেল, কনভয়ের ভেতর প্রবেশ করলাে—আরাে কিছু সম্ভবত অন্য দিক দিয়ে ঢুকেছে। এক একটি মিনিট যেন এক একটি যুগ-অন্ধকারে শােনা যাচ্ছে কেবল সমুদ্র কল্লোল, আর দেখা যাচ্ছে ফেটে পড়া ঢেউগুলির শ্বেতফেন রচিত সহ সহস্র শ্বেত-পদ্ম। চেয়ে আছি, আবার কোথায় ‘ভেরী লাইট ওঠে। আমাদের ভেরী’ লাইটগুলিও হাতের কাছেই রয়েছে । মিনিট পনের চলে গেল। নিকটেই জলবােমা ফাটছে, এক, দুই সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে তিন, চার পাঁচ ছয় সাত •• গুছি। একশ’ পৰ্য্যন্ত গুনেছিম, তার পরেও অনেকানেক জুলবােমা বিস্ফোরণের শব্দ পেলাম। করভেট গুলো সাবমেরিনগুলাের ওপর প্রতিআক্রমণ চাচ্ছে। দর্শক গ্যাটলান্টিক নিরপেক্ষ, ক্ষেপও করছে না অহঙ্কানী মানুষের হাস্যাস্পদ ক্ষীণ শক্তির স্পৰ্দা। জলবােমা গুলা মুদ্রবক্ষের কিছু নীচে গিয়ে বিস্কুরিত ছেQ, ৬.ক একটি বােনাকে কেন্দ্র করে প্রতি বিস্ফোরণ সেখান থেকে বিশিষ্ট একটি ব্যাসার্ধগঠিত বৃত্ত মধ্যগত জলরাশিকে তোলপাড় করে দানবীয় চাপের সৃষ্টি করছে। একটি বােমার বিস্ফোরণ ফলে সমুদ্রের জলমধ্যে যতদূর পর্যন্ত কার্যকরী চাপ তৈরী হয়, ঠিক ততদূর অন্তর অন্তর একসঙ্গে বহু বােমা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে সন্দেহজনক স্থানের চতুর্দিকে। এ বােম সাবমেরিনের একেবারে গায়ে ফেলবার কোন প্রয়ােজন নাই—সম্ভবও নয়। সাবমেরিনের চারিদিকে পড়ে বােমাগুলি যে সহস্র সহস্র টনের এক অভাবনীয় এবং আকস্মিক চাপ জলমধ্যে সৃষ্টি করে, তাতে জমধ্যে বৃহৎ দেহবিশিষ্ট কোন কিছুরই থাকবার উপায় নাই। এই চাপে সাবমেরিনের পরস্পর সংযুক্ত গায়ের ইস্পাতের পাত গুলি খুলে যায়, সঙ্গে সঙ্গে এই জলদৈত্যটির দেহের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহের শিরা- উপশিরাগুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। জলের নীচে সাবমেরিনের জীবন বৈদ্যুতিক শক্তি। বৈদ্যুতিক বন্দোবস্ত অচল হয়ে পড়লে তার মৃত্যু। অনেক সময় ডেপথচার্জ অর্থাৎ জলবােমা আক্রমণের পর সমুদ্রপৃষ্ঠে তিমি ও বড় বড় জন্তুকে মৃতাবস্থায় ভাতে দেখা যায়। মানুষের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধে বেচারা জলজন্তুরও পরিত্রাণ নাই । কি হ’ল কিছুই বােঝা গেল না। কনভয়ের প্রত্যেকটি জাহাজের মানুষগুলো ভাবছে এই বুঝি অন্ধকারের বুক চিরে আর এক প্রবল বিস্ফোরণ হয়, টর্পিডো আক্রমণ এবার বুঝি তাদের ওপরই হল।
উত্তর আটলান্টিকের রণাঙ্গনে সারারাত আশঙ্কা ও অপেক্ষার মধ্যে কাটল-নতুন আর কোন অবস্থার সৃষ্টি হ’ল না। কলের মত সকলেই আপন আপন স্থানে কাজ কছে। অঘটন যদি ঘটেই যায়, চব্বিশ ঘণ্টা ভাসিয়ে রাখবার জন্য কার্পাস তুলাের লাফ জ্যাকেট কলের গাশে রয়েছে। অসুবিধা কিছু নাই, শীতে আরামপ্রদও যথেষ্ট। প্রভাতের কুয়াশা কংকিং কাটলে গুনছি - কে আছে, কে নেই। পূৰ্বদি সন্ধ্যার আগে ক্ষী জাহাজের নির্দেশ অনুযায়ী পরস্পরের মধ্যে স্থান পরিবর্তনের সময় আমাদের জায়গায় যে বৃটিশ জাহাজটি গিয়েছিলো সেটিকে পাওয়া গেল না! রাত্রের দ্বিতীয় ‘ভেরী লাইট’ তারাই ছুড়েছিল। তাছাড়া আরাে ছয়টি অদৃশ্য হয়েছে। ভেরী’ লাইট দেখেছিলাম দু’বার-কনভয়কে সতর্ক করবার জন্য নিমজ্জমান জাহাজ থেকে উৎক্ষিপ্ত বিপদ-সঙ্কেত। আরগুলি হয় কুয়াশায় দেখি নাই অপবা রাত্রির অন্ধকারে যূথভ্রষ্ট ৪’য়ে পড়েছে। দু’খানা ডেস্ট্রয়ারও নেই, ক্রুজার দু’খানাও। কাল রাতের আক্রমণে সমুদ্রে পতিত নাবিকদের মধ্যে যারা এখন জলের ওপর জীবিত অবস্থায় ভাসছে বােধ করি তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে-অথবা, আর কিছু। দুপুরে, বেলা প্রায় ১টার সময় নির্দেশ এলো জাহাজগুলােকে ‘ন যযৌ ন ত’ে হয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে ভেসে থাকতে। চারখানা ডেস্ট্রয়ার এবং সেই সংখ্যক করভেট কনভয়ের সম্মুখভাগ থেকে বামদিকে প্রায় ৩০ ডিগ্রির এক কোন্ রচনা করে সেই বাহু ধরে অনেকটা এগিয়ে গেল। আরও দূরে একটি করভেট কি যেন সঙ্কেত করছিল। প্রায় একঘণ্টাকাল এভাবে অপেক্ষার পর কনভয়টিকে পূৰ্ব্ব গতিমুখের দক্ষিণদিকে একটু হেলে পড়ে এগােতে বলা হ’ল। সঙ্গে এবার কেবল একটি ডেস্ট্রয়ার যাচ্ছে। আর কোন রক্ষী রণতরী এলো না। খুব ৯৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে আস্তে ঘণ্টায় প্রায় পাঁচমাইল হিসেবে ঘণ্টা দেড় এগিয়েছি, পেছনে বাম দিকে জলবােমার বিস্ফোরণ শােনা যেতে লাগল। দেখি, সেদিকে দুটো বিভিন্ন স্থানে করভেট গুলো চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং বহু বােমা সমুদ্রমধ্যে নিক্ষেপ করছে। ডেস্ট্রয়ারগুলাে দূরে রয়েছে। প্রায় বিশ মিনিট একাজ চললাে। কিছু পরে কামান গর্জন শুছি—অদ্ভুত এক সামুদ্রিক জানােয়ার করভেট গুলো রচিত বৃত্তের মধ্যে ভেসে উঠেছে। জলবােমার ফল হয়েছে। সাবমেরিনের নাবিকেরা বােধ হয় আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু না,-মথিত জনদৈত্যটির কোনিং টাউয়ার থেকে গােলা বর্ষণ কছে ওরা। জলের নীচে আর থাকতে না পেরে ভেসে উঠেছে, পলায়ন অসম্ভব। এরাই বােধ হয় শতকরা শতভাগ নাৎসৗ। বন্দী হবে না, শেষ অস্ত্র একটি কামান এখনও আছে, শত্রুর যতদূর সম্ভব ক্ষতি করে রণাঙ্গনেই প্রাণ দেবে। এক সঙ্গে অনেক কামান গর্জে উঠল ডেস্ট্রয়ারগুলাে থেকে। অ্যাটলান্টিক মানব-নির্মিত ইস্পাতের এই বিচিত্র জলজটি গ্রাস করল। আবার চলেছে কনভয় এখনও বহুদূরবর্তী গন্তব্য লক্ষ্যের দিকে, বিচিত্র গতিতে। মানুষের জীবনধারা কনভয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। জীবনে বিশেষ লক্ষ্য আছে যাদের - শত সহস্র বিরুদ্ধ শক্তি নিয়ত চেষ্টা করে তাদের লক্ষ্যচ্যুত করতে। এমনই করে কোথাও তাদের কাউকে এড়িয়ে চলতে হবে, কোথাও অপেক্ষা করতে হবে অতি সাবধানে কিছুকালের জন্য, এবং সুযােগ বুঝে বাধা কোথাও চূর্ণ করে চলতে হবে। সামাজিক জীবনে, রাষ্ট্রনৈতিক জীবনে, ব্যক্তিগত জীবনে, সর্বত্রই কৃতকাৰ্যতা আসে এই কনভয়ের আচরণের মত। সারা প্রকৃতির এই বিধান। কোন লক্ষ্যে যাবার জন্য বাধাহীন সােজা একটানা পথ নাই। কখন এগােতে হবে, কখন পিছিয়ে পড়তে হবে, কখন পাশ কাটিয়ে যেতে উত্তর অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে হবে, স্থানবিশেষে প্রচণ্ড আঘাত পেতে হবে এবং অনুকূল অবস্থায় প্রচণ্ডতর নির্মম আঘাত দিতেও হবে। কিন্তু সম্মুখেই যাই বা পিছিয়েই পড়ি, দক্ষিণেই স’রি কি বামেই পাশ কাটাই, সৰ্ব্বদা মনে রাখতে হবে এই কনভয়ের জাহাজগুলাের মত অনির্দিষ্টকাল সমুদ্রে থাকা যাবে না, লক্ষ্যে পৌছুতে হবে কয়লা, তেল, জল, খাদ্য নিঃশেষ হবার আগে—জীবন- বৰ্ত্তিকার তেলটুকু থাকতে থাকতে। আলাে, অন্ধকারের গতি নিৰ্ম্মম-পাপ, পুণ্য, ন্যায়, অন্যায়ের অপেক্ষা রাখে না। ভীতিজনক তম না আবার অর্ধপৃথিবী আচ্ছন্ন করূছে। রাত্রির অন্ধকার আক্রমণকারীদের বাঞ্ছনীয়, দিনের আলাে আমাদের। পালা করে রাত দিন আসছে, পালা করে আমরাও আঘাত পাড়ি দিচ্ছি। অন্যায় কার, নাৎসীদের না মিত্রপক্ষের-সৌরজগতের নিয়ম ক্ষেপও করছে না। দিনের আলাের ব্যাপ্তিকাল আরও কিছু সময় প্রসারিত করে, মিত্রপক্ষের আমাদের সাহায্যও করছে না, রাত্রির অন্ধকার সঙ্কুচিত করে হিটলারের সাগরতলের দৈত্যদের বিরুদ্ধতা করার কথাও ভাবছে না। কনভয়ের গতিমুখ অন্ধকার হবার সঙ্গে সঙ্গে অকস্মাৎ ডাইনে। গতিও এখন পরিবর্ধিত। রাত্রি বারটার সময় গতিমুখ এবং গতি পুনরায় অন্য রূপ হবে। শত্রুর বুদ্ধিবৃত্তি ও উদ্যোগ উভয়ই অসাধারণ, তাই এত সাবধানতা। মাটি থেকে বেরিয়ে মাটি না ধরা পৰ্য্যন্ত চলবে কনভয়ের এই বিরামহীন, ক্লান্তিহীন ও আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন, সর্পগতি। অনন্ত সত্ত্বা থেকে উদ্ভূত হয়ে আবার সেই অনন্ত সত্ত্বাতে না ফেরা পর্যন্ত মানুষেরও বিরামহীন সর্পগতি-কৰ্ম্ম, সংগ্রাম। তার পূর্বে শান্তি কেমন করে সম্ভব? মানুষের আশা আকাঙ্গার সমষ্টির অভিব্যক্তি মানব সমাজে, সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে কি করে পূর্ণ শান্তি আসতে পারে? না, না,যতদিন সৃষ্টি আছে, মানুষ আছে, সমাজ আছে, সংগ্রামও থাকবে। সৃষ্টিতত্ত্ব সংগ্রাম। যে মূহুর্তে বহু হ’ল তখনই সংগ্রামের সূচনা। জীবনের fত্ত, গতি, সংগ্রামে। কৌপিনধারী বায়ুভুক হয়ে বেঁচে থাকবার জন্য মানুষ সৃষ্ট হয় নি। বহুর মধ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্যই মানুষ সৃষ্ট ম—আত্ম- প্রতিষ্ঠায় বা সে চেষ্টায় তার বেঁচে থাকার সার্থকতা। বিশ্বসংসারে নিয়ত সংগ্রামশীল আবেষ্টনের মধ্যে থেকেও মানুষকে বার : গ্রাম হতে বিরত থাকতে বলে, অভিসন্ধিপূর্ণ কপট তারা। আত্মপ্রতিষ্ঠা যার হয়ে গেছে, সেই চায় প্রকৃতির এই নিদারুণ সংগ্রামশীলত। ব্ধ হয়ে যাক, পতিতের অন্তর থেকে স্বাধিকার লাভের জন্য সংগ্রামে ! চিরতরে তিরােতি হােক, যেন যুদ্ধফলের অনিশ্চয়তার জন্য পতিত উথিত না হতে পারে, সংগ্রামহীন মানব-সমাজে তার নিজ প্রতিষ্ঠা চিরদিন নিশ্চিন্ত আরামে থাকে। জগতে তুলনাহীন যে প্রাচীন ভারতের ঋষিদের বংশধর আমরা, এই তাদের শিক্ষা। বিদেশী, বিধর্মী রাজশক্তির রক্তচক্ষুতে ভীত ও তার অনুগ্ৰহাকাঙ্ক্ষী ভারতের তামসিক যুগের সকল কপট জ্ঞানীদের কথিত ভারতীয় সংস্কৃতি বা ঐতীহ আত্মবান্ ভারতের নয়, অন্ধকারাচ্ছন্ন ‘দাস-ভারতের। নিকট ভবিষ্যতের ‘প্রবুদ্ধ ভারতে এই সব কপট সন্ন্যাসী ও জ্ঞানীর স্থান হবে জঞ্জালাধারে। সকাল হ’লকনভয়ের সকলেই পরের দিনের সূর্যের মুখ আবার দেখতে পেলাে। পূর্ব প্রণালীতে সারা দিনই চলছি, উল্লেখযােগ্য কিছু নেই, কুয়াশার গভীরতা ক্রমেই কমে আছে। অনেক খানি পথ এগিয়েছি আজ। শত্রুকে এড়িয়েছি, কখনও দলিত মথিত করেছি, এখন অনেকটা সােজা পথে চলছি পূর্বের তুলনায়। দুটো দিন, দু'টো উত্তর অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে ১৭ রাত্রি আরও কেটে গেল। আটলান্টিকের এই বিপুল পরিসর বারিধিতে ‘দলবদ্ধ নেকড়ে বাঘের আক্রমণ আশঙ্কা ক্রমেই ক্ষীণতর হচ্ছে। দৈবাৎ যদি দু একটির সামনাসামনি পড়া যায় রাস্তাতে, বিশেষ ক্ষতি করতে পারবে বলে মনে হয় না, সদা জাগ্রত আমাদের সঙ্গের শিকারী কুকুর করভেটগুলাের নাসিকা এড়িয়ে। ২ায় সকলেরই তাই অভিমত। আরাে দু’দিন কাল। হিসেব করছি, মৃত্তিকার মানুষ আমরা কবে আবার মৃত্তিকার মিষ্ট স্পশ পাবাে—কতদিন লাগবে নিউইয়র্ক পোঁছুতে। বি, বি, সি, ক্রমেই ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে আছে। আবাওয়াও চমৎকার, কুয়াশাও খুব কম। চিরক্ৰোধী দুব্বাস। উত্তর অ্যাটলান্টিকও কতকটা ঠাণ্ডা। রােদও উঠছে! কী সবুজ জল এ' মহাসমুদ্রের ! যেন দ্রবীভূত অকল্পনীয় সুবিশাল মরকত মণি। সে গর্ডনও নাই। বাত্যাহীন সমুদ্রে শীতের ধার এখন অনেক ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। হাতে পায়ে সূচ বিদ্ধ হচ্ছে না, কিন্তু শৈত্য গভীরতা তেমনই আছে। দিবানিদ্রার পর লেপের তলা থেকে বেরুলেই রাজ্যের শীতলতা এসে নিবিড় ভাবে আলিঙ্গন করে। তাই বিকেলে দেহের উষ্ণতা সঞ্চার করতে একটু গরম কফি খেতে মেস রুমে গিয়েছি। সুইডেনবাসী তৃতীয় ইঞ্জিনিয়ার দেখি সে রস গ্রহণে ইতিমধ্যে ব্যাপৃত রয়েছে। লােকটি চমৎকার! নাৎসী হস্তে নরওয়ের পতনের আগে থেকে অনেকদিন এ জাহাজে কাজ কচ্ছিল। অনায়াসেই যুধ্যমান জাজে না থেকে যে কোন বন্দরে সুইডিস্ কালের কাছে গেলে তাকে সুইডেনে পাঠাবার বন্দোবস্ত হতে পারতাে। কিন্তু তা করে নি। বন্ধুপ্রীতি এর অদ্ভুত। এ জাহাজের দু’একজনের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব হয়েছে, এদের ছেড়ে যাবে । নিরপেক্ষ দেশের অধিবাসী হয়েও যুদ্ধের সমস্ত বিপদ মাথায় নিয়ে রয়ে গেছে। ইংরাজী খুব ভাল বলতে পারে না, একলা কখন Sb সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ; আমার সঙ্গে গল্প করতে গেলে সময় সময় মনােভাব প্রকাশের ঠিক কথাটি খুঁজে না পেয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী করে বােঝাবার চেষ্টা করে এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজেই হেসে ফেলে। ইঞ্জিন রুমের কঠোরতা ও নীরসতার মধ্যে থেকেও সরস। চমৎকার অ্যাকডিয়ান বা বগল দোলা হারমনিয়ম বাজায়, বেহালায় ছড়ি টেনে যে শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করে, সকলেই মুগ্ধ হয়, আবার নিপুন চিত্রকর । টেবিলে তার মুখােমুখী বতেই কফির পাত্ৰাধার থেকে আমার পেয়ালায় দারুন ঠাণ্ডায় মনােরম গরম তরল পদার্থটি ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করল, আর কতদিনে নিউইয়র্ক পোঁছব জান ? “সিগারের তে আর কোন ভয় নেই, না ? সিগার অর্থ টপিডাে। দেখতে অনেকটা ঐ রকম, তাই নাবিক মহলে ঠাট্টার ছলে টপিডাে সিগার নামে অভিহিত হয় ; বােমাকে বলে ডিম, মাইকে বলা হয় ভাজা ডিম! বল্লাম, শুনিনি তাে কিছু, আর কিছু নতুন ছবি আঁকলে এর ভেতর। অস্ফুট ‘হু’ বলে টেবিল থেকে উঠে চলে গেল এবং কয়েক মিনিট পরে গােটান একটা মােটা কাগজ নিয়ে এসে বাধা ফিতেটা খুলে ফেলল। বহুবর্ণে চিত্রিত ‘আউষ্ট টপিডাের আঘাতে নিমজ্জিত হচ্ছে । আমি । বল্লম, একি অদ্ভুত খেয়াল হ’ল তােমার ? ছেলে আমাদের ধারণা ছিল, মনে পড়ে, বৃষ্টি হবে না বললে, হবে! সে ধরণের যুক্তি দিয়ে শিশুর মত নিতান্ত সরল এই যুবকটি বল, এটা একেছি তাে, দেখাে “আউষ্ট’ এর গায়ে কখন টপিডাে লাগবে না। যেন অদ্ভুত এই কথাগুলির যাথার্থ্য প্রমানের জন্যই সে রাত্রেই ভীষণ এক অবস্থার সৃষ্টি হল। কিন্তু প্রায় দুই মাস পরে বহু নাবিকের সঙ্গে আইষ্ট যখন সত্যই ধ্বংস হ’ল, ভাগ্যক্রমে ঐ লােকটিও আমার মত উত্তর অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে অক্ষত দেহে বেচে গিয়েছিলো। আক্রমণকারী নাৎসী জাৰ্মান ক্রুজারের পেটের মধ্যে বাইরের আলাে, বাতাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকার এক কারাকক্ষে বসে একে রহস্যভরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কই, তােমার ছবিই যে শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়ে দাড়াল! ম্লান মুচকি হেসে তথাপি সে বললাে, আমাদের জাহাজ তাে টপিডাের আঘাত পায়নি, ও ছবিটা হয়েছিলাে আমার কেবল সেই অস্ত্র বিরােধী। কথাট: আংশিক সত্য ! কিন্তু সমুদ্রের যে অপরূপ প্রশান্ত অবস্থায় আমাদের ওপর ক্রুজারের আক্রমণ হয়েছিলাে, টর্পিতাের আঘাত বুঝিবা ছিল ভাল, হয়তো অনেকেই বাঁচতে পারতাে। কামানগুলি থেকে নির্মম, অবিরাম গোলা বর্ষনে নাবিক কুল ৷ে ভাবে ছিন্নভিন্ন হত না। অথবা, কে বলতে পারে কি হলে ভাল হত বা হত না। রাত প্রায় দেড়টায় কোথাও কিছু নেই, জাহাজটি হঠাং আচমকা এক দিকে অনেকখানি মােড় ফিল। আকস্মিকতার বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে উঠতে তীব্র গগনভেদী বিস্ফোরণ শব্দ নিকটবর্তী আকাশ বাতাস প্লাবিত করে দিল। ক্ষীণ চন্দ্রিমার ম্লান আলােতে ব্রীজের ওপর তৃতীয় অফিসারের সতর্ক দৃষ্টি আমাদের জাহাজটিকে বাঁচিয়েছে। তার দৃষ্টি পথে আসে একটি টর্পিডাে, জলের ওপর এক শ্বেত পুচ্ছ রচনা করে নিতান্ত উদগ্রীব প্রেমভরে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। চকিতে জাহাজটিকে গতিপথ থেকে ঘুরিয়ে ফেলা হয়েছে। আমাদের পাশে পাশে ডান দিকে যে জাহাজটি যাচ্ছিল, টপিছােটা সেটাকে আঘাত করেছে। ভেরী লাইট আকাশে উঠল। অস্পষ্ট আলােকে দেখা যাচ্ছে, কতকগুলি লােক সমুদ্রের ওপর সাঁতার কাটছে। আক্রমন আমাদের দিক থেকে হয়েছে। সাবমেরিন বিধ্বংশী ৪” ইঞ্চি কামানে গােলা লাগিয়ে অপেক্ষায় আছি সাবমেরিনটাকে দেখা যায় সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে অন্য প্রান্ত থেকে আবার বিস্ফোরণ, ভেরী লাইট। আক্রমণ যেন বাম দিক থেকে দক্ষিণ দিকে সরে গিয়েছে। আকাশের বহু জায়গায় আবার সেই লাইট। করভেট, ডেষ্ট্রয়ারগুলি, দৌড়ােদৗড় কচ্ছে। মিনিট তিরিশ একেবারে নিস্তব্ধ, সমুদ্রের ওপর এখানে সেখানে আগুন জ্বলছে। মধ্যে কিছু জলবােম নিক্ষিপ্ত হ’ল নানা জায়গায় । দু’খানা ডেস্ট্রয়ার ঘুরে ঘুরে অনেক নাবিককে তুলছে জল থেকে পিছন থেকে আবার প্রচণ্ড নিনাদ—আকাশে তুবড়ীর আলো। নানা দিক থেকে উ প্যাক্ মেথড, অর্থাং নেকড়ের দল যে ভাবে আক্রমণ করে মেষপালকে, সেইভাবে আক্রমণ চছে। রক্ষী ডেস্ট্রয়ার ও করভেট গুলি বিশেষ লক্ষ্য এবার। কনভয় ভেঙ্গে গেল। দল থেকে আমরা বেগে বেরিয়ে একট! দিকে চছি । এত সতর্কতা সত্ত্বেও যখন এদের এড়াতে পাচ্ছি না, স্থির হ’ল আমরা তখন যেখানে, সেখান থেকে আর এতটুকু আঁকা বাঁকা পথে না গিয়ে, সােজা নিউইয়র্ক। সােজা পথে সময়ের মাত্রা অল্প, কিন্তু বিপদ হবার সম্ভাবনাও অধিক। তা হাে৪” ইঞ্চি কামানে সব সময় লােক রেখে এগােনো যাক। তারপর নিয়তি। ঘণ্টা দুই নিরুপদ্রবে এগিয়েছি, আবার কিসের আঘাতে জাহাজটা ভীষণ ভাবে আলােড়িত হয়ে উঠল। টপিডাে? কিন্তু বিস্ফোরণ কোথায় ? কাপ্তেন নিজে তখন ব্রীজের ওপর। জলের নীচ থেকে একটি সাবমেরিন সবে বেরিয়েছে ওপরে একেবারে আমাদের জাহাজের মুখের কাছে ; কাপ্তেন ওটার ওপর দিয়েই জাহাজ চালিয়ে দিয়েছেন। কি হ’ল দেখবার জন্য আর দাড়াই নাই, জাহাজের ল্যাজের ওপর কামানটা প্রস্তুত রেখে পূর্ণগতিতে সােজা পশ্চিমদিকে একক চলেছি। দ্বিতীয় আক্রমন আর হয় নাই, উত্তর অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে সাবমেরিনটিকেও আর দেখা যায় নাই। তাই অনুমান অসঙ্গত নয়, অ্যাটলান্টিক গর্তেই তার চিরস্থায়ী বাসের বন্দোবস্ত বােধ হয় করতে পেরেছিলাম। প্রভাতেও একই পথ ধরে চলেছি, দ্বিতীয় কাউকে চোখে পড়ছে না, কে কোথায় গেছে, কে জানে। দিন আট নয় পরে, নিউইয়র্ক থেকে আর মাত্র ৪০ মাইল দূরে এসে গিয়েছি, অ্যাটলান্টিক নিজ মূর্তি ধারণ করল। কুয়াশায় দিগন্ত আচ্ছন্ন সারাদিন, সঙ্গে সঙ্গে ঝঞ্চাবাত। দু’দিন দিনে দেখা গেল না সূর্যের মুখ, রাত্রে তারকার। জাহাজ বেয়ারিং হারিয়ে ফেলেছে, সমুদ্রের ঠিক কোথায় বুঝতে পারা যাচ্ছে না। আরো এগিয়ে যেতে ভয় হচ্ছে, পাছে উপকূলের কাছে কোন নিমজ্জিত পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ি। একই জায়গায় অনেকক্ষণ ঘুরে ফিরে ঠিক হ’লবােষ্টনের বেতারকেন্দ্র থেকে বেয়ারিং নেওয়া হবে। নিকটে সাবমেরিন যদি থাকে, থাকুক। সমুদ্রে এরূপ কূয়াস বা অন্য কোন কারণে সূৰ্য্য বা তারা না দেখতে পেলে হঠাৎ কোন জাহাজ ঠিক কোথায় আছে জানতে হলে, কাছাকাছি কোনও বেতার কেন্দ্রকে রেডিও সাহায্যে বলতে হয়, সেখান থেকে রেডিও তরঙ্গ উৎক্ষিপ্ত কতে। তাহলেই রেডিও ডাইরেক্স ফাইণ্ডার যন্ত্রের দ্বারা তরঙ্গ গুলির উৎপত্তিস্থল জাহাজের ঠিক কোন দিকে নির্ণয় করা যায়, এবং এভাবে জাহাজটি কোথায় আছে বেরিয়ে পড়ে। যুদ্ধের সময় বিপদ এই যে, সাবমেরিন কাছে থাকলে আমরা যখন বেয়ারিং নিচ্ছি, সেই যন্ত্রও কিছু বেতার তরঙ্গ উৎক্ষিপ্ত করবে, এবং সাবমেরিন এই তরঙ্গ আমরা কোন দিকে আছি টের পেয়ে যাবে।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে এতখানি পথ বেপরােয়া সােজা এসে, পাহাড়ের গায়ে আছড়ে না পড়ে আবার নিয়তির ওপর নির্ভর করে নিলাম বেয়ারিং। নিউইয়র্ক বন্দরের বাইরে এসে পৌঁছে গিয়েছি। আমেরিকান পাইলট জাহাজে উঠে বললেন, অভিনন্দন জানাচ্ছি, খুব ভাগাবান আপনারা, গত তিনদিনের মধ্যে একখানা জাহাজও বন্দরে আসে নাই। তার কাছেই শুনলাম, আমেরিকার ওপর যুদ্ধ ঘােষণার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বহু নাৎসী সাবমেরিন উপকূলবর্তী সমুদ্রে অনেক জাহাজ ডুবিয়েছে। বন্দরের ২৪ মাইলের মধ্যেও আক্রমণ চালাচ্ছে।
মিত্রশক্তির অস্ত্রগৃহে
No text on this page.
বেলা প্রায় ১০টায় নিউইয়র্কের সামনে সমুদ্র মুখ দিয়ে পৃথিবীর এই শ্রেষ্ঠ নগরীতে প্রবেশ করছি। জলের ওপর থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে এ নগরীর বিলাস ও অপরিমেয় ঐশ্বৰ্য্য। বন্দরে প্রবেশ করবার পথে পড়ে স্বাধীনতা দেবীর সুউচ্চ মৰ্ম্মর প্রতিমা, জলে একটি বেদীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেন নতুন এই ভূমিতে অভিজাত-প্রধান য়ুরােপের যে সব মানুষ গৃতের সকল আকর্ষণ উপেক্ষা করে পূর্বযুগে এখানে এসেছিলাে অতৃপ্ত আশা আকাঙ্খার পরিণতির প্রত্যাশায় তাদের পথের ইঙ্গিত। উত্তোলিত-নাসা নূনরাপীয় আভিজাত্য দেশে এদের স্থান দেয় নাই। ‘সাধারণ’-এর মধ্যকার সুপ্রচুর কর্মক্ষমতা ও উন্মুখ প্রতিভ। সেখানে বিকাশ পথে প্রচণ্ড বাধা পেয়ে ঠিকরে এসেছিলাে এই নব আবিস্কৃত বিরাট ভূভাগে। মুক্ত, নির্জন, ভূমির সুবিশাল পরিধিকে তাদের উদ্যোগ দিয়ে অপূৰ্ব্ব এক দেশে পরিণত করেছে। লক্ষ সম্ভাবনাপূর্ণ। রহস্যময়ী কিশােরী এই কুমারী মাটির সঙ্গে পৌরুষের মিলনে পৃথিবীতে ইন্দ্রপুরীর ঐশ্বৰ্য্য জন্মলাভ করেছে। বামে, দক্ষিণে, বিচিত্রা সুশােভিত দ্বীপমালা—মধ্যের জল ভাগের ওপর দিয়ে আমরা দেখতে দেখতে যাচ্ছি। একটু দূরে আমাদের দক্ষিণে আধুনিক ময়দানব রচিত এ যুগের ইন্দ্রপ্রস্থ সূর্যকিরণে ঝলমল করে উঠল কোনী দ্বীপ; নিউইয়র্কের ও আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলের লক্ষ্মীর বরপুত্র- দের গ্রীষ্মবিলাসের পুরী। নিউইয়র্কের ঐশ্বৰ্য্য কেন্দ্র মানহাট্টানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেতু ও যান্ত্রিক জলযান দিয়ে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে মানহাট্টানের গগনস্পর্শী অট্টালিকাগুলি--পরস্পরের প্রতিযােগিতা আকাশে উঠেছে। আমেরিকার প্রাচীনতর সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে অধিবাসী রেড-ইণ্ডিয়ান সর্দারদের কাছ থেকে নামে মাত্র মূল্যে ক্রীত জঙ্গলাবৃত খানিকটা খানিকটা জলাভূমি মানহাট্টান, আজ আমেরিকান অক্টোপাসের পৃথিবী ব্যাপী শুড়গুলির কেন্দ্র। সকল দেশের জন সমুদ্রের তলদেশে কত যে অমূল্য মনি মুক্তা রয়েছে, মাত্র চার শতাব্দীতে রচিত আমেরিকা ভূমি তা-ই নির্দেশ করছে। বাধাহীন অবস্থায় কৰ্ম্মা মানুষের উৎকর্ষতার নিদর্শন। বেলা প্রায় ১১টায় ব্রুকলিনের ‘পায়ারে’ জাহাজ বাধা হ’ল। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে এলেন ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মচারীগণ। ফিটফাট, কায়দাদুরস্ত সব, বিশেষ মনােযােগ দিয়ে আমাদের সকলের পাসপাের্ট পরীক্ষা করলেন; জিজ্ঞাসা করলেন, ইতিপূর্বে এদেশে এসেছি কিনা, হ্যা, ‘আলিয়েন রেজিষ্ট্রেষণ কার্ড কোথায়, দেখানাে হল, আমেরিকা ভূমিতে নামবার অনুমতি মিলল। পৃথিবীর স্বর্গভূমির’ দ্বাররক্ষক এ’র। সতর্কতার সীমা নাই, অবাঞ্ছনীয় কেউ যদি প্রবেশ করে বসে। তার ওপর বুদ্ধ কাল। নানা দেশের লােক আসছে জাহাজগুলিতে। ফ্রান্সের পৃথিবী বিখ্যাত বিশাল বিলাস জাহাজ ‘নরম্যাণ্ডি’ বন্দরে ছিল, কে বা কারা কাল পশু তাকে আগুন ধরিয়ে নষ্ট করবার প্রয়াস পেয়েছে। বহু আমেরিকানের বিচার চলছে নাৎসীদের গুপ্তচর অভিযােগে। কারাে সম্বন্ধে কিছু মাত্র সন্দেহ স্থলে, স্কুলে নামা তাে নিষিদ্ধই, পাঠিয়ে দেয় নিকটবর্তী লং দ্বীপের কারাগারে তদন্ত সাপেক্ষ। ব্রডওয়ের একটা রাস্তায় বিখ্যাত মুষ্টিযােদ্ধা জ্যাক ডেম্পসী নিজ নামে এক রেস্তোরাঁ খুলেছে। আমার কানাডাবাসী বন্ধু এবং জাহাজের কাজে সহকারী ভদ্রলােকও নিউইয়র্কে এই প্রথম এসেছেন। তার আগ্রহাতি- শয্যে একদিন জ্যাক ডেস্পসীর রেস্তোরাতে যাবার জন্য বেরুলাম।
মিত্রশক্তির অস্ত্রগৃহে ১০৭ ব্রুকলীন পােষ্ট অফিসের কাছে ফুটপাথের পাশে একটা বাড়ীর গা থেকে কয়েক ধাপ সিড়ি নেমেছে রাস্তার নীচে। নেমে দেখি, আরাে কয়েক ধাপ, এবং শেষে একটি রেল ষ্টেসন, ভূগর্ভেনিউ-ইয়র্কের সাবওয়ে বা মাটীর নীচেকার লােক চলাচলের জন্য রেলপথ প্রণালী। টাইম স্কোয়ারে যাব, কিন্তু টিকিট কে কোথায় বেচছে? অনেকেই আছে ষ্টেসনে ট্রেণের অপেক্ষায়। দুজনেই এদিক ওদিক দেখছি। কতকগুলি লােক এক একজন করে প্লাটফরমের গেটের কাছে একটি মূদ্রা যন্ত্রে পাঁচ সেন্টের একটি করে মূদ্রা ফেলে সামনের বোতাম টিপে ধরছে আর গেট খুলে যাচ্ছে একজনের বাবার মত ফাক হয়ে । আমরাও গেলাম, টিকিটের হাঙ্গামা নাই, চেকারও নাই। টাইম স্কোয়ারে পোঁছে সিগারেট কিনতে একটা মনােহারী দোকানে ঢুকেছি! সিগারেট চাইতে একটি মূদ্রা যন্ত্র দেখিয়ে দিল। আলমারীর মত সামনে পেটের কাছে ছোট্ট একটি দেরাজ বেরিয়ে রয়েছে, পাশে পয়সা ফেলবার মত একটা জানালা আর একটা বােতাম। দুটো নিকেল অর্থাৎ দশ সেন্টের টুকরাে ভেতরে গলিয়ে দিয়ে বােম টিপলাম, আল- মারীটার পেট থেকে দেরাজের মধ্যে এসে পড়ল এক প্যাকেটে কুড়িটা সিগারেট, প্যাকেটের গায়ে তিন সেন্টের তিন টুকরাে অভ্র দিয়ে সযত্নে মােড়া ফিতি পয়সা, আর বাৰুদ মাখান একটি ভারী কাগজে আঁটা কুড়িটি সিগারেটের জন্য কুড়িটি দেশালাইএর কাঠী! জানি না এত কাণ্ড না করে অন্য পাঁচ রকম জিনিষের মত এ জিনিষটা বেচতে কি অসুবিধা ! কল বিগড়ে গেলে তা-ই করে থাকে। বােধ হয় দোকানের শােভা, কারণ অনেক জায়গায় আবার এ যন্ত্রটি নাই। ডেম্পসীর রেস্তোরাঁতে প্রবেশ করে আমার বন্ধুটির এতক্ষণে চোখ খুললাে। সব জিনিষই চারগুণ দাম! বিচিত্র আলােক মালা সজ্জিত বিলাস sobr সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ভবন যেন। সযত্নচযিতা সুন্দরী পরিচারিকাদের এক ডলারের খাদ্যদ্রব্য চার ডলারে পেটে পৌছে দেবার সে কী সুমিষ্ট আগ্রহ। আমার হঠাৎ একটা চলচ্চিত্র দেখবার বিশেষ তাড়া পড়ে গেল, বন্ধুটিরও! তার সাধ মিটেছে। বন্দরে ঢোকবার সময় বাইরে থেকে যা মনে হয়েছিলো ভিতরে এসে দেখলাম অনেক কিছু গিটি করা! নিউইয়র্কের সব অধিবাসী-ই মানহাট্টানের কোটিপতি নয়। প্রাকৃতিক নিয়মে আর এক নতুন আভিজাত্যের রাজত্ব ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। যুদ্ধকাল, জনসাধারণের কাজ সবারই আছে। নতুবা অন্য সময়ে বেকার সমস্যা প্রবল হয়ে থাকে। ঠিক ভারতের সহরের বস্তীগুলির মত পশুবাসেরও অযােগ্য বস্তী অঞ্চল নেই, কিন্তু সাধারণ মানুষের বাসের জন্য ইষ্টক নির্মিত গৃহগুলি মানহাট্টান, কোন দ্বীপের সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। ব্রুকলীন অঞ্চল দেখে নিউইয়র্কের চোখ ঝলসান বন্দোবস্তে মনে হয় ব্যক্তি স্বাধীনতা দেবী নিতান্ত কুৎসিতা-জড়ােয়া গহনায় ও শাড়ীর বাহারে অঙ্গ ঢেকে রেখেছেন। বিভিন্ন ভাষা ভাষী য়ুরােপের বিভিন্ন দেশ থেকে সমাগত নর নারীতে বর্তমান আমেরিকা অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রগুলি গড়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা বলা হয়, এদেশের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ইংরাজী ভিন্ন আর সব ভাষা অচল, রাষ্ট্রবিধি অনুযায়ী। অন্য কোন দেশের কোন লােককে এদেশের নাগরিক হতে গেলে যে সব বিধি অবশ্য পালনীয়, তার প্রথম সৰ্ত্তই হচ্ছে, নিজ ভাষা সম্পূর্ণ ভুলে ইংরাজী ভাষা গ্রহণ করতে হবে গৃহেও, বাইরে তাে বটেই। বােধ হয়, প্রথম ঔপনিবেশিকদের মধ্যে বৃটিশ জাতি উদ্ভূতদেরই সংখ্যাধিক্য ছিল, তার জোরেই ইংরাজী চলেছিলাে অল্প- সংখ্যক অন্য দেশীয় যুবরাপীয় ঔপনিবেশিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা চূর্ণ করে।
মিত্রশক্তির অস্ত্রগৃহে কিন্তু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ১৩ কোটি লােকসংখ্যার অধিকাংশ কোন হিসাবেই এখন বৃটিশ রক্তে সমুদ্ভুত নয় । তথাপি জার্মান, ফরাসী, ইতালীয় এবং ইংরাজীর মি. নতুন কোন কলের গ্রহণযােগ্য ভাষা সৃষ্টির চেষ্টা দূরে থাকুক, সে কথা উত্থাপনও অপরাধজনক। জাহাজে ৰেথম, নরউই য়োন রক্তের অমেরিকানরা প্রাই মাতে। নরউইজিয়ান- দের ভাষায় কথাবার্তা বলার জন্যই শুধু এর ইংরাজী ভাষা আমেরিকান, অন্তর সে আনা নরউইজন। জাম্মান, ইতালিয়ান প্রভৃতি অন্য রক্তের আমেরিকানও তাই । কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর শাসনে মুখটি বুজে থাকতে হয় । বহু কোটি মানুসের জন্মগত প্ৰাথ মক অধিকার আপনার মাতৃভাষা বলপূর্বক ইর ক'রে, মুষ্টিমেয় ইংরাজী ভাষাভাষী ও তাদের করুণা ভিক্ষার্থী য়ুরােপের ক্ষুদ্র জাতিগুলির রক্তে গঠিত আমেরিকা। রাষ্ট্রযন্ত্র সম্পূর্ণ করতলগত রেখেছে। এই ভাষার একত্বের জন্যই অনিগ্ধ সাধারণ আমেরিকাবাস: অনেক সময় ইংল্যান্ডকে জাতিয়ের দেশ বলে ধারণ করে, অন্য জাতির তুলনায় ইংরাজকে নিকটতর আত্মায় মনে করে। ব্যক্তি স্বাধীনতা তাই আসলে হয়ে দাড়িয়ে, একটি বিশিষ্ট জাতি মুদ্ভূত কতকগুলি লােকের দ্বারা অন্য রক্তোদ্ভূত আমেরিকানদের ভাষা ও পিতৃ পরিচয় ধ্বংশ করার স্বাধীনতা। বুদ্ধের সময় সময় এই সযত্নে আবরিত আসল তথ্যটি নগ্নরূপেই চার্চিলের মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল, যখন তিনি ইংরাজী ভাষাভাষী দেশগুলির দ্বারা পৃথিবী শাসনের স্বপ্নে বিভাের হয়ে পড়লেন, এখনও আছেন। আমেরিকাবিলাসী এদেশের একশ্রেণীর নির্বোধের অযথা সে দেশে উল্লন লক্ষ্য করেই এত কথা বললাম।
১১০ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে বর্তমান শতাব্দীর মধ্যেই আমেরিকার জনসংখ্যা ত্রিশ কোটিতে নিয়ে যাওয়া সেখানকার সমাজপতিদের প্রােগ্রাম। অনেক পত্রিকায় এ বিষয় বহু প্রবন্ধ লক্ষ্য করছি । ম্যা প্রােডাকসন্ প্রজনন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করার উদ্দেশ্য ও বেশ পরিষ্কার বােঝান হত। নতুবা ঘুমন্ত বিশালদেহ প্রাচ্য দৈত্যটির বুকের ওপর বসে চিরকাল নৰ্ত্তন চলবে না। তার ঘুম ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ইংরাজী ভাষাভাষীদের পৌত্র প্রপৌত্রকুলে ধরাব ছেয়ে যাক! তখন আমেরিকার একজন বৃদ্ধ সিনেটর তার উনিশ বর্ষ বয়স্কা সুন্দরী তরুণী সেক্রেটারীর ওপর পাশবিক অত্যাচারের অভিযােগে অভিযুক্ত হয়েছিলো, ৯৪২ এর ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকে। সব সংবাদপত্রে বড় বড় হরফে বেরুতে ‘মৃত্যুদণ্ডেপযুক্ত অভিযােগে সিনেটর অভিযুক্ত। নব অভিজাত শ্রেণীভুক্ত এই লােকটির বৃদ্ধা স্ত্রী প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন স্বামীকে ইলেকটিক চেয়ার থেকে বাঁচাতে। মেয়েটির বাড়ীতে গিয়ে অভিযােগ সত্য বলে প্রমানিত হলে যে তার স্মামীর মৃত্যুদণ্ড হবে, সে কথা বলে চেষ্টা করেছিলেন যাতে সে দয়া হয়ে অভিযােগ প্রত্যাহার করে। কিন্তু সরকার পক্ষ জানতে পেরে সে চেষ্টার পথ রুদ্ধ করে। কি হলাে শেষ পর্যন্ত, জানি না। তার আগেই নিউইয়র্ক ছাড়ি। আমেরিকার অনেক রাষ্ট্রে স্ত্রীলােকের ওপর পাশবিক অত্যাচার প্রাণদণ্ডে দণ্ডাহ। প্রাচীন ভারতের রীতি তবে বিংশ শতাব্দীতেও চলতে কোন বাধা নাই! এদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইন প্রণয়নের সময় মনে রাখা দরকার। পাল হারবারের জাপানী আক্রমণের বিস্ময় ও বেদনায় তখন আমেরিকার জনসাধারণ আচ্ছন্ন। সমুদায় প্রশান্ত মহাসাগরের সর্বত্রই জাপানীরা দাবানলের মত বিস্তৃতি লাভ করেছে। জাতির মনে আত্ম- D ।
মিত্রশক্তির অস্ত্রগৃহে ১১১ প্রত্যয় দৃঢ় রাখবার যে নীতি পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রই অনুসরণ করে, আমেরিকান গভর্ণমেন্টের সেই নীতির ফলে আমেরিকাবাণী চিরদিন শুনেছে ও বিশ্বাস করেছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী জাতি তারা, কেউ কখন আক্রমণের কথা ভাবতেই পারে না। 'আমেরিকা আক্রমণ অর্থ, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রাটের স্বার্থ যেখানে যেখানে আছে সে সব স্থানও। ক্ষুদ্র জাপান যে তাকে কোনদিন প্রকাশ্যে এমন আঘাত দিতে পারে বা সে ক্ষমতা জাপানের আছে, কোনদিন তারা কল্পনাও করে না। বিশেষ করে যুদ্ধের শুরু থেকেই আমেরিকাবাসার শুছিতাে, প্রশান্ত মহা- সাগরের রণতরী বহর প্রয়ােজন হলে জানকে শায়েস্তা করার পক্ষে যথেষ্ট, যেমন আজকাল আণবিক বােমার জুজুর ভয় দুনিয়ার সবাইকে দেখান হচ্ছে। রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা এমন কথাও অনেকবার বহুভাবে বলেছিলেন, জাপান যদি হঠকারীতা করে যুদ্ধে এসে পড়ে, এই শতশালী নৌ-বহর তিন সপ্তাহের মধ্যে তাকে নক্ অফ, ফ’র দেবে। প্রশান্ত মহানগর সম্বন্ধে আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। আমেরিকার রাষ্ট্রকর্ণধারদের উক্তিতে ও ব্যবহারে স্পষ্ট দেখা যায়, সুস্থ আত্মপ্রত্যয়ের পরিবর্তে দুর্জয় অভিমান ও অার তাদের গ্রা করেছিলাে। তাই জাপানী আক্রমণের সম্ভাবনা সম্বন্ধে বৃটেনের সে সময়ের রাষ্ট্র-তরণীর কর্ণধারের মানসিক উদ্বেগ নিবারণের জন্য প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বলেছিলেন, পূর্বোক্ত মহাশয় ব্যক্তি যেন এ বিষয়ে বৃথা চিন্তা করে শরীর নাশ না করেন ! সুদূর প্রাচ্যের দুর্বিনীত বালকটির পিঠ চাপড়ে দেবেন, যেন বেয়াদবী না করে বসে। মধ্যে মধ্যে তাই প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধের সম্ভাবনার কথা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলেও, আমেরিকাদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিলাে, এতে গুরুত্ব তেমন কিছু নেই। যুদ্ধ যদি হয়-ই, নাবালক প্রাচ্য জাতি গুলির ১১২ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে মধ্যে অকালপক্ক এই পীত শিশু অকস্মাৎ যদি আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ রূপ ছেলেমানুষী করে বসেই, পাল হারবার থেকে কিছু রণতরী টোকিওতে গিয়ে ওদের কান মলে দিয়ে এলেই চলবেজাপান যে এত শীঘ্ৰ সত্যই শেষ পর্যন্ত গুরু মারা বিদ্যা প্রয়ােগ করে সারা এসিয়াটাই গ্রাস করতে চাইবে, আমেরিকার জনসাধারণ কল্পনাও করে নাই। সেজন্য, একদিন সকালে উঠে যখন শুনল পাল হারবারে জাপানী আক্রমণের কথা, তারা বিস্মিতই হয়েছিলাে। সে আক্রমণের তীব্রতা ও নির্মমতা যে কতখানি, সে দিন তাদের জানানাে হয় নাই। তথাপি, ক্রমে অতি অল্পকালের মধ্যেই আমেরিকানরা জানতে পারলো, ঐ আক্রমণ নেহাৎ শিশুর হঠকারীতা নয়। দিনের পর দিন, সকাল থেকে সন্ধ্যে পৰ্য্যন্ত, জাপানীদের কর্ণমর্দনের পরিবর্তে তারা শুছিল অভূতপূৰ্ব বিদ্যুৎ গতিতে জাপানী অগ্নি সারা প্রশান্ত মহাসাগর বক্ষে ছড়িয়ে পড়ছে, জাপানী মেরিন অর্থাৎ নৌ-সৈন্যেরা একটির পর একটি করে এই মহাসাগরের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হেলায় আয়ত্ত করে ফেলছে। স্বভাবতই আমেরিকার সকল দিক থেকে এক প্রশ্ন জাগল ‘আমেরিকার নৌবহর কোথায় ? ‘বিপুল শক্তিশালী প্রশান্ত নৌ-বহর কি কচ্ছে।” নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে রাষ্ট্রনায়কদের রেখে ঢেকে বলতে হ’ল, ‘বিশ্বাস- ঘাতকতাপূর্ণ জাপানী আক্রমণে পার্ল হারবারে এ বহরের সর্বনাশ ঘটেছে। প্রতিশােধ নাও। আমি নিউইয়র্কে পৌঁছি ১৯শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৪২ সালে। ইতিমধ্যে, কেবল প্রশান্ত মহাসাগর নয়, ভারতবর্ষ ও চুকিং চীন ছাড়া এশিয়ার প্রায় সকল ভূখণ্ডই পূৰ্ব্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব ভাগে জাপানী অধিকারে এসে গিয়েছে। ইন্দোচীন, মালয়, থাইল্যাণ্ড জাপানের কুক্ষিগত। ব্রহ্মের সীমান্ত অতিক্রম করে টেনে হেইকার সৈন্যদল স্বর্ণপ্যাগােডার দেশে মিত্রশক্তির অস্ত্রগৃহে প্রবেশ করেছে। আমেরিকার বিখ্যাত সংবাদপত্রগুলি ইংল্যাণ্ডের নিৰ্বদ্ধিতা ও অকৰ্ম্মণ্যতা সম্বন্ধে অনেকানেক প্রবন্ধে পরিপূর্ণ। সিঙ্গাপুরের পতন সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধের লেখক লিখেছিলেন, যুদ্ধের পূর্বে শান্তির সময় নাকি জনৈক সিঙ্গাপুরস্থিত আমেরিকান সংবাদদাতা সিঙ্গাপুর রক্ষার বে-বন্দোবস্ত সম্বন্ধে একটি প্ৰন্ধে বলেছিলেন, যদিও সমুদ্ৰবক্ষ বা সম্মুখভাগ দিয়ে কোন আক্রমণ হলে, প্রতিরােধের ভাল ব্যবস্থা বর্তমান, পশ্চাদ্ভাগ বা মালয় উপদ্বীপের ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আক্রমণ হলে প্রতিরােধের কোন ব্যবস্থা এখানে ছিল না। তাই এদিক দিয়ে এই বিখ্যাত নৌ-দুর্গ আক্রমণের সম্ভাবনা উপেক্ষা করা যায় না। প্রবন্ধটা সামরিক বিষয়। সুতরাং, রাতি অনুযায়ী, আমেরিকার কাগজগুলিতে পাঠাবার পূর্বে সেন্সর হবার জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছিলো। সিঙ্গাপুরের তালীন সামরিক কর্তৃপক্ষ নাকি সেই সংবাদদাতাটিকে বলেন যে তার কথাগুলি অর্থাৎ মালযের ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কোন শত্রু কর্তৃক সিঙ্গাপুর আক্রমণ এত উদ্ভট, যে তারা সেই সামরিক প্রবন্ধ আমেরিকায় পাঠাতে অনুমতি দিলেন। লেখক নিজেই এই অসম্ভব ব্যাপারের সম্ভাবনার কথা বলে হাস্যাস্পদ হন বিজ্ঞ সমাজে। মালয় উপদ্বীপে জাপানী আক্রমণের সময় স্থানীয় জনসাধারণ নাকি দেশের ভেতর থেকে আক্রমণকারীদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিলো। কথার উল্লেখ করে নিউইয়র্কের বিশিষ্ট সংবাদ পত্র গুলি লিখছিল, ইংরাজ বণিকদের ও মালয়ের অন্য শ্রেণীর ইংরাজদের নীচতা, অসাধুতা ও লােভের জন্য মালয়বাসীরা এত উত্ত্যক্ত হয়ে উঠেছে, যে জাপানীদের সাহায্য করেছে এই গৃধতা থেকে বাঁচার জন্য। জানিনা, প্রবন্ধগুলাে পড়ে বিলাতের সংবাদপত্রগুলাে আবার ফিলিপাইন সম্বন্ধে কিছু লেখার চেষ্টা করেছিল কিনা!
১১৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে জেনারেল পার্টিভালের সিঙ্গাপুরে ফোর্ডের কারখানায় জাপানী সেনাপতি ইয়ামাসিতার কাছে আত্মসমর্পনের দৃশ্যটি, ভগবান জানেন ওরা কি করে পেল, অথবা সত্য কিনা, এই দুই সেনাপতির মধ্যে হুবহু কথাবার্তাগুলি একটি কাগজে দেখেছিলাম। মর্মার্থ হচ্ছে, পার্সিভাল ইয়ামাসিতার কাছে এসে চান যুদ্ধবিরতি কিছু সময়ের জন্য, যাতে ইতিমধ্যে বিলাতের বড়কর্তাদের সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলতে পারেন। কিন্তু ইয়ামাসিতা কঠোরভাবে তাঁকে সেই মূহুর্তে বৃথা বাক্যব্যয় না করে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। বলেন, আমি দুটো শব্দের কেবল একটি শব্দ শুনতে চাই—“হ' বা ‘না’। পার্সিভাল মৃদু কণ্ঠে বলেন, ‘ই’! জ্ঞাতির দুর্গতি জ্ঞাতি যেন উপভােগ করছিল ! ‘গালভরা বৃটিশ সাম্রাজ্য, সূৰ্য্য যেখানে অস্ত যায় না,---এর জীবন কাঠি এবং মরণ কাঠি যে সম্পূর্ণরূপে এখন আমেরিকার ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর, জনসাধারণ সম্পূর্ণরূপেই বুঝেছিলাে এবং বেশ একটু মােলায়েম আত্মতৃপ্তি লাভ কচ্ছিল ! কতকগুলি কাগজে স্পষ্টই লিখছিল, ইংল্যাণ্ডের অদূরদর্শীতা, কাপুরুষতা এবং বিশ্বগ্রাসী লােভর জন্যই আজ জাপানীরা বাড়বানলের মত এত দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করেছে। সঙ্গে সঙ্গে ফিলিপাইনে আমেরিকান সৈন্যদের বীরত্ব কথা এবং ফিলিপিনাে স্কাউটদের জাপানী ঘৃণা ও মৃত্যুপণ যুদ্ধের কথা প্রচারিত হচ্ছিল। কিন্তু বৃথা পরস্পরের মধ্যে কথা কাটাকাটিতে তাে জাপানীদের অগ্রগতি রুদ্ধ হবে না। তাই সারা আমেরিকায় ভােলা হ’ল এক ধ্বনি-পাল হারবারের প্রতিশােধ নাও।” ‘পীত আক্রমণ রােধ কতে সমস্ত আমেরিকান একত্রিত হও। নতুবা, আমেরিকা পৰ্যন্ত জাপানী আক্রমণ প্রসারিত হতে পারে। রাস্তা, ঘাট, রেস্তোরা, প্রেক্ষাগৃহ, সর্বত্র এক মিত্রশক্তির অক্সগৃহে ১১ গান, ‘মনে রেখে পাল হারবার। মেয়েদের বুকে আঁটা, মনে রেখাে পাল হারবার। আমেরিকার সর্বত্র তখন এক বাণী, ‘মনে রেখাে পাল হারবার। এই একটি ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে সমস্ত আমেরিকা এক হয়ে গেল। যে লিণ্ডবার্গকে তাঁর জাৰ্মানপ্রিয়তার জন্য, আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রনীতিতে ইংরাজ নীতির সমর্থক প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, ‘সর্প’ নামে প্রকাশ্যে অভিহিত করেছিলেন এবং লিণ্ডবার্গও রুজভেল্টকে ঐ ধরণেরই আর এক বিশেষে সম্ভাষিত করেছিলেন—সেই লিণ্ডবার্গ রুজভেল্টকে ব্যক্তিগত চিঠি দিলেন, এখন হ’তে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে প্রেসিডেন্টের হাতে ছেড়ে দিলেন। পীত মানুষগুলির সঙ্গে যুদ্ধে এই বিখ্যাত বহু ক্রোড়- পতি বৈমানিক বিমান বিভাগে পাইলট রূপে যােগ দিতে চাইলেন। পৃথিবী বক্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্য অবিনশ্বর রাখবার নিতান্ত হাস্যাস্পদ চেষ্টায় আমেরিকার যে উপদলটি জার্মানীর সঙ্গে ইংল্যাণ্ডের যুদ্ধের শুরু থেকে আমেরিকাবাসীদের প্রভাবান্বিত করতে চেষ্টা করছিল ইংল্যাণ্ডের পক্ষে যুদ্ধে যােগদানের জন্য, এবং কিছুতেই কৃতকার্য হতে পাচ্ছিল না, পাল হারবারে পীত আক্রমণ মন্ত্রের মত সে কাজ সমাধা করল। ছয়মাস আগে যখন এই আমেরিকায় আসি কানাডা যাবার পথে, তখন দেখে- ছিলাম কয়েকটি পত্রিকায়, আমেরিকার য়ুরােপের যুদ্ধে যােগদানের কোন সম্ভাবনার বিরুদ্ধে কী তীব্র সমালােচনা! রিডার্স ডাইজেষ্ট নামে একটি ম্যাগাজিনে বেরিয়েছিলাে এই কথাগুলি—“হিটলার ১০০০ বৎসর পৃথিবীতে জার্মানীর আধিপত্য চালাতে চায় ; আমাদের কর্ণেল নক্স ১০ বৎসরের জন্য ইংরাজকে সপ্ত সমুদ্রের আধিপত্য দিতে চান। তাহলে দু’জনের পার্থক্য কেবল সময়ের পরিমাণে।” কর্ণেল নক্স যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন।
১১৬ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে আর আজ ছয়মাস পরে, বিভিন্ন য়ুরােপীয় রক্তসমুদ্ভুত আমেরিকার জনমত সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ। বিজাতীয় ঘৃণা তাদের একসূত্রে গ্রথিত করে ফেলেছে। মৃত্যুশয্যায়, পিতামহ ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে রাজনীতির উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দুরাত্মারা চটৎকারশীল বহ্নির নায় সদা জাগরূক থাকে। জাতির এই মানসিক অবস্থার সুযােগ নিয়ে অমনি নিউইয়র্কের বহু প্রচারিত এক শ্বেত-সাম্রাজ্যবাদী পরিপােষক সংবাদপত্র সম্পাদকীয় প্রবন্ধে একদিন জাপানীদের প্রায় ভারতের দ্বার পর্যন্ত অভিযান সম্বন্ধে লিখলো, বাইরের এই সংঘাতে ভারতবর্ষের বাদামী রংএর জাতিগুলির চোখ খুলে গিয়ে শ্বেতের প্রভুত্ব ও শ্বেতকর্তৃক পৃথিবী ভােগ দখল বিপন্ন হবে! কথাগুলিতে নাবালকের দায়িত্ব নেবার বিরক্তিকর ভণ্ডামী নাই, আছে জাতি ও বর্ণবিদ্বেষের বীভৎস নগ্নরূপ ; আমেরিকান রাষ্ট্রনীতির খােলাখুলি কথা। ভারত ‘প্রবুদ্ধ’ হলে যে পৃথিবীতে চিরতরে চক্র- বিশেষের অত্যাচার ও স্পর্ধা স্তব্ধ হয়ে যাবে, সেই ভীতি; অন্ধকারের ত্রাস প্রভাতের সম্ভাবনায়। ১৩ কোটি আমেরিকানকে কি ভাবে মুষ্টিমেয় কতকগুলি ষড়যন্ত্রকারী ঘৃণিত বিষে দূষিত করে, তার একটি দৃষ্টান্ত। জাতিতে জাতিতে সম্বন্ধ শেষ পর্যন্ত জাতিগুলির রাষ্ট্রনীতির দ্বারাই স্থিরীকৃত হয়, ব্যক্তি বিশেষদের পতিতের জন্য শুভেচ্ছার কোন মূল্যই নাই। বরং, এই সব শুভেচ্ছায় পতিতের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামে আমেরিকার কাৰ্যকরী সাহায্যের জন্য প্রচার কাৰ্য, নিছক মস্তিষ্ক প্ররােচনা ছাড়া আর কিছু নয়। পাল হারবারের প্রতিশােধ নেবার জন্য একদিকে সৃষ্টি হল বুজোপযােগী বিপুল ও তীব্র ঘৃণাভাব, অন্যদিকে চললো সুবিশাল রণসজ্জা মিত্রশক্তির অস্ত্রগৃহে ১১৭ নির্মাণের নিখুত ব্যবস্থা। কেবল চীৎকারে, বা নৰ্ত্তনে, বা বাণী আউড়ে শত্রুর বেয়নেটের ধার ভাতা হবে না। অস্ত্র চাই, যুদ্ধের এ অবস্থায় নিরুপদ্রবে অস্ত্র নির্মাণ কেবল আমেরিকাতেই, শত্রুর বােমাবর্ষী বিমানগুলির নাগালের বাইরেই সম্ভব। আমেরিকাকে হতে হবে ‘মিত্রশক্তির অন্ত্ৰগৃহ। অমানুষিক ঘৃণাকে ধ্বংশকার্যে নিয়ােগে অস্ত্রের জেন। সুচিন্তিত, সুসংবদ্ধ এবং শান্ত কর্মপদ্ধতিতে ১৯৪৪এর মধ্যেই সুবিশাল আমেরিকান্ কারখানাগুলিকে যথেষ্ট কামান, বন্দুক, বিমান, জাহাজ, রণতরী, ট্যাঙ্ক প্রস্তুত করে ফেলতে হবে। তারপর সুরু হবে ‘আসল যুদ্ধ বা প্রতি আক্রমণ’, যখন প্রতি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি শক্ত কামান, ট্যাঙ্ক, বিমানের বিরুদ্ধে আসবে তার তিনগুণ, চারগুণ তেমনই অস্ত্র, এই ‘মিত্রশক্তির অস্ত্ৰগৃহ হতে। তথাপি সে এখনও কিছু দূরের কথা। ইতিমধ্যে পূর্ব উপকূলে জার্মানীর সাবমেরিনগুলি আমেরিকাকে তার ঘরােয়া সমুদ্রেই ঘিরে রেখেছে। অ্যাটলান্টিক তীরবর্তী বন্দর গুলিতে নিয়মিত আর জাহাজ চলাচল হতে পাচ্ছে না। কানাডার নদী বিশেষের মধ্যে ঢুকেও নাৎসী সাবমেরিন আক্রমণ চালিয়েছে। ওয়েষ্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের বৃটিশ ও আমেরিকান নৌ-ঘাঁটির নাকের কাছে এসে ভেসে উঠে য়েকটি দ্বীপে এই সাবমেরিন কামান চালিয়ে গুলবর্তী তেলের ডিপাে প্রভৃতি ধ্বংস করেছে। প্রত্যহই জাহাজডুবির খবর আসছে। এত কাছে, যে একদিন একজন আমেরিকান গল্প কমতে কমতে বলে বসলাে, কোন দিন শুবাে স্বাধীনতা প্রতিমা নাৎসীরা ভেঙ্গে দিয়ে গেছে! আমাদের জাহাজের আট দশ জন নরউইজিয়ান নাবিক স্কটল্যাণ্ডের শীথ বন্দরে এ জাহাজ ছেড়ে অন্য একটি জাহাজে কাজ নেয়। পুরােনাে জাহাজ, টপিডো লাগলে বেশীক্ষণ টিকবে না, তাই নতুন ১১৮ সও সমুদ্রের রণাঙ্গনে জাহাজে গিয়েছিল। একদিন সকালের কাগজগুলিতে দেখি, এদের মধ্যে দু’জনের ছবি বেরিয়েছে এবং যে বিপদের মুখ থেকে এরা বেঁচে উঠেছে সেই বিবরণ। নিউইয়র্ক থেকে মাত্র ১০০ মাইলের মধ্যে এদের নতুন জাহাজটির টপিঁড়াে আক্রমনে সমুদ্রসমাধি হয়। জাহাজের প্রায় বার জন নাবিক একটি জীবন তরীতে উঠে তখনকার মত রক্ষা পায়। জীবন তরীতে আহাৰ্য্য ও জল ছিল যা’, দু’দিনেই শেষ হয়। তারপর বাতাবিক্ষুব্ধ অ্যাটলান্টিকের ওপর ভীষণ ঠাণ্ডায়, অনাহারে, অনিদ্রায় ও জলাভাবে একে একে এই দু’জন ছাড়া আর সকলেই মারা যায়। হাঙ্গর সমাকীর্ণ সমুদ্রে বন্ধুদের মৃতদেহগুলি সমুদ্রে ফেলে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই কিভাবে এই হিংস্র সামুদ্রিক মৎস্যগুলি টুকরাে করে ছিড়ে খাচ্ছিলাে সে দৃশ্য এরা দেখেছে। মাছগুলি এই শেষ দু’টি মানুষের জন্য অবিরাম জীবন তরীটির আসে পাশে কিলবিল কছিল। নিদারুণ বিভীষিকার মধ্যে অবশেষে প্রায় দিন দশ পরে উপকূলরক্ষী একটি জাহাজ এদের ভাগ্যক্রমে দেখে মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে। এ অবস্থায় আমেরিকায় একটা সন্ত্রস্ত ভাব থাকা খুবই স্বাভাবিক। ঠিক সেই মূহুর্তে প্রশান্ত ও আটলান্টিক এই উভয় মহাসাগরে এবং গৃহের সামনেই পীত ও নাৎসী স্পর্ধা দমন করবার যথেষ্ট শক্তি দেশের অক্ষমতা থেকে অবসাদ এসে জন সাধারণকে গ্রাস না কতে পারে, তাই নিয়ত নানাভাবে বলা হত, অতি নিকট ভবিষ্যতে আমেরিকায় বিরাট অস্ত্র সজ্জা সম্ভাবনার কথা। প্রবন্ধে, গল্পে, চিত্রে, ইথার তরঙ্গে, পাশাপাশি চলছিল ‘পাল হারবার এবং শত্রুকে অবশেষে মন্ত্র সংখ্যায় অভিভূত করবার জন্য আমেরিকাকে যে ‘মিত্রশক্তির অগ্রগৃহে পরিণত করা হচ্ছে, সেই কথা। এই অস্ত্রগৃহের প্রোগ্রাম ছিল ১ লক্ষ ২০ হাজার বিমান ও ৮ হাজার ট্যাঙ্ক। নাই।
মিত্রশক্তির অস্ত্রগৃহে ১১১ তখনও পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রেইংল্যাণ্ডে, আফ্রিকায়, কুষিয়ায়, ভারতবর্ষে—এখান থেকে বহু অস্ত্র শস্ত্র যাচ্ছিল। আমাদের জাহাজও বােঝাই হ’ল নব-নির্মিত বহু ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য যুদ্ধোপকরণে, ডেকের ওপরও বাদ নেই। সেখানে রাখা হ’ল বহু সহস্র গ্যালন পেট্রলের পিপে। সব জাহাজকেই তখন অন্য জিনিষের সঙ্গে কিছু কিছু সময়- সভার বহন করতে হত। আমেরিকার অ্যাটলান্টিক তীরবর্তী বন্দরগুলি থেকে এ সব যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে যারা দক্ষিণ আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর পথে আফ্রিকা, পারস্য বা ভারতবর্ষের দিকে যেত, তাদের ‘কনভয়ে’এ পৌঁছে দেওয়া হত না। পৃথিবীর সকল সমুদ্রে কনভয় নেবার মত রক্ষী জাহাজ মিত্রশক্তির নাই । একে একে এই পােত- গুলিকে দুস্তর বারিধি বক্ষের বিভিন্ন স্থান দিয়ে গন্তব্যস্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হত। কিছু কিছু, যত কমই হাে’ক, গিয়ে পৌছুবে। যতদিন পর্যন্ত যথেষ্ট শক্তিশালী বিভিন্ন প্রকারের রণতরী ও বিমান আমেরিকার জাহাজ নির্মাণের ইয়ার্ড ও কারখানাগুলি থেকে বেরুতে পাচ্ছে, দ্বিতীয় উপায় নাই। বহু ক্ষতি স্বীকার করেও মিত্রপক্ষের দেশগুলির মধ্যে সমুদ্রপথে যােগাযােগ রাখতে হবে। রুশিয়া বা অন্যান্য রণাঙ্গনগুলিতে যে পরিমাণ অন্ত্রশস্ত্র জলপথে নাৎসী ব্যুহ ভেদ করে পৌছুচ্ছে, তার সামরিক কাৰ্যকারীতা বিশেষ তেমন কিছুই নয়। বিশেষ করে কুশিয়ার যুদ্ধ- ক্ষেত্রগুলির অভাবনীয় ধ্বংসলীলার মধ্যে দু চারশ’ আমেরিকান ট্যাঙ্ক বা বিমানের মূল্য সমুদ্রে গােষ্পদের মত। অস্ত্র সরবরাহের জন্য আমেরিকার মুখাপেক্ষী হলে রুশিয়ার নেতৃবর্গকে ১৯৪১ সালের মধ্যেই, ইউরাল পর্বতের পূর্বপ্রান্তে গিয়ে নাৎসীদের বিরুদ্ধে নব প্রণালীতে যুদ্ধের আয়ােজনে ব্যাপৃত হ’তে হত। প্রকৃতপক্ষে, সসাভিয়েট আমেরিকার সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে মুখাপেক্ষী ছিল না; ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকাই সােভিয়েটের দিকে চেয়ে ছিল। ফ্রান্সের মত ত্বড়িৎগতিতে সােভিয়েটের পতন হলে, আমেরিকা প্রস্তুত হবার অবকাশ একেবারেই পেত কিনা, সে সম্বন্ধে যথেষ্টই সন্দেহ আছে। তথাপি যতটুকু যুদ্ধ সরঞ্জামই শেষ পর্যন্ত আমেরিকার বন্দরগুলি ছেড়ে সমুদ্রপারে বিভিন্ন দেশগুলিতে গিয়ে পৌঁছুক না কেন, জাহাজ চলাচল বন্ধ করা চলতে পারে না। উপকূলবর্তী সমুদ্রগুলিতে নাৎসী সাবমেরিনগুলিকে দমনের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ না করা পর্যন্ত কিছু সময়ের জন্য সমুদ্রপথের ব্যবহার একেবারে ত্যাগ করলেও সামরিক দিক দিয়ে বিচাতে বিশেষ ক্ষতি হত না। কিন্তু এর ফলে, মিত্রপক্ষের দেশগুলির জনসাধারণের মধ্যে আসত চরম নৈরাশ্য । তারা ভাবত, চূড়ায় পরাজয় প্রায় এসেই গিয়েছে। পরে, উপযুক্ত মূহুর্তে অস্ত্রসজ্জার আয়ােজন সম্পূর্ণ হলে আর এদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস আনা সম্ভব হত না। অপর দিকে, এ সংবাদ নাৎসী জগতের মানুষগুলির মধ্যে এনে ফেলতে আরাে বেশী উৎসাহ, উদ্দীপনা ও যুদ্ধজয়ে প্রগাঢ় নিষ্ঠা। তাই সমুদ্রপথ যেমনই হােক না কেন, নাবিকদের জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবেই, সাবমেরিন দমনের ব্যবস্থার জন্য অপেক্ষায় থাকলে চলবে না।
পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে
No text on this page.
৫ই মার্চ ১৯৪২, আমাদের যাত্রার দিন ঠিক হ'ল। বন্দরে জাহাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই এসে তাদের শুভেচ্ছা জানালেন, নিরাপদে যেন কেপটাউন পৌছতে পারি। সকলেই দেখি আমাদের মুখের দিকে বেশ একটু অনুকম্পার দৃষ্টি নিয়েই চেয়ে আছে ! সেদিনই সকালের সংবাদ পত্রে খবর বেরিয়েছে নিউইয়র্ক থেকে মাত্র দশ মাইল দূরে সাবমেরিন আক্রমণে একখানি জাহাজ নিমজ্জিত হয়েছে ; নাবিকদের কোন খবরই নাই। আমাদের জাহাজের অনেক অফিসার এখানে এই জাহাজের কাজ ছেড়ে দিল। তারা এ দিকটার চেয়ে এখন উত্তর অ্যাটল্যান্টিক গামী জাহাজই পছন্দ করল। তাদের দৃঢ় ধারণা, ভারত বর্ষের দিকের সমুদ্র এখন উত্তর অ্যাটলান্টিকের চেয়েও বিপজ্জনক। কারণ, শেষােক্ত সমুদ্রে জাহাজগুলি রণতরীর রক্ষণাবেক্ষণে কনভয়এ বায়—দক্ষিণ অ্যাটলান্টিক ও ভারত মহা সাগরে সে সুবিধা নাই, তখন পর্যন্ত ছিল না। কোন পথ দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়া হবে, তাই নিয়ে জল্পনা কল্পনা হচ্ছে। নবাগত চীফ অফিসার একদিন বল্লেন, আমরা উপকূলের পাশ দিয়ে দিয়ে যাব দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা পর্যন্ত। তারপর ওখান থেকে দক্ষিণ অ্যাটলান্টিক পার হয়ে ওপারে কেপটাউন। কিন্তু আগেই বলেছি, রাস্তার কথা কারুরই বন্দরে বসে জানবার উপায় নাই, নৌ-বহরের কর্তৃপক্ষ ভিন্ন। বিভিন্ন জায়গা থেকে যুদ্ধের ফলে যে সব জাহাজ ডুবির খবর আসে, সুবৃহৎ সমুদ্রের মানচিত্রের গায়ে সেই সেই বিশিষ্ট স্থান চিহ্নিত করে তারা একটা আন্দাজ করে নেয় সাবমেরিণ আক্রমণ সাধারণত কোন জায়গাগুলােতে হচ্ছে। একক যে সব জাহাজ অ্যাটলান্টিকের অপর প্রান্ত থেকে নিরাপদে এসে বন্দরে পৌছুচ্ছে সেই ১২৪ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে সব জাহাজের কাপ্তেনদের নৌ কর্তৃপক্ষের কাছে দিতে হয় পথের খবর ; রাস্তায় কোন প্রকারের আক্রমণের মুখ থেকে বেঁচে এলে সমুদ্রের ঠিক সেই স্থানটি দ্রাঘিা রেখা ও অক্ষাংশ দিয়ে বােঝতে হয়। যুদ্ধকালে ইথার তরঙ্গ থাকে সমুদ্রের ওপর নীরব, নিথর অর্থাৎ কোন জাহাজই রেডিও ব্যবহার করেনা যােগাযােগ রাখার জন্য , কারণ, আগেই বলেছি। তবে এসব জায়গায় কোন জাহাজ আক্রান্ত হলে সে সংবাদ রেডিও সাহায্য জানাতে পারে। রেডিওতে শত্রুপক্ষের জাহাজের কোন গন্ধ পেলে সে কথাও জানাতে হয়। এভাবে কতকগুলি জাহাজের দেওয়া তথ্য থেকে বিচার করা হয় সমুদ্রের কোন স্থান তখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। ঠিক বন্দর ছাড়বার আগে কাপ্তেনের কাছে নির্দিষ্ট পথটির খবর একট: খামে মুড়ে দেওয়া হয় শীলমোের করে। গভীর সমুদ্রে গিয়ে এই শীলমােহর ভেঙ্গে পথের সন্ধান বার করা হয়। বেলা আটটায় জাহাজ ধীরে ধীরে ব্রুকলিনের ‘পায়ার’ ছেড়ে গােল সমুদ্রের দিকে রওয়ানা হ’ল। মানহাটানের, ফেনী দ্বীপের সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে এলাম স্বাধীনতা দেবীর কাছে। সকলেই চেয়ে আছে এই অপূর্ব নগরীর দিকে। কে আবার কবে আসবে জানা নাই। বন্দরের বাইরেই হয়তাে কে কোথায় জলের তলায় ওঁৎ পেতে আছে। গত কয়েকদিনের মধ্যে পৃথিবীর এই প্রান্তে যাদের নাবিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তাদের কথাই মনে হয় বার বার। এমনি করে আরও কত জাহাজ মিত্র পক্ষের জন্য যুদ্ধের সরঞ্জাম নিয়ে এই বন্দর ছেড়েছিল, যুদ্ধাস্ত্র রণক্ষেত্রে আর গিয়ে পৌঁছুতে পারে নাই—নাবিকেরাও মাটির মুখ দেখে নাই। যতক্ষণ মাটি দেখা গেল, চেয়ে রইলাম। তারপরে ধীরে ধীরে নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ গগনস্পশী অট্টালিকা এম্পায়ার ষ্টেট বিল্ডিং দিগন্তের পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ আটলান্টিকের রণাঙ্গনে অন্তরালে অন্তর্হিত হ’ল। দি চক্ৰবালে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিম অ্যাটলান্টিকের তরঙ্গরাজি বুকের ওপর ক্ষুদ্র শিশু আমাদের এই জাহাজটিকে আবার উন্মত্ত স্নেহভরে চুম্বন দিতে দিতে অস্থির করে তুলল। যাওয়ার সময় পাইলট পুনরায় তার শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেন, আমরা নাকি খুবই ভাগ্যবান। পূৰ্ব্বেকার আক্রমণগুলির কথা তিনি জানতেন । কয়লার জন্য প্রথম আমাদের যেতে হবে ওয়েষ্ট ইণ্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের সেন্টটমাস দ্বীপে। সমুদ্রের ওপর দ্বিতীয় আর কোন জাহাজ দেখতে পাওয়া যাচ্ছেনা। কোন ধরনের যুদ্ধ পােতও না ! আকাশে উপকূলবর্তী সমুদ্রের ওপর আমেরিকার দু'একখানা বিমান ঘুরে বেড়াচ্ছে, যদি কোথাও কোন সাবমেরিনের চিহ্ন দেখতে পায় । ঘণ্টা পাঁচেক বাদে আর বিমানও নেই। গভীর সমুদ্র এসে পড়েছি। জাহাজ কোন পথে যাচ্ছে জানতে পাশে চার্ট রুমে গেলাম—নিউইয়র্ক থেকে সােজা ডানদিকে পূর্বমুখে প্রায় ৪০০ মাইল গিয়ে তারপর সেখান থেকে ঘুরে দ্বিতীয় একটি সরল রেখায় সেন্টটমাস । অর্থাৎ নিউইয়র্ক- সেন্টটমাসের ওপর টানা একটি সরল রেখাকে ভিত্তি করে বহিঃ সমুদ্রে একটি ত্রিভূজ আঁকলে, ত্রিভুজের অপর দুই বাহু ধরে আমাদের যেতে হবে। সেই দুই বাহুই নৌ কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট আমাদের গােপন পথ। সুতরাং বােঝা যাচ্ছে, ত্রিভুজের ভিত্তির কাছাকাছি জলরাশি বিশেষ বিপজ্জনক। সােজা পথে না গিয়ে তাই এই বন্দোবস্ত। রাত প্রায় আটটায় প্রথম এস্ ও এস পেলাম। সেই মূহুর্তে পশ্চিম অ্যাটলান্টিকে একখানা জাহাজের ওপর সাবমেরিন আক্রমণ হচ্ছে, টপিটে জাহাজটিকে আঘাত করেছে। ব্রহ্মাণ্ডের ইথার তরঙ্গ উদ্বেলিত করে সমুদ্র বক্ষে কতগুলো নিরুপায় লােকের সাহায্যের জন্য আর্তনাদ, এস ও এস। হিসেব করে দেখা গেল, আক্রমণ স্থান আমাদের কাছ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে থেকে বহু দূরে, প্রায় মেক্সিকো উপসাগরের কাছে। যে পথে চলছিলাম আমরা, সেই পথেই চলতে লাগলাম। জাহাজটি ব্রেজিলের। এ যুদ্ধে ব্রেজিল নিরপেক্ষ। তবুও নাৎসী সাবমেরিন তাকে আক্রমণ করেছে। বােধ হয় তাদের মতে, জাহাজটি যখন আমেরিকাগামী তখন নিশ্চয়ই আমেরিকার জন্য মালও বহন করছে। মানুষের ব্যবহারােপযােগী যে কোন ব্যবহারােপযােগী যে কোন জিনিষই এ যুদ্ধে সময়ােপকরণ তালিকাভুক্ত হয়ে পড়েছে। খাদ্যদ্রব্যেরও পরিত্রাণ নাই। নেপােলিয়ন অনুসৃত নীতির ফলে ইংল্যাণ্ডে খাদ্যদ্রব্য যেতে না পারায় সেখানে যে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি হয়েছিল, নেপােলিয়ন নিজেই সে সঙ্কট থেকে ইংল্যাণ্ডকে বাঁচান সেখানে খাদ্যসম্ভার যেতে দিয়ে। নতুবা পৃথিবীর ইতিহাস আজ হয়তাে অন্যরূপ লেখা হত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে শত্রুর দেশে অনাহার, দুর্ভিক্ষ, সৃষ্টি করা হয়ে উঠেছে রণনীতি গভীর নিশীথে, রাত প্রায় দুটোর সময় দ্বিতীয় আর্তনাদ আর একটি জাহাজ থেকে। সেও উপকূলের কাছে, আমেরিকার জাহাজ। দু’আনাই নিশ্চয় আমেরিকার বন্দর অভিমুখী। নতুবা উপকূলবর্তী সমুদ্র পথে যাচ্ছে কেন? বােধ হয় পূর্বে উপকূল দিয়ে যাবার নির্দেশ পেয়ে এরা বেড়িয়েছিলাে, এর মধ্যে সে পথ হয়ে উঠেছে নাৎসী সাবমেরিনদের বিহারস্থল। আমেরিকার বন্দরে না পৌঁছান পর্যন্ত নতুন পথের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। ক্যারিবিয়ান সমুদ্রও হয়ে উঠেছে নরক। প্রায় পাচটার সময় ওখান থেকেও পেলাম সেই আর্তনাদ। সারা দিন অপেক্ষায় আছি, আবার কোথায় কে ডাকে। যার সঙ্গে দেখা হয় কাজের ফাকে এক প্রশ্ন, কাছাকাছি সাবমেরিন আছে কি? না, সেদিনটা নিরুপদ্রবেই গেল, রাত্রিও। আমেরিকার উপকুল থেকে বহুদূরে এসে পড়েছি, প্রায় তিনশ মাইল পূবে। পথটা তবে পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে ১২৭ নাৎসীরা ধরতে পারে নি এখনও। রাত্রে হাসাহাসি করছিলাম, নতুন দ্বিতীয় অফিসারের একটা উক্তি নিয়ে। অন্ধকারে আমার কাজের ফাকে ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে এই সব কথাই হচ্ছে, চীফও এসে যােগ দিয়েছে, দ্বিতীয় অফিসার বলে উঠল, দেখ না, এই অন্ধকারে আমরা কত সঙ্গোপনে যাচ্ছি, ঠিক যেন চোর ! বেলা প্রায় দেড়টায় আবার, আমাদের রক্ষা কর, টর্পিতােতে জাহাজ মারা পড়েছে—আর এক মর্মভেদী আৰ্তনাদ। মানচিত্রের ওপর প্যারা- ল্যাল রুল বসিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাড়াতাড়ি নির্ধারিত হ’ল আমাদের কাছ থেকে কতদূরে, কোন দিকে। প্রায় ১৫০ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে ! আবার এ দিকটাতেও শুরু হয়েছে ! কে কাকে বাঁচাবে? নৌ কর্তৃপক্ষের নির্দেশ, কাছাকাছি বিপদ ঘটলে অন্য কোন সমুদ্রবিহারীর সেখান থেকে দূরে যেতে হবে। তাদের ভাবনা আমাদের ভাবতে হবে না, আমাদের চিন্তাও কাউকে করতে হবে না। আজিকার দিনে নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য যুদ্ধসম্ভার স্থলের রণক্ষেত্রগুলির জন্য নিয়ে চলেছি, সাধ করে একে শত্রুমুখে নিয়ে বাবার কোন প্রয়ােজন নাই। প্রতি রণাঙ্গনে পরাজয়ের কালিমা বহন করতে হচ্ছে এই নব যুদ্ধ সম্ভারের অভাবে। যতদূর সম্ভব বাঁচিয়ে চলতে হবে এগুলােকে। খালি হাতে প্রতিদ্বন্দীর সঙ্গে যুদ্ধ, সেটা ভারতবাসীই করুক। এদের প্রয়ােজন অস্ত্র, আরও অস্ত্র। সাবমেরিনগুলি এখন কেবল টর্পিতােই নয়, শক্তিশালী কামানও ব্যবহার করছে। হতভাগ্য যদি কেউ সমুদ্রে পড়ে কিছুকাল বেঁচে থাকে, ভাগ্যে থাকলে তাদের রক্ষা করবে রণতরী বা বিমান যদি কাছা- কাছি থাকে। না হলে••••• জাহাজের গতিমুখ ঘুরে গেল। একটু আগে বা এইমাত্র যেখানে বিপদ ঘটেছে অন্য কারাে, সেখান থেকে দূরে যাচ্ছি পরিপূর্ণ গতিতে।
১২৮ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ভােরের দিকে কাপ্তেন জিজ্ঞেস করলেন, দ্বিতীয় কোনও সংবাদ পাওয়া গেছে নাকি? দুপুরে আমরা মােড় ফিরলাম দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে, সেন্টটমাসে যাবার ত্রিভুজের দ্বিতীয় বাহু ধরে। কাল রাতে একটু অন্য দিকে ঘুরে এখন পর্যন্ত সে পথেই চলতে থাকায় এই দ্বিতীয় বাহুটি আর একটু দৈর্ঘ্যে বেড়ে গেছে। আরাে দুদিন কাটল। নিরামিষ নয় ; সাবমেরিন আক্রমণের খবর অনেকটা নিত্য নৈমিত্তিক স্বাভাবিক ব্যপার হয়ে উঠেছে। সবগুলিই ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে, আমাদের কাছ থেকে দূরেই। আশ্চৰ্য্য ! একখানা রণতরী দেখলাম ন। বহু কথিত আমেরিকান নৌ বহরের। নিশ্চিন্ত নির্ভয়ে জলদৈত্যগুলি সমুদ্রবিহার কচ্ছে, পশ্চিম অ্যাটলান্টিকে আমেরিকার ও বৃটেনের নৌ কেন্দ্রগুলির সামনে। প্রতি ত্রিশ মিনিট অন্তর রেডিও বিভাগকে পাশের চার্ট রুম থেকে দেওয়া হচ্ছে জাহাজের তৎকালীন স্থিতি-দ্রাঘিমারেখা ও অক্ষাংশের সংযােগ স্থল। চুড়ান্ত মূহুৰ্ত্ত যদি এসেই পড়ে, যেন সময় থাকতে সরে যেতে পারে সে স্থান অভিমুখী অন্য জাহাজগুলি। আকাশ পরিষ্কার। দুরে একখানি বিমান দেখা গেল, যুক্ত রাষ্ট্রের রণতরী বিভাগের। আমাদের কাছে এসে আলাের সাহায্যে মসের সঙ্কেত প্রণালীতে জানতে চাইল, নিমজ্জিত কোন জাহাজের কোন নাবিক আমরা পথে পেয়ে তুলেছি না কি? ক্যারিবিয়ান সাগর, মেক্সিকো উপসাগর, পশ্চিম আটলান্টিক, মধ্য অ্যাটলান্টিক, নাৎসী সাবমেরিনে ছেয়ে গেছে। এতদূরে, জাৰ্মানীর সাবমেরিন ঘাঁটিগুলি থেকে বহু হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে এসে এরা কেমন করে সমান ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, বিস্ময়ের বিষয়।
পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে কোথায় পাচ্ছে এরা তেল, জল, আহাৰ্য্য প্রভৃতি? কে দিচ্ছে ? মিত্র শিবিরে বহু প্রকারের সম্ভাবনার আলােচনা হয়। মেক্সিকোর উপকূলবর্তী ঘন জঙ্গলগুলিতে নাৎসী অর্থে পুষ্ট সে দেশের ষড়যন্ত্রকারীরা বােধ হয় এ কাজ কচ্ছে ! দক্ষিণ আমেরিকার ল্যাটিন রাষ্ট্রগুলির মধ্যে নাৎসী সহানুভূতিশীল কেউ কোন বন্দরে সাবমেরিনগুলির জন্য কোন বন্দোবস্ত করেছে কি না, কে জানে? ইংল্যাণ্ড ও আমেরিক! এদের সকলকেই সন্দেহের চক্ষে দেখছে। কিন্তু নির্দিষ্ট স্থির সিদ্ধান্তে মিত্র পক্ষ আসতে পাচ্ছিল না। সে তথ্যের সন্ধান পাই বন্দী হয়ে। নাৎসী রেভিও রােম থেকে, বার্লিন থেকে, ক্রমাগত উপহাস করে চলেছে, বলছে, আমেরিকানরা তাদের কারখানাগুলিতে প্রভূত পরিমাণ যুদ্ধোপকরণ প্রস্তুত করবার ক্ষমতা রাখে জানি, কিন্তু সেগুলাে তৈরী হচ্ছে সমুদ্রগর্ভে যাবার জন্যই! পৃথিবীর কোন যুদ্ধক্ষেত্রে আসতে হচ্ছে না। তৎসঙ্গে ব্যঙ্গের ধার বাড়িয়ে বলছে, আমেরিকা প্রস্তুত করবে, আমরা ধ্বংশ করবাে। যে অর্থে, যে পৰিশ্ৰমে একটি জাহাজ ও ট্যাঙ্ক, বিমান, কামান, গুলি, তৈরী হবে, তার সহস্ৰভাগ কম অর্থে, পরিশ্রমে, একটি টপিডাে, গােটা কয়েক গােলা, সেগুলির অকাল পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটাবে। কারখানাগুলি থেকে বেরুতে লাগবে যেগুলির চার মাস বা ছ’ মাস, পাঁচ মিনিটেই সাবমেরিনগুলি তাদের অতলে পাঠাবে। হিটলার নিজে আমেরিকানদের সম্বন্ধে ইতি পূর্বে বলেছিলেন, আমেরিকান্ প্লে-বয়রা অর্থাৎ আমেরিকার বাবুর দল শিল্পী ভাল, কিন্তু যুদ্ধের কি জানে? আমেরিকার বৃহৎ শিল্পের উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে জার্মানীর ধ্বংশাত্মিক শক্তির ঘাের প্রতিযােগিতা। শেষােক্ত শক্তিই যেন বিজয়ী সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে হচ্ছে! দিবা রাত্রিতে এত জাহাজ ডুবছে, কি লাভ এদের সমুদ্রে পাঠাবার, সবাই ভাবি। সেন্টটমাস পৌছে দেখি, তিনখানা ক্রুজার রয়েছে নৌ ঘাঁটিতে ঝকঝকে তকতকে অন্ত্রসজ্জায় সুসজ্জিত! সকলের মুখে এক কথা, এই যে কত জাহাজ, কত নাবিক মারা পড়ল নিতান্ত অসহায়ের মত এই কদিনের মধ্যে, এক দিনও তাে দেখিনি এদের কাউকেই বিপজ্জনক সমুদ্রের কোন অংশে। সমুদ্রগুলাে যেন একেবারেই নাৎসী অধিকারে চলে গিয়েছে। ছােট এই দ্বীপটির একটি কাফেতে বসে অন্য একটি ইংরাজ জাহাজের কয়েকজন অফিসারের সঙ্গে এই সব কথা হচ্ছিল। ভূমধ্য সাগরে ঘরের কাছে ইতালীয় নৌ বহরের কাপুরুষতায় নাবিক মহলে বিপ করে বলা হত, স্কচেরা ভালবাসে হুইস্কি, জার্মানরা বিয়ার, আর ইতালিয়ানদের প্রীতির বস্তু পাের্ট ! অর্থাৎ যুদ্ধ এড়িয়ে এরা বন্দরের নিরাপদ আশ্রয় পছন্দ করে বেশী! তবে কি ইতালীর পাের্ট প্রতি আমেরিকাতেও সংক্রামিত হ’ল না কি! সেন্টটমাসের ক্রুজার- গুলি তখন আমাদের কাছে মনে হচ্ছিল রণতরী নয়, আমেরিকানদের লােক দেখান এক বিলাস সামগ্রী। সেন্টটমাস থেকে দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের মাঝামাঝি পথ ধরে সােজা আমাদের কেপ টাউন যাবার কথা। সে রাস্তাতেও সেই একই নাৎসী আক্রমণ, আর নাৎসী আক্রমণ। দিন চার পরে এসব খবর আর তত পাচ্ছি না, দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকে এসে গিয়েছি। চীফ ইঞ্জিনীয়ার হঠাৎ বলে বসলেন কয়লা নিতে হবে পারনামবুকো । ব্রেজিল) থেকে। তাই, যেতে হ’ল সেখানে। যুদ্ধের আবহাওয়ার অনেকটা বাইরে, আবার সেই সহজ সাবলীল শ্যামাঙ্গ মানুষগুলি, বন্দরের সীমানা থেকে দূরে, খােলা প্রান্তরে ছােট ছােট পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ আটলান্টিকের রণাঙ্গনে ১১ কুঁড়েগুলি। ছােট প্যান্টে কোন ভাবে লজ্জা নিবারণ করে নগ্নদেহ, নগ্নপদ, বালকেরা গ্ৰীয়ে জল ক্রীড়া করছে জাহাজের চারদিকে। জলের নীচে টাকা পয়সা ছুড়ে ফেলতে বলছে, ওরা বাহাদুরী দেখায় গুলি তুলে এবং এই তামাসা দেখিয়ে আমাদের আনন্দ দেবার পারিশ্রমিকস্বরূপ আত্মসাৎ করে। এখানেও দেখি একখানা আমেরিকান ক্রুজার দু'দিন ধরে আছে। বড়র সঙ্গে বড়র যুদ্ধে ছােটর সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা অসম্ভব। নতুবা, নিরপেক্ষ দেশের বন্দরে যুধ্যমান জাতিগুলির কোন পক্ষের রণতরী আশ্রয় দেওয়া আন্তর্জাতিক নীতিবিরুদ্ধ। কিন্তু মরাে ডটিন তাে আছেই, নাৎসী ও জাপানীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য বুদ্ধ সৰু হবার পর থেকে আর একটি নতুন জিনিষ সৃষ্টি হয়েছে সেখানকার রাষ্ট্র বিভাগ থেকে কর্ডেল হা-এর ‘হেমিসফেরিক ডফেন্স' নীতি বা গােটা আমেরিকা মহাদেশটিকে, দে - কথায়, তাদের প্রয়ােজনে অ্যাক্সিস শক্তিগুলির সঙ্গে যুদ্ধের জন্য ব্যবহার নীতি। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য, নাৎসী প্রভাব যদি কোথাও থাকে দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলির মধ্যে, উচ্ছেদ করতে হবে। এমন কথাও বলা হল, পশ্চিম আফ্রিকার ‘ডাকার’ থেকে নাৎসীরা সহজেই ব্রেজলে এসে চেপে বসতে পারে এবং কিছুকাল পরে সেখানে একটি নিখুত সমর ব্যবস্থা পরিপূর্ণ করে শেষে যুক্তরাষ্ট্র বিজয়ে সহজেই অগ্রসর হতে পারে। বালিন অবশ্য বল, ঠিক তনয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে নাৎসী আক্রমণের জুজুর ভয় দেখিয়ে কাৰ্যতঃ প্রতিবেশী দুৰ্বল রাষ্ট্রগুলিকে হাতের মুঠোর ভেতর এনে এদের প্রাকৃতিক ধনসম্পদ সব নিজেদের যুদ্ধ কাজে লাগান ! ব্রেজিল সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের মধ্যে এসে গিয়েছে, তাই বুঝি ব্রেজিলের জাহাজগুলি ভােবান হচ্ছে। ব্রেজিলও একটু পরে এইসব ব্যাপার নিয়ে যুদ্ধ ঘােষণা করে দিল নাৎসীদের বিরুদ্ধে।
১৩২ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে দক্ষিণ আমেরিকার সব রাষ্ট্রই যুক্তরাষ্ট্রের মােড়লী মানতে প্রস্তুত নয়। ক্ষুদ্র চিলি ধানি লঙ্কা, বলে, নিজের দেশের পররাষ্ট্রনীতি কি হবে সে নিজেই বুঝবে, সাম খুডাের অভিভাবকত্বর দরকার নাই। আরাে কতকগুলি রাষ্ট্রেরও সেই মনােভাব। পরিষ্কার বলছিলােও সে কথা। কিন্তু আমেরিকার ক্রুজার এখানে কি কচ্ছে? আমেরিকার নগরী- গুলিতে দেখেছি সুচারু করে রাস্তা, ঘাট, গৃহ, সব সাজাবার প্রয়াস। যেন নেহাৎ নিউইয়র্ক-এর ‘ব্রডওয়েতে রাখা সম্ভব নয় বলে সমুদ্রের ব্রডওয়ে সুশােভিত করতে পাঠান হয়েছে । ব্রেজিলের বন্দরে ও সেন্ট টমাসে নিশ্চিন্ত আরামে দিন কাটাচ্ছে। কোন জাতির, কোন নাবিকেরই সেদিন আমেরিকার রণতরী বহরের ওপর শ্রদ্ধা ছিল না-ওয়াসিংটন থেকে কিছু বলা হলেই সবাই বলত, “ইয়াঙ্কি ব্লাফ বা আমাদের কলকাতার চাল! দু’বৎসর পর, আবার এই আমেরিকাই হ’ল সকলের বিস্ময়! উপযুক্ত ব্যবস্থায় ও সুপ্রচুর সমবােপকরণে জ্জিত সেই ‘আমেরিকান বাবুই পয়ে উঠল দুর্ধর্ষ ও সাহসী শত্রু! মানুষগুলি বদলায় নাই--সুচারু ব্যবস্থা মানুষের স্বাভাবিক দোষগুণগুলিকে কার্যকরী করে তুলেছে। এরই নাম নেতৃত্ব! ২৮শে মার্চ ১৯৪২, ব্রেজিল ছেড়ে বেড়িয়ে পড়লাম। যত শীঘ্র সম্ভব গভীর সমুদ্রের দিকে যাচ্ছি। ব্রেজিলের উপকূলের কাছে নাৎসীরা অনেকগুলি জাহাজ ধ্বংশ করেছে। ভাের রাতে এস্ ও এস্ পাওয়া গেল, বিপত্তিস্থান সেই ক্যারিবিয়ান সমুদ্র। পেছনে-বহু দূরে আমাদের কাছ থেকে। আপন পথেই যাচ্ছি, পথ বদলাবার কোন প্রয়ােজন নাই। আরাে দু'তিন দিন কেটে গেল। পেছনের ঘটনাগুলি ক্রমেই একটা স্মৃতি হয়ে উঠছে—উৎকণ্ঠা দূরে যাচ্ছে। রেডিওর যে তরঙ্গগুলি কেবল পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ আটলান্টিকের রণাঙ্গনে জাহাজ গুলির জন্য সমুদ্রে ব্যবহৃত হয় সেগুলাে স্থির, নিথর। এতটুকু শব্দ কোথা থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। কী চমৎকার নীল সমুদ্র, নীল আকাশের নীচে এই উষ্ণ মণ্ডলে। উত্তর আটলান্টিকের সে উন্মত্ততা নাহ, কুয়াশা নাই। বক্ষের শিশুটির এতটুকু আঘাত না লাগে, পরম স্নেহভরে রেখেছে। সমুদ্রের জলে তরঙ্গ ই-কম্পনের এতটুকু রেখা পৰ্যত নাই। দিবসের গ্রীষ্মে কাজ আছে যাদের, খালিগা: বা সামান্য কিছু গায়ে ধীরে সুস্থে কাজ করে, কৰ্ম্মহান যারা, নিশ্চিন্ত আরামে ঘুমায়। সন্ধ্যায় মৃদুমন্দ সামুদ্রিক বাতাস দিবসের উষ্ণতার ক্লান্তি সযত্নে দূরে ঠেলে দেয়। সমুদ্র দেখি, ওপরে আকাশে কোটি কোটি দীপমালা জ্বলে ওঠে, নাচে প্রশান্ত অচঞ্চল বারিধি বক্ষ। যুদ্ধের কোন কথাই মনে থাকে না। মাটি হতে, লােকালয় হতে, মানব সমাজের কল্লোল হতে বহু দূরে, কল্লোলহীন এই সমুদ্রে আকাশের গায়ে উজ্জ্বল ও অনুজ্জ্বল তারাগুলি কি কথা যেন বলে, বুঝেও বুঝে ওঠা যায় না। ক’মাসের একটানা সাবমেরিন, টর্পিডাে, বিমান, বােমা ও সমুদ্রের ক্ষিপ্ততার পর পরম শান্তিপূর্ণ এই প্রশান্ত আবহাওয়ায় সকলেই গা ঢেলে দিয়েছে। দুশ্চিন্তা দূরে গিয়েছে। লাইফ জ্যাকেট ওয়ার্ডরােবে উঠেছে। কেপটাউনে পৌছুতে এখনও প্রায় বারদিন বাকী। সেই কথাই হয়, বিচিত্রা আফ্রিকা এ সময়ে চোখের সামনে ভাসে। কেপটাউনে পৌছে দিনগুলাে কেমন করে কাটাবে, জল্পনা কল্পনা করে ওরা। আমি ভাবি, আর কতদিন লাগবে ভারতে পৌঁছুতে। সকলের ইচ্ছা, কেপটাউনে বেশ কিছু দিন, মাসখানেক হলেই ভাল হয়, কোন ছুতাে নিয়ে জাহাজ থাকে, আমার ইচ্ছা, যত কম সময়ের মধ্যে ওখান থেকে কলম্বাে বা বােম্বে মুখে পাড়ি দেওয়া যায় ।
সপ্ত সমুজের রণাঙ্গনে প্রত্যহ দিন গুনি, আর কতদিন আছে। ইংল্যাণ্ডের ওয়ালজেণ্ড থেকে বাড়ীতে কেবল করেছিলাম, উত্তর পাইনি, বােধ হয় জবাব আসবার আগেই ইংল্যাণ্ড ছেড়েছিলাম। নিউইয়র্ক থেকে আবার খবর নেবার চেষ্টা করি, তারও ফল হয়নি। ভারত সম্বন্ধে বিশেষ একটা আশঙ্কা। ব্রহ্মে জাপানী এসে পড়েছে কলকাতার কি অবস্থা, কে জানে? নৌ- কর্তৃপক্ষের আঁকাবাঁকা কষা পথে, জাহাজের মন্থর গতিতে, বিরক্তি ধরে যায়। ক্যাবিনে বসে নিজের রেডি ও’তে শুনিডাঙ্গায় কি হচ্ছে । প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আমেরিকান জীবন প্রণালীর কথা; যুদ্ধের পরে পৃথিবীতে রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার কথা ; চাচ্চিলের ইংরাজী ভাষাভাষী জাতিগুলিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর জাতিগুলিকে নিয়ে এক রাষ্ট্রনৈতিক সৌরমণ্ডল গঠনের স্বপ্ন। ইঙ্গ-আমেরিকান সূৰ্য নির্ধারিত কক্ষ গুলিতে পৃথিবীর আর সব জাতিকে ঘুরে বেড়াতে হবে যতদিন পৃথিবী আছে এই ধরণের সব কথা শুনলাম । চাচ্চিল লােকটাকে খুব পছন্দ হয়, সােজাসুজি ইংরাজ জাতির মনের কথাটা খুলে বলে, বিভ্রান্ত করে না। অপরকে সাবধানই করে দেয়। হঠাৎ একদিন শুনি, বি, বি, সি, ডাকছে ‘হ্যালাে ইণ্ডিয়া’! বিশ্বাস হ’ল না, আবার ভাল করে কান খাড়া করে রইলাম। আবার ‘হ্যালো ইণ্ডিয়া’- সম্পূর্ণ নতুন এ। বি, বি, সির তালিকায় বরাবর দেখেছি, আমেরিকার জন্য প্রােগ্রাম, দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য প্রােগ্রাম, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ডের জন্য, কিন্তু ভারতের জন্য একটা বিশেষ প্রােগ্রাম কোনদিন ছিল না। জানি না অন্য ভারতবাসী কেউ এতে ক্ষুন্ন হয়েছেন কিনা কখনও, আমি হইনি। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। জ্ঞাতি জ্ঞাতির সঙ্গে সম্বন্ধ রাখছে। অ-ভারতীয় স্লেচ্ছ জাতিগুলির সঙ্গে অন্ততঃ আমি তাে রক্তের সম্বন্ধ পাতাতে চাই না।
পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে ১৩৫ কিন্তু হঠাৎ আজ ভারতকে ডাকছে কেন? চিরকালই দেখেছি, এরা সকল কথায় ভারত ও আফ্রিকাকে বন্ধনীতে উল্লেখ করে। অর্থাৎ কৌশলে ব’লা—আফ্রিকার নিগ্রো ও জগতের শ্রেষ্ঠ আৰ্যজাতি এক-ই। নীচ যদি উচ্চ ভাষে সুবুদ্ধি উড়ায় হেসে-কোনদিন গ্রাহও করিনি ও সব কথা। কিন্তু হঠাৎ কি হল ? উন্মুখ হয়ে রইলাম, কি বলে। মানচিত্র থেকে যাকে একেবারে লুপ্তপ্রায় করা হয়েছে, অকস্মাৎ তারই ওপর এত প্রেম? বক্তা ভারতবাসীকে বােঝাচ্ছেন, পূর্ব দিকের পীতবর্ণের মানুষগুলি যে কী ভীষণ, তাই। ইংল্যাণ্ডের ও ভারতের বিপদ যে একই, বহু শূন্যগর্ভ শব্দ রচনা করে বােঝাবার চেষ্টা হ'ল। ভারতের ঐতীহের কথা স্মরণ করে বােধ হয় বক্তার দু’চারখানা রুমালই ভিজে গেল । সর্বশেষে পরিষ্কার বলা হ’ল ভারতীয়দের জাপানী আক্রমণ রুদ্ধ করতে । কথাগুলি যেন কেমন লাগল । স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে ছেলেবেলায় পড়েছি, ইংরাজের প্রতাপের ভয়েই পৃথিবীর অন্যান্য শ্বাপদ জাতিগুলি ভারতবর্ষকে গ্রাস করতে পাচ্ছে না। প্রাচীনত। নিবন্ধন ভারত নাবালক হয়ে পড়েছিলো, তাই করুণাময় করুণা করে ইংরাজকে এদেশে পাঠিয়েছেন আমাদের রক্ষা করতে, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে। এ কি শুছি আজ? বৃদ্ধশিশু ভারতকে ইংল্যাণ্ড বলছে, জাপানীদের হটাতে ! আর একদিন শুনলাম রুজভেল্ট আমন্ত্রণ করেছেন এক ভারতীয় নেতাকে ওয়াসিংটনে ভারত সমস্যা আলােচনা করতে এবং ব্যক্তি ও জাতিবিশেষের ওপর তার ব্যক্তিত্বের প্রভাবে এ সমস্যা সমাধানের আলােচনায়। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির যে কোন সময় আত্মচেতনা ফিরে পাওয়া দস্যজাতিদের কাছে সমস্যা বটে; কিন্তু আমাদের সেটা কিসের সমস্যা বুঝতে পারলাম না।
সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে আবার শুনছি কষিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রগুলিতে নাৎসীদের দুর্গতি। নাৎসী- অধিকৃত রুষঅঞ্চলগুলিতে সােভিয়েট গরিলাদের অপূৰ্ব বীরত্ব কাহিনী সব। নিউইয়র্কে থাকতে দেখেছি, তখন সদা নিন্দিত ষ্ট্যালিন অকস্মাৎ ওদের কাছে কত প্রশংসার পাত্র হয়ে দাড়িয়েছে। সিনেমাগুলিতে সােভিয়েট সম্বন্ধে কোন চলচ্চিত্রে এই মৌন মানুষটির আবির্ভাব হলেই জনতার কি উৎসাহ, উত্তেজনা ও আনন্দ ! ভীতিপ্রদ বিরাট নাৎসী যুদ্ধ যন্ত্রের মাত্র আংশিক চাপে ফ্রান্স ও উত্তর আফ্রিকায় অনেককে বৃথা অভিমানী জাতির মধ্যে কারো সম্পূর্ণ পতন ঘটেছে, কেউ দূরে সরে গিয়েছে; কিন্তু সেই জার্মানদেরই পরিপূর্ণ শক্তিকে এই লােকটির নেতৃত্বে যে জাতি এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ কৃতকাৰ্য্যতার সঙ্গেই ঠেকিয়ে রাখছে, তাদের প্রশংসার উচ্ছাসের সীমা নাই। জার্মান অগ্রগতির সম্মুখে রুশিয়রা কি অপূৰ্ব্ব পদ্ধতিতে সমস্ত শিল্পের কারখানাগুলি পশ্চাতে দ্রুত সরিয়ে ফেলছে, এ সম্বন্ধে বিষদ বর্ণনা। যে ২" কামান বর্তমান যুদ্ধে ফ্রান্সের ও ইউরােপের অন্যান্য রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা থেকে স্যাণ্ডহাষ্ট’ ‘উলউইচ’-এ রণনীতি শিক্ষাপ্রাপ্ত চাচ্চিলের সমশ্রেণী উদ্ভুত রণপাণ্ডতেরা নোৎ অব্যবহাৰ্য্য বলে ধরে নিয়েছিল, সােভিয়েট আবার যুদ্ধক্ষেত্রে তাই ব্যবহার করে চমৎকার ফল পাচ্ছে, সে কথা। তুষারমণ্ডিত রুষ রণক্ষেত্রগুলিতে সােভিয়েট যে নতুন স্কী-এর ওপর ট্যাঙ্ক উদ্ভাবন করে বিস্মিত নাৎসীদের ছিন্নভিন্ন করছে, সে কাহিনী। অথচ, কিছুদিন পূর্বেও এই সােভিয়েটের বিরুদ্ধে কত কথাই না। এরা প্রচার করেছে। এসিয়াটিক রুশ, বৰ্ব্বর রুশ, বহুভাষাভাষী রুশ এবং নাসা-উত্তোলনকারী-শ্রেণী বিধবংশী, ইতর শ্ৰেণীজাত কতকগুলি রক্ত- লােলুপ অশিক্ষিত ব্যক্তির দ্বারা চালিত রুশ সম্বন্ধে কত বিচিত্র, অদ্ভুত পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ অ্যাটলান্টিকের রণাঙ্গনে ১৩৭ কথাই না প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকা ও ইংল্যাণ্ডের বিশ্বনিন্দুক কাগজগুলিতে। ১৯১৭ সালের নভেম্বর বিপ্লবে জাত এই নব শিশু আন্তর্জাতিক ও গৃহের লক্ষ বাধা বিপত্তি কাটিয়ে উঠে যখন পঞ্চ-বার্ষিকি ব্যবস্থার দ্বারা সমষ্টিগতভাবে দেশকে পুনর্গঠন করতে সুরু করল, আত্মপ্রশংসাশীল ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকা একে হেসেই উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করল। এসিয়ার রক্ত যাদের শরীরে বইছে, তারা নাকি আবার বিরাটভাবে কোন কিছু করতে পারে কোনদিন ! কিন্তু ঈর্ষার জ্বালাভরা বিদ্রুপে জগন্নাথের রথ থামল না। তাই একদিন অবশেষে ‘গ্রিকো’কে পাঠিয়ে জানতে চাইল, সত্যিই পৃথিবীর আর এক প্রকাণ্ড ভূভাগে ম্যাস প্রডাক্স হচ্ছে কিনা। যা জানতে পারল, তাতে রুশ বিদ্বেষ বাড়ল বই কমল না। এই নিদারুণ রুশ-বিদ্বেষের ফলেই হিটলারের উত্থান সম্ভব হয়েছিল, জার্মানীতে নাৎসীবাঃ প্রসারিত হবার সমস্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল । অতি চতুর ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্সের দল ও চক্র বিশেষের সাহায্যেই নাৎসী দলের সৃষ্টি, স্থিতি ও বৃদ্ধি ঘটেছিল। প্রকৃতির মর্মন্তুদ পরিহাস—সেই ষ্ট্যালিন, সেই সােভিয়েটের গুণগানে পঞ্চমুখ, এদের পূর্বতন ধ্বংশ-কামীরা। সন্ধ্যায় কখন ক ন অনেকরাত্রি পর্যন্ত আলােচনা হয় আমাদের মধ্যে এ কথা। এই নরমেধ যজ্ঞের জন্য সত্যই দায়ী কে? কাদের নীচতায় ও অর্থলোলুপতায় পৃথিবীর শান্তি বিশ পঁচিশ বৎসর অন্তর অন্তর বিপন্ন হচ্ছে! রাজনীতিতে ক্লান্তি ধরলে তখন কেউ নিয়ে আসে বেহালাটি, কেউ বাজায় অ্যাকরডিয়ান্। তৃতীয় ইঞ্জিনিয়ার সুইডিস ছেলেটির যদি থাকে অবসর এবং আমাদেরও সেলুনে বসে সুরু হয় যন্ত্রসঙ্গীত চর্চা।
১৮ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে ছয় দিন কাটল। সেদিন আমাদের এই মজলিসের পর নতুন ডেনিস্ ইয়ার্ডটিকে হঠাৎ কাছে পেয়ে সবার কি খেয়াল হল, ওকে বলা হ’ল, কালকের ডিনারটি—এদেশীয় ইংরাজী রীতিতে লাঞ্চ --যেন একটু ভাল রকমই বন্দোবস্ত করা হয় ; ব্রেজিল থেকে নেয়া মুরগী লির রােষ্ট। ৩রা এপ্রিল -- আবহাওয়া পূৰ্বেরই মত। শান্ত সমুদ্র, নীল আকাশ, সুপ্রচুর তৃপ্তিকর প্রাতঃকালীন আহারের পর দু’চারটে আপেল নিয়ে ওপরে ব্রীজে গেলাম তখন যে সেখানে আছে, তার সঙ্গে গল্প করতে। তারপর এল মধ্যাহ্ন ভােজনের সময়। ডিনারের ব্যবস্থা নতুন স্টুয়ার্ডটি আজ রীতিমতই ভাল করেছিল। ভীষণ গরম। প্রাকৃতিক ও মানসিক নিশ্চিন্ত অবস্থা—পরিপাটি মধ্যাহ্ন ভােজনের পর অলস দেহকে নিদ্রা আচ্ছন্ন করে দিতে চায়। দু’টোর সময় আমার কাজ, একটু শুয়েছি কেবিনের পাখাটি খুলে দিয়ে জীবনে তবে নিবিড় আরামও আছে ! ট-ট-ট- টঘুম ভেঙ্গে গেল। কী ছেলেমানুষি করছে ব্রীজের ওপর মেসিনগান দু’টি নিয়ে। পাশ ফিরে শুলাম। তরলমতি বালকদের হাতে কোন কিছু থাকলে যেমন করে, তেমনি ডিনারের একটু আগেও দ্বিতীয় অফিসার মেসিনগান দুটো নিয়ে খেলা করছিল। ট-ট-ট-ট-একটা কাঠের ছােট্ট টুকরাে ছিটকে এসে বিছানায় পড়ল। চিমনীর দিকের জানালাটা খােলাই আছে এই গরমে—খুব নীচু হয়ে একটি বিমান সেখান দিয়ে ডানদিক থেকে বাঁ দিকে চলে গেল। স্পষ্ট দেখি, বিমানটির ল্যাজে লেখা, ইউ, এ, নেভি। বিছানায় পশ্চিম, মধ্য, দক্ষিণ আটলান্টিকের রণাঙ্গনে উঠে বসেছি, মাথার কাছে কাপ্তেনের এবং আমার ঘরের মধ্যবর্তী কাঠের দেয়ালটায় এক ইঞ্চি মতন একটা ফুটো! টট-ট-ট-ট-তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে যাবার জন্য দরজা খুলেছি ওয়ার্ডরােব, থেকে লাইফ জ্যাকেটটি নিয়ে গায়ে পরে, ওপরে--গুড়, গুড়ুম, গুড়ুম বিপদ-জ্ঞাপক সঙ্কেত বেজে উঠল জাহাজে। আবার গুড়ুম, গুড়ুম, “এবার মাথার ওপর মনে হচ্ছে, ছুটে গিয়ে ব্রীজের ওপর দেখি কেউ নেই। ভাঙ্গা কঁচ, কাঠের টুকরাে ছড়িয়ে পড়ে আছে চারদিকে। চার্টরুম ও রেডিও রুমের গায়ে প্রায় এক ফুট উঁচু করে পিচ, ও ছােট ােট পাথরের টুকরাে লাগিয়ে এ জায়গাটিকে গুলি ও পনেলের আঘাত সহনশীল করা হয়েছিল ইংল্যাণ্ডে থাকতে। সবাই বােধ হয় ভেতরেই গেছে। রেডিও-রুমে তখন তৃতীয় রেভিও-অফিসারের পালা চলছিল। ঘরের দরজাটা কোথায় উড়ে গেছে, ডান দিকের দেয়ালও খানিকটা। ভেতরে ঢুকে দেখি রক্তে ঘর ভেসে যাচ্ছে। মেজের সঙ্গে আঁটা টেবিলের গা ঘেষে লাগান চেয়ারটিতে একটি লােক বসে আছে-মাথাটি যেন ক্ষুরের মত ধারাল কোন অস্ত্র দিয়ে কেউ কেটে ফেলেছে এই মাত্র! সামনে দেয়াল, টেবিল, যন্ত্রপাতি রক্তে মাখামাখি। তখনও ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। পাশের চার্টরুমে ইতিমধ্যে কাপ্তেন এসে গেছেন, জিজ্ঞাসা করলাম, কিসের আক্রমণ ? কাপ্তেন বললেন, কিছুই বােঝা যাচ্ছে না এখনও, বােধ হয় রেইডার’। ইতিমধ্যে দেখি, বেতারের এরিয়েল ছিন্ন হয়েছে। এমার্জেন্সি এরিয়েলের সাহায্য সবে ইথার তরঙ্গ স্পন্দিত হয়েছে, আবার গুড়, গুড়, গুড়ুম। ওরা চায়না কোন খবর আমরা পাঠাতে পারি। আমি এখনও অনাহত। একটা সংবাদ পাঠান হল সকলের উদ্দেশ্যে, ১৭° ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমা রেখা ও ১৮ ডিগ্রী দক্ষিণ ১৪০ সপ্ত সমুদ্রের রণাঙ্গনে উঠল। অক্ষাংশের সংযােগ স্থলে ‘আউষ্টের ওপর প্রবল আক্রমণ চলছে, বিমানের ও অজ্ঞাত রণতরীর। জাহাজ একেবারে থেমে গিয়েছে। মিনিট পাঁচেক চুপচাপ। ব্রীজের উপর দাড়িয়ে দূরবীন লাগিয়ে সবাই দেখছি কে কোথা থেকে আক্রমণ করছে। জাহাজের হতাহতদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। জীবনতরীগুলি নামাবার ব্যবস্থা হবে, হঠাৎ আমাদের জাহাজের কামানটা একবার গর্জে কাপ্তেনের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে ওদিককার গান ক্রু অদৃশ্য শত্রুর ওপর গােলা ছুড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিধারার মত ভ্রাপনেল গােলা এসে জাহাজের ওপর ও কাছাকাছি জায়গায় ফাটতে লাগল। আড়াল নেবার জায়গা নাই। গােলার বিস্ফোরণগুলির মধ্যবর্তী সময়গুলিতে আহতদের করুন তীব্র আর্তনাদ। অকস্মাৎ জাহাজের ওপর একসঙ্গে অনেকগুলি বিস্ফোরণ! আগুন! আগুন! আগুন! ডেকের ওপরকার তেলের পিপেগুলির ওপর গােল বিস্ফোরিত হয়েছিল, এখন প্রচণ্ড শব্দ করে সেগুলাে ফাটছে। জ্বলন্ত তেল সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে, কিছু দেখা যায় না, বিস্ফোরণ, আগুন আর ধোয়া। প্রচণ্ড উত্তাপে গা ঝলসে যাচ্ছে। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে পৃথিবীর সঙ্গে অন্য কোন গগনচারী জ্যোতিষ্কের ধাক্কা লেগে গেল, সৃষ্টি রসাতলে দিয়ে লক্ষ কামান একসঙ্গে গর্জন করল। বিস্ময় কাটলে দেখি, সমুদ্রের ওপর ভাসছি। নিকটেই সমুদ্র ধূ ধূ করে বলছে।
No text on this page.
No text on this page.