Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Vin Desi Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
1
- WIF แF
(LD :YES: :,BRARY.
tsuu
- พเ
No text on this page.
ভিনৃদেশী
writik
/ta ::...:0p ear
1.sut
*
h3W8h
শুভেন্দু ঘােষ
old
PU
indio
.
সমবায় পাবলিশাল
कनिका
প্রাপ্তিস্থান :
২, হারিসন রােড
কলিকাতা
সমবায় পাবলিশা, শশিভূষণ দে ঐট, কলিকাতা হইতে
শহৰে সৰকা কর্তৃক প্রকাশিত।
প্রথম সংস্করণ
১৯৪৫
মুল্য পাঁচ সিকা
ভিক্টোরী কোম্পানী, ১৬২, বহুবাজার ষ্ট্রীট, কলিকাতা হইতে
হরিপদ দাস কতৃক মুজিত।
w.। fu) , '}}. ২ h na'r, নিবেদন * গল্প-সাহিত্যের সমাদর আজকাল বাংলাদেশে অনেক বেশি বেড়েছে। বাংলা সাহিত্যে মৌলিক গল্প রচনার সম্পদও দিন দিন বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন দেশী সাহিত্যে যে রসসম্ভার রয়েছে, তার গতি ও পবিণতি যে দিকে চলেছে তার পরিচয় নেওয়ার আগ্রহও এদেশে বাড়ছে। সেই কারণে অনুবাদ সাহিত্য আমাদের কাছে বর্তমানে একান্ত মূল্যবান। মানুষকে নিয়েই সকল দেশের সকল সাহিত্যই রচিত , ভিন্ন ভাষার আড়ালে সেই একই মানুষের কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ভাষার আবরণ যদি সন্তর্পণে অপসারণ করা যায় তবে ভিনদেশী হলেও মানুষকে-তার সুখদুঃখের চেতনাকে চিনতে অসুবিধা হয় না। উপরন্তু মানুষের সঙ্গে সেই দেশীয় সমাজ, রীতি ও সংস্কার সবকিছুর সঙ্গে আমবা পরিচিত হতে পারি , অনুবাদ সাহিত্যের এই দানও কিছু কম নয়। অনুবাদক শ্রীযুক্ত শুভেন্দু ঘোষ বাংলা সাহিত্যের একজন সুদক্ষ রচয়িতা। দেশী বিদেশী সাহিত্যের তিনি একজন যথার্থ রসবেত্তা ও বিজ্ঞ বিচারক। অন্য দেশীয় গল্প সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা পাঠকগণের কথঞ্চিত পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মানসে তিনি, চরিত্র-চিত্রনে ও ঘটনাবৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কয়েকটি বিভিন্ন ভাষার শ্রেষ্ঠ গল্প নির্বাচন করে বাংলায় ভাষান্তরিত করেছেন। তারাই ভিনদেশী রূপে প্রকাশিত হলো। ভিন্দেশী’কে পরিচয় করিয়ে দিতে আর কিছু বলার নেই। আশা করি, বাঙালী পাঠকসাধারণের কাছে এরা সমাদর লাভে সমর্থ হবে। প্রকাশক
সূচী
২৫
১। একটি রাত্রি
২। ব্যালজাকের উপন্যাস
| वामपनौन
৪। তেপান্তরে
৫। অঞ্জলি
৬। পতিত জমি
৭। র্যাচেলের ভৎসনা
৮। মানুষ বুঝি ব্যবহাবে
৯। মিৎসায়াের কাক
৭৮
-একD রাত্রি- প্রথম বাত্রি এগাবটা। প্যাবিনের থিয়েটাবগুলাে তখন গেট বন্ধ কবছে। হােটেল, কাযে প্রভৃতি এর আধ ঘণ্টা আগেই খরিদ্দারদের বিদায় কবে দিয়েছে। আমার সঙ্গীব। তখন বড় রাস্তার ধারে এলােমেলােভাবে দাডিয়ে। নানা প্ৰবাব আমােদ-প্রমােদেব জায়গা থেকে বেবিয়ে এলে জনস্রোত এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ছে। বিমান আক্রমণের ভয়ে রাস্তার ঘােমটা-ঢাকা বিজলী বাতিগুলােব পাব দীপ্তি একটু দূবে গিয়েই অন্ধকাবে মুখ লুকাচ্ছে। বাত্তির ওপর তারার চাদর টানা ছিল, এখন একটার পর একটা সার্চ লাইট’ এলে তীব্র দৃষ্টিতে আকাশটাকে উদ্ভ্রান্ত কবে শত্রুপক্ষীয় বােমারু বিমানেব সন্ধান চালাচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছিল, ঐখানেই দাড়িয়ে থাকি। দলে ছিলাম আমরা চারজন , একজন ফরানী লেখক, দু’জন সার্ভিয়ান বাহিনীর ক্যাপ্টেন, আর আমি। এই বিষগ্ন অন্ধকাব নগরীতে একটু স্ফুর্তি করতে যাই কোথায় ? সাভিয়ান ক্যাপ্টেনদেব একজন একটা হােটেলের নাম করলাে, সেটা নাকি সমস্ত রাত্রিই খােলা থাকে। সৈনিক অফিসাররা প্যারিসে চুটী কাটাতে চাইলে সে সময় নােজা ঐখানে গিয়ে উঠতেন। এ কথাটা খুব কম লােকেই জানতাে যে, বিভিন্ন বাষ্ট্রের সৈনিক অফিসাবে এই হােটেলে এসে পরস্পর মেলামেশা করেন , (গােয়েন্দাগিরি প্রভৃতি) অন্য কাজকর্মও সেরে নেন। আমরা খুব সাবধানতার সঙ্গে গিয়ে সেই হােটেলের উজ্জ্বল হল ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলাম। বাইরের ২ ভিদেশী ৩ অন্ধকার রাস্তার সঙ্গে ভিতরের এই প্রখব ঔজ্জ্বল্যর কি অপবিমেয় বৈষম্য। বােধ হচ্ছিল যেন একটা লাইট হাউসের অভ্যন্তবে এসে দাড়িয়েছি। গুচ্ছ গুচ্ছ ইলেকটি ক বালবের আলাে, দেওয়ালে আঁটা বড় বড় আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে ঠিকূবে পড়ছে। দেখে, যুদ্ধের দু’বৎসর আগেকার এখানকার দৃশ্যটা মানসপটে ভেসে উঠলাে। কত বিচিত্র রঙ্গিনী ফ্যান-দুরুস্ত মেয়ে, কত শ্যাম্পেন সুবা আর ভায়ােলিনের বাজনা, মন-মাতানাে গান আব হাবসীদেব নৃত্য। কিন্তু উপস্থিত কাউকে সাধারণ নাগবিকে বেশভূষায় দেখা গেল না। সকলেরই পরণে ধূলা-কাদা-মাখা বহুব্যবহৃত স্বজাতীয় উদি—ফ্রেঞ্চ, ইংলি বেলজিয়ান, রুশীয়ান, সার্ডিয়ান। কয়েকজন ইংরেজ সৈনিক ভায়ােলিন বাজাচ্ছিল। আগেকাব লালকুতা ‘জিল্পীদের জায়গায় ওবা বেশ জাঁকিয়ে বলে ছিল। ওদেব মধ্যে একজনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে মেয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি কবছিল, ওর বাপ লর্ড—বংশ ও ধনগোববে বেশ একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি। তি কবে নাও সব। কালকে হষতে ঘটবে মৃত্যু। এই লােগুলো বণদেবতার পায়ে নিজেদের জীবন নিবেদন কবে বেখেছে। জীবনের স্বাপাত্র এ এক চুমুকে পান কবে নিয়ে সব চুকিয়ে দিতে চায়। সহর-দেখার-অনুমতি পাওয়া জাহাজীদের মতে এরা মনে খুলীতে নেচে-কুদে, খেয়ে-দেয়ে, প্রেম করে বেড়াচ্ছে ,কাল ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্রের বুকে জীবনলীলাব হয়তাে পরিসমাপ্তি ঘটবে। সাভিয়ান ক্যাপ্টেন দু’জন বয়সে যুবক , স্বদেশের দুর্ভাগ্যের জন্যে তাদের যে প্যারিস দেখার সৌভাগ্য হল, এ ভেবে তারা যেন একটা তৃপ্তি অনুভব করছিল , নিজেদের ছােট্ট নগরটার নীরস জীবনের তুলনায়, বিশাল নগরী প্যারিসের দৃশ্য স্বর্গ বলে বােধ হচ্ছিল। দু’জনেরই গল্প বলবার একটা চমৎকার ভঙ্গী ছিল , এ গুণ ওদের স্বভাবজ। ওদের দেশে সকলেরই কবি হৃদয়। পঁচাত্তর বৎসর আগে লামাতিন তুরুকদের একটী রাত্রি অধীন লার্ভিয়ার কোনাে এক প্রদেশে পর্যটন কবার সময় ঐ মেষচারকদেব দেশের কবিত্ব-মহিমা দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন। সমস্ত দেশটায় লেখাপড়া জানা লােক কম, কিন্তু পূর্বপুরুষদেব আচার-বিচাব তাবা গাথার আবাবে গ্রথিত ক'বে রেখেছে। গুজলেবােশ ছিলেন নাভিয়াব জাতীয় ঐতিহাসিক , তিনি প্রাচীন কথাব সঙ্গে স্ববচিত অনেক গান যােগ কবে দিয়ে দেশেব ইতিহাসকে আবও মনােহব কবে তুলেছিলেন। শ্যাম্পেনেব পাত্রে মাঝে মাঝে চুমুক দিতে দিতে ক্যাপ্টেন দু’জন কমাস পূর্বব ঘটনা-নাভিয়াব পৰাজয় ও সৈন্যদলেব শােচনীয় ছত্রভঙ্গের কাহিনী বলতে লাগলাে। ক্ষুধার সঙ্গে, প্রচণ্ড শীতের সঙ্গে সে কি মারাত্মক দ্বন্দ্ব। বরফেব ওসব লডাই, এক একজনের সামনে দশ-দশজন শত্রু, শত্রুর আগে আগে ভীতিবিহ্বল মানুষ ও পশুর বিশৃঙ্খল পলায়ন , আর এ সকলের পশ্চাৎ ভাগে দুই পক্ষের মধ্যে তখনও ভয়াবহ মৃত্যুবিনিময় চলেছে। গ্রাম পুড়ছে, গণ্ডগােলের মধ্যে শ্রান্ত ও আহতদেব করুণ আর্তধ্বনি শােনা যাচ্ছে। বাতে পঙ্গু রাজা পীটার একটা সাধারণ যষ্ঠিমাত্র সম্বল করে কোনাে মতে প্রাণে বাঁচলেন। সেক্সপিয়বের কি যেন একটা দুঃখান্ত নাটকের নায়কের মতাে তিনি তখনও নিজেব পরাজিত অশ্বারােহী বাহিনীকে সঞ্চালন করে যাচ্ছিলেন। সার্ভিয়ান বন্ধুবা গল্প করছিল, ব'সে ব'সে আমি দিকে লক্ষ্য করছিলাম। দু’জনেই বেশ হৃষ্টপুষ্ট যুবা, লম্বা ছিপছিপে শরীর। দু জনেরই নাক বেশ টিকোলাে, গৃচঞ্চুর মত দুজনেরই মানানসই গোঁফ, গম্বুজাকার টুপির নীচে থােক ওদের লম্বা লম্বা চুলের গােছা বেরিয়ে পড়েছে। ওদের মুখভাব চিত্ৰকবদেব মতে, সেকালের রাজকুমারীরা যাদেব দেখলে ভাবাবেশে মােহিত হয়ে যেত। বাদামী রংয়ের উদীতে সুন্দর মানাচ্ছিল ওদের। চেহারায় একটা দৃঢ় প্রশান্ত ভাব , মৃত্যুর সামনে যাবা দাড়িয়ে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে তাদেরই মধ্যে কেবল এটা সম্ভব বলে মনে হয়।
৪ ভিদেশী ওরা গল্প করে চলেছে। মাত্র কয়েক মাস আগেকার ঘটনা, শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, যেন কোন্ পৌরাণিক যুগের কাহিনী বলে চলেছে—যেন কোন্ দৈত্যপুরীর উপকথা। এই যে দুটি লােক আজ প্যারিসের হােটেলে বসে কথা শােনাচ্ছে, অল্পদিন হ’ল এরাই জীবনের ভীষণ রূপের সঙ্গে পরিচয় করেছে, সার্ভিয়ার সমর তাণ্ডব থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরেছে। ফরাসী বন্ধুটি চ'লে গিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেনদেব একজন কথাবার্তাব ফাকে ফাকে বারে বারে পাশেব কোচে-বসা এক সুবীর দিকে কটাক্ষপাত করছিল। তরুণীব দৃষ্টিও তার উপর নিবদ্ধ বলে মনে হচ্ছিল। ক্যাপ্টেনটিব মন প’ডে ছিল ঐ দিকে , কিছুক্ষণ পরেই সে সুন্দরীব আকর্ষণে আমাদের কোচ ছেডে তাব পাশে গিয়ে বসলাে। আবও একটু পব সুন্দরীকে সঙ্গে ব’বে নে বেরিয়ে গেল। আমি একা অন্য ক্যাপ্টেনটির সঙ্গে রয়ে গেলাম। এ ছাকরাব বয়স কম , কথাবার্তাও নে কম বলে। সুরাপাত্র খালি কবে নে ঘন ঘন দেওয়ালে টাঙানাে ঘড়ির দিকে চাইতে লাগলো। আব এক পাত্র মদ নিযে সেটাও যখন ফুরুলল তখন সে আমার পানে যেভাবে চাইতে সুরু করলাে, তাতে বুঝলাম যেন প্রাণ খুলে সে কিছু বলে ফেলতে চায়। মনে হল, কোনাে দুঃখময় স্মৃতি ওর সমস্ত অন্তরকে মথিত ক'রে তুলেছে। সে আবার ঘডিব দিকে তাকালাে। রাত্রি একটা বেজে গিয়েছে। ঠিক এমনি সময়,-মৌনতা ভেঙে সে বলতে আরম্ভ কবলল,-সে আজ চার মাস পূর্বের কথা। ওর কথা শুনতে শুনতে কল্পনার সাহায্যে আমার চোখের সম্মুখে সমস্ত চিত্রটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো অন্ধকার রাত্রি, মাটিট। বরফে ছেয়ে গিয়েছে, শুভ্র পাহাড়ের ওপর দীর্ঘকায় গাছগুলােয় ঝােড়াে হাওয়া চীৎকার করে ফিরছে, শাখা নাড়িয়ে বাশি রাশি বরফ ঝরিয়ে দিচ্ছে। দেখলাম সম্মুখে পরিত্যক্ত বিধ্বস্ত পত্নী। ভাঙা-চোরা কুঁডেগুলাের মধ্য থেকে একটা রাত্রি পরাজিত সার্ভিয়ান সৈন্যরা বিশৃঙ্খল অবস্থায় পিছু হটছে, পা পা করে আড্রিয়াটিক সাগরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন বন্ধুটি ছিল এই পলাতক সৈন্যদলের পশ্চাদভাগের একজন অফিসাব। সৈনিকদের সুসংহত ‘দল’ এখন বিশৃঙ্খল জনতায় পরিণত হয়ে পড়েছে , ভয়ার্তবিপন্ন কৃষকদের ভীডের জন্যে তাদের ঝঙ্কাট আরও বেড়ে গিয়েছে। নৈবাখে, শান্তিতে এই কৃষকদের এমনি একটা আচ্ছন্নভাব এসে পড়েছে যে, তারা পথ হাঁটছে যন্ত্রের মতাে, পশুর মতাে তাদিকে আগে হাঁকিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে। বাচ্চাদিকে তাডনা করতে করতে মেয়েবা অতিকষ্টে বস্তা ভাঙছে , ওদেব মধ্যে যাবা শক্ত, এই সংকটকালেও তারা মৃত সৈনিকদেব বন্দুক আব কাতুজের পেটা ওঠাতে ওঠাতে সকলের থেকে আগে আগে চলেছে। আকস্মিক দীপ্তিতে অন্ধবাবকে শিউবে দিয়ে জনশূন্য গ্রামখানির ওপর মধ্যে মধ্য গগলা ফাটছে , শুধু গােলা নয়, বাত্রির নিস্তব্ধ অন্ধকারে বুক চিরে, ক্ষমাহীন মৃত্যুব মতে, পলাতকদেব ওপর সন্-সন্ শব্দে গুলিবৃষ্টিও চলছে। ভােব হতে না হতেই শত্রুর ভয়ঙ্কর আক্রমণ আরম্ভ হবে। ও একটুও জানে না, কোন শত্রু পিছন থেকে তাদিকে ডিয়ে নিয়ে যাচ্ছে-তারা জার্মান না অস্ট্রিয়ান ? বুলগেরিয়ান না তুরুক ? ঐতাে ছােট্ট একটা দেশ, তাকে এতও সইতে হয়েছিল। সার্ভিয়ান বন্ধু বলে যাচ্ছিল, “পিছন হটা ছাডা আমাদের গত্যন্তর ছিল । যাবা পিছিয়ে পড়ছিল, তাদিকে ফেলে আসতে হচ্ছিল। ভােরেব আগেই পাহাড়ে পৌছে আশ্রয় নেওয়ার দরকার।” পুরুষ, মেয়ে, ছেলে, বুড়াে, মাল বােঝাই খচ্চরশ্রেণীর পিছনে পিছনে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। গ্রামে যারা ছিল, ভাঙা বাভীগুলোর আড়াল থেকে আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে শত্রুসেনার ওপর তারা অবিশ্রান্ত ভিনদেশী চালাচ্ছে। সময় হলে এই বীরদলও পশ্চাৎ-অপসরণের চেষ্টা করবে। হঠাৎ ক্যাপ্টেনের মন অত্যন্ত চিন্তাবিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাে, আহতদের কি হবে ? ওদেব নিয়ে কি কবা যায় এখন ? একটা ভাঙা বাড়ীর বড়গোছের কামবাব মধ্যে জন-পঞ্চাশ আহত ব্যক্তি আশ্রয় নিয়েছিল, যন্ত্রণায় কাবও অধ্ব-মুছিত অবস্থা, কেউ বা কাংবাচ্ছিল। ওদের মধ্যে অনেকে কদিন পূর্বেই আহত হয়েছিল, সযত্নে পটি-টটি বেঁবে কোন মতে এ পর্যন্ত পালিয়ে আসতে পেবেছিল , কেউ কেউ ঐ বাত্রেই আহত হয়ে যেমন তেমন ভাবে তাড়াতাড়ি পটি বেঁধে বক্তস্রোত সদ্য বন্ধ কবেছে , ফাটন্ত গােলার টুকবাে লেগে জখম হওয়া দু'চাবজন মেয়েও সেখানে ছিল। ক্যাপ্টেন সেই বাডীটায় এল। চাবি দিকে পচা মাংস, শুকনাে বক্ত আব ময়লা কাপডেব দুর্গন্ধে বাযু বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। ক্যাপ্টেনেব সাড়া পেয়ে যাদেব এখনও একটু শক্তি অবশিষ্ট ছিল, তারা নিবু নিবু লণ্ঠনেব ম্লান আলােয় ভীষণ উদ্বেগে খাড়া হবার চেষ্টায় টলতে লাগলাে , কাংবানি বন্ধ হয়ে গেল। সকলেই ভয়ে বিস্ময়ে কেমন যেন বিমূঢ় হয়ে পড়লাে, যেন মৃত্যুব চেয়ে ভয়ানক কিছুব সম্মুখে এসে পড়েছে তারা। তাদিকে শত্ৰুব করুণার ওপর ছেড়ে দিতে হচ্ছে—এই কথা শুনে আহতরা আর একবাব খাড়া হবার নিস্ফল চেষ্টা কবে শক্তিহীনতাব জন্যে তক্ষুণি মাটির ওপর গড়িয়ে পড়লাে। আহতদেব করুণ কাকুতি মিনতিতে, হতাশ কণ্ঠেব প্রার্থনায়, ক্যাপ্টেন ও সৈনিকরা বিহ্বল হয়ে উঠল। ‘এখানে ফেলে যাবেন না আমাদিকে, দোহাই ভগবানের ধীরে ধীরে আহতরা বুঝতে পারলাে, কেন দিকে পিছনে ফেলে যেতে হচ্ছে। যা হয়, হােক’ বলে ওরা একেবারে হতাশ হয়ে পড়লাে। শেষে শত্রুর হাতে পড়বে। হয়তাে ওরা বুলগেরিয়ান, হয়তাে বা তুরুক—বংশ বংশ ধরে একটী রাত্রি ৭ ০ দেশের শত্রু। মুখের অনুচ্চারিত কথা যেন ওদেব মূক দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠলাে—বন্দী হওয়াব চেয়ে মবণও শ্রেয়। যাদের মৃত্যুব আব দেবী নাই, তাবাও বন্দী হওয়ার ভয়ে, থেকে থেকে কেঁপে উঠলাে বুলগেরিয়ান বা তুরুকে প্রতিহিংসা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। ‘ভাই, ভাই- ওদেব এই অতি-মিনতিব গােপন মর্ম বুঝতে পেৰে, ক্যাপ্টেন চোখ ফিরিয়ে নিল , ওদেব কাছে বার বার জিজ্ঞেস কবে নিল, তােমরা কি চাও যে, আমি?” আহতবা মাথা নেড়ে জানালাে, “হ'। ওদেব ফেলে যেতেই যখন হবে, তখন একজনও জীবিত সাভিয়ানকে যেন শত্রুবা বন্দী কবতে পায়। ওদেব মতাে অবস্থা হলে ক্যাপ্টেন নিজেও কি ঐ ভিক্ষাই কবতাে না ? পৰাজয় ও বিশৃঙ্খলাব জন্যে গুলী-বারুদেব কমতি থাকায় সৈন্যরা নিজেদেব কাজ খুব হিসেব কবে খচ করছিল। ক্যাপ্টেন খাপ হ'তে তলােয়াব বাব কবলে। কোনো কোনাে দৈনিক সঙ্গীন দিয়েই তাদেব অপ্রিয় কর্তব্য আবম্ভ কবে দিল , তাদেব হাত কিন্তু ভয়ানক কঁপছিল। ফিকি দিয়ে বক্ত ছুটছে, মুখ ফেটে যন্ত্রণার চীৎকার বেরিয়ে পড়ছে। আহতবা সকলেই উচ্চপদস্থ ক্যাপ্টেনের দিকে গঙিয়ে গড়িয়ে আসতে লাগলাে। ওর পাকা হাতে ওস্তাদী আঘাতে যে মবণ, তা যেন বেশী সহজ, যেন বেশী গৌববেব। ‘আমায় নাও, ভাই, এবার আমার পালা তলােয়ারের তীক্ষ্ণতম অংশ দিয়ে এক চোটেই ঘাডের শিরাটা দুফাক করে দেওয়ার চেষ্টাই করছিল ক্যাপ্টেন। ‘খট-খ। ক্যাপ্টেন আমাকে ভাল করে বােঝাবার জন্য বললাে ‘খট্ খট’!--সমস্ত বীভৎস দৃশ্যটা আমার চোখের সম্মুখে নেচে উঠলাে ?
ভিনদেশী হাত পায়ের সমস্ত বল নিয়ােজিত করে আহতরা প্রাণ দিতে এগিয়ে আসতে লাগলো। নিজের এই ভয়াবহ কীতি যাতে নিজের চোখে দেখতে না হয়, তার জন্যে প্রথম দিকটায় ও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল , কিন্তু এই মানসিক দুর্বলতার ফলে হাত চালনায় তার ভুল হচ্ছিল, একবারের জায়গায় দু’বার আঘাত করতে হচ্ছিল, মিছিমিছি কষ্ট বানাে হচ্ছিল মাত্র। একটু স্থির হয়ে হাত চালানােই ভাল , হাত অভ্রান্ত হওয়া চাই। বুককে পাথবেব মতাে শক্ত করে রাখা চাই।—খট খট । ‘এবার আমায় মাবাে, এই তাে আমার পালা '। পালি’ নিয়ে ওরা এমন ঝগড়া কবছিল যেন, ওদেব ভয়, ওদের বলিদানের আগেই শত্রুরা এলে পড়বে। নিজে থেকেই ওরা কেমন কবে যেন বুঝে নিয়েছিল, কোন্ ভঙ্গীতে বললে আঘাতটা বেশ সাফ হয়ে পড়বে। নিজেব ‘পালি’ এলে প্রত্যেকে মাথাটা এক দিকে হেলিয়ে দিচ্ছিল, যাতে ঘাডটায় টান প'ডে শিরটা ফুলে ওঠে, চোট দেবার সময় যাতে সেটা ভাল বকম নজবে আসে। ‘ভাই এবার আমার মাথাটা আবার বক্ত ছােটে, লাশ লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে থাকে। হােটেলের হল ঘরটা ধীরে ধীবে খালি হচ্ছে। উদীপ। সৈনিকদের বাহুলগ্না হয়ে মেয়েরা পাউডার ও সেন্টের গন্ধ ছড়িয়ে ঘর থেকে বেবিয়ে যাচ্ছে। হর্ষনিব মধ্যে ইংরেজ সৈনিকদের ভায়ােলিন বাজনা ক্ষান্ত হল। এই রক্তরাঙা বীভৎস স্মৃতিটিকে মস্তিষ্কের মধ্যে নিরন্তর সতেজ রাখবাব জন্যেই যেন আমাদের নাভিয়ান বন্ধু হাতে একটা পেন্সিল-কাটা চাকু নিয়ে কৌচের হাতার ওপর আওয়াজ করে যাচ্ছে। খট খট । * . স্পেনীয় গন- ব্লাকে ইবানেজ ) ১৯ | t A । ব্যাজাকের উপন্যাস- সাবাবণ পাঠাগাবের পঠন-কক্ষে দু-দুটো সকাল কাটিয়ে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বইখানা বন্ধ করলাম । ব্যাঙ্গাকেব একট। পুবাণাে সংস্কবণেব ষাটটা খণ্ডের প্রতিখানা একজন বৃদ্ধ সহকাবী-গ্রন্থাকাবিক আমার সামনে এনে দিয়েছিলেন। পণ্ডম ! প্রথম দিকে ভদ্রলোক একটু যেন বিস্মিত হয়েছিলেন, পরে দস্তুর মধ্যে বিবক্তই হয়ে উঠেছিলেন । কোনাে লাভই হ’ল না! যা খুঁজছিলাম তা পাওয়া গেল । শেষ খণ্ডটাকে সামনে গােছানাে লম্বা দুলাবি বই-এব মধ্যে যথাস্থানে বেখে দিলাম। সম্পূর্ণ গ্রন্থাবলী’—সােনালি জলে মােটা অক্ষবে লেখা এই শব্দ দুটো যেন আমাকে আমার সমস্ত প্রয়াকে—বিদ্রুপ করছিল। সামনেব ষাট খণ্ড বই-ই ঘুরে-ফিবে দেখা হয়ে গিয়েছে। এই বিবাট লেখকেব সব বইগুলিই এর মধ্যে আছে তাে? ভাল করেই জানতাম, আর কিছুর নাহােক তার কয়েকটা গল্পের হদি আমরা হারিয়েছি। একটা দৈব উল্লাস—যাকে আমরা প্রেরণা বলি—তার বশে সেগুলাে তিনি বচনা করেছিলেন--কখনাে কখনাে ছদ্মনামে,তারপর ছিড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। সম্মুখে বিছানাে সংবাদপত্রের দিকে চিন্তিতভাবে একবার চেয়ে দেখলাম , বড় বড় অক্ষরে উপন্যাসটার নাম লেখা রয়েছে, লেখাচোর’। আর নিচেই ভিদেশী তার চেয়ে একটু ছােট হরফে দেওয়া আছে গ্রন্থকাবেব নাম—অনাের- ব্যাজা। উপন্যাস খানাব শেষ পঙক্তিব নিচে এক কোণ ঘেসে আবে৷ ছােট হবফে লেখা, ‘ক. ম কতৃক ফবাণী হইতে অনূদিত। অনুবাদকটী কে ? ক ম আবাব কার নাম ? কোন্ পুবাণাে বই-এ, কোন্ জীর্ণ হলদেটে ফবাসী কাজে ব্যাজাকেব ঐ উপন্যাসখন তিনি পেয়েছেন? বহুদিন এটার কেউ খবব বাখেনি, হঠাৎ পুন প্রকাশ হবে গেল এটাও কি সম্ভব—দুনিয়ায় কেউ যাব সম্বন্ধে জানতাে না এমন একট। পাণ্ডুলিপি তব হাতে এসে পড়েছিল ? তাও কি হয় ? , সেটা সম্ভব বলে মনে হয় না। হলে, লােকটী নিশ্চয এমন মহামূল্য বকুটীকে জার্মানির মফঃস্বল হবে এই অখ্যাত বাগজে না ছাপিয়ে নগদ মূল্যেই বিক্রী কবতেন। বিশেষ, দেখছি এ-লেখাটাব সঙ্গে কোনাে বকম মুখবন্ধ বা ভূমিকা জোড়া নাই। হয়তাে বইখানাব ফবানী নামটা এব জার্মান নামেব মােটেই অনুরূপ নয় । ক. ম ভদ্রলোক হয়তো তাঁব খুনীমতে। এ নামটী পছন্দ কবে নিয়েছেন। এই বকম একটা ধারণার বশে এই উপন্যাসটীর সঙ্গে ব্যাজাকেব যতগুলি উপন্যাদেব সংযােগ থাকা সম্ভব বলে মনে হয়েছে, সে-সমস্তব প্রথম পঙক্তিগুলাে তুলনা করে দেখা গেল , একটাও মেলে না। গবেষণার সুবিধার জন্যে এ- উপন্যাসের প্রথম বাক্যটী মনে মনে ফবাসী ভাষায় পুনবনুবাদ কবেও দেখলাম। প্রথম বাক্যেব পব দ্বিতীয় বাক্য, দ্বিতীয়েব পব তৃতীয়, আপনা থেকেই অনুবাদ হয়ে চলে , অনুবাদ কবাটা আমার কাছে এতই সহজ বােধ হচ্ছিল যে, থামাটাই যেন দুরূহ হয়ে পড়ছিল। এ এক তাজ্জব ব্যাপাব। এ-থেকে বুঝতে পারছিলাম, এই জার্মান অনুবাদটী সত্যিই খুব সুন্দর হয়েছে। যখনই জার্মান বাক্যগুলাের ফাকে ফাকে মূল ভাষার আমেজ পাচ্ছিলাম তখনই পুনরনুবাদ করাটা শক্ত বােধ হচ্ছিল। এক অদ্ভুত কারিগবী—ভাষার উপর ব্যাজাকের উপন্যাস ১১ অধিকাবেব চরম পরিচয়। লিখনভঙ্গীর বিশুদ্ধতাব উপব এই একাগ্র দৃষ্টি মােটেই সামান্য কথা নয়। লিখনভঙ্গীব সম্বন্ধে কি সহজ সূক্ষ্মানুভূতি নিয়ে, জার্মান ভাষাটাকে কি বকম সহজ ও সাবলীল ভাবে নিয়ন্ত্রণ কবে এই অনুবাদক তঁার কাজ কবে গিয়েছেন। অথচ লেখকটী বিনয়বশে নিজেব পরিচয়টুকু পর্যন্ত বেখেছেন গােপন ক’বে। যত ভাবি, প্রশ্নটা ততই চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে। সববাবী কাজ ফাকি দিয়ে দু-দুটে। সকাল এই সহবে বলে ইতিমধ্যে নষ্ট ক’বেছি। স্থিৰ কবলাম, দুপুবটাও যাক্। ব্যাপাবটা জানতে হবে। এর দু-ঘণ্টা পব, আমি একটা ছােট্ট সম্পাদকীয় কক্ষে একজন প্রৌঢ় ভদ্রলােকেব সম্মুখে বলে। এই বুঝি পকেট থেকে পাণ্ডুলিপি বার কবে এই ভয়ে তিনি সশঙ্কভাবে আমার মুখেব দিকে চেয়ে আছেন। আমি তাকে অবিলম্বে সে বিষয়ে আশ্বস্ত কবে জিজ্ঞাসা করলাম, তাদেব যে-লেখকটী আমার কৌতূহল উদ্রেক কবেছেন তঁাব পবিচয়। শুনে তিনি বিস্মিত হলেন, আমাকেও বেশ একটু বিস্মিত কবলেন তিনি—তাব নাম বলে’ : ক্যারােলিন্ মেয়াব। ঠিকানা জিজ্ঞাসা কবে জানলাম, এই পহবেই তিনি থাকেন , তবে ভাব সঙ্গে দেখা কবে কোনাে ফল নাই। বৃদ্ধা এখন রােগশয্যায়—শােথ-এ ভুগছেন,—মৃত্যুব বড দেরী নাই। সম্পাদক মশাই বেশ একটু দরদেব সুবে বলে চললেন—বৃদ্ধা তঁার কাগজের খুব নিয়মিত লেখিকা ছিলেন। ভাবখানা, যেন তিনি ম'বেই গিয়েছেন! “আমাদেব সাহিত্যের চিরবিস্তৃত বগুলাে পুনরুদ্ধার করতে তাঁর আর জুড়ি ছিল না।” “বুঝতেই পারছেন, আমাদের কাগজটা আন্তর্জাতিক নয়, কাজেই আমাদের রবিবাসরীয় সংখ্যা—ঐ যে আপনার হাতে যেটা রয়েছে—এটা ভতি করতে হয় এই সমস্ত লেখা দিয়ে। এর জন্যে আমাদের কোনাে খরচা পড়ে ভিদেশী না, অথচ পাঠকদের মধ্যে যারা জহুরী তাদের মনস্তুষ্টি হয়। শ্রীযুক্তা মেয়ারের উপর এবিষয়ে বরাবর নির্ভর করে এসেছি। তার বিরাট সাহিত্য- জ্ঞান এবং অপ্রকাশিত রচনাদির সম্বন্ধে সহজ দক্ষতার দৌলতে আমরা তঁার কাছ থেকে অসংখ্য বিগতাত্মা লেখকের—তাঁদের অনেকেই জগদ্বিখ্যাত গদ্যরচনাব নানা উদ্ধৃতি পেয়েছি। চমৎকার পরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষরে সেগুলি নকল ব'বে তিনি আমাদের অফিসে এনে দিয়েছেন। এইভাবে আমরা পাঠকদের উপহাব দিতে পেবেছি কত উদ্ধৃতি-কত জ্ঞানগর্ত বাক্যাবলী,অল্পপবিচিত বিস্মৃত কত চমৎকাব বচনা-ডিকেন্স, ভলতেয়াব, ব্যাজ্জাক, তুর্গেনিভ-এব গ্রন্থ থেকে, কত বড বড লেখকেব দিনপঞ্জী থেকে, গ্যেটে শিলাব ক্লাইস্ট হেগেল প্রভৃতি মনীষীদেব পত্রাবলী থেকে। বড় বড় গ্রন্থকাবেব ছােট বড় কত সব জ্ঞানসমৃদ্ধ বাক্য! যুক্তা মেয়াবেব অক্লান্ত কর্মশক্তিব শেষ ফল ঐটি-ঐ—যাতে আপনি এত আকৃষ্ট হয়েছেন। এখানি তব চাকবের হাত দিয়ে পাঠাননা। এটিব সঙ্গে এসেছিল-আমাকে লেখা কয়েকছত্র একটা চিঠি। জানিয়েছিলেন, তাঁব শাবীবিক অবস্থা খুব খাবাপ-মৃত্যুব জন্যে তিনি প্রস্তুত হয়ে প্রতীক্ষা কবছেন , তার দুটী অন্তিম ইচ্ছা আমি যেন পূর্ণ কৰি :—পবেব রবিবাবেই যেন তার শেষ দান, ব্যাঙ্গাকেব এই লেখা-চোব’ উপন্যারখানা প্রকাশ করি , আব শেষ পঙক্তিব নিচে এই কথাগুলো খুব ছােট হবফে ছাপিয়ে দিই, “ক ম কর্তৃক ফরাসী হইতে অনূদিত'।” ভদ্রলােক একটু আত্মপ্রসাদেব সঙ্গেই বলে চললেন, “দেখছেন, আমি তার দুটী ইচ্ছাই অক্ষবে অক্ষরে পালন কবেছি। শ্ৰীযুক্ত মেয়াবেব আসন্ন মৃত্যুর জন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত। তঁাব স্থান পূরণ করবাব মতে আর কাউকে পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস হয় না।” এইখানটায় তার কণ্ঠস্বর বদলে গেল , নাকী কান্না থামলাে, ব্যবসায়ীর সুব এল। শে-ফ্রেমের চশমার ভিতর থেকে তার চোখ দুটো আমার উপর ন্যস্ত ব্যাজাকের উপন্যাস ১৩ করলেন। ভাবটা, আমাকেই যেন তাঁর শূন্য স্থানটা পূরণ করবার দায়িত্ব নিতে হবে। ভদ্রলােককে ধন্যবাদ জানিয়ে শ্রীযুক্তা মেয়ারেব ঠিকানাটা টুকে নিলাম বিদায় নেবার সময় জিজ্ঞাসা করলাম, এই শ্রদ্ধেয়া মহিলাটী তাঁর শেষ লেখাটী ছাড়া অন্য কোনাে লেখাতে ভঁব নামেব আদ্যাক্ষৰগুলােও প্রকাশ কবেন নি কেন? লেখার জন্যে কোনাে পারিশ্রমিকই বা নেননি কেন? সম্পাদক-প্রবব আমার প্রশ্ন শুনে আকাশ থেকে পড়লেন : “কোনাে দিন তাে উনি তব নাম প্রকাশ করতে আমাদেব বলেন নি। লেখাব জন্যে কোনাে পারিশ্রমিক তিনি তাে কখনাে চান নি।” বুঝলাম। ঠোটের আগায় একটা জবাব এসে পড়েছিল, সেটা চেপে গিয়ে তাড়াতাড়ি রাস্তায় বেবিয়ে পড়লাম। হােটেলের কামরায় ফিরে আবার ব্যাঙ্গাকেব উপন্যাস নিয়ে বসলাম। বছব কয় আগে, ব্যাঞ্জাবে কয়েকখানা উপন্যাদেব অনুবাদ কবেছি পবম উৎসাহের সঙ্গে, এ-অনুবাদকের লিখনভঙ্গী বা উৎকর্য বিচাব কববাব সামর্থ্য কি আমার নাই ? দ্বিতীয়বাব সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা কবে পূর্ব মত দৃঢ়তব হ'ল , এ অনুবাদের অতুলনীয় মূলানুগত্য বিষয়ে সন্দেহেব অবকাশমাত্র নাই , জার্মান বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ রকম প্রতিভা সত্যিই খুব বিরল। বড়ই দুঃখের বিষয়, শ্ৰীযুক্ত মেয়ারের অসুস্থতার জন্যে, তাঁর সঙ্গে দেখা করাটা সম্ভব হ'ল না। ‘টাগন্নাট’ পত্রিকার সম্পাদক মহাশয়ের ধাবণা প্রতিভাব জন্ম নিঃশেষে শশাষিত হবার জন্যে। এই মহাপুরুষটীর পক্ষে মােটেই শুভ নয়, এমনি একটা নীরব সঙ্কল্প এটে নিয়ে আমি আমার নিয়মিত কাজে মন দিলাম। কয়েকদিন পর, হাতের কাজ অনেকটা হাল্কা হ’ল। বাড়ী ফিরবার সময় এল। বাড়ীতে পোঁছে, সঙ্গে-আনা কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতে গিয়ে সেই ১৪ ভিনদেশী : পত্রিকাখানি আমার নজৰে পডল। হঠাৎ স্মবণ হ’ল, আমার কাগজপত্রে মধ্যে কোথায় যেন ব্যাজাকেব সমস্ত বইএব একটা তালিকা টোকা আছে— শেষ বযসেব লেখাগুলােব পর্যন্ত। কোনাে সন্দেহ নাই যে, আমি ব্যাজ্জাকের যে পুবাণা সংস্কৰণটা দেখে এসেছি, এটা তার চেয়ে অধিক সম্পূর্ণ। একটু খুজতেই কাগজটা পাওয়া গেল। এ তালিকাটাতেও কিন্তু লেখা-চোর' উপন্যানেব কোনাে হদিস্ মিললাে না। আশ্চয। শ্ৰীযুক্তা মেয়াব যদি এখনাে বেঁচে থাকেন,—হয়তাে তিনি কতকটা সেবে উঠেছেন, হয়তাে ‘টাগব্লাট’ পত্রিকায় আবাব লেখাও দিচ্ছেন । তঁাকে একখানা চিঠি লিখবাে, স্থিৰ কবলাম। হয়তাে তিনি উত্তর দিতে পারবেন। হয়তাে আমার চিঠিটা তব জীবনের শেষ ক্ষণটাকে একটু অনিন্দাজ্জল ক'বে তুলবে। এ চিঠি যখন পৌছুবে হয়তাে তিনি তখন পরলোকে। সেক্ষেত্রে চিঠিটা ফেবং আসবে , চিঠির পিছনে আমার নাম আব ঠিকানাটা লিখে দিলেই হল । ডেস্ক ব'সে লিখতে সুরু ববলাম,—দীর্ঘ পত্র-বােগীকে যে বকম পত্র লেখে, মুতের কাছে যেমন ক'বে লােকে মনােভাব নিবেদন কববাব চেষ্টা কবে চিঠিব মধ্য দিয়ে। লিখলাম, কেমন ক'বে তার নাম ও পেশা আমি জানতে পেবেছি। অনেক ফবানী অনেক ফবাসী লেখকের-বিশেষ করে ব্যাজাকেব অনুবাদক হিসাবে তাঁব সঙ্গে আমার একটা যােগসূত্র আছে এ-কথাটার উপর বিশেষ জোব দিলাম। তাঁকে জানালাম, জার্মান ভাষার বিশেষত্ব অক্ষু বেগে ইতিপূর্বে তার মতাে এমন অনুবাদ কেউ কবেনি, যদিচ অনুবাদ হচ্ছে এমন একটা জিনিস যাতে নাকি আনাডিৰ ভান-ভানা লেখাও নির্বিবাদে গ্রাহ হয়ে যায়,তার অগভীরতা প্রায়ই ধবা পড়ে না। লিখলাম, “অত্যন্ত বিস্মিত হলাম যে, এমন অসাধারণ প্রতিভা সত্ত্বেও আপনি পারিশ্রমিক হিসাবে কখনাে কিছু পান নি, একটা মফঃস্বল শহরের nid Bar বলাগুৈপন্যাস নগণ্য পত্রে লেখা বা করার অপেক্ষাধিক কোনাে খ্যাতি আপনি অর্জন করতে পারেনি। চিঠির শেষ দিকে 'শ্রীযুক্ত ফোরকে অনুরােধ জানালাম, স্বাস্থ্য প্রতিকূল হ'লে তিনি যেন আমাকে জানান, ব্যাজাকের কোন্ গ্রন্থ থেকে ‘লেখা-চোব’ উপন্যাসটী গৃহীত হয়েছে। গ্রন্থখানা আমার সম্পূর্ণ অজ্ঞাত, জানতে পারলে এবংকাল অপবিজ্ঞাত এই উপন্যাসখানার প্রতি আমি জনসাধাবণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবাে, যথাবিহিত সম্মানেব সঙ্গে এই অনুবাদের সম্পর্কে তার নাম প্রচার করাটা আমার কর্তব্য বিবেচনা করবাে। চিঠিটা একবার প'ডে দেখলাম। বেশ সুস্পষ্ট ও সুসম্বদ্ধ হয়েছে। সহানুভূতি জানিয়ে দ্রুত ব্যাধি-মুক্তি কামনা কবে চিঠিটা শেষ করা গেল। এক সপ্তাহের উপর অতিবাহিত হ'ল। চিঠির কোনাে উত্তর এল না। সেটা ফেরৎ-ও পেলাম না। বুঝলাম, শ্রীযুক্তা মেয়ার এখনও জীবিতা, সম্ভবতঃ উত্তব লিখবাব সামর্থ্য নাই। ব্যাজাক্-রচিত মূল লেখা-চোরের কোনাে পাত্তা পাওয়াব ভরসা একরকম ছেড়ে দিয়েছি এমন সময় একদিন সম্ভবতঃ সপ্তাহ চাবেক পবে—একটা মােটা লেফাফা পেলাম। দেখলাম, সেটাৰ পিছনে, ঈষৎ কম্পিত সুন্দব হস্তাক্ষবে লেখিকাব নাম দেওয়া রয়েছে : ক্যাবােলিন মেয়ার। তার নিচে—আর একজনের হস্তাক্ষরে একটা কুশ চিহ্ন আৰ চিঠি ডাকে দেওয়ার তারিখ । চিঠি খােলার আগেই বােঝ গেল, শ্ৰীযুক্তা মেয়ার নিজেই এই চিঠি লিখেছেন, আর তার মৃত্যুর অব্যবহিত পবেই এট। ডাকে ছাড়া হয়েছে। ওই লম্বা ভাবী চিঠিটায় লেখা ছিল- মহাশয়, আপনি আমায় পত্র দিয়ে ভুল করেন নি , আমি এখনও বেঁচে আছি, শ্বাস-প্রশ্বাস এখনও বন্ধ হয় নি। তবে বেঁচেই আছি মাত্র , নিঃশ্বাস নিচ্ছি টেনে টেনে, অতি কষ্টে। তবু আপনাব পত্রের উত্তর দেবার সামর্থ্য এখনও ভিদেশী যায় নি। চিঠিটা শেষ করতে হয়তাে কয়েকদিন লাগবে। বােজ একটু একটু করে লিখবাে। শক্তি ফুরিয়ে এসেছে সত্যি, তবে আপনাকে চিঠি লিখে আমার নিজেব জীবন-কাহিনী শােনানাে ছাড়া অন্য কাজও আমার এ জগতে নাই। ওরই মধ্যে আপনার সমস্যার সমাধান পাবেন , আপনার পবে মধ্যে যে-সব প্রশ্ন অনুক্ত রয়েছে সেগুলােরও। পত্রের প্রথমেই লিখেছি, আপনি আমায় পত্র দিয়ে ঠিকই কবেছেন। ঐ সঙ্গে এ-কথাটাও যােগ করতে চাই : আপনি ভাল কবেছেন। হ, দুনিয়া হতে বিদায় নেবার সময়—জীবনে এই যেন প্রথম উপকার পেলাম। আপনার চিঠির মধ্যে দিয়ে সমস্ত জগৎ যেন আমাকে সম্ভাষণ কবছে-যে- জগৎ জীবনভােব আমার চারপাশে পাষাণের মতাে মূক হয়ে ছিল। বহুদিন পূর্বেকার কথা। বয়স তখন অল্প ছিল। মনে হত আমার চারপাশের জগৎকে কত কথাই না শােনাতে পারি। বাবা শিক্ষকতা কবতেন , অল্প বয়সেই তিনি মারা যান। তার কাছ হতে উতবাধিকারসূত্রে পেয়েছিলাম পৃথিবীব শ্রেষ্ঠ লেখকদেব গ্রন্থবাজি। আমার জন্মেব সময় পর্যন্ত নূতন নূতন গ্রন্থ কিনে তিনি তাঁর গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ কবেছিলেন। গৃহকর্ম সমাপ্ত হ'লে রুগ্না মায়ের সেবার ফাকে ফাকে অবকাশ পেলেই আমি এই গ্রন্থরাজ্যে ছুটে আসতাম। পঁচিশ বছর বয়সে মাকেও হাবলাম। আমি একেবারে একা প'ডে গেলাম। মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করার অভ্যাস না থাকায়, লাজুক স্বভাবের জন্যে, একান্তভাবে আমার প্রিয় গ্রন্থগুলাের শরণ নিলাম , সান্ত্বনাও পেলাম। প্রথম দিকটায় মধ্যে মধ্যে গ্রন্থাগাবটা কালােপযোগী বববাব জন্যে নূতন প্রকাশিত পুস্তকও কিনবাব চেষ্টা করতাম। তার জন্যে সঞ্চিত সমন্ত অর্থ ব্যয় হয়ে যেত। বৃথাই। আমার উপর যে গ্রন্থ যত প্রাচীন, তাব প্রভাব তত বেশি হয়ে পড়েছিল। এমনি গভীরভাবে যে তথন’ আব শ । ব্যাজাকের উপন্যাস ১৭ ‘এখন'-এর মধ্যে সর্বদেশে সর্বকালে যে ব্যবধান দেখা যায় তা পূর্ণ করার আমি কোনাে উপায়ই উদ্ভাবন করতে পারলাম না। এ বিষয়ে সজাগ হতেও আমার অনেক সময় লেগেছিল। আধুনিক সাহিত্য আমার কাছে অসহ বােধ হত , স্বপ্নলােকের রহস্যের মধ্যে আরও গভীরভাবে ডুব না দিয়ে আমি মােটেই সােয়ান্তি পেতাম না। কিন্তু এই সময় স্বয়ং মানবনমাজকে সম্ভাষণ করবার একটা দুরন্ত কামনা আমার মধ্যে উদ্বেল হয়ে উঠলাে। প্রথম প্রথম কবিতার মধ্যে দিয়ে অন্তরে এ ব্যাকুলতা প্রকাশ করতাম , তারপর কথিকা লিখবার চেষ্টা করলাম, শেষ পর্যন্ত একখানা উপন্যাল। যা লিখতাম লেখনী হতে সহজেই উৎসারিত হ'ত। নিজেকে এমনিভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার যে কি আনন্দ। জীবনে সবচেয়ে ভালাে কেটেছিল সেই দিনগুলো। এ-ভাবটা বেশি দিন স্থায়ী হ’ল না। এখন নতুন একটা খেয়াল ঘাডে চেপে বসলে রােখ চাপলাে, দুবন্ত রােখ। মােদ্দা, ছাপার অক্ষরে নিজে নাম প্রকাশ করতে চাইলাম। যারা আমার আদর্শ ছিলেন তাঁদের পুষ্পিত কাননের বাছাই-করা ফুল দিয়ে যখন এই সরল কামনাটীকে মাল্যভূষিত করতাম, তখন তার অর্থ বুঝিনি। আজ সে সব কথা বােঝা অনেক সহজ হয়েছে। বিশেষ বিবরণ দেওয়াব প্রয়ােজন নাই। নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন আমায় সংক্ষেপে বলতে হবে। একজন পুস্তকবিক্রেতার কাছ থেকে কয়েকজন প্রকাশকের ঠিকানা নিয়ে আমার পাণ্ডুলিপিগুলো পাঠিয়ে দিলাম—বিশাল জগতে। ফল হ’ল মর্মান্তিক। কয়েকখানা ফেরৎ এল , সঙ্গে ছােট্ট একটুখানি ক'রে চিঠি: “দুঃখিত, এটা আমাদের কাজে লাগবে না।” অন্যগুলাে অনেক ঠোকুর খেয়ে কোনাে উত্তর না নিয়েই ফিরে এল। একটা বইও প্রকাশকদের মনােনীত হ’ল না। আঘাত পেলাম, কিন্তু দমলাম না। অল্পকাল মধ্যেই মনে হ’ল, আমার । ১৮ ভিনদেশী লিখনভঙ্গী কঁচা, বড় বড় লেখকরা যে উচ্চ আদর্শ স্থাপনের প্রয়াল করে অমব হয়েছেন, মােটেই তার যােগ্য নয়। আবার আমার চিরপ্রিয় পুরাণে লেখকদেব বচনার মধ্যে ডুব দিলাম, তঁাদের দৃষ্টিকোণ আবিষ্কার করতে, তাঁদেব লিখনভঙ্গী আয়ত্ত করতে। আবর আমার লেখনী হতে নিঃসাবিত হ'ল কথিকা, প্রবন্ধ, কাহিনী। একবার একখানা বীতিমতাে উপন্যাসও। দ্বিতীয় পৌষের প্রথম ফলটা প্রথম পৌষফললের অনুগামী হওয়ার পরেও এখানা বড যত্নে, বড় বিশ্বাসেই বচনা কবেছিলাম। প্রকাশকদের কাছে, সম্পাদকদেব কাছে পাঠিয়ে দিলাম আবাব ফেরং এল। এতদিনে আমার লেখাগুলাে ছাপার অক্ষরে দেখবার ইচ্ছাটা মনে মনে একটা দৃঢ় সংকল্পে পবিণত হয়েছিল। দুনিয়ার ভাব বুঝতে পাবছিলাম না— কেন আমার প্রতি এই নির্মম ঔদাসীন্য। মরীয়া হয়ে, কোনাে বিশেষজ্জেব অভিমত নেওয়া স্থির করলাম। বাবাব অনেক দিনেব বন্ধু—কোনাে বিশ্ব- বিদ্যালয়েব ভাষা ও সাহিত্যের একজন অধ্যাপকের কথা মনে পড়লাে। বাবাব মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি মার কাছে একখানা আন্তরিক সহানুভূতিপূর্ণ পত্র দিয়েছিলেন। তাঁকেই লিখলাম। লিখবার সময় জানতাম না, তিনি বেঁচে আছেন কি না। তবু সাধারণ ভাবেই লিখলাম, যেন বেঁচে না থাকাটাই আশ্চর্য। বেঁচে তিনি সত্যিই ছিলেন। কিছু দিন পব, তব কাছ হতে আমার পাঠানাে কাগজের মস্ত ডাটা ফিবে এল, সঙ্গে একখানা দীর্ঘ পত্র। সেখানা রুদ্ধশ্বসে পড়ে ফেললাম। পড়তে পড়তে বুক আমার ভেঙে যাচ্ছিল। বােধহয় হাজাব বার পড়লাম। এরই যেন প্রতীক্ষা করছিলাম। এ যে আমার মৃত্যুদণ্ড । আজও, এতকাল পরেও, এ ছাড়া অন্য নাম সেটাকে দিতে পারি না। তিনি আমার স্বপ্নলােক ভেঙে দিলেন। পরিবতে কিছুই পেলাম না।
ব্যাজাকের উপন্যাস বৃদ্ধ অধ্যাপক পিতৃ-সুলভ স্নেহের ভাবে লিখেছিলেন, “তােমার জীবন- কাহিনী, রুচি-অরুচি প্রভৃতি থেকে আমার পুবাণাে বন্ধুর আত্মজার পরিচয় পেলাম। এই কারণে, অবশ্য তুমি বিশেষ কবে আমাকে অনুরােধ করেছ ব’লেও, তােমার লেখার সম্বন্ধে আমার সুস্পষ্ট মতামত–সম্পূর্ণ সত্যটা প্রকাশ কববাে। অন্যভাবে বলা সম্ভব নয় বলেই কথাটা এভাবে বলতে হচ্ছে । —তুমি তােমার জীবন-ধাবার নাগপাশে বদ্ধ হয়েছ, পুবাণণা গ্রন্থকারদের মােহে একেবারে অভিভূত হয়ে গিয়েছ। নিজে লিখতে গিয়ে তাদের বাঁধন ছাড়িয়ে ওঠা তােমার পক্ষে স্পষ্টই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অমর সাহিত্যকে মূল-মন্ত্র বা মােটেই ঠিক নয়। তােমার কি মনে হয় আইকেনডফেব মত কোনাে লেখক এই ১৮২৬ সালেও তার ‘অপদার্থের মতাে একখানা বই লিখতেন, -এই বকম ধাঁচে? কোনাে অমর সাহিত্যের বস গ্রহণ কবার অর্থ তাে সেটাব ভিন্নযুগীয়তা ভুলে যাওয়া নয়। বস্তুতঃ কোনাে মহৎ গ্রন্থই তাব প্রথম প্রকাশের তারিখটার সূচনা না দিয়ে ছাপা হওয়া উচিত নয়। যদি কোনাে সমালােচক কোনাে পুস্তককে, সেটা প্রকাশ হবার ত্রিশ কি পঞ্চাশ বছর আগেকার জনসাধাবণবই উপযুক্ত মনে করতে একান্তই বাধ্য হয়, তাহলে সেটা লেখা পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কি ? “হায়রে হায় । এব মধ্যে যে দু'পুরুষ কেটে গিয়েছে।”—এমনি একটা নিষ্ঠুব আঘাত দিয়ে অধ্যাপক মশায় তার সমালােচনা শেষ করেছিলেন, এব পরে দু'একটা সান্ত্বনার কথা বা শুভ-কামনা যে না ছিল এমন নয়। প্রাচীন গ্রন্থকারদের উপর আমার যে প্রেম সেটা অক্ষুন্ন রেখে, তাদের মধ্যে যে সাধনা ও সিদ্ধির পরিচয় রয়েছে সেটা লাভ করবার সর্বপ্রকার প্রয়াস আমাকে ত্যাগ করতে হবে। এক কথায়, তাদের আদর্শলােকে আমায় আরও গভীরভাবে, অধিকতব বিনয়ের সঙ্গে প্রবেশ করতে হবে, যাতে তাদেব অন্তবতম আত্মা আমার কাছে উদঘাটিত হতে পারে কিন্তু সে উদঘাটন শুধু আমাবই কাছে হওয়া চাই।
২০ ভিদেশী 2 শুধু আমার কাছে অধ্যাপকের বক্তব্য বেশ বুঝলাম। লেখা আমায় বন্ধ করতে হবে। সে যে অসম্ভব। কিন্তু এই কি সত্যি? নিশ্চয়ই নয়। আমি খুব ভাল কবে জানতাম, আমার দৃঢ় ধারণা হয়ে গিয়েছিল, আমার মধ্যে দৈবী প্রেরণা আছে, যার বলে আমি মানুষকে সম্ভাষণ করতে পারি, তার অন্তবকে দৃঢ়ভাবে আকর্ষণ করতে পাবি, মথিত কবতে পারি। একটা বিষয়ে অবশ্য অধ্যাপক ঠিকই বলেছিলেন। আমার অন্তরস্থ পবিত্র এষণাগ্নি বিগত কালেব লেখকদেব দুষ্ট প্রভাবে নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। ছেলেবেলাকার এ-অভ্যান আব কাটিয়ে উঠতে পারবাে না। সেটাও ভাল করেই জানতাম। সত্যিই কি তাহলে আমায় লেখা বন্ধ করতে হবে ? অন্য ভঙ্গীতে লেখা তাে আমাৰ দ্বাৰা হযে উঠবে না। এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হয়েছে তা একবাব প'ডে নিলাম। অসুখ বাড়ায় সমস্ত সপ্তাহটা কিছুই লিখতে পারি নি। আজকে, হয়তাে অল্প সময়েব জন্যে, একটু ভাল বােধ হচ্ছে। সংক্ষেপে বলতে চেয়েছিলাম, অনেক ব’কে ফেলেছি। তবু বক্তব্য বিষয় খাপছাড়া ভাবেই নিবদ্ধ হ'ল। এব পর থেকেই আমার দুরদৃষ্টের আরম্ভ। ঐ দিনেব পব হতে আজ পর্যন্ত আমার জীবনের ধাবা কোন্ প্রণালীতে বয়েছে, তার কোনাে আভাষ এ পর্যন্ত দিই নি। দীর্ঘ একটানা প্রবঞ্চনা ও মিথ্যার প্রণালী ধ'রে। সুৰু হয়েছিল কৌতুকচ্ছলে। প্রাচীন কালের বড় বড় মনীষীদের বিরুদ্ধে সে যেন একটা ছেলেমানুষী বিদ্রোহ কেন তারা আমার সর্বনাশ করলেন। অধ্যাপক মশায় আমার প্রতিখানি পাণ্ডুলিপিব ওপর লাল পেন্সিলে লিখে দিয়েছিলেন—সেটা লিখবার সময় কোন্ বড লেখকের ভূত আমার হতে ভর করেছিলেন। কোনটায় ‘ব্যাজাক’ কোনটায় ‘তুর্গেনিভ’ ‘গ্যেটে’, ‘ক্লাইঃ। লেখাগুলাে ভাল করে প'ডে অস্বীকার ব্যাজাকের উপন্যাস করতে পাবলাম না, বৃদ্ধ ভুল করেন নি। কল্পনায় আমি পড়তে লাগলাম, আমার সমাপ্ত বা পরিকল্পিত কোন রচনার শীর্ষে কোন বড় লেখকের নাম থাকা উচিত। নিজের রচনার ভাব ও ভঙ্গীতে সেই সব বড় লেখকদের কতখানি অনুকরণ কবতে পেবেছি তা দেখে একটা তিক্ত আমােদ বােধ হত। প্রায় ঐ সময়ে আমাদের ‘টাগন্নাট' কাগজের প্রথম সম্পাদক-এর সঙ্গে আমার একটু পরিচয় ছিল তার পরিকল্পিত রবিবাসরীয় সংখ্যার জন্যে আমাদের প্রাচীন সাহিত্য থেকে অল্প পরিচিত বা বিস্তৃত কিছু কিছু রচনা সংগ্রহ কবে দিতে আমাকে অনুরােধ করলেন। চয়নের ভার রইলাে আমাব উপব , রাজনীতি বা ব্যবসায় সম্পক্ত বড় বড় সমস্যার বিচারে ছিল তাঁর নিজেব অভিরুচি। চট করে আমি সঙ্কল্প ক'রে নিলাম। আমার ব্যগ্র সম্মতি দেখে তিনি সরল মনে খুশি হয়ে উঠলেন। মৃত্যু পর্যন্ত বেচারীব ভুল ভাঙে নাই। একটা উপন্যাস লিখলাম,-“ ব্যাজ্জাক বিরচিত'। লেখাটা যখন দফায় দফায় পাঠিয়ে দিতাম, মনে হ’ত যাদের ভূত আমায় পেয়ে বসেছে, পাশবদ্ধ করেছে তাদেব একজনের উপর খুব একচোট শােধ তুলে নিচ্ছি। উপন্যাসটা বের হবার আগের কটা দিন অবশ্য ছটফট করে কাটাতে হয়েছে। বারেবারে ভেবেছি, পাণ্ডুলিপি ফেরৎ চেয়ে নিই। বারেবারে অভিমানে বেধেছে, ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখবার আকাঙ্ক্ষা আমায় বিবত করেছে। নইলে যে আমার পূর্বেকার সমস্ত রচনা ব্যর্থ হয়ে যায়। একদিন হঠাৎ সম্পাদকের আফিসে আমার ডাক পড়লাে। ভয়ে আধমরা হয়ে তার কাছে গেলাম। ভেবেছিলাম, ধরা পড়ে গিয়েছি। না, তা নয়। প্রুফ রীডার আসে নি, কম্পােজিটার এক ফালি ভিজে কাগজ এনে দিল আমার হাতে , বললাে, ভুল থাকলে যেন শুধরে দিই। তখন আমার গর্বই বােধ হ’ল। হাঁ, গর্বই। সাফল্যের প্রথম নিদর্শন কম্পিত হস্তে ধারণ করে নবিশের যে ২২ ভিনদেশী গর্ব জন্মায়, সেই গর্ব। যত্ন কবে ভুল সংশােধন করলাম। যা হয় হােবলে গা ঢেলে দিলাম। মনের মধ্যে একটা প্রশান্তি নেমে এল। এপথে প্রথমে পা দিয়েই যে সমস্ত সম্ভাবনা চোখে পড়লাে, ভাল করে সেগুলাে আলােচনা করে নিলাম। অসংখ্য সম্ভাবনা কাজ কবে চললাম—হাঁ, একথা বলবাব অধিকার আমাব আছে, এটা যে আমার বিরুদ্ধে একটা অভিযােগও,কাজ করে চললাম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, সযত্নে। এখানে একটা কথা বলে বাখা প্রয়ােজন সৃষ্টির সঙ্গে যােগ করলাম সার্থক চাতুর্য । এক একজন প্রাচীন লেখককে আদর্শ নিয়ে তাকে পুনর্জীবিত কবে তুলতাম। মধ্যে মধ্যে মনে হত, তিনিই যেন আমার টেবিলের উপর লিখে যাচ্ছেন আব আমি তার পিছনে দাড়িয়ে তাই দেখছি। তাকে অনুপ্রাণিত কবছি। সে সব লেখা আমার। ডিকেন্স থেকে নিলাম—শুধু তাঁব নামটা নয় তাব জাবালাে দীঘ-বাক্য বচনাভঙ্গী। আমাদের বসবাজ প্ৰেজাব-এব হয়ে চাটি চাটি বুলি ভাঁজলাম। হেকেল যে-সব চিঠি লিখলেও লিখতে পাবতেন, সেগুলি কপােল হতে সযত্নে উদ্ধাৰ কবলাম। এই সমস্ত বড় লােকদেব মুখ দিয়ে বাব বা গেল কত বক্তৃতা, অন্য প্রাচীন লেখকদেব সম্পর্কে তাদেব রুচি অরুচির কথা, তখনকাব বিবিধ ঘটনাব সম্বন্ধে তঁাদেব মতামত। কিছুদিনের মধ্যেই হাত পাকা হয়ে গেল , অনুত্তেজিতভাবে, শান্ত হয়ে, নিজের কল্পনাব উধ্ববিহার লক্ষ্য কবতে লাগলাম। আমাদের হবে স্কুলে, পৰীক্ষার প্রশ্নপত্রে বুডাে গ্যেটের মুখে আমি যে উক্তি আবােপ করেছিলাম, তার সম্বন্ধে একটা প্রবন্ধ বচন। কবতে দেওয়া হল, দেখলাম। এই স্কুল থেকে উত্তীর্ণ এক ছােকরা-সাহিত্যিক ভলতেয়াবএব বহু উক্তি তুলে একটা প্রবন্ধ লিখে ফেললাে ,—উক্তিগুলাের বেশিব ভাগ আমারই উদ্ভাবিত। আরও লিখতে পারতাম, কিন্তু সময় নাই। আমার দিন ফুবিয়ে এসেছে। পূর্ণসত্যের অনুরােধে আব একটা মাত্র কথা বলা প্রয়ােজন।
শেষ। ** বাজারের উপন্যাস আমার স্বরূপ কেউ চেনে নি , কানাে ধরা পড়িনি। ধবা পড়াটা যেন কতবাব আমি নিজেই কামনা কবেছি তাৰ প্রতীক্ষা কবেছি। ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে উ ব্যভুবতে চাই না। আমি যেন আর কেউ হয়ে পড়েছিলাম , একসঙ্গে শতটা জীবন যাপন কবেছি—তার একটাও আমার নিজের ছিল না। আপনি জানেন, লেখার জন্যে আমি কখনাে কোনাে দক্ষিণা নিই নাই। তবু কেন লিখে গিয়েছি সে কথা এখন আর পবিষ্কার কবে বনা। বাহুল্য হবে। আমার নামটাও অবশ্য ববাবব অজ্ঞাত বেখেছিলাম। বচনাটীতে কেবল নিজেব নামেব আদ্যাক্ষৰ দুটী প্রকাশ কবেছি। কেউ অবশ্য এটা টেব পাবে না। এবাবে নাম দেওয়াতে আমার কোনাে অন্যায় হয়নি। গল্পটা একাধিক অর্থে আমাবই। এতক্ষণ যা পড়লেন তা হতেই বােধহয় আপনি বুঝে থাকবেন, ‘লেখা-চোব’খানা ব্যাজাক্ লেখেন নাই- ওটা আমাবই জীবনেব নিবন্ধাব বিবৃতি মাত্র আমাব এই প্রবঞ্চক জীবনেব। হাঁ, আমিই এই লেখা-চোব'। একথা সত্যি, বড় লেখকদেব এক নাম ছাডা, কখনাে কিছু চুবি কবিনি , যে-গর্বোন্নত দৃষ্টিতে এই দুনিয়াকে দেখেছি সেটা ছাড়া তাদের কাছে আর কিছুর জন্যেই আমি ঋণী নই। আপনার প্রশ্নেব উত্তর দেওয়া হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন কবেছিলেন বলে আপনাকে ধন্যবাদ। আমার জীবনের এই গােধূলি-লগ্নে অন্তত একজন মানুষকে এই জীবনটা বােঝাবাব অবকাশ পাওয়া গেল। অবকাশ আপনি দিয়েছেন, সেই জন্যেই ধন্যবাদ। লেখা-চোর’ বইখানাব ব্যাপারে আপনি যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, আমার রচনাভীর চমৎকাবিতা সম্বন্ধে যে সব মন্তব্য করেছেন, তাতে মনে হয়েছে আপনি হয়তাে আমার স্বরূপ বুঝবেন। প্রশ্নটা তুলে যে ২৪ ভিদেশী এখন আর সময় নাই। মৃত্যু আমাকে প্রায়শ্চিত্তের সুযােগ দেবে না। এখনই অবশ্য একটু ভালোেৰ দিকেই আছি, তাই এ-পত্ৰ শেষ করা সম্ভব হ'ল। তবু জানি, আমার এই ভালাে-থাকা কত অনিশ্চিত। আমার বা আমার ডাক্তাবের এ বিষয়ে কোনাে মােহ নাই। দিন গােণাগুণতি হয়ে এসেছে। এবার চিঠি শেষ করে শিল-মােহর করা সেবে রাখতে হবে। মৃত্যুর দিনের তাৰিখ দিয়ে এটা যেন ডাকে দেওয়া হয়,—বলে রাখলাম। কাজেই, বুঝছেন, আপনার সঙ্গে কথা বছেন এক মৃত নারী। জীবিত কালে যে সুন্দর সহানুভূতি আপনার কাছ থেকে পেয়ে গেলাম, এখনও তার কিঞ্চিৎ হতে যেন বঞ্চিত না হই পাবেন যদি, আমার মৃত্যুর পরে সেটা নিবেদন করবেন।-ক্যাবােলিন মেয়াব। * * অট্রিয়ান গল্প-কাউন্ট টু হােহেনষ্টাইন - অদমনীয় রুমানিয়ার জেলগুলাে যেন জ্যান্ত মানুষেব গােবন। সেগুলাের ভিতর যেসব কাণ্ড ঘটে, আমি জানি। তারই তদন্ত করতে আমি রুমানিয়ায় গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে কয়েদীদের সঙ্গে আলাপ কবেছি , তাদেব চিঠি পেয়েছি , বসেভিজমেব জন্যে দণ্ডিত বা সন্দেহক্রমে ধৃত’ রাজনৈতিক বন্দীদের ডফটানা, যিলাভা, ভাকারেষ্টি প্রভৃতি যেসব জায়গায় রেখে ধীরে বীবে মেরে ফেলা হয়, সেই সব অতি আধুনিক বর্বরতার অন্ধ গহবর থেকে বেবিয়ে-আসা অনেকের কাছে আমি এ সম্বন্ধে সন্ধান নিয়েছি। অসংখ্য তথ্য পেয়েছি—সুস্পষ্ট, অনস্বীকার্য তথ্য। আমার চাবপাশে ভিড় করে তারা ব্যাকুল আগ্রহে ভাষা চাইছে। এই তথ্যগুলাের একটা আজ আমি এখানে পেশ করবে—মাত্র একজনের কাহিনী। জি, বুজোর ছিলেন রুমানিয়ান উকিল। রুশিয়ার উপর তাঁর আন্তরিক দবদ ছিল। বিশেষ করে এইটেই হ’ল তার বিরুদ্ধে সব চেয়ে বড় অভি- যােগ—তিনি ছিলেন রাকভস্কির খামুন্সী। তা ছাড়া, রুমানিয়া যখন জোর করে বোয়াবিয়া দখল করে, তিনি তার প্রতিবাদ করেছিলেন। নিজেদের শাসন-ব্যবস্থা নিজেরা করে নেবার যে স্বাভাবিক অধিকার মানুষের আছে, সেই অধিকারের এই অতি নিলজ্জ অস্বীকৃতিকে, এই অদ্ভুত আন্তর্জাতিক দতাকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেন নি। তাই, আজ ছ’ বৎসর ধরে বুজোর ডফটান। জেলে বন্দী। ছ’ বৎসর ২৬ ভিনদেশী কাল অবিবত শিকলপবা অবস্থায় ছােট্ট একটা সেলের মধ্যে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। সেলের মধ্যে আছে একটা কাষ্ঠশয্যা , হাতে পায়ে লােহার কডি প'বে তারই ওপর তিনি পড়ে থাকেন। ওই খানেই খাওয়া, ওই খানেই শােওয়া। হাতের নাগালের মধ্যে একটা প্যান্। সেইটেই একমাত্র আসবাব , আজ চুয়াত্তৰ মান এটী তার সঙ্গে বয়েছে। বুজোবকে ঘিবে একটা নিচ্ছিদ্র গােপনতাব লৌহপ্রাচীব খাড কবা হয়েছে। কারুব সাথে দেখা কবার অনুমতি তার নাই। জেলে ঢোকাব পর থেকে তাকে একজন মানুষেবও মুখ দেখতে দেওয়া হয় না , একজনেরও কণ্ঠস্বর শুতে দেওয়া হয় না। পড়া নিষেধ , লেখা নিষেধ। এই অন্ধগুহাব মধ্যে লেখাপড়া সম্ভবও হ'ত না। এই নিন্দুকেব মধ্যে আলাে প্রবেশের পথ নাই। চব্বিশ ঘণ্টা অন্তব, জেলাব আসে , ভাবী দবজাটা একপাশে ঠেলে, গরাদেব ফাক দিয়ে জঘন্য লক্ষ্মী বেখে যায়। সেটা তব মহাভাগ্য। হাতটাও যদি কোনােদিন তিনি দেখে থাকেন। এমনি অন্ধকার । প্রথম প্রথম, একান্ত সংস্কাবের বশে তিনি জেলাবের সঙ্গে কথা বলবাব চেষ্টা কবতেন, শুধু একটীবাব মানুষের গলা শুনবার জন্যে। মিথ্যে আশা। রুমানিয়ার মুষ্টিমেয় শাসকগােষ্ঠীব কড়া আদেশ, বুজোবেব সঙ্গে কারও কোনও বকম আলাপ চলবে না। মানুষকে মডার সামিল ক'বে, জ্যান্ত মানুষকে সমাধি দিয়ে, এই যে ভয়াবহ অত্যাচার চলেছে, এটাকে একটুকুও লঘু করবার কোনাে চেষ্টাই সফল হয়নি। রুমানিয়ার শাসকদের জিঘাংসাবৃত্তি এব কমে তৃপ্ত হয় না। সােভিয়েট রুশিয়া বুজোরেব বিনিময়ে অন্য বন্দী দেবার প্রস্তাবও দিয়েছিল , রুমানিয়া রাজী হয়নি। তবু, একদিন বুজোরের সঙ্গে দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে, তার সাড়া পাওয়া গিয়েছে।
অদমনীয় ২৭ একবার গুজব উঠলাে, বুজোর মারা গিয়েছেন , আবাব গুজব উঠলাে তিনি একেবাবেই পাগল হয়ে গিয়েছেন। ডফটানা জেল থেকে লেখা একজন বুড়াে কয়েদীব একখানা চিঠি আমি নিজের চক্ষে দেখেছি, তাতে লেখা ছিল—রাত্রে ঝডজল না হলে, মাটীব নীচে থেকে মাঝে মাঝে কানে আসে, গানের গুগুনানিব একটা চাপা একঘেয়ে আওয়াজ। ও-ই বুজোব। লেকুৎসা ফিলিপােভিচি ব’লে একজন অল্পবয়সী মজুবণী সঙ্কল্প কবলো, যেমন কবে হােক সে বুজোবের সঠিক সংবাদ জানবেই। ভাগ্যক্রমে একটা সুযােগও মিলে গেল, ‘তিনশ জনেব বিচাব ব'লে বিখ্যাত বাজনৈতিক বিচাবেব শুনানির সময় সরকার পক্ষে উকিল ঘােষণা করলাে, অষ্টাদশী লেমুৎসা নাকি বুজোরের বক্ষিত ছিল। কথাটা মিথ্যে , মেযেটী কিন্তু এই মিথ্যা বটনাকেও কাজে লাগাতে ত্রুটি কবলাে না। সে কমুনিষ্ট-দলনেব প্রধান পাণ্ডা, ক্যুনিষ্ট ব্রিগ্রেডে’ব বউ কত, রুদ্রমূতি ব্যাসিউলেস্কুব কাছে গিয়ে হাজির হ’ল। জিজ্ঞেস কবলল, “শুনছি বুজাব নাকি মারা গিয়েছেন।” ব্যাসিউলেস্কু জবাব দিল, “বাজে গুজব , সে বেঁচে আছে।” লেমুৎসা সাহসে ভর করে তার আর্জি পেশ কবলাে, “আপনি তাে জানেন, উনি ছিলেন আমার ভালােবানাব লােক। আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই যে, উনি বেঁচে আছেন।” বডনাহেৰ পিছন ফিরে বসলাে। সরকার থেকে কড়া হুকুম রয়েছে, কয়েদীকে কোনাে লােকেরই সংস্পর্শে আনা চলবে না। লেমুৎসা মরীয়া হয়ে ধ'রে বসলাে। ভয় দেখালাে, সে একটা হুলুস্থল বাধাবে, কত কাকুতি মিনতি কবে দেখলল। শেষ পর্যন্ত ঐ রাক্ষসটার কাছে নতজানু হয়ে কঁদতে লাগলাে। তারপর, যা দেখলেও বিশ্বাস হয় না, তাই ঘটলাে। অনেক দ্বিধার পর, কে জানে কেন, (করুণায় নয় নিশ্চয় ), বড় সাহেব মুখ ২৮ ভিদেশী ফিরিয়ে খেকিয়ে উঠলাে, “মরগে যা, নিজে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে, কথা কয়ে আয়। তিন মিনিট সময় দিচ্ছি।” তালা-আগল খােলা পাওয়ার ছাড়পত্র নিয়ে লেমুৎসা চললাে একটা দীর্ঘ অন্ধকার গলি-পথে। দেওয়াল থেকে যেন বরফের হাওয়া বেরুচ্ছে। অন্তহীন পথটার একজায়গায় এনে জেলার থামলাে। তালায় চাবি ঢােকানাে হ’ল , ভাবী কবাটটা ঠেলে একপাশ করে দিতে, লােহার গরাদ চোখে পড়লাে। ভিতরে নজর যেতে, লেমুৎসা দেখলে বুজারের কাপড় চোপড় ছিডে গিয়েছে , দাডীতে মুখখানা ভরে উঠেছে। কাঠের খাটটার ওপব তিনি হাত- পা গুটিয়ে পড়ে আছেন। লেমুৎসা লক্ষ্য করলাে, দবজা খুলতেই আধ-অন্ধকার গলি-পথ থেকে যে ক্ষীণ আলােকটুকু পেলে গিয়ে পড়লাে, তাতেই তব চোখে ধাধা লেগে গিয়েছে। বন্দীব মুখে একটা পাগলাটে ভাব। বেশ বােঝা যায়, তাব অবস্থা আর স্বাভাবিক নাই , ছ'বৎসর অন্ধকারের মধ্যে উৎপীডন ভােগ করতে করতে তাব মানসিক বিকৃতি ঘটেছে। আকস্মিক আবেগে লেমুৎসা গরাদের ফাক দিয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল , জেলার ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিল। কয়েক মুহূত লেংসা স্তম্ভিত হয়ে রইলাে , তার বাক্য-শ্রুতি হ'ল না। পরে, নিজেকে সামলে নিয়ে সে বললাে, “কমবেড, বুজোর, বন্ধুদের পক্ষ থেকে আমি আপনাকে অভিবাদন জানাতে এসেছি।” এই কণ্ঠস্বর শুনে বন্দীর মধ্যে, বন্দীর অন্তরের নিগূঢ় প্রদেশে যেন একটা বিপর্যয় ঘটে গেল। তার সমস্ত দেহে একটা কিসের যেন আলােক ঝলকে গেল। তিনি কথা বললেন,-অধমৃতের মতাে অতি ক্ষীণ, অথচ সুস্পষ্ট কণ্ঠে তিনি যা বলেন সেটা তাঁর মৃত্যুর মতাে ভয়াবহ একক জীবনের, প্রতি মাসের, প্রতি বৎসরেব, একমাত্র ধ্যানের বন্ধু। সে কথা তাঁর নিজের সম্বন্ধে
অদমনীয়
নয়, বন্ধুদের সম্বন্ধে নয়, আত্মীয়-পরিজন সম্বন্ধে নয় , সে তার সমগ্র
জীবনের সব চেয়ে গুরুত্বময় ভাবনা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,
“রুশিয়ায় বলশেভিকরাই এখনও সবল আছে তাে ?”
“আছে, আছে।”—লেনুৎসা ব্যগ্রকণ্ঠে জানালাে, “আছে।”
জেলার রূঢ়ভাবে ধমক দিয়ে উঠলাে “রাজনীতির চর্চা নিষেধ আছে ?”
লেনুৎসা এবার জিজ্ঞাসা করলাে, “কমবেড, বুজোর, আপনার কি কোনাে
কিছুব দরকার আছে ?”
বুজোরেব সংক্ষিপ্ত উত্তর এল, “না। আমি এখন সুখী।”
তাবপর বিদায় নেওয়া হ'ল। বুজোরকে দিতে পারবে আশা ক'রে,
লেমুৎসা সঙ্গে কিছু খাবাব, ক'খানা বই এনেছিল , সেগুলাে দেওয়া গেল না।
আইনভঙ্গ তাে চতে পারে না। কারও কাছ থেকে কিছু নেবাব
হুকুম বুজোরের নাই।
* ফরাসী গল্প - আঁরি বাস্তুস)
(তপান্তরে পেবেকফ, থেকে যখন বেরুলাম, মেজাজ উঠেছে চবমে, জঠবে জ্বলছে নেকড়ে বাঘেব ক্ষুধা, অন্তবে সাবা দুনিয়ার উপর একটা বিপুল বিদ্বেষ। চুরি কবে হাে, খেটে হােক্, কিছু সংগ্রহ কববার উদ্দেশ্যে পূরাে বারো ঘণ্টা আমাদের সমস্ত শক্তি ও কৌশল ব্যর্থ প্রয়ােগ করার পর নিঃসংশয়ে যখন বুঝলাম ও দু’টির কোনােটাই সেখানে সম্ভব নয়, তখন সম্মুখে এগুনােই স্থিব হ'ল। কিন্তু কোথায় ? যে চুলােয় হােক্, সম্মুখ। এ বিষয়ে সকলে যে একমত সেটা বুঝলাম মুখ চাওয়া-চাওয়ি কবে। অবশ্য জীবনের যে পথ এতদিন আসা গেল, নেপথ ধ'বে এগুতে আমরা যে কোন বকম গবরাজী ছিলাম, এমন নয়। যা হাে, সিদ্ধান্তটি গৃহীত হ’ল বিনা বাক্যব্যয়ে , আমাদের ক্ষুধিত চক্ষে ক্রুদ্ধ দীপ্তিতে সেটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠলাে। দলে ছিলাম আমরা তিন জন। দিন কয় আগে নীপার নদীর ধারে খেননে একটা তাডিখানায় আমাদের প্রথম পরিচয়। আমাদের মধ্যে একজন এক কালে বেলওয়ে পল্টনে সৈনিক ছিল, পরে পােল্যাণ্ডে ভিশ্চলার ধারে কোন বেলওয়েতে মজুরী করতাে। তার মাথার চুলগুলাে লালচে, দেহ বলিষ্ঠ , সে জর্মন ভাষায় বলতে কইতে পারতাে, তাছাড়া, কয়েদী জীবনেব যাবতীয় তথ্য ছিল তার নখাগ্রে। 1 If তেপান্তরে প্রায়ই কিছু-না-কিছু সঙ্গত কাবণ থাকে বলে আমাদের মতাে লােকে নিজেদের অতীত কাহিনী নিয়ে কোনাে প্রকার আলােচনা পছন্দ করে না। কাজেই যে যা বলে তা মেনে নেওয়াই আমাদেব দস্তুর , অর্থাৎ আমরা কি, সে সম্বন্ধে আমাদের বিশ্বাসটা নিছক বাহ্যিক , ভিতরে ভিতরে আমরা নিজেদিকেই বিশ্বাস করে উঠতে পাবি না। আমাদের দ্বিতীয় সাথীটিব চেহারা ছিল চিমলে, সে ছিল মাথায় খাটো, আব তার পাতলা চাপা ঠোট দুটিতে যেন অবিশ্বাস ফুটে বেরুতত। সে নাকি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ছিল। আমি এবং সৈনিকটি অবশ্য নির্বিবাদে তাই মেনে নিলাম। সে ছাত্র, চোর কি পুলিসের গুপ্তচর, যাই হােক্ না, আমাদেব কাছে সব সমান কথা। এইটুকু জানলেই যথেষ্ট যে, সে আমাদের স্বগােত্র । সেও খেতে পায় না, তার ওপরেও পুলিশের অনুগ্রহদৃষ্টি, গেয়াে চাষীরা তাকেও সন্দেহের চক্ষে দেখে। আর ঐ দুটি জাতকে সেও আক্রান্ত বুভুক্ষ পশুব মতাে নিস্ফল আক্রোশে ঘৃণা কবে। আমাদের মতাে সেও দুনিয়ার সবাব ওপর কোনও দিন একটা বিবাট প্রতিশােধ নেবে এই স্বপ্ন দেখে এক কথায় প্রাকৃতিক বা জৈব জগতে তার অবস্থা আমাদের থেকে একটুও স্বতন্ত্র নয়, আমরা এক গােয়ালেরই গরু। বিভিন্ন চবিত্ৰেব লােককে একসূত্রে গেথে নিতে দুর্ভাগ্যের জুড়ি নাই , আমবা মর্মে মর্ম বুঝেছিলাম, নিজেদিগকে দুর্ভাগা মনে করার অধিকাৰ আমাদের আছে। দলের তৃতীয় ব্যক্তি আমি। নম্রতা আমার স্বভাবসিদ্ধ , অতি শৈশব থেকেই আমি এ গুণের পরিচয় দিয়ে আসছি , সুতরাং নিজের গুণের কীর্তনটা নাই কবলাম। অতিসারল্যের ভাঁড়ামি করবাবও ইচ্ছা নাই। কাজেই নিজেব চারিত্রিক দোষত্রুটিগুলােও চেপে গেলাম। নিজের চরিত্র সম্বন্ধে এইটুকু আভাষ দিলেই বােধ করি যথেষ্ট হবে যে, আমি ভিনদেশী চিরকাল নিজেকে আর সবার চেয়ে ভাল মনে করে এনেছি এবং আজও করি। পেরেকফ ছেড়ে এগিয়ে চলাম। আমাদের সেদিনবাব লক্ষ্য ছিল বিরাট প্রান্তরের মধ্যে কোনও রাখালকে পাকড়াও করা। এ আধ টুকরাে রুটি সব সময়েই এদের কাছে চাওয়া যায় , ভবঘুরেদের এরা বড় একটা বিমুখও করে না। আমি চছিলাম সৈনিকটিব পাশে পাশে, ছাত্র ছিল আমাদের পিছনে। তার স্কন্ধে যে জিনিষটা ঝুছিল, এক কালে সেটা কুর্তাজাতীয় কিছু ছিল , তার ওপরের দিকে সরু-হয়ে-ওঠা, ছােট-করে-ছাটা মাথাটাব ওপর বিবাজ করছিল একটা ছেড়া টুপি , লিলিকে পা দু'খানা ঢেকে ছিল বিচিত্রবর্ণ, তালি মারা, ধূলিধূসর একটা পায়জামা , জামার আন্তব থেকে সুতাে বের কবে পাযেব সঙ্গে বাঁধা ছিল রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া এক জোড়া জুতােব শুতলা , ও অবশ্য সেটাকে বলতে ‘চটি'। পিটপিটে উজ্জ্বল চোখ মেলে রাজ্যেৰ ধূলাে উড়িয়ে সে মুখ বুজে পথ হাঁটছিল। গায়ে ছিল একটা লাল রঙের মােটা সূতােব কামিজ,—তার নিজেব ভাষায়, খেরুসনে স্বহস্তে-সংগৃহীত লাল কামিজের উপর তুলে-ভরা ফতুয়া , মাথায় পল্টনী কায়দায় ডান-কপালেব-উপর-কাৎকবা কিম্ভত রঙের একটা ফৌজীটুপি। পরণে ঢিলে মােটা পায়জামা, পায়ে জুতাে নাই। আমারও পা ছিল খালি। এগিয়ে চলেছি। আমাদের চারিদিকে সুদূর আন্তীর্ণ প্রান্তব কোন বিরাটের আভাস নিয়ে নির্মেঘ নিদাঘ-আকাশের উত্তপ্ত নীল চন্দ্রা- তপের তলে একটা গােল কালাে থালার মত পড়ে রয়েছে। তার বুক চিবে একটা প্রশস্ত রেখায় চলে গিয়েছে ধূলিধূসর পথখানা। আমাদের পা যেন পুড়ে যাচ্ছিল। জায়গায় জায়গায় ফসল কাটা হয়ে গিয়েছে। সৈনিক বন্ধুব অমুণ্ডিত গণ্ডের সঙ্গে স্থানগুলাের ছিল একটা আশ্চর্য সাদৃশ্য। বন্ধুটি পথ চলতে চলতে মােটা ভাঙা গলায় গান ধরেছিলেন “তব পুণ্যাহে তেপান্তরে মােরা ভজি” পল্টনে থাকতে পষ্টনী গির্জার কীর্তনিয়া গােছের কিছু একটা কাজও নে করেছিল, কাজেই ভজন ও গির্জা-সঙ্গীতের ভাণ্ডার ছিল ওব সুপ্রচুর , আমাদের কথাবার্তায় একটু শৈথিল্য এলেই সে এগুলাের যথেচ্ছ অপব্যবহার করতাে। সম্মুখে দিগন্তের গা বেয়ে বেগুনী হতে ফিকে গােলাপীতে মিলিয়ে আসা একটা স্নিগ্ধ-কান্তি সুষ্ঠু রেখা এঁকে বেঁকে মাথা তুলেছে। সেদিকে চেয়ে ছাত্রটি কর্কশকণ্ঠে বলে উঠলাে “নিশ্চয় ওগুলাে ক্রিমিয়া পর্বত”। “পর্বত” ? সৈনিকটি বললাে “পর্বত ? ওযে এখনও অনেক দূবে , বন্ধু, ও যা দেখছে তা হ’ল মেঘ। শুধু মেঘ । কিন্তু কি চমৎকাব, ঠিক যেন বলল মােরােঝ আব দুধের মতাে।” আমি এব ওপর একটা টিপ্পনী কাটলাম, “আহা! সত্যিই মােবােঝ আব দুধ হ'লে, কি মজাটাই না হত।” সহ আমাদের জঠরানল দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলাে। এ এক আচ্ছা অভিশাপ। সৈনিক বন্ধু একথা শুনে সশব্দে থুতু ফেললল—“দূৰ শালা ! এ পর্যন্ত একট। জ্যান্ত প্রাণীরও কি দেখা মিললো। কোথাও কেউ নাই। শীতকালেব ভালুকের মতাে নিজেব হাত চোষা ছাড়া গত্যন্তব দেখছি না”। তা শুনে ছাত্রটি বললাে, “আগেই তাে বলেছিলাম যেদিকে লােকালয় পাওয়া যাবে সেদিকে চলাে। বােঝে এখন।” সৈনিক ঝাঝিয়ে উঠলাে, “বলেছিলে নাকি। তা তুমি না বললে আর বলবে কে? লেখাপড়া জানা লােক তুমি। কিন্তু লােকালয় পেতে কোন্ পথে, শুনতে পাই ?” ছাত্র বন্ধু আর কোনােও উচ্চবাচ্য করলাে না, ঠোট চেপে রইলাে। सूर्य তখন অস্ত গিয়েছে। দিশ্বলয়ে মেঘমালা অবর্ণনীয় বিচিত্র আভায় উদ্ভাসিত হাওয়ায় লােনা মাটির গন্ধ। সেই মিষ্টি শুকনাে গন্ধে আমাদের ক্ষুধা তীব্রতর হয়ে উঠলাে। পেটের মধ্যে একটা যন্ত্রণা বােধ হ'তে হয়ে উঠেছে।
৩৪ সম্বন্ধে ভিন্দেশী লাগলাে। সে কি অদ্ভুত অসোয়াস্তি। মনে হচ্ছিল শরীরের মাংসপেশীগুলাে হ’তে সমস্ত রস যেন চুইয়ে পড়ছে , সেগুলো যেন শুকিয়ে যাচ্ছে, তাদেক সজীব নমনীয়তা যেন লােপ পেতে বসেছে , গলা আব মুখের ভিতরটা শুকতার টন্টন্ কবতে লাগলাে। মাথা ঘুবতে লাগলো, চোখের সুমুখে ছােট ছােট ছায়াবস্তু নৃত্য শুরু করলাে। সেগুলােকে কখনও দেখছিলাম সিদ্ধ মাংস টুকরোর মতাে, কখনও বা পাউরুটির মতাে। স্মৃতিব মােহিনী মায়ায় সেগুলোব যখন গন্ধও পেতে লাগলাম তখন মনে হ’ল পেটের মধ্যে কে যেন ছুবি চালিয়ে দিচ্ছে। তবুও আমরা এগিয়ে চল্লাম , চলি আর নিজেদেব অনুভূতি আলােচনা কবি , চারিদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখি, যদি কোথাও মেষ-টেষেব বেনােও চিহ্ন পাওয়া যায় , কান খাড়া থাকে যদি কোনাে তাতাবেব আর্মানিয়ার বাজার-মুখাে ফল-বােঝাই গাভীব ক্যাচ ক্যাচব শুনতে পাই। কিন্তু হায়রে ! এযে তেপান্তব, একেবারে নির্জন, নিস্তব্ধ। এই দুঃসময়েব প্রারম্ভে আমরা মাত্র দু'সেব রুটি এবং গােটা পাঁচ ছয় ফুটি তিনজনে ভাগ করে খেয়েছিলাম , তারপব, ক্রোশ তের পথ হেঁটে পেরেকফেব বাজাবে এসে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি, ঘুম ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গেই পেটেব জ্বালা ধরেছিল। ন্যায্য কথা বলতে হলে স্বীকার কবতে হয়, ছাত্র সত্যিই আমাদিকে রাত্রে না ঘুমিয়ে “কাজে লাগবাব পরামর্শই দিয়েছিল। সভ্যসমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির শ্লীলতাহানির কোন প্রকার পরিকল্পনা উল্লেখ করাটা গহিত, সুতরাং ও কথাটা হয় নাই আলােচনা কবলাম। আমি শুধু ন্যায্য বিচাবের খাতিরেই এ কথা তুলে ফেলেছি। নইলে ইতরামি করা তাে আমারই স্বার্থের প্রতিকূল। আমি কি জানিনা আমাদের এই উচ্চ সভ্যতার যুগে লােকে ক্রমেই কেমন সহৃদয় হয়ে উঠছে , প্রতিবেশীকে টুটি টিপে মাববার সময় লােকে এখন তেপান্তরে দিকে। ভব্যতাব গণ্ডী ছাড়ায় না, কাজটা যথাসম্ভব দরদের সঙ্গেই সমাধা করে। আমার নিজেব টুটিব সাক্ষ্য থেকেই আমি এই নৈতিক প্রগতির পরিচয় পেয়েছি আব ঐ অভিজ্ঞতাব জোরেই তাে আমি নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে এ কথা বতে পারছি যে, জগতে সব কিছুরই ক্রমােন্নতি হচ্ছে, আর এই প্রগতিটা বিশেষ কবে লক্ষণীয় হয়ে উঠছে জেল, তাডিখানা আর বেশ্যালয়েব বাৎসরিক সংখ্যাবৃওিতে। থাগে সে সব কথা। ক্ষুধায় লালা গিলে, গল্প গুজবে পেটের জ্বালাটা শান্ত কববাব ব্যর্থ চেষ্টা কবতে কবতে আমরা সেই জনমানবশূন্য নিস্তব্ধ প্রান্তবের মধ্য দিয়ে চলতে থাকলাম অস্পষ্ট-আশা-ভবা সূর্যাস্তেব রক্তিমাভার সম্মুখে, সূর্যদেব তব অন্তিম রশ্মিচ্ছটায় মেঘমালাকে রঞ্জিত কবে সেগুলাের অন্তরালে ধীরে ধীৰে ঢলে পড়ছেন। পিছনে, দুপাশে, একটা নীলাভ অন্ধকার, প্রান্ত থেকে আকাশেব দিকে উঠে, চারিদিকে সেই নিষ্ঠুর দিগন্তসীমাকে ক্রমেই সঙ্কীর্ণ করে তুলছে। সৈনিকভায় মাটি থেকে এক টুকরাে কাঠ কুড়িয়ে নিয়ে বললাে, “আগুন জালাবার জন্য কিছু সংগ্রহ করে ভাই, এই তেপান্তরেই তো রাতটা কাটাতে হবে। শিশিরও পড়ছে। কাঠ-কূটো যা পাও কুডিয়ে চলাে।” আমরা দুভাগ হয়ে রাস্তার দুপাশে শুনাে ঘাস, কাঠকুটো যা পেলাম, কুড়াতে সুরু কবলাম। যতবার মাটির দিকে ঝুকি, শবীর নেতিয়ে পড়তে চায় , মনে হয় শুয়ে পডি, শুয়ে পড়ে এই কাল কাল মাটিগুলাে খাই—যতক্ষণ পেটে তিল স্থান আছে শুধু খেয়ে যাই, তারপর ঘুমােই , সে ঘুম যদি শেষ ঘুমও হয়, তাতেই বা আপত্তি কি? খাওয়া তাে হবে মুখগহ্বর থেকে বিশুদ্ধ গলনালী বেয়ে, যা-হােক-কিছু-হজম-করা-দুর্বার-বাসনায় উন্মত্ত, ক্ষুধিত, মােচড-পীড়িত এই ছার জঠরটাতে ঐ আতপ্ত ঘনবস্তুটাব ধীরে ধীরে নেমে যাওয়ার অনুভূতিটা তাে পাওয়া যাবে।
ভিনদেশী সৈনিকের দীর্ঘশ্বাস শুনলাম, “গাছের শিকড-টিকডও যদি পাওয়া যেত। অনেক শিকডই তেল খাওয়া যায়। কিন্তু এই লাঙল দেওয়া কালাে মাটিতে একটাও কি শিকড় পড়ে আছে।” দেখতে দেখতে দক্ষিণ দেশের রাত্রি নামলাে। সূর্যের শেষ বশিটুকু মিলােতে না মিলােতে নীল আকাশে তারা ফুটে উঠলাে, চারপাশে ছায়া জমাট বেঁধে এল , বিশাল প্রান্তবটার অন্তহীন সমতলতা অন্ধকাবে আত্মগােপন করলাে। ছাত্রেব চাপা গলার আওয়াজ শােনা গেল, “আমাদেব বাঁদিকে কে যেন একজন শুয়ে আছে।” “মানুষ ?” লৈনিক সন্দিগ্ধভাবে জিজ্ঞাসা করলাে “মানুষ ? তা এখানে শুয়ে থাকতে যাবে কেন ?” ছাত্র যেন ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, “গিয়ে তাই জিজ্ঞেস করােনা। ও যখন এই মাঠের মধ্যে শুয়ে আছে ওর কাছে রুটি থাকা অসম্ভব নয়।” তাব কথামতাে বাঁদিকে তাকিয়ে সৈনিক একবাব থুতু ফেল্লো, তারপর সঙ্কল্প স্থির ক'রে নিয়ে বললো, “চলাে, ওর কাছেই যাওয়া যা।” রাস্তার বাঁ পাশে, প্রায় একশাে হাত দূরে একটা লােক যে ছােট্ট একটা কালাে ঢিপির মতাে পড়ে আছে—এটা আবিষ্কার করা ছিল কেবল ছাত্রের ঐ সবুজ তীক্ষ্ণ চোখদুটোব পক্ষেই সম্ভব। চষা মাটিব ডেলাগুলােব ওপর দিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি এগিয়ে চল্লাম , খাদ্য পাওয়ার নবজাগ্রত আশাতে আমাদের জঠরজালা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলাে। আমরা তার খুব কাছে এনে গেলেও লােকটার কিন্তু কোনাে সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। “হয়তাে ওটা মানুষই নয়।” সৈনিকের বিষন্ন স্বরে আমাদের সকলেবই আশঙ্কা ব্যক্ত হ’ল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাদের সন্দেহভঞ্জন করে মাটির ওপর টিপিটা ধড়মড় করে নড়ে উঠলাে, আমরা দেখতে পেলাম একটা জলজ্যান্ত মানুষ হাঁটু গেড়ে বসে আমাদের দিকে তার দক্ষিণ হস্ত প্রসাবিত করে ধরেছে।
তেপান্তরে ৩৭ 1 “থামাে, নইলে গুলি করলাম,” লােকটাব কর্কশ কম্পিত কণ্ঠস্বর আমাদেব কাণে পৌছলাে, সঙ্গে সঙ্গে একটা ক্ষিপ্র “কি” শব্দে বায়ুমণ্ডল একবার কেঁপে উঠলাে। যেন কাবও অলক্ষ্য আদেশে আমরা দাড়িয়ে পড়লাম। এই বকম মধুব অভ্যর্থনায় অভিভূত হয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্যে আমাদের বাক্রােধ হয়ে গেল। সৈনিকভাষা বিড বিড কবে বলে, “বেটা আচ্ছা শয়তান তো।” ছাত্র গম্ভীরভাবে মন্তব্য করলে, “হু, বিভব নিয়ে রাস্তায় বেবননা হয়েছে, এ মাছের তেল আছে খুব।” “এই”, সৈনিক চীৎকাব করে ডাল “এই, শুনছাে”। বােঝা গেল, ও কোনাে উপায় ঠাউবে ফেলেছে। লােকটীব ভাবভঙ্গীব কোনাে পরিবর্তন দেখা গেল না, তাব দিক হ'তে কোনাে জবাব এল না। “বলি, শুনছাে ? আমরা তােমার কোনাে ক্ষতি কবে না। আমাদের কিছু রুটি দাও। আমবা না খেতে পেয়ে মরছি। লক্ষ্মী ভাইটী, দোহাই ভগবান । আমাদিকে কিছু রুটি দাও। আর, তা না দাও তাে—চুলােয় যাও।” শেষের কথাগুলাে অবশ্য চাপা গলাতেই বলা হল। লােকটা তবুও চুপ। বাগে হতাশায় কাপতে কাপতে সৈনিক এবার খেকিয়ে উঠলাে, “কানে তালা দিয়েছে নাকি? আমাদিকে কিছু রুটি দাও না। আমরা তােমার কাছেও যাচ্ছি না। ছুড়ে দাও ওখান থেকেই।” লােকটা হঠাৎ বলে উঠলাে “আচ্ছা”। ওই রূঢ়কণ্ঠের আকস্মিক ‘আচ্ছার’ পরিবর্তে ও যদি বলত “ভাইরা আমাব।” যদি তার কথাগুলাের মধ্যে বিশ্বের পূততম, নির্মলতম ভাবও প্রকাশ পেত, তাহলেও আমরা এত বেশী উত্তেজিত বা মানুষের মতাে হয়ে উঠতে পারতাম বলে মনে হয় না। “আমাদিকে দেখে ভয় পাবার কোনাে কাবণ নাই, বন্ধু।” সৈনিক বেশ ৩৮ ভিদেশী মােলায়েম ভাবেই এ কথাটা জানিয়ে দিল। একথা বলবার সময় তার ঠোটে একটা বেশ তােয়াজী হাসি ফুটে উঠলাে, প্রায় বিশ পা দূরে থাকার দরুণ সেটা যদিও লােকটার চোখে পড়বাব কোনাে সম্ভাবনা ছিল না,-“আমবা নিরীহ লােক, রুশিয়া হ'তে কুবানে চ'লেছি। টাকা কডি সব হারিয়ে গিয়েছে। খাবার যা ছিল খেয়ে ফেলেছি। আজ দুদিন পেটে একটাও দান। পডনি।” “একটু দাড়াও,” লােকটাকে শূন্যে হাত ছুড়তে দেখা গেল। একতাল কাল পদার্থ লোঁ। কবে এসে চষা জমিব উপব পড়ামাত্র ছাত্র তার উপব হুডি দিয়ে পড়লাে। “আচ্ছা, আবও নাও, এই—এই—এই, ব্যস! আব নাই”। এই অভিনব ঢঙে দেওয়া রুটিব টুবেগুলাে ছাত্ৰ একত্র কবলাে। দেখা গেল প্রায় দেব দুই ওজনের মাটিমাখা বাসি রুটি। মাটিমাখা বলে অবশ্য আমাদেব একটুও বেগ পেতে হ’ল না, আব রুটি বানি হওয়াতে আমরা ববং একটু খুনিই হ'লাম কাবণ কম রস থাকার দরুণ নতুনব চেয়ে বাসি রুটিই আমাদের কাছে বেশী বাম্য হয়ে উঠেছিল। “এই নাও,—এই নাও,—এই”—সৈনিক ভাগ ক'বে দিল। “ঠিক লমান হ'ল না , ছাত্র মশায়, তােমার ভাগ থেকে আমাকে একটু নিতে হচ্ছে, হলে ওর ভাগটায় কম পডে”। তার রুটি থেকে এক আউন্সেব অতি সূক্ষ্ম ভগ্নাংশের লােকানটুকু ছাত্র বিনা প্রতিবাদে স্বীকাব কবে নিল। কটি পাল মাত্র আমি চিবােতে সুরু করলাম, আস্তে আস্তে একটু একটু করে। চোয়াল তখন পাথর পেনে পাথব চিবােয়, কাজেই চোয়ালটাব প্রবল উৎসাহ দমন করা বড় সহজ হচ্ছিল না। প্রথমটায় গলার ভেতর থেকে থেকে খেচুনি ধরছিল, সেটা ধীরে ধীরে শান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আরাম অনুভব করলাম। অনির্বচনীয় বর্ণনাতীত রকম মধুব, সেই রুটি। গ্রালে গ্রাসে জ্বলন্ত পেটের মধ্যে ঢােকে, আর মনে হয় যেন তক্ষুণি রক্ত ও মস্তিষ্কে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। পেট যত ভরে আনে অন্তরের মধ্যে ততই কী এক ।
তেপান্তরে পুলক উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে—অদ্ভুত, শান্তিভবা, প্রাণমাতানাে সে পুলক। শবীবে মনে একটা তন্দ্রালুতা। ভুলে গেলাম বিগত অভিশপ্ত দিনকয়টির একটানা বুভুক্ষা, ভুলে গেলাম সাথীদের কথা। তাবাও তখন আমার মতাে বিচিত্র অনুভূতিতে ডুবে গিয়েছে। কিন্তু সেই রুটিব শেষ টুৱােটা হাত থেকে যেই মুখের মধ্যে প্রবেশ কবছ, অমনি আবাব ভীষণ ক্ষুধার জ্বালা বােধ হ'তে লাগলাে। মাটিব ওপব বলে, পেটে হাত বুলাতে বুলােতে সৈনিকভায়া অস্পষ্ট সবে বললাে, “বদমাসটাৰ কাছে বোধহয আবও আছে—মাংস থাকাও বিচিত্র নয়”। ছাত্র চাপা গলায় বললাে, “আলবৎ আছে। রুটিতে মাংসের গন্ধ পাচ্ছিলাম। আমি ঠিক বছি ওর কাছে আবও রুটি আছে। ওব কাছে এই বিভারটা যদি না থাকত “লােকট। কে হে ?” “বেশ দেখা যাচ্ছে, জাতে ইহুদী।” সৈনিক সিদ্ধান্ত কবল “না, জাতে কুত্তা”। আমবা ঘেনা-ঘেসি কবে বলে, যে দিকটায় আমাদেব উপকাবক মশায় বিভৰ হাতে বলেছিলেন সেদিকে আড়চোখে চাইতে থাকলাম। সেদিক হ’তে কোনাে সাড এল না। আমাদিকে ঘিবে বাত্রির বহস্য ঘনীভূত হয়ে এল , তেপান্তবেব স্তব্ধতা, পরস্পণের নিঃশ্বালেব শব্দটাও শােনা যায়। মাঝে মাঝে পাহাডে ইদুবেব বিমর্ষ চীৎকব ভেসে আসছে। মাথার ওপব আকাশের সজীব পুষ্প তাবাগুলাে ঝিমি কবছে। আমরা ক্ষুধিত। একথা আলবং সগর্বে বলবাে যে সেদিনকাব অদ্ভুত রজনীর দু’দণ্ডেব সাথীদের চেয়ে আমার অবস্থাটা কিছু ভালাে ছিল না, মন্দও ছিল না, তবু আমিই প্রস্তাব কবলাম, লােকটার কাছে একবার যাওয়া যাক্। ওর দৈহিক ৪০ ভিদেশী কোনাে ক্ষতি কৰবাৰ প্ৰয়ােজন নাই, তবে ওব কাছে খাবার যা আছে, সেটা ছাড়া হবে না । এতে গুলি ছােডে, ছুড়ুক। আমরা তিনজন আছি, গুলি লাগে তাে একজনেরই লাগবে , আব তাও একরকম অসম্ভব। তাছাড়া একান্তই যদি গুলি লাগে,—আঘাতটা মারাত্মক নাও হতে পারে। সটান লাফিয়ে উঠে সৈনিক বলল “চলাে”। আমবা দু’জন প্রায় দৌডেই চনলাম , ছাত্র সাবধানী, সে চলাে পেছনে। “বন্ধু”। সৈনিক অভিযােগেৰ সুর ডাক দিল, “বন্ধু”। উত্তবে পেলাম একটা অস্পষ্ট কর্কশ কণ্ঠস্বব , বিভভাব টেপাব “ক্লিক্" কবে একটা শব্দ, এটা গণিক দীপ্তি, একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ। “ফস্কেছে।”—একলাফে লােকটাব কাছে পডে সৈনিকভায়া জয়ােল্লালে চীংকাব কবে উঠলো “ফঙ্গেছে। এখন, মানিক। এবাব মজাটা টেব পাওয়াচ্ছি দাড়াও।” ছাত্র লােজা লােকটাব থলির ওপব গিয়ে পড়ল , “মানিক” তখন চিংপটাং হয়ে গােঙাতে শুরু করেছে, হাতদুটো দিয়ে আত্মবঙ্গাব প্রবল চেষ্টা করছে। “লে হালুয়া । এ আবাব কি? সৈনিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল , লােকটাকে লাথি মাবতে সে পা উঠিয়েছিল, মা হ’ল না। “বেটা নিশ্চয় নিজেব গুলিতে নিজেই ঘাযেল হয়েছে।এই। গুলিটা কি তােমাকেই লাগলো?” ছাত্র তখন পবমানন্দে বলে চলেছে, “এই মাংস , এই পিঠে , এই ত বাবা রুটি।—অনেক আছে, আঃ , মরুক্ বেটা, জাহান্নামে যাক্। এলাে আমবা খেতে লেগে যাই।” লােকটার হাত থেকে আমি রিভলভারটা ছিনিয়ে নিলাম। সে তখন বাংরানি থামিয়ে চুপ কবে পড়ে আছে। রিভল্ভাবে তখনও একটা গুলি মজুত ছিল।
তেপান্তরে ৪১ আবাব খাচ্ছি, নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছি। লােকটা তখন অসাড় হয়ে পড়ে আছে, একটা অঙ্গও নড়ছে না। আমরা সেদিকে আর ফিরেও চাইলাম না। “ভাই সব, খাবার জন্যেই কি সত্যিসত্যি এই সব করেছিলে তােমরা ?” হঠাৎ একটা কম্পিত, কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন এল। তিনজনেই চমকে উঠলাম। বেশি কি,—ছাত্রেরও গলায় খাবাব আটকে যাওয়াতে সে মাটিব দিকে মুখ কবে কাশতে লাগলাে। সৈনিকভায়া মুখে একগাদা খাবার নিয়ে চিবােতে চিবােতে গালাগালি করে উঠলাে, “কুকুৰ কোথাকার, পেট ফেটে মবতে পাব নাই ? ভেবেছিলে, আমবা তােমার চামড়া খতিয়ে নেব, না ? তােমার চামড়া নিয়ে আমাদের কি উপকাবটা হবে ? বেটা চামাব । গুলি চালাতে শিখেছ, না? বদমাস্ কাহাকা।” মুখে খাবাব, তাই গালাগালিটা তেমন জোবালাে হ’ল না। ছাত্র ভয় দেখিয়ে বললল “দাড়াও না, খাওয়াটা হয়ে যাক্, তাবপব তােমার সঙ্গে একটা বােঝা পডা হয়ে যাবে।” সঙ্গে সঙ্গে বাবে সেই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ কবে লােকটাব আত বিলাপ আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না শুরু হল। আমরা পেয়ে গেলাম। “ভাই সব, কেমন কবে জানব বললা? ভয় পেয়ে গুলি করেছিলাম। নয়া এথেন্স থেকে বাড়ী যাচ্ছি। স্মেলেন্স্ক অঞ্চলে। ভগবান! অবটা চেপে এল আবার। সূর্য ডুবলেই, এই জ্বর পেয়ে বসে। বড় দুর্ভাগা আমি। এই জরেব আর্ম এথেন্স ছাড়লাম। সেখানে ছুতােবের কাজ করতাম। ব্য’য় আমি ছুতােষ বাড়ীতে বৌ ও একটা ছােট মেয়ে আছে। চার বছর তাদের দেছিলাঃ ভাই সব, যা আছে সব খেয়ে ফেলাে।” বলে উলে“তা কিন্ত তােমাব অনুমতিব অপেক্ষা কববাে না “হা ভগবাৰ শুধু যদি জানতাম তোমরা নিরীহ, ভাল লােক। তাহলে ভয় ৪২ ভিনদেশী কি গুলি ক’বতে যেতাম ? বাত্রে, এই তেপান্তবেব মাঠে একথা কে ভাববে, বলাে ? এর জন্যে কি আমি দোষী ?” কথা বলতে বলতে লােকটা কঁদছিল। “কঁদছিল’ বললে ঠিক বলা হয় , তব মুখ থেকে একটা কম্পিত করুণ আতধ্বনি বা ব হচ্ছিল। সৈনিক ঘৃণাব সুবে বলে উঠলল “এইবে প্যান্ প্যানানি শুরু কবলাে।” ছাত্র বললাে “ওব কাছে বােধহয় টাকাকডি কিছু আছে।” সৈনিক অনামিলিত নেত্রে তাব দিকে চেয়ে একটু মুচকি হাসলাে, “আন্দাজ বাব ওস্তাদ দেখছি তুমি। ওঠো, এখন ঘুম দেওয়া যাক্গে।” ছাত্র জিজ্ঞেস করলাে, “ওব কি ব্যবস্থা হচ্ছে ?” “ও চুলােয় যাক্। ওকে কি ঝলসিযে খেতে চাও নাকি?” “তাই করা উচিত ওকে।” ঘুচলাে মাথাটা ঝাঁকিয়ে ছাত্র তাব বা জাহিব কবলাে। ছুতােৰ মশাযেব ভয় দেখানােতে আমবা যেখানে হাতেব কাঠকুটোগুলাে ফেলে থমকে দাড়িয়ে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে সেগুলাে কুড়িয়ে আনলাম। এনে, আগুন জেলে বসলাম। সেই নিস্তব্ধ বাত্রিব বুকে আগুন মিটমিট কবে জ্বলতে লাগলাে। যে জায়গায় বলেছিলাম, সেটা কতকট। অলােকিত হবে উঠলাে। ক্রমে, ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল, তবে—আব একবাব খেতে পেলে যেন ভাল হ'ত। “ভাই সব,” ছুতােবের গলা শােনা গেল। আমাদের থেকে একটু দূরে সে শুয়েছিল, মাঝে মাঝে তাকে যেন অস্পষ্টভাবে বিড় বিড কবতে শুনছিলাম। সৈনিক বললাে, “কেন?” “তােমাদের কাছে যাবাে? ঐ আগুনেব কাছে। আমি মবছি হাড়গুলাে কনকন্ করছে। ভগবান। বাড়ী পৌছানে। আমার আর হ’ল না।” ছাত্র বললাে এলাে, গড়াতে গড়াতে।”
তেপান্তরে ৪৩ ৫৫ আস্তে আস্তে, যেন হাত পা কিছু খসে না পড়ে এমনিভাবে সন্তর্পণে ছুতাের গুটি গুটি আগুনের কাছে সবে এল। লােকটা ছিল লম্বা, ভয়ানক বােগা, গাযেব কাপডজামা ভীষণ বকম ঢ ঢ কবছে, বড বড ক্লিষ্ট চোখদুটীতে শবীবেব যন্ত্রণা প্রতিবিম্বিত হয়ে উঠেছে। বেদনা-বিকৃত মুখখান। মৃত্যু- পাংশু, আগুনেব আলােতেও তার বঙ হলদে, মৃতবৎ দেখাচ্ছে। তার সর্বাঙ্গ বাপছিল। তাকে দেখে আমবা একটা অবজ্ঞামিশ্ৰিত অনুকম্পা বােধ কলাম। লম্বা সরু সরু হাতদুটো আগুনের দিকে বাড়িয়ে, সে তাব অস্থিসর্বস্ব আঙ্গুলগুলাে ঘসতে লাগলো। সত্যি, লােকটা দেখতে একেবাবে কদাকাব হয়ে উঠেছিল। সৈনিকভায়া বিবক্ত হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা কবলো, “শরীরের এই অবস্থায় বাডী হতে বেবিয়েছ কেন বাপু ? তাও আবাব পায়ে হেঁটে, টাকা বাচাতে ?” “লােকে আমাকে বেরুতে মানাই কবেছিল । বলেছিল, জলপথে ক্রিমিয়াব পথে আসতে তবে হাওয়াটাব জন্যে। এখন আমি এগােতে পারছি না। মবতে বসেছি, এই তেপান্তবে একাই মাবা যাব। শকুনবা এলে আমাৰ উপব ঠোকব মাববে , কেউ আমাকে চিনতেও পাববে না। আমার স্ত্রী ছােট মেয়েটা আমার পথ চেয়ে বসে আছে। চিঠি দিয়েছিলাম। তেপান্তরেব বৃষ্টিব জলে হাডগুলাে ধুয়ে যাবে ভগবান্ । ভগবা।” আহত নেকডে বাঘের মতাে লােকটা ঘেউ ঘেউ কবতে লাগলাে। সৈনিক বেগে লাফ মেবে খাড়া হয়ে উঠলো, ধমকে বললাে, “খেলে যা, ঘ্যাঘ্যানিটা থামাও বাপু। একটু শান্তি দাও আমাদের। মবছাে? মরাে। তার জন্য এত হল্লা কবা কেন? তােমার অভাবে কারও দিন আকাবে না?” ছাত্র পরামর্শ দিল, “মারাে ওটার মাথায় একটা গাট্টা।” আমি বললাম, “আমাদের ঘুমােতে দাও বাপু। অমন ক'রে ঘ্যান্ ঘ্যান্ কবলে আগুনেব কাছে থাকা চলবে না তােমার, তা বলে দিচ্ছি।”
তাই কব। } ৪৪ ভিদেশী সৈনিক রাগের মাথায় বলে চললাে “কথাটা কানে গেল? যা বলা হ’ল ভবেছো, এক টুকরাে রুটি ছুড়ে দিয়েছ আর গুলি চালিয়েছ বলে তােমাব ওপব আমাদের অনুকম্পা জন্মে গিয়েছে , ভেবেছাে, তােমায় আমরা সেবা করতে লাগবে ? চুলােয় যাও। অন্যে হ'লে হয়তাে ছাে।” সৈনিক চুপ কবে আবার হাত পা বিছিয়ে মাটিৰ ওপর শুয়ে পড়লাে। ছাত্র শুয়েই ছিল। আমিও গড়িয়ে পড়লাম। ছুতােব ভয় পেয়ে গুটিসুটি মেবে তাল পাকিয়ে, আগুনের কাছে এগিয়ে এল , আগুনের দিকে চুপ কবে তাকিয়ে বইলাে। আমি তার ডান দিকে শুয়েছিলাম, তাবি দাতেব ঠকানি শুনতে পাচ্ছিলাম। ছাত্র ছিল তার বাঁ পাশে জডলড হয়ে শুয়ে, ভাবে বােধ হচ্ছিল ঘুমিয়ে পড়েছে। সৈনিক চিৎ হয়ে, হাতেব ওপব মাথা বেখে, আকাশের দিকে চেয়ে ছিল। “কি চমৎকার বাত্রি । কত তাবা।” তারপর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে সে বলে চললো, “কি সুন্দব আকাশখানা , আকাশ তাে নয়, যেন একখানা বেশ লাগে এই যাযাবর জীবন। ক্ষুধা আছে, শৈত্য আছে, তবুতাে স্বাধীন। হুকুম চালাবাব কেউ নাই। নিজেই নিজের মুনিব । নিজের মাথা চিবােতে চাও, কেউ ‘না’ বলবার নাই। কেমন সুন্দর। এই কদিনের ক্ষুধায় আমাদেব মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। এখন তাে বেশ শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছি। তাবাগুলাে আমার দিকে চেয়ে চোখ টিপছে, যেন বলছে, কুছ পবােয়া নাই, লাটিকি, ঘুরে বেড়াও পৃথিবীময়। সব শিখে নাও, কাবও বশ্যতা স্বীকার কোরােনা। আহা, মনে কি শান্তিই বােধ হচ্ছে। বলি ছুতােরভায়া, কেমন আছ আমাৰ ওপব রাগ কোরােনা যেন। ভয় করবার কিছু নাই। যদি তােমার সমস্ত রুটি খেয়েই থাকি, তাতে কি? তােমার কাছে রুটি ছিল, আমাদের কাছে ছিল না, তাই তােমারটাই খেতে হ’ল। তােমার ঐ বােকার মতাে গুলি চালান-টা। তুমি আমাকে রাগিয়ে কম্বল।
তেপান্তরে ৪৫ দিয়েছিলে , তুমি পড়ে না গেলে, তােমার ঐ বেয়াদপির জন্য বেশ দু' ঘা দিতামও। আব রুটি ? কাল তাে পেরেকফ পৌছুবে, সেখানে কিনে নিলেই পারবে। তােমাব কাছে পয়সাকডি আছে , তা আমি জানি। বলি, কতদিন হ’ল জ্বরে ভুগছ ?” অনেকক্ষণ ধবে সৈনিকেব গম্ভীর গলার মানি আর ছুতােরের কম্পিত কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম। অন্ধকার ঘনকৃষ্ণ বাত্রি ক্রমেই জমাট বাঁধলাে। সুগন্ধ বলবহ হাওয়াতে বুকটা ভবে উঠলাে। আগুনটা কখনও শিখা মেলে, কখনও ধিকি ধিকি জ্বলে উত্তাপ দিচ্ছিল। চোখ বুজে এল। তার মধ্যে একটা স্নিগ্ধ পবিত্রভাব সমস্ত আচ্ছন্ন করে ফেলল। “ওঠো শীগগীর। চলো, পালাই।” অজানা একটা ভয়ে আমি লাফিয়ে উঠলাম। সৈনিক এতক্ষণ আমার কভিটা ধরে টানাটানি করছিলাে। “চলাে পালাই, জদি”। তার মুখখানা গম্ভীব, ক্লিষ্ট। আমি চাবপাশে একবার তাকিয়ে নিলাম। ছুতােবের - নিথব নীলচে মুখের ওপরে উদীয়মান সূর্যেব গােলাপী কিবণ পডেছে , তার চোখে একটা ভীতি, কাচের মতাে দীপ্তিহীন একটা দৃষ্টি। বুকের কাছটাতে জামাটা ছেডা, দেহভঙ্গী অস্বাভাবিক, ভিমি হলে যেমন হয় সেই প্রবণের। “যথেষ্ট দেখা হয়েছে। এনাে বছি।”—সৈনিক ভ'য়া আমার হাত ধরে টান দিল। ভােরের কন্কনে হাওয়ায় কাপতে কাপতে জিজ্ঞেস করলাম, “মরে গিয়েছে ?” সৈনিক কথাটা পরিষ্কার করবার জন্য বললাে “সেই রকম ততা মনে হয়। তােমার গলাটা যদি টিপে ধরি, তাহলে মরবে না তুমি?” এসে ৪৬ ভিনদেশী “কে কবলে? ঐ ছাত্রটা ?” “না তাে কে ? তুমি বােধহয় ? না আমি ? ভ্যালা রে ছাতর। ওকে খতম ক'রে সঙ্গীদের ফ্যাসাদে ফেলে, মার টেনে চম্পট । কাল এ কথ জালে আমি ও শালাকে খুন করে ফেল্তাম। এক ঘুসিতেই সাফ । কপালেব রগ ঘেলে এক ঘুলি। পৃথিবীর একটা ভার কমিয়ে দিতাম। বুঝতে পাৰছে ওটাব কীতিটা? এখন, আমাদের এমন ভাবে স’রে পড়তে হবে যেন এই প্রান্তবেব মধ্যে কারও নজবে না পডি। বুঝলে? আজই ও লােকের চোখে পড়বে। তাবা দেখবে, ওকে মেরে কে ওব সব নিয়ে টিয়ে পালিয়েছে। তারপর শুরু হবে আমাদের মতাে যত সব ভবঘুবে লােকের খোঁজ। ওবা জিজ্ঞেস করবে, কোথা থেকে আসছি ? বাত্রি কোথায় কাটিয়েছি ? হয়তো আমাদেব ধরবে। আমাদেব কাছে কিছু না পেলেও তাইতো। আমার বুকেই যে ওর বিভভাবটা। নে ঝামেলা !” আমি তাকে সাবধান কবে দিলাম, “ওটা ফেলে দাও।” সে একটু চিন্তিতভাবে জিজ্ঞেস করলে, “কেন ? এব দাম আছে। হয়তাে ওরা আমাদের ধরতে পারবে না। নাঃ, ফেলবে না। বিক্রী কবলে তিন রুবল পাওয়া যাবে এখন। সঙ্গে একটা টোটাও আছে। শয়তানটা কত টাকা নিয়ে পরেছে, কে জানে?” “ছুতােবের ছােট মেয়েটার ভাগ্যি।” “মেয়ে ? কাব মেয়ে ? ওঃ, ওর। সে বড় হয়ে আমাদের তাে আব বিয়ে করতে আনবে না। তবে তার কথা নিয়ে মাথা ঘামানাে কেন ? চলো, চলো, পা চালাও, কোথায় যাওয়া যায় ?” “তা তাে জানি না। যে দিকে হয়, চলাে।” “আমিও জানি না, শুধু জানি—যে দিকেই যাবে, একই কথা। চলাে ডাইনে। ওদিকে সাগরটা পাওয়া যাবে।” আমি পিছনে চাইলাম। প্রান্তরের বুকে আমাদের থেকে অনেক দূরে তেপান্তরে ৪৭ একটা কাল পাহাড মাথা তুলেছে। তার ওপর সূর্য কিবণ ঝলমল করছে। দেখা হচ্ছে বুঝি, বেঁচে উঠলাে কিনা। ভেবাে না, কেউ আমাদেব ববে না। ছাব বড ধৃত, ভাল কাম হাসিল করেছে।” “সঙ্গী হিসেবেও চমৎকার। কেমন ফ্যাসাদে ফেলেছে, দেখ দিকি। ভাইবে, যত দিন যাচ্ছে, লােকগুলো যেন ক্রমেই বদমাস হয়ে উঠছে।” সৈনিকেৰ কণ্ঠস্ববে একটা গাঢ় বিষন্নতা। প্রভাতের বৌদ্রস্নাত নিস্তব্ধ নির্জন প্রান্তব দিগ্বলয় পর্যন্ত আস্তৃত। চারিদিকে শান্ত করুণ সূর্যালােক , আকাশের নীল চাদোয়াব তলে সেই অবিচ্ছিন্ন বিবাট প্রান্তবেব মধ্যে কোনো পাপ, কোনাে অন্যায়ই সম্ভব বলে মনে হয় না। সঙ্গী বা তামাকের একটা সিগাবেট পাকাতে পাকাতে বললাে, “ক্ষুধা বােব হচ্ছে ভাই।” “কি খাবাে ? পাবাে কোথায় ?” “সেই তাে সমস্যা।” হাসপাতালে আমবি পাশের বিছানায় শুয়ে এই গল্পের বক্তা এইখানে এসে চুপ কবলো , গল্পটীব উপসংহাব কবলাে এই ভাবে, “ব্যস এই। সৈনিকের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল, সেবার আমবা “কাবা” প্রদেশ পর্যন্ত এক সঙ্গে হেঁটে এলছিলাম। লােকটাব হৃদয় ছিল খুব দরাজ, অভিজ্ঞতাও ছিল অনেক। ও ছিল একেবাবে যাযাবর। আমি ওকে ভয়ানক শ্রদ্ধা করতাম। এলিয়া মাইনব পর্যন্ত এক সঙ্গে ছিলাম, তারপর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।” শুধােলাম, “দুতােরটাকে তােমাব কখনও মনে পড়ে না?” “দেখলেই তাে—মানে—শুনলেই তাে সব।”
৪৮
ভিদেশী
“আর কিছু নয় ?”
সে হেসে উঠল।
“ওর কথা আমার মনে থাকবে, কেমন ক'রে আশা করাে তুমি? তার যে
দশ হয়েছিল তার জন্যে আমি তাে আব দায়ী ছিলাম না , যেমন আমার এই
দশার জন্যে তােমার কোনাে দায়িত্ব নাই। কাউকেও কিছুব জন্যে দোষী
করা চলে না, আমবা সবাই একজাতেব পশু।” *
* মণীয় গল্প-সামি গােকা।
--অজলি – { যার অভিজ্ঞতার কাহিনী র মুখ থেকে শুনে হেলি ফ্লাগান এটি লিপিবন্ধ করে রাখেন।] প্রথম বয়। অল্পদিন হ’ল মস্কো এনেছি। একদিন দেখি, থিয়েটাবে ঠেলাঠেলি ভিড। শুনলাম, ইসাডােবা ডানকানের নাচ হবে। কিছু না বুঝেই দশজনেব দেখাদেখি আমিও ভিডের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। গান। শুনেই আত্মহারা হয়ে গেলাম। তারপর, ইসাভােরা ডানকানেব নৃত্য দেখতে গিয়ে চোখে জল আব বাধা মানে না, গাল বেয়ে হাতের উপর পড়ে , কী এক অপূর্ব বেদনায় হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে। রুশিয়ার বড বড লােক সকলেই সেদিন সেখানে , জাৰ, জাব-মহিষী, ম্যামষ্টভ, স্তানিস্লাভ স্কি। অভিনেতা, চিত্ৰকৰ, গায়ক বা লেখকদেব কেউ আর বাকী ছিল না। এক একটা নাচ শেষ হয়, আর বিপুল হর্ষধ্বনি করে সকলে ষ্টেজের দিকে ছােটে। লাজুক বলেই বােধহয় আমি ওদের মতাে ছােটাছুটি করতে পাবিনি, নিজের জায়গায় গুটি মেরে বলেছিলাম, হাত পা গুলাে যেন ববফে জমে গিয়েছিল , বুক জুড়ে যেন একটা অগ্নিশিখা জ্বলছিল। জনতার অধীর আহ্বানে ইসাডােরা যতবার ষ্টেজে আসছিলেন, শরীরের রক্তস্রোত যেন থেমে যাচ্ছিল , আর তিনি যখন নাচছিলেন, একটা অপূর্ব আনন্দহিক্কালে আমার সমস্ত অন্তর তার অভিমূখে ভেসে চলছিল। ৪ ভিনদেশী ভেবেছিলাম, আরও দু'চার দিন হবে থাকবাে। ইডােরা ডানকানের নৃত্যের পর আব কিছু দেখবার প্রবৃত্তি রইলাে না। সেই রাত্রেই গাটরিটা কাঁধে ফেলে বরফ-জমা রাস্তা ভেঙে গ্রামের দিকে বেরুলাম। সেদিন থেকে ইসাভােরা ডানকান হলেন আমার মানস-দেবী। শুধু তাবই কথা ভাবতাম , ক্ষেতে কাজ করতে গিয়েছি, বাঙামাটীতে পা দিয়ে বীজ বলাচ্ছি, হঠাৎ মস্কোব রঙ্গমঞ্চের উপব ইলাছােরার অপরূপ মূর্তিটি চোখের সামনে ভেসে উঠতাে , চোখের জলে সব ঝাপসা হয়ে যেত । । কয়েক বছর পরের কথা। বাবা মা মারা গেলেন। পড়াশুনা করতে আমি পিটার্সবুর্গ এলাম। অর্থাভাবের জন্য তখন কঠোর পরিশ্রম করতে দিনের পড়ার খরচ যােগাতাম রাত্রে কাজ করে। কোনাে দিনই থিয়েটারে যাওয়া ঘটেনি। সত্যি বলতে কি, যাবারও বড় প্রবৃত্তি ছিল না। ইসাভােরা ডানকানকে দেখাব পব, আর কাউকে বঙ্গমঞ্চে দেখবার ইচ্ছে হত না। এটা যে ভাল কবতাম, তা বলছি না। জানি, ওটা নিছক বােকামি। তবু, কেমন যেন পেরে উঠতাম না। একদিন আমাদের ক্লাসের এক মােটা মতাে ছকবা-থিয়েটার ঘােবা আব বঙ্গ-জগতেব কার কার সঙ্গে ওর আলাপ আছে তা নিয়ে গল্প করে বেড়ানাে ছিল তার নেশা—আমায় ডেকে বললে, “পিটার্সবুর্গে এবার কে আসছে শুনেছে হে? তা তুমি আব তার কি জানবে ? ও সবের তত খোঁজই রাখাে না। একজন নামকরা নতকী, ইডােরা ডানকান। বিয়ে করেছে একজন রাশিয়ান কবিকে। হপ্তা দুই বাদে এখানে তার নাচ হবে।” অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মধ্যে চোখ রেখে আমি তখন শ্লাইডের উপর দুটী বেগুনী রঙের ফুটকি দেখছিলাম। সে দুটো হাউইয়ের মতাে ফেটে আমার মগজের মধ্যে গিয়ে ঢুকলাে। তিনি আসছেন। এখানে আসছেন। আবার তাঁকে অঞ্জলি দেখবাে। একথা যে কখনও কল্পনা করতে পারি নি। বিশ্বাস হচ্ছিল না। গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছিল, কথা বেরুচ্ছিল না। মােটা ব’কে যাচ্ছিল, “যার সঙ্গে ওব বিয়ে হয়েছে না, তাকে আমি চিনি। নাচ-টাচ, সাঙ্গ হলে ওদের দলে গিয়ে ভিডবাে।” আমি নির্বাক। ওর ওই হেডে গলা আর মাংসের টিপি বপু নিয়ে ওযে ইরাডােবা ডানকানেব কাছে যাবে, একথা ভাবতেই আমার পিত্তি জলে যাচ্ছিল। তারপর ও বললাে “জীবনে একবাবও বড় কাউকে যদি দেখতে চাও, তােমায় সঙ্গে নিতে পাবি।” আমি শান্ত হয়ে গেলাম। মনটা তখনও স্তম্ভিত। একটু উম্মার সঙ্গেই উত্তর দিলাম, “আচ্ছা, নিয়ে যেও আমায়। এবার প্রতীক্ষার পালা। খাওয়া ভুললাম, ঘুম ভুললাম। কাজে মন বলে না, পড়াশােনা চুলােয় গেল । দেখা হবে, দেখা হ'লে কি ঘটবে, এসব ভেবে-যে এমনটা হচ্ছিল, তা নয়। ইসাডােরা ডানকানের সম্পর্কে কিছু ভাবছিলাম, তাও বলা চলে না। কিছুই ভাবছিলাম না, সমস্ত জীবন যেন একটা প্রতীক্ষা হয়ে দাড়িয়েছিল । তারপর, একদিন মােটা এলে জানালাে,—“সব ঠিক করে এসেছি। নাচ হয়ে গেলে আমরা ডানকানেব সাজঘবে যাবে। কিন্তু এমন ভাবে তাে তােমার সেখানে যাওয়া চলতে পারে না।” সে আমার পােষাকের দিকে একদৃষ্টে তাকাচ্ছিল। একটা নির্বোধ লজ্জায় আমার মাথাটা হেঁট হয়ে গেল , বললাম,—“সে তো নিশ্চয়।” “যা পরে আছ, তার উপর একটা কোট চড়িয়ে নিলেই চলবে।” ও খুলে যাবার পব, আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। ব্যাপারটা বুঝলে? এ পর্যন্ত ভেবে এসেছি, আমি ইসাভােরাকে দেখবাে, ইসাভােরাও ভিদেশী যে আমায় দেখতে পারেন, এ খেয়ালটা হয়নি। এখন পবিষ্কার বুঝলাম, এই জীর্ণ, তালিমার, হাতছােট পােষাক পরে আমি তার সামনে যেতে পারবাে না। ভাবতে লাগলাম, কার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার পেতে পারি ? নাঃ, ছাত্রদের মধ্যে যাদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা, তাদের সবারই অবস্থা আমারই মতাে , রাত্রে খেটে, দিনের বেলাকার পডাশুনার খরচ চালায়। আর চাষীদের দিকে জানি, তারা তাে মাস গেলে কয়েক টাকা মাত্র উপায় করে। নিজের মালপত্র যা ছিল, সেগুলাের উপর একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলাম। বাড়ী থেকে আনা এটা-সেটার মধ্যে একটা মাত্র দামী জিনিষ—লােনা উপব এনামেল কবা একটা ছােট্ট মূতি। মা মারা যাওয়ার আগে এটা দিয়ে বলেছিল,—“যদি কখনও একান্ত অভাবে পডিস ।” অনেকক্ষণ মূতিটাব দিকে চেয়ে রইলাম। তারপব লেটাকে গামছায় বেঁধে নিয়ে বেরুলাম বাজাবের দিকে। সেটা বিক্রী কবাব আশায় সমস্ত দিন দোকানে দোকানে যুবলাম । কেউ একটা কোটেব দামে সেটা কিনতে চাইল না। রাতেব মুখে নদীব ধাব দিয়ে বাড়ী ফিরছি, একটা দোকান নজরে পড়লো। পঙতি অবস্থায় লােকে যে সব দোকানে টুকিটাকি জিনিষ বিক্রী কবে আন, সেই বকবে একটা দোকান। দেখলাম, একটা কোট ঝুলছে, নতুন নয়, দু' এক জায়গায় একটু-আধটু ফুসি উঠে গিয়েছে, কিন্তু জিনিষটা ভাল। চমংকাব কাল “ফারের কলার।” দেখে লােভ হ'ল। শরীর কাপতে লাগলো। জানি এটা আমার হবেই , তবু, প্রথমটা আর পাচটা জিনিষ দেখার ভাণ কবলাম । খানিক বাদে তাচ্ছিল্য ক'রে জিজ্ঞাসা করলাম “আব ঐ পুবানাে কোটটার দাম?” দোকানদার চটে গেল। “পুরানাে কোট বৈকি। এমন খালা কোট অঞ্জলি কারের কলার। এর দাম হবে একশাে রুবল।” আমি এবার মূতিটা বের কলাম।—“ ঐ কোটটার বদলে এইটা দিতে পারি। দর কষাকষি রাখাে, আমি কিনতে এসেছি, দর করতে নয়।” দোকানী মূর্তিটা নিয়ে এনামেলের উপর হাত ঘষলল, নখের টোকা দিয়ে ঠুনকো কিনা পরখ কবলাে, আলােৰ কাছে ধ'বে সােনা থাকা সত্ত্বেও ওর মধ্যে দিয়ে আলাে বয় কিনা দেখে নিল। তারপব বললাে-“লােকসান হবে। তা আমি মধ্যে মধ্যে দধর্ম করে একটু ছাড ছুড দিই। আচ্ছা, নিয়ে যাও কোট।” কেমন ক'বে সেখানে গিয়ে পৌছুলাম, সে কথাটা আর নাই জিজ্ঞাসা কবলে। এইটুকু জানলেই হ’লসেখানে গিয়ে পৌছুলাম। কদিন ধ'রে বুকট। কেবলি দু দুব কবছিল , সেখানে যেতে শান্ত হ’ল। আমরা একটা ছােট কামবায় এসে ঢুকলাম। ও-পাশে দবজা দিয়ে অনেকের গলা আর হাসিব শব্দ ভেসে আসছিল, কে একজন গান গাইছিল। মাঝের কামরায় আসতে এক বৃদ্ধা আমাদেব টুপি নিয়ে রাখল। সে আমার কোটটা নেবার জন্যে হাত বাড়াতে আমি মাথা নেড়ে জানালাম, না। অমনি সে হই মাই ক'রে ফনী ভাষায় ঝড়ের বেগে কী-সব ব’কে যেতে লাগলাে। “কেউ কোট নিয়ে ঘবে আসে, মাইজী এটা পছন্দ করেন না, একে ছােট ঘব, তার উপর ঐ সব কোট-টোট ঢােকালে একটা জবড়-জঙ্গ হয়ে দাডায়।” আমি হতাশ হয়ে বন্ধুর দিকে চাইলাম। সে তখন তার কোট ছেড়ে রেখে দরজাব গােড়ায় অধীর হয়ে হাত কচলাচ্ছে, বিরক্তির স্বরে বললাে,-“খুলেই বাখােনা বাপু। ওঁব চারপাশে কত বড় বড় লােক। তােমার দিকে ওঁর নজর পড়বে ভেবেছাে?”
৫৪ ভিনদেশী নিরুপায় হয়ে কোট খুলে রেখে জীর্ণবেশেই আমাকে আসতে হ’ল। ঘরে অনেক লােক। ইনাভােরা ডানকান একটা লম্বা কুবি উপব অধশায়িত। তঁার চাবপাশে ফুলেব ছড়াছডি। সকলেই তাঁর কাছে ভিড় করে আছে। দরজার কাছে একটা অন্ধকাৰ কোণে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে লাগলাম। ব’নে আছেন , এত স্নিগ্ধ কোমলতা তার মধ্যে। মনে হ'ল মৃদু মৃদু হাসছেন, সত্যি, তবু তঁাব নিখুত মুখখানায় কিসের যেন একটা বিষন্নতা। ভাবলাম, হয়ত শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন, এখন একটু বিশ্রামেব দরকার। সকলে তখন তাঁর কাছ ঘেসে দাড়িয়ে, কেউ হাসছে, কেউ ওঁর হাতে চুমাে খাচ্ছে। আমার বন্ধুটী বীয়াবেব মাত্রা একটু বেশী করে এসে, তার আদবেব কুকুব সেজে তব কাছটীতে হামাগুড়ি দিচ্ছেন , আর তাই দেখে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আমার এমন লজ্জা হল । ওর সুপুরুষ রুশীয় স্বামী তখন হাত দুটো মুডে একপাশে দাড়িয়ে ছিল , মনে হ’ল, ভদ্রলোেক মনে মনে আমাদেব গাল পাড়ছে। পাড়াইতে স্বাভাবিক। ষ্টেজেব উপব ওকে দেখে তৃপ্তি হ’লনা, লােভী ছেলেদেব মতাে এখানে ভিড করতে এলাম। বুড়ীটা তখন একটার পর একটা ফুলের ঝুডি এনে ঘব ভবে ফেলছে, দেখতে দেখতে ঘরটা যেন ফুলের বাগান হয়ে উঠলাে। যতবাব সে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে আনে ইসাডােবাব মিষ্টি মিহি স্বরে ততবার উচ্চারিত হতে শুনি—“ধন্যবাদ। ধন্যবাদ। আমার উপর আপনাদের অসীম অনুগ্রহ।” যার কাছে আমাদেব ঋণেব তুলনা নাই তারই মুখে এই ধন্যবাদ শুনে আমার বুকটা গর্বে স্ফীত হয়ে উঠছিল। ইতিমধ্যে আরও লােক এসে তাকে ঘিবে দাড়ালাে। আমি আব ওঁর মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। নজরে পড়ছিল লম্বা কুসিটার কিনাবার উপর তাব সুদীর্ঘ সুন্দর হাতখানি। আঙুলের ফাকে একটা সিগারেট ধরা, তার ছাই খসে পড়লাে মেঝের উপর পড়ে-থাকা একটা ফারের কম্বলে। ছাই পড়তে অঞ্জলি ৫৫ } দেখে আমার চেতনা হ’ল, কি যেন পােডাব গন্ধ বেরুচ্ছে। মাথাটা ঘুরতে লাগলাে। এক্ষুণি আগুন জ্বলে উঠবে, লেলিহান্ শিখা মেলবে, লােকগুলাে চেঁচামেচি কবে হুটোপুটি খেতে লাগবে, আর আমি ?—আমি ওঁকে বাঁচাবাে । তাইতাে। মাথা ঠাণ্ডা রাখা চাই, উনি মেঝে থেকে চাব ধাপ উচুতে বসে আছেন , চাব পাশেব এই মুখগুলাে একবার বিপদ টের পেলে ওব পণে বাধা হয়ে উঠবে। এদেবই আগে সরানাে দবকাব । “অনেকটা বাত হ'ল”, বলেই আমি চুপ কবে গেলাম। কথাটা কেমন বেখাপ্পা বােকাব-মতো শােনালাে। সবাই একটু পিছনে সবে হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে বইলো, এতক্ষণ আমি চুপ কবে ছিলাম , আমি যে আছি, এটা কেউ লক্ষ্য কবেনি। এমন সময়, আমবা যে পথে এনেছিলাম সেদিকে দজা ঠেলে দমকা হাওয়ার মতাে একবাশ ধোঁয়া ঢুকিয়ে বুড়ীটা ঘবে এসেই দরজা বন্ধ করে দিল। “মাফ কব, মাইজী, কোন ভদ্রলােকের পােষাক পুড়ে গেল।” বুভী একটা আধ-পােডা জামা মেলে ধবে উত্তেজিতভাবে অনর্গল বকে চললাে তার কোনাে দোষ নাই। পরে যারা এসেছেন , তাঁদেব কেউ ভুল কবে এটা টুলের উপব না রেখে কাঠ কয়লার চুল্লীব উপব ফেলে এসেছিলেন। ইলাডােবা ডানকান আত কণ্ঠে বলে উঠলেন,—“কাব কোট এটা? আমার বাড়ীতে কাব এতবড় ক্ষতি হয়ে গেল ?” মােটা হেসে গড়িয়ে পড়লাে, হালি আর থামে না , শেষ পর্যন্ত একজন তার চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে তবে হাসি থামায়। আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে সে হানিব দমকার ফাকে ফাকে জানালাে,-“ঐ যে ওর। সে এক মজাব কথা। জানেন, আজকে এখানে আসার উপলক্ষেই ওটা কেনা হয়েছিল।” আমি উদাসীনভাবে বললাম,-“বেশী কিছু দামী নয়। পুড়ে গেছে, চুকে গিয়েছে। কোটের তাে আমার দরকার হয় না।”
ভিদেশী কিছুক্ষণ কেউ কোনাে কথা বললাে না। তারপর ইসাভােরা ডানকান আসন ছেড়ে উঠলেন , আমার কাছে নেমে এসে বললেন,-“বন্ধু, যদি অনুমতি দেন, আপনার জন্যে আমি নাচবাে।” তারপর বোঁ ক'রে চারপাশ ঘুরে আঙুল মটকে সকলকে উদ্দেশ করে বললেন, “এ তােমাদের জন্যে নয়। তােমরা চলে যেতে পারাে, দেওয়ালেব গায়ে চিপটে লেগে থাকতে পারাে, অনর্থক হল্লা ক'রে হাততালি দিয়ে বিরক্ত কোবাে না। এখন বা পবে, একটা কথাও বলতে চেয়াে না। এখনকার নাচ শুধু আমাদের দুজনের মধ্যে।” তিনি পা থেকে চটি খুলে ফেললেন। রূপালি উডানিটা আলগা ক'রে নিতে তার পায়ের চতুর্দিকে পড়ে সেটা ঝলমল কবতে লাগলাে। একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে তিনি খাড়া হয়ে দাঁড়ালেন। তাবপব নৃত্য শুরু হ'ল । অন্ধকারে পা চালিয়ে বেরিয়ে আনছি, মােটা আমার সঙ্গ নিল। বেচারা হাফাচ্ছিল , ওব মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ছিল। বকতে লাগলো—“বাঃ বেশ বাট। কবলে যা হাে। কোথাও কিছু নাই, হঠাৎ বলে বসা হ’লঅনেক বাত হয়ে গিয়েছে। তখন আবার বলনে, কোটেব আমার দরকার হয় । তাবপর, অতবড় একজন নর্তকী উনি, তা যদি বুঝতে “উনি ভদ্রতা করে আমাদের খাতিবে যখন নাচলেন, একটা ধন্যবাদ করা নাই, হন্তচুম্বন নাই, পাথরের মতাে হাঁ ক'বে চেয়ে থেকে, বাড়ী থেকে বেবিয়েই এক ছুট।” আমি জোরে জোরে হাঁটতে লাগলাম, অন্ধকারে এক ফাকে ওকে এড়িয়ে যাবার আশায়। ও কিন্তু না-ছােড়বান্দা। “ওঁকে ফুল পাঠানাে হ'ল না বলে আমি এত লজ্জিত হলাম। ফুল পাঠানোেটা একান্ত উচিত ছিল।” আমি বললাম,-“কেন? ওর তাে যথেষ্ট ফুল এসেছিল, আর কেন?” ম बधनि ৫৭ শুনে ও রাগে গগস করতে লাগলাে,—“কেন! যথেষ্ট ফুল এসেছিল। ভগবান, এমন গাধাও হয়। দয়া করে স্মরণ রেখাে আর কখনও আমি ওর গলা তখনও কানে আসছিল। চট করে এক গলিতে ঢুকে পড়ায় আব শুনতে হ'ল না। একটা গির্জার বাইরে দাঁড়িয়ে তার দেওয়ালের দেবী-মৃতিটার উপর জমে-বলা তুষার ঝডতে লাগলাম। মায়ের দেওয়া প্রতিমা বিক্ৰী কবেছি বলে কোনাে কষ্ট হচ্ছিল না। এককালে দেবতাদিকে দগ্ধ জীবের অঞ্জলি দেওয়া হত , আমিও দগ্ধ অঞ্জলি দিয়ে এলাম। * মার্কিন গল্প—হেলি ফ্লাগান – পতিত জমি বসন্তে প্রাবম্ভ। উত্তব চীনে তখনও বেশ শীত। বিবাট উষব প্রান্তর সমস্ত শীতকালটা ঝডে বরফপাতে জীর্ণ হয়ে পূর্বদিকে সুদূব গিবিশ্ৰেণীৰ পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রভাতে উৎকুন-প্রপীডিত লােমওঠ। ঘেষে কুকুবের মতাে হতশ্রী ঐ প্রান্ত বটীকে উত্তাপ দিতে ‘সূক্ষ্মচূড’ পর্বতেব গা বেয়ে বৌদ্র নেমে আসে। সন্ধ্যায় বয়ে আনে তীক্ষ্ম উত্তবে হাওয়া, ঘুমভাঙা মাটীব সঙ্গে সুর মিলিয়ে আতধ্বনি কবে। এই মাটী নিয়ে সে কি করবে, ম!-চু-চাং বুঝতে পারে না,—এ জমিতে চাষ দেওয়া চলে ? বন্ত উৎসবেব সময় লিউ-তা-সুং সবকাবী দপ্তব থেকে তার জন্য অনুমতিপত্র আনিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘকায ছিপছিপে জোয়ান মা-চুচাং, এখানে এসেছে পতিত জমিতে সােনা ফলাবার স্বপ্ন নিয়ে। সঙ্গে এনেছে তা-সু, লাঙ্গল, নিড়ানি। ধ্বসে-যাওয়া কনফুসিয়াস মন্দিরের ইষ্টক পের আশেপাশে ঘুবতে ঘুরতে লিউ-তা-সুং একটা দীর্ঘ প্রস্তরখণ্ডের উপর লাফিয়ে উঠে উত্তেজনায় নেড়ে বলে ওঠে, “এই জমিটাতেই আমরা লাঙল দেবো, ফসল হবে, শাকশী হবে। আর ঐ পাহাডটার গুহায় বেশ রাত কাটানাে চলবে।”
পতিত জমি তডা করে লাফিয়ে উঠে তক্ষুণি সে মাটী পরীক্ষায় লাগলাে। মা-চু-চাং তার পিছনে পিছনে। লিউ-তা-সুং-এব চোখে মুখে হাসি। মা তার সঙ্গে না হেসে থাকতে পারে না , বাগও হয় তার উপর। মা ধীরে ধীরে পাহাড়ের গা বেয়ে উপবে ওঠে , ঈষৎ-মুজ পিঠটা ফিবিয়ে পূর্বদিকে চায়। ইট সুরকিব স্তুপের মধ্যে একখানা ভাঙা দেওয়াল। তাব দক্ষিণ পাশে ইতস্ততঃ কয়েকটা কবর। কেউ ওগুলােব তদাবক করে না। উত্তর দিকটায় একটা প্যাগােডা ভেঙে পড়ছে। “এই হ’ল গে পােডড জমি।”—গুহাব দরজার দিকে মন্থর পদে চলতে চত মা-চু-চাং কত কি ভাবে। গ * “তােমাব মালপত্তব ভিতবে তােলে।।” মা-চু-চাং নীড বাঁধে। প্রথম দিন সকাল বেলা মা ধীবে-সুস্থে বিছানা থেকে ওঠে। মনটা বিষন্ন। সারাদিন সে ব'সে ব'লে তামাক ফেঁাকে। সঙ্গীরা বােঝয় , মা বুকে জোব পায় না। চোখ ঝানে৷ সূর্যালােকেও তাব মনের কালিমা কাটে না। পাহাডেব ঢালু পথ ধ’বে একজন কাজে যাচ্ছে। বেশ বেঁটে খাট গােছ লােকটি। পবণে সূতী কামিজ , প্যালুনটা কালাে কোমববন্ধ দিয়ে আঁটা। পাহাড়ের গায়ে প্রচুব গুল্মলতা, সেগুলো কেটে সে জ্বালানি সংগ্রহ করে। ঠাণ্ডা হাওয়া বয় , তার বেণী দুলে ওঠে, মাথায় টুপি নাই। “ইস কি ঠাণ্ডা।” বেচাবীর নিশ্বাসে বাষ্প বের হয়। জোরে জোরে সে গুডির ওপর কুড়ুল চালায়। সমস্ত উপত্যকা প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে মা-চু-চাং বলে ব’সে অন্যদের খাটুতে দেখে। কাজে লাগার প্রেরণা পায় না। জলখাবার বেলা লিউ-তা-সুং গুহায় ফেরে, ঘাড়ে এক বস্তা চাল, হাতে এক ভিনদেশী চুপড়ি আলু। দীর্ঘ খাড়াই পাহাড় ভেঙে এসে সে হাঁফায় , কপাল হতে ঘাম ঝরে। মা-র ইচ্ছা হয় বলে, “কাজ কববার আমার একটুও উৎসাহ নাই। এ পতিত জমিতে চাষ হবে, না ঢেকি।” তবু সে চুপ কবেই থাকে। লিউ-তা-সুং ঘাডের বােঝা নামিয়ে তার মুখেব দিকে চেয়ে একটু মুচকি হাসে। বরফ গলে । পাহাড় বেয়ে তুষার-শীতল জল কলধ্বনি করে নেমে আসে। সারা উপত্যকায় সূর্যদেব লােনা ছড়িয়ে দেন। গুহার দরজায় রোদ্র হাসে। লিউ-তা-সুং হাঁফাতে হাফাতে এসে বলে, “সবকার আমাদিগকে উৎসাহ দিচ্ছে। বিলি বিভাগ থেকে এখন হতে আমরা ময়দার বাদ পাবাে ? এবার থেকে হপ্তায় দু’দিন মেমমা আর মাংস পাওয়া যাবে।” মা-চু-চাং উঠে বলে, সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করে, “কি বলে, মাংস ?” ", সরকার আমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করছে। আমরা যে শ্রমিক।” যেনানে আসার আগে মা-চু-চাং মিচি জেলায় এক জমিদাবেব জন্যে অনুর্বর জমি চষতে। জমিদারটি ছিলেন দারুণ স্বার্থপর । মজুদেব জন্যে খাদ্য বরাদ্দ ছিল, শুধু ভুট্টা , মাংস তত দূবের কথা। মজুররা যাতে খেতে কম পাবে, কত্রী ঠাণ আবাব মাঝে মাঝে ভুট্টার আটায় বালিব ভেজাল মেশাতেন। এখন এই লিউ পাগলটা বলে কি। নাঃ, এ একেবারে অবিশ্বাস্য। লিউ-তা-সুং বলে যায়, “এই প্রত্যন্ত ভূমিতে সবাই সমান ব্যবহার পায়। মাও-সে-তুং আমাদের দেশনায়ক , তবু আমরা যা খাই, সেও তাই মাও-এর নাম শুনলে মা-চু-চাং-এর মনটা আনন্দে কেমন যেন শিউরে ওঠে। মিচি জেলায় ক্ষেতমজুরী করবার সময় এই লােকটাব কাহিনী সে nia তমি কিছু কিনেছে ঠিক রবিনহুর্তের মতাে তেপান্তরের মাঠ আর তুষার ঢাকা পর্বতে দেশের বীর বটে জাপানী ভূতগুলােকে কেমন হুভােটা দিচ্ছে। মা এভাতের দেয়, “জানি জানি মাও আমাদের—এই সাধারণ লোেকদেব—মুক্তিদাতা।” এই আসে লোকটার ঘুমেব ঘাের কাটতে থাকে। লিউ-তা-সুং ব'লে চলে, এখানে জমি কেমন ভাল, কোন্ কোন্ জিনিষ জন্মাতে পারে—এই সব কথা। জমিব কথা কানে পৌছুতেই মা-চু-চাং-এব মুখ নীচু হয়। এখানকার জমির উপর তার আস্থা নাই। লিউ বলে, “মাস তিনেক পবে আমাদের তরিতরকাবী যা দবকার এখানকার জমি থেকেই পাবাে।” “হু, তা দেখা যাবে।” “তা কাজকর্ম তাে ভালই বােঝে, পাকা লােক তুমি। লেগে যাও না কেন?” মা একথার জবাব দেয় না, আপন মনে বিড়বিড় করে। হু, এই বাজা পাথুরে জমিতে লােনাই ফলবে বটে , ভাত জোটে না, ভাতাব চায় । বাচাতুবী কেবল । পাহাড়ের ঢালু বেয়ে মা পাহাড় থেকে নীচে নামে , জমি নিডায়। “জমিতে কে কত ফলাতে পারে, তার প্রতিযােগিতা হচ্ছে এবার , শুনেছাে ?” “হৃষ্টপুষ্ট বেটে লােকটা প্রবল উৎসাহে নিড়ানি চালাতে চালাতে মাকে জিজ্ঞাসা কবে, “শুনেছাে?” মা একটা উত্তর দেওয়ার প্রয়ােজনও বােধ করে না। পাহাড়ের গা বেয়ে এক ঝাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যায়। টিপি আর কবরগুলােব উপর মরা ঘাস খসখসিয়ে ওঠে, যেন তাদের একান্ত নির্জনতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানায়।
ভিনদেশী কম পাথুবে দেখে একটুকরাে জমি মা বেছে নেয়। মিনিট কয়েকের মধ্যেই কিন্তু নিড়ানি ছেড়ে হাত গুটিয়ে বসে। চারপাশে শুধু আগাছা-আর আগাছা, কার সাধ্য সাফ কবে। মা-চু-চাং সমস্ত প্রান্তরটা চষে বেড়ায়। এ মাটীতে কোনােদিন লাঙল পডে নাই। কুমারী মৃত্তিকাব মৃদু গন্ধে নানাবন্ধ, ভ'বে ওঠে, মনে হয়, কী যেন তার বুকে উপর চেপে বছে। কৰ্ষণ-যােগ্য একটু জমির সন্ধান তবু সে কবে। সর্বত্রই ঐ পাথর আর পাহাড। মা-চু-চাং সবিস্ময়ে ভাবে, এ পতিত জমি চষতে চাওয়া কেন ? তার চোখে ফুটে ওঠে অবিশ্বাস, ঠোটের দুকোণ নেমে আসে। বেঁটেখাট নােকটা বিস্মিত হয়ে মা-কে শুধায়, “হয়েছে কি তােমাব, বলাে তাে?” মা ঐ এতটুকু লােকটার দিকে বিদ্রুপভব। চোখে একবার চায়, চুপ করে থাকে। সন্ধ্যা লাগে। ইতস্ততঃ ছডানাে ছােট্ট ছােট্ট অনুর্বব ক্ষেতগুলাে দীর্ঘকায় পাহাডের গুটিগুটি এগিয়ে-আসা ছায়াব বুকে মুখ লুকায়। গুহার বাইবে পাথবের বেঞ্চিতে ব'লে সকলে জটলা করে, তামাক টানে , তাদের কথাবার্তা হাওয়াব পিঠে চ'ডে দেশদেশান্তরে উড়ে যায়। লিউ-তা-সুং সাদা ময়দা নিয়ে সন্ধ্যাবেলা ঘবে ফেবে। প্রদীপের মিটমিটে আলােতে মা তার দিকে চায় , মেঝের ওপব থুতু ফেলে , কোনও কথা বলে না। “লিউ-তা-সুংটা বড় বােকা , যত উদভট জিনিষে তার অগাধ বিশ্বাস।” মা মনে মনে এমনিধারা লিউ-এর সমালােচনা করে। লিউ-যে প্রকৃতপক্ষে কেমন লােক, সে খবরও সে রাখে না। “একটা ডাণ্ডার উপর একখানা মাথা! কি কাজটা ও করতে পারে ?” মা জানে না, এই লিউ একদিন তার মতাে কত হাজার লােকের সঙ্গে কত পাহাড় প্রান্তর ভেঙে দশহাজার “লি” একটানা মার্চ ক'রে এসেছে, বরফ পতিত জমি মানে নাই, ক্ষুধাতৃষ্ণা উপেক্ষা করেছে। আজ তার সমস্ত সামরিক প্রেরণা ও শক্তি কেন্দ্রিত হয়েছে উত্তব সাননী প্রদেশের এই বাজা মাটীকে ফলিয়ে তুলবার দুরূহ তপস্যায় । “লাঙল হােক্, বন্দুক হাে, হাত ওর সমান পাকা”—বেঁটে লােকটা বিউ-এর সম্বন্ধে মা-কে বােঝায়। এমন সময় লিউ সেদিকে আসে। বেঁটে লােকটা মা-কে বলে, “কমরেড, মা, এ মাটী সত্যিই খুব ভাল। শাকজী যা ফলবে।” মা বিদ্রুপ কবে, “হাঁ, তা ভগবানই জানেন।” লােকটা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খায়, বলে, “তা যাই বলল, এ জমি সত্যিই খুৰ উবা।” । একটু একটু করে গবম পড়ে। পাহাডেব বুক-বেয়ে তরতর কবে জলস্রোত নামে, সূর্যেব উজ্জ্বল আলােকে ঝিলমিল করে। যে নদীর স্মিতহাস্যে সমস্ত অঞ্চল আলাে হয়ে ওঠে। মেঘেব বঙ বদলায়। গাছে গাছে নূতন পাতা গজায়, মুকুল আসে। উর্ব আকাশে বসন্ত-লখাব সঙ্গীত উপচে পড়ে। লিউ-তা-সুং বেঁটেখাট লােকটীব পাশে এসে দাঁড়ায়। “কমরেড, সাও, তুমি যে জমিটা সাফ করছে, ওর মাটী বেশ ভাল, না?” “ঠি”, ৎসাও বেশ একটু গর্বের সঙ্গে উত্তব দেয়, “ঠিক, খুব উব, এ জমিতে ভুট্টা যা হবে ! ইয়া মােটা আব ইয়া লম্বা। বিকালেব মুখে মা ভাঙা দেওয়ালটার কাছে এসে দাঁড়ায়। ৎসাও ওখানে চাষ দিয়েছে। চমৎকার নেতা বাঙা মাটী! মা একমুঠো তুলে শোঁকে,
৩৪
ভিদেশী
আঙুল দিয়ে চায়। মাটীতে একটা সুপরিচিত গন্ধ '-ঘােডার লাদিব
সাব দেওয়া হয়েছে।
মা-র মনে খটকা লাগে,-এই বাজা জমি হয়ত ফতেও পারে। আবার
মনে হয়, নাঃ, তাও কি সম্ভব ?
লিউ-তা-সুং নিড়ানি ঘাডে সে দিকে আসে। কাউলিয়াং শাখার মতাে দীর্ঘ
ঋজু দেহ। গাভীর্যময় মুখখানিতে খুসমেজাজী হানি।
লিউ ডাক দিয়ে বলে, “কমবেড, মা, মাটীটা বেশ ভাল মনে হচ্ছে না? খুব
ফবে।”
মা ধীরে ধীবে মাথা নাডে। “বড পাথুবে, পাথবে একেবারে ভতি।”
সাও একথার জবাব দেয়, “প্রবাদ আছে, লাঙলের ফাল ঘ’নে সুচ করা যায়।
পাথুরে জমিকে আমবা আবাদী কবতে পাববাে না?” কথা শেষ কবে সে
আবাব আগাছা নাফ কবতে লাগে।
চুপ করে একপাশে সরে দাড়িয়ে থাকতে মার কেমন লজ্জা কবে।
লিউএর সঙ্গে সে পাথর খুডতে সুরু কবে।
“কমবেড, মা, পীচ-বনটাব ইতিহাস জানাে?” “শুনেছি।” মা-র কণ্ঠস্ববে
নির্লিপ্তভাব বেশ স্পষ্ট।
“ওটাও এককালে এমনি বাজা জমি ছিল। আর কিছুদিনে সেখানে
মুকুল ববে।”
মা সন্দেহ প্রকাশ করে, “ওখানে অনেককাল হতে পীচ গাছ ছিল,
শুনেছি।”
“না, ছিল না। আমি বলছি ওটা এককালে পতিত জমি ছিল।” মা
সাড়া দেয় না।
কমরেডদের একজন, বুড়াে কিষাণ ওয়াংফা মুখ বুজে কঠিন পরিশ্রম করে
যায় , পাকা চুল, মুখে অসংখ্য তিল।
পতিত জমি সমস্ত নিস্তব্ধ। বাসন্তী ধরণী হেলে আকাশেব হালিব উত্তর দিচ্ছে। শীত চলে গিয়েছে। লিউ পীচ বনের কাহিনী শোনায়, কেমন কবে পতিত জমির রূপান্তর ঘলল, এখন সেখানে কেমন ক'রে যন্ত্র চালিয়ে আবাদ দেওয়া হচ্ছে। মা-ব মুখে একটু হাসি ফোটে , সে সাগ্রহে শােনে, বল, “আমাদেব যদি ঐ বকম যন্ত্র থাকত “না, আমাদের জমি এখনাে যন্ত্র চালানব উপযুক্ত হয়নি।” “কবে আমাদের যন্ত্র আসবে ?” “আসবে একদিন।” মা আবাব চুপ কবে যায়। আনবে একদিন। তাৰ বিবক্তি ধরে। মিচি জেলায় সে যখন কাজ কবতাে, জমিদাবটাও তাকে এই রকম স্তোক-বাক্য শুনিয়েছে অনেক। “খুব খাটু, তােব একটা বৌ জুটিয়ে দেবো ! শীতের রাতে বিছানা গরম পাবি।” মা মনে মনে অভিশাপ দেয়। ভবিষ্যৎ চুলােয় যাক্। এ জীবনে বৌ কোনােদিন জুটবে না। ভবিষ্যতের কথা বলে লােকে শুধু ধাপ্পা মাবে। জমিদার মা-কে বলেছিল মাইনেব টাকা তার কাছে জমা রাখতে। মা তাই বেখেছিল। কিছুদিন পব টাকা ফেরৎ চাইলে জমিদাব ঝেড়ে জবাব দেয়, টাকা দেবাে না। চটে গিয়ে মা তার সঙ্গে বচসা সুরু করে, উত্তেজনায় হাত ছুডতে গিয়ে একটা কলস ভেঙে ফেলে, আর এই অপরাধে তার কাজে জবাব হয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে মা-র মেজাজ গবম হয়ে ওঠে। “যে শালা লম্বা লম্বা কথা বলে, তার জাতেব ঠিক নাই।” লিউ বলে, “এ জমি চবার জন্যে যন্ত্রপাতি আমরা পাবাে একদিন, তবে এখন নয়। এখন আমাদের যুদ্ধ চালাতে হচ্ছে।” কথাটা সত্যি। মা লাইএর খবৰ জিজ্ঞাসা কবে, গল্প শুনতে চায়। লিউ ভিনদেশী তাকে পিলিংকোয়ানের প্রথম লডাইএর কাহিনী শােনায়,-চীনের চাষীরা জাপানীদের সঙ্গে কেমন যুদ্ধ করেছিল, তার কাহিনী। শুতে শুত মা উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তার চোখ দুটো ঝ ঝক্ করে। চটপট তার নিডানি সবে , ক্ষিপ্রগতিতে সে পাথর তােলে , ভাঙা খােলা, ইট-পাটকেল উপড়ে যায়। ৎসাও চীংকাব ক'রে বলে, “একজোটে হাত লাগাও ভাই , জাপানী ভূত গুলােকে না ভাগিয়ে শান্তি নাই।” ( ৩ ) লিউ-তা-সুং আব মা-চু-চাং সব সময় এক সঙ্গে কাজ কবে। ভাঙা দুর্গেব কাছে জমিটায় আগাছা সাফ করা হযেছে , ভাল কবে চষাও হয়েছে। তাব পূর্বদিকে পুরাণাে মন্দিবেব ধ্বংসস্তুপটাব পাশে ৎসা ও জমি থেকে সবানাে ভাঙা খােলা টালি প্রভৃতিব একটা পাহাড় খাড করেছে। বয়স তাব কম , মনটা সদাপ্রফুল্ল , কাজ করতে করতে গান করে। ওয়াফা কিন্তু নীবব, শীতে-জমা শ্রোতস্বতীর মততা। মাথা হেঁট কবে সে কাজ করে যায়, বচিং কখনাে একটু মুখ মুচকে হাসে। লিউ এখন মহিষের পিছন পিছন লাঙল ঠেলে। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। ছােট হালকা মেঘ পাহাড়ের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। উপত্যকাব বুকে ছােট ঘােট জলস্রোত কুলকুল শব্দে নেচে চলেছে। মেঘেব ফাকে ফাকে লােনালি রৌদ্র ভেঙে পড়েছে। হাওয়ায় বসন্ত ঋতুর সৌরভ। মাটি দেখে চাষীঘরের মেয়েব গাল মনে পডে , নরম, কিন্তু থস্থলে নয়। ঘুবে ঘুরে লিউ-এর পায়ের তলা চুলকায়। উপত্যকায় পীচ, গাছগুলােয় ঝাঁক ঝাঁক মউল এসেছে।
পতিত জমি
৬৭
“অর-র-র”—লিউ মহিষ ডাকায়। রৌত্রে দেহে ঘাম ঝরে।
ম৷ লিউএর লাঙল দেওয়া দেখে। মহিষটা ঘাড় উচিয়ে লাঙল টানে, মা
চেয়ে থাকে। ফালে পাথব ঠেকে। ফাল ভেঙেছে, এই ভয়ে লিউ লাঙল
তুলে ববে। মহিষটা হঠাৎ একটা হেঁচকা টান মাবে। লিউ কাদায় গােডডি
য।
“দাও, আমি ধরি।” মা দৌড়ে গিয়ে লিউকে ওঠায়। লাঙল আর
পাচনবাড়ি নিয়ে মা কাজে লাগে।
ফালের মুখে নরম ঢিলে মাটি দুর্ফাক হয়ে যায়। মহিষ দ্রুত এগিয়ে চলে।
পাকা চাষীব হাতে মা লাঙলেব মুঠো ধরে। লিউ সপ্রশংস দৃষ্টিতে তার নৈপুণ্য
লক্ষ্য করে, কমরেড, মা, জমির কাজে তুমি ওস্তাদ।”
“না না” মা হঠাৎ কেতাদুরুস্ত হয়ে ওঠে, বলে “তবে কি জাননা,
জমিদাবের কাজ কববার সময় দিনে দু’বিঘে জমিতে হেসে খেলে
লাঙল দিয়েছি।
পাহাডেব নীচে, গােবস্থানের কাছে, জন বাবােলােক একটা পাংকুয়ে
খোডে। তারা কাজ কবে আব গান গায় :-
সব দরিয়াব চাইতে রে পীত—পীত, দরিয়ার জল ।
‘চাও'-সহরে পড়েছে কাল জাপ, ডাকাতের দল।
ওখাং গাঁটাও পুড়ছে শুনি।—আমবা কি দুর্বল ?
চীন সেনারা হছে পিছে,-হাড জ্বলে যায় রাগে-
বাপদাদাবা শুকিয়ে জোগায় অন্ন তাদের আগে।
মরলে ফেলে উপত্যকায় , লড়ছে মর কুলি।
আর সওয়া নয়, হেইও রে ভাই, অন বন্দুক গুলী।
মা তাদের ভাঙা মােটা গলার গান শুনে বিচলিত হয়ে ওঠে।
“কমরেড, লিউ, যুদ্ধের খবর কি?”
ভিন্দেশী
“আমরা শক্রব্যুহ ভেদ করেছি।”
“কি? কি?”
“উতাই পর্বত অঞ্চলে আমাদের চোবাগুপ্তি সৈন্য অনেক বেড়েছে এখন।
পশ্চিম সাক্ষীতে একটা নূতন সৈন্যদল গড়ে উঠছে। আমাদের ঘােড়-
সওয়াররা পেইপিংএর উপকণ্ঠে প্রায়ই খণ্ডযুদ্ধ জাপানীদের উত্যক্ত করে
বাপে।”
“জাপবা ভয় পায় না ?”
“পাবে না কেন? আমাদের সেনাবা পিছন থেকে ওদের উপব পড়ে ,
ওদেব বিপর্যস্ত করে। জাপরা তাদের কি ক’ববে?”
“মরুক্ শালারা। ইচ্ছে হয়, জাপ, ভূতগুলােকে একটু শিক্ষা দিয়ে
আলি।”—মা যুদ্ধের খবর পেলে আনন্দে হেসে ওঠে।
“যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে লড়াই করার চেয়ে এখানে চাষ ক'রে, কলকাবখানা
চালিয়ে, লড়বার শক্তি জোগানাে কিছু কম বড় কাজ নয়, কমবেড, মা।
,
গ
মানুষের কণ্ঠস্ববে, পশুর ডাকে উপত্যকা মুখর হয়ে থাকে। এখানকার
সকল চাষীই বাসন্তী কৃষিপ্রতিযােগিতায় যােগ দিয়েছে।
লিউ-তা-সুং জোর গলায় হাঁক ছাডে : “সৈন্যদেব খাদ্য জোগাতে হবে,
সবাই খুব খাটো ভাই।” সমস্ত উপত্যকা তাব কষবে গম্ কবে।
মা-র হঠাৎ মনে পডে লিউ-এর সেই কথাগুলা: চাষ দিতে পাবলে এই
পােডড জমিতেই লােনা ফলবে।
মা এক বিঘে জমিতে লাঙল দেওয়া শেষ কবে , নাও ডাকে , ঘাসের
উপর শুয়ে, তামাক খেতে খেতে দুজনে গল্প কবে।
“মাং-ফা এদিকে এসাে না।”
ওয়াং-ফা আসে, মুখে
একটা
মৃদু হানি।
পতিত জমি লাও তাকে জিজ্ঞাসা করে, আহ-পাের কোনাে চিঠি পেয়েছ নাকি? আহ,-পাে বন্ধুলােক , এখন যুদ্ধ করছে। “পেয়েছি চিঠি। খুব লড়ছে মরদ। এক জাপভূতকে টেনে রেলগাড়ী থেকে নামিয়ে ওয়াং-ফা চিঠির সারাংশ শােনায়—সেদিন রাত্রে চীনা গেবিলা বাহিনী একখানা জাপানী সাঁজোয়া ট্রেণ কেমন কবে থামিয়েছিল, তাব বিবরণ। ( ৪ ) লিউ-তা-সুং গােটাকয় হাঁস ও বাচ্চা মুবগী, আর দুটো ধবধবে শাদা মেষ কিনে আনে। পাহাডের নীচেব পুকুরে হাঁসগুলাে সাঁতার দেয়। পুকুর- পাড়ে বাচ্চা মুবগীগুলাে খাদ্য খুঁটে বেড়ায়। মাঝে মাঝে হাঁসগুলাে তাদের পুকুবে নাক ডাকে। মুরগী ছানাগুলো কিন্তু বেশ চালাক , হাঁসগুলাে লােভ দেখাতেই, তাবা চটপট, উডে পালায়। ভেডা দুটো সকাল-সন্ধ্যা চডে বেড়ায়। ব্য-ব্যা । মা ভেড়াদুটোর পিঠের নবম পশমের উপর হাত বুলিয়ে আদব কবে। “দোন্ত। “দোস্ত। বােপটা শেষ হতে যা দেরী, তােদেব জন্যে কটা ভেড়ী এনে দেবে। বাচ্চা নইলে ভাল দেখায় ?” পশু দুটো এমনভাবে তার দিকে চেয়ে থাকে। ওবা যেন বুঝতে পাবে। মা-র হৃদয়টা হাল্কা বােধ হয় । সে তার দেশােয়ালী গান ধরে। এই ঘােট ঘােট জন্তুগুলাের উপর তার কেমন মায়া হয়। কেন, সে তা বুঝতে পাবে না। জমির সমস্ত আগাছা পরিষ্কার করা হয়েছে। পাথর সরাবাব কিংবা ছােট ঘােট গতগুলাে ভতি করবার সময় যা মনে হ'ত, মা-র এখন তা স্মরণ হয় না। সে নিজের মনে ভাবে। অদ্ভুত কিন্তু, মা-চু-চাং এককালে এ জমিকে রীতিমতাে ঘৃণা করতে, এখন এত ভাল লাগে কেন ?
৭০
ভিদেশী
মা মাথা চুলকায়, এব জবার খুঁজে পায় না।
লিউ-তা-সুং আগের চেয়ে ব্যস্ত, উজান-নদীর মাঝির মতাে পবিশ্রম
কবে। তাব কটা মুখ বােগা দেখায় , চোখ বলে গিয়েছে , তবু ও-দুটোয় সর্বদা
কিসের একটা দীপ্তি। সাও-কে আগেব চেয়েও প্রফুল্ল ও কর্মতৎপর মনে হয় ,
এখানে যায়, সেখানে যায, জ্বালানিব জন্যে গুন্ম কাটে , গান গায় , বাচ্চা
ঘােডার মতাে দ্রুত গতিতে চলে, নিপুণ হাতে পাথর ওঠায়, আগাছা তােলে ,
অবকাশ মত পাথব-ফাদে বুনাে পাখী ধবে। ওয়াং-ফা কিন্তু আগের মতােই
নির্বাক, কেমন যেন একঘেয়ে ভাব। বুডাে কিনা ।
“কমবেড ওয়াং, বুডো হ'লে বেঁচে থাকা বিড়ম্বনা নয় ?”—মা বুডােকে
জিজ্ঞাসা কবে বলে।
“নিশ্চয় নয়। আগে জীবনবাবণ কবেছি গােণাগুন্তি কয়েজনেব জন্যে , এখন
করছি দশের জন্যে।”
“তার মানে ?”
“আগে আমি দিন
মজুব ছিলাম
মা-ব মাথা গুলিয়ে যায়। এবা সবাই বলে, বেঁচে আছে দশেক
জন্যে। সেও কি তাদের জন্যেই বাঁচছে না? মা-র দিল্টা ভাল। সবাই
জানে, তার বৌ নাই , নিশ্চয়, সেও দেশব ও দশে জন্যেই প্রাণধারণ কবে ,
শুধু নিজের জন্যে নয়।
“এবাব বীজ বুনতে হবে, বসন্তেও আব শেষ হয়ে এল।
“এবার আবার কিসের বীজ ?”
“কেন, ভুট্টা, শণ আব খরমুজের।”—লিউ-তা-সৃং কোন্ লাবিতে কিনের
বীজ বুনতে হবে, দেখিয়ে দেয়। মা অনুমােদন কবে।
og ww } , পজিমি ৭১ বীজ কিনা হয়, মা অধীরভাবে প্রতীক্ষা করে এ মাটীতে কেমন গাছ জন্মায় দেখবজন্যে। । ভাৱে লিয় চমৎকাব হবে। আগের চেয়ে মা এখন অনেক স্বাস্থ্যবান দেখায় , মুখখানা প্রফুল্লতায় উজ্জল , ঠোটে একটা বেখাপ্পা ভাঁডসুলভ হাসি, আঁটসাট দেহে মাংস লেগেছে। লিউ-ত-সুংকে অন্যত্র যেতে হচ্ছে, সেখানকার চাষবাসেব' তদারক কবতে। মা এ সংবাদে বিষন্ন হয় , একগুয়েব মতাে লিউ-এব যাওয়ায় আপত্তি জানান। “তুমি গেলে আমি কাজ কববব কেমন কবে?” “কোনাে ভাবনা নাই , তুমি বেশ পাক। চাষী , ববং দেখবে, এখনকাব চেয়ে বেশী খাটবে।” “না, আমি তা পাবাে না “পাববে না কেন, শুনি? ক্ষেতে কাজ তুমি আমার চেয়ে ভাল কবে। আমি ত এব আগে শুধু লড়াই কবেছি, আব তুমি “আগে আব এখন। এখন তাে আমরা দশের জন্যে খাটি।” ম-ব কথা শুনে সবাই হেসে ওঠে। “কমবেত মা, কাজ করে যাও। আমি জানি, তুমি আমার চেয়ে ভাল কাজ কবতে পাবাে”,—লিউ তার পিঠ থাবড়ায়, মা পােষ পাখীব মতাে শান্ত হয়ে যায় , বলে, “বেশ, আমি চেষ্টা করে দেখবাে। লিউ চলে যায়। মা প্রত্যহ প্রত্যুষে ওঠে, কাজ করতে কবতে আপন মনে বকে: “দেখিয়ে দেবাে, আমি কি করতে পাবি।” নূতন জমিতে সে পাথর খোঁজে,—যেন লােনা খুঁজছে। তারপর সেগুলাে নিয়ে গিয়ে পাথরের স্তুপটার উপর ফেলে। মুরগীগুলাের জন্যে গুহার পাশে একটা ছােট্ট কুঠরী তৈয়ার কবে , প্রচুর হাওয়া চলাচলের জন্যে কয়েকটা U ৭২ ভিদেশী জানলা ফোটার। ৎসাও মা-কে সাহায্য করে, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে, “চমৎকার ব্যবস্থা।” নূতন বাসায় এসে মুরগী গুলাে কলব করে , ডিম পাডে , পাখা ঝাপটায় , উডে পাহাড়ের নীচের দিকে একটু নেমে আসে , বাচ্চা হ'লে সেগুলােকে ‘মানুষ’ করে। মহিষটার জন্যে মা একটা গুহা খোডে , তার খাদ্য রাখবাব গামলা প্রস্তুত হয়। মহিষ তার লালচে মুখের মধ্যে ঘাস পাতা টেনে নেয় , মা বসে বসে দেখে। “গামলা তৈরী কবাব কথাটা মনে কবেছিলে ভাল।"—ওয়াং-ফা প্রশংসমান চক্ষে চেয়ে থাকে। মা গভীরভাবে মহিষটাকে জিজ্ঞাসা কবে, “কমরেড মহিষ, গামলা পছন্দ হয়েছে ত?” মহিষ উত্তরে তার ড্যাব ড্যাবা চোখ দুটো বন্ধ কবে । মা ভুট্টা ক্ষেতের আগাছা লাফ কবে , শাকসী লাগায় , সারি সাবি বীজ বােনে, সুফলা মাটীতে একটুকরােও পাথর পড়ে থাকতে দেয় না। “কদিন থেকে দেখছি, কাজে তােমার তােমার উৎসাহের অন্ত নাই। ব্যাপাব কি ?”--ওয়াং-ফা ও ৎসাও দুজনেবই বিস্ময়েব অবধি নাই। মা কোনাে জবাব দেয় না, একটুখানি মুখ মুচকে হাসে। দিন যায়। একটু একটু করে গরম পড়ে। সােনালি রৌদ্রে জমি তপ্ত হয়ে ওঠে। পাহাডেব বুকে পালে পালে গরু ভেড়া দেখা দেয়। ঘাসের উপর তাদের ছায়া চরে বেড়ায়। মেষপালকরা গাছের তলায় শিন দেয়। মেয়েরা কলরব ক রে নদীতে আছড়ে আছডে কাপড় কাচে। ভুট্টা দীঘ হয়ে ওঠে। মা সারাদিন নিডান দেয়। সকালে গাছের পাতা হতে শিশির ঝরে। তাজা মাটীর গন্ধে হাওয়া ভারাক্রান্ত , মা বুকভরে খাস নেয়, যেন কতকাল পরে আবার মাঠে এসেছে।
পতিত জমি ( ৫ ) কূপ খনন শেষ হয়েছে। নতুন কূপের পাশে মজুরেরা এসে জুটেছে , নাচছে-কুদছে, গান গাইছে। মা-ব প্রবল উৎসাহ জাগে , নেও এলে তাদের সুঙ্গে যােগ দেয় । “পতিত জমি চাষ করবাে বে ভাই। দেশের জন্যে লড়ছে যাবা, রস তাদেব চাই মা সুর ধরতে পারে না, তবু গায়। গেমেই তাৰ সুখ। মা শাজীতে জল দেয়। এগুলাে বেশ বড় হয়েছে এখন, সবুজ পাতা মেলেছে। শালগমের পাতাগুলো ঝোপ দিয়ে উঠেছে। আলুব গােডা কঞ্চির মতাে খাড়া হয়েছে। সূর্যমুখী ফুলগুলাে চাষী মেয়েদের মতাে হাস্যময়ী । লিউ এসে তাকে কি বলবে, মা আপন মনে আওডায় : “এই তাে কমরেড মা চমৎকার কাজ কবছে।” পুরাণাে বন্ধুর মতো লিউ তার পিঠ থাবডাবে। মা ঘুমায়। লিউ ফিরে এসেছে। বন্ধুবা মা-র কাজের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছে। লিউ-এর বড় আনন্দ। সবাইকে সে মাংস খাওয়ায়, মদ খাওয়ায়। তারপর, অন্য জায়গায় চাষবাসেব কথা, লড়াই-এর কথা ওঠে। কেন সে বইপত্তর ছেড়ে বন্দুক ঘাডে নেয়, সৈন্যদলে ঢােকে,—লিউ তার ইতিহাস বলতে থাকে। “ও, তুমি পড়াশুনা করতে বুঝি ?” “করতাম, কিন্তু ইস্কুল শেষ কবেই ইস্তফা দিই।” মা ভাবে : এ বড় আজব কথা । কেন লেখাপড়া ছেড়ে এই সামান্য সৈনিকজীবন যেচে নেওয়া ? যেচে নেওয়া ? মরুক গে, লিউটা বড় বােকা। “ও সব থা, এখন আমাদের কাজের কথা হােক। নিজেদের খেতে হবে, খেত-খামার
৭৪
ভিদেশী
থেকে জাপভূতগুলােকে মেবে ভাগাতেই হবে।” সে জোর গলায় হাঁক ছাডে,
“জোট বেঁধে আমাদের কাজ করতে হবে।”
৪
মা-ব ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্ন দেখছিল। বাইবে তখন বৃষ্টি পড়ছে।
চাল থেকে জল পড়ার শব্দ হয় , নদী গর্জন করে। মা কান পেতে
নেন।
পবেব দিনটা মেঘ কাটে। সূর্য দেখা যায় না ।
সূর্য দেখা যায় না। পর্বতেব বুকে সুবে
তবে মেঘ জমে আছে।
“যাঃ শালা”—মুবগী-ঘবটা ভেসে গিয়েছে দেখে, মা উৎকণ্ঠায় চীৎকাব কবে
ওঠ,-“এগুলাে গেল কোথায় ? মােবগছানাগুলাে?”
চীৎকার শুনে ওয়াং-ফা, সাও ছুটে আসে। তাবাও চাবিদিক খোজে।
একটাও চোখে পড়ে না।
“এখন উপায়?” -মা-ব বুক ঢিপ ঢিপ, কবতে থাকে। মুবগী গুনাব
কথা ভেবে তার মন অশান্ত হয়ে ওঠে, সে পুকুবটা পর্যন্ত নেমে আসে।
হাসগুলাে খেলা করছে, কিন্তু মুরগী একটাকেও দেখা যায় না।
—দুব শালা।” মা পুকুবে একটা ঢিল ছােড়ে। হলগুলাে ভয় পেযে,
পাখা ঝাপটিয়ে, ঘাসের মধ্যে গিয়ে লুকোয়।
ওয়াং-ফা শুধায়, “তােমাব হ’ল কি ? মাথা বিগ ডালাে নাকি ?’ মা
উত্তর দেয় না।
একখান ছডি হাতে মা কামাক্ত পথ ধবে , সাও তার পিছু নেয়। বৃষ্টি
দাপটে ভুট্টা গাছগুলো নেতিয়ে পড়েছে , খাল-গতগুলাে জলে টইটুম্বুর।
“শালাব বৃষ্টি দেখাে ।”—মা গালি-গালাজ কবে।
“অত খেয়াল করে না। এ ত সাধারণ ঘটনা।”—ৎসাও মা-কে বােঝায়।
মা সকালে বৌদ্র ফুটে ওঠবার অপেক্ষা করে।
পতিত জমি ) সূর্য দেখা দেয়। আকাশ এখনও সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়নি। মা, ক্রমেই মনমরা হয়ে পড়ে , তার ওজন কমে যায়। ভাডের মতো সে আব নাচে । চোখ নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। “আমি একটা আস্ত গাধা।” -মা নিজেকে ধিক্কার দেয় , গুহাব মণ্যে বলে থাকে। সাও চোখ দিয়ে তাকে ভৎসনা কবে, জিজ্ঞাসা কবে, “তােমার বিরক্তিটা মাথামুণ্ড কিসেব জন্যে ?” মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ওয়াং-ফা তামাকের নল মুখে দিয়ে আস্তে আস্তে মন্তব্য কবে : “গালিগালাজ নিরর্থক। সব কিছুর জন্যে প্রস্তুত থাকা ভাল।” এক সপ্তাহ কেটে যায়, আকাশ পবিষ্কার হয়। মাঠে মাঠে আবাব ডাকাডাকি হৈ-হল্লা শুরু হয়। গরু মহিষগুলাে হাম্বা হাম্বা বব ছাড়ে। চাষীবা শপ শপ কবে চাবুকের শব্দ করে। নদীর ধারে ছেলেদেব গান শােনা যায় :- “দেশসীমান্ত বহ্মা করি, চল্। দেখে নেবে জাপ-ভূতদেব বল । মা আবাব চাংগা হয়ে ওঠে। বােঝে না, কেন? সারাদিন সে গােৰস্থানে কাছে নতুন জমিটায় কাজ করে। এখানে সে শণ আর যবের আবাদ কববে। ংসাও কাছেই জমি নিভায় । রৌদ্রে মাটী খরুখবে হয়। চাবিদিক বেশ উজ্জ্বল, উষ্ণ। ভুট্টা গাছগুলাে আবার সজীব হয়ে ওঠে। ধীবে ধীরে মাঠ হতে সমস্ত জল সরে যায়। সন্ধ্যাবেলা মা একটু বিশ্রাম নেবার জন্যে একটা ঘান-ছাওয়া ঢিপিতে বলে , ৎসাও হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, “ঐ যে ঐ। মুরগীগুলাে । আমাদের নেই মুরগীগুলাে ।” মা তবাক করে লাফিয়ে ওঠে, তাইতাে। ঘাসের মধ্যে থেকে কক্ কক্
৭৬
ভিদেশী
করতে করতে মুরগীগুলাে বেরিয়ে আসছে। মা সেদিকে ছুটে যায়। হাঁ,
সবগুলােই আছে।
তাল তাল সােনা পেলেও বােধ হয় মা-র এমন আনন্দ হত না। দৌড়ে
গুহাব ভিতর থেকে সে এক মুঠো ভুট্টা এনে মুবগীগুলােকে খাওয়াতে বসে।
সে কি যত্ন, যেন নিজের শিশুকে খাওয়াচ্ছে।
পরদিন মা কাঠের তক্তা দিয়ে ও-গুলাের জন্যে একটা বাসা তৈরী করে।
ছাদ হয় , দৰজা হয়। দরকার মতাে এটা সরানােচলবে। “দেখে নেবাে
শালার বৃষ্টি কেমন ক'বে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।”
শণ বড় হয় , তাব ডাটাগুলাে, লাল পাতাগুলাে বেড়ে ওঠে। ভুট্টা
পাকে। কূপের ধারে সূর্যমুখী ফুলের সভা বসে।
লিউ-তা-সুং একদিন ফিরে আসে। জ্যোৎস্না রাত্রি , গুহাব দরজায়
রূপালি আলো। সকলেই ঘুমিয়ে আছে। পায়ের শব্দ শুনে মা চোখ
খােলে, “কে ?”
‘‘আমি।” লিউ-এর কণ্ঠস্বর মা-র পবিচিত। সে গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে
চাষ। লিউ মানা করে।
“উঠতে হবে না, আমিও এখন একটু ঘুমাবাে।”
‘খাওয়া হয়েছে তােমার ?"
“খেয়েছি।” –লিউ কাঙ-এ উঠে মা-র পাশে শুয়ে পড়ে।
“জমিতে ভাল কাজ করেছ, না ?”
“এমন আর কি? তবে বিশেষ মন্দ নয়।” মা কথা খুঁজে পায় না।
“অষ্টম রুট আমির হাতে পডেছে জাপানীদের অনেক খাবারের টিন।
ওরা আর কত খাবে? কিছু এদিকে পাঠিয়ে দিয়েছে। সীমান্ত সরকার
আমাদিকে সেগুলাে সকলের মধ্যে বিলি করতে আদেশ দিয়েছে।” ঘুমে
লিউ-এর গলা জড়িয়ে আসে।
পতিত জমি
৭৭
মা-র আর ঘুম আসে না। শয্যার উপর চাঁদের ক্ষিপ্ত আলাে এসে পড়েছে।
বাইবে আকাশ ঝলমল করছে। মা-র দিকে চেয়ে তারাগুলাে মিটমিট
করে হাসছে। ঝিঝির ডাক শােনা যাচ্ছে। নদীর কুলুকুলু আওয়াজ ভেসে
আসছে।
“জাপানীদের টিনের খাবারও তা'হলে খেতে পাবো ।”—মা ভাবে, কাল
তার জীবনের সব চেয়ে সুখে দিন। *
চীনা গল্প : মেহ-ই রচিত
-র্যাচেলর ভৎসনা - জেরুজালেমের লােকগুলাে বড্ড চপল, বড় বেয়াডা। আবাব তাবা ভগবানের সঙ্গে তাদেব মহাচুক্তিব কথা বিস্মৃত হয়ে পিতলেব প্রতিমাব কাছে বলি দিল। এই অধর্ম কবেই বা ক্ষান্ত হ'ল না , ভগবানের ভক্তসেবক সলােমনেব মন্দিবেও তাবা ‘ব্যালে’র মৃতি প্রতিষ্ঠা কবে বলিব বক্তে মন্দিবের নগুলাে লালে লাল কবে তুললাে। তারই পবিত্র পীঠে তাকে নিয়ে এমনি ধাবা বিদ্রুপ ভগবান যখন দেখলেন, তখন তার বাগ ফেটে পড়লাে। তিনি হস্ত প্রসাবণ করলেন, তার গর্জনে আকাশ কেঁপে উঠলাে , এবার তাঁব ধৈর্য টুটেছে, পাপে-ভবা সহবটাকে এবাৰ তিনি ধ্বংস কবে দেবেন, এ-সবেব লােকগুলােকে তুষের মতাে উডিয়ে দেবেন। পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপব প্রান্ত পর্যন্ত তাব সঙ্কল্প ঘােষণা ব’বে বজ্র প্রতিধ্বনিত হল। মহাশক্তিমান্ তব ক্রোধ প্রকাশ কবলেন , পৃথিবী আতঙ্কে কাঁপতে লাগলাে। পিতামহ নােআর আমলেব মতে, আকাশের বাতায়নগুলাে খুলে গেল, গভীর সমুদ্রের তলে ঝর্ণাগুলাে ফেটে পড়লো, উচু পাহাড়গুলাে হুডমুড করে পড়তে লাগলো, আকাশের পাখী মাটীতে পড়লাে , ভগবানের ক্রোধের তীব্রতায় দেবদূতরা পর্যন্ত শঙ্কিত হয়ে গেলেন।
র্যাচেলের ভৎসনা নীচে, অনেক নীচে, অভিশপ্ত জেরুজালেমের পুরবাণীরা ভগবানের কণ্ঠ- নিঃসৃত বজ্রধ্বনি শুনলাে, কিন্তু তার মর্ম গ্রহণ করতে পারলাে না। তারা বুঝলাে না, তাদের মৃত্যুর পবােয়ানা বেরিয়ে গিয়েছে। এটুকু কিন্তু তারা বেশ বুঝতে পারলে, পৃথিবীর ভিং পর্যন্ত টলে উঠেছে , ভরা দুপুরে মাঝরাত্রির অন্ধকার নামলাে, প্রবল বাত্যায় প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বনস্পতিব গুডিগুলাে পর্যন্ত পাটকাঠির মতাে মটুম কবে ভাঙতে লাগলাে। মাথার উপর ছাদ ভেঙে পাব ভয়ে তারা বাড়ীঘব ছেড়ে ভােলা জায়গায় আশ্রয় নিল , ঝড়ের দাপটে, বৃষ্টি ঝাপটায়, ঘনান্ধকার মহাশূন্যে গন্ধকের তীব্র গন্ধে, তাদের আতঙ্ক আবও বেড়ে গেল। পবণের কাপড়চোপড় ছিডে, মাথায় ছাই মেখে, সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত কবে মিছেই তাবা ভগবানের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগলাে। পঞ্চভূতেব মত্তত। তাতে একটুও শান্ত হ’ল না, অন্ধকার একটুও পবিষ্কাব হল না। ভগবানের ক্রুদ্ধ গর্জন এমনি ভীষণ হ’ল যে, অন্তিম তূর্যদেব প্রতীক্ষায় যে সব প্রেতাত্মারা যথাবিহিত নিদ্রায় মগ্ন ছিলেন তাঁরাও মৃত্যুলােকে জেগে উঠলেন, ভাবলেন, সেই ভীম আহ্বানই বা এল। তারা গাত্রোত্থান কবে স্বর্গের দিকে ডানা মেললেন , মহাঝা ভেদ করে গিয়ে শুনলেন, শেষ বিচারের দিন এখনও আসে নি। আসুক, এই সব পিতাপিতামহদের আআব। ভগবানের সিংহাসন ঘিরে সমবেত হলেন, প্রার্থনা জানালেন, ঈদের সন্তানদেব উপর হ'তে, পবিত্র শহরের চুডাগুলাে হতে, ভগবান তার রুদ্র অভিশাপ সম্বরণ করুন। এই প্রার্থনায় অগ্রণী হলেন আব্রাহাম, আইজাক্ আব জ্যাকব। ভগবানের রুদ্রনাদে তাদের কণ্ঠস্বর চাপ পড়ে গেল , ভগবান ঘুবে ফিরে একই কথা আওড়াচ্ছিলেন, তার সৃষ্ট জীবদের একগুয়েমি তিনি যথেষ্ট সয়েছেন, আব না। যতই অকৃতজ্ঞ হােক ওরা, মন্দির চূর্ণ হয়ে গেলে, প্রেম দিয়ে ওদিকে যা শেখানাে যায় নি, এবার তা শেখানাে যাবে।
ভিদেশী ভগবানের ‘খাস্ পেয়ারের জাতের পূর্বপুরুষদের মুখ এমনিভাবে বন্ধ হয়ে গেল , এবাব পয়গম্বর স্যামুয়েল এলিজা আর এলিনা অগ্রসর হয়ে তাদের মিনতি জানালেন। জীবিতকালে এরা ছিলেন ভগবৎবাণীর উৎস। এবা ছিলেন সেই জাতেব মানুষ, যাদের জিহ্বায় বহিউদ্গীবিত হয়, যাদের অন্তরে জ্বলতে অগ্নিকুণ্ড। ভগবান কিন্তু তাদের কথায় কান দিলেন না। তাব কোপবাত্যার তাড়নায় পয়গম্বরদের কথাগুলো তাদের মুখে উপব ছিটকে ফিরে এল। মন্দিরকে ভস্মীভূত ক’বে মাটীর সঙ্গে মিশিয়ে দেব জন্যে বিদ্যুৎ আৰৰ চৰ্ম করে উঠলাে। পয়গম্বব আর ঋষিবা দমে গেলেন। তাদের আত্মা বাত্যাহত তৃণে মতো পঁপতে লাগলাে , পায়ে- মানাে মৃতপত্রের মতাে শুষ্ক হয়ে গেল। তাদেব কাবও মুখে আব একটাও কথা ফুটলাে না। শুধু ব্যাচেলের—একজন নারীর আত্মা কোনও বাধা মানলাে না। ইস্রাইলের মহা-মাতা এই ব্যাচেল, ‘রামাহ'ব কবরে সে শুয়েছিল , ভগবানের ঘােষণা শুনে অবধি তার সে-কি কান্না। কিছুতেই তাকে সান্ত্বনা দেওয়া যায় না। ভালােবাসার জোবে সে ভগবানের সঙ্গে বােঝা-পড়া কবতে অগ্রসর হ’ল। ভগবানের মুখ সে দেখতে পাচ্ছিল না—দেবদূত ছাড, শেষবিচারেব দিনের আগে তাে কেউ সে মুখেব দিকে চাইতে পারে না। নতজানু হয়ে, উধ্বে হাত তুলে, ব্যাচেল ভাব যা বলবার বললো :- “হে সর্বশক্তিমান্, এভাবে তােমাকে সম্বােধন কবতে গিয়ে আমাব হৃদয় দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে , কিন্তু তুমিই তো, আমার হৃদয়কে এমনি ভীতু করে গড়েছে। তুমি আমাকে যে মুখ দিয়েছে, তাই দিয়ে ভয়ে ভয়ে তােমাকে আমার মিনতি জানাচ্ছি। আমার সন্তানদের পরম প্রয়ােজনই আমার শক্তি যােগাচ্ছে। তুমি আমাকে জ্ঞান দাওনি, চাতুর্য দাওনি, কেমন করে তােমার রাগ শা করি, তাও আমি জানি না। তুমি জাননা, আমি ব্যাচেলের ভৎসনা ৮১ কি বলতে এসেছি, মানুষের মুখ হ'তে শােনবার আগেই-যে সব কথা তােমার মানসগােচর হয়ে যায়, মানুষের সকল কাজই-যে তুমি আগে হতে দেখতে পাও। তবু, তােমাকে মিনতি করি, ওই পাপীদেব পক্ষ নিয়ে আমি যে কথা বলছি, তা শােননা।” এই বলে, র্যাচেল মাথা নত করলাে। ভগবান তাব নম্রতা দেখলেন , লক্ষ্য করলেন তার গণ্ড বেয়ে অশ্রুবাবা ঝরে পড়ছে। তিনি ক্ৰোৰ সম্বরণ করলেন, ব্যাচেলেব ওকালতি শশার জন্যে শান্ত হয়ে চোপচুপে বসলেন। স্বর্গে ভগবান যখন কান পেতে কিছু শােনেন, মহাব্যোম্ বিক্ত হয়ে যায়, কালের গতি রুদ্ধ হয়। তাই, হাওয়াব গােঙানি বন্ধ হ’ল , বজেব চার্জন ক্ষান্ত হ’ল , লতিয়ে বা হামা-দিয়ে যাবা চলে, তাদেব চলা থেমে গেল , আকাশের পাখীবা ডানা গােটালাে, কাবও নিশ্বাস ফেলবার পর্যন্ত সাহস হল না। হােবাগণ স্তম্ভিত হ’ল, বিশিষ্ঠ দেবদূতবা পর্যন্ত প্রস্তরমূতির মতাে নিশ্চল হয়ে গেলেন। বেশী কি, সূর্য, চন্দ্র তাবাদেবও চক্রাবতন স্থগিত রইলাে, নদীর প্রবাহ থেমে গেল। নীচে —বহু নীচে, অভিশপ্ত জেরুজালেমপুবীর অধিবাসীরা জানলাে না, ব্যাচেল তাদের হয়ে ভগবানের দরবারে ওকালতি করছে , তা জানলাে না, ভগবান তার কথা শুনছেন। স্বর্গে কি হয় না-হয়, নবজীবরা তত তার ধারণা করতে পাবে না। তারা শুধু বুঝলো, ঝড শান্ত হয়ে গিয়েছে। ভরসা কবে আকাশের পানে চাইতেই তারা দেখলে, সমস্ত আকাশ ব্যেপে কালাে মেঘ তখনও ঝুলছে। নিবন্ধ অন্ধকারে, বিশেষ কবে, আকাশের থমথমে ভাবটা তাদিকে মডা-জানাে ক'রে ক্রমেই মুড়ে ফেলছিল বলে তাদের ভয় বেড়ে গেল। ভগবান তার প্রার্থনা মন দিয়ে শুনছেন দেখে ব্যাচেলের বুকে বল এল, উধর্বদিকে বাহু তুলে সে বলে চললল:- ৮২ ভিদেশী “প্রভু, আপনি জানেন, আমি পূবের লােকদের দেশ—হারানে বাস করতাম। সেখানে আমার বাবা লাবানেব মেষ চরাতাম আমি। একদিন সকালে আমরা, কুমারী মেয়েরা, মেষগুলােকে জল খাওয়াতে নিয়ে গেছি, গিয়ে কিন্তু, কুঁয়াের মুখ থেকে পাথরটা গড়িয়ে দেবার মত জোর পেলাম না। তখন এক জোয়ান, পরদেশী লােক সে, খাসা গড়ন,—সে লাফিয়ে এগিয়ে এল আমাদেব সাহায্য করতে আর এতাে সহজে পাথবটিকে বিয়ে দিল,-তা’ দেখে আমরা অবাক হয়ে গেলাম। তার নাম জ্যাকব, তার নাম জ্যাকব, আমার পিলীব ছেলে ছিল সে। সে তার পরিচয় দিলে পর, আমি তাকে আমার বাবা লাবানের বাড়ী নিয়ে গেলাম। কুঁয়ােব ধাবে দেখা হবাব একঘণ্টা যেতে না যেতে, পরস্পরের জন্যে আমাদের মন-কেমন করতে লাগলাে। তাকে ভেবে ভেবে রাতে আমার ঘুম হত না,—বলতে আমার লজ্জা কি?—পিরীতের আগুন আমাদের বুকে জলে সেটা চিতার মতাে দাউ দাউ কবেই জলে। সে তত তােমার ইচ্ছায় , নইলে, এমন হয় কেন ? তােমার ইচ্ছায়ই মেয়ে পুরুষের আলিঙ্গনের জন্যে ‘আকুপাকু করে, জোয়ান ছেলে আর কুমারী মেয়ের মধ্যে মনের টান ধবে । যেন যাদু । এই সবের জন্যে, আমরা মনের আগুন নিবােবার চেষ্টা না করে, প্রথম দেখার দিনই জ্যাকব আর আমি বাগদত্ত হ'লাম। প্রভু, তুমি জাননা, আমার বাবা লাবানের মেজাজ ছিল কডা, যে পাথুবে জমি তিনি চাষ করতেন তাব মতে,তার জোতের বলদের শিং যেমন ছিল, তেমনি কডা। যখন জ্যাকব তঁাব কাছে আমাকে বিয়ে করার কথা পাডলাে, তব মনে হ'ল, দেখতে হবে, তাঁর ভাবী জামাই, তাঁর ভাগ্নেটা, তার নিজের দবেব লােক কি না, কডা খাটিয়ে কিনা, তার লােহার মতাে ধৈর্য আছে কিনা। লাবা-আমার বাবা- জানিয়েছিলেন, আমাকে বিয়ে করতে হলে সাত বছর খেটে শুল্ক দিতে হবে। আমার আঁত, কেঁপে উঠলাে, জ্যাকবের গাল দুটো ফ্যাকাশে হয়ে ব্যাচেলের ভৎসনা ৮৩ গেল, কেন না, আমরা দুজনেই তখন অল্পবয়সী, অধীর। সাত বচ্ছর যেন অনন্ত কাল বলে মনে হল। তােমার কাছে, প্রভু, সাত বছর তাে এক মুহূতের সামিল, চোখের পলক ফেলার মতাে, অনাদি অনন্তের কাছে সময় তাে কিছুই নয়। এটা তুমি ভুলাে না, প্রভু, আমাদের কাছে, মর মানুষের কাছে কিন্তু, সাত বছর হচ্ছে জীবনের এক দশমাংশ। আমাদের আয়ু অল্প, চোখ খুলে তােমার পবিত্র আলাে দেখতে না দেখতে আমাদের চোখ আবার মৃত্যুর অন্ধকাবে বন্ধ হয়ে যায়। বসন্তে বানের মতাে মানুষের জীবনস্রোত ছুটে চলে , যে ঢেউ যায়, তা আর ফেবে না। সাতটা দীর্ঘ বছর সাথী হয়েও এমন কবে দূরে থাকতে হবে। আমাদেব ঠোট যখন চুমু খাবার জন্যে মরে যাচ্ছে তখনাে এমন আলাদা হয়ে থাকতে হবে। তবু জ্যাকব তার মামাব ইচ্ছাই পালন কবলাে, আমি আমার বাবার আদেশ মেনে নিলাম। আমবা মনে মনে ঠিক করলাম সাত বছরই প্রতীক্ষা কবে, বাবার বাধ্য হয়ে চলবে, ধীর হয়ে থাকবাে ,আমরা যে সত্যিসত্যিই ভালােবাসতাম। তুমি কিন্তু, প্রভু, তােমার জীবদের পক্ষে ধৈর্য ধরা কঠিন করে রেখেছ , পীবিতেব জ্বালা দিয়েছে, জীবন একটু জীবন একটু বলে উদ্বেগ লেগেই থাকে। ঋতুব পবে ঋতু আসে জানি, বসন্ত তবু কদিনের জন্যে ? তাই তাে আমরা জীবনে যা আনন্দ পাওয়া যায় লুফে নিই, তাইতাে আমরা দু’দিনের আমােদ লুটে নিতে চাই। দিন দিন আমাদের বয়স বাড়ে, মনমরা না হয়ে অপেক্ষা আমরা করবাে কি করে বললা? সত্যিই তাে, আমরা পুড়ি, তােমার হুকুমে, আমাদেব কেবলই ক্ষয় হয়। মৃত্যু দিনরাত কুকুবের মতাে আমাদের পিছনে পিছনে ধাওয়া করছে ব'লে, তাড়াতাড়ি না-করে আমাদের উপায় কি? প্রতি দিনের প্রতীক্ষা আমাদের কাছে হাজাৰ বছর মনে হত, তবু আমবা প্রবৃত্তির রাশ ধরে দিন কাটালাম। শেষে, সাত বছর পূর্ণ হলে অতীতের কথা ভাবতে গিয়ে মনে হল যেন, এক দিনের বেশী নয় ।
৮৪ ভিদেশী এমনি ক'রে, প্রভু, আমি জ্যাকবের জন্যে প্রতীক্ষা কবেছিলাম। জ্যাকবও আমাকে এমনি ভাললােবালতা, প্রভু। “সাত বছর যখন পূর্ণ হয়ে গেল, আমি মনের আনন্দে বাবা লাবানের কাছে গিয়ে আমাদের বিয়ের তাঁবু তৈরী করতে বললাম। আমার বাবা লাবান কিন্তু আমার আনন্দ দেখেও উদাসীন রইলেন। তার কপালে মেঘ নামলাে, কিছুক্ষণের জন্যে তঁাব মুখে কথা বলে না। শেষে, কথা ফুটলে, আমায় হুকুম দিলেন, আমার দিদি লিয়াকে ডেকে দিতে। “তুমি জাননা প্রভু, লিয়া ছিল আমাব চেয়ে দু’বছৱেব বড , শ্ৰহীন ব'লে কেউ তাকে বিয়ে করতে চাইত না, আব সেজন্য তার মনে খুব দুঃখ ছিল। আমি কিন্তু তাকে খুব ভালােবাসতাম, তাব কষ্টের জন্যে, তার শান্ত স্বভাবের জন্যে। বাবা যখন আমায় লিয়াকে ডাকতে বললেন চট করে আমার খেয়াল হল, বাবা আমাকে আব জ্যাকবকে ঠকাবার মংলব এটেছেন। আমি তাই তাবুর কাছে লুকিয়ে থাকলাম, ওদের কি কথাবার্তা হয় শুনবাব জন্যে। আমার বাবা বললেন :-- ‘লিয়া, আমার ভাগ্নে জ্যাকব সাত বছব অনুগতভাবে খেটেছে, ব্যাচেলকে স্ত্রী বলে পাবার আশায। তােমার জন্যে কিন্তু, আমি তা হতে দেব না। বড় মেয়ে থাকতে ছােটব বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ তাে আমাদের দেশে নাই। আদিতে সর্বশক্তিমান্ আদেশ দিয়েছিলেন, ফলবন্ত হ'তে, সংখ্যায় বাড়তে, যাতে তার জগৎ আমবা মানুষ দিয়ে ভরে দিতে পাবি-যাতে তার স্তুতি করবার জন্যে আমরা অনেকের জন্ম দিতে পাবি। তিনি চাননি, কোনাে জমি অনাবাদী পড়ে থাকে কি কোনাে মেয়ে-ছেলে মা না হয়, এমন কোনাে ভেডী অথবা এমন কোনাে গাই তুমি আমার গােষ্ঠে পাবে না, যার সন্তান হয় না। আমার বড় মেয়ের গর্ভ বন্ধই থেকে যাবে, এমনটা আমি কেমন করে হতে দিতে পারি ? লিয়া, তুমি তৈরী হও, কনে- র্যাচেলের ভৎসনা ৮৫ -বউএর ঘােমটা পড়ে গে, জ্যাকব না জেনেই র্যাচেলের বদলে তােমাকে বিয়ে করবে। আমার বাবা লিয়াকে এই কথাগুলাে বললেন। লিয়া ভয়ে ভয়ে চুপ করে শুনলাে। “আডি পেতে এ-সব শুনতে শুনতে, বাবা লাবান আর দিদি লিয়ার ওপর আমার ভয়ানক রাগ হ’ল। সন্তানের কি বােনের এমন হওয়া ঠিক নয়, প্রভু, তার জন্যে তুমি আমায় ক্ষমা কবাে। কিন্তু একবার ভেবে দেখাে জ্যাকব আর আমি কেমন ক'রে সাত বছর ধবে একজন আর-জনেব প্রতীক্ষা করেছি, আর এখন, এই সাত বছর খাটুনীর পর, জ্যাকবকে ঠকিয়ে তার ঘাডে আমার দিদিকে চাপিয়ে দেওয়া হবে। জ্যাকবের জীবন যে নিজের জীবনের চেয়েও আমার প্রিয় , আমি বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলাম, জেরুজালেমে তােমার সন্তানরা যেমন বিদ্রোহ করেছে তােমার বিরুদ্ধে, তেমনি ,তুমি যে, প্রভু, আমাদিকে এমনিই কবে তৈরী করেছ যে, আমাদের উপর কোনও অবিচার করা হয়েছে মনে হলেই আমরা একয়ে হয়ে পডি। আমি লুকিয়ে গিয়ে জ্যাকবকে বাবাব চক্রান্তের কথা বললাম। বাবার মতলব ব্যর্থ করার জন্যে, কি চিহ্ন দিয়ে সে আমাকে চিনতে পারবে, তা বলে দিলাম, বললাম, “বিয়ের পর, তাবুতে ঢুকবার আগে কাল তােমার কপালে তিনবার চুমু দেব।' জ্যাকব বুঝে নিল। ইসারাটা তার মনেও ধরলাে। বিকেল বেলা বাবা লাবান্ লিয়াকে কনে-বউএর ঘােমটা পরালেন। তার মুখখানিকে নিপুণভাবে সাজিয়ে দিলেন, যাতে জ্যাকব তার সঙ্গে সঙ্গম করার আগে তাকে চিনে না ফেলে। আমাকে তিনি গােলাঘরে বন্ধ করে রাখলেন। তাঁর ভয় ছিল, পাছে চাকরদের কেউ ব্যাপারটা সম্বন্ধে আমায় সাবধান করে যায়। অন্ধকারে আমি প্যাচার মতাে বসে থাকলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গিয়ে সন্ধ্যা পড়লাে। রাগে দুঃখে আমি মাথা খুড়তে লাগলাম।
ভিদেশী জ্যাকব তার সঙ্গে শােবে ব'লে কিন্তু আমি আমার দিদির উপর রাগ করিনি, প্রভু, আমি চটেছিলাম, সে যার জন্যে সাত বচ্ছর ধরে ক্রীতদাসের মতাে খাটল, তা হতে আমার প্রিয়তমাকে বঞ্চিত করার জন্যে। করতাল বেজে উঠলে আমি আমার হাত কামড়ে ধবলাম। সি যেমন তার শিকার নিযে হেঁছেড়ি করে, আমার হৃদয়বৃত্তিগুলাে তেমনি করে আমার বুকটাকে ছিডে খেতে লাগলাে। “এমনিভাবে বন্দী থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটতে লাগলে', তিক্ততায় বুক ভরে উঠেছিল। তারপর আমার বুকের অন্ধকারের মতােই বাইরের অন্ধকার যখন দুর্ভেদ্য হ’ল, তখন হঠাৎ ঘবেব আগল সবে গেল, আস্তে আস্তে দবজায় ফাক হ’ললিয়া এলে ঘরে ঢুকলাে। বিয়েতে বসবাব আগে লিয়া চুবি করে আমার সঙ্গে দেখা কবতে এসেছে। আমি তাব পায়ের শব্দ চিল্লাম, কিন্তু তার দিকে ফিরে তাকালাম না। তার উপর আমার বৈরীভাব হয়েছিল, তার উপর আমাব মন কঠিন হয়ে গিয়েছিল। লিয়া আমার চুলের মধ্যে হাত বুলােতে লাগলাে, আমি মুখ তুলে তার দিকে যখন চাইলাম, দেখলাম, তার মুখে একটা বিষাদের ছায়া। প্রভু, আমি খােলামনেই তােমার কাছে স্বীকার করছি,—ওর অসােয়াস্তি দেখে আমার মন বিদ্বেষবশে যেন খুশী হয়ে উঠলাে। লিয়াও যে বিয়ের দিনে কষ্ট পাচ্ছে, তা দেখে, আমার একটু সান্ত্বনা হ'ল। লিয়া কিন্তু—বড গােবেচারী ভাল মানুষ সে-আমার মনেব ভাব টেব পেল না। আমরা কি একই মায়ের স্তন পান করিনি ? চিরকাল একজন আর একজনকে ভালােবাসিনি ? বিশ্বাস করে সে আমার গলা জড়িয়ে ধরে শুনাে মুখে বলে গেল :- ‘ব্যাচেল, এসবের ফল কি হবে, ভাই। বাবার মংলবে আমার বড় দুখ হচ্ছে। বাবা তাের ভালােবাসার লােককে তাের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে আমাকে আমাকে দিচ্ছেন, তাকে এমন করে ঠকানাের কথা ভাবতেই ব্যাচেলের ভৎসনা ৮৭ দুঃখ হয়। তাের জায়গায় আমি কোন্ সাহসে বিয়ে যাবো? আমার পা যেন নড়তে চাইছে না, আমার মন ভয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, সে নিশ্চয়ই এই প্রবঞ্চনা ধরে ফেলবে। তারপর সে যদি আমায় তাঁবু থেকে তাড়িয়ে দেয়, কি লজ্জাটাই পাবাে। দুপুরুষ ধরে ছেলেরা আমাকে ঠাট্টা করবে, বলবে : ঐ লিয়া যাচ্ছে। কুচ্ছিৎ লিয়া। কাহিনী জানাে ? একজনের ঘাডে ওকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার অজান্তিতে , স্বামী জানতে পেরে ওকে নেয়নি, লােমওঠা খেকী কুকুরকে যেমন তাড়ায়, তেমনি করে ‘ছেই ছেই কবে তাড়িয়ে দিয়েছিল র্যাচেল, ভাই, আমি কি করবাে ? সাহস করে এগুবাে, না, বাবার আদেশ অমান্য করবাে, বাবা কি বকম কড়া লােক জানিস তাে? জ্যাকব যাতে আমাকে খুব শীঘ্রি চিতে না পারে, তার জন্যে আমি কি করবাে—যাতে আমার মাথা লজ্জায় না কাটা যায়, তার জন্যে কি করবাে ভাই ? আমার কি দোষ ? করুণাময় ভগবানের দোহাই, আমায় সাহায্য কর বােন, আমাকে সাহায্য কর।” “প্রভু, আমার তখনও বাগ খুব প্রবল , দিদিকে যতােই ভালােবাসি না কেন, আমার মনের পাপ তার উদ্বেগকে আমার কাছে মধুব কবে তুলেছিল। তবু, সে যখন ভােব পবিত্র নামে, তােমার পবিত্রতম নাম উচ্চারণ করে, তােমার করুণাময়’ নাম নিয়ে আমায় কাকুতি মিনতি করল, তখন তােমার করুণার মহিমা, তােমার মঙ্গলময়তাব, তােমার নামের শক্তি আমার শিরায় শিরায় সুরার মততা সঞ্চারিত হয়ে গেল, আমার অন্ধকার আত্মায় উজ্জ্বল দীপ্তিতে প্রবেশ করলাে। এযে তােমার চিরন্তন ইন্দ্রজাল প্রভু, যে-মুহুতে আমরা প্রতিবেশীর বেদনায় সহানুভূতি বােধ করি, তার উৎপীড়িত বক্ষের যন্ত্রণার অংশ গ্রহণ করি, সেই মুহূর্তে যে-বাধার প্রাচীর একজনকে আর একজন হতে বিচ্ছিন্ন করে রাখে ৮৮ ভিনদেশী তা চূর্ণ হয়ে যায়। তাই, নিজের দুঃখেৰ কথা ভুলে গিয়ে, আমি লিয়ার কাতরতায় কাবু হয়ে পড়লাম। আজ যেমন আমি সজলচোখে তােমার সুমুখে এসে দাঁড়িয়েছি, তেমনি করে সে যখন আমার কাছে এসে কেঁদে পডল, আমি, তােমার মূখ সেবিকা হয়ে—একথাটা তুমি বিশেষ করে খেয়াল করাে, দোহাই তােমার,-আমি তাকে করুণা করলাম। আজ আমি যেমন তােমার করুণা ভিক্ষা কবছি, সে তেমনি করে আমার অনুগ্রহ চেয়েছিল বলে আমি তাকে দয়া করলাম। জ্যাকবকে কেমন ক'বে। ঠকানাে যাবে, নিজেকে উপেক্ষা করে তাকে বলে দিলাম , জ্যাকবকে যে চিহ্ন দেখে চিনে নিতে বলেছিলাম, তা আমি তার কাছে ফাস করে দিলাম, বললাম, “তাবুতে ঢুকবার আগে তার কপালে তিনবার চুমু খেও। হে করুণাময়, তােমার প্রেমের খাতিবে, আমার অন্তরের বিদ্বেষকে আমি জয় করেছিলাম , যে মানুষকে আমি ভালেবাসতাম তারও বিশ্বাস ভেঙ্গে ছিলাম। “গােপন কথাটা লিয়াকে যখন বললাম, সে আর থাকতে পারল না, আমার হাত নিয়ে খেলা কবতে করতে আমার বাঞ্চলে চুমু দিতে দিতে সে আমায় প্রণাম করলাে। তােমার জীবদের তুমি এমনি করে গডেছ যে, কারও মধ্যে তােমার মহত্বেব চিহুমাত্র পেলে তাদের চিত্ত কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। আমরা একজন আর-জনকে জড়িয়ে ধবলাম, চোখে জলে আমাদের গাল ভিজে গেল। সানা পেয়ে লিয়া যাবার জন্যে উঠে দাড়ালাে। যখন উঠলাে, আবার তার মুখ বিষাদে ছেয়ে গেল, আবার তার ঠোট দুটো শাদা হয়ে গেল। “সে বললাে, তাের ভালােবাসার জন্যে তােকে আর কি বলবাে ভাই। তুই যা বললি, তাই করব। কিন্তু ওর যদি ঐ ইঙ্গিতটুকুতেই বিশ্বাস না হয়। র্যাচেল, আমার আরও পরামর্শ চায় যে। তাের নাম ধরে আমায় ডাকলে, আমি কি করবাে। বর কনের কাছে কথা বললে কনে হয়ে আমি সাষ্টাঙ্গ হয়ে ব্যাচেলের ভৎসনা একদম মুখ বন্ধ ক'বে থাকবাে? আমি মুখ খুললেই সে-যে বুঝতে পারবে, সে শুয়ে আছে লিয়ার সঙ্গে, র্যাচেলের সঙ্গে নয়। আমি তাে তাের গলায় ওর সঙ্গে কথা বলতে পারবাে না। আমায় আরও একটু সাহায্য কর, ভাই , তােব বুদ্ধি আছে, করুণাময়েব দোহাই, আমায় উদ্ধার কর। “প্রভু, আবার সে তােমার পবিত্রতম নাম উচ্চারণ করে আমার কাছে আবেদন করল, আবার সেই মতাময় অগ্নিপ্রবাহ আমার মধ্যে সঞ্চারিত হ'ল, আমার হৃদয় গলে গেল, নির্মম হয়ে নিজের কামনাকে পায়ে মাড়ালাম, আমি একেবাবে চরম উৎসর্গের জন্যে প্রস্তুত হলাম। আমি উত্ত, দিলাম । ‘তার জন্যে ভেবো না। একটা উপায় করা যেতে পারে। সর্বকরুণাময়ের খাতিরে, তােমাকে র্যাচেল মনে করে জ্যাকব যতক্ষণ তােমার সঙ্গে শােয়া শেষ না কবে ততক্ষণ সে যাতে তােমাকে চিনতে পারে, তার ব্যবস্থা আমি কবছি। আমার মৎলব হচ্ছে এই আমি চুপি চুপি জ্যাকবের তাবুতে ঢুকে বরকনের খাটের পাশে অন্ধকারে গুডি মেরে লুকিয়ে থাকবাে। সে কোনাে কথা জিজ্ঞাসা করলে, আমি তার জবাব দেবােখন, তাহলে তার আর কোনও সন্দেহ হবে না, ও তােমাকে আলিঙ্গন করবে, তােমার মধ্যে তার বীজ ঢেলে তােমাব দেহেব ফুল ফোটাবে। আমি করবাে, ছেলেবেলা হতে আমরা পৰস্পরকে যে ভালবাসা দিয়ে এসেছি তার খাতিরে, আর সর্বকরুণাময়েব প্রেমের খাতিরে। এই তার পবিত্রতম নাম নিলাম, তিনি যেন আমার সন্তানসন্ততির পরে অনুগ্রহ রাখেন। “প্রভু, তারপর, লিয়া আমায় জড়িয়ে ধরে মুখচুম্বন করলাে। জানু পেতে বসেছিল, যখন উঠলাে, তখন সে যেন অন্য মেয়ে হয়ে গিয়েছে। দুশ্চিন্তা হতে মুক্ত হয়ে, ঘােমটায় মুখ আবৃত করে সে জ্যাকবের কাছে ভিনদেশী নিজের দেহ অঞ্জলি দিতে গেল। আর আমি ? আমার প্রেমিক যে খাটের উপর দিদিকে ভােগ করবে সেই খাটের পাশে গিয়ে আমি লুকিয়ে থাকলাম,—আমি নিঃশেষে বিষপাত্র পান কবলাম। কিছুক্ষণ পরেই আবার করতাল বেজে উঠলো, সঙ্গীতকাররা নবদম্পতিকে এগিয়ে দিয়ে গেল। এক মিনিটের মধ্যেই নবদম্পতি তাঁবুর দরজায় এসে দাড়ালাে। বউকে আশীর্বাদ করবার জন্যে তার ঘােমটা ওঠাবার আগে জ্যাকব প্রতিশ্রুত ইসাবার প্রতীক্ষায় একটু থামলাে। লিয়া তিনবাব তাব কপালে চুমু খেল। ঠিকমতাে চিহ্ন পেয়ে জ্যাকব নিঃসংশয় হ’ল, আবেগভবে কনেকে জড়িয়ে তাকে বাহুতে তুলে নিয়ে যে-খাটের পাশে আমি গুড়ি মেরে বলেছিলাম, তাৰ উপব এনে শােয়ালাে। লিখ। আশঙ্কা করেছিল ঠিকই,—পূর্ণ আলিঙ্গন কববার আগে জ্যাকব জিজ্ঞেস করলে—“আমার বাহুবদ্ধা তুমি সত্যিই ব্যাচেল তত?” আমি ফিফিস্ ক’বে বললাম, (প্রভু, তুমি তাে জানাে, কথাগুলাে উচ্চারণ কবতে আমার বুক কি বকম ফেটে যাচ্ছিল ) :-‘হ, আমি। জ্যাকব, স্বামী আমাৰ। সাত বছর ধরে আমাকে পাবার জন্যে অপেক্ষা করেছিল যে, সে আমার গলা চিনতে পেবে আমার দিদি লিয়াকে তার মতাে ভবা জোয়ান মানুষ যেমন করে জড়িয়ে ধবতে পাবে তেমনি করে জড়িয়ে ধরলাে। প্রভু, কাস্তে যেমন করে ঘন কাটে, তােমার দৃষ্টিও তেমনি অন্ধকার ভেদ কবে চলে, তুমি নিশ্চয় আমার অবস্থা দেখেছিলে। আমার সমস্ত অঙ্গ যখন জ্যাকবের আলিঙ্গনকামনায় উন্মত্ত, আর আমার সঙ্গভােগ কবছে মনে করে জ্যাকব যখন লিয়াকে ভােগ করছিল তখন তাদের নাগালের মধ্যেই আমি গুডি মেরে পড়ে ছিলাম। প্রভু! তুমি তাে সর্বত্র থাক, সে বাত্রের কথা একবার স্মরণ করে দেখাে, দীর্ঘ সাত ঘণ্টা ধরে কি যন্ত্রণাই না সহ করেছিলাম পড়ে পড়ে। যে চরম-আনন্দ আমার প্রাপ্য ছিল, তা হতে র্যাচেলের ভৎসনা বঞ্চিত হ'য়ে তারই মণিত শুনছিলাম। সাত ঘণ্টা, সাত যুগ, শ্বাসরােধ করে আমি সেই খাটের পাশে শুয়েছিলাম। বুক ডুকরে কেঁদে উঠতে চাইছিল , জ্যাকব যেমন উত্তবকালে তােমার দেবদূতের সঙ্গে ভাের না হওয়া পর্যন্ত ধ্বস্তাধ্বস্তি কবেছিল, তেমনি ক'রে আমিও সেই বুকের কান্নাব সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি করেছিলাম। জ্যাকবের জন্যে সাত বচ্ছব প্রতীক্ষায় থেকে এই সাত ঘণ্টা যেন আরাে দীর্ঘ, আরাে অনেক দুঃসহ বােব হচ্ছিল। মনে মনে ভােব পবিত্র নাম জপ করতে না থাকলে, তােমাব অনন্ত ধৈর্য ধ্যান কবতে করতে সংকল্প দৃঢ় না হয়ে উঠলে, সেই পবম তিতিক্ষার রাত্রে আমার পক্ষে এতখানা সওয়া কখনই সম্ভব হত না। প্রভু, জীবনের তীর্থযাত্রায় প্রথম দিকের শুধু এই কাজটার জন্যেই আমার গর্ব। সেইদিন তিতিক্ষায় করুণায় আমার স্রষ্টাব সমকক্ষ উঠেছিলাম আমি। সেই যন্ত্রণা বালে, যে ভাব তুমি আমার উপর চাপিয়ে ছিলে, কোনাে মেয়ের উপব সে-ভাব তুমি কখনও চাপিয়েছ কি না সন্দেহ। আমি সহ্য করেছিলাম চবম। তারপর, মােরগ ডালে, নবদম্পতি যখন গাঢনিদ্রায় অভিভূত, আমি শান্তভাবে উঠে তাড়াতাড়ি বাড়ী পালিয়ে এসেছিলাম। শীঘ্রিই-যে প্রবঞ্চনা প্রকাশ হয়ে যাবে। জ্যাকবের ক্রোধের কথা ভেবে আমার দাত ঠক্ ঠক্ কবছিল। হায়রে । আমার ভাবনাই সত্য হল। বাবার বাড়ীতে নিরাপদে পৌছেছি, অমনি জ্যাকরের কুদ্ধ চীৎকার কানে এল, ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের মতাে বিকট গর্জনে প্রভাতের আকাশ বিদীর্ণ হতে লাগলো। একখানা কুড়ুল হাতে করে সে আমার বাবা লাবাকে খুঁজে ফিছিল। মত্ত জামাতাকে দেখে বাবা ভযে বিবশ হয়ে পড়েছিলেন। প্রভু, মাটীতে বসে পড়ে তােমার পবিত্র নাম জপ করছিলেন তিনি। প্রভু, তােমার কাছে বাবাকে আবেদন করতে শুনে, আমার পড়ন্ত সাহস আবার দৃঢ় হ’ল, আমার সঙ্কল্প স্থির হ'ল। বাবাকে ৯২ ভিনদেশী বাঁচাবার জন্যে, আমার প্রেমিকের সমস্ত রাগটা আমার উপর টেনে নেবার জন্যে, আমি লাবান ও জ্যাকবের মধ্যে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। জ্যাকবের মাথায় তখন খুন চড়েছে। আমি তাকে প্রবঞ্চনা করতে সহায়তা করেছি বলে, আমার উপর চোখ পড়া মাত্র সে আমার মুখে এক ঘুসি মারলাে, আমি পড়ে গেলাম। প্রভু, তুমি জাননা, তার দেওয়া শান্তি আমি খুশী মনেই গ্রহণ করেছিলাম। আমি বুঝতাম, আমায় খুব বেশী ভালােবাসে বলেই সে এত বেশী ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ও যদি সেদিন আমায় মেরেও ফেলতে, —আমায় মাববার জন্যে সে তাে কুড়ুল উঠিয়েছিল-তােমার সিংহাসনেব কাছে এলে নিশ্চয়ই তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযােগ আমি করতাম না। “তার পায়ের কাছে রক্তাক্ত-অবস্থায় আমায় পড়ে থাকতে দেখেই কিন্তু তার করুণা হ’ল। আমার উপর শুইয়ে পড়ে সে সস্নেহে আমার ঠোটেব বক্ত চুষে নিল। আমার খাতিরে সে আমার বাবা লাবনকে ক্ষমা কবলাে, লিয়াকে তার তাবু হতে তাড়িয়ে দিল না। এক সপ্তাহ পরে, বাবা আমাকে জ্যাকরের হাতে দিলেন, তার দ্বিতীয়া পত্নী ব’লে জ্যাকব আমাকে অন্তঃসত্বা করলো। আমি তার বহু সন্তান বাবণ করলাম, সন্তানদিকে আমি বুকের দুধ দিয়ে মানুষ করলাম, তাদের আমি তােমাব চুক্তির কথা শােনালাম , তাদের বলে দিলাম, দুদিনে তােমায় ডাতে, তােমার অপূর্ব নামেব রহস্যের উপর নির্ভর করতে। প্রভু, সর্বশক্তিমান তুমি, সর্বকারুণিক তুমি, আজ আমার নিজের পরমপ্রয়ােজনের দিনে তােমায় মিনতি করছি, জ্যাকব সেদিন যা করেছিল তুমি তাই করাে। তুমি তুমি ব্যাচেলের সন্তানসন্ততির উপর করুণা করতে পারবে না? আমি যেমন ধৈর্য ধরেছিলাম, তুমি তেমনি ধৈর্য ধরতে পারবে না? আমাদের পবিত্র পুরীকে রেহাই দিতে পারবে না? প্রভু, ওদের করুণা করাে, জেরুজালেমের উপর কৃপাদৃষ্টি দাও।” স্বর্গের ছাদ বেয়ে র্যাচেলের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়ে গেল। তার জোর র্যাচেলের ভৎসনা শেষ হয়ে গিয়েছিল, অবসন্ন হয়ে সে জাহর উপর বসে পড়লাে, তার কম্পমান দেহ ঘিরে কালাে বন্যার মতাে চুলগুলাে এলিয়ে পড়লাে। র্যাচেল ভগবানের জবাবের প্রতীক্ষায় রইলাে। ভগবান উত্তর দিলেন না। তিনি স্তব্ধ হয়ে থাকলেন। স্বর্গে, মতে, স্বৰ্গমর্তের মধ্যেকার যত ঘূর্ণমান্ লােকে, ভগবানের স্তব্ধতার মতাে এমন ভীষণ জিনিষ আর কিছুই নাই। ভগবান স্তব্ধ থাকলে সময়ের গতি থেমে যায়, আলােক অন্ধকারে মগ্ন হয়, দিন রাত্রে ডুবে যায় , সমগ্র বিশ্ব ব্যেপে সৃষ্টি পূর্বেকার বিশৃঙ্খলা নেমে আসে। জঙ্গমেব গতি থাকে না, নদীর প্রবাহ নিশ্চল হয়, ফুল ফোটে না, এমন কি, ভগবানের আদেশ ব্যতিরেকে সাগবে জোয়ার ভাটাও হয় না। কোনাে মবজীবের কান ভগবানের এ স্তব্ধতা সহ করতে পারে না। কোনাে মরজীবের হৃৎপিণ্ড এই ভয়াবহ শূন্যতায় স্পন্দিত হয় না। সে শূন্যে কিছুই থাকেনা, শুধু ভগবান ছাড়া প্রাণের প্রাণ হয়ে ভগবান নিজেও যেন এমনভাবে স্তব্ধ থাকবার সময় সজীব থাকেন না। তাব বিশেষ প্রয়ােজনের সময়ে ভগবানের এই অন্তহীন স্তব্ধতা, তাব যতাে ধৈর্যই থাক্র্যাচেল আর সইতে পারলাে না। আবার সে অলক্ষ্যে দিকে চোখ তুললাে, আবার তার মাতৃহন্ত উপরে উঠলাে, বাগে তার মুখ হতে অগ্নিগর্ভ বাক্যধারা দুর্দমনীয় বেগে নির্গত হতে লাগল :- “সর্বত্র বিদ্যমান তুমি, আমার কথাগুলাে তুমি কি তবে শুনতে পাওনি ? সর্বজ্ঞ তুমি, আমার কথা কি তুমি বুঝতে পারে নি ? তােমার দাসীকে কি আরও সহজ করে বুঝিয়ে বলতে হবে। তাহলে শােনন, কানে একটু খাটো হচ্ছাে তুমি! জ্যাকব আমার প্রাপ্য আমার দিদিকে দেওয়ায় আমার হিংসা হয়েছিল, যেমন আমার সন্তানরা তােমার প্রাপ্য বলি তুমি ছাড়া অন্য ভগবানকে দেওয়াতে তােমার হিংসা হয়েছে। কিন্তু আমি দুর্বল মেয়ে- মানুষ হয়েও তােমার খাতিরে আমার হিংসাকে জয় করেছিলাম। আমি ভিদেশী লিয়াকে দয়া করেছিলাম, তাই জ্যাকব আমার উপর দয়া করেছিল। সর্বশক্তিমান। এটা খেয়াল কবে দেখাে, আমরা সাধারণ জীব হয়েও হিংসাব কুপ্রবৃত্তি দমন কবেছিলাম। আব তুমি? সর্বশক্তিমান তুমি, বিশ্বস্রষ্টা তুমি, বিশ্বের আদি ও অন্ত তুমি , আমবা বিন্দুর অধিকারী হলে, সমুদ্রেব অধিকাবী তুমি,তবুও তুমি দয়া দেখাতে পাবছ না? আমি ভাল করেই জানি আমার সন্তানরা বড় একগুয়ে, তারা বিদ্রোহ কবেছে। কিন্তু তুমি ভগবান, প্রাচুর্যেব স্বামী তুমি, তােব তিতিক্ষা কেন তাদেব একগুয়েমিব ববাবর যাবে না ? তােমাৰ ক্ষমা কেন তাদের অবাধ্যতাব সঙ্গে তালরেখে চলবে না? এমনতাে হওয়া উচিত নয়, ভগবান, এমনত একেবারেই হওয়া উচিত নয় যে, তােমাব দেবদূতদেব সামনে তােমার মাথা হেঁট হবে , তাবা যে বলবে ‘এককালে একজন মেয়ে—একটা দুর্বল মরজীব—ছিল। নাম তার র্যাচেল। সে তার ক্রোধ দমন কবেছিল। কিন্তু সর্বশক্তিমান ভগবান বিশ্বজগতের প্রভু হ'য়েও তার ক্রোব সামলাতে পাবেননি। না ভগবান, এ কখনও হওয়া ঠিক নয়। তােমাব বরুণা যদি অসীম না হয়, তাহলে তুমিও তাে অসীম নও, তার মানে, তুমি ভগবান নও। আমার চোখের জল দিয়ে যে ভগবানেব মৃতি আমি কল্পনা করেছিলাম, সে ভগবান তুমি নও। আমার দিদির চোখের জলের মধ্য দিয়ে যার কণ্ঠ আমি শুনেছিলাম, তুমি তাে সে ভগবান নও। তুমি নিজেই তাে ‘অদ্ভুত ভগবান। রাগ, শান্তি, প্রতিহিংসার দেবতা তুমি , আমি, ব্যাচেল, প্রেমের ভগবানকে ভালােবেসে এসেছি, কারুণিক ভগবানকে সেবা করে এসেছি , তােমার দেব- দূতদের সামনে তােমায় আমি আজ বর্জন কবলাম। তারা, তােমার পয়গম্বররা, ভােমার কাছে মাথা নােয়াতে পারে। আমি, ব্যাচেল, মা হয়ে তােমার কাছে নত হতে পারবাে না। আমি খাড়া হয়ে এই তােমাকে তুচ্ছ করলাম। আমার সন্তানদের উপর তােমার ইচ্ছা খাটানাের আগে, ভগবান, আমি র্যাচেলের ভৎসনা তােমারই বিরুদ্ধে অভিযােগ করছি। 'তােমার কথার সঙ্গে তােমার প্রকৃতির গরমিল রয়েছে। তােমার হৃদয়ের সঙ্গে তােমার ক্রুদ্ধ বাক্যের কোনও সঙ্গতি নাই। ভগবান, তােমার নিজের আর তােমার বাণীব মধ্যে পার্থক্য বিচাব করে। তুমি নিজেকে যেমনভাবে জাহির করছে, সত্যিই যদি তুমি তেমনি রাগী আব হিংসুটে ভগবান হও, আমি অন্ধকাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার সন্তানদেব কাছে গিয়ে দাড়াবাে, তাদের দুর্ভাগ্যের অংশ নেব। বাগী ভগবানের রূপ ধ্যান করবার ইচ্ছা আমাব নাই। হিংসুটে ভগবানের কথা ভাবতে আমার ঘৃণা বােধ হয়। যার শিক্ষায় আমি চলতে চেষ্টা কবেছি, আমি যে ভগবানকে ভালােবাসি, তুমি যদি সেই করুণাব ভগবান হও ত হলে সেই রূপেই আত্মপ্রকাশ করাে , নরম হও, আমার সন্তানদিকে রেহাই দাও, জেরুজালেমেব উপব কৃপাদৃষ্টি দাও।” এই বিদ্রোহের বাণী উচ্চারণ করবার পর, র্যাচেলেব আর একটুও শক্তি ছিল না। মৃতেব মতাে নিমীলিতনয়নে সে পবমেশ্বরের উত্তরের প্রতীক্ষায় পড়ে বইলাে। পিতৃপুরুষদের, পয়গম্ববদের মনে সন্দেহ ছিল না, ভগবানকে যে পাপাত্মা গালাগালি কবেছে তাকে বজ্রাঘাতে দগ্ধ হতে হবে। ভয়ে ভয়ে তাঁরা সবে দাড়ালেন। ভীরু চোখে তার সিংহাসনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। লক্ষণ বােঝা গেল না। ভগবানের রুদ্রমূর্তি দেখে ভয় পেয়ে দেবদূতবা তাদের ডানার নীচে মাথা গুজলেন। তারপর, উকি মেবে যে-মেয়েটা ভগবানের সর্বশক্তিমত্তা অস্বীকার করেছে, তার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে দেখলেন, তাদের মনে হল, ব্যাচেলৰ কপালে যেন একটা জ্যোতি জ্বলছে। জ্যোতিটা যেন তার ভিতর থেকে বেরুচ্ছে, তার গালের উপর অশ্রুবিন্দুগুলাে উষার আভায় শিশির যেমন দেখায় তেমনি রক্তিম হয়ে ঝলমল করছে। এ কি ঘটছে? বুঝ দেবদূতরতে ভিদেশী পারলেন। তারা বুঝলেন, ভগবান এই বিদ্রোহিণীকে ভালোবাসেন, তার বেয়াপনা আর অধীরতার জন্যেই, মুনিদের পয়গম্বরদের তিনি যেমন ভালােবাসেন, যে-সব ধামিক অতি দীনতার সঙ্গে তার কথা মেনে নেয় তাদিকে যেমন ভালােবাসেন একে তার চেয়ে অনেক বেশী ভালােবাসেন। ভয় দমন করে দেবদূতব। ভবসা করে চোখ তুলে চাইলেন, দেখলেন, ভগবানের বিরাট সভা ব্যেপে একটা অপূর্ব জ্যোতির্ময় প্রশান্তি ফুটে উঠছে, তাব স্মিত হাস্যেব সান্ত্বনাময় নীলিমায় আবার স্বর্গের অসীম শূন্যতা ভরে উঠছে। তা দেখে, শ্রেষ্ঠ দেবদূতরা আবার আনন্দে ডানা ঝাপটা দিলেন, তাঁদের ডানাব মৃদু ধ্বনিতে আকাশে সঙ্গীত সৃষ্ট হ’ল। ভগবানের মুখের ঔজ্জ্বল্য এত প্রখর হ'ল যে তার তীব্রতায় আকাশ জ্বলতে লাগলাে। কোনাে মর-জীবের চোখে নে তীব্রতা সহ্য হয় না। দেবদূতবা এক সঙ্গে গান গেয়ে উঠলেন, কবর হতে যাব উঠে এসেছিল সেই মৃত্মবা স্তুতিতে যােগ দিল, আব এই মিলিত সঙ্গীতের সঙ্গে এসে মিললাে, সর্বশক্তিমান এখনও যাদিকে পৃথিবীতে বাঁচবাব জন্যে ডাক দেন নি, তাদেব কলকণ্ঠ। কিন্তু যাবা নীচে বাস কবে,—পৃথিবীব মরজীববা,-তাবা এসব ঘটনার সম্বন্ধে উদাসীন বইলাে , মাথার উপব কি হচ্ছে, তা তাবা কিছুই জানলাে না। কালাে কাফন গায়ে বা অন্ধকারে বিষন্ন হয়ে মুখ নীচু করেই পড়ে বইলাে, তারপর একজন একজন ক’বে তারা টের পেল, ফাগুন হাওয়ার মর্মরের মতাে একটা অস্ফুট ধ্বনি কোথা থেকে ভেসে আসছ। উপরের দিকে চেয়ে তারা অবাক হয়ে গেল । ঘন মেঘরাশি বিচ্ছিন্ন হয়েছে, মেঘের ফাকে ফাকে এদিক হতে ওদিক পর্যন্ত একটা অদ্ধবৃওলাতরঙা রামধনু। মা ব্যাচেলের চোখের জলের ওপর ভগবানের মুখমণ্ডলের আলাে পড়ে এই রামধনুর জন্ম। * * অট্রিয়ান গল্প লেখক–স্টেফান ইগ, ।
-মানুষ বুঝি ব্যবহারে রাতেব পাহারাও’লার মেজাজ তিরিক্ষি দেখাচ্ছিল। এমনিই সে ঢিমে, সেদিন সে আবাে ঢিমে হয়ে গিয়েছিল। বসতে গিয়ে, টবের বাক্সটাও তার কাছে কেমন-যেন বেয়াড়া বােধ হ’ল। মুখে তার গভীর বিষাদ , চোখে কিন্তু একটা অন্তর্জালা ফুটে বেবােচ্ছিল। হঠাৎ মুখ ফেটে অগ্ন্যুৎগার সুরু হ’ল“থিয়েটারী। এ-সব থিয়েটারী আমার সহ হয় না। কোনােদিন না। জীবনে দু-একবার থিমেটারে যে যাই নি, তা নয়। তা গিয়েছি , শুধু মনে হয়েছে, চেষ্টা করলে যে কেউ ওসব করতে পারে। ছেলেখেলা।—ফে ছেলেখেলা। সাজগােজ কবে আরকেউ হওয়াব ভাণ। একটু তামাক কেটে নিয়ে বাঁ গালে ফেলে সে ব'সে ব'সে চিবােতে লাগলো। তার জ্যোতিহীন চোখদুটো তখন নদীর ওপারেব ঘাটের ওপর নিবদ্ধ। মাঝ-নদীতে একজন বাতিও’লা অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গী করে তার নজর টানার চেষ্টায় নৌকা থেকে যে ডিগবাজি খেয়ে পড়তে বসেছে, সেদিকে সে খেয়াল করলাে না। বহুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলতে লাগলাে, “আগেই আমার বােঝা উচিত ছিল। হন্তদন্ত হয়ে পরােপকার করতে না গিয়ে মাথাটা একটু যদি খেলাতাম, আমিও ঠিক থাকতাম, ‘লিজী এ্যাও আনি' জাহাজের ঐ বদর-মুখখা ১৮ ভিনদেশী অপদার্থগুলাে—ওরা আবার নিজেদের জাহাজী বলে জাহির করে --ও-দিকেও খি-খি করে হাসবার জন্যে আব-কিছু দেখতে হ’ত। আধ ক্রোশ ধরে যতত পানশালায় রটিয়ে বেড়িয়েছে , কাল রাতে ‘টাউন অব মাগেটে ঢুকেছি এক পেয়ালা টেনে নিতে, দেখি, তিন ছেড়া বেড়ার ওপর উঠেছে আমাকে দেখবার জন্যে। লিজী এ্যাণ্ড আনির মেট, ঐ টেড, সইয়ার হেঁকে নিয়ে এ-সবের সূত্রপাত। ওটা আবাব মেট, । ভগ্নীপতি ক্যাপ্টেন না থাকলে ও মেট হত, না ঢেকি হ'ত। এটা-সেটা নিয়ে বার তিন আমার সঙ্গে হয় ওব বচসা। শেষের বার যা বলে গাল দিয়েছিলাম। এখন দেখছি, সেটা একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল। ও কি কেউ ভােলে? ওটার মতাে বাঁদরের তাে কথাই নাই। এ হ’ল গতবারের আগেবার, ওরা যখন আসে, তখনকার কথা। গত সপ্তাহে ওরা যখন ৷ ঘাটে লাগলাে, দেখলাম, কথাটা বাছাধন ভােলে নি। প্রথমটা ও ভাণ করেছিল, যেন আমাকে দেখতে পায়নি , তারপর যখন জানিয়ে দিলাম, ফের আমার পিছনে লাগলে ওব কি হালটা করবাে, ওটা বললাে “ আরে আমার আলুর বস্তা, কাব ফেলে-দেওয়া এক জোড়া ঠ্যাঙে চড়ে হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন। ছেডাব মুখটা বড বিশ্রী , ধারালাে নয়, বিএ। তারপর ওর দিকে আমি নজর দিই নি। এতেই ওর রাগ গেল বেড়ে। আমার যা করবার, তাতে অবিশ্যি আমি অবহেলা করিনি। রাত্তির বারটা বাজতে পাঁচ মিনিট থেকে সাড়ে বারটা পর্যন্ত ঘণ্টা বাজিয়ে, তবে সে আমার সাড়া পায়। রাতের পাহারাও’লা অনেকেই বদলা নিতে অমন একটু ঘুমিয়ে পড়ে। গেট খুলে দেওয়ার পর আধঘণ্টাটেক বকাবকি চললাে। বকলল। বকুনিতে একটু শান্তি এসেছে, দেখলে, আমি কেবল একটু “ইস মানুষ বুঝি ব্যবহারে করে দম দিচ্ছি। শেষে আমার চাল বুঝে ফেলে ও ওদের জাহাজে চলে গেল , যাবার সময় ঘুলি উচিয়ে জানিয়ে গেল, দেখে নেবে। পরের দিন সন্ধ্যেবেলা কাজে এসেই, গেটের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, যখন ও বাইরে যাবে একটু মুচকি হাসি ওর সঙ্গে দেব। ঠিক মত হাসতে পারলে, ওর বাড়া আর মার নাই। প্রভুর কিন্তু দর্শন মিললল না। ভুলে এক গাভােয়ানের ওপর মুচকি হাসির মক্স করে ভেতরে যেতে হ’ল। যখন গেটে ফিরলাম তখন ও চলে গিয়েছে। শিকার ফস্কেছে। বাইরে এসে গেট-পােষ্টে পিঠ রেখে পাইপটা ধরাতে যাচ্ছি, দেখি, একটা ছেলে ব্যাগ হাতে সেদিকে আসছে। সুশ্রী চেহারা, বছর পনরাে বয়স, পবনে সার্জের সুট। ছােকরা সরাসবি আমার কাছে এসে হাতের ব্যাগটা নামিয়ে সলজ্জ গােছের একটা হাসি হেসে আমার মুখের দিকে চেয়ে বললাে, “নমস্কার, ক্যাপ্টেন সায়েব। আমাকে ক্যাপ্টেন বলে ভুল করেছে অনেকে। ও প্রথম নয়, এর চেয়ে বেশী বয়সের লােকও। আমি বললাম, নমস্কার। ছােকরা একটু কঁপা গলায় বললাে, আপনার কেবিন-বয় চাই? বললাম, কেবিন-বয় ? না, আমার দরকার নাই। ছােকরা তখন বললাে, বাড়ী থেকে পালিয়ে এসেছি, জাহাজে ঘুরবাে বলে। হয়তাে কেউ পিছন নিয়েছে। ভেতরে যাবাে? মানা করবার আগেই ও ব্যাগশুদ্ধ গেটের ভেতরে ঢুকলাে, আমার বলার অপেক্ষা না করে সিধে অফিসে ঢুকে বুকে হাত চেপে হাঁপাতে লাগলাে। বললে, আপনার মুখ দেখেই বুঝেছি, আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি। জিজ্ঞেস করলাম, বাড়ী থেকে পালিয়েছ কেন, বলাে দিকি। বাড়ীতে দুর্ব্যবহার করে বুঝি?
जिनकी ছোরা হাসলাে, দুর্ব্যবহার করবে আমার সঙ্গে। বাবা হয়তাে এতক্ষণে পাগলের মতাে ছােটাছুটি করছে, হয়তাে পুরস্কার ঘােৰণাও করেছে। হাজার হাজার টাকার জন্যেও বাবা আমাকে কাছছাড়া কবে না। অমনি আমার কান খাড়া হয়ে উঠলাে, তা মানছি। সবাই হ'ত। তা ছাড়া, ছেলেটাকে বাপের কাছে নিয়ে যাওয়া একটা সৎকাজও তাে। একটু ভেবে নিলাম, কেমন করে তা করি। ডেস্কের পিছনে মেঝের ওপর খান তিন চার লেজার বই ফেলে বললাম, ‘বসস, ব্যাপারটা তলিয়ে দেখা যাক। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে বাগ মানাতে পারলাম না। ওর মাথায় তখন প্রবাল দ্বীপ, বােম্বেটে, আর বিদেশী বন্দর বাসা বেঁধেছে। সারা পৃথিবী দেখবে, পৃথিবী আর উডুকু মাছ। ছােকরা বলছিল, “ফুলে ফুলে-ওঠা নীলজলের ঢেউ—এই আমার চাই। উচু ঢেউ-এর মজাটা কি বম, তাকে বােঝাতে গেলাম। কে শােনে ? লেজারগুলাের ওপর বসে আমার দিকে চেয়ে ও কাঠের মূর্তির মতাে মাপা নাড়তে লাগলাে। ঝডে কত জাহাজ ডুবে যায়, বলতে গিয়ে দেখি, উত্তেজনায় ও ঠোট কামভায় , আনন্দে ওর চোখদুটো জ্বলে ওঠে। বুঝলাম, বােঝনাের কম নয় , হাল ছাড়ার ভাণ করলাম। বললাম,,দেখাে, আমার এক বন্ধুর জাহাজে তােমার জায়গা করে দিতে পারি, তবে তােমার বাপ-বেচারার মনের বােঝাটাও নামানাে দরকার। তােমার কি হ’ল সেখটা তাকে জানিয়ে দেবাে, কেমন? ছােকরা চট করে জবাব দিল, “আমাদের জাহাজ ছাড়ার আগে নয়। বললাম, তা আর বলতে। দাও তােমার বাপের নাম-ঠিকানাটা , শার্ক জাহা-যে জাহাজে তুমি যাবে—চলে গেলে, তােমার বাবার কাছে একটা বেনামী পত্ৰ ছেড়ে দেয়াে’খন, তুমি কোথায় গেলে সেটা জানিয়ে।
৭ । মালিব প্রথমটায়, কথা ওর মনে ধরলাে না ললল, সে নিজেই লিখবে। যখন বােঝালাম, ওল যেতে পারে , ছাড়া, আমার একটা দায়িত্ব থাকছে তখন সে মা জাওর বাপের নাম মিঃ ওয়াটস, কমার্শিয়াল রােডের ওপর তাঁর বড়গােছর একটা কাপড়ের দােকান আছে। তার সন্দেহ মেটাতে, খানিকক্ষণ এটা-সেটা কথাবার্তা করে তাকে বললাম, ঐ মেঝের ওপয়েই বলে থাকো, জানলা দিয়ে যেন কেউ না দেখতে পায়। ক্যাপ্টেন-বন্ধুটীর সঙ্গে দেখা করে সব ব্যবস্থা কবে আসছি। বাইরে এসে কি করা যায় স্থির করবার চেষ্টা করলাম। ঘাট ছেডে যাওয়া চলে না, ওদিকে ছেলেটার বাপেরও দুশ্চিন্তা দূর করা দরকার। ভাবতে ভাবতে একপাশ ঘেসে এগিয়ে চললাম। ছেলেটা দেখছে কিনা দু-একবার ফিরে দেখে, ছুটলাম কমার্শিয়াল রােডে। বয়স হয়েছে। তার ওপর, সেদিন সন্ধ্যেয় গরমও পড়েছিল। বাম ভাডার পয়সাও ছিল না। সারাটা পথ হেঁটে যখন পৌছলাম, ঘেমে নেয়ে বেশ বড়সড় দোকান। কাউটারের পিছনে দাড়িয়ে জনতিন- চার ভাগ মেয়ে কাজ করছে। ক'টা মোর পড়ে আছে, পায়াগুলাে লম্বা, বসবার জায়গাটা এতটুকু। একটা মেয়ের কাছে গিয়ে বললাম, “মিঃ ওয়াটসনের সঙ্গে দেখা করতে চাই। বললাম, ব্যক্তিগত কথা আছে। খুব জরুরী। মেয়েটা আমার দিকে একবার চেয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে সে একটা লম্বা মতাে, টেকো লােককে সঙ্গে নিয়ে ফিরলাে। লােকটীর গালে হালফ্যানের দাড়ি, নাকটা প্রকা। আমাকে এসে জিজ্ঞেস করলাে, ‘কি চান? বললাম, “একটা গােনীয় কথা আছে আপনার সঙ্গে। লােকটা ভাবে বললাে, “এই যথেষ্ট নিরিবিলি ! চট করে বলে ফেললা দিদি, কি চাও? উঠেছি।
১০২ ভিদেশী একটু গা ঝাড়া দিয়ে আমি তার দিকে চাইলাম, বললাম, “ওঃ, এখনও তার খোঁজ হয়নি বুঝি ? দোকানী খেকিয়ে উঠলাে, “খোজ হয়নি ? কার খোজ ? ‘তােমার ছেলের, তােমার নীল-চোখাে ছেলের। বলে, সােজা তাব চোখের দিকে তাকালাম। ও রাগে তােংলাতে লাগল, ভাল চাও তাে সরে পড়। এখানে চালাকি মাবতে এসেছ, না? মংলবটা কি? আমি চ'টে গেলাম, ‘মলব হচ্ছে এই : তােমার ছেলে জাহাজে পালাচ্ছে , আমি এসেছিলাম, তােমায় তার কাছে নিয়ে যেতে। লােকটা ভয়ানক ঘাবড়ে গেল , মনে হল, এখনি মূচ্ছা যায়। হবাবই কথা। দেখলাম, যে মেযেটা সবচেয়ে সুন্দরী, সে আর অন্য একটা মেয়েও মৃঙ্খ যায়-যায় হয়ে বহুকষ্টে সামলে নিচ্ছে। শেষে, লােকটীব মুখে কথা ফুটলাে, দোকান থেকে বেরােও, নয়তাে হাজতে ভরুবাে। আমি বেশ শান্তভাবেই বললাম, ‘ভাল। তবে একটা কথা শুনে রাখাে, ছেলেটা যদি ডুবে-টুবে মরে, এখন তত মেজাজ নষ্ট কবছ, তখন আপশােষেব সীমা থাকবে না, রাতের ঘুম কাকে বলে জানবে না। ভ্যালা, ওর মায়ের কথাটাও তত ভাবব। এক চুড়ী ভিজে আতসবাজির মতাে একবার ফাস করে উঠলাে। ওয়াটসন সায়েব রাগে প্রায় দমবন্ধ হয়ে ধাক্কা দিয়ে আমাকে দরজার বাব করে দিল। প্রথমটা তার ব্যাভারখানা বুঝতে পারিনি। পরে, ছুডীগুলােব একটা আমায় বললাে, সায়েব বে-ই করেনি, ছেলেপুলে আসবে কোখেকে ? কেউ তােমাকে ভালোমানুষ পেয়ে হয়তাে নাজেহাল করছে। বললাে, ওয়াটসন সায়েব ফেরবার আগেই গড়াতে গড়াতে সরে পড়াে, বাপু।
মানুষ বুঝি ব্যবহারে আর এক ছুডী বললাে, এমন লােককেও একা বাড়ীর বা’র হতে দেয় । কোথায় থাকো, ঠাকুর্দা ?” বুঝলাম, ঠকেছি। কানে কম শােনার ভাণ করে দোকান থেকে বেরিয়ে আসছি, এমন সময় ওয়াটসন সায়েব একটা চ্যাংড়া পুলিশ সঙ্গে করে ফিরে এল। পুলিসটা আমাকে জিজ্ঞেস করলাে, ‘কি মৎলবে দোকানে ঢুকেছিলে হে ? বেরােও।” এই না বলে সেটা আমাব ঘাডের ওপর সত্যিসত্যিই দুটো হাত চাপিয়ে ধাক্কাতে লাগলাে। তা, ও বেটা ধাক্কা দিয়ে আমায় বার করতে পাববে কেন ? একটু কেবল নড়ালাে। ছেলেটাকে একবার দেখে নেব, ভেবে বেরােলাম। পুলিসটা অনেক দূর পর্যন্ত আমাৰ পিছু পিছু এল, যাবার সময় মুডে নেডে হুসিয়ার কবে গেল। ভুল বাসে উঠে কমার্সিয়াল বােড় থেকে আলগেটে নামতে হল। লাভ হ’ল না বড। জাহাজঘাটে যখন এসে পৌছলাম, একেবারে শ্রান্ত হয়ে পড়েছি। দু-এক মিনিট বাইবে দাডিয়ে দম নিয়ে, রাগে ফুলতে ফুলতে ভেতরে ঢুকলাম। ওই যে বলে, পালকের ঘায়ে বসিয়ে দেওয়াব অবস্থা, আমাৰ হ’ল তাই। অফিসে ঢুকে আমার বাক্যবােধ হয়ে গেল। ছােকরা ভেগেছে , তাব জায়গায় মেঝেয় বসে একটা সুন্দবপান। মেয়ে। বয়স হবে আঠার-উনিশ , চুল ছােট , পরণে সাদা ব্লাউল। আমাকে দেখে মেয়েটা ধড়মড়িয়ে দাড়ালো, দুটো ভীরু চোখ মেলে বললো, ‘নমস্কাব, আমার ভাই আপনার সঙ্গে চালাকি করেছে, বলে আমি দুঃখিত। ছেলেটা দুষ্ট, সয়তান, অকৃতজ্ঞ। আপনাকে বলেছে কিনা, তাব বাবার নাম ওয়াটসন! আপনি তার কাছে গিয়েছিলেন বুঝি? আশা করি, ক্লান্ত হয়ে পড়েননি। জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় সে?
১০৪ ভিনদেশী মেয়েটা মাথা নেড়ে বললো, ‘ভেগেছে কোথায়। এতে মানা করলাম, শুনলাে না। বললাে, আপনি হয়তাে ওর ওপর চটেছেন। যাবার সময় ব'লে গিয়েছে, বুড়াে নাড়ুগােপালকে আমার ভালবাসা দিও , তাকে বলল, তাব ওপব আমার বিশ্বস নাই। মেয়েটাকে এভাে সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল যে, তাকে কি বলি, ভেবে পেলাম না। একটুক্ষণ বাদে, পকেট থেকে একটা রুমাল বার করে সে কাঁদতে লাগলাে। মেয়েটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললাে, তাকে ফিরিয়ে আনুন আপনি। এতদূব তার পিছন ছুটলাম এরি জন্যে ? আমার খাতিরে আর একটাবার চেষ্টা করে দেখুন। আমি বললাম, কোথায় গিয়েছে জানি না, কেমন কবে তাকে ফিরিয়ে আনবাে ? মেয়েটা চোখ রগড়াতে রগড়াতে বললাে, ওর ধবাবার কাছে-তার বাডী। দিব্যি গেলেছিলাম, কাউকে বলবাে না। কিসে যে ভাল হয়, বুঝি না।” বললাম, ওর ধবাপ ওকে ধরে রাখবেন। মেয়েটা মাথা নেড়ে বললাে, “তাকে জাহাজে যাওয়ার কথা বললে তাে। ও গিয়েছে, কিছু টাকা ধার করবে বলে। মেয়েটা ফেঁাপাতে লাগলো। তার কাছ থেকে কোনােমতে ছেলেটার বর্মবাপের নাম-ঠিকানা জোগাড় করে নিলাম। ওই ঠিকানা পেতেই যা বেগ পেয়েছি, ভাবতে মূৰ্ছা আসে। যা হােক, ফোপানির ফাকে ফাকে, তার কাছ থেকে জানলাম, নাম মিঃ কিড্ডেস, ২৭নং ব্রিজ খ্রীটে বাড়ী। মেয়েটা বললাে, ‘লােকটার দয়ার শরীর , অমন উদার লােক বড় দেখা যায় না। হারি ভাইটা সেইজন্যেই তার কাছে গিয়েছে। খুলী হয়ে তিনি যদি আপনাকে কিছু দিতে চান, ‘না’ করবেন না। তাঁর অঠেল ধন।
মানুষ বুঝি ব্যবহারে এবার ব্রিজ স্ট্রীট গেলাম একটু ধীরে সুস্থে। সন্ধ্যেটা কিন্তু ছিল বড় গরম। যখন পৌছলাম, অবস্থা ঘায়েল। একটা ছিমছাম ভদ্ৰচেহারার মেয়ে এসে দরজা খুললাে। মেয়েটা কিছু কাল। বার দশ-বারাে নামটা চেচিয়ে বলার পর, সে শুনতে পেল। বললো, তিনি তাে এখানে থাকেন না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাড়ী বদলেছেন বুঝি ? মেয়েটা মাথা নেড়ে আমায় দাড়াতে বলে ভেতরে চলে গেল , স্বামীকে ডেকে নিয়ে এল। লােকটা বললাে, ‘ও-নাম কখনও শুনিনি। আজ সতর বছর এ বাড়ীতে বাস। নম্বরটা ঠিক আছে তাে? ২৭নং? বললাম, “নিশ্চয়। ‘না, তিনি এখানে থাকেন না। ৩৭ কি ৪৭ নম্বর বাড়ী খোঁজ করতে পারেন। করলাম খোজ। সাঁইত্রিশ নম্বর বাড়ী খালি , সাতচল্লিশ নম্বরে একটা চিমসে-মুখাে ছোড়া কিজ্ঞেস নাম শুনে তাে হেসেই কুটকুটী। এতক্ষণ খেয়াল হয় নি, কিন্তু আমায় এমন করে ধাপ্পা দেওয়া বড় শক্ত। এক নিমিষে বুঝে নিলাম, আবার ঠকেছি। চুড়ীটা ছোড়ার চেয়ে কম পাজী নয়। ঘুবে ঘুরে অবস্থা যা হয়েছিল। কোনােমতে পা টেনে টেনে পৌছলাম। মাথা বিলকুল ঘুলিয়ে গিয়েছে। সমস্ত ব্যাপারটা ভাল করে ভেবে নিতে, বার তিন-চার দাড়ালাম। পারলাম না। শেষে, প্রায় গড়াতে গড়াতে অফিসে ঢুকলাম। যা ভয় করছিলাম তাই। অফিস-ঘর শূন্য। ছোড়াছুঁড়ীর পাত্তা নাই। ধপ করে একটা চেয়ারে বসে ভাবতে লাগলাম, এসবের মানেটা কি। হঠাৎ জানলা দিয়ে বাইরে চোখ পড়তে দেখি, কে যেন জেটীর এপাশ ওপাশ ছুটে বেড়াচ্ছে। সামনে কতকি থাকায়, ভাল দেখা গেল না। বাইরে বেরিয়ে যা দেখলাম, ভিদেশী তাতে চক্ষু স্থির। সেই ছোেটা পাগলের মত হাত মচকাতে মচকাতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। আমায় দেখে কোথায় পালাবে, না, ছুটে এসে তার নােব। থাবাদুটো দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলাে। বললাে, “বাচান, ওকে বাঁচান। বাঁচান। আমি তাকে ঝেড়ে ফেলে বললাম, “দেখাে বাপু।' ছেলেটী রীতিমত নাচতে লাগলাে, বললাে, “জলে পড়ে গিয়েছে , আমবি দিদিমণি। শীগগির। আমি যে সাঁতার জানি না। ও ছুটে জলের ধাবে গিয়ে জলের মধ্যে একটা জায়গা আঙুল দিযে দেখালাে , জলে তখন আব-জোয়াব। আমার হাতটা ধবে’ পিছনে একটা ঠেল। দিয়ে বললাে, ‘জদি' ঝাপিয়ে পড়ুন ' দেখছেন কি? আমি হতভম্ভ হয়ে জলেব দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। তারপর দেওয়াল হতে একটা লাইফ-বেট নামিয়ে ছুঁড়ে দিলাম জলের ওপর। একটু ভেবে নিয়ে, ‘লিজী এ্যাও আনি' জাহাজটা ঘাটের কাছেই আছে দেখে, তার কাছে গিয়ে চীৎকার করে এক ডাক ছাড়লাম। গলা আমার ববাববই খুব দরাজ। একডাকেই ক্যাপ্টেন আর টেড, সইয়াব কেবিন থেকে হুডমুড করে বেরিয়ে এল , খালালীরাও এসে জুটল। আমি চীৎকাব কবে বললাম, একটা মেয়ে জলে পড়েছে। ক্যাপ্টেন শুধু জিজ্ঞেস করে নিল, কোথায়। তারপর, ক্যাপ্টেন, মেটছোড। আর জাহাজের অন্য লােকগুলাে তাড়াতাড়ি তাদেব নৌকায় উঠে ঘাটে এসে লাগলাে। ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে আমি দৌডে ফিরে এলাম, আর দশজনেব মত দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখতে লাগলাম। ক্যাপ্টেন বললাে, “ঠিক কোন জায়গা, দেখাও দিকি। ছেলেটা আঙুল দিয়ে দেখালাে। ক্যাপ্টেন নৌকার ওপর খাড়া হয়ে জাহাঙ্গীফাটা ফেলে চারপাশ দেখতে লাগলাে। দুবার বললাে, “কি মানুষ বুঝি ব্যবহারে ১০৭ যেন ঠেকছে। না, ভুল। তার মুখ কমে ভারী হতে থাকলাে, মাথা নেড়ে জানালাে, কাটা ফেলে কোনাে লাভ নাই। ছেলেটাকে লক্ষ্য করে ক্যাপ্টেন বললাে, ‘দাড়িয়ে দাড়িয়ে কাঁদো কেন ? কেঁদ না। তারপর একজনকে ডেকে বললাে, “জেমস্, টেম্স্ পুলিশকে খবর দাও। ওরা কঁাটাজাল আনুক। ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে যাও, মনটা ঘুরে থাকবে। ওরা চলে গেলে ক্যাপ্টেন আব একবাব কাঁটা ফেলে দেখলাে। তারপর আশা ছেড়ে নৌকায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলাে। আমার দিকে মাথা নেডে ক্যাপ্টেন বললাে, ‘পাহারাও'লা, ল্যাঠা হ'ল তােমাব। এত সব কাণ্ড হ’লতুমি ছিলে কোন চুলােয় ? জাহাজের রাঁধুনে আমার পাশে দাড়িয়ে ছিল, নে তাড়াতাড়ি জবাব দিল, ‘বা সন্ধ্যে ওব দেখা নাই। ও ঠিকমত ডিউটী দিলে, মেয়েটা কি আব ডুবে মরে। জাহাজঘাটে মেয়েটা এলই বা কিসেব জন্যে ? মেট বললাে, “হয়তাে একটু কতি কবতে। আবও যে ডুবে মরে না, এইটাই আশ্চর্য । সাব। সন্ধ্যে পাহারা ওলা থাকবে তাডিখানায় পড়ে, হবে না এমন ? রাঁধুনে বললাে, আমাকে ফাসিতে লটকানাে উচিত। তার পাশের এক ছােকবা-মামুলী জাহাজী—সে বললো আমাকে পুড়িয়ে মারাটাই সঙ্গত। এ নিয়ে হয়তাে ওদের মধ্যে একটু কথা কাটাকাটিও হয়েছিল। আমার যা মনেব অবস্থা তখন, অতাে লক্ষ্য করিনি। ক্যাপ্টেন আমার দিকে চেয়ে একটু মাথা নেড়ে বললাে, ‘অমন মনমরা হলে মেয়েটা তাে আর ফিরে আসবে না। আমার কেবিনে গিয়ে ববং একটু হুইস্কি খেয়ে এল। বােতলটা টেবিলের ওপরেই আছে। পুলিস এলে, মাথা ঠিক রাখার দরকার হবে। আর যা করাে, যা-তা বলে নিজেকে দোষের ভাগী করে বোলাে না।
sob ক্তিদেশী রাঁধুনে বললাে, আমরা আছি কি জন্যে ? দেব না ফাসিয়ে? মামুলী জাহাজীটা বললো, আমি যদি ঐ মেয়েটা হতাম, রােজ রাতে ভূত হয়ে ওর জীবনভাের ওর সামনে এসে দাঁড়াতাম, গা বেয়ে জল ঝরতে, গােঙাম। রাধুনে বললাে, “ওই যে করবে না, কে বলতে পারে? আশা করি, মেয়েটাও তাই করবে। আমি তাদের কথার কোনাে জবাব দিলাম না। শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ভূতের ভয় আমার ভয়ানক , এমন একটা কাণ্ড হয়ে যাওয়ার পর এই জাহাজ-ঘাটে একা-একা রাত কাটাতে হবে, ভেবেই তাে আধমরা হ'য়ে গিয়েছিলাম। যাক, ‘লিজী এ্যাণ্ড আনি’র কেবিনের টেবিলে ক্যাপ্টেনের কথামতাে এক বােতল হুইস্কি পেলাম। লকারে বসে এক গ্লাস খেয়ে নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে ভাবতে লাগলাম, এ-সবের শেষ হবে কোথায় ? পেটে হুইস্কি পড়তে শরীর-মন কতকটা চাঙ্গা হল। আর এক মাস ঢালবার জন্যে বােতল উঠিয়েছি, শুনলাম, ক্যাপ্টেনের কামরা হতে একটা অস্পষ্ট শব্দ আসছে। বােতল নামিয়ে, কান খাড়া করে রইলাম, সব নিঝুম। বােতল তুলে একটু ঢেলেছি—পরিষ্কার শুনলাম, একটা হিহি আওয়াজ, সঙ্গে সঙ্গে গােঙানী। কিছুক্ষণ একেবারে পাথর হয়ে গেলাম। তারপর, বােতলটা আস্তে নামিয়ে যাবার জন্যে গা তুলেছি, হঠাৎ ষ্টেট-রুমের দরজা খুলে গেল। দেখলাম, আমার সামনে সেই ডুবে-যাওয়া মেয়েটা , মুখ চুল সব ভিজে, জল গড়াচ্ছে। টেড, সইয়ার চারদিকে বলে বেড়িয়েছে, আমি নাকি কেবিন থেকে ডেকে উঠে এসেছিলাম, মা-হারা বাছুরের মতাে চীৎকার করতে করতে। সারা সন্ধ্যেবেলা আমার মতাে কাটলে, এটা কি করতে দেখে নিতাম।
মানুষ বুঝি ব্যবহারে ১১ জেটীতে যখন এসে পৌছলাম, ওরা সবাই তখন সেখানে। আমি একেবারে ক্যাপ্টেনের বাহুর মধ্যে লুটিয়ে পড়লাম। সকলে জিজ্ঞেস করতে লাগলাে, কি হয়েছে ? কি হয়েছে? একটু দম নিয়ে, সব বললাম। ওর হাসতে লাগলাে, এক রাধুনে ছাড়া। সেটা বললাে, হবেই তাে এমনি। তাবপব, যেন স্বপ্নের মতাে দেখলাম, মেয়েটা জাহাজের সিড়ি বেয়ে উঠলাে, আস্তে আস্তে এপাশে এগিয়ে এল। আমি চীৎকার করে উঠলাম, ঐ দেখ, ঐ যে মেয়েটা দাড়িয়ে। ক্যাপ্টেন বললাে, ‘স্বপ্ন দেখছো তুমি। কই, কেউ তাে নাই। সবারই ঐ এক কথা। মেয়েটা ঘাটে এসে উঠলাে, তবুও ঐ এক কথা। মাজা ধবে আমার উদ্দেশে বিশ্রী মুখভঙ্গী করতে কবতে ক্রমে সে আমাদের দিকে এগিয়ে এল। ওরা জনপাঁচেক মিলে এখন আমাকে ধবে বাখতে পাবে না। চারপাশে ঘাটা সব বন্ধ করে ঘুবতে লাগলাে। ছুড়ীটা কাছে এনে, আমার গালে আস্তে আস্তে ক'টা টোকা মাবলাে। বললাে, বেচারী বুঢ়য়া। কি লজ্জার কথা, টেড। বড় খারাপ। আমায় ছেড়ে ওরা হেসে সারা জেটী পা-দাপাদাপি কবে মরে আর কি। যদি বুঝততা কি বিশ্রী দেখাচ্ছিল ও-দিকে, যদি বুঝতাে আমি দিকে কি বকম করুণার চক্ষে দেখছিলাম, তা হলে বােধ হয় অমনটা করতাে না। হাসি একটু থামিয়ে, টেড সওইয়ার চোখ মুছে মেয়েটা কোমর জডিয়ে ধরে বললাে, “ইনি হলেন আমার ভাবী বৌমাবী ফ্লোরি প্রাই। কেমন চালাক বল তাে? আমি বললাম, আমার মত আমার কাছেই থাক্, মেয়েদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাই না। শুধু, একবার ওর ভাই- ছেকে পেলে— ওরা এবার আরও জোরে হাসতে লাগলাে। তারপর বাঁধুন তার হাড- ভিগছিগে হাতখানা দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে কি সব
১১০
ভিন্দেশী
বকতে লাগলাে। যত ঝেড়ে ফেলতে চাই, তত বকে। আমার কাছে
সব তখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। একটু ভাববার সময় পেলে, আগেই বুঝে
ফেলতাম। বাগ কারও ওপর আমার নাই। তবে, হ, এইটুকু বলি,
টেড সইয়ারের সঙ্গে বে’ হওয়ার বাড়া শাস্তি আমি মেয়েটার জন্যে কামনা
করি না।” *
* ইংরাজী গল্প : লেখক-উলু, ডবলু, জ্যাকব।
– মিৎসারাের কাক ছুটীর দিনে একদল বাখাল মিলারােব খাড়া পাহাডটায় উঠতে উঠতে দেখতে পেল, একটা পাখীর বাসা, মস্ত একটা কাক সেখানে চুপ করে বসে ডিমে তা দিচ্ছিল। হৈ হুল্লোড করে বাখালবা কাকটাকে ধবে ফেললাে :- “কি বাপধন, এখানে কি করছিলে ব'সে ব'সে ? দ্যাখ, দ্যাখ, মশায় বসে ব'লে ডিমে তা দিচ্ছিলেন। দেখাে বাপু, ও কাজটা তােমার বিবির, তােমার নয়, বুঝলে?” বলাবাহুল্য, কাকটা নিজের আচরণের অজুহাত কিছু একটা দিল, কিন্তু কাকীয় ভাষায় ব্যক্ত হওয়ার দরুণ তার যুক্তি রাখালদের বােধগম্য হ’ল না। সমস্ত দিনটা বাখালবা কাকটাকে নিয়ে খুব আমােদ করলো, আর শেষ পর্যন্ত তাদের একজন সেটাকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেল। পরের দিন, সেটাকে নিয়ে কি কববে ভেবে না পেয়ে, তার গলায় ছােট একটা ঘন্টা বেঁবে সে কাকটাকে ছেড়ে দিল : “দূর হ, যা খুশী করগে।” টুং-টাং-করা দোলকটা গলায় বাবা থাকায় কাকের মনােভাব কি হ’ল, তা কাকই জানে। ঘটা বাজিয়ে সে উর্ব আকাশে উড়ে বেড়াত, তার এই উর্ববিহার দেখে বিচার করলে মনে হয়, গলায় ঘন্টা বাজতে থাকায় তার বেশ মজাই লাগতাে, নইলে নিজের বাসার কথা, নিজের সঙ্গিনীর কথা অমন ক'রে ভুলতে পারতাে কখনও ?
১১২ ভিনদেশী মাটীর দিকে মাথা নুইয়ে কাজ করতে করতে ঘণ্টার আওয়াজ শুনে 'চাষীরা খাড়া হয়ে দাড়তাে। চারদিকে অন্তহীন রৌদ্রোজ্জ্বল মাঠ, চোখ পিট পিট করে দূরের দিকে চেয়ে তারা এ-ওকে জিজ্ঞেস করত—“ঘণ্টা বাজছে কোথায় হে ?” হাওয়ার নাম গন্ধ নাই। এখানে, এই মাঠের মধ্যে যে-গির্জাটা হতে ঘণ্টার এই মিষ্টি আওয়াজ ভেসে আসছে, সেট নিশ্চয়ই অনেক দূবে হবে , কিন্তু এ কোন্ গির্জা? ঘণ্টার শব্দ নিয়ে ওদের মধ্যে নানাবকম জল্পনা কল্পনা চলতাে। ওবা স্বপ্নেও ভাবেনি, এই শব্দের উৎস তাদের মাথার উপরেই খুব উচুতে-ওড়া একটা কাক। কিচে কাজ করতে। তার নিজেব ক্ষেতে—একেবাবে একলা। তার মনে হ'ল, “এ নিশ্চয়ই কোনাে উপদেবতার কাজ।” সার দেবার জন্যে সে বাদাম গাছগুলাের গোঁড়া খুডছিল,—কথাটা মনে হতেই বুকের ওপর হাত আড়াআডি কবে সে ইষ্টদেবতা যিশুকে স্মবণ করলাে। ভূত প্রেতে তার অগাধ বিশ্বাস। কতদিন মাঠ হতে রাত করে বাড়ী ফেরার সময়, বড রাভা ধরে যেতে পুবােনাে ইটের পাজাটার কাছে পৌছুলে ও শুনেছে, কে যেন ওর নাম ধরে ডাকছে। কে না জানে ইটের পাঁজায় ভূতরা আচ্ছা বাঁধে। কিচে ওদের ডাক স্পষ্ট শুনেছে : কিচে। ও কিচে। ঠিক ঐরকম । শুনে টুপির নীচে তার মাথার চুল কাটা দিয়ে উঠেছে। কিচের কানে এল ঘণ্টার আওয়াজ, প্রথমে একটু দূরে, তারপর কাছে,আবার, অনেক দূরে। চারপাশে কয়েক ক্রোশের মধ্যে জনমানব নাই, ধু মাঠ আর গাছপালা। তারা না পারে কথা বলতে, না পায় কিছু শুনতে। তাদের এই নিশুপ ভাৰ দেখে কিচের ভয় বেড়ে যায়।
মিংসারের কাক ১১৩ দেখতে দেখতে জলখাবার সময় হয়। সকালবেলা বাড়ী থেকে সে একটা থলেতে করে খাবার এনে, দূরে একটা অলিভ গাছের ডালে নিজের কোটের সঙ্গে সেটা ঝুলিয়ে রেখেছিল। খাবারের মধ্যে আধখানা রুটি আর একটা পেঁয়াজ। খেতে গিয়ে কিচে দেখে, পেয়াজটা থলেতে আছে, রুটিটুকু নাই। এই কদিনের মধ্যে তিন-তিনবার এরকম ঘটলাে। একথা কিচে কারও কাছে ফাস করে নাই। সে জানতাে, উপদেবতারা মানুষকে নিয়ে খেলা শুরু করলে তা নিয়ে অভিযােগ করতে নাই। করলেই সর্বনাশ! তার। মৌকা খুজতে থাকেন, পরের বারে উপদ্রব আরও বাড়িয়ে দেন। ক্ষেতের কাজ সেরে কিচে যখন বাড়ী গেল, তার কেমন-কেমন ভাব দেখে বৌ জিজ্ঞেস করলে, কি হয়েছে? কিচে জবাব দিল, “শরীরটা ভাল নাই।” একটু পরেই কিন্তু খেতে বসে হাতার পর হাত বােল সাবাড় করতে লাগলো সে। বৌ বললাে, “শরীর ভাল নাই বলছে, এদিকে খাচ্ছে। তাে খুব।” কিচে বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, “ও হঁ্যা, খিদে তাে ঠিকই আছে।” একে সকাল থেকে উপবাস, তার উপর নিজের দুঃখের কথা কাউকে বলতে না পারায় তার মনটা বিগড়ে গিয়েছিল। একদিন এ অঞ্চলের সকলেই শুনলে, ঘণ্টা বাজায় একটা বদমাস কাক। সেটা আকাশে উড়ে বেড়ায়, আর ঘণ্টা বাজায়। কিচে বললাে, “এই দিব্বি কাটছি আমি,মােম দিব্বি, সয়তানী ওর আমি বার করবাে।” পরদিন মাঠে যাবার সময় আধখানা রুটি আর পেয়ারের সঙ্গে সে থলির মধ্যে ভরে নিল, চারটে কড়াই ৩টি আর চারগাছি সূতত। নিজের ১১৪ ভিনদেশী ক্ষেতে পেীছে, কিচে প্রথমে তার গাধার পিঠ হতে জিনটা খুলে, সেটাকে চরতে ছেড়ে দিল। আর-দশজন চাষীৰ মতাে কিচেরও অভ্যেস ছিল, নিজেব গাধাটাব সঙ্গে বিস্তালাপ করা। প্রায়ই দেখা যেত, গাধাটা তাব কথা শুনবার জন্যে একবার এ-কান একবার ও-কান তুলে ধবেছে , জবাব হিসেবে, মাঝে মাঝে একটা চাপা শব্দও যে সে কবলতা না, এমন নয়। সেদিন কিচে তার গাধাটাকে উদ্দেশ কবে বলল, “কিচ্চিও, একটু খেয়াল বাখলে দেখতে পাবি, কেমন মজা হয়।” তাবপব, সে কড়াই শুটিগুলাে ফুটো কবে ফুটোর মধ্যে দিয়ে একগাছি ক'রে তাে চালিয়ে দিয়ে জিনের সঙ্গে সেগুলোকে বাঁধলাে। তারপর কড়াইশুটি চাবটে খাবাবের থলিৰ উপৰ রেখে সে ক্ষেতেব কাজে মন দিল। একঘণ্টা কেটে গেল,—দুঘণ্টা, আকাশে ঘণ্টা বাজা শশানা যাচ্ছে ভেবে, কিচে মাঝে মাঝে হাতের কাজ ফেলে দাডিম উঠে কান খাড়া করছিল।—কোথায় শব্দ । কিচে আবাব বাদান গাছের গোড়া খুডতে লাগলাে। জলখাবার সময় হল। রুটা আনতে যাবে, না, আবও কিছুক্ষণ অপেক্ষা কববে—ইতস্ততঃ করতে করতে শেষ পর্যন্ত সে খাবাব আনাই স্থির করলাে। কিন্তু খাব থলির উপর কী চমৎকার ক'রে ফাদ পাতা আছে দেখে নে নিরস্ত হ'ল। ঠিক সেই সময় সে স্পষ্ট শুনলো, দরে টুং-টাং টুং-টাং ঘটা বাজছে। কিচে উপরের দিকে তাকালাে, “ঐ যে আস্ছন এবার।” দারুণ উত্তেজিত হয়ে কিচে হামাগুড়ি দিয়ে চুপি চুপি সেখান হতে পার একটু দূরে গিয়ে লুকালে।। কাক কিন্তু মাথার উপর অনেক উচুতে চরুব দিতে থাকলাে, নামবার নামও করলাে না।
মিৎসারাের কাক ১১৫ কিচে ভাবলল, কাকটা হয়তাে তাকে দেখতে পাচ্ছে। সে আও একটু দূরে গিয়ে গা ঢাকা দিল। কাক কিন্তু সেই উচুতেই রইলাে , তার নেমে আসার কোনাে লক্ষণ দেখা গেল না। কিচের খুব ক্ষিধে বােধ হচ্ছিল, তবু হার মানবার পাত্র সে নয়। সে নিজের কাজে গিয়ে লাগলাে, মনে মনে বললাে, “দাড়াও না একটু, দেখাচ্ছি মজা।” কাক কিন্তু উচুতেই উড়তে থাকলাে, যেন সয়তানি ক'রেই। কিচের শিবে বেড়ে চললাে , ঐ তাে তার রুটী—তবু যেন নাগালের বাইরে। কিচের মেজাজ বেজায় চটে গেল। পেটের নাড়ী জলে যায়, তবু সে তার গোঁ ছাডলাে না। “নামতে তােকে হবেই শীগগির, ক্ষিধে কি আর তােরই পায়নি।” কাকটা তাকে অবজ্ঞা করেই যেন আকাশ থেকে জবাব দিচ্ছিল, “তুইও না'—মূইও না।” সেদিনটা এইভাবেই কাটলাে। কিচে যখন গাধার পিঠে জিন পরাতে এল, কড়াইশুটিগুলাে তখনও জিন থেকে ঝুলছে—যেন কোনাে নতুন ধরণের অলঙ্কার। কিচের মেজাজ তখন ভয়ানক খারাপ, তার যত রাগ গিয়ে পড়ল তার পঙ্খীরাজের উপর। যে কুটীর কথা চিন্তা করতে করতে তার মানসিক যন্ত্রণার অন্ত ছিল না, বাড়ী ফেরার পথে কামড়ে সেটাকে ছিড়ে খেতে লাগলাে, একটু করে রুটি চিবােয়,আর ধরা না-দেওয়ার জন্যে কাকটাকে সে গাল পাড়ে, “বেটা সয়তান, চোর, বেইমান।” পরের দিন সিদ্ধিলাভ হল। আগের দিনের মতােই কিচে সযত্বে ফাদ পেতে তার কাজে লেগেছিল। অল্প একটু পরেই কাছাকাছি কোথায় জোর ঘণ্টা বাজার শব্দ তার কানে এল, সঙ্গে সঙ্গে কাটার প্রাণপণ চীৎকার আর পাখা ঝাপটানি। কিচে দৌড়ে গিয়ে দেখলাে, কাক ধরা পড়েছে, বেরিয়ে-আসা সুতােটা গলায় জড়িয়ে গিয়ে তার দম বন্ধ হবার অবস্থা। ঠোট থেকে ১১৬ ভিন্দেশী এবার টের ৫ I “ই, ফাদে পডেছাে ত যাদু।” কাকটার ডানা ধরে, কিচে তাকে সম্বােধন ক'রে বললাে, “পড়লে তাে ফাদে । ভাল কড়াইশুটি ওটা,খুব ভাল। এবার আমার পালা। বাং জানােয়ার কোথাকার। পাইয়ে দিচ্ছি।” সূততা কেটে দিয়ে কিচে প্রথমেই কাকটার মাথায় দুই চাটি লাগালাে “এইটা হ'ল আমার ভয় লাগিয়ে দেওয়ার জন্যে , ভয় লাগিয়ে দেওয়ার জন্যে , আর এইটা হ’ল গে, আমাকে উপােষ বাখার জন্যে।” কাছেই পাহাড়ের ঢালুতে গাধাটা চলছিল। কাকেব ‘কাকা’ চীংকাব শুনে সেটা ভড়কে গেল,—মারলাে এক দৌড। কিচে অনেক ডাকাডাকি কবে তাকে থামালাে, থামিয়ে, দূর থেকে তাকে হাতের কালা সয়তানটা দেখিয়ে কিচে বললাে, “দেখছিল কিচ্চি, এই যে সেই-টা। ধবেছি একে।” কাকটাকে সে গাছের সঙ্গে বেঁধে নিজের কাজে গেল। মাটী খুডতে খুডতে সে ভাবতে লাগলাে, কি কবে সবচেয়ে জন্ধব প্রতিশােধ তােলা যায়। স্থির করলাে, পাখা দুটো কেটে দিতে হবে, যেন বেটা আর উডতে না পাবে। তাবপব, ছেলেপিলেদেব হাতে তুলে দিলেই হবে। তার নিজের ছেলে পাড়ার ছেলেগুলাের সঙ্গে মিলে কাকটাকে খুবই জালিয়ে মারবে, মনে হতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠলাে। সন্ধ্যা লাগলে কিচে গাধার পিঠে জিন চড়ালাে , কাকটার পা দুটো বেঁধে সেটাকে ঝুলিয়ে নিল, গাধার লেজের নীচ-দিয়ে-টানা চামড়ার কালিটার সঙ্গে। তারপর, গাধার পিঠে চডে সে বাডীমুখখা হ’ল। কাকের গলার ঘন্টাটা বেজে ওঠামাত্র, গাধার কান খাড়া হয়ে উঠলাে, সেটা ভডকে দাড়িয়ে গেল। কিচে গাধার গলার দড়িটা টেনে এক ঝাঁকানি দিয়ে হাঁক ছাড়লো, “অর, রে।”
মিসাবাের কাক ১১৭ গাধা আবাব চলতে লাগলাে ! ধূলােভরা রাস্তায় চলতে চলতে প্রতিটি মন্থব পদক্ষেপের সঙ্গে যে অদ্ভূত আওয়াজ তার কানে আসছিল, সেটা মােটেই তার ভাল লাগছিল না। যেতে যেতে কিচে ভাবছিল, এর পব কেউ আর মিৎসারাের কাককে শূন্যপথে ঘণ্টা বাজাতে শুনবে না, ব্যাঙ পাখীটা এখন তার হাতে পড়েছে। বেঁচে যে আছে, তার কোনাে লক্ষণ দেখাচ্ছে না তো ! “এই ' কি করছিস্ ব্যাটা? ঘুম দিচ্ছিস্ বুঝি ?” কিচে মুখ ফিরিয়ে হাতেব দডিটা দিয়ে কাকটাকে এক ঘা বসিয়ে দিল। “ক—" এই কবশ আকস্মিক শব্দ তার কানে পৌছুতে গাধা চমকে উঠলাে, ঘাডট! যতখানা পাবে আগেব দিকে ঠেলে দিয়ে সে কান দুটোকে খাড়া কবে বইলো। কিচে হাে-হাে কবে হেসে উঠলাে। গালাটাব কানের কাছে দডি দিয়ে এক ঘা বানিয়ে নিচে নাডা দিল, “আবরি কিচ্চি, ভয় পাচ্ছিস কাকে?” দু-চার মিনিট বাদেই কিচে কাকটাকে আবার সেই প্রশ্ন কবলে, “ঘুম হচ্ছে বুঝি?” প্রশ্নেব সঙ্গে সঙ্গে কাকের গায়ে পা আব এক ঘা। কাকটা এবার জবাব দিল আবও তীক্ষ কঠে—“কা”। গাধাটাব আর সহ্য হ'ল না , সে টেনে দৌড় দিল। হাতপায়ের সমস্ত শক্তি লাগিয়েও কিচে কিছুতেই তাকে বাগে আনতে পারলাে না। গাধাব দুবন্ত লাফানিতে ভয়ানক ঝাপটা খেতে খেতে কাকটা মবীয়া হয়ে একটানা কয়েকটা “কাকা” আওয়াজ ছাড়লো। ভীষণ আতঙ্ক ওভনন্দনের গতি দ্রুত হত দ্রুততব হয়ে উঠলাে। "কা -কাকা”। গাধার গলার দড়ি ধরে প্রাণপণ টানাটানি কবতে কবতে কিচেও
১১৮
ভিনদেশী
চেঁচামেচি শুরু করছিল। গাধা আর কাক পরস্পরের ভয়ে তখন একেবারে
পাগল হয়ে উঠেছে। গাধাট। যত জোবে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে, কাকের
ঝাঁকুনি লাগে তত বেশী। এই পাগলা দৌডেব হট্টগােলে রাত্রির বুকে
হৃৎকম্প লেগে গেল। তারপর, ধপ করে একটা শব্দ হ’ল।তারপর, সব
চুপচাপ।
পরের দিন কিচেকে পাওয়া গেল একটা খাড়া পাহাডেব
হাড়গুলাে তার গুড়াে হয়ে গিয়েছিল। সে পড়ে ছিল তার গাধাটার
নীচে। গাধাটাও মারা গিয়েছিল। এক গাদা লাশ। সূর্যালােকে দেখা
গেল, তা থেকে ধোঁয়া উঠছে। সত্যিই বেয়া নয় সেটা,-এক ঝাক মাছি।
এর পর, একদিন সকালবেলার নিমেঘ আকাশে মিৎসারাের কাটাব
আবার দর্শন পাওয়া গেল। উর্ব গগনে ঘটা বাজিয়ে সে আবার মুক্তির
বম আনন্দ ভােগ করছিল। +
T
NAMELIH
৫।
5L) tulis
6
اده
।
* ইতালীর গল্প : লেখক-পিনদেশে।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.