Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Prabhath-kusum

Dhar,sharachchandra · 2009/11/28

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

প্রভাত-কুসুম
“অবলা-বান্ধব,” “সদ্ভাব-কুসুম” প্রভৃতি প্রণেতা
শ্ৰীশরচ্চন্দ্র ধর প্রণীত।
সত্যমেব ব্রতং যস্য দয়া দানে সদা ।
কামক্রোধৌ বশে য তেন লোকত্রয়ং জিং।
মহানিৰ্ব্বাণ।
কলিকাতা
১০১ নং কর্ণওয়ালিশ ট–বেঙ্গল মেডিক্যাল লাইব্রেরী হইতে
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত।
১২৯৮।
মূল্য ! ৫, আট জানা ।

No text on this page.

পূ ব ব জে র । র ব, বহুমানাস্পদ সজ্জনবরেণ্য শ্ৰীযুক্ত বাবু মনােমােহন ঘােষ। মহাত্মন, জীবনের দুরধিগম্য বন্ধুর পথে, নিরাশার নিবিড় অমা-আঁধারে তরঙ্গায়িত তটিনীবক্ষে লক্ষ্যহীন তরীর ন্যায় এতদিন অবসন্ন প্রাণে অবিশ্রান্ত ঘুরিতে ছিলাম। কত ভয়, কত আশঙ্কা, দুরাশার মর্মন্তুদ প্রহার আমার যৌবন-সুলভ-কোমল চিত্তকে অতিমাত্র অস্থির করিয়া তুলিয়াছিল। দুঃসাধ্য জীবন-ব্রতে, কঠোর কর্তব্য-পথে, নিরন্তর ঃ পরাজিত চিত্তে কত কি দুঃখের স্বপ্ন দেখিতেছিলাম। বক্ষঃস্থল ক্ষত, দেহবল হত, অথচ প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে ঘােরতর জীবন-সংগ্রাম ভবিষ্যৎ অন্ধকার, বর্তমান শশাচনীয়, কিছুতেই চিত্তের স্থৈর্য সম্পাদন করিতে পারি নাই। কিন্তু আপনার আশীৰ্ব্বাদে, ততােধিক আপনার দয়া ও অনুগ্রহে, জীবনের দুরধিগম্য বন্ধুর পথে, দুর্দিনে, আমার নিবিড় আঁধারে যে আশা ব্রততীর লাবণ্য-জ্যোতিঃ আমাকে পথ । দেখাইয়া দিতেছে, তাহাই এখন আমাকে প্রিয়কারিণী দেবীর ন্যায় স্নেহের সুকোমল হস্তে সুস্থ ও সান্ত্বনা করিতেছে। “প্রত-কুসুম” o সেই আশা-লতার একটি ফুল——সৌরভ-বিহীন ফুল। মহাত্ম, যদিও আপনার পূজার উপযােগী ফুল আমার পক্ষে দুর্লভ, তথাপি আন্তরিক ভক্তি-উচ্ছাসের আতিশয্য নিবন্ধন, এই হীন-সৌরভ কুসুমটিকেই আপনার পবিত্র নামে উৎসর্গীকৃত করিলাম। করিয়া কৃতার্থ হইলাম। ভরসা করি, কদাচ আপনার দয়ার কোমল প্রাণে এই অকিঞ্চিৎকর ভক্তির উপহার উপেক্ষিত হইবে না। আপনার স্নেহানুগত শ্ৰীশরচ্চন্দ্র ধর।

বিজ্ঞাপন। “ প্রভাত-কুসুম ” প্রকাশিত হইল। আমার লিখিত কবিতা- সমষ্টি হইতে যে সকল কবিতা সাহিত্য-শিক্ষার্থী ছাত্রগণের অধ্যয়নের উপযুক্ত বােধ করিয়াছি, ইহাতে সেই সমুদয় কবিতাই সন্নিবেশিত করিতে সাধ্যানুসারে চেষ্টা পাইয়াছি। কিন্তু কতদূর কৃতকার্য হই- য়াছি বলিতে পারি না। যদি “ প্রভাত-কুসুম ” কোন অংশেও ছাত্রগণের হিতকর ও সুখপাঠ্য হয়, তাহা হইলে আমার সকল যত্ন ও শ্রম সার্থক জ্ঞান করিব । উপযুক্ত বােধে মংপ্রণীত “ সদ্ভাব-কুসুম ” হইতে “ জীবন-যুদ্ধ, “ঈশ্বর মিলন-আশা,” “প্রকৃতি মা” ও “যমুনা-পুলিনে” শীর্ষক কবিতাগুলি পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত করিয়া বর্তমান গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট করিলাম। এস্থলে কৃতজ্ঞ হৃদয়ে প্রকাশ করিতেছি যে, আমার শুভানুধ্যায়ী শ্রদ্ধাস্পদ বন্ধু, সুযােগ্য নব্যভাৱত-সম্পাদক শ্রীযুক্ত দেবীপ্রসন্ন রায়- চৌধুরী এবং সুযােগ্য সারস্বত পত্র সম্পাদক শ্ৰীযুক্ত উমেশচন্দ্র বসু মহাশয় “ প্রভাত-কুসুম ” মুদ্রণ সম্বন্ধে আমার সাহায্য করিয়াছেন, এজন্য তাহাদের নিকট চির বাধিত রহিলাম। ইতি- স কলিকাতা, শ্ৰীশরচ্চন্দ্র ধর। ১ লা আষাঢ়-১১ ৯৮।

সচীপত্র। ••• • • • ১ - ••• ••• * • • ১৭ ••• ••• ১৮ • • * • ২৮ ••• ৩২ ••• ৩৮ বসন্ত-উষায় চরিত্র তরু-জীবন চকোর ও ঈশ্বর প্রেমিক জীবন-যুদ্ধ ঈশ্বর-মিলন-আশা নিদাঘে: চাতক প্রদীপ ও পতঙ্গ প্রদোষে নদীতটে কামনা চৈতন্যের গৃহত্যাগ চণ্ডাল বেশে রাজা হরিশ্চন্দ্র মেঘাচ্ছন্ন রজনীতে দুঃখাকুল যুবক যমুনা-পুলিনে প্রকৃতি মা ••• ••• ৩৯ + + । • • • ••• ••• ৪৫ ... ••• ••• ৪৯ ••• * •• ••• ••• ••• ••• ••• ••• ৫৬ ৬৪ ৭৩ ৮১ ৮৭ ৮৬ ••• । মেঘনার কলে ••• ••• ••• •••

প্রভাত-কুসুম !
বসন্ত-উষায়।
নবীন-নীরদ-কান্তিনভােনীলিমায়,
ভুবনমােহিনী ঊষা নাচিয়া বেড়ায় ;
মুখভরা হাসি তার,
ঝরিতেছে অনিবার,
পীযূষ-প্রসূন যেন ঝরে মৃদু বায় ।
কিশাের গগনােপরি,
কি মাধুরী মরি মরি ।
স্বরগ সুষমা যেন ফুটিছে ধরায় ;
সুখের হিল্লোল বুকে,
আধ ভাঙ্গা ঘুম চোকে,
গগন-উদ্যানে পশি, মধুর ঊষায়,
যেন সুরবালা কুল,
তুলিতে তারকা-ফুল,
উছলে কনক হাসি রূপের প্রভায়।

প্রভাত-কুসুম । এক- স্বচ্ছ সরসীর নীরে, কমল-কাননে, ললিত সংগীত ফুটে ভ্রমর গুঞ্জনে ; রাজহংস দলে দলে, বিষদ সরসী-জলে, সন্তরে মৃণাল লােভে হরষিত মনে । শীকর জড়িত বায়, হেসে খেলে চলে যায়, উষা-অলঙ্কত ধরা দলিয়া চরণে। বায়ুভরে দুলি’ দুলি’, বিকচ কুসুম গুলি, হাসির জ্যোছনা ঢালে নিভৃত কাননে । নীরবে ভূরুহ-রাজি, ফুল-ফুল-সাজে সাজি, চেয়ে আছে অবিচল আকাশের পানে, ফুলময়ী বনবালা প্রফুল্ল হিয়ায়, চারু করে গাঁথে মালা, শ্যাম লতিকায় হিমকণা-কণ্ঠহার, শিরােমণি সুষমার, বিলম্বিত শ্যামতরু-পল্লবিত করে;

বসন্ত-উষায় ।
৩
প্রেম-ভক্তি-ফুল্ল মনে,
প্রাণের উপাস্য ধনে,
দিতে যেন উপহার যত্নে সমাদরে।
তরুণ তপন কর,
মরি কিবা মনােহর,
হিম-সিক্ত তরুপত্রে হাসিয়া বেড়ায়।
বিনােদ বিপিনে বসে,
উষা-মহােৎসবে ভেসে,
শ্যামা দেয় শিশ, আহা শ্রবণ জুড়ায় !
কোকিল আকুল গানে,
ডাহুক ডাকিছে বনে,
গুঞ্জরে মধুপ কুল প্রমােদহিয়ায় ;
তালতরু-শ্যাম-শিরে সমীর খেলায়।
মধুর ধরায় কিবা অতুল মাধুরী;
সৌন্দর্য্যের শত সিন্ধু উছলিছে মরি ।
জগত্ জননী যেন,
আনন্দ উষায় হেন,
জগত্ সন্তানে বুকে করিয়া ধারণ,
( সযতনে স্নেহভরে চুম্বিছে বদন ;)

৪
প্রভাত-কুসুম ।
মধুর্থ পুতুল সম,
প্রাণ-পুত্র প্রিয়তম,
সেহের জননী যথা স্নেহ-বুকে ধরি
( ঢালে স্নেহ-সুধাসিন্ধু, অহ মরি মরি !)
জননীর স্নেহে গলে,
ভাসিয়া হিমাশ্রুজলে,
জগত্ কি যেন যাচে জননীর পাশে,
ভগ্ননিদ্র শিশু যথা ভােজন প্রয়াসে।
হাস্যময়ী প্রকৃতির শরদিন্দু বদনে,
শােভার মাধুরী রাশি উছলিছে সঘনে ।
চির শােভাময়ী ধরা,
সুখ-সুধারস ভরা,
কে বলে আনন্দ ধাম, নাহি এই ভুবনে ?
কে বলে রে ধরাতল,
পাপ ত্রিতাপের স্থল ?
নিয়ত সুখের স্রোতঃ প্রবাহিত যেখানে।
এই সুধা-সুষমায়,
যে জন না সুখী হায়,
সে কি ভাবে সুখী কভু, ধন-জন-স্বপনে ?

বসন্ত-উষায়।
সৌন্দর্যের লীলাভূমি
এ জগতে জে’ন তুমি,
শােভনা প্রকৃতি সদা, ঢালে সুখ জীবনে
সুষমা-পীযূষ ধারে,
সুখময়ী বসুধারে,
রচিলেন যেই শিল্পী, নমি তাঁর চরণে।
ভ্রম নিদ্রা পরিহর,
কেন সুপ্ত নিরন্তর
ওরে ভ্রান্ত মূঢ় মন ! দেখ জ্ঞান-নয়নে,
তারি প্রীতি ফুলবনে,
রবি-শশি-সমীরণে,
অঁরি স্নেহ-ভালবাসা প্রকৃতির বদনে ;
মাতৃ প্রাণে স্নেহ ভঁর,
কি ছার সুধার ধার !
অতুল জগতে তাহা, দেখ জ্ঞান-নয়নে।
অন্তর অমৃত নদী,
চাও সুখ-শান্তি যদি,
ঢেলে দাও সেই প্রেম-জলধির চরণে,
বাজাও হৃদয়-বীণা, প্রেমানন্দ-জীবনে।
or ..

চরিত্র
নিরমল যামিনীর নােনীলিমায়,
পূর্ণকল শরদিন্দু যেমন সুন্দর ;
সেইরূপ মণিপূর্ণ চারু বসুধায়,
আছে দিব্য রত্ন এক দেব-মনােহর ;
সরিৎ-সরসী-নীরে, অরুণ আভায়
প্রসন্ন কমল-মুখ যেমন সুন্দর ;
সেইরূপ মণিপূর্ণ চারু বসুধায়,
আছে দিব্য রত্ন এক দেব-মনােহর ;
বিহগ কূজিত বনে, মধুর ঊষায়
কুসুমের হাসি-মুখ যেমন সুন্দর ;
সেইরূপ মণিপূর্ণ চারু বসুধায়,
আছে দিব্য রত্ন এক দেব-মনােহর ;
নীরব নিশীথে, স্বচ্ছ তটিনীর গায়
হিল্লোলে জ্যোছনা হাসি যেমন সুন্দর ;
সেইরূপ মণিপূর্ণ চারু বসুধায়
আছে দিব্য রত্ন এক দেব-মনােহর ;

চরিত্র।
জগতের অতিপ্রিয়, অতুল সে ধন,
জীবনের শুভপ্রদ; ত্রিদিব-সােপান ;
মানুষ দেবতা হয় লভি সে রতন,
সংসারে দুর্লভ, চির সুখের নিদান ।
চরিত্র—সাধুতা সম কি ধন জগতে ?
তুচ্ছ সে সম্প রাশি, যার মােহাবেশে
অহঙ্কত, আশালুব্ধ, ধাবিত কুপথে,
নিয়ত দগধ নর কুচিন্তার বিয়ে !
নরললাকে নিত্যপূজা হৃদয়-মন্দিরে,
ভক্তিশ্রদ্ধা-ফুলদলে সাধু সাধুতার ;
দুজ্জনতা চির হেয়, অসাধুর শিরে
পড়ে শত পদাঘাত-বজের প্রহার ।
নিৰ্ম্মল-স্বভাব সাধু সদা সহৃদয়,
পথের কাঙ্গাল যদি, নহে তুল্য তাঁর
ভােগ-সুখে অভিলাষী অতৃপ্তহৃদয়,
কুস্বভাব, নীচাসক্ত ধরণীঈশ্বর !
চিরদিন শােভে মণি মস্তক-মুকুটে,
উজ্জ্বল প্রভায় তার দীপ্ত চরাচর
•

प
প্রভাত-কুসুম।
'দৈবেতে পতন হায় যদি পঙ্কে ঘটে,
সাদরে মস্তকে ধরে জহরী নিকর ।
অই যে চরিত্রহীন, মণিবিমণ্ডিত,
চঞ্চল, গরল-মুখ, ক্রুর বিষধর,
কে তারে আদরে ? দুষ্ট চির কলঙ্কিত
বলে দেখ করে ঘৃণা সবে নিরন্তর ।
হতে পারে তৃণাশ্রিত বিভাবসু প্রায়,
দপ্ করে ক্ষণস্থায়ী লৌকিক উন্নতি,
পরম অধৰ্মচারী মানবের হায়,
ধ্রুব সত্য পরিণামে অশেষ দুর্গতি ;
প্রভঞ্জন-বিস্ফারিত তরঙ্গ সলিলে
ভগ্নতরী আরােহীর বিপদ যেমন ;
অসাধুর—জর্জরিত কলঙ্ক-গরলে—
লাঞ্ছনা, তাড়না, মৃত্যু নিশ্চয় তেমন।
পাপীর বাহ্যিক দেহ যদিও সুন্দর,
অন্তর্দেহে জ্বলে সদা খর তুষানল,
ভস্মাশ্রিত বহ্নি যথা; হায় নিরন্তর
;
সংগােপনে ঝরে কত নয়নের জল !

চরিত্র।
অসাধুর কি দুর্গতি ! অসাধু যে জন,
নিন্দে তারে পাপী ব’লে সহযােগী তার ;
অবিশ্বাসী কলঙ্কী সে,—বিশ্বাসে কখন
নাহি এক কপর্দকে, অন্য কথা ছার।
কে না জানে পােড়ে পাপী নরক অনলে ?
কে না বুঝে অসাধুর বিপন্ন জীবন ?
কে না দেখে ভাসে পাপী নয়ন সলিলে ?
কিন্তু নাহি করে কেহ স্বভাব শােধন ।
ধিক্‌ তারে ! নাহি যার সাধুতা সম্পদ।
জগতের চির শত্রু ঘৃণিত সে জন;
অবিরত অনিবাৰ্য বিষম বিপদ,
মেদিনী মাঝারে তার জঘন্য জীবন !
সাধুতার সুখময়ী শীতল ছায়ায়,
শান্তির সাগরে মগ্ন হয়েছে যাহারা,
সম্ভোগে স্বর্গীয় সুখ, দুঃখের ধরায় ;
সংসার-ললাম আহা! কেবলি তাহারা।
চরিত্র,অমূল্য নিধি, লভিতে বাসনা
আছে যদি প্রিয়গণ ! কর প্রাণপণ ;

প্রভাত-কুসুম।
একটী সামান্য দোষ হেলায় পােষ’না,
রে’খ সদা আত্মপ্রতি জাগ্রত নয়ন।
ধন্য হবে নর জন্ম ; জগত্ সংসারে,
হবে তব নিদর্শনে শতেকের পথ।
ঈশ্বরের প্রীতিসুধা দিব্য পুরস্কার,
পাবে শান্তি, হবে সুখ, পূর্ণ মনােরথ ।
তরু-জীবন।
চারু প্রকৃতির নিভৃত নিকুঞ্জে,
কিবা শােভে তরু শ্যামল সুন্দর!
ইচ্ছা হয় সদা দেখি আঁখি ভরে,
মরতের এই তরু মনােহর।
শ্যামল পল্লবে পল্লবিত দেহ,
শ্যাম অঙ্গে শােভে নবীন বল্লরী,
ফুটে ফুল দল, জনমে সুফল,
অতুল সে শােভা, যাই বলিহারি ?

তরু-জীবন।
১১
বন-রঙ্গভূমে চির বাসস্থান ;
প্রকৃতি যথায় নিয়ত খেলায়,
কবিতা-আরামে শীতলে হৃদয়
প্রকৃতি-প্রেমিক ভাবুক যথায়।
ধ্যান-পরায়ণ মুনি মহাজন
সে নিভৃতে করে কুটীর স্থাপন ;
সে নিভৃতে বসে, মনের হরিষে,
চিন্তে চিতে তারা বিভুর চরণ।
সে নিভৃত কোলে, সদা কুতুহলে
চরে মৃগপাল সুখে করে কেলি ;
সদাই প্রফুল্ল তাদের অন্তর,
আনন্দ উৎসব করে সবে মিলি।
পাখী করে গান সুললিত সুরে,
শ্যামা দেয় শিশূ শ্রবণ মধুর ;
দোলে শ্যাম লতা মৃদুল হিল্লোলে,
একতানে ঝিল্লি বাজায় নূপুর।
সুখে বনবালা গাঁথে ফুলমালা,
অমৃতের কণা কুসুমের হাসি ;

১২
প্রভাত-কুসুম।
বহে মন্দ বায়ু সলিল-শীতল,
বৃন্দারক যার চির অভিলাষী।
কুসুম সৌরভে সুবাসিত বন ;
নিষ্কাম প্রকৃতি অমৃত বিলায় ;
লভি সে অমৃত আনন্দ-হৃদয়ে
ভাব-রসে ভেসে ভাবুক বেড়ায় ।
বসন্তের শােভা সে অমর পুরে ;
প্রভাত-উৎসব দেখ বুকে তার ।
সে আনন্দ ধামে বিটপী নিচয়
নিয়ত নিবসে ;—আনন্দ অপার !
কত সুখে যেন বিরাজে কাননে
গভীর হৃদয়ে, শান্তি সম্মিলনে ;
ধ্যান-মগন যােগীজন যথা,
চিরারাধ্য দেবে চিন্তে মনে মনে।
নশ্বর ঐশ্বর্যে গর্বিত হৃদয়
মানুষের ভাগ্যে সেই সুখ কই,
জগতে অতুল তরুর জীবন,
তরু-পদধূলি (ও) আমরা ত নই।

তরু-জীবন ।
নাহি হিংসা দ্বেষ, পাপ-অভিনয়,
পরনিন্দা মুখে নাহিক কখন ;
বর্ধিত সুখেও নহে অভিভূত,
দুখেও না হয় আকুলিত মন ।
মণিমুক্তা হার গাঁথি দাও গলে,
হবে না অন্তরে সুখের বিকার ;
কহিবে না কটু সরােষ নয়নে
চারু কলেবরে হানিলে কুঠার !
আতপ-তাপিত পথশ্রান্ত জনে
ছায়াদানে করে কত উপকার ;
আহা! সমভাবে সকলি সতত
স্নেহ-করুণার অধিকারী তার ।
সুফল শােভিত যবে তরুগণ,
অবনত শিরে থাকে অনুক্ষণ;
মানুষ সধন হয় যদি কভু
তৃণ্য তুল্য গণে বিপুল ভুবন।
কত অহঙ্কার ! কত পাপাচার ।
পাদভরে কাঁপে বিশ্ব চরাচর ।

১৪
প্রভাত-কুসুম।
কলুষ-গরল দু’হাতে তুলিয়া
ঢালে আপনার মুখের ভিতর ।
কে বলে মানুষ সাধু সহৃদয় ?
পরার্থ হরণে সদা আকুলিত !
স্বার্থ সাধনার হলে প্রয়ােজন,
নররক্তে ধরা করে কলঙ্কিত।
কিন্তু, দেখ এরা নিঃস্বার্থ কেমন,
জগতের তরে প্রসবে সুফল !
নিজে দগ্ধ হয়ে খর রবি করে
আশ্রিতেরে করে ছায়ায় শীতল !
ফল ফুল দিয়া করে কত হিত,
প্রতিদানে তার কিছুই না চায় ;
পীড়িত হলেও অকুণ্ঠিত দানে ;
নিয়ত নিরত অতিথি সেবায়।
;
আহা! কি নিষ্কাম ধৰ্ম্ম অনুষ্ঠান,
জগতে কি আছে তুলনা ইহার ?
কি মধুর হিয়া-পীযূষ পূরিত,
অবনীতে নাই এমনটি আর ।

তরু-জীবন ।
এই যে শ্যামল বিটপী নিবহ,
মানুষের মত নহে অসরল ;
কাপট্য-বসনে করি কায়াবৃত
পর সুখে কভু ঢালে না গরল।
মানুষের মত নাহি দেয় এরা
আপনার পথে আপনি কণ্টক ;
নাহি চপলতা, নাহি তরলতা,
মানুষের মত নহে প্রবঞ্চক।
নহে মদমত্ত বিষয় সেবায়,
আসক্তির দাস নহে কদাচন,
নাহি সুখ-তৃষা, দুখের বেদনা,
সংসার সন্ন্যাসী যােগীর মতন।
আঁখি যদি থাকে দেখুক যে চাহে,
কিবা শান্তিময় তরুর জীবন!
যদি সুখী থাকে, তবে তরু ভবে,
নর-ভাগ্যে সুখ সুদূরপন ! ,
ধন্য তরু! ভবে জনম তােমার ;
নিরখিয়া তব পবিত্র জীবন,

প্রভাত-কুসুম।
=
আনন্দ আহাদ ধরে না হৃদয়ে,
অশ্রুজলে মম তিতিছে নয়ন।
সকুঠার করে ছিন্ন করে মূল
তবু ঘাতকেরে কর ছায়া দান।
ধন্য ধন্য তব মধুর হৃদয় !
তব সম ভবে কে আছে মহান ?
নীতি শিক্ষা দিতে জগতের জনে,
স্বর্গীয় ঐশ্বর্য্যে গঠিয়া দয়
সৃজিলা কি তােমা জগতের পিতা ?-
ধন্য শিক্ষা তব, ওহে দয়াময়!
দেখ এসে, ওহে জগতের জন!
আঁখি যদি থাকে, চরিত্র সুষমা;
জ্ঞান যদি থাকে, লহ উপদেশ
জগতে অতুল চরিত্র মহিমা।
ওহে তরু! আজ তব পদধূলি
দাও হীন জনে, করুণা করিয়া ;
জগতে জনম স্বার্থক তােমার,
আমি যেন তরু হই হে মরিয়া।

চকোর ও ঈশ্বর প্রেমিক।
মধুর যামিনী,
নীরব অবনী,
নীরব নিশীথ তারা।
নিরমল নভে
নীরবে চন্দ্রমা,
ঢালিছে জ্যোছনা ধারা।
কৌমুদীর কোলে ঢেলে তনুখানি,
প্রমােদে চকোর খেলে ;
সুধা করে পান,
উছলে পরাণ,
পীযূষে গিয়াছে গলে।
সংবিরহিত,
ঘুম ঘােরে মৃতপ্রায়।
প্রকৃতির মুখে
হাসির লহরী,
নীরবে ভাসিয়া যায়।
জীবজন্তু যত,
সকলই মগন সুষুপ্তি আরামে,
যামিনীর মধ্যভাগে ;
সুধার পিয়াসে, সুধা-পিপাসিত,
চকোরই কেবল জাগে।

১৮
প্রভাত-কুসুম
৫
বিভু-প্রেম-সুধা রস পানে সদা
লােলুপ যাদের মন ;
মােহ-নিদ্রাবশে,
নহে তারা অচেতন।
বিষয়ের বিষে,
প্রিয়-প্রেমালাপে,
গভীর নিশীথে,
হ’য়ে সমাহিত চিত,
আকণ্ঠ পূরিয়া
করে সুধা পান,
অই চকোরের মত।
জীবন-যুদ্ধ।
ছল ছল আঁখি দু’টি, বদন বিষাদ ভরা,
কে তুমি, জীবন-যুদ্ধে কাঁদিয়া পাগল পারা
উত্তপ্ত নিশ্বাস বায়ু ধীরে ধীরে যায় স’রে,
দু’বিন্দু নয়ন-নীর কপােল লুটায়ে পড়ে।
আকুল হৃদয়খানি বিষাদে গলিয়া যায়,
মূরমের আশা গুলি কাঁদিছে বিষম ঘায় ।

জীবন-যুদ্ধ।
থেকে থেকে হায় হায় ! শিহরিয়া উঠে বুক;
আঁখির গলিত ধারে ভেসে যায় ম্লান মুখ।
চারিদিকে কোলাহল, হৃদয়েতে কালানল,
হুতাশের হলাহল প্রাণে মাখা অবিরল।
কে তুমি, সংসার-ক্ষেত্রে বাঁধিয়াছ এ সমর ?
ক্লান্ত, শ্রান্ত, পথভ্রান্ত, শক্তিহীন কলেবর।
কেন রণে পৃষ্ঠভঙ্গ দিয়াহে পলাও ?
সম্মুখে বিপক্ষ সেনা,
দেখাইছে বীরপনা,
নাহি পরিত্রাণ ; তবে কেন হে পলাও ?
বাজিছে শত্রুর ভেরী, গর্জিছে কামান ;
নাচিছে সৈনিক দল,
ভীম অসি ঝলমল,
দাঁড়াও, পলায়ে ভবে নাহি পরিত্রাণ !
প্রলােভন-সেনাপতি রক্তিম লােচন,
খর অসি করে নিয়ে,
অই যে আসিছে ধেয়ে,
এখনই করিবে তব মস্তক ছেদন।
০

প্রভাত-কুসুম।
উপান্তে দাঁড়ায়ে অই শমনের প্রায়
কামরিপু ভীমাকৃতি,
বদনে পাপের জ্যোতি,
ক্রোধ-বিস্ফারিত অাখি, ফিরি ফিরি চায় ।
ক্রোধ রূপ পদাতিক সমরে শমন,
সরােষে বন্দুক ধরে,
তুলে নিয়ে অংসােপরে
এখনই ছুড়িবে, তব বধিবে জীবন!
মদ-মােহ সেনা অই মৈনাকের প্রায়,
ললাভের সম্মুখে থেকে,
এখনই হানিবে বুকে,
বিষম বিষাক্ত বাণ, মরিবে তাহায়।
প্রবৃত্তি রাক্ষসী অই করালবদনা,
শােণিত পিয়াসে পুড়ে,
অই দেখ নৃত্য করে,
সংসার গ্রাসিতে যেন সতত বাসনা।
মৃত্যু যদি এক দিন হইবে নিশ্চয়,
কেন হে পলাও তবে ?

জীবন-যুদ্ধ।
অমর কে কোথা ভবে ?
হও অগ্রসর ; জয়, নয় পরাজয়।
কি ভাবিছ মনে মনে স্তম্ভিত হৃদয়ে,
বিস্মিত নয়ন দু’টি,
অবিষাদে আছে ফুটি,
কাঠের পুতুল প্রায়, কেমনে দাঁড়ায়ে ?
শত্রুর সমর সজ্জা করি বিলােকন,
ধ ধাকি লেগেছে মনে ?
আজি রক্ষা নাহি রণে,
মরিবি ! মরিবি! ওরে সম্মুখে পতন
বিষম সঙ্কট স্থলে, দাঁড়ায়ে নীরবে,
কি ভাব উদ্ভ্রান্ত মনে ?
অরিকুল আস্ফালনে,
ভীতির কবলে পড়ে এখনই মরিবে ।
মুখ তুমি !—নদীগর্ভে হেরি তুঙ্গ ঢেউ,
আসন্ন মৃত্যুর ভয়ে,
জীবনে নিরাশ হয়ে,
কর্ণ ছাড়ি জলে ঝাঁপ দেয় কি হে কেউ ?

২২
প্রভাত-কুসুম।
৪
অথবা, কুম্ভীর যদি করে আক্রমণ,
ভয়-ব্যাকুলিত হয়ে,
মুদি আঁখি দাঁড়াইয়ে,
কোন্ মূখ থাকে ? ভবে আছে কি এমন ?
উঠ ! জাগ! কর রণ, ধর অসি করে ;
বিষের প্রবাহ দেহে,
বসতি অনল গৃহে,
কেন ভাব নিরাপদ, দুর্কল অন্তরে ?
কেড়ে ল’বে শত্রু তব স্বর্গীয় বৈভব !
চিত্ত যার পীড়াময়,
কেমনে সে লভে জয় ?
অসম্ভব !তাসম্ভব!—জয় অসম্ভব!
অই শােন, বাজিতেছে সমর বাজনা ;
বিধুনিয়া ধরাতল,
করিতেছে অবিরল,
গর্বে যেন অরী বৃন্দ, বিজয় ঘােষণা।
জলদ-গম্ভীর নাদে বাজিছে বাজনা ;
রণমত্ত অরিগণ,

জীবন-যুদ্ধ।
করিতেছে আস্ফালন,
অলস, অবশ প্রাণে থেকোনা থেকে না।
চেয়ে দেখ, চেয়ে দেখ সমর-প্রবাহে,
স্বর্গীয় বৈভব রাশি,
চিরতরে যায় ভাসি !
দাঁড়াইয়া তবু আছি, মজি পাপ মােহে !
আপনার সর্বনাশ দেখি’ছ আপনি!
কোন্ প্রাণে রে অবােধ,
সহি’ছ জনম শােধ,
ভয়ে ভয়ে ভয়ঙ্কর শক্রর অশনি!
ছি! ছি! নর, নরকুলেশ্লভিয়া জনম,
একি কাজ, নাহি লাজ ।
মাথায় পড়ুক বাজ,
•রিপুর সংগ্রামে যদি ঘটিল মরণ।
কেন মুখ দাঁড়াইয়া, মৃত্যু সাথে করি ?
নর নাম যদি ধর,
হও রণে অগ্রসর,
অবশ্য লভিবে জয়, দমনিয়া অরি।

২৪
প্রভাত-কুসুম।
যদি কর শক্ত করে আত্ম সমর্পণ,
মরণ ত ভাল কথা,
প্রশমিত হয় ব্যথা,
জুলিবে জীবন্ত দেহে পাপ-হুতাশন।
দগ্ধ হবে হৃদি তব ; নয়ন আসারে
ভাসিবে সন্তপ্ত বুক,
জীবনে মরণ দুখ,
ঘাের অনুতাপ-জ্বালা হইবে অন্তরে।
তবে কেন পৃষ্ঠভঙ্গ দিয়া হে পলাও ?
দুর্জয় বিপক্ষ গণ,
বিষম সম্মুখ রণ,
নাহি অব্যাহতি ; সত্যে অটল দাঁড়াও।
হও অগ্রসর, ত্বরা হও অগ্রসর ;
করােনা বিলম্ব আর,
অরি পূর্ণ চারিধার,
ধর অস্ত্র, কর রণ, সহায় ঈশ্বর।
গর্জিছে ভীষণ নাদে কালের কামান।
শােক-দুখ-অগ্নি-গােলা,

জীবন-যুদ্ধ।
-
(মরমের অশ্রু টলা, )
উগরিছে মুহুর্মুহু কপিছে পরাণ ।
আবার আবার, অই ভীম দরশন
গর্জিছে কামান গুলি,
ছুটিছে দুর্গতি-গুলি,
নিরাশার
ধুম
রাশি ছাইল গগন।
উধাও সে ধুম পুঞ্জ গর্জিছে আবার !
নয়নে চলে না দৃষ্টি,
সংসার হইল সৃষ্টি,
অন্ধকার ! হাহাকার ! বহে অশ্রুধার !!
বাজিছে পাপের ভেরী রহিয়া রহিয়া।
বিপক্ষের জয়লক্ষী,
মেলি করুণার অক্ষি,
হাসিছে বিকট হাসি থাকিয়া থাকিয়া।
s
কি করিস্ ! কি করিস্ ! ভ্রান্ত অর্বাচীন !
করিস্ নে অরিকরে,
আত্ম সমর্পণ ওরে,
জীবন দুখেরই নয়,সম্মুখে সুদিন।

প্রভাত-কুসুম ।
!
কেন মূখ ! শত্রু-করে সঁপিতেছে প্রাণ ?
কর যুদ্ধ প্রাণপণে,
অবশ্য জিনিবে রণে,
পিতা তব, বিপন্নের বন্ধু ভগবান।
অখিল ব্ৰহ্মাণ্ড যাঁর চরণের ধূলি,
পুত্র তার, নাহি লাজ,
ছি! ছি ! একি কর কায,
হায় রে ! বিপক্ষ ভয়ে গেলে আত্ম ভুলি ?
কি ভয় ! কি ভয়! রণে হও অগ্রসর ;
বাঁচিতে বাসনা যদি,
ধৈরষে বাঁধহ হৃদি,
বিভু পদে সঁপে দাও দুর্বল অন্তর।
আত্মরক্ষা-বৰ্ম্ম দিয়া ঢাক তনুখানি ;
ধৰ্ম্ম-অসি লও করে,
অটল সাহস ভরে,
আগুলিয়া বেঁধে আন বিপক্ষে এখনি ।
,
কাম, ক্রোধ, লােভ আদি শঠ শত্রুগণ,
নাশিতে তােমায় রণে,

জীবন-যুদ্ধ
রণক্ষেত্রে ক্রুদ্ধ মনে,
ভ্রমিতেছে ; অই দেখ আর নয়ন!
থেকোনা থেকোনা আর ভয়ে ভীত হয়ে,
কিবা ফল ভয়ে ভাই,
ভয়ে ত নিস্তার নাই;
একি পাপ দুৰ্বলতা মানব-হৃদয়ে !
পরিহর, পরিহর পাপ দুৰ্বলতা,
নহিলে উপায় নাই,
একি ছেলেখেলা ভাই ?
জীবন মরণ কথা,—স্বর্গীয় বারতা।
পাপ প্রতি ঘৃণা রূপ দুর্নিবার বাণ,
ধনুকে যােজিত করি,
শত্রুগণে লক্ষ্য ধরি,
কর নিক্ষেপণ, রণে বাঁচিবে পরাণ।
আত্ম সংযমন রূপ সুদৃঢ় রঙ্গুতে,
বেঁধে আন রিপুগণে,
দেখিও বধােনা প্রাণে,
করে পদানত, রাখ আপন বশেতে।

২৮
প্রভাত-কুসুম।
হৃদয়-সাম্রাজ্যে তব এই অরিগণ,
নাশিয়াছেশান্তি-সুখ,
বিষাদে ফাটিছে বুক,
এখনই ধৰ্ম্মের দণ্ডে, করহ শাসন।
আপন হৃদয়-রাজ্য, কর অধিকার ;
পদানত শত্রগণে,
কর এই মহারণে,
জগত্ ঘােষিবে তব জয় জয়কার।
ঈশ্বর-মিলন-আশা।
মিলন আশায়,
দিন গেল চলে
আসে নিশা তমােময়।
হইবে কি প্রাণে, মিলন তােমার ?
কহ প্রিয় প্রেমময় ।
শৈশব যৌবন হইল বিগত
হ’ল না মিলন তব ।

ঈশ্বর-মিলন-আশা।
আজ কাল বলে, করাল কবলে,
গ্রাসিবে হেকালে ভব !
কেন প্রিয়তম! ঘুচে না বিরহ ?
আশায় রয়েছি ভুলে ;
আগত বিচ্ছেদ, করহ বিচ্ছেদ,
লও স্নেহ-কোলে তুলে ।
•
দিবা অবসানে, সােণালী সন্ধ্যায়
বিহগ ডাকিয়া যায়;
সে মধুর ডাকে, তােমার অভাসে,
উছলে পরাণ হায় ও
সান্ধ্য কল্লোলিনী, হিল্লোলে নাচিয়া,
কল্লোলে গাহিয়া ধায়
তব ভাবে প্রিয় ! ভরে উঠে বুক,
পরাণ গলিয়া যায়।
নিতি নিতি আসি
কত যে আনন্দ পাই ;
সতরঙ্গ জলে চাহিয়া চাহিয়া
অবাক হইয়া চাই।
তটিনীর তটে,

প্রভাত-কুসুম
আবার নিশীথে, চাদের আলােকে,
প্রবেশিয়া উপবনে,-
নিশি-সিতিমায়,
প্রসন্ন প্রসূন
হাসিছে প্রফুল্ল মনে ;
চেয়ে চেয়ে থাকি, তব স্নেহ দেখি
পাগল হইয়া যাই ;
শত সিন্ধু যেন ছুটে আসে প্রাণে,
কত যে আনন্দ পাই।
আবার উষায়, শ্যামল ধরায়,
লাখে লাখে ডাকে পাখী ;
তব ভাবে গলে, নেচে নেচে তােমা
সজল নয়নে ডাকি।
পূরব গগনে, নব নীলিমায়,
কনক কিরণ শােভা ;
অলক্ত অধরে হাসে চারু উষা,
মরি কিবা মনােলােভা !
ফুটে কত ফুল
জগতে অতুল,
তােমারই সােহাগ ভরা ;
মৃদুল পবনে
হেলিয়া দুলিয়া
নমিছে তােমায় তারা।

ঈশ্বর-মিলন-আশা।
৩১
তােমারই সােহাগে হাসিছে কমল,
গাহিছে মধুপ গান।
হিমস্নাত তরু
গম্ভীর অন্তরে
করিছে তােমার ধ্যান।
নিরখি এ সব
হে নাথ, তােমার
মধুর আভাস পাই ;
পুন এসে গৃহে, হে হৃদিরঞ্জন!
তব স্নেহে গ'লে যাই;
স্নেহের জননী,
স্নেহের জনক,
স্নেহের অমৃতে গড়া;
ভালবাসা দিয়া গড়েছ যে নাথ,
সহােদর সহােদরা ।
পিতা গাে ! যখন
জননীর পানে চাই,
স্নেহ-সুধা ভরা
সে মুখমণ্ডলে,
তােমায় দেখিতে পাই।
তাই চেয়ে থাকি,
জননীর মুখপানে;
আঁখি হ’তে ঝরে প্রেম-অশ্রু ধারা,
কাদি গাে অবশ প্রাণে।
ভক্তির নয়নে,
অবাক্ হইয়া,

৩
প্রভাত-কুসুম।
।
আবার যখন
প্রীতির নয়নে
নিরখি অনুজ জনে ;
তব ভাবে দেব,
হই বিমােহিত,
আনন্দ উছলে মনে।
প্রেমময় নাথ। প্রেমের মিলন,
এই ত সতত পাই ;
বৃথা কেন আর
মিলন আশায়,
কেঁদে কেঁদে চলে যাই।
সকাল সন্ধ্যায়,
হৃদয়ে তােমার সনে ;
হেসে কেঁদে নাথ, তাই বেঁচে আছি
অমৃত ধরিয়া মনে।
মধুর মিলন
নিদাঘে চাতক।
একদা নিদাঘে,
বৈশাখের মাসে
দ্বিতীয় প্রহর বেলা ;
‘প্রচণ্ড তপন
বরিষে কিরণ
অনলে করিয়া খেলা।

নিদাঘে চাতক।
কিবা জল স্থল,
শূন্য দূর মাঠ,
কিবা ঘাট বাট,
সকলই আগুণময় ;
কোথায় জুড়াই, ভেবে নাহি পাই,
সতত শরীর দয় ।
মঙুল কানন,
কিবা গৃহ নিকেতন,
যেখানেই যাই, নিদয় নিদাঘ
দহে হায় তনু মন !
অনলের সনে
খেলে সমীরণ
হু হু হু করিয়া বয় ;
একি হ’ল দায়!
নিদাঘ জ্বালায়
বুঝি প্রাণ গত হয়।
স্বেদ-সিন্ধু-নীরে, তনু ভেসে যায়,
শুষ্ক কণ্ঠ মরু প্রায় ;
, উঠিতে বসিতে,
খাইতে শুইতে,
নাহি সুখ কণা হায়।
একি ভয়ঙ্কর
অনলের হাসি
ধরায় পড়েছে গলে!
প্রাণ ভয়ে, যেন
চমকিত প্রাণী ;
পাহাড়ের চূড়া টলে।

৩৪
প্রভাত-কুসুম ।
কুহরে কোকিল
ব্যাকুল হইয়া
কুসুম-কাননে, ললিত ঝঙ্কারে
গায় না মধুপ গান ;
দূর বনান্তরে,
ক্লান্ত বিহঙ্গম,
নীরব ললিত তান।
মাঝে মাঝে দূরে,
আকুল নিদাঘ বিষে ;
কাটে না সাঁতার
সরসে মরাল
নিস্পৃহ রসাল বিসে।
জলচর যত
ছায়া আশে তীরে পায় ।
স্তুপীকৃত কত
উতপ্ত সিকতা,
আকাশে উড়িয়া যায় ।
হরিত্ বরণ
চারু তরু রাজি
দগধ ভানুর করে ;
মলিনা ব্রততী কাঁপিছে নিদাঘে,
কে বলে সমীর ভরে ?
এ হেন সময়
তৃষিত চাতক
বসি এক তরু ডালে,
দে জল” “দে জল”
(কি দুঃখ হায় রে ভালে!)
নিনাদে কেবল,

নিদাঘে চাতক।
ভানুর কিরণ
পিপাসাকাতর অভাগা চাতক,
ডাকিয়া ডাকিয়া উড়ে ;
উড়ে উড়ে বলে “দে জল” “দে জল,”
পুন বসে তরু’পরে।
ফেটে যায় গলা,
দারুণ তৃষায়,
নাহি মেঘ নভঃকোলে ;
ফেটে যায় ধরা,
ফেটে যায় নভঃ
কাতর চাতক-বােলে !
ঢালিয়া গরল
দহি’ছে চাতক প্রাণ ;
নীরস গগনে,
নীরস কাননে,
ফুটিছে দুঃখের গান
ওগাে মা প্রকৃতি। একি তব লীলা,
বুঝিতে পারি না হয় ।
বারি হীনবরা আগুণেতে পােড়া,
দেখ প্রাণ যায় যায় ।
আমরা মানব, তেঁই বেঁচে আছি ;
কাননের পাখী গুলি,
নিদাঘ-তৃষায় হয়ে মৃতপ্রায়,
দিয়াছে ক্রন্দন তুলি !

প্রভাত-কুসুম।
বিশেষতঃ অই
করেছে চাতক
এমন কি অপরাধ ?
মেঘ-বারি বিনা, অন্য কোন নীরে,
দাও নাই তার সাধ !
বরষে বরষে,
নিদাঘের বিযে
জর্জরিত তনু হয়ে,
তােমার আদেশ করিছে পালন
অসহ্য পিয়াস স’য়ে ।
কত জলাশয়,
সরিৎ সরসী,
বারিপূর্ণ বিদ্যমান ;
দারুণ তৃষায়
ফেটে যায় বুক,
তবৃনা করিবে পান।
নীরদের নীর
তুচ্ছ ভৃঙ্গারের জল।
কৰ্তব্য-জ্ঞায়ান
ধরায় এমন
ক’জনের আছে বল ?
জননি, তােমার
অচিন্ত্য মহিমা
ভাবিয়া না বুঝি হায় ;
তাই চেয়ে থাকি,
নমি তব দু’টি পায় ।
শুধুই সম্বল,
“অবাক হইয়া

নিদাঘে চাতক।
৩৭
সামান্য চাতক
প্রসাদে তােমার
শিখেছে কর্তব্য জ্ঞান ;
তা’ই কি জগতে শিখাও জননি?
তাই কি তােমার ধ্যান ?
হে মাতঃ প্রকৃতি। বুঝেছি এখন
তব শুভ অভিপ্রায় ;
ঘাের দুখার্ণবে, ডুবায়ে ডুবায়ে
দাও শুভ সুখ হায়।
তব স্নেহে মাতঃ, শিখিলাম আজি
কৰ্তব্য জ্ঞানের নীতি ;
জ্ঞান আছে যার,
কিসে ভবে তার ভীতি ?
কৰ্তব্য-জ্ঞানের বলে, পাহাড়ের চূড়া টলে,
নদী স্রোতঃ উজানেতে বহে !
ভীম চঞ্চল চপলা,
সদা বিনয়বিহবলা
হয়ে পদে অনুগত রহে।
অই চাতকের মত, কর্তব্যেতে অনুরত,
কিসে তার মরণের ভয় ?
স্বার্থক জনম তার,
চির কীৰ্ত্তি পুরস্কার
জীবন-সমরে সদা জয়।
এমন কৰ্ত্তব্য

প্রদীপ ও পতঙ্গ।
নিঝুম নিশীথে,
দ্বিতল ভবনে,
ব’সে অবহিত মনে ;
কল্পনা-উচ্ছ্বাসে যেতেছি ভাসিয়া
চিন্তা সহচরী সনে।
বাতায়ন পথে
বহিছে সমীর,
মধুর পরশ তার ;
ক্লান্ত দেহে মম,
স্নেহ-সিক্ত হয়ে
ঢালিছে সলিল ধার।
পুরােভাগে মম,
একটী প্রদীপ
জ্বলন্ত সলিতা তায় ;
আঁধারের কোলে,
ঢালিয়া আলােক,
নীরবে জ্বলিয়া যায়।
এসে তার স্থানে, কি ভেবে কে জানে,
অবােধ শলভ কত ;
ঘুরিয়া ফিরিয়া, আকুল হইয়া,
আপনি হ’তেছে হত!
কি আশ্চর্য হায় !
জীবনের সেই
এদের কি কিছুই নাই ?

প্রদীপ ও পতঙ্গ।
থাকিলে এমন
উন্মত্ত ব্যাপার
জগতে দেখিতে পাই ?
হায় রে! সংসারে কলুষ-অনল
জ্বলিতেছে অবিরত ;
দুৰ্বল মানব
মরিছে পুড়িয়া
অই শলভের মত।
কেনা জানে অই
কলুষ-অনলে,
দুখের মরণ ঘটে ?
নিরখিয়া তার
অপরূপ জ্যোতিঃ
মানুষ তবুও ছুটে!
তবু ছুটে হায় !
পাগলের মত,
ক্ষণিক সুখের তরে;
অনুতাপ-বিষ
ধরি হৃদি মাঝে
আপনি পুড়িয়া মরে !
প্রদোষে নদী তটে।
একদা প্রদোষে, প্রমােদ অন্তরে
বসি’ কূলবতী কূলে ;

৪০
প্রভাত-কুসুম
দেখিনু তটিনী
তরঙ্গ তুলিয়া
খেলে কিব। দু’লে দু’লে !
কিবা শুভ্র হাসি,
অকথিত ভাষা,
তরঙ্গে তরঙ্গে ফুটে।
কিবা চটুলতা!
কিবা মধুরতা!
ভাব-কূপ কেঁপে উঠে ।
পশ্চিম গগনে,
কনক কিরণে
বিভূষিত মেঘমালা ;
হেন লয় মনে
অনলের শিখা
অযুত তাহাতে ঢালা।
চারি পাশে তার,
নভাের্নীলিমায়
ঈষৎ কনক ভাস;
যেন নীল জলে,
ফুল্ল নীলােৎপলে
শত মণি পরকাশ।
আহা! মরি মরি কি সুন্দর ছবি :
জীবনে দেখিনি হেন ;
স্বরগ সুষমা
মরতের কোলে,
ফুটিয়া পড়েছে যেন।
মধুর প্রদোষে, তরল আঁধারে,
মরি কি মােহন রূপ!

প্রদোষে নদী তটে।
৪১।
বিভল পরাণ,
নিসর্গে নিরখি
উছলে হৃদয়-কূপ।
অন্তরের হাসি
অন্তরে ফুটিছে,
অকথিত হৃদিভাষা;
মরত নিবাসে
আহা মরি মরি ।
অনন্ত সুখের আশা।
মুহূর্ত সময়ে,
হৃদয়-গগনে
ফুটিল শশাঙ্ক কত ;
তটিনী ত্যজিয়া
নাচিল লহরী
আমার হৃদয়ে যত।
তর তর তর
তটিনীর জল
ঢেউ তুলি চলে যায় ।
প্রদোষের হাসি হাসিয়া তটিনী,
কল্লোলে মধুর গায়।
•গােধূলি-গগনে শােভিছে তারকা
আধ আধ হাসি মুখে ;
উদ্যান ছাড়িয়া যেন রে যূথিকা
ফুটেছে গগন বুকে ;
কিম্বা নীল নীরে
হীরকের আঁখি
হাসিয়া ভাসিয়া যায় ;

82
প্রভাত-কুসুম
কিবা মনােহর সৌন্দৰ্য-সাগর
উছলে গান গায় ।
দূর বন হতে
বিহগ কাকলী,
আসিয়া শ্রবণে পশে;
নেচে উঠে প্রাণ
আনন্দ-হিল্লোলে,
ডুবে যায় সুধারসে।
শােক-দুখ ভরা
এ বিশ্বমণ্ডলে
আহা কি অমৃত-নদী!
শান্তি-সুখ রসে
কেড়ে লয় প্রাণ,
আনন্দে উথলে হৃদি।
ধন্য, ধন্য দেব !
কি আনন্দ সদা
তােমার জগতে পাই;
ভাবিতে ভাবিতে, ডুবি আপনাতে,
অবাক্ হইয়া যাই।
মােহের ছলনে বিষয়-বিপিনে
মাকাল আশায় ঘুরি,
প্রকৃতির ধন
শান্তি-সুখ-সুধা
কোথা হতে পা’ব হরি!
দাও নাথ! মােরে পাগল করিয়া,
ভুমিব তটিনী কূলে ;
*

প্রদোষে নদী তটে ।
দেখিব লহরী,
শুভ্র হাসিগুলি,
যাইব সংসার ভুলে।
ভগ্ন তট হতে খসিয়া পড়িছে
ঝু ঝু বালুকণা ;
বসি নদীকূলে,
তাই দেখে দেখে,
হইব উদারমনা।
আমি ক্ষুদ্র কীট,
সিকতার রেণু
প’ড়ে কাল-নদী তটে ;
জানি কখন--- কেমনে জানিব ?
মরণ বিপদ ঘটে।
আপনি শিখিব,
জগতে শিখাব,
ক্ষুদ্র কীটে অহঙ্কার
পৈশাচিক ভাব,
পৈশাচিক লীলা,
সাজে না সাজে না আর।
পশিব কাননে,
লভিব মাধুরী
বিকচ নবীন ফুলে ;
আশার তাড়না,
বাসনার মােহ,
জীবনে যাইব ভুলে।
নিঝরের বারি, পতত্রিশিঞ্জন,
অমৃত করিবে দান ;

৪৪
প্রভাত-কুসুম।
সুস্বর-লহরী
শ্যাম তরু পানে
থাকিব চাহিয়া,
শীতল হইবে প্রাণ।
বন ফুল তুলি গাঁথিব মালিকা
দোলাব তরুর গ’লে ;
মৃগেরা খেলিবে, আনন্দে হেরিব
বসি শ্যাম-তরুতলে।
গাহিবে বিহগ,
ছুটিবে সমীর সনে ;
তুলি দুই হাত, আনন্দে নাচিব,
পীযূষ ছুটিবে মনে।
নাচিতে নাচিতে হ’ব প্রেমাকুল,
বহিবে নয়ন ধারা;
ধূলায় পড়িয়া
দিব গড়াগড়ি,
হইব পাগল পারা।
সিংহ ও শার্পলে
দিব আলিঙ্গন,
কহিব মনের কথা
দুই বাহু তুলি,
তব প্রেমে গলি,
আনন্দে নাচিব তথা।
ইব সকলে
নাচিয়া নাচিয়া,
করিব আনন্দ ধ্বনি ;
•
1.

প্রদোষে নদী তটে।
লইব জগতে
করি অন্বেষণ
অমর-অমৃত-খনি।
ভিখারী যাহারা,
আসিবে তাহারা
করিতে পীযূষ পান,
নাহি চেয়ে দান,
হাতে দিব তুলে
ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র প্রাণ।
দাও নাথ ! মােরে পাগল করিয়া,
লভি অমৃতের খনি ;
আর কিছু মাের নহে কামনার,
সে ধনে করহ ধনী।
কামনা।
ওহে নাথ, ভেঙ্গে দাও
মােহের স্বপন ঘাের;
অন্তরের অন্তরালে,
প্রবৃত্তি গরল টলে,
বিষম বিপদে নাথ,
বাঁচাও জীবন মাের।
ফুরায়ে আসিল বেলা,
ভেঙ্গে দাও পাপ-খেলা,

৪৬
প্রভাত-কুসুম
বিষয়-বিপণি গুলি পদাঘাতে ভেঙ্গে দাও;
দুৰ্বলতা-কলুষিত,
অবিদ্যায় অন্ধচিত
ভেঙ্গে দাও—ভেঙ্গে দাও—ভেঙ্গে চুরে গড়ে দাও।
হৃদয়ের তরলতা,
নিবৃত্তির নীরবতা,
আসক্তির শত বাঁধ, ভাল করে ভেঙ্গে দাও।
একে ভ্রান্ত ক্লান্ত মৃত,
তাহে মূৰ্থ অহঙ্কত,
উন্মত্ত প্রলাপ কত,
অবিরত মুখে ফোটে।
পারি না সাধিতে কায,
অন্তরায় বিঘ্ন-বাজ,
প্রবৃত্তির তীক্ষ্ণ দন্তে বিবেক বন্ধন টুটে।
সম্মুখেতে প্রলােভন,
তাহে মােহ-ভ্রান্ত মন,
প্রবল সংসার-স্রোতে ভেসে যাই নিরন্তর ।
কি হবে জীবনে আর,
জন্ম মৃত্যু হ’ল সার !
মরণের ভগ্ন তটে, আমি ত বেঁধেছি ঘর ।
দীনবন্ধু, দয়া করে

কামনা।
৪৭।
দাও শান্তি দগ্ধ নরে,
দাও গতি শেষগতি, • অগতি, পতিত জনে ।
বিবেক-অঙ্কুশ দিয়া,
উদ্বোধিয়া দাও হিয়া,
দাও জ্ঞান পদাঘাতে, ভ্ৰম-নিদ্রা অচেতনে।
আসক্তি-বন্ধন গুলি,
দয়া-করে দাও খুলি,
পাপ-খেলনক যত,, কাঁদাইয়া লও কেড়ে।
দিয়ে শান্তি, দিয়ে বল,
দিয়ে স্নেহ সুশীতল,
সাধিতে তােমার কাষ, সংসারে দেহ গাে ছেড়ে।
পুণ্যব্রত উদ্যাপনে
দেহ শক্তি দীন মনে,
দাও প্রেম-সুধা-সিন্ধু ;
প্রাণের প্রহরী হও।
যে কাযে এসেছি ভবে,
কেমনে সাধিতে হবে,
সাধনার দিব্য মন্ত্র অজ্ঞানে বুঝায়ে কও।
নতুবা-নতুবা নাথ,
অধােগতি-বজ্রাঘাত
এখনই হইবে শিরে;
ঘটিবে মরণ তায়!

৪৮
প্রভাত-কুসুম।
দুঃসাধ্য জীবন-ব্রতে,
কঠিন কর্তব্য-পথে,
আঁধারে হারাব পথ,
কণ্টক ফুটিবে পায় ।
পিতা গাে ! দেখ গাে এসে,
ভীষণা প্রবৃত্তি পাশে,
চমকে পরাণ মাের, ধমকে উহার হায় !
কেমন নয়ন দু’টি !
রােষ ভরে পড়ে ছুটি,
কঁপে যেন হিয়া মাের, কালান্ত প্রলয় বায় ।
পিতা গাে ! দুর্গতি ঘাের !
দাও গাে অভয় ক্রোড়,
ভীতির কবলে পড়ি, কাঁপিছে মুমুষু প্রাণ!
হৃদয়-কুটীরে এসে,
দয়া করে যুড়ে বসে।
দাও সঞ্জীবনী সুধা, অবিশ্রান্ত করি পান,
মুমুষু সন্তান নাথ,
লভুক অমর প্রাণ।

চৈতন্যের গৃহত্যাগ
গভীর রজনী, নীরব অবনী,
নীরবে জাগিলা গােরা গুণমণি ;
নীরবে উঠিলা, নীরবে ভাবিলা,-
“এই ত সময় ;—গভীর রজনী।”
“এই ত সময়-
-শুভ নিশা হায় ;
ডাকিছে জননী ‘আয় আয় আয়’
ডাকেন অভয়া, কর প্রসারিয়া,
‘মানবসন্তান, আয় কোলে আয়।
“অই ডাকে মাতা ‘আয় বাছা আয়,
এই ত সময় নিশা চলে যায় ;
কর্তব্যের পথে, জীবনের ব্রতে,
ঢেলে তনু মন, আয় বাছা আয়।
‘কোন্ মােহে ওরে মানবসন্তান,
ঘুমের আবেশে বিভল পরাণ!
সম্মুখে পরীক্ষা !ভীষণ পরীক্ষা ।
কোন্ সুখে ঘুমে, রয়েছ শয়ান।

প্রভাত-কুসুম ।
‘আয় কোলে আয় মানবসন্তান!
সুধা-সিন্ধু মাঝে “জুড়াতে পরাণ
রেখেছি তুলিয়া, যতনে অমিয়া,
আয় কোলে আয় মানবসন্তান।
“কেমনে থাকিব ! কেমনে থাকিব ।
মায়ের আদেশ কেমনে লঙ্বি ।
বহিতেছে ঝড় প্রাণের ভিতর,
আকুল অন্তর, কেমনে থাকিব ।
“কেমনে মজিব বিষয় সেবায় ?
ডাকেন জননী, ‘আয় কোলে আয়’;
একি দুৰ্বলতা ! একি তরলতা।
কেন মােহ মন ত্যজিতে না চায় ।
“জাগ ! জাগ! জাগ! ও মন আমার !
ত্যজ মােহ ঘুম বাসনা অসার ;
দিন বহে যায়, অসার খেলায়,
মহানিদ্রা ঘাের সম্মুখেতে প্রায় !
“যে কাযে এসেছি ভব-কৰ্ম্মভূমে,
করহ সাধন, কি ভয় মরণে ?

চৈতন্যের গৃহত্যাগ।
৫১
উঠ! জাগ মন! কর তবে রণ,
সঁপে দাও প্রাণ, মায়ের চরণে।
“কর্তব্যের গিরি, শিরােপরে যার
আলস্যের ক্রোড়ে ঘুম সাজে তার ?
সুধাসিন্ধুবাসী, সুধার প্রয়াসী,
সুধাপানে হয় আলস্য তাহার ?
“এই ত জননী স্নেহ-করে হায়,
সুধা লয়ে ডাকে আয় বাছা আয়’ ;-
মানবের তরে, সুধা হাতে করে,
ডাকিছেন মাতা সকাল সন্ধ্যায়।
“আঁধার প্লাবনে অন্ধ চিরকাল ।
ঘেরিয়াছে ঘাের মায়া-মােহ-জাল !
কেমনে বুঝিব ? কেমনে শুনিব ?
জননীর বাণী অমৃত-রসাল।
“এই ত সময়, মায়ার বন্ধন
অবিষাদে মন, করহ ছেদন ;
ঘুমায়েছে মাতা স্নেহের দেবতা,
এই ত সময়, উঠ, উঠ মন !
৫

৫২
প্রভাত-কুসুম ।
“এই ত সময়, গভীর রজনী ;
শুয়ে শয্যাতলে সরলা রমণী,
ঘুমে অচেতন ; সংসার বন্ধন,
অবিষাদে কত বিচ্ছিন্ন এখনি।
“নদেপুরে যত ঘুমে অচেতন,
পরিজন নাহি জাগে এক জন ;
এই ত সময়, জাগরে হৃদয় !
জীবনের ব্রত কর উদ্্যাপন।
“আর ঘুমাওনা ও মন আমার,
জগতের পাপী করে হাহাকার !
দগণ পরাণে, বিষম বদনে,
অই শােন পাপী কাঁদে অনিবার।
“পাপী জগতের হ’ল সর্বনাশ!
কেমনে ঘুমাবে সুখে রাখি আশ ?
সহে না সহে না, পাপীর বেদনা,
উগারে গরল পাপীর নিশ্বাস ।
“হরি নাম সুধা ঢালিব জগতে,
যায় যা প্রাণ, কি ভয় তাহাতে ?

চৈতন্যের গৃহত্যাগ।
ভাসি প্রেম জলে, ভবে যাব চলে,
খেলিবে আনন্দ পপি-হৃদয়েতে।
৩:
“পাপীদের সনে প্রেমানন্দ মনে,
গা’ব হরি নাম প্রেম আলিঙ্গনে।
জগত্ ভরিয়ে হরি নাম দিয়ে,
গা’ব হরি নাম জীবনে মরণে।
“হরি নাম সুধা পাপী করি পান,
ঘুচাবে ত্রিতাপ, জুড়াইবে প্রাণ ;
হাসিবে কাঁদিবে, নাচিবে গাইবে,
হইবে জগত্ সদানন্দ ধাম।
“যেয়ে ঘরে ঘরে, ধরি সবে পায়
ভজাইব হরি প্রেমের হিয়ায়
হরি দয়াময়, পাপীর হৃদয়,
গাইবে সতত আনন্দ সুধায়।
যায় ;
“এই ত সময় ;
-শুভ নিশা
ডাকিছে জননী ‘আয় বাছা আয়’ ;-
ডাকেন অভয়া বাহু প্রসারিয়া,
‘মানবসন্তান, আয় কোলে আয়।

প্রভাত-কুসুম।
!
“অই ডাকে মাতা, ‘আয় আয় আয়
এই ত সময় নিশা চলে যায় ;
কর্তব্যের পথে, জীবনের ব্রতে,
টেলে তনু মন আয় বাছা আয়।
“এসেছি যে কাযে ভব-কৰ্ম্মভূমে,
করহ সাধন, কি ভয় মরণে ?
উঠ । জাগ মন! কর তবে রণ,
সঁপে দাও প্রাণ মায়ের চরণে।”
এত বলি গােরা ধীরে দাঁড়াইলা,
ধীরে—অতি ধীরে দুয়ার খুলিলা ;
হরি বােল বলে, ভাসি নেত্ৰজলে,
অম্লান হৃদয়ে ধীরে বাহিরিলা।
ডাকিলে জননী আপন সন্তানে,
হেন সাধ্য কার বাঁধে তার প্রাণে ?
মায়ের উদ্দেশে, ভাব রসে ভেসে,
চলেছেন গােরা প্রফুল্ল পরাণে।
সাগরে ছুটিলে নদী বেগবতী,
হেন সাধ্য কার রােধে তার গতি ?

চৈতন্যের গৃহত্যাগ।
ছুটেছেন গােরা, ভাবে আত্মহারা,
যথা গুরুদেব কেশবভারতি।
চলেছেন গোরা, ফিরে নাহি চায় ;
নৈশ নীলাকাশ করে হায় হায় !
বায়ু হু হু বহি, কাঁদিতেছে কহি,
“নদেপুরে চাঁদ দেখ চলি যায়।
“নীরব নিশীথে, নীরব চরণে,
দেখ চলি যায় নদিয়ার ধনে।
জাগ নদেবাসি, দেখ দেখ আসি,
নদেপুরে চাঁদ পলায় কেমনে।
“না জাগিলে তােরা নদেবাসিগণ !
হারাবে জননী একটী রতন ;
জাগ নদেবাসি, দেখ দেখ আসি,
উঠেছে জ্বলিয়া শােক-হুতাশন !
লাখে লাখে পাখী ‘নিমু’ ‘নিমু’ বলে,
উঠিল কাঁদিয়া ঘাের কোলাহলে !
কাঁদিল রজনী হায় অভাগিনী,
ভাসিল কপােল হিম-অশ্রুজলে !

চণ্ডাল বেশে রাজা হরিশ্চন্দ্র।
দুৰ্বলতা !-মহাপাপ!—ছি ছি অতি হেয় ।
গেছে রাজ্য গেছে ধন মান,
যায় যাক্ তৃণ্যতুল্য প্রাণ,
তথাপি—তথাপি ধৰ্ম্ম, প্রিয়, পালনীয় ।
ক্ষুদ্র দেহে ক্ষুদ্র প্রাণ স্বপনের হাসি ;
বৈভব সম্পন্ যত হায়,
তরঙ্গের জলবিম্ব প্রায়,
অমৃত সুকৃতি-শান্তি-সুখ অবিনাশী।
মানব-জীবন রাজ্যে অমৃতের খনি
সত্যধৰ্ম্ম ; প্রাণ বিনিময়ে,
সে দুর্লভ অমৃত লভিয়ে
কি দুখ মরণে বল ?–মৃত্যু ধন্য মানি।
কিসে সুখ ? কিসে দুখ ? আছে কি জগতে,
দু’য়ের অস্তিত্ব কোন হায় ?
চেয়ে দেখ মানব-ধরায়
সুখ দুখ অনুভূত শুধুই মনেতে ।

চণ্ডাল বেশে রাজা হরিশ্চন্দ্র।
অই দেখ সম্পদের মধুর ছায়ায়,
অশ্রুজলে ভাসে নরবুক,
দুখ-রবি-করে ম্লান মুখ ;
কিন্তু তরুতলবাসী আনন্দে বেড়ায়।
তবে কেন ভ্রান্ত মন, তবে কেন আর
ফুকুরিয়া কর হাহাকার,
অবিরল ঢাল অশ্রুধার ?
দাঁড়াও আপন পদে ; কি ভয় তােমার ।
ধৰ্ম্ম-পথ-পরিপন্থী পাপ দুৰ্বলতা,
আসে যদি পাশে পুনরায়
পদাঘাতে ঠেলিও উহায় ;
পরিহর ঘণনীয় হৃদি তরলতা।
দেবতার প্রাণপ্রিয় সাধুতা-ভূষণ,
তুলনা কি ভবে আছে তার?
রক্ষিতে সে দেব অলঙ্কার,
যায় যদি যাক্, ক্ষুদ্র ক্ষণিক জীবন।
যায় যদি যা’, নহি কাতর তাহায়
ক্ষণেক অভাবে ভবে যার,.

প্রভাত-কুসুম।
মানবে পশুতে কিছু আর
থাকে বৈষম্য, হায় ! সেই যদি যায়,
যা’ তবে ক্ষুদ্র প্রাণ স্বপনের হাসি ;
গেছে যা’ রাজসিংহাসন,
ভােগ-সুখ-মাকাল-কানন,
করুক না বজ্রধ্বনি বিপদের রাশি ;
কি ভয় !
যে জন সত্য-সুধা অভিলাষী।
সে অমূল্য অতুল ভূষণে,
চলে যাব নিজ নিকেতনে,
লভিব আলােক চির, অমৃতের রাশি।
সত্য ধর্ম ;-ধৰ্ম্ম রক্ষা জীবনের ব্রত ;
মানুষের রক্ত-মাংসে যার
দেহ, অবশ্য কর্তব্য তার ;
তবে কেন ভ্রান্ত মন, চিন্তায় বিব্রত ।
যদ্যপি রক্ষিতে ধৰ্ম্ম যায় ক্ষুদ্র প্রাণ,
ভাল কথা, শুভ আশীৰ্বাদ ;
পরিহর গভীর বিষাদ,
উড়িবে জগতে তব বিজয় নিশান ।

চণ্ডাল বেশে রাজা হরিশ্চন্দ্র।
আমি ক্ষুদ্র কীট, কোথা পাব পুণ্যফল ?
ভয়ঙ্কর জীবন-সংগ্রাম,
তাহে অবাধ্য ইন্দ্রিয় দাম,
কেমনে লভিব হায় ! বিজয়ের ফল।
আমি ক্ষুদ্র কীট, কোথা পাব পুণ্যফল ?
সে কেমনে ব্রত সম্পাদন
করিবে দুর্বল যার মন,
দুখের প্রহারে ঋরে নয়নের জল ?
ভােগ-সুখে রত ছিনু, বুঝি নাই দুখ ;
বুঝি নাই দারিদ্র যাতনা,
ভাবি নাই ভাগ্য বিড়ম্বনা,
হয়নি অভাবে কভু আধফাটা বুক !
শিরীষ কুসুম সম সুখদ শয়ন,
পারেনি সুষুপ্তি আকর্ষিতে,
স্বপনের পীযূষ ঢালিতে,
এবে তরুতল হায় ! ভুলাইছে মন।
ভােগ বাসনার সেই অতৃপ্ত পিয়াস
আকাশ-কুসুমে পরিণত ; .

৬০
প্রভাত-কুসুম
দুঃখদগ্ধ চিত অবিরত।
কোথা রাজ্য, কোথা ধন, একি সর্বনাশ !
সর্বনাশ !–মিছা কথা ; কিসে সর্বনাশ ?
ধনে জনে কে সুখী সংসারে ?
সাম্রাজ্যেতে কি দুখ নিবারে ?
বিষয়ে মিটেছে কার বিষয়-পিয়াস ?
ক্ষণস্থায়ী জলবিষ মিশিয়াছে জলে,
রক্ষিবারে স্বর্গীয় সম্পদ,
মানুষের অতুল সুপদ,
কিসে তবে সর্বনাশ, এ মহীমণ্ডলে ?
গেছে ধন, আছে ধৰ্ম্ম অতুল ভুবনে,
শাশ্বত সুখের সুধা যাহে,
খেদান্বিত কেন তবে তাহে ?
কেন ভাবি ? কেন ভাসি নয়ন-জীবনে ?
ক্লান্ত দেহ ভয়ঙ্কর জীবন সংগ্রামে।
ভাবিতে না পারি কিছু আর,
শক্তিহীন দুৰ্বল অসার
মন ; ঘাের কালানল জ্বলিছে মরমে।

চণ্ডাল বেশে রাজা হরিশ্চন্দ্র।
কিন্তু হায়! আমা হতে মম প্রিয়জন
কষ্টের বজর ধরি বুকে,
বিষাদ কালিমা লয়ে মুখে,
দুঃসই দীনতা-বিষে মুমূয়ু জীবন ।
এ দুঃখেই আজি মম আকুল পরাণ ;
নহে হেন দীনতা-অনলে,
ঝরে অশ্রু নয়ন-কমলে ;
এক দুঃখে হইয়াছি মৃতের সমান ।
প্রাণাধিক রােহিতাস্য ! হৃদয়-নন্দন,
কোথা তুমি আজি হায় হায় !
অভাগা জনক তব পায়,
সুতীক্ষ কুঠার আহা! করেছে হনন।
বাছা মাের অপােগণ্ড অবােধ বালক,
রাজসুখে লালিত পালিত,
রাজ-ভােগে হয়েছে বর্ধিত,
কেমনে সহিছে বাছা, দুঃখ ভয়ানক!
জীবনে যে দেখে নাই বাটীর অঙ্গন
হা অদৃষ্ট! সেই শিশু আজ,

৬২
প্রভাত-কুসুম
কণ্টক-সঙ্কুল বনমাঝ,
ঘুরিয়াছে কত! প্রাণে সহে কি এমন ?
শত দাস ছিল যার সেবায় নিতে,
হায় আজি সে কেমন প্রাণে,
চেয়ে আছে পর-মুখ পানে ?-
কেমনে সহিছে দুঃখ আগুনের মত।
বিস্তৃত বিপিন যবে দহে দাবানলে,
প্রফুল্ল প্রসূন যথা হায়,
মুহূর্তে দগধ হয়ে যায়,
তেমতি পুড়িছে বাছা ঘাের দুখানলৈ !
পতিপ্রাণা, পুণ্যময়ী শৈব্যা রাজরাণী,
দাসীত্ব দুঃখের বেড়ী পরে,
নেত্ৰাসারে ভাসে পর ঘরে,
রাজরাণী হয়ে হায় পথের দুঃখিনী !
ঋণমুক্ত পাপমুক্ত করিতে আমায়,
পতিপ্রাণা পরের কিঙ্করী,
সু গতি করিও ভার হরি !
আমা হতে নাহি তার, হইবে উপায়।
.

চণ্ডাল বেশে রাজা হরিশ্চন্দ্র।
আর আমি হীনজাতি শ্মশান চণ্ডালে,
করিয়াছি আত্মসমর্পণ,
শ্মশানেই করিছি ভ্রমণ,
হা ঈশ্বর ! এত দুঃখ লিখেছিলে ভালে।
জগদীশ !
ধন্য তুমি ! তবু যে আমার
ঋণের পাহাড় অপনীত,
ধৰ্ম্মপথে রহিয়াছে চিত,
দুখ দগ্ধ জীবনেতে এ সুখ কাহার ?
কেন কাঁদি অতীতের বিষাদ ডাকিয়া ?
অকারণে কেন আর মনে,
গত শত দুখ আবাহনে,
ঘূর্ণিত দুশ্চিন্তা-স্রোতে যেতেছি ভাসিয়া।
অবশ্যই একদিন, জন্ম জন্মান্তরে,
যদি
রহে
ধৰ্ম্ম পথে মন,
কৰ্ত্তব্যেতে অটল চরণ,
ভুঞ্জিব অমর শান্তি, পবিত্র ‘অন্তরে।
“সম্মুখে—সম্মুখে, ওই সম্মুখে সে দিন;
বিজয় দুন্দুভি ল’য়ে করে,
.

৬৪
প্রভাত-কুসুম।
মহাকাল ঘাের ঘন স্বরে,
ওই শােন বিজ্ঞাপিছে, “সম্মুখে সে দিন।”
মেঘাচ্ছন্ন রজনীতে।
;
গভীর নিশীথ ; নৈশ নিবিড় আঁধারে,
নক্ষত্রখচিত নভঃ ঘন, আবরিয়া,
জীবন্ত জীমূত বৃন্দ খেলিছে কৌতুকে ।
ভয়ঙ্কর বজ্রধ্বনি ! বিদারি গগন
সহস্র কামান যেন গর্জিছে গম্ভীর
যুগপত্ ; স্তব্ধ ধরা। গৰ্ব্ব-বিস্ফারিত,
অভঙ্খিত মেঘমালা চপলার হাসি
হাসিতেছে মুহুর্মুহুঃ ধাঁধিয়া নয়ন ;
হায় রে যেমন ভীমা করালবদনা
মুক্তকেশা মুক্তকেশী অসুর সমরে,
ভীষণ খপর
করে,
নাচিছে ভীষণতর; হাসিতেছে তার
বিঘূর্ণিত-অসিপ্রভা।—বিশ্ব চমকিত।
আঁধারে প্লাবিত বিশ্ব অতি ভয়ঙ্কর ;
উন্মাদিনী বেশে,

মেঘাচ্ছন্ন রজনীতে।
বহে কি না বহে বায়ু, জড়ায় জড়িত
বিস্ময়-স্তিমিত নেত্রে, স্তম্ভিত হৃদয়ে,
তীক্ষ ক্ষণপ্ৰভালােকে দেখিনু সভয়ে,
ছুটিয়াছে চতুর্দিকে অনন্ত বিমানে,
আঁধার তরঙ্গ ভেদি, নীরদের মালা
দ্রুতগতি; মদমত্ত করি-যূথ যথা।
গভীর আঁধারে মুখ ঢাকিয়া নীরবে,
শঙ্কিত ব্রততী যেন কাঁপে তরু কোলে।
সভয়ে ভল্ল, ক ব্যাঘ্র শ্বাপদ নিচয়
গভীর নিশীথে এবে রয়েছে নিদ্রিত।
নীরব বিহঙ্গ কণ্ঠ ; নিস্তব্ধ কানন ;
ঘাের নিদ্রা অভিভূত, স্তব্ধ লােকালয় ;
একটি প্রাণীর কোথা সাড়া নাহি পাই।
শান্তিপ্রদায়িনী নিদ্রা, দুয়ারে দুয়ারে,
ফিরিছেন হৃষ্টচিত্তে, উৎসবকৌতুকে;
কিন্তু দেবী, দরিদ্রের অাধার কুটীরে
মলিনা; শায়িত হায় ! ছিন্ন শয্যাতলে
কাঙ্গাল; হৃদয়ে জ্বলে চিন্তা-চিতানল ।
আসে কি না আসে ঘুম, আকুল পরাণ
সকাতর ; মন যেন ছুটিয়া বেড়ায়
৯.

প্রভাত-কুসুম।
চৈত্র-বায়ু-বিতাড়িত শক্তর মতন।
ব্যাধ-বাণে জর্জরিত কোমলপরাণ
অথবা কুরঙ্গ যথা, ছটফটি হায়,
প্রাণ ভয়ে ছুটে দ্রুত, তড়িতের গতি,
গহন কাননে দূরে, নিবিড় আঁধারে ।
ভয়ঙ্কর মরুভূমি দুঃখীর হৃদয় ?
মাগু-ময়ূখমালা অর্থ-চিন্তা তার ;
নিশ্বাস উত্তপ্ত বায়ু বহে ঘন ঘন ;
আশা মরীচিকা, ঘাের প্রহেলিকাময়ী ;
পরের আশ্বাস বাক্য দূর জলাশয় ;
ঘৃণা, লজ্জা, ভয় উত্তপ্ত বালুকা রাশি,
ধ ধ জ্বলিতেছে কৃষাণু সমান!
কাঁদে দুঃখী, অদৃষ্টের ঘাের বিড়ম্বনে,
আঁধারে, ঢালিয়া অশ্রু ছিন্ন উপাধানে।
কি সাধ্য কাঙ্গালে হেন করিবে সান্ত্বনা,
করুণারূপিণী নিদ্রা, প্রসূতির মত !
হা বিধাতঃ ! কোন্ পাপে অপরাধী পদে
দীন দুঃখী ? কেন তার জীবন-কাননে,
জ্বালিয়া দিয়াছ হায় ঘাের দাবানল !
এ বিচার আমি, দেব, বুঝিতে না পারি ।

মেঘাচ্ছন্ন রজনীতে।
৬৭
কি ঘাের আঁধার নিশি! স্তব্ধ বিশ্বপুর।
আকাশে মন্দিছে ঘন, ঘন ঘাের রােলে ;
মুহুর্মুহুঃ চমকিছে বিদ্যুত্ বল্লরী।
তরঙ্গ বিভঙ্গে নাচে নিবিড় আঁধার ।
নিনাদিছে কালপেচা,ভয়ঙ্কর স্বর।
একাকী জাগ্রত আমি, হেন নিশাকালে ;
প্রতিবেশী, পরিজন সকলই নিদিত।
ভাবনা, বিস্ময়, ভয় আসি যুগপৎ
আক্ৰমিছে চিড় মাের, বিপুল বিক্রমে
বারম্বার ;-হায় যথা অহিভুণ্ডিকেরা
প্ৰদানিলে ফণিনীর বিবর নিবাসে
কর, ফেস্ ফেস্ করি করে আক্রমণ।
মানুষের ছায়া যেন (নহে পরিচিত)
নেচে এসে দৃষ্টিতলে, আঁখি পলকিতে
আঁধারে মিশিয়া যায় ; খদ্যোতিকা যথা
শ্যামাঙ্গী যামিনী কোলে খেলিয়া বেড়ায়।
একি ঘাের বিভীষিকা?—কেন ভীত আমি ?
মৃত্যু ভয়ে ? মৃত্যু কিসে ? মৃত্যু অভিধান
দেহনাশ? ভ্রান্ত!—ভ্রান্ত!—আশ্চৰ্য্যপ্রলাপ।
আমরা যেমতি, অতি জীর্ণ পরিধেয় ?
;

প্রভাত-কুসুম
উপলের মত ?
পরিহরি, পরিধান করি অভিনব
বাস ; আত্মা, জীর্ণ, বার্ধক্য-গলিত
দেহ, করি পরিহার, প্রবেশে নূতন
দেহে; এই ত মরণ ?—ভবে, এই ত মরণ ?
তবে কেন ভয় ? না—না মরেছি যে আমি
আমিত্ব-মৃত্যু-কবলে ;—দশাবিপৰ্যয় !
আমিত্ব! আমিত্ব মিথ্যা ?—আমি কিছু নই?
কে আমি প্রকৃতি, তবে, ডুবে আছি ঘাের
আঁধার-সাগরে ক্ষুদ্র
কে আমি অনন্ত বিশ্বে ?—কে আমি জননি
কোটি জীব জন্তু মাঝে ? কে আমি প্রকৃতি
কোটি চন্দ্র, কোটি সূৰ্য্য, কোটি কোটি তারা,
কোটি দেশ, মহাদেশ, পল্লী, জনপদে ?
সীমান্য বায়ুরাশি, কোটি তরুলতা,
কোটি ধরা, ধরাধর অভ্রভেদীচূড়া,
কোটি নদ, কোটি নদী, অম্বুরাশি মাঝে
কে আমি জননি?—ক্ষুদ সিকতার রেণু,
ডুবে আছি কাল রূপ জলধির জলে ?
এই দিবা, এই নিশা,—এই রবি শশী,
এই হাসি, এই কান্না, এই সুখ দুঃখ,

মেঘাচ্ছন্ন রজনীতে।
কি বিচিত্র মাখামাখি গরলে পীযূষে?
মগ্ন ধরা, জন্ম মৃত্যু আলাে অন্ধকারে।
কে আমি প্রকৃতি, হেন বিচিত্র জগতে ?
পড়ে আছে পদতলে বিপুলা ধরিত্রী,
অনন্ত আকাশ ঘুরে মস্তক উপরে-
কোটি গ্রহ সমন্বিত ;-অচিন্ত্য অদ্ভুত !
এ অনন্ত বিশ্বে মাতঃ, কত ক্ষুদ্র আমি
নাহি অনুভূত হয় ! কেমনে বর্ণিব ?-
ক্ষুদ্র মানুষের ভাষা অসার-দুৰ্বল,
কেমনে প্রাণের কথা বর্ণিব জগতে ?
বনে ফোটে ফুলদল, ডাকে পাখী কত
শ্রবণ কুহরে ঢালি পীযূষেধ ধারা,
নিশি দিশি বনে বনে ; জনমে সুফল
রসনার তৃপ্তিকর অমৃত সুস্বাদু ;
বহে বায়ু নেচে নেচে সলিলশীতল
মৃদুমন্দ গতি; ঢালে শশী জ্যোছনার
ধারা; হাসে কাদম্বিনী চপলার হাসি।
কহ মাতঃ ব্ৰহ্মময়ি, কহ দয়া করে
কে আমি?—কে আমি, হেন মধুর জগতে ?
বুঝি না কে আমি ; কেমনে বুঝিব?—

. ৭০
প্রভাত-কুসুম।
'অর্বাচীন, অহঙ্কত, মায়ামােহ-জালে
চিরবদ্ধ ; বদ্ধ যথা দৃঢ় বাগুড়ায়
অবােধ বিহঙ্গ। দাও বুঝাইয়া তবে
অজ্ঞান সন্তানে মাতঃ, কে আমি জগতে।
আসিয়াছি কোথা হতে? কোথা ভেসে যাই?
কোথা গিয়া পরিণামে হ’ব আবিভূত ?
অন্ধকারে কি আলােকে ! আঁধার আলােক
চিরসঙ্গী ;-ভাবিয়া নাপাই তত্ত্ব তার।
চিন্তি যদি স্থির চিত্তে নিভৃতে বসিয়া,
ক্ষুদ্র মানুষের ক্ষুদ্র বিবেক-শকতি
ফিরে আসে অবােধের মত ; কেমনে গো
বুঝিব জননি! দেবি, না শিখালে তুমি
কোথা শিক্ষা পাব ? না শিখালে মাতা
কোলের শিশুরে, বল, কেমনে শিখিবে
সু নীতি? হে মাতঃ, আমি ক্ষুদ্র জীব, তেই
বুঝিতে তােমার লীলা, অবােধ—অক্ষম।
সাগরে জনমি, পুনঃ মিশায় সাগরে
সাগর-হিল্লোল যথা, জন্মেছি তােমাতে,
তােমাতে মিশাব দেহ;—এই মাত্র জ্ঞান।
আসিয়াছি কেন ভবে ? নাই কি নিগুঢ়

মেঘাচ্ছন্ন রজনীতে। ? তার ? অবশ্যই আছে। কেমনে বুঝিব সে নিগুঢ় তত্ত্ব ? কে দিবে বুঝায়ে মােরে ? মাতঃ, আমি নর ক্ষুদ্র পতঙ্গ সমান, ক্ষুদ্র বালুকার রেণু-নরকের কীট- জগতের পদধূলি—ঘাের অর্বাচীন ; কেমনে বুঝিব আমি সে নিগূঢ় ভাব ? অক্ষম বুঝিতে যাহা, মুনি মহাজন। শােক, দুঃখ, জ্বর, ব্যাধি চির সঙ্গী মাের; কেন সহি জন্মে জন্মে, জন্ম মৃত্যু ঘাের বিড়ম্বনা ! ক্ষুদ্র দেহে কি হবে জগতে ? অবিদ্যা-অবশ হিয়া, অত্যন্ত দুৰ্বল, কি হবে সে হৃদয়েতে? কেন ভবে আসি ? মা, তােমার এ মহিমা বুঝিতে না পারি । তবে দেবি, দয়া করে দাও বুঝাইয়া (মূর্তিমতী দয়া তুমি স্নেহস্বরূপিণী) কি কাযে এসেছি ভবে, দীন, ক্ষীণ প্রাণ লয়ে আমি ?—পালিতে কি তােমার আদেশ? কি আদেশ তবে, কহ তা জননি! তােমারি কোলের শিশু, প্রাণের কুমার আমরা এ ক্ষুদ্র কীট, ক্ষীণবুদ্ধি জীব। •..

१२ প্রভাত-কুসুম। •• কহ'তবে বিশ্বরমে, আশীষি সন্তানে ; বিলম্ব না সহে আর। আজ্ঞা তব মাতঃ, জীবনের ধ্রুব লক্ষ্য মম; কি আদেশ কহ তবে, চির দাসে, চির আজ্ঞাধীনে। সাধিতে তােমার কায, অটল অচল, অভ্রভেদী চূড়া ; কিম্বা বজ ভয়ঙ্কর, বাধে যদি বৈরীরূপে, অবাধে জননি, উড়াইব পদাঘাতে ; পদাঘাতে যথা উড়ায় সিকতা পুঞ্জ, সৈকত পুলিনে, ক্রীড়াচ্ছলে ক্রীড়াসক্ত রাখাল বালক। জননী যাহার তুমি, কর্তব্য-বিবেক যাহার জীবনীশক্তি, সে কেন ডরাবে তুচ্ছ জগতের বাধা ?—বজের প্রহার ? সাধিতে তােমার কায,--আমি পুত্র তব- খসে যদি জীবফুল, কালের প্রহারে এ দেহ-ব্রততী হতে ; খসুক জননি! কি ভয় ? কি দুঃখ তায় ? বাসনা যাহার তুলিতে কমল ফুল, সে কি কভু গণে কণ্টকের ভয় ? মাতঃ, মধুপ কি কভু মধুর আধারে মধু করি বিলােকন, ।

দুঃখাকুল যুবক।
জগতের দুঃখে কিম্বা, তুচ্ছ মৃত্যু ভয়ে
সম্বরিতে পারে তার লােলুপ রসনা ?
ডরি না শমনে,-মৃত্যু চিরসখা মাের।
প্রসীদ, প্রসীদ মাতঃ, বিশ্বের ঈশ্বরি!
দাও দেখাইয়া মােরে ভবের সুপথ ;
যে পথে প্রবেশি, দেবি, লভিব আনন্দে
পদ যুগ তৃব, চির দুর্লভ জগতে ;
স্তন্য পানে জুড়াইব সন্তপ্ত হৃদয়।
প্রসীদ, প্রসীদ মাতঃ বিশ্বের ঈশ্বরি।
দুঃখাকুল যুবক।
বিশ্রাম লভিতে অস্ত গেলা দিনমণি ;
অবনী আবৃত করি ঈষৎ আঁধারে,
আসিল রজনীসহ সন্ধ্যা বিনােদিনী।
সুশীতল সমীরণ বহিল সংসারে ;
বিকশিল কত ফুল,মুখে মৃদু হাস,
মিটিল সুরভিপ্রিয় পবন পিয়াস।

৭৪
প্রভাত-কুসুম।
ক্রীড়া-কৌতুহলচ্ছলে, সুদূর গগনে,
সন্তরে তারকা নীল অম্বুরাশি জলে ;
সায়াহ্নের কাল রূপ যেন দরশনে,
হাসিছে নক্ষত্র প্রীতি-উপহাস-চ্ছলে।
প্রতিবিম্ব ধরি তার স্থির জলাশয়,
পরেছে তারার হার, হেন মনে লয় ।
একটি সুখের ঢেউ হৃদয়ে যাহার,
কালের প্রবল বাতে উঠেনি কখন ;
প্রীতির পবন যার হিয়ার মাঝার,
বহে নাই মৃদু, করি সুধা বরিষণ ;
আশার কোমল-কর-মার্জিত পরাণে
দহিতেছে নিরাশার দাব-হুতাশনে ;
জননীর অযাচিত স্নেহের ছায়ায়
শীতলিতে প্রাণ যার পারেনি কখন ;
মাতার কারুণ্যদৃষ্টি পূর্ণ অমিয়ায়,
যাহার আননে কভু হয়নি পতন ;
দক্ষিণ বাহুর মত প্রিয় সহােদর,
যাহার জীবন-পথে হয়েছে অন্তর ;

দুঃখাকুল যুবক।
জীবনের প্রিয় যার হৃদয়ের ধন,
হইয়াছে শ্মশানের ভস্মে পরিণত ;
নিদারুণ-শােকাঞ্জন-লাঞ্ছিত নয়ন
সজনে, নির্জনে হায় ঝরে অবিরত :
শােকে দুখে প্রাণ যার করে টল মল
অশ্রুজল জীবনের কেবলি সম্বল ;
তাহারও পরাণে ফোটে আনন্দের ফুল ;
তাহারও দগধ হিয়া হতেছে শীতল;
তাহারও দুঃখের স্মৃতি হইয়াছে ভুল,
প্রদোষ-সৌন্দৰ্য-দীপ্ত নয়ন-কমল।
ভাবিছে প্রমােদ চিত্তে কষ্টের পরাণ
এ নহে কেবলই মরু, দগধ শুশান।
কিন্তু হায়! কেন মম প্রাণের মাঝার,
জ্বলিতেছে হুহুঙ্কারে বহ্নি-পারাবার !
সান্ধ্য শীতলতা কেন বিদ্যুৎ আকার
পরাণে-মরমে মম পশে বার বার !
হেসে উঠে সুদুখের জাগ্রত স্বপন;
বিষাদ-লহরী প্রাণে ছুটে বিভীষণ !

প্রভাত-কুসুম।
শােক-অশ্রু বিদলিত কমল নয়ন,
মরমের কোলে হায় ঘাের কোলাহল,
হইয়াছে সম দুঃখ জীবন মরণ !
বিহগ নিস্বনে বিষ উগারে কেবল ;
মনের সুস্থতা মাের নাহি এক ক্ষণ ;
হায় রে ! অদৃষ্ট কেন এত নিরমম !
নাহি সুখ, নাহি শান্তি ; মরুর মতন
হৃদয়-কানন, তীব্র দীনতার বিষে।
ফাটে কণ্ঠ, ফাটে বুক ! হায় রে যেমন
পিপাসিত চাতকের দারুণ পিয়াসে।
অবস্থার অনিবাৰ্য কঠিন পেষণে
সজীব কুসুম যেন পুড়িছে আগুনে।
আশার মােহন ফুল কত না ফুটিল,
এ হৃদয়-তরু-শাখে ; হায় ভাগ্য দোষে
না ফলিতে সুধা ফল অমনি ঝরিল !
অমনি শুকা’ল!—যথা শুকায় সরসে
• মরালের নখছিন্ন কমলের দল!
নয়নে শুকাল কত দুখ অশ্রুজল।

দুঃখাকুল যুবক।
৭৭।
জীবনে সুখের মুখ দেখিনি কখন,
একটী মনের সাধ পূরিল না হায় !
তপনে তুষার বিন্দু শুকায় যেমন,
মনের বাসনা যত মনেই শুকায় ।
নিরাশার অগ্নিময়ী ভয়াল মুরতি
নিরখিয়া অবিশ্রান্ত অবসন্ন মতি।
অদৃষ্ট-সিন্ধুর জলে দুখের লহরী
মুহুমূহুঃ গর্জিতেছে, হতেছে বিলয় ;
গভীর কল্লোল তার, গগন বিদারি
ছুটিতেছে চতুর্দিকে ;-বিভীষিকাময় !
পারি বুঝিতে কিছু, না পারি ভাবিতে,
আশঙ্কার শত বজ পড়িতেছে চিতে।
দরিদ্রতা-কালানল ভীষণ কবলে,
করিয়াছে গ্রাস যারে, শান্তি-সুখ হায় !
সুদুর-স্বপন তার ; নয়ন-কমলে
নিশি দিন ঝরে অশ্রু বারিধারা প্রায়
হায় রে ! শােণিত-স্রোতঃ বিষের মতন
বহিতেছে ধমনীতে, জীবনে মরণ।

৭৮
প্রভাত-কুসুম।
প্রবাস হইতে যবে ফিরিনু আলয়ে,
ভাবিলাম ভবিষ্যৎ, ঘাের বর্তমান !
হেরিলাম আশালতা সম্মুখে পড়িয়ে,
ছিন্নমূল, ছিন্নদল, বিগতপরাণ ।
অচিন্ত্য পতন তার, অচিন্ত্য মরণ,
ভাসাইল তপ্ত বুক ঝরিল নয়ন।
ভবিষ্যৎ অন্ধকারে করিয়া নির্ভর,
সুখের কল্পনা করি দেখি’ছি স্বপন ;
স্থাপিয়াছি অট্টালিকা বিমান উপর,
সুখবীজ স্রোতােজলে করেছি বপন।
মােহান্তে এখন দুঃখ-নিশার আঁধার
নিরখি আতঙ্কে প্রাণ, কাঁপে বার বার ।
রে অদৃষ্ট, রুষ্ট-বিধি-লেখনী-লাঞ্ছিত !!
কত দিন, কত যুগ, হায় নিরন্তর
কালের,
কঠিন
করে, হ’ব বিড়ম্বিত ?
কত দিন ভেসে যাব ? ভাসে ক্ষুদ্রতর
স্রোতােধীন তৃণ যথা স্রোতস্বতী নীরে।
সুখের সু দিন হায় আসিবে না ফিরে ?

দুঃখকুল যুবক।
৭৯।
অদৃষ্ট ! তুই কি পােড়া মানবের হেন
যাতনিতে, বিড়ম্বিতে, আশার মুরলী
বাজায়ে প্রলুব্ধ কর মানুষের মন ?
তুই কি শাসন দণ্ড ভীম করে তুলি
অজ্ঞাত শক্তির বলে শাসিছ মানবে ?
এত কি প্রভাব তাের সংসার-আহবে ?
দরিদ্রতা-বহ্নি-চিতা অতি ভয়ঙ্কর
করিয়াছে অভাগারে একেবারে গ্রাস ;
পুড়িতেছে বাসনার কুসুম নিকর,
মর্মভেদী সেই দৃশ্য ! ভয়ানক ত্রাস।
অকালে কালের গ্রাসে আশা বিননাদিনী,
হায় যথা গরুড়ের নখরে নাগিনী।
যাই ফিরে ঘরে ; মা-র পূজিগে চরণ,
স্নেহময় জনকের লয়ে পদধূলি ;
সুন্দর সরল শিশু প্রিয়দরশন
ভ্রাতা মম, অনুপম ; ল’ব কোলে তুলি
সােনার হাসিটি তার পড়িবে ফুটিয়া
জুড়াইব দুঃখানল-দগ্ধীভূত হিয়া।

৮ ০
প্রভাত-কুসুম।
যাই ফিরে ঘরে ; ঘাের দারিদ্র্য যাতনা,
দেখিবেন স্নেহময়ী দুর্গতি আমার,
কাঁদিবেন মহাদুখে, তা’ত সহিবে না;
এক বিন্দু অশ্রু তার, শত বজধার !
কি অসহ্য বিড়ম্বনা!—তবু হা ঈশ্বর ।
হউক্ তােমার ইচ্ছা পূর্ণ নিরন্তর।
জগদীশ ! দীননাথ ! দীনের শরণ!
আশীষ সন্তানে তব, ওহে স্নেহময় !
নাহি ডরি দীনতায়, না ডরি শমনে,
কালের ঘূর্ণিত চক্রে—প্রহেলিকাময় !
খেতে পারি হলাহল আকণ্ঠ পূরিয়া,
পীযূষ-পূরিত নাম, অন্তরে স্মরিয়া ।
দীননাথ ! দীনতার সম্মুখ সমরে,
জয় পরাজয় মম, মম ভাগ্যাধীন ;
কিন্তু যেন ভক্তিপূর্ণ পবিত্র অন্তরে
পৃজি ও পবিত্র পদ সুখে চির দিন।
সত্য ধৰ্ম্ম,—এই ভিক্ষা, ভ্রমেও কখন
ভুলি নাহি হই নাথ কলুষিতমন।

যমুনা-পুলিনে
{ গভীর নিশীথে চন্দ্রোদয়ের সময় লিখিত।)
কি ফুল ফুটিছে ওই গগনের স্নিগ্ধ কোলে,
খুলেছে কি স্বর্গের দুয়ার ।
দিক্‌ হ’তে দিগন্তরে
গলিয়া পড়েছে যেন
পরাণের হাসিটি কাহার ।
কি মধুর!—নিরমল ! হাসির তরঙ্গগুলি
অন্তর ধরিয়া যেন টানে।
কি কবিত্ব !-ভাবুকতা! ঢালা কত পবিত্রতা ।
কি সারল্য চন্দ্রমার প্রাণে।
নীরবে গগনে উঠি নীরবে চলিয়া যায়,
অন্তরেতে নাহি হাহাকার !
নাহি জ্বালা অশান্তির, নাহি ক্লেশ দীনতার,
নয়নে না বহে অশ্রুধার ।
পরাণ উচ্ছাসে ভরা, অন্তর অমৃতে গড়া,
বাসনার হয়েছে নির্বাণ।
বড় সাধ শশি, আজ হৃদয়ের মাঝে ধরে,
তােমাতে ডুবায়ে রাখি প্রাণ।
.

৮২
প্রভাত-কুসুম
শশধর ! প্রাণে তব ফুটিয়া পড়েছে শান্তি,
আশা যেন কালকবলিত ।
জীবনের পিপাসার
সমাধি হয়েছে যেন,
সুখের সাগর উছলিত।
গাইছে যমুনা মরি ! ললিত কল্লোল তুলি,
তরঙ্গে ফুটিয়া পড়ে হাসি।
চন্দ্রিকা-জড়িত যত হাসিমাখা মৃদু ঢেউ
বহে যায় আনন্দ প্রকাশি।
ঘুমন্ত জ্যোছনা কোলে নৈশ বায়ু হেসে খেলে,
লহরীর গলা ধরে ধায়।
সখার মিলনে যেন উছলে সখার প্রাণ,
হাসি মুখে নাচিয়া বেড়ায়।
অনিলদোদুল্যমান শ্যামল বিটপী গুলি
পরিয়াছে কৌমুদীর হার ;
নবীন-নীরদ-কোলে ঘুমন্ত বিজলী যেন,
ঢালিয়া দিয়াছে হৃদিভার।
নীরব-নিস্তব্ধ ধরা, শান্তির সাগরে মগ্ন,
ত্রিতাপ হয়েছে অবসান।
চেত'তৃপ্তি! কত প্রীতি! কত শান্তি মরি মরি ।
আহলাদে পড়িছে গলি’ প্রাণ।

যমুনা-পুলিনে।
;
দেবতার কিবা স্নেহ !—উছলে অত সিন্ধু
অন্তরের অন্তরে আমার
ইহারি কাঙ্গাল করি, দেবতা সৃজিলা মােরে,
পান করি সে সুধার ধার ।
মনাের প্রকৃতির
সৌন্দৰ্য-সাগর মাঝে
আপনারে যাই হারাইয়া;
কত অশ্রু যায় মুছে, কত শান্তি আসে প্রাণে,
প্রেম-সিন্ধু উঠে উথলিয়া।
আশার সে তুষানল অলখিতে নিবে যায়,
বসি যবে যমুনার কূলে ;
বিষাদের বিষমাখা জীবন-কাহিনী গুলি
জানি না কেমনে যাই ভুলে।
এস শান্তি! এস বুকে, মরুভূমে
মন্দাকিনী
দগ্ধ জনে কর প্রীতি দান।
রাজায়ে হৃদয়-বীণা, ভকতি কোমল কণ্ঠে
প্রাণেশের করি গুণ গান ।
০
৫

প্রকৃতি মা।
আমি মা, দুধের শিশু বুঝি না সংসার ;
ভােগ-সুখে অভিলাষ নাহি গাে আমার ;
আশার হিল্লোলে আর নাচিতে চাহি না,
হেসে খেলে চলে যাই, প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা।
সংসার-জীবনে আমি তৃণের সমান ;
পরেশ প্রীতির ফুল—একটি পরাণ ;
একটি বিষয় কণা হৃদয়ে পশে না,
হেসে খেলে চলে যাই, প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা ।
1
দুখ আসে, চলে যায় বিজলীর মত ;
চিন্তার তরঙ্গ হৃদে উঠি খেলে কত ;
আঁখিভরা অশ্রুবিন্দু একটি ঝরে না,
হেসে কেঁদে চলে যাই, প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা ।
দীনের কুটীরে হেরি মলিন বদনে
কাঁদে দুঃখী, ঢালে অশ্রু জীবন মরণে,
পরাণ উঠে মা কেঁদে, তিষ্ঠিতে পারি না;
সহে না দুঃখীর দুখ, প্রকৃতি মা প্রকৃতি মা।

প্রকৃতি মা ।
৮ ৫
থা’ ধনী ভােগ-সুখে অভিমান লয়ে ;
গা’ সে সুখের গান আকুল হৃদয়ে ;
মজিতে অলীক সুখে আমি ত পারি না;
অবিরাম কাঁদে দুখী ; প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা
দুখী মাের পিতা মাতা, দুখী মমার ভাই ;
দুখ লয়ে সুখ-গান গেয়ে গেয়ে যাই ;
যেখানে দুখীর অশ্রু, সেখানে বাসনা
ঢালি অশ্রু দিবানিশি, প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা ।
তুলে নে মা স্নেহ-করে স্বার্থের গরল ;
ভেঙ্গে দে মা ভিখারীর মোহের শৃঙ্খল ;
মা তাের নদীর জলে, মা তাের বনের ফলে,
সুখে থাকি, এ জীবনে এই ত বাসনা,
তোমারি কোলের শিশু; প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা
স্বার্থশূন্য হয়ে মাগো তুমিও সতত,
পরের সেবায় সুখে রয়েছ নিরত।
সন্তানে তেমন করে, সংসারে দেহ মা ছেড়ে,
পরকে আমার ভাবি—এই ত বাসনা
খাটিব পরের তরে, প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা।

৮৬
প্রভাত-কুসুম।
বনফুল ‘ক’রে দে মা, অঙ্গ আভরণ ;
কেড়ে নে মা গরবের ভীষণ ভূষণ ;
সাজিয়া যােগীর বেশে, ফিরিব মা দেশে দেশে,
কোথা দুখী, অশ্রু তার অসহ্য যাতনা,
দেখিব, কাঁদিব দুখে, প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা।
সাজাও সাজাও মােরে, পরদুখ-অশ্রু-হারে,
পরে সুখী করে সুখী হ’ব গাে সংসারে।
এ দীনের দয়াময়ি, ইহাই কামনা,
প্রাণ যায় যাক্ তাহে, প্রকৃতি মা, প্রকৃতি মা।
মেঘনার কূলে।
।
বর্ষা অবসানে,
সায়াহ্ন সময়
করি তরী আরােহণ ;
ভ্রমিয়া উল্লাসে
সলিলের পথে,
( সঙ্গে বন্ধু এক জন )
বাঁধিয়া তরণী ।
দেখি’ছি সায়াহ্ন শােভা ;
মেঘনার কূলে

মেঘনার কূলে।
৮৭
D
শুভ্র হাসি মুখে তরঙ্গের মালা,
নাচিতেছে মােলােভা।
এমন সময় দেখিনু বিস্ময়ে,
জীবন্ত মহিষ পাশে ;
মেঘনার খর প্রবাহে পড়িয়া
চলিয়াছে ভেসে ভেসে।
তরঙ্গের ঘায় কভু ডুবে যায়,
কখন ভাসিয়া উঠে ;
কি ঘাের সঙ্কট!—হায় রে! সংসারে
এমনই বিপন্ ঘটে ?
নাক মুখ কাণে পশিতেছে জল
পরাণ অস্থির হায় !
রােষ ভরে যেন আসি ঢেউ গুলি
ঝাপিয়া ধরি’ছে তায়।
আবার দেখিনু, নদী-কূল-জলে
আছে এক খুটি পােতা;
তৃণগুচ্ছ এক ভাসিয়া আসিয়া
আশ্রয় লইল তথা।
নাহি ভেসে যায়, খর স্রোতে অর,
ধরিয়া রয়েছে খুটি ;

৮৮
প্রভাত-কুসুম
প্রিয় বন্ধুবরে,
বহুভাগ্যফলে, লভিনু হেথায়
ভাল উপদেশ দু’টি।
কহিনু সুধায়ে
ওই মহিষের মত,
সংসারের স্রোতে, কোটি কোটি নর
ভাসে ডুবে অবিরত।
নাক মুখ কাণে পশে জল রাশি,
পরাণ অস্থির হায় !
রােষ ভরে যেন আসি তুঙ্গ ঢেউ
ঝাপিয়া ধরি’ছে তায়।
বিভুর চরণ
অবিচল খুটি,
ধরিয়া রয়েছে যারা,
নাহি ডুবে ভাসে সংসার-প্রবাহে
তৃণগুচ্ছ সম তারা।
সমাপ্ত
চারুমুদ্রণ যন্ত্রে-শ্রীত্রৈলােক্যনাথ চক্রবর্তী দ্বারা মুদ্রিত।

সংবাদপত্রের মত।
ঢাকার ভূর্ণ কাব্য।—ঢাকাই ঝড়ের ভীষণ লীলা কাব্যাকারে
বণিত। লেখা মনােহর। গ্রন্থকার কবি ও সহৃদয় বটেন। গ্রন্থ পাঠে
পাঠক পরিতৃপ্ত হইবেন।
বঙ্গবাসী।
ঢাকার তুর্ণ কাব্য-কবির নাম পুস্তকে উল্লিখিত নাই। নাই
থাকুক, তাহার কবিত্বশক্তি আছে। ১২৯৪ সালে ঢাকায় যে ভীষণ
ঝটিকা হয়, তাহা উপলক্ষ করিয়া পুস্তিকা খানি লিখিত হইয়াছে।
সহচর।
ঢাকার তূর্ণড কাব্য। কবির বর্ণনা করিবার শক্তি যথেষ্ট
আছে। *
নব্যভারত।
ঢাকার তৃর্ণড কাব্য-স্বভাব বর্ণনায় গ্রন্থকারের যথেষ্ট ক্ষমতা
আছে। শরৎ বাবু কালে লােভনীয় কবিযশঃ লাভে সমর্থ হইবেন।
সারস্বত পত্র।
সদ্ভাবকুসুম ।* * যুবক ও বৃদ্ধের পাঠ্য হইয়াছে। গ্রন্থ
পাঠে তাহারা উপকৃত হইবেন। গ্রন্থকারের ভাব, পদবিন্যাস ও কবিত্ব
শক্তি যথেষ্ট আছে। কবিতাগুলি আমাদের ভাল লাগিয়াছে।
0
*
অবলা-বান্ধব।-পুস্তকখানি প্রকৃতই “ অবলা-বান্ধব ”। আমরা
এ পুস্তক পড়িয়া নিরতিশয় সুখী হইয়াছি।
* দেশের
বাক্ষিকা বিদ্যালয় সমূহে এ পুস্তকের সম্যক আদর, হওয়া উচিত।
মেয়েদের যদি পুস্তক পড়াতেই হয় তবে এমনি পুস্তক তাহাদের পড়ান
উচিত।
বঙ্গবাসী।

yo অবলাবান্ধব'—এই পুস্তক খানিতে অবলার কর্তব্যাকৰ্তব্য সুন্দররূপে লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে। পতির প্রতি কর্ত্তব্য, বিনয়, শিষ্টা- চার, লজ্জাশীলতা, শরীরপালন প্রভৃতি বিষয় অতি দক্ষতার সহিত আলােচিত হইয়াছে। এরূপ সদুপদেশ পূর্ণ পুস্তক স্ত্রীলােকের হস্তে অৰ্পণ করিতে আমরা কিছুমাত্র কুষ্ঠিত নহি। আমরা তাহাদিগকে সমগ্র পুস্তক পাঠান্তে তদনুসারে কাৰ্য্য করিতে পরামর্শ দিতেছি। সহচর। অবলা-বান্ধব।—গ্ৰন্থখানির প্রথম দুইটি প্রবন্ধ পাঠ করিয়া দেখি- লাম। পঠিত অংশ হইতে এরূপ সংস্কার জন্মিয়াছে যে, মার্জিত বঙ্গ- ভাষায় ভাবব্যক্তি বিষয়ে গ্রন্থকারের বিক্ষণ ক্ষমতা আছে। যাহা হউক পরিণীতা যুবতী ও পৌঢ়া কামিনীগণ কথিত গ্রন্থ হইতে উপদেশ লাভ করিতে পারেন। এবং তাহাদিগের হস্তে ইহার এক এক খণ্ড অধ্যয়নার্থ অর্পিত হইতে পারে। শ্রীকুঞ্জলাল নাগ এম, এ, প্রিন্সিপাল জগন্নাথ কলেজ। ঢাকা-কলেজের সংস্কৃত শাস্ত্রাধ্যাপক শ্রীযুক্ত বাবু কালীপ্রসন্ন ভট্টা- চাৰ্য মহাশয়ের ইংরাজী পত্রের অনুবাদঃ-“আমি শ্ৰীযুক্ত বাবু, শরচ্চন্দ্র 'ধর প্রণীত অবল-বান্ধবের কতক অংশ পাঠ করিয়াছি এবং আমি মনে করি যে ইহা মহিলাগণের পাঠোপযাের্গী।”

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Prabhath-kusum

Author
Dhar,sharachchandra
Title
Prabhath-kusum
File name
Prabhath-kusum
Text
OCR done
Citation
1891
Published
2009/11/28
Publisher
Gurudas Chattopadhyay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
106
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Dhar,Sharachchandra
DLI number
513074
Barcode
4990010020086.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
xNmw1Ir5EOJ
Download PDF

Prabhath-kusum