Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Londone Swami Bibekananda Ed. 1st

Dutta,mahendra Nath · 2010/03/23

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

স্বামী বিবেকানন্দ
শ্রীমহেন্দ্র নাথ দত্ত
যুগান্তর বাণী ভবন
পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক
৩০, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

প্রকাশক–শ্রীজহর লাল বক্সী
যুগান্তর বাণী ভবন
৩০, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ, ১৩৩৮
মূল্য দেড় টাকা
প্রিন্টার-শ্রনীরদ চন্দ্র ঘােষ
রতি প্রেস
১৫, রায়বাগান স্ট্রীট, কলিকাতা

প্রাক্‌-বাণী ১৮৯৬ সালে স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকা হইতে লণ্ডনে যান, স্বামী সারদানন্দ অল্প দিন পূর্বেই রেডিং নগরে ষ্টার্ভির বাড়ীতে পৌছিয়া- ছিলেন ; বর্তমান লেখক এক সপ্তাহ পরে কলিকাতা হইতে লণ্ডনে পৌছেন। স্বামীজীর সহিত জে, জে, গুডউইন নামক একটা ইংরাজ যুবক থাকিতেন, তিনি স্বামীজীর ক্ষিপ্রলিপিকারের কাজ করিতেন। গুডউইন বাথ নগরের কাছে ফ্ৰোম নামক গ্রামে বাস করিতেন। তাঁহার বিধবা মাতা ও অবিবাহিত দুই ভগ্নী ছিলেন। গুডউইন স্বামীজীর নিতান্ত বশদ ও একান্ত সেবক ছিলেন। স্বামীজী যখন যে কথা বলিতেন বা বক্তৃতা দিতেন গুডউইন ক্ষিপ্রলিপিতে তাহা করচা করিয়া রাখিতেন। যে সকল ইংরাজী গ্রন্থ বক্তৃতারূপে স্বামীজীর নামে প্রকাশিত হইয়াছে সে সমস্তই গুডউইনের পরিশ্রমের ফল । স্বামীজী কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিলে গুডউইনও সঙ্গে আসেন। তিনি নানা কারণে মাদ্রাজ প্রদেশে চলিয়া গেলেন ; তাঁহার ইচ্ছা ছিল অবসর পাইলে হার করচা হইতে প্রচলিত লিপি করিয়া স্বামীজীর কথােপকথন ও ভাষণের অপর অংশ প্রকাশ করিবেন। সেই সকল বিষয় প্রচলিত লিপিতে লিখিত হইলে প্রায় সাত খণ্ড গ্রন্থ হইত। নানা কারণে তাহা হয় নাই এবং গুডউইনও মাদ্রাজ প্রদেশে দেহত্যাগ করেন। মাদ্রাজের আলা সিঙ্গা প্রভৃতি স্বামীজীর কয়েকজন ভক্ত গুডউইনের দ্রব্যাদি ও কাগজ পত্র তাঁহার মাতার নিকট প্রেরণ করেন। বৃদ্ধা স্ত্রীলােক ক্ষিপ্রলিপির কিছু বুঝিতে না পারিয়া সমস্ত নষ্ট করিয়া দেন। এই ব্যাপারের কয়েক বৎসর পরে সিষ্টার নিবেদিতা ইংলণ্ডে যান ।

আমি হাকে গুডউইনের ঠিকানা দিয়া তাঁহার মাতার সহিত দেখা করিতে অনুরােধ করি। ইচ্ছা ছিল, সেই সমস্ত কাগজপত্র পাওয়া গেলে কোন বিশিষ্ট আমেরিকান ক্ষিপ্রলিপি-কোৰিদ দিয়া পুস্তকাকারে প্রকাশ করিব; একজন আমেরিকান ভক্তও সমস্ত ব্যয়ভার বহন করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন। নিবেদিতা ইংলণ্ড হইতে ফিরিয়া আসিয়া বলেন যে, গুডউইনের বৃদ্ধা মাতা ও ভগিনীদ্বয় অপর কোন স্থানে চলিয়া গিয়াছেন, তাহাদের কোন ঠিকানা পাওয়া যায় না। এইজন্য গুডউইন লিখিত সমস্ত কাগজপত্র নষ্ট হইয়া যায়। স্বামীজী যখন লণ্ডনে বক্তৃতা দিতেন তখন. নার্সের পরিচ্ছদে একটী স্ত্রীলােক আসিয়া স্বামীজীর দিবাভাগের বক্তৃতা সমুহ ক্ষিপ্রহস্তে লিখিয়া লইতেন। তিনি আমাদের সহিত কখনও মেশেন নাই বা আমরা কেহ তাহার ঠিকানা জানিতাম না ; তাঁহার কাছে স্বামীজীর অনেক বক্তৃতা থাকিতে পারে কিন্তু তাহা পাওয়া দুরাশার বিষয়। এই সকল কারণে বহু লােকের অনুরােধে আমি এই গ্রন্থ প্রণয়ন করিতে প্রয়াসী হই। আমার যতদূর স্মরণ আছে এবং যাহা নিভুল ও সত্য বলিয়া স্মরণ আছে সেই সকল বিষয় কিঞ্চিৎ আভাস্বরূপ এই গ্রন্থে প্রদত্ত হইল, ইহাতে আমার নিজের মত বা ভাব কিছুই সন্নিবেশিত হয় নাই। যে সকল বিষয় আমার অস্পষ্ট স্মরণ হইয়াছে তাহার উল্লেখ করিয়াছি এবং পাদটীকায় ব্যাখ্যা স্বরূপ কিঞ্চিৎ দীপিকা করিয়া দিয়াছি। গুডউইনের লিখিত কাগজের সহিত এই গ্রন্থ তুলনা করিলে হিমালয় পৰ্ব্বতের সহিত বালুকণার যে সম্বন্ধ ইহা তজ্জপ হইবে। তবে কিছু না থাকা অপেক্ষা অল্পমাত্র আভাষ ইঙ্গিতও ভাল সেইজন্য যৎ সামান্য এই স্থলে লিপিবদ্ধ করা হইল। স্বামীজী উপদেশকালে দেড় ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টা অনর্গল বলিয়া যাইতেন এবং অনেক গ্রন্থ উল্লেখ করিয়া ভাবরাশির সম্পর্ক ও সম্মিলন দেখাইয়া যাইতেন। গুডউইনের করচা ছাড়া অপর কোন স্থানে এই সমস্ত লেখা ছিল না এবং কোন ব্যক্তির পক্ষে সমস্ত বিষয় স্মরণ রাখাও সম্ভব নয়। আমার যে কয়টী বিশিষ্ট বিষয় স্মরণ আছে আমি সেই কয়টা মাত্র দিতেছি। এই গ্রন্থপাঠে যদি কাহারও কিছু উপকার হয় এবং স্বামীজীর বিষয় কেহ বিশেদভাবে বুঝিতে পারেন তাহা হইলে আমি কৃতার্থ হইব এবং আমার শ্রম সফল জ্ঞান করিব। ঘটনা সংক্ষেপ এবং ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য আমি পাঠকগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। এইরূপ সামান্য গ্রন্থপাঠে মহান্ স্বামীজীর বিষয় বিশেষ কিছু বােঝা যায় না তবে আকার ইঙ্গিতে সেই মহান্ ধীশক্তি সম্পন্ন পুরুষের কিঞ্চিৎ আভাষ দিলাম। এই গ্রন্থ প্রণয়ন কালে শ্রীযুক্ত বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত প্যারীলাল মুখখাপাধ্যায়, শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্র নাথ সেন, শ্ৰীযুক্ত বিধুভূষণ সেন, স্বর্গীয় বলাইচাদ মিত্র লিপিকার ও অন্যান্য বিষয়ে সাহায্য করিয়াছিলেন। ব্রহ্মচারী প্রাণেশকুমার ও শ্ৰীযুক্ত চিরঞ্জীব বলিআর অন্যান্য বিষয়ে বিশেষ উপকার করিয়াছিলেন। অপর কয়েকজন উৎসাহী যুবক একান্ত পরিশ্রম করিয়া আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন সেইজন্য আমি প্রত্যেকের নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। তাঁহাদের আন্তরিক সাহায্য না পাইলে আমি কখনই এই গ্রন্থ রচনা করিতে পারিতাম না। ৩, গৌর মােহন মুখার্জি স্ট্রীট, কলিকাতা। রাসপূর্ণিমা, ১৩৩৮ শ্ৰীমহেন্দ্র নাথ দত্ত

উৎসর্গ
শ্রীমৎ স্বামী বিবেকানন্দের যিনি একান্ত অনুরক্ত সেবক
ছিলেন, স্বামীজী সঁহাকে পুত্রের ন্যায় স্নেহ করিতেন,
যাহার পরিশ্রমে স্বামীজীর সমস্ত ইংরাজী গ্রন্থ
লিখিত ও জনসমাজে প্রকাশিত হইয়াছে
স্বামীজীর সেই পরম প্রীতিভাজন
জে জ, জে, গুডউইনের মধুময়
স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই
গ্ৰন্থ উৎসর্গীকৃত
হইল

প্রকাশকের নিবেদন
এহ গ্রন্থ প্রকাশনা ব্যাপারে আমি অনেক সহৃদয় ব্যক্তির
সাহায্য পাইয়াছি। শ্ৰীযুক্ত আশুতােষ গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীযুক্ত
সত্যচরণ দত্ত, ডাঃ অধীরশরণ বসু, শ্ৰীযুক্ত অক্ষয়কুমার ঘােষ,
শ্ৰীযুক্ত শৈলেন্দ্র নাথ দে, শ্রীযুক্ত উপেন্দ্র নাথ ঘােষ, শ্রীযুক্ত
হিরণ চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি ভদ্রমহােদয়গণ অর্থ সাহায্য না
করিলে ইহা প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব হইত না।
সেইজন্য আমি তাঁহাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন
করিতেছি।
শ্ৰীজহরলাল বক্সী

সমর্পণ
এই গ্রন্থ বিক্রয় করিয়া যাহা উপস্বত্ব হইবে তাহা স্বামী
বিবেকানন্দের নামে কোন বিদ্যা-প্রতিষ্ঠান স্থাপনকল্পে
নিয়ােজিত হইবে। ইহাতে আমার কোন স্বত্ব রহিল না।
কলিকাতা
মহেন্দ্রনাথ দত্ত
৮ই অগ্রহায়ণ, ১৩৩৮

- - স্বামী বিবেকানন্দ

No text on this page.

লণ্ডনে স্বামী বিবেকানন্দ এক ১৮৯৬ সালে মার্চের শেষ বা এপ্রিল মাসের প্রথমে বি, আই, এস, এন, কোম্পানীর রিউয়া জাহাজে করিয়া সারদানন্দ সারদানন্দ স্বামীর স্বামী লণ্ডন নগরে যান। পূৰ্বেই ই, এফ, ষ্টাডিকে লণ্ডন যাওয়া। চিঠি পত্র লেখা ছিল। সারদানন্দ স্বামী পৌছিলে স্টার্ডি তাঁহাকে সসম্রমে রেডিং নগরে আপন ভবনে লইয়া গেলেন এবং উভয়ে একত্র কস করিতে লাগিলেন। ষ্টার্ডি পূৰ্বে থিওজফিক সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন এবং ভারতবর্ষে আসিয়া আলমরায় যােগ অভ্যাস করিবার নিমিত্ত একটী বাড়ী ভাড়া লইয়া কিছু দিন বাস করিয়াছিলেন। আলমরায় অবস্থান কালে শিবানন্দ স্বামীর সহিত ষ্টার্ডির বেশ বন্ধুত্ব হয় এবং উভয়ে একসঙ্গে মাদ্রাজ যান। যাহা হউক, ষ্টাডির সহিত স্বামীজীর আমেরিকা হইতে পত্র ব্যবহার চলিতে লাগিল এবং ষ্টাডির অনুরােধে তিনি আমেরিকা হইতে ইংলণ্ডে আসিয়া বক্তৃতা করিতে মনস্থ করিলেন। ১৮৯৪ বা ১৮৯৫ সালে স্বামীজী একবার ইংলণ্ডে গিয়াছিলেন। আমেরিকায় অনবরত বক্তৃতা করিয়া ক্লান্ত ও শ্রান্ত হইয়া কিছু দিনের জন্য বিশ্রাম করিবার ইচ্ছা করিয়া তিনি ইংলণ্ডে আসিয়াছিলেন। দুই এক লণ্ডনে বিবেকানন্দ মাস পরে আবার আমেরিকায় চলিয়া যান। ১৮৯৬ সালের এপ্রিল বা মে মাসে তিনি আমেরিকা হইতে ইংলণ্ডে আসিয়া রেডিং নগরে ষ্টার্ডিক বাড়ীতে কিছুদিন অবস্থান করিতে লাগিলেন। স্বামী সারদানন্দ কলিকাতা ত্যাগ করিবার সপ্তাহ পরে বর্তমান লেখক অধ্যয়ন করিবার জন্য লণ্ডনে যান এবং আইন পড়িতে স্বামীজী নিষেধ করায় তিনি অন্য বিষয় অধ্যয়ন করিতে আরম্ভ করেন। স্বামীজী “বাচষ্পত্যম্ অভিধান” হিয়া পাঠাইয়াছিলেন, সেইজন্য বর্তমান লেখক লণ্ডন যাত্রাকালে আপনার সহিত স্বামীজীর জন্য একটা বাক্য করিয়া “বাচম্পত্যম্ অভিধান” লইয়া যান। স্বামীজী আমেরিকা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রেডিং নগরে ষ্টার্ডির বাড়ীতে অবস্থান করিতে লাগিলেন। স্বামী সারদানন্দ সেই সময় ষ্টার্ডির বাড়ীতে কয়েক দিন পূৰ্ব্ব হইতেই বাস করিতেছিলেন। কৃষ্ণ- মেনন্ নামক জনৈক মাদ্রাজী যুবক একদিন আসিয়া বর্তমান লেখককে বলিলেন, “ষ্টার্ডি লেডী মাগুসনের সজ্জিত বাড়ী ভাড়া করিবেন, লেডি মাগুসন (Lady Murgusan) তাঁহার সন্তানাদি লইয়া কয়েক মাস অন্যত্র বাস করিতে মনস্থ করিয়াছেন।” সজ্জিত বাড়ীর অর্থ—যে বাড়ীতে রন্ধনের তৈজসাদি, পড়িবার পুস্তকাদি, আসবাব সজ্জা ইত্যাদি যাহা কিছু ভদ্রলােকের আবশ্যক হইতে পারে, সে সমস্তই পাওয়া যাইবে, শুধু নিজের পরিধেয় বস্ত্র লইয়া প্রবেশ করিতে হইবে। স্বামীজী, সারদানন্দ স্বামী, বৃদ্ধা মিস্ হেনরিয়াটা মূলার ও জে, জে, গুডউইন সকলে গিয়া লেডী মাগুসনের বাড়ীতে বাস করিতে লাগিলেন। বর্তমান লেখক তখন একটু দূরে অপর পল্লীর একটি বাড়ীতে বাস করিতেছিলেন। কৃষ্ণমেন আসিয়া তাঁহাকে ৫৭ নং সেন্ট জর্জ স্ট্রীটের বাড়ীতে লইয়া গেলেন। স্বামীজী আলাদ করিয়া বর্তমান লেখককে লণ্ডনে বিবেকানন একটি কলম দিলেন। এই কলমটী স্বামীজীকে আমেরিকায় উপহার- স্বরূপ একজন দিয়াছিলেন। আষ্টীতে যে রকম সাদা ডােরা কাটা নীল পাথর থাকে, সেই রকম পাথরের হাতল এবং নিব ও নিব বসাইবার স্থানটি সােণার। কলমটী খুব মূল্যবান্ ছিল। বর্তমান লেখক সেই কলমটী তাহার ছােটভাইকে (বর্তমানে ডাঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এম, এ, পি, এইচ, ডি) ডাকযােগে পাঠাইয়া দেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ ডাকওয়ালাদের হাত হইতে তাহা আর পাওয়া যায় নাই। বর্তমান লেখক তখন অল্পদিন মাত্র লণ্ডনে গিয়াছেন। বিস্তৃত সহর, স্বতন্ত্র আচার-ব্যবহার, স্বতন্ত্র ভাবগতিক। বিদেশের এই সমস্ত ব্যাপার দেখিয়া বর্তমান লেখক একটু আশ্চর্যান্বিত হইয়া একদিন পদচারণ করিতে * করিতে (Cheap-side চীপসাইড নামক পল্লীর দিকে যান। কলিকাতায় যেমন বড় বাজার কারবারের প্রধান স্থান লণ্ডনের চীপসাইড এবং তন্নিকটস্থ স্থানগুলিও সেইরূপ কারবারের কেন্দ্রস্বরূপ। অতিশয় জনাকীর্ণ। জনতা এত অধিক যে ধীরে ধীরে পদবিক্ষেপ করিয়া অগ্রসর হইতে হয় । যাওয়া আসার জন্য সর্বদাই যেন লােকসমূহ চা-জমাট হইয়া দাড়াইয়া রহিয়াছে। এমন কি বৃষ্টি বা রৌদ্র হইলে ছাতা খুলিবার উপায় নাই, তাহা হইলে ছাতাটা অপরের মাথায় লাগিয়া যাইবে এবং ছাতা খুলিবারও আদৌ স্থান নাই। কলিকাতায় মেলা বা উৎসব উপলক্ষে কখনও কখনও যেরূপ লােকসমাগম হইয়া থাকে, এই সিটি অব লণ্ডনে বেলা ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ঠিক সেই ভাবের লােক সংবদ্ধ হইয়া থাকে। মােটকথা, যদি . জনসমুহের মাথার উপর একখানি তক্তা ফেলিয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলে বােধ হয় তাহার উপর দিয়া কয়েক মাইল পরিভ্রমণ করা যাইতে পারে ? এই সিটি অব লণ্ডন সমস্ত পৃথিবীর কারবাটী নিজের হন্তে রাখিয়াছে ও চালাইতেছে।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ স্বামীজী, সারদানন্দ স্বামী ও গুডউইন তিনজন চীপসাইডের একটা চৌমাথার কোণে দাঁড়াইয়াছিলেন। বর্তমান লেখকও মহা-জনতা দেখিয়া, অবাক হইয়া একদিকে দাঁড়াইয়া আছেন। গুডউইন স্বামীজীর সহিত বর্তমান লেখকের অপরিচিত সাধারণ ইংরেজের ন্যায় একজন হইয়া সাক্ষাৎ। গিয়াছেন। সারদানন্দ স্বামীকে চিনিতে পারা গেল, কিন্তু স্বামীজীকে বহু বৎসরের পর দেখিয়া বর্তমান লেখকের চিনিতে একটু বিলম্ব হইল। ইহার একটা বিশেষ কারণ এই যে, কলিকাতা বা বাংলাদেশে যে নরেন্দ্রনাথ ছিলেন, সে লােক আর তখন নয়, তিনি স্বতন্ত্র এক ব্যক্তি হইয়াছেন। গায়ের বর্ণ অনেকটা উজ্জ্বল বা যাহাকে ইংরাজিতে Fairbrown colour বলা যায়, শুধু white নয় : মাথায় যদিও অর্ধচন্দ্রাকৃতি লক্ষৌর তাজের মতন কলিলা মােটা কাপড়ের টুপি ছিল, কিন্তু মাথার সম্মুখেতে সিথি-কাটা দেখা যাইতেছিল । পরিধানে কালাে রংএর ইজের, কালাে রংএর ভেষ্ট, এবং গলায় কলার ছিল, কিন্তু টাই ছিল না। চক্ষুদ্বয় সুদীর্ঘ ও প্রশস্ত, চক্ষুর পাতার নিম্নস্থল স্ফীত এবং অক্ষিপুট সাধারণ লােকের অপেক্ষা কিঞ্চিৎ পরিমাণে সুদীর্ঘ ও বিস্ফারিত এবং নেত্র হইতে মহাতেজ ও আকর্ষণী-শক্তি বাহির . হইতেছে। চক্ষুদ্বয় স্বতন্ত্র ভাবে পরিবর্ধিত ও পরিবর্তিত হইয়াছে। কণ্ঠ স্বর অতিশয় গম্ভীর ও তেজঃপূর্ণ এবং শব্দস্রোত বহুদূরগামী ! অকস্মাৎ এভাবে দেখিয়া বর্তমান লেখকের একটু ইতস্ততঃ ভাব হইয়াছিল, এবং সেইজন্য চিনিতে একটু বিলম্ব হইয়াছিল। যাহা হউক, কথাবার্তা কহিয়া সকলেই প্রস্থান করিলেন। বর্তমান লেখক পর দিন মেননের সহিত সেন্ট জর্জ স্ট্রীটের বাটীতে যান। দেশের পাচটা কথা কহিয়া, স্বামীজী বর্তমান লেখককে অপর একটী ধরে লইয়া যান। ঘরটীতে যখন অপর কেহ রহিল না, তখন ৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ স্বামীজী বর্তমান লেখকের মনের কি ভাব হইতেছিল এবং কয়েক দিন ধরিয়া কি চিন্তা করিয়া ছিলেন, সমস্ত পড়া পুথির ন্যায় বলিয়া যাইতে লাগিলেন—কোন ভাবিয়া চিন্তিয়া নয়, স্বাভাবিক ভাবে বলিতে লাগিলেন, এবং প্রত্যেক কথাগুলি সত্য হইয়াছিল। তাহার পরেই পুনরায় নীচেকার বৈঠকখানা ঘরটিতে আসিয়া স্বামীজী বর্তমান লেখককে পুনরায় পূর্ধ্বতন বাঙ্গলা দেশের নরেন্দ্র নাথ হইয়া বেশ হাসি তামাসার ভাবে কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন এবং সােণার কলমটী দিলেন। যাহা হউক, স্পষ্ট বােঝা গেল যে পূৰ্ব্বতন নরেন্দ্রনাথ আর নয়, পূৰ্ব্বদেহে বিবেকানন্দ নামক এক মহাশক্তি প্রবেশ করিয়াছে। এক দেহের ভিতর কখন ৰা কলিকাতার নরেন্দ্রনাথ বাস করেন কখন বা বিশ্ববিজয়ী বিবেকানন্দ বাস করেন। ভাবভঙ্গী, আচার-ব্যবহার, হাত-নাড়া, আঙ্গুল-নাড়া স্বতন্ত্র হইয়া গিয়াছে। কোন কিছু ভাব প্রকাশ করিতে হইলে, বাম হস্তের ৫টা অঙ্গুলি কুঞ্চিত বা বিক্ষিপ্ত করিয়া ভাব প্রকাশ করিতে লাগিলেন, ডান হাত তত সঞ্চালন করিতে লাগিলেন না। কিন্তু প্রত্যেক হস্তসঞ্চালনে বা শিরঃসঞ্চালনে স্পষ্ট, নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত ভাব প্রকাশ করিতে লাগিলেন। হাঁ বা না যাহাই হউক না কেন, ভাবগুলি কিন্তু দ্বিধাশূন্য, যেন স্বতন্ত্র লােক, পূর্বে কখনও এভাব তাহার ভিতর দেখা যায় নাই। শুধু ইচ্ছা করিলে পূর্বের অবস্থায় নামিতে পারেন এবং পূর্ব অবস্থার স্মৃতি ও ভাবভঙ্গী একটু কষ্ট করিয়া আনিতে পারেন। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায়ও সব সময় যেন আজ্ঞাদাতা মহাশক্তিমান্ পুরুষ, সমস্ত কথাগুলি যেন husling, commanding voice ( দ্বন্দাতীত, আজ্ঞাপ্রদ গম্ভীর স্বর)। স্বামীজী বর্তমান লেখককে নিজের পকেট হইতে ৫ পাউণ্ড দিয়া দিলেন এবং কৃষ্ণমেনকে সঙ্গে করিয়া পাঠাইয়া দিলেন, পপে যাইতে যাইতে কৃষ্ণমেননের সঙ্গে কথা হইতে লাগিল। কৃষ্ণমেনন বলতে ৫ লণ্ডনে বিবেকানন্দ লাগিলেন, “মাদ্রাজের যে স্বামীজীকে দেখিয়াছি তিনি এব্যক্তি নন, এবং যাহার আমি তামাক সাজিতাম এবং যিনি আমার সঙ্গে হাসি তামাস করিতেন তিনিও এব্যক্তি নন ; ইহার ভিতর এখন অনেক শক্তি জাগ্রত হইয়া উঠিয়াছে, এখন যেন সম্মুখে যাইতে বা কথা কহিতে ভয় করে। ইচ্ছা করিয়া নিজে নিম্নস্তরে আসিয়া কথা না কহিলে অপরের কথা কহিতে সাহস হয় না। এক্ষণে যৌগিক শক্তি নানা প্রকার বর্ধিত হইয়াছে, এরূপ বলিতে বলিতে মেননের কাফি খাইতে ইচ্ছা হইল, এবং দুজনে একটী প্রথম শ্রেণীর কাফির দোকানে প্রবেশ করিলেন। ভারতবাসীরা বিদেশের যাহা কিছু গল্প পান, অধিকাংশ স্থলে কাটা- ছটা শুষ্ক কয়েকটী ভাবমাত্র, কিন্তু সেখানকার আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি প্রভৃতি অনেকের জানিতে কৌতুহল হইয়া থাকে । এস্থলে যদিও ধৈর্যচ্যুতি গল্পগুলি অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু মাঝে মাঝে হাসি তামাসা না দিলে পাঠকের হইতে পারে এই জন্য মাঝে মাঝে নানা রকম উপাখ্যান প্রদত্ত হইল। ভিক্টোরিয়া ষ্টেশনের সন্নিকটে একটি প্রথম শ্রেণীর কাফি হাউস বা চার দোকান ছিল। বসন্ত বা গরমের প্রারম্ভ, এইজন্য রাস্তার ধারের দোকান গুলিতে 0yster (কাঁকড়া) গলদা চিংড়ি ও কুঁচো চিংড়ি বিক্রয়ার্থ রহিয়াছে । Oyster আমাদের বাংলা দেশে ঝিনুক যে রকম লম্বা লম্বা হয় সে প্রকার নয়। যেরূপ পুরীধামে সমুদ্রে এক ইঞ্চি পরিমাণ গােল গােল ঝিনুক হয়, ইহা সেই জাতীয় । ossterএর খােসর মাঝখানে সাদাতে-হলদেতে মিশানাে হড়হড়ে নালের মত এক প্রকার শাস হয়, সেই হড়হড়ে নালের শসটা চামচে দিয়া সুরুৎ সুরুৎ করিয়া খাইতে থাকে কিন্তু ইহা শুনিয়া এদেশীয় লােকের ঘৃণা হইবে। ইংলণ্ডবাসীরা এই Oysterকে পরম উপাদেয় বলিয়া গণ্য করে। আমাদের দেশে যেমন হােট ঘােট গুগলি, ইংরাজ দেশে সেইরূপ ছােট ছােট গুগলি লণ্ডনে বিবেকানন্দ হয়। এসব গুগলিকে সিদ্ধ করিয়া বাজারে বিক্রয় করে, ৮১০ দিনের পুরাতন বা বাসিও হইতে পারে। এইগুলি একটী চীনে মাটীর প্লেটে রাখিয়া একটী পিন দিয়া ভিতরকার সিদ্ধ শাসটি বিঁধিয়া বাহির করিয়া খায়। স্ত্রীলােকেরা অনেক সময় মাথার পিন দিয়া ভিতরকার শক্ত শসটা বাহির করিয়া খাইয়া থাকে তবে বাংলা দেশে যেরূপ গুগলির ঝোল খায়, সেরূপ সেখানে হয় না। যদি হুগলির কোন লােক লণ্ডনে গিয়া গুগলির ব্যবসা করে তাহলে বেশ ব্যবসা চলিবে। কুঁচো-চিংড়ি, (prawn -বাংলাদেশে কুঁচো- চিংড়ি যেমন সাদাপানা দেখিতে, ইহা সেইরূপ নয়। prawnগুলাে একটু পাঁশুটে রঙের মােটা মােটা, সিদ্ধ করিয়া বাজারে বিক্রয় হয়। খাইবার সময় দুইহাতে খােসা ছাড়াইয়া খাইতে হয়, ইচ্ছা করিলে বা একটু গন্ধ হইলে ভিনিগার সংযােগ করিলে দোষ কাটিয়া যায়। এদেশের কাকড়া বাংলাদেশের কাকড়ার মত নয়। পুরীধামে সমুদ্রের ধারে মাঝে মাঝে যেরূপ কাকড়া দেখিতে পাওয়া যায়, অর্থাৎ মাঝারি রকমের কচ্ছপের মত, তবে গােল নয় বর্তুলাকার, অর্থাৎ ডান্ধার-বাঁধার কিছু লম্বা এবং অপর দুই দিকটা কিঞ্চিৎ চ্যাপটা হয়। এই কাঁকড়া সিদ্ধ হইয়া বিক্রয় হইয়া থাকে। সমুদ্রের কাঁকড়া, এই জন্য ইহার দাড়াগুলো মােটা মােটা, বােধহয় এই গড়া দিয়া যদি সে একবার ধরিতে পারে তাহলে মানুষের হাতের হাড় কাটিতে না পারিলেও, জখম করিতে পারিবে। সিদ্ধ অবস্থায় ভাঙ্গিয়া লইয়া কাটা বা চাচ্চা দিয়া ভিতরকার শাসগুলি বাহির করিয়া খাইতে থাকে, আবশ্যক হইলে ভিনিগার সংযােগ করে। গদা চিংড়ি ( Lobster )—ইহা বাংলাদেশের চিংড়ির ২৩টার গল্পেতে যে উেঁকি চিংড়ির কথা আছে, এ বােধ হচ্ছে সেই চেঁকি চিংড়ির প্রপৌত্র। বাংলাদেশে গলদা চিংড়ির দাড়া নেন্যালে, সরু-সরু, ৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ কিন্তু সমুদ্রের গা চিংড়ির দাড়া কঁকড়ার দাড়ার মত। পুরীতে একবার এই প্রকার গলদা চিংড়ি দেখা গিয়াছিল। দাড়াটা ভাঙ্গিয়া লইয়া তাহাতে ভিনিগার ও নুন দিয়া ঘােট চামচে করিয়া কুরিয়া কুরিয়া খায়। গন্দা চিংড়িটা খােসা শুদ্ধ ২৩ ইঞ্চি, কাটিয়া কাটিয়া তাহ খাইতে হয়, কারণ পূৰ্ব্ব হইতে ইহা সিদ্ধ করা থাকে। ইংরাজেরা মাছের মুড়ো খায় না, ফেলিয়া দেয়, এবং মাছের ডিম বাহা বাংলাদেশে এত আদর করিয়া খাইয়া থাকে, ইহারা তাহা ঘৃণা করিয়া খায় না। মাছের ডিম ( Fishroe ) এরা অজ্ঞানেতে খাইলেও বমি করিয়া ফেলে, ইহার উপর তাহাদের বড় বিতৃষ্ণা আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মাছের ডিম বেশ সুস্বাদু, বাংলাদেশের মাছের ডিমের চেয়ে কোন পক্ষে নূন নয়। কিন্তু অপর জাতের আহার পদ্ধতি লইয়া কোন দোষ গুণ বিচার করা উচিত, নয়, কথাতে বলে ‘আপ, রুচি খানা’—এই হ’লল মােটামুটি মাছের কথাবার্তা। তবে কাফি খাবার কথাবার্তা একটু বলা আবশ্যক। সদর দোরে ঢুকিয়াই সম্মুখে এক সিড়ি, দেওয়ালের দুই পার্শ্ব কফি হাউস ও প্রস্তুত প্রণালী। বড় বড় আশি দিয়া মােড়া, সিড়িতে নরম গালিচা, তার উপর মখমল পাতা। ভারতবর্ষের লােক এমন গালিচাতে কখনও শুইতে বা বসিতে পায় না। তাহার উপর জুতা পায়ে দিয়া উঠিয়া উপরে কফির ঘরটিতে গিয়া বসিতে হয়। মেঝের উপর গালিচাখানি, ইঞ্চি-কতক পুরু, পা দিলেই ইসপিরিঙ্গের মত বসিয়া যায়, আবার লাফাইয়া উঠে, তাহার উপর মখমল মােড়া ইম্পিরিং- এর চেয়ার, সম্মুখে একটা করিয়া মার্বেল পাথরের টেবিল, টেবিলের খুরা গুলি মেহগনি কাঠের নানা ফুলকাটা ও নক্সাকরা এবং ঝকঝকে পালিস দুইজন ভারতীয় লোেক সেই চেয়ারে বসিলেন, নূতন বলিয়া সক লণ্ডনে বিবেকানন্দ জিনিস আশ্চর্য হইয়া দেখিতে লাগিলেন। অবশ্য কিছুকাল থাকিলে এসব জিনিষ অভ্যস্ত হইয়া যায় তখন আর কোন বিস্ময় থাকে না এবং কয়েক বৎসর পর নিজের দেশে আসিলে নিজের দেশের জিনিস প্রথম দিনকতক নূতন নূতন বলিয়া বােধ হয়। ইহাই মনের স্বাভাবিক গতি, হাস্য করিবার কিছুই নাই। ঘরের তৈজসাদি সব রূপার, প্রথম শ্রেণীর কাফি হােটেল—এই জন্য অপর কোন নিকৃষ্ট ধাতু ব্যবহৃত হয় না। ছােট একটা ডিমের ন্যায় ছােট বাটীতে করে চিকরি মিশান কাফি দিলে, সঙ্গে ফুল-কাটা একটু করিয়া মাখন, ছােট একখানি Roll বা মচমচে পাউরুটি--মেনান মাদ্রাজী, কাফি খাওয়ার জাত, তার ঠোট ভিজিল না, গজগজ করিয়া বকিতে লাগিল। দাম চাহিল প্রত্যেকের ৫শিলিং করিয়া ১০ শিলিং—তখন ১৯৷ টাকা পাউণ্ড, ১০ শিলিং অর্থাৎ ১০ টাকা—এইত মেনান চটিয়া গেল। বর্তমান লেখক বলিলেন, “ওহে বাবু, চট কেন, কালা আদমি, ঘরে ঢুকতে দিয়েছে এই যথেষ্ট, ঘরটার ব্যাপার কি দেখে যাচ্ছ এই জন্য আক্কেল সেলামি দিলে,” এই বলিয়া হাসি তামাসাতে উভয়ে চলিয়া আসিলেন : লণ্ডনে অনেক ইংরেজ পরিবার প্রাতঃভোজনের সহিত কাফি খাইয়া থাকে এবং অপরাহ্বে চা পান করিয়া থাকে এই জন্য নানা দেশে কি করিয়া কাফি প্রস্তুত করিয়া থাকে সংক্ষেপে তাহার কিছু বর্ণনা করা যাইতেছে। ইংরাজ রমণীরা কাফির জলটা বেশ গরম করিয়া থাকে এবং তাহাতে ওঁড়াে কাফি দিয়া অল্প পরিমাণে টায়, ও তাহার পর দুধ চিনি মিশাইয়া জমটা ছাঁকিয়া বড় বড় বাটি করিয়া কাফি খায়, ইহাকেই ইংরাজি কাফি বলে। রায়ার কাৰ্যে মেয়ের সিদ্ধহস্ত। কাফিরু ভিতর একটা তেল আছে, সেটা বেরুলে সুগন্ধ হয়, জলটা কত গরম হইবে, কি পরিমাণে কাফির গুড়াে দিতে হইবে এবং কতক্ষণ গরম জলে কাফি লণ্ডনে বিবেকানন্দ ব্রাখিতে হইবে, এই কাৰ্য্য সুন্দর ভাবে করিতে ইংরাজ মেয়েরা সিদ্ধহস্ত। তাহারা কাফিটা এমন সুন্দর ও সুস্বাদু করে যে দ্বিতীয় বার খাইতে ইচ্ছা হয়। কাফি তৈরীর নিয়ম সম্বন্ধে একটি সুন্দর মেয়েলি ছড়া আছে। One tea spoonful for the cup, ona for the kettle. লণ্ডনে ফরাসী স্ত্রীলােকেরাও কাফির দোকান খুলিয়া থাকে, তাহারা কাফির গুড়াের সহিত ডিমের হলুদেটা দিয়া মাখায়, এবং সেইটাকে সিদ্ধ করিয়া দুধ চিনি মিশাইয়া দেয়, ঢালিবার সময় বড় বাটির উপর ঈষৎ লালচে রঙের বেশ ফেনা হইয়া থাকে, এব° খাইতেও বেশ সুস্বাদু হয়। সাধারণ Frenchরা কাফির গুড়াে একটা লম্বা হাতলওয়ালা তামার ঘটির বা চোঙের মত পাত্রে গরম করে, এবং ছােট ছােট বাটা করিয়া তাহা পান করে। তারা কাফিতে দুধ দেয় না, অল্প পরিমাণে mastie cognae ( ম্যাসটিক কনিয়া) মিশাইয়া চিনি দিয়া খায়, এবং পান করিবার সময় ইহা ছােট ছােট বাটিতে করিয়া পান করিয়া থাকে । তুর্কিদের কাফি এই Frenclদের মত, তবে mastie ব্যবহার করে । আরবরা ছােট বাটিতে করিয়া কৃথকে পুরু কাফি খান। পাতলা বা তরল অংশটা পান করে এবং নীচের কাদার মত অংশটা ফেলিয়া দেয়। কিন্তু উপরকার তরল অংশে এত গুড়াে থাকে, যে পান করিলে কয়েক দিনের ভিতর বিদেশী লোকের পেট কামড়ায়। মিশর দেশের কাফি খাওয়া আবার স্বতন্ত্র। আগে আধ গেলাস ঠাণ্ডা জল খায় তারপর ছােট ছােট বাটিতে আরবি কাফি খায়, তারপর আধ গেলাস ঠাণ্ডা জল খায়। এইত হলাে মােটামুটি নানা দেশের কাফির বর্ণনা, আর কত দেশে কি রকম কাফি খায় তা বিশেষ জানা নাই। বৰ্ত্তমান লেখক যখন পরের দিন স্বামীজীর সহিত দেখা করেন তখন লণ্ডনে বিবেকানন্দ বৰ্তমান লেখকের পােষাক পরিচ্ছদ ক্রয় করিবার জন্য মেননের হস্তে স্বামীজী ১১ পাউণ্ড দিয়া দেন। সেন্ট জর্জ স্ট্রীটের বাড়ীতে স্বামীজী সপ্তাহ খানেক থাকিয়াই Miss Mullerএর গ্রামের বাড়ীতে শরৎ মহারাজের সহিত চলিয়া গেলেন এবং বর্তমান লেখককেও তথায় যাইতে বলিয়া যান। পথ হইতেছে-Paddington Station to Winson tayo ayur Fray Maiden headstation যাইতে হয় এবং ষ্টেশন হইতে ঘােড়ার গাড়ীতে বা টিয়া মাইল তিনেক যাইলে Pinkineys green ( পিংকিনিস্ গ্রী) নামক একটা গায়ে পৌছান যায়। প্যাডিংটন্ ষ্টেশন ভারতবর্ষ রেলওয়ের ষ্টেশন হইতে বহুগুণে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ষ্টেশনের প্লাটফরমটী (platforum) যেন কোন বড়লােকের বৈঠকখানা, দেওয়ালে নানা রকম ছবি টাঙ্গাননা এবং ছবির নীচে কারবারীদের বিজ্ঞাপন। দেওয়ালটা সাজানও হইল এবং কারবারীদেরও বিজ্ঞাপন চলিল। এত লোকের ভিতরে চেঁচামেচি হৈ-হৈ কিছুই নাই, সকলেই আপন আপন কার্যে ব্যস্ত এবং স্থির ভাবে কাৰ্য্য করিতেছে। ট্রেনে কেবল মাত্র দুই শ্রেণীর গাড়ী আছে, প্রথমে শ্রেণীকে Saloon কহে, এবং সাধারণকে Ordinary কহে, তবে গাড়ীতে তামাক খাওয়া নিষিদ্ধ, গাড়ীতে তামাক খাইলে পাচ পাউণ্ড জরিমানা দিতে হয়। একখানা Smoking (Car তামাক খাইবার গাড়ী) থাকে। যত তামাক খাের সেই গাড়ীতে গি। ভিড় করে; কারণ অপর গাড়ীতে তামাক খাইলে ভদ্র মহিলারা বিশেষ আপত্তি করিয়া থাকেন। সাধারণ গাড়ীগুলি অতি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং গাড়ীর কাঠের দেওয়ালগুলিতে নানা প্রকার ফটোগ্রাফ ও ছবি লাগান, গাড়ীতে কেহ থথ ফেলে না বা নােংরা করে না, এইজন্য গাড়ীর ঘরগুলি খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। তবে স্ত্রীলােকদের ও পুরুষদের জন্য ভিন্ন গাড়ী { লণ্ডনে বিবেকানন্দ নাই, কারণ পর্দাপ্রথা বা স্ত্রীলােকদের স্বতন্ত্র বসিবার নিয়ম তথায় নাই। ; বর্ণনাগুলি ১৮৯৬ সালের হইতেছে, এখন অনেক পরিবর্তন হইতে পারে, কিয়দংশ মিলিতেও না পারে। সে সময় ঘােড়ার গাড়ী দুই প্রকার ছিল, এক Four wheelers ক্ৰম ( Brougham) এবং অপরগুলি 1tansom; এগুলি দুই চাকা বগি গাড়ীর ন্যায়, তবে গাড়ীর ঘেরাটোপ, বা ছাদটা কাঠের তৈয়ারী। আরােহী বসিয়া সম্মুখে খােলা স্থান দিয়া সব দিক পরিদর্শন করিতে পারে এবং কোচম্যান (চালক) গাড়ীর পিছন দিকে ছাদের উপর বসিয়া ঘােড়ার লম্বা লাগামটা ছাদের উপর দিয়া টানিয়া লর, স্পাং সহিস যেমন পিছনদিকে নীচুতে বসে, তাহা না হইয়া কোচ ম্যান পিছনদিকে উচু স্থানটীতে বসে এবং ছাদের উপর দিয়া লাগামটা ঘােড়ার সহিত সংযুক্ত হইয়া থাকে এরূপ গাড়ী অপর দেশে প্রায় দেখিতে পাওয়া যায় না। পাঠকের ভিতর অনেকেই বিদেশের বর্ণনা জানিতে ইচ্ছা করেন, তাদের আচার নীতি ও নানা প্রকার কার্যকলাপ জানিতে চাহেন, এই জন্য অপ্রাসঙ্গিক হইলেও আবশ্যক বিবেচনায় এই স্থানে প্রদত্ত হইল কারণ আনুসঙ্গিক বিষয় জানা না থাকিলে, স্বামীজী কি প্রকারে কাৰ্য করিয়াছিলেন ও নি কি ভাবে কাটাইতেন, তাহা বিশেষ উপলব্ধি করা যাইতে পারে না । স্বামীজী ও সারদানন্দ স্বামী মিস্ মূলারের গ্রামের বাড়ীতে অবস্থান করিতে লাগিলেন এবং বর্তমান লেখক তথায় গিয়া মিস মুলারের বাড়ী। উপস্থিত হইনে। গুডউইন কেবল সহরে রহিলেন। মিস্ মুলারের বাড়ীতে থাকিবার ঘর তত বেশী না থাকায় পার্শ্বের একটা বাড়ীতে বর্তমান লেখক রহিলেন, কিন্তু সর্বদাইতিনজনে একত্ৰ থাকিতেন। ૨૨ লণ্ডনে বিবেকানন্দ ইংলণ্ডের গ্রামগুলি অতি সুন্দর ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, দেখিতে যেন এক একখানি ছবি। গ্রামের ভদ্রলােক ও চাষাদের ঘরগুলি অতি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। বাড়ীগুলি প্রায় ছােট ছােট দোতলা, দেওয়ালগুলি একহার ইটের পেটি, মেজেটা এদেশের মত পাকা খােয়া-পিটা নয়, কেবল তক্ত। পাতিয়া দেওয়া হইয়াছে। এদেশে যেমন ছাত! রাখিবার জন্য কড়ি ও বরগ। দুই প্রকার আধার আছে ও তাহার উপর টালি পাতিয়া খােরা পিটাইয়া ছাদ হয়, ইহা তদ্রুপ নয় । ৩X ৫ ইঞ্চি বা ৫X৭ হইতে আড়র মতন কাঠ বিছাইয়া দিয়া তাহার উপর তক্তাগুলি ইস্ক্রপ মারা হয় এবং মেজেতে গালিচা পাতিয়া দিলে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হইয়া যায়। দেওয়ালগুলিতে রঙিন কগজ মুড়িয়া দেয় • বালি ধরান বা চুনকাম কাটা সেরূপ নয়। Wallpaperএর প্রচলন অধিক পরিমাণে। ছাদগুলি গেচালা অর্থাৎ দুদিকে গড়ান, বরফ বা বৃষ্টি পড়লো জমিয়া না থাকিয়া শাদ্য গড়াইয়া যায়। চাষাদের ছােট ছােট বাড়ীগুলির সম্মুখে একটু উঠান বা ফাঁকা জমি এবং পিছনদিকে ছোট ছোট উঠান আছে, ইহাকে ব্যা ইয়ার্ড (back-yard) বলে। এই বাক্ ইয়ার্ডএ দড়ি টাঙাইয়া কাপড় বিছানা শুকাইতে দেয়। কাপড়গুলি স্পিংওয়ালা কাঠের (clip) ক্লীপ দিয়া দড়িতে ঝােলান হয়। মিস্ মুলারের গ্রামের বাড়ীর সম্মুখে একটি ছোট বাগান, এবং চুচোলা মুখখা পাতলা পাতলা কাটের তক্তার গোঁজ দেওয়া, রাস্তার ধারের বেড় এবং এরূপ গােজ দেওয়া একটী কপাট। এই কপাট বন্ধ করিয়া রাখিলে কোন জানােয়ার আর ঢুকিতে পারে না। বাড়াটা দ্বিতল ও কাঠের তৈয়ারী। বাড়ীতে ঢুকিয়া ডানদিকে বসিবার ঘর বা বৈঠকখানা-বদিকে অন্য কার্যের জন্য ঘর, তাহার পর ভিতরকার উঠান বা বাগান, উঠানের এক অংশে অর্থাৎ বসিবার ঘরের পার্শ্বে একটা লম্বা কাচের ঘর। কাচের ঘরটীর ভিতর নানা রকম ফুলগাছ সাজান ছিল।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ ইহাকে (Green-house) সজ্জাগার বলে। উঠানের দিকে সম্মুখ করিয়া বা-দিকে একটী স্থানে একটা লতাকুঞ্জ ছিল! গােটাকতক তারে একটা আয়তন করিয়া তাহার উপর লতানে গাছ দেওয়া ছিল। এই লতাকুঞ্জের ভিতর বসিবার মতন একটী স্থান বা ঘর ছিল। মিস্ মূলার ও স্বামীজী অনেক সময় এই স্থানটীতে বসিয়া অপরাহ্নে চা পান বা সান্ধ্য আহার করিতেন। উঠানে অনেকগুলি গাছ ছিল, বসন্তকাল—বেশ ফুল ধরিয়াছে, গাছগুলি সম্ভবতঃ আপেল, ন্যাসপাতি ও চেরি গাছ হইবে। এদেশের একটি বিশেষত্ব যে বসন্তকালে আগে ফুল ফোটে তাহার পরে পাতা বেরােয় কারণ শীতকালে গাছের পাতা ঝরিয়া যায়। দোতালার ঘরগুলি নীচেকার ঘরের আয়তনে সমান! নিম্নে বসিবার ঘরের পাশে একটা ঘর, সেটী স্নানাগার। এই স্নানাগারে বাংলাদেশের পূর্বে প্রথানুযায়ী একটী পাতকুয়া,—পাইখানা ছিল, উপরটী বেশ কাঠের বাক্স পাইখানার বা Comodeএর মতন ছিল, এবং মলত্যাগের পর কিঞ্চিৎ পরিমাণে বালি ঢালিয়া দিতে হইত, তাহা হইলে ঘরটীতে আর কোন দুর্গন্ধ হইত না। কিন্তু গ্রামের অপর বাড়ীর পাইখানা এরূপ নয়, উঠানের এক কোণেতে একটা ঘর থাকে, এবং পাইখানার ভিতরে একখানা তক্তা ও তাহার উপরের তক্তায় একটা গর্ত। একপার্শ্বে কতকগুলি পুরাতন কাগজ থাকে, মেজেতে গামলা পাতা থাকে না,-মল মাটিতে পড়ে, কারণ ওদেশে জল- শৌচের প্রথা নাই--সেইজন্য অত সঁাৎসেঁতে কাদা হয় না, মাঝে মাঝে চাষার আসিয়া মাঠে সার দিবার জন্য মলটা তুলিয়া লইয়া যায়। একদিন বেলা এগার বা বারটার সময় স্বামীজী মিস্ মূলারের বাড়ীর নীচেকার বৈঠকখানা ঘরটিতে আসিয়া একখানি সােফায় স্বামীজীর কথােপন। বসিনে। ডাক পিয়ন কতকগুলি চিঠি দিয়া গিয়াছিল- :: স্বামী সেই সকল চিঠি স্বামীজীকে পড়িয় ১৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ শুনাইতে লাগিলেন। কলিকাতার একখানি চিঠিতে লেখা ছিল, “বলরাম বাবুর পুত্র রামকৃষ্ণ ও শ্ৰীযুক্ত তুলসীরাম দােষের কন্যা চণ্ডী—উভয়েরই বিবাহ হইয়া গিয়াছে।” এই খবর শুনিয়া স্বামীজী, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক তিনজনে খুব আনন্দ করিতে লাগিলেন এবং বলরাম বাবুর অনেক সুখ্যাতি হইতে লাগিল। তারপর সারদানন্দ স্বামী পুনরায় চিঠি পড়িতে লাগিলেন। একস্থানে লেখা ছিল, “রাখাল মহারাজের পুত্র সত্যের মৃত্যু হইয়াছে। ইহাতে রাখাল মহারাজ ( স্বামী ব্ৰহ্মানন্দ) বড় ব্যথিত ও বিষন্ন হইয়া পড়িয়াছেন।” এই খবরটি শুনিয়া সকলে দুঃখিত হইলেন। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “রাখালের মত এত উচ্চ অবস্থ’র লােকও পুত্র শশাকে বিহ্বল হয় ! পুত্রশােক কি ভয়ানক জিনিস! মানুষ জগতের সব সহ্য করতে পারে কিন্তু পুত্রশোক সহ্য করতে পারে না, এত বেশী অধীর হয়ে পড়ে। তাই তাে রাখালের ছেলেটি মারা গেল—ছেলেটা বেঁচে থাকলে তাকে গিয়ে মঠে নিয়ে নিতু। ছেলেটাকে তৈরী করে নিতু। তার কি ব্যামাে হয়েছিল?” বর্তমান লেখক বলিলেন “ছেলেদের সঙ্গে খেলতে খেলতে সে পড়ে যায়। তাইতে, তার বুকে একটা গোঁজা লেগে পাঁজরা ফুলে ওঠে। সেই থেকে তার হৃৎপিণ্ড রােগ হয় আর সব সময় বুক ধড়ফড় করতাে। রাখাল মহারাজ বৰ্তমান লেখককে সঙ্গে লইয়া কাসারি পাড়ার সেনেদের বাড়ীতে গিয়ে ছেলেটিকে বােজ দেখে আসতে চিকিৎসাও বেশ হয়েছিল।” রাখাল মহারাজ যে ছেলেটিকে দেখে আসতে এইকথা শুনিয়া স্বামীজী একটু সুস্থ হইলেন এবং বলিতে লাগিলে, “যা হউক, রাখাল তো ছেলেটিকে দেখা শুনা করেছে।” কিন্তু শােকের চিহ্ন স্বামীজীর মুখে স্পষ্ট রহিল এবং মাঝে মাঝে সেই কথা তুলিয়া বলিতে লাগিলেন, “তাইতাে রাখালের ছেলেটা মারা গেল !” সারদানন্দ স্বামী পুনরায় চিঠি পড়িতে লণ্ডনে বিবেকানন্দ লাগিলেন। একস্থানে লেখা ছিল, “হরমােহনের মিত্রের স্ত্রী মারা গিয়াছে।” এইকথা শুনিয়া বর্তমান লেখক সহসা বলিয়া উঠিলেন, “এটা সুখবর! এটা সুখবর !! স্বামীজী একটু বিরক্ত হইয়া বর্তমান লেখককে বলিলেন, “একজন মরে গেল আর তুই বলছিস্ সুখবর?” বৰ্তমান লেখক বলিলেন, “হরমােহনের স্ত্রী কষ্ট থেকে বেঁচেছে। এখন হরমােহন তার ছেলেপুলে নিয়ে বুঝুকূগে যাবউটা তত অব্যাহতি পেলে।” এই বলিয়া হরমােহন যে ঘর-সংসার না দেখিয়া কেবল হুজুগ করে হৈ হৈ করে বেড়াত সেই সমস্ত কথা স্বামীজীকে বলিতে লাগিলেন্ এবং বর্তমান লেখক আরও বলিলেন যে, হরমােহনের স্ত্রীর অসুখ করলে হরমােহন ফিরেও দেখতাে না। একদিন আলমবাজারের মঠ থেকে দীন বুড়াে এসে হর- মােহনকে খুব ধমক দিয়ে বলে গেলেন, “যদি হরমােহন স্ত্রীর চিকিৎসার বন্দোবস্ত করে তাহলে তিনি আসিয়া চিকিৎসা ও শুশ্রুষার বন্দোবস্ত করিবেন। স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “দীন বুড়ো আবার কে জুটলাে রে ?” তখন সারদানন্দ স্বামী দীন বুড়াের সমস্ত ঘটনা বলিতে লাগিলেন। স্বামীজী সমস্ত শুনিয়া একটু খুসী হইয়া বলিলেন, “যা হােক এখন দু’একটা লােক মঠে আছে তাে।” চিঠি পত্রের কথা সমাপ্ত করিয়া স্বামীজী কলিকাতার কথা তুলিলেন। কলিকাতার লােকের হাব-ভাব এবং তাহারা স্বামীজীর কাৰ্য্য কিরূপ ভাবে লইতেছেন সেই সকল বিষয় জিজ্ঞাসা করিলেন। নরেন সেন যে তাঁহার পক্ষ লইয়া “ইণ্ডিয়ান মিররে” খুব লিখিতেছেন সেই কথা শুনিয়া স্বামীজী বিশেষ আনন্দিত হইলেন। তাহার পর স্বামীজী জিজ্ঞাসা করিলেন, এন, ঘােষের ভাবগতিক কিরূপ ? সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, “এন, ঘােষ তাঁহার “নেশন” পত্রে প্রথম দু’একবার বিরােধীভাব প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু তাহার পর স্বামীজীর পক্ষ লইয়া খুব জোর কলম লিখিতে আরম্ভ ১৬ লণ্ডনে বিবেকানন্দ করেছেন এবং টাউন হলের সভাতে তাঁহারই সব চেয়ে শ্রেষ্ঠ বক্তৃত হয়েছিল । ইহা শুনিয়া স্বামীজী বলিলেন, “স্থা, এন, ঘােষ একটা পণ্ডিত লােক। সে যে এপক্ষে দাঁড়াইয়াছে এটা ভাল কথা ইহাতে ঢের কাজ হবে।” তাহার পর আমেরিকাতে ধর্মপালের বক্তৃতার কথা উঠিল। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “আরে ধর্মপালটা প্রতিনিধি হয়ে গেল, পড়া- শুনা বিশেষ কিছু করে নাই, সে তত গিয়ে এক লোরের সরঞ্জম করলে। দেখলুম্ কিছুই জানে না, তখন আমি কি করি, বুদ্ধ তাে আমাদেরও একজন অবতার, সেইজন্যে নিজে কোমর বেঁধে লেগে গেলুম আর বুদ্ধর কথা লােককে বললুম।” কারণ স্বামীজী বক্তৃতায় একস্থানে বলিয়াছিলেন “আমি বৌদ্ধ নহি-কিন্তু আমি বুদ্ধ হতে চাই। চীন, জাপান ও সিংহল সেই লােকগুরু বুদ্ধের উপদেশ অনুসরণ করতে পারেন, কিন্তু ভারত তাঁহাকে ঈশ্বরাবর বলে পূজা করেন।” এইরূপ সরলভাবে হাসি তামাসাচ্ছলে অনেক কথাবার্তা হইতে লাগিল। ঘরের দেওয়ালে একখানি ছবি ছিল। ছবিটি হইতেছে একটি ১৩১৪ বৎসরের মেয়ের,চুল এলিয়ে, হাঁটু উচু করে পা ছড়িয়ে চরকার সুতা কাটিতে কাটিতে সূতাটি ছিড়িয়া গিয়াছে, আর মেয়েটি মাথা হেঁট করিয়া নিজের হাঁটুতে মাথাটা যেন দেবীর মত করিয়াছে এবং পা দুটি লম্বা করিয়া ছড়াইয়া বসিয়া পড়িয়াছে। ছবিটির তলায় লেখা ছিল “Hope Deferred” অর্থাৎ আশা-ভঙ্গ। স্বামীজী দেওয়ালের সেই ছবিটির দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিতে লাগিলেন, “মানুষের আশা যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ সে ঘাড় উচু করে, হাত পা সংযত করে, প্রফুল্ল-মনে বসে থাকে, কিন্তু আশাটি নষ্ট হলে আর যেন হাত পায়ের জোর থাকে না, হাত পা এলিয়ে পড়ে। ছবিখানা বেশ ভাবটা প্রকাশ করেছে, মানুষের জীবনেও ঠিক এইরূপ ভাব হয়ে থাকে। এইরূপ কথাবার্তা কহিয়া স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীকে বলিলেন, “না, লণ্ডনে বিবেকানন্দ অনেকক্ষণ ব’কেছি, একটু উপরে গিয়ে আড়াগােড় দেই গিয়ে” এই বলিয়া স্বামীজী উপরকার ঘরটীতে বিশ্রাম করিতে চলিয়া গেলেন। বেলা ৩টার সময় রেডিং নগর হইতে ষ্টার্ভি ও ষ্টাডির পল্লী উভয়ে দুইখানি বাইকে করিয়া মিস মুলারের বাড়ীতে আসিলেন। মিস্ মূলার তখন বৈঠকখানার ঘরে আসিয়া বসিলেন। লণ্ডনে ফিরিয়া গিয়া কিরূপভাবে কাৰ্য্য চলিবে এবং বাড়ী ভাড়া প্রভৃতি স্টাডি ও তাহার দিয়া কেমন করিয়া চলিবে সেই সকল বিষয়ে কিছু খ্রীর আগমন। কথাবার্তা হইল। উভয়ে স্থির করিলেন যে প্রথম প্রথম কিছু খরচ তাঁহারা নিজেদের হাত হইতে দিবেন, তাহার পর স্বামীজী ক্লাস ও বক্তৃতা সুরু করিলে তখন অনেক বন্ধু-বান্ধব টাকা কড়ি সাহায্য করিবেন। তাহা হইলে খরচের আর কোন অকুলান হইবে না, বেশ সুশৃঙ্খলায় চলিয়া যাইবে। ষ্টার্ডি তখন মাথায় একটা ( Statv Panama hat) উচু চোঙ্গপানা খড়ের টুপি দিয়াছিলেন। তিনি বলিলেন, “এই খড়ের টুপি বেশ হাল্কা তবে ধূলাে লেগেছে। সাবান দিয়ে ধুয়ে নিলে চলিবে।” ষ্টার্ডি ও তঁাহার পত্নী, মিস মুলার, সারদা- নন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক একটু চা পান করিলেন। মিস্ মূলার সেদিন একটা নূতন পােষাক পরিয়াছিলেন,-পায়ে জুতা, হাঁটু পর্যন্ত মােজ, তারপর অর্ধেক পা-ওয়ালা ইজের, গায়ে ডবল ব্রেষ্ট কোট ও মাথায় একটি টুপি। পােষাকের রং কাল বনাতের ছিল। তখন দিনকতক লণ্ডন সহরে মেয়েদের ভিতর পুরুষদের পােষাকের চাল উঠিয়াছিল। স্বামীজী তখন উপরকার ঘরে বসিয়া চিঠি পত্র লিখিতেছিলেন। সেইজন্য ষ্টাডি উপরে গিয়া দেখা করিতে ইচ্ছা করিলেন না। তারপর মিস্ মূলার ও স্টাডি-দম্পতী তিনখানি বাইসাইকেলে চড়িয়া রেডিং নগরের দিকে চলিয়া গেলেন। ঘণ্টা কয়েক পরে মিস্ মুলার ফিরিয়া আসিয়া ষ্টার্ডির পত্নীকে ১৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ বকিতে সুরু করিলেন, “আলবড়ে মাগী (awkward woman), বাইসাইকেল চড়তে জানে না, পথে খানিকটা গিয়ে ধপ করে পড়ে গেল, কাপড়-চোপড়ে সব ধুলাে লাগলাে, পাড়ার হতভাগা ছেলেরা হােঃ হাের করে হাতে লাগলাে। দেখ দেখি, বেহিসাবী, বাইসাইকেল চড়তে জানে না” এই বলিয়া আপনাআপনি বকিতে লাগিলেন। তাহার পর আবার শুরু করিলেন, “গাঁয়ের ছোড়াগুলাে কি পাজী। আমাকে হাততালি দিতে লাগলাে, কেউ বা ঢেল ছুড়তে লাগলাে, সব ছেলে-মেয়েগুলাে দল বেঁধে আমার বাইসাইকেলের পথ আটকে দিয়ে বলতে লাগলাে, “দ্যাখ, দ্যাখ, একটা বুড়াে মাগী মদোর পােক পরেছে’ এই বলে ছেলে মেয়ে গুলাে এত বিরক্ত করলে যে আমি আর যেতে পান্নুম না, কাজেই ফিরে এলুম। ছেলে গুলাে ভারি দুষ্টু!” সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক মিস্ মুলারের ভাবগতিক দেখিয়া চুপ করিয়া রহিলেন, “হ’ ‘না’ কিছুই বলিলেন না, দুটো যেন জ্যান্ত পুতুলের মত দুইখানি বেতের চেয়ারে বসিয়া রহিলেন। মিস্ মুলারের যদিও বেশী বয়স হইয়াছিল কিন্তু তাহার মুখে পুরুষের মত একটু একটু গোঁফ, এবং দাড়িতে সামান্য একটু চুল হইয়াছিল, গালে কিন্তু ছিল না, তাহার গোফটা যেন স্পষ্ট দেখা যাইত। লণ্ডনের স্ত্রীলােকেরা খুব বলিষ্ঠ, এইজন্য লণ্ডনে অনেক স্ত্রীলােকের মুখে ঘােট ঘােট গোঁফ দেখিতে পাওয়া যায়, কাহারও বা সাদা গোঁফ, কাহারও বা কালাে গোঁফ। ভারতবর্ষে এরূপ নাই বলিলেই হয়। কিন্তু লণ্ডনে এটা কিছু আশ্চৰ্যজনক নয়, এরূপ স্ত্রীলোেক অনেক দেখিতে পাওয়া যায়। সেইজন্যই বােধ হয় ছেলেগুলাে আরও ক্ষেপাইয়া দিয়াছিল। ৰ 'ৰা কহিবার প্রথা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রকারের আছে। ইংরেৎ গর কটি প্রথা আছে এবং স্বামীজী তাহা বিশেষ করিয়া লক্ষ্য ', লণ্ডনে বিবেকানন্দ করিয়াছিলেন। যখন নিজেরা অর্থাৎ বঙ্গভাষীরা থাকিতেন তখন বাঙ্গালায় কথাবার্তা হইত কিন্তু মিস্ মূলার বা ষ্টার্ডি ঘরে ঢুকিলেই তখন ইংরেজীতে কথাবার্তা হইতে থাকিত। কারণ সকলে ইংরেজদের কথাবার্তা কথাবার্তা কহিয়া আনন্দ উপভােগ করিবে আর কহিবার প্রথা। একজন ভাষা না জানার জন্য নিরানন্দ ভাবে বসিয়া থাকিবে ইহা ভদ্র সমাজের নীতি-বিরুদ্ধ। এইজন্য সকলের বােধগম্য ভাষায় কথাবার্তা বলা উচিত। স্বামীজী এ বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রাখিতেন এবং অপর কেহ ঘরে ঢুকিলেই ইংরেজীতে কথা কহিতেন। বৈঠকখানা ঘরটি মাঝারি রকমের ছিল, নিতান্ত বড় বা ছােট ছিল । মেঝেতে তক্তাপাতা—তাহার উপর বালান্দার মাদুর পাতা। মাদুরগুলি পর পর সেলাই করিয়া সমস্ত ঘরের মেঝেটি মােড়া হইয়াছে। আহারের সময় ডাকিবার জন্য ছােট একখানি কাসর ছিল এবং তাহা বাজাইবার জন্য একটি রবারের গুলাে দেওয়া কাঠী ছিল। লণ্ডনে অনেক বাড়ীতে ঘণ্টার পরিবর্তে ছােট ঘােট কাসর বাজার এক প্রথা ছিল। কসরটি বাজাইলে সকলে বুঝিতে পারিতেন যে আহারের সময় হইয়াছে। ঘরে বসিবার জন্য বেতের ও বাঁশের মােড় চেয়ার ও সুখাসন ( sofaclair) ছিল, তাহার উপর লম্বা লম্বা পশমওয়ালা চামড়া বা পাতলা পাতলা বালিসের মত গদি পাতা ছিল। ঘরের যেখানে আগুন জ্বালান হয় অর্থাৎ আতসিখানা ( Fire-place) সেখানে একখানি মির্জাপুরী পশমওয়ালা গালচে ছিল। জিনিসগুলি অধিকাংশ ভারতবর্ষ-জাত। লণ্ডন সহরের পূৰ্ব্বসীমান্ত পল্লীতে ঐ সকল জিনিসের আড়ৎ আছে, তথায় বহু পরিমাণে বাঙ্গলা দেশের মাদুর ও মির্জাপুরী গালচে বিক্রয় হইত। সময়টা যদিও বসন্তকাল কিন্তু কলিকাতার পক্ষে বেশ ঠাণ্ডা মনে হইতে লাগিল। পর দিবস স্বামীজী, মিস্ মূলার, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান ২০ লগুনে বিবেকানন্দ লেখক দুপুর বেলা বসিয়া আছেন, সকলেই একটু ঠাণ্ডা অনুভব করিতে লাগিলেন। মিস মূলার তাহার বুড়ী ঝিকে আতুসিখানাতে একটু আগুন করিয়া দিতে বলিলেন ঘটী যাহাতে একটু গরম হয়। বুড়ী ঝি কিছু কাঠের কুঁচো (woodchils) ও ঘুটে আনিয়া আগুন জ্বালিয়া দিল। বাঙ্গালা দেশের খুঁটেগুলি চ্যাপটা হয়। হিন্দুস্থানের অনেক জায়গায় ঘুটেলি মােটা মােটা অদ্ধ গােলাকার অর্থাৎ নীচের দিকটা চ্যাপটা ও উপর দিকটা অর্ধচন্দ্রাকার কিন্তু মিস মুলারের বাড়ীতে যে ঘুটে দেখিলাম তাহা অন্য প্রকারের, নিরেট লম্বা লম্বা চোঙ্গার মত অর্থাৎ নিরেট লম্বা লম্বা মাটীর গ্লাসের মত। নীচের চ্যাটালাে দিক থেকে উপরের দিকটা ক্রমে সরু হইয়া গিয়াছে। প্রায় ৯ ইঞ্চি, এরূপ তিনখানা ঘুটে রাখিয়া মাঝখানে কাঠের কুঁচো দিয়া আগুন দিতে ঘরের ঠাণ্ডা কমিয়া গেল। গ্রামটী রেল ষ্টেশন থেকে প্রায় ২৩ মাইল দূরে, এইজন্য পাথুরে কয়লার চলন নাই, আনাইতে গেলে বিশেষ খরচ পড়ে। গ্রামে কাঠ জ্বালাইয়া সকলে রন্ধন করিয়া থাকে। একদিন বিকালবেল! স্বামীজী, মিস্ মুলার, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক চারজন যাইয়া ভিতরকার উঠানে বসিলেন। মিস মুলার একখানি চেয়ারের উপর বসিয়া রহিলেন। স্বামীজীর পরিধানে একটা কালরংয়ের ইজের, একটা কাল রংয়ের ভেষ্ট, গলায় কলার ছিল না, আলপাকার লম্বা চোগাটা পরিয়াছিলেন। তিনি বাঁ-হাতের কনুইয়ের উপর ঠেস দিয়া ঘাসের উপর বাঁকিয়া শুইয়া পড়িয়াছিলেন এবং কথাবার্তার সময় মাঝে মাঝে উঠিয়া পা মুড়িয়া একপায়ের উপর অন্য একটি পা দিয়া বসিয়া কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। কালাে লম্বা কোট ও ইজের পরা সারদানন্দ স্বামীও ঘাসের উপর চাপটানি খাইয়া বসিয়া রহিলেন। বর্তমান লেখক সারদানন্দ স্বামীর লণ্ডনে বিবেকানন্দ পাশে বসিয়া রহিলেন। স্বামীজী মিস্ মূলারের সহিত কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। প্রথমে আমেরিকায় কার্যের কথা উঠিল, তারপর ইংলণ্ডের কাৰ্য্য কি করিয়া হইবে সেই সব বিষয় কথাবার্তা কৰ্ম্মপ্রণালী সম্বন্ধে হইতে লাগিল, এবং ভবিষ্যতে ভারতে যাইয়া কি আমীজীর আলােচনা। প্রকারে কাৰ্য্য করিবেন সে বিষয়ে কথাবার্তা বলিতে বলিতে স্বামীজী একটু উত্তেজিত হইলেন। বাঁ হাতে হেলান দিয়া গুইয়া থাকার অবস্থা হইতে উঠিয়া বসিলেন ও মুখে গম্ভীর ভাব আসিল। তাহার পর পুনর্জন্মের কথা উঠিলে স্বামীজী বলিলেন, “lhis time 1 will give hundred years to this body” অর্থাৎ এবার এই শরীরকে শত বৎসর রাখিব। আমায় এবার অনেক দুরূহ কাজ করিতে হইবে । পূৰ্ববারের চেয়ে এবার আমার ঢের কাজ বেশী। মিস্ মূলার বলিলেন কাজ দিনকতক ভাল লাগে তারপর বড় বোর বলিয়া বােধ হয়, চিরকাল কি মানুষ কাজ করিতে পারে ?” কিন্তু স্বামীজী উত্তেজিত ও গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “এবার শেষ মূহুৰ্ত্ত পৰ্য্যন্ত কাজ করিব”-বলিতে বলিতে তিনি আরও উত্তেজিত হইয়। নিজের অন্তর্নিহিতভাব প্রকাশ করিয়া ফেলিলেন। যদিও ভাষাটা ঠিক উদ্ধৃত করিতে পারিতেছি না কিন্তু ভাবটা স্পষ্ট মনে আছে। তিনি প্রকারান্তরে বলিলেন যে পূর্বজন্মে আমি বুদ্ধ দেহ ধারণ করিয়াছিলাম। যদিও এই কথাটা মিস্ মুলারের পক্ষে ততটা হৃদয়স্পর্শী হইল না কিন্তু অপর দুইজনের পক্ষে অতি বিস্ময়কর বলিয়া বােধ হইল; বিশেষতঃ যখন তিনি বলিলেন যে, এইবার এই দেহকে একশত বৎসর ধরিয়া রাখিব।” এই বলিয়া তিনি পূর্বজন্মের অনেক কথা বলিতে লাগিলেন। কিন্তু কথাগুলি এত জোরের সহিত বলিয়াছিলেন যে সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক তাহা শুনিয়া বিভাের বা হতভম্ব হইয়া রহিলেন। সব যেন নূতন ভাবের নূতন লােক। তাহার २२ লণ্ডনে বিবেকানন্দ পর স্বামীজী কিঞ্চিৎ পরিমাণে ভাব সম্বরণ করিয়া আবার সাধারণ লােকের স্যায় কথা কহিতে লাগিলেন ও চোখ দুইটা মিটমিট করিয়া মাঝে মাঝে নাসিকা কুঞ্চিত করিতে লাগিলেন। তাঁহার মুখের ভাব-ভঙ্গী ও গলাৰু আওয়াজ যেন প্রকাশ করিতে লাগিল যে এ কথাগুলি বলে ফেলা ঠিক হয়নি, ফস্ করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। তার পর কথাটা চাপিয়া অঞ্চ কথা বলিলেন। মিস্ মূলার একেই স্ত্রীলােক তাতে আবার বুড়ী, মেজাজ অত্যন্ত খিটখিটে, কাহার সহিত তাহার বনিবনা হইত না। স্বামীজীর এই কথাগুলি শুনিয়া তিনি তাঁহার ভাব ও অবস্থা অনুযায়ী উপলব্ধি করিয়া বলিতে লাগিলেন, “এত বুড়াে হয়ে বেঁচে থাকবার কোন আবশ্যক ফাই। বুড়াে হােয়ে বেঁচে থাকলে জীবনটা বড় কষ্টকর হয়। এক শ’ বছর বেঁচে থাকা—হাত পায়ের জোর থাকে না, চোখের জোর কমে যাব---না, এতদিন বেঁচে থাকা ঠিক নয়। এক শ’ বৎসর বেঁচে থাকা-- আমার শুলে ভয় হয়। স্বামীজী কথার প্রারম্ভেই বলিয়াছিলেন, “কাজ ত সবে শুরু করেছি, আমেরিকাতে ত সবেমাত্র একটা কি দুটো ঢেউ তুলেছি—একটা মহা তরঙ্গ তুলতে হবে—জাতিটাকে উল্টে ফেলতে হবে। জগতকে এবার একটা নূতন সভ্যতা দিতে হবে। শক্তি কি জগত বুঝবে! কি জন্যে আমি এসেছি জগত বুঝবে, পূৰ্ববারে আমি যে শক্তি দেখিয়েছি এবার তার চেয়ে ঢের বেশী শক্তি দেখিয়ে দিয়ে যাব : এই সকল কথা শুনিয়া সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখকের হতভঙ্গ ইবারই কথা। এইস্থানে কেবলমাত্র সেই সকল তেজঃপূর্ণ কথা আভাষ মাত্র দিলাম কারণ স্বামীজী ঐ ভাবের প্রকৃত কথা ১৫/২০ মিনিট ধরিয়া বলিয়াছিলেন। হার পর স্বামীজী কথা বদলাইয়া দিলেন, সন্ধ্যার সময় গাছে লণ্ডনে বিবেকানন্দ নানারকম পাখী ডাকিতেছিল তাহাদের কথা তুলিয়া ভারতবর্ষের পাখীর ডাকের সহিত তুলনা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত তিনি যেন নিজের ভাবটা অনেক কষ্টে সকলের নিকট হইতে লুকাইবার চেষ্টা করিতেছেন। মাঝে মাঝে চোখ হইতে তীব্র দৃষ্টি অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত বাহির হইতেছিল। বেশ স্পষ্ট বােঝা যাইতেছিল যে স্বামীজীর ভিতরে এক ভাব বহিতেছিল কিন্তু বাহিরে কথাবার্তার দ্বারা সে ভাব চাপিয়া রাখিবার চেষ্টা করিতেছিলেন। স্বামীজীর সেই দিনের কথাবার্তা শুনিয়া সকলেই স্থির হইয়া বসিয়া রহিলেন—কাহারও কোন কথা কহিবার সামর্থ্য ছিল না। তারপর মিস্ মূলারের উঠানে বা-দিকে যে একটি লতাকুঞ্জের মত ছিল সেখানে সকলে যাইয়া সান্ধ্য-আহারে বসিলেন। প্রথমে দিয়াছিল দুধ দিয়া মােটা মােটা ম্যাকরণি (inaearoni) সূপ, তাহাতে নুন দেওয়া ছিল। সারদানন্দ স্বামী দু’এক চাচে খাইয়া মুখ বিটকেল করিয়া ন্যাকার করিবার মত করিলেন। সারদানন্দ স্বামী নূতন লােক, কি করিয়া থালাখানি কাৎ করিয়া ধরিতে হয় এবং চাচে কিরূপভাবে ধরিয়া তাহার উপর খাদ্যদ্রব্য তুলিয়া লইতে হয়, চাচের কোনদিকে মুখ দিতে হয়, সে সব বিষয় তখন কিছুই তিনি জানিতেন না। স্বামীজী মৃদুভাবে সারদানন্দ স্বামীকে ইসারা করিয়া বাংলায় বলিতে লাগিলেন, “ওরে শরৎ, ও রকম করে ধরে না। আমি যেভাবে করছি সে রকম ক।” অর্থাৎ প্লেট অপরদিকে বেঁকিয়ে ধরিতে হয়, সম্মুখের দিকটা উচু করিলে মাথার দিকটায় সব তলার জিনিস জমা হয়। চামচেটা তলার দিক থেকে হেলাইয়া সূপটা লইতে হয় এবং মুখে দেবার সময় চাচের পাশ দিয়া লইতে নাই, ডগার দিক দিয়া লইতে হয়। চাচেটা পরিবার সময় গােড়ার দিক ধরিতে নাই, মাঝখানে ধরিতে হয়। ভারতবর্ষের হস্ত সঞ্চালন ও দিক্‌ নিৰ্ণয়ের লণ্ডনে বিবেকানন্দ ইহা ঠিক বিপরীত। আহারের থালাটা সম্মুখে নীচু করে ও পেছন দিকটা উচু করে, কিন্তু এ দেশ ঠিক ইহার বিপরীত। তাহার পর কোন্ হাতে কাটা চাচে ধরিতে হয়—সে এক বড় সমস্যা। স্বামীজী অলক্ষিতভাবে সারদানন্দ স্বামীর পা চাপিয়া দিয়া বলিলেন, “ওরে ডান্-হাতে ধ’তে নেই, ডান হাতে ছুরি ধরিতে হয়, আর বাঁ হাতে কাটা দিয়ে মুখে তুলতে হয়। অত বড় বড় গরদ করে না, ঘােট ঘােট গরস্ করবি। খাবার সময় দাহ জিভ বার করতে নেই, কখন কাবি না, ধীরে ধীরে চিবুবি। খাবার সময় বিষম খাওয়া বড় দূষণীয়, আর নাক ফোঁস ফোঁস কখনও করবে না।” এ সব হচ্ছে তালিম প্যারেড, যেন থিয়েটারে প্রস্পটিং করা হচ্ছে। যাহ। হউক, নুন দিয়া দুধ খাইয়া সারদানন্দ স্বামীর গা বমি বমি করিতে সুরু করিল, আর কিছুই খাইতে পারিলেন না, কোন রকম করিয়া খাওয়া সাঙ্গ করিতে পারিলে যেন তিনি বাচেন। অবশেষে খাওয়া সাঙ্গ করিয়া মিস মুলারের বৈঠকখানা ঘরে আসিয়া সারদানন্দ স্বামী বর্তমান লেখককে বলিলেন, 'না বাবা, অমন আটে-কাটে বেধে আমি লেক্চার কর্তে পাৰ্ব না। ও নরেনের কাজ, নরেন করুক গে ! কোথায় হাতে করে বড় বড় থাবা করে খাব, না, একটু একটু করে ছুঁচ বিধে খাওয়া ! আর দ্যাখ দেখি হিন্দুর ছেলে দুধে নুন দিয়ে খাওয়া? আরে খেয়ে আমার পেট গুলিয়ে উঠলাে, কিন্তু ভয়ে বমি কর্তে পান্তুম না। তখন উঠতেও পারিনি, আবার ও জিনিস খেতেও পারি নি। দ্যাখ, ভাই, এ দেশের দুধটা বেশ ঘন আর যােটা ভার মিশেলি পাওয়া যায়, কমলা নেবুও এ দেশে আছে, একদিন ভাল করে চিনি দিয়ে কমলা লেবুর ক্ষীর ৰা ভারমিশেলির ক্ষীর খাব! স্থাখ দেখি এমন ঘন দুধ নুন দিয়ে নষ্ট কচ্চে। শুধু ওর খাতিরেই এই যায়গায় পড়ে আছি আর ঐসব জিনিস খেয়ে বেশ আছি”—এইরূপ কথা অদ্ধ কুঞ্চিত ও অর্ধ বাঙ্গচ্ছলে বলিতে লাগিলেন। কিন্তু স্বামীজী যখন লণ্ডনে বিবেকানন্দ পুনরায় বৈঠকখানা ঘরটিতে আসিলেন, তখন সারদানন্দ স্বামী শান্ত শিষ্ট ভাল মানুষটির মত বসিয়া রহিলেন—যেন তাহার খাবার সময় কোন কষ্ট হয় নাই। মিস্ মূলার নিরামিষভােজী সেইজন্য তাঁহার বাড়ীতে মাছ মাংস আসিত না।

দুই অপর একদিন স্বামীজী দুপুর বেলা ঘরে ঢুকিয়া বলিতে লাগিলেন, বর্তমান লেখকের “আঙ্গুলগুলি সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিয়া রাখিবে, প্রতি স্বামীজীর নখে যেন ময়লা থাকে না। বড় নখ হলে কেটে উপদেশ। ফেলবে। দ্যখ আমার জামার পকেটে বা ট্রাঙ্কের ভতর একটা লােহার রিং করা নখ কাটবার অনেক রকম যন্ত্র আছে। নখ কাটবার, নখ ঘর সব রকম যন্ত্র আছে। আমায় নখ কাটবার জন্য আমেরিকায় একজন দিয়েছিল, সেইটে দিয়ে নখ পরিষ্কার কর”—এই বলিয়া নানারূপ গল্প করিয়া স্বামীজী চলিয়া গেলেন। পরদিন বেলা ১১টা বা ১২টার সময় বর্তমান লেখক কটেজ বাড়ীর উপরকার ঘরে বসিয়া সান্ন্যাল মহাশয়কে চিঠিতে Pinkeneys green, মিস মূলারের বাড়ী ও স্বামীজীর বিষয় লিখিতেছিলেন, দরজাটি ভেজান এমন সময় দরজায় ঠক্ ঠক্ করে টোকা মারার আওয়াজ হইল। বর্তমান লেখক বলিলেন, “Come in, please?” বর্তমান লেখক মনে করিয়া- ছিলেন যে কটেজের কেহ বােধ হয় আসিয়াছেন। দরজাটি খুলিয়া দিয়া ফিরিয়া দেখেন, যে স্বামীজী ঘরে ঢুকিলেন। বর্তমান লেখক সসম্রমে চেয়ার থেকে দাড়াইয়া উঠিলেন। “বােস বােস্” বলিয়া নিজে একটা চেয়ার টানিয়া লইয়া বসিয়া স্বামীজী বলিলেন, “কি রে, কি খেয়েছিস্?” বর্তমান লেখক বলিলেন, “অনেক দিন ভাত খেতে ইচ্ছে হয়েছিল, তাই দু’টি ভাত আর একটু মাংসের ঝোল খেয়েছি।” স্বামীজী বলিলেন, “তা বেশ, যােগাড় করে নিতে পারলে গ্রামে ভাত হতে পারে । তাহার প লণ্ডনে বিবেকানন্দ পুনরায় বলিতে লাগিলেন, “মাথার চুল সব সময় বুরু করে রাখবে, চুল যেন উসকো খুসকো হয় না, তা হলে এ দেশের লােক বড় ঘৃণা করে। জামা ইজের সর্বদা বুরুস করতে হয়। সর্বদা ফিটফাট, সেজে থাকবে, নইলে লােকে ঘৃণা করবে। একেই তােত ইণ্ডিয়ানস্ ব’লে লােকে অবজ্ঞা করে, তার উপর যদি ফিটফাট হয়ে না থাকতে পার তাহলে লােক আরও ঘৃণা করবে।* স্বামীজী তারপর জিজ্ঞাসা করিলেন, স্নান করেছিস?” বর্তমান লেখক বলিলেন, “কি করে নাই, কল চৌবাচ্চা যে নাই ?” স্বামীজী একটু হাসিয়া বলিলেন, “এ দেশে অমন করে স্নান করে না। ঘরেতে Bath টবেতে ঠাণ্ডা জল মিশিয়ে দিয়ে যাবে। আগে একখানা স্পঞ্জ ভিজিয়ে গায়ে বুলাইয়া নিতে হয়, তারপর সাবান দিয়ে গা-টা ঘসে নিতে হয়। দ্বিতীয় বার ভিজে স্পঞ্জ দিয়ে সাবানের ফেনাটা গা থেকে তুলে ফেলতে হয়, তারপর Bath-tubএ ব’সে মগে করে মাথায় জল দিয়ে গা টা ধুয়ে ফেলে, শুকনা তােয়ালে দিয়ে গা-টা পুছে ফেলেই তখনই কাপড় জামা পরিতে হয়, নইলে বুকে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। আর দ্যাখ, নাকের শিনি হাত দিয়ে অমন করে ফেলতে নেই, দুখানা রুমাল পকেটে রাখতে হয়, নাক ঝাড়তে হলে রুমাল দিয়ে নাক মুছে পকেটে রাখতে হয়। শিক্‌নি, থুথু যেখানে সেখানে ফেলতে নেই, এরা বলে তাতে অপরের ব্যামাে হবে। আর খেয়ে দেয়ে খুব ফাঁকা হওয়ায় বেড়াগে যা।” বর্তমান লেখক যদিও স্বামীজীর এ সব কথার কোন প্রত্যুত্তর করিলেন না, কিন্তু মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন যে, শিনি মাখান রুমাল পকেটে রাখতে হবে, হায় রে কপাল! তাহার পর স্বামীজী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কাকে চিঠি লিখছিস ?” বৰ্তমান লেখক বলিলেন, “সান্ন্যাল মহাশয়কে লিখছি।” স্বামীজী বলিলেন, “তা বেশ, সান্ন্যালকে মাঝে মাঝে চিঠি দিস্। আর দ্যাখ, রােজ একঘেয়ে খে লে অরুচি হয়, ২৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ বাড়ীর মাগীটাকে বলিস, যে মাঝে মাঝে যেন সে পােচট এ (Poached egg) বা অমলেট (Omelette) করে দেয়, তা হলে মুখ বদলান হবে। আর আমি বােধ হয় শীঘ্র লণ্ডনে চলে যাব, শরৎও সঙ্গে যাবে, তা তুই একা থাকতে পারি নি ?” এই বলিয়া স্বামীজী ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে নীচে নেমে গেলেন। যাইতে যাইতে স্বামীজী পুনরায় ফিরিয়া বলিলেন, “চিঠি লেখা হলে ও বাড়ীতে যা।” পােচ-এগ (Poached egg) হইতেছে—একটা প্যান (an) বা কড়াতে খানিকটা জল টগবগ করিয়া ফুটিবে, আর ডিমের ডগার দিকের খােসা খানিকটা ভেঙ্গে ভিতরকার তরল পদার্থটি জলের উপর ঢেলে দিতে হয়, তাহা হইলে ডিমটি জমিয়া গিয়া নীচেটা গােল সাদা মত হয় এবং মাঝখানটা হলদে মত থাকে কিন্তু ফেলিবার সময় হাতের বিশেষ নৈপুণ থাকা প্রয়ােজন ; নচেৎ নষ্ট হইয়া যাইবে। অলেট (Omelette ) হইতেছে সাধারণতঃ ডিম ফেটিয়ে বড় করা। তবে তাহাতে ওয়াটার ক্রে ( Water-cress) নামক একরকম সুগন্ধি শাক কুঁচিয়ে দেয়। এই শাকটি পুনে ও ধনে শাকের মত বেশ সুগন্ধি। অমলেটএ ওয়াটার- ক্রেস্ শাক দিলে খাইতে বেশ সুস্বাদু হয়, তবে ডিমটাকে ভেঙ্গে একটা চীনামাটির বাটিতে অনেকক্ষণ ফেনায় ( well-beaten egg )। এদেশের মাংসের তরকারি করিবার প্রথা হইতেছে এই যে, ভেড়ার মাংসের হাড় বাদ দিয়া টুকরা টুকরা করিয়া গরম জলে ফেলিয়া দেয়। সেইটি যখন অল্প জলে খুব করিয়া ফুটিয়া সিদ্ধ হয়, তখন তাহাতে একটু “কারি পাউডার” ( Curry powder) ছড়িয়ে দেয় আর একটু নুন দেয়। খােলটা ঘন করিবার জন্য ঈষৎ পরিমাণে ময়দা গুলিয়া তাহাতে দেয়। তা বাহা হউক খাইতে এক রকম হয়। জানালাকে স্যাস ( Sash) বলে। একটি কাঠের ফ্রেমের মাঝখানে ২৯ শুনে বিবেকানন্দ একটি কঁচ দেওয়া। ভারতবর্ষে যেমন জানালা দুকপাটওয়ালা হয়, ইহা তদ্রুপ নয়। রেলগাড়ীর জানালার মত উপরে উঠান ‘মলা ও জানালা। ও নীচে নামান যায়। দুখানা কাচের ফ্রেম থাকে, উপরকার খানা স্থায়ীভাবে Screv মারা থাকে আর নীচের খান উঠান নামান যায়, তবে কাঠের তক্তার কপাট নহে। ঘরের অতিরিক্ত আললা নিবারণ করিবার জন্য দু ধার থেকে দুটি দড়ি বাঁধা থাকে, সেই দড়ির মাঝে একখানা ন্যাকড়া থাকে। ইচ্ছামত কাপড়খানা গুটিয়ে ব ছড়িয়ে রাখা যায়। ইহাকে বলে window-blind. দরজাগুলি এক-কপাটে, দু-কপাটে প্রায় হয় না। ঠাণ্ডা ও স্যাং- স্টে তে দেশ বলিয়া দরজা সব সময়ে প্রায় বন্ধ থাকে। ভারতবর্ষ গরম দেশ, তথায় যাহাতে ঘরে বেশী হাওয়া ঢুকিতে পায় সেই নিয়মে ঘরের দরজা জানালা তৈরী হয়। ইংরাজদের শীতপ্রধান দেশ, সেইজন্য যাহাতে ঠাণ্ডা না ঢুকিতে পারে সেই হিসাবে ঘর ও দরজা জানালা এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য আছে সিড়িগুলি প্রায় কাঠের হইয়া থাকে। বড় লােকের বাড়ীতে সিড়ির উপর গাচে পাতিয়া দেয়, কারণ তাহলে আর আওয়াজ হবে না। কিন্তু সাধারণ লােকের বাড়ীতে সিড়ির ধাপগুলি পালি করা থাকে। অবশ্য কটেজের কথা স্বতন্ত্র। একদিন বেলা ১১টা ২টার সময় বর্তমান লেখক মিস্ মূলারের বৈঠকখানা ঘরটীতে গেলেন, এবং বেতের সােফার উপর বসিলেন। সারদানন্দ স্বামী . ভিতরকার উঠানের দিকে দেওয়ালের কাছে একটা গড়ানে টেবিলে (Secretariat table) কাগজগুলি রাখিয়া একটি চেয়ারে বসিয়া আছেন। স্বামীজী ভেষ্ট ও আলপাকার চোগাটা পরিয়া সারদানন্দ স্বামীর বাঁ দিকে টেবিলের কোণে দাড়াইয়া আছেন। স্বামীজীর আমেরিকার কাৰ্য্য ও তৈয়ারি হয়।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ ইংলণ্ডে আগমন সম্বন্ধে একটি রিপাের্ট তৈয়ারী করিয়া মাদ্রাজের “ব্ৰহ্মবাদিন্ কাগজে পাঠাবেন। সারদানন্দ স্বামী সেই রিপাের্ট পাঠ করিতে আরম্ভ করিলেন ও স্বামীজী দাঁড়াইয়া শুনিতে লাগিলেন। সারদানন্দ স্বামী খানিকটা পড়িয়া এক জায়গায় পড়িলেন, “yesterday night।” স্বামীজী তৎক্ষণাৎ শুধরাইয়া দিয়া বলিলেন, “yesterday night হয় না, last night হবে, কেটে দে।” তাহার পর সারদানন্দ স্বামী আবার পড়িতে লাগিলেন। অভ্যাসবশতঃ সারদানন্দ স্বামী সুর করিয়া পড়িতে লাগিলেন। স্বামীজী ব্যঙ্গচ্ছলে বলিলেন, ‘দুর শালা, অমন ঞ ঞ করে পড়ছিস কেন? তাের চণ্ডী পাঠ করা অভ্যাস কি না, তাই মনে করিস্ যেন চণ্ডী পাঠ কচ্ছি। ভাল করে স্পষ্ট স্পষ্ট করে পড়।” সারদানন্দ স্বামী অপ্রতিভ হইয়া সালাইয়া লইয়া পুনরায় সহজভাবে পড়িতে লাগিলেন। একদিন স্বামীজী খুব প্রফুল্ল, বেলা ৪টার সময় বলিলেন, “চ, সকলে মিলে সুমুখের মাঠে গিয়ে বাইক চড়িগে। মিস্ মূলারের আর্থার { Arthur) নামে একটা মালী ছিল, সে মিস্ মুলারের গ্রিন হাউস থেকে একটি বাইক মাঠে পৌছিয়া দিয়া আসিল। সারদানন্দ স্বামী বাইকটি ধরিলেন, আর স্বামীজী বর্তমান লেখকের কাঁধে হাত দিয়া বাইকে উঠিয়া বসিলেন। অনভ্যস্ত, সেইজন্য দুইজনে দুইদিকে থেকে বাইকটিকে সালাইতে লাগিলেন। তাহার পর সারদানন্দ স্বামীকে বলিলেন, “তুই চড়, শেহ্ না, দিনকতক চেষ্টা করলে অভ্যাস হয়ে যাবে। সারদানন্দ স্বামী অনিচ্ছাসত্বেও খাতিরে বাইকের উপর একবার চড়ে বসলেন। মােটামানুষ, বড় ভয় করিতে লাগিল, সেইজন্য দুইজনে দু পাশ থেকে তাঁহাকে আটকাইতে লাগিলেন। আর্থার মালী ছোড়া একটু দূরে বেড়াতে ঠেস্ দিয়া দাড়াইয়া তামাসা দেখিয়া খুব হাসিতেছিল। স্বামীজী লণ্ডনে বিবেকানন্দ মালী ঘোড়াকে হাসিতে দেখিয়া কৌতুক করিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘ওরে আমাদের চড়া দেখে মালী ছেড় যে হাস্ করছে, আরে হা করছি ক্যান্?” তাহার পর স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীকে বলিতে লাগিলেন, “দ্যাখ, শরৎ! তুই মােটা, তাের শিখতে আর পা চালাতে একটু দেরী হবে।” বর্তমান লেখকের দিকে নির্দেশ করিয়া বলিতে লাগিলেন, এর পাগুলাে খুব লম্বা লম্বা, এ খুব শিগগির শিখে ফেলবে। সারদানন্দ স্বামী একটু পরে নামিয়া পড়িলেন। স্বামীজী আবার উঠিলেন, সেদিন মনটা খুব প্রফুল্ল ছিল, মৃদুস্বরে বাঙ্গালায় গান গাহিতে লাগিলেন “সাধের তরণী আমার কে দিল তরঙ্গে ভাল তরী সকালবেলা, ভাবিলাম এ জলখেলা, মধুর বহিবে সমীর ভেসে যাব রঙ্গে।” এবং মাঝে মাঝে সারদানন্দ স্বামীর সহিত হাসি তামাসা করিতে লাগিলেন এবং কখন কখন দেশের কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। তখন তাঁহার গম্ভীর ভাব ছিল না। পূর্বতন ক্রীড়াপ্রিয় বালকের ন্যায় হাসি তামাসা ও খেলাধুলা করিতে লাগিলেন-যেন সমস্ত জগৎ ভুলিয়া গিয়া বাইক চড়াই তখন তাহার জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল। স্বামীজীর কলার ছিল সম্মুখদিকের বােম দেওয়া, ইহাকে সাধারণের কলার বলে। পারিদিগের কলারে ঘাড়ের পশ্চাৎদিকে বােম বন্ধ, করিতে হয়। স্বামীজী যদিও ধৰ্ম্ম-উপদেষ্টা ছিলেন, কিন্তু পারিদের কলার ব্যবহার করিতেন না, এবং গলায় টাইও দিতেন না। কারণ তাহার জামার গলার উপরটী কলারের কাপে কাপে থাকিত। স্বামীজীর ঘড়িটি ছিল সােণার ও উপরকার ঢানিটির মাঝখানে একটু কাটা এবং কঁচ দেওয়া ছিল। চেষ্টা রেশমের ফিতা ছিল, তাহার লণ্ডনে বিবেকানন্দ একদিকে ঘড়িটি আটকে রাখিবার জন্য সােণার আংটা ছিল। মাঝখানে একটা সােণার চারকোণা লম্বা কড়া (clasj) এবং অপর দিটার ডগায় একটি সােণার চৌকোপানা আটকাইবার যায়গা ছিল। গাটুকাটা শীঘ্র চুরি করিয়া লইতে পারিবে না। ফিতেটা ৬ ইঞ্চি লম্বা ও ১ ইঞ্চি চওড়া এবং বাঁ দিক্‌টার ভেষ্টের পকেটে রাখিতে হয়। ভারতবর্ষে সাধারণতঃ দুই প্রকার ঘাস হইয়া থাকে, মুগাে ও দুৰ্ব্বা। গরম দেশ বলিয়া উদ্ভিদের বেশী তেজ হইয়া থাকে তজ্জন্য মুথাে ঘাসগুলি বড় বড় ও চওড়া হইয়া থাকে। কিন্তু ইংলণ্ড ঠাণ্ডা দেশ, ঘাসগুলি বেশ নরম ভেড়ার ললামের মত সরু সরু কেঁড়ান হয়। বসন্তকাল, বরফ গলিয়া গিয়াছে সেইজন্য মাঠের চতুর্দিকে খুব ঘাস ও গাছে নুতন পাতা বাহির হইয়াছে। বাঙ্গালা দেশে আমড়া গাছে যেমন আগে ফুল ধরে তহার পর পাতা বাহির হয় ঠাণ্ডা দেশে সেইরূপ চেরী, আপেল প্রভৃতি ফল গাছে আগে ফুল বাহির হয় তাহার পর পাতা গজায়। ন্যাড়া ডালে ফুল বেরুতে দেখলে ঠিক যেন একটা বিড়ালের ল্যাজের মত দেখিতে বড় বাহার হয়। গ্রামের মাঝখানে একটা বড় খালি জায়গা থাকে সেটা সাধারণের জায়গা। সেই ফাঁকা মাঠে গােটা কতক সেকেলে মােটা মােটা ও (Oak ) গাছ ছিল। ও গাছের গােড়ার মাটিটা একটু উচু বােধ হইত, যেন মাটিটা সেখান থেকে গড়িয়ে আসছে আর কুটিকাটি না পাকাতে মনে হইত যেন ঝড় দিয়েছে। ইংরাজদিগের গ্রামগুলি যথার্থ একটি ছবি—যেন মা লক্ষ্মী বিরাজ করিতেছেন। মেইভেন্সহেড, ষ্টেশন হইতে মাঠ ও গ্রামের মাঝখান দিয়ে একটা রাস্তা মিস্ মূলারের বাড়ীর দরজা পৰ্যন্ত আসিয়াছে এবং ইংলণ্ডের পল্লীগ্রাম। আরাে অগ্রসর হইয়া দুটি রাস্তায় বিভক্ত হইয়াছে। তথায় একটি কার্ডের সাইনবাের্ডে রেডিং এবং অম্লফোর্ড বা কেজি গ লণ্ডনে বিবেকানন্দ ( এটা ঠিক এক্ষণে স্মরণ হইতেছে না) লেখা ছিল অর্থাৎ একটি পথ রেডিং নগরের দিকে আর অন্যটি অক্সফোর্ড বা কেব্রিজের দিকে গিয়াছে। মাঠগুলি বাঙ্গালা দেশের মত সমতল নয়, ঢেউ খেলান, তজ্জন্য যখন একটা লােক বাইক করিয়া গমন করে তখন তাহাকে দেখতে দেখতে মনে হয় যেন কোথায় লুকাইয়া পড়িল, খানিকক্ষণ পরে আবার বাহির হইয়া আসিল। গ্রামগুলি অতি পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর স্থান! গ্রামের জল Pum] করিয়া কি পাকো হইতে লয় সেটা ঠিক এক্ষণে স্মরণ নাই । গ্রামের দুপুরবেলা খেয়ে দেয়ে অনেকেই গ্রাম্য যাজক বা পাদরির বাড়ীতে যাইয়া জটলা করে। পাদরি গিন্নী হইতেছেন গুরুঠাকরুণ, কাজেই স্ত্রীলােকেরা সেইখানে বসিয়া সুখ দুঃখের ও গ্রামের কথা চর্চা করে। কারণ গ্রামের পাদরি হচ্ছেন মাতব্বর লােক, পুরুষ বাবাজীরা কাজকৰ্ম্ম সারিয়া সন্ধ্যার সময় শুড়ীর দোকানে (public house) বসিয়া মজলিস্ করে—এক এক গ্লাস বিয়ার খায় ও গল্প করে। মাঠে ভেড়া চরিতেছে। সকল ভেড়ার রং প্রায় সাদা, কালাে ভেড়া প্রায় দেখিতে পাওয়া যায় না, এই জন্য কালাে ভেড়া ( black sheep) একটা গালের কথা। নাদুস নুদুস টাপ টোপ ভেড়াগুলি মাঠে যখন চরে তখন দেখিতে অতি সুন্দর। গরুগুলির পিঠে কুঁদ বা কুকুদ (hump) নাই! শিং ভারতবর্ষের গরুর মত বড় হয় না, ছােট ছােট হয় । প্রায় শ্যামলী (lun colour) হয়। সাদা রংএর গরু খুব কম বলিয়া বােধ হইল। ভারতবর্ষের গরু খুব চালাক চতুর হয়, মুখের চেহারা দেখলে খুব তেজী বলিয়া বােধ হয় কিন্তু এদেশের গরু দেখলে বােক বলে বােধ হয়। পিঠে কুঁদ নাই বলিয়া লাঙ্গল টাতে পারে না এইজন্য এক জোড়া ভাল তেজী ঘােড়া দিয়ে লাঙ্গল টানে। কটেজ বাড়ীর কিছুদূরে ক্ষেত ছিল : চাষারা লাঙ্গল দিচ্ছে, যব বা ৩৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ গম বুনবে। চাষাদের পরিচ্ছদ হইতেছে পায়ে মােটা মােটা বুট তাহার তলায় বড় বড় পেরেক দেওয়া। একটা ভেলভেটিন বা মােটা খাঁজকাটা শক্ত কাপড়ের ইজের, হাঁটুর নীচেটা একটা বগলেওয়ালা চামড়া দিয়া আঁটা। ভিতরে একটা পিরাণ ও ভেষ্ট আর উপরে একটা ভেলভেটিনের কোট এবং মাথায় একটা বড় felt-hat । এই ভেলভেটিনের কোট আর ঐ মােটা বুট জুতা বহুকাল পর্যন্ত টেকে। উইল করিয়া যাইলে পৌত্র পর্যন্ত সেটা ব্যবহার করিতে পারে। গ্রামে চাষা মালীরাই বেশী পাকে। ইহারা বেশ বিনয়ী ও নম্র। আগন্তুক ভদ্রলােক দেখিলে বেশ সম্মান করিয়া কথা কয়। সহুরে লােকের মত খটমটে নয়। গ্রামে ধােপার প্রথা নাই সেইজন্য কাপড় ধােয়াই করিতে হইলে গ্রামের কোন গরীব স্ত্রীলােককে কাপড় দিতে হয় । সে নিজে ধুইয়া ইস্ত্রী করিয়া সময় মত দিয়া দেয়। সকল গ্রামে রুটীর দোকান নাই। একটি বড় গ্রামে রুটীওয়ালা রুটী তৈয়ারী করিয়া গাড়ী করিয়া নিকটবর্তী সকল গ্রামে রুটী দিয়া বেড়ায়। দুগ্ধ, মাংস, ডিম, আনাজ-তরকারী সব এইভাবেই ছােট ছােট গ্রামে সরবরাহ করে। গ্রামের লােকদিগের সহিত অর্থাৎ চাষাদের সঙ্গে যদি একটু মিষ্টি করিয়া কথাবার্তা বলা যায় বা যদি পাইপের তামাক একটু তাহাদের দেওয়া যায় তা হলে তা হারা অত্যন্ত আপ্যায়িত হয় এবং বিশেষ সম্মান ও যত্ন করিয়া থাকে। মিস্ মুলারের একটা বুড়ী ঝি ছিল, তাহাকে হাউস কিপার (llousekeeper) বলে অর্থাৎ বাড়ীর সব কাজ কৰ্ম্ম তাহাকে করিতে হইত। সাদা কথায় যাকে বলে জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ। তাহাকে রীধিতে হইবে, জুতা বুরুশ করিতে হইবে, ঘর ঝাঁট দিতে হইবে, খাবার পরিবেশন করিতে হইবে । কিন্তু একটি বুড়ি ঝি এই হামার-খামার কাজ করিত।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ ইংরাজদিগের ঝি-গুলি খুব পরিশ্রম করিতে পারে। ভারতবর্ষের তুলনায় তিন চারিটি ঝিয়ের কাজ একা করিতে পারে। একঘেয়ে রান্না খাইয়া স্বামীজী মাঝে মাঝে মুখ বদলাইতে ইচ্ছা করিতেন। একদিন স্বামীজী বলিলেন, “চ’,রান্না ঘরে গিয়ে বঁধি গে, বেশ ঝাল ঝাল আলু-চচ্চড়ি বা আলুরদম।” বৰ্তমান লেখককে সঙ্গে যাইতে দেখিয়া স্বামীজী নিষেধ করিয়া বলিলেন, “না রান্না ঘরে বাইতে নেই, গেলে এ দেশে বড় নিলে করে।” যাহা হউক, বেশ মাখন দিয়ে কাল মরিচ দেওয়া আলু-চচ্চড়ি বেঁধে নিয়ে স্বামীজী আসিলেন। সেই আলু-চচ্চড়ি একটু মুখে দিয়ে যেন ধড়ে প্রাণ আসিল। তখন সকলে বুঝিতে পারিল যে দেশের জিনিসটা কি মিষ্ট ও আদরের। নানাবিধ রাজভােগ ফেলে দিয়ে কালমরিচ দিয়ে আলুচচ্চড়ি যেন ঢের উপাদেয় বােধ হইল। একেই বলে দেশানুরাগ বা স্বদেশ-প্রীতি। স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীকে বলিলেন, “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের ইংরাজীতে একটা সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ ত?” মিস্ মূলার পত্র লিখিয়া প্রঃ ম্যাক্স-- মূলারের সহিত বন্দোবস্ত করিয়াছেন যে স্বামীজী এক নির্ধারিত দিনে অধ্যাপকের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইবেন। সারদানন্দ স্বামী ব্যস্ত সমস্ত হইয়া যথেষ্ট পরিশ্রম করিয়া শ্ৰীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখিলেন। মিস্ মূলারের বৈঠকখানা ঘরে বসিয়া সারদানন্দ স্বামী সেইটি পড়িলেন ও স্বামীজী শুনিয়া একটু আধটু বদলাইয়া দিলেন, কিন্তু লেখাটী পছন্দ করিলেন। তাহার পরদিন সেই সংক্ষিপ্ত জীবনীটি লইয়া স্বামীজী, সারদানন্দ স্বামী ও মিস মূলার অধ্যাপকের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলেন। অধ্যাপক ম্যামূলার যে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবনী লিখিয়াছেন সেই লিখিত জীবনের ঘটনাবলীর অনেক অংশ সারদানন্দ স্বামীর রচনা হইতে গৃহীত হইয়াছে ; এমন কি সেই ভাষাও স্থানে স্থানে রহিয়া গিয়াছে। একদিন বেলা ১১ টার সময় মিস্ মূলার ও স্বামীজী একটা গােল লণ্ডনে বিবেকানন্দ টেবিলের ধারে বসিয়া আছেন। টেবিলের উপর বেশ রংচঙে নুতন প্রকাশিত Stanley লিখিত, “How I found Living Stone” নামক একখানি বই রহিয়াছে। বর্তমান লেখক গিয়া তথায় বসিলেন এবং বইখানি লইয়া দেখিতে লাগিলেন, পরে পড়িবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। মিস মুলার বলিলেন, ‘বইখানি কাহাকেও দিবে না। বই কাহাকেও দিব না এই স্থির করিয়াছি। বই লইয়া গেলে কেউ ফেরৎ দেয় না।” স্বামীজী বলিলেন “না, মহিম বই ফেরৎ দিবে।” মিস্ মূলার বিরক্ত হইয়া বর্তমান লেখককে বই পড়িতে দিলেন এবং বিরক্তির সহিত কথা বলিতে লাগিলেন, “ব্যাটা ছেলেকে কখন বই পড়িতে দিতে নাই, নিয়ে গেলে আর তারা কখন ফেরৎ দেয় না, পুরুষদের এটা ভারি দোষ। আর মাগীদের কথা যদি বল তত নিডিল বক্স, থিম্বুল (thimble) ও কঁচি দেখতে পেলেই সুবিধামত নিয়ে সরে পড়বে। মাগীদের সম্মুখে নিডিল বক্স, কাচি এবং অন্যান্য জিনিস সব সময় লুকিয়ে রাখতে হয়। স্বামীজী শুনিয়া ব্যঙ্গচ্ছলে হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন, তাদের বাড়ীতে কি কঁচি নিডিল বক্স সব থাকে না?” মিস মূলার উত্তেজিত হইয়া বলিলেন, ‘থাকে না কেন? মাগীদের ঐ সব তত বােগ, এই জন্য মাগীরা এলে অত ভয় করে। স্বামীজী এই সকল কথা শুনিয়া হাসিতে লাগিলেন। বর্তমান লেখক আর দুদিন পিকিনিস্ গ্রীনে থাকিয়া লণ্ডনে ফিরিয়া আসিলেন। মিস্ মূলারের গ্রামের বাড়ী হইতে সকলে আসিয়া সাউথ-বেল গ্রেভিয়াতে লেডি মাগুসনের ৫৭ নং সেন্টজর্জ স্ট্রীট বাড়ীতে পৌছিলেন। রাস্তার পার্শ্বে একটি ছােট বাগান বা পার্ক ছিল, হ্যানার স্কোয়ারের বর্ণনা। তাহার নাম “হানাভার স্কোয়ার।” এই স্থানটি ভিক্টোরিয়া ষ্টেশন ও টেমস্ নদীর প্রায় মধ্যে এব’ পি- লিকো পাড়ার অনতিদূরে। বাড়ীটি ছিল পাঁচতলা। বাড়ীতে প্রথম ঢুকিয়া ৩৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ একটি প্যাসেজ। তাহার পর ডান দিকে বৈঠকখানা ঘর, ভিতরদিকে যাইলে ডান দিকে ছােট দুই একটি ঘর ছিল। সেই ঘরের একটিতে স্বামীজী শয়ন করিতেন; তাহার পরেই ছােট একটি পাইখানা ছিল। পাইখানা ঘরটীর মেজেতে ভাল করিয়া গাচে মােড়া ছিল এবং স্বামীজী শৌচে বসিয়া বড় থুথু ফেলিতেন সেইজন্য স্বতন্ত্র একটী চীনা মাটীর বাটি পায় রাখিয়াছিলেন। দরজায় ঢুকিয়া ভিতরদিকে একটা কাঠের সিড়ি, সেইটি দিয়া দোতালায় যাওয়া যায়। কাঠের সিঁড়িতে খানিকটা উঠিয়া একটা বড় কাঠের ছাত বা চাতাল ( landing place ), তাহার পর আবার উঠিয়া সম্মুখে একটী বড় ঘরে যাওয়া যায়। এই ঘরটী গতি সুন্দরভাবে সুসজ্জিত, এইটি ছিল লোর বা ড্রয়িং রুম। ঘরটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশটি ছােট এবং অপর আংশটি নীচেকার বৈঠক খানা ঘর ও গলির ঠিক উপরে সেইজন্য সেইটি বড় ছিল। ঘরের দুটি অংশের মধ্যে লোহার থাম দিয়া ছাতটী রাখায় একটী ঘর বলিয়া বােধ হইত । ঘরটীতে ঢুকিয়া অপর পার্শ্বে অর্থাৎ রাস্তার দিকে একটা টেবিল ও একটী চেয়ার থাকিত, সেইখানে দাড়াইয়া স্বামীজী বক্তৃতা করিতেন। স্বামীজীর দাড়াবার স্থানের ডানদিকে ও আগন্তুকদিগের বা দিকের দেওয়ালের দিকের মাঝখানে একটী অতসীখানা ছিল ; এই আতসীখানার রাস্তারদিকের কোণেতে দেওয়ালের দিকে টেবিল করিয়া ও ঘরের দিকে পিছন করিয়া গুডউইন ক্ষিপ্র লিপিতে (sliort-liand) সমস্ত লিখিয়া যাইতেন। ঘরটর ভিতর প্রায় দেড়শত লােক বসিতে পারিত। সিড়ি থেকে উঠিয়া ঘরে ঢুকিয়া ভিতরদিকের বাঁ দিকে কয়েকটী আলমারী পুস্তক- পূর্ণ ছিল এবং ভিতরকার দেওয়ালের দিকে একখানি বড় স্প্রীংএর শােফা ছিল। কাঠের সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া আর একটি চাতাল দিয়া গেলে লণ্ডনে বিবেকানন্দ লেক্চার ঘরের উপরে আর একটি ঘর ছিল। এই ঘরটীতে মিস মুলার বাস করিতেন। দোতলা ও তেতলার ঘরের মাঝখান ও ভিতরকার উঠান দিয়া স্নানের ঘর ছিল । একটি এনামেলের তৈয়ারী বড় স্নানীয় জলাধার (bath tib) ছিল, তাহাতে গরম ও ঠাণ্ডা জলের দুটি কল ছিল। স্নান করিবার সময় ইচ্ছামত ঠাণ্ডা ও গরম জল মিশাইরা লইত। মেঝেটি কর্কের চাদর পাতা এবং একখানিতে বিন্দু বিন্দু কর। পিঁড়ের মত ছিল। নখ ঘসিবার জন্য একটি ব্রুস এবং পিঠ ঘসিবার জন্য লম্বা হাতলওয়ালা ক্রস। দেওয়ালে আশি ও চুল পরিষ্কার করিবার জন্য চিরুণী ও ব্রুস ছিল এবং ঘরের এক পার্শ্বে একটি (ভিতরটা চিনা মাটীর এবং বাহিরটা ভাণ পালিস করা) কাঠের কমড এবং পিঠে ঠেস্ দিবার জন্য চামড়ার গদি ও পাতলা কাগজের রােল ছিল। বসিবার স্থানটী বেশ পালিশ করা। দাত মাজিবার, মুখ ধুইবার স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত ( wash stand ) ছিল। মেঝেটা ভাল রঙিন টালিতে মােড়া ছিল। বাড়ীর মেঝের নীচেতে (ground floor) রান্না ঘর, ভাড়ার ঘর ও ঝি চাকরদের থাকিবার স্থান ছিল। উনুনের সঙ্গে একটি বড় বয়লার অর্থাৎ দেওয়ালে লােহার দুটি নল দেওয়া বয়লার (boiler) ছিল এবং তার সঙ্গে উপরকার Bath tul এর পাইপের সহিত যােগাযােগ ছিল। রাস্তা থেকে জল তাতে আসিয়া পড়ে এবং জলটা তথায় গরম হয় এবং রাধিবার সময় কলটা ঘুরাইলে গরম জল পাওয়া যায়। এই বয়লার হইতে গরম জল নল দিয়া স্নান ঘরে উঠিয়াছে। ঠাণ্ডা জলেরও এই প্রকারের বন্দোবস্ত আছে। উনুন ধরিলে জল গরম হয় এবং রাস্তায় জল আসিলেই সেই গরম জল চাপে উপরে উঠে; তখন উপরে কল খুলিলেই আপনা- আপনি জল পড়ে। এইরূপ কল বড় এইরূপ কল বড় মানুষের বাড়ীতে থাকে, গৃহস্তের বাড়ীতে এমন হয় না, তাহার উপর অধিকাংশ বাড়ীতে মানের বন্দোবস্তই লণ্ডনে বিবেকানন্দ নাই। পাড়ায় একটি সাধারণের স্নানাগার আছে তথায় সকলে স্নান করে, তাহাকে public bath house বলে । পূৰ্ব্বকথিত সিড়ি দিয়া আর খানিকটা উঠিলে উপরে একটি বড় ঘর ছিল। ঘরেতে দুই তিন জন শয়ন করিতে পারে এমন একটা লােহার খাটিয়াতে বিছানা ছিল। রাস্তারদিকের দেওয়ালের নিকট প্রকাণ্ড একটি মাটির জিনপরান দো-ঘােড়া (Rocking horse ) ছিল। ছােট ছেলে মেয়ে তাহাতে দোল খায়। ঘরের মাঝে একটি গােল টেবিল ও তিন খানি চেয়ার ও একটি আতসীখানা ছিল। রাস্তার দিকের দেওয়ালের নিকট cpboard বা টানাওয়ালা দেরাজ ছিল, তাহার উপর আরসি চিরুণী থাকিত। এই ঘরের উপরে অর্থাৎ পাচতলায় একটি লম্বা টানা ঘর ছিল। ছাতটা দুদিকে গড়ান, ঘরটির মধ্যস্থানে দাড়াইলে ছাতটা মাথায় ঠেকে কিন্তু ধারে যাইলে মাথায় ঠেকে, ইহাকে বলে Garet। ঝি চাকরের কাপড়-চোপড় ও বাড়ীর ভাঙ্গাচোরা জিনিস এইখানে থাকে। আলাের জন্য মাঝে মাঝে ফোকর আছে এবং একটি fumber rooin অর্থাৎ ভাঙ্গাচোরা জিনিস রাখিবার ঘর ছিল। বাঁ-দিকে সিড়ির নীচেতে অন্ধকার দিয়া গােটা কতক ধাপ নামিয়া মেঝেরতলায় (ground floor) ঘর পাওয়া যায়। এই ঘরগুলি ভিতরকার উঠানের সহিত এক লেভেলের। তথায় রান্নাঘর এবং আর দুই তিনখানি ঘর ছিল। ভিতরে একটি উঠান ছিল। এই হইল সমস্ত বাড়ীর বর্ণনা। ফুটপাতের নীচেতে কয়লা রাখিবার ঘােট ঘােট ঘর থাকে এবং ফুটপাতের উপর লােহার কড়াওয়ালা গােল গােল ঢানি থাকে। ঢাকনিটা ৪০ লণ্ডনে বিবেকানন্দ তুলিয়া গৰ্ত্ত দিয়া কয়লা ঢালিয়া দেয় সেইজন্য বাড়ী কয়লার গুঁড়াতে অপরিষ্কার হয় না। রাত্রি ৯টার পর সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক চারিতলার বড় ঘরটিতে শুইতে গেলেন। রাস্তারদিকের দেওয়ালের নিকট পাওয়ালা একটী দেরাজ ছিল। দেরাজের উপর ঘােরান যায় এইরূপ ফ্রেমওয়ালা একখানি আয়না, ক্রস ও চিরুণী ছিল। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখকের জিনিস সব স্বতন্ত্র ! সারদানন্দ স্বামী গলার কলার খুলিয়া আমারীর উপরে রাখিলেন। তিনি “টাই” (tie) পরিতেন না, পাশী- কোটের ন্যায় লম্বা কাল কোট পরিতেন। গলার কাছে বােম দেওয়া ছিল। বর্তমান লেখক পুরা ইংরাজী পােষাক পরিতেন এই জন্য তিনি টাই ও কলার আশীর পার্শ্বে রাখিলেন। সারদানন্দ স্বামী জুতা মােজা ও ট্রাউজার ইত্যাদি খুলিয়া শিল্পি সুট ( sleeping suit) পরিলেন অর্থাৎ ফ্লানালের একটা চিলা পায়জামা ও একটা কোট পরিলেন। পায়জামাকে বাঙ্গালা দেশে Pantaloon বলে কিন্তু ইংলণ্ডে ওকথা বলিলে কেহ বুঝিতে পারে না। Pantaloon অর্থে ভাড় বা নাচওয়ালা বুঝায় এইজন্য ট্রাউজার বলে । Pantaloon হইতেছে, ফ্রেঞ্চ.ক..-অপভ্রংশ হইয়া এ দেশে চলিতেছে। ইজের বাঁধিবার গলার যে ফিতা থাকে তাহাকে বাংলাদেশে গ্যালিস্ বলে কিন্তু লণ্ডনে গ্যালিস্ বলিলে বুঝিতে পারা যায় না, তাহারা ব্রেশেজ, বলিয়া থাকে। জুতার সাধারণ নাম বুট (Boot) ও টুপির সাধারণ নাম হাট (IIat)। যাহা হউক সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক দুজনে কাপড় ছাড়িয়া বিছানার কাপড় ( sleeping suit) পরিলেন। এক কপাটের দরজা, সেটা সদা সর্বদা ভেজাইয়া রাখিতে হয়। সারদানন্দ স্বামী নিরিবিলি পাইয়া লম্বা করিয়া পা ছড়াইয়া আলমারীর সুমুখের গালিচার উপর বসিয়া বর্তমান লেখককে ৪১ লণ্ডনে বিবেকানন্দ বলিলেন, “ওহে, একটু আরাম করে বােস, একটু পা ছড়িয়ে হাঁপ ছাড়ি। তাহার পর ছ্যাকা গাড়ীর ঘোড়া বিকেল বেল। গাড়ী থেকে মুক্ত হয়ে যেমন করে মাটীতে শুয়ে এদিক ওদিক গড়াগড়ি দেয়, সারদানন্দ স্বামীও তদ্রুপ চিৎপটাং হইয়া গ ড়াইয়া লইলেন এবং বর্তমান লেখককে বলিলে, ‘একবার গড়িয়ে নাও হে, দেখ না কি আরাম। খানিকক্ষণ পিঠে শুয়ে টু দুটি উচু করিলেন এবং ক্রীড়াবৃত বালকের ন্যায় খুব অঙ্গভঙ্গী করিলেন, তাহার পর চ্যাপ্টানি খাইয়া বসিলেন। বর্তমান লেখকও আদেশমত সবই অল্প বিস্তর অনুকরণ করিলেন। সারদানন্দ স্বামী বলিতে লাগিলেন, “বাবা! চব্বিশ ঘণ্টা আটেকাটে বন্ধ থাকা একি আমার সাধ্যি। অষ্টবজে বন্ধন করে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা। এ বাপু নরেনের সাধ্যি, নরেন করুক গে ! নরেনের ফরে পড়ে প্রাণটা আমার গেল। কোথায় বাড়ী ছাড়লুম মাধুকরী কৰ্বো, নিরিবিলিতে জপ ধ্যান কৰ্বো না এক হাঁফরে ফেলে দিলে। না জানি ইংরাজী না জানি কথাবার্তা কইতে অথচ তাইশ হচ্ছে লেচার কর লেক্চার কর ? আরে বাপু আমার পেটে কি কিছু আছে ? আবার নরেন যা রাগী হয়েছে কোন্ দিন মেরে বােবে। তা চেষ্টা কৰ্বো, দাড়িয়ে উঠে যা আবে তাই একবার বােলবাে যদি হয় ত ভাল, না হয় এক চেঁচা মারূবাে, একেবারে দেশে গিয়ে উঠবে। সাধুগিরি কোর্বো সে আমার ভাল ! কি উপদ্রবেই পড়েছি ! কি ঝরির কাজ। এমন জালে কি এখানে আস্তুম ? শুধু নরেনের অসুখ শুনে এলুম। নরেন আর গঙ্গাধরটা সারাদিন বােকচেই তাে, মুখের আর বিরাম নেই ! নরেন কিনা উকিলের বেটা আর গঙ্গাধর ভাটের বেটা তাই সারাদিন বােকছে। কান ঝালাপালা হয় সেইজন্যে আমি পালিয়ে আসি। আচ্ছা ওদের মুখ কি ব্যথা করে না, মাথা ধরে না, ইত্যাদি বলিতে লাগিলেন। ৪২ লণ্ডনে বিবেকানন্দ এইরূপ পূরাে ব্যঙ্গচ্ছলে সারদানন্দ স্বামী কথা বলিতেছেন এমন সময় দরজায় টোকা মারার আওয়াজ হইল। উদ-চরিত্র সারদানন্দ স্বামী ত্বরান্বিত হইয়া বলিলেন, ‘ome গুডউইন। in, please? ইংরেজীতে ভদ্রভাবের কথা কহিতে হইলে সকল কথার সহিত please বলিতে হয় এবং please ) বলিলে অতি রূঢ় ভাষা হয়। সারদানন্দ স্বামীর আদেশ পাইয়া গুড়উইন ঘরে প্রবেশ করিলেন এবং আতসীখানার নিকটে তাহার চামড়ার গ্ল্যাডষ্টোন ব্যাগ ও আর দু’ তিনটি ছােট ব্যাগ, রাখিলেন। সেই ব্যাগেতে তাহার সমস্ত জিনিস পত্তর থাকিত। গুড উইনের বয়স তখন ২৩২৪ বৎসর হইলেও বরাবর কষ্টে ও উদ্বেগে প্রতিপালিত হইয়াছিলেন বলিয়া তখন তাঁহার ৩৫/৩৬ বৎসর বয়স বলিয়া মনে হইত। গুডউইনের প্রাণটী বড় সরল ও সরস ছিল। ব্যাগ হইতে তাঁহার sleeping suit ও আর দু একটি জিনিস বাহির করিয়া সারদানন্দ স্বামীর সহিত মিষ্টালাপ সুরু করিলেন। সমস্ত দিন কাজে ব্যস্ত ছিলেন সেই জন্য কাহারও সহিত ঝগড়া করিবার অবকাশ পান নাই কাহারও সহিত ঝগড়া করিতে না পারিলে তাহার মন সুস্থ থাকিত না। এক্ষণে সময় পাইয়া বেশ ঝগড়া আরম্ভ করিলেন। গুডউইন সারদানন্দ স্বামীকে বলিতে আরম্ভ করিলেন, You (ooky Swami,Devil Swami, Blackie Swami, তুমি চোখ বুজে বুজে কেবল ধ্যান কর আর ভাব যে কখন খাবার আবে, কখন খাবার ঘণ্টা বাজবে’ ইত্যাদি বলিতে লাগি- লেন। সারদানন্দ স্বামীও হাসিতে হাসিতে তাহার জবাব দিতে লাগিলেন। এইরূপে দুজনায় কিছুক্ষন হাসি তামাসার কেঁাদল চলিল। তার পর গুডউইন তাহার জিনিস পত্তর লইয়া গ্যারেট ঘরে শুইতে গেলেন। গ্যারেট ঘরটি অনেক দিন ব্যবহার হয় নাই বলিয়া সেই ঘরে অনেক পিনু (dea) ছিল ।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ গুডউইন দরজাটি ভেজাইয়া দিয়া চলিয়া গেলে উভয়ে বিছানায় শুইলেন এবং সারদানন্দ স্বামী বলিতে লাগিলেন, “আরে ভাই, আমরা ত গরীব দেশের লােক, মেঝেতে মাদুর পেতে রাত কাটাই। আরে প্রথম যখন এ দেশে এসে বিছানায় শুতে গেলুম তখন দেখি না ধব ধবে বিছানা একটার উপর আর একটা, কোনটা গায়ে দেব আর কোনটায় শােব কিছুই ঠিক কর্তে পারলুম না। অবশেষে হাঁটু দুটি গুডিয়ে শুলুম। শীত ধলে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলুম। তা কি জানি বিছানার ভেতর কত কেরামুতী রয়েছে। বর্তমান লেখকও সায় দিলেন যে একটু শীত ধরলে সব তুলে বিছানার ভেতরে ঢুকে বেশ গরম হয়ে শুয়ে থাক। কারণ বসন্তকালে ঝিঝিম্ বৃষ্টি হচ্ছে। বাঙ্গালা দেশের পৌষ বা মাঘের সময়। এইরূপ কথাবার্তা কহিতে কহিতে দু’জনায় শুইয়া পড়িলেন। একটা লােহার স্প্রিংওয়ালা খাটিয়া ছিল তাহাতে দুইজনায় পাশাপাশি কম্বল মুড়ি দিয়া শুইয়া রহিলেন। বিছানা হইতেছে, একটি তারের স্পিংওয়ালা খাটিয়া। তাহার উপর বড় কুঁচাননা বা ঐ রকম একটি মােটা ক্যান্বিশের গদি, তাহার উপর পালকের হউক বা তুলার হউক মােটা তােষক। বাঙ্গালা দেশে তােষকের মাঝে সেলাই করে, ইহা তদ্রুপ নয়। কাপড়ের থােলের ভিতর তুলল বা পালক দেয়। প্রত্যেক দিন বিছানা করিবার সময় উল্টে পাল্টে দেয় ও চোস্ত করিয়া দেয়। তাহার উপর একটি বড় চাদর দেয়। মাথার বালিস বেশ লম্বা চওড়া। তবে পাতলা পাতলা একটির উপর আর একটি দেয়। বাঙ্গালা দেশে একটু উচু করিয়া শােওয়া অভ্যাস সেইজন্য প্রথম প্রথম মাথা ঝুলিয়া পড়িতেছে বলিয়া মনে হয় তারপর অভ্যাস হইয়া যায়। বিছানার উপরকার চাদরের উপর আর একখানি চাদর দেয় তার উপর দু’একখানা কম্বল দেয় এবং এই কম্বলের উপর এক বড় সূজনীর চাদর ৪৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ পাতিয়া দেয়। অর্থাৎ কম্বল দু’খানার যেন ওয়াড় দেওয়া হইল। শয়ন করিবার সময় কম্বলের নীচেকার চাদর তুলিয়া বিছানার উপর শুইয়া চাদর মােড়া কম্বল দিয়া গলা পর্যন্ত ঢাকিয়া রাখিতে হয়। লােহার খাটিয়ায় কালাে ফ্রেম দেখিতে খারাপ হয় সেইজন্য চারিদিকে একটা ঝালর করিয়া ঝুলাইয়া দেয় এবং নীচে চাকাওয়ালা একটি পােরসিলিংএর বাটী থাকে। রাত্রিতে প্রস্রাব পাইলে তাহাতে ত্যাগ করিতে হয়। নচেৎ অন্যত্র প্রস্রাব করিতে গেলে বুকে ঠাণ্ডা লাগিয়া যাইতে পারে।

সকালবেলা ৮টার সময় স্বামীজী, সারদানন্দ স্বামী, মিস্ মূলার বর্তমান লেখক আহার করিতে বসিলেন। কৃষ্ণমেন উইলিয়ম হােয়াইটুলির দোকান হইতে তিনটি খুব কচি কাঁচা লঙ্কা আনিয়াছিল। সবে হইয়াছে, তাই ঝাল নাই, কেবলমাত্র একটু গন্ধ আছে। তিনটির প্রত্যেকটির দাম এক শিলিং করিয়া। তখন ১৯০ টাকায় পাউণ্ড বা গিনি ছিল। স্বামীজী লঙ্কা খাইতে বড় ভালবাসিতেন সেইজন্য কৃষ্ণমেনন অনেক দোকান খুঁজিয়া সবে মাত্র তিনটি পাইয়াছিলেন। লঙ্কাকে কারেন পেপ্পার (Cayne Pepper) বলিয়া থাকে চিলি ( Chilli) বলিলে কেহ বুঝে না। স্বামীজী আহার করিতে করিতে একটি লঙ্কা খাইয়া ফেলিলেন। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখকেরও কাচা লঙ্কা দেখিয়া খাইতে বড় লােভ হইল কিন্তু দামের কথা শুনিয়া হাত তুলিয়া লইলেন। ষ্টার্ডিও সঙ্গে খাইতে বসিয়াছিলেন কিন্তু গুডউইন অন্য ঘরে খাইতেছিলেন। মেনন আসিয়া ডানদিকের দেওয়ালের নিকট চেয়ারে বসিয়া রহিল। বৰ্তমান লেখকের খাইতে খাইতে টোষ্ট বা সেঁকা রুটী আবশ্যক হওয়ায় তিনি মৃদু ও নম্রস্বরে রুটীর টু চাহিলেন। মিস মূলার বুড়ী ওমনি রাগিয়া উঠিলেন, “অমনভাবে কথা কহিলে কেন ? We are not cruel people ? ভয়ে ভয়ে অমন করে কথা কহিলে কেন?” এই তাহার বকুনি চলিল! স্বামীজী বলিলেন, “ভারতবর্ষে ছােট ভাই বড় ভায়ের সামনে কোন জিনিস চাইবার বেলা নম্রভাবে কথা কহিয়া থাকে।” মিল, মূলার আবার ক্ষেপিয়া উঠিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘এ তােমার ভারতবর্ষ নয় ! এ ইংলণ্ড, এখানে বড় ভাই ছােট ভাই সব s৬ লণ্ডনে বিবেকানন্দ সমান। আর কোন কথা বলা অবিবেচনা বুঝিয়া সকলেই নিজ নিজ থালায় নজর রাখিয়া আহার করিতে লাগিলেন; তবে মিস, মূলার বুড়ী থামে। সকলে কাফি খাইতে লাগিলেন। মিস, মূলার একটা জাপানী বাটিতে গরম জল ঢালিলেন এবং ঝাজরিওয়ালা ছােট ছেলের ঝুমঝুমির মত হাতলওয়ালা একটি জিনিস লইলেন। ঝুমঝুমির যেখানে কৌটা থাকে তার ঢাকনি খুলিয়া দিয়া জাপানী চা বা গ্রীন্ টি ভরিয়া দিয়া ঢাকৃনিটি আবার টিপে বন্ধ করিলেন। সেই জিনিসটি রূপার ছিল । হাতলটা ধরিয়া জাপানী চায়ের বাটিতে গরম জলে ডুবাইয়া মাঝে মাঝে নাড়া দিতে লাগিলেন। খানিকক্ষণ পর বাটির সমস্ত জলটা বেশ লাল হইয়া উঠিল এবং তাহাতে দুধ চিনি মিশাইয়া খাইতে লাগিলেন এবং যন্ত্রটা অন্যত্র রাখিলেন। প্যাসেজ দিয়া ঢুকিয়া ডান দিকে একটি ঘর। ঘরে ঢুকিয়া বাদিকে একটি ক্যাপ বাের্ড, নীচে একটি কপাটওয়ালা তিন-তাক দেওয়া আলমারী। উপরে বেশ বাহারি ছােট গরাদে দেওয়া কাচের গ্লাস রাখিবার স্থান। ঘরের মাঝখানে গােল টেবিল ও চারখানি চেরার । ঘরে ঢুকিয়া ডান- দিকের দেওয়ালের নিকট ঘাসের বিনুনি চারিখানি ‘উইকার চেয়ার।” দরজার সম্মুখে আতসীখানা, ইহার নীচে লােহার গরাদে দেওয়া একটা বেড়া থাকে সেটাকে ফেণ্ডার ( Fender) বলে। আতসীখানার দিক সম্মুখ করিয়া ডানদিকের কোণে জাপানী একখানি বেতের সুখাসন ( easy chair) ছিল। স্বামীজী তথায় বসিতেন এবং ষ্টার্ডিও দু'এক দিন বসিয়াছিলেন। অপর কেহ তাহাতে বসিতেন না। স্বামীজীর বসিবার বা-দিকে সেক্রেটারিয়েট টেবিল ছিল, উপরটা বর্তুলাকার ঢাকনা দেওয়া, ইচ্ছা করিলে নামাইয়া চাবি দেওয়া যায়। ঘরের ছাতের উপরটা ৪৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ . সিলিং (Ceiling) দেওয়া, পদ্ম ফুল আঁকা। সিলিংটা শােন, পাট, চুণ ইত্যাদি দিয়ে একটা কাদা (paste) করে খুব বড় ছাচে জমিয়ে দেয় ও একটা কড়ি কাঠে মেরে দেয়। যেন একটা রং বেরঙের চূণকাম করা কেম্বিস। সেই সিলিংএর মাঝখানে একটা ঝাড় ছিল। বাড়ীতে ইলেকট্রিক আললা ছিল না, গ্যাসের ঝাড়ে গ্যাস জ্বলিত অথবা ষ্টাডি বাতি আনিয়া ঝড়ের ডালটা সাজাইয়া দিতেন। আহারের পর স্বামীজী নিজের সুখাসনে গিয়া বসিলেন। কখন বা পা ঝুলাইয়া কখন বা জুতা সমেত এক পায়ের উপর আর এক পা রাখিয়া দিব্বি বাঙ্গালী ধরণে বসিতেন। একটি চেরী কাঠের গুড়ি, তার মাঝখানে পাইপে তামাক রাখিবার গর্ত, তার ধারে ফুটো করিয়া লম্বা একটা পাইপ ছিল। সেইটি স্বামীজীর প্রিয় পাইপ ছিল, তাহাতে তামাক দিয়া লম্বা পাইপে বেশ টানিতেন। ষ্টার্জি, মেনন, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক দেওয়ালের দিকে স্টাডি ও মেননের চারিখানি চেয়ারে বসিলেন। মিস্ মূলার নিজের ঘরে সহিত স্বামীজীর চলিয়া গেলেন। স্বামীজী ষ্টার্ডির সহিত কথা কহিতে কথােপকথন। লাগিলেন। স্বামীজী বলিলেন, “দেখ, আমি ভারতবর্ষে যখন ঘুরে বেড়াতুম তখন আমার শুধু পা, গায়ে সামান্য একটা গা ঢাকা কাপড়। একদিন আমেদাবাদের ট্রেণে করে যাচ্ছি, সেই ট্রেণে কতকগুলি থিয়ােজফিষ্ট লােক কুতমিলালের গল্প কর্তে লাগলাে। তাদের পেটে যত আজগুবি গল্প ছিল সব বলতে আরম্ভ করিল। আমার পেটে তখন দু’একদিন কিছু জোটেনি, ক্ষিদেয় দেহ অবসন্ন। আমি তােত চুপ করে বসে তাদের যত সব আজগুবি কথা শুনতে লাগলুম। আমায় গেরুয়া পরা দেখে একজন জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘মহাত্মা কোথা থেকে তাছেন?” আমি তার কিছু আগে হরিদ্বার থেকে আসছি। আমি বল্ল, “আমি লণ্ডনে বিবেকানন্দ হরিদ্বার থেকে আসছি, আমি রতা সাধু। এই তাে আমাকে ধল্লে আপনি নিশ্চয় কুতমিলালকে দেখেছেন। আমার তখন ক্ষুধায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। আমিও তাদের আজগুবি গল্পের সঙ্গে মিশে গিয়ে বল্লুম, ‘কুতমিলালের কথা বলবেন কি এই কয় দিন আগে কুতমিলালের ভাণ্ডারায়ে গেছলুম। সে কি ব্যাপার ! ইয়া বড় বড়া লাড, (নিজের প্রকাণ্ড হাত দেখাইয়া) আর কত যে সাধু ভােজন করছে তার ইয়ত্তা নাই। সে কি ব্যাপার তা আর আপনাদের কি বােল্বাে’ এইরূপ কথা আমিও তাদের বলতে লাগলুম। আমার কথা শুনে তাদের ঠিক বিশ্বাস হলাে। তখন আমার খাতির দেখে কে! তাড়াতাড়ি আমাকে খাবার এনে খাওয়ালে। খেয়ে দেয়ে আমার শরীর যখন সুস্থ হলাে তখন আমি তাদের গাল পাড়তে লাগলুম, ‘তােরা দেখাপড়া শিখে থিওজফিষ্টদের বিশ্বাস করিস ? যত সব mystery monger আর miracle hunterএর দল।” ইত্যাদি। তারা বল্লে আপনি যে বল্লেন। আমি ওসব ঠাট্টা করে বলছিলুম, এই বলিয়া স্বামীজী উত্তেজিত হইয়া আপনার পাইপে এক একবার দম্ মারিতে লাগিলেন ও ষ্টার্ডির সহিত কথা কহিতে লাগিলেন। পুনরায় উঠিয়া ফেণ্ডারে তামাকগুলি উল্টে ফেলে দিলেন। আবার রবারের পাউচ বা তামাকের ব্যাগ হইতে তামাক বাহির করিয়া তামাক ভরাইলেন। প্রথম বারে যে তামাক ফেলিয়া দিলেন তাহা একেবারে পােড়ে নাই ; উত্তেজিত হইলে মানুষের যেমন হয় তেমনি হইয়াছিল। স্বামীজী আবার তামাক টানিতে লাগিলেন ও থিওজফিষ্টদের কথা বন্ধ করিয়া দিলেন । তাহার পর মৃদু মৃদু হাসিতে হাসিতে ও তামাক টানিতে টানিতে মেননের দিকে তাকাইয়া বলিতে লাগিলেন, “দেখ, যখন আমি মেননের দেশটা ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখন ওদের দেশে এক বীভৎস ব্যাপার দেখে- ; घ লণ্ডনে বিবেকানন্দ ছিলুম। ওদের দেশটা হচ্ছে মাদ্রাজের দক্ষিণ দিকে। আরে রাম কহ! ওদের দেশে গিয়ে গা ঘিন্ ঘিন্ কৰ্তে লাগলাে। ওদের মেয়েদের কাপড় পরা কি বােল্বাে। মেয়েদের কোমর পর্যন্ত কাপড় আর উপরটা সব খালি ; সে দেখে মাথা হেঁট করে থাকতে হয়। তারপর যখন দেশশুদ্ধ এই রকম ব্যাপার দেখলুম তখন আমার সব সঙ্কোচ চলে গেল। আরে কি বড় ঘর, কি ছােট ঘর! আগন্তুক আসিলে মেয়েরা সব অভ্যর্থনা করে—কিন্তু গা খােলা। কি রে মেন! তােদর দেশে ঠিক এরকম নয় ?” মেনন আর কি বােবে কথা সব বেরিয়ে পড়লাে। মেনকে লইয়া এইরূপ কৌতুক রহস্য চলিতে লাগিল। তাহার পর ষ্টার্ডি উঠিয়া কাৰ্যান্তরে চলিয়া গেলেন, স্বামীজী হঠাৎ বর্তমান লেখকের পায়ের দিকে নজর করিয়া বলিয়া উঠিলেন, ‘তাের বুট ইজেরের পায়ের দিকটাতে অমন ঢেপানা কেন? বর্তমান লেখক বলিলেন, “উপরে একটা বনাতের ইজের বা ট্রাউজার তার ভিতরে একটা ড্রয়ার, তার ভিতরে সক্স (socks) তাই ওরকম হয়েছে। না তুই পরতে জানিস্ নি’ এই বলিয়া স্বামীজী চেয়ার থেকে উঠিয়া আসিয়া বর্তমান লেখকের চেয়ারের সম্মুখে উপু হয়ে বসে, বুটের কাছে পায়ের ইজেরটা তুলিলেন। বর্তমান লেখক তাই দেখিয়া স্বামীজীকে বলিতে লাগিলেন, “আরে কি কর, কি কর, পায়ে হাত দাও কেন?” স্বামীজী বালকের মত ইজের তুলে দেলেন যে সসের (মােজা) উপর ড্রয়ার রয়েছে তাই অমন হয়েছে অর্থাৎ সকা ভিতরে থাকিবে আর ড্রয়ারটা উপরে থাকিবে তাহা হইলে আর তেমন ঢেলা মত হবে না। স্বামীজী এমন ভাবে করিতে লাগিলেন যে বর্তমান লেখক আর কিছু বলিতে পারিলেন , ইজের পরা হলে বর্তমান লেখক স্বামীজীকে প্রণাম করিলেন। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “দেখ চিকাগাে প্রদর্শনীতে এক তিক্ষর লণ্ডনে বিবেকানন্দ মেজাজ মহারাষ্ট্রীয় দোকানদার ভারত-উৎপন্ন জিনিসপত্তর বেচিতেছিল । খবরের কাগজের রিপাের্টাররা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল যদি কিছু নূতন খবর পায় । তাহারা সেই দোকানদারকে নানা কথা জিজ্ঞাসা করিতেছিল। কথাপ্রসঙ্গে তাহারা বরােদার মহারাজের কথা জিজ্ঞাসা করিল। দোকানদারটি কড়া মেজাজের লােক ছিল, বরােদা মহারাজের নানা কুৎসা কৰ্তে লাগলাে। রিপাের্টাররা তাহা লিখিয়া লইল এবং নিজেদের করিয়া মনােমত অনেক আবার তৈয়ারী করিয়া লইল ; কিন্তু লােকটার নাম ভুলিয়া গিয়াছিল। এ কথা সকলেই জানিত। ভারতবর্ষ হইতে স্বামী বিবেকানন্দ আসিয়াছে চিকাগােতে, রিপাের্টে একটা নাম তত দিতে হবে তাই তারা আমার নাম দিয়ে দিলে। কাগজে বেরােলাে স্বামী বিবেকানন্দ বরােদা মহারাজের নিন্দা করেছে। অথচ আমি তার বিন্দু বিসর্গ জানি না। এইরূপ জগতের ব্যাপার! ঘটনাক্রমে বর্তমান লেখকের সহিত একটি কারবারী মহারাষ্ট্রীর সহিত সাক্ষাৎ হয়। দুই চারিদিন সাক্ষাতের পর অনুমান করিয়া তাহাকে প্রশ্ন করা গেল। তখন তিনি স্পষ্ট বলিলেন যে তিনি বরােদার মহারাজকে গাল দিয়াছিলেন, তবে অতি অল্পই হয়েছিল, বেশী দেওয়া উচিত ছিল। লােকটির নাম ছিল রাজোওয়াড়ী কিন্তু সকলে তাহাকে “রিচি” বলিয়া ডাকিত। স্বামীজী হাসিতে হাসিতে বলিতে লাগিলেন যে বীরচঁদ গান্ধী নামক এক ব্যক্তি চিকাগাে পার্লামেন্টে জৈনধৰ্ম্ম বিষয়ে বীরা গান্ধী। বলিতে গিয়াছিলেন। লােকটা একটু বেশী মাত্রায় নিরামিষ ভােজী। হােটেলে গিয়া তিনি বন্দোবস্ত করিলেন যে তিনি নিরামিষ ভােজী, আমিষ কোন জিনিস দিবে না। হােটেলে তাহাই হইতে লাগিল। একদিন তিনি কাফি খাইতেছেন এমন সময় তাহার কাফির সহিত ডিমের খােলা বাহির হইয়া পড়িল। সেই দেখিয়া লণ্ডনে বিবেকানন্দ লােকটি ভৃত্যকে ডাকিয়া বলিলেন, “এ কি করেছ ?” ভৃত্যটী বলিল, ডিমটা মাংসর মধ্যে গণ্য হয় না, ওটা নিরামিষের মধ্যে। একজন বলিলেন, “There is a egg shell in the coffce pot' অপর একজন বলিলেন, ‘ডিম নিরামিষের ভিতর’ ইত্যাদি। স্বামীজী এই বলিয়া মুখ- ভঙ্গী করিয়া রহস্য করিতে লাগিলেন এবং পরে বলিলেন, “অত গোঁড়ামী করে কি বিদেশে থাকা চলে? সব জিনিসকে নিজের মত করে নিতে হয়। অনেকক্ষণ পরে গুডউইন ফিরিয়া আসিলেন। বর্তমান লেখকের তখন কেঁাড়ান কোড়ান দাড়ী ছিল। ইংরেজদের দেশে ইহা নিতান্ত অশােভন। স্বামীজী গুডউইনকে বলিলেন, ‘একে একটা নাপতের দোকানে নিয়ে গিয়ে দাড়ীটা ছটিয়ে আন। গুডউইন তখন বর্তমান লেখককে সঙ্গে লইয়া অনতিদূরে বঙ্গাটজ, (Bongarta) নামক জার্মান নাপিতের দোকানে লইয়া গেলেন। নাপতে গুডউইনের কথামত দাড়ীগুলি চুচালাে বা ফ্রেঞ্চ ফ্যাসানে কাটিয়া দিল। গুডউইন যেরূপ ধমক দেন তাহাতে বর্তমান লেখক তাঁহাকে কিছু বলিতে আর সাহস করিলেন না। অবশেষে কেঁাড়ান দাড়ী পরিত্যাগ করিয়া ছু চালাে ছাগল দাড়ী লইয়া বর্তমান লেখক ফিরিয়া আসিলেন। স্বামীজী ত সেই দেখিয়া হাসিতে লাগিলেন এবং বলিলেন, “আরে ছ্যাঃ, ঠিক চূণােগলির ফিরিঙ্গি হয়েছে। অতি জঘণ্য দেখিতে হইয়াছিল। তাহার দিন কতক পরেই Bongartzএর দোকানে গিয়া বর্তমান লেখক দাড়ী মুড়াইয়া আসিলেন । 'গুডউইন বিকালবেলা সারদানন্দ স্বামীকে লইয়া অনেক দূরে ক্রিকেট খেলা দেখিতে গেলেন। গুডউইন ইংরাজ, তাহার খেলা গুডউইন ও শরৎ মহারাজের ক্রিকেট ধূলায় ভারি আমােদ। সারদানন্দ স্বামীর ভাল লাগিতে খেলা দেখিতে যাওয়া ছিল না, খাতিরে গেলেন এবং তাহার সঙ্গে একটি শিলিং সম্বল ছিল। ৫টা ৫ টার সময় দু’জনায় ফিরিয়া আসিলেন এবং লণ্ডনে বিবেকানন্দ গুডউইন বাস ভাড়া দিয়াছিলেন। সারদানন্দ স্বামী তখন পকেট হইতে শিলিং বাহির করিয়া বেঙের আধুলির অভিনয় করিতে আরম্ভ করিলেন। গল্পটা তত যুৎসই বলিতে পারিলেন না এবং গুডউইনের তাহা ভাল লাগিল না। সারদানন্দ স্বামী বলিতে লাগিলেন যে তাঁহার ক্রিকেট খেলা তত ভাল লাগে না। ক্রিকেট খেলা দেখে কি আমি স্বর্গে যাব ? বর্তমান লেখক চট করে বলিয়া ফেলিলেন, স্বর্গে যেতে হয় On the top of a bus অর্থাৎ বা গাড়ীর উপরের ছাতে বসে গেলে স্বর্গ হয়। গুডউইন সেই শুনিয়া হােঃ হােঃ করিয়া হাসিয়া উঠিয়া বলিলেন যে, ঠিক বলেছ বাস, গাড়ীর ছাদে বসেই ত স্বর্গে যেতে হয়। বাস্ গাড়ীর ভিতরের গদি- গুলি বেশ মখমল দেওয়া এবং ভিতরে তামাক খাওয়া নিষিদ্ধ। এইজন্য মেয়েরা এবং যে সব পুরুষ তামাক খাইবেন না বা সিগারেট টানিবেন না তাহারা ভিতরে বসিয়া থাকেন। কিন্তু পুরুষেরা ছাতের উপর এক এক টুক্র অয়ে-ক্লথ উরু পর্যন্ত ঢাকিয়া দিয়া piye বা সিগারেট টানিতে টানিতে মজা করিয়া উপরে বসিয়া চারিদিক দেখিতে দেখিতে যায়। বৃষ্টি হইলে ছাতা খুলিয়া মাথায় দেয়। বা গাড়ীর ছাতটী বড় আরামের স্থান তাই গুডউইন এত আলাদ করিয়াছিলেন। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক কলিকাতার ম্যালেরিয়া জরে দেড় বা দুই বৎসর ভুগিতেছিলেন। সারদানন্দ স্বামীর জ্বরটা জ্বর অবস্থায় সানি মাস দেড়েক স্থগিত ছিল কিন্তু বর্তমান লেখকের দু’ একদিন অন্তর জ্বর হইতেছিল এবং প্রত্যহই দুই তিন- বার করিয়া কুইনাইন খাইতেন। দু’জনাই উপরকার Rocking horse ঘরে কম্বল মুড়ি দিয়া শুইয়া আছেন। দু’জনারই জ্বর। সারদানন্দ স্বামীর জ্বর অত্যধিক। স্বামীজী মাঝে মাঝে গুডউইনকে উপরে দেখিতে পাঠাইয়া দিতেছেন এবং গুডউইন আসিয়া দুধ সাগু ইত্যাদি খাওয়াইয়া স্বামী বক্তৃতা।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ । যাইতেছিলেন। বেলা ১টার সময় সারদানন্দ স্বামীর জ্বরটা কিছু বেশী হইল, বাতিক বৃদ্ধি খুব হইল। তখন তিনি বিছানা পরিত্যাগ করিয়া উঠিলেন এবং বর্তমান লেখকও সঙ্গে সঙ্গে উঠিলেন। দু’জনেই শ্লিপিং সুট পরিধান করিয়া আছেন। গােল টেবিলের ধারের একখানা চেয়ারে বৰ্ত্তমান লেখক বসিলেন। সারদানন্দ স্বামীর বাতিকের জর—তিনি বসিতে পারিলেন না, দাড়াইয়া দাড়াইয়া পায়চারি করিতে লাগিলেন। একে ম্যালেরিয়ার জ্বর তাহার উপর লেচার করিতে হইবে এই ভয়ে তাহার বাতিক বৃদ্ধি হইয়া গিয়াছিল। প্রথমে চোখ খুলিয়া তিনি পায়চারি করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন, “দেখ মহিম, নরেন ত ছাড়বে না, যে কোন প্রকারেই হউক লেক্চার দেওয়াবেই। আমি ত বাবা ওর কিছু বুঝি না, আবার যে রাগী কখন কি গাল দিবে, কি মেরেই বসবে! তা এখন ত আর এখানে কেউ নেই এখন লেক্চার রিহারশেল দি। কিন্তু তুমি হু দিও।' এই বলিয়া সারদানন্দ স্বামী ঘরে ঘুরে ঘুরে বলিতে Tlfstacial, 'The subject of my lecture, ladies and gentlemen, of course 1 have got nothing to say’, বাতিকের জ্বরে নানা পর্দার সুর ভাজতে ভাজতে এই কথাই বহুবার বলিতে লাগিলেন এবং মাঝে মাঝে বলিতেছেন ‘মহিম শুনছ ত? দু দাও।” বর্তমান লেখকেরও জ্বর, চেয়ারে বসা থেকেই অতিকষ্টে উত্তর দিলেন। তাহার পর চোখ বুজিয়া পাইচারি করিতে করিতে সারদানন্দ স্বামী সেই একই কথা আওড়াইতে লাগিলেন। তাহার পর পা ব্যথা করিতে লাগিল, চেয়ারে ঠেস দিয়া বসিয়া সেই কথাই বলিতে লাগিলেন। বাতিকের ধমকে সুরের মাত্রা ক্রমেই বাড়িল। তাহার পর টেবিলে হাত ও মাথা রাখিয়া লোর চলিল এবং মাঝে মাঝে বলিতে লাগিলেন, “মহিম, শুছােত? ই দাও।” তাহার পর উভয়েই বিছানার ভিতর কম্বল মুড়ি দিয়া শুইয়া ৫৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ পড়িলেন। সারদানন্দ স্বামী মাথা পর্যন্ত কম্বল ঢাকিয়া লেকচার আওড়াইতে লাগিলেন। প্রায় ৫টার সময় স্বামীজী আসিয়া ঘরে ঢুকিলেন ও সারদানন্দ স্বামীর লেচার শুনিলেন। তিনি হাসিয়া ধমক দিতে সারদানন্দ স্বামী নিঝুম হয়ে ঘুমাইয়া পড়িলেন, আর কোন চাঞ্চল্য- ভাব রহিল না । পরদিন সারদানন্দ স্বামীর জ্বর কম ও বর্তমান লেখকের কম্প দিয়া খুব জ্বর। খুব যন্ত্রণা হইতেছিল কিন্তু কি করিবেন নাচার, উভয়েই পাশা- পাশি কম্বল মুড়ি দিয়া শুইয়া রহিলেন। বেলা ২টা ২টার সময় বর্তমান লেখক অনুভব করিতে লাগিলেন যে পায়ের চেটো হঠাৎ গরম হইয়া উঠিল। বেশ রীতিমত গরম অনুভব করিলেন। গরমটা ধীরে ধীরে পায়ের গাঁটের কাছে এসে আটকে রহিল। তাহার পর হঠাৎ গরমটা নামিয়া গেল। খানিকক্ষণ পরে গরমটা এসে পায়ের গাট হইতে হাঁটু পৰ্যন্ত ধীরে ধীরে আবার উঠিতে লাগিল ! কি যেন একটা ভিতর থেকে যাচ্ছে তা বেশ অনুভব করিতে পারিতেছিলেন কিন্তু অতি ধীরে ধীরে উত্তাপটা উঠলাে। হাঁটুর নিকট আসিয়া আটকাইল তাহার পর নামিয়া যাইবার সময় শীঘ্র নামিয়া গেল। খানিকক্ষণ বাদে হাটু হইতে কোমর পর্যন্ত উত্তাপ অনুভব হইতে লাগিল এবং আবার সেইভাবে নামিয়া গেল। ক্রমে হৃদূপিণ্ডের নিকট আসিল এবং ভয়ানক যন্ত্রণা হইতে লাগিল। আভ্যন্তরিক একটা শক্তি ও বাহির থেকে একটি শক্তির সংঘর্ষণ অনুভব হইল। তাহার পর বর্তমান লেখকের আর কোন চৈতন্য রহিল না । উত্তাপ ধীরে ধীরে মাথা পর্যন্ত গেল। এইরূপ বেহুস অবস্থায় বর্তমান লেখক এক ঘণ্টার উপর ছিলেন, এত ঘামিয়া ছিলেন যে মাথার বালিশ কম্বল ইত্যাদি সব ভিজিয়া গিয়াছিল। বেলা ৪টার সময় দরজায় কে টোকা মারিল। কিন্তু অভ্যাস এমনি জিনিস যে এরূপ বেহুস অবস্থায় মৃদু ক্ষীণ- লণ্ডনে বিবেকানন্দ স্বরে বর্তমান লেখক বলিলেন, “•ome in, please” স্বামীজী হাসিতে হাসিতে ঘরে ঢুকিলেন এবং জোরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি রে তাের জ্বর ছেড়েছে ? বৰ্তমান লেখক অর্ধনিদ্রিত অস্পষ্ট স্বরে বলিলেন, “ই। জ্বর ছেড়েছে। স্বামীজী বলিলেন, “হ্যা, জ্বর ছেড়ে গেছে আর ঔষধ কুইনাইন খাস্ নি, জ্বরকে তাড়িয়ে দিয়েছি।” সারদানন্দ স্বামীও জ্বরে আচ্ছন্ন ছিলেন তিনিও দেখিতে লাগিলেন কিছু বলিলেন না। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “কি রে শর! জর হুকুম শুনে না ? বৰ্তমান লেখককে স্বামীজী বলিলেন, “হঁারে, তাের জর কি করে গেল ? বৰ্তমান লেখক তখন ক্ষীণকণ্ঠে সমস্ত ঘটনা বলিলেন। স্বামীজী বলিলেন, ‘খা তাের আর জ্বর আসবে না, আমি নীচে চেয়ারে বসে will force দিচ্ছিলুস, জ্বরকে বের করে দিলুম, অর হুকুম মানবে না? স্বামীজী কখন টেবিলের নিকট দাড়াইয়াছিলেন, কখন বা পাইচারি করিতেছিলেন! সারদানন্দ স্বামীর তখন তা কাটিয়া গিয়াছে। তিনি গায়ের কম্বল চুড়িয়া ফেলিয়া তড়াক করিয়া মেজেতে নামিয়া হাটু গাড়িয়া বসিয়া স্বামীজীর পা জড়াইয়া বালকের ন্যায় কঁদিতে লাগিলেন এবং অনবরত বলিতে লাগিলেন, “আমার মনটা ভাল করে দাও, এটাকে উপড়ে তুলে দাও,” এই বলিয়া পা জড়াইয়া ধরিয়া পায়ের মাঝে মাথা রাখিয়া পড়িয়া রহিলেন। স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীর অকপট ভালবাসা দেখিয়া মৃদু মৃদু হাসিয়া বলিতে লাগিলেন, “দুঃ শ্যালা হোঁৎকা, উঠে বােস ! শালার ম্যালেরিয়া জ্বর হয়েছে কি না তাই বাতিকে কি কচ্ছে দেখ! যা শ্যালা, তােকে লেক্চার কৰ্ত্তে হবে, না হােলে তােকে মাৰ্ব্ব লাথি আর এই চার-ভােলার জানালা থেকে রাস্তায় ফেলে দোবাে। শ্যালা তােকে work houseএ খাটাব। জানি না কত খরচ হয়েছে ?” সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, “তুমি লাথিই মার আর যা ইচ্ছা কর, কিন্তু আমার মন ভাল করে দাও, দাও, তা না হলে তােমায় লণ্ডনে বিবেকানন্দ ছাড়বাে না।” স্বামীজী হর্য ও প্রীতভাবে বলিতে লাগিলেন, “তা শালা হবে, এখন ওই !” সারদানন্দ স্বামী পা পরিত্যাগ করিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন। কিন্তু মনে এতটা উদ্বেগ আসিয়াছিল যে আর সখ্যভাবে কথা কহিতে পারিলেন না, নিতান্ত অনুগতের ন্যায় দাড়ালেন। স্বামীজী বলিলেন, “দ্যাখ, ডাইনিং-রুমের যে চেয়ারে আমি বসি, সেইখানে বসে আমি শক্তি সঞ্চার কচ্ছিলুম। স্যালা, শক্তি সঞ্চার জানি নি, কিন্তু এই দেখলি ত তােদের চোখের সামনে কলুম।” সারদানন স্বামী বিনীতভাবে বলিলেন, ‘তা করেছ বেশ করেছ, আমার মন ভাল করে দাও। স্বামীজী বর্তমান লেখককে বলিলেন, “যা আর কুইনাইন খাসনি, বাস্কো থেকে সব টেনে ফেলে দে। উইল ফোর্স বা শক্তি সঞ্চারে সব হয়। আজ রাত্রে রুটী খানে, দুধসাগু খাস’ এই বলিয়া স্বামীজী চলিয়া গেলেন। সারদানন্দ স্বামী বিছনায় শুইয়া বলিলেন, “ওহে সে নরেন আর এখন নেই, এই ত হাতে হাতে দেখলুম হুকুমে ত এত বৎসরের জর এক দিনে একেবারে তাড়িয়ে দিলে। এখন বুঝে সুঝে কথা বলা ভাল” ইত্যাদি নানা কথা বলিতে লাগিলেন। সারদানন্দ স্বামীর জ্বর ভাল হইলে মিস্ মুলারের সহিত বেশ সমানভাবে চলিতে লাগিলেন। আবশ্যক হইলে সারদানন্দ স্বামী মিস্ মূলারকে একটু আধটু সংস্কৃত পড়াইয়া দিতেন। একদিন বৈকালবেলা মিস্ মূলার তাঁহার কোন পরিচিত লােকের বিবাহ দেখিতে সারদানন্দ স্বামীকে সঙ্গে লইয়া গির্জাতে গেলেন। গির্জাতে কিরূপভাবে বিবাহ হয় মিস মুলারের সহিত সারদানন্দ স্বামী পূর্বে তাহা দেখেন নাই। যাহা সারদানন্দ স্বামীর গির্জাতে যাওয়া। হউক ঘণ্টা খানেক বাদে আনন্দিত ভাবে ফিরিয়া আসিয়া সারদানন্দ স্বামী বিবাহের কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। কারণ কয়দিন তিনি প্রায় বিমর্ষ ছিলেন। খায় দায়, বসে লণ্ডনে বিবেকানন্দ থাকে বিশেষ কোন কাজ নাই, তাহার পর তামাক খেতে পায় না। মাঝে মাঝে গুডউইন দু’ একটা সিগারেট দেয় সেইজন্য মনটা খুসী ছিল না। বিবাহ দেখিয়া পাঁচ জনের সঙ্গে মিশে মনটা খুসী হইল। সারদানন্দ স্বামী ষ্টার্ডি বা মিস মূলারের সহিত আর কোর্ট (Earls Court) স্থানেতে ইণ্ডিয়ান এম্পায়ার একজিবিশন ইণ্ডিয়ান এম্পায়ার দেখিতে গিয়াছিলেন। তিনি ফিরিয়া আসিয়া একজিবিশন। বলিলেন যে ইংরাজ ঝি কমলালেবু রঙের শড়ী পরিরা উল্টো দিক থেকে মাথায় ঘােমটা দিয়ে পেতােলের থালায় দুধের বাটী ও চায়ের বাটী রেখে দোকানে চা বিক্রী কচ্ছে দেখে ভারি খুসী হয়েছিলেন। তবে একজিবিসন্ স্থানটা প্রকাণ্ড বড় তাই সমস্ত স্থানটি দেখিতে পারেন নাই। আর একদিনেও সম্ভব নয়। সারদানন্দ স্বামীর মুখে একজিবিসনের কথা শুনিয়া বর্তমান লেখক গুডউইনের নিকট খবর লইয়া পরদিন বেলা ১১টার সময় বাহির হইয়া ঘুরে ঘুরে একজিবিশন দেখিতে লাগিলেন। চায়ের দোকানটি দেখিতে খুব ভাল হইয়াছিল। সারদানন্দ স্বামীর যে রকম ধারণা হইয়াছিল বর্তমান লেখকেরও তদ্রুপই হইল। আমাদের দেশের মেয়েদের শাড়ী পরা ইউরােপের গাউন পরার চাইতে দেখিতে ঢের সুশ্রী হয়। একজিবিসনে বাঙ্গালা দেশের অনেক হিন্দু ও মুসলমান কারিগর গিয়াছিল। ভূনেওয়ালা ঝাল ছােলা, খই মুড়ী ভাজিতেছিল, কেউ বা কাশীর ফুলকাটা থাল, গেলাস ইত্যাদি তৈয়ারী করিতেছিল। কেউ বা বরফী তৈয়ারী করিতেছিল। যাহারা কলিকাতার মেছুয়াবাজারের ও চাটগাঁয়ের মুসলমান ও বিহারের হিন্দু কারিগর ছিল তাহারা বর্তমান লেখককে বাঙ্গালী পাইয়া তাহাদের পেটের কথা সমস্ত খুলিয়া বলিল। তাহারা বিদেশে বাঙ্গালী বাবুকে পাইয়া বড়ই খুসী হইল। তাহারা বলিল যে ফিরিঙ্গিদের ছোয়া জল, রুটী বা উহাদের কাটা মাংস ৫৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ তাহারা খায় না। নিজেরা ভেড়া কিনে ও মুসলমানরা কাটে সেই মাংস হিন্দু মুসলমান দুজনায় মিলিয়া খায়। কিন্তু ফিরিঙ্গির ছোঁয়া জিনিস তাহারা খায় না। বােঝা গেল বিদেশ হইলে হিন্দু মুসলমান একসঙ্গে খার আর তখন দেশের ভালবাসা জাগে। একটা ইংরাজ বুড়ো পাত্রী বা নিম্ন শ্রেণীর যাজক ভূনেওয়ালাদের দোকানের কাছে ঘুরে বেড়াইতেছিল। বুড়াের হাতে একটা ব্যাগ ও চাটগায়ে মুসলমানী-ভাষাতে কতকগুলা খৃষ্টানী প্যামফ্রেট ছাপান ছিল। বুড়ােটি তাহাদের সহিত ও অন্যান্য মুসলমানদের সহিত দিব্বি কথাবার্তা কহিতে লাগিল। বৰ্তমান লেখক সেই দেখিয়া বুড়টিকে বলিলেন “আপনি কি পূর্ববঙ্গে ছিলেন ? লােকটি বলিল তিনি ইংলণ্ডের বাহিরে কখন যান নাই, ঘরে বসিয়া তিনি ঐ ভাষা শিখিয়াছিলেন ও বেশ কথা কহিতে পারেন। বাঙ্গালী বাবু পাইয়া তাহাকে কিছু খাওয়াইবার জন্য তাহাদের কি আলাদ! অবশেষে তাহাদের খুসী করিবার জন্য এক মুঠো মুড়ী ও ছােলাভাজা লইয়া বর্তমান লেখক খাইলেন। দুই পেনী দিয়া বফিওয়ালাদের দোকান হইতে একটি বফি লইলেন। একটি ইংরাজ যুবক সব একটি ইংরাজ যুবক সব দেখিতেছিল, সে বলিল ভারতবর্ষে যে এরূপ শিল্প কাৰ্য্য হয় ইহা তাহার ধারণা ছিল না। যদি এই সকল কাৰ্য্য এদেশে হইত তা হলে পৃথিবী শুদ্ধ নাম জাহির হইয়া যাইত। পিতলের থালায় পেরেক দিয়া কি সুন্দর ময়ুর তৈয়ারী করিতেছে। কাজকর্ম সব চট্‌পট্ হইতেছে। ময়ুরের লেজটি ঠিক হইয়াছে। সে কাশীর কাপড় বােনা দেখিয়া একেবারে আশ্চৰ্য্য হইল। নানা দেশ থেকে যত লােক আসিয়াছিল সকলেই ভারতবর্ষের সুখ্যাতি করিতে লাগিল। যুবকটিকে বরফি দিলে সে খাইয়া বলিল, It is sweat wax অর্থাৎ কােনে চিনি দিয়া ইহা তৈয়ারী হইয়াছে। সে সেইটা কাগজে মুড়িয়া বন্ধু বান্ধবকে দেখাইবার জন্য লইয়া গেল।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ
এই সময়ে অর্থাৎ এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের প্রথমে আমেরিকা
হইতে জন্ পিয়ার ফক্স নামক একটি যুবক আসিয়া এইখানে রহিলেন।
ফক্স স্বামীজীর অত্যন্ত অনুরক্ত এবং আমেরিকায়
মিঃ লক্সের আগমন
বােষ্টন নগরের কাছে কেমব্রিজ নামে যে গ্রামটা আছে
সেখানে মিস্ ওলীবুলের বাড়ীতে যখন একটি ধর্মসঘ হয় তখন তিনি
সেখানকার সেক্রেটারী ছিলেন। যাহা হউক ফক্স যুবক হইলেও স্বামীজীর
পূর্বপরিচিত বলিয়া সকলেই বিশেষ স্নেহ করিতেন। সারদানন্দ
স্বামীর সহিত তাঁহার বিশেষ হৃদ্যত হইয়াছিল।
স্বামীজী ও সারদানন্দ স্বামী অধ্যাপক মাঝামূলারের সহিত সাক্ষাৎ
করিতে গিয়াছিলেন! কি কথাবার্তা হইয়াছিল তাহা
মাক্স মূল্লারের সহিত
স্বামীজীর সাক্ষাৎ।
কেহ কিছু বলেন নাই। কিন্তু স্বামীজী একটু হর্ষিত
হইলে অধ্যাপকের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করিয়া কথাবার্তা
কহিতেন। স্বামীজী বলিতেন, “ম্যাক্সমুলার ইউরােপের মধ্যে প্রধান
পণ্ডিত, বেশ ইংরাজি জানেন কিন্তু তাহার উচ্চারণ জাৰ্মানদিগের মত ও
খুব ভাল নয়। স্বামীজী মাঝে মাঝে nice man ( নাই ম্যান্) nice
nian করিয়া রহস্য করিতেন।
মিস মূলার কেমব্রিজে অধ্যয়ন কালে ডাঃ ভেনের (Dr. Tane)
নিকট অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। ডাঃ ভেন ন্যায় শাস্ত্রে
ডাঃ ভেনের সহিত
অগাধ পণ্ডিত ছিলেন। তাঁহার পুস্তকখানির নাম
স্বামীজীর কথাবার্তা
লজিক অব চান্স ( Logic of Chance) এই ন্যায়-
শাস্ত্রের জন্য তিনি সমস্ত জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন এবং ইউরােপের
‘ন্যায়ের প্রধান ব্যক্তিদিগের মধ্যে তিনি একজন অন্যতম বলিয়া পরিগণিত
হইতেন। মিস্ মূলার একদিন স্বামীজীকে সঙ্গে লইয়া প্রফেসর ভেনের
সহিত দেখা করিতে গেলেন। প্রফেসরের সহিত স্বামীজীর নানাদেশের

লণ্ডনে বিবেকানন্দ ন্যায়শাস্ত্রের কথা উঠিল। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ন্যায়শাস্ত্রের চর্চা কিরূপভাবে হইয়াছিল সেই সব বিষয় আলােচনা হইতে লাগিল। গ্রীকদিগের, ইউরােপের, বৌদ্ধদিগের এবং হিন্দুদিগের নানা সময়ের নানা ন্যায়শাস্ত্রের কথা উঠিল। প্রফেসর ভেনের ধারণা ছিল বে স্বামীজী ধৰ্ম্মের উপদেশ দেন, দৃশ্য অদৃশ্য বস্তুর যে সব কথা বলেন ওসব বাজে জিনিস। স্বামীজীর মুখে ন্যায় শাস্ত্রের কথা শুনিয়া প্রফেসর দেখিলেন যে বােধ হয় তাহারই মত সমস্ত জীবন এ ব্যক্তি ন্যায়শাস্ত্রে অতিবাহিত করিয়াছেন এবং ভারতবর্ষ হইতে একজন প্রধান নৈয়ায়িক আসিয়া ইউরােপের প্রধান প্রধান নৈয়ায়িকের সহিত দেখা করিয়া গেলেন। স্বামীজীর সহিত কথাবার্তা কহিয়া প্রফেসর অত্যন্ত আনন্দিত হইয়াছিলেন। স্বামীজী কিন্তু ফিরিয়া আসিয়া এ বিষয় কোন কথা বলিলেন না, তাঁহার সঙ্গের একজন আনন্দিত হইয়া সব বলিয়াছিলেন। মিস্ মূলার বুড়ী হইয়াছিলেন এইজন্য সব সময় খিট খিটে থাকিতেন। সারদানন্দ স্বামীর উপর তিনি এতদিন সন্তুষ্ট ছিলেন। একদিন দুপুর বেলা নীচেকার খাবার ঘরে আতসীখানার পার্শ্বে দু’জন দু’খানা চেয়ারে বসিয়াছিলেন। বর্তমান লেখকও দেয়ালের দিকের চেয়ারে বসিয়া আছেন। মিস্ মূলার কথা আরম্ভ করিলেন, “আমি যখন গুজরাটের কাছে লেকচার করিতেছিলাম এনীকে ( অ্যানী বেসেট ) বলিলাম এই এই কর। এইরূপভাবে কার্য্য করিতে হইবে। আমি ভারতবর্ষের অনেক স্থান বেড়াইয়াছি এবং দেখিয়াছি যে বােগা নােগা গরু, রােগা বােগা কুকুর lean cows, lean dogs চারিদিকে, সবাই রােগা। আমরা কিন্তু এমন হতে দিই না। যখন গরু বা ঘােড়া বুড়াে হয় তখন তাহার জীবনটা একটা বােঝ হয়। তখন তাদের বেঁচে থাকবার দরকার কি? তাই আমরা বুড় গরু ঘােড়াকে মেরে ফেলি এবং তার মাংস লােকে লণ্ডনে বিবেকানন্দ খায়। কারণ বুড় হয়ে জীবন ধারণ করবার আবশ্যক কি ? তিনি প্রত্যেক কথায় মাত্রা দিতে ছিলেন যে We English are very kind people ( আমরা ইংরাজেরা বড় দয়ালু) সারদানন্দ স্বামী নীরবে বােকা হাবার মত গল্প শুনিতেছিলেন, শেষটা আর তিনি থাকিতে পারিলেন না। তিনি বলিয়া ফেলিলেন ‘ বাপ মা বুড় বুড়ী হলে জীবন বড় কষ্টদায়ক হয়, কেন তাদের মেরে ফেলেন না ? বৃদ্ধা মিস্ মূলারের মাতা তখনও জীবিত ছিলেন। এই আর কি! মিস্ মূলর অগ্নিশর্মা হইয়া ঘর থেকে উঠে চড়, চড়, করিয়া চলিয়া গেলেন। সারদানন্দ স্বামী ত অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলেন। আবার কে জানে স্বামীজী শুনিলে বিরক্ত হইবেন। সব দিক বিপরীত। ষ্টার্ডি কি মনে করিবে ? পরের বাড়ী থাকা যে কি ঝকমারি তা বেশ বুঝিতে পারিলেন। বর্তমান লেখকের নিকট প্রাণ খুলে অনেক কথা বলিলেন। বর্তমান লেখক বলিলেন, “কি হবে যেমন কথা তেমনি উত্তর ! তা ভয় পাবার দরকার কি ? না হয় চলে যাব।” সারদানন্দ স্বামী সেই শুনিয়া একটু আশ্বস্ত হইলেন এবং পুনরায় বলিতে লাগিলেন-এ দেবীর কি মন্ত্র জান ? ক্ষণে রুষ্ট ক্ষণে তুষ্ট তুষ্ট রুষ্ট ক্ষণে ক্ষণে এই দেবীকে এই মন্ত্রে পূজা করিতে হয়। তাহার পর মিস্ মূলার তিন দিন সারদানন্দ স্বামীর সহিত কথা কহেন নাই। প্রমাণ গ্ৰহণ করিতেন না, কেমন আছ ইত্যাদি কথার কোন উত্তর দিতেন না। স্বামীজী একদিন জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হারে পাগলী বুড়ীর সহিত কি হয়েছে ? বর্তমান লেখক সমস্ত কথা বলিলেন। স্বামীজী বলিলেন, “ও খ্যাতা মাগীর জ্বালায় অস্থির করে তুলেছে। দ্যাখ শরৎ, এ দেশে যে মাগীরা বে করে না সে গুলি বুড়ী হলে দু'রকম হয়। কতকগুলাে মাগী ফেটিয়ে লণ্ডনে বিবেকানন্দ বায় (মােটা হয়) সে গুলাে ঠাণ্ডা ভালমানুষ থাকে। কতকগুলাে মাগী শুটকে যায় সে মাগীরাখি মিটে হয়। খ্যাতা মাগীর জ্বালায় অস্থির করে তুলেছে। ওরে বাপু তােরা বুড়ী মাগীর সঙ্গে খুব সাবধানে চবি । ঘরে ও ঢুকলেই দাঁড়িয়ে উঠবি, কেমন আছেন জিজ্ঞাসা কোৰ্বি, প্যান্টুলুনের পকেটে হাত রাখবি নি, বুকে হাত রাখবি নি। বুড়ী যতক্ষণ দাড়িয়ে থাকে তা বাপু তােরা বােসি নি। যে জিনিস চাইবে তা তাড়াতাড়ি ওকে দিস। কোন রকমে বুড়ীকে সন্তুষ্ট কোৰ্বি। আর পারি নি বাপু, সারাদিন লেচার কৰ্ত্তে হবে, ভিজিটরদের সঙ্গে দেখা কৰ্ত্তে হবে, আবার বুড়ীকে ও সন্তুষ্ট কতে হবে, ইত্যাদি বলিতে লাগিলেন। ৫৭ নং সেন্টজ স্ট্রীটস্থ বাড়ীতে আসিয়া ষ্টার্ডি, মিস্ মূলার এবং অপর, কয়জনে মিলিয়া বক্তৃতার বন্দোবস্ত করিলেন। মঙ্গলবারে বেলা ১১টা হইতে আরম্ভ হইয়া ১টা পর্যন্ত বক্তৃতা হইত। কিন্তু অনেকে স্বামীজীর বক্তৃতা সেই সময় আসিতে পারিতেন না বলিয়া পুনরায় সেই আরম্ভ। বিষয় সন্ধ্যা ৭টার সময় হইতে আরম্ভ হইত। শুক্রবারেও ঠিক এইরূপ ভাবে দুইবার বক্তৃতা হইত। প্রায় মাস খানেকের পর রবিবারে ‘পিকাডেলি’ নামক স্থানে রয়েল ইনষ্টিটিউটের ওয়াটার পেন্টিং গ্যালারীতে বেলা ৪টা হইতে বক্তৃতা হইত। বাড়ীর বক্তৃতার নাম হইল ‘ক্লাস লেচার। ক্লাস লোরে রাজযােগের একটি সূত্র লইয়া কথা আরম্ভ হইত। তাহার পর সেই কথা উপলক্ষ করিয়া প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে যত প্রকার দর্শন শাস্ত্র আছে, এমন কি ইতিহাস, কেমিস্ত্রী, ফিজিকস্ প্রভৃতি তুলিয়া অনর্গল বক্তৃতা দিতেন। বক্তৃতা শেষ হইলে প্রশ্ন আরম্ভ হইত। শ্রোতাদিগের ভিতর লইতে যাহারা প্রশ্ন করিতেন স্বামীজী তাহাদিগকে উত্তর দ্বারা বুঝাইয়া সন্তুষ্ট করিয়া দিতেন। এ সময়টাতে বিশেষ কোন নিয়ম-পদ্ধতি থাকিত না, বেশ সখ্য লণ্ডনে বিবেকানন্দ অারম্ভ। ভাবে কথাবার্তা হইত। কিন্তু এমন দিন ও দেখা গিয়াছে যে ক্লাস লেকচার হইতে প্রশ্নোত্তরই সুন্দর হইয়াছে। কিন্তু এত দুরূহ ও গভীর বিষয় তিনি এত শীঘ্র অনর্গল বলিয়া যাইতেন যে সমগ্র স্মরণ রাখা সম্ভবপর নয়, এমন কি বক্তারও পর মূহুর্তে কিছু স্মরণ থাকিত না। তখনকার লােকের মধ্যে বর্তমান লেখক বতীত আর কেহ জীবিত আছেন বলিয়া জানা নাই। যে দিন স্বামীজী বর্তমান লেখকের জ্বর ভাল করিয়া দিয়াছিলেন সেই দিন তাহার প্রথম ক্লাস লেক্চার আরম্ভ হয়! রাত্রে লেক্চার অবসান হইলে রাত্রি ১১টার সময় স্বামীজী উপরকার ঘরে প্রথম দিনের বক্তৃতা ঢুকিলেন। পরিধানে লাল রঙের হাঁটু পর্যন্ত একটা বকু (পাহাড়ীদের ন্যায় কোট অর্থাৎ অনেক সময় যাহা স্বামীজীর ছবিতে দেখিতে পাওয়া যায়) কোমরে একটা রেশমের কাপড় বা Sash। প্রফুল্ল অবস্থায় স্বামীজী ঘরে ঢুকিয়া দুই একবার পাইচারি করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি রে শরৎ জেগে আছিস্? এই দুপুরের মাতন এখন শেষ হলাে তাই তােদের দেখতে এলুম। আর তাের এখন জ্বর-ট হয় নি ত ? কি খেয়েছিস্? দুধ সাগু খাচ্ছিস্ ত ?' এই বলিয়া সামান্য আর দু একটি কথা কহিয়া তিনি চলিয়া গেলেন। প্রাতে ভােজনের কোন বিশেষ নিয়ম ছিল না। কখনও সকলে এক সঙ্গে বসিয়া খাইতেন আবার কখনও বা আগুপেছুও খাইতেন। লােকও নির্ধারিত ছিল না কারণ গুডউইন ও ষ্টার্ডি ইহারা প্রাতঃকালীন কাৰ্য্য। ইচ্ছামত কখনও একসঙ্গে কখনও বা পৃথক বসিতেন। আহার সমাপনান্তে ষ্টাডি সংস্কৃত নারদসূত্র পুস্তকখানি, কাগজ কলম ও দোয়াত লইয়া বসিতেন আর স্বামীজী সংস্কৃত বইখানি দেখিয়া ইংরাজীতে অনুবাদ করিয়া যাইতেন ও ষ্টার্জি তাহা কাগজে লিখিয়া লইতেন। ইহা হইল প্রাতের নির্দিষ্ট কাৰ্য, তা ছাড়া আবশ্যক মত অন্য কাৰ্যও হইত। ৬৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ এই ইংরাজী নারদসূত্র পুস্তকখানি ষ্টার্ডি মুদ্রিত করিয়াছিলেন। কলের আশ্রমে অদ্যাপি তার একখণ্ড আছে। স্বামীজীর অনুরােধে ষ্টার্জি কতকগুলি সংস্কৃত গ্রন্থ ‘ইণ্ডিয়া অফিসের’ পুস্তকাগার হইতে আনাইলেন। তখন কলিকাতার সি, এইচ, টনি পুস্তকাগারের অধ্যক্ষ ছিলেন। স্বামীজী সংস্কৃত পুস্তকগুলি পাইরা ষ্টার্ডিকে বলিলেন, “দ্যাখ, ভারতবর্ষের কয়েক স্থানে আমি এই বই গুলির অনুসন্ধান করেছিলুম কিন্তু পাই নি। যাহা হউক এখন পাইলাম। স্বামীজী সেই পুস্তকগুলি অল্পদিনের ভিতরে পড়িয়া ফেরৎ দিলেন। এক্ষণে সেই পুস্তকগুলির নাম স্মরণ নাই। আমেরিকাতে স্বামীজী যে সকল বক্তৃতা দিয়াছিলেন গুডউইন ক্ষিপ্ত লিপিতে তাহার অনেক লিখিয়া লইয়াছিলেন—সেইগুলি ছাপাইবার কথাবার্তা হইতে লাগিল। গুডউইন সময় পাইলেই স্বামীজীর আমেরিকার আপনার নােট বই হইতে প্রচলিত অক্ষরে লিখিয়া বক্তৃতা ছাপাইবার ফেলিতেন এবং ছাপাইবার চেষ্টা করিতেন। এ বিষয়ে ষ্টার্ডি প্রধান উদ্যোগী ছিলেন এবং মিস্ মূলার ও অপরে অর্থ সাহায্য করিতে সম্মত হইয়াছিলেন। সিটি অফ লণ্ডনে (সম্ভবতঃ কুইন ভিক্টোরিয়া স্ট্রীটে ) স্যালভেস আর্মিদের একটি বড় কাৰ্য্যাশ্রম ছিল। গুডউইন একদিন বর্তমান লেখককে বলিলেন, “চল, দুজনে ছাপাখানায় যাই। গুডউইন ও বর্তমান লেখক দু’জনায় দুই মাইল দূরে ‘ স্যভেস আর্মিদের’ ছাপাখানায় গেলেন। গুডউইন ঘুরিয়া ঘুরিয়া বর্তমান লেখককে সেই বাটীর সমস্ত অংশ দেখাইতে লাগিলেন। তাহাদের নিজেদের ব্যাঙ্ক, ছাপাখানা, জুতার কারখানা প্রভৃতি অনেক প্রকার কার্যের কারখানা বর্তমান লেখক দেখিলেন। তাহার পর প্রফসিট হাতে লইয়া পুনরায় দু’জনায় বাড়ীর দিকে ফিরিয়া আসিলেন। রাস্তায় কাগজের বগলী করিয়া চেরীফল বিক্রয় হইতেছিল, তখন সবে নূতন উঠিয়াছে। এক পেনি কথা। ར লণ্ডনে বিবেকানন্দ করিয়া প্যাকেট, দু’জনায় দুই প্যাকেট কিনিয়া লইলেন, গুডউইন বলিতে লাগিলেন, “ইংলিশ চেরি সব দেশের চেয়ে ভাল, খাও খাও। আরে খুব ভাল করে খাও। তবে কাগজের বগলীটা পকেটে পুটে, ললাকের সুমুখে দেখিয়ে খেলে অসভ্য ববে। পকেটে হাত দিয়ে একটি কোরে বার কর আর খাও। কাশ্মীরে এই চেরিকে গিত্ আস্ বলে এবং পারস্য দেশেও ঐ শব্দ ব্যবহার হইয়া থাকে। হিমালয়ের স্থানে স্থানে ইহাকে পাহাড়ী কুল বলিয়া একটা নাম করিয়া লইয়াছে। পারস্য দেশের ও কাশ্মীরের চেরিগুলি টোপা কুলের মত—খাইতে একেবারেই ভাল নয়। কিন্তু ইংরাজী চেরী খাইতে খুব সুস্বাদু। তাহার পর উভয়ে বাটীতে ফিরিয়া আসিলেন। ২টার সময় বা ল্যাচের সময় ( lunch) স্বামীজী অধিক দিবসই বাটীতে খাইতেন না। কোন বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত লােক আসিয়া স্বামীজীকে লইয়া যাইতেন এবং তাহার সহিত আহার করিতেন। বেলা ৪টার সময় তথায় চা খাইয়া হয় তাহার সহিত বেড়াইতে বাহির হইতেন নয় ত বাটীতে ফিরিতেন। বেলা সাড়ে চারিটার সময় বর্তমান লেখক ও গুডউইন বাটীতে ফিরিয়া আসিলেন। সারদানন্দ স্বামী ও মিঃ ফক্স বসিয়াছিলেন। বাটীতে একজন বুড়ী ঝি বা হাউস-কিপার ছিল, সে চা লইয়া আসিল। একটা টি পট্‌ করিয়া বা একটি ছােট জ্যাগে করিয়া কাঁচা দুধ, পিচবােডের মত পাতলা পাতলা মাখন দেওয়া পাউরুটী কাটা ও ল্যাম্প সুগার। আর একটা বড় জ্যাগে গরম জল থাকে। যিনি পাতলা চা খান তাঁহাকে গরম জল দেয়। সাধারণতঃ ইংরাজেরা পালা চা খায়, বাঙ্গালীদের মত কড়া চা খায় না। খালাসীরা কড়-চা খায় বলিয়া সেইজন্য তাহাকে ‘সেলার্স টি’ বলিয়া থাকে। গুডউইন কর্তা হইয়া সকলের বাটিতে চা ঢালিয়া দিলেন—সকলেই চা ও রুটি দু’টুকরা করিয়া খাইলেন। ইংরাজদিগের লণ্ডনে বিবেকানন্দ দেশে দুধ গরম করিয়া খায় না, সর্বদা কঁচা থাকে। একবার বর্তমান লেখক গরম দুধ খাইয়াছিলেন। কিন্তু এত লবণ বােধ হইতে লাগিল যে খাইতে কষ্ট হইতে লাগিল। গরুকে ইহারা অতিরিক্ত লবণ খাওয়ায়। ইহারা দুধ কঁচা খায় বলিয়া বাঙ্গালা দেশে যাহাকে দুধের সর বলিয়া থাকে তাহা তথায় নাই। সেইজন্য দুধের সরের কোন ইংরাজী কথাও নাই। চিনি হইতেছে বিটু সুগার অর্থাৎ বিট পালঙ্গের চিনি। এক ইঞ্চি স্কয়ার এবং তিনখানা রাখিলে স্কয়ার হয়। ইহাকে বলে ল্যাম্প সুগার। আর এক রকম লাল দানাওয়ালা ব্রাউন সুগার আছে সেটা খুবই কম ব্যবহৃত হয়। কোন জিনিস হাত দিয়া ধরিবার প্রথা নাই। ল্যাম্প সুগার লইবার প্রথা হইতেছে যে একটি জার্মান সিলভারের বা ঐরূপ কোন সাদা ধাতুর বাহারি চিমটার দুই দিক্কার ডগাতে সরু সরু আঙ্গুলের মত কাঁটা দেওয়া আছে ; চিনির টু সেই কটা দিয়া টিপিয়া ধরিয়া ইচ্ছামত চায়ের বাটিতে দিতে হয়। হাত দিয়া চিনি তুলিয়া লওয়া নিষিদ্ধ। চা পান করিয়া টেবিলের একদিকে বসিয়া গুডউইন তঁাহার প্রফসিটু দেখিতে লাগিলেন। সারদানন্দ স্বামী, ফক্স ও বর্তমান লেখক তিনজনে দেওয়ালের দিকে পিছন করিয়া আমেরিকা ও ভারতবর্ষের নানা কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। স্বামীজী কোথায় বাহির হইয়া গিয়াছিলেন, একেবারে রাত্রির আহারের পর আসিলেন। 'গুডউইনই তখন বাড়ীর মালিক, স্বামীজী না থাকায় তিনি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন কিন্তু স্বামীজী ফিরে আসায় আবার পূর্ববৎ জড়সড় হইয়া রহিলেন। সারদানন্দ স্বামী ফক্সকে অনিমা লঘিমা প্রভৃতি শক্তির কথা বলিতে লাগিলেন। শ্রীচৈতন্যদেবের শরীর যেমন কখন হ্রস্ব বা দীর্ঘ হইয়া যাইত, কখন বা গ্রন্থি সকল যেন শিথিল হইয়া গিয়াছে এইরূপ দেখাইত সেই সকল বিষয় বলিতে লাগিলেন ও ফক্স অবাক হইয়া তাহা শুনিতে লাগিল, লণ্ডনে বিবেকানন্দ মাঝে মাঝে শুধু একবার একবার প্রশ্ন করিল। প্রসঙ্গক্রমে কথা উঠিল যে একবার একটি আমেরিকান স্ত্রীলােক কলিকাতায় আসিয়াছিলেন, দেখিতে কৃশ, খুব সামর্থ্য আছে বলিয়া বােধ হইল না। তিনি কোন এক ধনাঢ্য ব্যক্তির প্রাঙ্গনে এক অলৌকিক কাণ্ড দেখাইয়াছিলেন। প্রাঙ্গনে তিনি ধ্যান করিতে বসিলেন এবং পূর্বেই বলিয়া দিলেন যে তিনি ধ্যানে বসিলে বলিষ্ঠ লােকেরা তাহাকে নড়াইবার চেষ্টা করিলেও নড়াইতে বা তুলিতে পারিবে না। সেই বিষয় পরীক্ষা করিবার জন্য ষণ্ডা ষণ্ডা পালােয়ান তাহাকে তুলিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিতে লাগিল, কিন্তু অকৃতকার্য হইল। প্রথমে একজন, তাহার পর দু’জন তাহার পর তিনজনেও পারিল না। পরে বক্ষে দড়ি বাঁধিয়া টানিতে লাগিল কিন্তু তাহাতেও কিছু সুবিধা করিতে পারিল না। ধ্যান ভঙ্গ হইলে তিনি সাধারণ কৃশ স্ত্রীলােকের ন্যায় পুনরায় উঠিলেন। সারদানন্দ স্বামী ফক্সকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন যে, যােগের অষ্ট সিদ্ধি হইলে এইরূপ শক্তি পাওয়া যায় এবং এ সকল কাৰ্যও সহজে করিতে পারা যায়। মনুষ্য শক্তি পৃথিবীর সহিত এক হইয়া যায়, স্বতন্ত্র থাকে না। সেইজন্য কৃশ স্ত্রীলােকটিকে নড়াইতে পারা যায় নাই। ফক্স এই সব বিভূতির কথা শুনিয়া অবাক হইয়া বসিয়া রহিল। ষ্টার্ডি ও মিস্ মূলার নিরামিষভােজী, সেইজন্য বাড়ীতে মাছ মাংস কিছুই প্রবেশ করিতে দেওয়া হইত না। ফক্স মাংসাহারী সেইজন্য বাহিরে খাইতে চলিয়া গেল। তারপর তিনজনে একত্র বসিয়া আহার করিলেন। গুডউইনের কাজ শেষ হইয়াছে তাই তাঁহার ভারি স্ফুর্তি। টেবিলটা সরাইয়া দিয়া মেঝেতে খানিকটা ফাঁকা জায়গা করিলেন, তাহার পর মেঝেতে নাচিতে সুরু করিলেন। সারদানন্দ স্বামীর সহিত ধ্বস্তাধ্বস্তি ও আপােসে গালমন্দ হইতে লাগিল। তাহার পর গান গাহিতে সুরু লণ্ডনে বিবেকানন্দ করিলেন, “তেরা লেরা বৌন দিলে। বর্তমান লেখক স্পনিশদের বড় বড় টুপি মাথায় দিয়া মাথা দুলাইয়া পা তুলিয়া নাচের কথা বলিলেন। বর্তমান লেখক পাের্ট সৈয়দ বা এই রকম কোন স্থানে উক্ত নাচ দেখিয়া ছিলেন। তুই বুঝি স্পানিশদের ক্যান্ ক্যান্ ডান্স দেখেছি এই বলিয়া গুডউইন পুনরায় বাণডান্স দেখাইলেন, পরে স্প্যানিশদের নাচ, আরম্ভ করিয়া মাঝে মাঝে হাসিতে লাগিলেন ও সারদানন্দ স্বামীর উপর মাঝে মাঝে গাল পাড়িতে লাগিলেন। গুডউইন মাঝে মাঝে নিজে একটা সিগারেট লইতেছেন আর একটা সারদানন্দ স্বামীর মুখে দিয়া বলিতেছেন, “খা খা স্ফুর্তি কর, সারাদিন খাটতে হয় ঘূৰ্ত্তি না কর্মে চবে কি করে।” সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, “দেখ ইংরাজ জাতির কি পরিশ্রম করিবার শক্তি! এই গুডউইন সমস্ত সহর ঘুরেছে, প্রফসিট দেখেচে আবার এখন কি নাচ দেখ ! এত পরিশ্রম না করিলে কি এই . জাতটা উঠেছে।” তাহার পর ফক্স আসিল। সকলে মিলিয়া ষ্টেটএর কথা কহিতে লাগিলেন। ইউনাইটেড স্টেটকেই চলিত কথায় ‘ষ্টেট বলিয়া থাকে। তারপর রাত্রি হইলে সকলে শয়ন করিতে গেলেন।

প্রাতের বক্তৃতা বেলা ১১টার সময় আরম্ভ হইত। কিন্তু আহারাদি সমাপ্ত হওয়ায় স্বামীজী, সারদানন্দ স্বামী, গুডউইন ও ষ্টার্ডি নীচেকার ঘরে বসিয়া রহিলেন। বর্তমান লেখক উপরকার বক্তৃতা ক্লাসের বক্তৃতা ঘরটিতে গিয়া একান্তে বসিয়া রহিলেন। বহুদুর পল্লী ম্যাকলাউড়। ক্রিষ্টাল প্যালেশ বা সাইডেহাম হইতে একটি বৃদ্ধা রমণী আসিয়া বসিলেন। বৃদ্ধার বয়স ৬০ বৎসরের উপর হইবে বলিয়া বােধ হইল—স্থূলকায়, চুলগুলি সাদা। অল্পে অল্প কষ্টে কষ্টে সিড়িতে উঠিয়া তিনি বক্তৃতা ঘরটিতে আসিয়া একখানি চেয়ারে বসিলেন। গ্রীষ্মও বেশ আরম্ভ হইয়াছে কিন্তু শীতকালের মত গায়ে কাপড় থাকায় ঘাম হইতে লাগিল। দ্বিতীয়তঃ তিনি অনেকদূর হইতে আসিয়াছেন, তাই বাতাস খাইবার জন্য একখানি হাতপাখা চাহিলেন-বৰ্তমান লেখক সসম্ভ্রমে একখানি হাত-পাখা দিলেন। তাহার পর দুইজনায় কথাবার্তা হইতে লাগিল। তিনি বলিলেন, “এই স্বামীর কথা আমার বড় ভাল লাগে। আমি যেন বাইবেলের উল্লিখিত ব্যক্তিগণকে দেখিতে পাই। আমি মেয়ে মানুষ ও বৃদ্ধা, সব কথার মানে বুঝিতে পারি না, ও সব পণ্ডিতদের কথা। তবে স্বামী এমন একটি ভাবে বলেন এবং গলার আওয়াজ ও মুখ ভঙ্গি এমন- ভাবে করেন যে দেখতে শুনতে আমার ভাল লাগে। আমি যেন বাইবেলের অনেক ঘটনা চোখে স্পষ্ট দেখুঁতে পাই।” বর্তমান লেখক জিজ্ঞাসা করিলেন “আপনি কোন খান থেকে আসেন ?” বৃদ্ধা বলিলেন, “আমি সাইডেনহাম ক্রিষ্টাল প্যালেশ থেকে আসি। তা অত গাড়ী ভাড়া কোথা লগুনে বিবেকানন্দ থেকে পাব তাই খানিক হেঁটে ও খানিক গাড়ীতে আসি কিন্তু প্রত্যেক লেচারের দিন আমি আসিয়া থাকি।” এইরূপ কথাবার্তা হইতেছে এমন সময় ভাল কাপড় চোপড় পরা একটি ৩৫ বৎসর বয়সের স্ত্রীলােক ভিতরে আসিয়া একখানি চেয়ারে বসিলেন এবং সস্নেহে বর্তমান লেখকের সহিত কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। তিনি নিজেই পরিচয় দিলেন যে তাহার নাম মিস্ জোসেফাইন ম্যাক্লাউড, আমেরিকায় বাড়ী, তিনি স্বামীজীর নিতান্ত অনুগত। নামটি পূৰ্ব্ব হইতে জানা ছিল সেজন্য বর্তমান লেখক অতি আনন্দিত হইয়া বিশেষ সম্মানের সহিত কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। মিস্ ম্যালাউড তখন বসিয়া স্বামীজীর বিষয় কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন এবং তাহার কথাবার্তার প্রত্যেকটির ভিতরই স্বামীজীর প্রতি একটা প্রগাঢ় অনুরাগ, শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশ পাইতে লাগিল। স্বামীজীর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তি তাহার প্রত্যেক কথাবার্তায় বা অঙ্গ চালনায় প্রকাশ পাইতে লাগিল। কথাবার্তা চলিতেছে এমন সময় শ্রোতৃবৃন্দ আসিতে লাগিলেন এবং দুই তিন মিনিটের ভিতর ঘর ভরিয়া গেল। সারদানন্দ স্বামী ও গুডউইনকে সঙ্গে লইয়া স্বামীজী ঘরে প্রবেশ করিলেন। গুড়উইন তাহার নিজের স্থানে খাতা-পত্তর লইয়া বসিলেন। ঘরের ভিতর ভিড় বেশী হওয়ায় সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক সিড়িতে উঠিয়া চাতালে দুইখানি চেয়ার লইয়া বসিলেন। ষ্টাডি ভিতরকার ঘরে কোণের দিকের শােফার উপর বসিলেন। এই সব বক্তৃতায় ষ্টার্ডি সভাপতি ছিলেন এইজন্য তিনি ভিতরকার শােফায় বসিতেন, অবশ্য স্বামীজীর স্থান হইতে অনেক দূরে। শ্রোতৃবর্গ ক্রমশঃ বাড়িতে লাগিল এবং চাতালও ভরিয়া গেল। সারদানন্দ স্বামী, ফক্স ও বর্তমান লেখক তেতলায় উঠিবার সিড়ির প্রথম ধাপে বসিলেন। নূতন লােক আসিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তিনজনে ৭১ লণ্ডনে বিবেকানন্দ ক্রমশঃ উপর উপর ধাপে উঠিতে উঠিতে শেষে তেতলার চাতালে গিয়া বসিলেন। যে যতটুকু শুনিতে পায় ততটুকুই ভাল। কিন্তু সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক তেতলার চাতালের (landing place) নিকট বসায় ঘরের ভিতরের সমস্ত কথা শুনিতে পাইতেছিলেন। এই সময় একটি স্ত্রীলােক আসিতেন। তিনি হাসপাতালের নার্স ছিলেন অর্থাৎ পােষাকের উপর সাদা একটি ‘এপ্রােন (Apron) ও মাথায় একটি কেঁকান ফুলকরা কাপড়ের টুপি ছিল। লণ্ডন সহরে এইরূপ পরিচ্ছদ হাসপাতালের নার্সদিগের হইয়া থাকে সেইজন্য তাহাকে হাসপাতালের নার্স বলিয়া জ্ঞান হইয়াছিল। স্ত্রীলােকটির বয়স আন্দাজ ৩০/৩২ বৎসর হইবে। অবয়ব কৃশ। তিনি চাতাল বা চাতালে ঢুকিবার দরজার ঠিক নিকটে বসিয়া নিবিষ্ট মনে ক্ষিপ্র-লিপিতে সমস্ত বক্তৃতাটি লিখিয়া লইতেন। কোনদিকে চাহিতেন না বা কাহারও সহিত কোন কথাবার্তা কহিতেন না। নিজের মনে একপ্রাণে লিখিয়া যাইতেন এবং বক্তৃতা শেষ হইলে তিনিও ত্বরিতপদে চলিয়া যাইতেন। দুপুরবেলার প্রত্যেক বক্তৃতাটিতে তিনি আসিতেন এবং লিখিয়া লইতেন। কিন্তু তিনি কাহারও সহিত আলাপ পরিচয় কখনও করেন নাই। প্রায় ১টার সময় বক্তৃতা সমাপ্ত হইল। উপস্থিত ব্যক্তিদের ভিতর অনেকেই স্বামীজীর সহিত একটু আধটু কথা কহিয়া চলিয়া গেলেন। মিস্ জোসেফাইন ম্যালাউডের সহিত আর একটি রমণী ঘর হইতে বাহির হইয়া নামিতে লাগিলেন ও স্বামীজীর সহিত যেন বিশেষ পরিচিত এইভাবে কথা কহিতে লাগিলেন। তাঁহার বেশভূষা অন্যান্য স্ত্রীলােকদিগের চেয়ে বিশেষ দামী। ইটের-রঙের গরদের পােষাক এবং মিস্ ম্যালাউডের চাইতে তার বয়স একটু বেশী। উভয়ে একখানা হাস্যম্ গাড়ী করিয়া চলিয়া গেলেন। পরে শুনা গেল যে তাহার নাম মিসেস লেগেট এবং १२ লণ্ডনে বিবেকানন্দ তিনি মিস্ ম্যাক্লাউডের জ্যেষ্ঠা ভগ্নী। বক্তৃতার পর প্রায়ই কেউ না কেউ নিমন্ত্রণ করিয়া স্বামীজীকে সঙ্গে লইয়া গিয়া খাওয়াইতেন। স্বামীজীও সেদিন কাহার সহিত আহার করিতে চলিয়া গেলেন। বক্তৃতা-ঘরে স্ত্রীলােকদিগের সংখ্যা বেশী হইয়াছিল ; পুরুষের সংখ্যা কম, কারণ দিনের বেলা পুরুষেরা কাজে ব্যস্ত থাকেন সেইজন্য আসিতে পারেন না, রাত্রের বক্তৃতার সময় তাঁহারা উপস্থিত হইতেন। তবুও দিনের বেলা পুরুষের সংখ্যা বড় কম থাকিত না। লণ্ডনে “স্বামীজী” কথাটা গুউইন বা অপর কেহ ব্যবহার করিত না। সম্মান অর্থে যে ‘জী” ব্যবহার করিতে হয় তা তাহারা জানি না। তাহারা “স্বামী” এই শব্দ ব্যবহার করিত। রাত্রি সাতটার সময় সেই বক্তৃতা পুনরায় হইত। অনেক ভদ্রলােক তখন উপস্থিত থাকিতেন। লণ্ডনের একজন বড় পাদ্রী ( cannon ) সপরিবারে রাত্রের বক্তৃতার সময় উপস্থিত থাকিতেন। তিনি স্বামীজীর প্রতি বিশেষ অনুরাগ ও শ্রদ্ধাভক্তি দেখাইতেন। রাত্রের বক্তৃতার পর স্বামীজী কখনও বা ষ্টার্ডিকে কখনও বা গুডউইনকে লইয়া খানিকক্ষণ রাস্তায় বেড়াইয়া আসিতেন। কারণ অনবরত কথাবার্তা কহিয়া শরীরটা ক্লান্ত হইয়া পড়িত সেইজন্য অনেকক্ষণ পায়চারি করিয়া আসিলে রাত্রে ঘুম হইত। মিস্ জোসেফাইন ম্যাকুলাউড আসা অবধি বেলা একটার সময় প্রত্যহ “উইলিয়ম হােয়াইটলির দোকান হইতে একজন স্ত্রীলােক আসিয়া কাগজে মােড়া অনেক ফল দিয়া যাইত। বাজারে ফল উঠিবার প্রায় তিন সপ্তাহ পূর্বে টাটকা ফলগুলি পৌছিয়া দিয়া যাইত। আনারস ফল লণ্ডনে দুপ্রাপ্য এবং তাহার উপর দাম প্রায় এক গিনি। মাঝে মাঝে সেই লােকটী আনারস ফলও দিয়া যাইত। যখনকার যে ফলটি প্রথম পাওয়া লণ্ডনে বিবেকানন্দ যাইত যতই তাহার দাম বেশী হউক না কেন, সেই লােকটি তাহা দিয়া যাইত। নানা রকম ভাল ভাল ফল প্রত্যহ এগারটার সময় আসিত। কিন্তু কে দোকানে টাকা জমা দিয়াছে এবং কাহার আদেশ মত ফল আসিতেছে তাহা কেহ জানিত না। অনুমান অনেকে করিলেও কেহ জিজ্ঞাসা করিত না কারণ যিনি দিতেছেন তিনি যখন তাহার নাম জানাইতে ইচ্ছুক নন তখন সেই কথার পুনরুত্থান হইত না। স্বামীজী পূর্বরাত্রে কোথায় নিমন্ত্রণে গিয়াছিলেন, আসিতে রাত্রি হইয়াছিল। বক্তৃতার দিন নয় সেইজন্য তিনি একটু বেলা পর্যন্ত বিছানায় স্বামীজীর হাস্য ছিলেন। সকলের প্রাতঃভােজন সমাপ্ত হইলে স্বামীজী রসিকতা। ড্রেসিং গাউন্ বা কোমরে দড়ি-বাঁধা লম্বা বনাতের জামা পরিয়া পায়ে পাতলা কাল চামড়ার জুতা পরিয়া একা খাইতে বসিলেন। ষ্টার্ডি, গুডউইন, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক দেওয়ালের নিকট চেয়ারে বসিয়াছিলেন। গুডউইন গোঁফ কামাইতেন। প্রায় দু’সপ্তাহ গোঁফ কামান নাই তাই একটু একটু গোঁফ উঠিয়াছে। গুডউইন গোঁফে হাত বুলাইতে বুলাইতে আহলাদ করিয়া বলিলেন, “A painter will give me ten pounds to make this a model” অর্থাৎ চিত্রকরেরা আমার গোঁফ জোড়াকে মডেল বা আদর্শ করিবার জন্য ১০ পাউণ্ড আমায় দিবে। স্বামীজী কৌতুকভাবে গুড়উইনের দিকে খানিকক্ষণ চাহিয়া চট্‌ করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “yes, it would be a pair of very nice broom” অর্থাৎ হঁা, একজোড়া বঁটার বেশ নমুনা হইতে পারে। সেই কথা শুনিয়া সকলে হাসিতে লাগিল ও গুডউইন অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলেন। ষ্টার্ডি খুব প্রফুল্ল, কারণ ক্লা-লেকচার বেশ জমিয়া আসিয়াছে এবং রবিবারের বক্তৃতার চেষ্টা হইতেছে। ষ্টার্ডি বসিয়া দু'হাত দিয়া চেয়ারখানি বাজাইতে লাগিল এবং মুখে সঙ্গীতের আওয়াজ ৭৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ করিতে লাগিল। “ক্যান্টনমেন্টের ঢাকের আওয়াজ অনবরত ঠিক এইভাবে বাজে” এই বলিয়া সে হাতে চেয়ারে টোকা মারিয়া বাজনা বাজাইতে লাগিল ও সুরের নকল করিতে লাগিল। তাহার পর সে বলিল, “আমি যখন স্কুলে পড়িতাম সেই সময় একটি মাষ্টার একটি ছেলের হাতে বেত মারিয়াছিল। বালকটি এত তেজী ও নির্ভীক ছিল যে সে হাত সরাইল না এবং শিক্ষককে পুনঃ পুনঃ বলিতে লাগিল, আরও মারুন আরও মারুন। ছাত্রটির হাত দিয়া রক্ত পড়িল কিন্তু সে স্থির হইয়া রহিল। অবশেষে শিক্ষক লজ্জিত হইয়া স্থির হইলেন। সেই পৰ্য্যক্ত I become awfully angry when I see a man beating a boy অর্থাৎ একটি লােক যদি ছােট ছেলেকে মারে তা হলে আমার ভারি রাগ হয়। এই বলিয়া ষ্টার্ডি ক্ষান্ত রহিলেন। গুডউইন প্রফুল্ল, কিছু বলিতে, হইবে কিন্তু কি বলিবেন তা মাথায় ছিল না। তিনি বলিয়া উঠিলেন, “Yes, Mr. Sturdy, I too become awfully angry when I see a man beating a lonkey!” অর্থাৎ যখন কোন মানুষ গাধাটাকে মারে, তখন আমিও ভয়ানক রাগিয়া যাই। গুডউইন যেমন এই কথা বলিয়াছে স্বামীজী ব্যঙ্গচ্ছলে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়াছিলেন অমনি বলিলেন, “Yes because it rouses your fellow feelings' spetto a casa গাধাকে মারিলে তাের স্বশ্রেণীর প্রেম উথলে উঠে তাইতে তাের এত রাগ হয়। সেই শুনিয়া সকলে হােঃ হােঃ করিয়া হাসিয়া উঠিল এবং গুডউইনও অপ্রতিভ হইয়া পালাইবার চেষ্টা করিলেন। বেলা ১১টার সময় গুডউইন সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখককে সঙ্গে লইয়া সহর দেখিতে বাহির হইলেন। চেরিংসে ‘কিগে পল Kegen Paul পুস্তকের দোকানে যাইবার কথাবার্তা হইল। কারণ লণ্ডনে স্বামীজীর প্রথম ছাপা বইগুলি কিগে-প বাহির করিয়াছিল। বইগুলি লণ্ডনে বিবেকানন্দ যেমন ছাপা তেমনি বাধান। কলিকাতার বটতলাও তাহার চাইতে নীচে যায় না। যাহা হউক সেটী প্রথম ছাপা হইয়াছিল এবং সেই পুস্তক অবশ্য কেহ পড়িতে ইচ্ছা করিত না। একটু খানি চটি বই। কিগে-পলের দোকান হইতে গুডউইন নানাস্থল ঘুরিয়া সেন্ট জেম্স্ প্যালেসের (পুরান রাজ বাড়ী) দোর দিয়া আসিতে লাগিলেন। তিনজনেই একসঙ্গে চলিয়া যাইতেছিলেন কিন্তু চলিবার সময় ইংরাজদিগের যে কি আচার-পদ্ধতি আছে তাহা বিশেষ তাহাদের জানা শুনা ছিল না। গুডউইন উভয়ের পদবিক্ষেপের প্রতি চাহিয়া বলিয়া উঠিলেন, “Oh Swami, I cannot keep pace with you” অর্থাৎ আমি আপনাদিগের সহিত সমানভাবে পা ফেলতে পারিতেছি না। ইংরাজদিগের চলিবার সময় সকলের পাদবিক্ষেপ সমান থাকে, আগু পেছু হয় না কারণ তাহা বড় অসভ্যতার পরিচয়। কিন্তু ভারতবর্ষীয়দের চলিবার সময় পদ-বিক্ষেপ সমান ভাবে পড়ে না। সেইজন্য গুডউইন ঐ কথা বলিয়াছিলেন। দরজায় ‘গ্ৰীনেডীয়ার’ গার্ড অর্থাৎ যাহাদের মাথায় ভালুকের মত চামড়ার টুপি থাকে তাহারা পাহারা দিতেছিল। হঠাৎ সিপাইয়ের সম্মুখে পড়াতে সারদানন্দ স্বামী একটু ত্রস্ত হইয়া কয়েক পদ হটিয়া আসিলেন। সেই দেখিয়া গুডউইন হাস্য কৌতুক করিয়া বলিলেন, “Oh devil, you are seared to death”অর্থাৎ একটা সিপাই দেখে যে ভয়ে মরে যাচ্ছিলে। তাহার পর হাইড় পার্ক ও অপর অপর স্থান দেখাইয়া বলিতে লাগিলেন, “This is our national property অর্থাৎ আমাদের জাতের এই সম্পত্তি। চেরিং ক্রসে ‘ নেসকোলাম’ দেখাইয়া বলিতে লাগিলেন,This is our national column.' গুডউইনের মুখে অনবরত এই national (জাতীয়) কথাটি এমন শুনাইতে লাগিল যে সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক উভয়ে পরস্পরের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। গুডউইন যেন বুক ফুলাইয়া কথা বলিতে লাগিলেন এবং তাহার লণ্ডনে বিবেকানন্দ মুখে শােভা পাইতে লাগিল। আর সঙ্গী দুজনায় জাতিভাই, তাই উভয়ে মাথা হেঁট করিয়া রহিলেন ও প্রাণে প্রাণে প্রভেদটা খুব বুঝিতে পারিলেন। তাহার পর তিনজনে বাড়ী ফিরিলেন, ফক্স পূৰ্ব্ব হইতেই আসিয়া বসিয়াছিল। স্বামীজী উপরকার ঘরে কোন অভ্যাগতের সহিত কথা কহিতেছিলেন সেখানে তখন যাওয়া নিষিদ্ধ। তিনি পূর্বেই আহার করিয়া লইয়াছিলেন। দুটী ভাত এবং ওলন্দা-কড়ায়ের মটর ডাল হইয়াছিল। ডালেতে একটু কারি-পাউডার ও নূন দিয়া সিদ্ধ করিয়া একটু মাখন দেওয়া হইয়াছিল। যাহা হউক ডাল, ভাত, একটু একটু কটী ও আলুর তরকারী লইয়া খাইতে বসিলেন—গুডউইনের মটর-ডাল খাইয়া মহা আহলাদ। মটর- ডালে একটু ঘি পড়েছিল তাহাতে দু’ চামচ ভাত দিয়া মুখে খুব ভাল লেগেছিল । গুডউইন আহলাদ করিয়া বলিতে লাগিলেন, ‘আমি এ রকম জিনিস খাইয়া সারা জীবন থাকতে পারি, আহা কি সুন্দর জিনিস? সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক একটু মিকি মিকি হাসিতে লাগিলেন কারণ—হায় রে কপাল ! এখানেও মটর, ডাল সিদ্ধ ? আহারান্তে সকলে বসিয়া আছেন এমন সময় মিস্ জস নামে একটি স্ত্রীলােক আসিলেন। উপরকার ঘরে স্বামীজী কাহার সহিত কথা কহিতে ছিলেন সেইজন্য তিনি নীচে বসিয়া রহিলেন এবং সারদানন্দ স্বামী বর্তমান লেখকের সহিত কথা কহিতে লাগিলেন। স্ত্রীলােকটির বয়স ৪২/৪৩ বৎসর হইবে। দেখিতে কৃশ ও খর্বাকৃতি। তিনি জাতিতে ইংরাজ হইলেও মস্কোতে জন্মাইয়াছিলেন ও তথায় পরিবর্ধিত হইয়াছেন। বিবাহ করেন নাই ও নিজের চলিবার মত সঙ্গতি আছে। তিনি ব্যগ্র, উৎসুক ও ভক্তিপূর্ণ ভাবে বলিতে লাগিলেন যে, একদিন তিনি মস্কোতে রাত্রে নিদ্রা যাইতেছেন এবং স্বপ্ন দেখিলেন যে একটি জ্যোতির্ময় পুরুষ ৭৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ আসিয়া বলিলেন, ‘চলে এস। তিনি দ্বিধা বা আপত্তি না করিয়া সেই জ্যোতির্ময় লােকটির সহিত চলিতে লাগিলেন। অনেক দূর চলিয়া মাঠ পার হইয়া সমুদ্রের তীরে উপস্থিত হইলেন। ঘাের অন্ধকার রাত্রি কিন্তু সম্মুখে একটি কাঠের জাহাজ হাতে অনুভব করিলেন। সেই অন্ধকার হইতে আওয়াজ আসিল, ‘এই জাহাজে উঠ। তিনিও সেইমত জাহাজে উঠিলেন। জাহাজ ছাড়িয়া দিল, পালে বাতাস লাগিল-জাহাজ নক্ষত্র- বেগে ছুটিল। চারিদিকে মহাসমুদ্র, কিছুতেই দিক নির্ণয় হইতেছে না। রাত্রি ঘাের অন্ধকার, নক্ষত্রও দেখিতে পাওয়া গেল না। ক্রমে প্রাণে শঙ্কা আসিল এবং শঙ্কা ক্ৰমে বিভীষিকায় পরিণত হইল। চারিদিক অন্ধকার, জাহাজের নায়ক কে, কয়জন আরােহী কিছুই বুঝিতে পারিলাম । এইরূপ ভাবে কিছুক্ষণ থাকিয়া দেখিলাম যে জাহাজের মাস্তুল হইতে ভগা (prow) পৰ্যন্ত দড়ি লাগান, তাহাতে একটি লণ্ঠন রহিয়াছে। হঠাৎ যেন আলােটা আসিল, আলােটা ক্ষুদ্র হইলেও প্রাণে একটু আশা হইল। দেখিলাম যে আলাের নিকট একজন লােক দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন, তিনি জাহাজের কাপ্তেন বা অন্য কর্মচারী হয় তাে হইবেন, যাহা হউক তাঁহাকে স্পষ্ট দেখিলাম। তাঁহার চেহারার ফটো স্পষ্ট আমার প্রাণে উঠিল। লােকটি আমার দিকে চাহিয়া আমায় ভীত দেখিয়া বলিলেন, ‘ভয় নাই অন্ধকার হইলেও জাহাজ ঠিক স্থানে গিয়া পৌছিবে, তােমার কোন ভয় নাই। হঠাৎ আমার স্বপ্ন তিরােহিত হইল, আমার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। জাহাজে যে লােকটিকে দেখিলাম তিনি যে কোন্ দেশের লােক হা ঠিক করিতে পারিলাম না। স্বপ্ন আমার প্রাণে এত লাগিয়াছিল যে কষিয়াতে আমি অনেক স্থান দেখিয়াছি কিন্তু সেই মুখ আর দেখিতে পাই নাই। কয়েক বৎসর আমি লণ্ডনে বাস করিতেছি এবং স্থির করিলাম যে আমার মাথার গােল হইয়াছে সেইজন্য এরূপ স্বপ্ন ৭৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ দেখিলাম। কয়েক সপ্তাহ পূৰ্ব্বে লােকপরম্পরায় শুনিলাম যে, একজন হিন্দুধর্ম বিষয়ে বেশ বক্তৃতা করিতেছেন। আমার স্বপ্ন মিথ্যা হইবে জানিয়া বক্তৃতা আরম্ভ হইবার পূর্বেই আসিয়া বসিলাম। খানিকক্ষণ পরে বক্তৃতা আরম্ভ হইল, আমি কথাবার্তা কিছু বুঝিলাম না—স্থির বা অর্ধ নিদ্রিত হইলাম। পূৰ্বস্মৃতি স্পষ্ট আমার মনে আসিল। জাহাজে যে মুখ, যে বর্ণ দেখিয়াছিলাম সেই মুখই এক্ষণে ঠিক দেখিলাম। আর যে কণ্ঠস্বর আমাকে আশ্বাস দিয়াছিল স্বামীজীরও সেই কণ্ঠস্বর শুনিলাম। আমার মনে যে সন্দেহ ও যন্ত্রণা ছিল তাহা আমি বলি নাই কিন্তু স্বামীজী বক্তৃতাকালে ঠিক সেই প্রশ্ন তুলিয়া তাহার উত্তর দিলেন। আমার মনে হইল যেন আমাকে মনে করেই তিনি উক্ত কথা বলিলেন। আমি মেয়ে মানুষ, স্বামীজীর সঙ্গে কথা কহিতে ভয় করে—কিছুই বলিতে পারি নাই। তা যদি এক্ষণে সময় হয় ত একবার যাব, জানিনে কি বলিবেন। মিস্ জন্ এই কথা বলিতে বলিতে অভিভূত হইয়া পড়িলেন। বুকে হাত জোড় করিয়া রহিলেন ও চক্ষে জল আসিল এবং কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হইতে লাগিল, তাহার ভাবভঙ্গী দেখিয়া মনে হইল যে তিনি কোন অলীক কথা কহিতেছেন না। তিনি অতি ভক্তিপূর্ণ ও নিষ্ঠাভাবে কথাগুলি বলিয়াছিলেন বলিয়া আমরা সকলে তাহার কথা বিশ্বাস করিয়াছিলাম এবং পরে আমরা সেই বিষয় লইয়া চৰ্চা করিতে লাগিলাম। মিস্ জন্ উপরে চলিয়া গেলে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বৎসরের একজন স্ত্রীলােক একটি কুকুর সঙ্গে লইয়া আসিলেন। কুকুরটির গলায় চামড়ার বিনাননা দড়ি (leash) ছিল। মহিলাটি বেশ গিন্নি-বান্নি ও ভাল কাপড়-চোপড় পরিয়াছিলেন। বৈঠকখানা-ঘরে ঢুকিয়া আলমারির হাতলে কুকুরটিকে বাঁধিয়া রাখিলেন এবং কাহারও অনুমতি না লইয়া উপরে উঠিতে লাগিলেন। কেবল জিজ্ঞাসা করিলেন, “স্বামীজী কোথা আছেন ?” সারদানন্দ স্বামী লণ্ডনে বিবেকানন্দ বলিলেন, “উপরে।” এই কথা শুনিয়া তিনি গম্ভীরভাবে উপরে উঠিতে লাগিলেন। কুকুরটি হাঁপাইতে হাঁপাইতে এদিক ওদিক্‌ করিতে লাগিল। পাছে কুকুর গাচে নষ্ট করে সেই জন্য বর্তমান লেখক কুকুরটাকে প্যাসেজ বা গলিতে বাঁধিতে যাইতেছিলেন সেই দেখিয়া সারদানন্দ স্বামী বর্তমান লেখককে বলিলেন,-“ ওহে ও কাজ করােনা, ও এক জেনারেলের পরিবার, ওরা স্ত্রী-পুরুষে স্বামীজীকে বিশেষ শ্রদ্ধা ভক্তি করে। কাজ নাই বাপু কে বকুনি খাবে । ও যেখানকার কুকুর সেখানে থা।” রাত্রে আহারের পর স্বামীজী ও ষ্টার্ডি পায়চারি করিতে লাগিলেন, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক পশ্চাতে পশ্চাতে চলিলেন। স্বামীজী ষ্টার্ডিকে গুডউইনের সহিত কিরূপে আলাপ হইয়াছিল সেই কথা বলিতে আরম্ভ করিলেন। স্বামীজী বলিলেন,-“আমেরিকার প্রথম এমনি এমনি বক্তৃতা দিতুম, কেই বা লেখে আর কেই বা খবর রাখে! অবশেষে সকলে জিদ করিল যে এমন সব সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এগুলি লিখে রাখা ভাল এজন্য সংবাদপত্রে এক দ্রুত-লিপি-লেখকের প্রয়ােজন বলিয়া তাহারা বিজ্ঞাপন দিলেন। অনেক কর্মপ্রার্থী আসিল, তাহারা সকলেই আমেরিকান দেখলুম। এক ছোড়া ইংরেজ আমেরিকায় গিয়ে চিকাগাের প্রদর্শনী দেখে সংবাদ দেয় ও চিকাগোের বক্তৃতা নিয়ে খবরের কাগজে দিয়ে দিন চালায়। সেও কৰ্ম্মপ্রার্থী হইয়া আসিল এবং তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য লওয়া হইল। প্রথম প্রথম সে বৃত্তিভােগী হইয়া আসিয়াছিল। অন্যত্র থাকিত ও খাইত, সপ্তাহখানেক পরে সে আমার বড় অনুগত হইল এবং বলিল যে আমি আর কিছু লইব না, আপনার সব কাজ করিব। সেই থেকে গুডউইন আমার সঙ্গে রয়েছে। ও আমার ঢের কাজ করে, ও না থাকলে আমার বড় অসুবিধা হয়। স্বামীজী লণ্ডনে বিবেকানন্দ s এইরূপে গুডউইনের সুখ্যাতি করিতে থাকিলে ষ্টার্ভি গম্ভীর হইয়া গেল দেখিয়া স্বামীজী কথা ঘুরাইয়া লইলেন। তাহার পর Conjugal right বা স্ত্রীর কতক্ষণ পর্যন্ত স্বামীর উপর ভরণ-পােষণের অধিকার থাকে সেই সব কথা উঠিল। ষ্টার্ডি বলিল,- “ইংরাজী আইন মতে যদি পরস্পর ফারখৎ না হয় তা হলে স্ত্রীর যাবজ্জীবন অধিকার থাকে। স্বামীজী বলিলেন,—“হিন্দুধর্মে কিন্তু পার্থক্য আছে। স্বামী যতদিন পর্যন্ত উপার্জন করিবে ততদিন পর্যন্ত স্ত্রীর অধিকার আছে কিন্তু স্বামী যদি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন তা হলে স্বামীর উপর স্ত্রীর আর কোন অধিকার থাকে না” এই বলিয়া স্বামীজী সংস্কৃত গ্রন্থ হইতে শ্লোক উদ্ধৃত করিতে লাগিলেন স্বামীজী মাথার সিথে সম্মুখদিকের মাঝখানে কাটিতেন। বৰ্ত্তমান লেখক মাথার বাঁ-দিকে সিপে কাটিতেন। স্বামীজী সেদিন হঠাং বা-দিকে সিথি কাটিলেন। পরদিন প্রাতে টেবিলে খাইতে স্বামীজীর প্রতিঃকালীন বসিয়া পরস্পরের মাথায় দৃষ্টি হওয়ায় স্বামীজী আহারাদি হাসিলেন কারণ সেদিন তিনি অন্য প্রকারে চুল আঁচড়াইয়াছিলেন। আহারের পর ষ্টার্ভির ‘নারদ সূত্র’ কিয়ৎ পরিমাণে অনুবাদ করা হইল। ষ্টাডি চলিয়া গেলে স্বামীজী আপনার ঘর হইতে বক্তৃতার পরিচ্ছদ অর্থাৎ লাল রঙের জামাটা ও রেশমের কোমরবন্ধ পরিরা আসিলেন। রবিবারেও বক্তৃতার বন্দোবস্ত হইয়াছে, ক্লাস্ লেক্চার বেশ জমিয়াছে, লােকজনও খুব আসিতে সুরু করিয়াছে, তাই স্বামীজী বেশ প্রফুল্ল। সকালের বক্তৃতা আরম্ভ হইতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় বাকী আছে। বেলা দশটা হইয়াছে, রাস্তায় অনেক লােকজন আগা-গােনা করিতেছে। ডাইনিং-ঘরের রাস্তার দিকের জানালার সমস্তটা একখানা বড় কঁচ দিয়ে ঢাকা ছিল। রাস্তার লোকজন সব দেখা যাইতে- s লণ্ডনে বিবেকানন্দ । ছিল। সেই দিকে চাহিয়া স্বামীজী একটি কৌতুকপূর্ণ গান রচনা করিলেন :- “ছাতি হাতে টুপি মাথায় আছে যত চুড়ী, মুখে মেখেছে তারা ময়দা ঝুড়ি ঝুড়ি।” গানটি এমন বিদ্রুপ ও রহস্যের সহিত সুর করিলেন যে বর্তমান লেখক হাসিতে হাসিতে দরজার সম্মুখে প্যাসেজে বাহির হইয়া আসিয়া মুখে রুমাল দিয়া হাসিতে লাগিলেন। স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীকে বলিলেন, “দ্যাথ, মুখে মাগীরা পাউডার মেখেছে যেন কোদাল দিয়ে চাচা যায়। বর্তমান লেখক পুনরায় ঘরে প্রবেশ করিলেন এবং স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীর সহিত হাসি ঠাট্টা করিয়া কথা কহিতে লাগিলেন। স্বামীজী ঘড়ি খুলিয়া দেখিলেন যে বক্তৃতার আর চার পাঁচ মিনিট সময় বাকী আছে। স্বামীজী ও সারদানন্দ স্বামী কৌতুক করিতে করিতে ঘর হইতে বাহির হইয়া সিড়ির ধাপের দিকে চলিলেন। বর্তমান লেখকও পেছনে চলিলেন । তখনও দু’জনে অল্প-বয়স্ক ক্রীড়াপ্রিয় বালকের ন্যায় পরস্পর পরস্পরকে কনুয়ের গুতা মারিতেছিলেন ও হাসি তামাসা হইতেছিল। ক্রমেই যখন স্বামীজী এক এক সিড়ি উঠিতে লাগিলেন তখন তাঁহার মুখের ভাব, চক্ষুর জ্যোতিঃ ও গলার আওয়াজ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইতে লাগিল। স্বতন্ত্র ব্যক্তি-মহাপ্রতাপশালী সিংহবিক্রমী আর এক ব্যক্তি সহসা আবিভূত হইলেন। সারদানন্দ স্বামী সহসা স্বামীজীর মুখের দিকে চাহিয়া একেবারে ত্রস্ত ও বিহ্বল হইয়া পড়িলেন। সেই পুরাতন পরিচিত ব্যক্তি এক্ষণে আর নাই— স্বতন্ত্র আর এক ব্যক্তি, কাহার সহিত তিনি চপলতা করিতেছিলেন। সারদানন স্বামী চার পাঁচ পইটে উঠিয়া স্থির হইয়া কাঠের পুতুলের ন্যায় দাড়াইয়া রহিলেন। স্বামীজী গম্ভীরভাবে পদ বিক্ষেপ করিয়া একলাই ৮২ লণ্ডনে বিবেকানন্দ উঠিতে লাগিলেন। স্বামীজী উপরে উঠিয়া গেলে সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক ধীরে ধীরে উঠিতে লাগিলেন এবং উভয়ে ভাবিতে লাগিলেন, ‘এ যে পূর্ব দেহের ভিতর এক নূতন জিনিস দেখিলাম!” উপরকার লেকচার-হলে অনেক লােক বসিয়াছেন এবং তখনও অনেক লােক আসিতেছিলেন। স্বামীজী যাইয়া নিজের স্থানে দাঁড়াইলেন। গুডউইনও নিজের টেবিলের ধারে কাগজ পত্র লইয়া স্থির হইয়া রহিলেন। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক তে-তলার ধাপেতে একটু একটু করিয়া উঠিতে লাগিলেন। ফক্স, নীচেকার ধাপে বসিয়াছিলেন, পরে পিছু হটিয়া একটু একটু করিয়া উপরে উঠিতে লাগিলেন। বক্তৃতা আরম্ভ হইল। গম্ভীর তরঙ্গায়মান স্পষ্ট স্পষ্ট শব্দ, কণ্ঠধ্বনি বাহির হইতে লাগিল। ঘরটা নিস্তব্ধ হইয়া গেল। কাহারও মাথা নাড়িবার বা হাত নাড়িবার ক্ষমতা রহিল না। ঘরে অপর কোন লােকজন আছে কিনা তখন বােঝা যাইত না। কেবল মাত্র স্বামীজীর গম্ভীর নাদপূর্ণ শব্দ কণ্ঠ হইতে বাহির হইতে লাগিল। বক্তার বক্তব্য বিষয় অনেক সময় শ্রোতারা ভুলিয়া যাইত ; কেবল মাত্র সেই কণ্ঠস্বর লােকে শুনিত এবং তাহাতেই মুগ্ধ হইয়া থাকিত। আধঘণ্টা বা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বক্তৃতা হইয়াছে এমন সময় কলিকাতার সুবিখ্যাত বি, এল, গুপ্ত, তাহার পত্নী ও কে, জি, গুপ্ত তিনজনে বক্তৃতা ঘরে প্রবেশ করিলেন। নিজের দেশের লােক বলিয়া স্বামীজী বক্তৃতার ভিতরও তিনজনকে সাদরে অভ্যর্থনা করিয়া নিকটে বসিতে অনুরােধ করিলেন। তাঁহারা তিনজনে বসিলে স্বামীজী পুনরায় বক্তৃতা করিতে লাগিলেন। হাসপাতালের নার্সটিও যথা সময়ে আসিয়া তাহার নির্ধারিত স্থানে বসিয়া সমস্তই লিখিয়া লইতে লাগিলেন। বক্তৃতা খুব জমিয়া গেল। সকলেই একমনে শুনিতে লাগিলেন। বক্তৃতা শেষ হইলে প্রশ্নোত্তর লণ্ডনে বিবেকানন্দ হইতে লাগিল। তাহার পর শ্রোতারা ধীরে ধীরে একে একে নামিয়া গেল। স্বামীজী মিঃ বি, এল, গুপ্ত, তাঁহার পত্নী ও মিঃ কে, জি, গুপ্তের সহিত বেশ সাদরে দু’চার মিনিট কথা কহিলেন। শ্রোতৃবৃন্দের ভিতর জনৈক মহিলা ( বােধ হয় কোন লর্ড বা ডিউকের বাড়ীর) স্বামীজীকে দুপুরবেলা খাইবার জন্য নিমন্ত্রণ করিয়া নিজের গাড়ী করিয়া লইয়া গেলেন। কয়েকদিন পর বর্তমান লেখক মিঃ বি, এল, গুপ্ত মহাশয়ের বাড়ী গিয়াছিলেন। মিঃ বি, এল, গুপ্ত মহাশয়ের পত্নী তঁাহাকে অতি যত্ন করিয়াছিলেন এবং সম্ভবতঃ তাঁহার পরিচয় দিয়াছিলেন যে তিনি অন্নদা কান্তগিরির কন্যা ও কেশৰ বাবুর ভাগিনেয় বধু। গিন্নি-বান্নী বাঙ্গালীর মেয়ে বিদেশে থাকিলে অপর বাঙ্গালীকে কিরূপ যত্ন আত্তি করিতে হয় তাহা তিনি অতি সুন্দরভাবে জানিতেন ও করিতেন। অভিমানের লেশমাত্র তাঁহার ছিল না। নিজের হাতে দুধের ছানা কাটাইয়া পান্তুয়া বা বাঙ্গলাদেশের ঐরূপ খাবার করিয়া অভ্যাগতকে খাওয়াইতেন এবং সকলের সহিত অতি যত্নের সহিত কথা কহিতেন ও তাহাদের খােজ খবর লইতেন। এইরূপ দয়াবতী গিন্নি-বান্নী স্ত্রীলােক হওয়া সকলের প্রশংসনীয় ও আদর্শ স্থানীয় । স্বামীজী তাহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন। তাঁহাদের বাড়ীতে কেহ যাইতেছে শুনিলে স্বামীজী তাহাকে স্নেহ জানাইতেন এবং কোন কথায় তঁাহার উল্লেখ উঠিলে স্বামীজী অনেক প্রশংসা করিতেন। সম্ভবতঃ দেখা শুনা একবারের বেশী হয় নাই কিন্তু স্বামীজী মিঃ বি, এল, গুপ্তের পত্নীকে বিশেষ শ্রদ্ধা করিতেন। স্বামীজী প্রায় বেলা চারটার সময় ফিরিয়া আসিলেন এবং চায়ে দুধ দিয়া লেবু দিয়া খাইতে লাগিলেন। সিট্রণ (citron) বা গোঁড় লেবুর মত গােল গােল এক রকম বড় লেবু হয় তাহাকে দুভাগ করিয়া ৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ কাটিয়া জাপানী চা’র বাটিতে চা ঢালিয়া সেই লেবুর রস ও অল্প পরিমাণে চিনি দিয়া (lump sugar) স্বামীজী ধীরে ধীরে এক বাটি চা খাইতে লাগিলেন এবং বলিতে লাগিলেন, “চা ভাল লাগে না খেতে। আর দুধ দিয়ে চা খাওয়া ঠিক নয় উহাতে অনেক পেটের গােল হয়। আমেরিকায় অনেকে লেবু দিয়ে চা খায় সেটা বেশ।” স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীর প্রতি চাহিয়া পুনরায় বলিলেন, “আরে আমেরিকানদের সব বাড়াবাড়ি! চা খাবে লেবু দিয়ে তাতে আবার এক চাপ বরফ দেবে। গরমিকালে তারা ice-tea খুব খায়। আর খাবে ত এইটুকু (হাত দেখাইয়া) কিন্তু থালায় নেবে এতটা। ওদের সব বেয়াড়া। শীতকালে ঘরে ঈম পাইপ দিয়ে বসে থাকবে কিন্তু জল খাবার বেলা গ্লাসে এক চাপ বরফ দিয়ে খাবে।” এইরূপে আমেরিকার খাওয়ার বিষয় খানিকক্ষণ কথাবার্তা চলিল। স্বামীজী নিজের লম্বা ইজি-চেয়ারে গিয়া বসিলেন আমেরিকার কথা ও মাঝে মাঝে বড় পাইপে তামাক খাইতে লাগিলেন। ফক্সের পায়ের জুতার দিকে তাঁহার নজর পড়িল। জুতাটা ছিল ব্রাউন রঙের বুট এবং তাহার মুখটা ছিল চুচাল। স্বামীজী পুনরায় বলিতে লাগিলেন, “আমেরিকায় যে জুতা পরে তার ডগা এত সরু যে পায়ের আঙ্গুলগুলাে মুড়ে থাকে, টিপে চ্যাপ্টা হয়ে যায়। প্রথম প্রথম এক অস্বস্তি বলে বােধ হয়।” খানিকক্ষণ পরে পুনরায় বলিতে লাগিলেন, আমেরিকাটি যেন বিদ্যুতে পরিপূর্ণ ( full of electricity ) সকলের ভিতর কি একটা উদ্যম ও উৎসাহ! আমি দেতুম গরীব ইটালিয়ান বা রাশিয়ানগুলাে পুটলি ঘাড়ে নিয়ে ত চুল। মানুষ দেখুলে ভয় পায়, পায়ে পায়ে জড়িয়ে যায়। ময়লা কাপড় চোপড়। মাস দুই তিন বাদে দেখি যে বেশ ভাল কাপড় পরেছে, বুক ফুলিয়ে ৮৫ লণ্ডনে বিবেকানন্দ গট করে যাচ্ছে, রেস্তারায় ঢুকছে ও সকলের সঙ্গে খাচ্ছে! কোন আর ভয় ভাবনা নাই। দেশটা স্বাধীন কি না তাই ওদের ভিতরও স্বাধীনতা ঢুকে গেছে। আর দেখ আমেরিকায় কেউ যদি স্পিংওয়ালা বােম করে ওমনি সে সেটা পেটেন্ট করে নিলে ও লক্ষ লক্ষ টাকা তা থেকে পেলে। একটা লোেক নখ-ঘসা উকো বা কঁচি করে লক্ষ লক্ষ টাকা করে নিলে! পাঁচজনের উন্নতি দেখলে নূতন লােকেরও উন্নতি করবার ইচ্ছা হয়, আশা হয় তাই সেও চেষ্টা করে। দেশটা বিদ্যুতে ভরে রয়েছে। ওরা চায় নূতন কিছু করবাে, জগতের ভিতর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করবে। আর একটি জিনিস আমেরিকায় দেখলুম। কি করে ইচ্ছ! কেউ কারুর উপর নির্ভর করে না। ছেলে বাপের উপর, বাপ ছেলের উপর নির্ভর করে থাকতে চায় না। যে যা’র স্বতন্ত্র হয়ে অর্থ রােজগার করতে চায় এবং নিজেও স্বাধীন হয়ে থাকতে চায়। স্বাধীনতা যে কি জিনিস সে আমেরিকায় গেলে বেশ বুঝতে পারা যায়। আমেরিকায় দেখলুম কি বড় কি ছােট সকলেই কাজ করতে মহা উৎসাহী এবং সকলেই আশা করে থাকে যে সে ভবিষ্যতে ক্রোরপতি হবে এবং এমন কি প্রেসিডেন্ট পৰ্য্যন্ত হবে। কৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম-আত্মবিকাশ-প্রতিবন্ধক চূর্ণ বিচূর্ণ করা—স্বাধীনতা প্রকাশ করা—এই যেন আমেরিকার হাওয়াতে বইছে।” এইরূপ ভাবে আমেরিকার কথা চলিতে লাগিল। স্বামীজী সাতটার সময় খাইয়া লইলেন কারণ আটটা সাড়ে-আটটার সময় বক্তৃতা আরম্ভ হইবে। গরম কালসূর্য অস্ত গিয়াছে কিন্তু তখনও বেশ আলাে রহিয়াছে। ইহাকে গােধুলি বা twilight বলে। গরমিকালে সাড়ে আটটা পর্যন্ত কি তাহারও বেশী এই আলােটা থাকে এবং প্রাতে সাড়ে চারিটার পর এইরূপ আলাে হয়—যদিও সূর্যোদয় ৬টা বা সেই রকম সময় হইয়া থাকে। • • • - ৭w" * * ৮৬ লণ্ডনে বিবেকানন্দ স্বামীজী বক্তৃতা-ঘরে গেলেন। রাত্রির বক্তৃতাকালে পুরুষের সংখ্যা বেশী হইত। তাহার ভিতর অনেক পণ্ডিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তি থাকিতেন। বক্তৃতা চলিতে লাগিল। শেষকালে স্বামীজী “কালা দাদার দই ছােবার” গল্প বলিতে লাগিলেন। এই গল্পটি স্বামীজী তাহার মাতামহী ও প্রমাতামহীর নিকট বাল্যকালে শুনিয়াছিলেন। গল্পটি সকলেই জানেন সেইজন্য এখানে বলিবার বিশেষ প্রয়ােজন নাই। কিন্তু গল্পের শেষ অংশটি স্বামীজী এমন হৃদয়গ্রাহী ভাবে ও নিজে এমন ব্যথিত হইয়া বলিলেন যে সেই গল্প শুনিয়া সকলেই মােহিত হইলেন। শেষ অংশটি হইতেছে নারদ বৈকুণ্ঠে যাইতেছিলেন। বালকের গুরুমশাই এক বৃহৎ প্রাচীন তেঁতুল গাছতলায় বসিয়াছিলেন। নারদকে দেখিয়া গুরুমশায় সসম্ভ্রমে চরণ বন্দনা ও প্রণাম করিলেন এবং বলিলেন, “বৈকুণ্ঠে যাইয়া নারায়ণকে জিজ্ঞাসা করিবেন যে কত জন্ম পরে আমার নারায়ণ দর্শন হইবে।” নারদ গিয়া নারায়ণকে সেইরূপ জিজ্ঞাসা করিলেন। সেই কথা শুনিয়া নারায়ণ বলিলেন, “তেঁতুলগাছে যত পাতা আছে তত জন্ম পরে তাহার নারায়ণ দর্শন হইবে।” নারদ ফিরিয়া আসিয়া তদ্রুপই 'গুরুমশাইকে বলিলেন এবং মনে মনে ভাবিলেন যে লােকটি এই কথা শুনিয়া বিশেষ দুঃখিত ও বিমর্ষ হইবে। কিন্তু গুরুমশাই সেই কথা শুনিয়া আনন্দে নৃত্য করিতে লাগিলেন। নারদ গুরুমশায়ের আনন্দ-নৃত্য দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “এত বিলম্বে তােমার নারায়ণ দর্শন হবে তবুও তােমার এত আনন্দ কেন? গুরুমশাই বলিলেন, “গাছে কটা আর পাতা আছে, ও তাে দু’দিনে ফুরিয়ে যাবে তাই এত আনন্দ কচ্ছি। তবুও তাে আমার নারায়ণ দর্শন হবে। নারদ লােকটির ভক্তি বিশ্বাস দেখিয়া বড়ই আনন্দিত হইয়া পুনরায় বৈকুণ্ঠে গেলেন এবং নারায়ণকে সমস্ত ঘটনা বলিলেন। সেই কথা শুনিয়া নারায়ণ বলিলেন, ৮৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ “ওর এত দৃঢ় ভক্তি বিশ্বাস যখন রয়েছে তখন ওকে তত দিন থাকিতেও হইবে না, দশ জন্ম পরেই ও বৈকুণ্ঠে আসিবে এবং আমার সান্নিধ্য লাভ করিবে।” স্বামীজী রাত্রির বক্তৃতাকালে এই উপাখ্যানটি এমন সুন্দর ভাবে বলিয়াছিলেন যে শ্রোতৃবৃন্দ বিশেষতঃ ভক্তিপরায়ণা স্ত্রীলােকেরা অতিশয় আনন্দিত হইলেন। তাহাদের সকলের মনেও একটা আশা জন্মিল, সকলেই মনে করিলেন যে তাঁহাদের মুক্তি ও ভাবদর্শন নিশ্চিত হবে। বক্তৃতা শেষ হইলে সকলেই স্বামীজীকে বেষ্টন করিয়া বলিলেন যে এমন সুন্দর কথা আর কখনও শুনি নাই। বুকে যেন একটা শান্তি এলাে। সকলেই আপন আপন উল্লাস নানাভাবে প্রকাশ করিতে লাগিল। যথার্থই সেই রাত্রির বক্তৃতাটি বড় সুন্দর জমিয়াছিল। কারণ সাধারণ লােক রাজযােগের ধ্যান ধারণা, দর্শন শাস্ত্র ও ন্যায়শাস্ত্রের জটিল কথা বুঝিতেন না, শুনিতে হয় তাই শুনিতেন কিন্তু এই রাত্রে ভক্তির কথা শুনিয়া সকলেই উল্লসিত হইয়াছিলেন। স্বামীজীরও সেদিন গম্ভীর- ভাব ছিল না তিনিও ভক্তিভাবে সেদিন বিভাের ছিলেন ও মাঝে মাঝে হাসিতেছিলেন। সেদিন যেন একটা ভক্তির স্রোত চলিতে লাগিল। স্বামীজী ও সারদানন্দ স্বামী অগ্রে নামিয়া ডাইনিংরুমে ঢুকলেন এবং গুডউইন ও বর্তমান লেখক পশ্চাতে আসিলেন। সারদানন্দ স্বামী সেদিন বক্তৃতা শুনিয়া বড়ই মােহিত হইয়াছিলেন। ঘরে ঢুকিয়া বা-দিকে যে কাপ-বাের্ড ছিল সেখান থেকে এক গ্লাস জল গড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে খাইলেন। স্বামীজী ষ্টাডি ও মিস্ মূলারের প্রতি চাহিয়া বলিলেন, “দেখছ দেখছ এর কাজটা দেখছ ? 1 lectured and he became thirsty অর্থাৎ আমি বক্তৃতা করিলাম আর ওর তৃষ্ণা পাইল।” সারদা- নন্দ স্বামীর প্রতি চাহিয়া বলিলেন,-তুই কি বক্তৃতা করেছি যে তাের তৃষ্ণা এত পেলে?” সারদানন্দ স্বামী কৌতুক করিয়া বলিলেন, ৮০ লণ্ডনে বিবেকানন্দ “আরে তােমার যে বক্তৃতার ধমক তাতে তৃষ্ণা না পেয়ে থাকি কি করে ! এক গ্লাস নয় তিন গ্লাসের তৃষ্ণা পেয়েছে।” কথা শুনিয়া সকলে হাসিতে লাগিলেন। মিস্ মূলারও বক্তৃতা শুনিয়া বড় আনন্দিত হইয়াছিলেন। তিনি বারে বারে বলিতে লাগিলেন যে আজ কি সুন্দর লেকচার হ’লল, কি মিষ্টি কথা, কেমন সুন্দর । ষ্টার্ডিও খুব সুখ্যাতি করিল। তাহার পর স্বামীজী গুডউইনকে সঙ্গে লইয়া গায়ে কাল রঙের ক্লো দিয়া, হাতে ছড়ি লইয়া ও মাথায় খাজকাটা টুপী পরিয়া বেড়াইতে বাহির হইয়া গেলেন। ৮৯ পাঁচ রবিবারের বক্তৃতা। লণ্ডনে ক্লাশ লেচার খুব জমিয়াছে এইজন্য বৈকালবেলা পাবলিক লেকচারের বন্দোবস্ত হইল। পিকাডিল নামক স্থানে “রয়েল ইনষ্টিটিউটের ওয়াটার পেন্টিং গ্যালারিতে” বাড়ীর উপরকার হল রবিবারের বক্তৃতার জন্য ভাড়া লওয়া হইল এবং সকলকে জানাইবার জন্য প্রত্যেক সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হইল। পাদ্রীদের কাগজে রটিল যে, ভারতবর্য হইতে একজন নাস্তিক ধর্ম প্রচার করিতে এখানে আসিয়াছে, সে ভগবান মানে না এবং খৃষ্টানদের ধর্মকে নিন্দা করে ইত্যাদি নানা প্রকার কুৎসা প্রচার করিল। সমস্ত সংবাদ- পত্রে পাদ্রীদের বিশেষ প্রভাব সেইজন্য সাধারণও সেইরূপ বুঝিল। শুক্রবার বা শনিবার সন্ধ্যাকালে গুডউইন ছােট ঘােট কাগজে নােটিশ লিখিয়া প্রত্যেক সংবাদপত্রে পাঠাইবার জন্য প্রস্তুত করিল। অনেক পূর্জা লিখিতে হইত সেইজন্য সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক অনেক পূর্জা অনুলিপি করিতেন। যথাসময়ে সেই সকল পাঠাইয়া দেওয়া হইত কিন্তু রবিবারের সংবাদপত্রে তাহার কোন উল্লেখ বাহির হইত না। ইহা হইতে স্পষ্ট বুঝা যাইত যে ভিতরে একটি বিদ্বেষ ভাব বিশেষ ভাবে ছিল। গুডউইনও তেমনি একগুঁয়ে, তিনি প্রত্যেক হপ্তায় যথাসময়ে পূর্জা লিখিয়া সমস্ত সংবাদপত্রে পাঠাইতেন। কিন্তু ‘চার্জ নিউজের’ (church news) সংবাদস্তম্ভে তাহার কোন উল্লেখ থাকিত না । গুডউইন খবর পাইলেন যে রিজ, পার্কের নিকট এক উচ্চ শ্রেণীর পাদ্রী গির্জাতে হিন্দুভাব বা স্বামীজীর কথা লইয়া পারীর গির্জায় গুডউইন। বক্তৃতা দিবেন। এই পাত্রী (canon) নিজের স্ত্রী ও কন্যা লইয়া সন্ধ্যার বক্তৃতায় প্রত্যহ আসিতেন ও স্বামীজীকে বিশেষ সম্মান ও শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন। সাধারণ গির্জা লণ্ডনে বিবেকানন্দ অপেক্ষা রিজেন্স পার্কের গির্জাতে অধিক লােক বাইত ও সেই সময় উক্ত পাদ্রী সাধারণের নিকট অতি প্রিয় ছিলেন। পরদিন প্রাতঃ-আহারের পর গুডউইন কথা তুলিলেন যে, সারদানন্দ স্বামী, ফক্স , বর্তমান লেখক ও নিজে এই চারিজনে মিলিয়া ঐ পাত্রীর বক্তৃতা শুনিতে যাইবেন। স্বামীজী এই কথাতে প্রথম সম্মত হইলেন। ফক্স, সেই পাত্রীর নাম উচ্চারণ করিল, ‘হাউই। স্বামীজী সংশােধন করিয়া বলিলেন, ‘হাউয়ে। তাহার একটু পরে গুডউইন বিশেষ বিবেচনা করিয়া বলিলেন যে, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখকের গিয়া কাজ নাই, তাহার সঙ্গে ফক্স, গেলেই হইবে। কারণ দু’টী ভারতবাসীকে দেখিলে অনেকেই অনুমান করিবেন যে অদ্য স্বামীজীর বিষয় কি বলা হয় তাহাই শুনিবার জন্য ইহারা আসিয়াছে। ফক্স, যাইতে পারিল না গুডউইন একাই গেলেন। বক্তৃতা শুনিয়া আসিয়া গুডউইন বলিতে লাগিলেন ‘কেমন লেকচার দিলেন ব্যাটি এণ্ড ব্যাটো ( ভক্তি ও ভক্ত)। পাদ্রী বক্তৃতা-প্রসঙ্গে বলিল যে এই ভাবটি হইতেছে ভারতবর্ষের। বর্তমানে ভারতবর্ষ হইতে যে স্বামী বিবেকানন্দ আসিয়াছেন তিনি এই ভাবটি অতি সুন্দরভাবে ব্যাখা করিয়াছেন। অনেক লােকে তাঁহার ব্যাখ্যা শুনিয়া মােহিত হইয়াছেন এবং এই ভাবটি তিনি স্বামীজীর নিকট হইতে পাইয়াছেন। খৃষ্টানধৰ্ম্মে এই ভাবটি প্রবেশ করিলে বিশেষ শুভকর হইবে ইত্যাদি। গুডউইন অনেকক্ষণ ধরিয়া ব্যাটি ও ব্যাক্টো কথাটি লইয়া হাস্য কৌতুক করিতে লাগিলেন। কিন্তু লেচার শুনিয়া যে তিনি খুব খুশী হইয়াছিলেন তাহা বারংবার বলিতে লাগিলেন। রবিবার বেলা ৪টা বাজিলে সকলেই পিকাডিলিতে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। মিস্ মূলার স্বতন্ত্র গিয়াছিলেন। পুরুষেরা সকলে বাসে (bus) গেলেন। তখন ঘােড়া দিয়া বাস টানা হইত। স্বামীজী ও ষ্টাডি লণ্ডনে বিবেকানন্দ বাসের ছাদের উপর একখানি বেঞ্চে বসিলেন ও কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন এবং মাঝে মাঝে সিগারেট টানিতে লাগিলেন। তাহাদের পিছনে গুডউইন, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক বসিলেন। অল্প সময়ের পর গন্তব্য স্থানে সকলে পৌছিলেন। ক্রমে শ্রোতৃবৃন্দ আসিতে লাগিল। কাঠের সিড়িতে উঠিয়া প্রথম দালানটাতে স্বামীজী দাড়াইয়া পরিচিত ব্যক্তিদিগের সহিত কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন,—বেশ সাদা- সিদে ভাব, কোন বিশেষত্ব নাই । বক্তৃতার স্থান হইতেছে—লম্বা একটী হল-ঘর, তাহাতে চার পাঁচ শ” লােকের স্থান হইতে পারে। গুডউইন বলিলেন যে লেকচার হইলে বড় ভিড় হইবে—সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক পূৰ্ব্ব হইতে যাইয়া লেকচারের প্লাটফরমের নিকট একটা শশাফায় (sofa) গিয়ে বসিয়া থাকুক নচেৎ পরে প্রবেশ করিতে পারিবে না। তিনি দু’জন ভারতবাসীকে লইয়া ভিতরে বসাইয়া দিলেন এবং নিজে ঘুরিয়া ফিরিয়া সকলকে অভ্যর্থনা করিতে লাগিলেন। মিস্ মূলার হলের ভিতর স্থান না পাইয়া দরজার নিকট বড় বড় ঈষৎ হরিদ্রা বর্ণের স্ফটিকের মালা গলায় দিয়া দাড়াইয়া রহিলেন। হল-ঘরটির দেওয়ালে কয়েকখানি ছবি টাঙ্গান ছিল ও মেঝেটি কাঠ মােড়া ও পালিস্ করা ছিল। বক্তার দাড়াইবার বক্তৃতাকালে স্বামীজীর ভাব। স্থানটি হলের শেষ প্রান্তে। একটি কাঠের প্লাটফর্ম ও তাহার উপর টেবিল ও জলের গ্লাস। ষ্টার্জি কাঠের প্ল্যাটফরমে দাড়াইয়া যে বিষয়ে বক্তৃতা হইবে ও স্বামীজীয় বিষয় দু'এক মিনিট সকলকে বলিয়া নামিয়া আসিলেন। স্বামীজী তাহার পর উঠিলেন। গুডউইন ইতিমধ্যে কোন্ বিষয় লেকচার হইবে তাহা স্বামীজীর কাণে কাণে বলিয়া দিলেন। কারণ, কোন্ বিষয় বক্তৃতা হইবে এবং লণ্ডনে বিবেকানন্দ গুডউইন সাধারণের নিকট কোন্ বিষয়ের লেকচারের কথা প্রচার করিয়াছেন স্বামীজীর তাহা কিছুই স্মরণ থাকিত না। পূৰ্ব্ব হইতে ভাবিয়া চিন্তিয়া বা বক্তৃতা তৈয়ারি করিয়া বলা স্বামীজীর অভ্যাস ছিল না। কথা পড়িলে উপস্থিত মত তিনি বলিয়া যাইতেন এবং সেই সময় কোন নােট করা কাগজ সম্মুখে রাখিতেন না। তিনি উপস্থিতবক্তা ছিলেন। স্বামীজী লাল রঙের টিউনিক বা লম্বা জামাটা পরিধান করিয়াছিলেন, গলায় কলার, কিন্তু টাই ছিল না। কোমরে একটা sash বা রেশমের কোমরবন্ধ জড়ান কিন্তু মাথায় টুপি বা পাগড়ী কিছুই নাই। তিনি প্ল্যাটফরমে উঠিয়া দুই বাহু ( একের উপর আর একটি দিয়া) বুকের উপর রাখিয়া প্লাটফরমের উপর ক্ষিপ্র সিংহের ন্যায় এদিক ওদিক পায়চারি করিতে লাগিলেন। এই সময় তাহার মুখের ভাব সম্পূর্ণ পরিবর্তন হইতে লাগিল। যে ব্যক্তি পাঁচ মিনিট পূর্বে সাধারণ লােকের মত সরল ভাবে হাসি ঠাট্টা তামাসা করিতেছিলেন, সিগারেট টানিতে ছিলেন হঠাৎ তাহার ভিতর সুষুপ্ত শক্তি জাগ্রত হইতে লাগিল, স্নায়ু সকল দৃঢ় ও কঠিন হইয়া উঠিল, চক্ষু বিস্ফারিত হইয়া উঠিল এবং দৃষ্টি মহা তেজস্বী ও আজ্ঞাপ্রদ হইয়া উঠিল । পূৰ্বদেহ হইতে স্বতন্ত্র লােক বাহির হইল। তাহার পর বুক হইতে হাত দুটি নামাইয়া দুই পাশে রাখিলেন এবং মাঝে মাঝে অল্পভাবে দুই হাত দুলাইতে লাগিলেন। তাহার পর সহসা স্থির হইয়া দাড়াইলেন। চক্ষুতে অন্তদৃষ্টি ভাব প্রকাশ পাইল। তিনি যেন স্থূলদেহ পরিত্যাগ করিয়া সূক্ষ্মদেহে চলিয়া গিয়াছেন এবং যেন হাওয়ার ভিতর কোন বস্তু দেখিতেছেন এইরূপ এক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। তাহার পর ধীরে স্নিগ্ধস্বরে অল্পে অল্প কথা নিঃসৃত হইতে লাগিল। গলার স্বর মৃদু হইলেও শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট শুনা যাইত। ক্রমে যেমন ভাব গাঢ় ও নানা প্রকার হইতে লাগিল স্বামীজীর স্বরও সেইরূপ উচ্চ হইতে লণ্ডনে বিবেকানন্দ লাগিল। ক্রমেই তিনি বাম হস্ত সঞ্চালন করিতে লাগিলেন এবং অঙ্গুলি সকল কখন কুঞ্চিত বা কখন বিক্ষিপ্ত করিয়া মনের ভাব প্রকাশ করিতে লাগিলেন। তাহার পর ডান হস্ত সঞ্চালন করিতে লাগিলেন এবং যখন ভাব অতিশয় গভীর হইতে লাগিল তখন দুই হস্ত সঞ্চালন করিয়া মনের ভাব প্রকাশ করিতে লাগিনে। এইরূপে প্রায় দেড় ঘণ্টাকাল লেকচার হইল। শ্রোতারা নিষ্প ও নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন-যেন ঘরে কোন লােক ছিল না। বক্তৃতা সমাপ্ত হইলে স্বামীজী টেবিলস্থিত গেলাসের জল পান করিয়া লইলেন এবং প্ল্যাটফরম হইতে নামিয়া আবার নিজের সাম্যভাব ধারণ করিলেন ও মিনিট পাঁচেক পরে সকলের সহিত মিশিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তখনও মুখে চোখে প্রদীপ্ত তেজের ভাব রহিয়াছে। খানিকক্ষণ পরে তিনি সকলের সহিত মিষ্ট আলাপ করিয়া পুনরায় বাস গাড়ী করিয়া বাড়ীতে প্রত্যাগমন করিলেন। শ্রোতৃবৃন্দ এই লেচার শুনিয়া বড় আনন্দিত হইয়াছিলেন। তাঁহাদিগের মধ্যে যাঁহারা আমেরিকা ছিলেন তাঁহারা বলিলেন যে এই লেকচার পূর্বে আমেরিকায় শুনিয়াছিলাম কিন্তু যাঁহারা নূতন ও প্রথমবার শুনিলেন তাহাদের পক্ষে ইহা অতি আশ্চর্যজনক হইয়াছিল। মিস্ জোসেফাইন ম্যালিয়ডও এই লেকচারে উপস্থিত ছিলেন। বাড়ীতে রাজযােগের বিষয় বক্তৃতা হইত এবং পিকডিলিতে রবিবারে ধারাবাহিক যে সকল বক্তৃতা হইত তাহা পরে জ্ঞানযােগ ও ভিন্ন ভিন্ন আখ্যায়িকা দিয়া বক্তৃতার ভাব অনুযায়ী পৃথক পৃথক পুস্তক হইয়াছে। একদিন স্বামীজী ও সারদানন স্বামী নীচেকার মাটির তলার ঘরে গিয়া মাখন গলাইয়া ঘি করিয়া খানকতক আলুর পুর দেওয়া কচুরি ও বেশ ঝা ঝা চচ্চড়ি করিয়া উপরকার ডাইনিংরুমে দুজনায় আসিলেন ও তিনজনে মিলিয়া একটু একটু খাইতে লাগিলেন। ঘরে তখন অপর লণ্ডনে বিবেকানন্দ কেহ ছিল না। খাইতে খাইতে সারদানন্দ স্বামী হঠাৎ বর্তমান লেখককে বলিলেন, “ওহে, মিস কেমিরণের জন্য একটু তুলে রেখে দাও নইলে সে বিকেলে এসে ঝগড়া কোর্বে। তুমি একখানা রেকাবি (saucer) করে একটুকু খাবার নিয়ে উপরকার ঘরের আলমারির টানার উপর রেখে দিয়ে এস। ভুল না, মিস্ কেমিরণ এলে পরে তাকে যেন দিও।” বর্তমান লেখক তদ্রুপই করিলেন। কিন্তু সেইদিন বৈকালবেলা মিস্ কেমিরণ আসিলেন না তাহার পরদিন বেলা চারিটার সময় একটি সুই যুবককে সঙ্গে লইয়া আসিলেন। মিস কেমিরণের বয়স আন্দাজ পঁয়তাল্লিশ হইবে, ষ্টাডির বউয়ের মিতিন। তিনি স্বামীজীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভক্তি মিস্ কেমিরণ। করিতেন। বুকটা ভালবাসায় ভরা ছিল কিন্তু মুখটা বড় কড়া। তিনি দরজায় ঢুকিয়াই সারদানন্দ স্বামীকে শ্রদ্ধার সহিত গালি পাড়িতেন, “You cooky swami, devil awami ইত্যাদি। মুখে যদিও গাল দিতেছেন কিন্তু রান্নাঘর হইতে শয়নঘর পর্যন্ত সমস্ত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। রান্নাঘরে জিনিস- পত্তর আছে কি না, কি কি রান্না হইয়াছে, প্রত্যেক দিন খাবার জিনিস বদলাইয়া করিতে হয় ইত্যাদি বিষয় বুড়ি ঝির সহিত কথা- বাৰ্তা কহিলেন। তারপর প্রত্যেক ঘরে গিয়া পা সা ঠিক হইয়াছে কি না, বিছানা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আছে কি না সব তন্ন তন্ন করিয়া দেখিতে লাগিলেন। কিন্তু মুখে সৰ্ব্বদাই গাল দিতেছেল ও ঝঙ্কার করিতেছেন। চার পাঁচ তলা বাড়ী, প্রত্যেক ঘরগুলি তিনি একবার ভাল করে দেখিয়া শুনিয়া আসিলেন। তারপর নীচেকার ডাইনিং রুমে আসিয়া বসিলেন। যে যুবকটি সঙ্গে আসিয়াছিল সে ইতিপূর্বে সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখকের সহিত বসিয়া কথাবার্তা কহিতেছিল। পরে লণ্ডনে বিবেকানন্দ যুবকটির পরিচয় পাওয়া গেল যে সে সুইজ্যারল্যাণ্ডের লােক এবং মিস কেমিরণ তাহাকে পালক-পুত্রের মত গ্রহণ করিয়াছেন। মিস্ কেমিরণ বসিয়াই কথা তুলিলেন, “তােমাদের কি রান্না হয়েছে বল? নিজেরাই সব ভাল ভাল জিনিস খাবে আর আমার জন্য কিছু রাখবে না ?” এই বলিয়া তিনি চোখ মুখ মাথা নাড়িয়া ঝগড়া ছলে সারদানন্দ স্বামীকে বলিতে লাগিলেন, “You cooky Swami, তুমি কেবল খাবে আর খেয়ে খেয়ে মােটা হবে, আমার জন্য কিছু রাখবে না ইত্যাদি?” সারদানন্দ স্বামী হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “কাল তুমি আস নাই কেন ? স্বামীজী ও আমি কাল এক ভাল ইণ্ডিয়ান রান্না করেছিলুম, তাই তােমার জন্য একটু রেখেছি” এই বলিয়া বর্তমান লেখককে বলিলেন, “ওহে যাও উপরকার ঘর থেকে কচুরি নিয়ে এস ত ?” বৰ্তমান লেখক ত্বরিৎপদে যাইয়া লইয়া আসিলেন—দু’খানা কচুরি ও একটু আলু চচ্চড়ি ছিল। মিস্ কেমিরণ ও তাঁহার পােষ্যপুত্র খাইতে বসিলেন এবং সারদানন্দ স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি দিয়ে খাইতে হয় চিনি দিয়ে না নুন দিয়ে ?” এই বলিয়া চিনি দিয়া খাইতে লাগিলেন কিন্তু ভাল লাগিল না। সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, “নুন দিয়া দেখ না ?” ( try it with salt) তারপর তাহারা নুন দিয়া খাইতে লাগিলেন। তারপর চামচে দিয়ে আলু চচ্চড়ি মুখে দিয়েই মিস্ কেমিরণ একেবারে চীৎকার করিয়া উঠিল, “ওঃ কি ভয়ঙ্কর জিনিস, গােল মরিচকে লঙ্কা দিয়ে বেঁধেছে!” (Oh it's horrible thing! it's poison, it's pepper, seasoned with cayne pepper) এই বলিয়া দুই হাত দুই গালে চড়াইতে লাগিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সারদানন্দ স্বামীকে গাল পাড়িতে লাগিলেন। চক্ষে জল বাহির হইল এবং ক্রমাগত বলিতে লাগিলেন, 'Oh it is poison ! Oh it is poison! (অর্থাৎ ইহা লণ্ডনে বিবেকানন্দ বিষ, ইহা বিষ )! কিন্তু সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন, এমন ঘি লঙ্কা দিয়ে আলু চচ্চড়িটা নষ্ট হইল। গুডউইন স্বামীজীর কাছে সর্বদা থাকেন, মন দিয়া স্বামীজীর সমস্ত কথা শুনেন এবং বেদান্ত রাজযােগের কথা সমস্তই লিখিয়া লন। তাঁহার ভিতর তখন বেদান্তের ভাব খুব জাগ্রত হইয়া উঠিল। মুড়ী ঝি ও গুডউইনের একদিন প্রাতে সকলে আহার করিলে পর স্বামীজী ঝগড়া আপনার ঘরে চলিয়া গেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে অপর সকলেও চলিয়া গেলেন। বুড়ি ঝি আসিয়া খাবার বাসনগুলি তুলিতে লাগিল। সকলের সহিত ঝগড়া করা গুড়উইনের অভ্যাস, বিশেষ তখন স্বামীজী ঘরে ছিলেন না, আরও সুবিধা পাইলেন তখন বুড়ি ঝির সহিত ঝগড়া আরম্ভ করিলেন। বুড়ি ঝি একখানা বড় ট্রেতে থালা চা’র বাটি সব সাজিয়ে খানিকটা তুলেছে এমন সময় গুডউইন হঠাৎ তাহাকে বলিলেন, বুড়ি তুমি খৃষ্টান, তাই নরকে যাবে (Mrs. you are a Christian you shall go to hell.) এই কথা শুনিয়া বুড়ি ত রাগিয়া ট্রে খানি আবার টেবিলে রাখিয়া গুডউইনকে জবাব দিল, তুমি বিধর্মী তুমিই নরকে যাবে, আমি স্বর্গে যাব। (You are a heatlien, you shall go to hell. I am a Christian, 1 shall go to heaven.) এক্ষনে গুডউইন ঝগড়া করিবার একটা ছুতা পাইলেন তাই পুনরায় বুড়ি ঝিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “But Mrs, what is your heaven ?” অর্থাৎ তুমি স্বর্গ কাহাকে বল। বুড়ি ঝি মহা ফাঁপরে পড়িল। সে দুই চক্ষু মুদ্রিত করিয়া দুই হস্তে মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে অনেকক্ষণ ভাবিয়া বুদ্ধিটা স্থির করিয়া বলিল, “Plenty to eat and drink and noo liber (no labour ), গুডউইন পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “and what shall you drink there?” বুড়ি ঝি অনেকক্ষণ ভাবিয়া চোখ, লণ্ডনে বিবেকানন্দ মিট মিট করিয়া কুঁতিয়ে বলিল, “of course, champagne” অর্থাৎ স্যাম্পে হচ্ছে কি না বড় মানুষদের ভাল করিয়া খাওয়া দাওয়ার পর বিশেষ পানীয়। এই বুড়ি ঝিকে সমস্ত কাজ করিতে হইত তাই আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিল খাটুনির হাত হইতে নিস্তার পেলে আর শ্যাম্পেন্ মদ পেলেই তার স্বর্গলাভ হল। গুডউইন ত এই চুতা পাইয়া ঝগড়া শুরু করিলেন এবং বলিতে লাগিলেন, “দেখছ দেখছ এই খৃষ্টানগুলাের স্বর্গের ধারণা দেখছ! খৃষ্টান-ধৰ্ম্মটা একেবারে গেছে, এটা আর জগতে চলবে না।” এই কথা শুনিয়া বুড়ী ঝি বাসনগুলি লইয়া রাগিয়া চলিয়া গেল। স্বামীজীর থুথু ফেলার খুব অভ্যাস ছিল তাই তিনি আতসিখানার ফেণ্ডারে ( fender) থুথু ফেলিতেন। একদিন ফোরে থুথু ফেলা দেখিয়া বুড়ি ঝি ত মহা রাগিয়া গিয়া বর্তমান লেখকের উপর মহা তম্বিতা করিলেন। বর্তমান লেখক বলিলেন যে, তিনি ফেলেন নাই, স্বামীজী ফেলিয়াছেন তাহাকে গিয়া বল না? স্বামীজীর নাম শুনিয়াই ত বুড়ি ঝি ভড়কে গিয়া বলিতে লাগিল, “না, স্বামী একজন খুব বড় লোেক; আমি তাঁকে বিশেষ শ্রদ্ধা করি, তিনি সকলের প্রতিই খুব দয়ালু, তিনি একজন বড় প্রেমিক পুরুষ!” (No, Swami is a great man. I love him much. He is very kind to all. He is a great loying man ) ইত্যাদি।” তখন বুড়ি ঝি থুথু ফেলার কথা ভুলে গেল এবং তাহার পর থেকে ফেণ্ডারে থুথু ফেলিলে বুড়ি ঝি আর কিছু বলিত না। বুড়ি ঝি কখন লেকচার শুনিতে যাইত না, সে সর্বদাই নীচেকার রান্নাঘরে থাকিত কিন্তু বহু লােক স্বামীজীর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিত এবং সকলেই স্বামীজীকে বড় লােক বলিত। সেই সব দেখিয়া শুনিয়াই বুড়ি ঝির স্বামীজীর প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি হইয়াছিল।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ একদিন ষ্টার্ডি দামে সস্তা পাইয়া প্রায় এক পাউণ্ড পাইপে খাবার কুঁচান তামাক (thickened minced tobacco) লইয়া আসিল। হার ভিতর নানা রকমের তামাক ছিল। ষ্টার্জি তামাক খাইত না সেইজন্য সে তামাকও চিনিত না। স্বামীজী তাঁহার পাইপে একবার করিয়া তামাক ভছেন একবার করিয়া দিয়াশলাই দিয়া ধরাচ্ছেন ও টানছেন। কিন্তু ধোয়াও বাহির হইতেছে না, সুগন্ধিও বাহির হইতেছে না। স্বামীজী ঠেসান দেওয়া বেতের চেয়ারটীতে বসিয়া পায়ের উপর পা দিয়া এক একবার তামাক টানছেন আবার খানিকটা পরে বিরক্ত হয়ে উঠে ফেণ্ডারে পাইপটা ঝেড়ে আসছেন, অর্থাৎ তামাক খেয়ে কিছুই সুখ হচ্ছে না। বারকয়েক এইরূপ করিবার পর একেবারে চটিয়া গিয়াছেন এবং মাঝে মাঝে ফোরে থুথু ফেলিতেছেন। তাহার পর গুডউইনের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “দেখ গুডউইন, ষ্টার্ডিটা বড় দুখচেটে। সস্তায় পেয়েছে তাই খানিকটা রদ্দি তামাক এনেছে। না স্বাদ না গন্ধ। এই তামাক ত টানা যায় না বাপু ; এই তামাকগুলি ফেলে দিয়ে যা তুই বাপু কিছু ভাল তামাক নিয়ে আয় ত’। আমায় সারাদিন খাটতে হবে, লােকের সঙ্গে কথাবার্তা কইতে হবে, ভাবতে হবে, একটু তামাক খাব তাও হবে না। এই দুখচেটের হাতে পড়ে আমার প্রাণটা গেল” ইত্যাদি অনেকক্ষণ বলিতে লাগিলেন। গুডউইন একটু পরে কিছু ভাল তামাক আনিয়া দিলেন। একদিন মধ্যাহ ভোজনের পর স্বামীজী তাঁহার ঠেসান দেওয়া চেয়ার- খানিতে বসিয়া ভাবিতেছিলেন বা ধ্যান করিতেছিলেন। ফক্স, ও বর্তমান লেখক অপরদিকের দেওয়ালের নিকট পাশাপাশি দুখানি চেয়ারে বসিয়া ছিলেন। স্বামীজী অনেকক্ষণ স্থিরভাবে বসিয়াছিলেন, হঠাৎ যেন তাহার মুখে বড় কষ্টের ভাব দেখা গেল। খানিকক্ষণ পরে তিনি নিশ্বাস ফেলিয়া ফক্সকে বলিলেন, “দেখ ফক্স, আমার প্রায় heart-fail ( সন্ন্যাস লণ্ডনে বিবেকানন্দ নােগ) কচ্ছিল। আমার বাপ এই রােগে মারা গেছেন। বুকটায় বড় যন্ত্রণা হচ্ছিল, এইটা আমাদের বংশের রােগ।” বর্তমান লেখক এই সব কথা শুনিয়া মনে মনে বড় উদ্বিগ্ন হইয়া রহিলেন, তখন আর কাহাকেও কিছু বলিলেন না। কিন্তু ভবিষ্যতে তাহাই হইয়াছিল। যাহা হউক সেইদিন স্বামীজীর মুখে বড় যন্ত্রণার ভাব দেখা গিয়াছিল। একদিন সকালবেলা আহারের পর স্বামীজী ও ষ্টার্ডি বাহির হইয়া গেলেন। বেলা প্রায় তিনটে সাড়ে তিনটের সময় ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন যে তিনি ফটো তুলিতে গিয়াছিলেন। তিন চার দিন বাদে এক প্যাকেট ফটো আসিল। প্রত্যেক ফটোখানি ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির। কোন- খানি একটি প্রাচীন লােকের, কোনখানি মহা তেজস্বী যুবকের, কোন খানি বা স্ফুর্তিবাজ অল্প বয়স্ক যুবকের। কিন্তু স্থিরমনে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলে স্পষ্টই বােঝা যায় যে তিনি একই কাপড় পরিধান করিয়া একই চেয়ারে বসিয়া সকল গুলি তুলিয়াছেন। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তােলা হয় নাই। স্বামীজীর মনের ভাব যেমন যেমন পরিবর্তিত হইত তাঁহার মুখের ভাবও তদ্রপ পরিবর্তন হইয়া যাইত। ইচ্ছামত মুখের স্নায়ু সকলকে তিনি নানা ভাবে পরিবর্তন করিতে পারিতেন এবং এক এক ভাবে এক এক লােক হইতেন। ইহাই তাহার এক আশ্চৰ্য্য শক্তি ছিল। তাহার ভাব অনুযায়ী দেহ পরিবর্তন হইত। দেশাই নামক জনৈক গুজরাটী যুবক প্রায়ই স্বামীজীর নিকট আসিতেন। মধ্যে মধ্যে সংস্কৃতে কবিতা লিখিয়া গুজরাটী যুবক দেশাই আনিয়া স্বামীজীকে শুনাইতেন। তঁাহার কবিতা দেখিয়া স্বামীজী দেশাইকে বলিলেন, “যে কাজ কর্তে এসেছ সেই কাজ মন দিয়া করগে যাও। সংস্কৃতে কবিতা লিখবার জন্য সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে আসার কোন দরকার ছিল না ; ও তত বাড়ীতে বসেই লণ্ডনে বিবেকানন্দ হ’ত ইত্যাদি। মাঝে মাঝে আর দু’একটি গুজরাটী যুবকও স্বামীজীর কাছে যাইত। দেশাই একদিন বলিলেন, “স্বামীজী, আপনি ত রাজযােগের লেকচার দিয়া থাকেন, হঠযােগের লেকচার দেন না কেন ?” দেশায়ের সঙ্গে স্বামীজীর হিন্দীতে কথা হইতে লাগিল। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “ওহে বাপু, এই সাধুগিরি করে পথে ঘুরে ঘুরে এতেই অন্ন জুটতাে না। তারপর আবার হঠযােগ ! হঠযােগে নিয়মিত আহার করিতে হয়, গায়ে । কম্বল ফ্লানেল মুড়ি দিয়ে থাকতে হয়। এ তাে অনেক হাঙ্গামার কথা। যাদের ভাল আহারের সংস্থান আছে, অন্যদিকে বিশেষ মন যায় না, বসে বসে বেশ করে শরীরটি তােয়াজ করছে তাদেরই হঠযােগ হতে পারে।” দেশাই জিজ্ঞাসা করিলেন, “আচ্ছা, হঠযােগে কি মনের উন্নতি হয় না ?” স্বামীজী বলিলেন, “মনের উন্নতি ও মনের সঙ্গে যে ব্যাপার সেইটাকে রাজযােগ বলে। হঠযােগে শুধু দেহটা ঠিক থাকে। বহু বৎসর ধরে দেহটা রাখা যায়। মহারাজ রণজিৎ সিংহের দরবারে বাবা হরিদাস নামে এক সাধু ছিল। সে হঠযােগী ছিল। সে একদিন হঠযােগের ক্রিয়া দেখাল। সে প্রথমে স্থির হয়ে বসল। তখন তাকে একটা সিন্দুকে পুরে শিকল দিয়ে সেটা বাঁধলে। তারপর সেটা শীলমােহর কলে। সিন্দুকটা মাটিতে পুঁতে তার উপর গম লাগাইয়া দিল। গম পাল, তখন গম কাল, অন্ততঃ পাঁচ ছয় মাস হবে ত! চারিদিকে সিপাই পাহারা রহিল। তারপর সিন্দুকটা তুলে জড়ান শিকলগুলি খুললে। সিন্দুকটা খুলে দেখে বাবা হরিদাস তার মধ্যে স্থির হয়ে রয়েছে শুধু ব্ৰহ্ম- তলার কাছটা একটু গরম। তখন তার শিষ্যরা অনেক গাছ গাছড়ার রস নিয়ে পিঠে মালিস করে তার জ্ঞান ফিরিয়ে নিয়ে এল। মহারাজ রণজিৎ সিংহ তাকে অনেক অর্থ দিতে চাহিলেন কিন্তু সে কিছুই নিলে লণ্ডনে বিবেকানন্দ । শেষ জীবনটা তার বড় ভাল ছিল না। হঠযােগে মনের কোন উন্নতি হয় না শুধু দেহটা নিয়েই নাড়াচাড়া করে। মনের ব্যাপারে রাজ- যােগই একমাত্র পথ” ইত্যাদি বলিতে লাগিলেন। ফক্স, স্বামীজীর প্রতিভা দর্শনে এতদূর আকৃষ্ট হইয়াছিল যে কোন তর্ক উঠিলে সে স্বামীজীকে প্রামাণ্য বলিয়া উল্লেখ করিত। স্বামীজীর প্রতি ইতিহাসের কথা উঠায় ফক্স, বলিল যে স্বামীজী বলেন, ফল্পের একা। “The French are the Persians of Europe" অর্থাৎ এসিয়াতে পূর্বে পারস্যবাসীরা যেরূপ ভােগবিলাসিতা করিয়াছিল সেইরূপ ইউরােপে ফরাশী জাতিরা ভােগ বিলাসে মাতিয়াছে। ফরাশীরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে এত মাতিয়া গিয়াছে যে তাহারা সাধারণ চিত্র ত্যাগ করিয়া বিবস্ত্র (naked) চিত্র অঙ্কণ করিতেছে। ফক্সের সহিত কথাপ্রসঙ্গে স্বামীজী একদিন বলিলেন, “পায়জামা বা tailoring dress ইত্যাদি প্রথম পারস্যরা করিয়াছিল। পারস্যদের নিকট হইতে অপর জাত গ্রহণ করিয়াছে। বর্তমানে ফরাসীদেরও সৌষ্ঠব ইউরােপের অপর জাতি গ্রহণ করিতেছে।” এইরূপে উভয় জাতির সৌসাদৃশ্য দেখাইতে লাগিলেন। স্বামীজীর সহিত ফক্সের অনেক ইতিহাসের কথা হইত। স্বামীজী এক সময় বলিলেন, “মেগেস্থনিসের সময় ভারতবর্ষের লােকেরা বেশ ফরসা ছিল। মেগেহানিস হচ্ছে চন্দ্রগুপ্তের সময়কার লােক। কিন্তু তাহার পর বৌদ্ধ ধর্মের প্রাবল্য হওয়ায় তার ও অপর জাতির সহিত ভারতবর্ষের লােকের রক্ত সংমিশ্রণ হয় তাতেই জাতটা কালাে হয়ে গেছে। এই রক্ত সংমিশ্রণ হওয়ায় জাতটার মস্তিষ্ক শক্তি অনেক পরিমাণে হ্রাস হয়ে গেছে” ইত্যাদি। স্বামীজী ইতিহাসের বিষয় যখন কথা তুলিলেন তখন পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নানা গ্রন্থের উল্লেখ করিয়া বহু বিষয় বলিলেন। ১০২ লণ্ডনে বিবেকানন্দ একদিন রােম সম্রাট ভাইটালিয়াসের কথা উঠিল। গিবনের ঝােমান ইতিহাসে উল্লিখিত আছে যে, ভাইটালিয়া যে কয় রােম সম্রাটের কথা। বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন সেই সময় শুধু তিনি আহারই করিয়াছিলেন। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন যে, আসাম থেকে ময়না পাখী, ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থান হইতে ময়ূর-এ সমস্ত রােমে যেত। ময়না পাখীর মাথার ঘি-টা দুধ দিয়ে সিদ্ধ করে ভাইটালিয় তাই একটু খাইতেন। সাইবেরিয়া হইতে হােয়াইট ফক্কা আনাইয়া তাহার একটু লিভার খেতেন। লােকটার খাবার নিয়ম বিটকেল ছিল। মানুষের অজস্র অর্থ বা ক্ষমতা হইলে সে যে কি না করে তার ঠিকানা নাই, সে একটা পশু হয়ে যায়। এইরূপে তিনি গ্রীক, পারস্য, আসিরিয়া ও বাবিলিয়নদের অনেক বিষয় বলিয়া যাইতে লাগিলেন যাহা চলিত গ্রন্থে পাওয়া যায় না এবং সাধারণ পাঠকও যাহা বিশেষ জানে না। সামান্য একটি ফুল বা চিত্র উপলক্ষ্য করিয়া তিনি তদ্বিষয়ে কোন্ কোন্ জাতি কোন্ সময় কিরূপ চিন্তা করিয়াছিল সেই সকল বিষয় অনর্গল বলিয়া যাইতেন। ফক্স মাঝে মাঝে বলিত, “আমেরিকার অনেক প্রফেসর ও পণ্ডিত স্বামীজীর সমকক্ষ নন।” স্বামীজী ফক্সকে মাঝে মাঝে বলিতেন, “দেখ তােমাদের আমেরিকাটা দেখলুম, লােকগুলাে টাকা টাকা করে উন্মাদ হয়েছে। আমেরিকায় বর্ণ-বিদ্বেষ। জগত মানেই তাদের টাকা। জগতে অন্য জিনিস যে কিছু ভাববার আছে তা তাদের মােটেই হু নাই। আরে বলব কি একবার চিকাগাের এজিবিসন্ দেখতে গিয়ে বড় নাগর- দোলার উপর উঠা গেছে। দুটো লােকের মাথা ঠোকাঠুকি হয়ে গেছে কোথায় তারা অপ্রতিভ হয়ে পরস্পর মাপ চাইবে তা নয়, করলে কি না বিজ্ঞাপনের কাৰ্ডখানি পরস্পরের হাতে দিল । এই উপলক্ষ্যে যদি লণ্ডনে বিবেকানন্দ কারবারের কিছু সুবিধা হয়, মাল বেচে যদি কিছু টাকা হয়। ওরা এমন কারবারী লােক। লােকগুলাের মুখে আর কোন কথা নাই শুধু কারবারের কথা। কিন্তু যখন টাকাটা দেশে খুব জমে যাবে তখন মনটা উচ্চ চিন্তার দিকে যাবে, তখন ঐ দেশে বড় দার্শনিক, চিত্রকর ও গায়ক প্রভৃতির উদ্ভব হবে। আরে আমেরিকায় বড় একটা নাপতের দোকানে যাওয়া মহা বিভ্রাট! সঙ্গে একজন লোেক নিয়ে যেতে হয়, তিনি হলেন জীবন্ত সাটিফিকেট-নইলে ভদ্র দোকানের নাতেরা মলিন বর্ণের, লােককে কামাইবে না। কারণ মলিন বর্ণের লােক হইলে তাহারা মিশ্রিত নিগ্রো বলিয়া ধরিয়া লয় । সে এক মহা বিভ্রাট! বর্ণ-বিদ্বেষটা আমেরিকায় বড় প্রবল দেখেছি। একদিন বেলা দুইটা তিনটার সময় স্বামীজী ঘরের কোণের কাছে ঠেসান দেওয়া চেয়ারটির উপর পায়ের উপর পা দিয়া ঠেস দিয়া বসিয়া আছেন। চক্ষু দুটি মুদ্রিতযেন কি ভাবিতেছেন। অনেকক্ষণ এইরূপ ভাবে স্থির হইয়া রহিলেন। ফক্স, বর্তমান লেখক ও আর কয়েকজন দেওয়ালের নিকট স্থির ভাবে বসিয়া আছেন। স্বামীজী হঠাৎ পায়ের উপর পা দিয়া খাড়া হইয়া বসিলেন এবং গম্ভীর মুখে বলিতে লাগিলেন, “দেখ ফক্স, আমি পল ও খৃষ্টান ধৰ্ম্মটার বিষয় ভাবছিলুম। দেখলুম কি জান, একটা নগণ্য ইহুদীদের ধর্ম গােটাকতক জেলে মালার হাতে ছিল। সে সময় গ্রীক ও রােমান এরা দুটি প্রধান জাত। ইহুদীরা তখন পরাধীন জাত। পল সেই জেলে মালাদের ভাবগুলির অ্যাড- ভােকেট হল। Paul was a learned tanatic সেইজন্য সে গ্রীক দর্শন ও রােমান সভ্যতাকে উল্টাইয়া ফেলিল। শুধু ধৰ্ম্মভক্তিতে কাজ চলে না, fanatic গুলাে জেতে। আমি কি জান? Paul was a learned fanatic, I am a learned fanatic and I like to create a band ১০৪ লগুনে বিবেকানন্দ of learned fanatics. দেখ, শুধু fanaticগুলাে কোন কাজের নয় ওটা হচ্ছে brain disease, ওতে বড় অনিষ্ট করে । Learned fanatic হলে কাজ চলে” এইরূপ কথা তিনি উত্তেজিত হইয়া বলিতে লাগিলেন ও সকলে মােহিত হইয়া শুনিতে লাগিল। এইজন্য অনেকেই বলিতেন যে, What Paul was to Jesus, Vivekananda is to Ramkrishna. একদিন সকালবেলাকার বক্তৃতা হইয়া গেলে স্বামীজী ধীরে ধীরে সিড়ি দিয়া নামিতে লাগিলেন। বৃদ্ধা মিস্ মূলারও সঙ্গে সঙ্গে নামিতে- ছিলেন। পূৰ্ব্বে মিস্ মূলার ও সারদানন্দ স্বামীর ঝগড়ার কথা উল্লেখ করিয়াছি। স্বামীজী মিস্ মূলারকে মিষ্ট ভাষায় কিছু ভৎসনা করিবার 69 cu antistata, “We are all monomaniac, I am monomaniac for my preaching of Vedanta, yon are monomaniac for your whims. The world is full of monomaniack," sports আমরা সকলেই একটু মাথা পাগল। আমি আমার বেদান্ত প্রচারের জন্য এক পাগলামী করে বেড়াচ্ছি আর তুমিও তােমার খেয়ালের জন্য এক পাগলামী কর। জগতটা পাগলায় পরিপূর্ণ। সারদানন্দ স্বামীর সহিত ঝগড়ার উল্লেখ করিয়া স্বামীজী এই কথা বলিলেন। বুড়ী ঝি যাহা বঁধিত মিস মূলারের তাহা খাইতে ভাল লাগিত না। একদিন বিকাল বেলা রাগ করিয়া বলিতে লাগিল যে এই রকম রান্না আর খাওয়া যায় না ইত্যাদি বলিয়া কতক্ষণ গজ গজ করিতে লাগিল। তার- পর নিজে ভাল পােষাক পরিয়া তাহার আত্মীয়ের বাড়ীতে চলিয়া গেল। ষ্টাডি সেদিন ছিল না। স্বামীজী বিরক্ত হইয়া বলিতে লাগিলেন, “আর পারিনি বাপু, কেবল কোদল, কেঁদল ! পান থেকে চূণ খলেই বুড়ী টং হয়ে যায়। যাক, দিনকতক ওর আত্মীয়ের বাড়ী গিয়ে থাকুক। দিনকতক খেয়ে দেয়ে কিছু ঠাণ্ডা হয়ে আসবে। তারপর স্বামীজী, ১০৫ লণ্ডনে বিবেকানন্দ সারদানন্দ স্বামী, গুডউইন ও বর্তমান লেখক আহার করিতে বসিলেন। স্বামীজী দু’ চার চামচ খাইয়াছেন এমন সময় গুডউইনকে বলিলেন, -“গুডউইন, ডায়েরিটা দেখ ত আজ কোন engagement আছে কি না?” গুডউইন তাড়াতাড়ি করিয়া ডায়েরিটা খুলিয়া দেখিলেন যে ঠিক সেই সময় পার্ক লেনে এক ডিউকের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ। স্বামীজী ঘড়ি খুলিয়া দেখিলেন যে নির্ধারিত সময়ের আর মিনিট দশেক বাকী আছে। তিনি চঞ্চল হইয়া উঠিয়া পড়িলেন। সকলেই আহার ত্যাগ করিয়া সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া পড়িলেন। সেই অল্প সময়ের মধ্যে কাপড় বদলাইতে হইবে, জুতা বদলাইতে হইবে, গাড়ী ডাকিতে হইবে এবং সেখানে পৌছিতে হইবে। স্বামীজী ত তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে গিয়া সার্ট, কলার, ভেষ্ট ইত্যাদি পরিলেন। যে জুতা পায়ে ছিল তাহা ছাড়িয়া বুট জুতা পরিলেন। কিন্তু এত চঞ্চল হইয়াছিলেন যে বুটের ফিতা বাঁধিতে পারিতেছিলেন না এবং ক্রমাগত বলিতে লাগিলেন, “কি হবে রে গুডউইন, আমি যে পাচ্ছিনা, তুই সব ঠিক করে দে।” গুডউইন তাড়াতাড়ি করিয়া বুটের ফিতাটা বাঁধিয়া দিলেন। এমন সময় স্বামীজী বলিলেন, “ওরে মাথার টুপিটা আতে ভুলে গেছি।” গুডউইন দৌড়িয়া গিয়া টুপিটা লইয়া আসিলেন। আবার খানিকক্ষণ পরে স্বামীজী বলিলেন, “ওরে ছড়িটা আন্‌তে ভুলে গুডউইনের গেছি।” গুডউইন তাড়াতাড়ি গিয়া আবার সেবাপরায়ণতা। ছড়িটা লইয়া আসিলেন। আবার বলিলেন, “সিগারেট দে।” গুডউইন নিজের পকেট হইতে তামাক ও কাগজ বাহির করিয়া অভ্যাস বশতঃ নিজের মুখের কাছে লইয়া গেলেন। জিবের লাল দিয়া কাগজটা আঁটিতে চেষ্টা করিতেছেন এমন সময় স্বামীজী বলিলেন, “ওরে থুথু দিস্ না, থুথু দিলে বাম হয়, অমনি দে।” গুডউইন অপ্রস্তুত লণ্ডনে বিবেকানন্দ হইয়া সিগারেটটা স্বামীজীর হাতে দিলেন। স্বামীজী নিজে জিবের লাল দিয়া সিগারেটটা পাকাইয়া মুখে দিলেন ও গুডউইন পকেট হইতে দেশলাই বাহির করিয়া কাঠি জ্বালাইয়া আগাইয়া দিলেন। স্বামীজী দু'এক টান টানিয়া বলিলেন, “ওরে একটা গাড়ী ডেকে দে।” গুডউইন দৌড়াইয়া গিয়া একটা হাস্যাম গাড়ী ডাকিয়া লইয়া আসিলেন। সময় মাত্র পাঁচ মিনিট বাকী আছে। গাড়ােয়ানকে পার্ক লেনের বাড়ীর ঠিকানা বলিয়া দিয়া বলিলেন যে তােমার যা ভাড়া তা তুমি পাবে আর তুমি ঠিক সময় পৌছাইয়া দিতে পারিলে কিছু বসি পাবে। তুমি গাড়ী উড়াইয়া লইয়া যাও। এমন সময় স্বামীজী পকেটে হাত দিয়া বলিলেন, “ও গুডউইন, পকেটে যে কিছু নাই।” গুডউইন তখন আবার ৫ পাউণ্ড আনিয়া দিলেন। এই সমস্ত ঘটনা ঘটিতে দু’তিন মিনিট লাগিয়াছিল। গুডউইন এই অল্প সময়ের মধ্যে এই সমস্ত খুঁটিনাটি কাজ করিয়াছিলেন ; যেন চরকীর কলের মত ঘুরিয়াছিলেন। স্বামীজী চলিয়া যাইবার পর পুনরায় সকলে আহার করিতে বসিলেন। গুডউইন দু’এক চামচ মটর ডাল খাইয়া বলিতে লাগিলেন, “কি সুস্বাদু জিনিস! কি সুন্দর জিনিস! আমি ইহা খাইয়া সমস্ত জীবন কাটাইয়া দিতে পারি” এই বলিয়া নানা প্রকার মুখভঙ্গী ও মুস্তক সঞ্চালন করিতে লাগিলেন। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক গুডউইনের ভাব দেখিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন। সেদিন স্বামীজীর আসিতে রাত্রি হইয়াছিল। সকলে শয়ন করিবার পর তিনি ফিরিয়াছিলেন সেইজন্য বেলা পর্যন্ত একটু নিদ্রা গিয়াছিলেন। সকলের প্রাতঃভােজন হইয়া গেলে পর স্বামীজী ড্রেসিং গ্রাউন পরিয়া আহার করিতে লাগিলেন। আহার হইয়া যাইবার পর তিনি নিজের চেয়ারখানিতে বসিয়া একটু তামাক খাইতে লাগিলেন। সেদিন মনটা ১০৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ বেশ প্রফুল্ল। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক দেওয়ালের নিকট বসিয়া আছেন। স্বামীজী কখনও চেয়ারে বসিতেছেন কখনও বা টেবিলের দিকে পায়চারি করিতেছেন। স্বামীজী মৃদু মৃদু হাসিতে হাসিতে সারদানন্দ স্বামীকে বলিলেন, “ওরে শরৎ, দেখলি তাে তাের কলিকাতার ঢের হােড়া চোড়া লােক যারা এখানে আসে তাদের কিন্তু কেউ পোঁছে না। ডিউরা কি তাদের সঙ্গে খায় রে। অনেক সুপারিশ নিয়ে গেলে তবে তাদের সঙ্গে দেখা করে। আর দ্যা আমাকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে খাওয়াচ্ছে। আমি হচ্ছি teacher class (শিক্ষক), তাই আমাকে সম্মান করে। আমি ইংরাজগুলাের মত ধনী, মানী, জ্ঞানী—সবার মাথায় পা দিয়ে চলি। আর দেখছিস্ তত এরা জুজুবুড়ি হয়ে আমার সম্মুখে থাকে। এদের হাড়ে হাড়ে বেদান্ত ঢুকিয়ে দিয়ে যাচ্ছি; এখন থেকে এরা ইণ্ডিয়াকে অন্য চক্ষে দেখবে, সম্মান করে ইণ্ডিয়ার কথা শুবে” এই বলিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন। বেলা দেড়টা দুটোর সময় স্বামীজী ফক্সকে বলিলেন, ‘দূর, বােজ বােজ একঘেয়ে খাওয়া যায় না। ফক্স, চ—দুজনে গিয়া একটা হােটলে খেয়ে আসি” এই বলিয়া দু’জনে বাহিরে খাইতে চলিয়া গেলেন। গরমকাল—একটা বাক্স করে আম আসিল। মিস্ মুলারকে ভারতবর্ষ হইতে কে একজন বাক্স করে আম পাঠিয়ে দিয়েছে। বাক্সের গায়ে হাওয়া যাইবার জন্য ফুটো ফুটো দাগ করে দিয়েছে এবং প্রত্যেক আমটি কাগজ মুড়ে থাকে থাকে বাক্সের ভিতর সাজিয়েছে। আসিতে প্রায় মাসাবধি হইয়াছে, এইজন্য আমগুলি তুবড়ে তুবড়ে গিয়াছে; তেমন আর স্বাদ নাই। স্বামীজী গুডউইনকে বলিলেন, “গুডউইন, খানিকটা বরফ এনে আমগুলােকে ভিজাইয়া দাও ত, তা হলে আমার কিছু স্বাদ হবে।” sot লণ্ডনে বিবেকানন্দ গুডউইন তাড়াতাড়ি করিয়া মাছের দোকান হইতে বরফ আনিলেন। লণ্ডনে মাছ পচে যায়, সেইজন্য অতিশয় যত্ন করিয়া মাছে বরফ দিয়া রাখে। বরফের দোকান ভিন্ন নাই। মাছের দোকানেই বরফ পাওয়া যায় এবং দোকানগুলিও বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। গুডউইন বরফ আনিয়া গােটাকতক আম বরফেতে দিয়া একটা চিনামাটীর বড় বাটিতে আমগুলি রাখিয়াছিলেন। আমগুলিও পরে কনে ঠাণ্ডা হইল এবং খাইতে কিছু ভাল হইল। ফক্স আমেরিকাতে কখনও আম দেখে নাই। তারপর আমগুলির মাঝে আঁটি রাখিয়া দুই ধারে দুই চালা করে কাটা হইল। কি করিয়া খাইতে হইবে ফক্স তাহা জানে না। ফক্স ছুরি, কাটা, চামচে দিয়া অনেক উপায় অবলম্বন করিল, কিন্তু কিছুতেই তার আম খাওয়ার সুবিধা হইল না। স্বামীজী ফক্সকে স্নেহভাবে বলিলেন, চাচে দিয়ে কুরে কুরে খাও (Try with your spoon, coo] it out)। ফক্স তখন তদ্রুপ করিয়া খাইতে আরম্ভ করিল। স্বামীজী তখন গুডউইন প্রভৃতিকে ভারতবর্ষের নানা স্থানের আমের কথা বলিতে লাগিলেন। বিদেশে বসিয়া নিজের দেশের জিনিস খাওয়া যে কি আনন্দদায়ক ও প্রীতিকর তাহা সকলেই বেশ বুঝিতে পারিলেন। দেশানুরাগটা সামান্য একটা আবেগেই বাড়িয়া উঠিল। একদিন সকালবেলা গুডউইন সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখককে “ওয়েষ্ট মিনিষ্টার অ্যাবি” দেখাইতে লইয়া গেলেন। ওয়েষ্ট মিনিষ্টার পাথরের প্রাচীন বাড়ী, অনেক যায়গায় দেখিতে আৰি। অন্ধকার এবং স্থানে স্থানে পাথরে মরিচা ধরিয়াছে। তথায় বড় বড় লােকের সমাধি আছে ; কাহারও বা মেঝের সঙ্গে একভাবে মিলানাে এবং উপরে পাথরের উপর বর্ণনা লেখা আছে। রাজা বা কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির সমাধি জমীর উপর গাঁথুনি ও পাথরে নানা লণ্ডনে বিবেকানন্দ প্রকার কারুকার্য আছে। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক বিশিষ্ট ব্যক্তির সমাধির নামগুলি পড়িয়া দুই হাত তুলিয়া প্রণাম করিতে লাগিলেন। গুডউইন তাহাতে মুচকে মুচকে হাসিতে লাগিলেন। অবশেষে অভিষেক সিংহাসনের কাছে লইয়া গেল। একখানা সামান্য চেয়ার ( কাঠের বা পাথরের এক্ষণে ঠিক মনে নাই) তার মাঝে একখানা পাথরের চাপ। গুডউইন টুপি খুলিয়া প্রণাম করিলেন এবং তৎসঙ্গে সারদানন্দ স্বামী আর বর্তমান লেখকও প্রণাম করিলেন। তারপর William the Firstএর দরবার ঘর দেখাইতে লইয়া গেলেন। গুডউইন সেখানে নিজের জাতের গৌরব করিয়া বুক ফুলাইয়া নানা কথা কহিতে লাগিলেন। সম্মুখে একখানা চামড়ার কাগজে পুরান ভাষায় কি লেখা রহিয়াছে। গুডউইনের জাতিগত গৰ্ব্ব-কথা শুনিয়া সঙ্গী দু’জনের একদিকে যেমন আল্লাদ হইতে লাগিল, তেমনি অন্যদিকে নিজেদের হীন অবস্থার কথা স্মরণ করিয়া দুঃখ আসিতে লাগিল। তারপর তিনজনে নানাদিক দেখিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। গুডউইন বলিলেন, “প্রত্যেক লম্বা লম্বা পাথরের টালির নীচে কাহারও না কাহারও সমাধি আছে।” অপরের মৃতদেহের উপর জুতা পায়ে দাঁড়ান হইয়াছে সেইজন্য সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক সঙ্কুচিত হইয়া পিছু হটিয়া আসিলেন। সেই দেখিয়া গুডউইন হাঃ হাঃ করিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “Oh you supperstitious Hinduis. এতে হয়েছে কি? এখানে ত সব পাথরের নীচেই সব মাটির নীচেই এইরূপ অস্থি আছে। ওতে কি হয়েছে। আমরা ওসব কিছু মানিনা।” যাহা হউক এই সামান্য কথাটিতে জাতিগত ভাব বেশ প্রকাশ পাইল। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক গুডউইনের মুখের দিকে চাহিয়া বলিতে লাগিলেন “ও কি কথা, আমরা মৃত ব্যক্তিকে বিশেষ সম্মান করিয়া থাকি।” একদিন প্রাতভর্ভাজনের পর স্বামীজী আপনার চেয়ারে বসিয়া ১১০ লণ্ডনে বিবেকানন্দ আছেন। গুডউইন ও বর্তমান লেখক দেওয়ালের নিকট চেয়ারে বসিয়া আছেন। প্রসঙ্গক্রমে আমেরিকার কথা উঠিল। গুডউইন বলিলেন, “ডেট্রয়েটে আমাদের যা সভা হয়েছিল সে সব্বার চেয়ে বড় ; প্রায় ছয় হাজার লােক সমাগম হয়েছিল। সেদিন আপনার (স্বামীজীর প্রতি লক্ষ্য করিয়া) অমানুষিক শক্তিতে কথা বাহির হয়েছিল। আমি সেদিন আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলুম।” স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “আমেরিকায় বেদান্ত প্রচারে কে কে সহায় হইবে ?” গুডউইন বলিলেন, ‘আমেরিকায় যে বড়লােকগুলাে সভায় আস্ততা আমি তাদের আঙ্গুলে গুণতে পারি।” স্বামীজী বলিলেন, “টেস্লা ও এডিসনের কি ভাব?” গুডউইন বলিলেন, “টে স্বপক্ষে হবে কিন্তু এডিসনের সহিত আদায় কাঁচকলায়।” এইরূপ আমেরিকার অনেক বিশিষ্ট লােকের নাম উল্লেখ করিয়া কে কে সহায় হইবে এবং কে কে সহায় হইবে না, সেই সকল বিষয় কথাবার্তা হইতে লাগিল। বেদান্ত প্রচার যে আমেরিকায় স্থায়ী হইবে, এই কথা গুডউইনের মুখ হইতে শুনিয়া স্বামীজী বেশ একটু উৎসাহিত ও আনন্দপূর্ণ হইলেন। ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডে নাপিতের দোকান প্রায় জার্মেনরাই করিত। ইংরাজ নাপিতের দোকান অপেক্ষাকৃত কম ছিল। বাড়ীর চাকর অনেকেই জার্মান ছিল, কারণ জাৰ্মানরা অল্প পয়সায় কাজ করিত এবং ইংরাজরা একটু বেশী পয়সা চাহিত। এইজন্য অনেকে জার্মান চাকর রাখিত ও জার্মান নাপিতের দোকানে যাইত। স্বামীজীর যখন কাটিবার আবশ্যক হইত, তখন তিনি কোন বিশিষ্ট লােকের সহিত গিয়া চুল ছাঁটিয়া আসিতেন। সাধারণের সেই সকল দোকানে প্রবেশ নিষেধ। সেই সমস্ত দোকান একটা রাজবাড়ীর সমান। তবে বিশিষ্ট লােক সঙ্গে যাওয়ায় স্বামীজীকে অভ্যর্থনা করিয়া চুল কাটিয়া দিত। মাথার চুল লণ্ডনে বিবেকানন্দ ইংলণ্ডে ও অপর দেশে নাপিতে চুল দাড়ী কাটিয়া দিবে, কিন্তু কখনও নখ কাটিয়া দিবে না। হাত পায়ের নখ নিজেদের ছুরি দিয়া কাটিতে হয়। একদিন বিকালে তিনটে চারটের সময় স্বামীজীর পায়ের , নখ কাটিবার ইচ্ছা হইল। নখ কাটিবার যন্ত্রের রিংটা আনিলেন ও পায়ের বুটজুতা ও মােজা খুলিয়া নখ কাটিতে বসিলেন। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “আরে, আমেরিকায় নাপিতের দোকানে যাওয়া কি ফেঁদ। কোন বিশিষ্ট লােক সঙ্গে করে না নিয়ে গেলে নাপিতের দোকানে ঢুকতে দেয় না, বলে কিনা নিগ্রো বা মিশ্রিত নিগ্রো, সে একটা মহা বিরক্তির কথা। নাপিতের দোকানে চুল কাটতে যাবে, আবার সঙ্গে সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে হবে। কি দুর্গতি! ইংলণ্ডে কিন্তু সেই ভাবটা তত নয়, কলেই সব জায়গায় যেতে পারে। চিকাগােতে জর্জ হেলের বাড়ীতে আছি, হাতের পায়ের নখ বড় হয়েছে। হেলের মেয়েদের কাছে pen-knife চাইলুম। তারা বল্লে কি করবেন? আমি বল্লম, হাত পায়ের নখ বড় হয়েছে, কাটব। এই ত হেলেদের মেয়েদের হুড়ােহুড়ি লেগে গেল। কন্যাটি অতি সাগ্রহে পদানত হয়ে মেঝের গালিচার উপর বসে আমার জুতাে খুলে মােজা খুলে, অতি শ্রদ্ধা ভক্তি করে দুই পায়ের আঙ্গুলের নখ কেটে দিয়ে তাহার পর পুনরায় মােজা জুতা পরিয়ে দিয়ে তবে উঠে চেয়ারে বসিল এবং নাপিতের মত আমাকে বলতে লাগলাে “আমায় দাম দিন, আমরা আমেরিকান, দাম না পেলে কোন কাজ করি । নাপিতের দোকানে গেলে দু’তিন ডলার দিতে হােত। আমি ঘরে বসে নখ কেটে দিয়েছি, আমাকে দু’তিন ডলার মজুরি দিন।” এই বলে সে হাস্য করতে লাগল। আমিও হাসতে হাসতে বল্লুম, “আমার যে পা ছুঁতে পেয়েছ আর নখ কাটবার অধিকার পেয়েছ এর জন্য আমায় কি দেবে দাও ?” এই কথা বলিয়া সকলে খুব হাস্য করিতে লাগিল।

একদিন সকালবেলা বক্তৃতা শেষ হইবার পর সকলেই খুত্র হর্ষিত ও প্রফুল্ল। গুডউইন ও সারদানন্দ স্বামী আহলাদে যেন অধীর হইয়াছেন। আগন্তুক ব্যক্তিরা সিড়ি দিয়া নামিয়া যাইবেন। গুডউইন ও সারদানন্দ স্বামী সিড়ি দিয়া নামিয়া চাতালের উপরে আসিলেন। বর্তমান লেখক পূৰ্বেই নামিয়া আসিয়া নীচে দাঁড়াইয়াছিলেন। তিনি উপর দিকে চাহিয়া দেখেন যে, গুডউইন ও সারদানন্দ স্বামী দুই মূর্তি স্কুলের বালকের মত খেলা করিতেছেন। গুডউইন সারদানন্দ স্বামীকে ধাক্কা দিতেছেন। গুডউইন ধাক্কা দিতে দিতে বলিতেছেন, “You cooky Swami, you clevil Swami, you do not meditate but close your eyes and think your next meal. You meditate only upon your meal”. অর্থাৎ বঁধুনি স্বামী, দুষ্ট স্বামী, তুমি ধ্যান কর না, শুধু চক্ষু দুটি বুজিয়ে খাবার কথা কেবল ভাব। সারদানন্দ স্বামীও গুডউইনকে কিছু কিছু পাল ও ধাক্কা দিতেছেন। বর্তমান লেখক নীচে হইতে এই দুটি মিসের বালকের মত খেলা দেখিতেছেন। সেইদিন গুডউইন ও সারদা- নন্দ স্বামীর আদের মাত্রা কিছু বেশী হইয়াছিল। এমন সময় স্বামীজী উপর হইতে নামিয়া আসিয়া পিছন দিক থেকে তাঁহাদের ব্যাপার দেখিয়া বলিলেন, “What are you doing, you two chaps ?” অর্থাৎ দুটো ছোঁড়ায় কি কচ্ছি রে? স্বামীজীর কথা শুনিয়া দুজনে অপ্রস্তুত হইয়া পড়িলেন এবং দৌড়িয়া গিয়া নীচেকার ঘরে শান্তশিষ্ট বালকের মত লণ্ডনে বিবেকানন্দ বসিয়া রহিলেন—যেন কিছু জানেন না বা কিছু করেন নাই। স্বামীজী নীচেকার ঘরে আসিয়া গম্ভীর হইয়া অন্য কথা কহিতে লাগিলেন। ষ্টার্জি “রুবাব” খাইতে বড় ভালবাসিতেন। ইহা এক রকম ঘােট ছােট নলের মত ফাপা শিকড়, খাইতে টক ও মিষ্ট মিশ্রিত। ভারত- বাসীর মুখে ভাল লাগে না। সেইগুলি একটী চীনে মাটীর বাটির ভিতর রাখিয়া একখানি ময়দার রুটি দিয়া উনুনে গরম করে। ইহাকে ষ্টার্ট বা পাই বলে। আহার করিবার সময় উপরকার রুটীখানি কাটিয়া ভিতরকার সেই শিকড়গুলি খাইতে হয়। আহার করিতে একটু মিষ্টি মিষ্টি লাগে, ষ্টার্ডি এই রুবাব খাইতে বড় ভালবাসিতেন কিন্তু অপরের তাহা খাইতে ভাল লাগিত না। একদিন প্রাতর্ভাজনের পর সকলে বসিয়া আছেন এমন সময় ষ্টার্ডি । পাউরুটি পাঁউরুটি ও চাপাটির কথা তুলিলেন। তিনি বলিলেন, ময়দাকে খামিরা দিয়ে পচিয়ে পাঁউরুটি তৈয়ারি চাপাটির কথা। করে; ইহাতে ময়দার স্বাদ আর কিছু থাকে না। যাদের হজমশক্তি কম তাদের পক্ষে এটা চলতে পারে, কিন্তু আমি যখন ভারতবর্ষে ছিলুম তখন চাপাটি খেতুম। চাপাটি টাকা ময়দায় তৈরি হয়, খামিরা দিয়ে পচান হয় না। প্রথমে দু' একদিন পেটের গােল হয়েছিল, তারপর বেশ হজম হতে লাগল। দেখলুম চাপাটি বেশ পুষ্টিকর আহার, loaf তদ্রুপ নয়। আমি সেইজন্য মাঝে মাঝে কোন গতিকে চাপাটি করে খাই। ইংলণ্ডে চাপাটিটা চলিলে অনেকের স্বাস্থ্য ভাল হবে। যখন ভারতবর্ষে ছিলুম তখন অতি কদৰ্য্যভাবে ভাত পরিবেশন করিত। অতি কদৰ্যভাবে নখওয়ালা অপরিষ্কার কালাে কালাে আঙ্গুল গুলাে ভাতের ভিতর জুড়ে দিয়ে ভাত তুলে সকলের পাতে দিত। সেই সবে আমার ঘৃণা হত। যদি একটা চামুচে বা অন্য কোন রকম জিনিস ১৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ দিয়ে ভাত তুলে পাতে দেয় তা হলে খেয়ে তৃপ্তি হয়। Loaf গুলি বড় নােংরা। উপস্থিত সকলে স্থির হইয়া ষ্টার্ভির কথা শুনিতে লাগিলেন, কেহই কোন কথা কহিলেন না। একদিন প্রাতর্ভাজনের পর আলমারীর ওপর চিনে মাটির পাত্র করিয়া কিছু ফল রহিয়াছে, তাহার ভিতর ষ্ট্রবেরী (strawberry) কিছু ছিল। স্ট্রবেরী আধ ইঞ্চি লম্বা পুরুষ্টো ফল, গায়ে বিনকুড়ি বিনকুড়ি ঘামাচির মত দানা, ভিতরে অনেকগুলি ঘােট ঘােট বীচি থাকে। খাইতে ঈষৎ ট ও মিষ্টি। ভারতবাসীদের মুখে বিশেষ ভাল লাগিত না। গুডউইন তাঁহার স্বজাতির প্রত্যেক জিনিসকে ভালবাসিতেন। গুডউইন বর্তমান লেখককে বলিলেন, “Strawberry খাও, বড় সুন্দর, ইংরাজী ফল বড় ভাল জিনিস।” বর্তমান লেখক অগত্যা অনিচ্ছায় দু’একটি খাইলেন, বিশেষ কিছু ভাল লাগিল না, সেইজন্য আর হাত বাড়াইলেন না। গুডউইন সেই দেখিয়া চটিয়া গিয়া বলিলেন, “অমন করে কি খায়, গুঁড়াে চিনিতে জুবড়ে খেতে হয়। বর্তমান লেখক অগত্যা তাহাই করিলেন ও মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন, হায়রে কপাল, যে জীব আম খায় সেই জীব কিনা বুনন গুড়কামানী খাচ্ছে। গুডউইন কিন্তু চিনি দিয়া, সেই স্ট্রবেরীগুলি আজাদ করিয়া খাইতে লাগিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে উইলিয়ম হুইটলির দোকান হইতে বেলা ১টা বা ১-৩০টার সময় একজন চাকর আসিয়া নিত্য উৎকৃষ্ট ফল দিয়া যাইত। একদিন একটি আনারস দিয়া গেল, ইংলণ্ডে আনারস বড় দুষ্প্রাপ্য জিনিস ; বােধ হয় এক পাউণ্ড দাম হইবে। যাহা হউক স্বামীজী আনারস দেখিয়া বড়ই আনন্দিত হইলেন। গুডউইন তাড়াতাড়ি চুরী লইয়া আনারস ছাড়াইতে গেলেন, কিন্তু কোনদিক হইতে বা কি প্রকারে ছাড়াইতে হয় তাহা তিনি জানেন না, সেইজন্য একটু গােযােগ করিয়া লণ্ডনে বিবেকানন্দ ফেলিলেন। স্বামীজী তখন ছুরীখানা তাহার নিকট হইতে লইয়া নিজেই ছাড়াইতে লাগিলেন। গুডউইন তখন ছাড়াইবার প্রণালী বুঝিয়া লইলেন এবং স্বামীজীর হাত হইতে ছুরীটা লইয়া নিজেই যতটা সম্ভব ছাড়াইতে লাগিলেন। স্বামীজী মুখে মুখে সব বলিয়া দিতে লাগিলেন। সব টুকরা টুকরা করিয়া গুঁড়াে চিনি দিয়া ঘােট ঘােট থালে করিয়া গুডউইন সকলকে দিলেন। আনারস খাইয়া তাে গুডউইনের মহা আনন্দ! ভারতবর্ষে এমন ফল যে আছে তা তাঁহার কল্পনায় ছিল না। স্বামীজী তাহার পর আনারসের কথা বলিতে লাগিলেন, “এটা চীনে ফুল, ভারতবর্ষে পূর্বে ছিল না। সম্ভবতঃ পর্তুগীজ বা ডাচেরা চীন হইতে এই ফলটা নিয়ে আসে। ইহাকে Annanus বলিত, সেইটা অপভ্রংশ হইয়া আনারস হয়েছে, কিন্তু ভারতবর্ষে এখন ইহা অপর্যাপ্ত জম্মায়। ভারতবর্যের মাটি এমন উৰ্ব্বরা যে অনেক বিদেশী ফলও ভারতবর্ষে প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়।” যাহা হউক, আনারস একটু মুখে দিয়ে যে কি আনন্দ হইল তাহা বলিবার নয়। দেশের ফল বলিয়া সে যেন অমৃত বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। একেই বলে দেশের কাকের আওয়াজও মিষ্টি। একদিন স্বামীজী দেশাইকে miracle বা আজগুবি কত রকমের হয় সেই সম্বন্ধে অনেক কথা বলিতে লাগিলেন। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “দেখ দেশাই, তান্ত্রিক সাধুরা মদ দেশাইয়ের সহিত স্বামীজীর চোয়ান করতে জানে। কমণ্ডলু করে মদ নিয়ে যাচ্ছে, এমন সময় মদের গন্ধ পেয়ে ললাকেরা আপত্তি করলে। তান্ত্রিক সাধু অমনি তার কেরামতি দেখাতে লাগল। খানিকটা জল নিয়ে মন্ত্র পড়ে অনেক রকম অঙ্গভঙ্গী করে জলটা কমণ্ডলুর মদের ভিতর ঢেলে দিলে ; সেই জলটা মদের সঙ্গে মিশাতে যেন দুধের মত হ'ল। এই আর কি ! সকলে সাধুর কেরামতি দেখে আশ্চৰ্য্য কথােপকথন। ;

লণ্ডনে বিবেকানন্দ হয়ে গেল। দেখ, মদে জল দিলে অনেকটা দুধের মত দেখতে হয়। সাধুরা এইরূপ অনেক আজগুবি করে; এই সব আজগুবির জন্য আসল ধর্মটা হাস্যম্পদ হয়ে গেছে এবং সাধুদের প্রতি লােকেরও একটা অবিশ্বাস দাড়িয়েছে। দেখ, শিবাজীর এক গুরু ছিল সাধু, তাঁরই আশীর্বাদে শিবাজীর উন্নতি হয়েছিল। যখন মােগলদের সঙ্গে শিবাজীর যুদ্ধ হয়, তখন শিবাজীর চরেরা সাধুর মত গেরুয়া পরে’ নানা জায়গার খবর নিয়ে আস্ত ; ভারতবর্ষে সাধুর গতিবিধির বাধা নাই। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সরকার গেরুয়া-পরা লােককে বিশেষ সন্দেহের চক্ষে দেখে। এইজন্য পুলিশ গেরুয়া-পরা লােককে বড় সন্দেহ করে ও তার উপর কড়া নজর রাখে। পুনরায় স্বামীজী দেশাইকে বলিতে লাগিলেন, “দেখ, ভারতবর্ষে যখন রতা সাধুর মত ঘুরে ঘুরে বেড়াতুম, তখন একবার এক গাঁয়ে এক পাঠশালার কাছে বিশ্রাম লই। সেখানে গােটাকতক ছেলে ব্যাকরণ পড়ছিল। আমি ত দূরে একটা যায়গায় বসে আছি। আমায় দেখে কেউ কিছু বললে না, মনে করলে যে একটা অতিথি এসেছে, দুটো খেয়ে চলে যাবে, এখন বসে ক, খাওয়ার সময় দেখা যাবে। ছেলেগুলাে ভুল ব্যাকরণ পড়ছিল। তাদের ভুল পড়া শুনে আমার তাে কান ঝালাপালা হয়ে উঠল, অবশেষে আর থাকতে না পেরে তাদের ভুল সূত্রটা সংশােধন করে দিই। এই আর কি, তখন দেখে কে, তখন ছেলেগুলাে এসে আমায় মহা খাতির কতে লাগল এবং সেখানে থাকবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে আরম্ভ করল। আমার তখন মনটা বড়ই খারাপ, অন্য একস্থানে চলে যাব, সেইজন্য আমি সেখানে দুটো খেয়েই আবার অন্য দিকে চলে গেলুম। দেশাই, ভারতবর্ষে আমি ঘুরে ঘুরে দেখেছি, সাধুদের দুটি অন্নের কি দুর্গতি! তুমি সেদিন যে হঠযােগর কথা বলেছিলে, ১১৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ এখন বুঝতে পারলে কিরূপ অনাহারে থাকতে হয় ? রতা সাধুর ন্যায় ঘুরে ঘুরে সমস্ত ভারতবর্ষে দেখলুম, লােকগুলাে কি কষ্টে, কি অনাহারেই না আছে। এই কথা বলিতে বলিতে স্বামীজীর ভাবান্তর উপস্থিত হইল, হাসিমুখ চলিয়া গিয়া মহা গম্ভীর হইয়া অপূর্ণনেত্রে স্থির ভাবে বসিয়া রহিলেন। একদিন স্বামীজীর একখানি সংস্কৃত পুস্তকের প্রয়ােজন হইল। তিনি বলিলেন, “ভারতবর্ষের অনেক যায়গায় এই পুস্তকখানি খুঁজিয়াছি কিন্তু কোথাও পাই নাই।” ষ্টার্ডি দু’ চার যায়গায় অনুসন্ধান করিয়া “ইণ্ডিয়া আফিস লাইব্রেরী” হইতে আনিয়া দিলেন। স্বামীজী পুস্তক পাইয়া বড় খুসী হইলেন। গুডউইন বর্তমান লেখককে বলিলেন, “টনি হচ্ছে ইণ্ডিয়া অফিসের লাইব্রেরীয়ান্।” বর্তমান লেখক বলিলেন, “টনি হচ্ছে কলিকাতার লােক, প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। স্বামীজী যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে ফাষ্ট ইয়ার ক্লাসে পড়েছিলেন, উনি তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন।” গুডউইন বলিলেন, “টনি তাহলে স্বামীজীকে চেনে?” বর্তমান লেখক বলিলেন, “টনি কলিকাতায় বড় চাকরি করিত, তবে এখানে এত ছােট কাজ করে কেন ?” গুডউইন বলিলেন—“লাইব্রেরীয়ানের খুব বড় চাকরী, এখন তিনি বই লেখবার অনেক সুবিধা পাবেন। একদিন সকালবেলা স্বামীজী বেশ প্রফুল্ল, সকলে ঘরে বসিয়া আছেন। স্বামীজী আমেরিকায় চীনের কথা নকল করিয়া বলিতে লাগিলেন, "Me melican chinaman, me eat polk, me eat blandy, me eat evely thing,” চীনের ‘র’ স্থানে ‘ল’ প্রয়ােগ করে, সেইজন্য brandy স্থানে blandy ও porkএর স্থানে polk উচ্চারণ করিয়া থাকে। i স্বামীজী মুখভঙ্গী করিয়া নানাভাবে কৌতুক করিয়া সকলকে হাসাইতে লাগিলেন। ১১৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ স্বামীজী ষ্টাডির সহিত এক আইরি চাষার গল্প বলিতে লাগিলেন, “দেখ, আমেরিকায় এক আইরিস চাষার গল্প শুনেছিলুম। এক আইরিস চাষা সে কখন পূর্বে গির্জায় যায় নাই বা যীশুর কোন কথা শুনে নাই। বৃদ্ধ হয়ে তার মনে হল যে গির্জায় যেতে হবে। এক রবিবারে সে তত গির্জায় গেল। গির্জায় গিয়ে পাদ্রীর মুখে সে শুনিল যে ইহুদিরা প্রভু যীশুকে মারিয়াছে। এই শুনে তাে সে রেগে টং হয়ে গির্জে থেকে বেরিয়ে এসে দেখে, যে তার সুমুখ দিয়ে এক ইহুদি যাচ্ছে। সে ইহুদিকে দেখেই তাে তাকে কিলােতে লাগল, আর ইহুদিটা ভ্যাবাচ্যাকা লেগে গিয়ে মার খেতে লাগল। অবশেষে ইহুদিটি চাষাকে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি আমায় মারচ কেন ?” চাষাটি বলিল, “তুমি আমার প্রভু যীশুকে মেরে ফেলেছ, সেইজন্য আমি তােমায় প্রহার কচ্ছি।” ইহুদিটি সেই কথা শুনে তখন বলিল, সে ব্যাপার তাে ১৯০০ বৎসর পূর্বে হয়ে গেছে, এখন তার কি ?” চাষাটি বলিল, “সে সব কথা আমি জানি না, This is the first time I heard it ( অর্থাৎ এইমাত্র আমি প্রথম শুনিলাম) সেইজন্য আমি ইহুদিদের সঙ্গে যুদ্ধ কৰ্ব্ব” --স্বামীজী “This is the first time I heard it”--অতি হাস্য কৌতুক করিয়া বলিতে লাগিলেন। গল্পটি শুনিয়া ষ্টার্ডি বলিলেন, “বােধ হয় চাষাটা জীবনে এই প্রথম দিন গির্জাতে গিয়াছিল।” গল্পটি শুনিয়া সকলেই হাসিতে লাগিল। একদিন গুডউইন সারদানন্দ স্বামীর সহিত তাহার জীবনের কথা বলিতে লাগিলেন। ফ্রোয়েম গ্রামে তাঁহাদের বাস। মারকুইস্ অফ ব্যাথের প্রজা এবং তাহার বিধবা মা ও অবিবাহিতা গুডউইনের জীবন দুই ভগ্নী আছে। তাহারা কোন রকম করিয়া নিজেরাই খেটে চালায় এবং গুডউইন কখন কিছু অর্থ পাইলে মাকে পাঠাইয়া দেন। গুডউইনের বয়স তখন ২৩২৪ বৎসর। কথা লণ্ডনে বিবেকানন্দ সর্ট-ব্যাণ্ড (Short and ) তিনি ভাল জানেন। কাজ এক জায়গায় পাওয়া যায় না, সেইজন্য কখন ইংলণ্ডে, কখন আমেরিকায়, কখন অষ্ট্রেলিয়ায় ঘুরিয়া বেড়াইয়াছিলেন। প্রত্যেক জায়গার গ্রাম্যভাষা বেশ শিখিয়াছেন। গুডউইন আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়ার গ্রাম্যভাষা বলিতে লাগিলেন। বর্তমান লেখক বলিলেন “ভারতবর্ষে ইংরাজী ভাষা স্বতন্ত্র ধাজ নিচ্ছে।” গুডউইন বলিলেন, “ইংরাজী ভাষা একই বটে, কিন্তু অষ্ট্রেলিয়ায় একটু পৃথক হইয়াছে, আমেরিকায় স্পষ্টই পৃথক দেখা যার, ক্যানোয়ও ঐরূপ হইয়াছে। তবে ভারতবর্ষে ইংরাজী ভাষা স্বতন্ত্র রূপ ধারণ কৰ্বে তার আর আশ্চর্য কি?” দেশের আনুসঙ্গিক নানা কারণে ভাষা কিঞ্চিৎ মাত্র বদলাইয়া যায়। গুডউইন অষ্ট্রেলিয়ার অনেক কথা বলিতে লাগিলেন তাহা সব বুঝা গেল না। আমেরিকারও অনেক কথা বলিতে লাগিলেন তাহাও নূতন নূতন ঠেকিতে লাগিল। গুডউইন বলিলেন, “আমি অনেক দেশ ঘুরিয়াছি, শুধু ভারতবর্ষে যাই নাই। অষ্ট্রেলিয়ায় আসিবার সময় কলম্বাে হয়ে এসেছি” এই বলিয়া সারদা- নন্দ স্বামীকে হর্ষিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, “একবার অস্ট্রেলিয়া হতে জাহাজে করে আসছি, জাহাজে কোন কাজ কৰ্ম্ম নাই। দিনই বা কাটাই কি করে, রাতই বা কাটাই কি করে! কি আর করি, নাচতে শুরু কলুম, অর্ধেক রাত্রি এই করে কাটালুম। দিনের বেলা তাস খেলে বাজী ধরে অনেক টাকা হেরে গেলুম। এই রকম করে তবে দিন রাত কাটাই।” এই কথা শুনিয়া সারদানন্দ স্বামী বৰ্তমান লেখককে বলিতে লাগিলেন, গুডউইন স্বামীজীর ভক্ত হইলেও ওর ইংরাজী ভাবটা বড়ই প্রবল ; ক্রিকেট, ফুটবল খেলা একটা বাতিক, জুয়াখেলা ওর একটা নেশা। ইংরাজদের যেগুলাে দোষ ওর ভিতর সব গুলি রয়েছে।” গুডউইন সারদানন্দ স্বামীর কথা শুনিয়া বলিলেন, “আপনাদের ভাষায় বুঝি আমার ১২০ লণ্ডনে বিবেকানন্দ নিন্দা কচ্ছেন?” সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, “না, তােমার জুয়াখেলার কথা বলছি।” গুডউইন বলিতে লাগিলেন যে, একদিন এ্যাসল্ট এ্যাটু আর্মস ( Assault at arms ) রাত্রে একদল ফৌজ কেল্লা দখল কৰ্বে আর একদল ফৌজ কেল্লা রক্ষা কৰ্বে। আমরা অনেকে ত দেখতে গেলুম। রাত্রে যখন ড্রাম বাজাবে, তখন লড়াই শুরু হবে। আমরা কল্পম কি, বাজী রেখে তাস খেলা শুরু করুন। আমি ত ক্রমেই হারতে লাগলুম। এক দুই তিন করে ৪০ পাউণ্ড হারলুম। ট্রেনে করে ফিরে আসবার একটা পয়সা পৰ্যন্ত নাই। একজনের কাছ থেকে ধার করে তবে ট্রেণের টিকিট কিনি। বাজী রেখে খেলা যেন আমার একটা নেশা, পকেটে টাকা থাকলে নিজেকে সামলাতে পারি না। তার পর রাত্রি দু’টার সময় ড্রাম বাজুল। সকলে ত তাস ছেড়ে লড়াই দেখতে গেলুম। আসল লড়াই যে রকম হয় সেই রকমই হতে লাগল। স্বামীজী গুডউইনের জুয়া খেলায় হেরে যাবার কথা পূবেই জানিতেন, সেইজন্য বলিতেন, ‘ভুল করে তাের নাম রেখেছিল গুডউইন, তাের নাম হচ্ছে Bad-win।” গুডউইন ওমনি মাথা নেড়ে চোখ ঘুরিয়ে বলিতেন, “I am not Bad-win, but lam Good-win, (iood-win 1" yatan) মৃদু হাসিয়া বলিতেন, “তুই হচ্ছিস জুয়ারে, তাের জুয়া খেলাই ধ্যেয়।” লণ্ডনে রবিবারে অনেক স্ত্রীলােক হাইড পার্ক বাগানে চার্জ প্যারেড নামক স্থানে গিয়া সমবেত হয়। স্থানটিতে বড় বড় গাছ থাকায় একটু ছায়া আছে এবং অপেক্ষাকৃত উচ্চ ; সেখানে অনেক চেয়ার পাতা আছে, দু’একটি পেনি দিলে বসিতে দেয়। স্ত্রীলােকদিগের ভিতর অনেকেই অবিবাহিতা, প্রৌঢ়া বা বৃদ্ধার সংখ্যা অতি অল্প। ইহারা সকলেই ভদ্রঘরের স্ত্রীলােক ; কে কি নূতন পােষাক পরিয়াছে, কে কি নূতন জুতা লণ্ডনে বিবেকানন্দ বা অলঙ্কার পরিয়াছে, সাধারণকে দেখাইবার জন্য এই স্থানটি বড় সুযােগ। স্ত্রীলােকের চেয়ারে বসিয়া থাকে এবং অনতিদূরে পুরুষেরা ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহাদের দেখিয়া বেড়ায়। পুরুষদিগের ভিতর যাহাদের বিবাহ করিবার ইচ্ছ, তাহারা তাহাদের ভাবী পত্নী এই অবিবাহিতা স্ত্রীলােকদিগের ভিতর হইতে পছন্দ করিয়া লয় এবং পরে কথাবার্তা কহিয়া বিবাহ হয়। পক্ষান্তরে, ইহাকে Marriage market বা বিবাহের হাট বলে। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন আচার ব্যবহার, সেজন্য তাহাদের বিষয় মন্তব্য প্রকাশ করা উচিত নয় । মিস্ মূলার সারদানন্দ স্বামীকে সঙ্গে লইয়া একদিন চার্চ প্যারেড ( Church parale) দেখিতে যান। সারদানন্দ স্বামী তখন নূতন লণ্ডনে গিয়াছেন তাহার নিকট সবই আশ্চৰ্য্যবৎ। তিনি ফিরিয়া আসিয়া গল্প করিতে লাগিলেন যে, একটি স্ত্রীলােক এক জোড়া নূতন জুতা পরিয়াছে, জুতাটি পায়ের চেয়ে ছােট—পায়ে বিস্তর কষ্ট হইতেছে, কিন্তু জুতাটি ভাল, পাঁচজনকে দেখাইতে হইবে, সেইজন্য কষ্ট স্বীকার করিয়াও জুতাটি পায়ে দিয়া রাখিয়াছে। চলিবার সময় অতি কষ্টে খুড়িয়া খুড়িয়া হাঁটিতেছে, তবু কিন্তু তাহার সেই জুতাটি পরা চাই, ইত্যাদি কথা নানা রকম ব্যঙ্গ করিয়া বলিতে লাগিলেন। একদিন বেলা ৩টা ৩০টার সময় স্বামীজী বলিতে লাগিলেন যে, আমেরিকায় এক দম্পতী ছিল, উভয়ে চিত্রকর, দেখিতে বেঁটে বেঁটে গােল গাল শরীর। ছুটিতে বন্ধুভাবে ছবি আঁকিয়া আমেরিকার বেড়াইত। তাহারা স্বামীজীকে বড় ভক্তি করিত চিত্রকরের কথা। ও মাঝে মাঝে বাইক করিয়া আসিয়া তাহাদের যন্ত্রপাতি লইয়া উভয়ে স্বামীজীর দুই ধারে বসিত। স্বামীজী মাঝখানে বসিয়া থাকিতেন, আর তাহারা দু’জনায় স্বামীজীর ছবি আঁকিতে লণ্ডনে বিবেকানন্দ শুরু করিত। দু’জনার জি হইত যে কে কাহার চাইতে ছবি হুবহু তুলিতে পারে এবং সেইরূপ ব্যগ্রভাবে দু’জনায় ছবি আঁকিতে চেষ্টা করিত। স্বামীজী মাঝখানে আড়ষ্ট ভাবে বসিয়া রহিলেন, আর তাহারা দু’জনে ছবি তুলিতে লাগিল। তাহাদের ছবি তােলার চেয়ে পরস্পরের প্রাধান্যের ইচ্ছাটাই বড় আনন্দ লাগত। এই গল্পটি বলিতে বলিতে স্বামীজী খুব হাসিতেন। একদিন কাপ-বাের্ডের উপর পাত্র করিয়া একটু আম-তেল রয়েছে। গুডউইন আমের আচার একটু মুখে দিয়া মুখ বিকৃত করিয়া বলিয়া উঠিলেন “What a nasty stuff!” যথার্থই তাঁহার কষ্ট হইয়াছিল। স্বামীজীর আমেরিকায় অবস্থান কালে, কলিকাতা হইতে সান্ন্যাল মহাশয় আচার, আম-তেল, ডাল, বড়ি প্রভৃতি পাঁচ রকম জিনিস স্বামীজীকে পাঠাইয়া দেন। স্বামীজী তাঁহার প্রিয় জিনিসগুলি অতি সন্তর্পণে সঙ্গে করিয়া বেড়াইতেন এবং যখন রান্না করিবার ইচ্ছা হইত তখন পাঁচ রকম মসলা দিয়া কিছু তরকারী রাধিতেন ও গুডউইনকে একটু আধটু খাইতে দিতেন। গুডউইন তত ঝাল ও হিং দেওয়া বড়ি খাইয়া একেবারে মুখ বিটকেল করিয়া উঠিতেন ও মহা রাগিয়া বলিতেন, এইরূপ বদ-গন্ধওয়ালা জিনিস ভারতের লােকেরা খায় ! বড়ির হিংএর গন্ধে তঁাহার বড় কষ্ট হইত। জিনিসগুলির বাঙ্গালা নাম শুনিয়া গুডউইন বিকৃত শব্দ উচ্চারণ করিয়া ব্যঙ্গ করিয়া নানা ভাবে নামগুলি বলিতে লাগিলেন। গুডউইন বড় নকুলে ছিলেন সেইজন্য নানাভাবে ব্যঙ্গ করিয়া সকলকে হাসাইতে লাগিলেন। এপ্রিল বা মে মাস, তখন একটু একটু সকাল বেলা ঠাণ্ডা আছে। বর্তমান লেখক নুতন গিয়াছেন ঠাণ্ডা সহ করিবার তত অভ্যাস নাই, সেইজন্য চেয়ারে বসিবার সময় দুই পকেটে দুই হাত দিয়া রাখিয়াছিলেন লণ্ডনে বিবেকানন্দ এবং বৃদ্ধা মিস্ মূলার ঘরে ঢুকিবার সময় তাহাকে সম্ভাষণ করেন নাই। বর্তমান লেখক তখন নবাগত ব্যক্তি, বিদেশী আচার ব্যবহার শিখেন নাই । অনাদৃত হইয়াছেন, এইজন্য মিস মূলার মহা চটিয়া য়াইয়া গজ, গজ, করিয়া বকিতে লাগিলেন। স্বামীজী ব্যাপারটা বুঝিতে পারিয়া বর্তমান লেখককে বলিলেন যে, ঘরের ভিতর বসিয়া থাকিবার সময়, বিশেষতঃ স্ত্রীলােক উপস্থিত থাকিলে ইজেরের পকেটে হাত দিয়া বসিতে নাই, ইহাকে এদেশে অসভ্যতা বলে ; হাত দুটি হাঁটুর উপর বা অন্য কোন ভাবে রাখিতে হয়, বুকেও হাত রাখিতে নাই। মিস্ মূলার খিটখিটে, সে যখন ঘরে আসিবে তখন দাড়াইয়া উঠিয়া সম্বোধন করিও এবং কেমন আছেন এইরূপ দু'একটি কথা বলিও, যাহাতে বৃদ্ধা না রাগ । লণ্ডনে ঝি বা চাকর দরজা খুলিয়া দিলে বা অপরিচিত লােকের সহিত সাক্ষাৎ হইলে একটা কথা কহিতে হয়। কিছু কথা না পাইলে “Ol it is a glorious day! Oh it is a fine day !" fortfa ga বাতাসের কথা বলিতে হয়। ইংলণ্ডে রৌদ্র উঠিলে লােকেরা বড় আনন্দ করে, কারণ দেশটা মেঘলা কুয়াসা ও বৃষ্টির দেশ। রৌদ্র উঠা বড় আনন্দের জিনিস। মেঘলা কুয়াসা হইলে বলিতে হয় “It is a lasty day, it is a beastly day !” যদি খুব স্পষ্ট রৌদ্র হয় তাহলে বলিতে হয় “Awfully fine day. লণ্ডনে ‘ভাল’ এই ভাবটি প্রকাশ করিতে হইলে ‘awfully বলিয়া আরম্ভ করে । লণ্ডনে বাড়ীর সদর দরজা সব সময় বন্ধ থাকে। সদর দরজার বাহির দিকে একটা পিতলের বাহারি করা দাণ্ডার মত থাকে, সেটাকে knocker বলে এবং কপাটের গায়ে একখানা পিতলের পাত থাকে। আগন্তুক ব্যক্তি আসিয়া সেই নকার দেওয়া পিতলের পাতের উপর ১২৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ তিনবার ঠুকিলে, ভিতর হইতে ঝি বা চাকর আসিয়া দরজা খুলিয়া দিয়া দু একটি জল বাতাসের কথা কহিয়া ভিতরে বসিবার ঘরে লইয়া যায়। আওয়াজ করিবার একটি নিয়ম পদ্ধতি আছে। একবার টোকা মারিলে বুঝিতে হইবে, ফেরিওয়ালা জিনিস পত্তর বিক্রী করিতে আসিয়াছে, দুইবার টোকা মারিলে ডাক পিয়ন, তিনবার টোকা মারিলে কোন ভদ্রলােক দেখা করিতে আসিয়াছে, এইরূপ অর্থ হয়। যতদুর স্মরণ হইতেছে, টোকা মারার বােধ হয় এইরূপ পদ্ধতিই হইবে। হাতের ছড়ি ব! ছাতি-বাহিরে একটা নল থাকে, অনেকটা ড্রেণের পাইপের মত—তাহার ভিতর রাখিতে হয়, এদিক ওদিক রাখিতে নাই। টুপি ও ক্লোক খুলিয়া দরজার সম্মুখের গলির দেওয়ালের গায়ে আলনা বা হুকের গায়ে টাঙ্গাইয়া রাখিতে হয়। রাস্তায় বেড়াইলে জুতায় কাদা ধুলা লাগিয়া থাকে, এজন্য বাহির দরজার ধাপেতে তারের জাতিওয়ালা আসনের মত বা লােহার পাত দেওয়া একটা চৌকা রকমের জিনিস থাকে তাহাতে জুতার ধারগুলি ও পা বেশ পুছিয়া তবে সদর দরজার গলিতে ঢুকিতে হয়, কারণ তাহা না হইলে মেঝের পাতা-গালিচার উপর দাগ পড়ে। ভারতবাসীরা প্রথম যাইলে, এইরূপ আদব কায়দা শিক্ষা করিতে বড়ই বিব্রত হইয়া পড়ে। ঝি চাকরকে ডাকিতে হইলে চীৎকার করিয়া ডাকা উচিত নয়। প্রত্যেক ঘরেই একটা করে হাতল আছে সেই হাতলওয়ালাটার সহিত তার দিয়া রান্নাঘরে যােগ আছে এবং প্যাচ দেওয়া প্রীংএতে একটি ঘণ্টা আছে। ঘর হিসাবে ঘণ্টায় নম্বর দেওয়া আছে। হাতলটি নাড়াইলে সেই ঘরের নম্বর অনুযায়ী রান্নাঘরের ঘণ্টাটি বাজে, তাহা হইলে ঝি চাকর ঠিক ঘরে আসিয়া হাজির হয়। তবে কোন কোন বাড়ীতে তখন ইলেকট্রিক বেল প্রচলিত হইতেছিল। এই সকল প্রথা হইল ভাল গৃহস্থ লণ্ডনে বিবেকানন্দ বা বড় লােকের বাড়ীর, গরীবের বাড়ীতে এত আদব কায়দা নাই। গরীব -গরীব, তাহার কাছে এত নিয়ম নাই। নূতন যে সব পাড়াতে বাড়ী হইতেছে, সেখানে বাড়ীর সম্মুখে একটি বাগান আছে। বাগানের ফটকের গায়ে একটা bottom বা একটা কড়া থাকে। সেই কড়া ধরিয়া টানিলে ভিতরকার ঘণ্টা বাজিয়া উঠে এবং সদর দরজা খুলিয়া দেয়। এই সকল ব্যাপার হইতেছে ভিন্ন ভিন্ন পাড়ার ভিন্ন ভিন্ন প্রথা, তবে মােটামুটি কিছু বলা হইল। স্বামীজী আচার পদ্ধতির উপর বিশেষ দৃষ্টি রাখিতেন, কোন বিশেষ তিনি খুঁত রাখিতেন না, সেইজন্য তাঁহার আদব কায়দাতে সকলে বড় খুসী হইত। একদিন স্বামীজী ডাকিলে বর্তমান লেখক তাড়াতাড়ি করিয়া নীচেকার ঘরে আসিলেন এবং কাপবাের্ডে ঠেসান দিয়া দাড়াইয়া রহিলেন। তখন বেলা পাচটা হইবে। বর্তমান লেখক বাহির হইতে বেড়াইয়া আসিয়াছিলেন এবং তখন মুখ ধুইবার চেষ্টা করিতেছিলেন, সেইজন্য টাই (tie) খুলিতেছিলেন। গলার কলারটা চার পাঁচ দিন ধরিয়া বদলান নাই। স্বামীজী বর্তমান লেখককে দেখিয়াই বলিলেন যে, টাই খুলিয়া বসিবার ঘরে ঢুকিতে নাই। গলার কলারটা ময়লা হইয়া গিয়াছে, সপ্তাহে দুইবার করিয়া বদলাইবে। বর্তমান লেখক তখনই টাই পরিয়া আসিলেন কিন্তু তখন কলারটা বদলান হইল না। ভারতবর্ষে একমাসে যাহারা কাপড় বদলায় এবং যাদের কাপড়ে কোন ইস্তিরি করায় না, তাহাদের পক্ষে অমন ইস্তিরি-করা কলার সপ্তাহে একবার করিয়া বদলান বড়ই সৌখীন জিনিস! দুইবার বদলান লণ্ডনের ভদ্র-আনা! লণ্ডনে একটা প্রবাদ আছে “without collar and tie, a man is not fit to die."

লণ্ডনে বিবেকানন্দ স্বামীজী হাতের কপ, গলার কলার খােলা রাখিতেন, পিরানের সহিত সেলাই করা নয়। এই জন্য হাতের কষ্টা প্রথমদিন স্বামীজীর পােষাক পরিচ্ছদ। একদিকে পরিতেন, দ্বিতীয় দিন ঘুরিয়ে পরিতেন কিন্তু তৃতীয়দিন আর সে জিনিস ব্যবহার করিতেন না। গলার কলারটা সপ্তাহে দুই তিনবার বদলাইতেন। কিন্তু কোন স্থানে যাইতে হইলে ধােপদস্ত টাকা ইস্তিরি করা পােষাক পরিয়া যাইতেন। আদেবকেতা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে স্বামীজী বিশেষ লক্ষ্য রাখিতেন, এইজন্য আমেরিকাতে অনেকে বলিয়াছিল যে, সন্ন্যাসী হইয়া পথে পথে ঘুরিয়া বেড়ায় বটে, কিন্তু বড় ঘরের ছেলে—আদবকায়দা কিছুই ভুলে নাই। আদবকায়দায় নিপুণ, এটা যেন তাহার স্বভাবসিদ্ধ ছিল । দাড়ী গোঁফ তিনি নিত্য কামাইতেন এবং সন্ধ্যার সময় যদি কাহারও বাড়ী নিমন্ত্রণ খাইতে যাইতে হইত, তাহলে তিনি অনেক সময় দাড়ী গোঁফ- কামাইয়া সাবান দিয়া মুখ ধুইয়া, চুলটা খুব আঁচড়াইয়া টেরি কাটিয়া কলার সাট বদলাইয়া তবে যাইতেন। জুতাটি ব্রাস্ হইল কি না সে বিষয়েও তিনি নজর রাখিতেন। লণ্ডনে রােজ জুতা ব্ৰাস্ করিতে হয়। রাস্তায় যদি কাদা লাগে তা হলে আবার তখনি ব্রাহ্ (brush) করিয়া লইতে হয়। এইরূপ প্রত্যেক দিন দুইবার তিনবার ব্রা করিতে হয়। ব্রাউন জুতা হইলে ব্রাউন পালিশ মাখাইতে হয়। একবার সারদানন্দ স্বামী গুডউইনের সহিত কথা কহিতে কহিতে বলিয়া ফেলিয়াছিলেন white boot! গুডউইন ত, এদিক ওদিক খুঁজিতে লাগিলেন, সেই দেখে সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, brown boot । তখন গুডউইন সারদানন্দ স্বামীকে বলিলেন “Oh you devil, you can't distinguish white and brown !" সারদানন্দ স্বামী ত সেই শুনিয়া অপ্রতিভ হইয়া রহিলেন ও গুডউইন লণ্ডনে বিবেকানন্দ হাসিতে লাগিলেন। Dey and Martinএর জুতার কাল কালী সেই সময় খুব বিখ্যাত ছিল। কলিকাতায়ও তাহার খুব চলিত হইয়াছিল। অনেক বাড়ীতে রাত্রিতে শুইবার সময় বুট জুতাটি চাতালে রাখিয়া শুইতে হয়। ঝি সকালবেলা একটা নলওয়ালা হাতলযুক্ত টিনের টব করিয়া গরম জল রাখিয়া যায় এবং জুতা জোড়াটি ব্ৰাস করিয়া যার যার জায়গায় ঘরের দরজায় রাখিয়া যায় । অনেক জায়গায় জুতায় ব্রাস করা ঝিয়ের কাজ। রাস্তার মােড়ে মােড়ে জুতা ব্ৰাসওয়ালা আছে, তাহাদের দৃষ্টি কেবল লােকের পায়ের জুতার দিকে। কাহার জুলটি একটু কাদা লাগিয়াছে সে ঠিক দেখিতে পাইয়াছে, আর শিস, দিয়া গান করিতে লাগিল —Shine your boot. ভদ্রলােক যাইলে একটা কাঠের বাক্সের উপর পা রাখে আর মুচির ছেলেটা হাঁটু গেড়ে বসিয়া ইজেরের পায়ের দিকটা গুটাইয়া দিয়া তার কালী জুতায় মাখাইয়া দুই হাতে দুটি ব্ৰাস লইয়া ঘসিতে থাকে। খুব চকচকে হইয়া উঠিলে তাহার পর পুনরায় ইজেরটা নামাইয়া দিয়া, আর একখানি ব্রাস দিয়া ইজেরটা পরিস্কার করিয়া দেয়। ফ্রান্সে ও তাহার উপনিবেশে যে যে সহর দেখা গিয়াছে, তথায় জুতা ব্রাসের অন্য প্রকার প্রথা আছে। খুব উচু পায়াওয়ালা মখমলের গদি দেওয়া একটা চেয়ার থাকে, ভদ্রলােক গিয়া আরাম করিয়া সেই চেয়ারে বসিয়া পা দুটি একটা বাঙ্ক’র উপর রাখিয়া দেয়, আর তাহার জুতা ব্রাস করিয়া দেয়। লণ্ডনে রাস্তায় জুতা ব্ৰাস করিতে তখন দুই পেনী লাগিত। পেনীগুলি দেখিতে আগেকার ডবল পয়সার মত, আধপেনী এখানকার পয়সার মত, সিকি পেনী বা ফার্দিং এখানকার আধলার মত। একদিন সকালবেলা নীচেকার ঘরে সকলে বসিয়া আছে, স্বামীজী আমেরিকার কথা তুলিলেন। আমেরিকায় এমন সহর নাই যেখানকার ১২৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ দেশের কথা ২০৩০ হাজার লােক তাহাকে চিনে না। অনেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও হইয়াছে। অনেক চেলাও জুটিল, কিন্তু সেগুলাে হইল চেলা কাঠ, সব চলিয়া গেল। শুধু একটা গুডউইন রয়েছে, দেখছি ওটা না খয়ে দেয়ে পড়ে আছে। তবে আমেরিকান ও ইংরাজদিগের ভিতর তফাৎ আছে। দেখছি, আমেরিকানগুলা বড় হুজুকে আর ইংরাজগুলা এখন ভিড়তে চায় না, কিন্তু এরা দেড়ে পিঁপড়ের মত কামড়াইয়া থাকে। তাহার পর স্বামীজী অন্য কথা বলিতে লাগিলেন। একদিন প্রাতভর্ভাজনের পর স্বামীজী তাঁহার চেয়ারখামিতে বসিয়া আছেন। নানাপ্রকার কথাবার্তা হইবার পর স্বামীজী তাহার নিজের কথা তুলিলেন। স্বামীজী সারদানন্দ স্বামীকে বলিলেন, “দেখলি ত আমি সব পথ চেষ্টা করেছি । মাষ্টারী করবার চেষ্টা করেছি, ওকালতী করবার চেষ্টা করেছি, দেখলুম সক পথ বন্ধ । তারপর এই পথটা দেখলুম। এই পথটা আমার খুলে গেল, এতেই success হ’ল। মানুষকে সব পথ চেষ্টা করতে হয়, তাহলে একটা পথ খুলে যাবে, তাতেই তা’র সফল হবে।” তারপর পুনরায় দেশের কথা উঠিল। “হুঁ রে, দেশের লােকগুলাে এত শীঘ্র শীঘ্র মরে যায় কেন? বা’র কথা জিজ্ঞাসা করি খবর নেই, সে মারা গেছে। জাতটা কি মরে লােপ পেয়ে যাবে না কি! আমেরিকাতে দেখুতুম, ৮০/৯০ বৎসরের অনেক লােক ৬০ বৎসরকে প্রৌঢ়ের ভিতর ধরে। আমেরিকার লােক বহুকাল বাঁচে, ইংলণ্ডের লােকগুলােও দেখি খুব বাঁচে। কিন্তু ভারতবর্ষের লােকগুলি মরে যায়। তারা যে wretched (দুখচুটে ) হায়, তাতে এত শীঘ্র মরে যায়। ওদের খাওয়াটা বদলে দেওয়া দরকার। আমেরিকাতে যখন ছিলুম, তখন কয় বৎসরের ভিতর কোন ব্যানাে হয় নাই, সামান্য কয়দিন সর্দি কাশী হয়েছিল। ঐ ভূতের মত পরিশ্রম করেছি, তাতে কিন্তু ১২৯ লণ্ডনে বিবেকানন্দ শরীর খারাপ হয় নাই। জল বাতাস সে দেশের খুব ভাল, আর লােকগুলাে কতকালই না বাঁচে, মরতে যেন চায় না। কি সাহস! কি উদ্যম। লােকগুলাে যেন চন্ মম্ করে বেড়াচ্ছে, আর ভারতবর্ষের লােকগুলাে নিঝুম, যেন বসে বসে চলছে। ঐ যে বেদান্তের কথা আমি হেঁটে হেঁটে সমস্ত ভারতবর্ষের গায়ে গায়ে ঘুরে লােকদের বলেছিলুম, যদি তারা নেয় কিন্তু নেওয়া ত চুলােয় গেল, উল্টে তারা আমায় বিদ্রুপ করূতে লাগল । আমার মনে বড় লাগল। মনে কলুম, একটা স্বাধীন দেশে গিয়ে এইটা বলব, স্বাধীন জাত না হলে এ ভাব নিতে পারবে না। তাই দেখলুম, চিকাগােতে একটা সভা হবে, আমি ত চো চো দৌড়ে চিকাগােতে হাজির হলুম। তারাই ত প্রথম বেদান্তের ভাবটা appreciate করূলে, ভারতবর্ষ নিঝুম, তারা নিলে না। স্বামীজী সেদিন এইরূপ আক্ষেপ করিয়া অনেক কথা বলিতে লাগিলেন। রবিবার স্বামীজী ন্যাশনাল ওয়াটার পেন্টিং গ্যালারিতে বক্তৃতা দিয়া "আসিয়াছেন। সােমবার প্রাতর্ভাজনের পর স্বামীজী ষ্টার্ডির সহিত বেদান্তের কথা কহিতে লাগিলেন। স্বামীজীর মন খুব প্রফুল্ল, তিনি বলিতে লাগিলেন, “এই বেদান্তের ভাব পুরাকালে হিন্দু ঋষিরা বাহির করেছিল। তাদের বুকটা তখন বড় ছিল, মনটা খুব উন্নত ছিল, সেজন্য সকলের ভিতর ভাবটা ছড়িয়েছিল। কিন্তু জাতটা পরে যখন পড়ে গেল, তখন এটাকে পুটুলি বেঁধে কোণে ঠেলে রেখে দিলে-coopped it up in a corner হল কি, কতকগুলাে অনুপযুক্ত লােকের হাতে জিনিসটা পড়ে অশ্রদ্ধেয় হয়ে গেল। এখন কিন্তু সেই বেদান্তের ভাবটাকে জগৎময় ছড়াতে হবে, Make it an universal property. ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম নিজের সময়ােপযােগী ভক্তির ভাব, ব্যক্তিগত জ্ঞান ও নিয়ম পদ্ধতি বলিয়া থাকে, কিন্তু তার ফিলসফিটা কেউ বেদান্তের কথা লণ্ডনে বিবেকানন্দ বলে না। বেদান্ত সকল ধর্মের ফিলসফিটা বলে যায়, যা কোন ধর্ম বিশেষের অন্তভূত নয়, এজন্য বেদান্ত universal religion ( সাৰ্বজনীন ধৰ্ম্ম) হবে।” এই বলিয়া তিনি পায়চারি করিতে লাগিলেন ও পাইপ টানিতে টানিতে উৎসাহিত হইয়া প্রায় বলিতে লাগিলেন Make it an universal property. কতক গুলাে narrow-minded লােকের হাতে থাকবে না। গুডউইন ও মিস্ মূলারে একটু খিটিমিটি হইত, অর্থাৎ মিস্ মূলার গুডউইনকে তত পছন্দ করিত না। অন্য কোন তেমন কারণ ছিল না, তবে এক কারণ হইতে পারে যে, স্বামীজী গুডউইনকে গুডউইন ও মিস বিশেষ ভালবাসিতেন এবং সকল কাজেই গুডউইনকে মূলারের বিবাদ ডাকিতেন। গুডউইন একদিন স্বামীজীকে বললেন “স্বামীজী, এখানে থাকা তত সুবিধা হচ্ছে না, পার্শ্বের কোন স্থানে বাস করে এখানে কাজ করে গেলেই হবে।” স্বামীজী শুনিয়া সমস্ত কথা বুঝিতে পারিলেন এবং বড় দুঃখিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, “সেই রকম করলেই কি হবে! চব্বিশ ঘণ্টা দরকার আছে, কাছে না থাকলেই বা কি করে হবে?” গুডউইন বলিলেন, “আর কি করা যায়, যখন এদের সঙ্গে সুবিধা হচ্ছে না ; পেটে ত খেতে হবে, তখন অন্য যায়গায় কাজ করে কিছু রােজগার হবে, তাতেই নিজের এক রকম চালিয়ে নেওয়া যাবে। আর বক্তৃতার সময় এখানে এসে নােট নেওয়া যাবে।” স্বামীজী এই সকল কথা শুনিয়া চুপ করিয়া রহিলেন, কোন কথাই আর বলিলেন না, শুধু মাঝে মাঝে গুডউইনের দিকে চাহিতে লাগিলেন। তাহার পর স্বামীজী চলিয়া যাইবার পরে, গুডউইন মিস্ মূলারের উপর একটু আক্রোশ প্রকাশ করিলেন, “She is not an English, she is a chillian woman” ইত্যাদি নানা কথা বলিতে লাগিলেন। মিস্ মূলারের বাপ লণ্ডনে বিবেকানন্দ জার্মান ছিলেন, দক্ষিণ আমেরিকার চিলি দেশে গিয়া কাঠের জাহাজের ব্যবসা করিয়া খুব ধনবান হন। পরে কারবারটা বেচিয়া দিয়া নগদ টাকা করিয়া ইংলণ্ডে আসিয়া বাস করেন ও ছেলে মেয়েদের ভিতর টাকা ভাগ করিয়া দেন। এই জন্য গুডউইন চটিয়া গেলে, মিস্ মূলারকে chillian woman ( চিলি দেশের মেয়ে) বলিতেন। একদিন গুডউইন, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক তিনজনে বেড়াইতে গিয়াছিলেন। গুডউইন সেন্ট, জেম্স্ প্যালেসের (পুরাতন রাজবাড়ীর) নিকট দিয়া যাইবার সময় বলিতে লাগিলেন যে পূর্বকালে, রাজারা এই বাড়ীতে বাস করিতেন। সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, “বাড়ীটা নিতান্ত ছােট, সেকালে রাজারা কিরূপে থাকিতেন ?গুডউইন, বলিলেন, “না, ভিতরে খুব বড় বড় ঘর আছে।” তাহার পর চলিবার, সময় গুডউইন ও বর্তমান লেখক এক মাপে পা ফেলিয়া চলিতে লাগিলেন কিন্তু সারদানন্দ স্বামী মােটা মানুষ, পা হেলিয়া দুলিয়া ফেলিতেছিলেন, কখন আগে বা কখন পেছনে ফেলিতেছিলেন। গুডউইন যাহাতে তিনজনের পা সমান সমান পড়ে সেই জন্য এগিয়ে পেছিয়ে গিয়া শুধরে, নিচ্ছিলেন। বর্তমান লেখক এ প্রথাটা জানিতেন, সেইজন্য সমান পা ফেলিয়া চলিতেছিলেন। গুডউইন কয়বার যদিও পা ফেলিয়া শুধাইয়া লইলেন, কিন্তু সারদানন্দ স্বামী সে বিষয়ে কিছু লক্ষ্য না করিয়া হেলিয়া দুলিয়া নিজে চলিতে চলিতে এদিক ওদিক্‌ মাথা ঘুরাইতে লাগিলেন। গুডউইন তখন স্পষ্ট বলিলেন ‘স্বামী, এদেশে রাস্তায় চলবার সময় সকলে সমান পা ফেলে চলে, এদিক ওদিক করা, আগে পেছু করা ঠিক নয়?” সেই কথা শুনিয়া সারদানন্দ স্বামী অপ্রতিভ হইয়া পায়ের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া একসঙ্গে পা ফেলিয়া চলিতে লাগিলেন। তাহার পর মৃদুস্বরে বর্তমান লেখককে বলিতে লাগিলেন, “বাবা, এ যে ড্রিল প্যারেড়, রাস্তায় চলবার, ১৩২ লণ্ডনে বিবেকানন্দ সময় যে আদব কায়দা।” রাস্তায় চলবার সময় সকলে একসঙ্গে পা ফেলিয়া যাইবার সময় ভাব হইতেছে, বােধ হয় সকলেই সমান, কেহ কাহারও তাবেদার নয়। যাহা হউক, এই রকম চলাটা দেখিতে বড় ভাল হয়। সারদানন্দ স্বামী ত বাড়ীতে আসিয়া মাথার টুপিটা প্যাসেজের দুকে এবং ছড়িটা যথাস্থানে রাখিয়া দিলেন। গুডউইন ও বর্তমান লেখক সেইরূপ করিলেন। গুডউইন ও সারদানন্দ স্বামী ঘরে চেয়ারে বসিয়া বিক্রম প্রকাশ করিতে লাগিলেন। সারদানন স্বামী বলিলেন, “বাবা এদেশে কি আবার আতে আছে, সব সময় তাদের কায়দা কেতা! ছুরি কাটা চাচে ধরবার আদব-কেতা, নাক ঝাড়বার আদব কেতা, রাস্তায় চলবার আদব কেতা, এ যে দেছি আদব-কেতায় মেরে ফেলবে। আরে আমি সন্ন্যাসী মানুষ, যেখানে সেখানে থাকব, নিজের ইচ্ছামত চলা ফেরা ক, এ তা নয়, আটেকাটে মারছে। নরেনের কাছে এসে প্রাণটা গেল, ছেড়ে দেয় তো একেবারে চেঁ চো দৌড় মেরে পালাই” এই বলিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন! পূৰ্বেই কপিত হইয়াছে যে স্বামীজী বর্তমান লেখকের হৃষীকেশের ম্যালেরিয়া জ্বর নিজের শক্তি সঞ্চার করিয়া আরাম করিয়া দিয়াছিলেন, কিন্তু পেটের অজীর্ণ রােগ তখনও তাহার ছিল। স্বামীজী একদিন প্রাতে তাহার বাক্স খুলিয়া ঘােট ঘােট। শিশি আনিলেন ও বর্তমান লেখককে বলিলেন, “প্রাতভোজনের পর এই carlsabad salt একটা চায়ের বাটিতে গরম জল দিয়ে এক চামচে বা দুই চামচে খাবে, তা হলে পেটটা খুব পরিষ্কার হয়ে যাবে। এই ঔষধে আহার বন্ধ করবার দরকার নাই।” এই বলিয়া তিনি পুনরায় বলিতে লাগিলেন, “হাঙ্গারি বা অষ্ট্রিয়া অঞ্চলে Carlsabad নামক একটা ছােট নগর আছে। সেইখানে ধাতু-জলের লণ্ডনে বিবেকানন্দ উৎস আছে এবং সেখানে ভাল ভাল হােটেল আছে। উৎসের চতুর্দিকে বেশ বাগান করা জমী আছে, সেখানে বজিনা বাজান হয়। সেই বাগানের ভিতর ভাল ভাল পায়খানাও আছে। ইউরােপের যত পেট বােগা ৰড় মানুষগুলাে সেখানে যায়, গেলাসে করে টাকা জল ফোয়ারা থেকে তুলে খায়, আর Band বাজে তার কাছে ঘুরে ঘুরে বাজনা শুনে বেড়ায়। খানিকটা পরেই বাহের বেগ আসে আর পায়খানা গেলে খুব পেট পরিষ্কার হয়ে যায় ! আর ক্ষুধা লাগে, হােটেলে গিয়ে বারে বারে খায়। এইরূপে ইউরােপের পেট রােগা লােকগুলাে সেখানে গিয়ে মাসখানেক থেকে শরীরটা সুধরে আসে। সেই জলটাকে কোন রকম করে শুকিয়ে এই নূন করেছে, সেইজন্য একে carlsabad salt বলে”—এই বলিয়া বর্তমান লেখককে শিশিটা দিয়া দিলেন এবং বর্তমান লেখকও সেইদিন থেকে খাইতে লাগিলেন। একদিন প্রাতের খবরের কাগজে একটী খবর বাহির হইল যে, একজন চীনা যুবক লণ্ডনে আসিয়াছিল এবং চীনের রাজদূত তাহাকে ভুলাইয়া আপন বাটীতে লইয়া গিয়াছিল । তথায় চীনা যুবকের বিপদ তাহাকে মারিয়া ফেলিবার উপক্রম করিয়াছে বা বন্দী ভাবে জাহাজে করিয়া চীন দেশে পাঠাইয়া দিবার চেষ্টা করিতেছে। সেই খবর পড়িয়া স্বামীজী গুডউইনকে বলিলেন, “কি গুডউইন, তােদর ত free country ( স্বাধীন দেশ) না? সকলের সমান liberty ? ( স্বাধীন ভাব) এখন right of liospitality কোথায় ? এই ত একটা গরীব চীনে ঘোড়াকে লণ্ডন সহরে মেরে ফেলবে বা অত্যাচার করছে, তােদের national idea of liberty কোথায় ?” গুডউইন ত দাঁড়াইয়া উঠিয়া, হাত নাড়িয়া, পা ঠুকিয়া, লম্ফঝম্প করিয়া মহাগরম হইয়া বলিতে লাগিলেন, “ইংলণ্ডে এরূপ অত্যাচার! যে কোন লােক ইংলণ্ডের জমিতে ১৩৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ পা দিলে সেই মুহূর্ত থেকে স্বাধীন হয়। চীন রাজদূতের কি অন্যায় ! সে জানে না যে এটা ইংলণ্ড ? কুষিয়ার নিহিলিষ্ট, অ্যানার্কিষ্ট বা অনেক প্রকার রাজদ্রোহীরা ইংলণ্ডে স্বাধীনভাবে বাস করিতেছে। তাহাদের সভা সমিতি, সংবাদপত্র প্রভৃতি স্বাধীন ভাবে চালাচ্ছে ; কাহারও বলিবার কিছু নাই। আর চীন রাজদূত এইরূপ করিয়া চীনে ছেলেটাকে আটক করিল।” এইরূপ নানা কথা বলিতে বলিতে গুডউইন অগ্নিশৰ্ম্মা হইয়া উঠিলেন। ষ্টার্ডি বলিতে লাগিলেন, “এতে যদি চীনের সঙ্গে লড়াই করিতে হয়, তাতেও আমরা রাজী। আমি নিজে সিপাই হয়ে যাব। এটা ইংলণ্ডের বদনাম।” খবরের কাগজ সেই বিষয় লইয়া দুই ঘণ্টা অন্তর বাহির হইতে লাগিল। সবেরি তখন প্রধান মন্ত্রী, তিনি চীন রাজদূতের বাড়ীতে সিপাই ঘেরােয়া করাইয়া দিলেন এবং প্রত্যেক বন্দরের প্রত্যেক জাহাজে পুলিশ দাঁড় করাইয়া দিলেন যাহাতে চীন যুবককে ইংলণ্ডের বাহিরে না লইয়া যাইতে পারে। এবং সেই সঙ্গে চীন রাজদূতকে পত্র লিখিয়া দিলেন যে কয়েক ঘণ্টার ভিতর সে যেন চীন যুবককে স্বয়ং সঙ্গে লইয়া প্রধান মন্ত্রীর নিকট দিয়া যায়। গুডউইন ত সেদিন মহা গরম, ক্রমাগত ঐ কথাই বলিতে লাগিলেন, কোন কাজকৰ্ম্ম আর সেদিন করিলেন না। মাঝে মাঝে খবরের কাগজ কিনিয়া আনিতে লাগিলেন। স্বামীজীর মুখ অতি বিষন্ন, ভিতরে যেন মহাচিন্তিত হইয়া পড়িয়াছেন, মাঝে মাঝে একটি আধটি কথা কহিতেছেন যে, প্রবল লােকেরা গরীবের উপর এইরূপ অত্যাচার করে। স্বামীজী অতি বিষন্ন হইয়া শােকার্তভাকে গম্ভীর হইয়া বসিয়া রহিলেন। কেহ আর তাঁহার সহিত কথা কহিতে সাহস করিল না। স্বামীজীর সমস্ত মনােভাব ভাষায় না হউক মুখ দিয়া প্রকাশ পাইতে লাগিল। বেলা ২টা ৩টার সময় খবর বাহির হইল যে, চীন যুবককে মুক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। গুডউইন তাড়াতাড়ি আসিয়া লণ্ডনে বিবেকানন্দ উত্তেজিত উল্লসিত ভাবে স্বামীজীকে খবর দিলেন। স্বামীজী খবর শুনিয়া যদিও মৃদু হাসিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই সেই প্রকার শােকাৰ্তভাবে বসিয়া রহিলেন। বর্তমান লেখক ব্রিটিশ মিউজিয়মে গিয়াছেন। একটি নবাগত চীনযুবক সঙ্কুচিতভাবে এদিক ওদিক দেখিতেছেন এবং পড়িবার ঘরে প্রবেশ করিয়া কোথায় কি করিতে হয় না জানার জন্য কুষ্ঠিত ভাবে একস্থানে দাঁড়াইয়া আছেন। বর্তমান লেখক কাৰ্যবশতঃ সেই চীন যুবকের পাশ দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি যুবকটিকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কোন দেশের লােক ?” চীন যুবকটি বলিলেন যে তিনি চীন দেশের লােক। বর্তমান লেখক পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি সাইয়াৎসেনকে চেন?” যুবকটি আধ আধ ভাঙ্গা ইংরাজীতে উত্তর দিলেন “I ain the kilna]e Chinest ( আমিই সেই চুরিকরা চীন যুবক )।” বর্তমান লেখকের সেই সময় অল্পবিস্তর সাইয়াৎসেনের সহিত আলাপ হইয়াছিল। সেই যুবকই পরে চীনের বিখ্যাত লােক হইয়া- ছিলেন। একদিন খবরের কাগজে বাহির হইল যে ১frs. Dyre নামক এক বৃদ্ধার বিচারে ফাঁসির হুকুম হইয়া গেল। সেই খবর পড়িয়া স্বামীজী ষ্টার্ডিকে কৌতুক করিয়া বলিতে লাগিলেন, “The মিসেস্ Thames' water is turned into baby's soup" অর্থাৎ টেস নদীর জলটা শিশুর মাংসের সুরুয়া হইয়াছে। ব্যাপারটা হইতেছে এই যে, ইংলণ্ডের বড় ঘরের অনেক অবিবাহিতা মেয়েদের সন্তান হয়। সেই সমস্ত স্ত্রীলােকেরা সদ্যজাত শিশুটিকে মিসেস ডায়ারের হাতে লালন পালন করিতে দিত এবং তৎসঙ্গে কিছু অর্থও দিত। ডায়ার বুড়ী রেডিং নামক স্থানে বাস করিত। সে ডায়ারের কথা।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ সেই সমস্ত শিশুগুলিকে পরে গলা টিপিয়া মারিয়া টেমস নদীতে ফেলিয়া দিত। এমন কত বৎসর ধরিয়া কত ছেলেকে সে নদীতে ফেলিয়া দিয়াছে। ১৮৬৬ সালে টেস্ নদীর জল শুকাইয়া যায়, তাহাতে অনেক ছােট ছেলের অস্থি বাহির হইয়া পড়ে। সেই অস্থির অনুসন্ধানের ফলে পুলিশ সেই বুড়ী মিসেস ডায়ারকে ধৃত করে ও মকদ্দমায় তাহার কঁসি হয়। যাহা হউক, স্বামীজী খবরের কাগজে সমস্ত বিষয়টি পড়িয়া ষ্টার্ডিকে বলিতে লাগিলেন, “এ যে দেখছি সমাজটা পচে গেছে ; ঘরে দরে যে শিশুহত্যা হচ্ছে। জাতটার আগে ভিতর থেকে পচতে শুরু হয়, তারপর বাহিরে থেকে শএসে পবংস করে। এ জাতটার এইরূপে যদি চলে, তাহলে জাতটা যে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে দেখছি। Social evil ( সামাজিক পাপ) থেকে সব evil আসে।” ৪ার্ডি বলিতে লাগিলেন, “স্বামীজী, ইংরাজ জাতটার সমাজের ভিতরটা পচে যাচ্ছে, ভােগবিলাসটা যেমন একদিকে বাড়ছে, তেমনি ভিতরে corruptionও বেড়ে যাচ্ছে । আর কি জানেন, এদেশে খুব ভাল খায়-দায়, খুব সুখে স্বচ্ছন্দে থাকে, এতে hunan nature যা হয় তা’ত হবেই, এইজন্য এত social evil হচ্ছে। স্বামীজী সেদিন এই সব কথাতে ঘৃণার মুখ ধারণ করিয়া একটা বিরক্ত ও অবজ্ঞার ভাবে রহিলেন। এই সময় মােক্ষমূলার লিখিত সুবিখ্যাত Ninteenth Century নামক কাগজে “প্রকৃত মহাত্মা” নামক একটি প্রবন্ধ বাহির হয় । প্রবন্ধের কথাগুলি সব এক্ষণে স্মরণ নাই, কিন্তু শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের বিষয় বেশ শ্রদ্ধা ভক্তি করিয়া লেখা হইয়াছিল। এই প্রবন্ধটি পরিবর্ধিত করিয়া ও স্বামী সারদানন্দ লিখিত ঠাকুরের জীবনী সংমিশ্রিত করিয়া, মােলর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবনী নামক পুস্তক প্রকাশ করেন। অল্পদিন পরেই প্রেসিডেন্সি কলেজের ভূতপূৰ্ব প্রিন্সিপাল টনি ১৩৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের বিষয় একটা প্যাটে, প্রচার করিয়াছিলেন। স্বামীজীর লণ্ডনে বক্তৃতা করায় ও বিশিষ্ট লােকদিগের সহিত মেলামেশা করায়, ইংরাজ পণ্ডিতমণ্ডলীর ভিতর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের বিষয় একটু আলােচনা হইতে লাগিল। ১৯১৭ সালে কঙ্খলে বরিশালের সুবিখ্যাত অশ্বিনীকুমার দত্ত একদিন বর্তমান লেখককে বলিয়াছিলেন, যে তাহার পূর্বতন অধ্যাপক টনির সহিত সৰ্ব্বদাই চিঠি পত্র লেখালিখি আছে। এক পত্রে অধ্যাপক টনি লিখিয়াছিলেন যে, তিনি “শ্রীম” লিখিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত বাঙ্গালায় পাঠ করিতেছেন কিন্তু ভাষাটা এত গ্রাম্য যে অনেক স্থানে তিনি ভাল বুঝিতে পারিতেছেন না। বৃদ্ধ টনি প্রাতে যেমন বাইবেল পড়েন সেইরূপ রামকৃষ্ণকথামৃতখানি ভক্তি- ভাবে পড়েন এই কথা অশ্বিনীবাবু খুব আনন্দ করিতে করিতে বলিতে লাগিলেন। একদিন প্রাতে ডাকওয়ালা ভারতবর্ষের মেলের চিঠি দিয়া গেল। গুডউইন স্বামীজীকে সেই চিঠিগুলি দিলেন। অখণ্ডা- অখণ্ডান স্বামীর নন স্বামী একখানি পত্র স্বামীজীকে লিখিয়াছিলেন। অখণ্ডানন্দ স্বামী বরাহনগর মঠ হইতে চলিয়া গিয়া তিব্বত পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। তাহার পর, তথা হইতে ফিরিয়া আসিয়া পুনরায় নানা স্থানে ঘুরিয়া রাজপুতনায় কিছুকাল থাকিয়া আলমবাজার মঠে ফিরিয়া আসেন। তিনি পুনরায় মধ্য এশিয়ার অন্যান্য স্থানগুলি ভ্রমণ করিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন এবং সেই মর্মে স্বামীজীর নিকট অনুমতি লইবার জন্য একখানি পত্র স্বামীজীকে লেখেন। স্বামীজী পত্রখানি পড়িয়া খানিকক্ষণ স্থির হইয়া রহিলেন ও তৎপরে বলিতে লাগিলেন, “গঙ্গা রাজপুতনায় ছিল, খেতড়ির রাজা তাকে বেশ যত্ন করে রেখেছিল, সে চলে এলাে কেন? কেবল ঘুরে ঘুরে মরা ওর অভ্যাস।” ১৩৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ বর্তমান লেখক বলিলেন যে, খেতড়ির রাজা প্রথম যেমন যত্ন করেছিলেন পরে সেরূপ করেন নাই। স্বামীজী বলিলেন, “সে সব কথা আমি জানি, আমি শুনেছি গঙ্গারই ত দোষ। তুই বাবু সাধুর মত থাকবি, তা না হয়ে তাদের রাজনীতিতে হাত দিতে যাচ্ছিলি কেন? তারা রাজপুতনার রাজা, পুরান রাজবংশ, তারা রাজনীতি ছেলেবেলা থেকে শিখেছে। গঙ্গা সাধুর মত না থেকে তাদের রাজনীতিতে হাত দিতে গেল, তাইতাে রাজা অজিতসিং চটে গেল, শুধু আমার খাতিরে বিশেষ কিছু বলত না। যা ইচ্ছে করুকগে যাক”—এই বলিয়া গঙ্গাধর মহারাজকে একটু ভৎর্সনা করিতে লাগিলেন। স্বামীজী পুনরায় বলিতে লাগিলেন, “রাখালকে বলুম, যা মঠে ফিরে, যা খেতড়ীর রাজাকে বলে দিচ্ছি তােদর মাসে ১০০ খেতড়ির রাজার টাকা দেবে, তা হলে এক রকম চলতে পারে, তা নয় রাখালের বৈরাগ্য হল, টাকা নিলে না। যা খুসী করুক্‌গে, কষ্টে মরুগে! আর রাজা অজিৎ সিং তেমন হাো চোমরা রাজা কি! সামান্য একটা petty chief, তিন চার শ টাকার ভিতর মাস চালায়। একটা বরা কাটে, তাই খায়, আর একটু একটু মদ খায়, এইত ত’দের খরচ, তবুও ত সে রাখালকে দিতে রাজী হয়েছিল। খেতড়ীর রাজা যে আমায় অভিনন্দন দিয়েছিল, তার জবাব রং বেরং করে, লিখেছিলুম। রাজাগুলাের ভিতর যেন একটা ক্ষত্রিয় ভাব আসে, সেইটা তুলবার জন্য খেতড়ীর রাজার অভিনন্দনের ঐরূপ জবাব দিয়েছিলাম। তবে দেখলুম, রাজাটার প্রাণটা বড় সরল, বুকটা খুব বড়। আর রাজারা ত মদ খেয়েই থাকে, তাতে ওদের কিছু এসে যায় না। তবে লােকটার, ভেতর অনেকগুলি গুণ আছে দেখলুম, আর আমার প্রতি অগাধ বিশ্বাস” -এইরূপে রাজা সাহেবের অনেক সুখ্যাতি করিতে লাগিলেন। প্রশংসা।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ '? একদিন বেলা আড়াইটা তিনটার সময় স্বামীজী নীচেকার ঘরে নিজের চেয়ারে বসিয়া আছেন। ষ্টার্ডি প্রভৃতি অনেকেই আছেন। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “দেখ জাৰ্ম্মণরা বিজ্ঞানে খুব উন্নতি করেছে। এই যে পচা দুর্গন্ধ দেন তার জল, সেটাও তারা পরিষ্কার করে কাজে লাগাচ্ছে। একটা খালওয়ালা বড় মাঠ নিচ্ছে, রাস্তার নীচে ময়লা ড্রেনের জলটা punp করে সেই মাঠের একধারে ফেছে। জলটা ধীরে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে মাঠের উপর দিয়ে ও ঘাসের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, তাতেই জলটা filter (পরিষ্কার) হয়ে গেল। জলট। যখন মাঠের অপর ধারে গেল তখন পরিষ্কার জল হয়ে গেল, কোন দুর্গন্ধ নাই। যে ডাক্তার এর ex]erimentএ ছিল, সে মাঠের শেষ ধারের জল এক গ্লাস নিজে খাইল ও অপরকে খাইতে দিতে লাগিল। তখন জলে কোন দুর্গন্ধ আর নাই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ঘাসের একটা গুণ আছে যে, সে জলের দূষিত জিনিসগুলি পরিষ্কার করে দেয়। তারা দুটো মাঠ নিয়েছে, প্রথমে যে মাঠে এই কাজ করলে সে মাঠ কিছুদিন বাদে সঁতসেঁতে হয়, তখন সে মাঠে আর এ কাজ করে না, অন্য মাঠে করে, ইত্যবসরে পূর্বের মাঠও শুকিয়ে যায়। এই রকম অদল বদল করে তারা কাজ চালাচ্ছে।” সেই- দিন তিনি জল পরিষ্কার করিবার বিজ্ঞানের অনেক কথা বলিতে লাগিলেন। একদিন বর্তমান লেখক মিসেস্ টার্ণার নামক জনৈক স্ত্রীলােকের বাড়ীতে খাইতে যান। স্ত্রীলােকটী গৃহস্থ, স্বামী পুত্র কন্যা আছে, তবে ভারতবর্ষীয় লােকের মত কিছু রাঁধিতে শিখিয়াছে, এইজন্য ভারতীয় লােকেরা মাঝে মাঝে তাহার বাড়ীতে গিয়া খাইয়া আসে। এক রকম ঘরােয়া হােটেল। স্বামীজী বর্তমান লেখককে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আজ সন্ধ্যার সময় কোথায় গিয়েছিলে?” বৰ্তমান লেখক বলিলেন, “মিসেস্ ১৪০ লণ্ডনে বিবেকানন্দ টার্ণারের বাড়ীতে খাইতে গিয়াছিলাম। মিসেস্টার্ণার খুব রাধিতে পারে।” স্বামীজী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি বেঁধেছিল ?” বর্তমান লেখক বলিলেন, “চাপাটি রুটী, মাংসের একটা তরকারি এবং আর দু একটী তরকারি, পুদিনার চাটনি, আর চাউলের পায়েস।” স্বামীজী হাসিয়া বলিলেন, “তাতে বেশ একরকম খাওয়া চলে। একদিন সে এখানে এসে বেঁধে যায় না, তাহলে একটু খেয়ে বাঁচি, একটু মুখ তারাই।” বর্তমান লেখক বলিলেন “সে গৃহস্থ লােক, সে ত ঝি চাকরাণী নয়, অপরের বাড়ীতে রাধতে আসবে কেন?” স্বামীজী একটু হাসিয়া বলিলেন, ‘া নয়, একদিন তার বাড়ীতে গিয়ে খেয়ে আসব।” কিন্তু তারপর সে কথা কাহারও মনে ছিল না।

গরম কালবেলা ৩টার সময় নীচেকার ঘরে স্বামীজী চেয়ারটিতে বসিয়া আছেন। ষ্টার্ডি, গুডউইন, সারদানন্দ স্বামী, রুস সম্রাটের স্মভিষেক বিবরণ। ফক্স, ও বর্তমান লেখক সকলেই ভিন্ন ভিন্ন চেয়ারে বসিয়া আছেন। রুসের সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাসের অভিষেকের বর্ণনা খবরের কাগজে বিশেষভাবে বাহির হইয়াছে। গুডউইন একখানি সংবাদ পত্র লইয়া বর্ণনাটী পড়িতে লাগিলেন। অভিষেকের স্মৃতিস্বরূপ বহুপ্রজাবর্গের অপ্রদত্ত খাজনা এক বৎসরের জন্য রদ হইয়াছিল এবং সিজারের অভিষেকের সন তারিখ লেখা এনামেলের একটি করিয়া গ্লাস বহু সংখ্যক লােককে দেওয়া হইবে সেইজন্য বিরাট আয়ােজন করা হইয়াছিল। গরীব প্রজা একটি করিয়া গ্লাসের লােভে মস্কোতে সমবেত হয় কিন্তু জনতা অত্যন্ত অধিক হওয়ার সাধারণ লােক কিছু পরিমাণে চঞ্চল হইয়া উঠে। পুলিশ জনতার সুশৃঙ্খলতার কোন বন্দোবস্ত করিতে না পারিয়া অবশেষে গুলি চালায় এবং তাহাতে বহু সংখ্যক লােক মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অবশেষে পুলিশের কর্তা নিজেকে গুলি মারিয়া আত্মহত্যা করে। সকলেই এই ভীষণ বর্ণনা শুনিয়া স্তম্ভিত হইয়া রহিল। খানিকক্ষণ পরে ষ্টার্জি বলিলেন, “বাকি খাজনা রদও তােত নাম মাত্র। বড় বড় কৰ্ম্মচারীরা যেমন করে হােক পেট ভরিয়ে নেবে, প্রজাদের ইহাতে কোন উপকার হবে না বরঞ্চ একটা ছুতাে করে বেশী খাজনা আদায় করবে। জলি অসভ্য জাত রাজ্য শাসন কিছুমাত্র জানে না, কেবল জবরদস্তি করে রাজ্য চালায়।” ষ্টাডি ইংরাজের সুশাসন ও অপরের কুশাসন সম্বন্ধে কথাবার্তাবলিতে লাগিলেন! গুডউইন উত্তেজিত হইয়া হাত মাথা নাড়িয়া বলিয়া উঠিলেন, “এ বড় অন্যায় অত্যাচার, এরকম ১৪২ লণ্ডনে বিবেকানন্দ করা উচিৎ নয়। যদি ইংলণ্ডে এরূপ অন্যায় অত্যাচার হইত তা হলে আমরা দেখে নিতুম” ইত্যাদি নানা প্রকার আস্ফালন করিতে লাগিলেন। স্বামীজী এতক্ষণ ঠেসান দেওয়া চেয়ারটিতে স্থিরভাবে নির্বাক হইয়া বসিয়াছিলেন—যেন কি একটা গভীর চিন্তায় মগ্ন হইয়া আছেন; মুখ অতি গম্ভীর, চক্ষুদ্বয় বড় বড় হইয়া উঠিল, শশাকে ও দুঃখে চোখ যেন ভরে গেছে। সহসা তিনি স্থির হইয়া বসিলেন এবং গম্ভীরভাবে এদিক ওদিক চাহিতে লাগিলেন। তারপর হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, কি দুঃখ ! কি কষ্ট! একটা এনামেলের গ্লাস পাবার জন্য শত শত লোেক নিজের গাঁ ছেড়ে সহরে এল এবং কত লােক গুলিতে মলাে। দেশটা কি গরীব! লােকগুলাে খেতে পায় না। নিজেদের এত হীন বলে মনে করে যে দু গণ্ডা পয়সার জন্য, একটা গ্লাসের জন্য প্রাণটা দিলে। জারের অভিষেকের এই হল একটি আনন্দ উৎসব না বীভৎস হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি রহিল ? এ যে অভিষেকের কথা বল্লেই লােকের মনে নরহত্যার কথা উঠবে। এটা স্বয়ং সিজারের সম্মুখে হইল ? কি দুঃখ, কি দুঃখ। লােকগুলাে এত হীন হয়ে গেছে” এই বলিয়া স্বামীজী মেজেতে শােকা, গম্ভীর ও বিষন্ন হইয়া পাইচারি করিতে লাগিলেন। কখনও বা হাত দুটো বুকের উপর রাখিতেছেন কখনও বা হাত দুটো পার্শ্বে নামাইয়া দিতেছেন। এতই শােকা ভাব যে অপরে আর কোন কথাই কহিতে পারিল না। সকলেই শােকাৰ্ত্ত হইয়া বসিয়া রহিল। তাহার পর সকলে একে একে উঠিয়া চলিয়া গেল। একদিন প্রাতভোজনের পর স্বামীজী বেশ প্রফুল্ল, পাইপে করিয়া তামাক টানিতেছেন ও মৃদু মৃদু হাসিতেছেন—যেন কাহার সঙ্গে কথা কহিতেছেন। সপ্তম এডওয়ার্ড তখন যুবরাজ। তাঁহার ‘পারমিসন’ বলিয়া এক ঘােড়া ডারবি রেসে এক বাজি জিতিয়াছে। ইংলণ্ড রেস খেলার ১৪৩ লণ্ডনে বিবেকানন্দ দেশ তাহাতে যুবরাজের ঘােড়া জিতিয়াছে তাই খুব হৈ চৈ পড়িয়া গিয়াছে। সকলেরই খুব আহলাদ। গুডউইন উত্তেজিত হইয়া নানা ভাবে ঘােড়দৌড়ের কথা বলিতেছেন, তাহার ভারি আমােদ। তিনি ঘােড়দৌড়ের নানা কথা বলিতেছেন কিন্তু স্বামীজী, বর্তমান লেখক ও সারদানন্দ স্বামীর সে সব কথা ভাল লাগিতেছে না। কিন্তু গুডউইন ততই উত্তেজিত হইয়া নানা কথা বলিতেছিলেন ও বহুবার ‘পারমিসন’ কথাটি উচ্চারণ করিতেছিলেন। স্বামীজী পায়চারি করিতে করিতে নানা রকম মুখ ভঙ্গি করিয়া ঠাট্টার ছলে সবে পারমিসন কথাটি বলিতে যাইতেছেন এমন সময় গুডউইন স্বামীজীর কাছে গিয়া নতজানু হয়ে জোড়হাত করে বসিলেন। গুডউইন স্বামীজীর সমস্ত ভাবগতিক জানিতেন সেইজন্য তিনি বুঝিয়াছিলেন যে স্বামীজী এইবার ঠাট্টা তামাসা করিবেন। গুডউইন স্বামীজীকে বলিতে লাগিলেন স্বামীজী, গরীব গুডউইনকে ঠাট্টা তামাসা গাল মন্দ যাহা কিছু করিতে হয় করুন কারণ গরীব গুডউইন আপনার শিষ্য, আপনার ভৃত্য কিন্তু রাজপরিবারের উপর কিছু বলিবেন না, এটা এ দেশে বড় দূষনীয় মনে করে আপনি আমার উপর কৃপা করুন। গুডউইনের কথা শুনিয়া সকলে স্তম্ভিত হইয়া রহিল। যে গুডউইন এক- জন পাকা radical schoolএর লােক তাঁহার কিন্তু রাজ পরিবারের উপর কি অচলা ভক্তি! স্বামীজী গুডউইনের কথা শুনিয়া স্তম্ভিত হইয়া বার কতক তাঁহার পানে চাহিয়া নিজের চেয়ারে গিয়া বসিয়া রহিলেন। একদিন সকাল বেলা আহারের পর স্বামীজী নীচেকার ঘরে নিজের চেয়ারে বসিয়া আছেন। ষ্টার্ভি, সারদানন্দ স্বামী আমেরিকার ও বর্তমান লেখকও নিজের নিজের চেয়ারে বসিয়া পাত্রীদের কথা। আছেন। ষ্টার্ডির সহিত স্বামীজীর আমেরিকার পাদ্রীদের কথা উঠিল। স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, “আমেরিকার পাত্রী SSS লণ্ডনে বিবেকানন্দ গুলাে কেবল টাকা নােজগারের ফন্দিতে বেড়ায়। শ্রদ্ধা, ভক্তি এসব তাহাদের ভিতর কিছুই নাই। আমেরিকার কারবারীগুলাে যেমন টাকা টাকা করে বেড়ায়, ও দেশের পাদ্রীগুলােও তেমনি শুধু টাকা রােজগারের ফন্দি করছে। যীশু কোথায় মহা ত্যাগ বৈরাগ্য দেখিয়ে গেল, এক কম্বল গায়ে দিয়ে পথে পথে ঘুরে ভগবানের নাম শুনিয়ে গেল আর এই পাদ্রীগুলাে কেবল টাকা, টাকা করে বেড়াচ্ছে। আমি একদিন চটে গিয়ে দু’চার কথা বলে দিলুম। তারা তাে আমার উপর খুব চটে গেল কিন্তু সাধারণ লােকে আমার উপর খুব খুসী—কারণ পাদ্রীর দপ দপানিতে মুখ খুলে কেউ ধানি দিতে পারে না।” ষ্টার্ডি বলিলেন, “পৃষ্টান ধর্মটা একেবারে পচে গেছে, এটা নিতান্ত Military ও Commercial ধৰ্ম্ম হয়েছে। লড়াই ও কারবার এই দুইটী হচ্ছে সার। এই ধৰ্ম জগতে আর টিকবে না, একেবারে গােড়া বলে ফেলে নূতন ধর্ম স্থাপন করতে হবে, বেদান্ত ধৰ্মই একমাত্র শুধু এখন চলবে”—এই সব কথা বলিতে বলিতে ষ্টার্জি কিছু উত্তেজিত হইয়া খৃষ্টানধৰ্ম্মের ভিতরকার নানা রকম গ্লানির কথা বলিতে লাগিলেন। টাকা না নিয়ে গেলে কোন গির্জেতে ঢােকবার যাে নাই, যে যত পরিমাণে টাকা ঢালবে সে তত পরিমাণে ধর্মপরায়ণ হবে। শ্রদ্ধা ভক্তির তাে নাম গন্ধ নাই। গিটো হল একটা টাকা বােজগারের দোকান’—৪ার্ডি এইরূপ নানা রকম কথা বলিতে লাগিলেন। একদিন একটা ভদ্রলােক স্বামীজীর সহিত দেখা করিতে আসিলেন। তিনি স্বামীজীর সঙ্গে কথা কহিবার সময় মাঝে মাঝে বলিতে লাগিলেন, “Do you not think so and so ?” যেন তাহার সিদ্ধান্ত মত স্বামীজীকেও ভাবিতে হইবে, নিজে স্বাধীন ভাবে চিন্তা করিবার কাহারও অধিকার নাই, তা’র মতেই মত দিতে হইবে এবং ভিন্ন মত হইতে . ১৪৫ লণ্ডনে বিবেকানন্দ পারে না। স্বামীজী স্থির হইয়া মুখ গম্ভীর করিয়া সমস্ত কথা শুনিতে লাগিলেন। অবশেষে দুই একটি কথা কহিয়া তাহাকে বিদায় দিলেন। লােকটি চলিয়া গেলে স্বামীজী ষ্টার্ভিকে বলিতে লাগিলেন, “This is a bad way of conversation, লােকটা ওর কথাই যােল আনা বলে গেল যেন আর কোন রকম কেউ ভাবতে পারে না; মাতব্বরি হিসাবে লােকের সঙ্গে কথাবার্তা কয়, I cannot bear this patronising tone, তাতেই লােকটীর কথায় বেশী যােগ দিলাম না, অল্প দুই একটা কথা কয়ে লােকটীকে উঠিয়ে দিলাম।” ষ্টার্জি বলিলেন, “কথাবার্তায় অনেকের ওই দোষটা আছে, ওপর পরােয়া হয়ে নিজের মত চালায় কিন্তু শ্রোতার যে ভিন্ন মত হতে পারে সেটা সে বুঝতে পারে না, এই মাতব্বরি ভাবে কথা বলা অনেকেরই দোষ আছে।” একদিন ষ্টার্ডি সকালে স্বামীজীর চেয়ারখানিতে ঠেস দিয়া বসিলেন। বক্তৃতা খুব চলিতেছে এই জন্য মন প্রফুল্ল। তিনি বলিতে লাগিলেন, মিসেস ষ্টার্ডি তাহার একটী আলাপী লােকের বাড়ী দিনকতক গিয়ে থাকবে। আর তিনি হয়ত এইখানে দিনকতক থাকবেন, না হয় অন্যত্র বেড়াইয়া আসিবেন। এখানে ঘর তত কম। তা যাহা হউক লেক্চার ঘরের শােফার উপর শােওয়া যাবে তােত। ষ্টার্ডি এইরূপ ঘরােয়া কথা অসঙ্কুচিত চিত্তে বলিতে লাগিলেন। সকলের ভিতর পরস্পর বেশ আপনাআপনি ভাব হয়েছিল, বিদেশী লােক বলে কোন কিছু দ্বিধা ছিল না। একদিন একটী লােক আসিয়া তার সাংসারিক নানা কথা স্বামীজীর সহিত বলিতে লাগিল এবং এইরূপ স্থলে কি করা উচিত সে বিষয়ে পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। স্বামীজী শুনিয়া বিবেচনা মত যাহা উচিত হয় তাহাই বলিলেন। লােকটী সমস্ত মনের কথা স্বামীজীকে বলিয়া যেন আশ্বস্ত হইল। অনেক লােকই স্বামীজীকে আত্মপরিবারের লণ্ডনে বিবেকানন্দ মধ্যে গণ্য করিত, সেইজন্য যার যা সংসারের কথা ও মনের কথা আসিয়া খুলিয়া বলিত। বিদেশী লােক—তার সঙ্গে আবার কি মিণিব এইরূপ ভাবটী মােটেই ছিল না, অনেকের সহিত স্বামীজীর এইরূপ মেশা- মেশি হইয়াছিল। পার্লামেন্টের একটি বাই-ইলেকসন বাহির হইল বা ব্যক্তিগত নির্বাচন হইল। গুডউইন হুজুগে লােক, দিনকতক খুব মেতে গেলেন। একদিন তিনি একজন আরমনি-ইংরেজের নকল করিতে লাগিলেন এবং আরমনির বক্তৃতা লইয়া কৌতুক করিতে লাগিলেন। তাহার পরদিন বেলা নয়টার সময় একটী গ্রাম্য লােক মজুরের বুট পায়ে দিয়া দরজায় ধাক্কা মারিল। গুডউইনের সহিত বর্তমান লেখক দরজার কাছে গেলেন। গুডউইন তাহার সহিত সদর দরজায় কথা বলিয়া তাহাকে বিদায় করিয়া দিলেন। বর্তমান লেখক বলিলেন, “ওকে বাড়ীর ভিতর আনলে না কেন?” গুডউইন বলিলেন “He belongs to a labouring class.” অর্থাৎ মুটের শ্রেণীকে ভদ্রলােকের বাড়ীতে ঢুকিতে দেওয়া যাইতে পারে না। বর্তমান লেখক শুনিয়া মনে মনে ভাবিলেন, এই গুডউইন্ বলেন সকল ইংরেজই সমান, One man one vote অর্থাৎ প্রত্যেক লােকের একটি ভােট। কিন্তু ইহাকে বাড়ীতে ঢুকতে দিলে না, এদের ভিতরেও সমাজের উচু নীচু জ্ঞান এত বেশ। ঘরে আসিয়া সারদানন্দ স্বামী বলিতে লাগিলেন যে, গুডউইন এদিকে স্বামীজীর এত ভক্ত-সেবা, শুশ্রুষা করে। কিন্তু Politics পেলে একেবারে মেতে যায়। ইংরেজ জাতির হাড়ে হাড়ে এত Polities ঢুকে গেছে। স্বামীজীর সংস্রবে আসিয়া গুডউইনের শ্রদ্ধা, ভক্তি, সেবার ভাব খুব হয়েছে কিন্তু জাতে ইংরেজ তাে, ইংরেজের দোষগুণগুলা সব রয়েছে। জাতের দোষগুণ কিছুতেই যায় না। তাহার পর সকলে উঠিয়া গেলেন। ১৪৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ গুডউইন একদিন দুপুর বেলা বসে রাজনীতির কথা বলিতে লাগিলেন। গুডউইন Liberal বা Radical দলের লােক ছিলেন। যদিও স্বামীজীকে অত্যন্ত ভক্তি করিতেন, ছায়ার মত গুডউইনের স্বামীজীকে অনুসরণ করিতেন, কিন্তু রাজনীতির দুটা রাজনীতিক অভিমত কথা বলিতে পারিলে তার প্রাণে বড় ঘূৰ্ত্তি হইত, তখন যেন তিনি নিজের ধাতে আসিতেন। তিনি বলিতে লাগিলেন, “Gladstoneএর মত এই যে ইংরেজদিগের যত উপনিবেশ আছে সবগুলিকে Republic করিয়া ( স্বাধীন করিয়া) দেওয়া চাই। যে যার নিজের স্বাধীন ভাবে কাৰ্য্য করিবে, শুধু একটা Commercial Treaty এবং offensive ও defensive allowance থাকিবে। Irelandকেও ঠিক সেই ভাবে দেওয়া চাই। কারণ একজন প্রধান মন্ত্রী এত বড় রাজ্য সুশৃঙ্খল ভাবে চালাতে পারে না, অনেক ভুল হইয়া যায়।” সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, “আয়ারলণ্ড চলে গেলে ইংরেজের রাজত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।” গুডউইন চট করে উত্তর করিলেন আয়র্ল্যাণ্ডের কথা “কেন, আয়ারলণ্ড আগে তাে ভিন্ন রাজ্য ছিল, তারা নিজের কাজ নিজে করত, শুধু নেপােলিয়ানের লড়াইয়ের সময় উইলিয়াম পিট সেই আয়ারলণ্ডকে মিলিয়ে নিয়েছিল। এক একজন জমীদারকে এমন কি, এক ক্রোর টাকা ঘুস দিয়েছিল, বড় বড় উপাধি দিয়ে বশ করেছিল। পিট একজন বড় রাজনীতিজ্ঞ লােক ছিল, তখন সে কি বুঝেছিল এখন ঠিক বলা যায় না কিন্তু এখনকার সময় সে কাজটা কুফল হয়েছে এইজন্য আয়ারলণ্ডকে মুক্ত করে দেওয়া নিতান্ত আবশ্যক, তা না করিলে বােজ খিটি মিটি হয়, ইহাতে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ চলে না।” সারদানন্দ স্বামী চুপ করিয়া রহিলেন তাহার পর ভারতবর্ষ ও ইজিপ্টের কথা উঠিল। গুডউইন বলিলেন, ১৪৮ 7 লণ্ডনে বিবেকানন্দ “ভারতবর্ষ ও ইজিপ্ট এখন নিজে নিজে রাজ্য চালাইতে তেমন পারগ নহে, বিশেষতঃ ভারতবর্ষে কস আক্রমণের বড় ভয় ভারতবর্ষ ও ইজিপ্ট আছে সেইজন্য এই দুইটী দেশকে কিছুদিন হাতে রাখিয়া কাৰ্য্য প্রণালী শিখাইতে হইবে। পরে স্বতন্ত্রভাবে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে শুধু একটা ব্যবসায়ী সন্ধি রাখিলেই হইবে। কারণ একটা জাত অপর একটা জাতকে বেশী দিন দাবিয়ে রাখতে পারে না। আর ভারতবর্ষে ইংরেজের সংখ্যা অল্প, তার বিদেশী। তাহারা এ দেশের লােকের আচার ব্যবহার জানে না। ভারতের জাতিগত ভাব স্বতন্ত্র, ইংরেজেরও জাতিগত ভাব স্বতন্ত্র, দুটো জাতে কখনও মিল হতে পারে না, অল্পসংখ্যক লােক বহু সংখ্যক লােককে কিছুতেই দাবিয়ে রাখতেও পারে না। তবে উপযুক্ত করে যত শীঘ্র ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে ততই ভাল, তা হলে ইংরেজ জাতের যত শক্তি ভারতবর্ষ চুষে খাবে। কিছুদিন পরে ইংরেজ জাতটা ভুয়গা হয়ে যাবে, ইংরেজ জাতের আর কোন শক্তি থাকবে না।” তাহার পর রুস আক্রমণের কথা উঠিলে গুডউইন বলিলেন, “রুল এখন আর ভারতবর্ষ আক্রমণ করিতে পারিবে না।” সারদানন্দ স্বামী বলিলেন, “তাইমুর প্রভৃতি মধ্য এসিয়া হইতে পুনরায় কন্স আক্রমণের ভেদ করিয়া ভারতবর্ষে আসিতে পারে না। ” গুডউইন বলিলেন, সে সেকালে পারত এখনকার দিনে হয় না ; সেকালে ফৌজের সঙ্গে মাল পত্র সামান্য থাকত। কতকগুলা Rabel (গােলা লােক) একসঙ্গে চলিলেই ফৌজ বলি ত। কিন্তু এখনকার ফৌজের সঙ্গে বড় বড় তােপ অনেক থাকে। হিমালয় ভাে করিয়া আসা এখন অসম্ভব। রুসের ফৌজ কিছুতেই হিমালয় ভেদ করে ভারতে আসতে পারে না, এটা শুধু খবরের কাগজের হৈ চৈ মাত্র, বিশেষতঃ কথা ১৪৯ লণ্ডনে বিবেকানন্দ আফগানিস্থানকে ঘাটিদার (Buffer state) করে রাখা হয়েছে। রুসের শক্তির প্রকোপটা আফগানিস্থানের উপর পড়িবে—সেই খানেই শক্তি খরচ হয়ে যাবে তা হলে ভারতবর্ষে আসিতে পারিবে না। গুডউইন স্বামীজীর কাছে মুখ বন্ধ করে থাকিতেন এইজন্য দুইটা শ্রোতা পাইয়া মুখ খুলিয়া রাজনৈতিক বিষয়গুলি বলিতে আরম্ভ করিলেন। তাহার পর ইংলণ্ডের রাজনীতির কথা তুলিলেন। গুডউইন বলিলেন, "House of Cominons q* House of Lords go aterata cota আবশ্যক নাই। সাধারণ লােকের প্রতিনিধি House of Commons, ইহারাই যথার্থ কাজ করিয়া থাকে কিন্তু হাউস্ অফ্ লর্ডস এরা কাহারও প্রতিনিধি নয়, নিজেরাই নিজেদের প্রতিনিধি। অপরের সাথে বসবার তার কোন অধিকার নাই আর অনেক সময় নিজেদের স্বার্থ রাখিবার জন্যে তাহারা স্বার্থপরতা প্রকাশ করে এবং জাতির উদ্দেশ্যের অন্তরায় হইয়া থাকে। বিশেষতঃ হেরেডিটারী লেজিলেটার (বংশগত নীতিকারক) কেহ হইতে পারে না। হইতে পারে তার বাপ বড় বিচক্ষণ লােক ছিল তা বলে তার বেটাও উপযুক্ত হইবে ইহা কোন যুক্তিসঙ্গত কথা নহে। House of Lordsএ অনেক লােকই দেখা যায় যারা অপদার্থ, শুধু নামের দোহাই দিয়ে সভায় এসে বসে।” বর্তমান লেখক জিজ্ঞাসা করিলেন, “হেরেডিটারী লেজিলেটার তুলে দিলে রাজাও ত একজন হেরেডিটারী লেজিলেটার, তাহা হইলে তাহারও তত চাকরী উঠিয়ে দিতে হবে। কারণ রাজাও নিজে একজন House of Lordsএর Member এইজন্য তাহাদিগকে Peer বা স্বশ্রেণী বলে। Peerএর পদ উঠিয়ে দিলে রাজাকেও উঠাতে হবে। গুডউইন বলিলেন, “তা আবশ্যক নয়। রাজা-রাজা। আমাদের রাজা ইচ্ছামত কিছু করিতে পারে না, Constitutional King. অনেক দেশেও লণ্ডনে বিবেকানন্দ তাে Single Chamber (একক সভা) তাদেরও ত রাজা আছে ? কিন্তু louse of Lords কোন মতেই রাখা যাইতে পারে না।” গুডউইন সেদিন মহা উত্তেজিত হইয়া ক্রমাগতই রাজনীতির কথা বলিতে লাগিলেন। অবশেষে সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক উঠিয়া গেলেন। ফক্স একদিন আমেরিকার রাজনীতির কথা তুলিল। সে নিজে আমেরিকান রিপাবলিকান, সেই জন্য ইংরেজদের রাজ্য শাসন প্রথা হচ্ছে বুড়ােটে, প্রাচীনকালের রাজ্যশাসন প্রথা ইত্যাদি অামেরিকার রাজনীতি বলিয়া একটু শ্লেষ করিয়া কথা বলিলেন। ফক্স বলিল, “ইংরেজ জাত আমেরিকান জাতের ৫০ বৎসর পিছনে। ইহারা বড় কসারভেটিভ (conservative) লােক, কোন একটা নূতন ভাব শীঘ্রই নিতে চায় না। সমস্ত জগতে যে ভাবটা নিতে চায় ইংরাজেরা বিবেচনা করে যে সে ভাবটা নেওয়া যেতে পারে কি । একটা কারণ হইতে পারে যে দেশটা সেলে ও মেঘলায় ঘেরা, লােকের মন যেন ভিজে রয়েছে, গরম হতে অনেক সময় লাগে, এইজন্য আধুনিক সভ্যতার পঙতিতে ইংরাজেরা ঢের পেছনে। তবে ইংরেজের একটী জাতিগত ব্যায়রাম হয়েছে সেটার নাম হচ্ছে Iand hunger ( জমির খিদে )। পৃথিবীর যেখানে যত জমি পাবে ন্যায়তঃ বা অন্যায়তঃ সে জমিটা ইংরেজেরা খেয়ে বসবে। এত মাইল জমি নিয়ে কি আবশ্যক ? এটা শুধু জাতির দুর্বলতা। অল্প জমি উন্নত করিলে ঢের ভাল ফল হয়। অনেক জমি দখল করে রাখলে জাতির শক্তি ক্ষয় হইয়া যায়, জাতের সব শক্তি ও মনােবৃত্তি লয় হইয়া যায়। তার বিশেষ একটা লক্ষণ হচ্ছে এই যে আমেরিকায় বা অন্য দেশে বড় বড় চিন্তাশীল লােক আছে, জাতের ভিতর যে তেজঃপূর্ণ একটা প্রাণ আছে তাহার পরিচয় দেয়। কিন্তু ইংরেজ জাতের ভিতর প্রখর মস্তিষ্কের লােক বেরুচ্ছে লণ্ডনে বিবেকানন্দ , জগৎকে নূতন ভাব আর দিতে পারছে না। ইহারা শুধু Diplomacyর চুড়ান্ত হইয়াছে। শুধু কথা বেচে দুৰ্বল জাতের উপর প্রাধান্য স্থাপন করা যায় কিন্তু শক্তিমান্ জাতের কাছে হটে আসতে হয়। আর যে জাত ইংরেজকে বিশ্বাস করে না সেখানে ইংরেজ পরাস্ত হয়। এখন সমস্ত জগৎ নূতন ভাবের জন্য আমেরিকার দিকে চাহিয়া আছে। এখন যদি নূতন সঙ্গীতের রাগ, চিত্র, দর্শন বা কবিতা বেয়ােয় ততা শুধু আমেরিকায় বেরুবে। পুরান জাত ইংরেজের নিকট হতে বেরুবে না। এ জাতটার আর উচ্চ চিন্তা করিবার ক্ষমতা নাই।” তাহার পর আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার কথা উঠিল। ফক্স বলিল, “যদি পার্লামেন্ট কোন একটা আইন করে, রাজার তাহা নামঞ্জুর করিবার এর আছে এবং প্রত্যেক আইনে রাজার মত আবশ্যক হয় কিন্তু আমরা রিপাবলিকান, আমাদের রাষ্ট্রপতির এ সবে কিছু ক্ষমতা নাই; সাধারণ ভাবে বা রাষ্ট্রপতির মত স্বাক্ষর করিয়া প্রকাশ করিবে। কিন্তু যদি রাষ্ট্রপতির কোন আইনে মত না থাকে তাহা হইলে কংগ্রেস নিজের একরে সেই আইন চালাইতে পারে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর কোন আবশ্যক হইবে না। তাহার পর কথা উঠিল, ইংলণ্ডে ও আমেরিকায় অনেক টাকার ঋণ কর্জ নেয় সে টাকার দরুণ কে দায়ী ? সারদানন্দ স্বামী বলিলেন “যারা ঋণ নিয়েছে তাদের প্রত্যেক লােকেই দায়ী।” বর্তমান লেখক বলিলেন, “নিজের ঋণ হলে নিজে দায়ী কিন্তু জাতির ঋণ হলে প্রত্যেক লােক ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। শুধু রাষ্ট্রপতি সকলের প্রতিনিধিস্বরূপ দায়ী। প্রত্যেক লােক রাষ্ট্রীয় বিধিতে স্বাক্ষর করিতে পারে না এইজন্য রাষ্ট্রপতির পর রাষ্ট্রসচিব--তাহার স্বাক্ষর গণ্য করিয়া লওয়া হয়।” গুডউইন বলিলেন ‘তােমার ঠিক কথা, প্রধান একজনের মত বা স্বাক্ষর সকলের মত বা স্বাক্ষর বলিয়া পরিগণিত হয় এই হচ্ছে ;

লণ্ডনে বিবেকানন্দ 1 রাজনীতির প্রধান নিয়ম। একজনকে সকলে মানিয়া চলিবে। ব্যক্তিগত ভাবে ভিন্ন ভিন্ন মত চলিবে না তাহাকে Mobocracy বা হাউডাের দল বলে। ক্রমেই ইংরেজ ও আমেরিকানদের প্রাধান্য লইয়া কথাটা বেশী গরম হইয়া উঠিল। কাজেই কথাটা বন্ধ করিয়া দিয়া অন্যত্র সকলে চলিয়া গেলেন। যেদিন রাত্রে বক্তৃতাকালে একটি ইংরাজের সহিত স্বামীজীর ঝগড়া হইয়াছিল তাহার পরদিন প্রভাতে শয্যা হইতে ভারতীয় সংগ্রামের উঠিতে স্বামীজীর অনেক দেরী হইয়াছিল। কারণ কথা। সে রাত্রে মন চঞ্চল থাকায় তিনি গুডউইনকে লইয়া অনেক রাত্ৰি পৰ্য্য রাস্তায় বেড়াইয়াছিলেন। রাত্রে ঠাণ্ডা লাগায় চোক- গুলা ফুলিয়াছিল। স্বামীজী তাহার ড্রেসিং গাউন গায়ে দিয়া ও পায়ে নরম চামড়ার পেছন উচু শ্লিপার দিয়া প্রয়ি ৯টা বা ৯টার সময় খাইতে বসিলেন। প্রাতভর্ভাজন সমাপন করিয়া তিনি তাঁহার ঠেস্ দেওয়া চেয়ার- খানিতে বসিলেন। এত দিন পর্যন্ত গুডউইনের সহিত ধর্মচর্চা ও আমেরিকার বক্তৃতার কথা চলিত কিন্তু আজ হঠাৎ স্বামীজীর ভাষা ও সুর বদলাইয়া গেল। তিনি ভারতীয় যুদ্ধের বিষয় বলিতে লাগিলেন। কারণ পূৰ্ব্ব রাত্রে তিনি অনর্গল ইতিহাসের কথা বলিয়াছিলেন। এখনও ভিতরে সেই ভাবটা রহিয়াছে, সেইজন্য ইতিহাসের নানা কথা আরম্ভ করিলেন। স্বামীজী সুরু করিলেন যে যখন ইংরেজরা প্রথম মাদ্রাজে আসে তখন ফরাসীরা খুব উন্নত জাতি ছিল। যুদ্ধ ও রাজনীতিতে তাহাদের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। কিন্তু ফরাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করায়, স্থানীয় মুসলমান ও ফরাসী এক হইয়া যায় এবং ইংরেজদিগের আরকট দুর্গে অবরােধ করে ; ইংরেজদের তখন অল্প মাত্র দেশী সেপাই ছিল। লড়াই ও অবরােধ ক্রমেই বাড়িতে লাগিল। ইংরেজরা ক্রমেই ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িল, অনেক লােক মারা গেল। এদিকে তাদের রসদ একেবারে কমিয়া আসিতে লণ্ডনে বিবেকানন্দ লাগিল। খাদ্য না থাকায় অবরােধকারীদের বা শক্তহস্তে আত্মসমর্পণ করিতে হইবে, না হয় শুকাইয়া মরিতে হইবে, কিন্তু ভারতীয় সেপাইরা এত কৃতজ্ঞ ও উচ্চমনের লােক.যে তাহারা বলিল আমরা ভারতীয় লােক, লঘু আহারেই থাকিতে পারি। সেইজন্য তাহারা ভাত রাঁধিয়া নিজেরা ফেন খাইতে লাগিল এবং ইংরেজ সেপাইদিগকে ভাতটা দিতে লাগিল । এইরূপে কয়েক দিন চলিল। একজন মারাঠা সেনানী দূরে নিজের সেনা সহ ছাউনী করিয়া কয়েক দিন ইংরেজদিগের বীরত্ব দর্শনে অতিশয় প্রীত হইয়া বলিলেন, “যাহারা এরূপ সুকৌশলে আত্মরক্ষা করিতে পারে আমি তাহাদের সাহায্য করিব” এই বলিয়া তিনি নিজে হার দলবল লইয়া অগ্রসর হইলেন। মহারাষ্ট্রের তখন প্রবল প্রতাপ। তিনি ফৌজ লইয়া ইংরেজদের সাহায্যে অগ্রসর হইতেছেন এই খবর পাইয়া মুসলমান ও অল্পসংখ্যক ফরাসী সৈনিকেরা সরিয়া পড়িল এবং দুর্গস্থিত ইংরেজের প্রাণ রক্ষা হইল। এই হইল হিন্দুদিগের উদার ভাব, বীরত্বের ভাব—তার পরিবর্তে তােমাদের জাতেরা হিন্দুদের অবজ্ঞা, অত্যাচার করিতে লাগিল। মৃত্যুর মুখ হইতে বাঁচাইয়াছিল বলিয়াই তােমরা এখন হিন্দুদিগের উপর নানা প্রকার অত্যাচার করিয়া থাক। তােমাদের জাতের ভিতর কৃতজ্ঞতা নাই, তােমরা হ’চ্ছ স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ জাত। তাই জগতের লােকেরা তােমাদের কেউ বিশ্বাস করে না। সিনিয়া মহারাজ এই সময় অনেক সুশিক্ষিত ফরাসী সেনাপতি নিজের চাকরীতে রাখিয়াছিলেন এবং নিজের ফৌজ পাণিপথে সিন্দিয়া ফরাসী যুদ্ধ প্রণালীতে গঠন করিয়াছিলেন। ফৌজ মহারাজের ফৌজ। খুব সুশিক্ষিত, তাহারা অনেক তােপ সংগ্রহ করিয়া- ছিল। আহ্মদ সা আবদালি দিল্লীর সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে আসে। ১৫৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ দিল্লীর সম্রাট তখন নামতঃ রাজা, কোন কিছুই শক্তি ছিল না। সিন্দিয়া তাঁহার ফরাসী ফৌজ লইয়া পানিপথের যুদ্ধে চলিলেন এবং নানা স্থান থেকেও ফৌজ একত্রিত হইয়াছিল। পাছে যুদ্ধে জয় হইলে অপর রাজাদের ও দিল্লীর বাদশাহের আধিপত্য বাড়ে এইজন্য সিন্দিয়া মহারাজ বিশেষ লড়াই না করিয়া নিরপেক্ষভাবে রহিলেন, অবশেষে পানি- পথের লড়ায়ে দিল্লীর বাদশাহের হার হইল ও আহ্মদ সা আবদালির জিত হইল। মহারাজা সিন্দিয়া এই অবসরে নিজের রাজ্য ও আধিপত্য বাড়াইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন কিন্তু পাণিপথের লড়ায়ে তাঁহার পুত্র মারা যায়, এই শােক তাহার প্রাণে এত লাগিয়াছিল যে তাহাতেই তিনি এক প্রকার উন্মাদ হইয়া যান। অবশেষে বৃন্দাবনে এক বিশিষ্ট মন্দির দর্শন করিতে গেলেন। হিন্দুরাজা মন্দির দর্শন করিতে গিয়াছেন, সকলেই তাহাকে খুব অভ্যর্থনা করিল, সিন্দিয়া ঠাকুরের কাছে ক্রমাগত মাথা খুঁড়িতে লাগিলেন ও চীৎকার করিতে লাগিলেন, “ঠাকুর, আমার ছেলে মল কেন ?” বিগ্রহ তাে কথা কহিল না। অবশেষে ঠাকুরের ঘরে ঢুকে ঠাকুরের অলঙ্কার সােণা, রূপা, হীরে সব নিজের হাতে খুলে নিলেন। সকলে দেখিয়া অবাক, অবশেষে মন্দিরের সব জিনিস পুটুলী বাঁধিয়া লইয়া নিজের দেশে চলিয়া গেলেন, শেষটা শশাকে পাগল হইয়া মারা গেলেন। গুডউইনের সহিত স্বামীজীর ইতিহাসের কথা যাহা হইয়াছিল তাহা কেবল একদিন প্রাতঃকালেই হয় নাই, এই সময় রােজই কিছু কিছু হইত এইজন্য সমস্ত উপাখ্যানগুলি একত্র সন্নিবেশিত হইল। নাদের সাহ দিল্লী লুণ্ঠন করিয়া ময়ূর সিংহাসন লইয়া দেশে চলিয়া গেল। কয়েক বৎসর পর তাহার মৃত্যু হইল এবং তার এক সেনাপতি আহ্মদ সাহ দুরানী বা আবদালি আফগান দেশে স্বয়ং লণ্ডনে বিবেকানন্দ রাজা হইয়া বসিল। এই দুরানী আফগান দিল্লীর বাদশাহের দুর্বলতা বুঝিয়া কয়েক বার লুণ্ঠন করিতে আসিয়াছিল । লােকটী অতি নিষ্ঠুর এবং লুট তরাজ ভিন্ন অপর কিছু বুঝিত না। তাহার বিষয় একটী গল্প আছে। দুরানী সবদার অনেক বিবাহ করিয়াছিল, ছেলে মেয়েতে তার প্রায় ১৫০টী জন্মিয়াছিল। লােকটি এত নিষ্ঠুর ও এত বৰ্বর যে মেয়ে ভুমিষ্ঠ হইলেই তাহাকে মারিয়া ফেলিত ; একটী মেয়েও সে জীবিত রাখিত না। পাছে ভুমিষ্ঠ হইলেই মারিয়া ফেলে এইজন্য একজন ধাই বা ধাত্রী ভুমিষ্ঠ হইলেই একটী মেয়েকে লুকিয়ে নিয়ে রাখে। এবং এ বিষয়ে এত গােপন করিয়াছিল যে সবদার কোন খবর পায় নাই। এইরূপে প্রায় ১৬ বৎসর কাটিয়া গেল। ধাইয়ের মনে হইল মেয়েটী এখন ১৫/১৬ বৎসরের হইয়াছে, দেখিলে বাপের হয়ত মনে স্নেহ হইবে, আর প্রাণে মারিবে না। এইরূপ চিন্তা করিয়া মেয়েটিকে একদিন বাপের সানে আনিয়া তাহার পরিচয় দিয়া দিল । জঙ্গলী সবদার এমনি নিষ্ঠুর ছিল যে শুনিবামাত্রই কোমরের তলােয়ার খুলিয়া তখনই মেয়েটিকে কাটিয়া ফেলিল। কি লােমহর্ষণ ব্যাপার। এই হ’ল জঙ্গলী আফগানদের কাণ্ড! স্বামীজী এই কথা বলিতে বলিতে মুখ বিবর্ণ করিয়া মৌন হইয়া রহিলেন, সকলেরই মনে একটী বিষাদ ভাব হইল কারণ স্বামীজীর বর্ণনা শক্তি অতি সুন্দর ছিল। অভিনেতারাও সেইরূপ ভঙ্গি করিয়া ভাবপ্রকাশ করিতে পারে না এই জন্য তাহার কথা ও বর্ণনা সকলের এত হৃদয়গ্রাহী হইত। স্বামীজী একদিন নাদের শাহের কথা পাড়িলেন। নাদের জাতিতে তাতার। Casbian সাগরের ধারে মরুতটে ভেড়া চরাইত। তাহাতে তাহার মন উঠিল না, একটা দল করে ডাকাইতি সুরু করিল। অবশেষে সে পারস্য রাজ্যের ফৌজের সিপাই হইয়া প্রবেশ করিল। ডাকাতি করিয়া লােক মারপিট, খুনখারাপী নাদের শাহের কথা।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ করিয়া অবশেষে সেনাপতি হইল এবং পারস্য দেশের রাজাকে মারিয়া ফেলিয়া সে নিজে রাজা হইল। কিন্তু যে জঙ্গলী সেই জঙ্গলীই রহিল । খুনখারাপী ছাড়া অন্য কিছু বুঝিত না, মানুষ মেরে মেরে মানুষ মারা তার মাথায় একটা ব্যানাে হইল। কিন্তু লােকটার একটা গুণ ছিল মুখ দিয়ে যা বলবে ঠিক সে কাজ সে করবে তা এতে লাভ হক আর লােকান হক। তার কথাই ছিল—“নাদের দুকথা বলে না।” অবশেষে এক সময় খােরাসানে (মেসে বা প্রাচীন তুষ সহরে ) ছাউনি করিতেছে, তাহার প্রধান কর্মচারী কাজরও তার বংশীয় ছিল। নাদের শুইবার সময় শপথ করিল, প্রাতে উঠিয়া সমস্ত তাঁবুর কাজারদের নির্মূল করিবে। একটিকেও বাঁচিতে দিবে না। এই কথা শুনিয়া সকলে পরামর্শ করিল যে নাদের বখন বলিয়াছে সে তখন নিশ্চয় করিবে । তখন তাঁবুতে প্রায় পাঁচ হাজার কাজার ছিল। তাহারা একজোট করিয়া নাদেরের শােবার তাবুতে ঢুকিয়া নাদেরকে কাটিয়া ফেলিল। তাই থেকে কাজাররা পারস্যদেশের রাজা হইয়া আসিতেছে। একদিন গুডউইন ইংরেজ সেপাইদের খুব বীরত্বের কথা বলিতে লাগিলেন। গুডউইনের কথার মর্ম এই যে, ইংরেজ সেপাইয়ের মত অন্য কোন সিপাই সাহসী হয় না। স্বামীজী চুপ করিয়া শুনিতেছিলেন। গুড- উইনের কথা সমাপ্ত হইলে স্বামীজী তেজ করিয়া নিজের চেয়ারটীতে সােজা হইয়া বসিলেন। তারপর বলিলেন, “হ্যা রে গুডউইন, তাের ইংরেজ সেপাই- দের বীরত্বের তাে সে বৎসর আফগান সীমান্তের লড়ায়ে পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। একদল আফগান পাহাড়ের উপর হইতে লড়াই করিবার জন্য ধীরে ধীরে নীচে নামিতে লাগিল। একজন একটা নিশান নিয়েছে আর একটী মােল্লা গলায় একটা বড় ডােল ঝুলিয়ে বাজাচ্ছে। যত "আফগানরা তাদের বন্দুক তলােয়ার নিয়ে হৈ হৈ করে ভীষণ চীৎকার ১৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ করূছে এবং ক্রমেই এগুচ্ছে। এদিকে ইংরেজের তরফে এক পলটন দিশি সেপাই আফগানদের আক্রমণ করিতে দিশি সেপাইদের ভিতর একজন লক্ষ্য করিয়া ঢােল বাজানওয়ালা মােল্লাকে গুলি মারিল। মােল্লা পড়িয়া গেল। কিন্তু পাছে ঢােলের আওয়াজ বন্ধ হয় ও আফগারা পাছে ভয়, পায় এইজন্য আর একজন লােক তাড়াতাড়ি ঢলটা গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে বাজাইতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে ভারতীয় সেপাইরা পাঁচ জন আফগান ঢােল বাজানওয়ালাকে গুলি দিয়া মারিয়া ফেলিল। ষষ্ঠ লােক তখনি ঢােলটী গলায় ঝুলাইয়া লইতে তাহাকেও দিশি সেপাইরা গুলি মারিল। আফগান ঢােলওয়ালা তার সঙ্গীদের বলিল, তাহারা যেন নিশানের গায়ে ঠেস্ দেয়, তখন চোখ বুজে আছে ও হাত দুটীও নিস্তেজ হয়ে আছে কিন্তু তখনও সে ঢােলের চামড়াতে গুলি মারিয়া চামড়া ছিড়িয়া দিল এবং ঢােলের আওয়াজ বন্ধ হইল। তখন আফগারা ভয় পেয়ে ছােড় ভঙ্গ হয়ে পলাইয়া গেল। এই যে দিশি একজন সেপাই সমস্ত আফগানদের হারিয়েছিল এর পুরস্কার হল কি জানিস্ ? একজন ইংরেজ সেপাই v. c. (Victoria Gross) পাইল, দিশি সেপাইটার নাম উল্লেখ পৰ্য্যন্ত করিল না। লড়ে মরে ভারতীয় সেপাইর, বাহবা পায় ইংরেজ সেপাইরা। তােদের জাতের তত এই বীরত্ব, এই ন্যায় বিচার ! দেখ, এই ভারতবর্ষটীকে Flypnotism করে ফেলেছে তাহাতেই অল্প সংখ্যক ইংরেজ ভারতবাসীদের বুকের উপর বসে রক্ত চুষে খাচ্ছে। কিন্তু যে দিন 1fypnotism ( মােহিনীশক্তি) চুলােয় যাবে এবং ভারতবাসীরা নিজেদের ভিতরকার শক্তি বুঝিতে পারিবে সেদিন তােদের চেপটে মেরে ফেলবে ‘will squeeze you like lemon” এই বলিয়া নিজে হাতে হাতে ঘর্ষণ করিয়া দেখাইতে লাগিলেন। ১৫৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ দেখ, তােদের ইংরেজ জাতটা এখনও টিকে আছে কেন জানি ? ফরাসীরা খুব বড় জাত হয়েছিল, খুব বীরের মত কাজ করেছিল। ওদের একটী দোষ হয়েছিল সেনাপতিরা, মন্ত্রী, বিদেশীর কাছে ঘুষ খেয়ে নিজেদের জাতের অনিষ্ট কত। লড়াইয়ের মাঠে নিজের ফৌজ ধরিয়ে দিত। তাহাতে ফরাসী জাতটা পড়ে গেল। তােদের হাজার দোষ দেখছি। তােরা অতি নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর জাত। কিন্তু একটা গুণ দেখছি, জাতির প্রতি ভালবাসাটী খুব প্রবল রয়েছে, মন্ত্রীরা, সেনাপতিরা ঘুষ খেয়ে সেপাই ধরিয়ে দেয় না। নিজের জাতের অনিষ্ট করে না, শুধু এই গুণটীর দরুণ তােদের জাতটা এখনও টিকে রয়েছে। যে দিন তােদর মন্ত্রী ও সেনাপতিরা শত্রুর কাছে ঘুষ খেয়ে নিজের জাতের অনিষ্ট করবে সেইদিন থেকে তিন দিনের ভিতর চূর্ণ হয়ে যাবে, সব গুঁড়িয়ে যাবে । আর আগে তােরা যা জঙ্গলী ছিলি সেই জঙ্গলী থাকবি।” একদিন মােগল সাম্রাজ্যের কথা উঠিল। কেন এতবড় রাজ্য চূর্ণ হয়ে গেল ? স্বামীজী বলিতেন যে, মােগল সাম্রাজ্য নিজের মোগল সাম্রাজ্যের পাপে নিজেই ধ্বংস হয়ে গেল। স্যার টমাস্ রাে যখন ইংরেজদূত হইয়া জাহাঙ্গীরের দরবারে যান, তিনি লিখিয়াছেন, মােগল সম্রাট যখন একস্থান হইতে অপর স্থানে যায় তখন তাহার সঙ্গে একটা সহর চলে, সহরে যত শ্রেণী লােক বাস করে বাদশাহের তঁাবুর সহিত তত শ্রেণী লোক চলিয়া থাকে । কয়েক লক্ষ লােক শিবিরের সহিত গমন করিয়া থাকে, কোন জিনিসের অনাটন বা অভাব থাকে না। স্নানাগার বা হামম খান, সে এক বৃহৎ ব্যাপার হইয়াছিল। তারপর রান্নাবাড়ার ব্যাপার, তা আর কহতব্য নয়! পৃথিবীর মধ্যে ঐশ্বর্যে ও প্রতাপে মােগল বাদশাহ সৰ্বশ্রেষ্ঠ হইয়াছিল। কবির কল্পনার বস্তু হইয়াছিল।

লণ্ডনে বিবেকানন্দ জাহাঙ্গীরের পর সাজাহান ও আওরঙ্গজেবের ঐশ্বৰ্য্য ও ভােগবিলাস আরও বাড়িতে লাগিল। সেপাইয়ের সংখ্যা এত বেশী হইয়াছিল যে এক টাকা মাসিক বৃত্তিতে একজন সেপাই নিযুক্ত হইত। কিন্তু এত সেপাই রাখার ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা আরম্ভ হইল। সেপাইরা নিজেরাই গ্রাম, নগর লুঠ করিতে লাগিল। এইরূপে প্রজার উপর নানা অত্যাচার হইতে লাগিল, অতিরিক্ত ভােগ-বিলাস ও অতিরিক্ত সেপাই রাখার দরুণ রাজ্য- ব্যয় সঙ্কুলান হইল না, সেইজন্য চাপে সাম্রাজ্য চুর্ণ হইয়া গেল। ইংরেজরা অসাবধান ও লােভর বশবর্তী হইয়া অতি বিস্তৃত রাজ্য ইংরেজ রাজ্য করিতেছে এবং প্রায়ই রাজ্যের পরিধি বাড়াইতেছে। বংসের কথা। উপযুক্ত পৰ্যবেক্ষণের লােক তেমন নাই। প্রায়ই তাে বিশৃঙ্খলার সংবাদ পাওয়া যাইতেছে। গুটিকতক স্বার্থপর ইংরেজ মন্ত্রী এত বড় সাম্রাজ্য নিজের স্বেচ্ছায় চালাইতেছে এবং নানাবিধ সিপাই সান্ত্রীর খরচা উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে, “It will crumble to pieces out of sheer weight” এই চাপেই ইংরেজ রাজ্য চূর্ণ হয়ে যাবে, এত বড় রাজ্য কখনও চতে পারে না। রােমের বাদসাহেরা সহরের লােককে ঠাণ্ডা রাখিবার জন্য নিজ ব্যয়ে সহরের গরীব লােককে খাইতে দিত। তাহারা রােমান বাদশাহের নির্ভাবনায় খাইতে পাইয়া গুণ্ডার দল তৈয়ারী করিত এবং নানা প্রকার উপদ্রব করিত। মােগল বাদশাহেরা দিল্লীর অনেক গরীব লােককে বিশেষতঃ মুসলমানকে নিজের ব্যয়ে খাইতে দিত। তাহাতে একদিকে যেমন ভাল হইত তেমনি অপর দিকে গুণ্ডা, চোর ছাঁচোড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইত। পরিশেষে ইহারই কুফল হইয়াছিল। ইহাও মােগল সাম্রাজ্য ধ্বংসের একটি কারণ। গুণ্ডা বদমাস লােকেরা জোর জবরদস্তি করে সরকারী খরচায় নিজেদের সংসার প্রতিপালন কথা। { । ১০ লণ্ডনে বিবেকানন্দ করিত, আর না পাইলেই বিপ্লব করিত, ইহাতে রাজ্যের সুশাসন চলে না। একদিন স্বামীজী বলিতে লাগিলেন, ভারতবর্ষের লােকের বর্ণ সাদা ছিল, White Indians এইরূপ উল্লেখ পাওয়া যায়। তারপর বৌদ্ধধর্মের বহুল প্রচার হওয়ায় নানা শ্রেণীর রক্ত সংমিশ্রণ হয় এবং তার ও ভিন্ন জাতির সহিত রক্তের সংমিশ্রণ হয়। তারপরই ভারতবর্ষে লােকের বর্ণ মলিন হয়, এইটী বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের একটী দোষ রহিয়া গিয়াছে।

আট ও একদিন ইংরেজের ও চীনের লড়াইয়ের কথা উঠিল। গুডউইন বলিতে লাগিলেন, ইংরেজেরা নিজের বীরত্বে তাহাদের বিরাট রাজ্য চীনের লড়াই স্থাপন করিয়াছে, ইংরেজই তাহা নিজের বলে সংরক্ষণ করিবে। স্বামীজী শুনিয়া একটু বিরক্তভাব প্রকাশ হিন্দুর বীরত্ব। করিয়া প্রকৃত ইতিহাসের কথা বলিতে লাগিলেন। তিনি বলিতে লাগিলেন, “চীনের লড়াই বা অন্য যায়গাকার লড়ায়ে ইংরেজরা কি করেছিল? আমার হিন্দু-সেপাইরা সর্বত্র গিয়ে লড়াই করেছে, লড়াইয়ে জিতেছে, নিজের গায়ের রক্তপাত করে রাজ্যস্থাপন করেছে আর সেই রাজ্য ইংরেজের হাতে তুলে দিয়েছে। হিন্দুর রক্তে-ও হিন্দুর অথে এত বড় সাম্রাজ্য হয়েছে। তােরা ইংরেজরা কি করেছিস? হিন্দুর রােজকারের জিনিস, মাঝখান থেকে তােরা মুনাফা খাচ্ছিস। ইজিপ্টের যুদ্ধে কারা লড়াই করেছিল? আমার হিন্দু সেপাইরা গেছলাে। তােদর যত সাম্রাজ্য বাড়িয়েছিলি, যে জায়গাটা অধিকার করেছিলি সবটায় আমার হিন্দু সেপাই লড়েছে। তাহাদের গায়ের রক্ত জলের মত ঢেলেছে, আর তাদের টাকা অজস্র ঢেলেছে, তবে তােরা তত বড় সাম্রাজ্য স্থাপন করেছি। পলাশীর লড়ায়ে কয়টি ইংরেজ ছিল ? সবই তাে আমার দেশী সেপাই, এরাই তাে ইংরেজ রাজ্য জয় করলে। মিউটিনির সময় কয়জন ইংরেজ ছিল ? আমার দেশী সেপাইরাই তাে রাজ্য জয় করে লণ্ডনে বিবেকানন্দ ইংরেজের হাতে তুলে দিলে। তােদর জাত লড়ায়ে কবে বীরত্ব দেখিয়েছে ? নিজেরা তাে কাপুরুষ, লােককে ভুলিয়ে ( Hypnotise) জগতের উপর আধিপত্য ক’রছি। হিন্দুর রক্তে ও হিন্দুর অর্থে এই বৃটিশ সাম্রাজ্য স্থাপন হয়েছে—জেনে রাখি, আজকের বৃটিশ এম্পায়ার একদিন হিন্দু সাম্রাজ্য হয়ে যাবে। রােমানরা যেমন স্পেন, জার্মানী, গ্রীস প্রভৃতি নানা দেশ জয় করেছিল, পরে স্পেনিয়ার্ডরা ও জার্মানরা রামের বাদশাহা হয়ে বসল। রােমানরা তখন অধীনস্থ হয়ে রইলাে, তােদের বৃটিশ সাম্রাজ্যটা ঠিক সেইরূপ হয়ে যাবে।” এইরূপ তীব্ৰ কথা শুনিয়া গুডউইনের মনে জাতীয় ভাব প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। গুডউইন বলিতে লাগিলেন, “No Swami, your men do not know how to fight.” স্বামীজী আরও উত্তেজিত হইয়া তাহাকে বলিলেন, আমার হিন্দুরা লড়তে জানে না? গ্রীকদের আলেকজাণ্ডার যখন পারস্য জয় করে গর্বে মহা স্ফীত হয়ে ভারতবর্ষ আক্রমণ করে কে তাহাকে প্রথম রুকে ছিল? সেই একজন হিন্দুরাজা পােরা (Porus) আলেকজাণ্ডারের যুদ্ধতৃষ্ণা মিটিয়ে দিয়েছিল। Battle of Arbelaতে ভারতীয় সৈন্য পারস্য সম্রাট Danu Codomanusএর সহায় হয়ে ভীষণ যুদ্ধ করেছিল এবং আলেকজাণ্ডারের সেনাপতি পারমীনীয়সের সেনা বিভাগকে বিধ্বস্ত ও বিভ্রাপিত করেছিল। এইজন্য আলেকজাণ্ডার ভারতবাসীদের সহিত যুদ্ধ করিতে মনস্থ করে। দেখ, তুমি বল্লে আমার হিন্দুরা লড়তে জানে না। আবহমান কাল থেকে হিন্দুরা বীরত্বের জন্য বিখ্যাত। তবে তাহারা ইংরেজ জাতের মত নিমক- হারামী জানে না ও অকৃতজ্ঞ নয়। জান না—মিউটিনির সমর সিপাইরা বল্লে, অনেক দিন ইংরাজের নিমক খেয়েছি, তাদের এখন বিপদ, তাদের এখন কোনরূপে বাঁচাতে হবে। এইজন্য তাহারা নিজের লােক উচ্ছন্ন দিয়ে লণ্ডনে বিবেকানন্দ বিদেশী রাজ্য পুনরায় স্থাপন করল। হিন্দুদের হচ্ছে chivalrous spirit, তারা অতত নিমকহারামী বা বেইমানী জানে না। আর তােমরা যে বড় জাত বলে এত বড়াই কর, ভারতবর্ষ তত জোচ্চুরি করে নিয়েছ। তােমাদের মাথায় তত একটি নরম বালিশ ছিল না, অতি গরীব নগণ্য জাত ছিলে। ইয়ােররাপের ইতিহাসে ইংরেজরা পিছনে-পড়া জাত। ফরাসীরাই তখন প্রধান জাত ছিল ; শুধু ভারতবর্ষ পেয়ে, ভারতবর্ষের ধনরাশি পেয়ে তােমাদের তাে এখন এত বল হয়েছে। কিন্তু দেখ, যে দিন হিন্দুদের মােহ কেটে যাবে এবং ভিতরকার সুষুপ্ত শক্তি জাগ্রত হবে সে দিন লেবু নিচড়ােনার মত তােমাদের সব চেপটে ফেলবে, will squeeze you like lemon-এই বলিয়া নিজের করদ্বয় নিষ্পেষণ করিয়া দেখাইতে লাগিলেন। গুডউইন বলিতে লাগিলেন, “You are a great lan, no doubt, but your men do not know how to govern themselves. We, British people are the best men to govern India." স্বামীজী গুডউইনের এই কথা শুনিয়া একেবারে উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন। তিনি বলিতে লাগিলেন, চন্দ্রগুপ্তের সময় মেগাস্থেনিস যখন ভারতে আসিয়াছিল, সে সমস্ত লিখিয়া গিয়াছে। তাহার লেখা হইতে পাওয়া যায় যে, গ্রামগুলি এক একটি ছােট Republic, গ্রামবাসীরা একজনকে প্রধান নিযুক্ত করে, এই নিযুক্ত ব্যক্তিই গ্রামের সমুদায় কাৰ্য্য দেখিয়া থাকে। চুরি, ডাকাতি নাই বলিলেও হয়। প্রত্যেকে নিজে নিজে ব্যবসা করে এবং সুখে স্বচ্ছন্দে দিনপাত করে। লােকেরা অতিশয় সত্যবাদী ও ধর্মপরায়ণ, কুটিলতা বা প্রবঞ্চনা তাহাদের মধ্যে নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। স্বামীজী আরও বলিতে লাগিলেন যে, সব স্থানে ইংরেজের প্রভাব ১৬৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ প্রবেশ করে নাই বা হিন্দু রাজাদের রাজ্যে প্রজারা এখনও অনেক পরিমাণে সুখে বাস করে। কিন্তু যেখানেই ইংরেজের ইংরেজ রাজত্বে কিছু প্রভাব প্রবেশ করেছে সেখানেই দুঃখ, দারিদ্র্য ভারতের দুর্দশা ও নানা রকম উৎপাতের শুরু হয়েছে। ইংরেজেরা ছলে বলে গরীব প্রজাদের লুটতরাজ করছে। তাহারা কেবল নিজেদের দেশেরই শ্রীবৃদ্ধি, ঐশ্বৰ্য বিস্তারের চেষ্টা করূছে। ভারতবাসীরা ক্রমশঃই গরীব হয়ে পড়ছে। গুডউইনের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া বলিলেন, “এই ত’ তােমাদের শাসন প্রণালী, তবুও বলছ, ভারতবাসীরা নিজেদের শাসন করতে জানে ?” স্বামীজী ঐতিহাসিক বিষয়ে সর্বদাই উত্তেজিত হইয়া উঠিতেন। গুডউইন কিন্তু স্বামীজীর একজন প্রধান ভক্ত হইলেও ইংরেজের যা গােড়ামি তা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করিতে লাগিলেন। গুডউইন radical দলের লােক হইলেও তাহার ঐ একই কথ) “No Swami, your men do not know how to fight. We, the British people aro the best fighters. No Swami, you are a great man, no doubt, but your men do not know how to govern themselves." স্বামীজী এবারেও উত্তেজিত হইয়া অনেক কড়া কথা বলিলেন, যথা, ক্লাইভের ‘Red treaty and white treaty অর্থাৎ উমিচঁাদের সহিত সন্ধিপত্র ও মিরজাফরকে সন্ধি পত্র দেওয়া, নিজের নাম সহি করা প্রভৃতি। এই প্রসঙ্গে ইহার বিস্তারিত আলােচনা করা হইল না। একদিন কথা উঠিল যে Sir M. M, Bhowdagiri নামক একজন পাশী Parliamentএর সদস্য হইয়াছেন। গুডউইন পার্লামেন্টের বড় নাম উচ্চারণ করিতে না পারিয়া অনেক প্রকার করিয়া উচ্চারণ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। স্বামীজী বলিলেন, প্রথম Parliamentএ সদস্য হইবার চেষ্টা 6 সদস্যপদ লণ্ডনে বিবেকানন্দ মন্তব্য একজন বাঙ্গালীর মাথা হইতে উঠে। লালমােহন ঘােষ কলিকাতার একজন ব্যারিষ্টার। তিনিই প্রথম এই চেষ্টা করেন কিন্তু কৃতকাৰ্য্য হন নাই ও পরে একেবারে নষ্ট হইয়া যান। তারপর এই চেষ্টারই ফলে নাওরাজী একজন পার্শী Parliamentএ প্রবেশ করেন ও তারপর এই Sir Bhownagiri সদস্য হন। কিন্তু প্রথম একজন বাঙ্গালীই এ পদের জন্য চেষ্টা করেন। যেদিন গুডউইনের সহিত ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যাপার সম্বন্ধে কথা হয় স্বামীজী বলেন, “দেখ, আমি কয়েকদিন পূর্বে এক Generalএর সহিত ভারতীয় রাজনীতির বিষয় আলােচনা করিয়া- ভারতীয় রাজনীতি সম্বন্ধে জেনারেলের ছিলাম। আমি কথাপ্রসঙ্গে কহিলাম যে, ভারত- বর্ষ পাইবার পূর্বে ইংরেজদের মাথায় এত নরম বালিশ ছিল না, তাহারা সামান্য নগণ্য জাতি বলিয়া পরিচিত ছিল—শুধু ভারতবর্ষ হাতে পাইয়া এবং ভারতের সােণা, দানা লুট করিয়া আজ তাহারা ভােগ বিলাসী হইয়া উঠিয়াছে।” জেনারেলটী নিজেই এই কথা স্বীকার করিয়া বলিলেন যে, ভারতবর্ষই ইংরেজদের সকল দিক দিয়া বাড়াইয়া দিয়াছে। গুডউইন ভারতের ইতিহাস বা নিজের দেশের প্রাচীন ইতিবৃত্ত বিশেষ জানিতেন না, শুধু খবরের কাগজ হইতে বর্তমান সময়ের কথা পাঠ করিয়া যতটুকু জ্ঞান থাকা সম্ভব তাহাই তাঁহার ছিল। এইজন্য উভয় দেশের ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে স্বামীজীর নিকট হইতে শুনিয়া বিস্মিত হইতেন। নিজেদের জাতের বিরুদ্ধে কথা শুনিলে আপত্তি করিতে যাইতেন বটে, কিন্তু এরূপ আলােচনায় স্বামীজীর উপর তাহার শ্রদ্ধা আরও অকপট হইয়া উঠিত। মুখে তাঁহার একই বুলি ছিল, “ইংরেজরাই পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, ভারতের লােকেরা সমস্ত কাজেরই অনুপযুক্ত।”

লণ্ডনে বিবেকানন্দ স্বামীজী সময় সময় দু চার দিন ধরিয়া উত্তেজিত হইয়া থাকিতেন। এইরূপ এক সময়ে সারদানন্দ স্বামীর সহিত কংগ্রেস লইয়া কথাবার্তায় তিনি বলিলেন—“ভারতের লােকগুলা কংগ্রেস, কংগ্রেস কংগ্রেস ও ভারতের করে মিছামিছি হৈ চৈ কচে কেন ? কতকগুলাে দাবী হাউডােলােক এক জায়গায় জুটে কেবল গলা বাজি কলেই কি কাজ হয় ? চেপে বসুক, নিজেদের Independent বলে (leelare করুক, হেঁকে বলুক আজ থেকে আমরা স্বাধীন হ’লাম, আর সমস্ত স্বাধীন Governmentকে নিজেদের Declaration পত্র পাঠিয়ে দিক্‌, তখন একটা হৈ চৈ উঠবে।” তারপর তিনি বলিতে লাগিলেন, “জগতে ভারতবর্ষ ব'লে যে একটা দেশ আছে, তা বেশীর ভাগ লােক জানেই না, আমেরিকানরা কি করে সারা জগতে সাড়া তুলেছিল ? কেবল কি গলা-বাজিতে কাজ হয় ? বেপরােয়া হয়ে কাজ করতে হবে, বিধিমতে কাজ করে যাব, তাতে যদি গুলি বুকে পড়ে, প্রথমে আমার বুকে পড়ুক,”—এইরূপ বলিতে বলিতে দাঁড়াইয়া উঠিয়া পায়চারি করিতে লাগিলেন। পরে আবার বলিতে লাগিলেন—“ পড়ুক গুলি আমার বুকে, আমে- রিকা, ইউরােপ একবার কি রকম কেঁপে উঠবে। তখন বুঝবে; বিবেকা- নন্দ কি জিনিস। আমেরিকায় এমন স্থান নেই যেখানে ২০/৩০ হাজার লােক নিতান্তই আমার অনুগত নয়। আমার রক্ত পড়লে সারা জগতে একটা সাড়া পড়ে যাবে। Congress জোর গলায় নিজেদের স্বাধীনতা (declare করুক, শুধু মাগীদের মতন বসে বসে কঁদুনি গাইলে কি হবে ?” স্বামীজীর এই উত্তেজিত ভাবের কথাবার্তা শুনিয়া সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক নীরবে স্তম্ভিত হইয়া শুনিতে লাগিলেন। ১৬৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ স্বামীজী একদিন কুষিয়ার কথা বলিতে লাগিলেন। জঙ্গলী ৰুষগুলাে ইউরােপ ও এসিয়ার মাথার উপর চেপে বসে আছে। কষিয়ার কথা। তাদের জমিজমা সব একলাক্ত অর্থাৎ এক সঙ্গে। রুষ গভর্ণমেন্ট খুব জবরদস্ত। সেন্ট্রাল এসিয়ার তারগুলাে চিরকাল জগতে উৎপাত করে এসেছে, কিন্তু কিন্তু সেই দুর্ধর্ষ তাতারগুলােকে সায়েস্তা করেছে রুষেরা, তাদের টু শব্দটী পর্যন্ত করবার উপায় নেই। এখন রুষেরা যখন যার উপর ইচ্ছা অত্যাচার করে, তাদের জমি একলাক্ত থাকায় বিশেষ সুবিধা। ইংরেজদের এ বিষয়ে বড়ই অসুবিধা, কারণ রুষদের মত তাদের জমি এক জায়গায় না থেকে বিভিন্ন বড় বড় টুকরা টুকরা যায়গা নিয়ে তাদের ঘর করতে হয়। স্বামীজী প্রায়ই বলিতেন, এই রকম বিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্য চিরকাল চলতে পারে না—শাই আলগা বাঁধন একেবারেই খুলে যাবে। একদিন ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ ব্যাপারে নুরজাহানের কথা উঠল। স্বামীজী প্রাতভোজনের পর নুরজাহানের ইতিবৃত্ত নুরজাহানের কথা। আরম্ভ করিলেন। জাহাঙ্গীর সিংহাসনে বসেই কিরূপে সের খাকে হত্যা করিয়ে নুরজাহান ও তার কন্যাকে আগ্রায় কয়েদ করে আল সে বিষয়ে স্বামীজী আগাগােড়া বলে যেতে লাগলেন। নুরজাহানকে রাজবাড়ীর একটা নীচু ঘরে রাখা হত, প্রথম প্রথম নুরজাহান জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথাবার্তা কওয়া দূরে থাক্‌, স্বামীহা বলে তাকে খুবই ঘৃণার চক্ষে দেখৃত। জাহাঙ্গীর মনে করল, নুরজাহান নিরাশ্রয় হলেই অচিরেই তাহার শরণাগত হবে কিন্তু নুরজাহানও জাহাঙ্গীরকে পরাজয় করতে দৃঢ় সঙ্কল্প করল। নুরজাহান নতুন নতুন বেশ পরে’ জাহাঙ্গীরের মুখ দিয়ে মাঝে মাঝে চলে যেত এবং জাহাঙ্গীরের দিকে বেশ অবজ্ঞার দৃষ্টি দিয়েই মুখ ফেরাত। এই রকম ১৬৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ কিছুদিনের পর জাহাঙ্গীর কাবু হয়ে পড়ল। জাহাঙ্গীরকে পরাজয় স্বীকার করিয়ে নুরজাহান তাকে বিবাহ করে। নুরজাহানের কথা- প্রসঙ্গে স্বামীজী তার জন্মবৃত্তান্ত আরম্ভ করলেন। নুরজাহান পারস্যদেশীয় এক বণিকের কন্যা, বণিকের কাজকৰ্ম্ম নষ্ট হবে যায়। সেই সময় ভারতবর্ষে আকবর বাদশার খুব নাম। বাদশার আশ্রয় পাবার জন্যে বণিক ভারতবর্ষে আসে। তখন তার স্ত্রী গর্ভবতী ছিল। পথিমধ্যেই একটী কন্যারত্ন প্রসব বণিকের অবস্থা সে সময় এত বিপর্যস্ত যে মেয়েটাকে দুধ খাওয়াবার পর্যন্ত সঙ্গতি ছিল না। মরুদেশে জল মেলাও কঠিন। তাই গায়ের ঘাম খাইয়ে মেয়েটির জিভ ভিজিয়ে রাখতে হত। যখন কোনও মতেই মেয়েটীকে বাঁচাবার সুবিধা হল না, একটী স্ত্রীলােকের কাছে মেয়েটিকে বিক্রী করে ফেলে। স্ত্রীলােকটি মেরেটীকে অপরের কাছ থেকে কিনলেও তার উপর এত মায়া পড়ে গেল যে নিজের কন্যার অধিক স্নেহ করতে লাগল। সেও বণিকের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষে এসেছিল। ভারতবর্ষে পৌছিলে ভারতসম্রাট আকবর বাদশা বণিকের থাকবার সুন্দর বন্দোবস্ত করে দিলেন, বণিকের আবার অবস্থার পরিবর্তন স্বামীজী একদিন বলতে লাগলেন, তাইমুরের জন্ম হয় মধ্য-এসিয়ার। লােকটা লেঙ্গড়া ছিল, এইজন্যে লােকে তাকে তাইমুরের কথা। তাইমুরলঙ্গ বত। প্রথম জীবনে তাইমুরের দুর্দশার অবধি ছিল না, তারপর যুদ্ধ জয় করে পৈত্রিক রাজ্য হস্তগত করে। এই সময় সে বৰ্বর তাতারদের এককাট্টা করে এবং লুটের অংশ পাওয়া যাবে এই লােভে অনেক জঙ্গলী তাতার তাইমুরের খোঁজে আসতে লাগল। তাইমুর দেশ বিদেশ লুঠ করতে লাগল এবং নগর, ১৬৯ লণ্ডনে বিবেকানন্দ গ্রাম যেখানেই যেত, সেগুলাকে একবারে ধ্বংস করে ফেলায় তার পৈশাচিক আনন্দ ছিল, আর অধিবাসী লােকগুলােকে নির্মম ভাবে মেরে ফেলত। জঙ্গলী তাতার তাইমুরের সঙ্গে এত জড় হ’ল যে, কোন রাজ্যই তাইমুরের বর্বরতার প্রতিরােধ করতে সক্ষম হ’ল না। এই রকম করে নানা দেশ উচ্ছন্ন দিয়ে, শেষে ভারতবর্ষে সদলবলে তাইমুর প্রবেশ করে ও ভারতবর্ষকে রীতিমত আক্রমণ করে। দিল্লী, মথুরা প্রভৃতি সহরে লােকগুলােকে মেরে উজাড় করে দিতে লাগল এবং যত মানুষ মারতে লাগল, ততই মারবার ইচ্ছেটা আগুনের মত হল্কা দিয়ে উঠতে লাগল। ভারতবর্ষ থেকে ফিরতি মুখে বহুসংখ্যক লােককে গােলাম করে বেচবার জন্য নিয়ে গেল। যখন হিমালয় ভেদ করে নিজের দেশ মধ্য এসিয়ার দিকে যাচ্ছে, তখন হঠাৎ দেখল তার সঙ্গে খােরাক আর বেশী নেই। পথও অনেক বাকী—অবশেষে এক লক্ষ ভারতীয় কয়েদীকে কেটে ফেলবার হুকুম দিল। তার জঘন্য অনুচরেরা আজ্ঞা পাবামাত্রই তাদের মাথা এক এক করে উড়িয়ে দিল। এত নিষ্ঠুরতা ইতিহাসে বিরল--এক লক্ষ লােকের মাথা কাটা ছেলেখেলার মতই তাইমুরের কাছে মনে হত। তাইমুরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড স্বামীজী এরূপ ভাবব্যঞ্জক ও বিরক্তিপূর্ণ উত্তেজনা সহকারে বলতে লাগলেন যে শ্রোতারা যেন সেই ছবিগুলি চোখের সামনে বিভীষিকার মত দেখতে লাগল। ভয়ে সকলের মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠেছিল। একদিন স্বামীজী কাশীর রাজা চৈৎ সিংএর কথা সুরু করলেন। ওয়ারেণ হেষ্টিংসের সেপাইরা কি করে চৈৎ সিংএর রাজ্য চৈৎ সিংয়ের করেছিল ও লােকের উপর অত্যাচার করেছিল সমস্ত ইতিহাস। বলতে লাগলেন। ওয়ারেণ হেষ্টিংসে-এর সেপাইদের অত্যাচার দেখে কাশীর লােকেরা রাজবাটীতে গিয়ে চৈৎসিংকে বলে- ১৭০ লণ্ডনে বিবেকানন্দ “শিগগীর পালান, নইলে আপনিও মারা যাবেন। এই বিষয়ে তারা একটা ছড়া বেঁধেছিল । “হাতিপর হাওদা, নেইত ঘােড়ে পর জিন্। ভাগে ভাগাে আতে ওয়ারাণ হেষ্টিং।” কিছুদিন পরে ওয়ারেণ হেষ্টিংস যখন নিজে কাশীতে আসে, তখন সহরের লােকেরা যে যেখানে পারল, বাড়ী ঘর ছেড়ে পলায়ন করেছিল। তখন নৌকা বা বজরা করে কাশী যেতে হত । ওয়ারেণ হেষ্টিংস নিজের লােকদের জিজ্ঞেস করল, “লােকগুলাে পালায় কেন ?” হেষ্টিংসের লােকেরা খবর নিয়ে এসে জানাল যে, কোম্পানীর লােকেরা আগে এরূপ অত্যাচার করেছে যে তা বলবার নয়, এখন ওয়ারেণ নিজে আছে শুনে তাদের ভয় হয়েছে এবার অত্যাচারের পরাকাষ্ঠা হবে, এইজন্যে প্রাণ- ভয়ে তারা যে যেদিকে পারে পলায়ন আরম্ভ করেছে। হেষ্টিংস শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর লােকেরা প্রথম প্রথম এইরূপ অত্যাচার করত। তারপর মিউটিনির কথা উঠল। স্বামীজী বলতে লাগলেন, প্রথমে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী মহা অত্যাচার করিতে আরম্ভ মিউটিনির কাণ্ড। তারা পালামেন্ট বা কিছুই মান্ত না। কারবারী কোম্পানী একটা বিপুল সামাজ্য পেয়ে গেল । কারবার চালাবে না রাজত্ব করবে? লাভ করাই প্রথম প্রথম তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, এইজন্যে নানা বিষয়ে যথেচ্ছাচার করতে লাগল। এই- রূপে কিছুদিন কারবার করার পর কোম্পানীর ভারতীয় সেপাইরা পৰ্যন্ত তারা কোম্পানীর হাত থেকে ভারতকে বাঁচাবার জন্য লড়াই করতে পেছপাও হ’ল না। কিন্তু নায়ক ত সে সময় একটা নয়, ভিন্ন ভিন্ন নায়ক। মুসলমানেরা বলল, তারা দিল্লীর বাদশাকে পুনরায় চটে গেল। ১৭১ লণ্ডনে বিবেকানন্দ ক্ষমতাশালী করবে, হিন্দুরা রুকে উঠল, তারা বাজীরাওএর ছেলে নানা সাহেবকে হিন্দু সম্রাট করবে। ছােট ঘােট নেতারাও যে যার স্বাধীন রাজা হবার চেষ্টা করূলে। সকলেই স্ব স্ব প্রধান, কেউ কারুর কথা কাণে দেয় না—সেপাইরা ইংরেজী ভাবে লড়াইয়ে শিক্ষিত, কিন্তু না আছে তাদের নায়ক, না আছে খােরাক। অবশেষে এক মুটো চালের জন্যে তারা লুটপাট আরম্ভ করল এবং নিজেদের পর্যন্ত রাজ্য লুট করতে সুরু করল। হিন্দুরা মুসলমানদের, মুসলমানরা হিন্দুদের লুঠতরাজ করতে লাগল। এমন দুরবস্থায় সেপাইরা পড়েছিল যে খােরাকের জন্য তাদের এক গাছা মুক্তার মালা বেচতে হয়েছিল। এই সুযােগ পেয়ে ইংরেজরা নতুন দেশী সেপাই তৈরী করে মিউটিনি ( mutiny) দমন করে ও দ্বিতীয় বার ভারতবর্ষ জয় করে। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অত্যাচারের ফলে ভারতের রাজ্যশাসন হস্তান্তরিত হ’ল—পালামেন্টের হাতে গেল । আগে কোন বিচার করতে হলে কোর্ট অফ ডিরেক্টরস্ ( Court of Directors) ছাড়া অপর কেহ ছিল না। তারা যা ইচ্ছা তাই করত, এখন পার্লামেন্টের হাতে যাওয়ায় শৃঙ্খলা অনেক পরিমাণে এসেছে, কিন্তু অপমানের লাঞ্ছনা যেমন ছিল তেমনই আছে, কেবল প্রকারভেদ। গুড়উইন radical পন্থীর লােক ছিলেন, এইজন্য জমিদারের উপর চটা ছিলেন। একদিন বলিতে লাগিলেন, ভারতবর্যের গবর্ণমেন্টের ইংলণ্ডের জমির আয় কি ? সারদানন্দ স্বামী বলিলেন যে, জমির খাজনা বা land revenue এইটাই বিশেষ আর, তা ছাড়া অন্য সকল বিষয়েই টেক্স আছে, গবর্ণমেন্ট এত টেক্স নেয় যে প্রজারা জর্জরিত হইয়াছে। এমন কি লবণের উপরেও টেক্স দিতে হয়। ভারতবর্ষে প্রত্যেক জিনিসের উপর টেক্স ; মুসলমানদের সময়ে আরঙ্গজেবের জেজিয়া বা খাজনা ছিল। সেটা খালি হিন্দুর উপর কর খাজনা ও লবণ শুষ্ক। ১৭২ লণ্ডনে বিবেকানন্দ ধাৰ্য্য হইয়াছিল, মুসলমানেরা বাদ ছিল। সেটা শুনি যে ভীষণ, তবু লােক তখন খাইতে পাইত কিন্তু ইংরাজ আমলে টেক্স এত বেশী যে লােক খাইতে পায় না। গুডউইন এই কথাগুলি শুনিয়া চটিয়া গেলেন এবং ইংরাজকে গালি দিতে লাগিলেন। তারপর গুডউইন নিজেদের দেশের কথা বলিতে লাগিলেন। দেখ দেখি, এই দেশে কি অন্যায় আচরণ ? এইখানকার জমিদারেরা হইতেছে জায়গীরদার, তাহারা এক পয়সা খাজনা দেবে না। Land revenue সমস্ত ইংলণ্ডে মাত্র পাঁচ হাজার পাউণ্ড। আর প্রজারা টেক্স, খাজনা সব দেবে। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক ইংলণ্ডে জমীর খাজনা নাই, কেবল মাত্র Land revenue পাঁচ হাজার পাউণ্ড শুনিয়া অবাক হইয়া রহিলেন। সারদানন্দ বলিলেন, ভারতবর্ষে গভর্ণমেন্ট হচ্ছে বড় জমিদার ও জমির মালিক। গভর্ণমেন্ট ছােট ছােট জমী ভাগ করিয়া লােককে দেয় ও খাজনা লয় । গুডউইন বলিলেন, আমাদের দেশে জমী জাইগীরদারদের। রাজার নিজের দরুণ খানিক জমি আছে তাহাকে crown land বলে। তাহা ছাড়া গভর্ণমেন্টের বিশেষ জমি নাই। এই জমিদারগুলি নিজেরা ভাড়া নেবে, নানা রকম করে টেক্স খাজানা নেবে, আর খাজনা টেক্স কিছু দেবে না। রাজস্ব সমস্ত পড়ল গরীব প্রজাদের উপর। এই সব জমীদারেরা বাইতে পারে না। নিজেরা শুধু লাভটী খাবে, আর গরীর প্রজারা টেক্স খাজনার ভার বইবে। দেখ দেখি এই বিশপগুলা, উহারা তত জমীদার, অট্টালিকা বাড়ীতে থাকবে। কি রকম চেয়ার, কি খােস তােয়াজে থাকবে, আর গরীবগুলাে শক্ত কাঠের চেয়ারে বসবে, আর লর্ড বিশপের দরুণ টেক্স খাজনা যােগাবে। এই সব দেখিয়া সাধারণ লােকেরা চটিয়া গেছে, কেন বিশপেরা কি সাধারণ লােকের মত থাকতে পারে না? খােস ভােয়াজে থাকিলে কি ধৰ্ম্ম হয় না? যীশু কি এত খােস তােয়াজে থাকিত ? ১৭৩ লণ্ডনে বিবেকানন্দ জুতা, কি বিশপ ও জমিদার এদের একার কেড়ে লওয়া চাই। এই সব নিয়ম বদলে ফেল, তাহা হইলে দেশে সুখ শান্তি হইবে না। গুড়উইন এই কথা বলিতে বলিতে কিছু উত্তেজিত হইয়া গাল মন্দ করিতে লাগিলেন। সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক আর কোন কথা না বলিয়া চুপ করিয়া রহিলেন। কথাপ্রসঙ্গে ঘােড়ার গাড়ীর চাকার কথা স্বামীজী বলিতে লাগিলেন। আমেরিকায় কয়েক বৎসর থাকিয়া দেখিলাম যে, আমেরিকা সর্ব বিষয়ে নূতন জিনিস করিতেছে। আর ইউরােপে অনেক স্থান আমেরিকা ঘুরলুম ও দেখলুম, পুরান সেকেলে জিনিস সব ইউরােপ ধেড় ধেড়া, মােটা মােটা জিনিস, চোস্ত নূতন রকম জিনিস খালি আমেরিকায় দেখতে পেলুম। কি বাড়ী করা, কি পােষাক, কি জামার বােম, আমেরিকায় সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, নূতন জের। প্রত্যেক জিনিস দেখলে বােধ হয় যে জাতিটার ভেতর একটা সতেজ জীবন্ত শক্তি রহিয়াছে। আর ইংলণ্ডে সব পুরানাে ধাঁজের জিনিস। ঘােড়ার গাড়ীর চাকাগুলাে আমেরিকায় দেখলুম ; পাতলা ফিন্ ফিনে, দেখলে বােধ হয় যে চাপলে যেন ভেঙ্গে যাবে, কিন্তু এত মজবুত ও শক্ত যে খুব টেকে। ওরা করে কি জান, প্রথম কাঠখানা লইয়া season করে (পাকায়। তারপর ভয়ানক pressure ( চাপ দেয় ; সেই কাঠটা শক্ত হয়ে যায়, তারপর গড়ন করে। এইরূপ কাটা পাত সরুল ও এত মজবুত। দেখতে যেমন পরিষ্কার, ওজনেও তেমনি হালকা হয়। আমেরিকার সব জিনিসগুলা দেখলে বুকে যেন একটা আহলাদ ও উৎসাহ হয়। তাহারা মানুষের শক্তির পরিচয় দিচ্ছে। স্বামীজী তাই বলিতে বলিতে বিশেষ হর্ষিত হইয়া উঠিলেন। বর্তমান লেখককে বলিলেন, যা আমেরিকায় যা, ইংলণ্ডে থেকে কি হবে, সেটা হচ্ছে নূতন দেশ, নূতন উৎসাহ সেটা দেখলে মাথাটা খুলে যাবে, একটা নূতন ভাব আসবে। ১৭৪ লণ্ডনে বিবেকানন্দ । তাই বুড়টে দেশে নুতন ভাব আসে না, নিজের উদ্যমে কিছু করতে হলে আমেরিকা দেখতে হয়। বুড়টে দেশে থাকলে লোেক বুড়টেই হইয়া যায়, নূতন ভাব আর কিছুই আসে না। সেদিন স্বামীজী আনন্দিত হইয়া আমেরিকার অনেক সুখ্যাতি করিতে লাগিলেন। একদিন বিকাল বেলা রান্নার কথা উঠিল। স্বামীজী বলিলেন, মাংসের সঙ্গে পেঁয়াজ খাওয়া একটা বহু প্রাচীন প্রথা। পেঁয়াজকে পলা বলে- পল মানে মাংস, মাংসের সহিত সেটা ব্যবহৃত হয়, এই জন্য উহাকে পলাণ্ড বলে। পেঁয়াজ ভেজে খেলে দুম্পাচ্য, পেটের ব্যাম করে, কিন্তু পেঁয়াজ সিদ্ধ করিয়া খাইলে উপকার করে এবং মাংসের যে costiveness থাকে সেটী নাশ করে, bowels clear করে। এইজন্য সৰ্ব্বদেশে বহুকাল হইতে পেঁয়াজ চলিত। স্বামীজীর মনে আনন্দ হইলে এক একদিন গুন্ গুন্ করিয়া বাংলা গান করিতেন। গুড়উইন বাংলা গান কিছুই বুঝিতে পারিতেন না বা সুরও তাঁহার ভাল লাগিত না। একদিন প্রাত- স্বামীজীর গান গাওয়া। ভোজনের পর স্বামীজী উপকার ঘরে গেলেন, ঘরে গুড়উইন, সারদানন্দ স্বামী ও বর্তমান লেখক রহিলেন। কথাপ্রসঙ্গে ভারতীয় সঙ্গীতের কথা উঠিল এবং ইউরােপ ও ভারতবর্ষের সঙ্গীতের বিষয় অল্পবিস্তর সারদানন্দের সঙ্গে কথা হইতে লাগিল। ভারতবর্ষে বড় বড় গাইয়ে আছে এবং তাঁহাদের সঙ্গীত প্রণালীও ভিন্নরকম। সারদানন্দ স্বামী এইটা বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। কলিকাতায় যাহারা বিশিষ্ট ধ্রুপদ গায়ক, স্বামীজী তাহাদের মধ্যেও একজন বিশিষ্ট গায়ক বলিয়া পরিচিত। গুডউইন কথাটা ভাল বুঝিতে পারিলেন না। সারদানন্দ স্বামী সহজ করিয়া বুঝাইলেন যে, স্বামীজী একজন বড় গাইয়ে এবং গাইয়ে হিসাবে তাঁহার কলিকাতায় বেশ নাম আছে। ১৭৫ লণ্ডনে বিবেকানন্দ গুডউইন শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া হাততালি দিয়া বলিলেন, তা তাে আমি জানিতাম না। স্বামীজী যে একজন বড় গায়ক, এই কথা এখন শুনিলাম। আমি জানি স্বামীজী খুব philosopher, খুব ভাল বাগ্মী, কিন্তু তিনি যে বড় গায়ক একথা আমি আদৌ জানিতাম না। গুডউইনের মহা আনন্দ, তিনি নানা রকম ভঙ্গী করিয়া আলাদ করিতে লাগিলেন আর ক্রমাগত বলিতে লাগিলেন, স্বামীজী যে বড় গায়ক এটা আমি আগে জানিতাম না : স্বামীজীর কোনরূপ সুখ্যাতি ও কাৰ্য্য সফল হইলে তিনি আনন্দে আল্লাদিত হইতেন। কি তঁার ঐকান্তিক ভক্তি! Doctor Andrue নামক নরওয়ে বা সুইডেনের জনৈক পণ্ডিত বেলুন করিয়া কয়েকটা সঙ্গী সঙ্গে করিয়া উত্তর মেরু আবিষ্কার করিতে গেল। খবরের কাগজে খুব লিখিতে লাগিল। ২টার সময়কার ভাঃ এনড রুর উত্তর আহারের পর, গুডউইন ও অন্যান্য সকলে বসিয়া সেই মেরু যাওয়া । বিষয়ে কথােপকথন হইতে লাগিল । স্বামীজী নীরব হইয়া চুপ করিয়া শুনিতে লাগিলেন। গুডউইন ও ষ্টার্ডি খুব ত এই ব্যাপারটীর প্রশংসা করিতে লাগিলেন এবং জগতে এক নূতন পথ খােলা হল এই সব কথা কহিতে লাগিলেন কিন্তু স্বামীজী কোন কথাই বলিলেন না; বরং বিষন্ন হইয়া রহিলেন। স্বামীজী বলিলেন, “বেলুনে করে গেছেন বটে, কিন্তু ফিরিবেন কি না তাহার কোন নিশ্চয়তা নাই।” কথাটা শুনিয়া সকলেই যেন চমকিয়া উঠিল। লােকে যে আনন্দ করিতেছিল, হঠাৎ নিবিয়া গেল। একটা কাজের যে আর একটা দিক আছে তা তখন সকলের চোখে পড়িল এবং সকলে নিস্তব্ধ হইয়া গেল। কিন্তু প্রকৃতই Andrue ও তাহার সঙ্গী ফিরিয়া আসে নাই, তাহাদের আর কোন খবর পাওয়া যায় নাই। ভারতবর্ষে cloak ও জামা পরিতে হইলে প্রথমে ডান আস্তিনের ভিতর লণ্ডনে বিবেকানন্দ নিজের হাত পাইয়া দিতে হয়। ক্লো বা জামা সকলেই নিজে পরিয়া লয়, অপরের সাহায্যের আবশ্যক হয় না। ইংলণ্ডে কিন্তু অন্য ক্লোক্ পরার প্রথা। প্রকার, cloak হইলে দুটি আস্তিনের ভিতর দুটী হাত জুড়িয়া দেয়, তাহা হইলে জামাটা পিঠে ও গলায় ঠিক হয়। ক্লো একটা বড় ভারী জামা, এইজন্য নিজে সব সময়ে সামলাইতে পারে না। দেশের প্রথা—সম্মুখে যে কেউ লােক থাকিবে তখনই দাড়াইয়া উঠিয়া cioakটা ধরিবে এবং লােকটা একসঙ্গে দুই হাত আস্তিনের ভিতর দিয়া cloakটা পরিয়া লইবে। যে ব্যক্তি cloakটা ধরিয়াছে, তাহাকে thank yon বলিলেই কাৰ্য্য মিটিয়া যায়। বাড়ীতে ঢুকিলে ঘরের ভিতর cloak পরিয়া যাওয়া প্রথা নয়। cloak, টুপী, ছাতা, ছড়ি এই সব সদর দরজার কাছে যে রাখিবার স্থান আছে সেইখানে রাখিয়া আসিতে হয়। এই ১ব হচ্ছে ভদ্র আচারের কথা, গরীব লােকের কথা স্বতন্ত্র। ভারতবর্ষে ঘরের বাহিরে যাইয়া জল ফেলিয়া মুখ ধুইয়া থাকে। কিন্তু ইংলণ্ডে ঘরের ভিতর মুখ ধুইতে হয়। একটা লােহার Teajoy বা একটা কাঠের টেবিলে একটা গামলা থাকে এবং একটা বিলাতে মুখ ধুইবার ঢিলা jug এতে মাটীর পাত্রে জল থাকে, ঠাণ্ডা বা গরম জল, শীত বা গরম হিসাবে। সেই টেবিলটাতে সাবান থাকে। jug থেকে জলটা গামলায় ঢালিতে হয় এবং অল্প জল লইয়া মুখে দিতে হয়, তারপর সাবান দিয়া মুখ ঘসিয়া সেই গামলার জলে চোখ ধােয়, মুখ ধােয়া, দাঁত মাজা সব কাজই করিতে হয় এবং ধুইয়া লইতে হয়। যাহারা brush দিয়া সঁত মাজে, তাহারা সেই গামলার জল মুখে দিয়া দাঁতে brush ঘসিয়া লয় । জল মেঝেতে ছড়াইতে নাই। ভারতবর্ষের লােকের এই কথা শুনিলে ঘৃণা আসে। কিন্তু ভিন্ন দেশের ভিন্ন প্রথা, এই সব সহ্য করিয়া যাইতে হয়। মুখ ধুইবার সময় একখানি প্রথা। ১৭৭ লণ্ডনে বিবেকানন্দ তােয়ালে বুকে ও গলায় জড়াইতে হয়, যেন ভিতরের পিরান জামা নষ্ট হয় এবং আর একখানি ভােয়ালে পিঠের দিক থেকে গলায় ও জিয়া দিতে হয় এবং তৃতীয় রুমাল খানি দিয়া মুখ ও জামা মুছিতে হয়। কেহ কেহ বা দুখানিতে কাৰ্য্য সারিয়া লন। পিঠের রুমালের আবশ্যক হয় না, তারপর চুল আঁচড়াইয়া ঘর হইতে বাহির হইতে হয়। চুল ও নখ অপরিষ্কার রাখা বড় অসভ্যতার কথা, এইজন্য সব সময় আরসী brush দিয়া চুল আঁচড়াইতে হয় এবং কোন জায়গায় যাইতে হইলে আরসী দিয়া দেখিতে হয় collar, জামা, মাথার চুল ঠিক আছে কি না। ময়লা বা অপরিষ্কার থাকাকে অসভ্য বলিয়া থাকে। নূতন লােক গেলে তাহাকে প্রথমে বড় বিব্রত হইতে হয়। তারপর অভ্যাস হইয়া যায়। ইজের কোট বারে বারে নরম brush দিয়া ঝাড়িতে হয় এবং খুলিয়া রাখিবার সময় hook এতে টাঙ্গাইয়া রাখিতে হয়। এই দেশের ন্যায় পুটুলি করিয়া রাখিতে নাই, তাহা হইলে ভাজ পড়ে। Boot জুতা সকালে একবার brush করিয়া ফেলিতে হয়। পরে রাস্তায় কাদা লাগিলে পুনরায় brush করিতে হয়। নূতন লােকের পক্ষে ইহা বড় হাঙ্গামা। Dey & Martinএর কেক কালী এক রকম আছে, এর শক্ত টুকরাটা এক বােতল গরম জলে ফেলে দিলে গুলিয়া যায় আর একটা কর্ক (cork ), তাহাতে একটা জড়ান তার থাকে, তারের উপর এক টুকরা sponge থাকে, এই sponge খানা দিয়া বােতলের ভিতর গােলা কালি উঠাইয়া boot জুতাটাতে মাখাইয়া লইতে হয়। তারপর দু হাতে দু’ খানা নরম brush লইয়া ঘসিলেই বেশ চকচকে হয়। নিজের নিজের জুতা বুরুস করিয়া লওয়া কোন লজ্জার কথা নয়, তবে ছেলেদের ঝি বা চাকর বুরুস করিয়া দেয়। মেয়েদের সাবান দিয়া মুখ ধােয়ার একটু বিশেষত্ব আছে। এক টুকরা ফ্লানেল ভিজাইয়া লইয়া প্রথমে তাহাতে সাবান ঘসিয়া লয়, তারপর সেই ১৭৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ সাবান-যুক্ত ফ্লানেল মুখে খুব করে ঘসে, তাতে চামড়া বেশ পরিষ্কার হয় এবং সাবানও খুব কম লাগে। কলিকাতায় এই প্রথাটা মেয়েদের মধ্যে প্রচলন করা খুব ভাল। অনবরত স্বামীজীর কথােপকথনে পাঠকের ধৈৰ্য্যচ্যুতি হইতে পারে, এইজন্য এ স্থানে অপ্রাসঙ্গিক হইলেও, ও দেশের সামাজিক রীতিনীতির কথার সামান্য অবতারণা করিলাম। প্রথমে ওদেশে ইংলণ্ডের সামাজিক লবণ ব্যবহারের কথা বলিব। বাঙ্গালা দেশে লবণ রীতিনীতি যেমন গুড়া পাওয়া যায়, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে লবণ চাপড়া চাপড়া হয়, কিন্তু ইংলণ্ডে লবণ রাখার প্রথা একেবারেই অন্যরূপ। ইংলণ্ড মেঘলা, জলাে দেশ, সব সময়েই কুয়াশায় আচ্ছন্ন, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি অনবরতই পড়ে, এই হেতু ওদেশে লবণ গুড়া করিয়া রাখিলে জল হইয়া যাইবার সম্ভাবনা, তাই লবণ চাপ চাপ করিয়া মােটা মােটা ইটের মত করিয়া রাখা হয়। দরকার মত একটা কুটনা-কোটা ছুরি দিয়া ( ওদেশে বলে peeling knife) উপরটা চাচিয়া লওয়া হয়। সেই চাচা লবণটুকু একটী কাচের বাটিতে রাখা হয়। খাইবার সময় টেবিলের উপর একটা তারের বা অন্য জিনিসের হাতাওয়ালা একটী পাত্র থাকে, তাহাতে একটা শিশি ভরা ভিনিগার ( vinegar ) থাকে, আর একটা শিশিতে সাদা মরিচ থাকে—সেই শিশিটির উপরের ঢাকনাটীতে বিদ্ধ বিদ্ধ করা গর্ত থাকে। এদেশে কাল মরিচের ব্যবহার আছে, কিন্তু ইংলণ্ডে সাদা মরিচ ব্যবহৃত হয়। ওদেশে আমাদের জানা আছে, সকলেই খাবার সময় ছুরি কাঁটা ব্যবহার করিয়া থাকে—ছুরি ডান হাতে ধরিয়া কঁটাটী বাম হাতে ধরিতে হয়, ঐ কাটার দ্বারা খাবার বিদ্ধ করিয়া মুখে দিতে খাইবার পাতি। হয়। চামচ দিয়া খাবার সময় কিন্তু ডান হাতে চামচ ১৭৯ লণ্ডনে বিবেকানন্দ ধরিয়া খাওয়ার রীতি আছে। খাবার সময় ওদেশে আরও চাওয়া ভদ্রতা- বিরুদ্ধ। ছুরি, কাটা রাখিবার পদ্ধতি অনুসারেই পুনরায় চাওয়া বা খাওয়া শেষ হইয়া যাওয়া বুঝায়। ছুরি, আর কঁাটার ডগা যদি একসঙ্গে মিশান থাকে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে—খাওয়া শেষ হয় নাই, আরও খাদ্যের প্রয়ােজন কিন্তু ঐ দুটা যদি পৃথক পৃথক্ করিয়া পাশাপাশি বসান থাকে, তাহা হইলে আর কিছু প্রয়ােজন হইবে না, খাওয়া শেষ হইয়া গিয়াছে। এই সব ওদের দেশের আদব কায়দা না জানা থাকায়, প্রথম প্রথম ওদেশে যাইয়া আমাদের দেশের ছেলেদের বহু কষ্টে পড়িতে হয়। অনেক সময় কাটা, ছুরি, চামচ প্রভৃতি বেঠিক রাখার দরুণ টেবিল হইতে খাদ্যে ভরা থালা ইত্যাদি তুলিয়া লইয়া যাওয়া হয়। এরূপ হঠাৎ থালা বাটি সন্মুখ হইতে অদৃশ্য হওয়ায় ক্ষুধিত ব্যক্তির কষ্টের সীমা থাকে - ভারতবর্ষে শুভ কৰ্ম্মে বা বেশীর ভাগ সময় ডান হাত লােকে ব্যবহার করিয়া থাকে, কিন্তু ইংলণ্ডে বাম হাতের চলনই অধিক। আমাদের দেশে কাহাকেও ডাকিতে হইলে ডান হাত তুলিয়া নাড়িতে হয় এবং এই সঙ্কেতে দূরের লােক কাছে আসে, এসিয়ার সর্বত্রই এই প্রথা। কিন্তু ইংলণ্ডে সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের দেশে বাম হাত দিয়া কোন কাৰ্য্য করা নীতিবিগর্হিত, এমন কি অবজ্ঞাসূচক । ইংলণ্ডে ডাকিবার প্রথা— বাম হাত তুলিয়া হাতের চেটোটী উপরিভাগে ধরিয়া অঙ্গুলি সঙ্কোচ করা । খাইবার সময়েও ইংরেজেরা বাম হাতই অধিক ব্যবহার করিয়া থাকে। অনেকেই দেখিয়া থাকিবেন, ইংরেজদের বক্তৃতাকালীন বাম হাত সঞ্চালন অধিক সময়েই হয় । ভারতবর্ষের চিনি সাদা বা কাল হইলেও সবই গুঁড়া চিনি। আমরা যাহাকে মিছরি বলি, ওরূপ পদার্থ ইংলণ্ডে নাই। ইংলণ্ডের চিনি ১৮ লণ্ডনে বিবেকানন্দ লাচে-উহাকে Brown sugar বলে। সাদা দোবরা চিনিও পাওয়া যায়, কিন্তু কম। চলিত চিনি হইতেছে একইঞ্চি চৌকা সাদা চিনির ডেলা, উহাকে lump sugar" বলা হয়। চা বা কফির সঙ্গে এইরূপ একটী চাকা ডেলা দিয়া খাইতে হয়। আর একরকম চিনি আছে উপর দিকে মােটা ও নিম্নদিকে সরু-একরকম চোঙ্গার মত, ইহাকে বলে loaf silgar. এই চিনিও যথেষ্ট ব্যবহৃত হয়। লবণের ন্যায় ইহাও জল হইয়া যাইবার আশঙ্কায় চাপ দিয়া চাকা চাকা টু বা ডেলা করিয়া রাখা হয়। ইংলণ্ডে বৈকাল বেলা রুটি ও মাখন বা জ্যাম j.m খাওয়া রীতি আছে। কিন্তু এই পাউরুটি কাটিবার বিশেষ কৌশল আছে। রুটির দুই পার্শ্বের দু টুকরা কাটিয়া ফেলিয়া দেওয়া হয়। তারপর খুব ধারাল ছুরি দিয়া এক এক চাকলা এরূপ নিপুণতা ও তৎপরতার সহিত কাটা হয় যে তাহা সত্যই দেখিবার জিনিস। সেই কাটা রুটিগুলি পাতলা পেষ্ট বাের্ডের (paste-board) মত দেখিতে হয়। এইরূপ কাটা হইয়া যাইবার পর সেগুলি আবার একত্র করিয়া পাশাপাশি রাখা হয়, মনে হয় আস্ত রুটিখানি (কাটিবার পূর্বে ) যেরূপ ছিল ঠিক সেইরূপই বসান রহিয়াছে। ইংলণ্ডের স্ত্রীলােকেরা রুটি কাটা কাজে বিশেষ একদিন সকালে আহারের পর সকলে বসিয়া আছে। ষ্টার্জি সেদিন বেশ প্রফুল্ল। কথা প্রসঙ্গে ফরাসী বিপ্লবের কথা উঠিল। প্যারী সহরে মন্বন্তর পড়িল। গমওয়ালারা গােলাতে গম আটকাইয়া করাসী বিপ্লবের রাখিল। গমের মূল্য চড়িয়া যাওয়ায় রুটি মহার্ঘ হইয়া কথা। উঠিল। গরীব লােকের খাবার বড়ই কষ্ট হইল। একদিন সকালে বড় বড় বাড়ীর ঝি, চাকরাণী, মজুরাণী প্রভৃতি ১৮১ সনে বিবেকানন্দ নিয়শ্রেণীর স্ত্রীলােকেরা সব একজোট হইয়া পথে বাহির হইল। ঝিয়েদের অস্ত্র ত ঝাড়ু, প্রত্যেকে ঝাড়ু হাতে লইল। বাঙ্গালা ঝাডুর মাথার দিকটা হাতে করিয়া ধরিতে হয়, কিন্তু ইউরােপের অনেক স্থানে একটা লম্বা ডাণ্ডা দেওয়া থাকে। ইহাকে Broom-stick বলে। সেই সব স্ত্রীলােকেরা এইরূপ প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ডাণ্ডা-দেওয়া ঝডু কঁাধে করিয়া রাস্তা দিয়া চলিতে লাগিল। ক্রমে তাহাদের সংখ্যা বাড়িয়া প্রায় পাঁচ হাজার হইল। তাদের সঙ্গে গােটাকতক ঢুলি বা Drummer জুটিল। উহারা স্ত্রীলােকদের সঙ্গে সঙ্গে ঢাক বাজাইতে বাজাইতে, রুটি রুটি রুটি করিয়া চীৎকার করিতে করিতে চলিল। তাহারা এইরূপে ভারসেলস্ ( Versailles )এর পথে আসিল। আশে পাশের চাষীরাও কাস্তে প্রভৃতি যন্ত্র হাতে লইয়া দলে মিশিল । রাজা, রাণী বিলাসে থাকে—তাহারা ত’ লােকের দুঃখ কষ্টের কোনও খোঁজ খবরই রাখে না। উন্মত্ত ঝিয়ের দল ভারসেলএর বাগানে প্রবেশ করিল। রাণী মেরী এন্টোয়ানেট (Mary Antoinette ), অষ্ট্ৰীয়ার সম্রাজ্ঞী মেরিয়া থেরেসার ( Maria Therisa) মেয়ে ছিলেন। ভৃত্যদের রাণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “লােকগুলা ওরূপ চীৎকার করে কেন?” ভূতত্যরা উত্তর করিল “Madam, they have no bread,” রাণী, ওরা রুটি খাইতে পায় না। রাণী উত্তর করিলেন, “Jet them lave cakes”—ওদের কে খেতে দাও। কিন্তু কে যে ময়দায় তৈয়ারী হয় এবং সেই ময়দারই অভাবে যে ইহাদের এই অবস্থা, রাণী বা রাজার তাহা খেয়ালের মধ্যেও ছিল না। উন্মত্ত স্ত্রীলােকের দল মনে করিল, রাণী বুঝিয়াই তাহাদের অবমাননা ও বিদ্রুপ করিয়াছে। ইহাতে তাহারা মহা প্রচণ্ড হইয়া উঠিল। রাজবাড়ীতে প্রবেশ করিয়া রাজা ও রাণীকে তাহারা বন্দী করিল। রাণীকে তাহারা Bakers wife বলিয়া ১২

লণ্ডনে বিবেকানন্দ
বিদ্রুপ করিতে লাগিল। তাহাদের একটা গাড়ীতে বসাইয়া তাহারা
প্যারীতে লইয়া আসিল। এই হইল ফরাসী বিপ্লবের প্রথম দিনের
ঘটনা।
সমাপ্ত
১৮৩

স্বামীজীর সহােদর শ্ৰীযুক্ত মহেন্দ্রনাথ দত্ত প্রণীত গ্রন্থাবলী Appreciation of Mielinel & Dinobandhu Dissertation on Painting (Highly appreciated by Romain Rolland) 1s, 3, স্বামীজীর জীবনের ঘটনাবলী তিন ভাগ প্রত্যেক ভাগ ১০ কাশীধামে বিবেকানন্দ • আনা Reflections on Woman Re. 1. 4. 14, ডাঃ ভুপেন্দ্র নাথ দত্ত এম-এ, পি-এইচ-ডি যৌবনের সাধনা এক টাকা ছাত্র এবং যুবকদের জন্য বিস্তৃতভাবে বিভিন্ন ধারার কর্মপদ্ধতি দেওয়া হইয়াছে। ছাত্র আন্দোলন, যুব আন্দোলন, গণ শ্রেণীর আদর্শ, জাতীয় শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে সুচিন্তিত প্রবন্ধ এবং বিশদভাবে কাৰ্য প্রণালী দিয়া চিন্তাশীল লেখক ডাঃ দত্ত ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ করিয়াছেন। প্রত্যেক ছাত্র, যুবক এবং দেশকর্মীর অবশ্য পাঠ্য। যুগ-সমস্যা ( পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ) আট আনা দেশের বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে একটা মূল্যবান্ প্রবন্ধ এই সংস্করণের গ্রন্থে সন্নিবেশিত হইয়াছে। ইহাতে দেশের বর্তমান অবস্থা উপলব্ধি করিবার সুবিধা হইবে। পাঠকগণের আগ্রহে দ্বিতীয় সংস্করণ বাহির হইল । কবি বিবেকানন্দ মুখােপাধ্যায় বিপ্লবী নায়িকা ( উন্মাদনাময় কাব্যগ্রন্থ) পাঁচ সিকা বাজেয়াপ্ত ‘শতাব্দীর সঙ্গীতের’ খ্যাতনামা কবি বিবেকানন্দ বাবু এই গ্রন্থে নর-নারীর সম্পর্কের মধ্যে এক নূতন আলােক সম্পাত করিয়াছেন। কাব্যের মধ্যে সংসার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর বিপ্লবী- নায়িকা মুর্তি দেখিতে পাইবেন। বলিষ্ঠ ভাষা এবং ভাবের গাম্ভীর্যে ইহা একখানি অতুলনীয় গ্রন্থ। " ন ৩০, কর্ণওয়ালিস স্ট, লিকাতা যুগান্তর বাণী

No text on this page.

No text on this page.

Londone Swami Bibekananda Ed. 1st

Author
Dutta,mahendra Nath
Title
Londone Swami Bibekananda Ed. 1st
File name
Londone Swami Bibekananda Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2010/03/23
Publisher
Jugantar Bani
Language
Sanskrit
Pages
199
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Swami Bibekananda
DLI number
511184
Barcode
4990010018354.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
xbytUg2V730
Download PDF

Londone Swami Bibekananda Ed. 1st