Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Italir Sera Galpo Ed. 1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সেরা গল্প সিবিজ (২)
ইতালীৱ সেৱা গল্প
অনুবাদক
শ্রীরবীন্দ্রকুমার বসু
l
৭।
বুক স্ট্যাণ্ড
১/১/এ, বঙ্কিম চাটার্জী টি
কলিকাতা
প্রকাশক: শৈলবিহারী ঘােম বুক ষ্ট্যাণ্ড ১১এ, বঙ্কিম চাটার্জী থ্রীট কলিকাতা প্রচ্ছদপটে রূপ দিয়েছেন- শিল্প—অনাথবন্ধু সেন প্রচ্ছদপট ভাবত ফটোটাইপ স্টুডিও প্রথম সংস্করণ অক্টোবর ১৯৪৫ দাম—আড়াই টাকা প্রিন্টার-পরমেশ্ব ক ভাগবত প্ৰে ৩৪, হরমােহন ঘােষ কে কলিকাতা
16
প্রখ্যামা কথ-শিল্পী
শ্ৰীযুক্ত শৈলজানন্দ মুখােপাধ্যায়
শ্ৰদ্বম্পদে
No text on this page.
২ * । . ভূমিকা ইটালীর কয়েকজন বিশাল এলকের গল্প শযুক্ত রবীন্দ্রকুমার বস্তু এই বইতে তর্জমা কবেছেন। তার এই সাধু প্রয়াসে জন্যে তাকে আমি অভিনন্দিত করছি। বিজ্ঞানের কল্যাণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আগেকার সেই দূরত্ব ও ব্যবধান এখন আর নেই। আগেকার সেই সুদূর পরামরাজ্য এখন আমাদেব বাড়ির কাছের দেশ বললেই চলে,—আকাশে কতক্ষণেই বা পথ। যেমন রাজনীতি অর্থনীতি, তেমন সংস্কৃতির দিক থেকেও বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হচ্ছে। আজ যদি আমরা আমাদের বাণী-মন্দিরের বাইরের দিকের জানালাগুলাে বন্ধ করে রাশি তাহলে আত্মহত্যার মতোই ভূল করব। আমাদের উদ্যম এখন শুধু মৌলিক সাহিত্য-সৃষ্টির মধ্যে নিবদ্ধ রাখলেই চলবে না। সেই সঙ্গে বাইরের সাহিত্যের সঙ্গেও পরিচিত হতে হবে। অন্য দেশের সাহিত্য এবং চিন্তাধারা কোন পথে চলেছে এও আমাদের জানতে হবে। এই কাজটা এতদিন আমরা ইংরিজির মারফৎ চালিয়ে আসছিলাম। ইউরােপের বিভিন্ন দেশের সাহিত্য ইংরিজিতে জমা হয়েছে। তর্জমা পড়ে আমরা ইউরােপীয় সাহিত্যের আস্বাদ গ্রহণ করেছি। রবীন্দ্রকুমারও সেই ইংরিজি অনুবাদ থেকেই বাংলায় অনুবাদ করেছেন বলেই মনে হয়। এর অনেক অসুবিধা আছে ।
ইংলণ্ডের সঙ্গে ইউরােপের বিভিন্ন দেশের পরিবেশগত সংস্কৃতিগত এবং ভাষাগত একটা মিল রয়েছে। হিন্দি অথবা গুজরাটি গল্প বাংলায় অনুবাদ করা যেমন কঠিন নয়, ফরাসী কিম্বা ইটালীয় সাহিত্য ইরিজিতে অনুবাদ কবা তেমনি কঠিন নয়। কিন্তু ওনের রস অক্ষুন্ন রেখে ইটালীয় সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করা অত্যন্ত কঠিন। এই দুরূহ কার্যে আমাদের ফেবৰ এইটুকু সুবিধা আছে যে, দীর্ঘ কানের সংস্পর্শে ও সান্নিধ্যে ইংরিজির সঙ্গে বাংলা ভাষার একট। সংযােগ স্থাপিত হয়েছে। ইংরিজি আমরা প্রায় মাতৃভাষার মতাে করেই আয়ত্ত করবার চেষ্টা করেছি এবং আমাদের ভাষার কাঠামােতেও ই'রিজির ছাপ পডেছে গভীর। সেই সুবিধা রবীন্দ্রকুমারেরও আছে এবং তাকে তিনি ষোল আনার উপর আঠারো আনা কাজে লাগিয়েছেন। ইটালীয় সাহিত্যের সূক্ষ্ম রসগ্রহণের শক্তি তার আছে। নিজে তিনি উচু দরেব সাহিত্য- রসিক। যে রস তিনি নিজে পরিপূর্ণ করে গ্রহণ করেছেন, অন্যের কাহে অবিকল তা পরিবেশন করার অসামান্য শক্তিও তঁার আছে। তাই অনুবাদ এত সুন্দর হয়েছে। বিদেশীয় পরিবেশের যে বিজাতীয়ত, সুন্দর ভাষায় তার খেচগুলি তিনি চমৎকার পালিশ করে দিয়েছেন। পড়তে পড়তে মনে-মনে তঁাকে বহুবার বাহবা দিয়েছি। তার লেখনী অজস্র ধারায় এমনি সুমধুর রস পরিবেশন করুক এই প্রার্থনা করি। শ্রীসরােজকুমার রায়চৌধুরী ।
সূচী
২৩
)
তুষারপাত
এটিতে কাটতে
(১৮৩৯•••)
বুকিওলাে এবং তার অধ্যাপক
সার গিওভানি
ক্যানডিয়ার শেষ পরিণতি
গেরি ডেনান্থসিও
(১৮৬০
দু'টি নর ও একটি নারী
গ্রেংসিম দেলেদ্দা
(১৮৭২ •
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজত-মূর্তি
এনটনিয়ে বোমাংসারে।
(১৮৪২• ১৯১১)
সানন্দ সদ
লুসিয়ানা জুলি
৭২
১২০
No text on this page.
, pl k তুষারপাত বইছে কালাে-কালাে মেঘে আকাশ সমাচ্ছন্ন। বাতাস বইছে। হু-হু করে। অসম্ভব শীত। বাতাসের সঙ্গে একটা শীতলতা আসছে ভেসে। এতে ঠাণ্ডা যে, দেহের সমস্ত হাডগুলি কেঁপে কেঁপে ওঠে। এমনি যখন বিশ্রী প্রভাত, তখন কিসের আকর্ষণে, এই ন'টার সময়, সিনর আডােয়াডাে তার অধ্যয়ন কক্ষের বাতায়নের সুমুখে দাঁড়িয়ে আছেন? নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে—তিনি সযৌবন, শক্তিসম্পন্ন সতেজ ব্যক্তি। কারাে স্বাস্থ্য সম্বন্ধে ঈর্ষান্বিত হওয়া কখনাে যুক্তিসঙ্গত নয়। সিনর অভােয়ারাডার বাতায়নের বিপরীত ভাগে, সিনােরা ইত লিনার জানালা। এরও অভােয়াডাের মতই নিজের জানালায় দাড়ানাে অভ্যাস আছে। আজো সেই অত্যাসের কোনাে ব্যতিক্রম দেখা গেলাে না। ইভলিনা ঘরের জানালাটার ওপর নিজের দেহের ভার ন্যস্ত করে দাড়িয়ে আছেন। ওঁর কুঞ্চিত কেশদাম বাতাসের দাপটে ললাটদেশে আছাড় খেয়ে পড়ছে। এবং সেই বিক্ষিপ্ত কুঞ্চিত কেশ, মাঝে-মাঝে মাথার ঝাঁকুনি দিয়ে ললাট থেকে সরিয়ে দেবার বৃথা চেষ্টা করছেন। দু-জনের বাড়ীর মাঝখান দিয়ে একটা অপরিসর রাস্তা। কাজেই ঐ দুই বাড়ীর বাতায়নে দাড়িয়ে এক ব্যক্তি আর এক ব্যক্তির সঙ্গে স্বচ্ছনেই বাক্যালাপ করতে পারেন।
ইতালীব সেরা গল্প অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, ইভলিনার স্বামী মৃত, এবং এর সৌন্দৰ্য্য অনুপম। শুধু অনুপম নয়, সৌন্দৰ্য্য মাদকতায় পূর্ণ। ওর দেহের কমনীয়তা এমনি যে, নারীর মনেও লালসার উদ্রেক করে। মাথার কেশ সােনালী। গায়ের রং রং ঠিক দুধে-আলতা। সরল না। চুম্বন করার উপযােগী ওষ্ঠদ্বয়ের ভেতর চমংকার শাদা ধবধবে দাঁতের সারি। চোখ দু’টি ঠিক মেঘশূন্য নীলাকাশের মতো। অনন্যসাধারণ দু’টি চোখের সদ্ব্যবহার তার অজানা ছিলাে না। বয়স মাত্র চব্বিশ। কিন্তু ঈশ্বরের কী অবিচার দেখুন। এই তুলনাহীন সৌন্দর্য নিয়ে, এত অল্প বয়সে সে বিধবা । সত্যি কথা বলতে কি, এর চরিত্রের একটা সবলতার ভাব বিদ্যমান। তাঁর স্বামী গত হবার পর মাত্র ছ'টি মাস কেটে গিয়েছে। এটা সুখের বিষয়, নিশ্চয়ই সুখের বিষয় যে, ইভলিনা সংসারে জড়িত হয়ে পড়েন নি। না পড়ার একটা কারণও আছে। স্বাধীন, ছেলেমেয়ের বালাই নেই। কিন্তু আমাদের দৃঢ় ধারণা, তিনি তাঁর এই ভরা যৌবন, অনন্যসাধারণ রূপরাশি এবং সীমাহীন মাদকতা নিয়ে দ্বিতীয় স্বামী লাভ করতে পারেন অনায়াসে। ফলত এটা দোষ হবে না, যদি এটা স্বীকার করা যায় যে, ইলিনা দ্বিতীয় বার বিয়ে করবার অভিলাষ মনে-মনে পােবন করেন। এই প্রসঙ্গে এটা বলে রাখা ভালাে, সিনর অভােয়াডাের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল, এবং তিনিও বিপত্নীক। কী আশ্চৰ্য্য সমম্বত। কিন্তু তারা দ্বিতীয় বার বিয়ে করেন না কেন?
তুষারপাত সিনর অভােয়াডাে এখনাে কিছু স্থির করতে পারেননি। যদি প্রেম-সংক্রান্তের খারাপ কিছু ঘটতাে, তাহলে আমার মনে হয় এই অস্থিরতা ইতিপূৰ্বই অপসারিত হয়ে যেতাে। কিন্তু সিনাের ইতলিনার অভিরুচির মধ্যে মৌলিকতা আছে। তিনি দ্বিতীয় বারের জন্যে স্বামীর খোঁজ করছেন। সত্যিকারের স্বামী চান তিনি। প্রতারণা কখনন ভূলেও কামনা করেন না। পুরুষের মাথা খারাপ করে দেবার অনেক কিছু কলা-কৌশল তার জানা। কিন্তু নিজে অনুক্ষণ ঠিক থাকেন। এটা বড়াে কম শক্তি নয়। পরের মাথা ঘুরিয়ে দিয়ে নিজে খাট থাকা, চরিণের একটা বৈশিষ্ট্য বৈকি। নিজে স্বার্থসিদ্ধিব দিক দিয়ে ধরতে গেলে, সিনােরা ইভলিন অত্যন্ত সতর্ক , একথা বলতেই হবে। সিনর অডােরাের পাঠাগারের জানালার বিপরীত দিকে, কক্ষের প্রবেশ পথের দরজা। সহসা সেই দরজা সশকে ঠেল একটি আটন বছরের বালিকা প্রবেশ করলো। এই মেয়েটির মাম—ডয়েটা। ডরেটা সুমিষ্ট স্বরে তর পিতাকে লক্ষ্য করে বল্লো, আমি ইস্কুলে যাচ্ছি বাবা। -এসো ডরেটা। এই বলে তিনি স্মিতহাস্যে কন্যার মুখচুম্বন করলেন। ঠিক সেই সময়ে সিনাের ইলিনা ওদিকের জানালা থেকে বলে উঠলেন, সুপ্রভাত ডরেটা। ডরেটা ঘরে প্রবেশ মাত্রই লক্ষ্য করেছিলাে, ঐ সুন্দুরী ইভলিনাকে তার পিতার সঙ্গে বাক্যালাপ করতে। সে বিরক্তি এবং অনিহার সঙ্গে অকূটে বল্লো, সুপ্রভাত।
ইতালীর সেরা গল্প
এই বলে বাশিকাটি হাতে একটা ছােটো ব্যাগ নিয়ে হলঘরে নেমে
আসে। এখানে তার জন্যে পরিচারিকা অপেক্ষা করে।
ইভলিন। একটা নিশ্বাস পরিত্যাগ করে বল্লেন, মেয়েটিকে আমি
কততই না ভালােবাসি। কিন্তু আমার নিতান্তই দুর্ভাগ্য যে, ও আমাকে
একেবারেই দেখতে পারে না।
-কী অদ্ভুত ধারণা আপনার। ডরেটা যে অত্যন্ত স্বাধীনচেতা
মেয়ে। ওর মনে কখনাে এভাব আসতে পারে না। আর যদিও বা
আসে, সেটা থাকে না বেশিক্ষণ ।
সিনর অডােয়ারাে একথা প্রতিবাদচ্ছলে ব’জেন বটে, কিন্তু উনি
বেশ ভালাে করেই জানেন, তাঁর কন্যার কোনাে আসক্তিই নেই
সিনােরা ইভলিনার প্রতি।
ইত্যবসরে বায়ুর শীতলতা অধিক থেকে অধিকতর হয়ে উঠছিলাে।
তুষারপাতে চতুর্দিক শাদা। জানালা বন্ধ করে রাখা ছাড়া আর
গত্যন্তর নেই।
উদ্ধপানে দৃষ্টিপাত করে সিনােরা ইভলিন। বল্লেন, বরফ পড়ছে।
-হ্যা, এখুনি হয় তাে ঘরের ভেতরে এসে পড়বে।
-আচ্ছা, এখন চল্লাম। ঘরের কাজকর্ম বাকী আছে। বিদায়
যতক্ষণ পর্যন্ত না আবার দেখা হয়। পরে আপনার দেখা পাবাে ?
-আশা তাে করি।
—আচ্ছা, আসি তবে।
এই বলে সিনােরা ইভলিনা জানালাটা বন্ধ করে দেন। এবং
পরক্ষণেই আনত মুখে একটা সরল হাঙ্গ-রেখা ওঠের ওপর টেনে
তুষারপাত এনে, তখুনি অদৃশ্য হয়ে যান। এটা অভােয়ারভাের চোখে ধরা পড়তে বিলম্ব হলাে না। দরজার ভেতর দিকে স্বচ্ছ, পরিষ্কার শার্সি। এর মধ্য দিয়েই তিনি ইভলিনার মুখের হাসি দেখতে পান। অভােলারডাে জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে পাঠ অনােযাগ দেবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু অত্যন্ত শীত বােধ হওয়ায় তিনি প্রজ্জ্বলিত অগ্নিমুখে আরাে খান কয়েক কাঠ খুঁজে দিলেন। দিয়ে পুনশ্চ চেয়ারখানা টেনে নিয়ে অধ্যয়ন করতে সুরু করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার। উনি 'নমনে অশান্ত হয়ে উঠেছেন। তাই আসন ত্যাগ করে ক্ষাকালের মধ্যেই কক্ষের ভেতর পায়চারী আরম্ভ করেন। সিনর অডােয়াডাে গভীর চিন্তায় নতমস্তকে পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঠিক হায়নার মতাে ঘুরছেন। তার মনে হতে থাকে তিনি তার জীবনের এক বিপদ সঙ্কুল পথে পা দিয়েছেন। এবং বােধকরি কয়েকদিনের মধ্যে, চাই কি কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই, তার ভবিষ্যৎ নিরূপিত হয়ে যাবে। ইলিনার কি তাঁর মৃত স্ত্রীর মতাে চমৎকার স্বভাব ? ডরেটার মার অভাব তিনি কি পূরণ করতে পারবেন? হলঘরে কার যেনো পদশব্দ। সির অডােয়াডাে মধ্যপথে অকস্মাৎ থমকে দাড়ালেন। তার কক্ষঘর সহসা উন্মুক্ত হলাে—ডরেটা প্রবেশ করছে। মেয়েটির কচি কপােল দু’টি রক্তাত। বরফ পড়ছে বাপী। সেই জন্যে আমাদের ছুটি হয়ে গেলাে। এই ব'লে ডরেটা মাথার টুপিটা দূরে ছুড়ে দিয়ে, আগুনের কাছে এলাে।
ইতালীর সেরা গল্প —আগুন খুব রয়েছে। কিন্তু ঘরটা এলে ঠাণ্ডা। ডরেটা বলো। ডরেটা আগুন পােয়াতে পােয়াতে আবার বলো, বাপী, আজ সমস্ত দিনটাই তােমার কাছে থাকবে কিন্তু। হ্যা, বাপী-নিশ্চয়ই থাকবে। কিন্তু তােমার এই বাপীর যদি কোনাে জরুরী कषि না না, বাপী। ওসব শুনতে চাইনে। আজকে তােমার কোনো কাজই করতে দেবাে না। এই বলে ডরেটা উত্তবের কোনাে প্রতীক্ষা মাত্র ন করে তার বই, পুতুল নিয়ে আসবার জন্যে ঘর থেকে দৌডেই বেরিয়ে গেলাে। ফিরে এলাে, মিনিট দুই পবে। ডেস্কের ওপর বই বিছিয়ে এবং পুতুলটিকে পরমষত্বে সােফার এক পাশে বসিয়ে রেখে ডরেটা আনন্দে বলে উঠলাে, বাঁচা গেলাে বাবা, আজ ইস্কুল হলাে না। পড়া হয়নি আজকের। পড়াটা ভালাে করে পড়বার সময় পেলাম বাবা। দেখাে বাপী, কী রকম বরফ পড়ছে। দেখো, দেখাে । সত্যি চারিদিকে তুষারপাত হচ্ছে। ঘরের বাইরে ঠাণ্ডার প্রচণ্ডতা আছে। কিন্তু ভেতর দিকটা শীঘ্র উষ্ণ হয়ে উঠছিলাে। একটা চেয়ারের ওপর আসন গ্রহণ করে ডরেটা সন্তুষ্টচিত্তে জানায় যে, ‘পারা এতক্ষণে নিশ্চয় এগারাে ডিগ্রিতে উঠেছে। -হ্যা, মা। কিন্তু দেখছাে এগারােটা বেজে গেলো। শিগ্যির গিয়ে ওদের বলল, প্রাতরাশ তৈরী রাখতে।
তুষারপাত ডরেটা পিতার আদেশ পালন করতে দৌড়ে ঘরথেকে বেরিয়ে গেলাে। কিন্তু তখুনি ফিরে এসে বল্লো, বাপী বাপী—খাবার ঘর ধোয়ায় ধোয়াকার। —তাহলে, এখানেই আমাদেব প্রাতঃরাশ আনতে বলো। এই কথা শুনে ডরেটার, এতােটুকু মেয়ে ডরেটার, প্রাণটা আনলে নেছে ওঠে। সংবাদটা দিতে সে রান্নাঘরে ছুটে যায় । এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে রান্নাঘর থেকে পড়বার ঘরে, পড়বার ঘর রান্নাঘরে ঘনঘন যাওয়া আসা ক’বে, তার নিজের হাতে ছুরি, কাটা, চামচ, ডি, টেবিলক্লথ এবং তােয়ালে নিয়ে হাজির করে। এরপর সেগুলি ভৃত্যের সাহায্যে তার পিতার টেবিলে গুছিয়ে রাখে। সিনর অডেয়ারডাে তার কম্মঠ কন্যার প্রতি চেয়ে আনন্দতিশয্যে বলে ওঠেন, বাঃ, ডরেটা বাঃ। ডরেটার আকৃতিটা ওর মাকে অনুসরণ করেছে। এ বিষয়ে সকলেরই এক মত। ওর মা সুগৃহিণী ছিলেন। সৌন্দর্য ছিলাে ডরেটার মতােই। কিন্তু সিনােরা ই লিনার মতাে তাঁর চমৎকার কেশ এবং মন ভােলান চোখ ছিলােনা। ভৃত্যের আহাৰ্য্য আনার সঙ্গে-সঙ্গে একটা নতুন জীব এসে ঘরে প্রবেশ করলাে। মিলানিও-বেডাল মিলানিও। এই বেড়ালটা খাবার সময় হলেই যেখানেই থাকুক না কেন, এসে হাজির হবেই। এর বয়েস বার্ধক্যের কোল ঘেঁসে দাড়িয়েছে। ডরেটাকে জানে—এই ধরার বুকে ইতালীর সেরা গল্প আসার পর থেকেই ওকে জানে। প্রতিদিন ভােরবেলা মিলানিও এসে তার দরজায় মিউমিউ করে ডাকে। ভাবটা এই যে, ডরেট। নির্বিঘ্নে নিদ্রা যাচ্ছে কিনা অনুসন্ধান নেওয়া। ডারেটার শয্যা গ্রহণ করার পূর্ব পৰ্যন্ত সে তার পেছন পেছন ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গ ছাড়ে না কখনাে। হা-কখােনই স ছাড়ে না। এটা চোখে পডেছে—ডরেটা কোথাও গেলে, মিলানিও নিস্তব্ধ পদবিক্ষেপে তাকে অনুসরণ করে। করে আস্তে নয—দস্তুর মতাে ক্ষিপ্রগতিতে। তারপর ও যখন ফিরে আসে, তখন বৃদ্ধ মিলানিও ওর পায়েব নিজের দেহের স্পর্শ দিয়ে কতাে আনন্দই-না জানার চেষ্টা করে। কিন্তু মিলানিওর, বেডাল মিলানিওর, সিনর অভােয়াডাের পড়ার ঘরে আসা অভ্যাস ছিলাে না। আজ হঠাৎ এই ঘরে আহার্যের পালা শুরু হতে দেখে, ওর মনে বােধকরি একট। বিস্ময়ের ছাপ, পড়ে গেলাে। প্রাতঃরাশপর্ব চুকে যাবার পর ডরেটা তেমনি ক্ষিপ্রগতিতে সব তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু মিলানিওর স্বভাবের এবার একটা ব্যতিক্রম দেখা গেলো। সে ওকে তাে অনুসরণ করলেই , উপরন্তু এক পা এক পা করে গিয়ে বসলো আগুনটার পাশে। সিনর পুনশ্চ পাঠে মনােনিবেশ করলেন। কিন্তু মন যার নিয়ত সুমুখের সাশিসম্বলিত জানালাটার প্রতি নিবিষ্ট, তঁার অধ্যয়নে মনােসংযােগ কী করে আসতে পারে, আপনারাই বিচার করুন। আডােয়াডাে, সিনাের ইভলিনার মুখছবি মানস-চক্ষে নিরীক্ষণ করতে করতে হঠাৎ এক জায়গায় গিয়ে হোঁচট খেলেন-না-অসম্ভব। ইভলিনার তুষারপাত বাড়ীতে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। এটা সত্যি যে মাঝখানে মাত্র একফালি পথ। কিন্তু ঘরের বাইরে এলেই তাকে তুষারের মধ্যে আত্মগােপন করতে হবে। এখন, এই বারােটার সময় তার অতিবডে শত্রুও একথা স্বীকার না করে পারবে না। দেখা যাক পরে তুষারপাত বন্ধ হতে পারে তো । কিছুক্ষণ পর ডরেট। তার পিতার ডেস্কের ওপর নত হয়ে কাগজ, কলম দিয়ে তার দিদিমাকে পত্র লিখতে বসেছে। অডােয়াডাে আগুনের দিকে ঈষৎ ঝুকে শরীর গরম করতে করতে মেয়ের রকম দেখে নিঃশব্দেই মৃদুমৃদু হাসছিলেন। ডরেটা কাগজের ওপর মাত্র দুটি শব্দ লিখেছে- প্রিয় দিদিমা । বহু চেষ্টা কবেও উরেটা এর বেশী লিখতে পারে না। গলদঘৰ্ম্ম হয়ে মাথা তুলে সিনকে প্রশ্ন করে, দিদিমার নেমতন্ন রাখতে আমি কি লিখবাে—বাপী ? —লিখে দাও, এখন তুমি যেতে পারবে না। আগামী বসন্তকালে তুমি তার কাছে যেতে পারে। —তােমার সঙ্গে তো বাপী? অডোয়াডে। অন্যমনস্ক বল্লেন, হ্যা আমার সঙ্গেই। কিছুক্ষণ পর ডরেটা সানন্দে বলে উঠলাে,আমি শেষ করেছি। কিন্তু এই আনন্দের সঙ্গে-সঙ্গেই একটা তীব্র বিরক্তির এবং ক্রোধের সুর ভেসে এলো। —ব্যাপার কি ?
ইতালীর সেরা গল্প
-ব্লটিং পেপারব্লটিং পেপার কৈ ?
দেখি, আমাকে দেখতে দাও তুমি কি করেছে •••এ-তুমি দেখছি
চিঠিটা একেবারেই নষ্ট করে ফেল্পে।
কাগজের ওপর কালীর ফোটা পড়তে ডরেটা জিবের দ্বারা
সেটা লেহন করে নিতে গিয়ে, কাগজটাই ছিড়ে ফেলেছে।
ডরেট। অপ্রতি-কণ্ঠে বল্লো, চিঠিটা এখুনি আমি নকল করে
নিচ্ছি।
-আচ্ছা সন্ধ্যের দিকে নকল করাে। এটা আমার কাছে দাও।
চাবি দিয়ে রাখি বা বেশ লিখছে তাে। তবে দু'-একটা কথা উঠিয়ে
দিয়ে নতুন কিছু ওর বদলে বসাতে হবে। মােটের ওপর তােমার
মতাে ছােট্টো মেয়ের পক্ষে, এ সত্যি প্রশংসনীয়।
ডরেটা, এখন তার পুতুল নিনিকে নিয়ে মহাব্যস্ত হয়ে ওঠে।
নিনিকে সে ভালাে ভালাে পোষাকে সাজায়। সাজিয়ে মিলানিওর
কাছে নিয়ে যায়।
বেড়াল মিলানিও, অর্ধনিমিলিত চক্ষে শুয়ে শুয়ে ঝিমচ্ছে। এই
আরামদায়ক তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটায় বাধা পড়ায় বােকরি মনে-মনে
অপ্রসন্ন হয়ে ওঠে। নিজের চারটে থাবার ওপর ভর করে উঠে
দাড়ায়। নরম দেহটা ধনুকের মতাে বেঁকিয়ে তৎক্ষণাৎ, মাটিতে গড়াগড়ি
দিয়ে পেছন ফিরে ডরেটার পানে দৃষ্টিপাত করে।
ডরেটা
বল্লে, মিলানিওর স্বভাবটা আজ কেমন যেনো বদলিয়ে গিয়েছে বাপী-
? এই বলে হাতের পুতুলটাকে ভরেটা সােফার ওপর শুইয়ে
রাখলাে।
১০
তুষারপাত
-
সিনর অভােয়ারডাে বল্লেন, দুঃখ করাে না ডরেটা। অামার
মনে হচ্ছে-এর জন্যে এই বি আবহাওয়াটাই দায়ী। ডরেটা, তােমার
কি ঘুম আসছে ?
কিছুক্ষণ ঘরটা নিস্তব্ধতা অবলম্বন করে রইলাে। কিন্তু সে স্বক
ভঙ্গ করে ডরেটা। হঠাৎ নিজের একখানা বই নিয়ে একটা কবিতা
পডে বলতে লাগলাে ঠিক আবৃত্তির সুর করে। কিন্তু পড়’ত পড়তে
সে দু-চোখ তুলে দেখে, সিনর অভােয়াডে অন্যমনস্কে অন্যত্র দৃষ্টি
পাত করে আছেন। এতে ঐ ক্ষুদ্র মেয়েটির অন্তরে নিদারুণ
অভিমান আশ্রয় গ্রহণ করলাে। ডরেটা আর পড়েনা। বইখানা
হাত দিয়ে সরিয়ে চুপ করে গম্ভীর বিষয়
মনে
থাকে
বসে।
আডােয়ারভাের এবার হস হয়। বলেন, ডরেটা,
রইলে যে? বেশ তত পড়ছিলে—পড়ো না ?
—না আমি পড়বে না। বয়ে গিয়েছে আমার পড়তে ।
পডবাে আমি?
-কেন মা কেন? কী হলাে তােমার ?
ডরেটা নিরুত্তরে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাড়ালাে। নিজের
দু’-পায়ের আঙ্গুলগুলির ওপর ভরদিয়ে উচু হয়ে যা আবিষ্কার করলাে,
তাতে ওর বুঝতে বিলম্ব হলাে না—কি হেতু ওর পিতা অন্যমনস্ক
থেকে ওর পড়ায় মন দেন নি। তুষার পূর্বের চেয়ে পাৎলা হয়ে
এসেছে। এবং সিনােরা ইভলিনার মনােম মুখখানি ওদিকের ভেজান
সাশির মধ্যে দিয়ে এদিক পানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। ইভলিনা বাতায়ন
চুপ করে
ইতালীর সেরা গল্প
উন্মুক্ত করে একটা শাবল দিয়ে গােবরাটের গায়ে-লাগা তুষারকণা
পরিষ্কার করে ফেলছেন।
সিনােরা ইভ লিনার চোখের দৃষ্টি ঠিকরে এলাে সিনর অভােয়াডাের
মুখে প্রতি। ফিক করে হেসে ফেল্লেন। ওঁর চোখ যেনাে সিনরকে
বলতে চাইলােঈ কী বিশ্ৰী দিনটা।
অভােয়ারভাে অকৃতজ্ঞ নন । উনি নিজের ঘরের ওদিককার
জানালাটা উন্মুক্ত করতে বিস্তৃত হলেন না। ইলিনাকে প্রশংসা করে
বলে উঠলেন, ইভলিনা-বাঃ। আমি দেখছি, তুমি তুষারপাতের ভয়ও
করাে না।
উঃ কী বিশ্রী দিন,কী জঘন্য আবহাওয়া। কিন্তু আমি যেনাে
ভরেটাকে ওখানে দেখছি। কি ডরেটা, কেমন আছাে ?
আডােয়াডো কন্যাকে উদ্দেশ্য করে ব’নে, উরেট-এদিকে এসো।
উনি যা জিজ্ঞাসা করছেন, তার উত্তর দাও।
ইভলিনা একথা শুনতে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, না না। ওকে
বিরক্ত করবেন না। বিরক্ত করবেন না। আপনি জালা বন্ধ করে
দিন। বড়াে বিশ্রী ঠাণ্ডা। ছেলে-মেয়েদের চট করে সর্দিকাশি হয়ে
যায়। আমার মনে হয়, আজ আর আপনার সঙ্গে দেখা হবে না।
রাস্তার অবস্থা একবার দেখুন।
উঃ আপনারা কী স্বার্থপর। আচ্ছা চ’ল্লাম।
-আচ্ছা।
এক সঙ্গেই দুই বাড়ীর, দুই কক্ষের জানালা দু'টি সশব্দে বন্ধ হয়ে
গেলাে। কিন্তু এবার ইতলিনা অদৃশ্য হলেন না। জানালা
তুষারপাত
সংলগ্ন একটা স্থান পরিষ্কার করে নিয়ে উপবেশন করলেন।
খুব পড়ছিলাে। তুষারপাতে জানালার সার্শির ওপর ইভলিনার মুখের
একপার্শ্বের ছায়া সুস্পষ্ট রূপে লেগে রইলাে। সিনর অডােয়ারভাের
চোখে সেটা ধরা পড়লো। হায়! হায় । ভগবান তুমি সিনােরা
ইভলিনাকে জগতের সমস্ত সৌন্দৰ্য্য দিয়ে তৈরী করেছে।
সিনর অভােয়ারডে। চিন্তাক্লিষ্ট মনে ঘরময় পায়চারি করতে
লাগলেন। তাঁর একবার মনে হলো,-সিনাের ইভলিনার কাছে না
যাওয়া একটা ভুলের ব্যাপার—দোষের ব্যাপার। কিন্তু পরক্ষণেই
মনে হলাে—ওঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটাও পরম অপরাধের
ব্যাপার। আজ সকালে উরেটার মুখ কেমন বিষয় হয়ে উঠেছিলাে
এখন ঠিক তেমনি হয়ে ওঠে।—এটা অডােয়াডো বেশ উপলব্ধি
করেন।
তিনি কন্যাকে হাত ধরে নিয়ে এলেন সােফার কাছে। নিজে
তাতে উপবেশন করলেন এবং ডরেটাকে কোলের ওপর বসিয়ে
পরম স্নেহে বল্লেন, আচ্ছা ডরেটা, তুমি ইভলিনার ওপর এতো
চটা কেন বললাগে ?
কিন্তু এই ক্ষুদ্র মেয়েটি সে কথার জবাব কোনাে মতেই দিতে
পারে না। ওর মুখখানি রক্তাভ হয়ে ওঠে। বেশ বােঝা যায়,
সে বিরক্ত হয়ে উঠেছে।
অভােয়াডাে পুনশ্চ বল্লেন, কিন্তু সিনােরা ইভলিনা তােমার কাছে
কী অপরাধ করেছেন,-মা?
—কিছু না, কিছু না। তিনি কোনাে অপরাধ করেন নি।
ইতালীর সেরা গল্প
তবু তুমি তাকে ভালােবাসাে না।
কিছুক্ষণ গভীর নিস্তব্ধতার মধ্যে অতিবাহিত হয়ে যায়।
—কিন্তু তিনি তােমায় কতাে ভালোবাসেন।
-তাতে আমার কী ? আমার কী তাতে?
-ছি। তুমি বড় দুষ্ট হয়ে উঠছে। ইভলিনার কাছে তােমাকে
যদি কিছু দিন থাকতে হয় তা হলে ?
ডরেটা অভিমান পূর্ণ আস্বরে বল্লো, না না, আমি তার কাছে
কিছুতেই থাকবে না।—কিছুতেই না কিছুতেই না।
অডেয়ারডাে
ডরেটাকে কোল
থেকে নীচে নামিয়ে দিলেন।
ভৎসনা স্বরে বল্লেন, তুমি বােল। ভয়ানক বােকা তুমি। বােকার
মতাে কথা বলছে। কেন ?
এই তিরস্কারে ডরেটা এবার উচ্ছ্বসিত ক্রন্দনে ফুলে-ফুলে উঠতে থাকে।
মাতৃহারা একমাত্র কন্যাকে—এই পরম স্নেহের কন্যাকে, এমনি-
ভাবে লােদন করতে দেখে সিনর আটোয়ারডাে আর স্থির থাকতে
পারলেন না। তিনি অশ্রুসিক্ত
চোখে ডরেটাকে নিজের দুই
বাহু প্রসারিত করে বুকের ওপর আকর্ষণ করে নিলেন। এবং
পরক্ষণেই তার পিঠের ওপর পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে
দিতে বলেন, কেঁদোনা মা, কেঁদোনা। ছিঃ চুপ করে। আর তােমায়
কখনাে তিরস্কার করবাে না।
সিনর অভােয়ারডাে নিজের মুখখানি দুহাত দিয়ে ঢেকে বসে
আছেন। তাঁর মাথায় কতত প্ৰকাই-না চিন্তা ভিড় করে উঠছে।
১ঃ
তুষারপাত কতো গভীর ভালােবাস, স্নেহই-না তার বুকখানাকে আশ্রয় করেছে। সিনােরা ইভলিনার মুখখানি যদি অন্তর থেকে মুছে ফেলা যেতো। কিন্তু কৈ—তাতে তিনি পারেন না। অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু সব চেষ্টাই তব নিল। ইভলিনা আকাশের মতাে নীল স্বচ্ছ দুটি চোখ, সেই প্ররােচনার হাস্য রেখা—এ যে তিনি বিস্মৃত হতে পারছেন না। তার ইচ্ছে হয়, এই মুহূর্তেই সিনােরা ইভলিনাকে ছুটে ব’লে আসেন-ইভলিনা, তুমি আমার হও। আমার অন্ধকার ঘরে এসে আলোকমালায় সর্বত্র উদ্ভাসিত করে তােলাে। তােমার ভালােবাসায় আবার আমার জীবন নতুন আলাের সন্ধান পাক। তোমার সঙ্গ পেলে আমার বয়েস দশবছর পিছিয়ে যাবে। এবং সেই সুখ-শান্তি উপলব্ধি করলে, যে সুখ শান্তি আমি উপভােগ করেছিলাম, আমার জীবনের সেই প্রথম বিবাহিত-জীবনে। এ পর্যন্ত চিন্তা কবে নির অভােয়ার একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। মনে হয় সিনর অডােয়ারডাের অনেক যেনো পরিবর্তন হয়েছে। সেই পূৰ্ব্বকার অভােয়ারভাে এখন কোথায় ? তার মৃত সী, সিনাের ইভ লিনা থেকে কতত অংশেই-না বিভিন্ন ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন, নম্র, আভিজাত্যপূর্ণ। প্রেমের দিক দিয়ে তিনি সরল- প্রাণ বালিকার মতো। প্রতারণা, বঞ্চনা এবং কূটনীতি তাঁর অন্তরে কোনােদিন স্থান পায়নি। তিনি ছিলেন একাধারে কন্যা, ভগিনী, স্ত্রী এবং জননী। প্রথম দিকটা অভােয়াৰতো তাঁকে নির্জনেই ভালােবাসা জাপন করতেন। এবং সেই দিনেই স্ত্রী স্বামীকে সেই ভালােবাসার ইতালীর সেরা গল্প প্রতিদান দিতেন। একদা উদ্যানে পাশা-পাশি বিচরণ করতে করতে অডােয়াডাে স্ত্রীর একখানি হাত হৃদয়াবেগে ধারণ করে তাতে চুম্বন রেখা অঙ্কিত করে দিয়ে বলেছিলেন, তােমাকে আমি কত ভালােবাসি। এই কথা শুনে তাঁর স্ত্রী মার কাছে দৌড়েগিয়ে পরম উল্লাসে ব্যক্ত করেছিলেন—আমি কত সুখী । সিনর অভােয়ারলে জীবনের প্রথম গার্হস্থ্য প্রেমের মধ্যে দিয়ে, কবিত্ব-শক্তি অর্জন করেছিলেন। কতাে সময়ে, কতাে স্বৰচিত কবিতাই-না তিনি স্ত্রীকে শুনিয়ে নিজের অন্তরের একনিষ্ঠ ভালােবাসা প্রকাশ করেছেন। সংসার-পথে অনেক সময়ে সামান্য বিষয়-বস্তুকে কেন্দ্র করে তাদের দাম্পত্য-জীবনে কোলাহল সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সে কতক্ষণ? কতক্ষণ সেটা স্থায়ী হতে পেরেছিলাে ? মেয়াদ ছিলাে তার এক মুহূর্ত। সেই দাম্পত্য কোলাহলের অবসান হতে নিবিড় ভালােবাসার মধ্যে দিয়ে। স্ত্রীর অশ্য তিনি সযত্বে মুছিয়ে দিতেন। সমস্ত কোলাহলের অবসান হততা, গভীর চুন্ন রেখায়। হায়রে। কোথায় গেলাে সেই সব দিন। সেই স্বর্গীয় আনন্দে-ভরা দিন গুলি ? কিন্তু ঐ ইলিনা? না-না। তিনি পারেন না, কখনােই পারেন না—সিনর অভােয়ারভাের মনে সেই পূৰ্বদিনের আনন্দ ফিরিয়ে আনতে। ঐ আত্মাভিমানী বিধবা, যিনি তার স্বামীর মৃত্যুর ছ'মাস পরে পুনরায় দ্বিতীয় স্বামীর সন্ধানে নিজেকে নিয়ােজিত করেছেন, তিনি পারেন না কখনো পারেন না, অডােয়ারডে অন্তরে সেই বিগত দিনের নির্মলানন্দের ধারা বহিয়ে দিতে। অসম্ভব, সম্পূর্ণ অসম্ভব। রাত্রিকালে সূর্যের আলোেক পাতের মতােই অসম্ভব।
তুষারপাত দিনের আলাে ফুরিয়ে এলাে। অন্ধকার এসে তার আধিপত্য বিস্তার করে। এবং সেই অন্ধকার কক্ষে একমাত্র মিলানিওর চোখ দু’টি জ্বলজ্বল করে ওঠে। ভূত ঘরের মধ্যে আলো জ্বেলে দিয়ে নিজের কাজে চলে যেতে সিনর অভােয়াডে পুনরায় চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি তার মুদ্রিত চক্ষুর ভেতর দিয়েও নিরীক্ষণ করতে লাগলেন-তার মেয়ের দোলনা। মেয়ের সেই কচি মুখের হাসি, তার ক্রন্দন, মনের মধ্যে তার এক অভূত- পূৰ্ব অবস্থার সৃষ্টি করলাে। অস্কিম-শয্যায় শায়িত তাঁর স্ত্রীর সেই শেষ-চুম্বন রেপাটুকু এখনো তব মুখে আছে সজীব হয়ে। অন্তিম- শয্যায় শায়িত স্ত্রীর সেই শেষ অস্ফুট-বাণী-আমার ড.রটাকে কখনো অষ করােনা—তাকে মর্মান্তিক যাতনা দেয়। এই সামান্য ক’টি কথা । কিন্তু তাৰ মনকে পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে যেনো তার অন্তরেব গভীরতম স্থানে কশাঘাত করে বসলাে, এবং সেই আঘাতে সিনর অডেয়ারডো ভ্রষ্টপথে যেতে-যেতে নিজেকে সংযত করে নিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে টপটপ করে তপ্ত অৰি গড়িয়ে পড়তে লাগলাে। না না-ডরেটা, তার প্রাণের ভরেটাকে অসুখী করতে তিনি পারবেন না। পারবেন না কখনাে। কিন্তু তিনি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারেন না। সিনােরা ইভলিনার সমােহনশক্তি, যা নাকি, তার চক্ষুদৃষ্টির সঙ্গে এক হয়ে মিশে, গিয়েছে সেই শক্তিকে তিনি ভয় করেন, ভয় করেন, যথার্থই ভ করেন। তাঁর প্রাণ ভয়ে শঙ্কিত হয়ে ওঠে, পাছে আবার আগামী কাল প্ৰতে এই মায়াবিনীর দৃষ্টির মুখে পড়ে যান।
ইতালীর সেরা গল্প
1
কিন্তু উপায় আছে—একমাত্র উপায় আছে।
অডোডাে আদ্রশ্বরে ডরেটাকে আহ্বান করলেন।
—কি বাপী ?
—তােমার দিদিমাকে যে চিঠিটা লিখছিলে, সেটা কি এখন নকল
করবে মা?
—হ্যা বাণী, করবাে।
-দিদিমাকে দেখতে যাবে না ?
কার সঙ্গে যাবে বাপী ?
-আমার সঙ্গে,
ভরেটা
ডরেটা যেমন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না।
বল্লো, তােমার সঙ্গে বাপী, তােমার সঙ্গে?
হ্যা আমার সঙ্গে, তােমার এই বাপীর সঙ্গে মা।
শুনে ডরেটার সারা অন্তরটায় আনন্দের স্রোতস্বিনী বইতে থাকে।
পিতার কণ্ঠদেশ তার ক্ষুদ্র দু’টি বাই দিয়ে বেষ্টন করে আদর করতে
করতে বলে, বাপ্পা বাপী, আমার বাপী। আমরা বেরুবাে কখন ?
—কাল সকালে। অবশ্য যদি তুমি তুষারপাতের ভয় না করে।
—আজকে চলােনা বাপী—এখুনি? হ্যা বাপী, এখুনি। সে কিন্তু
বেশ মজার হবে বাপী। চলাে বাপী, আজই চলল।
সিনর অভােয়ারডাে ধীরে ধীরে কন্যার বাহুবেষ্টন থেকে নিজেকে
মুক্ত করে নিলেন। তারপর মন্ত্রচালিতের মতাে উঠে সেই বাতায়নটার
পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। ওঁর জানালার ঠিক
সম্মুখের বাড়ীটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সিনােরা ইভলিনার মুখের পা
১৮
তুষারপাত ভাগ ওই জানালাসংলগ্ন শাসিটার গায়ে আর প্রতিফলিত হচ্ছে না। আবহাওয়া এখনও ভীতিপ্রদ। তুষার পড়ছে। ভৃত্য এসে জানালার খড়খড়িগুলি বন্ধ করে একটা পর্দা দিলে টেনে। কি জানি আবার যদি ঐ সম্মুখের বাড়াটা থেকে মায়ামুখ-দৃষ্টি এসে বাড়ীতে পৌছিয়ে এদের গৃহের পবিত্রতা মুছে দেয় । অডােম্বারলাে হঠাৎ বল্লেন, এখানেই খাওয়া ভালাে। কারণ, আমাদের খাবার ঘরখানা নিশ্চয়ই গ্রীণল্যাণ্ডের মতাে নিদারুণ ঠাণ্ডায় ভর্তি হয়ে আছে। পিতার কথা শুনে ভরেটা রান্নাঘরে গিয়ে ঔৎফুল্পের একটা তুমুল (সারগােল তুলে পাচিকাকে অস্থির করে তুল্লো :—তাদের পরি- ভ্রমণ এখুনিই সুরু হবে। অতএব শীঘ্র যেনাে তার ও তার বাবার খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। পাচিকা প্রথম দিকটা মনে করে নেয়, ওটা বুঝি একটা মাসা। কিন্তু যখন ভরেটা জানায়, সে তার সঙ্গে ঠাট্টা-তামাসা করছে না—সত্যিই তারা এখান থেকে চলে যাবে, তখন পাচিকা মনে-মনে ধারণা করে নেয়—এই বাড়ীর কর্তার মাথা নিশ্চয়ই খাবাপ হয়েছে। এই শীতকালে, অস্বাভাবিক বি আবহাওয়াকে মাথায় করে ভ্রমণে বের হওয়া ? আশ্চৰ্য্য। সত্যি আশ্চর্যের ব্যাপার। কিন্তু তার মন্তব্যে ভরেটার কী এমন যায়-আসে? সে তাতে হৃক্ষেপ মাত্রও করলাে না। অধিকন্তু আনাতিশয্যে গান গেয়ে, নেচে সমস্ত ঘরখানাই মুখরিত করে তুল্লো। খেতে বসে দেখা গেলে, দুরেটা আর ক'রছে অল্প। কিন্তু
ইতালীর সেরা গল্প
কথা বলছে অনর্গল। বারংবার সে তার পিতাকে প্রশ্ন করে, এখন
সময় কত? কখন, কটার সময়, আমরা বেরুবাে বাপী ?
ডরেটার পিতা সহাস্যে বল্লেন, তুমি কী ট্রেন ফেল করবার ভয়
করছে, ডরেটা?
তিনি কন্যাকে প্রশ্ন ক’বলেন বটে, কিন্তু তার নিজের মনই
এখান থেকে রওনা হবার জন্যে, চাইকি উরেটার চেয়েও, অধিকতর
অস্থির হয়ে উঠলাে। তিনি চলে যেতে চান দূরে-বহুদূরে। সম্ভবত
বসন্তের পূর্বে তিনি ফিরবেন না। ভূতকে ডেকে তাঁদের জিনিষ
পর বাঁধাহাদা করতে আদেশ দিলেন।
নিয়মিত শয্যা গ্রহণ করবার অনেক পূর্বেই আজ ডরেটাকে
বিছানায় দেখা যায়। কিন্তু সাবা রাত্রিটাই ও বিছানায় এপাশ ওপাশ
করে কাটিয়ে দিলে । রাত্রে প্রায় বিশবার সে তার আয়াকে
জাগিয়ে জাগিয়ে জিজ্ঞাসা করলাে, এখন কি-ওঠবার সময়
হয়েছে ?
পরদিন ভাের ছ’টা সময় ভৃত্য এসে সিনর অডােয়াডােকে
বিছানা থেকে তুলে দেয়। তিনি ওকে প্রশ্ন করেন, আজকের দিনটা
কেমন দেখছিসরে, এ্যাংগিলাে?
—অতি বিশ্রী। ঠিক কালকের মতো। আমি বলি কি, আজকে
যাত্রা না করলেই যেনাে ভালাে হয়।
সিনর একটা দীর্ঘনিঃশাস পরিত্যাগ করেন -
তুষারপাত না, এ্যাংগিলাে। আজই আমার যাওয়া দরকার। ইষ্টিশানে লােক জনের ভিড় ছিলাে না। শুধু গুটিকতক পথচারী গরম জামা কাপড়ে সর্বদেহ আচ্ছাদিত করে এক জায়গায় উপবিষ্ট । তাদের সকলের মুখেই একটা বিরক্তির এবং নিরানন্দের ভাব প্রস্ফুটিত। ওরা বলাবলি করে—এমনি বিশ্রী দিনে বিশেষ প্রয়ােজনীয় কাজ ছাড়া, কে বাবা বাড়ীর বাইরে পা বাড়ায় ? আমাদের কাজ বডাে জরুরী, তাই না এমনি বিএ দিনে, এমনি সময়ে, শয্যা ছেড়ে এখানে আসতে হয়েছে। কিন্তু ডরেটার মনে বিরক্তির বা নিরানন্দের কোনাে ছায়াই নেই। বরঞ্চ ওকে অন্যদিনের চেয়ে আজ, এমনি বিএ দিনে, ঢের বেশী খুশী বলেই মনে হয়। প্রথম শ্রেণীর কামরায় আসন গ্রহণ করে সিনর অভােয়ারটে কন্যাকে বল্লেন, ডরেটা খুশী হয়েছে? —হ্যা, এমন খুশী কথন হইনি বাপী। অামার যা’ আনন্দ হচ্ছে। দশবছর পূর্বে, শীতঋতুর এক চমংকার দিনে, সিনর অভােয়ালে বিয়ে করে ফিরছিলেন। ট্রেণের কামরায় তার মুখের আসনে মেয়েটি উপবিষ্ট ছিলাে। তার মুখখানি দুটোরই অনুরূপ। কোথাও
ইতালীর সেরা গল্প
এতটুকু পার্থক্য ছিলাে না। সে ওঁর মুখপানে শিশুসুলভ দৃষ্টিতে
চেয়ে ছিলাে। কী ভালােই বাসতাে সে সিনর অভােমারডােকে। ট্রেণ
অগ্রসর হতে সুরু করলে তিনি ঐ একই প্রশ্ন তাকে করেছিলেন -
খুশী হয়ছে, মেরি ?
এবং সেও উত্তর দিয়েছিলো। ঠিক উরেটার মততা :-
হ্যা, এমন খুশী কখনাে হইনি। আমার যা আনন্দ হচ্ছে।
ট্রেণ বাতাসের বেগে ছুটে চলে। •বিদায়—চিরদিনের মতাে বিদায়।
শিনাের। ইভলিনা, বিদায়।
মাস কতােক পরে সিনর অভােয়ারডাে ফিরে এসে দেখলেন,
তাঁর টেবিলটার ওপর ইতালনার পুনর্বিবাহের একখান নিমন্ত্রণ পত্র
পড়ে রয়েছে।
২
বুকিতলা এবং তাঁর অধ্যাপক
বুকিওলাে আর পিট্রোপােলােএরা দু’টি বন্ধু। অন্তরঙ্গতায় বাধকরি
ওঁরা রােম নগরীর সাভেলী পরিবারের পূর্বপুরুষদের অতিক্রম করে
গিয়েছেন।
তা উভয়েই সাতেলী পরিবারের অভূত। উভয়ের
আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল। বংশগরিমা এমনি যে, ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোেক
ওদের যথেষ্ট সম্মান না দিয়ে পারত না ।
উচ্চশিক্ষার শেষে নিজেদের স্বাবলম্বী করবার অভিপ্রায়ে, এই
দু’টি অভিন্নহৃদয় বন্ধু বেলনা শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।
বুকিওলাে এবং পিট্রোপােলার মধ্যে অনন্যসাধারণ হৃদ্য বিদ্যমান
থাকা সত্ত্বেও, পরস্পরের পাঠ্য বিষয়-বস্তু এক ছিলাে না। বুকিওলােৰ
বিষয়-বস্তু সহজ থাকাতে, তিনি অনেক পূর্বেই ডিগ্রি লাভ করে
নােম নগরীতে ফিরে যাবার বাসনা প্রকাশ করলেন। কান্তেই একদিন
বন্ধুকে বল্লেন, ভাই পিট্রো, আমার শিক্ষা শেষ হলে,
ডিগ্রিও পেলুম।
এখন শুধু বাড়ী, মানে স্বদেশে ফিরে যেতেই যা বাকী। আমি
বলি কিভােমার তাে এখনাে যেতে দেরী আছে।
মত দাও আমি কালই বাড়ী ফিরে যাবার বন্দোবস্ত করে
ফেলি—কি বলাে?
তুমি যদি
ইতালীর সেরা গল্প পিট্রোপােলাে অসম্মতি জানিয়ে বল্লেন, না—তা কিছুতেই হতে পারে না। আমাকে এখানে ফেলে রেখে তুমি বাড়ী যাবে ? না এতে আমার মত নেই। এই পৰ্যন্ত বলে ক্ষণকাল মৌন থেকে পুনশ্চ বল্লেন তােমার প্রতি আমার অনুরােধ—এই শীতকালটা আর আমাকে ফেলে যেওনা। বসন্ত আষক। দু’জনেই একসঙ্গে ফিরে যাবে। এক যাত্রার আবার পৃথক ফল কেন ? বুকিওলাে বন্ধু বলার রকম দেখে হেসে ফেলেন। বলেন, কিন্তু একমাস সময় নষ্ট করবো ? তুমি তো জানাে পিট্রো, আলস্যে জীবন কাটানাে আমার স্বভাবের বাইরে ? পিট্রো পাইপে অগ্নিসংযােগ করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বনে বৃথাই বা সময় নষ্ট করবে কেন? যা-হােক আর একটা কিছু শেখো। এমন জিনিষ শেখাে, যা তােমার সম্পূর্ণ অজানা। বুকিওলাে বহুক্ষণ চুরুট টাতে টানতে নীরবে বসে চিন্তা করতে লাগলেন। বন্ধুকে প্রতিশ্রুতি দিলেন—তার জন্যে তিনি বসন্ত কাল পৰ্য্যই অপেক্ষা করবেন। পরদিন প্রভাতবেলায় বুকিওলে তাঁর প্রফেসারের কাছে এলেন। পিটোপােলাের অনুরােধে বসন্ত কালের পূর্ব পর্যন্ত এখানে থাকবার সঠিক সংবাদ জানিয়ে পরিশিষ্টে বলেন, তার এই সময় টুকু আপনার কাছ থেকে একটা নতুন কিছু শিখতে চাই। আপনি কি বলেন? ২ঃ বুকিওলাে এবং তার অধ্যাপক প্রফেসর স্মিতহাস্যে বল্লেন বেশ তো। সে তল পরম আনন্দের কথা। তােমরা ছাত্র—আমি শিক্ষক। তােমাদের যা কিছু শেখবার ইচ্ছে হবে—সবই আমি আনন্দের সঙ্গে শেখাবাে। শিক্ষা দেওয়ার মতাে আনন্দের জিনিষ আর কিছু নেই, বাবা আর কিছু নেই। প্রফেসরের এই উক্তিতে বুকিওলাে পরমানন্দে বলেন, স্যর তাহলে আমায় এই শিক্ষা দিন, যাতে করে একজন যুবক সরলভাবে নারীর সঙ্গে ভালােবাসায় পড়তে পারে। ব’ঞ্জেন, আমি এ বিষয়ে একেবারে অজ্ঞ। আপনাকে প্রথম থেকে ধীরে ধীরে শেখাতে হবে স্যার। এ পৃথিবীতে অনেক বিজ্ঞান আপনার অধ্যাপনায় শিখলাম। কিন্তু এই পূৰ্বরাগ যে কি জিনিষ এবং কেমন করেই বা করে, জানিনে। ইচ্ছে, আপনার কাছ থেকে এ বিষয়ে পুরোপুরি জ্ঞান লাভ করা। প্রফেসর ছাত্রের কথা শুনে সীমাহীন উল্লাসে যেন ফেটে পড়লেন। দাড়িতে হাত বুলিয়ে পরিতৃপ্তির স্বচ্ছ-হাস্যে বল্লেন, বেশ বেশ। এ বিদ্যায়ও আমার অনন্ত জ্ঞান। বল্লেন, সময় নষ্ট করা কখনাে যুক্তিসঙ্গত নয় । কাল সকালেই ড্রেটি মাইনােরির গির্জায় যাবাে। কাল কি বার? রবিবার, না ? তা ঠিকই হয়েছে। রবিবার দিনই তাে গির্জায় উপাসনা করবার জন্যে প্রচুর নারীসমাগম হয়ে থাকে। তাই না ? -আপনিই জানেন স্যার। প্রফেসর ম্ভীর হয়ে ৰ'ছেন, হ্যা, আমিই জানি। জানি। নিশ্চয় আনি। কাল গির্জায় গিয়ে উপাসনা কালে ঐ সৰ সমবেত নারীদের প্রতি দৃষ্টি রাখবে। দৃষ্টি রাখবে এমনি ভাবে ইতালীর সেরা গল্প যাতে তাদের মধ্যে একজন তােমার পছন্দের মধ্যে, ঠিক মক্ষিকা যেমন মধুতে আটকে যায়, ঠিক তেমনি ভাবেই যাবে আটকে। বম্বুেন ই, তারপর সে যখন তার উপাসনা শেষ করে বাড়ী মুখখা হবে, তুমি তাকে করবে অনুসরণ। অনুসণ করবে মেয়েটার অজ্ঞাতে এবং অলক্ষ্যে। উদ্দেশ্য, তার থাকবার স্থানটুকু জানা। এই হলাে তোমার নতুন পাঠের সর্বপ্রথম আয়ত্ত করবার জিনিষ। ক্রমশঃ অগ্রসর হবে তুমি। কিন্তু দৈনন্দিনের বুঝিয়ে দেওয়া পাঠ, আমার কাছে এসে তােমায় দিতে হবে বুঝিয়ে। কি ঘটলাে, কি ঘটলাে না—সমস্তই আমার কাছে এসে সারল্যে প্রকাশ করবে। নইলে, আমি বুঝতে পারবে না, কতত- দূর তােমার এই নতুন পাঠ এগিয়ে চলেছে—বুঝলে? বুকিওলাে ঘাড় নেড়ে জানালেন-বুঝেছেন। পরদিন রবিবার। বুকিওলাে সকালের দিকটায় তার প্রফেসরের নির্দেশমত গির্জায় গিয়ে উপস্থিত। সেখানে দেখলেন—সুন্দুরীর হাট। একে দেখেন, ওকে দেখেন, তাকে দেখেন—মনে আর কাকেও ধরতে চায় না। কিন্তু শেষকালে চোখজোড়া একটি সুন্দুরীর দিক থেকে আর যেন ফিরিতে চায় না। সত্যিই সে সুন্দুরী। মনে হয়, ভগবান এই নারীটিকে জগতের যতো কিছু সৌন্দৰ্য একত্র করে সৃষ্টি করেছেন। কী অপূর্ব মুখ। খেতপাথর কুঁদে ভাস্কর যেমন সুন্দর মূর্তি নির্মাণ করে, এও ঠিক তেমনি।
বুকিওলাে এবং তার অধ্যাপক উপাসনার শেষে মেয়েটি গৃহেরদিকে অগ্রসর হয়। বুকিওলল তার অন্তরাল থেকে অনুসরণ করলেন। মিনিট পাঁচ-সাত পরে একটা গাছের আড়ালে দাড়িয়ে দেখলেন, সেই মূৰ্ত্তিমতি সুন্দরী যদি ঘেঁষে দু-চার পা’ সম্মুখ ভাগে অগ্রসর হবার পর একটা লাল রংয়ের বাড়ীর দরজা ঠেলে ভেতরে মিশিয়ে গেলাে । এই ঘটনার ঘন্টা খানেক পবে বুকিওলাে তাঁর প্রফেসরের কাছে এসে বলেন, স্যার, আপনি যা, আমাকে করতে উপদেশ দিয়েছিলেন, সবই আমি নিখুতভাবে পালন করেছি। এখন মনে হচ্ছে, যেনো আমার তাকে বেশ মনে লেগেছে। প্রফেসর মুখের পাইপ নামিয়ে গভীরভাবে বল্লেন, বেশ। মুহূর্ত নীরব থেকে বল্লেন, এর পর যা তােমায় করতে হবে মন দিয়ে শােনন। বল্লেন, দিন কতােক দু'বার সেই মেয়েটির বাডীর সুমুখে নিজের আভিজাত্য বজায় রেখে ঘােরাঘুরি করাে। তােমার চোখ জোড়া নিজের দেহের দিকে নিবন্ধ রেখে এমন ভাবে মাঝে- মাঝে মেয়েটির মুখপানে চাইবে, যাতে অন্য কেউ বুঝতে না পারে। ওর মুখে যদৃষ্টি তােমার চোখ থেকে ঠিকরে গিয়ে পড়বে—সে দৃষ্টিতে যেনাে থাকে পূর্ণ মাদকতা, যেনাে থাকে গােলাপ ফুলের সৌরভ। সেই মাদকতা ও সৌরভ একযােগে মিশে সেই মেয়েটিকে, সেই সুন্দুরী মেয়েটিকে সারল্যে জানিয়ে দেবে—তােমার বুকের ভাষা। এই পর্যন্ত বলে প্রফেসর পুনশ্চ মুখে পাইপ দিলেন। দিয়ে ধোঁয়া হাড়তে লাগলেন।
ইতালীর সেরা গল্প বুকভরা আশা, মনভরা কৌতুহল এবং প্রাণভর। উৎসাহ নিয়ে বুকিওলাে দিন দুই-তিন সেই মেয়েটির বাড়ীর সুমুখে এদিক-ওদিক পায়চারি করলেন। মেয়েটির দৃষ্টি একদিন তার দৃষ্টির সঙ্গে বিনিময় হতেই তিনি সসম্মানে মাথা নীচু কবে তফাতে চলে এলেন। তফাতে এসে মেয়েটির অলক্ষ্যে দেখলেন, সে চোখ ফিরিয়ে আঁকেই দেখবার চেষ্টা করছে। বুকিওলাে যেনো একমুহূর্তে ইন্দ্রপুরীতে চলে গেলেন। এমনি তার আনন্দ হলো। অধ্যাপককে মনে-মনে প্রণিপাত করে তিনি পুনশ্চ আড়াল থেকে মেয়েটির দৃষ্টির মধ্যে এলেন। এবং নিতান্ত অনিচ্ছা ও অতর্কিতের ভাব দেখিয়ে আব একবার তার মুখপানে দৃষ্টিপাত ক’বলেন। চাবিচক্ষে আবার মিলন। মেয়েটি দৃষ্টি অন্যত্র নিবদ্ধ করতে গিয়ে বারংবার তার দিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো। মেয়েটিও যে তাকে চায়, এ-সম্বন্ধে বুকিওলাের সন্দেহমাত্র রইলাে না। যথাসময়ে বুকিওলাে প্রফেসরের কাছে এসে সমস্ত বৃত্তান্ত অকপটে বর্ণনা করলেন। প্রফেসর নিজের অভিজ্ঞতার ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে ধীরে ধীরে বল্লেন, তােমার বুদ্ধি দেখে আমি সত্যি অত্যন্ত খুশী হয়েছি। তুমি বুদ্ধিমান ছােরা। বুঝলে হে, তুমি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছোকরা। প্রফেসর পকেট থেকে একখানি রুমাল টেনে নিয়ে পরিমাণ মুখখানি ভালাে করে মুছলেন। মুছে রুমালটা যথাস্থানে রেখে একবার ২৮ বুকিওলাে এবং তাঁর অধ্যাপক দুই কঁধ ঈষৎ ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠলেন, এখন দরকার হয়ে দাড়িয়েছে তােমার ঐ মেয়েটির সঙ্গে বাক্যালাপ করার। তা দেখা সম্ভব হবে, একটা নীচ জাতির স্ত্রীলােকের সাহায্যে। পথে-ঘাটে এই জাতীয় স্ত্রীলােক আর্শী, ভ্যানেটি ব্যাগ, নারীদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবার যাবতীয় জিনিষ বহে বেড়ায়, বাড়ী-বাড়ী বিক্রি করার জন্যে। এদের একজনকে ঠিক করে। ওকে দিয়ে জানাও, তুমি মেয়েটির একান্তই অনুরক্ত। জগতের সমস্ত নাবী একেধারে, আর সে একা একদিকে। তাকে সন্তুষ্ট ক’বতে তুমি এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুই নিঃসঙ্কোচে ত্যাগ করতে প্রস্তুত। প্রফেসর কিছুক্ষণের জন্যে মৌন হয়ে রইলেন। একসময়ে বল্লেন, দু’ দিন লাগুক, বা তিন দিন লাগুক—তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমি যেমন শিক্ষা দিলাম, ঠিক সেই মতাে কাজ করে ফলাফল আমাকে শীঘ্র জানিও। তারপর পথ বলে দোবাে--আরাে অগ্রসর হয়ে যেতে। আমি কি বলতে চাই, বুঝতে পেরেছো? -আজ্ঞে হ্যা, স্যার। এতো সােজা কথা। বুকিওলো প্রফেসরকে ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ভাবটা এই—মুহুৰ্তমাত্র বিলম্ব হলে ওঁর অনেক কিছু লােকসান হয়ে যাবে। কিন্তু দু’দিন পরে অনেক খোঁজাখুজির পর এই ব্যবসায়ে লিপ্ত, একটা ছােটো জাতের বৃদ্ধা স্ত্রীলােক পাওয়া যায়। মনে হয়, ও নিজের ২১
ইতালীর সেরা গল্প
ব্যবসায়ে বিলক্ষণ নিপুণ।
বুকিওলাে ভাবেন, একে দিয়েই কাজ
।
স্ত্রীলােকটিকে গােপনে ডেকে বুকিওলাে ফি-ফিস্ করে যা বল্লেন
তার সারমর্ম হলাে এই যে-সে যদি তার একটা কাজ উদ্ধার করে
দিতে পারে, তাকে যথেষ্ট পুরস্কার তিনি দেবেন।
শ্রীলােকটি মনে-মনে সন্তুষ্ট হয়েই বলো, আপনি তো জানেন,
যে রকম করেই হােক টাকা রােজগার করাই আমার ব্যবসা।
আপনি যা বললেন, যেমনটি করতে হুকুম করবেন ঠিক তেমনটিই
ক’রবাে«একটুও নড়চড় হবে না।
—কিন্তু আমি যেটুকু বলবো, ঠিক সেইটুকু করলে তােল চলবে না
বাপু ! তােমার নিজের বুদ্ধি খাটাতে হবে যে।
—আজ্ঞে হ্যা। নিজের বুদ্ধি খাটাবাে বৈকি। নিজের বুদ্ধি
কাজে লাগালে কি, পয়সা আসে মশাই ?
বুকিওলো এর জবাবে কিছু না বলে পকেট থেকে দু ফ্লোরি
তার হাতে গুঁজে দিলেন।
দিয়ে তাকে
বেশ ভালাে করে তাঁর
প্রেমিকার বাড়ীর পথ, নম্বর, বাড়ী কী রকম দেখতে ইত্যাদি বুঝিয়ে
দিয়ে বল্লেন, ঐ মেয়েটিকে আমি অত্যন্ত সম্মান করি। তুমি বুদ্ধি
খাটিয়ে আমার হয়ে এমন সব মন ভুলােনাে কথা তাকে বলবে,
যাতে সে আমার ওপর প্রসন্ন হয়, যাতে আমি তার একটুখানি
ভালােবাসা পেতে পারি।
খ্রীলােকটি সুচতুরা। নিমেষের মধ্যে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে
ফিক করে হাসলো। আপনি নির্ভাবনায় থাকুন। আমাকে বিশ্বাস
বুকিওলাে এবং তার অধ্যাপক
করে কাজের ভার দিয়েছেন। আপনার কাজ উদ্ধার না করে
আমি ছাড়বাে না।
এই বলে সে তার মাল বােঝাই ঝুডিটা মাথায় তুলে যাবার
উপক্রম করলাে।
বুকিওলাে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, দেখাে বেশী দেরী করােনা
কিন্তু। আমি তােমার জন্যে অপেক্ষা করবো।
“আজ্ঞে, আচ্ছা।
বাডীটা চিনে নিতে স্ত্রীলােকটির একটুও দেরী হলাে না।
বাডীটার কাছে, একেবারে কাছে এসে দেখলাে, বুকিওলাের প্রেমিকা
ফটোকের সুমুখেই দাঁড়িয়ে বােধকরি পার্কের উন্মুক্ত বাতাস গ্রহণ
করছে। কানের কাছে মুখ রেখে ফিফিস করে বল্লো, আপনার
পছন্দ করবার মতাে অনেক জিনিষ আছে।
এই বলে সে মুহূর্তেব মধ্যে তার ঝুডিটা নামিয়ে ভালাে ভালাে
দ্রব্যগুলি একে একে মেয়েটি দৃষ্টির ওপর তুলে ধরলাে :—কিছু নি।
যা আপনার পছন্দ হয়, তাই নি। অন্তত একটা। একটা আপনাকে
নিতেই হবে। নিতেই হবে কিন্তু। আপনার জন্যেই তাে এতাে
কষ্ট করে আসা।
মেয়েটির নাম গিওভানা।
গিওনার পছন্দ, একটা ভানেটি ব্যাগ।
বল্লো, তােমার সব জিনিষের মধ্যে ঐ ব্যাগটাই আমার চোখে
ইতালীর সেরা গল্প
লেগেছে। কিন্তু দাম নিশ্চয় বেশী। বেশী দাম হ'লে বাপু কিনতে
পারবো না, তা কিন্তু বলে রাখছি।
দাম? দামের কথা আপনি কী বলছেন? সব জিনিষ গুলো
আপনি নিয়ে ঘরে তুলে রাখুন না।
দাম আপনার এক কডিও দিতে
হবে না। কেন হবে না জানেন ?
এই বলেই সে একটু মুচকি হেসে গিওভানাকে ফিসফিস করে
কি বলে, বােঝা গেলাে না। কিন্তু গিওভানা সে কথায় নিরতিশয়
বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হয়ে উঠলাে : একথা বলাব মানে ?
-মানে? আজ্ঞে মানে যদি শুনতে চান, তাে মানে করবার
আমার একটু মাত্রও আপত্তি নেই।
-হ্যা—আমি শুনতে চাই। সব কথাই মানে থাকে।
--থাকে বৈকি। নিশ্চয়ই মানে থাকে ।
এই পর্যন্ত বলে স্ত্রীলােকটি কিছু কালের জন্যে ঝুডির ভেতরকার
বস্তুগুলির ওপর দিয়ে দৃষ্টি বুলিয়ে পরক্ষণেই গিওভানার সুন্দর মুখ
প্রতি চাইলো। ব'লে, আপনি যখন নেহাৎ শুনবেন, তখন আর না
বলে উপায় কি? মরি মরি। কী রূপ রে আমার বাছার। সাধে
কি বুকিওলাে ছােকরাটি আপনার কাছে আমায় পাঠিয়েছেন। আহা
ছেলেটি আপনাকে কী ভালােই না বাসেন। ছায়া যেমন কায়াকে
ভালােবাসে, দেহ যেমন প্রাণকে ভালোবাসে—তেমনি ভালােবাসেন
উনি আপনাকে। এক কথায় সমস্ত জগৎ একদিকে, আর আপনি
একদিকে। জগতের সমস্ত সৌন্দৰ্য্য, বুকিওলাের আপনার প্রতি
বুকিওলাে এবং তাঁর অধ্যাপক ভালােবাসায় কোথায় না-জানি যায় ভেসে। জগতে কেউ এমন গভীরভাবে ভালােবাসতে শেখে নি। কিন্তু কী দুখেই-না বেচারা বুকিওলাের মনটা ভরে ওঠে। অাপনার সঙ্গে কথা না বলতে পাওয়ার জন্যে, হয়তো শেষে ওঁর মৃত্যু হতে পারে। স্ত্রীলােকটির কথায় গিওভানার মুখখানি দেখতে দেখতে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলাে। সমস্ত মনটা ঘৃণায় এবং ক্রোধে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ক্রোধপূর্ণ-স্বরে তাকে লক্ষ্য করে বল্লো, দূৰ হ' মাগিশীগ্যির এখান থেকে দূর হ’। নইলে, এমন শিক্ষা দোবাে যে, জীবনের শেষদিন পর্যন্তও মনে থাকবে। গিওভানা দৰজার পাশ থেকে একটা লৌহদণ্ড নিলাে তুলে। বল্লো, হতভাগা বজাং মাগি কোথাকার। আমার সঙ্গে এসেছিস চালাকি করতে? বেব—বেরে। এখুনি দূর হ আমার সামনে থেকে। সেই মহিলাটি গিওভানার অগ্নিমূর্তিতে সত্যি ভয়ে কাঁপতে লাগলাে। চক্ষের নিমিষে সে তার দ্রব্যগুলি ঝুড়ির মধ্যে ভরে একরকম দৌড়েয়েই বুকিওলাের কাছে এসে হাঁপাতে লাগলাে। বুকিওলাে উদ্বিগ্ন-চিতে ওর জন্যেই প্রতীক্ষা করছিলেন। বল্লেন, কী হলাে? কাজ এগােলে কত দূর? স্ত্রীলােকটি তার হাতে, তাঁরই দেওয়া টাকা ফিরিয়ে দিলে। বলো, এই নিন আপনার টাকা ফেরৎ। বাপরে বাপ। আর একটু হলেই আমার মাথাট। লােহার ঘায়ে দিয়ে ছিলাে উড়িয়ে আর কি। tw০
ইতালীর সেরা গল্প
উ:ভগবান রক্ষা করেছেন। আপনি অন্য লােক দেখুন গে।
আমার দ্বারা হবে না। শেষে কি প্রাণটা খুইয়ে ব’লবাে?
বুকি গুলো বিলম্ব না করে অধ্যাপকের কাছে আবার এলেন।
এসে, আজকের ঘটনার কথা সমস্তই খুলে বল্লেন ।
শুনে প্রফেসর লেশমাত্রও হতাশ হলেন না। ছাত্রকে উৎসাহ
দিয়ে বল্লেন, বুকিওলাে হতাশ হও না। তুমি তাে জানে, এক
আঘাতে একটা বড়াে গাছকে ভূমিস্মাৎ কবা সম্ভব নয়। অন্যদিনের
মত আঙ্গো মেয়েটির বাডীর সুমুখে পায়চাবি করে গিয়ে। লক্ষ্য
রেখাে তার দৃষ্টির দিকে, এবং বােঝবার চেষ্টা কবে, সত্যিই সে
তােমার ওপর রেগে গিয়ছে কিনা।
এই নতুন পাঠে বুকিওলােব মনটা একটু একটু কবে রঙিণ হয়ে
উঠছিলাে। তিনি পূর্বদিনের মতো গিওভানাব বাড়ীর সামনে পায়চারি
করতে লাগলেন।
গিওভান। বুকিওলােকে দেখতে পেয়ে ছুটে আসে নীচে নেমে ।
দাসীকে ডেকে বলে ঐ, ঐ যে সুন্দর ছেলেটি চলে যাচ্ছেন, তাঁকে
গিয়ে বল—আজ সন্ধ্যার পর আমার এখানে আসতে। হ্যা আজ
কোনাে ভুল যেন না হয়। যা—যা। দেরী করিসনে চলে গেলাে
বুঝি। দৌড়ে যা- শীগ্যির, শীগ্যির।
৩;
বুকিওলাে এবং তব অধ্যাপক
দাসী যথাসময়েই বুকিওলার কাছে আসে। সবিনয়ে বলে, আমার
মনিব গিওভানা, হ। আমার মনিব গিওভানা, আজ সন্ধ্যায় আপনার
উপস্থিতি প্রার্থনা কবেন। আপনার সঙ্গে আলাপ ক’বতে তার অত্যন্ত ইচ্ছে।
বুকিওলাে তার এই সৌভাগ্যে খুশী হন—অসম্ভব খুশী হন। বলেন,
-বলাে, আমি, আমি যাবাে—নিশ্চয়ই যাবো।
বুকিওলাে সাফল্যের উত্তেজনায় তৎক্ষণাৎ প্রফেসরের কাছে ফিরে
এলেন। এসে সবই খুলে প্রকাশ করলেন।
কিন্তু প্রফেসবের মানব মধ্যে একটা সন্দেহ মাথা তুলে দাঁড়াবার
চেষ্টা করে। মেয়েটি নাম, বাডীব নন্সর শুনে মনে আশঙ্কা হয়—এ
তাঁর নিজের স্ত্রী নয় তাে ? নানান চিন্তা তার মনে ভিড় করে তাঁকে
উত্তেজিত কবে তােলে। হঠাৎ এক সময়ে ছাত্রকে প্রশ্ন করেন, তুমি
কি ঠিক ক’বলে ? যাবে তুমি ?
নিশ্চয় যাবে, স্যার।
যাবে ?
—যাবাে না-আপনি কী বলছেন, স্যার?
-তা হলে আমাকে কথা দিয়ে যাও যে, যাবার আগে তুমি আমার
এখান থেকে একবার হয়ে যাবে।
—আজ্ঞে স্যর। তাই করবাে। যাবার আগেই আমি আপনার
এখানে আসবাে। জানিয়ে যাবে—আমি এবার যাচ্ছি।
ইতালীর সেরা গল্প
এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালাে যে, প্রফেসর রাত্রিবেলা বাড়ী
ফিরতেন না। শীতকালে পড়াশুনাে এবং লেকচারের মধ্যেই কলেজে
রাত্রি কাটাতেন।
যথাসময়ে বুকিওলাে এলেন। বলেন স্যার, আমি যাচ্ছি। আপনার
কিছু বলবার আছে ?
প্রফেস অন্যমনস্কে কী যেনো ভাবছিলেন। ছাত্রের প্রশ্নে হঠাৎ
যেনাে তার খেয়াল হলাে। বল্লেন, কী বলছে—আমার কিছু বলবার
আছে কি না ?
“আজ্ঞে স্যার।
-বলবার? হ্যা তা বলবার আছে বৈকি। দেখাে, বুকিওলাে,
তুমি যে বিপদের মধ্যে যাচ্ছে, তাতে কোনাে সন্দেহ নেই। সব সময়ে
সতর্ক থেকো। নিজের প্রাণটি যেনাে হারিয়ে বসাে না।
—আপনি কিছু ভাববেন না, স্যার। আমি ঠিক বেঁচেই আবার
আপনার কাছে ফিরে আসবাে। আপনার আশীর্বাদ যে আমার
মাথার ওপর রয়েছে, তাঁর। বিপদে পড়বাে কেন ?
বুকিওলাে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কিন্তু প্রফেসর আজ আর নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারলেন না।
তিনি ধীরে ধীরে, অতি সন্তর্পণে ঘরের বাইরে এলেন। এবং দূর থেকে
বুকিওলােকে অনুসরণ করে পথ চলতে শুরু করলেন।
বুকিওলাে এবং তার অধ্যাপক যথাসময়েই প্রফেসর দেখলেন তারই লালরংয়ের দোতলা বাড়ী- দরজায় এসে বুকিওলাে মৃদু আঘাত করতেই তার স্ত্রী, অনন্যসাধারণ সুন্দরী স্ত্রী গিওভানা, এসে দরজা খুলে তাকে ভেতরে এনে দরজা দিলে বন্ধ করে। আপনারা একবার প্রফেসরের মনের অবস্থা অনুভব করতে চেষ্টা করুন। প্রিয় ছাত্রকে লাভমেকিং শেখাতে গিয়ে তিনি অজ্ঞাতসারে নিজের বাড়ীতেই, খাল কেটে কুমীর এনেছেন। ছাত্রকে নিয়ে খেলা করতে গিয়ে তিনি নিজের প্রিয় ছাত্রকেই জীবনের সবচেয়ে বড়াে করে তুললেন। চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে ? সেই বিখ্যাত বােলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিত প্রফেসর, আজ সমস্তই বিস্মৃত। শুধু তার মনে বুকিওলােকে খুন কববার একটা প্রবল স্পৃহা মাথা উচু করে দাঁড়ালো। তিনি সশস্ত্রে এসে, নিজেব বাডীব দরজায় আঘাত করতে থাকেন। গিওভানা এবং বুকিওলাে ঘরের মধ্যে পাশাপাশি বসে আগুন পােয়াতে পােয়াতে আলাপ করছিলাে। দরজার গায়ে আঘাতের শব্দ শুনে গিওভানার বুঝতে বাকী থাকে না, তার স্বামী এসেছেন। কেননা দরজায় আঘাত করবার তার একটা স্বতন্ত্র রীতি আছে। এটা কেবল তার পক্ষে সম্ভব। তাড়াতাড়ি বুকিওলাের হাত
ইতালীর সেরা গল্প
ধরে এদিক পানে টেনে নিয়ে আসে। জড়করা অনেকগুলি কাপড় জামার
ভেতর ওঁকে লুকিয়ে রাখে। দরজার পাশে এসে প্রশ্ন কবে—কে ?
কে? বুঝতে পারছেনা কে ? শীগ্যির দরজা খােলো।
দরজা খুলতেই প্রফেসর, খােল-তলােয়ার হাতে ঘরে এলেন।
গিওভানা ভয়ে চীৎকার করে, এর মানে কি ?
এর মানে তাে তোমার কাছেই। তুমি জাননা, দুবৃর্ত এই
বাড়ীর মধ্যে আছে ? আছে, নিশ্চয়ই আছে।
গিওভানা পরম বিস্ময়ের ভাব দেখিয়ে বল্পে, তুমি ওসব কী যা’
তা’ বলছো? তােমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেলাে ? হা ভগবান।
শেষে তুমিও আমাকে সন্দেহ করতে সুরু করলে ?
এই বলে সে একটা আশ্চৰ্য্য উপায়ে আয়ত চোখ দুটি থেকে অশ্রু
জোর করে টেনে আনে। তারপর ক্রন্দনজডিতস্বরে বলে, এসাে,
এসাে তুমি। খুঁজে দেখে সমস্ত বাড়ীখানা। যদি কাউকে বার
করতে পারাে, তােমার ঐ তলােয়ারের ওপর আমি স্বেচ্ছায়
ঝাপিয়ে পড়বে। নয়তো,
ঐ তলােয়ারের সামনে দোকে
মাথা পেতে।
বলেই গিওভানা চোখ মুছতে মুছতে পুনৰ্ব্বার বলে, তুমি কি
মনে করছে যে, আমি নিজের চরিত্রকে দূষিত, কলঙ্কিত করতে সুরু
করেছি ? কেউ কোনাে কালে যে বংশে খারাপ ছিল না, কলঙ্কিত করেনি
চরিত্র, সেই বংশের মেয়ে হয়ে, আমি নিজের চরিত্র করবে অপবিত্র ?
নিজেকে পরপুরুষের অঙ্কশায়িত করবে।? এসব বলার আগেই যে
আমার মরা উচিত ছিলােহা’ ভগবান।
বুকিওলাে এবং তার অধ্যাপক কিন্তু প্রফেসর, স্ত্রীর কোনাে কথায়ই কর্ণপাত করেন না। সমস্ত বাড়ীখানা তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান কবেন। গিওভানা একটা বাতিদানে বাতিজেলে স্বামীর পেছন পেছন আলাে দেখিয়ে আসে। এবং পেছন থেকেই বলে, দেখাে, আমার মনে হচ্ছে, কোনাে অদৃশ্য-শয়তান তােমার কাঁধে ভব কবেছে। নইলে, তুমি হঠাৎ এই রকম অস্বাভাবিক ভাবে যেতে বলে। তুমি আমাকে যতটা সন্দেহ করছে, তার অর্ধেকও যদি আমি সন্দেহের ভাগী হতাম, তা হলে আমি নিজের গলা নিজের হাতে টিপে কোন আত্মহত্যা করতাম। আমি তােমাকে এই প্রার্থনা ক’বছি, শয়তানকে প্রশ্রয় দিও না—নিজেকে সন্দেহেব বিরুদ্ধে দাড করবার চেষ্টা করে। আমি অসতী, আমি দুশ্চরিত্রা—এ-কথা তুমি কী করে ভাবতে পারলে । ছি, আমায় তুমি সন্দেহ করো। এই বলে হঠাৎ সে প্রফেসরের কণ্ঠদেশ নিজেব একখানা হাত দিয়ে বেষ্টন করলাে। সত্যি কথা বলতে কি, প্রফেসর কোথাও তাঁকে খুঁজে পান । ভগবান্ বুকিওলাের প্রতি সদয়। প্রফেসর স্ত্রীর কথায়, আলিঙ্গনে, অভাবিতভাবে বদলে যান। এখন তার মনে হয়, শয়তান নিশ্চয়ই তারই ওপর ভর করেছে। মনে হয়, এ তারই মনের ভুল, দৃষ্টির ভ্রম। নইলে, তন্নতন্ন কবে বাড়ীটা অনুসন্ধান করা সত্ত্বেও বুকিওলাের সন্ধান পাওয়া যায় না কেন? স্ত্রীকে যে বৃথা সন্দেহ করেছেন, এখন তাঁর মনে এটাও সত্যি হয়ে ভেসে ওঠে। কোনো কথা না বলে তিনি নিজের শয়ন কক্ষে গিয়ে শয্যার ওপর শুয়ে পড়েন। এবং এটা নিরীক্ষা
ইতালাব সেবা গল্প
করে গিওভানা ধীৰে ধীরে বেবিয়ে এসে দরজাটায় চাবি দেয়। ফিরে
এসে বুকিওলােকে সেই জডে করা কাপড়-জামার ভেতর থেকে, হাত
ধরে টেনে বের করে ।
পরদিন প্রভাতকালে।
ঢংঢং কবে কলেজের ঘডিতে দশট।
বাজছে। বুকিওলাে এই সবে এসে প্রফেসরের মুখে বসেছেন।
বলেন, সার কাল একটা ভারী মজার ব্যাপার হয়েছে। আপনি শুনে
না-হেসে থাকতে পারবেন না।
প্রফেসরের মনের মধ্যে কালকের ঘটনা এক নিমিষেই
প্রদীপ্ত হয়ে উঠলাে। তিনি সহসা অস্বাভাবিক ভাবে বারকয়েক মাথা
নেডে চেয়ারের হাতল দু’টো, দু'হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে লাগলাম
প্রশ্ন করলেন, কী রকম—কী বকম মজার ব্যাপার? না-হেসে থাকতে
পারবাে না? কিন্তু, কেন,—কেম—কেন ?
বুকিওলাে নিজের আনন্দে এমনি মেতে
উঠেছেন যে,
প্রফেসরের বর্তমান মনের অবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করলেন।
এ ছাড়া তার মনের মধ্যে অধ্যাপকের বিরুদ্ধে কোনাে সন্দেহই স্থান
পায়নি।
তিনি তাে ঘুণাক্ষরেও জানেন না যে, তাঁর গিওনা
অধ্যাপকের স্ত্রী।
বুকিওলাে প্রত্যুত্তরে বলেন, গতরাত্রে আমি গিওভানার বাড়ীতে
উপস্থিত হবার কিছুকাল পরে, ওর স্বামী এসে হাজির। বাপরে-
বুকিওলাে এবং তার অধ্যাপক সে কী ক্রোধ তাঁর। সমস্ত বাডীটা তন্ন-তন্ন করে খুঁজে বেড়ালেন। কিন্তু আমি যে সম্প্রতি-কাচা পােষাক-পরিচ্ছদের গাদাব মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম, সে টুকু তঁাব খেয়াল হলাে না। কাজেই আমাকে তিনি দেখতে পেলেন না। উনি বিফল মনােরথ হলেন এবং নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে প'ডতেই, গিওভানা বাইরে থেকে ওঁকে চাবি দিয়ে আমাকে হাসতে-হাসতে সেই কাপড়-চোপডেব ভেতর হতে বার করলে। সমস্ত বাতটা স্যার কী আনন্দেই কাটলাে। এমন আনন্দ এর পূর্বে আমি আর পাইনি। মানুষের জীবনে এর চেয়ে বডে আনন্দ বােধকবি আব কিছুই হতে পারে না। এই পর্যন্ত বলে বুকিওলো এক মুহূর্ত নীরব থেকে পুনশ্চ বলেন, আজো সন্ধ্যায় আমি গিওভানার কাছে যাবাে, স্যার। যাবাে এই জন্যে যে, ওর কাছে আমি যাবার কথা দিয়ে এসেছি। তার এই সারল্যভরা কথা শুনে প্রফেসরের অন্তরের ভেতরটা ঠিক জীবন্ত আগ্নেয় গিরিব মতাে ফুটতে থাকে। অসম্ভব ক্রোধে উৰ্বর মস্তিটা বুঝি বিদীর্ণ হয়। কিন্তু অসম্ভব ধৈৰ্য্য সহকারে তিনি ক্রোধ সংবরণ করে গম্ভীর স্বরে বল্লেন, যাবার আগে আমাকে জানিয়ে যাবে। যাবে, নিশ্চই যাবে। -সে কথা অব বলতে তার । বুকিওলে বিদায় গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রফেসর ? তিনি দুশ্চিন্তায় মগ্ন হয়ে প্রতিশােধ গ্রহণ করবার প্রবল আগ্রহে, কেমন যেন হয়ে পড়েন। কলেজে শত চেষ্টা করেও ছাত্রদের পড়াতে পারেন ৪১
ইতালীর সেরা গল্প
। সমস্ত দিনটাই অস্ত্র হাতে করে হিংস্র শ্বাপদের
মতাে ঘুড়ে
বেড়ান।
তারপর? তারপর আসে সেই মুহূর্তটুকু-সেই সন্ধ্যাবেলা ।
বুকিওলাে যাবার পূর্বে প্রফেসরের সঙ্গ দেখা করেন। প্রফেসর
বলেন, যাচ্ছে। তা হলে ?
যাও। কিন্তু কাল তােরবেলা
আমার সঙ্গে আবার দেখা করাে। আমি জানতে চাই—কতদূর
তুমি এগিয়ে গেলে।
-নিশ্চয়ই স্যার । কাল আপনার সঙ্গে দেখা করে আজকের
সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করবে।।
বুকিওলাে বেরিয়ে এলন। এবং
প্রফেসর বিলম্ব
করে সঙ্গেসঙ্গেই তাকে অনুসরণ
কবতে থাকেন। আজ তার
উদ্দেশ্য——গিওনার বাড়ীতে প্রবেশ করার মুহূর্তেই বুকিওলােকে
হাতে-হাতে ধরা।
কিন্তু যে সব নারীরা পূর্ব-যৌবনাবস্থায় বৃদ্ধ স্বামীকে প্রতারণা
করে যুবাপ্রেমিকের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় কবে, তারা সব সময়ই
সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। পাছে কেউ জানতে পারে, পাছে
তার স্বামী তাকে দুশ্চরিত্রা বলে
গিওভার
এর ব্যতিক্রম হয় না। বুকিওলাে ভেতরে প্রবেশ করবার
ফেলে।
শেষে
বুকিওলাে এবং তাঁর অধ্যাপক
সঙ্গেসঙ্গেই, সে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
প্রফেসর এক মিনিটের
মধ্যে দরজার কাছে এসে দাড়ান। বুকিওলােকে সঙ্গেসঙ্গে ধরতে
পরলেন না বলে, তার সর্বশবীর অধিকতর ক্রোধে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
তিনি দরজার ওপর প্রচণ্ড ঘুসি মারতে থাকেন।
গিওভানাব কানে সেই শব্দ আসে। মুহর্তের মধ্যে আলাে নিবিয়ে
দরজার পাশে বুকিওলােকে দাড় করায়। তারপর দরজা সশব্দে খুলতেই
প্রফেসর উত্তেজনা ঘনঘন নিঃশ্বাস ছাড় ছাড়তে ভেতরে
আসেন।
গিওভানা
পলকের মধ্যে স্বামীর কণ্ঠ তার দু’টি মৃণালভূজের
সাহায্যে বেষ্টন কবে এমনি ভাবে আড়াল করে দাঁড়ায়, যে, তিনি
দরজার পাশের ব্যক্তিটিকে আদৌ দেখতে পান না। অধ্যাপক
স্ত্রীর আবেষ্টন থেকে নিজেকে জোর কবে মুক্ত করেন। ক্ষিপ্রগতিতে
মুখ দিকে এগিয়ে যান। এবং সেই অবসবে বুকিওলাে তার অজ্ঞাতে
দরজার পাশ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। প্রফেসর সীমাহীন
উত্তেজনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। কোষমুক্ত তলােয়ার মাথার ওপর দিয়ে
ব-বন্ শব্দে ঘুরিয়ে চীৎকার করেন, খুন করবো। কেটে টুকরাে-
টুকরো করে ফেলবো। মাংস টুকরো, কুকুর দিয়ে খাওয়াবাে। দুষমন,
বেইমান কোথাকার।
দেখে গিওভানা
চীৎকার করে পাড়ার লােক
বাড়ীতে জড়াে করলাে। এবং তাদের সম্মুখে বল্লো, আমাকে
করাে। আমার #
পাগল হয়ে গিয়েছে। অত্যন্ত
পড়াশােনার জন্যে, এর মাখায় আর
৪৩
ইতালীর সেরা গল্প
পাড়ার লােক সত্যিই দেখে, অধ্যাপক, সেই শান্তিপ্রিয় অধ্যাপক,
অন্ত্রে নিজেকে সজ্জিত করেছেন। গিওনার কথা তারা বিশ্বাস না
করে পারে না। বলে, প্রফেসর, আপনি স্থির হােন। আসুন, আপনাকে
কৌচে শুইয়ে দি। আপনি বিশ্রাম করুন ।
প্রফেসব বলেন, বিশ্রাম? অসম্ভব। হ্যা অসম্ভব সম্পূর্ণ অসম্ভব।
আমার স্ত্রীর ঘরেতে আসতে তাকে আমি স্বচক্ষে দেখেছি।
গিওভানা প্রতারণার মুখােস প'রে বলেন, আমি দুশ্চরিত্রা? গ
ভগবান্ এও তােমার মুখ থেকে আমায় শুনতে হলাে? আমার
সমস্ত বন্ধু-বান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশিদের জিগ্যেস করে দেখােকোননা
দিন, কোনাে দুর্বল মুহূর্তেও তারা আমার চরিত্রে তিলমাত্রও কলঙ্ক
রেখা দেখতে পেয়েছে কিনা।
এই কথায় পাড়া-পড়শীরা একসঙ্গে প্রফেসরকে বলে, স্যার, আপনি
স্থির হােন। স্ত্রীর চরিত্রে আপনি মিথ্যে সন্দেহ করছেন। আমরা
এই পাড়ায় বহুদিন আছি। আমবা জানি, আপনার স্ত্রী গিওনার
মত পবিত্র চরিত্রের স্ত্রীলােক, দু'টি নেই। উনি ফুলের মতােই
পবিত্র-কলঙ্কের কোনো বেপাই ওঁর চরিত্রে নেই।
কিন্তু প্রফেসরের সেই এক কথা-কী করে তা হতে পারে?
আমি তাকে এখানে আসতে স্বচক্ষে দেখেছি। সে এখানে আছে।
নিশ্চয়ই কোথাও লুকিয়ে আছে।
গিওভানার দু' ভাই
এলেন।
এদের
बांधन
সত্যিই
ss
বুকিওলাে এবং তার অধ্যাপক অপ্রত্যাশিত। অগ্নি আকুল হয়ে কেঁদে ওঠে। ক্রনজড়িত- বিনিয়ে বিনিয়ে বলে, আমার को সর্বনাশ হল। তোমাদের ভগ্নিপতি একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়। আমার ঘরে দ্বিতীয় পুরুষ মানুষ আছে, এই অপবাদ তিনি দিচ্ছেন। কিন্তু তােমরা জানো, ভালাে করেই জানাে, কি ধাতের তােমাদের বােন্ আমি। ভগ্নির কথায় দু’-ভাই অধ্যাপককে ভৎসনা করে উঠলেন। আমরা অত্যন্ত আশ্চর্য্য হচ্ছি। শুধু আশ্চৰ্য্য নয়—সত্যিই আমরা আন্তরিক দু খিত। এতােদিন নিঃসন্দেহে এবং শান্তিতে ঘর সংসার করবার পর, আপনি হঠাৎ আমাদের বােনের বিরুদ্ধে এ-রকম সন্দেহ—এমনি জঘন্য সন্দেহ, নিজের মনে পােষণ করছেন। কিন্তু কেন ? প্রফেসর তখনাে রাগে ফুলছেন। বলেন, দেখেছি, আমি নিজের এই বড়ােবড়াে চোখ দিয়ে দেখেছি—একটা সুন্দর, ফুটফুটে ছােকবাকে ঘরে ঢুকতে। সে আছে, এখানেই আছে। তবে আসুন, আমরা সকলে ভালাে করে খুঁজে দেখি। সেই ছােটাকে যদি বার করতে পারি, তবে গিওভানাকে আপনার ইচ্ছেমতো শান্তি আমরাই দিয়ে যাবে । এই বলে সমবেত প্রতিবেশিদের মধ্যে একজন প্রফেসরের মুখপানে চায় । গিওভানার এক ভাই, ভগ্নিকে এদিক পানে এনে জিজ্ঞাসা করেন, গিওভানা, সত্যি করে আগে বলাে, কারুকে তুমি এই বাড়ীতে লুকিয়ে রেখেছে কিনা। সত্যি সত্যি কথা বলবে। ৪৫
ইতালীব সেরা গল্প
-ভগবানের দিব্যি। আমার ঘরে কেউ নেই। পরপুরুষের
সঙ্গে প্রেমালাপ করার দুরসিন্ধি হবার আগেই যেন আমার মৃত্যু
হয়। কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে তুমি আমার ভাই হয়ে কী
করে এ কথাট। মুখ দিয়ে উচ্চারণ ক’বলে ? তােমার বােন্ আমি।
আমার কলঙ্ক, তােমাদেরও কলঙ্ক। আমাকে ও কথা জিগ্যেস কবার
আগে তােমার লজ্জা হওয়া উচিত ছিলাে। পবপুরুষকে ডেকে এনে
আমি এ বাডীকে কলঙ্কিত করবে—আমার পূজনীয়
পৃজনীয় স্বামীর
অপমান করবো ? শেষে তােমরাও আমাকে সন্দেহ করতে সুরু
করলে? হা গবান্ । এখন আমি বেঁচে আছি।
গিওনার চোখ দিয়ে এবার শ্রাবণের ধারা বয়।
ভগ্নিব উক্তিতে দু’-ভাই মনে মনে সন্তুষ্ট। কিন্তু সমবেত সকলের
সামনে তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ করার জন্যে, প্রফেসরেব
সঙ্গে সারা বাড়ীটা অনুসন্ধান করে বেড়ালেন। কিন্তু কাকেও
দেখা গেলাে না।
অধ্যাপক একস্থানে
এসে দেখলেন, অনেকগুলি
পোষাক টেবিলটার ওপর জড়াে করা অবস্থায় পড়ে। তিনি তৎক্ষণাৎ
তলােয়ার চালিয়ে মূল্যবান বস্ত্র গুলি টুকরাে টুকবো করে ফেললেন।
তার মন কিন্তু আনন্দে নেচে ওঠে। কেননা তিনি মনে করছেন,
বুকিওলােকেই তরবারির আঘাতে টুকরাে টুকরাে করে ফেলছেন ।
প্রফেসরের কীত্তি দেখে সকলের নিঃসংশয়ে ধারণা হলো,
তার
মাথায় আর কিছু নেই। গিওভানার ভাইয়ের বলেন,
০৬
বুকিওলল এবং তার অধ্যাপক প্রফসব আপনি অনেকদূর পর্য্যন্ত এগিয়ে গিয়েঠেন। এতােট। এখােননা আপনার কোনাে মতে উচিত হয় নি। আমাদের ভগ্নি গিও খানার প্রতি আপনার এই অশিষ্টাচার কোন মতেই সই করা যায় না। আমরা দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, আপনি উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন। এবং এই জন্যেই, আপনাকে ক্ষমা করা গেলাে। ক্ষমা, আমাকে করবে তােমরা ক্ষমা ? কী ক্ষমতা আছে তোমাদের ক্ষমা কবর ? যে দোষী, সে পেয়ে গেলাে পার। আব আমি সেই আসামীকে ধরতে এসে হয়ে গেলাম ক্ষমার পাত্র, হয়ে গেলাম উন্মাদ ? তােমরা তােমরা সকলে সড়যন্ত্র করে সেই দুৰ্বত্ত ছােকরাটাকে রেখেছে। লুকিয়ে। বার করে শিগ্যির তাকে। আমাব সুমুখে বাব ক'রে দাও। নইলে, এই তলোয়ারের ঘামে তােমাদের প্রত্যেকের রক্ত দর্শন করবে। উন্মত্ত প্রফেসর লােয়ার শূন্যের ওপর আস্ফালন করেন। তখন সকলে একসঙ্গে নিজেদের হাতের লাঠি ব্যবহার না করে পারে না। দু-চার ঘা লাঠি প্রফেসরেব পিঠের ওপর এসে পড়ে। তার তলােয়র ভেঙ্গে টুকবাে টুকরাে হয়ে যায় । সকলে তাকে লােহার শেখলের সাহায্যে বেঁধে ফেলেন। এ অবস্থায় তিনি নির্জীবের মতাে ঘরের এক কোণে পড়ে থাকেন। দুঃসংবাদ কখনাে চাপা থাকে না। বােলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপকের বিরুতির কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। ৪৭ ইতালীর সেরা গল্প মর্মান্তিক দুঃখে কলেজের ছেলেরা নে অভিভূত। একসঙ্গে অধ্যাপককে দেখতে যাচ্ছেন, এমন সময় বুকিওলাে এলেন কলেজে। তিনি এসব কিছুই জানেন না। গতরাত্রে তাঁর প্রেমাভিযানের ফলাফলের কাহিনী তিনি প্রফেসরকে আজো জানাতে এসে ছিলেন। কিন্তু এখন শুনে মন তাবও খারাপ হলো। অধ্যাপককে তিনি পিতার মতো সম্মান কবেন, ভক্তি করেন— ভালােবাসেন। আজ সেই ব্যক্তির মস্তিষ্ক বিকৃতিব অশুভ সংবাদে বুকিওলাের চোখ দুটি অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। তিনিও অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে অধ্যাপককে দেখতে যান। অধ্যাপকের বাড়ীতে পদার্পণ কবে বুকিওলাে চারিদিকে চোখ ফিরিয়ে-ফিরিয়ে দেখেন। তাই তােল। এই স্থানটি যে তার জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতার স্মৃতি নিয়ে দাড়িয়ে। বুকিওলাের বুকটা আজ হঠাৎ দুর দুর করে উঠলাে। এবং মুহুর্তের মধ্যে সমস্ত ব্যাপারটা তার চক্ষে জলের মতাে পরিষ্কার হয়ে যায় । কিন্তু পাছে সঙ্গের সাথীরা সত্যি কথা বুঝতে পারে, এই ভয়ে বুকিওলাে সকলের সঙ্গে ঘরের ভেতর এলেন। এসে দেখেন, তার অধ্যাপক নির্দয়ভাবে প্রহৃত হয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় নিজের শয্যার ওপরে স্থির হয়ে পড়ে আছেন। অন্যান্য ছাত্ররা তাঁর শয্যার চারিধারে ঘিরে তার ঐ মর্মস্পর্শী অবস্থার জন্যে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করে চলে যাবার পর, বুকিওলো নিতান্ত অপরাধীর মতো তার মুখে এসে দাঁড়ান। সজল চক্ষে বলেন, স্যার, আমার বাবার মতো আমি আপনাকে ভক্তি করি, সম্মান করি। আমাকে দিয়ে ৮
বুকিওলাে এবং তাঁর অধ্যাপক
আপনার যদি কোনাে উপকার হয়, ব’লুন। আপনার ছেলের মতো
আমি তাই পালন করবে।
প্রফেসর ধীরে ধীরে ঘাড় নেড়ে বল্লেন, না, বুকিওলাে ।
আমার আর কিছু আদেশ করবার নেই। তুমি যাও। শান্তিতে
তুমি ফিরে যাও। আমার নিজের অনন্ত ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে,
তুমি পেয়েছে প্রচুর অভিজ্ঞতা। তুমি যাও।
তিনি বােধকরি আরাে কি বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী
বাধা দিয়ে বুকিওলােকে বল্লো, এসব বাজে কথায় কান দেবেন না।
দেখছেন না, লােকটার মাথার কোনো ঠিক নেই ?
শুনে বুকিওলাের মনে হয়, তার নিজের হৃদয়ে কে যেন সহ
সুচের অগ্রভাগ দিয়ে বিদ্ধ করে দিলাে। তিনি মুহূর্তের জন্যে দৃষ্টি
ফিরিয়ে গিওভানার দিকে চাইলেন এবং পরক্ষণেই অধ্যাপকের কাছ
থেকে শেষ বিদায় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
পিট্রোপােলাের বাসায় এসে বুকিওলাে ধরা গলায় বলেন, ভাই,
পিট্রো। আমি তােমার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি। ভগবান
তোমার মল করুন। বলেন, আমার আর তােমার জন্যে অপেক্ষা
করার উপায় নেই। আমি আজই স্বদেশে, আমার নােম নগরীর
ইতালীব সেরা গল্প উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পডবাে। কেন না, আমি পরের ক্ষতি করে, নিজের অভিজ্ঞতার খাতায় অনেক-অনেক সঞ্চয় করেছি। আমার জীবনে এই পাপের বােঝা স্বেচ্ছায় নির্বোধের মতােই কাঁধে তুলে নিয়েছি। ভগবানের কাছে আমার এই একমাত্র প্রার্থনা, তিনি যেন আমাকে এর জন্যে কোনাে দিন ক্ষমা না করেন। to ক্যানডিযাব শেষ-পবিণতি ইষ্টারের বিরাট তেজের তিন দিন পব :- লাগেনিকা পবিবারে এই ইষ্টার উপলক্ষ্যে, প্রতি বছরই একটা বেশ বড়াে গােছর ভােজের আয়ােজন হয়। এটা ল্যামােনিকা পরিবাবের একটা চিরকালের প্রথা হয়ে দাড়িয়েছে। বহু বিশিষ্ট ভদ্রলােক পর্ব-উপলক্ষ্যে নিমন্ত্রিত হন এবং প্রচুর আহারাদির পর যে যার নিজের গৃহে ফিরে যান। ল্যামােনিকা পরিবারের গৃহকর্মী ডােনাক্রিশ্চিনা ল্যামােনিকা, ব্যবহার করা টেবিলক্লথ, তােয়ালে, ডি, কাটা রূপোর বাসন-কোশন গুণে-গুণে একে একে যথাস্থানেই তুলে সাজিয়ে রাখছেন। উদ্দেশ্য, আগামী বছরে হারের সময়ে এগুলি আবার কাজে লাগানো ভােনাক্রিশ্চিনাকে এই কাজে সাহায্য করছে, র গৃহের পরিচারিকা–মেরিবিকিয়া। বাকী ক্যানডিডা মারকান ওরফে ক্যানডিয়াও কয়ছে সাহায্য। মেঝের ওপরে রয়েছে সারি সারি অনেকগুলি ইতালীর সেরা গল্প বাঝেন্টু। প্রতি বাস্কেটটি জামা কাপডে পরিপূর্ণ। একটা বাস্কেট থেকে টেবিল-ক্লথ, ঝাডন, তােয়ালে তুলে নিয়ে ক্যাডিয়া গৃহকর্ত্তীকে একবার স্মরণ করিয়ে দিলো—কোনাে জিনিষ-ই হারায় নি, সব ঠিক আছে। এই কথা স্মরণ করিয়ে দেবার পর, সে তার হাতের জিনিষগুলি মেরিয়ার হাতে তুলে দেয়। মেরিয়া আবার সেগুলি পরম যত্নে ড্রয়ারের ভেতর ভরে রাখে। গৃহকর্তী ল্যাভেনডার ছড়িয়ে দেয়, এবং পরে একখানা খাতার মধ্যে এর সংখ্যা টুকে রাখেন। ক্যান্ডিয়ার চেহারাটা লম্বা এবং রােগা। বয়েস পঞ্চাশের ধার ঘেসে গিয়েছে। সামনের দিকে একটু নুয়ে পড়েছে। হাত দু’টি দেহের অনুপাতে লম্বা। মেরিয়া, অরটোনার বাসিন্দ। চেহারা মােটা । এর গায়ের রঙ পরিষ্কার। চোখ দুটি মনােরম। কথা বলার পদ্ধতিটা ভালাে। মেজাজটা শান্ত। জােনাক্রিশ্চিনাও অরটোনার অধিবাসী। এর দেহের গঠন খৰ্ব্ব। সরল না। সমস্ত মুখখানা ছুলির দাগে ভরা। চোখের সৌন্দর্য বিশেষ করে নজরে পড়ে। কিন্তু দাত বড়াে অপরিষ্কার, নােরা। অপরাহের অধিকাংশ সময়টা এই তিনটি মহিলার, এই বস্তুগুলিকে কেন্দ্র করেই কেটে গেলাে। ক্যানডিয়া তার শুন্য বাস্কেটটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার উপক্রম করতেই, রূপাের চামচ শুনতে শুনতে ভােনাক্রিশ্চিনা হঠাৎ মেরিয়াকে সম্বােধন করলেন : মেরিয়া,
ক্যানডিযার শেষ-পরিণতি
মমরিয়া। গােগােগােণে এ গুলাে। নিজে গুণে
দেখাে। একটা
চামচে? কোথায় গেলো সেটা ? মুস্কিল। শেষকালে রূপাের
চামচেটা হারালাে?
মেরিয়া বিস্মিত হলো : তা কী করে হতে পারে। না—এ
অসম্ভব, মা। আচ্ছা, আমি একবার দেখি।
এক, দুই, তিন-মেরিয়া গুণতে থাকে। ডােনাক্রিশ্চিনা সেদিকে
চোখ রেখে, মাথা নাড়েন।
গোণা শেষ করে মেরি। হতাশ ভাবে বলে ওঠে। তাইতো।
সত্যিই তো একটা কম। কী হবে ?
তার দিক দিয়ে, সে সম্পূর্ণ সন্দেহের বাইরে। আজ পনেরাে
বছর ধরে ও এ-বাড়ীতে কাজ করে আসছে। কখনাে একদিনের
জন্যেও মনিবের সন্দেহ-চক্ষে পড়েনি। আর পড়বেই বা কেন ?
সে যে প্রকৃতই বিশ্বাসী, এর অনেক পরিচয় গৃহকত্রী পেয়েছেন।
ভােনাক্রিশ্চিনাব বিয়ের পর, ওঁর সঙ্গেই অরটোনা শহর থেকে সে এ
বাড়ীতে এসেছে। এক রকম বলতে গেলে, মেরিয়াই ভােনাক্রিশ্চিনার
বিয়ের ফুল ফুটিয়েছে। প্রথম থেকেই মেরিযার, ল্যামােনিক।
পরিবারের ওপর একটা বিশেষ আধিপত্য দেখা যায়। এই আধিপত্যের
আসলে কিন্তু ঐ ডােনাক্রিশ্চিন।
ডােনাক্রিশ্চিনা বল্লেন ভালাে করে বাইরেটা দেখে এসো দিকনি।
মেরিয়া তখুনি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। রান্না ঘরের প্রতি স্থানে
ত-তরী করে খুজে দেখে। চামচে এপাের চামচে কিন্তু কৈ? বারান্দায়
ইতালীর সেরা গল্প
আসে। এদিক ওদিক ভালাে করে দেখে। কিন্তু চামচে পায় না।
শূন্য হাতে ফিরে আসে ও। বলে : না, কোথাও পাওয়া গেলাে না তাে।
দু-জনে তখন চোখ বুজে স্মরণ করবার চেষ্টা করেন, কোথাও
চামচেটা ফেলে এসেছেন কিনা। ওরা বারান্দা ডিঙিয়ে ওদিক পানে
এসে দাঁড়ায়। বারান্দার ওদিকটা রজকদের কাপড় কাচবাব জায়গা।
এখানে অনুসন্ধান করা হলাে। কিন্তু বৃথা—নিফল।
জিনিষটা পাওয়া না যাওয়াতে ওদের দু'জনকে বেশ চড়া গলায়
এই নিয়ে আলােচনা করতে শােনা গেলাে। পাশাপাশি বাড়ীর
বাতায়ন ক’টি হঠাৎ খুলে
যায়।
এর ফাক দিয়ে গুটিকয়েক
নারীমূতি মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে : কী হয়েছে, ডােনাক্রিশ্চিনা ?
অতাে চেঁচামেচি কেননা গো ?
মেরিয়া এবং ডােনাক্রিশ্চিনা হাত মুখ নেড়ে ব্যাপারটা খুলে বলে।
ওরা বলে : কী সর্বনাশ। এখানেও তা হলে চোরের উপদ্রব
ৰু হয়েছে ?
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা আশ্চর্য রকমের সাড়া পড়ে গেলাে সমস্ত
শহরটায়। বিষয়-বস্তু, এই রূপাের চামচে। এই চামচে চুরির
আসামী কে হতে পারে, সেই নিয়ে বেশ একটা গবেষণা চলে।
কথাটা ফেনিয়ে যখন অগটিনােতে গিয়ে পৌছলাে, তখন ওর চেহারা
গেলাে বদলিয়ে। চামচে, শুধু চামচেই যে চুরি গিয়েছে এটাতে
কেউ তখন আর আস্থা রাখলাে না। ল্যামােনিকা পরিবারের একটা
৫০
ক্যানডিযার শেষ-পরিণতি চামচে নয়--সমস্ত রূপপার থালা গুলি পৰ্যন্ত চোরের হাতে পড়ছে, মানে চুরি করেছে। এমনি ব্যাপার। পালার গিন্নীরা অযাচিত হয়ে এসেছেন। বারান্দার দিক থেকে আসছে বাতাসের সঙ্গে ভেসে গােলাপের সৌরভ। ফুরফুর করে বাতাস বইছে। শিকে টাঙানাে খাচায়, বন্দী গােটা কয়েক পাখী, মাঝে-মাঝে কুজন কবে উঠছে। ভােনাক্রিশ্চিন একসময়ে নিজের হাত কচলাতে কচলাতে ব’নে । কিন্তু কে চুরি করলাে, বলোতো? ডােনা ইসাবেলা সাবটেলের চাল-চলন অনেকটা শিকারী পশুর সে তার সারস পাখীর মতাে দীর্ঘ ঘাড়টা বাড়িয়ে কর্কশ স্বরে জিজ্ঞাসা করলো : ডােনাক্রিশ্চিনা, তােমার সঙ্গে কারা ছিলাে? আমার যেনাে মনে হচ্ছে, আমি ক্যানডিয়াকে দেখেছিলাম ডােনাফেলিসেটা মার্গাসান্টা বাধা দিয়ে অনর্গল ব’কে যায়। কী সৰ্ব্বনাশ তুমি এটা ভাবােনি ? তুমি দেখনি? তা দেখবে কেন? তুমি ওকে সন্দেহ করাে না? সন্দেহ করাে না এই জন্যে যে, তার পক্ষে এ কাজ অসম্ভব ? ই অসম্ভব। অসম্ভব আবার কি? মানুষকে কখনাে বিশ্বাস করা যায় ? কি বলল তুমি ডােনা ইসাবেলা? কী বল্লে, মানুষকে কখনো বিশ্বাস করা যায় না? হা ঠিক বলেছাে।
ইতালীব সেরা গল্প
তােমার দেখছি বেশ অভিজ্ঞতা আছে। কী—তুমি ক্যান্ডিয়ার
সম্বন্ধে কিছুই জানাে না ? কিন্তু আমি জানি। আমি তার বিষয়ে
অনেক কিছু বলতে পারি।
আর একজন বলে ওঠে। সে কাপড় কাচে চমৎকার। এর
বিরুদ্ধে কিছু বলা যায় না। আমি কখনাে লােকের নামে মিথ্যে
অপবাদ দিইনে বাবা। যেমনটি দেখেছি, ঠিক তেমনটি ব’লবাে। একটু
বাড়িয়ে নয়।
একটু দম নিয়ে পুনৰ্ব্বার বলে : সাবা পেসকারা শহরটা ঘুরে
এলেও ওর মতো ধোপানী পাওয়া যাবে না। এটা কিন্তু মিথ্যে নয়।
তবে কথা হচ্ছে এই-ওর হাত-টানটা উপেক্ষা করা যায় না কোনাে
মতেই। কি বললা তুমি?
এই বলে সে অপব এক জনকে সালিশী মানতে চায় ।
সে হাত মুখ নেড়ে বলে : কী বলবো ভাই। ক্যান্ডিয়া মাগীর
পেটে-পটে যে এতে চুবির ফন্দি পাক দিয়ে আছে, কী করে জানবে
বলাে ? আমি ভাই—সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। মাগী
একদিন এসে হাতে পায়ে ধবে কাপড় কাচতে নিয়ে গেলাে।
আহা। গরীব মনিষি । পাগ না দুটো পয়সা । এই ভেবে তলে,
রুমাল, গাউন দিলাম কাচতে। কিন্তু সেই যে নিয়ে গেলে ব্যস।
আর দেখা নেই।
ভােনাক্রিশ্চিন বলেন: কিন্তু এবার ওকে আমি ছাড়িয়ে দেবে।
কাকে রাখি বলতে।? এমন কে বিশ্বাসী আছে ? সিলভেষ্ট। মনে
হয় ভালাে লােক। তােমার কি মনে হয়, ডােনা ইসাবেলা?
"C
ক্যান্ডিযার শেষ পরিণতি —সিতেষ্ট।? সিতে। ভালাে লােক? আহা মরে যাইরে। শালুক চিনেছেন গােপাল ঠাকুর। বদমায়েস—এটা হাড় বদমায়েস। -তবে এজেল্যাটোনিয়া ? -না। সে ও সুবিধেব নয়। ডােনাক্রিশ্চিনা একটু ভেবে নিলেন। বল্লেন : মরুগগে। নেবু, বেশী না কচলানােই ভালাে। এবার না হয় চামচের ওপর দিয়েই গেলাে। ভবিষ্যতে তো বেশী কিছু যেতে পাবে—তখন ? না না, ডােনাক্রিশ্চিনা - তুমি ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করােনা। —উপেক্ষা ক’বি আর নাই করি—সেটা আমারই বিবেচ্য, ডােন ইসাবেলা। —দুই- পরদিন সকালবেলা। ক্যাডিয়া একটা গামলা ভর্তি কাপড় কাচ ছিলাে এক-মনে। হঠাৎ মুখ তুলতেই দেখে :-গাঁয়ের পুলিশ কন্সটেবল্ বিয়াগিওপেসি ওর দরজার সুমুখে দাড়িয়ে। বল্লে : মাননীয় নেয়র-সাহেব তার দরবারে তােমাকে এখুনি যেতে আদেশ করেছেন। ক্যান্ডিয়ার মুখে-চোখে বিরক্তির রেখা উঠলো ফুটে। করতে করতে জ্ব-কুঁচকিয়ে বলে: কী বল্পে? কাঙ্গ
ইতালীর সেরা গল্প
কিন্তু কেন ?
তঁার হুকুম
মাননীয় মেয়র-সাহেব তার দরবারে তােমাকে এখুনি যেতে
আদেশ করেছেন।
ক্যাডিয়া এর জন্যে আদৌ প্রস্তুত ছিলাে না। মেয়র তাকে ডেকে
পাঠাতে যাবে—এটা সে কল্পনাও ক'বতে পারিনি।
পারবারই
তো কথা। গরীর মানুষ বেচারা। মাথা ঘাম, পায়ে ফেলে পেট
চালায় , তাকে আবার কী প্রয়ােজন থাকতে পাবে মেয়র-সাহেবের।
দৃটম্বরে প্রশ্ন ক’বলাে। আমাকে ডাকছেন ?
কিসের
জন্যে ?
—আমি ওসব বলতে পাবিনে। আমার ওপব যা হুকুম হয়েছে
তাই তােমায় বলেছি।
হুকুম ?
মতো চলবো? আমি কী
দোষ করেছি যে, মেয়ব-সাহেবের এই গরীবের দিকে নজর পড়েছে ?
, আমি যাবো না। কিছুতেই যাবনা। কেন যাবাে? আমি তো
কোনাে অপরাধ করিনি।
ক্যাডিয়ার এই কথায় কন্সটেবলের ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটলো . को
এতো বড় স্পর্ধা ? যাবে না? আচ্ছা দেখে নােবাে তােমায়।
আমার কথা অমান্য করা ? আরে কি আমার ধপানীরে। যাবে
? দাড়াও দেখাচ্ছি মজা তােমায়।
একটা অপরিসর রাস্তার একধারে ক্যাভিয়ার মাথা গোঁজবার
সামান্য আশ্রয়। পথচারীরা পথ চলতে চলতে থমকে দাড়ালো
সেখানে। উকি মেরে দেখলল—সে উত্তেজনাবশে খুব জোরে জোরে
কাপড় আহডায়। ওরা
ওরা মুখটিপে হাসে। একে উদ্দেশ করে
৫৮
ক্যাভিযার শেষ পরিণতি
দু-চারটে বিদ্রুপ-বাণী বেরিয়ে আসে ওদের মুখ দিয়ে। ক্যাডিয়ার
সে সব কথার অর্থ মাথায় ঢােকে না। শুধু চোখ-মুখ লাল করে
নিজের কাজ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে, আরাে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কবে যায়। কিন্তু
কী জানি কেন হঠাৎ ওর সাহস যায় বেড়ে, যখন ও দেখে বিয়াগিও
পেসিকে আর একজন পুলিশ কর্মচাবীব সঙ্গে আবার তার বাড়ীর
দরজায় আসতে।
বিয়াগিওপেসি গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বরে বল্লো : চলাে। চলে।
আমাদের সঙ্গে।
কোনাে কথা বলে না। হাত মুছে রাস্তা দিয়ে
ক্যান্ডিয়া
ওদেব অনুসরণ করতে লাগলো।
দু’জন পুলিশ কর্মচারীর পেছনে ক্যাডিয়াকে যেতে দেখে, ওর
রােসাপারা তার দোকানের দরজার ওপর দাঁড়িয়ে
মুখ বাড়ায়। ক্যাভিয়াকে লক্ষ্য করে বিপ-হাস্যে বলে ওঠে ।
কী গাে--শশুর বাড়ী যাচ্ছো? কেন বাবা বুড়ো বয়েসে আবার
এসব পাগলামি! চুরির মালটা বার করে দাওনা বাবা।
ক্যান্ডিয়া এই লাঞ্ছনার কোনো যুক্তি খুঁজে পেলে না। ওর মুখ
দিয়ে, এই অপবাদ খণ্ডন ক’বার, কোনাে কথাই ফুটলাে না।
মেয়রের আপিসের সুমুখে কয়েকজন লােক ছিলাে জড় হয়ে।
ওদের দেখে মনে হয়-এ-বিশ্বে পরের লান উপভােগ করাই
একমাত্র ওদের জীবনের লক্ষ্য।
ইতালীর সেরা গল্প ক্যানডিয়া এদের প্রতি ফিরেও চাইলো না। বসে কঁপতে কাপতে সে সিড়ির ধাপগুলি এক নিমেষেই পেছনে ফেলে এসে, একেবারে মেয়রের সামনে এসে দাড়ালো । হাঁপাতে হাঁপাতে বলে : আপনি কী চান আপনি আমার কাছ থেকে ? কি চান ? ডীল্লা লােকটা মনে হয় একটু শান্ত প্রকৃতির। রজকিনীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রশ্নে, বিরক্ত হলেন। কিন্তু নিজেকে সংযত কবে তার সুমুখে উপবিষ্ট দু’জন উচ্চপদস্থ কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে নিজের পকেটে হাত দিলেন। একটা নস্যির কৌটো থেকে একটিপ নস্যি নিয়ে ক্যান্ডিয়াকে বল্লেন : বসাে মা, তুমি বসো। ক্যান্ডিয়ার আসন গ্রহণ করবার কোন লক্ষণ দেখা গেলােনা। তার টিয়াপাখীর ঠোটের মতাে লম্বা নাকের ছােটো ছােটো বন্ধু দু’টি অসম্ভব বাগে একবার স্ফীত এবং আর একবার সঙ্কুচিত হতে লাগলাে। ব'ল্পে : আপনি কি জন্যে আমাকে ডেকেছেন ? মেয়র ডীল্লা বলেন : কাল ভােনাক্রিশ্চিনার ওখানে কাপড় দিতে গিয়েছিলে ? গিয়েছিলাম। নিশ্চয়ই গিয়েছিলাম। কিন্তু কী দোষ হয়েছে। তাতে ? কোনাে কাপড় কি খেয়া গিয়েছে ? না যায়নি। এক- খানাও থােয়া যায়নি। গুণে-গুণে, একটা একটা করে গুণে-গুণে সমস্ত মিলিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এখন আবার সেকথা কেন?
ক্যানডিযার শেষ-পরিণতি
দাড়াও, সব ব’লছি।
মেয়র আর একটিপ নস্যি দেন নাকে। বলেন : ঘরের টেবিলের
ওপর অনেকগুলি রূপাের চামচে ছিলো। ডােনাক্রিশ্চিন খুব ভালো
করে হিসেব করে দেখেছেন—একটা রূপাের চামচে গুনতিতে
মিলছে না। কম পড়েছে। কিন্তু আমি বলতে চাই কি,
হয়তাে তুমি চামচেটা নিয়েছে। কিছু মনে করােনা তুমি। এটা
একটা—মানে, কথার কথা আর কি-বুঝলে ?
ভুল করে
ক্যানডিয়ার এবার বুঝতে বাকী রইলাে না। সেই হারানাে
রূপাের চামচেটা সে করেছে চুরি ? চোর অপবাদে তার চরিত্র
এরা ক’বছে কলঙ্কিত? ক্যাডিয়া-ক্যাডিয়া তো সম্পূর্ণ নির্দোষ।
পরের জিনিষ আত্মস্মাৎ করবার মতো হীন মন ওর নয়।
কাজেই চুরির অপবাদে ক্যানডিয়া রাগে দুঃখে একেবারে
জর্জরিত হয়ে উঠলো। অস্বাভাবিক উচুগলায় বল্লে : আমি—আমি
নিয়েছি ? আমি? কে-কে বলে এ-কথা ? আপনার কথায় আমি
ভয়ানক আশ্চৰ্য্য হচ্ছি। আমি চোর? আমি? আমি ?
ডীল্লা বিচাব করবার চেয়ারে দেহকে সম্পূর্ণ এলিয়ে দিলেন।
বল্লেন : তা হলে তুমিই নিয়েছো কেমন ?
শুনে ক্যাডিয়া এবার সত্যিই বােমার মতে ফেটে পড়ে। ওর
মুখ-চোখ দেখতে-দেখতে একটা অভূতপূৰ্বরূপে রূপান্তরিত হয়ে
ওঠে। হাত দু’টি শূন্যে মাথার ওপর দিকে বারকয়েক আস্ফালন করে
ইতালীব সেরা গল্প
চীংকাব করে, আমি-আমি চোর? কখনােই না—কখনােই না।
বিচার নেই। আপনার নেই বিচার। আশ্চর্য্য -মামি আপনাব
বিচার দেখে আশ্চর্য্য হচ্ছি।
মেয়র বলেন : আচ্ছা তুমি এখন যেতে পারে। আমরা এবিষয়ে
খোজ-খবর নােবাে।
ক্যাভিয়া নেমে এলাে তরু-র করে। মেয়রকে কোনাে রকম
অভিবাদন জানালাে না। বাস্তায় পডলাে এসে। দেখলে--
ভিড় জমে আছে। লোকের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলে, এবা
প্রত্যেকেই ওর বিরুদ্ধে। কেউ ওর পক্ষে নয়। কিন্তু তবুও ক্যান্ডিয়া
আপন মনে নিজের পক্ষ সমর্থন করে, পথ চলতে লাগলাে। বাড়ী
এসে যখন পৌছলাে, তখনাে ওর বাগ পড়েনি।
কিন্তু এইবার মর্মান্তিক যাতনায় ক্যান্ডিয়ার দু'চোখের কোণ বেয়ে
অশ্রুবিন্দু নিঃশব্দেই ঝরে পড়তে লাগলাে : উঃ। এতে অপমান-এতাে
অবিচার।
সমস্ত দিনটা ক্যান্ডিয়া মন দিয়ে নিজের কাজ করতে পারলে
সব সময়ে মনের ভেতরটায় একটা অব্যক্ত বেদনা ওকে
অস্থির
তােলে।
চোর নয়।
সে চুরি
ক্যানডিয়ার শেষ পরিণতি কবেনি—এই নির্দোষিতা প্রমাণ করবার জন্যে তার প্রাণটা বেদনায় অধীর হয়ে ওঠে। সন্ধ্যাবেলা ক্যানডিয়া এসে হাজিব হয়- ডােনাক্রিশ্চিনার বাড়ী। নির্দোষিতাব প্রমাণ দেবার ওব কিন্তু ডােনাক্রিশ্চিনার দেখা সে পায় না। দেখা হয়—মেরিয়ার সঙ্গে। একে সামনে দেখে ক্যান্ডিয়া হাত-মুখ নেডে নিজেব নির্দোষিত প্রমাণ কববার চেষ্টা কবে। মেবিয়া কিন্তু একটা কথাও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে না। ধীরে ধীরে সে সরে যায়। এড়িয়ে যায় ক্যান্ডিয়াকে। হয়তাে গােপনে, ওর অবস্থা দেখে হাসে। কিন্তু ক্যান্ডিয়া এবাৰ আসে একে একে তার বাবুদেব বাড়ী। মানে, যাদের বাড়ীর সে কাপড় কাচে। তাদেব প্রত্যেককে নিজে অদৃষ্টের কথা যায় বলে, একটি একটি করে। নিজে চোর নয় , চুরি সে কখনাে করেনি—এই কথাটাই সে কতো প্রকারেই না বােকাতে চেষ্টা করে। কিন্তু যাব ভাগ্য মল, তার হাত থেকে মরা শােল মাছও পালিয়ে যায়। তার গলায় জলও বেঁধে হয় তাে ক্যাডিয়ার মতো দুর্ভাগা একটা দীন, সামান্য ধােপানীর কথা কে সত্যি বলে মনে করবে ? পয়সা-পয়সা। ক্যান্ডিয়ার কি পয়সা আছে ? ক্যাডিয়া এখন এটা অনুভব করে-সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়েই অনুভব করে। এজগতে সে গরীব, তাই সহায়হীন সে। এজগতে ইতালীর সেরা গল্প সে ভাগ্যদোষে পরের পরণের কাপড় কাচে, তাই সে হীন । জগতে নেই, কেউ কেউ নেই তার। কেউ ওর নির্দোষিতা চায় না বিশ্বাস করতে । —তিন- কিন্তু ব্যাপারটা ঐ খানেই শেষ হলােনা। সিনিগিয়ার ডাক পড়লােভােনাক্রিশ্চিনার বাড়ী। সিনিগিয়া যাদুবিদ্যায় পাকা। অনেকের হারানাে জিনিষের পুনরুদ্ধার এই নারীটীর সাহায্যে হয়েছে। শােনা যায়, হাতুড়ে ওষুধ-পত্তরও ইনি দরকার হলে দিয়ে থাকেন। লােকে বলে, চোর ঘেঁচোডদের সঙ্গে ওঁর যথেষ্ট পরিচয় আছে। নইলে, হারানাে জিনিষ কী এতে। চপ ফিরে পাওয়া সম্ভব হতে পারে ? তা যাই হােক, সিনিগিয়া, ল্যামােনিকা গৃহকত্রীর আহ্বান উপেক্ষা করতে পারলেন না। উনি এলেন। ভােনাক্রিশ্চিনা সমস্ত ঘটনাটা বুঝিয়ে দিয়ে পরিশেষে বল্লেন : চামচেটা আমাকে পাইয়ে দাও দেখি। তােমাকে ভালােরকম পুরস্কার দেববাবুঝলে? —বেশ। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা সময় আমায় দিতে হবে। মধ্যে আপনি চামচে পাবেন নিশ্চয়ই পাবেন। আশ্চৰ্য। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই চামচেটা পাওয়া গেলাে। পাওয়া
ক্যাডিয়ার শেষ-পরিণতি
যে প্রাণ
আছে, সেই প্রাঙ্গণের একটা
গেলইদানার কাছে
গর্তের মধ্যে।
বাতাসের যেমনি গতি, সেই গতিতে এই সুসংবাদটা সমস্ত
পেসকারায় ছড়িয়ে পড়লাে। ক্যান্ডিয়ার কানেও সেটা পৌঁছয়।
সে একটা মহাচিন্তার হাত থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, এই আনন্দে
সমস্ত বস্তা ঘুরে আসে। ওর চেহারা যায় বদলিয়ে। কুজদেহ
সমস্ত মুখখানি একটা পরিতৃপ্তির হাসিতে ভরে
ওঠে। চোখের দৃষ্টি সরল এবং স্বচ্ছ। যাকেই পথে দেখতে পায়,
তারই মুখে সােজাসুজি দৃষ্টিতে তাকায়। তার চোখের দৃষ্টি যেনাে
বলতে চায়—আমি তাে বলে ছিলাম।
কাফের পাশ দিয়ে ক্যাডিয়াকে যেতে দেখে ফিলিপপ লা’
সেলতি মুচকি হেসে ওকে ভেতরে ডাকলে। ওকে বসতে দিয়ে একগ্লাস
মদের হুকুম করলে।
ফিলিপপ লা’ সেলতি বল্লো : একগ্লাস মদ- আমারই মতাে একগ্লাস
মদ তােমার পাওয়া উচিত, নিশ্চয়ই পাওয়া উচিত।
কাফের সুমুখে কতকগুলি বিশ্ব-নিক ভিড় করে দাড়িয়ে
ছিলাে। এদের প্রত্যেকের মূখেই দুরভিসন্ধির রেখা মূর্ত হয়ে
উঠেছে। ক্যাডিয়া মদের গ্লাসটি এক নিঃশেষে পান করতেই,
ফিলিপে লা সেলভি একটা বিদ্রুপের হাসি ওপ্রান্তে এনে, জনতার
দিকে মুখ করে ক্যাভিল্লাকে উদ্দেশ করে বলে কি করে সধিক
ইতালীরসেরা গল্প
সামলাতে হয়, ও তা জানে। নয় কি ? চালাক, ভারী চালাক
এ-না ?
এই বলে সে ক্যান্ডিয়ার অস্থিময় কঁাধের ওপর একটা মৃদু
চাপড় দেয়।
আকাশ ফাটিয়ে ফেলা
জনতা হােহােহা করে হেসে ওঠে।
হাসি। হঠাৎ কানে এলে সত্যি ভয় হয় ।
এই
জনতার ভেতর থেকে অত্যন্ত খর্বাকৃতি মাগনাফেভের
সৰু ঘাড়টা ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। নিজেব ডানহাতের তর্জনী
বাঁ-হাতের তর্জনী দিয়ে আবেষ্টন করে এক অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে
বল্লে : ক্যা—ক্যা-ক্যা—ক্যানডিয়া—সিসি—সিনিগিয়া।
কিন্তু এই, শেষ নয়। এখানে যদি ও ক্ষান্ত হত, তা হলে
হয় একটা কথা ছিলো। নানা রকম নিম্নস্তরের ঠাট্টা-তামাসা, নানা
রকম অঙ্গভঙ্গি ও লাগলো করতে। এবং সেই
ঠাট্টা-তামাসা,
অদ্ভূত অঙ্গভঙ্গিমা—সমস্তই ক্যান্ডিয়া ও সিনিগিয়াকে উপলক্ষ্য কবে।
ক্যাডিয়ার যে সিনিগিয়ার সঙ্গে ষড়যন্ত্র আছে—এইটাই সে সকলকে
বােৰাবার কী অক্লান্ত প্রচেষ্টাই না করে। দর্শকরা কিন্তু এটা বেশ
উপভােগ করতে লাগলাে। ওরা হাসে-প্রাণ খােলা হাসি হাসে।
কিন্তু ক্যাভিয়? সে শূন্য কাচের মাসটা হাতে ধরে বিল
ক্যানডিযার শেষ পরিণতি হয়ে আছে। প্রথমটা ও এসব তামাসার তাৎপর্য বুঝতে পারে না। আকাশের বুকে যেমন সহসা বিদ্যুৎবে দেখা যায়, ঠিক তেমনি সহসাই ক্যাডিয়া একসময়ে এসবেব অর্থ পাবে বুঝতে।:-এর তাব নির্দোষিতায় করেনা বিশ্বাস। নিজেকে অার একটা নতুন বিপদ থেকে বাঁচাবার জন্যে সে সিনিগিয়াব সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে চামচেটা বের করে দিয়েছে। মুহূর্তেব মধ্যে ক্যান্ডিয়াব সৰ্বশৰীরে ক্রোধের একটা সীমাহীন চাঞ্চল্য প্রকাশ হয়ে পড়লাে। এবং এই প্রভাবে ওর ঐ শীর্ণ কুজদেহ অকস্মাৎ যেনাে বলিষ্ঠ যুবার মতােই শক্তিসম্পন্ন হয়ে উঠলো। চক্ষে পলক পড়বাবও সময় রইলাে না। ক্যাভিয়া লক্ষ্য করেই ম্যাগনাফেতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাে। ওকে টেনে নিয়ে এলা। নিয়ে এসে, এক অপূৰ্ব শক্তিতে তাকে বন্-বন্ করে গাড়ীর চাকার মতাে বারকয়েক ঘুরিয়ে দিলে ছেড়ে। লােকটা ঘুরতে ঘুরতে খানিকটা তফাতে গিয়ে পড়ে। সামলিয়ে নিয়ে, পালাবার উপক্রম করতেই, ক্যান্ডিয়া এবার ওর মুখের ওপরই আছাড় খেয়ে প’ড়ে খিচিয়ে, ঘুসি মেরে ওর সর্বাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত করে দিল। চুলের মুঠি ধরে . নিজের মাথা গোঁজ বার আশ্রয়ে ফিরে এসে ক্যান্ডিয়া টলতে টলতে বিছানায় শুয়ে পড়লাে। অন্তরের সীমাহীন যাতনায়, সে এবার ছােটো মেয়ের মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলােহারে।
ইতালীর সেরা গল্প কী উপায়ে সে নিজেকে এই মিথ্যে কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে পারবে? কী করে সে লােককে বিশ্বাস করাবে—সে একেবারে নির্দোষ, ফুলের মততই কলহীন? না, চুরি সে করেনি। যাদুকরের সঙ্গে আপােষে মিটমাট করে চামচে বার করে দেয়নি। কোথায় পাবেও চামচে? চামচে যে সে নেয়নি। যাদুকরের সঙ্গে আপােষ, তার সঙ্গে ষডযন্ত্র করে চুরির জিনিষ ফিরিয়ে দেওয়া—এই অপবাদটা এখন আরাে যেনাে বেশী করে ওর মনে কষ্ট দিতে শুরু করলাে। ক্যান্ডিয়া কঁদে । অবিরাম তার চোখ দিয়ে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। শুয়ে শুয়ে ক্যানডিয়া ভাবে তার নির্দোষ প্রমাণের তিনটে, চারটে, পাঁচটা আলাদা-আলাদা যুক্তি। এই যুক্তি দিয়ে সে প্রমাণ করবে, চামচেটা উঠোনের গর্তের মধ্যে পাওয়া যায়নি, না কখনােই পাওয়া যায়নি। ক্যানডিয়া বেরিয়ে আসে। চারিদিকে ঘুরে লােক ডেকে-ডেকে তার নির্দোষিতা প্রমাণ করতে নানা রকম যুক্তি দেখায়। কিন্তু তারা হাসে। মনে-মনে হাসে। ক্যাডিয়া ওদের মনের ভাব বুঝতে পারে। একটু দেরী হয় বুঝতে। ও যায় রেগে । তার সমস্তই নতুন যুক্তি তবে নিফল হলাে? ক্যান্ডিয়া আবার যায় নিজের আশ্রয়ে ফিরে। সারা রাত্রি ধরে চিন্তা করে, নানা রকম নতুন-নতুন যুক্তি। সকালে বেরিয়ে আসে লােক ডেকে পূর্বদিনের মতো তাদের যুক্তি দেখিয়ে যােঝাবার চেষ্টা
{4
কাৰীয়াজ শেষরণতি
করে। যুক্তি বােঝাবার চে রে যে, সে নির্দোষ। চামচে
সে করেনি চুরি
তার কোনাে ষড়যন্ত্র ছিলাে না।
লোকে শোনে। শুনে হাসে। কেউ বিশ্বাস করে না।
কিন্তু এর একটা বিষময় ফল দেখা গেলাে । সদাসর্বদা এই
চিন্তাকে আশ্রয় করে থাকার জন্যে, ক্যানডিয়ার মনের সত্যিকারের
মানুষটি গেলাে কোথায় গেলিয়ে । চামচে-রূপে চামচে ছাড়
এবিশ্বে তার আর দ্বিতীয় চিন্তা নেই। চামচে—চামচেই এখন ওর
জপমালা। রূপাের চামচেই এখন ওর সাধনা।
ক্যাডিয়ার নিজের কাজে আব মন বসতে চায় না। কখনাে
হয়তাে লােহার সে ফুটার নীচে খবস্রোতা নদীর তীরে গিয়ে ও কাপড়
কাচে। অন্যমনস্ক কাচতে কাচতে তার হাত ফস্কে হয়তাে কাপড়
নদীর স্রোতে ভেসে তার নাগালের বাইরে চলে যায়। কিন্তু আশ্চৰ্য্য।
ওর তাতে ক্ষেপও নেই। আরাে যে-সব ধােপানী নদীর ঘাটে
কাপড় কাচে, তাদের কানের কাছে। অর্গল ব’কে যায়। ব’কে
যায়, সেই একটি মাত্র বিষয়কেই কেন্দ্র করে। ধােপানীরা কেউ ওর
সেই পুরােণে ইতিহাস শােন না। কেউ হয়তো আবার গান গেয়ে,
ঠাট্টা-তামাসার ভেতর দিয়ে তার কথার জবাব দেয়। শুনে ক্যানডিয়া
হঠাৎ অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি করে ঠিক উন্মাদিনীর মতো একটা বিকট
চীংকার করে ওঠে।
এমনি করে দিনের পর দিন যায় চলে। ক্যাভিয়ার কাজ
ইতালীর সেরা গল্প করতে ভালাে লাগেনা। কেউ ওকে আর কাজও দেয় না। আগেকার দু'-চার জন মনিব দয়া করে কোনাে কোনাে দিন তার অশ্নটা পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু প্রতিদিন তাকে খাওয়াবে কে? ক্যানডিয়া আবার কাজ দিলে ছেডে। পেটের জন্যে তাকে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করতে হলাে। গায়ে একটা সামান্য আচ্ছাদন দিয়ে, তাকে পথে- পথে ভিক্ষে করতে দেখা যায়। পথের দুষ্ট ছেলেরা ওর পেছু নেয়। বলে : ক্যাডিয়া, ও ক্যান্ডিয়া। আমাদেব সেই চামচের ইতিহাসটা একবার শোনাও তো । ক্যান্ডিয়া পথ চলতে থাকে । পথচারীদের থামিয়ে দাঁড় করায়। দাড় করিয়ে তার কাহিনী বলে যায়। বলা শেষ হলে, নিজেকে রক্ষে করবার জন্যে কতো অর্থহীন যুক্তিই-না দেখায়। বড়ােরা কোনাে কোনাে সময়ে তাকে স্বেচ্ছায় ডাকে। ওর কাহিনী শশানে-দু’-বার, তিনবার, চারবার। শুনে তারা ক্যান্ডিয়াকে পয়সা দেয়। কেউ বা তার কাহিনী চুপ করে শুনে, শেষে তাকেই মৰ্ম্মে-মর্মে আঘাত করে। ক্যাভিয়া এবার একটা কথাও বলে না। শুধু মাথা নেডে আপথ ধরে। ক্যাডিয়াকে দেখা যায়—তার ভিক্ষুনী-সঙ্গর মধ্যে। এখানে সে সেই পুরাতনের পুনরাবৃত্তি করে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবার জন্যে অবিরাম অক্লান্ত চিত্তে যুক্তি দেখায়। আঠারােশাে চুয়াত্তর শশীতকাল।
ক্যানডিযার শেষ-পরিণতি
ক্যাডিয়া মৃত্যুশয্যায় শায়িত। তাকে এই দুঃসময়ে দেখাশােনা
করছে, তারই এক ভিক্ষুনী বােবা বান্ধবী।
মৃত্যুশয্যায় থেকে মাঝে-মাঝে ক্যাডিয়া বিকার-ঘােরে হাতের
কনুইয়ের ওপর ভর করে উঠে বসবার চেষ্টা করে। নিজেকে
নিন্দাষ প্রমাণ করবার জন্যে পূর্বের মতাে যুক্তি দেখাতে চেষ্টা করে। কিন্তু
পারে না। মুখ দিয়ে একটা কথাও ফোটেনা ওর। ধু চক্ষু দু'টি
অন্তর্যাতনায় অশ্রুময় হয়ে ওঠে।
কিন্তু ক্যাডিয়ার কোটরে প্রবিষ্ট সেই চক্ষু দু'টি, নিঃশব্দ অশ্রুপাতের
মধ্যে দিয়ে, যেনাে অনন্ত ব্যাকুলতায় ব’তে চায় :-
আমি নিইনি—আমি নিইনি।
৭১
দু’টি নর ও একটি নাবী
মাৰ্চমাসের তেইশ তারিখ। সূৰ্য্য আকাশের পশ্চিমদিকের কোল
ঘেসে দাড়িয়েছে। এর ভেতর থেকে যে-রশ্মিটুকু বেরিয়ে আসছে,
তার সৌন্দৰ্য সত্যিই উপভােগ করার মতো।
এমনি যখন প্রাকৃতিক অবস্থা, তখন জেলখানার লােহার দরজা
ঝন শব্দে খুলে যায়। এর মধ্যে প্রবেশ করে, একটি কমেদী।
বয়েস তার কম, সত্যিই কম। চাল-চলন, হাব-ভাব, চেহারা—সবই
অন্য কয়েদী থেকে বিভিন্ন । দেহটা ঘিরে—শাল পােক। মাথার
ওপর লম্বা টুপি।
সেটার রঙও
শাদা—দুধের মতােই শাদা।
টুপিটার একপ্রান্তে একটা রেশমী ফিতে। এই ফিতেটাও দেখতে
শাদা রঙের।
সমস্ত পথটা সে নীরবে এসেছে। কারুর সঙ্গে একটা কথা
কয়নি। পুলিশ ওকে হাতকড়া দিয়ে ট্রেনে করে আনছিলাে।
কামরায় সে পাষাণের মতো স্তব্ধ হয়ে, মুখ নীচু করে শুধু নিজের
হাতের নখ গুলির দিকে চেয়ে ছিলাে বসে। তারপর এখানে
নেমে, সে জেলখানার পরিচালকের মুখের দিকে, আগ্রহের সঙ্গে তাকালাে।
৭২
দু’টি নর ও একটি নারী
কিন্তু জেল-পরিচালক তার এই দৃষ্টির বিনিময়ে, ওর মুখের ওপর যে দৃষ্টি
নিক্ষেপ করলেন, তা উদাসীনতায় ভরা।
কিন্তু একটা মজার ব্যাপার দেখুন। কয়েদী এবং জেল-পরিচালকের
নাম একই। দু'জনেই ক্যাসিওলঙ্গিননা। এটা ওরা জানে। হ্যা জানে।
নিশ্চয়ই জানে।
জেল-পরিচালক মানুষটি বেঁটে। সামনের দিকে সামান্য নুয়ে
পডেছেন। ছােটো ছােটো হাত দুটি প্রায়ই এঁর ওভারকোটের
পকেটে মধ্যে ঢোকানো থাকে। মুখখানি পরিষ্কার করে কামানাে ।
মুখে একটা ক্লান্তির ভাব । চোখ দুটি সবুজ এবং বুদ্ধির পরিচায়ক।
মাথার চুল ছোটো ছোটো করে ছাটা। কান দু’টি বেশ বডে।
বড়ো—সহজেই লােকের নজরে পড়ে।
এপ্রিলের প্রথমেই, মানে একেবারে পয়লা তারিখে, ক্যাসিও
আবেদন করেছিলো। আবেদন করেছিলে জেল-পরিচালকের কাছে।
উদ্দে-লেখবার অনুমতি পাওয়া ।
সেই জন্যে ক্যাসিওকে ডেকে পাঠানাে হয়েছে জেল-পরিচালকের
নিজের ঘরে।
ক্যাসিও একটা বাতায়নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দাড়িয়ে
দেখছে-বাইরের সেই পড়ন্ত সূৰ্য-কিরণের সােণালী আভা।
জেলের পরিচালক একটা শাদা রঙের টেবিলের সুমুখে অস্বাভাবিক
৭৩
ইতালীর সেরা গল্প
ভাবে ঝুকে পড়ে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। ক্যাসিও অনেকক্ষণ
পৰ্য্যন্ত ওর সামনে দাড়িয়ে যে অপেক্ষা করছে, সে দিকে ওঁর ভ্রুক্ষেপ
নেই।
সময়ে হঠাৎ জেল-পরিচালক ক্যাসিওর দিকে ফিরলেন।
কিন্তু নিজের আসন ত্যাগ করে তাকে সম্মান দেখাতে উঠলেন না।
বসতেও বল্লেন না। ওর মুখের দিকে একবার চেয়েই, তখুনি
দৃষ্টি নিলেন ফিরিয়ে। বল্লেন, জাল করার অপরাধে, তােমার তিন
বছর বিনাশ্রম কারাবাসের আদেশ হয়েছে। একটু চুপ করে থেকে
সেই ভাবেই চেয়ে বল্লেন, হ্যা একবার—মাসে একবার করে চিঠি
লেখার অনুমতি তােমাকে দেওয়া গেলাে।
-কিন্তু আমি তে বাড়ীতে চিঠি লেখবার জন্যে অনুমতি ভিক্ষে
করিনি। আমার নিজের মন ভালো রাখবার জন্যে-ঘরে, আমার
ঘরে বসে এটা-সেটা লেখবার অনুমতি আপনার কাছে
জেল-পরিচালক বাধা দিয়ে বল্লেন :-
জেলেব নিয়ম তা নয়। তবে, তুমি যদি ক্যারানীদের আপিসে
সকলের সামনে বসে জেলের খাতাপত্তর লিখতে চাও, তার ব্যবস্থা
আমি করে দিতে পারি। কেমন—রাজী?
ক্যাসিও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাে।
কিন্তু একটা কথা আছে। জেল-পরিচালক ২৪৫ নম্বরের আসামীর,
মানে ক্যাসিওর সম্বন্ধে, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যে-রিপাের্ট পেয়েছিলেন,
৭০
দুটি নর ও একটি নারী
তাতে উনি জানতে পেরেছেন যে, এই আসামীটি ভদ্রঘরের ছেলে।
অবস্থা খুব ভালাে। সার্ডেনিয়ার একজন বিখ্যাত বড়লােক। এই
জন্যে, জেল-পরিচালক ওপর তেমন কঠোর হতে পারেন না।
আর তা ছাড়া, ২৪৫ নম্বরের আসামীব চোখ-মুখে এমন একট।
আকর্ষণেব ভাব আছে যে-জেল-পরিচালক শত চেষ্টা করেও ওর
বিরুদ্ধে, নিজের স্বভাবগত কঠোবত নিয়ােগ করতে পারেন না হয়
ততা। এই নিয়ে ওদিকে আবার অন্যান্য কয়েদীরা, ক্যাসিওর বিরুদ্ধে
একটা হিংসাব ভাব, মনে-মনে পােষণ কবে। ওরা বলাবলি করে—
জেল-পরিচালক সার্ডেনিয়ার লােক। ক্যাসিও ও সেখানকার বাসিন্দ।
দু’জনের মধ্যে নিশ্চয়ই একটা আত্মীয়তা আছে। সেই জন্যে, তিনি
এই আসামীকে সাধারণ দৃষ্টিতে দেখেন না। দেখেন স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে।
এমনি আরাে কতাে ওরা বলাবলি করে।
ক্যাসিও বসে আছে জেলের আপিসের একখানা টেবিলের সামনে।
টেবিলটাব তিন দিকে আরাে তিনটি কয়েদী। ক্যালিও দেখলাে, এরা
কাজ করতে পারে না ভালো করে। চারিদিকে একটা বিশ্বলতার
ছাপ।
টেবিলটার ওপর ছড়ানাে
কাগজপত্তর, খাতা, মাঝে-
মাঝে যাচ্ছে বাতাসে উড়ে ঘরের এদিক-ওদিক। ওরা কেউ করে
ক্ষেপ। ঘরের মধ্যে এখানে-ওখানে জাল আছে জমা হয়ে।
অপরিষ্কার—অত্যন্ত অপরিষ্কার। দেখে-শুনে ক্যাসিওর মনটা, বিরক্তি
এবং অসন্তোষে ভরে ওঠে।
কিন্তু ধু এই নয়।
৭৫
ইতালীর সেরা গল্প ক্যাসিওর সঙ্গ ওরা পছন্দ করে না। ওরা ওকে নিজেদের সামনে বসতে দেখলেই, মুখচোখের ভাব এমনি কি করে তােলে যে, কাসিও তা দেখে অত্যন্ত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। এদের সদ ওব ভালাে লাগেনা। ওর মনে হয়-এর চেয়ে তার নির্জন ছােটো ঘব খানির মধ্যে একা থাকা অনেক ভালাে। সেখানকাব জানালাটার গরাদে হাত রেখে বাইরের পর্বতশ্রেণীর সৌন্দৰ্য, তার চোখে পড়বে। এই পর্বতশ্রেণীর প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য, তাকে শবণ করিয়ে দেবে-ওর নিজের দেশের প্রকৃতিৰ ৰূপ। এতে সে, তার এই দুর্ভাগ্যের মধ্যেও, শান্তি পাবে। দিন কয়েক পরে :- খামের ওপর সার্ডেনিয়ার ছাপ নিয়ে ক্যাসিওর নামে একখানা চিঠি এলো। খামের শিরােনামা বেশ পরিষ্কার অক্ষরে লেখা। দেখলেই বােঝা যায়-নারীব হাতের লেখা। কিন্তু চিঠি খুল্লেন জেল-পরিচালক। আগাগোড়া পাঠ করলেন একটা ইতস্ততার মধ্যে দিয়ে। তাঁর মনে হতে থাকে, এরই অপেক্ষায় সত্যিই বুঝি তিনি এতাে দিন বসে ছিলেন। জেলের পরিচালক হাজার হােক মানুষ-পুরুষ মানুষ। যৌবন যে সত্যি তার দেহ থেকে বিদায় নিয়েছে, তা নয়। উনি অনেক দুঃখ-কষ্ট ভােগ করেছেন। সহানুভূতি এবং মমতা তার হৃদয়ে আছে। ২৪৫ নম্বরের কয়েদী যদি গরীব হতাে, শয়তান, দুষমন হত,যেমন দু’টি নর ও একটি নারী অন্য কয়েদীরা হয় তাহলে পরিচালক কখনােই প্রথম দিনের পর থেকে তার সম্বন্ধে একটা স্বতন্ত্রভাব-ধারা মনে-মনে পোষণ করতেন না। ২৪৫নম্বরের কয়েদীর চিঠিপানিতে লেখা আছে :- ক্যাসিও, ধৈর্য্য ধরে থাকো। হতাশ হয়াে না। তােমার এই পবিণতির জন্যে নিজের মনকে অযথা কষ্ট দিও না। । স্মরণ বেখাে, এ-পৃথিবীর বুকে আমরা একা। ভালােবাসা নিয়ে আমরা বেঁচে আছি। এই ভালােবাসাকে অবলম্বন করে, আমরা পরস্পরকে বিশ্বাস করি। ক্যাসিও, সেই বিশ্বসের অন্ত নেই। সময় কারাে জন্যে অপেক্ষা করে না। দুঃসময় যাবে কেটে। সময়ের অনুকূলতায়, ঈশ্বর যখন আমাদের দুজনের মাঝে মিলনের সুমধুর-বাঁশী বাজাবেন, তখন, আমার জন্যে তােমার এই যে স্বার্থত্যাগ, তার আমি প্রতিদান দোবাে। নিজেকে নীচ এবং ঘৃণিত বলে মনে করে । সাধুলােকেরা জানে,তুমি আমার জন্যে যে-কাজ করেছে, এবং যে-কাজের ফলে তােমার এই দুঃখ, সে-কাজ বীরের কাজ। বীর হলে এ-কাজ কারাে সাহসে কুলােয় না। চিঠি পড়ে জেল-পরিচালক চিন্তিত হয়ে উঠলেন। সামান্য ক’টি লাইন লেখা। কিন্তু কী প্রেরণা, আর কী ভালােবাসার সৌরভ-ই ন এব মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে। জেলখানায় এই রকম সুন্দর চিঠি, এই প্রথম। সে বিষয়ে কোনাে সন্দেহ নেই। তিনি ২০৫ নম্বরের কয়েদীকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন। সে এলে, তাকে আপিসের কাজের সম্বন্ধে দু-চার কথা বলবার
ইতালীর সেবা গল্প
পর, ক্যাসিওর মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বল্লেন, তােমার
একখানা চিঠি আছে।
এই বলে তিনি ক্যাসিওব হাত লক্ষ্য করে চিঠিখানা এগিয়ে দেন।
ক্যাসিও চিঠিখানা, মানে খােলা চিঠিখান, নতমুখে হাত বাড়িয়ে
নিরুত্তরে গ্রহণ করলাে বটে, কিন্তু ওর সমস্ত মুখখানা একেবারে
জবাফুলের মতাে বাঙা হয়ে উঠলাে। ওব নিজের নামের চিঠি
জেলে পরিচালক খুলে পড়েছেন। এই সত্যিটা জেনেও সে চুপ
করে দাড়িয়ে থাকে। ব’লতে পাবে না মুখ ফুটে যে, পরের চিঠি
খুলে পড়া শুধু বেআইনী নয়, পাপও।
কিন্তু এই খােলা চিঠি পাওয়ার দিন থেকেই ক্যাসিওর
ভাগ্য যেননা হঠাৎ সুপ্রসন্ন হয়ে ওঠে। জেলের পবিচালক হঠাৎ
ওকে সুনজরে দেখতে সুরু করেন। কিন্তু পরিচালকের এই
পক্ষপাতিত্ব, অন্যান্য কয়েদীর চোখ ও কাণকে এড়িয়ে যেতে পারে
। তারা এব জন্যে মনে-মনে অসন্তুষ্ট এবং ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে
ওঠে।
তারা বলাবলি করতে থাকে—ক্যাসিও জেল-পরিচালকের
নিকট-আত্মীয়-তাই এই পক্ষপাতিত্ব। তবু, এ অন্যায়-বসে
অন্যায়।
একমাসের পূর্বে ক্যাসিও তার বৈমাত্রেয়ী ভগ্নি পােলার চিঠির
জবাব দেবার অনুমতি জেল-পরিচালকের কাছ থেকে পেলে না।
৭৮
দু’টি নর ও একটি নারী
তারপর একদিন ক্যাসিও লিখলাে :-
এখানে আমি একমাসের ওপর হলাে আছি। কিন্তু এই সময়টা
আমার মনে হচ্ছে বিশ বছর। আমাব পরিশ্রম অনেক কমে
গিয়েছে। এঁরা আমাকে ক্যাবানীর আপিসে কাজ দিয়েছেন। কাজ
যদিও কম নয়, তবু এটা আমার সময় কাটাবার পক্ষে ভালাে।
প্রথমে এ কাজে আমার মন বসতো না। কিন্তু এখন সব সহ
হয়ে গিয়েছে। সেল-পবিচালক মশাই, আমাকে বলাে নেই
কবেন। প্রীতির চক্ষে দেখেন। হয়তো ভালাে বাসেন যথেষ্ট। হ্যা,
আমি জানি—বেশ জানি যে, সময় কখনাে বসে থাকে না। এব
কাজ করে এ যাবেই। কিন্তু তবুও আমার মনে হয়, আমাৰ
এই যে শাস্তি”াগ, এট। থাকবে অনন্তকাল ধরে। নশাে
সাতাশী দিন এখনাে বাকী । সমুদ্রের ঢেউবে যেমন শেষ থাকে না,
আমার বাকী দিনগুলিও মনে হয় সেই বকম সীমাহীন, স খ্যান।
তােমার কথা যখন আমাব মনে হয়, তখন আমি বড়ো অস্থির হয়ে
উঠি। মনের ভেতরটা কেমন যেনো ব্যথায় টন্ট করে ওঠে। কিন্তু
তবু আমি শান্তি পাই। পােলা তুমি কতত ভালাে। আমার
অনুরােধ, আমাকে তুমি ভুলে যেও না। আমার অনুপস্থিতির মধ্যেই
তুমি বিয়ে করে, ঘর-সংসার করে। কিন্তু এ কতোখানি ভােমার
পক্ষে অসম্ভব, তা আমার অজানা নেই। আমি জানি,সৎ-ভগ্নি
কখনাে তার দুঃখী ভাইকে ভুলতে পারে না। রাত্রে অল্প পরিসর
বিছানায় আমার ঘুম আসে না। শষ্যার ওপর ছটফট করতে
থাকি। তখন আমার ভয় হয়,—বড়ােত হয়। কিন্তু তারা আমার
৭১
ইতালীর সেরা গল্প এ কী সর্বনাশ করলে? • চিঠির উত্তর শীঘ্র দিও। আমায় ভুলাে না, পােল, আমায় ভুলাে না। জেল-পরিচালকের মন ঈর্ষার এবং আকালার একটা বিস্ময়কর মােহতে সমাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। সমাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে তখন, যখন পােলার আর একখানি চিঠি তার হাতে এসে পড়লো। পােলা ক্যাসিওকে চিঠির একস্থানে লিখেছে, ক্যাসিওকে নিরানন্দ থাকতে জেনে সে কতখানি আন্তরিক দুঃখিত, ক্যাসিও ফিরে না আসা পর্যন্ত সে বিয়ে করবে না, কিছুতেই না। জেল-পরিচালকের উদ্দেশেও চমৎকার কথা লিখেছে —তাকে ভক্ৰিশ্রদ্ধা করে। তিনি তোমার জন্যে যথাসাধ্য করেছেন। তােমাকে তিনি নিজের ছেলের মতো দেখেন। ঈশ্বরের কাছে আমি তােমার ও তার মঙ্গল কামনা করি। তারপর একদিন এলাে পােলার তৃতীয় পত্র । এতে সে লিখেছে :- তােমার অভাবে আমার সময় কাটছে নিরানন্দে। কাজের মধ্যে ডুবে থাকবার চেষ্টা করি। ভাবি, হয়তাে এতে শান্তি পাবে। কিন্তু কৈ—তা তো হয় না, শান্তি তো আমি পাইনে। শান্তি পাবার আশায় মাঝে-মাঝে আমার পালক পিতা-মাতার সঙ্গে আমি দেশে যাই। এই দেশ আমার এখন আনন্দের একমাত্র আশ্রয়। আমরা ঘোড়ায় করেই যাই। এটা কিন্তু বেশ লাগে। মনকে ভুলিয়ে রাখবার চমৎকার বাড়ীতে নতুন কিছু ঘটেনি। ইস্কুলে যে বুটীদার কাপড় পর্দা করবার জন্যে বুনেছিলাম, তার ওপর এখন সুচীকাৰ্য করছি।
দুটি নর ও একটি নাবী আমি আর কারাে দেখা পাইনে। দেখা করবার ইচ্ছেও হয়না। আমি সব সময়েই তােমার কথা ভেবে দিন গুনছি। পত্রপাঠ সমাপ্ত করে জেল-পরিচালক নিজের মনেই বলে ওঠেন, এ-জগতে যারা ধনী আর মহৎ, তাবা ক্ষমা প্রার্থনা করেনা কেন? আশ্চৰ্যবােই আশ্চর্য্য। এই বলে তিনি আসন ছেড়ে উঠে দাড়ান। ঘরের পাশ দিয়ে যে বাগানটা চলে গিয়েছে বরাবর বহুদূর পর্যন্ত, সেই বাগানে এসে ধীরে ধীরে তিনি পায়চাবি শুরু কবেন। গাছে-গাছে কতত শতশত গােলাপ ফুল ফুটে, চাৰিদিকে পাগল-করা সৌরভ দিচ্ছে ছড়িয়ে। জেল-পবিচালক চিন্তিত মনে পায়চারি করতে করতে ফুলের ঘ্রাণ নিতে থাকেন। নিমিষের মধ্যে তার মন ছুটে যায় সেই ২৪৫ নম্বরের কয়েদীর ভগ্নিব দিকে। কল্পনা-চক্ষে উনি নিরীক্ষণ করেন :-পােলা তার ভাইয়ের মতাে সুন্দর দেখতে সুন্দর। সমস্ত দেহভবে মাধুরী এবং লালিত্য যেনাে ঠিকরে পড়ছে। এবং সেই অনন্যসাধারণ সৌন্দর্যের মাদকতায় জেল-পরিচালক আত্মহারা হয়ে আত্মহারা হয়ে তাবই উদ্দেশে দু-হাত, দু-দিকে প্রসারিত করে ছুটে চলেছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে তাঁর মন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তাঁর নিজের ওপরই রাগ হয়। এ কী ছেলেমানুষী তিনি করছেন ? ৫ : আরাে দু-তিন মাসের মধ্যে পােব তিন-চার খানা চিঠি এলাে ক্যাসিওর নামে। শেষের চিঠিখানায় পােলা লিখেছে যে, সে তার ইতালীব সেরা গল্প নিজের একখানি প্রতিকৃতি পাঠাতে পারে, যদি ক্যাসিও ওটা জেল- পরিচালকের কাছ থেকে পাবার অনুমতি পায়। ক্যাসিও অনুমতি পেলো। এক, দুই তিন সপ্তাহ ধরে সেই দু’টি নর, একটি নারীর প্রতিকৃতির জন্যে কী ব্যাকুল ভাবেই না প্রতীক্ষা করতে লাগলাে। অন্ধ যেমন জগতের আলাে দেখবার জন্যে অস্থির হয়ে ওঠে—ঠিক তেমনি। কিন্তু সেই ব্যাকুল প্রতীক্ষায় থাকলেও, দু’জনের প্রতীক্ষার বাবা সম্পূর্ণ বিভিন্ন । ক্যাসিওর প্রতীক্ষার মধ্যে ছিলাে শান্ত-মধুর ভাব। কিন্তু জেল-পরিচালকের প্রতীক্ষা, একটা উগ্র মানসিক চঞ্চলতাকে অবলম্বন করে, সাবানের ফেনার মতাে কেঁপে কেঁপে উঠছিলাে । র মনের শান্তি গেলাে হারিয়ে, স্বস্তি গেলাে কোথায় তলিয়ে । অবশেষে একদিন পােলার চিঠি এবং প্রতিকৃতি এসে জেল-পরিচালকের হাতে পড়লাে। পােলা লিখেছে :- ছবিটা যখন ভােলা হয়ে ছিলাে, তখন আমি তােমার কথা ভেবে নিঃশকে হাসছিলাম। আশা করি আমার এই ছােট্টো-ছবিটা, তােমার মনে নির্মল আনন্দের এবং শান্তির স্রোত বইয়ে দেবে। তােমার আগামী শুভদিনের জন্যে আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি। আমার চোখের ভাষা তােমাকে কি বলতে চায়, আশা করি সেটা তোমার বুঝতে দেরী হবে না। জেল-পরিচালক প্রতিকৃতির চক্ষু দু’টির প্রতি অন্তরের সমস্ত দৃষ্টি ৮২ দু’টি নর ও একটি নারী করেন। কিছুক্ষণ পরে চিঠিখানা আগাগােড়া পড়ে যান। প’ডে আবার প্রতিকৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তাঁর মুখ থেকে আয়াতে বেরিয়ে আসে এমনি চমৎকার চিঠি তিনি ভাইকে লিখতে পারেন ? কিন্তু কিন্তু আরাে কত সুন্দর চিঠি লিখতে পারবেন, তার ভালােবাসার পা ত্রকে। এই কথা তাঁর কানে এসে যখন বাজলাে, তখন জেল পৰিচালকের মন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠলাে। তার দুঃখও হলাে এই চিন্তা করে যে, তিনি কুৎসিত ও বিগত-যৌবন। এবং তাঁকে, র ঐ চক্ষু দু’টিকে, এখানকার সমস্ত কয়েদীই ঘৃণা করে, ভয় করে। জেল-পরিচালকের চোখ দুটি সহসা সজল হয়ে উঠলাে । তিনি আর একবার ছবিটার দিকে বহুক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে রইলেন চেয়ে। এবং এর ফল এই হলাে যে, তিনি ছবি এবং চিঠি—কোনােটাই ক্যাসিওকে দিলেন না। সত্যিটা অম্লানবদনে গােপন করে রাখলেন। সেই রাত্রে জেল-পরিচালক স্বপ্ন দেখেন। অসাধারণ স্বপ্ন জেল-কয়েদীরা একযােগে বিদ্রোহ ঘােষণা করেছে। লৌহশৃঙ্খল ভেঙ্গে ফেলে তার দিকেই রুদ্র-মূর্তিতে আসছে এগিয়ে। তিনি পােলার প্রতিকৃতি ধরে আছেন। তাঁর হাত কাঁপছে থর-থর করে। পালাতে পারেন না, নিজেকে রক্ষা করতে পারছেন না। হঠাৎ ছবিখানি তার হাত থেকে মাটিতে টুক করে পড়ে যেতেই ২৪৫ নম্বর জানতে পারলে—এই ছবিখানি তিনি আত্মসাৎ করেছিলেন। কিন্তু কয়েদীরা যেমনি তাকে হত্যা করতে উপক্রম করেছে, ক্যাসিও তাদের মধ্যে ইতালীর সেরা গল্প ঝাপিয়ে পড়লো। বল্লো, ছেড়ে দাও, ওঁকে ছেড়ে দাও। উনি আমার ভগ্নিকে বিয়ে করবেন। ঘুম ভেঙে যেতেই জেল-পরিচালক উপলব্ধি করলেন, তার সর্বাঙ্গ ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছে। বাকী রাত্রিটা তিনি শয্যার ওপর ছট ফট করে কাটিয়ে দিলেন। ক্যাসিও দিনের পর দিন পােলাব চিঠি আর প্রতিকৃতির পথ চেয়ে আছে বসে। এক সপ্তাহ কেটে গেলো। ক্যাসিও অস্থির হয়ে উঠলাে। ওর দুশ্চিন্তায় মন গেলাে পূর্ণ হয়ে। তাইতাে । সংবাদ নেই। পােলা অসুস্থ হয়ে পড়লােনা তাে ? মনে মনে স্থির করলাে—টেলিগ্রাম করবে। জেল-পরিচালককে এই কথাটা জানালেও তিনি অনুমতি দিলেন না। কিন্তু বহু সাধ্যসাধনা এবং অনুনয় বিনয়ের পর তার নির্দিষ্ট মাসের মাত্র দু'দিন পূৰ্ব্বে পােলাকে পত্র লেখবার পুনরাদেশ লাভ করলাে। ক্যাসিওব এবারকাব পত্র এমনি একটা ব্যথার সুরে লেখা যে, পাঠ করে জেল-পরিচালকের মন বেদনায় টন্টন্ করে উঠলো। নিজের কুকীর্তির জন্যে তার লজ্জা ও অল্পশােচনাব অস্ত রইলাে না। মানুষ নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেমন ভাবে পাপের পথে নেমে যায়— সে কথা বুঝতে আজ তাঁর বাকী থাকে না। কিন্তু বুঝেও তিনি নিজের মনকে শাসন করতে পারলেন না। তাঁর মনে এখন এমনি অবস্থা যে, ইচ্ছে হতে লাগলাে দৌড়িয়ে গিয়ে ক্যাসিওর হাত দু'টি চেপে ধরে বলেন, ভাই ক্যাসিও, আমি নির্বোধ হতে পারি। কিন্তু ৮৪ দুটি নর ও একটি নাবী তােমার ভগ্নিকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালােবেসে ফেলেছি, যদিও তাকে আমি কখনাে চোখে দেখিনি। তাকে দেবে—আমার স্ত্রী হতে? পােলা ক্যাসিওর পত্রের উত্তরে টেলিগ্রাম করলাে। ক’বলল ক্যাসিওকেই। এতে জানিয়েছে—একখানি প্রতিকৃতি সে পাঠাচ্ছে। এতাে দিন পাঠাতে পারেনি এই জন্যে যে, তার ছবি তােলাতে কিছুতেই সময় হয়ে উঠছিলাে না। অনিবার্য কারণবশতঃ তার চিঠি দিতে এত দেরী হলাে। এর জন্যে ক্যাসিও যেন দুঃখ না করে। এই মিথ্যে কথা লেখার মধ্যে একটা সাধু উদ্দেশ্য পােলার ছিলাে। বেচারা ক্যাসিওর মনে নতুন কবে দুখ দিতে সে চায়নি। পােলা বুঝতে পেরে ছিলো, কেউ তার ছবি এবং চিঠি দু’-ই আত্মসাৎ করেছে। কিন্তু পাছে সে সন্দেহ করে জেল-পৰিচালককে, সেই জন্যে পােলা দোষটা নিলে নিজের ওপরেই। একদিন জেল-পরিচালক ক্যাসিওকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন। ক্যাসিও কিছুক্ষণ পরে তার সুমুখে এসে মাথা হেঁট করে দাড়ালাে। কাজের সম্বন্ধে এ-কথা সে-কথা জিজ্ঞাসা করবার পর, তিনি হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, তুমি ক্ষমা প্রার্থনা ক’বেছে ? —হঁ্যা, করেছি। কার কাছে করেছো? জেল পরিচালক কাজের মধ্যে চক্ষু নিবদ্ধ করেই প্রশ্ন করলেন। ওর দিকে ফিরে চাইলেন না।
ইতালীর সেরা গল্প
—মন্ত্রীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি।
তােমার দুর্ভাগ্য! ওঁদের কাছে দরখাস্ত পেশ করলে কোনাে
কাজই হবে না। প্রায় দেখা যায়, ওঁরা এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন।
কয়েদীর নির্দিষ্ট জেলভভাগের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায় তারা মুক্তি পেয়ে
যে-যার ঘরে ফিরে যায়, কিন্তু তবু ওঁদের কোনাে জবাবই এসে
পৌছয় না। অদ্ভুত, সত্যিই তারা অদ্ভুত।
এই বলে জেল-পরিচালক এক মুহুর্ত নীরব হয়ে থেকে পুনরায়
বল্লেন, রাণীর কাছে তােমার দরখাস্ত পেশ করো। উত্তর শীগ্যিব
পাওয়া যাবে।
ক্ষমা করুন মশাই। আমি একথা আগে জানতাম না। কিন্তু
তাঁকে জানালে কি আমার ইচ্ছে পূর্ণ হবে।
—যদি ভােমার ভগ্নির তরফ থেকে, তােমার জন্যে অনুরােধ করা
হয়, তবে নিঃসন্দেহে তােমার ইচ্ছে পূর্ণ হবে।
এই বলে জেল-পরিচালক ক্যাসিওর দিকে, পেছন করে অন্যদিকে
মুখ ফেরালেন।
যথাসময়েই ক্যাসিও পােলাকে
লিখে জেল-পরিচালকের উদ্দেশ্য
এবং শুভেচ্ছা জানালে।
শীতঋতু চলে গেলো। ফেব্রুয়ারী মাসের এক স্বচ্ছ প্রভাতে
ক্যাসিও তার ঝাঁঝরিশম্বলিত বাতায়নের সুমুখে দাড়িয়ে আছে।
ওর মুখ ভক্তহীন। কিন্তু চোখ দুটি আশায় প্রদীপ্ত। তার
দু’টি নর ও একটি নারী সর্বশরীরের সমস্ত শিরা-উপশিরাগুলি ভবিষ্যতের আনন্দের প্রত্যাশায় যেনাে নেচে উঠতে থাকে। কিন্তু দিন এসে পড়লাে। মন্ত্রীমণ্ডলী ক্যাসিওলজিনন ইসিডােরাের স্বভাব সম্বন্ধে বিশদ-বিবরণ জেল-পরিচালকের কাছ থেকে চেয়ে পাঠালেন। জেল-পরিচালক যা’ রিপাের্ট পাঠালেন তার সার মর্থ হলাে এই যে, ২৪৫ নম্বরের কয়েদী জাল করার আসামী কখনাে হতে পারে না। তার মতো সং, সুশিক্ষিত এবং সুনীতি-সম্পন্ন যুবক কোথাও দেখা যায় না। ক্যাসিওলঙ্গিনাের মুক্তির আদেশ এলাে। * জেল-পরিচালকের খাশ কামর। উনি টেবিলের সম্মুখে একটা আসন গ্রহণ করে ক্যাসিওর প্রতীক্ষা করছিলেন। উনি ওকে ডেকে পাঠিয়েছেন। যথাসময়েই ক্যাসিও ধীরে ধীরে কক্ষে প্রবেশ করলাে। কিন্তু এইবার বােধকরি সর্ব প্রথম জেল-পরিচালক দাড়িয়ে উঠে ওকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। যুবকটির দৃষ্টি এটা এড়িয়ে গেলাে না। ওর জিব কথা বলবার জন্যে দু-চারবার ভেতর দিকে নড়ে উঠলাে। কিন্তু শতচেষ্টা করেও মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরুল না । লে বেশ উপলব্ধি করতে লাগলাে, তার অন্তঃকরণ স্বর্গীয় আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৮৭
ইতালীর সেরা গল্প
জেল-পরিচালক হাতে একটা কাগজ ধরে বল্লেন, মুক্তিব
আদেশ-পত্র এসেছে।
মুক্তির আদেশ-পত্র ?
-হ্যা, মুক্তির আদেশপত্র। ক্ষমা প্রার্থনা মঞ্জুর হয়েছে।
-কার জন্যে ? ক্যাসিও প্রশ্ন করলো।
এই প্রশ্নে মনে হলে জেল-পরিচালকের বুঝি ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটে। কিন্তু
নিজেকে সংবরণ করে নিয়ে বল্লেন, তােমার জন্যে—আবার কাব
জন্য ?
ক্যাসিও সহসা যেনাে ভােলা হয়ে যায়। -আ-আমার ?
আমার জন্যে ? আ-আমার জন্যে ? ক—ক কত দিনের জন্যে ?
কতাে দিনের জন্যে ?
জেল-পরিচালক বল্লেন, চিরদিনের মতাে—তুমি চিরদিনের মতাে
মুক্তি পাবে। কিন্তু এখুনি, এই মুহূর্তে নয়। এক সপ্তাহ-এক সপ্তাহ
পরে তোমার মুক্তি—চিরদিনের মতে, বিনাশর্তে খালাশ। বুঝেছে—
চিরদিনের মতাে।
এই মুক্তিবাণী শুনে ক্যাসিও ধীরে ধীরে ওঁর নিকটবর্তী হয়ে
চোখতুলে উজ্জ্বল এবং কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টিতে ওঁর মুখের দিকে বহুক্ষণ
চেয়ে রইলাে। এবং দেখলে, বেশ ভালাে করেই দেখলাে-র
সেই পাণ্ডুর মুখখানি হঠাৎ কিসের সংস্পর্শে রক্তরাঙা হয়ে উঠলো।
কিন্তু সে মুহূর্তের জন্যে।
তিনি ওকে একখানা চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে বসতে অনুরােধ
৮৮
দুটি নর ও একটি নারী জানালেন। মুক্তির আদেশ-পত্র দেখিয়ে বল্লেন, দেখাে, তােমাকে আমার কিছু বলবার আছে। ভালাে করে শােনন। হঠাৎ আমাকে বিচার করাে না। এই সময় টুকুর জন্যে আমি অনেক দিন থেকে ব্যর্থ হয়ে অপেক্ষা করছিলাম। এই বলে জেলের পরিচালক নিঃশব্দে একটুখানি হাসলেন। কিন্তু সেই হাসিব মধ্যে আনন্দ মাত্রও নেই। তিনি গলাটা একটু পরিষ্কার করে বল্লেন, কি ভাবে নিজেকে তােমর কাছে প্রকাশ করলে তুমি আমাকে ঠিক বুঝতে পারবে, তা’ জানিনে। কিন্তু তােমার বুদ্ধির ওপর আমার যথেষ্ট বিশ্বাস আছে। এই পৰ্যন্ত বলে তিনি ক্ষণকাল চুপ করে থেকে বাইরের খােল মাঠের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর সহসা একসময় দৃষ্টি ফিরিয়ে ক্যাসিওর মুখের দিকে চাইলেন। হাতেব কাগজখানা দেখিয়ে বলেন, তােমার মুক্তির আদেশ-পত্ৰ পাবার জন্যে, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। আমি জানি, আমার সেই অক্লান্ত চেষ্টা মােগ্যব্যক্তির জন্যেই। এজন্যে অবশ্য আমি কৃতজ্ঞতাভাজন হতে চাইনে। তোমার সঙ্গে আমি সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে চাই। এখন তুমি মুক্ত। এখন তুমি স্বাধীন। এই স্বাধীনতা নিয়ে তুমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। ক্যাসিওর মন সন্দেহ এবং কৌতূহলের দোলনায় দোল্ খেতে সুরু করে। কিন্তু আত্মসংবরণ করে নম্বরে বলে, বলুন, আপনার যা বলবার আছে। আমার যথাসাধ্য আপনার জন্যে
ইতালীর সেরা গল্প
কিন্তু আমি তাে জানিনে,—সেটা তােমার সাধ্য কুলােবে কি না।
-বলুন, আপনি বলুন। সঙ্কোচ করবেন না, আপনি কোনাে
দ্বিধা করবেন না।
তবে শােনা। কিন্তু আমাকে ভুল বুঝাে না। উন্মাদ বলে
উপহাস করো না। তােমার ভগ্নির চিঠি পড়বার সময় তার পরিচয়
পেয়ে, তাকে আমি প্রীতির চক্ষে দেখেছি—তাকে আমি ভালাে
বেসেছি। হেসাে না। আমি এখনাে যুবক—আমার এখনাে যৌবন
আছে। কাসিও, এখন আমি বৃদ্ধ হইনি।
শুনে ক্যাসিওর মনে হলাে, তার পায়ের তলায় পৃথিবীটা কেঁপে
উঠেছে। মাথা উঠলো ঘুরে। চোখ চেয়েও যেনাে কিছু দেখতে
পাচ্ছে না। সব ধোঁয়া ধোয়া সপিল গতিতে উর্জে যাচ্ছে উঠে।
কিন্তু সংবরণ করতে হলাে নিজেকে। ধরা গলায় ভয়ে-য়ে প্রশ্ন
করলে তাকে আপনি চিঠি লিখেছিলেন ?
-না-না, কখনাে না। চিঠি তাকে আমি লিখিনি—নিশ্চয়ই লিখি
নি। এতটা সুবিধে নিতে আমি সাহস করিনি।
—কিন্তু এযে অসম্ভব।
—অসম্ভব মনে হলেও এটা সত্যি। এবং যদিও এটা অদ্ভুত,
তবু এটা ঠিক যে, এমনি ঘটনা এই প্রথম ঘটছে না। আমার
ক্যাসিওলজিনাে—আমার দাবী, আমার প্রার্থনা সামান্য নয়। তােমার
ভগ্নি সেটা কি অনুমােদন করবেন ?
দাবী ? কি দাবী? কি প্রার্থনা? রুদ্ধকণ্ঠে ক্যাসিও প্রশ্ন
করলাে।
দু’টি নর ও একটি নারী
বল্লেন, বিয়ের
জেল-পরিচালক মিনিটখানেক নির্বাক থেকে
প্রস্তাব। এই আমার দাবী, এই আমার প্রার্থনা।
ক্যাসিও হঠাৎ এ-কথার উত্তর দিতে পারে না। অতিকষ্টে
নিজেকে সংবরণ করে। সে ফিরে দাড়িয়ে তৎক্ষণাৎ পরিচালকের
মুখ-পানে নিনিমেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ কবে। এবং তার সৌন্দর্যহীন,
লালিত্যহীন বিশু মুখকৃতি ওর চোখ দু’টিকে নিরতিশয় ব্যথিত
করে তােলে। সেই মাহী তার মধ্যেও সে স্বস্তির নিঃশ্বাস
ফেলে বাঁচে।:-গলী কখনাে এই প্রস্তাব গ্রাহ্য করবে
না-করতে পারে।
Po Camalan
১৫
ক্যাসিও জিজ্ঞাস করলাে,
আপনি কী করছেন, সেটা
কী একবার মনে ভেবে দেখেছেন? আমার দেশের সম্বন্ধে লিখে
কিছু সংবাদ নিয়েছেন কি ? এ-রকম ক্ষেত্রে
—না আমি লিখিনি। কোনাে খোঁজ-খবরও নিইনি। নিয়ে
ফল কি হতাে ? আমি ভালাে করেই জানি, তােমার ভগ্নি সৎ।
এর চেয়ে আর কিছু আশা ক’বিনে। আমি নিজেই তাে পৃথিবীতে
একা সম্পূর্ণ একা।
—আপনার মহত্বের তুলনা মেলে না।
আপনাকে কী বলে
যে কৃতজ্ঞতা জানাবাে, তা ঠিক করে উঠতে পারছিনে। আপনাকে
আমি ভুল বুঝিনি। আপনাকে আন্তরিক প্রশংসা করি। আপনি
ইতালীর সেরা গল্প আপনার হতাশ হবেন না। আপনার কাছে আমি চিরঋণী। উপকার করতে আমি প্রাণপণ চেষ্টা করবাে। ক্যাসিওর এই কথাগুলি জেল-পরিচালকের কানে যেনো মধু বর্ষণ করে। তঁার মনের গভীরতম স্থানে, একট। উজ্জ্বল আশার রেখ। সঞ্চিত হয়ে চোখ দু’টিকে অস্বাভাবিক জ্যোতিতে পূর্ণ করে তােলে। তিনি করমর্দন করবার জন্যে, নিজের একখানা হাত বাড়িয়ে দেন। ক্যাসিও নিজের ক্ষুদ্র কক্ষটিতে ফিরে আসে। গোটানো বিছানাটা তার ওপর ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে। শুয়ে-শুয়ে মর্মান্তিক যাতনায় কতো কী ভাবতে থাকে -পােলা তার তন্নি নয়--প্রেমিকা। এব জন্যে ক্যাসিও তার নিজের সম্মান, নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে। নিজের আত্মীয় স্বজনের মায়া পরিত্যাগ করতেও, ওর কণামাত্রও সঙ্কোচ হয়নি। এই পােনাই তার জীবনের একমাত্র মুখ, একমাত্র সম্পদ। এবং একে ভগ্নি বলে পরিচয় দেবার একটা কারণ আছে । ভগ্নি বলে পরিচয় না দিলে বোধকরি পােল তাকে চিঠি লিখতে পারতো না। এই পোলাকে, তার হৃদয়ের একমাত্র কোহিনুরকে সে কি চিরদিনের জন্যে হারিয়ে ফেলবে? জেল-পরিচালক—তিনিও মানুষ হিসেবে অনেক বড়ো। তাঁর উজ্জল-ভবিষ্যৎ সুপ্রতিষ্ঠিত। এর সঙ্গে পােলার বিয়ে হলে, ওর সুখ-ঐশ্বর্যের সীমা থাকবে না। তবে তার কী অধিকার আছে-পােলার সেই জীবনের চমৎকার ভবিষ্যৎ ১২ দু’টি নর ও একটি নাবী নষ্ট করে দেবার ? পােলার জন্যে ওর স্বার্থত্যাগ, জগতের, একটা আলােচনার বস্তু। ওর স্বার্থত্যাগ মনে হয় জগতের ইতিহাসে স্থান পাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, পােল স্বার্থত্যাগ করতে কোনাে দিন তাকে অনুরােধ করেন। এর বিনিময়ে তার, মানে, পােলাব সমস্ত জীবনটাই কি সে দাবী কববাব স্পৃহা রাখে? যে কোনো ক্ষেত্রে সেই মেয়েটিকে নিজেব ভবিষ্যৎ বেছে নিতে দেওয়া ভালো। কিন্তু ক্যাসিওর হৃদয়ের সমস্ত জায়গা জুড়ে অধিষ্টান ক’বছে পােলা, তার সেই দশবছরের ভালােবাসার পােল । ক্যাসিওর মন এইসব চিন্তায় সন্তুষ্ট হতে পারলো না। সে বিষন্ন হয়ে উঠলাে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধবে ঐ সব চিন্তা করে ক্যাসিও শয্যার ওপর ওঠে ব’সলাে। এবং পরক্ষণেই তার মুখ দিয়ে বেবিয়ে এলাে, যা হয় হােক। সমস্ত ব্যাপারটা তাকে আমি খুলে বলবাে। কিন্তু তখুনি অস্ফুট-কণ্ঠে আপন মনেই বলো, না—না, বলবাে না। কারাে কথাই প্রকাশ করবাে না। সে-সব কথা তঁার জানবার কোনাে অধিকার নেই। কিন্তু নিজেরই এই উক্তিতে ক্যাসিও মনেমনে পরম বিরক্ত এবং ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলাে। চীৎকার করে বল্লো, কিন্তু আমি কি অকৃতজ্ঞ মনুষ্যত্বের ছাপও কি নেই? বলতে বলতে সে বিছানা পরিত্যাগ করে উঠে দাড়ালো। বাকরি-সম্বলিত উন্মুক্ত বাতায়নের সন্নিকটে এসে, বাইরের আকাশ 2 ইতালীর সেরা গল্প পানে পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে পাকতে দেখতে পেলে—স্বচ্ছ শাদা মেঘগুলি আকাশের গায়ে জমা হয়ে উঠছে। এই মেঘগুলি দেখতে হয়েছে ঠিক মর্মব-নিৰ্মিত সােপান-শ্রেণীর মতাে। এবং সেই আলােক-বিকাশী সােপান শ্রেণী অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে- দুল উচ্চতায়। এর সৌন্দর্ঘ্যে ক্যাসিওব মন ছুটে গেলাে নিজের গৃহের পানে। তার মনে হলো, সে বুঝি ঐ শুভ্রমেষের মর্মর- সদৃশ সােপান-শ্রেণীর সাহায্যে, নিজের দেশে—নিজের ঘরে গিয়ে উঠেছে। ক্যাসিও মনে-মনে বল্লো, তঁার জন্যেই আমার এতাে শীগ্যিব মুক্তিলাভের আদেশ হয়েছে। তিনি কতাে চেষ্টাই না করেছেন। আর কিছুদিন এমনি থাকলে, হয়তো আমাকে আত্মহত্যা করতে হত। হয়তাে আমি উন্মাদ হয়ে যেতাম। কিন্তু রক্ষা করেছেন, জেল-পরিচালক। না, আমি সমস্তই খুলে ব’লবাে। ফলাফলের দিকে আহমাত্রও করব না। ক্যাসিও (জল-পরিচালকের সঙ্গে দেখা করলাে। ব'লে, স্যার, যে-বিষয় আজ সকালে আপনাকে বলবার জন্যে, আমাকে আদেশ করেছিলেন, সেই বিষয় আমি চিন্তা করেছি। —বেশ, বেশ। জেল-পরিচালকের মন দুরুদুরু করে ওঠে। ক্যাসিও অবিচলিত-কণ্ঠে বলে যেতে লাগলাে :- আজ দশবছর আমার নিজের দেশের একটি অবিবাহিত মেয়েকে ভালােবেসে আসছি। তার ঐশ্বৰ্য্য ছিলাে প্রচুর। একজন অভি- দুটি নর ও একটি নারী ভাবকের তত্ত্বাবধানে সে ছিলাে। কেননা তার বাপ, মা, কেউ জীবিত নেই। এক কথায় সে অনাথা। আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন কয়েক বছরের জন্যে দেশ ছেড়ে আমাকে থাকতে হয়। ফিরে এসে দেখলাম, সেই মেয়েটি তার অভিভাবকের কাছ থেকে মর্মান্তিক যাতন পাচ্ছে। তার অভিভাবক তাকে অযথা নিৰ্যাতন করছে। তাব কোনাে অভিযােগে কর্ণপাতও করে না। বিচার নেই, সহানুভূতি নেই- শুধু অত্যাচার। কিন্তু এখানেই শেষ হলাে না। তার সমস্ত সম্পত্তি অভিভাবক মশাই আত্মসাৎ করে নিলে। দিনরাত্রি তাকে ভয় দেখাতে এই বলে যে, সম্পত্তি নিয়ে বেশী বাড়াবাড়ি করলে গলা টিপে খুন করবে। তারপর একদিন সুযােগ এলো। বহু চেষ্টার পর তার সঙ্গে আলাপ করে বুঝলাম, সে আমাকে ভালােবাসে। আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিলাম, তার সম্পত্তি উদ্ধার কবে, তাকেই ফিরিয়ে দেবাে। সে বলে, এসাে, আমবা পরস্পরে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হই। চলাে আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই। কিন্তু তখন আমার অনেক বাধা-বিপত্তি ছিলাে, সেইজন্যে তার তার কথায় রাজী হতে পারলাম না। বন্ধু-বান্ধবের সাহায্যে, তাকে একদিন সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে এলাম। এনে আমার কর্তব্যের দিকে মন দিলাম । ক্যাসিও বাইরের পানে মুখ ফিরিয়ে কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে পুনশ্চ বলে, আন্দাজ করতে পারেন, আমি কি করেছিলাম? আমার স্থিব বিশ্বাস আপনি পেরেছেন। তার অভিভাবকের নাম আমি জাল করেছিলাম। সমস্ত সম্পত্তির মালিক হ’লাম। অর্থ আমি সেই মেয়েটিকে দিয়েছিলাম। আমার এই কীর্তি যথাসময়েই কিন্তু সমস্ত
ইতালীর সেবা গল্প
জানাজানি হয়ে গেলো। পরিণামে হলাে—আমি জাল করার অপরাধে
ধরা পড়লাম। লােকে আমায় ছি-ছি করতে লাগলাে। আমার
সামান্য কিছু অর্থ, সম্পত্তি ছিলো। সে সব নিলে কেড়ে। আমার
আত্মীয় স্বজনেরা আমায় ত্যাগ কবলে। এই বিশাল পৃথিবীর বুকে
আমাৰ সে ছাড়া আব কেউ বইলাে না। এবং সে হলাে ঐ
পােলা, স্যার সেই পােলা ।
জেল-পরিচালক নিস্তব্ধ, নবিব হয়ে বসে বইলেন। তাঁর মুখ
দিয়ে একটা কথাও বলো না। আর বলবার তার আছে কি?
তিনি মৌন হ'য়ে শুধু উপলব্ধি করতে লাগলেন যে, ক্যাসিওব কাহিনী
এবং নিজের কাহিনী অসম্ভব মনে হলেও সম্পূর্ণ সত্যি '
-আশ্চৰ্য্য, অসম্ভব-তাই না? হঠাৎ বিশ্বাস করা যায় না।
জেল-পবিচালককে ক্যাসিও বল্লো, আমাকে কেউ বলে বিশ্বাস
হতাে না।
হাতেব নখেৰ সাহায্যে আঙ্গুলের ওপর অন্যমনঙ্কে আঘাত করতে
করতে জেল-পরিচালক বলেন, মনুষ্য-জীবন বৈচিত্র্যেপূর্ণ। ভাগ্য কাকে
কোন দিকে নিয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না।
ক্যাসিও তার কথায় ওর মুখ পানে দৃষ্টিপাত করলেন। দেখলেন,
জেল-পরিচালকের সমস্ত মুখখানি ব্যথায় টন্টন্ করে উঠেছে।
ক্যাসিও বল্লো, আমার জন্ধে আপনি যা করেছেন, তার তুলন
নেই। আমি এই জন্যে আপনার কাছে চিরঋণী। আমার যথাসাধ্য
দু’টি নর ও একটি নারী
আপনার ঋণ শােধ করবো। স্যার, আমি আর যাই হই-অকৃতজ্ঞ
নই। অকৃতজ্ঞতার রক্ত আমার দেহে নেই।
—তুমি কী বলতে চাও, ক্যাসিও ? তােমার এসব
-আমাকে বলতে দিন। আমার কর্তব্য-সত্যিটা আপনাকে
জানানাে । আপনি আমার এতো উপকার করেছেন, এতো ভদ্ৰব্যবহার
আমার প্রতি দেখিয়েছেন যে, আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি,
ভদ্রলােকের কথা দিচ্ছি-আমি সব কিছুই আপনার জন্যে
জেল-পরিচালক নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
পরমবিস্ময়ে প্রশ্ন ক'বলেন, কী বলছে--তুমি কী বলছে।
ভেবে দেখলাম, পােলাই একমাত্র সমস্যার সমাধান করতে
পাবে। তাকে আমি সব জানাবাে। কণামাত্রও গােপন করবাে না।
ঠিক ভাইয়ের সম্পর্ক নিয়ে তাকে বলবাে। ভাইয়ের দাবী নিয়ে।
স্যার, ভাইয়ের দাবী নিয়ে। এর একচুলও ব্যতিক্রম হবে না।
—আরে না, না। তুমি বলছো কী ক্যাসিও ?
—শুধু এই নয় । আপনি যদি অনুমতি দেন, তবে আজই
পােলাকে লিখে জানাতে পারি। তার জবাব না আসা পর্যন্ত
এখানেই আমি প্রতীক্ষা করবাে। যখন জবাব এসে পৌছবে, হয়তাে
তখন আমার আর বাড়ী ফিরে যাবার কোনাে প্রয়ােজন হবে না।
জেল-পরিচালক পুনরুক্তি করলেন, তুমি কী বলছে?
কিন্তু এই পুনরুক্তি কার সঙ্গেসঙ্গে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে মনে হলাে,
তার অন্তরে লুপ্ত-শক্তি ফিরে এসেছে। ক্যাসিওর মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টি
নিক্ষেপ করে বলেন, না, না চিঠি লিখােনা। তুমি এখুনি বাড়ী
ইতালীর সেরা গল্প ফিরে যাও। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি, তােমার জন্যে সেখানে অনাবিল আনন্দ প্রতীক্ষা করছে। ঠিক ঠিক্-এ-জীবনটা একটা মধুর প্রেম ও সুললিত ছন্দে আপ্লুত। মনুষ্য-জীবন বৈচিত্র্যময়। কিন্তু ক্যাসিও ক্ষান্ত হ'তে পাবছিলাে না । জিদ প্রকাশ করে ব’মে, আমাকে চিঠি লিখতে অনুমতি দিন। আপনার প্রতি আমার যা কর্তব্য আছে, সেটা ক’বতে দিন। আমার কর্তব্য করবে। আমার ঋণ, আমি পবিশােধ করবে।। জগৎ জানুক-ভালােবাসার চেয়ে কর্তব্য, মানুষের উপকারের প্রতিদান দেওয়া, -বড়ো, অনেক বড়াে। পােলা আমার হওয়ার চেয়ে, আপনার হলে অনেক সুখে থাকবে, অনেক আনন্দে থাকবে। আমার দিক দিয়ে সব চেয়ে বডে জিনিষ, পােলার সুখ-সুবিবে দেখা। আপনার কাছেই সে সেটা সম্পূর্ণ ভাবে পাবে। জেল-পরিচালক ধৈৰ্য্যসহকারে সব শুনলেন। তাঁর চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলাে। একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বল্লেন, তােমার কর্তব্য যদি হয় তাঁর কাছে নিজেকে কৃতজ্ঞ এবং মহভাবে পরিচয় দেওয়া, অ' হলে তাঁর, মানে পালার কর্তব্যও হবে—তােমাকে আনন্দ দেওয়া, তােমার এই কয়েদবাসের দুঃখকষ্ট লাঘব করা। ক্যাসিও বাধা দিয়ে বলে উঠলাে, কিন্তু ওর কথাটা অসমাপ্ত রয়ে গেলাে। জেল-পরিচালক তার কথায় দু’টি নব ও একটি নাবী প্রবল বাধা দিয়ে বল্লেন, সবুর করাে—আমাকে শেষ করতে দাও। বল্লেন, পােলা যদি ভিন্নরূপ ব্যবহার করেন, তা হলে আমার, তাঁর সম্বন্ধে যে উচ্চ এবং মহৎ ধারণা আছে, সবই বাতাসের সঙ্গে ভেসে যাবে। পােলা মহৎ, পােলা উদাব—ভালােবাসাব মৰ্য্যাদা জানেন, সম্মান জানেন। ক্যাসিও, এটা সম্পূর্ণ সত্যি যে, তিনি কখনাে তার বহুদিনের প্রেমিককে মানে, তােমাকে প্রতারণা করতে পাবেন না। এ তার স্বভাব নয়। এবং এই আমি চাই । বলতে বলতে জেল-পবিচালকের চোখ দুটি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলাে। সে নীরবে বাইরে সেই কিন্তু ক্যাসিও একটা কথাও বলেন। উদ্যানের দিকে মুখ করে দাড়িয়ে রইলাে। ১ ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টেব বজত-মূর্তি -এক- কাউন্ট-পত্নীর শশাবার ঘরের দরজার ওপর দাঁড়িয়ে পরিচারিকা বল্লো, মা, আপনার কফি এনেছি। কাউন্ট-পত্নী ওর কথার কোনাে জবাব দিলেন না। বিছানার ওপর মশারী খাটানাে। এই মশারীর ফাক দিয়ে অস্পষ্টভাবে দেখা যায়—তাব মাথাটা এখনাে পর্যন্ত একটা শাদা বালিশের ওপর ন্যস্ত হয়ে আছে। পরিচারিকা কোনাে সাড়া-শব্দ না পেয়ে ঘরের ভেতর এলাে। ওর হাতে একখানা ট্রে। ট্রের ওপর প্রাতঃরাশের আহাৰ্য্য সাজানাে। সে পুনরায় একটু উচু-গলায় বল্লো : মা, আপনার কফি এনেছি। কাউন্ট-পত্নী এবার শয্যার ওপর ওঠে বসেন। হাই তুলতে তুলতে বলেন : ঘরের মধ্যে একটু আলাে আসতে দেনা রে। তার আদেশে পরিচারিকা বাতায়নের কাছে সরে আসে। হাতের ট্রে তার হাতেই থাকে। নামিয়ে কোথাও রাখে না। জানালার খড়খড়ি একহাত দিয়ে তুলে দেয়। এই সময় ট্রের ওপরকার কাপ, ডিসগুলিতে সংঘর্ষ হয়ে একটা বিশ শব্দ বেরিয়ে আসে।
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজতমূর্তি কাউন্ট-পত্নী এই বিশ্রী শব্দে বিরক্ত হয়ে উঠলেন। ফিফিস্ করে বল্লেন শব্দ করছিস কেন? আজ ভােরবেলা এ-সব কী ভােব হচ্ছে? দেখতে পাচ্ছি নে, আওয়াজে আমার থােকাৱঘুম ভেঙ্গে গেলাে? সত্যি ছেলেটি জেগে উঠেছে। ও, ওর ছােট্টো বিছানায় শুয়ে কঁদছে যে। কাউন্ট-পত্নী ছেলের বিছানার দিকে ফিরলেন। ফিরে তখুনি শাসনপূর্ণস্বরে বলেন : চু-উ-প, কিন্তু কী আশ্চৰ্য্য। ছেলেটির তৎক্ষণাৎ কান্না যায় থেমে। কাউন্ট-পত্নী পরিচারিকাকে উদ্দেশ করে ব’ভেন: হা-এইবার আমার কফি নিয়ে আয়। একটু চুপ করে থেকে বলেন : ওকি-- তুই অমন কঁপছিল কেন ? কি—কি হয়েছে তােব, এ্যা? কথাটা মিথ্যে নয় । কী একটা মর্মান্তিক বেদনা ওর সমস্ত দেহটাকেই থর-থর করে কঁপিয়ে তুলছে। ওর হাত দিয়ে ধরা ট্রের ওপরকার জিনিষগুলি, সেই কম্পনে পরস্পরে ঠোকাঠুকি করে, একটা রিনিঝিনি শব্দে বেজে উঠলো। এবং সেই শব্দে কাউন্ট-পত্নী বিৰক্তি প্রকাশ করে বলে উঠলেন : ওকি ? ওকি ? তার এই প্রশ্নের মধ্যে যথার্থই সন্দেহের এবং ভার রেশ মূর্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু পরিচারিকা পূর্বের মতাে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ব’য়ে : ন—না, ও কিছুনা। কিছু হয় নি তাে। কী আবার হবে মা?
ইতালীর সেরা গল্প দাসীর জবাবে, কাউন্ট-পত্নী সন্তুষ্ট হতে তত পারলেন না, পরন্তু তাঁর আগ্রহ অধিকতর প্রবল হয়ে উঠলো। ওর একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরলেন। চেপে ধরে, একটা ঝাকুনি দিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলেন : কিছু হয়নি মানে? নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। বলব বলছি আমায়। তােক বলতেই হবে। খােকার—কাউন্ট-পত্নীর একমাত্র ছেলেটির, ক্ষুদ্র মাথাটি এই সময়ে ওরই ছােট্টো খাটের ধার ঘেঁসে উচু হয়ে উঠেছে। বােধকরি ছেলেটি ওদের কথাবার্তা বােঝবার চেষ্টা করছে। পরিচারিকা সজল-চক্ষে বল্লো : কলেরা-কলেরা লেগেছে মা, কলেরা লেগেছে। পাড়ায় কলেরা লেগেছে। শুনে কাউন্ট-পত্নীর মুখখানি এক লহমার মধ্যেই কাগজের মতো শাদা হয়ে উঠলো। তাঁর লালিত্য-ভরা মুখখানি শুকিয়ে একেবারে এতােটুকু—যেনাে মৃত্যুর কালাে ছায়া তার ওপর এসেছে নেমে। উনি বিদ্যুৎচালিতের মতাে উঠে দাড়ান। উঠে দাঁড়িয়ে তার ছেলেটির মুখের পানে দৃষ্টিপাত করেন। এবং পরক্ষণেই ইঙ্গিতে পরিচারিকাকে ঘর থেকে বেরিয়ে, পাশের ঘরে যাবার জন্যে আদেশ করেন। পরিচারিকা কক্ষত্যাগ করলে কাউন্ট-পত্নী ছেলের খাটের কাছে এলেন। ছেলেটি আবার কান্না শুরু করে। উনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কতাে আদর করেন। অসংখ্য চুম্বনরেখা তার কচি-গালে একে দেন। নিজে হাসেন, হেসে ছেলেকে হাসাবার চেষ্টা করেন। ওর সঙ্গে খেলা করতে থাকেন। মন ভােলাবার কতাে সুন্দর
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের বজত-মূর্তি
মার সনে
সুন্দর গল্প বলে যান। থােক তার কান্না যায় ভূলে।
হাসে, খেলা কবে।
খােকাকে ভুলিয়ে কাউন্ট-পত্নী ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তাঁর পােক
পরিবর্তন করলেন। আস্তে-আস্তে তব পেছনের দরজাটা বন্ধ করে
এসে যোগদেন পৰিচাবিকাদের সঙ্গে।
বালিক-পবিচারিকা কেঁদে ওঠে: হা-ভগবান।
আর একটি বয়ঃপ্রাপ্ত পরিচাবিক। ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। কাউন্ট
পত্নী ওদেব মিনতি কবেন : চুপ। চুপ কর বাপু তোবা। চেঁচাসনে
আস্তে। পাশের ঘবে থােকন আছে, হয়তো এখুনি ভয় পেয়ে
উঠবে। না, না—ওকে ভয় দেখানাে উচিত নয়, কখনাে উচিত নয়।
এই পয্যন্ত নীচু গলায় বলে তিনি পুনরায় ফিফিস করে
বল্লেন : হ্যা, তারপর? তারপর সেটাব কী হলো? কোথায়, কোন
জায়গায় হয়েছে ?
—এই খানে মা এইখানেই। আমাদের নায়েবের বউ, রােজা।
রোজাকে জানেন তাে ? সেই রােজার মাঝরাত্তি থেকে ব্যায়াম,
মা, মাঝরাত্রি থেকে ব্যায়াম।
—গবান আমাদের রক্ষা করুন। কিন্তু এখন—এখন সে কেমন ?
—সে তত নেই। আধঘণ্টা আগেই মৃত্যু হয়েছে তার।
এইসময় পাশের ঘর থেকে থােকার কান্নার শব্দ পাওয়া যায়।
কাউন্ট-পত্নী ব্যস্ত, যা নিতান্তই ব্যস্ত হয়ে পরিচারিকাকে বলেন : যা
মা যা ঘরের ভেতরে। থােকার সঙ্গে খেলা করগে। ওকে খুন
ইতালীর সেরা গল্প
করতে, শান্ত করতে, যা তাের ভালো বলে মনে হয়—তাই করগে
যা। যা—এখুনি ষা। আমি এখুনি আসছি। তুই যা।
এই বলে তিনি তার স্বামীর কক্ষের দিকে পা বাড়ালেন।
এই কলেরা-ব্যাধির ওপর কাউন্ট-পত্নীর একটা বিষিকা
আছে। কলেরা শব্দটাই তার কাছে যেনাে একটা নগ্ন-মৃত্যু।
ব্যাধিটিকে তিনি ভয় করেন–ভয়ানক ভয় করেন। এতে ভয়
বােধকরি সাধারণতঃ আর কারো হয় না। কিন্তু একটা কথা
আছে এর মধ্যে। তার ভয়টা অহেতুক নয়। তিনি তার ঐ এক
মাত্র খােকাকে এতাে ভালােবাসেন যে, অন্যান্য ছেলেদের মা পর্যন্ত
ওর প্রতি ঈধান্বিত হয়ে পড়েন। তা'—এই ছেলের জন্যেই তাব
এই অস্বাভাবিক ব্যস্ততা। ছেলে—তার খােকাকে তাে রক্ষা করতে হবে।
কাউন্ট-পত্নী ঝড়ের মতাে ঘরে ঢুকলেন। স্বামীকে লক্ষ্য করে
বিস্ফারিত চক্ষে বল্লেন, শুনেছাে? শুনেছে। একবার কাণ্ডটা ? গেলাে,
গেলাে সব গেলাে। শশ্মান-শখানের দৃশ্য চোখের ওপর যেনাে নেচে
বেড়াচ্ছে। ভগবান-ভগবান রক্ষা করুন।
কাউন্ট দাড়িতে ব্রাশ দিয়ে সাবান ঘষছিলেন। স্ত্রীর কথায় হাতটা
কখলেন। ব’নে হাহা, ও আমি জানি।
শুনে কাউন্ট-পত্নী একেবারে বােমার মতো ফেটে পড়লেন : কী ?
১০৪
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টেব রজত-মুর্তি তুমি জাননা ? জাননা তুমি? জেনেও নিশ্চিন্তে, নিৰ্ভবনায় বসে বসে কামাচ্ছে দাডি ? তােমার আর কিছু কি করবার নেই? আশ্চৰ্য্য মানুষ। বাপের কর্তব্য নেই? স্বামীর কর্তব্য নেই। কলেরায় পট- পটু করে লােক মারা-যাচ্ছে, আর তুমি ছেলের বাপ হয়ে, আমার স্বামী হয়ে, দিব্যি বসে আছাে ? ভাবনা নেই—চিন্তা নেই ? एगि মানুষ তুমি স্ত্রীব কথার ঝঙ্কার শুনে কাউন্ট হাত দুটি উর্ধপানে তুলে একটা নিরুৎসাহেব দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বল্লেন : সকালবেলা, কাক পক্ষী ডাকতে-না-ডাকতে এলে আমার সঙ্গে ঝগড়া ক’বতে ? আজকে সমস্ত দিনটাই দেখছি খারাপ যাবে। ভগবান, তুমিই বক্ষা করে। হা ভগবান—শুধু ভগবানই আজ আমায় বিপদ থেকে রক্ষা ক’বতে পারে। এই বলে তিনি স্ত্রীব মুখের ওপর কটাক্ষপাত ক’বলেন। এবং পরক্ষণেই গৌৰকাৰ্যে মন দিলেন। কিন্তু কাউন্ট-পত্নী সে কথায় ভগ্নোৎসাহ হলেন না। মুখ-চোখ দেখে মনে হতে লাগলাে—উনি আজ, এমনি প্রভাতকালে কী একটা নগ্ন বিভীষিকায়, নিজেকে অভাবিতভাবে উত্তেজিত এবং মুখর করে তুলেছেন। উনি হাত মুখ নেডে বলেন, আমার হুকুম। কেউ গােলাবাডীব উঠোন থেকে আমার বাড়ীতে আসতে পারবে না। আমাৰ বাড়ীর কোনাে লােকও সেখানে যাবে না। কোচ ম্যানকে ল্যাণ্ডোগাড়ী তৈরী রাখতে বলে দিচ্ছি। আধঘণ্টার মধ্যেই নিশ্চয়ই আধ বরঞ্চ ওঁব ইতালীব সেবা গল্প ঘণ্টার মধ্যেই আমরা বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু, কিন্তু কোথায় যাই বলােতাে। তুমি যেখানে ব’লবে যেতে, সেখানেই যাবে। বুঝলে সেখানেই যাবে। এখানে আর নয়। মৃত্যুমৃত্যু ডাকতে এই বাডীটার প্রতি স্থান থেকে হাতছানি দিয়ে। নাও-নাও। উঠে পডাে। দেরী করাে না । কাউন্ট ক্ষৌবকাৰ্য সমাপ্ত করে শান্তস্বরে বলেন : কিন্তু কী তুমি ক’বতে যাচ্ছ? ভেবে দেখছো মা একবার? হঠকারিতা ভালাে নয়। কোনো কাজেই হঠাৎ নামা উচিত নয়। অগ্রপশ্চাৎ ভেবে কাজ করা কি তােমার কুষ্টিতে লেখেনি ? কাউন্ট-পত্নী মুহূর্তের মধ্যেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন। অস্বাভাবিক তীব্রকণ্ঠে বল্লেন, : হঠকারিতা ? আমার মন হঠকারিতায় পূর্ণ ? কোনাে কাজ আমি ভেবে চিন্তে করি না ? কী করে তুমি এ-কথা ব’লত পাবন ? একটু চুপ করে থেকে আবার বলতে সুরু করলেন : তােমার কথা -সব কথা আমি শুনতে প্রস্তুত। কিন্তু—কিন্তু যখন জীবন-মরণের প্রশ্ন এসে হাজির হয়, যখন আমার ছেলের জীবন সংশয়াপল, তখন কারো কথাই আমি শুনতে চাইন। এখুনি—এই মুহূর্তেই, আমি এই স্থান ত্যাগ করতে চাই। বুঝণে—এই মুহূর্তেই । পত্নীর কথায় কাউট মনেমনে নিরতিশয় অসন্তুষ্ট হয়ে উঠলেন। এখুনি, এই মুহূর্তে, এই বাডী পরিত্যাগ করে অন্যত্র যাওয়া তার কাছে সত্যি-সত্যি অসম্ভব বলেই মনে হলো। তার কাজ-কারবার আছে। এই সংসারের অনেক একান্ত-প্রয়ােজনীয় দ্রব্যসামগ্রী আছে।
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজত-মুর্তি এগুলির একটা সুবন্দোবস্ত না কবে কেমন করে অতর্কিতে এবাড়ী পরিত্যাগ করে অন্যত্র যাওয়া সম্ভব হয় ? দু-চার দিন তো সময় দেওয়া আবশ্যক। এই সময়টুকুর মধ্যে না হয় একটা কিছু ব্যবস্থা করা যেতে পাবে। না—না, তিনি কোনো মতেই ঐ সময়টুকুর পূর্বে কোথাও যেতে পাবেন না—কখনো না। কাউন্ট, গীর মুখের ওপর স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে প্রবল আপত্তি জানালেন। বল্লেন : না, এ কী কবে সম্ভব হতে পারে ? চলাে, বল্লেই কি যাওয়া যায় ? আমার কাজ-কর্শের কতো ক্ষতি হবে, তা তােমার ধারণা নেই, না কিছুতেই নেই। তােমার দেখছি। সব তাতেই •• স্ত্রী বাধা দিয়ে বলে উঠলেন : কাজ-কর্ম ? এই বুঝি তােমার কাজ-কর্ম নিয়ে পড়ে থাকার সময় ঐ ? মৃত্যু যেখানে আসছে ঘনিয়ে, সেখানেও তুমি ধন-সম্পত্তি নিয়ে থাকবে পডে? প্রাণ বাঁচাবার আমাদের খােকনের প্রাণ বাঁচাবার করবে না কোনাে চেষ্টা ? ছিঃ ছি! এ কী তােমার মনােবৃত্তি ? —কিন্তু আমাদের পরবার জামা-কাপড় তো কিছু নিয়ে যাওয়া দরকার সঙ্গে করে ? গােছগাছ করবার জন্যে তো কিছু সময় আমাদের চাই। কাউন্ট-পত্নী কুঞ্চিত ক’বলেন। বল্লেন : সময় চাই—এর জন্যে তােমায় দিতে হবে দু'মাস সময়, না? ফু' তােমার কী বুদ্ধিশুদ্ধি সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে ? আমি তােমায় কথা দিচ্ছি—একঘণ্টার আগেই আমাদের ট্রাক জামা-কাপড়ে নােবাে ভর্তি করে-বুঝেছো?
ইতালীর সেরা গল্প
—কিন্তু যাবে বলেই তো আর যাওয়া হয় না। যাবার একটা
জায়গা তে চাই। কোথায় যাবে শুনি?
-প্রথমে ইষ্টিশানে। তারপর যেখানে
যেখানে তুমি যেতে বলাে,
সেইখানেই যাবাে।
নাও, নাও। আর দেরী করােনা। ঘােডা
তৈরী রাখতে বলগে।
কাউন্ট বিরক্তি প্রকাশ কবে বলেন, থাক যথেষ্ট হয়েছে।
সকাল বেলা আর বেশী বকাবকি করো না। তােমর কথায়ই
বাজী হলাম। এখুনি—এখুনি চলো। চুলােয় যাক আমার কাজ-কর্ম,
ব্যবসা-বাণিজ্য। খেতে পাই আর না পাই, তোমার সঙ্গে এই
মুহূর্তেই এখান থেকে পালানােই সব চেয়ে আবশ্যকীয় ব্যাপার।
বেশ চলে।
কাউন্ট-পত্নী নিজে প্রসাধনে মেতে ওঠেন। প্রসাধন সারেন
অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। তারপর যুক্তহস্তে ভগবানের উদ্দেশে
প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা সমাপ্ত হলে, বেল দিয়ে দাস-দাসীকে আহ্বান
করেন। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত বাড়ীটায় একটা সােরগােল পড়ে যায়।
দাস-দাসীরা তবু-তব করে সিড়ি বেয়ে ওঠা-নামা করতে থাকে।
কেউ হাসে। কেউ চীৎকার করে। কেউ আর একজনের নাম ধরে
ডাকাডাকি করে। গোলাবাডীব সুমুখের বাতায়ন গুলি কাউন্ট-পত্নীর
আদেশে, দাস-দাসীর দেয় বন্ধ করে। এবং এই বাতায়ন গুলি বন্ধ
করে দেওয়াতে, গােলাবাড়ী থেকে মাতৃহারা শিশুদের ক্রন্দন আর
এ-বাড়ীতে ভেসে আসে না। ঐ গােলাবাড়ী থেকে একটু পূৰ্বেও
১৮
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজত-মুর্তি ক্লোরিণের একটা দুর্গন্ধ এ-বাড়ীর জানালাগুলি ডিঙিয়ে ভেতরে আসছিল। কিন্তু জানালাগুলি বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে, সেই বিশ্রী গন্ধটা থেকে এখন নিস্তাব পাওয়া যায় । কাউন্ট-পত্নী কুদ্ধস্বরে দাসীদের বলেন: ঈঃ কী বি গন্ধ আস ছিলাে ক্লোরিণের। কিন্তু কী বােকা ওরা। ক্লোরিণ ব্যবহার করে সমস্তই নষ্ট করে ফেলছে। ক্লোরিণ—ক্লোরিণে হবে কি? ছাই হবে। মাঝখান থেকে একটা উৎকট গন্ধ এসে মানুষকে রুগ্ন করে তুলবে । নাও,—ট্রাকে সব ভর্তি করো। ও-ক’য়েছে। ভর্তি। আচ্ছা, এবার ওগুলােতে চাবি দাও। একটু চুপ করে থেকে পুনরায় বলেন : ক্লোরিন ব্যবহার করে কোনাে ফল নেই। চেয়ে বরং সমস্ত পুড়িয়ে ফেললে কাজ হয়। ব্যাধি প্রসার লাভ ক’বতে পারে না। কেমন কি না? S: কাউট প্রস্তুত হয়ে এসেছেন। এসেছেন, তার স্ত্রীর কক্ষে। দাস-দাসীদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে, স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বল্লেন " এদের সবাইকে নিয়ে যাবে নাকি? কী সর্বনাশ । এতাে গুলো। লােককে নিয়ে কাউন্ট-পত্নী বাধা দেন। বলেন : তােমার যা ইচ্ছে। ওদের যদি নিয়ে না যাও, তবে অন্য জায়গা পাঠিয়ে দাও। এখানে, এই বাড়ীতে থাকা, সম্পূর্ণ বিপদজনক। আমি চাইনে, সত্যি আমি চাইনে-ওদের কলেরা হােক।
ইতালীর সেবা গল্প একটু থেমে আবার বলেন : আমি চাইনে, আমার ঘর, আর ভালাে ভালাে গাউন লাে ক্লোরিণ ছডিয়ে ওরা দেবে নষ্ট করে। হাজার হোক ওরা মাইনে করা লোক। আমাদের ভালাে ভালাে জিনিষ গুলাের ওপর দরদ থাকবে কেন বলাে ? শুনে কাউন্ট দুঃখের আতিশয্যে মৃদু ভৎসনা কবে বল্লেন : তুচ্ছ ব্যাপারে তুমি এত অধীর হয়ে উঠ ঠছো ? তারপর, তারপর দেখে তুমি কততখানি স্বার্থপর হয়ে পড়েছে। চোরের মতাে এখন থেকে চাইছো তুমি সরে পড়তে ? ছিঃছিঃ। তােমাব লজ্জা হওয়া উচিত,-হা নিশ্চয়ই লজ্জা হওয়া উচিত । ভীতু-ভীতু তুমি। অত্যন্ত ভীতু। স্বামীর এই শ্লেযপূর্ণবাক্যে স্ত্রীর জ্ব-দু’টি কুঞ্চিত হয়ে ওঠে। দু’ হাত দু' দিকে প্রসারিত করে উত্তেজিত হয়ে বলেন : ধন্য ধন্য তােমরা পুরুষ মানুষ। যে-কথা এইমাত্র বলে, সে-কথা সত্যিই তােমাদের, মানে পুরুষ মাষদেরই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। পুরুষ মানুষে এমনি অবিবেচক হয়। এই বলে তিনি জিব এব তার সংঘােগে একটা অব্যক্ত শব্দ করে পুনরায় বলেন: সংসার—তােমার সংসারের নির্বিঘ্নতা, তােমার চোখে হয়ে উঠলাে নগণ্য-উপেক্ষার আর যতাে কাজে, যতো আদর্শের হয়ে দাড়ালাে—এমনি দুঃসময়ে সাহসী হওয়া? বলেন : তুমি আমায় বলছে, আমি স্বার্থপর । কিন্তু নিজের দিকে একবারও ফিরে দেখছে না? তুমি নিজেই তাে স্বার্থপর। কেননা ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজত-মূর্তি তুমি মনে করছে, এমনি করে এখান থেকে চলে গেলে, লােকে তােমায়—ছি, ছি, করবে। জনপ্রিয়তাই তােমার একমাত্র উদ্দেশ্য। কাউন্ট-পত্নী ক্ষণকালের জন্যে মৌন থেকে পুনরায় শুরু করেন। আচ্ছা, তােমার সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে যদি তোমার এততাই আগ্রহ, তবে তুমি মেয়রসাহেবকে ডেকে তার হাতে একশােটি লায়ার দিয়ে এই জায়গার কলেরা রুগীদের ভালাে করে চিকিৎসা করার বন্দোবস্ত করছে না কেন ? একথার প্রত্যুত্তরে কাউন্ট কোনাে কথা বলেন না। শুধু দাস- দাসীদের আদেশ করলেন, তাদের আরাে কাতােকগুলি দরকারী জিনিষ ভরে রাখতে। * খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরাে গােটা তিন-চার ট্রাঙ্ক কানায়- কানায় ভরে উঠলাে। :- তাদের খােকার খেই বা কত রকমের। কাঠের ঘােড়, ডাল-পুতুল, ফুটবল, দম দেওয়া মােটর গাড়ী,এগুলি সমই ট্রাক ঠাসাঠাসি ক'রে রাখা হলো। তারপর, কতাে রংমের কতো ভালাে ভালো পােক। দরকারী, অদরকারী—অনেক জিনিষে ট্রাক উঠলে ভর্তি হয়ে। এমনি ভাবে ভত্তি হয়ে উঠলাে যে, এর ডালা কিছুতেই যায় না বন্ধ করা। গায়ের জোর দিয়েই ট্রাকগুলির লা বন্ধ করা সম্ভব হলাে। ট্রাঙ্কগুলিতে তালা লাগিয়ে কাউন্ট-পত্নী এঘর ও-ঘর করতে লাগলেন। টেবিলের ড্রয়ার ধরে টেনে দেখেন, চাবি দেওয়া হয়েছে কি না। আলমারীর পা ধরে টানাটানি করেন। দেখেন, সত্যি সেরা গল্প এতে চাবি দেওয়া হয়েছে। কাউন্ট, স্ত্রীকে অনুসরণ করছিলেন। তিনিও ওর সঙ্গেসঙ্গে পরীক্ষা করে দেখছিলেন। তার ব্যস্ততা দেখে মনে হলো তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই এ-বিষয়ে উৎসুক হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এটা আশাতিরিক্ত। কাউন্ট-পত্নী স্বামীর এই উৎসাহ দেখে, মনেমনে খুশী না হয়ে থাকতে পারলেন না। —দুই- মিনিট পনেরাে-কুড়ি পর- ওদের ভিলার দরজায় ল্যাণ্ডো-গাড়ী অপেক্ষা করছে। যাবার সমস্ত আয়ােজন সম্পূর্ণ। কাউন্ট-পত্নী যাত্রার পূর্বে নিজের নিরালা শয়ন কক্ষে ফিরে আসেন। এখানে এসে উনি শেষবারের মতো প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা করেন, একখানা চেয়ারের স্বাথে নতজা হয়ে বসে। যুক্তহস্তে উৰ্দ্ধপানে তাকিয়ে ভগবানকে স্মরণ করেন। ভগবানকে কাতর অনুরােধ জানান। কিন্তু কাউট-পত্নীর এই অক্ষট প্রার্থনায় এবং কাতর অনুরােধের মধ্যে একটা বিশিষ্টতা চোখে পড়ে। যে সব হতভাগ্য শিশুর, তাদের মাকে এই কলেরা-ব্যাধিতে হারিয়ে বসেছে চিরকালের মতে, তাদের জন্যে তিনি ভগবানের কাছে কোনাে নিবেদনই জানান । যারা, মানে যে-সব গরীব দীন-মজুর, যে-সব হতভাগ্য চাষীরা, তাঁর এই বিপুল ঐশ্বর্যের মূলে আছে, তাদের জন্যে ভগবানের - ১১২ ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজত-মূর্তি কাছে প্রার্থনা করেন না। যারা নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে তার সশদ খাড়া করে দিয়েছে, তাদের যেনাে এই কাল-ব্যাধি নিস্তান দেয়, এই উদ্দেশ্যে কোনাে প্রার্থনাই উনি করেন না। কাউন্ট-পী নিজের জীবনের জন্যেও কাতর মিনতি জানান না। শুধু তাঁর থােকন—এই খােকনের জন্যে, এই খােকনের জীবন যাতে নিরাপদ থাকে, সেই প্রার্থন, সেই কাতর অনুবােধ, তিনি ভগবানের কাছে করেন । কাউট-পত্নী উঠে দাঁড়ালেন। গায়ের ওপর একটা বহিরাবরণ চাপিয়ে সম্মুখের বাতায়নটা দিলেন বন্ধ করে। প্রভাতের ফু-ফুৰ করে প্রাণ মাতানাে বাতাস বইছে। বাতাসে--আকাশের ওপর দিয়ে মেঘগুলি যাচ্ছে ভেসে। ভিলার মুখে একটা উদ্যান। এই উদ্যানের ভেতরকার ঝাউ গাছগুলি মৃদুমন্দ বাতাসে হেলে-দুলে হাত নেডে যেন ওকে বিদায়-বাণী জানাতে চায়। কিন্তু ওঁর ওদিকে আদৌ ভ্রুক্ষেপ নেই। তার শিশুকালের কতো স্মৃতিই না-জানি এই উদ্যান, এই গাছপালার সঙ্গে মিশে আছে। কাউট-পত্নীর সে-সব ভুলেও স্মরণপথে পড়তে চায় না। কাউট-পত্নী তাড়াতাড়ি সিড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলেন। মেয়র এই খানিকক্ষণ হলাে ওঁদের ঘােড়র গাড়ীর পাশে এলে দাড়িয়েছেন। দাড়িয়েছেন একেবারে দরজার গা-ঘেঁসে। 1 মেয়র কাউন্টের সঙ্গে কথা কইছেন। কাউন্ট-পত্নী এসে উপস্থিত। উনি ওঁকে উদ্দেশ করে বলেন : আপনি কি বাড়ী থেকেই আসছেন ?
ইতালীর সেরা গল্প
মেয়র সবিনয়ে উত্তর করলেন : হ্যা ! বাড়ী থেকেই আসছি।
আপনাল দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন এনে, আর থাকতে পারলাম
ৰ। ভাবলাম, যাই একবার না হয় দেখা করে আসি। কি বলেন,
ভালল করিনি?
-বেশ করেছেন।
এই বলে কাউন্ট-পত্নী খােকাকে কোলে নিয়ে গাড়ীতে উঠে
বসলেন। বল্লেন : কিন্তু এই সংক্রামক ব্যাধি ধ্বংস করবার আপনি
তত কোনো উপায়ই করলেন না দেখছি।
এ রকম নিস্পৃহ থাকা মেয়রের
পক্ষে ভারী অন্যায়, হঁা নিশ্চয়ই ভারী অন্যায়।
মেয়র বিনয়সূচক মুহ-হাঙ্গে বল্লেন, ক্ষমা করবেন। আমার
দোষ হয়ে গেছে।
কাউট-পত্নী বল্লেন : না, না , ক্ষমা চাইবেন না। আপনি মেয়র।
আপনার কি ক্ষমা চাওয়া শােভা পায় ?
এই সময়ে কাউন্ট গাড়ীতে উঠলেন। স্ত্রীর পাশে বসলেন।
কাউট-পত্নী স্বামীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিফিস
করে প্রশ্ন করলেন, ওঁকে, মানে মেয়রকে টাকা দিয়েছো?
স্বামী নীরবে শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন।
মেয়র পুলকিতমনে কাউন্ট-পত্নীকে উদ্দেশ করে
বলেন :
আপনাকে ধবাদ। সহ তাদ। মাপনার উদারর, যার
কাউট গাড়ীর ভেতর থেকে গলাটা বাড়িয়ে, বাধা দিয়ে বলে
উঠলেন, না, না, ও কিছু না কিছু না।
১১
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজত-মৃত্তি
গাড়ীর ভেতরে ভালাে করে বসে কাউন্ট-পত্নী এবার সুমুখে
অবস্থিত জিনিষগুলি বেশ ক'রে দেখে নেন। : হা-ব্যাগ, বায়,
কোট, শাল, পুরুষের মেয়েদের ছাতা—সমস্তই ঠিক আছে।
কোনােটাই নিতে ভুল হয়নি। স্ত্রীর দেখাদেখি কাউটও ল্যাভো-
গাভীর পেছনে মাল রাখবার জায়গাটার ওপর দিয়ে কয়েকবার
দৃষ্টিপাত করেন। ভাবটা এই যে, সমস্ত মালপত্তর ঠিক আছে কিনা
জেনে নেওয়া।
হঠাৎ কাউণ্ট প্রশ্ন করেন ? এখানে একটা ছােটো ছেলে
দেখা যাচ্ছে। ওর কী হলাে বলাে তাে?
শুনে কাউন্টের স্বী উত্তেজনায় বলে ওঠেন : সত্যি তো।
যেনাে কঁদছে ।
এই বলে তিনি গাড়ীর ফাক দিয়ে মুখটা বাইরের দিকে বাড়িয়ে
দিলেন।
একটা কৃষক ভৃত্যদেব মালপত্তর গাভীর ওপব তুলতে সাহায্য
করছিলাে। ওর সঙ্গে একটা ছোটো ছেলে।
অতি বি চেহারা
তার। সেই কাদছিলাে।
কৃষকটার ছেলে সে।
ওর বাবা ওকে
ধমক দিয়ে বল্পে : চুপ চুপ, কব তুই হতভাগা। খালি ভ্যা ভ্যা
করে কঁদলে হবে কি?
কাউট-পত্নী জিজ্ঞাসা ক’বলেন : কী হলো তার ঐা। এতে
কাদছিস কেন?
ছেলেটি ফুপিয়ে বল্লো : মা—আমার মার মুখ ।
কালো হয়েছে তার।
ইতালীর সেরা গল্প শুনে এক নিমিষে কাউন্টের স্ত্রীর মুখখানা শুকিয়ে কাগজের মত শাদা হয়ে উঠল। গােলাপ ফুলের মতাে রাঙা গাল দু’টি বিবর্ণ, ফ্যাকাসে হয়ে গেলাে। গাড়ীর ভেতরেই তিনি একটা লাফ দিয়ে এদিক পানে সরে এলেন। এবং পরক্ষণেই কোচম্যান্কে ভষমিশ্রিত কণ্ঠে বল্লেন : চাও-শীগ্যির। শীগ্যির চালাও-জলদি। আদেশমাত্রই কোচম্যান ঘােডা দু’টির পিঠের ওপর সজোরে চাবুকের আঘাত করলো। এরা হ্রেষারবে ছুটতে লাগলাে। মের এর জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না। হঠাৎ ঘােডা দুটি গাডীটাকে টেনে নিয়ে মুখ দিকে অগ্রসর হতেই, তিনি লাফ দিয়ে এদিকে সরে এলেন। নইলে, গাড়ীর চাকা বােধ করি ওঁর পা-দুটিকে আস্ত রাখতো না। যাক মেয়র সাহেব খুব জোর বেঁচে গেছেন আজ। গাড়ী চলতে সুরু করলে কাউন্ট একমুঠো তামার পয়সা সেই কৃষকটির পা লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলেন। ও পাষাণের মতো শুব্ধ হয়ে দাড়িয়ে দেখে। ছেলেটার কান্না তখনাে থামেনি। গাড়ীর চাকাব ঘূর্ণায়মান গতির পানে পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে সেই কৃষকের, (যে জাতির প্রাণ, জাতির মেরুদণ্ড, জাতির ঐশ্বর্যের যা কিছু সব)—মুখ দিয়ে, অব্যক্ত অন্তর্যাতনায়, ধনী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটা অতি বিশ্রী শ্রুতিকটুকথা এলাে বেরিয়ে। এই গালাগালিটা যেনাে শুনতে পাননি, এমনি ভাৰ দেখিয়ে মেয়র সেখান থেকে চলে এলেন। T ১১৬ ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজত-মৃত্তি কৃষকটার বয়েস বেশী নয় । আবয়েসী। ছেলেটীর মতােই ক, পার চেহারা । সে ছােলটীকে দিয়ে রাস্তার ওপর ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পয়সাগুলি কুড়িয়ে নিলে। তারপর ওরা দুজনে একসঙ্গে নিজেদের মাথা গোঁজবার আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালে । এই অভাগা কৃষকটীর জীবনের দুঃখের একটা ইতিহাস আছে। ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে কাউন্ট-পত্নীর জমিদারীতে বাস করে। অতি সামান্য এতটুকু একটা ঘরে কোনােমতে ওদের তিনজনের মাথা গোজবার স্থান। ক্ষুদ্র পরিবার। মাত্র তিনটি প্রাণী সংসারে। কিন্তু তবু, এই অল্প-পরিসর আশ্রমে ওদের বড়াে কষ্টে দিন কাটাতে হয়। ঘরেব মাথার ওপর একটা চালা। কিন্তু এই চালাটা বৃষ্টির জল থেকে ওদের রক্ষা করবার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বখন বর্ষা নামে, তখন ওদের কষ্টের আব দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। যেদিকে সরে যায়, সেইদিকেই বৃষ্টির জল ওদের অস্থির করে তােলে। তারপর আবর্জনার অত্যাচার। এখানে ওখানে আবর্জনা থাকে জমা হয়ে। জমিদারের লােক পরিষ্কার করে নিয়ে যায় না। ওরা দিনরাত্রি খালি মদ খায়। মদ খেয়ে আবার মাঝেমাঝে অন্যস্থানের আবর্জনা বহে এনে, এইস্থানে জড়ো করে। এই কৃষকটী নিজের অভিযােগ জমিদারের কাছে অসংখ্যবার জানিয়েছে। কিন্তু কে, কার কথা শােনে ? জমিদার এদের সুখ-সুবিধের দিকে উদাসীন। ঘরের একপাশে কৃষকের স্ত্রী একখানা ছােটো তক্তার ওপর য়ে আছে। ওর মাথাটা শয্যার ধার 'যেসে বাইরের দিকে পড়েছে ১১৭
ইতালীর সেরা গল্প
বুকে। মুমূর্ষ, অবস্থা ওর। কলেরা-রাক্ষুসী মৃত্যুর কালাে-ছায়া ওর
মুখের ওপর দিয়েছে বিছিয়ে। চেহারা দেখে বােঝবার উপায় নেই, ওর
এককালে সৌন্দৰ্য্য ছিলাে—দেহে ছিলাে কমনীয়তা। বয়েস বেশী নয় ।
খুব বেশী হয়তো তিরিশ-ই যথেষ্ট। কিন্তু কে এখন সে-কথা করবে
বিশাস ? এই বয়েসেই সে হয়ে উঠেছে বিগত-যৌবনা।
ঘরে আসতেই, কুষকে পা অতিকষ্টে ক্ষীণকণ্ঠে ওর স্বামীকে
উদ্দেশ করে বল্পে :
খােকাকে এখান থেকে সরিয়ে দাও।
এই ব'লে ০ কযেক মুহুর্ত নীরব হয়ে রইলো।
পুনর্বার বল্লে ।
-থােকন, বাবা--তুমি তােমার কাকীমার কাছে যাওতে।। আমার
কাছে তােমায় থাকতে নেই বাবা।
তারপর স্বামীকে লক্ষ্য করে বল্লে
এখান থেকে একে নিয়ে যাও। বল্লে, ধৰ্ম্মযাজককে পাঠিয়ে
দাও শীগ্যির।
যাচ্ছি। এখুনি আমি যাচ্ছি।
এই বলে কৃষক ছেলেটির দিকে ফিরে চাইলো। ওকে দরজা
দেখিয়ে দিয়ে বলে :
—যাও বাবা, তােমার কাকীমার কাছে যাওতো। দেখছে না,
তােমার মার বড়াে অসুখ।
ছেলেটি সজলচক্ষে তার মরণাপন্ন মায়ের মুখের দিকে বহুক্ষণ
নিঃশবেই রইলাে চেয়ে। চেয়ে থাকতে থাকতে, ওর ফল
T
১৮
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজত-মুৰ্ত্তি
দু'টির ওপর দিয়ে আর বডােডো ফোটা গড়িয়ে পড়তে
লাগলাে।
এই দেখে ছেলেটির মারও কোটরগত চক্ষু দুটি, অতে চকচক
করে উঠলাে। বাষ্পরুদ্ধকঠে, অতিকষ্টে বল্লে :
—ছিঃ খােকন কেঁদোনা। তুমি কাকীমার কাছে গিয়ে দু একদিন
থাকগে। ত’ হলেই আমি আবার সেরে উঠবাে ।
ছেলেটি এবার, তার অশ্রুসিক্ত মুখপানির ওপর হাত দুটি চাপ
দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাে।
এই ক্ষুদ্রঘরের বাইরে একটুখানি একটা রান্নাঘর।
(থকে বেরিয়ে এলো। একগাদা খড় নিয়ে এলো জোগাড় করে।
বিছিয়ে রাখলাে এই রান্নাঘরে। তারপর স্ত্রীর কাছে ফিরে এলো।
কোমলকণ্ঠে বল্লে :
—দেখো, বলতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু না বলে
উপায়ও দেখছিনে। তুমি যদি এই বিছানার ওপর মারা যাও,
তাহলে, এই বিছানাটাই আমাকে পুড়িয়ে নষ্ট করতে হবে।
তার চেয়ে বরং এক কাজ করাে। রান্নাঘরে আমি
শড এনে মেঝেতে বিছিয়ে ভারী চমৎকার বিছানা তৈরী করেছি।
তুমি যদি
ইতালীর সেরা গল্প কথাটা কৃষক শেষ করতে পারলে না। পারলে না শতচেষ্টা করেও। একটা প্রবল-সঙ্কোচ তাকে ভেতর থেকে বাধা দিলে । কিন্তু যক-পত্নী স্বামীর মনের ভাব বুঝতে পারে। ও তক্তা ছেড়ে অতিকষ্টে একটুখানি উঠতেই, স্বামী এসে দু-হাত বাড়িয়ে তাকে পাজাকোলা ক'র তুলে নেয়। কৃষকের স্ত্রী, অদূরে দেয়ালে টাঙ্গানো যিশু খ্রীষ্টের ক্ষুদ্র ক্রুশবিদ্ধ রজত-মৃত্তিটির কাছে নিয়ে যেতে স্বামীকে ইঙ্গিত করলাে। স্বামী স্ত্রীর আদেশ মতাে দেওয়ালটার ধার ঘেসে দাড়িয়ে ওর হাতে ক্রুশ বিদ্ধ রজত-মূর্তিটি তুলে দিতেই, ও সেটিকে বক্ষের ওপর অত্যন্ত ভক্তি এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে চেপে ধ’বলাে । তারপর, নিজের ওষ্ঠদ্বারা সেটিকে ঘন-ঘন চুম্বন দিতে লাগলাে। কৃষক এই অবস্থাই ওকে নিয়ে এলাে বান্নাঘরে। খডের বিছানার ওপর শুইয়ে দিয়ে ধর্মযাজকের উদ্দেহে বেবিয়ে পড়লাে। সেই জনমানবহীন বিশ্রী রান্নাঘবের একপাশে, খড়ের বিছানার ওপর ওয়ে, কৃষকের হতভাগ্য স্ত্রী। ওর দু-চোখের কোণ বেয়ে, এবার খাবণের ধারার মতে অশ্রু ঝরে পড়তে লাগলাে। ও উপলব্ধি করছে, বেশ ভালাে করেই উপলব্ধি করছে—তার জীবন প্রদীপের তৈলের আধার নিঃশেষ হয়ে আসছে। হয় তো এখুনি, চিরকালের মত প্রদীপটি নির্বাপিত হয়ে যাবে। তাই, আজ যাবার দিনে, সে কাতরতার সঙ্গে প্রার্থনা করতে লাগলাে। প্রার্থনা করতে লাগলাে, তার আত্মার মুক্তির জন্যে। ওর বিশ্বাস, দৃঢ় বিশ্বাসও করেছে ১২ ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের বজত-মূর্তি অনন্ত পাপ। এবং সেই পাপের জন্যেই তাকে এমনি অসহায় ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে। —তিন- মেয়র বােধকরি সংবাদটা পেয়েছিলেন। তাই তিনি দয়া করে একজন ডাক্তার এখানে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু এই ডাক্তারের শরীরে মেদের যেমন অভাব ছিলাে না, মনে ভয়ের তেমনি প্ৰাচুৰ্য্য ছিলাে। অসম্ভব ভীরু প্রকৃতির লােক। রুগীব অবস্থা দেখে তিনি যেনাে কেমন নার্ভাস হয়ে পড়লেন। করলেন রুগীব স্বামীকে—ঘরে র্যাম” বা “মারসালা” আছে কি? কিন্তু দরিদ্র কৃষক পরিবারে, এ-সব দামী মদ কি করে পাওয়া যেতে পারে ? কাজেই, ডাক্তাব যখন শুনলেন, ও জিনিষ দুটির একটি ঘরে নেই, তখন তিনি ব্যবস্থা করলেন-গৰম ইট ক্লষক পত্নীর পেটের ওপর দিতে । ডাক্তার বেরিয়ে এলেন রুগীর ঘর থেকে। তার দেহে যেনে প্রাণ ফিরে এলো। ডাজার বিদায় নেবার ক্ষণকাল পরে ধর্মযাজককে সঙ্গে করে কৃষক আর ঘরে ঢুকলাে। ধৰ্মৰাজকের ভয় নেই, ভাবনাও নেই। তিনি ১২১ ইতালীর সেরা গল্প কৃষকের মুমূর্ব, স্ত্রীর শিয়রে দাড়িয়ে, ভগবানের নাম করতে লাগলেন। শুনে স্ত্রী লােকটির মনে একটা স্বর্গীয় ভাব আয় করলাে এবং এই স্বর্গীয় ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে সে পরম শান্তিতে মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাে। ধর্মযাজকের কাজ শেষ হলে, তিনি বেরিয়ে এলেন। আরাে দু-মুঠো খড এন, স্বীর পিঠের তলায় স্থাপন করলাে। এবং ডাক্তারেব নির্দেশমতে গবেব একপাশে আগুন জাবিতে। আললে ইট উত্তপ্ত করবার জন্যে। কৃষক-পত্নী এতক্ষণ সেই ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের ক্ষুদ্র বঙ্গত-মূর্তিটা হাতে করে নিয়ে চুপ কবে শুয়ে ছিলাে। এখন সে হঠাৎ ঐ রজত মূৰ্ত্তির কুশটাকে প্রাণ ভরে চুম্বন ক’বতে সুরু করলাে। চুম্বন করতে করতে তার মনটা ফিরে গেলাে তার দিকে, যিনি এটিকে-ঐ যিশুখ্রষ্টের এই বত-মূর্তিটিকে,—দান করেছিলেন । এখন থেকে যােলবছর পূর্বে, বর্তমান কাউট-পত্নীর মাব আদেশে, মেয়ে তাঁর কৃষকের কন্যাকে এটি উপহার দিয়েছিলেন। তখন এই কাউন্ট-পত্নী, মানে যিনি কলেরার ভয়ে গ্রাম পরিত্যাগ করে সরে পড়লেন, তিনি সম্প্রতি যৌবনের সাক্ষাৎ পেয়েছেন নিজের দেহে। তর মা এখন বেঁচে নেই। কিন্তু তার সুকীর্তি তাকে এখনো লােকের মপাে বাচিয়ে বেখেছে। এবং বােধকরি অনন্তকাল ধরে বাঁচিয়ে রাখবে। কৃষকের স্ত্রী এখন অনুতপ্ত। অনুতপ্ত এই কারণে যে, সে বহুবার বর্তমান কাউন্ট-পত্নীর বিরুদ্ধে তার স্বামীর কাছে অভিযােগ করেছে। এবং এই অভিযােগের ওপর ভিত্তি করে তার স্বামী আবেদন করেছে শবিদ্ধ
ক্রুশবিদ্ধ যিশুখ্রীষ্টের রজতমূর্তি
কাউন্টের স্ত্রীর কাছে তাদের ঘর-দোর মেরামত করে দেবার জন্যে।
কিন্তু তার সেই আবেদন কাউন্ট-পত্নী কানে তােলেন নি। এবং
সেই
জন্যে,
তার স্বামী পরমদুঃখে তঁাকে
বারই না
অভিসম্পাত করেছে ।
কৃষকের স্ত্রী এর জন্যে, আজ তার জীবনের শেষদিনে, মনে মনে
কাউন্ট এবং কাউন্ট-পত্নীর কাছ থেকে ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগলাে।
ভগবানের কাছে সে এই প্রার্থনা করলে, যেনাে তিনি এই কাউন্ট-দম্পতির
কোনাে অমল না করেন ।
ডাক্তারের নির্দেশমতো উতপ্ত ইট রুগীর পেটের ওপরে রাখব
মুহূর্তকাল পরেই কৃষকটি দেখলে, তার স্ত্রীর দু’চক্ষু উঠেছে কপালে।
একবাৰ সমস্ত শরীরটা, ভেতরের কী এক অদৃশ্য শক্তিতে হঠাৎ
থরু-খব কবে কেঁপে উঠলাে।
তারপর সব শেষ।
সেই দিন অপরাহু কাউবে কয়েক জন ভৃত্য, মনির খান
বৈঠকখানায় বসে পরম তৃপ্তির সঙ্গে “ব্যাম” এবং “মারসালা”
পান করছিলাে।
সানন্দ সঙ্গ
বৃষ্টি পড়ছে। সমস্ত দিন ব’বে বৃষ্টি পড়ছে। বাস্তা-ঘাট কর্দমাক্ত।
বি—অতি বিল দিন। মানুষের মন অজানা কী একটা সুরে
ধূত হয়ে ওঠে। কিছু ভালো লাগেনা।
গিগি ক্যাভালারী বা পিভিয়ন। একই লােকের দু’টি
দু’টি নাম।
পােষাকী আর আটপৌরে । গিগি ক্যাভালারী, এই নামটি হলো
পােষাকা। পিভিয়ন, নামটি হলাে আটপৌরে ।
পােটারােমনা শহর থেকে বেরিয়ে এলাে গিগি। পায়ে জুতত
আছে বটে, কিন্তু তাতে হিন্ নেই। মাখায় ছাল নেই। পায়ের
গতির সঙ্গে পথের কাদা উঠছে তার পা-জামাতে। বৃষ্টিতে ভিজে
সে ঠিক কাকের মতো হয়ে উঠলো। মাথায় টুপি বেয়ে বৃষ্টির
জল ওব দেহের চারিদিকে ঝর্ণার ধারার মতাে গড়িয়ে পড়ছে।
পড়ক—তাতে ওর কোনাে ক্ষতি নেই। কোনো ক্ষেপও নেই
১২৪
সান সদ
তার। যেনাে এমনি জমে তেজ। এর দৈনন্দিনের সই করা
ব্যাপাব।
গিগি অগ্রসর হয়। পায়ের গতি দ্রুত, অথচ সতর্ক। চনতে
চলতে ও পেছন ফিরে দৃষ্টিপাত করে, এবং পরক্ষণেই সুমুখভাগে
অবস্থিত গাছ-ঝাউগাছের দিকে চোখ ফিরিয়ে চায় । পথে লােক
-এই দুর্যোগে বেরুবে ?
নেই।
গিগি একটা ছােটো বাড়ীর সামনে এসে দাড়ালাে।
পরিশ্রমক্লান্ত দেহটা অবশ হয়ে পড়েছে। চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ
করে ও পকেট থেকে একটা চাবি বের কবলে। দরজা খুলে
তেতবে এসে আবার ওটা দিলে বন্ধ করে।
তারপর অতি কষ্টে সিড়ি বেয়ে একটা অপরিষ্কাৰ ছােট্টো ঘরে
এসে পৌঁছলে ।
এই ঘরে বিছানার ওপর একটি মেয়ে শায়িত। পরণে তার
সুদৃশ্য পােক।
মাথার চুল সুশ্রী, সুন্দর। ওর রাঙা চোখ দুটি
দেখলে বােঝা যায় যে, প্রবল হয়ে সে পীড়িত। সিডির ওপর
পায়ের শব্দে সে ধীরে ধীরে দরজাটার দিকে কোনো মতে মাথাটা
দিয়ে ছিলো ফিরিয়ে। এখন গিগিকে দেখতে পেয়ে ওর সমগ্র
মুখমণ্ডল একটা অনির্বচনীয় আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলাে। ওঠে
ধার ঘেঁসে একটা তীব্র হান্তরেখা, বিদ্যুতের মতােই গেলে
খেলে।
ইতালাব সেরা গল্প
মেয়েটির পায়ের দিকে একটি ক্ষীণ দুর্বল বুদ্ধ বসে। গিগি
তাকে নিয়ে প্রশ্ন করলাে, ও আছে কেমন ?
বৃদ্ধা বল্লেন, ও তো এই রকম আছে।
শুনে গিগির মন বিরক্তি এবং অসন্তোষে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
পকেটের ভেতর থেকে কাগজেমােড় একটা বা
বলে, আমি কুইনাইন এনেছি।
এই বলে সে মাথা থেকে ট প খুলে এক জায়গায় রাখলাে।
গায়ের ভিজে কোটটা খুলে রাখলে একটা হুকে টাঙিয়ে। মেয়েটি
তখনাে পর্যন্ত ওঁর দিকে স্মিতহাস্যে চেয়ে ছিলাে। গিগিও বহুক্ষণ
পর্যন্ত ওর মুখের পানে নিনিমেষে চেয়ে রইলাে । গিগির শীর্ণ
পাওর মুখ পাপের, অনিদ্রাব এবং ভীতির রেখা মূর্ত হয়ে বয়েছে।
এর অন্তরে সহসা প্রীতির এবং ভালােবাসার শিহরণ জেগে ওঠে।
সে ধীরে ধীরে পরমস্নেহে মেয়েটির কেশের ভেতর অঙ্গুলি সঞ্চালন
করলে। এমনি ভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে ও মেয়েটির উত্তপ্ত
ললাট নিজের একখানি হাত দিয়ে স্পর্শ করলে।
কোমলম্বরে প্রশ্ন করলে, কেমন আছাে গিউলিয়া ?
অতিকষ্টে গিউলিয়া বল্লে, ভাললা—অনেক ভালাে।
গিগি নীরবে ওর মুখের প্রতি চেয়ে রইলাে। একসময়ে মনে
হলে', যেন ওর দৃষ্টি গিউলিয়ার মনের অন্তর্দেশে গিয়ে পৌছিয়েছে।
সে ঐ ভাবেই চেয়ে ছিলাে। কিন্তু বৃদ্ধার স্পর্শে সে চোখ ফিরিয়ে
ওর দিকে চাইলাে। তিনি ওর হাতে এক গেলাস জল দিলেন।
বল্লেন, ওষুধটা এখন ওকে কি খাইয়ে দেবে?
১৬
সানন্দ' সঙ্গ
দিয়ে তুলে
গিগি নির্বাক্যে মােড়ক থেকে একটা পাউডার তুলে নিয়ে সেট
জলের মধ্যে দিলে ফেলে। তারপর মেয়েটির মাথা পরময়ত্বে নিজের
ওষুধটা—সেই কুইনাইনের প্রথম ডােজটা
খাইয়ে দিলে।
গিগি বৃদ্ধাকে
বলো, জামাগুলাে যদি
গা
খুলে নেওয়া যায়, তা হলে কিছুটা আরাম বােৰ ক’বতে
পারে।
-কিন্তু আমার মনে হয়, গিউলিয়া বড়ো দুর্বল। এবং আমার
পক্ষে একা সব দিকে যs নেওয়া অসম্ভব । তুমি একটু সাহায্য
করাে না। করবে ?
বৃদ্ধা, নিজের একখানা হাত গিউলিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিতে,
গিগি প্রবল ভাবে বাধা দিলাে। বল্লো, না না। তুমি এদিকে এসো।
একটা কথা শােনাে।
এই বলে গিগি গিউলিয়ার চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করলো।
দেখলাে, সে দু’চোখ বুজে স্থির হয়ে পড়ে আছে।
গিগি সিডির পথ ধরলো। ধরে নীচে নামতে লাগলাে। বৃদ্ধ
ওর পেছন-পেছন 'আসছিলেন। ও বল্লো, দেখাে, ঐ পাউডারের
একটা, কি বড়জোর দু'টো দু’ণ্টা অন্তর গিউড়িয়াকে খাইয়ে
দিও। কালকে বিকেলের আগেই, ওর জর ছেড়ে যাবে। কিন্তু
ও যেনাে ঠাণ্ডা না লাগে' সাবধান, ওর শরীর থেকে জামাটাম
মে না।
১২।
ইতালীর সেরা গল্প এই পর্যন্ত বলে গিগি মুহূর্তমাত্র নীরব হয়ে রইলো। নিম্নস্বরে বল্লে, তোমাদের দু'জনেরই এখান থেকে পালানাে দরকায় হয়ে দাড়িয়েছে। বুঝলে, পালানো দরকার হয়ে উঠেছে। শুনে বৃদ্ধা হতাশ হয়ে পড়লেন। ওঁর ক্ষুদ্র চক্ষু দু’টি অস্বাভাবিক তবে বিস্ফারিত হয়ে উঠলাে। সম্বিত চিত্তে শুধু প্রশ্ন করলেন, কেন, কেন? কি হয়েছে বলাে তাে? এক নিমিষের মধ্যে গিগি নিজেব দেহটার চারিধারে চোখ বুলিয়ে নিলে। তারপর পাতে, দাতে চেপে নীচু গঙ্গায় তাড়াতাড়ি বল্লো, আমাকে টুনিনােকে, ংঘেলাকে, থেকে, বােলােনােসস এবং পূঘনাকে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। বাঁশী,—ইশিল—ইশিল তুমি জানাে ? তিনবার বশির শব্দ করবে। বৃদ্ধা কিছুই বুঝতে পারেন না। তব মাথাটা কেমন যেনাে গােলমাল হয়ে যেতে থাকে। গিগি পুনশ্চ সুরু করলাে, তুমি অবশ্যই ওকে রক্ষে করবে। এমন কি নিজের কাঁধে করেও। হয়তে। তখন ও দুর্বলতার জন্যে চলতে পারবে না। কিন্তু তাই বলে তাে ওকে ফেলে রেখে যাওয়া যায় না। পালাতে হবে, ওকে তােমাকে কঁাধে করেও নিয়ে পালাতে হবে। এই নাও টাকা। প্রায় দু’শােলায়ার। এই দু'শোেলায়ার গিউলিয়াকে সুস্থ এবং কর্মঠ করবার পক্ষে যথেষ্টা নিই যথেষ্ট। আমি চিরকাল কারাগারে থাকবে না। খালাস পেয়ে আবার তােমায় খুঁজে বার করবে। কারাগারে থাকা সত্ত্বেও আমি গিউলিয়ার সংবাদ রাখবো। তাতে কোনাে সহে নেই। কিন্তু যদি ১৮
সানন্দ সঙ্গ
পারি তার কোনাে কষ্ট হয়েছে, তবে তােমার সঙ্গে আমার বােঝাপড়া
হবে। বুঝতে পারছে, আমি কি বলছি ?
বৃদ্ধা ভয়ে ভয়ে উত্তর করেন, পেয়েছি ।
গিগি উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলাে, গিউলিয়া যদি আমার কথা
জানতে চায়, বলাে আমি কোনো রাজনৈতিক কারণবশতঃ কোথাও
আটক হয়ে আছি। যদি দরকার বলে মনে করাে—ওকে জানিও যে,
ওরই জন্যে, ওকে সুখে রাখার সুন্তে আমাকে চুরি পর্যন্ত করতে হয়েছে।
কিন্তু আর একটা কথা। পুশিণ আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। মনে রেখাে,
তিনবার বাণীর আওয়াজ শুনলে গিউলিয়াকে নিয়ে পালাবে।
এমন কি কাধে করেও। যদি অনেকক্ষণ পর্যন্ত বাশীর শব্দ হয়, তাহলে
বুঝবে-তােমাদের আশু কোনাে বিপদের সম্ভাবনা নেই, কিন্তু আমি ধরা
পড়েছি। কিন্তু
কিন্তু আর
আর নয়। আমার যাবার সময় হয়ে এলাে।
গিউলিয়াকে আমার বিদায় জানিও।
-কিন্তু তােমার কি ধরা পড়বার সম্ভাবনা আছে ?
গিগি কাধের একটা ঝাকুনি দিয়ে তার প্রশ্নের জবাব দিলো।
-কিন্তু কেন ?
একবার প্রত্যুত্তরে গিগি নিজের গলাটা দুহাত দিয়ে চেপে ধরে
যা ইঙ্গিত করে, তাতে বৃদ্ধা নিরতিশয় ভীত হয়ে ওঠেন। এবং তৎক্ষণাৎ
১২১
ইতালীর সেরা গল্প
ওর অজ্ঞাতসারে একটা বিকৃত স্বর বাইরে আসে বেরিয়ে খুন ?
গলা টিপে? খাসরােধ করে খুন ?
গিগি ওঁর মুখে হাত চাপা দিয়ে বল্লো, চুপ। চীৎকার করাে না।
মুখ ছেড়ে দিয়ে বল্লো, আমি এ পাপ নিজের হাতে করি নি।
প্রয়ােজন হলে এ—আমি প্রমাণ করতে পারবে। বােলােরােসােই
আসল (দাষী। সে আমাদের সকলের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। যাক,
এ-সবের আর দরকার নেই।
গিগি ফিরে পড়লো। ওপরে উঠে এলাে সিড়ি বেয়ে। সেই
এ ঘরখানার মায়ায় তার মন আচ্ছন্ন।
গিউলিয়া অনেকটা সুস্থ বােধ করছে এখন। ভাইয়ের মুখের পানে
স্থিরদৃষ্টি নিবদ্ধ করে সহজ এবং কোমরে জিজ্ঞাসা করলে,
তুমি কি আজ থাকবে?
-না না। আমাকে এখুনি যেতে হবে। ওরা আমার জন্য অপেক্ষা
—তুমি আবার আসবে?
-আ:বে বৈকি। আজ রাত্রে না হোক, কাল সকালে তে
विड सक्ष
রেখে গেলাম খেতে চলে না
বুলে?
বটেই।
সানন্দ সঙ্গ -আচ্ছা। একট। বিশ্রী নিস্তব্ধ কিছুক্ষণ ধরে সই ক্ষুদ্র ঘরখানাকে বেষ্টন করে রইলাে। কিন্তু সেই নিস্তব্ধ তা ভঙ্গ করলো, গিগি। ভগির মুখের দিকে নিনিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বল্লো, ধরাে, আমি যদি না ফিরি। মানুষের বিপদেব কথা তো বলা যায় না। এই বলে মুহূৰ্তমাত্র নীরব থেকে পুনর্বার বলে, কিন্তু আমি যেখানেই থাকি না কেন, তুমি কি ক’র ছা, না করছে—সবই আমি খবর বাখবে। তোমার খবর নিতে এক মুহু ও আমার বিরাম থাকবে না। এ তুমি ঠিক জেনাে। গিউ লম্বা বিচ্ছেদের আশঙ্কা, মুহমান হয়ে প্রশ্ন করে, কেন-তুমি কি ফিরে আসতে চাও না ? ভদনােক সিক্ত কোটটি টেনে নিয়ে গায়ে দিলে । টুপটা মাথায় দিতে দিতে সে, প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলে, গিউ লয়া চল্লাম। একপ্রশ্ন, দু’বার জিজ্ঞাসা করা, গিউলিয়ার অনেক দিন থেকেই বাবের বাইরে। সে আর কোনাে প্রশ্ন করলাে না। কথাও বল্লো শুধু গিগিকে আলিঙ্গন করবার জন্যে একবার নিজের ক্ষীণ হাতটা ওর দিকেই বাড়িয়ে দিলে। কিন্তু গিগি সেদিকে লক্ষ্য করলে । নিঃশব্দে ধীরে ধীবে ঘরের বাইরে চলে এলাে । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়। গিগি সিড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে হঠাৎ কী মনে করে আবার ঘরে ফিরে এলো। গিউলিয়ার অধৌত শীর্ণ মুখখানির দিকে চেয়ে বল্লো, গিউলিয়া, ভূলান। ওষুধ খেও। বৃদ্ধার দিকে দৃষ্টিপাত করে ইঙ্গিতে সাবধান করে দিয়ে অন্য কোনাে ১৩) ইতালীর সেরা গল্প দিকে লক্ষ্য করলাে না। দিকে। শুধু লক্ষ্য রইলাে, সােপান-শ্রেণীর বােলোবােসাের জীবনের একটা ইতিহাস আছে - পুলিশ অক্লান্ত পরিশ্রম স্বীকার করা সত্ত্বেও ওকে ধরতে পারলে । ওরা এক রকম হাল দিয়েছিলাে ছেডে। বােলােনােসাের মতো একটা সুচতুৰ দুৰ্বত্তকে ধরা, তাদের পক্ষে অসম্ভব বলেই ওরা মেনে নিলে। এমনি যখন তাদের সিদ্ধান্ত, তখন একদা সন্ধ্যাবেলা একটা পকেটমারকে ধ'রে বােলােনােসস বিজয়গর্বে সেই অঞ্চলের নামজাদা ইষ্টিশনে এসে দাড়ালাে। কিন্তু এই পকেটমার ধরাই তার ‘কাল। এটা ওর জীবনে একটা মহাভাস্তির মৃতিময়ী বিভীষিকা। পুলিশ ইন্সপেক্টর সৌভাগ্যক্রমে সে-সময়ে সেই জায়গায় ডিউটী দিচ্ছিলেন। সে সানন্দ সঙ্গের প্রসিদ্ধ দুৰ্বত্ত বােলােনােসােকে দেখতে পেলে। এটা আশাতিরিক্ত। ওর বিস্মযেরও সীমা হারিয়ে গেলাে। একটা চোরকে ধরেছে, আর একটা ডাকাত, খুনে, বয়েস। বড়ো হাসির ব্যাপার নয় কি? এই ছিচকে চোরটা একজন সওদাগরের পকেট থেকে সােনার হার তুলে নেয়। ভদ্রলােক তখন পার্কে দাড়িয়ে সঙ্গীত শুনছিলেন নিবিষ্ট চিত্তে। বােলােনােসস এটা দেখতে পায়। একটা তামাস ১৩২ সানল সদ করার অভিসন্ধিতে সে লােকটাকে ধরে ফেলে। কিন্তু সেই তামাসা করাটা, ওর জীবনে সাংঘাতিক হয়ে দাড়ালো। ইন্সপেক্টর তাকে ছাড়বে কেন ? দু'জনকেই করলেন গ্রেপ্তার। কিন্তু বােলােনােসস ওকে বােঝাতে চাইলো—এটা তার সৎকাজ। তার জীবন পরিবর্তনের একটা উজ্জল পন্থাও বটে। পুলিশের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্যে প্রতিদিন দশটা চোর ধরে দেবার প্রতিশ্রুতি দিতে চাইলো । কিন্তু ইন্সপেক্টর সাহেব নিরুত্তরে শুধু একটু হাসলাে। বােলােবােসাে কারাগারে প্রেরিত হলাে। কিন্তু বােলােনােসােদের দলকে সানন্দ সহ নামে অভিহিত করারও কারণ আছে। এই সজের একমাত্র উদ্দেশ্য আনন্দপ্রিয়তা । বালােনােসস। সহচবদের সততই আনন্দ বিতরণ করতে। সে যেনাে তার সাথীদের উৎস, প্রেরা এবং আনন্দের ঝর্ণ। জীবনকে ওরা রঙিন দেখলে। জীবনকে গলাটিপে মারতে কখনাে চাইতো না। পথচলা পথিকদের অযথা লাঞ্ছনা করতাে। মনিকারের দোকানের কাচ ভেঙ্গে দিতাে, ইত্যাদি কতো কি। ওরা এই সৰ অষণা উপদ্রব করতে নিজেদের জীবনকে আনন্দের আলােকে উদ্ভাসিত করে তোলবার জন্যে। এ-ছাড়া দ্বিতীয় অভিসন্ধি ওদের মনে স্থান পেতাে না। অতঃ, মনে ভগ হয় না। কিন্তু পরের ক্ষতি করে নিজেদের মনে আনন্দের খােক যােগাতে গেলে সব ক্ষেত্রেই যে, নিরাপদ হওয়া যায়, তা নয়। ১৩ ইতালীর সেরা গল্প বিপদ আসে। আসা স্বাভাবিক। এবং স্বাভাবিক বলেই সানন্দ সদের সাথীরা, বিধাতার অভিশাপ অজ্ঞাতসারে আহরণ করে নিলে। কিন্তু কী করে আহরণ করলাে, সে কথাই বলছি:- কালো মেটিয়ােটি 'ঔষধ বিক্রেতা। লােকটার পয়সা আছে প্রচুর। অসম্ভব কৃপণ। পপাষাকের মধ্যে একখানা কন। আহার যা করে, সামান্য। পয়সা খরচের ভয়ে, রাত্রে তার ঘর অন্ধকার। ওর জীবনে ছিলাে আনন্দ, না ছিলাে ভালােবাসা। ভয় আর সন্দেহ এক মুহূর্তের জন্যেও তার মন ছাড়া হতাে না। একদিন রাত্রিকালে বােলােনােসাে, গিগি এবং ট্রিংঘেশা ওর বাড়ীর দরজা ভেঙে ঢুকে পডে সমস্ত লুঠ করে নিলে। ফেরার সময় বােলােনােসাের মনে একটা নতুন অভিসন্ধি আয় করলাে । সেই অভিসন্ধিটা—বাড়ীর কর্তার সঙ্গে একবার দেখা করা। প্রজ্জলিত বাতি হাতে নিয়ে কালো- মেটিরােটির শয়ন কক্ষে ওরা প্রবেশ করলো। বাডার কর্তা হাঁ করে গীর নিদ্রা যাচ্ছিলাে। লােকটার দন্তহীন কাদৰ্য মুখখানা দেখে বােলােনােসাের প্রাণটা আর একটা নতুন কৌতুক করার লােভে নেচে উঠলাে এদিক-ওদিক খুঁজে কোনাে জিনিষই ওর দৃষ্টিগােচর হলো না। ঐ দন্তশূন্য ঐহীন হাঁ-করা মুখখানা বুজিয়ে দেবার মতলবে, সে হাতের বাতিটাই কালো মেটিরােটির মুখের মধ্যে নিঃসঙ্কোচে প্রবেশ করিয়ে দিলে। লােকটা বিদ্যুৎস্পশিতের মতো শয্যার ওপর উঠে বসলো। এবং পরক্ষণেই বাতিটা অদম্ভ মাড়ি দিয়ে, কামড়ে ধরলাে। কিন্তু নিমিষের মধ্যেই সমস্ত ব্যাপারটা ওব কাছে জলের মতাে পরিষ্কার হয়ে উঠলো। ভয়ে চীৎকার করে ১৩
সানন্দ সঙ্গ
লােক ভাবার চেষ্টা করতেই, বােলােরোসাে তার অভিসন্ধি ধরে
ফেল্পে। কিন্তু তার? তারপর এক মুহূর্তেই সব শেষ।
এক দিকে
হাতের বাতি নির্বাপিত। অন্যদিকে কালো মেটিয়েটির জীবনাবসান।
খেলাচ্ছলে এত বড় একটা দুর্ঘটনা বােধকরি পৃথিবীতে আর
ঘটেনি।
কিন্তু এই আকস্মিক দুর্ঘটনা গিগির মনে একটা অভূতপূর্ব
পরিবর্তন এনে দিলে। দলের থেকে ও ছাড়া হয়ে রইলো। প্রচার করে
দিলে-ইলেকটিকের কাজ একটা কোম্পানীতে নিয়েছে।
কিন্তু সেই কোম্পানীর অস্থিত্ব আছে বলে মনে হয় না।
ওর সঙ্গীরা ওকে দলছাড়া করতে চায় না। ওরা বলে, তুমি
আমাদের দলে থেকে সামান্য-সামান্য কাজ করাে। এবং তা
থেকে নিজের জন্যে সামান্য কিছু না। গিগি এ-কথায় রাজী না
হয়ে
পারেনি। যে-কাজে কম ঝকি, সেই কাজের মধ্যে থেকে
গিউলিয়ার জন্যে অর্থ পাওয়া, তার বড় বেশী প্রয়ােজন। গিগি
আজকাল অস্বাভাবিক গভীর হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে তার মনটা
কোথায় যেনাে ভেসে চলে যায়। গিউলিয়া, ওর ভগ্নি গিউলিয়া,
বাইরে কাজ করে, মানে দর্জির কাজ করে-মন্দ উপার্জন করতে
না। কিন্তু হঠাৎ একদিন গিগির চোখে পড়লাে গিউলিয়ার যৌবন
উঠেছে উবলিয়ে। নদীতে বান ডাকলে নদীর দু'কুল উচ্ছ্বসিত হয়ে
ওঠ। গিগি অন্ধের মতো
অন্ধের মতো ভালােবাসতাে তাকে। ওর দেহের
১৩
ইতালীর সেরা গল্প উচ্ছসিত যৌবন দেখে, তার আশঙ্কা হলাে। চিন্তা হলাে—ওর যদি এরকম পথে-ঘাটে যাওয়া-আসা বন্ধ করা না যায়, তাহলে হয়তো ওর চরিত্র ঠিক থাকবে না। গিউলিয়ার পথে বেরােনাে বন্ধ হলাে। কি একটা কারণে, গিগি প্রথম জেলে গেলে, পুলিশ তার বাড়ীতে মধ্যে-মধ্যে অতর্কিতে হানা দিতাে। উদ্দেশ্য—গিউলিয়ার জীবন ধারণের পৰা জ্ঞাত হওয়া। কিন্তু পুলিশ সন্দেহজনক কিছু পেলে না। গিউলিয়াকে সংভাবে জীবন যাপন করতে দেখে, তারা তাকে আর বিরক্ত করা সমীচীন বলে মনে করলাে না। কারাগার থেকে মুক্তি পাবার কিছু দিন পরেই ঐ কৃপণ হত্যা কাণ্ড ঘটে। গিগির এতে ভাগ ছিলো। অর্থ নিয়ে সে অসুস্থ ভগ্নিকে দেখতে এসেছিলাে। টাকা না হলে, ওর চিকিৎসাই বা কী করে সম্ভব হবে ? s; দেড় বছর পরে হ্যা, ঠিক দেড় বছর পরে, সানন্দ-সঙ্গীদের বিচার বসেছে আদালতে—বিচারকের সম্মুখে। আদালতে বিপুল জনসমাগম। এদের বিচার একটা মন্ত আলােচনার বন্ধু। মিলানের জনসাধারণের অনুরাগ যেনাে একত্রীভূত হয়ে কৌতুহলে চেয়ে আছে বিচারকের পানে।
সানন্দ সঙ্গ পাঁচটি দুৰ্বতের উগ্র এবং ভীতিপ্রদ চেহারা, সমবেত জন- মণ্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। গিগি ওরফে পিভিয়নের দীর্ঘ এবং ক্ষীণ দেহ, ওর দু’টি উজ্জ্বল চক্ষু সর্বাগ্রে সকলের চোখে পড়ে। বােলােনােসস ওরই দক্ষিণভাগে দাড়িয়ে। এর দেহ খৰ্ব্ব এবং চোখ দুটি লাল, রক্তবর্ণ। সে তার চারিপাশে কেবল দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখছিলাে । বােলোয়ােস। বিচারককে লক্ষ্য করে বলে, মাননীয় বিচারপতি মশাই, আপনাকে মনে করিয়ে দিতে আদেশ হােক যে, আমি একটা চোরকে ধ'রে দিয়েছি। ওর এবম্বিধ উক্তিতে আদালতে দর্শকরা সকলেই প্রায় একসঙ্গে উচ্চ-হাস্ট করে উঠলো। কিন্তু এতে বােলােনােসে লেশমাত্রও লজ্জিত হলাে না। বরঞ্চ ও যেনাে প্রচুর আনন্দোপভােগ করলে। জনতার পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অত্যন্ত উচুগলায় বলে, এর দরকার নেই, দরকার নেই। জনতার আমি বড়ো প্রিয়। এই বলে সে পাম্বোপবিষ্ট স্পঘনাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে, দেখছি, আমার আকর্ষণের ক্ষমতা। শুনে “ঘনা হেসে ফেলে। বয়েস ওর বেশী নয়। সবে চব্বিশে পডেছে। ওর কানের ধার ঘেঁসে চিবুক পর্যন্ত একটা কালাে বি দাগ। বিনা চেষ্টায় ওটা নজরে পড়ে। এর জন্যে ওর মুখের চেহারাটা একেবারে বদলে গেছে। নইলে, মুখখানা দেখতে ভালােই হতাে। ওর মনে ভয়ের দেশমাত্রও খুঁজে পাওয়া যায় না। জানে, হত্যা সয়ে ওর কোনাে সংস্পর্শ নেই। ওর ধারণা-ওকে ১৭ ইতালীর সেরা গল্প আর গিগি । অপরাধী হিসেবে এখানে আনা হয়েছে শুধু হায়ণ করবার জন্যে। ব’য়ে, হত্যার সনে এ-সবের কী করবার আছে? সে রাত্রে আমি- স্পঘনার ঠিক পরেই দাড়িয়ে ছিলাে—স্ট্রিংঘেলা। সে বােলােনােসস এবং গিগির অপরাধে, অপরাধী। বেলােরাসো হত্যা সম্পর্কে ধৃত । স্পঘনার কথায় ইিংঘেলা হঠাৎ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। স্পঘনার পাজর- দেশে নিজের কনুইয়ের সাহায্যে এমন একটা আঘাত করে বসে যে, তাতে স্পঘনা বহুক্ষণ পর্যন্ত নিঃশ্বাস নিতে পারে না। পঞ্চম আসামী-এন্টনিয়াে কি। ওর মুখ দেখে কারাে বােঝবার উপায় নেই যে, ও ডাকাতীর এবং হত্যার মামলার অপরাধী। মুখে একটা আনন্দের হাসি, সব সময়েই লেগে রয়েছে। ওর পকেটে হাত ঢুকিয়ে বাবার ভঙ্গি দেখে, আর মাঝে-মাঝে বিচারপতির বক্তৃতায় ঘন-ঘন মাথা নাড়ার রকম দেখে মনে করবার কোনাে উপায় নেই যে, ও এই মামলার আসামী। অন্যান্য দর্শকের মতাে সেও যে একজন-এই ভাবটাই ওর মন মূর্ত হয়ে ওঠে। পিভিয়নের স্বপেক্ষ কোনো জোরালাে প্রমাণ নেই যাতে করে ও মেটিরটির হত্যার সহকারী ছিলাে না বলে, নিজেকে বাঁচাতে পারে। বিচারপতি যখন ওকে মেরা করছিলেন, তখন তার চোখ দু'টি একটা পরিচিত মুখকে সেই বিশাল জনতার মধ্যে আবিষ্কার করতে ব্যস্ত ছিলাে। বিচারপতি সাক্ষীর সাক্ষীর মারফং জানতে পারলেন, পিজিয়নের ভগ্নি আছে। তিনি সেই ভগ্নিসহ ওকে না দেখতে পেয়ে নিতান্তই বিস্মিত হলেন। ১ সানন্দ সঙ্গ বিচারপতি পিলিয়নকে প্রশ্ন করলেন- -তোমার ভগ্নি করে কি ? কাজ করে। এই ব'লে পিলিয়ন পায়ের ওপর ভর দিয়ে একটা প্রচণ্ড লাফ দিয়ে উঠলাে। মনে হলো, বুঝি কয়েদীর খাচার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। -ও কাজ করে ? কিন্তু কাজটা কী শুনি? তােমার ব্যবসা অনুসরণ করেন ? -সে দর্জির কাজ করে। ওর জীবন যাত্রার মধ্যে কোনাে অসৎ উদ্দে নেই। -তুমি ওর সঙ্গেই থাকো? -হ্যা, মশাই। -তুমি যে-কাজ করেছে, সে-সম্বন্ধে তার কোনাে ধারণা আছে ? মানে, তুমি যে চুরি, হত্যা, ডাকাতী করে থাকো, তা ও জানে ? না, মশাই। সে জানে, আমি একজন বিদ্যুৎ-বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। -কিন্তু এতােদিন তুমি তাকে ঠকিয়ে এসেছে? তিনেক তােমার ভাগ্যে কারাবাস ঘটেছে। কিন্তু আমি আশ্চৰ্য্য হয়ে যাচ্ছি, তুমি কী ভাবে এই সত্যিটা তার কাছে গােপন করে রাখতে পেরেছে—হ্যা? এনটনিয়ে কি, সহচরের মুখের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। তার মাথায় আসছিলাে না যে কী ভাবে ও, মানে পিভিমুন, এই জেরার প্রত্যুত্তর দেবে। ১৯ ইতালীর সেরা গল্প পিজিয়ন উত্তর দেয়, প্রথমবারে তাকে আমি জানিয়ে ছিলাম, রাজনৈতিক কারণবশতঃ আমার জেল হয়েছে। একথা শুনে জন উচ্চ-হাত করে উঠলাে। দ্বিতীয়বারে বলে ছিলাম, কাজের জন্যে বিদেশে যাচ্ছি। তৃতীয়বারে ওকে আবার রাজনৈতিক কারণের ওজুহাত দিয়ে ছিলাম। -তােমার ভগ্নি সব সময়েই তােমায় বিশ্বাস করে? সব সময়েই। তা হলে বলতে হবে, সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। কিন্তু, এসব আমার কাছে এখনাে পরিষ্কার হচ্ছে না। আচ্ছা, তুমি ব’সাে। গিগি জনতার ওপর দিয়ে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে ধীরে ধীবে উপবেশন করে। তখন বিচারপতি পােটাগারিবাত্তির অঞ্চলের অধিবাসী একজন সাক্ষীকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি তাকে জানাে ? মাননীয় বিচারপতি মশাই, আমি তাকে চিনি। --সে কি করে বলাে তাে ? -এক সময়ে সে কাজ করতে বটে। কিন্তু সেতাে অনেক আগে। তখন পিভিষন হত্যার অপরাধে ধরা পড়ে নি। এই সময় একটা মজার ব্যাপার ঘটলো। বােলােনােসস জনতার একদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে লাফিয়ে উঠলাে দেখুন-দেখুন-দেখুন। বিচারপতি অপ্রসন্নচিত্তে প্রশ্ন করলেন, কেন, কী হয়েছে? বােলােনােসস উত্তর করলে, মহামান্য বিচারপতি মশাই, ঐ দর্শক- দের মধ্যে সেই চোরটাকে দেখতে পাচ্ছি। ঐ-ঐখানে ও দাড়িয়ে ১৪
সানন্দ সঙ্গ
দাড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে দাত খিচোচ্ছে। আমার বেশ মনে
প'ড়ছে, ঐ লক্ষ্মীছাড়া চোরটাকে প্রায়
চোরটাকে প্রায় বছর দুই আগে পাকড়াও
করে ছিলাম।
বােলােনােসাে একটু নীরব থেকে আবার বল্লো, বিচারপতি
মশাই, ঐ চোরটা আমার সঙ্গে মনে হচ্ছে দেখা করতে এসে ছিলাে ।
আমি আগেই ভালাে ভাবে জীবন যাপন করতে শুরু করে ছিলাম ।
আমি চোর ধ'রেছি ।
জজসাহেব নিতান্তই বিরক্তি প্রকাশ করে চীৎকার করলেন,
দেখাে, তুমি যদি বক্তৃতা বন্ধ না করে, তোমায় কয়েদ-কনে
আবার পাঠাবােবুঝলে?
বােলােনােসস এবার উপবেশন করলাে ।
কিন্তু পিভিওনের কানে ফিসফিস্ করে বল্লো, ঠিক সেই
লােকটা। বহুদিন পর ওর চেহারা দেখে আম সত্যি বডে
খুশী হয়েছি।
কিন্তু ও বােলােনােসাের কথার প্রত্যুত্তর করলাে না।
সুমুখের দিকে একটু বুকে সাক্ষীর কথা শুনতে লাগলাে।
বিচারপতি আবার সাক্ষীকে ব'ল্লেন :-
—তখন সে কাজ করতাে। কাজ করা এর অভ্যাস ছিলো।
কিন্তু এখন, এখন সে কি করে ?
সাক্ষী গিগির মুখপানে দৃষ্টিপাত করে ইতস্তত করতে লাগলো।
বলো, মহামান্য বিচারপতি বাহাদুর, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনে,
আমার এসব বলা উচিত কিনা।
১৪১
ইতালীর সেরা গল্প
-কিন্তু তােমায় বলতেই হবে। সত্যকে তুমি ভয় করো?
--আচ্ছা, বিচারপতি বাহার। যখন আপনি আদেশ করছেন,
তখন আমি প্রকাশ করতে বাধ্য। তা আমি বলতে চাই যে,
গিউলিয়ার ভাই বিভিন, ধরা পড়বার পর থেকে গিউলিয়া, কাজে ইস্তফা
দিয়েছে। একজন অবস্থাপন্ন লােকের সঙ্গে খুব সাজগােজ করে
গিউলিয়াকে থি টারে যেতে আমি দেখেছি। একদিন নয়, দু-দিন
নয়—প্রায় প্রতিদিন।
ই-বুঝতে পেরেছি। কিন্তু যতাে দিন পর্যন্ত এই কয়েদী ধরা
পড়েনি, ততো দিন পর্যন্ত কি গিউলিয়া নিজের স্বভাব ভালাে
রেখে ছিলাে ?
-ও নিশ্চয়ই। সে তখন দর্জির কাজ করে অনেক টাকা
উপায় ক'রতো। ওর ভাই ওকে বড়াে ভালােবাসতাে।
ভাইকে সম্মানের চক্ষে দেখতে। কিন্তু ঠিক বলতে পারছিনে,
গিউলিয়া সত্যি ভাইকে ভালােবাসতাে, কি ভয় করে চলতে।'
বহুদিন পােটাগারিবন্ডির কাছা-কাছি ছিলাে। তারপর
হঠাৎ একদিন হয়ে গেলাে অদৃশ্য।
বিচারপতি বাধা দিয়ে বলেন, সবুর করে। তারপর গিগিকে
লক্ষ্য করে বল্লেন, তুমি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলে কেন?
কিন্তু গিগি সে-প্রণে কর্ণপাত না করে নত মস্তকে দাড়িয়ে
রইলাে। এনটনিয়ে কি চুপি চুপি ৰ'জো,
বল্লো, গাধা কোথাকার
উত্তর দে’ না।
।
তাড়াখেয়ে পিতিয়ন উচু গলায় বলে উঠলাে, না-না এ কখনো
১৫২
मावन्न मन
সত্যি হতে পারে না। আমার বােন সাজগােজ করে থিয়েটার দেখতে
যাবে ? অসম্ভব, অসম্ভব এ সম্পূর্ণ অসম্ভব। সাক্ষী এর নামে
মিধ্যাপবাদ দিচ্ছে।
বিচারপতি উগ্রভাবে বল্লেন, তোমার বাজে কথা শােনার
জন্যে আদালত তৈরী হয় নি। আমি জানতে চাই--পােটগরিবন্ডি
ছেড়ে চলে আসবার পর, তুমি কী ভাবে জীবন যাপন করতে ?
তোমার ভগ্নিকে নিয়ে সহসা মি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলে কিসের
জন্যে ?
পিভিমন বল্লো, কারণ আমি গুটিকতেক টেলেকে তার জানালার
নীচে দিয়ে প্রায় আসা-যাওয়া করতে দেখেছিলাম। তারা চেষ্টা
করতো- আমার বােনের সুনজরে পড়ত।
-তোমার উদ্দেশ্য কি ঐ ছিলাে? আর কিছু ছিলাে না ?
গিগি অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে বল্লো, তারা ওকে দেখতে পায়, এ আমি
চাইতাম না। ওব প্রণয়ী জুটবে, এও আমি চাইনি। তার জীবন
নষ্ট হতে দিতে আমার কোনােকালেই ইচ্ছে ছিলো না।
বিচাপতি তঁার দক্ষিণভাগে উপবিষ্ট একজন জুরীকে লক্ষ্য করে
বল্লেন, এসমস্তই অদ্ভুত ঠেকছে। তারপর তিনি গিগির দিকে
চাইলেন। ব’নে, ঐ কারণে তুমি তাকে শহর থেকে
জায়গায় সরিয়ে ফেলে ছিলে?
-হ্যা, পােটায়ােমনা থেকে প্রায় মাইলটাক দূরে। এখানে
সে কারোর মুখ দেখতে পেতাে না।
-কিন্তু তুমি পেট চালাতে কি করে ?
১৪৩
ইতালীর সেরা গল্প
সে কাজ বন্ধ করেনি, যদিও সে উপার্জন করতে অল্প।
এবং আমি
বিচারপতি বাধা দিয়ে বলেন, তুমি চুরি করতেই লাগলে ?
তুমি কি ভেবেছিলে যে, তােমার ঐ অসৎ-দৃষ্টান্তে তােমার ভগ্নি
সৎ-জীবন যাপন করতে ?
সে জানতাে না। আমি যা বলতাম, সবই সে বিশ্বাস
করতো। উপরন্তু আমার জীবনের চলবার ধারা পরিবর্তন করবার
দৃঢ়সঙ্কল্প করে ছিলাম।
কিন্তু একদিন দুর্ভাগ্যক্রমে বােলােররসাের
সঙ্গে দেখা হতেই, আমার সে-সঙ্কর বাতাসের সঙ্গে ভেসে গেলো।
সে সময় আমার ভগ্নি পীড়িত। সাংঘাতিক ভাবে পীডিত। তার
চিকিৎসা করবার মতো এক পয়সাও আমার পকেটে ছিলাে না।
আমি টাকা পেয়েই ভগ্নির জন্যে, আমার ভগ্নির জন্যে, ওষুধ কিনে
নিয়ে গিয়ে ছিলাম।
—গিউলিয়া তােমার কুকীর্তি জানতাে না ?
-না।
বিচারপতি সাক্ষীকে উদ্দেশ করে বল্লেন, তুমি কি বিশ্বাস
করা, মেয়েটি তার ভাইয়ের কীর্তি কিছুই জানতাে না ?
মাননীয় বিচারপতি মশাই, আমি নিঃসন্দেহ। সে তার ভাইকে
কখনাে অবিশ্বাস করতাে না।
না, এসব আমার কাছে এখনাে পরিষ্কার হলো না।
সেদিনের মত মামলা মুলতুবী রইলো।
পরদিন গিউলিয়ার নামে আদালত থেকে শমন ধরানাে হলাে।
১৪
Old স —তিন- পাত সংবাদপত্রের উপদ্রব অনেকেরই জানা আছে। পরদিন বেলায় সংবাদপত্র গুলি গিগির গতকালকের আদালতে উপস্থিতিকে অবলম্বন করে, নানা রকম মিথ্যে কাহিনী জনসাধারণের মধ্যে নিসঙ্কোচে পরিব্যাপ্ত করে দিলাে। এরা সবাই একবাক্যে গাইলাে, আদালতে বিচারকালীন গিগি তার ভগ্নির সম্বন্ধে সাক্ষীর মারফং যে-সব कथा শুনেছিলো, তাতে তার ঘনঘন ফিট না হয়ে যায়নি। এবং বারদুই সে আত্মহত্যারও উপক্রম করে ছিলাে। শুধু এই নয়। কয়েকটি সখের সাংবাদিক দুরভিসন্ধিবশে শ্রমীকার করেও গিউলিয়ার মাসাকে খুঁজে বার করলাে। কিন্তু বার করেই তারা ক্ষা হলােনা। সত্যি মিথ্যেতে সমস্ত কাহিনীটা তাকে জানিয়ে দিলো। ভাব বােনপাে এবং গিউলিয়ার পক্ষাবলম্বন করে অনেক কথাই বলে গেলেন। সাংবাদিকরা জেনে গেলো—গিউলিয়া, গিগির ধরা পড়বার পর থেকে একটি অবস্থাপন্ন ছেলের বাগদত্তা হয়ে আছে। তারপর? তাৰপর গিউলিয়ার প্রতিকৃতি দৈনিক কাগজে ছাপা হলাে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গিউলিয়া হঠাৎ বিখ্যাত হয়ে উঠলাে। আজ গিউলিয়ার আদালতে হাজির হবার দিন। এই সংবাদট। পূর্বেই প্রকাশ করা হয়। মিলানের জনতা যেনাে একযােগে আদালতে ১৪৫ ইতালীর সেরা গল্প তেলে পড়লাে। আদালত-গৃহ আজ লােকে লােকারণ্য। কোথাও তিলমাত্র স্থান খালি নেই। যথাসময়েই গিউলিয়া ধীর পদক্ষেপে প্রবেশ করলাে। তার দেহে কালাে পােশাক। মাথার টুপির ওপর দিয়ে একটা ওড়না নেমে এসেছে ওর কাধে। কিন্তু সেই ওড়নার মধ্য দিয়ে ওর দু’টি হরিণীর মতো চোখ দেখা যায়। বিচারপতি ওর মুখপানে ক্ষণকাল তীব্ৰদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে ব’ক্সেন, তােমার নাম গিউলিয়া ক্যাভেলিয়ারী ? তােমার বয়েস মাত্র উনিশ বছর। তুমি গিগি বা পিভিয়নের ভগ্নি -কেমন? আচ্ছা, এই বার বসতে পারে। কিন্তু গিউলিয়া লজ্জার সঙ্গে অজসাহেবের আদেশ মাত করতে গিয়ে, সারা বিচারকক্ষটায় একটা হাসির তুফান বহিয়ে দিলাে। এর পেছনে একখানা চেয়ার পাতা। জানতাে না যে, ওখান নিজের জায়গাটা আঠার মতাে দখল করে আছে। চেয়ারটা ছিলো পেরেক দিয়ে মারা। গিউলিয়া জুরীর দিকে পেছন করে উপবেশন করবার অভিপ্রায়ে চেয়ারখানাকে হাত দিয়ে সরিয়ে নেবার প্রয়াস করতে গিয়েই এই বিভ্রাট। আদালত কক্ষের একযােগে-বিদ্রুপ ষ গিউলিয়াকে ধূ ভীত করলাে না। তার আপাদমস্তক পৰ্য্যন্ত লজ্জার এবং অতিতের আতিশয্যে শিহরিয়ে উঠলাে। কিছুক্ষণ পর বিচারপতি গিউলিয়াকে প্রশ্ন করলেন, এই আসামী তােমার ভাই ? তুমি জাননা ও কি দোষে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ওখানে দাড়িয়ে আছে? ১৪
সানন্দ সঙ্গ
গিউলিয়া ঈষৎ ঘাড় নেড়ে জানালো যে সে তা জানে।
বিচারপতি পুনরায় বল্লেন, তােমার ভাই, চুরি, ডাকাতী নির্যাতনের
আসামী। এবং হত্যাকার্যে সহকারী—আসামী।
সকল
দোষে সে দোষী। আমি যা বলছি, সত্যি নয় ?
এই পর্যন্ত বলে তিনি চুপ করলেন। কিন্তু সেটা মুহূর্তের
জন্য। পুনর্বার বল্লেন, কিন্তু তুমি কী করে সে সব জানতে পারলে ?
কে তোমাকে জানালে ?
গিউলিয়া এর উত্তরে ফিসফিস করে কি যেনো উচ্চারণ করলাে,
গলা শােনা গেলাে না।
জজসাহেব বল্লেন, শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না। ফারে বলাে, যা
তোমার বক্তব্য আছে।
—মাসীর কাছ থেকে আমি সমস্তই শুনেছি। তা ছাড়া সংবাদ
পত্রেও আমি পড়েছি। গিগি কখনাে আমাকে বিশ্বাস
করে নি।
বিচারপতি সাহেব গিউলিয়ার এই কথায় কয়েক মুহূর্ত ওর মুখ
পানে উৎসুক এব নিনিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন।
প্রবঞ্চনার কোনো ছাপ, ওর মুখে
পড়ে কিনা সেটা জানাই
তাঁর উদ্দেশ্য। কিন্তু উনি এর কিছুই সেই সুন্দর মুখখানার কোথাও
খুঁজে পেলেন না। বল্লেন, এটা কি সত্যি—গিগি আর তােমার
মধ্যে একটা প্রগাঢ় ভালােবাসা বহে যেতো এবং ঐ গিগি, বাব
যেন তার শাবকদের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়, ঠিক তেমনি ধারা
তােমার প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলাে? কেমন, সত্যি না ?
মিথ্যে বা
১৭
ইতালীব সেরা গল্প জজসাহেবের এবম্বিধ জেরায় গিউলিয়ার সমগ্র মুখমণ্ডল পলকের মধ্যেই রাঙা হয়ে উঠলো। কী যেনাে বলবার জন্যে তার প্রাণটা অস্থির হয়ে উঠছিলাে । কিন্তু শত চেষ্টা করে একটা কথাও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পাবলো না। বিচাৰপতি পুনবায় বল্লেন, গিগি তােমাকে সর্বদাই আগলে থাকতো পাছে তুমি অন্যের সুনজবে পড়ে। এবং ওব নিজের মুখ থেকে সতােদর পর্যন্ত শােনা গিয়েছে তাতে করে মীমাংসা করতে দেরী হবে না যে, তুমি ওর ভগ্নি নও—প্রমিকা। তােমার এমনি সু (হাবা। (তামার মুখ সারল্যে পরিপূর্ণ। কাজেই সকলেব মন সহজেই ব’লত চাইবে—গিগির মতাে বিশ্র চেহারার ধুনীর ভগ্নি তুমি কী ক’ব হতে পারে ? না—এ সম্পূর্ণ অসম্ভব। তুমি কখনাে গিগিৰ • হাতে পাবাে না । বিচারপতি এই বিশ্রী মন্তব্যে গিগিব উকিল তীব্র প্রতিবাদ করলেন। জজসাহেবের উত্তর দেবাৰ পূৰ্বেই আদালতের উকিল এমন কনােক গুলি বি ইজিত ওঁকে, মানে গিগির উকিলকে করে বসলেন, যে সেই নিয়ে উভয়ের মধ্যে একটা বচসার সৃষ্টি হলাে। বােলােরোসাে এতক্ষণ নীরবে, নিস্তব্ধে ব’সে ছিলো। কিন্তু আর সে পাবলে না। হাস্য-বেগ দমন ক’বতে গিয়ে ওর মুখ দিয়ে একটা অব্যক্ত এবং অদ্ভুত শব্দ বাইরে বেরিয়ে এলাে। সমগ্র বিচার কক্ষটাই যেনো ওর দিকে ফিরে দৃষ্টিপাত করলাে। এবং এতে জজসাহেব পরম ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি প্রথমে ভয় দেখালেন, বিচার মুলতুবী রাখবেন। পরে বােলােয়ােসসকে জানালেন-ওকে ১৪৮ সানন্দ সঙ্গ অন্ধকার কারাগারে এখুনি পাঠাবেন। কিন্তু ভয় দেখানােই সার। পরিশেষে গিউলিয়ার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। বল্লেন, আদালতে আর কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবার নেই। তুমি এখন যেতে পারে। গিউলিয়া বীরে ধীরে উঠে দাড়ালো। দাড়িয়ে দৃষ্টিপাত করলে সেই পঞ্চবন্দী খাঁচাটার দিকে। ওর ভাই খাঁচার গরাদ ধ'রে বসে। গিউলিয়া ওর দিকে অগ্রসর হয়ে গেল। আস্তে আস্তে তার হাত প্রসারিত করে দিলে গিগির পানে। কিন্তু আশ্চৰ্য্য। গিগি ক্ৰোধান্ধ হ'য়ে চীৎকার করে ওঠে, দূর হয়ে যাও। আমার মুখ থেকে শীগ্যির যাও সরে । নইলে, গলা টিপে তােমার জীবন শেষ কবে দোবাে। বলতে বলতে ও দাত দাঁত চেপে নিজের হাত দুটো সত্যিই গিউলিয়ার কণ্ঠ লক্ষ্য কবে খাচার লােহার গবাদের ফাক দিয়ে বাব করে দিলে। এই অশােভন ঘটনায় বিচারকক্ষের প্রতি জানালাটা পয্যন্ত জনসাধারণের গালি-গালাজে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলাে। এর ফলে চক্ষে নিমিষে দেখা গেলােখাচার মধ্যে সকলেই, সেই পাঁচটি কয়েদী, বিদ্যুৎচালিতের মত সহসা উঠে দাড়ালাে। গুদের মুখ-চোখ দিয়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে আসছে। চেহারা হিংস্র খাপদের চেয়ে ও ভীষণতর। সেই পাঁচটি কয়েদী একসঙ্গে লােহার খচার গায়ে প্রবল-বিক্রমে আঘাত করতে লাগলাে। মনে হলো, এখুনি—এই মুহূর্তে-চক্ষের পলক ফেলতে না ফেলতে ওরা একসঙ্গে জনসাধারণের ঘাড়ের ওপর পড়ে টুটি ধরবে চেপে--জীবন দেবে শেষ কবে। ১৪৯
ইতালীর সেবা গল্প
মুখ দিয়ে তখন একটা ‘রা বের ক’রবারও অবসর দেবে না,
এমনি ভয়ঙ্কর।
এনিয়ে উকি চীৎকার করে ওঠে, বিচারপতির ধ্বংস হােক।
বােলােনােসস খাচার গরাদের ওপর মুখ রেখে বানরের মতো দন্ত
বিকশিত কবে বলে, শালা খেকি কুকুরের দল। জনসাধারণ হয়ে
ভীষণ চীৎকার করে ওঠে :—কয়েদ ঘরে নিয়ে যাও, কয়ে ঘরে
নিয়ে যাও।
পুলিশ ছুটে আসে। বিচারপতির আদেশে তারা কয়েদীদের
গারদে নিয়ে যায় । কিন্তু যাবার সময় গিগির গগনভেদী চীৎকার
কানে আসে :-খুন করবাে। গিউলিয়াকে খুন করবাে।
আমার
থেকে ও নিস্তার পাবেনা কখনাে। খুনখুন । খাসরােধ
কবে খুন। গিউলিয়া, এই আমার প্রতিশ্রুতি।
উঠলো।
মর্মান্তিক দৃশ্য।
গিউলিয়ার হৃদয়খানা একটা অব্যক্ত বেদনাভারে
একেবারে মুহমান।
মাথা
চোখের
সুমুখে কিছু দেখা যায় না। সব যেনাে একটা অন্ধকার-পিকে
পরিণত হয়ে একে পাতালদেশে আকর্ষণ করে নিয়ে যেতে লাগলাে।
গিউলিয়া মুহুর্তের মধ্যে বারান্দার একট। রেলিং নিজের কম্পিত ।
হাত দিয়ে চেপে ধরতে গেলাে, কিন্তু পারলাে না। ওর জয়দেশ
সানন্দ সঙ্গ থর-থর করে কাপতে লাগলাে। ঘুরে যাচ্ছিলো পড়ে। কিন্তু ওর পাশের একটি লোেক ধরে একে পতন থেকে রক্ষা করলাে। —গর- গিউলিয়ার প্রেমিক আগােফিলেটি। আজ কিছুদিন হলাে তিনি নােগশয্যায় শায়িত। তার নিরাময় আসন্ন । হযতো আজ কি কাল সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শষা পরিত্যাগ করবেন। কিন্তু এখনো কিছু দৌর্বল্য ওঁর সারা দেহটায় পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। গিউলিয়ার আদালতে সাক্ষ্য প্রদান কালে তিনি আদালতে যেতে পারেন নি। পারেন নি, তার পীড়ার জন্যে । কিন্তু প্রতিদিন তিনি সংবাদপত্র মন দিয়ে পড়তেন। কাজেই ব্যাপারটা তার অজানা ছিলাে না। আরােগ্য লাভ করে আগােফিলেটি একদিন গিউলিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। কিন্তু মেয়েটিব কৃষ্ণবর্ণ পােষাক আর অ- পূণ চোখ দেখে তার নিজেরও বড়ো কষ্ট হতে লাগলাে। সেই দুর্বল ভাবটা মন থেকে অপসারিত করে দিয়ে গিউলিয়াকে উদ্দেশ করে বল্লেন, দুঃখ করাে না। দুর্ভাগ্যবশত তুমি ঐ বকম ভাই পেয়েছে। তুমি তো তাদের বেছে নাও নি। তােমার ভাগ্যই ওদের তােমার কাধে চাপিয়ে দিয়ে ছিলাে। কিন্তু তুমি নিঃসন্দেহ হতে পারে-এর জন্যে তােমাকে আমি বিন্দুমাত্রও দোষ দিই নে। শেষে কিন্তু সব ভালােই হবে।
ইতালীব সেরা গল্প
গিউলিয়া বলে, সত্যি—সব ভাললাতে শেষ হবে -হ্যা?
—অস্থির হও না। তােমার ভাই যদি সৌভাগ্যবান পুরুষও হয়,
ত্রিশ বছর সশ্রম কারাবাসের আগে খালাৰ পাবে না।
এটা ঠিক জেনে ।
এই ক'লে আগােফিলেটি দাত
হাসতে লাগলেন।
গিউলিয়া একটা ইজিচেয়ারে শুয়েছিলো। আগেফিলেটির
কথায় সর্প দংশিতের মতাে উঠে বসলাে। চোখ দুটি অসম্ভব
বিস্ফারিত করে বল্লো, এ-কথা তুমি আমায় হাসি মুখে শােনাতে
পারলে? তােমার এতাে বড়ো সাহস?
শুর এই উচ্ছাসে আগােফিলেটির বিস্ময়ের অবধি রইলাে
না। শান্তকণ্ঠে বল্লেন, সে জেল থেকে ফিরে এসে আবার তােমার
সঙ্গে বাস করবে-এই কি তোমার ইচ্ছে ?
গিউলিয়া বিদ্রুপ পূর্ণ-স্বরে বল্লো, তাই যদি হয়, তবে--তবে সেটা
কি তােমার খুব আশ্চৰ্য্য বলে মনে হবে ?
যুবকটি প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে বাতায়নের ভেতর
দিয়ে
বাইরের উদ্যানের দিকে ক্ষণকাল নিশব্দেই চেয়ে রইলেন। তারপর
একসময়ে গিউলিয়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে ব’ক্সেন, মাথা ঠাণ্ডা করে ।
ভালাে করে
বুকে দেখাে।
ওর ফিরে আসাটা আমাদের উভয়ের
পক্ষেই কতাে বড়াে ভয়ের ব্যাপার। সে তাে তোমাকে খুন করবে
বলে শাসিয়েছে।
শুনে গিউলিয়া পুনরায় ইজিচেয়ারটার ওপর নিজের দেহখানি
একা করলাে। ওর সমগ্র মুখখানা একটা নিদারুন দাসীন্তে
১৫২
সানন্দ সঙ্গ
ও বিতায় ছাপা-ছাপি হয়ে উঠেছে। কিন্তু এইটাই আলােফিলেটি
গিগিব চকচক শারালাে
ছােরাব চেয়ে সুষ করতেন। কাজেই
গিউলিয়াকে শান্ত করবার উদ্দেশ্যে, বেশ বিনয় এবং নসূচক কণ্ঠে
বল্লেন, তুমি অস্বীকার করতে পারে না, তােমার ভাই গিগি, ওরফে
পিভিষন, একটা অত্যন্ত বাগী এব
বদমেজাজের লােক।
অব
এটা ঠিক তার দোষ নয়। দোষ সময়ের প্রতিকূল সময়ের। অন্য
যে কেউ, পিভিয়নের মতো অবস্থায় পড়ল, হয়ত আরাে পারাপ কাজ
করে বসতে।।
নয় কি ?
মেয়েটি বাধা দিয়ে বললো, আপনাকে অনুবেল করছি, সাংসারিব
ব্যাপার নিয়ে আলােচনা ক’ববেন না।
কিন্তু আগােফিলেটি খুব
খুব অবােণে কর্ণপাত না কবে, বনে
যেতে লাগলেন, তােমাদের বংশকে আমি যথেষ্টই সম্মান দি ।
তােমাদের বংশ আমার সম্মানা।
বলেন, তত্ৰাচ আমি চাইনে যে, তোমার ভাই এখুনি বাড়ী ফিবে
আসুক। হয় তাে আমি ভুল করছি। কিন্তু এটা আমার অনেক
চিন্তার ফল ।
গিউলিয়া ক্রোধ প্রকাশ করে বল্লো, কিন্তু আমার প্রতি কি কোনাে
কর্তব্য তােমার নেই ? আমার ভাইয়ের লাশের জন্যে তােমার
আপ্রাণ চেষ্টা করা উচিত। উকিল, জুরী, এমন কি জজের কাছে
গিয়েও তােমার ওর খালাশের জন্যে অনুরােধ করা উচিত। তাদের
সকলকে জানতে দাও যে, আমার ভাইয়ের দুর্ভাগ্যে সমবেদনা
জানাতে, অতঃ, একজন ধনী লােকও বেঁ, আছে। আগােফিলেটি,
ইতালীর সেরা গল্প তুমি আমায় ভালােবাসে। এই ভালােবাসার ওপর নির্ভর করে (তামাকে বলছি--তােমার কর্তব্য তুমি কবাে। আগােফিলেটি তার উক্তিতে সন্তুষ্ট হয়েছেন বলে মনে হলাে না। वित যেনো তার কর্তব্য সম্পাদন করতে যাচ্ছেন, এমনি ভাব দেখিয়ে গিউলিয়ার মুখপানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। এবং একটু পরেই তার হাতের মধ্যে গিউলিয়ার হাতখানি অনুরাগভয়ে চেপে *রে বলেন, যাচ্ছি-এখুনি আমি যাচ্ছি। এই সামান্য ব্যাপার। এমন কি শক্ত, এমন কি শক্ত ? গিউলিয়া বল্লো, আমার মনে হয়, একটু চেষ্টা করলেই আমবা একে বাঁচাতে পাবি। সংবাদপত্রে আমার বিশ্বাস নেই। আমার তাই বে—এ আমি কখনাে বিশ্বাস করিনে। এখুনিই গিয়ে সব ব্যবস্থা করছি। আজই সবার আগে সুসংবাদ নিয়ে আসবে। তুমি আমার ডিনারের বন্দোবস্ত করে বেপাে। দু’জনে একসঙ্গে আহার ক’রবাে-বুঝলে ? এই আশার বাণী গিউলিয়ার কানে যেনাে সুধা বর্ষণ করলো। আনন্দের আতিশয্যে সে ওর প্রেমিকের দিকে নিজের একখানা হাত প্রসারিত করে দিলে। সমস্ত মুখখানা নির্মল সারল্যপূর্ণ-হাশে উদ্ভাসিত করে তাঁকে ক'রে তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলাে, আগােফিলটি, তােমার দয়ার তুলনা মেলে না। তুমি সত্যি অন- সাধারণ। আজ ঈশ্বর তােমার সহায় হবেন। আমি তােমার প্রতীক্ষায় থাকবে কিন্তু। ১৫৪ मानन्न मन्त्र কিন্তু কী হতভাগ্য ঐ গিউলিয়া। প্রতিদিন ও প্রতীক্ষায় বসে থাকে। এই বুঝি তার ভাইকে নিয়ে আগােফিলেটি ফিরে আসে। কোথায় কে ? এমনি কয়েকদিন প্রতীক্ষায় থেকে গিউলিয়া আর স্থির থাকতে পাবলে না। অবশেষে বিচারের শেষদিনে পরিচারিকাকে সঙ্গে করে আদালতকক্ষে এসে হাজির হলাে। আদালতের উকিল তখন কয়েদীদের দিকে দু’হাত প্রসারিত উত্তেজনায় পড়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তুমি তুমি পিট্রোকায়েনাজিও, তুমি, কালোপামপেলী। আর তুমি, গগি ক্যাভেলিয়ারী। তােমরা সকলেই ভালােমানুষ বৃদ্ধ মেটিয়ােটির সর্বস্ব লুণ্ঠন করে তাকে হত্যা করেছে। কেন? কারণ সে তার অর্থ, বার্ধক্যবশত: রক্ষা ক’বতে অক্ষম ছিলাে। অর্থ সঞ্চয় করে ছিলাে অসাধু উপায়ে নয়। একদিনেও নয়। সে তার সঞ্চিত অর্থ শুধু নিজের স্বার্থেই ব্যয় করতাে না। বহু দীন-দরিদ্র ব্যক্তিকেও সে অর্থ বিতরণ ক’বতো। জুরীগণ, আপনারা একবার ভেবে দেখুন। নৃশংস হত্যাকাণ্ড এর সম্পাদন করেছে। এই হত্যাকাণ্ড যে হঠাৎ, অবস্থার বৈগুণে। ঘটেছিলো তা নয়। কখনাে তা নয়। দুরাচার, বর্বর, সানন্দ সঙ্গের সমস্ত সদস্যরাই তাদের অন্তনিহিত নৃশংসতায়, এবং পৈশাচিকতায় ঐ হত্যাকাণ্ড স্বেচ্ছায় সম্পাদন করেছে। দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে আদালতপক্ষের উকিল যথাস্থানে উপবেশন করলেন | জসাহেব চিরচরিত প্রথানুযায়ী জুরীদের সঙ্গে বহুক্ষণ পরামর্শ করে কিছুক্ষণের জন্য আদালতের কাজ বন্ধ রেখে বিএম
ইতালীর সেরা গল্প
করতে বিচার কক্ষ পরিত্যাগ করলেন। জুরীরাও তাকে মরণ
করতে বিস্মৃত হলাে না।
আর গিউলিয়া ? সে যে কতক্ষণ আনতমুখে এবং অপূর্ণ ক্ষে
পাষাণের মতাে নীরবে বসে ছিলো, নিজেরই জ্ঞান ছিলাে না।
ইস হলো, যখন জজসাহেব এবং জুরীর। বিচারকক্ষে
পুনরায়
প্রবেশ করলেন।
গিউলিয়ার প্রাণ তখন বলতে চাইলে, ওগাে জজসাহেব।
আমার ভাই গিগিকে চেনাে না। সে কখনােই চুরি করতে পাবে
। মানুষ খুন করতে পারে না। তুদি ওর প্রতি সুবিচার করে।
কিন্তু শতচেষ্টা করেও তার কণ্ঠ হতে একটা শব্দও নির্গত হলাে না।
শুধু ও উদাসৰ দৃষ্টিতে বড়ো বডো চোখ মেলে বিচারপতির দিকে
রইলাে চেয়ে।
তারপর? তারপর হঠাৎ একসময়ে ওর কানে এলো শিচাৰপবি
রায়-ঘােষণা :-
গিগি ক্যালিয়ারী ( পিঙিন, বােলােরােসাে পিটো
ক্যাবেনাজিও) এবং ট্রিংবেলা (কালোপামপেলী) আজীবন ঘর
বাস করবে। এটনিয়ে উকি আর লুইগি মডোনির প্রতি এই
সঙ্গে ত্রিশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হলো ।
বিচারপতির আদেশে প্রত্যেক কয়েদীকে
কয়েদীকে পুলিশ জেলখানায়
নিয়ে গেলাে।
গিউলিয়া পাষাণ, ঠিক নিথর পাষাণের মতাে বসে রইলাে।
সানন্দ সঙ্গ
ও ওর মুখে
গিগির গমন
সময়ে সে একটা দৃষ্টিও
ফেলতে পারলে
না। সে এখন শুধু সেই শূন্য কয়েদীর খাঁচাটার পানে মইলাে চেয়ে।
একসময়ে সঙ্গের পরিচাবিকা ওকে ডেকে আদালত-কক্ষ পরিত্যাগ
ক'রে যাবার জন্যে অগ্রসর হলাে। গিউলিয়া কলের পুতুলের মতো
সিড়ি বেয়ে নীচে এলাে নেমে এবং পথে পদার্পণ করবার দরজা
পার
হ'তেই,
এর দৃষ্টি-পথে পডলো-আগােফিলেটির নিজের
ঘােড়ার গাড়ী । তিনি গাড়ীতে ওঠবার জন্যে ওকে নির্বাক্যে
ইঙ্গিত করলেন ।
গাড়ীতে ওরা তিনজনে উঠে বসলো।
আগো, গিউলিয়াকে
নিজের বুকে টেনে নিয়ে আড্ররে, সত্যি—আদ্রস্বরে বলেন, কী
দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।
গিউলিয়ার চোখের কোণ বেয়ে এবার শ্রাবণের ধারার মতো
অঞ নিশব্দেই গড়িয়ে পড়তে লাগলো। অরুদ্ধকণ্ঠে বল্লো, আব
তাকে আমি দেখতে পাবেনা-চিরদিনের মতো তাকে দেখতে
পাবে না। গিগি, গিগি-আমার ভাইরে।
—কী দুর্ভাগ্যের কথা ।
আগাফিলেটি আজ গিউলিয়ার চোখে জল দেখে এবং তার
অন্তবের বেদনা উপলব্ধি কবে প্রকৃতই আন্তরিক ব্যথিত হয়ে
উঠলেন। কিন্তু এখন তার করবার তাে কিছু নেই। যখন করার
তাব ছিলাে, তখন তাে কিছুই তিনি করেন নি।
গিউলিয়া অঞরুদ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করলাে, গিগির জন্যে আর কিছুই
কি করা যায় না ? কিছুই করা যায় না ?
১৫৭
ইতালীর সেরা গল্প
আগােফিলেটি এর উত্তরে কোনাে কথা বলতে পারলেন না।
গিউলিয়াকে নিজের দিকে আর একবার টেনে নিয়ে ওর কেশের
ভেতর অঙ্গুলি সঞ্চালন করতে লাগলেন।
গাড়ী এসে
থামলাে। থামল গিউলিয়ার বাড়ীর
তিনজনেই একে একে নেমে পড়লো।
গিউলিয়া আপােকে লক্ষ্য করে সজলচক্ষে একটা দীর্ঘনিবাস ফেলে
বলে, কিন্তু তখন আমি সত্যি কতাে সুখী ছিলাম।
আগােফিলেটি ওকে হাত ধবে ভেতরে নিয়ে
যে•ে (घास
জিজ্ঞাসা করলেন, তখন—কখন বলল তাে ?
—যখন আমি আমাদের সেই সামান্য, অতি সামান্য ঘরে আমার মানীর
সঙ্গে থাকতাম। গবীব ছিলাম। কিন্তু নিজে
খেটে খেতাম।
বিচিত্র জগতের বুটি আমার জানা ছিলাে না। তখন গিগি আমাৰ
জন্যে প্রতিদিন কতোই না ফুল আনতে।
—কিন্তু সে তাে চুরি করতে। '
–আমি তার কিছুই জানতাম না। আমি সুখী ছিলাম—হ্যা
নিশ্চয়ই সুখী ছিলাম '
এই ব'লে গিউলিয়া নিজের হাত দুটির মধ্যে তার অধৌত
মুখখানি ঢেকে ফেলে। কাঁদতে-কাদতে ল
রংবার বল।
লাগলো, গিগি-দাদা আমার ।
.
pur
+ 0 CN
,
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.