Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Tarabai Ed.2

Ray,dijendralal · 2009/09/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ভাবাই
(নাটক)
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
সুরধাম, ২নং নন্দকুমার চৌধুরীর দ্বিতীয় লেন
বলকাতা।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
১৩২১ সাল।
মূল্য ১৮ এক টাকা মাত্র।
.

কলিকা, ২১ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট,
বেঙ্গল মেডিকেল লাইব্রেরী হইতে
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায়-কর্তৃক প্রকাশিত।
কলিকাতা, ১২ নং সিমলা স্ত্রী,
“এমারেল্ড, প্রিন্টিং ওয়ার্ক” হইতে
ঐবিহারীলাল নাথ দ্বারা মুদ্রিত।

| ,
উৎসর্গ।
মাননীয়
শ্ৰীযুক্ত রাজেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রী
মহােদয় করকমলেষ,

No text on this page.

ভূমিকা। এই নাটকের উপাদান টপ্রণীত রাজস্থান হইতে গৃহীত হইল। পৃথ্বীরাজ ও তারার কাহিনী এখনও রাজস্থানে চারণ কবিদ্বারা রাজপুত- দিগের মনােরঞ্জনার্থে গীত হইয়া থাকে। “When they assemble at the feast after a day's sport, or in a sultry evening spread the carpet on the terrace to inhale the leaf or take a cup of kusumba, a tale of Prithwi recited by the bards in the highest treat they can enjoy." আশ্চর্যের কথা এই যে এ মহিমাময়ী কাহিনী অদ্যাবধি কোন বঙ্গীয় নাটকের বিষয়ীভূত হয় নাই। আমি যদিও এ নাটকের মূল বৃত্তান্ত “রাজস্থান হইতে লইয়াছি, তথাপি অপ্রধান ঘটনা সম্বন্ধে স্থানে স্থানে ইতিহাসের সহিত এই নাট- কের অনৈক্য লক্ষিত হইবে। এ অনৈক্য আমি মারাত্মক বিবেচনা করি না ! কারণ নাটক ইতিহাস নহে। কোন কোন সমালােচক এইরূপ অনৈক্য লইয়া অনেক কালী ও কাগজ খরচ করেন দেখিয়া এ কথাটি বলা দরকার হইল। গ্ৰন্থখানি ছাপাইতে ছাপাইতে দেখিলাম যে লিখিত নাটকের কলেবর উচিত সীমা অতিক্রম করিয়াছে। তজ্জন্য মুদ্রিত পুস্তক হইতে সঙ্গ সংক্রান্ত দুইটি দৃশ্য বাদ দিতে বাধ্য হইলাম। এরূপ করায় বর্তমান নাটকে তৃতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যটি অবান্তর হইয়া পড়িয়াছে। পাঠক- বর্গের নিকট অনুরােধ যে তাহারা যেন উক্ত দৃশ্যটি (এবং চতুর্থ দৃশ্যে তা বটেইত গীতটি) পুস্তক হইতে বাদ দেন।

No text on this page.

কুশীলবণ।
(পুরুষ)
রায়মল
মেবারের রানা।
সুর্যমল
রায়মলের ভ্রাতা ও সেনাপতি।
সদ
পৃথ্বীরাজ •••
রায়মসের পুত্রগণ।
জয়মণ
প্রভুরাও
সিরােহীর রাজা।
শুতান
পলায়িত তােড়া অধিপতি।
সারঙ্গ দেব
রায়মলের জনৈক সৈন্যাধ্যক্ষ।
বণিক, মালব, চন্দ্ররাও, কৃষক, ফকির-ইত্যাদি ।
ঘী)
শুরতানের রাণী।
তানের কন্যা।
সুৰ্যমলের স্ত্রী।
যমুনা
রায়মলের কন্যা ও প্রভুরাওর
চারশী, পরিচারিকা, কৃষকরষণী ইত্যাদি

No text on this page.

ভাবাই
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
স্থান—সূৰ্যমলের বাটী। কাল-প্রভাত।
রাজভ্রাতা সূৰ্যমল ও তার স্ত্রী তমসা।
সূৰ্যমল।
তমসা।
পলায়িত শূরন তােড়াঅধিপতি
যুদ্ধক্ষেত্র হতে।হায়! ক্ষত্রিয়, চৌহান
হেন কাপুরুষ ?
কোথ। তিনি?
বনবাসী-
দুরে আরাবলিগিরিসানুপাতলে।
হয়েছিলে অতিথি কি তুমি তার হবে।
হইয়াছিলাম গামি তাঁহায় আশ্রমে
অতিথি দশ দিন।
তমসা।
সূৰ্য্য।

প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। [ প্রথম দৃষ্ণ। তমসা। তমসা। সূৰ্য্য। তাহার দাম্ভিক রাজ্ঞী—তাঁর সঙ্গে ? রাজ্ঞী তার সঙ্গে, আর অপূৰ্ব্বলাবণ্যময়ী কন্যা—নাম “তারা। —আশ্চৰ্য্য বালিকা! মহাভারত বৃহৎ, রামায়ণ,-কণ্ঠস্থ! পড়িছে এইক্ষণে উত্তরচরিত। জানি তাহার রাজ্ঞীরে। গৰ্ব তাঁর অমানুষী ; চুর্ণ অহঙ্কার আজি তঁার। হইওনা হেন উল্লসিত পতিতের দুর্ভাগ্যে, তমসা।একদিন সবাই ঘটিতে পারে তাহা । কি ঘটিবে ? মন্দভাগ্য ?—উন্নতের পতন সম্ভবে ; আমি রাজ্ঞী নহি। সেনাপতিপত্নী তুমি। ইহার অপেক্ষা মন্দভাগ্য আছে প্রিয়ে। -বলিতেছিলাম—সঙ্গ, পৃথী, জয়মল, যে হইবে রাণা চিতােরের ভবিষ্যতে, তার উপযুক্ত পাত্রী খুরনবালা। কেন? নাহি স্থির তবে কেইবে পর সূৰ্য্য। তমসা। ১••

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ প্রথম দৃশ্য।
সূৰ্য্য।
মেবারের রাণা ?
কিছু বুঝিতে না পারি ।
জটিলসমস্যা তাহা ; অতীব জটিল।
যে কনিষ্ঠপুত্র জয়মল, অর্বাচীন ;-
সে রাজার সর্বাপেক্ষা প্রিয়। যে দ্বিতীয়
পুত্র, পৃথীনির্ভীক উদারচিত্ত বটে,
কিন্তু অসংযত, পরিচালিত সৰ্ব্বদা
পরকীয় মন্ত্রণায়। সর্বজ্যেষ্ঠপুত্র,
সর্বগুণান্বিত সঙ্গ—প্রিয়পাত্র নহে।
ভূপতির। কেহ নাহি জানে ভবিষ্যতে
কে হইবে মেবারের রাণা।
চিরপ্রথা
নহে রাজ্য পায় জ্যেষ্ঠ পুত্র ?
চিরপ্রথা
কে মানিবে, রায়মল স্বহস্তে যদ্যপি
মুকুট পরায়ে দেন জয়লশিরে ।
সর্বৈব রাজার ইচ্ছ। প্রজাবর্গ জানে
জয়মল মেবারের ভাবী অধিপতি।
কিন্তু ছাড়িবে কি সঙ্গ জন্মস্বত্ব তার
সহজে? পৃথ্বীই—নাকি ছাড়িবে?
তমসা।
সুৰ্য্য।
তমসা।
পৃথ্বীর?

প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। [ প্রথম দৃশ্য সূৰ্য্য। তমসা। সূৰ্য্য। তমসা। সূর্য। শক্তির স্বত্ব। সৈন্যদের প্রিয় পৃথী, ক্ষাত্রগুণে। তবে রাজ্য অরাজক ? অরাজক একরূপ। তবে নাহি জানি, তুমি বা একাকী কেন রাজ্যস্বত্ব হতে হইবে বঞ্চিত, যবে রাজভ্রাতা তুমি ? আমি রাণা মেবারের ?-কি বলিছ রাণী ? স্তব্ধ হও;-বলি, কহিও না পুনর্বার ওই কথা, আজ্ঞা করিতেছি।—যাও–যাও। [ তমসার প্রস্থান ] আশ্চৰ্য্য।—আশ্চৰ্য্য ইহা ।জানিল কিরূপে তমসা আমার পাপ অন্তরের কথা ? সে দিন গিয়াছিলাম চারণীমন্দিরে, কহিল চারণী, হস্ত দেখিয়া আমার, “মেবারের রাজ্যভাগ তােমার-সহসা কে যেন অমনি বেগে করিল আঘাত উচ্চাশার রুদ্ধদ্বারে। হইল চঞ্চল, উদ্বেল, হৃদয় এই নব সমস্যায়। আহারে বিহারে এই—কয়দিন ধরি, কে কর্ণে নিয়ত যেন করিছে ঝঙ্কার- “আমিই বা কেন এই রাজ্যস্বত্ব হতে । সূর্য। ক ১২]

(প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ প্রথম দৃশ্য
হইব বঞ্চিত, যবে রাজভ্রাতা আমি ?”
তারই প্রতিধ্বনি শুনি’ তমসার মুখে
উঠিয়াছি শিহরিয়া ;—তস্কর যেমতি
আপনার ছায়া দেখি, চমকিয়া উঠে।
রূঢ় হইয়াছি অকারণ,—এই ভয়ে
পাছে এ জিজ্ঞাসামাত্র হয় পরিণত
প্রকৃত প্রস্তাবে।-না না, করিব না আমি
হেন হীন হেয় কাৰ্য-বীভৎস প্রস্তাব!
যার অন্ন খাই, তার বিপক্ষে তুলিব ,
খড়গ ? তবে কে কাহারে করিবে বিশ্বাস ?
—কি বীভৎস! আপনার মনে উঠে যাহা,
ধ্বনিত যখন তাহা অপরের মুখে,
কি ভীষণ শুনায় সে কথা!—দেখিয়াছি
সমস্ত প্রস্তাব প্রতিবিম্বিত দর্পণে,
সাক্ষাৎ সহসা যেন।-বীভৎস ! ভীষণ
করিব না হেন কাৰ্য আমি—অসম্ভব ।
—অসম্ভব।
[ পৃথ্বীর প্রবেশ ]
পিতৃব্য ।
[ চমকিয়া )
কে ? পৃথ্বী।
সত্য, আমি।
চমকিলে কেন?
পৃথী
সূৰ্য্য।
পৃথ্বী।
[ ১৩"

প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। [ প্রথম দৃশ্য। সূৰ্য্য। পৃথ্বী। সূৰ্য্য। পৃথ্বী। হেন চমকিয়া সূর্য। হ বলিতে হইবে। ভাবিতেছিলাম—না না—বলিব কি আর, বিশেষ কিছুই নয়। যাহাই হউক, বলিতে হইবে তাহা পিতৃব্য আমারে ; নহিলে করিব অভিমান। প্রতিদিন আসি যাই। কই, কভু উঠ নাই তুমি -বল। বলিব কি তবে ? ভাবিতেছিলাম বৎস! কে হইবে রাজা ভ্রাতার মৃত্যুর পরে । কেন ? জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সঙ্গ। বৎস! নহে অত সমস্যা সরল । এত কি জটিল প্রশ্ন ? চিরকাল জানি, জ্যেষ্ঠপুত্র পায় রাজ্য। চিরকাল নহে। ইতিহাসে দেখিয়াছি পাইয়াছে কভু রাজত্বকনিষ্ঠ পুত্র। জয়মল ? ধিক্ ! লক্ষ্য কর নাই বৎস, তােমার পিতার পৃথী। সূৰ্য্য। পৃথ্বী। সূৰ্য্য। পৃথ্বী। সূৰ্য্য। ১৪} প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। [ প্রথম দৃশ্য। পৃথ্বী। স্নেহ সমধিক জয়মলে ? [ চিন্তিত ভাবে ] করিয়াছি ; যদি তাই হয়, হােক। সূৰ্য্য। সরল, উদার, পৃথী। সূৰ্য্য। } পৃথ্বী। সূৰ্য্য। একান্ত স্বভাব তাের। অসম্ভব নহে রাজ্যেশ্বর হবি তুই। [ সাশ্চর্য্যে ] আমি কেন নহে ? অসিবলে বলী তুই, সৈন্যদের প্রিয় রাজপুত্র তুই। [ সাশ্চর্যে আমি ! সােন্ বৎস! তােরে এত দিন লালন করেছি যত্নে। কত ক্রোড়ে করিয়াছি ; কত সস্নেহে চুম্বন করিয়াছি; ধরিয়াছি বক্ষে। পূর্ণ হয় আমার সকল বাঞ্ছা, পারি যদি তােরে বসাইতে সিংহাসনে। [ সঙ্গের প্রবেশ ] পিতৃব্য এখানে ? ‘। এখানে। কি সংবাদ সঙ্গ ? জয়মল - কি করেছে জয়মল ? সূৰ্য্য। সঙ্গ। সূর্য। [১৫ প্রথম অঙ্ক। তারাবাই। [ প্রথম দৃশ্য সূৰ্য্য। আনিয়াছে ধরি, সুন্দরী বালিকা এক। পিতা বালিকার আসিয়াছে অভিযােগ করিতে এক্ষণে রাজার সমীপে। তাত ! জান ত পিতার কঠোরকর্তব্যপরায়ণ ধৰ্ম্মনীতি। রক্ষা কর জয়মলে। কি করিব আমি ? উপযুক্ত শাস্তি হােক। আমি কি করিব ? বুঝাও তরে!-সে মূঢ় অবােধ বালক। অবােধ বালক জয়মল ? চল, আমি বিধান করিব যথাযযাগ্য ব্যবহার, দোষীর। • এই যে জয়মল- পৃথ্বী। সূৰ্য্য। ক পৃথী। জমল। পৃথী। [ জয়মলের প্রবেশ ] জয়মল ! আনিয়াছ ধরিয়া কি বালিকায় ? কহ, সত্য। আনিয়াছি সত্য। উত্তম! এক্ষণে তাহারে ফিরায়ে দাও। কেন দিব ? তুমি কে আদেশ করিবার ? ১৬] প্রথম অঙ্ক।] পৃথী। জয়। পৃথ্বী। তারাবাই । [ প্রথম দৃশ্য । আমি পৃথ্বীরাও, অগ্রজ তােমার। হােক, মানিনা তােমার প্রভুত্ব। উত্তর দাও, দিবে কি দিবে না। [ সঙ্গকে ] দাদা- দিবে কি দিবে না ? [ গলদেশ ধারণ ] পৃথ্বী, ছেড়ে দাও জয়মলে। তুমি যাও। [ জয়মলকে ] দিবে কি দিবে না ? পৃথ্বী। সঙ্গ। পৃথী। জয়। দিব । পৃথ্বী। চল সঙ্গে। দিতে হইবে এক্ষণে, আমার সাক্ষাতে। সঙ্গে চল এইক্ষণে। [ পৃথ্বী ও জয়মলের প্রস্থান ] কেন রূঢ় হও পৃথী? জয়মল-মূঢ়, অবােধ, নির্বোধ। [ প্রস্থানােত সঙ্গ। পিতৃব্য। জানাে কি, হিংসা করে জয়মল তােমারে ? হ জানি। সূৰ্য্য। সূৰ্য্য। সঙ্গ। সূর্য। ঘৃণা করে- [১৭

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ প্রথম দৃশ্য।
সঙ্গ।
এতদুর ? কেন ?
হেতু—তুমি
সূৰ্য্য।
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা।
হায় মূঢ় অবােধ বালক! [ প্রস্থান ]
মহৎ চরিত্র সঙ্গ তােমার ।তথাপি
সূৰ্য্য।
[ যমুনার প্রবেশ ]
যমুনা।
পিতৃব্য! কোথায় মেজদাদা? জানাে?
সূৰ্য্য।
যমুনা ?
যমুনা।
সূর্য।
দেখিব শুদ্ধ।
কি হেতু ?
জানিনা।
যমুনা।
সূৰ্য্য।
অদ্ভুত বালিকা বটে ! চল সঙ্গে চল।
[ নিষ্ক্রান্ত }
১৮ ]

দ্বিতীয় দৃশ্য
স্থান—পথ। কালপ্রাঃ।
গাইতে গাইতে বালকদিগের প্রবেশ।
বালকদিগের গীত।
এখনও তপন উঠেনি গগনপুরবভাগে ;
এখনও ধরণ চেয়ে আছে পথ তাহার লাগি ।
এখনও নীরব তিমির জড়িত নিবিড় কুঞ্জ,
এখনও ঘুমায় শাখায় শাখায় মধুপ পুঞ্জ,
শুধু আছে চাহি’ মেঘকুল, সাজি’
ভূষিত অরুণকিরণ রাগে ।
ধীরে ধীরে ওই উঠিল গগনে দিবসরাজ ।
ছড়ায়ে পড়িল মহিমার ছটা ভুবন মাঝ ।
অমনি উঠিল কাননে কাননে বিহগ ছন্দ,
অমনি ছুটিল কুঞ্জে কুঞ্জে কুসুম গন্ধ,
দুলিল চামর, শীতল সমীর পরশে
ভুবন উঠিল জাগি।
প্রস্থান ]
[ কলসকক্ষে পরিচারিকাদ্বয়ের প্রবেশ ]
১ পরিচারিকা। রাণা কাল ভারী ক্ষাপা হয়েছিলেন, শুলাম।
২ পরিচারিকা। তা ত হবেনই, তা ত হবেনই ;—তবে কার
উপর গা ?
( ১৯

প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। দ্বিতীয় দৃশ্য। ১ পরিচারিকা। তার মেজো ছেলে পৃথীর উপর। আবার কার উপর। ২ পরিচারিকা। তা ত হতেই পারেন বটে। তবে কেন ক্ষাপ হলেন ? ১ পরিচারিকা। শুনি, পৃথী ছােট রাণীর ছেলে জয়মলকে তরােয়াল দিয়ে কাটতে গিইছিল। ২ পরিচারিকা। ওমা সত্যি নাকি? তা ত কাটতে যেতেই পারে। তা ত কাটতে যেতেই পারে। তবে কেন গা? এই ভায়ে ভয়ে বিবাদ। তার উপর, রাণার ছােট ছেলের উপর টান বেশী কিনা ২ পরিচারিকা হ তা হবেই । তা হবেই । সুয়ােরাণীর ছেলে কিনা। তা আর হবে না ? সত্য যুগ থেকে এই রকমই ত হয়ে আছে। এই যে, রাজা যুধিষ্ঠির মলে’ তার সুয়াে রাণীর ছেলে ভরতের জন্যে তার দুয়াে রাণীর ছেলে বলরামকে বনে পাঠিইছিল না? তা আর হবে না ?—তবে তাই বলে কি বিবাদ কর্তে আছে গা? ১ পরিচারিকা। মেজো ছেলে তা সইবে কেন? ২ পরিচারিকা। তা ত সত্যিই ভাই। সে সইবে কেন? সেও ত ছেলে বটে, সে তা সইবে কেন ভাই ?—তবে কিন্তু এখন কি হবে ? ১ পরিচারিকা। রাণার যেমন মর্জি সেই রকমই কাজ হবে। ২০] * তবে কি . প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। [ দ্বিতীয় দৃশ্য। ২ পরিচারিকা। তা বৈ কি। তা বৈ কি। নৈলে কি আর আমার মর্জি মােতাবেক কাজ হবে ! , বলছিলাম যে ১ পরিচারিকা। হয় ত বা রাণা মলে ছােট ছেলেই রাণা হয়। ২ পরিচারিকা। এত দূর ! তার আর আশ্চর্য্য কি গা । হতেই পারে। তা ত হতেই পারে। এই যে রামচন্দ্র মলে তার ছােট ছেলে দুর্যোধনই ত রাজা হয়েছিল। বিধাতা মনে কল্লে কি না হয় ? ১ পরিচারিকা বিধাতা নয়রে ! বরং বল ছােটরাণী মনে কল্লে কি না হয় ? ২ পরিচারিকা ঐ একই কথা। পুরুষের ঐ সুয়ােরাণীও যে আর ঐ বিধাতাও সেই। ১ পরিচারিকা তা বৈকি। দেখ রাজা বড় রাণীর মেয়েটাকে একেবারে ভাসিয়ে দিলে গা । অপগণ্ড জানােয়ারের হাতে সঁপে দিয়েছে। তাকে দেখলে গায়ে জ্বর আসে। ২ পরিচারিকা। তা ত আদারই কথা, তা ত আসবারই কথা। -বলি মেয়ে না কি শ্বশুর বাড়ী যাচ্ছে? ১ পরিচারিকা। যাচ্ছে বৈকি—মেয়ে কি বিয়ে করে, বাপের বাড়ী থাবার জন্য ? শ্বশুর বাড়ী যাবে বৈকি। ২ পরিচারিকা। তা ত যাবেই। তা ত যাবেই।—আহা খাসা মেয়ে। [ ২১

আম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
১ পরিচারিকা। রাজজামাতা তাকে নিতে এসেছে, এখন না
গেলে চলে ?
২ পরিচারিকা। ও মা! তা কি চলে?
১ পরিচারিকা। চল্। আর একটু হেঁটে চল না। চছিস যেন সমস্ত
মাটি মাড়িয়ে যাচ্ছি।
যেন গতর খাটিয়ে খেতে
আসি নি।
২ পরিচারিকা। ও মা সে কি গাে। তবে কি গায়ে ফু দিয়ে
বেড়িয়ে বেড়াতে এসেছি ? তা’লে কি আর মুনিব
মাইনে দিত-ও মা বল কি গাে?
১ পরিচারিকা। চল্ চল, এখন চল্।
২ পরিচারিকা। এই চল না গা। ধমক দাও কেন?
[ নিষ্ক্রান্ত ]
তৃতীয় দৃশ্য।
স্থান—আরাবলী পদপ্রান্ত গ্রাম। কাল—অপরা।
শতান ও তাহার রাজ্ঞী। দূরে পাঠনি তারা।
পুরতান। সংসারের লীলা খেলা; সৌভাগ্যলক্ষ্মীর
চঞ্চলতা ; নিয়তিচক্রের আবর্তন।
আজি মহারাজ, কল্য ভিক্ষুক। প্রেয়সী
ইহা মাত্র প্রকৃতির খেয়াল ।
২২]
!

প্রথম অঙ্ক। তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য। ; প্রেয়সী! রাণী। রাণী । খেয়াল? জানিনা। ক্ষত্রিয় নারী আমি এই নীতি বুঝি না ; আমি জানি, স্বীয় বাহুবলে গড়ে আপনার ভাগ্য, মনুষ্য- শুর। গড়ে আপনার ভাগ্য! সাধ্য কি তাহার রােধিতে বিপক্ষগতি বিশ্বনিয়মের ? চতুর্দিকে, ঘটনার বিপুল প্রবল। ঘাের আবর্তের মধ্যে, কি করিবে একা মনুষ্যের ক্ষীণ বাহুবল ? কি করিবে ? করিবে সংগ্রাম ;-ভীরু সৈনিকের মত নাহি পলাইবে কর্মক্ষেত্র হতে। যদি পরাজিত হয় ? মরিবে বীরের মত। প্রেরিত হয় না নর, বিশ্বে, তৃণসম ভাসিয়া যাইতে, যে দিকে লইয়া যায় তরঙ্গ; তরীর মত যাইতে হইবে বাহিয়া বিপক্ষে তার, প্রয়ােজন যদি। পূর। ধীরে, কিছু ধীরে, যাণ।—যদি তাই হয়, কেন তবে নল, রাজ্যভ্রষ্ট পত্নীত্ৰষ্ট, রাণী। [ ২৪

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
রাজা ঋতুপর্ণের সারথী-
রাণী।
আত্মদোষে।
প্রকৃতির খেয়ালে নহে সে! আত্মদোষে,
স্বেচ্ছায়, অবৈধ অক্ষক্রীড়ায় কুঠার
মারিয়াছিলেন তিনি আপনার পদে
শূর। স্বেচ্ছায় নহে সে প্রিয়ে দৈবেচ্ছায় ;-কলি—
রাণী। কলি ? আসিয়াছিল কি কলি ছিদ্র বিনা ?
কে দিয়াছিল সে ছিদ্র ?
কেন অনুযােগ
কর প্রিয়ে! কি দুঃখ এখানে ? রমস্থান
এ বিদর্ভ, আরাবলীশৈলপদতলে।
বহে যায় নিঝর সুমিষ্ট স্বচ্ছতােয়া,
সুন্দর। প্রচুর শস্য। অনন্ত আরাম।
রাণী। পিঞ্জর স্বর্ণের যদি হয়, প্রিয়তম !
তথাপি পিঞ্জর তাহা। স্বেচ্ছায় মানুষ
হয় বনবাসী। কিন্তু পরের আজ্ঞায়,
প্রাসাদে নিবাস হয় ন্যক্কারজনক ?
শূর। প্ৰেলী একটু তুমি অধিক মাত্রায়
অসংস্কৃত বাক্য আজি করিছ প্রয়োগ ;
তাহা যে স্বামীর প্রতি সম্মানসূচক,
বলিয়া হয় না বােধ। শাস্ত্রে আছে বটে,
যুধিষ্ঠির রাজ্যচ্যুত যবে, বনবাসী,
২৪ ]
.

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
দ্রৌপদী এরূপ ভাষা পাণ্ডবের প্রতি
করিয়াছিলেন উচ্চারণ ভগবতী
—এরূ প্রবাদ আছে, একদা এহেন
করিয়াছিলেন দ্বন্দ্ব ভৈরবের সনে।
তথাপি স্বীকাৰ্য ইহা প্রিয়তমে ! সতী
হিন্দুরমণীর মুখে এইরূপ ভাষা
শােভা নাহি পায়।
রাণী স্বামী ! শােভা পায় বটে
ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধক্ষেত্র হ'তে পলায়ন!
-নিযুক্ত পুরুষজাতি, বিধান করিতে
নিয়ত, স্বামীর প্রতি কর্তব্য নারীর ;-
আপনার কর্তব্যপালনে উদাসীন।
—হায় স্বামী ! যদি তুমি যুদ্ধক্ষেত্র হতে
নাহি পাইতে, হেয় কাপুরুষ সম ;
যদি ক্ষত্রিয়ের মত মরিতে সমরে ;
ক্ষত্রিয় নারীর মত, দেখিতে, উল্লাসে
যাইতাম আমি সহমরণে ;-
প্রেয়সি !
আমি যদি মরিতাম সমরে, কিরূপে
দেখিতাম, তাহা ঠিক বুঝিতে না পারি।
এযুক্তির ভ্রমটুকু ছাড়িয়া দিলেও,
আমার মৃত্যুর পরে, মানিলাম যদি,
[ ২৫

প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য যাইতে সহমরণে তুমি, কিন্তু প্রিয়ে তাহাতে আমার লাভ? আমি ত নিশ্চিত যেই মরিলাম, সেই মরিলাম-- রাণী। ধিক। ক্ষত্রের মরিতে ভয় সমরে ?-হা ধিক! শূর। শােন অন্য যুক্তি, প্রিয়তমে। যুদ্ধে যদি মরে বীর, সে নিশ্চিত মরে ; যুদ্ধ আর করে না সে। কিন্তু যদি পলায়, কদাপি পুনঃ যুদ্ধ করিলেও করিতে পারে সে। রাণী । বৃথা যুক্তি। ভীরুতার শত যুক্তি আছে। প্রকৃত বীরত্ব তর্ক করে না কদাপি ; জয়লাভ করে কিম্বা মরে।—হায় যদি এ গর্ভে জন্মিত পুত্র, কন্যা না জন্মিয়া সে বিষয়ে একটুকু হয়েছিল ভ্রম, কাহার জানি না। তবে পুত্র হইলেও, সে যে নাহি পলাইত, তাহার প্রমাণ ? রাণী। জন্মে না সিংহীর গর্ভে শৃগাল-শাবক- শূর। সিংহীর বিবাহ যদি হয় প্রিয়তমে, শৃগালের সঙ্গে—তাহা হইতেও পারে। রাণী। করিতে চাহিনা চর্চা এ বিষয়ে প্রভু। [ প্রস্থান । শূর। প্রেয়সীর মেজাজটা নবনীর মত অদ্য সুকোমল নহে, তাহা সুনিশ্চিত। ২৬]

প্রথম অঙ্ক।}
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য
-হা বিধি ! যখন তুমি গড়েছিলে নারী,
কি দিয়া যে গড়েছিলে বলিতে না পারি। ( প্রস্থান ]
তারা। ধিক্।—আমি নারী !—ধিক! কেন হই নাই
পুত্র ? ধিক্ নারী জন্ম তাহাই বা কেন ?
কিসে হীন নারীজাতি ? এই নারীকুলে
জন্মে নাই দময়ন্তী, সুভদ্রা, সাবিত্রী-
জন, খনা, লীলাবতী, প্রমীলা রূপসী ?
কিসে হীন নারীজাতি ? নাহি হস্তপদ?
হৃদয়, মস্তিষ্ক নাই ? শক্তি, বল, তেজ,
শিক্ষায় অবশ্য সাধ্য সকলি। দেখিব
কি করিতে পারি আমি। এ মৃণাল বাহু
করিব লোহের মত কঠিন। ধরিব
শাণিত কৃপাণ তাহে। দেখি পারি কিনা।
—ক্ষুব্ধ হইওনা মাতা। উজ্জ্বল করিব
নির্বাণ গরিমা আমি! আমি উদ্ধারিব
অপহৃত রাজ্য। দেখি কি করিতে পারি।
ক্ষত্রিয়-ললনা আমি।-পুত্র হই নাই,
করিব পুত্রের কাৰ্য জননী তােমার।
[ প্রস্থানী
[ প্রস্থান।
[ ২৭

চতুর্থ দৃশ্য
স্থান-বন, দূরে মন্দির। কাল—মধ্যাহ্ন।
সশস্ত্র সঙ্গ, পৃথী, ও জয়মল মৃগয়া হইতে ফিরিতেছিলেন।
পৃথী। পথ ভুলিনিত ?
সঙ্গ। না। এ পথ আমি জানি।
জয়। তুমি আগে এ পথে এইছিলে নাকি ?
সঙ্গ। অনেকবার।
জয়। কবে ?
সঙ্গ। পরশুই এইছিলাম।
পৃথী। কেন? এখেনে কেন ? কি খুজতে ?
সঙ্গ। নির্জনতা
পৃথ্বী। নির্জনতা—সে ত বাড়ীতেই পাওয়া যায়। চোখ বুজলেই
নির্জনতা।
সঙ্গ। আর নিস্তব্ধতা।
পৃথ্বী। কাআেঙুল দিলেই হোল।
গাহিতে গাহিতে চারণীর প্রবেশ।
স। এ কে ?
পৃথী। তাই ত। জটাইবুড়ী নাকি
২৮]

প্রথম অঙ্ক।
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
চারণীর গীত।
সম্মুখে সেই পশ্চাতে সেই অসীম তিমির রাশি।
স্ফুলিঙ্গসম এ আঁধারে মােরা কোথা হ'তে ছুটে আসি।
কতটুকু পথ অালোকিত করি,-কিছু দেখিতে না পাই।
এ আঁধারে পথ খুজিতে খুজিতে এ আঁধারে মিশে যাই।
অস্ফুট ভাতি উপহাস করি’ প্রদীপ শিখার পাছে,
বিরাট মরণ সমান বিরাট অাধার জাগিয়া আছে ।
মহাসমুদ্র আঘাতে, ক্ষুদ্র ধরণী ভাঙিয়া যায়,
নিভে যায় ক্ষীণ নক্ষত্র ও দিগন্ত নীলিমায় ।
জয়। আবার গান গায়।
পৃথী। তাই ত ! গানটার কিন্তু কোনই অর্থই বােঝা গেল না।
সঙ্গ। অদ্ভুত! এই নির্জন বনভূমিতে একাকিনী।
জয়। কে তুই ?
পৃথী। হাঁ, ঠিক কে তুই?
সঙ্গ। কে তুমি মা ?
চারণী। আমি বনচারিণী তাপসী।
পৃথী। তাপসী? তা কখন হতে পারে ?
চারণী। কেন হতে পারে না বাছা ?
পৃথ্বী। তাওত বটে।—কেন যে হতে পারে না তা ত বােঝা যাচ্ছেনা।
জয়। না না এরা সব চোর,—দিনে তাপসী সেজে বেড়ায়, রাত্রে
চুরি করে।
পৃথী। ঠিক! বেটা নিশ্চয় চোর। দিনে তাপসী সেজে বেড়ায়।
[ ২৯

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
চাণী। এ রকম তাপসী চোর কটা দেখেছ বাছা ?
পৃথী । তাওত বটে -এ রকম তাপসী চোর ত কখন দেখিছি বলে
মনে হচ্ছে না।
জয়। তবে এ ভিখিরি।
পৃথী। ভিখিরি বটে! আমিও তাই ভাবছিলাম। ভিখিরি। নিশ্চয়
ভিখিরি।
চারণী। ভিখিরি কি কর্তে বনে থাকবে বল না বাছা ?
পৃথ্বী। তাওত বটে, বনে ভিক্ষাই বা দেবে কে? তবে তুমি কে
সেইটে খুলে বলনা ছাই !
চারণী। আমি চারণী।
সঙ্গ। আপনি চারণী ? এখানে কি আপনার আশ্ৰম ?
চারণী। এখানে নয় । তবে বেশী দূরও নয়। নিকটেই আমার
মায়ের মন্দির।
সঙ্গ। হাঁ পিতৃব্যের কাছে একদিন আপনার কথা শুনেছিলাম বটে।
ও তাইত বটে! আপনি হাত দেখতে জানেন না ?
চারণী। [ সহাস্যে ] কিছু কিছু জানি।
পৃথ্বী। ভবিষ্যৎ গুতে পারেন নাকি ? আচ্ছা, বলুন দেখি
আমাদের তিন জনের মধ্যে কে মেবারের রাজা হবে ?
চারণী। ক্ষণিক নিস্তব্ধ থাকিয়া } সঙ্গ মেবারের রাজা হবে।
উক্ত গীতের প্রথম চরণ গাইতে গাইতে চারণীর প্রস্থান।
পৃথ্বী। মিথ্যা কথা !-ভণ্ড!
জয়। কিন্তু নাম জালে কেমন করে?
৩০ ]

প্রথম অক্ষ। ]
তারাবাই।
[ পঞ্চম দৃশ্য।
পৃথী। তাওত বটে! তবে ত বলেছে ঠিক বােধ হচ্ছে।
সঙ্গ। [ চিন্তিতভাবে ] তাইত ! চল বাড়ী চল। বেলা হল।
সঙ্গ। [ স্বগত ] আমি বিশ্বাস করি না যে মানুষ ভবিষ্যৎ বলতে
পারে। যদি পাৰ্ত্ত তা হলে ভবিষ্যৎ খণ্ডনীয় হ’ত ; আর
ভবিষ্যৎবাদ খণ্ডনীয় হয়, যদি তা হ’তেও পারে নাও
হতে পারে, তবে তা আগে থেকে বলবে কেমন করে ?
প্রহেলিকা প্রহেলিকা—সব-প্রহেলিকা।
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান-সূৰ্যমলের গৃহের অন্তঃপুর। কাল—প্রাদু।
সূর্যমল একাকী।
সূৰ্য্য।
তথাপি বাজিছে কর্ণে সেই এক কথা-
প্রহেলিকাপূর্ণ সেই ভবিষ্যদ্বাণী
আমি পাব রাজ্যভাগ। নিভাইতে চাহি।
এই দুঃসাহসী ইচ্ছা ; অমনি কৌশলে
ইন্ধন যােগায় পত্নী তমসা সতত,
মন্থরার মত।না না, ইহা অসম্ভব ।
করিব না হেন পাপ।-বৃদ্ধ রায়মল,
[ ১

যমুনা।
যমুনা।
প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই ।
[ পঞ্চম দৃশ্য।
স্নেহশীল, বিশ্রৰূ উদার ; সেনাপতি
আমি তার ;-হইব না বিশ্বাসঘাতক।
[ নেপথ্যে অলঙ্কারধ্বনি ]
আসিছে যমুনা। আজি যাইবে এক্ষণে
পতিগৃহে -আসিতেছে বিদায় লইতে।
[ যমুনার প্রবেশ ]
পিতৃব্য। এখানে? আমি আসিয়াছি, তাত !
বিদায় লইতে।
সূৰ্য্য।
যাইতেছ এক্ষণেই ?
এক্ষণেই যাইতেছি। কর আশীৰ্বাদ।
সূৰ্য্য। যাও মা স্বামীর ঘরে ; পতিব্রতা হও,
গুরুজনসেবাপরায়ণা হও সদা ;
পরিজনপ্রিয় হও;-কদিও না বৎসে !
যমুনা। কাঁদিব না। পিতৃব্য। জানিনা কেন কাদি।
চিরকাল আমি দুষ্ট। পিতৃব্য তােমারে
করিয়াছি কত ত্যক্ত। করিও মার্জনা।
সূৰ্য্য। যমুনা আমার কন্যা নাই! আশৈশব
করেছি পালন তােরে স্বীয় কন্যা সম।
আজি হতে কন্যাস্নেহসম্পদে, যমুনা,
বঞ্চিত পিতৃব্য তাের।-বৎসে! প্রাণাধিকে।
যাও পতিগৃহে তবে, আজি শুভদিনে,
সুলগ্নে। জানিও বৎসে, স্বামীর ভবন
৩২ ]: ",

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই ,
[ পঞ্চম দৃশ্য।
যমুনা।
সূৰ্য্য।
নারীর আপন বাটী, পর পিতৃগৃহ !
যাও মা আপন গৃহে—যেমন পাৰ্বতী
বিজয়া দশমী দিনে যান মা কৈলাসে !
আশীৰ্বাদ করি, পতিসােহাগে গৌরবে
গরবিণী হও! পতি যদি রূঢ় কহে
হইও প্রিয়ভাষিণী ; হয় যদি রূঢ়
সহিও নীরবে।পতি ওনিও সতীর
সৰ্বস্ব, পরমাগতি জীবনে মরণে।
পিতৃব্য প্রণাম হই।
সূৰ্য্য। আয়ুষ্মতী হও।
[ যমুনার প্রস্থান)
| পদচারণ সহ ] সােণার প্রতিমা এই—দিয়াছেন ভাই--
সঁপিয়া চণ্ডালকরে ; এই মুক্তাহার
পরায়ে বানরগলে !-হায় প্রভুরাও
বুঝিতি যদি মূল্য এ রত্নের ; তারে
রাখিতিস্ শিরে, নাহি দলিতি পদে।
[ দূরে শিবিকাবাহকদিগের ধ্বনি ]
-ওই যায় শিবিকায় জননী আমার ;-
কোথায় চলিয়া যা নিষ্ঠুর বালিকা
ছাড়িয়া পিতৃব্যে তাের।
[ তমসার প্রবেশ.]
গিয়াছে যমুনা-
৩৩
তমসা।
ক

প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। [ পঞ্চম দৃশ্য সূর্য। তমসা। সূৰ্য্য। তমসা। সঙ্গ। ক 'তমসা। গিয়াছে চলিয়া দিবা , গৃহ অন্ধকার। কা’র জন্য নিত্য ব্যগ্র হও? অশ্রুজল নিয়ত বর্ষণ কর ? পরের কারণ সতত ব্যাকুল ! বুঝি না তােমার রীতি। বুঝিবে কি তুমি? হায় ! তাহার সহিত রক্তের সম্বন্ধ নাই ; কর নাই তারে পালন, ধরিয়া ক্রোড়ে। [ দূরে সঙ্গের দ্রুতবেগে প্রবেশ ] সঙ্গ কোথা যাও ? বৈদ্য অন্বেষণে- কেন ? পীড়িত মূচ্ছিত পিতা- মুচ্ছিত ? কিরূপ? কহিতেছি ; আগে ডাকি বৈদ্যে। যাই দেখি। এই যদি সেই মূচ্ছা, নাহি ভাঙে যাহা [ সারঙ্গদেবের প্রবেশ ] মা ডাকাইয়াছিলে। কে ? সারঙ্গ ? হ্যা আমি ডাকাইয়াছিলাম তােমারে। প্রয়ােজন? আছে প্রয়ােজন, গুরুতর প্রয়ােজন। সূৰ্য্য। [ প্রস্থান। [ প্রস্থান ] সুৰ্য। তমসা। সারঙ্গ। তমসা। সারঙ্গ। তমসা। ৩৪ ] প্রথম অঙ্ক। ] তারাবাই। [ পঞ্চম দৃশ্য। সারঙ্গ। তমসা। সারঙ্গ। তমসা। সারঙ্গ বলিব; স্থির হও। কিন্তু তার পূৰ্বে হও প্রতিশ্রুত, করিবে পালন আদেশ আমার। প্রতিজ্ঞার প্রয়ােজন ? জানাে না কি আজ্ঞাবহ সারঙ্গ নিয়ত তোমার চরণে। জানি। তথাপি সারঙ্গ। প্রতিশ্রুত হও—অতি কঠিন আদেশ। প্রতিশ্রুত হইবার পূর্বে শুনি তবে কি আদেশ। নহিলে শপথ করিবে না ? মনে আছে—সেইদিন, প্রভাতে একাকী গম্ভীরাসৈকত তুমি, ক্ষুধায় কাতর, C A ছিন্নবস্ত্র, শীতার্ত, চাহিয়াছিলে ভিক্ষা আমার নিকটে ? মনে আছে। মনে আছে- তােমারে আদরে আমি চিতােরে আনিয়া করি সৈন্যভুক্ত। মনে আছে। তাই আজি পঞ্চশত পদাতির সেনাপতি তুমি। - / সারঙ্গ। তমসা। সারঙ্গ। তমসা। [৩

প্রথম অঙ্ক ]
তারাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
সার।
সত্য, রক্ষাকর্তী তুমি, মানি মাতা!
তমসা।
সারঙ্গ।
প্রতিশ্রুত হও, যাহা আদেশ করিব,
করিবে পালন, কোন প্রশ্ন না করিয়া ।
হইলাম প্রতিশ্রুত।
অনুবর্তী হও।
[ নিষ্ক্রান্ত ]
তমসা।
ষষ্ঠ দৃশ্য
স্থান—সিনােহী-রাজ্য। প্রভুরাওর বিলাস-গৃহ। কালরাত্রি
পারিষদবর্গ সহিত প্রভুরাও।
পারিষদবর্গের গীত।
আমরা-ভাঙ খেয়ে হয়ে আছি চুর।
যাচ্ছি চলে'—সশরীরে—যাচ্ছি চলে’ মধুপুর।
শুনছি বসে নিশিদিন, কাণের কাছে বাজছে বীণ
খাচ্ছে যত অর্বাচীন—ঐ গাঁজা গুলি চরস'।
সস্তা হাে না, তার চেয়ে ভাঙক্ষগুণে সরস ;
নেশার রাজা সিদ্ধি, যেমন মণির মধ্যে কোহিনুর।
লিখে গেছেন পুরাণকর্তা “স্বয়ং ভোলা খেতেন ভাঙ”;
খেতেন তা, হয় ভোলা, কিন্তু পুরাণ কর্তাই, সুতরাং।
৩৬]

প্রথম অঙ্ক ] তারাবাই। [ ষষ্ঠ দৃশ্য। জানে শুদ্ধ সিদ্ধিপাের, জেগে জেগে ঘুমের ঘাের বেশী খেলেই নেশায় ভোর —আর অল্প খেলেই তাহা --আর কি-বসে’ হাস্য কর-হাঃহা হাহা হাহা- হাো কেন ফকির, ভাবে আমি রাজা বাহাদুর। পারিষদবর্গ। দেখ দেখ- আমি প্রভুরাও- পারিষদবর্গ। [ নির্জীবভাবে ] ইনি প্রভুরাও সিরােহীর রাজা- পারিষদবর্গ। [ তদ্রুপ } হাঁ- এই যথেষ্ট। পারিষদবর্গ। [ তদ্রুপ ] আবার চাও কি ? তবে লােকে বলে কেন ? পারিষদবর্গ। [ তদ্রুপ : ঠিক। বলে কেন যে “আমি কে ? না রায়মলের জামাই”! -বলে কেন? পারিষদবর্গ। [ তদ্রুপ ] বলে কেন? বরং বলা উচিত, যে রায়মল কে ? না প্রভুরাওর : পারিষদবর্গ। [ তদ্রুপ ]—প্রভুরাওর শ্বশুর। -দেখ সব পারিষদবর্গ । তােমরা সব বেজায় কুড়ে হয়ে যাচ্ছ। খােমােদ কৰ্বে ও উৎসাহের بنا ৩ প্রথম অঙ্ক ] পারিষদবর্গ। তারাবাই। [ ষষ্ঠ দৃশ্য, সঙ্গে কর্তে পারো না? না, আমি যা বলছি, কুড়ের মত শুধু তাই ইতি’ করে যাচ্ছ।-ইতে আরাম হয় না। ঠিক! ইতে আরাম হয় না ! দেখ, আমি এবার যে বিবাহ করেছি সে একবারে চূড়ােন্ত বাবা। [ কতকটা উৎসাহের সহিত চূড়ােন্ত বাবা, একেবারে চূড়ােন্ত ! সুন্দরী—একেবারে সাক্ষাৎ উর্বশী, কেবল নাচে না, পারিষদবর্গ। প্রভু। এই যা! ক { পারিষদবর্গ। [ তদ্রুপ ] হা--এই যা। নাচে না এই যা —আবার!—আমি বছি যে ফের যদি ঐ রকম ‘ইতি’ করে’, সেরে দেবার চেষ্টায় থাক, তাহলে পোষাবে না?—মনে রেখাে! পারিষদবর্গ। [ উৎসাহে] মনে রেখােপােষাবে না। মনে রেখাে। প্রভু। মেয়েটা একেবারে সাক্ষাৎ বিদ্যাধরী। —সাক্ষাৎ!- [ পারিষদবর্গকেহ বলিল “সাক্ষাৎ” কেহ, চুমকুড়ি দিল, কেহবা অঙ্গভঙ্গী করিল ] ঢের ঢের মেয়েমানুষ দেখলাম—কিন্তু আমার যমুনা একেবারে ৩৮ ] 19.

প্রথম অঙ্ক ।
তারাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
[ পারিষদবর্গ অঙ্গভঙ্গী ইত্যাদি দ্বারা উৎকর্ষ প্রকাশ করিল ]
8
প্রভু। দেখতে—কি রকম জানাে ?-যেন-যেন-না
দেখলে ঠিক বােঝা যায় না।
পারিষদবর্গ। তা ঠিক।-না দেখলে বােঝা যায় না।
প্রভু। দেখবে। আচ্ছা তােমাদের দেখাচ্ছি।
-এই প্রহরী।
পারিষদবর্গ। প্রহরী ! প্রহরী।
প্রহরীদ্বয়। [ প্রবেশ করিয়া ] মহারাজ।
প্রবী। এক্ষণেই আমার রাণীরে এখানে নিয়ে আয়।
-হাঁ করে দাড়িয়ে রইলি যে !—যা ।
১ পারিষদ। [ মহা উৎসাহে ] যা না বেটা !
প্রহরী।
এখেনে মহারাজ ?
প্রভু। এখেনে বৈকি! নইলে কি সেখেনৈ!
২ পারিষদ। [ তােপ নইলে কি সেখেনে ?-হু-
প্রভু। ব রাজার হুকুম।
৩ পারিষদ। [ তদ্রুপ ] হাঁ হুকুম !
[ প্রহরীদ্বয়ের সবিস্ময়ে প্রস্থান ।
প্রভু।
মেয়েটা কিন্তু আমার ভারি বাধ্য।
পারিষদবর্গ। বেজায় !
যেন[অনেক ভাবিয়া] একেবারে যেন-কুকুর।
পারিষদবর্গ। হাঁ, ঠিক! যেন কুকুর!
[ ৩৯
?

প্রথম অঙ্ক ] তারাবাই। [ ষষ্ঠ দৃশ্য। আবার ! দেখ, এ রকম কল্লে পপাষাবে না বছি। পােষাবে না। না না। পােষাবে না।—বলছি- পারিষদবর্গ । [ বৃদ্ধা দাসীর সহিত যমুনার প্রবেশ ] যমুনা। ১ পারিষদ। বৃদ্ধা। ২ পারিষদ। ৩ পারিষদ। যমুনা এসেছো ? আমায় এখানে নিয়ে এলে কেন ? ওমা! সত্যিইত । আমাদের এখেনে নিয়ে এলি কেন? বলি, ও দারােগা—বলি—ও— তুই বুড়ি যা ! । তুমি যাও বৃদ্ধে কেন? আমি যাবো কেন? এ সভায় তুমি কোন কাজে লাগবে না বৃদ্ধে! হ। বৃদ্ধে! বৃদ্ধস্য বচনং গ্রাহমাপকালে হপস্থিতে কিন্তু সৰ্ব্বত্রৈব এ রকম বিচারে তু চলবে ত বাবা। মুখের ঘােমটা খােলত সােনার চাদ!-[ স্বহস্তে যমুনার অবগুণ্ঠন উনােচন ] বলি, দেখছে চেহারা খানা ?-যমুনা !—প্রাণেশ্বরি! একবার আমার পাশে দাড়াও ত সােনার চাদ! একবার এরা সব দেখুক যে কি রকম মানায়। এরা কারা? বটে। . বৃদ্ধা।

প্রথম অঙ্ক ]
তাৱাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
এরা যারা’ই হােক্, তোর কি ? বেরাে এখেন
থেকে।
পারিষদবর্গ। [ সঙ্গে সঙ্গে ] বেরাে বেটী।
যমুনা।
আমাকে এখন থেকে নিয়ে চল।
বৃদ্ধা। সত্যিই ত! এখেনে নিয়ে এলি কেন ? বলি
ও-পােড়ারমুখাে[ প্রহরীকে ধাক্কা দিল ]
প্রহরী। আঃ ধাক্কা দাও কেন ?
প্রভু। যমুনা ! এক বার আমার পাশে একবার দাঁড়াও না।
—তা নৈলে যেতে দেবাে না।
আচ্ছা একবার বাঁয়ে দাঁড়া বাছা! নৈলে ত
ছাড়বে না।
( যমুনা বৃদ্ধার বাক্যবৎ প্রভুরাওর বামপার্শ্বে দাঁড়াইলেন।]
[ পারিষদবর্গকে } বল! কেমন মানিয়েছে বল না।
পারিষদবর্গ। বাহবা কি মেনিয়েছে-
গীত।
{-আহা কিবা মানিয়েছে রে-
ওহহ কিবা মানিয়েছে।
{ ব্রঙ্গের কুঞ্জবনে)
যেন মেঘের কোলে ইন্দ্রধনু,
যেন কৃষ্ণের পাশে বলরাম ;
যেন নাচের সঙ্গে তবলার চটি
আর টপ্পার সুরে হরিনাম।
}
( বাহবারে বাহবা।
[ ৪১

প্রথম অক। ] তারাবাই [ সপ্তম দৃশ্য (বৈশাখ চৈত্রমাসে) যেন কপির সঙ্গে মটর সুটি, যেন ক্ষীরের সঙ্গে পাকা আম ; যেন মুড়ির সঙ্গে পাঁপর ভাজা, আর মদের সঙ্গে হরিনাম। (বাহবারে বাহবা ) যেন জ্বরের সঙ্গে বিচিকা, যেন গােপীর সঙ্গে ব্রজধাম । (ও সেই ধাপরযুগে) যেন বিয়ের সঙ্গে রসন চৌকি, আর মরণকালে হরিনাম। ( বাহবারে বাহবা) [ গাইতে গাইতে নিষ্ক্রান্ত। { সর্বাগ্রে প্রভুরাও, যমুনা ও বৃদ্ধা ; তৎপশ্চাতে পারিষদবর্গ গাইতে গাইতে নিষ্ক্রান্ত ) সপ্তম দৃশ্য স্থান-অন্তঃপুরগৃহ। কাল—দ্বিপ্রহর রাত্রি। শয্যায় শান- রাণা। পার্শ্বে বসিয়া—সঙ্গ, পৃথী ও জয়মল। মায়। কতরাত্রি সঙ্গ ? সঙ্গ। রাত্রি দ্বিতীয়প্রহর। রায়। তবু তিনজনে বসে আছ?—এত রাত্রি ! ৪২]

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃথ।
;
;
ঘুমাওগে ; যাও পৃথী, যাও জয়মল ,
ঘুমাওগে, কত আর র’বে রাত্রি জাগি’!
তােমরা সবাই সম পিতৃভক্ত-জানি।
সঙ্গ বসে থাক; যবে অতি ক্লান্ত তুমি,
পাঠায়, পৃথীরে, কিন্তু জয়মলে।—ওকি!
তবু বসে ?
পৃথী। পিতৃদেব। শ্রান্ত নহি আমি।
জয়। জীর্ণ রুগ্ন শয্যাগত পিতৃদেবে ছাড়ি’,
আসে কি নয়নে নিদ্রা ?
রায়।
ধন্য পিতৃভক্তি।
—শূরন বলিত যে “বিশ্বে দয়া মায়া —
কিছু নাই। সব ধূর্ত—নিজকার্যে ফিরে।”
বুঝিয়াছি, শূরতান মিথ্যা বলেছিল।
জয়মল-জল, [ জলপান ] বাড়ে শীত! বাঁড়ে শীত।
একি জ্বর ! ডাক বৈদ্যে সঙ্গ!-না না থাক্।
কাজ নাই ঔষধে। ঔষধে-কাজ নাই।
ঔষধে সারায় ব্যাধি ? খাব না ঔষধ।
খাব না ঔষধ! একি দাহ। একি জালা ।
পৃথী-জল ;-সঙ্গ—না না থাক্‌-না না থাক।
চক্ষে নিদ্রা আসে।—অবসন্ন হয় দেহ।
এ কি মৃত্যু!—এত স্নিগ্ধ! এত সুমধুর।
এ যে বিষাদের মত আলিঙ্গন করে
=
[ ৪৩

প্রথম অঙ্ক।] তারাবাই। [ সপ্তম দৃশ্য এই তপ্ত দেহ।ঘুম আসে। [ নিদ্রা ] পৃথী। [ বহুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া জয়মল! মহানিদ্রাগত বুঝি পিতা। দেখ দেখি ! সঙ্গ। ডাকিব কি বৈছে ? জয়। না কাজ নাই। আমি জানি কিছু নাড়ীবিদ্যা। সঙ্গ। দেখ দেখি নাড়ী। জয়। [ নাড়ী দেখিয়া ] সত্য, পৃথী, নাড়ী নাই। পৃথী। বলিয়াছি ঠিক। জয়। এযে অঙ্গ শিলাসমহিম ;-মৃত্যু বটে। সঙ্গ। নিঃশ্বাস বহিছে ? জয় কোথা নিঃশ্বাস বহিছে । -সব স্তব্ধ। পৃথী। কি করিবে ? বুঝিব কি তবে রাণা সঙ্গ? পৃথী। সেই রাণা যার তরবারি সমধিক শক্তি ধরে। হােক সপ্রমাণ তাহা এইক্ষণে।—সঙ্গ। লও তরবারি। সঙ্গ। পৃথী! ক্ষিপ্ত হইয়াছ? পৃথী -লও তরবারি। হােক স্থির এক্ষণে, কে মেবারের রাণা। ৪৪ ]

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
সঙ্গ। আমি রাজ্য চাহিনাক।
পৃথী।
রাজ্য চাহােনাক।
শুনিতে চাহিনা স্তোকবাক্য।—মিথ্যা কথা।
রাজ্য চাহােনাক বটে ?—লও তরবারি।
সঙ্গ। পৃথী! সত্য বলিতেছি, রাজ্য চাহিনাক।
তুমি ভােগ কর রাজ্য, কিম্বা জয়মল।
পৃথী। মনে নাই চারণীর ভবিষ্যৎ বাণী ?
“সঙ্গ মেবারের রাণা?”—আমি বলিয়াছি
“রাজা হবে পৃথীরাও”।—পরীক্ষা করি।
দৈববাণী বড় কিম্বা বাহুবল বড়।
—লও তরবারি। আজি হবে এই ভূমি
তব রক্তে কিম্বা মম রক্তে বিরঞ্জিত।
সঙ্গ। কি ? পিতার মৃতদেহ উপরে করিব
যুদ্ধ ভূমিখণ্ডজন্য ?-ক্ষান্ত হও ভাই ।
চাহিক রাজ্য। পৃথী! এ রাজ্য তােমার ।
করি এ শপথ, আমি রাজ্য চাহিনাক।
পৃথী। শুনিতে চাহি না কথা ; খােল তরবারি।
{ পৃথী তরবারি লইয়া সঙ্গকে আক্রমণ করিলেন, সঙ্গ তরবারি
খুলিয়া আত্মরক্ষা করিতে লাগিলেন ]
সঙ্গ। ক্ষান্ত হও পৃথী।—আমি করি অনুরােধ।
পৃথী। হা ভীরু। মরিতে এত ভয় ! এত ভয়।
সবারই ত একদিন আছে।-এত ভয় !

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
যুদ্ধ কর—রক্ষা নাই। [ পুনরাক্রমণ ]
সঙ্গ। [ চক্ষে আহত ] ক্ষান্ত হও, আমি
বিষম আহত।
পৃথী।
যুদ্ধ কর, যুদ্ধ কর ;
ছাড়িব না জীবিত তােমারে।
[ উভয়ের যুদ্ধ )
[ সূৰ্যমলের প্রবেশ ]
সুৰ্য্য।
একি! একি!
ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব রুগ্নপিতৃশয়নমন্দিরে ?
ক্ষান্ত হও পৃথী! [ উভয়ে ক্ষান্ত হইলেন ]
পৃথী।
ওকি—উঠিয়া বসেছে
রায়।
শব নহি। এখনও মরি নাই।
এরি মধ্যে শৃগাল কি শকুনির মত
শব নিয়ে কাড়াকাড়ি ?—পিতৃভক্ত বটে!
একি দুঃস্বপ্ন না সত্য।—পৃথী! জয়মল !
সঙ্গ!—একি! এত শীঘ্র ?" মুহূর্ত বিলম্ব
সহিল না জনকের করিতে সৎকার ?
সামান্য দরিদ্র হীন মুখ কৃষকের
এর চেয়ে শীলতার জ্ঞান আছে।—ধিক্ !
[ দীর্ঘশ্বাস সহ ]-পিতা সব মূখ। সমস্ত জীবন ধরি’
অনশনে অনিদ্রায়, সদা লালায়িত
"
৪৬ ] .

প্রথম অঞ্চ।
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
সন্তানের সুখ হেতু ;-চেয়েও দেখে না
সন্তান পিতার প্রতি, দুঃখে কি বিপদে
করে ব্যয় সুখে, যাহা দীর্ঘ অনশনে
অনিদ্রায়, করে পিতা সঞ্চয় ! হাধিক।
জয়মল ! পৃথী! সঙ্গ ! একি
করি নাই
দ্বন্দ্ব আমি, পিতা।
রায়
সত্যকথা! সত্যকথা !
তুমি দ্বন্দ্ব কর নাই। কিন্তু পৃথী।-তুমি !
পৃথী। অপরাধ করিয়াছি, পিতা, ক্ষমা কর !
রায়। অপরাধ করিয়াছ শুদ্ধ ?—গুরুতর
অপরাধ ;-বুঝি নাই, কত গুরুতর।
পৃথী। বুঝিয়াছি। পিতা, ধরি চরণে তােমার।
চাহি এ মার্জনাভিক্ষা অনুতপ্ত আমি।
রায়। এইরূপ চিরদিন ব্যবহার তব।
সেদিন উঠায়েছিল অসি, শুনিয়াছি,
জয়মল বিপক্ষে।--প্রাসাদে করিয়াছি
দর গহ্বর, তব রূঢ় আচরণে।
নির্বাসিত করিলাম তােমারে এক্ষণে
মেবারের রাজ্য হতে।—যথা ইচ্ছা যাও।
কর রাজ্য সংস্থাপিত নিজ অসিবলে।
চলে যাও রাজ্য ছাড়ি।
[ ৪৭
[

প্রথম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য
রায়।
সুৰ্য্য।
শুন মহারাজ!
রায়। স্তব্ধ হও সূৰ্য্যমল! অনম্য কঠিন—
নিয়তির মত, জানাে, আদেশ আমার
চিরদিন। পৃথী এ মুহূর্তে দূর হও।
[ পৃথীর অবনতশিরে প্রস্থান ]
আর সঙ্গ তুমি ?
সূর্য।
সঙ্গ। জানিতাম তুমি
ধীর, স্থির, শান্ত। শেষে উন্মত্ত তুমিও?
রায়। স্তব্ধ হও সূৰ্য। সঙ্গ বুঝাউ আজি
তার নিজ ব্যবহার নিস্তব্ধ তথাপি ?
কিছু কহিবার নাই ?
পিতা কিছু নাই
বক্তব্য আমার।
সুৰ্য। [ সাশ্চর্য্যে ] সঙ্গ।
সঙ্গ! বুঝিয়াছি।
এতদিন যে আদরে করেছি পোেষণ,
ভস্মে ঘৃত ঢালিয়াছি ; অথবা অধম
তার চেয়ে,পুষিয়াছি সর্পে দুগ্ধ দিয়া,
আপনার বক্ষে।-ইহা উত্তম। উত্তম।
দুই পুত্র রুগ্নপিতৃশয্যাপাশ্বে বসি’
অপেক্ষা করিতেছিলে তাহার মৃত্যুর।
করি তারে মৃত অনুমান, এ কিরীট
৪৮}

প্রথম অৰু
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
লইয়া করিতেছিলে বিগ্রহ বিবাদ,
রুগ্নপিতৃকক্ষে।~-এই প্রতিদান বটে।
ভাবিয়াছ যদি এ আমার ভালবাসা
দিবে প্রক্ষালিয়া সৰ্ব্ব কালিমা তােমার ;
দিবে ঢাকি’ সৰ্ব্বক্ষত ; করিবে মার্জনা
সৰ্ব্ব অপরাধ ;—তবে বুঝিয়াছ ভ্রম।
ভালবাসা বর্ষে স্নিগ্ধ জলধারা বটে।
তাহাই আবার কিন্তু উদগারে বিদ্যুৎ।
শােন সঙ্গ-তুমি এই রাজ্য নাহি পাবে।
রাজা হবে জয়মল। সূৰ্য্য !-এ সংবাদ
প্রচার করিয়া দাও রাজ্যের ভিতর।
পুনরায় শয়ন।]
[ পটক্ষেপ ]
[৯

দ্বিতীয় অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। স্থান-রাণার অন্তঃপুর। কাল-আগত প্ৰা মধ্যাহ্ন। অর্ধশয়ানরাপা। সম্মুখে সুৰ্যামল। রায়মল। পাও নাই সন্ধান সঙ্গের ? সুৰ্য্য। পাই নাই- এক্ষণে আমার হস্তে দিল ভৃত্য আনি পত্র এক। লিখিয়াছে সঙ্গ মহারাজে। রায়। দেখি পত্র [ পাঠ ] পড় মন্ত্রী !-পড়িতে না পারি, ক্ষীণদৃষ্টি আমি। সুৰ্য্য। -যথা আজ্ঞা, মহারাজ। [ পত্র পাঠ লিখিয়াছে সঙ্গপিতা প্রণাম চরণে কোটী কোটী। জানি মহারাজের বিশ্বাস “আমি রাজাকাঙ্ক্ষী—আমি রাজ্যের কারণে করিয়াছিলাম যুদ্ধ সেই রাত্রিকালে রুগ্নজীবন্তপিতৃশয়নমন্দিরে।” “করিতেছি বিদ্রোহমন্ত্রণা, সৈন্যদলে উৎকোচ দিতেছি ; কহিয়াছে জয়মল। }

দ্বিতীয় অঙ্ক।
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় দৃষ্ট।
চলিলাম রাজ্য ছাড়ি।-“রাজ্য চাহিনাক
কহিয়াছি বহুবার।-পিতার বিশ্বাস
হয় নাই সেই বাক্যে ;-অদ্য, আশা করি
হইবে বিশ্বাস।-পূজ্য পিতৃব্য! যদ্যপি
করিয়াছি অপরাধ তােমার চরণে
কভু—অদ্য ভিক্ষা চাহিকরিও মার্জনা।
-ভাই জয়মল !—আজ হ’ল দূরীভূত
তােমার আপদ, পথে কণ্টক তােমার।
এ উত্তম! সূৰ্য্য। এ উত্তম প্রতিদান ।
ঈশ্বর ! শত্রুর যেন পুত্র নাহি হয়।
—যাক। যাহা হইবার হইয়াছে।
বদ্ধ কর দ্বার! অত্যুত্তম!—যাও ভাই।
শ্রান্ত আমি।কিছুক্ষণ ঘুমাইতে চাই।
রায়।
[ প্রস্থান ।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-বিদোর।-কাল-প্রাঃ।
শূরতন ও রাী।
পূর। রাণী । তারা কোথায় ?
গিয়াছে মৃগয়ায়
শিকারীদলের সঙ্গে।
রাণী।
[১

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য।
শূর।
আশ্চর্য্য বালিকা
রাণী। বালিকা নহে সে আর। সে পূর্ণ যুবতী।
অন্বেষণ কর পাত্র।
কোথা পাত্র রাণী ?
রাণী। চিরদিন উদাসীন সৰ্ব্ব কর্মে তুমি।
“উদাসীন” ?—পৃথিবীতে, বাধা বিপত্তির
মাঝখানে ঔদাসীন্য প্রকৃত সন্ধান।
রাণী। কিরূপ?
*কিরূপ” ?—যদি কাৰ্য্য নাহি কর,
ভ্রম হইবার কোন নাহি সম্ভাবনা।
কাৰ্য্য যদি কর, ভ্রম হইতেও পারে।
রাণী। এ যুক্তি বুঝিতে নাহি পারি।
নাহি পারাে ?
-তবে শােন।পৃথিবীতে চারিদিক হতে
প্রতিকূল অনুকুল কিম্বা সমকুল ~
শক্তিপুঞ্জ, ক্রমাগত ঘেরিয়া তােমারে,
করিতেছে সষ্পেষণ সংঘর্ষণ, সদা,
পরস্পরে। তুমি তার মধ্যস্থলে বসি’
কেন্দ্রসম থাক যদি কোন ভয় নাই
কেন্দ্রের বাহির যথা হইয়াছ, তথা
গিয়াছ ;-ঘূরিয়া মর আবর্তের সনে।
রাণী। কিরূপ?

দ্বিতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ দ্বিতীয় দৃশ্য। কিরূপ জানাে? দুই পত্নী যা’র নিয়ত সপত্নীদ্বয় করিবে কলহ; দাঁড়াইয়া দেখ যদি, নাহি কোন ভয় যােগ দাও যদি, মহা বিপদ নিশ্চয়। রাণী। হায় ধিক্। নিরুদ্যম বসিয়া রহিবে সচল বিশ্বের মাঝে জড়জীবসম ? শর। তদুপরি আমি করি বিশ্বাস অন্তরে, যাহা হইবার তাহা হইবেই ; কেহ অন্যথা করিতে নাহি পারে, প্রিয়তমে। রাণী । এ উত্তম যুক্তি-তবে বসি' নিরুদ্বেগে রহ কাৰ্য্যশূন্য- –কি না যতদুর পারে । বৃথা শক্তি ব্যয় কেন ? বরং সঞ্চয়, কর শক্তি বসে বসে। কি হেতু সঞ্চয় যদি ব্যয় কভু নাহি করিবে ? প্রেয়সী দর্শন শাস্ত্রের তত্ত্ব তত সােজা নয় যত সােজা ভাবাে। ইহা নারীর মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না শীঘ্র। কিছু শিক্ষা চাই। রাণী। জানিনা দর্শনশাস্ত্র। জানিতে চাহিনা। রাণী। [ e

দ্বিতীয় অক।]
তারাবাই ।
{ দ্বিতীয় দৃশ্য।
':
| সশন্ত্রে পুরুষবেশিনী তারার প্রবেশ ]
তারা। পিতা দেখিয়াছ?
কি দেখিব ?
তারা।
ব্যাঘ্ৰশিশু।
কে আনিল ব্যাঘ্ৰশিশু ?
সবলে ছিনিয়া-
নিবিড় গহন মধ্যে, ব্যাঘ্রের বিবর
হইতে, এনেছি তারে, আমরা শিকারী ।
আনিয়াছ যদি, মহা ভ্রম করিয়াছ।
এক্ষণি আসিবে ব্যাঘ্রী তাহার সন্ধানে।
শাস্ত্রে কহে হতশাবা ব্যাঘ্র। ভয়ঙ্করী ;
নিজ প্রাণ তুচ্ছ করে ;
ভ্রমে সন্নিহিত
প্রান্তরে, উন্মত্তবৎ। এক্ষণি আসিবে
হয়ত বা আসিয়াছে দ্বারে এতক্ষণে।
তারা। আসে যদি কিবা ভয় ;
ভুবলে।
বলা যায় অবলীলাক্রমে
সংসারে অনেক কথা ; করা শক্ত তাহা।
ব্যাখ্রীর সহিত যুদ্ধ ?
ব্যাঘ্রী কি করিবে?
| ব্যাঘ্রীর যদিও তার ধাতুর হিসাবে
প্রাণ করিবার কথা; কিন্তু সে কাৰ্যতা :
করিব সংহার

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য।
তাহার অধিক করে। জন-পরম্পরা
শুনেছিও ব্যাঘ্রজাতি সর্বমাংস চেয়ে
নরমাংস-প্রিয় ।
তারা। [ হাসিয়া ] পিতা! থাকিতে নিকটে
আমরা, তােমার ভয় নাই। দেখ এসে।
কি দেখিব ? ব্যাঘ্ৰশিশু আকারে সম্ভব
ব্যাঘ্রের মতই ; শুদ্ধ ক্ষুদ্র আয়তনে।
অনুমান করিতেছি।আর এক কথা
তারা, তুমি নারী। এই পুরুষের বেশ,
এই পুরুষের কাৰ্য শােভা নাহি পায়।
রাণী। শতবার শােভা পায়, পুরুষ যখন
ছাড়িয়াছে পুরুষের কাৰ্য। নারীসম
পুরুষ যখন সৰ্ব্বকৰ্ম্মে, ব্যবহারে
শুদ্ধ লজ্জাহীন। আর পুরুষ যখন
নতশিরে সহে পৃষ্ঠে শত্রু-পদাঘাত।
শুর। রাণি। এই ক্রোধ এই অদ্ভুত ৰক্ততা
হইত বিস্ময়কর ; তবে কিনা তুমি
পড় নাই ন্যায়শাস্ত্র।
তারা।
দেখিবে না তবে
ব্যাঘ্র-শিশু পিতা ?
রাণী।
এস, মা, আমি দেখিব।
[ রাণী ও তারার প্রস্থান :
শুর। অতীব বিস্ময়কর চরিত্র নারীর।
[ নিক্রান্ত ]
[ ৫

তৃতীয় দৃশ্য। স্থান-বিদোর। কাল—অপরাহু। ছদ্মবেশী সঙ্গ ও তারা। তারা। আচ্ছা, বৃহ ভেদ করার চেয়ে থেকে বেরিয়ে আসা শক্ত। সঙ্গ। পৃথিবীতে সব জিনিষেই তাই। তর্কে যুক্তিজাল খণ্ডন করা শক্ত নয়, কিন্তু জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসা শক্ত। প্রেমে ও- তারা। না আমি প্রেমের কথা শুন্তে চাইনে। ও বাতুলের স্বপ্ন। আচ্ছা মােহিত সিং, মেঘনাদ কি সত্যসত্যই মেঘের অন্তরাল থেকে যুদ্ধ ক ? সঙ্গ। ওটা রূপক। তারা। রাবণের দশমুণ্ডও রূপক ? সঙ্গ। রূপক বৈ কি। তারা। তবে রাবণও রূপক ? সঙ্গ। রাবণ রূপক হতে যাবে কেন? তারা। বলি হতেও ত পারে। রামায়ণের খানিকটা যখন রূপক বলে মেনে নিলাম, তখন বাকিটুকু রূপক হতে পারে কেন ? }

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
তারাবাহ।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
সঙ্গ। না তারা। ও যুক্তি ঠিক নয়। রামায়ণ সত্য। তবে তার
যে টুকু মনুষ্যের বিশ্বাসের অতীত, তা হয় রূপক, না হয়
কাব্যালঙ্কার বলে ধৰ্তে হবে।
তারা। কেন ধর্তে হবে? হয় সমস্তই রাখব,নয় সমস্তটাই ছাড়বে।
সঙ্গ। বুদ্ধ, খ্রীষ্ট, মহম্মদ সম্বন্ধে অনেক অলীক প্রবাদ আছে ;
তাই বলে কি তাঁরাই ছিলেন না বলে মানতে হবে ?
তারা। [ ভাবিয়া ] মােহিত সিং! তুমি কত জানাে । তোমার,
সঙ্গে খানিক কথা কৈলে কতই শিখিতে পারা যায়।
সঙ্গ। [ নীরব ]
তারা। তার উপরে এমন নম্র। তাই বাবা তােমায় এত ভাল
বাসেন।
সঙ্গ। কেবল তােমার বাবাই ভাল বাসেন?
[ রাণীর প্রবেশ )
রাণী। তারা ! তােমার বাবা তােমাকে ডাকছেন।
[ তারার প্রস্থান।
রাণী। মােহিত সিং, তুমি মেবারের রাজপুত্র জয়মলকে চেনাে ?
সঙ্গ। চিনতাম।
রাণী। তিনি কি মেবাররাজ্যের ভাবী উত্তরাধিকারী ?
সঙ্গ। সেইরূপ শুনেছি।
রাণী। তিনি তার উপযুক্ত পাত্র বলে বোধ হয় কি ?
সঙ্গ। ( চমকিয়া ] কি না জানি না—হবে।
রাণী। মােহিত সিং! তারার উপযুক্ত পাত্র পাই না। শৃগালের
[ ৫৭

দ্বিতীয় অঞ্চ ]
তারাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
সঙ্গে সিংহিনীকে বেঁধে দিতে পারিনে। তার মােগ্যপাত্র
এক মেবারের যুবরাজ। তারা সমস্ত রাজপুতনার মধ্যে
এক চিতােরেরই রাণী হ’বারযােগ্য কি বল ?
স। নিঃসন্দেহ।
রাণী। চিতােরের রাণাজ্যেপুত্র সংগ্রাম সিং ত নিরুদ্দেশ।
মধ্যমপুত্র পৃথীরাও নির্বাসিত; তরাং, জয়মলই তারার
উপযুক্ত পাত্র।
সঙ্গ। [ স্বগত ] এখানেও জয়মল আমার বিবাদী ?
রাণী। তুমি উত্তর দিচ্ছনা কেন? মােহিত wিং কি ভাবছাে ?
সঙ্গ। আপনি যা বলছেন তাই বােধ হয় ঠি।
রাণী। তুমি যদি তারাকে রাজী কৰ্তে পারে; সে বিবাহ কৰ্ত্তে
রাজী হয় না। তােমাকে শ্রদ্ধা করে, তােমার কথা
শুনবে বােধ হয়।
স। [অগত} এত শ্রদ্ধা করে প্রকাশ্যে জয়মল বিবাহ
কৰ্ত্তেরাজী ?
রাণ। তিনি সম্পূর্ণ রাজী। তিনি তারার পাণিগ্রহণেচ্ছায়
এখানে এক সপ্তাহের মধ্যে আসছেন।-চকালে যে ?
স। না।
রাণী। আমি তাকে নিমন্ত্রণ করেছি। তারাকে বােঝালে সেও
রাজী হতে পারে।
{ প্রস্থান ]
স। শেষে জয়মল শিরে এ রত্ন? ইহার।

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
তারাবাই।
[তৃতীয় দৃৎ।
মূল্য কি বুঝিৰে জয়মল।—কি এই
দেবীর চরিত্র যদি পাবকের মত
পবিত্র করিতে পারে সংস্পর্শে তাহারে।
-তাই হােক—আমি ত্যাগ করিব দুরাশা।
স্বেচ্ছায় সাম্রাজ্য ছাড়ি’ আমি বনবাসী,
নিঃসম্পদ,—আর তার রাজার দুহিতা
যােগ্য হইবার রাজমহিষী।-আমায়
যদি শ্রদ্ধা করে তারা—তার স্বীয় গুণে ;
আমি রহিব না বিপ্ন তাহার সম্পদে।
হােক তারা মােবারের রাণী—আর আমি!
আসিয়াছিলাম কোন ঘটনার স্রোতে
তৃণসম ভাসি’ নন্দনের উপকূলে,
কুসুমিত বল্লরীর শাখায় জড়ায়ে
ছিলাম মুহূর্তকাল—ঘটনার স্রোতে
আবার ভাসিয়া যাই।
[ তারার প্রবেশ
তারা।
মােহিত। মােহিত।
সঙ্গ। আসিয়াছ তারা?
তারা।
আসিয়াছি। এতক্ষণ
কহিতেছিলেন মাতা কি গৃঢ় সংবাদ
তােমারে মােহিত ?
সদ। [ তারার হস্ত ধরিয়া ] তারা।
[ ৫ ৯

দ্বিতীয় অঙ্ক তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য। তারা। কি মােহিত। একি । । সহসা গদগদস্বর ! সঙ্গ। [ হস্ত ছাড়িয়া ] ক্ষমা কর। তারা কল্য যাইতেছি আমি বহুদূর দেশে। তারা। সে কি ? বহুদূর দেশে ? কোথায় ? জানি না যেদিকে এ চক্ষু যায়। তারা। কি মােহিত ? সঙ্গ। হেতু ?—সুখী হও তারা! করিও না তুমি জিজ্ঞাসা “কি হেতু” ? তারা। একি প্রহেলিকা ? সন্দেহে ] বল মাতা—হন নাই রূঢ় ? অসম্ভব। তারা। তবে ? সঙ্গ। বলিয়াছি করিও না জিজ্ঞাসা “কি হেতু যাইবার পূর্বে এক নিবেদন আছে। রাখিবে মিনতি ? তারা। অত্যুত্তম পরিহাস। সঙ্গ। পরিহাস নহে তারা। তােমার মাতার ইচ্ছা যে বিবাহ কর তুমি। তাঁরা। যাদুকর। ও ঝুলির মধ্যে আরাে কিছু আছে নাকি ?

দ্বিতীয় অঙ্ক ]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
;
দেখিতে প্রস্তুত আছি।–বিবাহ ?—কাহাকে ?
সঙ্গ। শুনিয়াছ ‘জয়মল” নাম? মেবারের
ভাবী অধিপতি ?
তারা।
শুনি, হারে কি হেতু ?
যােগ্য হইবারে তুমি মেবারের রাণী
শােভেনা এ সমুজ্জ্বল হীরককিরীট
নৃপতির শিরে ভিন্ন।
তারা।
মানি, শ্রদ্ধা করি
জ্যেষ্ঠভ্রাতা সম, আমি তােমারে মােহিত
মানিতে পারিনা কিন্তু, “বলি দিতে হবে
মেবাররাজ্ঞিত্বপদে জীবন আমার।
মেবাররাজত্ব ছার।-করি পদাঘাত
ইন্দ্রপুরী—কিম্বা অলকায়।আমি তারা
বিবাহ করিব তুচ্ছ কাঞ্চনের লােভে ?
সঙ্গ। দেখিয়াছ জয়মলে?
দেখিতে চাহিনা,
মােহিত! মােহিতসিংহ!—ইহা সত্য বটে
শিক্ষা করি শস্ত্রবিদ্যা তােমার নিকটে;
এ বিষয়ে উপদেশ দিবার তােমার
দিই নাই অধিকার।তারার বিবাহ
তারার অনিচ্ছা ইচ্ছা।
[ সগর্বে প্রস্থান ]
তারা।

দ্বিতীয় অৰু
তারাবাই।
(তৃতীয় দৃশ্য
।
[ পদচারণসহ ] তারা,-যদি তুমি
জানিতে কি যুদ্ধ করিয়াছি এতক্ষণ,
আপনার সঙ্গে আমি, করিতে এক্ষণে
অপ্রিয় প্রস্তাব এই ?—অথবা আমার
কি স্বত্ব তাহারে দিতে এই উপদেশ,
অযাচিত ? ভাবিয়া ] কেন পাই ব্যথা এ অন্তরে ?
করিয়াছি এ প্রস্তাব—অযাচিত যদি-
তারার সুখের হেতু।
[ তারার পুনঃ প্রবেশ ]
তারা।
মােহিত! মােহিত।
আমারে মার্জনা কর।
কেন রাজকন্যা
তারা। হইয়াছি, রূঢ় আমি ।
কি যায় আসে ?
ভৎসনা করিতে ভূতত্য আছে চিরদিন,
অধিকার প্রভুর।
মার্জনা কর। আমি
নারী মাত্র।
[ সলজ্জভাবে প্রস্থান ]
বুঝিয়াছি। বুঝিয়াছি তারা,
ওই আরক্তিম গণ্ড লজ্জায় না তারা।
তাহা হইবার নহে। করিব না আমি
৬২]

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য
তােমারে অসুখী কভু। রহিব না আমি
আর তব চরণে জড়ায়ে !—সুখী হও।
করিয়াছি “ত্যাগ”ব্রত, ভাঙ্গিবনা তাহা।
যেইরূপ অনায়াসে রাজ্য ছাড়িয়াছি,
ছাড়িব এ নারীর! যায় যা প্রাণ।
আর রহিবনা হেথা-বড়ই অধিক
প্রলােভন ; এ হৃদয় অতীব দুর্বল।
চলিলাম এইক্ষণে।—নাহিক সাহস
বিদায় লইতে। তারা। চলিলাম তবে।
উদ্দেশে তােমারে এই আশীৰ্বাদ করি
“সুখী হও। প্রাণাধিক ! বৎসে ! সুখী হও।”
[ প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
স্থান-সরাই। কালরাত্রি।
বণিক ও অতিথিদ্বয়।
বণিক।
১ অতিথি। তবে
তবে এ রাজ্য কার ?
আপাতত কারুই নয়। মীনের আয়াবলীর পার্বত্য
প্রদেশ হ'তে নেমে দেশে যা পায় লুঠ করে নিয়ে যায়।
[ ৬১

বণিক।
দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
রাজপুতেরা এদেশ জয় করেছে বটে, কিন্তু লাভের গুড়
পিপড়েয় খায়।
১ অতিথি। রাজপুতদের কেউ মানে না কেন ?
তাদের একজন নেতার অভাব। সকলেই স্বপ্রধান।
তাদের শক্তি গুছিয়ে একত্রিত করে, এই রকম
একটা লােক চাই।
১ অতিথি। রাজপুতদের সৈন্য নাই ?
বণিক।
থাকবে না কেন? তারা নাড়ােলের দুর্গে বসে
নিরুদ্বেগে নাসিকাধ্বনি সহ নিদ্রা যাচ্ছেন। তাদের
নাকের সামনে মীনের দলপতি রাজচ্ছত্র মাথায় দিয়ে
রাজত্ব কচ্ছে, অথচ তারা যেন দেখতেই পাচ্ছেন না।
২ অতিথি। [ সভয়ে ] ও বাবা। তবে কালই এখান থেকে
পাততাড়ি গুটতে হচ্ছে।
১ অতিথি। তা আর বলে।
[ পৃথীর প্রবেশ ]
বণিক।
এ আবার কে? রাজপুত দেছি।
পৃথ্বী। তোমরা কারা ?
১ অতিথি। আমরা আবার কারা ? আমরা হচ্ছি আমরা।
পৃথ্বী। [ ২ অতিথিকে ] মহাশয় এটা কি সরাই ?
২ অতিথি। [ অনুকৃতস্বরে ] হাঁগাে দাদা সরাই
পৃথ্বী। গৃহকর্তা কোথায় ?
অতিথি। কেন ?
৬৪ ?

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
পৃথ্বী।
২ অতিথি। এই ধরনা আমিই গৃহকর্তা।
এ পরিহাস কৰ্বার সময় নয়। শীঘ্র বল ; নহিলে,
[ তরবারি নিষ্কাসন ]
১ অতিথি। এ–এ আবার কি প্রকার ?
২ অতিথি। এ-এর ত কোন কথা ছিল না।
বণিক। মহাশয় স্থির হন। গৃহকর্তা এখনি আসছেন। রাজ্য
অরাজক বটে, কিন্তু এত অরাজক নয়, যে আপনি
যখন ইচ্ছা যা’র তার মুণ্ডটা কেটে ফেলতে পারেন।
পৃথ্বী। না মশায় মাফ কৰ্ব্বেন।
[ তরবারি পিধানবদ্ধ করিলেন ]
বণিক।
এইযে গৃহকর্তা এসেছেন।
[ গৃহকর্তার প্রবেশ ]
বণিক।
ইনিই গৃহকর্তা।
১ অতিথি। [ গৃহকর্তাকে ] মশয়! ইনি এখনই আপনার খোঁজ
কচ্ছিলেন।
গৃহকর্তা। [ পৃথীকে] আপনি কি চান ?
২ অতিথি। আপাতত চাচ্ছিলেন ত আমার এই মুণ্ডটা। যেন
বেওয়ারিশী মাল আর কি। ঈ।
পৃথী। আমরা আজ এখানে থাকবাে।
গৃহকর্তা। তা বেশ! থাকুন না।কয়জন?
পৃথী। আমি আর পাঁচজন।
গৃহকর্ত্ত। তা বেশ ! থাকুন না । আহারের কি আয়ােজন কর?

পৃথী। পৃথী। দ্বিতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। ( চতুর্থ দৃশ্য। আমার কাছে কিন্তু এক কপর্দকও নাই। গৃহকর্তা। তাইত। সে ত শুভবার্তা নয়। আপনার চেহারাখানি নেহাত মন্দ নয়। তবে শুদ্ধ এ চেহারাখানি দেখে, এ সহরে যে কেউ রসদ জোগাবে, তা ত বােধ হয় না। এখানে কেউ বণিক আছেন ? বণিক। কেন ? পৃথ্বী। এই হীরার আংটিটি বব। বণিক। দেখি [ দেখিয়া চমকিয়া ] বুঝেছি, আপনি কি-- পৃধী। [ সগর্বে ? আমি পৃথ্বী। আমি নাড়ােলে বাস কর্তে এসেছি। বণিক। উত্তম! নাড়ােল আজ সরাজক হল। (গৃহকর্তাকে ] ইহাদের জন্য যথাদেশ সর্বোৎকৃষ্ট প্রকোষ্ঠ বাস- স্থানের জন্য দাও। সর্বোত্তম খাদ্যের আয়ােজন কর। মূল্য আমি দিব। গৃহকর্তা। [ সবিস্ময়ে তাইত ! [ পৃথীকে) আসুন মশায় ; আপনার সঙ্গীরা কি বাইরে। পৃধা। আজ্ঞা । চলুন। ( উভয়ের প্রস্থান ] বণিক। ইনি মেবারের রাজপুত্র পৃীরাও। ২ অতিথি। { সচকিতে ] বলেন কি? ইনি !!! ১ অতিথি। তাই অত রুক্ষ মেজাজ, না ? বণিক। এর মত বীর অদ্যাবধি রাজপুতানায় জন্মগ্রহণ করে ৬৬]

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই। ,
[ পঞ্চম দৃ।.
১ অতিথি।
২ অতিথি।
নাই। ইনি একবার এক শতাধিক যবনের সঙ্গে যুদ্ধ
করে জয়ী হয়েছিলেন।
[ চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া ] বটে ।
আগে বলতে হয়। চল চল দেখি। লােকটাকে
ভালাে করে দেখে নেওয়া যাক্। ভালাে করে
দেখা হয়নি।
চল চল। [ উভয়ের প্রস্থান ]
এর দ্বারা কাৰ্য উদ্ধার হবে। নাড়ােল আবার
১ অতিথি।
বণিক।
রাজপুতের হবে।
[ প্রস্থান ]
পঞ্চম দৃশ্য।
০
স্থানবিদার। কাল—-অপরাহু
বৃক্ষতলে অশ্বারূঢ় জয়মল ও বৃক্ষকাণ্ডে ন্যস্তদেহা তারা।
তারা। শুনিয়াছি যুবরাজ! সেই এক কথা
-ভালােবাসি ভালােবাসি’-একশতবার
শুনিয়াছি । পচিয়া গিয়াছে সেই বাণী
ঘৃণা জন্মিয়াছে ; আর শুনিতে চাহিনা।
জয়। শুনিতে হইবে। তারা ! আমি ভালােবাসি।
তারা।
ভালােবাসাে নাহি বাসাে, কার যায় আসে।
;
[ ,

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[পঞ্চম দৃশ্য
কার যায় আসে। তারা ! সত্য কি এ কথা ?
সত্য কি, কিছুই যায় আসে না তােমার,
আমি ভালােবাসি কি না বাসি ?
সত্যকথা।
অবিশ্বাস করিবার কারণ কি আছে ?
শতবার বলিয়াছি, কহি পুনৰ্ব্বার,
একশত এক বার—তুমি ভালােবাসাে
কিম্বা নাহি বাসস, কিছু নাহি যায় আসে
তারার। শুনেছ?-যাও।
হা কঠিন নারী ?
তােমারে রমণী করে কে গড়িয়াছিল?
বিধাতার ভ্ৰম !
ভালােবাসাে না আপনি,
বিশ্বাস করিতে পারি। কিন্তু ভালােবাসা
বুঝিতেও পার নাকি ? জান না কি, তারা,
ভালােবাসা কারে কহে ?
ভালােবাসা !-কই
কেহ শিখায় নি মােরে! শিখিয়াছি বটে
শাস্ত্র-কথা, অস্ত্রচর্চা, গণিত, বিজ্ঞান।
ভালােবাসা শিখি নাই। ভালােবাসা বুঝি
ধনী সম্ভোগ। তাহা গৃহপ্রতাড়িত
পরমুখপ্রেক্ষী দীন হীন দরিদ্রের
তারা।
তারা।

দ্বিতীয় অঙ্ক।] তারারাই। [.পঞ্চম দৃ। জয়। তারা। ; দুহিতা তারারে নাহি সাজে।--বাঁধিয়াছি, প্রাণের সমস্ত বাঞ্ছা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা “যতদিন নাহি উদ্ধারিব মাতৃভূমি, অপর চিন্তারে স্থান দিবনা অন্তরে।” কিরূপে উদ্ধার হবে তব মাতৃভূমি ? নাহি জানি যুবরাজ। তথাপি সতত সেই এক চিন্তা জাগে মনে। আমি নারী, শিখিয়াছি শস্ত্রবিদ্যা ; কিন্তু কি করিব একাকিনী আমি ? হায় ! কি করিবে নারী, যখন পুরুষজাতি নিশ্চিন্ত; পিছে জীবন জঘন্য ঘৃণ্য স্বচ্ছন্দ বিলাসে। জানিনা কিরূপে, কি উপায়ে, কতদিনে, হইবে কমলমীর উদ্ধার ; তথাপি করিয়াছি পণ; ধরিয়াছি এই ব্রত এ কৌমার-ব্রত, যতদিন এ সাধনা সিদ্ধ নাহি হয়। তাহে কি বাধা বিবাহে? সর্বৈব বাধা—এ বিবাহই রজ্জম বাঁধে হস্তপদ সৰ্ব্ব উচ্চ সাধনার। প্রেম বিলাসীর স্বপ্ন, সাধকের নহে। জাগেনা বেণুর স্বরে নিদ্রিত যে জন ; তুরীধ্বনি চাই।—ফিরে যাও যুবরাজ। ; তারা। [ ৬৯ দ্বিতীয় অঙ্ক।] তারাই। [ পঞ্চম দৃশ্য। তারা। ভালাে বাসিবার মাের অবসর নাই, যতদিন মাতৃভূমি পরপদানত। আমি যদি উদ্ধারি তােমার মাতৃভূমি ? বিবাহ করিব।-ভালােবাসি নাহি বাসি, বিবাহ করিব। [ ভাবিয়া ] সত্য; বিবাহ করিব। দিব এ যৌবনরূপ, সতীত্ব নারীর যাহা কিছু প্রিয়, সব বলি তবপদে ;- বিসর্জন করে যথা ধৰ্ম্মে, ক্ষুধাতুর, খাদ্য চুরি করি ; ভাসাইয়া দেয় যথা মাতা প্রাণাধিকপ্রিয় কন্যা গঙ্গাজলে। উত্তম। শিখিবে ভালোবাসিতে আমারে বিবাহ করিলে মােরে ? -জানিনা ; তথাপি দিব এ যৌবনরূপ করিয়া বিক্রয়। তােমার চরণে, তাহা সম্পত্তি তােমার। তাহাই হইবে । তবে যাও।যতদিন তারা। তারা। ও প্রতিজ্ঞা পূর্ণ নাহি কর যুবরাজ! আসিও না ততদিন সমক্ষে আমার। আস যদি অনিষ্ট ঘটিবে। বুঝিয়ছি ? বুঝিয়াছি। যাও তবে। ( প্রস্থান ? তারা। ৭ ]

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাই।
হায় তারা, যত
প্রত্যাখ্যান কর তুমি, তত লিগা বাড়ে
নিরুদ্ধ স্রোতের মত। দেখিয়াছি আমি
শতাধিক নারী; বশীভূত করিয়াছি
বাক্যে, অর্থবলে। কিন্তু এ হেন রমণী
দেখি নাই কভু।-সমধিক অগ্রসর
হইলে জ্বলিয়া উঠে বিদ্যুতের মত,
চকিতে নয়ন ; ওষ্ঠ বিকম্পিত হয়
ক্রোধে ; ভয়ে পিছাইয়া যাই। কিন্তু তার
প্রত্যেক বচন, ভঙ্গী, কটাক্ষ -লিগার
ইন্ধন যােগায়।-একি আশ্চর্য্য রমণী
আকর্ষণ করে সমধিক সেইক্ষণে,
যবে সমধিক দেয় দূরে খেদাইয়া।
[ নিক্রান্ত
ষষ্ঠ দৃশ্য।
স্থান—তমসার অন্তঃপুর। কালরাত্রি।
সার ও তমসা।
তমসা।
বুঝেছ ?
বুঝেছি।
সারঙ্গ।
১

দ্বিতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ষষ্ঠ দৃশ্য। তমসা। সারঙ্গ। - তমসা। সারঙ্গ। তমসা। মালবের নবাব যােগ দেবেন স্বীকার হয়েছেন। তুমি মালবকে বলবে যে, তিনি এসে যদি আমার স্বামীকে একবার বােঝন, তা’লে আরাে ভাল হয়। কিন্তু সূৰ্য্যমলকে বােঝান এক প্রকার অসম্ভব। তাঁর দৃঢ় কর্তব্যপরায়ণতা, প্রভুভক্তি, ভ্রাতৃস্নেহ- তার চরিত্র তােমার চেয়ে আমি ভালাে জানি। তিনি কর্তব্যপরায়ণ,প্রভুভক্ত, স্নেহশীল বটে; কিন্তু তিনি জলের মত তরল। কখন এদিকে গড়ান, কখন ওদিকে গড়ান। তবে তিনি সম্মত হলেও বিশ্বাস, কি ? তার জন্য ভাবনা নাই। তিনি যদি একবার প্রতিজ্ঞা করেন, তবে তিনি প্রাণ দিয়েও সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা কৰ্বেন তা জানি। তবু প্রতিজ্ঞাপত্র দেহের রক্ত দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে বলে। কি জানি, যেখানে সত্যপ্রিয়তার বিপক্ষে কর্তব্যপরায়ণতা, সেখানে সত্যভঙ্গ নিতান্ত অসম্ভব নহে। উত্তম ।কিন্তু জয়াশা নিতান্তই অল্প। তবে রাজা বৃদ্ধ, আর সৈন্য সূৰ্যমলের হস্তে, এই ভরসা। নহিলে- কোন ভয় নাই। কিন্তু এ সুযােগ অতীত হলে আর আসবে না।-বুঝেছো?.. বুঝেছি। সব কথা মনে থাকবে ? ক সার। তমসা। সার। তমসা। ২ ] দ্বিতীয় অঙ্ক।] তারাবাই । [সপ্তম দৃশ্য। সারঙ্গ। তা থাকবে। তমসা। সারঙ্গ। তমসা। আচ্ছা তবে যেতে পারে। জেনাে সারঙ্গ, মনে রেখাে, . [ সারঙ্গের স্কন্ধে হাত দিয়া সস্নেহে) তােমার জন্যই এত কচ্ছি। [ অধােবদনে ] আপনি আমার জন্য এত কচ্ছেন কেন ? কচ্ছি কেন? তােমার জন্য কব্ব না, সারঙ্গ!-ত আর কার জন্য কৰ্ব্ব ?—সারঙ্গ! সারঙ্গ! জানিনে, তুই আমার কে ?-না এখনাে না। কাজ সিদ্ধ হলে বলব। তােকে মেবারের সিংহাসনে বসিয়ে তবে বসে কথা বড় প্রাণের, বড় গভীর, বড় গােপনীয়।এখন যাও। [ বেগে প্রস্থান ] অদ্ভুত। ইনি আমার হিতাকাঙ্কিণী—তা জানি। কিন্তু কেন ? আর এতদূর ! মাঝে মাঝে ঘাের সন্দেহ হয়। এতদূর! [ চিন্তিতভাবে প্রস্থান ] সারঙ্গ। সপ্তম দৃশ্য। স্থান-তারার শয়নকক্ষ। কালরাত্রি। একাকী জয়মল। আসিয়াছি নিশীথে প্রচ্ছন্ন ছদ্মবেশে . তারার শয়নাগারে। জানিনা তথাপি জমল। [ ৭৩

দ্বিতীয় অঙ্গ।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
তারার সম্মতি। একি অন্ধ দুঃসাহস!
তবে কি আশায় আসিয়াছি সঙ্গোপনে
তাহার নিভৃতকক্ষে, নাহি পূর্ণ করি,
প্রতিজ্ঞা আমার ? তােড়া করিব উদ্ধার
কিরূপে? কোথায় সৈন্য ? অনুরুদ্ধ পিতা
লিখিলেন স্পষ্টাক্ষরে “অন্যে কি করিবে
যা’র কাৰ্য সে যদি ঘুমায় নিরুদ্বেগে ?”
তারারে দেখাইলাম সেই রূঢ় লিপি;-
‘অত্যুত্তম ! যাও তবে ; আসিওনা আর।
কহিল সগর্বে তার।-কি কহিবে তারা
আমারে দেখিবে যবে?-ফিরাইবে মুখ ?
করিবে ভৎসনা ? দুরে খেদাইয়া দিবে?
তাহাই সম্ভব !–অতি দৃঢ় স্পষ্টভাষে
কহিয়াছে সে, যে ভালােবাসেনা আমায়।
-না না, ভালােবাসে তারা। কে জানে? কে বুঝে
নারীর হৃদয় ? নিত্য বিরোেধ তাহার
কাৰ্য্যে ও বচনে ; ভালােবাসেনা বলিলে
বুঝিতে হইবে ভালােবাসে। হায় নারী!
তােমার জীবন এক কি প্রকাণ্ড ছল !
कि
মধুর মিথ্যাবাদ,! -বাহু প্রসারিয়া,
আহ্বান করিয়া, পরে দূরে সরে যাও
মায়া মরীচিকা সম।যা হবার হবে।
{
শ]
]

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃষ্ণ
যখন হয়েছি অগ্রসর এতদূর,
যাইব না-না দেখিয়া শেষ। ভালােবাসে
নাহি বাসে, ছাড়িব না তার আশা। ছলে,
বলে কি কৌশলে, বশ করিব তাহারে।
-থাকি লুক্কায়িত এই দ্বার-অন্তরালে ;
ওই আসে তারা, কথা কহিতে কহিতে
তাহার দাসীর সঙ্গে।-এখন লুকাই।
{ লুক্কায়িত।
( তারা ও পরিচারিকার প্রবেশ ]
তারা। মাতার আদেশ ! রামা! কহিও মাতাসে,
বিবাহ করিবে তার জয়মলে; যদি
তাঁহার আদেশ ইহা। কহিও তথাপি,
ভালো নাহি বাসি জয়মলে। কহিয়াছি
স্পষ্টাক্ষরে তারে।
পরিচারিকা।
ভালােবাসিতে শিখিবে।
তারা। কখন না। তার ক্ষুদ্র ভয়সঙ্কুচিত,
খল, নীচ চিত্ত ভালােবাসিতে শিখিব ?
তার চেয়ে শীঘ্র ভালােবাসিতে শিখিব
পথের কুকুরে কিংবা বনের শৃগালে।
পরিচারিকা। রাজপুত্র তিনি
তবু ঘৃণা করি তারে।
পরিচারিকা। তিনি ভাবী রাজা মেবারের
[.

দ্বিতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
তারা।
মগ্রহ
অতি মেবারের।—তবু ঘৃণা করি তারে-
পরিচারিকা। এই স্থির ?
তারা।
এই স্থির। যাও জননীরে
কহিও একথা।—কর স্তিমিত প্রদীপ।
-উত্তম। এখন যাও।
[ কথাবৎ কাৰ্য্য করিয়া পরিচারিকার প্রস্থান :
তারা।
{ দ্বার রুদ্ধ করিয়া গবাক্ষের নিকট গিয়া আকাশের
দিকে চাহিয়া ] গভীর রজনী।
ক্লান্তদেহ পরিশ্রান্ত। বহিছে বাতাস
প্রবল বৈশাখী। স্তব্ধ ধরণী। অদূরে
বনগ্রাম মগ্ন অন্ধকারে। নীলাকাশে
যেঘখণ্ড নাই ; শুদ্ধ জ্বলিছে প্রদীপ্ত
অগণ্য নক্ষত্রপুঞ্জ যৌবন উদ্যমে।
-ঘুমাই। শেয়ন] না। ঘুম নাহি আসে।—চিত্তে ভাবি
পিতার নিগ্রহ, নিত্য মাতার আক্ষেপ।
কেন মাতা তিরস্কার করেন পিতারে
বারংবার ?-বুঝেন না তিনি এ লাঞ্ছনা
বাজে কত পিতৃবক্ষে। চক্ষে ঘুম আসে। [ নিদ্রিত ]
ঘুমায়েছে তারা। এতক্ষণ সঙ্গোপনে
শুনিয়াছি আত্মনিল। সত্য যদি তাহা,
তিক্ত তবু। প্রতিশােধ লইব ইহার ।
৭৬]

দ্বিতীয় অঙ্ক।] তারবাই। [ সপ্তম দৃশ্য। দ্বাররুদ্ধ কি না দেখি। [ দ্বার পরীক্ষা করিয়া ] দ্বাররুদ্ধ বটে। [ নিকটে যাইয়া পৰ্যবেক্ষণ [ দন্তধর্ষণ সহ ] এখন!—সুন্দরী বটে! নিখুত সুন্দরী! কিবা চক্ষু । কি ! আহা! কেশগুচ্ছ কিবা ন্যস্ত উপাধানে। কিবা বর্ণ ! কিবা দেহ,- আয়ত বলিষ্ঠ দৃঢ় অথচ কোমল। এক হস্ত ন্যস্ত গণ্ডতলে, এক হস্ত বিলম্বিত শূন্যে। কিবা স্ফুরিত অধর- সরস রক্তিম, যেন মাগিছে চুম্বন, নিষ্ফল লজ্জায় পরে উঠেছে রাঙিয়া উঠে নামে বক্ষঃস্থল--আলিঙ্গন মাগি যেন অগ্রসর, পরে যাইছে ফিরিয়া দীর্ঘশ্বাসি’ হতাশ্বাসে। [ চমকিয়া উঠিয়া ] কে তুমি? [ সচকিতে ] প্রেয়সী আমি জয়মল দাস শ্রীচরণে। [ দাড়াইয়া ) তুমি। এখানে ! নিশীথে ! • তারা। তারা। প্রিয়ে। তারা। জয়। [ দৃঢ়স্বরে ] বুঝিয়াছি। যাও। যাইব না হইয়া নিষ্ফলমনােরথ ; -তারা! [ অগ্রসর হইলেন ] [ ৭ দ্বিতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ সপ্তম দৃশ্য। তারা। - জয়। তারা। তারা। নীচ ! ভীরু। কাপুরুষ।-লজ্জা নাই ? পশিয়াছ কুমারীর শয়ন-মন্দিরে, নিশীথে চোরের মত ? শ্লীলতাও নাই ? হারায়েছি জ্ঞান তারা। [ পদতলে পতিত ) [ উঠিয়া দাড়াইয়া ] হারাইবে প্রাণ, যদি দীর্ঘ কর তব ঘৃণ্য উপস্থিতি। [ উঠিয়া ] কি করিবে তারা? রুদ্ধ করিয়াছি দ্বার। রুদ্ধ করিয়াছ দ্বার? ভাবিয়াছ তাই নিরাপদ তুমি? বটে! অতি স্পর্ধী তুমি । একা তারা-যুবরাজ!শত জয়মলে চরণে দলিতে পারে পিপীলিকা সম। -মূঢ়! যাও চলি, যদি প্রাণে মায়া থাকে। পূর্ণকাম হয়ে যাব। [ কোমল স্বরে] এবার রূপসী ফাকি দিতে পারিবে না আমারে। [ হস্তধারণ ] (হাত ছাড়াইয়া শয্যার নিম্ন হইতে তরবারি লইয়া] অধম । এতদূর স্পর্ধা! স্পর্শ কর !–এতদূর সাহস?-ক্ষত্রিয় তুমি? বাপ্পার সন্তুতি। বলিতেছি দূর হও, নতুবা মরিবে। [ ত্রস্তভাবে পলায়নােন্মুখ হইয়া শান্ত হও নারী! তব কৃপাণের চেয়ে ভয়ঙ্কর তব ওই স্ফুলিঙ্গ নয়নে। জয়। তারা। ৭৮] দ্বিতীয় অঙ্ক। তারাবাই। { সম দৃত। শূর। শুর। শান্ত হও। এ মুহূর্তে যাইতেছি আমি। [ দ্বারমুক্ত করিলেন ? ( আলােক ও পিস্তলহস্তে পূরনের প্রবেশ ] এ ঘাের নিশীথে, কে ও আমার কন্যার শয়ন-মন্দিরে ? মেবারের রাজপুত্র জয়ম। পথ ছাড় যাইতেছি চলি। যাইবে ? কন্যার কক্ষ কলুষিত করি কোথায় যাইবে ? আমি দরিদ্র পতিত, সৌভাগ্য-লক্ষ্মীর পদাহত ; তবু আমি রাজা, তারা রাজকন্যা তারে সাধ্য কার করে অপমান ?-হােক মেবারের রাজপুত্র- তারে কলঙ্কিত করি’ যাইবে না ফিরে সজীব স্বগৃহে। [ কম্পিতস্বরে ] ক্ষমা কর। শিখি নাই ক্ষমা। ছেড়ে দাও পিতা পলায়নােম্মুখ ভয়ার্ত নিরস্ত্রজনে। ক্ষাত্র প্রথা নহে ; জয়। তারা। ইহা। ঘৃণ্য চোরসম যে প্রবেশ করে [ ৭৯

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য
পৌরগৃহে রাত্রিকালে, সে ক্ষত্রিয় নহে।
তার সঙ্গে পালনীয় নহে ক্ষাত্র প্রথা।
সে তস্কর মাত্র। তস্করের দণ্ড দিব।
—জয়মল ! দাড়াও সম্মুখে।
[ জানু পাতিয়া ] ক্ষমা কর।
আর আসিব না ।
চৌর! দাড়াও সম্মুখে।
[ গুলি করিলেন
জয়।
৮০]

তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
স্থান-রণার কক্ষ। কাল-প্রভাত।
রাণা ও সুৰ্য্যমল।
রায়মল।
সূৰ্য্য।
রায়।
মরিয়াছে জয়মল। ভ্রাতা পূৰ্বে আমি
শুনিয়াছি সেই বার্তা।
কহ নাই কভু
সে কথা আমারে?
কহি নাই কি কহিব ?
কহিবার নহে সেই কলঙ্ক কাহিনী।
শুনিলাম যবে তাহা—অমনি, লজ্জায়
রক্তিম, আকাশ যেন ভাঙিয়া পড়িল ;
মেবারের রাজবংশে অমনি কে যেন
কালিমা ঢালিয়া দিল।—এত কাপুরুষ
বাপ্পার সন্ততি ! রায়মলের কুমার !!!
-এত নীচ!!! আহহ ধিক্‌— মুখ ঢাকিলেন।
হায় জয়মল !
কহিও না “হায় জমল। লভিয়াছে
যােগ্য শাস্তি সে অধম।
সূৰ্য্য।
রায়।
(৮১

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ প্রথম দৃশ্য
সূৰ্য্য।
রায়।
সূৰ্য্য।
রায়।
কেন মহারাজ ?
যে দুরাত্মা কলঙ্কিত করিবারে চাহে
কুমারীর শুভ্রশয্যা ; হেঁট করে নিজ
বংশের গৌরব ; করে লাঞ্ছনা নির্ভয়ে
দুর্ভাগ্য পতিতজনে; যােগ্য দণ্ড তার
মৃত্যু। তা’ দিয়াছে শূরন।—দুঃখ এই
দিতে নাহি পারিলাম মৃত্যুদণ্ড তার
স্বহস্তে আমার।
নাহি লবে প্রতিশােধ ?
প্রতিশােধ ? সূৰ্য্য ভালো মনে করিয়াছ।
লব প্রতিশােধ! লব এই প্রতিশােধ,
আমার রাজত্বখণ্ড দিব প্রতাড়িত
লাঞ্ছিত সে শূরনে ;-এই প্রতিকার
সন্তানের দুষ্কৃতির, সাধ্য যতদূর
পিতার-করিব আমি ।-যাও সূৰ্য্যমল ।
মন্ত্ৰীরে পাঠাও রাজমন্ত্রণা ভবনে,
এক্ষণে।
[ প্রস্থান ]
মহৎ অতি চরিত্র তােমার।
কিন্তু—কিন্তু—এতদূর-ভাবি নাই কভু।
[ প্রস্থান ]
সুৰ্য্য।
৮২ ]

দ্বিতীয় দৃশ্য।
=
স্থান—আরাবলীর সানুদেশ। কাল-প্রাঃ।
একাকী সঙ্গ।
সঙ্গ।
কোথায় মেবার রাজ্য—কোথায় সুদূরে
এই ক্ষুদ্র গ্রাম আরাবলীপদতলে।
দূরে নদী বহে ; উর্ধে চাহে ঘননীল
উদার আকাশ ; নিম্নে শ্যামল ধরণী
চরে তাহে মেষপাল, দেখিতেছি তাহা
আলেখ্যে চিত্রিত, যেন গিরিশৃঙ্গ হতে।
আমি মেষপালক এক্ষণে। মন্দ নহে;-
রাজপুত্র সঙ্গ আজি গােমেষ-রক্ষক
এ দরিদ্র কৃষকের। কে বলিবে আমি
রাজপুত্র ?যেই সাজে সাজিয়াছি আজি,
আপনারে আপনিই চিনিতে না পারি।
—নিয়তির চক্র।–মন্দ নহে এ জীবন ।
তবে বড় শীত লাগে শীতে; গ্রীষ্মকালে
প্রখর রৌদ্রের তাপ সহ নাহি হয়।
কালে সহ্য হইবে।—আশ্চর্য! মনুষের
জীবন ধারণ জন্য এই সামান্য
প্রয়ােজন।—খানি দুই দগ্ধ রুটি খাই।
'-
( ৮৩

[ দ্বিতীয় দৃশ্য।
তৃতীয় অঙ্ক।
তারাবাই।
-তাহাতেই দিন চলে যায়।--কি ভীষণ
ওই গিরিগুহা। কি সুন্দর নিঝরিণী-
এই ভয়াবহস্থানে ;-দৈত্যের সহিত
বিবাহিত যেন কোন কৃশাঙ্গী অপ্সরা।
বনদেবীগণের গীত।
একি শ্যামল সুষমা, মধুময় বিশ্ব শিশির ঋতু অন্তে
নবঘনপল্লবকোকিলমুখরনিকুঞ্জসুমধুরবসন্তে।
সুন্দর ধরণী সুন্দর নীল সুনির্মল অম্বর ভাতি,
অরুণকিরণঅনুরঞ্জিত তরুণ জবাবলমালতিজাতি।
একি স্নিগ্ধ সুললিত বহে তনু শিহয়ি পবন মৃদুমন্দ ;
একি স্বপ্নবিজড়িতপদে পড়ি' মুচ্ছিত কুসুমসুগন্ধ ,
কার মুখচ্ছবি অরুণ কিরণ সহ হৃদয়ে উঠিছে ধীরে ;
কার নয়নদুটি অঙ্কিত করিছে চম্পক সরসী নীরে।
জানে কার স্পর্শমুখস্মৃতি মলযঙ্গ করি' অনুকম্পা ;
কার হাটুকু করি’ পরিলুণ্ঠন গর্বিত বিকশিত চম্পা।
কার প্রেমমধুর মৃদু অশ্রুট কী জাগে প্রাণে
চপলপবনবিকশিতকিশলয়পল্লবমৰ্ম্মরতনে।
সেই মুখখানি মনে আসে ; অবিরত
তার মধুমাখা বাণী-কর্ণে বাজে। চাহি
ভুলিতে তাহারে কই ভুলিতে পারিনা।
তারা!-না, ভুলিব তারে, নিশ্চয় ভুলিব।
এতটুকু বল নাই ? ইচ্ছা শক্তি নাই
তবে কেন পণ্ড হয়ে জন্মি নাই? তবে,
}
সঙ্গ।

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য।
কোন্ স্বত্বে ধরিয়াছি মনুষ্য শরীর ?
ভুলিব তাহারে ; আমি ভুলিব নিশ্চয়।
[ কৃষকের প্রবেশ }
কৃষক। তাের দিয়ে মাের কাম চবে না।
কেন ?
কৃষক। তু ভেড়া চরাবি কি ? দুপুর বন্দরে গাছের গুড়িতে
হেলান দিয়ে ভাবি।-না ?
[ ছল ছল নেত্রে ] হাঁ ভাবি।
কৃষক। আবার তু শুন্তে পাই যে রাতে লুকিয়ে বহি পড়ি।
সঙ্গ।
হ পড়ি।
কৃষক। তা হলে কাম চলবে কি করে? তার উপরে তু বসে
বসে’ কেবল তুই রুটি খা। না ?
{ অন্যমনস্কভাবে ? হা রুটি খাই।
কৃষক। আবার এমন লম্বা লম্বা কথা কহি যে মুই সমজাতে
পারি না। তােরে বলে এমনি হাঁ করে চেয়ে থাকি
যে তােরে বতে দুকু হয়।
তােরে আমি আর
রাব না। তু মাহিনা নিয়ে বিদেয় হ।
সঙ্গ।
[ কুর্নিস করিয়া প্রস্থান)
বাঃ! এ ত বেশ মজার নােক দেখছি। নকরি ছাড়িয়ে
দিলাম,-ত সটাং বল্লে “যে আজ্ঞে” !
রাজপুত্তর—দৈখি লােকটাকে বুঝিয়ে দেখি, যদি থাকে।
লােকটা ভালাে।
বেটা যেন

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য।
ise
[ কৃষকরমণীর প্রবেশ।]
কৃষকরমণী। তুমি অমনি ধাঁ করে’ নােকটাকে ছাড়িয়া দেলে।
কৃষক। হ দেলাম ! তাই হয়েছে কি?
কৃষকরমণী। এখন আবার নােক দেখ
কৃষক। তা দ্যাখবাে ! তাই কি!
কৃষকরমণী। কি আবার!—এমন নােক কোথা থেকে পাও দেখি।
কেমন নােক।
কৃষকরমণী। এই এমন খাসা নােক!
কৃষক। তা খাসা নােক পৃথিবীতে বুঝি ঐ একটাই জন্মেছেল ?
কৃষকরমণী। আহা এমন শিষ্ট শান্ত—মুখে রা টি নেই। আর
মুখখানিই বা কি! যেন ছাঁচে ঢালা! মরি মরি কি
পটল চেরা চোখ ! যেন সর্বদাই ছলছল কচ্ছে গা।
কৃষক।
ওরে আবাগীর বেটী। তাের ওর সঙ্গে আসনাই
ছেল বােধ হচ্ছে। আমি ভাবছেলাম বটে যে নােক
টাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাখি। কিন্তু এখন—ওকে শুধু
ছাড়িয়ে দেবাে? ওকে কুরুল মেরে বিদেয় করে
দেবাে। দাড়া, আমি এক্ষণি ওর ভূত ঝাড়িয়ে দিচ্ছি।
[ সবেগে প্রস্থান ]
কৃষকমণী। ওমা মাের কি হবে গাে ! ওগাে এমন রাগ
কখন স্থাখিনি গাে ! ওগাে, বাছা বড় ভালাে মানুষ,
ওকে মেরােনা গো • ওকে মেরােনা। পােয়
ভালােয় বিদেয় করে দাও। [ পশ্চাদ্ধাবন।

তৃতীয় দৃশ্য।
।
বণিক।
স্থান—মীনরাজ্য। কাল—প্রভাত।
পৃথ্বী ও বণিক।
পৃথী। স্থাপিয়াছি নবরাজ্য স্বীয় বাহুবলে।
দেখায়াছি পিতারে এ দেহে, এশােণিতে,
বংশের মর্যাদা ভিন্ন আরাে কিছু আছে ।
বর্বর মীনের রাজ্য এই বাহুবলে
করিয়াছি করায়ত্ত। ভ্রমে রাজপুত
নাড়ােলে নির্ভয়ে আজি ।
সত্য প্রিয়বর।
পৃথ্বী। পঞ্চ অশ্বারােহী সহ আসিয়াছিলাম
এ রাজ্যে, এখন পঞ্চ সহস্র সেনানী
আমার প্রভুত্ব মানে।
বণিক। [ স্বগত ]
হায় এ বীরত্ব
যদ্যপি হইত না-এ জগতে হায়
নাহি হয় কেহ বাস্তবিক একাধারে
সর্ব গুণান্বিত।
{ দৌবারিকদ্বয়ের প্রবেশ ]
পৃথ্বী। কি সংবাদ দৌবারিক ?
দৌবারিক।
মহারাজ
[ ৮৭

তৃতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য আসিয়াছে এক বার্তাবহ এইক্ষণে মেবারের রাজ্য হতে প্রভুর সমীপে। পৃথ্বী। মেবারের রাজ্য হতে ? নিয়ে এস তারে। [ দৌবারিকের প্রস্থান ] পৃথী। মেবারের রাজ্য হতে ? কি কহ বণিক ? কি বার্তা লইয়া আসিয়াছে বার্তাবহ ? বণিক। বুঝিতে না পারি । [ পত্রবাহের প্রবেশ ও অভিবাদন ] পৃথী। তুমি আসিয়াছ দূত! মেবারের রাজ্য হতে ? আমি আসিয়াছি দূত। মহারাজ। মেবারের রাজ্য হতে। পৃথী শুনি, এনেছ কি বার্তা ?-পিতা আছেন কুশলে ? কহিবে এ পত্র তাহা। পৃথী। দাও পত্র খানি। [ পত্র গ্রহণ ও পাঠ] আশ্চৰ্য্য! আশ্চৰ্য্য। বণিক। [ সকৌতুহলে ] কি সংবাদ ? প্রিয়বর ! জিজ্ঞাসা করিতে পারি ? পৃথ্বী। লিখিয়াছেন এ পত্র, আহ্বান করিয়া আমারে মেবার রাজ্যে। ৮৮ ] বন্ধুবর ! পিতা তৃতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য। বণিক। সইসা !কারণ ? পৃথ্বী। কারণ ? কারণ মৃত ভ্ৰাতা জয়মল। বণিক। জয়মল মৃত? হেন সহসা ? কিরূপে? পৃথী। | বণিককে ] পড় এই পত্রখানি [ পত্র প্রদান ] { দূতকে ] যাও দূত। কর বিশ্রাম বিরামগৃহে; অপরাহে এই পত্রের উত্তর দিব। যথা আজ্ঞা প্রভু। [ সাভিবাদন প্রস্থান ] বণিক। অত্যাশ্চর্য্য বার্তা!--তবে তুমি এইক্ষণে মেবারের যুবরাজ ? পৃথী। আমি যুবরাজ। তথাপি না চাহি, বন্ধু, সে সম্পদ আমি গড়িয়াছি নিজ রাজ্য স্বীয় বাহুবলে। বণিক। যাইবেনা চিতােরে ফিরিয়া ? পৃথ্বী। কদাপি না ! বণিক। অতীব বিস্ময়কর এ প্রেম কাহিনী। শূরন কন্যার এ প্রতিজ্ঞা অদ্ভুত “বিবাহ করিবে তারে সে বীররমণী যেই উদ্ধারিবে তার প্রিয় মাতৃভূমি।” —হেন পণ, বন্ধুবর !-শুনিনাই কভু, কলিকালে করিয়াছে কোন স্বয়ম্বর। */ [ ৮

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
পৃথী। কিরূপ সে নারী জানাে বন্ধু ?
বণিক।
অনুপমা।
পৃথী। তাহার কি নাম ?
বণিক।
“তারা।” তারার মতই
অন্য নারী হ’তে উর্দ্ধে স্থিতা, জ্যোতির্ময়ী।
পৃথী। উত্তম! আমিই তবে করিব ভ্রাতার
নিল প্রতিজ্ঞা পূর্ণ ! আমি উদ্ধাৰিব
তােড়া।
বণিক।
বুঝিয়াছি। তাহা যদি কর সথে,
লভিবে অতুল কীর্তি বিশ্বে ; তদুপরি
লভিবে রমণী এক-অতুল জগতে।
[ ভৃত্যের প্রবেশ ]
ভৃত্য। আগত মধ্যাহ্ন প্রভু।
পৃথী।
সত্য নাকি! চল।
–[ ফিরিয়া আসিও পরশ্ব বন্ধু ।
বণিক।
উত্তম আসিব।
[ উভয়ের বিপরীত দিকে নিষ্ক্রান্ত
৯০]

চতুর্থ দৃশ্য। স্থান—সিরােহী রাজার বিলাস গৃহ। কালরাত্রি। পারিষদবর্গ ও নর্তকীগণ। ১ পারিষদ। রাজা কোথায় হে ? এখনো যে সে বেটার দেখা নেই। ২ পারিষদ। [ মদিনাজড়িত স্বরে ] সে বেটা কোন্ খানায় পড়ে আছে আর কি ৩ পারিষদ। বেটা কখন্ যে কোথায় থাকে তার কি ঠিক আছে ! ৪ পারিষদ। কোথায় যে থাকে না তা কিন্তু খুব ঠিক আছে। ১ পারিষদ। কোথায় হে? ৪ পারিষদ। নিজের অন্তঃপুরে। মাসের মধ্যে তিনি গড়ে এক দিন সে দিকে যান। ৩ পারিষদ। আহা রাণী বেচারীর কি কষ্ট!-চিতােরের রাণার মেয়ে! ৪ পারিষদ। আহা বড় ভাল মেয়ে ! দেখুলে ত সে দিন। ১ পারিষদ। আহা! ২ পারিষদ। তােমাদের যে তার জন্যে শােক-সাগর উথলে উঠলো [ নর্তকীদিগকে ] গাও গাও—তােমরা গাও- আমােদর সময় আমোদ কর। ! নর্তকীগণের গীত। ভিতরে হাসিছে মুখ যামিনী দীপমালা সুখে গলায় পরিয়া ; বাহিরে শিশিরনয়না বিষাদিনী নিশা কাদে গুমরিয়া। [ ৯১

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
ভিতরে আলোকশিখা চারিদিকে, ঠিকরিয়া পড়ে মুকুরে, ফটিকে।
বাহিরে পড়িয়া অসীম আঁধার-বন প্রান্তর ঘন আবরিয়া।
উছলে কক্ষে সঙ্গীতরব নৃত্যলহরী, রহিয়া রহিয়া
-সুদুর সলায় নিঠুর শীতের কঠোর বাতাস যাইছে বহিয়া ;
তােরণস্তশিরে দোলে যবে গােলাপমালিকা কুলটাগরবে ;
--বিজন বিপিনে নিভৃত নীরবে তিমিরে শেফালি পড়িছে ঝরিয়া।
!
১ পারিষদ। বাঃ বাঃ এ গানটা আমাদের রাজারাণীর অবস্থার অতি
সুন্দর টীকা।
২ পারিষদ। একেবারে মল্লিনাথ !
৩ পারিষদ। কি ! কি বল্লে হে ? “তিমিরে শেফালি পড়িছে
ঝরিয়া”-না ?
৪ পারিষদ। বাঃ অতি সুন্দর। অতি সুন্দর!
২ পারিষদ। আরে রেখে দাও—এ রকম যায়গায় তােমার ও বেদব্যাস
ভালাে লাগে না।-একটা ভালো গান গাও।
১ পারিষদ। এ গানটা বুঝলিনে ? বেটা কুলাঙ্গার ?
২ পারিষদ। আর তুই বাপের ভারি সুপুত্র ! একেবারে কুল আলাে
করে বসে আছিস্ বেটা।
৩ পারিষদ। আরে চটো কেন ?
২ পারিষদ। দেখ দেখি ! মিশছেন ত এই দলে, মােসাহেবী কচ্ছেন
ত এক অপগণ্ড রাজার—আবার ছড়াচ্ছেন ভগবদগীতার
তৃতীয় অধ্যায়। আমরা উচ্ছন্ন গিইছি স্বীকার করি।
এরা সব উচ্ছও যাবেন আবার দেখাবেন যেন এরা
৯২]
৩

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
এই সেদিন হােল ঋষ্যশৃঙ্গমুনির টোল থেকে বেরিয়ে-
ছেন।—ঝেটা মারাে।
১ পারিষদ। ঘাট হয়েছে বাবা। বেনাবনে আর মুক্তা ছড়াচ্ছিনে।
১ পারিষদ। ওহে রাজা আসছে,-রাজা আছে।
{ প্রভুরার প্রবেশ ও সকলের অভিবাদন ].
[ নর্তকীদের প্রতি অঙ্গুলি নিক্ষেপ করিয়া ]
এরা
এখানে কেন ? বেরাে বেটীরা। বেরাে!
পারিষদবর্গ। বেরাে বেরো।
[ নর্তকীদিগের প্রস্থান ]
প্রভু।
[ ক্ষণেক পাচারণ পরে ] শােন তােমরা সব শােন।
পারিষদবর্গ। শােন গােন।
পৃথ্বীরাও করেছে কি ? তার গুণ গান করে আমার
রাজ্যে সকলে যে একটা হাট বসাবার যােগাড়
করেছে, সে পৃথ্বীরাও করেছে কি ?
পারিষদবর্গ। তা বৈ কি। করেছে কি মহারাজ ?
প্রভু। তবে বলবাে ? বলবো ? বলবাে?
পারিষদবর্গ। হাঁ বলুন বলুন বলুন।
প্রভু। নাঃ বলবাে না।
পারিষদবর্গ। না আর বলে’ কাজ নেই, আমরা বুঝতে পেরেছি।
প্রভু। বুঝতে পেরেছ কি রকম ? কি বুঝেছ বল দেখি।
পারিষদবর্গ। [ পরস্পরকে হাঁ বলত কি বুঝেছ বলত।
কিছুই বুঝতে পারে নি।
.

যে কেউ তৃতীয় অঙ্ক। তারাবাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। পারিষদবর্গ। আজ্ঞে মহারাজ, ভেবে চিন্তে দেখলাম কিছুই বুঝতে পারিনি। তা পারােনি তা আমি আগেই জেনেছি। তবে শােন বলি । পারিষদবর্গ। শােন শােন, মহারাজ বলছেন। শােন পৃথীরাও-যে আমার শ্যালক-তার বড়ভাগ্যি যে সে আমার শ্যালক- ২ পারিষদ। বেজায় ভাগ্যি। মহারাজের শ্যালক হওয়া অনেকের ভগিনীপতি হওয়ার ধাক্কা। প্রভু। সে গােটাকতক নেড়েকে যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছে। [ প্রথম পারিষদকে কি বলহে। ১ পারিষদ। তা বৈ কি তবে। তবে- চোপরহে। পারিষদবর্গ। এই চোপরহাে। প্রভু। সে আর শক্ত কি! গােটাকতক নেড়েকে হারিয়েছে। শক্ত কি ? পারিষদবর্গ। তা বৈকি।—শক্তটা কি। প্রভু। সে নেড়ে গুলাের সঙ্গে যুদ্ধ করা শক্তটা কি ? হ্যা, যদি প্রভুরাওকে হারাত তবে বুতাম। পারিষদবর্গ। হ তা’লে বুঝতাম বটে। হ আসুক দেখি আমার সঙ্গে।-আমি একবার একটা যুদ্ধ করেছিলাম জাননা? ৩ পারিষদ। আজ্ঞে না। মহারাজ যে কথন যুদ্ধ করেছিলেন তা ত শুনি নি !-কবে? ৯৪] প্রভু।

তৃতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। প্রভু। এই চোপরহে— পারিষদবর্গ। এই চোপরহে-এই চোপরহাে না। কবে ?—সে খোঁজে দরকার কি? যুদ্ধ করিছিলাম। সে কথা সকলেই জানে। [ ৪ পারিষদকে ] কি বল -তুমি শােন নি ? ৪ পারিষদ। তা মহারাজ যখন আজ্ঞে করেছেন, তবে অবশ্যই শুনিছি। তবে কিনা ঠিক মনে হচ্ছে না। [ চোরহে ] পারিষদবর্গ। [ সতেজে } চোপরও। যুদ্ধ করিনি বটে। কিন্তু ইচ্ছে কল্লে কি আর পাত্তেম না? পারিষদবর্গ। ইঃ তা কি পার্তেন না ? মনে কল্লে-বীর হওয়া কি ? লেখক, বক্তা, গাইয়ে, যা খুসী তাই হতে পাৰ্তাম। তবে কি না—তবে, কি না -গােড়ার বাঁধুনিটা একটু আলগা হয়েগিয়েছিল,এই যা। পারিষদবর্গ। হাঁ এই যা। গীত। রাজা। দেখ হোতে পাৰ্তাম্ নিশ্চয় আমি মস্ত একটা বীর- কিন্তু গােলাগুলির গােলে কেমন মাথা রয়না স্থির আর ঐ বারুদটার গন্ধ কেমন করি না পছন্দ । আর সঙ্গীন খাড়া দেখলেই মনে লাগে একটা ধন ; খোলা তরােয়াল দেখলেই ঠেকে যেন শিরােহীন এ কন্ধ তাই বাক্যে বীরই হােয়ে রৈলাম আমি চটে, মটেই তা নইলে খুব এক বড় তৃতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। পারিষদবর্গ। “ তা বটেই ত তা বটেই ত।” রাজা। দেখ হােতে পাৰ্তাম্ আমি একটা প্রত্নতত্ত্ববিৎ কিন্তু গবেষণা” শুনলেই হয় আতঙ্ক উপস্থিত । আর দেশটাও বেজায় গম, আর বিছানাও বেশ নরম, আর তাও বলি প্রেয়সীর সে হাসিটুকু চরম। আর তাকে চর্চা কল্পেও একটু কাজও দেখে বরং। তাই স্ত্রীতবিং হােয়ে রৈলাম আমি চটে মটেইত,- তা নইলে বেশ এক ভাল- পারিষদবর্গ। “ তা বটেই ত তা বটেই ত?” রাজা। দেখ হেতে পাৰ্তাম নিশ্চয় একজন উচুদরের কবি- কিন্তু লিখতে বসলেই অক্ষরগুলো গড়মিল হয় যে সবই ; আর ভাষাটাও তা ছাড়া মােটেই বেঁকে না রয় খাড়' ; আর ভাবের মাথায় লাঠি মাল্লেও দেয়নাক সে সাড়া ; ছাই হাজারই পা দুলােই, গোঁফে হাজারই দেই চাড়া ; তাই নীরব কবি হােয়ে রৈলাম আমি চটে মটেইত,-- নইলে খুব এক উচু- পারিষদবর্গ। “ তা বটেই ত তা বটেই ত।” জা। দেখ হােতে পাৰ্তা রাজনৈতিক বক্তাও অন্ততঃ- কিন্তু কিন্তু বাড়ালেই হয় স্মরণশক্তি অবাধ্য স্ত্রীর মত ; আন মুখস্থ সব বুলি এমন বেজায় যায় সব ঘুলিয়ে । আর সুযোগ পেয়ে রুখে দাড়ায় বিদ্রোহী ভাব গুলি হে; হায়ার কাশি, আদর করি দাড়িতে হাত বুলিয়ে তাই বইলাম বৈঠকখানাবা আমি চটে মটেইত ;- তা , নইলে খুব একভারি ৯৬ ] w ১৯.

তৃতীয় অঙ্ক )
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
পারিষদবর্গ।
হাঁ তা বটেই ত তা বটেই ত।”
রাজা। দেখ ক্ষমতাটা ছিল নাক সামান্য বিশেষ ;
কেবল প্রথম একটা ধাক্কা পেলেই চোলে যেতাম বেশ ;
হতাম পেলে সুযােগ ও বুঝি একটা যেও সেও;
ওই কেষ্ট বিষ্টর মধ্যে একটা হতাম নিঃসন্দেহ।
কিন্তু প্রথম সে ধাক্কাটী আমায় দিলে নাক কেহ ;
তাই যা ছিলাম তাই রয়ে গেলাম আমি চটে’ মটেইত ;-
নইলে-বুঝলে কি না,
পারিষদবর্গ ।
“হ তা বটেই ত তা বটেই ত।”
[ চন্দ্ররাওর প্রবেশ ]
১ পারিষদ। একি চন্দররাও যে ভােরের সময় উদয় ?
মহারাজ! এক ভারি জবর খবর এনেছি।
২ পারিষদ। কেলেঙ্কারি ত ?
চন্দ্র। ভারি কেলেঙ্কারি। শূরতনের একটা মেয়ে আছে
তারে জানেন ত ?—মহারাজ খবরটা শুনছেন?
হাঁ শুছি।-হাঁ হাঁ তার পর!
চন্দ্র।
তার শশাবার ঘরে রাণার ছােট ছেলে জয়মলের মৃতদেহ
পাওয়া যায়-
৩ পারিষদ। পুরােনাে খবর।
চন্দ্র। আরো আছে। শােন না।
পারিষদবর্গ। শােন শােন।
এই রাষ্ট্র, যে শূরােনই তাকে মেয়ের ঘরে দেখতে
পেয়ে গুলি করে
৭

তৃতীয় অঙ্ক )
তারাবাই।
৪ পারিষদ। বেজায় পুরােনাে।
আরে শােন না। রাণা না সেই কথা শুনে—মহারাজের
শ্বশুর-তাই শুনে
প্রভু। -শূরতনকে ধরে অন্তে সৈন্য পাঠিয়েছে ত।
এই ত! —তার আর আশ্চৰ্য্যটা কি ?
চন্দ্র।
আজ্ঞে তা নয়।—রাণা না তাই শুনে,রাণা না
তাই শুনে,-রাণা না তাই শুনে
পিলে ফেটে মারা গিয়েছে। এইত! তা ত যেতেই পারে।
চ। আজ্ঞে মহারাজ তাও নয়। রাণা না তাই শুনে,
রাণা না তাই শুনে,রাণা না তাই শুনে-শূরতানকে
পঁচিশটা পর্গনা দিয়েছে
পারিষদবর্গ। গুলিখুরি।
হাঁ।—তা কখন হতে পারে ?
চন্দ্র। আসুন! মহারাজ! মুকোবালা করে দেবাে।
মেবার থেকে মহারাজের কাছে এক দূত এসেছে,
সেই বলে।
প্রভু।
চ।
মেবার থেকে দূত? কিসের জন্য ?
মহারাণীকে না কি নিতে।
মহারাণীকে নিতে।
দূত বল্লে চিতােরে জনরব যে মহারাণী এখানে না কি
বড় অসুখে আছেন। 'মহারাজ তার ওপর না কি
ভারি অত্যাচার কছেন।
চ।

তৃতীয় অঙ্ক ]
তারাবাই।
[ পঞ্চম দৃশ্য।
প্রভু।
বটে! তাতে রাণীর বাপের কি! আমার রাণীর
উপর আমি অত্যাচার করি, না করি, আমার খুসী!
তার কি ? আমি ত তার মাইনে করা চাকর নই,
যে হুকুম তামিল কৰ্ত্তে হবে! চলত সে দূতটাকে
মেরে বিদায় করে দিই।—এসত সব, এসত।
পারিষদবর্গ। সর সর! মহারাজ যাচ্ছেন।
[ নিষ্ক্রান্ত ]
পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান—বিদোর ; নদীর তীরে বৃক্ষতল। কাল—অপরাহু।
একাকিনী তারা।
তারা।
হােলনা এখনাে সিদ্ধ সাধনা আমার।
কত বর্ষ এল গেল। পরপদানত
অদ্যাপি সে মাতৃভূমি! সে পূর্ণ চন্দ্রমা
হইলনা রাহুমুক্ত।
[ পরিচারিকার প্রবেশ ]
পরিচারিকা। রাজপুত্রি! ত্বর।
আসিছেন মহারাজ, সঙ্গে রাজপুত্র
মেবারের।
- ১৯

তার। তৃতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ পঞ্চম দৃশ্য। রাজপুত্র মেবারের ? সেকি। কোন্ রাজপুত্র তিনি। পারিচারিকা। মধ্যম। তারা। কি নাম? পৃথ্বীরাও ? পরিচারিকা। হবে রাজপুত্রি —অতদূর পরিচয় হয় নাই তাহার সহিত এখনাে আমার। তারা। তুমি হাসিতেছ কেন? পরিচারিকা। “কেন” তা শুনিবে যুবরাজের নিকট। [ প্রস্থান ] তারা। কি রূপ | অপূৰ্ব আচরণে কিঙ্করীর || —শুনেছি পৃথীর নাম ; কেবা শুনে নাই ? মহিমামেখলা তার পৃথ্বীর ভূষণ ; কিন্তু তিনি এ আলয়ে আজি যে সহসা ? —স্পন্দিত সহসা কেন বামবাই আজি ? পরিচয় হয় নাই তাহার সহিত। জানিনা কিরূপ তিনি দীর্ঘ কিম্বা খর্ব, গৌরাঙ্গ অথবা শ্যাম ; কৃশ কিম্বা স্থূল ;- [ শূরন ও পৃথ্বীর প্রবেশ ] তারা। ইনি পৃধীরাও। শুনিয়াছ নাম ? তারা। শুনিয়াছি নাম। —মেবারের যুবরাজ! ; = - . তৃতীয় অঙ্ক।] তারাবাই। [ পঞ্চম দৃe ইনিই আমার কন্যা তারা!—পৃথ্বীরাও! এই দীন দরিদ্রের মাথার মুকুট আমার এ কন্যা তারা।-কন্যা! শুনিয়াছ পৃধীরাও উদ্ধারিয়া তােড় বাহুবলে পাঠানের হস্ত হতে, আগত আপনি লইয়া সে বার্তা ? তারা। তাহা শুনি নাই পিল। মনে আছে তারা সেই প্রতিজ্ঞা তােমার ? তারা। [ সলজ্জ । মনে আছে পিতা। শূর। -মেবারের যুবরাজ! স্বীকৃত যদ্যপি তুমি, আশীর্বাদ করি বরিয়া জামাতৃরূপে। পৃথ্বী। সম্পূর্ণ স্বীকৃত ; স্বীকৃত যদ্যপি তারা। ; - সে ভার আমার । [ হস্তে হস্ত যােগ করিয়া ] দিলাম তারারে পৃথী।—সাক্ষী নারায়ণ সুখী হও তুমি বৎস! বৎসে সুখী হও। [ বজ্রধ্বনি ] একি বজ্রধ্বনি কেন নির্মল আকাশে ! বিবাহ উৎসৰ দিন পুরােহিতে ডাকি করিব এখনি স্থির।-চল বৎস, তবে, পৃথী।

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
এক্ষণে, বাহির কক্ষে। [ উর্ধদিকে চাহিয়া উঠিল ঝটিকা !
[ পৃথ্বী ও শুতানের প্রস্থান ]
তারা। ইনি পৃথ্বী !! ভগবান্ মনে শক্তি দাও,
করিতে প্রতিজ্ঞা রক্ষা!—আমি স্বয়ম্বর,
ক্ষত্রিয় রমণী, নাহি ভঙ্গ হবে কতু,
ক্ষত্রিয়ের পণ !
[ পরিচারিকার প্রবেশ ]
পরিচারিকা।
কেন হাসিতেছিলাম
বুঝিয়াছ রাজকন্যা এতক্ষণে ?-বর
ধরিয়াছে মনে ?—একি কেন অপােমুখ ?
একি কাদিতেছ কেন ?
তারা।
পরিচারিকা।
কাদি নাই। কহিওনা মাতারে এ কথা ;.
করিতেছি নিষেধ।
পরিচারিকা। কি কথা রাজপুত্রি ?
তারা। কোন কথা নহে। চল জননীর কাছে। ( নিক্রান্ত ।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
স্থান-সূৰ্যমলের কক্ষ। কালরাত্রি।
মালব ও সূৰ্য্যমল।
মালব। বৃদ্ধ রাজা রামুল। এক পুত্র তার
১০২।

তৃতীয় অঙ্ক।
তারাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
জয়মল মৃত ; পুত্র সঙ্গ নিরুদ্দেশ
স্থাপিয়াছে নবরাজ্য পৃথ্বী যুবরাজ
সুদূর কমলমীরে। শুনিয়াছি বীর
করিয়াছে অবহেল। পিতার আহ্বান
ফিরিতে মেবাররাজ্যে। অতীব সহজ
সুসাধ্য মেবার আক্রমণ। তুমি যদি
এক্ষণে সহায় হও, বীরবর, আমি
পরাস্ত করিব রায়মলে অনায়াসে।
সূর্য। তাহাতে আমার লাভ?
মানব।
তােমারে করিব
মেবারের রাজ্যেশ্বর।
সুৰ্য্য।
রাজ্য নাহি চাহি।
লালিত শৈশবে যার ভ্রাতৃস্নেহে, তাঁর
বিপক্ষে ধরিব অস্ত্র ?
মালব।
লালিত শৈশবে।
-হা মুঢ়। লালন কে না করে অসহায়
নিরীহ শৈশবে? ইহা ধৰ্ম প্ৰকৃতিৰ,
নহে পালকের। বিশ্বে বাচিত কি কেহ,
রহিত যদি এই মঙ্গল নিয়ম ?
গাভী বৎসে দুগ্ধ দেয়, বিপদে তাহারে
রক্ষা করে প্রাণপণে ; সেই বৎস যবে
গাভী হয়, হয় না সে উৎসুক সতত

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
( ষষ্ঠ দৃশ্য
স্বকীয় বৎসের হেতু ? জননীর পানে
দেখেনাও চাহি’। বিশ্বে কে কাহার তরে
ছাড়ে আপনার স্বত্ব ?
সূৰ্য্য।
মেবার আমার
স্বত্ব নহে, ম্লেচ্ছপতি।
মালব।
কে বলিল নহে?
কে বলিবে জ্যেষ্ঠভ্রাতা কনিষ্ঠের চেয়ে
শ্রেষ্ঠতর ? এক গর্ভে জন্ম উভয়ের।
তােমার শরীর, রায়মলের শরীর
অপেক্ষা নিকৃষ্ট নহে। তারও দুই পদ,
তােমারও তাহাই, বীর ! দুই হস্ত তার,
তােমারও কি নাই তাহা ? সমান, তােমার
মস্তকে; শােভেনা রাজমুকুট? কি হেতু
সে ভূপতি, আর তুমি শুদ্ধ পুষ্ট হও
কৃপাদত্ত অম্নে তার ? ধিক্ বীরবর।
এ বিশ্বে তাহারই স্বত্ব যার বাহুবল ।
সুৰ্য্য। বাহুবল? আমার কি বাহুবল ? আমি
সেনাপতি মাত্র, নহে এ সৈন্য আমার।
রাণার এ সৈন্য ।
তিনি আনিয়াছিলেন
সঙ্গে করিয়া কি সৈন্ত তার জন্মদিনে ?
এ সৈন্তে তােমার আছে সম অধিকার।
১০]

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
কিম্বা সমধিক অধিকার—যে কারণ
সেনাপতি তুমি, রাজামাত্র রায়মল ।
সূৰ্য্য। [ চিন্তা সহকারে ] না না হইব না আমি বিশ্বাসঘাতক
মালব। না, রহিবে চিরদিন ভ্রাতৃঅন্নদাস ॥
ভীরু সে, যে রহে পরভৃত্য, যবে তার
আছে স্বীয়ভুজে শক্তি।-জাগাে বীরবর
দূর কর এ কলঙ্ক, লও তরবারি ;
দেখিবে সৌভাগ্য লক্ষ্মী চাটুকার সম
তার পক্ষে রহে নিত্য, যে তাহারে আনে
ছিনিয়া বলে।-তুমি পাইতেছ বটে
অদ্য মুষ্টিমেয় অন্ন ভ্রাতার প্রসাদে ;
কিন্তু যবে হবে রাজা অন্তে—কে বলিবে-
তাহার প্রসাদ ভিক্ষা সে দিবে তােমারে,
সুৰ্য্য। কি করিব ?—বুঝি অবশ্য সম্ভাব্য ইহা
ফলিবেই বুঝি সেই চারণীর বাণী।
আমি কি করিব ? আমি হস্তে নিয়তির
ক্ষুদ্র যন্ত্রমাত্র।—ইহা ঘটিবেই পরে।
[ প্রকাশ্যে ] তাহাই হউক তবে।
মানব। [ সােল্লাসে ] স্বীকার ?
সূৰ্য্য। ( উদভ্রান্তভাবে ) স্বীকার।
মালিব। না, কর শপথ।
সূৰ্য্য। [ তদ্রুপ ) করিলাম অঙ্গীকার।
(১০৫

তৃতীয় অঙ্ক।
তারাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
মালব। ( কাগজ বাহির করিয়া ] এই অঙ্গীকার পত্র। দেহরক্ত দিয়া
ইহাতে স্বাক্ষর কর।
সুৰ্য্য।
এত অবিশাস ?
এই নেও করিলাম স্বাক্ষর।
উত্তম।
মালিব।
করিলাম পরীক্ষা যে প্রয়ােজনস্থলে
রক্ত দিতে পারে কি না।
সূৰ্য্য।
স্লেচ্ছরাজ ! আমি
ক্ষত্রিয়।
উত্তম !
মালব। ক্ষত্রিয় তুমি ; প্রকৃত ক্ষত্রিয়।
যাও, একত্রিত কর সৈন্ত, সেনাপতি।
আমি একত্রিত করি নিজসৈকল।
সূৰ্য্য।
মালব। উত্তম।-তবে আসি এইক্ষণে।
[ মালবের প্রস্থান ]
সূৰ্য্য। মেবারের অধীশ্বর আমি! ভয় করে
ভাবিতে সে কথা। মেবারের অধীশ্বর।
উচ্চপদ! কিন্তু বলি দিতেছি, দিয়াছি
সে উদ্দেশ্যে সর্বধর্ম সৰ্বপুণ্যফল !
-কি উৎসর্গ ! হইতেছি বিশ্বাসঘাতক
ভ্রাতার নিকটে --করিয়াছি সমুচিত ?
না, করি নাই। বুঝিতেছি। করি নাই
•৬]

[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই
উচিত। অন্যায় করিয়াছি, বুঝিতেছি
ক্রমে স্পষ্টতর। আমি গভীর অন্যায়
কৰ্ম্ম করিতেছি। কি করিব ?-করিয়াছি
অন্যায় প্রতিজ্ঞা আজি।—কেন করিলাম ?
[ তমসার প্রবেশ ]
পূর্ণবাঞ্ছা তব প্রিয়ে।
তমসা।
শুনিয়াছি সব,
অন্তরাল হ’তে। তুমি শুন নাই, যবে
কহিয়াছিলাম আমি সে সহজ কথা।
বুঝাইল ম্লেচ্ছপতি আসিয়া,-বুঝিলে
অমনি শিশুর মত।
সূর্য।
সত্য। বুঝিলাম
অমনি শিশুর মত; তমসা তমসা।
একি করিয়াছি? একি করিয়াছি আমি।
তমসা। সাধিয়াছ কৰ্ত্তব্য আপন।
সূর্য।
আমি
করিব না ঘৃণ্যকর্ম হেন!-কথন না।
তমসা। করিয়াছ, মনে নাই, আপন শােণিতে
স্বাক্ষর প্রতিজ্ঞাপত্ৰ । সেই জন্য আমি
পরামর্শ পাঠাইয়াছিলাম মালবে
করাইয়া লইতে প্রতিজ্ঞাপত্ৰখানি
স্বাক্ষর, তােমার রক্তে।
না না,
[১

তৃতীয় অঙ্ক।
তারাবাই;
[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
সুর্য। [ বিস্ময় বিস্ফারিত নেত্রে ] কি বলছ নারা!
পাঠাইয়াছিলে এই পরামর্শ তুমি ?
-চক্রান্ত। চক্রান্ত!-নারী ! কুট রাজনীতি
স্বতঃ ভয়ঙ্করী অতি ;-স্ত্রীবুদ্ধি যদ্যপি
তাহাতে প্রবেশ করে, প্রলয় হইবে
রাজ্যে। -একি করিয়াছি! একি করিয়াছি।
করিয়াছি সৰ্ব্বনাশ, সৰ্ব্বনাশ, আজি।
তমসা। যাহা করিয়াছ, করিয়াছ ; সত্যভঙ্গ
করিবে না তদুপরি, আশা করি নাথ ! [ হস্তধারণ ]
সূৰ্য্য। যাও, কহিওনা মিথ্যাসােহাগমিশ্রিত
চাটুবাণী। নারীজাতি অত্যুত্তম পারে
করিতে সােহাগণ স্বার্থ সিদ্ধি যবে
উদ্দেশ্য তাহার।—যাও, শুনিতে চাহি না ।
সত্যভঙ্গ করিব না আমি। কিন্তু নারী!
আপনারে বিসর্জন দিব এই রণে। [ তমসার প্রস্থান ]
সুৰ্য্য। অবশ্য করিব এই যুদ্ধ। কিন্তু দিব
অবসর রায়মলে, করিতে সংগ্রহ
যথাসাধ্য সৈন্ত আপনার। বৃদ্ধ অতি,
নিঃসহায় অভিমানী ভাতা রায়মল
নাহি চাহিবেন তার সর্বগুণাধার
পুত্রের সহায়। আমি বার্তা পাঠাইব
পৃথ্বীরাজে! পরে যাহা করেন ভবানী [ প্রস্থান ]
১]
;

সপ্তম দৃশ্য
স্থান-মীনরাজ্য। কাল—জ্যোৎস্না রাত্রি।
পৃঙ্খী ও তারা।
তারা শিখি নাই ভালােবাসা, নাহি জানিতাম
প্রেমের বিজ্ঞান, তুমি শিখায়েছ নাথ
হাতে ধরি।
পৃথ্বী।
আমি গুরু, আমি শিষ্য তব।
তারা। ভাবি নাই --ক্ষমা কর পতি, ভাবি নাই
পারিব বাসিতে ভাললা তােমারে কদাপি।
পূৰ্ব্বে যবে শুনিতাম বীরগাথা তব
পথে চারণের মুখে, ভাবিতাম যদি
তুমি হও পতি মাের, সব সাধ মিটে।
পরে যবে দেখিলাম, লাগিল আঘাত
হৃদয়ে ও মুক্তি হেন বিরূপ কর্কশ ;-
ভাবিলাম আপনারে করেছি বিক্রয়।
পরে যত পরিচয় হইল আমার
তােমার সহিত, মুগ্ধ হইলাম তত
উদার চরিতে তব। আজি কায়মনে
তােমার চরণে দাসী তারা।
প্রাণেশ্বরী !
{ ১৯

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃষ্ণ।
নাহি জানিতাম ছিল কঠিন
ভূতলে
এ স্থির চপলা মিগ্ধ, এ জ্যোৎস্না জঙ্গম,
সজীব সৌরভ এই, শরীরী সঙ্গীত।
তারা। জানি, নহে উপচারপদ এই। তুমি
ভালােবাসাে মােরে, তাই এ মুঢ় বিশ্বাস।
আমি নহি বিদ্যুৎ কি জ্যোৎস্না কি সঙ্গীত।
আমি মাত্র তারা।—দোষ আছে গুণ আছে।
পৃথী। আমি ত দেখিনা দোষ।
তারা।
ভালােবাসা নাহি
দেখে, শুদ্ধ ভালােবাসে। ভালােবাসা ঢাকে
সমুদ্রবারির মত গিরি ও গহ্বরে
সমভাবে ; আনে বসন্তের বায়ুসম
কেবল সৌরভ আর কেবল সঙ্গীত।
গীত।
এ হৃদি কুঞ্জবনে তুমি রহহে প্রাণসখা মম জীবনভাতি।
নিখিল শান্ত নব, নিরতি নিভৃত সব, নীরব সে, দিনরাতি!
স্নিগ্ধবসন্ত সেবিত পুস্পিত চম্পক বেলা মালতি জাতি।
বিহর তথা মম হৃদয়বিলাসী! শতফুলগন্ধে মাতি ;
রহ ঘিরি মােরে তব ভুক্তভােরে হে চিরজবীনসাথী ;
দিব পিককুজন, মলয়সমীরণ, কুসুমহার দিব গাঁথি
শয়তরে দিব শিশির শীতল কিশলয়কোমল এ বুক পাতি।
[ ভৃত্যের প্রবেশ ]
ভৃত্য। উপস্থিত পত্রবাহ মেবার হইতে।

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃ।
পৃথ্বী। মেবার হইতে ? দাও ফিরায়ে তাহারে।
তারা। ছিছি নাথ! ফিরাইয়া দিবে বৃদ্ধ তব
পিতার প্রেরিত দূতে, অবমান করি’
তাহারে ?-প্রাণেশ!-জানি ইহা অভিমান।
জানি ভালােবাসাে তুমি পিতারে ; নহিলে
হইত না অভিমান ।কিন্তু অভিমান
রাহুসম গ্রাস করে পূর্ণ চন্দ্রে যদি,
আবার সে রাহুমুক্ত পূর্ণচন্দ্র হাসে।
পৃথী। উত্তম! ডাক সে দুতে।
যথাদেশ প্রভু।
[ প্রস্থান ]
তারা। ভালো নাহি বাসো নাথ চিতােরে ?
পৃথ্বী।
চিতাের
আমারে বাসে না ভালো।
তারা।
তােমারে বাসে না
ভালাে, কেহ হেন আছে জগতে বল্লভ।
[ দূতের প্রবেশ ]
মহারাজ! দিয়াছেন এই পত্রখানি
সূৰ্যমল, মহারাজে।
পৃথী।
দাও পত্র দূত।
[ পত্র লইয়া পড়িয়া বিস্ময় প্রকাশ।
তারা। কি সংবাদ পত্রে ?
[ ১১

তৃতীয় অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
পৃথী।
অতি অদ্ভুত সংবাদ !
-যাহ, কভু কোথা ঘটে নাই, ঘটে তাহা,
দেখিতেছি, মেবারের রাজপরিবারে।
পিতৃব্য বিদ্রোহী। সঙ্গে দিয়াছেন যােগ
মজফর ও সারঙ্গ দেব। তিন জন
সমুদ্যত আক্রমণ করিতে চিতাের।
দিয়াছেন সে সংবাদ স্বয়ং বিদ্রোহী,
আমারে করিয়া অনুরােধ, দিতে যােগ
বৃদ্ধপিতৃসহ এই যুদ্ধে।
তারা।
অত্যদ্ভুত !
যাইবে ?
পৃথ্বী।
তারা। করিবনা পদার্পণ
চিতােরে কদাপি আর ।
কি হেতু বল্লভ ?
পৃথী। দিয়াছেন পিতা মােরে বহিষ্কৃত করি’
আপনি চিতাের হ’তে। তদুপরি পিতা
করেন নি আহ্বান আমারে। পিতৃব্যের
নাহি স্বত্ব আহ্বান করিতে ।
তারা।
পুনরায়
অভিমান?-রহিবে বসিয়া কোন্ প্রাণে,
যখন বিপন্ন বৃদ্ধ পিতা--নিঃসহায়?
তিনি তব পিতা; তিনি বৃদ্ধ নিঃসহায় ;
১২।

তৃতীয় অঙ্ক।
তারাবাই ।
[ সপ্তম ।
তার অভিমান সাজে ; কিন্তু তুমি নাথ ! -
পুত্র তার, বীর, পূর্ণ সম্পদগৌরবে ;
এই ক্ষুদ্র অভিমান তােমারে না সাজে।
তােমারে না সাজে হেথা বহিতে 'এ হেন
মগ্ন সুখে, নিরুদ্বেগে, নিশ্চিন্ত হৃদয়ে,
যখন তােমার পিতা আচ্ছন্ন বিপদে।
—উঠ বীরবর! উঠ প্রাণাধিক। উঠ
এ কলঙ্ক কর দূর।—এ ঘন কালিমা
স্পর্শ করবে না তব শুভ্র যশােরাশি।
পৃথী। তাই হােক—আর তুমি ?
তারা।
যাইব সমরে
পতিসঙ্গে। নাথ!—আমি ক্ষত্রিয় রমণী।
পৃথী। তাহাই হউক! তারা!—তুমি ধন্য নারী।
তুলিছ গড়িয়া তুমি নিজ হস্তে প্রিয়ে
চরিত্র পৃথীর।
আমি শুদ্ধ বক্সিম
করিতেছি অনাবিল খনিজ কাঞ্চনে।
[ নিষ্ক্রান্ত ।

চতুর্থ অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। স্থান-রাণার কক্ষ। কালপ্রায়। একাকী সশস্ত্র রাণা। রায়মল। বাধিয়াছে সমর। বিদ্রোহী সেনাপতি, দিয়াছে সমরে যােগ মালবের সনে সসৈন্যে।-হা সূৰ্য্যমল ! সহিয়াছি আমি নীরবে উপযুপরি তিন পুত্রশােক, একমাত্র প্রাণাধিক কন্যার বিচ্ছেদ ;- কিন্তু এই তব আচরণ-সূৰ্য্যমল- শেলসম বাজিয়াছে বক্ষে। এত ব্যথা কভু পাই নাই। কি করিলে সুৰ্যমল ! কি করিলে?—এ যে কভু স্বপ্নে ভাবি নাই [ দূতের প্রবেশ ] রায়। কি সংবাদ দূত? রাণা । সমূহ বিপদ! করিয়াছে অধিকার শত্রুদল আসি, দক্ষিণে বাতুরো সাজি। ১১৪]

চতুর্থ অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ প্রথম দৃশ্য।
রায়।
দুত।
ইহা সত্য কথা ?
সত্য কথা মহারাজ! আসিছে এক্ষণে
আক্রমণ করিতে চিতাের। পাতিয়াছে
শিবির গম্ভীরাতীরে।
স্পর্ধা এতদুর !
কি করিছে আমার সেনানী ?
পলায়িত
নব সেনাপতি সহ।
নিয়াছে উৎকোচ।
চিতাের প্রহরিগণ ?
রায়।
রায়।
চিতােরের, পূৰ্ব্ববৎ।
অত্যুত্তম। যাও ! [ দুতের প্রস্থান)
স্বয়ং যাইব আমি সমরে প্রত্যুষে ।
“কি করিব ? একাকী মরিব যুদ্ধে, আমি
ক্ষত্রিয়। জানিনা ভয়। মৃত্যু আর আমি
এক ক্রোড়ে মানুষ হয়েছি। নাহি ডরি
মৃত্যুরে। মরিব আজি ক্ষত্রিয়ের মত
চিতােরের রাণার মতই, অসি করে,
যুদ্ধক্ষেত্রে মহানন্দে। কিন্তু সূৰ্যমল ।
কি করিলে তুমি ?—রক্ষা কর মা ভবানী।
চক্রীর চক্রান্তগত লুব্ধ সূৰ্যমলে।
[ অন]
[১১৫

দ্বিতীয় দৃশ্য।
স্থান-শিবির। কাল—অপরাহু।
একাকিনী তারা।
তারা।
বাধিয়াছে ঘোর যুদ্ধ।
মরণ কল্লোল
উঠিয়াছে চারিদিকে। দেখিয়াছি আজি,
যাহা দেখি নাই পূৰ্বে জীবনে কখন,
গজবাজীমনুষ্য রক্তাক্ত কলেবরে
গড়াগড়ি যায়, ভূমিতলে পীভূত
একাকার।-শুনিয়াছি—যাহা শুনি নাই
পূৰ্বে কভু-শস্ত্রধ্বনি, সমরচীৎকার,
মরণে আৰ্তনাদ, বিমিশ্রিত ঘাের
অসীম বিকট কোলাহলে। করিয়াছি
যুদ্ধ আজি তুচ্ছ করি, জীবন, প্রবল
বিরাট উৎসাহে। আনিয়াছি বন্দী করি
এই হন্তে মজফরে আজি।
[ প্রহরীদ্বয়ের সহিত শৃঙ্খলিত মজফরের প্রবেশ ]
প্রহরী।
যুবরাণী !
তারা
আমার শিবিৰে।
রাখিব বন্দিরে কোথা ?
-বীর তুমি মজফর! দিব মুক্ত করি’
১১৬]
।

চতুর্থ অঙ্ক।
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় বৃত।
এই
তারা।
তারা।
যুদ্ধ অবসানে তােমারে নির্ভয়
রহিও। আমরা ক্ষত্র। বধ নাহি করি
নিরস্ত্র বন্দীরে!
তুমি বীরনারী বটে!
তুমি দেখ নাই পূৰ্বে ক্ষত্রিয় রমণী ।
ক্ষত্রিয় রমণী আমি!-যাও, নিয়ে যাও
বন্দীরে প্রহরী!
[ সৈন্য সহ মজফরের প্রস্থান ]
এই জয়বাৰ্তা যবে
শুনিবেন যুদ্ধ হতে ফিরি’ প্রাণেশ্বর,
কত ভালবাসিবেন আমারে। আমার
আজি গৌরবের দিন।কিন্তু এইক্ষণে
কোথা যুবরাজ ?-অবসান প্রায় দিবা।
এখনাে সমরক্ষেত্র হতে, কই, তিনি
নহে প্রত্যাগত। যুদ্ধে নাথের উন্মাদ
জানি-
সৈন্যদল সহ সেনাপতির প্রবেশ
-একি সেনাপতি ! তুমি আসিয়াছ
যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে?
সত্য, আসিতেছি আমি
যুদ্ধক্ষেত্র হতে, রাণী ।
কোথা যুবরাজ!
হইয়াছে জয়।
সেনা।

চতুর্থ অঙ্ক।
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় বৃ।
সেনা।
হায় রাজপুলি?—জয় !
প্রবেষ্টিতে যুবরাজ শত্রু সৈন্যদলে,
যুঝিছেন, বীরবর, দৃপ্ত সিংহবৎ
কিন্তু এতদূর অগ্রসর যুবরাজ,
ফিরিবার নাহি পথ। তার সৈন্যদল
নিহত শক্রর বৃহে প্রায় সর্বজন।
তারা। কি কহিছ সেনাপতি ? তুমি পার্শ্ব তার
ছাড়িয়া এসেছ নিরুদ্বেগে? পলায়েছ
শৃগালের মত তবে যুদ্ধক্ষেত্র হতে,
পরাজয় সম্বাদ লইয়া ?—সেনাপতি!
ক্ষত্রিয় পুরুষ তুমি ? আমি তুচ্ছ নারী
ফিরিয়াছি যদি যুদ্ধ হতে, ফিরিয়াছি
জয়লাভ করি’, বন্দী করি অরাতিরে ;
এক্ষণে যাইব যুদ্ধে পুনর্বার আমি,
উদ্ধারিব যুবরাজে।—কে আসিবে, এস।
প্রবল ঝঙ্কার মত গহন কাননে,
পড়িব শক্রর দলে ; করিব নির্মূল,
উড়াইব, ধূলিসম বাড়বাগ্নিসম
নিঃশ্বাসে করিব ভন্ম তাহারে নিমেষে।
—যার ইচ্ছা এস সঙ্গে। যার ইচ্ছা বহ।
সেনাপতি। যুবরাণী ! কে রহিবে লুকায়ে গরে,
যখন গভীরস্বরে ডাকেন জননী ?
১১৮]
;

চতুর্থ অক।]
তারাবাই।
তৃতীয় বৃক্ষ।
তারা।
কার প্রাণে এত মায়া ?-চল মা এক্ষণে,
বিপক্ষ শিবিরে পড়ি করিয়া হুঙ্কার,
জিনিব সমর কিম্বা মরিব সংগ্রামে।
চল তবে, ডাক সৈন্তে, কহ ‘ভয়নই
ঘন উচ্চৈঃস্বরে। ভয় নাই, আমি আছি।
[ জানু পাতিয়া ] রক্ষা কর ভগবতি চণ্ডি। প্রাণেশ্বরে,
যতক্ষণ আমি নাহি আসি পার্শে তাঁর।
-দাও শক্তি মহাশক্তি। যাইছে সমরে
সতী—তার প্রাণেশ্বরে করিতে উদ্ধার ।
[ নিকা।
তৃতীয় দৃশ্য।
স্থান—একটি সাধারণ গৃহাঙ্গণ। কাল—অপরাহ।
শান্তি-রক্ষক প্রহরী ও জনৈক সৈনিক।
সৈনিক। আঃ কি যুদ্ধটাই হােল।
শান্তিরক্ষক। হাঁ হাঁ কি রকম বল দেখি ! কে জিতলে ?
সৈনিক। আঃ যুদ্ধ দেখে চক্ষু জুড়িয়ে গেল।
প্রহরী। এ! যুদ্ধ দেখে চক্ষু জুড়িয়ে গেল কি রকম
শান্তিরক্ষক। কে জিতলে ?
সৈনিক। যুদ্ধ যারে বলে !
শান্তিরক্ষক। কি রকম? কৈ জিতলে ?
সৈনিক। তবে শুনবে? শােন। কিন্তু আমি যে রকম নিয়মে
[১১৯
!

চতুর্থ অয়।]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
বলব, সেই রকম নিয়মে শুনে যেতে হবে। নৈলে-
এই চুপ।
উভয়ে।
আচ্ছা তাই।
সৈনিক। এই শােন। এই প্রথমতঃ মনে করে খুব যুদ্ধ হচ্ছে।
উভয়ে।
আচ্ছা।
সৈনিক। মনে কচ্ছে ?
: উভয়ে।
কচ্ছি।
সৈনিক। মনে কচ্ছো ?
কচ্ছি, তারপর ?
সৈনিক।
ওরকম “তারপর বল্লে চলবে না।
যাও।
শুদ্ধ
সৈনিক। উত্তর দিক থেকে মজফর, দক্ষিণ দিক থেকে সারঙ্গদেও,
পূর্ব দিক থেকে সূর্যমল আর পশ্চিম দিক থেকে
রায়মল, চিতাের আক্রমণ কল্লে।
শান্তিরক্ষক। সে কি! আমাদের রাণা রায়মল চিতাের আক্রমণ
কল্লে কি রকম?
সৈনিক। কি রকম আবার।—ঐ রকম।
প্রহরী।
রায়মল চিতােরের রাণা, চিতাের আক্রমণ কর্তে যাবে
।
সৈনিক। তাওত বটে। তবে পশ্চিম দিক থেকে কে এল ? তিন
১৫।

• চতুর্থ অঙ্ক।] তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য। দিক ত মিলে যাচ্ছে, পশ্চিম দিকটা কি একবারে ফাঁক ছিল ? ও দিক থেকে কে এল? উভয়ে। তা আমরা কি জানি ? সৈনিক। এই ধর—বােস—মনে করে নেও আমি যেন—আমি যেন মজফর ; তুমি সূৰ্য্যমল ; আর তুমি যেন সারঙ্গদেও; -আর রায়মল কে হবে ? উভয়ে। তা কি জানি। সৈনিক। আচ্ছা রােস— সহসা বাহিরে গিয়া পথবী একজন কৃষককে ধরিয়া আনিয়া]-এই-দাড়া। কৃষক। এজ্ঞে, মুই ত কিছু করিনি। সৈনিক। আরে, কে বলছে যে করিছি। ; সৈনিক। তােকে একটু দরকার আছে। তুই রাণা রায়মল হতে পাৰ্বি ? এতে না। সৈনিক। আজ্ঞে না কিরে! দাড়া, তােকে রাণা রায়মল হতে হবে। কৃষক। এজে- সৈনিক। আরে দাঁড়ানা। একটু খানিকের জন্যে একবার তােকে রাণ রায়মল হতে হচ্ছে। ছাড়ছিনে। এজে, কি কৰ্ত্তে হবে? সৈনিক। কিছু কৰ্ত্তে হবে না। শুদ্ধ দাঁড়িয়ে থাক্। মাঝে মাঝে একবার কান্তে ঘােরাতে হবে। বুঝিছিস। yি

চতুর্থ অঙ্ক।
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
উভয়ে।
এজ্ঞে।
সৈনিক। আচ্ছা, সূৰ্য্যমল কে ?
শান্তিরক্ষক। আমি।
সৈনিক। বেশ! [ প্রহরীকে। আর তুমি মজফর-না না, আমিত
মজফর। তুমি হচ্ছ সারঙ্গদেও। [ কৃষককে ] ঠিক হয়ে
সূর্যমল পূর্বদিকে থাক।
উত্তরদিকে, না না দক্ষিণদিকে—আর আমি মজফর
উত্তর দিকে। রায়মল মধ্যে। ধর খুব যুদ্ধ হচ্ছে-
[ কৃষককে ] কাস্তে ঘােরা, কান্তে ঘােরা-যুদ্ধ হচ্ছে।
যুদ্ধ হচ্ছে।
সৈনিক। রঙ্গদেও। দক্ষিণ দিক থেকে এস। সূৰ্য্যমল
পূৰ্বদিক থেকে এস।
এস। আর আমি এই-রায়মলকে
আক্রমণ কর।
[ সকলে আসিয়া কৃষককে প্রহার আরম্ভ করিল
কৃষক। এ=ে
সৈনিক। তাের কোন ভয় নেই। পৃথ্বীরাজ এলাে বলে’ মাথার
উপর কেবল কাস্তে ঘােরা। দেখিস যেন আমাদের গায়ে
লাগে। ঘােরা—পৃথ্বীরাজ ও তারা এলাে বলে। [কৃষক
চিৎকার করিতে লাগিল ও কান্তে ঘােরাইতে লাগিল ]
( লাঙ্গল হতে অন্য এক কৃষক ও কৃষকপত্নীর প্রবেশ
২ কৃষক। সাধুসাকে মাচ্ছিস্ কেন সব? মাতাল হয়েছিস নাকি ?
*
বেরো বেটারা।

তারাবাই। চতুর্থ অঙ্ক।] ( চতুর্থ দৃশ্য। সৈনিক। [ ফিরিয়া দেখিয়া ) এই যে পৃথীরাজও এয়েছে- তারাবাইও এয়েছে। এই তারা আমাকে বন্দী কঙ্গে। [ কৃষক পত্নীর গলধারণ ] আর পৃথী! ঐ বেটা সূৰ্য্যমল- ওঁর ঘাড়ে মা কোপ। আমাকে মারিস কেন? আমি যে মজফর। এই যুদ্ধ খতম্। পালা সূৰ্য্যমল, পালা সাজ দেও, পালা পালা—পৃথ্বী এয়েছে। দৌড় দৌড়। [ তিন জনে পলায়ন) ২ কৃষকপত্নী—কি, সাধুসা তােমাকে মাচ্ছিল কেন ? ১ কৃষক। কি জানি—আমারে—আমারে রাণা রাইমল সাজাইছিল। ২ কৃষক। বেটারা তাড়ি খেয়েছে নিশ্চয়। চল। ১ কৃষক। [ যাইতে যাইতে ] ভাগ্যিস্ এইছিলি ভাই। নইলে মাের জান যেত। [ নিক্রান্ত । চতুর্থ দৃশ্য। স্থান-সুৰ্যমলের শিবির। কালরাত্রি। সূৰ্য্যমল ও তাহার পত্নী তমসা। নিদ্রা হয় মাই ? নিল ? সমস্ত দিবস করিয়াছি শয্যা পরিক্রমণ। বেদনা - তমসা। সুৰ্য্য। [ ১২৩ • চতুর্থ অৰু।} তারাবাই। ( চতুর্থ দৃশ্য। বিষম বেদনা স্কন্ধে। তমসা। তমসা ! -কেন হইল না মৃত্যু ?—পৃথী প্রিয়তম! মানুষ করেছি--ক্রোড়ে করে’; সমুচিত পুরস্কার দিলি আজ। তাের খঙ্গ শেষে পড়িল এ স্কন্ধে ? কিম্বা তুই কি করিবি এ দৈবের প্রতিশােধ। রায়মল ভাই- সেও ত আমারে ক্রোড়ে ধরে’, কত স্নেহে লালন করিয়াছিল। তদমে বন্ধিত আমি হইয়াছি তার বিশ্বাসঘাতক তার পুত্র লইয়াছে প্রতিশােধ। তবে, -কেন হইল না মৃত্যু। তমসা। হয় না অস্থির। সুৰ্য্য। অস্থির ? হইব স্থির অচিরে প্রেয়সী। [ জনৈক সৈনিকের প্রবেশ ] সৈনিক। উপস্থিত দ্বারে মেবারের যুবরাজ। পৃথী! পৃথ্বী !—নিয়ে এস ত্বরা সসম্মানে। [ সৈনিকের প্রস্থান ] তমসা। [ স্বগত ] উপনীত পৃথ্বীরাও কি হেতু শিবিরে ? [ পৃথীর প্রবেশ ] পৃথী। পিতৃব্য, পিতৃব্য পত্নী, 'প্রণাম চরণে। সুৰ্য্য। এস প্রিয়তম বৎস!—দীর্ঘজীবী হও ! [ তমাকে] কর আশীৰ্বাদ।-কেন ফিরাইছ মুখ । ১২৪ ) সূৰ্য্য।

খ অঙ্ক।] তারাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। তমসা। পৃথী। সুৰ্য্য। তমসা। ইহা যুদ্ধ ক্ষেত্র নহে; এ আমার গৃহ। পৃথী প্রাণঘাতী শত্রু নহে এইক্ষণে ; সে আমার ভ্রাতুস্পুত্র। স্নেহের সামগ্রী। কর আশীর্বাদ প্রিয়ে,—কর অভ্যর্থনা . -এস বৎস! প্রাণাধিক। দীর্ঘজীবী হও। দীর্ঘজীবী হও। ক্ষত কিরূপ? পিতৃব্য ! বেদনা বিষম ; তৰু বহু উপশম হইয়াছে, তােমারে দেখিয়া এধিক, এতদিন পরে। পৃথী-সাধিয়াছ ভালাে পিতৃব্যে তােমার কাজ। মা, তােমার চেয়ে বাজিয়াছে এই দুঃখ আমারে অধিক। { মুখ ঢাকিলেন ] সাধন করেছ তুমি কৰ্তব্য তােমার। পিতার রক্ষার হেতু উঠায়েছ অসি বিদ্রোহীর স্কন্ধে। তুমি করিয়াছ স্বীয় কৰ্ত্তব্য।—করিনি আমি কত্তব্য আমার । আমি যার অন্নে পুষ্ট তাহারি মন্তকে করিয়াছি লক্ষ্য, অসি! আমি করি নাই কর্তব্য আপন। পৃথী। সূৰ্য্য। [ ১২৫

চতুর্থ অঙ্ক।]
তারাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
পৃথ্বী।
হায় ! পিতৃব্য, কিহেতু
এ প্রমাদ ?
পৃথ্বী।
সূৰ্য্য। শুধায়ে বৎস, সেইকথা।
—ভুলিয়াছি জিজ্ঞাসা করিতে এতক্ষণ,
ভ্রাতার কুশল বার্তা।
দেখা হয় নাই
এখনাে পিতার সঙ্গে।—পিতৃব্য, এক্ষণে
বিষম ক্ষুধার্ত আমি। খাদ্য কিছু আছে ?
সূৰ্য্য। আছে খাদ্য কিছু ? দাও তমসা।
তমসা।
দিতেছি।
[ স্বগত ] থাকিত যদ্যপি ভস্ম দিতাম ও মুখে।
[ প্রস্থান ]
সূৰ্য্য। ধন্য তুমি পৃথ্বীরাজ ! আর ধন্য তব
নবােঢ়া বনিতা তারা প্রচণ্ড বিক্রমে
করিয়াছে বন্দী মজফরে বীরনারী।
-কোথা তারা।
পৃথী।
শিবিরে
তমসার খাদ্য লইয়া প্রবেশ।
সুৰ্য্য।
এনেছ?
তমসা।
যাহা ছিল
এনেছি | পৃথ্বীর সম্মুখে—খাদ্য রাখিলেন।

চতুর্থ অঙ্ক।] তারাবাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। সূৰ্য্য। তমসা খাইতে বল।-খাও বৎস তবে। তমসা জানােই স্বল্পভাষিণী স্বতঃই। পৃথী। [ আহার করিতে করিতে ] যুদ্ধ করিয়াছ আজি সিংহের বিক্রমে, পিতৃব্য। সুৰ্য্য। যদ্যপি স্কন্ধে নাহি পাইতাম সাঙ্ঘাতিক এ আঘাত সহসা, হইত অদ্যকার সমরের ফল অন্যরূপ। তথাপি দুঃখিত নহি।-পরাজিত আমি স্বহস্তে লালিত ভ্রাতুষ্পত্রের বিক্রমে। পৃথী। দাও বারি। তমসা। [ জল দিলেন। পৃথী। পান আছে। তমসা। এই লও। [ প্রদান ] পৃথী। তবে যাই আমি, পিতৃব্য, সমরক্লান্ত আমি ; -আবার হইবে দেখা সমর প্রাঙ্গণে, প্রভাতে, ভরসা করি। সূৰ্য্য। নিশ্চম, যদ্যপি ক্ষণমাত্র এই ক্ষত অপশম হয়। পৃথী। পিতৃব্য, পিতৃব্য-পত্নী, প্রণাম চরণে। . ; . ১২৭

চতুর্থ অঙ্ক।
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
সূৰ্য্য। যাও, যুদ্ধে জয়ী হও যশস্বী, সৰ্ব্বদা,
বংশদীপ—মেবারের যুবরাজ !
[ পৃথ্বীর প্রস্থান ]
তমসা। বুঝিনা তােমার রীতি।
সূৰ্য্যমল।
বুঝিবে তমসা,
একদিন কোথায় সারঙ্গ দেব?
তমসা।
স্বীয়
শিবিরে।
সুৰ্য্যমল।
আসিতে বল আমার শিবিরে।
করিতে হইবে শীঘ্র যুদ্ধের মন্ত্রণা।
[ তমসার প্রস্থান)
সূৰ্য্যমল। জ্বালায়েছি অগ্নি যদি—সে অগ্নি জ্বলিবে,
আলাইবে পুরপল্লী! কিন্তু যদি হয়
জয়লাভ ? কি করিব ? বসিব আপনি
মেবারের সিংহাসনে ?-না। ছাড়িয়া দিব
সিংহাসন পৃথ্বীরাজে! সম্পত্তি যাহার,
তাহার হউক। আমি করিব যাপন
জীবনের শেষ, দূর অরণ্যে নিভৃতে।
ধর্মকর্মে প্রায়শ্চিত্ত করিব ইহার।
t
১২৮]

পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান—সিরােহী, যমুনার কক্ষের ছাদ। কালরাত্রি।
একাকিনী যমুনা।
যমুনা। ঘােরা অমাবস্যা রাত্রি-গগনমণ্ডলে
জ্বলিছে নক্ষত্র পুঞ্জ, ভূত কাহিনীর
সুখস্মৃতিসম, ঘন নৈরাশ্য-সাগরে।
—নিস্তব্ধ ধরণী। শুদ্ধ দূরে বংশীধ্বনি
উঠিছে বিলাপসম রজনীর মুখে।
—এস নিশীথিনী! এস প্রিয় সখী মম।
দুঃখিনী আমরা বসি’ কাঁদি এ নির্জনে।
গীত।
এস তারাময়ী নিশি এস ধরা মাঝারে।
ব্যথিত পীড়িত প্রাণে ডাকি আমি তােমারে।
হুহু করি' হৃদিতলে দেখ কি আগুন জ্বলে,
তব শান্তিজলে দেবি নিভাও গাে তাহারে।
হয় যে সময় হৃদে হৃদয়ে যে শেল বিঁধে-
তােমা বিন শান্তিময়ি জানাইব কাহারে।
ন
।
-গাঢ় হতে গাঢ়তর অন্ধকার রাশি
ঢেকে আসে পৃথ্বী। গাঢ় হতে গাঢ়তর
ঢেকে আসে নৈরাশ্য অন্তরে। নাহি জানি
হইবে কোথায় পরিসমাপ্ত নাটিকা।

চতুর্থ অঙ্ক।
তারাবাই।
[ পঞ্চম দৃশ্য।
“সতীর দেবতা পতি” পিতৃব্যের এই
উপদেশ করিয়াছি জীবন আশ্রয়।
দুঃখে, শােকে, অপমানে, চিত্তের বিপ্লবে,
অকূল সমুদ্রে, করিয়াছি ওই মন্ত্র
জীবনের ধ্রুবতারা। তবু মাঝে মাঝে
ঢেকে যায় সেই জ্যোতি নিবিড় জলদে ;
আবার দেখিতে পাই তারে। কিন্তু হায়,
বুঝিয়াছি এ সমুদ্রে কুল পাইব না।
বুঝিয়াছি নাহি এই দুঃখের অবধি।
তবু ধৈৰ্য্য ধরে থাকি। করি এই ব্রত
নীরবে নিভৃতে একা দুঃখে উদযাপনা।
-তবু পারি না যে ভালােবাসিতে পতিরে
করিতে হারে ভক্তি, দিতে অন্তরের
পূজা-পারি না যে। দয়াময়! শক্তি দাও,
শক্তি দাও যমুনার দুর্বল হৃদয়ে।
—এই যে আসেন পতি। আজি যে সহসা ?
[ প্রভুরাওর প্রবেশ ?
যমুনা।-
[ স্বগত ] স্বর মদিরাজড়িত দেখছি।
তােমার নাম যমুনা ? তােমার বাপকে আমি চিনি
নাত। তােমার বাপের নাম কি ?
আমার পিতা মেবারের রাণা রায়মল।
যমুনা'।
প্রভু।
যমুনা।

চতুর্থ অঙ্ক।]
তারাবাই।
| পঞ্চম দশ্য।
প্রভু। বটে বটে! সেই বেটাই তােমার বাপ বটে। ঐ যে কি
নাম বল্লে তার। তােমার ঐ বাপ, প্রেয়সীতােমার বাপ
চোর-বেজায় চোর।রাগ করাে না;-প্রমাণ দিচ্ছি-
যমুনা। প্রভু! আমার পিতা সাধু কি চোর, তা তােমার মুখে
শুন্তে চাই নে।
প্রমাণ দিচ্ছি—এই সেই পাজি বদমায়েস বুড়াে তার
বেহাই শূৰ্ত্তনকে রাজ্যের খানিক ছেড়ে দিলে।
আর
আমি কি বাবা ভেসে এসেছিলাম। দেখ যমুনা
তােমার ভাই ওই যে শাল পৃথ্বীশালা একেবারে নীচ
খােসামুদে জোচ্চোর হাড়হাবাতে বেশ্যাসক্ত
যমুনা।
পায়ে ধরি প্রভু! আর থাকুক। আমার মনে ব্যথা
দিওনা। বড় ব্যথা পাই।
ওঃ! উনি ব্যথা পান ত আমার ঘুম হচ্ছে না। সত্যি কথা
বলব, তার আর ভয় কি ; নিশ্চয় বলবো। আমি প্রমাণ
করে দিচ্ছি, যে তার স্ত্রী দস্তুর মত বারাঙ্গনা ছিল।
তােমার ভাই জয়মল তাকে রেখেছিল। তার শাের
ঘরে তার মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছিল। তাের ভাই পৃথ্বী—
সাধের ভাই পৃথী—তাের প্রাণের ভাই পৃথী-তাকে
বিয়ে করেছে কি না ?-যাবি কোথায় ? শুনে যা-
যমুনা। তা আমার কাছে বলে কি হবে?
প্রভু। কি হবে? হবে এই যে আমি তােকে মাথা মুড়িয়ে ঘােল
ঢেলে গাধার পীঠে চড়িয়ে—দেশ থেকে তাড়িয়ে দেব।
[১০১

চতুর্থ অঙ্ক।
তারাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃষ্ট।
এমন বাপের মেয়ে, এমন ভায়ের বােনকে আমার ঘরে
রাখলে কলঙ্ক হয়।
যমুনা।
ভাই হােক।
প্রভু।
কিন্তু তার আগে তাের সামনে এই তাের বাপকে এক
পয়জার ; তাের ভাইকে দুই পয়জার।
( উদ্দেশ্যে পাদুকা প্রহার )
[ যমুনা পায়ে ধরিতে উদ্যত প্রভু তাকে সবলে আঘাত ও যমুনার পতন
প্রভু। কেমন! হাঃ হাঃ হাঃ।
( প্রস্থান
এই স্বামী আমার দেবতা। মা জগদম্বে !-এ অন্ধকারে
পথ দেখাও, আব পারি না যে।
[ প্রস্থান)
যমুনা।
যই দৃশ্য।
স্থান-বনস্থশিবির ; স্থানে স্থানে অগ্নি জ্বলিতেছে।
কালরাত্রি।
"
সূৰ্য্যমল ও সারঙ্গ।
সূর্য্য। আমার যথাসাধ্য তা করেছি। নগর হতে নগরে, বন হতে
বনে বিতাড়িত হয়ে শেষে এই বাতুরাে জঙ্গলে আশ্রয়
নিইছি। আমার কাজ আমি করেছি।
সার। তােমার কাজ তুমি করােনি।
১৩২ ]

চতুর্থ অঙ্ক।] তারাবাই { ষষ্ঠ দৃশ্য সুৰ্য্য। সূৰ্য্য। আমার কাজ আমি করিনি ? হায় ভগবান। ভাইয়ের বিপক্ষে ষড়যন্ত্র করেছি ; ভাইপাের গায়ে অস্ত্রাঘাত করেছি। আর তুমি? তুমি লুঠ নিয়ে ব্যস্ত। সারঙ্গ। নইলে সৈন্যদের বেতন কোথা থেকে, আসত সূরয । তােমার কোষাগার নেই ; গচ্ছিত ধন নেই। সূৰ্য্য। এরূপ অযথা উপায়ে এ সমর নির্বাহ কৰ্ত্তে হবে জানলে, আমি এতে প্রবৃত্ত হতাম না। সারঙ্গ। প্রবৃত্ত হয়েছিলে কেন ? কার দোষ ? তােমার দোষ। তােমার মন্ত্রণায় এই সর্বনাশ। সারঙ্গ। যা হবার তা হয়েছে। এখন ভবিষ্যতের উপায় চিন্তা কর।-ও কি ঘােড়র পায়ের শব্দ না ?-শত্রু নাকি ? সূৰ্য। এ নিশ্চয়ই ভ্রাতুস্পুত্র পৃথী। তরবারি কই ? (তরবারি গ্রহণ) (বেগে পৃথী ও তার প্রবেশ) পৃথী। এই যে (সূৰ্যমলকে আক্রমণ ও সূৰ্যমলের পতন ) সারঙ্গ। ধিক্ পৃথী! তােমার পিতৃব্যের গায়ে আর সে শক্তি নাই। পৃথী। স্তব্ধ হ’ বিদ্রোহী। (সূৰ্য্যকে) পরাভব স্বীকার কর ? পরাভব স্বীকার করি, পৃথী। পৃথী। (সুৰ্য্যকে ছাড়িলেন) পৃথী! তাের কাছে পরাভব স্বীকার করি, তাতে আমার লজ্জা নাই। আমি তােকে জোড়ে করে মানুষ করেছি। ঐ সুন্দর সুপেশী বলিষ্ঠ দেহ ক্রমে ক্রমে চন্দ্রকলার মত বাড়তে [ ১৩৩ ৮ সূৰ্য্য। ! সূৰ্য্য।

চতুর্থ অঙ্ক।]
তারাবাই।
( ষষ্ঠ দৃশ্য।
দেখেছি। প্রত্যেক অবয়ব, প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, প্রত্যেক
ভঙ্গী আমার কাছে পরিচিত। তাতে অস্ত্রাঘাত কর্তে
আমার বুক ফেটে যায় রে পৃথী।
পৃথী। কি কৰ্বে পিতৃব্য! যখন এই কালানল জ্বালিয়েছ
সূৰ্য্য। ভাবিনে পৃথী, যে আমি মৃত্যুর ভয়ে এ কথা বলছি।
চিতােরের বীরমগুলীকে নিয়ে আয় ; এখনও যুদ্ধ কৰ্ত্তে
পারি কি না দেখ। কিন্তু তাের সঙ্গে আর না ।
পৃথী। কেন পিতৃব্য যুদ্ধে জ্ঞাতিত্ব নেই।
সূৰ্য্য। নেই বটে। কিন্তু ভেবে দেখেছি যে তাের সঙ্গে যুদ্ধে আমার
জয়েই বেশী লােকসান। যুদ্ধে আমি যদি মরি, আমার
কি? আমি অপুত্রক। আমার জন্য কেউ কাঁদিবার নেই।
কিন্তু তুই যদি মরিস, তাহলে চিতােরের কি হবে?—আমার
মুখে চিরকালের জন্য চূণকালি পড়বে। তাের সঙ্গে আর
। চিতােরের বেছে বেছে একশত বীর নিয়ে আয়।
একা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কৰ্ব। কিন্তু তার সঙ্গে
আর না।
পৃথী। [ অবনত মস্তকে ] বুঝেছি পিতৃব্য, এত দিনে বুঝেছি।
যুদ্ধে কেন তােমার দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, যখন আমার
• দেহে অন্ত্রের দাগটি লাগেনি তা—এখন বুঝেছি।
পিতৃব্য ক্ষমা কর।
সুৰ্য্য। ক্ষমা কর্ক কি রে ? তাের উচিত কাজ তুই কচ্চি।
আমি বিদ্রোহী; আমিই কমার পাত্র।

চতুর্থ অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য।
।
পৃথী। সে ক্ষমার উপায় আমি কৰ্ব্ব।-না পিতৃব্য, আর না,
আমাকে আশীর্বাদ কর।
সূৰ্য। [ আশীৰ্ব্বাদ করিলেন ] এ বালকটি কে ?
পৃথ্বী। ইনি আমার পত্নী, তারাবাই ।
সূৰ্য্য। মা তুমি তারা! তুমিই সেই বীরনারী, যে স্বহস্তে মজফরকে
বন্দী করেছিলে ! হায় মা, যে দেশে হেন বীরনারী জন্মে সে
দেশে কি হেন কাপুরুষ পুরুষ জন্মে—যে আপনার ভায়ের
বিপক্ষে অস্ত্র ধারণ কৰ্ত্তে হেয় যবনের সহায়তা গ্রহণ করে।
-মা তুমি আয়ুষ্মতী হও।
সারঙ্গ। তবে কি বুঝবে যে এ যুদ্ধ এইখানেই সমাপ্ত।
পৃথী। পিতৃব্যের সঙ্গে যুদ্ধ এইখানেই শেষ।
তারা। পিতৃব্যপত্নী কোথায় পিতৃব্য
সূৰ্য্য। কালীর মন্দিরে গিয়েছিল। (সারঙ্গকে,) এখনাে ফিরে
নাই কি?
সারঙ্গ। জানি না। [ স্বগত । মাঝে মাঝে তাকে উন্মাদিনী
বােধ হয়। আমার প্রতি তার আচরণ অদ্ভুত। অনেক
সময় উদ্ধান্তভাবে আমাকে পুত্র সম্বােধন করেন।
পৃথী। এখানে কালীর মন্দির আছে না কি ?
সারঙ্গ। আছে।
পৃথ্বী। উত্তম! কাল তুমি আমি সেখানে গিয়ে, মাতাকে উৎসর্গ
দিয়া এ যুদ্ধ শেষ কৰ্ব। বলির আয়ােজন আমি করিব।
সূৰ্য্য। তাই হােক।
[১

চতুর্থ অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃৎ।
পৃথী। তবে আজ এখানে থাকব।
সুৰ্য্য। নিশ্চয়।
পৃথী। আমরা আবার আগে তােমরা কি কচ্ছিলে খুড়াে?
সূৰ্য্য। এই আবােল তাবােল বকছিলাম।
পৃথী। তােমার মাথার উপর আমি হেন তােমার শত্রু যখন খাড়া
রইছি তখন তুমি এত উদাসীন ভাবে আবােল তাবােল
বছিলে ?
সুৰ্য্য। কি কৰ্ব্ব পৃথী? তদ্ভিন্ন আর উপায় কি ?
পৃথী। চল ভিতরে যাই।
[ নিজাত ]
সপ্তম দৃশ্য।
স্থান-কালীর মন্দির। কালমেঘাচ্ছন্ন প্রভাত।
পৃথী একাকী।
পৃথী। কালী। জগদম্বা ! আজি করিব তােমার
পূজা নরবলি দিয়া। আমার, অথবা
সারঙ্গদেবের মুণ্ড লােটাবে চরণে
তােমার, জননি,আজি! দিব মহাপূজা।
—আসিছে সারঙ্গদেব।
[ সারঙ্গ দেবের প্রবেশ ]
পৃথী। পিতৃব্য কোথায় ?

চতুর্থ অঙ্ক। তারাবাই। [ সপ্তম । সারঙ্গ। শােণিতক্ষরণে অতিদুৰ্বল, প্রভাতে শয্যাগত তিনি। একা আসিয়াছি আমি। পৃথী। সে ভালােই হইয়াছে। সারঙ্গ। কই? বলি কই ? পৃথী! পৃথী। আছে বলি। সার। কই, কিছুই দেখিনা। পৃথী। হাঁ আছে। সারঙ্গদেব! বলি মাতৃপদে তুমি কি আমি। সার। সেকি ? তুমি জ্বলিয়াছ এ বিদ্রোহ। করিয়াছি প্রতিজ্ঞা, কালীর সম্মুখে করিব এই সমরের শেষ আজি নরবলি দিয়া তােমারে, বিদ্রোহী। তুমি জালিয়াছ এই বিদ্রোহ। তােমার শােণিতে করিব এই বিদ্রোহ নিৰ্ব্বাণ । আজি মার দিব নরবলি। বুঝিয়াছ? সেই বলি—তুমি কিম্বা আমি। নিষ্কাসিত কর খা । উত্তম তাহাই হােক। অসি কর মুক্ত। •[ অসি নিষ্কাসন ] পৃথ্বীরাজ! রাখিও স্মরণে, আমি তব মেহাতুর কোমলস্বভাব [১৩৭ সার

চতুর্থ অঙ্ক।
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
অথৰ্ব্ব পিতৃব্য নহি।দয়া করিব না।
কঠিন কৃপাণ এই শােণিতলােলুপ ।
পৃম্বী। রক্ষা কর আপনারে বিশ্বাসঘাতক
[ যুদ্ধ ও সারঙ্গের পতন ও দূরে গিয়া তাঁহার মুণ্ড নিক্ষিপ্ত হইল ]
পৃথ্বী। হােতূ এই রক্তে এই সমর নির্বাণ।
লভিব পিতৃবাক্ষমা পিতার চরণে
করযােড়ে জানু পাতি’, দিয়া উপহার
মূল বিদ্রোহীর ছিন্ন মুণ্ড পিতৃপদে।
[ তমসার প্রবেশ ]
তমসা। একি! একি! কে করিল ইহা। পৃথ্বী তুই ?
কি করিলি পৃথী?
পৃর্থী।
পূজা দিলাম কালীর।
তমসা। দিয়াছ কালীর পূজা !–দাওনি কালীর
পূজা, পৃথ্বী। করিয়াছ মাের সর্বনাশ।
নিষ্ঠুর!-জানিস পৃথী কে সারঙ্গদেব ?
পৃথী। চিতােরের রাজবংশে জন্ম তার জানি
পূৰ্ব্ব চিতােরাধিপতি ‘লক্ষের’ সন্ততি।
তমসা। হায় পৃথ্বী।কহি তবে কলঙ্কের কথা
আমার।সারঙ্গদেব সন্তান আমার।
পৃথী। তােমার সন্তান?
সত্য, আমার সন্তান।
কিন্তু—কিন্তু নহে তার পিতা সূৰ্যমল।
১৩৮ )
.

তারাবাই।
{ সপ্তম ।
চতুর্থ অঙ্ক।]
পৃথী।
তমসা।
কি কহিছ উন্মাদিনী ?
নহি উন্মাদিনী।
–কর রাষ্ট্র, পৃথী, এই কলঙ্ক কাহিনী
নগরে নগরে। আর করিনাক ভয়।
গিয়াছে সর্বৈব। ভয় করিব কি হেতু ?
যার কিছু রাখিবার আছে বিশ্বতলে,
সেই ভয় করে। অদ্য আমার নিকটে
এই বিশ্ব মরুভূমি। এই চিত্ত হতে
সুখ দুঃখ আশা প্রীতি গিয়াছে ধুইয়া,
এ মহাপ্লাবনে। আর কারে নাহি ডরি--
এস এস প্রলয়ের মহাদীপ্তি—তবে-
জল, জ্বল, দগ্ধ কর ভস্ম করে দাও।
[ উন্মাদবৎ নিষ্ক্রান্ত ]
[ হস্তে মুখাবরণ করিয়া ]
নারী! ইহা কি সম্ভব?—জায় তুমি অবিশ্বাসী?
নারী! নারী! কি করিলে, কি করিলে তুমি!
তুমি যদি সতীধৰ্ম্মে দাও জলাঞ্জলি,
সংসারের সকল বন্ধন ছিন্ন হবে,
ধৰ্ম্মলুপ্ত হবে ;-তুমি যদি অবিশ্বাসী,
কে কাহারে করিবে বিশ্বাস বিশ্বতলে ?
আহারে রহিবে বিষ ; উপাধান তলে
লুকায়িত ছুরী; গৃহী হইবে সন্ন্যাসী।
১৩৯।
পৃথী।

[ সপ্তম দৃশ্য
চতুর্থ অঙ্ক।]
তারাবাই।
বাহিরের কর্মক্লান্তি হইতে মনুষ্য
আসে স্বীয়গৃহে, ধৌত করিতে প্রত্যহ
প্রেয়সীর স্নিগ্ধ প্রেমে সৰ্ব্ব অবমান,
সৰ্ব্ব দুঃখ, সৰ্ব্ব পাপ। দেখে যদি আসি’
শুষ্ক সে নিঝর-নর কোথায় যাইবে ?
উদ্ভান্ত পুরুষ ঘূরে কৰ্ম্ম আবর্তনে ।
দ্বিগ্বিদিগ ; তুমি তারে রাখিয়াছ বাঁধি,
মাধ্য আকর্ষণে জায়া। ছিন্ন হয় যদি
সেই আকর্ষণ—নর কোথায়, যাইবে ।
—পবিত্র সম্বন্ধ সব মুছিয়া যাইবে
সংসার হইতে ;—পিতা হবে পুত্রহীন ;
পুত্র পিতৃহীন ; ভ্রাতা ভ্রাতৃহীন; বন্ধু
বন্ধুহীন ;-ঈর্ষায় সন্দেহে দ্বন্দ্বে, সদা
হইবে গৃহীর গৃহ ভগ্ন ধ্বংসস্তুপ,
মহা মরুভূমি, মহাশূন্য, একাকার।
;
•
১১]

পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
স্থান-রাণীর কক্ষ। কাল—প্রভাত।
রায়মল একাকী।
রায়মল। ফিরিয়াছে পুত্র আজি, বিজয়ী সমরে,
সঙ্গে ল’য়ে পুত্রবধু। শুভদিন আজি।
কিন্তু এ সমরে হারায়েছি রত্ন এক
-অতুল অমূল্য রত্ন—ভাই সূৰ্যমলে।
পারিব না ভুলিতে সে আক্ষোভ জীবনে।
[ পৃথী ও তৎপশ্চাতে তার প্রবেশ ও রায়মলকে প্রণাম
রায়মল। আয়ুষ্মন্ হও বৎস!—এ ঘাের সমরে
জয়ী আজি রায়মল তােমার বিক্রমে।
-আয়ুষ্মতী হও, তারা। এস মা কল্যাণী ।
তুমি আনিয়াছ শান্তি মেবারের গৃহে ;
করিয়াছ দূর অভিমানব্যবধান
পিতা ও পুত্রের মধ্যে। বড় দয়াবতী

পঞ্চম অঞ্চ।] তারাবাই। [ প্রথম দৃশ্য। ; - ; তুমি, বৎসে ; তাই আসিয়াছ অনাহুত, অযাচিত ভাবে এই রাজপরিবারে। তারা। পিতা! আপনার স্বত্বে আসিয়াছি আমি আপন আলয়ে। রায়মল। আস নাই, স্নেহময়ী, আশ্রয় লাভের তরে ; আসিয়াছ তুমি হাস্য মুখে—স্নেহময়ী জননীর মত অপরাধী পুত্রে টানিয়া লইতে ক্রোড়ে। পৃথী, আমি বৃদ্ধ হইয়াছি। অভিলাষ, গ্রহণ করিব অবসর, সমর্পিয়া রাজ্যভার তব করে ; করিব যাপন জীবনের শেষ অঙ্ক নিভৃতে নির্জনে। তারা। কোথায় যাইবে তাত! যাইতে দিবনা। আমরা করিব সেবা ; বহিব তােমার বার্ধক্য, যেমতি জীর্ণ বটভারে বহে তার শাখামুল। রায়মল। বৎসে শাস্ত্রের বিধান ক্ষত্রের অন্তিমে যােগ্যকাৰ্য্য যােগ। আমি করিয়াছি অবহেলা সে শাস্ত্রীয় বিধি এতদিন;-তাই বুঝি এই পরিবারে এত দ্বন্দ্ব, কোলাহল, অশান্তি, বিগ্রহ। এইক্ষণে যাই সভাগৃহে।

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ প্রথম দৃশ্য।
পৃধী।
আমি রাণা
মেবারের ! নাহি তবে হইল সফল
চারণীর বাণী।—সঙ্গ হবে চিতােরের
রাণা। হা উদার সঙ্গ! কোথা তুমি আজি !
স্বেচ্ছায় রাজত্ব ছাড়ি’ তুমি বনবাসী।
অবিচার করিয়াছি, হইয়াছি রূঢ়
অত্যাচারী আমি, বাহুশক্তিমদভরে।
করিও মার্জনা।
তারা।
কি ভাবিছ প্রিয়তম ?
পৃথী। ভাবিতেছি ? প্রিয়তমে করি নাই হেন
প্রতিজ্ঞা যখন, যাহা ভাবিব, তাহাই
করিতে হইবে নিত্য তোমার গােচর।
[ প্রতিহারীর প্রবেশ ]
প্রতি। যুবরাজ ! আসিয়াছে যুবরাজ কাছে
সিরােহী হইতে দূত এ পত্র লইয়া।
পৃথী। কি ? পত্র ? কাহার পত্র ? দেখি! যমুনার !
[ পত্র গ্রহণ ও পাঠ। প্রতিহারীর প্রস্থান ]
যাহা ভাবিয়াছি-
তারা।
পত্র কার প্রিয়তম ?
পৃথী। সে সম্বাদে তােমার কি প্রয়ােজন—প্রিয়ে।
[বেগে প্রস্থান ।
তারা।
হয়েছে নাথের পরিবর্তন এরূপ,
[১৪

পঞ্চম অফ।
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য।
যুদ্ধ অবসানাবধি।কথায় কথায়
উঠেন জ্বলিয়া ক্ষুদ্র-বাড়বাগ্নিসম।
কখন চাহেন হেন তীব্র, মুখপানে,
ভয় পাই ; অবনত করি চক্ষু দুটি।
এরূপ হইল কেন? মা ভবানী কেন
এরূপ হইল। কিছু বুঝিতে না পারি।
[ প্রস্থান ]
দ্বিতীয় দৃশ্য
স্থান-গম্ভীরা নদীর তীর। কাল-সন্ধ্যা।
তমসা একাকিনী উদাসিনী বেশে।
তমসা। গেছে গেছে—সব গেছে। যা ছিল না তা হােল না।
যা ছিল তা গেল। নারীর ধর্ম গেল, পতির প্রেম গেল।
শেষে যার জন্য এত ষড়যন্ত্র, এত চেষ্টা, সেও গেল।
বুঝেছি এত দিনে, যে অধৰ্ম্মপথে সুখ হয় না। অধর্শের
শাস্তি একদিনে আসেই আসে। সে ইহজন্মেই হােক
আর পরজন্মেই হােক। গেছে, গেছে, সব গেছে। তবে
আমি আর পড়ে থাকি কেন। আজ এই গম্ভীরার
জলে ঝাঁপ দিব। তার পরে ?-পরকালে নরকে পুড়বো ?
হােক! তাতে আমার ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। আমার জীবতেই
নরক যন্ত্রণা আরম্ভ হয়েছে। সারঙ্গ! সারদ!-কেন
১৪৪]

পঞ্চম অঙ্ক।] তারাবাই । [ দ্বিতীয় দৃশ্য। তােরে সেদিন দেখেছিলাম ?—মায়া কাটিয়ে লােক- লজ্জার ভয়ে তােকে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিইছিলাম ; কে আমার সর্বনাশ কৰ্ত্তে তােকে বাঁচালাে ? কেন তুই সেদিন আমার সামনে এসেছিলি ?—আহা! সেই সজল কাতরচক্ষে আমার কাছে অন্নবস্ত্র চাচ্ছিলি অথচ জানতি যে আমিই তাের মা ? সে কথা তাের জীবনেও কখন জান্তে পাল্লিনে। ভেবেছিলাম চিতােরের সিংহাসনে তােকে বসিয়ে সে কথা বলবে। সে সুযােগ আর হােল না। সারঙ্গ। সারঙ্গ! আমার সারঙ্গ! আমার প্রাণাধিক পুত্র !-ওঃ- [ গাইতে গাইতে এক ফকিরের প্রবেশ ও প্রস্থান } গীত। আমার আমার বলে ডাকি, আমার এ ও আমার তা তোমার নিয়ে তুমি থাক, নিওনাক আমার মা। আমার বাড়ী আমার ভিটে, আমার যা তা বড়ই মিঠে ; আমার নিয়ে কাড়াকাড়ি, আমার নিয়ে ভাবনা। আমার ছেলে, আমার মেয়ে, আমার বাবা, আমার মা আমার পতি, আমার পত্নী :—সঙ্গে ত কেউ যাবে না। আমার যত্নের দেহ, ভবে, তাও রেখে যেতে হবে ; আমার বলে কারে ডাকি, —ৈচোখ বুজলে কেউ কারাে না। তমসা। তাওত বটে। আমি কার? কে আমার—এসংসারে কে কার ? যাকে আমার বলে ডাকি; বড় আগ্রহে বড় আবেগে যাকে বুকে চেপে ধরি, বুকে চেপে তবু তৃপ্তি হয় [ ১৪৫

পঞ্চম অঙ্ক
তারাবাই।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য।
; যাকে প্রাণের সঙ্গে মিশিয়ে রাখতে চাই ; সে ঐ যে
যাদুকর মৃত্যু তার দণ্ডটি ছুইয়েছে, অমনি সে আমার
একেবারে কেউ নয়—একেবারে পর!একেবারে পর!
কেউ নয়। সে মায়া কাটিয়ে যায়, ভালবাসা ভুলে যায়,
নির্দয় ভাবে কোথায় চলে যায়,—আর দেখতে পাই না।
আর দেখতে পাই না! স্বর্গ মর্ত্য পাতাল খুঁজে আর
তাকে একবার চোখের দেখাও দেখতে পাই না। কি
মানব জন্মই তৈর করেছিলে দয়াময় ? | দীর্ঘনিঃশ্বাস ! ·
[ দুজন সৈনিকের প্রবেশ।]
১ সৈনিক। ধরা পড়েছে।
২ সৈনিক। ধরা পড়েনি। সূৰ্য্যমল আপনি ধরা দিয়েছে।
১ সৈনিক। ধরা দিলে কেন?
২ সৈনিক। কে জানে, যখন ধরা দিলে জানে নিশ্চয় মৃত্যু, তখন ধরা
দিলে কেন, এটা একটা সমস্যা বটে।
১ সৈনিক। না, সূৰ্যমল হাজার হােক রাণার ত ভাই, রাণা তাকে
ছেড়ে দেবে।
২ সৈনিক। উহুঃ । রাণা সে রকম লােকই নয়। বিচারে তার
কাছে ভ্রাতৃত্ব জ্ঞাতিত্ব জ্ঞান নাই।
১ সৈনিক। তার বিচার হবে কবে ?
২ সৈনিক। কাল।
[ উভয়ের প্রস্থান ]
তমসা। ধরা দিয়েছেন। শেষে ধরা দিয়েছেন তার আর
১৪৬ ]

পঞ্চম অঙ্ক ]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
আশ্চৰ্য্য কি ? এরা জানে না তিনি কেন ধরা দিয়াছেন।
আমি জানি। তিনি ধরা দিয়েছেন, মনের ক্ষোভে,
যন্ত্রণায়, লজ্জায়। তাই তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলি-
জন কর্তে যাচ্ছেন।—আচ্ছা, মৰ্বার আগে একটা
ভাল কাজ করে দেখি না কেন, কি হয়। [ প্রস্থান ]
তৃতীয় দৃশ্য।
স্থান-রাণার সভা। কাল-প্রভাত।
রায়মল সিংহাসনারূঢ়। সভাসদ ও অনুচরবর্গ। পার্শ্বে পৃথী।
সম্মুখে শৃঙ্খলিত সূৰ্য্যমল।
রায়মল। সূৰ্য্যমল ! তুমি আর ভ্রাতা নহ আজি,
শত্রু তুমি! বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি,
সামান্য বিদ্রোহী প্রজামাত্র। বিদ্রোহীর
শাস্তি দিব আজি বন্দী।
সূৰ্য্যমল।
তাহাই হউক।
মহারাজ ! আমি সেই শাস্তি চাহি।
রায়মল।
বলিবার কাছে ?
সূৰ্যম।
কিছু বলিবার নাই।
কিছু
[ ১৪৭

পঞ্চম অঙ্ক ]
তারাবাই।
(তৃতীয়
।
রায়মল। সূৰ্য্যমল ! প্রাণদণ্ড শান্তি বিদ্রোহীর,
আছ অবগত তুমি !
সূৰ্য্যমল।
আছি অবগত।
রায়মল। সেই প্রাণদণ্ড শান্তি দিলাম তােমার।
পৃথ্বী। পিতা! পিতৃব্যের হেতু, নৃপতির ক্ষমা
চাহি করপুটে। কর পিতৃব্যে মার্জনা !
রায়মল। পৃথী! স্নেহশীল আমি ! কিন্তু বসায়েছি
কৰ্ত্তব্যে স্নেহের উচ্চে। বসি’ সিংহাসনে
অবিচার করিব না, বিচার করিব।
পৃথ্বী! এই রাজদণ্ড ক্ষমা নাহি জানে;
সম্বন্ধ না মানে। কেহ যেন নাহি কহে
“পড়ে তাহা বজ্রসম অপরাধী শিরে,
শুদ্ধ বর্ষে আশীৰ্ব্বাদ জ্ঞাতির মস্তকে।”
-যাও তবে সূৰ্যমল। এ শুভ প্রভাতে
তব রক্তে বিরঞ্জিত হবে বধ্যভূমি।
সূর্যমল। রাণার অসীম কৃপা ! আমারে লইয়া
চল বধ্যস্থলে। আমি প্রস্তুত প্রহরী।
[ প্রহরীসহ প্রস্থানােত ]
রায়মল। ( সিংহাসন হইতে অবতরণ করিয়া )
কোথা যাও সূৰ্য্যমল । ভ্রাতার নিকটে
বিদায় না মাগি'।—ভাই, প্রিয়তম ভাই।
—উঠাও আনত মুখ ; চেয়ে দেখ আমি
১৪৮]

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য
নহি নরপতি আর।আমি এইক্ষণে
ভ্রাতা তব! কর আলিঙ্গন একবার
শেষবার, সূর্যমল।--করিয়াছি আমি
এই ক্রোড়ে লালন তােমারে প্রিয়তম,
ভাইটি আমার!—কত আগ্রহে আদরে !
এই হস্তে আজি দিতে হইল তােমারে
প্রাণদণ্ড প্রাণাধিক—বিধির বিপাকে।
সূৰ্য্যমল। বিধিবিড়ম্বনা ভাই ! কি করিবে তুমি ?
রায়মল। সূৰ্যমল ! সূৰ্য্যমল ! কেন রহিলে না
সেই সূৰ্য্যমল তুমি—সরল, উদার,
স্নেহশীল ? কেন মুখ ফুটে বল নাই
তুমি রাজ্য চাহাে ভাই ? আমি অনায়াসে
ছাড়িয়া দিতাম তাহা ।
সূর্যমল।
মার্জনা করিও
আমার মৃত্যুর পরে মার্জনা করিও।
ভুলে যেও অপরাধ অবােধ ভ্রাতার।
আমি মূঢ়। বুঝি নাই।
রায়মল।
না এত তুমি
নহ সূৰ্যমল কহ কে মন্ত্রণা দিল?
তােমারে শিখণ্ডীরূপে রাখি পুরােভাগে,
কে হানিল এ হৃদয়ে এ বিষাক্ত শর?
'?
4
কে সে ? কহ
[ ১৪৯

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ তৃতীয় দৃশ্য।
সূৰ্য্যমল।
রামল।
কহিবনা ; বলিওনা ভাই
কহিতে সে কথা আজি ।
কি করিলে ভাই ?
-কি কহিব ? তব এই কাৰ্য্যে, সূৰ্য্যমল,
জ্বালায়ে দিয়াছ বক্ষে সর্বৈব বিশ্বাস।
চেয়ে দেখি ঘন নীলাম্বরে ;-শঙ্কা হয়
তাহা আবরণ করে ক্রর বজ্রশেল ;
দেখি স্বচ্ছ নিঝর, সন্দেহ হয় বুঝি
তাহাতে মিশ্রিত বিষ ; শুনি গীতধ্বনি,
ভাবি আছে তাহে কোন নিহিত বিদ্রুপ।
—সূৰ্য্যমল !—কি করিলে এ বৃদ্ধবয়সে
আমার ?
ভুলিয়া যাও এ দুঃস্বপ্ন বলি।
ভাবিও এ ধূমকেতু নিশীথ আকাশে
আসিয়া চলিয়া যায়; কিন্তু চিরদিন
রহে স্থির অটল নক্ষত্র রাজি তাহে।
ভাবিও এ ভূমিকম্প বিপ্লব ক্ষণিক
আসে যায়, রহে কিন্তু শ্যামল পৃথিবী,
ধীর, শান্ত, পূৰ্ব্ববৎ ক্ষমা কর ভাই,
এক্ষণে বিদায় দাও।
যাও সূর্যমল !
আমি করিয়াছি ক্ষমা। পাও যেন তুমি
সূৰ্যমল।
আমল।
১৫]

; পঞ্চম অঙ্ক।] তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য। বিধাতার মার্জনা মৃত্যুর পরে ভাই। [ জনতা হইতে তমসার নিষ্ক্রমণ ) তমসা। কোথা যাও । যাইওনা। দাড়াও দেবতা [ সূৰ্য্যমল স্তম্ভিতভাবে দণ্ডায়মান ] দাড়াও মুহূর্তকাল ; [ রায়মলের পদতলে পড়িয়া ] শুন মহারাজ। কিছু বলিবার আছে- সূৰ্য্য। নারী উন্মাদিনী শুনিওনা এর কথা- তমসা। শুনিতে হইবে। সূৰ্য্যমল। তার পূর্বে বধ কর আমারে। তমসা। শুনিবে তুমিও সে কথা।তবে শুন মহারাজ ! দোষী নহে স্বামী। দোষী আমি। জালায়েছি আমি এ বিদ্ৰোহৰছি। দিয়াছি মন্ত্রণা আমি। আমি ডাকিয়াছি মালবে চিতােরে আমার এ ষড়যন্ত্র-আমার। রায়মল। তােমার? তমসা। আমার। তবে এ কাৰ্য কেন করিলাম? জিজ্ঞাসা করিবে ? শুন, কেন করিলাম। সূৰ্যমল। শুনিওনা মহারাজা-রাখ এ মিনতি। শুনিতে হইবে। আমি কলঙ্ক কাহিনী [১৫১ ০ পঞ্চম অঙ্ক।]. তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য রামল। তমসা। রটাইব আপনার, উদগারিব বিষ ; করিব স্বীকার পাপ-শুন মহারাজ। জানিতে সারঙ্গদেবে ?—সে পুত্র আমার ! তথাপি তাহার পিতা নহে সূৰ্যমল । সত্য ! উন্মাদিনী নারী। উন্মাদিনী আমি, কিন্তু যাহা কহিতেছি, নহে সে প্রলাপ। —তাহাকে করিতে এই মেবারের রাণা করিয়াছিলাম আমি এ গূঢ় মন্ত্রণা। -ব্যর্থ হইয়াছে তাহা। না আসিত যদি পৃথী এ সমরে, তাহা সফল হইত। কে দিল পৃথীকে জানো বিদ্রোহ সংবাদ, অনুরােধ করি’ যােগ দিতে এ সংগ্রামে, আসিয়া রাণীর পক্ষে ?—এই সূৰ্য্যমল। সূর্যমল ॥ আপনি বিদ্রেহী !! সত্যকথা সূৰ্যমল ? সত্যকথা। পতিত যদ্যপি এই ষড়যন্ত্রজালে স্বামী, তবু তিনি বুঝিলেন যেইক্ষণে স্বকীয় প্রমাদ- লিখিলেন এক পত্র ভ্রাতুষ্পত্রে, আসি” দিতে এ সমরে যােগ চিতােরের সনে। ইহা সত্য কথা পিতা। জানিনা কি হেতু রায়মল। পৃথী। ১৫২] পঞ্চম অঙ্ক।] তারাবাই। [ তৃতীয় দৃশ্য। । করিনাই এই সত্য পিতার গােচর এতদিন। ০ তমসা। করিলাম সত্য অনাবৃত। এই মূল বিদ্রোহীর প্রাণদণ্ড দাও। রায়মল। অবধ্য রমণী। সূৰ্যমল। তমসা। কেন কহিলে তমসা, আমার মৃত্যুর পূর্বে কলঙ্ক কাহিনী? কেন কহিলাম! পূৰ্বে কদাপি জীবনে করিনাই পুণ্য কৰ্ম্ম,—আজ করিলাম। ভাবিওনা স্বামী, চাহি মাৰ্জনা তােমার। সেই অধিকার রাখি নাই। আজীবন, করিয়াছি ছল, ভাণ করিয়াছি প্রেম, শুদ্ধ স্বার্থসিদ্ধি হেতু।-চাহিনা মার্জনা ; তবে পুণ্য কভু করি নাই; নাহি জানি কি সুখ তাহার, তাই দেখিলাম আজ। দেখিলাম তাহে সুখ আছে, বড় সুখ ; পাপ কৰ্ম্ম লব্ধ মুখ চেয়েও অধিক সে সুখ আরম্ভ করিলাম জীবনের নূতন অধ্যায় আজি। নারীর জীবন যাহা এত তুচ্ছ, ঘৃণ্য-রাজদণ্ড, সেও, তাহারে করিতে স্পর্শ ঘৃণা বােধ করে ;- [ ১৫৩

পঞ্চম অঙ্ক।
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
সে জীবন, যথাসাধ্য, উৎসর্গ করিব
আজি হতে পুণ্য কৰ্ম্মে, পরহিত ব্রতে। [ প্রস্থান ]
প্রহরী এক্ষণে মুক্ত কর সূৰ্যমলে। [ নিষ্ক্রান্ত ]
রায়মল।
চতুর্থ দৃশ্য।
স্থান—রাণার অন্তঃপুর কক্ষ। কাল—প্রভাত।
শূরতন ও তাহার রাণী।
পূরন।
রাণী।
পুরতান।
তােমাকে বরাবর বলে এসেছি রাণী, যে চুপ করে
বসে থাক; ঘটনাগুলি আপনিই ঠিক খাপে খাপে
বসে’ আসবে। দেখ, তাই হােল কি না। ঘটনাপরম্পরা
এমন মােলায়েম ভাবে ঘটে’ আসছে, যে এর পরে যে
কি হবে বােঝা যাচ্ছে না।
আবার কি হবে ?
এক চিতােরের রাণাও হতে পারি, চাই কি তুর্কীর
বাদশাহও হতে পারি। এই দেখ তােড়া উদ্ধার হল
আমি এখন যে রাজা সেই রাজা। তার উপরে মেয়ের
এমন এক পাত্র জুটলাে যে আমি এক নিঃশ্বাসে
একেবারে রাজা রামলের বেহাই হয়ে পড়লাম।
তার উপরে আবার শুনছে যে রাণা ঘােষণা
করেছেন যে তিনি মাসাধিক পরে পৃথীকে যৌবরাজ্যে
f
১৫৪]

পঞ্চম অঙ্ক।] । রাণী । শূরতান। তারাবাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। অভিষিক্ত কৰ্বেন। তা’লেই দাড়াল এই, যে পৃথী হােল মহারাণা, তারা হােল মহারাণী—আমি আর একদৌড়ে একেবারে মহারাণার শ্বশুর। এই গৌরব নিয়ে অহঙ্কার কৰ্ত্তে লজ্জা করে না ? এ পরদত্ত সাম্রাজ্য ভােগ করার চেয়ে বনবাসী থাকা ভালাে। এই স্ত্রীলােক জাতটাকে কোন রকমেই সন্তুষ্ট করা যায় । যখন বনবাসী ছিলাম তাতেও ঘ্যানর ঘ্যানর। আর আজ রাণার বেহাই স্বরূপ নিমন্ত্রিত হয়ে, চিতােরে এসে যে রাজভােগ খাচ্ছি ; তাতেও সেই ঘ্যানর ঘ্যানর। ফলকথা দাঁড়াচ্ছে এই যে-ঘ্যানর ঘ্যানর করাই স্ত্রী- জাতির স্বভাব,—“যথা প্রকৃত্যা মধুরং গৰাং পয়ঃ।” আচ্ছা, এ পরদত্ত রাজ্য না হয় চুলােয় যাক—এই রাজ- ভােগ চুলােয় যাক্। কিন্তু তারার এর চেয়ে কি সৎপাত্র মিলতো ? সে সৎপাত্র বিধাতা জুটিয়ে দিয়েছেন। যােগ্য ব্যক্তিকেই বিধাতা ঐরকমই জুটিয়ে দেন। তুমি ত সে বিষয়ে একেবারে উদাসীন ছিলে। আর তুমি তৎপর হয়ে ত সবই করেছিলে। ব্যস্তবাগীশ হয়ে ত এক রায়মলবিভ্রাট ঘটিইছিলে। কেন সে কি মন্দ হত ? মন্দ। তারা তার চেয়ে, ওই যে দেখছ একটা ষাঁড়, ঐ [১৫৫ রাণী। শুরতান। রাণী। শূরন। রাণী। খুরতান।

পঞ্চম অঙ্ক।] তারাবাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। রাণী । রাণী। ষাঁড়টাকে বিয়ে করা সম্ভব ছিল। বিয়ে কল্লে আর কি! বিয়ে কৰ্ত্ত কিনা দেখতে, যদি ঐ মােহিত সিংহ অন্তরায় না হােত। শূরােন। এঃ স্ত্রীজাতিটা নিরেট। যদি তার মাথার উপর গৌতম মুনির তর্কশাস্ত্র ছুড়ে ফেলে মারা যায় তা’লে সে ন্যায়- শাস্ত্রটাই চূর্ণ হয়, তার মাথার কিছু হয় না।—মােহিত সিং কি কল্লে! সে ত জয়মল আসার আগেই চলে গিইছিল। চলে গিহছিল বটে। কিন্তু আমি পরে জেনেছি যে সে তারার হৃদয়ে তার মূর্তি মুদ্রিত করে রেখে চলে গিইছিল । শূরন। বটে। তােমার হৃদয়ে মুদ্রিত করে চলে যাইনি ত ? [ গম্ভীর ভাবে রাণী তা হােত না। কি হােত না ? শূরতান। মােহিতকেও বিয়ে কৰ্ত্ত না, জয়মলকেও বিয়ে কৰ্ত্ত না। তার নজর আমি চিরকাল দেখেছি রয়েছে ঐ চিতাের সিংহাসনের দিকে।-আর সে জানে যে পৃথ্বী একদিন না একদিন সে সিংহাসনে বসবেই। একি ছেলের হাতের মােয়। তারা আমার মেয়ে ত বটে। আমি বরাবর ওঁত পেতে আছি, তাই এতদিন চুপ করে ছিলাম। ১৫৬ ] রাণী।

A রাণী। পঞ্চম অঙ্ক।] তারবাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। রাণী । তুমি আবার কি কল্লে। ঘটনা পরম্পরায় এরকম ঘটে গেল। শূরতান। রাণী ! যারা চুনােপুটি ধরে তারা জল ঘুলিয়ে পাঁকের দুর্গন্ধ উঠিয়ে পুকুরময় জাল ফেলে বেড়ায়। কিন্তু যারা রুই কাৎলা ধরে, তার জালটি পেতে চুপ করে বসে থাকে ।-এখন চল রাজভােগের যথাযােগ্য ব্যবহার করা যাক গে,সূক্ষ্ম বুদ্ধির পরিচালনা করে স্কুল শরীরটা একটু কাতর হয়ে পড়েছে। [ সহাস্যে ] বিধাতা, তােমাকে ভােজনপ্রিয় ব্রাহ্মণ করে’ ক্ষত্রিয় কল্লেন কেন ? শূরতান। বিধাতার ও রকম ভুল আরও দুই একটা তােমাকে দেখিয়ে দেব। একটা মাত্র এখন দেখিয়ে দিচ্চি—এই তিনি যদি তােমাকে নারী না করে পুরুরাজের হাভিল- দাররূপে সৃষ্টি কৰ্ত্তেন,তা’লে সম্ভবত সেকেন্দার সার সঙ্গে যুদ্ধে পুরুরাজ হাতেন না।-চল। [ উভয়ের প্রস্থান ] ( বিপরীত দিক্ হইতে পৃথীর প্রবেশ ] পৃথী। আমি শুন্তে চাইনি। হঠাৎ কাণে এল। বুঝিছি সব- বুঝিছি। জলের মত সাফ হয়ে গিয়েছে। আমি এদের পার্থিব উন্নতির পথে সােপান মাত্র ?-ষড়যন্ত্র ! ষড়যন্ত্র ! । তাই বা বলি কেন? আমি নিজেই ত ধরা দিইছি। মােহিত সিং কে ?—এ মােহিত সিং তবে [ ১৫৫

পঞ্চম অঙ্ক।
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
তারার প্রণয়ী ছিল।—আরও কত প্রণয়ী ছিল কে
জানে!—তা নৈলে জয়মল তারার শয়নাগারে প্রবেশ
কৰ্ত্তে সাহস করে ?- নৈলে তারা একটা রাজ্যের
জন্য আপনাকে বিক্রয় করে ? পিতৃব্য পত্নীর মুখে সেই
ভীষণ স্বীকারকাহিনী শােনার পরে আর কিছুই অবিশ্বাস
হয় না। সবই সম্ভব! তারার ইতিহাস দেখছি অবিকল
সেই একই ইতিহাস—সব স্ত্রীরই কি তাই? এত আদর,
আগ্রহ, সেবা, শুদ্ধ স্বামীর অর্থের মানের ক্ষমতার জন্য ?
ঘৃণা জন্মে’ গিয়েছে। এই সমস্ত নারী জাতিটার উপরেই
ঘৃণা জন্মে’ গিয়েছে—এই যে তারা আসছে।
[ তারার প্রবেশ ও সঙ্কুচিতভাবে দ্বারদেশে অবস্থিতি ]
পৃথী।
কি চাও ?
তারা। [ নীরব ।
পৃথী। নীরব রৈলে যে ?
তারা। তুমি কি কোথাও যাচ্ছ ?
হাঁ যাচ্ছি—সিরােহী রাজ্যে
তারা। কেন ? সহসা ?
কেন !–[ স্বগত) আচ্ছা না হয় বল্লামই বা।–[প্রকাশ্যে
সেদিন যমুনা চিঠি লিখেছিল জানাে ?-যমুনা একবার
আমাকে দেখতে চেয়েছে।
তারা। [ অধােমুখে ] আমি সঙ্গে যাবে ?
পৃথী। ।
১৫৮]
পৃথ্বী।
পৃথ্বী।

পঞ্চম অঙ্ক।] তারাবাই। [ চতুর্থ দৃশ্য। তারা। পৃথ্বী। তারা। পৃথী। তারা। পৃথ্বী। তারা। পৃথী। তারা। কেন নাথ ? সব কথা শুনে কোন ফল নাই, তারা । [ ক্ষণেক নিস্তব্ধ থাকিয়া ] নাথ! একদিন ছিল, যে আমাকে সব কথা খুলে বলতে। সে দিন আর নাই, তারা । কেন স্বামী! কি দোষ করেছি ? [ স্বগত ] ঠিক এক রকম। পিতৃব্যপত্নীও ঠিক এই রকম বলতেন। আমি লক্ষ্য করেছি নাথ, যে এই মাসাধিক কাল আমার প্রতি তােমার সে প্রেম, সে নির্ভর, সে বিশ্বাস নাই। কিছুই চিরদিন থাকে না তারা। থাকে। স্বামী স্ত্রীর সম্বন্ধ চিরদিন থাকে। সংসারে এই এক সম্বন্ধ চিরস্থায়ী—পৰ্ব্বতের মত অটল, সমুদ্রের মত গভীর, নক্ষত্রের মত উজ্জ্বল। এ সম্বন্ধ ইহকালের, এ সম্বন্ধ পরকালের ! এ সম্বন্ধ ঘােচেনা প্রভু। উঃ কি ভয়ঙ্কর। আমি যদি কোন অপরাধ করে থাকি ক্ষমা কর। তুমি আমার প্রভু, আমি তােমার দাসী। তােমার কাছে আমার অপরাধ পদে পদে।ক্ষমা কর। [ স্বগত ] পিতৃব্যপত্নীও ঠিক এই রকম বলতেন। ভারি মিলছে। ( প্রকাশ্যে ] তারা। দীর্ঘনিঃশ্বাস ] [ পদতলে পড়িয়া ] বল, আমি কি দোষ করেছি। [ ১৫৯ পৃথী। তারা। , পৃথী। তারা।

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ চতুর্থ দৃশ্য।
পৃথী।
তারা।
পৃথী।
তারা।
পৃথী।
ওঠ তারা, বছি কি দোষ করেছো। [ সস্নেহে তারার
হাত দুইটি ধরিয়া ]—তারা। তুমি আমাকে বিবাহ
করেছিলে কেন ?
তুমি জানােত সব।
( হস্ত ছাড়িয়া কঠোর স্বরে ] জানি সব জানি। আর
তুমি ভাবচ আমি যা জানি না, তাও জানি।
কি জাননা ?
তােমার ভূত জীবনের ইতিহাস। সে কথা যাক !
তারা! তুমি চেইছিলে তােমার পিতার হৃত রাজ্য, তা
পেয়েছে। তােমার যে দাম চেইছিলে, তা পেয়েছে।
আর কি চাও? তােমার পিতা মাতা তােমার রূপের
ফাঁদ পেতেছিলেন, রাণার বেহাই হবার জন্য। সে ফাঁদে
পড়ে অবােধ বেচারী ভাই জয়মল মারা যায়; সে ফাঁদে
আমি ধরা পড়িছি।—তােমরা সবাই যা চেয়েছিলে তা
পেয়েছে। আরাে কি চাও? বল দিচ্ছি।—হা ঈশ্বর।
নারীরূপের কি ফাদই তৈর করেছিলে । [ প্রস্থান ]
নাথ! এ কথা না বলে বুকে ছুরি বিধিয়ে গেলেন
কেন ?-অহহ ভগব।–এতদুর!
[ নিষ্ক্রান্ত ]
তারা।
১৬০]

পঞ্চম দৃশ্য।
স্থান—প্রভুরাওর বিলাস কক্ষ।-কাল-রাত্রি।
প্রভুরাও ও পারিষদবর্গ।
সম্মুখে নর্তকীদিগের নৃত্য।
*
বাহবা বাহবা ! নাচো আবার নাচো! রূপের ফোয়ারা
তুলে দাও।
পারিষদবর্গ। [ সঙ্গে সঙ্গে ] ফোয়ারা তুলে দাও।
প্রভু। মর্ত্যে নামিয়ে নিয়ে এস স্বর্গরাজ্য। জীবনের সার
হচ্ছে সৌন্দৰ্য্য। আর সৌন্দর্যের সারই হচ্ছে নারী।
—এই ঢালাে।
পারিষদবর্গ। এই ঢালাে।
প্রভু। নারী শব্দে ১৫ থেকে ২০ বৎসরের বয়স পর্যন্ত চলনসৈ
অসম্পৰ্কীয়া সব নারী বােঝায়।কিন্তু স্ত্রীবাদ।
পারিষদবর্গ। হাঁ হাঁ অমরকোষে এই রকম লেখে বটে।
লেখে বটে ?-হিঃ হিঃ হিঃ ।
পারিষদবর্গ। হিঃ হিঃ হিঃ !
স্ত্রী জিনিষটা কি রকম জাননা?—এই বেজায় একঘেয়ে ।
পারিষদবর্গ। বেজায়, মহারাজ।
কিন্তু নারী জিনিষটা কিরকম জানাে ? এই পঞ্জিকা
রকম আর কি ;-অন্তত বছর বছর একখানা করে’
নুতন চাই। হিঃ হিঃ হিঃ ।
[ ১৩১

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
পঞ্চম দৃশ্য।
পারিষদবর্গ। হিঃ হিঃ হিঃ ।
১ পারিষদ। মহারাজের মুখে আজকে রসিকতার খৈ ফুটছে দেখছি।
২ পারিষদ। আর মদ নৈলে যা প্রকৃত রসিকতা কি হয় দাদা।
বটে—তবে আরাে ঢাললা—এই রূপসিরা-
পারিষদবর্গ ও নৰ্তকীদিগের গীত।
••
ঢালাে, আরাে ঢালল, আরো ঢালল, আরাে ঢালাে।
রূপের সঙ্গে তীব্র মদির লাগে ভালাে, ভারি লাগে ভালো।
স্বর্ণ পাত্রে ঝর তুমি সুর,
সরসরক্ত অধর মধুরা,
চুম্বন দাও, শিরায় শিরায় লালসা বহ্নি আলাে আলাে।
আমরা ঢালিব রূপের আহুতি, জ্বলিবে দ্বিগুণ কামানল ;
কামের সাগরে উঠেছি আমরা উৰ্ব্বী, তুমি হলাহল ;
আমরা ঝড়ের মত বয়ে যাই।
বন্যার মত এস তুমি ভাই ;
সর্বনাশটি না করিয়া অাজ যাবনা লাে সখি যাবনা লাে।
প্রভু।
চ।
[ চরাওর প্রবেশ ]
চন্দ্ররাও যে? খবর কি ?
ভারি সুখবর, মহারাজ, ভারি সুখবর।
কি রকম?—কি রকম?
পৃথ্বী—
আবার “পৃথ্বী”। জ্বালাতন কল্লে যে।-“পৃথী” ছাড়া
কি আর কথা নেই ?
চন্দ্র।
প্রভু।

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ পঞ্চম দৃশ্য।
প্রভু।
তাইত বােধ হচ্ছে। রাস্তায় ঘাটে, মাঠে, যেখানে যাই
কেবল “পৃথী” রবই শুনছি। কুলবধূদের মুখে ঐ নাম,
চারণ কবিরা ঐ নাম গাচ্ছে; সভায় মন্দিরে
থাক্ থাক্। তার কি হয়েছে বলে ফেল। সে মরেছে
বলতে পারাে ?
আজ্ঞে সে ছেলেই নয়। বরং এই সপ্তাহ দুই পরে তার
অভিষেক। রাণা অবসর নিচ্ছেন। এখন পৃথীই রাণা ,
চ।
প্রভু।
চন্দ্র।
পৃথী রাণা ?
কেন রাণার ছেলে রাণা হবে এর মধ্যে আশ্চৰ্য্যটা কি
দেখলেন ? আপনার দুঃখ কিসের!
পৃথী আমার মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে। আবার তুমি
বল আমার দুঃখ কিসের ?—প্রতারণা! প্রতারণা!—সঙ্গ
সন্যাসী, জয়মল মৃত, পৃথী নির্বাসিত, এতে আমার রাণা
হবার কথা ছিলনা?—প্রতারণা! চুরি! ধাপ্পাবাজি।
-আমি তাই রাণার মেয়েকে এত দিন পুষেছি। আজ,
আমি তাকে মেরে বাড়ীর বার করে দেবাে -এই
কে আছিস?
[ দৌবারিকদ্বয়ের প্রবেশ।
যা রাণীকে, এখানে এক্ষণেই নিয়ে আয়। শুধু নিয়ে
আসবিনে, কুকুরের মত শিকল দিয়ে, বেঁধে নিয়ে আয়।
[.১৬৩.

পঞ্চম অঞ্চ।]
তারাবাই ।
।
[ পঞ্চম দৃশ্য।
দৌবারিকদ্বয়। যে হুকুম মহারাজ [ প্রস্থান ]
মহারাজ!
চোপ রহহ!
[ পারিষদবর্গ নিস্তব্ধ ]
চন্দ্র। আমি তবে আসি মহারাজ।
[ প্রস্থান ]
-ষড়যন্ত্র ।-রাণা ছেলেকে নির্বাসিত করেছিল। তাকে
আবার ডেকে পাঠিয়েছে শুদ্ধ আমাকে ফাঁকি দেবার
জন্য।–এতদূর জোচ্চোরি!—ঢালো—এই ঢালল।
পারিষদবর্গ।—এই ঢালো।চলুক গান চলুক
নর্তকীদিগের গীত।
“ঢালো, আরো ঢালাে” ইত্যাদি
এই চোপরও।
পারিষদবর্গ। চোপরও।
আমি আজ প্রতিশােধ নেবব! প্রতিশােধ নেবাে।
[ পরিক্রমণ ] জোচ্চোরি।
[ শৃঙ্খলাবদ্ধ যমুনার প্রবেশ ]
দৌবারিক। মহারাজ । এনেছি।
এনেছি বেশ করেছি।-এই যমুনা।
যমুনা।
[ নীরব ]
আমি আজ তােকে অপমান কর্ব।
যমুনা। অপমান য়ােজত কই। বাকি রেখেছো কি ?
১৬]

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাই।
[ পঞ্চম দৃশ্য।
প্রভু।
যমুনা।
যে টুকু বাকি রেখেছি, সে টুকু আজ কৰ্ব। আজ
তােকে জুততা মেরে আমার বাড়ী থেকে বের করে দিব।
তাই দাও! এ আপদ দূর হােক। তাই দাও! আর
সহ্য হয় না।
; তােকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিলে শুধু হচ্ছে না।
তােকে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়াবাে।
আমার অপরাধ কি মহারাজ ?
তাের অপরাধ যে রায়মল তাের বাপ, আর পৃথী তাের
যমুনা।
ভাই।
যমুনা।
এই অপরাধ। এ অপরাধ আমি স্বীকার করি, মহারাজ।
তার জন্য যা শাস্তি দিবে দাও, মাথা পেতে নেবাে।
তাই এ জীবনের সান্ত্বনা অপমানে অহঙ্কার। আমি যে
তােমার এত অত্যাচার সহ্য কচ্ছি, তা এই মনে করে,
যে আমি রাণার মেয়ে, পৃথ্বীর বােন; আমার অপমান
নাই; তা এই মনে করে যে ইচ্ছা কল্লেই এ অপমানের
প্রতিকার কন্তে পারি। তবে প্রতিকার করিনা-
কারণ তুমি যাই হও, আমার স্বামী ;-প্রতিকার করিনা
কারণ আমি হিন্দুনারী—যে হিন্দুধৰ্ম্মে শিক্ষা দেয় যে
স্বামী পাষণ্ড হলেও সে নারীর দেবতা।তাই এত দিন
এত সহ্য করেছি ;-অপমান গা পেতে নিইছি। বুক
ফেটে গিয়েছে তবু সহ করেছি, প্রাণ জলে গিয়েছে
তবু সহ করেছি, চখের জলে বুক ভেসে গিয়েছে তবু
[১৬

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ পঞ্চম দৃশ্য।
সহ করেছি। নৈলে আমি কি মুষ্টিমেয় অন্নের জন্য
তােমার দুয়ারে পড়ে আছি মনে কর ?-আমি-
যার বাপ রাণা রায়মল, যার ভাই ভুবনবিখ্যাত
পৃথ্বীরাজ ?
বটে। তােমার অহঙ্কার চূর্ণ কচ্ছি। আমি যদি
তােকে এখেনে পদাঘাত করি, তাের বাপই বা কি
কৰ্তে পারে। আর তাের ভাইই বা কি কর্তে পারে ?
পৃথ্বী।
পৃথী।
{ কেশাকর্ষণ ও পদাঘাত ; যমুনার পতন ]
[ পঞ্চ সৈনিক সহ বেগে পৃথ্বীর প্রবেশ ]
প্রভুরাও একি ? [ গলদেশ ধারণ ও পারিষদবর্গের
চীৎকার করিয়া পলায়ন ]
কে? এ পৃথ্বীরাজ ? ছাড়াে।
[ ছাড়িয়া, অসি নিষ্কাশিত করিয়া ] খােল তরবারি।
এ তরবারি খুলবে কেন? এই—কে আছিস্?
ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছ কেন?
মর বীরের মত মর।
আজ তােমার অন্তিম দিন। কি! তরবারি খুলিবেনা ?
[ গলদেশে ধাক্কা ও প্রভুর পতন তাহার উপরে বসিয়া ]
প্রভুরাও এই তােমার শেষ মুহূর্ত। ইষ্টদেবের নাম জপাে।
[ তরবারি উত্তোলন ]
[ সকাতরে ] ক্ষমা কর পৃথ্বীরাজ !
ক্ষমা চাও যমুনার-তার পায়ে ধরে ক্ষমা চা কাপুরুষ।
পৃথ্বী।
প্রভু।
পৃথ্বী।

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ পঞ্চম দৃশ্য
যমুনা।
পৃথী।
প্রভু।
পৃথী।
যমুনা! পায়ে ধরি, ক্ষমা কর।
মেজদাদা! ইনি যাহাই হােন আমার স্বামী। এই মুহূর্তে •
একে ছেড়ে দাও।
[ ছাড়িয়া স্বগত ] এ! রমণী এরূপও দেখছি হয়!
তাইত।–[ প্রকাশ্যে আচ্ছা। ছেড়ে দিলাম এবার,
প্রভুরাও। মনে থাকে যেন যে এবার যমুনার কৃপায়
তুমি প্রাণ পেলে। [ ধাক্কা দিয়া ] কেমন মনে
থাকবে ?
থাকবে।
ভবিষ্যতে শুনিছি যে এর গায় আঁচড়টি লেগেছে, কি
তুমি গিয়েছ জেনাে। যমুনা পৃথীর বােন্; মনে থাকবে?
খুব থাকবে।
চল যমুনা গৃহাভ্যন্তরে। এ মাতালের আড্ডা থেকে চল।
[ পৃথীর ও যমুনার প্রস্থান ]
[ দন্ত ঘর্ষণসহ ] পৃথী! এর প্রতিশােধ নেবব!—উপযুক্ত
প্রতিশােধ নেবাে। না নেই, আমার নাম প্রভুরাও
নহে।
[ প্রস্থান ]
পৃথী।
[১৬৭

ষষ্ঠ দৃশ্য।
স্থান—উদ্যান। কাল–সায়াহ্ন।
একাকিনী তারা।
গীত।
কে পারে নিবারিতে হৃদয়েরি বেদনা,
সে বিনে নিজ করে দিয়াছে যে তাহারে।
হৃদয়ে যে ঘাের আঁধারে ঘেরে,
কে নিবারে, যে তারে গেছে প্রাণে ঘিরে সে বিনে।
তারা।
কেন আজ হৃদয় আকুল বারংবার
নাচিছে দক্ষিণ চক্ষু। কাপে বক্ষস্থল।
[ পদবিক্ষেপসহ পুনরায় গীত ]
নাহি আর মধু রে মধুর অধরে ;
শরত চাদিমা চরণে লুটায় অনাদরে ;
হাসে কি গগন, ঘন ঘন আবরিলে তারে ?
বিফলে চন্দ্রমা তারা রাজি ভায় তায় রে।
সত্য !—ভাবিলেন তিনি, এত নীচ আমি!
মনেও আসিল তার ?হায় !
[ পরিচারিকার প্রবেশ ]
পরিচারিকা।
যুবরাণী—

পঞ্চম অঙ্ক ] তারাবাই। [ ষষ্ঠ দৃশ্য । তারা। আমি যুবরাণী নহি—আমি শুদ্ধ “তারা”। পরিচারিকা। কেন রাজপুত্রি ? তারা। “কেন” বলিতে চাহিনা। নহি যুবরাণী, নহি রাজপুত্রী।—আমি শুদ্ধ “তারা” ততােধিক সম্মান চাহি না। পরিগরিকা। আমরা সামান্য নারী! বুঝিনাক অত নামের মহিমা। যাহা বলিয়া এসেছি এত দিন, তাহাই বলিব। রাজপুত্রী! চাহে একজন নারী সাক্ষাৎ তােমার! তারা। কিরূপ সে নারী ? পরিচারিকা। অতি দুঃখিনী। তারা। দুঃখিনী ? নিয়ে এস [ পরিচারিকার প্রস্থান ] তারা। করিয়াছ বড়ই অন্যায় দোষারােপ। প্রাণেশ্বর।-আমি রাজ্য চাহি। বুঝিলেনা এতদিনে আমারে প্রাণেশ ! [ পুনরায় গীত।] [ তমসা ও পরিচারিকার প্রবেশ কে তুমি ? তারা। [ ১৬৯ পঞ্চম অঙ্ক।] তারাবাই। [ ষষ্ঠ দৃশ্য তারা। তমসা। চিনিতে নাহি পারিবে।-নাহিও চিনিবার প্রয়ােজন। কি চাহে রমণী ! তমসা। তােমার মঙ্গল চাহি। তারা। আমার মঙ্গল ? তমসা। তােমার মঙ্গল ।তারা। কোথা পৃথ্বীরাজ ? তারা। সিরােহী নগরে। তমসা। তুমি সঙ্গে যাও নাই ? তারা। আমি সঙ্গে যাই নাই। তমসা। এক্ষণেই যাও। তারা। কি হেতু রমণী ! সব বুঝিতে নারিবে। তবে এইমাত্র কহি-যমুনার স্বামী প্রভুরাও, ভাল নাহি বাসে পৃথীরাজে । তাহার স্বভাব হেন, বিষ দিতে পারে আহারে, ছুরিকা পৃষ্ঠে বসাইতে পারে। তারা। জানো তারে ? তমসা। খুব জানি ! ভাল করনাই ‘সঙ্গে যাও নাই তুমি। এক্ষণেই যাও। [ প্রস্থান ] তারা। বুঝিয়াছি বুঝিয়াছি।তাই মুহুর্মুহু কাপে বক্ষঃস্থল ; চক্ষে ভরে আসি বারি ; কেন ছেড়ে দিলাম প্রাণেশে। যেইখানে ১৭]

পঞ্চম অঙ্ক।]
তারাবাই।
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
যাইতেন, যাইতাম সঙ্গে ; এইবার
কেন নাহি যাইলাম ?-একি বারংবার
কহিছে কে কর্ণে যেন থাকিয়া থাকিয়া
“আর দেখা হইবেনা।”—জগদীশ হেন
হােয়ােনা নিষ্ঠুর। দিও ফিরায়ে তারারে
তাহার নয়নতারা।—যাই, আমি যাই,
তােমার সকাশে নাথ। রাখিও, ভবানী!
প্রাণেশ্বরে, যতক্ষণ আমি নাহি আসি।
—আর নাই অভিমান; আর ক্রোধ নাই ;
লাঞ্ছনার ক্ষত নাই ; অপমান নাই।
নাথের বিপদ, আর মূঢ় অভিমানে,
নিশ্চিন্ত হৃদয়ে আমি বসিয়া এখানে ?
ক্ষমা কর জীবন সৰ্বস্ব।-প্রাণেশ্বর
ক্ষমা কর ! আসিতেছি আসিতেছি, আমি।
[ নিষ্ক্রান্ত ]
(১৭১

সপ্তম দৃশ্য।
স্থান—প্রভুরাওর সজ্জিত অন্তঃপুর কক্ষ। কাল—মধ্যাহ্ন।
একাকী পৃথী।
পৃথী। [ পদচারণ সহ ] হৃদয় ব্যাকুল ফিরে যাইতে চিতােরে।
টানিছে আমারে গৃহে নিত্য অভিমানে,
সজল নিৰ্ম্মল স্বচ্ছ নীল চক্ষুদুটি।
বুঝিয়াছি ভ্রম—করিয়াছি অবিচার !
ক্ষমা কর প্রাণেশ্বরি! চিরদিন আমি
হেন উগ্ৰ অসংযত।
[ প্রভুরাওর প্রবেশ ]
পৃথী! তবে তুমি
অদ্যই যাইবে ?
পৃথী।
আমি অদ্যই যাইব।
প্রভু। ভাবিও না আসিয়াছ কুটুম্বের বাড়ী
এ তােমার বাড়ী, পৃথী। আরাে দুইদিন
থেকে যাও।
পৃথী।
অম্বই যাইতে হইবে।
প্রভু। [ স্বগত যাইতে হইবে বটে। আর ফিরিবে না
[ প্রকাশ্যে ] বুঝিয়াছি ; চিতােরের বাতায়ন পথে,
পথ চেয়ে আছে কৃষ্ণবর্ণ চক্ষুদুটি।
পৃথী। সত্য কথা, প্রভুরাও।
১৭২]

পঞ্চম অঞ্চ।] তারাবাই। [ সপ্তম দৃশ্য। প্রভু। [ স্বগত ] থাকুক না চেয়ে ; এ জীবনে ঘুচিবেনা সেই চেয়ে থাকা। [ যমুনার প্রবেশ ] যমুনা। দাদা যাইতেছ ? পৃথী। : বােন্! যাইতেছি আমি। তবে যাই। যমুনা। বল “আসি।”—কর মিষ্টমুখ স্বহস্তে মিষ্টান্নপাক করিয়াছি আমি, আনিয়া দিতেছি ভাই। [ প্রস্থান) প্রভু। আমিও এনেছি- সিরােহীর সর্বোত্তম মােদকের হস্তে প্রস্তুত করায়ে, শ্রেষ্ঠ মদক এক্ষণে, তােমার—তারার জন্য,--দেখ দেখি ভাই, কিরূপ করিল। পৃথী। দাও, সঙ্গে লয়ে যাই। প্রভু। না এখানে খেয়ে দেখ, আমার সম্মুখে ; নহিলে কি তৃপ্তি হয় ? পৃথী। থাকুক না প্রভু। প্রভু। না, খাও, নহিলে ছাড়িব না। পৃথী। অবিলম্বে। দাও তবে, [১৭৩ পঞ্চম অঙ্ক।] তারারাই। [সপ্তম দৃশ্য। এই লও [ মিষ্টান্ন প্রদান ] পৃথী। [ মিষ্টান্ন ভক্ষণ ] কিরূপ করিল। পৃথী। উত্তম সামান্য কটু। প্রভু। [ স্বগত ] পূর্ণ মনস্কাম, এতদিনে পৃথ্বীরাজ ! পৃথী। যাইবে ত তবে তুমি অভিষেকদিনে। নিশ্চয় যাইব। পৃথী। একি বড় ঘুরিতেছে মস্তক। প্রভু। [ স্বগত ] ঔষধ ধরিয়াছে। [ মিষ্টান্ন-পাত্র হস্তে যমুনার প্রবেশ ] পৃথী। ঘুরিতেছে মস্তক-যমুনা জল আন। যমুনা। ঘুরিতেছে মন্তক! কি হেতু ? [ প্রস্থান পৃথী। [ অস্থিরভাবে ] প্রভুরও! সত্য ক—একি প্রবঞ্চনা ? মিষ্টান্নে দিয়াছ বিষ ? [ জল লইয়া যমুনার প্রবেশ ] এই জল নাও। পৃথী। [ জলপান করিয়া | সত্য বল প্রভুরাও—একি প্রবঞ্চনা ? যমুনা। ১৭৪ ]

পঞ্চম অঙ্ক।
তারাবাই।
[ সপ্তম দৃশ্য।
প্রভু। আর বঞ্চনায় নাহি কোন প্রয়ােজন।
সত্য পৃথ্বী। খাইয়াছ যে মদক আজি
বিষাক্ত মদক তাহা।
পৃথী
বিষাক্ত? কে দিল
বিষ ?
প্রভু। আমি দেওয়ায়েছি।
পৃথ্বী।
একবার তবে
কহিয়াছ সত্যকথা, প্রভুরাও, তুমি
এজীবনে !—জানিতাম তুমি নীচ জ্বর,
কিন্তু এত নীচ, এত জ্বর, ভাবি নাই।
—কেন দিলে বিষ প্রভুরাও ?
পৃথ্বীরাজ !
লইয়াছি প্রতিশােধ তােমার দাম্ভিক
অপমানরাশির।—হইয়াছিল প্রায়
কর্ণবােধ, শুনিতে শুনিতে পথে গৃহে
অন্তঃপুরে পৰ্য্যন্ত, পৃথ্বীর যশােগীতি;
হইয়াছি নিয়ত হিংসায় জর্জরিত
পৃথ্বীরাজ ! আজি লইয়াছি প্রতিশােধ।
পৃথ্বী। অত্যুত্তম প্রতিশােধ। প্রভুরাও!—হায়!-
যমুনার স্বামী তুমি। কি আর বলিব!
যমুনা। ডাকি বৈদ্যে।
[ ১৭৫

পঞ্চম অঞ্চ।] ..
তারাই।
এ সপ্তম দৃ।
নাহি বৈঞ্চ এ তিন ভুবনে,
এ বিষের প্রতিকার করিতে যে পারে।
পৃথী। কাজ নাই বৈদ্যে আর।—যমুনা ! যমুনা !
ছাড়িয়া যেওনা শেষ সময়ে আমারে
অধিক বিলম্ব নাই আমার মৃত্যুর ;
বিশ্ব অন্ধকার হয়ে আসে।
অধিক বিলম্ব নাই যমুনা ! প্রেয়সি !
বড় যে করিতে গৰ্ব পৃথীর।-এখন ।
যমুনা। [ জানু পাতিয়া } জগদীশ ! রক্ষা কর ; বুঝিতে পারি না
স্বামী মাের নর, কিম্বা নরকের কীট।
মানুষ কি এও হয়? এত নীচ হয় ?
এত খল হয়? এত কাপুরুষ হয় ?
দিতে পারে যেই নর, হেন অনায়াসে
বিষাক্ত মদক তুলি অতিথির মুখে ;
বিশ্ব অতিথিযে অতিথি এক দিন
তার প্রাণদাতা; যে অতিথি এত উচ্চ,
উদার, মহৎ, যে এ নিখিল বিশ্বকে
সরল উদার ভাবে।দেব।-ওকি নর।
বোধ হয় অন্যরূপ। বােধ হয় যেন
দেখিতেছি রহিয়াছে অদূরে পড়িয়া
ঘৃণা সরীসৃপ কোন মিশিয়া কর্দমে।
১৭৬]

পঞ্চম অঞ্চ। }
তারাবাই
পৃথ্বী। যমুনা-যমুনা !
প্রভু।
যমুনা ডাকিছে ভাই।
“প্রাণের ভাইরে” বলে ডাক একবার। [ প্রস্থান ]
পৃথ্বী। যমুনা যমুনা ! ছােট বােনটি আমার
যমুনা [ পৃথ্বীর মস্তক ক্রোড়ে লইয়া ]
ক্ষমা কর ভাই। আজি আমার আহ্বানে,
আসিয়া আমার গৃহে, আমার অতিথি
আমার পতির হস্তে—তােমার এ দশা ?
তুমি রক্ষা করিলে আমারে ; কিন্তু আমি
নাহি পারিলাম রক্ষা করিতে তােমারে। [ ক্রন্দন ]
পৃথ্বী। কঁদিওনা বােন্—এক মিনতি আমার
কহিও তারারে,—আমি মরণ সময়ে
চাহিয়াছিলাম--তার মার্জনা।-যমুনা-
-চক্ষু হ’তে-নিভে যায়—নিখিল জগৎ
কহিও সে কথা—ভুলিওনা—তৰে যাই। [ মৃত্যু ]
বম না। [ উচ্চ স্বরে ] দাদা দাদা! দাদা-দীপ নিভিয়া গিয়াছে
• সােণার পিঞ্জর হতে সন্ধ্যার আকাশে
উড়িয়া গিয়াছে পাখী। কি করিব রাখি’
পিঞ্জর ধরিয়া ক্রোড়ে—[ মস্তক ভূমিতলে রাখিয়া
দাড়াইয়া ] তবে যাও ভাই--
যাও সে অমর ধামৈ। আসিতেছি পিছে
আমরা।ঔদার্য বীর্য স্নেহের আধার
[১৭।

তারাবাই।
[ সপ্তম ।
ছিলে তুমি। তব যশােগীতি রাজস্থানে,
পথে ঘাটে মাঠে গিরিসঙ্কটে, গহনে
গাইবে চারণ কবি—যাও স্বর্গধামে।
এ কে আসিছে। এযে উন্মাদিনী তারা।
[ তারার প্রবেশ ]
তারা। কই! প্রাণেশ্বর কই! যমুনা ! আমার
কোথায় জীবিতেশ্বর।
যমুনা।
[ নীরব )
তারা।
—এইযে এখানে।
ভূতলে পড়িয়া হেন কেন প্রাণাধিক ?
জীবন সর্বস্ব ? কেন বিবর্ণ ?-- যমুনা-
যমুনা। তারা। তারা ! কি দেখিতে আসিয়াছ আর ।
পৃথী এ জগতে নাই।
তারা।
পৃথী কোথা নাই ?
যমুনা কি বলিতেছ ?
যমুনা।
কি আর বলিব।
কিছু বলিবার নাই।-হত্যা হত্যা-তারা।
হত্যা করিয়াছে।
তারা।
হত্যা ?—কে হত্যা করিল।
যমুনা। হায় তারা। এই হতভাগিনীর হাতি।
তারা। কিরূপে?
যমুনা। দিয়াছে বিষ।
১৭৮)

পঞ্চম অঞ্চ। ] তারাবাই। [ সপ্তম দৃশ্য। তারা। বিষ? বিষ ? [ স্তম্ভিতভাবে ] তবে নাই পৃথী? সত্য কথা ? ইহা সত্য কথা ? উঠিয়াছে শরীরের সমস্ত শশাণিত মস্তকে। বুঝিতে নাহি পারি। পৃথ্বী নাই ? যমুনা। নাই, অভাগিনী। আয় গলা ধরাধরি আমরা দুজনে বােন কঁদি উচ্চৈঃস্বরে। আমি হারায়েছি ভাই, তুই পতি, আয় সম বেদনায় মােরা কঁদি দুইজনে। তারা। চলে গেছে ?—এত ক্রোধ !এত অভিমান। একবার কহিলে না কথা ? একবার চাহিলেন মুখ’পরে!-এত অপরাধী আমি ? যমুনা। কহিয়াছিলেন মরিবার পূর্বে ভাই কহিও তারারে, আমি মরণ সময়ে চাহিয়াছিলাম তার মার্জনা।” তারা। মার্জনা ! মিথ্যা কথা! যমুনা! এ মিথ্যা কথা। তিনি বড় অভিমানী ! বড় নিষ্ঠুর! চলিয়া গিয়াছেন না বলিয়া-না বলিয়া তাই। -নাথ ! প্রাণেশ্বর!-ফাঁকি দিয়াছ এবার। করি নাই নয়নের অন্তরাল কভু- -এক বার করিয়াছি, অমনি, কপট- সময় বুঝিয়া ফাঁকি দিয়েছ !-উত্তম। দেখিব তথাপি,ফাঁকি দাও কি প্রকারে। আমিও যাইব।বনে, সমুদ্রে, পৰ্বতে, থাক তুমি ; আমি গিয়া মিলিব তােমার সঙ্গে আজি!-স্বর্গ মর্ত্য পাতাল খুঁজিয়া [১৭৯ পঞ্চম অঙ্ক।] তারাবাই। [ সপ্তম দৃশ্য যমুনা। বাহির করিব, যেথা থাক প্রতারক ! 'ভাবিছ কঁদিব আমি নিষ্ফল বিলাপে ধরায় তােমার লাগি ?—ভাবিছ চলিয়া গিয়াছ যেখানে, আমি নারিব যাইতে। না শঠ। পারিবে না।আমিও যাইব ?- সলিল দাবাগ্নি দিয়া, মৃত্যু পথ দিয়া, প্রলয়ের মধ্য দিয়া,—আমিও যাইব। সুখে দুঃখে, বিপদে সম্পদে, জ্ঞানে ও অজ্ঞানে জীবনে মরণে তারা রহিবে তােমার সঙ্গিনী।-দেখি কে রােধে। [ বক্ষে তরবারি দিয়া পৃথীর পদতলে পতন ) —একি সর্বনাশ । তারা তারা ! কি করিলে ? কি করিলে তুমি ? নারীর—সতীর-স্ত্রীর কাৰ্য্য করিয়াছি। এস মৃত্যু—এত স্নিগ্ধ, এত—সুমধুর, তুমি বন্ধু !—নিয়ে চল নাথের সমীপে সতীরে সুহৃৎ!--[ যমুনাকে। তবে বিদায় ভগিনি। চলিয়াছে সতী তার নাথের উদ্দেশে। কি করিলে তারা-একি ? নুতন বাসর। প্রিয় ভগ্নি -এ আমার নূতন বাসর [ সহাস্যে মৃত্যু } অন্ধকার ! অন্ধকার! ঘাের অন্ধকার! [ পতন ) ? তারা। যমুনা। ( তারা। যমুনা। অন্ধকার ! [ পতন । যবনিকা পত্ন। --- ~- ১৮ ]

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Tarabai Ed.2

Author
Ray,dijendralal
Title
Natak
File name
Tarabai Ed.2
Text
OCR done
Citation
1914
Published
2009/09/15
Publisher
Gurudas Chattopadhyay,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
186
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Tamasa
DLI number
513406
Barcode
4990010020386.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
woD9r0sFCNm
Download PDF

Tarabai Ed.2