Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Dharmatattwa-baridhi

Chakraborty,karalicharan · 2010/04/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

একad
ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি।
---
।
bird. a365
---
শ্ৰীকরালীচরণ চক্রবর্তী।
NUCUJULUI
##c।
c

No text on this page.

ধৰ্ম্মতত্ত্ব বারিধি।
করালীচরণ চক্রবর্তী,
কলিকাতা
১৪নং মদন বড়ালের লেন, বহুবাজার, “লীলা প্রিন্টিং ওয়ার্ক
যন্ত্রে মাণিকচন্দ্র ঘােষ কর্তৃক মুদ্রিত,
এবং এখােড়া-সীতারামপুর হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।
সন ১৩২ সাল।
মুল্য ॥ অানা মাত্র।

E D,1890.
CALCUTTA
PRINTING
WORKS
*

ও দুর্গা শরণং।
উৎসর্গ-পত্র।
পরমারাধ্য পরমপূজনীয় অকিাচরণ,
দেবশর্মণঃ
পিতৃদেবস্য শ্রীচরণকমলেষু-
“পিতা ধর্মঃ পিতা স্বর্গঃ পিতাহি পরমং তপঃ।
পিতরি প্রতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ।”
পিতৃদেব!
সংসাব-মােহে সমাচ্ছন্ন থাকিয়া এ অধম শ্রীচরণের সেবা করিতে
অবকাশ পায় নাই। সেই চিন্তায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া অস্থির হইয়া
পড়িয়াছি। কিন্তু কৰ্ম্মাবলম্বনই অস্থির মনের স্থিরতা সম্পাদনের
প্রধান উপায়। সেইজন্য ঋষি-প্রণােদিত সনাতন নিয়মের উপর চিরন্তন
ধারণা দ্বারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়! যে প্রত্যক্ষ দেবতার কৃপায় সংসারক্ষেত্রে
ভাসিয়া বেড়াইতেছি, সেই পরব্রহ্মরূপী পিতৃদেবের শ্রীচরণে সতত
যুক্ত থাকিয়া, এ অধমের অনিত্য পৌরুষেয় জ্ঞান সত্তেও সেই নিতা:
জ্ঞান প্রসূত সৰ্বধৰ্ম্মের প্রসূতিস্বরূপ হিন্দুধৰ্ম্মমূলক এই গ্রন্থ প্রকাশিত
করিয়া, সেই পরমারাধ্য শ্রীপাদপদ্মের উদ্দেশেঅৰ্পণ করিলাম।
দীন হীন সন্তান,
এখড়া-সীতারামপুৰ। }করালাভৰণচক্রবর্তী।

No text on this page.

নিবেদন। এই পাপপ-কলুষিত কলিযুগে হিন্দুধৰ্ম্মের বিষয়ে নূতন কিছু বলিবার বাসনা মাদৃশ হীনজনের পক্ষে বাতুলতা মাত্র। হিন্দুধৰ্ম্মের স্তম্ভম্বরূপ বহু বহু আৰ্য ঋষিগণ কর্তৃক যে সকল তত্ত্ব বিশদরূপে ব্যাখাত হইয়াছে, সেই সকল পুরাতন কথার পুনরাবৃত্তি ভিন্ন নূতন করিয়া কিছু বলিবার শক্তি বা সামর্থ্য কোথায় ? সামান্য শিক্ষায় স্বীয় অনুভবলব্ধ নূতন প্রথায় বা নূতন কথায় এ ধৰ্ম্মের আলােচনা কেহ কখনও করেন নাই বা করিতে পারিবেন না। সেই শান্তধৰ্ম্ম, যাহা নিত্যজ্ঞানপ্রসূত, তাহা কখন এ অধমের অনিত্য পৌরুষেয় সামান্য বিদ্যার দ্বারা আলােচিত হইতে পারে না, ইহা স্বতঃসিদ্ধ। যাহারা পূর্ণজ্ঞানী, ধর্মের উপর চিরন্তন বিশ্বাস ও প্রকৃত অধ্যবসায় দ্বারা যাহাৱা ধৰ্ম্মতত্ত্ব উপলব্ধ করিতে পারিয়াছেন, সেই মহাপুরুষগণের দ্বারা যাহা সৰ্ব্বধৰ্ম্মপ্রসূতিস্বরূপ সনাতন হিন্দুধৰ্ম্ম বলিয়া কীৰ্তিত হইয়াছে, সেই গ্রন্থ সমূহের যথাসাধ্য সংগৃহীত উপকরণের ভিত্তির উপর এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানি লিখিত হইয়াছে। অল্প-বাগ্বিভব-শক্তি আমি যে বিষয় চিত্তে পরিপােষণ করিয়াছি, তাহার গুঢ় অভিপ্রায় অনুধাবন করিতে বা বুঝাইতে আমি সম্পূর্ণ অক্ষম, তাহা আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি। সেইজন্য ভগবান্ শঙ্করাচাৰ্য, উপনিষদ স্বরূপ গীতা, যােগবাশিষ্ঠ, তন্ত্র ইত্যাদির মৰ্ম্মানুবাদ অনেক যশস্বী মনীষীদিগের কৃত গ্রন্থ হইতে উদ্ধত করিয়াছি; তাঁহারা আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমি অতি কৃতজ্ঞতার সহিত প্রকাশ করিতেছি যে, পঞ্চকোট- মহারাজের মহামান্য সভাপণ্ডিত পূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য্য স্মৃতিকণ্ঠ, মান্যবর উদারচেতা সাহিত্যসেবী ঐতিহাসিক-বিশারদ শ্ৰীযুক্ত নিখিলনাথ রায়, বি, এল, ও স্বনামধন্য “দৈনিক চন্দ্রিকা” ও “হিন্দুস্থানের ( ২ ) সুযােগ্য সম্পাদক বিদ্ব-প্রবর শ্রীযুক্ত হরিদাস দত্ত কবিভূষণ মহাশয়গণ কৃপা করিয়া আমার পুস্তকখানি দেখিয়া দিয়াছেন। তাহাদের নিকট আমি চিরঋণে আবদ্ধ রহিলাম । নানাকার্যে ব্যস্ততা প্রযুক্ত অনেক স্থানে মুদ্রাক্ষন-প্রমাদ অনিবায্য- রূপে বহিয়া গেল ; তাহা দ্বিতীয় সংস্করণে সংশােধনের বাসনা রহিল । ; একান্ত বিনয়াবনত, এখােড়া, সীতারামপুব, বর্ধমান। ২রা আশ্বিন, ১৩৯ সাল। ' করালীচরণ চক্রবর্তী সূচীপত্র ০ ০ , ১৪ ০ ০ ০ ৩২ ৪৭ ৬৭ প্রথম পরিচ্ছেদ –উপক্রমণিকা দ্বিতীয় -জগৎলক্ষ্মীর বিকাশ সংসার-ধৰ্ম্ম তৃতীয় জীব চতুর্থ মানুষের স্বরূপ পঞ্চম --আমি কে তুমি কে, মুক্তি ও বন্ধন নষ্ট --কৰ্ম্ম সপ্তম জাতিভেদ অষ্টম -আত্মতত্ত্ব নবম বেদ ও পুরাণ —সাকার উপাসনার তাৎপর্য --বহুমূৰ্ত্তির প্রয়ােজনীয়তা একাদশ -সাকার উপাসনা কাহাদের জন্য দ্বাদশ ---- গুরুকবণের আবশ্যক তা --মন্ত্রগ্রহণের তাৎপৰ্য্য -সাকার উপাসনার অধ্যাত্ম-তত্ব চতুর্দশ উপায় উদ্ভাবন পঞ্চদশ -~-কৰ্তব্য ১০৫ . . ১০৮ ১১ এয়ােদশ, ।

নিম্নলিখিত গ্রন্থসমূহ হইতে এই পুস্তকের প্রণয়নে
সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি।
১। শ্রীমদ্ভাগীতা। (মাননীয় পাত্র মহাশয় ও পূজনীয় বঙ্কিম বাবু
• দ্বারা ব্যাখ্যাত।)
২। শান্তি গীতা ও ভগবতী গীতা
৩। শঙ্করাচাৰ্য গ্রন্থাবলী ।
৪। যােগবাশিষ্ঠ ( পূজনীয় পঞ্চানন তর্করত্ন দ্বারা অনুবাদিত।
৫। যােগতত্ত্ববারিধি।
৮। হিন্দুধৰ্ম্ম মম।
৭। হিন্দুধয়ত।
৮। সনাতন ধর্মশিক্ষা।
৯। ভক্তিসাধন।
১০। কাঠোপনিষদ ।
১১। মনুসংহিতা।
১২। তত্ত্বজ্ঞানােপদেশ।
১৩। স্বামী বিবেকানন্দের জ্ঞানযােগ ।
ভক্তিযােগ।
রাজুযােগ।
১৬। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত।
১৭। উৎসব পত্রিকা।
১৮। ব্রাহ্মণসমাজ পত্রিকা।
১৯। ত্রিশূল পত্রিকা, ইত্যাদি।
শীকরালীচরণ চক্রবর্তী।
১৪।
ঐ

willwall Wazhts are ধম্মতত্ত্ববারিধি। প্রথম পরিচ্ছেদ। উপক্রমণিকা। শিষ্য। আপনার নিকট ধর্মসম্বন্ধে উপদেশ লইতে আকাঙ্খা হইতেছে; অতএব আৰ্যশাস্ত্রে তত্ত্ব-বিষয়ের প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও জ্বলন্ত নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও কেন মানব তাহা বুঝিতে পারে না, এবং কেনই বা তৎসাধনে যত্নবান হয় না, তাহা আমাকে বুঝাইয়া দিন গুরু। বংস! তােমার ঐ সব প্রশ্ন শুনিয়া পরম আহলাদিত হইলাম। তােতমাকে সংক্ষেপে জানাইতেছি, মন দিয়া শ্রবণ কর। ( যােবাশিষ্ঠ-স্থিত-প্রকরণ, দ্বিচারিংশ দর্প। “সৰ্ব্ব-ব্যাপী অনাময় অনাদি ভ্রান্তিশূন্য অনন্ত ব্রহ্মের যে চিৎ-প্রতিবিম্ব, সেই চিৎ-প্রতিম্বরূপ সােপাধিক একদেশ হইতে চিৎস্পন্দই তরঙ্গ- কনে শশান সাগরের প্রায় ঘনীত প্রাপ্ত হয়। যেমন সাগরের ধর্মতত্ত্বরিধি। অন্তর্গত সলিল স্পন্দহীন হইলে স্পন্দধৰ্ম্মী হয়, তেমনি আত্মার সমগ্র শক্তি প্রথমে স্পনশক্তিতে পরিণত হয়। যেমন গগনতলে সমীরণ আপনিই আপনাতে প্রবহমান হয়, সেইরূপ আত্মা আপনাতেই--আপন শক্তিতে-ঐরূপ স্পন্দভাব প্রাপ্ত হয়। যেমন নিশ্চল দীপ স্বীয় শিখার স্পন্দশক্তি দ্বারাই উর্ধ্বদেশগামী হয়, ঐ আত্মাই তদ্রুপ স্বশরীরে স্পন্দ- শক্তি প্রকাশ করেন। সাগর যেমন জলমধ্যে সলিলের উল্লাসে চঞ্চল হয়, সর্বশক্তিমান আত্মাও তেমনি স্বীয় শরীরে স্পন্দধৰ্মী হন। যেমন শারদীয় আতপপুঞ্জে জলনিধি দ্রবীভূত কনকবৎ প্রতীয়মান হয়, তেমনি চিৎসাগর আত্মাতে পরি দ্বারা ইন্দ্রিয় প্রকাশধৰ্ম্মী হইয়া স্ফুরিত হন। যেমন অতীন্দ্রিয় নভােমার্গে মুক্তস্পন্দ দৃষ্টিগােচর হয়, তেমনি মহাচিদাকাশে চিতিশক্তির আকৃতি উল্লসিত হয়। মহাচিদাকাশে সেই চিতিশক্তি কিঞ্চিৎ ক্ষুভিতরূপ হইলেও সাগরে তরঙ্গমালাবৎ অচ্ছচিন্ময়ীই হইয়া থাকে। (বাস্তবিক রূপান্তর হয়।) চিতিশক্তি আত্মা হইতে পৃথক্ না হইলেও পৃথকভূত বলিয়া বােধ হয়। সূচ্যাদি কঠোরগত আলোক যেমন সাধারণ হইলেও, পৃথক একটু ক্ষুদ্রালােক বলিয়া বােধ হয়, ঐ চিতিশক্তিই তদ্রুপ উপাধির অধীন হইয়া পৃথভূত (পরিচ্ছিন্ন ) সেই চিৎশক্তি সর্বশক্তিমতী হইয়া ক্ষণকাল স্ফরিত হইতে থাকে ; তাহার পর চন্দ্রকলার পর চন্দ্রকলার শৈত্যপ্রকাশবৎ স্বকীয় শক্তি প্রকাশ করে এই প্রকাশখ্য চিতিশক্তি পরমাত্মা হইতেই সমুদিত হইয়াছে। দেশ, কাল ও ক্রিয়ার শক্তিও সেই চিতিশক্তি হইতে সমুদ্ভূত হয়। এই চিতিশক্তি স্বীয় স্বভাবের জ্ঞান লাভ করিতে পারিলে আদ্যন্তবিহীন পরমপদেই অবস্থিতি করে। যদি উহার স্ব-স্বভাব জ্ঞান না থাকে, তাহা হইলে স্ব-স্বভাবকে ভ্রান্তিবশতঃ উক্তরূপ কল্পনা করিয়া পরিচ্ছিন্ন হইয়া থাকে। যখন ঐ চিতিশক্তি অতি-বাস্তবরূপে উক্তরূপে ভাবিত হয়, তখন নাম ও সংখ্যাদি ও প্রথম পরিচ্ছেদ। আসিয়া উহার অনুগামিনী হয়। সৎস্বরূপ আত্মা হইতে বিভিন্ন কল্পনা যখন অসতী, তখন সমুদ্রের উৰ্ম্মিবং চিতে কল্পিত সকল কল্পনাই সেই বিশুদ্ধ চিৎই। কটক ও কেয়ূরাদিরূপে যেমন সুবর্ণের বৈলক্ষণ্য, জগদ্ধপে ভাবিত চিতি ও আত্মাতেও পুরস্পর তেমনি বৈলক্ষণ্য ; ফলত এই জগাব অাত্মার অংশিক মাত্র। স্ব-সস্তৃত দীপান্তরের দীপের পার্থক্য যেমন, দেশ কাল ও অবয়বভেদে আত্মা ও চিদাভাসের পার্থক্যও তদ্রুপ। ঐ চিতি দেশ, কাল ও স্পন্দশক্তি দ্বারা উদ্দীপিত হইয়া সঙ্কল্পানুগামিনী হওয়ায় দৃশ্য জগদাকার ধারণ করেন। মহাবাহহ! বিকল্পবলে সাকার এবং দেশ, কাল ও ক্রিয়ার আশ্রয় চিতির যে রূপ, তাহাকেই ক্ষেত্র বলা হইয়া থাকে। ক্ষেত্ৰশব্দে শরীর ; ঐ চৈতন্য উক্তবিধ বহি ও অভ্যন্তর শরীরকে অখণ্ডিতভাবে জ্ঞান করেন বলিয়া ক্ষেত্রজ্ঞ নামে অভিহিত হন। সেই ক্ষেত্রজ্ঞ বাসনার অনুবর্তী হইয়া অহঙ্কারত্ব প্রাপ্ত হন। ঐ অহঙ্কার অধ্যাবসায়পর হইয়া অন্যবিধ কল্পনারূপ কলঙ্কে আক্রান্ত হইলে, বুদ্ধিপদবাচ্য হইয়া থাকে। সঙ্কল্পাক্রান্ত বুদ্ধি তাহার পর মনঃপদ প্রাপ্ত হয় ; ঐ মনও ঘনীভূত বিকল্পবলে ক্রমে ইন্দ্রিয়ভাব ধারণ করে। ঐ ইন্দ্রিয় তৎপরে হস্তপাদময় দেহরূপে পরিণত হয়, ইহা বুধগণ অবগত আছেন। ঐ দেহ লৌকিক জ্ঞানের বিষয় হইয়া প্রসূত ও জীবভাব প্রাপ্ত হয়। চিতি এইরূপে জীবভাব প্রাপ্ত হইয়া ক্রমে সঙ্কল ও বাসনারূপ রঞ্জু দ্বারা বেষ্টিত ও দুঃখ- জালে জড়িত হইয়া চিত্তভাব ধারণ করে। যেমন বদরী প্রভৃতি ফল ক্রমে পরিপক্ক হইয়া কেবল রূপসাদিগুণের পরিবর্তনরূপ অবস্থাভেদে পূর্ব- বৈলক্ষণ প্রাপ্ত হয়, আকৃতিগত কোন বৈলক্ষণ্য হয় না, তেমনি জীবও অবিদ্যামলের পরিণমি বশতঃই বৈলক্ষণ প্রাপ্ত হয় ; চিৎস্বভাব সেই একই থাকে ; কারণ তাহা, পরিণমনশীল নহে। জীব সঙ্কল্পবলে অহঙ্কারধর্ম প্রাপ্ত হয় ; সেই অহঙ্কার বুদ্ধিরূপে পরিণত হয়; সেই বুদ্ধি আবাব ধর্মতত্ত্ববারিধি। ; সঙ্কল্পবলে মনােৰূপে পরিণত হয়। সঙ্কল্পময় ঐ মন আকৃতিগ্রহণে তৎপর এবং সসীম তুচ্ছবিষয়ে আসক্ত হয়। তাহার পরে নদী যেমন সাগরের প্রতি অনুধাবিত হয় এবং গাভী যেমন উন্মাদবৃষের অনুগামিনী হয়, তেমনি ইচ্ছা প্রভৃতি শক্তি অনুধাবিত হইয়া ঐ চিত্তকে দূষিত করে। এইরূপ শক্তিসম্পন্ন হইলে চিত্তের অহঙ্কার ক্রমে ঘনীভাব প্রাপ্ত হয় ; তখন ঐ চিত্ত স্বেচ্ছামেই কোষকার-কীটের ন্যায় বন্ধন প্রাপ্ত হয়। হায় কি কষ্ট। আত্মা আপন-দোষেই স্বকীয় সঙ্কল্প অনুসন্ধান করত জালদ্বারা মৃগের ন্যায় বন্ধ হইয়া পরিতাপ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। তখন তিনি যথার্থরূপে অবলােকন করেন, “আমি বদ্ধ হইয়াছি” ; সুতরাং তথন তাহার বিদ্যাতত্ত্ব (পারমার্থিক আত্মরূপ) থাকে না। তাহা হইতে তখন জগৎরূপ জঙ্গলের রাক্ষসীস্বরূপা অবিদ্যা (জন্মজরাদিভ্রান্তি) উৎপন্ন হইতে থাকে। তখন ঐ আত্মরূপী মন, স্বকল্পিত শব্দাদি বিষয়জালরূপ বহিজালার মধ্যবর্তী হইয়া, নিগড়বদ্ধ কেশরীর ন্যায় নিতান্ত বিবশ হইয়া পড়েন ; বাসনাবশে বিচিত্র কাৰ্য্যসমূহের কর্তা ইন, এবং আপন ইচ্ছায় রচিত বিবিধ দশার অনুবর্তী হইয়া আরও বিবশ হইয়া পড়েন। মননাদি বিভিন্ন বৃত্তির অনুসারে কখন মন, কখন বুদ্ধি, কখন জ্ঞান, কখন ক্রিয়া, কখন অহঙ্কার, কখন পুৰ্য্যষ্টক, কখন প্রকৃতি, কখন মায়া, কখন মল, কখন কৰ্ম্ম, কখন বন্ধ, কখন চিত্ত, কখন অবিদ্যা ও কখন ইচ্ছারূপে অবস্থিত হন। হে রাঘব ! সেই এই চিত্তই . আবদ্ধ, দুঃখিত, তৃষ্ণাশােকাক্রান্ত ও রাগ- ভূমি হইয়া বিস্তৃত হন। ঐ চিত্তই জরা, মৃত্যু, মােহের অন্তভূত ভাবনায় ব্যথিত হন। চেষ্টা ও নিশ্চেষ্টতায় আক্রান্ত ও অবিদ্যারাগে রঞ্জিত হন। কৰ্ম্মরূপ তরুবনের, অঙ্কুর ইচ্ছাবিকৃত ঐ চিত্ত, স্বীয় উৎপত্তির হেতুভূত আত্মপদ বিস্মৃত হইয়া, কল্পনাপ্রসূত, অনর্থের হেতু হয়। -কীটের ন্যায় বন্ধন প্রাপ্ত হইয়া চিত্ত শােকাকারে পরিণত প্রথম পরিচ্ছেদ। হয় ; শব্দাদি তন্মাত্ৰসমূহ উহার অবয়বস্বরূপ ; ঐ চিত্ত অনন্ত নরক- রৌদ্রে জর্জরিত হইয়া থাকে। আত্মার উহা অনাত্মরূপে দৃশ্য হইলেও ঐ চিত্ত এতই দুৰ্ব্বিবেকে আচ্ছন্ন হইয়া দুৰ্দ্ধর হয় যে, উহা বৃহৎ পৰ্বত- সম গুরু ও ভয়াবহ হইয়া উঠে। ঐ চিত্তই জরামৃত্যুরূপ-শাখাপরিবৃত সংসার-বিষবৃক্ষ। যেমন ক্ষুদ্রবীজমধ্যে প্রকাও বটবৃক্ষ অবস্থিত থাকে, তেমনি অশাপাশবিধানকারী ফলবিহীন এই নিখিল সংসার ঐ চিন্তমধ্যে অবস্থিত থাকে। ঐ চিত্ত চিন্তারূপ অনলের শিখায় দগ্ধ ; কোনরূপ অজগরকতৃক চৰ্বিত ও কামসমুদ্রের তরঙ্গে আহত হইয়া আত্মরূপ পিতামহকে (মূলকারণকে) বিস্মৃত হইয়া যায়, এবং যুথ- ভ্রষ্ট হরিণের ন্যায় শােকে বিলুপ্তচৈতন্য ও বিষয়ানলে পতঙ্গবৎ দগ্ধ হইতে থাকে। ছিন্নমূল কমলের ন্যায় ঐ চিত্ত সাতিশয় ম্লানি প্রাপ্ত হয়। ঐ চিত্ত যখন স্বীয় নিবাসস্বরূপ এক দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তত্তদ্দেহবিশেষের বিচ্ছেদে নিতান্ত কাতর হয়; এবং বিষয়, দেহ, ও ইন্দ্রিয় প্রভৃতি বিচিত্র শত্রুগণমধ্যে কেমন বিশ্বস্ত হইয়া বাস ঐ চিত্ত এবংবিধ বিবিধ সঙ্কটদশায় বিলুষ্ঠিত হইয়া থাকে। হে অমবােপম! তােমার মন স্বীয় বন্ধনহেতু দেহাদিতে আস্থাবান্ হইয়া সমুদ্রপতিত পক্ষীর ন্যায় বিষম দুঃখে মগ্ন আছে। মন যে জগজ্জালে জড়িত আছে, বাস্তবিক ঐ জগৎ গন্ধৰ্বনগরবৎ শূন্য ; অতএব তুমি বিষয়বিদ্রুত তুচ্ছ অনুরাগ-সাগরে ভাসমান মনকে কর্দমপতিত মাতঙ্গবৎ উদ্ধার কর। হে রাম! মন এক্ষণে বলীবর্দবৎ কাম- পলে অমগ্ন রহিয়াছে, উহার অঙ্গ জীর্ণ-শীর্ণ হইয়া গিয়াছে ; অতএব উহাকে বলপূৰ্ব্বক উদ্ধার কর। শুভ ও অশুভ কৰ্ম্মসমূহ দ্বারা মলিনাকাত, উদ্দীপ্তজরা, মৃত্যু ও বিষাদে মুচ্ছিত মনে যাহার কিছুমাত্র ব্যথা নাই, হে রাম! এই জগতে সেই ব্যক্তি মনুষ্যাকৃতি রাক্ষস ”। ;

ধর্মতত্ত্ববারিধি।
বৎস! মনুষ্যের ধর্মই বিশেষত্ব :—
আহারনিদ্রাভয়মৈথুনঞ্চ
সামান্তমেতৎ পশুভির্ণরানাম।
ধৰ্ম্মোহি তেষামধিকো বিশেষে
ধৰ্ম্মেণ হীনাঃ পশুভিঃ সমান।।
এক এব সুহৃদ্ধৰ্ম্মো নিধনেপ্যনুযাতি যঃ।
শরীরেণ সমং নাশং সৰ্বমন্যত্ত গচ্ছতি ॥
আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন (কাম), এই চারিটি—পশু এবং মনুষ্য
এই উভয়জাতীয় জীবেরই সাধারণ ধৰ্ম্ম। কেবল মনুষ্যের ধর্মই
বিশেষত্ব। ধর্মহীন মনুষ্য পশুতুল্য ৪
ধৰ্ম্মই একমাত্র সুহৃৎ, কারণ উহা মৃত্যুর পরেও অনুগমন করে,
আর সমস্ত শরীরনাশের সমকালে বিলয় প্রাপ্ত হয়।
বৎস! সর্বভূতে সমদৃষ্টি, সৰ্ব্বভূতের হিতসাধন, ও সৰ্ব্বভূতে আত্মবৎ
জ্ঞান করাই ধৰ্ম্মের মুখ্য উদ্দেশ্য। কারণ, শাস্ত্রে আছে,
একস্তথা সৰ্ব্বভূতান্তরাত্মা
রূপং রূপং প্রতিরূপাে বভূব।
সেই এক তিনি (ব্ৰহ্ম) সৰ্ব্বভূত অন্তরাত্ম হয়ে নানারূপে বহু
হয়ে বিরাজ করিতেছেন।
স্বামী বিবেকানন্দ বলিয়াছেন—
“আত্মমাত্রেই অব্যক্ত ব্ৰহ্ম”।
“বাহ ও অন্তঃপ্রকৃতি বশীভূত করিয়া আত্মার এই ব্রহ্মভাব ব্যক্ত
করাই জীবের চরম লক্ষ্য।”
কৰ্ম্ম, উপাসনা, মনঃসংযম অথবা জ্ঞান,—ইহার মধ্যে এক, একাধিক
বা সকল উপায়গুলির দ্বারা আপনার ব্রহ্মভাব ব্যক্ত কর ও মুক্ত হও,

প্রথম পরিচ্ছেদ। ইহাই ধর্মের পূর্ণাঙ্গ। মত, অনুষ্ঠান, পদ্ধতি, শাস্ত্র, মন্দির বা অন্য বাহক্রিয়াকলাপ উহার গৌণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মাত্র।” মহাত্মা রামমােহন রায় লিখিয়াছেন :- “এই প্রত্যক্ষ দৃশ্যমান যে জগৎ, ইহার, কারণ ও নিৰ্বাহকর্তা পরমেশ্বর ;-শাস্ত্ৰত ও যুক্তিতঃ এইরূপ যে চিন্তন, . তাহাই পরমেশ্বরের উপাসনা। ইন্দ্রিয়-দমনে ও প্রণব-উপনিষদাদি বেদাভ্যাসে যত্ন করা এ উপাসনায় আবশ্যক হয়। ইন্দ্রিয়দমনে যত্ন অর্থাৎ জ্ঞানেন্দ্রিয়, কৰ্ম্মেন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণে এরূপে নিয়ােগ করিতে যত্ন করিবেন যাহাতে আপনার বিঘ্ন ও পরের অনিষ্ট না হইয়া স্বীয় ও পরের অভীষ্ট জন্মে। বস্তুতঃ, যে ব্যবহারকে আপনার প্রতি অযােগ্য জানেন, তাহা অন্যের প্রতিও অযােগ্য জানিয়া, তদনুরূপ ব্যবহার করিতে যত্ন করিবেন। প্রণব-উপনিষদাদি বেদাভ্যাসে যত্ন অর্থাৎ আমাদের অভ্যাসসি ইহা হইয়াছে যে, শব্দের অবলম্বন বিনা অর্থের অবগতি হয় না ; অতএব পরমাত্মার প্রতিপাদক প্রণব, ব্যাহৃতি, গায়ত্রী ও শ্রুতি স্মৃতি-তন্ত্রাদির অবলম্বন দ্বারা তদর্থ যে পরমাত্মা তঁাহার চিন্তন করিবেন, এবং অগ্নি, বায়ু, সূৰ্য্য, ইহাদের হইতে ক্ষণে ক্ষণে যে উপকার হইতেছে, আর ব্রীহি, যব, ওষধি ও ফলমূল ইআদি বস্তুর দ্বারা যে উপকার জন্মিতেছে, সে সকল পরমেশ্বরাধীন হয়, এই প্রকার অর্থ-প্রতি- পাদক শব্দের অনুশীলন ও যুক্তি দ্বারা সেই সেই অর্থকে দাড় করিবেন। ব্রহ্মবিদ্যার আধার সত্যকথন, ইহা পুনঃ পুনঃ বেদে কহিয়াছেন; অতএব সত্যের অবলম্বন, করিবেন, যাহাতে সত্য যে পরব্রহ্ম তঁাহার উপাসনায় সমর্থ হন।” কিন্তু বৎস! মানব অবিদ্যামালিন্যে প্ৰদূষিত ও স্বাভাবিক চাঞ্চল্যে বিচলিত হইয়া প্রকৃততত্ত্ব একেবারেই ভুলিয়া গিয়া, এক মহাস্বেচ্ছাচারী হইয়া যায়, এবং কামনার প্রভাবে লক্ষ লক্ষ মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, পরপীড়ন, ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। দ্বেষ ও হিংসাসম্বন্ধিনী প্রবৃত্তির প্রশ্রয় দিতে কিছুমাত্র ব্যাকুলিত হয় না। বৎস আজ কাল দেশ-কাল-পাত্র অনুসারে প্রকৃত শিক্ষার অভাবে মানব- গণকে নিজের বুদ্ধিদোষে আপন আপন কৰ্ম্মত্যাগ করিয়া, আমােদ আহলাদে ও বাহ্যবস্তু এবং সুখ-ঐশ্বর্যে মুগ্ধ থাকিতে দেখা যাইতেছে ; এবং ক্রমশঃ তাহার অনুসরণ করিয়া নিজেদের সর্বনাশ সাধন করিতেছে, বিকৃত-প্রকৃতি-বশে আমাদের পূর্বপুরুষগণের উপদেশ ও তাহাদের প্রতিষ্ঠিত আরাধ্য দেবতার উপর ভক্তি অনুরাগ প্রায়ই লােপ করিয়া দিয়াছে। বৎস! এই অনৈসর্গিক ঘটনার কারণ—কেবল প্রকৃত শিক্ষার অভাব। নানারূপ গ্রন্থ পাঠ করিয়া তাহার সম্পূর্ণ উৎকর্ষতা সাধনকে প্রকৃত শিক্ষা বলে। কি উপায়ে কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ ইত্যাদি বিদূরিত হইবে, কি উপায়ে নিৰ্বাতদীপশিখাসদৃশ মনের সম্পূর্ণ একাগ্রতা সম্পাদিত হইবে, কি উপায়ে প্রকৃত আত্মগ্লানি ও নিৰ্বেদ উপস্থিত হইবে, সেই সব বিষয় উপদেষ্টার নিকট উপদেশ গ্রহণ করিয়া তাহার সম্পূর্ণ উৎকর্ষ সাধন করাই প্রকৃত শিক্ষা। জ্ঞান না হইলে মুক্তি নাই। অতএব চিত্তের একাগ্রতা ও সহিষ্ণুতা সাধন করিয়া জ্ঞান উপার্জন করা একান্ত বিধেয়। সৰ্ব্বদা আমােদ-আহলাদে এবংবাহ্যবস্তুর ও সভ্যতার সুখ-ঐশ্বর্যে বিমুগ্ধ থাকিয়া, কিসে আত্মােন্নতি হইবে, আলস্য পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক তাহার বিহিত অনুষ্ঠানে ব্রতী হওয়া একান্ত কর্তব্য ; এবং বিষয়াসক্ত ইন্দ্রিয়গণের আজ্ঞাবহ না হইয়া, গীত-বিনিহিত পরমতত্ত্বের অমিয়মিশ্রিত জ্ঞান অনু- ভব করা একান্ত কর্তব্য। স্বামী বিবেকানন্দ র্তাহার জ্ঞানযােগে যাহা উপদেশ দিয়াছেন, তাহা বলিতেছি :- “সত্য কিবা, তারা জানে না কখন, সদাই যাহারা দেখয়ে স্বপন।

প্রথম পরিচ্ছেদ। পিতামাতা জায়া তাপত্য বান্ধব আত্মা ত কখনও নহে এই সব। নাহিক ত তাহে কোন লিঙ্গালিঙ্গ ভেদ, নাহিক জনম, নাহি খেদাখেন। কার পিতা তবে কাহার সন্তান, কার বন্ধু, শত্রু কাহার ধীমান । একমাত্র যেবা যেবা সময়, তাহা বিনা কোন অস্তিত্বই নয়। তত্ত্বমসি ওহে সন্নাসিপ্রবর, উচ্চ রবে তাই এই তান ধর। বৎস! মানব যে স্ত্রী পুত্র ভাই-বন্ধুদের সুখ-ঐশ্বর্যের জন্য এবং নিজের স্বার্থের লালসায় লক্ষ লক্ষ মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, পরপীড়ন, দ্বেষ হিংসা-সম্বন্ধিনী প্রবৃত্তির প্রশ্রয় দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হইতেছে না, কিন্তু তাহারা কে এবং তাহাদের পুত্রকলত্রাদিই বা কে, এবং কি জন্যই বা এই দুল্লভ মানবজন্ম ধারণ করিয়াছে, তাহা কি তাহারা এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করিতেছে ? তাহারা যে, কতক দিবসের জন্য পথের সহচর মাত্র, তাহা কি কেহ এক দিনের জন্য ভাবিয়াছে ? বৎস! যাহারা তাহাদের শরদিন্দুনিভাননা পত্নী, আদরিণী কন্যা, এবং প্রাণসম পুত্রকে এক মুহূর্তও কাছছাড়া করিতে চাহে না, অপরিহার্য ও অনিবাৰ্য রােগ-শােকে জর্জরিত হইলে, বল দেখি, তাহারা মৃত্যুর পর কোন উপকার করিতে পারে কি? তাহাদের জন্য উহারা কি বিন্দুমাত্র চিন্তিত হয় ? সেই প্রাণসন স্ত্রীপুত্রাদি তাহাদের মৃত্যুর সময় অতিনিকট দেখিয়া, তাহাদের সান্ত্বনা দেওয়া দূরে থাক, তখন অশান্তিপ্রদানে রত থাকিবে। কোথায় তাহারা অর্থ রাখিয়াছে, অন্য ৫ * ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। কোন ব্যক্তির নিকট কিছু প্রাপ্য অছে কি না, সেই বিষয়ের অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকিবে। তাহাদের দেহে মূল্যবান বস্তু ও অলঙ্কার থাকিলে তাহা কাড়িয়া লইয়া, সেই সব জিনিষের পরিবর্তে এক অব্যবহাৰ্য্য বস্ত্র ও কম্বল প্রদান করিবে, এবং তাহাদের মৃতদেহ ঘরের বাহিরে নীত হইলে, পাছে আপনাদের ঐহিক কোন অনিষ্ট হয়, সেই আশঙ্কায় অস্থির হইয়া শবের সঙ্গে সঙ্গে গােময়ের দ্বারা গৃহ-সংশােধন করিবে। বৎস, মায়াময়ের কি বিচিত্র লীলা। এসব ঘটনাস্রোত মানবের চক্ষে প্রতিনিয়ত প্রতিবাহিত হইতেছে, তথাপি মানবগণ নিজের কর্তব্য কাৰ্য্য ভুলিয়া যায়; সংসারের সুখ, দুঃখ ও বাসনার প্রবলস্রোতে পতিত হইয়া, উহার ক্ষণমাত্র চিন্তা করিবার অবসর থাকে না। ভগবান শঙ্করাচাৰ্য বলিয়াছেন, মূঢ় জহীহি ধনাগম তৃষ্ণাং কুরু তনু বুদ্ধে মতষি বিতৃষ্টা যল্লভসে নিজকম্মোপাত্তং বিত্তং তেন বিনােদয় চিত্ত । হে মূঢ়! ধনাগমের তৃষ্ণা ত্যাগ কর। শরীরে, বুদ্ধিতে এবং মনে উহার প্রতি বিতৃষ্ণাভাব প্রদর্শন কর। তুমি নিজকৰ্ম্মফলে যাহা লাভ করিতে পার, তাহাতেই চিত্তের পরিতােষ জন্মাও। কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ সংসারােহয়মতীববিচিত্র কস্য ত্বং বা কুত আয়াতং চিন্তয় তদিদং ভ্রাতঃ। কে তােমার স্ত্রী? তােমার পুত্ৰই বা কে? এ সংসারের ব্যাপার অতি বিচিত্র। তুমি কাহার এবং কোথা হইতেই বা আসিলে? হে ভ্রাতঃ! এই নিগূঢ় তত্ত্ব চিন্তা কর । শিষ্য । আপনি যে আত্মগ্লানি ও নিৰ্বেদ উপস্থিত হওয়ার বিষয় এবং সন্ন্যাসীর গীতে আত্মা সম্বন্ধে এবং ভগবান শঙ্করাচার্যের শ্লোকে “তুমি কে,-স্ত্রী কে,” ইত্যাদি যাহা বলিলেন, আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম অতএব জগতের বিকাশ কি প্রকার, আত্মগ্লানি ও নির্বেদ প্রথম পরিচ্ছেদ। উপস্থিত কি প্রকারে হয় ও কোথায় বা কোন্ আশ্রমে হইবে, এবং আত্মগ্লানি ও নিৰ্বেদ উপস্থিত হইলে কি হয় ;—আত্ম কি, মানব কে, অর্থাৎ জীব কে, মানবের সৃষ্টি কি প্রকারে হইল, ভগবানের সহিত মানবের কি সম্বন্ধ আছে, ভগবানকে পাইতে হইলে কি কি গুণ থাকা আবশ্যক, মুক্তি কি, এবং কি প্রকারে তাহা প্রাপ্ত হওয়া যায়, মানবের কর্তব্য কাৰ্য্য কি, ইত্যাদি বিস্তারিত ভাবে বুঝাইয়া দিউন। গুরু। বৎস! ক্রমে ক্রমে তােমার মনের পরিবর্তন হইতেছে ও ধৰ্ম্ম- বিষয় জানিবার চেষ্টা করিতেছ দেখিয়া আমি পরম সন্তোষ লাভ করি- লাম। আমার এমন ক্ষমতা নাই যে, ধৰ্ম্মবিষয় বিস্তারিতভাবে বুঝাইতে পারি। যাহা হউক, তুমি যাহা যাহা জিজ্ঞাসা করিলে, সংক্ষেপে জানাইতেছি।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সংসার। গুরু। বৎস! এক্ষণে জগৎলক্ষ্মীর বিকাশ ও সংসারধৰ্ম্মের বিষয় বলিতেছি, শ্ৰকা কর। জগৎলক্ষীর বিকাশ। (যােপবাশিষ্ঠ-উৎপাত্ত-প্রকরণ, দ্বাদশ পর্গ।) “তিনি (আত্মা) আকাশ অপেক্ষা সূক্ষ্ম ও নির্মল ; তাহাতে প্রথমে যে কিছু চেত্যতার প্রকাশ হয়, সেই চেত্যজ্ঞান অহংজ্ঞান- পূৰ্ব্বক হইয়া থাকে ও তাহাতেই সকল জ্ঞান-সংস্কার হয় ও তাহাই আমাদিগের সংস্কারবিশিষ্ট চিত্তের উদ্বোধক। অনন্তর সেই চিত্ত- বৃত্তির ন্যায় বৃত্তিশালী চেতনাত্মক ব্ৰহ্মসত্তাই অনতিরিক্ত চিন্ময়ী পবম-সত্তারূপে ব্যবহৃত হন; পরে যখন তিনি চিরানুবৃত্ত ঈক্ষণ- সংবেদনবশতঃ জ্ঞানঘন হন, তখন তিনি আত্মভাব বিস্মৃত ও পরমপদ ত্যাগ করত পুনঃ সংসারােপাধিক জীবভাব প্রাপ্ত হন; জীবভাব প্রাপ্ত হইলেও তাহার ব্রহ্মভাব দূর হয় না, কারণ পূর্বোক্ত ব্ৰহ্মসত্তাই ভাবনাবিশেষ দ্বারা প্রকাশােম্মুখী হয় এবং তাহাতে তাহার কোন রূপ বিকৃতি হয় না। ঐ জীবসত্তার পরেই শূন্যতাস্বরূপিণী আকাশসত্তার আবির্ভাব হয় ; তাহাই শব্দাদিগুণের ও আকাশাদি ভাবীসংজ্ঞার কারণ। তৎপরে কালের সত্তাবধারণের সহিত জীবের অহংতা প্রভৃতি অভিমান ৫ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। জন্মিয় থাকে ; তাহাই ভাবীসৃষ্টি ও জগৎস্থিতির মূল এবং সেই পরমাত্মা হইতেই এই আত্মসংবেদ্য অসভ্ৰূপ জগৎ উৎপন্ন হইয়া সতের মত প্রকাশিত হইতেছে। এইরূপ অহংতাদিসম্বলিত সংবি—সঙ্কল্পরূপ বৃক্ষের বীজম্বরূপ। তাহার অংশ হইতেই স্পন্দনধর্মী বায়ুর উৎপত্তি হইয়াছে। সেইজন্য এই অহম্ভাববিশিষ্ট আকাশরূপ সুত্তাকে শব্দ তন্মাত্র কহে, ও তাহা হইতেই ক্রমে ক্রমে আকাশতন্মাত্র হইয়া থাকে। উক্ত শব্দ তন্মাত্রই শব্দময় বৃক্ষেরও কারণ, যে বৃক্ষ হইতে পদ, বাক্য ও প্রমাণসমন্বিত বেদনিচয় প্রকাশ পাইয়াছে। নিখিল অর্থে সমবেত শকবৃন্দে পরিণত বেদাত্মা ব্রহ্ম হইতে এই অসীম জগল্লক্ষ্মী উদয় পাইতেছে! যে সমুদায় বায়াদি ভূতচয়ের উল্লেখ হইয়াছে, তদযুক্ত চিন্ময় ব্রহ্মই জীবনামে অভিহিত হন ; ইনিই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপাদির কারণ, এবং সেই মহাবায়ু হইতেই এই চতুর্দশ ভুবন ও জরায়ুজাদি প্রাণিনিচয় সস্তৃত হইয়াছে। সেই চিৎশক্তির স্ফুরণে দেহের বিকাশ হইয়া থাকে, এবং তাহাকেই স্পৰ্শতন্মাত্র কহে, ও সেই স্পৰ্শতন্মাত্র- রূপ বৃক্ষ হইতে একোনপঞ্চাশৎ বায়ুস্কন্ধের বিস্তার হইতেছে ও সৰ্ব্বভূতের স্পন্দনকাৰ্য্য সম্পাদিত হইতেছে। তাহাতেই চিৎশক্তির বিলাসে তেজস্তম্মত্রের উৎপত্তি হইয়াছে। উক্ত তন্মাত্র আলােকের বৃক্ষ বলিয়া উহা হইতেই সূৰ্য্য, অগ্নি, ও বিদ্যুৎ প্রভৃতি তেজের উৎপত্তি হইয়াছে এবং রূপবিভাগে সংসার বিস্তৃত হইয়াছে। তিনিই সঙ্কল্প- মাত্রে জলময় শরীর প্রাপ্ত হন ও তাঁহারই আস্বাদনকে রসতন্মাত্র কহে। ইহাই যাবৎ দ্রব-পদার্থের কারণ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হইয়া সংসারের বিস্তার করিতেছে। কল্পনাময় আত্মাই স্বীয় কল্পনাপ্রভাবে গন্ধতন্মাত্রকে অবলােকন করিয়া থাকেন, এবং উক্ত মনুষ্যাদির আকৃতি-বৃক্ষস্বরূপা ও সকলের আধারভুত গন্ধতন্মাত্রমন্ত্রী ভাবী ভূগােলকেরও মূল- সুরূপিণী পৃথিবী হইতে সংসাৰ- ৰ ইয়াছে। সেন বুদ্র দ- ১৪ ধর্মতত্ত্ববারিধি। নিচয় জলেই পরিণত হয়, তদ্রুপ চিৎশক্তির ভাবনায় সমুত তন্মাত্র- নিচয়ই পরস্পর মিলিত হইয়া ব্রহ্মাণ্ডাকারে পরিণত হইতেছে। ইহারা কিছুকাল মিলিত থাকে, পরে পুনরায় বিশ্লেষ প্রাপ্ত হয় ; যাবৎ সকলের ধ্বংস অর্থাৎ মহাপ্রলয় না হয়, সে পর্যন্ত ইহাদিগকে বিশুদ্ধ- চিৎশক্তিসম্পন্ন বলিয়া জানা যায় না। যেমন সূক্ষ্ম বটবীজের মধ্যে অসংখ্য বটবৃক্ষ নিবিষ্ট আছে, তদ্রুপ এই তন্মাত্ৰসকল গগনমধ্যেই অবস্থান করে, এবং পুনরায় ইহাদিগের হইতেই গগনাদির প্রকাশ হইয়া থাকে। অঙ্কুরের উদগম, শশাখাকারে প্রকাশ এবং ক্ষণমধ্যে ফলবান্ বৃক্ষে পরিণতি সূক্ষ্ম-পরমাণুমধ্যেও ভ্রান্তি-দৃষ্টির বিষয়ীভূত হইয়া থাকে। (স্বপ্নাবস্থায় অতি সূক্ষ্মনাড়ীচ্ছিদ্রেও ত বৃহৎ বস্তুর দর্শন ঘটে।) এ স্থূলভাব বাস্তবিক নহে। এ সকল কখন বিবৰ্ত্তকে অনুসরণ করিতেছে; পুনরায় বিবৰ্তশূন্য হইয়া হইয়া থাকিতেছে ; কখন বা চিদাধারে সূক্ষ্ম হইতেছে ও ক্ষণমধ্যে পিণ্ডিত হইয়া স্থূল হইতেছে, এবং সঙ্কলাত্মিক চিৎশক্তিই তন্মাত্রগণ হইয়া ত্রসরেণুর (পরমাণুত্রয়ের) আকার ধারণ করিতেছে ; কথন বা নিরাকার। দৃষ্টা হইতেছে। হে রাম ! পঞ্চতন্মাত্রই এই দৃশ্যজগতের কারণ এবং পরমাত্মার সহিত নিত্যসম্বদ্ধ। আদিশক্তিই সেই পঞ্চতন্মত্রেরও কারণ এবং অনুভূতি গ্রাহ আদিভূত অজ চিন্মাত্র সেই আদিশক্তিরও কারণ। এই কারণ- পরম্পরায় জগৎলক্ষ্মীর বিকাশ হইতেছে।” সংসারধর্ম। বৎস! চারিটী আশ্রমের মধ্যে সংসার-আশ্রম প্রধান বলিয়া কথিত আছে। চিত্তশুদ্ধি মানবের মুক্তির সােপান। বৎস! মহাত্মগণ যাহা লিখিয়াছেন, তাহাই জানাইতেছি।-“চিত্তশুদ্ধিগৃহে ব্যতীত অরণ্যে পরিপকরূপে হওয়ার সম্ভাবনা নাই ; যেহেতু তথায় চিত্ত-বিক্ষেপের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। ১৫ বিষয় না থাকায় তৎপরীক্ষায় কারণভাব এবং বিষয়াসক্ত জনের বনে নির্জনে থাকার প্রবৃত্তি হইবারও বিষয় কি? গৃহস্থাশ্রমে—সংসার- সমুদ্রে বিষয়তরঙ্গে মনােনৌকা নিরন্তর দোলায়মান থাকে, তাহাকে বৈরাগ্যাদিসাধনরূপ কর্ণ , অর্থাৎ হাইল দ্বারা সুস্থির করতঃ সেই সকল তরঙ্গোত্তীর্ণ করিতে পারিলেই তদীয় নিরাপদ অবধারিত হইতে পারে। এই সংসারে থাকিয়া যেমন মানবের আত্মগ্লানি ও নিৰ্ব্বেদ উপস্থিত হইয়া মুক্তি প্রাপ্তি হয়, এরূপ সহজে আর কোন আশ্রমে হয় না। কোন মহাত্মা লিখিয়াছেন,-'জীবের অন্তরে যে এক স্বাধীন ইচ্ছা বলবতী থাকে, তাহার বশবর্তী হইয়া তিনি প্রথমতঃ এক মহস্বেচ্ছাচারী হইয়া পড়েন, আর সেই অবস্থায় সহজে কাহারও বশবর্তী হইতে চাহেন না। কিন্তু সেই স্বেচ্ছাচারিতার গুণে পরে তাহার চরম ফল ও পরম উপকার লাভ হয়,-পরিণামে তাহাকে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের ইচ্ছার উপর নির্ভর করিতে হয়, এবং সম্পূর্ণরূপে তাঁহার বশীভূত হইতে হয়। যদিও জীবকে এই অধিকার লাভ করিবার জন্য সংসারে অনেকবার অনেক প্রকার কষ্ট সহ্ন ও অভিনয় করিতে হয়, কিন্তু তঁাহার উদ্দেশ্য সফল হইবার জন্য এই সংসারই উপযুক্ত স্থান। কামনাই জগত-রহস্যের মূল ; কামনা চরিতার্থ হইলে লােকের অন্তরে ভুক্ত বৈরাগ্য উপস্থিত হয়, সুতরাং সংসার-মাসক্তি কমিতে থাকে। সাধারণতঃ লােকে স্বার্থের জন্য লক্ষ লক্ষ মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, পরপীড়ন, দ্বেষ, হিংসা প্রভৃতি প্রবৃত্তির সম্যক্ প্রশ্রয় দিতে বিন্দুমাত্র কুষ্ঠিত হয় হয় না ; অপিনি মহামুর্থ হইলেও আপনাকে মহাপণ্ডিত বলিয়া—মহাজ্ঞানী বলিয়া প্রচার করিয়া থাকে। এই কামনাই ইহার নেতা। ইহার প্ররােচনায় মানব না করিতে পারে এরূপ কাৰ্য্যই নাই। স্বার্থের লালসায় ব্যাকুল হইয়া মানব শতযােজন পথ উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়িয়া যাইবে, আবার স্বার্থসিদ্ধি না হইলে হতাশ্বাস হইয়া চতুর্দিক শূন্য দেখিকে। বৎস!

ধর্মতত্ত্ববারিধি ৩; যখন এই স্বার্থপর মানব পুত্ৰকলাদির বিয়ােগ-বিচ্ছেদে উন্মাদপ্রায় হয় এবং মায়ামােহে মােহিত হইয়। চতুর্দি শূন্য দেখে ; যখন অনিবাৰ্য ও অপরিহার্য রােগশােক নিরন্তর আসিয়া মানবের অস্থিপঞ্জর ভাঙ্গিয়া দেয়, দেহ-মন জর্জরিত করে; যখন আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক তাপয়ে ক্লিষ্ট হইয়া মানুষের মন প্রাণ আকুল হইয়া উঠে; যখন নিজের বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভর করিয়া মানব পদে পদে ভগ্নমনােরথ হয়, পদে পদে নৈরাশ্য নিরুদ্দ্যমতা আসিয়া উপস্থিত হয় ; যখন বার বার জনন-মরণ- রূপ সংসারগতিতে মানব ক্লিষ্ট হয়, তখন সেই কামনা বা সংসার-আসক্তি ধীরে ধীরে মানবের হৃদয় হইতে কমিতে থাকে। বস্তুতঃ, লােক এ সংসারে নানাপ্রকার অভিনয় করিয়া, সুখের আশয়ে স্বার্থের জন্য নানাবেশে নানাদেশে ভ্রমণ করিয়াও হৃদয়ের স্বার্থভাব--মনের অতুলনীয় বনতৃষ্ণা কমাইতে পারে না। কিন্তু সেই মানুষ যখন দেখে, দারা-পুত্র বন্ধু-বান্ধব সকলি কতক দিবসের জন্য পথের পরিচারক মাত্র, তখন তাহার অন্তরে এই ভাব উদয় হয় যে, সংসার ছাড়া আরও কিছু অমূল্য বস্তু থাকিতে পারে। তখন তাহার অন্তরে স্বভাবতঃ আত্মগ্লানি উপস্থিত হয় ; তখন সে সংসারে কিছুতেই সুখ পায় না। সে অবস্থায় দুগ্ধফেননি শয্যাদি ও দেবােপভােগ্য দ্রব্যাদিও তাহার পক্ষে যেন বিষময় বলিয়া বােধ হইয়া থাকে। তখন ধনৈশ্বৰ্য্য ও ভােগবিলাস তাহার পক্ষে যেন বিরক্তিজনক বােধ হয়। যেন তখন তাহার পক্ষে সকলি শান্তিপথের কণ্টকস্বরূপ। তখন মানব কোথায় শান্তি কোথায় ও শান্তি বলিয়া চীৎকার করিয়া থাকে। তখন সেই সংসারসেবী, সেই স্বার্থপর ইন্দ্রিয়পরায়ণ পুরুষ নিভৃতে বসিয়া কোন এক অনুদ্দেশ্য অচিন্ত্য অপরিচিত বস্তুর জন্য কাদিবে,—যেন আকুলপ্রাণে দিগবিদিগ্‌-জ্ঞানশূন্য হইয়া কোন দিকে দৌড়িবে । যেন তখন একবিন্দু শান্তির জন্য একটা চেনা, গান,এক অতিদৰ বামৈ নিঃসে গেলেন

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
যেন
যাইতে চাহিবেন। তখন সেই সংসারসুখে অতৃপ্ত লােকটি মুক্তকণ্ঠে
বলিবেন, “সংসারে শান্তির আশা -মরীচিকায় যথা জল”।
তখন সেই স্বার্থপর, ঘােরনৃশংস আততায়ী, পরশ্রীকাতর, জঘন্য
ইন্দ্রিয়সেবী মানব সম্পূর্ণ পৰিবৰ্ত্তিত ও পরিমার্জিত হইবেন। তখন
সেই লােকটী অতি ধীরগম্ভীরভাবে অতি বিনীত ও বিনম্রভাবে উপদেশ
দিবেন।
সন্তোষামৃততৃপ্তানাং যৎসুখং শান্তচেতসাম্।
কুতন্তধনলুক্কামিতশ্চেত ধাবতাম্ |
তখন সেই লােকটি, যিনি একজন ঘােরসংসারী—মূহ অবিশ্বাসী
ছিলেন—তিনি অতি বিশ্বাসের সহিত বলিবেন :-
ন জাতু কামঃ কামানামুপভােগেন শাম্যতি।
হবিষা কৃষ্ণবত্মেব ভূয় এবাভিবর্ধতে।
বৎস। তখন সেই আততায়ী-পরশ্রীকাতর মানব ভগবানের বাক্যের
উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করিয়া কৰ্ম্ম করে। যথা-
জানামি ধৰ্ম্মং নচমে প্রবৃত্তি
জানামধৰ্ম্মং নচমে নিবৃত্তিঃ
ত্বয়া হৃষীকেশ ! হৃদিস্থিতেন
যথানিযুক্তোহস্মি তথা করােমি।
হে ভগবন্! আমি ধৰ্ম্ম বা অধৰ্ম্ম কিছুই জানি না ; কোন্ কাৰ্য
করিতে হইবে, কোন্ কাৰ্য্য করিতে হইবে না—তাহার কিছুই বুঝি না।
হে হৃষিকেশ ! তুমি হৃদয়ে থাকিয়া আমাকে যে কার্যে নিযুক্ত করিতেছ,
আমি তাহাই করিয়া থাকি।
বৎস! এই সংসারের পূঢ়মৰ্ম বুঝিতে পারিয়া যে কৰ্তব্য কর্মে
;

১৮ • ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। । ; নিযুক্ত হইতে পারে, সেই জ্ঞানী। আমি তােমায় সংসারের বিষয় বলিতেছি, শ্রবণ কর। ভগবান গীতায় বলিয়াছেন - উৰ্দ্ধমূলমধঃশাখমশ্বখং প্ৰাহুরব্যয়ং। ছন্দাংসি যস্য পর্ণানি যস্তং বেস বেদবিৎ অধশ্চোদ্ধঞ্চ প্রস্তাস্তস্য শাখা গুণপ্রবৃদ্ধাবিষয়-প্রবাল। অধশ্চ মূলানুসন্ততানি কৰ্ম্মাণু বন্ধীনি মনুষ্যলােকে। সংসাররূপ এক অব্যয় অশ্বথ বৃক্ষ আছে ; উহার মূল উদ্ধে, উহার শাখা অধধতে অবস্থিত্ত আছে। বেদসমুদায় উহার পত্র। যিনি এই অশ্বখবৃক্ষ বিদিত হইয়াছেন, তিনি বদবেত্তা। এই বৃক্ষের শাখা অধঃ ও উৰ্দ্ধদেশে বিস্তীর্ণ হইয়াছে ; উহা সত্বাদিগুণদ্বারা পরিবর্ধিত হইতেছে এবং রূপ-রস প্রভৃতি বিষয় সকল উহার পত্র বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে। এই বৃক্ষের ধৰ্ম্মাধৰ্ম্মরূপ কৰ্ম্মপ্রসূতি মূলসকল অধঃপ্রদেশে জীব- লােকে বিস্তীর্ণ হইয়াছে। ন রূপমতেথােপলভ্যতে, নান্তো ন চাদিন চ সংপ্রতিষ্ঠা। অশ্বথমেং সুবিরূঢ়মূলমসঙ্গশস্ত্ৰেণ দৃঢ়েণ ছিত্ত্বা। ততঃ পদং তৎপরিমার্গিতং যস্মিন্ গ ন নিবন্তিভূয়। তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্ৰস্তা পুরাণী। এই বৃক্ষের রূপ নিরীক্ষিত হয় না; ইহার আদি নাই, অন্ত নাই, এবং কিরূপে অবস্থান করিতেছে, তাহাও অবগত হওয়া যায় না। এই বদ্ধ- মূল অশ্বথবৃক্ষ সুদৃঢ় নির্মমত্বরূপ শস্ত্র দ্বারা ছেদ করিয়া উহার মূলভূত বস্তু অনুসন্ধান করিবে ; উহা প্রাপ্ত হইলে পুনরায় প্রত্যাবৃত্ত হইতে হয় না। এই যে প্রকৃতি পুরুষ সংযােগ দ্বারা প্রকাশিত ব্ৰহ্মাদি স্তম্ভ পর্যন্ত সংসার একটী অশ্বথবৃক্ষস্বরূপ গণ্য। কারণ বৃক্ষের ন্যায় ইহারও মূল ; ;

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। শাখা, স্কন্ধ ও পত্র-পল্লবাদির কল্পনা হইতে পারে। গঙ্গাতরঙ্গদ্বারা অর্ধ সমুৎপাটিত অশ্বথবৃক্ষের যেমন মূলভাগ উৰ্দ্ধদেশে অবস্থিতি করে, এবং শাখাগুলি নিম্নদেশে থাকে, সৃষ্টিপরম্পরাগত সংসারবৃক্ষেরও তেমনই উৰ্দ্ধমূল ও অধঃশাখা। ইহার মুখ্য মূল আছে ; মায়াতি সম্বন্ধ চৈতন্য- স্বরূপ ব্ৰহ্ম হইতে এই সংসারবৃক্ষটী বাহির হইয়াছে। এ নিমিত্ত তিনিই ইহার মুখ্য মূল। তিনি সমস্ত জগতের কারণস্বরূপ নিত্য এবং মহান, এইজন্য তাহাকে উদ্ধা বা উদ্ধস্থ বলিয়া ব্যবহার করা যায়। অতএব এই সংসারবৃক্ষটী উদ্ধমূল হইল। তৎপরে প্রথমােৎপন্ন সূক্ষ্মদেহধারী পুরুষ অবধি এই স্তম্ভাদি পৰ্যন্ত যতপ্রকার প্রাণী ও জীব আছে, ইহারা সকলেই সেই মূল হইতেই ক্রমে ক্রমে প্রস্ত ও বিস্তৃত হইয়াছে। এই জন্য ইহাদিগকেই এই বৃক্ষের শাখা বলিয়া গণ্য করা যায়। এই সকল জীবের অবস্থা অবিদ্যা দ্বারা সমাবৃত হওয়ায় প্রকৃতচৈতন্যস্বরূপ অবস্থা নিতান্ত বিকৃত ও জড়ভাবাপন্ন হইয়াছে, সুতরাং ব্রহ্ম বা ঈশ্বর হইতে নিকৃষ্টভাব প্রাপ্ত হইয়াছে। এজন্য ইহাদিগকেই অধঃ বা অধঃস্থ বলিতে পারা যায়। সুতরাং এই বৃক্ষটি অধঃশাখা হইল, অর্থাৎ ইহার শাখাসকল অপােদিকে প্রসারিত হইতেছে বলা যায়। বেদমূল শাস্ত্ৰসকল নানা প্রকার কর্মকাণ্ডের এবং ফল শ্রুতিরও প্রতিপাদন করিয়া থাকেন। সেই অসংখ্য ক্রিয়াসমূহই এই বৃক্ষের পত্রস্বরূপ গণ্য হইতে পারে ; কারণ বৃক্ষ যেরূপ পত্ৰসমূহে সমাবৃত হইয়া এবং প্রাণবায়ু গ্রহণ করিয়া আপন অস্তিত্ব বর্তমান রাখে, এই সংসার-বৃক্ষও তেমনই পরিব্যাপ্ত কর্মসমূহ দ্বারাই বিদ্যমান থাকে, কৰ্ম্মসমূহ দ্বারাই সংসারবৃক্ষের জীবনীশক্তি পরিলক্ষিত হয়। ঐ কৰ্ম্মসমূহের প্রতিপাদক বেদকেও উহার, পত্রস্বরূপ গ্রহণ করা যায়। বেদাধ্যয়ন দ্বারা সংসারবৃক্ষের এই মৰ্ম্ম যিনি অবগত হয়েন, তিনিই প্রকৃত বেদার্থবিৎ।

ধৰ্ম্মতত্ববারিধি। ; ; পূৰ্বে যে অধঃপ্রবাহিনী শাখার কথা বলিয়াছি, তাহার মধ্যে কিছু বিশেষ আছে ; তাহা এইঃ-যদিচ পরমব্রহ্ম অপেক্ষা সমস্ত জীবই নিকৃষ্ট বা অধধগত, অতএব এই সংসারবৃক্ষ অধঃশাখাই হইল ; তথাপি এই অধােভাগের মধ্যেও আবার অপেক্ষাকৃত উর্দ ও অধঃভাগ আছে। গঙ্গা- তীরে অর্পোৎপাটিত বৃক্ষের শাখাগুলি যেরূপ মূল অপেক্ষা অধিকতর অধােগামী হইলেও, কতকগুলি শাখা নীচে এবং কতকগুলি উপরে অবস্থিতি করে, সংসারবৃক্ষের জীবস্বরূপ শাখাগুলিও তেমনি নিম্নভাগে এবং উপরিভাগে প্ৰস্ত আছে। যাহারা পাপ-পরায়ণ জীব, তাহার ক্রমে পশু, পতঙ্গ, কীটাদি অধােযােনির দিকে অগ্রসর হইয়া তত্ত্বজ্জাতি প্রাপ্ত হইতেছে ; আবার যাহারা পুণ্যাচারী, তাহারা দেবযােনির দিকে অগ্রসর হইয়া তত্ত্বজ্জাতি প্রাপ্ত হইতেছে। অতএব এই বৃক্ষের শাখা নিম্নে মনুষ্যলােক হইতে অবীচি পৰ্যন্ত অবস্থত হইয়াছে। আবার উপরে এই মনুষ্য লােক হইতে সত্যলোক পৰ্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছে। জলসেচনাদি ক্রিয়া দ্বারা যেরূপ সাধারণ বৃক্ষের শাখাগুলি বৃদ্ধি ও পরিপুষ্টি লাভ করে, এই জীবসমূহস্বরূপ শাখাগুলিও তেমনি দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি আকারে পরিণত ত্রিগুণদ্বারা পরিপুষ্টি ও বৃদ্ধিলাভ করিয়া থাকে। রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শাদি বিষয়সমূহ ইহার অসংখ্যশাখার পল্লবস্বরূপ বলা যায়। এইঞগেল শাখার বিষয়। এই বৃক্ষের মূলসম্বন্ধেও কিছু বিশেষত্ব আছে। এই বৃক্ষের মুখ্যমূল- স্বরূপ যে ব্ৰহ্ম, তাহাত পূর্বোক্তরূপে সৰ্ব্বোর্ধেই বটে ; তদ্ব্যতীত, পূর্বোক্ত- মত বৃক্ষের যেরূপ একটা মুখ্যমূল থাকে, আর তাহারই অনুগত চতুঃপার্শ্ব- ব্যাপক আরাে অসংখ্য মূল থাকে, তন্মধ্যে তাদৃশ বৃক্ষের (গঙ্গাতীরস্থ অর্পোৎপাটিত বৃক্ষের ) যেটী মুখ্য মূল, সেইটী উপরের দিকেই থাকে, আর তাহার চতুস্পার্শ্ববর্তী যে সকল অবান্তর মূল আছে, তাহার কতকগুলি উর্ধদিকে, আর কতকগুলি অধােদিকে অবস্থিতি করে; সেইরূপ এই সংসার- বৃক্ষেরও কতকগুলি অবান্তর মূল আছে; তাহারও কতকগুলি অধােদিকে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। প্রস্ত, আর কতকগুলি উৰ্ধদিকেও আছে। সুখজনক বিষয়ে অনুরাগ এবং দুঃখজনক বিষয়ে বিদ্বেষ দ্বারাই জীবগণ এই মনুষ্যলােকে নানা- প্রকার কৰ্ম্মানুষ্ঠান করিয়া থাকে, এবং তদ্দারা জীব হয় উত্তমযােনি, না হয় অধমযােনি প্রাপ্ত হয়। বাসনা না থাকিলে কেহ কোন কৰ্ম্মানুষ্ঠান করে না, ভাল মন্দ কোন যােনি প্রাপ্তও হয় না, সুতরাং সংসারে থাকে । অতএব বাসনাকেই এই সংসারবৃক্ষের অন্তর মূল বলিতে পারা যায়। তন্মধ্যে যে-গুলি নীচ বাসনা (বৈষয়িক সুখ-বাসনা ), সেইগুলিকে অধঃপ্রস্ত, আর যেগুলি উচ্চবাসনা (আত্মােন্নতি-বিষয়িণী), সেইগুলিকেই উদ্ধপ্রসূত বলা যাইতে পারে। বৎস! একজন মহাত্মা লিখিয়াছেন :- “চিত্তশুদ্ধি গৃহে ব্যতীত অরণ্যে পরিপকরূপে হওয়ার সম্ভাবনা নাই; যেহেতু তথায় চিত্তবিক্ষেপের বিষয় না থাকায় তৎপরীক্ষার কারণভাব এবং বিষয়াসক্ত জনের বনে নির্জনে থাকার প্রবৃত্তি হইবারও বিষয় কি ? গৃহস্থাশ্রমে—সংসারসমুদ্রে বিষয়তরঙ্গে মনােনৌকা নিরন্তর দোলায়মান থাকে ; তাহাকে বৈরাগ্যাদি-সাধনরূপ কর্ণ অর্থাৎ হাইল দ্বারা সুস্থির করতঃ সেই সকল তরঙ্গোত্তীর্ণ করিতে পারিলেই তদীয় নিরাপদত্ব অব- ধারিত হইতে পারে। “ভাগবতের সপ্তম স্কদের দ্বাদশাধ্যায়ে চতুরাশ্রমের কর্তব্য বিষয়ক যে বর্ণনা আছে, তাহাতে এই বিধান দৃষ্টি হয় যে, প্রথমতঃ গুরুকুলে অর্থাৎ আচাৰ্যগৃহে বাস করতঃ বেদাধ্যয়ন এবং সাধনা সম্পন্ন করিয়া, তদুত্তর যাহার গৃহস্থ হইবার সম্ভাবনা হয়, সে দারপরিগ্রহ করিবে, এবং যাহার তদিচ্ছা না হয়, সে বনে গমন করিবে। একাদশ স্কন্ধের সপ্তদশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ উদ্ধবের নিকট আশ্ৰমধৰ্ম্ম রৰ্ণনা করিয়া, গৃহস্থের পক্ষে পঞ্চযজ্ঞ, নিজ পােয্যজনের ভরণপােষণ, ন্যায়ােপার্জিত ধনে যাগাদি, কুটম্বের আসক্তিত্যাগ, অনুদ্যমে অথবা সুবৃত্তি দ্বারা লব্ধধনে ব্যয়নিৰ্বাহ, ধর্মতত্ত্ববারিধি। সংসারের অনিত্যতা বিচার, স্ত্রীপুত্রের সহিত পথিকের মিলন, শরীরের সহিত কুটুম্বের নাশ বিবেচনা, গৃহকৰ্ম্ম করণান্তর ভক্তিপূৰ্ব্বক ঈশ্বর- পূজা, অহং-মমতা ভাব পরিত্যাগ-করণ, ঈশ্বরনিষ্ঠায় সমাহিত হওন, ও অতিথির ন্যায় গৃহে বাসকরণের বিধান দিয়াছেন, এবং বাণপ্রস্থের নিয়ম এই উক্ত করিয়াছেন যে, অরণ্যবাস ও মৃত্তিকায় শয়ন, ফলমূলাদি আহার, বৰুল বা অজিন পরিধান, বস্ত্র-অলঙ্কারাদি পরিত্যাগ, কেশ, রােম, নখ, শ্মশ্রু আদি ধারণ, শরীরের মলা অমার্জন, দণ্ডধারণ না করণ, ত্রিকালীন স্নানকরণ, গ্রীষ্মে পঞ্চতপা, বর্ষায় জলধারাসহন, শিশিরে জলমগ্ন হওন ইত্যাদি কাৰ্য্য দ্বারা তপস্যা করিবে। অতএব, স্পষ্ট জানা যায় যে, গৃহে মনের সাধন ও বনে শরীরের সাধন হয়, এবং সন্ন্যাসধর্মী কেবল জ্ঞান- লাভ করিয়া ব্ৰহ্মানন্দ আস্বাদনপূৰ্ব্বক সুখে বিচরণ করে।” বৎস! সংসারে থাকিয়া কতকগুলি কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্ম আছে ; তাহাও তােমাকে জানাইতেছি। ভগবান মনু বলিয়াছেন : “ঋষয়ঃ পিতরাে দেবা ভূতাতিথয়স্তথা। আশাসতে কুটুম্বিভ্যস্তেভ্যঃ কাৰ্যং বিজানতা। স্বাধ্যায়ে নাচঁয়েতষীণ হােমৈর্দৈবান যথাবিধি। পিতৃন শ্রাদ্ধৈ নৃনভূৈতানি বলিকৰ্ম্মন। মাননীয় গিরীশচন্দ্র মহাশয় ইহার উত্তম ব্যাখা করিয়াছেন, যথা,- ঋষিগণ পিতৃগণ আর দেবগণ। অতিথিনিয় আর সর্বভূতগণ। গৃহস্থের কাছে আশা করেন সদাই। জানিয়া সে আশা পূর্ণ করা সদা চাই । স্বাধ্যায়ে তুষিতে হয় যত ঋষিগণে। দেবগণে তুষ্ট কর হােম-সম্পাদনে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। শ্রাদ্ধ করি পিতৃগণে, নরে অনুদানে। ভূতগণে বলিকৰ্ম্মে তােষ সাবধানে।” গৃহস্থের এই সব কৰ্ম্ম ; অতএব এই কৰ্ম্মগুলি যাহাতে সম্পাদিত হয়, তাহার বিহিত অনুষ্ঠান করা উচিত। সংসারে থাকিয়া সৰ্ব্বভূতে দয়া, সৰ্ব্ব- ভূতে আত্মবজ্ঞান ও হিতসাধন করাই ধৰ্ম্ম। কারণ শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবান বলিয়াছেন, যথা :- ন কাময়েহহং গতিমীশ্বরাৎ পরাং অষ্টদ্ধিযুক্তাম পুনর্ভবং বা। আর্নিং পদ্যেহস্মিন দেহভাজাং অন্তস্থিতে যেন ভবস্তৃদুঃখা। ক্ষুট, মােগাত্র পরিশ্রম। দৈন্যং ক্লমঃ শােক বিষাদ মােহাঃ। সৰ্বে নিবৃত্তাঃ কৃপণস্য জন্তে। র্জিজীযােজীব জলাপ নামে। গিরীশবাবু ইহার ব্যাখা করিয়াছেন :- নাহি চাই পয়াগতি ঈশ্বরের পায়। চাই নির্বাণ আর সিদ্ধি সমুদায়। যত জীব আছে, যথা দুঃখহীন রয়। শুধু তব পদে চাহি দয়াময়। ক্ষুধা তৃষ্ণা শ্রম আর শরীর-যাতনা। দৈন্ত ক্লেশ শােক আর বিষাদ সে নানা । মােহআদি সব মাের গিয়াছে চলিয়ে। তােমার জীবের আজি তৃষ্ণা বিনাশিয়ে।

২৪ ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। অতএব, সংসারে থাকিয়া সৰ্ব্বভূতে সমদৃষ্টি, সৰ্ব্বভূতের হিতসাধন ও সৰ্ব্বভূতে আত্মবজ্ঞান করিলেই মুক্ত হইতে পারে। বৎস! ব্রহ্মজ্ঞান- সকল জ্ঞানের শ্রেষ্ঠ ; কি প্রকারে উহা লাভ হয়, তাহাও শাস্ত্রে বর্ণিত আছে। যথা :- বস্তু সর্বাণি ভূতাণি আত্মন্যে বানুপশ্যতি । সৰ্ব্বভূতেষু চাত্মানং ততােন বিজুগুপসতে । যস্মিন্ সৰ্বাণি ভূতানি আত্মৈবাভূদ্ধিজানতঃ। তত্র কোমােহঃ কঃ শােক একত্বমনুপশ্যতঃ । ঈশােপনিষৎ। গিরীশবাবু যাহা উত্তমরূপে ব্যাখা করিতেছেন—তাহাও বলিতেছি। আত্মাতে যে জন দেখে সর্বভূতগণ। সৰ্বভূতে আত্মা আর করে দরশন। ব্ৰহ্মজ্ঞান তার হৃদে হয়েছে উদয়। কাহাকেও আর তার ঘৃণা নাহি হয়। যখন সকল ভূতে আত্মজ্ঞান হয়। জ্ঞানীর তখন কোথা শােক মােহ রয়। কারণ, শান্ত্রেই আছে :- একস্তথা সৰ্বভূতান্তরাত্মা। রূপং রূপং প্রতিরূপােবভূব। সেই এক তিনি (ব্রহ্ম) সৰ্ব্বভূতে অন্তরাত্মা হয়ে নানারূপে বহু হয় বিৰাজ করিতেছেন।

ও ৮ র তৃতীয় পরিচ্ছেদ। জীব। বৎস! জীবের সৃষ্টি কি প্রকারে হইল, এবং জীব কে, তাহা তােমাকে সংক্ষেপে জানাইতেছি। মম যােনিম হদ্ব হ্ম তস্মিন্ গর্ভং দধাম্যহং। সম্ভবঃ সৰ্বভূতানাং ততােভবতি ভারত । গীতা। হে ভারত! মহৎপ্রকৃতি গর্ভাধান-স্থান। আমি তাহাতে সমস্ত জগতের বীজ নিক্ষেপ করিয়া থাকি। তাহাতে ভূত সকল উৎপন্ন হয়। অতীব সূক্ষ্ম, কেবল শক্তিমাত্রস্বরূপে অবস্থিত জীবসকল ঘটনাক্রমে বিবিধ খাদ্যদ্রব্য অথবা নিশ্বাস-বায়ুর সহিত সংশ্লিষ্ট হইয়া, পিতার দেহে প্রবেশ করে ; পরে তাহা এমন অভিন্নভাবে পিতার আত্মার সহিত মিশাইয়া যায় যে, কোন প্রকারে তাহাদের প্রার্থক্য অনুভব করা যায় না, যেন একেবারে একই হইয়া যায়। পরে যখন স্ত্রী ও পুরুষের যােগ হয়, তখন ঐ বিলীন শক্তিটুকু আবার বিশ্লিষ্ট হইয়া পিতার দেহের অণুমাত্র ভৌতিক পদার্থের আশ্রয় গ্রহণপূর্বক মাতৃ-জরায়ুতে প্রবেশ করিয়া আবার মাতার দেহে একেবারে মিশ্রিত হইয়া যায়। পরে মাতা হইতেই দেহের পুষ্টি- সাধন পূৰ্বক, আধার মাতা হইতেই বিস্খলিত হইয়া জন্মগ্রহণ করে। এক এক বার মহাপ্রলয়ের পর ব্রহ্মা আর প্রকৃতি হইতে ধৰ্ম্মতত্ববারিধি। ঠিক এইরূপেই জীবের উৎপত্তি হইয়া থাকে। মহত্তত্ত্ব হইতে পৃথিব্যাদি যতপ্রকার জন্য-পদার্থ আছে, এতৎসমস্তই মহাপ্রলয়কালে ত্রিগুণাত্মিক বা ত্রিশক্তিস্বরূপা প্রকৃতিতে বিলীন হইয়া যায় ; তখন কোন প্রকার জন্যশস্তুরই অস্তিত্ব থাকে না, একমাত্র প্রকৃতি ও চিৎস্বরূপ ব্রহ্মের সহিত অভিন্নভাবে মিশাইয়া যায়। প্রত্যেক জীবের যে পৃথক পৃথক্‌ জীবনী- শক্তি আছে, তাহাও ঐ প্রকৃতিতে বিলীন হইয়া যায়; কারণ, উহাও প্রকৃতি-জন্য পদার্থ। এদিকে প্রত্যেক জীবের অবলম্বনস্বরূপ বা আত্মা- স্বরূপ যে পৃথক পৃথক ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চৈতন্যের অনুভব হইতেছে, তৎসমস্তই সেই অপরিমিত চৈতন্য-সমুদ্রে মিলাইয়া যায়, ইহাদের কিছুমাত্র পার্থক্যের অনুভব হয় না ; তখন একমাত্র পরমাত্মাই বিদ্যমান থাকেন। পরে যখন মহাপ্রলয়ের অবসান হয়, তখন ঐ মায়া বা ত্রিগুণাত্মিকা অথবা ত্রিশক্তিস্বরূপা প্রকৃতির সহিত ঐ চৈতন্যস্বরূপ আত্মা বা পুরুষের পূর্বোক্ত অধ্যাস-স্বরূপ সংযােগ থাকাতে, সেই পূর্ব- বিলীন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব-চৈতন্যগুলি, সেই সুবৃহৎ চৈতন্যস্বরূপ পিতা হইতে যেন পৃথগভূত হইয়া পড়ে। তখন তাহারা সেই পূৰ্ব্ববিলীন, আপ আপ জীবনীশক্তিও গ্রহণ করে, এবং ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি- স্বরূপা মাতাতে বিলীন হইয়া যায়। ইহাই হইল প্রকৃতির গর্ভাধান ব্যাপার। পরে ঐ প্রকৃতি হইতে জ্ঞানশক্তি, ক্রিয়াশক্তি, এবং পােষণশক্তি, সংমিশ্ৰিত বুদ্ধি, অভিমান, মন ও ইন্দ্রিয়াদির শক্তি সংগ্রহ করিয়া অসংখ্য জীবের পৃথক পৃথক্‌ দেহ বা লিঙ্গদেহ বা সূক্ষ্মদেহ সংগঠিত হয় ; তখনই পৃথক পৃথক্‌ জীবের জন্ম হইল বলা যায়। তৎপরে সেই জীব হইতেই প্রকৃতির অংশসকল গ্রহণ করিয়া যথাক্রমে ব্রহ্মা অবধ কীট পতঙ্গ পর্যন্ত সমস্ত প্রাণীদেহের বিকাশ হইয়াছে। অতএব ব্রহ্মা বা আত্মাই, জগতের পিতা এবং ত্রিগুণাত্মিক প্রকৃতিই এই জগতের মাতা।” ;

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। বৎস! জীবের সৃষ্টি কি প্রকারে হইল, তাহা বােধ হয় এক্ষণে বুঝিতে পারিলে। এইবারে জীব কে—তাহাও বুঝাইতেছি। মমৈবাংশােজীবলােকে জীবভূতঃ সনাতনঃ। মনঃ ষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কৰ্ষতি। “এই জীবলােকে সনাতন জীব আমারই অংশ। ইনি প্রকৃতি-বিলীন পঞ্চ- ইন্দ্রিয় ও মনকে আকর্ষণ করেন।” “এই জীবলােকে যত জীব আছে (প্রত্যেক জীবের সঙ্গে সঙ্গে যে চৈতন্য আছে) তৎসমস্তই আমার অংশবিশেষ সুতরাং উহা সনাতন (নিত্য)। পরন্তু একটি মৃৎপিণ্ড খণ্ড খণ্ড করিলে তাহার যেরূপ এক একটি অংশ হইতে পারে, এই জীবগণ অামার সেরূপ অংশ নহে; কারণ, আমি অখণ্ড অদ্বিতীয় নিরবয়ব বস্তু। সুতরাং কোন মতেই আমার খণ্ড খণ্ড ভাগ হইতে পারে না। তবে কি না আকাশ যেরূপ অখণ্ড ও পরিব্যাপ্ত পদার্থ হইলেও নানা প্রকার মেঘের সহিত সম্বন্ধ থাকাতে বিভিন্ন বলিয়া গণ্য হয়,—এক পরিব্যাপ্ত আকাশেই যেখানে শুভ্রবর্ণ মেঘের সম্বন্ধ গ্রহণ করে, সেইস্থান শুভ্র বলিয়া ব্যবহৃত হয়, এবং যেখানে নীলমেঘের সম্বন্ধ গ্রহণ করে, সেই স্থানেই নীল আকাশ, আর যেখানে রক্তমেঘের সম্বন্ধ গ্রহণ করে, সেই খানেই রক্তাকাশ বলিয়া ব্যবহৃত হয়,—ইত্যাকার ভ্রমজ্ঞানবশতঃ একই আকাশ নানা প্রকারে ব্যবহৃত হয়, আবার ঐ রক্তাকাশ, পীতাকাশ, শুভ্রাকাশ ও নীলাকাশ প্রভৃতিকে মহান্ আকাশে অংশ বলিয়া গণ্য করা হয় ; আমিও সেইরূপ একও অখণ্ড পদার্থ হইলেও ত্রিগুণাত্মিক প্রকৃতির সহিত সম্বন্ধ থাকাতে প্রকৃতি এক এক ভাব গ্রহণ করিয়া এক এক ভাবে ব্যবহৃত হই; আবার যে স্থানটা প্রকৃতি হইতে বিকসিত মন এবং ইন্দ্রিয়গুলিকে গ্রহণ করে, তাহাই জীব বলিয়া খ্যাত। আবার ঐ মন ও ইন্দ্রিয়াদিরও অসংখ্য প্রকারভেদ থাকাতে, উহাদের অসংখ্যপ্রকার • ২৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। • আকৃতি হইয়া থাকে ; তাহারাই আমার অংশ বলিয়া গণ্য হয়। বাস্তবিক আমিই তাহারা, তাহারাই আমি ; ইহার মধ্যে কোন ভাগ বা অংশ হইতে পারে না।” বৎস! তােমায় পূর্বেই বলিয়াছি যে, শাস্ত্রে আছে ? একথা সর্বভূতান্তরাত্মা রূপং রূপং প্রতিরূপাে বভূব। এবার এই শ্লোকের ভাব বেশ বুঝিতে পারিলে ? মােগাবাশিষ্ঠ-উৎপত্তি প্রকরণ ত্রয়ােদশ পর্গ। “হে রাম! নভঃ, তেজঃ তমঃ সমস্তই অনুৎপন্ন, উহাদের সত্তার কারণ—চিদাত্মা পরব্রহ্ম। উক্ত চিদাত্মাই মায়াকাশে বিকাশ পাইয়া প্রথমে চেত্যবিষয়িণী কল্পনাকে পরে তৎসংযুক্ত জীবভাবকে ও অহংজ্ঞানকে উৎ- পাদন করেন। উক্ত অহংতার পরিণামে বুদ্ধির বিকাশ হয় ও বুদ্ধি হইতেই মননধর্মী মনের উৎপত্তি অর্থাৎ বুদ্ধিই শব্দতন্মাত্রাদি-বিশিষ্ট হইয়া মন হয়। এই মনই তন্মত্রিপঞ্চকের মেলনে মহাভূতাকারে বর্ধিত হহয়া জগদাকার মহাগুল্ম দৃষ্ট হন। যেমন অকৃত বা অদৃষ্ট বস্তুকে স্বপ্নে হঠাৎ দেখা যায়, তদপ চিদায়া মনের আবেশে জগৎ দেখিতেছেন, সুতরাং এই বিশ্ব চিন্ময় আকাশে বারংবার উৎপন্ন ও বিনষ্ট হইতেছে। “স্বপ্ন যেমন সুষুপ্তিতে লয় প্রাপ্ত হয়, তদ্রুপ এই চরাচর জগৎও প্রলয়ে বিনষ্ট ইইয়া থাকে। তৎকালে যে অনির্বচনীয় সৎপদার্থ অবশিষ্ট থাকেন, তাহার নাম নাই। তিনি তখন অভিব্যক্তি-শূন্য। তিনি তেজঃ নহেন, অন্ধকাবও নহেন; তিনি নিষ্ক্রিয় এবং অপরিচ্ছিন্ন। পণ্ডিতগণ বাক্য- প্রয়ােগ ব্যবহারসিদ্ধির জন্য পরমাত্মার, ঋত, আত্মা, পরব্রহ্ম, সত্য ইত্যাদি কল্পনা করিয়া থাকেন। তিনি শুদ্ধচিৎস্বভাব হইলেও সৃষ্টির প্রারম্ভ সময় আপনিই আত্মমায়ায় জড়রূপে বিবর্তিত হইয়া জীবনামে বিড়ম্বিত জীব- ; তৃতীয় পরিচ্ছেদ। ভাব যেন পরিগ্রহ করিয়া থাকেন (তিনি ঈশ্বর)। অনন্তর সেই চৈতন্যময় বস্তু মনােভাব প্রাপ্ত হইয়া সঙ্কল্প বিকল্প অবলম্বন হেতু জড়ভাবের সম্বন্ধ- বাহুল্য প্রাপ্ত হইলে পর প্রণারূপ ও পঞ্চভূতরূপ পরিগ্রহ করেন। “কিন্তু বৎস, এইটি খুব স্মরণ রাখবে যে (যােগাবাশিষ্ঠ—উৎপত্তি প্রকরণ) এই যে চেতন জীব জন্মরূপ নির্জন অরণ্যে বিকীর্ণ হইতেছেন, ইহাকে যাহারা পরমাত্মা বলিয়া জ্ঞান করেন, তাহারা পণ্ডিত হইয়াও মূখ ; কারণ সেই জীব বুদ্ধি সংসার ও দুঃখসমুদয়ের কারণ, সুতরাং ইহাকে জানিলে কিছুই জানা হয় না। যদি পরমাত্মাকে জ্ঞাত হওয়া যায় অর্থাৎ জীবের জীবভাব পরিহার পূর্বক, পরমভাব গ্রহণ করা হয়, তবেই বিষবেগ উপশান্ত হইলে বিচিকা রােগের ন্যায়, দুঃখসমুদয় এককালে বিদূরিত হইয়া থাকে।” বৎস! ভগবান শঙ্করাচাৰ্য বলিয়াছেন, ব্রাহ্মণঃ সর্বভূতানি জায়ন্তে পরমাত্মনঃ। তম্মদেনি হ্মৈব ভবন্তীত্যবধায়েৎ ॥ হ্মৈব সর্বনামানি রূপাণি বিবিধানিচ। কৰ্ম্মাণ্যপি সমগ্রাণি বিভীতি শ্রুতিৰ্জগে ৷ “ব্রহ্ম হইতেই সমস্ত সঞ্জাত, অতএব সমস্তই ব্ৰহ্ম—এইরূপ নিশ্চয় করিবে। ব্ৰহ্মই সকল প্রকার নাম, বিবিধপ্রকার রূপ, ও সমস্ত কৰ্ম্ম ধারণ করিতেছেন, ইহা স্বয়ং শ্রুতি কহিয়াছেন।” ভগবান গীতায় বলিয়াছেন : যদা ভূত পৃথগ ভাবমেকস্থমনুপশ্যতি । তৃতএব চ বিস্তারং ব্ৰহ্ম সম্পন্দ্যতে তদা। গীতা।

ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। মান্যবর পাত্র মহাশয় ইহা সুন্দরভাবে ব্যাখা করিয়াছেন, যথা : জীবের পার্থক্য যবে, অভিন্নতা অনুভবে, একতায় সম অবস্থিত। প্রকৃতির গুণােত, বিস্তরেও একীভূত, ব্ৰহ্মপ্রাপ্তি তখনি কথিত । জীব সর্বদাই ব্ৰহ্মপদার্থ হইলেও অবিদ্যা দ্বারা সমাচ্ছন্ন থাকিয়া তাহা বুঝিতে পারে না; এই জন্য ব্রহ্মা হইতেই পৃথক্ বলিয়া আপনাকে মনে করে। কিন্তু যখন তাহা সেই অন্ধকার দূরীভূত হয়, তখন সে যে স্বয়ং ব্রহ্মপদার্থ, ইহা বুঝিতে পারে এবং তাহাকেই জীবের ব্রহ্মত্ব বা ব্ৰহ্ম- প্রাপ্তি বলে। এদ্ব্যতীত মুক্তির অবস্থায় কোন অপ্রাপ্ত নূতন বস্তু পায় না। ভগবান শঙ্করাচাৰ্য বলিয়াছেন :- “রজ্জ্বজ্ঞানাদ্ভাতি রঞ্জুৰ্যথাহি স্বাত্মজ্ঞানাদাত্মাননা জীবভাব। আপ্তোক্ত্যাহি ভ্রান্তিনাশে স রঞ্জুর্জীবােনাহং দেশি কোক্তা শিবােহহম্ । অজ্ঞানতাবশতঃ রঙ্কুতে যেমন সর্পজ্ঞান হইয়া থাকে, সেইরূপ সর্বব্যাপী পরমাত্মাতেও মানবগণের জীবভাব বলিয়া ভ্রান্তি জন্মে। জ্ঞানীলােকের উপদেশে সর্পভ্রান্তি বিনষ্ট হইলে যেমন রঞ্জুকে আর সর্প বলিয়া বােধ থাকে না,-রঞ্জু বলিয়াই জ্ঞান হয়, তােপ বেদশাস্ত্রীদিগের উপদেশ পাইয়া অজ্ঞান-তিমির তিরােহিত হইলে, “আমি জীব নহি” অর্থাৎ আমি সেই মঙ্গলস্বরূপ পরমাত্মা বলিয়া জীবের জ্ঞান জন্মে। শিষ্য।—আপনি যাহা বলিলেন, তাহাতে এই বুঝিলাম যে, আমি তুমি কিছুই নহে—সকলি ব্ৰহ্ম, এবং আমিই সেই আত্মস্বরূপ। সংসারে তিনিই অবলম্বনীয় এবং জ্ঞানের দ্বারা ইহা জানিতে হয় ; ইহা জ্ঞানযােগ।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ। যদি তাহাই হয়, তবে কাৰ্য অর্থাৎ কৰ্ম্ম করিবার প্রয়ােজন কি ? যখন আমিই সেই আত্মস্বরূপ, তখন আমার কাজে আবশ্যক কি? দ্বিতীয় কথা, যদি সবই ব্ৰহ্ম, তবে কেহ কেহ সুখীর ঘরে জন্ম গ্রহণ করিয়া চিরসুখভােগ করিতেছে ; কেহ দুঃখীর ঘরে জন্মগ্রহণ করিয়া আজন্ম দুঃখভােগ করিতেছে; আবার কেহ পাপাচারীর ঘরে জন্মগ্রহণ করিতেছে, আবার কেহ বা পুণ্যাচারীর ঘরে জন্ম গ্রহণ করিতেছে, কেন ?—ইহা আমাকে ভালরূপে বুঝাইয়া দিন। গুরু।—বংস! এই সব ধারণাই মতভেদের কারণ। যাহা হউক, তােমাকে আমি ভালরূপে জানাইব। বঙ্কা! মানব আপন আপন কৰ্ম্ম বা গুণ দ্বারা সদসদ যােনি প্রাপ্ত হয়, গুণসম্বন্ধে তােমায় স্থানান্তরে জানাইব। এখন তােমার অন্য সন্দেহ ভঞ্জন করিতেছি, শ্রবণ কর।

; চতুর্থ পরিচ্ছেদ মানুষের স্বরূপ। গুরু।বৎস! স্বামী বিবেকানন্দ জ্ঞানযােগে মানুষের স্বরূপ বিষয়ে যাহা বলিয়াছেন, তাহা তােমাকে জানাইতেছি; তাহা হইতেই তুমি সবই বুঝিতে পারিবে। আমরা প্রথমে দ্বৈতবাদীদের মত, আত্মা ও উহার গতি সম্বন্ধে তাহাদের মত বর্ণনা করিব। অবশেষে অদ্বৈতবাদের দ্বারা উভয় মতের সামঞ্জস্যসাধন করিতে চেষ্টা করিব। এই মানবাত্মা শরীর ও মন হইতে পৃথক্ বলিয়া এবং আকাশ প্রাণে গঠিত নয় বলিয়া অমর। কেন? মরত্বের বা বিনশ্বরত্বের অর্থ কি ? যাহা বিশ্লিষ্ট হইয়া যায়, তাহাই বিনশ্বর। আর যে দ্রব্য কতকগুলি পদার্থের সংযােগল, তাহাই বিশ্লিষ্ট হইবে। কেবল যে পদার্থ অপর পদার্থের সংযােগােৎপন্ন নয়, তাহা কখনও বিশ্লিষ্ট হয় না, সুতরাং তাহার বিনাশ কখনও হইতে পারে না, তাহা অবিনাশী। তাহা অনন্তকাল ধরিয়া রহিয়াছে, তাহার কখনও সৃষ্টি হয় নাই। সৃষ্টি কেবল সংযােগমাত্র। শূন্য হইতে সৃষ্টি কেহ কখনও দেখে নাই। সৃষ্টি সম্বন্ধে আমরা কেবল এই জানি যে, উহা পূর্ব হইতে অবস্থিত কতকগুলি বস্তুর নূতন নূতন রূপে একত্র মিলনমাত্র। তাহ যদি হইল, তবে এই মানবাত্মা ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর সংযােগােৎপন্ন নয় বলিয়া অবশ্য অনন্তকাল ধরিয়া ছিল, এবং অনন্ত কাল ধরিয়া থাকিবে। এই শরীর পাত হইলেও আত্মা থাকিবেন বেদান্তবাদীদের মতে যখন চতুর্থ পরিচ্ছেদ। এই শরীরের পতন হয়, তখন তাহার ইন্দ্রিয়গণ মনে লয় হয়, মন প্রাণে লয় হয়, প্রাণ আত্মায় প্রবেশ করে, আর তখন সেই মানবাত্মা যেন সূক্ষ্মশরীর বা লিঙ্গশরীররূপ বসন পরিধান করিয়া যান। এই সূক্ষ্মশরীরেই মানুষের সমুদায় সংস্কার বাস করে। সংস্কার কি ? মন যেন হ্রদের তুল্য, আর আমাদের প্রত্যেক চিন্তা যেন সেই হ্রদে তরঙ্গতুল্য। যেমন হ্রদে তরঙ্গ উঠ আবার পড়ে, পড়িষ্ম অন্তর্হিত হইয়া যায়, সেই রূপ মনে এই চিন্তাতরঙ্গ গুলি ক্রমাগত উঠিতেছে, আবার পড়িতেছে । কিন্তু উহারা একেবারে অন্তর্হিত না হইয়া ক্রমশঃ সূক্ষ্মতর হইয়া যায়; কিন্তু একেবারে লুপ্ত হয় না,-আবশ্যক হইলে আবার উদয় হয়। যে চিন্তাগুলি সূক্ষ্মতর রূপ ধারণ করিয়াছে, তাহারই কতকগুলিকে আবার তরঙ্গাকাবে আনয়ন করাকে স্মৃতি বলে। এইরূপ আমরা যাহা কিছু চিন্তা করিয়াছি, যে কোন কাৰ্য্য আমরা কারয়াছি, সবই মনের মধ্যে অবস্থিত আছে। সবগুলিই সূক্ষ্ম ভাবে অবস্থিতি করে, এবং মানুষ মরিলেও এই সংস্কারগুলি তাহার মনে বর্তমান থাকে। উহারা আবার সূশরীরের উপর কাৰ্য্য করিয়া থাকে। আত্মা এই সকল সংস্কার এবং সূক্ষ্মশরীররূপ বসন পরিধান করিয়া চলিয়া যান ও এই বিভিন্ন সংস্কার রূপ শক্তির সমবেত ফলই আত্মার গতি নিয়মিত করে। তাহাদের মতে আত্মার ত্রিবিধ গতি হইয়া থাকে। যাহারা অত্যন্ত ধার্মিক, তাহাদের মৃত্যু হইলে, তাহারা সূর্যরশ্মির অনুসরণ করিয়া সূৰ্যলােকে উপনীত হইতে চন্দ্রলােকে এবং চন্দ্রলােক হইতে বিদ্যুল্লোকে উপনীত হন। তথায় তাঁহাদের সহিত আর একজন মুক্তাত্মার সাক্ষাৎ হয় ; তিনি ঐ জীবাত্মাগণকে সর্বোচ্চ ব্ৰহ্মলোকে লইয়া যান। এই স্থানে উহারা সৰ্বজ্ঞতা ও সৰ্ব্ব- শক্তিমত্তা লাভ করেন। তাহাদের শক্তি ও জ্ঞান প্রায় ঈশ্বরের তুল্য আর অদ্বৈতবাদীদের মতে তাঁহার তথায় অনন্তকাল বাস ইন ; ; হয়।

ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। করেন, অথবা অদ্বৈতবাদীদের মতে কল্পবাসনা ব্রহ্মের সহিত একত্ব লাভ করেন। যাহারা সকামভাবে সৎকাৰ্য করেন তাহারা মৃত্যুর পরে চন্দ্রলােকে গমন করেন। এখানে নানাবিধ স্বর্গ আছে। তাহারা এখানে সূক্ষ্ম - শল্পীর—দেবশরীর লাভ করেন, অর্থাৎ তাহারা দেবতা হইয়া তথায় বাস করেন ও দীর্ঘকাল ধরিয়া স্বর্গসুখ উপভােগ করে। এই ভােগের অবসানে আবার তাঁহাদের প্রাচীন কৰ্ম্ম বলবান হয় ; সুতরাং তাহাদের মর্ত্যলােকে পতন হয়। তাঁহারা বায়ুলােক, মেঘলােক, প্রভৃতি লােকের ভিতর দিয়া আসিয়া অবশেষে বৃষ্টিধারার সহিত পৃথিবীতে পতিত হন। বৃষ্টির দ্বারা পতিত হইয়া তাহারা কোন শস্যকে আশ্রয় করিয়া থাকেন; তৎপরে সেই শস্য কোন ব্যক্তি ভােজন করিলে, তাহার ঔরসে সেই জীবাত্মা পুনরায় কলেবর পরিগ্রহ করে। যাহারা অতিশয় দুৰ্ব্ব ও, তাহাদের মৃত্যু হইলে, তাহারা ভূত বা দানব হয়, এবং চন্দ্রলােক ও পৃথিবীর মাঝামাঝি কোন স্থানে বাস করে। তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ মনুষ্যগণের উপর নানাবিধ অত্যাচার করিয়া থাকে ; কেহ কেহ আবার মানুষের প্রতি মিত্র-ভাবাপন্ন হয়। তাহারা কিছুকাল ঐ স্থানে থাকিয়া আবার পৃথিবীতে আসিয়া পশুজন্ম গ্রহণ করে। কিছুদিন পশুদেহে নিবাস করিয়া তাহারা আবার মানুষ হয়, আর একবার মুক্তিলাভ করিবার উপযােগী অবস্থা প্রাপ্ত হয়। তাহা হইলে আমরা দেখিলাম, যাহারা মুক্তির নিকটতম সােপানে পঁহুছিয়াছেন, যাহাদের ভিতরে খুব অল্প পরিমাণে অপবিত্রতা অবশিষ্ট আছে, তাঁহারাই সূৰ্যকিরণ ধরিয়া ব্ৰহ্মলােকে গমন করেন। যাহারা মাঝামাঝি রকমের লােক, যাহারা স্বর্গে যাইবার কামনা রাখিয়া কিছু সৎকাৰ্য করেন, চন্দ্রলােকে গমন করিয়া সেই সকল ব্যক্তি সেই স্থানস্থ চতুর্থ পরিচ্ছেদ। স্বর্গে বাস করেন। তথায় তাহারা দেবদেহ প্রাপ্ত হন, দেবদেহ প্রাপ্ত হন, কিন্তু হা- দিগকে মুক্তিলাভ করিবার জন্য আবার মনুষ্যদেহ ধারণ করিতে হইবে। আর যাহারা অত্যন্ত অসৎ, তাহারা ভূত দানব প্রভৃতি রূপে পরিণত হয় ; তারপর তাহারা পশু হয় ; তৎপরে মুক্তিলাভের জন্য তা- দিগকে অবার মনুষ্যজন্ম গ্রহণ করিতে হয়। এই পৃথিবীকে কৰ্ম্মভূমি বলে ; ভাল মন্দ কৰ্ম্ম সবই এখানে করিতে হয়। মানুষ স্বৰ্গকামী হইয়া সংকাৰ্য্য করিলে স্বর্গে গিয়া দেবতা হন। এই অবস্থায় আর তিনি কোন নূতন কৰ্ম্ম করেন না, কেবল পৃথিবীতে তাঁহাৰ কত সৎকৰ্ম্মের ফল ভােগ করেন ; আর এই সৎকৰ্ম্ম সেই শেষ হইয়া যায়, অননি তিনি জীবনে যে সকল অসৎ কর্ম করিয়াছিলেন, তাহার সমবেত ফল তাহার উপর বেগে আইসে; তাহাতে তাহাকে পুনৰ্ব্বার পৃথিবীতে টানিয়া আনে। এইরূপে যাহারা ভূত হয়, তাহারা সেই অবস্থায় কোন রূপ নূতন কৰ্ম্ম না করিয়াই কেবল ভূতকর্মের ফলভােগ করে ; তাহারা পশুজন্ম গ্রহণ করিয়া তথায়ও কোন নূতন কৰ্ম্ম করে না। তারপর তাহারা আবার মানুষ হয়। অতএব বেদান্ত-দর্শনের মতে মানুষই জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী আর পৃথিবীই সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান। কারণ, এই খানেই মুক্ত হইবার একমাত্র সম্ভাবনা। দেবতা প্রভৃতিকেও মুক্ত হইতে হইলে, মানবজন্ম গ্রহণ করিতে হইবে। এই মানবজন্মেই মুক্তির সর্বাপেক্ষা অধিক সুবিধা। এক্ষণে এই মতের বিরােধী মতের আলােচনা করা যাউক। বৌদ্ধগণ এই আত্মার অস্তিত্ব একেবারে অস্বীকার করেন। বৌদ্ধগণ বলেন, এই শরীর ও মনের পশ্চাতে যে আত্মা বলিয়া একটী পদার্থ আছে—ইহা মানিবার আবশ্যকতা কি ? এই শরীর ও মনােরূপ যন্ত্র স্বতঃসিদ্ধ বলিলেই কি যথেষ্ট ব্যাখ্যা হইল না ? আর একটা তৃতীয় পদার্থ কল্পনার প্রয়ােজন কি ? এই যুক্তি খুব প্রবল। যতদূর পর্যন্ত অনুসন্ধান চলে, ততদুর ;

ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। ; বােধ হয় এই শরীর ও মননযন্ত্র স্বতঃসিদ্ধ ; অন্ততঃ আমরা অনেকেই এই তত্ত্বটী এই ভাবেই দেখিয়া থাকি। তবে শরীর ও মনােহতিরিক্ত অথচ শরীর ও মনের আশ্রয়ভূমিস্বরূপ অত্মা নামক একটী পদার্থের অস্তিত্ব কল্পনার আবশ্যক কি? শুধু শরীর ও মন বলিলেই যথেষ্ঠ হয়। নিয়তপরিণামশীল জড়স্রোতের নাম শরীর, আর নিয়তপরিণামশীল চিন্তাস্রোতের নাম মন। তবে এই যে একত্বের প্রতীতি হইতেছে তাহা কিসে হয় ? বৌদ্ধ বলেন, এই একত্ব বাস্তবিক নাই। একটি জ্বলন্ত মশাল লইয়া ঘুরাইতে থাক; ঘুরাইলে একটি অগ্নির বৃত্ত স্বরূপ হইবে। বাস্তবিক কোন বৃত্ত হয় নাই, কিন্তু মশালের নিয়ত ঘূর্ণনে উহা ঐ বৃত্তের আকার ধারণ করিয়াছে। তদ্রুপ আমাদের জীবনেও একত্ব নাই, জড়ের রাশি ক্রমাগত চলিয়াছে। সমুদয় জড়ারাশিকে এক বলিতে ইচ্ছা কর, বল ; কিন্তু ভদতিরিক্ত বাস্তবিক কোন একত্ব নাই। মনের সম্বন্ধেও তদ্রুপ। প্রত্যেক চিন্তা অপর চিন্তা হইতে পৃথক্‌। এই প্রবলচিন্তাস্রোতেই এই ভ্রমাত্মক একত্বের ভাব রাখিয়া যাইতেছে ; সুতরাং তৃতীয় পদার্থের আর আবশ্যকতা কি ? এই যাহা কিছু দেখা যাইতেছে, এই জড়স্রোত ও চিন্তাস্রোত,—কেবল ইহাদেরই অস্থিত্ব আছে ; ইহাদের পশ্চাতে আর কিছু ভাবিবার আবশ্যকতা কি ? আধুনিক অনেক সম্প্রদায়ই বৌদ্ধদের এই মত গ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু তাহারা সকলেই এই মতকে তাঁহাদের নিজের আবিষ্কার বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে ইচ্ছা করেন। অধিকাংশ বৌদ্ধ-দর্শনের মূল কথা এই যে, এই পরিদৃশ্যমান জগৎই পৰ্যাপ্ত ; ইহার পশ্চাতে আর কিছু আছে কি না, তাহা অনুসন্ধান করিবার কিছু মাত্র আবশ্যকতা নাই। এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎই সৰ্বস্ব ; কোন বস্তুকে এই জগতের আপ্রয়রূপে কল্পনা করিবার কি আবশ্যকতা আছে, যাহাতে সেগুলি গিয়া থাকিবে ? পদার্থের জ্ঞান আইসে কেবল গুণরাশির চতুর্থ পরিচ্ছেদ। বেগে ; স্থান-পরিবর্তন বশতঃ কোন অপরিণামী পদার্থ বাস্তবিক উহাদের পশ্চাতে আছে বলিয়া নহে। আমরা দেখিলাম, এই যুক্তিগুলি অতি প্রবল। বাস্তবিকও লক্ষে একজনও এই দৃশ্য-জগতের অতীত কিছুর ধারণা করিতে পারে কি না, সন্দেহ। অধিকাংশ লােকের পক্ষে প্রকৃতি নিত্য- পরিমাণশালী মাত্র। আমাদের মধ্যে খুব অল্পলােকেই আমাদের পশ্চাদ্দেশস্থ সেই স্থির-সমুদ্রের অত্যল্প আভাসও পাইয়াছেন। আমাদের পক্ষে এই জগৎ কেবল তরঙ্গপূর্ণ মাত্র। তাহাহইলে আমরা দুই মত পাইলাম। একটি এই,—এই শরীর ও মনের পশ্চাতে এক অপরিণামী সত্তা রহিয়াছে। আর একটি মত—এই জগতে নিশ্চলত্ব বলিয়া কিছুই নাই; সবই চঞ্চল, সবই কেবল পরিণাম। অদ্বৈতবাদেই কেবল এই দুই মতের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। অদ্বৈতবাদী বলেন, জগতে একটি পরিণামী আশ্রয় আছে। দ্বৈতবাদীর এই বাক্য সত্য। অপরি- পামী কোন পদার্থ কল্পনা না করিলে আমরা পরিণাম কল্পনা করিতে পারি না। কোন অপেক্ষাকৃত অল্পপরিণামী পদার্থের তুলনায় কোন পদার্থকে পরিণামীরূপে চিন্তা করা যাইতে পারে; আবার তাহা অপেক্ষাও অল্পপরিণামী পদার্থের সহিত তুলনায় উহাকেও আবার পরিণামীরূপে নির্দেশ করা যাইতে পরে—যতক্ষণ না একটি সম্পূর্ণ অপরিণামী পদার্থ বাধ্য হইয়া স্বীকার করিতে হয়। এই জগৎপ্রপঞ্চ অবশ্য এমন এক অবস্থায় ছিল, যখন উহা স্থির শান্ত ‘ছল ; যখন উহা শক্তিদ্বয়ের সামঞ্জস্য স্বরূপ ছিল অর্থাৎ কোন শক্তিরই অস্থিত্ব ছিল না। কারণ, বৈষম্য হইলে শক্তির বিকাশ হয় না। এই ব্রহ্মাও আবার সেই সাম্যাবস্থা প্রাপ্তির জন্য চলিয়াছে;-যদি আমাদের কোন বিষয় সম্বন্ধে নিশ্চিত জ্ঞান থাকে, তাহা এই। দ্বৈতবাদীরা যখন বলেন, কোন অপরিণামী পদার্থ আছে, তখন তাঁহারা ঠিকই বলেন। কিন্তু উহা যে শরীর মনের সম্পূর্ণ অতীত, শরীর মন হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্‌ থাকে, একথা ভূল। বৌদ্ধেরা v ধর্মতত্ত্ববারিধি। ; ; যে বলেন, সমুদায় জগৎ যে কেবল পরিণাম-প্রবাহ মাত্র, একথাও সত্য; কারণ যতদিন আমি জগৎ হইতে পৃথক্‌, যতদিন আমি আমার অতিরিক্ত আর কিছুকে দেখি, মােটকথা, যতদিন দ্বৈতবাদ থাকে, ততদিন এই জগৎ পরিণামশীল বলিয়াই প্রতীত হইবে। কিন্তু প্রকৃত কথা,--এই জগৎ পরিণামীও বটে, অপরিণামীও বটে। আত্মা, মন ও শরীর, এই তিনটী পৃথক্ বস্তু নহে; উহারা একই। একই বস্তু কখন দেহ, কখন মন, কখন বা দেহ-মনের অতীত আত্মা বলিয়াই প্রতীত হয়। যিনি শরীরের দিকে দেখেন, তিনি মন পৰ্যন্ত দেখিতে পান না; আর যিনি মন দেখেন, তিনি আত্মা পর্যন্ত দেখিতে পান না। আর যিনি আত্মা দেখেন, তাহার পক্ষে শরীর মন কোথায় চলিয়া যায় ! যিনি কেবল গতি দেখেন, তিনি সম্পূর্ণ স্থিরভাব দেখিতে পান না ; আর যিনি সেই সম্পূর্ণ স্থিরভাব দেখেন, তাহার পক্ষে গতি কোথায় চলিয়া যায়। সর্পে রঞ্জুম হইলে, যে ব্যক্তি বজুকে সর্প দেখিতেছে, তাহার পক্ষে রঞ্জু কোথায় চলিয়া যায় । আর যখন ভ্রান্তি দূর হইয়া সেই ব্যক্তি রজুই দেখিতে থাকে, তাহার পক্ষে সর্পও কোথায় চলিয়া যায়। তাহা হইলে দেখা গেল, একটী মাত্র বস্তুই আছে ; তাহাই নানারূপ বলিয়া প্রতীত হইতেছে। উহাকে আত্মাই বল, আর বস্তুই বল, বা আর যা কিছু বল, জগতে কেবল একমাত্র ইহারই অস্থিত্ব আছে। অদ্বৈতবাদের ভাষায় বলতে গেলে, এই আত্মাই ব্রহ্ম,—কেবল নামরূপ উপাধিবশতঃ উহার বহুপ্রতীতি হইতেছে। সমুদ্রের তরঙ্গগুলির দিকে দৃষ্টিপাত কর; একটী তরঙ্গও সমুদ্র হইতে পৃথক্‌ নহে। তবে তরঙ্গকে পৃথক্‌ দেখাইতেছে কেন? নাম, রূপ, তরঙ্গের আকৃতি, আর আমরাই উহাকে তরঙ্গই এই যে নাম প্রদান করিয়াছি, তাহাতেই উহাকে সমুদ্র হইতে পৃথক্ করিয়ুাছে। নাম রূপ চলিয়া গেলে, উহা যে সমুদ্র ছিল সেই সমুদ্রই রহিয়া যায়। তরঙ্গ ও সমুদ্রের মধ্যে কে প্রভেদ কর্মিতে পারে ? অতএব এই সমুদয় জগৎ একস্বরূপ হইল;

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। কেবল নাম ও রূপই যত প্রার্থক্য রচনা করিয়াছে। যেমন সূৰ্য্য লক্ষ লক্ষ জলকণার উপর প্রতিবিম্বিত হইয়া প্রত্যেক জলকণার উপরেই সূর্যের একটি পূর্ণ-প্রতিকৃতি সৃষ্টি করে, তদ্রুপ সেই এক আত্মা সেই এক সত্তা, ভিন্ন ভিন্ন বস্তুতে প্রতিবিম্বিত হইয়া, নানারূপে উপলব্ধ হইতেছেন। কিন্তু বাস্তবিক উহা এক ; বাস্তবিক আমি বা তুমি বলিয়া কিছুই নাই—সবই এক। হয় বল সবই আমি, না হয় বল সবই তুমি। এই দ্বৈতজ্ঞান সবই মিথ্যা, অর সমুদয় জগৎ এই দ্বৈতজ্ঞানের ফল। যখন বিবেকের জ্ঞানে মানুষ বুঝিতে পারে,—দুইটা বস্তু নাই, একটা বস্তু আছে, তখন তাহার উপলব্ধি হয়—তিনিই এই অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডস্বরূপ হইয়াছেন। আমি এই পরিবর্তনশীল জগৎ; আমি আবার অপরিণামী নিগুণ, নিত্যপূর্ণ, নিত্যানন্দময়। অতএব নিত্যশুদ্ধ, নিত্যপূর্ণ—অপরি- শামী, অপরিবর্তনীয় এক আত্মা আছেন, তাঁহার কখনও পরিণাম হয় নাই। আর এই সকল বিভিন্ন পরিণাম সেই একমাত্র আত্মাতেই প্রতীত হইতেছে মাত্র। উহার উপরে নামরূপ এই সকল বিভিন্ন স্বপ্নচিত্র অঙ্কিত করিয়াছে। আকৃতিই তরঙ্গকে সমুদ্র হইতে পৃথক্ করিয়াছে। মনে কর, তরঙ্গটী মিশাইয়া গেল ; তখন কি ঐ আকৃতি থাকিবে ? না, উহা একে- বারে চলিয়া যাইবে। তরঙ্গের অস্তিত্ব সম্পৰ্ণরূপে সাগরের অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে ; কিন্তু সাগরের অস্তিত্ব তরঙ্গের অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে না। যতক্ষণ তরঙ্গ থাকে, ততক্ষণ রূপ থাকে ; কিন্তু তরঙ্গ নিবৃত্ত হইলে ঐ রূপ আর থাকিতে পারে না। এই নামরূপকে মায়া বলে। এই মায়াই ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির সৃজন করিয়া, একজনকে আর এক জন হইতে পৃথক্ বােধ করাইতেছে; কিন্তু ইহার অস্তিত্ব নাই। মায়ার অস্তিত্ব আছে— বলা যাইতে পারে না; কারণ, উহা অপরের অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে। আবার উহা নাই—তাহাও বলা যাইতে পারে না; কারণ, উহাই এই সকল ভেদ করিয়াছে। অদ্বৈবাদীর মতে এই মায়া বা অজ্ঞান কর নাম-রূপ ৪০ ধর্মতত্ত্ববারিধি। • অথবা ইউরােপিয়ানগণের মতে দেশ, কাল ও নিমিত্ত-এই এক অনন্ত সত্তা হইতে এই বিভিন্নরূপ জগৎ-সত্তা দেখাইতেছে। পরমার্থতঃ এই জগৎ এক অখণ্ডস্বরূপ। যতদিন পর্যন্ত কেহ এই দুইটী বস্তুর কল্পনা করেন, তিনি ভ্রান্ত। যখন তিনি জানিতে পারেন একমাত্র সত্তা আছে, তখনই তিনি যথার্থ জানিয়াছেন। যতই দিন যাইতেছে, ততই আমাদের নিকট এই সত্য প্রমাণিত হইতেছে। কি জড়-জগতে, কি মনােজগতে, কি অধ্যাত্ম-জগতে, সর্বত্রই এই সত্য প্রমাণিত হইতেছে। এখন প্রমাণিত হইতেছে যে তুমি, আমি, চন্দ্র, সূৰ্য্য,তারা, সবই এক জড়সমুদ্রের বিভিন্ন অংশের নামমাত্র। এই জড়রাশি ক্রমাগত পরিণাম প্রাপ্ত হইতেছে। যে শক্তিকণা কয়েক মাস পূর্বে সূৰ্য্য ছিল, তাহা আজ হয়ত মানুষের ভিতরে আসিয়াছে ; কাল হয়ত উহা পশুর ভিতরে যাইবে আবার পর হয়ত কোন উদ্ভিদে প্রবেশ করিবে। উহা সৰ্ব্বদাই আসিতেছে ও যাইতেছে। উহা একমাত্র অখণ্ড জড়াশি; কেবল নাম ও রূপে পৃথক্‌। ইহার এক বিন্দুর নাম সূৰ্য্য, এক বিন্দুর নাম চন্দ্র, এক বিন্দু তারা, এক বিন্দু মানুষ, এক বিন্দু পশু, এক বিন্দু উদ্ভিদ, এইরূপ। আর এই যে বিভিন্ন নাম—ইহা ভ্রমাত্মক। কারণ এই জড়শির ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটিতেছে। এই জগৎকেই আর-একভাবে দেখিলে চিন্তা- সমুদ্ররূপে প্রতীয়মান হইবে। উহার এক এক বিন্দু এক একটি মন। তুমি একটি মন, আমি একটি মন, প্রত্যেকেই এক একটি মনমাত্র। আবার এই জগৎ জ্ঞানের দৃষ্টি হইতে দেখিলে, অর্থাৎ যখন চক্ষু হইতে মােহবরণ অপসারিত হইয়া যায়, যখন মন শুদ্ধ হইয়া যায়, তখন উহাকেই নিত্যশুদ্ধ, অপরিণামী, অবিনাশী 'অখণ্ড, পূর্ণস্বরূপ পুরুষ বলিয়া প্রতীত হইবে। তবে দ্বৈতবাদীর পরলােক-বাদ-মানুষ মরিলে স্বর্গে যায়, অথবা অমুক অমুক লােকে যায়, অসৎ লোেক ভূত হয়, পরে পশু হয়,–এসব কথার কি হইল? অদ্বৈতবাদী বলেন,-কেহ ।

১১ ; ; চতুর্থ পরিচ্ছেদ। আসেও না, কেহ যায়ও না। তােমার পক্ষে যাওয়া আসা কিসে সম্ভব ? তুমি অনন্তরূপ ; তােমার পক্ষে যাইবার স্থান আর কোথায়? কোন বিদ্যালয়ে কতকগুলি ছোট বালক-বালিকার পরীক্ষা হইতেছিল। পরীক্ষক ঐ ছােট ছেলেমেয়ে গুলিকে নানারূপ কঠিন প্রশ্ন করিতেছিলেন। অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে তাহার এই প্রশ্নও ছিল,- পৃথিবী পড়িয়া যায় না কেন? অনেকেই এই প্রশ্নটা বুঝিতে পারে নাই ; সুতরাং যাহার মনে যাহা আসিতে লাগিল, সেই সেইরূপ উত্তর দিতে লাগিল। একটি বুদ্ধিমতী বালিকা, আর একটি প্রশ্ন তুলিয়া, ঐ প্রশ্নটীর উত্তর করিল,-“কোথায় উহা পড়িবে ?” ফলতঃ মূল প্রশ্নটাই ভুল। জগতে উচু জগতে উচু নীচু বলিয়া কিছুই নাই। উচু নীচু কেবল আপেক্ষিক মাত্র। আত্মাসম্বন্ধেও তদ্রুপ। জন্ম মৃত্যু সম্বন্ধে প্রশ্নই ভুল। কে যায়—কে আসে? তুমি কোথায় নাই ? এমন স্বর্গ কোথায় আছে, যেখানে পূৰ্ব্ব হইতেই তােমার অবস্থিতি নাই ? মানুষের আত্মা সর্বব্যাপী। তুমি কোথায় যাইবে ? কোথায় যাইবে না ? আত্মা ত সর্বত্রই। সুতরাং সম্পূর্ণজীবন্মুক্ত ব্যক্তির পক্ষে এই বালক- সুলভ স্বপ্ন, এই জন্মমৃত্যুরূপ বালকসুলভ ভ্ৰম, স্বর্গ নরক প্রভৃতি স্বপ্ন, সবই একেবারে অন্তর্হিত হইয়া যায়। যাহাদের ভিতরে কিঞ্চিৎ অজ্ঞান অবশিষ্ট আছে, তাহাদের পক্ষে উহা ব্ৰহ্মলােকান্ত নানাবিধ দৃশ্য দেখাইয়া অন্তর্হিত হয়; অজ্ঞানের পক্ষে উহা থাকিয়া যায়। সমুদয় জগৎ-স্বর্গে যাইবে, মরিবে, জন্মিবে,—একথা বিশ্বাস করে কেন? আমি একখানি গ্রন্থ পাঠ করিতেছি ; উহার পাতা উল্টান হইতেছে। এক পৃষ্ঠার পর আর এক পৃষ্ঠা আসিল ; উহা উল্টান হইল। পরিণাম প্রাপ্ত হইতেছে কে? কে যায় আসে? আমি নই ! কেবল পুস্তকের পাতা উল্টান হইতেছে। সমুদয় প্রকৃতিই আত্মার সম্মুখস্থ একখানি পুস্তকস্বরূপ। উহার অধ্যায়ের পর অধ্যায় পড়া হইয়া যাইতেছে ও উল্টান হইতেছে। নূতন দৃশ্য সম্মুখে আসিতেছে ; উহা পড়া হইয়া গেল ও উল্টান হইল। আবার নূতন ; ;

82 ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। ; অধ্যায় আসিল। আত্মা যেমন তেমনই অনন্তস্বরূপ। প্রকৃতিই পরিণাম প্রাপ্ত হইতেছেন,-আত্মা নহেন। উহার কখনও পরিণাম হয় না; জন্ম মৃত্যু প্রকৃতিতে,—তােমাতে নহে। তথাপি অজ্ঞেরা ভ্রান্ত হইয়া মনে করে, আমরা জন্মাইতেছি, মরিতেছি,-প্রকৃতি নহৈন। যেমন আমরা ভ্রান্তি বশতঃ মনে করি, সূৰ্য্যই চলিতেছেন—পৃথিবী নহে। এসকল সুতরাং ভ্রান্তি মাত্র। যেমন আমরা ভ্রমবশতঃ রেলগাড়ীর পরিবর্তে মাঠকে সচল বলিয়া মনে করি, জন্মমৃত্যুও ঠিক এইরূপ। যখন মানুষ কোন বিশেষরূপ ভাবে থাকে, তখন সে ইহাকে পৃথিবী, সূৰ্য্য, চন্দ্র, তারা, প্রভৃতি বলিয়া দেখে ; আর যাহারা ঐরূপ মনােভাবসম্পন্ন, তাহারাও ঠিক তাহাই দেখে। তােমার আমার মধ্যে লক্ষ লক্ষ লােক থাকিতে পারে, যাহারা বিভিন্নপ্রকৃতিসম্পন্ন। তাহারা আমাদিগকে কখন দেখিবে , আমরাও তাহাদিগকে কখন দেখিতে পাই না। আমরা একরূপ চিত্তবৃত্তিসম্পন্ন প্রাণীকেই দেখিতে পাই। সেই যন্ত্রগুলিই পরস্পর পরস্পরকে দেখিতে পায়, যেগুলি এক প্রকার কম্পনবিশিষ্ট মনে কর, আমরা এক্ষণে যেরূপ প্রাণকক্ষনসম্পন্ন, উহাকে আমরা মানবকম্পন নাম প্রদান করিতে পারি। যদি উহা পরিবর্তিত হইয়া যায়, তবে আর মনুষ্য দেখা যাইবে না ; উহার পরিবর্তে অন্যরূপ দৃশ্য আমাদের সমক্ষে আসিবে। হয়ত দেবতা ও দেবজগৎ; কিম্বা অসৎ লােকের পক্ষে দানব ও দানব-জগৎ ; কিন্তু ঐ সকলগুলিই এই এক জগতের বিভিন্ন মাত্র। এই জগৎ মানবদৃষ্টিতে পৃথিবী, সূৰ্য্য, চন্দ্র, তারা, প্রভৃতিরূপে ; আঁরার দানবের দৃষ্টিতে দেখিলে উহাই নরক বা শাস্তিস্থানরূপে প্রতীত হইরে। আবার যাহারা স্বর্গে যাইতে চাহেন, তাহারা ঐস্থানকে স্বর্গ বলিয়া দেখিবেন। যাহারা সজীব ভাবিতেছেন, আমরা স্বর্গসিংহাসনারূঢ় ঈশ্বরের নিকটে গিয়া সারা-জীবন তাহার উপাসনা করিব, তাহাদের মৃত্যু হইলে তাহারা তাহাদের চস্থ ঐ বিষয়ই দেখিবেন। তঁহাদেৱ চক্ষে এই জগৎই একটি বৃহৎ স্বর্গে ;

চতুর্থ পরিচ্ছেদ। ৪৩ এই সব ; পরিণত হইয়া যাইবে। তাহারা দেখিবেন,—নানাপ্রকার অপ্সর কিন্নর চারিদিকে উড়িয়া বেড়াইতেছে, আর দেবতারা সিংহাসনে উপবিষ্ট আছেন। স্বৰ্গাদি সমুদয় মানুষেরই কৃত। অতএব অদ্বৈতবাদী বলেন, দ্বৈতবাদীর কথা সত্য, কিন্তু ঐ সকল তাহার নিজেরই রচিত। এই সব লােক, দৈত্য, পুনর্জন্ম, প্রভৃতি সবই রূপক। মানব-জীবনও তাহাই। এইগুলি কেবল রূপক, আর মানব-জীবন সত্য, তাহা হইতে পারে না। মানুষ সৰ্ব্বদাই এই ভুল করিতেছে। অন্যান্য জিনিষ যথা স্বর্গ, নরক, প্রভৃতিকে রূপক বলিলে তাহারা বেশ বুঝিতে পারে; কিন্তু তাহারা নিজেদের অস্তিত্বকে রূপক বলিয়া কোন মতে স্বীকার করিতে চায় না। এই আপাত-প্রতীয়মান সমুদয়ই রূপকমাত্র ; আর সর্বাপেক্ষা মিথ্যা এই যে, আমরা শরীর, যাহা আমরা কখনই নই এবং কথনও হইতে পারি না। আমরা কেবল মানুষ, ইহাই ভয়ানক মিথ্যা কথা। আমরাই জগতের ঈশ্বর। ঈশ্বরের উপাসনা করিতে গিয়া আমরা নিজেদের অব্যক্ত আত্মারই উপাসনা করিয়া আসিতেছি। যিনি নিজে পাপী, তিনিই কেবল পরকে পাপী দেখিয়া থাকেন। মনে কর, এখানে একটি শিশু রহিয়াছে, আর তুমি টেবিলের উপর মােহরের একটা থলি রাখিলে ; মনে কর, এক জন দ্য আসিয়া ঐ মােহরের থলি লইয়া গেল। শিশুর পক্ষে ঐ মােহরের থলির অবস্থান ও অন্তর্ধান উভয়ই সমান। তাহার ভিতরে চোর নাই, সুতরাং সে বাহিরেও চোর দেখে না। পাপী ও অসৎ লােকেই বাহিরে পাপ দেখিতে পায়। কিন্তু সাধুলােকের পক্ষে তাহা বােধ হয় না। অত্যন্ত অসাধু পুরুষেরা এই জগৎকে নরকস্বরূপ দেখে ; যাহারা মাঝামাঝি লােক, তাহারা ইহাকে স্বর্গস্বরূপ দেখে ; আর যাহারা পূর্ণসিদ্ধপুরুষ, তাহারা ইহাকে সাক্ষাৎ ভগবানস্বরূপ দর্শন করেন। তখনই কেবল তাহার চক্ষু হইতে আবরণ পড়িয়া যায়, আর তখন সেই ব্যক্তি পবিত্র ও শুদ্ধ হইয়া দেখিতে পান—তাঁহার দৃষ্টি একেবারে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে, •০ ধর্মতত্ত্ববারিধি। যে সকল দুঃস্বপ্ন তাঁহাকে লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরিয়া উৎপীড়িত করিতেছিল, তাহ একেবারে চলিয়া গিয়াছে। আর যিনি আপনাকে এতদিন মানুষ দেবতা দানব প্রভৃতি বলিয়া মনে করিতেছিলেন, যিনি আপনাকে কখনও উর্ধে, কখনও অধােতে, কখনও পৃথিবীতে, কখন স্বর্গে, কখন বা অন্যস্থানে অবস্থিত বুলিয়া ভাবিতেছিলেন, তিনি দেখিতে পান, তিনি বাস্তবিক সর্বব্যাপী; তিনি কালের অধীন নহেন—কালই তাহার অধীন, এবং সমুদয় স্বর্গ তাঁহার ভিতরে। তিনি কোনরূপ স্বর্গে অবস্থিত নহেন ; আর মানুষ কোন না কোন কালে যে কোন দেবতার উপাসনা করিয়াছে, সবই তাহার ভিতরে। যিনি কোন দেবতায় অবস্থিত নহেন, তিনিই দেবাসুর, মানুষ, পশু, উদ্ভিদ, প্রস্তর প্রভৃতির সৃষ্টিকর্তা। আর তখন মানুষের প্রকৃত স্বরূপ তাহার নিকট এই জগৎ হইতে শ্রেষ্ঠতর, স্বর্গ হইতে শ্রেষ্ঠতর, এবং সর্বব্যাপী আকাশ হইতে অধিক সৰ্বব্যাপীরূপে প্রকাশ পায়। তখনই মানুষ নির্ভয় হইয়া যায় ; তখনই মানুষ মুক্ত হইয়া যায়; তখন সব ভ্রান্তি চলিয়া যায়; সব দুঃখ দূর হইয়া যায়; সব ভয় একেবারে চিরকালের জন্য শেষ হইয়া যায়। তখন জন্ম কোথায় চলিয়া যায়, তাঁর সঙ্গে মৃত্যুও চলিয়া যায় ; দুঃখও চলিয়া যায়, তার সঙ্গে সুখও চলিয়া যায় ; পৃথিবী উড়িয়া যায়, তাঁর সঙ্গে স্বর্গও উড়িয়া যায় ; শরীর চলিয়া যায়, তার সঙ্গে মনও চলিয়া যায়। সেই ব্যক্তির পক্ষে সমুদয় জগৎই যেন এক অব্যক্তভাব ধারণ করে। এই যে শক্তিরাশির নিয়ত সংগ্রাম—নিয়ত সংঘর্ষ, ইহা একেবারে স্থগিত হইয়া যায়। আর যাহা শক্তি ও ভূতরূপে, প্রকৃতিবিভিন্ন চেষ্টারূপে প্রকাশ পাইতেছিল, যাহা স্বয়ং প্রকৃতিরূপে প্রকাশ পাইতেছিল, যাহা স্বর্গ পৃথিবী উদ্ভিদ পশু মানুষ দেবতা প্রভৃতি রূপে প্রকাশ পাইতেছিল, সেই সমুদয় এক অনন্ত, অচ্ছেদ্য, অপরিণামী সত্তারূপে পরিণত হইয়া যায়। আর জ্ঞানী- পুরুষ দেখিতে পান, তিনি সেই সত্তার সহিত অভেদ। যেমন আকাশে নানাবণের মেঘ আসিয়া খানিকক্ষণ খেলা করিয়া পরে অন্তর্হিত হইয়া যায়, ; ;

৪৫ এমন চতুর্থ পরিচ্ছেদ। সেইরূপ এই আত্মার সম্মুখে পৃথিবী, স্বর্গ, চন্দ্রলােক, দেবতা, সুখ, দুঃখ প্রভৃতি আসিতেছে ; কিন্তু উহারা এক সেই অপরিণামী নীলবর্ণ আকাশকে আমাদের সম্মুখে রাখিয়া অন্তর্হিত হয়। আকাশ কখনও পরিণাম প্রাপ্ত হয় না; মেঘ কেবল পরিণাম প্রাপ্ত হয়। মূবশতঃ আমরা মনে করি, আমরা অপবিত্র, আমরা সান্ত, আমরা জগৎ হইতে পৃথক। প্রকৃত মানুষ এই এক অখণ্ড সত্তাস্বরূপ। এক্ষণে দুইটি প্রশ্ন আসিতেছে। প্রথমটি এই অদ্বৈত-জ্ঞান উপলব্ধি করা কি সম্ভব ? এতক্ষণ পর্যন্ত মতের কথা হইল, ইহার অপরােহ্মানুভূতি কি সম্ভব? হা,সম্পূর্ণ সম্ভব। অনেক লােক সংসারে এখনও জীবিত, যাহাদের পক্ষে অজ্ঞান চিরদিনের মত চলিয়া গিয়াছে। ইহারা কি এই সত্য উপলব্ধি করিবার পরই মরিয়া যান ? আমরা যত শীঘ্র মনে করি, তত শীঘ্র নয়। এক কাষ্ঠখণ্ড-সংযােজিত দুইটি চক্র একত্রে চলিতেছে। যদি আমি একখানি চক্র ধরিয়া সংযােজক কাষ্ঠখণ্ডটি কাটিয়া ফেলি, তবে আমি যে চক্রখানি ধরিয়াছি, তাহা থামিয়া যাইবে; কিন্তু অপর চক্রের উপর পূর্বপ্রদত্ত বেগ রহিয়াছে, সুতরাং উহা কিছুক্ষণ গিয়া তবে পড়িয়া যায়। পূর্ণ ও শুদ্ধস্বরূপ আত্মা যেন একখানি চক্র, আর এই শরীরমনােরূপ ভ্রান্তি আর একটি চক্র,-কৰ্ম্মরূপ কাষ্ঠখণ্ড দ্বারা উহারা যােজিত। জ্ঞানই সেই কুঠার, যাহা ঐদুইটির সংয়ােগ-দৃণ্ড ছেদন করিয়া দেয়। তখন আত্মারূপ চক্র স্থগিত হইয়া যাইবে—তখন আত্মা আসি- তেছেন, যাইতেছেন, অথবা তাহার জন্ম মৃত্যু হইতেছে--এ সকল অজ্ঞানের ভাব পরিত্যাগ করিবেন। আর প্রকৃতির সহিত তাহার মিলিত ভাব এবং অভাব, বাসনা—সবই চলিয়া যাইবে। তখন আত্মা দেখিতে পাইবেন, তিনি পূর্ণ বাসনা-বিরহিত। কিন্তু শরীর-মনােরূপ অপর চক্রে প্রাক্তন কর্মের বেগ থাকিবে। সুতরাং যত দিন না এই প্রাক্তন কৰ্ম্মের বেগ একেবারে নিবৃত্ত হয়, তত দিন উহা থাকিবে। এই বেগ নিবৃত্ত হইলে শরীর-মনের পতুন হইবে, তখন আত্মা মুক্ত হইবেন। তখন আর স্বর্গে যাওয়া বা স্বর্ণ ;

৪৬ ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। হইতে ফিরিয়া আসা, এমন কি ব্ৰহ্মলােক গমন পর্যন্ত স্থগিত হইয়া যাইবে। তিনি কোথা হইতে আসিবেন, কোথায়ই বা যাইবেন ? যে ব্যক্তি এই জীবনেই এই অবস্থা লাভ করিয়াছেন, যাঁহার পক্ষে অন্ততঃ এক মিনিটের জন্যও এই সংসার-দৃশ্য পরিবর্তিত হইয়া গিয়া সত্য প্রতিভাত হইয়াছে, তিনি জীবন্মুক্ত বলিয়া কথিত হন। এই জীবন্মুক্তি অবস্থা লাভ করাই বেদান্তীর লক্ষ্য।”

. পঞ্চম পরিচ্ছেদ। আমি কে? তুমি কে ? মুক্তি ও বৃন্ধন। “ আমি কে? আমি দৃশ্যমান (যােগবাশিষ্ঠ, উপশম-প্রকরণ, উনষষ্টিতম অধ্যায়।) ( মাণ্ডব্য ঋষি প্রস্থান করিলে, রাজা একান্তেঃগমন পূর্বক নিজ সাধু- বুদ্ধিতে চিন্তা করিতে লাগিলেন, ) মেরুপৰ্বত নহি ; এই জগৎও আমার নহে। আমি শৈল নহি, এই শৈলও আমার নহে। আমি পৃথিবী নহি ; এই পৃথিবীও আমার নহে। আমি এই কিরাতমণ্ডল নহি; এই কিরাতমণ্ডলও আমাৰ নহে। “সৰ্ব্বজনের সম্মতিক্রমে এই দেশের রাজ্যে আমি অভিষিক্ত”—এই রূপ সঙ্কেতে (কল্পনামাত্রে) কেবল এই দেশ আমার হইয়াছে ; ( বাস্তবিক ইহা আমার নহে)। আমি এক্ষণে উক্ত সঙ্কেত পরিত্যাগ করিলাম। আমি এদেশ নহি, এই দেশও আমার নহে। কথিত পদার্থসমূহ- মধ্যে কিছুই আমি নহি। এক্ষণে অবশিষ্ট এই নগরী, তাহাও আমি নহি, ইহাই স্থির। পতাকারূপ বনশ্রেণীতে পরিপূর্ণ, স্থানে স্থানে উদ্যানসঙ্কুল, গজ-অশ্ব-সামন্ত-ভৃত্য-পরিজন-সমন্বিত এই পুরীও আমি নহি ; ইহাও আমার নহে। বৃথা সঙ্কেতবশতঃ আমর সহিত এই সমস্ত সম্বন্ধ হইয়াছিল। এক্ষণে সে সঙ্কেত অপগত হওয়াতে আমার উক্ত প্রকার দৃশ্যপদার্থের সহিত সম্বন্ধ গিয়াছে। অবশিষ্ট ভােগসমূহ ও কলত্র, তাহাও আমি নহি ;

৪৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। নহি ; ; উহাও আমার নহে। এইরূপ ভৃত্য-বাহন-নগর-সম্বলিত এই রাজ্যও আমি নহি। এই রাজ্যও আমার নহে। উক্ত সঙ্কেত কেবল ব্যবহার-পরম্পরায় প্রসিদ্ধ হইয়া উঠিয়াছে, ফলতঃ উহা মিথ্যা। এক্ষণে অবশিষ্ট হস্তপদাদিমান্ দেহ ; বােধ হয় এই দেহই আমি। এক্ষণে এই দেহ-বিষয়ক বিচার করিয়া দেখি,--এদেহ আমি কি না? এই দেহস্থিত যে অস্থিমাংস, ইহা ত আমি ; কারণ ইহা অচেতন, আমি সচেতন। পদ্মপত্রে সলিল যেমন সংশ্লিষ্ট হয় না, সেইরূপ এই অস্থিমাংসাদির সহিত আনি কোনরূপে সংশ্লিষ্ট নহি। মাংস, অস্থি, রক্ত, এ-সমস্ত জড় পদার্থ ; সুতরাং আমি ইহা নহি এবং এ সকলের সহিত আমার কোন সম্বন্ধ নাই। এই হস্তপদাদি কৰ্ম্মেন্দ্রিয়ও আমি নহি; ইহারাও আমার নহে। এই দেহমধ্যে যে কিছু জড়পদার্থ আছে, তৎসমুদয়ও আমি নহি, কারণ আমি চেতন। এই ভােগসমূহও আমি নহি ; এ সকলও আমার নহে। জড় অসৎস্বরূপ এই বুদ্ধীন্দ্রিয়ও আমি নহি এবং ইহারাও আমার নহে। সংসার-দোষের মুল এই মনও আমি নহি; কারণ উহা জড়। এই যে অহঙ্কার বুদ্ধি দৃষ্ট হইতেছে, ইহাও আমার নহে; যেহেতু উহা মনেরই অবস্থাবিশেষ। এইরূপে শরীর হইতে আরম্ভ করিয়া মন-বুদ্ধীন্দ্রিয়াদি পর্যন্ত স্থূলসূক্ষ্মভূত- প্রপঞ্চ, ইহার মধ্যে কোনটাই আমি হইতে পারিলাম না। এক্ষণে ইহার অবশিষ্ট যাহা আছে,তাহা একবার বিচার করিয়া দেখ। এক্ষণে অবশিষ্ট জীব, সে যদি চেত্য বিষয়ের চেতনা (প্রমান করিতে পারে, তাহা হইলে উক্ত জীব চেতন-প্রমাতা) হইতে পারে এবং আমিও উক্ত জীব, ইহা বলিতে পারি; কিন্তু ঐ জীবও সাক্ষী-চৈতন্যকর্তৃক বােধ্যমান হইয়া থাকে, সুতরাং উহাও আমি নহি। উহার নিজের কোন শক্তি নাই। যেহেতু সাক্ষীসংবেদ্য প্রতি প্রমেয় উক্ত জীব আমি নহি ; সুতরাং আমি উহা ত্যাগ করিলাম। এক্ষণে আমি ঐ সকলের জবশিষ্ট বিকল্পবিবর্জিতৃ বিশৃদ্ধচিৎই হইলাম। কি আশ্চর্য! এত্ব কাল পঞ্চম পরিচ্ছেদ। ৪৯ ; ; ; যে চেষ্টা করিয়া আসিতেছি, আজ তাহা সফল হইল; আমি যে চিৎ- স্বরূপ, তাহা আজি জানিতে পারিলাম ; আজি আমার আত্মলাভ হইল। আমি সেই অনন্ত আত্মা ; এই পরমাত্মারূপী আমার অন্ত নাই। যেমন মুক্তাহারের সূত্র প্রত্যেক মুক্তাতেই, গ্রথিত—সম্বদ্ধ, সেইরূপ এই ভগবান্ আত্মা-ব্রহ্মা, ইন্দ্র, যম, বায়ু প্রভৃতি নিখিল ভূতসমূহে সম্বদ্ধ। এই নির্মলা চিতিশক্তি চেত্যবােগ হইতে নিম্মুক্ত; চেত্যের সহিত ইহার সম্বন্ধ নাই। চিতিশক্তি নিখিল দিচক্র পূর্ণ করিয়া ভীষণ আকারে অবস্থান করিতেছেন। অথচ ইনি সৰ্বভাবের অনুগত অতিসূক্ষ্মা ; কিন্তু ইহাতে ভাব- অভাব কিছুই নাই। ইনি আব্ৰহ্ম- স্তম্ভপৰ্যন্ত নিখিল-ভুবনের অন্তরে অবস্থিত; এই নিখিল শক্তির পেটিকা-স্বরূপিণী। ইনি সৰ্ববিধ সৌন্দর্য্যে সুশােভিতা ও নিখিল- বহুপ্রকাশবিষয়ে প্রদীপরূপিণী । এই চিতিশক্তি নিখিলসংসাররূপ মুক্তকলাপের বিস্তৃত তন্ত্রস্বরূপা ; ইনি সৰ্ববিধ আকৃতি-বিকৃতিতে পরিপূর্ণ ; অথচ ইহার কোনপ্রকার আকার নাই। ইনি নিখিলভূত- স্বরূপতা প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। ইনি সর্বদা সৰ্বভাবপ্রাপ্তা ; ইনি ব্রহ্মাণ্ড- মধ্যে চতুর্দশভুবনের চতুর্দশপ্রকার ভূতসমূহ ধারণ করিতেছেন ; ইনি নিখিলজগৎকল্পনাস্বরূপা ও বেদনাত্মিক। এই সুখদশা উক্ত চিৎশক্তির মিথ্যা আভাসমাত্র ; এই পরমা চিৎই আমার আত্মা এবং জগদব্যাপী। এই চিৎই আমার বুদ্ধিসাক্ষী ; ইনি দ্রষ্টা ও দৃশ্যরূপে বিভিন্ন আকৃতি ধারণ পূৰ্ব্বক “আমি রাজা” এবংবিধ ভ্রান্তি উৎপাদন করিতেছেন। এই চিতির প্রসাদেই মন দেহরথে আরূঢ় হইয়া সংসার জালে লাল-সহকারে চলিত, বল্পিত ও নৰ্তিত হইতেছে। এই শরীরাদি বস্তুতঃ কিছুই নহে; এই ক্ষণভঙ্গুর শরীরাদি নষ্ট হইলে, কিছুই নষ্ট হইবে না। সাক্ষীরূপিণী চিতিই বুদ্ধিরূপ দীপশিখা দ্বারা এই জগৎজালময় ব্যাপী চিত্তনটের নৃত্য সম্পাদন করিতেছেন। এযাবৎ ;

ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। প্রজাবর্গের নিগ্রহ ও অনুগ্রহবিষয় লইয়া মদীয় দেহে বৃথা চেষ্টা হইতেছিল। কারণ দেহ কিছুই নহে। অহহ! আমি এক্ষণে প্রবুদ্ধ হইয়াছি; আমার সে দুদৃষ্টি গিয়াছে ; যাহা দ্রষ্টব্য, তৎসমস্তই দৃষ্ট হইয়াছে ; যাহা প্রাপ্তব্য, তাহা সমস্তই “পাইয়াছি। এই যে জগদগত নিখিলদৃশ্য দৃষ্ট হইতেছে, ইহাতে চিতির মায়ায় জীবভ্রম, তাহার অভ্যন্তরে সপ্তদশ লিঙ্গশরীরভ্রম, তাহার মধ্যে বাহ অন্তঃকরণে বিভেদ ভ্রম ও তাহার অভ্যন্তরে জাগ্রৎস্বপ্ন দৃশ্যম—এই ভ্ৰম-পরম্পরা ব্যতীত আর কিছুই শাশ্বত বস্তু নাই অর্থাৎ ইহা অংশ। অংশ করিয়া বিচার করিলে ভ্রান্তি ব্যতীত আর কিছুই “ইহাতে নাই। সুতরাং ইহাতে নিগ্রহ, অনুগ্রহ ও হর্ষ-ক্রোধ কোথায় কি প্রকারে কি স্বরূপে অবস্থান করিতেছে, তাহাত দেখিতে পাইতেছি না। ইহাতে আবার সুখ কি ? দুঃখই বা কি? এই সমস্তই ত একমাত্র বিতত-ব্ৰহ্ম। আমি এযাবৎ বৃথা মােহমগ্ন ছিলাম ; ভাগ্যক্রমে আমার এক্ষণে সে মােহ দূর হইয়া গিয়াছে। পরমানন্দরূপে অনুভূয়মান এই একমাত্র ব্রহ্মে শশাকের বিষয়ই বা কি? আর মােহের বিষয়ই বা কি? দর্শনীয়ই বা কি ? করণীয়ই বা কি ? অবস্থিতিই বা কি ও গমনই বা কি? (এ সকলের কিছুই ইহাতে সম্ভবে না)। এ সমস্ত অলৌকিক চমৎকার চিদাকাশস্বরূপ বিরাজমান রহিয়াছে। হে তত্ত্ববিহীন সুন্দর চিদাকাশ ভাগ্যক্রমে অন্ত তােমাকে দেখিতে পাইলাম ; তােমাকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার করি। আহা! আমি এক্ষণে সম্যক প্রবােধ প্রাপ্ত হইয়াছি; আমার সম্যক জ্ঞানলাভও হইয়াছে ; সম্যক্‌জ্ঞানলাভে আমি অনন্ত হইয়াছি; আমাকে আমি নমস্কার করি। আমি উপাধিবিরামহতু স্থির সুষুপ্তিকলায় একীভূত হইয়া বিগতরঞ্জন ও নিৰ্বিষয়ভাবে সংসার- ভ্রমশূন্য রঞ্জনাবিবর্জিত আত্মার আত্যন্তিক, অভিন্নরূপে অবস্থান করিতেছি।” ;

পঞ্চম পরিচ্ছেদ। বৎস, এইবার বন্ধন ও মুক্তির বিষয়ে কিছু বলিব। “প্রকৃতিই পুরুষকে বন্ধন করে। প্রকৃতি হইতে পুরুষের উদ্ধারকেই বলে মুক্তি। প্রকৃতির হাতে পড়িয়া পুরুষ আত্মবিস্মৃত হইয়া আত্মমহত্ব হারাইয়া ফেলেন। ভুলিয়া যাওয়াই হারান। আবার স্মরণে চৈতন্য হয়; তাহাই পাওয়া। আত্মা বা পুরুষকে আপনার স্বরূপ স্মরণ করানই মুক্তির প্রথম কাৰ্য। পুরুষ আপনাকে আপনি স্মরণ করিয়া জীবাত্মাতে পরমাত্মার ধ্যান করুন। ধ্যানেই মুক্তি। ধ্যানেই আত্মা স্মরণ করেন । তিনিই পরমাত্মা! আত্মার স্বরূপ স্মরণ করায় কে ? মন এব মনুষ্যানাং কারণং বন্ধমুক্তয়াের। প্রকৃতির বিকারই মন। জীব এই মনের সহিত যুক্ত হইয়াছে। মন দুই অবস্থা লাভ করিতে পারে। জীব মনদ্বারা বদ্ধ হইলেও আপন স্বরূপ ভুলে না। জীবাত্মা যখন নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধিতে অভিমান করেন, তখন সেই নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি মনকে বৈরাগ্য উপদেশ দেয়,—“রে মন! সমস্তই ক্ষণস্থায়ী জানিয়া বৈরাগ্য অবলম্বন কর।” ইহা বুদ্ধিযুক্ত আত্মার উপদেশ। মন বৈরাগ্যযুক্ত হইলে আবার আত্মাকেই তাহার স্বরূপ স্মরণ করাইয়া দেয় ; আর বিষয় যুক্ত হইলে আত্মাকে সৰ্ব্বদা সুখে দুঃখে চঞ্চল করে। আত্মা সর্বদা আপন স্বরূপে থাকিয়াও অহং অভিমানে আপনাকে সুখী দুঃখী ভাবনা করেন। সাধকের কাৰ্য্য প্রথমে মনকে বৈরাগ্যে উপদিষ্ট করা। যত দিন বৈরাগ্য দ্বারা মন বিষয় হইতে আপনাকে প্রত্যাহার না করে, তত দিন উপদেশ করা চাই। কি দেখিবে, কি চাহিবে, কিই বা শুনিবে ? সব ভােগই ত করিয়া দেখিয়াছি ; দুঃখ ভিন্ন সুখ ত পাও নাই। তবে আর কেন? বিষয় দেখা ছাড়; একবার আত্মাকে দেখ। প্রথমে বৈরাগ্য-বিষয়ক উপদেশ দ্বারা বিষয়ে অনাস্থা জন্মাইয়া নিজের স্বরূপ স্মরণ করাও, আত্মদর্শন কর। এই আত্মদর্শন জন্য প্রথম কাৰ্য-শ্ৰবণ বেদান্ত ধর্মতত্ত্ববারিধি। ; বা উপনিষদ্‌-বাক্যে আত্মার কথা শ্রবণ কর ; পরে যুক্তিদ্বারা তাহা যে নিশ্চয়, তাহা স্থির কর। ইহা হইল মনন। শ্রবণ ও মনন ঠিক হইলে হইবে ধ্যান। ধ্যান অর্থে এখানে আত্মভাবে স্থিতি। আর এক প্রকার ধ্যান আছে ; যােগী ইহার অনুষ্ঠান করেন। জ্ঞানী আত্মার কথা শ্রবণ মনন নিদিধ্যাসন করিয়া আত্মদর্শন করেন। ইহা উপরকার যােগীর ক্রম নিম্ন হইতে। চিত্ত বিষয় লইয়া থাকে বলিয়া প্রথমে মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, ও উপেক্ষা অভ্যাসদ্বারা সুখে মিত্রভাব, , দুঃখে করুণা, পুণ্যে মুদিতা এবং পাপের প্রতি উপেক্ষা-ভাবনা কর। মৈত্রী করুণা মুদিতা ও উপেক্ষা অভ্যাস দ্বারা চিত্ত ক্ষণে রুষ্ট, ক্ষণে তুষ্ট হইবে না, একভাবে একটা প্রসন্ন অবস্থায় থাকিবে। পরে প্রাণায়াম দ্বারা ইহাকে চঞ্চলতা-শূন্য কর ; পরে প্রত্যাহার দ্বারা বৈরাগ্য অভ্যাস করাও। যতবার বিষয়ে যাইতে চাহিবে, ততবার ইহাকে বৈরাগ্য স্মরণ করাইয়া বিষয়-বিমুখ কর। চিত্ত যখন আর বাহিরে যাইতে চাহিবে , তখন ইহাকে শরীর-মধ্যে কোন আধ্যাত্মিক-প্রদেশে—যেমন নাভিচক্রে বা হৃদয়পদ্মে বা নাগ্রে বা জমধ্যে অথবা হৃদয়কমল-মধ্যবর্তী ভগবৎ- মূর্তিতে বন্ধন কর। ইহাই হইল ধারণা। চিত্তকে সর্বদা ধ্যেয়বস্তুতে বন্ধন কর। হৃদয়-পুণ্ডরীকে যে শূন্য আকাশ আছে, তাহাতে সগুণ- ব্ৰহ্ম চিন্তা করিতে হয়। ইহাই দহর বিদ্যা। ধারণা গাঢ় হইলেই ধ্যান। গাঢ়ধ্যানই—সমাধি। সমাধি-ভঙ্গে শ্রবণ, মননও নিদিধ্যাসনে মুক্তি। মুক্তি হইলে প্রকৃতি আর ভুলাইতে পারিবে না। প্রকৃতি আপনার পুরুষকে মুগ্ধ করিতে কত হাব-ভাব' দেখাইবে, কত চেষ্টা করিবে; আর পুরুষ দেখিবে, শুনিবে, সব করিবে সত্য ; কিন্তু এ দেখা, শুনায় আর মুগ্ধ হইবে না। বেশ্যার ভিতরটা একবার দেখিয়া ফেলিলে, বেশ্যা যেমন আর মুগ্ধ করিতে পারে না, সেইরূপ। প্রকৃতির এ কি কাৰ্য সকলই ক্ষণস্থায়ী, সমস্তই দোষযুক্ত। ইহা দেখিলে আর

পঞ্চম পরিচ্ছেদ
•
?
প্রকৃতিকে ভাল লাগিবে না। একদিকে আপনাকে আপনি দেখার সুখ
অনুভূত হইতেছে ; আর এক দিকে কাপড়ে—বেশভূষায় ব্যাধিগ্রস্ত
বেশ্যা দেখা হইতেছে ; আর পুরুষ মুগ্ধ হইবে কিসে? যখন আপন
সুন্দরস্বরূপ দেখিয়া দেখিয়া ডুবিয়া যাইতেছেন, তখন আত্মধ্যানে
সমাধি। আবার সমাধি ভাঙ্গিলে ব্যাধিগ্রস্ত বেশ্যা ভিন্ন দেখার কিছুই
নাই। কাজেই আবার অন্তরে প্রবেশ করিয়া স্বরূপদর্শন। এইরূপে
আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ
শ্রোতব্যো মন্তব্যে। নিদিধ্যাসিব্যঃ ॥”
EID
.

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। = গুরু।-বৎস! এক্ষণে কর্মসম্বন্ধে বলিতেছি, শ্রবণ কর। “ষটপদার্থবাদী বৈশেষিক কর্ণাদ কৰ্ম্মকে তৃতীয় পদার্থ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তদনুসারে ভাষা পরিচ্ছেদ ও তৃতীয় পদার্থরূপে কৰ্ম্ম। পরিদৃশ্যমান জগতে বিচিত্ররূপে চিত্রিত নানাবিধ পদার্থ উপলব্ধি করা যায় ; ঐ বিচিত্র ভাবের প্রতি কৰ্ম্মই একমাত্র কারণ। বিষয়ে সাঙ্কার ভগবান্ কপিল বলিয়াছেন; যথা—“কৰ্মবৈচিত্র্যাৎ সৃষ্টিবৈচিত্র্যং” করুণাময় পরমেশ্বরের ইচ্ছায় এই জগতের সৃষ্টি হইয়াছে। জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি, সুখ, দুঃখ, হিংসা, দ্বেষ, রাগ, অভিনিবেশ, প্রভৃতি কোনরূপ কৰ্ম্ম পরমাত্মা পরমেশ্বরকে আশ্রয় করিতে পারে না। ভগবান পতঞ্জলি বলিয়াছেন, “ক্লেশকর্মবিপাকাশয়ৈপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষ ঈশ্বরঃ।” তিনি সৃষ্টি-সময় হইতে প্রলয়-কাল পর্যন্ত ভূত- প্রপঞ্চ ও জন্মমরণশীল জীবজন্তু সকলকেই সমভাবে দৃষ্টি করিতেছেন, পাপী ও পুণ্যাত্মা উভয়ের প্রতি সমভাবে দৃষ্টি করিতেছেন। সৃষ্টির আদিতে পরমাত্মা পরমেশ্বর ব্যতীত অন্য কিছুই ছিল না। ছিল না। এ বিষয়ে শ্রুতি বলিয়াছেন, “আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীৎ, নাৎ কিঞ্চনমিষৎ।” করুণাম ভগবান একাই সৃষ্টির পুর্বে অবস্থিত ছিলেন এবং সৃষ্টি হইতে সৃষ্টবস্তুর বিনাশ-সময় পর্যন্ত সৃষ্টবস্তুসমূহে সমভাবে দৃষ্টি রাখিয়া যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। সকলকে পালন করিতেছেন। এ কথা যদি সত্য হইল, তবে শরীর- ধারী জীবসমূহ সমভাবে সুখ দুঃখ লাভ করিতেছে না কেন? কেহ রুগ্ন, কেহ সুস্থ, কেহ সুন্দর, কেহ বা কুংসিত হয় কেন? কেহ বাঞ্ছিত ফললাভে সৰ্ব্বদা শান্তি অনুভব করিয়া শরীরযাত্রা শেষ করিতেছে; আবার কাহারও ভাগ্যে দেখিতেছি জন্মাবধি জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত বাঞ্ছিত ফললাভে বঞ্চিত হইয়া সর্বদা দুঃখেরই অনুভূতি। অধিক কি, বহুলােক নিরন্তর নানাবিধ তাপে উত্তপ্ত হইয়া করুণাময় পরমেশ্বরে দোষারােপ করিতেছে। সুতরাং দোষবিবর্জিত ভগবানের রাজ্যে এই সকল বৈষম্যভাব দর্শন করি কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য স্বীকার করিতে হইবে যে, শাস্ত্রকারের ঐ কথাই সত্য—“কৰ্মবৈচিত্র্যাৎ সৃষ্টবৈচিত্র্যং।” অর্থাৎ কর্ম বহু, এই জন্য সৃষ্টি ও বহুতর। কর্ম নানারূপে অবস্থিত, এই কারণ সৃষ্টজগৎও নানরূপে অবস্থান করিতেছে। কৰ্ম্ম অনাদি ও অনন্ত ; সুতরাং কৰ্ম্মজনিত সৃষ্টি-প্রবাহেরও আদি অন্ত নাই। স্থাবর, জঙ্গম, কীট, পতঙ্গ, প্রভৃতি জীবগণ পূর্ব-পূৰ্ব্ব- জন্মজ্জিত কৰ্ম্মবশতঃ নানারূপে নানাভাবে বিভক্ত হইয়া ভুয়ােভুয়ঃ জন্মপরিগ্রহ করিতেছে; আমি উত্তমশরীরবিশিষ্ট মানব-স্ব- ইচ্ছায় নানাবিধ কাৰ্যানুষ্ঠান করিতেছি। আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক, এই ত্রিবিধ তাপ হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য নিয়ত চেষ্টা করিতেছি। যে দিকে দুঃখ, সে দিক হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া সুখের দিকে বারংবার অগ্রসর হইতেছি। শীত-উত্তাপ-জনিত ক্লেশ নিবারণের জন্য কতই উপায় উদ্ভাবন করিতেছি, এবং তাহাতে অনেক পরিমাণে কৃতকার্য হইতেছি। বৃক্ষাদির এ সকল তাপ হইতে উদ্ধার পাইতে কোনরূপ চেষ্টা করিবার অধিকার নাই ; পরন্তু অচল- অটলভাবে অবস্থান পূর্বক উহারা শীত তাপ প্রভৃতি জনিত বহুতর দুঃখ অনুভব করিতেছে। ইহার একমাত্র কারণ—পূর্বজন্মের অনুষ্ঠিত কৰ্ম্ম।

ধৰ্ম্মতত্ববারিধি। ; মানবগণের মধ্যে কেহ অকালে মৃত্যুগ্রাসে পতিত হয়, আবার কেহবা দীর্ঘজীবন লাভ করে ; ইহারও পূৰ্বাৰ্জিত কৰ্ম্মই এক মাত্র কারণ। এ বিষয়ে পাতঞ্জলি বলিয়াছেন, “ক্লেশ মূলঃ কর্মশিয়াে দৃষ্টাদৃষ্ট জন্ম বেদনীয়ঃ সতি মূলে তদ্বিপজাত্যায়ুর্ভোগা।” এই বাক্যে সকল কৰ্ম্মের স্বরূপ যতদূর প্রকাশিত হইল, তাহাতে বুঝিতে হইবে, যে কৰ্ম্মকে মহাত্মা কণাদ প্রভৃতি ঋষিগণ পদার্থনিরূপণ-প্রসঙ্গে তৃতীয় পদার্থরূপে নির্দেশ করিয়াছেন, সেই কৰ্ম্মই অদৃষ্ট উৎপাদন দ্বারা সৃষ্টিবৈচিত্র্যের হেতু। অদৃষ্টজীবের ধর্মবিশেষ। যদ্বারা বস্তুর স্বরূপ রক্ষা হয়, তাহাকেই তাহার ধর্ম বলে। জীবাত্মাতে যে সকল শক্তি বা গুণ নিহিত আছে, তাহাই জীবের ধর্ম বলিয়া নির্দিষ্ট। যেরূপ বত্নির ধর্ম- দাহিকাশক্তি, জলের ধৰ্ম্ম-শীতলতা, সেইরূপ কৰ্ম্ম অর্থাৎ কর্মজনিত অদৃষ্টও জীবাত্মার একটি ধর্ম। এই কৰ্ম্মরূপ ধৰ্ম্ম হইতে জীব উত্তম, মধ্যম ও অধম, এই ত্রিবিধগতি প্রাপ্ত হয়। পরিদৃশ্যমান সৌরজগতে যে সমস্ত ভৌতিক রাজ্য অথবা গ্রহ-উপগ্রহ আমরা অনুভব করি, ঐ সমস্তই জীবের ভােগসাধনস্থান। কৰ্ম্ম হইতেই জীব ঐ সকল স্থানে পরিভ্রমণ করে। কর্মের দ্বারা যখন যে স্থানে যাইবার উপযুক্ত হয়, তখন সেই স্থানেই যায়।”-ব্রাহ্মণসমাজ। “শিক্ষার উপাদান শুধু বস্তুজগতে নিবদ্ধ হইলে শিক্ষার অঙ্গহানি হয়। আধ্যাত্মিক শিক্ষা-ভক্তির দ্বার দিয়া শিক্ষাই শিক্ষার প্রধান অঙ্গ। চাই ভক্তি; দেশের প্রতি ভক্তি, দশের প্রতি ভক্তি, রাজার প্রতি ভক্তি, আপনার প্রতি ভক্তি; আর—সকলের চেয়ে বড়—চাই- ভগবানের প্রতি ভক্তি। এই ভক্তির অর্জনেই হচ্ছে শিক্ষার চরিতার্থতা, জ্ঞানলাভের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যসিদ্ধি, কর্মীর কর্মিত্ব। যে সঙ্কীর্ণ অর্থে জ্ঞান ও ভক্তি, শিক্ষা ও শ্রদ্ধার কথা এ প্রবন্ধে প্রয়ােগ করিয়াছি, সে অর্থে জ্ঞান ও ভক্তি না থাকিলে কৰ্ম্ম থাকিতে পারে না। জ্ঞান হচ্ছে কর্মের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। নয়ন, আর ভক্তি তার হৃদয় বা মন। নয়ন মন ও ছাড়া জীব চরাচরে দেখিয়াছ কি ? এই তিনের সামঞ্জস্য না ঘটিলে কৰ্ম্ম করা আর না করা সমান। কৰ্ম্মত্যাগের কথা তোমরা বহু বহু শুনে থাক। আমাদের পক্ষে কর্মত্যাগ একেবারে অসম্ভব। বস্তুতঃ, কৰ্ম্মত্যাগ তারই সাজে --কৰ্ম্ম ঘরে ত্যাগ করেছে,যার মন সঙ্কল্প বিকল্পের দ্বারা পরামষ্ট হয় না, সংসারের দ্বন্দ্ব যাঁহার কাছে অস্তিত্বহীন ফাকা জিনিষ। বড় বড় সাধকের পক্ষেও চিত্তশুদ্ধির জন্য, ধ্যান-ধারণার সহজ সাধুনের জন্য, কৰ্ম্মের বিধেয়তা শাস্ত্রে উপদিষ্ট রয়েছে। তবে কৰ্ম্মত্যাগ কথাটার আসল তাৎপর্য হচ্ছে-কৰ্ম্মফলত্যাগ-ভগবানে সর্বকৰ্ম্ম সমর্পণ। ভক্তের আত্মসাধনা --‘ত্বয়া হৃষীকেশ ! হৃদিস্থিতেন, যথা নিযুক্তোহস্মি তথা করােমি।” অথবা সাধক কবি রামপ্রসাদের “যা শিখাও মা তাই শিখি” শ্রেণীর পােষা-পাখীর বুলি—এরূপ আত্মসমর্পণের প্রকৃষ্ট নিদর্শন।” বৎস! কর্মসম্বন্ধে আরাে সংক্ষেপে জানাইতেছি। মহাত্মা লােকনাথ বসু তাঁহার হিন্দুধর্ম মর্মে এবিষয়ে যাহা লিখিয়াছেন, তাহা তােমাকে বলিতেছি। “মুক্তির অব্যবহিত কারণ যে তত্ত্বজ্ঞান, তাহা চঞ্চল, এবং সমল মনে উদিত হয় না। চিত্তের চাঞ্চল্য দূর করিয়া তাহাকে নিৰ্বাতদীপ- তুল্য সুস্থির করা পরমেশ্বরের উপসনার কৰ্ম্ম, এবং মনােমালিন্য সম্যক্‌- রূপে পরিষ্কারকরণ পূর্বক শুদ্ধ স্ফটিকের ন্যায় নির্মল করা ঈশ্বরে প্রগাঢ় অথচ নৈষ্ঠিকী ভক্তি ব্যতীত অন্য কাহারও সাধ্য নহে। অপিচ সেই যে দৃঢ় ভক্তি, তাহা নিত্যনৈমিত্তিকাদি কৰ্ম্ম দ্বারাই লব্ধ হয়। ভগবানের ধ্যান, সেবা ও পরিচর্যা (যাহাকে পূজা বলা যায়) নাম গ্রহণ (জপ), তাহার স্মরণ, মনন এবং স্তবাদি পাঠ করার নামই উপাসনা।

৫৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। যে বস্তু কখনও চক্ষুগােচর হয় নাই, ও যাহার আকার-প্রকার কদাচ শ্রুত হয় নাই, এবং যাহার দৃষ্টান্ত নাই, তাহার ধ্যান অথবা পূজাদি কিছুই সম্ভবে না, এবং কোনদেশীয় কোন পণ্ডিত এ পর্যন্ত পরমেশ্বরের স্বরূপ নির্ণয় করিতে পারেন নাই। সকলেই তাঁহার সত্তা মাত্র স্বীকার করিয়াছেন। অম্মদাদির ধর্মশাস্ত্রে অধিক এই উক্ত হইয়াছে যে, তিনি চিৎ, সৎ, আনন্দ, অদ্বিতীয়, অখণ্ড, অচল, অজ, অক্রিয়, কূটস্থ, স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপ, স্বপ্রকাশ ও ব্রহ্ম এই দ্বাদশ বিশেষণের বিশেষ্য। এমত অবস্থায় তাহার উপাসনা, অর্থাৎ ধ্যান-ধারণাদি সম্পন্ন হইবার উপায় কি আছে ? সেই উপাসনা প্রথমাবস্থায় খণ্ডরূপে করণাবশ্যক হইয়া, তদর্থে নানা কৌশল করিবার প্রয়ােজন হইয়াছে। প্রথম কৌশল,—পরমেশ্বর সর্বজীবের হৃদয়ে পরিচ্ছিন্নভাবে দারুস্থিত বহ্রির ন্যায় আত্মারূপে অধিষ্ঠিত আছেন, এহেতু আত্মােপসনাতেই তাহার উপাসনা করা হয়। যেমন কোন মান্যব্যক্তির পদাঙ্গুষ্ঠমাত্র পূজা করিলেই তাহার সমুদায় শরীরের পূজা সিদ্ধ হইয়া থাকে, তদ্রুপ। কিন্তু সেই আত্মারও কোন অবয়ব নাই, অতএব ধ্যান-ধারণাদি সাধনা সম্পাদনের নিমিত্ত আত্মার এক এক রূপ কল্পনা করিবার প্রয়ােজন হইয়াছে। সাধকেরা স্বয়ং ঐ কল্পনা করিলে পাছে ভক্তির ত্রুটি এবং ব্যভিচার দোষ উপস্থিত, অর্থাৎ সময়ে সময়ে উপাস্য মূর্তি পরিবর্তনেচ্ছা হয়, এ নিমিত্ত গুরুকরণপূর্বক উপাস্য বিগ্রহ অর্থাৎ ইষ্টদেবতা এবং তাঁহার মন্ত্ররূপ গুহনাম লাভকরত স্থূলাবয়বে চিত্তের স্থৈর্য এবং প্রেমলক্ষণ ভক্তির আবির্ভাব পৰ্যন্ত পরব্রহ্মের ঐ সকল নাম ও মূর্তির প্রতি দৃঢ়বিশ্বাসে একাগ্রচিত্তে স্বহৃদয়ে তাহারই চিন্তা এবং মানসপূজা করিবার বিধান অবধারিত হইয়াছে। দ্বিতীয় কৌশল,—অন্তর্যাগ অপেক্ষা বহির্যাগে মন অধিক নিবিষ্ট হয়, এবং পরমেশ্বর যেমন প্রাণিমাত্রের হৃদয়ে আছেন, তদ্রুপ বাহিরেও আছেন, অর্থাৎ তাঁহার সারহিত স্থানই নাই; অতএব গন্ধ- পুদি যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। তাঁহার পদপদ্মে এবং নৈবেদ্যাদি তাহার মুখচন্দ্রিমাতে প্রদান করিতেছি, এমত মনে করিয়া যে কোন স্থানে তাহা অর্পণ করা যায়, তাহাতেই তাহার পূজা সিদ্ধ হইতে পারে; এ নিমিত্ত বাহ পূজার সৃষ্টি হইয়াছে। “সাধারণ বিবেচনায় শুচি মনােমালিন্য করাই বােধ হইতে পারে ; কিন্তু তত্ত্বদর্শীরা সারগ্রাহী, এজন্য তাহাকে যােগাঙ্গস্বরূপে গণনা করিয়াছেন। তুমি কিঞ্চিৎ বিবেচনা করিলেই জানিতে পারিবে যে, স্থূলদেহের সহিত মনের এতাধিক আন্তরিক সম্বন্ধ আছে, যেন উভয়েই একধৰ্ম্মাক্রান্ত এবং বাস্তবিক তাহাই বটে; যেহেতু উভয়ের জড় পদার্থ। অতএব স্থূলদেহের অপবিত্রতায় মনের অশুচি এবং তামসিক আহারে, তাহার তমােগুণের বৃদ্ধি করে। পক্ষান্তরে স্থূলদেহের পবিত্রতায় মনের শুদ্ধি জন্মে, এবং সাত্ত্বিক আহারে সত্ত্বগুণের প্রভাব হয় ; সুতরাং চিত্তশুদ্ধির নিমিত্ত শুদ্ধাচার এবং ব্রহ্মচর্যাদি নিতান্ত প্রয়ােজনীয়। “ব্রহ্মচর্য শব্দের অর্থ ভাগবতের ষষ্ঠ স্কন্দের প্রথমাধ্যায়ে (১২) দ্বাদশ শ্লোকের টীকায় শ্রীধরস্বামী কর্তৃক ধৃত হইয়াছে, যথা- “স্মরণং কীৰ্ত্তনং কেলিঃ প্রেক্ষণং গুহ্যভাষণ। সঙ্কল্লোহধ্যবসায়শ্চ ক্রিয়ানিষ্পত্তিরেব চ। এতস্মৈথুনষ্টাঙ্গং প্ৰবদন্তি মনীষিণঃ । স্ত্রীলােকের স্মরণ ও কীৰ্ত্তন, তাহাদের সহিত ক্রীড়া ও দর্শন, তাহাদের সহিত নির্জন স্থানে কথােপকথন, মানসিক মৈথুন এবং ক্রিয়ানিষ্পত্তি অর্থাৎ কায়িক মৈথুন, এই অষ্টপ্রকার মৈথুন কথিত হইয়াছে। ইহার বিপৰ্যয় অর্থাৎ এই সকল না করা ব্রহ্মচর্য শকে বাচ্য হয়। কাম্য, নিষিদ্ধ, নিত্য, নৈমিত্তিক, প্রায়শ্চিত্ত ও উপাসনা, এই যকর্মের মধ্যে আদ্যোক্ত দুইটি মুমুক্ষুজনের সম্বন্ধে অবশ্যই পরিত্যজ্য; যেহেতু কাম্য কৰ্ম্মবন্ধের হেতু হয়, এবং নিষিদ্ধ কর্মে পাপ জন্মায়, এজন্য তাহার ধর্মতত্ত্ববারিধি। অনুষ্ঠানে সকলেরই ক্ষান্ত থাকা উচিত। উপাসনা কৰ্ম্মের বিষয় পূৰ্বেই কহিয়াছি। অতএব অবশিষ্ট তিন কৰ্ম্মের কথা মাত্র তুলি। সন্ধ্যা- বন্দনাদি, স্নান, তর্পণ, প্রত্যহিক ইষ্টপূজা, স্মৃত্যুক্ত একাদশী, জন্মাষ্টমী, শিবরাত্যাদি ব্ৰত, পিতৃমাতৃশ্রাদ্ধ ইত্যাদি কৰ্ম্ম, যাহার অকারণে প্রত্যবায় হয়, তাহার নাম নিত্যকর্ম। পুত্ৰজন্মদি নিমিত্তক জাত্যেষ্টি প্রভৃতি মৃতপিতৃমাত্রাদি বন্ধুজনের আদ্য শ্রাদ্ধ-তড়াগাদি খনন ও উৎসর্গ এবং সেতু-বন্ধনাদি তান্ত্রিক বার্ষিক পূজা ইত্যাদি কর্মের নাম নৈমিত্তিক। প্রায়শ্চিত্ত কৰ্ম্ম তাহাকে বলা যায় যাহা পাপক্ষয়ার্থে কৃত হয়, যথা চান্দ্রায়নাদি ব্ৰত। কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ, মাৎসর্য্য, যাহারা ঐহিক ও পারত্রিক এবং শারীরিক হানি- কর বলিয়া ষড় রিপু সংজ্ঞায় গণ্য হয়, তাহারা এবং ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, শােক, অহঙ্কার, মমকার, নিন্দা, দ্বেষ, হিংসা, ঈর্ষা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা,, কপটতা, সংশয়, অভাবনা, বিপরীত ভাবনা, ইত্যাদি যে সকল মনােবৃত্তি নীতিশাস্ত্রেও দূষ্যরূপে বর্ণিত হইয়াছে, তাহারাই মনের মল জানিবে। ঐ সকল অসদবৃত্তি যে পাপজ, তাহা বলিবার অপেক্ষা নাই, সুতরাং প্রায়শ্চিত্ত কর্মে—যাহার মধ্যে তপস্যাও গণ্য হইতে পারে- ঐ পাপ ক্ষয় হইয়া মননামালিন্যের মূলােৎপাটন হইবার সন্দেহ কি আছে ? অপর, নিত্য-নৈমিত্তিক এবং উপাসনা কৰ্ম্ম ঈশ্ববােদ্দেশে অর্থাৎ শুদ্ধ তাহারই প্রীত্যর্থে করিলে তিনি সন্তুষ্ট হয়েন। যেহেতু তিনি অন্তঃকরণের অধিষ্ঠাতা প্রযুক্ত অন্তরের ভাবমাত্র গ্রহণ করেন, এবং তাহার সন্তোষের পরিমাণে সুতরাং মনের প্রসন্নতা হওয়া সম্ভব। যেহেতু তিনিই মনের নিয়ন্তা। অতএব ঐ প্রসন্নতার ফলে ঈশ্বরে যে ভক্তির বৃদ্ধি হইবে, তাহার সংশয় নাই। কেন না যে কর্মে সুফলপ্রাপ্তি হয় তাহাতেই লোকের শ্রদ্ধা জন্মে, ইহা সৰ্ব- লোকে প্রসিদ্ধ আছে। অপর ঈশ্বরে প্রগাঢ় ভক্তি হইলে অসৎ বৃত্তিরা, যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। কোথায় উদয়ের স্থান প্রাপ্ত হইবে ? বিশেষতঃ মনের কুপ্রবৃত্তি সকল রজঃ এবং তমােগুণজনিত। ঈশ্বরে নৈষ্ঠিকি ভক্তির উদয় হইলে ঐ রজঃ এবং তমােগুণের হ্রাস হইয়া সত্ত্বের প্রভাব হয় ; তাহাতেও অসদবৃত্তি উদয়ের সম্ভাবনা।” বৎস, পূজনীয় বঙ্কিম বাবু মহাভারত হইতে উদ্ধত করিয়া তাহার গীতা ব্যাখ্যায় লিখিয়াছেন, “শুচি ও কুটুম্ব-পরিপালক হইয়া বেদাধ্যয়ন করতঃ জীবন যাপন করিবে, এইরূপ শাস্ত্রনির্দিষ্ট বিধি বিদ্যমান থাকিলেও ব্রাহ্মণগণের নানাপ্রকার বুদ্ধি জন্মিয়া থাকে। কেহ কৰ্ম্মবশতঃ, কেহ বা কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া এক মাত্র বেদজ্ঞান দ্বারা মােক্ষলাভ হয়, এইরূপ স্বীকার করিয়া থাকে। কিন্তু যেমন ভােজন না করিলে তৃপ্তিলাভ হয় না, তদ্রুপ কৰ্ম্মানুষ্ঠান না করিলে, কেবল বেদজ্ঞ হইলে ব্রাহ্মণগণের কদাচ মােক্ষলাভ হয় না। যে সমস্ত বিদ্যার দ্বারা কাৰ্য্য সাধন হইয়া থাকে তাহাই ফলবতী ; যাহাতে কোন কৰ্ম্মানুষ্ঠানের বিধি নাই, সে বিদ্যা নিতান্ত নিষ্ফল ; অতএব যেমন পিপাসার্ত ব্যক্তির জলপান মাত্র পিপাসার শান্তি হয়, তদ্রুপ ইহকালের যে সকল কর্মের ফল প্রত্যক্ষ হইয়া থাকে, তাহারই অনুষ্ঠান করা কর্তব্য। হে সঞ্জয়! কৰ্ম্মবশতই এইরূপ বিধি বিহিত হইয়াছে ; সুতরাং কৰ্ম্মই সর্বপ্রধান। যে ব্যক্তি কৰ্ম্ম অপেক্ষা অন্য কোনও বিষয়কে উৎকৃষ্ট বিবেচনা করিয়া থাকে, তাহার সমস্ত কৰ্ম্মই নিষ্ফল হয়। দেখ, দেবগণ কৰ্ম্মবলে প্রভাবসম্পন্ন হইয়াছেন; সমীরণ কৰ্ম্মবলে সতত সঞ্চরণ করিতেছেন; দিবাকর কৰ্ম্মবলে আলস্যশূন্য হইয়া অহােরাত্ৰ পরিভ্রমণ করিতেছেন; চন্দ্রমা কৰ্ম্মবলে নক্ষত্রমণ্ডলী-পরিবৃত হইয়া মাসার্ধ উদিত হইতেছেন ; হুতাশন ধৰ্ম্মবলে প্রজাগণের কৰ্ম্ম সংসাধন করিয়া নিরবচ্ছিন্ন উত্তাপ প্রদান করিতেছেন; স্রোতস্বতীসকল কর্মবলে প্রাণীগণের তৃপ্তিসাধন করিয়া সলিলরাশি ধারণ করিতেছে। অমিতবলশাল দেবরাজ ; ; ;

ধৰ্ম্মতত্ববারিধি। ; ইন্দ্র দেবগণের মধ্যে প্রাধান্য লাভ করিবার নিমিত্ত ব্ৰহ্মচর্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। তিনি সেই কৰ্ম্মবলে দশদিক ও নভােমণ্ডল হইতে বারিবর্ষণ করিয়া থাকেন, এবং অপ্রমত্ত চিত্তে, ভােগবিলাস বিসর্জন ও প্রিয়বস্তু সমুদয় পরিত্যাগ করিয়া শ্রেষ্ঠত্বলাভ, এবং দম, ক্ষমা, সমতা, সত্য ও ধর্ম প্রতিপালন পূৰ্ব্বক দেবরাজ্য অধিকার করিয়াছেন। ভগবান বৃহস্পতি সমাহিত হইয়া ইন্দ্রিয় নিবােধন পূর্বক ব্রহ্মচর্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন; এই নিমিত্ত তিনি দেবগণের আচাৰ্য পদ প্রাপ্ত হইয়াছেন। রুদ্র, আদিত্য, যম, কুবের, গন্ধৰ্ব্ব, যক্ষ, অপ্সর, বিশ্বাবসু ও নক্ষত্রগণ কর্ম প্রভাবে বিরাজিত রহিয়াছেন। মহর্ষিগণ, ব্রহ্মবিদ্যা, ব্রহ্মচর্য ও অন্যান্য ক্রিয়া-কলাপের অনুষ্ঠান করিয়া শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়াছেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাহার জ্ঞানযােগে যাহা উপদেশ দিয়াছেন, তাহা তােমাকে জ্ঞাত করাইবার জন্য উদ্ধত করিলাম—“যদিও সৎ উভয়ই আত্মার খণ্ড প্রকাশ মাত্র, তথাপি অসম্ভাবই আত্মার বাহ-আবরণ, আর সদ্ভাব মানুষের প্রকৃতস্বরূপ যে আত্মা, ভঁহার অপেক্ষাকৃত নিকটতর আবরণ। যতদিন না মানুষ অসতের স্তর ভেদ করিতে পারিতেছেন, ততদিন তিনি সতের স্তরে পঁহুছিতেই পারিবেন না ; আর যতদিন না তিনি সদসৎ উভয় স্তর ভেদ করিতে পারিতেছেন, ততদিন তিনি আত্মার নিকট পঁহুছিতে পারিবেন না। আত্মার নিকট পঁহুছিলে তাহার কি অবশিষ্ট থাকে ; অতি সামান্য কৰ্ম্ম-ভুক্ত জীবনের কার্যের অতি- সামান্য বেগই অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু এ বেগ শুভ কর্মেরই বেগ। যতদিন অসদ্বেগ একেবারে রহিত হইয়া না যাইতেছে যতদিন পূর্ব অপবিত্রতা একেবারে দগ্ধ হইয়া না যাইতেছে, ততদিন কোন ব্যক্তির পক্ষে সত্যকে প্রত্যক্ষ এবং উপলব্ধি করা অসম্ভব। সুতরাং যিনি আত্মার নিকট পঁহুছিয়াছেন, যিনি সত্যকে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, তাহার কেবল ভূতজীবশের শুভসংস্কার, শুভ বেগগুলি অবশিষ্ট থাকে। শরীরে বাস যষ্ঠ পরিচ্ছেদ। করিলেও এবং অনবরত কৰ্ম্ম করিলেও তিনি কেবল সৎকৰ্ম্ম করেন, তাহার মুখ সকলের প্রতি কেবল আশীৰ্বাদ বর্ষণ করেন; তাহার হস্ত কেবল সৎকাৰ্য্যই করিয়া থাকেন; তাহার মন কেবল সৎচিন্তা করিতে সমর্থ ; তিনি উপস্থিতিই। তিনি যেখানেই যান না কেন, সর্বত্রই মানব- জাতির মহা-কল্যাণকর। এরূপ ব্যক্তির দ্বারা কোন অসৎ কর্ম কি সম্ভবে ? তােমাদের স্মরণ রাখা উচিত প্রত্যক্ষানুভূতি এবং শুধু মুখে বলার” ভিতর বিস্তর প্রভেদ! অজ্ঞান ব্যক্তিও নানা জ্ঞানের কথা কহিয়া থাকে। তােতা পক্ষীও এইরূপ বকিয়া থাকে। মুখে বলা এক, আর উপলব্ধি আর এক। দর্শন মতামত, বিচার, শাস্ত্র, মন্দির, সম্প্রদায়, প্রভৃতি কিছু মন্দ নহে; কিন্তু এই প্রত্যক্ষানুভূতি হইলে, ও সঁব আর থাকে । মানচিত্র অবশ্য উপকারী, কিন্তু মানচিত্রে অঙ্কিত দেশ স্বয়ং প্রত্যক্ষ করিয়া আসিয়া তার পর আবার সেই মানচিত্রের দিকে দৃষ্টিপাত কর, তখন তুমি কত প্রভেদ দেখিতে পাও। সুতরাং যাহারা সত্য উপলব্ধি করিয়াছে তাহাদিগকে উহা আর বুঝাইবার জন্য ন্যায় যুক্তি তর্ক বিতর্ক প্রভৃতির আশ্রয় লইতে হয় না। তাহাদের পক্ষে উহা তাহাদের অন্তরাত্মার মর্মে মর্মে প্রবিষ্ট হইয়াছে।” এই কাৰ্যটা যেমন বৃহত্তম ও মহত্তম, উহার উপকরণও তেমনি কঠিন, বহু জন্মে বহুতর নিত্যনৈমিত্তাদি সৎকৰ্ম্মই ইহার উপকরণ। মহাত্মা পরমহংসজব উপদেশ দিয়াছেন— আড়। আড়া জলের কথা পাঞ্জি আছে লেখা। নিড়াইলে পাঞ্জিখানি বিন্দু যায় না দেখা। তেমনি রকম ধৰ্ম্মকথা শাস্ত্রে আছে লেখা। সাধন ভজন না করিলে পাতা ঘাঁটা মিছা । শিষ্য। সাধন কাহাকে বলে, তাহা বিস্তারিত ভাবে বুঝাইয়া দিউন।

৬৪ ধর্মতত্ত্ববারিধি। ক ২। গুরু। মহাত্মা লােকনাথ বসু লিখিয়াছেন,-“দশ ইন্দ্রিয় এবং মনকে বশীভূত করার নাম সাধনা। তাহা চারি প্রকার, যথা, ১। নিত্যানিত্য-বস্তুবিবেক। ব্ৰহ্মাই নিত্যবস্তু, তভিন্ন সকল বস্তু অনিত্য—এই প্রকার বিবেচনা। ইহা মূত্র ফল ভােগ বিরাগ। যেমন কর্ম জন্য প্রযুক্ত ঐহিক মাল্যচন্দনাদি বিষয়ভােগ সকল অনিত্য, তদ্রপ পারত্রিক স্বৰ্গাদি বিষয়ভােগ সকলও কৰ্ম্মজন্য হেতু অচিরস্থায়ী, অতএব তাহা হইতে সুতরাং নিবৃত্তি। ৩। সম-দমাদি সাধন সম্পত্তি। সম-ঈশ্বরবিষয়ক শ্রবণ মনন, এবং নিদিধ্যাসন ব্যতিরিক্ত বিষয় হইতে অন্তরিন্দ্রিয়ের নিগ্রহ ; এবং দম শ্রবণাদি ব্যতিরিক্ত বিষয় হইতে বাহেন্দ্রিয়ের নিবৃত্তি। ৪। মুমুক্ষুত্ব।—মােক্ষেচ্ছা। জ্ঞানশাস্ত্রে এই চারিটী সাধনচতুষ্টয় নামে খ্যাত আছে। কিন্তু সম- দদির অন্তর্গত আর চারিটী সাধন আছে ; তাহা এই ঃ-(১) উপরতি অর্থাৎ বিধিপূৰ্ব্বক বিহিত কৰ্ম্মের পরিত্যাগ, অর্থাৎ অননুষ্ঠান। (২) তিতিক্ষা, শীতােষ্ণাদি সহন। (৩সমাধান অর্থাৎ ঈশ্বর বিষয়ক শ্রবণা- দিতে বা তৎসদৃশ কোন বিষয়ে নিগৃহীত মনের একাগ্রতা। এবং (৪) শ্রদ্ধা, অর্থাৎ গুরুবাক্যে ও বেদান্ত-বচনে বিশ্বাস। এতদ্ভিন্ন অষ্টাঙ্গ যােগাভ্যাসকেও এক প্রকার সাধনা বলা যাইতে পারে। ঐ সকল অঙ্গের নাম, (১) যম, অর্থাৎ অহিংসা, সত্য, অচৌর্য্য ও অপরিগ্রহ। (২) নিয়ম অর্থাৎ শুচি, সন্তোষ, তপস্যা, অধ্যয়ন, এবং ঈশ্বরে প্রণিধান। (৩) আসন অর্থাৎ হস্তপদাদির সংস্থানবিশেষ যথা পদ্মাসন প্রভৃতি। (৪) প্রাণায়ম অর্থাৎ রেচক, পুরক, কুম্ভকরূপ, প্রাণ দমন করিবার উপায়। (৫)প্রত্যাহার ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। অর্থাৎ শব্দাদি বিষয় হইতে শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়গণের নিবারণ। (৬) ধারণা অর্থাৎ অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মবস্তুতে অন্তকরণের অভিনিবেশ। (৭) ধ্যান অদ্বিতীয় ব্ৰহ্মবস্তুতে অন্তঃকরণের বৃত্তিপ্রবাহ; এবং (৮) সমাধি। ঐ সমাধি দুই প্রকার ;-সবিকল্প ও নির্বিকল্পক। জ্ঞাতা, জ্ঞান, জ্ঞেয়, এই বিকল্পত্রয়ের জ্ঞান সত্ত্বেও অদ্বিতীয় ব্রহ্মবস্তুতে অখণ্ডাকারাকারিত চিত্তবৃত্তির অব স্থানকে সবিকল্প সমাধি, এবং জ্ঞাতা, জ্ঞান ও জ্ঞেয়, এই বিকল্পত্ৰয় জ্ঞানের অভাবে অদ্বিতীয় ব্রহ্মবস্তুতে একীভূত হইয়া অখণ্ডাকারাকারিত চিত্তবৃত্তির অবস্থানকে নির্বিকল্প সমাধি বলা যায়। যােগবাশিষ্ঠে লিখিত আছে যে, সংসার-বিষয়ে আসক্ত ব্যক্তি যদ্যপি আমি ব্ৰহ্ম ও আমার কর্মে প্রয়াে- জন নাই বলিয়া ধৰ্মকৰ্ম্ম ত্যাগ করে, তবে সে ব্যক্তির কর্ম ও ব্রহ্ম উভয় নষ্ট হয়; তাহাকে জ্ঞানী ব্যক্তি অন্ত্যজের ন্যায় পরিত্যাগ করে। মহামুনি যাজ্ঞবল্ক্য বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি ন্যায়পূর্বক ধনােপার্জনকারী এবং তত্ত্বনিষ্ঠ অর্থাৎ ভগবদূবিষয়ে একনিষ্ঠ ও অতিথিসেবা-পরায়ণ হইবে, নিত্য-নৈমিত্তিক মাতৃ-পিতৃ-শ্রাদ্ধাদি করিবে ও সত্যবাক্য কহিবে এবস্তুত গৃহস্থও পরিমুক্ত হয়। ভাগবতে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যাহা উপদেশ দিয়াছেন, একজন সাধক তাহার এইরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছেন—“মনুষ্যগণ যে পৰ্য্যন্ত সৰ্ব্বভূতে অবস্থানকারী আমাকে---পরমাত্মাকে আপনার হৃদয়ে না জানিবে (অর্থাৎ ধ্যানদ্বারা আপন হৃদয়ে পরমাত্মার অস্তিত্ব স্পষ্টরূপে অনুভব করিতে না পারিবে ), সে পৰ্যন্ত কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠান পূর্বক প্রতিমাদিতে অর্চনা করিবে। অনন্তর যখন বুঝিবে যে, আমি পরমাত্মা সৰ্বপ্ৰাণীতে বাস করিতেছি, তখন সৰ্ব্বপ্রাণীর আত্মাকেই দানে, মানে ও মৈত্রভাবে অর্চনা করিবে এবং সকলকেই অভিনেত্রে অবলােকন, করিবে। ভগবান মনু লিখিয়াছেন : ঋণানি জীণ্যপাকৃত্য মনােমােক্ষে নিবেশয়েৎ। অনপাকৃত্য মােক্ষং তু সেবমানাে ব্রজত্যধঃ ।

ধর্মতত্ত্ববারিধি।
অধীত বিধিবদ্বেদান্ পুত্রাংশ্চোৎপাদ্য ধৰ্ম্মত।
ইষ্টাচ শক্তিতে। যমৈনে মােক্ষে নিবেশয়েৎ ॥
তিন ঋণ শােধ করিয়া মােক্ষে মন দিবে, কারণ তিন ঋণ শােধ না
করিয়া মােক্ষে মন দিলে পতন অবশ্যম্ভাবী। ধৰ্ম্মতঃ পুত্র উৎপাদন করিয়া
যথাশক্তি যজ্ঞকৰ্ম্ম করিয়া পরে নিঃশ্রেয়ভাবে মােক্ষলাভ করিতে তৎপর
হইবে।
বৎস! যজ্ঞ পঞ্চপ্রকার; এবং সেই পঞ্চযজ্ঞ কি প্রকারে করিতে হয়,
তাহা জানাইতেছি! ভগবান্ মনু বলিয়াছেন—
অধ্যাপনং ব্রহ্মযজ্ঞঃ পিতৃযজ্ঞস্তু তপণম,
হােমাে দৈবাে বলির্ভোতে নৃযজ্ঞােহতিথিভােজনম্ ।
অধ্যাপন দ্বারা ব্ৰহ্মযজ্ঞের, তর্পণকার্যের দ্বারা পিতৃষজ্ঞের, হােম দ্বারা
দেবযজ্ঞের, বলিকৰ্ম্ম দ্বারা ভূতজ্ঞের এবং অতিথিপূজা দ্বারা নৃযজ্ঞের
সাধন হয়।
কি প্রকার কর্ম করা উচিত তাহাও ভগবান বলিতেছেন :-
সক্তাঃ কৰ্ম্মণ্যবিঘাংসােযথা কুন্তি ভারত।
কুৰ্যাদ্বিদ্বাং স্তথাসক্তশ্চিকীষু'লোকসংগ্রহ।
হে ভারত! যেমন অবিদ্বানেরা কর্মে আসক্তিবিশিষ্ট হইয়া কৰ্ম্ম
করিয়া থাকে, তেমনি লােকসংগ্রহচিকীষু বিদ্বানেরা অনাসক্ত হইয়া কৰ্ম্ম
করিবেন। অর্থাৎ ধৰ্ম্মার্থে ফলকামনা পরিত্যাগ করিয়া কৰ্ম্ম

nE Mw ১, wali War ১ কাপ সপ্তম পরিচ্ছেদ। জাতিভেদ। (গুণ বা বর্ণভেদের আবশ্যকতা।) শিষ্য।কর্মসম্বন্ধে বেশ বুঝিতে পারিলাম ; কিন্তু বর্ণভেদের আবশ্যকতা কি, এবং গুণ কি, তাহা কয় প্রকার, এবং কি গুণ থাকিলে আত্মদর্শন সম্ভবে, বুঝাইয়া দিউন। গুরু।—বৎস! মহাত্মা লােকনাথ বসু যাহা লিখিয়াছেন, তাহা তােমায় বুঝাইবার জন্য এই স্থানেই উদ্ধত করিলাম :- “মুক্তি-সাধনের পক্ষে বর্ণবিভেদ অনিবাৰ্য জানিবে ; যেহেতু জীব জন্তু স্থাবর জঙ্গমাদি বতেরই জন্ম স্ব স্ব জাতিতে হয় এবং পরমেশ্বর প্রত্যেক জাতিকে পৃথক পৃথক্‌ শক্তি প্রদান করিয়াছেন। এ প্রযুক্ত একের ধৰ্ম্ম অন্যে আচরণ করিলে অনিষ্ট ব্যতীত ইষ্ট সম্ভবে না। যথা বানরের হস্তে খন্তা, এই কথা প্রসিদ্ধ আছে। অতএব সাত্ত্বিক লােকের ঔরসে তামস সন্তান এবং রজোগুণপ্রধান ব্যক্তির সাত্ত্বিক সন্তান উৎপন্ন হওয়া অসাধারণ ঘটনা। সাধারণ নিয়ম এই যে, পিতা মাতার গুণই সন্তানে বৰ্ত্তে। ব্রাহ্মণর জন্ম সত্ত্বগুণাধিক্যে ও ক্ষত্রিয়ের উৎপত্তি রজোগুণের প্রাধান্যে হয়। শূদ্রের তমােগুণই প্রবল ; আর রজঃ ও তমঃ উভয় গুণের আধিক্যে বৈশ্যের উৎপত্তি। উহারা পৃথক পৃথক, শ্রেণীভুক্ত না হইয়া পরস্পরের মধ্যে বিবাহ প্রচলিত থাকিলে, বর্ণসঙ্কর অর্থাৎ ভ্রষ্ট সন্তান ;

ধর্মতত্ত্ববারিধি। - উৎপত্তি এবং উচ্চবর্ণ নীচের অন্নভােজন করিলে আদ্যের উত্তম গুণের হ্রাস হইয়া অধমত্ব প্রাপ্ত হওয়া সম্ভব। বর্ণবিচারের দুইটী প্রয়ােজন আছে ; প্রথম,—বিশুদ্ধচিত্ত ব্যক্তি আহারাদির নিয়ম পরিত্যাগে যথেচ্ছাচারী হইলে, মনের পুনৰ্ব্বার মালিন্য জন্মিবার সম্ভাবনা আছে। দ্বিতীয়, সাধারণ লােকে উত্তম লােকের দৃষ্টান্তের অনুগামী হয়। অতএব যদি জ্ঞানীগণ জাতিবিচার পরিত্যাগ করেন, তবে কাহারও তদ্বিচার করা সম্ভব নহে; সুতরাং মূঢ় ব্যক্তিদিগের চিত্তশুদ্ধির ব্যাঘাত সম্ভবে, (ক)• হিন্দুধর্মতত্ব :- “অৰ্যজাতীয় তীক্ষমনীষা-সম্পন্ন দার্শনিক পণ্ডিতেরা জগদীশ্বর ব্যতীত জগতের অন্তর্ভূত যাবতীয় পদার্থকে সাতভাগে বিভক্ত যথা- দ্রব্যং গুণাস্তথা কৰ্ম্ম সামান্যং সবিশেষকং। সমবায়স্তথাভাবঃ পদার্থাঃ সপ্তকীৰ্ত্তিতাঃ । পদার্থ সাতকার ; যথা—দ্রব্য, গুণ, কৰ্ম্ম, সামান্য, সমবায় ও অভাব। “সামান্য পদার্থেরই নামান্তর “জাতি” পদার্থ। জাতির করিয়াছেন ; লক্ষণ এই নিত্যা-অনেক-সমবেত জাতিঃ। যে পদার্থ নিত্য অর্থাৎ মহাপ্রলয় পর্যন্ত স্থায়ী এবং যাহা অনেক সংখ্যক পদার্থে সমবেত অর্থাৎ যাহা এককালে একাধিক পদার্থকে বুঝায়, তাহার নাম “জাতি”। তাৎপৰ্য এই যে, জাতিশব্দে শ্রেণী বুঝায় একবিধ একাধিক পদার্থকেই শ্ৰেণীশব্দে নির্দেশ করা যায়। আর এই দৃশ্যমান জগৎ একাধিক দ্রব্য ও একাধিক গুণাদির সমষ্টি ; সুতরাং যাবৎ জগৎ বিনষ্ট হইবে, তাবৎ ঐ জাতি বা শ্রেণী পদার্থ বিলুপ্ত সপ্তম পরিচ্ছেদ। হইবে না। এই নিমিত্ত জাতিপদার্থ নিত্য বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে। ঐ জাতি পদার্থ প্রথমতঃ দুই প্রকার, যথা-“পরা” অর্থাৎ সাধারণ জাতি, এবং “অপরা” অর্থাৎ বিশেষ জাতি। ব্যাপকাৎ পরাপি স্যাৎ ব্যাপ্যবাদপরাপি চ। যে জাতি পদার্থ ব্যাপক অর্থাৎ বহুব্যাপী তাহা পরাজাতি, এবং যাহা ব্যাপী অর্থাৎ অল্পব্যাপী, তাহা অপর জাতি। দ্রব্য-পদার্থ ও গুণ-পদার্থের ইতরবিশ্যেই ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী বা জাতি পদার্থ উৎপন্ন হইবার কারণ। রসায়ণ শাস্ত্র দ্বারা নিঃসংশষিত- রূপে প্রতিপাদিত হইয়াছে যে, দুইটী পরমাণু-সমষ্টির গুণ• একবিধ, তিনটী পরমাণু সমষ্টির গুণ অন্তবিধ। এইজন্য ঐ দ্বিবিধ পরমাণু-সমষ্টি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীতে পরিগণিত। সচেতন জীবদিগেরও আহারের ইতর- বিশেষ এবং ব্যবহাৰ্য্য জলবায়ুর ইতরবিশেষ দ্বারা শারীরিক পরমাণু- দিগের অন্যথাভাব অর্থাৎ পরিবর্তন হইয়া থাকে ; ইহাও শারীরবিধান শাস্ত্রের অখণ্ডনীয় সিদ্ধান্ত। সুতরাং মনুষ্যত্রের শরীর যে একবিধ বা একপরিমিত পরমাণুতে নির্মিত, ইহা বলিবার উপায় নাই। অতএব “দ্রব্যভেদে মানবজাতির শ্রেণীবিভাগ বিজ্ঞানশাস্ত্রের অনুমােদিত হইয়াছে। যেমন নীলপীতাদি বর্ণ এবং অম্লমধুরাদি রস ইত্যাদি গুণ- ভেদে অচেতন দ্রব্য-পদার্থের শ্রেণীভেদ বা জাতিভেদ সৰ্ববাদিসম্মত, সেইরূপ সত্ব, রজঃ ও তমঃ এই গুণত্রয় অর্থাৎ উৎকৃষ্ট প্রবৃত্তি ও নিকৃষ্ট প্রবৃত্ত্যাদি মানসিক গুণভেদে সচেতন জীবদিগের জাতিভেদ অপরিহার্য হইয়াছে। হিন্দুধৰ্ম্মে কারণ, ও যুক্তি অবলম্বন করিয়াই ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়াদি জাতিভেদের সৃষ্টি হইয়াছে।” বৎস! সত্ত্ব, রজ, রজস্তম ও তম এই গুণগুলি দ্বারা মানব পৃথক পৃথক্‌ কৰ্ম্ম করিয়া সদসদখেনি প্রাপ্ত হয়। সত্ত্বপ্রধান ব্যক্তি ব্রাহ্মণ বলিয়া ৭০ ধর্মতত্ত্ববারিধি। কথিত আছেন ; রজঃপ্রধান ক্ষত্রিয়, রজস্তমপ্রধান বৈশ্য, এবং তমপ্রধান ব্যক্তি শূদ্র বলিয়া কথিত আছে, যথা- ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ । কৰ্ম্মাণি বিভক্তানি স্বভাব প্রভবৈ ণৈঃ গীতা। হে পরন্তপ ! এই স্বভাবপ্রভব গুণের দ্বারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদিগের কর্ম বিভক্ত হইয়াছে। বৎস! মানবগণ আপন আপন গুণদ্বারা পৃথক্‌ পৃথক্ কৰ্ম্ম করিয়া এই সংসারে মায়ামােহ-বিজড়িত হইয়া যায়; আবার সেই শ্রেষ্ঠগুণ দ্বারা শ্রেষ্ঠকর্মে প্রবৃত্ত হইয়া পরে পরমপদ লাভ করে। ভগবান্ গীতায় বলিয়াছেন, যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভৃৎ। তদোত্তমবিদাং লােকানমলা প্রতিপদ্যতে। রজসি প্রলয়ং গত্ব কৰ্ম্মসজিষু জায়তে। তথা প্ৰলীনস্তমসি মুঢ়যােনিষু জায়তে। সত্ত্বগুণ পরিবর্ধিত হইলে যদি কেহ কলেবর পরিত্যাগ করে, সে হিরণ্যগর্ভেপাসকদিগের প্রকাশময় লােকসকল প্রাপ্ত হয়। রজোগুণ পরিবর্ধিত হইলে যদি কাহারও মৃত্যু হয়, তাহা হইলে কর্মাসক্ত মনুষ্য- যােনিতে তাহার জন্ম হইয়া থাকে। আর যদি কেহ তমােগুণ-পরিবর্ধিত হইলে দেহত্যাগ করে, তাহা হইলে তাহার পশ্বদিযােনিতে জন্ম হয়। বৎস, আজকাল দেশ-কাল-পাত্র অনুসারে মহামহিমান্বিত অনেক ব্রাহ্মণ- দিগকে কেবল ব্রাহ্মণবংশজাত বলা চলে, কিন্তু ব্রাহ্মণ বলা চলে না। কারণ ব্রাহ্মণের যে গুণ থাকা আবশ্যক, তাহা একটিও ব্রাহ্মণে পরিলক্ষিত হয় না। তাহারা কেবল ঐহিক সুখাভিলাষে মত্ততাযুক্ত প্রকৃত বিষয় সপ্তম পরিচ্ছেদ। • হইতে ভ্রষ্ট হইয়া মহাস্বেচ্ছাচারী হইয়া যায়, অর্থাৎ সদাসর্বদা মদ্যপানে রত থাকিতে এবং শূদ্রাণীর সহবাসে রত থাকিতে বিন্দুমাত্র কুষ্ঠিত হয় না। তাহারা দ্বেষ-হিংসায় পরিপূর্ণ থাকে; পরােপকার যে কি, তাহা জানে না, এবং সর্বদা অহঙ্কারে মত্ত থাকে। বৎস! কুলিন ব্রাহ্মণদের যে শাস্ত্রসম্বন্ধীয় নয়টি গুণ থাকার দরকার, আজকাল তাহার একটিও উক্ত ব্রাহ্মণে লক্ষিত হয় না, বরং গর্বটিই প্রবল দেখা যায়। কুল অর্থাৎ বংশং অশ্য অস্তীতি কুলিন। সম্প্রতি জগতীতলে কুলিন শব্দটি অর্থ হইয়াছে, ইহাতে আর সন্দেহ নাই; যেহেতু আধুনিক কুলিন মাশয়গণ অর্থগৃপ্ত হইয়া বহুবিবাহ করিতেছেন। কিন্তু বৎস! ব্রাহ্মণগণ তাহাদের কি কি কৰ্ম্ম যখন জ্ঞাত হইয়া কৰ্ম্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইবে, তখন পূর্বোক্ত অহঙ্কার হওয়া দূরের কথা পুত্ৰকলত্রাদির উপর অনাসক্তি জন্মিতে থাকিবে। ব্রাহ্মণের কি কি কৰ্ম্ম, তাহা ভগবান গীতায় বলিয়াছেন, শমােদমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেবচ। জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্ৰহ্মকম্ম স্বভাবজং। শম, দম, তপ, শৌচ, ক্ষমা, আর্জব, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আস্তিক্য এই কয়েকটি ব্রাহ্মণের কম। মনঃসংযম করাকে শম বলে। দশবিধ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়ের সংযম করাকে দম কহে। শারীরিক, মানসিক ও বাচনিক ক্রিয়াকে তপ কহে। যাহার দ্বারা অপকৃত হইলেও মনােবিকার হয় না, তাহাকে ক্ষমা কহে। বেদের প্রকৃত রহস্যবােধ হওয়াকে জ্ঞান কহে। অন্তর্জগতের অনুভূতি বা মানসিক প্রত্যক্ষ-জ্ঞান থাকাকে বিজ্ঞান কহে। বৎস, ব্রাহ্মণের এসব কৰ্ম্ম না করিলে ব্রাহ্মণ বলা যায় না। ব্রাহ্মণের আচারেই ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হয়। কেবল ব্রাহ্মণ-বংশজাত হইলে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হয় না। কারণ মহাভারতে কথিত আছে, ধর্মতত্ত্ববারিধি। ন যােনির্ণাপি সংস্কারাে ন শ্রুতং নচ সন্ততিঃ। কারণাণি দ্বিজস্য বৃত্তমেবতু কারণ। বনপর্ব। জন্ম কিম্বা সাকারেতে, কিম্বা বেদ-অধ্যয়নে অথবা ব্রাহ্মণবংশে জন্ম- কারণে ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হয় না, কেবল ব্রাহ্মণের আচারেই ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হয়। বৎস! ইহাতেই সম্পূর্ণভাবে প্রতিপন্ন হইতেছে যে, সমস্ত বিষয়ের অনুষ্ঠান (কর্ম ) করাই প্রধান। কেবল পুস্তকপাঠে সমস্ত হয় না। কারণ, দেখা যায় যে, অনেকে সামান্য বিদ্যায় হিন্দুর অনন্তশাস্ত্র গ্রন্থের মধ্যে দুই একখানি গ্রন্থ পাঠ করিয়া সম্পূর্ণভাবে উৎকর্ষ সাধন না করিয়া, লেখনীসম্ভূত কতক শ্লোক উদরসাৎসা করিয়া জনসমাজে পুনঃ পুনঃ উদগীরণ করে, আপনাকে মহাজ্ঞানী ও মহাপণ্ডিত বলিয়া প্রচার করে, এবং বাহতঃ প্রকৃতমৰ্ম্মশীর আত্মোকর্ষতা ব্যক্ত করিয়া আত্মাকে তৃপ্ত করে। সুতরাং পুস্তক পাঠ করি উপদেশগুলির মর্ম বুঝিয়া তাহার অনুষ্ঠান কর। আচারহীন ব্রাহ্মণ- গণের বেদপাঠ পৰ্য্যন্ত শাস্ত্রে নিষেধ করিতেছেন। যথা- আচারহীনং ন পুনন্তি বেদা যদ্যপ্যধীতা সহ ষড়ভিরঙ্গৈঃ । দুলাং স্যেনং মৃত্যুকালে ঝর্জন্তি নীড়ং শকুন্তাই জাতপক্ষাঃ আচারহীনস্য তু ব্রাহ্মণস্য বেদাঃ ষড়ঙ্গাখিলাঃ সযজ্ঞাঃ কাং প্রীতি মুৎপাদয়িতুং সমর্থ অন্ধস্য দারাইব দর্শনীয়া। বশিষ্ঠ-সংহিতা। মান্যবর গিরীশবাবু ইহার সুন্দর ব্যাখ্যা করিয়াছেন, যথা- “ছয় অঙ্গসনে বেদ করি অধ্যয়ন। পবিত্র না হয় অনাচারী যেই জন

সপ্তম পরিচ্ছেদ।
৭
জাতপক্ষ পক্ষী নীড় ত্যজে যেইমত।
মৃত্যুকালে ত্যজে তারে ছন্দোগণ যত ।
অন্ধের হইলে যথা সুন্দরী কামিনী
নয়নরঞ্জিনী তার নাহি হন তিনি।
সেরূপ ষড়ঙ্গ বেদ যজ্ঞের সহিত ।
অনাচারী ব্রাহ্মণের নাহি সাধে হিত ॥”
সর্বভূতং হিতং কুৰ্যাৎ নাহিতং কস্যচিক্ দ্বিজং।
মৈত্রিং হি সৰ্ব্বভূতেষু ব্রাহ্মপঃ সোত্তমঃ স্মৃতঃ ॥
সকল প্রাণীর হিতসাধন করা, কাহারও দ্বারা অপকৃত হইলেও
তাহাদের অহিত না করা এবং সকলকেই মিত্রভাবে দর্শন করাই ব্রাহ্মণের
কৰ্ম্ম। বৎস! মহাভারতে লিখিত আছে, “পাতিত্যজনক কুক্ৰিয়াসক্ত
দাম্ভিক ব্রাহ্মণ প্রাজ্ঞ হইলেও শূদ্রসদৃশ হয় ; আর যে শূদ্ৰ সত্য, দান ও
ধৰ্ম্মে সতত অনুরক্ত, তাহাকে আমি ব্রাহ্মণ বিবেচনা করি, ইহাই
ঋষিবাক্য।
রাজর্ষি নহুষ বলিতেছেন,—“বেদমূলক সত্য, দান, ক্ষমা ও অনৃশংসতা,
অহিংসা,ও করুণা শূদ্রেও লক্ষিত হইতেছে। যদ্যপি সত্যাদি ব্রাহ্মণধৰ্ম্ম
শুদ্রেও লক্ষিত হইল, তবে শূদ্রও ব্রাহ্মণ হইতে পারে। তদুত্তরে যুধিষ্ঠির
বলিতেছেন,—“অনেক শূদ্রে ব্রাহ্মণ-লক্ষণ ও অনেক দ্বিজাতিতে শূদ্রক্ষণ
লক্ষিত হইয়া থাকে। অতএব ব্রাহ্মণ-বংশ-সস্তুত হইলেই যে ব্রাহ্মণ হয়,
শূদ্র বংশ-সস্তৃত হইলেই যে শূদ্র হয়, এরূপ নহে। কিন্তু যে সকল ব্যক্তিতে
উহা লক্ষিত না হয়, তাহারাই শূদ্র।” শাস্ত্রেই আছে,
ন জাতিঃ পূজ্যতে রাজন্ গুণাঃ কল্যাণকারকাঃ।
চণ্ডালমপি বৃত্তস্থং তং দেবা ব্রাহ্মণং বিদুঃ ।
গৌতম-সংহিতা।

৭৪
ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি।
হে রাজন! জাতি পূজ্য নহে, গুণই কল্যাণকারক। চণ্ডালও
বৃত্তস্থ হইলে দেবতারা তাহাকে ব্রাহ্মণ বলিয়া জানেন। সাত্বিক কৰ্ম্ম ও
জ্ঞান কাহাকে বলে, ভগবান তৎসম্বন্ধে গীতায় লিখিয়াছেন, যথা :-
নিয়তং সঙ্গরহিতম রাগদ্বেষতঃ কৃতং।
অফলপ্রেপ সুনা কৰ্ম্ম যত্তৎ সাত্বিকমুচ্যতে ।
কামনারহিত পুরুষ মঙ্গলশূন্য ও রাগরােষাদি বজ্জিত হইয়া যে
নিত্যকর্মের অনুষ্ঠান করে, তাহাই সাত্বিক কৰ্ম্ম।
সর্বভূতেষু যেনৈকং ভাবমব্যয়মীক্ষতে।
অবিভক্তং বিভক্তেষু তজ জ্ঞানং বিদ্ধি সাত্বিকং।
গীতা।
যে জ্ঞান দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন ভূতসমূহে সৰ্ব্বস্থানব্যাপক এক অব্যয়-
সত্তারূপ ভাবের উপলব্ধি হয়, তাহাই সাত্বিক জ্ঞান।
বৎস! ব্রাহ্মণগণের অহঙ্কার ত্যাগ করা সম্পূর্ণভাবে উচিত।
দীনতা স্বীকার না করিলে মহত্ত্ব প্রাপ্ত হওয়া যায় না। স্বয়ং ভগবান্
অকাতরে ভৃগুমুনির পদাঘাত সহ্য করিয়া, তজ্জন্য ক্রুদ্ধ হওয়া দূরে থাক,
তিনি তৎক্ষণাৎ মুনিবরের শ্রীচরণে কোন আঘাত লাগিয়াছে কিনা
তাহার অনুসন্ধানে ব্যস্ত হইয়াছিলেন। যিনি জগতের পালক, তিনিও
সমস্ত সহ করেন; সুতরাং তাহার কার্যের অনুকরণ করা সম্পূর্ণভাবে
উচিত। দীনতা স্বীকার না করিলে ভগবানকে পাওয়া যায় না।
শাস্ত্রেই আছে-
তৃণাদপি সুনীচেন তগােরিব সহিষ্ণুনা।
অমানিনা মানদেন কীৰ্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ।
হরি-সংকীৰ্ত্তনের তিনিই যােগ্য ব্যক্তি যিনি, তৃণ হইতে সুনীচ,
তরুর মত পহিষ্ণু এবং যিনি অমানীকেও মান দিতে পারেন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ।
বৎস! আহারের সহিত ধৰ্ম্মের অনেক সামঞ্জস্য আছে, সুতরাং সে
বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রাখা উচিত। স্বামী বিবেকানন্দ ভক্তিযােগে বলিয়া-
ছেন,-“আমরা আহারের দ্বারা শরীরের ভিতর যে উপাদান গ্রহণ করি,
তাহাতেও আমাদের মানসিক গঠনের অনেক সাহায্য হয়; সুতরাং
আমাদিগের খাদ্যাখাদ্য বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে হইবে।”
ভগবান গীতায় বলিয়াছেন ;-
আয়ুঃ সত্ত্ব বলাবােগ্য সুখপ্রীতিবিবর্ধনা।
স্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থির হৃদ্যা আহারাঃ সাত্তিকপ্রিয়া।
কটলবণাত্যুষ্ণ তীক্ষ্ণ রুক্ষ বিদাহিন।
আহারা রাজসস্রেষ্টা দুঃখশােকাময়প্রদাঃ ।
ষাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতঞ্চ যৎ।
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভােজনং তামসয়িং।
জীবন, উৎসাহ, বল, আবােগ্য, সুখ ও রুচিবর্ধন, রস ও স্নেহ,
সুখযুক্ত, দীর্ঘকালস্থায়ী মনােহর আহার সাত্বিকদিগের প্রীতিকর।
অতিকটু, অতি-অম্ন, অতিলবণ, অতিতীক্ষ্ণ, অতিরুক্ষ, অতিবিদাহী,
এবং দুঃখ, শােক ও রােগপ্রদ আহার রাজসগণের অভিলষিত।
বহুক্ষণের পক, গতরস, দুর্গন্ধ, পযুষিত (বাসী), উচ্ছিষ্ট, অপবিত্র
ভােজ্য তামসিকদিগের প্রতিকর।
রাজসিক ও তামসিক কৰ্ম্ম কি, তাহাও জানাইতেছি; শ্রবণ কর :-
যত্ত কামেপনা কৰ্ম্ম সাহঙ্কারেণ বা পুনঃ।
ক্ৰিয়তে বহুলয়াসং তদ্ৰাজসমুদাহৃতং ।
—গীতা।
সকাম ও অহঙ্কার-পরতন্ত্র ব্যক্তি কর্তৃক অনুষ্ঠিত বহুল-আয়াসকর
কৰ্ম্মরাজসিক।
-

ধর্মতত্ত্ববারিধি।
শৌৰ্যং তেজোদ্ধৃতিদক্ষ্যিং যুদ্ধেচাপ্যপলায়নং।
দামীশ্বরভাবশ্চ ক্ষত্ৰকৰ্ম্ম স্বভাবজং ।
-গীতা।
শৌর্য, তেজ, ধৃতি, দাক্ষ্য, যুদ্ধে অপরায়ুখ, দান প্রভুত্ব, এই কয়টী
ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজ কৰ্ম্ম।
অনুবন্ধ: ক্ষয়ং হিংসা মনপেক্ষ্য চপৌরুষং।
মােহাদারভ্যতে কৰ্ম্ম যৎ তত্তামসমুচ্যতে ।
ভাবী অশুভক্ষয়, হিংসা, প্লৌরুষ ইত্যাদি বিচার না করিয়া অবিবেক
বশতঃ যে কৰ্ম্মের আরম্ভ হয়, তাহাই তামস্।
কৃষি গােরক্ষ বাণিজ্যং বৈশ্যকৰ্ম্ম স্বভাবজং।
পরিচৰ্য্যাত্মকং কৰ্ম্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজং ।
-গীতা।
কৃ ষ, গােরক্ষণ ও বাণিজ্য এই কয়টি বৈশ্যের স্বাভাবিক কৰ্ম্ম,
এবং একমাত্র পরিচৰ্য্যাই শূদ্রজাতির স্বাভাবিক কৰ্ম্ম।
রাগী, কৰ্ম্মফলং প্রেপ সুলুক্কাহিংসাত্মকোহশুচিঃ।
হর্ষশােকান্বিত কর্তা রাজসঃ পরিকীৰ্ত্তিতঃ ॥
অনুরাগপরায়ণ, কৰ্ম্মফলপ্রার্থী, লুব্ধপ্রকৃতি, হিংস্রক, অশুচি ও
হর্ষশােসম্বলিত কাৰ্য্যই রাজসিক।
অযুক্ত প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠেী নৈষ্কৃতিকোহলসঃ।
বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কৰ্ত্তা তামস উচ্যতে ।
-গীতা।
অনবহিত, বিবেকহীন, উদ্ধত, শঠ, পরাণমাণী, অলস, বিষাদযুক্ত ও
দীর্ঘসূত্ৰী কৰ্ত্তাই তামসিক।

সপ্তম পরিচ্ছেদ।
৭৭
বৎস! সত্ত্বগুণসম্পন্ন না হইলে, যে বিষয়ের অনুষ্ঠান করা যায়, সবই
ভ্রষ্ট হইয়া যাইবে। দুই এক পৃষ্ঠা পুস্তক পাঠ করিয়া আপনাকে ব্রহ্মজ্ঞ
বলিয়া ভাবিও না। কাৰ্য্য কর। যখন দেখিবে যে তােমার মন পবিত্র
হইয়াছে এবং নিম্নলিখিত কাৰ্যগুলি সম্পন্ন করিতে পারিতেছ, তখনই
জানিবে যে এবারে ভগবানকে পাইবার উপযুক্ত হইয়াছ।
অভয়ং সত্বসংশুদ্ধিজ্ঞানযােগব্যবস্থিত।
দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবং
অহিংসা সত্যমক্রোধস্ত্যাগঃ শান্তিরপৈশুনং।
দয়াভূতেলােলুপ্তং মাৰ্দবং হ্রীরচাপলং ॥
তেজঃ ক্ষমা ধৃতিঃ শৌচমদ্রোহােনাভিমানিতা ।
ভবন্তি সম্পদং দৈবীমভিজাতন্য ভারত ।
গীতা।
মান্যবর পাত্র মহাশয় ইহার সুন্দররূপে ব্যাখা করিয়াছেন ; যথা-
‘সাদ্ভাসে সংশুদ্ধতা
অভয়ত্ব নিৰ্ম্মলতা,
জ্ঞান যােগ ব্যবস্থিতি দান ।
দম, শম, যজ্ঞ, জপ,
স্বাধ্যায় আজ্জব তপ।
তন্ময়তা তদ্ভাব তদ্ধ্যান।
অহিংসা অক্রোধ 'ত্যাগ
সত্যনিষ্ঠ বীতরাগ,
অপৈশুন শান্তি উদারতা।
দয়া প্রাণী-সমুদয়ে
নির্লোভ বিষয়চয়ে,
মাদ্দব হ্রীং বীতচপলতা ।
দ্বন্দ্ব-দ্রোহ-বিশূন্যতা অভিমান-বিহানতা,
তেজ ক্ষমা ধৃত শৌচ আর ধ

৭৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। সত্বগুণে সমুভব, ইহা দৈবি-সম্পদ হিয়ার।” এই পুত্র-কলত্রাদি পরিজনবর্গ এবং সকল প্রকার পরিচ্ছদ ও প্রতি গ্রহদি পরিত্যাগ করিয়া কেবল একাকী আমি কিরূপে জীবিত পাকিব, এইরূপ ভীতির উদয় না হইয়া, প্রত্যুত উহাতেই একপ্রকার উৎসাহ- বিশেষের নাম অভয়। অন্তঃকরণের নির্মল অর্থাৎ সম্যক্‌রূপে আত্মতত্ত্ব-পরিস্ফুরণের উপযুক্ততাই সত্ত্বসংশুদ্ধি। আত্মতত্ত্বাদি- প্রকাশক শাস্ত্রের প্রকৃত তাৎপৰ্য্য গ্রহণ করিয়া যে সংস্কারবিশেষ জন্মে, তাহাকে জ্ঞান বলে। সেই জ্ঞান কার্যে পরিণত করিবার নিমিত্ত অর্থাৎ দেহাদি জড়পদার্থের অতীত আত্মতত্ত্ব অনুভবের নিমিত্ত চিত্তৈকাগ্রতার অভ্যাস করাকে মােগ বলে। আপন পরিজন এবং সৎপাত্রে যথাশক্তি অন্নাদি বিভাগ করিয়া দেওয়াকে দান বলে। বাহেন্দ্রিয়সংযম, ঋতু-কালাদির অতিরিক্ত কালে স্ত্রী-সংস্পৰ্ণাদির অভাবকে মম বলে। দেবতাদের উদ্দেশে এক এক ক্রিয়াবিশেষকে মত্ত বলে। ; যজ্ঞ চারিপ্রকার ; যথা দেব্যজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ ও মনুষ্যজ্ঞ দেবতাদের উদ্দেশে যে অগ্নিহত্ৰাদি যজ্ঞ করা হয়, তাহাই দেব্যজ্ঞ। শ্রাদ্ধ-তর্পণাদিকে পিতৃযজ্ঞ বলে। কাক ও কুকুরাদি প্রাণীকে অনুদানের নাম ভূতযজ্ঞ; এবং অতিথি-সৎকারকে মনুষ্য-যজ্ঞ বলে। অপিচ ভগবান মনু অধ্যাপনকে একটি যজ্ঞ বলিয়া পঞ্চযজ্ঞের উল্লেখ করিয়াছেন, আত্মােন্নতিসাধন উদ্দেশ্যে বেদ-বেদান্তাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন পূৰ্ব্বক উহাদের নিগুঢ়ার্থ হৃদয়ঙ্গম করাকে স্বাধ্যায় বলে। শারীরিক, বাচনিক ও মানসিক যে একরূপ ক্রিয়াবিশেষ আছে, তাহার নাম তপ। অব স্বভাবকে “আর্জব” বলে। কোন প্রকার প্রাণী-বিনাশের হেতু না সপ্তম পরিচ্ছেদ। ৭৯ হওয়াকে অহিংসা বলে। কাহারও দ্বারা আক্রোশ বা তাড়না প্রাপ্ত হইয়া যে তৎপ্রতীকারের নিমিত্ত বৃত্তিবিশেষে বিজম্ভিত হওয়ার নাম “অক্রোধ।” সমস্ত কৰ্ম্মফল ভগবানে সমর্পণ করাকে ত্যাগ বলে। মন জয় করার ক্ষমতাকে শান্তি বলে। পরােক্ষে পরদোযাদি কীৰ্ত্তন-প্রবৃত্তিকে পৈশুন বলে ; সেই বৃত্তি সংযত করার ক্ষমতার নাম অপৈশুন। সৰ্ব্বদা ভােগ্য বিষয়ের সন্নিকর্ষে থাকলেও তাহাতে আসক্ত না হওয়াকে নির্লোভ বা অলােলুপতা বলে। স্ত্রী, বালক, অল্পবুদ্ধি ও কুললকদ্বারা অভিভূত না হইয়া আত্মাকে স্থির রাখিতে পারাকে তেজ অপকারীর অপকারে সামর্থ সত্তেও শান্ত থাকার ক্ষমতাকে ক্ষমা” বলে। যথাবিহিত কাৰ্য্যে দেহ ও ইন্দ্রিয়াদি অবসাদ প্রাপ্ত হইলেও তাহাদিগকে ধৈৰ্যযুক্ত রাখিবার যত্নবিশেষকে “ধৃতি”, বলে। ধন-প্রয়ােগাদিতে মায়া ও অনূদি না থাকাকে শৌচ বলে। বৎস! এইগুলি মহামহিমান্বিত সত্বগুণশালী ব্যক্তিগণের কৰ্ম্ম, অর্থাৎ পূজনীয় ব্রাহ্মণ- দেবগণের কর্ম। বলে।

অষ্টম পরিচ্ছেদ আত্মতত্ত্ব। গুরু।বৎস! এইবার আত্মসম্বন্ধে তােমায় সংক্ষেপে জানাইব, অর্থাৎ তুমি যে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে, আত্মা কি এইবার—তাহাই তােমায় বুঝাইব। । প্রথমে ভগবান শঙ্করাচাৰ্য শান্তি, তিতিক্ষা, জ্ঞানেন্দ্রিয় ইত্যাদি বিষয়ে যাহা বলিয়াছেন, তাহা বুঝাইতেছি। লােক যেমন কাকবিষ্ঠাকে ঘৃণা করে, তদ্রুপ ব্ৰহ্মা হইতে স্থাবর পৰ্যন্ত বিষয়ে যে বৈরাগ্য তাহাকে নিৰ্ম্মল বৈরাগ্য কহে। আত্মা নিত্য ও দৃশ্য অর্থাৎ জগৎ অনিত্য—এইরূপ যে নিশ্চয়, তাহাকে উত্তম-বস্তুবিবেক কহে। বাসনা-ত্যাগ ও বাহবৃত্তি-নিগ্রহকে দম কহে। বিষয় হইতে পরাবৃত্তিকে পরমা উপরতি কহে। সকল প্রকার দুঃখ-সহনকে তিতিক্ষা কহে। তিতিক্ষা অতিশয় মঙ্গলকারিণী। বেদ ও গুরুবাক্যে ভক্তিকে শ্রদ্ধা কহে সংলক্ষ্যে চিত্তের একাগ্রতার নাম সমাধি। ভগবান শঙ্করাচাৰ্য আৰৱা বলিয়াছেন যে, নির্বিকার চিত্তে আপনাকে ব্ৰহ্মস্বরূপ জ্ঞান করিয়া সকলপ্রকার প্রপঞ্চভাবের পরিবর্জনকেও সমাধি কহে। কি প্রকারে কখন সংসার-বন্ধন মােন হইবে—এই যে সুদৃঢ় বুদ্ধি, তাহাকে মুমুক্ষ্ণতা কহে। প্রাণবায়ু পাঁচটী—প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমান শিবসংহিতায় আরও পাঁচটীর উল্লেখ আছে; যথা-নাগ, কু, • অষ্টম পরিচ্ছেদ। কুকর, দেবদত্ত, ও ধনঞ্জয়। তন্মধ্যে পূর্বকথিত পাঁচটীই শ্রেষ্ঠ। জ্ঞানেন্দ্রিয় সাতটী,মন, বুদ্ধি এবং শােত্র, ত্বক, চক্ষু, জিহবা ও ঘ্রাণ। কৰ্ম্মেন্দ্রিয় পাঁচটী-হস্ত, পদ, মুখ, গুহ ও লিঙ্গ। সাকল্যে এই সপ্তদশ অবয়বযুক্ত অপঞ্চীকৃতভূতনিৰ্ম্মিত সূক্ষ্মশরীর জীবের সুখদুঃখভােগের হেতু হইয়া থাকে। কোষ পাঁচটী—অন্নময়, প্রাণময়, মনােময়, বিজ্ঞানময় ও আনন্দময়। বপুস্তুষাদিভিং কোধৈর্যক্তংযুক্ত্য বঘাততঃ। আত্মানমন্তরং শুদ্ধং বিবিচ্যাত্তণ্ডুলং যথা ॥ ভগবান শঙ্করাচার্য। দেহ কখন আত্মা হইতে পারে না; কেন না উহা মৃত্তিকা, জল, বায়ু, ইত্যাদি জড়পদার্থ সমূহের সমষ্টিমাত্র। উহা অনিত্য এবং অস্থায়ী পদার্থ ; কখন আছে, কখন ছিল না, এবং কখন থাকিবে। প্রাণসমূহও আত্মা নহে; কেন না উহা বায়ুবিশেষ মাত্র, সুতরাং উহাও জড়পদার্থ ভিন্ন আর কিছুই হইতে পারে না। মনকেও আত্মা বলা যাইতে পারে না; কেন না কামাদি রিপুর প্রাবল্য হইলে উহার বিকার জন্মে। বুদ্ধিবৃত্তিও আত্মা নহে; কেন না সুষুপ্তি-সময়ে উহার কার্যকারিতা থাকে না, উহা অবিদ্যাতে বিলয় প্রাপ্ত হইয়া যায়। বুদ্ধির প্রলয় এবং উৎপত্তি ইত্যাদি অবস্থা হয় বলিয়া বুদ্ধিকে আত্মা বা যাইতে পারে না। যে কারণ শরীর আনন্দময় কোষ বুলিয়া কথিত হয়, তাহাও আত্মা হইতে পারে না; কেন না তাহা সমাধিকালে বিদ্যমান থাকে না, উহা সমাধিতে বিলীন হইয়া যায় । অতএব উল্লিখিত পঞ্চকোষ হইতে ভিন্ন এবং বিপরীত-লক্ষণাক্রান্ত অখণ্ড চিদানন্দ আত্মশব্দের বাচ্য হইতে পারেন। অতএব এস্থলে বিশুদ্ধ আত্মতত্ত্ব এইরূপ হইতেছে—ধান্যাদি হইতে তণ্ডুল বাহির করিবার যে প্রণালী আছে, অর্থাৎ তুষাদিতে আবৃতশরীর ধান্যাদিকে তুষাদি

৮২
ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি।
ত্যাগ করাইয়া তাহা হইতে যেমন বিশুদ্ধ তণ্ডুল বাহির করিতে হয়,
সেই প্রকার যুক্তিরূপ অবঘাত দ্বারা দেহাদি কোষরূপ তুষাদিকে
পরিত্যাগ করিয়া বিশুদ্ধতত্ত্বলাভ হইয়া থাকে।
নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানামেকো বহুনাং
যযা বিদধাতী কামান্।
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরান্তেয়াং শান্তিঃ শাশ্বতী
নেতরেষাং
কাঠকোপনিষৎ
যিনি অনিত্যবস্তুর মধ্যে নিত্য, যিনি চেতনবাদিগের চেতন,
যিনি একাকী অনেকের কাম্যবস্তুসকল বিধান করিতেছেন, তাহাকে
যে জ্ঞানিগণ আপনাতে দর্শন করেন, তাঁহাদেরই নিত্যশান্তি ; অপরের
নহে। বাহজগতে তাহাকে কোথায় পাওয়া যাইবে? সূৰ্য্য, চন্দ্র বা
তারায় তাহাকে কিরূপে পাইবে ?
ন তত্র সূৰ্যোতি ন চন্দ্ৰস্তারকং নেমা বিদ্যুত ভান্তি
কুতােজুয়মগ্নিঃ।
তমেব ভ্রান্তমশুভাতি সৰ্ব্বং তস্য তাসা সর্বমিদং বিভাতি ।
কাঠকোপনিষৎ।
যেখানে সূর্য কিরণ দেয় না, চরকা কিরণ দেয় না, এই
বিদ্যুৎসমূহও প্রকাশ পায় না, এ অগ্নি কোথায়? সমুদয় বস্তু সেই
দীপ্যমানের প্রকাশে অনুপ্রকাশিত ; তাঁহারই দীপ্তিতে সকল দীপ্তি
পাইতেছে।
উদ্ধমূলস্তধঃশাখ এযােহশ্বখঃ সনাতন।
তবে শুক্রব্রহ্ম তদেবামৃতমুচ্যতে ।
তল্লিকাঃ শিতাঃ সর্বে তদুনাত্যেতি কশ্চন। এতৰৈ তৎ।

অষ্টম পরিচ্ছেদ। ; যেরূপ লােকে তুলা-দর্শন নিবন্ধন শাল্মল্যাদি বৃক্ষের মূল নির্ণয় করে, তদ্রপ সংসার-রূপ বৃক্ষের দর্শন নিবন্ধন তাহার মূলকারণ ব্রহ্মের অবধারণাৰ্থ এই ষষ্ঠী বল্লী আরম্ভ করিতেছেন।এই সংসার- রূপ তরু উর্ধমূল, অর্থাৎ বিষ্ণুর পরমপদই এই তরুর মূল। এই, সংসার-তরু প্রতিক্ষণেই জন্ম, মরণ, জরা ও শােকাদি অনেক অনর্থ দ্বারা অন্যথাভাবে পরিণত হইতেছে। কদলীস্তম্ভ যেরূপ অসার বস্তু, এই সংসার-তরুও তদ্রপ অসার পদার্থ, এই সংসার-তরুকে লক্ষ্য করিয়া অনেকশত পাষণ্ড বহুবিধ বিকল্পনা করিয়া থাকে । কিন্তু যাহারা তত্ত্ব-জিজ্ঞাসু, তাঁহারা ইহার তত্ত্ব-নিরূপণ করিতে সক্ষম। পরমব্রহ্মই এই তরুর মূল, ইহা বেদান্ত-বচন দ্বারা প্রতিপন্ন হইয়াছে। অবিদ্যা-জনিত কামনা ও কৰ্ম্মাদিই এই তরুর বীজ, এবং জ্ঞান ও ক্রিয়া-শক্ত্যাত্মক হিরণ্যগর্ভই ইহার প্রথম অঙ্কুর ; নিখিল প্রাণিপুঞ্জই স্কন্ধ। এই বৃক্ষ নিরন্তর তৃষ্ণারূপ জলাশয় দ্বারা সিক্ত। জ্ঞানেন্দ্রিয়ের বিষয় শাদি ইহার প্রবাল ; শ্রুতি-স্মৃত্যাদি শাস্ত্রোপদেশই: পত্র ; এবং যজ্ঞ, দান, তপস্যা প্রভৃতি অনেক ক্রিয়াসমূহ ইহার সুন্দর পুষ্প। প্রাণীর সুখদুঃখাদি বেদনাই বহুবিধ রস। এই তরুর মূলদেশ ফল- তৃষ্ণারূপ জলসেক দ্বারা সুদৃঢ়ীকৃত হইয়াছে। সত্যাদি নামক সপ্ত- লােকে ব্ৰহ্মাদিরূপ বিহগবৃন্দ এই তরুতে কুলায় নির্মাণ করিয়া অবস্থিতি করিতেছেন। প্রাণিবৃন্দের সুখদুঃখজনিত হর্ষশােকাদিদ্বারা জাত নৃত্য, গীত, বাদ্য এবং হাহাকারাদি অশেষ শব্দরাশি দ্বারা এই সংসার-তরু সৰ্বতঃ পরিব্যাপ্ত, বেদান্তশাস্ত্র-বিহিত আত্ম দর্শন-জনিত অসঙ্গতা-রূপ শস্ত্রই ইহার উচ্ছেদে সক্ষম। এই সংসার-তরুর কাম-কৰ্ম্মরূপ বায়ু দ্বারা নয়ত অশ্বথ-বৃক্ষের ন্যায় বিচলিত-স্বভাব ; স্বর্গ, নরক, তির্যক্-প্রেতাদি ইহার শাখা। এই তরু অনাদি কাল হইতে প্রবৃত্ত। যে দ্রব্য এই সংসার- তরুর মূলীভূত, তাহাই শুদ্ধব্ৰহ্ম, এই ব্রহ্ম ব্যাপক এবং অবিনাশিস্বভাব। ;

ধৰ্ম্মতত্ববারিধি। এই ব্রহ্মকে আশ্রয় করিয়া সত্যাদি সমস্ত লোেক বিদ্যমান আছে। ইহাকে কেহই অতিক্রম করিতে সক্ষম নহে। হে নচিকেতঃ ইহাই পরমব্রহ্ম জানিবে । ১। বৎস! সেই চিদানন্দস্বরূপ আত্মা কিরূপ ভাবে নির্লিপ্ত আছেন, তাহাও বলিতেছি। উপদ্ৰষ্টান্তমন্তা চ ভর্তা ডােক্তা মহেশ্বরঃ। পরমাত্মেতি চাপুক্তো দেহেহস্মিন্ পুরুষঃ পরঃ। -গীতা। এদেহে বিদ্যমান থাকিয়াও যিনি সর্বদা স্বতন্ত্র কারণ-তিনিই উপদ্রষ্টা ও অনুমন্তা, তিনি ভর্তা, ও ভােজা মহেশ্বর এবং শ্রুতিতে তিনিই পরমাত্মা বলিয়া ব্যাখ্যাত হইয়াছেন। বিনি স্বয়ং কোন ক্রিয়া করেন না, কিন্তু নিকটে থাকিয়া সাক্ষী স্বরূপে সমস্ত অবলােকন করেন, তাহাকে ‘উপদ্রষ্টা” বলে। আত্মার নিজের কোন ক্রিয়া নাই, প্রকৃতিদ্বারা সমস্ত ক্রিয়া নিষ্পন্ন হইয়া থাকে। কিন্তু প্রকৃতির সহিত আত্মার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সংযােগ থাকাতে, প্রকৃতির সমস্ত ক্রিয়া ও ব্যাপার সেই স্বপ্রকাশস্বরূপ আত্মাতে প্রকাশ পাইয়া থাকে ; তাহাই আত্মার অনুভব করা। সুতরাং আত্মা প্রকৃতিৰ ক্ৰিয়াসকলের উপদ্রষ্টা হইলেন। অন্যকর্তৃক নিম্পাদিত কোন কাৰ্যে প্রতিপক্ষভাব না থাকিয়া যাহার সন্তোষভাব থাকে, তাহাকেই সেই কার্যের “অনুমন্ত৷” বলা যায় ; কিংবা পরকর্তৃক নিম্পাদিত কাৰ্যে নিজে অপ্রবৃত্ত থাকিলেও যদি তাহার আনুকূল্যে প্রবৃত্তি হওয়ার চিন্তু পরিলক্ষিত হয়, তাহাকে সেই কাৰ্য্যের অনুমন্তা বলে এবং অন্যকর্তৃক নিম্পাদিত কাৰ্য যদি সাক্ষীস্বরূপ থাকিয়া তাহাকে নিবারণ না করে, তাহা হইলেও তাহাকে ঐ কাধ্যের অনুমন্তা বলা যাইতে পারে। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতি প্রাকৃত পদার্থের দ্বারা যে সকল অষ্টম পরিচ্ছেদ। ক্রিয়া নিষ্পন্ন হয়, তাহাতে আত্মার কোন প্রকার প্রতিপক্ষ-ভাব নাই, কেন না আত্মা নিষ্ক্রিয় পদার্থ। নিষ্ক্রিয় পদার্থের প্রতি পক্ষতাচরণ অসম্ভব। কারণ প্রতিপক্ষতা করিতে হইলে এক প্রকার ক্রিয়া হওয়ার আবশ্যক হয়। আবার দেহেন্দ্রিয়াদি দ্বারা যে সকল কাৰ্য্য নিষ্পন্ন হয়, তৎসমুদয় স্বপ্রকাশস্বরূপ আত্মাতে প্রকাশ পাইয়া থাকে—অর্থাৎ আত্মা তাহার অনুভূতি করেন; তাহাকেই আত্মার একরূপ সন্তোষবিশেষ বলা যাইতে পারে। অতএব দেহেন্দ্রিয় ও মন প্রভৃতির কাৰ্যে আত্মাকে অনুমন্তা বলা যাইতে পারে। আত্মার স্বপ্রকাশস্বরূপ আত্মার সহিত অতিঘনিষ্ঠতম সংযােগবিশেষ থাকাতেই দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি প্রভৃতি কাষ্ঠলােষ্ট্ৰাদির ন্যায় অন্ধজড়পদার্থগুলি চৈতন্য লাভ করিয়া, দেখিয়া শুনিয়া সকল কাৰ্য্য নিষ্পন্ন করিয়া থাকে। নতুবা উহাদিগকে ঐ কাষ্ঠ- লােষ্ট্ৰাদির ন্যায় অন্ধভাবে থাকিয়াই জড়পিণ্ডের ক্রিয়ার ন্যায় অনিয়মিত অসম্বদ্ধভাবে কাৰ্য্য করিতে হইত। অতএব এই দেহেন্দ্রিয়াদির কাৰ্য্যে আত্মা স্বয়ং অপ্রবৃত্ত থাকিলেও তিনি ইহার আনুকূল্য করিতেছেন- ইহা বলিতে পারা যায়; সুতরাং এই ভাবে আত্মাকে দেহেন্দ্রিয়াদির কাৰ্য্যের অনুমন্তা বলা যাইতে পারে। তৃতীয়তঃ আত্মার যখন কোন ক্রিয়া নাই, তথন দেহেন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতির সহিত তাঁহার অতিশয় ঘনিষ্ঠতম, সম্বন্ধ থাকিলেও তিনি উহাদিগকে কোনকার্যে নিবৃত্ত করিতে পারেন না, সুতরাং করেনও না। অতএব, এই ভাবে আত্মাকেও দেহেন্দ্রিয়াদির কাৰ্য্যে অনুমন্ত বলা যাইতে পারে। একমাত্র আত্মা বা চৈতন্যস্বরূপ পুরুষই সৎপদার্থ ; এদ্ব্যতীত আর যাহা কিছু আছে, তৎসমস্তই বাস্তবিক অসৎপদার্থ। ভ্রান্তিপ্রভাবে যেরূপ সর্পে রঞ্জুবােধ হয়, সেইরূপ ঐ অবিদ্যাপ্রভাবে একমাত্র চৈতন্যস্বরূপ আত্মাতেই ঐ দেহ মন ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি প্রভৃতির পরিস্ফুরণ হইয়া দৃষ্টি হইতেছে। আত্মা থাকিলে ইহাদের পরিস্ফুরণ হইতে পারিত না। অতএব আত্মাকে ;

ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। ; দেহেন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতির ধারয়িতা বা ভর্তা বলা যাইতে পারে। বুদ্ধি, অভিমান, মন ও ইন্দ্রিয়াদি প্রকৃতিস্যুত পদার্থের মধ্যে যে সকল সুখ, দুঃখ, মােহ, ঈর্ষা, অসূয়া, দয়া, ভক্তি প্রভৃতি গুণ আছে, তাহা স্বপ্ৰকাশ চৈতন্য দ্বারা প্রকাশিত হইতেছে ; সেই প্রকাশের নামই ‘অনুভূতি বা ভােগ। এই অনুভূতি আত্মাকেই আশ্রয় করিয়া থাকে; এ নিমিত্ত আত্মাকে “ভােক্তা” বলা হয়। আত্মা স্বাধীন এবং সৰ্বান্তস্বরূপ। ইনিই অতীব মহান্ ও সমস্ত জগতের একমাত্র অবলম্বন, তাই “মহেশ্বরূ” বলিয়া অভিহিত হন। ইনি দেহাদি সমস্ত জড়পদার্থ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উৎকৃষ্ট পদার্থ ; এই জন্য ইহাকে পরমাত্মা বলা যাইতে পারে। শিষ্য -আত্মা সম্বন্ধে যাহা বুঝাইলেন, তাহা অতি মধুর বােধ হইল। এক্ষণে এই আত্ম-দর্শন কি প্রকারে হইবে, তাহা বলুন। গুরু।বৎস! ভগবান গীতায় তাহা উত্তমরূপে বুঝাইয়াছেন। ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কোচিদাত্মানমাত্মনা অনন্য সাখেনযােগেন কৰ্ম্মযােগেন চাপরে। গীতা। কেহ কেহ ধ্যান করিয়া প্রত্যাগত্মার সাক্ষাৎকার লাভ করেন। কেহ কেহ বা সাখযােগ দ্বারা এবং কেহ কেহ বা কৰ্ম্মযােগ দ্বারা আত্মা-সাক্ষাৎকার লাভ করিয়া থাকেন। উক্ত আত্মতত্ত্বদর্শনের চারিপ্রকার উপায় আছে ; তন্মধ্যে একটা মুখ্য উপায়, দ্বিতীয়টী গৌণ উপায়, আর একটা গৌণতর উপায় এবং চতুর্থ টী গৌণতম উপায়। আবার এই সংসারেও আত্ম- জ্ঞানদর্শনেও চারিপ্রকার অধিকারী ব্যক্তি আছেন। কেহ উত্তম অধিকারী, কেহ মধ্যম অধিকারী, কেহ মূল, অধিকারী, আর কেহ বা মন্দতর অধিকারী। ইহার মধ্যে যিনি উত্তম অধিকারী অষ্টম পরিচ্ছেদ। ৮৭ তিনি মুখ্য উপায়, যিনি মধ্যম অধিকারী তিনি গৌণ উপায়, যিনি মন অধিকারী তিনি গৌণতর উপায়, এবং যিনি মন্তর অধিকারী তিনি গৌণতম উপায়ের অবলম্বন করেন। জ্ঞানেন্দ্রিয় শক্তি, কর্ম- ন্দ্রিয় শক্তি, এবং প্রাণাদি শক্তিগুলির প্রত্যাহার পূর্বক মনে লয় করিতে হয় ; মনকে আবার অভিমানে বিলয় করিতে হয় ; অভিমানকে বুদ্ধিতত্বে বিলীন করিতে হয় ; বুদ্ধিকে প্রকৃতি-তত্ত্বে বিলীন করিতে পরে প্রকৃতিও আত্মাতে বিলীন হইয়া যায়। তখন কেবল এক অদ্বিতীয় নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্তস্বভাব, সমস্ত ক্রিয়াগুণ ও কৰ্ম্মাদি বিবর্জিত চৈতন্যময় আত্মাই অবশিষ্ট থাকেন। আর কিছুরই অস্তিত্বের ভাল হয় না। এইরূপ অবস্থাকে ধ্যান বলে। এই ধ্যানই আত্মদর্শনের মুখ্য উপায়। আর যাহার সুখ দুঃখে সমজ্ঞানসম্পন্ন, অর্থাৎ যাহার সুখজনক ঘটনায় কিছু মাত্র আনন্দোচ্ছাস হয় না, আবার দুঃখজনক কোন ঘটনা হইলেও অণুমাত্র স্নানভাব হয় না, সুতরাং যাহার সুখভােগের নিমিত্তও কিছুমাত্র অনুরাগ নাই, আবার দুঃখভােগের আশঙ্কায়ও কিছুমাত্র ভয় বা বিদ্বেষাদি নাই ; যাহার দেহ ইন্দ্রিয় মনবুদ্ধি প্রভৃতি কোন প্রকার জড়বস্তুতেই আত্মত্ব বােধ নাই, অর্থাৎ দেহাদি সমস্ত জড়পদার্থ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্ বস্তু ধলিয়া যিনি আত্মাকে জানেন, সুতরাং এই “দেহটা অস্ত্র-শস্ত্রাদি দ্বারা ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন অথবা অগ্নিদ্বারা ভস্মসাৎ হইলেও “দেহ আত্মা নয়” বলিয়া যিনি কিছুমাত্র ব্যথিত বা বিচলিত না হয়েন এবং মন বা ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা যত প্রকার সুখদুঃখাদি সমুৎপন্ন হয়, তাহার কোনটিকেই যিনি আপনার সুখদুঃখাদি বলিয়া অনুভব করিয়া বিচলিত না হয়েন ; যিনি শত্ৰুমিত্রাদিতে সমদর্শী, ইত্যাকার লক্ষণযুক্ত মহাত্মাকে উত্তম অধিকারী বলা যায়। ইনিই ঐ পূর্বোক্ত মুখ্য উপায়ের (ধ্যানের) অবলম্বন করিয়া, তাদৃশ ধ্যান-পরিসংস্কৃত চিত্ত দ্বারা, উত্তপ্ত লৌহপিণ্ড ৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। যেরূপ তাপদ্বারা অনুস্ত থাকে, সেইরূপ অনুস্তভাবে অবস্থিত পরমাত্মাকে আপন অন্তঃকরণমধ্যে সর্শন করেন। প্রকৃতি এবং পুরুষের বিবেকজ্ঞানকে গৌণ বলা যায়; অর্থাৎ দেহমধ্যে যে কোন প্রকার ক্রিয়া হইতেছে তৎসমস্তই এই দেহ, মন, ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি প্রাণাদি জড়পদার্থের ক্রিয়া—উহা আত্মার ক্রিয়া নহে; কারণ আত্মা নিতান্ত নিগুণ, নিষ্ক্রিয় ও নিধৰ্ম, চৈতন্যময় পদার্থ ; তাহার কোন প্রকার ক্রিয়াদি কদাচ সম্ভবে না ;—তিনি সাক্ষী-স্বরূপে অবস্থিত আছেন;—সুখদুঃখাদি কোন প্রকার গুণ তাহার নাই ;- ইত্যাদি রূপ বিচার করাকে প্রকৃত পুরুষ-বিবেক বলে। ইহারই নাম সাঙ্খ- যােগ (কিন্তু পূৰ্বের সাঙ্খযােগ হইতে ইহা বিভিন্ন); এইরূপ বিচার করাকে সাক্ষাৎসম্বন্ধে আত্মদর্শনের কারণ বলা যায় না। এইরূপ বিচার বা বিবেকের অনুশীলন করিতে করিতে পূর্বোক্ত ধ্যানের ক্ষমতা বিকশিত হইতে পারে ; তৎপরে সেই ধ্যানদ্বারা আত্মার দর্শন হইয়া থাকে। এইজন্য বিচার ও বিবেককে আত্ম-দর্শনের গৌণ উপায় বলা গিয়া থাকে। আর যাহাদের চিত্ত হইতে সমস্ত প্রকার রজোগুণের ভাৰ নিঃশেষে বিদূরিত হইয়া সম্পূর্ণ সত্ত্বগুণের বিকাশ হইয়াছে, কিন্তু পূর্বোক্ত উত্তমাধিকারীর অবস্থা জন্মে নাই, তাহাদিগকে মধ্যমাধিকারী বলা যায়। সেই মধ্যমাধিকারীগণ উক্ত গৌণ উপায় (প্রকৃতি-পুরুষ- বিবেকের) অবলম্বন করিয়া থাকেন। এবং ঐরূপ বিবেকের (সাখযােগের) অনুশীলন করিতে করিতে অবশেষে ধ্যানসম্পন্ন হইয়া পরিসংস্কৃত চিত্ত দ্বারা আপন অন্তঃকরণেই আত্মাকে দর্শন করিয়া থাকেন। সমস্ত কৰ্ম্মফল ঈশ্বরে সমৰ্পণ পূর্বক ফল-কামনা-শূন্য হইয়া বিহিত করে অনুষ্ঠান করাকে গৌণতর উপায় বা কর্মযােগ বলা যায়। আর যাঁহাদের চিত্ত রজোগুণ ও তমােগুণ হইতে বিমুক্ত হইতে পারে নাই, পূর্বোক্ত ধ্যান ও বিবেকের অবস্থাও যাহাদের জন্মে নাই, তাহারা মন্দ- অষ্টম পরিচ্ছেদ। অধিকারী। মল অধিকারীগণ গৌণতর উপায়ের (ঈশ্বরে ফল সমর্পণ পূৰ্ব্বক ফলকামনাশূন্য হইয়া বিহিত কৰ্ম্মানুষ্ঠানের) অবলম্বন করিয়া থাকেন। তাদৃশকৰ্ম্মযােগের অনুষ্ঠান দ্বারা সমস্তু রজোগুণ এবং তমােণ মন হইতে নিঃসারিত হইলে, বিশুদ্ধ সত্বগুণের বিকাশ হইয়া থাকে। চিত্ত তখন আত্মতত্ত্ব-বিবেকের উপযুক্ত হয়। ইহাকেই “চিত্তশুদ্ধি” বলে। পরে পূর্বোক্ত ধ্যানানুষ্ঠান দ্বারা চিত্ত সংস্কৃত হইলে সেই চিত্তই আত্মদর্শন করে। পরমাত্মার বিবরণ। বংস! কোন মহাত্মা লিখিয়াছেন,—“প্রস্তাবিত ব্ৰহ্মপদার্থ যদিও স্বয়ং কোন ক্রিয়ার কর্তা নহেন, তথাচ তাহার সন্নিধিমাত্রে চুম্বকের লৌহাকর্ষণ ও অগ্নির বারুদিয় পদার্থের বিস্ফোরণরূপ ক্রিয়ােৎপত্তির ন্যায় প্রকৃতির বিক্রিয়া দ্বারা বিশ্ববস্তুর নানাপ্রকার ক্রিয়া উৎপন্ন হইয়া থাকে। অতএব উক্ত ব্ৰহ্মপদার্থকে যখন সচেতন ও অচেতন সমস্ত পদার্থের প্রবর্তক শক্তির সহিত ব্যপদেশ করা যায়, তখন তিনি পরমাত্মা বলিয়া খ্যাত হয়েন। তথাচ ব্ৰহ্মতর্কে- দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লােকেশ্চাক্ষর এবচ। ক্ষরঃ সৰ্বাণি ভূতানি কূটম্বােক্ষর উচ্যতে। উত্তমঃ পুরুষঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃতঃ। যােলােকয়মাবিশস্য বিভব্যয়মীশ্বরঃ। অর্থাৎ এই সংসারমধ্যে ক্ষর অক্ষর নামক দুই প্রকার পুরুষ প্রসিদ্ধ আছে ; তন্মধ্যে ব্রহ্মাদি স্থাবরান্ত প্রাণিসমূহের শরীর ও তৎকারণ পৃথিব্যাদি ভূতসকল ক্ষর (নশ্বর ) পুরুষ, এবং এবং কূটন্থ অর্থাৎ জীবােপাধি যাহা দেহনাশেও নষ্ট হয় না তাহা অক্ষর (অনশ্বর ) পুরুষ বলিয়া উক্ত হয়। এইরূপ ক্ষরাক্ষর উভয় পুরুষ হইতে ভিন্ন ও • ধর্মতত্ত্ববারিধি। তদপেক্ষা উত্তম পুরুষ যিনি লােকয়ে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া জীবসকলের বুদ্ধি ও অজীব বস্তুর স্বভাবকে স্ব স্ব কাৰ্যে প্রবৃত্ত করেন, তিনিই পরমাত্মা নামে খ্যাত হয়েন। এই পরমাত্মার উক্ত শক্তি দ্বারা বিক্রিয়াপ্রাপ্ত প্রকৃতি হইতে অন্তঃকরণ প্রধান লিঙ্গশরীর উদ্ভূত হইয়া বহির সন্তাপে তপ্ত লৌহপিণ্ডের ন্যায় তাহার চৈতন্য দ্বারা তাহা যখন সচেতন হয়, তখন তাহাকে জীবাত্মা বলা যায়। ইহাই জীবাত্মা ও পরমাত্মার প্রভেদ, নতুবা অন্য কোন প্রভেদ নাই। উক্ত পরমাত্মাকেই সাক্ষি- চৈতন্য কহে। বিশেষতঃ শ্রীভাগবতের একাদশঙ্কন্ধে এইরূপ লিখিত আছে যে, যিনি দেহেন্দ্রিয়, প্রাণ ও মনকে সচেতন করেন এবং যে চেতনা হইতে বিষয়সঞ্চার হয়, তিনিই পরমাত্মা। অতএব পরমেশ্বর এই অংশেই জগতের পরমনিমিত্ত কারণ হইয়াছেন। ভগবানের বিবরণ। প্রাগুক্ত ব্ৰহ্মপদার্থের যে প্রদেশে, বিশ্বের প্রকৃতিরূপা তাঁহার তটস্থা- শক্তি আশ্রিতা হইয়া থাকে, সেই প্রদেশ—প্রকৃতির সহিত ব্যপদিষ্ট হইলে, ভগবান্ অথবা ঈশ্বর বলিয়া নিরূপিত হয়েন। উক্ত ঈশ্বর, —মূল কারণ, সূত্র ও কাৰ্য্য এই প্রকার ত্রিবিধরূপে নির্দিষ্ট আছেন। তন্মধ্যে যখন তাহাতে কোন কাৰ্যমাত্রের প্রকাশ থাকে না, তখন তিনি মূলকরণ অথবা বাসুদেব বলিয়া বিবেচিত। উক্ত মূলকারণ, ঘটকাৰ্য্যের প্রতি যে প্রকার পৃথিবী এবং যখন তিনি জীবাদৃষ্টবশতঃ ক্ষুব্ধ প্রকৃতি হইতে পরমাত্মার প্রেরণাশক্তির দ্বারা উৎপন্ন মহৎ অহঙ্কার ও পঞ্চতন্মাত্রাদি কাৰ্য্যরূপে প্রকাশ হইয়া ঘটকাৰ্য্যের দ্বিতীয় কারণ মৃৎপিণ্ডের ন্যায় বিশ্বের দ্বিতীয় কারণরূপে গণ্য হয়েন, তখন তাহাকে সূত্ৰাত্মা দ্বিতীয় কারণ ) অথবা নারাণ বলিয়া নির্দেশ করা যায়। অপর যখন তিনি বিশ্বকাৰ্যের শৃঙ্খলা বৰ্দ্ধনাথ ব্রহ্মারূপে অষ্টম পরিচ্ছেদ। প্রকাশিত হয়েন, পণ্ডিতেরা তখন তঁহাকে কাৰ্যব্ৰহ্ম ব্রহ্মা বলিয়া নিরূপণ করিয়া থাকেন। অতএব প্রকৃতির আশ্রয়ভূত নিগুণ ব্রহ্মই তদীয় গুণের সহিত প্রকাশিত হইলে ঈশ্বর নামে খ্যাত হয়েন। অর্থাৎ প্রকৃতির সমুদয় গুণের সহিত অবভাসিত যে ব্ৰহ্ম, তিনিই ঈশ্বর।” তির্যপূর্ধ্বমধঃ পূর্ণং সচ্চিদানন্দমদ্বয়ম্। অনন্তং নিত্যমেৰুং যৎ ত ব্ৰহ্মেত্যবধারয়েৎ ॥ অত্যাবৃত্তিরূপেণ বেদান্তৈলক্ষ্যতেইদ্বয়ম্। অখগুানন্দমেকং যৎ তদ্ব্রহ্মেতবধরয়েৎ ॥ ভগবান্ শঙ্করাচার্য। যিনি চতুর্দিকে, উৰ্দ্ধদেশে , ও অধােভাগে সৰ্বত্ৰ স্বকীয় সত্তা এবং জ্ঞান ও আনন্দময়ভাবে পরিপূর্ণ হইয়া বিরাজ করিতেছেন যিনি অদ্বিতীয়, অর্থাৎ যাহা ব্যতীত অপর কোন পদার্থ তাহার সমান কিংবা তাহা হইতে অধিক আছে ইহা দেখিতে পাওয়া যায় না; যিনি অনন্ত ও নিত্যকাল বিরাজমান আছেন; যিনি স্বজাতীয় অদ্বিতীয় বস্তুরূপে বিরাজিত হইতেছেন, তাহাকেই ব্ৰহ্ম বলিয়া জানিবে । যিনি বেদান্ত-বাক্য দ্বারা অতদ্ব্যাবৃত্তিরূপে পরিলক্ষিত হন, অর্থাৎ ইহা নহে, ইহা নহে,—এই ভাবপ্রপঞ্চ যাবতীয় পদার্থ নিষেধপূৰ্ব্বক যাহা নিষিদ্ধ নহে স্বয়ং তদ্রূপে প্রতিভাত হইতেছেন, এবং যাহা হইতে ভিন্ন আর দ্বিতীয় বস্তু নাই ও যিনি নিরবচ্ছিন্ন পরমআনন্দস্বরূপে প্রকাশ পাইতেছেন, যিনি স্বজাতীয় ভেদশূন্য অর্থাৎ একমাত্র তাঁহাকেই পরব্রহ্ম বলিয়া অবধারণ করিবে। v নবম পরিচ্ছেদ। v বেদ ও পুরাণ। শিষ্য।-আপনার নিকট তত্ত্বজ্ঞান শ্রবণ করিয়া আমার জ্ঞানের উদয় হইল; কিন্তু বেদে কেবল এক ব্ৰহ্মই উপলক্ষ মাত্র, অথচ পুরাণাদিতে নানা দেবদেবীর উপাসনা করিবার বিধি দিয়াছেন, এরূপ অনৈক্যের কারণ কি, তাহা আমাকে বুঝাইয়া দিউন। গুরু।-বৎস! বলিতেছি শ্রবণ কর। “বেদ, পুরাণ এবং তন্ত্রাদি সকল শাস্ত্রেরই প্রতিপাদ্য ব্ৰহ্ম। তদতিরিক্ত অন্য কোন দেবতার উপাসনা করিবার উপদেশ মুমূযু জন- গণের প্রতি কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। কায়মনােবাক্যে ভক্তিপূৰ্ব্বক পরাৎপর পরমেশ্বরের উপাসনা করিয়া মনের শান্তিলাভ করিবার বিধান সর্বত্রই দৃষ্ট হয়। তবে কেবল এই মাত্র প্রভেদ যে, বেদ যাহা বলিয়াছেন, পুরাণাদি তদাচরণের উপায় দেখাইয়াছেন; যথা, বেদ এই আদেশ করেন যে, “আত্মা বা অরে দ্রষ্টব্যঃ শ্রোতবব্যা মন্তব্যো নিদিধ্যাসিতব্যঃ।” অত্যার্থ—অরে! আত্মার শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন দ্বারা সাক্ষাৎকার হইতে পারে। কিন্তু বিষয়াসক্ত বেদানভিজ্ঞ লােকদিগের জন্য সেই শ্রবণাদি অনুষ্ঠান করিবার উপায় পুরাণাদি নানাশাস্ত্রে কথিত হইয়াছে। যদিও শাস্ত্রে উপাসনা অর্থাৎ ভক্তি-প্রকরণে বিবিধ দেবদেবীর প্রসঙ্গে মনুষ্যের ন্যায় তাহাদিগের বাসস্থান ও পরিবার ও বাহনাদি থাকার বিবরণ ও সেই সেই দেবদেবীর উপাসনা করিবার উপদেশ অথবা নবম পরিচ্ছেদ। বেদং উপাস্য দেবের বিভিন্নতা দৃষ্ট হয়, তথাপি ইহা বেদের আশ্চর্য কৌশল জানিবে। ১। পুরাণ শাস্ত্র যে বেদমূলক, তদ্বিষয়ে এই বক্তব্য যে, পুরাণ- কৰ্ত্তাদিগের মধ্যে প্রধান যে বেদব্যাস, তিনি শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম ঋন্ধের প্রথম অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকে লিখিয়াছেন যে, “এই ভাগবতশাস্ত্র বেদরূপ কল্পবৃক্ষের ফল।” পুনরায় তৃতীয় অধ্যায়ের চত্বারিংশৎ শ্লোকে লিখিয়াছেন যে, “ইহা সৰ্ব্ববেদের তুল্য”। ইহা সৰ্ব্ববেদের তুল্য”। পুনশ্চ তৎপর শ্লোকে লিখিত হইয়াছে যে, “মহর্ষি বেদব্যাস এই শাস্ত্রে সকল বেদ এবং ইতিহাসের সার উদ্ধার করিয়া আত্মসুত ধীরশ্রেষ্ঠ শুকদেবকে শিক্ষা দিয়াছিলেন।” এ বিষয়ের প্রমাণ স্মৃতিতেও পাওয়া যায় “ইতিহাসপুরাণাভ্যাং সমুপবৃংহয়েৎ। বিভেত্যল্পশ্রদ্বেদো মাময়ং প্রহরিষ্যতি । অত্যার্থ :—ইতিহাস এবং পুরাণাদি শাস্ত্র বেদার্থেরই স্তাবক মাত্র। বেদ অল্পজ্ঞানবিশিষ্টলােক কর্তৃক প্রহারিত হইবার ভয়ে ভীত হয়েন। অর্থাৎ যে সকল লােক কেবল ব্যাকরণাদি শাস্ত্রাধ্যয়ন করতঃ জ্ঞান-ভাণ্ডারের দ্বারমাত্র স্পর্শ করিয়া পণ্ডিভিমানী হয়, তাহারা বেদাধ্যয়ন বা তদালােচনা করিলে, তাহার প্রকৃতাভিপ্রায় গ্রহণ করিতে অশক্ত হইয়া অর্থবাদ সকলকেই যথার্থবাদ জ্ঞান করিয়া অনর্থ ঘটাইতে আরম্ভ করে। এ নিমিত্ত বর্ণাশ্রম এবং অধিকারভেদে ও রাজপ্ৰজাদির যাহা কৰ্তব্য, পরম দয়ালু ঋষিরা তাহা পুরাণাদি শাস্ত্র দ্বারা স্পষ্ট করিয়া উপন্যাসচ্ছলে লিখিয়াছেন। ২। স্মৃতিশাস্ত্র যে বেদমূলক, তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ তাহাতেই লিখিত আছে ; যথা প্রায়শ্চিত্ততত্ত্বে প্রায়শ্চিততাপদেশ প্রকরণে এই মনুবাক্য ধৃত হইয়াছে,-“আর্যং, ধর্মোপদেশঞ্চ বেদশাস্ত্রাবিরােধিনা। যন্ত কেণানুসন্ধত্তে স ধৰ্ম্মং বেদনেতরঃ॥” অত্যার্থ : বেদাধিকারী

ধর্মতত্ত্ববারিধি।
জনগণের মধ্যে যে ব্যক্তি মীমাংসা দ্বারা বেদ ও স্মৃত্যাদি অনুসন্ধান
করে, সেই ব্যক্তিই ধৰ্ম্ম জানে, তদিতরে জানে না।
৩। তন্ত্রশাস্ত্রে বেদ-মূলকতার প্রমাণ এই যে,
ন বেদঃ প্রণবং ত্যক্ত। মন্ত্রেীবেদ সমুখিতঃ।
অস্মাৎ বেদপয়ােমন্ত্রো বেদাঙ্গশ্চাগমঃ স্মৃতঃ।
--ইতি মেৰুতন্ত্রে প্রথম প্রকাশে।
অত্যার্থ-প্রণব পরিত্যাগ করিলে বেদের বেদত্ব রহিত হয়; এবং
মন্ত্র সকলের উৎপত্তি বেদ হইতে; অতএব সমুদায় মন্ত্রই বেদপর অর্থাৎ
বেদের মধ্যে উত্তম এবং আগমও বেদের অঙ্গ ; এই হেতু মন্ত্রসকল
বেদের অঙ্গরূপে কথিত হইয়াছে।
অপিচ, নিরুত্তর তন্ত্রে কথিত হইয়াছে যে,
“আগমঃ পঞ্চমােবেদঃ কোলস্তু পঞ্চমাশ্রমঃ।”
অর্থঃ আগম পঞ্চম বেদ এবং কৌল অর্থাৎ বামাচার পঞ্চম আশ্রম।
বিশেষতঃ তন্ত্রে যে সকল নামরূপ উদ্দেশে উপাসনার বিধান আছে,
তত্তাবতের প্রসঙ্গ বেদে এবং পুরাণে দৃষ্ট হইতেছে ; এ বিধায়ে তাহা
তন্ত্রকারদিগের স্বকপােলকল্পিত বলা যাইতে পারে না। অধিকন্তু প্রকৃত
বিষয়ে বেদের সহিত তান্ত্রিক মতের অনৈক্য নাই; যেহেতু
যাহার আভাস তােমাকে পূর্বেই কহিয়াছি, তাহা এই যে, জীব
বাস্তবিক বিদাভাস অর্থাৎ জ্ঞানের প্রতিবিম্ব, কেবল মায়াচ্ছন্নতাপ্রযুক্ত
জীবরূপ উপাধিগ্রস্ত হইয়াছেন; এবং তন্ত্রেও তাহাই অবিকল লিখিত
আছে। যথা :-
জীবঃ শিবঃ শিবে। দেবঃ স জীবঃ কেবল শিবঃ।
পাশবদ্ধো ভবেজ্জীবঃ পাশমুক্তঃ সদাশিবঃ ॥” ইতি—
মুণ্ডমালাতন্ত্র—দ্বিতীয় পটল।
বৈদান্তিক মত,

নবম পরিচ্ছেদ। অত্যার্থ। জীবই শিব, শিব দেবতা, এবং সেই যে জীব, তিনি কেবল, অর্থাৎ দ্বিতীয়বহিত শিব ; কেবল পাশবদ্ধ হেতু জীব ; পাশক্তি হইলেই সদাশিব হয়েন। তথাহি।—“তুষেণ বদ্ধ৷ ব্ৰীহঃ স্যাৎ তুষভাবে তু তণ্ডুলঃ কৰ্ম্মবদ্ধো ভবেজ্জীব কৰ্ম্মমুক্তঃ সদাশিবঃ”। ইতি মুণ্ডমালা তন্ত্র—তৃতীয় পটল । অস্যাৰ্থঃ।-তুষাচ্ছাদিত যে শস্য, তাহারই নাম ব্রীহি ; তুষরহিত হইলেই সেই শস্য তণ্ডুল আখ্যা প্রাপ্ত হয়। তদ্রুপ কৰ্ম্মপাশ দ্বারা বদ্ধ হেতু জীব-সংজ্ঞা এবং তাহা হইতে মুক্ত হইলেই সদাশিব নাম হয় ; এবং পরমাত্মার সহিত জীবাত্মার অভেদজ্ঞান সাধনাৰ্থে পূজাপদ্ধতির মধ্যে ভূতশুদ্ধির প্রকরণ কল্পিত হইয়াছে। তাহাতে এমত ভাবনার উপদেশ আছে যে, জীবাত্মা মূলধারে চতুর্দশপদ্মে অবস্থিত জ্ঞানে সুষুম্ন নাড়ীর পথে তাঁহাকে উর্জে উত্তোলনকরতঃ লিঙ্গমূলে বড় দল, নাভিমূলে । দশদল, হৃদয়ে দ্বাদশদল, কণ্ঠে যােড়শদ, জমধ্যে দ্বিদল পদ্ম ভেদকরণপূৰ্ব্বক মস্তকমণ্ডলস্থ সহস্রদল পদ্মের কর্ণিকান্তৰ্গত দ্বাদশকমলদলস্থিত পরমাত্মার সহিত সংযােগকরতঃ সেই আমি, এই চিন্তা করিয়া পুনরায় জীবাত্মাকে পৃথক্ করােন্তর উক্ত পথে অবতারণ- পূৰ্ব্বক স্বস্থানে স্থাপন করিবে। এতাবত পুরাণাদি তাবং শাস্ত্রের বীজ বেদই জানা যায় ; অর্থাৎ বেদ যাদৃশ নিরাকার ব্রহ্মোপাসনার উপদেশক, তাদৃশ সাকার-অৰ্চনার এবং বিবিধ কর্মের প্রবর্তক, অথচ সৰ্ব্বকর্মাদিরও নিবর্তক। তিনি চিৎ, সৎ আনন্দ, অদ্বিতীয়, অখণ্ড, অচল, অজ, অক্রিয়, কুটস্থ, স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপ, সুপ্রকাশ, ব্ৰহ্ম, এই দ্বাদশ বিশেষণের বিশেষ্য। এমত অবস্থায় তাহার উপাসনা, অর্থাৎ ধ্যানধারণাদি সম্পন্ন হইবার উপায় কি ধর্মতত্ত্ববারিধি। আছে? সেই উপাসনা প্রথমাবস্থায় খণ্ডরূপে করণাবশ্যক হইয়া তদর্থে নানা কৌশল করিবার প্রয়ােজন হইয়াছে। প্রথম কৌশল—পরমেশ্বর সর্বজীবের হৃদয়ে অপরিচ্ছিন্নভাবে দারুস্থিত বহ্রির ন্যায় আত্মারূপে অধিষ্ঠিত আছেন; এহেতু আঘােপসনাতেই তাহার উপাসনা করা হয়। যেমন কোন মান্যব্যক্তির পদাঙ্গুষ্ঠমাত্র পূজা করিলেই তাহার সমুদায় শরীরের পূজা সিদ্ধ হইয়া থাকে, তদ্রুপ। কিন্তু সেই আত্মারও কোন অবয়ব নাই, অতএব ধ্যান-ধারণাদি সাধনা সম্পন্ন করিবার নিমিত্ত আত্মার এক একরূপ কল্পনা করিবার প্রয়ােজন হইয়াছে। সাধকেরা স্বয়ং ঐ কল্পনা করিলে পাছে ভক্তির ত্রুটি এবং ব্যভিচার-দোষ উপস্থিত হয়, অর্থাৎ সময়ে সময়ে উপাস্টমূৰ্ত্তির পরিবর্তনেচ্ছা হয়, এ নিমিত্ত গুরুকরণপূৰ্ব্বক উপাস্য বিগ্রহ অর্থাৎ ইষ্টদেবতা এবং তাহার মন্ত্ররূপ গুহনাম লাভকরতঃ ঐ স্থূলাবয়বে চিত্তের ৰ্য্যৈ এবং প্রেমলক্ষণ ভক্তির আবির্ভাব পৰ্যন্ত পরব্রহ্মের ঐ সকল নাম ও মূর্তির প্রতি দৃঢ়বিশ্বাসে একাগ্রচিত্তে স্বহৃদয়ে তাহারই চিন্তা এবং মানসপূজা করিবার বিধান অবধারিত হইয়াছে। দ্বিতীয় কৌশল—অন্তর্যাগ অপেক্ষা বহির্যাগে মন অধিক নিবিষ্ট হয় ; এবং পরমেশ্বর যেমন প্রাণিমাত্রের হৃদয়ে আছেন তদ্রুপ বাহিরেও আছেন, অর্থাৎ তাহার সভারহিত স্থান নাই। অতএব গন্ধ- পুদি তাহার পাদপদ্মে এবং নৈবিদ্যাদি তাঁহার মুখচন্দ্রিমাতে প্রদান করিতেছি, এমত মনে করিয়া যে কোনস্থানে তাহা অর্পণ করা যায়, তাহাতেই তঁাহার পূজা সিদ্ধ হইতে পারে। এ নিমিত্ত বাহপূজার হইয়াছে। ভগবদ্গীতার সমাধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন যে, ; বাহপূজার সৃষ্টি “অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং মন্তন্তে মামুবুদ্ধয়। পরং ভাব মানন্তো মর্মব্যয়মনুত্তমম্।

নবম পরিচ্ছেদ। ৯৭ নাহং প্রকাশঃ সৰ্বস্য যােগমায়াসমাত। মূঢ়োহয়ং নাভিজানাতি লােকো মামজমব্যয়ম্।” আমি অব্যক্ত হইলেও, মূঢ় ব্যক্তিরা আমার অব্যয় অনুত্তম পরমভাব অবগত হইতে না পারিয়া, আমাকে ব্যক্তস্বরূপ বিবেচনা করে। আমি যােগমায়াদ্বারা সমাবৃত রহিয়াছি; সুতরাং মূঢ়েরা অজ ও অব্যয়স্বরূপ আমাকে পরিজ্ঞাত হইতে সমর্থ হয় না। মার্কণ্ডেয় পুরাণের চতুর্থাধ্যায়ে প্রকাশ আছে যে, জৈমিনি ঋষি মহাভারতের কয়েক বিষয়ে সন্দিগ্ধ হইয়া বিন্ধ্যপর্বত-গহ্বরস্থিত পক্ষিরূপী দ্রোণপুত্র-চতুষ্টয়কে অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে প্রথমতঃ এই জিজ্ঞাসা করেন যে, “ভগবান বাসুদেব অখিল ব্রহ্মাণ্ডের আধার এবং সকলের কারণের কারণ। তিনি নিগুণ হইয়াও তবে কি নিমিত্ত মনুষ্যত্ব প্রাপ্ত হইয়া- ছিলেন ? তাহাতে পক্ষীরা উত্তরপ্রদানে প্রবৃত্ত হইয়া তাঁহার স্বরূপবর্ণন করােন্তর পরিশেষে স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করেন যে, “তাহার রূপ এবং বর্ণ ইত্যাদি কিছুই যথার্থ পদার্থ নহে, কল্পিতমাত্র। সেই মূর্তি অতি শ্রদ্ধা এবং প্রতিষ্ঠাস্বরূপ হইয়া বৰ্তমান আছে ; কেবল ইহাই মান্য করিও।” পুরাণবৃন্দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শ্রীমদ্ভাগবত ; তাহাতেও বেদব্যাস উক্ত কল্পনা অপ্রকাশ রাখেন নাই; যেহেতু ষষ্ঠস্কন্ধের চতুর্থাধ্যায়ে লিখিয়াছেনঃ- যঃ প্রাকৃতৈজ্ঞানপথৈর্জনানাং যথাশয়ং দেহগতত বিভাতি। যথানিলঃ পার্থিবমাশ্রিতাে গুণং স ঈশ্বরাে মে কুরুং মনােরথম ॥ সেই ঈশ্বর আমার মনােবাঞ্ছা সফল করুন, যিনি আধুনিক উপাসনা দ্বারা পােকদিগের চিত্তানুরূপ বিবিধ আকারবিশিষ্ট হইয়া তাহাদিগেৰ অন্তঃকরণে স্কুত্তি প্রাপ্ত হয়েন ; যেমত একবায়ু পার্থিব পরমাণু আশ্রয় করিয়া নানাবিধ গন্ধবিশিষ্ট হইয়া থাকে। ।

ধর্মতত্ত্ববারিধি। •ন ; ; ; ; পুনশ্চ, দ্বাদশ স্বন্ধের একাদশাধ্যায়ে শৌনকাদি ঋষিদিগের প্রশ্নের উত্তরচ্ছলে এবম্প্রকারে বিষ্ণুমূৰ্ত্তি কল্পনার অলঙ্কার ফুট করিয়াছেন যে, তিনি যজ্ঞরূপ পুরুষ ; শুদ্ধ জীবচৈতন্য (তাঁহার বক্ষঃস্থিত) কৌস্তুভমণি ; ঐ চৈতন্যের প্রকাশ-ঐবৎস অর্থাৎ দক্ষিণাবর্ত লােমাবলী ; নানাগুণময়ী মায়া বনমালা; ছন্দোময় পীতবস্ত্র ; প্রণব যজ্ঞােপবীত ; সাংখ্যযােগ (কর্ণের) মকরাকৃতি কুণ্ডলদ্বয় ; ব্ৰহ্মপদ মস্তক ; সত্ত্বগুণ পদ্ম; প্রাণতত্ব গদা; জলতত্ত্ব শঙ্খ ; তেজস্তত্ব সুদর্শননামক চক্র ; আকাশ-তত্ত্ব অসি ; তমােময় চৰ্ম্ম ; কালরূপ ধনুঃ ; (সকাম ও নিষ্কাম) কৰ্ম্মময় তুণদ্বয় ; ইন্দ্রিয়গণ শর ; ক্রিয়া- শক্তি রথ ; বিষয়—রথের প্রকাশ ( অভিব্যক্তি); অর্থক্রিয়া-বরাভয়াদি মুদ্রা ; ধর্ম এবং যশং—উভয় চামর-ব্যজন ; বৈকুণ্ঠ (মুক্তি)—ছত্র ; বেদত্রয় —গরুড় (নামক বাহন); চিৎশক্তি-লক্ষ্মী এবং অনিমাদি অষ্টৈশ্বৰ্য্য- দ্বারপাল। বিষ্ণু-পুরাণের ১ খণ্ডের ২২ অধ্যায়ে ঐ মূর্তির রূপক এইরূপে স্ফুটীকৃত হইয়াছে যে, হরির বিশ্বাত্মত্ব কৌস্তুভমণি প্রধান শ্রীবৎস- চিহ্; মহত্তত্ত্ব গদা ; অহঙ্কারের একাংশে শঙ্খ ও অপরাংশে ধনু ; মন সুদর্শন চক্র, যেহেতু তদ্বত্তিসকল ঐ চক্রের ন্যায় বায়ু অপেক্ষা দ্রুত গমন করে ; পঞ্চতন্মাত্র পঞ্চরদ্রের বৈজয়ন্তীমালা ; কর্মের ও বুদ্ধির গুণ সকল শর, তত্ত্বজ্ঞান অসি, যাহা কখন কখন অজ্ঞানরূপ চৰ্ম্মাচ্ছাদিত থাকে। এতাবৎ ইহা বিদিত আছে যে, আত্মা, প্রকৃতি, মহত্তত্ব, অহঙ্কার, পঞ্চতন্মাত্র, ইন্দ্রিয়সকল, মন, অজ্ঞান এবং বিজ্ঞান সকলই হরিতে আছে। মুণ্ডমালাতন্ত্রের সপ্তম পটলে উক্ত হইয়াছে- শিব উবাচ।-- নির্ণা প্রকৃতিঃ সত্যমহমেব চ নিগুণ। যদৈব সগুণা ত্বংহি সগুণােহহং সদাশিব । =

নবম পরিচ্ছেদ।
।
;
সত্যং হি সগুণাদেবী সত্যং হি নিগুণঃ শিবঃ।
উপাসকানাং সিদ্ধার্থং সগুণা সগুণাে মতঃ।
শিব কহিলেন, ইহা সত্য বটে যে, প্রকৃতি অর্থাৎ মায়া নিগুণ
এবং আমিও নিগুণ। যে কালে তুমি সগুণ হও, সেইকালে আমিও
সগুণ অর্থাৎ মূৰ্ত্তিমান হই। প্রকৃতি যে সগুণা ইহাও সত্য, এবং শিবও
নিগুণ ; কিন্তু উপাসকের কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত উভয়েই সগুণরূপে
কল্পিত হয়েন।
কুলার্ণবতন্ত্রের পঞ্চম খণ্ডে ষষ্ঠোল্লাসে উক্ত হইয়াছে যে,
চিন্ময়স্যা প্রমেয়স্য নিষ্কলস্যাশরীরিণঃ।
সাধকানাং হিতাথায় ব্ৰহ্মণেরূপকল্পনা।
জনস্বরূপ অপরিমিত নিঃসঙ্গ অশরীরী যে ব্ৰহ্ম, তাঁহার রূপকল্পনা
কেবল সাধকদিগের হিতার্থ।
মহাকাব্য রত্নাবলীতে লিখিত আছে,
রক্ষকো বিষ্ণুরিত্যাদি ব্ৰহ্মা সৃষ্টেস্তু কারণম্।
সংহারে রুঞ্জ ইত্যেং সর্বং মিথ্যেতি নিশ্চিনু।
বিষ্ণু রক্ষক, ব্ৰহ্মা সৃষ্টির কারণ এবং সংহারকর্তা মহাদেব ইত্যাদি
সকলই মিথ্যা।
মন অদৃশ্য বস্তুর ধারণায় নিতান্ত অশক্ত; অতএব ধ্যেয়মূর্তির বর্ণনা
মাত্র শ্রবণে তাহার চিন্তা করা দুঃসাধ্য ; সুতরাং মনের তদাকারাকাৰিত
বৃত্তি উদয়ার্থে সেই মূৰ্ত্তি পটে চিত্রিত, কিংবা মৃত্তিকাদিতে নির্মাণ করতঃ
পূজা করিলে ধ্যানাৰ্চনা উভয়েরই উপযােগী হয়। কিন্তু এ প্রকার
আরাধনা প্রত্যহ হওয়া সুকঠিন; অথচ যখন ইচ্ছা তখন করার নিয়ম
হইলে, জীবিতকালের মধ্যে বারেক না হওয়ারও সম্ভাবনা আছে।
এজন্য তদর্থে বিশেষ বিশেষ দিনবধারিত হইয়া কতিপয় বিগ্রহে উৎসব
;

ধর্মতত্ববারিধি। । সম্বন্ধে দৃঢ়শাসনও হইয়াছে ; অর্থাৎ পুৰ্ব্বে পূর্বে সেই সেই পুজা-অকরণে প্রত্যবায়রূপ ভয় এবং তৎকরণে স্বৰ্গভােগাদি মিষ্টফলের প্রলােভন দর্শিত হইয়াছে। ইহাই পৌত্তলিক ধর্মের বীজ জানিবে। যদিও কালক্রমে ঈশ্বরাধনাতেও অভিমান এবং অজ্ঞান জড়িত হইয়াছে, অর্থাৎ লােকে খ্যাতি, প্রতিপত্তি, উপরােধ, অনুরােধ, নিন্দা, ভয় ইত্যাদি নানাকারণ বশতঃ স্ব স্ব উপাস্য বিগ্রহাতিরিক্ত বিবিধ প্রতিমাৰ্চনার অনুষ্ঠান করে, তথাপি তাহারও প্রতি দোষারােপ করা যাইতে পারে না; যেহেতু নানা-নামরূপ-উদ্দেশে যে পূজা তাহা একেরই হয় ; ইহা পূৰ্বেই বলিয়াছি। বিশেষতঃ সাংসারিক লােকে সময়ে সময়ে আপন আপন আত্মীয় স্বজনকে লইয়া ভােজন এবং নৃত্যগীতাদি দ্বারা আমােদ প্রমােদ না করিয়া কদাচ সুস্থির থাকিতে পারে না; ইহা সভ্যাসভ্য সর্বদেশেই প্রসিদ্ধ আছে। কিন্তু শুদ্ধ লােকানুরােধের পরিবর্তে ঈশ্ববরাদ্দেশে তদনুষ্ঠান করিলে ঐহিক মুখাতিরিক্ত পারত্রিকের উপকারও সম্ভবে। কোন কোন বাদী এতৎকারণে পৌত্তলিক ধর্মের গ্লানি করিয়া বলেন যে, মৃত্তিকাদির প্রতিমাতে ঈশ্বর-বুদ্ধি করায় জগদীশ্বরের বিদ্রুপ করা হয়। ইহা নিতান্ত অসঙ্গত নহে; কিন্তু তাহাতেও অধিকার-ভেদ আছে ; অর্থাৎ মলিনচিত্ত লােক—যাহাদিগকে পণ্ডিতেরা মূঢ় কহিয়া থাকেন, তাহাদিগের সম্বন্ধে পৌত্তলিক-ধৰ্ম্মাচরণ চিত্তশুদ্ধিরই কারণ হয়.; পক্ষান্তরে বিশুদ্ধচিত্ত ব্যক্তিদিগের পক্ষে তাঁহা বিড়ম্বনাস্বরূপে গণ্য হইয়া থাকে। এ বিষয়ে ভগবান্ বেদব্যাস শ্রীমদ্ভাগবতে যাহা বলিয়াছেন, তদতিরিক্ত আর কিছুই বলিবার অপেক্ষা নাই; অতএব তাহাই এই স্থানে উদ্ধত করিয়া দিলাম। অহং সর্বেষু ভূতেষু ভূতাত্মবস্থিতঃ সদা। তমবজ্ঞান মাং মত্তঃ কুরুতেহর্চা বিড়ম্বন।

নবম পরিচ্ছেদ।
১০১
;
আমি আত্মস্বরূপ সৰ্ব্বভূতে সর্বদাই স্থিতি করিতেছি; সেই আত্মারূপ
আমাকে অবজ্ঞা করিয়া মরণ-ধৰ্ম্মবিশিষ্ট মনুষ্য যে প্রতিমাপূজা করে,
তাহা বিড়ম্বনা মাত্র।
যাে মাং সর্বেষু ভূতেষু সস্তমাত্মনীশ্বর
হিত্বাৰ্চ্চাং ভজতে মৌঢ্যাৎ ভস্মনেব্য জুহােতিসঃ ।
দ্বিষত পরকায়ে মাং মানিনাে ভিন্নদর্শিন।
ভূতেষু বদ্ধবৈরস্য ন মন শান্তিচ্ছতি ॥
আমি আত্মারূপ ঈশ্বর, সৰ্ব্বভূতে বিদ্যমান আছি; আমাকে পরিত্যাগ
করিয়া মৃঢ়তা প্রযুক্ত প্রতিমাদিতে ভজনা করা ভস্মে আহুতি দেওয়ার
ন্যায় বিফল। পরকায়াতে অর্থাৎ অন্যের শরীরে আমাকে দেষ করিয়া
যে ব্যক্তি আত্মাভিমানী ও ভিন্ন ভিন্ন দেহে ভিন্ন ভিন্ন আত্মদর্শন এবং
অপরাপর প্রাণীকে বৈরী জ্ঞান করে, তাহার মন শান্তি পায় নাই।
অর্শাদাবয়েত্তাবদীশ্বরং মাংস কৰ্ম্মকৃৎ।
যাবন্ন বেদ স্বহৃদি সর্বভূতেষবস্থিত ।
আমি ঈশ্বর,-আমাকে প্রতিমাদিতে পূজা করা কর্মীলােকের সেই
পৰ্যন্ত বিধেয়, যে পর্যন্ত আমাকে সে নিজের হৃদয়ে এবং সর্বভূতে
অবস্থিত না জানে।
অথ মাং সৰ্ব্বভূতেষু ভূতাত্মানং কৃতালয়।
অহঁয়েদ্দামানাভ্যাং মৈত্রাভিয়েন চক্ষুষা।
অনন্তর (অর্থাৎ এমত জ্ঞান হইলে পর ) সৰ্ব্বভূতে আত্মারূপে রহিয়াছি যে
আমি, সেই আমাকে দানে, মানে, মৈত্রভাবে এবং অভিন্নদৃষ্টিতে পূজা
করিবে; অর্থাৎ সৰ্ব্বভূতে আমি আছি, এহেতু সৰ্ব্বত্র সকলকে দান, মান
এবং তাবৎকে মিত্ৰজ্ঞান করিবে ও সকলকে আত্মতুল্য জানিবে; ইহা
হইলেই আমার প্রকৃত পূজা হইবে।

ধর্মতত্ত্ববারিধি। চতুর্থ কৌশল। সৰ্বধৰ্মশান্ত্রের এই অভিপ্রায় যে, লােকে আপনার প্রতি যেরূপ ব্যবহারের প্রত্যাশা করে, ব্যবহারের প্রত্যাশা করে, সেইরূপ ব্যবহারে অন্যের সম্বন্ধে করা তাহাদের কর্তব্য। এই নিমিত্ত উপাস্য দেবের সেবা আত্মবৎ করিবার আবশ্যকতা প্রযুক্ত তাহার সাঙ্গোপাঙ্গি সম্পন্ন করণার্থ স্বীয় কলত্রপুত্রাদি পরিবার ও বাসস্থান যানবাহনাদি পরিকর-নিকর থাকার ন্যায় তাহার সম্বন্ধে তত্তাবতের কল্পনা করণের প্রয়ােজন হইয়াছে। বিশেষতঃ মনকে একেবারে বিষয়-ভাবনা হইতে উপরত করিতে হইলে, তাহাকে অন্যত্র সংস্থাপিত করিতে হয় এবং চিস্থির করিবার স্থল আপন অভীষ্টদেবের মূর্তি ব্যতীত আর কোথায় আছে? কিন্তু ভক্তি ব্যতিরেকে ঐ মূর্তিতে চিত্তের আকর্ষণ সম্ভবে না, এবং ভাব ব্যতিরিক্ত ভক্তির উদয় হয় না। অধিকন্তু যােগের প্রথমাবস্থায় অহর্নিশ সেই মূৰ্ত্তির ধ্যান-পরায়ণ হওয়া দুঃসাধ্য। অতএব ধ্যানবর্জিত কাল ব্যর্থ ব্যয় না হইবার নিমিত্ত অর্থাৎ ঐ কাল ভগবৎ-কথা-শ্রবণ, কীর্তন এবং মনন দ্বারা যাপন-করণাথে তিনি বিবিধ রূপধারণ পূর্বক স্থানবিশেষে এক মূৰ্ত্তিতে মনুষ্যের ন্যায় উৎকৃষ্ট প্রাসাদে সপরিবারে ক্রীড়াদি করিতেছেন; এবং যাতায়াতের কারণ তাঁহার রূপবিশেষের বিশেষ বাহনও আছে,—এমত বর্ণনা হইয়াছে। ইহা ব্যতীত তাহার গমনাগমনের জন্য পশুপক্ষ্যাদি বাহন থাকার এবং স্ত্রীপুত্র লইয়া সংসার করিবার উক্তিতে স্বরূপাখ্যান বলিয়া প্রতীতি জন্মাইবার অভিপ্রায় শাস্ত্রের নহে।” *, স্বামী বিবেকানন্দ বলিয়াছেন,-“প্রতীক অর্থে যে সকল বস্ত অল্পবিস্তর ব্রহ্মের পরিবর্তে উপাসনার যােগ্য। প্রতীকে ভগবদুপাসনার অর্থ কি ? ব্ৰহ্ম নয় এমন বস্তুতে ব্রহ্মবুদ্ধি করিয়া ব্রহ্মের অনুসন্ধান। “অব্ৰহ্মণি ব্ৰহ্মদৃষ্টাহনুসন্ধান।” ভগবান্ রামানুজ বলিয়াছেন,-মনকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করিবে, নবম পরিচ্ছো। ইহাই আধ্যাত্মিক ; আকাশ-ব্রহ্ম, ইহাই অধিভৌতিক ; ” মন-আধ্যাত্মিক ও আকাশ-বাহ প্রতীক; এই উভয়কেই ব্রহ্মের বিনিময়ে উপাসনা করিতে হইবে। এইরূপ, আদিত্যই ব্ৰহ্ম—ইহাই আদেশ। “যিনি নামকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা, করেন” ইত্যাদি স্থলে প্রতীকোপসন সম্বন্ধে সংশয় হয়, শঙ্করাচাৰ্য্য এইরূপ বলিয়াছেন। প্রতীক শব্দের অর্থ বাহিরের দিকে যাওয়া এবং প্রতীকোপাসনা অর্থে ব্ৰহ্মের পরিবর্তে এমন এক বস্তুর উপাসনা, যাহা একাংশে বা অনেকাংশে ব্রহ্মের খুব সন্নিহিত কিন্তু ব্ৰহ্ম নহে। তিবর্ণিত প্রতীকের ন্যায় পুরাণতন্ত্রেও অনেক বর্ণনা আছে। সমুদয় পিতৃ-উপাসনা ও দেবাে- পাসনা এই প্রতীকোপাসনার অন্তর্ভুক্ত করা যাইতে পারে। এক্ষণে কথা,—এই ঈশ্বরকে এবং কেবল ঈশ্বরকে উপাসনার নামই ভক্তি। দেব, পিতৃ অথবা অন্য কোন উপাসনা, ভক্তিপদ- বাচ্য হইতে পারে না। ভিন্ন ভিন্ন উপাসনা কর্মকাণ্ডের অন্তভুক্ত। উহা উপাসককে কেবল কোন প্রকার স্বর্গভােগরূপ বিশেষ ফল প্রদান করে; কিন্তু উহাতে ভক্তির উদয় হয় না; উহা মুক্তিও প্রসব করিতে পারে না। সুতরাং একটা কথা বিশেষরূপ মনে রাখা আবশ্যক। দার্শনিক দৃষ্টিতে পরমব্রহ্ম হইতে জগৎকারণের উচ্চতর ধারণা আর হইতে পারে না। প্রতীকোপাসনা কিন্তু অনেক স্থলেই এই প্রতীককে ব্রহ্মের আসনে বসাইয়া উহাকে আপন আত্ম- স্বরূপ চিন্তা করিতে পারে; কিন্তু এরূপ স্থলে সেই উপাসককে সম্পূর্ণ লক্ষ্যভ্রষ্ট হইতে হয়, কারণ প্রকৃত প্রস্তাবে কোন প্রতীকই উপাসকের আত্মা হইতে পারে না। কিন্তু যেখানে ব্ৰহ্মই উপাস্য, আর প্রতীক কেবল উহার প্রতিনিধিস্বরূপ অথবা উহার উদ্দীপক কারণ মাত্র, অর্থাৎ যেখানে প্রতীকের সহায়তায় সর্বব্যাপী ব্রহ্মের উপাসনা করা হয়, সেখানে এইরূপ উপাসনা বিশেষ উপকারী। শুধু মৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। তাহাই নহে। প্ৰবৰ্ত্তকদিগের পক্ষে উহা একেবারে অনিবাৰ্যরূপে প্রয়ােজনীয়। সুতরাং যখন কোন দেবতা অথবা অন্য প্রাণীকে ঐ দেবতা অথবা প্রাণীরূপেই উপাসনা করা হয়, তখন এরূপ উপাসনাকে একটী কর্ম মাত্র বলা যাইতে পারে। আর উহা একটী বিদ্যা বলিয়া, উপাসক ঐ বিশেষ বিদ্যার ফললাভ করিয়া থাকেন। কিন্তু যখন কোন দেবতা অথবা অন্য প্রাণী ব্ৰহ্মরূপে দৃষ্ট ও উপাসিত হন, তখন উহা ঈশ্বনােপাসনার তুল্য- ফল হইয়া পড়ে। উহা হইতেই বুঝা যায়, অনেক স্থলে শ্রুতি স্মৃতি প্রভৃতি সৰ্ব্বত্রই কোন দেবতা বা মহাপুরুষ অথবা অন্য কোন অলৌকিক পুরুষের দেবত্ব প্রভৃতি ভুলিয়া গিয়া, কি জন্য তাহাদিগকে ব্ৰহ্মরূপে উপাসনা করা হয়। অদ্বৈতবাদী বলেন, “নাম রূপ বাদ দিলে সকল বস্তুই কি ব্ৰহ্ম নহে?” বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী বলেন—“সেই প্রভুই কি সকলের অন্তরাত্মা নহেন ?” শঙ্কর তাহার ব্রহ্মপুত্রভাষ্যে বলিয়াছেন,-“আদিত্যাদির উপাসনার ফল ব্ৰহ্মই দেন, কারণ তিনিই সকলের অধ্যক্ষ। যেমন প্রতিমাদিতে বিষ্ণু আদির আরােপ হয়, তদ্রপ ব্ৰহ্মাও প্রতীকে আরােপিত হন। প্রতীক সম্বন্ধে যে কথা বলা হইল, প্রতিমা সম্বন্ধেও সেই সকল কথা খাটিবে ; অর্থাৎ যদি প্রতিমা কোন দেবতা বা সাধুর সূচক হয়, তাহা হইলে সেইরূপ উপাসনাকে ভক্তি বলা যাইবে না, সুতরাং উহা হইতে মুক্তিলাভও হইবে না। কিন্তু উহারা সেই এক ঈশ্বরের সূচক হইলে উহারা ভক্তি-মুক্তি উভয়ই প্রসব করে। .

দশম পরিচ্ছেদ। সাকার উপাসনার তাৎপৰ্য্য। শিষ্য।—আপনার নিকট তত্ত্ববিষয়ের উপদেশ পাইয়া জ্ঞানের সঞ্চার হইল; কিন্তু আমার মনে কয়েকটি বিষয়ের সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে, সেই গুলির ভঞ্জন করিয়া দিউন। আপনি বলিয়াছেন যে “আত্মা- মাত্রেই অব্যক্ত ব্ৰহ্ম ; সেই ব্ৰহ্মভাব ব্যক্ত করাই জীবের চরম লক্ষ্য। তিনি নির্বিকার, নিগুণ, নিস্ক্রিয় ও চিৎস্বরূপ।” তবে সেই নিগুণ ব্রহ্মর উপাসনা করিতে উপদেশ না দিয়া তন্ত্রে সাকার, সগুণ উপাসনা করিতে বলেন কেন? সাকার উপাসনা কাহাদের জন্য ও বহুমূর্তির আবশ্যকতা কি? গুরু-করণেরই বা আবশ্যকতা কি? দেবদেবীর ইষ্টমন্ত্র জপ করিবারই বা তাৎপর্য কি? আমাকে বুঝাইয়া দিউন। গুরু-বৎস! তােমায় সবিশেষ জানাইতেছি, শ্রবণ কর। প্রথমে দ্বৈতবাদ সিদ্ধ হইবার কারণ বুঝ। “শক্তিই ব্ৰহ্ম ; দেবাত্মশক্তি স্বগুণৈর্নিগূঢ়াং” ইত্যাদি বেদবাক্যে এই শক্তি ক্রীড়াশক্তি ও আত্ম- শক্তিরূপে আন্নত ; কেন না দিব, ধাতু ক্রীড়নার্থক এবং আত্মন্ শব্দের অর্থ-সচেতন। এই উভয় শক্তির মধ্যে ক্রীড়া-শক্তি পরিণামিনী এবং আত্মশক্তি অপরিণামিনী। “স্বগুণৈর্নিগুঢ়াং” *—এস্থলের স্বগুণ শব্দের ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। । আত্মস্বরূপ গুণাবলীতেই তাৎপৰ্য। সেই গুণ কি কি? জ্ঞানশক্তি, বলশক্তি ও ক্রিয়াশক্তি। নিত্য-সম্মিলিত শক্তিই সমষ্টিরূপে এক। এই ত্রিবিধ শক্তি সম্বন্ধে বেদবাক্যও আছে ; যথা—“স্বাভাবিকী জ্ঞানবল- ক্রিয়া চ” ইতি। স্বপ্রকাশময়ী যে শক্তি, প্রজ্ঞাশক্তি বিস্তার করতঃ নিখিল জগৎ প্রকাশিত করিতেছেন, সেই প্রকাশকত্রী এবং প্রকাশ কৰ্মস্বরূপা জ্ঞানশক্তিই সকল-লােক-ধারণক্ষমা ; অতএব তিনিই বলশক্তি এবং এই শক্তিই অংশতঃ পরিণামিনী; অতএব তিনিই ক্রিয়াশক্তি। এইরূপে বলশক্তি ক্রিয়া ও জ্ঞানশক্তির সহিত নিত্য-সম্মিলিত হইয়া দেবাত্মশক্তি নামে আয়াত। এই ত্রিবিধশ্যাত্মিকা দেবাত্মশক্তি এক এবং স্বপ্রতিষ্ঠা। সেই এক শক্তিতেই পরিণামবতী নানাশক্তি প্রতিষ্ঠিত। নট যেমন নানাভূমিকা গ্রহণ করিলেও এক, সেইরূপ ঐ দেবাত্মশক্তি নানা পরিণামি-শক্তির স্বরূপ হইয়াও এক। শ্রুতিতেও “পরাস্য শক্তিৰ্বিধে শুয়তে” ইত্যাদি স্থলে ঐ কথাই বলা হইয়াছে। সেই পরিণামি-শক্তি শ্রুতি অনুসারে পৃথিবী, পৃথিবী-তন্মাত্র প্রভৃতি ভেদে নানানামে উল্লিখিত আছে। স্মৃতিতেও ঐরূপ “ ভূমিরাপােন’ ” ইত্যাদি। ঐগুলি স্থূলভভদ ; উহাদের আবার অবান্তরভেদ আছে ; যেমন ঘটপট প্রভৃতি ভূমির অবান্তর-ভেদ। মূলশক্তি স্বরূপতঃ অন্য শক্তি- নিচয়ের আধার। এই মূলশক্তিকেই ব্ৰহ্ম বলা হয়। মহামায়া প্রভৃতি মূলশক্তির নামান্তর। এইরূপেই শক্তদিগের স্বরূপা- দ্বৈতবাদ সিদ্ধ হয়। দুর্গাকে প্রকৃতি বলিয়া জানিতে ইচ্ছা কর—উত্তম। তুমি তখন গীতা দেখিবে—“ মায়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরং;” অর্থাৎ প্রকৃতি আমাকর্তৃক প্রেরিত হইয়া জগৎ সৃষ্টি করিয়া থাকেন। যদি বল, প্রকৃতি হইলে তাহার উপাসনায় ফল কি আছে? বেদান্তে ত পরমাথােপানা বা ব্রহ্মোপাসনা মােক্ষহেতু বলিয়া বিহিত। সংক্ষেপে দশম পরিচ্ছেদ। ১৭ ইহার উত্তর শুন; প্রকৃতি-ব্ৰহ্ম, ঈশ্বর বা পরমাত্মার শক্তি; শক্তি বা শক্তিমানে ভেদ নাই ; যেমন বহির দাহিকা শক্তি বহি হইতে পৃথক নহে। ইহা বেদান্তের সিদ্ধান্ত। যে পদার্থ যে পদার্থকে ছাড়িয়া থাকিতে পারে না, সে পদার্থদ্বয়ে অভেদ-সম্বন্ধ। এই সিদ্ধান্ত স্বীকার করিয়াই বেদান্তের অদ্বৈতসিদ্ধান্ত সংস্থাপিত হইয়াছে। তবে শ্রুতিতে মায়া ও মায়ী এই পদার্থ দুইটীর পৃথকভাবে নির্দেশ থাকায় আপাতত ভেদ প্রতীয়মান হইলেও, বাস্তবিক ভেদ নাই। তাহা স্বীকার না করিলে (একমেবাদ্বিতীয়) এই অপর শ্রতিটি বাধিত হইত। বেদান্তশাস্ত্রে জগৎসৃষ্টির উপাদান ও নিমিত্ত এই দুইটি কারণ নির্দিষ্ট হইয়াছে; মায়া উপাদান-কারণ, এবং ঈশ্বর নিমিত্ত-কারণ। এই কারণ-বৈলক্ষণ্য বশতঃই মায়া-মায়ীর ভেদ-ব্যবহার ; বস্তুতঃ কিন্তু ভেদ নাই। যতাে বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে যেন জানি জীবন্তি যৎ সং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি তদ্বিজিজ্ঞাসস্ব তহ্ম।” অর্থাৎ যাহা হইতে সমস্ত ভূত উৎপন্ন হয়, যাহাকে অবলম্বন করিয়া তাহারা জীবিত থাকে, এবং বিনাশকালে যাহাতে লয় প্রাপ্ত হয়, তিনি ব্রহ্ম ; তাঁহাকে জানিতে ইচ্ছা কর।-এই শ্রুতিবাক্যের দ্বারা জানা যাইতেছে যে, প্রলয়কালে এই জগৎ ব্রহ্মেই লয় হয়। যদি জগতের উপাদানস্বরূপ প্রকৃতি ব্ৰহ্ম হইতে ভিন্ন হয়, তবে জগৎ প্রকৃতিতে বিলীন হয়; সুতরাং ব্রহ্মে বিলীন হয়- এ কথাটি অসঙ্গত হয়। অতএব বুঝিতে হইবে, প্রকৃতি ব্ৰহ্ম হইতে ভিন্ন নহেন। প্রকৃতিতে যে পদার্থ বিলীন হয়, তাহা ব্রহ্মেই বিলীন হয়। এখন বিবেচনা করিয়া দেখ, এই প্রকৃতির উপাসনাও ফলতঃ ব্রহ্মোপাসনা ব্যতীত আর কিছুই নহে। সুতরাং তাহার উপাসনায় মােক্ষলাভ হইবে না কেন? এইজন্য শাস্ত্রকার বলিয়াছেন,—“আরাধিতা সৈব ন नगर ভােগস্বৰ্গাপবর্গদা”অর্থাৎ মহামায়া আরাধিত হইয়া, মনুষ্যগণের ভােগ, বর্গ ও মুক্তি প্রদান করিয়া থাকেন। ;

ধর্মতত্ত্ববারিধি। বহুমূর্তির প্রয়ােজনীয়তা। “প্রতিমা, লিঙ্গ, ঘট, পট, মন্ত্র ইত্যাদি যিনি যাহাকে আশ্রয় করিয়া পূজা করেন, অথবা এই সকল বাহ আশ্রয় পরিত্যাগ করিয়া অন্তরে ধ্যানযােগে যিনি ইষ্ট-দেবতার উপাসনা করেন, সেই সকল সাধক একই ঈশ্বরের উপাসক। ভগবান মানবের প্রতি কৃপা করিয়াই সাধারণের বিভিন্ন প্রকৃতি অনুসারে নানাভাবে উপাস্য হইয়া থাকেন। অধিকার- ভেদে উপাসকের অবলম্বনমাত্র ভেদ হইয়া থাকে। মানব-প্রবৃত্তির পার্থক্যই বহুত্বের কারণ; ইহমােটামুটি বুঝিতে পারা যায়। মানসিক বৃত্তিগুলির একতার অভাবই নানাবিধ ভেদ সৃষ্টি করিয়া থাকে। এখন দেখা যাউক, প্রবৃত্তির পার্থক্যের কারণ কি। মােটামুটি বুঝিতে পারা। যায় যে, মনুষ্যমাত্রই পূৰ্বজন্মকৃত কৰ্ম্মজন্য অদৃষ্ট প্রভাবেই হউক, দেশ- কানাদির স্বভাব-প্রভাবেই হউক, অপরিবর্তনীয় নিয়তির নিয়মেই হউক, অনন্তময়ের অমােঘ ইচ্ছাবশেই হউক, উপাদানীভূত সত্ত্ব, রজঃ তমঃ গুণত্রয়ের পরিণামবশেই হউক, অথবা ইহজন্মের শিক্ষা বা সংসর্গ প্রভাবেই হউক, পরস্পর ভিন্নপ্রবৃত্তিসম্পন্ন। উপাসনা মনেরই কাৰ্য্য ; মনের অনৈক্য হেতু উপাসনার অনৈক্য ও একতার অভাব হইয়া থাকে। সমস্ত জগতে যদি একটা মাত্র মন থাকিত, তাহা হইলে উপাসনার প্রকারভেদ কদাপি শাস্ত্রে দেখিতে পাওয়া যাইত না।” ব্রাহ্মণ-সমাজ। বৎস! তুমি এইটী মনে রাখিবে যে, মানব আপন আপন প্রবৃত্তি অনুসারে কেহ বিষ্ণু, কেহ শিব, কেহ দুর্গা, কেহ বা কালীর উপাসনা করে, কিন্তু সকলেই এক ঈশ্বরেরই উপাসক।

.
.
একাদশ পরিচ্ছেদ।
সাকার উপাসনা কাহাঁদের জন্য ?
গুরু।—বৎস! সাকার উপাসনা কাহাদের জন্য, তাহাও তােমাকে
জানাইতেছি ; শ্রবণ কর।
অৰ্চ্চাদাচঁয়েত্তাবদীশ্বরং মাংস কৰ্ম্মকৃৎ।
যাব বেদ সহৃদি সৰ্ব্বভূতেষবস্থিত।
অথ মাং সর্বভূতেষু ভূতাত্মানং কৃতালয়ং।
অৰ্হয়োনমানাভ্যাং মৈত্রাভিয়েন চক্ষুষ।
-ভাগবত।
( ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উপদেশ দিতেছেন) মনুষ্যগণ
পৰ্যন্ত সৰ্ব্বভূতে অবস্থানকারী আমাকে (পরমাত্মাকে) আপনার হৃদয়ে
জানিবে অর্থাৎ ধ্যানদ্বারা আপন হৃদয়ে পরমাত্মার অস্তিত্ব স্পষ্টরূপে
অনুভব করিতে না পারিবে), সে পর্যন্ত কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠানপূর্বক
প্রতিমাদিতে অর্চনা করিবে। অনন্তর যখন বুঝিবে যে আমি (পরমাত্মা)
সৰ্বপ্ৰাণীতে বাস করিতেছি, তখন সর্বপ্রাণীর আত্মাকেই দানে, মানে ও
মৈত্রভাবে অর্চনা করিবে এবং সকলকেই অভিন্ননেত্রে অবলােকন
করিবে। এই ব্যবস্থার দ্বারা প্রতিপন্ন হইতেছে, যে পৰ্য্য তত্ত্বজ্ঞান না

১১০ ধর্মতত্ত্ববারিধি। জন্মিবে, তাবৎ অন্তঃকরণের নিশ্চলতা ও নির্মলতা সম্পাদনার্থ মনুষ্যকে সাকার উপাসনা করিতে হইবে। শাস্ত্রান্তরে নিরাকার, উপাসনার অধিকারী-নির্ণয় বিষয়ে আরও স্পষ্টতর নির্দেশ আছে ; যথা :- অধিকারী তু বিধিবদধীত বেদবেদাঙ্গপােততােহধিগতা- খিলবেদার্থোহস্মিন্ জন্মনি জন্মান্তরে বা কাম্যনিষিদ্ধবর্জন- পুরঃসরং নিত্যনৈমিত্তিক প্রায়শ্চিত্তোপাসনানুষ্ঠানেন নির্গত নিখিলকল্মষতয়া নিতান্তনিৰ্ম্মলস্বান্তঃসাধনচতুষ্টয়সম্পন্ন প্রমাতা।”-বেদান্তসার। যিনি যথাবিধি বেদ ও বেদান্তশাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া আপাততঃ অর্থাৎ সূলরূপে সকল বেদের অর্থ বুঝিয়াছেন, ইহজন্মে ও জন্মান্তরে কাম্য ও নিষিদ্ধ এই দুই প্রকার কার্য পরিত্যাগ করিয়া, নিত্য, নৈমিত্তিক, প্রায়শ্চিত্ত ও উপাসনা এই চতুৰ্বিধ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান দ্বারা সকল প্রকার পাপ ধ্বংস হওয়াতে অন্তঃকরণকে একান্ত নির্মল করিয়াছেন, এবং নিত্যানিত্য-বস্তুবিবেক, ইহামুত্র ফলভােগবিরাগ, শমমাদিসাধন- সম্পত্তি ও মুমুক্ষুত্ব এই চতুৰ্বিধ সাধন অবলম্বন করিয়াছেন, তাদৃশ প্রমা অর্থাৎ প্রাণীই (মনুষ্য) ব্রহ্মজ্ঞানের অর্থাৎ নিরাকার ব্রহ্মোপাসনার অধিকারী। স্বৰ্গাদি ইষ্টকামনায় যে কাৰ্য্য করা যায়, তাহাকে কাম্য বলে। নরকাদি অনিষ্টসাধন কাৰ্য্যকে নিষিদ্ধ বলা যায়। যে কাৰ্য্য না করিলে পাপ হয়, তাহাকে (যেমন প্রাত্যহিক সন্ধ্যাবন্দনা ও পিতামাতার প্রতিপালনাদি) নিত্যকর্ম বলে। কোন নিমিত্ত অবলম্বন করিয়া যে কাৰ্য করা হয় (যথা অপুত্ৰক ব্যক্তির পুত্র-কামনায় যজ্ঞাদি ), তাহা নৈমিত্তিক। পাপক্ষয়মাত্ৰ-সাধক কাকে (যেমন চন্দ্রায়ন। প্রায়শ্চিত্ত বলে। সগুণব্ৰহ্ম অর্থাৎ সাকার ঈশ্বরের একাদশ পরিচ্ছেদ। আরাধনাকে উপাসনা বলে। কামক্রোধাদি নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি সকলের রাহিত্যকে অন্তঃকরণের নির্মলতা বলা যায়। ইহকালের নিতান্ত অল্পক্ষণস্থায়ী এবং পরকালের কিছু অধিকক্ষণস্থায়ী (অনিত্য) সুখের ভােগবিষয়ে বিবক্তিকে ইহামুত্র ফলভােগ বিরাগ বলে। শম (ঈশ্বরের শ্রবণ-মননাদি ব্যতিরেকে অন্তরিন্দ্রিয়ের নিগ্রহ ), দম (ঐরূপ বাহহন্দ্রিয়ের নিগ্রহ), উপরতি (বিহিতকাৰ্য্যের বিধিপূৰ্ব্বক পরিত্যাগ ), তিতিক্ষা ( শীতােষ্ণাদি সহ করিতে পারা), সমাধান (ঈশ্বরবিষয়ক শ্রবণ- মননাদিতে আকৃষ্ট মনের একাগ্রতা) ও শ্রদ্ধা (গুরূপদেশ ও বেদান্ত- বাক্যে বিশ্বাস স্থাপন), এই ষড়বিধ কাৰ্য্যকে শমদমাদিধনসম্পত্তি বলা যায়। নির্বাণ মুক্তিলাভের ইচ্ছাকে মুমুক্ষুত্ব বলে। অদ্বৈতবাদের প্রধান প্রবর্তক শঙ্করাচাৰ্য্যও ভাষ্যে লিখিয়াছেন যে, অসংসারী ক্রিয়া সংসারে থাকিয়া হয় না, অর্থাৎ অনিত্যের সংসৰ্গদোষে নিত্যেরও প্রভাব থাকে না। যেমন অশ লখন করিয়া ঘাস গ্রহণ হয় না, তদ্রুপ অপরিসমাপ্তকর্মী কদাচ ব্ৰহ্ম-জিজ্ঞাসার অধিকারী হইতে পারে না। পূর্বে কৰ্ম্মকাণ্ডে তৎপর হইয়া শমদমাদি সাধন দ্বারা ক্রমে ইন্দ্রিয়াদির শক্তি হইতে মুক্ত হইলে স্বভাবতঃই কৰ্ম্ম রহিত হইয়া যায়। তাহা হইলে ব্ৰহ্মজ্ঞান সহজেই সুলভ হয়। উপনিষদ শাস্ত্রে ইহার স্পষ্ট প্রমাণ রহিয়াছেঃ- যদা পঞ্চাবতিষ্ঠন্তে জ্ঞানানি মনসা সই। বুদ্ধিশ্চ ন বিচেষ্টেতি তামাহুঃ পরমাং গতিম্। তাং যােগমিতি ম্যন্তে স্থিরামিন্দ্রিয়ধারণা। অপ্ৰমস্তদাভত যােগােহি প্রভাবাপ্যযয । কাঠোপনিষৎ।

ধৰ্ম্মবারিধি। যৎকালে (স্ব স্ব বিষয় হইতে নিবৃত্ত হইয়া) মনের সহিত পঞ্চজ্ঞান অর্থাৎ ইন্দ্রিয় (আত্মাতে) অবস্থান করিবে এবং স্ব-ব্যাপারে বুদ্ধির চেষ্টা না থাকিবে, সেই কালের যে গতি, তাহাকে পরমাগতি কহে। ধারণাদ্বারা ইন্দ্রিয় সকলের নিশ্চলতারূপা তাদৃশী অবস্থাকেই যােগ অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান) বলে। তৎকালে অপ্রমত্ত অর্থাৎ প্রমাদবর্জিত হইলে, এই যােগপ্রভাব হয়। আধুনিক তত্ত্বজ্ঞানীদিগের পূৰ্বাচাৰ্য মৃত রামমােহন রায় মহাশয় আনীদিগকে লক্ষ্য করিয়া স্বকৃত বেদান্তানুবাদ ইংরাজি পুস্তকে লিখিয়াছিলেন,-“যথার্থ ব্ৰহ্মজ্ঞানের উপলব্ধি হইলে কর্মকাণ্ডের দৃক প্রয়ােজন থাকে না বটে, তথাপি জ্ঞানীদিগের কর্মকাণ্ড সাধন করা অবশ্যকর্তব্য। উহা কোন মতে ত্যজ্য নহে। কেন না, তৎসাধনে ঐ ব্ৰহ্মজ্ঞানের সর্বথা ঘূৰ্ত্তি হয় ; হয় ; বিশেষতঃ বেদ- বেদান্ত-বিধি অনুসারে ব্রহ্মতত্ত্বজ্ঞান হওয়া দুর্লভ। সকাম সাধনার নাম ধৰ্ম্মজিজ্ঞাসা। নিষ্কান সাধনার নাম ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসা । অতএব ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসার পূর্বে ধৰ্ম্মজিজ্ঞাসার একান্ত আবশ্যকতা আছে। ইহার প্রমাণস্বরূপ তিনি বেদান্ত-দর্শনের প্রথম সূত্র উদ্ধার করিয়াছেন ; যথা :—“ অথাতত ব্ৰহ্মজিজ্ঞাসা।” অর্থাৎ কর্মকাণ্ডানস্তর ব্ৰহ্ম-জিজ্ঞাসা করিবে। বেদের মর্ম এই যে, যাবৎ কর্মকাণ্ড রাখিবে, তাবৎ গৃহস্থ থাকিবে। কম্মের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হইলে, অর্থাৎ জগৎকে অনিত্য দেখিলে, অনন্তর—সংসারধর্ম ত্যাগ করিয়া দণ্ড গ্রহণ পূৰ্ব্বক ব্ৰহ্মজ্ঞানানুষ্ঠান করিবে। যেহেতু ঋকবেদরে অনু- ক্রমণিকাতে লিখিত আছে-- ‘ব্ৰহ্মানুষ্ঠানং পরমহংস সৈৰ ধৰ্ম্মঃ।” অর্থাৎ ব্রহ্মজানের অনুষ্ঠান পরমহংসেরই ধৰ্ম্ম।

একাদশ পরিচ্ছেদ। ১১৩ সুতরাং অসংসারী ব্ৰহ্মজ্ঞান—সংসারদোষসংসৃষ্ট ব্যক্তির প্রাপ্য নহে। তথাপি যে ব্যক্তি শাস্ত্রানুশাসনাতিক্রমে তাহাতে প্রবৃত্ত হয়, জ্ঞানীদিগের নিকট সে অজ্ঞান, উন্মত্ত ও ভ্রষ্টাচারীরূপে পরিগণিত হয়। যেরূপ প্রমাণ প্রয়ােগ প্রদর্শিত হইল, তাহাতে কোন সংসারাসক্ত অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি প্রকৃত ব্ৰহ্মোপাসনার অধিকারী নহে, ইহাই প্রতিপন্ন হয়। কিন্তু তাহাতে এইরূপ আপত্তি উত্থাপিত হইতে পারে যে, যে ব্যক্তি সন্তরণ-কার্যে সুশিক্ষিত নহে, সে ব্যক্তি নদী উত্তীর্ণ হইতে সমর্থ নহে, ইহা সত্য বটে; কিন্তু তাহাকে নদ্যাদি জলাশয়ে অবগাহন পূর্বক অবশ্যই সন্তরণ শিক্ষা করিতে হইবে। সংসারাসক্ত ব্যক্তি প্রকৃত ব্রহ্মোপাসনায় সমর্থ নহে, ইহা সত্য; কিন্তু যদি সংসারে অবস্থানকালে, সে ব্যক্তি ব্রহ্মোপাসনা অভ্যাস না করে, তবে কিরূপে তাহার পরে ব্রহ্মে পারগতা জন্মিতে পারে ? দূরদর্শী শাস্ত্ৰকৰ্তারা এরূপ প্রশ্নের উত্তর করিতে বিস্মৃত হন নাই। তাঁহাদের মতে যদি সংসারী ব্যক্তির ব্রহ্মোপাসনায় প্রবৃত্তি জন্মে, তাহাতে বাধা নাই। সংসারােচিত কৰ্ম্মকাণ্ড অর্থাৎ নিত্যনৈমিত্তিক যাগযজ্ঞ ও দেবপিতৃকাৰ্য্য ত্যাগ না করিয়া, বৈধাবৈধ বিচার ও বর্ণাশ্রমধর্মের ব্যাঘাত না করিয়া, শাস্ত্র নিষিদ্ধাচরণে পরাত্মখ’ হইয়া ও প্রসিদ্ধানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত থাকিয়া ব্রহ্মোপাসনা করিলে সংসারীব্যক্তিও পরিমুক্ত হয় ; যথা- ন্যায়াগতধনস্তত্ত্বজ্ঞাননিষ্ঠাহতিথিপ্রিয়। শ্রাদ্ধকৃৎ সত্যবাদাচ গৃহস্থাপি বিমুচ্যতে । যাজ্ঞবল্ক্য-সংহিতা। যে ব্যক্তি ন্যায়পূর্বক ধনােপাৰ্জন করিবে এবং তত্ত্বনিষ্ঠ অর্থাৎ F ১১৪ ধর্মতত্ত্ববারিধি ভগববিষয়ে একনিষ্ঠ ও অতিথি-সেবাপরায়ণ হইবে, নিত্যনৈমিত্তিক মাতৃপিতৃশ্রদ্ধাদি করিবে ও সত্যবাক্য কহিবে, এবষ্কৃত গৃহস্থও পরিমুক্ত হয়। এতাদৃশ শাস্ত্র-ব্যবস্থা সত্তেও যে গৃহস্থ কৰ্ম্মত্যাগ করিয়া ব্ৰহ্মজ্ঞানী বলিয়া যথেচ্ছাচারে প্রবৃত্ত হয়, তাহাকে শাস্ত্র ও যুক্তিপথত্যাগী স্বেচ্ছাচারী বলিয়া গণ্য করিতে হইবে। মিথিলাধিপতি জনকদিও ব্রহ্মজ্ঞানী ছিলেন । কিন্তু তাহাদিগের দ্বারা কর্মকাণ্ড প্রবাহের অবরােধ হয় নাই, বরং তাহারা প্রভূত দক্ষিণা দ্বারা বহুবিধ যজ্ঞাদি সম্পাদৎ করিয়াছিলেন। তাঁহারা শাস্ত্রনিন্দা, দেব- ব্রাহ্মণ-নিন্দা, অপ্ৰসিদ্ধাহার ও সদাচার পরিত্যাগ, অথবা ব্রত-নিয়মােপ- বাস এবং তীর্থস্নানাদির ব্যাঘাত করেন নাই। শাস্ত্রান্তরেও এবিষয়ের বিশেষ প্রমাণ পাওয়া যায়। যথা- বহিৰ্য্যাপার-সংরন্তো হৃদি সংকল্প-বর্জিত। কৰ্ত্ত৷ বহিরকৰ্ত্তান্তরেবং বিহর রাঘব। যােগবাশিষ্ঠ। বশিষ্ঠদেব শ্রীরামচন্দ্রকে কহিতেছেন, “হে রাম! তুমি বাহিরে সকল কৰ্ম্ম কর, মনে সংকল্প-রহিত হও, বাহিরে আপনাকে কর্তা বলিয়া জানাও, কিন্তু মনে আপনাকে অকৰ্ত্তা বলিয়া জানিও। এইরূপে সংসারযাত্রা নিৰ্বাহ করিয়া পরমেশ্বরের উপাসনা করিও। অর্থাৎ সংসারে থাকিয়া জ্ঞান-প্রশংসা-শ্রবণে ধৰ্ম্মকর্মের ব্যাঘাত করিও না। যেহেতু পরমহংসের ধৰ্ম্ম, যে ব্ৰহ্মজ্ঞান, তাহা সংসারী ব্যক্তি কেবল কর্মত্যাগ করিয়াই লাভ করিতে পারে না।” ৫ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। গুরুকরণের আবশ্যকতা। বৎস! প্রথমে জ্ঞান উপার্জন কর তৎপরে ধৰ্ম্মকে বিশ্বাস কর পরে অব্যভিচারিণী ভক্তিদ্বারা মা জগদম্বার উপাসনা কর,-দেখ মুক্ত হইতে পারি কি না। সাধক রামপ্রসাদ সংসারে থাকিয়া মায়ের উপর অচলা ভক্তিদ্বারা মুক্ত হইয়াছেন। মহাত্মা তুলসীদাস প্রভু রামচন্দ্রের উপর অচল। ভক্তিদ্বারা ব্ৰহ্মপ্রাপ্ত হইয়াছেন। মনকে নির্মল কর ; সর্বদা চিন্তা কর যে, একদিন মরিতে হইবে। সেই বিশালনিতম্বা, পূর্ণশশধরবদনা যুবতী পত্নী ও প্রাণসমসন্তানাদি ছাড়িয়া কোথায় চলিয়া যাইতে হইবে যাহাদের জন্য ধৰ্মকৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া স্বার্থের লালসায় দিকবিদিক- জ্ঞান হারাইয়া মিথ্যা প্রবঞ্চনা ইত্যাদি তােমার একমাত্র অবলম্বনীয় হইয়াছে, ভাবিয়া দেখ, তাহারা কেহ নয়,-পথিকের পথিকদর্শন মাত্র। বৎস! এ বিবেক পুস্তকপাঠে হয় না। দিবারাত্র পুস্তক পাঠ কর; কিন্তু তােমার নিত্য সঙ্গী মন, যে সম্পূর্ণভাবে কণ্টকস্বরূপ সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে, এবং তােমাকে সে দিকে যাইতে দিতেছে না। অবশ্য পুস্তক পাঠে অনেকটা মানের পরিবর্তন হয়; কিন্তু যেন ক্ষণস্থায়ী শকুনি যতই উদ্ধ’-আকাশে !

ধর্মতত্ত্ববারিধি।
উঠুক না কেন, লক্ষ্য তাহাদের সারের উপর ; সেইরূপ
পুস্তকপাঠীদের লক্ষ্য কেবল স্বার্থে। আধ্যাত্মিক উন্নতি খুব
কম লােকেরই হয়। দুই এক পৃষ্ঠা উল্টাইয়া লেখনীসস্তৃত
কতকগুলি শ্লোক উদরসাৎ করিয়া জনসমাজে পুনঃ পুনঃ উদগীরণ
করে এবং আপনাকে মহাজ্ঞানী ও মহাপণ্ডিত বলিয়া প্রচার
করে, এবং বাহতঃ প্রকৃতমৰ্ম্মদশীর আত্মােৎকর্ষতা ব্যক্ত করিয়া
আত্মাকে তৃপ্ত করে। সুতরাং পুস্তক পাঠ কর ও তাহার
উৎকর্ষ সাধন কর, তাহা হইলেই আধ্যাত্মিক উন্নতি হইবে।
এই বিপথগামী মনকে উদ্ধার কর; কারণ মন সর্বদাই
নিম্নাভিমুখী হয়। যেমন জল সর্বদাই নিম্নাভিমুখী এবং ঐ
জলকে উন্নত প্রদেশে লইয়া যাইতে হইলে যেরূপ অত্যন্ত
পরিশ্রম ও নানারূপ উপায় উদ্ভাবন আবশ্যক, মানবের মনও ঠিক
তােপ। তাহাকে উন্নতপথে লইয়া যাইতে হইলে, বহু পরিশ্রম,
যত্ন ও সাধন আবশ্যক। মনকে উন্নীত করিতে হইলে
ও আত্মােন্নতি সাধন করিতে হইলে সৎগুরুর আবশ্যক ;
গুরুপ্রদত্ত ইন্টমন্ত্র সদাসর্বদা জপের আবশ্যক, ও অব্যভি-
চারিণী ভক্তিদ্বারা সেই ইষ্টদেবতাকে ধনে, মানে, প্রাণে
আরাধনার আবশ্যক।
ভগবান্ শঙ্করাচাৰ্য বলিয়াছেন,
“নলিনীদলগত জলমতিতরলং। তদ্বজ্জীবনমতিশয়চপল।
ক্ষণমিহসজ্জনসঙ্গতিরেকা। ভবতি ভবার্ণবতরণে নৌকা।
অর্থাৎ পদ্মপস্থিত জলের ন্যায় জীবন অতীব চঞ্চল। এই সংসারে
**

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। ১১৭ সাধুসঙ্গই একমাত্র অবলম্বনীয়। উহাই সংসারসাগর উত্তীর্ণ হইবার একমাত্র নৌকাস্বরূপ। স্বামী বিবেকানন্দ ভক্তিযােগে বলিয়াছেন, “জীবাত্মামাত্রেই পূর্ণতা লাভ করিবেই করিবে। চরমে সকলেই সিদ্ধাবস্থা লাভ করিবে। আমরা যখন যাহা করি, তাহা আমাদের অতীত কাৰ্য্য ও চিন্তারাশিব ফলস্বরূপ। আর এক্ষণে যেরূপ চিন্তা ও কাৰ্য্য করিতেছি, ভবিষ্যতে তাহাই হইব। কিন্তু আমরা নিজেরাই নিজেদের অদৃষ্ট গঠন করিতেছি বলিয়া, বাহির হইতে যে, আমাদের কোন সাহায্যের আবশ্যক নাই, তাহা নহে; বরং অধিকাংশ স্থলে এরূপ সাহায্যের সম্পূর্ণ প্রয়ােজন। যখন আমরা এই সহায়তা প্রাপ্ত হই—তখন আত্মার উচ্চতর শক্তি ও আপাত- অব্যক্ত ভাৰগুলি ফুটিয়া উঠে,—আধ্যাত্মিক জীবন সতেজ হইয়া উঠে। উহার উন্নতি ত্বরিত হয় ও সাধক অবশেষে শুদ্ধস্বভাব ও সিদ্ধ হইয়া যায়। এই সঞ্জীবনী শক্তি গ্রন্থ হইতে পাওয়া যায় না। আত্মা কেবল অপর এক আত্মা হইতেই শক্তি প্রাপ্ত হইতে পারে, আর কিছু হইতেই নহে। সারাজীবন পুস্তক পাঠ করিতে পারি ; খুব একজন বুদ্ধিজীবী হইয়া উঠিতে পারি ; কিন্তু শেষে দেখিব, আধ্যাত্মিক উন্নতি কিছুই হয় নাই। বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতি হইলেই যে সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিক উন্নতিও খুব হইবে, তাহার কোন অর্থ নাই। গ্রন্থ পাঠ করিতে করিতে অনেক সময় অমবশতঃ ভাবি, আমরা আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করিয়াছি। কিন্তু যদি গ্রন্থপাঠে আমাদের কি ফল হইয়াছে, তাহা ধীরভাবে আলােচনা করি, তবে দেখিব, বড়-জোর, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি একটু সতেজ হইয়াছে; কিন্তু অন্তরাত্মার কিছুই হয় নাই। আমাদের মধ্যে প্রায় সকলেরই আধ্যাত্মিক বাক্যবিন্যাসে অদ্ভুত নৈপুণ্য থাকিলেও কাৰ্য্যের সময়—প্রকৃত ধৰ্ম্মভাবে জীবন যাপন করিবার সময় কেন এত ন্যূনতা লক্ষিত হয় ?, তাহার কারণ—গ্রন্থরাশি আধ্যাত্মিক জীবনের উন্নতির পক্ষে পৰ্যাপ্ত নহে;

১১৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। জীবাত্মার শক্তি জাগ্রত করিতে হইলে, অপর এক আত্মার শক্তিসঞ্চার আবশ্যক। “যে ব্যক্তির আত্মা হইতে অপর আত্মায় শক্তি সঞ্চারিত হয়, তাহাকে গুরু বলে, এবং যে ব্যক্তির আত্মায় শক্তি সঞ্চারিত হয় তাহাকে শিষ্য বলে। যিনি শক্তিসঞ্চার করিবেন, তাহার এই সঞ্চারের শক্তি থাকা আবশ্যক। আর যাহাতে সঞ্চারিত হইবে, তাহারও গ্রহণের শক্তি থাকা আবশ্যক। বীজ সতেজ হওয়া আবশ্যক ; ভূমিও সুকর্ষিত থাকা আবশ্যক। যেখানে এই উভয়েরই বিদ্যমান, সেইখানেই প্রকৃতধৰ্ম্মের অপূৰ্ব্ব বিকাশ দৃষ্ট হয়। ধর্মের প্রকৃত বক্তাও আশ্চৰ্য্য ; শ্রোতার ও সুনিপুণ হওয়া আবশ্যক। যখন উভয়েই আশ্চৰ্য্য ও অসাধারণ হয়, তখনই আশ্চৰ্য্য আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে; অন্য স্থলে নহে। এইরূপ ব্যক্তিই প্রকৃত গুরু আর এইরূপ ব্যক্তিই প্রকৃত শিষ্য—মুমুক্ষু ; আর সকলে ধৰ্ম্ম লইয়া ছেলে-খেলা করে মাত্র। তাহাদের কেবল একটু কৌতূহল একটু জানিবার ইচ্ছামাত্র হইয়াছে ; কিন্তু তাহারা এখন ধৰ্ম্ম-চক্ৰবালের বহির্দেশে রহিয়াছে। অবশ্য ইহারও কিছু মূল্য আছে ; কারণ, সময়ে ইহা হইতে প্রকৃত ধৰ্ম্ম-পিপাসা আসিতে পারে। আর প্রকৃতির এই বিচিত্র নিয়ম যে, যখনই ক্ষেত্র উপযুক্ত হয়, তখনই বীজ নিশ্চয়ই আসিবে—আসিয়াও থাকে। যখনই আত্মার ধৰ্ম্ম-পিপাসা প্রবল হইবে, তখনই ধৰ্ম্মশক্তি-সঞ্চারক পুরুষ সেই আত্মার সহায়তার জন্য অবশ্যই আসিবেন—আসিয়াও থাকেন। যখন গ্রহীতার আত্মায় ধৰ্ম্মালােকা- কর্ষিণী শক্তি পূর্ণা ও প্রবলা হয়, তখন সেই আকর্ষণে আকৃষ্টা আলােক- দায়িনী শক্তি অবশ্যই আসিয়া থাকে।” বৎস শিষ্যের পবিত্র, প্রকৃত জ্ঞান-পিপাসা, বিশ্বাস ও অধ্যবসায় থাকা আবশ্যক। তৎপরে অব্যভিচারিণী ভক্তিদ্বারা গুরুপ্রদত্ত ইষ্টমন্ত্র জপ করিবে, ও ইষ্টদেবতাকে সম্পূর্ণভাবে সমস্ত কার্যের ফলাফল সমর্পণ দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। ১১৯ পূৰ্ব্বক ঘটে, পটে, হৃদয়ে, সৰ্বস্থানেই তিনি বিরাজ করিতেছেন ভাবিবে, এবং তাহার আরাধনা করিবে। যথা- বৈরাগ্যং কারণঞ্চাদৌ যুদ্ভবে বুদ্ধিশুদ্ধিতঃ। কৰ্ম্মণা চিত্তশুদ্ধিঃ স্যাদ্বিশেষং শৃণু কথ্যতে। স্ববর্ণাশ্রমধৰ্ম্মেন বেদোক্তেন চ কৰ্ম্মণ।। নিষ্কামেণ সদাচার ঈশ্বরং পরিতােষয়েৎ। কামসঙ্কল্পসন্ত্যাগদীশ্বর প্রতিমানসাৎ স্বধৰ্ম্মপালনাচ্চৈব শ্রদ্ধাভক্তিসমন্বয়াৎ। —শান্তিগীতা। তাহার আদি-কারণ -বৈরাগ্য। চিত্তশুদ্ধি হইলে সেই বৈরাগ্যের উদয় হয় এবং কৰ্ম্ম দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হইয়া থাকে। তাহার বিবরণ বিশেষ করিয়া বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ কর। সদাচারযুক্ত ও বাসনারহিত হইয়া বেদোক্ত বিধানুসারে স্ব স্ব বর্ণ ও স্বাশ্রমগাচিত কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান দ্বার ঈশ্বরকে পরিতুষ্ট করিবে। ঈশ্বরের প্রীতিসাধনমানসে কামনা ও সঙ্কল্পাদি পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক শ্রদ্ধা ও ভক্তিযুক্ত চিত্তে স্বধৰ্ম্ম পালন এবং সমস্ত কৰ্ম্ম ব্ৰহ্মে অৰ্পণ করিয়া নিত্য- নৈমিত্তিকাদি কর্মের অনুষ্ঠান এবং দেবতা ও তীর্থস্থানসমূহ ও যথাবিধি দর্শন ও সেবা করিলে ক্ৰমে চিত্তশুদ্ধি হয়। অনভিধ্যায়রূপন্তু স্থূলং পব্বতপুঙ্গব। অগম্যং সূক্ষরূপং মে যদ্দষ্ট মােভাগ, ভবেৎ। —ভগবতী গীত। হে পৰ্বত প্রবর! আমার স্থূলরূপ চিন্তা না করিলে আমার সূক্ষ্মরূপ ১২০ ধর্মতত্ত্ববারিধি। কোন প্রকারে জানিতে পারিবে না এবং তাহার অদর্শনে মােক্ষলাভও হইবে না। তস্মাৎ স্থূলংহি মে রূপং মুমুক্ষুঃ পূর্বমায়েৎ ক্রিয়াযােগেন তান্যের সমভ্য*বিধানতঃ। শনৈ বলায়েৎ সূক্ষারূপং মে পরমব্যয়ম্। —ভগবতী গীতা। সেইজন্য মুমুক্ষু ব্যক্তি সর্বাগ্রে আমার স্থূলরূপ আশ্রয় করিবে এবং ক্রিয়াযােগে তাহাকে বিধানানুসারে অর্চনা করিয়া ক্রমে ক্রমে আমার পরম অব্যয় সূক্ষ্মরূপ আলােচনা করিবে । এইরূপ শাস্ত্রযুক্তি দ্বারা প্রতিপন্ন হইতেছে যে, সাকার উপাসনা নিরাকার উপাসনার সােপান-স্বরূপ। সেই গুরুপ্রদত্ত দেবতাকে আরাধনা কর ও মন্ত্র জপ কর। কলিকালে মানুষ অল্পবুদ্ধি ও অল্পায়ু হইবে বলিয়া শাস্ত্রে “নাম বা মন্ত্র ব্যতীত জীবের অন্য গতি নাই বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়াছে। কলিং সভাজয়ন্ত্যাৰ্য্যা গুণঃ সারভাগিনঃ। যত্র সংকীৰ্ত্তনে নৈব সর্বস্বাযযাপি লভ্যতে। -ভাগবং। গুণবেত্তা সারগ্রাহী মহাত্মারা কলিযুগে কেবল নামকীৰ্ত্তন করিয়া যথার্থ সিদ্ধ হইবে জানিয়া উক্ত যুগের প্রশংসা করিয়াছেন। মহাযােগী শঙ্করাচার্য প্রণীত “ব্ৰহ্মসূত্র” নামক অতি প্রামাণ্যগ্রন্থে লিখিত হইয়াছে, যে দেবতাগণ ইচ্ছানুরূপ আকৃতি ধারণ করিতে পারেন । অতএব আমরা যদি বলি যে, দেবতাগণ মানব হইতে উন্নত জীব, তাহারা উদ্ধা জগতে বিচরণ করেন, তাহা হইলে আমাদের ভ্রম হয় না; কিন্তু এই ঊৰ্ধজগৎবাসী মানব হইতে শ্রেষ্ঠজীবের সহিত আমাদের বিশেষ দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ। } সম্বন্ধ আছে। কিন্তু এই সম্বন্ধ মুখে বলা যায় না; মন্ত্রই সেই দেবতাদিগের সম্বন্ধ বলিবার এক মাত্র উপায় বা সােপান। মন্ত্রবলেই যে কোন দেবতাকে ইচ্ছা করি না কেন আনয়ন বা অধিষ্ঠান করিতে পারা যায়। মন্ত্রগ্রহণের তাৎপৰ্য্য। বৎস! মন্ত্রের বিষয় তােমায় সংক্ষেপে বুঝাইতেছি, শ্রবণ কর। পূজনীয় সুরেন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন “মন্ত্র-শাস্ত্রে ব্রহ্মকে বিন্দু বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। বীজ ইহার শক্তি। তন্ত্রশাস্ত্রে এই বীজকে শক্তি বা প্রকৃতি নাম দেওয়া হইয়াছে। তাহাদের একত্রীভূত কাৰ্য্যকে শব্দ ব্রহ্মের নাদ বলে। মন্ত্রদ্বারা কিরূপ শব্দ হয়, সে বিষয়ে অতি সামান্য মতভেদ আছে। একদল উপাসক বলেন—উহা শব্দ ব্রহ্মের প্রকাশক। অপর দল বলেন,—শক্তির প্রকাশক। আর একদল বলেন—শব্দ ব্ৰহ্ম সকল পদার্থে ই বিদ্যমান। মানবের কুণ্ডলিনী-নদীতে এই শক্তি আছে, আর সেখান হইতেই বর্ণমালার প্রত্যেক অক্ষরের উৎপত্তি হয়। সুপ্তা নাগােপমা হেষা ক্ষুরন্তী প্রভয়া স্বয়া। অহিবৎ সন্ধিসংস্থান বাকদেবী বীজসংজ্ঞকা । শিবসংহিতা। কুণ্ডলিনী প্রমুপ্তসর্পের আকার ধারণপূর্বক নিজপ্রভাবে দেদীপ্যমান হইয়া নিদ্রা যাইতেছেন। ইহার সকল অবয়ব-সংস্থান সর্পের ন্যায়। ইনি বাক্‌দেবী। ইহা হইতেই সকলের বাক্যর্তি হয় ; ইনি (বর্ণময়ী) সমগ্র বীজমন্ত্রস্বরূপা। আমাদের তিনটি প্রধান দেবতা,ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। ইহারা একই ব্রহ্মের ভিন্ন অবস্থা-শক্তিদ্বারা সৃষ্ট হইয়াছেন। ইহার বিকাশ মহৎ, তিন ভাগে বিভক্ত, সাত্ত্বিক, রাজস ও তামস। ইহা হইতেই তিন অহঙ্কারের সৃষ্টি। অহঙ্কারের মধ্যে দশ দেবতা যাহাদিগের নাম দিক :(দশদিক), বায়ু, অশ্বিনী, অগ্নি, সূৰ্য্য, প্রচেতা, ইন্দ্র, উপেন্দ্র, ১২২ ধর্মতত্ত্ববারিধি। মিথিরণ এবং দশ ইন্দ্রিয় ও তন্মাত্রা। ইহা হইতেই পঞ্চভূতের সৃষ্টি হইয়াছে। ( ক্ষিতি, জল, তেজ, বায়ু, ও আকাশ) এই পঞ্চমহাভূত হইতে মানবদেহ উৎপন্ন এবং তন্মধ্যে কুণ্ডলিনী শক্তি সংস্থাপিত। যােগশাস্ত্রে রূপক-ভাবে কথিত হইয়াছে যে, দেহমধ্যে তিনটী নদী প্রবাহিত ; উহাদিগকে ইড়া, পিঙ্গলা, ও সুষুম্না বলে। ইহারা নাসিকা হইতে নাভির কিঞ্চিৎ আধােদি পৰ্য্যন্ত বিস্তৃত এবং গুহ্যদ্বারের কিছু উপরেই কুণ্ডলিনী শক্তি বিদ্যমান। কথিত আছে, তিনি সর্পের ন্যায় জড়াইয়া থাকেন এবং যখন যােগক্রিয়া দ্বারা জাগ্রত করা যায় তখন প্রসারিত হন এবং ব্রহ্মদ্বার পরিষ্কার করেন। এই কুণ্ডলিনী হইতেই শব্দের উৎপত্তি। কুণ্ডলিনী হইতে শব্দ উৎপন্ন হইয়া ক্রমে ক্রমে পরা, পশ্যন্তি ও মধ্যম এই তিন অবস্থা অতিক্রম করিয়া অবশেষে নির্গত হয়। যখন নির্গত হয় তখনই আমরা তাহা শুনিতে পাই ও বলিতেছি বলিয়া বুঝিতে পারি। সংস্কৃত ভাষায় পঞ্চাশটি অক্ষর আছে। দার্শনিকগণের মত এই যে, শব্দ-জগৎ শব্দ হইতেই উৎপন্ন, অর্থাৎ যে কথা বা শব্দ কোন বস্তু নির্দেশ করিয়া উচ্চারিত হয়, তাহার সহিত সেই বস্তুর বিশেষ সাদৃশ্য আছে। মহর্ষি পতঞ্জলি এ বিষয় অতি সহজে বুঝাইয়া দিয়াছেন। তিনি শব্দ ও কথার মধ্যে কথাকেই প্রথম বলেন। কথা আগে, শব্দ পাছে। মনে কর, গাভী একটি কথা। গাভী বলিলে আমরা কি বুঝি? চারি পা, লেজ, ককুদ, খুর ও শিংযুক্ত একটি জীব। তাহাই কি গাভী ? উহার অস্থিসঞ্চালম, চক্ষুর দৃষ্টি, তাহাই কি গাভী ? পতঞ্জলি বলেন—না; ও সকল গাভীর কাৰ্য। তবে কি তাহার গায়ের শ্বেত, কৃষ্ণ অর্থাৎ তাম্রবর্ণ ইত্যাদি গাভী ? পতঞ্জলি বলেন—না, তাহাও নহে। তবে কি?-কাহাকে গাভী বলিব ? অথবা গাভী বলিতে কি বুঝিব? গাভী একটি কথা যে কথা মুখ দিয়া নির্গত হইলে আমরা সেই শব্দ শ্রবণ- মাত্র উপলব্ধি করি যে, এই প্রকার চতুষ্পদযুক্ত, পুচ্ছযুক্ত, খুরযুক্ত, দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। ১২৩ শৃঙ্গযুক্ত একটি জীব। গাভী সেই শব্দ ভিন্ন আর কিছু নহে। এতদ্বারা বুঝিতে পারা যায় যে, তদাত্ম কোন কথা ও সেই কথার নির্দেশক বস্তুমধ্যে বিশেষ সাদৃশ্য আছে। পূৰ্বেই উক্ত হইয়াছে যে, কুণ্ডলিনীতে পঞ্চাশটি অক্ষর আছে। ইহার অর্থ অনেক প্রকার। মন্ত্রশাস্ত্রে এরূপ কথিত আছে যে, এই পঞ্চাশটি অক্ষরই কুণ্ডলিনীর পরা-অবস্থা হইতে উৎপন্ন, এবং ইহা হইতে যে শক্তির উৎপত্তি হয় তাহাই শব্দরূপে প্রকাশিত। বৈয়াকরণিকগণ বলেন, ইহা হইতে সংস্কৃত ভাষার পঞ্চাশটি অক্ষরের সৃষ্টি হইয়াছে। যখন কোন শব্দ করিবার জন্য প্রথম চেষ্টা করা হয়, তখন হৃদয়ে বা অন্তঃকরণে প্রথম প্রণব বা ওঁকার শব্দ হয়। যখন কোন একাক্ষর-শব্দ উচ্চারণ করা হয়, তখনও এই প্রণব উচ্চারিত হইয়া থাকে। কোন সুরযন্ত্রে আঘাত করিলে এই প্রণব ধ্বনিত হয়। যতকাল দেহে প্রাণ থাকিবে, ততকাল দেহমধ্যে এই শব্দ ধ্বনিত হইবে; ইহা দেহমধ্যে সৰ্ব্বদাই ধ্বনিত হইতেছে। ইহা শুনিবার জন্য উপযুক্ত হইলে, সৰ্ব্বদাই এই শব্দ শুনিতে পাওয়া যাইবে। আমরা অন্যান্য শব্দে অত্যন্ত আকৃষ্ট, তাই এ শব্দ শুনিতে পাই না। নতুবা দেহমধ্যে অহর্নিশি এ শব্দ উথিত হইতেছে। এই তত্ত্ব হইতে জ্ঞানিগণ বিবেচনা করেন যে, সর্বত্রই এ শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়। কারণ, পূৰ্বেই বলা হইয়াছে, কোন শব্দ করিবার পূর্বেই এই প্রণব-ধ্বনি আমাদের হৃদয়ে ধ্বনিত হয়। আৰ্য ঋষিগণ এইজন্যই প্রণবকে প্রথম শব্দ বলিয়া নির্দেশ করিয়া- ছেন। প্রণব-প্রথম শব্দ বা প্রথম মন্ত্র। ইহার আর একটি অর্থ ব্রহ্ম-সকল পদার্থেই বিদ্যমান। সৃষ্টির প্রথম শব্দ বা মন্ত্রই প্রণব। কুণ্ডলিনী হইতে উৎপন্ন হইয়া শব্দ পূৰ্বোল্লিখিত নাড়ীত্রয়ের কোন একটির মধ্যে গমন করে। যেরূপ অক্ষর উচ্চারণ করিবার আবশ্যক হয় শব্দ আপনা হইতেই সেই নাড়ীতে গমন করে। অ হইতে অঃ পৰ্যন্ত ১২৪ ধর্মতত্ত্ববারিধি। সমস্ত অক্ষর ইড়া হইতে প্রবাহিত হয়। ক হইতে ম পৰ্য্যন্ত পিঙ্গলা দ্বারা এবং য হইতে ক্ষ পৰ্য্যন্ত সুষু-পথে বাহিত হইয়া থাকে। এই তিন নাড়ীর আদি দেবতা চন্দ্র, সূৰ্য্য ও অগ্নি। অর্থাৎ ঐ ঐ দেবতার সহিত ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নামক নদীত্রয়ের একটি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে। কিন্তু সে সম্বন্ধ যে কি, তাহা আমরা অনুভব করিতে পারি না। মন্ত্রগুলি বীজাক্ষর হইলেও শিব, শক্তি ও বিষ্ণু এই তিন অংশ বিদ্যমান। এস্থলে ইহা বল কর্তব্য যে, কতকগুলি গুণসমষ্টি ও কোন নির্দিষ্ট দেবতা একই পদার্থ অর্থাৎ দেবতা শব্দে গুণসমষ্টি ব্যতীত আর কিছুই বুঝিতে পারা যায় না।

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। সাকার উপাসনার অধ্যাত্ম-তত্ত্ব ও কৌশল গুরু।-বৎস! সৰ্ব্বপ্রকার সাকার উপায়নাই নিরাকার উপাসনার যােপানস্বরূপ ; নিরাকার উপাসনাই নিৰ্বাণ-মুক্তির কারণ ; নির্বাণ মুক্তিই জীবাত্মার চরম লক্ষ্য। এই কাৰ্যটি যেমন বৃহত্তম, ইহার উপকরণও সেইরূপ কষ্টসাধ্য। অনেক জন্মে, অনেক যত্নসাধ্য নিত্য নৈমিত্তিক দানপ্যানাদি সৎকর্ম দ্বারা চিত্তশুদ্ধি করাই ইহার উপকরণ স্বরূপ। বংস! মা জগদম্বার উপাসনায় যােগসাধন করিবার উপায় আছে, এবং তাহার উপাসনাতে মানবের যেরূপ সহজে মুক্তিলাভ হয়, এরূপ আর কিছুতেই হয় না। ভক্তিপূৰ্ব্বক শক্তি, বিষ্ণু ও শিব, যে দেবতাকে আরাধনা কর না কেন, সেই এক ব্রহ্মের আরাধনা ভিন্ন কিছুই নহে। তবে আজকাল দেশকালপাত্র অনুসারে অনেক সম্প্রদায় ধৰ্ম লইয়া ছেলে-খেলা করে মাত্র ; কারণ শাক্ত, বৈষ্ণব ইত্যাদি সম্প্রদায়ের অন্তঃকরণে কেমন এক বিদ্বেষের ভাব দেখা যায়, অর্থাৎ বৈষ্ণব শাক্তকে, অথবা শাক্ত বৈষ্ণবকে ঘৃণা করে। কিন্তু সাকার উপাসনা যে ভাবেই কর, সেই অনুদ্দেশ্য অচিন্ত্যনীয় ব্রহ্মেরই উপাসনা ভিন্ন আর কিছুই নহে; তাহা তাহারা বুঝিতে পারে না। সেই জন্য, বৎস মানকের প্রথমে চিত্ত শুদ্ধি ও সত্ত্বগুণসম্পন্ন হওয়া আবশ্যক। বৎস! তােমায় পূর্বেই বলিয়াছি যে, মানব কখনই একেবারে ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি সূক্ষ্মরূপ দর্শন করিতে সমর্থ হয় না সেইজন্য মানবকে প্রথমে সাকার উপাসনা করিতে হয় এবং সেই উপাসনা দ্বারা মানব আপনা আপনি অধ্যাত্মতত্ত্ব জ্ঞাত হইয়া মুক্তি প্রাপ্ত হয়। স্বামী বিবেকানন্দ ভক্তিযােগে যাহা বলিয়াছেন, তাহা তােমায় জানাইতেছি :—“আমাদের বর্তমান প্রকৃতি যেরূপ, তাহাতে আমাদিগকে বাধ্য হইয়া ভগবানকে মনুষ্যরূপে দেখিতে হইবে। মনে কর, মহিযদের ভগবানকে পূজা করিবার ইচ্ছা হইল। তাহাদের স্বভাবানুযায়ী তাহারা ভগবানকে একটী মহিষ দেখিবে। মৎস্য ভগবানের আরাধনেচ্ছু হইলে তাহারা ভগবানকে একটী বৃহৎ মৎস্য ভাবিবে। মানুষ ও ভগবানকে মানুষই ভাবিবে। বাপি মনে করিও না যে, ঐ সকল বিভিন্ন ধারণা বিকৃতকল্পনাসত মাত্র। মানুষ, মহিষ, মৎস্য, এগুলি যেন বিভিন্ন পাত্রস্বরূপ—স গুলিই ভগবৎ-সমুদ্রে নিজেদের জলধারণশক্তি ও আকৃতি সারে পূর্ণ হইতে গেল। মানুষে ঐ জল মানুষের আকার ধারণ করি; মহিষে মহিষের আকার ও মংস্যে মংস্যাকার ধারণ করিল। অথচ প্রত্যেক পাত্রেই সেই একই ঈশ্বর-সমুদ্রের জল রহিয়াছে। মানুং তঁহাকে মানুষরূপে দেখিবে ; আর তির্যগ জাতির যদি ভগবৎসধার কোনরূপ জ্ঞান থাকে, তবে তাহারা নিজেদের ধারণারূপ পশুরূপে তাঁহাকে ভাবিবে। অতএব আমরা ভগবানকে মানুষরূপে না দেখিয়া ও থাকিতে পারি না। সুতরাং আমাদের তাহাকে মনুষ্যরূপেই উপাসনা করিতে হইবে,অন্য কোন পথ নাই। দুই প্রকার লােক ভগবাকে মানুষরূপে উপাসনা করে না ; (১ম) নরপশুগণ, যাহাদের কোনরূপ ধৰ্মজ্ঞান নাই ; (২য়) পরমহংসগণ, যাঁহারা মনুষ্যসুলভ সমুদয় দৌ বল্য অতিক্রম করিয়া মানব-প্রকৃতির সামা ছাড়াইয়া গিয়াছেন।” ;

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। বৎস! যােগসাধনা না করিলে আত্মদর্শন হয় না; কিন্তু কলিকালে মানব অল্পায়ুঃ ক্ষীণবুদ্ধি বলিয়া যােগসাধন করিতে সক্ষম হয় না। সেই জন্য আৰ্যঋষিগণ প্রতিমার আরাধনা করিতে উপদেশ দিয়াছেন এবং রূপকভাবে যােগ-সাধনের সমস্ত উপায় বলিয়া গিয়াছেন। সুতরাং মায়ের আরাধনা করিলে মানব যেরূপ সহজে অধ্যাত্মতত্ত্ব জ্ঞাত হইয়া মুক্তি লাভ করে, সেরূপ সহজ উপায় পরিলক্ষিত হয় না। প্রতিমাপূজার কি কি কৌশল নিহিত আছে, এক্ষণে তাহা জানাইতেছি। “প্রথম।—যাবৎ মানুষের জ্ঞাননেত্র উন্মীলিত না হয়, তাবৎ অদৃশ্য জগদীশ্বরের অস্তিত্ব অনুভূত হইতে পারে না। অথচ জগদীশ্বর সর্বব্যাপী। চেতনাচেতন যাবতীয় পদার্থেই তাহার বিদ্যমানতা রহিয়াছে। সুতরাং অপেক্ষাকৃত স্কুলজ্ঞানী ব্যক্তি যদি জগতের কোন অচেতন জড়মূর্তিতে ঈশ্বর-বােধ সংস্থাপন করে, আর তিনি মনুষ্যবৎ সুখদুঃখাদি অনুভব করেন ভাবিয়া তাহার প্রতি স্নেহ- মমতাদি প্রকাশিত করিতে অভ্যাস করে, তবে তাহার অন্তঃকরণ অপেক্ষাকৃত নিৰ্ম্মল ও নিশ্চল হইবে, এবং তাহার ধর্মপ্রবৃত্তি সকল ক্রমশঃ পরিবর্ধিত হইবে। এই যুক্তিতে ঈশ্বরমূৰ্ত্তির “আত্মবৎ সেবা” নামক প্রথম কৌশলের সৃষ্টি হইয়াছে। “পুরাণাদি শাস্ত্রের পৌত্তলিক-আরাধনা-ঘটিত যাবতীয় আলঙ্কারিক বর্ণনা এই কৌশল হইতেই সমুদ্ভূত। “দ্বিতীয়।—যখন এরূপ জ্ঞান জন্মে যে, সকল পদার্থে ঈশ্বর বিদ্যমান থাকিলেও জড়মূর্তিতে বিদ্যমান ঈশ্বরাংশ বাস্তবিক সুখ দুঃখ অনুভব করেন না, ও মনুষ্যাদির ন্যায় হার কোনরূপ নিকৃষ্ট প্রবৃত্তি নাই, তখন তাঁহাকে সুখদুঃখীত পবিত্র- ১২৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। স্বরূপজ্ঞানে, কেবল ভক্তি প্রদর্শন করিবার ইচ্ছাই বলবতী হয়। তখন সম্মুখস্থ বিশেষ ভাবময়ী কোন মূর্তির নিকট কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান হইয়া, তদীয় পাদপদ্মে পুস্পাঞ্জলি প্রদানাদি যেমন সাক্ষাৎসম্বন্ধে ভক্তি- প্রকাশের চিঃ, এরূপ আর কিছুই নহে। এই যুক্তি অবলম্বন করিয়া “চিত্রিত বা নির্মিত মূর্তিতে সচেতনত্ব কল্পনা পূৰ্ব্বক ঈশ্বর পূজা”- রূপ দ্বিতীয় কৌশলের সৃষ্টি হইয়াছে। পুত্তলিকার প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও বিসৰ্জনাদিঘটিত যাবতীয় ব্যবস্থা এই কৌশলই হইতে সমুৎপন্ন। “তৃতীয়।ক্রমশঃ সাধনা দ্বারা যখন ঈশ্বরের সৰ্বব্যাপিত্ব-বােধ দৃঢ় হইয়া আসে, তখন নির্মিত প্রতিমূর্তি ব্যতিরেকে ও যে কোন বাহ্য বস্তুতে ঈশ্বরপূজার সফলতা অনুভব হয়। তজ্জন্য “বাহ্যপূজা”-রূপ তৃতীয় কৌশল অবলম্বিত হইয়াছে। “তাকুণ্ড ইত্যাদি জলপাত্রে, পুষ্করিণী ইত্যাদি জলাশয়ে এবং তুলসী- বৃক্ষাদি বা ঘটাদিতে অব্যক্ত চৈতন্যের পূজা এই কৌশল হইতে উৎপন্ন। “চতুর্থ।ক্রমশঃ জ্ঞানােন্নতির দ্বারা যখন এরূপ বােধ হয় যে, জীবাত্মাই পরমাত্মার অংশস্বরূপ, তখন আপন দেহমধ্যেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব হয়। তদবস্থার নিমিত্ত “মানসপূজা” নামক চতুর্থ কৌশলের সৃষ্টি হইয়াছে। “প্রাত্যহিক পূজাকালে আন্তরিক আসন-শুদ্ধি, ভূতশুদ্ধি ও মানসিক পূজা ইত্যাদি এই কৌশল হইতে সমুৎপন্ন।” বৎস! সাধক শ্রেষ্ঠ রামপ্রসাদ সংসারে থাকিয়া মায়ের উপর অচলা ভক্তি দ্বারা মুক্ত হইয়াছেন। মহাত্মা তুলসীদাস প্রভু রামচন্দ্রের উপর অচলা ভক্তি দ্বারা মুক্ত হইয়াছেন। অতএব তুমি যাহাকেই ভরাধনা কর, সেই এক ব্রহ্মেরই আরাধনা করা হইবে জানিও; সুতরাং নিবােপরূপী ভক্তি দ্বারা মায়ের আরাধনা কর, দেখ মুক্ত হইতে পার কি না। ভগবান পরমহংসদেব বলিয়াছেন যে, এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। জলের ভিতর ডুবলে যেমন হাঁটু পাঁকু প্রাণ, তেমনি ধারা হলে পরে মিলবে ভগবান্। অতএব মায়ের উপর অচলা ভক্তি কর এবং ধর্মকর্ম সমন্ত তাঁর উপর নির্ভর করিয়া কাৰ্য্য কর। মহামুনি যাজ্ঞবল্ক বলিয়াছেন,-“যে ব্যক্তি ন্যায়পূর্বক ধনােপার্জন করিবে, এবং তত্ত্বনিষ্ঠ অর্থাৎ ভগবান-বিষয়ে একনিষ্ঠ ও অতিথি- সেবা-পরায়ণ হইবে, নিত্যনৈমিত্তিক মাতৃপিতৃশ্রাদ্ধাদি করিবে ও সত্যবাক্য কহিবে, এবষ্কৃত গৃহস্থও পরিমুক্ত হয়।” পূৰ্বে আচাৰ্যদের ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিতে দেখা যাইত, কারণ ব্রাহ্মণগণ সত্ত্বগুণসম্পন্ন ছিলেন সুতরাং তঁাহারা সমস্ত বিষয়ে বীতরাগ ও সন্তুষ্ট ছিলেন। সেই জন্য সংসার পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক নির্জনে যাইয়া পরমার্থ চিন্তা করিতেন। কিন্তু আজকাল সেই মহামহিমান্বিত ব্রাহ্মণগণ নিজের গুণ অধিকাংশ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক তমােগুণপ্রধান হইয়া পড়িয়াছেন; সুতরাং তাঁহাদের সামান্য জ্ঞানে সংসার পরিত্যাগ করিলে ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম সবই নষ্ট হইয়া যাইবে। অতএব পরিপূর্ণ জ্ঞানময়ী মায়ের প্রকৃত অধ্যাত্মতত্ত্ব জ্ঞাত হইয়া তাহার উপর অচলা ভক্তি দ্বারা উপসনা কর, তাহা হইলেই মুক্ত হইবে। শিষ্য।--মায়ের আরাধনায় কি অধ্যাত্মতত্ত্ব নিহিত আছে, তাহা আমার বিশেষ করিয়া বলুন। গুরু।-বৎস! এক মহাত্মা মায়ের অধ্যাত্ম বিষয়ে যাহা বর্ণনা করিয়াছেন, তাহা তােমায় বলিতেছি, শ্রবণ কর :—“এই উভয়- কালীন দুর্গাপূজা প্রকৃতপক্ষে অধ্যাত্মতত্ত্বঘটিত পরমাত্মার উপাসনা ব্যতিরেকে আর কিছুই নহে। যাহারা দুর্গামহােৎসবে তাচ্ছিল্য বা ঔদাস্ত করে, কিম্বা আমরা তত্ত্বজ্ঞানী,—ইহা ? " "বু'র কর্ম ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। —এইরূপ অবজ্ঞা করিয়া অথবা আলস্য বা মােহবশতঃ পরিপূর্ণজ্ঞানময়ী দেবীর পূজাচ্চ না না করে, ভগবতী দুর্গাদেবী ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাদের সমস্ত অভিলাষ হইতে বঞ্চিত করেন ; তাহাদিগের আর কোন সাধনাই সফল হয় না। এইরূপ শাসনবাক্যও নির্দিষ্ট আছে। • জৈগীষব্য প্রভৃতি পূৰ্ব্বে যত যত ব্ৰহ্মজ্ঞানী হইয়া গিয়াছেন, তাহারা সকলেই সগুণ-ব্রহ্মে চিত্তস্থাপন করিয়া নিগুণলাভ করিয়াছিলেন। ফলতঃ মুক্তিসাধন বিষয়ে এই পথ ভিন্ন আর অন্য পথ নাই। মহাবিস্তৃত নিগূঢ়তত্ত্বময় দুর্গোৎসব , ব্যাপারের প্রত্যেক কার্যের একদিকে পৌরাণিক কল্পনা, অন্যদিকে বৈদিক তত্ত্বজ্ঞানােপদেশ,—এই উভয় বিষয়ের সামঞ্জস্য করিতে হইবে। সূর্যের দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ন—দুই পথ। পৌরাণিক কল্পনাতে দক্ষিণায়ন পিতৃযানে ও উত্তরায়ণ দেবযানে বলিয়া গণ্য। আশ্বিনীয় কৃত্য পিতৃযানে এবং চৈত্রীয় কৃত্য দেবযানে হইয়া থাকে। প্রবৃত্তিমার্গের যে কৰ্ম্ম তাহা দক্ষিণায়নে, এবং নিবৃত্তিমার্গের যে কৰ্ম্ম তাহা উত্তরায়নে সম্পন্ন হইয়া থাকে। একারণ শাস্ত্র বলেন যে, দেবতাদিগের দিবা উত্তরায়ন ও রাত্রি দক্ষিণায়ন। সুতরাং দিবা ভিন্ন রাত্রিকালে পূজা করিতে হইলেই নিদ্রিত দেবগণকে জাগাইতে হইবে। তাহার নাম “বােধন”। উত্তরায়নে জাগ্ৰদাবস্থা ; তাহাতে স্বভাবতঃ চৈতন্যপ্রযুক্ত বােধনের প্রয়ােজন হয় না। এতবতা প্রকৃতিমার্গে অবস্থিতি করিয়া নিবৃত্তিমার্গের কাৰ্য্যলাভ প্রত্যাশা করিলেই ঐ প্রবৃত্তিমার্গস্থিত ব্যক্তিরা তাহাকে নিবৃত্তিমার্গ করিয়া লয়েন। বােধন শব্দের ইহাই আধ্যাত্মিক অর্থ ; যথা- প্রবৃত্তিমার্গঃ সংসাররা নিবৃত্তিস্তু তদন্যথা। ইতি যামলং।

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। ১৩১ ; সংসারকে প্রবৃত্তিমার্গ বলে ; তদ্ভিন্ন নিবৃত্তিমার্গ ; অর্থাৎ সংসার- সন্ন্যাস ধৰ্ম্মকে নিবৃত্তিমার্গ কহে। অপরন্তু কুণ্ডলিনী শক্তির নিদ্রিতাবস্থাকে প্রবৃত্তিমার্গ ও তাঁহার জাগরণাবস্থাকে নিবৃত্তিমার্গ বলিয়া উক্ত করিয়াছেন। অতএব কুণ্ডলিনী বােধনের নামই বােধন বলিয়া যােগিগণ নিয়ত কুলকুণ্ডলীনিকে বােধৰে রাখিয়াছেন। এনিমিত্ত তাহাদের নিয়ত দেব্যান উত্তরায়নে কাৰ্য্য সপন্ন হইতেছে অর্থাৎ তকাৰ্য্য আদিত্যদারে গমন করিতেছে। আদিত্য শব্দে সূৰ্য। অধ্যাত্মতত্ত্বে সূৰ্যশব্দে পিঙ্গলা নাড়ি ; তাহা দক্ষিণ নাসিকাতে অবস্থিত। তাহাতে প্রাণবায়ু বহনকালে কুণ্ডলিনী জাগ্রতাবস্থায় থাকেন; সুতরাং তত্ত্ব-চিন্তকেরা কুণ্ডলিনীর জাগ্ৰতকালকে দিবা বলিয়া উক্তি করিয়াছেন। এই জন্যই কাল-চিন্তকেরা দেবযান উত্তরায়নকে দেবতাদিগের দিব। বলেন। দেবতা শব্দে এখানে ইন্দ্রিয়গণ। এই ইন্দ্রিয়গণকে কুণ্ডলিনী জাগ্রত অবস্থায় বিষয়বৈরাগ্যযুক্ত নিদ্রিতাবস্থার বিষয়ে অভিভূত করেন ; তৎকালে কোন যাগযজ্ঞাদি সাধন বা সম্পন্ন হয় না। শ্ৰীবৃক্ষ বােধয়ামি ত্বাং যাবৎ পূজাং করােম্যহম্। হে পরমাত্মন্ ! আমি যাবং পূজাদি করিব, তাবং তোমাকে শ্রীফল- বৃক্ষে বােধন করাইব —এইরূপ উক্ত হয়। অর্থাৎ তুমি সত্যাত্মারূপে জগদ্বাপী ; সেই জগদরূপে তােমাকে বোধন করাইব। যখন চিত্ত সমাহিত হইবে, বাহ পুজা থাকিবে না, তখন তন্ময় হইয়া যাইবে। জগৎশব্দে ব্ৰহ্মাণ্ড; ব্রহ্মাণ্ড পদে বিরাট। অর্থাৎ জগদীশ্বর বা ঐশ্বরী শক্তি বিরাটরূপে ব্ৰহ্মাণ্ডমধ্যে প্রসুপ্তবং রহিয়াছেন। তদীয় স্বরূপবােধের নামই শ্রীবৃক্ষে বােধ। তিনিই ব্রহ্মাণ্ডে শয়ন করিয়া রহিয়াছেন। ইহাই সকলকে প্রতিশােধিত করাব নাম বােধন বলা হইয়াছে। শ্ৰীবৃক্ষ শব্দেও ব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ শ্ৰীসম্বন্ধে ।

১৩২ ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। ঐশ্বৰ্য্য। ঐশ্বৰ্য যাহার ফল, তাহার নাম শ্রীফল; সুতরাং শ্রীবৃক্ষ বলাতে ব্ৰহ্মাণ্ড শব্দই প্রতিপন্ন হইয়াছে। স্বরূপতঃ রূপকব্যাজে শ্রীফল শব্দে ব্ৰহ্মাণ্ড ; তাহাতে প্রমুপ্ত চৈতন্য-শক্তির উদ্বোধনের নাম শ্রীবৃক্ষদেবীর বােধন, তাহাতে সন্দেহ নাই। । হইবে। ; ; ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণাঃ স্বন্তি তে বসন্তি কলেবর। ব্রহ্মাণ্ডে যাহা আছে, কলেবরেও তাহাই আছে। অর্থাৎ শ্রীই শরীরের ফলস্বরূপ ; একারণ এখানে দেহকে শ্রীফল বলিয়া ব্যাখ্যা করিতে শ্রীফলে ব্ৰহ্মরূপা জ্ঞানশক্তির শয়ন বলাতেই জীবশরীরে প্রমুপ্ত চৈতন্য-শক্তির ব্যাখ্যা করা হইয়াছে ; তন্নিদ্রাভঙ্গ পদে চৈতন্যরূপা কুলকুণ্ডলিনীকে বােধ করাইবার কথা বুঝিতে হইবে। সেই জ্ঞান- শক্তি কুলকুণ্ডলিনীর নিদ্রাভঙ্গার্থে অনেক জপ, তপ, পূজা ও যােগাদি করিতে হয় ; হার বােধন না হইলে কোন সাধনাই সিদ্ধ হয় না। কিন্তু প্রাণায়াম ও জপ-যজ্ঞ বিনা তাহার বােধন হয় না। সুতরাং দুর্গোপলক্ষে আধ্যাত্মতত্ত্বান্বেষণপক্ষে ভােগপর তমােঃময় অজ্ঞানরূপ রাত্রিতে প্রসুপ্তবৎ জ্ঞানাত্মক আত্মবােধের নিমিত্ত অপরপক্ষের নবমকল্পে শ্রীবৃক্ষে বােধনের উপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে। তদ্বতীত বাহ-পূজোপদেশ দেবীর বােধন এখানে স্বরূপার্থ সঙ্গত, হয় না; যেহেতু প্রথমতঃ দেবীর নিদ্রাই অপ্রশস্ত ; দ্বিতীয়তঃ বৃক্ষোপরি শয়ন অত্যন্ত অলীক; সুতরাং অধ্যাত্মতত্ত্ববােধই এই বােধনের স্বরূপার্থ মানিতে হইবে। নম্যাদী কল্পে দেবীর বােধনাভিপ্রায় ব্যাখ্যাত হইল; অতঃপর ষষ্ঠাদিকল্পে দেবীর সায়ংকালের বােধনের তাৎপৰ্য বর্ণিত হইতেছে। যষ্ঠী—এই সংখাবাচক শব্দটী উপাসনা-ভেদের সময়বিশেষ, এবং কালাবয়ব অর্থাৎ তিথি ও যােগাবয়ব এই তিনেরই বিশেষণ ; যথা আসন প্রত্যাহার প্রাণায়াম ধ্যান ধারণা সমাধি এই ষড়ই যােগ। . ;

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। ১৩৩ ২ হইল। ; এস্থলে প্রতিপদ আসনযােগ, দ্বিতীয় প্রত্যাহার অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সংযম যােগ, তৃতীয় প্রাণায়াম যােগ, চতুর্থী ধ্যানযােগ, পঞ্চমী ধারণাযােগ, ষষ্ঠী সমাধিযােগ, ইহা প্ৰতিপদাদি তিথিতে ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যদানস্থলে বােধিত হইয়াছে। প্রতিপদে দেবীকে রজতাসন দিবে; ইহাতেই আসন-যােগ বলা দ্বিতীয়াতে কেশ-সংযমার্থে ডােরক-দান-স্থলে ইন্দ্রিয়-সংযমন প্রত্যাহার যােগ উক্ত করিয়াছেন। তৃতীয়াতে নাসাভরণ স্বর্ণ ও রজতনিৰ্মিত তিলকদান-স্থলে প্রাণায়াম যােগ উক্ত হইয়াছে। রজত- কার ঈড়া ও স্বর্ণাকার জ্যোতির্ময়ী পিঙ্গলা নাসাভ্যন্তরচারিণী, পুরক- রেচকাদি-লক্ষণসমন্বিত ; সুতরাং ইহাতে প্রাণায়াম যােগ বলাই সঙ্গত হইয়াছে। চতুর্থীতে উচ্চাবচ ফলদানাচ্ছলে জগতের অভিলষিত ফলপ্রদাতা পরমেশ্বরের অনুস্মরদরূপ ধ্যানযােগের উপদেশ প্রদান করা হইয়াছে। পঞ্চমীতে ‘ককতিকা-দানস্থলে ধারণা-যােগ কথিত হয় ; কারণ অসার বর্জন পুরঃসর সারবস্তুর সন্ধানই ধারণা-যােগ। ষষ্ঠীতে পঞ্চগব্য ও মধুপর্ক- প্রদানচ্ছলে সমাধি-যােগােপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে; কারণ মধুধারাপানে আসক্ত ব্যক্তির বাহ্যজ্ঞান লােপ পায়, সমাধিতেও বাহজ্ঞানের অবসান সুতরাং সময়ে সময়ে অধ্যাত্মচিন্তক যােগী এক এক যােগের যে ক্রমে অভ্যাস করিবে, তদৃষ্টান্তস্বরূপে কালাবয়ব প্রতিপদাদি তিথিমে এক এক দ্রব্যদানাচ্ছলে ষড়ঙ্গযােগ সম্বন্ধে উপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে। প্রতিপদ দ্বিতীয়া তৃতীয় চতুর্থী পঞ্চমী ষষ্ঠী পর্যন্ত কল্প-পূজোপলক্ষে ষষ্ঠী অবসানে অর্থাৎ সায়ংকালে বােধন করিতে হইবে। ইহার তাৎপর্য এই যে, জ্ঞান ও বিজ্ঞানপ্রাপ্তির নাম বােধন ; সুতরাং সমাধির পর বিজ্ঞানকোষ প্রাপ্ত সাধকের তত্ত্বজ্ঞানেদয়ে চৈতন্যস্বরূপা কুণ্ডলিনীর প্রবােধন হয় ; তদ্বোধন ব্যতীত বিশ্রান্তি সুখ লাভ হয় না। অনন্তর হয়।

১৩৪ ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে আনন্দময়কোষপ্রাপ্ত জীব জীবনমুক্তের ন্যায় নিত্যমহােৎসবযুক্ত হইয়া আনন্দ প্রকাশ করিতে থাকে। একারণ আনন্দময়ী , ভগবতী দুর্গার মহামহােৎসব নবমীতেই হয়। ইহাকেই শারদোৎসব বলে। এই তত্ত্ববােধনােপদেশ নবমী- কল্পে শ্রীবৃক্ষে দেবী-বােধনেই বােধ করিতে হইবে। আব্রায়াং বােধয়েদ্দেবীং মূলেনৈব প্রবেশয়েৎ। পূৰ্বোত্তরাভ্যাং সংপূজ্য শ্রবণেন বিসৰ্জ্জয়েৎ। আদ্রযুক্ত অপরপক্ষীয়' কৃষ্ণানবমীতে শ্রীবৃক্ষে বােধন, মূলাযুক্ত সমীতে প্রবেশন, পূৰ্বাষাঢ়া নক্ষত্রযুক্ত অষ্টমী ও উত্তরাষাঢ়াযুক্ত নবমীতে অর্জন, এবং শ্রবণা-নক্ষত্রযুক্ত দশমীতে বিসৰ্জন করিবে। ইহার অভিপ্রায় এই যে, যোগাচিত্তবৃত্তিতে তত্ত্বজ্ঞানােদয়ের নাম বােধন ; ইহা পূর্বেই উক্ত হইয়াছে। মূলে প্রবেশের স্বরূপাৰ্থ এই যে, মূলানক্ষত্র উপলক্ষ মাত্র, শুদ্ধ প্রাণায়াম যােগসিদ্ধির কারণভূতা কুলকুণ্ডলিনী জগদ- যােনি জ্ঞানশক্তির প্রকাশভূতা শুদ্ধ্যাত্মিক শক্তির সহিত জীবের মূলাধারে সুষমাবত্মে প্রবেশের নাম মূলাতে প্রবেশন। পূৰ্বোত্তরে পুজনার্থে অষ্টমী কলাতে প্রবৃত্ত সাধক পূজা-জপাদি-সহকারে সগর্ভ প্রাণায়াম করিবে ; উত্তরে নবমী কলাতে প্রণবাবলম্বন পূর্বক প্রাণধারণা করিবে ; তদর্থে পূজা-জপাদির আবশ্যকতা আছে। অর্থাৎ যে সাধক অন্নময়াদি কোষের গত হয়েন তাঁহাকেই যােগশাস্ত্র প্রাপ্তসমাধি বলিয়া খ্যাত করিয়াছেন। স্বঘটে জ্ঞানশক্তির প্রবেশ মূলাধারে হয় একারণ অষ্টমীতে বাহ্য মৃন্ময়াদি ঘুটস্থাপনা করিয়া আবাহনাদি করে ; তাহার প্রমাণ-মানস- পূজার শিরঃসহস্রারস্থ ইষ্টদেবতারূপে পরমাত্মাকে সহৃদয়-ঘটে অধিষ্ঠিত করিয়া মানােপচার প্রদানে পূজা করিবার পদ্ধতি চিরপ্রথিত ;

এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। ; সেই পূজাই বাহে কল্পিত ঘটে ঘটিয়া থাকে, সুতরাং ফলে পরতত্ত্ব ঘটিয়া উঠিয়াছে। অষ্টমীতে ঘট ও ভদ্রমণ্ডলাদি যন্ত্র নির্মাণ করিয়া বাহুল্যরূপে পূজা করিয়া থাকে, অর্থাৎ শরীরস্থিত সমস্ত তত্ত্বকে লক্ষ করিবার উপায়ার্থ আবরণ দেবদেবীরূপে গন্ধপুষ্পদানাচ্ছলে উপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে ; যে হেতু পীঠপূজা ও আবরণ-পূজা-মন্ত্রার্থে ই প্রকাশ আছে যে এসকল বাহ্ন বিষয় মাত্র নহে। তথাপি প্রথমতঃ ভূতশুদ্ধির সহিত বাহ সম্বন্ধের ঘটনা হয় না ; উহার ফল কেবল অধ্যাত্মতত্ত্ব-চিন্তন। দ্বিতীয়তঃ মাতৃকান্যাসও শরীরাভ্যন্তর-বৃত্তির আবৃত্তি মাত্র। যথা আধারে লিঙ্গ, নভাে ইত্যাদি মন্ত্রে শরীর যে কালাক, সেই তাৎপৰ্য প্রকাশ পাইতেছে। “পঞ্চাশ গ্লিপিভি” ইত্যাদি মন্ত্রের অর্থে বাহাবয়ব উপলক্ষে বর্ণমাত্র লক্ষ্য করিয়াছে, অর্থাৎ পূজকেরা যে সকল বর্ণাত্মক মন্ত্রে পূজা করিয়া থাকেন, তাহা সাধকের শরীর হইতে স্বতন্ত্র নহে; সুতরাং মন্ত্রসকল যে আত্মাতে বিরাজিত রহিয়াছে, উহা ঐ পূজাচ্ছলে উপদিষ্ট হইয়াছে। তৃতীয়তঃ পীঠপূজা অধ্যাত্মতত্ত্বের প্রতিপােষক। জ্বর পরমাত্মার পীঠ। বাহ্যিক যত আধার, সেই সমস্ত আধারই জীবের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত আছে। একারণ “হৃদি আধার শক্তয়ে নমঃ” এই মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া গন্ধপুষ্প প্রদান করা হয়, কিন্তু বাহপূজাকালে ঐ পূজা মানসে বা কল্পনাতেই সম্পন্ন হয়। তাহার একপীঠও কস্মিকালে কাহার ও দৃষ্টিগোচর হয় না। কূৰ্ম্ম, অনন্ত, পৃথিবী ক্ষীরসমুদ্র, শ্বেতদ্বীপ মণিমণ্ডপ, কল্পবৃক্ষ, মণিবেদী, সিংহাসন এবং দক্ষিণ স্কন্ধে অজ্ঞান ও অধৰ্ম্ম, বামে জ্ঞান, বাম উরুতে বৈরাগ্য, দক্ষিণে ঐশ্বৰ্য্য ইত্যাদি সমস্তই অচাক্ষুষ বিষয়। চতুর্থতঃ আবরণ-শক্তিপূজা ক্রমে খ্যাতি, সৌম্য, রৌদ্রা, প্রতিষ্ঠা, কীর্তি, মায়া, চেতনা, বুদ্ধি, নিদ্রা, ক্ষুধা, ছায়া, শক্তি, তৃষ্ণা, ক্ষান্তি, জাতিশান্তি, ধর্মতত্ত্ববারিধি। লজ্জা, শ্রদ্ধা, কান্তি, শােভা, বৃত্তি, ভ্রান্তি, স্মৃতি, দয়া, তুষ্টি, মাতৃ, ব্যাপ্তি, অনসূয়া, প্রাপ্তি, চিতি ইত্যাদি সমস্তই সর্বশক্তিমান পরমাত্মার উরুশক্তি ব্যতীত কিছুই নহে। সুতরাং অষ্টমী-পূজাচ্ছলে বিজ্ঞানময় কোষের বিষয় উপদিষ্ট হইয়াছে। পঞ্চমতঃ মহানবমী উত্তর কাৰ্য্য হইলেও তাহাতে পূৰ্ব্ববৎ পূজা করিয়া থাকে। বিশেষতঃ তাহাতে ঘট- যন্ত্রাদির অপেক্ষা নাই। ইহারও তাৎপৰ্য্য গ্রহণ করা উচিত। তথাপি পূৰ্ব কৰ্ম্মফলে বিজ্ঞানপ্রাপ্ত সাধকের বিশেষ আনন্দ জন্মে, সেই আনন্দ- রসে মগ্ন হইয়া সাধক ব্যক্তি পূজা সমাধান করিবার কামনায় যত্নবান হয়। সুতরাং এককালে প্রভুতােপটার দ্বারা অর্চনা মাত্র করিয়া কার্যে পূর্ণাহুতি দিয়া দক্ষিণান্ত করে। ইহার অভিপ্রায় এই যে, আমার ইষ্টপূজন কৰ্ম্ম এই পর্যন্ত সমাপ্ত হইল। কিন্তু হােমচ্ছলে ইহা জানাইতেছেন যে, আমি ব্ৰহ্মাগ্নিতে সমস্ত কৰ্ম্ম আহুতি দিয়া ভস্মীভূত করিয়া এক্ষণে বাহ লৌকিক কৰ্ম্মে আর আবদ্ধ থাকিব না ; যাবৎ দেহ ধারণ করিযা থাকিব, তাবৎ পরিশুদ্ধ ব্ৰহ্মভূতপ্রায় ও আনন্দময় বিগ্রহে প্রণবােচ্চারণে নিবিষ্টচেতাঃ হইয়া যথারুচি তথা ব্যবহারে কেবল আনন্দ সূচক সঙ্গীতেই কালক্ষেপ করিব। এই উপদেশের নিমিত্ত “নব্যমাং শারদোৎসব” অর্থাৎ সেই দিন জাতি- বিজাতি-জ্ঞানশূন্য হইয়া কেবল তভোজ্ঞার্থ সঙ্গীতাদি করিবে; ইহাতে লােকলজ্জানুবােধে আপন আনন্দের বিরাম করিবে না,—এইরূপ ব্যবস্থা হইয়াছে। এদিকে জীবন্মুক্ত ব্যক্তি স্বভাবতঃ লৌকিক কাৰ্য্যে শঙ্কারহিত হয়, ইহা জানাইয়া গিয়াছেন। শারদীয় দুর্গাপূজাঙ্গীভূত বিসর্জন-কল্পকে তত্ত্বজ্ঞানানুকল্পরূপে ব্যাখ্যা করিয়া পরমার্থ বিষয়ে আনয়ন করাই পুরুষার্থৰিদ্ধির কারণ। “আত্মা বা অরে শ্রোতবব্যা মন্তবব্যা নিদিধ্যাসিতব্য সাক্ষাৎকার কর্তব্যশ্চেতি”-আত্মার শ্রবণ মনন নিদিধ্যাসন ও সাক্ষাৎকার করিতে হয়। এই শ্রুতি প্রমাণের ফল এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। ১৩৭ ; প্রদশনার্থে সিংহাবলােকন ন্যায়ে শ্রুত্যুক্ত চতুৰ্বিধ সাধকের অবস্থাভেদ দ্বারা সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর বিষয় বিশেষরূপে উল্লিখিত হইয়াছে। (পূর্বোক্ত মন্ত্রর দ্বারা প্রমাণ হয়) বােধনান্তর মূলাধারে চৈতন্য শক্তির প্রবেশের নাম “ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকার” ; অষ্টমীতে মনন দ্বারা জ্ঞানাঙ্গস্বরূপ শান্তিপুষ্টাদির অনুস্মরণ ও ভদ্রমণ্ডলে আবরণ-শক্তি পূজনের নাম আত্মার “মনন”। নবমীতে সাধক আনন্দময় হইয়া আপনাতে দেবীরূপ ভাবনাদ্বারা উৎসবান্বিতচিত্তে হর্ষোৎসাহ প্রবৃদ্ধি করিবে ; ইহার নাম আত্মার “নিদিধ্যান”। যখন নবমীর শেষে আনন্দের প্রতি নির্ভর করিতে অনুশাসন করিয়াছেন, তখন ইহাই বিবেচনা করিতে হইবে যে, সাধকের আর বিশেষ পূজার প্রয়ােজন নাই, তবে ইচ্ছামত করিলেও হানি নাই। সেই অবস্থায় নাম জীবমুক্তি। তাহাতে আত্মার কেবল শ্রবণ প্রয়ােজন হয় ; এই জন্য আত্মাই শ্রোতব্য বলিয়া শ্রুতি অনুশাসন করিয়াছেন। অর্থাৎ মুক্ত-পুরুষেরা সর্বোপনিষ- প্রতিপাদ্য আত্মার শ্রবণে জীবনাতিপাত করিবেন; পূৰ্বাঙ্গ যাবৎ কৰ্ম্ম সেই তাবৎ কৰ্ম্মই আত্মশ্রবণ দ্বারা বিসর্জন করেন। তত্ত্বজ্ঞান- সাধনের পক্ষে আত্মার শ্রবণই সর্বপ্রধান কৰ্ম্ম। ইহা জানাইবার জন্য “শ্রবণেন বিসর্জয়েৎ” বলিয়াছেন। অতএব সৰ্ব্ববেদবেদান্তাদি প্রমাণে তত্ত্বজ্ঞান-সাধনার উপদেশ অভিপ্রায়ে দুর্গোৎসব কাৰ্য্য সৰ্বকালই জগদব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে। নবপত্রিকা না হইলে দুর্গোৎসব হয় না, অর্থাৎ পূৰ্ব্বে সাধনচতুষ্টয় সম্পন্ন না হইলে তত্ত্বজ্ঞানানুশীলনের অধিকারী হয় না,শাস্ত্রকর্তারা রূপক-ব্যাজে ইহাই জানাইয়াছেন। রম্ভা কচ্চী হরিদ্রাচ জয়ন্তী বিশ্ব দাড়িমে। অশােক মানকশ্চৈব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা। ;

১৩৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। রম্ভা, কচ্চী, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম্ অশোক মানক ও ধান্য, এই নববৃক্ষে নবপত্রিকা হয়, এই নবপত্রিকা অপরাজিতা লতার দ্বারা পরিবেষ্টন করিবার বিধি ও ব্যবহার আছে। ইহার তাৎপৰ্য্য এই যে, স্বরস্বতী নাড়ী তত্ত্বজ্ঞান-প্রদায়িনী ; ঐ নাড়ীর ছিদ্রে প্রাণবায়ুর সঞ্চারে জ্ঞানােপযােগিনী মেধা জন্মে। সেই মেধা বিষ্ণুবৎ সৰ্বপ্ৰবেশন, শক্তিমতী, একারণ তাহার নাম বিষ্ণুক্রান্ত। লতা। ঐ বিষ্ণুক্রান্তা লতার নামান্তর অপরাজিতা লতা। সুতরাং অপরাজিতা বেষ্টনের তাৎপর্য এই যে, মেধাকে পরাজয় করিতে পারে না। সত্বরজস্তমােগুণাকারে ব্রহ্মনাড়ীস্থ জ্ঞানরূপকে ত্রিবিধ বেষ্টন করিয়া রাখিলে সাধক ব্যক্তি অঙ্খলিতরূপে তত্ত্বজ্ঞানসোপানে স্থির থাকিতে পারে। ইহা জানাইবার জন্য ব্রহ্মনাড়ীস্থ জ্ঞানস্বরূপ সৰ্বারম্ভক রম্ভাতরুকে অপরাজিতা দ্বারা বেষ্টন করিতে কহিয়াছেন। শিষ্য।--অাপনার মুখে ধৰ্ম্মসম্বন্ধে সমস্ত বিষয়ে উপদেশ প্রাপ্ত হইয়া আমার হৃদয় পরম-আনন্দ-রসে অভিষিঞ্চিত হইল ; এবং সংসারী ব্যক্তিদের সাকার উপাসনাই যে নিরাকার উপাসনার সােপানস্বরূপ, তাহাও বেশ বুঝিতে পারিলাম। তবে আমার মনের মধ্যে আরাে একটু সন্দেহ আছে। আমি শুনিয়াছি যে, তন্ত্রে পঞ্চমকার-সাধন করিবার উপদেশ আছে ; তবে কেন আপনি পূর্বে মদ্য পান একেবারে নিষেধ করিয়াছেন এবং কেনই বা তবে মৎস্য বা মাংস সাত্ত্বিক আহার হইতে পারে না বা ব্রাহ্মণেরা তাহা আহার করেন না। দ্বিতীয়ত সৰ্ব্বভূতে দয়া, সৰ্ব্বভূতে সমদৃষ্টি ও সৰ্ব্বভূতে আত্মজ্ঞান, এই কয়টী আত্মজ্ঞানের চি; তবে তন্ত্রে কেন জীবহিংসা করিয়া মৎস্য বা মাংস খাইতে আদেশ দিতেছেন, তাহা আমায় বুঝাইয়া দিউন। গুরু।বৎস! তন্ত্রে এই সমস্ত বিষয়ে অতি রূপকভাবে উপদেশ দেওয়া আছে; তাহা তত্ত্বজ্ঞানী না হইলে বুঝিতে পারা বড়ই কঠিন। ; ৫

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ।
১৩৯
মনকে সম্পূর্ণভাবে নির্মল ও নিশ্চল করিয়া তত্ত্বজ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিই ঐ
তন্ত্রের মধ্যে যে নিগূঢ় অধ্যাত্মতত্ত্ব নিহিত আছে তাহা সম্পূর্ণভাবে
বুঝিতে পারেন। যাহা হউক বৎস! পঞ্চমকার-সাধন করিবার
যাহা উপদেশ আছে, তাহাতে মদ্য পান বা মৎস মাংস আহার করিবার
উপদেশ নাই ; উহা কেবল যােগসাধনের উপদেশ ভিন্ন আর কিছুই।
নহে। তােমায় বিস্তারিত রূপে জানাইতেছি।
(১) মদ্য।
সােমধারা ক্ষরে যা তু ব্ৰহ্মন্ধুাৎ বরাননে।
পীনন্দময়স্তাং যঃ স এব মদ্যসাধক।
হে বরাননে, ব্ৰহ্মরন্ধ -সরসীরুহ হইতে ক্ষরিত যে অমৃতধারা, তাহা
পান করিয়া যে আনন্দময় হয়, তাহাকেই মদ্যসাধক বলে।
(২) মাংস।
মা শাদ্রসনা জ্ঞেয়া তদংশান রসন প্রিয়ে।
সদা যাে ভক্ষয়েদ্দেবি স এব মাংসসাধক।
হে দেবী রসনাপ্রিয়ে (পাৰ্বতী), রসনার নাম মা; তদংশ বাক্য ; যে
ব্যক্তি সর্বদা তাহা ভক্ষণ করে, অর্থাৎ যে ব্যক্তি বাক্যসংষমকারী,
মৌনাবলম্বী যােগী, তাহাকেই মাংসসাধক বলা যায়।
(৩) মৎস্য।
গঙ্গাযমুনয়ােৰ্ম্মধ্যে মৎস্যে দ্বেী চরতঃ সদা।
তৌ মৎস্যৌ ভক্ষয়ে যস্তু স ভবেন্মৎস্যসাধক।
গঙ্গা ও যমুনা এই দুই নদীর মধ্যে যে দুই, মৎস্য নিরন্তর চরিতেছে,
সেই মৎস্যকে যে ব্যক্তি আহার করে, তাহার নাম মৎস্যসাধক।
স্পষ্টাৰ্থ এই যে, এস্থলে গঙ্গা শব্দে ঈড়া নাড়ী, অরি যমুনা শব্দ পিঙ্গলা

১৪০ ধর্মতত্ত্ববারিধি। নাড়ী। এই ঈড় ও পিঙ্গলা নাড়ীর মধ্যে যে নিশ্বাস ও প্রশ্বাস নিয়ত গতায়াত করিতেছে, তাহারাই মৎস্যৰয়। এই মৎস্যদ্বয়ের ভক্ষক যােগী যিনি প্রাণায়ামসাধক শ্বাস প্রশ্বাসকে—নিবােধ করিয়া কুম্ভকের দ্বারা পুষ্টি করিতেছেন, তাহাকেই, মৎস্যসাধক বলে।” অতএব বৎস! পঞ্চমকার—রূপকভাবে যােগশিক্ষা ভিন্ন কিছুই নহে; কিন্তু অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণ তন্ত্রের ২১ পাতা উ'টাইয়া জনসমাজে মদ্য মাংস ইত্যাদি ব্যবহার করিতে বলে, অথবা অপরের মুখে শুনিয়া নিজেরাও ঐ সমস্ত অব্যবহার্য জিনিষ ব্যবহার করিয়া ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম নষ্ট করে। মদ্য মাংস ইত্যাদি ব্যবহার করিলে সেই ব্যক্তির মন কখনই ধর্মের দিকে ধাবিত হইবে না বলিয়া উক্ত জিনিষগুলি অব্যবহার্য্য। (৪) মুদ্রা। সহস্রারে মহাপদ্মে কর্ণিকা মুদ্রিতা চয়েৎ। আত্মতত্রৈব দেবেশি কেবলং পারদোপমং। সূৰ্য্যকোটী প্রতীকাশং চন্দ্রকোটী সুশীতলং, অতীব কমনীয়ঞ্চ মহাকুণ্ডলিনীযুতং। যস্য জ্ঞানােদয়স্তত্র মুদ্রাসাধক উচ্চতে। হে দেবেশি! শিরসিস্থিত সহস্রদল মহাপদ্মে মুদ্রিত কণিকার মধ্যে শুদ্ধ পারার ন্যায় শ্বেতবর্ণ আত্মার অবস্থিতি। কোটি ৰ্য্যের ন্যায় তাঁহার প্রকাশ, অথচ তিনি কোটি চন্দ্রের ন্যায় সুশীতল হয়েন। তিনি অতিশয় কমনীয় এবং মহাকুণ্ডলিনীশক্তিসংযুক্ত। যাহারা সেই পরমাত্ম তত্ত্বজ্ঞান জন্মে, তাহারই নাম মুদ্রাসাধক। (৫) মৈথুন। মৈথুনং পরমং তত্ত্বং সৃষ্টিস্থিত্যন্তকারণং। মৈথনাজ্জায়তে সিদ্ধি ব্ৰহ্মজ্ঞানং সুদুভং ।

এয়ােদশ পরিচ্ছেদ।
১৪১
রেফস্তু কুঙ্কুমাভাস কুণ্ডমধ্যে ব্যবস্থিতং ।
মকারশ্চ বিন্দুরূপে মহাযােনৌ স্থিত প্রিয়ে।
আকারাে হংসমারুহ একতা যুদা ভবেৎ।
তদাজাতং মহানন্দং ব্রহ্মজ্ঞানং 'সুদুল্লভং।
আত্মনি রমতে যস্মদাত্মারামস্তদুচ্যতে।
অতএব রামনাম তারকং ব্ৰহ্ম নিশ্চিতং ।
মৃত্যুকালে মহেশাণি স্মরেদ্ৰামাক্ষরদ্বয়ং।
সর্বকৰ্ম্মানি সংত্যজ্য স্বয়ং ব্রহ্ম ময়ং ভবেৎ।
ইদন্তু মৈথনং তত্ত্বং তব স্নেহাৎ প্রকাশিতং ।
মৈথ নং পরমং তত্ত্বং তত্ত্বজ্ঞা-স্য কারণং ।
সর্বপূজাময়ং তত্ত্বং জপাদীনাং ফলপ্রদং।
ষড়ঙ্গ পূজয়েদ্দেবী সর্বমন্ত্র প্রসীদতি।
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের কারণ স্বরূপ মৈথুন পরমতত্ত্ব। মৈথুনে সিদ্ধ
ব্যক্তির সুদুল্লভ ব্রহ্মজ্ঞানরূপ আনন্দ উদয় হয়। রেফ কুমবর্ণ
কুণ্ডের মধ্যে আছে, মকার বিন্দুরূপ মহাযোগীতে স্থিত। হে প্রিয়ে।
আকাররূপ হংসকে আরােহণ যখন উভয়ের (“র” ও “ম” এই
অক্ষরদ্বয়ের) একতা হয়, তখন সুদুল্লভ ব্রহ্মজ্ঞানানন্দ জন্মে। ঐ
পদার্থ (অর্থাৎ রাম এই শব্দের বিষয়ীভূত পরমাত্মা) আত্মাতে
রমণ করেন, এইজন্য তাঁহাকে আত্মারাম বলে। অতএব রাম এই শব্দ
নিশ্চয়ই তারকব্রহ্মস্বরূপ। হে মহেশাণি ! যে
রাম এই অক্ষরদ্বয় অর্থাৎ শব্দ
স্মরণ করে, সে ব্যক্তি সৰ্ব্বকৰ্ম্ম
পরিত্যাগ পূর্বক (পাপ ও পুণ্যাদি) সকল কার্যের ফলভােগ রহিত
হইয়া ব্ৰহ্মময় হয়। তােমার প্রতি স্নেহবশতঃ এই মৈথুন-তত্ব
প্রকাশ করিলাম। মৈথুন পরমতত্ত্ব ; ইহা তত্ত্বজ্ঞানের কারণস্বরূপ
ব্যক্তি মৃত্যুকালে

১৪২ ধর্মতত্ত্ববারিধি। সৰ্বপূজাময় ও জপাদির ফল প্রদানে দেবী ষড়ঙ্গ দ্বারা পূজা করিলে সকল মন্ত্রই প্রসন্ন হয়। হিন্দুধর্মতত্ত্ব। শিষ্য।—কালীমাতার অধ্যাত্ম-তত্ত্ব কি, তাহা বুঝাইয়া দিন। গুরু।-বৎস, তােমায় বলিতেছি, শ্রবণ কর। এক্ষণে “কালীর ধ্যান বা মুর্তিপূজায় বেদান্তবিজ্ঞান। (ত্রিশূল হইতে গৃহীত।) ব্রাহ্মণ।—ঘােররাবাং ' মহারৌদ্রীং শ্মশানালয়বাসিনীং। সহান্মুখী হওয়ায় ‘ঘােররাবাং' অর্থাৎ অজপা ‘হংসঃ হংসঃ এই শব্দে প্রকৃতি চলিতেছে ; ইহা ঘাের অর্থাৎ এই হংস হংস শব্দ কোনস্থান হইতে কি প্রকারে হইতেছে, ইহা রজস্তমােগুণে বােধ হয় না বলিয়া অর্থাৎ ইহা দুলভ বলিয়া ইহাকে ঘাের বলিলেন। অথবা সত্ত্বগুণাধিক্য মানব এই মায়ার গােলযােগ ঘাের দেখেন ; আর এই প্রকার নাশ বা পরিবর্তন তমােগুণ এবং স্থিতি পালনের প্রকার প্রকৃতির রজো- গুণের কাৰ্য্য দেখিয়া প্রকৃতিকে “মহারৌদ্রীং” বলিয়া এই প্রকৃতির পরিণাম শ্মশানহেতু “শ্মশানালয়বাসিনীং” বলিলেন। অথবা শ্মশানলয়- বাসিনী কি না—মহাপ্রলয়ে জগতের উপাদানভূত পঞ্চমহাভূত শবরূপ পরমব্রহ্মে শয়ন করে বলিয়া পরমব্রহ্মকে শ্মশান বলে, তাহাতেই —সেই পরমব্রহ্মে আলয় বলিয়া প্রকৃতিকে “ শ্মশানালয়বাসিনীং বলিলেন। তাহার পর ধ্যান কি বল। ব্রাহ্মণ।-বালার্কমণ্ডলাকারলােচনত্রিতয়ান্বিতাং। স্বামী।—এইরূপে মানব যখন প্রকৃতির জন্মমৃত্যু পালনাদি কাৰ্য্য রহিলেন, তখন তাহা প্রত্যক্ষের নিমিত্ত প্রকৃতিতে সত্বগুণের কাৰ্য্য ত্রয়ােদশ পরিচ্ছে ১৪৩ দেখাইবার জন্য মলােকে বালসূর্যের ন্যায় সুন্দর সূৰ্য্য, অগ্নি ও জ্ঞান- রূপ তিনটী চক্ষু প্রকৃতির দেখাইলেন। তত্র সত্ত্বং নিৰ্ম্মলত্বাৎ প্রকাশকমনাময়। সুখসঙ্গেন বাতি জ্ঞানসঙ্গেন চানঘ। —৬১৪ গীতা। নিৰ্ম্মলহেতু সত্ত্বগুণস্থিত জ্ঞানই সেই অনাময়পদের প্রকাশক, তাই শ্রুতি বলেন- “জ্ঞানপ্রসাদেন বিশুদ্ধসত্ত্বস্ততস্তু তং পশ্যতে নিষ্কলং ধ্যায়মান।” জ্ঞানশুদ্ধির দ্বারা বিশুদ্ধান্তঃকরণ হইয়া তাহার পর জ্ঞানযােগে নিরবয়ব পরমাত্মাকে দর্শন করেন। জ্ঞানেন তু তদজ্ঞানং যেষাং নাশিমাত্মনঃ। তেষামাদিত্যজ জ্ঞানং প্রকাশয়তি তৎপরম্ | -১৬৫ গীতা। জ্ঞানদ্বারা যাঁহাদের বৈষম্যবােধক অজ্ঞান নাশিত হয়। সূৰ্য্য যেমন তমােনাশ করিয়া সমস্ত বস্তু প্রকাশিত করেন, সেইরূপ জ্ঞানও তাহাদের অজ্ঞান বিনষ্ট করিয়া পরিপূর্ণ পরব্রহ্মকে প্রকাশিত করেন। জ্ঞানই ব্রহ্মকে প্রকাশ করেন বলিয়া জ্ঞানকে প্রকৃতির প্রধান চক্ষু করিলেন। আর এই জ্ঞানচক্ষু আমরা সূৰ্য্য ও অগ্নিরূপ দুইটা চক্ষুদ্বারা প্রাপ্ত হই, এই হেতু সূৰ্য্য ও অগ্নি লইয়া আমাদের উপাসনা ; “ভর্গো দেবশ্যধীনহি”—জগৎ-প্রকাশক সূর্যের প্রকাশককে আমরা ধ্যান করি। “হিরণয়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখং। তত্ত্ব পূষন্নপাবৃন্ত সত্যধৰ্মায় দৃষ্টয়ে।” হে জগৎপােষক সূৰ্য্য ! তােমাৰ জ্যোতির্ময় ১৪৪ ধর্মতত্ত্ববারিধি। । । । । পাত্র দ্বারা (কিরণ দ্বারা) সত্যের (ব্রহ্মের) মুখ আচ্ছাদিত রহিয়াছে, সত্যধর্মানুষ্ঠায়ীর দৃষ্টির জন্য তাহা তুমি আবরণশূন্য কর। ইত্যাদি। সূৰ্য্য হইতে সেই স্বপ্রকাশক ব্রহ্মের প্রকাশ মানব-হৃদয়ে প্রতিবিম্বিত হয় বলিয়া সূৰ্য্য একটী প্রকৃতির চক্ষু এবং অগ্নি সাক্ষাৎসম্বন্ধে বেদময় হয় ; যেহেতু অগ্নিদ্বারাই সমস্ত 'স্মার্ত ও বৈদিককাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়া থাকে। প্রকৃতির এই কাৰ্য্য দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হইলে, অবশেষে ব্ৰহ্মলাভ হয় বলিয়াই অগ্নিকে একচক্ষু করিয়া ব্ৰহ্মপ্রকাশক প্রকৃতির তিন চক্ষু” দেখাইলেন। “তস্মাদ্বা এতে দেবা......প্রথমাে বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি” শ্রুতিঃ। যেহেতু অগ্নি, বায়ু ও ইন্দ্র, এই সকল দেবতারা এই প্রকৃতি দ্বারা প্রথম ব্ৰহ্ম জানিতে পারেন, “তস্মাদ্বা ইন্দ্র প্রথমাে বিদাঞ্চকার ব্রহ্মেতি” শ্রুতিঃ। যেহেতু ইন্দ্র তাঁহাকে সৰ্ব্ব- প্রথম ব্ৰহ্ম বলিয়া জানিতে পারিয়াছিলেন, ইত্যাদি প্রকৃতি হইতে জ্ঞান লাভ হয়। তাহার পর ধ্যান বল । ব্রাহ্মণ।—দন্তুরাং দক্ষিণাং ব্যাপিলম্বমানকচোচ্চয়াম্। স্বামী।-সাধক রজোগুণের অধিক্যে কৰ্ম্মের গতি দেখিয়া যে কৰ্ম্মের মুখে “ঘােরদংষ্ট্রাং” দেখিয়াছিলেন, এক্ষণে সত্ত্বগুণের আধিক্যে সেই দন্তকে “দন্তুরাং” কি না সুলক্ষণাযুক্ত দেখিলেন, কারণ প্রকৃতির সৌন্দৰ্যবৰ্ধক কৰ্ম্মরূপ কচসমুহ লম্বমান কি না? অনাদিকাল হইতে “দক্ষিণg” ব্যাপী কি না ? জ্ঞান ব্যাপিয়া রহিয়াছে। অর্থাৎ কৰ্ম্মই জ্ঞানলাভের উপায়। কুন্নেবেহ কৰ্ম্মাণি জিজীবিষেচ্ছ সমঃ। এবং ত্বয়ি নাথেতােহস্তি ন কৰ্ম্ম লিপ্যতে নরে॥ —শ্রুতিঃ।

এলােদশ পরিচ্ছেদ।
১৪৫
কৰ্ম্ম করিয়াই ইহলােকে শতবৎসর জীবিত থাকিতে ইচ্ছা করিবেক।
হে মনুষ্য! এরূপ জীবন ইচ্ছা থাকিলে তােমার পক্ষে ইহা ব্যতীত
অর্থাৎ শুভকৰ্ম্ম ব্যতীত এমন অন্য কোন পথ নাই, যাহাতে তােমাকে
অশুভ কর্মে লিপ্ত হইতে হইবে না।
ন কৰ্ম্মণামনারম্ভাকৈৰ্ম্মং পুরুষেহণুতে।
ন চ সন্ন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি ॥
—৪৩ গীতা।
কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান না করিয়া কেহ জ্ঞানলাভ করিতে পারে না, কেবল
সন্ন্যাসেই সিদ্ধিলাভ হয় না।
কৰ্ম্মজং বুদ্ধিযুক্তা হি ফলং ত্যা মনীষিণঃ।
জন্মবন্ধবিনিৰ্ম্মক্তাঃ পদং গচ্ছন্ত্যনাময় ।
—৫১২ গীতা।
বুদ্ধিযুক্ত জ্ঞানিগণ কর্মফল ত্যাগ করিয়া জন্মবন্ধনরূপ মৃত্যু হইতে মুক্ত
হইয়া সর্বোপদ্রবশূন্য মােক্ষপদ প্রাপ্ত হয়েন।
সন্ন্যাসঃ কৰ্ম্মযােগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ
তয়ােস্ত্র কর্মসংস্যাসাৎ কৰ্ম্মযােগাে বিশিষ্যতে ॥
২৫ গীতা ।
সন্ন্যাস ও কৰ্ম্মযােগ উভয়ই মােক্ষপ্রদ ; কিন্তু এতদুভয়ের মধ্যে
কৰ্ম্মসন্ন্যাস অপেক্ষা কৰ্ম্মযােগ উৎকৃষ্টতর।
আরুরুক্ষোমুনেৰ্যোগং কৰ্ম্ম কারণমুচ্যতে।
জ্ঞানযােগে আরােহণেচ্ছু মুনির সম্বন্ধে কৰ্ম্মই কারণরূপে নির্দিষ্ট হয়।
যজ্ঞােদান তপঃ কৰ্ম্ম ন ত্যাজ্যং কাৰ্যমেব তৎ। ৫।
৮ গীতা
১•

ধর্মতত্ত্ববারিধি।
যজ্ঞ, দান ও তপস্যা এই সকল কর্ম পরিত্যাজ্য নহে।
যজ্ঞােদানং তপশ্চৈব পাবনানি মনীষিণা।
যজ্ঞ, দান ও তপস্যা বিবেকীদিগের চিত্তশুদ্ধির কারণ।
নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কৰ্ম্মণণা নােপপদ্যতে।
নিত্যকর্মের ত্যাগ উচিত নহে। ইত্যাদি।
কৰ্ম্ম জ্ঞানলাভের উপায় বলিয়া “দন্তুরাং দক্ষিণাঃ ব্যাপিলম্বমান
কচোচ্চয়াম্” বলিলেন।
তাহার পর ধ্যান বল
ব্রাহ্মণ।-শবরূপ মহাদেব-হৃদয়ােপরি সংস্থিতাং
স্বামী।—এই শব।
মহাভূতান্যহঙ্কারে বুদ্ধিরব্যক্তমেচ।
ইন্দ্রিয়াণি দশৈকঞ্চ পঞ্চ চেন্দ্রিয়গােচরাঃ ॥৫১৩ গীতা।
ইচ্ছদ্বেষং সুখং দুঃখং সংঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ।
এতৎক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতম্ ॥—৬১৩ গীতা।
ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম, এই পঞ্চমহাভূত ; ইহাদের
কারণস্বরূপ অহংকার বুদ্ধি অর্থাৎ জ্ঞানাত্মক মহত্তত্ত্ব, অব্যক্ত কি না
মুলা প্রকৃতি। দশ ইন্দ্রিয়, এক মন এবং ইন্দ্রিয়গােচর পঞ্চ অর্থাৎ রূপ,
বস, গন্ধ, স্পর্শ ও শব্দ—এই পঞ্চতন্মাত্র সাংখ্যগণ প্রকৃতির এই চতুর্বিংশতি
তত্ব কহিয়া থাকেন। এই ইন্দ্রিয়াদি বিকারের সহিত ইচ্ছা, দ্বেষ,
সুখ, দুঃখ, শরীর, চেতনা, অর্থাৎ জ্ঞানাত্মক মনােবৃত্তি ও ধৈৰ্য্য,
ইহাই ক্ষেত্র বা প্রকৃতি সংক্ষেপে কহিলাম। ইহার মধ্যে-
ভূমিরাপোনলােবায়ুঃ খং মনােবুদ্ধিরেবচ।
অহংকার ইতীয়ং মে ভিন্ন প্রকৃতিরষ্টধা।
-৪৭ গীতা।

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ।
১৪৭
ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যাম, মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কার, এই
আটরূপে বিভক্ত আমার প্রকৃতি, ইহা অপরা।
অপরেয়মিতস্তস্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধি মে পরা।
জীবভূতাং মহাবাহাে যয়েদং ধাতে জগৎ।
৫| গীতা।
ইহা কিন্তু অপরা বা জড় বলিয়া নিকৃষ্টা। হে মহাবাহে ! ইহা অপেক্ষা
অন্য একটী জীবস্বরূপ আমার উৎকৃষ্ট-প্রকৃতি অবগত হও, যে প্রকৃতি
এই জগৎকে ধারণ করিয়া আছেন। এই পরা প্রকৃতিকেই শবরূপ
মহাদেব বলিয়া দেখান হইতেছে। এই শবরূপ মহাদেবের উপরেই
জগৎ স্থিতি করিতেছে ;-
এতদ্‌যােণীনি ভূতানি সৰ্বাণীত্যুপধারয়।
অহং কৃৎস্য জগতঃ প্রভবঃ প্রলয়স্তথা।
—৬৭ গীতা।
সমস্ত ভূতগণ এই প্রকৃতি হইতে উৎপন্ন জানিও। আমিই সমস্ত
জগতের উৎপত্তির নিধান এবং আমিই উহার সংহারকর্তা। শ্রুতি বলেন,
“তৎসৃষ্ট। তদেবানুপ্রাবিশৎ”—তিনি এই সংসারের সমস্ত সৃষ্টি করিয়া
তাহাতেই অনুপ্রবেশ করিলেন। শ্রুতি আরও বলেন,—“সক্ষত কথং
দ্বিদ মতে স্যাদিতি।” অর্থাৎ আমার অধ্যক্ষতা ব্যতিরেকে এই
শরীর কি প্রকারে অবস্থান করিবে? পুরুষ ইহাই চিন্তা করিলেন।
অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে।
ইতি মত্ব ভজন্তে মাং বুধ। ভাবসমন্বিতাঃ।
- ৮১• গতা।
আমি সকলের উৎপত্তির হেতু, আমাদ্বারাই সমস্ত প্রবর্তিত হয়, ইহা

১৪৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। জানিয়া পরমার্থতত্ত্বপরায়ণ বিবেকিগণ আমাকেই উপাসনা করেন; এই বিরাট উপাসনাই ব্রহ্মোপসনা। ইহা ব্যতীত ক্লেশােহধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্। অব্যক্তা হি গতিদুঃখং দেহবরিবাপ্যতে ॥ ৫|১২ গীতা। নিগুণ ব্রহ্মের উপাসনা দেহাভিমানিদিগের পক্ষে অত্যন্ত ক্লেশকর ; অর্থাৎ দেহাভিমান নষ্ট না হইলে ব্ৰহ্মপদ লাভ হয় না। দেহাভিমান দূর করিবার জন্যই উপাসনা; দেহাভিমান দূর হইলে আর উপাসনা নাই; কারণ অজ্ঞানজন্যই দেহাভিমান। সেই দেহাভিমান বা অজ্ঞান নষ্ট হইলে -- জ্ঞানেন তু তদজ্ঞানং যেষাং নাশিমাত্মনঃ। তেষামাদিত্যজ জ্ঞানং প্রকাশয়তি তৎপর। -১৬৫ গীতা। জ্ঞানের দ্বারা যাহাদের অজ্ঞান নষ্ট হয়, সূৰ্য্য যেমন তমােনাশ করিয়া সমস্ত বস্তু প্রকাশিত করেন, সেইরূপ জ্ঞানই তাহাদের অজ্ঞান বিনষ্ট করিয়া পরিপূর্ণ ঈশ্বরকে প্রকাশিত করে। তখন “ব্রহ্মবিদ ব্ৰহ্মণি স্থিতঃ”— ব্ৰহ্মজ্ঞানী ব্ৰহ্মতেই অবস্থিত করেন; তাহার পর ক্রমশােজ্ঞানের পরিপাকে “ব্রহ্মবিদ ব্ৰহ্মব ভবতি”—ব্রহ্মবি ব্ৰহ্মই হইয়া যান। অতএব যতক্ষণ প্রকৃতি, ততক্ষণ জ্ঞান ও ততক্ষণই উপাসনা। প্রকৃতি না থাকিলে উপাসনাও নাই, জ্ঞানও নাই। বেদান্তশাস্ত্র এইরূপ প্রকৃতিতত্ত্ব বিচার দ্বারা মানবকেতাতীত করেন বলিয়া বেদান্ত নাম ধারণ করিয়াছেন; ইহা ভিন্ন বেদান্ত আর কিছুই নহে। বেদান্তের ভির জ্ঞেয়, জ্ঞাত ও জ্ঞান এই ত্রিপুটীর কিছুই নাই।

এয়ােদশ পরিচ্ছেদ।
১৪৯
ব্রাহ্মণ -যে চৈতন্যশক্তি ক্ষেত্রজ্ঞস্বরূপ হইয়া জগৎকে ধারণ করিয়া
রহিয়াছেন, তাহাকে শব বলা হইল কেন?
স্বামী।-শবের যে প্রকার কোন কাৰ্য্য নাই, এই ক্ষেত্রজ্ঞ পুরুষ
যিনি, তাহারও সেইরূপ কোন কাৰ্য্য নাই বলিয়াই তাহাকে শব বলা
হইয়াছে।
ব্রাহ্মণ-প্রকৃতি স্বয়ং যখন জড়, যখন চৈতন্যস্বরূপ ক্ষেত্রজ্ঞ
থাকিলে ক্ষেত্র হইতে পারে না বা কাৰ্য্য করিতে পারে না, তখন চৈতন্যের
কাৰ্য্য নাই—ইহা কি করিয়া বলিব ?
স্বামী।-সূৰ্য্য যেমন কিছুই করেন না, অথচ সূৰ্য্য না থাকিলে
জগতের কাৰ্য্য বা কারণ যেমন নাই, সূৰ্য্য থাকাতেই যেরূপ জগতের
কাৰ্যকারণ চলিতেছে, সেইরূপ চৈতন্য থাকাতেই প্রকৃতি চলিতেছে ;
চৈতন্য না থাকিলে প্রকৃতির কোন কাৰ্য-কারণ নাই; কিন্তু চৈতন্য
নিষ্ক্রিয়।
মােধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্।
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদূবিপরিবর্ততে ।
১০৯ গীতা।
আমার অধিষ্ঠানবশতঃ প্রকৃতি, চরাচরাত্মক জগৎ প্রসব করে। হে
কৌন্তেয় ! এই জন্যই জগৎ বারংবার উৎপন্ন হয়।
উদালীনবদাসীনমসক্তস্তেষু কৰ্ম্ম।
আমি প্রকৃতির কর্মে অনাসক্ত বা উদাসীনের ন্যায় অবস্থান করি।
ময়া ততমিদং,সং জগদব্যক্তমূৰ্তিনা ।
মৎস্থানি সৰ্ব্বভূতানি ন চাহন্তেম্বৰস্থিতঃ ॥
.
--৪৯ গীতা।
আমি অব্যক্তরূপে এই নিখিল জগৎ ব্যাপিয়া অবস্থিতি করিতেছি ;

১৫০
ধর্মতত্ত্ববারিধি।
ভূতগণ আমাতে অবস্থিত, আমি সে সকলে অবস্থিত নহি। ইহাতে
আমার সর্বব্যাপকত্বে ও সৰ্ব্ব-আশ্রয়ত্বে বিরােধ নাই
ন চ মৎস্থানি ভূতানি পণ্য মে যােগমৈশ্বর।
ভূতভৃন্ন চ ভূতন্থাে মমাত্মা ভূতভাবন ।
-৫৯ গীত।
ভূতসকল আমাতে অবস্থিত নহে। আমার ঐশ্বরিক যােগ দেখ ;
আমি ভূতধারক ও ভূতপালক।
“ময়ি সর্বমিদং প্রােতং সূত্রে মণিগণাইব।
সূত্রে মণিগণের ন্যায় আমাতে এই সমস্ত জগৎ গ্রথিত রহিয়াছে।
তাহার পর ধ্যান কি বল।
ব্রাহ্মণ-শিবাভিঘোরারাবাভিশ্চতুর্দিষ্ণু সমম্বিতাং।
স্বামী।—প্রকৃতির সত্ত্বগুণাধিক্যে শবরূপ মহাদেব দর্শনের পর অর্থাৎ
আত্মজ্ঞান লাভ হইলে, পূৰ্ব্বে রজোগুণে প্রকৃতিতে যে সমস্ত শব্দ ঘাের
বলিয়া বােধ হইয়াছিল, সাত্ত্বিক গুণাধিক্যে অহা মঙ্গলময় বলিয়া প্রকৃতির
চারিদিকেই বােধ হইতেছে; কারণ—
বস্তু সূৰ্বাণি ভূতানি আত্মবােনুপশ্যতি ।
সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।
ঈশোপনিষদ্‌।
যিনি আত্মাতে সমুদয় ভূত দেখেন এবং সমুদয় ভূতে আত্মাকে দেখেন,
তাঁহার নিকট প্রকাশ সর্বময় আত্মাও অপ্রকাশ থাকেন ।
যস্মিন্ সর্বকণি ভূতানি আত্মৈবাভূদ্বিজানতঃ।
অত্র কো মােহ কঃ শােক একত্বমনুপশ্যতঃ .
-ঈশােপনিষদ।
৫

এয়ােদশ পরিচ্ছেদ।
*
।
-যখন জ্ঞানীর আত্মাই সমুদয় ভূত হয়, তখন সেই একত্বদর্শীর কি মােহ,
আর কি শোক ? আত্মজ্ঞান অর্থাৎ সমদর্শন হইলেই
সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি।
ঈক্ষতে যােগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শন।
-২৯ গীতা ।
যােগধারা সমাহিত এবং সর্ববিষয়ে সমদর্শনযােগী আত্মাকে সর্বভূতে
এবং সৰ্ব্বভূতকে আত্মাতে অবস্থিত দেখেন; যাহাদের সমদর্শন হইয়াছে,
তাহারা মঙ্গলময় দেখেন ; তাহাদের আর কিছুই ভয়ানক নাই।
রজস্তমােগুণে যাহা “ঘােরারাবা” বলিয়া বােধ হইতেছিল, তাহাই স
গুণে মঙ্গলময় বলিয়া জ্ঞান হয়।
ব্রাহ্মণ।—মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাং।
স্বামী।-মঙ্গলময় অসঙ্গ আত্মদর্শন হইলে নশ্বর প্রকৃতি, অনাদি
মহাকালের সহিত, জন্ম ও মৃত্যু—এই দুই বিপরীত ভাব লইয়া ক্রীড়া
করিতেছেন বােধ হওয়াকে “বিপরীতরতাতুরাং” বলিলেন। অথবা
“কালঃ স্বভাবঃ” কালই হইতেছে বস্তুর স্বভাব। প্রকৃতি কালের
সহিত অর্থাৎ কালানুযায়িনী প্রকৃতি বলিয়াই “বিপরীতরতাতুরাং”
বলিলেন।
তাহার পর ধ্যান কি বল।
ব্রাহ্মণ।সুখপ্রসন্নবদনাং স্মেরাননসরােরুহাং।
স্বামী।—তত্র সত্ত্বং নির্মলত্বাৎ প্রকাশকমনাময়ং।
সুখসঙ্গে বন্ধুতি জ্ঞানসঙ্গেন চানঘ।
—৬১৪ গীতা।
তিনটি গুণের মধ্যে সত্ত্বগুণ নির্মল বলিয়া প্রকাশক অর্থাৎ
জ্ঞানাসক্তির দ্বারা দীপ্তিবিশিষ্ট এবং উপদ্রবশুন্য ; তাহা সুখাসক্তি দ্বারা
;

ধৰ্ম্মতত্ববারিধি। s দেহীকে জ্ঞানাসক্তি করিয়া বন্ধ করে। প্রথমে অপ্রকাশাত্মক তমােগুণে প্রকৃতিতে জন্ম ও মৃত্যু উপদ্রবরূপ যে “করালবদনাং ঘােরাং দেখাইয়া- ছিলেন, পরে ক্রমশঃ রজোগুণাধিক্যে প্রকৃতির বহির্ম খী কাৰ্য্য দেখিয়া যে মুখকে “হসম্মুখীং” “বিচ্ছুরিতাননাং” বলিয়াছেন, এক্ষণে প্রকৃতির সত্ত্বগুণাধিক্যে প্রকৃতির অন্তর্মুখী কাৰ্যে আত্মদর্শন দেখাইয়া সেই সুখকে “সৱােৰুহাং” প্রস্ফুটিত পদ্মের ন্যায় ও “ম্মোননাং ঈষৎ আনন্দযুক্ত ; অর্থাৎ অপরােহ্মানুভূতি দ্বারা সমস্ত মুখমণ্ডলকে “সুখ- প্রসন্নবদনাং ” উপদ্রবশূন্য জ্ঞানপ্রদীপ্ত সুখ বলিলেন। এইরূপে প্রকৃতি “বিদ্যা তথৈব ক্রিয়তে ভগবদ্বিষ্ণুমায়য়া”। -(চণ্ডী) প্রকৃতি বিষ্ণুমায়া হইলেও মানবকে তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করেন। তাহার পর ধ্যান কি বল। ব্রাহ্মণ।—এবং সঞ্চিয়েৎ কালীং ধৰ্ম্মকামার্থমােক্ষদাং। স্বামী।-এই প্রকার সত্ত্বগুণে প্রকৃতির সুখ অর্থাৎ অপরােক্ষানু- ভূতি হইলে নত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ। ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মৃতঃপরম্। -১২৫ গীতা। আমি পূর্বে যে কখন ছিলাম না এমন নহে, এবং সেই রূপ তুমিও যে ছিলেন এমনও নহে; এই রাজগণও যে ছিলেন না এমন নহে; অতঃপর আমরা যে থাকিব না, তাহাও নহে। হিন্দুধৰ্ম্মের এই প্রধান, তত্ব হৃদয়ঙ্গম করিবার জন্য এবংপ্রকার ধর্ম-অর্থ-কাম-মােক্ষদায়িনী প্রকৃতিস্বরূপা কালীর চিন্তা কর; কারণ- ;

ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ। ইতি ক্ষেত্ৰং তথা আনং জ্ঞেয়ঞ্চোক্তং সমাসত। মক্ত মদ্ভক্ত এতবিজ্ঞায় মত্তাবায়ােপপদ্যতে । —১৮১৩ গীতা। এই ক্ষেত্ৰ, এই জ্ঞান, ও এইরূপ জ্ঞেয় সংক্ষেপে বলিলাম ; আমার ভক্ত ইহা জানিয়া আমার ভাব অর্থাৎ ব্ৰহ্মপ্রাপ্তির যােগ্য হয়েন। এই কালীর ধ্যানেও সেই ক্ষেত্র, ক্ষেত্রজ্ঞ ও জ্ঞানের বিজ্ঞান দ্বারা ব্ৰহ্মপ্রাপ্তির যােগ্য হওয়া যায়। য এবং বেত্তি পুরুষং প্রকৃতিঞ্চগুণৈঃ সহ। সর্বথা বৰ্তমানােহপি ন স ভূয়ােহভিজায়তে । -২৩১৩ গীতা। যে ব্যক্তি এইরূপ পুরুষের স্বরূপ অবগত আছেন এবং গুণের সহিত প্রকৃতির স্বরূপ অবগত আছেন, তিনি যে কোন রূপে অবস্থান করুন্ না কেন, তাহাকে পুনরায় আর জন্মগ্রহণ করিতে হয় না। এক্ষণে দেখ, মূর্তি-পূজার ভিতর কি সমস্ত বিষয় রহিয়াছে। অতএব মুর্তিপূজাই বর্তমান সময়ে জ্ঞানলাভের প্রধান পথ । যিনি ব্রহ্মোপাসনা করেন, তিনিও মূর্তিপূজা করেন; তবে। মূর্তিপূজা করিতে হইলে, মূর্তির প্রতি লক্ষ্য রাখিবার প্রয়ােজন;- বদস্তু শাস্ত্রাণি যজন্তু দেবা কুন্তু কৰ্ম্মাণি ভজন্তু দেবতাঃ। আত্মৈক্যবােধেন বিনাপি মুক্তিসিদ্ধতি ব্ৰহ্মশতান্তরেহপিবা। শাস্ত্রই ব্যাখ্যা করুন্ আর যজ্ঞই করুন্ বা দেবতা-পূজাই করুন্, আত্মবােধবিনা ব্ৰহ্মার পরিমিত শতকল্পেও মুক্তি নাই। ব্রাহ্মণ।—নহি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্ৰমিহ বিদ্যতে। ইহলােকে জ্ঞানের তুল্য পবিত্র আর কিছুই নাই। অতএব ১৫৪ ধৰ্ম্মতত্ববারিধি। এইরূপ আত্মচিন্তা বা ধ্যান করিলেই যখন মােক্ষ হয়, তখন পূজাদি কৰ্ম্ম কেন ? কারণ- সর্বকৰ্ম্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে। সমুদায় কৰ্ম্ম যখন জ্ঞানের অন্তর্ভূক্ত। স্বামী।—জ্ঞানং লব্ধা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি। জ্ঞানের পর অচিরে শান্তি পাওয়া যায়, কেবল জ্ঞানই যে শান্তি তাহা নহে; নাবিরতো দুশ্চরিতাশান্তো নাসমাহিতঃ। নাশান্তমানসসা বাপি প্রজ্ঞানেনৈনমাপুয়াৎ। -২৪২ কঠ। যে লােক নিষিদ্ধ ব্যবহার হইতে বিরত নহেন, সংযতেন্দ্রিয় নহেন, সমাহিতচিত্ত নহেন, যে লােক ভােগ হারহিতও নহেন, তিনি কেবল জ্ঞানের দ্বারা অত্মািকে জানিতে পারেন না। ধ্যানে যে প্রকার মূর্তি, সেই মুর্তির ভাবনায় যে জ্ঞান হয়, আর পূজা-পদ্ধতিতে যে সমস্ত কৰ্ম্ম আছে, তাহাতে যে ভক্তি হয়, সেই জ্ঞান আর ভক্তি উভয়ে অন্তর্জগৎ সৃষ্টি করেন। আমাদের মূর্তিপূজা অন্তর্জগৎসৃষ্টির সহজ উপায়; কারণ মূর্তিপূজায় জ্ঞান ও কর্ম দুই একত্রে আছে। কেবল-জ্ঞান মরুভূমির শুষ্কতা ও কেবল-ভক্তি অন্ধকারময় ; জ্ঞান ভিন্ন ভক্তি কোথায়ও নাই। জ্ঞান ভিন্নভক্তি-- শ্রুতিস্মৃতিপুরাণানি পঞ্চরাত্রিবিধিং বিনা। আত্যন্তিকী হরের্ভক্তিরুৎপাতায় প্রকল্পতে। শ্রুতি স্মৃতি পুরাণাদি বিধি বিনা যে আত্যন্তিকী ভক্তি, তাহা উৎপাত সৃষ্টি করে; যাহা বর্তমান সময়ে হইতেছে। সৰ্ব্বপ্রধান ভক্তিশাস্ত্র আমদ্ভাগবতের মঙ্গলাচরণে এইজন্যই “জন্মাদ যতঃ ; ন এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। এই বেদান্তের সূত্র ; কারণ জ্ঞান ভিন্ন ভক্তি কেবল উৎপাতের কারণ। পুরুষ আর , প্রকৃতি, অর্থাৎ জ্ঞান ও ভক্তি না হইলে অন্তর্জগৎ সৃষ্ট হইবে না। যাহাকে মূর্তিপূজা বলিয়া ঘৃণা করিতেছিলে, তাহাতে এই জ্ঞান ও ভক্তির উভয়ের কারণ একত্র সমাবেশ রহিয়াছে। আর মূর্তিপূজা সঙ্কীর্ণ উপাসনা নহে; ভাবিয়া দেখিলে অধিকারিভেদে সার্বভৌমিক উপাসনা। আমরা মূর্তিপূজাতে সাৰ্বভৌমিক মাতৃপূজা করিয়া থাকি। ব্রাহ্মণ।-বৰ্তমান সময়ে শিক্ষিত ব্যক্তিরা “জননী জন্মভূমি বর্গাদপি গরীয়সী”—এই জন্ম-ভূমির পূজাকেই মাতৃপূজা বলে। স্বামী।-আমরাও তাহাই করি। -“ত্রিশূল।”

- চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। উপায় উদ্ভাবন। (ভগবান্ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-কথামৃত হইতে উদ্ধত।) মাষ্টার। ঈশ্বরে কি করে মনে হয় ? শ্রীরামকৃষ্ণ। ঈশ্বরের নাম-গুণ-গান সর্বদা করতে হয়। আর সৎসঙ্গ ; ঈশ্বরের ভক্ত বা সাধু, এদের কাছে মাঝে মাঝে যেতে হয়। সংসারের ভিতর ও বিষয়-কাজের ভিতর রাত দিন থাকলে ঈশ্বরে মন হয় না। মাঝে মাঝে নির্জনে গিয়া তাঁর চিন্তা করা বড় দরকার। প্রথম অবস্থায় মাঝে মাঝে নির্জন না হলে ঈশ্বরে মন রাখা বড়ই কঠিন। যখন চারাগাছ থাকে, তখন তার চারিদিকে বেড়া দিতে হয়। বেড়া না দিলে ছাগল গরুতে খেয়ে ফেলে। ধ্যান করবে মনে, কোণে ও বনে। আর সর্বদা সৎ বিচার করবে। ঈশ্বরই সৎ, কিনা নিত্যবস্তু ; আর সব অসৎ, কিনা অনিত্য। এই বিচার করতে করতে অনিত্য বস্তু মন থেকে ত্যাগ করবে। মাষ্টার। সংসারে কি রকম করে থাকতে হবে ? শ্রীরামকৃষ্ণ। সব কাজ করবে, কিন্তু মন ঈশ্বরেতে রাখবে। স্ত্রীপুত্র বাপ মা সকলকে নিয়ে থাকবে ও সেবা কবে। যেন কত আপনার লােক; কিন্তু মনে জাবে যে তারা তােমার কেউ নয়। ;

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। বড় মানুষের বাড়ীর দাসী সব কাজ কচ্ছে, কিন্তু দেশে নিজের বাড়ীর দিকে মন পড়ে অছে। আবার সে, মনিবের ছেলেদের আপনার ছেলেদের মত মানুষ করে। বলে - আমার রাম, আমার হরি ; কিন্তু মনে বেশ জানে—এরা আমার কেউ নয়। কচ্ছপ জলে চরে বেড়ায়, কিন্তু তার মন কোথায় পড়ে আছে জান ?—আড়ায় পড়ে আছে। যেখানে তার ডিমগুলি আছে। সংসারের সব কৰ্ম্ম করবে, কিন্তু ঈশ্বরে মন ফেলে রাখবে। ঈশ্বরে ভক্তিলাভ না করে যদি সংসার করতে চাও, তাহলে আরাে জড়িয়ে পড়বে। বিপদ শােক তাপ এসবে অধৈৰ্য্য হয়ে যাবে। আর যত বিষয়-চিন্তা করবে, ততই আসক্তি বাড়বে। তেল হাতে মেখে তবে কাটাল ভাঙ্গতে হয়। তা না হলে হাতে আটা জড়িয়ে যায়। ঈশ্বরে ভক্তিরূপ তেল লাভ করে তবে সংসারের কাজে হাত দিতে হয়। কিন্তু , ভক্তি লাভ করতে হইলে নির্জন হওয়া চাই। মাখন তুলতে গেলে নির্জনে দই পাততে হয়। দইকে নাড়ানাড়ি করলে দই বসে না। তারপর নির্জনে বসে, সব কাজ ফেলে দই মন্থন করতে হয়, তবে মাখন তােলা যায়। আবার দেখ, এই মনে নির্জনে ঈশ্বর চিন্তা করলে জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ভক্তি লাভ হয়। কিন্তু সংসারে ফেলে রাখলে ঐ মন নীচ হয়ে যায়। সংসারে কেবল কামিনী কাঞ্চন চিন্তা। সংসার জল, আর মন যেন দুধ। যদি জলে ফেলে রাখ, তাহলে দুধে জলে মিশে এক হয়ে যায়, খাঁটি দুধ খুজে পাওয়া যায় না। দুধকে দই পেতে মাখন তুলে যদি জলে রাখা যায়, তাহলে ভাসে। তাই নির্জন সাধনা দ্বারা আগে জ্ঞানভক্তিরূপ মাখন লাভ করবে। সেই মাখন সংসার-জলে ফেলে রাখলেও মিশবে না- ভেসে থাকবে। একজন ব্রাহ্মভক্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, ঈশ্বর সাকার না নিরাকার ধৰ্ম্মতত্ববারিধি - শ্রীরামকৃষ্ণ। তার ইতি করা যায় না। তিনি নিরাকার আবার সাকার। ভক্তের জন্য তিনি সাকার। যারা জ্ঞানী, অর্থাৎ জগৎকে যাদের স্বপ্নবৎ মনে হয়েছে, তাঁদের পক্ষে তিনি নিরাকার। ভক্ত জানে, আমি একটা জিনিষ, জগৎ একটী জিনিষ ; তাই ভক্তের কাছে ঈশ্বর ব্যক্তি হয়ে দেখা দেন। জ্ঞানী-যেমন বেদান্তবাদী-কেবল “নেতি -নেতি” বিচার করে। বিচার করে জ্ঞানীর বােধে বােধ হয় যে, আমিও মিথ্যা, জগৎও মিথ্যা স্বপ্নবৎ। জ্ঞানী ব্ৰহ্মকে বােধে বােধ করে । তিনি যে কি-মুখে বলতে পারে না। কি রকম জান ? যেন সচ্চিদানন্দ সমুদ্র-কূল-কিনারা নাই—ভক্তি-হিমে স্থানে স্থানে জল বরফ হয়ে বায়বরফ-আকারে জমাট বাঁধে। অর্থাৎ ভক্তের কাছে তিনি ব্যক্ত ভাবে কখন কখন সাকাররূপ ধ'রে থাকেন। জ্ঞান-সূৰ্য্য উঠলে, সে বরফ গলে যায় ; তখন আর ঈশ্বরকে ব্যক্তি বলে বােধ হয় না, তার রূপও দর্শন হয় না। কি তিনি—মুখে বলা যায় না। কে বলবে ? যিনি বলবেন—তিনিই নাই,তার “আমি” আর খুঁজে পান না। বিচার করতে করূতে আমি-টামি আর কিছুই থাকে না; যেমন প্যাজের প্রথমে লাল খােসা তুমি ছাড়ালে, তারপর সাদা পুরু খােসা ছাড়ালে,এইরূপ বরাবর ছাড়তে ছাড়তে ভিতরে কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। যেখানে নিজের আমি খুঁজে পাওয়া যায় না—আর খুজেই বা কে?- সেখানে ব্রহ্মের স্বরূপ বােধে বােধ কিরূপ হয়, সে কথা কে বলবে ? একটা লুণের পুতুল সমুদ্র মাপতে গি’ছল। সমুদ্রে যাই নেমেছে, অমনি গ'লে মিশে গেল। তখন খবর কে দিবে ? পূর্ণজ্ঞানের লক্ষণ।—পূর্ণজ্ঞান হলে মানুষ, চুপ হয়ে যায়। তখন আমিরূপ লুণের পুতুল সচ্চিদানন্দরূপ সাগরে গলে এক হয়ে যায়, আর একটুও ভেদবুদ্ধি থাকে না। বিচার করা যতক্ষণ না শেষ হয়, লােকে ফড়, ফড়, করে তর্ব ; র চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। করে। শেষ হলে চুপ হয়ে যায়। কলসী পূর্ণ হলে, কলসীর জল আর পুকুরের জল এক হলে আর শব্দ থাকে না। কিন্তু যতক্ষণ না কলসী পূর্ণ হয় ততক্ষণ শব্দ। ভক্তের পক্ষে সগুণ ব্ৰহ্ম—অর্থাৎ তিনি সগুণ—একজন ব্যক্তি হয়ে, রূপ হয়ে দেখা দেন। তিনিই প্রার্থনা শুনেন। তােমর যে প্রার্থনা করে, তাকেই করাে। তােমরা বেদান্তবাদী নও, জ্ঞানী নও; তােমরা ভক্ত। সাকাররূপ মানাে আর না মানাে, এসে যায় না। ঈশ্বর একজন ব্যক্তি বলে বােধ থাকলেই হলাে। যে ব্যক্তি প্রার্থনা শুনেন, সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করেন, সে ব্যক্তি অনন্ত শক্তি। ভক্তিপথেই তাকে সহজে পাওয়া যায়। সবই ঈশ্বরাধীন মানুষ কি করবে? তার নাম করতে করতে কখনও ধরা পড়ে, কখনও পড়ে না। তাঁর ধ্যান করতে এক এক দিন বেশ উদ্দীপন হয়,আবার একদিন কিছুই হলাে না। কৰ্ম্ম চাই, তবে দর্শন হয়। - এক দিন ভাবে হালদার পুকুর দেখলাম। দেখি, একজন ছােট- লােক পানা ঠেলে জল নিচ্ছে, আর হাতে তুলে এক একবার দেখছে। মেন দেখালে,- পানা না ঠেললে জল দেখা যায় না কৰ্ম্ম না করলে ভক্তিলাভ হয় না,-ঈশ্বর দর্শন হয় না ধ্যান, জপ, এই সব কর্ম; তার নাম-গুণকীৰ্ত্তনও কর্ম;-দান, যজ্ঞ, এই সবও কর্ম। মাখন যদি চাও, তবে দুধকে দই পাততে হয়। তারপর নির্জনে রাখতে হয়। তারপর দই বলে পরিশ্রম করে মন্থন করতে হয়। তবে মাখন ভােলা হয়। মহিমাচরণ -আজ্ঞা , কৰ্ম্ম চাই বই কি। অনেক খাটতে হয় লাভ হয়। পড়তেই কত হয় অনন্ত শাস্ত্র !

১৬০ ধর্মতত্ত্ববারিধি ** শ্রীরামকৃষ্ণ-শাস্ত্র কত পড়বে ? শুধু বিচার করলে কি হবে? আগে তাকে লাভ করবার চেষ্টা কর, গুরুবাক্যে বিশ্বাস করে কিছু কৰ্ম্ম কর। গুরু না থাকেন, তাঁকে ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা কর; তিনি কেমন, তিনিই জানিয়ে দিবেন। বই পড়ে কি জাবে? যতক্ষণ না হাটে পৌছান যায়, ততক্ষণ দূর হতে কেবল হাে হাে শব্দ। হাটে পঁহুছিলে আর একরকম। তখন স্পষ্ট দেখতে পাবে, শুনতে পাবে। আলু নাও-পয়সা দাও- স্পষ্ট শুনতে পাবে। সমুদ্র দূর হতে হ হহ শব্দ করছে। কাছে গেলে কত জাহাজ যাচ্ছে, পাখী উড়ছে, ঢেউ হচ্চে- দেখতে পাবে। বই পড়ে ঠিক অনুভব হয় না। অনেক তফাৎ। তাকে দর্শনের পর বই, শাস্ত্র, সায়েন্স—সব খড়-কুটো বােধ হয়। বড়বাবুর সঙ্গে আলাপ দরকার। তাঁর কখানা বাড়ী, ক’টা বাগান, কত কোম্পানির কাগজ, এ আগে জান্দার জন্য অত ব্যস্ত কেন? চাকরদের কাছে গেলে তারা দাঁড়াতেই দেয় না,কাগজের খবর কি দিবে। কিন্তু যাে সাে করে বড়বাবুর সঙ্গে একবার আলাপ কর, তা ধাক্কা খেয়েই হােক, আর বেড়া ডিঙ্গিয়েই হােক; তখন কত বাড়ী, কত বাগান, কত কোম্পানির কাগজ, তিনিই বলে দিবেন। বাবুর সঙ্গে আলাপ হলে আবার চাকর দ্বারবান্ সব সেলাম কবে। একজন ভক্ত।-এখন বড়রাবুর সঙ্গে আলাপ কিসে হয় ? শ্রীরামকৃষ্ণ।—তাই কৰ্ম্ম চাই। ঈশ্বর আছেন বলে বসে থাকলে হবে না। যাে সাে করে তার কাছে যেতে হবে। নির্জনে তাকে ভাকো, প্রার্থনা কর—দেখা দাও বলে। ব্যাকুল হয়ে কঁাদ। কামিনী- কাঞ্চনের জণ্ঠ পাগল হয়ে বেড়াতে পারে; তবে তার জন্য এক চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। পাগল হও। লােকে বলুক, ঈশ্বরের জন্য অমুক পাগল হয়ে গেছে। দিন কতক না হয় সব ত্যাগ করে তাকে একূলা ডাকো। যখন জগৎ নাশ হয়, মহাপ্রলয় হয়, তখন মা সৃষ্টির বীজসকল কুড়িয়ে রাখেন। গিন্নীর কাছে যেমন একটা ন্যতা-কাতার হাঁড়ি থাকে, আর সেই হাঁড়িতে গিন্নি পাঁচরকম জিনিষ তুলে রাখে। হাঁগাে, গিন্নিদের ঐ রকম একটা হাঁড়ি থাকে। তার ভিতর সমুদ্রের ফেণা, নীলবড়ি, ঘােট ঘােট পুটলি-বাঁধা শশা-বীচি, কুমড়াে- বীচি, লাউ-বীচি, এই সব রাখে। দরকার হলে বার করে। মা ব্ৰহ্মময়ী সৃষ্টিনাশের পর-ঐ রকম সব বীজ কুড়িয়ে রাখেন। সৃষ্টির পর আদ্যাশক্তি জগতের ভিতরেই থাকেন। তিনি জগৎ প্রসব করেন, অাবার জগতের জগতের মধ্যে থাকেন। বেদে আছে উনাভের কথা । মাকড়সা আর তার জাল। মাকড়সা ভিতর থেকে জাল বার করে, আবার নিজে সে জালের উপর থাকে। ঈশ্বর জগতের আধার ও আধেয় দুই। মাষ্টার।—দয়াও কি একটা বন্ধন ? শ্রীরামকৃষ্ণ।—সে অনেক দূরের কথা। দয়া সত্ত্বগুণ থেকে হয়। সত্ত্বগুণে পালন, রজোগুণে সৃষ্টি, তমােগুণে সংহার। কিন্তু ব্ৰহ্ম সত্ত্ব- রজস্তমঃ তিন গুণের পার। প্রকৃতির পার। যেখানে ঠিক ঠিক সেখানে গুণ পঁহুছিতে পারে না। চোর যেমন ঠিক যায়গায় যেতে পারে না, ভয় হয় পাছে ধরা পড়ে। সত্ত্বরজস্তমঃ তিনগুণই চোর। সংসারই অরণ্য। এই বনে সত্ত্বরজস্তমঃ তিনগুণ ডাকাত, জীবের তত্ত্বজ্ঞান কেড়ে লয়। তমােগুণ জীবের বিনাশ করতে যায়। রজো- গুণ সংসারে বদ্ধ করে। কিন্তু সত্ত্বগুণ রজমঃ থেকে বাঁচায়। সত্ব- গুদের আশ্রয় পেলে কাম ক্রোধ এই সব তমােগুণ থেকে রক্ষা হয়। সৎ অবার জাবের সংসারবন্ধন মােচন করে। কিন্তু সত্ত্বগুণও , ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। চোর,- তত্ত্বজ্ঞান দিতে পারে না; তবে পরমধামে যাবার পথে তুলে দেয়। দিয়ে বলে “ঐ দেখ, তােমার বাড়ী ঐ দেখা যায়। যেখানে ব্ৰহ্মজ্ঞান, সেখান থেকে সত্ত্বগুণও অনেক দূরে। ব্ৰহ্ম কি, তাহ মুখে বলা যায় না। যার হয় সেখবর দিতে পারে না। একটা কথা আছে-কালাপানিতে গেলে জাহাজ আর ফেরে না। ভক্তিপথ তােমাদের পথ ; এ খুব ভাল-খুব সহজ পথ। অনন্ত ঈশ্বরকে কি জানা যায় ? আর তাকে জান্বারই বা কি দরকার ? এই দুর্লভ মানব-জন্ম পেয়ে আমার দরকার—তার পাদপদ্মে যেন ভক্তি হয়। যদি আমার একঘটি জলে তৃষ্ণা যায়, পুকুরে কত জল আছে, মাপবাব আমার কি দরকার ? আমি আধ বােতল মদে মাতাল হয়ে যাই; শুড়ির দোকানে কত মদ আছে-এ হিসাবে আমার কি দরকার ? দেখ, অমৃত-সাগরে যাবার অনন্ত পথ। যে কোন প্রকারে থােক, এ সাগরে পড়তে পারলেই হল। মনে কর, অমৃতের একটী কুণ্ড আছে। কোন রকমে এ অমৃত একটু মুখে পড়লেই অমর হবে ; তা তুমি নিজে ঝাঁপ দিয়েই পড়, বা সিড়িতে আস্তে আস্তে নেমে একটু খাও, বা কেউ তােমায় ধাক্কা মেরে ফেলেই দিক্‌-একই ফল। একটু অমৃত আস্বাদন করলেই তুমি অমর হবে। অনন্ত পথ। তার মধ্যে জ্ঞান, কৰ্ম্ম, ভক্তি, যে পথ দিয়ে যাও, আন্তরিক হলে, ঈশ্বরকে পাবে। মােটামােটি যােগ তিন প্রকার—জ্ঞানযােগ, কৰ্ম্ম- যােগ, আর ভক্তিযােগ। ১। জ্ঞানযােগ—জ্ঞানী ব্ৰহ্মকে জানতে চায়। নেতিতে

॥
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ।
বিচার করে। ব্ৰহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা—এই বিচার করে। সৎ বিচার
করে। বিচারের শেষ যেখানে, সেখানে সমাধি হয়, আর ব্রহ্মজ্ঞান
লাভ হয়।
২। কর্মযােগ-কর্মদ্বারা ঈশ্বরে মন রাখা। অনাসক্ত
হয়ে প্রাণায়ম্, ধ্যান-ধারণাদি কৰ্ম্মযােগ। সংসারী লােকেরা যদি
অনাসক্ত হয়ে ঈশ্বরে ফল সমর্পণ করে, তাতে ভক্তি রেখে সংসারের
কৰ্ম্ম করে, সেও কৰ্ম্মযােগ। ঈশ্বরে ফল সমর্পণ করে পূজা, জপ, এই
কৰ্ম্ম করার নামও কৰ্ম্মযােগ। ঈশ্বরলাভই কৰ্ম্মযােগের উদ্দেশ্য।
৩। ভক্তিযােগ—ঈশ্বরের নাম-গুণ-কীৰ্ত্তন,–এই সব ক'রে
তা’তে মন রাখা। কলিযুগের পক্ষে ভক্তিযােগ সহজ উপায়।
ভক্তিযােগই যুগধর্ম।
কৰ্ম্মযােগ বড় কঠিন। আমি আগেই বলেছি—সময় কৈ ? শাস্ত্রে
যে সব কৰ্ম্ম কতে বলেছেন, তার সময়
সময় কৈ? কলিতে
আয়ু কম। তার পর অনাসক্ত হয়ে, ফলকামনা না করে কর্ম
করা ভারি কঠিন। ঈশ্বরলাভ না করলে ঠিক অনাসক্ত হওয়া যায়
। তুমি হয়তাে জান না, কিন্তু কোথা থেকে আসক্তি এসে
পড়ে।
আবার জ্ঞানযােগও এ-যুগে ভারি কঠিন। জীবের একে অন্নগত প্রাণ,
তাতে আবার আয়ু কম। তার পর আবার দেহ-বুদ্ধি কোন মতে
যায় না। এদিকে দেহ-বুদ্ধি না গেলে একবারে জ্ঞানই হবে না।
জ্ঞানী—বলে আমি সেই ব্ৰহ্ম; আমি শরীর নই ; আমি ক্ষুধা, তৃষ্ণা,
রাগ, শােক, জন্ম, মৃত্যু, সুখ, দুঃখ-এ সকলের পার। •
(যদি রােগ, শােক, সুথ, দুঃখ, এ সব বােধ থাকে, তুমি
জ্ঞান কেমন করে হবে? এদিকে কঁাটায় হাত কেটে যাচ্ছে,
;

১৬৪ ধর্মতত্ত্ববারিধি। দরদর করে রক্ত পড়ছে, খুব লাগছে—অথচ বলছে, কৈ হাত ত কাটে নাই ;আমার কি হয়েছে ? তাই এ যুগের পক্ষে ভক্তিযােগই প্রশস্ত। এতে অন্যান্য পথের চেয়ে সহজে ঈশ্বরের কাছে যাওয়া যায়। জ্ঞানযােগ, কৰ্ম্মযােগ, আর অন্যান্য পথ দিয়েও ঈশ্বরের কাছে যাওয়া যেতে পারে; কিন্তু এ সব পথ ভারি কঠিন ভক্তিযােগ যুদ্ধ-ধর্ম—তার এ মানে নয় যে, ভক্ত এক যায়গায় যাবে, আর জ্ঞানী বা কৰ্ম্মী আর এক যায়গায় যাবে। এর মানে- যিনি ব্রহ্মজ্ঞান চান, তিনি যদি ভক্তিপথ ধরেও যান, তা হলেও সেই জ্ঞানলাভ করবেন। ভক্তবৎসল মনে করলেই ব্রহ্মজ্ঞান দিতে পারেন। ভক্ত ঈশ্বরের সাকার রূপ দেখতে চায় এবং তার সঙ্গে আলাপ ক’বতে চায় ;-প্রায় ব্রহ্মজ্ঞান চায় না। তবে ঈশ্বর ইচ্ছাময় ; তার যদি খুসী হয়, তিনি ভক্তকে সকল ঐশ্বর্যের অধিকারী করেন। ভক্তিও দেন, জ্ঞানও দেন। কলিকাতায় যদি কেউ একবার এসে পড়তে পারে, তাহলে গড়ের মাঠ, সুসাইটি, সবই দেখতে পায়। কথাটা এই, এখন কলিকাতায় কেমন করে আসি? জগতের মাকে পেলে ভক্তিও পাবে, আবার জ্ঞানও পাবে। জ্ঞানও পাবে আবার ভক্তিও পাবে। ভাব-সমাধিতে রূপ-দর্শন হয়; আবার নির্বিকল্প সমাধিতে অখণ্ড- সচ্চিদানন্দ দর্শন হয়, তখন অহং নাম রূপ থকে না। ভক্ত বলে, মা ! সকাম কৰ্ম্মে আমার বড় ভয় হয়। যে কর্মে কামনা আছে, সে কৰ্ম্ম করলেই ফল পেতে হবে। আবার অনাসক্ত হয়ে কৰ্ম্ম করা বড় কঠিন। সকাম কৰ্ম্ম করতে গেলে তােমায় ভুলে যাব তবে এলন - * {ই। তা না হয়রি ল ত পারি, সুইদিন } চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। পর্যন্ত যেন কৰ্ম্ম কমে যায়। যেটুকু কৰ্ম্ম থাকবে, সেটুকু কৰ্ম্ম যেন অনাসক্ত হয়ে রুরূতে পারি, আর সঙ্গে সঙ্গে যেন খুব ভক্তি হয়। আর যতদিন না তােমায় লাভ কতে পারি, ততদিন যেন নূতন কৰ্ম্ম জড়াতে মন না যায়। তবে যখন তুমি আদেশ করূবে, তখন তােমার কৰ্ম্ম করবাে--নচেৎ নয়।”

-
লা
**
stra
।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।
কর্তব্য।
বৎস! কলিযুগে কেবল “জপা” আর “মা” এই দুই কৰ্ম্ম।
সৎগুরুর আশ্রয় লও। গুরুর কৃপা না হলে কিছুই হবে না। সঞ্জীবনী
শক্তি উন্নত আত্মা হইতে প্রাপ্ত হওয়া যায়। সেই গুরুপ্রদত্ত ইষ্টমন্ত্র
ও গায়ত্ৰী সৰ্ব্বদা জপ কর, এবং অহেতুকী ভক্তি দ্বারা সেই মন্ত্রের
দেবতার চিত্র ও গুরুদেবের মূর্তি নির্জনে রাখিয়া, তথায় তাদের
পূজা, জপ ও প্রণাম কর। আর মনে সরলতা ভাব রাখ, সাত্ত্বিক আহার
কর, সাত্ত্বিক কৰ্ম্ম কর, যথাশক্তি মাপা অর্থাৎ দান কর। এসব করিলে
আমায় লােকে খুব যশ করিবে, মান্য হবে, ইত্যাদি ভাব একেবারে
ত্যাগ কর। তাতে ভক্তি হয় না। তুমি একজন তৃণাদপি হীন ব্যক্তি –
এরূপ মনে কর। “ভৃগুমুনির পদচিহু ধারণে” আছে,
তৃণাদপি সুনীচেন তরােরিব সহিষ্ণুনা।
অমানিনা মানদেন কীৰ্ত্তনায় সদা হরিঃ ।
যিনি তৃণ হইতে নীচ, তরুর মত সহিষ্ণু, অমানি লােককে মান দিতে
পারেন, তিনিই হরি-সংকীৰ্ত্তনের যােগােত্র। শাস্ত্রে বিশ্বাস কর।
ভগবানকে পাবার জন্য ব্যাকুল হও-কাদো, তবে তাকে পাবে। ভগবান
রামকৃষ্ণদেব বলিয়াছেন,
০

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। ; জলের ভিতর ডুবলে যেমন হাকুপাঁকু প্রাণ। তেমনি ধারা হলে পরে মিলবে ভগবান। বৎস! “উৎসব” পত্রে এ বিষয় বেশ লিখিয়াছে ; তাহা তােমায় জানাইবার জন্য বলিতেছি, শুন:- “মন সদা অশান্ত, আত্মা সদা শান্ত। মন সৰ্ব্বদা সঙ্কল্প বিকল্প তুলিয়া অশান্ত ; আর আত্মা সর্বদা সকল কার্যের সাক্ষীরূপে থাকেন বলিয়া “যাহাকে জিজ্ঞাসা কর, সেই বলিবে আমি জুড়াইতে চাই; আর জ্বলিতে পুড়িতে পারি না, আর ভাবিতে পারি না, আর ভুগিতে পারি । আমি শান্তি চাই, আমি বিশ্রান্তি চাই। “সবাই আমরা শান্তি চাই। গানে বলে -শান্তিনিকেতন ছাড়ি কোথা শান্তি পাবে বল ? তবে একটী শান্তিনিকেতন আছে, যেখানে চিরশান্তি বিরাজিত। “কোথায় সেই শান্তিনিকেতন? শ্রীভগবান্‌ই সেই শান্তিনিকেতন। তাঁহাকে আশ্রয় কর-শান্তি পাইবে। স্মরণ রাখ—মনের সত্তা যাহা, তাহাই শ্রীভগবান্। শ্রীভগবান্ মন্ত্ররূপী হইয়াও মনকে মনন হইতে ত্রাণ করেন। “কৰ্ম্ম না করিয়া মানুষ ত একদণ্ডও স্থির থাকিতে পারে না সঙ্কল্প বিকল্প না তুলিয়া মানুষের মন সজ্ঞান অবস্থায় এক দণ্ডও ত শান্ত হইয়া থাকিতে পারে না;—তবে শান্তি কিরূপে পাইবে ? মন শান্ত হইলে যদি শান্তি না পাওয়া যায়, আবার মনের স্বভাবই যখন হইতেছে সংসার-আড়ম্বর তােলা, তুখন মন কিরূপে শান্ত হইবে ? “মন সৰ্ব্বদাই একটা-না-একটা লইয়া জ্বলিতেছে সত্য। ভিতরে সঙ্কল্প বিকল্প, আর বাহিরে স্কুলসঙ্কল্প পুঞ্জীকৃত হইয়া এই প্রকৃতির মশাল তাণ্ডব নৃত্য ! বাহিরের জগতের ঘটনাপুঞ্জ একদিন সঙ্কল্পই ১৬৮ ধর্মতত্ত্ববারিধি। ছিল; পুনঃ পুনঃ আবর্তনে ভিতরের বস্তু বাহিরে আসিয়া স্থূল হইয়া দাড়াইয়াছে। “ভিতরে বাহিরে প্রকৃতির নৃত্য; বল শান্তি এখানে কোথায় ? “কৰ্ম্ম তছাড়িতে পারি না। কৰ্ম্ম আজকালকার জগৎ ছাড়িতেও চায় না। কিন্তু শান্তিও চাই। কি হইবে ? “শ্রীগীতার শরণাপন্ন হও। শ্রীগীতা, বলিতেছেন—কৰ্ম্মের ভিতরে একটি বিশ্রাম আছে,-অশান্তির মধ্যে একটি চিরশান্তি রহিয়াছে। তুমি যদি ইহা ধরিতে পার, তবে কৰ্ম্ম করিয়াও তুমি শান্ত থাকিতে, পারিবে। “কৰ্ম্মণ্যকৰ্ম্ম যঃ পশ্যেৎ।” কর্মে যিনি অকৰ্ম্ম দেখেন, তিনি সর্বকৰ্ম্ম শেষ করিয়া শান্ত হইয়াছেন। এখন দেখ—অকৰ্ম্ম কি ? অকৰ্ম্ম বলে তুষ্ণীম্ভাবকে। তুষ্ণীম্ভাবই বিশ্রাম। বিশ্রামই সন্তুষ্টভাব। ইহাই কর্মশূন্য অবস্থা। ইহাই বিশ্রান্তি। কিরূপে ইহা বুঝিব? “একটু বিচার কর, বুঝিতে পারিবে। মন সঙ্কল্প বিকল্প তুলিতেছে । মনটি সূক্ষ্মপ্রকৃতি। আবার প্রকৃতি বাহিরে শত শত ঘটনা ঘটাইতেছে। এই দুই প্রকৃতি তােমার পশ্চাতে লাগিয়াছে, তাই তুমি জুড়াইতে পার না। “কেন জুড়াইতে পার না—জান ? তুমি ভাব, তুমি প্রকৃতির তাড়নাই পাইতেছ। কিন্তু যেখানে প্রকৃতি আছেন, সেইখানেই তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে সেই শান্তিনিকেতন পুরুষ আছেন। সেই পুরুষ সদাই শান্ত ; সেই পুরুষ-প্রকৃতির দ্রষ্টা; সেই পুরুষ সৰ্বসাক্ষী। তিনি উদাসীনের মত প্রকৃতির কাৰ্যমাত্র দেখেন। তুমি শুধু প্রকৃতিকে যতক্ষণ দেখিবে, ততক্ষণ তােমার সব ভুল হইয়া যাইবে। কিন্তু পুরুষকে যদি দেখ পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ। তবে দেখিবে -প্রকৃতি এই পুরুষকে কিছুতেই মুগ্ধ করিতে পারেন না। প্রকৃতির সে শক্তি নাই। “ধান্না স্বেন সদা নিরস্ত কুহকং”- তিনি আপন মহিমায় মায়ার সমস্ত কুহক নিরস্ত করিয়া আপন-গৌরবে সদা গৌরবান্বিত,—তিনি আপন গরবে আপনি বিরাজিত,—আপন শান্তিতে আপনি চিরশান্ত। তুমি এই দ্রষ্টা পুরুষের দিকে একবার চাহিতে শিক্ষা কর,-তুমি এই সৰ্বসাক্ষী পুরুষের আশ্রয় একবার গ্রহণ কর ; দেখিবে—প্রকৃতি আর তােমাকে অশান্ত করিতে পারিবে না। “সহজভাবে বল, কি করিয়া এই পুরুষকে দেখিব? প্রথমে মােটামুটি এই তত্ত্ব শুনিয়া বিশ্বাস কর-প্রতিকর্মের মূলে এই অকৰ্ম্ম বা তুষ্ণীম্ভাব রহিয়াছে। মনের সত্তাটিই এই পরম শান্ত তুষ্ণীস্তাব। ইহাই শ্রীভগবান্। চঞ্চল তরঙ্গের কোলে স্থিরসাগর রহিয়াছে। স্থিতি ভিন্ন গতির খেলিবার স্থান নাই। বিশ্বাস রাখ-পরমপুরুষ সর্বদা সৰ্বস্থানে সর্ববস্তুর মধ্যে বিরাজিত। “দ্বিতীয় কথা, যখন নিজে তাঁহাকে বুঝিতে পার না, তখন তাহাকে প্রণাম করিতে শিক্ষা কর। শুধু প্রণাম কর অভ্যাস করিতে পারিবে । তিনি অবতার গ্রহণ করিয়া তাহার ভক্তকে উপদেশ করেন- মাং নমস্কুরু। তাহার নাম জগতে প্রচারিত হইয়াছে। প্রণব বীজ ও নাম লইয়া মন্ত্র। মনন হইতে ত্রাণ করেন বলিয়াই তিনি মন্ত্র। মন্ত্র জপ কর, আর প্রণাম অভ্যাস কর। “মসপে সর্বদা প্রণাম অভ্যাস কর। কোথায় তিনি নাই ? এই আকাশ, এই বায়ু, এই পৃথিবী, এই জল, এই অগ্নি, এই অসংখ্য জীব, অসংখ্য তরুলতা,—এই বিশ্বের যেখানে যা আছে,—শত্রু মিত্র, সুন্দর কুৎসিত, সকলের মধ্যেই যখন তিনি আছেন, তখন সৰ্ব্বদা তাহার নাম ও, আর মনে মনে প্রণাম কর,-এই মূল সাধনা-দ্বামা-বিশ্বাসের ১৭০ ধৰ্ম্মতত্ত্ববারিধি। - ধৰ্ম্ম ছাড়াইয়া ভক্তির ধৰ্ম্মে যাইতে পারিবে ; ক্রমে ভক্তির দ্বারা তত্ত্বজ্ঞানে পৌছিবে। “শাস্ত্রও বলেন, সর্বজীবে নারায়ণ আছেন। তুমিত ইহা মনে রাখিতে সকল সময়ে পার না। কতবার ভাবিয়াছ-মনে রাখিবে ; আবার কতবার ইহা ভুলিয়া গিয়া রাগদ্বেষের কাজ করিয়া ফেলিতেছ। তাই বলি, অল্পে অল্পে সাত্ত্বিক আহারটা অভ্যাস কর। কারণ শ্রুতি বলেন, “আহার শুদ্ধৌ সত্ত্বশুদ্ধিঃ সত্ত্ব শুদ্ধাহ বা স্মৃতি।” আবার, নূতন করিয়া আরম্ভ কর। প্রথমেই তােনার উপাস্য দেবতার একটি মূর্তি নিজের সাধনা-গৃহে রাখ ; রাখিয়া নিত্যক্রিয়া-অন্তে তাহাকে মন্ত্র জপ দ্বারা বহুক্ষণ প্রণাম অভ্যাস কর। বাহিরে যখন আসিবে, তখন যে বস্তু বা যে মনুষ্যকে দেখিতে পাইবে, তাহাকে দেখিয়াই ভাবনা কর—“কোথায় তুমি?” “কোথায় তুমি প্রভু!” বলিয়া তাহাকে খুঁজিতে থাক, আর মন্ত্র জপ করিতে করিতে প্রণাম করিতে থাক। মনে মনে প্রার্থনা কর বিশ্বাস করি তুমি সৰ্বত্ৰ আছ, কিন্তু দেখিতে ত পাই না। তাই নিরন্তর তােমার নাম লইতে চাই, আর তােমায় প্রণাম করিতে চাই। তুমি প্রসন্ন হও—হইয়া আমার গতি কর। হে প্রভু! আর আমি কিছুই চাই ; তুমি প্রসন্ন হও-ইহাই আমার প্রার্থনা। আমি যেন এক ক্ষণকালও তােমায় ভুলিয়া না থাকি। বায়ু যেমন একদণ্ডও আপন স্পন্দভাব ত্যাগ করে না, সেইরূপ আমিও যেন এক ক্ষণকালও তােমার নাম করিতে করিতে তােমাকে প্রণাম করা বিস্মৃত না হই।” “প্রণাম কর আর নাম কর, নিরন্তর কর। যাহা দেখ, তাহাই তিনি ভাবিয়া, সৰ্ব্বদা কৰ্ম্মটি লইয়া থাক। কর্মে অকৰ্ম্ম-এই ভাবে অভ্যাস করিয়া দল। শুভ হইবে। " শান্তি পাইবে।” সমাপ্ত।

No text on this page.

প্রাপ্তিস্থা
দৈনিক চন্দ্রিকা আফিস,
১৪ নং মদন বড়াল লেন, বহু বাজার,
কলিকাতা ;
শ্ৰীকরালীচরণ চক্রবর্তী
এথােড়া, সীতারামপুর

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dharmatattwa-baridhi

Author
Chakraborty,karalicharan
Title
Dharmatattwa-baridhi
File name
Dharmatattwa-baridhi
Text
OCR done
Citation
1913
Published
2010/04/19
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
188
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Epics
Keywords
Jatibhed
DLI number
515516
Barcode
4990010016251.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
xLApiRNFKrI
Download PDF

Dharmatattwa-baridhi