Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Dinesh Sener Choto Galpo
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
রুশ সংব
fa
অজিসে
সেবাহিতা
উদয়নারায়ণপুর,
হাওড়া
No text on this page.
এই সকল
বাজছে। সেই পরম মধু আনন্দনিন্দিনী আখ্যায়িকাটির
এই ক্ষীণ প্রতিধ্বনি পাঠকের ভাল লাগবে কিনা জানি না
—কিন্তু আমি আনন্দসহকারে পূৰ্ব্ব স্মৃতির ঘুম ভাঙ্গিয়ে
তার সঙ্গে একটু লীলা করে নিয়েছি।
উপাখ্যান -পুরাতন কাসুন্দীর ন্যায় কোন কোন পাঠকের
ন্যক্কারজনক হবে কিনা, বলতে পারি না। কিন্তু আমার
নিকট আজন্ম শুনেও এই সকল প্রসঙ্গ একেবারেই পুরাতন
হয় নি—সৰ্ব্বদাই একটা আনন্দের প্রেরণা দিতেছে।
সুতর কে কি বলবেন তাহা ভাবিয়া ননকে কিছুতেই
নিরস্ত করতে পারছি না।
উপসংহারে বক্তব্য—অসুস্থতা বশতঃ ভাল করে প্রচ্গুলি
দেখতে পারি নি। এজন্য অনেক ভুল রয়ে গেছে। এক
জায়গায় নকল কারীর দোষে ‘কুটিলার জায়গায় ‘জটিল।
হয়েছে। আমি অপরাধ স্বীকার কচ্ছি, যাদের দয়া আছে,
ঝরা মার্জনা কববেন।
৭নং বিশ্বকোষ লেন, বাগবাজার,
কলিকাত।।
২৬শে বৈশাখ, ১৩৩২
শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন
No text on this page.
কানুপৰিলাদ
যশােদার আঙ্গিনায়।
বলাই শিঙ্গা সেজে উঠেছে।
ব্ৰজ শিশুব তাড়াতাড়ি সেজে গুজে যশােদার
আহিনৰ দিব ছুটেছে। ব্যক্তিটি কানু ছাড।
হযেছিল-সুপ্রভাতে শত শত ন'ল পদ্মব চাইতে
সুন্দর কৃষ্ণেব মুখখানি দেখবে—তাই কেউ শিঙ্গা
বাজিয়ে, কেউ বেণু হতে কেউ বা পচনবাড়ি হতে
নন্দেব বাড়াব দিকে হাসি মুখে ছুটে আছে।
প্রথমে এগিয়ে এলেন সুদাম। মাথায মন্তবড়
ৰঙ্গিণ পাগড়ী, বর্ণটি প্রাতঃকালের সদ্য ফোটা চাপা
ফুলের মত, দুই বাহুতে সোণাৰ অলঙ্কাব ঝলমল
কবছে, কিন্তু সােণ' ছাপিযা উঠেছে সোণাৰ বং, মণির
* কানুপরিবাদ *
হার ছাপিয়া উঠেছে বৃন্দাবনের নানাবর্ণের সুগন্ধ
ফুলের মালা। গলায় মুক্তার মালা, কিন্তু তার সঙ্গে
গৰু বঁধিবাব দডিটি ঝুলছে। সুদামেব পাছে অংশুমান,
তার মাথার মযুবপুচ্ছটি বাতাসে নড়ছে ও তার
কোলে একটি সাদা ধবধবে বাছুব। তাৰ কঁধ ধবে
এসে দাডলি বসুদাম,-গম্ভাব নৃত্তি, পাচনবাডিটি ডান
হাতে উচু করে ধরে স্থির হয়ে দাড়াল। কত নাম
কবব। যশােদাৰ আঙ্গিনায যেন নানা বঙ্গের চুল ধুটে
উঠল, বোনটির বর্ণ শ্যাম, চোখ জুড়ানাে দুর্বাদল
শ্যাম, কোনটি কালো—যেন নব মেঘেব লহরী, কেউ
শ্বেত পদ্মকে লজ্জা দিচ্ছে, কেউ চাপা ফুলেব গবে
ফুটে উঠেছে, কেউ দোহা, কেউ নধব কান্তি-তাব
এসে দেখলে মা যশোদাব কোলে বসে কিশাের
কানু হাসছে। যশোদা বলাই এর শিঙ্গা শুনেছেন,
এক নিরস্ত্র পথিক দব চীৎকার শুনে যেমন কবে
আথিবিথি নিজের ধনরত্ন লুকিয়ে বাখিবার চেষ্টা
কবে, তেমনই করে তিনি কানুকে আগলে চলে
লুকোচ্ছেন।
२
* কানুপরিবাদ * কেমন করে যেতে দেবেন ? কংসের চব বাতদিন ঘুরছে, গােষ্ঠে পাঠিয়ে যে তিনি মণিহাবা ফণীর ন্যায় পাগল হয়ে থাকেন, তিনি সুদামেব দিকে চেয়ে স্পষ্ট কবে বল্লেন। “আজ কানুকে যেতে দিব না,” ঐ এক কথায সুদামেব চোখ জলে ভরে গেল, খাল- দেব আনন্দ সূয্যের তাপে কুমুদ ফুলের ন্যায় শুকিয়ে গেল,-কারু হাতেব পাচনবাডি পড়ে গেল, কেউ সখার কাধে ভর দিয়ে বিমনা হইযা দাড়াল, কেউ বা মিনতিব চোখে কানুব দিকে চেযে বইল , বানু সেই দৃষ্টিতে ব্যথিত হয়ে উঠলেন। যশোদা বলেন—“বােজ রোজ এমন কষ্ট কেমন কবে সইব ? অামাব ছেলেকে তো আমি ভাল করে চিনি, কাপড খানি খুলে গেলে নিজে তা পবতে পারে না,কতদিন দেখেছি কটি থেকে কাপড় খসে পায়ে বেডী লেগেছে,-দুহাতে চোখের জল মুছতে মুছতে পথে দাড়িয়ে আছে, কাপডেব বেঙী খুলতে না পেরে এগুতে পারছে না। ছেলেদের সঙ্গে খেলতে খেলতে ক্ষুধা হলে একা একা বাড়ী ফিরতে চেয়েছে, ত
* কানুপবিবাদ ১
এই ব্রজব পথটা এত চেনা,-এব মধ্যেই পথ
হাবিযে দুটি সজল চোখে কাকে জিজ্ঞাসা করবে ঠিক
করতে পাচ্ছে না। আমি হঠাৎ পথে যেতে দেখতে
পেয়ে মুখ খানি আঁচলে মুছিযে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি।
এমন অবােধ বাছা, বােদে শুকিয়ে যায, জলে ভেসে
যায, এক কেমন করে ছেড়ে দেব ? শুনেছি
কংস ঢব এলে এই শিশুকে তাব মখ ছেড়ে দিয়ে
তোবা চলে যাস্। কেন্ মুখ আৰ এক নিতে
এসেছিস।”
উত্তর প্রত্যুত্তর
সুদাম বলে—“এই ব্ৰজে তুমি একটি মাত্র মা নও,
জামদেব সাব মা অাছে। কংসেব চৰ আমাদের
মাবিতে এলে কানু নিজে এগিয়ে যায, আমরা তাে
ওব পাযেব বেড়াব মত ওকে জড়িয়ে ধরে বাখি। কি
করব মা ? তোমার ছেলে ত তা শোনে ন', 'ওর পাযে
5
* কানুপরিবাদ *
কাটা ফুটলে যে মা আমাদেব বুকে শেল ফোটে—
কিন্তু এই শিশুটিকে সামান্য মনে কোর না, বড় বড়
অসুরকে টিকি ধবে আকাশে উঠিংয গলা টিপে মারে,
তুমি তো শট ভাঙ্গাটা দেখেছ, বড দুটো অৰ্জ্জুন
গাছ কি কবে হামাগুড়ি দিতে দিতে ভেঙ্গেছিল
তা দেখেছ, পুতনা বাসীর স্তন চুষে তাকে কি
কবে মেবেছিল—সেও তো তোমার চোখের সামনে
ঘটেছে মা, তা তো জান।”
যশোদ। কাতর কণ্ঠে বল্লেন, “শকটটা ভূমিকম্পে
চুমাব হযেছিল, অর্জুন গাছ দুটো কত পুবানো,
তাদেব সাব কিছু ছিল না, তাবা আপনি পড়ে গেছিল।
পুতনা সন্ন্যাস বােগে না পডে-কেন তাদের কি
মনে নেই, ও পাডবি ঘু গযলা নিয়ে ফিবে বাড়ী
অছিল, পাগডটি। হঠাৎ মাটিতে পড়ে যায়, আর
তাই কুড়োতে গিযে অমনি ধপাস্ কবে ভূঞ পড়ে
তখনিই মরে যায,—পুতনা তেমনি মরে গেছে,
ভােবা তিলকে তাল করে এই শিশুকে একটা মস্ত
বড় বীব মনে কষেছিস, তােরা কি দেখছিস না, এর
-
* কানুপরিবাদ *
কোমল মুখখানিতে সাদা চন্দন দিযে তিলক আঁকতে
আমার হাত কেঁপে উঠে, পাছে ব্যথা পায়। নূপুব
পরাতে গেলে কতবাব “উহু করে ওঠে, তােবা কি
দেছিস না বাছা আমার যেন ফুল দিয়ে গড়া,
বে'দ্র লাগলে যেন এলিয়ে পড়ে , তােবা একে মস্ত
একটা বীও ঠাওবিযেছিস। একে তোদের সঙ্গে
দিয়ে,—আমি একবার ঘর, এক বাব বা’ব এমনি
কবে দিন কাটাই , ঝডেব শব্দ শুনলে বুক কেঁপে
ওঠে, মনে হয় বুঝি কংসেব চব এসে সর্বনাশ করলে,
বেলা হ'তে থাকে, আর ভাবি কানু ক্ষুদা তৃষ্ণা
কোন গাছের নীচে এলিযে পাড আছে—কেন, এত
কষ্ট সইব কেন ? কানু তো বাজার ছেলে, ওকে
গােঠে না পাঠালে কি চলে না?”
৬
* কানুপরিবাদ * অংশুমানের উক্তি অংশুমান আর থাকতে পালে না, সে শিঙ্গা হাতে বসুদামকে ঠেলে ফেলে এগিয়ে এসে বল্লে “কানু. তুই যাবি কি না বল্ আমৰা বা চাদমুখ দেখে ভুলে আছি ? ও মুখ না দেখলে আমরা বাঁচব না। আমাদের সকল আযােজন নষ্ট, সকল খেলা বৃথা হবে। তােব মা ই কেবল তাের জন্য ভাবতে জানেন, আমরা সব ভুইফোড, এমন ধাবা কথা আমাদের মা সকলেরাও বলতে জানে, অমন কত কথা আমরাও শুনে থাকি,—তােব মাযেব অদর জানা আছে, পিঠ খুলে দেখ, চুরি কবে ননী খেয়ে যে মার খেযেছিলি, ভাব দাগ এখনও আছে”,এই বলে মা যশােদাব কোল হতে কানুকে টেনে এনে ডান হাত- খানি দেখিয়ে বল্লে, “দ্যাখ এখনও তােব মাযের দডি বাধবাব দাগ মিলায নি।” এবার যশােদাব চক্ষে জল এল, সেই দাগ দেখে মুখে আঁচল চাপলেন, আর কথা ৰেকল না। অংশু
* কানুপরিবাদ *
মানের কণ্ঠস্বর আরাে উত্তেজিত হয়ে উঠল—সে বলে
যেতে লাগল, “জিজ্ঞাসা কর মা কামুব কাছে-ওব
পক্ষ হতে যেয়ে খেলার সময় বলাইদাব হাতে কত মার
খেয়েছি ; কানু হেরে গেলে বলাইদা ওব কঁাধে চড়ে
, ওর পক্ষে থাকি বলে তিনি আমার বাঁধে চডেন,
ও সে কি ভাব। মনে হয় যেন গিবি-গগাবর্ধনটা
আমার কঁাধে চেপে বসল। বু কানুকে যে
রেহাই দিয়েছি, এই আনন্দে দর দব কবে আমার
চোখ দিয়ে জল পড়ে, নিজের শৰীবেব কষ্ট আমার
জ্ঞান থাকে না। মা, তুই কি আমাদের থেকে
কানুকে বেশী ভালবাসিস্ ? আমবা রাতে যে ঘুমিয়ে
থাকি, তখনও কানুকে স্বপনে দেখি, বিছানাটা
হাতড়িয়ে ভুল করে কানুকে খুজতে থাকি।
৮
* কানুপরিবাদ * কানাই রাজা বদান বল্লে “মা, আমবা যমুনার পাড়ে কি খেলা খেলি, তা জান ?- নুকে বাজা করে খেলি, বলাই দা কানুব মাথায ছাতা ধবেন—ছাতা ধরে কি করেন জান? কানুর মুখ দেখেন আব কেঁদে কেঁদে আনন্দে মেতে উঠেন, সুবল চামব ধবে ব্যজন করে আর সুদাম শিখিপুচ্ছের মুকুট মাথায পবিয়ে দেয়, শ্ৰদাম- দূত হয়ে কানু-মঙ্গল ঘোষণা করে , আমি কি করি জান ? আমি জোড়হস্ত হয়ে কানুর স্তুতি কবি, ঠিক বলছি কংস বাজা এলেও তেমন স্তুতি আমার মুখ দিয়ে বেরবে না,—মনে হয, কানু সত্য সত্যই রাজার রাজা। স্তুতি-কথা বল্তে বলতে আমার অঙ্গ সুখে কাটা দিয়ে উঠে ও দর দর চোখ দিয়ে জল পড়ে।” যশােদা অস্থির হয়ে উঠলেন। কি করবেন, কামুকে সাজাতে লাগলেন,—মাথায চূড়া এটে বাঁধলেন,—মযুবপুচ্ছ মাথায় পরিয়ে দিলেন, কপালে
* কানুপরিবাদ »
তিলক কেটে হাতে কানুর চিবুক ধরে উঁদমুখ
দেখতে লাগলেন, বুক যেন ফেটে যেতে লাশ,
আবাব ধৈর্য্য ধবে কেয়ূর বালা ও <র পরতে
লাগলেন। তাবপব নীলপালা- ৩ পা দুখানিতে নূপুব
পরাবার সময় রান এ সমস্ত ধৈর্য্যের বাঁধ টুটিযা গেল,
এবার চোখে জল থামাতে পারলেন না। এতক্ষণ
কানুন অমঙ্গল আশঙ্কায যে অশ্রু পড়তে দেন নাই, তা
বনসংযমব পাষাণ ভেদ কবে গঙ্গা হয়ে ছুটল-যশােদা
এবাব সাজানাে ছেড়ে দিলেন, এবং বল্লেন, “কিছুতেই
আমি কানুকে ছেড়ে থাকতে পারব না--তােবা
আমায় যে শাস্তি হয়, তা দে—আমি নিষ্ঠুব। আমি
কানুর গায়ে হাত তুলি, সব কবুল, কিন্তু আমি
কানুকে ছেড়ে থাকতে পারব না,তােদের মা আছে
কিন্তু আমি এত ব্যাকুল হই কেন, আমি নিজেই বুঝি
, এখন মাকে মেরে ছেলেকে নিতে চাস্, তো এই
বুক পেতে দিচ্ছি আমাকে মাব।” যশোদাব চোখের
জল কে থামাবে।
কানু মায়ের কোল থেকে নেবে দাড়িয়ে ছিল, সে
* কানুপরিবাদ *
সুবলের হাত ছেড়ে দিযে, পুনরায় হাত জোড় করে
বল্লে—“ভাই, আজকাব দিনটা মাপ কর, মাকে এমন
দেখে আমি কি কবে যেতে পাবি।”
দেব গােষ্ঠ
সব বাখাল ছবিব মত হয়ে দাড়াল, তাবা কি
করবে বুতে পারল না , সুবল হাত জোড় করে
যশােদাকে বলতে লাগল।
“মা, তুমি বিশ্বাস কর আব না কব, কিন্তু আমরা
জানি কানুব বিপদ নেই, আমাদের সমস্ত বিপদ
কানু কাটিয়ে দেয়,
দেয়, খেলার সময় কানুকে তাে
আপনব জনই মনে করি। কিন্তু কানু আমাদের
কাছে এক বহস্য। কি গুণে কানু আমাদিগকে
টাছ, বলতে পাবি না, কিন্তু কানু ছাড়া আমরা
কায়া ছাড়া ছাযাব মতন, কানুকে না পেলে
আমরা বাঁচব না,—কি আনন্দে থাকি কেমন করে
জানাব। এই আনন্দ গেলে জীবনের কি থাকে?
* কানুপরিবাদ *
“তুমি যা ভাবছ তা নয়। কি সব লােক এসে
যে কানুকে রক্ষা কবে, তা আর কি বলব। আমবা
ব্রজের বালক ব্রজের পথ ঘাট সবই চিনি, কিন্তু
এমন ধাবা একজন লােক ত আমরা আগে কখনই
দেখি নি। লাল সিন্দুব গাষ মেখে কে এক
পুরুষ এসে কানুকে প্রণাম কবতে থাকেন, তার
মাথাটা হাতীব মত, শুডটা দোলাইয়া কি এক বকম
গানের সুবে মন্ত্র অাওডা। কানু তা স্তব্ধ হয়ে শোনে,
আমবা সেই শুডের দোলানো দেখে ভয়ে পালিয়া
যাই—কিন্তু সেই মধুব মন্ত্র নেশাব মত আবার আমা-
দিগকে টেনে আনে। আর একজন আসেন, কত
রাজার ভাণ্ডারের মণি-মাণিক্য তার গায়ে, হাতে
পাচনবাডির মত একটা লােহা-তা বাদে ঝক
ঝক করে ওঠে, মনে হয় তা দিয়ে চুলেই প্রাণ
চলে যাবে, ইনি কোন রাজা হবেন। সাদা ধবধবে
মস্ত বড় হাতীর উপর চেপে ইনি কানুকে জোড
হাত করে কি বলতে থাকেন,—সে কথা আমরা
বুঝি না, কিন্তু কানু আনমনে বঁাশী হাতে বসে থাকে,
১২
* কানুপবিবাদ *
যদি বা দৈবক্রমে কানু তার দিকে চেয়ে একটু হেসেছে,
তবে সে ধন্য হয়ে, হাতীর পিঠ থেকে নেমে
কানুকে প্রণাম করতে থাকে। আমাদেব ভয় হয়,
মা, এত বড় মিন্সেটা আমাদের একটুখানি কানুকে
প্রণাম কবে কি কল্যাণ কবছে। তাৰপর একজন
আসেন, তার আগুণ বর্ণ, চাবটা মুখ,-একটা
পুথি পড়েন। সে কি সুব, যমুনায় ঝড় উঠলে
যেমন সুর উঠে তেমনি সুর, কানু তার দিকে
চাইলেই তিনি পড়া বেখে কানুকে প্রণাম করেন।
কিন্তু তাবপব বিনি আসেন তার কীর্তি শোন বলছি,
পাগলের মত বাঘের ছালেব নেংটা পবা
হাতে শিঙ্গা, মাথায় জটাজুট, সেই জটাব মধ্য থেকে
সাদা সাদা জলের ধাবা বয়ে যাচ্ছে, সেই জলে
ধাবাব সঙ্গে তার চোখের জল মিশে যাচ্ছে, এত
জটা, গায়ে ছাই মাখা। কিন্তু মুখখানি যেন একটা
শ্বেত পদ্ম। আমাদেব বলইদাব মাথায় যদি জট।
থাত, তবে ঠিক এই লােকটার মুখের মত দেখাত।
কানু তাকে পেয়ে যেন নেচে ওঠে। আর যারা
লে.
* কানুপরিবাদ »
আসে তাদের দিকে তাে কানু দুই একবাব চেয়ে
দেখে মাত্র। কিন্তু তাকে দেখে কানু ছুটে
যেয়ে জড়িয়ে ধরে, সেই পাগলটা মাথার জট।
খুলে জল বের করে কানুর পা
পা ধুইয়ে দেয়।
কিন্তু মা সবার শেষে যিনি এসেছিলেন, তার মুখ
তােমার চাইতে সুন্দর, আমাদের মাযেদেব চাইতে
এমন ভুবন ভুলানাে রূপ তো কাক
দেখিনি, তাৰ ৰূপে সমস্ত বনটা ঝলম কবে উঠল,
তার মুকুটেব মণিগুলি সূর্যের ন্যায ঝকঝকে,
তার হাতের অলঙ্কাব, গলার হার,কত দামের
কে জানে ? এমন তো তােমাদের কাৰু নেই—তিনি
রাজার বাণী, তিনি এসে কানুকে কোলে নিয়ে কত
কি খেতে দেন, আমাদেবও দেন। তেমন জিনিষতে।
কোথাও খাইনি, তুমি তো রাজ-রাণী, তােমার ভাণ্ডারে
তেমন খাবার জিনিষ নেই, কানু তাকে মা বলে
ভালে।”
এইটুকু শুনে যশােদা চমকে উঠলেন, “আমার
বুকের ধনকে কোন ডাইনী কোলে নিয়ে ওকে দিয়ে
১৪
১ কানুপবিবাদ *
মা ডাক ডাকিয়ে শুনে। আমি কিছুতেই কামুকে
তার হাতে ছেড়ে দিব না।” সুবল বল্লে “মা, তুমি এমন
কথা বল না, ভাব দশহাত, আর তার পাশে একটা
মস্ত বুড সিঙ্গি ঘুমিয়ে থাকে।”
হঠাৎ যশােদার মুখ আনন্দে প্রযুল্ল হয়ে উঠল,
“তবেতো তিনি দেবী ভগবতী। আমি কত তপস্যা
করে হর-গৌবীকে আবাধন করে কামুকে পেয়েছি।
বনে কি তিনি আমার বাছাকে বক্ষা করেন।”
তথাপি দে, মনা হয়ে কানুকে ছেড়ে দিতে ইতস্ততঃ
কবতে লাগলেন।
বলাই দাদা
সময় দিক দিগন্ত কাঁপিযে, গাছের ফুলে
লে, প্রফুল্লতার শিহরণ জাগিয়ে, বলাইর
শে বেজে উঠল, মনে হল যেন স্বর্গে
বলাইএর শিঙ্গার এক কথা-
T
১৫
* কানুপবিবাদ ১৮
বলাই ভােলা,-তােলব এক কথা দুই তিন
কথার মত শুনায়, সেই দুই তিন কথার মত এক কথা
হচ্ছে ‘কাক্কা বানাইযা। কনুব নাম ধরে এইভাবে
শিঙ্গা বাজিয়ে, নিজে কাণে নিজেব স্বব শুনে বলাই
মাতাল হয়ে যায়। কানুর প্রেম তাকে পাগল করে
রেখেছে, কোন সময়ে “আমি কানু দাদা বলে
গর্বেব নিজের বুক নিজে ঠকিতে থাকে। নীল
কাপড় পবা বলাই রূপব পাহাডেব মত ধবধবে,
যেন কটিদেশে নীল নাস্তবেখা, গলায় গুঞ্জামাল।
ভাইযের প্রেমে মত্ত, শ্বেতকমলেব মধুবায় বুক
বেযে তােতলার মুখের লালা পড়ছে, আব ‘কাক্কা
কানাইয়া’ বলে শিঙ্গা বাজাচ্ছে, মাতালেব ন্যায
ঝাপ মেবে খেলছে ও মাতালেব মত চক্ষে
তাবা ঘুবছে। হঠাৎ দেখলে নিজের ছায়াটা
কানু প্রেমে বলাই পাগলের মত হযে '
এ ছায়াটা আব কেউ, “সা
সরে যা” বলে ছায়াটার প্রতি অঙ্গুলি
কখন বা তুড়ি মেরে ঘন ঘন ওটাকে ত
* কানুপরিবাদ ।
যাচ্ছে, কিন্তু নিজের অঙ্গভঙ্গীর সঙ্গে ছায়াটাও
নানা ভঙ্গী কচ্ছে। তখন বলাই রেগে গেছে,
“ওবে তুই কি জানিস না, আমি ভাই কানাইএর
দাদা--এত বড় স্পর্ধা, আমার হুকুম মানি না,
ব্ৰজের রাখালেরা আমায সব্বাই ভয় করে চলে
থাক” এই বলে শিঙ্গাটা কঁাখে রেখে, লাল ধূলি
গায় মেখে মল্ল হয়ে দাড়িয়ে “কাকা কানাইয়া”
বলে কানুকে ডাকতে লাগল।
এদিকে বলাইযের প্রেমের নেশা যায় নাই।
নিজে টলছে ও আব মনে কচ্ছে পৃথিবীটা তার
পদভরে টলছে, তখন ডান হাতটা অভয় দেওযাব
ভঙ্গীতে উঁচু কবে বলছে, “ধরণী স্থির হও”। কবির
লিখেছেন, বলাই অনন্ত নাগের অবতার, অনন্ত
পৃথিবীকে ধারণ করে আছে , যে ধরে রেখেছে, সেই
যখন মেতে গেছে, তখন পৃথিবী যদি টলতে থাকে,
তবে তাহাতে আশ্চৰ্য্য কি ?
নানাভঙ্গী করে বলাইদা এসে উপস্থিত হল।
বলাইকে দেখে রাখালদের প্রাণ এল। বলাই
১৭
* কানুপরিবাদ **
যখন নিজে হাজির, তখন আর মা যশােদাব সাধ্য
কি যে কানুকে বাড়ীতে রাখবেন। আঁচলে চোখ
মুছতে মুছতে রাণী কানুকে বলাইযের হাতে দিয়ে
বল্লেন “তুমি নিয়ে যাও, কিন্তু নিকটে ধেনু চরিও,
দূরে যেও না, কানুর বাঁশব ব ও তােমার শিঙ্গার
সুর যেন আমি এখান থেকে শুনতে পাই।” এই
বলে বাণী কানুব গা ছুঁযে বক্ষামন্ত্র পড়তে লাগলেন,
“এই দুইখানি পা যেন ব্রহ্মা বক্ষা কবেন, জানু অপর
দেবতা রক্ষা করুন, হৃদযটী নাবাষণ, কণ্ঠ সূর্য,
মস্তক শিব এবং জনার্দন দশদিক রক্ষা করুন।
যাহার শত্রু তাহারা যেন মিত্র হয।” এই বলে
বাণী সজল চক্ষে কানুব প্রতি অঙ্গ স্পর্শ করলেন।
এদিকে গরুগুলি এত দেরীতে ক্ষুধার্ত হলেও
বনের দিকে যাচ্ছিল না। রাখালেরা তাদের লইযা
বনে যেতে চেষ্টা কচ্ছিল, কিন্তু তারা বাঁশীর সুর
শুনিতে কান খাড়া করে এদিক ওদিগ চাচ্ছিল।
সুবল একবার তাড়া দিযা সেগুলি বনপথে লইয়া
যাচ্ছিল, কিন্তু তারা ফিরে ফিরে কানুর মুখ
১৮
* কানুপরিবার * দেখছিল। তাবা কথা বলতে জানত না, কিন্তু কৃষ্ণ- সখারা এত কথায়, এত ছন্দে কানুর প্রতি যে ভালবাসা জানাচ্ছিল, তা তাবা দুইটি চোখের অপলক দৃষ্টি দিয়েই বুঝতে পেরেছিল। এমন সময় কামু সেজে গুজে বার হযে পড়লেন। তখন প্রভাত আকাশের সূর্যের নীচে এক অপরূপ দৃশ্য ফুটে উঠল । কি সুন্দর ভঙ্গীতে তালে তালে পা ফেলে রাখালেরা চলেছে, কি সুন্দর তাদের পায়ের নূপুর বাজছে, কি সুন্দর গলার ফুলের মালা দোলাচ্ছে,সবাইব মধ্যে রামকানু, একজন ধবধবে সাদা, আর একজন মিসমিসে কালো, কিন্তু সেই কালােৰূপে জগত আলাে-নীলকণ্ঠেব মত উজ্জ্বল, নীল যমুনা জলের ন্যায় স্বচ্ছ নীল, মাথার উপর নীলাভ শিখিপুচ্ছ নীল, সবটা নীলে নীল। কানাইএর আনন্দে বাখালেব মাতােয়াবা, সেই মাতােয়ারা রাখালদিগকে আরো মাতাল করে কানুর বাঁশী বাজছে, সে বাঁশীর রবে গরুগুলির চোখ থেকে আনন্দাশ্রু বেয়ে পড়ছে , গাছের ফুল এগিয়ে
* কানুপরিবাদ *
কাছে আসছে,—বাযু সুগন্ধে ছন্দে ঢেউ খেলছে,
“আর কি কেউ ঘরে থাকতে পারে, যাব বনে যেয়ে
সংযমী হয়ে কঠোর কবে তপস্যা করছিল, সেই সুর
শুনে ভাবা হঠাৎ চমকে উঠল—তাদের মুহূর্তের
জন্য (যন তপঃসিদ্ধি হ’ল, “যােগী যােগ ভুলে, মুনি
ধ্যান টলে।” এমনি সে বাঁশীর সুব।
দ্বাদশ বন ঝন্ধুত করে বাঁশী বাজতে লাগল,
যমুনার তরঙ্গে সে সুর নাচতে লাগল, কলসী ভাসিয়ে
চোখের জল ফেলতে ফেলতে কত গােপী সেই
সুরে পাগল হযে ঘবেব বা’র হল, আর ঘরে
ঢুকল না।
কিন্তু আজ খেলা ধূলা সব মাটী আজ কানুর
বাঁশী শুনে বলাই মেতে উঠেছে—
খেলা হল না রে
আজ মাঠে বলাই মাতিল রে।”
চোখ দুটি রাঙ্গা পদ্মের মত-নেশায় ঢুলু
দুলু, কোন্ বাণী খেয়ে সে মেতেছ,-আর
শিঙ্গা বাজাচ্ছে না,-কামুর বাঁশী বাজছে, এই কি
* কানুপরিবাদ *
শিঙ্গা বাজাবার সময় ? বলাই শিঙ্গাটা কাখে পুরে
নিঝুম হযে শুনছে, পা টলছে, মন উধাও হয়ে
যাচ্ছে, আর তােতলা “মুখে কাক্কা কানাইয়া” বলছে,
মা রােহিণী যে বেশ বানিয়ে দিয়েছিলেন, তার
দুর্দশা দেখ,—কটি
কাচুনি বাঁকা নীলধূতি এলিয়ে
পডেছে, মাতা হাতীর মত ধীর-মন্থর গতি, আর
আবেগ বেশী হলে মাটীতে পড়ে যাচ্ছে,—নিজে
পড়ে গিয়ে পাগলের মত বলছে—“ধরণী স্থির হও
নড় না।”
“বাম কাখেতে শিঙ্গা কানে রাঙ্গা ফুল।
রােহিণী বানান বেশ হইল আউলখুল।”
রাখালেরা দাদা বলাইকে কিছুতেই খেলায়
আন্তে পারলে না, কানাইএর বাঁশীর সুরে দাদা
মেতে গিয়ে একবারে মসগুল হয়েছে।
২১
* কানুপৰিবাদ » অঘাসুর সেই বাঁশীর সুরে দেবলােকের দেবদেবীরা নিষ্পন্ন হয়ে শুনছেন-নরলােকে যেন আকাশ গঙ্গা নেবেছেন, কিন্তু তা কি সব্বায়ের ভাল লাগছে? তা হতেই পারে না। যখন বীণা বাজে তখন ঈর্ষায় মশকের ভ্যান- ভানিনি শুরু হয়। ঐ দেখ, মস্ত বড় একটা মুণ্ড দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ের গহ্বরের মত মুখে বিরাট হাঁ করে আছে , তার দেহ কোথায় আছে কে জানে ? সে বিরাট দেহের কোন অঙ্গ হ'তে ক্ষুরধার নখর বের হচ্ছে, সেই হা’ হতে তীক্ষ দাত বেরিয়ে আছে, তার শ্বাসে আগুনের ফিকি বের হচ্ছে, তার ল্যাজের দাপটে বালকদের মাথা চুড করবে এই পণ করে সে বসেছে, ও কে জান? ও-অঘাসুর, পুতনার ভাই, বকাসুরের অগ্রজ, কংসের চর। যাদের দেহ ননীর মত কোমল, যারা কানু ভিন্ন জানে না--যারা কাউকে আঘাত করে না, যাদের ২২
* কানুপরিবাদ *
সকল সুখ কানুর হাসি, যাদেব সকল দুঃখ কানুর
চোখের জল, যারা ঐশ্বৰ্য্য চায় না, বৃন্দাবন যাদেব
ফুল দিয়া খেলা দিয়ে রাখে, যমুনা। যাদেরে ঘুম
পাড়ানো গান গেয়ে ঘুম পাড়ায—সেই বালকের
দলকে বধ করিতে কংসের এই বিবাট আযােজন,
এই দুষ্ট সৰ্পৰূপী অঘাসুরটাকে পাঠাইযা দিয়েছেন।
কিন্তু বালকদের সাহস দেখ, তারা জানে তাদের
কানু আছে,—তারা ও বিকট হাঁ নখ ও আগুণে
হাওয়া—তুচ্ছ করে। কানুর দিকে তারা একবার
চাইল, আর অমনই সেই বিকট হাঁ টার মাঝখানে
তারা গরব করে ঢুকল,—তারা বল্লে আমরা কামুকে
যদি সত্যি ভালবেসে থাকি, দেখি অঘাসুর তোব
হ। কি করতে পারে ? ওরে দুষ্ট, তুই ভেবেছিস
আমরা নিরীহ, আমরা একা,-তুই কানুকে চিনিস
না, সে একাই একশ, তাের নখ দন্ত তা ফুৎকাবে
চলে যাবে ? আমরা তাকে ভালবেসে মৃত্যুকে
জয় করেছি।” এই বলে দর্প করে রাখালেরা সেই
অঘাসুরের মুখ বিবরে প্রবেশ কল্লে, যেমন কবে
* কানুপৰিবাদ »
তালে তালে পা ফেলে তারা বৃন্দাবনে খেলা করতে
গরু চড়াতে এসেছিল, তেমনই তালে তালে পা
ফেলে তারা আনন্দে, সেই বিকট মুখর মাঝখানে
এক একটি কবে প্রবেশ কবলে--যাকে জালে
সব পথ অমৃত, মৃত্যু অমর বর দিয়ে যান, তার
পাদপদ্ম মনে মনে আকড়ে ধরে রাখালেরা মৃত্যুকে
ব্যঙ্গ কবতে চল্ল। বলাই অঘাসুরকে দেখেই নাই,
সে কানু প্রেমের যে ধ্যানালােকে আছে, তা এত
উচু জাযগায-যে অঘাসুর বকাসুরের অস্তিত্বই
তথায় উপলব্ধি হয় না। সে কামুব প্রেম-সুরা পান
করে অমব হযেছে, তাকে মাববে কে ।
এদিকে অঘাসুর দেখলে--একে একে সব
গযলার ছেলে তার মুখের মাঝখানটায় গিয়ে বেশ
একটা গয়লাপাড়া ফেঁদে বসেছে , তখন সে যদি মুখ
বুজিযে ফেলে—তবেই সকলগুলি তাব পেটের গহবরে
যেয়ে জঠরানলে পরিপাক হতে পারে। কিন্তু সে
মুখ বুজল না, তার আসল শত্রু রামকানু বাইরে,
তাদেরে না পেলে সে মুখ বুজে কি করবে, তার
२४
* কানুপরিবাদ *
বােন পুতনাকে রক্ত শােষণ করে যে মেরেছে-
তাকে না পেলে, তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ হবে
কি করে ?
আর কি
কানু দেখলেন, তার উপর নির্ভর করে, একান্ত
নিৰীক হয়ে ছেলেরা একটা কাণ্ড করে বসেছে,
কানু স্থির
থাকতে পারে। অমনি বাণীটি
হাতে কবেই অঘাসুরের মুখে ঢুকে পড়লেন।
ঢুকে পরে কামু জ্বলন্ত তেজ প্রকাশ কল্লেন, যার
তেজে সূর্যের তেজ, যব শক্তির এক স্ফুলিঙ্গ
বিদ্যুৎ, তার তেজ মুখের ভিতরে ঢুকে—অঘ৷ হাঁ
করে বইল, সে হ। তাপে আরও বড় হয়ে ওষ্ঠ ও
অধর ফাক হ'তে হ'তে মুখটা একবাবে ফেটে গেল।
ব্রহ্মরন্ধু দিয়ে পঞ্চ প্রাণ বাব হয়ে গেল , দেখতে
দেখতে অঘার বাহদেহ অাকাশে মিলিয়ে গেল ।
বালকেরা দেখল সবুজ ঘাসের উপর যমুনার নীলােৎ
পলের পরশ স্নিগ্ধ বাযুর হিল্লোল খেলছে—তারা
সেইখানে দাড়িয়ে আছে, কাকা কানাইয়া বলে
বলাই দা তার সমস্ত দেহের রঙ্গের শুভ্রতা দিয়ে
২৫
* কানুপরিবাদ »
যেন কামুকে ঘিরে ধরেছেন, শ্বেতপদ্ম ও নীলপদ্মের
জড়াজডি। অঘাসুর একটা দুঃস্বপ্নের মত শেষে
হয়েছে। তারা ভাবতে লাগ্ল সত্য কি অসুরের
মুখে গেছিলেম—না এট একটা স্বপ্ন ?
কানু বলিলেন “বেলা নেই, চল ঘরে ফিরে যাই”
তখন সকলে নন্দালয়েব দিকে রওনা হল ,
বনের ফুল ছিডিতে ছিডিতে,-পাখার ছায়ার সঙ্গে
দৌডিতে দৌডিতে,-যমুনাব জলে নিজেদের মুখ
দেখিতে দেখিতে, কেউ পাচন বাডী ঘুরাইযা, কেউ
শিঙ্গা বাজাইয়া, কেহ বেঙ্গের মত লাফাইতে
লাফাইতে, কেউ কম্বল মুডি দিয়া বৃষ সাজিয়া চাব
পায় হাটিতে হাটিতে, কেউ বা কর্ণিকার ফুল ছিডিয়া
কানে কুণ্ডল গডিতে গডিতে, কেহ গান করিতে
করিতে, নানা রঙ্গে নানা ভাবে গাইগুলিকে আগে
করিযা এর ছুটিয়াছে—এই যমুনার পথে কেবলই
ফুল ফোটে, আর দয়েল কোকেলা গায়, এই
যমুনার পথে বিকিকিনি নাই, রাখালেরা প্রাণ দিতে
জানে, কিছু চাইতে জানে না, হাসিতে হাসিতে
* কানুপরিবাদ * সব বস্তু বিকিয়ে দেয়। এই যমুনার পথ নিত্য- তাহা কৈশাের। এখানে শুধু প্রাণেরখেলাতার পর যমুনাব ওপারে বিকিকিনি, ধন সম্পদ—যশ প্রতিষ্ঠা—কংস রাজার অধিকার। কিন্তু এপারে রাখালেরা কংসের অধিকার মানে না,এখানে যে প্রাণ দিতে জানে, প্রাণের দাম জানে—অন্য সকল তুচ্ছ করে, তাদেরই অধিকারে। ওই দেখ গরুর খুরের ধূলি আকাশ ছেযে উঠেছে,—এই হচ্ছে বৃন্দাবনের গােধূলি, গােধূলি দেখে মাযেরা ফাগ ছড়াচ্ছেন, আকাশ রাঙ্গিয়া যাচ্ছে, ব্রজবধূরা কুঙ্কুম ছুড়ছে, ফুলের সঙ্গে আমােদিত বাযুও আরও সুগন্ধ হয়েছে—সখ্যের মহােৎসব, বাৎসল্যের মহােৎসবের সৃষ্টি করে রাখালেরা বাড়ীর দিকে সবাই যাচ্ছে। কিন্তু কানু ধীর স্থির,আজ তার প্রাণে আনন্দ তেমন করে খেলেছে না—কে যেন হাহাকার করে তাকে মনে মনে ডাকছে, তার চোখের জল অলক্ষিতে তীক্ষ্ণ বাণের মত তার বুকে এসে বি ধছে। আ সে অঘাসুরের হাতে পড়েছিল—তা না দেখেও মায়ের ২৭ * কানুপরিবাদ » প্রাণ বুঝতে পেরেছে, ছয় মাসের পথে যদি পুত্র মরি যায়, আর কেউ জানে না তা, সবার জানার আগে-জানে তার মায়। সেই যশােদার প্রাণান্তকর কষ্ট ও আকুলি- ব্যাকুলি কৃষ্ণের বুকে এসে আঘাত কচ্ছে, তিনি মাযের জন্য আকুল হয়ে ছুটেছেন, মনে মনে ভাবছেন, যশােদা একবাব ঘরে, একবাব বাইবে আছেন, আর তার আঁচল ধূলায় লুটোচ্ছে, আর নিজের হাতে ননীমাখনের বাটী দেখে নিজে কঁদছেন, আর তার প্রাণ আকুলি ব্যাকুলি কচ্ছে। কখনও দেখছেন, তিনি দুই হাত বাড়িযে কাকে বুকে তুলে নিতে চাচ্ছেন, যাকে দেখেন তাকে কি শুধাচ্ছেন,—হর- গৌরীর মন্দিরে যেয়ে ধা দিচ্ছেন,—মায়ের কথা মনে পড়ে কানুর মুখ শুকিয়ে গেছে,-অঘাসুর নন্দালয় হতে দুই ক্রোশ দূরে এসেছিল, কিন্তু তাকে যেন অন্তদৃষ্টিতে তিনি দেখেছেন, ও তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন যশোদার কেঁপে উঠেছে,-এ শাস্ত্র কে বুঝাবে ? কেমন করে ২৮ * কানুপরিবাদ * মায়ের প্রাণ সন্তানের সন্ধান রাখে, কে যে সন্ধান দেয় ? এই যমুনার পথ, এই গােপ-গােপীর ভবন মাতৃ করুণা ও সখখার প্রেমে ভরপূব—তাই বৃন্দাবন ছেডে কানু এক পা ও নড়তে পারে নি। পূৰ্ব্ব রাগ সহসা জটিলা এসে পথে আগলিয়া ডাল, তার ভাই এর বউ রাই মুচ্ছা গেছে, কানু কি মন্ত্র জানে, সখীরা সব বলে দিয়েছে। তাকে যেতে হবে, অনেক চিকিৎসক এসেছিল—তাবা কিছুই করতে পারে নি। জটিল। দুটি হাত জোর করে কামুকে বল্লে- “আমি তােমার অনেক নিন্দা করেছি, তােমার নামে অনেক কথা দেশময় রটিযেছি, সে সব মাপ কর, আমাদের বউকে বাঁচাও। দেখ এসে রাজনন্দিনী রাই- এর পদ্মের মত মুখখানি সাদা হয়ে গেছে, চোখ
* কানুপরিবাদ »
গড়িয়ে জল পডেছে, কি বন্দুতে চাচ্ছে—পাচ্ছে না,
ঠোঠ দুখানি, দুটি শিরিষ ফুলের মত কোমল ঠোঠ
দুখানি কঁপছে,-একবার এস।”
ক্ষণেকের তরে এমন যে মা যশােদা তার কথাও
কামু যেন ভুলে গেল, সখাদের বল্ল, “তােমরা এগিয়ে
যাও, আমি খানিক পবে যাচ্ছি।”
রাই সইদের সাথে কথা বলছিলেন, ললিতা
তব মাথাব চুলগুলি সােনার চিরুণী দিযা আঁচডিয়া
বিনােদ কবরী বেঁধে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা কচ্ছিল,
“রাই তুমি বলেছিলে সূর্য-পূজার দিন কানুর সঙ্গে
দেখা হওয়ার আগেই তুমি মনে মনে তার রূপ
দেখেছিলে,—সেটা কি রকমে হয়েছিল, বলবে কি?”
রাই মৃদুস্বরে বল্লেন-মৃদুসুবে যেন বীণা বাজতে
লাগল।
“সই তাকে আগে মনে মনে পেযেছিলাম। এক
দিন স্বপ্নে দেখলেম, কালেরূপে দিক্ আলো করে
তিনি দাড়িয়ে আছেন। তার পাশে এক রমণী একটি
কণিকার তকর ন্যায় অতি কৃষ, উপবাস ও সংযম
* কানুপরিবাদ *
করে তার দেহটি হলকা হয়েছে, তার অধর শুভ্র,
পাণের লালে ঠোঠ উজ্জ্বল হয় নাই, শুভ্র গরদ
পডেছেন, কিন্তু লাল পাডে তা ঝলমল হয় নি, বর্ণ
অতি শুভ্র, ঝরা সিউলি ফুলটির মত, কিন্তু সিউলির
রক্তিমাটুকু তাতে নাই। মাথাভবা চুল এলাইয়া পিঠে
পড়েছে কিন্তু তা আঁচড়ানাে নয়, কবরীতে তা বাধা
পড়ে নাই। তিনি চোখের জল ফেলতে ফেলতে
সারা রাত যে চন্দন ঘষেছেন, সেই সাদা চন্দন
এনে, নিজের কোমল পা দুখানি কুশাঙ্কুরে বিদ্ধ করে
সারার বাগানে বাগানে ঘুরে যে ফুল চযন করেছেন,
সাজি ভরে সেই ফুল এনে তা দিয়ে কঙ্কন বালা
হার তৈরি করে, কামুকে পরিয়ে দিচ্ছেন—সে কত
কবে কত নিষ্ঠায়, কত পবিত্রভাবে তা যদি তুই
দেখতিস। কিন্তু কানু, বাঁশীটি হাতে করে পাথর হয়ে
দাড়ায়ে রইলেন, রমণী কত কি বলে যেতে লাগলেন,
কানুর ঠোট কাল না, একটিবার কথা বের হল
না। রমণীর চক্ষের জলে বুক ভেসে যেতে লাগল,
কিন্তু কানুর চোখের পলক পড়ল না—তবুও বমণী
* কানুপৰিবাদ %
কানুর হাতে ফুলের কঙ্কণ পরাতে লাগলেন, পায়ে
আলতা পরাতে লাগলেন, সেই পাথরকে সাজিয়ে
যা তৃপ্তি, সেইটুকু লয়ে তিনি চলে গেলেন।
আমি কানুর রূপ দেখে পাগল হয়েছিলেম—কিন্তু
আমার বড় ভয় হল। আমি ত অমন করে রাত জেগে
কাটা বেছে ফুল তুলি নি, আমি ত অমন করে সারারাত
জেগে জেগে চন্দন ঘষতে জানি না, ইনি এর কাছেই
পাথব হয়ে রইলেন, আমাকে কি ইনি চাইবেন ?
আমি ত বিরাগের সাড়ী পডি নি, আমার যে নীল
সাডি-অনুরাগেব সাডী, এত যে ভালবাসার বুনন,
আমি তো সংযম জানিনে, আমার প্রাণ যে পাগল হয়ে
ওকে চাচ্ছে,--আমার ঘবে স্বামী, আমি ত নীতি
পালন কচ্ছি না,--আমি তো একে একটু দেখবার
জন্য সব ছেড়ে দিতে পারি, এর একটা চোখের ইঙ্গিতে
যে বেদ আমার কাছে মিথ্যা হয়ে যায়। আমি কি
করে একে পাব। কিন্তু না পেলে ত ন্য।
এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলুম, কত লজ্জা,
কত ভয়ে,-বুক দুরুদুরু করতে লাগল। গেলেম
তখন
* কানুপরিবাদ *
কিন্তু কি উপহার দেব—আসব সময় তো পূজা
দেওয়ার কথা ভুলে গেছিলাম, ওকে জড়িয়ে ধরে
বুকে রেখে বুক শীতল করব—তাই আগ্রহে এসে-
ছিলাম—আমি পূজা করব বলে তো আসি নি। তখন
হঠাৎ দেখলেম, বোধ হয বহু জন্মলব্ধ তপস্যা ও
পুণ্যফলে একটি উজ্জ্বল, সুগন্ধি, সুন্দর ফুলের মালা
আপনা আপনি আমার হাতে এল, আমি তাই নিয়ে
গিয়ে তার সামনে দাড়ালেম, কিন্তু দাড়ালেম মাত্র,
ফুলের মালা আব পবানো হল না, তার মুখ দেখে
আমার প্রাণ সকল কথা ভুলে গেল—আমার চোখ
দুটি অপলক হল, পাখীর মত উড়ে গিয়ে তার মুখের
লাবণ্য সুধা পান করতে লাগল। কখন যে হাত হতে
মালাটি পড়ে গেল, তা জানি না, আমার জ্ঞান ছিল
না, শুধু একটা আনন্দ মনে জাগছিল, যখন জ্ঞান হল
তখন দেখি তিনি আমার পায়ের কাছে এসে সেই ভুঞে
পড়া মালাটি কুড়িয়ে নিয়ে নিজের গলায পছেন,
আর কত আদরে কত কথা জিজ্ঞাসা কচ্ছেন—পাথর
মানুষ হয়ে গেল, আমার বহু ভাগ্যের গুণে প্রেমিক
গ
* কানুপৰিবাদ *
হয়ে গেল, তখন হাতে বাঁশী বেজে উঠল, “রাই
এস রাই এস” বলে।
যখন কথা শুরু হল সে কথা অব বুঝতে চায়
না, ভ্রমর গুঞ্জন আর থামে না, যতক্ষণ পদ্মফুলটি
ফুটে থাকে। কানুর প্রসঙ্গে বাই কি কবে চুপ
থাকবেন ? এক কথাব পর আর এককথা মনে হল,
সে যে মধুচক্র, তার কত দিক দিয়া মধু ঝরছে।
রাই বল্লেন “আর একদিন স্বপ্ন দেখলেন, আমি
একা তাঁর পায়ের কাছে বসে আলতা পাচ্ছি।
কিন্তু পায়ের স্পর্শে আলতাব কথা ভুলে গেছি।
সেই পাযের উপর আনন্দাশ্রু পড়ছে, আমার আব
কোন জ্ঞান নাই, তিনি হাত ধরে উঠে আদব কল্লেন,
আমি বল্লেম, এই সেবিকাকে আবাব আদর। পায়ে
একটু আলতা পরাতে বসে সে কথা ভুলে গেছি, এই
আমার সেবা, আর তার জন্যে আবার আদর ?”
তিনি হেসে হেসে আমার চিবুক ধবে বল্লেন “রাই, আমি
আলতা চাই, না তােমার মনটা চাই ?” আর এক
দিন স্বপ্নে দেখলেন, আমার কাছে তিনি দাডিযেছেন,
৩৪
* কানুপবিবাদ »
তােৰা এসে কেউ ফাগ ছড়াচ্ছিস, কেউ চামৰ ব্যজন
কচ্ছিস,কেউ আমাদের যুলেব সাজ পরাচ্ছিস, ললিতা
দুষ্ট মেযে, সামনে না এসে পুষ্পবাটীর আড়াল
থেকে সুগন্ধি কুঙ্কুম আমাদের বুকে ছুঁড়ে মারছে,
বঙ্গদেবী খর্ব ছন্দ, ধীরগতি সে আস্তে আস্তে সােনার
দীপে ঘিযেব বাতিটা জ্বালিয়ে আমাদেব মুখ দেখছে
অপাঙ্গ দৃষ্টিতে, আর মৃদু মৃদু হাসছে—তাব গায়ে লাল
সাড়ী দীপের আলােতে ফাগের মত উজ্জ্বল হয়ে
উঠছে—সবাকাব যে কি আনন্দ তা আব কি বলব ।
আব একদিন স্বপ্নে দেখলেন, যমুনার পারে, কামু
বাঁশী হাতে দাঁড়িয়ে আছেন—যমুনা নদীটা—সমস্ত
আকাশটা যেন তার কালো রঙ্গের প্রতিবিম্বেব মত
ৰূপে ঝলমল কচ্ছে,--তার কপালে চন্দনের
বেখাটা যেন তৃতীযার চঁাদ হয়ে যমুনার এক প্রান্তে
দেখা যাচ্ছে, তার রক্ত অধর যুগলের ছটায় যমুনা
নদীতে প্রবাল উজ্জ্বল বক্তিম হয়ে উঠেছে,তার
পায়ের প্রভা লয়ে যেন যমুনার জলে রক্ত-শতদল
ফুটে উঠেছে—আমি স্বপ্নেই যেন ভাবছি, ঘুম যেন না
* কানুপরিবাদ *
ভাঙ্গে,-গোপিনীরা যমুনায় জল নিতে এল, আমি কি
করে নিলজ্জার মত তার মুখের দিকে তাকিয়ে
থা-যমুনার জলে যে কালেরূপের প্রতিবিম্ব
পড়েছে—তাই দেখতে লাগলেম, অপলকে দেখতে
লাগলেম। কলসী কাখে ‘নবমল্লিকা সখী জল নিতে
এল, আমি জোর হাত করে তাকে বল্লম :-
“ঢেউ দিও নাজলে শুন নৰ্ম্মসখি,
দরশনে দাগা দিলে হবে পাতকী।”
এই বলে যেন লজ্জায় মরে গেলেম, সখীব
কাছে হঠাৎ মনের ভাব ধরা দিয়েছি।
তারপর স্বপ্ন সত্য হল। তিনি যেদিন আমার
নাম ধবে বাঁশী বাজালেন, সেদিন আমায় আর
রাখে কে? বুঝলেম, স্বামী, ননদী, শাশুড়ী, পিতা,
এরা সেই বাঁশীর সুরে সাড়া দেওয়া শিখাতে
এসেছেন—এই সুবে যিনি বাধা দেবেন, তিনি আর
আমার কেউ নন। তারপর কত মিলন হ’ল,—তাকে
পেয়ে জীবনে ধন্য হয়েছি।
আজ সকালবেলা তিনি যখন গােঠে যান,
1
ঢেউ দিওনা হলে শুন নম্মসখি ।
দরশনে দাগা দিতে হবে পাতকী।”
( পৃ: ৩৬
No text on this page.
* কানুপরিবদ * দেখলেম চারদিকে রাখাল, মাঝখানটায় রাখালরাজ, তার মযুর পুচ্ছে সূর্যের কিরণ খেলছে, তার পায়ের নুপূবেব ৰুণুৰুণু শুনতে পাচ্ছি—কিন্তু আমার চিব- পিপাসিত (চাখ দুটি তাকে দেখতে পেল না, তার সঙ্গে দাদা বলাই ছিলেন, আমি লজ্জায় চোখ চেযে দেখতে পেলেম না,--বড় আশায় সেই মযুর পুচ্ছ দেখেছিলেম, চাদ মুখ দেখব বলে উকি মেরে চেয়ে- ছিলেম, কিন্তু চোখ দুটি নত কবে রইলেম তাবপরে একটু থেমে যেমন বীণা বেজে ওঠে, তেমনি থেমে পুনরায় বল্লেন—তাকে ভাল বেসেছি বলে গুরুজনেব। আমায় ত্যাগ কবেছেন। তাঁরা ত্যাগ কবেছেন বলে আমি তাকে বেশী করে পেয়েছি, আমার শাশুড়ী ও ননদী আমার কলঙ্ক বটাচ্ছেন- তাই তঁাকে আরও বেশী কবে পেয়েছি। আমাকে তারা যত খাট কবে দেখছেন ও দেখাচ্ছেন, আমাৰ প্রেম ততটা বড় হয়ে উঠছে—আমি ততই তাব নিকটতর হচ্ছি। এই সংসার নিন্দার ঢেউএ আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে তঁাব আশ্রযের পাদপদ্মের ৩৭ * কানুপরিবাদ * দিকে ঠেছে-এই নিন্দায় আমার দুঃখ করবার কিছু নাই—যা পৃথিবী থেকে সরিয়ে তার কাছে নেয়, সেটা আমার কলঙ্ক না গৌরব ? আমি এই কলঙ্কই চেযেছিলাম, সংসাবেব কাছে ছােট হয়ে তার বেশী কাছে থাকব—এই তো চেযেছিলেম, বাইরের সঙ্গে গােলমাল যত কমবে তার সঙ্গে আমার নিবালা কথা তত জমবে, এই ত চেয়েছিলাম। বিধাতাকে ধন্য- বাদ দিচ্ছি, তিনি আমার সে ইচ্ছা পূর্ণ কবেছেন, “কানুপরিবাদ, মনে ছিল সাধ, সফল করল বিধি।” এই বলতে বলতে বাই সহসা কেমন করে তাকাতে লাগলেন, হঠাৎ শাস বােধ হলে যেরূপ হয়, নৌকা- ডুবির ঠিক পূর্বে কর্ণধাবে যেভাবে তাকায় সেই ৰূপ অস্থিরতার সঙ্গে তাকাতে লাগলেন। বিশাখা তাড়াতাড়ি এসে তাকে ধবলে—বাই আধ আধস্বরে পাগলিনীর ন্যায় বল্লেন, “নীলমণিকে কোন আঁধার গহববে হারায়ে ফেল্লেম ! ”এই বলে অজ্ঞান হযে তিনি বিশাখার কোলে পড়ে গেলেন।--ঠিক সেই
* কানুপরিবাদ *
সময় অঘাসুরেব মুখে বাঁশীটি হাতে করে কৃষ্ণ প্রবেশ
করেছিলেন, রাই এর মনের দ্বাবে ভয়ানক আঘাত
কবে কে যেন এই কথা বলে গেল—সে কে-
মনের গুপ্ত দূত ?
তডিতেব মত সেকথা চারিদিকে রাষ্ট্র হল, কত
কত ওঝা ও যােগিনী, কত লােক সেখানে এল।
জটিল। বুডি নডি ভর করে এসে চীৎকার করতে
লাগল, কুটিলাব মন সত্যই বউএর জন্য আজ কেঁদে
উঠল, বৈদ্যিবা এসে বল্লে শ্বাস নাই, যােগিনীরা
বলিল শিবের অসাধ্য, ওঝারা ঝেডেপুছে কিছুই
করতে পাল্লে না—সখীদের চোখের জল চোখে
কঠিন হযে বইল, ভাবা শােকে পাথরেব মত হযে
গেলেন।
ধরাধরি করে বাইকে আঙ্গিনায় আনা হল,
তখন কুটিলবও চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল ,
কতনা নিন্দাবাদ করেছিলেম, কে জানে এমন সােনার
প্রতিমা যদি নির্দোষ হয়, তবে আমার অপরাধের
মানা নেই। উনুনের আগুন নিবে গেল, তার
os
* কানুপরিবাদ *
উপর রুটি চড়েছিল, তা পােডা কাঠ হযে গেল,
কে তা দেখে?
চিকিৎসা কবতে যাব এসেছিল, তাবা এবার
বিদায় নিল। বৃন্দা এসে তখন রাই এব মাথা ও
কপাল পরীক্ষা করে বল্ল-“রাই মবে নি, এ ঔষধ
একজন মাত্র জানে।”
“কে সে ?” বলে কুটিলা তার দিকে তাকাল,
জটিল। বুডিব কোটর গত দুই চোখ কৌতূহলী হয়ে
তারার মত জ্বলতে লাগল, ললিত বিশাখা বনদেবীব
মত স্ফুরিতাধরে সেই কথা শুনবার জন্য বৃন্দাব
প্রতি লক্ষ্য স্থির করে রইল। বৃন্দা বল্লে “সে নাম
করতে ভয় হয়, যদি অভয় দেও তবে বলতে পারি।”
কুটিলা চক্ষের জল আঁচলে মুছতে মুছতে বলতে
লাগল, “এই কি ঠাট্টা করবার সময় ?—বৃন্দা, সে
যদি আমাদের সবাইর বুক ছুরি মেরে থাকে—
বউকে বাঁচিয়ে দি—তার সাত খুন মাপ।”
বৃন্দা বল্লেন, “সে কানু—তার নাম শুনে তাে
তােমরা ক্ষেপে যাও, সে মন্ত্র জানে একবার
৪০
* কানুপরিবাদ » নিবালা কাণের কাছে বলেই বাই জ্ঞান লাভ করবে।” কুটিলা বল্লে, “সেই নন্দ-সুতটা, তা এত গুণ- পনা ? বৃন্দা সত্য বলছি ?” বৃন্দা, “কেন দিদি তুমি শােন নাই, কালিদযে বিষজল খেয়ে বাখালেরা মরে গিয়েছিল, কানু মন্ত্র পড়ে কালিয সাপের বিষ ঝেড়ে নিয়ে রাখালদের প্রাণ দিয়েছিল, শোননি সে মন্ত্র পড়ে বাঁশী বাজালে কাৰু সাধ্য নেই ঘবে থাকে, তােমরা মিছে রাইকে দোষ দিচ্ছ—মবা সব্বাই তো সেই বাণীর সুবে ঘবের বার হয়ে পড়ি। বাই যদি দু' একদিন সেই বাঁশী শুতে বনে গিয়ে থাকে, তাতে এমনই কি তাব দোষ হযেছে যে তােমরা তাকে জ্যান্ত মেরে রেখেছ ?” কুটিলাব অনুতাপ বেডে চল্প, সে বল্লে, “আচ্ছা সে তো এখুনি গােঠের ফেবতা এই পথ দিয়ে যাবে, আমি তাকে নিজে শেধে নিয়ে আসব।” ভবপর কামুকে সে শেধে এনেছিল, একা এক ৪১
কানুপরিবাদ *
ঘরে বাইকানু-তাও আবার আযান ঘোষের
বাডীতে, তাও আবার জটিল। কুটিলাব আহ্বানে,
এমন কখনও হয় নি।
রাইএর কর্ণমূলে কানু বল্লেন, “ওঠ” সেই
সঞ্চবনী মন্ত্রটি বলবার সময়, তার মৃদুশ্বাস বাইএব
মুখের উপর পড়েছিল, নিদ্রোখিতেব মত বাই জেগে
উঠলেন এবং বল্লেন, “তুমি এসেছ, আমি দেখছিলেম
যেন একটা প্রকাণ্ড পর্বতেব অতল গহ্ববে তোমায়
কে ফেলে দিল ?”
কামু অঘাসুরের বৃত্তান্তটা বল্লেন, কুটিল। যে
নিজে তাকে নিয়ে এসেছে-শুনে রাই বল্লেন,-
“আমার নিন্দাব কি শেষ হ’ল ? এই নিন্দার প্রাচীর
যে আমাকে সংসাব হতে বাহির করে তােমার
কাছে রেখেছিল। সংসার কি আবার আমায় আদর
দেখিযে তােমার কাছ থেকে কেড়ে নিবে ?”
কানু বল্লেন, “সে হবে না,—জটিলা-কুটিলাব
সরলতা যে মুহূর্তের, তারপর তাদের বিদ্বেষ আবাব
জাগবে—বৃন্দাবনে তোমার আমার কলঙ্ক পতাকা
৪২
* কানুপরিবাদ *
আবার প্রােথিত হবে। এই কলঙ্কের কথা নিয়ে ব্যাস
ভাগবতে লিখবেন, গােস্বামীবা এই কলঙ্ক দিন রাত
স্মরণ করবেন, আর এই কলঙ্ক-পবে পঙ্কজ স্বরূপ
যিনি আছেন, তিনি পবে এক যুগে তােমাকে ও
আমাকে নিজ দেহে অভিনন্দিত করে, কেঁদে কেঁদে
সংসারের দোরে দোবে সেই কথা গাইবেন , কত
মৃদঙ্গের বোলে, করতালেব বােলে,-খঞ্জনীর গুঞ্জনে,
শিঙ্গাব উচ্চতানে, ডনিনাদে, নুপূবেব ঝাবে সেই
কলঙ্ক কথা জগৎবাসীর নিকট প্রচারিত হবে।”
এর মধ্যে সখীরা এসে পড়েছে, তাঁরা উকি মেরে সব
শুনেছে, তঁাবা সমস্বরে বল্লে “সে কৰে ?”
কানু বল্লেন-“যিনি আসবেন তােমরা সবে তাব
অনুচর হয়ে আসবে--কেউ কবি হযে তার আগমনী
গান করবে, কেহ তব চরিতামৃত লিখে ধন্য হবে,
কেউ বা তঁাবে মস্ত প্রেমের আবেগ দেখে হৃদয়খানি
পথে পেতে বেখে তঁাব পদপঙ্কজ ধারণ করবে,
কেউ বা তাকে চামব ব্যজন কবে ধন্য হবে।”
রাই উঠে বসে বল্লেন, “সে দিন আব কি আমি
* কানুপরিবাদ
তােমার বিরহে, তােমার গোষ্ঠের আশঙ্কায় এমনই
কবে ঝুবে মব না, কে যেন মনকে ডেকে বলছে,
সেদিন তুমি আমি এক হয়ে যাব।”
কানু বাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে বল্লেন “ভয কব
না, তােমার কানু-পরিবাদ দূব হবে না। আমি
তােমাকে ছুঁযেছি, কি সাধ্য সংসার আর তােমাকে
ধরতে পারে ? ওগো আজ আমার মা বড় আকুল
হয়ে আমার প্রতীক্ষা কচ্ছেন, আমার দেরী দেখে
অসহ্য কষ্ট পাচ্ছেন, আজ তার কাছে যাই—
অভিসারে যেও।”
সমাপ্ত
শ্যামলীখোঁজ।
তাব গাধা
(১)
আজ কানুকে মা যশােদাব কাছ থেকে গােষ্ঠে
আতে শ্রীদাম সুদামাদিব বড়ই বেগ পেতে হয়েছে।
তার দুটি কারণ ছিল। গতকল্য বলাই দা তালীবনে
কতকগুলি অসুর বধ করেছিলেন।
হয়ে খুব চীৎকার কচ্ছিল এবং দুই পায়ের ক্ষুর দিয়ে
কেবলই বলাইকে লাথি মারছিল। কানাই নিজে
শিং ধরে তাদিকে ছুডে
ফেলবেন এই মনে
করে এগুচ্ছেন, এমন সময় বলাই
এমন সময় বলাই দা চোখ
রাঙ্গিয়ে বল্লেন—“কাক্কা কানাইয—তু-তুই যা
ওদেরে আমি দে-দেখছি।” এই বলে বাঁ হাতটা দিয়ে
কানুকে ঠেলে ফেলে নিজেই অসুর দলন করতে
লেগে গেলেন।
নীলাম্বরপা বলাই রূপার
পাহাডের মত শাদা, মুখখানি যেন শ্বেতপদ্ম, ক্রোধে
দুটি চোখ রাঙ্গা, তার উপর কালো ভ্রমর-পংক্তির
৪৫
* শ্যামলীখোজা *
মত
। তিনি সেই যুগল ধনুকের মত বঁকিয়ে
এক একটা অসুরের পা ধরে আকাশে ছুড়তে
লাগলেন, তাব। লাটিমের মত ঘুরতে ঘুরতে তাল
গাছের উপর পড়ে একটা একটা করে মবতে
লাগল। আর বলাইদা নীল কাপড়ের বাঁধ কটি
থেকে খসে পড়েছে, শিঙ্গাটা পাযের নীচে গড়াগড়ি
যাচ্ছে, একেবাবে দিগম্বর হ'যে তিনি রণবঙ্গে মেতে
গেছেন।
সন্ধ্যাকালে অসুর বধ করে যখন ফিরে এলেন,
তখন বেহিণী তব গাময় খুরের দাগ দেখে কাঁদতে
কাঁদতে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। শাদারঙ্গে
খুরের ঘায়ে মাঝে মাঝে রক্ত ফুটে উঠেছে, শাদ।
পদ্মের বক্তিমার মত শোভা পাচ্ছে। বলাইদা
মায়ের হাতের শুশ্রষা পেয়ে আরামে এসে শুযে
পড়লেন, কিন্তু ঘুমােবার আগে বেশ করে অনেক
খানি বাণী পান করে শ্রান্তি দূর করে ফেল্লেন।
বাকণী পানে সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গল না,
সুতরাং কানাইকে যশােদা কার হাতে সঁপে দেবেন?
৪৬
* শ্যামলীখোজা *
গত কল্যব অনুরের কথায় মায়ের মনে ত্রাস
হয়েছিল, তার উপর এক। বলাই ছাড়া কাকে বনে
পাঠাতে তার কিছুতেই সাহস হচ্ছিল না।
আব একটা কারণ ছিল, যশােদা স্বপ্নে দেখে-
ছিলেন, যমুনার জল যেন গাঢ় নীল হয়ে গেছে
ঢেউগুলি আকাশ ছুঁয়ে উঠেছে এবং কানু সেই
জলে ডুবে গেছেন।
তানেক্ষণ কথা কাটাকাটি হল। যশােদা কানুকে
আগলে ধবে বাখতে জানেন, বাখালেরা আবার
তেমনই নাছোড় বান্দা। এ পক্ষের চোখের জল,
এপক্ষে মিনতি, ওপক্ষের অনিচ্ছা, এপক্ষের পায
ধবা, ওপক্ষের হানাডা--আঙ্গিনায় তো বােজ রােজই
এরূপ ঘটে থাকে এবং যশােদা কোনো দিনই শেষ
রক্ষা কতে পাবেন না। আজও পালেন না-শেষে
আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে কানুকে সাজিয়ে সুবলের
হাতে হাতে দিতে হ’ল। অনেক রক্ষা মন্ত্র পড়লেন,
অনেক রকম ধান দূর্বা, হাতে রাখী বাঁধ, মাথায়
দিয়ে জপ করা, দেবতাদেরে ডেকে ডেকে কামুকে
৪৭
* শ্যামলাখোজা ৬
তাদের হাতে সঁপে দেওয়া প্রভৃতি শেষ হলে—শিঙ্গা
বেনু রবে পাঁচনবাড়ী ঘুণের সঙ্গে
লাল নীল
নানারূপ ধটী পবা রাখালদের—মধ্যে—তাদের গান
গাওয়া, লাফঝাপ, চীৎকারের সঙ্গে সঙ্গে শিখিপুচ্ছের
চূডা দোলাইয়া অলকা-তিলক। চিত্রিত কপালেব
শােভা দেখিযে, পায়ের নূপুবেব কনু কনু শব্দে
মুনি-ঋষিদের ধ্যান ভঙ্গ করে, আহলাদে ডগমগ
শ্যামলী ধবলী প্রভৃতি ধেনুগণকে মনভুলানো
বাঁশীর রবে মুগ্ধ ও যন্ত্রবৎ চালিত কবে—কামু
বৃন্দাবনের মাঠের দিকে চলেন।
(২)
আজ একটা নূতন জায়গায় যেয়ে নূতন খেলা
খেতে হবে, রাখালরাজ এই মতলৰ দিলেন।
রাখালেরা আনন্দে পূব দিকে চলতে লাগল । যতই
এগিয়ে যাচ্ছেন, কানাই এর মনে হচ্ছে কোন ভক্ত
তার পাদপদ্ম ভক্তির শেকল দিয়ে বেঁধে টানছে,
কে যেন তার জন্য কেন্দে আকুল হচ্ছে। সুতরাং
৪৮
* শ্যামলীখোজা *
তিনি সেই দুর্গম স্থানে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ
কবলেন না—বাখালেরা তার পিছু পিছু নির্ভায়
চলতে লাগল ।
একটা জায়গায় বাখালেরা দেখতে পেল,
দূর্বাদল যেন শুকিয়ে যাচ্ছে, তরুপল্লব ক্রমশঃ
বিরল হয়ে পড়ছে-রৌদ্রের তেজ দুঃসহ
উঠছে—তার মধ্যে একটা জ্বালা বােধ হচ্ছে,
বাযু যেন আগুনের হল্কা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সবল
ভে কামু ভাই, কি খেলা খেবি ?
কানাই বল্ল “অয আগে গেড়, খেলে নি”,
গেডু খেবার জন্য সবাই ফুলের সন্ধানে ছুটল,-
আশে পাশে দূরে একটা ফুলও নেই ,
বল্লে “চল মযুব নাচ নাচি”—মযুর যখন পেখম
তুলে নাচে, তখন বালকেরা কেহ তাদের পিঠে-
দোলান নীল কাপড়, কেউ লাল উর্ণি, কেউ পীত
আঁচল উধাও কবে মযুদের সঙ্গে নাচতে থাকে।
কিন্তু ময়ূব-বহুল যমুনাতীরের এ জায়গায় একটা
একন
মযুরও নাই।
৪৯
* শ্যামলীখোজা
অন্যদিন তার ভ্রমরের মত গুঞ্জন করে,
কখনও বা মর্কটদের দাত vিচুনি দেখে তাদেব দাঁত
বের কবে ভেচায় , কখনও বা তাদের সঙ্গে
গাছের ডালে ডালে লাফাতে থাকে।
থাকে। কিন্তু
আজ না আছে ভ্রমর, না আছে মর্কট, হঠাৎ
ছেলেরা বুঝলে—এস্থান যমুনার তীর হয়েও ভিন্ন
রকমের, তাদের প্রাণ ত্রাসে শুকিয়ে উঠল।
যখন ছেলেরা খেলার মত কিছু না পেয়ে কৃষ্ণের
ছেড়ে যাবার পূর্বে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “হবে
তাের নূতন খেলা কি?” তখন কৃষ্ণ হেসে বলেছিলেন,
“দেখবি এখন—সে মরা বাঁচার খেলা।” ছেলেরা
এ কথার অর্থ
বুঝতে
পারেনি। তারা এ ওর মুখ
চাওয়া চাই করে ঠিক কল্লে “কানু ঠাট্টা কচ্ছে।”
তখন সুদাম রেগে উঠে
বেনুটা বাম হাতে ধ'রে,
ডান হাতটা খুব নাড়া দিয়ে বল্পে—“সে হবে না
বাপু, আমরা সব খুঁজে খুঁজে মরছি, আর কানাই
তুমি হেসে হেসে ঠাট্টা কচ্ছ। গেছুই খেলব—ফুল
নিয়ে এস, আদুরে কানাই—যে অবধি ফুল না
শ্যামলীখোজা *
পাবে—সে অবধি ঘুরে মর গে, এখানে আসতে
হবে না। অজানা পথে এনে আমাদের উৎসবটি
মাটি করবে, সেটি হতে দিব না।”
ইতিমধ্যে তারা দেখলে কৃষ্ণ নাই, কৃষ্ণ বাঁশী
বাজাচ্ছিলেন এবং ফুলের সন্ধানে অনেকটা পথ ফিরে
গিয়েছিলেন, এমন সময় পথে রঙ্গদেবীর সঙ্গে দেখা
হ’ল। বঙ্গদেবী তার কানে কানে কি বলে, তিনি
সমস্ত ভুলে, বাখালদের ভুলে-ভক্তের আহ্বান
ভুলেরইএর মান ভাঙ্গতে চলে গেলেন।
কানাই পশ্চিম দিকে যাবটের পথে চলে গেলেন।
কানাইএর স্নিগ্ধ বর্ণে রাখালেবাগকগুলি
পৰ্যন্ত-সকল জ্বালা ভুলে গেছিল। কানু চলে
গেলে তারা সেই জায়গায় অসহ তৃষ্ণা ও দৈহিক
জ্বালা বােধ কতে লাগ্ল।
এর মধ্যে মধুমঙ্গল বল্লে “আমার শ্যামলী
গরুটা পাওয়া যাচ্ছে না, খুঁজতে খুঁজতে হয়রাণ
হলেন। ঐ দ্যাখ না বাছুরটা মাকে কি রকম
ব্যাকুলভাবে খুজছে। হাম্বা রব করে মাকে
* শ্যামলীখোজা ** মাঝে আমার ধরাটা মুখ দিয়ে টেনে ধছে, যেন বলতে চাচ্ছে ওর মাকে আমি খুঁজে বের করে দেই।” সকল রাখল একত্র হযে শ্যামলীর সন্ধানে ছুটল। তাদের সঙ্গে সঙ্গে আর আব গাভীগুলিও ছুটল।—ক্ষুৎপিপাসায় দগ্ধপ্রায বাখালেরা নিজেদের তৃষ্ণা ভুলে গরুগুলিকে জল পান করাতে ব্যস্ত হয়ে ছুটল।শ্যামলীকে পাওয়া একান্ত দরকার, তারা উদ্ধ মুখে ছুটেছে। কানাই কোথায় গেল, বলাইদ। আজ আসে নি,একাকী নিঃসঙ্গ, তকগুল্ম হীন বাজ্যে তাব। হাঁফাতে হাফাতে চলেছে। কেমন একটা অজানিত- ত্রাসে তাদের বুক দুরুদুক করে উঠছে। যতই এগুতে লাগল, ততই তাদের ভয বেডে চল্ল। পথের মাটিতে একটি ঘাসের শিষ নাই, একটি গাছ নাই, পৃথিবীর শ্যামল ছবি যেন মুছে গেছে। আকাশ ধূসর বর্ণ, কোনখানে একটা পাখী গায় না, সূৰ্য্য দিগদিগন্তে রক্ত-চক্ষের মত চাইছে, প্রকৃতির সমস্ত ঐ যেন ভয়ে সেস্থান হতে চলে গেছে।
* শ্যামলীখোজা *
যমুনার পাড়ে নীপকুঞ্জ, কুকুঞ্জ, গুঞ্জাকুঞ্জ,
সেফালী, স্থলপদ্ম রজনীগন্ধার মেলা-তাদের উপর
রং বেরং প্রজাপতির উজ্জ্বল পাখা সােণা-রূপা-
মােড়ানাে পাতের মত ঝকঝক করে থাকে, তাদের
পাশে ইন্দ্রধনুর বর্ণ পাখায় একে মযুব নৃত্য করে;
কোকিল পাপিয়ার অশ্রান্ত ডাকে প্রাণ প্রফুল্ল
হয়—কিন্তু এখানে তাহার কিছুই নাই।
যমুনা দূরে দেখা যাচ্ছে, এখানে যে ভয়াবহ মৃত্তি
প্রকট করে ধরিত্রী সবাকার ত্রাস জন্মাচ্ছেন।
তা ছাড়া বাযু কি একটা জ্বালা দিয়ে গা যেন
পুড়ে ফেলছে। চোখ মুখ পুড়ে যাচ্ছে, রাখালদের
চোখ সেই শ্যামৰূপের সন্ধান খুজতে লাগল, যা
তাদের তৃষ্ণা ভুলায়, সকল জ্বালা জুড়িয়ে দেয়।
তারা এত নাচতে গাইতে জানে, এত খেলা
জানে, তাদের স্মৃর্তির অবধি নাই। কিন্তু তারা আজ
বুঝল, কৃষ্ণ ছাড়া তারা কায়ছাডা ছায়ার ন্যায়।
তাদের মুখ শুকিয়ে গেছে, শ্যামলী কই ? কোন
কংসের চরের এ মায়া ? কোন রাক্ষস শ্যামলীকে
* শ্যামলীখোজা * চুরি করে নিয়েছে ? কানু কানু বলে তারা ডাকতে চাইল, কিন্তু তালুকণ্ঠ শুষ্ক—সে নাম অস্ফুট হয়ে বাহির হল। গরুগুলি আর চলতে পারে না— তারা এদিক ওদিক চেযে কৃষ্ণৰূপের সন্ধান করতে লাগল। আর একটু দূর এগিয়ে তারা দেখতে পেল, অদূবে যমুনা,নীল জল গাঢ় কৃষ্ণাভ, তথাপি সেই এল দেখে তাদের প্রাণ এল। শত শত শুকণ্ঠ তৃষ্ণা মিটাবার আশায় সেই জলের দিকে ছুটল। গকগুলি প্রায় ভূঞে পড়েছিল—উঠবার সামর্থ্য ছিল না, তথাপি সেই কালো জল দেখে তারা উদ্ধ- পুচ্ছ হয়ে ছুটল। যমুনার তীরে এসে রাখালেরা ও গরুগুলি জ্ঞান- হারার মত জল পান কবলে। জল খেল না তিক্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ খেল। অমনি মর্মান্তিক যন্ত্রণায় তার কানু কানু করে চীৎকার করে উঠল—শেষবার বহু চেষ্টায় তাদের মুখ হতে কার নাম বেল, তারা পাড়ে শুয়ে ছটফট করতে লাগল। কামু ৫৪
* শ্যামলীখোলা *
কোথায-“ভাই একবার এসে ছুয়ে যা, মবাব
সময় একবার তেব মুখখানি দেখিয়ে যা”—এই বলতে
বতে তারা বিষ জল পান করে প্রাণত্যাগ কল্লে।
যমুনার পাড়ে কালো, সাদা, গোর বিভিন্ন
বর্ণের মূর্তি তৈরী করে, কোন্ কুম্ভকার সূর্যের কিরণে
সে গুলির রং শুকোতে রেখে গেছে ?
দেখতে
দেখতে গৌর, সাদা, বং এমন কি কাপডের পীত,
নীল, সাদা সমস্ত রং মিলিয়ে গেল। যাকে তারা যমুনা
বলে ভুল করেছিল, তা যমুনার একাংশে কালীয়-
হ্রদ। বিষের জ্বালায় তাদের রং সমস্ত কালো হয়ে
গেল, কৃষ্ণের ন্যায় কৃষ্ণত্ব পেয়ে শত শত রাখাল
কালাে হয়ে সেইখানে পড়ে রইল।
গরু বাছুব-তাদেরও রং বদলিয়া গেছে।
রঙ্গিয়া বিষের জ্বালায় কালো হয়ে গেছে। শ্যামলীকে
খুজতে খুজতে তারা সবাই যেন শ্যামল হয়ে গেছে।
(৩)
এদিকে রাধার মান ভেঙ্গে কৃষ্ণ ছুটে আসছেন—
রাখালদের মৃত্যুকালে তারা কানু' বলে ডেকেছিল,
* শ্যামলীখোজা *
তার অন্তরাত্মা তা শুনতে পেয়েছে, তার চোখ
দুটি জলে ভরে গেছে। পীতধরা ও ময়ূরপুচ্ছ উলট
পালট হয়ে গেছে।
সেই ধূসর, প্রতপ্ত, বিষদগ্ধ দেশ কানুর আগমনে
শান্তভাব ধারণ করল, তঁার শ্যাম অঙ্গের ছটায়
নির্জন প্রদেশটা ঝলমল করে উঠল।
তিনি এসে দেখলেন, “যেন কনক পুতলী, পডি-
য়াছে ঢলি”—সেই চির-হস্যময়, প্রফুল্ল, ক্রীড়াশীল
কুঞ্জে কুঞ্জে স্বচ্ছন্দ বিহার,
তার চিরানুগত—তার
প্রাণাপেক্ষা প্রিয় রাখালের মরে কালো হয়ে
গেছে, “সেই স্ফুট চম্পকদল-নিন্দিত উজ্জ্বল তনু
আভা” সুদামকে আর চেনা যায় না। মধুমঙ্গলের
তুষারকল্প শুভ্রবর্ণ কে যেন কালো রং দিয়া ঢেকে
রেখেছে, তার বুকে “গাে-ছাদনে” পীতবর্ণ দডিটা
পৰ্য্যন্ত কালো হয়ে গেছে।
(৪)
তিনি খানিক স্তব্ধ হয়ে দাড়ালেন-তারপর
প্রসন্ন দৃষ্টিতে গরু ও রাখালদের দিকে তাকালেন।
+n*12-1 39,"-"te
No text on this page.
* শ্যামলীখোজা * তার দৃষ্টিতে সুধাবৃষ্টি হ’ল, সেই দৃষ্টির সঙ্গে তার কৃপা বিতরিত হল,—সেই মৃতের রাজ্যে তার দৃষ্টি অমৃত দান করলে। শিখিপুচ্ছ হেলিয়ে মুক্তা ও গুঞ্জা ফলের হার দোলাইতে দোলাইতে, ঘাড় নেড়ে নেড়ে তিনি যার দিকে চাইলেন, তারই চোখ খুলতে লাগল, প্রভাতাৰুণের রেখা স্পশে যেরূপ রাত্রির আঁধার ঘুচে যায়, তার প্রসন্ন দৃষ্টিতে সেইরূপ তাদের অঙ্গের কালিমা দূর হতে লাগল। নিদ্রোখিতের ন্যায় তার। উঠে বসে দেখল, সম্মুখে নীলাম্বর সুন্দর-তনু কানু। তাদের কণ্ঠের তৃষ্ণা দূর হ’ল—তাদের চোখ জুডাল, তারা সজল চক্ষে কানুকে দুইবার জন্যে, বুকে ধ- বার জন্য এগিয়ে এল। কামু বল্লেন-“এখানে একটা দুষ্ট সাপ আছে, আমি তাকে তাডাব, তােমরা এখানে অপেক্ষা কর, ভয় কর না,” এই বলে প্রত্যেককে আলিঙ্গন করে, একটা কদম্ব বৃক্ষের উচ্চ ডালে উঠে পড়লেন। সেই নিশুরু দেশে ঐ একটি মাত্র কদম্ব গাছ গোলাকৃতি শুভ্র মিশ্র হরিদা বর্ণের প্রফুল্ল ফুলগুলি ৫৭
* শ্যামলীখোজা *
দেখিয়ে নয়নাভিরাম হয়ে ছিল। গরুড যখন অমৃত
ভাও য়ে স্বর্গ হতে যাচ্ছিলেন—সে বহু যুগের কথা,
তখন বিশ্রামের জন্য একবার সেই গাছটার উপর
বসেছিলেন।
অমৃত ভাণ্ডের স্পর্শ পেয়ে নীপতৰুটি
অমর হয়ে আছে। তাই গাছটা বিষে জ্বলে যায় নি।
সেই
বৃক্ষে
উঠে
কানু মল্লবেশে মালসাট দিয়ে
কালীয়দের মধ্যে ঝাপ দিয়ে পড়লেন,—তাব
আগমনে সেই স্থানের বায়ুমণ্ডল শুদ্ধ হয়েছিল,
এবং বিষজজ্জবিত বসুধা বিষশূন্য হয়েছিল। সুতরাং
রাখালেরা সুস্থ হয়ে কামুকে একলক্ষ্যে দেখিতে-
ছিল। কালীয়দ কানুকে বুকের মধ্যে পেয়ে
পর্বতপ্রমাণ ঢেউ নিয়ে আন্দোলিত হয়ে উঠল।
এ পর্যন্ত হ্রদল বিষদগ্ধ হয়েছিল—তার বুকের
জ্বালা বুকে করে স্তব্ধ ও অনড়ভাবে ছিল। আজ বহু
যুগ পরে এই প্রকাণ্ড হ্রদজল প্রীতির মূর্তিকে পেয়ে
আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। দিকবিদিগে ঢেউগুলি
আনন্দে গড়াগড়ি দিতে লাগল। কোন ঢেউ সূৰ্যেৰ
কিরণে কম
কছিল, কোন ঢেউ ফেণা
৫
১৮ শ্যামলীখোজা
বের করে গুমরিয়া মবছিল, কোনটি বিষেব
জ্বালায় ছটফট কবছিল—কোন
ঢেউ
নীরবে
প্রস্তরখরে
মত স্থির
হয়ে ছিল—কিন্তু আজ
শুভ্রতা লাভ কবে—সমস্ত বৈষম্য দূর হয়ে
ঢেউগুলি আলাদে নেচে উঠল, সমস্ত হ্রদ দুলে উঠল,
সেই সাগবােপম বৃহৎ কালীযহ্রদেব জল—শত শত
ক্রোশ ব্যাপিয়া আনন্দে ঝঙ্কার করে উঠল। কালীয়
নাগের প্রভুত্ব যেন আর মানবে না, তার উদ্যত বড়
মাথায় পড়লেও না। আজ মুক্তিব কোলাহলে
তবঙ্গের পর তবঙ্গ অবাধ গতিতে ছুটল।
(৪)
হ্রদেব ভিতরে কালীয় হঠাৎ তরঙ্গের আন্দোলন
বুঝে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে খানিকটা চুপ করে
ডাল , তার পর বাগে তার রক্তচোখ আরো
রাঙ্গিয়ে গেল, তীক্ষ দন্ত হতে বিষস্রোত প্রবাহিত
হ’তে লাগল। কিন্তু কোন্ অদৃশ্য শক্তিতে ঠেকিয়া
সেই বিষস্রোত হ্রদের জল আর কলুষিত করতে
* শ্যামলীখোঁজা *
পাল না, পুঞ্জীভূত বিষরাশি কালীয় নাগের পার্শ্বে
শুধু পৰ্বতবৎ জড় হতে লাগল।
শত শীর্ষ লয়ে সর্পরাজ দারুণ ক্রোধে উর্ধদিকে
উঠতে লাগল, তার মুখে জগৎধ্বংসকারী হলাহল,
তার লেজে বিষাক্ত হুল,-এই লয়ে সে হ্রদের
উপরিভাগে অতি ভীষণ ভাবে জল আলােড়ন করে
উঠে পড়ল। কামুর দিকে সে এগুচ্ছে দেখে
রাখালদের প্রাণ ত্রাসে উড়ে গেল, তারা অস্ফুট
চীৎকার কবে মূৰ্ছিত হবার মত হ’ল ।
কানু বল্পে—“এস কালীয়, আমি তােমাকেই
চাই, তােমার বিষাক্ত বেষ্টনকে আমি ভয় করি না।
তুমি দুষ্ট—আমি তােমাকে এস্থান হইতে তাড়াব।
যমুনা-তীর এই বৃন্দাবনের রাজ্য আমার, এখানে এত
দিন তুমি অধিকার করেছিলে—এই ঢের, আর পারবে
না।” এই কথার উত্তর না দিয়ে সর্পরাজ তার
বিশাল দেহ দিয়া কৃষ্ণকে জড়িয়ে ধরে ক্রমশঃ হ্রদের
নীচে যেতে লাগল। তখন রাখালেরা হাহাকার করতে
লাগল,ক্রমে ঐ যে কামু অলকা তিলকারঞ্জিত
* শ্যামলীখোলা *
নীলােৎপলনিন্দী মুখখানি কালীদহের জলে ডুবে
গেল—কেবল তাব শিখিপুচ্ছটা শান্ত নীলরঙ্গের
শােভা দেখিযে তখনও একটু দেখা গেল-মূহুৰ্ত্ত
পবে একটা ঢেউর নীচে ওটিও ডুবে গেল।
তখন কেন্দে কেন্দে সুবল সখা বল্লে-
“চল চল গৃহে চল—আমরা বলিগে
মায়েরে গিয়ে,
তোব অঞ্চলের মণি, শুন গাে জননী
এলেম ভাসিয়ে দিয়ে।
ব্রজকুল শশী অস্ত হ’ল এত দিনে
ও ভূবন শূন্য হল
আর আমবা থাকিব কি নিয়ে।”
(৫)
যখন কৃষ্ণ কালীদহের জলে ডুবে গেলেন, তখন
বৃন্দাবনে ঘন ঘন ভূমিকম্প হতে লাগল। অকস্মাৎ
পথিকেরা পথ ভুলে বিপথে যেতে লাগল। মাতা
ছেলেকে শুন্য দিতে গিয়ে তাকে কোল হতে
* শ্যামলীখোজা *
আছড়ে ফেল্লেন। পত্নী স্বামীকে ভাত দিতে গেছেন,
হঠাৎ হাত হতে থালা ফেলে দিলেন। ঘন ঘন
উল্কাপাৎ হতে লাগল। ব্রজের সূৰ্য্য নিবে গেল ।
বল্লরীর গায়ে যে নানা রঙ্গের ফুল ফুটেছিল, তা
কিশােরীদের কচি মুখের মত শুকিয়ে গেল।
আকাশে একটা বিপুল কান্নার রব শােনা গেল ।
বিনা কারণে নর নারীর চোখের জল পড়তে লাগল।
যশােদা ও নন্দ পাগলের মত হয়ে যমুনার তীর
খুজতে লাগলেন, এবং রাখালদেব পদাঙ্ক ধরে ধরে
যেয়ে কালীদহের পাড়ে উপস্থিত হলেন, তাদের
পেছনে সমগ্র ব্রজের লােক।
সেইখানে শিশুরা কাদছিল-সর্বস্ব ডুবে গেলে
যেরূপ সমুদ্রগামী বণিক মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে
থাকে, তারা সেইভাবে কাদছিল। তারা কালিদহের
জলে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ দিবে। কিন্তু তাদের সব
আশা নিবে গেছে, বলাইদা যখন-এ কথা ববেন
তখন তার মবে,—তার আগে নয়।
সেই কালিদহের তীরে তখন একটা ভীষণ কান্না-
* শ্যামলীখোলা * কাটির রােল, কানুকে ছাড়া ব্রজধাম, সে যে কি তাহা কে বুঝাবে। কার কথা বল্, যশোদা দেখলেন,—ব্রজের শিশুরা ও মায়েরা সকলেই তার মত, কানু তার একার নয়, সকলেরই। লাঙ্গলটার উপর ভর দিয়ে ডান হাতে সিঙ্গাটা ধরে বলরাম দাড়িয়ে। সবাই কাদছে, হাহাকাব কবছে-কিন্তু বলাই নিঃশব্দ, তার মনেও অবিশ্বাসের ছায়া এক এক বাব পড়ে শ্বেতপদ্মের উপর যেন নীলােৎপলের বর্ণ ফলাচ্ছে, কিন্তু সে মহূর্তের জন্য। বলদেব পরক্ষণেই ভাবছেন,-“ধিক আমায়। আমি অবিশ্বাস কচ্ছি, প্রেম-ধৰ্ম্ম যা দিয়ে বৃন্দাবন জগজ্জয়ী হবে, তার উপর অপ্রত্যয় হচ্ছে। আসুরবল দেব- বলকে ভয় দেখাচ্ছে । এ কখনই সম্ভব নয়, কামু যে ফুলদল দিয়ে শাস্মকীতক কাবার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। প্রীতিদ্বারা হিংসাকে, বিবাগ দিয়ে ভােগকে, দৈন্য দিয়ে অহংঙ্কারকে, বিশ্বাস দিয়ে দুর্জয় অবি- শ্বাসীকে দলন করবে বলে এসেছে। আসুরবলের ব্যাপকতা, দুর্লংঘ্য শক্তি দেখে যদি প্রীতি ভয় পায়, * শ্যামলীখোলা * তবে কি করে আর জগতে ফুল ফুটবে, পাখী গাইবে? বৃন্দাবন যে তা হলে ব্যর্থ হয়ে যাবে—মাথার উপর বজ্র আছে মনে করে কেউ আর হাসতে পাবে না- মৃত্যু সবার সামনে দাড়িয়ে—এই দেখে মা তার, শিশুকে চুম খাবে না—ভীষণ ব্যস্থ যে গাছটায় গা ঘেঁসে আছে, তার উপরকার ল পুঞ্জ পুঞ্জে ফুল আর হেসে হেসে ফুটতে পাবে না পৃথিবীর সব রস যে তা হলে শুকিয়ে যাবে। মুহূর্তকাল বলাইদা ধ্যানস্থ হয়ে চুপটি করে রইলেন—শেষে বল্লেন, “আমি অভয় দিচ্ছি, কানুর একটি নষ্ট করতে পারে, এরূপ পাশব বল জগতের কোন- খানে নেই, তােমরা ভালবাসতে জান কিন্তু বিশ্বাস করতে জান না। আর একটু আর একটু থেমে উৎসাহে বল্লেন-“তো-তােমাবা ভয ক-করো না, আমি-- কবছি, আমি যখন শি-শিঙ্গা বাজাব, তখন কা কা কানাইয়া আসবে, সময় হলে আমি শিশিঙ্গা বাজাব।” বলাইদা একটু তোলা ছিলেন, তার উপর বানীর প্রভাবটা তখনও একেবারে যায় নি। ৬৪
* শ্যামলীখোলা *
(৬)
কংস রাজার সভায় দুরন্তনাগ আহুত হযেছিল,
সে আজ ফিরে এসেছে, রাজসভায় দুরন্তনাগ যে
সক কথা বলিতেছে, যবনিকার আড়াল থেকে
মহারাণী অরুপ কালীয় রাজার স্ত্রী) তা শুনছেন।
দুরন্ত বল্ল “কক রে শক্তি যা দেখলেম।—তা অসীম,
দেবগণ তঁাব ভয়ে কাঁপছে। অথচ কংস-মহাবাজকে
খুবই উদ্বিগ্ন দেখলেম।” কালীয়-রাজাকে সম্বােধন
করে দুরন্ত আবার বল্লে, “মহারাজার সঙ্গে একটা সখ্য
সম্বন্ধ স্থাপন করতে কংস খুব উৎসুক, রামকানু নামে
দুটো গয়ালার ছেলের ভয়ে রাজা অস্থির। কামু
অংকুর ঘরে থাকতে পুতনা রাক্ষসীকে মেরে ফেলে-
ছিল, মহারাজার দাতের একটু বিশ সে তাে শুনে
মাখতে চেয়ে নিয়ে গেছিল, -কানুটা নাকি সেই
বিষ সমেত স্তন চুষে তাকে মেরে ফেলেছিল।”
বাধা দিয়ে কালীয় রাজা বল্লেন, “কখন ও নয়,
সে নিশ্চয়ই আমার বিষ হারিয়ে ফেলে আর কিছু
শুনে মেখে গেছিল। আমার বিষ জগতে কখনও
* শ্যামলীখােজা *
ব্যর্থ হয় নাই। অপগণ্ড শিশু তাই মুখে দিয়ে
বেচে থাকবে—তা দেখলে ও বিশ্বাস করি না। অন্য
সর্পের বিষ রক্তের সঙ্গে সংযোগ হলে কাজ করে,
কিন্তু আমার বিষের হাওয়া লাগলে মানুষ ঢলে
পডে। যা হােক তুমি বলে যাও
দুরন্ত পুনরায় বলতে লাগল—“তারপর রামকানু
ক্রমশঃ বড় হচ্ছে এবং তারা অসুর বকা,
তৃণাবর্ত প্রভৃতি কংসের রাক্ষসদিগকে মেরে সাবাড
কচ্ছে। কংস এজন্য মহারাজার সাহায্য চাচ্ছেন।”
কালীয় সাহায্য চাচ্ছেন, সাহায্য দেব। দুরন্ত,
তুমি আজ তাকে জানিয়ে এস, দুইটা কেন সবগুলি
গয়লার ছেলের শব তিনি এসে শীগগির দেখতে
•াবেন। শুনেছি সে কানু চোর নাকি শীঘ্র আমার
এই হ্রদে আসবে। তার কোন ভক্ত স্বপ্ন দেখেছে ,
যদি এমনই না এসে, তবে আমার অনুচরেরা তাকে
তেড়ে গিয়ে ধরূবে।”
এই বলে সভা-ভদ করে রাজা অন্তঃপুরে গিয়ে
দেখেন, রাণী অরূপা অতি ক্ষুন্ন মনে জানেলার গরাদ
* শ্যামলীখোজা *
ধরে পশ্চিম আকাশের দিকে চেয়ে আছেন।
স্বভাবতঃ নাগ কন্যারা সুন্দরী, কিন্তু অৰূপার মত
সুন্দরী সমন্ত নাগরাজ্যেও আর একটি ছিল না।
কালীয় অরূপার কাপে ভুলেছে—যদিও উভয়ের
প্রকৃতি বিষম । কালীয় অহষ্কৃত, ক্রুর ও হিংস্র,
অরূপা স্নিগ্ধ প্রকৃতি—দয়ালু ও করুণাময়ী। আe
অৰূপার ম্লান মুখ দেখে কালীয় বল্পে-“তােমার কি
হয়েছে বল দেখি?” অরূপ মুখ ফিরিয়ে “কিছু
নয়” বলে এড়িয়ে যেতে চাইল। কালিয় তাকে
বল্লে “সেটি হচ্ছে না, তােমাকে বলতেই হবে, কি
হয়েছে অৰূপ স্বামীর দিকে চাইতে পালে না,
অধােমুখে বল্লে “শুনে কি হবে, তুমি কি আমার কথা
শুনবে?”
“শােনবার মতন হলে শুনৰ বই কি? গহনা-
আসবাব-স্ত্রীলোকেরা যাহা চায়,-মণির
মালা, হীরার কষ্ঠী, মরকতের বালা—সবই দেব,
তোমার আরামের জন্য আমি কি না করতে পারি,
তােমাকে আমার অদেয় কি অাছে, অৰূপা? আমার
পত্র,
৬৭
* শ্যামলীখোজা *
মনে বড় কষ্ট, তুমি কোন দিন মুখ ফুটে তাে আমার
কাছে কিছু চাও না, একবার চেয়ে দেখ, আমি কত
আনন্দের সঙ্গে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করি।”
অরূপা এসকল উক্তিতে একটুও প্রীত হয়েছেন
এরূপ দেখা গেল না। বাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল্লেন
“আজ শুনলুম, তুমি কংসের সঙ্গে মৈত্রী করেছ,
রামকানুকে মারবে ”
“ঐ হচ্ছে সব গোলমেলে কথা -তুমি তো
বলেছ যে তুমি স্বপ্ন দেখেছ কানু আছে। কানুর
বাহন গড আমাদের বংশের শত্রু, আমি তার ভয়ে
এই হ্রদে পড়ে আছি, আমি—যে আমি বিশ্ব দগ্ধ
করতে পারি,আমাকে গকড তাড়িয়ে এনেছিল।
এই শিশুটাকে মেরে ফেলে গরুড় হীনৰীৰ্য হয়ে
পড়ব,—শুনেছি গৰুডের সমস্ত বল—এই শিশুটার
থেকে পাওয। শিশুটাকে মারতে পারলে আমি
জগতের বাজা-জগদীশর হব, শুধু কংসের অনুবােধে
মৈত্রী করি নি,-এই শিশু আমাদের উভয়েব শক্র।”
রাণী স্নান মুখে বল্লেন, “তা তুমি পারবে না।”
* শ্যামলীখোজা * কালীয়-“কেন পারব না। এই কালীয় হ্রদের বিষের তেজ তুমি জান ? ব্যোম বিহারী পাখীরা এই হ্রদের উপরে উঠলে অমনি পুড়ে ঝুবে জলে পডে যায়। হ্রদেব হলে আমার অনুচরেরা বিষ ছুডে ফেল্লে তা সপ্ততাল ভেদ করে প্রাণী মাত্রকে বধ করে , মাটির উপর বহুক্রোশ জুড়ে এই হ্রদের হাও- যায় একটি বৃক্ষ নাই, একটি পত্র নেই। রাখালের ছেলেরা কি দিয়ে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবে, পাচন বাড়ি নিয়ে, না বাশী বাজিয়ে? মৃত্যু আমার হাতে। অরূপ কুঞ্চিত করে বল্লেন, “জানি মরণ তােমার হাতে, কিন্তু জীবন যে তাদের হাতে।” এবার কালীয় রেগে গিয়ে নিজের অঙ্গ আস্ফোট করে বলে, “এই অন্তঃপুরের যবনিকার ভিতর নীল শাড়ীর একটি মােড়কের মত পড়ে আছ। আমার ক্ষমতা কি করে জানবে? আমি ক্রুদ্ধ হলে আকাশে উল্কাপাত হয়,--তা জান?” অতি নম্বরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে রাণী বল্লেন , “তুমি যমের দণ্ড নিযেই এস, আর বিষ অগ্নি সহায়
* শ্যামলীখোজা *
করেই এস-যাদের বিরুদ্ধে যাবে, তারা তােমার
এলাকার নহে। তাদের প্রেম ব্ৰত, তাদেব রাজ্যে
বের হয় নাই, তারা যমদগুকে রাজত্বের ভিত্তি
মনে করে না, তারা ভালবাসার রাজ্য গডে, তারা
যেখানে যায় সেইখানেই জয়ী। তমার বল তাদেরে
কিছু করতে পারবে না। তােমার বল তাদের কাছে
যারা তােমায় ভয় করে। তারা নির্ভয় হয়ে তােমাকে
ফাকি দিয়েছে—তারা মবণ-জীবনে কোন তফাৎ
দেখে না। মরণকে নূতন
জীবনে যাওয়ার সাকো
মনে করে , তুমি তােমার বিষ দিযে খেচর, ভূচর,
জলচব সব্বাইকে ত্রস্ত করতে পার,—তাদেরে
পাবে না। তারা যা চায় না, যা গ্রাহ্য করে না,
সেইগুলি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার ভয়
দেখিয়ে তাদের ভীত করতে পাবে না।”
কালীয় অকপার রূপে মজে গেছে। রাণীর
প্রত্যেকটি কথা বীণার সুরের ন্যায় তার কাণে বা
ছিল—অথচ সে কথাগুলি যে নিতান্ত অসার, তা
সে নিজে বুঝেছিল । সে মৃত্যুর ভাণ্ডার খুলে বসে
৭০
* শ্যামলীখোজা
আছে। যে বিষে যমুনা নদীর একাংশ—তার উপরের
আকাশ, ওপাডের মাটী, দগ্ধ হয়ে গেছে, বালকের
কচিদেহ তা ঠেকিয়ে রাবে-কি দিয়ে প্রীতি
দিয়ে।শুছ পাগলীর কথা। কিন্তু এ সকল কিছু
না বলে—রাণীর দিকে কৌতুকপূর্ণ, হাস্যময় দৃষ্টি
নিক্ষেপ করে রাজা বল্লেন “যা হােক, রাণী, তােমার
রাখালেরা চোখের
চোখের জল
জল ফেলে,
ফেলে, বাঁশী বাজিয়ে,
কোকিলের ডাক ডেকে যদি আমায় পরাভব কতে
পারে তা করুক না । আমি পরাজয় মাথা পেতে
নিব, তার জন্য তুমি ম্লান মুখে রয়েছ কেন ?”
“আমার ম্লান মুখ কেন ?” রাণী এইবার কেঁদে
ফেলে বল্লেন “আমার ভাবী বৈধব্যের আশঙ্কায়,
আমার স্বামী জগৎ-পতিকে তুচ্ছ কচ্ছেন,তার
অসীম প্রেমে ধরা দিচ্ছেন না তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
কচ্ছেন—এই কারণে।” এই বলে পায়ে ধরে
রাজাকে বল্লেন—“তুমি এই ব্যাপারে ক্ষ্যান্ত দাও,
কংসকে বলে পাঠাও, তুমি রামকৃষ্ণের বিকদ্ধে যেতে
পারবে না, তাদের শরণ নেও।”
৭১
* শ্যামলীখোজা **
রাজা রাণীকে সােহাগ করে তার চোখ মুছিয়ে
দিলেন—“তবু ভাল, তুমি আমার মৃত্যুর ভয়ে কঁা-
ছিলে।
আমি ভাবছিলেম, কচি রাখালগুলি যে
শুকিয়ে দগ্ধ হয়ে মবে—তার জন্য বুঝি আমার
করুণাময়ীর করুণা উথলে উঠেছিল। তা হলে না
হয় তাদের রক্ষার জন্য একটু মনােযোেগী হতেম ।
আমার প্রাণের জন্য কাঁদছ ?” এইবার কালীয়
একটা অট্টহাস্য হাসলেন, তারপর বল্লেন, “যদিও
গকড আমায় তাড়িয়ে এই হ্রদে এনেছিল, কিন্তু সে
আমার প্রতাপ বিলক্ষণ জানে,—সর্পজাতি তার ভয়ে
একটা সন্ধি করেছিল, নিয়মিত সময়ে তাকে একটা
প্রকাণ্ড ডালি পাঠাতে ।
“আমি তাদেরে বারণ কবলেম। তারা বল্লে, শেষ
রক্ষা করবে কে? সে যখন একটা গহ্বরের মত মুখ
ব্যাদান করে, দুইটা নদীর মত ঠোট দুটো বিস্তার
করে, একদিনে এক লাখ সাপকে পেটের ভিতর
পুরুবে,তখন কে কোথায় থাকবেন? আমি বল্পেম--
“আমি অভয় দিচ্ছি, আমি তাকে সংহার করব।”
१२
* শ্যামলীখোজা *
তারা কবুল হ’ল না। যথা সময়ে ডালি পাঠাতে
লাগল। একদিন ক্ষুধায় পেট জ্বলছে, দেখলেম,
একটা প্রকাণ্ড ডালি মাথায় করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে
সাপেরা। আমার জাতির এই অপমান-আমাদের
শত্রুর নিকট এই পরাভব, বরদাস্ত করতে পারলেম
না। আমি সেই ডালি কেড়ে নিয়ে উদর-তৃপ্তি
কবলেম।
“সংবাদ পৌছিতে বিলম্ব হ’ল না—তারপর দেখি
আকাশে যেন প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ঢেউ উঠছে। সমস্ত
আকাশট। আলােডণ কবে কি যেন একটা অসছে—
প্রথম শুনলেম পাখাব শব্দ, তাতে অন্য সকল শব্দ
ডুবে গেছে—আমার কানে তালা লেগে গেল।
তারপর দেখলুম, দশটা নখর দশটা শাণিত খডেগর
ন্যায়—তারপর দেখলুম রক্তচক্ষু ও দুইটা ঠোট
দুইটা প্রকাণ্ড আগুণের হালকার ভিতর যেন স্ফুলিঙ্গ
দেখা যাচ্ছে। আমি তার সঙ্গে সাতদিন যুদ্ধ করে-
ছিলাম। কংস সেদিন আমার পক্ষে ‘বাহবা দিয়েছিল,
সেই যুদ্ধে বারংবার ভূমিকম্প হচ্ছিল, হিমাদ্রি পর্বত
৭৩
* শ্যামলীখোজা
হতে বড় বড় শাল্মলি উড়িয়ে পড়েছিল। গরুডের
পালকের উপর আমার বিষ-বর্ষণ ততটা কাজ করতে
পারে নাই, এই দুর্ভেদ্য পালকের বুহ ভেদ করে
আমার বিষ দেহে প্রবেশ করতে পারে নি। তারপর
এক মধ্যাহ্নে আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে সূর্যেরদিকে
তাকাচ্ছি, এমন সময় আমাকে ঠোট দিয়ে এমনি
কাটতে লাগল, যে আমি এই কালীয় হ্রদে এসে
ঢুকলুম—এই হ্রদের উপর শাপ আছে—গরুডের
এখানে আসবার অধিকার নেই। কিন্তু আমার
মনে হয়-আর একটা রণক্ষেত্রে পেলে আৰাৰ
যুঝে দেখতেম। এর মধ্যে কংস আমায় জানিযেছে-
তার সমস্ত বল কামু।
কচি শিশুটাকে মেরে যদি
পাখীটাকে হীনবল করা যায়—সেইটিই ত সহজ
উপায় হবে। রাণী তুমি তােমার বৈধব্য ভেব না,
বরং ভাব যে শিশুগুলি মববে”—
এই বলে জরুরী কাজে কালীয় বাইরে চলে গেল।
(৭)
অরূপা তখন কাদছেন, আমার স্বামী কৃষ্ণদ্বেষী,
৭৪
* শ্যামলীখোজা তার এত অহঙ্কার ও স্পর্ধা—কিন্তু সে যে কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে বকাসুরে অঘাসুরের দশা পাবে—তা রাণী জাতেন। তার পাশে তার স্নেহ- শীলা সহচরী অঙ্গনা এসে বসেছিল,সে রাণীকে বিষ দেখে বল্লে–শুনছি তুমি নাকি স্বপ্ন দেখেছে, কালীর হ্রদে কৃষ্ণ আসবেন। চোখের জল মুছতে মুছতে রাণী বল্লেন, “সত্যি অঙ্গ, আমি স্বপ্ন দেখেছি। আমার কি হয়েছে, রােজ সকাল সন্ধায় বাঁশীর সুর শুনতে পাই, মনে হয় যে বঁশী বাজায় তাকে গিয়ে একবার দেখে চোখ জুড়াই । বাণী শুনেছি, নাম শুনেছি—কিন্তু চোখে দেখিনি।এই আমার নিত্যকার আরাধনা তাকে পূজা করব, তিনি রাখালদল লয়ে যে নিত্য লীলা করেন—এই যমুনার পাডে নৃত্য করেন, তাকে একবার দেখলেম না, আমার বৃন্দাবনবাস মিথ্যে হয়ে গেল অঙ্গ, এই কষ্ট । মনে হয় বনের পাখী হতে পাৰ্ত্তেম, তবে উড়ে গিয়ে কদম গাছে বসে তাকে দেখে চোখ জুডোতে পারতেম ; যদি যমুনার ৭৫
* শ্যামলীখোজা
জল হতে পারতেম, তবে রাখালরাজ যখন পড়ে
বসে বাঁশী বাজাতেন, তখন তার নূপুর ছুয়ে পা ধুয়ে
দিতে পার’তেম।
“রাজসভায় তার নিন্দা, আমার স্বামীর মুখে
তার নিন্দা-এত আব রােজ রােজ সইতে পারি না,
তাই কাল ব্যাকুল হয়ে তাকে ডাকছিলেম। কাল
মনে হয়েছিল যেন সাড়া পেলেম ,রাত্রে স্বপ্ন যেন
একটি কালো সুন্দর ছেলে হেসে হেসে আমার
পাশে দাড়িয়ে বল্লেন—“আমি শীঘ্র যাব,-তুমি
প্রতীক্ষা করে থেক।”
এই অরূপা কৃষ্ণকে দেখিবার জন্য অনেক দিন
তপস্যা কচ্ছিলেন। তিনি কায়মনােবাক্যে মিথ্যাকে
পরিহার করেছিলেন, তিনি ভোগবিলাসের মধ্যে
থেকেও একান্ত নিবৃত্তির পথ অবলম্বন করেছিলেন ,
তিনি উপবাস করে থাকতেন, রাত্রে তাঁকে স্মরণ
করে কাঁদতেন। তাঁর নিদারুণ স্বামী তাকে শুধু
ভালবাসতেন না, ভয় করতেন। তাঁর সংযত জীবন
একটা আরতির দীপ শিখার ন্যায় জ্বলেছিল,-লালসা
৭৬
* শ্যামলীখোলা * পারি, নিয়ে রাজা তার ঘরে ঢুকতে সাহসী হতেন না। তার বহু সংখ্যক কাম-মহিষী ছিল, তাদের নিয়ে সেই সকল চপল আমােদে যােগ দিতেন। কিন্তু পুরােহিত যে ৰূপভাবে মন্দিরে প্রবেশ করে সেই ভাবে তিনি অৰূপার গৃহে আসতেন। অরূপ কখনও অনার গলা জড়িয়ে ধরে বলতেন, “আজ অঙ্গ, আমার রাত জাগা সার্থক হয়েছে, আজ তঁার পায়ের নূপুর শুনেছি।” অঙ্গনা বলত “আমি কি করে শুনতে রাজ্ঞী আমায় বলে দিতে পার।” রাণী সােহাগ করে অরূপাকে বলতেন, “কি করে আমি বলব। যদি দেখা হত, তবে তাকে সেধে এই ভিক্ষা চাইতেম, যে তােমাকে তিনি একটি বার দেখা দেন। আমি নিজে দেখা পাই নাই, কি করে নূপুর শুনবি, তাই বা বলব ?” অঙ্গনা বল্লে “আমি তা জানি কি করে পেতে হয়। তুমি অবশ্য তাকে দেখবে, আমি তােমারই মতন হয়ে তাকে পাবার দাবী করব।” তদবধি অঙ্গন। তার সুদীর্ঘ কেশ- পাশ চ্ছেদন করে, একাহারী হ’ল , বাক্য ও ব্যবহারে ৭৭ * শ্যামলীখোজা * সংযম শিখে একান্ত মনে কাণ পেতে থাকত—বাণীর সুর শুনতে। অরূপ যখন বলতেন—“ওই শুছি না, বাযুর গতিতে লহরী তুলে সুর অ সূছে, কালী- দহের কলের জ্বালা জুডিয়ে সুর কেমন নেচে নেচে আছে-শত শত ভ্রমর গুঞ্জনের ন্যায়-নারদের হাতের বীণা-বাদনের ন্যায়-ততোধিক মিষ্ট—সেই সুর আছে।” অঙ্গন। দেখত রাণীর চোখে জল, তিনি দেবার মত বসে যেন আনন্দাশ্রু ফেলে স্বর্গ- সুখ উপভােগ কচ্ছেন। এই নিষ্ঠুর, বিষদগ্ধ, বিষাভিমানী, ক্ষমতা লুব্ধ, অতি ভীষণ, ত্রুর রাজ- ধানীর মধ্যে মাত্র সেই দুইটি প্রাণী জানতেন বৃন্দাবনে যে প্রীতির সুর জেগে উঠছে—শত শত কালীদয়ের দগ্ধ হৃদয় তা জুডোবার শক্তি রাখে। (৮) এদিকে ব্রজবালক ও গােপীদের হাহাকারের সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ কালীয় নাগের দেহ বেষ্টিত হয়ে, তার দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে জলের নীচে নামছেন। তাহার অঙ্গের শ্যামশ্র, পীতবাস, সুবর্ণমণ্ডিত মকর- ৭৮
* শ্যামলীখোজা *
চিহু যুক্ত বাঁশী, গলায় মুক্তার হার, পায়ের মণির
নূপুর ও শিখিপুচ্ছের নানা বিচিত্রবর্ণ কালীয় নাগের
তমিস্রাতুল্য অঙ্গের খরপ্রভার সঙ্গে মিশে যাওয়াতে
কালীদহের জল বিবিধ বর্ণেব মণি খচিত একটা বৃহৎ
পুষ্পের ন্যায় দেখাচ্ছে। ক্ষণকালের জন্য কালীয়
মনে কবুল, 'একে আর হত্যা করে কি হবে ? এ যে
কচি ফুলসম দেহ, একটু এটে ধ’ল্লেই ত প্রাণ
ত্যাগ করবে—অৰূপার কাছে ধরে নিয়ে গেলেই
বুঝবে, তার খেয়াল ও কল্পনা কত অসার। মেয়েদের
মাথায় কি না আজগবি কথা স্থান পায়। বিশ্ববিশ্রুত
বীৰ্য, জগৎ সংহাব ক্ষম কালীয় নাগের বিষ এই কচি
শিশুদেহ ঠেকিযে রাখিবে—এই ভাবের বিশ্বাস কি
কবে মনে স্থান পায় ?
যখন কালীয় এই ভাবের চিন্তা কচ্ছিল, তখন সে
হঠাৎ দেখতে পেল, কি যেন তার বেষ্টনের মধ্যে
বড় হচ্ছে। মুহূর্তে মুহূর্তে কে যেন তাকে ছাপিযে
উঠতে চেষ্টা পাচ্ছে। কৌতুকের সঙ্গে সে চেয়ে
দেখল, কৃষ্ণ আব ছোট্ট ছেলেটি নাই, তিনি বড় হচ্ছেন,
* শ্যামলীখোজা * ক্রমে তার দেহ কালীয়ের দেহ ছাপিয়ে উঠল। যে জিনিষটা একটা মুঠোর মধ্যে বলে সে মনে করেছিল—তা যে এত বড় হতে পারে, তা তার মাথায়ই আসে নি। ক্রমে সেই দেহ এক অসীম আকার ধারণ করলে,-যা বিন্দুটির মত ক্ষুদ্র ছিল, তা সিন্ধুব মত হয়ে উঠল। কালীয়ের মাথায় এ আশঙ্কা কখনই হয নাই। যাকে সে ধরেছে সেই ত বিষে জর জর হয়ে মরেছে,—কিন্তু একি ? দিশি দিশি কৃষ্ণের শ্যাম অঙ্গ, শত শীর্ষ, সহস্র চক্ষু, সহস্র বাহু পুরুষবর তার দেহের গণ্ডা ছাপিয়ে কতদিকে বিস্তীর্ণ হয়ে পড়েছেন। কালীয যে দিকে চাহে, সেই দিকেই উদ্ধে অধে—পার্শ্বে শ্যামৰূপ ঝলমল। জিনিষটা এত বড় তা না দেখলে প্রত্যয হত না,তার দাতের সমস্ত বিষ—তার সহস্র সহস্র অনুচরের বিষ, তার বিরাট দেহের কাছে অতি তুচ্ছ। তখন মদঘূর্ণিত রক্তচক্ষে সে কৃষ্ণের মৰ্ম্মস্থান- গুলি দংশন করতে লাগল। তার সহস্র সহস্র অনু চরেরা এসে সেই শ্যাম দেহ দংশন করতে লাগল।
* শ্যামলীখোলা কিন্তু যে স্থানে দংশন করে, সেই স্থানের শ্যাম জ্যোতি আরও ফুটে উঠে ,-অপূর্ব সহিষ্ণুতার অমৃত প্রলেপে সেই সেই অংশের শােভা আরওজাজ্বল্যমান হয়। কালীয়ের অনুচরেরা—দুরন্ত, সুতীক্ষ ও কালনেমী প্রভৃতি নাগের—যাদের চক্ষের জ্যোতির বিষে উদ্যান শ্মশান হয়ে পড়ে, শত শত জীবন যাদের বিকট নিবতায় অবহেলায় নষ্ট হয়, সেই রকৰ্ম্ম৷ অনুচবের দল—কৃষ্ণের বিরাট বপুর যেখানে- সেখানে দংশন কচ্ছে , কিন্তু সেই এক ভাব। বিশ্বের নমস্য, বিশ্বরূপ ধারণ করে দ্বিগুণ জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে—কৃষ্ণ দিদেশ জুড়ে দাড়িয়ে আছেন। এ মুঠোব ভিতর পুরবার জিনিষ নহে, এ রণ- ক্ষেত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয—এ যে বিরাট অসীম, এর নাম শত, সহস্র, অযুত, নিযুৎ,—নাগকুল যতই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল, সেই বিরাটপুৰুষের হাসিও ততই উৎফুল্ল হতে লাগল। দংশনের পর দংশন যেন সে মুর্তিকে আরও নির্মল করে দিচ্ছে। যখন বিরাট দেহের শেষ কোথায় তার লাগ না পেয়ে কালীয়ের শরীর P১
* শ্যামলীখোজা *
আস্তে আস্তে সেই ক্রমবর্ধিষ্ণু দেহ হতে আলগা হয়ে
পড়ল, তার মুখ হতে অবিরাম লালা ভাঙ্গতে লাগল,
তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভয়ে রােধ হবার উপক্রম হল,
কৃষ্ণ তখন আস্তে আস্তে তার শিরেব উপর পা দিয়ে,
নাচতে আরম্ভ করলেন। তিনি এই ব্যাপারে যুদ্ধ
করেন নাই, শুধু প্রীতির দ্বারা বিদ্বেষকে জয়
কবছেন--সুধুবাদনৰ্ত্তনে অসুবকে পরাভূত করে-
ছেন। কালীয়ের শত মস্তক, কোনটির নাম দম্ভ,
কোনটির নাম কাপট্য, কোনটির নাম বৈর, কোনটির
নাম লােভ, কোনটির নাম স্বার্থ, কোনটির নাম
অত্যাচার, কোনটির নাম কুরতা,কোনটির নাম
ভেদ বুদ্ধি, এইরূপ। কৃষ্ণের পদভরে এক একটি
মস্তক বিদীর্ণ হল এবং কালীয ধূলায় লুষ্ঠিত হয়ে পড়ল।
এখন সর্বশেষ মস্তকটি—যাহাতে জীব মাত্রেরই
জ্ঞান থাকে, তার উপর কানু বাঁশী হাতে দাঁড়িয়ে।
এখনও—সমস্ত দেহ অবসন্ন হওযার পরেওকালীয়
সীয় মস্তক উদ্ভত করে আছে। কিন্তু তার অবস্থা অতি
শােচনীয়, কানুর মৃদু বেণু বাদনে ও নৰ্ত্তনে তার
* শ্যামলীখোজা *
প্রাণ যে ওষ্ঠাগত। মুখের দুই ধারে লালা ভাঙ্গছে,
চোখ দুটি হতে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে, পুনঃপুনঃ দিকবিদিক
জ্ঞান-শূন্য
হয়ে দংশন চেষ্টায় তার অস্থিগুলি
স্থানচ্যুত হয়ে দেহটা অসারের মত হয়েছে—এইবার
প্রাণ যাবে। হঠাৎ কালীয় মনে করলে, তার
একমাত্র মস্তক স্পর্শ করে আছে—সেই যে পাদপদ্ম,
তাহা অতি কোমল। এত যে বৈর সাধনের চেষ্টা
সে করেছে—তাতে করে কৃষ্ণের করুণা হতে সে
বঞ্চিত হয় নাই। তার মস্তকগুলি গিয়েছে তাদের
নিজেদের দংশন করবার বিরাট চেষ্টায়। কৃষ্ণ
সে গুলি নষ্ট করেন নাই, সে নিজের ভারে নিজে
তলিয়ে যাচ্ছে।
(৯)
এইবার অনুতাপ আসবে, এমন সময়ে কালীয়
এক দৃশ্য দেখে বিস্মিত হল,-কৃষ্ণের দুই দিকে
অৰূপা ও অঙ্গন। তারা হাত জোর করে তাকে
স্তব করছে।
কৃষ্ণ হেসে হেসে বল্ছেন-“তােদের
ডাকেই ত আমি থাকতে পারিনি, নইলে এ পূবদিকে
* শ্যামলীখোজা *
রাখালদের নিয়ে কেন আসব ? তােরা যে উপোস
কতি, আমার বাঁশীর সুর শুনতে কান পেতে
থাকতিস, মেঘের কোলে বিদ্যুৎ দেখে আমার পীত
বাস মনে করে চোখের জল ফেসি-সে কি
আমার চোখ এড়িয়েছে ? বাঁশী বাজাতে বাজাতে
আমি কতদিন আনমনা হয়েছি--আমার প্রাণ তোদের
জন্য কেঁদে উঠেছে , আজ, অরূপ, তুই তাের
স্বামীর প্রাণ ভিক্ষে চাচ্ছি-তার চেয়ে বড়, তার
মধ্যে প্রকৃত জ্ঞান-ভক্তির সঞ্চাব যাতে হয়, সেই বর
চাচ্ছি, আমি উভয়ই তাকে দিলেম।”
কালীয় আর থাকতে পারলে না; সে বলে উঠল,
“আমার বাকী মাথাগুলি চলে গিয়ে এই আমার
মাথাটা উচু হয়ে উঠেছে। আমি বুঝতে পেরেছি,
আমার স্পর্ধা, দম্ভ, সবই গেছে-এখন আমি
তােমার পায়ের নীচে তৃণের মত হয়ে আছি। আহা,
তােমাকে দংশন করে কত না বেদনা দিয়েছি, এখনও
আমার মস্তকটা কুকুরের মত তোমার কোমল
পাদপদ্মে বি ধছে। আমাকে আরও কোমল করে
;
৪
শ্যামলীখোজা
নেও, আমাকে তোমার যােগ্য করে নেও, আমার
চোখের রক্তিমা হরণ কর, তােমার শ্যামৰূপ দেখাবার
যোগ্যতা এদের দেও, আত্মপ্রশংসার দুন্দুভি শুনে
শুনে কর্ণ বধিব হয়ে গেছে—তােমার অপূর্ব বংশীর
স্বর, যা অরূপা শুনতে পেয়েছে--তা তো আমি
শুনতে পাই নাই,আমার কর্ণ সেই মধুর স্বর শুনতে
পারে, এমন শক্তি দাও। অৰূপার ন্যায় পত্নী লাভের
যথার্থ যােগ্যতা দিয়ে আমায় ধন্য কর।” এই বলতে
বতে কালীয়ের চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে অশ্রু
পড়তে লাগল, কৃষ্ণের অমৃত স্পর্শে কালীয়ের
শবীরের সমস্ত যন্ত্রণা ও অবসাদ ঘুচে গেল-অরূপ
ও অজানা কোন কথাই বলে নি, তারা জোরহাত করে
কৃষ্ণের পার্শ্বে দাড়িয়েছিল। তাদের অবিরত চোখের
জল পড়ছিল, সেই চোখের জল দিয়েই তারা তাদের
সমস্ত ভক্তি ও প্রার্থনা জানাচ্ছিল। কি বাচালতা
করে এই নীরব নিবেদনের একাগ্রতা নষ্ট করে নাই।
এমন সময় কালীয় হ্রদের জল প্রকম্পিত করে,
আকাশ আলােড়ন করে, বহুযুগ-সঞ্চিত করুণার
৮৫
* শ্যামলীখোজা *
বাণীর ন্যায়, চোখে অশ্রুর বান ডেকে এনে—এক
মহা কৰুণ গাথার ন্যায়—বলাইদার শিঙ্গা বেজে
উঠল। সেই শিঙ্গা শুনে কৃষ্ণ ত্রস্ত হলেন, তিনি
পা দুখানি কালীযের মাথায় রেখে, তাকে এবং দুই
নাগকন্যাকে আকর্ষণ করে হ্রদ-জলের উপরে উঠতে
লাগলেন।
এবার ব্রজ গােপ ও গোপীরা দেখতে পেল সেই
শিখিপুচ্ছ, যা তারা শেষ বার দেখে কেঁদে ভেসে
যাচ্ছিল,-এবার ক্রমঃ প্রকটিত শিখিপুচ্ছ দেখে তারা
পুলকাতে ভেসে গেল।
অল্প পরেই দেখা গেল সেই নয়নাভিরাম মুর্তি,
পাদপদ্মের নীচে কালীয়, দুই পার্শ্বে দুই নাগকন্যা
এদৃশ্য যে এদেশের চিত্রকরের একে একে পুরাণ
করে দিয়েছে—কিন্তু তােমরা হয়ত এই গল্পটি ঠিক
এমন ভাবে শােন নি।
কৃষ্ণ বল্লেন “কালীয়। তুমি এই হ্রদ ত্যাগ কর,
দক্ষিণদিকে রমণকদ্বীপ আছে—তথায় যাও,
-তথায় যাও, সেইখানে
বহুনাগ জলের নীচে ডুবে আছে—সেই দ্বীপ অতি
* শ্যামলীখোজা *
বিশাল, সেখানে তােমাকে গডের ভয়ে জলের নীচে
লুকিয়ে থাকতে হবে না।”
কালীয় নির্ভরের ভাবে—ব্যাকুল ভক্তির সহিত
কৃষ্ণের দিকে চাইল। কৃষ্ণ বল্লেন “কোন আশঙ্কা
নেই, আমি তােমার মাথায় আমার পদাঙ্ক একে দিচ্ছি,
গৰুড তােমার রাজ্যে কখনই আসবে না।” অকপার
মুখ লক্ষ্য কবে বল্লেন “বৃন্দাবন ছেড়ে যেতে কষ্ট
হচ্ছে। এই মাটীর বৃন্দাবন ফেলে মনে নিত্য-বৃন্দাবন
গডে রেখ,—আমি সেই বৃন্দাবন ছেড়ে এক পা ও
কোথায় যাই না। আমাকে সেখানে সর্বদাই পাবে।”
নাগ জগৎ এইভাবে বৃন্দাবন হতে অপসৃত হ’ল।
(১০)
পরীক্ষিৎ শুকদেবকে জিজ্ঞাসা কল্লেন, “যে পাদপদ্ম
পাবার লােভে মুণিঋষিরা উপবাস করে-অর্ধাশন
করে, গাছের তলায় গ্রীষ্মকালে পঞ্চাগ্নির ভিতর
থেকে-শীতকালে হিমশীতল জলের মধ্যে থেকে
কত তপস্যা কবেন। কালীনাগ কৃষ্ণদ্বেষী হয়ে কি
করে সেই পাদপদ্ম মাথায় পেয়েছিল ?”
৮৭
* শ্যামলীখোজা
শুকদেব বল্লেন, “পূর্বজন্মে কালীয় এক দেশের
অধিপতি ছিল, তার নাম ছিল সর্বমােচন’-রাজা
অতি ক্র-প্রকৃতি ছিলেন, প্রজাদিগকে অতিশয়
উৎপীড়ন করতেন।
কত নির্দোষী ব্যক্তি যে তার
কোপে পড়ে পীড়িত হত তার সংখ্যা নাই, এর
উৎপীড়নের কথা যে মুখ ফুটে বলত, তার প্রতি
তিনি অতি
নৃশংস ব্যবহার করিতেন। কোন এক
রমী একদা তার ব্যবহারের আলােচনা করেছিলেন,
এই শুনে তিনি তাঁর সদ্যজাত শিশুটিকে শুন্য দিতে
বাধা দিয়ে শুকিয়ে মেরে ফেলে ছিলেন। এই শেষ
অপরাধের ভার আর প্রকৃতি সহ কতে পারলে না।
তিনি দারুণ যক্ষারােগে আক্রান্ত হলেন।
অতি দুষ্ট লোকও ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে নিজের
স্বভাবের দোষ দেখতে পায়। যক্ষারোগে আক্রান্ত
হয়ে, মৃত্যু আসন্ন মনে করে, সর্বমোচন নিজের
পাপরাশির জন্য অনুতাপ বােধ করতে লাগলেন।
মৃত্যুর ভয়ে তিনি আহার নিদ্রা ত্যাগ করলেন।
কন লোকের প্রতি অত্যাচার করেছিলেন,
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.