Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Bana-tulasi
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বন-তুলসী
তুলস্যমৃতনামাসি সদাত্বং কেশবপ্রিয়া,
কেশবার্থে চিনােমিত্বাং বরদা ভব শােভনে।”
শ্রীকুমুদরঞ্জন মল্লিক, বি এ।
চক্রবর্তী, চাটার্জি এণ্ড কোং,
৬৩নং হাবিস রােড, কলিকাতা।
মূল্য • পাঁচ আনা
২৪নং মিডিল রোড, ইটালী ইণ্ডিয়া প্রেস, হইতে শ্রীকুসুমকুমার ভট্টাচাৰ্য্য দ্বারা মুদ্রিত।
তাপিত হৃদয় কর সুশীতল
শান্তিনিঝর হরি হে,
নিদারুণ শােকসায়কের ব্যথা
পাসরিতে নাহি পারি যে।
তুমিই দিয়েছ তুমিই নিয়েছ
ব্যথা দিলে কেন বহিতে,
ফুল গেছে তার বৃন্তের কাঁটা
পারিনে মরমে সহিতে।
চাহিনাক কিছু শুধু তব প্রেমে
দাও হে হৃদয় উলসি’
তােমারি চরণে আঁখিজলে ভেজা
দিলাম এ বনতুলসী ।
কুমুদরঞ্জন
No text on this page.
.
আমার এ বনতুলসী, একে ত বন তুলসী তাও আবার
সব নিজের বনের নয়। একশ আট পাতার মধ্যে অনেক
পাতাই ভক্ত ও মহাপুরুষগণের তপােবন হইতে ভােলা।
ইহার যাহা কিছু ভাল তাহা তাঁহাদের, যাহা কিছু
দোষাঘ্রাত তাহা আমার নিজের। এই পুস্তক প্রণয়নে
শ্রদ্ধাস্পদ বন্ধু শ্ৰীযুক্ত বিভূতীশচন্দ্র কাব্যব্যাকরণতীর্থ
এবং অগ্রজকল্প শ্ৰীযুক্ত প্রসন্নকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
মহাশয়দ্বয়ের যথেষ্ট সাহায্য পাইয়াছি, তজ্জন্য তাঁহাদিগের
নিকট প্রকাশ্য ভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বাহুল্য মাত্র,
তবু যে করিলাম সে কেবল আমার তৃপ্তির জন্য।
মাথরুণ
১৫ই অগ্রহায়ণ
গ্রন্থকার।
১৩১৮
No text on this page.
‘যাকর নাম দরশ সুখ সম্পদ,
দরশ পরশরসপুর,
পরশে যে সুখ তাহ কি বলিতে পারি গাে
সে যে বাণী অনুভব দূর
|”
নরহরি।
No text on this page.
বনভুলী।
নির্ভর।
কৃষক চাতকে বলে, সুধাই হে পাখি ।
কেমনে সলিল পাও জলদেরে ডাকি ?
দারুণ নিদাঘ কালে বাঁচ বা কি করে,
বরষায় ও মরিতেছি দেখ দুনী ধরে।
চাতক বলছে জানি করিতে নির্ভর,
সেই যে আমার সব জানিনে অপর ;
তব বাহুবল আছে, আছে কত দুনী,
আমার আছেন ভাই কেবল যে তিনি।
প্রাণের ডাক।
ক্ষুদ্র টুনটুণি বসি সেফালি শাখায়
প্রাণ ভরি উযা কালে বিহুগুণ গায়।
বায়স বলিছে ডাকি হে বিহগবর
পশিবে কাহার কাণে তব ক্ষীণ স্বর?
বন-তুলসী ।
টুণি বলে আমি অতি ক্ষুদ্র প্রাণী
সবাকার চেয়ে সেটা আমি আগে জানি
যিনি মােরে ক্ষুদ্র করি গড়েছেন ভাই,
তিনিই শুনুন শুধু এই আমি চাই।
জীবে দয়া।
বলেন ডাকিয়া ভক্ত অবােধ শিশুরে,
দলিত করােনা ওই ক্ষুদ্র পােকাটীরে।
জগতের শত শিল্পী, শত যত্ন করে,
ওর চেয়ে ক্ষুদ্র কীটও গড়িতে না পারে।
ঈশ্বরের প্রয়ােজন গড়িতে যাহায়,
তাহারে না কি বাছা তাের শােভা পায় ?
সাকার উপাসনা।
হস্তী বলে হে কমল কি বৃহৎ রবি
তুমি ক্ষুদ্র বক্ষে ধর তার ক্ষুদ্র ছবি।
বিশ্বের সবিতা তিনি, তুমি গণ প্রাণ,
তারে খর্ব করি কর কি পাপ মহান্।
বন-তুলসী।
।
৩
বিরাট মূরতি তাঁর, বলিছে কমল
ক্ষুদ্র আমি ভাবিবার শক্তি কোথা বল।
যতটুকু প্রাণ মাের ততটুকু ভরি
তার বিশ্বব্যাপীরূপ রাখি আমি ধরি।
মূর্তিপূজা।
চকোরে ডাকিয়া ধীরে বলিছে ছাতার
চন্দ্র সে তত শিলাময় প্রকাণ্ড আকার।
নাহি রস, নাহি জল, তার পানে চাহি
বিফলে কাটা নিশি, কিছু বুদ্ধি নাহি।
চকোর হাসিয়া বলে, হে প্রগম্ভ পাখি!
পাণ্ডিত্যের গর্বে তাের অন্ধ দুটী আঁখি।
যে পেয়েছে তাঁর সুধা, হেরেছে সে ছবি,
সে কেন শুনিবে তাের কথা আজগবি।
বিস্ময়।
শিল্পকর বলে, সদা আমি ভেবে মরি
কি বিরাট কি নিপুণ শিল্পী তুমি হরি।
যে হাত গড়ছে অভ্রভেদী হিমালয়
বালুকার কণা তারি গড়া সমুদয় ।
৪
বন-তুলসী ।
জলদের গায়ে যাহে আঁক হে বিজলি
তাতেই কুসুমদলে টান রেখা গুলি।
অপূৰ্ব্ব তুলিকা যাহা রাঙ্গায় গগন
ছােট প্রজাপতি পাখা সাজায় কেমন ।
অতি ক্ষুদ্র তৃণে তব হেরি কারিগরি
বিস্ময়ে পুলকে চক্ষু জলে উঠে ভরি।
চাটকার।
বলিছেন কচু গাছ মেঘ পানে চাহি
তুমিই সবার বড় আর বড় নাহি।
লােকে বলে নিতি নিতি সাগরের কথা
প্রত্যয় হয় না তাতে, বকে তারা বৃথা।
মেঘ বলে কথা শুনে আসে মাের হাস
আমি যে তাহার শুধু জমাট নিশ্বাস।
ক্ষমা।
নাস্তিক বলিছে আমি মানিনে ঈশ্বরে
সর্বশক্তিমান দেখি কি করিতে পারে ?
সে যদি বিশ্বের রাজা ইচ্ছাময় যদি
করে না সে মাের হানি কেন অদ্যাবধি।
বন-তুলসী।
ভক্ত কন জাননা কি তাঁর পরিচয়
তিনি যে বিশ্বের পিতা চির দয়াময়।
মহাকবি ।
মহাকবি বলে, হেরি মূক মাের বাণী
কি জীবন্ত মহাকাব্য এই বিশ্ব খানি।
কি লালিত্যে, অলঙ্কারে, অর্থের গৌরবে,
সৰ্ব্ব রস সমাবেশে তুল্য নাহি ভবে।
এক মহাকাব্য অনবদ্য, অনাবিল,
অমিলের মাঝে নিত্য কি সুন্দর মিল।
কি আশ্চর্য্য প্রতি ছত্রে প্রত্যেক অক্ষরে
করুণাবারিধি কবি নিজে ধরা পড়ে।
বদ্ধ ও মুক্ত।
মরাল বলিছে, বক এস মাের সাথে
যাইবে মানস সরে নব বরষাতে।
মরতে বাঁধা তট, নমেরুতে ঢাকা,
সমীরণ নীলােৎপলপরিমল মাখা ।
বন-তুলসী।
মরাল যুথের সাথে করিবে ভ্রমণ,
মধুর মৃণাল তুলি করিবে ভক্ষণ ।
নাহি ক্লেশ, নাহি দুঃখ, নিষাদের ডর,
পুলকে ভ্রমিবে নীল জলের উপর।
বক বলে, সেথা গিয়া কি হইবে ভাই
গুগুলি কর্দম কীট সেখানে যে নাই।
ভুল।
যত্নে গড়া, সুরচিত, বালুকার ঘর
ভেঙে যায়, শিশু কঁদে ধূলার উপর।
টানে সে জলের দাগ, দাগ যায় মুছে,
কঁদিয়া আকুল শিশু, কিছুতে না বােঝে।
দেখে তার ভ্রম মােরা মনে মনে হাসি,
সংসারের খেলা যেন স্থায়ী খুব বেশী ।
আবশ্যকতা।
শ্যামলতা ফুল এক গােলাপের দলে
ফুটিয়াছে দেখি সবে হেসে পড়ে ঢলে।
বলে সবে ওহে ফুল নাহি তব লাজ
ধরা মাঝে ফুটে তব আছে কিবা কাজ।
বন-তুলসী।
৭
ফুল বলে আমি যবে তারি সৃষ্ট ভাই
কে বলিবে মাের কোনাে প্রয়ােজন নাই।
দেবােদ্দেশে।
হর বােলা ‘পিক ডাকে’ তুষিতে রাজায়,
পুরষ্কার দিয়া রাজা সুধান তাহায়।
বল ‘ভদ্র, কেন তব সুমধুর স্বরে
হৃদয় তেমন মাের উদাস না করে ?
হরবােলা বলে ধীরে জুড়ি দুটীকর
আমি গাহি তােষিতে যে রাজার অন্তর।
পিক সে যে গায় প্রভু ব্যাকুল অন্তরে
তােযিবারে বিশ্বনাথ রাজরাজেশ্বরে।
স্বভাবকপট।
দুষ্ট মতি সাধু সঙ্গে হয় বটে সৎ
দূরে গেলে কিছু পর হয় পূৰ্ব্ববৎ।
চুম্বকের কাছে লােহ লভে গুণ তার,
দূরে রাখ যে লােহা সে লােহাই আবার।
বন-তুলসী ।
কুমতি।
পাপী যদি সাধু হয়ে ধৰ্ম্ম পথে যায়
তবু তার প্রলােভন এড়ান যে দায়।
আরশােলা যদি কষ্টে হয় কাচপােকা
যায় না ক তবু তার তেল কালী শোঁকা।
====
সাধুর সাজা।
পরণে কৌপীন, কিম্বা কমণ্ডলু হাতে,
ঘন ঘন হরিনাম, কপটমূচ্ছাতে,
লুকাতে পারে না পাপ হৃদয়ের ক্ষত,
গলিত কুষ্ঠীর গায়ে চন্দনের মত।
ভক্তিহীন ডাক।
কেবল বাদ্যের ঘটা, নৈবেদ্যের রাশি,
শুধু বলিদানে নাহি আসে এলােকেশী,
মাতালের মুখে হায় মা মা রব শুনে,
ভূত আসে, মা পলান কুটীরের কোণে।
বন-তুলসী।
গােপনে দান।
গােপনে নীরবে করে পর উপকার,
সবাকার প্রথমে সে লভে কৃপা তাঁর।
চাহে যে বিশ্বের চক্ষু থাক তারে ঘিরে,
হরির করুণ দৃষ্টি যায় না সে ভিড়ে।
সহিষ্ণু তরুর মত,
নীচ তৃণ চেয়ে
অমানীকে মান দেন নিজে হীন হয়ে,
সর্বজীবে সম দয়া, হরি মনে মুখে,
প্রকৃত বৈষ্ণব তিনি দুখী পর দুখে।
প্রকৃত সুহৃদ।
ধৰ্ম্মই সুহৃদ সত্য, শান্তি দেয় দুখে,
দ্রুত আসি বাধা দেয় পতনের মুখে।
দেহের সহিত আর সকলি ফুরায়,
মরণের পরে শুধু সেই সাথে যায়।
বন-তুলসী।
পুণ্যস্নান।
সংযম পবিত্র তীর্থ, ভক্তি পুণ্য-নদী,
দয়া ও দাক্ষিণ্য উৰ্ম্মি, বহে নিরবধি
চরিত্র সৈকত শুভ্র, সত্যই সােপান,
শুদ্ধ আত্মা করে যেই সে নদীতে স্নান।
প্রকৃত সাধক।
সংযমী সংসারে থাকি, হিংসা দ্বেষ হীন,
হৃদি খানি থাকে সদা হরি পদে লীন,
স্বার্থশূন্য, পরহিতে রত যার মন,
সেই পঞ্চতপা তার গৃহ তপােবন।
স্বার্থপর
স্বার্থপর লােক ঠিক ব্যাধের সমান,
স্বার্থনে হস্তে ধীরে হয় আগুয়ান,
সে কেবল দেয় তার নিজ স্বার্থ ছেড়ে,
সুদূর বৃহৎ স্বার্থ ধরিবার তরে।
বন-তুলসী।
১১
শিশুর সুখ।
দূরে উচ্চ তাল গাছ হেরি শিশুকালে
ভাবিতাম স্বর্গ ছোঁয়া যায় সেথা গেলে,
জ্ঞানের সহিত দেখি পাপও গেছে বেড়ে
কাছের সে স্বর্গ মাের গেছে বহুদূরে।
পরমহংস।
যে পেয়েছে শ্রীহরির পাদপদ্মে ঠাঁই,
আরাধনা জপ তপ তার কিছু নাই।
পদ্ম-মকরন্দ-স্বাদ যাবৎ না পায়,
তাবৎ গুঞ্জরে অলি, চারিদিকে ধায়।
যখনি করে সে মধু রস আস্বাদন,
ভুলে যায় আপনারে, ভুলে সে গুঞ্জন
নিষ্কাম।
কয়লা খুড়িতে ভাই যদি মিলে হীরে,
কয়লা পানে সে আর চাহে কিহে ফিরে।
সুখ যাচি হরি ডেকে, যদি মিলে তারে
আর কি সে চাহে কভু এ ছার সংসারে।
১২
বন-তুলসী।
দোষানুকারী।
ফিঙে ভাবে, রূপে আমি কোকিলের মত,
আদর তবু ত লােকে করেনাক তত।
বুঝিলাম চাহিনা যে আমি রাঙাচোকে,
তাই করে অবহেলা যত নীচ লােকে।
এত ভাবি ফিঙা সদা রেষভরে চায়,
দেখিয়া পাখীর দল হাসিয়া পলায়,
শুধু দোষ নকলে তৎপর,
করনা নকল তার মধুমাখা স্বর।
বােকা পাখী
সুখ দুঃখ।
একের যা সুখ, তাহা অপরের দুখ,
এক হিয়া শূন্য করে, ভরে অন্য বুক।
যে শিশির রজনীর নয়ন আসার,
সেই হায় প্রভাতের মুকুতার হার।
বন-তুলসী।
গাছ ও আগাছা।
স্বার্থত্যাগ কল্পবৃক্ষ যত্ন কর তারে,
স্বার্থের আগাছা সে ত আপনিই বাড়ে।
মুখে মনে।
পাপে রত, মুখে সদা ডাকে হরি বলি
হরি তার ডাকে ডাকে দূরে যান চলি।
মুখে না ডাকিয়া যে গাে হরি জপে মনে,
হরি তার ক্ষীণ ডাক সব আগে শােনে।
বন্ধন।
বনের বিহগ বদ্ধ সুবর্ণ পিঞ্জরে,
কাটিয়া শিকল বনে যেতে চায় উড়ে।
যতনে পালিত মুগ, ত্যজি শত সুখ
সদাই কাননে ফিরে যাইতে উন্মুখ।
মানবই কেবল হায় মায়ার শিকলে
আপনারে আপনি জড়ায় কুতূহলে।
১৪
বন-তুলসী।
হেরি হায় এ সংসার-পিঞ্জর শােভন,
ভুলে যায় আপনার শান্তি নিকেতন।
জ্ঞানী ও মূখ ।
ভক্তিহীন জ্ঞানী হৃদি, ঘাটবাঁধা বাপী
পাপ পানা আছে তার কূলে কূলে ছাপি।
ভক্তিভরা মূর্খ-হিয়া, সরঃ স্বল্প জল
বক্ষ তার ভরে আছে শুভ্র শতদল।
রােকশােধ।
ধরায় থাকিয়া যেহে ধরা যায় ভুলে,
আপনারে সঁপি দেয় পরের মঙ্গলে,
নাহি মান, অপমান, নাহি যার ক্রোধ,
ধরার সহিত জেনাে তার রােকশােধ।
জীবন ও প্রেম।
জীবন শুক্তিকা, তুচ্ছ কর্দম, বৈভব,
প্রেম মুক্তা ফলে যদি তবেই গৌরব।
বন-তুলসী।
পাপী ও সাধু।
গােবর কঁাদিয়া বলে, ছুওনা গো মােরে
আরাে দুটী দিন আমি থাকি সারকুড়ে।
ফুল কঁদে হায় মােরে তুলিবে কখন,
কবে বা লভিব আমি হরির চরণ।
অনাদর।
নাস্তিক ঈশ্বর আছে করে না স্বীকার,
তাহাতে গৌরব কিছু কমেনাক তার।
মুকুতারে যদি নাহি চিনেহে বানর,
কমে কি তাহাতে কভু মুকুতার দর?
ভস্মমাখা।
ভস্মমাখা সাধু, শত বিভূতি মণ্ডিত,
তেজঃপুঞ্জ অগ্নি তিনি ভস্ম আচ্ছাদিত।
সাধু নয়, শুধু ভস্ম মাখে যেই জনা,
সে কেবল ছাই ঢাকা ঘৃণ্য আবর্জনা।
বন-তুলসী।
সংযম।
ঝটিকা সংযত হয়ে, হলে সমীরণ,
কুসুম সুরভি তবে করে বিতরণ।
নদীর উদ্দাম স্রোত হইলে সংযত,
তবে হৃদে পূর্ণশশী হয় সে বিম্বিত।
সংযমপবিত্র হলে, হইলে নিৰ্ম্মল,
জাগে হৃদে শ্রীহরির মূরতি বিমল।
মায়ামুগ্ধ।
তাপতপ্ত অন্ধ এক, শ্যাম তরু ছায়
প্রখর মধ্যাহুকাল সুখেতে কাটায়।
লভে তার মিষ্টফল, করুণা, মমতা,
বলেনা ভুলেও অন্ধ সে গাছের কথা,
তরুর দয়ার কথা যদি কেহ বলে
লাগেনা তাহারে ভাল যায় দূরে চলে,
যে দিয়েছে সুখে শান্তি, যে দিয়েছে প্রাণ
তারে হেলা করিলে কি হয়রে কল্যাণ ?
বন-তুলসী ।
১৭
জীবহিংসা।
রাজার পালিত পশু যদি মারে কেহ
তারে শাস্তি দেন রাজা এত তাঁর স্নেহ।
বিশ্বের রাজার সৃষ্টপ্রাণী করি নাশ
নিষ্কৃতি কে পাবে তাঁরি রাজ্যে করি বাস।
কথক ও ভক্ত।
ভেক বলে, দিন মাের গেল বকে শুধু
কৃতী তুমি মধুকর পেলে ভক্তি মধু।
রত্নলাভ।
মুকুতা তুলিতে যদি থাকে হে আশয়,
লহরী গণিয়া হবে কিবা ফলােদয়,
দিওনা, দিওনা, কাণ তর্কের কল্লোলে,
ডুব দাও শুধু ভক্তি-রত্নাকর জলে।
১৮
বন-তুলসী।
প্রকৃত সন্ন্যাসী।
প্রকৃত সন্ন্যাসী শুধু, সেই মহাভাগ
সংসারী, লাগে না কিন্তু সংসারের দাগ।
মরাল পঙ্কিল সরে সুখে ক্রীড়া করে,
কিন্তু তার দেহে কভু দাগ নাহি পড়ে।
আগ্রহ।
হইতে রাজার প্রিয়, লভিতে প্রসাদ,
কত চেষ্টা কর তুমি কর কত সাধ।
রাজার রাজার প্রিয় হওনারে মন,
সার্থক জনম, হবে সার্থক জীবন।
তর্ক ও ভক্তি।
ঝিঝি বলে হে ভ্রমর জান শ্রুতি, স্মৃতি,
জান কি কেমনে জন্মে মকরন্দ প্রীতি।
সাকার কি নিরাকার, কি বর্ণ তাহার
এসাে দেহে করি সব তত্ত্বের বিচার,
বন-তুলসী।
১১
অলি বলে কেন ভাই বাদ বিসম্বাদ,
ততক্ষণ লই তার মধুর আস্বাদ।
গায়ক।
হে গায়ক তােষিবারে শ্রোতার অন্তর
মুক্তকণ্ঠে কত গান গাও নিরন্তর।
বাকি ত রাখনা কিছু করিতে যতন
ক্ষুদ্র-রৌপ্য-খণ্ড লাগি তােষিবারে মন।
তেমন কাতর কণ্ঠে, সে ব্যাকুল প্রাণে
বারেক যদ্যপি তুমি ডাক ভগবানে।
করুণ শ্রবণে তার পশে তব স্বর
জীবনে নিশ্চিন্ত হও মরণে অমর।
বাজিকর।
ভাবিছে একাকী বসি বৃদ্ধ বাজিকর,
করেছি বাজিতে মুগ্ধ বহু নারী নর।
জীবন সায়াহে আমি বসে ভাবি আজি,
লাগায়েছ চোখে হরি কি যে ভােজবাজি।
২০
বন-তুলসী।
হে কিষণ-জীউ, সদা যাই ভেবে মরে
এ মায়া ভেকী আমি কাটাব কি করে?
আত্মারাম কিম্বা টেকো সরকারের নামে
লাগালেম বহু ভেকী, এই ধরা ধামে,
এখন পীযুষ মাখা তব নাম স্মরি,
এ ভেকী কি কাটিবেনা হে দয়াল হরি!
অভিনেতা।
সানেত্রে, যুক্ত করে, বলে নটরাজ
রঙ্গমঞ্চে শেষ খেলা হল মাের আজ।
মিথ্যা সাজ সজ্জা খুলি দেখিলাম আমি
ছিন্নবাস জীর্ণ দেহ হে হৃদয় স্বামী।
নাহি কান্তি, নাহি শান্তি, কিছু নাহি আর
প্রাণেতে বহিছে শুধু বৃথা হাহাকার।
অনেক সাজালে আর, সাজে নাহি আশ,
এবার সাজাও তব দাস অনুদাস।
বন-তুলসী।
২১
কবিরাজ।
হারায়ে চোখের কাছে জামারে আজ
কাদিছেন ধন্বন্তরীকল্প কবিরাজ।
বলেন আমি যে কিছু করিতে না পারি,
তাহাই দেখায়ে দিলে ওহে দর্পহারী।
হৃদে যে লেগেছে ব্যথা, শত প্রলেপেতে
সাধ্য নাই কণামাত্র তাও কমাইতে।
তুমি রাখ, তুমি মার, জানিনে কি লাগি
আমারে করহে হরি নিমিত্তের ভাগী।
মহত চরিত।
উদয়ে লােহিত রবি, অস্তে ও লােহিত,
সুখে দুখে একরূপ মহৎ চরিত।
অস্থায়ী।
পূৰ্বে উঠি রবি, শশী ডুবি অস্তাচলে,
সুখ দুখ স্থায়ী নয় জানায় সকলে।
২২
বন-তুলসী
জীবন।
মানুষ দোলক শুধু হাসি অশ্রু মাঝ,
হাসে এই কঁাদে, এই তার কাজ।
সন্তোষ।
হেসে যেন লই যাহা দাও দয়া করে,
অসুখী না হই যেন লও যদি কেড়ে,
বহু দুঃখ কষ্ট আছ, আছে বহু দোষ,
বাড়াব তা কেন নিজে আনি অসন্তোষ।
সহানুভূতি।
কীট থেকে রয়াে দূরে, রহিয়াে নির্মল,
কীট-গ্রস্ত তরুমূলে ঢেলাে যেন জল,
পাপেরে করিয়াে ঘৃণা, করাে পদাঘাত,
পাপীর তাপিত দেহে বুলাইয়াে হাত।
বন-তুলসী।
করুণা।
,
করুণার পাত্ৰাপাত্র নাহিক বিচার,
তাপিতে জুড়াতে শুধু জীবন তাহার,
স্নিগ্ধ বারি ধারা সম নীচে পড়ে ঝরে,
গঙ্গা সম দুইকুল সুপবিত্র করে।
আতিথেয়তা।
অতি ক্ষুদ্র কুন্দ ফুল, আশ্রিততরে ঠাঁই
সেও দেয় শত্ৰুমিত্র ভেদাভেদ নাই।
যে কৃতঘ্ন কীট করে তাহাকে ছেদন,
তারাে প্রতি দেখ তার নাহি অযতন।
তৃপ্তি।
আঙুরে বলিছে নিম, খায় তােমা নরে
তাতে কি আনন্দ হয় তােমার অন্তরে ?
আঙুর বলিছে মাের আনন্দ মহান,
ক্ষুদ্র আমি তবু লােকে তৃপ্তি করি দান।
28
বন-তুলসী।
জড়বাদী।
যে জন এ বিশ্ব দেখি, দেখে না ঈশ্বর
নির্বোধ তাহার তুল্য মেলা যে দুষ্কর।
সুন্দর মন্দির দেখি সে যে হায় ফেরে
দেখেনা ক রাধাশ্যামে বেদীর উপরে।
ভ্রম।
ঈশ্বর না মানি যেই শাস্ত্র নানা পড়ে,
বীজ না রােপিয়া সে ত শুধু চষে মরে,
হৃদয়ে হয় না বিন্দু আলােক সঞ্চার,
ফু পাড়িয়া মরি, মাত্র ধোঁয়া লাভ তার
শুধু শাস্ত্র পাঠ।
ভকতি মিলেনা শুধু ধৰ্ম শাস্ত্র পড়ে,
গীতার প্রত্যেক শ্লোক তন্ন তন্ন করে।
ললিত মাধবী
ফুল কর খান খান,
পাবে না কোথাও তার মধুর সন্ধান।
বন-তুলসী।
*
পুনর্জন্ম।
কাল দামােদরে ডাকি বলে তনু তরী,
বল নদ কত আর যাতায়াত করি।
নদ বলে তার স্পর্শে হবে যবে সােণা,
তখন ঘুচিবে তব ভবে আনাগােনা।
সাধুর কৃপা।
জাগেনা প্রকৃত জ্ঞান, জাগেনা বিবেক,
বিনা মহতের পদ রজো অভিষেক।
পাপ।
পাপ একটুকু ঠাই, চাহি ক্ষণতরে
অতিথি হইয়া আসি রয়ে যায় ঘরে,
যাইতে বলিলে শুধু চায় মৃদু হাসি,
যার গৃহ সেই গৃহে হয় পরবাসী।
বন-তুলসী।
ভাল ও মন্দ।
কৃষ্ণপ্রেমে যান যারা ত্যজিয়া সংসার
সমাজের সর’ তারা ভােগ্য দেবতার,
পাপ লিপ্সা মিটাতে যে গৃহ ধৰ্ম্ম ছাড়ে
দূরীভূত সংসারের গাদ’ বলি তারে।
বলিছে শার্দুল বৃদ্ধ বহুদিন ধরে
সাধু সেজে বসে আছি, হেতা চুপ করে।
তাহাতে হলনা মাের হরি পদে ঠাই
শিখিপুচ্ছ পাবে তারে হেসে মরে যাই।
ধরা বলে পশু তব ভীষণ মুখ
দেশ কাল পাত্র ভােদ আছে কিহে সেথা।
বিফলে জীবন যাপ তুমি হিংসা লােভে
ক্ষুদ্র শিখিপুচ্ছ, তবু হরি শিরে শােভে।
বন-তুলসী।
২৭
মূঢ়।
তাল তরু বলে আজ কাজ কিহে গােলে,
করা যাবে হরি নাম ‘বুড়া সুড়া’ হলে।
কাজ নাই এনে আর ও সকল ভাব,
ততক্ষণ করা যাক সুদের হিসাব।
কি অবােধ তরু হায়, হল অকস্মাৎ
শরতের বিনা মেঘে শিরে বজ্রাঘাত।
সাধু ও গৃহী।
সাধুরে জিজ্ঞাসে বক, এই গঙ্গাতটে
প্রভাতে সন্ধ্যায় দেহে বসে থাকি বটে।
আমি ত তােমারি মত থাকি চোক বুজে,
কই ত হরির কিছু পেলাম না খুঁজে।
সাধু কন ‘চোক বােজ’ মন থাকে তব
আসিবে শীকার কবে ছোঁ মারিয়া লব।
ও নহে হরির লাগি তব চোক বােজা,
ও কেবল মনে মনে মৎস্য কীট খোঁজা।
২৮
বন-তুলসী।
ঘর বাড়ী।
বাবুই বলিছে ধীরে পাপিয়ারে ডাকি,
করােনাক ঘর বাড়ী তুমি খেপা নাকি?
ঢালিবে বরষা যবে খর জল ধার,
রবে না তােমার ঠাই মাথা গুজিবার।
পাপিয়া বলিছে নিজে ঘর নাহি গড়ি’
তাই ধরাময় ঘর দিয়েছেন হরি।
পাপ ও মিথ্যা।
পাপ ত ডাকাত, আসি ভাঙ্গে ঘর দোর
হেসে ধীরে আসে মিথ্যা ভদ্রবেশী চোর।
ধর্মের ভান।
বিবেক রচিয়া ব্যুহ রাখে পাপে দুরে,
নানারূপে আসি পাপ যায় ফিরে ঘুরে।
কিন্তু যবে ধৰ্ম্মসাজে সেজে আসে হায়,
তখনি তাহারে আর ঠেকানাে যে দায়।
বন-তুলসী।
সংজ্ঞা।
সৌন্দৰ্য্য—বিশ্বেতে তার পুণ্য কর লেখা,
প্রেম—সে সৌন্দৰ্য্য মাঝে নিত্য তাঁরে দেখা,
প্রীতি—রূপ হেরি তঁার হওয়া অনুরাগী,
ভকতি-উৎকণ্ঠা হরি মিলনের লাগি।
তুলনায়।
স্বার্থলাভ চেয়ে স্বার্থত্যাগ ফলবান,
আত্মজয় বিশ্বজয় চেয়ে গরীয়ান।
কলঙ্ক স্তম্ভ।
কাড়িয়া পরের গ্রাস, লুটি’ পর ধন,
পার পাবে করি কিহে মন্দির স্থাপন।
থাকে না দেবতা সেথা জেনাে মনে স্থির,
সে তব কলঙ্কস্তম্ভ নহেক মন্দির।
বন-তুলসী।
পাগল।
পাগল সন্ন্যাসী থাকে বাঁধিয়া নয়ন।
দেখিবে না জগতের পাপ প্রলােভন।
হায় মূঢ় কি করিবে চোখে বেঁধে কথা।
চোখ যেথা যাবেনাকো মন যাবে সেথা।
কৰ্ম্মফল।
চোরাচকিটা যদি লাগে কাপড়েতে।
তুলিলে যায় না তা কখন ধােপেতে।
কৰ্ম্মফলল সেই মত না করিলে ক্ষয়,
জন্ম জন্মান্তরেও আত্মার সাথী হয়।
মাতৃত্ব।
পুণ্যবতী যুবতী যখন হন মাতা,
তখনি তাহার রূপ লভে সার্থকতা।
কনক লতিকা ক্রোড়ে শােভে যবে ফুল
তখন তাহার শােভা ভুবনে অতুল।
বন-তুলসী।
৩১
সৎসঙ্গ।
তুলসীর মালা কণ্ঠে করিয়া ধারণ,
সাধু কন আজ হল সার্থক জীবন।
মালা কন ক্ষুদ্রকাঠ ছিনু পড়ে জলে,
কত পুণ্য সাধু মােরে ধরেছেন গলে।
সূতা কন সব চেয়ে আমি ভাগ্যবান,
মালা সঙ্গে থাকি হল সাধু কণ্ঠে স্থান।
প্রতারিত।
পড়িয়া বকুল ফুল পথের ধূলায়,
কাদে হায় যে আসে সে পদে দলে যায়
বলে ভেবেছিনু হেথা মিটিবে পিয়াসা,
ইচ্ছায় খােয়ানু সব হায়রে দুরাশা।
বুলবুল বলে তুমি বােঝ নাকি ফুল,
দুখ পায়, সুখ লাগি ত্যজে যেই কুল।
গৃহস্থের গণ্ডীর বাহিরে পদ দিলে,
মিলে না কিছুই, শুধু কলঙ্কই মিলে।
৩২
বন-তুলসী।
কর্তব্য।
কোকিলা বলিছে সদা তার নাম গাই,
তবু কেন হৃদে মাের শান্তি নাহি পাই,
সারসী বলিছে কর কর্তব্য লঙ্ঘন,
করােনা যে তুমি স্বীয় সন্তান পালন।
মাতা হয়ে তনয়ে যে না করে শিক্ষিত।
জগত জননী স্নেহে হয় সে বঞ্চিত।
গৃহধর্ম।
পালিত ময়না মুখ ফিরাইয়া ধীরে,
নিত্য উপহাস করে কৃষ্ণসারসীরে।
বলে নাই রূপ থাক তড়াগ প্রান্তরে
কণ্ঠ নাই পারনাক ডাকিতে ঈশ্বরে।
বৃথায় কাটালে জন্ম ঘাের গৃহী হয়ে।
ভােজন শয়ন আর ছেলে পুলে লয়ে।
সারসী বলিছে ভাই নাই মায়া ঘােরে
তাহাদেরি মাঝে আমি পেয়েছি ঈশ্বরে
স্ত্রীলােকের অন্য যােগ আরাধনা নাই
গৃহকৰ্ম্ম আমাদের জপ তপ ভাই।
বন-তুলসী।
নারীধৰ্ম্ম।
পতিপ্রেম, হরিভক্তি, সন্তানপালন,
রন্ধন, শুশ্রুষা, নারি এ পঞ্চ সাধন।
কাব্য উপন্যাস লিখি যশে কিবা কাজ
কৃতীপুত্র কীর্তিস্তম্ভ তব জগ মাঝ।
মহাপুরুষ।
আহত সেনানী পড়ি সমর প্রাঙ্গণে
তৃষ্ণার্ত কাতর দেখি সেনা জল আনে।
তুলিতে ভৃঙ্গার মুখে, হেরিল নয়ন
পার্শ্বে তার রিপু সেনা পড়ি একজন।
তৃষিত কাতর আছে জল পানে চাহি,
শােণিতাক্ত কলেবর, দেহে শক্তি নাহি।
আপনি না পিয়ে জল শীতল ভৃঙ্গার
ঈঙ্গিতে বলেন ভৃত্যে দিতে মুখে তার ।
কর পান হে সৈনিক কন মহামতি
মাের তৃষা হতে তব তৃষা বলবতী।
৩৪
বন-তুলসী।
মানুষের অকৃতজ্ঞতা।
যে মন্ত্রী স্থাপিল শান্তি দমি দুষ্ট প্রজা
বার্ধক্যে তাহারে দূরে খেদাইল রাজা।
পথের ভিখারী মন্ত্রী শ্রান্ত ক্লান্ত প্রাণে
বসিল আসিয়া এক মন্দির সােপানে।
প্রণমিয়া দেবে কাদে জুড়ি দুটি কর,
বলে কি সুন্দর শিক্ষা দিলে হে ঈশ্বর।
একদিননা করিতাম যদি তব কাজ
কভু ত্যজিতে না মােরে রাজ-অধিরাজ।
তন্ময়তা।
গােপালে পূজেন ভক্ত নিত্য প্রাণভরি,
করেন তাহারি ধ্যান দিবা বিভাবরী।
দেবতা খায় না কিছু, কহে না যে কথা,
মনেতে সন্দেহ তাই, তাই ঘাের ব্যথা।
একদা আরতি কালে কন ভাগ্যবান
আমি ত দেবতা পূজি পূজিনে পাষাণ।
বন-তুলসী।
পরাণগােপাল মাের হই হব পাপী,
চরণ অঙ্গুলে তব দন্ত দিনু চাপি।
দেবতা হাসিয়া কন, কি কর কি কর
ছেড়ে দাও, পায়ে ভাই লাগিতেছে বড়।
কাঁদিয়া ভকত বলে দেবতা কঠিন
পাষাণ সাজিয়ে কেন ছিলে এতদিন।
দেবতা কহেন হাসি তুমিও তাে আগে
ভাব নাই, পাষাণেরে টিপিলে যে লাগে।
বন্ধন ছেদন।
রুদ্ধ পাখী কাটে আগে লােহার শিকল,
তবে সে দেখিতে পায় নীলনভােজ্জল।
শিখীপুচ্ছ ত্যজে আগে শিখণ্ডীর কায়
তবে ত সে শ্রীকৃষ্ণের শিরে ঠাঁই পায়।
তুমিও ছেদরে মন রিপু মায়া পাশ
তবে অধিকারী হবে হতে তঁার দাস।
বন-তুলসী।
উপদেষ্টা।
মৃত কুম্ভীরের পানে চাহি বলে জেঁক
বৃথা গৰ্ব অহঙ্কার কেন করে লােক।
এই যদি পরিণাম তবে কেন হায়
পরের হাতের দ্রব্য কেড়ে লয়ে খায় ।
কবি বলে ওহে জোক হে সাধু বৈরাগী,
তুমি কেন ছুটে যাও শােণিতের লাগি ।
কোকিল বলেন এসাে পলায়ে ভ্রমর,
বরষার প্রলােভন এড়ান দুষ্কর।
ফুটিবে কেতকী তার পরাগের ঘ্রাণে
ছুটে গিয়া কণ্টকেতে মারা যাবে প্রাণে
যুখীপরিমলবাহী মাতাল সমীর
কুপথে লইয়া যাবে করিবে অধীর।
মেঘের নয়ন ধারা, ঝঙ্কা দীর্ঘশ্বাস,
অচিরে করিবে পূর্ণ তােমার আবাস।
বন-তুলসী।
৩৭
অলি বলে দুখ শােক ত্যজি যে পলায়
তার গুণপনা কেহ গাহেনা ধরায়,
শােক, দুখ, লােভ, মাঝে রহে যে অটল
প্রকৃত মহৎ সেই জানিয়াে কেবল।
মহাভাব।
সংসারের প্রেম ক্ষুদ্র পয়ােনালী হায়
হরি-প্রেম-গঙ্গা সনে যদি মিশে যায়।
সঙ্কীর্ণ স্বার্থের বাঁধ থাকেনা ক আর,
ভক্তি বন্যা জলে সব হয় একাকার।
সৌন্দৰ্য্য সাগর।
যুবতীর আঁখি কোণে লাবণ্যের রাশি,
বালকের চন্দ্র মুখে সুধাময় হাসি।
দেখি মুগ্ধ চিত্রকর, দেখি মুগ্ধ কবি,
নয়ন ফিরাতে নারে, আঁকে সেই ছবি।
সত্যশিব সুন্দরের মূর্তি প্রেমময়,
সে মাধুৰ্য সাথে যার হয় পরিচয়,
বন-তুলসী।
ভুলে সে যে সুখ দুখ ভােজন শয়ন
ভুবন ফিরাতে নারে তাহার নয়ন।
রাধাকৃষ্ণ।
রাধাকৃষ্ণ আত্মা পরমাত্মার মিলন
সে প্রেমে কলঙ্ক দেয় সে লােক কেমন।
যে কলঙ্কে কলঙ্কিত হইবার তরে,
যােগী ঋষি যুগে যুগে কৃচ্ছতপ করে।
যে কলঙ্ক যুগে যুগে ঘােযিবার লাগি,
কেঁদে মরে শত কবি, শত অনুরাগী।
সংযত বিশুদ্ধ আত্মা হয়ে মহাভাগ,
লভিবারে ব্যগ্র সদা যে কলঙ্ক দাগ।
তাহারে কলঙ্ক তুই বলিসনে বােকা,
হৃদয় নিকষে সে যে কনকের রেখা।
কৰ্ম্মক্ষয়।
সুকর্মে সাধুরও পুণ্য পায় বটে লয়,
ঘর্ষণে চন্দন যথা ক্রমে পায় ক্ষয়।
চন্দনেরি মত তিনি সব পুণ্য শেষে
যান আহা শ্রীহরির পাদপদ্মে মিশে ।
বন-তুলসী।
রাঙ্গা ও সন্নাসী।
সম্রাট সাধুরে কন হে মহাকৃপণ,
নাহি ব্যয় সদা তব সঞ্চয়েতে মন।
আমি যে অমিতব্যয়ী করিনে সঞ্চয়,
তােমারে দেখিয়া তাই মনে হয় ভয়।
তুমি ত বৈকুণ্ঠে ক্রয় করেছ ভবন
পরণে কৌপীন কিন্তু তুমি মহাজন,
আমার যা কিছু ছিল খােয়াইনু হেতা,
তুমি ত হে মহাধনী আমি দীন সেথা।
ভিখারী।
বলেন ডাকিয়া ধনী সাধু হেরি দ্বারে,
কে আছিস ভিখারীরে ভিক্ষা দিয়ে যারে
শুনি সাধু মৃদুহাসি মনে মনে কন,
তুমি চাও ধন, রত্ন, বন্ধু, পরিজন,
নিয়েছ নিতেছ নিত্য তৃপ্ত নহ তবু,
অনন্ত যাচনা তব ফুরায় না কভু।
যে কেবল একমুঠা চাল শুধু চায়,
সে হল ভিখারী তুমি ধনী হলে হায় !
৪০
বন-তুলসী ।
পরের লাগি।
ইক্ষু কঁাদে কবে আমি হইব শর্করা,
মেঘ কাদে জলে কবে ভিজাইব ধরা,
ফুলকুড়ি কঁদে কবে দিব পরিমল,
পাখী কঁদে গীতে কবে মাতাইব বল ।
ইহারা কেবল সুখী ‘দান করে’ ভাই,
আমরা পরের দ্রব্য কেড়ে নিতে চাই।
সফল।
গান গাহিবার আগে যে শ্যামাটী মরে,
কোরকেতে যে চম্পক ভুমে ঝরে পড়ে।
বুক ভরা গান, সেই হৃদি ভরা বাস,
দেবভােগ্য হয় জেনো হয়না ক নাশ।
হেরি শ্রীমুখ পথে যাত্রী যদি মরে,
ভেবনা তাহার দেখা হলনা ঈশ্বরে।
সে নহে নিষ্ফল যাত্রা, সে নহে মরণ,
শ্রীহরি তাহারে আসি আগাইয়া লন।
বন-তুলসী।
৪১
প্রকাশ।
হয়ে থাকি
পর দুখে দুখী যদি, কভু,
কাহারেও সুখ যদি দিয়ে থাকি প্রভু।
যদি কোন দিন তুচ্ছ করে থাকি দুখ,
যদি হয়ে থাকি কভু পাপেতে বিমুখ।
বিশ্বের সৌন্দৰ্য হেরি, শুনি মধু গান,
যদি কভু তােমা পানে গিয়ে থাকে প্রাণ,
যদি প্রেমময় নামে কোন দিন আমি।
ফেলে থাকি আঁখিজল হে অন্তরযামী,
তাতে শুধু এই মাত্র করেছে প্রকাশ
দুর জন্মজন্মান্তরে ছিনু তব দাস ।
গভীরতা।
নীরবেতে ভালবাস, করিয়ােনা গােল,
হরি চান গভীরতা চান না কল্লোল।
৪২
বন-তুলসী।
ঈশ্বরত্ব আরােপ।
যে করেন হরি তব মহিমা প্রচার,
নত শিরে পালি যেন আদেশ তাহার।
কিন্তু যেন মােহ ঘােরে অথবা অজ্ঞানে,
বসাই তঁারে কভু তােমার আসনে।
ঈশ্বরের স্নেহ।
ভ্রমরের কালাে দেহ দেছ চিকনিয়া ,
কত যত্নে শিখীপুচ্ছ দিয়াছ রাঙিয়া,
অতি দীন, অতি ক্ষুদ্র, পিপীলিকাটীরে,
গড়িয়াছ কত যত্নে কত ধীরে ধীরে।
করিয়াছ তারে দক্ষ, সবল, নির্ভীক,
শিখায়েছ নিজ হাতে গড়িতে বল্মীক।
এতই আদর স্নেহ ক্ষুদ্র জীবে তব,
মানুষে যে কত স্নেহ সে কি আর কব।
বন-তুলসী।
৪৩
মরণ।
১,
টুটিয়া বন্ধন যবে ফুল পড়ে ঝরি,
তখন তােমার ভয়ে হৃদি উঠে ভরি,
আকাশের কোলে যবে ডােবে রাঙা রবি,
ফুটে উঠে চোখে তব নিদারুণ ছবি,
তবুও তােমারে ভালবাসি হে মরণ
তুমি সুরাইয়া দাও অভয় চরণ।
আপন ধৰ্ম্ম।
আল্লা, গড, জিহােবা, অলখনিরঞ্জন,
হরি, হর, কৃষ্ণ, কালী, সবি একজন,
তিনি এক, ভিন্ন নাম, সবি আমি জানি,
তবু মধুমাখা রাধাকৃষ্ণ নাম খানি।
হিয়ার সর্বস্ব মাের সৰ্বরূপ সার,
নব দুৰ্ব্বাদল শ্যাম শ্রীকৃষ্ণ আমার।
৪৪
বন-তুলসী ।
এসাে।
বাল্যে এসাে জনক জননী রূপ ধরি,
শৈশবে শিক্ষক রূপে দেখা দিয়াে হরি।
যৌবনে আসিয়াে হয়ে প্রিয়া প্রাণসখা,
প্রৌঢ়েতে তনয় রূপে দিয়ে মােরে দেখা।
বার্ধক্যে আসিয়ো তুমি হয়ে হরি নাম,
মরণে আসিয়াে সখা হয়ে রাধাশ্যাম।
ভক্তিতে মিলয়ে কৃষ্ণ।
বায়ু বিশ্বব্যাপী ইহা জানেনাক যারা,
সমীর সেবন সুখ লভেনা কি তারা?
যে জানে না পৃথিবীর তিনভাগ জল
তৃষ্ণা নিবারণ তার হয় কি না বল ?
কি প্রকাণ্ড এ ভুবন জানে না যে জন
আপনার জমি যত্নে করয়ে কর্ষণ,
সে কি গাে লভে না গ্রীষ্মে ছায়া সুশীতল,
লভে না কি গাছ ভরা সুরসাল ফল?
বন-তুলসী।
৪৫
তেমনি যে ভক্তি ভরে ব্যাকুল অন্তরে
ঈশ্বরের অতি ক্ষুদ্র মূর্তি পূজা করে,
সেও লভে তার কৃপা লভে মুক্তি ফল,
চক্ষু বুজি চিন্ময়েরে মিলে না কেবল।
বিফল।
কত বর্ষা আসে যায় করি কুলুকুল
হৃদয় মালঞ্চে মাের ফোটেনাক ফুল।
শরত কত যে হায় এলাে গেল চলে,
হলাে না বিম্বিত শশী হৃদয় পল্বলে ।
মধুর বসন্ত গেল, হাসায়ে ভূলােক
ফুটিল না জীর্ণশাখে বাসন্তী অশােক,
হায় শুনিল না মাের, এ পােড় উদ্যান,
একদিননা হরি নাম পাপিয়ার গান।
যদি।
শােকে ফেলিয়াছি আমি যত আঁখিজল
ধােয়া’তাম তাহে যদি শ্রীপাদ কমল।
৪৬
বন-তুলসী।
বেদনা ব্যথায় যত করেছি চীৎকার,
করিতাম তার লাগি যদি সিকি তার।
ফেলিয়াছি দুখে হায় যে দীর্ঘ নিশ্বাস,
ফেলিম যদি তাহা হতে তঁার দাস।
কেটে যেত এতদিন মায়ামােহ ঘাের,
ভব বন্ধনের ক্লেশ শেষ হ’ত মাের।
প্রার্থনা।
হে ঈশ্বর যদি তুমি হও নিরাকার,
ক্ষমা করাে যদি ভাবি অন্যথা তাহার।
হে ঈশ্বর যদি তুমি হও শুধু জ্যোতি
ক্ষমা করাে যদি নাহি হয় তাতে মতি।
হে ঈশ্বর যদি শুধু হওহে চিন্ময়,
ক্ষমা করাে যদি মাের ভক্তি নাহি হয়।
হে ঈশ্বর যদি তুমি হও মাের হরি,
নব ঘন শ্যাম তনু শঙ্খচক্রধারী,
এই ভিক্ষা তব কাছে হে দীনের সখা
অন্তিমে সে রূপে যেন দিয়ে মােরে দেখ।
বন-তুলসী।
৪৭
ভিক্ষা
দুদিনের পােষ পাখী পলাইলে উড়ে,
খাঁচা প্রাণ মন ব্যাকুলিত করে।
পরাণের প্রিয় জনে দিয়া হে বিদায়
জীবন আঁধার হয়, মূরছে ব্যথায়।
সে দিনে তােমারে যদি ভুলে থাকি হরি,
ক্ষমা করাে দুৰ্ব্বলেরে তুমি কৃপা করি।
ভাস্কর জীবন ধরে গড়া প্রতিমায়
যে আদর্শ যে রূপটী ফলাইতে চায়।
কল্পনা মিশায়ে রঙে সদা চিত্রকর,
যাহা ফলাইতে চাহে ছবির উপর।
যে শেষ কথাটী কবি বলিবার তরে
শব্দ নাহি খুজে পায় শুধু কেঁদে মরে।
সেই রূপ, সেই রঙ, তুমি সেই গান,
চরম আদর্শ তুমি ওহে ভগবান।
সম্পূর্ণ
No text on this page.
শ্ৰীযুক্ত কুমুদরঞ্জন মল্লিক বিএ প্রণীত
শতদল।
মূল্য তিন আনা।
এক শত সৌরভময় দলে পূর্ণ। কবিবর রবীন্দ্রনাথ,
সার গুরুদাস, অধ্যাপক ললিতকুমার, সুলেখক প্রভাতকুমার
প্রভৃতি কর্তৃক মুক্তকণ্ঠে প্রসংশিত। চক্রবর্তী চাটার্জি এণ্ড
কোং, ৬৩ হারিসন রােড ও ২০নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট মজুমদার
লাইব্রেরীতে প্রাপ্তব্য।
সাহিত্যসম্রাট রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন
“আপনার প্রণীত শতদল পড়িয়া আনন্দিত হইলাম।
ইহার ঘােট ঘােট কবিতাগুলি মৌচাকের ঘােট ঘােট
কক্ষের মত রসপূর্ণ হইয়াছে। কখনাে কখনাে মৌমাচির
হুলেরও পরিচয় পাওয়া যায়।”
স্বনামধন্য অধ্যাপক ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, এম, এ,
বিদ্যারত্ন মহাশয় লিখিয়াছেন—
“শতদল একশত দলই আম্রাণ করিয়াছি। ভাবুকতার
মৃদুসৌরভে ইহা প্রকৃতই পদ্মের সহিত উপমেয়। আজ
কালকার বিকট প্রেমের কবিতায় যে একটা কাঁটালে
চাপার উগ্রগন্ধ পাওয়া যায় ইহাতে তাহা নাই। শতদল
আদরের বস্তু হইয়াছে, বহুবার পড়িলেও এরূপ কবিতা
পুরাতন হয় না। এ নাটক নভেল প্লাবিত দেশে এরূপ
ভাবুকতাময় ক্ষুদ্র কবিতার পাঠক যুটিবে কি?
ইণ্ডিয়া প্রেস, ২৪নং মিডিল নােড়, ইটালী।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.