Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Paritran
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পৱিত্ৰাণ।
( কাব্য ).
وما ارسلنک الا رحمة للعالمين
শেখ ফজলল করিম প্রণীত।
প্রকাশক-মােহাম্মদ মেহের উল্লা।
ছাতিয়ানতলা— যশােহর।
প্রম সংস্করণ।
কলিকাতা,
১৫৯ নং কড়েয়া রােড়-রেয়াজুল-ইসলাম প্রেসে
মােহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ কর্তৃক মুদ্রিত।
১৩১০ সাল ; ফাল্গুন।
মূল্য ১১ এক টাকা।
---
No text on this page.
উৎসর্গ-পত্র।
চিশতিয়া খান্দানের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, অমায়িকতার মাধুরী-মণ্ডিত
ধৰ্ম্মোজ্জ্বল চরিত্র গুণে বিভূষিত, সারল্যের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি,
জীবনের আনন্দ-কানন, অশেষ গুণালঙ্কত তাপস প্রবর,
পরমারাধ্যতম পীর, জোনাব হজরত হাফেজ, কারী,
হাজী, মৌলবী, মওলানা, ফকির
মােহাম্মদ শাহ সাহাব উদ্দীন চিশতি সাবেরি সাহেব
ভক্তি-নিকেতনে।
চঞ্চল সৌভাগ্য আজি সুতন্ত্র পরশে
হইয়াছে স্থির,
বড় আশা পাব দেব অন্তিমে তােমার
চরণ মঞ্জীর ।
সাধু তুমি,পৃথিবীর অতুল সৌরভ,
জ্ঞানী তুমি,—পৃথিবীর অক্ষয় গৌরব,
—চির দিন রহিবে সমান
;
দয়া করে লও গুরাে ! সেবকের তক
জীর্ণ পরিত্রাণ” !
No text on this page.
অবতরণিকা। নিরুদ্দিষ্ট বিষয়ের অন্ধকার বর্ণনা অনায়াস সাধ্য করিতে, কল্পনাই কবি দের একমাত্র অবলম্বনীয়া। কাজেই এ পুস্তকেও স্থান বিশেষে কল্পনার আশ্রয় লইতে হইয়াছে। কল্পিত বিষয়ের দায়িত্বের হিসাব করিলে, কবিদের গুরুদণ্ড হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু উদার হৃদয় পাঠকেরা এতদিন তাহাদের সে ধৃষ্টতা ক্ষমা করিয়া মহত্ত্বেরই পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন; সুতরাং আমিও আমার ধৃষ্টতার জন্য ক্ষমার পাত্র। শতাধিক বর্ষ পূর্বে যখন খ্রষ্টিয় ও জড়বাদের প্রবল সঙ্ঘাতে সুপবিত্র ইসলাম ধর্মের হীনাবস্থা উপস্থিত হইয়াছিল, যখন আরবের গৃহে গৃহে প্রস্তর নির্মিত দেব-দেবীর উপাসনা চলিতেছিল, সেই সময়ে দয়াময় খােদাতাআলা ইসলামের পুনঃসংস্কারের জন্য হজরত রেসালতপানা খাতেমনবিয়িন্ মােহাম্মদ সল্লাল্লহ, আলায়হে ওয়ালিহি-ওয়া-সালেমকে প্রেরণ করেন। ভীষণ মরুভূমির অনলময় তপ্তবক্ষে নিরাশ্রয় হজরত মােহাম্মদ (দঃ) কি দুর্বিষহ যন্ত্রণা সহ করিয়া ইসলামের সংস্কার করিয়াছিলেন, কি কঠোর ব্রতে ব্রতী হইয়া বিংশতি বৎসরে পৃথিবীতে পুনরায় নবজীবন সঞ্চারিত করিয়া ছিলেন,-ইতিহাস তাহার জ্বলন্ত সাক্ষ্য। মুসলমানের সেই মুক্তি-কর্ণধার চিরারাধ্য হজরত মােহাম্মদের (দঃ) স্বাত্বিক জীবনের কাহিনী,ইসলামের জন্য ও আমাদের জন্য অসাধারণ আত্মত্যাগ,-কবি-তুলিকায় চিত্রিত করি- বার আশায় পরিত্রাণ কাব্যের সৃষ্টি। দুঃখের বিষয়, আশা যতটুকুতুলি- কায় ততটুকু রংএর অভাব! তবে প্রেমে-পুণ্যে-সঞ্জীবিত সত্য ধর্মের উজ্জল কাহিনী, আপনা হইতেই ধর্মভীরু পাঠকের হৃদয়ে সজীব •ধর্মভাব উদ্দীপন করিতে পারিবে -এইটুকুই যা আশা। তিন বৎসর পূর্বে এই পুস্তকের কতকাংশ “প্রচারক” পত্রিকায় প্রকাশ শিত হইয়াছিল; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে প্রচারকের প্রচার শেষ হওয়ায়, আর কোন পত্রিকায় প্রকাশ করা হয় নাই।
|
বঙ্গ-বিখ্যাত মােহামেডান মিশনরী, বাগ্মীপ্রবর শ্রদ্ধেয় বন্ধু মুশী মেহের
উল্লা সাহেব গ্রন্থ-মুদ্রাঙ্কণে যে অকৃত্রিম সদাশয়তা প্রকাশ করিয়াছেন, তজ্জন্য
চিরদিন তাহার নিকট কৃতজ্ঞ রহিলাম।
গ্রন্থের দুই একটা স্থানে আমি মাইকেল ও নবীন বাবুর ভাবে অনুপ্রাণিত
হইয়াছি; এজন্য তাহাদের নিকট চিরঋণী হইয়া থাকিলাম। প্রুফ দেখার
ত্রুটিতে কোনও কোনও স্থলে সামান্য এক আধটু ভুল রহিয়া গিয়াছে।
সহৃদয় পাঠকগণ সংশােধন করিয়া পাঠ করিবেন।
নূতন
শিল্পির কাব্য রচনার চেষ্টা এই প্রথম। দুরাশার কবলে পতিত
হইয়া, সে যাহা করিয়াছে, কবিতার হিসাবে তাহাতে ত্রুটি লক্ষিত হইলেও
বিষয়-গৌরব সে ত্রুটি অপনােদিত করিতে পারিবে। কারণ চন্দ্রে কালী:
থাকা স্বত্বেও তাহার গুণের কোন হ্রাস হয় নাই। ইতি।
কাকিনা,
শেখ ফজলল করিম।
১লা মাঘ ; ১৩১৫।
ভন-সংশােধন। পৃষ্ঠা। যুঝিবার। ৪ বুঝিবার দুরলােকে উৎসবে ধ্বনীত দূর লােকে। ৩১ ১১ উৎসব। ধ্বনিত। ৪ : অজ্ঞায় আজায়। ৪ ১৬ প্রসাদে গহীন প্রাসাদে। পত্র হীন। ১৮. মােসলেম। কোরেশে। २ ১০৮ ৪ মােসম। বলে ইসলাম কোরেশ মােসম চলি मौखि সাধিত বিচরণ ইসলামের ১২২ দীপ্ত। সাধন। বিরচন । ইলাম।
No text on this page.
পৰিত্ৰাণ। (কাব্য)। প্রথম সর্গ। আরব।-সাধারণ সভাগৃহ। মধ্যাহ্ন তপন-তীক্ষ্ণ খর কর-জালে সস্তাপিত মরুবাসী তৃষ্ণায় কাতর, ঝাঁ ঝাঁ করে দিগঙ্গনা লতা-পুষ্পহীনা যেন সে বিধবা বেশ ; দীনা ভিখারিণ। বিরল বলাকা কুল ; অসহ উত্তাপে লভেছে শরণ-থ, জনিত দেশে ধূ ধূ ধূ ধূ চারি দিকে বালুকা প্রান্তর কত অভিশাপে যেন জ্বলিয়া পুড়িয়া অনল বহিছে বুকে অনিল ঝলকে, খর্জুৰ বাবেল (১) তরু শীর্ণ কলেবর শুকায়েছে রসাভাবে বিশ্বচরাচর। অদূরে পর্বতবর (২) উন্নত মস্তকে হতাশ প্রণয়ী হেন পথ পানে চেয়ে ডাকিছে কাতরে যেন শান্তির মন্দিরে জুড়াতে বিদগ্ধ হিয়া ; ঢালি দিতে প্রেম- (১) এক প্রকার কন্টক সমাকীর্ণ বৃক্ষ বিশেষ ; বাবলা গাছ। (২) জবল-কোবা এবস পর্বত।
২
পরিত্রাণ।
সংসারের দূরদেশে নিভৃত-কাতারে
মনুষ-সঙ্গম-হীন বিরল বিতানে;
ভুলিয়া সে হিংসা-দ্বেষ নীচ-অভিমান
অহমিকা, কুটির তুচ্ছ অভিমােষ ;
মনােমুখে পিপাসিত বিহঙ্গম, গণ
গাহে না পঞ্চমে হেথা মাতামে ভুবন !
উদাস চৌদিশি যেন নাহি মনােরম
কারুকার্যময়ী পট। কোকিল কুজন
বিঁধে না হিয়ায় শেল। নাই সে পাপিয়া :
অতৃপ্তি-সঙ্গীত লয়ে নীরস বিভূমে।
ঝঙ্কারে না মধুকর অর্ধ স্ফুট ফুলে
শ্যামাঙ্গিনী দূৰ্বাতনু নব-কিশলয়
কোথায় এখানে? সুপ্ত কঙ্কর প্রান্তর।
নেত্র-তৃপ্ত নাহি করে নবীন নীরজ।
পশু নাই—পক্ষী নাই-হাহাকারময়,
ভগ্ন যেন-প্রকৃতির নিরাশ হৃদয়।
তবে কিবা আছে হেথা ? মুগ্ধ প্রজাপতি
এ ফুলে সে স্কুলে যদি করে না চুম্বন,
ক্ষীণাহিনী কামিনীর কোকিলগনি-
উঠে সঙ্গীতশ্রোত। বিলাস-চাতুরী
কটাক্ষে খেলে না যদি ভেদিয়া হৃদয় ?
উষ্ট্রদুম্বা পশুগুলি কাতর পরাণে
জুড়া’তে মিছে শুধু। কই হেন স্থান
পণ্য-ভার ক্লিষ্ট-পু জুড়াবে যেথায় ?
জল কোথা? কি পিয়িবে হেন শুষ্ক ভূমে
দারুণ এ দ্বিপ্রহরে নাশিতে পিপাসা।
প্রথম সর্গ। ফুল নাই, ফল নাই, বৃক্ষ হীন স্থান, প্রকৃতি হয়েছে যথা ভীষণ শ্মশান। ওকি ? উচ্চ-সৌধ মুখরিত জন-কোলাহলে উলঙ্গ কৃপাণ করে দৌবারিক দল সশস্ত্র মিছে যেন যম অনুচর! কিসের এ মহাসভা? কহলাে কল্পনে সুধামুখি! চল দেখি হেন দ্বিপ্রহরে সমবেত নগণ, কেন এ ভবনে। • পিশাচের দেশে)আজি কে অভিলায়ে মুহুর্মুহ জয় ধ্বনি হতেছে কীর্তন, শত-বজ্র এক সঙ্গে গর্জয়ে যেমন ! রক্ত-জবা বিনিন্দিত রােষ-কষায়িত, আরক্ত লােচনদ্বয়-মুষ্টিবদ্ধ কর। থেকে থেকে শিহরিছে, এ কি হেরি আজি রসের উৎসব ছেড়ে!ছেড়ে নৃত্য পরা স্বরগ বাসিনী যত নবনী সম্ভব- যুবতী রসিকা বক্ষ-অমরের মত। মন্মথের শরাসনে, বঙ্কিম চাহনে নিয়ত অধীর হিয়া, তারা কেন আলি ছাড়িয়া সকল,-ঢল ঢল নেত্রে রক্ত? (কামের মদিরা ?) সকলি আশ্চর্য্য হেরি! বালি-বাঁধে মহাশ্রেত রােধে কি কখন কামুকের বীর সাজ আজি কি কারণ? (১) এই সময়ে এখানে সতীত্ব হরণ প্রভৃতি কুকাৰ্য যথেচ্ছ হত।
পরিত্রাণ। “আসহ অসহ্য ইহা-ভীষণ আঘাত লাগেরে হৃদয়ে, আহা হেন অত্যাগর ! আমাদের চির-পূজ্য সাধনার ধনে- বিচূর্ণ করিব আজি এতদিন পরে? কোথা সেই যাদুকর-ঈশ্বর প্রেরিত । দুৰ্দান্তেরে আজিকেই নিশার আঁধারে হইবে বধিতে ;-নতুবা, নতুবা জান- মিথ্যা সব অহঙ্কার ; মিথ্যা ধৰ্ম্মবল, বৃথা এত দেব-পুজা হৃদয় শােণিতে। ত্যজ অবসাদ,-দেখ অন্তিম ভীষণ ধর অস্ত্র ধর অসি বধ সে পামরে শরে দলিয়া রক্ষ আপন ধর্মেরে।” ; “বিন্দু মাত্র রক্ত যদি থাকে ধমনীতে লজা যদি মনে হয় মরণ সমান আর কেন ?-কোন্ মােহে ভুলিতেছ সবে? কোরেশ বংশের (১) নাম ডুবাইবে শেষে - সাক্ষাৎ ঈশ্বর ছাড়ি কোন্ হতভাগা নিরাকারে করে পূজা ; “এক” নাকি সেহ !! কিসের প্রেরিত ? দুষ্ট ছল-মায়াবাদে ভুলাইছে আরবের অন্ধ নগণে; পিতৃ-পূজ্য দেবগণে করিয়া সংহার মিথ্যা একেশ্বরবাদে কোন দুরাশয় আপনার ধর্ম কর্ম দিবে বিসর্জন ? এক বিভু? হেন মিথ্যা শুন’না কখন। (২) (১) কোরেশ বংশ-ইহা মক্কার প্রাচীন সত্তান্ত বংশ। মহাপুরুষ হজরত মোেহ (দঃ) এই বংশে জন্মগ্রহণ করেন। বক্তাও এই বংশােদ্ভব। (২) কোরেশ দলের তামীম দলপতি আবু সুফিয়ানের বক্ততা। '
প্রথম সর্গ।
“পাগল-পাগল সেহ-দেহ তাড়াইয়া,
কি কাজ বধিয়া আহ অাগার তরে,
মতিচ্ছন্ন যদি কিছু করে থাকে ভ্রমে
উচিত মার্জনা করা, তাহারে বধিলে
কি যশ পাইবে বল ? কলঙ্ক মাখিয়া
জগতের চির-ঘণ্য হইবে স্বেচ্ছায় ?
নির্বাসন কর কি দেহ কারাগারে
ভুক অপার-ক্লেশ যাবত জীবন।
ডুবুক নরকে যারা করেছে গ্রহণ
তার সে ইসলাম ধর্ম। জানিয়া শুনিয়া
হেন মায়া-ফাঁদে নাহি দিব মােরা ধরা ;
এলয়ে ত্রৈলোক্য যদি ভেঙ্গে হয় সারা
তথাপি ইসলাম ধর্ম না সেবিব মােরা (১)!
“তা হবে না, তা হবে না, হইবে বধিতে,
কে হেন দুৰ্ম্মতি কবে অগ্নি-কণা হেরে
নিভায় জল দানে ভবিষ্য ভাবিয়া?
কে কোথায় নিজ-বাসে প্রদানে অনন?
পার তাহাই বল। কাপুরুষ হেন
চলে যাও পত্নী-ক্রোড়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শিয়া,
একাই সারাক (২) দেখ পারে কি না আজি
অতি তুচ্ছ এই কাৰ্য্যে ; হেন ভীত সবে ?
কাপুরুষ-গ্য-সৃষ্টি অধম আমরা।
ধিক ধিক্ নরজন্মে—ধি এ জীবনে
আরব নিস্পন্দ আজি ধরিতে কৃপাণ ?
(১) দ্বিতীয় বার মত—মান্বয়ে বা এতিবাদ চলিতেছে।
২) জনৈক পৌত্তলিক।
পরিত্রাণ।
সহস্র বিদ্যুত জিনি অস্ত্র কড় কড়
ধ্বনিল সভার মাঝে ; হইল গর্জন
“নহে ভীত আরবের বীর-পুত্রগণ
সামান্য এ রণবঙ্গে ; মাতঙ্গ কি কভু
ভরে পিপীলিকা হেরে ? তুচ্ছ মােহাম্মদ
তৃণ হেন ফুৎকারেতে যাইবে উড়িয়া
নিভাইব ইসলামের নব-ধৰ্ম্ম-তেজ,
বীৰ্য দিব রসাতলে। নতুবা কালেতে
এ অঙ্কুরে বিষ-বৃক্ষ হইলে উদ্ভুত
ধ্বংস হবে দার পুত্র প্রিয় পরিজন
বিহিত এ বিষ-মূল করা উৎপাটন!”
“দেবেন্দ্র পুরীর সম পূত মক্কা ধাম
অনন্ত লােভর সৃষ্টি,—আলােকের দেশ
প্রাণান্তে অন্যের পদে দিব না হেলায়।
দুর ব্যাপী সুখ রাজ্য আমাদের হাতে,
হবে পর পদানত ? কি ছার জীবন
কিসের আনন্দ বল, কোন্ প্রাণ লয়ে
অন্ন তুলে মুখে দেই এ আরব ভূমে?
চরাচরে খ্যাতৰীৰ্য যেই শুর-ভূমি
আজি সেথা বীর শত? কে বলিতে পারে।
ৰৈ কি ম বশে ইসলামপতাকা
দিব না উড়িতে হেথা ; হাসিবে জগত
ত্রিভুবনে হব মোরা নরকের কীট
চল—ফিরে--অটল এ প্রতি মােদের
স্বর্গ-মর্ত্য যা ডুবে থােক একাকার
তথাপি না টলিবে এ প্রতিজ্ঞা ভীষণ!
প্রথম সর্গ।
দিব কি লইৰ সব ধনৈশ্বৰ্য্য তার
সুখের স্বর্গীয় গৃহ অন্ত্র-অগ্নি আলি
ঘুচাব রাজত্ব সাধ; আশা-কল্পতরু
এইখানে চিরতরে করিব নির্মূল
যায় যাবে যশ, যা ধন-জনমান,
তথাপি দেখিব তারে কত বলীয়া!!
“
হত নগণ্য হয়ে পশেছে কোথায়?
পতঙ্গের অগ্নি মনে প্রেমের বাসনা।
ভুল, ভুল, দুল, মুগ্ধ কি ভেবেছে মনে?
নাহি জানে করে রাজ-শুনে নাই কভু
অগণ্য রথীন্দ্র হেথা, হৃদয় শােণিতে
তােষে মাতৃ-ভূমি-পদ ভক্তি-অর্ঘ্য দিয়া,
সুরক্ষিত ইন্দ্রপুরী যথা সুরগণে!
আরব-আরব নাম দিব না অতলে
ফেরুপাল হেন, আজি ত্রিযাম বিদ্বােরে
দূর কর মা হতে। সম্মুখ সমরে
বাসনা পুরাও তার জনমের তরে!”
"কি গুণে সে মদ-মত্ত, কেন এত মােষ
আমাদের প্রভু প্রতি ; (১) লহ প্ৰতিশােধ।
একান্ত বিবেক শূন্য হ’ল নরাধম,:
ঘুচাও প্রতিষ্ঠাবল ইসলাম ধর্মের,
দেখিব শূরত্ব তার বীরদম্ভ কত।
উন্মুক্ত কৃপাণতলে নির্ভীক পরাণ
: (১) এই সময়ে আরব বাসির হবল, লাৎ, মাৎ প্রতি অনেকগুলি দেবতার উপাসনা
পরিত্রাণ।
বিদায় লউক দেখি আরবীয় করে।
ধুলায় মিশায়ে যাক্ শৌর্য-বীর্য-বােধ।
এ উত্তপ্ত মরু মাঝে মােহাম্মদ নাম
জন্মান্তরে আর যেন নাহি করে কেহ।
শাচনীয় পতনের স্মৃতি-ছবি সুধু
কেবল মানস-পটে বিরাজয়ে যেন ;
লুপ্ত হােক ইস্লামের উন্মুখ-গরিমা,
বাক্ যুদ্ধ-বিতণ্ডায় নাহি প্রয়ােজন
যাও গৃহে কর সবে রণ আয়ােজন!
“শরে অক্ষত ৰাখি গৃহে ফিরে যেই
বৃথা তার ভূজৰল, বৃথা বীরপণ।
হত-গর্ব-বক্ষ লয়ে কি কাজ বাঁচিয়া
নিতান্ত পশুর মত।
দেহ আত্মবলী
ধৰ্ম্মযুদ্ধে মাতােয়ারা হও বীরগণ
ধর ধর ধর সবে শাণিত কৃপাণ,
জ্বণে হত্যা কর আদি ইসলামের প্রাণ!
কপিল আরব ভূমিকাপিল মেদিনী
গম্ভীর আকাশতল প্রতিধ্বনি বুকে
আরবের গৃহে গৃহে করিলা ঘােষণা
বীরের হুঙ্কার রব, অস্ত্রের ঝনা।
“আজিকে কাঙ্গাল যেই কালি সে সম্রাট
দুর্নিবার অদৃষ্টের হােত বিঘূর্ণনে
হইতেছে পলে পলে, বৃথা বিলম্বেতে
ঘটিবে মােদের ক্লেশ দেখ বিচারিয়া।
দুৰ্ম্মদেরে নিশাযােগে করহ নিধন,
দুধ দিয়া কাল সাপ হবে না পােষণ।
প্রথম সর্গ।
-গর্জনে হল কম্পিত আরব,
কোথা হতে দুরাচার জন্মিল এখানে ?
নিত্য-মােক্ষ-দাতাগণে নাহি চিনে আজি
অচল প্রতিমা বলে হাসে বিজপেতে,
“অসার” “শকতি হীন প্রস্তর” বলিয়া
যত অপমান করে সহে কি পরাণে?
খদ্যোতের চাদ হ'তে এতই বাসনা?
নিভাও আজিকে সবে তার সে সাধনা !
*
*
ম
“নিশার সুষুপ্তি যবে ঘেরিবে বসুধা
ঘুমাইবে বিশ্ব প্রাণী শ্রান্তি নাশ তরে
সুকোমল স্নেহময়ী প্রকৃতির কোলে,
সকলি একত্র হয়ে বেষ্টিয়া ভবন
নাশহ অরাতি চয়ে, ভাল যুক্তি এই।
নিতান্ত কৃতান্ত তার এসেছে শিয়রে,
নতুবা এহেন কথা ফুটিত না কভু
ক্ষুদ্র সেই কালামুখে (?) দেখিব আজিকে
কেমন ঈশ্বর তার রক্ষে ইসলাম,
বাঁচায় বন্ধুর প্রাণ,ভাল পরিচয়
হইবে যামিনী-যােগে ; কর বীরগণ !
মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।”
“সমধিক বাক্য ব্যয়ে নাহি প্রয়ােজন,
কাৰ্যস্থলে বীরত্বের হবে পরিচয়,
বৃখা পর্ব কোন কালে নহে কাৰ্যকরী।
যাও সবে গৃহে তবে পুনঃ হুবে দেখা
বীরবেশে, শত্রুনাশে ধরম অর্জনে,-
পরিত্রাণ উলঙ্গ কৃপাণ করে। মায়া পরিহরি তুচ্ছ ক্ষণস্থায়ী এই নশ্বর প্রাণের ; ধৰ্ম্মবল মনুষ্যত্ব যদি লােপ পায় কি সুখ জীবনে বল ? অধীনতা বিষে জর্জরিত হবে সবে ; বিহঙ্গম হেন কঠিন নিগড় পরি আপনার পায় চির জনমের সুখ হারাব হেলায়।” “দুর্বিনীত দেব-দ্বেষী মােহাম্মদ করে কখন দিব না হতে দেব অপমান। শতবার সহনীয় মৃত্যুর যন্ত্রণা জ্বলন্ত অনল এর নহে সমতুল- বিষ-বিষ-বড় বিষ, বড় জ্বালা এতে, এ জগতে চির দুঃখী হব তবে মাের অসহায় ভিক্ষাজীবি। পর মুখ চেয়ে রহিব সম্বল হীন!-কি ঘৃণা, কি ঘৃণা !! যাবে প্রাণ-যাবে পুত্ৰ কিবা ক্ষতি তাহে হেন কৰ্ম্মক ধৰ্ম্মরক্ষা হয় যাহে।” বাজিল বিজয় ডঙ্কা বিহবল সভ্যেরা ততক্ষণে চলিলেক গৃহ অভিমুখে উলঙ্গ কৃপাণ করে। শ্বেত স্মরাণি চুম্বিতেছে বক্ষস্থল ; চঞ্চল চরণ- কোথায় পড়িছে তাহে নাহিক ঐক্ষেপ,-- সুরাসক্ত মদ্যপায়ী বিশৃঙ্খল পদে চলে যথা ঢলি ঢলি নগরের পথে। প্রমত্ত কুহক-ম্বপ্নে ভ্রষ্টাচারী দল, ইসলাম ডুবাতে শেষে বাধিলেক বল।
প্রথম সর্গ।
নীরব নিস্পন্দ গৃহ বহে না নিশ্বাস
অবাত-বিক্ষুব্ধ যথা জলধি-জীবন,
কল্পনার তীক্ষ্ণ। কর্ণে পশিল গম্ভীরে
সুদূর আকাশ-পথে হেন বজ্রধ্বনি
(শত দৈত্য-বীর-পে কাঁপিল যেমতি
নন্দনের দেবদল-অসুর মর্দনে !)
“কি করিলি কি করিলি রে মােহা নর,
কে পারে মারিতে তারে বিধি সখা যায়,
. ঘাের অর্বাচীন তােরা, মজিয়া পাপেতে
কোথায় কাহারে আজি বধিতে মন্ত্রণা?
সত্য না ডুবিবে কভুইল্লাম আলােক
পথভ্রান্তে দেখাইবে সনাতন পথ,
তুচ্ছ তাের নীতি-ভ্রষ্ট কি করিবি তার ?
শত নরপতি কেন বিপুলা ধরণী-
যার পদে দিবে শির সানন্দ অন্তরে
সুরেন্দ্র-সেবিত পদ না ধরিয়া হৃদে
পাপাত্মার-পাপ-বাণে হেরিয়া আঁধার
উদ্যত নাশিতে সেই ঋষি-পূজ্য-জনে ?
উদিত শাসিতে ধরা ইল্লাম তপন,
দেখরে মােহান্ধ দল মানস নয়নে।
পঙ্গুরে সাজেনা কভু গিরি-উল্লঙ্ঘন,
বুঝিয়া কৰ্ম্মকাণ্ড, পবিত্র আদেশ
হয়েছে অধীর ; ভ্রান্তির নির্দেশ বাণে
অন্ধ ছলনায়,ধরা হের সরা সম,
মঙুকের বীর সাজ বিষধর সনে ?
কেন যাস কেন যা --- সম্বর এখন
১২
পরিত্রাণ।
নিৰ্ম্মল বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে বিসর্জন
জগতে কলঙ্ক ঘাের করিবে রক্ষণ ?”
“তুবিলি—ডুবিলি ওরে অজ্ঞান মানব
ফিরে দেখ পিছে অই ভীষণ নরক
লােল জিহ্বা বিস্তারিয়া ডাকিছে তােদেরে ;
বৃথা যাবে অহঙ্কার, ভগ্ন-মনােরথে
জ্বলিবে আগুনে পুড়ি যুগ-যুগান্তর।
অনিবাৰ্য তবে কিরে দুর্গতি তােদের ?--
ভেবে দেখু কেন হলি সুমতি-বিহীন
পাপের ত প্রায়শ্চিত্ত আছে এক দিন ?”
দ্বিতীয় সর্গ।
প্রান্তরে।
অলস বিশ্রান্ত রবি-রক্তিম বরণ
প্রশমিত খর কর,—তবু দাউ দাউ
অলিতেছে মরুস্থলে অনল প্রবাহ;
এখন অনলয় রয়েছে পবন,
দাব দগ্ধ চারিদিক্, হাহাকার ময়--
ফেলিতেছে হতাশ্বাস। নিরাশ সঙ্গীত
প্রত্যেক পবন স্তরে আসিছে ভাসিয়া।
জ্বলন্ত আগুন বুকে যেন রে মরুভূE
নরকের কামুৰ্ত্তি করি অভিনয়
পথভ্রান্তে বুঝাইছে একত্ব শকতি-
ত্যজিতে প্রস্তর-পূজা,মজিতে ইমে।
সেই পরিচিত রবি, সেই তীক্ষ্ণ কর
অঙ্গার করিয়া যেন রেখেছে প্রান্তর।
দ্বিতীয় সর্গ।
রঞ্জিত গােধূলী-রঙ্গে সুনীল আকাশ ।
দূরে দূরে-অতিদূরে মহীধর-শিরে
নামিছে আঁধার সতী। কি আশ্চর্য, তবু
শান্ত নহে মানবের চঞ্চল পরাণ।
হেন সুখময় কালে গাহে না হেথায়-
নধর লতিকা ঘেরি গুঞ্জিয়া ভ্রমর,
কঁদে না পাপিয়া স্মরি বিরহের গান
নিকুঞ্জ আড়াল হতে; দিবা অবসানে
ধায় না বলাকাদল কলরব করি
.আপনার নীড় পানে; এখানে কেমনে
জুড়াবে আতপ-তপ্ত কঠোর পরাণ।
“দে জল” “দে জল” বলি বিহঙ্গ প্রেমিক
যেখানে আকুল স্বরে যাচে না প্রণয়,
সেখানে কেমনে বল হবে প্রফুল্লিত
হেন দুঃখময় প্রাণ। তাহাতে আবার
“এক তিনি ভজ তারে—এই আমি দাস"--
গভীর হুঙ্কারময় বিশাল গর্জনে
ভ্রান্ত-চিত্ত আরবের প্রতি গৃহে আজি
কেহ হাসে-কেহ কাঁদে (নগরের দশা)
কোষবদ্ধ তরবারি কটিতে সবার,
জুড়ায় সন্তাপিত হেন কারাে মন
চিন্তানলে দগ্ধ যেই হয় অনুক্ষণ।
গ
মলয় পবন কোথা পাইব হেথায়,
হে সুষমে! হেথা কোথা পাৰ নিবধিতে
তােমার কুসুম-রূপ-জুড়াতে হৃদয় ?
আঁধার করিয়া দিশি হুহুঙ্কার রবে
১৪
পরিত্রাণ।
নাচিছে ঘূর্ণিত বায়ু উড়ায়ে বালুকা!
এখানে প্রসূন দলে মানস রঞ্জিতে
কোথায় বসিবে দেবি ? অইসে খর্জুর
শীর্ণ-দেহ জীর্ণ-গর্ভ, অর্ধ দগ্ধ প্রায় !
অইসে ভৈরব রব অইসে গর্জন
আসিছে ভাসিয়া পুনঃ “ভজ একেশ্বর”
সত্য কিম্বা ভ্রম কিছু না পারি বুঝিতে।
আকাশে চাহিয়া দেখি শােণিতের ধারা,
বধি ভীম রণ-রঙ্গে পৌত্তলিক গণে
লেপিয়া দিয়াছে যেন কোন মহারথী।
ফলিত হইয়া তাহা স্বর্ণ কর জালে
ভাতিছে ভয়ের ছায়া ভবিষ্য কপােলে !
।
বেলা যূথী নাহি হেথা, সুরভি মাধবী
হাসে না প্রকৃতি-অঙ্গে অশােক বকুল।
এখানে সরােজ দল ফুটে না সরস
ক্ষণিক মানস-লাভা বাসন্তী যৌবনে
বহেনা মলয়-বায়ু মৃদুল হিল্লোলে।
খর করবাল করে মরণ এখানে
নাচিতেছে ঘরে ঘরে ; কপিছে মেদিনী
সে দাপটে থর থর-কি প্রলয় ছবি ।
করাল বিভূতি মূৰ্ত্তি হেরি ত্রস্ত রবি
ঢলিয়া পড়িছে ভয়ে অচলের পারে ।
• আজি যেন ধরণীতে কি হয় কি হয় !
ভাবিয়া বিহবলা সতী মহা-প্রহেলিকা!
পাপ ভারে মরুভূমি বুঝি পায় লয়,
সেই সঙ্গে লয়ে যত পাতকি নিচয়।
দ্বিতীয় সর্গ।
ডুবিল, রক্তিম-রবি অনন্ত গ্রাসেতে
মগ্ন হল চরাচর ঘাের অন্ধকারে,
ভাসিলা ঘুমের ঘােরে সন্ধ্যা কন্যাগণ
পর্বতের শিরােদেশে,-শান্ত সুগভীরে।
মিশাইল পুণ্য-পাপ কল-কোলাহল
ভীষণ সে রজনী-গরভে! হা বিধাতঃ-
কোন্ খেলা খেলিবার এত আয়ােজন
করিছ হে আজি এই শ্মশান ভূমিতে ?
প্রকৃতির ক্ষীণকণ্ঠে বহে না পবন
সন্ত্রাসে সবিতৃ যেন হয়েছে বি-জন!
.
ধূমল আকাশ পটে স্বপ্নাহত তারা
করিতেছে চোখা চোখি হাসিয়া হাসিয়া,
যেন রে নাগর-পাশে সােহাগিনী ধনী
আঁখির ভাষায় করে প্রেম-আলাপন ;
কিন্তু না অমিয়া বর্ষে সুধাংশু কিরণ---
কেবল উঠিছে যেন বিশ্ব-বিদারিয়া
নীরবের প্রভঞ্জন! একি ভাববাদে
আকাশ পাতাল সিন্ধু আজিরে কম্পিত।
মুমুষু পরাণে রােগী কাঁপে যথা শেষ
নিরাশ হৃদয়ে,-আজি তেমতি এ ধরা
অর্ধমৃত আত্মহৃত উঠিছে কাঁপিয়া।
কোথায় আনন্দ আশা কোথা ভালবাসা
প্রকৃতি সেজেছে ভীমা সমর-রঙ্গিণী,
মরুভূমি আরাে যেন হয়েছে ভীষণ,
পতিবক্ষে রসবতী, মাতৃ ক্রোড়ে শিশু
তা’ দেখে লভিছে যেন ভয়েতে শরণ ;
পরিত্রাণ।
বিষাদিনী ধরাদেবী করিলা য়ােদন।
আকাশে তারকা গুলি ভাবিল মরণ,
বহিছে প্রচণ্ড বায়ু প্রবল স্বননে
ঝর ঝর উড়িতেছে খেজুরের শাখা,
মনে হয় তরু সারি হয়ে সন্ত্রাসিত
দূরান্তরে পলাইতে ভাবিছে উপায়,
পত্নী হেন বুকে ধরি শিকড় সুন্দরী
উন্মাদ স্বামীর তরে প্রবােধিছে মনে ;
আবার, আবার তরু ভীমরব করি
হেলি দুলি’ করিতেছে তীক্ষ প্রতিবাদ।
কাঁপিছে ত্রিলােক-ভূমি হেরি বিভীষিকা ;
বিকট অশ্রান্ত বাদ্যে—এ হেন সময়-
অদূরে মন্দির মাঝে, কঁাপায়ে ভুবন
শঙ্খ-মন্ত্ৰ-ঘণ্টাধ্বনি হল উচ্চারণ ।
নাহি আজি সুবিমল সুধাকর ধারা,
ফুটে না সুখের নৃত্য লহরে হরে
প্রকৃতির অঙ্গ-জুড়ি। আজি বিলাসিনী
কৃষ্ণাভ বসন পরি মেখেছে বিভূতি!
বিরহ-মলিনা শুষ্ক যুবতীর মত
এলায়ে চাচর কেশ হয়েছে যােগিনী ;
অন্ধকার-নদে ধরা কাটিছে সাঁতার
একটু কুলের তরে। কি দৃশ্য তাণ্ডব !
ভূত প্রেত পিশাচের অট্টহাস্য রােলে
ভীম কুম্ভীপাক যেন নেমেছে ভূতলে!
দ্বিতীয় সর্গ।
সুদূরে আকাশ পথে আঁধারের গলে
শত মুক্তা বিনি শোভে নক্ষত্রের মালা,
মনে হয় সুয়বালা পূজা অবদানে
পারিজাত ভাইছে মন্দাকিনী-নীরে
হেন কালে প্রান্তরের দূরদেশ হতে
মধুর “ভােয়দ” গান হল নিঃসরণ
( আহা কি মুরলী জিনি কোকিল কাকলী
মূর্তিমতী শান্তি যেন নামিল হৃদয়ে !)
হেন প্রলয়ের কালে-এ দৈব দুৰ্যোগে
পশুপক্ষিহীন ভূমি সুষুপ্ত যখন
করাল কালের কোলে বসিয়া তখন
কে লাে এ মধুর গাথা করিছে কীৰ্ত্তন--
“আমি দাসু—সেই এক নিত্য নিরঞ্জন
ভজরে তাহারি তরে, বাঁধ মত্ত মন”।
কে এ নর?-এত বীৰ্য,-হেন পরাক্রমে
গাহিছে অচিন্ত্য গান নির্বিকার চিতে?
বুঝেছি বুঝেছি হায় তুমি কর্ণধার
অকুল পাথর বক্ষে রক্ষিতে তরণী
প্রবল এ ঝটিকায়-কৰ্ত্তব্যে মহান
রাখিয়াছ স্থির লক্ষ্য তুচ্ছ ভাবি প্রাণ
ব্রিলােক পূজিত তুমি বিধাতার সখা! (১)
লক্ষ অয়ষ্ণান্ত জিনি রূপের গৌরবে
প্রদ্যোতিত মরুলী ; বিরলে তাপস
নিগূঢ় স্বর্গীয় তত্ত্ব করিছে ঘােষণা।
চারিদিকে দেবদূত সশস্ত্র বেড়িয়া
ইসলামের ভক্তি-সুধা করিতেছে পান ;
(১) হজরত মােহাম্মদ (দরুদ)।
১৮ পরিত্রাণ বেষ্টিত শিষ্যের দলে (১) কহিলা প্রেরিত- অবিনাশী স্থিতিশীল—তিনি একেশ্বর, তাহারি চরণে নম, দাও, আত্মবলী ধৈৰ্য্য ধর-পরকীয় করােনা গমন, সেই একে ভক্তি ভরে হও নিমগন । দুস্তর জলধি তলে শুক্তি অভ্যন্তরে লভে যথা মানবের অমূল্য মুকুতা তেমতি হৃদয়-সিন্ধু করি আলোড়ন বিভু রূপ এক মুক্ত করহ চয়ন! এই কাল নিশীথের, বিঘাের কালিমা যেমতি এ মরুভূমে, তেমতি মােদের হৃদয় ছাইয়া আছে পাপের আঁধার, ধর এ ইলাম আলাে ধর এ কোরাণ আলােকিত হয়ে যাক আঁধার হৃদয় ! পিয় রে ভকতি সুধা সরল অন্তরে ডর গঞ্জনা, নাহি ভীত হও প্রাণে, চৰ্ম্ম-বর্মে আচ্ছাদিত ক্ষণস্থায়ী দেহ পলকে হইবে লয় ;—কি ভয় কি ভয় রক্ষিতে ধরমে তবে প্রাণ করি পণ ? ধৰ্ম্মই প্রধান সুখ মানব জীবনে ধৰ্মই অনন্ত শান্তি-লভিতে নির্বাণ তবে কেবা পদে ঠেলে এ দুষ্প্রাপ্য নিধি ? তাতে এ জগত-নম্য ইস্লাম তরণী- সুখে দুঃখে পাইয়াছি জীবনে সম্বল কেমনে উপেক্ষা করি ত্যজিব তাহায় ? (১) এই সময়ে বীরেন্দ্র কেশরী হজরত আলী (কঃ ওঃ) সঙ্গে ছিলেন, ইতঃপূৰ্ব্বে শতাধিক শিষ্য যাথেব (মদিনা মনুওয়া) নগরে চলিয়া গিয়াছিলেন, হজরত আৰু সিদ্দিক (রাজি, তখন পর্যন্ত মাতেই ছিলেন।
দ্বিতীয় সর্গ। সম্মুখে আলােক ছাড়ি যেই ভ্রান্ত নর স্বেচ্ছায় আঁধার পথে রয়ে গমন কে হেন তাহার মত হতভাগ্য ভবে ? ওই যে হেরিছ যত স্বরগের দুত লাবণ্য মণ্ডিত দেহ উন্নত ললাট- জ্যোতির্ময় হেম-কান্তি পুরুষ বিরাট- ওরাও একত্বে মগ্ন, মােরা তুচ্ছ নর- কি পাপে সে লভিব না হেন আশীৰ্বাদ ? থাকে বটে, সিন্ধু-বক্ষে অগণ্য রতন কিন্তু তা নগণ্য যথা মুকুতার কাছে ইম-চন্দ্রিকা পদে তেমতি সকলি হীন-গৰ্ব খদ্যোতের সম. হয়ে আছে । ডুবি ডুবি এ অতল বিশ্বের সাগরে যে ধরম মণি মােরা পেয়েছি হেলায়, সেই জ্যোতিঃ জগতের দাও ঘরে ঘরে বিলাইয়া প্রাণে প্রাণে; হােক সত্যময় বুঝুক জগত ঠিক্ এসেছে আলােক পথ ভ্রান্ত পথিকেরে দেখাতে সু-পথ। নর-জন্মে দেবতার লভহ আসন সানন্দ অন্তরে সেবি ইলাম চরণ!” নিরবিলা সাধু শ্রেষ্ঠ ; বহুক্ষণ পরে , কি যেন ভাবিয়া পুনঃ লাগিলা কহিতে- “হে অনাদি আদ্যশক্তি করুণা-নিলয় আজি এই মরুভূমে আঁধার শৰ্বরী সকৰি লভেছে গৃহে সুখের শয়ন, একমাত্র দাস প্রভাে! পরিচৰ্য্যা হেতু এই পঁাড়াইয়া আছে,বারেক চাহখো ২৫ পরিত্রাণ। অধম জনার এই বিষাদিত মুখ। অতুল মাহাত্ম্য তব ওহে প্রাণময় ! রুক্ষ আজি দীন জনে ক্ষুদ্র তেজ দানে ; মায়াবাদী বলে লােকে করয়ে লাংনা। বিক্ষত শরীর বটে, কিন্তু তবু মন তব আজ পালিরে আছে নিয়ােজিত। যেই বলে র’ক্ষেছিলে তায়েফ-প্রান্তরে ভ্রান্ত পৌত্তলিক করে ; যেই দয়া ঢালি হাশেম বংশের প্রাণে রক্ষেছ আমারে, আজি পুনঃ দাও প্রাণে সেই আত্মত্যাগ শিখাইতে তব নাম প্রতি ঘরে ঘরে। “অত্যাচারে অবিচারে জর্জরিত প্রাণ- শত ধন্যবাদ তবু তব মহিমায় ; বেই শক্তি উদেছিল মারিতে আমার ভাতেই তাহার আজি পেয়েছে বিনয় ?” (১) “জ্যেষ্ঠতাত ভাইয়ে গিয়েছেন শশাকে- সে উদ্বেগে একেবারে না হতে শমিত আবার হৃদয় ভেদি বায়াত কেন, তবে কিহে পরীক্ষিছ বিশ্বাসের বল ? ভেঙ্গেছে হিয়ার সুখ নিরাশ পাথারে তাহাতে তােমার নাম না পারি প্রচারি। মিশাইলে কীটোদরে সে চৰ্ম প্রতিজ্ঞা () w (১) পাপিষ্ঠ কোরেশগণের কু-অভিসন্ধি অত্যল্প কালের মধ্যে গৃহবিবাদে ধ্বংস হইয়া গিয়াছিল। যে হাশেম বংশের সাহায্য আশায় উৎফুল্লিত হইয়া তাহারা এ কাষ্ণ করিয়াছিল, হজরতের উপর অতিরিক্ত অত্যাচারে তাহারা তাহাদিগকে (কোরেশ দলকে) পরিত্যাগ করিলে, তাহারা ভগ্ন মনােরথ হয়। পরন্তু পূর্ব শৌর্য বীর্যের অবসান হয়। (২) এই চুৰ্ম্ম প্রতিজ্ঞা দ্বারা কোরেশগণ শপথ করিয়াছিলেন যে, যত দিল কাশেম
দ্বিতীয় সর্গ।
২)
পুনঃ জালাইলে অগ্নি কদাচারি দলে,
মনােবাদে গৃহশ করে পরস্পর
করিলে ভম্মেতে শেষ দিলে রসাতলে
তা’ হলেও ক্ষুদ্র এই কাল নাগ ছানা,
একদিনে বিনাশিতে পারে শতজনা!”
“আমি একা--তুমি মাের সুখে দুঃখে সাথী।
যেই শক্তি অন্ধকার পর্বত গহ্বরে
কোলে আবরিয়া ধরি রেখেছিল মােরে
শান্তির বিশাল রাজ্যে; আজি তাহা কোথা?
আরাে মনে হয় প্রভাে! সেই কাল নিশা
পরিশ্রান্ত হয়ে যবে গিরি পাদমূলে
যােড় করে করেছি বল ভিক্ষা নাথ,
রক্ষেছিলে সেই কালে কোরেশীর করে
ফল-জল দিয়া দান।
চির শত্রু যেই
মরিয়া তারি হাতে পাই জীবন,
তুমি ভিন্ন এই লীলা কে বুঝিবে বল ?
শূন্য—আঁধারেও হেরি তােমার যতন
কৃতজ্ঞ হৃদয়ে নাম করিনু স্মরণ !”
.
বংশীয়েরা হজরতকে ত্যাগ না কৰিবে, ততদিন তাহাদের সহিত বিবাহ, বাণিজ্য, আহার,
বিহার প্রভৃতি সর্বপ্রকার সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হইল। (৬১৮ খৃঃ)। আশ্চর্যের বিষয়, হাশেম
বংশীয়েরা তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন নাই, কেবল কুটুম্বত্বের অনুরােধে তাহারা এতটা
। অত্যাচার সহ করিতে ছিলেন। কোরেশগণ তাহাদিগকে যথেষ্ট অর্থের প্রলােভনে প্রলো-
ভিত করিতে চেষ্টা করিলেও, এ হেন পুণ্যাত্মা জগদালােককে উহারা কাপুরুষদিগের হস্তে
দিতে স্বীকৃত হন নাই। এই প্রতিজ্ঞাপত্ৰ কাবা-মন্দিরে ছিল। অধিক দিন এক স্থানে
থাকায় কীট দষ্ট হইয়া নষ্ট হয়।
পরিত্রাণ।
“উপেক্ষিত, অনাদৃত অতি ঘৃণ্য আমি
স্বদেশের ঘরে ঘরে,-নাহি হেন স্থান
কেবল ভূ-ধর ছাড়া; জুড়াতে হৃদয়।
বন্ধুহীন—প্রীতি শূন্য শোচনীয় মনে
কেবল তােমারি নাম সুখের সান্ত্বনা ;
সুদূরে খ্ৰীষ্টান-রাজ ইস্লাম তনয়ে
ধৰ্ম্মে উৎপীড়িত হেরি হইয়া সদয়
আশ্রয় দিয়াছে মরি! অর্থ প্রলোভনে
পিশাচ কোরেশ দল পারেনি ভুলাতে,
সেই মহা শুভক্ষণ পুনঃ মনে হয়
যে দিন যার্থেববাসী ষড় মহাজন
ইস্লামের গৃঢ়-মৰ্ম্ম করিয়া গ্রহণ
নবাশার সূক্ষ্মালােক দিয়েছিল জ্বেলে
আমার নিরাশ হৃদে। আরো জান প্রভভ
অই সে মেলার দিনে দ্বাদশ যাqেবী
করেছিল যবে হায় সত্য ধর্মাশ্রয়,
নাচিয়া উঠিয়াছিল আমার হৃদয়
বাসন্তী পবনে যথা লতিকা দোলয়।”
“আবার আবার মনে হয় সেইক্ষণ
দ্বি-যাম আঁধারে যবে আকাবা-করে-
অগণ্য যার্থেববাসী, লভি নব প্রাণ
নগণ্য প্রাণের মায়া দিল বিসৰ্জ্জন,
শুনি সে বিকট রব কালি পাবে ফল
ত্যজিলে যেমন আজি পূর্ব ধর্ম বল”
ডরিল। পরদিন যম-অত্যাচারে
চাহিয়া তােমারি মুখ স’য়েছিল তার
সে মহা-যন্ত্রণা ! তুমি হইলে সদয়
দ্বিতীয় সর্গ।
তারা না করিল কেহ আত্ম সমর্পণ।
দুরে গেল যার্থেবের পুতুলের খেলা
তােমাকে লইয়া সবে আনন্দে মাতিলা।”
কিন্তু মনে এই তাপ জলিল তখন
স্বদেশ রহিল অন্ধ-পাইল বিদেশ
ইমেয় সু-প্রভাবে নব চক্ষু দান
তাই বুঝিবার তরে তাহাদের সাথে
একা আমি বেঁধেছি আমার জীবন
দূরে গেল মৃত্যু ভয়,বার্ধক্য জড়তা-
* ধরমে অধিক যেন বুঝিল মমতা।”
;
“নিরাশ্রয়দীন হীম এ ভব মণ্ডলে
কে আছে আমার মত ? তবু কৃপানিধি।
ধন্য এ তাপিত প্রাণ, ধন্য জন্ম হবে
যদি পারি জালাইয়া যাইতে আগুন,
আমার মৃত্যুর (ও) পরে পুড়িবে জগত।
অথবা যেমন, সুদূর যাবে ভূমে-
লভিয়াছে নব-প্রাণ লক্ষ নাগরিক,
তেমতি যদ্যপি পাম তােমার করুণা
আমার এ ক্ষীণ-কণ্ঠে একটু বিস্তৃতি,-
ভুলে যাব শােক-দুঃখ যত অত্যাচার
ক্রন্দনের শেষে পুনঃ হাসিব আবার।
“লীলাময়! তব লীলা বুঝিব কেমনে,-
সেই অসম্ভব কথা-সুখ-নিশা-মােগে
যখন লভিয়াছিনু তােমার পরশ
অতুল নন্দন বনে-অপ্সরী বেষ্টিত।
২৪ পরিত্রাণ। মােহ-মধুরতা ঢালি স্বপনের মত কি সুখের কথা সমাপিলা আহা! অবণ-অসাড় অঙ্গ দিব্য জ্যোতি হেরি কেবল গহিয়া ঋ’ তব মুখ পানে। “অস্তমিত আলি হায় সে সৌভাগ্য-রবি- অতীত সে পুণ্য মাস-স্মৃতিতে অঙ্কণ ; মুছে গেছে দু’দিনের সেই সুখ-রেখা ভেঙ্গে গেছে জীবনের সােণার স্বপন। পুনঃ নিরায় আমি দুরন্ত সংসারে, পদে পদে দেখি প্রভাে জীবন সংশয়, সত্যের আলােক দেখি উদিতে ধরায় পেচক কোরেশ কুল মুদিয়াছে আঁখি। দিনে দিনে পলে পলে আমার মরণ- শাণিত কৃপাণ-তলে হতেছে কল্পনা। আজি ভীম রণ-স্থলে বধিবারে মােরে করিয়াছে কুমন্ত্রণা না বুঝিয়া তারা ; দাও সাধু-মন্ত্র-বিন্দু আজি তাহাদেরে পভুক নূতন আলাে-আঁধার জীবনে, বুঝুক “নাহিক কেহ ঈশ্বর ব্যতীত এ জগতে দাস আমি তােমারি প্রেরিত।” স্তব্ধ অন্ধকার ভূমি-স্তব্ধ ধরাতল, ধারের দেহে মিশে বিশ্ব-চিত্রখানি কেবল অনতিদূরে ছিল দাড়াইয়া। আবার যেমন নিশা হইল তেমন প্রগাঢ়প্রবল ভর। যেন রে রাক্ষসী গ্রাসিয়া সে কালমুখে তাবত জগৎ দ্বিতীয় সর্গ। ২৫ থেই খেই নাচিতেছে ঢলিয়া ঢলিয়া। ঘুমন্ত ভাবিয়া বিশ্বে,-কিন্তু ভয়ে ধরা আঁধায়ে মিশেছে আহা সব একাকার !! এহেন ভীষণ কালে আকাশের পথে কে যেন নির্ভীক হৃদে করিলা ঘােষণা- “একমেবাদ্বিতীয়” করে সাধনা”!! “দীন দীন সত্য দীন হবে মহম্মদী দীন পাপ তাপ দূরে যাবে জনমের তরে, অালােক পরশে যথা আঁধার পলায় তথা হাসয়ে প্রকৃতি দেবী রক্ত-বিশ্বধরে। অবসাদ হয় যথা পুনঃ অবসান তেমতি ইলামে ধরা পাবে নষ-প্রাণ” ! "সৃষ্টির আদিমকালে যে ধৰ্ম্ম অবনী ভালে করিয়াছি সাধ করে চির প্রতিষ্ঠিত, এই তার শেষ নবি ( মােহন স্বর্গীয় ছবি ) আসিয়াছে ধরা পরে, আমার প্রেরিত। গম-দণ্ড পাবি হায় তারি এই উপেখায় তােরা রে কীটাণুকীট অতি তুচ্ছ নর কেন না ভজিমা সত্য হয়েছি মােহ মত্ত কেন রে লতি এই বংশনাশী ধর? তােরাই ডুবিবি ওরে তােরাই ডুবিবি ডুবিবে ইলামের নবােখিত রবি।” প্রলয়-পয়ােধিনীরে ধরা যবে ধীরে ধীরে লভিবে অনন্ত শান্তি অনন্তু নিৰ্ব্বাণ, তথিতে এ মহসিন্ধু ইমই প্রকৃত বন্ধু রহিবে জগতী তলে মুখের নিদান! আগন্তু উজলা বেশে বরঞ্চ বিস্তৃতি শেষে ইসলামই করিবে রাজ্য দোর্দণ্ড প্রতাপে, :
২৬ পরিত্রাণ । , সে মহান্ তাপ ভরে নিষ্প্রভ হইবে ডরে কল্পিত ধরম যত-শুনি বীর দাপে! ভাই ভাই মােসেমের সুখ-আলিঙ্গনে, ত্রিদিবের সুখ-শান্তি আনিবে ভুবনে ।” “আমার আকার নাই নিরাকার সব ঠাই স্থান ভেদে তবে আমি সব রূপে আছি, ওদের যে কায়া আছে ওদের যে ধ্বংস পাছে তা কি আর ভাব নাই?—সব মিছামিছি। প্রলুব্ধ মনের ভুলে অন্ধ বিশ্বাসের ছলে যাদেরে রেখেছ করি অন্তিমে কাণ্ডারী, দুরন্ত কালের ধায় তাহাদেরি আগে হায় ডুবিয়া যাইবে ওরে ভগ্ন ধৰ্ম্ম-তরী। প্রাণ হীন ধুলী তারা ক্ষণস্থায়ী ভবে- এখনি রয়েছে খাড়া এখনি মিশাবে!” “মনে কিনা পড়ে আজি সেই মহা ভােজবাজি যে দিন প্রণয়াস্পদ জন্মেছে আমার, মহান প্রলয় বলে লুটিয়া ভূতল তলে কি দশা হইয়াছিল তাদের ধাতার। জ্যোতির্ময়ী জলদাভ সুশীতল হেম নিভ প্রজ্জোল মােসম-রাণী নামিয়া ধরায় দুঃখ তম বিনাশিয়া সুখ-সূৰ্য্য সমুদিয়া শোভেছিল জগজুড়ি মরি কিবা ভায়। দ্রুত ইরম্মদ বেগে সেই সে তপন। দেখ না উদিছে ধরা করিতে রক্ষণ*!! অপূর্ব পুলক আমি ব্ৰহ্মাণ্ড লয়েছে গ্রাসি, ফুটিছে সুধাংশু হাসি অই ঝলমলা, ওরে রে পিশাচ নর তারে কেন অনাদর করিতেছ পাপ-সুখে হইয়া উতলা।
দ্বিতীয় সর্গ। আয় সবে হাসি হাসি আনন্দে যাইতে ভাসি অজর অমৃতনদে-ধরিয়ে ইসলামে, আয় কোলে ওরে মূঢ় দেখাই সে ভাব গৃঢ় পিয়াস নিবারি মাের দয়াময় নামে। আমি সত্য, সব মিথ্যা দেখরে ভাবিয়া এখনও বাকা পথ চলহ ছাড়িয়া !” আমি রে জগতপাত সুখ-শান্তি মােক্ষদাতা আমি স্বর্গ—আমি তীর্থ আমি ধৰ্ম্ম সার, একেলা অনন্তু বল ভ্রমিতেছি অবিচল, আমি প্রেম—আমি কাম্য-আমি একাকার। একত্বে করিয়া সন্দ হইয়া জীবন অন্ধ ক উন্মাদ সাদিয়া তােরা যাস্ কারােদ্দেশে, তােদেরে পাগল দেখে শেল বিঁধে মাের বুকে তাের যে মােহিনী বলে পড়েছি ফাসে ! পাপের কুহকে এবে যেয়ে হেসে হেসে। অবহেলে আমারে যে হারাইবি শেষে !” “দে ঐ মােসেম রাণী কোটী মরকত মণি দিয়েছি আদরে আমি পরায়ে গলায়, এই সত্য সনাতনী পতিত-পাবনী-ধনী- কেমন পবিত্র জ্যোতি—ঢালিছে ধরায়। সে দিন কি মনে হয় যে দিন সে দূত চয় হতগৰ্ব হয়েছিল এই তেজ কাছে, জ্বলন্ত সত্যের স্পর্শে এ প্রাণ সঁপিয়া হর্ষে আজো রাঙ্গাপদ-দুটী বুকে ধরি আছে। কোরেশ কুলের মণি বীরেন্দ্র কেশরী— আপনি ওমর(ও) ধন্য অই পদ ধরি। “সত্য সনাতন পথ এই সে স্বর্গীয় রথ, এখন তেয়াগ তবে পাপের কল্পনা, পরিত্রাণ। অলীক স্বপন সুখে কেন রে ডাকি দুঃখে স্বেচ্ছায় সৌভাগ্যমণি হারায়ে জাপন। আমি এক-অংশ শত লভহ অশেষ পুণ্য আমাকে ধরিয়া ধ্যানে জীবনে-সম্বল, এক সুরে বিশ্বসাধা আমাতে সকলি বাঁধা মিথ্যা গর্ব কর কেন স্মরি দেব বল ? পাথরের গড়া ও অসার মুরতি মানুষের হাতে যে রে লভিয়াছে স্থিতি।” “আমার পবিত্র গ্রন্থ মহান্দার মন্ত্র ধররে মস্তকে এই পবিত্র কোরাণ, লভিয়া আধ্যাত্ম তত্ত্ব হও জীব প্রেমােন্মত্ত- দেখ আমি তােমাদের কত দােবা? অসার সংসার মাঝে বৃথা দেবতায় পুজে পাপ-পথে বৎসগণ করেন গমন, নিত্য-শান্তি- সিন্ধু স্বামী প্রতি বন্ধে দেখ আমি মহাশক্তি মৃত্যুঞ্জয় বিপদ বারণ! এস সনাতন, পথে ভজরে ইলাম, ত্যজ প্রস্তরের পূজা, হওরে: নিষ্কাম!” “এক ভিন্ন দুই নাই রূপে গুণে রসে তাই দেখিতেছ আমাকেই মিশিয়া থাকিতে, অমৃত পিয়িতে যদি আশা থাকে নিরবধি নম এসে ইলামের রাঙ্গা চরণেতে। দুষ্কর ব্রতের শেষে আমাকেই ভালবেসে আমার “আমিত্ব টুকু দেও রে বিয়ে, চাহিয়া আমার মুখ পাশর সকল দুঃখ অনায়াসে ভৰ-সিন্ধু যাও রে এড়ায়ে, শক্তিহীন প্রস্তরের বৃথা উপাসনে *কেন ক্ষয় করিতেছ অমূল্য জীবনে ?”
দ্বিতীয় সর্গ। ২৯ ত্রিভুবন বিমােহিনী পুনঃ হ’ল.দৈৰ বাণী ব্যোম-পথে কি সুন্দর মৃদুল ঝঙ্কারে, সু-কোমলা তর তর কিনুমীর কণ্ঠস্বর এক সঙ্গে আহা:শত বীণার সুরে। “ন্যায় ধর্ম নাহি যেখা কি হবে থাকিয়া সেখা চলে যাও নিশাযােগে আজি দেশান্তরে, আজি হতে তেয়াগি ভাগ্যরবি ডুৰাই পাপ-ভূমি আরবের নরক মাঝারে!” রূঢ় কণ্ঠে তুৰ্য্য না হ’ল সঘনন— “আজি হতে তােমাদেরে করিনু বর্জন! মিশাল শূন্যের ছায়া জ্যোতির্ময় স্নিগ্ধ কায়া ঘন-সৌদামিনী কোলে রােষভরে হেসে বাহ্ জ্ঞান লুপ্ত প্রায় প্রেরিত গৃহেতে ধায় আত্মহারা—ভাবে ভােলা প্রেমের পরশে। ঘোরতর অন্ধকারে অজানিত হাহাকারে বিষ যেন কত শশাকে উঠিল কঁদিয়া, প্রকৃতি স্তবধ হয়ে হতাশে দেখিল চেয়ে ‘ত্রাহি ত্রাহি রবে যেন কপিল স্বশিয়া। ফেনিল শােণিত খেয়ে চামুণ্ডা রূপেতে নামিল অলক্ষ্মী যেন কৃষ্ণপক্ষ-রথে ! তখন নির্দয় স্বরে সুদূর অধর পরে সুমধুর নৈশ-শান্তি করি আলােড়ন কে যেন গর্জিল ক্রোধে (সাধ্য কার শক্তি রােধে) “অজ্ঞানতা অন্ধকারে ডুবিলে যখন, তােমাদের যত গর্ব হরি তখন।”
৩০ পরিত্রাণ। তৃতীয় সর্গ। আবুসুফিয়ানের বিলাস-কক্ষ। ভীম প্রভঞ্জন পৃষ্ঠে বিজলী-সুন্দরী তিল দ্যুলােক জুড়ি, কি অশ্রাব্য গােল পিশাচ তাণ্ডব নৃত্য ;-চপল চমকে-- বাড়ব অনল যথা সাগর জীবনে,- অথবা বিধাতা যেন পথভ্রান্ত গণে রােষান্ধ নয়নে চেয়ে করিতে নিধন দেখাইছে ভয়,আহা তবু নগণে সত্যের সরল পথ দেখে না নয়নে। -- হেনকালে আবার অদূর পর্বতে রুদ্র তেজে মহাবঞ্জ গর্জিল ঘর্ঘরে কপিল ধরণীধর,-কাপিল মেদিনী ভাঙ্গিয়া পড়িল যেন বিস্তৃত আকাশ- একেবারে ধরণীর বক্ষ আবরিয়া । একটা বিকট ভাব ভেদি অন্ধকার করিছে ভীষণ খেলা। পুনঃ অমানিশা- ঢাকিছে কালিমা দিয়া প্রকৃতি বয়ান মরুভূ লভেছে যেন অনন্ত শয়ান। বিচ্ছিন্ন-রিদ দল হয়ে সচঞ্চলা শশনি ছুটিতেছে,--উদ্দাম-প্রসারে, বিধাতার গুপ্ত কোন অভিশাপ ল’য়ে । বিকট স্বর্গীয় দূত আসিছে ধাইয়া- তৃতীয় সর্গ। করে ধরি বক্স-ষষ্ঠি ; ঘাের অমানিশা তাহারি দাপটে যেন উঠিছে শিহরি, কঁপিছে ত্রিলােক। তাই তারকা-নিকর লুকায়েছে প্রাণ ভয়ে,দুর দুরলােকে। ! আঁধারে আঁধার মিশি চৌদিশির আজি অনন্ত নর-নদে ঘটেছে নিরয়, অবিরাম বজ্রপাত-কড় কড় নাদে ফাটে বুঝি কর্ণ-র-মুর্দিতা বসুধা ! স্তব্ধ যেন দিগঙ্গনা,-উৰ্ব্বীরুহ দল দূরে দূরে দাঁড়াইয়া হেরিছে নীরবে উন্মাদ-উৎসবে মগ্ন শ্মশান ধরার প্রবল তরঙ্গ-ভঙ্গ! একি এ সময়ে ওরা কে, কিসের তরে বসিয়া সদলে দুলু ঢুলু ঢুলিতেছে ? কাল-মূৰ্ত্তি গুলি কোন্ পাপ লালসায় হেন দুর্যোগেতে ভাসিছে সুরার স্রোতে একত্র সকলি ? নিশ্চয়-নিশ্চয় এই নরাধমগণ- নিভাইতে যাবে আজি ইস্লাম তপন! " জ্বলিছে সুগন্ধ দীপ কক্ষ উজলিয়া . মাতােয়ারা সভাজন চন্দ্রাতপ তলে- আরক্ত নয়ন দয়,কঁপে ওষ্ঠাধর কাপে যথা কমােন্মাদ অনঙ্গ-সন্ধানে-- বিলাসিনী রসিকার যােহাগ-পরশে ! অদূরে তাহারি মাঝে বৃদ্ধ এক জন সে আমােদে মাতিয়াছে, কি বিভৎস খেলা! হেন ভয়ঙ্করী নিশা,-ঘাের অন্ধকারে পরিত্রাণ। অচেতন ঘষে বিশ্ব শান্তিনিকেতনে, হা বিধাত। এ সময়ে কে এরা ঘলিয়া ঢালিছে ফল-পাত্রে বায়ার মা। বসুমতি।-হে রব, “যাও রসাতলে, লইও না এত পাপ পাতি বক্ষস্থলে। - কেমন? এখানে না কি উঠে মা সঙ্গীত রমণীর কম কঠে।-এবে কিবা দেখি- ঢালে সুরা? নাচ, পিয়, সান-অন্তরে ; কিন্তু জেন হতভাগ্য-ওরে সুফিয়ান- যেই পাপে আজি ধরা হ’ল কলুষিত সেই পাপে কোরেশের ঘটিবে বিলয়। “পৌত্তলিক কোয়েশেয়” ডুবে যাবে নাম একান্ত এবার ধাতা তোমাদের বাম । বৰ্দ্ধিত লােভনা। আহা ঘুঙ্গুরু শিঞ্জনে তালে তালে রাগ-মুগ্ধ কোমল চরণ- ধরণীর বুকে বুকে সুখে আলিঙ্গিয়া কেমন মধুর ধ্বনি তুলিছে ফুটায়ে! মনে হয় মুর্তিমতী কলা-শিল্প নামি একখানি চিত্রপটে দিতেছে জীবন; চারি দিকে বসন্ত মদনের মেলা চারি দিকে সুকুমার সৌন্দর্য্যের খেলা। t বৈদূর্য মণির মত সুচারু চুমকি রমণী সবার। তাহে স্বর্ণ-দীপ-জালে হইয়াছে উদ্ভাসিত-ঝলসে নয়ম। শত রুধিয়াখ্য মিলি পূর্ণ দুটী গালে আরবার পড়িতেছে,-পশে নানয়ন
তৃতীয় সর্গ।
৩৩
এত কি সুন্দর। যেন,-রূপ, রসে মিশি
শতধা ফাটিয়া ধরা দিতেছে হাসা’য়ে।
অর্ধস্ফুট কলি সম নক-গন্ধ-ভরা
নাচিছে বসন্তু' সুখে মানস-বিহরা।
পাঠক। আবার অই রবাব সেতার
কেমন মধুর তালে হ’তেছে ধ্বনীত।
কোকিল-কুজন জিনি মধুর কাকলী
গ্রামে-গ্রামে-খলখলি তরঙ্গ উল্লাসে
কেমন উধাও স্বরে মাতাইছে প্রাণ ;
রিনিকি ঝিনিকি অই গুন নুপুরের,
চল তবে এক বার হেরি এ আমােদ
সরস সুধার বুস সঙ্গীত প্রধানে,
করি চিত্ত বিনােদন ;-নিত্য হাহাকারে
পরাণ হয়েছে ভস্ম কঠিন সংসারে।
মঞ্জু-নিকুঞ্জ ছাড়িয়া, কে কোথায় পশে
স্বেচ্ছায় কণ্টক-বনে ; তাই লাে কল্পনে
কেন বঞ্চ এ সৌভাগ্যে? চল না সুন্দরি !
এক বার দেখে যাই এ সুখের ছবি।
তুমি ত আমার সখি প্রিয় সহচরী,
আমারি সন্তুষ্টি শুধু মাগ যদি তুমি
তবে কেন অনুরােধ না রেখে আমার
ফিরিছ গৃহেতে ?
চল একটু দেখিয়া-
আবার আপন পথে যাইব ফিরিয়া ।
.
প
একি—একি! উঠে যদি আমােদ-লহরী
প্রেমের তুফানে, তাহে এত ব্যভিচার :
পরিত্রাণ। অভিনীত হয় কেন? পাপের ধারায় ভাসিছে সহাসে সবে সমাসনে বসে যুবক কি বৃদ্ধ তার নাহি কোন ভেদ- সকলি তন্ময় ভাবে, সকলি বিহ্বল। লাে সুন্দরি! কোথা যাও বাঁকাইয়া আঁখি উড়ায়ে কাঞ্চ খানি? ঢাক ঢাক রমে। বিবশ অবশ অঙ্গ। অয়ি বরাননি। নাচ-নাচ-হাস হাস—এইবারি শেষ এইবামি গেয়ে পিয়ে মিটাও পিয়াস, অই দেখ কালমেঘ ভবিষ-আকাশে কেমন ভীষণ ঘটা করেছে সরােষে ; চূর্ণ হবে অহঙ্কার—দূরে যাবে পাপ আরব এবার হবে মুক্ত-অভিশাপ ! ওরে রে জেহেল পাপি!—তুইও কিরে আজ প’শেছিস কাম-রঙ্গে? রে কামুক পশু- আজি শেষ, আজি হবে তরঙ্গ-উল্লাস একেবারে চির রুদ্ধ !-কি জানিস্ পাপি, যুগে যুগে যে আগুণ দিয়েছি জেলে আরবের জীর্ণ বুকে। সেই ভস্মানলে আজিকে পুড়িতে তোরা এই আগুয়ান্ ;- সর-সম্বর এ কি?-মেঘের গর্জনে একেবারে পশিতেছ বামা—উপাধানে ? আবার রমণী-কণ্ঠে উঠিল ঝঙ্কার, আবার উজল গৃহ পূরিল বামার- কল কল কাকলীর উছাস কল্লোলে। এ কি পুন?-তুমি কেলে। বিজলী গনি,
তৃতীয় সর্গ।
৩৫
বেহেলের পাশে বসে? চিনেছি চিনেছি-
বলে কি ছলে পাপী ভুলায়ে তােমারে,
ভাসাইয়া কুল-মান সতী ধম্ম তব
এনেছে পাপের তরে। হাস জাগিনা
ক্ষণিক পাপের মােহে। মনে রেখ হয়-
হাসিলে ক্রন্দন শেষ রয়েছে নিশ্চয়।
{
চলুক চলুক নাচ-গাও-গাও গান,
চঞ্চল চরণ-পদ্মে খঞ্জন জিনিয়া
কর লাে আনন্দ-নৃত্য ; কোকিল-কুজনে
উরলাে বসন্ত-রাণী -কোমল। ধনী
করাও একটু পান কামের মদিরা
কামুক জেহেল তরে ;-কোকিল জিনিয়া
গাহ লাে পঞ্চমে গান অয়ি বিনােদিনি!
কর শেষ আজি মনােরঞ্জন সবার
ঢালিয়া মদন-মন্ত্র—কটাক্ষের শরে ;
কামের পরাগ-মেখে দেহ-খানিময়,
ভুল ও-ভুলাও শেষ পাপীর হৃদয় ।
নেত্ৰ-নিলোৎপল-ছন্দে মধুপের দলে
হাসিতে,-খাইতে মধু তােমার যৌবনে,
ডাক সখি বঁধুয়ায় চুমুক অধর
বিলােল কটাক্ষ হানি ;-বিবসনা হয়ে !
পাপ-পাপ-মহাপাপ,-কি এ “পশু ভাৰ
উল নিতম্ব কটি রমণী সবার !!
নাচিছে উন্মত্ত হয়ে অচেতন মদে ?-
যাও যাও মুখ-নিশা হে’র না। এদিকে,
এ পাপে মজিয়া আর করো না বিশ্রাম,
পরিত্রাণ।
-
কামের আশ্রমে তুমি। পৈশাচিক রসে
বেষ্টিয়া রমণী-অঙ্গ-চুমিছে অধর!
বাসনা-সলিল মাঝে হৃদি-সরােসিজ
কাম-গন্ধ মাখি অই হয় বিকশিত,
কি শুনিবে,-কি দেখিবে-যাও শান্তিরাণী
তােমার কর্তব্যে ফিরিতােষিতে মানবে
ত্যজিয়া এ পাপ-ভূমি সুখের বাসবে।
.
আবার—আবার মরি সে স্বর-লহরী
উঠিল কঁপায়ে কক্ষ। পড়িল ঢুলিয়া
অবশ জেহেল পাপী। ধরি সুফিয়ান
কহিলা তুলিতে কোলে রূপসীর তরে-
ধরে যথা রাজহংসী বেষ্টিয়া মৃণালে ।
সু-বঙ্কিম গ্রীবা-মূলে--হৃদয়েশ ভাবি
তেমতি। উঃ! সর্বনাশ, সর্বনাশ হল
বিপ্লাবিত বক্ষস্থল,-ভাসে শ্মশ্ররাজি
প্রবল সুরার স্রোতে। উৎকণ্ঠ-অন্তরে
সজোরে চুমিল পাপী বামার অধরে !
মনােসিজ!—ফুলময়!—হে বসন্তবীর।
এই যে নীরস ভূমি কঙ্কর প্রান্তরে
দ্বিপ্রহরা বিভাবরী নিদ্রিত ভুবন
শান্তির শীতল-কোলে। হে দেব, কেমনে
এখানেও পশিয়াছ ফুল-ধনু-করে ?
নাশিতে বিবেক-রাজা কাম-সৈন্য-বলে।
ধন্য তুমি,-আর ধন্য তােমার এ খেলা...:
তুমিই জগত খানি করিলে বিহ্বল !!!
-
তৃতীয় সর্গ।
অনেক্ষণে বাম-কষ্ঠে উঠিল ঝঙ্কার ।
“হে রজমি.! সুখমল্পি,হে জীমূত ছায়া!
সকলি য়েছ আজি, নাহি সে কেবল
আমার হৃদয় রাজ রহও গাঢ়তর ;--
আমি কঁদি, কি করিব জন্মেছি যখন
কেবলি এ ধরাতলে করিতে ক্রন্দন।”
গান থামিল বামার। আহা! অই দেখ,
বৃদ্ধ আবুলুফিয়ান কহিছে সােহাগে :-
“লাে মােহিনি! এস হৃদে-এস একবার,
জুড়াও তাপিত প্রাণ ;-আর না ভামিনী,
হানিও নয়ন-বাণ! এস গাে পূরাই
জন্মের সাধনা মম,-কামের বাসনা,::::
একটু বুকেতে ধরি চরণ দুখানা !!
;
*.
এক নয়,অই দেখ সবারি কোলেতে : ১
একটী দুইটা ফুল-রক্তিম-বরণ
বসিয়া রয়েছে স্থির,উলঙ্গ-বদনা-
উলঙ্গ সৰ্বাঙ্গ ! একি দৃশ্য-পৈশাচিক
কেহ চুমে,কেহ ধরে বক্ষে আবরিয়া।
কেহ বা মূচ্ছিত; শুধু আৰু-সুফিয়ান
অস্থির-উন্মত্ত-বসে! চারি দিক ঘেৰি
জড়িত ভাষার হােত পড়িছে উথলি..
পূর্ণ বসন্তের রাজ্যে—অনঙ্গ-সন্ধানে।
হেরিছে আঁধার, পাপী তাবত জগত্
কামের মােহের কাছে। তুচ্ছ ভারি মনে
অতুল এ সিংহাসন-ছার রাজ্য-ধন!
কামনা রূপিনী কত সৌন্দর্য্যের খনি
জ্বলিতেছে জ দুক, বাসন্তী পরনে,
পরিত্রাণ।
ফুটে যথা অৰ্ধক্ষুট গােলাপ কলিকা।
অথবা চম্পক; বরষা বিধৌত হয়ে
শােভে যথা ৰিভাময়ী নবীন যৌবনে।
আধা-ফুটা সকলেরি তেমতি যৌবন,
তেমতি চঞ্চল হাসি,-আকর্ণ নয়নে
ফুটিছে বিদ্যুৎবেগে ; পুনঃ মিশে যায়
কামের মােহিনী বলে। কালে দুরু হিয়া।
কেহ বা বৃদ্ধের দেহে পড়িছে ঢলিয়া।
কি আশ্চর্য! যেই বৃদ্ধ দিবসে সভায়
কঠোর জের ভাষে গর্জিল হঙ্কারী ;
সেই এবে টুলিতেছে মাতাল হইয়া
ভাৰিছে না কি ছিল সে হইয়াছে কিবা ।
না ভরিছে জগতের কল-কোলাহলে
বুকে ধরি যুবতীরে চাপিছে আবেগে
এ কেমন বল ?-নাহি পারিশ্ন বুঝিতে !
ওরে মূঢ়। এ বয়সে রসিকার সনে
সাজে কি রে হেন খেলা?-রসের উৎসব।
বিড়ােল যুবক হেন হইয়া অধীর
নিমগ্ন প্রণয়-তীর্থে মদন-পূজায় ?
দেশ-কাল-পাত্রে দিলি পাপের কালিমা।
ডুবাইলি কাল-রাত্রে আরব গরিমা।
এইবায় কিবা ভাবি চকিত নয়নে
কহিলা সকলে বৃন বীরগণ!
তৃতীয় প্রহর নিশা হয়েছে আগত,
আর না বিলম্ব সহেলহ করবাল
লহ অসি-বধ আজি ধর্মের মরাতি।
তৃতীয় সর্গ। ম করহ নাম বনী মাঝারে রাখিয়া দেবের মান-অরপি জীবন দেখাও উজ্জ্বল চিত্র-ত্যাগের মহিমা। শিখাও নিকামধৰ্ম্ম জগতের ধরে। সার্ধশত বর্ষ বারে বলে কি কৌশলে পারিনি করিতে নাশ আজি সেই দিন- সেই শুভক্ষণ আজি ৰধি আততায়ী লতিব শাত্বনা। হা-হা! বুভুক্ষু কৃপণ শান্ত হবে ইসলামের করি রক্ত পান! *পারিব না”-মুখে নাহি তুলিও কখন। সুমেরু সিন্ধুর জলে দিতে বিসর্জন যেই আরবের সূত অতি তুচ্ছ গণে, নাহি ভরে শমনের কাল-বিভীষিকা তা’রা হবে হতবীৰ্য্য মােহাম্মদ কাছে ? পৰি-পৰি যদি রণে ভঙ্গ দিয়া কি সুখ পাইবি প্রাণে ; কোন মুখ লয়ে আবার আসিব ফিরি আরবী সমাজে? মরণ-মরণ-তুচ্ছ সরম হইতে এই ভেবে ক’র কাজ, কি কহিব আর বীৰ্য্য বলে বলীয়ান–বিচক্ষণ যারা তাদেরে অধিক কিবা কহিব গো আর, জগতে থাকে না যেন ইসলামের নাম কর্তব্য ভাবিয়া সবে করে। আত্মদান। সুরা উত্তেজিত কণ্ঠে কহি এ সকল সদর্পে ত্যজিলা বৃদ্ধ বিলাসমহল।
৪০
পরিত্রাণ ।
গভীর ত্রিযামা। স্তব্ধ বিশাল প্রতি
গম্ভীরে অশুভ মিশিসৌন্দর্য্যের দেশে,
কি প্রলয় কাল-ছবি!-একাকার শুধু
নির্জনতা চারি পাশে-প্রগাঢ় আঁধারে !
আকাশে চন্দ্রমা নাই, নাই সে চকোর
এ পাপ-নিশীথে। আছে শীতল পবন
প্রকৃতি অঞ্চল-প্রান্তে করিতে ব্যজন!
হেন কালে মন্দিরের দ্বারদেশ হতে
জয় দেবতার জয়” হ’ল আচম্বিতে !!
:
.
ভীম প্রভঞ্জন এবে হয়েছে শমিত
কেবল আঁধার আছে বিশ্বৰক্ষ-ঘেরি
নীরবে শুইয়া! দেখে উপজয়ে ভীতি
এমন নীরস শােভা-প্রেত-পুরী হেন।
সেই আঁধারের কোলে সুষুপ্তি ভাঙ্গিয়া
“জয় দেবতার জয়” উঠিল ভাসিয়া।
আবার যেমন নিশা হইল তেমন,
গর্জিল কোরেশদল,-শিহরিল ক্রোধে ;
ছুটিল বিদ্যুৎ বেগে অরাতি নাশিতে
সে আঁধার ভেদ করি—জীবন সংগ্রামে।
আজি আঁধারের রাজ্যেপাপ-কোলাহল,
ছুইতেছে কোরেশের জীবন-আকাশ,
প্রতিধ্বনী-সে শবদে উঠিছে শিহরি,
পুণ্য-প্রীতি চলে গেছে ধরা পরিহরি ।
কহিলা আবার বৃদ্ধ “একান্তই যদি
পরাজিত হই মােরা তবু তার পদে
তৃতীয় সর্গ। ৪১ নাহি দিব বিসর্জন স্বাধীনতা ধন। ছি,ছি,ছি, ছি, একি কভু হয় রে সম্ভব ? ক্ষীণ সে ইসলাম-শক্তি দলিতে যাইয়া পরাজিত হব ? ভীত কাপুরুষ হেন বুঝিব প্রাণের মায়া-শত্রুরে ছাড়িয়া ! কে তবে মােদের মত হতভাগ্য আর কি কহিবে লােকে ? বল কোন মােহাশায় আবার এ কাল মুখে ফিরিব সেথায়?” শ : বলিতে বলিতে বৃদ্ধ চলিল সবেগে উলঙ্গ কৃপাণ করে ; বহুক্ষণ পরে লাগিলা কহিতে পুনঃ “হে রথীন্দ্র দল । এই খানে অপেক্ষহ সকলি তাের। আমিও এখান হতে সাধিব স্ব-কাজ ;- সকলের প্রয়ােজন দেখিনা যাইতে মুষ্টিমেয় ইস্লামের দলিতে আসিয়া !” দশনে দংশন করি ওষ্ঠ, প্রান্ত খানি কম্পান্বিত সেনাপতি বসিলা আপনি ! * ভীত আবু সুফিয়ান কঁপিল তরাসে কি যেন স্বর্গীয় ক্রোধে-মনের বিকারে ঝরিল দু’বিন্দু অশ্রু সেই অন্ধকারে দেখিল কেহ,-শুধু বিশ্ব অধিপতি দেখিলা পাপীর এই পূর্ণ অধােগতি। আবার সাহসে পাপী কহিল সবায়, কেন তবে আছ আর পুত্তলিকা প্রায়,--- যাও সবে,একেবারে কর আক্রমণ, নতুবা চৌদিক বেড়ি করহ বেষ্টন।” -~-
পরিত্রাণ।
?
অন্ধকারে পরিব্যাপ্ত আকাশ পাতাল
কেবল নক্ষত্রমালা তখনো নীরবে
কত কি অশুভগাথা ছিল। ভাবিবারে,
চলিলা কোরেশ-সৈন্য। অত্যাশ্চর্য এ কি
বসিয়া পড়িল সবেচলে না চরণ
কি করিবে আক্রমণ ?-নাশিবে অরাতি।
সত্য কি ভৌতিক কেহ না পারে বুঝিতে।
সম্মুখে-বিপদ হেরি-গ্রস্ত সেনাপতি
সাহসে বঁধিয়া বুক উঠিল চীৎকারি-
“আজিকে পীক্ষা শেষ। যাবে কি যাইব।
বেষ্টিয়া দুখানি গৃহ থাক নিশাকাল,
প্রভাতে “নমা” তরে হলে নিষ্কাষণ
চির-জনমের মত করিও নিধন !”
দাড়াল কোরেশ-সৈন্য নায়ক- জ্ঞায়,
স্তম্ভিত কুৰ্ত্তব্য-পথে-দলিতে শরে।
কিন্তু কি বুঝিনি ওরে পাষণ্ড কামুক
বিধাতা সহায় যার,-অপ্সরী-কিন্নরী
চৌদিক থেরিয়া করে আনন্দ বর্ধন,
শিরে শােভে মহা-জ্যোতি। পবিত্র পৃষ্ঠেতে
মােহরে নবুয়ত” ভাতে ;-সেই লােক-গুরু
বিধাতার পরাণের বান্ধবের তরে
কে নাশিবে ?-আপনারে স্বহস্তে নাশিতে।
কে করিবে পরিষ্কার নরকের পথ
একান্ত বিবেকশূন্য তােদের মতন!
ইলাম-ইসলাম-সূৰ্য নাশি কুহেলিকা,
দেরে কেমনে আনে প্রেমের বাহার,
উজল ধরায়,-পাপ করিয়া সংহার
চতুর্থ সর্গ।
৪ত
“ভয় নাই-ভয় নাই, আমি আসিয়াছি,
রক্ষিতে এ রুদ্র-তেজে, তুচ্ছ সুফিয়ান
কি সাধ্য তােমারে নাশে? যাও ধৰ্ম্মবীর
করহ পালন আজ্ঞা করিয়াছি যাহা।”
মাভৈঃ মাভৈঃ রবে ধ্বনীল। পৰ্বতে
বিধাতার বিকট সে মহান হুঙ্কার।
উঠিল সম্মিত মুখে বিড়ােল প্রেরিত,
অপূৰ্ব্ব স্বর্গীয় গন্ধে পূরিল চৌ-দিশি,
হিলােক জুড়িয়া হ’ল আলােক সঞ্চার,
পূজিলা মানসে সাধু সে মনে-প্রতিমা
কঁপিল পাপীর হিয়া, নিভিল সাহস
সুধাংশু নিষ্প্রভ যথা দিনকর করে-
তেমতি এ পূত-বীযে–কি দৃশ্য ভীষণ ।
ব্যোম-পথে ব্যোম-চর নামিলা সহাসে
উত্তরিলা সবে পুণ্য-পুরে। পদভরে
কঁপিল আরব-বক্ষ থর থর থরি !!
কোমল পবিত্র স্বরে মহা ভাববাদী
তােষি দেবেন্দ্র-দূতে, শান্তি-হস্তচ্ছায়
ভাতিন-ভূতলে-শূন্তে ভয়ঙ্করী রূপে!!
চতুর্থ সর্গ।
হজরতের পুরী-দ্বারে।
ঘোর অন্ধকার নিশা-নিথর প্রকৃতি
সুপ্তি মগ্ন চরাচর, কৃষ্ণাঙ্গী ধরণী
ঘন-ঘনঘটা-ব্যাপ্ত,-জীমূত ছায়ায়
থেকে থেকে শিহরিছে বিরহী ৰিঞ্জী,--
৪৪
পরিত্রাণ।
দেখাইতে হৃদয়ের জ্বলন্ত আগুন।
উন্মত্ত প্রণয়ী যথা প্রিয়ার বিরহে
চকিতে চমকি উঠে, স্মরণে শিহরে
পরাগ-পবন পেলে স্বপ্নহত হেন
*এসেছ,এসেছ” বলি ধরে আবেগেতে,
সেই মত চমকিছে আশার তাড়নে!
নীরব শৰ্বরী তাহে নিবিড় জলদে
আরো গাঢ়তর যেন করেছে মেদিনী,
ধরিত্রীর সুস্থচিতে গাম্ভীৰ্য ভাঙ্গিয়া
অশান্তির ধারা যেন হ’তেছে বাহিত ।
সুখময়ী নিদ্রাদেবী প্রতি ঘরে ঘরে
বিরাজিত শিয়রেতে সন্তান-সোহাগে,
ক্রোড়ে করে,—আশ্বাসিতে জীবন সংগ্রামে
সুখের কল্পিত-চিত্রে স্বপ্নের আড়ালে।
-
আঁধার আকাশ-তলে কাদম্বিনী কোলে
মুদিছে নয়ন ভরা ; কৃষ্ণবাসে দিশি
শুনাতে এসেছে আজি পাপ-রঙ্গালয়ে
মরণের কথা ; তাই নৈরাশ্য-বিজলী
গগন-গবাক্ষ ভেদি উঠিছে ফুটিয়া ।
দূর-ভবিষ্যতে কোন অমঙ্গল স্মরি
ভাসাইতে দুঃখ-স্রোতে, কঁাদাইতে ধরা
স্বরগের দেবদূতে পরিবিষ্টা হয়ে
এ মর-মরত মাঝে ; বিষাদ হুঙ্কারে-
মরণ সঙ্গীত গেয়ে হাসির ছলনে-
অলক্ষ্মী নামিলা যেন অশুভক্ষেপণে!
চতুর্থ সর্গ।
৪৫
দেখিলা প্রেরিত ;-ঘেরা চৌদিকে অরাতি
তৃণ বাণ হন্তে কেহ,কেহ গরবে
কোদণ্ড টঙ্কারে দূরে! উলঙ্গ কৃপাণ
ঝনা ঝনৎ রবে উঠে ঝকঝকি।
বীর-মদ প্রহরণে গম্ভীর নির্ঘোষ
নীরব বিমান-বায়ু উঠিছে বিদারি।
প্রতিশব্দে-কাপে ত্রাসে তুঙ্গ মহীধর
কানন-কুন্দর। ঘাের কোলাহলে বিশ্ব
অচেতন ;-একি স্বপ্ন। নীরব অবনী।
তখনাে ভাসিত গৌর-মূরতি বিরাট
অনম্বর পথে! ঋষি কহিলা সহাসে-
“উঠ বলি মহাবলী, হে বীরেন্দ্র আলী,
লহ মাের দেহ-বাস-ঢাক বর-বপু।
বিদায়,-বিদায় শেষ পাপ-ভূমি হতে
মদিনায়। আছে প্রাণের দোসর মম
আপনি সিদ্দিক। থাক একাকী মক্কায়,
গতি-বিধি লক্ষ্য কর শত্রু-কোরেশীর।
অই দেখ চারিদিকে এ কাল-নিশিথে
কি মােহন-মেলা! আহা দয়াময় আজি
কি মাধুরী ঢালিছেন! প্রভাে! বক্ষ দীন-জনে
অকূল এ ভবার্ণবে। কল্যাণ হে,-এস
একবার ; দয়াদানে উরগাে-ভিক্ষুকে
দেব ! আমি হতভাগ্য তাইতে নারিনু
তােমারে পূজাতে হেথা। তবে কি এসেছ
আশ্রিতে রক্ষিতে আজি? ভাল, ভাল দেব।
অভয় হে! একবার দাও পদ-ছায়া
!
পরিত্রাণ।
প্রচারি মাহাত্ম তব ; ধন্য হােক প্রাণ
এ ধরার। তব নাম করি কীর্তিমান
সস্নেহে উথিত হ’ল সুর-লহরী
তরঙ্গে তরঙ্গে। আহা, সুতানে কিশােরী
গাহিল কি রস-রাগ! অম্বরের পথে
আকাশ-সম্ভবা বাণী,তােষিতে প্রেরিতে
কহিলেন মহারূপ,—“কি ভয় তােমার
হে সুহৃদ। ম-লােক বিনাশক মাের
লােকে বলে। আমি উব্বী-পতি। একবার
এই পাপে ডুবাইয়ে ধরা, করেছি
ছারখার। বারিধারে মহান্ প্লাবনে (১)
ডুবে ছিল নরলােক। আরাে জান সথে!
প্রেয়ময় নামে আমি পরিচিত লােকে
ত্রিদিব-রক্ষক। আমারি কৌশল-বলে
পুণ্যাত্মা “নুহেরে আমি রক্ষেছিনু ধরি
রাতুল চরণ-দলে,জানে তা’ জগত।
সাধিল এ মহাব্রত-ইসলাম-প্রচার
ঘরে ঘরে ! বিশ্ব জুড়ি এ চরণদল
পূজিল। আমিও হইনু সুখী। আহা
পুনঃ পাপাচারে ধরা আঁধারে ডুবিল ?
আমি দুঃখান্তক। জীবের মঙ্গল মাের
পদে বাধা। এই দেখ মিটাই এখনি
পাপীর মন্ত্রণা-জাল। এস বুকে ধরি-
বিপদ-তারণ নাম করি রে সফল।”
(১) এই বিশ্বব্যাপ জল-প্লাবনের বিষয় ইতিহাস-পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন,
পুনরুখে নিষ্প্রয়ােজন।
চতুর্থ সর্গ।
৪৭.
দুলিল সহসা যেন অমর ভুবন
ক্ষীরােদ আবাস। জ্যোতির্ময় মিশাল সুদূরে
চুমকি! থর থর কাপিল নন্দন
ষণ। ঘাের ভূ-কম্পনে।
মানস-মােহন
কাঞ্চন আসনে হেসে ঢালিলা কি স্নেহ
বিদারি অম্বর-গর্ভ,—বিজলী চমকে।
মহােৎসবে—মহানন্দে মহেন্দ্র-চরণে
নমিলা প্রেরিত-শ্রেষ্ঠ ; তরুরাজি দূরে
স্বসিল তা শুনি যেন,-কুজনিল যথা
নিকুঞ্জে-বিহঙ্গকুল মঙ্গল-নিৰূণে।
সমীরণ বহিল স্বননে। উত্তরিল দূত,
অরিন্দম রথী যথা রথচক্র ধরি
দুর্বার আহবে মাতে। ঘাের-নাদে নাদি
নিশঙ্কিল প্রিয়জনে আগু-আশঙ্কায়।
কহিলা সুমতি পুনঃ-“হে দয়াল প্রতে!
ঘাের অন্ধকার নিশা, নিদ্রিত ভুবন
নিদ্রিত শক্রতা এবে ; তবু দেখ অই
পাষণ্ডরা বধিৰারে আমার জীবন
করিতেছে উকি-ঝুকি। দেহ হেন বল
রক্ষি যেন এ বিপদে তোমার প্রসাদে
অমর-অক্ষয় বরে !
এই ভিক্ষা শেষ
জগতে থাকে না যেন তিমিরের লেশ।”
.
নীরবিলা নবিবর। মহা রাজেন্দ্রজ
রুদ্র-মূর্তি অপসৃয়া,-বিমােহন রূপে
স্বপ্নাহত প্রেরিতের কর-পদ্ম ধরি
৪ পরিত্রাণ। === দেখাইলা পথ।হেরি লীলা-মুগ্ধ আলী প্রীতি-তরঙ্গ-ভঙ্গ। স্বীয় বস্ত্র খুলি পরাইল বর-অঙ্গে। বাহিরিল নবি প্রতুল প্রমােদ-সুখে, আনন্দ-বিভাের। ঝলসিল চৰ্ম্ম-চক্ষু, না দেখিল অরি প্রেরিতের অন্তর্ধান গবাক্ষের পথে ! কে যেন স্নেহের স্বরে কহিল আবার- “সু প্রসন্ন,আমি সখে, এই পিছে পিছে চলেছি তােমার। তুমি ডরাে না শত্রুরে ; তােমার সহায় আমি। দীনের সম্বল। ন্যায়েরি ছায়ায় মম পরিপুষ্ট দেহ, তাই এ অভয় নাম ; তাই সে প্রলয়ে- বিচারিব পাপ-পুণ্য সে মহা হাশরে (১) পাপীর।—পুণ্যাত্মারে করিব বরণ সুখের মাধবী-ভরা বসন্ত-পীযূষে তােষি সুখ-ভূমি-প্রমােদ-প্রসাদে। কোটি মরকতমণি উজলিবে যথা কোশেয় বসনে। গবে বসন্ত আনন্দ মদন-মােহিনী শত, কণকে-কৌস্তুভ মহান্ সে কারুকার্য্য। স্ফটিক আবাসে করিবেক ঝর ঝর পীত-লালে-নীলে বিজলীর হাসি সম প্রণয়ের হাসি। ঝলিবে মুকুতা চারু মলয় সমীরে ফুটিবে কলিকা-দল। অমৃত-ভাষিণী ধরিয়া সখার গল। মজিবে হরষে স্ফুট পারিজাত-বনে। মন্দাকিনী ধারা নন্দনের পাদ-মূলে ;-কি শােভা অতুল!” ( ইসলগ ধৰ্ম্ম-শাস্ত্রোল্লিখিত সেই শেষ পাপ-পুণ্য বিচারের দিন।
পথম সর্গ।
৪৯
প্রভাত হইল দেখি দুৰ্জ্জন কোরেশী
রােধিল প্রবেশ দ্বার। যেন মহম্মদ
কোন মতে নাহি পারে এড়াইতে হাত।
পাপ-চক্ষে পাপীগণ দেখিল চাহিয়া,
কেহ নাই,আছে এক যুবক (১) শুইয়া !
পঞ্চম সর্গ।
পার্বত্য-পথে।
নিদাঘ-শৰ্বরী-অন্ত, স্নিগ্ধ সমীরণ—
চুম্বিয়া লতিকা-বক্ষ বহে ধীরি ধরি,
শান্তাজ্জল পূৰ্বাসার ভাতিজা পূরবে
নাশিতে বিশ্বের তমঃ,-হাসিল প্রকৃতি
আনন্দে দোলা’য়ে শির ; নিকুঞ্জ বল্লরী
সে উৎসবে মাতিলেক যেন এ ধরায়
সুখের স্বপন পেয়ে ! এ হেন সময়ে
দূরে,—অতি দূরে শ্রান্ত পান্থ দুই জন
আরােহিছে সন্তর্পণে, কভু দেখা যায়,
কভু বা পার্বত্য-পথে অলক্ষ্যে মিশায় ।
অতিক্রমি দুরারােহ তুঙ্গ-শৃঙ্গ-পথ
চঞ্চল-চরণ-ক্ষেপে পথিক-যুগল
সম্মুখে গহ্বর-দ্বার পাইলা দেখিতে
;
যেই প্রবেশিতে তাহে হ’ল অগ্রসর
(১) এই যুবক বীর-কেশরী হজরত আলী (ক, ত
পরিত্রাণ। অমনি প্রবল রবে কাপিল, পর্বত দূরে অশ্ব-পদ-শব্দে,-বীর-দম্ভভরে। দেখিল পশ্চাতে ফিরি শাণিত ছুরিকা পিপাসার শান্তি আজি করিতে ধরায় মুৰ্ত্তিমান যম-করে শােভিতেছে হায় ! সঙ্গীকে করিয়া লক্ষ্য কহিল অপরে,- “মহম্মদ। অই দেখ শক্র সম্মুখেতে ! এবার নিবিবে হেথা জীবন-প্রদীপ- কর সদুপায় !” “আর সদুপায় কি বা আপনি মহান্ তিনি নিত্য-সঙ্গী জীবে ভয় কি সিদ্দিক। দেখ চারিদিকে চেয়ে, ব্ৰহ্ম তেজে ব্ৰহ্মময় ; মােরা তার দাস, জীবন-মরণ যার শুভ-অভিলাষ।” ক । ন; স্মিত-নেৱে পৰ্বতের নির্জন-প্রান্তরে হেরিলা সিদ্দিক এক অপূৰ্ব্ব মাধুরী, সে মাধুরী ভােগ যােগ্য-উপমা-বিহীন বর্ণ-গন্ধ-ময়ী-চিত্র কাব্য-শিল্প-কলা পরাজিত তার কাছে ; যে বুঝে সে বুঝে সে চিত্র কোথায় পাব এ হিয়ার মাঝে। লেগে ছুটিতেছে মত্ত-বীর-দল সম্মুখের দিকে ছুটে যথা বাণ বলবান কিরাতের মৃগ-মৃগয়ায়! লক্ষ্য নাহি চারি পাশে যেন কোন আশে উন্মত্ত,-উদভ্রান্ত প্রায়। সফল হইলে আবার গৃহাভিমুখে ধাইবে সকলে। .
পঞ্চম পর্গ।
গেল চলি বীরবু, বিপন্ন পখিক
সকতজ্ঞচিতে বন্দি বিধাচরণ
কহিল আপন মনে ;-~-ই অভয় প্রভো!
সত্যের সরল পথে সত্য-প্রচারিতে
পাঠা’য়েছ যেই দাসে,-- আজি দুঃসময়ে
রক্ষিলে চরণ-তলে কি মায়া-দর।”
এই সেই গার-হেরা - এই সই পর
এইখানে এক দিন জগতের
ছিন্ন বস্ত্র, মান-মুখে ফকিরের মও
অন্ধকার গুহা:গে প'শেছিলা হয় ।
এইখানে মহামতি সিদ্দিকের করে-
দংশিল বিষাক্ত সপে ---রক্ষিতে নবিরে !
আত্মত্যাগ হাসি-কান্না এক সঙ্গে সেথা
অভিভূত করে হায় মােসেমের প্রাণ!
প্রবল শত্রুর অস্ত্র নিবারিতে বিভু
ঊর্ণনাভ-জাল-তলে কপােতের ডিমে
ভ্রান্তি উপজিলা যেথা কোরেশীর হৃদে !
নমরে মােসুম সেই পুণ্য-গার-হােরে
ধন্য হও প্রণিপাতি কালসাক্ষী থরে ।
পাঠক। ফিরিয়া চল দেখি এক বার
মক্কায় কি হইতেছে !-হেথায় সকলে
প্রেরিতেরে না পাইয়া সিদ্দিকের গৃহ
লুঠিল দনুর মত। বীরবর আলী
শত্রু-হস্তে বন্দীকৃত! পর্বতে-পর্বতে-
গৃহে-গৃহে কোরেশিরা পতি পত্তি কৰি
পরিত্রাণ।
-
অন্বেষিলা নবিবরে ; যে দিবে সে শির
লক্ষ মুদ্রা পুরষ্কার পাবে সেই বীর।
কোথায় প্রেরিত আজি ?—কোথায় শত্রুতা
নিৰ্বাপিত হবে ? শুধু ভ্রান্ত কোরেশীরা
স্বদলে কলহ করি আত্মদ্রোহে জ্বলি
নিবারিছে ক্রোধ ;-যথা সারমেয় দল
আহাৰ্য্য পাইলে মুখে ভুলে আত্ম-পর!
হায়রে ! সুমতি-হৃত উদভ্রান্ত কোরেশী
কত দিন রবে অন্ধ ?—জ্বলিবে না হৃদে
ইসলামের তেজস্কর একত্ব-অনল?
উঠিবে না এক তানে—এক মন্ত্র ধ্বনী
“আল্লাহু আকবর”। ঘাের বজ্র নদে
ইলাম লভিবে রাজ্য শক্ত দলি পদে।
।
তিন দিন তিন রাত্রি অক্লান্ত-বিক্রমে
হুহুঙ্কারে বীরগণ ফিরিলা চোদিশি
পাইলা মহম্মদে।
স্তব্ধ নর নারী
এ সংবাদে ! হত-গৰ্ব মূখ কোরেশীরা
ভাবিল,—সত্য কি তবে দেববলে বলী
মহম্মদ ?-না,-না,-মিথ্যা প্রবঞ্চনা সব,
যাদু-মন্ত্রে ভুলাইছে ইস্লামের নামে
পাষণ্ডদলেরে! এই মােদের দেবতা
কত কাল যাঁহাদেরে সেবিয়াছি সুখে
লভেছি কামনা ; কত মনের বাসনা
সফল যাদের বরে ; তাহাৱা থাকিতে
একেশ্বর আর কেবা হইবে মহীতে?
পঞ্চম সর্গ।
নির্জন গহ্বর-গর্ভে হেথা মহম্মদ
ইসলাম-তরণী-বক্ষে ভাসিছেন সুখে,
এ বিপদ-পারাবারে। বিমুগ্ধ সিদ্দিক
নিরত ইসলাম-সুধা করিবারে পান;
চাঁদের সুধার-ধারা চকোর যেমতি
সাগ্রহে করয়ে পান,তেমতি সিদ্দিক
উৎকর্ণ হইয়া সেই প্রত্যাদেশ-বাণী
নিছেন অন্ধকারে। জ্বলিছে আলোক
হিয়ার মাঝারে,-যথা গুপ্ত খনি মাঝে
উজ্জ্বল হীরকখণ্ড করে দীপ্তি দান
নির্মল বিভায় ;-আহা সেই দিব্য জ্যোতি
ইহকালে পরকালে থাকে যেন সাথী।
পরিশ্রান্ত শত্রু সেনা প্রাণপণ করি
ফিরিলা গৃহের-পথে ; অবকাশ পেয়ে
ত্যজিলা প্রেরিত সেই অন্ধকার গুহা !
—দুৰ্বার সে থর-গিরি ভীম গারহাের।
ঘাের অন্ধকার-ব্যাপ্ত ধূময় দিশি
বিশুদ্ধ স্থলিত-পত্র মর মর রবে
উপজয়ে ভীতি! আহা হেন প্রেত স্থানে
শক্ত হস্তে সুরক্ষিলা ইমেরে বিধি।
প্রভাত-প্রকাশে সাধু উষ্ট্র আরােহণে
ধীরে ধীরে ধরিলেন মদিনার পথ,
হেন কালে চমকিয়া দেখিলা সিদ্দিক
ধাইছে কোরেশী পুনঃ,-রক্ষা নাহি আর
দুর্নিবার গিরি-পাশে! হেরি প্রভুবর
কহিলা সিদ্দিকে ডাকি-“আজি দেখ চেয়ে
৫৯
পরিত্রাণ।
ইলাম কেমনে বাঁচে শক্ত করে হেথা;
অসময়ে অস্ত্রীন ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসীর
কেমনে রক্ষয়ে প্রাণ জগতের পতি।
ভয় নাই,অই দেখ স্বরগের দ্বারে
হাসিছেন বিশ্বনাথ দেখে কোরের
এ আস্পর্ধা। চিরদিন জানিও অন্তরে
অন্ধকার নাহি রবে আলােকের রড়ে।
তীক্ষ্ণাগ্র - সুদীর্ঘ বর্শা এখনি পড়িবে
প্রেরতের বুকে -অই,-অই পড়ে বুঝি
সারাকার দৃঢ়কর ইক্লামের বুকে।
-মুহূৰ্ত্ত-মুহূৰ্ত্ত আর,—গেলা বুঝি হায়
ইলাম-চন্দ্রিমা অন্ত। একি বিপরীত
ভূমিতলে কেন বীর পড়িলা ঢলিয়া
স্বলিত তুরঙ্গ-পদ- শুষ্ক মুখে কেন
যাচিতেছে ক্ষমা-ভিক্ষা? প্রেরিতের পদে
কি বেদনা তার? না,-না তা’নয় তানয়
সত্যালােক পেয়ে আজি আঁধার হৃদয়
হাসিয়া উঠেছে বুঝি ! ধরে ইসলাম
নাশিলি অরাতি আজি বিনা-রক্তপাতে
আনিলি একত্ব-সুধা পিয়াতে জগতে।
শ জয়ে আত্মদান করিয়া সারাক।
ফিরিলা গৃহের মুখে ; শান্তি-প্রত্যাশায়
প্রেরিত, সিদ্দিক সাথে গেলা মদিনায় !
যষ্ঠ সর্গ।
ষষ্ঠ সর্গ।
মকা;-আবুসুফিয়ানের গৃহে।
দেবতায় অবিশ্বাস ? একেশ্বর কে সে?
কি বিশ্বাস, কি বন্ধন,-কি মন্ত্র তাদের
বুঝে না হৃদয়! প্রাণ ল’য়ে দিন রাত
খেলা ; তাইতে আমরা দেখ নির্বিকার মনে
দেবতার আরাধনে ডুবি। খ-দুঃখ
নিরাশায় আশার আলােকে বহু দূরে
দুরলােকে মনে হয় ধ্রুব তারা হেন
জীবনের। বুঝিয়া যা’র সে ইসুমে
সঁপিয়াছে উহার দুর্লভ জীবন
চির-অন্ধ ভ্রান্ত তারা। কি জানি তাদের
কি উপায় হবে ?
আহা মুগ্ধের জীবনে
ভুল এত সত্য হয় ভাবিনি স্বপনে।*
এ সংসার সুখময়।
প্রেমের বারতা
পীব-কণ্ঠে-উছলিত,-নিঝরের প্রায়
আমাদের বুকে বুকে !
এ সুখ তেয়াগি-
কোথায় দুর্বোধ-স্বপ্নে হতাশের প্রায়
মাগিতে যাইব ভিক্ষা, ইলমের পদে ?
মুখ আছে, আমাদের হৃদয়ে-হৃদয়ে
কেন যাচি দুঃখ তাহে? অমৃতে স্বেচ্ছায়
হলাহল ঢালি নাহি দিব কোন কালে।
অন্ধের করের যষ্টি এ পূজা মােদের
সদা পুণ্যে, সদা প্রেমে, মৃদুকলোলিত
পরিত্রাণ। অমৃতের গন্ধময়। লালসার রেখা পলে পলে ঢালে তীক্ষ্ণ উন্মাদনা আনি সৌন্দর্যের সাথে। মােহ-মুগ্ধ নহি ;- অথচ জাগ্রত হয়ে স্বপ্ন হেন ভাবি ধরি বুকে আবরিয়া। কি আছে ভিতরে ভয়ে কিম্বা স্নেহে তাহা করি না বাহির বিশ্বের এ রহস্য-সুন্দর! এই সুখ, । এই প্রেম, থাকে যদি নিত্য বিকশিয়া কোরেশের দগ্ধ-হৃদে ; তবেই তাহার একটু লভিবে শান্তি। এ পথ ছাড়িয়া কোন্ মূখ যায় বল ইস্লামে ভজিতে ? থাকে যদি গাল-ভরা প্রাণ-ভরা হাসি, থাকে যদি প্রেয়সীর সুন্দর যৌবন ; বাসনার আধাআধি ;-অপূর্ণ আশায় কেন বিসর্জিবে বল কাপুরুষ-প্রায় !” সারহীন ;- . কম্পিত,-মধিত-শ্বাস বক্তার বদন (১) ক্রোধে আরক্তিম যথা মারের ফুল, শুধু আছে টুকটুকে রং শুধু আছে অহঙ্কার। দেখে মনে হয়, পাপ যেন হিংসা ল’য়ে লজ্জায় ঘৃণায় হলাহল ঢালিতেছে মােহিনী আবরে !! ওদিকে আকাশ-পথে—ব সু-গম্ভীরে প্রত্যাদেশ প্রকাশিল জীমূত-মনে- (১) এই বক্তা-মদিনা নিবাসী আবদুল-এবনে উব্বে। সভায় মদিনার ক্লিহুদিগণ ও কারো সমভাবে যোগদান করিয়াছিল।
যত সর্গ। পাপ আছে; পুণ্য আছে,দেরে কোরেশী লয় আছে, স্থিতি আছে, উন্নতি-আনতি। আজি তােরা বুঝিলি না, পুণ্য কারে বলে, বুঝিলি শুধুই পাপ, না চিনিলি মােরে। শুষ্ক ফুলে মজিলি রে ;-গুপ্ত বন্ধে খুঁজি আমি মধু-প্রেমময়,-না দেখিলি তাহ। অসারে মজিলি হয়, না চাহিলি সার- চর্ম চটিকার হেন পাপের তিমিরে ছুটিলি আলােক-অন্ধ। একি এই প্রেম 'এ পথ-ও পথ শুধু ব্যবধান মাঝে। নারিলি রক্ষিতে সত্য ;-অসত্যের ঘােয়ে কলঙ্কিত ধৰ্ম্ম-ছবি দেখালি ধরায়, তথাপি আমার প্রেমে মজিলি না হায়! = “বুঝে দে,-বিনা দোষে দণ্ডি না রে আমি অবােধ শিশুর মত নিত্য পায়ে ঠেলি— অনিত্য ক’ দিন আর পূজিয়া রহিবি? ইসলাম ; আমারি শক্তি,-আমারি কল্পনা ও আলােক এ পথেতে আলিয়াছি আমি। বিশ্ব-বক্ষে-ব্ৰহ্ম-ছায়া, আমারি বিকাশ আয় রে সাধের-সৃষ্টি মাের কোলে হাস। প্রেমে মজি–প্রেমময় ---মেহের ঝঙ্কারে, আশ্বাসে তুলি যেন পাপীর উদ্ধারে । সগর্বে উলঙ্গ অসি করি অকালন কহিতে লাগিলা সুফি ;-“বৃথা কেন আর বিবাদ করিয়া মরি! কি সাধ্য তাহার
পরিত্রাণ।
আমরা থাকিতে করে ইসলাম প্রচার।
ভীত,পলায়িত সে ত দূর,-মদিনায় ।
বুঝেছে এবার অন্ধ (?) দেবতার বল,
দেব-ভক্তি কত উচ্চ। তাহার খােদায়”
এ রাজীব বরুপদে কে গণে কোথায় ?
“অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত হও বীরগণ
আহারীয় আহরণে ছুট দিকে দিকে।
সিরিয়া দেমেঙ্কে চল সঞ্চমিতে বল
আমি নিজে সঙ্গে যাব বণিকের বেশে।
নব বলে বলীয়ান্ দুর্জয় কোরেশ
মাতে যদি এক বার সমর খেলায়,
মাতঙ্গ সে কীট তুল্য নগণ্য-বিবেচি
যমালয়ে করে তার শেষ পিণ্ড দান।
“মদিনার সিংহাসন ঘুচাইব তার,
ঘুচাব প্রচার-সাধ,মিশাব ইসলাম।
মূল হীন জীর্ণ তৰু পড়ে যথা ভূমে
তেমতি বিলুপ্ত হবে অঙ্কুয়েই পাপ।
অনুরাগে,—দেব বরে লভি আশীর্বাদ
বিমল শান্তির রাজ্যে নিসিব মুখে
“সাধু সাধু ঋবে গৃহ হইল ধ্বনীত,
বসিল প্রাচীন পাপী-স্থির সু-গম্ভীর
শান্ত সিন্ধু যথা। কত আশা বুকে নিয়ে
হাসিতেছে কল্পনার কোমল কোলে।
ভিত্তি নাই—শ-পথে রাজহৰ্ম গড়ে
এহেন গণগ্য নরকে আছে সময়ে।
যই গর্গ। সহাসে উঠিল পাপী জেহেল এর,- উঠে যথা প্রণয়ের মদির পরশে কামােন্মত্ত নরকের কীট। কাপে অঙ্গময় থর থর থরি ; তবু সাহসে নির্জরি কহিলা —“হে বীরগণ! বৃদ্ধ সুফিয়ান যেই উপদেশ আজি দিয়াছে সবায় অতি সদুপায় ! এৰে নহে সমীচীন কাহারাে দ্বিরুক্তি কিম্বা বিলম্ব ইহায়। পাপ যদি দূর হয়, শান্তি যদি ফিরে প্রাণ সম অৰ্চনায় বিঘ্ন না ঘটিলে পৃথীতলে কেবা সুথী আমাদের মত ? কোষােম্মুক্ত ধৰ্ম্ম-অসি স্পর্শ করি আজ সকলি প্রতিজ্ঞা কর,ইঙ্গাম ধ্বংসিতে; কুশাঙ্কুরে ক্লান্ত করে অত বড় করী, মানুষ নারির মােরা নাশিবারে অরি?” প্রবল প্রবাহ যথা কলকলি ধায় শুনি তথা এ সকল ছুটিল কোরেশী, পাপের কুহকে মুগ্ধ হয়ে মুগণ- না ভাবিল ভবিষ্যৎ ;-এ সত্য কেমন!
পরিত্রাণ।
সপ্তম সর্গ।
মদিনা ;-হজরতের মসজিদ-প্রাঙ্গণে।
পুর্ণ-গর্ভ ধরণীর সতৃষ্ণ চাহনে
চারি দিক পাণ্ডু বর্ণা—অর্ধ অন্ধকার
বিরস মলিনা অঙ্গে ; দু’ চারিট তারা
মিটি মিটি জ্বলিতেছে কিন্তু দীপ্তি হীন ;
উদাসিনী প্রকৃতির অলস কাতর
রােগজীর্ণ ছবি খানি করে মর মর
কখন কি হবে তার নাহি কোন ঠিক ;
শুধু অশ্রু প্রবাহিনী, শুধু হা হুতাশ
জীবনে তাহারে যেন করিছে নিরাশ।
-
অয়ি দিগঙ্গনে। অয়ি সৌন্দর্য্যের খনি-
অয়ি বিধাতার ছবি-লাে চারু-আননি।
এই দেহ লতিকার সুঠাম সুন্দর
চিকন-কাচুলী পরা রাগ-বস ভরা
কোমল চার্বঙ্গে সতি! কি আমি দেখিনি।
এইখানে কত জ্ঞান, কত কি বিজ্ঞান
কত দর্শনের কথা, কত ইতিহাস
অতীতের স্মৃতিমাখা অশ্রু-উপহার
হেরেছি হৃদয় জুড়ি। বসন্ত-কাননে
কখন ভ্রমর হয়ে-এই কবি-বেশে
সৌন্দর্য্যের উপাসনে নিভূত কান্তারে
কত নদী-তীরে কত কুঞ্জ-উপবনে
বেড়ায়েছি লাে মানসি মহা-আরাধনে ;
আত্মহারা প্রেমােন্মত্ত যদিও পাগল )
সপ্তম। ১ কিন্তু দেৰি! বল দেখি কেমনে ভুলিৰ সে চির সৌন্দৰ্য্যশি-আবক্ষ বয়ি অতৃপ্তির মাঝখানে আধেক ধেয়ানে ভাদিয়া যা পড়ে থাকে।-কেমনে তা তুলে বেড়াব অকুলে ভেসে? তুমি পরিচিত, তােমাতে আমার কাম্য, পূজা-দেবতা হেরিতেছি রন্ধ্রে রন্ধে ; ঈড়াও লাে দেবি আমার মানস মাঝে অনন্তের রূপে সাধনার পুরস্কার। করাও লাে পান একটু প্রেমের সুরা, শিখাও কবিতা দেহ লাে কবিত্ব-বিন্দু এ অধম জনে; যাই চলে যাই অই সংসারের পথে তােমর বিরাট রূপ লয়ে মনােরথে। কল্পনে লাে ! চল আজি পুনঃ মদিনায়, প্রাণ ভরি হেরি কোথা মহা-পুরুষ ইসলামের কর্ণধার! চল লাে সুমতি এ জীবনে পূর্ণকাম হই আজি হেরি জগতের শ্রেষ্ঠ ধনে,-হৃদয়-রতনে! যারে পাইবার তরে বিধাতা আপনি সখা বলি সম্বােধন করিলেন সাধে, সেই মহাপুরুষের চরণ-দর্শনে পূরাই কামনা, ভাগ্য হাসুক গৌরবে । চঞ্চল-গামিনী গিরি-জায়ার মতন চল ত্বর প্রক্ষালিতে সে যুগ্ম চরণ- হৃদয়-শােণিতে; কিবা আছে বল আর অপূত পরাণও যে গাে নহে যােগ্য তায়।
নিস্তব্ধ প্রকৃতি রাঝিল্লিমুখরিত নহে আলি, পলিয়া পয়েছে যেন হয়, কণক-কীৱিষ্ট্র ভূষাকালীদাহায় পূমে চিফগাল্পিং জয়ে শিহরিয়া উঠিতেছে সে মকী হেয়। এহেন ভীমণ কালে বসে ছাতলে সরষে হামজা বীর উঠিল গর্জিয়া, বীর দম্ভে এক লক্ষে হয়ে আল্লাম প্রেরিতের পাদদেশে,“ধৰ্ম্ম সাল জরি এই অস্ত্র--এই ব্রত-ইসলাম-রক্ষণ করিনু গ্রহ আজি ; আশীৰ্বাদ মাগি পূর্ণ মনােরথ যেন হই এ সময়ে। এত স্পর্ধা—এত সল-মূর্ষ কোয়েশীর ? এই যে আব্দুল্লা এই শঠের প্রধান মৌখিক ইয়-বন্ধু স্বার্থান্ধ কপট, এত দিন জানি নাই গোপনে নারী কোরেশদলের-দৌত্য করেছে কেমনে? মিষ্ট বাক্যে ভুলে এর ইসলাম জননী অকুল সাগর-কে ডুবিলা গ্লাপনি।” - “পুনঃ কিনা শুনিতেছি কোরেশীর দল করিয়াছে আয়ােন মহাসমরে আক্রমিত মদিনায়। নৱকৰ টি- ‘ক্ষুদ্রমতি কার্জ শুনি সেনাপতি আয় । যেই দিন গ্রাম-ভূমি করি.আক্রমণ নগরের পূর্ণলিকল্পিছে ভগন দিউল্পে অইল ঠিকাঙ্গাল- সম্পদ মদিনার চারি ভিতে গুপ্তচর দিয়া,
সপ্তম।
।
ভুলাইলা মােহশেখবাবৰিয়া
করিল খাল-পুষ্ট ; পাপের লালসা
দিল মেলে মহাৰছি, আশা পেল প্রাণে
বিমূঢ় কোরেশ-দল। আরো সুফিয়ান',
দূরদেশে বণিকের অধিপতি হয়ে
বহু উঠু-সমবায়ে বাণিজ্যের রে
গিয়াছে চলিয়; তারা অর্থ আহারীয়
সংগ্রহ করিছে এই সংগ্রাম কারণ।
অনিবার্য এ সময় তাই আজ্ঞা মাগি
নাশি য়িহুদীর দল—এই বীরবাহ
দৈখাক জগতে দেব ইলামের তেজ
বাজুক সমর রঙ্গে দফ, ও বিষান;
পূর্ণ থােক ইসলামের প্রতিষ্ঠা-গরিমা
হউক মােসেম রাজ্য ; এত বড় কথা-
মৌখিক বন্ধুতা কিন্তু অন্তরে গরল!
ধিক ধিক্ ধিক্ এই নরাধমগণে--
শত যুগ পুড়িলেও নরক আগুণে
এ পাপ হবে না ক্ষয়-দেহ 'অঙ্গ রণে।”
“বিনা রক্তে সে পাপীরা নাহি করে কাজ
হেন অবিচার? এই ধৰ্ম্ম সাক্ষ্য করি
কহিতেছি বীরগণ করই শ্রবণ :-
যেই দেশেষেই ভূথম শান্তির লাগিয়া
বিধাতার প্রত্যাদেশ শিরোধার্য্য করি
আইনু 'আলায়। সেই প্রকৃতির কোলে,
শান্তির বিল জ্যে, গামলা পথ
অমৃতের নিলিনী ক্ষী-সলিলা
পরিমাণ। পুণ্য পীঠ মদিনার দুধ-নিকেতনে অশ্রু হাহাকার। ব্যথিত বীরের মতি, তােমরা পুরুষ ; কেমনে সহিয়া মাছ অবলার আঁখিজল--শিওর হনন। রক্ত-য-অভিনয় করিব নিশ্চয়--- অবিলম্বে সাজ সবে করিও না ভয়!" জানি আমি নহ ভীত সন্মুখসমরে জানি শ্রেষ্ঠ নহে প্রাণ অপমান হতে, পৌত্তলিক বিধর্মী সে কোরেশীর করে- সম্ভব মােসেম সেনা হবে কি নিহত ? ভ্রাতৃত্ববন্ধুত্ব-প্রেম-স্নেহের বন্ধনে একত্বের একচ্ছত্র মধুর শৃঙ্খলে যবে বেঁধেছিনু এই মদিনার লােকে এই পদ-কোকনদে, কি স্বর্গীয় প্রেম বিকাশিত করেছিল নিদ্রিত হৃদয় দেখ ত ভাবিয়া ; শুধু স্মরিলে সে কথা থাকে না প্রাণের মায়া, লাগে ব্যথা হতে দুঃখিনী মায়ের তরে ; তাই বলি সবে সময়ে স্বদেশ তরে সাজ রণে তবে!” চিন্তাক্লিষ্ট মেয়ােজ্জল বদন তুলিয়া সস্নেহে সম্বােধি বীর হামজার তরে এতক্ষণে বিশ্বারাধ্য লাগিলা কহিতে অমিয়া মাখান স্বরে-স্থির হও বীর- অই নিত্য, অই সত্য, আলােক যাদের জীবনের ধ্রুব লক্ষ্যকে পারে টলাতে তা’য়ে চরণ বল? কেন ভীত হও
অষ্টম সর্গ।
৬
বিধাতা মােদের সাথী, নাহি প্রয়ােজন
সমরে সাজিতে সবে। নেকলা-প্রান্তরে
আব্দুল্লা থাকুক একা, শক্ত-গতিবিধি
নিরাপদে জানা যাবে। আজি বীরগণ
স্থির মনে গৃহ-মুখে করহ গমন।
প্রচণ্ড আবর্তশেষে অথবা ভাটায়
স্বীতা কল্লোলিনী যথা হয় মৃদুশীল,
তেমতি মােসসম-চম্ নিৰ্বাক অটল
গম্ভীর বিষাদ-ক্লিষ্ট চলিলা ভবনে।
ক্ষণে ক্ষণে দীর্থ-খাস ভাঙ্গি নিস্তব্ধতা
প্রকাশ করিতেছিল হৃদয়ের ব্যথা।
অষ্টম সর্গ।
N:
মরু-পথে।
দ্বিপ্রহর। মরুভূমি চিতার সমান
জ্বলিতেছে ধক ধক্-বিদগ্ধ-প্রান্তর,
অদূরে সুউচ্চ গিরি উত্তোলিয়া শির
অসীম একের দিকে অঙ্গুলী-সঙ্কেতে
দিতেছে অভয় ; হেন কালে শ্রান্ত পান্থ
দল-বলে উতরিলা শৈল-সানুদেশে।
পূরিল বিজন-মরু জন-কোলাহলে
শান্তিলা আতপ তাপে ক্লান্ত পিপাসিত
ধীরে ধীরে বীরগণ চলিলা প্রান্তরে
সন্ত্রাসে,—নিশেষ-প্রায় নিপান-উদ্দেশে,
হেরিলা বিস্ময়ে,-খর্জুরের অষ্টি-ৰাশি
*
পরিত্রাণ।
হায়িত উমর সাথে ! চমকিল।
এ নিশ্চয় মদিনা-নিবাসী গুপ্তচর
এসেছিল আমাদের লইতে সন্ধান!
অকস্মাৎ ভীম-কঠে হইল গর্জন :-
“উষ্ট্রারােহী মদীনার গুপ্তচর এসে
এখানে পিয়েছে জল, পেয়েছে সন্ধান
তোমাদের ; কৌশলে পূরায়ে অভিলাষ
বিনা বাক্যে চলে গেছে হও সাবধান!
নীরব স্তম্ভিত যত কোরেশী বণিক
প্রাণের মায়ায় ; আয়াে যদিচ মােসম
মুষ্টিমেয়,-তাও বীর্যে কে আঁটে তাদেরে ;
বেষ্টিত একার দৃঢ়—দুৰ্ব্বহ জীবনে
এমন বিপদে কভু পড়েনি কোরেশী।
বর-কণ্ঠে সুফিয়ান কহিলা গরবে-
হাতে অসি থাকিতেও যে বীর-হৃদয়
কঁপে মৃত্যুভয়ে, ওরে নারী বলি তারে
উপহাস করি আমি ধিক সে বর্বরে।
কাপুরুষ,-কুকুর সে ষােগ্য উপেক্ষার
বীরের সম্মান নহে উপযুক্ত তার!”
“ভাবিছ উন্মুক্ত বুঝি মরণের পথ
এ পাপপর্বতে! তা নয় সুহৃদ
গুপ্ত পথে-গুপ্ত ভাবে নির্ভীক কোরে
নির্বিঘ্নে চলিয়া যাবে জনম ভূমিতে।
উঠ ত্বরা, বিলম্বেতে অশুভ কল্পনা
হিবে সন্দিগ্ধ হিয়া ; শমন-যন্ত্রণা
ধুই সহিৰে কেন? মক্কায় যাইয়া
যথার্থ বীরের মত আমি আসি
অষ্টম পর্গ।
মদিনায় ; শতমুখী প্রতিভার বলে
“একেশ্বরবাদ” দিব অতল সলিলে।
হেথায় মদিনা-ভূমি করে টলমল
যথ ঘাের ভূ-কম্পনে ! আসিছে কাকের
করিবারে অবরােধ শ্যামা জন্মভূমি।
জীর্ণ ভগ্ন তরবারী করিয়া সম্বল
বদর প্রান্তপথে চলিলা মােসেম।
“বারিধি সমুখে আজ গােপদ দাভাবে
দেথরে জগতবাসী সত্যের শকতি,
তক্ষকের ফণাতলে মণ্ডুক যুঝিবে
পাপে পুণ্যে ভেদাভেদ হের রে সুমতি।
ইসলামের বন্ধু কে তা কালই বুঝিবে,
দেবতার বল কত তাহাও দেখিবে।”
মেহ-বিগলিত-কণ্ঠে ইসলাম-সন্তান
শূন্যপথে প্রত্যাদেশ করিলা শবণ।
সে স্বরে এত কি মধু, এত প্রেম হায়,
ধরার তাবত স্নেহ নগণ্য তাহায় !
ওদিকে কোরেশ-বৃহ উন্মত্ত আবেগে
নাশিতে ইসলাম রাজ্য তা-মগ্ন-সুখে।
ধূমায়িত পাক সে শহকে বীর
উলক্ষিয়া চলিয়াছে শাখামৃগ যথা।
কপিল বদর ভূমি অন্ত্রের নির্ঘাতে,
উষ্ট্র-থর-তুরঙ্গের বিকট চীৎকারে
প্রেতপুরী ভিতিল পৰ্বত-কাতারে।
পরিত্রাণ।
নবম সর্গ।
পর্বত-শিখরে।
চন্দ্রমা-শালিনী আহা কি মধুযামিনী
স্নিগ্ধতােয়া কমনীয়া কৌমুদী বিভায়
ফুটাইছে মহাপ্রেম প্রকৃতির বুকে ;
মেলিল সুচারুমুখী কুসুম-কলিকা
আনত-নয়ন, যেন উর্ধে চাহি চাহি
কাতরে করুণা মাগে করুণালয়ের
বরপদে বালা।
অনাঘ্রাত কুসুমের
এ প্রেম-রহস্য আহা কি কোমল-টানে
করে আত্মহারা ! কাম-গন্ধে সবিহবলা
বনভূমি ;-হাসিলা মন্মথ বুকে বুকে!
দুগ্ধস্রোতা তটিনীর ক্লান্ত মন্দস্রোত
বহিছে কল্লোলি ধীরে বিরহিণী সমা,
নবােঢ়া যুবতী হেন প্রকৃতি ঝরি
খলখলি হাসিতেছে বস্ত্রাবাস টানি
সলাজে । সে সুকুমার কান্তি সমাবেশে
সমুজ্জ্বল দশদিশি—গরবিনী ধরা।
পুষ্প-গন্ধ-সমাশ্রিত কাব্যময়ী নিশা,
নগ্নবেশে আলু খালু ঈড়ল বিশা!
শত তানে শত লয়ে নীরবের গান
নীরবেতে তুলিছে ঝঙ্কার ; স্নেহময়ী
দিগ্বলয় আকুল সঙ্গীতে ;-মুখরিত
ঝিল্লি-মন্দ্রে। ফুলশর রচি নব নব
মিনা ছুটিল যেন হৃদয়ে হৃদয়ে।
প্রকৃতির সে উল্লাস ৰিচিত্ৰ-কাকলী
নবম সঙ্গ।
যে গুনেছে একবার, হায়রে সে নর
প্রলােভন পূর্ণ ভবে শ্রেষ্ঠ ভাগ্যধর।
বিদূরিতে কৰ্মশ্রান্তি সােহাগিনী লতা
নিদ্রালস-মদালসা-অবশ তনিমা
কি সুন্দর। আনন্দ আকাঙ্ক্ষা চারি দিকে
পায় পায়; স্নেহে ভাঙ্গে মরণের বেড়ী!
বিকচ-যৌবনা-দিশি বক্ষোবাস ফেলি
যুগ্ম-কুচ-অভিসারে কুঞ্জ অন্তরালে
ডাকিলা মনজে!
দূরে দূৰ্বাময়ী ভূমি
কি জানি কি দীপ্তিভরে উঠিল ভাতিয়া ।
প্রবাহিত মলয় অনিল, জ্যোৎস্না-মাখা
ফুটন্ত ফুলের কোলে হাসির ছলনে
একবার পড়িল ঢলিয়া অকস্মাৎ!
“ছি” “ছি বলি সরি গেলা বিকশিতা ফুল
কি দুর্বোধ প্রণয়ের গুপ্ত বিচিত্রত।
পিয়াস-দগ্ধ বিরহির মত--আবার
পড়িছে লুটি ফুলের অঞ্চলে পবন !
কি নির্লজ্জ-কি নিষ্ঠুর প্রেমে অত্যাচার।
-তা নয় ওটুকু শুধু প্রণয়ের রস,
মিলন তখনি মিটে,--- বিরহই মুখ
তাই এত ঢলাঢলি “দিব না” “দিব না-
অথচ উথলি পড়ে পরাণের মাঝে
ভাদরের ভরা নিঝরিণী! ফুটে ফুটে
মিশে কথা,-হয় হয় হয় না বাহির ;
বুক ফাটে-মুখ বদ্ধ–কি লজ্জা গভীর!
বিমুগ্ধ কৃতজ্ঞ চিতে গিরিশৃঙ্গ-তলে
=-
পরিণ। উপবি মােহাম্মদ(দঃ) গভীর চিন্তায় নিমিলিত আঁখি যেন ঝলসি উঠিল জ্যোতির্ময় পুরুষের মধুর আহ্বানে ? ‘স্বর্গশ্রেষ্ঠ দুত আমি জিব্রাইল; প্রভো! আসিয়াছি নিবেদিতে বিধাতার বাণী ও চরণ-দলে। প্রণমি তােমায় দেব। প্রত্যুষে হইবে রণ, ভীম-প্রহরণে ফিবেন প্রভু নিজে স্বর্গীয় কৌশলে ; পরাক্রমে পরন্তপ মদিনার বীর দুর্জয় অটল। বলি প্রাক্তন-লিখন কে খণ্ডাবে কবে? মেহ সহস্রদ বিভু সহভাবী তব ; প্রয়ােজনে সুসময়ে পাঠাবেন পঞ্চ সহস্রেক ব্যোমচর। নির্ভয় অন্তরে.কালি হও অগ্রসর এ কাল সমরে। তুচ্ছ আবু সুফিয়ান পাপীট জেহেল অধম কি করিবে। সত্যপথ-পা তুমি কি জয় হে বীর সহগামী মােসেমেয়ে প্রানি অভয়, বিধাতার শুভ-অজ্ঞা করহ পালন। নিশ্চয় হইবে জয়, রুষ্ট বিশ্বনাথ পাপী-দলে; সদা তুষ্ট সত্য প্রসারণে!” অতি দুরে মিশে গেল পুণ্যময় জ্যোতি লক্ষ্যে আকাশে। প্রেম- ভাববাদী সকৃতজ্ঞ হৃদেনমিলা মহেন্দ্র পদে ; মান চত্ৰ অন্ত-প্রায় সরকন্যাগণ প্রভাতী আনন্দ নৃত্যে মাতিলা স-সখী রিজাত বনে। মৃদু পদে নবিবর লিলা শিবির পানে প্রেমার্ত হৃদয়ে ।
শম শর্ম।
দশম সর্গ।
রবিক-করজালে ছাইল মেদিনী
পাখীরা প্রভাতী গানে,
লহর তুলিল কাশে,
আনমনে দিশি দিশি ছুটিল সবায়,
নববৎসাহ সঞ্চারিত হইল ধরায়!
উছলি পড়িল যেন সহ কিরণ
গাছে গাছে পাতে পাতে
শিশির কণিকা পাতে
শেভিল মুকুতাহার ; লুটি পরিমল,
পবন ফুটায়ে গেল বন ফুল-দল!
সহসা ফাঁপিল গিরি রণবা-মেলে
দুৰ্ম্মদ কোরেশীগণ
করি অস্ত্র আন্দালন,
ব সম হুঙ্কারিল বীর দাপ শুনে,-
পত পক্ষী প্রবেশিল নিবিড় কাননে।
.
ঝম্ ঝ ঝম্ রবে কোরেশী বাজনা
বাজিয়া উঠিল দূরে
যেন রে রাক্ষস পুরে
পিশাচ উৎসব-মগ্ন-আনন্দে অধীর,
ওদিকে সাজিল শত মহম্মদী বীর !
পত্রিকা
বেগে রড়ে দশদিক ইহুইলাস
ওনি অশ্ব-পদশব্দ
আকাশ-পাতাল স্তব্ধ
বিমান বালুকা-পূর্ণ শব্দিত অচল,
ভীমবল অরণ্যজ হইল চঞ্চল ।
মুচ্ছিত অফুট-কলি-এ কি এ সহসা
নীরব প্রান্তর মাঝে
কেন রে বিষাণ বাজে
ফের গভীর তেজে “দীন “দীন” বলি
কেন রে মােসেম-সেনা রণ-কুতুহলী।
ঝন্ ঝন ঝন ঝন্ চক্ চক চকু
তীক্ষ্ণাগ্ৰ কৃপাণ-মুথ
আতঙ্কে শিহরে বুক
কালানল উগারিছে প্রতি প্রতিঘাতে,
আজি কি দুর্দিন হায় শান্তির রাজ্যেতে।
বিস্তীর্ণ বদর ভূমি-বসতি-বিহীন
অতি দুরে তরু সারি
মৰ্ম্মরিছে ধরি ধরি,
সচকিত খগদল করে কল কল
পাপভারে বুঝি ধরা যায় রসাতল।
গৃহ-পার্শ্বে যদি কেহ সংযােগে অনল
পার্শ্বস্থিত গৃহী যথা
বিহবল নয়নে তথা
দশম সর্গ।
৭৩
হয় ভীত ; তেমতি এ প্রলয় হতাশে
দুর্বল বলাকা দল কপিল তরাসে ।
নিরুদ্ধ অনিল যথা ঝটিকার আগে
তেমতি সদল-বলে
মােসেম-কাফের দলে
দু’ দিকে দাড়াল আসি-কৃতান্ত শিয়রে,
শশনি ভৗমা অসি ধাঁধিল বদরে।
“এইবার এইবার হও অগ্রসর
গর্জিল ওতবা বীর
দাপটে মেদিনী শির,
চূর্ণিত হইল যেন গরবের ভরে,
জলিল অনল-শিখা ফলক উপরে।
কুপাঙ্গ কাফের-সেন জয়ােল্লাসে মাতি,
হইলেক অগ্রসর
পুনঃ সিবা বীরবর
তীরবেগে ছুটিলেক ইলাম নাশিতে,
দুর্জন ওলিদা বীর চলিল পশ্চাতে ।
বর পদে প্রণিপাতি হামজা ওবেদা
সবেগে ধাইল বলে
বীরচুড়া আলী চলে,
যথা মত্ত-প্রভঞ্জন অথবা আলােক,
মুহূর্তে বিদ্যুৎবেগে উজলে ভূলােক।
৭৪
পরিত্রাণ।
।
হু হু হু হুম্ ভীষণ শবদে
ক্রোধে সিবা নিরভয়
আক্রমিল হামজায়
শান্ত ধীর জলধিতে বুদ্ধদের প্রায়,
নারিল টলা’তে তিল বীরের হিয়ায়।
থর অসি ঝলসিল মুহূর্তের তরে
শ্রাবণের ধারা প্রায়
রুধির-প্রবাহ ধায়,
ভূতলে লুন্ঠিত শির সিবা ওলি দার
ছুটিল হামজা, আলী, ফিরিয়া আবার।
ধমনীতে উষ্ণ রক্ত বহিল যােধের
বিধর্থী ওতবা সঙ্গে
ওবেদা সমর রঙ্গে
মাতিল ; ধৈষী তাহে প্রবল গরজি
আকর্ষিল ওবেদার ধরি পদ-রাজি।
আহত মৃগেন্দ্র যথা আক্ৰমে মানবে
তেমতি ওবেদা ধরি
ওতবারে যমপুরী
দেখাইল চির তরে ; ভীত সুফিয়া ,
হেরিলা শিবিরে বসি এ দৃশ্য ভীষণ।
ৰূক্ত-যজ্ঞ-নিশেষিকা মহম্মদী দল ;
শােণিত-প্রবাহে ভাসি
কোরেশ কবন্ধ-রাশি
দশম সর্গ
ভাসিতে লাগিল তাহে বিকৃত বয়ান,
সাহসে কোরেশী পুনঃ মুড়িলেক যাণ।
শন্ শন্ শন্ শন্ ছুটিল সে শর;
সাঁঝের আঁধারে মিশে
আশে-পাশে দিশে-দিশে
করাল ডাকিনীদল আসিল নামিয়া,
হইল শ্মশান-পুরি বদর ব্যাপিয়া।
s
নিয়তি-নিগড়-বদ্ধ দুর্বল মানব
অদৃষ্ট খণ্ডিতে নারে-
নিমেযের পর পারে
কি গভীর অন্ধকার,—দুল্লঙ্ঘ্য বিধান,
আঁধারে আঁধারে হ’ল রণ-সমাধান!
বীরপ্র মুসলমান বিধুমুখীগণ
বীত শােক মত্ত প্রাণা
নহে আর ম্রিয়মানা
মঙ্গল নিক্কণে বীরে শালি এ খেদে,
ওবেদা ত্যজিল প্রাণ প্রেরিতের পদে।
হাহাকারে চারি দিক পূরিল আবার
কহিল প্রেরিত সবে-
“ধর্মযুদ্ধে যে মরিবে
অনন্ত স্বর্গীয় শান্তি মিলিবে তাহায়,
-আবার বীরের হিয়া ভরিল আশায়।
পরিত্রাণ। সে দিনে সে শুভক্ষণে যে মন্ত্র উঠিল- সে মন্ত্রের মােহিনীতে পরাণ সঁপিয়া দিতে আজিও মােসেম-প্রাণ উঠেরে নাচিয়া, নির্বিচারে সুখ-রাজ্যে যাবার লাগিয়া । শােক তাপ ডুবে গেল কালের গরভে মিটি মিটি অন্ধকার হইলে একাকার রঞ্জি সুধাকর-জালে পাতায় পাতায়, ঝরিল কৌমুদী-রাশি সহস্র ধারায়। নিজ বাসে উৰ্দ্ধ শ্বাসে বিমূঢ় কোরেশ চলিল ফিরিয়া আজ নামিল সুখের সঁঝ শীতল মারুত বহি ধরার অঞ্চলে জাগা’ল সাহসে শ্রান্ত মহম্মদী-দলে । । অবসান বিভাবরি গুঞ্জরিল অলি, পূরব-গগন-ভালে সহস্রাংশু কর জালে হেলে দুলে দেখা দিল হাসিয়া হাসিয়া আবার বিকট-বাছ উঠিল বাজিয়া ! “এক সঙ্গে সবে আজি কর আক্রমণ পতিত মােসম কুলে, দেওরে আগুণ জ্বেলে,
দশ ।
৭৪
বেঁধে আর তাহাগের প্রেঝিতের অরে,
আজি রে বাসনা পূর্ণ কর এ বদরে
“কাৰ্ম্মক টঙ্কারি সবে ডুবাও ইসলামে
শােপিতে তৰ্পণ করি
চল রে মক্কায় ফিরি
দেবতার নামে প্রাণ বিলাইয়া দাও,
কোরেশী অমর হােক, যাও চলে যাও!”
“পরাণ লইয়া যদি পলাবি মায়ায়
কোরেশ রমণীগণে
ঘৃণায় তােদর পানে,
যখন নয়ন তুলি দেখিবে না হায়,
কি সুখে জীবন লয়ে বাঁচিৰি তথায়।
“মানুষ হইয়া যদি জন্মেছি ওরে
আজি অর্ক প্রায়
অরুন্তুদ অসি ঘায়-
নাশরে মােসম-সেনা বীর-পদতলে,
দেবতার শান্তি-রাজ্য হােতূ ধরাতলে।”
প্রজ্জ্বলিত হুতাশন বিক্রান্ত কোরেশী
নাহি জানে মৃত্যুভয়
মাহি জানে পরাজয়
কেবল মাগে রে জয়-ইম পতন
দগ্ধি এ পতঙ্গ-রাশি উড়াও কেন?”
৭
পরিত্রাণ।
"মাতঙ্গ পড়িলে যেই কোরেশীর করে
চৈজ-শেষে তুলা প্রায়
পবনে উড়িয়া যায়
সে করে মােসম কি রে পাইবে নিস্তার
পাষণ্ড-দলনে ত্বরা হও আগুসার।”
রেষদীপ্ত-করে অসি করি সঞ্চালন
জেহেল গরজি ধায়,
মত্ত-প্রভঞ্জন প্রায়
ধাইল কোরেশ-সেনা বদর প্রান্তরে,
মাভৈঃ মাভৈঃ রব ধ্বনিত ভূধরে।
অকুল সাগরে ঝাঁপি পড়িল ইলাম,
প্রেরিত দেখিল চেয়ে,
জ্যোতিতে আকাশ ছেয়ে
স্বর্গ হতে নামিতেছে শূর-ব্যোমচর,
উলঙ্গ কৃপাণ করে ;-প্রফুল্ল অধর!
দেখিতে দেখিতে যেন বদর প্রান্তরে
ছুটিল শশাণিত ধারা
বাণের শ্রোতের পারা।
পলা’তে লাগিল যত কোরেশীর দল,
শৃগাল সমান সবে ত্যজি রণস্থল।
এ কি রে, এ কি রে আজি পলা’স কোথায়,
কোথায় ফিরিয়া যাবি
মক্কায় কি স্থান পাবি
দশম গার্গ। ৭৯ কলঙ্ক কি বীরত্বের অলঙ্কার হায়, অসময়ে আজি সবে পলা’স কোথায়?” “বীর বীর্য-বীর দম্ভ সঁপি পর পদে নিতান্ত আশ্রয় হীন চলেছিস্ হ'য়ে দীন এই কি রে কোরেশীর পরিণামে ছিল জেহেল কোথায় আজি ভয়ে লুকাইল?” “এতগুলি বাক্বীর কোরেশ সেনানী কোথায় পলা’য়ে গেল “অপমান” না বুঝিল- জীবনে কি এত মায়া ওরে নীচাশয়, ইস্লামের দাস হবে কোরেশ তনয়?” “না-না-মা-না তা কি হয় দাড়ারে কোরেশী ফিরিয়া চল না যাই ইসলামে নাশিয়া ভাই কীর্তি-মঠ স্থাপি আজ জগতের বুকে, কেন রে আপন দোষে ডাকিছিস দুঃখে?” “মক্কার রাজত্ব যেই কোরেশীর ছিল- মৃত প্রাণ সে কোরেশী পরিবে দাসত্ব ফাঁসি মােসসমের পদরজঃ করিবে'লেহন ভেবে দেখু কোন্ সুখে সে পাপ জীবন ?
পরিত্রাণ।
নরকের লােল-বহি গ্রাসিবে কোণে
তও তারা সহি দিবে
দাসত্ব না স্বীকারিবে
পরের পাদুকা নাহি লইবে রে শিরে
রক্ষিবেন দেবরাজ এ কাল সমরে।”
“চল তবে ভ্রাতৃগণ চলছে ফিরিয়া
দৃঢ় করে ধরি অসি
ডুবাও রে গ্রহ-শশী
কি সাধ্য মােসসমগণে কোরেশে বিনাশে,
এই হাতে কি না পারে করিতে কোরেশে?
“ধিক ধিক শত ধিক তােদের জনমে
হেন কাপুরুষ ছেলে
জন্মিয়া মরিয়া গেলে
কোরেশ জননী বুঝি হত না দুঃখিত,
কেমনে পরে যা হতে পদানত?*
দাড়াল কোরেশ-সেনা দুন্দুভি-নিনাদে
আবার চলিল ধেয়ে
পুনঃ অবসর পেয়ে
ঘাের যুদ্ধে মােসেমেরা পড়িল ঝপায়ে
রণ বাদ্য চারি দিক তুলিল কঁপায়ে ।
প্রমত্ত স্বগীয় সেনা'রণ কোলাহলে
ক্ষুধিত সিংহের মত
লাগিলা করিতে হত
দশম সর্গ। ৮) পারে না সহিতে আর হেন পরাক্রম, কোরেশী দেখিল চেয়ে সমুখেই বম। মুখর আনন্দ-স্রোতে করিয়া হুঙ্কার লুক্কায়িত মৃত-তলে জেহেলে ধরিয়া বলে বাহিরিল মসউদ প্রেরিতের অরি জয়ােল্লাসে মােসেমেরা উঠিল চীৎকারি। মুহূর্তের তরে পাপী ক্রোধােন্মত্ত হয়ে তৈল হীন দীপ প্রায় অলিয়া, নিবিল হায় রক্ত জবা ফুটিলেক আরক্ত নয়ন- আঁধারে হাসিল যেন বিজলী কিরণ। ক সে মত্ততা নিমেষের ; কৃতান্তের করে কতক্ষণ প্রাণ আর এইবার এইবার শাণিত কৃপাণ বুঝি পশিল গলায়, জেহেল এ ধরা হ’তে লইল বিদায়। চার্জ কেতন তুলি ইস্লাম-সন্তান “দীন “দীন” উচ্চারিয়া বদর কাপায়ে দিয়া চলিল মদিনা পানে হরিষ অন্তরে, আহত কোয়েশ দল লাইল ভরে।
৬২ পরিত্রাণ। পুণ্যের হইল জয় পাপ হ’ল ক্ষয় পলাইল সুফিয়ান লুপ্ত কোরেশীর মান, স্বর্গ-সেনা গে’লা চলি, ধৰ্ম্মবীরগণ- জ্বলন্ত প্রমাণ স্পর্শে বাধিল জীবন! সত্য-প্রাণ ত্রয়ােদশ ইমের দাস বীত-ভয় বীত-মল ফুলমুখ ঝলমল অমর শান্তির রাজ্যে করিল। প্রয়াণ সে এক অমৃত ভােগ পুণ্য পরিত্রাণ! একাদশ সর্গ। মদিনা;—মসজিদ প্রাঙ্গণে। কল্পনে লল! চল আজি পুনঃ মদিনায় কি সুখ-উৎসব সেথা হয় অনিবার, ইম-সন্তানগণে একেশ্বর নামে কি অসাধ্য সাধিয়াছে হেরি একবার। অচল কঁপিয়া উঠে যাদের গর্জনে তা'র কেন শিশু হেন হেরিরে সরল, প্রার্থনা করিছে বুঝি মন্দির-প্রাঙ্গণে আহা কি সুন্দর-সাম্য-দৃশ্য সুবিমল। ছোট নাই--বড় নাই-সকলি সমান, এমন ভ্রাতৃত্বে ব ইলামের প্রাণ!
একাদশ সর্গ।
অয়ি মাতৃভাষা।-মাগো কম-কষ্ট তব
কি শক্তি এ দীন-দাসে দোলাইবে মালা,
সাজাবে তােমার তরে অনুরাগ ভরে
সুদুর্লভ পংকিজাতে করিয়া উজলা।
শুধু যদি দয়া কর, স্নেহ টুকু ল ও
তবে মা হইব ধন্য হইব মমর,
পরাধীন সন্তানের মলিন শ্রদ্ধায়
আজি মা সান্ত্বনা লভি যাও দিয়া বয়।
শক্তি আছে, সাধ্য আছে, বঙ্গ-সন্তানের,
কেবল আসক্তি নাই উপরে মায়ের।
কি পাপে দারুণ বিধি তােমার কপালে
লিখেছিলা হেন দুঃখ বল বঙ্গভাষা,
অনাহারে অবহেলে-পরিচৰ্য্যাভাবে
জীর্ণ শীর্ণা, হারায়েছ সকল ভরসা!
মুখের উপরে তব অন্ন তুলি খায়
তােমার সন্তানগণ কৃত্রিম আদরে,
ভুলিয়াছে স্নেহ মায়া তুমি দীন-হীনা
পরের দুয়ারে মাগ, ভুল না তাদেরে,
হতভাগ্য বাঙ্গালীর অদৃষ্টের দোষে
তুমি মা কাঙ্গালী আজ আপনার দেশে।
কারে মা’ বলিব দুঃখ-কে শুনে ক্রন্দন
কি মধু পিয়াব আমি বাঙ্গালী মােসেমে
ভাঙ্গা এ লেখনী-মুখে, অগৌরব। তুমি
কেমনে আঁকিব ছবি ? তােমাৱ মরমে
কেবলি যে দুঃখ মাতঃ কেবলি হতাশা,
কোথা পাব নন্দনের সুধা-
নিরিণী
পরিত্রাণ।
কেমনে এ মৃত বঙ্গ জাগাবি উল্লাসে
কেমনে মােসম-রাণী হবে গৌরবিনী ?
কিন্তু আশা সুপবিত্র মহম্মদ নাম,
করিবে নীরস-কাব্য সুধা-অনুপম।
যেই শক্তি দিয়েছিলে হাফেজ সাদরে
যে প্রসাদে হইয়াছে অমর ফেরদৌসী,
সে শক্তি লইয়া আজি কণ্ঠে বস মাের,
বুচি এ নূতন কাব্য হে চির উদাসি।
দাতা তুমি, চিরদিন তােমার ও নাম
অক্ষয় ত্রিলােকে তাই যাচি গো সাদরে,
করুণ-নয়নে আসি স্নেহময় হৃদে
হৃদয় কমলাসনে ব’স দয়া করে!
প্রাণের শােণিত দিয়া ধুইব চরণ
পাপের কালিমা মোর করে প্রক্ষালন।
;
কাদার সময় আজি হয়েছে মােদের
মােসেম-সন্তান মাের হেন দীন হীন,
ধৰ্ম্মহারা পথভ্রান্ত অলস অধম
কেবল গণিছি বসি মরণের দিন।
জগতে পতিত বলি ইসলামের নামে
কলঙ্ক দিয়েছি ঢালি অভাগ্য আমরা,
তাই এ প্রাচীন চিত্র দেখাব আঁকিয়া
কি ছিল কি হইয়াছে আজি রে তাহারা !
ধৰ্ম্ম উজ্জ্বল সদা পবিত্রতা-ভরে
লেপিয়াছি কালি মােরা তায় নিজ করে !
-
একাদশ সর্গ। গৌরবের এক দিন দেথুরে মােসম দেরে কাফের'বন্দী তােদের চরণে, . অই দেখু-ক্ষমাভিক্ষা মাগিছে সবায়, শৃঙ্খলিত যাqেবীয় প্রতিহারী সনে। এ সুখ অনেক দিনে অতীতে মিশেছে, তবুও কাব্যের চিত্রে নির্জীব জীবনে-- সমুখে আদর্শ পেয়ে জয়ােল্লাসে মাতি উন্নতির পথে ছুটি চল্ ভ্রাতৃগণে! ফিরিবে ঐশ্বৰ্য-মান ফিরিবে গৌরব দিগু-দিগন্তরে হবে যশের সৌরভ। খর্জুর-আসনে শােভে মদিনার পতি স্থিয়ােজ্জল,অপলক দৃষ্টি সুগভীর, নয়ন-নিলিমে ভাসি অন্তরের কথা ক্ষণে ক্ষণে কত ভাবে হ’তেছে বাহির ! ফারুকের দিকে চেয়ে কহিলা সুমতি : বন্দী দলে আন তবে সমুখে আমার, দুৰ্ম্মদ কোরেশীগণ জীবনে মরণে ইসলাম ভজে কি না সুধি একবার! প্রথমেই ওতবার করিব বিচার- ক্রমে ক্রমে তারপরে হইবে সবার!” মেষ শিশু কাপে যথা মৃগেন্দ্র দর্শনে তেমতি ওতবা বীর লাগিলা কাঁপিতে, তা দেখিয়া ভাববাদী সাননে সম্ভাষি মিষ্টভাষে বৈরি তরে লাগিলা কহিতে মনে কি না পড়ে আজ মক্কার সে পথে প্রার্থনা-নিরত যবে ছিঃ আমি বসে,
পরিত্রাণ।
মানব-পুরীষ তুই দিয়েছিলি লেপি
আমার শরীরে ওরে কত হেসে হেসে।
আবার গলায় বাঁধি উত্তরীয় তোর
কি যন্ত্রণা দিয়েছিলি মনে আছে মাের!”
“জীবন মরণ সব বিভুর ইচ্ছায়,
অনিত্য এ মােহমন্ত মানবের সুখ,
এ সুখ - অনন্ত দুঃখ ; শান্তি রাজ্য আছে
সেখানে রয়েছে মুখ ভরে যাহে বুক!
এমন ইস্লামে তুই পদতলে দলি
দয়াময় বিধাতার নাশিলি সম্মান,
তাই এ কঠোর দণ্ড দিমু রে ওতবা
বীরসিংহ আলী তাের লইবে পরাণ ;
আপন করম দোষে আপনি ডুবিলি ।
নিকট আত্মীয় হয়ে অসত্যে মজিলি।”
-
আহত ফণীর মত মহাবীর আলী
নবির আদেশ শুনি গর্জিয়া উঠিল,
গদাঘাতে বিচূর্ণিল ওতবার শির,
এ দৃশ্যে কোরেশ-বন্দী ভয়ে শিহরিল।
সুমিষ্ট বচনে তােষি কহিল প্রেরিত :
“বৎসগণ ! অই দেখ মুক্তির সু-পথ,
ইলাম ছাড়িয়া কেন প্রতিমা অর্চনে-
দুর্লভ মানব-জন্মে ধরেছ বিপথ ?
ভয়ের কারণ নাই মুক্ত-কণ্ঠে বল
ও পথ সরল কি রে এ পথ সরল ?”
-
জীবন হনন নাহি করিব তােদের,
মােসেমের দাস হৰি না হৰে অঞ্চখা,
একাদশ সর্গ।
ইলাম-গ্রহণ যদি কর সাধু মনে,
মুক্তি পাবে ;-এ জীবনে নাহি পাবে ব্যথা।
ভাল-মন্দ পাপ-পুণ্য আলো-অন্ধকার
সম্মুখে উন্মুক্ত আজি যাহা অভিলাষ,
প্রকাশ করিয়া বল অন্যায় বিচারে
কোরেশের বংশ নাহি করিব বিনাশ!
অসত্য ডুবিয়া যাবে সত্যের পরশে,
সু-দিনে অন্ধের আঁখি ফুটিবে সে যশে।”
আঁধারে আলেয়া যেন উঠিল জ্বলিয়া
দেখিল কোরেশ-বন্দী হৃদয়ের মাঝে,
পদ্মরাগ-বিখচিত রত্ন সিংহাসনে
দিব্য এক সুপুরুষ হাসি মুখে রাজে!
মনের মন্দিরে পেয়ে এহেন রতনে
হতভাগ্য কে এমন সে পদ না সেবে,
বলন্ত সত্যের ভরে আজি রে কাফের
ভক্তিভরে যুড়ি পাণি কহিলেক সবে :-
“এক সত্য,-মহম্মদ (দং) প্রেরিত তাহার,
উপায় নাহিক কেহ তিনি ভিন্ন আর।
এমন প্রাণের টান যে ইসলামে আছে
সে ইম সত্য নয় কে বলিবে হারে,
এমন বিমল জ্ঞান যাহে শােভা পায়
সে ইস্লামে তরবারি কি করিতে পারে ?
প্রাণের ৰন্ধন যৰি না থাকে প্রবল
তরবারি কয় দিন ধৰ্ম্ম রক্ষা করে,-
সকলি আপন পথে যেত না কি ফিরে
এক দিন-দুই দিন-তিন দিন পরে ।
পরিত্রাণ।
পেচক যদ্যপি বলে সূৰ্য্য আজ নাই
অবিশ্বাস করিবে কি নিজ চক্ষু তাই ?
’ নয়, যা’ বলে ওরা বলুক আপনি
তােরা রে আপন পথে থাকে অটল
মুক্তি যদি পেতে চা’ রে জগত-বাসি !
জীবনে মরণে ক ইসলামে সম্বল।
সংসার-সংগ্রামে মত্ত ভ্রান্তি-কীট মাের।
শত শত ঈশ্বরের যদি ভক্ত হই,
শত টানে এ বিশ্বাস কেমনে থাকিবে--
সদা নিত্য এক পথে যদি নাহি রই ?
“দশ চক্রে ভগবান ভূত” হয়ে যাবে
এত পূজা-প্রাণ ক্ষয় কাজে না আসিবে।
বিধৰ্ম্মী কোরেশী আজ লভিল ইসলাম
মন্ত্রবলে মুগ্ধ যথা কাল-বিষধর,-
কঠিন কুলিােেপম হৃদয় যাদের
নাহি করিলেক তারা সত্যের আদর !
রােষ ভরে ভাববাদী কহিলা সিদ্দিকে :-
“দাসত্ব বুঝিবা ছিল ভাগ্যে কোরেশের,
নিরূপায় আমি বল কি করিব আর
কোরেশ-রমণী হবে দাসী ইসলামের !”
গম্ভীর আদেশ করি-ধৰ্ম্মাসন ত্যজি
সভা-ভঙ্গে ভাববাদী চলিলেন আজি ।
=
দ্বাদশ সর্গ।
৮৯
দ্বাদশ সর্গ।
মসজিদে।
কন্যা-শােকে শােকাতুর প্রভু মহম্মদ (দঃ)
পার্শ্বচর পরিবৃন্দ উদাস-নয়ন,
বিষাদ-বিক্ষুব্ধ যেন ব্যথিত হৃদয়
মর্মভেদী নিরাশার নিদারুণ তাপে!
যােড় হস্তে ভাববাদী অশ্রু সম্বরিয়া
কহিলা দেবেশ-পদে “হে করুণাময় ।
.কি পাপ করেছি দেব তার প্রতিফলে
বার বার অভিশাপ ভুঞ্জিতেছি আমি!
হতভাগ্য এ ধরায় আমার মতন
আর বুঝি হে প্রাণেশ নাহি কোন জন?”
“ধৰ্ম্ম রক্ষা--সত্য রক্ষা করিবার তরে
জীবন সঁপিয়া দিমু পদ-কোকনদে,
কন্যাশােক পাসরিতে না পানু সময়
আসিল কোরেশী পুনঃ লুঠিতে নগর।
বাল-বৃদ্ধ কেহ নাহি পারিল রক্ষিতে
শরম ভরম আর তাহাদের হাতে,
দুৰ্জ্জন কোরেশীদল নির্দোষী জনেরে
নাশিল গৰ্বিত-হৃদে বীরত্ব দেখাতে ।
শত ধিক্ কোরেশের পশু আচরণে
বীরত্ব প্রকাশে কি রে দীন-পীড়নে ?”
“আৰ্ত্ত জনে রক্ষিবারে পশিলে মােসেম
প্রাণ ল’য়ে কোরেশীরা গেলা পলাইয়া,
পরিত্রাণ। = ===== “বিষকুম্ভ পয়ােমুখ” য়িহুদীর দল- অসন্তুষ্ট ইস্লামের এহেন বিজয়ে। রচিয়া য়িহুদী-কবি কত বীর-গাথা উত্তেজিল মদিনার প্রতি ঘরে ঘরে, দেশব্যাপী অম্বুতে সত্য ইস্লামের কিছুই হল না ক্ষতি ; তথাপি কাফের বীর রসে কোরেশীর বীৰ্য্যগাথা শুনে আবার সাজিয়া এল কাল রণাঙ্গনে ” == “সন্মুথে বিপদ হেরি ইলমে রক্ষিতে আবার শােণিত-যজ্ঞে দিনু অনুমতি, কহিনু তেয়াগি যাও পবিত্র মদিনা- অথবা ইলম-ধৰ্ম্ম করহ গ্রহণ। বিবাদ করিয়া শুধু অশান্তি ডাকিলে অহিত নিশ্চয় ; তবু পাতকী য়িহুদী- আশ্রয় লইল দুর্গে আজ্ঞা অবহেলি; পঞ্চদশ দিনে দুর্গ জিনিনু তাদের বিজয় কেতন হর্ষে তুলি গগনে। সপ্ত শত অস্ত্রহীন বিধর্মী যীহুদী গলবস্ত্র হয়ে গেল তেয়াগি যাবে ? প্রাণদণ্ডে দণ্ডিমু পরাভূত জনে বণ্টন করিয়া দিমু সম্পত্তি স্বগণে!* প্রথম জীবন হ’তে এ পর্যন্ত প্রভো, কি দুর্বহ অত্যাচারে ভগ্ন মাের হিয়া, জানি আমি দুঃখ-শেষে পারিব উঠিতে আবার তােমার কোলে হাসিমুখ লয়ে? তােমার ভকতগণে এত দহ তুমি
দ্বাদশ সর্গ।
৯১
পরীক্ষা করিতে কি হে হৃদয়ের বল,
সত্যের সাধনা তরে দাসের জীবন
অত্যাচারে না ভুলিবে তােমারে কখন!
সুপন্থা দেখাও প্রভাে পথহারা জানে
ইসলাম জীবন্ত কর কাফেরের মনে!”
“যেই দিন পরিশ্রান্ত পথিকের বেশে
উতরিনু শৈল-শিরে সিদ্দিকের সাপে,
কেরা ওল আমিনে প্রভো সপ্ত শত নর
বদিয়ার পাছে পাছে ভজিল ইসলামে।
আবার কোরবা-কাবা পুণ্যগ্রামে এলে
মরুপ প্রপীড়িত দাহিত জীবন
পূরিল নূতন মুখে স্বপ্নের মতন,
কল্লোলিনী কল্লোলিত কুঞ্জময়ী-গৃহে
বসন্তে কলিকা-দল যথা মুঞ্জরিত !
ফকির হইয়া আমি রাজত্ব পাই -
অগণ্য মদিনা-বাসী ইামে বাঁধিনু!”
সে ত গাে তােমারি প্রেমে, তােমারি ইচ্ছায়
আমি তুচ্ছ দীন দাস চরণে আশ্রিত,
কালি ছিনু গৃহ-ভ্রষ্ট পথের ভিখারী,
আজি সিংহাসন দিলে সঁপিয়া 'আমায় !
লক্ষ লক্ষ শত্রুসেনা দিবা নিশি যার
পরাণ নাশিতে প্রভাে ছিল স-সজ্জিত,
তাহারি চরণ-তলে সদা আজ্ঞাবহ
শত শত মহারথী, কি রহস্য অহে!
সত্যের গৌরব-পুষ্ট কান্তি মনোহর
জ্যোতিতে করিল পূর্ণ দিগ-গির!”
পরিত্রাণ।
“পূর্ণচন্দ্র সমুদিত বাসন্তী নিশায়
যখন জেহেল পাপী তীক্ষ্ণ অসি তুলি
কহিল আমার তরে -“ওরে মন্ত্রদি।
কিসের প্রেরিত তুই, কোথা নিদর্শন ?”
তােমারি দয়ায় প্রভাে হ’ল দ্বিখণ্ডিত
পূর্ণচন্দ্র। আকাশেও মন্ত্রবল হেরি—
বুঝিল বিধর্মীগণ দুরাশ মায়াবী,
ভ্ৰমান্ধে নারিনু আমি বুঝাতে ইসলাম।
আততায়ী কোরেশীর ছিল বলীয়া-
উপহাস করি গেল তৃণের সমান!”
।
“শিশু ছিনু যবে নাথ ক্রীড়া স্থানে পরি -
জিব্রাইল বিদারিল হৃদয় দাসের,
একে একে চারি বার প্রক্ষালিয়া তাহা
পাপের কালিমা-রেখা মুছিল প্রাণের !
পিতৃহীন-জন্মে নাহি হেরিনু চরণ
জনকের ; মাতৃসমা পালিল হালিমা।
ব্যবসায়ীবেশে প্রভো ভ্রমি দেশে দেশে
মাতামহ-সঙ্গে পুনঃ ফিরি স্বদেশে।
ধন-জন বিলাইয়া সন্ন্যাসিনী বেশে
খােদেজা পতিত্বে মােরে বরিলেক শেষে !”
কোন্ কথা তব কাছে আছে লুক্কায়িত
তথাপি তােমারে নাথ নিবেদি আবার,
বিপদে পড়িয়া যদি অসহায় নর
তােমারে জানায় দুঃখ ; জান তুমি বটে
সব কথা সে ভাগ্যের, তথাপি সে জন
প্রবােধিতে আপনার ব্যথিত হৃদয়
দ্বাদশ সর্গ। করয়ে মিনতি পুনঃ তােমারি চরণে ;- (সকাতরে,-কারুণ্যের সাক্ষাৎ মুরতি।) ভূত-ভবিষৎ-তত্ত্ব জান তুমি প্রভাে, তবুও এ গত দুঃখ তােমাকে জানাব।” ; “সহ-পরিবারে শেষে মদিনা মাঝারে আইনু ; হায় রে ভাগ্য কি কব সে কথা, অভাগিনী যােফেয়ার অকাল মরণে জীয়ন্তে ওমান আজি হইয়াছে মৃত। সহানুভূতির ছলে কহিলা ওমর হাফজায় বিবাহিতে; শোকাতুর পতি পত্নী-স্মৃতি না ভুলিতে অন্তরের খেদে বিরােষিলা সে কথায় ; আত্মদ্রোহ ভয়ে নিজে, আমি হাফজায় বিবাহ করি, উম্মুে-কুলসুমে পুনঃ ওমানেরে দিমু!” “গৃহানল গেল নিবে, স্বর্গীয় বন্ধনে সে হ’তে একটু যেন আছি শান্তি সুখে, প্রচারিতে সত্য ধর্ম প্রাণ করি ক্ষয় রঞ্জিতে তােমার চিত্ত ঘুরি পথে পথে ! যে ইসলাম এক দিন ছিল উপেক্ষার কত শত মহাবীর, কত শত সাধু সে পদে মনের সুখে ঘুমায় নির্ভয়ে অন্তহীন পরকালে ত্রাণের আশায়। শত্রু যারা—শেষে তারা মিত্র ইস্লামের তথাপি সমরে শুনি আসিছে কাফের!” নীরবিলা নবিশ্রেষ্ঠ ; মীরব মন্দির, আলােড়িয়া নিস্তব্ধতা কহিলা ওমর-
পরিত্রাণ।
(প্রশান্ত সাগর বক্ষে ঝটিকা যেমন )
*এই প্রাণ এই হস্ত যতক্ষণ আছে
কার সাধ্য প্রবেশিবে মদিনায় আসি?
সত্য তেজে বলীয়ান্ ইলাম-সেবক,
কাহারে ডরাই মােরা-কেন প্রভু খেদ ?
অদৃষ্টের ফল যাহা ফলিয়াছে তাহা।
সুকল্পনা পূর্ণ যদি হ’ল বিধাতার,
এ প্রাণ গেল বা তাহে ক্ষতি কিবা আর!
“বৃথা শােকে বিলাপন নহেক বিহিত
হে নৃমণি! চিন্ত আজি রণ সদুপায়,
আসিছে কোরেশী পুনঃ লক্ষ লক্ষ বীর
সমবেত এইবার পাপীষ্ঠ সুফির
পতাকার তলে। জগ শিরােমণি তুমি
ইসলামের গুরু, কন্যা শােকে অধীর
শুনিলে,-রণগৰ্ব্বে মত্ত হয়ে আসিবে
কোরেশী ; ধৈৰ্য্য ধরি হও অগ্রসর,-
নিকট শমন সম হুঙ্কারে কাফের।
সত্যের শকতি তলে অসত্য বিনাশি
জয়ােন্মাদে মদিনায় প্রবেশিৰ আসি।”
}
“পিশাচী হেদার কথা শুনিনু যখন
ঘৃণায় হৃদয় যেন হইল কুঞ্চিত,
কি করালা,-নারী হয়ে রাক্ষসীর মত
হেলা-অসুফিয়ানের সহধর্মিণী। সুফিয়ান যখন ওহােদ যুদ্ধের জন্য মদিনার
দিকে অগ্রসর হইতেছিল, তখন পথে তাহারা আবোয়া নগরে উপস্থিত হয়। সেইখানে
হেন্দ, হজরতের পূজনীয়া জননী আমেনা খাতুনের (রা জিঃ আঃ) সমাধি খনন করিয়া
অষ্ট্রিপুঞ্জ চৰ্বণে উদ্যত হইয়াছিল; কিন্তু অনেকে বাধা দেওয়ায় পারিয়া উঠে নাই।
দ্বাদশ সর্গ। অস্থিরাশি আমেনার করিতে চর্বণ হয়েছিল সমুদ্যতা; প্রতিরােধে পড়ে পারে নাই বিদারিতে সমাধি গহ্বর। সমুচিত প্রতিদান দিতে হবে এর হেন অপমান সহি রবে না মােসেম ; বুকে জ্বালি চিতানল কেমনে বাঁচিব- শােণিত সমুদ্র-নীরে ওহােদে ডুবাব !” - “সাজ সাজ রণবীর মহারথীগণ সাজরে মােসেম-সেনা আততায়ী বধি- কাফেরের রক্তে আজি তীক্ষ্ণ কয়বাল পবিত্র করিয়া লই ওহােদ-প্রাঙ্গণে। ধৰ্ম্ম রক্ষা প্রাণ রক্ষা স্বদেশ রক্ষণ- সম্মুখে কেমনে হে বীর নিশ্চপ রহিবে শুনি রণ-ডঙ্কা-নাদ ? মনুষ্যত্ব ধরি কোন্ নর হেন কালে রহিবে নীরবে ? ভুজঙ্গ তুমরি রবে রয় কি বিবরে ? ধৰ্ম্মযুদ্ধে ধর্মমদে হও আগুয়ান সুখময়-প্রেমময় হবে পরিপাম!” স্ত্রী-পুত্রের মায়া যদি থাকে রে হৃদয়ে যদি মােসেমের বংশ না কর নিপাত, মদিনার নাম যদি চাহ রক্ষিবারে করবাল ল’য়ে তবে হও অগ্রসর! কীত্তি মঠ প্রতিষ্ঠিত হবে পৃথী বুকে আরবীর নামে হবে শুভ হুলু ধ্বনী,- নতুবা ঘৃণিত হাৈর পর দাস হয়ে কাফেরের পদজ বহিবে পৃষ্ঠেতে।
পরিত্রাণ। রণ-তূর্য্য নিনাদিয়া ধৰ্ম্মবীরগণ- “জয় ইসলামের জয়” কর উচ্চারণ।” অশ্ববহ অস্ত্রী-সেনা দুন্দুভির নাদে আহব-আহবান ধ্বনি শুনিল শ্রবপে, রণ-রঙ্গে পশিবারে প্রমত্ত-আহ্বানে তুলিলেক খর অসি খরাংশু প্রােজ্জ্বল। শিবির-শকট-বাহী চতুষ্পদ দল উন্মাদ সে কোলাহলে। শির শিরষে প্রেরিতের—হিম-স্বচ্ছ স্বর্ণ-চুড়া-সম পর্বতের! জ্যোতি-দীপ্ত তত্ত্বজ্ঞ প্রেরিত তারাদল মাঝে যথা হিমতি রাজে সৈন্যদলে শােভিলা তেমতি। দিগ্বলয়- হিঞ্জির ঝঞ্জনে যেন হইল সভয় ! । বুভুক্ষু কেশরী যথা শশাণিত-আদাদে, তেমতি ইাম-সৈন্য রক্ত-প্রত্যাশায় ; পিপীলিকা শ্রেণী হেন-ত্রিভুবন জয়ী স্ব-বন্ধু-বান্ধবহীন চলিলা ওহােদ। বারিদ-প্রতিম-স্বনে মত্ত-অনীকিনী- গর্জিল হুঙ্কার দিয়া ইসলামের জয়, সপ্তসিন্ধু বিকম্পিল ভৈরব-নিঘোষে শঙ্কা-ত্রস্ত জীবকুল তড়িতায় যথা! সুকেশিনী রমাদল কল-কণ্ঠস্বরে বীরের পশ্চাতে যেন মুর্তিমতী তেজ দাড়াইলা। বীরগৰ্ব অস্ত্র ঝলঝলে বিপুল এ সৃষ্টি যেন যায় রসাতলে।
দ্বাদশ সর্গ। কম্বু-গ্রীব রক্তনে শ্মশ্রদল দোলি, মনে হয় সিন্ধুনীরে উৰ্ম্মিমাল খেলে ; মমতার প্রতিমূৰ্ত্তি যােদ্ধ বেশে যেন কেমন সাদৃশ-হীন। তৃণ-বাণ নহে : উপযুক্ত এ করের ; এ কর-কৌস্তুভ জ্ঞানময়—ভাবময় অজর কোরাণ- ভবনদী তরণের ভারসহ ভেলা। তথাপি বীরত্ব যেন মত্ততার মাঝে অরুণ-নয়নে ভাসে । সুমিষ্ট ক্ষীরোদে, অম্ল-সহােদ্ভব যেন হয়েছে সহসা ! কুঙ্কুম-রঞ্জিত-বাস, সুবাস-সম্ভারে সু-গন্ধী পবন। মধুকর, মধুলােভে ফুলদল লুটে যথা;তেমতি সকলে ধৰ্ম্মকথা-প্রেমমধু করিবারে পান ঘেরিয়া চৌদিকে । অহে! কি সুন্দর কথা, এক ফুল ফুটে যদি হেন মধু লয়ে বিয়াকুল তারি গন্ধে এত মধুকর ; এক মহম্মদ ফুটি জগতের মাঝে- তাই কি ইসলাম-পদে বাঁধি নর-প্রাণ রাখিয়াছে সত্যমুগ্ধ ? তাশা,-সুখ-পরিত্রাণ । পীযুষ-প্রবাহ বহে, সৈন্য-সারি মাঝে আশু-বিশ্বজয়ী প্রভু ইসলাম-রক্ষক শ্বোসে! ধীর-মন্দ্র-কম্প্র-দৃশ্য—কিবা, “ভেদী ওঠা, ছ স ম -নিনাদ। শরদেন্দু-নিভানন বিমল বয়ান, কিন্তু যুগলে মনে হয় চন্দ্র কালী
পরিত্রাণ।
প্রতিভাত যেন। তা হলে কি হবে বল ?
কলঙ্কই অলঙ্কার শশী-লেখা সনে ;
হীরক কালিমাময়কালী সাজায়েছে
তারে। মূল্যবান্ দীপ্তিটুকু-গুণে মান !
অমন হীরক যদি হয় কালীমাখা,
তা’ বলে কি সৌন্দর্য্যের অঙ্গহানি ঘটে
?
বরঞ্চ অধিক হয় ; অঙ্গার না হলে,
কখন ভাতে না ভাতি-প্রেম-ধৰ্ম্ম-শিখা
তাই বুঝি প্রেমে ও বিরহ-পােড়াইতে
মনু মন। যে জ্যোতি অঙ্গার হতে হয়,
নির্দোষ—নিষ্কাম তাহা সৌন্দৰ্য্য আলয়।
৬।
মীরজ-নয়ন দু’টা তরুণ-অরুণে-
বিকশিত যেন ; সুঠাম নাসিকা;- তপ্ত
বর্ণ ; অথচ প্রাথৰ্য-হীন স্নিগ্ধ রশ্মি
পাতে ; মনে হয় পূর্ণিমার প্রস্ফুরিত
সে মুখ-চন্দ্রমা ! কুন্দ-জিনি দন্ত-পতি
বিমলীন। প্রাণের সারল্য মুখে লেখে !
৮
নরান্তক সম অত্রাণ বিভূষিত বাহ,
দাপটে মেদিনী ভয়ে কঁপে থরথরি
ধূলীতমম দশদিশি দিনে অন্ধকার,
ধুম্রল নরেন্দ্র-মার্গ কুম্ভীপাক যথা!
হাড়ি সৌধ-কিরীটিনী মদিনা-নগরী,
প্রবেশি পার্বত্য-পথে চলিলা মােসেম ;
বিজন যার্থেব ভূমি শ্মশান সদৃশ
নির্জনতা-মগ্ন-যথা ঘােরা নক্তমুখ।
চন্দ্রহীনা অমানিশা, পত্রহীনা তরু,
দ্বাদশ সর্গ।
স্বামীহারা সতী যথা, জনহীন মরু-
কাদিলা তেমতি তিতি মণিহারা ফণী,
বিরহ বিধুরা সুপ্ত মদিনা নগরী।
প্রফুল্ল থাকিলে পদ্ম মধু পানে ধায়
প্রমত্ত ভ্রমর ;- শু ফাইলে নাহি চায় ।
তাই কেহ নাহি যায় মদিনার পথে
সত্য-পথ-পান্থ হতে। আঁধার যাবে
কি কাজ পশিয়া ? মহাজনপদ-ধূলী
যেইখানে পড়ে, - এমনি সৌভাগ্য যেন,
বাঁধা লক্ষ্মী চরণের রেণু, চিরদাসী ।
প্ৰেম-উন্মাদিনী আজ লবঙ্গ-লতিকা
যৌবন গরবে। ফুলময়ী ফলপ্রিয়া
বংশক-বাসরে হাসিলেক নব-বধূ!
বিহঙ্গের সু কাকলী মুক্ত-গীতি-স্রোত,
মহান-দর্শন দৃশ্যতত্ত্ব প্রকৃতির।
এয়ােদশ সর্গ।
রাত্রি কাল ;-ওহােদে।
তমােময়ী তমস্বিনী-গাঢ় অন্ধকার
উদ্ধ-অধঃ আশে-পাশে তমিস্রা সাগর;
তারা হানা নিরাশ্রয়া দুঃখিনা প্রকৃতি
জীর্ণ শীর্ণা ; অতীতের ফুট ইতিহাস।
মেঘাচ্ছন্ন বসুমতী, মরণ-উন্মুখ
রােগীর মতন বিকারগ্রস্ত ; তথাপি
;
৬
পরিত্রাণ। ঐ গুন, ? ক্ষণিক যেন লভিছে চেতন, স্বজনে আশ্বাস দিতে-চপল চমকে! আবার সে অন্ধকার-ঘাের অন্ধকার। রূঢ় কণ্ঠে কহিতেছে বিকট পেচক :- “আণ্ড মিষ্ট পাপাচারে পরিণামে ভ্রাতঃ কেবলই অনুতাপ-কেবল আগুন, সত্যের আকুল ডাক এখনও শুন্ !” কি ভীষণ। ত্রাসে বুক কঁপে দুরু দুরু । হেন ভয়ঙ্কর স্থানে বিজন প্রান্তরে, মানব-সঙ্গম হীন হিংস্রক আবাসে, কা’র হিয়া নাহি কাপে ? কে এমন বীর নরকের পথে এসে না ডরে জীবনে আরাে ভয়,-শৃঙ্খলের ঝঙ্কনী শবদে মনে হয় প্রায়শ্চিত্ত হইছে পাপীর রৌরবে ! তাহারি রব থাকিয়া থাকিয়া, করাল কালের ছায়া তুলিছে আঁকিয়া হৃদয়ের মাঝে। শ্মশনাগ্নি জ্বেলে যথা, তেমতি শিবির মাঝে দপ্ দপ্ দপি জ্বলিয়া উঠিছে দীপ, তখনি আবার অন্ধকার। দূরে—অতি দূরে চীৎকারিছে অরণ্যজ! কাল রাত্রি কারে বলে আর ? একে সুপ্ত বিভাবরী, নিদ্রিত শিবিরে প্রহরীর কণ্ঠ ভিন্ন আর নাহি কিছু শুনা যায়। মদমত্ত সুফিয়ান সুখে, দুগ্ধ-ফেণ-নিভ শয্যা করিয়া আশ্রয়, নবীন। রূপসী বেষ্টি নিদ্রালস প্রেমে ! বীরত্বের ছায়া যেন কামের অতলে ৫
দ্বাদশ সগ।
আপনি ডুবিয়া গেছে ; কল্পনা সঞ্চারে,
দেখিলা ভীষণ স্বপ্ন কপিলা কমি ।
প্রথম স্বপ্ন।
ম
‘আমি রে ইস্লাম ধৰ্ম্ম ওরে দুচার,
বার বার অবহেলি আমার আহ্বান,
পদাঘাত করেছিস বুকে, কিন্তু শােন ;
সত্যে গৌরবিনী আমি অবিনাশী ধন,
তাের তরবারি আমি তৃণের সমান
মনে করি। বিধি-বলে মহাবলী যিনি,
সেই প্রভু মহম্মদ (দঃ) রক্ষক আমার।
দেখিৰি আগামী রণে দরিদ্র ইসলাম,
দৈব-শক্তি সমবায়ে সমর-সাগর
কেমনে লঘিবে, তাের নিশ্চয় পতন।
চন্দ্রের জ্যোতির কাছে খদ্যোতের জ্যোতি
কতক্ষণ ঋবে? এই দেখ ওরে রে দুর্জন,-
আমার চরণ তলে মুক্তি-সিংহাসন!”
দ্বিতীয় স্বপ্ন।
তাের সেই বন্ধু আমি, অভাগা জেহেল,
ভীষণ নরকে পড়ে
দেখা দিতে তাের তরে
আসিয়াছি একবার—কি দশা আমার,
নয়ন তুলিয়া ওরে দেখু একবার!”
পরিত্রাণ।
“সত্যে না ভজিয়া ভাই পড়িয়া কুহকে,
প্রস্তরে করিয়ে পূজা,
অবশেষে এই সাজা
ঐশ্বৰ্য্য বীরত্ব-গৰ্ব্ব লাগে না হেথায়,
ধৰ্ম্ম চাই;-এক ভিন্ন দ্বিতীয় কোথায় ?
“যা হবার হইয়াছে ওরে সুফিয়ান,
ইলাম আশ্রয় ধরি
পরিত্রাণ লাভ করি
এ পারে আসি ভাই ; অনন্ত যন্ত্রণা
সহিতে হবে না তবে, উহু কি বেদনা!*
“প্রাণ যায়, কে কোথায় প্রিয় পরিজন ?
কোথায় দেবতা আজি
সব দেখি ভােলবাজী,
দিনগুলি কাটানের ক্রীড়নক ছিল,
আজ সে কল্পিত শক্তি কাজে না আসিল।”
সাবধান, সাবধান ওরে মুঢ়মতি !
আমি বুঝিতেছি এবে
ইমেরে নাহি সেবে
কি অন্যায় করিয়াছি ;-এ ভুলের ফলে,
অনন্ত নরক বাস আমার কপালে”
চমকি উঠিলা বীর অশুভ স্বপনে,
এ কি ?-ভুল-ভুল শুধু মনের বিকারে -
দু:স্বপ্নচকিত হিয়া ! হতভাগ্য সুফি!
তাের ভাগ্যে এত ছিল ? হায় রে দুৰ্ম্মতি
ত্রয়োদশ বর্গ।
না বুঝিয়া কত পাপে ইচ্ছায় মানব
অনুক্ষণ ডুবিতেছে সঙ্কট সাগরে।
হায় ভাগ্য !-দুঃসাধ্য বুঝিয়া উঠা তােরে !
হাসিয়া আবার বীর করিল শয়ন,
আর নয়ন দু’টা পড়িল ঢুলিয়া
তন্দ্রাবশে! স্বাধীন অলস চিত্তে
আবার দুঃস্বপ্ন যেন উঠিল ফুটিয়া।
তৃতীয় স্বপ্ন।
“দুরদৃষ্ট ওতবায় দেখ দুরাশয়,
তোর আজ্ঞাবহ হয়ে যে দশা তাহার ;
এই শত নরকের বৃশ্চিক দংশন,
কালি রণস্থলে তুই সহিবি আবার।
হতভাগ্য ছিনু তাই প্রতিমা পূজিয়া,
এ যম-যন্ত্রণা নিজে অনিৰু কিয়া।”
এইবার বীর-বীৰ্য্য দমিল ক্ষণেক,
পধন পরশে যথ। অস্থির প্রদীপ
নিবিয়া ও নাহি নিবে ; নয়ন উন্মিলি
পাপী দেখিলা বিস্ময়ে-
নিশা অবসন!
পরিত্রাণ। চতুর্দশ সর্গ। সমর-ক্ষেত্র। মধু-তীব্র স্নাত-ঊষা আধ-রৌদ্র-ছায়ে মনােহারী ;-বহে বায়ু শ্রম-বিনাশিনী ; মারুত-হিল্লোলে হেলি সুকোমলা লতা, কত নীরবের গীতি সমাপিলা আহা! কে বুঝিবে সে প্রাণের আকুল পিয়াসা, কে বুঝিবে সে আহ্বান, সে অক্ষয় পূজা? পাপ-তুষ্ট পৃথিবীর পঙ্কিল-প্রণয়ে, কে দেখে এমন দৃশ্য ইচ্ছায় নয়নে ? কিন্তু হায়,--ভাগ্য দোষে কবি-জন্ম নিলে, অণু পরমাণু-তত্বে জীবন নিঃশেষ । তা’তে বা সাবাশী কই ? ঐকুট করিয়া কত জনে উপহাসে—তুচ্ছি চলে যায়, বলে-“ওটা প্রমত্ত পাগল।”-- প্রাণশেষে ক্ষিপ্ত-আখ্যা, কবি-জন্মে ধিক্। কি ভীষণ!- ওহােদে ছুটেছে আজ ক্ষিপ্র নর্ণব,- যথা ছুটে নদীর জোয়ার! নবিবর- সৈন্যদলে পরিবেষ্টি কহিলা আম্বানি। “জ্বলন্ত এ ইসলামের সেবিতে চরণ পরাণ করেছ তুচ্ছ, অই শৃঙ্গ দেখ, কি দুর্জয় স্থান! শস্ত্র-হস্ত ত্রি-সত্তর মহাবীর এক সঙ্গে বেষ্ট অই স্থান। পরাজয় কিম্বা জয় হয় ইস্লামের
চতুর্দশ সর্গ।
হইও না স্থানচ্যুত করিনু আদেশ!
আজি আসিয়াছে পুনঃ দলিতে ইসলামে
কাপুরুষ কাফের সন্তান ;-ভাল কথা !
কিন্তু থেকো যথা-সাবধান। জানি আমি
মােসেমেরা নহে ভীত জীবন সঁপিতে
ধরমের তরে। জ্বলরে সমুদ্রবহ্নি
অই অস্ত্র,-সুফীর ও সৈন্য পারাবারে।
এই বার কর্তব্য সম্মুখে ;-বৃথা কথা
আলাপনে নাহিক সময়। ফিরে দেখ
ধাইছে কোরেশী ;- সমুদ্র-রমণা যেন
ডুবে আজি রুধির পঙ্কিলে । ”
হেন কালে
প্রেমময় দৈববাণী ঝঙ্কারি উঠিল :-
“নিরুৎসাহ হয়ে না হে হও অগ্রসর,
না
নিশ্চয় এবারাে রণে জিনিবে ইসলাম ;
বিধাতার বিধি কেহ নারিবে খণ্ডাতে,
কিনিবে অমর নাম এ মর মহীতে।
দেহ আজ সৈন্য দলে নির্ভয় অন্তরে
যা অরি বিমর্দিতে, প্রণমি তােমারে !”
সৌর-দীপ্ত সুধাকর পূর্ণকলা যথা
তেমতি প্রভুর প্রাণ উঠিল উজলি,
বিধাতার শুভাদেশ শুনি ; ছুটিলেক
মত্ত-সেনা ঝটিকার মত তীর বেগে ।
তীক্ষ অস্ত্র ঝনঝনি উঠিল। ওহােদ
কপিল যেন প্রলয় কম্পনে। সত্রাসে-
চমকি উঠিল শক্র। শক্তির-শক্তি
যেন টলিল বারেক; সন্নাহ শবদে
১৪
পরিত্রাণ।
-
সশস্ক দানব নর! প্রমত্ত তুরঙ্গ
দ্রুত চলিলেক দলি বিভ্রান্ত কোরেশ !
কোলাহল পরিপূর্ণ সমর-প্রাঙ্গণে
বাজিল মােসেম-বাদ্য ঝম্ ঝম্ ঝমি,
বাজে বথা অট্টহাস্য বিকট-নাদিনী
অপার। পারাবার ছুটিল শােণিতে!
নাদিল কোরেশ দল-করাল-কবল,
সমস্বর-কণ্ঠস্বরে, চকিতে ধাবিল
ইরষদ বেগে ;
ক্ষিপ্ত অস্থিভক্ষ যথা
দংশিবারে ধায়, তেমতি ধাহল সবে
দংশিতে মােসেমে।
'অহংমদ কোরেশীর
গর্বিত হৃদয়, আগ্নেয়গিরির সম
একেবারে উঠিল উচ্ছসি বীর মদে!
. শিঞ্জিনী আকর্ষি রােষে মােসেম সন্তান,
আশুগতি সম শর নিক্ষেপিলা বলে,-
সন্ত্রস্ত,শঙ্কিত শব্দে অচল মেদিনী!
হারিণিক ধায় যথা ল গ্য-মৃগ পাছে
গভীর কাননে ; তেমতি ধাইল পুন:
হামজা, মৰ্ত্তজা দিকে দিকে বৃহভেদী !
ভবিষ্য অশ্রেয়-চিত্র দেখিল কোরেশ
বিপুল আহব-ক্ষেত্রে ! আর না আর না
সহে এ বজ্র-আঘাত! প্রাণভয়ে ভীত
সুফী, রণস্থল ছাড়ি-শৃগালিকা-শিবু
যথা বন্দুক-নিনাদে ত্যঙ্গে মুখ গ্রাস,
তেমতি পালাল ভয়ে ত্যজি রণভূমি।
চতুর্দশ সর্গ।
কে কার সংবাদ নয়, ছত্রভঙ্গ হয়ে
ছুটিল কোরেশ-সেনা পৃষ্ঠ প্রদর্শিয়া।
আনন্দে বিক্ষয় হর্ষে মােসেম-সন্তান
বাতাহত কদলীর দুর্দশা যেমতি
তেমতি ধাইল সবে বিধৰ্ম্মি বধিয়া।
শােকে দুঃখে অভিমানে বৃদ্ধ সুফিয়ান,
লুকাল প্রাণের ভয়ে পৰ্বত করে।
ছুটিল প্রমত্ত রক্ষি গিরিশৃঙ্গ ত্যজি
কোরেশের পিছে ; শুন্য হেরি স্থান,
বিষম বিক্রমে গর্জি কোরেশী খালেদ
কহিলা অধীন সৈন্যে ?
“মক্কার সন্তান।
জননীর নাম যদি না ডুবাতে চাও--
পরের পাদুকা যদি বহিতে মস্তকে
ঘৃণা মনে হয়,—তবে এইবার শেষ ।
এইবার শেষ চেষ্টা ; অই দেখ চেয়ে-
কি দুর্গম গিরি চূড়া অধিকারী ছিল
মুসলমান। চল ত্বরা আক্রমণ করি
এ সুযোগে ; অবরোধ করি একবার
কি দুর্দশা মােসেমের করি দেখ হয় !”
মুমূর্ষ, পুত্রের শেষ নিশ্বাসে যেমন
জননী সান্ত্বনা লভে, তেমতি বারেক--
পেয়ে এ সুবুদ্ধি বল–চকিতে কোরেশ
রােধিল অচল-শির ; দুর্জয় সমরে
মােসেম হইল ক্লান্ত শিলা-প্রতিঘাতে।
দুর্বার আহব-শ্রান্ত রবির দেহে,
পরিত্রাণ।
শত শিলাঘাত সহি বীরেন্দ্র হামজা
লভিল অনন্ত মুক্তি-অনন্ত নির্বাণ
বিষাদে প্রেরিত-হৃদি হ’ল ম্রিয়মাণ।
সন্ধ্যা সমাগত হেরি আহত মােসম,
বেষ্টিয়া প্রেরিতে বলে হ’ল অগ্রসর,
গুলি-ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্র যথা ; এহেন সময়ে
পর্বতের শৃঙ্গ হ’তে কহিলা চীৎকারি
কে যেন “মায়াবী সে মহম্মদ আজি,
কোরেশের বাহুবলে -অখণ্ড প্রতাপে,
চির জনমের তরে অকালে নিদ্রিত।
প্রাণ লয়ে পলাবার নাহি প্রয়ােজন,
৭ি সত্বে কোন্ বীর ত্যজে রণাঙ্গণ ?”
।
{-"লায়ুধ-ক্ষেপে ক্লান্ত রক্ষিদল,
** পণে যুঝিবারে লাগিল আবার ;
রশ্রেষ্ঠ অস্ত্রিদল নিহত সমরে-
অকস্মাৎ স্মিত-নেত্রে দেখিল প্রেরিত্ব ;
সন্মদে মােসেম-যােধ আসিছে রক্ষিতে
দুঃসময়ে ! সুকৌশলে আনিলা নবীরে
দুর শম্পাবৃত ভূমে সূর্যকান্ত মণি
কণক কীরিট-চূড়ে শােভিল যেন রে !
রক্ষো মােসম-সেনা দাড়াল চৌদিকে
প্ররিতের ; প্রস্তরের বিষম আঘাতে,
স্খলিত একটী দন্ত সন্মুখ পংক্তির!
বিক্ষ বিধ্বস্ত প্রায় ইন-শকতি,
বীতদন্ত ভাববাদী, শােণিতে রঞ্জিত
চতুর্দশ সর্গ।
ন
পরিধেয় ; কি কুক্ষণ ওরে! এক দন্ত
বিনিময়ে আজি যদি কেহ, পৃথিবীর
ধন-রত্ন লয় তবু হায়, কে দিবে গাে
আবার হারাণ নিধি ? দেখরে মােসেম,
এ পাপ-জীবনে তােরা নিমেষের তরে
দেখু আঁখি ভরি আজ ;-পরিত্রাতা নবি
তােদের মঙ্গল তরে,-ইলাম-বিস্তারে
কি যন্ত্রণা সহিছেন আপনা জীবনে।
হৃদয়-শােণিত দানে রঞ্জি রণস্থল,
আবার ইসলামে নবি প্ৰদানিলা বল ?
এইবার কুহকিনী হেদা স-নৰ্ম্মদ
উতরিলা রণক্ষেত্রে, বিদারি হৃদয়
হামজার, হৃৎপিণ্ড লাগিলা ভক্ষিতে।
নিম্মদ ফকির বেশে জগতের গুরু
হেরিলা এ কাল-দৃশ্য; সুধীর মােসলেম,
বক্ষ চাপি দুর্বিপাকে সচ্চিৎ-স্মরণে,
ফিরিলা তিমির ঘােরে আপন শিবিরে।
নির্জন শিবির-প্রান্তে বসি সুফিয়ান
কল্পনায় স্বপ্নরাজ্য বিরচনে রত,
হেন কালে দেখিলেক তুলিয়া নয়ন,
ভীষণ-প্রকৃতি এক অস্ত্রভৃৎ রথী।
(গর্জিয়া কহিল যথা বজ্রাগ্নি চমক।
“ওরে পাপিষ্ঠ কোরেশি! ভেবেছিস বুঝি
ইসলাম সহায়-হীন? আমি সে হামজা,
অন্যায় সমরে যারে বধেছিস্ তােরা!
সত্যের সেবক আমি, বিধাতৃ-প্রসাদে
পরিত্রাণ।
সৌভাগ্যে নিবসি স্বর্গে, - দেখ রে নারকী?
নির্ধনের গতি মুক্তি একমাত্র ধাতা,-
কালি রণে ইক্লামের সম্বল কেবল।
সাজিতেছে স্বর্গদূত নাশিতে কাফের
প্রাণের ভরসা আর না রাখি পাপী।
নখাগ্রে বিচ্ছিন্ন যথা হয় ভুজগিনী
সারির, তেমতি আগামী রণে হবি,
ইসলামের অসি তলে পরমাণু সম
ক্রীড়নক! বিঘ্ন-বিনাশন বিভু অই
প্রাণের ইসলামে তাঁর রক্ষিবার তরে
মত্ত আয়ােজনে। অনুকূল দয়াময়,
দয়ায় দ্বিগুণ বলে জিনিবে মােস্লেম !
বুদ্ধি দোষে জয়ােন্মত্ত ইম-সন্তান
উপযুক্ত প্রতিদান পাইয়াছে আর্জি
ত্যজি গিরি-চূড়! তাতে ভাবি না মনে
কালিও বিজয় লভি ফিরিৰি সহাসে
শিবিরে ! শুনি নাই,-এ কি চোখে নর,
একবার হাসি পরে কাঁদে পুনরায় !”
বিরাট কল্পনা-বক্ষে ঘন অন্ধকার,
উপবিষ্ট সুফিয়ান, চিন্তায় কুঞ্চিত
ললাট-প্রদেশ। নিশ্বাসে নিশ্বাসে বহি
বিষাদের ভার আশ্বাসিছে হৃদয়েরে ;
• আশা-নিরাশার মাঝে বসি সেনাপতি,
ভাবিতেছে আগামীর ভবিষ্য নিয়তি!
পোহাইল বিভাবরী, উন্মত্ত মােসলেম
সাজিল সৈনিক বেশে; দুশ্মদ কোরেশী
চতুর্দশ সর্গ।
নামিল আহব-ক্ষেতে, রণবাদ্য বোলে
কাঁপিল ওহােদ ভূমি। । মহাবীর আলী
চলিলা সবার আগে, ওমান সুমতি
পশ্চাতে তঁাহার। কৃতান্তের সম সাজি
চলিলা ওমর আর যত বীরগণ।
ধীর-পাদক্ষেপে প্রভু পশ্চাতে সবার,
রণভূমি অভিমুখে হ’লা অগ্রসর!
হেন কালে প্রত্যাদেশ হইল প্রেরিতে :-
“শান্ত হও বীরবাহু 'আমি সঙ্গী তব,
সত্যের সেবক যত ইলাম সন্তান
তাদের সহায় আমি ; আজিকার রণে
এখনি স্বর্গীয়-সেনা করিব প্রেরণ
রক্ষিতে ইলামে। নিশ্চয় হইবে জিত
দুৰ্বত্ত কোরেশী ! হও সখে অগ্রসর,
রণে আজ্ঞা দেহ তুমি বিপন্ন মােলেমে !”
মুহূর্তে বিহ্বল প্রায় মদিনা-সন্তান,
দেখিল স্বর্গীয় সেনা অস্ত্র ঝক্ঝকি
নামিল সংগ্রাম ক্ষেত্রে উজ্জ্বল কপোলে
ফুটিতেছে পুণ্যতেজ-হীরকের সম!
সাহসে বাঁধিয়া বুক সন্ত্রস্ত মােসুেম
পড়িল শত্রুর মুখে ;-ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্র যথা
পড়ে শিকারের স্কন্ধে। চকিতে কোরেশী
বিপদ বুঝিল ঘাের ; শােণিতের ধারে,
অসংখ্য নৃমুণ্ডমালা লাগিল ভাসিতে।
১১২ পরিত্রাণ। এইবার -এইবার—এইবার শেষ সহিতে পারে না আর বিচ্ছিন্ন কোরেশী মােসেম কৃপাণাঘাত–বিষমুখ বাণ! প্রভঞ্জন সম ছুটি মহাবীর আলী লাগিল বধিতে সেই অগণ্য রথীরে। বাত্যাহত তরী সম, কোরেশীর দল বারেক চঞ্চল হ’ল, দেখিল চাহিয়া হত যত মহাবীর, ভীত সুফিয়ান কহিলা চীৎকারি : “আর নাহি কোন আশা, চল ফিরে। পঙ্গপাল উড়ে যথা দেশে, তেমতি ওহােদ-ভূমে বিজিত কোরেশী ছুটিল মক্কার পানে; পশ্চাতে মােসলেম চলিল হুঙ্কারি ভীম নাশিয়া অরাতি ; শাণিত কৃপাণ-মুখে কন্দুকের প্রায়, শত শত শত্রুসেনা লইল বিদায়। = . বাজিল বিজয় ভেরী, উড়িল ওহােদে অর্ধচন্দ্র-বিখচিত ইস্পাম-পতাকা পতপতি। আহ্বানি কহিলা প্রভু সবে - “হত মহাবীরগণে সমাধিস্থ করি চল ফিরে মদিনায় ; অবশিষ্টগণে লহ সঙ্গে রথীবৃন্দ। আত্মীয় স্বজনে প্ৰদানিবে তাহাদেরে সমাধি সেখানে। বীরেন্দ্রকেশরী আলী ৰা মদিনায়, ঘােষিত হউক জয়, মদিনা নগরে উঠিতেছে হাহাকার ; দুষ্ট শয়তানে
পঞ্চদশ সর্গ।
পরাজয়, মৃত্যু কত করিয়া ঘােষণ।
করিয়াছে ম্রিয়মাণ অধিবাসিগণে!
যাও শীঘ্র মদিনায় দেহ এ সংবাদ,
মােসেম লড়েছে জয়, শান্তি নিৰ্বিবাদ।
পঞ্চদশ সর্গ।
মদিনা ;-দিব। তৃতীয় প্রহরে।
সুদীন আসনে বসি মহান পুরুষ,
উৎফুল্ল নয়ন ভুলি কহিলা সম্ভাষি ..
“আজি বিপ্লবের শেষে আনন্দ :
কিন্তু তবু জ্বলিতেছে হৃদয় আনার,
দুৰ্ব্বও পারস্য আর বসােরা-পতি
নিষ্ঠুর অভদ্রোচিত হেরিয়া আচার !
জন্মভূমি দেখিবার সাধ করে মনে,
অস্ত্রহীন গেনু মক্কা, তথাপি কোরেশী
পারিল না বিশ্বাসিতে ;-একটী বৎসর
আজি হইতেছে গত, হয়েছি অধীর,
দেখিতে জনম ভূমি করিয়াছি স্থির !”
ক্ষ
“ভীষণ ওহােদ যুদ্ধে পরাজিত অরি ;-
একটী বৎসর মাত্র না হইতে গত
অমিল মদিনায় ; প্রবল বাহিনী,
একমাত্র বিধাতার অনুগ্রহ বলে
হইলােক বিতাড়িত। তারপর পুন:-
জন্মভূমি হেরিবার প্রবল ইচ্ছায়,
অগ্রসর হয়ে যদি গেছু মক্কা-পথে,
১১৪ ।
পরিত্রাণ।
কোরেশী সন্দিগ্ধ-হৃদে দিল না আমায় ;
পশিৰারে পূতভূমি ভূস্বর্গ মক্কায় !”
রণােন্মত্ত হু’লে সবে আবার যখন,
দেখিনু সময় নহে, পুণ্য জেলহজে
হইবে শক্রতা বৃদ্ধি ; কৌশলে কোরেশে,
সন্ধিবশে নিরােধিনু । দশটা বৎসর
নিশ্চিন্ত হইনু শুনি আনন্দে অন্তর
নাচিয়া উঠিল হায়! প্রচার আশায়,
অগণ্য দূতের তরে করিনু প্রেরণ,-
সত্য ইলামের ভেরী করিতে বাদন।”
“হায় সে দুরাশা বুঝি হল না সফল,
শুনিতেছি দুঃসংবাদ ; কখন কোথাও
ফুটিছে সত্যের আলো বিজলীর মত
স্পণেকের তরে। তাহে কি করিব আর,
যতদিন দেহে প্রাণ থাকিবে আমার,
নিত্য ইসলামের তরে করিব প্রচার !”
“পুনঃ শুনিতেছি সেই সমর-বারতা,
পুনঃ সম্মিলিত যত তাড়িত য়িহুদী,
বিস্তীর্ণ খয়বর প্রান্তে নাশিতে ইস্লামে ;
চল সেথা একবার, চল বীরগণ -
জন্মভূমি-ধৰ্ম্মবল করিতে অক্ষয়,
খবরে তাদের তরে করিতে বিজয়।”
নীরবিলা সাধুবর, ক্রোধান্ধ ওমর,,
তীক্ষ্ণ তরবারী তুলি কহিলা সবায় ;
পঞ্চদশ সর্গ। ১১৫ “ধৰ্ম্মবীর মহারথী তােমরা মােসেম, বদর ওহােদ ভূমে দিলে পরিচয় ;- এইবার চলি তবে খয়বর প্রান্তরে - নাশিতে বিধৰ্ম্মীদল ; কর বীরগণ- ধৰ্ম্ম রক্ষা হেতু আজি প্রাণ বলী দান !” গর্জিল মােসলেম-চমু সিংহ-পরাক্রমে, কপিল আকাশ-পথ অচল-সাগর ; উলঙ্গ থর্শান তুলি প্রতিজ্ঞা প্রকাশে, সম্মতি জ্ঞাপন যেন করিলা সকলে। গৃহে গৃহে সমরের মহা আয়ােজনে, মদিনা কাপিল পুনঃ প্রবল স্বননে! === কহিলা সুমতি সবে,—“চল ধীরগণ, আজিকেই রণমুখে হই অগ্রসর ;- কালি বিধৰ্ম্মির তরে করিয়া নিৰ্ম্মল, ফিরিব সুখের-গৃহে সান অন্তর!” “সজ্জিত মােসলেম-সেনা আততায়ী বধে, তুচ্ছ গণে প্রাণ তারা ধরমের তরে ; শুভক্ষণে করি যাত্রা আজিকেই তবে, নাহি বিঘ্ন ধৰ্ম্মহেতু, না ডরি কাহারে!” উত্তেজনে আস্ফালিত কৰি তরবারী, সাজিল মােসলেম-সেন। বধিবারে অরি।
পরিত্রাণ।
যােড়শ সর্গ।
খয়বরে।
প্রভাত হইল বিভাবরী,
গাছে গাছে পাতে পাতে,
সােণার কিরণ পাতে,
বসুমতী হইল উজল ;
সাজিল কৃতান্ত সম দু'দিকে দু’ দল ।
অশ্বের দাপটে কঁপে দিক,
শাণিত কৃপাণগুলি,
বজ সম করে তুলি,
যােলেম হইল অগ্রসর ;
আজিকে সমরে বুঝি রবে না প্রান্তর!
অন্ধকার আকাশ-পাতাল,
দিবাকর ধূলি মগ্ন,
কি কুক্ষণ কি কুলগ্ন,
'ন হইল য়িহুদী ;
.::", "ৎ রবে কাঁপিল জগতী ।
.
তাদিল রণ-ডঙ্কা নাদ,
ভীত য়িহুদীর দল,
অরিল দেবের বল,
ডাকিলা আপন প্রভুগণে,
রক্ষিতে অনাথ জনে এ ভীষণ রণে।
যােড়শ সর্গ।
ফেরুপাল ব্যাঘ্ৰ হেরি যথা,
জীবন রক্ষার আশে,
বিজনে পলায় ত্রাসে,
তেমতি য়িহুদী দল হায় ;-
যে দিকে পাইল পথ লইল আশ্রয় ।
রক্তনদী বহিল খয়বরে,
অগণিত শক্ৰশিরে,
মনে হল আজি কিরে
নরক হইল ধরাতল ;-
সহসা শান্তির রাজ্যে এ কি কোলাহল।
‘জয় ইসলামের জয়” রবে ;-
চমক ভাঙ্গিল যেন,
য়িহুদী ফিরিল পুনঃ-
বরিষার বারিধারা প্রায়
আবার তুমুল রণ হইল সেথায়।
বীর-পরাক্রমে অস্ত্র ধরি,
ধাইল মােসলেম দল,
জলিল সমরানল,
ডুবে গেল যিহুদীর বল :-
দাপটে খয়বর-ভূমি হইল চঞ্চল!
উড়িল বিজয়-কেতু ধীরে ;
আনন্দে বিজয় গান,
গাহিল মােসলেম প্রাণ ;
:
পরিত্রাণ সুখের হিল্লোল চারি ধারে; আবার উঠিল বাদ্য কাপা’য়ে অম্বরে। । কহিলা প্রেরিত, সৈন্যগণে :- “বন্দী দলে আন এবে সমুখে হউক তবে ইসলামের পূর্ণ অধিকার ; করিব বিহিত মত তাদের বিচার !” আজ্ঞা মাত্রে বন্দী দলে আনি প্রেরিতের পদতলে সারি দিয়া সকলেরে, উপস্থিত করিলা তখন ; সাদরে প্রেরিত কহে মধুর বচন। “অসার মায়ায় ভুলি ভাই ;- কেন হইয়াছ মত্ত এ ইসলাম নিত্য সত্য, বধিবারে মােলম জীবন- কেন রণ আয়ােজন করেছ এমন ?” ঘােষিবারে একত্বের জয় জীবন করেছি পণ, বিচলিত নহে মন, জেনে শুনে আবার তোমরা, আসিলে সমরে ভাই নির্দোষী আমরা।”
যােড়শ সর্গ।
১১৯
‘প্রাণের ইসলামে রক্ষিবারে,
বিধাতা ধরার পরে
পাঠাইয়া মাের তরে,
দিয়াছেন করিতে প্রচার ;-
এ নহে অলীক ধৰ্ম্ম এ নহে অসার।”
--
“বন্দী হইয়াছ যদি আজ ;
মাের আজ্ঞা শিরে ধর,
বশ্যতা স্বীকার কর,
ফিরে যাও সপিনু জীবন ;-
কর দানে বাধ্য হলে রাখিও স্মরণ?”
-
নত শিরে য়িহুদীর দল ;
মানিয়া প্রভুর জয়,
হারাইয়া উষ্ট্ৰহয়,
বিপন্ন ছুটিল গৃহ পানে;
ইসলাম লভিল জয় খয়বর প্রাঙ্গণে।
সপ্তদশ সর্গ।
মদিনা ;-মসজিদ-প্রাঙ্গণে।
অতীত প্রহর নিশা নীরব অবনী,
শান্ত সুগম্ভীরে মিশি প্রশান্ত হৃদয়ে,
যেন ধাইতেছে ধীরে দিবসের অশে,
সুদূরে করিয়া লক্ষ্য-দেখিতে আলােক।
হেন কালে মন্দিরের দীপ্তি বেদী হতে
উঠিল মধুর স্বর, কহিলা প্রেরিত :-
পরিত্রাণ। নির্বিবাদে শান্তি-রাজ্য স্থাপিতে কোরেশ, সন্ধি-বন্ধে আবদ্ধিলা; ভাবি তখন- দশটী বৎসর মাের ইসলাম-প্রচারে ঘটিবে না কোন বিঘ্ন ;-এবে দেখিতেছি, পুনঃ ভ্ৰষ্টাচার দলে হ’তেছে মন্ত্রণা,- নাশিতে ইসলাম-রাজ্য-সুখ-স্বাধীনতা ! আবার সমরানল জ্বলে বুঝি হায়, ভাবিতেছি বিনা রক্তে কি এর উপায় । *একটা বৎসর এই হইয়াছে গত, সন্ধির সর্তানুসারে পশিমু মক্কায় ; শান্ত-শিষ্ট কোরেশীর হেরিয়া আচার, মনে হ’ল হিংসা দ্বেষ শেষ এইবার। কিন্তু তবু সন্দেহের ক্ষীণ রশ্মি টুকু থাকিল হৃদয়ে মাের, যখন তাহারা দিল না মােসূলেম-সুতে থাকিতে সেথায় ; ভাবিল অধিক দিন রহিলে আমরা, বন্ধুতায় ডুবে যাবে শক্ত কোরেশীরা ! “বীরকুল অগ্রগণ্য বিক্রান্ত খালেদ পবিত্র ইসলামে যবে সপিল জীবন, আনন্দে নমিনু ভূমে বিধাতার পদে, কস্তুরিকা গন্ধে যেন মােদিল হৃদয়। মতী মইমুনার তরে করিয়া গ্রহণ, খালেদের মনােবাঞ্ছা করিনু পূরণ !” “তারপর বসােনার বিখ্যাত সমরে, পাঠাইনু খালেদেরে করিয়া আদর ;
সপ্তদশ সর্গ।
কহিনু জৈইদ তরে, নিজ হস্তে তুমি
ইমের জয়চন্দ্র করিও ধারণ!
তােমার মৃত্যুর পরে সুধীর জাফর
পতাকার অধিকারী ; একান্ত সে যদি
দৈববশে হয় হত, আল্লা তখন
করিবে পতাকা হস্তে ; সেও ভাগ্যদোষে
যদি লভে শেষ-শয্যা, খালেদ তখন,
করিবে ইসলাম-চিহ্ন স্বহস্তে ধারণ !”
“অক্লান্ত বিক্রমে যুঝি পূর্ণ দুটী দিন,
কৌশলে লভিল জয় সাহসী খালেদ ;
বিধাতার নামে হ’ল জয় জয়কার,
হৃতবল নােম-সৈন্য গণিল প্রমাদ।
রাহুগ্রস্ত দিবাকর লুকায় যেমতি,
রােমীয় প্রাণের ভয়ে পলাল তেমতি।”
“কিন্তু দেখ এইবার নির্দয় কোরেশী,
নিরাশ্রয় বেনীখুজাদলের উপর
করিতেছে উৎপীড়ন; পারিনা সহিতে
দুঃখীর এ হাহাকার,-আশ্রিত দুর্দশা।
অনিবার্য হ’ল বুঝি এবারাে সমর,
অনিচ্ছায় রক্তপাত অতি ভয়ঙ্কর।”
“যাও তবে গৃহ-মুখে কর আয়ােজন,
একবার পশি সবে মক্কার ভিতর,
ইসলামের শেষ ভেরী করি নিনাদিত,
চুর্ণ করি অহঙ্কার যত দেববল!
সত্যের বিকীর্ণ জাতি পৰিছে ধরায়,
পরিত্রাণ ।
আঁধার স্বদেশ মাের এই সুখ মনে ;
দিবানিশি ভাবিতেছি ইস্লামের কথা,
কেমনে প্রচার-কাৰ্য্য করিব সাধিত।
শােকে দুঃখে মুহমান মিরাশ হৃদয়,
হেরি ইসলামের দুশ' কত কথা কয়।
নীরব হইলা নবি আঁখি নত করি,
চিন্তায় ললাট দেশ হইল কুঞ্চিত।
দীর্ঘশ্বাস ফেলি যত ইলাম সেবক,
উঠিল সস্মিত-মুখে ভাৰি ভাৰী কথা ।
নির্বাপিত অগ্নিশিখা জ্বলিল হৃদয়ে,
উষ্ণ-রক্ত-শ্রোত যেন গেল তরঙ্গিয়া ;
আরক্ত লােচন তুলি গম্ভীর বনে,
চাহিদা প্রভুর আজ্ঞা, রণে-অভিমতি।
সু-অভিবাদনে তুষি প্রেরিতের তলে,
চলিল মােসমদল নিজ ঘরে ঘরে।
অষ্টাদশ সর্গ।
মক্কা-প্রান্তরে।
বিস্তীর্ণ শিবির আজি মক্কার প্রান্তরে
পড়িয়াছে অই দেখ ; দেখ লাে কল্পনে !
কি ভীষণ জনস্রোত-জলস্রোত হেন,
চৌদিকে ভ্ৰমিছে আজি যমের মতন!
কহ শুনি কবিরাধ্যা-
টিপু-শীলা,-
কিসের এ কোলাহল,কেন এ শিবির ;-
অষ্টাদশ অর্গ।
তবে কি আবার কে এল এখানে-
তাই মত্ত-প্রাণ হেৰি সােলেম-নন্দনে ?
আইস, নেহারি মােরা এক প্রান্ত হতে,
কি হয় এখানে দেখি যাের রাত্রিকালে ;
কিসের শরম দেবি, পুরুষের তরে;
কে দেখিবে আলিয়াছ ভীষণ প্রান্তরে।
চল মােরা অই খানে দু’জনে বসিয়া,
ভবিষের কথা গুলি দেখি বিচারিয়া ।
অই শুন শৃঙ্খলের ঝন্ঝণ!
ঈড়াও এখানে দেবি, দেখি কি হয় ;
পূরা’য়ে মনের সাধ আজি সারা নিশা,
ফিরিব আলয়ে পুনঃ স্বকার্য সাধি।
মায়ারাজ্য বিচরণ কর মহারাণী,
ললিত ঝঙ্কারে আজি রচি মধু-বাণী!
আর না!-দেখ লাে সতি-অই দেখ আসে
বন্দী আবু সুফিয়ান মােসলেমের করে,
অপরূপ বিধাতার বুঝি কৌশল,
সত্যের নিয়ে জয়, অধর্ম বিজিত।
চল তৰে প্রেরিতের শিবিরের কাছে,
আড়ালে দাঁড়ায়ে মােরা শুনি তাঁর কথা
কি আদেশ হয় দেখি শক্রর উপরে,
কেমন সারল্যধৈৰ্য্য সাধুর অন্তরে।
১০
দেখ লাে রুল্পনে!-এই দুর্মুখ কোরেশী,
মানব-নামের কালি-মূর্তিমান পাপ!
তা না হলে হেন নয়ে এত দুঃখ দিয়ে,
পরিত্রাণ। কেন দহিতেছে সবে বারবার তবে? অই শুন, সন্ধি বন্ধ করিয়া লন; মােসেমে করেছে বাধ্য করিবারে রণ! • প্রবল-বাহিনী চয় হের ইস্লামের, খ্যাত চরাচরে যার বীরত্ব অসীম অই সে ওমর, আলী, খালেদ, ওসমান্, সিদ্দিক -সকলি বসি প্রেরিতের পাশে। তীব্র-লক্ষ্যে বক্তনেত্রে দংশিছে অধর- তুলিছে উলঙ্গ-অসি বধিতে সুফিরে ! বারবার মহাপ্রভু করিয়া বারণ,- নিবারণ করিছেন ক্রর আচরণ। , মেঘ-মন্দ্রে যামিনীর নিস্তব্ধতা ভাঙ্গি, কহিলা প্রেরিত,-“শুন আবু-সুফিয়ান ; কোরেশের প্রভু তুমি,-পাপীর অধম, বুঝিলে নিত্য সত্য ইসলাম-রতন। দহিয়াছ ইমেরে দিয়া যত দুঃখ, আজি অনুতাপ তুমি ভুঙিবে তাহার ; শত তরবারী হতে মনের এ গ্লানি দহে মানবের প্রাণ! কি কহিব আর, এমনি সত্যের তেজ -ধম্মের বিজয়,- আচম্বিতে হলে বন্দী এ কাল সময়। “একেশ্বর ধ্রুবসত্য তেয়াগ পুতুল, নহে ওরা চিরারাধ্য, ওরা শক্তিহীন প্রস্তর মূরতি শুধু , কবীর তুমি, মাতি এ ইমে লভ নূতন জীবন! -
অষ্টাদশ পর্গ।
ধৰ্ম্মবীর নামে হও বিখ্যাত ধরায়,
ধীরত্বে মহত্বে পূর্ণ হোক্ ও হৃদয়!
শুনি প্রেরিতের হেন-মধুময় বাণী,
যুগ্ম-পাণি ঘুড়ি কহে আবু সুফিয়ান ;-
“নিশ্চয় সত্যের তেজ এমনি দুর্জয়,
বুঝিলাম এতদিনে অধৰ্ম্মের ক্ষয়!
শত আয়ােজনে আমি দীন ইমেরে
করিয়াছি ক্ষতিগ্রস্ত ; ক্ষম অপরাধ,
আজি মাগি কৃপা তব হে ইল্লাম-মণি!
আশ্রিত জনের এই আন্তরিক সাধ,
পুরাও ইামে বাঁধি যা অপবাদ।”
আবার বিধাতৃ-সখা কহিলা সুফিরে ;-
ধন্য আজি তব প্রাণ, কহ তবে মুখে,
ইসলামের আদি-মন্ত্র ; সদয় বিধাতা
ক্ষমিবেন অপরাধ হ'য়াে না বিহ্বল।
দ্বিতীয় অধ্য নাই, একমাত্র তুমি
প্রেরিত হে মহম্মদ (দং)-পথ-প্রদর্শক ;
ভজিনু ইস্পাম-পদ-বৈর নির্যাতন,
জঘন্য জিগীষা দূর চিরতরে হােক ।
হৃদয়ের গূঢ় আশা করিনু পূরণ,
ইমই মহান্ সত্য উজ্জ্বল রতন!”
সস্নেহে সাদরে কর করিয়া মর্দন,
পাশে বসাইয়া ধারে মেসেম-সন্তান ;
“ভাই” বলি আলিঙ্গনে তুষি সুফিয়ানে,
ইম-মাহাত্ম্য কত করিল বাখান।
পৰি।.
প্রেমাঞ্চত কোরেশীর উজল কয়েক
এলিল গ্লানি -অ করে
লাগিলবহিতে, যথা অনপরশে,
গলে এক মোবাতী ফোঁটা ফোটায়।
আনমে তুলিয়া নবি জ্যোতিদীপ্ত শিল্প,
কহিলা সুফিক তরে ধৈৰ্যৰ ৰী !”
.
পাদ-প্রান্তে পড়ি আজি যেই অফিসান
নীরবে কাঁদিছে; হায়, সেই একদিন ;
বধিতে ইলাম করে কি না করিয়াছে ?
এমনি ধাতার ইচ্ছা,-এ ইসলাম দীন।
ভ্রমে পড়ি কেন ওরে অজ্ঞান মানব,
আজিও না চিনিতেছ হেন কোহিনুরে ;
অই ডুবে, কালস্রোতে জীবনের-বেলা,
আর না ফিরিবে আয়ু।-ফুরায় যেমন
অগ্নি-সহযােগে তীক্ষ বারুদসম্ভার
নিমেষের মাঝে । তেমতি আমরা সবে
নিমেষে বুদ্বুদ নে এসে জেয়ে ৰাই
আইস-এখন ভজ ইস্লামেৰে ভাই।
সন্ত্ৰমে চরণে নমি কহিলের
“যদিও হইনু আমি ইসলামের দক্ষ
অগণিত কোরেশী সে আক্রমণ রে
হইয়াছে সন্মিলিত। কি জানি তাহার
প্রভাত না হতে হতে শিবির দুয়ার
করিবেক আজনক। যদি দুল।
তথাপি নির্বা+প্রস্থ দীপের মতন,
শেষ একবার যুকি ছাড়িৰে তখন।
অষ্টাশ সর্গ। প্রেমের হইল হিল প্রেরিত :- ভয় নাই, নাহি ভরে মােমেসন্তান সম্মুখ-সংগ্রামে কভু। আজিকার মত, যাও তৰে গৃহেগৃহে নিশা প্রায় গত!* সসম্মানে পদপ্রান্ত করিয়া চুম্বন, উঠিলা বীরদল-নন্দিত মন। । প্রভাত হইল নিশা মৃদু সমীরণ, চুম্বিয়া বিটপী-শির লতার অধর, চলিলা জগতে যেন করিতে থােষণ- নিমেষের মুখ তারক্ষণিক মিলন। অতিদূরে মহীধর তুলি উচ্চ শির হেরিছে বিস্মিত-নেত্রে মােসম শিবির, ভৰিছে কি হয় আজি রক্ত-জ্ঞ শেষে তরঙ্গ ছুটিবে বুঝি যুণ-পয়ােধির। বীরসাকে সুসজ্জিয়া দশ মােলেম, দেখিল ফোরেশ-সেনা আসিছে ধাইয়া ভীম তম সম। তীক্ষ আসি তুলি সবেগে ধাইল পিছে যােলেম নন্দন! হঙ্কারে কঁপিল ভূমি, এস্তা-দিক্-বধূ সম্বরি স্খলিত-বাস উঠিলা চমকি ভীষণ শবদে। কহ কহ,লাে কল্পলে,- চঞ্চল-সৌভাগ্য কার বন্ধ ঐচরণে? “মত্ত অনীকিনী রঙ্গে দিকে দিকে পশি, অই দেখ রক্তস্রোত বহায় হে কবি ;- মােসলেম লভিবে জয় কহিনু নিশ্চয় ; সত্য এ ইলাম ধৰ্ম্ম-সত্য শেষ নবি।”
পরিত্রাণ।
শুনি কল্পনার কথা, দেখিনু চাহিয়া,
মিথ্যা নহে বাণী তার , সভয়ে কোরেশী
খাইছে মক্কার পথে ;-রক্তসিন্ধু মথি,
দ্রুতবেগে পশিতেছে মােসলেম-সন্তান
পশ্চাতে পশ্চাতে। এই হ’ল বুঝি জয়,
শ্মশান হইল যেন রণ-ভূমিময়!
–
সগৌরবে চন্দ্রকেতু হইল উড্ডীন,-
বাজিল বিজয়-বাদ্য; বিজেতৃ প্রেরিত
বেষ্টি বীরদলে আজি সৌভাগ্যের সনে,
পশিলা পাপের রাজ্যে। হুতাশন সম
মাতি ধর্মবীরবৃন্দ আক্রমিল কাবা ;
সার্ধ-তিনশতাধিক দেবতা-নিচয়ে
ভাঙ্গি দিল কোরেশের হরষে মােসলেম।
পুষ্পবৃষ্টি হ’ল শিরে হাসিল বিধাতা,
মােহান্ধ হেরিল আজি সত্য পরিত্রাতা।
কহিলা প্রেরিত তবে মহারথগণে-
“আজি প্রায় ব্রত শেষ,-হ’তেছে পূরণ
আমার প্রণের সাধ। পৌত্তলিক ভূমি
হইল সত্যের রাজ্য ;-করহ বিশ্রাম।
মধ্যাহ্নের উপাসনা করি সমাপন,-
সাফায় করিব মহাসভা আবাহন!”
-:0:.
উনবিংশ সর্গ। ঊনবিংশ সর্গ। সাফা-পৰ্বতে। বিশাল মরুভূ-বক্ষে উচ্চ মহীধর- জীর্ণ দেহ শীর্ণকায়—শূন্য-আভরণ, কালের ভীষণ-চিত্র ধরিয়া হৃদয়ে আছে যেন বজ্রাহত ; উষ্ণ বায়ু রাশি কখন পবন-সঙ্গে মিশি দুরান্তরে, আসিতেছে ঘুরিফিরি ;-কখন সুদুরে কদাচিৎ উষ্ট্রদল করিতে চারণ- দেখা যায়। জনহীন শুষ্ক দিকচয়, হাহাকার কৃরি যেন কাঁদে নিরাশায়। আহূত বিরাট-সভা তাহারি উপরে, সহস্র সহস্র কণ্ঠে উঠে জয় রব ;- আবার মীরব হয় ; সুকণ্ঠে প্রেরিত- করিছেন মৃধাসম ধৰ্ম্ম-আলাপন। প্রেমে-মুগ্ধ ধৰ্ম্মবীর তুলি নত শির হাসিয়া কহিলা সবে—যেন চন্দ্র হতে ঝরিল অমিয়া-কণা ; মােসলেম-চকোর লাগিলা করিতে পান। “অই ভ্রাতৃগণ!- আজি কি সুখের দিন ইসলামের তরে, আজি কতকাল পরে বিপ্লবের শেষে পূরেছে আকাঙ্ক্ষা মম। স্বদেশী তােমরা বধিতে আমার প্রাণ করিলে মন্ত্রণা, উৎপীড়নে ছাড়াইলে গৃহ-জন্মভূমি। - =
পরিত্রাণ।
ভাবি নাই তার তরে, বিধাতার নাম
সুখে-দুঃখে ধরিয়াছি তাপিত হৃদয়ে ;-
নিরাশ্রয় দীন আমি সত্য-প্রচারক
আসিয়াছি ; বুঝি নাই সুখ-দুঃখ ভেদ !
তখনাে খর্জ বপত্র শয্যা ছিল মােব,
এখনাে তাহাই আছে ; চাইনা ও ধন,
চাই না রাজত্ব গৰ্ব রত্ন-সিংহাসন।
শুধু লক্ষ্য ইসলামের বিস্তৃতি আমার,
বিধাতার নামে যাহে হয় জয়কার !
“পুতুলের ক্রীড়া স্থান এই মক্কা ভূমি,
জ্বলন্ত সত্যের পদে সঁপেছে জীবন
এর চেয়ে কি সৌভাগ্য! নাহি কাম্য কিছু
বিধাতার নাম ভিন্ন এ ধরায় মাের।
এই সত্য জ্যোতি ভাতি পবিত্র কাবায়,
উজল করিবে ক্রমে তাবৎ ধরায়।”
এখনাে সামান্য আছে মনের বাসনা,
এখনাে সম্পূর্ণ নাহি হয়েছে সফল ;
আউদান-অধিবাসী বেদুইন দল,
মজিয়া রয়েছে ঘাের পৌত্তলিকতায়।
খালেদ যাইবে সেথা করিতে সমর,
ফিরে যাৰ আমি এবে মদিনা নগর।
!
“অধিক সময় নাই নিবসিতে হেথা,
যাব পুণ্য মদিনায় ; আবােয়া নগরে
জননী-সমাধি-হেরি শােকার্ত জীবন
.
বিংশ শর্গ।
১৩)
করিব শীতল জাত! এবে এ মক্কায়,
সুশাসন-প্রতিষ্ঠায় গৌণ যাহা কিছু ।
ইসলামের বাধহ মন, হইও না পিছু।
মুগ্ধ মধুকর কথা মকরন্দ পানে
মুহূর্তে বিস্মৃত হয় আপনার কথা,
তেমতি কোরেশ-দল শুনি এ বচন
দলে দলে ইস্লামেরে করিল গ্রহণ।
পাপ-রাজ্যে পুণ্য আমি লভিল আসন,
মরুভূমি কল কাজ নন্দন-কানন!
•
বিংশ সর্গ।
ব্ৰত-উদ্যাপন,পরিত্রাণ।
আজি কিবা শুভদিন দেখরে চাহিয়া
একবার দেখরে চাহিয়া ;
হাস্যময়ী ফুল-বীথি,
উছলিত প্রেম-প্রীতি,
ঝঞ্চারিত মধু-গীতি মুখরিত হিয়া,
অলেছে সত্যের আলাে ভেদিয়া তিমির
আঁখি তুলি দেখরে চাহিয়া !
প্রেমে যেন মাতােয়ারা বুকেবুকে বাঁধা
এতগুলি বিশ্বের পুতুল ;-
শুনিয়া মধুর বাণী,
একত্ববংশীর ধ্বনি,
,
পরিত্রাণ।
পাশে-পাশে মহাপাশে জু’ড়েছে দু’কুল,
কুয়াসা ছুটিয়া গেছে,-তরুণ-অরুণে-
মানবের ভাঙ্গিয়াছে ভুল!
প্রদীপ্ত স্মৃতির মঠে আদি উঠে জাগি
নিরাশার বিলুপ্তসভা,
নূতনে-নূতন মিশে
আনিছে আনন্দ ভেসে
দিশাহারা জগজন একি মন্ত্র-তালে,
নাচিছে প্রেমের-ছায়ে কি সাম্য-শ্নর
বিশাল এ ভুবনের তলে!
।
ভীষণ ঝটিকা-শেষে শাস্ত-বসুধায়
বহে যথা শীতল পবন ;
পূর্ণদীপ্ত কিসলয়
সতেজ-সগর্ব হয়,
অনুরাগে ভরি উঠে প্রেমিকের মত,
আজিরে তেমতি ধরা সাজিয়াছে দেখ
শত মুখে মাধুরী-মণ্ডিত।
বদর, ওহােদ গেছে খয়বর-প্রান্তরে
তৃণাদপি যেই দীন হীন ;-
বিশ্বসে করিয়া ভর,
তেয়াগি মমতা ভর,
যে বিজয়-মহাকেতু-করেছে-উড্ডীন,
আজি সে নিশান-তলে কত জন খাড়া
দেখ রে চাহিয়া এই দিন।
বিংশ শর্গ।
নীরব করুণ-ভাষা কত সুখ আশা
মরমের স্তর ভেদ,
প্লাবিছে হৃদয়-নদী,
নিরবধি উথলিছে তরঙ্গের তান ;-
ইসলাম করিছে পূর্ণ জীবনে মরণে-
আধা-ফুটা ভাঙ্গা-চু গান !
এ শক্তি প্রেমের শক্তি এ মহান্ গীতি
চিরদিন অমর-অক্ষয় ;
আলাপি বচন সুধা
আকাঙ্ক্ষার মহাক্ষুধা
নিবারিছেকি জীবন্ত ভাবের আবেশ,
মদিয় নয়ন তুলি স্নেহময় চোখে
দেখ সবে ইসলামের বেশ!
স্বপ্ন নয় -অই সত্য দুয়ারে দাড়ায়ে,
দেয় প্রেমে ডুবানে জীবন ।
আধেক চেতনে থাকি
তৃষিত জীবন-পাখী,
ডাকিছে যখনি দুটী পাখা ঝাড়া দিয়া
একটা মধুৰ পতা হয় নিরাকারে
মায়াময় সংসার ব্যাপি।
প্রাণময়ী-প্রেমময়ী মােসেমের রাণী
হেসে উঠে একজের নামে ;
কল্পনা অকুলে টুটে
অযুত তরঙ্গ ছুটে
১তঃ
পরিত্রাণ।
হৃদয় আকুল হয়ে ভূমে পড়ি লুঠে,
এই সে ইলাম আর সবার মারে,
সকলের হিন্নার নিকটে।
লও কোলে ; -কি দেখিছ ওরে রে জগত
চিয়ােজ্জল পবিত্র ইসলামে ।
কোটি কোটি নর প্রাণ
আজি এই অবসান,
হইতেছে ত্রয়ােদশ শতাব্দি ব্যাপিয়া,
একি সুর—একি লক্ষ্য-এক স্বরে উঠে
জীবনের কামনা লইয়া ।
!
অই স্বর্গ,-এই মর্ত্য—বুহু দূরে দূরে
মাঝখানে দেখরে চাহিয়া,
একেতে সকলি বাধা
এক লয়ে বিশ্ব সাধা,
অসীম একের রাজ্য অন্তরে বাহিরে,
ইলামে এমন শিক্ষা, এমন মহান .
বিপথেতে কেন যাও ফিরে ?
*
জ্ঞান বিজ্ঞানের বলে অনীর মাঝ
বালিয়াছে মােহ-অন্ধকার ;
বিশ্বাস প্রদীপ্ত জ্বেলে
উদমনৰ মূলে,
যে আগুন করিয়াছে আপন আস্থতি,
“পাগলের ধর্ম” তা মহে কে পাগল
অসীমের সরল গতি।
বিংশ সর্গ।
কোটী শত্রু পরিবৃন্দ যাহারজীবন
একাকী যে মরুভূমি মাঝে,
বুঝিয়াছে দিবা রাতি
ছড়া’তে ধর্মের ভাতি,
বিশাল বিশ্বটী ঘেরি আজি যার গান,
সে নহে “বঞ্চক” কভু সে ধৰ্ম্ম কখন
নহে ওরে “স্বপন সমান।
যার নামে জাগি উঠে পাগলের মত
আজি ওরে সারাটা পৃথিবী;
যা’র অগণিত শিষ,
ঘিরেছে তাবত বিশ্ব,
সহায়-সম্পদ-হীন কণার ভিখারী
যাদুমন্ত্রে কত দিন ভুলাইতে পারে
জ্ঞানদৃপ্ত এত নর নারী ?
ধ’র নামে আস্ফালিত শত্রুর কৃপাণ
পুরস্কার হইত ঘােষণা ;
অন্ধকার গৃহ-তলে
“হা শিষ্য” “হা শিষ্য” বলে
যে ভিখারী চলে গেছে ছিন্ন-বাস পরি,
সে যদি মায়াবী হত এত দিন পরে
ধরা যেত তাহার চাতুরী ।
সত্য যাহা-পূত তাহা আপনি উজল
কুলে কুলে ভরা সে পিরিতে
;
অভাব কোথাও নাই
পিয়াসা সকল সহ,
পরিণ।
দৈন্য নাই, আছে শুধু পূর্ণত্ব লইয়া,
প্রাণ ছুটে বিয়াকুল বিভোল আবেশে
সঙ্গীতের সে রসে মজিয়া।
যা’র বাণ তারি বুকে বিঁধিল আজিরে
পৌত্তলিক মজিল ইমে;
ব্ৰত উদযাপন-শেষে,
আজি:দেখ শশী-পাশে
তারাদল যেন হাসে সেই সে কাফের,
ইসলামে এমনি মধু-এমনি শকতি
বিজড়িত বন্ধন ভাবের।
যেইখানে শঙ্খ-মন্ত্রে হত হুলুধ্বনি
লীলাভূমি মূরতি পূজার ;
সেই দেশে সেই ঘরে
ইসলাম প্রভুত্ব করে,
ফকির গৌরব-ভরে দেখিল চাহিয়া,
শিশিরের কণা হেন ঝরিছে ধরায়
বিধাতার প্রেমের অমিয়া।
সঙ্গীহীন-বিত্তহীন—নির্ধন কাঙ্গাল
হয় যদি জগতের গুরু ;
কে এমন মূখ ওরে,
তাহারে বলিতে পারে,
“এক হস্তে অসি আর কোরাণ লইয়া,
মহম্ম, ঘরে-ঘরে অনিচ্ছার মাঝে
এ ইসলাম গেছে প্রচারিয়া ?”
১৩৭:
,
এক পূর্ণ অন্তহীন তারি কল গান
শত মুখে শত কাব্যে গায় -
বিরাট প্রকৃতি-বক্ষে-
দেখ দেখি প্রেমচক্ষে,
একেরি সহ রূপ-শতবর্ণ মাখি
কেমন হাসিছে আহা -কি-তত্ত গভীর
কারে দেখ, তারে নাহি দেখি?
সেই নদী,—সেই ধৰ্ম্ম-দু’কুল প্লাবিয়া
জাতিভেদ ভাসাইছে বুকে ;
উচ্চ-নীচ সঙ্কীর্ণতা
বৈষম্যের এ হীনতা,
উপাড়িয়া ফেলিয়াছে সাম্য মন্ত্র বলে,
ইলাম মন্দিরে যেয়ে দেখ সেই ছবি
কি জীবন্ত পবিত্রতা খেলে !
ধুপ নাই--ধূনা নাই,--আড়ম্বর হীন—
নিশমের জ্বলন্ত-চিত্ৰণ ;
আছে দৃঢ় হিয়া-বল
আছে প্রেম -লক্ষ্যস্থল
এক বিভু; একমাত্র কোরাণ তাহার
পথ প্রদর্শক এই জগতের মাঝে-
একে এত শক্তির সঞ্চার।
বিজন মরুভূ মাঝে বিধাতার বলে
অন্ধজমে দেখল যে পথ;
মূখ কোরেশীর দলে
যে সত্যের মহানলে
১৩৮
পরিত্রাণ।
প্রেম অাখি ফুটাইল দেবতা করিয়া
সে ধৰ্ম্ম কখন কিরে বলহীন হবে
সে কি পারে যাইতে মরিয়া ?
;
বন্ধুহীন,-স্নেহহীন ছিল যবে ইহা
কে নাহি আদরে যাচিত
তখন অরাতি দলে
বলে কিম্বা সু-কৌশলে,
যে সত্য ডুবাতে নাহি পারিয়াছে আহা
সে ধর্মের এতগুলি থাকিতে স্বজন
কে তােরা ডুবাবি আজ তাহা !
-
প্রস্তরে দংশিলে যথা মত্ত বিষধর
কৰ্ম্মদোষে দন্তহীন হয় ।
তেমতি ইসলামে যদি
দংশে শত্রু নিরবধি
আপনি ডাকিবে সেহ অশুভ আপন;
অক্ষয় অক্ষত র’বে অমর হইয়া
এ ইস্লাম নিরেট এমন!
প্রাণ গেছে স্মৃতি আছে স্বর্ণ-ইতিহাসে-
ইলামের সেই আত্মত্যাগ ;
সদাফুল ধৰ্ম্ম-পদে
কর্মবীর মহামদে
লক্ষ শত্রু দলিয়াছে পার্বত্য-প্রান্তরে,
ভক্তি-পুস্পাঞ্জলি ঢাল অ-অর্থ দিয়া
বর সবে হৃদয়-মন্দিরে।
বিংশ শর্গ। পথের ভিখারী যেই তারি ব্যবস্থায় বদণ্ডে শাসিত জগত; চাহিয়া দেখরে ভ্রান্ত প্রেমােজ্জল দিপ্রান্ত হাসিছে সে মহালােকে,-চন্দ্রমা উদিলে হাসে যথা দিবধূ। শুভ আশীর্বাদ আজি শিরে সহ সবে তুলে! পিতৃহীন মাতৃহীন দীন-সন্তানের পদতলে মাণিক লুটায় ; সে চায় ইসলামি দীন, ধন-রত্নে উদাসীন, সে চাহেনা অহঙ্কার উচ্চ অভিলাষ, সে চাহে একেতে মতি মেহ-বিধাতার, কি উদার স্বর্গীয় বিকাশ। == সত্য সে পড়েছে বটে বিপদের মুখে কত কার কত পরীক্ষায় ;- অনলে পুড়িলে স্বর্ণ- তবে হয় শুদ্ধ-বর্ণ- যে হবে “জগত গুরু” “অকুলে আশ্রয়, কোথায় পাইব শিক্ষা সে জীবন বিনা এ মহান আদর্শ-নিচয় । এ কি পায়নি সে রে এ জগতি-তলে কামনা কি ছেড়েছে লভিতে ?- প্রাণের ইলামে সেহ- ক্ষয় করি নিজদেহ -
১৪০
পরিত্রাণ।
প্রচারি গিয়েছে, যার প্রেম-তরী ধরি
এ অকুল ভবার্ণবে কু-তরঙ্গ মথি
সদানন্দে যাইব উতরি।
*এক সত্য,-মহম্মদ তঁাহারি প্রেরিত
অনন্ত এ ইসলাম-সাগর ;-
প্রাণে প্রাণে বাঁধি আজ
আয় বিশ্ব,—রে সমাজ,
ডুবি এই মহাতলে রত্ন-আহরণে,
না ডুবিলে কোথা পাবে পরশ-রতন
-সাধনার সাফল্য জীবনে ?
লক্ষ্য এক,-লক্ষ পথ প্রসারিত তার,
—কিন্তু দেথ কোন্ট সরল ;-
এক যেথা—দুই নাই,
এক টান,-এক চাই ।
একি নিত্য,সুমহা-সরল সবার,-
এ ছাড়ি যে অন্য পথে করে রে গমন
শত ধিক্ বিবেকে তাহার ।
ন
আলােক-আঁধার পূর্ণ-অপূর্ণ রয়েছে
পুণ্য আছে পাপ আছে জানি
অপূর্ণে মজিবে কেন
সম্মুখে পাইয়া হেন
মুক্তির সুপথ,-বুঝি সেই অভাজন,
পুর্ণে না মজিয়া অল্পে শুধু ছায়া হেরি
মােহে হিয়া করে অরণ।
বিংশ সর্গ।
১৪১
অন্ত পাবক কুণ্ডে পতঙ্গ পড়িলে
পুড়িয়া কতক্ষণ থাকে ?
পুণ্যবলে পাপ ধ্বংশ,
লুপ্ত কোরেশের বংশ,
অবশিষ্ট নত শির, ইসলাম-চরণে,
কোথা আবু সুফিয়ান-কোথায় জেহেল
কার সাধ্য সত্য বিনাশনে ?
পশি জতুগৃহে যদি কোন ভ্রান্ত নয়
অনল-সংযােগ করে তায় ;
মুহূর্তে সে দহে যথা
ইসলামে বিধর্মী তথা,
পুড়েছে কর্মের দোষে, জীবন সঁপিয়া
অথবা গিয়াছে ফিরি কোন সাধুজন
নিদানের অমৃত পিয়িয়া।
নির্বাপিত কালানল পতিত কোরেশী
লভিলেক নূতন জীবন ;
নবালােকে সুফিয়ান
লভিল নুতন প্রাণ,
খালেদ মাতিল প্রেমে আত্ম বিকাইয়া,
ইম লভিল রাজ্য দোর্দণ্ড প্রতাপে
বিভাসিল ইরাণ সিরিয়া!
মহাসিন্ধু প্রশান্তের পুণ্য তীরদেশে
অঙ্কুরিত হয়েছিল যাহা ।-
ভূ-মধ্য করিয়া জয়
আজি রে জগতময়,
১৪২ পরিত্র। খাইয়াছে হুহুঙ্কারি সেই সে ইসলাম, এ ধৰ্ম্ম অসার নহে দে রে বুঝিয়া, এই সত্য-সরল-নিষ্কাম। দুর্দান্ত বেদুইন-জাতি মাতিল ইসলামে ব্ৰতশেষ হ’ল মােসমের ;- ইসলাম বসন্তরাজ্য, মহম্মদ চির-পূজ্য কোকিল সে কাননের, মধুর সঙ্গীত যতদিন চন্দ্র-সূর্য যতদিন ধরা ততদিন হবে যশ-গীত। জবল, আরফাত মাঝে যেই তক্ষণে দেখা দিয়ে সত্যের পথিক- সুমিষ্ট বচনে তুমি ধর্মকথামৃত ভাষি করিলা মক্কায় শেষ উপদেশ দান, হইল আকাশ-বাণী “আজি হতে সথে ধৰ্ম্ম তব করিনু পূরণ ! , ছত্রে ছত্রে বিশ্ব-কাব্য করিয়া মন্থন পাইয়াছি ইসলামে অমৃত ; শত রসে শত ছন্দে মৃদু-মন্দ গীত-গন্ধে করুণা দিয়েছে ঢালি পাপ-দগ্ধ বুকে, পারের ভরসা পেয়ে প্রবাসী আমরা নিশিদিন জাগি সুখে-দুঃখে !
বিংশ সর্গ। ১৪ আননেপঞ্চমে পিক গাহুক স্বরে পাপীর হইল পরিত্রাণ- মাটীতে মিশাল মাটী সত্য যা রহিল খাটি, কোরেশীর পূজনীয় হইল বিনাশ, ইসলাম হইল সেতু তরিতে এ নদী বাড়ি গেল প্রেমের পিয়াস। পর্বতে-কাননে কিম্বা জলে-স্থলে অই হেয় উড়ে গৌরব-কেতন সাধিতে খরার হিত উঠিছে মঙ্গল গীত- একতা সেখানে শুধু-শান্তি নিকেতনে আয় রে এম নর-ভাই ভাই মিলি নমি আজি এফের সদনে। ভ্রমে দৈন্তে পথভ্রান্ত সংসার-সাগরে ধরিয়াছি ইসলাম তরণী ; সত্যে যেন থাকে মতি সেবকের এ মিনতি, আলােকে-আলােকে যেন হয় অবসান, ও রাজীব পদ-তলে, কালিমা অভাগার করে পরিত্রাণ!
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.