Bally Sadharan Granthagar
Sakaler Sat Rang
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সকালের সাত রং
তপতী রায়
১৯৬
মিত্র ও ঘােষ
১০, শ্যামাচরণ দে খ্রীট, কলিকাতা-১২
-আড়াই টাকা-
মিত্র ও ঘােষ, ১০, খামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-১২ হইতে ভানু রায়
কতৃক প্রকাশিত ও কালিকা প্রিন্টিং ওয়ার্কস, ২৮ কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট,
কলিকাতা হইতে বিজয়কুমার মিত্র কর্তৃক মুন্ত্রিত।
- মণীন্দ্র রায়কে
No text on this page.
জাতি
হাতটা সজোরে মুচড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ
করে উঠল খোঁড়াটা।
কদিন থেকেই লক্ষ্য করছে বিশ্বনাথ এই খোঁড়ার চালচলন।
সােহাগীর সঙ্গে বেশ একটু মাখামাখি করবার চেষ্টা করছে সে।
বিশ্বনাথ বহুবার সাবধান করতে গেছে সােহাগীকে। উত্তরে
সােহাগী শুধু বােকার মত চেয়ে থাকে।
‘াকা সাজে নাকি ? আপন মনে গজরাতে থাকে বিশ্বনাথ।
কিন্তু উপায় নেই। অদ্ভুত জাদু জানে মেয়েটা। কি যে আছে
ওর চোখে বিশ্বনাথ ভেবে পায় না। তার মত কড়া মেজাজের
লােকও কিছু করতে পারে না যেন।
একটা ভিখারীর দলকে বস্তি থেকে চালিয়ে বিভিন্ন রাস্তায়
ছেড়ে দেওয়া—এই হল বিশ্বনাথের কাজ। মালিকের নাম
বনওয়ারীলাল শর্মা। মানুষের দয়ার পয়সায় ভাগ বসানাের
পাপকে ধর্মশালায় ধুয়ে স্বর্গের রাস্তা পরিষ্কার করছেন তিনি,
নরকের পাহারাদারীর ভার বিশ্বনাথের ওপর। জাতে সে কায়স্থ।
লেখাপড়ার কথা জিজ্ঞেস করলে বেশ গর্বের সঙ্গেই বলে ‘বার্ড
সকালের সাত রং
ক্লাস’। বাপমারা যাবার পর গ্রাম থেকে এসে কয়েক বছর
হােটলের কাপ-ডিস, ধুয়ে আর বিড়ির দোকানের পাতা কেটে
পেট চালিয়েছে। হঠাৎ খোঁজ পেয়ে গেল এই চাকরিটার। বেশ
চট পটে দেখে বনওয়ারীলালও তাকে কাজে বহাল করতে
দ্বিরুক্তি করেনি।
“তবে আর কি রে, কপাল তাে ফিরে গেল। খালি মাইনে
নাকি? উপরিও আসবে দেখিস।”
চোখ টিপে ঠাট্টা করেছিল বিড়ির দোকানের মালিক।
“উপরিই বটে”, মনে মনে হাসে আজ বিশ্বনাথ। কাজে
নেমে প্রথম প্রথম রীতিমত গা ঘিনঘিন করত তার। ভাের না
হতেই ঐ নােংরা বস্তিতে ঢােকা। গরীব তত সেও, কিন্তু এরা
যেন মানুষ নয়। নােংরা কিলবিলে অন্য জগতের জীব। ঘেন্ন
করে তার। মারামারি ঝগড়া লেগেই আছে। বঞ্চিত হওয়ার
সমস্ত প্রতিশােধ তারা নিচ্ছে পরস্পরকে আক্রমণ করে।
কিন্তু সােহাগীকে দেখবার পর থেকে এ জগতটাই যেন বদলে
গেল ওর কাছে। এই চার বছর কাজের ভেতরে আস্তে আস্তে
সেই রােগাপটকা বারাে বছরের মেয়েটা কবে যে একটি সতেজ
যুবতীতে পরিণত হয়েছে, এতদিন তা সে লক্ষ্যই করেনি। হঠাৎ
যেন আবিষ্কার করল তাকে। কোথা থেকে যৌবন আর
সৌন্দর্যের এত রসদ পায় মেয়েটা ? অবাক হয় বিশ্বনাথ।
মালিক যা খেতে দেয় তাতে জীবনটা ধরে রাখা ছাড়া বাড়তি
কিছু তাে থাকবার কথা নয়, এত পুষ্টি ওর হয় কিসে কে জানে।
সকালের সাত রং
সমস্ত শরীরটা নিটোল ছাদে গড়া।
দেহের প্রত্যেকটি খাজ
‘আর কিছু না থাক, মেয়েটির গড়নটা বেশ কিন্তু, তারিফ
করে পারে না সে তার বিড়ির দোকানের বন্ধুর কাছে। বন্ধুর
কাছ থেকে সায় পেয়ে সাহস তার বেড়ে যায়। ও যেন বুঝেই
মিয়েছে যে সােহাগী তারই নিজস্ব সম্পত্তি। খাওয়া-দাওয়া
একটু ভাল করার চেষ্টা করে। এরই ভেতর যতটা পারে তলা-
কার ঘন খিচুড়ি বেশি করে দেয় সােহাগীর পাতে। খাক মেয়েটা,
আহা শুধু তাে এই-ই খায়। ভিক্ষের পয়সা থেকে দু পয়সা
মুড়ির বরাদ্দও করে দিয়েছে সে। সাধ যায় একখানা কাপড়
কিনে দেবার। কিন্তু সাহস পায় না। মালিক বড় জবরদস্ত এ
সব বিষয়ে। এর মধ্যেই সােহাগীর জন্যে তার দরদের কথা নিয়ে
কানাকানি চলছে ভিখারীদের ভেতর। মাঝে মাঝে টুকিটাকি
কথাও কানে আসে।
“কি লা তাের রস যে দিন দিন বাড়ছে, ছিরিও খুলছে
বেশ ।” টেনে টেনে হেসে বললাে সেদিন দুখীর মা সােহাগীকে।
“তা আর বাড়বে না? ওরই তত দিন গাে? আমাদের কি
আর পদাঙ্খ বলতে কিছু আছে?” টিপ্পনী কেটে সায় দেয় আর
একজন।
t
“সত্যি লা।”—দুখীর মা জোর দিয়ে বলে, “কপাল ভাল
তাের। সরকারবাবুর চোখ আছে তাের ওপর। তাের আর
ভাবনা কি?”
সকালের সাত রং
“কেননা?” কথাটা বুঝতে চেষ্টা করে সােহাগী।
“আহা-খুকি।” হেসে গড়িয়ে পড়লাে দুখীর মা মতিয়া
বুড়ীর গায়ে।
“কিছু বুঝতে পারিস না তু?” মতিয়া হাসতে লাগলো
ফোকলা দাতে, “সরকারবাবু যে তােকে পেয়ার করে ?”
“ভাগ-” বিব্রত বােধ করে সােহাগী, “আমরা যে ঘােট
নােক।”
“ঈস, ভারি যে আপসােস দেখি তাই নিয়ে।” ঝাঝিয়ে
উঠলল দুখীর মা, “কই আমাদের তাে অত কথা মাথায় ঢােকে
। সবই বুঝি লল—আর ছেনালি করিস নি মাইরি।”
তাড়াতাড়ি সরে যায় বিশ্বনাথ।
চিন্তার দায় এসে পড়ে সােহাগীর ওপর। কিন্তু সে যে বড়
ভয় করে সরকারবাবুকে। তার তাকানাে সহ্য করতে পারে না
সােহাগী।
রাস্তা পার করবার সময় সবাইকে বাদ দিয়ে সরকারবাবু
তার হাত ধরতে যেতেই লজ্জায় পিছিয়ে যায় সেদিন
“আমি ঠিক যাব বাবু। তুমি মিছে তাগিদ কর কেন?”
“তাগিদ করি কি আর সাধে? চাপা পড়লে তাে আমারই
ভােগান্তি।” ধমক দিল বিশ্বনাথ।
“বাবু!” ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলাে খোঁড়াটা, “আমি
চাপা পড়লে আর ভােগান্তি নেই বুঝি ?”
“চুপ কর হারামজাদা।” খেকিয়ে উঠলাে বিশ্বনাথ—“অত
সকালের সাভ ভাড়া কিসের। একে একে যাবি তাের পাজি। হারামজাদা।” ভীষণ রাগে খোড়ার দিকে তেড়ে যায় সে। নাঃ, ব্যাচ বদলাতেই হবে। সােহাগীর সঙ্গে ওকে রাখা চলবে না। “তাের তেল দিন দিন বাড়ছে, না?” শক্ত মুঠিতে তার হাত ধরে রাস্তা পার হতে হতে বলে বিশ্বনাথ, “তেল বার করছি রাখ।” “এই। কেননা বাবুর কথার জোবাব দিচ্ছিস রে?” বিশ্বনাথকে খুশী করার ফিকিরে ধমক দেয় তাকে মতিয়া বুড়ী। অসম্ভব ভয় করে তাকে এই ভিখারীর দল। তাদের কত। তাে বিশ্বনাথই। দারােগা যেমন থানার কত, নায়েব যেমন মৌজার। “কাজ কি আমাদের ঘেটিয়ে?” বুদ্ধিমান বুড়াে ভিখারীরা সান্ত্বনা দেয় সকলকে, “ভাতে মরবাে কি শেষে ? যেতে দাও ভাই, যেতে দাও।” “যেতে দিলে ও শালা একদিন নিয়ে ভাগবে।” প্রতিবাদ করে খোঁড়া, “মালিকের কানে তুলে দিয়ে বােঝাব শালাকে। অত সােজা নয়। শালা।” গজগজ করে সে। খোঁড়া পায়ের কাঠটিকে ভীষণ আক্রোশের সঙ্গে ঠক্ ঠক্ করে ঠোকে সে সিমেন্টের ফুটপাতে। কাটা পায়ে ঠোকা খেয়ে তার পঁচিশ বছরের তাজা রক্তের ধাক্কা হৃৎপিণ্ডের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। কি একটা সঙ্কল্প করে সে এগিয়ে যায় সােহাগীর দিকে। “আমরা হলুম গিয়ে এক দলের লােক-ভিকিরীও বাবু কেন আসবে আমাদের ভেতর?” ফিস ফিস করে একটা জীবন- ৬ সকালের সাত রং মরণ সমস্যার বিষয় বােঝাবার চেষ্টা করে সে যেন। চোখ মুখ তার শক্ত, তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। “কেননা, বাবু কি করেছে ?” বােকার মত জিজ্ঞেস করে সােহাগী। “কি করেছে ? চুড়ির মত বকিস না। আরে মােদের সুখ- দুঃখু মােরাই বুঝবাে। ও বাবুর অত মাথাব্যথা কেন? ও কেন আসে তাের খাওয়া দেখতে, তাের হাত ধরতে ?” কেমন যেন কোণঠাসা হয়ে পড়ে সােহাগী। হঠাৎ ঝাঁঝিয়ে ওঠে—“তাতে তাের কি রে ?” “তুই কি ভাবিস বাবু তােকে নিয়ে ঘর করবে? মালিক টের পেলে কি করে দেখিস, তখন মজা বুঝবি।” “তা নিয়ে তাের অত মাথাব্যথা কেন রে লো? আমার মজা আমি বুঝবাে। তুই ভাগ।” ফল হয় না কোননা, তবু আশা ছাড়ে না খোঁড়া। যৌবনের সহজধর্মে, তাড়া খেয়েও সােহাগীর কাছে ঘােরাফেরা করে। বিশ্বনাথের নজর এড়ায় না কিছুই। কিন্তু সেদিন সে আর সামলে উঠতে পারল না। “এই, তাের জায়গা তাে ঐ ও-রাস্তায়। তুই এখানে এসে কি করছিস?” কড়া চোখে জিজ্ঞেস করল খোঁড়াকে। “মাের বাটটে বদলি হয়ে গেছে গো বাৰু এর সাথে, তাই
সকালের সাত রং
এসেছিঃ”-মিথ্যে বলে খালাস পাবার চেষ্টা করে খোঁড়া।
সােহাগী অবাক হয়ে খোঁড়ার মুখের দিকে তাকায় একবার।
কিন্তু সত্যি কথাটা ফঁস করে দেয় না। হঠাৎ তার জন্য একটু
মায়াই বােধ করে যেন। হাজার হােক একই দলের লােক তাে।
-ই বা জানল বিশ্বনাথ, কেন সে এসেছিল সােহাগীর কাছে।
আজকের দিনটা উপবাসের হাত থেকে রেহাই পেতে পারে সে
তাহলে। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সােহাগী।
“যা বাটি নিয়ে চলে যা।” ফুটো কলাইকরা বাটিটা বদলে
নেয় ওরা,—বিশ্বনাথ বলে, “আর শাে-রােজগার ঠিক মত
হলে খাওয়ার বরাদ্দ কমবে। এখানে এসে খালি খালি
গুজগুজ করা বের করব তাের।”
একটি লােক এসে পড়ায় হঠাৎ তার খেয়াল হয়, সে
ভদ্রবেশী পথচারী, সামনে যুবতী ভিখারী মেয়ে। অন্য পথিকের
চোখে অবস্থাটা বিসদৃশ লাগবারই কথা। তাড়াতাড়ি পয়সা
বের করতে গিয়ে একটা আনিই ছুড়ে দেয় সে সােহাগীর
দিকে। তারপর চট করে মােড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
কিন্তু কাজের কি আর শেষ আছে? সারাদিন বিশ্বনাথকে
কাজের হিসেব নিয়ে বেড়াতে হয়। খুশী মনে নিজের ডেরায়
ফিরে গিয়ে যে একটু দিবাস্বপ্ন দেখবে সে উপায় রাখেনি বরাত।
ভাদ্র মাসের নাের অসহ্য হয়ে উঠছে। তবু তারি মাঝেই
ছাতা মাথায় ঘুরে ঘুরে তদারক করে বেড়াচ্ছে বিশ্বনাথ। সর্বাঙ্গ
ঘামে ভিজে গেছে তার। মুখচোখ হয়ে উঠেছে দমফাটা রকম
সালের সাত রং
লাল। নাঃ, আর পারা যায় না। সােহাগীটা না থাকলে কি
যে করত, ভেবেই পায় না। দুর থেকে সে রােজ দেখতে পায়
সােহাগীর মুখটা তামাটে হয়ে উঠছে। ফণা-বাঁকানাে কটা
চুলগুলাে শুনাে হাওয়ায় উড়ছে। কেমন একটা মমতা হয়
বিশ্বনাথের। মেয়েটাকে কি একটু সুখও দিতে পারা যায় না?
ঘেঙিয়ে চলেছে সােহাগী দুটো পয়সার জন্য চোখ বুজে
একটানা সুরে। মানুষগুলাের কি দয়ামায়া নেই? সামনের
পানের দোকানে দাড়িয়ে একটি বাবু হাসতে থাকে সােহাগীর
দিকে চেয়ে। রক্তটা গরম হয়ে ওঠে বিশ্বনাথের। পর মুহূর্তেই
দেখতে পায় বিশ্রী রসিকতার সঙ্গে একটা আনি ঠিকরে আসে
সেদিক থেকে। চোখ খুলে এক গাল হেসে আনিটা কুড়িয়ে নেয়
সােহাগী। সত্যি সত্যি এবার রীতিমত জ্বালা অনুভব করতে
থাকে বিশ্বনাথ। কিন্তু কিই বা করতে পারে সে? এদের
হাত থেকে সােহাগীকে রক্ষা করতে গেলে একমাত্র যা উপায়
তা অসম্ভব। পালিয়ে গিয়ে মালিকের শেনচোখকে ফাঁকি
দেওয়া আরও অসম্ভব। অথচ এখানে থাকলে যে আর কিছুদিন
পরেই মালিকের অন্য ব্যবসাতে চালান যাবে সােহাগী, এ
কথাও স্পষ্টই জেনেছে সে বনওয়ারীলালের কাছ থেকে।
না, তার আগেই বাঁচাতে হবে মেয়েটাকে। মনে মনে স্থির করে
ফেলে বিশ্বনাথ। আজকের ভেতরই শেষ করবে সব ভাবনার।
একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। একটা মােটরের হনে স্বপ্ন
তার ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এদিকে ফিরে তাকিয়ে দেখে
সালের সাত রং
চোরের মত খোঁড়া এগিয়ে আসছে সােহাগীর দিকে এপাশে
ওপাশে তাকাতে তাকাতে। “হারামজাদা বড় বাড়িয়েছে
দেখছি।” ছিটকে এগিয়ে যায় বিশ্বনাথ সেইদিকে, রাস্তায়
যানবাহনকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনে না যেন।
একটা ছােট্ট ঠেলা দেয় সােহাগী কি একটা কথায় খোঁড়াকে,
আর সঙ্গে সঙ্গে খোড়াও দিল তার গালে একটা ঠোনা।
জীবনে কখনও এদের গায়ে হাত তােলে নি বিশ্বনাথ। কিন্তু
আর পারল না। মাথার সমস্ত রক্ত যেন বারুদের মত ফেটে
পড়বে তার। প্রায় দৌড়ে এসে খোঁড়ার হাতটা সজোরে মুচড়ে
দিল বিশ্বনাথ।
তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করে উঠলাে খোঁড়া। হাতটা ঝাঁকিয়ে
ঝাঁকিয়ে অদ্ভুত ভাবে এক পায়ে লাফাতে লাগল লেজ মাড়ানাে
কুকুরের মত।
“কেমন? আর আসবি? মজা পেয়েছিস না? বিশবার
বারণ করলেও শােনা হয় না। মস করতে এসেছেন-রস।”
আবার একটা চড় কসালাে সে। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে পেছু
হটে চললল খোড়া। “আর তুইও ঠিক তেমনি হারামজাদী,
কতদিন বলেছি না তােকে?” হাত ধরে টান দেয় সােহাগীর।
“দাড়া মালিককে বলে তাের কি করি দ্যাখ। চল বাসায়।
বিশ্বনাথ পা বাড়ায়।
রীতিমত ভয় পেয়ে যায় সােহাগী—“হেই বাবু, আমাকে
বকো কেন? ঐ মিসেই তাে”—বিশ্বনাথের লম্বা পায়ের
সকালের সাত রং
তালে চলতে চলতে একটানা কৈফিয়ৎ দিয়ে যায় সে।
লম্বা সড়কটা পার হয়ে তারা সােহাগীদের খুপরিটাতে
ঢুকলে এসে। বস্তিটা প্রায় খালি। সকলেই দুপুরের কাজে
বা ভিক্ষয় বেরিয়েছে।
“দরজা বন্ধ করে দে।” ধমক দিল বিশ্বনাথ, “ন্যাকামাে
বাড়ছে দিন দিন না ?” এদিক ওদিক চেয়ে মনের খুতখুতি চাপা
দিয়ে অগত্যা নােংরা মেঝেতেই গা এলাতে যায় সে।
“বাঃ-তুমি।” বিশ্বনাথের বর্তমান অবস্থা ও অবস্থানকে
যেন বিশ্বাস করতে পারে না সােহাগী ।
“এক্ষুনি যাবার জন্য এতটা পথ এলুম?” খেকিয়ে উঠলো
বিশ্বনাথ। তারপর নিজেই পা দিয়ে দরজার পাল্লা দুটো জোড়া
লাগিয়ে দেয়, আর সঙ্গে সঙ্গেই দু হাতে বুকে জড়ায় সােহাগীর
পাতলা দেহ। বহুদিনের অতৃপ্ত ক্ষুধা আজ যেন আস্ত মেয়েটিকেই
গ্রাস করবার জন্য মরীয়া হয়ে ওঠে। মুচড়ে, দুমড়ে একাকার
করে দিতে ইচ্ছে করে সােহাগীকে।
“ছাড়াে বাবু লাগে।” প্রায় কেঁদে ফেলল সােহাগী এই
অভাবনীয় ব্যাপারে।
“থাম্।” বিশ্বনাথ ফিসফিসিয়ে বলল, “তাের ভাল লাগে
না আমাকে? চল না আমরা দুজনে গিয়ে ঘর বাঁধি। তােকেও
আর ভিক্ষে করতে হবে না। কেমন রাজি তাে?”
সকালের সাত রং
.
বুঝতে পারে না সােহাগী, এ সুখ না শাস্তি। জড়িয়ে
জড়িয়ে উচ্চারণ করে, “আমরা ছােটনােক—গরীব-ভিকিরী-
“সে তােকে ভাবতে হবে না। তুই যাবি কিনা বল?” দু-
হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল বিশ্বনাথ। “সারাজীবন তত
এভাবে কাটবে না সােহাগী। একা একা থাকলে মন্দ লােকের
খপ্পরে তােকে পড়তেই হবে। আমাকে তাের বিশ্বাস হয় না,
বুঝি ?”
বােকার মত চেয়ে থাকে সােহাগী। পাগলের মত কি সক
যা তা বছে বাবু। তাকে বাবুর এত দরকার?
“চল আমরা দুজনে গিয়ে ঘর বাঁধি। তােকেও আর ভিক্ষে
করে খেতে হবে না, আমারও ভাল লাগে না এ জীবন।
বুঝলি?” আবার বলে বিশ্বনাথ।
ঘাড় নাড়ে সােহাগী। সবই বুঝেছে সে। এই দুপুর রােদে
তাকে আর ঘেঙাতে হবে না। গেরস্থ ঘরের বৌ-ঝির মত
থাকতে পারবে, এত সােজা কথা বুঝতে ভিখারীদের দেরি
হওয়ার কথা নয়।
আশ্বস্ত হয় বিশ্বনাথ। তারপর চলে তাদের আরাে অনেক
আলাপ, প্রায় একতরফা। ভবিষ্যৎ জীবনটা কথায় কথায় তাদের
বর্তমান উপস্থিতির মতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যে নাগাদ বিশ্বনাথ বেরিয়ে এল সােহাগীর ঘর থেকে।
১২
সকালে সাত রং
কেমন যেন উদভ্রান্ত দেখাচ্ছে তাকে। আস্তে আস্তে পা ফেলছে
সে, একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে তার মন ভরে উঠেছে যেন।
নিজের কাছেই তার নিজের দাম বেড়ে গেছে।
বড় রাস্তায় এসে চলবার গতি বাড়িয়ে দিতে হয়। এখন
যেতে হবে আবার সব ভিখারীদের জড়ো করে আনতে। কিন্তু
আজ আর তার বিরক্তি লাগছে না। আর ক’দিনই বা। নিজের
মত করে জীবন শুরু করবার আগে এই অসহায় ভিখারীদের
ওপর কেমন মায়াই অনুভব করছে সে যেন। এদের প্রতি নিজের
দুর্ব্যবহার ও অবিচারের কথা স্মরণ করতে গিয়ে আজ সবার
আগে মনে আসে খোড়ার কথা। আহা অতটা জোরে
হাতখানা না মােচড়ালেই চলত। তারই খোঁজ আগে নেবার
জন্যে তাগিদ বােধ করে বিশ্বনাথ।
কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না খোঁড়াকে। গেল কোথায়
লােকটা? লাগেনি বােধ হয় বেশি। আর লাগলেই বা সে
কী করতে পারে। সােহাগীর সঙ্গে ভাব জমাতে না এলেই
পারত। নিজের কৃতকর্মের জন্য একটু সাজা তার পেতে হবে
বৈকি।
কাজ শেষ করে বস্তিতে ফিরে আসতে বেশ একটু রাত
হয়ে গেল বিশ্বনাথের। বাচ্চা একটি ছেলে মায়ের কোলে
সন্ধ্যে থেকে ঘেঙাতে শুরু করেছে, হরেক কোলাহলের মধ্যে
সেই শব্দটাই বিরক্তিকর লাগে।
“থামা তাের ছেলেকে।” বিরক্ত হয়ে পথচলতি ধমক ছড়িয়ে
সকালের সাত রং যায় বিশ্বনাথ। এই সব ক্লেদাক্ত আবহাওয়ায় আর যে তাকে থাকতে হবে না এইটেই ভরসা। চোখের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। পায়ের নীচে নােংরা গলি। চলতে চলতে সােহাগীর ঘরের দরজার সামনে এসে থমকে দাড়ালাে বিশ্বনাথ। দরজাটা ঈষৎ ফাক। দূরের গ্যাসের আলােয় ছােট খুপরিতে মানুষের অস্তিত্ব বােঝা যায়। সােহাগীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে রয়েছে-ও কে ? খোঁড়া না? বিশ্ব- নাথ চোখের জ্যোতি তীব্র করবার চেষ্টা করে। কিন্তু সামনের দৃশ্যে ভুল দেখবার কোন ফঁাকই যে নেই। আরামে চোখ বুজে শুয়ে রয়েছে খোঁড়া, আর তার মােচড়ান বাহুতে হাত বােলাতে বােলাতে অনর্গল বকে চলেছে সােহাগী। মাঝখানে একটা কথা তীরের মত ছুটে এসে বিধে যায় তার কানে। “চল দুজনে ঘর বাঁধি। আর ভাল লাগে না এ বিত্তি।” ঠিক এই প্রস্তাবই কি একটু আগে সােহাগীকে সে নিজে জানায় নি “শালার জাত যাবে কোথায় ?” দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে উচ্চারণ করে বিশ্বনাথ। তারপর হাতের আধপােড়া বিড়িটার দিকে নজর পড়ায় মাটিতে ছুড়ে ফেলে পা দিয়ে পিষতে থাকে। ?
পুননবা
ট্রেন প্লাটফরম ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে লােকটি দরজা ঠেলে
কামরায় ঢুকল, তাকে দেখে অবাক না হয়ে পারল না স্বর্ণলতা।
ভুল হবার নয়। তেমনিই আছে। বয়সের কোন ছাপই পড়েনি,
কেবল চুলের রং একটু ফিকে হয়েছে যেন।
‘একি!’ তার মুখ দিয়ে কথাটা যেন বেরিয়ে যায়। তারপর
যেন নিজের মনেই আস্তে আস্তে উচ্চারণ করে, “সমরেশ।”
পা দিয়ে দরজাটা ঠেলে বন্ধ করে সিগারেটে আগুন ধরাতে
-ধরাতে উত্তর দিল সমরেশ, “তাই তাে মনে হচ্ছে।”
স্বর্ণলতাকে দেখে সে কি নিজেও অবাক হয়নি ?
গায়ের চাদরটা ভাল করে জড়িয়ে নিল স্বর্ণলতা। “এখান
থেকে হঠাৎ ?” সহজ হবার চেষ্টা করে স্বর্ণলতা।
“বসতে পারি ?” কথার উত্তর না দিয়ে সমরেশ বলল।
ছড়ানাে পা দুটি গুটিয়ে নিয়ে সমরেশকে বসবার জায়গা
করে দিয়ে মৃদু গলায় বলল স্বর্ণলতা, “নিশ্চয়ই।”
“তার পর?” দীর্ঘ একটা ঘােয়ার রিং ছাড়ল সমরেশ, “খবর
কি ?”
ও পাশের বার্থে এক অবাঙালী ভদ্রলােক ছাড়া আর কেউ
নেই এ কামরায়। তবু তারই দিকে একবার তাকাল স্বর্ণলতা।
“কেমন আছ? বেশ ফর্স। আর মােটা হয়েছ কিন্তু।”
সকালের সাত রং
সিগারেটের ছাই জানালার বাইরে ঝাড়তে ঝাড়তে প্রশ্ন করল
সমরেশ। আর ওর নির্লজ্জতায় মরমে মরে যেতে লাগল
স্বর্ণলতা।
“কতদিন বাদে দেখা, কোন কথাই বলবে না নাকি?”
আবার প্রশ্ন করল সমরেশ।
“দেখা না হলেই তাে ভাল ছিল।” আস্তে আস্তে বলে
স্বর্ণলতা।
“এ্যাকসিডেন্ট। চাইলেই তাে এড়ানাে যায় না সব সময়।
কি আর করবে বল ?”
“এখান থেকে হঠাৎ উঠলে যে ?” তার আগেকার প্রশ্নটির
পুনরাবৃত্তি করে স্বর্ণলতা।
“কারণ এ স্থলেই অধীনে থাকা হয়।”
“এই পাণ্ডববর্জিত দেশে তােমার মত লােক থাকতে
পারে ?” সহজ হবার চেষ্টা করে স্বর্ণলতা।
সমরেশকে দেখা অবধি তার বুকের হৃৎস্পন্দন যে ভাবে
দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছিল, তার মুখের রক্তোচ্ছ্বাসে কি তার
কোন আভাসই ছিল না ?
“আমার মত লােকেরই তাে এমন জায়গায় থাকা উচিত।
কি বল ? লােকালয়ে বাস করার মত ভদ্ৰতা আমার আছে?”
আর একবার স্তম্ভিত হয়ে যায় স্বর্ণলতা। এ কথা নিয়ে
পরিহাস করতে পারার মত মানুষও হয়। ও কি সবই
ভুলেছে। সমরেশের নির্লজ্জতায় যেন নিজেই লজ্জা পায়
সকানের সাত রং স্বর্ণলতা। ভাৰ গােপন করতে গিয়ে মুখটা জানালার দিকে ফিরিয়ে নেয় সে। কিন্তু সমস্ত মুখটা তার লাল হয়ে যায়। “কী হল?” সমরেশ হাসি হাসি ভাবটা বজায় রাখে। কিন্তু স্বর্ণলতার মুখ দেখে হাসতে গিয়েও থেমে যায়। সে বলে “না, তুমি ঠিক তেমনি আছ দেখছি। অল্পতেই চটে যাও। এবার সিরিয়াসলি বলছি, তােমার খবর বল।” “খবর আর কি? চলে যাচ্ছে।” নির্বিকার ভাবটা যেন বজায় রাখবার চেষ্টা করে স্বর্ণলতা। “চলে তাে যাবেই। আমারও যাচ্ছে, তােমারও যাবে। তবুও জ্ঞাতব্য কিছু তাে থাকে।” “কিছুই না” “তাহলে ওল্ড মিস স্বর্ণলতা সেনই আছ ?” “সমরেশ।” প্রায় ধমক দেয় স্বর্ণলতা। “কি হল?” হঠাৎ অবাক হয় সমরেশ। “কিছু না।”—কোলের বইখানা তুলে নেয় স্বর্ণলতা। ওপাশের ভদ্রলােক তার বার্থ থেকে পা নামিয়ে বসে সােজা তাকান ওদের দিকে। তার দিকে একবার দেখে নেয় সমরেশ, তারপর ভারী গলায় ডাকে, “লতা।” “প্লীজ-” য় আর্তনাদ করে ওঠে স্বর্ণলতা। “শােন আমার কথা তােমার শােনা প্রয়ােজন, আমার অপরাধ-
সকালের সাত রং
“না।” ততক্ষণে সামলে নিয়েছে নিজেকে স্বর্ণলতা।
“কোন প্রয়ােজন নেই। আর অপরাধই বা কিসের?”
“কিসের তা তুমি ভালই জান।”
জানে বৈকি। দীর্ঘ সতের বছর ধরে তিল তিল করে এ
কথাটাই কি সে মর্মে মর্মে জানছে না? কিসের জন্য আজ
তাকে সুদূর পশ্চিমে থাকতে হচ্ছে? শুধু কলকাতা নয়, বাংলা
দেশেও থাকা তার পক্ষে সম্ভব হল না। সে আজ কতদিন। এক
যুগ নয় ?
“লতা।” আবার ডাকে সমরেশ। কোন উত্তর দেওয়া
প্রয়ােজন বােধ করে না স্বর্ণলতা। বই-এর পাতা উল্টে পড়া
সমরেশ আবার বলে—“সত্যি লতা, কি রকম বদলে গেই
তুমি। অতীতকে একেবারে মুছে ফেলেছ নাকি?”
অতীতকে মােছর সাধ্য যদি থাকত তাহলে তাকে মুছেই
ফেলত লতা। কিন্তু ক্লাস পালিয়ে গঙ্গার ধারে আর বােটা-
নিসে বেড়ানাে দিনগুলাে, বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় তাদের দোতলার
ঝুল বারান্দায় একসঙ্গে কবিতা পড়া, কোন তুচ্ছ ক্ষণের কথাই
কি সে ভুলতে পেরেছে ? ভুলতে সে চেয়েছে, ভেবেছে এই
দীর্ঘ সতের বছরে অনেক কিছুই সে ভুলেছে; কিন্তু আজ
সমরেশকে দেখে সে নিঃসংশয়ে বুঝেছে, অতীতের মুহুতটুকুও
ভােলা তার দ্বারা সম্ভব হয়নি।
পাশাপাশি বাড়ীতে নয়, এক পাড়াতেও নয়। একেবারে
১৮
সকালের সাত রং
দুই প্রান্তের বাসিন্দা তারা, টালিগঞ্জ আর শ্যামবাজার। তবু দুটি
সমান্তরাল রেখার মত তারা চলতে পারল না। মিলতে হল
কোনাে এক সময়ে। সে আজ কতদিন।
প্রথম প্রথম যখন তারা অত ঘনিষ্ঠ হয়নি, তখনই সমরেশের
নামে তার বান্ধবীদের কাছে কত কথা শুনত। সে নাকি বড়-
লােকের চালিয়াৎ ছেলে। একেবারে মাকাল ফল। জীবনকে
তারা নাকি রূপ আর টাকা দিয়েই চেনে। কিন্তু কোনদিনই
বিশ্বাস করেনি সে কথা স্বর্ণলতা। সমরেশ-সমরেশই। হতে
পারে স্বর্ণলতা কালাে। কিন্তু এমনও তাে দেখা যায় যে কালাে
কুরূপ মেয়েকে তার অতি সুপুরুষ বিত্তবান স্বামী অসম্ভব
ভালবাসে। তবে তারও যে হবে না, সমরেশের মত দুর্লভ
রূপবান ছেলে যে তাকেও পছন্দ করবে না, এরকম মনে হওয়ার
কি কারণ থাকতে পারে? আসলে এ সমস্তই ঈর্ষা। মনে মনে
ভেবেছিল স্বর্ণলতা। আর ততই তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে মিশে-
ছিল স্বর্ণলতা সমরেশের সঙ্গে।
কৗ ভাবছ ?”
“কিছু না।” জানলার বাইরেই তাকিয়ে রইল স্বর্ণলতা।
“চোখে কয়লা পড়তে পারে।” স্বর্ণলতার কোলে-রাখা
বইটা তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল সমরেশ।
কোন উত্তর না দিয়ে দূর দিগন্তে তাকিয়ে রইল স্বর্ণলতা।
আর মনে মনে ভাবল, কি অদ্ভুত সহজ হতে পেরেছে সমরেশ।
নিঃশেষে সব কিছু ভুলেছে। অথচ সেই দিনটির কথা কি সে
কালের সাভ
*
নিজে কোন দিন ভুলতে পারবে?
রাত হয়ে গেছে। উত্তর কলকাতার একটা গানের জলস
থেকে বাড়ী ফিরছিল সে আর তার বান্ধবী উমা। বাসের জন্য
বহুক্ষণ দাঁড়াতে হচ্ছিল। হঠাৎ বড় কালাে গাড়ীটা পাশে
আসতেই চমকে উঠেছিল তারা।
কোথায় যাচ্ছেন ?”
সজোরে একটা চিমটি কেটে উমা তাকে ফিসফিসিয়ে
বলেছিল, “তাের মালঞ্চের মালাকর।”
“যাঃ।” সলজ্জ একটা ঠেলা দিয়েছিল স্বর্ণলতা। ততক্ষণে
গাড়ীটা থেমেছে। হাত বাড়িয়ে পিছনের দরজাটা খুলে দিয়ে
সমরেশ তাদের আহ্বান জানাল, “আসুন না পোঁছে দিই। ট্রামে-
বাসে যা ভিড়। ফিরতে কষ্ট হবে।”
“ও আমাদের অভ্যাস আছে।” উমা বলেছিল, “তাছাড়া
আপনি কেন মিছিমিছি অতদুর কষ্ট করে যাবেন?”
“মিছিমিছি কষ্ট? মনস্তত্ত্বে জ্ঞান তত আপনাদের বেশ
পাকা দেখছি।” হেসে উঠেছিল সমরেশ-“নিন, রাস্তায়
দাড়িয়ে আর বেশী দেরি করবেন না। ভেতরে আসুন।”
উমাকে তার চৌরঙ্গী টোসের ফ্ল্যাটে ছেড়ে দিয়ে গাড়ী
যখন হরিশ মুখার্জি রােডে এল, হঠাৎ গাড়ীর মুখ ঘােরাল
সমরেশ।
“মিস সেন, আপনার ফিরতে দেরি হলে বিশেষ অসুবিধা
হবে?”
সালের সাত রং দেরির আর বাকী কি? ভেবেছিল স্বর্ণলতা। তবু এ সন্ধ্যাটা এমনভাবে এখানেই শেষ করতে তার সত্যিই ইচ্ছে করছিল না। নীচু গলায় জিজ্ঞেস করল স্বর্ণলতা, প্রায় ফিস- ফিসিয়ে বলার মত, “কেন?” “তাহলে একটু গঙ্গার ধারটা ঘুরে যেতাম।”—অবশ্য গাড়ী ততক্ষণে গঙ্গার দিকে বেশ কিছুটা এগিয়েছে। “পিছনে বসে থাকলে কারও সঙ্গে কথা বলা যায় না। সামনে আসতে আপত্তি আছে?” “আপত্তি। না আপত্তি আর কি ? কিন্তু আমি বেশী দেরি করব না। পিসীমা বকবেন।” গাড়ী একটু থামলে সামনে এসে বসতে বসতে বলল স্বর্ণলতা। আর কোন উত্তর না দিয়ে ঝুঁকে পড়ে গাড়ীর দরজা বন্ধ করল সমরেশ। গঙ্গার ধার দিয়ে পীচঢালা মসৃণ চওড়া যে রাস্তাটা কুমারীর সাদা সি থির মত চলে গিয়েছে, সেখানে এসে গাড়ীর গতি মহর করল সমরেশ। “মিস সেন।” ভারী গলায় ডাক এল সমরেশের কাছ থেকে। ভীরু পাখীর মত কাপছিল স্বর্ণলতার বুক। আজ এক বছর কি এমন দিনেরই সে প্রতীক্ষা করছিল না। কিন্তু সাহসটা বােধ হয় বড় বেশী হচ্ছে। কি বলবে ভেবে পেল না। “সত্যি মিস সেন, স্বপ্নেও ভাবিনি আমার এ সৌভাগ্য হবে। আপনি কি যেন বলতে গিয়ে থামল সমরেশ।
সকালের সাত রং
স্বর্ণলতা টের পায়, বুঝতে পারে কী বলতে চায় সমরেশ।
ওর নিজের গলাটাও যেন আবেগে আটকে আছে। কোন
কথা বলতে বুঝি ভাল লাগছে না। খালি চুপ করে থাকা,
খালি প্রাণ ভরে উপলব্ধি করা।
“আপনার সেদিনের রেসিটেশনটা সত্যি অপূর্ব হয়েছিল।”
বাস্তব জগতে ফিরে এল স্বর্ণলতা সমরেশের কথায়।
“আহা।” মৃদুগলায় প্রতিবাদ করে স্বর্ণলতা।
“সত্যি আমি ভাবতেও পারিনি, কোন মহিলার মুখ থেকে
এ রকম জোরালাে স্পষ্ট উচ্চারণের সঙ্গে কবিতা শােনা যেতে
পারে। বিশেষ করে আপনাকে দেখলে তােবােঝাই যায় না
এমন শান্ত লাজুক চেহারা আপনার।”
“মহিলারা বুঝি কেবল নরম করেই কথা বলেন। এ
আপনার ভুল ধারণা।” এতক্ষণে নিজেকে যেন ফিরে পায়
স্বর্ণলতা, “আমি এ কথার প্রতিবাদ করছি।”
“প্লিজ মিস সেন। আজকের সন্ধ্যাটুকু আর বিতর্ক করে
নষ্ট করবেন না।” একহাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্যহাতে ঈষৎ চাপ
দিয়েছিল সমরেশ স্বর্ণলতার কাঁধে, আর সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণলতা
বুঝেছিল, সে মরেছে। শিউরে উঠেছিল সে।
দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল স্বর্ণলতা। তার মন যে
এত বেশী প্রস্তুত ছিল, সে নিজেও জানত না। বন্ধ দরজা যেন
অল্প একটু টোকার অপেক্ষা করছে।
“স্বর্ণলতা
ভারী গলায় টেনে টেনে বলেছিল
দেবী।”
সকালের সাত রং
বার্থের ভদ্রলােকটি যে নেমে যাবেন তা কে জানত। আবার
যখন ট্রেন চলতে সুরু করল তখন স্বর্ণলতা রীতিমত অস্বস্তি
বােধ করতে লাগল।
“যদি চা-টা তৈরী করে দাও।” ট্রেটা স্বর্ণলতার দিকে ঠেলে
দিল সমরেশ। “এসব নিজে করে খাওয়ার অভ্যেসটা এখনও
আয়ত্ত করতে পারিনি।”
চা তৈরী করে দেবার লােকের অভাব বােধকরি নেই,
স্বর্ণলতা ভাবল। কিন্তু প্রশ্ন করে কথা বাড়াবার ইচ্ছে তার
ছিল না।
এক কাপ চা ঢেলে সমরেশের দিকে কাপটা এগিয়ে দিল
অণলতা। তারপর হাত গুটিয়ে আবার পাশ ফিরে জানলার
বাইরে মুখ ফিরিয়ে বসল সে।
“ওকি তুমি নিলে না?” সত্যিই অবাক হল সমরেশ।
“আমি তাে বলেছি, চা খাই না।”
“না লতা, তা হবে না। একসঙ্গে চা খাব বলেই তাে
নিলাম।”
“সমরেশ, দোহাই তােমার, অত ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা কর না।”
রীতিমত লাল হয়ে গেল সমরেশের ফস। টুকটুকে মুখ।
কাপ থেকে খানিকটা চা তার দামী ট্রাউজারে পড়ে গেল।
ট্রেনের গতি তখন খুব বেড়ে গিয়েছে।
নিজের ভেতর ডুবে গেল স্বণলতা।
ঘনিষ্ঠ হবার প্রয়ােজন এখন ফুরিয়েছে। খুব বেশী রকমের
সকালের সাত রং
ঘনিষ্ঠই কি হয়নি তারা এককালে ?
যেদিন অনেক রাত হয়ে গেল বলে তাদের বাড়ীর একটি
ঘরে রাতের মত সমরেশকে থেকে যেতে বললেন পিসীমা, সেদিন
কি বৃষ্টি। সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টিতে রাস্তায় রীতিমত জল দাড়িয়ে
গেছে, ওদের সে খেয়ালও ছিল না। বাইরের ঘরে তার বাবার
মক্কেলরাও সব চলে গেছে। শুধু দুরূহ কোন আইনের কৌশল
জেনে নেবার জন্য তার বাবা মােটা মােটা বই-এর পাতা উল্টে
চলেছেন।
“সমরেশ, বড্ড বৃষ্টি বাবা! কি করে যাবে? গাড়ীও
তােমার চলবে না। আমাদের এই গলিটায় বড় জল জমে।”
এসে বলেছিলেন পিসীমা।
তাছাড়া টালিগঞ্জের ব্রীজটার তলায় এত জল জমে যে
কোন মতেই পেরােতে পারব না। কি করি বলুন তো পিসীমা ?
এত রাত হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।”
“এক কাজ কর তাহলে। আজ এখানেই থেকে যাও।
লতুর বাবাও তাই বলছিলেন।”
ভীষণ খুশি হয়েছিল স্বর্ণলতা। কিন্তু স্বপ্নেও কি সে
ভেবেছিল দু’খানা মেঘেই বাজপােরা ছিল ?
বর্ষার ঝিমঝিম শব্দে ঘুম আসছিল না সেদিন। কিছুতেই
ভুলতে পারছিল না স্বর্ণলতা যে আজ সমরেশ তাদেরই বাড়ীতে।
বারান্দার ওপাশে সামান্য পথটুকু শুধু। কান ঝাঁ ঝাঁ করছিল।
উঠে সে হাতে মুখে জল দিল।
সকালের সাত রং নীচে ঝি-চাকরদের জটলা তখনও শেষ হয়নি। জানলা খুলে দিতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা ভেজা হাওয়া ঘরে ঢুকল আর অন্ধকারে সাপের গায়ে পা দেওয়ার মত শিউরে উঠল স্বর্ণলতা। দরজায় টোকার শব্দ শুনে ধড়মড়িয়ে বিছানার ওপর উঠে বসল। “কে?” “আমি গাে।” মতির মা। দেখতে এসেছে ঘরের জানলা-দরজা বন্ধ আছে -কিনা। রাত বাড়ল। কে যেন ডাকছে না ? “কে?”—আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল স্বর্ণলতা। সে কি স্থির জেনেছিল এ মতির মা নয় ? “আমি-দরজা খােল।” একটু ইতস্ততঃ করে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাড়াল স্বর্ণলতা। তার হাত-পা তখন কঁপছে। “ভিজে যাচ্ছি লতা। দরজা খােল।” চিন্তা করবার শক্তিটুকুও বুঝি স্বর্ণলতা হারিয়েছে। তা না হলে তার হাত খিলের কাছে যাবে কেন ? একটা স্টেশনে ট্রেনটা শব্দ করে থামতেই স্বর্ণলতা সম্বিত ফিরে পেল। সমরেশের দিকে তাকিয়ে দেখল সেও যেন অন্য- মনে কী ভাবছে। স্বলতা তার হাতের বইয়ে সেই একই খােলাপাতায় চোখ ফেরাল আবার।
সকালের সাত রং
তারা এগিয়েছিল অনেক দূর, নিশ্চিত পরিণতি জেনেই।
আর লতা তার অনেক আগেই জেনেছিল এ থেকে তার
অব্যাহতি নেই।
পিসীমাই কথাটা পেড়েছিলেন সমরেশের কাছে। কিন্তু
সমরেশ যেন অবাক হয়েছিল সব থেকে বেশী।
“সে তাে আমি জানিই পিসীমা। কিন্তু আমাকে আগে
নিজের পায়ে দাড়াতে দিন।”
“তােমরা বড়লােকের ছেলে বাবা। তােমাদের অভাব
কিসের ? তুমি রােজগার না করলে তােমার বৌ কি খেতে
পাবে না ?”
“খেতে পাওয়াই তাে সব নয় পিসীমা। লতাকে তার যােগ্য
সম্মান দিয়ে নিয়ে যেতে চাই।”
“সে তত ভাল কথাই। বাধাটা কিসের ?”
বাধা আর কিছুই নয়। এখন যদি আমি বিয়ে করি,
তাহলে আমার সব কেরিয়ার মাটি হয়ে যাবে। আমার বিলেত
যাওয়ার যে সবই ঠিক হয়ে গেছে।”
মনে মনে আর্তনাদ করে উঠেছিল স্বর্ণলতা।
“সে কি বাবা।” পিসীমা তবু হাল ছাড়েন নি, “বেশ ত,
বিলেত যেতে চাও, তা বিয়ে করে যাও না!”
“তা হয় না পিসীমা। বাবা-মা কারও মত নেই। আমি
তাদের বলেছিলাম।”
“সমরেশ।” পিসীমার গলায় অন্য সুর। “এসব কথা
সকালের সাত রং
আগে ভাবতে হয়। তােমার মত শিক্ষিত ছেলের এই ব্যবহার ?
কিন্তু লতুকে বৌ করায় তােমার বাবার আপত্তিটা কিসের
শুনি?”
“পিসীমা!” পিসীমাকে চুপ করাতে চেয়েছিল স্বলতা।
‘তুই ছাড় লতু।—না, তােমায় বলতেই হবে সমরেশ।
এসব ছেলেখেলা করবার বয়স তত তােমার আর নেই।”
“আমি তো বলছি, বিলেত থেকে ফিরে নিজের পায়ে
দাড়িয়ে তবে বিয়ে করব।”
“আর তােমার এই মুখের কথায় নির্ভর করে লতু আমার
অপেক্ষা করে থাকবে ততদিন, কি বল ? কবে তুমি এসে ওকে
গ্রহণ করে ধন্য করবে, তাই না?”
“কি করব বলুন? বাবা বড় ঘরের সুন্দরী মেয়ে চান।
কালাে বৌ ঘরে আনবেন না।” সমরেশের নির্লজ্জতায় মরে
গিয়েছিল স্বণলতা। তার চোখের সামনে দমকা হাওয়ার
ঝাপটে যেন একটা রঙিন পর্দা খসে পড়েছিল, আর সেই
নিরাবরণ বাস্তবে আসল সমরেশকে স্পষ্ট দেখতে পেল সে।
কানে এল, পিসীমা তবু জিজ্ঞাসা করছেন—“আর তাঁর
বাধ্য ছেলে। তারও নিশ্চয়ই ঐ মত।”
সমরেশ চুপ করে থেকেছিল। আর স্বর্ণলতা খাটের
রাজুটাকেই আঁকড়ে ধরে নিজের শরীরটাকে খাড়া রেখেছিল।
“সমরেশ। আর এক মুহুর্তও তুমি এখানে থেকো না।
তােমার মত লােকের গলায় মালা দেওয়ার চেয়ে লতু আমার
সকালের সাত রং
মরা ভাল। তুমি যাও।”
জ্ঞান হারাবার আগেই স্বণলতার শিথিল দেহ পিসীমাই
ধরে ফেলেছিলেন।
কিন্তু কথাটা প্রকাশ পেয়েছিল তারও অনেক পরে।
সমরেশ বিলেত চলে যাওয়ার তিনমাস বাদে।
“কি হবে হতভাগী ?” পিসীমা কপালে করাঘাত করেছিলেন।
কোন উত্তর দেয়নি স্বর্ণলতা। আর দেবার ছিলই বা কি?
পরিপুর্ণ আত্মসমর্পনের আগে কি তার ভাবা উচিত ছিল না?
“সমরেশকে আমি লিখি। এ কথা জানলে সে ফিরে
আসবে। তার দায়িত্ব তাে আছে।”
কিন্তু স্বর্ণলতার প্রবল বাধায় সে প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত
কার্যকরী হয়নি। পাকে পড়ে বাধ্য হয়ে তাকে গ্রহণ করার
কোন মূল্য নেই। তাহলে নিজেকেও সে জীবনে ক্ষমা করতে
পারবে না।
অসময়ে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিল স্বর্ণলতা সুদূর
পশ্চিমের এক গ্রামে। সে মেয়ে বেঁচেছিল মাত্র দু’ঘণ্টা। আর
তার দুমাস বাদেই ফিরে এসেছিল স্বণলতা তাদের কলকাতার
বাড়ীতে।
কিন্তু এই অভাবনীয় ব্যাপারে বাবা এত ভেঙে পড়েছিলেন
যে বছর খানেকের ভেতরেই তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল। ভাবলেও
কেঁপে ওঠে স্বর্ণলতা।
দু-তিনটে স্টেশন পার হয়ে গেছে কখন খেয়াল হয়নি
সকালের সাত রং
ঘণলতার।
সমরেশ যেন অন্য জগতে আছে। তার সিগারেট
খাওয়াও বন্ধ হয়েছে। কিছুক্ষণ আগের অপমানটা সে ভুলতে
পারছে না বােধ হয়।
গাড়ী যখন গাজিয়াবাদ স্টেশনে আসল, তখন চা-এর
সরঞ্জাম ফেরৎ নিতে এল বেয়ারা। তাকে দাম মিটিয়ে দিয়ে উঠে
দাড়াল সমরেশ। স্বর্ণলতা তার সুটকেসটা বার্থের তলা থেকে
টেনে বার করল।
“স্বর্ণলতা শােন।” প্রায় তার মুখােমুখি দাড়াল সমরেশ।
“আমি অন্য কামরায় যাচ্ছি। তােমাকে আর বিরক্ত করব না।
কিন্তু কিন্তু তার আগে আমার একটি কথার উত্তর তােমায়
দিতে হবে।”
“আমি এই স্টেশনেই নামব।” ওর কথার উত্তর না দিয়ে
উঠে দাড়ায় স্বর্ণলতা।
“গাড়ী অনেকক্ষণ দাড়াবে। ভয় নেই, সময় আছে।”
“কিন্তু আমায় সময় নেই।” শুকননা গলায় জবাব দেয়
স্বলতা।
“সময় নেই বললে হবে কেন স্বণ। তােমার কাছে অপরাধী
হয়েআছি। এতদিন বাদে যদি সুযােগ পেলাম তো ভারমুক্ত
হৰ না?”
“কোন প্রয়ােজন নেই।”
“কিন্তু আমার আছে স্বর্ণলতা। জানি এতদিন বাদে একথা
হে যাওয়ার কোন অর্থ নেই। কিন্তু একটা কথা তােমায়
সকালের সাত রং বিশ্বাস করতে হবে।” আবার বিশ্বাস। “শােন লতা। একথা ঠিক, প্রথমে আমি সত্যিই দায় এড়াবার জন্য পালিয়ে গিয়েছিলাম। পরে যখন ভুল বুঝতে পারলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম জীবনের ও অধ্যায়টুকুকে ভুলে গেছি। কিন্তু আজ তােমাকে দেখে আবার নতুন করে বুঝছি বতবড় ক্ষতি আমার হয়েছে। আর তােমারও যে কি ক্ষতি আমি করেছি লতা, তােমাকে “সমরেশবাবু।” সমস্ত রক্ত যেন স্বর্ণলতার মুখেই এসে গেছে-“আপনাকে জাননাে প্রয়োজনে যে আপনি কোন ভদ্র- মহিলার সঙ্গে কথা বলছেন।” “লতা।” প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে সমরেশ। “লতা নয়। মিসেস স্বর্ণলতা ডেভিড। আর জেনে রাখুন, কোন ক্ষতি আপনি আমার করতে পারেন নি। জগতে মহৎ লােকও দুলভ নয়। আমার স্বামী আমাকে স্টেশনে নিতে এসেছেন। নমস্কার।” চিত্রাপিতের মত পথ ছেড়ে সরে দাড়ায় সমরেশ। আর দরজা খুলে নামবার সময় এক মধ্যবয়সী ভদ্রলােক এগিয়ে এসে স্বণলতার হাত ধরে.তাকে সাহায্য করেন।
সহকার খাবারের ঠোঙাটি হাত থেকে পড়ে গেল অমিতার। “শেষকালে ঘুষ নিলে?” সমস্ত গা ঘিনঘিন করতে লাগল তার স্বামীকে একথা জিজ্ঞেস করতে। “তাছাড়া উপায় কি ?” নির্বিকারভাবে কোটটি আলনায় রাখতে রাখতে বললেন বিপিনবাবু। বেশ খুশিই হয়েছিল সে হঠাৎ খাবার দেখে। এসব আনার অভ্যেস বিপিনবাবুর নেই। খাবার তাে দোকানেই রয়েছে, সেখানে বসে খেলেই যখন ইচ্ছাপূরণ হওয়া সম্ভব তখন মিছি- মিছি মােট বইবার বােকামি আর কেন ? কিন্তু ঘুষের টাকায় কেনা খাবার ? ছিঃ । বয়সের ও স্বভাবের অনেক বেশি তফাৎ থাকা সত্ত্বেও বিপিন- বাবুকে বেশ মেনেই নিয়েছিল অমিতা। স্বভাবতই বিপিনবাবু কড়া মেজাজের লোেক। তাছাড়া অমিতা এও জানে-স্বার্থের খাতিরে না করতে পারেন বিপিনবাবুর কাছে এমন কাজ খুব কমই আছে। তবু শেষকালে তার অর্থ-লালসা যে এমন একটি সর্বনাশের পথ নেবে, এতটা কল্পনা করতেও তার বাধা ছিল। চমক ভাঙল বিপিনবাবুর ধমকে। “ওকি, খাবার ফেলে দিলে কেন ?” ঠোঙাটি এমনিই পড়ে গিয়েছিল নিজের অজান্তে, কিন্তু সেই আকস্মিক ঘটনায় ওপরেই
সকালের সাত রং
নিজের ইচ্ছাকে আরােপ করে অমিতা উত্তর দেয় এবারঃ
“ও খাবার ছেলের মুখে আমি দিতে পারব না।”
“আলবাত দেবে।” দাঁত খিচিয়ে উঠলেন বিপিনবাবু,“বেশী
তেজ হয়েছে, না? হাঁ করে দাড়িয়ে রইলে যে? তিন টাকার
খাবার, সে হুশ আছে? তােমার বাপের বাড়ী থেকে আসেনি
মনে রেখাে।”
স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে অমিতা। এ ব্যবহার তার
কাছে নতুন নয়, কিন্তু প্রতিবারই বাপের বাড়ীর দৈন্যের উল্লেখে
সে স্তম্ভিত না হয়ে পারে না।
“এ বুদ্ধি তােমাকে কে দিলে শুনি?” নিরুপায় হয়ে
খাবারের ঠোঙাটি তুলতে তুলতে নীচু গলায় জিজ্ঞেস করল
অমিতা।
“অন্তত তােমার থেকে তার বুদ্ধিটা কিছু বেশীই মনে হয়ে।”
ক্যাভাসের ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে বললেন বিপিনবাবু।
“আচ্ছা কোন কথার ভাল উত্তর কি জীবনেও পাব না
তােমার কাছ থেকে ?”
“কেমন করে পাবে বল ? আমি তাে আর তােমাদের
প্রগতিবাদী নব্য ছােকরা নই।”
বড় একটি নিঃশ্বাস ঠেলে বেরিয়ে এল অমিতার বুক থেকে।
এ ইঙ্গিতের অর্থ সে বেশ ভালই বােঝে। প্রতিবাদ না করাই
ভাল। আস্তে আস্তে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। এখনও কিছু
কর্তব্য বাকি আছে তার।
সকালের সাত রং
কিছুক্ষণ পরে একটি রেকাবিতে কিছু খাবার নিয়ে অমিতা
ঘরে ঢুকল। খাবারটা টুলে রেখে জল গড়াতে গড়াতে বলে,
“নাও খাও।” তারপর ভাল করে তাকিয়ে দেখে—বিপিনবাবুর
কোলের ওপর একখানা আধখােল। বই, যে বইখানা অমিতা
একটু আগে পড়ছিল।
খাবার দেখে বেশ একগাল হেসে তারিফ করে বিপিনবাবু
বলেন, “নাঃ, তুমি দেখছি একটা কিছু না হয়েই ছাড়বে না।
দেখাে বাপু, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের ভাতটুকু আর মেরাে না।”
“মানে?”
“কার বই এখান? কোলের ওপর থেকে বইখানা তুলে
তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে নিজের অনুমান
জ্ঞাপন করেন তিনি, “বােধ করি তােমার সেই গুরুদেবের ?”
এসব ব্যাপারে তাঁর অনুমান গােয়েন্দা-সিরিজের নায়কের
চাইতেও অভ্রান্ত। দাত দিয়ে ঠোট চেপে একটু ইতস্তত করে
বেশ স্পষ্টভাবেই উত্তর দেয় অমিতা, “হ্যা, নিখিলবাবুই
দিয়েছেন।”
“সে তাে নিশ্চয়ই, নাহলে আর এ হেন রত্ন আমদানি
করবেন কে?” বইখানি সশব্দে টুলের একপাশে রেখে দিয়ে
বিপিনবাবু বলেন, “কিন্তু আমার বাড়িতে এসব প্রগতি-ট্রগতি
চলবে না, এ আমি বলে দিলুম। হু, প্রগতি। এ জন্যেই
শালা বিদুষী বউ ঘরে আনে না বুদ্ধিমানেরা।” অতএব বুদ্ধি-
মামের উপযুক্ত পরিচয়ে ডান হাতের কাজ চালাতে লাগলেন
সকালের সাত রং তিনি। আর খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে চলতে লাগল মন্তব্য, ‘তখনই জানি। অন্ত্যজ ঘরের মেয়ে আনতে নেই। সম্বন্ধই পাততে নেই। মান গেল, সম্ভম গেল, ছেলেটারও যে কি শিক্ষা হবে- ছিঃ।” শেষ রসগােল্লাটি মুখে পুরে ঢকঢক করে একগ্লাস জল নিঃশেষ করে ফেল্লেন বিপিনবাবু। চুপ করে থাকে অমিতা। মানসম্রম আর শিক্ষার ধারণাতেই যখন দুজনের আকাশ-পাতাল পার্থক্য তখন বাপের বাড়ীর মান- অপমান নিয়ে আর প্রতিবাদ করে লাভ কি? তাছাড়া পনেরাে বছরের দাম্পত্যজীবনের টানাপােড়েনে সে আজ ক্লান্তও বটে। কিন্তু ক্লান্তিহীন বিপিনবাবু। গেলাসে আঙুল ডুবিয়ে আলগােছে ঠোট মুছে হঠাৎ পিতৃকর্তব্যের বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন তিনি। “ছেলেটা গেল কোথায়? তার জন্য কিছু রাখলে ? না বললে তাে আবার সে জ্ঞানটুকুও থাকে না। যে মায়ের ছব্বা।” রীতিমত অবাক হয় অমিতা। ধীরে ধীরে বলে, “রেখেছি, যদিও না রাখাই উচিত ছিল। কিন্তু কথা না বাড়িয়েই প্রশ্ন করে অমিতা, “তােমায় একটা কথা বলব?” “ও বাবা! এ যে একেবারে নভেলি ভূমিকা। যা বলবে চটপট বল। আমার সময় নেই। বেরােব।” “এই সামান্য লােভটুকু ত্যাগ করতে পারলে না তুমি ? পরের অনিষ্ট করে কি কখনও ভাল হয়। অন্যায়ের সায় দিয়ে যাওয়া তাে আরও অন্যায়। বিশেষ করে দীপু রয়েছে, তার
সকালের সাত রং
কথাও তাে ভাবতে হয়। এমনি করে এক দিনের লােভে কি
ভবিষ্যৎ খােয়বে তুমি?”
“বলে যাও। বলে যাও। বক্তিমে তত ভালই হচ্ছিল।
থামলে কেন? হুঃ লােভটা আমারই হল বটে। ওষুধে জল
মেশাচ্ছে তাতে আমার কি? পুলিশ এল আর আমি অমনি
তাদের গলা জড়িয়ে সব কথা ফাস করে দিই আর কি ? বলি
কোম্পানীটা বন্ধ হলে খেতে কি? ঘুষ। কত্তা খুশি হয়ে কিছু
দিলে তাকে ঘুষ বলে না, সেটা—সেটা বােনাস, বুঝলে
বােনাস।” বেশ জুতসই একটা কৈফিয়ৎ দিতে পেরে নড়েচড়ে
বসেন বিপিনবাবু, তারপর আবার বললেন, “লােভ। লােভী।
জিজ্ঞেস করি তােমরা কি
মুখে
তালাচাবি এটে রাখবে? পার
তাে আমার এই পাপের টাকাতে কেনা খাবারই তােমার গুরু-
দেবের জন্যও একটু ঘেন্না-ঘেন্না করে রেখে দিও।”
ইঙ্গিতটা নিখিলের প্রতি। অমিতার বাপের বাড়ীর পাড়ায়
থাকত, তার ছেলেবেলার বন্ধু। “নিখিলবাবু তােত আর আসে
।” ধীরে ধীরে উত্তর দিল অমিতা।
“তবে বইটা কি উড়ে এল ?” ঘাড় কাত করে প্রশ্ন করেন
বিপিনবাবু।
সমিতির একটা মেয়ের হাত দিয়ে পাঠিয়েছেন।
“ও বাবা, আবার সমিতি। বলি ন্যাতা-ট্যাত কিছু করে
জায়নি তাে?”
“সে ভাগ্য কি আমার ?” থালা-গোলগুলাে তুলে নিতে
সকালের সাত রং নিতে যথাসম্ভব শালীন্য বজায় রেখেই বলবার চেষ্টা করে। অমিতা। যা তার জীবনের স্বপ্ন, যে জীবনাদর্শের কথা নিখিলে কাছে সে শুনেছে তাকে কি কোনদিনই সে জানতে পারবে? সে তাে বন্দিনী। এক চাকাতেই বাঁধা তার জীবন। খাওয়ার: পর রাধা। কি কাজ হবে তার দ্বারা ? তার স্বপ্ন চিরদিন স্বপ্নই; থেকে যাবে।-চিন্তায় বাধা পড়ে তার বিপিনবাবুর কথায়। “যাই, সন্ধেটা আর তােমার সঙ্গে বসে বসে নষ্ট করব না। এতক্ষণে ওরা বােধহয় এসে গেছে।” হঠাৎ বেখাপ্পাভাবে উঠে আলনা থেকে জামা টেনে তাসের অডিড়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন বিপিনবাবু। ডালটা পুড়ে যায়নি তাে? অমিতাও বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। একতলার দুটি ঘরে ওরা থাকে। উঠানের পাশে একফালি বােয়াকে রান্নার ব্যবস্থা। মাথার ওপর যে দরমার ছাউনি দেওয়া হয়েছিল, তার প্রায় সবটাই লােপাট হয়ে গেছে বহুকাল আগে। তাই বেলা থাকতেই রান্না চাপিয়ে দেয় অমিতা। ডাল সাঁতলানাে শেষ করে ভাত চাপাতে চাপাতে মনটা; অনেক হাল্কা হয়ে আসে তার। কি লাভঅযথা মন-খারাপ করে। ‘ছায়ার সাথে কুস্তি’—সত্যি কথাই লিখেছে দীপুর বইখানাতে। বইয়ের কথা মনে হওয়ায় ভাত চাপিয়ে ঘরে ফিরে এসে বিপিন- বাবুর ফেলে দেওয়া বইখানা টুল থেকে আবার তুলে নেয় অমিতা। বেশ লাগছে। যত পড়ছে, ততই ভাল লাগছে তার।
৩০
সকালের সাত রং
“মা জানাে, আমায় ক্লাবের ক্যাপ্টেন করে দিয়েছে।”
একটু পরেই চীৎকার করতে করতে ঢুকলে দীপক। তার বগলে
ফুটবল, চোখ মুখ খুশিতে ভাসছে। বই থেকে চোখ তুলে
হাসল অমিতা। তারপর তাকে কাছে বসিয়ে গায়ে মাথায় হাত
বুলােতে বুলােতে অনুযােগ করে, “কিন্তু দীপু, দেরি দেখে তােমার
বাবা কত রাগ করছিলেন। এত দেরি করে ফেরে কি ঘােট
ছেলেরা? এত দেরি কোরাে না বাবা।”
“আচ্ছা মামণি।” কাদামাখা হাতে মার গলা জড়িয়ে ধরে
প্রবলবেগে মাথা নাড়ে সে।-“কিন্তু এখন তাে মােটে সাড়ে
ছটা।”
“তুমি বুঝি রাগ করেছ মামণি?” আরও জোরে সে মার
গলা জড়িয়ে ধরে।
“না রে পাগলা। আচ্ছা ছাড় দেখি আমায়। তাের খাবার
দিই।” হাসিমুখে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় অমিতা।
খাবার খেতে খেতে অসীম উৎসাহে বলে চলে দীপক তার
কৃতিত্বের কথা। জিজ্ঞেস করে, “হ্যা মা, নিখিলমামা জানে
যে আমি এমনি ভাল খেলতে পারি ?”
“জানেন বৈকি রে। কত প্রশংসা করেন তিনি আমার
কাছে।” ভাতের ফেন গালতে গালতে উত্তর দেয় অমিতা।
“নিখিলমামা আর আসেন না কেন মা?”
কি উত্তর দেবে অমিতা? নিজেকে আর প্রবঞ্চনা করতে
ইচ্ছে হয় না, তবু বলে, “কাজে আটকা পড়েছেন বােধহয়।”
সকালের সাত রং .. “তা কেন? আমাদের রাস্তা দিয়ে তাে প্রায়ই যান।” “তাই নাকি? তা হবে।” উনুনে তরকারির কড়া চাপিয়ে কথাটার ছেদ টানতে চায় অমিতা। কিন্তু দীপক যেন সদ্য পদপ্রাপ্তির আনন্দে ঘুরে ঘুরে নিখিলের কথাই জিজ্ঞেস করে আজ। নিখিল যে তার বড় আপন। দিন দিন সমেহ ব্যব- হারে কাছে টেনেছে তাকে নিখিল। তার বাবার রূঢ় স্নেহহীন ব্যবহারের তুলনায় সে যেন সস্নেহ নীড় খুঁজে পায় মা ছাড়া একমাত্র নিখিলমামারই কাছে। বাবার থেকেও তাই সে বেশী ভালবাসে নিখিলমামাকে। একথা সে বারবার প্রকাশ করতে ছাড়ে না। কত বই পড়তে দিয়েছেন তাকে নিখিলমামা। কত দেশ-বিদেশের কথা শুনিয়েছেন তাকে। ভারী ভাল ভাল গর বলতে পারেন নিখিলমামা। মার সঙ্গেও কি সুন্দর ব্যবহার করেন তিনি। বাবার মতাে রাতদিন দাত খি চিয়ে কথা বলেন । “বিচ্ছিরি লাগে বাবাকে আমার।” হঠাৎ বলে ওঠে দীপক। “ছিঃ দীপু, বাবা হন না।” “তা হলেই বা। বাবা কেন তােমাকে শুধু শুধু বকে। নিখিলমামা কত ভাল, তবু নিখিলমামাকেও বাবা ভালবাসে ।” “হ্যা তুই ভারী জানিস কিনা।” হেসে ফেলে অমিতা। “জানিই তাে।” প্রতিবাদ করে দীপক। “তা হােক দীপু।” বাধা দেয় অমিতা। !
সকালের সাত রং “না মা। বাবা নিশ্চয়ই বিচ্ছিরি। নিখিলমামা যখন আগে আসত, তখন বাবা মােজ আমাকে জিজ্ঞেস করত, কি কথা বলে তােমাকে? আমি কিন্তু কিছু বলিনি মা। তুমি যে নিখিল- মামার কাছে পড় তাও বলিনি। আমি খুব চালাক, না মা?” চুপ করে থাকে অমিতা। নিখিলকে নিয়ে স্বামীর এই মিথ্যা সন্দেহ সব সীমাই ছাড়িয়েছে। সৌজন্য-জ্ঞান তো নেই-ই, সৎসাহসও নেই যে স্পষ্ট করে নিখিলের সামনে কিছু বলেন। সমস্ত রাগ তাই সুদে-আসলে মিটিয়ে নেন অমিতার ওপর। তাইতাে নিজেই একদিন বারণ করে দিয়েছিল অমিতা নিখিলকে, “তুমি আর এ বাড়ীতে এসে না। শেষে কি একটা কেলেঙ্কারি হবে ?” গলায় তার রীতিমত ভয়ের আভাস ছিল। “তুমি বলাে তাে আর আসব না। কিন্তু কেন?” “ওঁকে তাে চেন।” “বুঝলাম।” বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলেছিল নিখিল, “কিন্তু তােমার ওপর হােটবেলা থেকে কত জোর খাটিয়েছি আমি। আর আজ যখন নিজে সত্যিকারের একটা পথ পেলাম, তােমার কোন কাজেই.লাগতে পারব না ভেবে দুঃখ পাই। উন্মুখ মন নিয়েও সমাজের কোন সেবা তােমার দ্বারা হবে না। কি অসহায় অবস্থা বল তাে।” “তােমার জোর তােমারই আছে। জানি না একদিন এ অবস্থার অবসান হবে কিনা। কিন্তু সমাজের জীব তাে আমরা। স্বামীর অমতে কোন কাজ করা কি সম্ভব ?”
সকালের সাত রং
০৮
“হয় তত সম্ভব, হয় তাে নয়—যে যেমন মনে করে। যাক
সে কথা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল মিখিল, “কিন্তু
নিজেকে তুমি পরাজিত হতে দিও না অমিতা। আমি আসি বা
-আসি তাতে কিছু আসে যায় না। তােমার মধ্যে যে সংকল্প
দেখেছি তা যেন নিভে না যায়, মনে রেখে দীপুর ভার তােমার
ওপর। ও যেন সত্যিকারের মানুষ হয়।”
চোখে জল এসে যায় অমিতার, “ও যে আমার কত সাধের
তা তুমি বুঝবে না নিখিল।”
“বুঝি অমিতা।” বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিখিল—“আর
এও জানি আমার জন্যে দীপুকে অনেক অত্যাচারই সহ্য করতে
হয়। সেই জন্যই তার কথা মনে হচ্ছে।” গলা ভারী হয়ে
আসে নিখিলের, “আচ্ছা আমি যাই, কোন দরকার পড়লে
আমায় খবর দিও।”
“দেব।”
“চলি। কয়েকটা দিন বড় দুঃখে কাটল তােমার।”
তারপর আরও কি বলতে গিয়ে হঠাৎ মােড়া থেকে উঠে
পড়েছিল। প্রশান্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে অমিতার নীচু-করা মুখের
দিকে একবার দেখে নিয়ে আস্তে আস্তে রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য
হয়েছিল।
সে আজ কতদিন।
সকালের সাত রং
মাস কয়েক পরের কথা।
শীতের ভােরে অনিচ্ছুক শরীর আর মনকে লেপের তলা
থেকে যেন টেনে বার করতে হয়। পাশেই দীপক ঘুমুচ্ছে।
ও পাশের তক্তপােশে আকণ্ঠ লেপ জড়িয়ে ঘুমুচ্ছেন বিপিনবাবু।
মাথার দিকের জানলাটা বন্ধ করে দীপকের গায়ে লেপটা
ভাল করে টেনে দেয় অমিতা। তারপর শাড়ীটা গুছিয়ে
নেয়।
আজ বেশ শীত পড়েছে, মনে মনে ভাবে আর নীচু গলায়
উচ্চারণও করে। কদিন থেকেই একথা বলছে সে। কে জানে
এতে শীতজয়ের গরিমাটুকু বেড়ে যায় কিনা।
উনুনে আঁচি দিয়ে কড়া নাড়ার শব্দে খিড়কি দরজা খুলতে
যায় সে। বাসন-মাজার ঝি এল বােধহয়।
“বডড বেশী দেরি করেছ।” দরজাটা খুলতে খুলতে বলে
অমিতা।
“বিশেষ দেরি হয়েছে কি? এখনও তত ভাল করে ভােরই
হয়নি।” হাসতে হাসতে বলে নিখিল।
“একি তুমি।” আচমকা কয়েক পা পিছিয়ে যায় অমিতা।
“হ্যা আমিই। একটা জরুরী কথা আছে। তােমার
অনুরােধটা আর রাখতে পারলাম না তাই এসে পড়লাম।”
পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুড়তে লাগল অমিতা। নিখিলের
হাসিকে হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে পারল না। হঠাৎ যদি
বিপিনবাবু এসে পড়েন। মনে তার যেন কাঁটা দিয়ে উঠল।
সকালের সাত রং
দেবে।
নিখিলই কথা শুরু করল, “আজ সাতটার ট্রেনে বাড়ী যেতে
হচ্ছে। বাবার খুব অনুখ।”
“তােমার জামাগুলাে সেলাই হয়ে থাকলে অপর্ণার হাতে
দিয়ে দিও, পার তত আরও কয়েকটা সেলাই করাে। দক্ষিণের
বস্তির বাচ্চাগুলাে শীতে বড় কষ্ট পাচ্ছে। কাপড় অপণাই
আর বইপত্র যা দরকার দীপুকে দিয়ে নরেনের কাছ
থেকে আনিয়ে নিও। কিন্তু একটু থেমে বলে, ‘অসুবিধে
হচ্ছে মেয়েদের কেন্দ্রটি নিয়ে।”
“কী অসুবিধে ?”
এতক্ষণে জড়তা কাটে অমিতার।
“গৌরীর বাবা আর ওকে পড়াতে যেতে দেবেন না। তুমি
এর পরিপূর্ণ ভার নাও অমিতা।”
“কিন্তু আমার পক্ষে বাড়ীর বাইরে গিয়ে পড়ানাে তাে সম্ভব
হবে না।”
“বেশ, তােমার বাড়ীতেই কর তাহলে, সপ্তাহে তিনদিন
সেলাই আর তিনদিন লেখাপড়া। সে তিনদিন তােমার
এখানেই তাে হতে পারে।”
“কখন? দুপুর বেলাতেই তাে?”
“হ্যা। বেলা দুটো থেকে চারটে পর্যন্ত। কথা দাও অমিতা।
নাহলে আমি জানি ফিরে এসে দেখব কেন্দ্রটি ভেঙে গেছে।
কিন্তু তােমার ওপর আমার বিশ্বাস আছে।”
বিশ্বাস আছে তার ওপর ? সে পারবে এতগুলো নীচুতলার
মানুষকে খােলা হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে সাহায্য করতে? কেমন
সকালের সাত রং
.
উসুখ হয়ে ওঠে অমিতার মন। বলে, “আচ্ছ। কিন্তু তুমি
কবে ফিরবে ?”
‘বুঝতে পারছি না। দেরিও হতে পারে। তবে এর মধ্যেও
ফিরতে পারি। সবই নির্ভর করছে ওখানকার অবস্থার ওপর।”
অমিতা চুপ করেই থাকে। নিজের থেকে জিজ্ঞাসা করা
ওর স্বভাবের মধ্যে নেই।
“হ্যা, দীপু কোথায় ?” অন্য কথা পাড়ে নিখিল।
“ঘুমুচ্ছে, ডাকব?”
“থাক, বেচারাকে কষ্ট দিয়ে আর কাজ নেই। কতদিন যে
আদর করিনি ওটাকে। আচ্ছা আজ চলি, কেমন ?”
আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে অমিতা। তারপর যতক্ষণ দেখা
যায় দরজা ধরে দাড়িয়ে থাকে। যে দরজা দিয়ে সে বেরিয়ে
পড়তে পারে বাইরের জগতের মাঝখানে, অথচ সারাজীবনই যে
মুহূর্তটির জন্য প্রতীক্ষা করে থাকতে হবে, সেই দরজা। ভেতরটা
বারান্দায় অচি-ওঠা উনুনের মত গনগনে হয়ে ওঠে।
অচি বয়ে যায়।
।
ঘণ্টা তিনেক বাদে বিপিনবাবুর অফিস যাবার সময় আর--
কপসলা বর্ষণ হয়ে গেল। বলা বাহুল্য এক তরফা।
নিখিলকে অমিতা কথা দিয়েছে আজ থেকে পরিপূর্ণ ভার
সেবে ও কেন্দ্রটির। কিন্তু বিপিনবাবুর সম্মতি ছাড়া যে কোন--
মতেই তা সম্ভব নয় সে কথা বেশ ভালভাবেই জানে অমিতা।
সকালের সাত রং
কিন্তু কথাটা পাড়তেই যেন ঠিকরে উঠলেন বিপিনবাবু।
অবশেষে গালিগালাজ এবং রীতিমত শাসানির পরর নাটকীয়
প্রস্থান ঘটল।
দীপুর আজ ইস্কুলে যাবার তাড়া নেই, গা-টা যেন ছ্যাকহ্যাক
করছে। পাশের ঘরে বসে বসে বই পড়ছে গল্পের। হঠাৎ
যেন মায়া লাগল অমিতার নতুন করে স্বামী আর সংসারটার
জন্য। সত্যিই স্বামী যেন তার এক রকমের। তিনি তাকে
একটি সস্তা দরের আসবাব ছাড়া আর কিছুই মনে করেন না-
এ কথা সে জানে। আর বারাে বছরের দাম্পত্যজীবনের প্রথম
বছর ছাড়া ভাল ব্যবহারও যে একদিনের জন্যও সে পেয়েছে
তাও মনে করতে পারে না অমিতা। তিনি তার সংসারেরই অন্য
আধখানা, তবু তিনি দীপুর বাবা, একথাও ভােলা যায় না।
তাছাড়া স্বামী-স্ত্রীর এই দ্বন্দ্বে ক্ষতি দীপুরই সব থেকে বেশী, সে
যদি তার বাবাকে না ভালবাসতে পারে, চরিত্রগঠনেও তবে তার
ফাঁক থেকে যাবে এটা অমিতা ভালভাবেই জানে। কিন্তু
অমিতা কী করবে? কোনদিনই সে কঠিন কথা বলে না।
আঘাত আসে আচমকা। সে শুধু আত্মরক্ষা করে, নিজেকে
টিকিয়ে রাখতে চায়। নিজেকে আর নিজের মনকে, মনের
আদর্শকে। তার চরিত্রে কোথায় যেন একটা জাের আছে
"নানা প্রতিকূল অবস্থায় যা চিরকাল চায় স্বাধিকারের প্রতিষ্ঠা।
স্বভাব বদলাবে সে কী করে।
দুটো ৰাজবার আগে থেকেই মেয়েরা এসে গেল,
সকালের সাত রং তাদের নিয়ে এল। শােবার ঘরের পাশেই যে ঢাকা ফালিটুকু সেখানে তারা বসে পড়েছে ততক্ষণে। একই অমিতাদি।” অপণ। ডাক দেয়, “মেয়েরা এসে গেল। দুজন শুধু আসতে পারল না, একজনের ছেলের অসুখ, অন্য- জনের স্বামী আসতে দিল না।” ময়নার সােয়ামিটো যেন ষণ্ডামার্কা গো।” একজন মেয়ে মন্তব্য করে, “আমার ঘরের নােকের তাে কতই ইচ্ছে। তবে হা বাপু, ছেলে রাখতে পারবেনি, আগে থেকেই বলে দিয়েছে। তাইতাে ছেলেটাকে টেনে নে এসতে হলাে।” “তা হােক, তবু তােমরা হাল ছেড় না।” অপর্ণা তাদের বােঝায়, “আজ না হােক কাল স্বামীরা বুঝতে পারবে যে তােমর লেখাপড়া শিখলে তাদেরই ভালাে। তােমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে মানুষ হয় সে কথা তাে ভাবতে হবে।” অমিতা এ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পায়। —আজ না হােক কাল স্বামীরা বুঝবে সত্যি সেই আশাতে ও-ও যে দিন গুণছে। কিন্তু সে কাল কবে? “ঐ মাদুরটা পেতে বসােনা ভাই তােমরা। মেঝেতে ন?” মাদুরটা কোণ থেকে নিয়ে পেতে দিল অমিতা। : আজ বেশিক্ষণ বসতে পারব নি।” রেবতী বলে, “আমরা তাে তােমাদের মত স্বাধীন নই গাে দিদিমণি। আমার সােয়ামী তাে এতেই দিতে চায়নি। কত কষ্টে যে এসেছি।”
সকালের সাত রং ৪৭ স্বাধীনই বটে। অমিতা মনে মনে হাসে। মুখে বলল, “তােমরা তাে লেখাপড়া শেখ অপর্ণাদিদির কাছে। আমি তােমাদের সেলাই শেখাব। আর তাছাড়া রােজ আমরা খবরের কাগজ পড়বে। কি বল ?” “সে তুমি ভাল জান দিদি।” বয়স্কা একটি বৌ উত্তর দেয়, “তবে আমায় বাপু এমন করে শিখিয়ে দাও যেন রামায়ণটা অন্তত নিজে পড়তে পারি। নিজে চিঠিখানাও নিখতে পারি।” “পারবে বৈকি। এই তিনদিন অমিতাদি তােমাদের সেলাই শেখাবেন। আমি পড়াব বাকি তিনদিন।” অপর্ণা তাদের উৎসাহ দেয়। “জ। হঁ্যা গা দিদি-তােমার শশাবার ঘরে আমাদের বসালে, তােমার কত্তা কিছু বলবে নি ?” এ তত ভাল কাজ। উনি বলবেন কেন?” অমিতা বসে পড়ে মাদুরের একপাশে। শােন। তােমরা সেলাইয়ের জন্য চুচ-সূত.কিছু এনেছ ? তােমাদের আসন- বােনা শেখাব। এর জন্য খানিকটা চট...” দরজায় অসময়ে কড়া নাড়ার শব্দ হল। অমিতা ওঠবার উপক্রম করতেই অপর্ণ। বলল, “অমিতাদি আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। তুমি কাজ কর।” দরজা দিয়ে ঢুকলেন বিপিনবাবু। হাতে একটি নাতি-বৃহৎ বোঁচকা। ফুলকপির মাথা দেখা যাচ্ছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই অপায়ে একবার তিনি দেখে নিলেন অপর্ণাকে। একপাশে “না।
: সকালের সাত রং সরে দাড়িয়ে অপর্ণা হেসে বলল, “আজ আপনার বাড়ী চড়াও করেছি। সব ঘর বেদখল।” “হু।” গম্ভীরভাবে পাশ কাটিয়ে ঢুকলেন বিপিনবাবু। আবার সেই বস্তিঘােরা মেয়েটা। শােবার ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে গেলেন। অমিতা ততক্ষণে বুঝেছে ব্যাপারটা। স্বপ্নের অগােচর বিপিনবাবুর এই আকস্মিক আবির্ভাব। সে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। এমন অসময়ে? আর কিনা আজই! বিপিন- বাবুর স্বভাব তার অজানা নয়, কিছুক্ষণ আগে মায়া-করা মােক- টার জন্য সে ভয় আর বিতৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই অনুভব করতে পারল না। “এদিকে শােন।” ঘরে যেতে যেতে চাপাগলায় অমিতাকে ডাকলেন বিপিনবাবু। “যাচ্ছি।” সময় নেবার চেষ্টা করে অমিতা। “যাচ্ছি নয়, এখনি এসাে।” শশাবার ঘর থেকে ক্রুদ্ধ আওয়াজ আসে। “তােমরা বসাে ভাই। আমি আসছি।” ঘরে ঢুকতে গিয়ে একটু দাড়ায় অমিতা। দাত দিয়ে ঠোটটা চেপে ধরে। তারপর সােজা ঘরের মাঝখানে গিয়ে হাজির হয়। সঙ্গে সঙ্গেই উচু গলায় বলে ওঠেন বিপিনবাবু, “বলি ব্যাপার কি? স্বাধীন জেনানা নাকি?—একেবারে বাড়ীর
সকালের সাত রং
“আস্তে বল, আন্তে। তােমার পায়ে পড়ি
“কিসের আন্তে? ভয়টা কাকে? ঐ মাগীগুলােকে নাকি?”
“দোহাই তােমার। আমি তো ভাবিনি তুমি এ সময়ে
ফিরবে।”
‘তা তত ভাববেই না। পতিচিন্তায় বিভাের হলে যে প্রগতি
হবে না, সেকেলে হয়ে পড়বে। তা আয়ান ঘােষ ঘরে নেই,
কেষ্ট ঠাকুরের আসতে বিলম্ব কেন?”
“ছিঃ!” আকণ্ঠ ঘৃণায় মুখ বিকৃত করল অমিতা।
“কিসের ছিঃ।নভেলিআনা না ?—আবার ছিঃ-কোনটা
বাকি রেখেছ শুনি। ও মাগীগুলােকে আমি চিনি না নাকি?
ঢুকিয়েছ কেন ওদের এ বাড়ীতে ? কার হুকুমে?”
“হুকুম আবার কিসের? নিজের সংসারে দুটো ভাল কাজ
করতে পারব না ?”
“ভাল কাজ।” তার সুর নকল করে খিচিয়ে উঠলেন
বিপিনবাবু, “কতকগুলাে বাজারে-মাগীর হট্টগােল ভাল কাজ ।
বলি এটা ভদ্রলােকের বাড়ী নয় ?” গলা তখন সপ্তমে চড়েছে।
“এখন তােমাকে দেখে তা মনে হচ্ছে না।”-চাপা অথচ
জোর গলায় বলে অমিতা।
“কি? এত বড় আস্পন্দা। মুখে মুখে জবাব।”
এই সময়েই দীপু ঢুকল ঘরে। পাশের বাড়ীতে গিয়েছিল
একটা গল্পের বই আনতে।
“এই যে ওয়ার। কোথায় যাওয়া হয়েছিল?” হেলের
ও
সকালের সাত রং
মাথার চুল ধরে কাছে টানলেন তিনি।
পাশের বাড়ী।” প্রায় আর্তনাদ করে উঠল দীপু।
“ইস্কুল নেই। আমি শালা মাস মাস টাকা গুনব আর
তােমরা মায়ে-পােয়ে ফুৰ্তি মারবে! দাড়াও।”
“কি করছ ?” এগিয়ে আসে অমিতা, “জ্বরভাব বলে আমিই
ইস্কুলে যেতে দিই নি।”
“সরে যা হারামজাদী। আমার বাড়ীতে যা ইচ্ছে তা চলবে
।” চড় পড়ল দীপুর পিঠে।
আমার ওপর রাগ করে ছেলেটাকে মেরে ফেলবে নাকি ?
ছেড়ে দাও।”
ছাড়াবার চেষ্টা করার সঙ্গে সঙ্গে সশব্দে একটা চড় এসে
পড়ে তার হাতে। আর প্রবল বেগে মারতে থাকেন বিপিনবাবু
দীপুকে।
“দ্যাখ, অনেক সহ্য করেছি, আর নয়।”—দৃঢ় গলায় বলে
এগিয়ে আসে অমিতা। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক প্রচণ্ড
ধাক্কায় পড়ে যায় সে মেঝের ওপর। জলচৌকির কোণে লেগে
তার কপাল ফেটে যায়। রক্ত ঝরতে থাকে।
“মামণি।” নিজের ব্যথা ভুলে মাকে জড়িয়ে ধরে দীপক।
আর অসহ্য মানসিক উত্তেজনায় ফাটা কপাল চেপে ধরে জ্ঞান
হারাবার আগে অমিতা দেখতে পায়-ছেলের ব্যাকুল মুখ, আর
অপর্ণা আর ঐ মেয়েগুলির মুখ•••রেবতী, পাঁচুর মা, কুসুম:
অমিতার চারিদিকে ওরা ঘিরে দাঁড়ায়।
বাসিগোলাপ
ছােটবেলা থেকেই সুপর্ণার এ বিষয়ে নামডাক ছিল। আর
সেইজন্যই বীরেশের মত অমন জাঁদরেল চাকুরের সঙ্গে বিয়েটাও
তার সহজেই হয়ে গেল।
বীরেশ চেয়েছিল রূপ আর বলিয়ে-কইয়ে বৌ। আর
সুপর্ণার ভেতর নাকি এ দুটোরই এত প্রাচুর্য যে এ বিষয়ে
আর দুবার ভাববার কথা মনে হয়নি বীরেশের। তাই প্রথম
প্রস্তাবেই মত দিয়ে বসেছিল সে।
সুপর্ণার রূপ আছে, বিদ্যে খুব না থাক তার জৌলুষ আছে,
আর আছে লােককে মুগ্ধ করার ক্ষমতা। সে না হলে নাকি
কিছুই জমে না। বন্ধুদের বাড়ী বা কোন উৎসবে তাকে চাই-ই।
এ জন্য বান্ধবীদের ঈর্ষা তাে হতই, তারা বলতেও ছাড়ত না।
“কি পায় ওর ভেতর সকলে ? খালি রূপ আর কথা
বুড়ি।”
“ঠিক বলেছিস।” আর কেউ সায় দিত, “সেদিন মনীষার
অমন গান, তা অবধি ভাল করে শুনতে পেলাম না। কি না
সুপর্ণা এসেছে। সব কটি মাথা অননি ওদিকেই ঘুরে গেল।”
“হিপনটিজম্ জানে বােধ হয়।”
সত্যি জানে নাকি? সুপর্ণার হাসি পায়। আর এ শক্তির
পরখ করতে গিয়ে সে যা করল, সেটাই তার অভ্যেসে বাড়িয়ে
সানের সাত রং
গেল। বিয়ে করার সময় বীরেশ তাও কিছু কিছু জানত।
অনেকের কাছেই এ বিষয়ে ইতি পেয়েছে। কিন্তু তার মতে
এটা তাে একটা আর্ট, পরকে আকর্ষণ করা। অবশ্য একেই
নাকি ওর বান্ধবীরা বলত খেলা। পুরুষ নিয়ে খেলা।
হ্যা সুপর্ণার এটা একটা অভ্যাসই ছিল। বেশী কিছু নয়।
একটু প্রশ্রয় দেওয়া, তাদের স্তুতিবাদ কান পেতে শােনা,
দুএকবার তাদের সঙ্গে সিনেমায় যাওয়া; কিন্তু আর নয়। তাদের
মধ্যে কেউ গঙ্গার ধারে ‘মুনলিট’ পিকনিকে নির্জনতম মুহূর্ত
খুঁজতে গেলেই ছেদ পড়ত অন্তরঙ্গতায়। তবু আবার। আবার
এ খেলায় আনন্দ পেত সুপর্ণা। দু-একজন বান্ধবী চাইত,
ও একবার মরুক।
“তেমন ছেলের পাল্লায় পড়লে সুপর্ণার এই খেলা আর
কামাে বেরিয়ে যাবে। যত সব হাঁদা। হাঁ করে ওর রূপ
গেলে, আর মরে।” বলেছিল প্রীতি, সুপর্ণারই এক নিকটতম
বান্ধবীর কাছে।
“তা কেন? এতে খারাপ কি আছে ? ওর মত রূপ আর
চার্ম থাকলে তােরাও কি কোন এ্যাডভানটেজ নিতিস না?”
কণা জবাব দিয়েছিল।
“জানি না বাবা। রূপ থাকলেই একসয়েট করতে হবে এ
মেনে করি না। পুরুষগুলাের সঙ্গে এভাবে মেশামেশি করলে
চরিত্র নষ্ট হয় না?”
“চরিত্র ?” হেসেছিল ঝর্ণা, “ভাই আমরা যারা চরিত্র নষ্ট
করবার সুযােগই পেলাম না, এমনি চেহারা, তারা আর ওর
নিয়ে মাথা ঘামাব কেন বল? ও সব সুপর্ণাকেই মানায়।”
এ সব যুক্তি অবশ্যই মনে লাগেনি কান্ধবীদের। তারা
সমালােচনার হাল ছাড়েনি। কিন্তু যাকে নিয়ে এত আলােচনা
সে নির্বিকার। আর তার জন্য ছেলেরা পাগল।
বীরেশের সঙ্গে বিয়েতেও সুপর্ণার মত ছিল না। আর
কিছুদিন পরে মা। আমার এম. এ হয়ে যাক।”
“কোন দরকার নেই। এমন পাত্র আমি হাতছাড়া করতে
পারব না। অতবড় চাকরি, অমন চেহারা, কত ভাগ্য করলে
তবে পায়।”
“সব মানছি। কিন্তু বিয়ে মানেই তাে সব শেষ।”
“শেষ।” মা অবাক হয়েছিলেন। “কিসের শেষ ?”
“মানে এই স্বাধীনতার।” সুপর্ণাকে দু একটা কে
গিলতে হয়েছিল বৈকি।
“সুপর্ণা । বাড়াবাড়ি করিসনি।” মা প্রায় ধমক দিয়ে-
ছিলেন, “তােরা যা স্বাধীনতা পেয়েছিস আমরা তা ভাবতেও
পারিনি কোনদিন। আরও চাস?”
“মা তােমাদের সময় যে গেছে।”—মাকে জড়িয়ে ধরেছিল
সুপর্ণা।
“সে তাে গেছেই। তা বলে ও সব আমি শুনব না।
সামনের বােশেখে বাপু তােমার বিয়ে আমি দেবই। এবারই
দিনস্থির করব। স্বাধীনতা না ছাই-উচ্ছলতা।”—মা গ
সকালের সাত রং
গজ করেন।
বিয়ের পর বীরেশের কর্মস্থল ধানবাদে সুপর্ণাকে আসতে
হ’ল বীরেশের সঙ্গে। সুপর্ণার সঙ্গে কয়েকদিন ঘর করেই
বীরেশ বুঝতে পারল, অন্য কেউ নয়, তার জীবনে সুপর্ণাকেই
প্রয়ােজন। যা থােক মানানসই বৌ পেলে তার মত অফিসারের
কোনমতেই চলত না, ভবিষ্যতও খুব উজ্জ্বল হত না এ বিষয়ে
নিঃসন্দেহ। কয়লা খনির অফিসার বীরেশ যেন হীরের সন্ধান
পেল। সুপর্ণার রূপ আর গুণের খনিতে হীরের লােভে সে
এগিয়ে গেল অনেকদূর। তার আশপাশের ওপরওয়ালাদের
চোখ ঝুটো কঁচের ঝমকানিতেই যে কী আন্দাজ ঝলসে ওঠে,
তার কিছু কিছু বীরেশের ভালই জানা ছিল।
বিকেলের দিকে লাল শাড়ীটা পর।” কোনদিন হয়ত বলত
বীরেশ, “অফিসের দাস আসবে। হিরন্ময় দাস। ওকে চায়ে
বলেছি।”
তারপর চলত যতদূর সম্ভব সুন্দর আর লােভনীয় সন্ধ্যার
একটি পরিবেশ সৃষ্টি করার সযত্ন প্রয়াস। মাঝে মাঝে স্ফুরিত
ঠোটে সাদা ঝকঝকে দাঁত টিপে মিষ্টি করে হাসি, দু-একটা
কৃত্রিম রাগ, বিস্ময় ও উৎকণ্ঠার প্রকাশ, আর অতিথিসেবার
অভিনয়। সেটা অবশ্যই অভিনয়ে সীমাবদ্ধ থাকত না, তবে
ব্যবহারে অভিনয়ের এনামেল থাকত।
এমনি করে কতদিন তাে গেল। প্রায় তিন বছর। কত
অফিসার বদলি হ’ল, আর তার সঙ্গে সাদা সবুজ লাল নীল, কত
সকালের সাত রং
রং-বেরঙের শাড়ী বদলে বদলে পরল সুপর্ণা।
নিজেকে বিচিত্ররূপে উপস্থিত করল। বীরেশের ঘন ঘন
পদোন্নতিতে তার সার্থকতার পরিমাপ বােঝা গেল।
এর মধ্যে কাউকে কাউকে বেশী একটু প্রশ্রয় দিত সে।
তারা অবশ্যই বিশেষ শ্রেণীর। চাকরির জগতে যাদের বলা যেতে
পারে ব্রহ্মা-বিষ্ণু জাতের। সুপর্ণার অভ্যস্ত খেলায় কোন কষ্ট
হত না। বরং এতেই সে বেঁচে থাকত। বিয়ের আগে যা শেষ
হবে ভেবে ও ভয় পেয়েছিল তা যে সত্যিই শেষ হ’ল না, এতে
সে আনন্দিতই হ’ল। আর-কোন দায়িত্ব না নিয়ে এভাবে
রঙিন সন্ধ্যাগুলাে কাটানােতে তার আপত্তি ছিল না মােটেও।
সেদিন সন্ধ্যায় যে দুজন তাদের বাড়ীতে চায়ে এলেন, তাঁরা
হলেন এই বিশেষ শ্রেণীর। সেন আর মুখার্জি। এদের কথা
বীরেশের কাছে আগেই শুনেছিল সুপর্ণ। এরা বাড়ীতে আসা
নাকি গৃহস্বামীর রীতিমত সৌভাগ্য। সুতরাং এদের আগমনকে
আবির্ভাব বলে মেনে নিতে সুপর্ণা দ্বিধা করল না, আর এই
বিশেষ শ্রেণীর জন্য সেদিন বিশেষ ভাবে সজ্জিত হ’ল সে।
“সত্যি মজুমদার,” মুখার্জি বললেন কোন এক সময়ে,
“আপনার স্ত্রী-ভাগ্যে ঈর্ষা হয়।”
একবার আলগা করে দেখল সুপর্ণা আঁকে, তারপর মিষ্টি
হেসে জিজ্ঞেস করল, “আপনাকে আর-একটু কফি দি ?”
“দিন।” কাপটা বাড়িয়ে দিলেন মুখার্জি, “যদিও তিন কাপ
হ’ল, তবু আপত্তি নেই আর এক কাপে।”
সকালের সাত রং
“আমাকেও দেবেন।” সেন যােগ দেয়।
“জানেন, ভাল মুক্তো চেনবার জন্য ভাল জহুরী দরকার।
আমাদের মজুমদার যে এত বড় জহুরী কে জানত?”
বীরেশ শুধু পাইপের ধোঁয়া ছাড়ে আর অল্প হাসে।
তবু মাঝে মাঝে বীরেশের দৃষ্টি সুপর্ণা। এদিকে ফেরাতে
হাড়ত না।
“দ্যাখ, তােমার মুখার্জিকে আমার বিশেষ ভাল লাগে না।”
“কেন প্রপােজ করেছিল নাকি?”
‘অতটা সাহস হবে বলে মনে কর না।” ঠোঁটের লাল
রেখায় শেষ টান দিয়ে সুক্ষ্মতম করবার সময় বলে সে।
“তবে?”
“বােকা বােকা ঢুলু ঢুলু তাকিয়ে প্রপােজ করার মত বােকা
তােমার মুখার্জি নয়। ও যেন একটু ওভার স্মার্ট।
“সেজন্যই তাে অতবড় পােষ্টটি বাগিয়েছে, তা ভুলে না।”
বৌ-এর মাথায় একটা টোকা দিয়ে বলে বীরেশ।
“দিলে তাে চুলটাকে খারাপ করে ?” আবার একটু চিরুনি
চালিয়ে সুপর্ণা উঠে পড়ে। তারপর বীরেশের ঠিক বুকের
কাছটাতে ঘন হয়ে দাড়ায়। তার গা থেকে ছড়িয়ে পড়ে মৃদু
একটা সুবাস, যা বীরেশকে রীতিমত আবিষ্ট করে তােল।
“আজ তােমায় সত্যিই লােভনীয় লাগছে।” বৌকে কাছে
আকর্ষণ করে দীর্ঘ চুম্বন করে বীরেশ। রীতিমত অস্বস্তি বােধ
করে সুপর্ণা। আবার ঠোটটাকে ঠিক করে নিতে হবে।
সকালের সাত রং বাইরে হর্ণের শব্দ আসে। আর ঠোঁটের রং আবার লাগাতে লাগাতে বীরেশকে জানিয়ে দেয়, আজ সন্ধ্যায় সে মুখার্জির চায়ের পার্টিতে অতিথি। সুপণ। ভাবতেও পারে না এই স্তাবকদের একজনও তার কথা ছাড়া অন্য চিন্তা করবে। এ বেশ মজা। এ খেলায় যেন ক্লান্তি নেই, একঘেয়েমি নেই। নিত্য নতুন বিচিত্র খেলা। মুখার্জি ব্যাচেলর, কিন্তু সেনের নাকি বৌ আছে। এ সম্বন্ধে অনেক গুজবও শােনা যায়। কিন্তু সুপণ। জানে ওর কাছে দুজনেই সমান। সেবার যখন তাদের কথা হ’ল কোম্পানীর গাড়ীতে কাছেই তারা কোথাও বেড়াতে যাবে, তখন স্থানাভাবে মাথাওলা দুচার- জনের স্ত্রীরাও ফর্দ থেকে বাদ পড়লেন। কিন্তু বীরেশের স্ত্রীকে বাদ দিলে নাকি বাইরে যাওয়ার মানেই হয় না। সেন- মুখার্জির সমবেত’ আগ্রহে তাই সুপণ। চলল প্রধানদের সঙ্গে তাদের নির্দিষ্ট গাড়ীতে, আর সারাটা পথ ঠাসাঠাসি করে তাদের স্ত্রীরা অন্যগাড়ীতে জ্বলতে জ্বলতে গেল। এমনি ভাবেই বেশ কাটছিল দিনগুলাে। এমনি করেই যা না। সুপণাও তাই ভেবেছিল। সেদিন সুপর্ণার মাথা ধরেছিল খুব। তাই প্রসাধনে সযত্ন প্রয়াস ছিল না। গেরুয়া রংএর শাড়ীর লাল পাড় ঘেষে তার সাদা পা দুটি সামনে রাখা মােড়ায় তুলে ভেতরের চওড়া বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে একটা বই পড়ছিল সুপণ।।
সকালের সাত রং
দু-একটা রুক্ষ চুল তার সাদা কপালে উড়ে এসে পড়ে তার মধ্যে
একটি বিষন্ন মাধুর্যের সৃষ্টি করেছিল।
গাড়ী আসার শব্দ পাওয়া গেল। জুতাের আওয়াজ এগিয়ে
এল বারান্দা পর্যন্ত। এখানেই আসবে নাকি?
“মিসেস মজুমদার।” পরদার ওপাশে সেনের গলা শােনা
গেল।
সুপর্ণা আনমনা ভাবটা বজায় রাখার চেষ্টা করে।
সেন এসে সামনের চেয়ারে একেবারে মুখখামুখি বসল।
“আপনি? মজুমদারের আগেই?”
“খুব জোর বৃষ্টি আসছে, তাই আগেই চলে এলাম।”
“ফিরবেন কি করে? ওদিকের ভাঙা রাস্তাটায় যে জল
জমে যাবে ?” সুপণ। বইটা রেখে নড়ে চড়ে বসে।
“ফিরব না।”—সেন উদাসভাবে উত্তর দেয়।
‘‘বন, চায়ের কথা বলে আসি।”
“এখান থেকেই ডেকে বলুন। অদ্ভুত সন্ধ্যাটা আজ। তাই
?”
আবার একটা গাড়ীর শব্দ। মুখার্জি নাকি? কিন্তু না,
বীরেশ ঢুকল পর্দা সরিয়ে।
“খুব ক্লান্ত আজ।” অস্ফুট স্বরে বলে বীরেশ, তারপর
সেনকে দেখে বলে “আপনি কখন এলেন?” মুহূর্ত আগের
ক্লান্তিকে মুছে ফেলে আপ্যায়নের হাসিতে মুখ তার ভরে ওঠে।
এখনি।”-ওর দিকে লক্ষ্য না দিয়েই উত্তর দেয় সেন।
সকালের সাত রং তার চোখে বীরেশের প্রতি স্পষ্ট উপেক্ষা ফুটে ওঠে। চা খাবার পর বীরেশ উঠে পড়ে। “আচ্ছা আপনারা বসুন। আমি স্নান সেরে আসি।” কতক্ষণ দেরি হয় বীরেশের। এর মধ্যে সন্ধ্যার অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে আসে। “আলােটা জ্বালা প্রয়ােজন।” সুপণ। হঠাৎ বলে ওঠে। “আলাে থাক। চলুন না মিসেস মজুমদার একটু বেড়িয়ে আসি।” “মজুমদার তাে স্নানে, উনি আসুন।” “আসুক না, আমরা হাঁটতে হাঁটতে এগােই। এত সুন্দর সন্ধ্যাটা আজ, বড় হাঁটতে ইচ্ছে করছে। আপত্তি আছে?” “না আপত্তি কিসের? কিন্তু...” নিজের খােলা চুলের কথা মনে পড়ায় একটু ইতস্তত করে সুপণ।। “মিসেস মজুমদার।” ভারী গলায় সেন ডাক দেয়। বােধ- হয় ওর ইতস্তত ভাবটা লক্ষ্য করে বলে, “একটা কথা বললে বােধহয় বিশ্বাস করবেন না।” “কি এমন কথা?” “আপনাকে আজ না সেজেই অদ্ভুত লাগছে। গেরুয়া শাড়ীতে আপনাকে এমন আশ্চর্য সুন্দর দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে সন্ন্যাসীর ভেক নিই।” “তা মন্দ কি?” হেসে ওঠে সুপণ। “কিন্তু আপাততঃ সে ইচ্ছা স্থগিত রাখছি। বলেই
সকালের সাত রং
কোটের বাটন-হােল থেকে রক্তের মত লাল গােলাপটা খুলে
নিয়ে তুলে দেয় সুপণার হাতে।
ধন্যবাদ জানিয়ে দীর্ঘ একটা ঘ্রাণ নেয় সুপর্ণা, তারপর
সেটা সযতে পাশের ছােট নীচু টেবিলে রেখে দিয়ে কি মনে করে
বলে, “একটু বসুন। আমি এখনই আসছি।”
স্নানের ঘরের কাছে গিয়ে দরজায় টোকা দেয় সুপণ।।
“এই শােন। তােমার দেরি হবে?”
“হা, কেন?” ওপাশ থেকে সাড়া আসে।
“সেন বলছে, একটু বেড়াতে যেতে।”
ঘাও না।”
“আমার ভাল লাগছে না। তুমি তাড়াতাড়ি নাও।
একসঙ্গে বেরােই।”
“না, আমার দেরি হবে। তুমি যাও না! কি আর
হবে। সেনকে চটিও না।”
শুধু সেন কেন ? কাউকেই চটানাে অসম্ভব। সুপণ।
সেকথা ভাল করেই জানে।
জায়গাটা এমনিতেই জনবিরল, তারপর সন্ধ্যায় মেঘ জমার
আয়ােজনে আমরা নির্জন হয়ে এসেছে।
ওরা যখন বাড়ী ছাড়িয়ে খানিকটা দূর এগিয়েছে তখন বড়
বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে আরম্ভ করল।
“কি হবে? ভিজে যাব যে!” হাওয়ায় ওড়া চুলগুলাে
মুখের থেকে সরাতে সরাতে সুপণ বলে।
সকলের সাত রং
“ভিজবেন কেন? আমার ব্যাতিটা নিন।”
আর আপনি?”
“আমার প্রয়ােজন নেই।”
“দরকার নেই। চলুন তাড়াতাড়ি ফেরা যাক।” ততক্ষণে
বৃষ্টি এসে গেছে। হাওয়ার বেগও বেড়েছে।
“ছুটে গেলেও ভিজে যাব। নিন বর্ষাতিটা গায়ে দিন।
আচ্ছা দুজনেই গায়ে দিই আসুন।”
“সে কি ?” চলতে চলতেই সুপণ। বলে, “থাক দরকার
নেই। আমার ভিজলে কিছু হবে না।”
“তা হয় না।” বর্ষাতির একপ্রান্ত ওর গায়ে দিয়ে দেয়
সেন। তারপর বলে, “অস্বস্তি বােধ করছেন নাকি?”
“না অস্বস্তি বােধ করব কেন?” সহজ হবার চেষ্টা করে
সুপণ।।
“একটা বর্ষাতিতে দুজনের ঠিক হয় না, সরে আসুন।”
ওকে কাছে টানে সেন।
“তাড়াতাড়ি পা চালান।” সুপণ না বােঝার ভান করে।
সে কি এতদিন বাদে খেলায় ভয় পেল।
“মিসেস মজুমদার।” সেন প্রায় কানের কাছে মুখ এনে
বলে, “আপনাকে আগুনের সঙ্গে তুলনা
সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছে
করছে।
“এত বৃষ্টির ভেতরেও আগুন নিভে যাবে যে?” “ন্য
গলায় জোরে হেসে ওঠে সুপণ।।
সকালের সাত রং
“ভেতরের আগুন যে। বাইরের ছাঁটে কিছু হবে না।”
বলেই হঠাৎ শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে সেন তার জলে
ভেজা কাঁপা ঠোটে চুম্বন করে।
‘ছাড়ুন।” আস্তে আস্তে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় সুপণ।
‘ছাড়ব বলেই কি আজ এসেছি ?”
তার মানে?”
“মানে তাে বুঝতেই পারছেন।” তারপর সুপণার ঠাণ্ডা
হয়ে যাওয়া হাত মুঠির মধ্যে চেপে ধরে সে আবার বলে,
“আপনি আমাকে পাগল করে দিয়েছেন মিসেস মজুমদার।
আজ সারাদিন কাজে মন দিতে পারিনি। কেবল আপনার
কথা ভেবেছি।”
“বাড়ীতে বসে ভাববেন চলুন।” নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে
নেয় সুপণ।। এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আঁচল ধরে আবার
কাছে টেনে আনে সেন। বৃষ্টি আর অন্ধকারে মিশে রাস্তা যেন
ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
“মিষ্টার সেন।” গর্জে ওঠে সুপা, “মনে রাখবেন
আপনি একজন ভদ্রমহিলার অপমান করছেন।”
“অপমান?” হা হা করে হেসে ওঠে সেন। “আপনাদের
মত মেয়ের আবার অপমান কি? ন্যাকামি রাখুন। চলুন”
জোর করে সুপর্ণাকে জড়িয়ে ধরে সে আবার বলে, “মজুমদারকে
একটা লিফট দিলেই তাে••
চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চায়, কিন্তু অপমানের
ত
সকালের সাত রং
আগুনে তা যেন নিঃশেষে শুষে নেয়। চোখ দুটো করকর
করে। প্রাণপণ শক্তিতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় সুপর্ণা। তারপর
এক রকম ছুটতে ছুটতে এগিয়ে যায় অন্ধকারে।
পনের দিনের মধ্যে বীরেশের নিজের চেষ্টায় বদলির খবরে
সকলেই অবাক হ’ল। যেদিন সুপর্ণারা রওনা হয়ে গেল
সেদিনই বিকেলবেলা বেয়ারার হাতে সেন পেল একখানা মুখ
আঁটা খাম।
খুলে দেখল চিঠি নেই, শুধু একটি শুকনাে লাল গােলাপ।
কমলালেবু
অনেকক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। একটার পর একটা
বাছল। তারপর রেখে দিয়ে ছােটগুলাের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে
জিজ্ঞেস করল হরিপদ, “এগুলাে কত করে?”
ফলওয়ালা ততক্ষণে খদ্দেরের পকেটের খবর বুঝে নিয়েছে।
তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জবাব দিল, “লাওনা বাবু এগুলােই। খুব সস্তা,
টাকায় যােলটা। ক’ টাকার লেবে?”
“টাকায় কুড়িটা হবে না?” হরিপদ তবু আশা ছাড়ে না।
“নাঃ।” স্রেফ জবাব দিয়ে দিল ফলওয়ালা।
“তাহলে দুটো দাও।” পকেট থেকে পয়সা বার করল
হরিপদ। তারপর পাশে অপেক্ষমান ছেলেকে বলল, “লেবু দুটো
হাতে নে রে থােকা।”
থােকা এতক্ষণ চুপটি করে পাশে দাড়িয়ে ছিল। প্রথমেই
বড় লেবুর দিকে আঙুল দেখিয়ে কেনার আবদার করে বাবার
কাছে সে ধমক খেয়েছে। চোখ দুটি তার জলে ভরে গেছে।
আর সে কোন কথা বলেনি। তাকিয়ে কেবল দেখেছে।
একজন মােটা মতন ভদ্রলােক মােটে দর করলেন না।
কেমন বড় এক ঠোঙায় দু’ টাকার কমলালেবু কিনলেন, আর
কলওয়ালা কত তাড়াতাড়ি সব থেকে বড় বড় লেবুগুলাে তাকে
বেছে বেছে দিল। আর হরিপদ কত বেছে দুটি লেবু নিল।
সকালের সাত রং “এ দুটো লেবু কার কার বাবা?” এতক্ষণে থােক। আবার জিজ্ঞেস করল। “দুটোই তমার মায়ের জন্য।” চলতে চলতে জবাব দিল হরিপদ। “আমি একটা নেব বাবা?” “না খােকা, বেশী জ্বালিও না।” “তবে আমি যাব না।” খােকা দাড়িয়ে পড়ল। “আমাকেও একটা দিতে হবে।” “কি মুস্কিল করলে! খােকা মার খাবে কিন্তু। আমার আর পয়সা নেই। কোথা থেকে পাব ? জান ত তােমার মার জন্য দুটোই দরকার।” “তবে আমি একটা চেয়ে আনি। ফলওয়ালার তাে কত আছে। যাই না বাবা।” বাবার হাত ছেড়ে দিল খােকা। ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল হরিপদ খােকার নরম তুল- তুলে গালে। “বদমাশ ছেলে। পথের মাঝে অসভ্যতা? কারও কাছে চাইতে হয় ? হাংলা বলবে না তাহলে।” মার খেয়েও কঁাদল না থােক। কেবল তার বড় বড় চোখ থেকে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। হরিপদ আবার খােকার হাত ধরে চলতে শুরু করল। ছেলেটাকে মেরে মনটা তার কেমন নরম হয়ে গেল। সে ডাকল, “খােকা।” খােক সাড়া দিল না।
সকালের সাত রং
“খােকা, তুমি তাে বাবা লক্ষ্মী ছেলে। বই পড়তে
শিখেছ। তুমি তো জান, কারও কাছে কিছু চাইতে নেই। জান
তুমি?” থােকার মুখের দিকে ঘাড় কাত করে তাকায় সে।
খােকা চলতে চলতে ঘাড় নাড়ল।
“শােন খােক। কাল তােমাকে আমি দুটো লেবু কিনে
দেব। কেমন ?”
কোন উত্তর না দিয়ে থােক। বাবার হাত ধরে চলতে
লাগল।
আশুতােষ কলেজের সামনে এসে হরিপদ একবার তাকিয়ে
দেখা কলেজ বিল্ডিংটার দিকে। এখানেই সে পড়েছিল।
তখন তার কত আশা। হরিপদ মিত্র তখন কলেজেরও আশা।
যেবার ম্যাটিকে থার্ড হয়ে সে কলেজে ভর্তি হ’ল সেবারই তার
বাবা মারা গেলেন। ভাল ছেলে ও, তাই সেইটুকুর ওপর ভরসা।
করেই দাদারা তার পড়াশুনা চালিয়ে গেলেন বি-এ পর্যন্ত। এর
পর কোনদিনও সে সেকেণ্ড ছেড়ে থার্ড হয়নি।
“বই-এর পােকা ও।” বলত ওকে বন্ধুরা। “ওহে হরিপদ,
বলি বই ছাড়াও বাইরের জগতে কিছু দেখবার আছে। সে
খবর রাখ ?”
শুধু হাসত হরিপদ। বলুক না বন্ধুরা। সে জানে, তার
ওপর শুধু তার সংসারের সুনামই নির্ভর করছে না, সারা
কলেজের সুনামও নির্ভর করছে। ভাল করে তাকে পাশ
করতে হবে।
সকালের সাত রং
সেবার এম-এ পড়ার সময় একজনের সঙ্গে তার প্রথম
বন্ধুত্ব হ’ল জোর রকমের। সে প্রণব। সবাই বলল, যদি এতদিন
বাদে সে বন্ধুই করল তাহলে সেখানে পুরুষ না হয়ে নারী
নির্বাচনের বয়স নাকি তার হয়েছে। কিন্তু নির্বিকার রইল
হরিপদ। প্রণবের পড়াশুনা আছে, ও অনেক বাইরের খবর
রাখে। সেই প্রণবই একদিন ওকে খবর দিল অনিমার।
“আমার মাসতুত বােন। বেশী পাস না করেও যে একটা
মেয়ে কত শিক্ষিত হতে পারে তার উদাহরণ পেতে পারবে ওর
সঙ্গে আলাপ করে।” বলেছিল প্রণব।
আর হরিপদ যথারীতি অনিমার সঙ্গে আলাপ করে তৃপ্ত
হয়েছিল। তার বেশী নয়। সকলের সন্দেহকে ভূমিসাৎ করে
দিয়ে সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল যে বই ছাড়া আর কোন
জিনিসকেই সে ভালবাসতে পারবে না। আর বইকেই ভাল
বেসেছিল সে। অধ্যাপকরা আশা করেছিলেন, সে বেশ একটা
কিছু করবে। আর তার বাড়ীর লােকে আশা করেছিল এক
বড় চাকরি পেয়ে হরিপদ তাদের সব কষ্ট ঘােচাবে।
কিন্তু কোন কিছুই হ’ল না হরিপদর। এমন কি ফাস্ট
ক্লাশও পেল না। একটি উচুদরের সেকেণ্ড ক্লাস পেয়ে তাকে
সন্তুষ্ট থাকতে হ’ল। তার আজীবনের সাধনা একবারের
অসাফল্যে নষ্ট হয়ে গেল। যে ছেলেটি ফাস্ট হ’ল তারু
নাকি বরাবরের রেকর্ড ভাল না, তার বাবা পরীক্ষক ও
অধ্যাপকদের মধ্যে একজন ছিলেন বলে তাকে উচু নম্বর পেতে
সকালের সাত রং
বেগ পেতে হয়নি। আর সেবার ফাস্ট ক্লাশও কাউকে দেওয়া
হয়নি।
হরিপদ ভেঙে পড়ল। তার আশা ছিল এরপর সে গবেষণা
করবে। কিন্তু তাও হ’ল না। পরিমল নামে যে ছেলেটি ফাস্ট
হ’ল সে বিলেত যাবার আগে বিয়ে করে নিয়ে গেল অনিমাকেই।
অথচ প্রণবের মুখে হরিপদ শুনেছিল, অনিমার নাকি স্কলারদের
ওপর বেজায় ঝোঁক, যার জন্য হরিপদকেও সে পছন্দ
করেছিল।
নিজের ময়লা ছেড়া পাঞ্জাবিটার দিকে একবার তাকাল
হরিপদ। পরার যােগ্য দ্বিতীয় পাঞ্জাবী আর না থাকায় এটাই
তাকে পরতে হচ্ছে আজ সাতদিন না কেচে। ঘরে সুরমা
অসুস্থা। খােকা জন্মাবার পর একটি মেয়ে হবার পর থেকেই
সুরমা ক্রমশঃ শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। মেয়েটি মারা গেল তিন
মাসের ভেতরই। কিন্তু তার মাকেও আধমরা করে রেখে
গেল।
কত আশা করে সুরমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন মা,
হরিপদর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও।
“বিয়ে না করলে কি চলে? আমি চোখ বুজলে সংসার
দেখবে কে?” বলেছিলেন মা।
: “সে চলে যাবেই। যারা বিয়ে করে না তাদের সংসার
চলে না? সবে চাকরিতে ঢুকেছি, এই মাইনে, এতে চালাব
কোথা থেকে?”
সকালের সাত রং
“সেই জন্যেই তাে গরীবের ঘরের স্বাস্থ্যবতী মেয়ে আনছি
বাবা। গতরে খেটে সে তােমার সংসারে লক্ষ্মী আনবে।”
লক্ষ্মী এনেছেই বটে। মা তাে তাঁর কর্তব্য করে চোখ
বুজলেন। আর বিয়ের সাত বছরের মধ্যেই তিনটি ছেলেমেয়ের
জন্ম দিতে গিয়ে লক্ষ্মীর আহ্বানকারিনী শয্যাশায়ী হলেন।
গতরে খাটা তার আর হল না।
মাসকাবারে হাতের পয়সা একেবারে শেষ হয়েছে। অথচ
লেবুর রসের সঙ্গে ওষুধটা খাওয়ানাের কথা। তাই যে করেই
হােক লেবু দুটি তাকে কিনতেই হ’ল। খােকার জামাটার দিকে
একবার তাকাল হরিপদ। ছেলেটার এত শখ বাইরে বেরােবার,
হলে জামা কাপড় বা স্বাস্থ্য কোনটাই তার পক্ষে এত হাঁটা
বা বেনােনাের উপযুক্ত নয়। তাছাড়া ঘরে বড় মেয়ে রান্না বা
রােগী নিয়ে থাকবে। খােকাকে একটু আগলানও হ’ল। তাই
বেরােবার সময় খােকাকে নিয়ে বেরােনােই শ্রেয় মনে করেছিল
হরিপদ।
“বাবা, মা দুটোই খাবে কেন?” চিন্তায় ছেদ পড়ল
হরিপদর। এতক্ষণেও তাহলে খােকা লেবুর কথা ভুলতে
পারে নি।
“মার যে অসুখ।”
“আমারও কাল অসুখ করবে। আমাকেও দুটো দেরে
বাবা?”
রীতিমত আঘাত পেল হরিপদ। কি যে ভালবাসে ছেলে
সকালের সাত রং
কমলালেবু। যে করেই হােক, ও-মাসে মাইনে পেলেই হরিপদ
একেবারে এক টাকার লেবু কিনে ফেলবে।
“অসুখ করবার দরকার নেই বাবা। দেখ না দু তিনদিন
বাদেই তােমাকে এক সঙ্গে এক টাকার কমলালেবু কিনে দেব।”
“এক—টাকার ?” খােক টেনে টেনে উচ্চারণ করল।
সেই লােকটা যেমন এক ঠোঙা নিয়ে গেল তেমনি, না বাবা?”
“হ্যা।” ছােট্ট একটা উত্তর দিয়ে খােকার হাত ধরে মােড়টা
পেয়ােতে গেল হরিপদ।
এই সময়েই ওপাশের রাস্তা থেকে মােড় ফেরাবার জন্য
গাড়ীটা এসে যে তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে তা কে
জানত?
অনেক লােকজন ছুটে এল। হৈ হৈ করে উঠল সবাই।
ভিড় সরিয়ে লােকজনদের বুঝিয়ে গাড়ীর আরােহী ওদের কাছে
এলেন। খােকার কিছু হয়নি, কিন্তু হরিপদ হুমড়ি খেয়ে রাস্তায়
পড়েছে। হাঁটুর কাছে কাপড় খানিকটা ছিড়ে গেছে, হাতের
মেটো আর কনুই থেকে অল্প রক্ত বেরােচ্ছে।
যেখানে হরিপদ পড়েছিল, সেখানেই তার হাত থেকে
ছিটকে যাওয়া লেবু দুটো পড়ে রইল।
দামী অ্যাটে নিজেকে মুড়ে যে ভদ্রলােক সান্ধ্যভ্রমণে খুশী
মনে বেরিয়ে ছিলেন, তিনি তাঁর বিরক্তিভরা মুখে কষ্ট করে
হাসি টেনে এগিয়ে এলেন। হরিপদ ততক্ষণে ধুলাে ঝেড়ে
নার চেষ্টা করছে।
সকালের সাত রং
“আমি সত্যিই দুঃখিত। আপনার খুব লেগেছে বুঝি?”
তাে কি ঠাট্টা করছে পড়ে যাওয়ার ভান করে-হরিপদ
মনে মনে ভাবল। তারপর উঠে দাড়িয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,
“নাঃ বিশেষ কিছু হয়নি। অল্প ছড়ে গেছে।”
“চলুন আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।” ভদ্রলােক উৎসুক
চোখে তাকালেন ওদের দিকে—“এস খােক।”
থােকার দৃষ্টি এতক্ষণ লেবু দুটোর ওপর ছিল, হাত বাড়িয়ে
নিতে গেল সে লেবু দুটো। আর সেই সময়ই খােকাকে হাত
ধরে টানতে গিয়ে দামী জুততা শুদ্ধ পায়ে অজান্তে মাড়িয়ে
দিলেন ভদ্রলােক লেবু দুটোকে।
“আমাদের লেবু।”—প্রায় আর্তনাদ করে উঠল খােকা।
“কি হল?” হকচকিয়ে একটু পিছু হটে গেলেন ভদ্রলােক।
ছেলেটা হঠাৎ চেঁচাল কেন?
“আমাদের কমলালেবু!”—ফুপিয়ে উঠল খােকা।
“কই? ওঃ।” এতক্ষণে পায়ের দিকে চোখ পড়তে বুঝতে
পারলেন উনি।
“তাতে কি? এই নাও।”—গাড়ী থেকে উনি বার করে
আনলেন এক ঠোঙা কমলালেবু। থােকা দেখল ঠিক সেই
ভদ্রলােকের ঠোঙার মত বড় বড় কমলালেবুতে ভর্তি।
তাড়াতাড়ি সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এগিয়ে গিয়ে
বাবার হাত ধরল থােকা। “চল বাবা।”
“খােকা শােন, গাড়ীতে এসাে, তােমাদের পৌঁছে দেব।”
৭২
সকালের সাত রং
“না।” গম্ভীর হয়ে বলল হরিপদ, “হেঁটেই যাব, অভ্যেস
আছে।”
“তাহলে এই লেবুর ঠোঙাটা নাও থােকা।” ভদ্রলােকের
গলায় বেশ আগ্রহ ফুটে ওঠে।
“না।” এবার মােটা গলায় বলল খােক। তারপর তার
বাবার হাত ধরে এগিয়ে গেল।
বাড়ীর দরজায় এসে কড়া নাড়ল হরিপদ।
“বাবা।” খােকা ডাকল। এতক্ষণ সে একটি কথাও
বলে নি।
“কি ?” হরিপদর স্বর বিষন্ন।
“আমাকে দিলেও আমি কিন্তু নিইনি বাবা। আমি তাে
চাইনি তবু দিল কেন বাবা? কিন্তু আমি নিইনি। আমি কি
হাংলা ?
বড় বড় চোখ মেলে তাকাল খােক। বাবার মুখের দিকে।
হঠাৎ কোন উত্তর দিতে পারল না হরিপদ। শুধু তার হাতটা
আরাে শক্ত করে ধরে বাড়ীর ভেতর উঠে এল।
বিচিত্র মন
অন্যের কথা কি বলব ? নিজের মনের খবরই কি সবাই
জানে? আমার তাে তা মনে হয় না। কত মানুষ তাে দেখলাম,
কত বিচিত্র মন তাদের, বাইরে তারা এক, আবার ভেতরে আর
এক রকম। কি জানি মনের ডাক্তার হয়ত বা এর তল খুঁজে
পেয়েছেন, কিন্তু আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে
পারি নিজের মনই নিজে বােঝা যায় না। এ অসম্ভব।
আমি জীবনে যা করতে চেয়েছি হয়তাে তার উল্টোটি করে
বসেছি। যা চাইনি তাই ঘটে গেছে। যেটা না হলে আমার
চলবে না মনে করে ক্ষেদ করেছি, পরক্ষণেই সেটির প্রতি
নিদারুণ এক নিস্পৃহতা অনুভব করেছি। বিশেষ করে প্রেমের
ক্ষেত্রে। যাকে ছাড়া বাঁচব না মনে হয়েছে তাকে নিঃশেষে
ভুলেছি, আর যার অস্থিত্বকেই স্বীকৃতি দিইনি তার কাছে..
পনের বছর বয়সে যে মেয়েটিকে আমি ভালবেসেছিলাম,
সে আমার থেকে চার বছরের বড়। আমি তখন সবেমাত্র
বঙ্কিম আর শরৎ শেষ করেছি, রবীন্দ্রনাথ তখন আমার মানস
গুরু, আর সেই সময়ই অচলাকে দেখলাম এক চায়ের নিমন্ত্রণে,
আর সঙ্গে সঙ্গে ভালবেসে ফেললাম। তার বয়স তখন উনিশ।
উনিশের যে কি মাধুর্য তা আমার থেকে আর ভাল করে কে
বুঝবে? কবিরা পঞ্চদশী, অষ্টাদশীর বর্ণনায় মুখর, কিন্তু তারা
৭
সকালের সাত রং
কি কখনও উনিশ বছরের ফোটা ফুল দেখেনি? তারা বােধ
হয় দেখেনি, কিন্তু আমি দেখেছিলাম, আর দেখামাত্র প্রেমে
পড়তে দ্বিধা করিনি।
অচলাকে যখন কথাটা জানালাম, অন্ধকারে সাপের গায়ে
পা দেওয়ার মত অচলা যেন চমকে উঠল।
“পাকামাে কর না।” রাগে লাল হয়ে গেল অচলার
মুখ।
“পাকামাে কিসের? তােমাকে ভালবাসা কি অপরাধ ?”
জোরে হেসে উঠল অচলা। “অপরাধ ?” আবার এক
বার জোরে জোরে হাসল, আর আমি ক্ষুব্ধ অপমানে অলতে
লাগলাম।
“আচ্ছা শােন।” এককোণে ডেকে নিয়ে গেল অচলা।
“তােমার বয়স কত বল ত? প্রেমের বােঝ কি?”
“দেহের বয়স আর মনের বয়স তত সকলের সমান নয়।
আমি যদি প্রেমের কিছু নাই বুঝি তাে প্রেমের গল্প লিখি কি
করে ?”
“ওসব তত তােমার উদ্ভট কল্পনা। গল্পের প্রেম আর
জীবনের বাস্তব প্রেম এক হয় না।”
“কিন্তু বাস্তব প্রেমকে ভিত্তি করেই তাে সাহিত্যে...”
আমার কথা থামিয়ে দিল অচলা।
“ব্যস-ব্যস, আর নয়। তােমার কাছে সাহিত্যের প্রেম
সম্বন্ধে আর একদিন শুনব। আজ সুপ্রতিম আসবে এখনি।
সকালের সাত রং
আঙুলের
আমার এখনও কিছু হয়নি।”—মােটা একটা চিরুনি দিয়ে তার
চুলের জট ছাড়াতে লাগল অচলা। আর চুলের মধ্যে তার
সুন্দর
ফস। চলাফেরা দেখে আমি তাকে আরও গভীর
ভাবে ভালবাসতে লাগলাম।
“সুপ্রতিম।” রাগ করে বললাম, “জানাে ঐ নামটা
পর্যন্ত আমি সহ্য করতে পারি না।
“তুমি না পারাতে কিছু এসে যায় না। আবার হাসল
অচলা, “আমি যে খুব বেশী রকমের পারি।”
“তুমি কি নিষ্ঠুর।” প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম আমি।
“তাই নাকি?”—আমার মাথায় একটা নাড়া দিয়ে জোরে
হেসে উঠল অচলা, তারপর বাড়ীর ভেতর চলে গেল। আর
আমি পাথরের মত বসে রইলাম প্রত্যাখ্যাত প্রেমের অপমানের
“জ্বালা সহ্য করে।
আধ ঘণ্টা পরে সুপ্রতিম যখন এসে পৌছাল, অচলা তখনই
বেরিয়ে এল। সাজসজ্জা শেষ করেও সে সুপ্রতিমের আসার
অপেক্ষাতেই দরজার আড়ালে দাড়িয়েছিল নাকি ? না হলে
এক মুহূর্তও সুপ্রতিমকে অপেক্ষা করতে হ’ল না কেন?
এতক্ষণ ভাবছিলাম অচলার কথা। কি কঠিন মেয়ে।
আমার এতখানি ভালবাসা ওকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারল না।
রীতিমত আহত হলাম আর ঈর্ষায় মরে গিয়ে দেখতে লাগলাম
সকালের সাত রং
এই কঠিন মেয়েই কি কোমল হয়ে গেল সুপ্রতিমকে দেখার
সঙ্গে সঙ্গে।
“তুমি তাহলে এখন কি করবে? আমরা তাে বেরােচ্ছি।”
সােজা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে অচলা জিজ্ঞেস করল।
‘‘আমিও যাব ” তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম চেয়ার থেকে।
“তােমাদের কথাবার্তায় বাধা দিলাম নাকি?” যেতে যেতে
সুপ্রতিম জিজ্ঞেস করল অল্প হেসে।
ওর হাসি যেন ছুরির মত আমাকে কেটে কেটে যেতে
লাগল। এই প্রথম কোন লােকের প্রতি আমি বিজাতীয় ক্রোধ
দুভব করলাম।
এতক্ষণে লক্ষ্য করলাম অচলাকে আজ অপূর্ব দেখাচ্ছে।
অন্যদিন বা সময় হলে নিশ্চয়ই কিছু বলে উঠতাম। যে
রংএর শাড়ীতে ওকে প্রথম দেখে আমি ভালবেসেছিলাম, আজ
যেন বেছে বেছে ঐ শাড়ীটাই পরেছে অচলা। আমি মনে মনে
আবার অচলার সৌন্দর্যের প্রশংসা না করে পারলাম না।
অচলার রূপ দেখে আমার বরাবরই মনে হত এ সৌন্দর্য কেবল
দূর থেকে তারিফ করার, একে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না।
আমার মনে হ’ত একে ছুলেই এর পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাবে।
আজ সে মত সম্বন্ধে আরও নিশ্চিন্ত হলাম।
অচলার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছেদ হয়েছে ভেবে মনকে স্থির
সকালের সাত রং করতে চাইলাম, কিন্তু তার সেই স্বর্গীয় সৌন্দর্য আমার মনকে তারই দিকে টেনে রাখত। অচলা আমার প্রেমের সম্মান দেয়নি বলে ওর বাড়ীতে যাওয়া ছাড়লাম। কিন্তু ওর ওপর রাগ হল । মনে হ’ল ও ঠিকই করেছে, ও তাে কারও পার্থিব প্রেমের প্রতিদান দিতে পারে না। ও যে স্বর্গীয়। কিন্তু এর ঠিক এক বছরের মধ্যেই যে আমার মনের ভাব এমন হবে কে জানত? সেদিন অচলার বাড়ীতে গিয়ে যখন পৌছুলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আমার কাছে ওর কতকগুলো বই ছিল। দেবার জন্য নিজেই গিয়েছিলাম ওদের বাড়ীতে। বাড়ী অন্ধকার। বােধ হয় কেউ নেই। দরজায় আস্তে আস্তে কড়া নাড়লাম। হিন্দুস্থানী একটা চাকর এসে দরজা খুলে দিল। বােধহয় নতুন এসেছে এ বাড়ীতে, আগে তাকে দেখিনি। জিজ্ঞেস করলাম- “বাড়ীতে কেউ নেই ?” “জী।” “দিদিমণি আছেন?” “জী।” বুঝলাম এর সঙ্গে সময় নষ্ট করা বৃথা। অতএব আমার অতি পরিচিত অচলার শশাবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। “অচল।”বলে ডেকেই পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলাম আমি। পরক্ষণেই বেরিয়ে এলাম। আমার তখন জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে। থাকব কি চলে যাব ভেবে পেলাম না। ৫
সকালের সাত রং
অচলা ঘুমােচ্ছ। তার অসংবৃত জামা-কাপড়ে, তার হাঁ-
করা মুখে, আর ঘুমানাের ভঙ্গিতে সব মিলিয়ে এমন একটা
দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে, যা দেখে আমার মনে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগল।
ভাললাগা মন্দলাগার ক্ষমতা আমার ভেতর যে একই সঙ্গে
এভাবে কাজ করছে তা কে জানত? এই নারী দেহ? এই
দেহকেই আমি এতদিন আমার হৃদয়ের সবটুকু পূজা নিঃশেষে
ঢেলে দিয়েছি ?
আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলাম বাড়ী থেকে। মনে হল
অচলাকে বােধ হয় আমি কোনদিনই ভালবাসিনি। তা না হলে
ইতিমধ্যেই ওর প্রতি আমি এত তীব্র বিতৃষ্ণা অনুভব করতে
আরম্ভ করেছি কেন ?
সত্যিই এরপর থেকে অচলার স্মৃতিমাত্র আমার কাছে
খারাপ লাগতে লাগল। তাকে যে কোনদিনই ভালবেসেছিলাম,
সে কথা নিঃশেষে ভুলে যেতে চাইলাম।
অচলার কাছে আমার মন যে আঘাত পেল জীবনে তার
পুনরাবৃত্তি ঘটনার সম্ভাবনা রদ করবার যথােপযুক্ত আয়ােজন
আমার নিজের ভেতর আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্বাস
করলাম। আর আমার এই আভ্যন্তরিক প্রতিবাদ এত জোরাল
হল যে বহুদিন, প্রায় দশ বছর ধরে, কোন মেয়ের সঙ্গেই
ঘনিষ্ঠতা ঘটতে পারল না।
সকালের সাত রং কত মেয়ের সঙ্গেই তাে পরিচয় হল। কত মেয়েকেই তাে দেখলাম। কিন্তু কাউকেই ভালবাসার কথা ভাবতে পারলাম । সত্যি বলতে কি দেহের ব্যাপারে আমার কেমন একটা আপত্তিই জন্মে গিয়েছিল। তাই যে মেয়েটিকে ভাল লাগবার পরই মনে হত মেয়েটি সুন্দর, তার দেহ তাকিয়ে দেখবার মত, তখনই আমার মনে হত যে এর ভেতরও হয়ত কিছু সুলতা: আছে যা আমার মনকে আবার পীড়িত করে তুলবে। ইতিমধ্যে সাহিত্য-প্রীতিবশত আধুনিক কবিতার রসে আমার মনকে ভরিয়ে তুলেছি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা তাে আমার শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এখন আধুনিক কবিদের কবিতার বহু ভাল ভাল লাইন আমার সর্বদাই মনে ঘরে। এমন কি তাদের সমধর্মী ইংরেজ ও ফরাসী কবিদের সঙ্গে তাঁদের কত- টুকুই বা পার্থক্য আর কোথায়ই বা সাদৃশ্য তাও আজকাল বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারি। বন্ধু-সমাজে কবি ও বিদগ্ধ ব্যক্তি বলে কিছু খ্যাতিলাভও করেছি। আমার ছােট বােন মঞ্জুর বন্ধু রুণুকে আমার ভাল লাগল তার লেখা “আধুনিক সাহিত্যে নিসর্গের স্থান” প্রবন্ধটি পড়ে। প্রকৃতির কবি বলে পরিচিত এক আধুনিক কবির বহু উদ্ধতি সে বেশ লাগসই ভাবে ব্যবহার করেছে। মাঝে মাঝে তার বিস্ময়কর মন্তব্য থেকে স্পষ্ট বােঝা যায় যে আধুনিক কবিদের অনেক কবিতাই তার বেশ জানা আছে। তার সঙ্গে অনেক বিষয়ে দ্বিমত হওয়া সত্বেও বুঝতে পারলাম
সকালের সাত রং
রুণু প্রবন্ধটি অসম্ভব ভাল লিখেছে। সাহিত্য জগতে আমার
যেটুকু পরিচয় ছিল তারই ফলে মঞ্জুর অনুরােধে আমি ওর
প্রবন্ধটা একটা পত্রিকায় বার করতে সাহায্য করলাম।
সেদিন ধন্যবাদ জানাতে এসে রুণুর সঙ্গে আমার দু-তিন
ঘণ্টা এ বিষয়ে আলাপ আলােচনা হ’ল। সাহিত্যের কোন
দিকই বােধ হয় বাদ রাখলাম না। বার বার ওর সঙ্গে আমার
মতের অমিল হওয়ায় আমি বেশ অধৈর্য হয়ে উঠতে লাগলাম,
অথচ রুণু বেশ ধীরভাবে যুক্তি দিয়ে তার নিজের মত প্রতিষ্ঠা
করার চেষ্টা করতে লাগল।
এ রকম সাহিত্য সভা প্রায়ই হত। একজন নীরব শ্রোতা,
আমরা দুজন তার্কিক। ক্রমশঃ এই আলােচনা সভা একটা
নেশায় দাড়িয়ে গেল। নানা বই পড়ে নিজেকে শানিয়ে রাখতাম,
জোরাল যুক্তি দিয়ে রুণুর মতামতকে নস্যাৎ করবার জন্য
নিজেকে প্রস্তুত রাখতাম।
বন্ধু-বান্ধবরা টিটকারি করত আমি প্রেমে পড়েছি ভেবে।
আর আমার হাসি পেত রুণুর প্রেমে পড়া যায় এই কল্পনামাত্রে।
সেদিন রবিবারের সকালেই আমাদের আলােচনা সভা জমে
উঠল। ইদানীং আমাদের সভার শ্রোতাটি প্রায়ই অনুপস্থিত
থাকত। তাতে আমাদের কিছু অসুবিধা হত না। আমি আর
রুণুই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলােচনা করে যেতাম।
যে জানলা দিয়ে রােদ আসছিল, তার ঠিক উল্টো দিকেই
রুপু বসেছিল। মুখে রােদ লাগার দরুন হাত দিয়ে বারবার সে
সালের সাত
চোখ আড়াল করছিল। বুঝলাম রুণুর অসুবিধা হচ্ছে। উঠে
গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দিলাম। ফিরে আসবার সময় একটা
টেবিলে ধাক্কা লেগে পায়ে ব্যথা পেলাম।
“উঃ!” বলে পা-টা ধরে খাটের এককোণে বসে পড়লাম।
“দেখি দেখি কোথায় লাগল ?” রুণু চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে
এল।
“পায়ে। হাত দিও না।” নিজের পায়ের আঙুলটা চেপে
ধরে বল্লাম।
“তাতে কি হয়েছে ? দেখি না কি হল।” জোর করে
কোথায় লেগেছে দেখতে গেল।
“ছাড়াে।” হাতটা সরাতে গেলাম, আর এই প্রথম যেন
অনুভব করলাম, রুণু একটি মেয়ে। ওর হাত আমার হাতের
মধ্যেই ধরা রইল, আস্তে আস্তে ওর হাতটা আমার দু হাতের
মধ্যে তুলে নিয়ে ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম।
রুণু বােধ হয় অস্বস্তি বােধ করছিল। হাতটা ছাড়িয়ে
নিয়ে সরে গিয়ে ওর নিজের চেয়ারে বসল।
আমি ধীরে ধীরে গভীর গলায় ডাকলাম-“রুণু।”
“কি হল আবার ?” ওর মুখটা লাল হয়ে গেছে, কিন্তু
ভাৰ গােপন রাখার চেষ্টা করতে ও দ্বিধা করল না।
বড় ব্যথা লাগছে।”
“তবে?” ও এবার যেন সত্যিই খুশী হল, অন্য কিছু
বললাম না বলে। একেবারে কাছে চলে এল তারপর বুকে
সকালের সাত রং
পড়ে বলল-“দেখি। ইস রক্ত পড়ছে, দাড়ান জল নিয়ে
আসি।”
ওকে আঁচল ধরে টেনে আনলাম নিজের কাছে, তারপর
প্রায় ফিসফিস করে বললাম ওর চোখের দিকে সােজা তাকিয়ে
—“ব্যথাটা পায়ে নয়, এখানে।” ওর হাতটা টেনে নিয়ে
আমার বুকের বাঁ দিকে চেপে ধরলাম।
“ছাড়ুন।” গম্ভীর হয়ে ধীরে ধীরে ওর হাতটা ছাড়িয়ে
নিল রুণু। তারপর ফেলে রাখা ওর বইগুলাে গুছিয়ে নিল।
পেনটা তুলে নিয়ে ব্লাউজে গুজে বলল-“আজ যাই।”
আমি এতক্ষণ চুপ করে দেখছিলাম। ও আমার দিকে
চোখ তুলে তাকানাে মাত্র কি যেন অনুভব করলাম। সব কিছু
ভুলে ওকে কাছে টেনে আনলাম। ওর হাত থেকে সব বই
পড়ে গেল সশব্দে। আর ও কিছু বলবার আগেই চুম্বনে চুম্বনে
ওকে ভরিয়ে দিলাম। ওর পাতলা দেহ থরথর করে কাঁপতে
লাগল।
ঠিক সেই সময়েই মঞ্জু ঘরে ঢুকল-“দাদা।”—প্রায়
আর্তনাদ করে উঠল সে।
সম্বিত ফিরে পেলাম। যে পশুটা মাতাল হয়ে এই কাণ্ড
করল তার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে রুণু দু-হাতে মুখ ঢেকে
কেঁদে ফেলল। তার কান্না যেন ধীরে ধীরে সমস্ত জায়গায়
ছড়িয়ে গেল। আমি ভয় পেলাম।
মঞ্জু আমার দিকে ঘৃণা আর বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে
সকালের সাত রং
৮৩
রইল। সে অবাক হয়েছে।
কিন্তু সব থেকে বেশী অবাক হয়েছি আমি নিজে।
যে-আমি দেহ সম্বন্ধে একটি চীনের পাঁচিল তুলেছি বলে
জানতাম, তার পক্ষে কোন মেয়ের সঙ্গেই যে রক্তমাংসের সম্বন্ধ
ঘটতে পারে না—এ বিষয়ে স্থির নিশ্চিত ছিলাম। এমন কি
কোন মেয়ের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা হতে পারে এ বিষয়ে কল্পনা
করাও অসম্ভব ছিল।
কিন্তু আজ এ কি হল? রুণু, যাকে প্রতিনিয়ত দেখছি,
ছােট বেলা থেকে যে আমাদের বাড়ী এসে প্রায় মঞ্জুর সমানই
হয়ে গেছে এ বাড়ীতে, দেহের সৌন্দর্য যার বিশেষ প্রায়
কিছুই নেই, তাকে আমার আকর্ষণীয় লাগবার কোন কারণ
ততা ঘটে নি।
সত্যি সত্যিই নিছক সাহিত্য আলােচনার জন্যই যে আমরা
রােজ গল্প করতাম, আমাদের রােজকার আলােচনা সভায় ফে
এক মুহূর্তের জন্য সাহিত্য ছাড়া অন্য কিছুর আলােচনার
সম্ভাবনা পর্যন্ত ছিল না, এখন কি করে তা বােব ?
মঞ্জুর সরল চাহনি যেন আমাকে নীরব তিরস্কার করতে
লাগল। আর হতভম্বের মত বসে রইলাম আমি।
করকোষ্ঠী
বড় রাস্তার ধারেই ফুটপাতে বেশ গুছিয়ে নিয়ে বসেছে
লােকটি। পেশা চালাবার জন্য যা দরকার, তার টুকিটাকি
জিনিস সংগ্রহ করে সযত্নে সাজিয়ে রেখেছে। সামনে একটা
বাক্সের ওপর গাঢ় চন্দনের প্রলেপ, তার ওপর দুটি পেতলের
খড়ম। খড়ম দুটি ফুল আর চন্দনে ঢেকে দিয়েছে। একটি
কম্বল পেতে বসেছে লােকটি। রােদ থেকে বাঁচবার জন্য
পুরানাে তালিমারা একটা ছাতা খুলে দিয়েছে। এককালে
ছাতার রং কালােই ছিল বােধ হয়। তবে আজ সেটা ময়লা
ছাই রং-এ দাড়িয়েছে।
পাশে কয়েকটা বহু পুরানাে ছেড়া বই। সামনে একটা
তেলচিটে বড় কাগজে মস্ত বড় হাতের লাল ছাপ। রেখাগুলি
স্পষ্ট করে টানা আর তার চারপাশে অসংখ্য কালীর লেখা।
হাতের ছাপটি যে চৌকিতে রাখা সেটি একটি কাগজের ফুলে
এড়ানাে।
সকাল বেলা স্নান সেরে গঙ্গার ঘাটেই ফোঁটা-তিলক কেটে
নিয়ে বসে গেছে লােকটি। হাওড়ার এ অঞ্চলে সর্বক্ষণই খুব
লােজনের যাতায়াত। আর গঙ্গায় স্নান করতে যাবার ও
ফেরবার পথে কত লােকই তাে বসে যায়।
“বাবাজী, বলিয়ে না মেরা নসিবনে সুখ হায় কেয়া নহি।”
সকালের সাত রং
প্রৌঢ় এক পাগড়ীওলা শােক তার সামনে নিজের ফাটা
ফাটা হাতের চেটোটা প্রসারিত করে বসে পড়ে।
বহুক্ষণ ধরে হাতটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সে। তারপর
হঠাৎ কি যেন দেখতে পেয়ে মাথাটাকে পেছনে নিয়ে যায়।
একদৃষ্টে চেয়ে থাকে কোন এক নির্দিষ্ট চিহ্নের দিকে। মুখে
তারিফের শব্দ করে তারপর বলে ওঠে, “বাঃ বাঃ।”
উৎসুক হয়ে ভাল করে বসে আগন্তুক। যে লােকটির
কাছে তার ভবিষ্যতের সমস্ত সুখ-দুঃখের খবর এসে পৌঁছেছে
তার প্রতি সন্ত্ৰমে বােধকরি প্রৌঢ়ের মন ভরে যায়।
অচিরাৎ খুব বড় রকম একটা লাভের সম্ভাবনার আশ্বাস
দিয়ে ওর হাতটা ঠেলে দেয় জ্যোতিষী। আবার কি মনে করে
টেনে নেয়। ভুরু দুটো কুঁচকে ফেলে। তারপর ওর প্রসারিত
হাতের মুঠিটা বন্ধ করে দেয়। এবার আগন্তুক বুঝি ভয় পায়।
“কৈ মুস্কিল হায়?”
“ছ।” গম্ভীর হয়ে বলে সে-“ভাগ্যে শনির দৃষ্টি আছে
“তব, হাল কেয়া হােগা বাবাজী?”
“হাল আর কি?-কিছু খরচ করে এহশান্তি করতে
হবে।” মুখের নির্লিপ্ত ভাবটুকু যথাসম্ভব বজায় রাখার চেষ্টা
এক ঘণ্টা বাদে বহু দর কষাকষির পর কিছু দক্ষিণা দিয়ে
যখন সে লােকটি উঠে পড়ে, তখন জ্যোতিষীর মুখে বেশ একটা
সকালের সাত রং
খুশীর আমেজ ফুটে ওঠে।
কোন কোন সময় সারাদিনে দুটো লােককেও হয়তাে সে
কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারে না। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে
হতাশ মনে বাড়ী ফেরার সময় সামনে শুয়ে থাকা রাস্তার রুগ্ন
কুকুরটাকে একটা সশব্দে লাথি মেরে এগিয়ে যায়। বহুদুর
পর্যন্ত কুকুরটার ঝিমরে ঝিমরে কান্না শােনা যায়।
সেদিন কি একটা পর্বের দিন ছিল। সকাল থেকে কত
লােকই গেল। মনটা ভালই ছিল জ্যোতিষীর। একটি লােককে
ততা রীতিমত ঘায়েল করা গেছে। পুত্রশােকের মত মােক্ষম
অস্ত্র ছেড়ে তার কাছে থেকে গােটা একটা টাকা আদায় করেছে
দশটা নাগাদ তিন-চারটে মেয়ে আর বৌ দল বেঁধে স্নান
করতে গেল। তার মধ্যে দুটি বেশ অল্পবয়সী।
একটি বৃদ্ধার হাত দেখতে দেখতে আড়চোখে একবার ভুরু
কুঁচকে চেয়ে দেখল জ্যোতিষী। রাস্তায় এত জোরে হাসাহাসি
কয়ে যেতে দেখলে রাগ হবে না? মেয়েগুলাে কী।
সব থেকে যে মেয়েটা বেশী হাসাহাসি করছিল তার
বাঙালীর মত সাজ-পােশাক, কিন্তু কথাবার্তায় একটু অবাঙালীর
টান। সঙ্গের বুড়ীর হাতে গঙ্গাজলের যে ঘটিটা ছিল তার থেকে
খানিকটা জল মাটিতে পড়ে গেল তার হাসাহাসির জন্য। ধমকে
সকালের সাত রং
উঠল বুড়ী, “ফেললি তাে! এই জন্যে তাের সঙ্গে আসতে চাই
সুভদ্রা। রাস্তায় এসেও ন্যাকামি যায় না।”
“রাস্তায় এলুম তাে কি হল গাে।”—জোরে হেসে উঠল
সুভদ্রা, “এ তাে কোম্পানীর রাস্তা। আমরা তাে টেক্সস দিই।
কি বল ভাই শান্তা।” পাশের সঙ্গিনীকে একটা ঠেলা দেয়
সুভদ্রা।
এই সময় হঠাৎ তারও চোখ পড়ল জ্যোতিষীর দিকে।
“ও ভাই শান্তা। চ’না ভাই একটু নসিবটা জেনে লি।”
“আর নসিব জেনে কাজ নেই।” সঙ্গের বুড়ী গজগজ করে
উঠল, “বেলা হয়নি ? রান্নাবান্না নেই ?”
“সে তাে ােেজ আছে গাে দিদিমা। আমি একটু হাতটা
দেখিয়ে লিই।”
“তাহলে আমরা চললাম। তুই থাক।” বুড়ী এগিয়ে
গেল। শান্তা নামে মেয়েটিও এগিয়ে যাচ্ছিল। আঁচল ধরে
তাকে টেনে রাখল সুভদ্রা। বুড়ী ডাকল শান্তাকে।
“কি রে। তুইও হাত দেখাবি নাকি? দাড়ালি যে?”
“কি করি দিদিমা ? সুভি যে টেনে ধরে রয়েছে। আচ্ছা
তােমরা এগােও, আমরা যাচ্ছি একটু পরে।” শান্তা পেছিয়ে
এল সুভদ্রার সঙ্গে।
জ্যোতিষী তখন এক বুড়াের হাত দেখে তার ভবিষ্যতের
রহস্যের আবরণ সরাবার চেষ্টা করছিল।
“আমাদের হাতটা একটু দেখবে নাকি গণক ঠাকুর?”
সকালের সাত রং
অভদ্রা এসে দাঁড়াল শান্তাকে নিয়ে।
একবার চোখ তুলে তাকাল ওদের দিকে, তারপর চোখের
ইজিতে ওদের বসতে বলে আবার গড়গড় করে উপদেশ দিতে
লাগল বুড়ােকে।
অনেক দর কষাকষির পর লােকটা একটা সিকি ফেলে উঠে
দাড়াল। সিকিটা একবার কপালে তারপর খড়মে ঠেকিয়ে
বাক্সের ভেতর ফেলে দিল জ্যোতিষী। তাপর ওদের দিকে
তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কার হাত আগে দেখবাে?”
“আমি হাত দেখাব না। ওর হাতটাই দেখ গাে গণক
ঠাকুর।” শান্তা সুভদ্রাকে দেখিয়ে দিল।
শুধু হাত দেখাবে? না কিছু ভবিষ্যৎ পােনাবে?”
ভবিষ্যতই তােগােনাব।”
“তাহলে এক টাকা লাগবে।”
“বাগে আনা পাবে। দেখ বাৰু হাতটা।” ওর মুঠিটা
খুলে জ্যোতিষীর সামনে মেলে ধরল সুভদ্রা নিঃসঙ্কোচে। একটু
যেন দ্বিধা করল জ্যোতিষী।
“কই গো। দেখ।” এবার আর একটু এগিয়ে দিল।
হাতটা সুভদ্রা।
হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল জ্যোতিষী। শক্ত করে ধরল হাতটা
সুইজার। তারপর হাতের রেখাগুলাের দিকে তার মনকে
আবদ্ধ করল।
বহুক্ষণ ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলওর হাতখানি। মাথাটাকে
সকালের সাত রং
৫
পেছন দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে একদৃষ্টে সে তাকিয়ে রইল কোন
এক নির্দিষ্ট চিহ্নের দিকে।
খিলখিল করে হেসে উঠল সুভদ্রা : “অতক্ষণ ধরে কি
দেখছ গাে।”
এবার চোখ তুলে তাকাল জ্যোতিষী। বলল, “তােমার
হাত তত সংঘাতিক।”
“হবে না? আমি লােকটিও যে সাংঘাতিক গাে” হেসে
সুভদ্রা একটা ঠেলা দিল শান্তাকে।
“চুপ ক শুভি, ওকে বলতে দে।” শান্তা ওর কাঁধে হাত
রাখল।
“ও বললে তাে চুপ করি। বলে না যে।” হােট গলায়
বলল সুভদ্রা।
একবার তাকাল ওদের দিকে জ্যোতিষী।
“কতদিন বাঁচব বল তাে?” সুভদ্রা ভয়ের ভান করে।
জিজ্ঞেস করে।
তা মন্দ নয়। অন্ততঃ আশী বহুর।”
সভয়ে চমকে উঠে হেসে ফেলল সুভদ্রা।
“বল কি গাে? আশী। তখন তাে একবারে ঢকঢকে বুড়ী
হয় যাব।”
“হঁ্যা, লাশী প্রায় হবে।” হাতটা ভাল করে দেখে নিয়ে
জ্যোতিষী নিঃসন্দেহ হ যেন। “অদ্ভুত তাে।” হঠাৎ কি
একটা বুঝি খুজে পেল ওর হাতের রেখায়।
সকালের সাত রং
“কী অদ্ভুত গণক ঠাকুর?” শান্তা ঝুকে পড়ল ওর হাতের
'ওপর।
“মাথা সরাও, ভাল করে দেখতে দাও।” তারপর সুভদ্রার
দিকে চেয়ে বলে জ্যোতিষী, “আচ্ছা তােমরা তো এখানেই থাক,
না?”
“হ্যা, এই গলিটা পেরােলেই আমাদের বস্তি।” সুভদ্রা
-বলল।
“পেয়ারা বাগানে ?”
“হ্যা।”
“অন্যদিন তাে দেখিনি তােমাদের।”
“আমরা তােত প্রায়ই যাই। তবে সুভদ্রা তত থাকত না।
এই দু মাস হল পেয়ারা বাগানে এসেছে।” শান্তা উত্তর
দিল।
“তােমার নাম বুঝি সুভদ্রা ?”
“সে কথা গুণে বলতে পারলে না গণক ঠাকুর?”
“তাহলে অঙ্ক কষতে হয়।”
“অঙ্ক কষে বুঝি সব বলতে পার ?”
সব।”
“আচ্ছা বল ত আমার বয়স কত? কোথায় আমার বাড়ী।
আমার কে কে আছে?” হাসতে হাসতে সুভদ্রা বলে
চল।
“আস্তে আস্তে। এক সঙ্গে অত কথার উত্তর দেব
সকালের সাত রং
করে? এ সমস্ত শক্ত অঙ্ক তত এত তাড়াতাড়ি হয় না। আচ্ছা
তােমার পনের বছর বয়সে কিছু হয়েছিল ?”
গম্ভীর হয়ে গেল সুভদ্রা।
‘হ্যা, পনের বছরেই তাে সাদি হল গাে।”
“হ্যা, ভারী তাের সাদি। জন্মে যে বরের মুখ দেখলি না।”
শান্তা ঠেলা দিল ওকে।
ওদের কথায় কান না দিয়ে গম্ভীর হয়ে সুভদ্রার হাত
দেখতে লাগল জ্যোতিষী, তারপর নীচু গলায় প্রায় ফিসফিস
করে বলার মত করে বলল, “বিয়ের পরই তােমার স্বামী
নিখোঁজ হয়, না?”
অবাক হয়ে গেল সুভদ্রা। সত্যি কি করে জানল লােকটা ?
'সন্ত্ৰম বেড়ে গেল তার।
“তার খোজ বলতে পার?”
গুণে দেখতে হবে।”
“এখনি বল না।”
“না, আজ বলতে পারব না। কাল একবার এসাে। গুণে
দেখে রাখব। অনেক অঙ্ক কষে তবে তােমার স্বামীর খোঁজ
পেতে হবে।”
উঠে দাড়াল সুভদ্রা। আঁচল খুলে একটা আধুলি বার
করে জ্যোতিষীর হাতে দিল। বলল, “বাকিটা কাল নিও।”
ওর দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জ্যোতিষী।
রংচটা একটা জামার ওপর বেগুনি ডুরে শাড়ীটা ঘুরিয়ে পরেছে
সকালের সাত রং
পণে',
লুজা। তার নিটোল বুক আর কোমরের প্রতিটি রেখার
সৌষম্যে অভিভূত হয়ে গেল জ্যোতিষীর মন। একটু পরে
সে বলল, “কাল ঠিক এসে। একটু সকাল সকাল।
রাখব।”
ভিজে কাপড় ভাল করে গুছিয়ে হাতে তুলে নিল সুভদ্রা।
তারপর হেসে বলল “আসবই তাে গাে। আমার হারিয়ে
যাওয়া আমিকে তুমি খুঁজে দেবে আর আমি আসব না?”
ওর আমি। একবার বড় করে তাকাল ওর দিকে
জ্যোতিষী। তারপর খড়মটাতে আধুলিটা ঠেকিয়ে বাক্সে
ফেলল।
বস্তির শেষ দিকে একখানা নীচু চালার ঘরের দরজার তালা
খুলল সুভদ্রা। তারপর ভিজে কাপড়টা বাইরের একটা ইটে
রেখে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণ পর গুনগুন করে একটা হিন্দী গানের সুর ভঁজতে
ঊাজতে সুভদ্রা কাপড়টা মেলে দিচ্ছিল দড়িতে। শান্তা তার
ঘর থেকে বেরিয়ে বলল, “কি রে শুভি। বরের খোঁজ পাওয়া
যাবে নেই মনে ফুর্তি জাগল ?”
কোন কথা না বলে ওর দিকে তাকিয়ে একবার হাসল
অনুষ। তারপর বােয়াকে রাখা বালতির উনুনটা টেনে নিয়ে
উনুন ধরাতে বসল।
সকালের সাত রং
তার এখন পঁচিশ বছর বয়স। দশ বছর আগে হাপিয়া
জেলার এক অখ্যাত দেহাতে তার বিয়ে হয়েছিল একজনের
সঙ্গে। তাদের সমাজের রেওয়াজমত অল্প বয়সে তার বিয়ে
হওয়ায় কত কথা শুনতে হয়েছিল তার বাপ-মাকে। প্রায়
এক ঘরে হয়েছিল তারা। তবু বাবা তার সাদি দেয়নি। বরং
চেয়েছিল আর পাঁচটা গােয়ালার মেয়ের মত তার মেয়ের জীবন
যেন এভাবেই না যায়। গ্রামের পাঠশালায় কিছুদিন পড়েও
ছিল সে। বাপের একমাত্র মেয়ে আর মােড়লের মেয়ে বলে
তার হােটবেলা যেভাবে কেটেছিল গ্রামের অন্য মেয়েদের সেটা
ঈর্ষার বস্তু ছিল।
কিন্তু অত খােজখবর করেও যে বিয়ে হল তাতেও সে
সুখী হল না। সকলে বলল সুভদ্রার কপালই খারাপ। নাহলে
বিয়ের দুদিন বাদেই কারও স্বামী নিখোঁজ হয় ?
কত খোজাখুজি করল তার বাবা, কিন্তু কোন পাত্তা পাওয়া
গেল না রামকিষনের।
তারপর তারা চলে এল বাংলা দেশে। তার বাবা মারা
যাওয়ার পর সে আর তার মা দেশের সম্পত্তি বেচে ফেলল।
বাবার ব্যবসাটাকেই নিজের কাঁধে তুলে নিল সুভদ্রা। আরও
কতকগুলাে গরু কিনে সে ভাল করে জাঁকিয়ে বসল আর
দেশেই। যে জীবনকে এড়াবার জন্য তার বাবা আপ্রাণ চেষ্টা
করেছিল সেইটাই একমাত্র সত্য হল সুতার। সে হল
গােয়ালিনী। দুধ বেচাই হল তার পেশা।
সকালের সাত রং
“সুভদ্রা। জেরা পানি দেনা মা।” ঘরের ভেতর থেকে ।
মার ডাক এল। বুড়াে হয়ে গেছে তার মা। দশ বছরেও ভাল
বাংলা শিখতে পারল না। অথচ সে নিজেকে প্রায় বাঙালীই
ভাবে। পাশের ঘরের শান্তা আর তার বাঙালী বর হরিশের
দাম্পত্য জীবন দেখে তার রামকিষণকেও সে কবে যেন হরিশের
সদে এক করে ফেলেছে।
“যাই।”-উনুনটা উঠানের এক কোণে সরিয়ে রেখে সে
ঘরে ঢুকে গেল।
“কোন আবাগী আবার এখন আঁচ দিল ঢং করে ?” ও
পাশের ঝগড়াটে পঞ্চুর মা চেঁচিয়ে উঠল।
“আবাগী নয় গাে। আমি।” সুভদ্রা জোরে জোরে হেসে
তাকে বলল।
“আম। ছুড়ির এত হাসি কিসের আসে বাবা জানি না।”
-বেঁকা মুখ আরও বেঁকিয়ে পঞ্চুর মা ঘরে ঢুকে সশব্দে ভাঙা
নড়বড়ে দরজা বন্ধ করে দিল ধোঁয়া আকাবার জন্য।
একটা হােট উঠান ঘিরে চারদিকে মাটির দেয়াল আর
টিনের চাল তােলা দশ-বায়ােখানা ঘর। একজনের অচি
পড়লেই সব অন্ধকার। এজন্য কেউ কেউ উনুনটা রাস্তায়
বসিয়ে আসে। সাধারণত এত বেলায় কেউ অচি দেয় না
বলে আজ যেন আপত্তিটা একটু প্রবল হল।
“হাত দেখাবার শখ হল ধেড়ে বয়সে। তারপর ম তােরা
বেয়া খেয়ে।” ওপাশের বােয়াকে তরকারি নাড়তে নাড়তে
সকালের সাত রং
দিদিমা বলল। ও সকলেরই দিদিমা ।
এদের কথার কোন উত্তর না দিয়ে শব্দ করে শিলনােড়ায়
বাটনা বাটতে বসল সুভদ্রা। এসব তাে নিত্যি গা-সওয়া।
একটা যে-কোন ছুতােয় নিজের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে অন্যকে জড়িয়ে
ফেলার প্রয়াস।
বাটনা বেটে তরকারি কুটে রান্না শেষ করতে করতে বেলা
হল। কাছেই মিলের বাঁশীতে দুটোর ভেঁা বেজে যাওয়ার
পনের মিনিটের ভেতরেই পঞ্চু ওরফে পঞ্চানন এসে হাজির
হল।
“মা ভাত দে তাড়াতাড়ি।” ঢুকতে ঢুকতেই চেঁচিয়ে খবর
দিল পন্টু।
“দিচ্ছি দিছি।” ধড়মড় করে উঠে পড়ল পঞ্চুর মা।
দুপুরের সুখনিদ্ৰাটুকু হবার যাে নেই পঞ্চুর সকালের শিফটে
ডিউটি থাকলে। সেও মেজাজে উত্তর দিল, “এত চেঁচাচ্ছিস
কেন?”
“চেঁচাচ্ছি কি আর সাধে?” বুড়ী বলে শুনিয়ে শুনিয়ে,
“না চেঁচালে ওর আসাটা তার পেয়ারের লােক জানবে কি
করে?”
ইঙ্গিত বুঝতে দেরি হল না সুভদ্রার। পঞ্চানন তাকে
জালিয়ে মারছে এখানে এসে অবধি। ভােরে উঠে দাত মাজা
সকালের সাত রং
থেকে, রাতে বেসুরাে বাঁশী বাজানােনার চেষ্টা, সব কিছুই
কেন্দ্র সুভদ্রা। তার চুলটুকুও সে ঘরের বাইরে আচড়াতে
পারে না।
সম্প্রতি তার উৎপাত বেড়েছে বেশী, কিন্তু এ নিয়ে টু
শব্দটিও করার যাে নেই। তাহলে আর পঞ্চুর মা আস্ত রাখবে
তাকে। সেদিন তাে প্রকাশ্যেই সে বলল-“মাগীর ঢং
দেখেছ ? আমার অমন ছেলেটার ওপর লােভ আছে আর কি।
কচি মাথা চিবিয়ে খাবার যম। এখন দাম বাড়াচ্ছে, যেন কত
অচ্ছেদা।”
“তা আর বলতে।” ও ঘরের অন্নপূর্ণা সায় দিল, “আমাদেরও
তো বয়েস ছিল গাে, কই এমন ধারা ঢং তো দেখিনি দিদি।
কততই যেন সতী-লক্ষ্মী।”
সুভদ্রা একটু হাসে শুধু। সতীলক্ষ্মী কিনা সে জানে না।
কিন্তু এদের মত জীবন-যাপন করতেও তার প্রবৃত্তি হয় না।
পঞ্চু ভাত খেয়ে দুপুরে এক ঘুম দেবার জন্য বােয়াকে চেটাই
পাততে পাততে প্রবল বেগে শিশ দিয়ে সুর ভঁজতে লাগল।
সুভদ্রার গা জ্বলে গেল। সবেগে ঘরের ভেতর ঢুকে মাকে
জিজ্ঞেস করল, “ছেলেটা কি চায় বল ত মা? ও কি ভাবে ওকে
আমার আদমি করব ?” হেসে গড়িয়ে পড়ল সুভদ্রা মায়ের
গায়ের ওপর।
“আরে,
তু এত না হাসিস কঁহে?” মা বিরক্ত হল,
‘সরম নেই তুর? হরবখত এতনা হাসি কিস লিয়ে রে?”
সকালের সাত রং
হরবখত হাসি পায় যে মা।” সুভদ্রার হাসি যেন থামতে
চায় না।
দিন দুয়েক আর জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া হল না।
বৃহস্পতিবার সুভদ্রা সকালে উঠেই শান্তাকে ডাকল গঙ্গায়
যাবার জ)।
“আজ নয়।” শান্তা বাসন মাজতে মাজতে উত্তর দিল।
“না ভাই, আজই চল। আমার মন লাগছে না কাজে।
শুনে আসি না কী বলে জ্যোতিষী।”
“কি আর বলবে? যত সব বুজরুকি।” শান্তা নিঃস্পৃহ
ভাবে উত্তর দিল।
“না ভাই। আমার মনে লাগে, ও কিছু তাে বলবে।”
“বলবে আর কি? তােকে যে ওর খুব মনে ধরেছে সে
কথাটাই বলবে এবার।”
“যাঃ।” হেসে গড়িয়ে পড়ে সুভদ্রা শান্তার গায়ের ওপর,
“কিন্তু সত্যি ভাই। গণক ঠাকুরের চেহারাটি বেশ। ও বুজরুকি
করবে বলে তাে মনে লাগে না।
“ও বাবা।” শান্তা চোখ বড় বড় করে বলল, “তাের মনেও
যে রং ধরেছে রে? তাহলে তো যেতেই হয়।”
সকালের সাত রং
কাজ-কর্ম সেরে নিয়ে তারা দুজনে যখন গেল তখন দুপুর
গড়িয়েছে বেশ। মাথার ওপর সূর্য। তার হাত থেকে বাঁচবার
জন্য ময়লা একটা গামছা ছাতার ওপর থেকে বুলিয়ে দিয়েছে
জ্যোতিষী।
সুভদ্রা আসতেই জ্যোতিষীর চোখ দুটো যেন কথা বলে
উঠল। কিন্তু ওদের দিকে না তাকিয়ে সে একমনে হেঁড়া একটা
বইয়ের পাতা উল্টে কি যেন সব পড়ে যেতে লাগল।
“কি গাে গণক ঠাকুর? কোন হদিশ পেলে আমার
আমির?” স্বভাবসুলভ হাসিতে মুখ ভরিয়ে তুলল সুভদ্রা।
“বস।” গম্ভীর হ’ল জ্যোতিষী—“খবর ভাল নয়।”
“কেন, কী খবর?” যেন ভয় পেল সুভদ্রা।
আস্তে আস্তে। অত তাড়াতাড়ি হলে কি চলে? বােস।
ধীরে সুস্থে শােন। বইটা বন্ধ করে সামনে থেকে গামছাটা
খুলে নিল জ্যোতিষী।
“দেখি, হাতটা আরেকবার দেখি।”
ব্যগ্র হয়ে সুভদ্রা হাত বাড়িয়ে দিল।
হাতটা টেনে নিয়ে ভাল করে দেখতে লাগল জ্যোতিষী।
রুদ্ধ নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করছে সুভদ্রা। তার মুখের দিকে একবার
তাকাল জ্যোতিষী, তারপর হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল, “খবরটায়
ঘাবড়াবে না তো?”
কোন কথা না বলে শুধু মাথাটা নাড়ল সুভদ্রা।
“তােমার আদমির খোঁজ পেয়েছি। সে হাওড়াতেই
সকালের সাত রং
আছে। তবে তার যেন অসুখ বলে মনে হচ্ছে।”
“কী হয়েছে? কোথায় আছে বলতে পার ?”
“পারি। কিন্তু তার আগে একটা কাজ করতে হবে
তােমাকে।”
“বুঝেছি। তােমার মাদুলি কিনতে হবে তাে?” শান্তা বাধা
দিল, “আমার জানাই আছে। নে আবার গ্যাট-গচ্চা দে কিছু।”
“না না, মাদুলী নয়। আমাকে কিছু দিতেও হবে না।”
গম্ভীর হয়ে বলল জ্যোতিষী, “তােমার হাতের রেখা অদ্ভুত
ভাবে বদলাচ্ছে। তােমাকে তিনদিন আমাকে হাতের রেখা
দেখাতে হবে বােজ। তিনদিন বাদে আমি বলব, কী করতে
হবে, কোথায় যেতে হবে।”
ওরা দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসল। জ্যোতিষীর
প্রাপ্য ফেলে দিয়ে ওরা যখন ফিরতি পথ ধরল তখন শান্তাই
প্রথম কথা বলল, “সত্যি ভাই শুভি, তুই এত বিশ্বাস করি
কেন ওর কথায়
“না করারই বা কি আছে ? এমন তাে কতই হয়।” অ্য--
মনস্ক ভাবে উত্তর দেয় সুভদ্রা।
“তাের জন্য আমার দুঃখ লাগে সত্যি।” হঠাৎ শান্তা
বলে ওঠে।
“কেন?”
“তাের এমন বয়েস, এমন চেহারা সব এমনি এমনি
যাচ্ছে।”
সকালের সাত রং
যেন চম ভাঙল সুভদ্রার, হাসতে হাসতে বলল, “তা ভাই,
ঠাকুরের দয়া না হলে তাে পূজা লিবেন না।”
“কো ঠাকুর? গণক ঠাকুর?”
“মরণ আর কি।” খিল খিল করে হেসে শান্তাকে জড়িয়ে
ধরল সুভদ্রা।
পরের দিনগুলাে সুভদ্রা একাই এল। জ্যোতিষী সমান
আগ্রহে তার হস্তরেখা দেখল। শেষে সুভদ্রা একদিন স্পষ্টই
জিজ্ঞেস করে বসল, “কি গাে গণক ঠাকুর, আর কদ্দিন লাগবে?
সত্যি সত্যি গুণতে জান তাে, না এমনি এমনি
জ্যোতিষী কি যেন ভাবছিল, চমকে উঠল, “এসব কাজ
নিভুল করতে গেলে সময় লাগেই। আচ্ছা, কাল তােমায়
বলে দেব ঠিক। কাল এসাে।”
‘আবার কাল।” মুখে বলল বটে, কিন্তু সুভদ্রা যেন
বিশেষ বিরক্ত হল না। বরঞ্চ কথা শেষ হওয়ার পরও বসে
রইল কিছুক্ষণ। দুপুর শেষ হয়ে এসেছে। সূর্যের আলাে
আর ততটা অসহ্য মনে হচ্ছে না। তবু ছাতাটা খােলা রইল।
কেমন যেন আশ্রয় দেয় ঐ জরাজীর্ণ ছাতাটা।
“জান গণক ঠাকুর,” সুভদ্রা হঠাৎ বলল, “কাল রাতে
আমি ভারি মজার এক স্বপ্ন দেখেছি।”
মজার ?”
সকালের সাত রং
“মজার নয় তাে কি ?” মনে করতেই সুভদ্রা হেসে উঠল,
“এক পাগলার বেসরম কাজ আর কি।”
“বেসরম? কেন?”
“নয়? নাহলে রাস্তার ওপর আমার হাত ধরে টানাটানি ?”
ওর হাতটা ছেড়ে দিল জ্যোতিষী।
“আরে তুমি নয় গাে।” হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়ল সুভদ্রা,
“ও সেই স্বপনা-দেখা পাগলটার কথা বলছি। জানাে গণক
ঠাকুর—”
“বারবার গণক ঠাকুর গণক ঠাকুর বল কেন?”
“তাহলে কি বলব?”
“কেন শুধু ঠাকুর বলতে পার না?”
“ঠাকুর ?”—জোরে হেসে উঠল সুভদ্রা। “বেশ তাই
বলব।—তােমার দেশ কোথায় ঠাকুর?”
“এখানেই।”
“বাঙালী না? বামুন তাে?”
“নিশ্চয়ই!-তােমরা কী?”
এবার আর হাত দেখে শুনে দেখতে বলল না মুদ্রা
আস্তে আস্তে বলল, “আমরা আহিরমানে, গােয়ালা।”
“ও। তা কটা গরু আছে তােমাদের?”
“পাঁচটা। তবে আমার তো মনেই লাগে না এ ব্যবসা।
আমার বাবার একদম ইচ্ছা ছিল না আমি দুধ বেচি। তা কি
করব। নসিব।”
সকালের সাত রং
।
“নসিব তাে বটেই। তাতে দুঃখ কি ? দুধ বেচে স্বাধীন
ভাবে আছ তাে। স্বাধীন ব্যবসা সব থেকে ভাল। দেখ না
কত ভাল ভাল চাকরি ছেড়ে আমি এই স্বাধীন ব্যবসা করি।”
“এটা তােমার ব্যবসা বুঝি ?”
“ব্যবসা মানে পুণ্যের কাজও বটে। কিন্তু তাতে পয়সাও
তাে আসে। তার জন্যে অনেক পড়াশােনা, যাগযজ্ঞ, অনেক
কিছু করতে হয়। সবাই কি আর পারে একাজ। হঠাৎ
গম্ভীর হয়ে নিজের পদমর্যাদা সম্বন্ধে সচেতন হ’ল জ্যোতিষী।
তারপর জিনিসপত্র গােছাতে গােছতে যেন কতকটা আপন
মনেই বলল, “তবে ব্যাপার হয়েছে কি জাননা, একেবারে একা
একা—সব দিক সামাল দিতে
একটি লােক এসে দাঁড়াল এই সময়। তাকে মাথা নেড়ে
বলল জ্যোতিষী, “কাল এসো। আজ আর নয়।” লােকটি
তবু গেল না। ভবিষ্যৎ জানবার আশায় না অন্য কোন
আকর্ষণে বােঝা গেল না।
সুভদ্রা উঠে দাড়াল। বােদ প্রায় পড়ে এসেছে। নিজের
চিন্তায় সে এমনি মশগুল ছিল যে পাঁচ-ছটা বাড়ীতে বরাজের
দুধ দিতে হবে তাও যেন তার খেয়াল ছিল না।
}
রবিবার দিন তার কিরকম যেন লাগছিল। আজ গণক
ঠাকুর কথা দিয়েছে তাকে সব খবর খােলাখুলি বলবে।
সকালের সাত রং
দুপুর বেলা মাকে খাইয়ে দাইয়ে ছেড়া কথাগুলাে সেলাই
করতে করতে সে কত কথাই ভাবছিল। রামকিষণকে সে মনে
আনবার চেষ্টা করল। সে কিছু শিশু ছিল না তখন। পনের
বছর বয়স। কিন্তু সরমে সে কি ছাই ভাল করে দেখেছে তার
আদমির মুখ? আচ্ছা কি রকম হতে পারে ? লম্বা মত,
চোখ দুটো বড় বড়, নিচের ঠোঁটখানি মােটা—মনে করতে
গেলেই অন্য একটা মুখের সঙ্গে সাদৃশ এসে পড়ে। আপন
মনেই হাসে সুভদ্রা। রাস্তার এক জ্যোতিষী, তাকে চেনে না,
শশানে না—একটা জুয়াচোরও হতে পারে, তার কথা সে ভাবতে
যাবে কোন্ দুঃখে!
হঠাৎ দামী সেন্টের গন্ধে চারিদিক ভরে গেল। একজন
মাঝবয়সী মােটাসােটা ভদ্রলােক ঢুকলেন বস্তিতে। সঙ্গে বস্তির
ভাড়া আদায়কারী সরকার গােপীবাবু।
অহেতুক বিনয়ে গলে গেল পঞ্চুর মা, আর বুড়ী দিদিমা।
কারও দিকে দৃকপাত না করে পশ্চিমের বন্ধ একটা ঘরের দিকে
এগিয়ে গেল তারা, তারপর দুড়দাড় করে ঘরের সব জিনিসপত্র
ফেলে দিতে লাগল বাইরে।
প্রথমটা সুভদ্রা এদিকে বিশেষ নজর দেবার প্রয়ােজনই
অনুভব করেনি। কিন্তু দুমদাম শব্দে চমকে উঠে সে সেলাই
বন্ধ করে পায়ে পায়ে এগিয়ে লােকগুলাের একেবারে সামনে
এসে দাড়াল।
একহাত কোমরে অন্য হাত ছড়ির ওপর রেখে আগন্তুক
১.
সকালের সাত রং
বাবুটি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকালেন লােকগুলাের দিকে।
বস্তির সব ঘরের বাসিন্দাই ততক্ষণে উঠানে জড়ো হয়েছে।
তারপর সুভদ্রার দিকে চোখ পড়তে জিজ্ঞেস করলেন
গােপীকে, মেয়েটা কে হে?”
সুভদ্রা একটু সরে গেল।
“আজ্ঞে ও তাে গয়লানী বুড়ীর মেয়ে। দু মাস হ’ল স্যার
পূবের ঘরখানা ভাড়া নিয়েছে।”
“কোন্ গয়লানী ?” ভুরু দুটো ওপরে তুলে বাবুটি প্রশ্ন
করলেন।
“মতি গােয়ালিনী স্যার। মে মাসে এসেছে। ভাড়াটে স্যার
ভাল। মাসের প্রথম দিকেই ভাড়া মিটিয়ে দেয়।”
“ছ। ভালই তাে মনে হচ্ছে। বেশ ভাল।” অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত
করল বাবুটি। “কই এ খবর তাে দাওনি।”
হাত কচলাতে সুরু করল গােপী। আর পঞ্চুর মার মুখ
হাসিতে ভরে গেল। সে আদিখ্যেতা দেখাবার জন্যে না অন্য
কোনাে ঝাল মেটাতে তা বােঝা গেল না, বলল-“কেন গােপ
বাবু, বাবুকে বলনি যে নতুন ভাড়াটে এয়েছে ?”
একবার পঞ্চুর মার দিকে দাঁত কড়মড় করে তাকাল গােপী,
আর তৎক্ষণাৎ বিনীত হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, “আপনাকে তাে
আগে বলেছি স্যার, আপনি বােধ হয় ভুলে গেছেন, এসব ছােট
কথা।•••• •ওর স্বামীটি বিয়ের পরই ফেরার। ওর বুড়ী মা আর
ও দুধ বেচে খায়। লােক বড় ভাল ওরা।”
সকালের সাত রং
“আচ্ছা, আচ্ছা, দেখা যাবে সে এখন।” বলে ছড়িটা দু-চার
বার মাটিতে ঠুকে নেন বাবু—তারপর হঠাৎ সুর বদলে জিজ্ঞেস
করলেন, “কিন্তু সে হারামজাদা গেল কোথায় ? বিনােদ ?”
দিদিমা বুড়ী হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল, “আজ সাতদিন সে
জ্বরে বেহুশ ছিল বাবু। কলে যেতে পারেনি। আজ গেছে
হাসপাতালে ওষুধ আনতে।”
“ওষুধ আনা বার করছি। বাবুর ওষুধ আনার পয়সা থাকে
আর ঘর ভাড়া দেবার নাম নেই। ধর্মশালা খুলে বসেছি, না?”
বাবু গর্জে উঠলেন।
“কি বলছ গো বাবু?” সুভদ্রা এবার এগিয়ে এল, “মরদটা
আজ সাতদিন একদম বেঘাের জ্বরে বেহুশ, আর তার ঘর তছনছ
করলে। লােকটার দোষ কি হ’ল ? পালাচ্ছে না তাে? ভাড়া
ততা দেবেই।”
“তাের মাথা-ব্যথা কেন রে ছুড়ি?” পঞ্চুর মা ঝাঝিয়ে
উঠল।
“তুই থাম।” এক ধমকে পঞ্চুর মাকে থামিয়ে দিল গােপ।
বাবুর বর্তমান মনােভাব জানতে তার বাকী নেই। তেজী ঘােড়
পা ঠুকতে শুরু করেছে, মুখে লাগাম পরাতে দেরি করলে
তাকেই পস্তাতে হবে।
সে সুর মােলায়েম করে বলল, “তুমি জান সুভদ্রা, বিনােদ
সত্যি কোথায় গেছে ?”
“দিদিমা তােত বললই—ও হাসপাতালে গেছে।”
সকালের সাত রং
ওর ঘর আমরা দখল করলাম। ও আজ তিন মাস ভাড়া
দেয়নি। খালি ভাঁড়াচ্ছে।”
“তাহলে মােগা মানুষটা যাবে কোথায়?”
“তাের ঘরে তােল না।” পঞ্চুর মা আড়াল থেকে টিপ্পনী
কাটে।
ইঙ্গিতে সুভদ্রাকে কাছে ডাকল গােপী, তারপর ফিসফিস
করে বলল—“বাবুর কাছে ভাল করে বুঝিয়ে বল। বাবুর দয়ার
শরীর
“দয়ার শরীর তা দয়া দেখান না কেন।” সজোরে হেসে
উঠল সুভদ্রা। সে হাসিতে বাবুর ঠোটেও হাসির রেখা ফুটে
উঠল। তিনি বললেন, “চাবিটা তাড়াতাড়ি লাগিয়ে দে গােপ।
সন্ধ্যের দিকে আবার না হয় খোঁজ নেওয়া যাবে।•••তখন যেন
বিনােদ থাকে, বুঝলে?”
বাবু গাড়ীতে গিয়ে উঠে বসলেন। গােপী আবার ফিরে
এল। সুভদ্রা তখনও দাড়িয়ে দেখছে উঠানে ছড়ানাে একরাশ
ভাঙা-ছরানাে জিনিসপত্রের দিকে।
গােপী বলল, “বাবু যখন রাতে আবার আসবে, তখন তুমি
নিজে বলল বিনােদের জন্য।”
“আমার বয়ে গেছে-তােমার বাবুর কাছে এর লিয়ে
মােদ করতে। আমি কি ভাড়া বাকী ফেলেছি ? আজ
সাতদিন লােকটা বেঘােরে বেহুশ, সে এখন যাবে কুথায় তাই
ভাবছি।”
সকালের সাত রং
“তুমি একটু বলল না, তাহলেই হবে। বাবুকে বুঝিয়ে
বললে বাবু একেবারে জল, বুঝলে।” বলে এদিক ওদিক
তাকাতে তাকাতে শেয়ালের মতাে পা ফেলে গােপী বেরিয়ে
গেল। অন্য ঘরের বাসিন্দারা তখনাে উপস্থিত ঘটনা নিয়ে জটলা
করছে। হঠাৎ বেলার দিকে নজর পড়তে সুভদ্রার যেন চমক
ভাঙল। ইস্ বড় দেরি হয়ে গেল। এখনি যে তাকে জ্যোতিষীর
কাছে যেতে হবে।
-
জ্যোতিষী তাকে দেখেই বলে উঠল, “এত দেরি করলে
“কেন ? আলাে পড়ে গেলে হাতের রেখা কি দেখা যায় ?”
“কি করব বল? ওরা আমি না জানােয়ার তাই ভাবছি!”
“কারা ?” প্রশ্ন করতে গিয়ে জ্যোতিষীর গলা যেন কেমন
কেঁপে উঠল।
“আমাদের বস্তির মালিক গাে! কি জুলুম জ্বরে বেহুশ
আদমির উপর।”
“মরুক গে।” আশ্বস্ত হয়ে বলল জ্যোতিষী, “আমি বহু
গুণে অনেক মন্ত্রের জোরে তার খোঁজ পেয়েছি। তার কাছে
আজ তােমাকে রাত ন'টার পর নিয়ে যাব।”
“অত রাতে? কোথায়?”
“এই-কাছেই।”
“তাহলে এখনি চল না? তােমার তাে কাজকর্ম হয়ে গেছে।”
১০৮
সকালের সাত রং
“না না, আমার জন্য নয়। একটা শুভ সময় চাই তত ?
হলে মন্ত্র খাটবে কেন?”
সুভদ্রা ছেলেমানুষ নয়। লেখাপড়া বেশি কিছু শিখতে না
পারলেও সংসারের জ্ঞান তার ভালই ছিল। ভবিষ্যৎ গণনায় ।
শান্তার মত একেবারে অবিশ্বাসী না হলেও মন্ত্রতন্ত্রের ক্ষমতার
বিষয়েও সে বেহিসেবী রকমের ভরসা রাখত না। একবার তার
মনে হ’ল অস্বীকার করে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সে ভেবে দেখল,,
মিথ্যাই যদি হয়, তাহলেও তাে সব কিছুই তার মিথ্যা হয়ে
যাবে না। জ্যোতিষীর সঙ্গে হারানাে স্বামীর কথায় কথায়, হাত
দেখানাের ফাকে ফাকে নিজের মনটাও কি সে একেবারেই
দেখায়নি কখনন? অবিশ্যি শান্তা যা ভাবে তা নয়, নিছকই
বন্ধু। কিন্তু বন্ধু লােককে তাে মানুষ অবিশ্বাস করে না। একটু
চুপ করে থেকে সে বলল•••••
“আচ্ছা যাব। কিন্তু তােমাকে কোথায় পাব ঠাকুর ?” তার।
গলার স্বরে কেমন একটা ব্যাকুলতা যেন ফুটে উঠল।
জ্যোতিষী সেটা লক্ষ্য করে বলল, “সে না হয় আমি,
তােমার বাসাতেই যাব। কিন্তু একটা কথা, ধর মানুষের মন
তাে, মন্ত্র হয় তত ভাল করে বলা হয়নি কি কাপড় জামা কিছু
অশুদ্ধ ছিল, যা গুনে দেখেছি তা ঠিক হ’ল না••মানে তােমার
স্বামীকে হয় তাে আজ পাওয়া গেল না, তাতে তােমার রাগ হয়ে
যাবে না তো?”
“রাগ ? না রাগ কেন হবে? দোসরা দিন আবার দেখ,
সকালের সাত রং
-তাহলে।”
“বেশ বেশ, তাহলে সব ঠিক আছে।” জ্যোতিষী উৎসাহের
সঙ্গে বলল, “তুমি কাপড় চোপড় পরে তৈরী থেকো, আমি ঠিক
ন'টার সময় যাব।”
সুভদ্রা উঠে পড়ল। আর আপন মনে হাসল। কিন্তু এতদিন
বাদে এই প্রথম সে হাসিতে বোন আওয়াজ বেরুল না। তার
চোখের দৃষ্টিও যেন অন্য রকম।
সন্ধ্যা হতে না হতেই সুভদ্রা সাজগোেজ সেরে ফেলল।
এ বেলায় রান্না করে না। ও বেলার রান্নাই রােজ রাতের জন্য
রেখে দেয়। আজ সে সন্ধ্যা লাগতেই মাকে খাইয়ে দিল।
নিজের খাওয়া সেরে, কাজকর্ম শেষ করে যখন সে নিজেকে
একটু একলা করে পেল, হঠাৎ যেন তখন কেমন ভয় পেল সে।
একটা মানুষকে রাস্তায় মাত্র কবার দেখেই এতটা বিশ্বাস করা
কি তার ঠিক হচ্ছে? হয় তাে সে একটা বুজরুক। হয় তাে সে
তার সর্বনাশ করে পথে বসিয়ে ভাগবে। এমন যে না হয় তা
তাে নয়। এই তো সেদিন ওদিকের ঘরের বাসিনী, কাদের
বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করতে গিয়ে একটা
করতে গিয়ে একটা কাণ্ড বাধিয়ে
বসল। তারপর খালাস হতে গিয়ে প্রাণ নিয়ে টানাটানি।
কথাটা মনে পড়তেই সুভদ্রা শিউরে উঠল। একবার মনে করল,
সাজ খােল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনের অন্য কোণ থেকে যেন
সকালের সাত রং
একটা ভরসাই পেল সে। সে তত ছেলেমানুষ নয়, জোর করে
তাকে কিছু করান তাে যেতে পারে না।
কিন্তু গােপীবাবু আসে না কেন? বিনােদটাও সেই থেকে
ফেরেনি। যাক গে ছোঁড়া, মরুক গে। সে তার নিজের কর্তব্য
করে বাবুকে নিজে একটু অনুবােধ করে চলে যাবে। গােপী
বলেছে সাড়ে সাতটার ভেতরেই আসবে তারা।
কিন্তু সাড়ে আটটা বেজে গেলেও তারা এল না, সুভদ্রা
সেজেগুজে ঘেমে উঠছিল। গণক ঠাকুর এখনিই আসবে।
রাত নটা নাগাদ একটা বাচ্চা ছেড়া এসে তাকে চুপি চুপি
বলল, “তােমায় ডাকতেছে গাে।”
“কে? কোথায়?”
“ওই হােথা। ঘােড় গাড়ীতে।”—বলেই সে যেমন এসে-
ছিল, তেমনি ছুটে চলে গেল।
সুভদ্রা মনে মনে একবার রামজির নাম স্মরণ করে রাস্তায়
বেরিয়ে পড়ল।
বস্তির একটু দূরেই গলির মধ্যে কারখানার উচু পাঁচিলের
পাশে একটা ছ্যাকরা ঘােড়ার গাড়ী দেখতে পেল সে। গলির
ওপাশ থেকে একটা আমগাছ এমন ভাবে ঝুকে পড়েছে যে
জায়গাটা বেশ অন্ধকার। রাস্তায় লােকজনও দেখা গেল না।
সুভদ্রার কেমন গা ছমছম করতে লাগল।
গাড়ীর কাছে এসে সে বিপন্নভাবে হেসে বলল, “হেটে
গেলে হত না ঠাকুর।” বলতে বলতে সে গাড়ীতে উঠে বসল।
সকালের সাত রং
১১১
কিন্তু তৎক্ষণাৎ ভূত দেখার মত আঁতকে উঠে নামবার জন্য পা
বাড়াতে গেল। ততক্ষণে তার মুখে রুমাল চাপা দিয়ে
কোয়ানকে গাড়ী ছােটাতে হুকুম দিয়েছে গােপী।
ঘােড়র পিঠে চাবুক পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডুকরে কেঁদে উঠল
সুভদ্রা।
চার-পাঁচ দিন পর বিপর্যস্ত দেহমনে সুভদ্রা যখন বাড়ী
ফিরছিল তখনও ভাল করে সকাল হয়নি। হঠাৎ সে দেখতে
পেল, অত ভােরেই স্নান সেরে জ্যোতিষী তার জিনিসপত্র গুছিয়ে
নিজের জায়গায় বসছে। এক মুহূর্ত সে দূর থেকেই জ্যোতিষীকে
ভাল করে দেখল। তারপর অনভ্যস্ত ঘােমটায় মুখ ঢেকে বাড়ীর
পথ ধরল।
৬-২০১৭
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.