Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Parnaput Ed. 4th

Roy,kalidas · 2009/11/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পর্ণপুট
শ্রীকালিদাস রায়
চতুর্থ সংস্করণ

এসময় বন্দ্যোপাধ্যায় এম, এ, কাব্যতীর্থ
কর্তৃক সম্পাদিত।
শ্ৰশিশিরকুমার নিয়ােগী
বরদা এজেন্সি
কলেজ স্ট্রীট মার্কেট,
কলিকাতা।
১ম সংস্করণ-৫•
২য় সংস্করণ-১•••
৩য় সংস্করণ-১•••
অর্থ সংস্করণ

পর্ণপুট
কাঞ্চন খালি
নাহি আমাদের
অশ্ন নাহিক জুটে
যা-কিছু মােদের এনেছি সাজায়ে
নবীন
পর্ণপুটে।
-রবীন্দ্রনাথ।

মুদিত আলাের কমল-কলিকাটিরে
রেখেছে সন্ধ্যা আঁধার “পর্ণপুটে,
উতরিবে যবে নব প্রভাতের তীরে
তরুণ কমল আপনি উঠিবে ফুটে।
--রবীন্দ্রনাথ।

--------
উৎসর্গ
পরম ভাগবত, পরম সারস্বত,
(দেবচরিত্র
শ্ৰীযুক্ত দেবকুমার রায়চৌধুরী
অগ্রজ মহোদয়ের
শ্রীচরণে

---
কবিগুরু আশীর্বাদ
তােমার কবিতা বাংলাদেশের মাটীর
মতই স্নিগ্ধ ও শ্যামল। বাংলাদেশের
প্রতি গভীর ভালােবাসায় তোমার মনটি
কানায় কানায় ভরা, সেই ভালবাসার
উচ্ছলিত ধারায় তোমার কাব্যকানন
সরস হইয়া কোথাও বা মেদুর কোথাও
বা প্রফুল্ল হইয়া উঠিয়াছে।
তোমার
এই কাব্যগুলি পড়িলে বাংলার ছায়া-
শীতল নিভৃত আঙ্গিনার তুলসীমঞ্চ ও
মাধবীকুঞ্জ মনে পড়ে। ”
শরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সু
হঙ্গবাণী
দ্যুলোক ভূলােক পুলকি’ আলোকে জননী আমারি মা
অযুত-ভক্ত-অমল-রক্ত-মৰ্ম্ম-কমল-মাঝে,
মুজরে ফুল চরণে, ভৃঙ্গ গুঞ্জরে মধুবাণী।
আমার বঙ্গবাণী এ অখিল জ্ঞানভুবনের রাণী ।
চণ্ডীদাস বি-মণ্ডিল শিৱ চূড়াশিখণ্ড-ভারে,
‘ান’ ‘গোবিন্দ’ বৃন্দাবনের কু-কুমুদহারে।
‘লোচন’ রছিল পান্থ, গোরার লেচন-সলিল আনি।
ভামার বঙ্গবাণী শ্যামাঙ্গী, রসরাজ্যের রাণ।
বৈপায়নের ভৃঙ্গার-জলে অভসিঞ্চি ‘কাশ
কবিরাজ কবি ভক্তি-সুরভি দিল ধুপধূমরাশি,
কৃত্তি জালিল বৰ্ত্তী তমলা তীর্যের হবি দানি।
আমার বঙ্গবাণী বরাজী, যুগে যুগে কবিরাণী ।
কবিকঙ্কণ দিল কঙ্কণ, কনে মঙ্গলগানে,
কবিরঞ্জন রঞ্জিল পদ দমক্ত দানে।
রতচন্দ্র আরক্তি-অালােকে উজলে অঙ্গখানি।
আমার বঙ্গণী, সঙ্গীত-সুধা-গঙ্গার রাণী।

পর্ণপট
** রচিল প্রভা করে টাকা, দীপ্ত ললাটে জাগে।
‘রঙ্গ’ ভূষিল ক্ষইতেজের তারুণ অঙ্গরাগে।
দশিরণি দিল নিষ্ঠ-নবনী গোষ্ঠমধুরী ছানি।
আমার বঙ্গবাণী মা যশােদা গােপপল্লীর রাণী।
শ্ৰদনবন্ধু,
তা বিদ্যাসাগর নেবেদ্যের থালা,
গৃহমনিরে
বরণ' *ডাল।
নাহি ভুদেবের পৌরহিত্যে পূজার অঙ্গহানি।
আমার বঙ্গবাণী বসরূপে যশােগৌরবে রাণী ।
বঙ্কিম’ তারি অঙ্কিল চারু কারু কজ্জল আখে,
নবীন’ ঘােষিল জয়বাণী, নব পাঞ্চজন্য শাখে ।
‘হৈন’ হৃদয়-রঙ্গমলী শেভিল শুভ্র পানি
অামার বঙ্গবাণ কল্যাণী কল্পলোকেরাে বাণ ।
মরালের মত ‘মধু গীতরত, চরণ বেড়িয়া ভাসে,
গিরিশ হরিষে হরিচন্দন বরিষে নূপুর পাশে।
‘বি’ পরিবেশ-মণ্ডলে তার রচে নব রাজধানী।
অামার বঙ্গবাণী এ মহীতে মহীয়স্বী মহারাণী ।
‘সি কান্নার হীরা পান্নার দুল দিল দ্বিজরাজ,
‘রজনী’ করেছে রজনীতে সেবা, প্রভাতে ‘প্রভাত’ আজ
কিন্নর নর-সুর জয়গানে, আজিকে ঐকতানী।
আমায় বঙ্গবাণী-মা নিখিলে সকল জ্ঞানেরি রাণী ॥
.( ২ )

বিশ্ব ও বিশ্বনাথ
বিশ্ব ও বিশ্বনাথ
==
তুমিত জড় বিশ্ব নহ তুমি যে নিজে বিশ্বনাথ,
পাগল ভােলা, একি-এ লীলা-দৃশ্য হেরি দিবসরাত।
জ্যোছনাভাতি, তারকাপাতি -বিভূতিভূষা অঙ্গময়,
ভাঙের ঘােরে কক্ষপরে নৃত্যে তাল-ভঙ্গ হয়।
বারিধি-হ্রদে শারদনদে ডমরু তুলে ডামর-তান,
দোদুল-জট। জলদ-ঘটা দামিনী-দুটা—দীপ্যমান।
উলচাপে সন্ধ্যারাগে কটিতে আঁটা কৃত্তিপট,
ধরেছ শপি-ছুরিত-তাপ-গরল গলে, রুদ্র নট,
তোমার পাশে গৌরী হাসে বিতরি জীবে জান্নজল,
শশিরে আঁচল উড়ে, চরণে ফুরে কমলদল ।
তুমি ত জড় সৃষ্টি নং-তুমি যে নিজে স্রষ্টা, নাথ,
পাগল ভােলা, একি-এ লীলা-শহরী হেরি দিবসরাত।
শিশিরকণ-মণিভূষণ
বনবিতান-ব্রততীচয়
আনতণ ফণীর মত জড়ায়ে তনু প্রণত হয়।
নর-কৰােটি তোমার করে, কণ্ঠে মহাশঙ্খ-হার,
ধবলগিরি-বৃষভ বহে শৃঙ্গে মেঘপঙ্ক-ভার।
ঈশান, তব পিনাকে ছুটে শনি-শর কৃশানুময়,
বিষাণ-রবে ঝঞ্চা জাগে ঘোষণা করে ভীষণভয়।
ত্রিশূল্প তব ত্রিতাপ পে ত্রিকাল ব্যেপে ঘূর্ণমান,
অট্টহাসি,-তুহিনরাশি তটিনী কোটি করিছে পান।
১০

পর্ণপুট
বােয-ভীবণ ভাল-নয়ন,-নিদাঘ ভানু নিৰ্ণিমেষ,
রতিপতিরে ঋতুপতিরে দহিয়া করে ভস্মশেষ।
তুমি-ত জড় বিশ্ব নহ-তুমি যে নিজে বিশ্বনাথ,
পাগল ভােলা ! একি-এ লীলা—একি এ খেলা দিসরাত!
দুর্বাসা
কোথা যাজ্ঞিক অজি অজ্ঞানে ভুলেছ নিত্যযাগ,
কোথা ঋত্বিক করনি সাধন আত্মকভাগ,
কোথায় শিষ্য ভুলেছ ভাষ্য মাধবীর সৌরভে,
দুর্বাসা আসে দুর্বার বেগে, অবহিত হও সবে।
কোথা ঋষিবালা পুষিহ পরাণে মােহারুণ কামনায়,
অতিথ আসিয়া ফিরে যায় তবু হয়না চেতনা তায়,
তরুলতাগুলি পায়নি পানীয়, হরিণী" শম্পদল,
দুৰ্ব্বাস আসে দুর্ভাষ মুখে, কোথায় পাজল ?
কোথা নরপতি লালসালালিত, পুষ্পবাটিকামাঝে
বিলাস-ব্যসনে আছ সারাবেলা, হেলা করি রাজকাজে ?
'কোথা শূরবর ভুলেছ সমর প্রেমিকার কর ধরি ?
দুর্বাসা আসে, দুৰ্বল চিত! জাগাে মােহ পরিহরি।
ভুলি দেবদ্বিজ ব্রত, পূজা, নিজ জনমের তিন ঋণ,
কোথা গৃহী হায় শফীলীলায় বিলসিছ নিশিদিন ?
( ৪ )

মথুরার দূত
গৃহকাজ কোথা ভুলিয়াছ বধু বিরহের বেদনায় ?
দুর্বাসা আসে জাগাে জাগো সবে নিজ নিজ সাধনায়।
আসিছে মূৰ্ত রুদ্রশাসন, কুটাকুটিল মুখ,
শিরে জটাজাল নয়নে দহন, শ্মশ্রুগইন বুক।
সাধনার ভার বহ আপনার, মােহের আঁধার নাশি,
জাগ্রত রহ, উগ্র তাপস কখন পড়িবে আসি।
মথুরার, দূত
বিদায় চন্দ্রাননে,
এসেছে আজিকে মথুরার দূত আমার বৃন্দাবনে।
সাঙ্গ আজিকে বারব-গান,
হলো ব্রজে কলহাসি অবসান।
শেয—অভিসার—মান-অভিমান, উচ্ছল রসাবেগ।
যদিও যমুনা ভরা টলমল,
নপনিকুঞ্জ চারু চঞ্চল,
ময়ুর ময়ূর্ব। রসটলটল, গুরু গুরু ডাকে মেৰ,
তবু হায় যেতে হবে,
বারতা বহিয়া মথুরার দূত গােকুলে এসেছে হবে।
বলল সখাসখীগণে
এসেছে নিঠুর মথুরার দূত বঁধুর কুঞ্জবনে।
}

12
পর্ণপুট
--
জলকেলি শেষ ঝাপায়ে ঝাপায়ে
কালীদহে ভটবিটপী কঁাপায়ে।
বৃথা বনফলে ভরিছু আঁচল, নিছে গাঁথ বনমালা।
ফুলের ঝুলন লুটিবে ভূতলে
ভাবিতে নয়নে সলিল উথলে।
যাই বুকে বহি রসসদোলঝুলনের স্মৃতিজ্বালা।
মিছে আর মায়াডাের,
ভেসে যাক চলে যমুনার জলে সাধের বাঁশরী মাের।
ব’লো পাগলিনী মায়,
আজিকে তোমার প্রাণের দুলাল বঁধুন কাটিয়া যায়।
কে হরিবে আর ক্ষীরসর ননী ?
কে ধরিবে শিখিপুচ্ছ পাচনী ?
শত আঁচলের গ্রন্থি টুটাতে হিয়া ফেটে শতখান।
ব’লাে• গােপীগণে,যমুনার ঘাটে,
সাঝে নদীবাটে, দিনে দধিহাটে,
আজ হতে হলো ত জ জ্বালা যাতনার অবসান।
মিছে ডাক’ বারে বারে,
এসেছে আজিকে মথুরার দূত কানুর হৃদয় দ্বারে।
কেমনে হেথায় রহি,
মথুরার দূত এসেছে নিদয় বিদায়নিদেশ বহি।
( ৬ )

পর্ণপুট
ডাকিছে সত্য বিষাণ-বদনে
জীবন-মরণ—রণ—প্রাঙ্গণে,
ডাকে মথুরার কাতর কাকুতি, আতুরের আঁখিলাের।
পাষাণ-কারার আকুল রােদন
করিছে সুপ্ত তেজের বােধন,
ভাঙিতে হয়েছে রাগের স্বপন, ফাগের রঙীন ঘোের
মিছে আর আঁখিজল
মথুরার দূত করিয়া দিয়াছে অন্তর টলমল।
সূর্য্যমণি
পুষ্পসভায় উৎসব লীলা ফুরায়ে গিয়াছে যবে,
অবশ আলসে লুলিত এলায়ে ঘুমায়ে পড়েছে সবে।
রুক্ষ কাষায় বাসে
তুমি জাগিয়াছ রুদ্র তাপসী রৌদ্রবহ্নি পাশে।
তুমি চাও যারে মিলেনা তাহারে উষার সরস সুখে,
তোমার বাসক শয়ন রচিত নহে কিসলয় বুকে,
চারিপাশে রচি কৃশানুকুও ভানু পানে মেলি আঁখি
দয়িতের লাগি তােমার সাধনা বুঝিতে কি আছে বাকি ?
তুমি জানিয়াছ সার,
অর-বসন্তে সঙ্গী করিলে চরণ মিলেনা তার।
( ৭ )

সূর্য্যমণি
ভয়ে হ’ল কেহ পাণ্ডুর দেহ আঁখি মুদি কেহ কঁপে,
গরবিনী যত সােহাগিনী ঐ ঝলসি পড়িছে তাপে।
তুমি জ্বালাময়ী স্বাহা,
বহ্নিবেদনা বহিবে সহিবে তুমি বিনা কেবা আহা!
বালারুণ হেরি যে মেলে নয়ন জ্যোৎস্না-বিলাসে যেবা,
তাদের মাঝারে কে করিবে মরু মণ্ডের সেবা?
কেহ বা বন্দে উষা দেবতায়, সন্ধ্যারে কোন জনা,
উষ। সন্ধ্যার সে আদিনিদানে বল’ কার আরাধনা ?
বিনা তপােমহিমায়
কোন্ সাহসিকা চণ্ড ভানুর প্রেম চুম্বন চায় ?
বিশ্বদীন তপনে
তপনে তুষিতে পট্টবসনে ধরা
স্বস্তিবাচন-হার্ঘ্যরচনা তােমায় করেছে ত্বরা।
তুমি আছ ধুয়া ধরে
রসকীৰ্ত্তনে, সকলে যখন ঢুলে পড়ে ঘুমঘােরে।
হওনিক হারা জনতার মাঝে, স্বকৃত পন্থা তৰ,
অন্তরে জপাে অ-পরতন্ত্র জীবন মন্ত্র, মব ।
কেদারী রাগিণী—মৃচ্ছনা তুমি, জটাবল্কল সাজে,
জগরম মন্দ্রিত কর তন্দ্রিত সমাঝে।
যখন ভূষণহীন।
বসুধাসতীর সিথির ‘আয়তি’ কে রাখিবে তােমা বিনা ?

পর্ণপুট
প্রদ
শিশুটিরে ফেলে যখন জলে,
ডুবল না সে, ঠেল কমলদলে,
বিস্ময়ে তাই দেখল হাজার আঁখি--
ঢেউয়ের পরে আছে হেলে দুলে।
ফেল্লে যবে হিংসুণের পায়,
হর্যে তারা খেল্লে নিয়ে তায়,
সিংহ তাহার চাল চরণ দুটি
হস্তী তারে পৃষ্ঠে নিল তুলে।
চুতে তা ফেল্লে অবােধ যত,
আগুন নিভে ইন্দ্রায়ুধের মত
তোরণ হয়ে জাগল তাহায় ঘিরে,
হরে’ নিল গায়ের যত মলা।
সত্য,-এযে প্রদি অবতার,
জল্লাদে তার করবে কিবা আর ?
সালাদে সে গাইবে হরির নান
যতই কেন রােধ’ তাহার গলা।
নৃসিংহদেব জাগবে দানবপুরে,
মাণিক্যময় স্তম্ভ ভেঙ্গে চুরে,
দম্ভকরীর কুম্ভ বিদারিতে
মিথ্যাসুরের রক্তে নিতে বলি ;
• (৯)

অন্ত্রগত ভ্রান্তি নাড়ী ছিড়ে
উরুর তটে দবে জঠর চিরে।
শেষকালে সেই সত্য হয়ে জয়ী
চেয়ে চেয়ে দেখবে কৃতাঞ্জলি
।
ধ্রুব
উত্তমই যায় ভাবছ মােহের ঘােরে,
বসায়ে আজ আদরে তায় ক্রোড়ে,
তাড়াচ্ছ যে ধ্রুবেরে দূর বনে,
ধ্রুবের সাথে বিদায় নিবে শুভ।
অধ্রুবেরে চিত্তে ভজি’ ভজি’
সুরুচিতে নিত্য রয়ে’ মজি’
সুনীতিরে করবে কর দূর ;
দুঃখ কি তার পুত্রটি যার ধ্রুব।
ধ্রুব আপন কঠোর সাধন বলে
উঠবে জিনে হরির পদতলে।
সুনীতি-ও হবেই শ্রেয়ােমাতা
সবার উচু পুণ্য ধ্রুবলােকে।
ভােগের মােহে মরীচিকার জালে
মিটবেনা তৃষ্ণা কোন কালে
চাইতে হবে ধ্রুবলােকের পানে
অশ্রু-অরুণ আৰ্ত্ত করুণ চোখে।
)

বিশ্বামিত্র
.
ধ্রুবের সেবা ভিন্ন কেবা কবে
বিশ্বে অশােক শ্বাশত লােক লভে ?
ধ্রুবের প্রভা ভিন্ন ভাবে
নাবিক তুমি হবেই পথহারা,
সুলভ সুখের লােভ লালসা যত,
ক্ষণিকভাতি জোনাকাতির মত ;
নিশান্তে হায় নিভবে তাদের আয়ু
অনন্তকাল জ্বলবে তাবা।
বিশ্বামিত্র
দেশে-দেশে ব্ৰহ্ম-ক্ষত্র, বিশ্বক্ষেেত্র বিশ্বামিত্র, তব জাগরণ,
তব ঋক্‌মন্ত্রে, রথি, সুতরা’ নদনদী বিজিত ভুবন।
জন্মবলে নহে তব, পুরে দুস্কর তপে ব্ৰহ্মপদুলাভ,
বাষ্ট্ৰজাতি নব নব যুগে-যুগে গড়ে তব তপের প্রভাব।
তব যােগ ভঙ্গ ফলে চতুঃষষ্টি- কলাশিশু জন্মে কালে কালে,
শিল্পী-শকুন্তের যারে বক্ষপুটে স্নেহসারে পক্ষছায়ে পালে।
প্রমূৰ্ত পুরুষকার, তােমার ‘জ শুক’ আজো অশিবে তাড়ায়,
তব রাজ-পরীক্ষার বহ্নিকুণ্ড জ্বলে শত মণিকর্ণিকায়।
অভিশপ্ত মুক্তি লভে যজ্ঞদ্রোহী মহবে পড়ে দলেদলে,
দেশবৈরী সৃষ্টিত্রাস মাতৃ-হা’র দর্পনাশ তােমারি কৌশলে।
আজো গায়ত্রীর সহ ‘অতিব’ বিদ্যা কহ তরুণ শ্রবণে,
‘সত্য-শিব’‘শূর-সতী’—মিলনের প্রজাপতি রাজর্ষি-ভবনে।

পর্ণপুট
বিশ্বরাজ।
কেমনে চিনিব তােম। তুমি নাকি বিশ্বের ভূপাল ?
একমুষ্টি তায়—তাও, ভিক্ষা চাও হে রাজ-কাঙাল।
চিতাভস্ম অঙ্গরাগ, পরিধানে হেরি গজাজিন,
ছত্ৰীভূত সপফণা জটা-পূর্চে কিরীট নবীন।
নিতান্ত বাতুল পেয়ে বৃষভে বসায়ে অবশেষে
কে তােমারে সাজাইল ও অপূৰ্ব্ব রাজেব্দের বেশে ?
দেবগণ নিল বাটি রাশি রাশি 'অমৃত ধবল,
অকুন্ঠিত কণ্ঠে তুমি নিলে হাসি অসিত গরল।
বিলায়ে মন্দার কুন্দ অরবিন্দ তুলসী মধুর
নিলে মহাশঙ্খ-কষ্ঠী, বিল্বপত্র, বিষাক্ত ধুতুরা।
তেয়াগি লাবণ্যলতা রাজকন্যা তারুণ্যে অরুণ,
ব্ৰতজীর্ণ। তপশীর্ণ। অপর্ণারে করিলে করুণ।
হে রাজেন্দ্র, তব রাজ্যে তুমি শুধু চির অকিঞ্চন,
সকলে যা বিসজ্জিল করিলে তা মৌলির ভূষণ।
হে বৈরাগী সৰ্ব্বত্যাগী বিশ্বপতি হেরিয়া তোমারে
হতদর্প, নতশীর্ষ বিশ্বলােক লজ্জা কুণ্ঠাভারে
সৰ্বভোগ্য ত্যজি রাজা যদি রও শ্মশান প্রবাসে,
কেমনে সৌভাগ্য সুখে র’বে প্রজা সংসার বিলাসে
শবাসন ছেড়ে আজো ফিরলেন তব সিংহাসনে
ছুঠিছে নিখিল ভব তাই তব শ্মশান সদনে।
( ১২ }

জাজর্ষি হয়ত
রাজর্ষি ভরত
গৃহসুখ সিংহাসন,
মৃগশিশু, তােরে ভালবেসে,
হায় হায় শতশত
যা জপ যায় সব ভেসে।
খেয়ে নিস তুই সব সোম চর কুশ যব,
কোশাকশী হতে গঙ্গাল,
ণ্ডিলে সমিধ পরে ঘুমাইবি অকাতগে,
কমনে জালিব হােমনল।
এক অত্যাচার তোর,
১ান্ত্রপূত হবি মাের
সুক হ'তে তুই নিস, কাড়ি ;
যােগে সমাহিত হ'লে
আসিয়া শুইবি কোলে,
স্পনহীন নাহি হ'তে পারি।
এ আয় চোখ ভুলারে যুক্ত শ্লোক,
দাতে ধরে টানি বাকল ।
সর্বাঙ্গ লেহন করি সব তপ নিশি হরি,
শেষে কিয়ে করিবি পাগল?
পরিহরি ঘনসার
কুসুম, রোচনা,
কালাগুক, উশীয়, চন্দন,
সুগন্ধ বিলাস সৰি
ছেড়ে এসে এ টি
মৃগছে মালয়ে মম।
১৩

পর্ণপট
রূপতৃষা, রসতৃষা
(জয়তৃষ যশ’তৃষা
সৰ্বতৃষা গৱেঁ জিনি হায়,
কান্তারে প্রান্তরে ঘুরি’ ভ্রান্ত আজি পন্থা ঢুড়ি
মরুভ্রান্তি ‘মৃগতৃষ্ণিকায়।
ছিড়ে এসে মায়া ডাের ওরে মায়ামৃগ মাের
তাের লাগি ঘাের অধােগতি,
প্রতিহিংসা প্রকৃতির, এযে দণ্ড বিদ্রোহীর,
ভগবন্! দাও স্থিরমতি ।
থাক্ তুই রে শাবক, অঙ্কে মম, শুষ্ক হাে
চতুৰ্বর্গ-ফলের পাদপ।
জীবন্ত সবার চেয়ে
স্নেহ প্রেমে শিশু পেয়ে
হত্যা করি করিব কি তপ ?
যদি যােগ-তুষানলে
শাসন-শােষণ বলে
বসলেশশূন্য সারা প্রাণ,
অন্তরে বাহিরে জটা,
তবে মিছে তপােঘটা
বৃথা নস-ব্রহ্মের সন্ধান।
বৈরাগ্যের শ্যেন যদি
অনুসরে নিরবধি
প্রেম-ওক ত্রাণ কোথা পায় ?
সব ঠাই হতে তারে তাড়াইলে বারে বারে
মৃগবকে বাঁধিবে কুলায় ।

রূপ ও ধূপ
রূপ ও ধূপ
ওগো রূপ অপরূপ,
তোমার দেউলে দহিয়া মরিল কত না সুরভি ধূপ।
অটল নিঠুর, চরণের মূলে,
তবু একবার হিলে না ভুলে।
পলি ক্ষীণ রেখা, রসহীন ‘অশান’ পাষাণ - বুকে।
দষ্ট তোমার লুঙ্গিত ভূমে।
দঃh C
দর গন্ধিত ধূমে,
মলিন কালিমা দেছে ধূপ ব কপটোল মুখে।
'ওগো রূপ অরূপ,
তৰ মন্দিরে মরণে বরিছে কত যে জীবন-ধূপ।
ক ও-ক ও কথা একবার ডাকি,
মেল, ও ইন্দ্রনীলমণি-আঁখি,
কত যে ভক্ত লোচন-রাজীব তুলি’ শরে দিল পায়,
লােনা ও দেহে কৃপা শিহরণ?
নিল বক্ষে কেড়ে প্রহরণ
তব হোমানলে পূর্ণাহুতিতে সপিল যে আপনায়।
ওগো রূপ, অপরূপ,
মেল
একবার অন্ধলোচন, দহে গলাে কত ধূপ।

পর্ণপুট
দর্শীচি
কোথা তপােবনে যজ্ঞকুণ্ডে পড়েনি পূর্ণাহুতি,
দেবের প্রসদি আসেনি মিয়া, থামিয়া গিয়াছে শ্রুতি
আহিতাগ্নিক, হয়ােনা নিরাশ দৰীচি সপিছে প্রাণ,
অস্থি শােণিত-ইন্ধন ঘৃত, দিতে হােমে বলিদান ।
বৃষ্টি বিহনে রৌদ্র দহনে কোথা দেশ ছারখার,
ধূ-ধূ করে মাঠ, হু-হু করে প্রাণ, গৃহে গৃহে হাহাকার
হে কৃষকবর, হয়ো না কাতর, দধীচি সপিছে প্রাণ,
শ্রাবণানন্দে বারিদমত্রে নামে ইন্দ্রের দান।
সুরলােক কোথা রসাতলে যায় অসুরের পশুবলে,
গিরিগুহা-বনে, ঘুরিছে গােপনে দেবতারা দলে দলে,
উঠ দেবরাজ, ত্যজ দীনসাজ, হীনলাজ অবসান,
যােগাসনে ঐ বসেছে দধীচি করিতে অস্তিদান।
ধজগতে বিপ্লব কোথা—কলুষের উপচ,
সত্যের গ্লানি, পুণ্যের মানি, নিরীহের নিতি ভয়,
সাধু মহারাজ, উঠ উঠ, আজ দধীচি সপিছে প্রাণ
কুশে যাগে রণে মেরু-মরুবনে তার এ আত্মদান।
( ১৬ :

নবীন বঙ্গ
নবীন বঙ্গ
রচিল ধৰ্ম্ম-ত্রিবেণীতীর্থ তব ভগবান পরমহংস,
শ্রুতির বার্তা শুনাইল পুন তব রায়, সেন, ঠাকুরবংশ।
বাড়বোজ্জ্বল করুণা-সাগর’ ভরিল অঙ্ক রত্নপুঞ্জে,
বঙ্কিম নব শুভ সংসার রচিল তােমার মাধবী-কুঞ্জে।
লুটি মাগো তব চরণ ধূলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ,
জ্ঞানবিজ্ঞান-ললিতকলায় শােভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।
দত্ত, মিত্র, গুপ্ত, বসুর অর্ঘ্যে পদারবিন্দে দীপ্তি,
গিরিশ, নবীন, হেম, মধু করে সুধাদানে জ্ঞানক্ষুধার তৃপ্তি,
মত, সুরে, মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত করে অযুত শিষ্যে।
ব্ৰতী ব্রজেন্দ্র ব্রহ্মবিদ্যাবর্তিকলােক বিতরে বিশ্বে ।
জ্ঞানী দানবীর রাসবিহারীর কণ্ঠে ধ্বনিত ন্যায়ের বিশ্ব,
স্বর্ণ, তারক, নহশীন, মণি ‘বলির ধৰ্ম্মে হয়েছে নিঃস্ব।
রাজনীতি-রণক্ষেত্রে ধ্বনিল ঃখী শ্ৰীকৃষ্ণদাসের শঙ্খ, :
শোভে আশুতােষ, মৈত্র, ত্রিবেদী অলিসম তব কমলঙ্ক।
লুটি মাগাে তব চরণ ধূলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ
জ্ঞানবিজ্ঞান-ললিতকলায় শােভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।

2
-
ঋষি মহেন্দ্র গঙ্গাধরের ভৃঙ্গার-জলে বঁচিল সৃষ্টি,
হােতা প্রফুল্ল নব রসায়ন-হােমানলে করে হবির বৃষ্টি।
বহে গুরুদাস অগুরু-পাত্র, তাবনীর করে প্রাচীনছত্র,
যােগী জগদীশ তাড়িতাক্ষরে নিখিল তােমার বিজয়-পত্র।
তব অপত্য দূর-ভূখণ্ডে লভিল শৌর্য সেনাপত্যে,
তােমার চিত্ত জিনিয়া বিত্তে চিনিল নিত্যে,চরম সত্যে।
দুহিতারা তব জাগ্রত করে রমণীগরিমা তিমিরলুপ্ত,
সেন, সরকার, শাস্ত্র তোমার করে প্রবুদ্ধ কীৰ্ত্তি সুপ্ত।
লুটি মাগাে তব চরণ ধূলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ,
জ্ঞানবিজ্ঞান-ললিতকলায় শােভিত অমল শ্যামল ভাঙ্গ।
সত্বরজের মিলন-মন্ত্র ঘোেষল বিশ্বে বিবেকানন্দ,
দিগ জয়ী কবি সিন্ধুর কূল গায়িল সামসামের ছন্দ।
শরচন্দ্র-মরীচিমালায় কল্পসুষমা তােমার অঙ্গে,
তব বন্দনা কুজে আনন্দে কাব্যকুঞ্জে কোটি বিহঙ্গে।
ত্যাগবিশুদ্ধ ধ্যাননিরুদ্ধ মূদিত তোমার হৃদয়বিন্দ,
কোটি ভক্তের দুর্জয় তপে তােমার আননে দ্যুতি অনিন্দ্য
পুত্র তােদর গর্তের তরে বরিছে শীর্ষে অশনিবর্ষ,
দেশের কৰ্ম্মে সেবার ধৰ্ম্মে এদের মৰ্ম্মে ত্যাগের হর্য।
লুটি মাগো তব চরণ ধূলায় তুমি যে আমার জননী বঙ্গ,
জ্ঞানবিজ্ঞান-ললিতকলায় শশাভিত অমল শ্যামল অঙ্গ।
( ১৮

কৃত্তিবাস কৃত্তিবাস । আজিকে তােমার ভক্তগণেব ও শুভ মিলনে তোমারে স্মরি। তোমাৰ খড়ম ফিবে পেলে গুক নৃত্য কবিগো শীর্ষে ধরি। তাজি হে সাক তব ভিটা চুমে’ পম তী তব বাস ভূমে ধুলায় লুটাই কম গুণ হ ত পদবজে তিলক পবি’। বাক- বিত নবলোকে * বল ত্ব। তা দি কবি-.চাখে, অনিলে তা' হতে • খ-ভাগ বস মিল জানে বঙ্গ ভরি। জানিন : “fত সংহিতা, ८१.६५ -4ect 01, ইহসসার ই পৰবাৰ লৈশে ত মা নিবেশে গড়ি। পাসন্ধ্যা গুলিরে হে কবি, ববেছ মধুব পূণ্য-সুভি, অস তারে দিনসাপ থ বাত, অত | তবে দিলে পবের কড়ি • ত থ ব' কুটাবে কুটাবে, ক. ভিতর বাইবে, মৃ৮ ভবে নয়নের নাবে ববি। দেনা হরি। বলা নাবীব সতী-সতিমা নষ্ঠ ভক্ত প্রতি প্রমায় তোমাৰ অমল কওঁ ধবল ? ম দেখে গেছ অমর কবি

পর্ণপুট
দাশরথি ,
প্রাচ্য প্রতীচ্যের আদিসঙ্গমের উৎসব-ভবনে
দেশপণ্ডিতেরা যবে হলো হােতা জাতীয় হবনে,
দুয়ারে কাঙালী যারা জুটেছিল মলিন-বসন,
তাদের বিদায়-ভার কে তথন করিল গ্রহণ ?
বিদেশী ভূষায় যবে বিমণ্ডিতা ভারতী ইন্দির।
মন্দিরে বিকাতেছিল বিজাতীয় সাহিত্যমদি;
মৃভাণ্ডে গােরস-সুদা পল্লী-স্তনে কে করি দোহন
তাদের ভােগের লাগি পথে পথে করিল বহন ?
নগরের সভামঞ্চে নব মন্ত্রে মত্ত পুরবাসী,
বৈষ্ণব-শাক্তের দ্বন্দ্ব পল্লীভূমি ফেলেছিল গ্রাসি,
তাহাদের রণাঙ্গণে তুলে ধরি’ সন্ধির কেতন,
মিলন-গীতার গানে কে করিল দ্বন্দ্ব-নিরসন ?
যত জ্ঞানগব্বিগণ আভিজাত্য-সমুচ্চ সােপানে
যখন রচিতেছিল শিক্ষাশালা ভিক্ষা-উপাদানে,
বঙ্গে মহামানবের লােকগুরু-দৰ্ভাসন খানি
কে তখন অধিকারি’ শুনাইল শুভ ধ্রুব বাণী ?
সেই তুমি মহাকবি, এ বঙ্গের অন্তরঙ্গ কবি
অনাথের পতিতের অন্তরের আঁধারের রবি।
শত শত গুহকেরে দাশরথি তুমি দিলে কোল,
চামার চণ্ডাল সহ এককণ্ঠে বলি হরিবােল
( ২০ )

রবীন্দ্র-বয়ণে
4
রবীন্দ্র-বরণে
হে সুন্দর, অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্য্যের আশ্রান্ত বিকাশ,
লভেছি তোমার মাঝে অনন্তের মঙ্গল আভাস।
লােকোত্তর আত্মা তব অভ্র ভেদি’ ব্রহ্মলােকে ছুটে,
অনুসরি’ দৃথিহঙ্গ নেমে আসে ক্লান্ত পক্ষপুটে।
মুরছিল মম ধ্যান তব জ্ঞান-সিন্ধু-সিকতায়,
বসবা, উম্মি মাঝে মতট লুকাল’ কোথায়।
সমা নাই ভূমানলে, হে বিরাট, সব যাই ভুলে,
পদহীন, নিশিদ, কৃতাঞ্জলি তব পদলে।
হে তান! আসিয়াছ ছদে গন্ধে কর কান্তরে,
প্রভাতের কলরঙ্গে, কুসুমের ‘সুষমা-সম্ভারে।
ঙ্গের চলঙ্গে, অণ্যের সঙ্গীতের সুরে,
নিসর্গের রগে রগ্ধে, মেঘ, ইয়ূব পুরে।
হে কল্যাণ ! আসিয়াছ শঙ্খস্বনে উটজ প্রাঙ্গণে,
লাজবর্ষে হাস্যে হর্ষে স্বশিস্যে ভবনে ভবনে,
বী-ডোরে, মল্লীমাল্যে, পূজামন্ত্র, উশীর চন্দনে,
শিশুর দেয়াল। মাঝে, কাঙালের সফল ক্রন্দনে।
হে মােহন! এলে যদি এসো তবে আরাে সন্নিকটে,
সুবৰ্ণ-মরাল-তরী 'অয়েরূঢ় মম চিত্ত-তটে
ভিড়াও, একটি বার,—ব্রহ্মানন্দ স্পর্শ-সুখ লভি’
জন্ম জন্মান্তর মম কে ধন্য নিৰ্ম্মাল্য-সুরভি।
( ২১

পর্ণপুট
রাখ’ পাদপদ্ম, মম রোমাঞ্চিত ভক্তির মৃণালে,
এ অঙ্গ পিশঙ্গ করি ভূঙ্গ হয়ে তার রেণু-জালে।
ভক্ত-মৰ্ম্ম-মৰ্ম্মরের আরোহণী বাহি’ উঠি ধরে,
নবতীর্থ রচ’ বঙ্গে সঙ্গীতের রস গঙ্গাতীরে।
৫
কতদূরে ! কত উচ্চে ! হে রাজর্নি, তবু কত প্রিয়,
প্রাংশুলভ্য, তবু দীন বামনের পরম আত্মীয়।
গােস্পদের জলে জাগে পূর্ণ চারু চন্দ্রমার ছবি,
নীহার-বিন্দুর বুকে ধরা দেয় গগনের রবি।
রথ হ’তে নেমে এস দাড়ায়ােনা ইন্দ্রিয়-দুয়ারে,
অন্তরের অন্তঃপুরে চলে যেতে হবে একেবারে ।
রচিয়া রেখেছি তথা নিৰ্মথুন-বরণ-সম্ভার
আজন্মসঞ্চিত অর্ঘ্য মধুপর্ক ষোড়শােপচার।
গন্ধৰ্ব্ব-লােক হ’তে সপ্ত সুর-তুরঙ্গম-রথে
এস নামি’ সপ্তষির আশ্রমের পুণ্য ছায়াপথে।
বাদেবীর বীণা হতে এস নামি মূর্ত ব্ৰহ্মরাগ,
হে সবিতা, সারস্বত সেমিষজ্ঞে লহ আজ্যভাগ।
খৃষ্টসম স্নিগ্ধকণ্ঠে ডাক’ তব স্নেহচ্ছায়াতলে
দুগ্ধ শুভ্র দৃষ্টিদানে স্নাত করি মুগ্ধ শিশুদলে।
বরিষ’ ভৃঙ্গার হ’তে হে দেবর্ষি, আশীৰ্বাদ-ধারা,
তােমা ঘেরি নৃত্য করি’ চিত্ত ভরি’ মােরা আত্মহারা।
2
( ২২ )

পণপুট
দ্বিজেন্দ্র-স্মরণে
ওগো ‘দ্বিজরাজ’ কোথা গেলে আজ? লুকাল’ জোছনাহাসি,
‘রবির কিরণ জাগেনা প্রাচীতে, শুধু যে তমসারাশি।
এখনাে যামিনী রয়েছে যে বাকী,
চলেছে পেচ ক শির’ পরে ডাকি।
কার পানে চেয়ে রবে আঁখি ? অশ্রুতে যায় ভাসি।
ওগো ‘দ্বিজরাজ’ কোথা গেলে আজ রচিতে পৌর্ণমাসী?
অর্চিলে মা’য় শূর-শােণিতের ‘সুর-ধুনী কূলে কূলে,
তব সঙ্গীত শ্রুতিমূলে তার কুণ্ডল হয়ে দুলে।
গড়ি মঞ্জীর কনক-জীবনে
পরালে বঙ্গ ভাষার চরণে,
তােমার কণ্ঠ-কম্বুর নদে জাগিল গৌড়বাসী।
মন্দির ত্যজি কোথা গেলে আজি ঘুচায়ে মায়ের হাসি ?
জাগালে কাস্থ মৃতকল্পের পার ম্লানমুখে,
ফুটালে চপলা অশমেদুর জীবন-মেঘের বুকে।
ফুটায়ে কমল গরল-পঙ্কে
বসালে বাণীরে তাহার অঙ্কে,
ওগো ‘নটরাজ’ ফণীর ফণায় বাজালে মােহন বাঁশী ।
কোথা গেলে কল-মুখর-কণ্ঠ,—কোথা গেলে উল্লাসী?
' ( ২৩

চিত্ত-চিতা
“চিত্ত-চিতা
৮
শীর্ণ দেশের ব্যথার-ঘুণে-জীর্ণ পাঁজর চূর্ণ আজ,
হয় বিধি হায়, হলে কি ন্যায়-দণ্ড-বিধান পূর্ণ আজ ?
রুদ্র, তােমার উদ্যত রোষ করবেনাকো সংহরণ ?
আর কতকাল ও শূল করাল কবে ভয়াল সঞ্চরণ?
ভাঙছে ‘বােধিক্রমের’ শাখা, ভাঙছে মলয়-বিন্ধ্যশির,
মীনার চূড়া করছে গুড়া, সৃষ্টি নাশিশতাব্দীর ।
যেনি মাথা তোলে এ দেশ অম্‌নি কর বজ্রাঘাত,
প্রবাল কীটের সাধনা তার ভস্ম কর অকস্মাৎ।
পথের সেতু রথের কেতু মুহুর্মুহুই ভগ্ন হয়,
বাঞ্ছা তােমার লাঞ্ছিত দেশ, পঙ্কতলেই মগ্ন রয়?
ভারত-জনারণ্যে আজি কি দাবানল জ্বলে হায়,
আশার গহন শ্যামল স্বপন, মুক্তি-জীবন, দগ্ধ তায়।
জ্বল্লে দেশের চিত্তে চিতা এই কি তােমার চিত্তমেধ ?
চিত্তে আজি চিন্তা-চিতায় রাখলেনাক ভিন্ন-ভেদ।
তৃপ্ত হলো ললাট-অনল মােদের হৃদয়খাণ্ডবে,
চণ্ড এখন ভস্ম মেখে নৃত্য কর তাণ্ডবে।
ভারতজোড়া শ্মশান আজি পূরল তোমার মনস্কাম,
প্রেতের সাথে রাজ্য কর’ অট্টহাসে রুদ্র বাম।
কঠোর অনল-পরীক্ষা তাের দুঃখ হতভাগ্য দেশ,
তুষানলের তৃষায় পুড়েও হয়নি প্রায়শ্চিত্ত শেষ?
( ২৪ )

পপুট
পাপের কি তাের অন্ত আছে ? কোথায় রে তাের ধৰ্ম্মবল ?
এত যুগের দণ্ডাঘাতেও ঝছে না তাের কর্মফল।
অনেক পুরুষ ধরে শুধুই মরিস্ ভুগে কুম্ভীপাক,
দম্ভ বৃথা, পুণ্য কোথা? রেখে দে তাের শূন্যঞ্জক।
নইলে কেন বভ্রাটন হচ্চে ক্ৰমে দাস্তপাশ,
বিধির রােষে নান্দীমুখেই অধিবাসেই সর্বনাশ।
শুদ্ধভিন্ন দিল এবার দুর্বিষহ পুত্রশােক,
অভিশাপের মােচন তরে শোচন-পুরশ্চরণ হােক।
শোকের পাষাণ বক্ষে বহি চোখের জলে রাত্রিদিন
অনুতাপের বহ্নিপে কররে শাপের প্রতাপ ক্ষীণ।
পুণ্যহ্রাসে কালের গ্রাসে, সহায়-সাহস-বিত্ত তাের,
চিত্ত গেল সত্যলােকে থাল প্রায়শ্চিত্ত ঘাের ।
ভারতবাসি, আজকে তুমি দেখছ যাতে অন্ধকার,
সতর্কতার অনুশাসন জেন’ তা সেই নিয়ন্তার ।
কঠোর তপশ্চরণ বিনা মিলবে না তাই মুক্তিজয়
মিলবে তপে আত্মলােপে, ভিক্ষাতে নয় শাঠ্যে নয়।
গুল্মলতা বল্মীকে এই তাঙ্গ ঢাকুক, তপ করাে,
চিত্তযােগীর মন্ত্রটিকে নিত্য তত জপ করাে।
ইন্দ্রগণের ইন্দ্রিয়দের সব প্রলোভন জয় করি’
বিষ্ণুচরণ স্বিন্ন করে পুঞ্জিত পাপ ক্ষয় করি।
পুড়ল মাতে ত্যাগীর তনু দ্য তাতেই দীক্ষা হােক,
অক্ষয় রাে’ক তোমার মনের সদ্যোজাত স্বর্গলােক।
( ২৫

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র
সমান ব্যসন সবার শিরে শ্মশান-নিরানন্দ দেশ,
পাবন স্মৃতির শাসনতলে বিলােপ কর’ দ্বন্দ্ব দ্বেষ।
বাটতে এসে মুক্তিসুধা লাভ হলাে যার ব্যর্থতাই
মরণ-পাথার মথি তাহায় সুধার সাথে ফিরাও ভাই।
শােকের মাঝেই অশােক লােকের পথটি চিনে লও সবে,
ভিক্ষু অশােক কিরীট শিরে আসুক ফিরে গৌরবে।
এই শ্মশানের যজ্ঞশালায় নবীন জীবন- কে, সুরু,
জীবনে দেশবন্ধু
যে, সে মরণে হাে দেশগুরু।
মুক্তি মিলা’ক গঙ্গা হয়ে বঙ্গভূমির শােকরা,
তার জীবনের সন্ধ্যাতারাই হােক তােমাদের শুকতারা।
আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র
তোমারে গড়িল বিধি তাঁর পাদপদ্মের পরিমলে,
রাখাল-রাজ্ঞের তাঙ্গের রজে, নিমায়ের আঁখিজলে।
তােমার মাঝারে ধ্রুবের সাধনা, জনকের জ্ঞান-গরিমার কণা,
সনকের পরাভক্তি উজলি’—ভীষ্মের তেজ জ্বলে।
রণ
এলে
রসময়।
হাঙ্গীত চরক
নাগার্জুনের চিত্ত
করিয়া জয়,
আহুতিমন্ত্র
শিখে
বিগতজনমে রস-ব্রজধামে গােষ্ঠলীলায় ছিলে কোন্ নামে ?
বিরাগ দীক্ষা নিয়ে এলে তুমি কোন্ বােধি-তরুতলে?
( ২৬ )

চিত্ত-বিয়ােগে
চিত্ত-বিয়ােগে
-
৩
তাপস-দুর্লভ লােকে, যাও যােগি.-কবি-তপােধন,
তোমার জীবন ধন্য, অবাে ধন্য .তামার মরণ।
মূঢ় মাের করি শােক, শুধু তুমি ভূলােকের নহ,
বন্যহােক স্বর্গলােক, দেবতারাে ঘুচুক বিরহ।
মরণে রচিলে ইহ-পরত্রের সম্মিলন-সেতু,
মবুকে ধ্বদণ্ড, স্বর্গে তব উড়ে জয়কেতু।
নশ্বরে করিয়া ভস্ম, দুইভাগ করিলে শাশ্বতে,
হাত্মা গেল আত্মধামে, রয়ে গেল সাধনা ভারতে।
সবি যার,-দেশে-দেশে যুগে-যুগে সাধনাই বাঁচে,
দেহব্যবধান-হারা হয়ে সে যে আসে অারো কাছে।
মােরা হেরিতাম তােম। কেন্দ্রীভূত একটি তনুতে,
অজি হেরিতেছি ব্যপ্তি এদেশের অণুতে অণুতে,
ঐক্যে, সখ্য-আলিঙ্গনে, তরুণের উৎসাহ আশায়,
প্রতি তাশ্রুবিন্দু-বুকে, চিত্রে, গীতে, কবির ভাষায়,
দেশের নিজত্ব-বােধে, আহােদয়-ব্রতের শিক্ষায়,
জাতির ‘দ্বিজত্ব-বােধে’, নবজন্মে প্রণব-দীক্ষায়,
স্ব-প্রতিষ্ট ভারতের গর্ভ-ক্রুণ-ললাট-লেখায়,
প্রত্যাসন্ন বিজয়ের ধ্বজালিপি-রেখায়-খােয়।
তােমা হেরিতেছি নব জীবনের অঙ্কুরে তঙ্কুরে
প্রত্যেক রােমাঞ্চে অঙ্গে, গেহে-গেহে সারাবঙ্গ জুড়ে,
-
( ২৭ )
'

পণপুট
সত্যোদয়ে, মিথ্যাজয়ে, সংকল্পিত ব্রতের বরণে
প্রতিদণ্ডপলে, দুর ভবিষ্যেরো দিগন্তের কোণে।
এক ‘চিত্ত হইয়াছ লক্ষ চিত্ত জড়ে চেতনায়,
এক ‘নিত্য’ যেন আজি প্রকটিত বহুধা ভূমায়।
এক চন্দ্র প্রতিবিম্বে লক্ষচন্দ্র জনসিন্ধুময়,
চূর্ণ করি আপনারে, পূর্ণতায় লভিয়াছ জয়।
চিত্ত তুমি ভারতের ছিলে এতদিন,
প্রতি স্নায়ু-রক্তকণা মাঝে তার হইলে বিলীন।
তব ভস্ম, মহাকাল অঙ্গে মাখি’ করিল ভূষণ,
যুগে-যুগে, কল্পে-কল্পে ব্যাপ্ত হলে, হে চিত্তরঞ্জন।
গঙ্গাধর স্মরণে
তুমি শেষ-ঋষি পুন এ-দেশেরে জ্ঞান-গৌরবে মণ্ডিলে,
অশ্বী দু’জন এক দেহে এসে জীবে অনাময়-ধন দিলে।
দেহ-আত্মার লাগি দুই-করে আনিলে ভেষজ আর্নের তরে,
সুরভির হবি অমৃত সুরভি মন্দার-মধু বন্টিলে।
ইহপরত্রে পুণ্য-মিলন তােমার জীবনে ধ্যান-চোখে,
রুদ্র শিবের শুভ সঙ্গতি তােমার পাবন জ্ঞান-লোকে।
জটাজালে ঝরে জাহ্নবীবারি শবসঞ্জীব ভবরােগহারি,
নয়নে তোমার জলিল বহি ভ্রান্তিমেধের স্থাণ্ডলে।
( ২৮ )

মৃত্যুশয্যায় রজনীকান্ত
মৃত্যুশয্যায় রজনীকান্ত
হে কিন্নর! কণ্ঠে কণ্ঠে বন্টি’ বঙ্গে সঙ্গীত-ঝঙ্কার,
কণ্ঠ তব আঙ্গিকে নীরব,
আজি দীন ভিক্ষু বেশে দাড়ায়েছ লক্ষপতি তুমি
বিলাইয়া যক্ষের বিভব।
বিতরি অমৃত আর মণিহার, মহাশঙ্খমালা,
উগ্রবিষ ধরিয়াছ গলে,
হাস্যসত্ৰ উদ্যাপিয়া আজি তুমি নেমেছ সিনানে
বিদায়ের নয়নের জলে।
আজি তুমি দানরিক্ত, কণ্ঠে ধরি শুষ্ক রসঘট
মরুর খৰ্জর তরু যেন।
‘কল্যাণী বাণীরে দিয়া বরসজ্জা রত্নসিংহাসনে,
নিজে নিলে শরশয্যা হেন?
হে মুক্ত সাধক, আজি দাড়ায়েছ বিজয়-গৌরবে
পারে যেতে ভবসিন্ধু কূলে,
কল-কল রাঙা জল পদতলে আসে ছুটে ছুটে
লুটে লুটে পড়ে ফুলে ফুলে।
একখানি তরী তার তটে বাধা, করে টলমল
বসি তাহে অকূল কাণ্ডারী,
হরিনামাবলী ছাড়া সাথে কিছু লওনি পাথেয়,
হে বাণীর কুবের-ভাণ্ডারী।
( ২৯ )

পণপুট
প্রপঞ্চের পঞ্চদীপ নিভে আসে, ক্রমে জাগে তব
মনােনেত্রে অতীন্দ্রিয় দ্যুতি,
দিগন্তে উদ্যত অই সুপ্রসন্ন বরাভয়-পাণি,
প্রত্যাসন্ন তব পূর্ণাহুতি।
মরণ, মাতলিসম আধি-ব্যাধি অশ্ব দুটী জুড়ি,
আনিয়াছে বৈজয়ন্ত রথ,
শঙ্করে দেবাঙ্গনা দুইধারে শ্রেণী বিরতিমা, :
আলােকিত করে যাত্রাপথ ।
ব্যথা তব, মুক্তিপদ্ম-স্ফুটনের ব্যাকুল ব্যগ্রতা,
চিত্ত উৎসে উৎসার-প্ৰয়াস,
দেহের পিঞ্জর-দ্বারে রহি আত্মা-বিহঙ্গম তব
মুক্তিহর্ষে হেরে নীলাকাশ।
তুমি প্রসাদের মত গাহিতে বিদায়-সঙ্গীত,
গঙ্গাজলে আকণ্ঠ দাড়ায়ে,
মূঢ় ভক্তগণ তব তীরে রহি' কঁাদে ঝর ঝর,
ডাকে তােমা দু’বাহু বাড়ায়।
ব্ৰহ্মানন্দ করি লাভ, এ মর্তের প্রত্যন্ত-সীমায়
স্বর্গ তব হইয়াছে সুরু,
আজি মহাযাত্রারম্ভে, সন্ধিক্ষণে আশীৰ্বাদ সহ
দীক্ষামন্ত্র দিয়ে যাও, গুরু।
( ৩ )

নীলকণ্ঠ
নীলকণ্ঠ
জনমেছ মল্লীবনে, বল্লীবেণী পল্লীমা’র উল্লাসী দুলাল।
তব লীলানিকেতন বঙ্গপল্লবৃন্দাবন। কদম্ব, তমাল
নীরদমের ব্যোম, ফুলকুঞ্জ, পূর্ণসােম, শ্যামসরােবর
তােমারে করেছে কবি, কূজনগুঞ্জনম নদীকলস্বর
শিখাল গাহিতে তােমা। নগরের জনসংঘে চাওনি আসন,
আদেশ ইঙ্গিতে বুজসংসদে করনি কভু সারঙ্গ বাদন,
তবু তুমি শ্রেষ্ঠ কবি। দেশবন্ধু বঙ্গমার অন্তরঙ্গ জন
সকলেরি প্রতিবাসী, সন্ধ্যার সুহৃৎ কবি, একান্ত আপন।
যােগায়নি' গ্রন্থ তােমা নিত্য নিত্য কবিত্বের বৈচিত্র্যসম্ভার,
তােমারি অঙ্গনতলে চিরমুক্ত নিসর্গের সুষমা-ভাণ্ডার।
নহ তুমি শিল্পীমাত্র, অনুশীলনের ফল করনি সঞ্চয়,
মধুখ-কুসুম নহে গীতি তব, দ্রোণ-পুষ্প,—সে যে মধুর।
বিশ্বের ললাট ঘেরি কতবার ঘনঘটা ছেয়েছে প্রবল
চমকেনি তবু কভু তব কাব্যনভােনীল—চির অচঞ্চল।
জগতের জ্ঞানসত্রে মন্তোৎসবে করনিক তুমি যােগদান,
একতারা করে ধরি গঙ্গাতীরে করিয়াছ হরিনাম গান।
তােমার সঙ্গীত-মা পরস্ব কৃত্রিম ভূষা করেনি সম্বল,
অমণ্ডিত অঙ্গে তার তরঙ্গিত নৈসর্গিক লাবণ্য তরল।
নাহি চন্দ্ররাজ্ঞীগণসম অঙ্গে অগণন ভূষণের ভার,
নীলকণ্ঠপ্রিয়াসম আছে পূত সতীতেজোদৃপ্ত রূপ তার।
( ৩১ )

পর্ণপুট - মহাসমিতির মাঝে গীতি তব শতকণ্ঠে হয়নি উদগীত, পাঠ্যশালা, নাট্যশালা, রঙ্গমঞ্চ, তব কাব্যে হয়নি স্তম্ভিত, তবু তুমি শ্রেষ্ঠ কবি। শুনি মাের ভক্তিভরে দিবস-নিশীথে তব গীতি বাটে মাঠে গােপীযন্ত্রে, রাখালের বাঁশের বাঁশীতে, পল্লীগােঠে হাটে ঘাটে গাে-শকটে জেলেদের তালডিঙ্গি পরে ওগো কণ্ঠ ! কণ্ঠ তৰ ছুটে চলে গ্রামান্তরে কান্তারে প্রান্তরে। কৰ্মশ্রান্ত কৃষকেরা ও-গীতসিনানে হয় ক্লান্তিশ্ৰান্তিহারা, মাঠ হতে তব গানে পল্লীর প্রেমিক দেয় প্রেমিকারে সাড়া। ও-গানে অতিথ্য যাচি’ সন্ধ্যা-পান্থ গ্রামপথে জানায় প্রবেশ, ভিখারীসন্থলধন কৃপণেরর বুকে করে কৃপার উন্মেষ । প্রফুল্ল মধুর মেধ্য অই গানে স্বেদসিক্ত ক্লেদতিক্ত শ্রম, অর্জর-তরুর অঙ্গ ইক্ষুদণ্ড মাঝে হয় রসের উদগম। অন্ধকার বনপথে একাকী যাত্রীর ওযে একান্ত সহায়, দিনান্তের উপাসনা, গ্রামান্তের ঘরে ঘরে ডাকে দেবতায়। ওগাে ‘কণ্ঠ, কণ্ঠ তুমি বঙ্গমা’র, বৈকুণ্ঠের শ্রীমাল্যমণ্ডিত, সহজ সরল লঘু অন্তরের ক্ষরে যাহে আনন্দ অমৃত। এ-বঙ্গের গােষ্ঠে গােষ্ঠে রচিয়া রেখেছ তুমি নব বনাবন, কণ্ঠে কণ্ঠে নেচে ঘুরে বেণুকরে নীলমণি নন্দের নন্দন। নীলকণ্ঠ, মণ্ডিয়াছ শিখণ্ডকে শ্রীকৃষ্ণের মােহন চূড়ায়, তােমার বিতত শিখাছত্র ছায়ে বঙ্গভূমি সতত জুড়ায়। হে বিশ্বাজার সভাগায়ক, চারণ-কবি, অর্চি ও চরণ, তােমার অক্ষয় সুরে শুনি আমি এ বঙ্গের বক্ষের স্পন্দন। ( ৩২ )

ববধূ
বঙ্গবথ,
আজি বন্ধু, তােমাদের শুভ নব বাসরের নাতি,
বৎসর চারিটি পরে পুন জ্বলে উৎসবের বাতি,
সে যেন অনেক যুগ, যবে দুহু কৈশাের যৌবন
মিলিল প্রিয়ার অঙ্গে, গেলে তারে তেয়াগি তখন
তারপর হতে নিতি দ্বিখণ্ডিত মৃণালের প্রায়
অবলমি তন্তুটুকু প্রাণরক্ষা আশায় আশায়।
মাঝখানে কত গিরি মরু হ্রদ নদী ব্যবধান,
অজ্ঞেয় বারিধি তার ভরিয়াছে রহস্যে পরাণ ।
বর্ষার দুর্যোগ রাতে চমকেছে চপলার সনে
যেন এই উৰ্মিলার প্রাণান্ত গিয়াছে কাননে।
নিশিদিন কত নদী সত্তরেছ পিয়াসী অন্তর
নিরন্তর পার হলো একা কত বিজন প্রান্তর।
উড়িল কল্পনা তার বারবার তােমার উদ্দেশে
অশ্রুসিন্ধুনীরে পড়ি ক্লান্তপক্ষ নিমজ্জিল শেষে।
বসন্ত নিশান্তে কত স্বপ্ন দেখে' হয়েছে বিল
হারাই-হারাই শুধু আশঙ্কায় আঁখি ছল ছল।
যেচেছে কল্যাণ তব, দেবতার নিত্য সন্ধ্যাতে
পূজাপুপে দিন গণি শুভ্র শবলষিত হাতে।
(৩৩ )

পর্ণপুট
নিত্যগৃহ-কৰ্ম্মমাঝে নানা ছলে উন্মন চঞ্চলা
তােমারি বরণডালা সাজায়েছে তােমারি কমলা।
কবরীভূষার লাগি কোনদিন তুলেনিক ফুল,
লিপির আশিস বিনা মাসান্তেও বাঁধেনিক চুল।
মধুটুকু বক্ষে পুষি কোনরূপে যাপিল শর্বরী,
রজনীগন্ধার মত ক্ষীণ আশা-বৃন্তে ভর করি।
নিত্য নিত্য লক্ষ পৌত ভিড়িয়াছে তার চিত্ত-তটে
ধরিতে পারেনি এলে কোন্ পােতে সহ নিকটে।
সংসার-প্রাঙ্গণ তলে এস বন্ধু, ষােড়শ কলায়
অশ্রুহিমধৌত ইন্দু উদি’ হেথা অমিয়া ৰিলায়।
যােল মধু পূর্ণিমার ফুল ফুলে যত্নে গাঁথা হার
আজি বন্ধু লহ কঠে,—পদে নমে যােড়শী তােমার ।
হে প্রাজ্ঞ, হে সহৃদয়, আজি অজ্ঞ বঙ্গ-বালিকায়
বরিতে হইবে শান্ত কৃপানেত্রে স্নেহের ছায়ায়।
ক্ষমিতে হইবে তার টীময় প্রিয়বিনােদন,
ভাষায় ভূষায় ভাবে ভঙ্গিমায় দীন আয়ােজন।
ক্ষমম তার লজ্জাকুণ্ঠ, সজ্জাহীন, দীন উপচার,
মৃন্ময় ভাজনে ধূপ, ক্ষীণ দীপ, বনফুলহার।
কুড়ায়ে লইতে হবে ভূমি হতে, দিতে গিয়ে পায়
পুলকপ্রকল্পে অর্ঘ্য কর হতে যদি পড়ে যায়।
চিত্তকূপ পূর্ণ তার পুণ্যঘন প্রেমের সুধায়,
কলা-কৌশলের ফেনবুদুদের ঠাই নাহি তায়।
}
( ৩৪ )

বঙ্গবন্ধু
তুলসীবনের শারী কলরুত শিখেছে কেবলি
হৃদয়-পিঞ্জরে রাখি ক্ষমাে তার স্বভাব-কাকলী।
গুরুগুরু সুখমন্দ্রে ঘনন্দে দুরু দুরু বুক,
স্বিন্ন তনু তনিমায় বিলসিছে রােমাঞ্চ-কঞ্চুক,
সে আজিকে প্রাবটের কম্পমানা কদম্বের শাখা
ধীরে দিও পদভার,, ও গাে শিখি, ধীরে মেলে পাখা।
ভূলুণ্ঠিতা লতিকার সৰ্ব্বকুণ্ঠা দূর করি, প্রিয়,
নােওয়াইয়া, ভুজশাখা জড়াইয়া বুকে তুলে নিও।
উপল-ব্যথিত তন্বী তটিনীটি উপকণ্ঠে যদি,
মূরছিয়া পড়ে, তবে কণ্ঠে টেনে নিও প্রোেদধি।
প্রেমাবেশে আত্মহারা, যদি নারে কহিবারে কথা
নীরব বাগ্মিতা তার ক্ষমা কর’ শুদ্ধ কাতরতা।
ভাবাবেগে রুদ্ধকণ্ঠ কুম্ভমুখে কলবিশ্বসম
অসম্বদ্ধ অসন্নদ্ধ অৰ্দ্ধস্ফুট ৰাণী তার ক্ষম।
ক্ষমিও লুলিত দুটী মৃণালের ক্লান্তি অবসাদ
তরঙ্গপ্রহত আঁখিউৎপলের শতেক প্রমাদ।
হে বরেণ্য, হে স্নাতক, প্রেম তব পবিত্ৰ-সুন্দর
ব্রহ্মচর্য্যপূত শুচি শাপ-মুক্ত অমল ভাস্বর।
প্রেম-পৌরহিত্যে আজি নবােদ্বাহ-কুশণ্ডিকা-বাগ
নিষ্ঠা শুদ্ধি জ্ঞানে দেহে রচ বন্ধু গৃহের প্রয়াগ।
ঢালল পুণ্য মিলনের উষ্ণশীত আনন্দাশ্রুজল
অভিষেক করি তাহে গৃহে বসি লভি তীর্থফল।
(, ৩৫ )
"

পর্ণপুট
পল্লীবালা
পড়িছে ঝলসি কুন্দ অতসী অনাদরে
ব্যথিত গন্ধরাজ।
শেফালি চামেলি ঝরেছিল বড় পিয়াসায়,
কুড়ালনা কেউ, শুকায় বিফল নিরাশায়।
শ্রীফলপত্ৰ আজি দেব-পূজা উপচার,
তুলসীমাত্র সাজ।
গৃহের লক্ষ্মী দুলালী গিয়াছে পরধরে
এ-গৃহ আঁধার আজ।
ঠাকুরের সেবা হয়ে গেছে আজ চুপি-চুপি,
সেটা নাহি বটে বাকী।
সরসীর পথে কলসী বাজেনি কনকন,
কোশাকুশী টাটে উঠেনিক ঘাটে খনখন।
প্রসাদী-কুসুম না পেয়ে বাছুর আসে ফিরে
নামায়ে কাতর আঁখি।
পিতা নিজে রচে পূজা আহ্নিক আয়ােজন
চোক মুছি থাকি থাকি।
খােকাখুকীদের হয়নিক আজ নাওয়া-খােওয়া,
কে তাদের ডাকি পুছে ?
ঘরে ঘরে আজ বাজেনিক মল ঋণ-রণ,
ভিখারী আসিয়া ফিরিয়া যেতেছে ঘন-ঘন ।

পল্লীবালা
হরিনামঝােলা হয়না সেলাই ঠাকুমার
সূতা যায়না যে সূচে,
খুকীটির গালে দাগ হয়ে আছে আঁখিজল,
কেবা দেয় বলাে মুছে ?
ধুলায় ধূসর ধবলী ফিরিছে দ্বার-দ্বার
গােঠ হতে এসে ফিরে।
কাকে মাছ লয়, ছাগে খেয়ে যায় চাল-ধান,
পায়নিক দাদা আচাবার জল, সাজা পান,
তুলে পুষী মেনী ঘুরে ঘুরে কেঁদে হলো খুন,
গা’র ললাম দুখে ছিড়ে ;
খাঁচার ময়না পায়নিক আজ জল-ছোলা
গেল গলা তার চিরে।
বসেনি বাড়ীতে বেণী বিনানর বৈঠক,
আসেনি পাড়ার দল।
বালিশের তুলা, আকাচা কাপড় ঘরময়,
বাসন পাত্রে জিনিসপত্রে নয়ছয়,
আঙিনার তরু পায়নিক আজ বৈকালে
একটী ফোটাও জল ।
শিউলিছােপান’ শাড়ীখানি হেরি মা’র চোখে
ব্যথা ঝরে অবিরল।
ঠাকুরের ঘরে পা-ধােবার জল, আলাে কই?
পুরুত লাগায় ধুম

পুট
-
থােকাখুকীদের আনে নাই কেউ পূজোবাড়ী,
শীতলপ্রসাদ-বিতরণে নাই কাড়াকাড়ি,
চঁাদের কপালে টি’ দিয়ে না যায় ‘চঁাদা-মামা’
চোখে নেই কারাে ঘুম।
তারা আজ কঁাদে সারাদিন তাদে’ বুকে চাপি
খায়নি যে দিদি চুম।
ললিত কোমল ছােট দুটি কর-মুঠি বটে,
কম কি ক্ষমতা তার ?
তারে পর-করা লােকে বলেছিল দায়-সারা,
ভাবেনিক কেহ অচল এ গৃহ সেই ছাড় ;
সংসার পাতা শিখিবার ছলে নিল সে যে
বহু জীবনের ভার।
আজি এ গৃহের শিশু পশু পাখী তরু লতা
করে সবে হাহাকার।
আহা সেষে কোন পরিচয়ের মাঝখানে
বন্দিনী দিবা রাতি।
তথা গৃহভরা হাস্যোৎসব-কলরােলে,
আহত নিয়ত ফুলসম নদী কল্লোলে।
মুছিছে
অবগুণ্ঠন-অঞ্চলে
নাহিক ব্যথার সাথী।
মা-হারা এ গৃহ কঁদে হেথা হায় লুটে-লুটে
নিভায়ে সাঝের বাতি।

পল্লীবধূ
পল্লীবধূ
না ধরিতে প্রচী অরুণ বরণ, না ডাকিতে সব পাখী,
পাড়াপথে ঘাটে সাড়া না পড়িতে, ফুল না মেলিতে আঁখি,
কেগাে ঐ জাগি শয্যা তেয়াগি, দ্বারে দ্বারে ঢালে জল,
গােম মাড়লী লেপনে জাগায় সুপ্ত তুলসী তল?
উঠান ছাড়িয়া না উঠিতে রোদ ঘরের পৈঠা 'পরে,
কলস ভরিয়া জল লয়ে কেবা স্নান করে ফিরে ঘরে ?
না বাড়িতে বেলা গৃহ-দেউলের বেদীমার্জন সারি’
মলিন বসনে কে পশে হেঁসেলে তসর শাড়ীটি ছাড়ি?
কার–লজ্জাসরমই সজ্জাপম, অন্তর ভরা মধু?
সেযে—ভক্তিনিষ্ঠা শৌচে শিষ্টা বঙ্গ-পল্লীবধূ।
ছেলেপুলেগুলি নাওয়ায়ে দেওয়ায়ে খাওয়ায়ে করিয়া খুসী,
গুরুজনদের ভােজনের শেষে, অতিথি ভিখারী তুষি’,
পাতের ভাতে কে ক্ষুধা করি দূর এটোকাটা খুটে তুলি,
হাঁস-ঝটপট খিড়কির ঘাটে পােয় ঘটি-বাটিগুলি ?
করিয়া সেলাই মশারি দোলাই, সারি কাজ ঝট পাটে
পাড়ার মেয়ের খোঁপা বেঁধে দিয়ে চলে কে দীঘির ঘাটে ?
গৃহপারাবতে আহারে তুষিয়া
খেপে খেপে কেবা থুয়ে,
সজি দীপগুলি তেল সলিতায় রেখে দেয় মুছে ধুয়ে ?
কার—জ্জাসমই সজ্জাপরম অন্তর ভরা মধু?
সে-যে-দক্ষিণা দীনা, রুক্ষমলিনা মােদের পল্লীবধু।
( ৩৯

পর্ণপুট
সজের বাতিটি জ্বলিয়া আবার বাঁচায়ে আঁচল আড়ে,
তুলসীর মূলে দেবতা দেউলে ঘুরে কেগো দ্বারে দ্বারে ?
উপকথা কয়ে, খেয়ে চুম, গেয়ে ঘুম-পাড়ানিয়া গান,
কোলের কুলায়ে আনে কে ভুলায়ে শিশুদের কলতান ?
শ্বশুর-শশ্রুপদযুগ সেবি’, লভি শুভাশিস শিরে
সবার শয়ন ভোজন অন্তে চলে কে শয়নে ধীরে ?
শ্রান্ত শয়নে সেবারতা কে বা কান্তের পাদ মূলে
ক্লান্ত নয়নে গভীর নিশীথে ঘুমঘোরে পড়ে ঢুলে ?
কার-লজ্জাসরমই সজ্জাপরম, অন্তর ভরা মধু?
সেযে—সন্তোষবতী কল্যাণী সতী মােদের পল্লীবধূ !
নাহি চাপল্য, মুখর ভাষণ, নাহি রাগ অভিমান,
আঁখিপুটতলে অশ্রুসলিলে সব ব্যথা অবসান।
গৃহ কোণে সদা শুভদা বরদা জানিতে পারেনা পরে,
অজ্ঞাতবাসে আছেন দেবীরা দাসীবেশে ঘরে ঘরে।
কল্যাণ জপে মৌন মহিমা অবগুণ্ঠন তলে,
কাহারো অযথা তাড়নায় তার ধ্যান-ধীরতা না টলে।
গৃহকাজে, কর হয়েছে কঠোর, ক্ষয় হয়ে গেছে শাখা,
হলুদ কাজলে সিদূর তৈলে সতীর মাধুরী মাখা।
তার-লজ্জাসরমই, সজ্জাপরম,
অন্তর ভরা
মধু
সেযে—প্রণয়ে সরলা বিনয়ে তরল সুশীলা পল্লীবধূ।
৪০

কুড়ানী
কুড়ানী
কুয়াশায় ভরা পাে’ষের বিষম হাড়-কনেকনে জীড়ে,
আমীর চাচার খামারে মােরগ না ডাকিতে একেবারে,
চাটাই ছাড়িয়া উঠি তাড়াতাড়ি ছেড়া-কঁাথা গায়ে দিয়ে,
মাঠপানে ধাই ধান কুড়াইতে ছোট্ট ঝুড়িটি নিয়ে।
ক্ষেতে ক্ষেতে ঘুরি শামুকে করিয়া খুঁটে-খুঁটে তুলি ধান,
গােটা শীষ যদি দেখি ভুয়ে পড়ে উথলিয়ে ওঠে প্রাণ।
হটিয়া হাঁটিয়া এমনি করিয়া সারা হয় ধান খোজা,
নিয়ে যায় ঘরে পাড়ার লােকেরা আঁটিআঁটি বােঝ বােঝ।
পিছু-পিছু যাই ঝুড়িটি লুকায়ে বা’র করি মাের ঝুলি,
যেটি পড়ে খুঁয়ে তাড়াতাড়ি গিয়ে সেটি খুঁটে সই তুলি।
ঠোট মুখ গাল জাড়ে জরজর পা’দুটা গিয়াছে ফাটি
ছুটে আসি যাই কি করিবে বল মাঠের ‘কুচল’ মাটি ?
ছােট্ট ঝুড়িটি হয় চুরচুর ভরে যায় মৌর ঝােলা।
লােকে কয়, “চাষে কি করিবি তােরা? কুড়ানী বাঁধিবে গােলা।”
শীত যায়-যায়, ক্ষেতে নেই ধান, ধূ-ধূ করে সারামাঠ,
মরসর করে শুকনাে পাতার গাছতলা পথঘাট।
ছােট ঝুড়িটি রাখিয়া এবার বড় ঝুড়ি লই কঁাখে।
শুকনাে পাতায় উঠানে কোথাও জায়গাটুকু না থাকে।
দুপুরে গােবর-ঝুড়িটি লইয়া ফিরি রাখালের পাছে,
বাজে কথা ক'রে ঘুরি ফিরি গােরুবাছুরের কাছে কাছে।

পর্ণপুট
,
বিকালে বেরুই, কাঠ খড়ি খুজি বনে-বনে মাঠে-মাঠে,
পড়সীরা কয়, “শশবে একদিন কুড়নী রূপাের খাটে।
বালা লাগিলে পথে ঘাটে কাদা, নিভে আসে খর তাপ,
তালপাতা দিয়ে বাঁধা চালাটিতে জল পড়ে টুপটাপ।
কাঠকুটো কিছু মিলেনা কোথাও, জ্বলেনা সহজে আখা,
আমার দুয়ারে আসেন সবাই হাতে লয়ে ঝুড়ি-ঝাঁকা।
নালী ‘পাউসে’ জালিটি পাতিয়ে বসে থাকি আমি ঠায়,
চুনােপুটীদুটো আঁচলে গিঠিয়ে ফিরি কাদামাখা গায়।
বর্ষা ফুরায় লাউকুমড়ায় গােটা চাল যায় ভরে,
ডােবায় ডােবায় কলমী শুশুনী তুলে আনি ঝুড়ি করে।
নালাটি শুখায় কঁকড়া লুকায়, মাছ ঢুড়ে মরা মিছে,
গুগুলি শামুক কুড়িয়ে বেড়াই জেলেদের পিছে পিছে।
তালটি বেলটি কুড়ালে লােকেরা হাঁ-হাঁ করে আসে ছুটে,
মােৰ ভাগে থােয়, লােকে যা’না ছোঁয়, নিতে হয় যাহা খুটে।
এমনি করিয়া তিলটি কুড়ায়ে তালটি করিশ্ন ,
কুড়ানাে ভাতে এ পেটটি ভরায়ে হয়েছিত এত বড়।
খোড়া মা আমার ঘরে পড়ে রয়, বাপমরা মনে নাই,
ঘরটি পুড়িলে পাড়া-পড়সীরা দেয়নিক কেউ ঠাই।
কাঁচা আ’লে কারাে দেইনা পা আমি, পাকা ধানে কারো মই,
চাকরী করিনা ভিখও মাগিনা এমনি করেই রই।
অনেক বকেছি কুড়ুনী বলিয়া ডেক’নাক মিছে পিছু
মাঠে যে হাটিলে ঝুড়িটি ভরিবে, টুড়িলে মিলিবে কিছু।
( ৪২ )

কৃষকের ব্যথা
কৃষকের ব্যথা
এমন করে, কেমন করে আঁধার ঘরে আর
তােমায় ছেড়ে রইব আমি নিয়ে তোমারি ভার ?
দুয়ারে নাই জলের ছড়া—উঠানে নাই ঝট,
বিহানে আর গােয়াল ঘরে করে না কেউ পাট।
গাইয়ে দুধ শুকায় বটে হয়না গাই দোয়া,
খামার ক্ষেতে তােমার ধান খড় যে যায় খােয়।
গােয়ালে নাই সজাল ধোয়া, পড়েনা ঘরে সাঁজ,
মাদুর পেতে কে দেবে ? শুই গামছা পেতে আজ।
বারেক ফিরে এসে
লক্ষী মাের লওগাে ভার তােমার ঘরে, হেসে।
একটী বাছা কঁাধে যে কঁাদে আরটি রম্ভ কঁাখে,
তিলেক পিছু ছাড়েন। খুকী, মg58.থে থাকে।
ক্ষের খােকাটি হয় নালায় গড়াগড়ি,
সকল কাজে অবুঝ মেয়ে ঘাড়েই রয় পড়ি।
টোকায় করি বিহানে তারা পায়না মুড়ি লাড়,
নাইক নাওয়া সময়ে খাওয়া, ঘুমটি নাহি কারু।.
দুপুর রাতে উপুড় হয়ে কঁদিয়া তােমা চায়,
উদুম গায়ে কাঁপে যে জাড়ে দোলাই নাহি পায়,
বারেক ফিরে এসে
তােমার ছেলে ওগাে কোলে বদন চুমি হেসে।
( ৪৩ )

পর্ণপুট
নিড়ানী হাতে আখের ক্ষেতে কাদাতে রই ৰ’সে,
পায়ের চাপে ডােবেন দুনী, কোদাল পড়ে খ’সে।
কঁদ-কাদ’সে কাজল আঁখি মনে যে উঠে জলি,
ধানের চারা উপড়ে ফেলি আগাছা বােরা বলি।
বাড়িতে ফিরে জিরানাে নাই, চড়াতে হয় হড়ী,
যে-কাজ শুধু তােমারে সাজে আমি কি তাই পারি ?
হারাই হু হেঁসেল ঘরে কিছু না খুঁজে পাই,
ফেনে যে ঢালি মুনের সরা, ডা’লে যে ঢালি, ছাই।
বারেক ফিরে এসে
হলুদপোঁছা শাড়িটি পরি’ হাতটি ধরে হেসে
শান্তিপুরে তােমার ডুরে আঁকড়ি চেপে ধরি’
চোখের জলে অঝােরে ভিজে মেঝেয় রই পড়ি।
কার কোমরে সােহাগ ভরে পরিয়ে দেব, গােট
যার লাগিয়ে আর-ফাগুনে ধরিয়াছিলে খােট
মনে যে আসে রােগের মাঝে সকল-সহা মুখ,
পায়ের-ধূলােমাথায়-লওয়া, গুমরে উঠে বুক।
বাদলে ভিজে হাঁটিয়াছিলে উঠানে মাের লাগি,
ফুটিয়া আছে পায়ের দাগ গােলার পাশে জাগি।
বারেক ফিরে এসে,
আতা পরে, আরশী ধরে খােপাটি বাঁধাে হেসে।
।
( ৪৪ )

কৃষাণীর ব্যথা
কৃষাণীর ব্যথা
সুখের এ ঘর গড়িয়া তুলিয়া বুকের রক্ত দিয়া,
আজ কোথা তুমি চলে গেলে হায় সংসার আঁধারিয়া?
পানে ধানে আজ উঠান ভরেছে, ঠাইটুকু নাই তার,
মঙ্গল আজি ঢালিতেছে দুধ বাছুর হয়েছে তার।
মাচান ছাপিয়ে লাউলতাগুলি খুঁয়ে লুটে পুটে পড়ে
পালঙের শীষে শাকের চাকড়া আগাগােড়া আজ ভরে।
সন্ধ্যামনিতে আলো হয়ে আছে সারা আঙিনাটি ঐ,
আজ সংসারে সবি ভরপুর, হেন দিনে তুমি কই ?
দুবেলা পাওনি পেট ভরে খেতে গিয়েছিল দেহ ভেঙে,
লুকিয়ে চোখের জল মুছে তুমি ভিক্ষা এনেছ মেঙে।
একমুঠো চাল চিবাতে চিবাতে রুইতে গিয়েছ চলি,
উপােষ করিয়া রাত কাটায়েছ ক্ষুধা নাই মোরে বলি।
দুপুরের তাতে বাদলের ছাটে খেটে খেটে দিনরাত
মাঠে মাঠে ঘুরে কনকনে জাড়ে করেছ পরাণপাত।
সাঝের বেলায় হেঁটে হঁটে এসে এলায়ে পড়েছ ঘুমে
রাত্রি কাবার না হ’তে আবার চলেছ খােকারে চুমে।
বাকী খাজনার লাগি জমিদার দিয়েছে যাতনা কত,
মহাজন, দেনা “সুদের জন্য গঞ্জনা দেছে শত।
'
(• ৪৫ )

পণপুট
চুপ করে সবি সয়েছ, আহা রে! দুটীহাত জোড় করে’
সকলের কাছে সময় নিয়েছ হাতে পায়ে ধরে, পড়ে,।
রােগে পড়ে, থেকে সংসার নিয়ে কতই দিয়াছি জ্বালা,
ক্ষুধায় কঁদিয়ে করেছে ছেলেরা কানদুটো ঝালাপালা।
যাতনা দুঃখ কতনা সয়েছ কথাটি ছিল না মুখে
ফিরে এস আজ ঘরটি তােমার ভরিবে সােণার সুখে
ঘনায়ে আসিছে সাঁঝের আঁধার নাহি মাের কোন কাজ
এ ঘর দুয়ারে পড়েনিক ঝটি জ্বলেনি এখনাে সাজ।
চালের বার্তায় ঝি ঝি পােকাগুলাে বুক চিরে চিরে ডাকে
উঠিতে বসিতে টিকটিকি পড়ে ফাটা দেওয়ালের ফাঁকে।
ঐখানে আহা পীড়ের উপর শুইতে গামছা পাতি’,
ঝুলিতেছে ঐ লাঠী, চোঙ, মই, মাথালী, তালের ছাতি।
ঘাটের ধারের বশবুন পানে সারারাত চেয়ে কঁদি,
ঐখান হতে নিঠুর বাঁধনে লয়ে গেছে নদি
তেমনি পড়েগাে কাল, ছায়া ঐ ভরিয়া বকুল তল,
বৈকালে যেথা এলানাে শরীরে চাহিতে ঠাণ্ডা জল।
সাজে ভােরে সেই পাখী গুলাে ডাকে প্ৰণ আনচান করে,
বেলা হয় তবু গোরুগুলো সব বাধা রয়ে যায় ঘরে
পথ চেয়ে হায় বসে থাকি ঠায়, জ্বলেনা দুপুরে চুলো।
আপন ছেলেরাে নাম ভুলে যাই মনটা হয়েছে ভুলো।
( ৪৬ )

হা-ঘরে
মালতী তােমার এসেছে ফিরিয়া শ্বশুরের ঘর থেকে,
খােকা যে তােমার হাঁটিতে শিখেছে, একবার যাও দেখে।
এত সব ফেলি জনমের মত চলে যাওয়া কিগাে সাজে?
তবে কিগাে তুমি প্রবাস’ গিয়েছ আমাদের কোন কাজে ?
বাবুদের আর গদাইপালের অত্যাচারের ভয়ে
চলে গেলে কিগে মনের দুঃখে কিছুই না বলে কয়ে ?
তাই যদি হয় ফিরে এস তুমি তােমারে সঙ্গে পেলে,
খােকারে লইয়া পালাই কোথাও ঘর সংসার ফেলে,
ভিক্ষা মাগিব কাঠ কুড়াইব, ফিরিব না আর বাড়ী,
আঁচলের গিঠে বঁধিয়া রাখিব তিলেক দিব না ছাড়ি।
হা-ঘরে
হ-ঘরে ঐ ঘুরে বেড়ায় সঙ্গে করে গৃহস্থালী,
জীবনজোড়া পুজি তাহার বাঁকঝুলানো দুটী ডালি,-
কোলের ছেলে, সাপের ঝাপি, ভাতের হাঁড়ি, মাটির থালা,
ডুগডুগি আর তেলের চোঙা, সবুজ কাচের কণ্ঠমালা
অসমানই তার ঘরের চালা রবিশশীর আলােকজ্বলা
মাঠ-মরু তার বাড়ীর উঠান, প্রমােদভবন গাছের তলা।
ঝােপের ভিতর জন্ম তাহার পান করে জল ঘাট আ-ঘাটে,
সেইখানে তার রাতের ডেরা যথায় রবি বসেন পাটে।
( ৪৭ )
.

পর্ণপুট
কোনাে রাজার নয়কো প্রজা দীনদুনিয়ার মালিক বিনে
মুখ চেয়ে সে রয়না কারাে থাকে না। সে কারাে ঋণে।
সকল বাঁধনহারা সে যে জানেনাক সমাজনীতি,
জীবনপথে লক্ষ্যহারা,-মানেনাক স্বাস্থ্যনীতি।
আজকেরই তার মাত্র পুঁজি ভাবেনা তাও কাল কি খাবে।
অশ্বমেধের অসম বিশ্বে আপন বশ্য ভাবে।
যায়না কোনো সদাব্রতে যায়না ধনীর দেউড়ি ঘরে
তরুতলের অতিথ গাঁয়ে, তাও শুধু এক তিথির তরে।
একটি দিবস গাছের ডালে ঝােলে তাহার ভাতের হাড়ী
গাঁয়ের ছেলে দেখতে জমে একটি দিনের তাহার বাড়ী।
ভালুক তাহার হুকুম পেলে কেঁাকেঁ করে জ্বরটি আনে,
সাপটি ফণা নত করে’ লুকায় ঝাপির মধ্যখানে!
জানেনাক ভিক্ষা মাগা চাকরি চুরি প্রবঞ্চনা,
প্রাণের অভাব সব চুকে যায় পেলে পটে না ।
জীবিকা তার সাপখেলানো নানানরকম বাজীর খেলা,
মনে পড়ায় বাজীর ছলে বিশ্ববাজিকরের মেলা।
***
কোনাে শাসন রুক্ষ ভাষণ পারেনি তায় আনতে বাগে,
সকল আইন হদ্দ হয়ে হার মেনেছে তাহার আগে।
পথের সাথীর পতন দেখি থামেনা সে যাত্রাপথে,
যুধিষ্ঠিরের মতন চলে স্বর্গে অটল চরণ-রথে।
( ৪৮ )
*,

মথুরাযাত্রা
কোথায় গােকুল ছেড়ে প্রাণবধু চলিলে,
ভাসাইয়া আশীরাশি নয়নের সলিলে ?
এমন করিয়া হায়
চলে যাবে মথুরায়,
আগে হতে শ্যামরায় কেন নাহি বলিলে ?
অখলা অবলা মােরা কাননের হরিণী,
ছুটিয়াছি বাঁশী শুনে কখনাে ত ডরিনি,
বাঁশী যে শায়ক হবে কে কোথা ভেবেছে কবে ?
এমন করিয়া সবে হে নিঠুর ছলিলে ?
গােকুলে অকূলে ফেলে কি সুখে বা রহিবে ?
ব্রজের বিরহ ব্যথা ও বুকে কি সহিবে ?
সেথা উদাসীন রবে ধূমরাশি হেরি নভে
যমুনার এই পারে দাবানল জ্বলিলে ?
রাধারে না হয় শঠ অবাধেই ছাড়িবে,
রাধা-নামে-সাধা বাঁশী ছাড়িতে কি পারিবে ?
রাসতলা হবে মরু
করিতে উৎসব ঘটা যাতে ফল ফলিলে ।
শসিতেছে বেণুবন সুয়ে সুয়ে ভূতলে,
পথ রােধে ধেনুগণ চোখে নীর উথলে।
ফুলের বদলে শিলা
ছুড়ে শেষে একি লীলা?
নিজ হাতে গাঁথা, মালা রথতলে দলিলে।
ta,
শুকাইবে চুত-তরু
( ৪৯ )

পণপুট
শ্যাম বিহনে
হলােনা বসন্ত এবার বৃন্দাবনের বনে,
প্রেমানন্দ বিহনে--শ্যামচন্দ্রমা বিহনে।
কোকিল এসে ডাল কুহু
বকুল শাখায় মুহুর্মুহঃ
শুনে ব্যথার আহাউহু ফিরল হতাশমনে।
দখিণ পবন এসে সবায় গেল ছুয়ে ছুয়ে,
জাগলন কেউ, কীচক কানন বাজনা তার ফুয়ে।
ললিত ল-বঙ্গলতা
হলােনা তায় রঙ্গরত।
চূততরু অঙ্গ হতে খল পরশনে।
শীত অবসান ভেবে হঠাৎ পলাশ দিয়ে উকি,
দেথে ধূলায় লুটায় যত ব্ৰজের বিধুমুখী।
অনি সে মুখ লুকাইল, গুরে দুখে শুকাইল,
ফোটা এবার হলােনা তার রভসরঙ্গনে।
শােণতরাঙা শানিত সব শায়ক পিঠে বাঁধি,
এসেছিলেন অনঙ্গদেব ফিরে গেলেন কঁদি,
তাপিছল পথে পড়ি
ফুলের ধনু গড়াগড়ি।
যমুনা গায় বিয়ােগিনী আর্তআলোড়নে।
হােলই যখন হবেন তার বৃথাই আয়ােজন,
ফুটতে গিয়ে গেল ফেটে নটকোনা রঙ্গণ।
গগনবনের অরুণিমা
তরুলতার তরুণিমা
ধূসর হয়ে ধূমল হয়ে মিলায় দিগঙ্গনে।
**
:

রাখালরাজ
রাখালরাজ
?
অবুঝ কানু কার মায়াতে ভুলে
গােকুল ছেড়ে চলে গেলি ভাই
সেথায় কেবল হাতী ঘােড়র মেলা
তাের ত সেথা খেলার সাথী নাই।
কোথায় সেথা দূৰ্বাশ্যামল গােঠ
রাখাল দলে খেলার হেন জোট,
মনীর মত কোমল ধবলদেহ
কোথায় সেথা এমন দুধল গাই ।
এমন রাখালরাজ্যখানি ফেলে
কেমন করে আছিস কানাই ভাই ?
ময়ূরনাচা এমন পাখীডাকা
হরিণচরা কোথায় সেথা বন ?
মাটীছােয়া কোথায় তরুশাখা
ঝুলবি কোথা দুবি সারাক্ষণ?
ফুনে নাই ফুলের ছড়াছড়ি
ফুলের ডােরে কোথায় জড়াজড়ি ?
গুজতে কাণে মুকুল কোথা পাবি ?
খুঁজতে গিয়ে আকুল হবে মন।
অবুঝ রাজা এমন বশীবাজা
সবুজ তাজা কোথায় সেথা বন ?
'৯।
***
(, ৫১ )

পর্ণপুট
দুপুর রােদে সেথায় তরুর তলে,
কোথায় পাবি
মধুর মৃদু হাওয়া?
কোথায় সেথা কালিন্দীরি নীরে
কলকলিয়ে সাঁতার কেটে নাওয়া ?
সেথায় কিরে গভীর কালীদ’য়
কমল কুমুদ নিত্য ফুটে রয়?
গায়ের ঘামেও ঘনায় ঘুমের ঘাের
কোথায় এমন ঘুমে নয়ন ছাওয়া ?
রােদের তাতে তাতলে তনু তাের
গাছের ছায়ায় কোথায় পাবি হাওয়া?
তুলবে কেবা বেলের কাঁটা দিয়া
কুশের আঁকুর বিধলে রাঙা পায় ?
পড়লে বসে নূপুর ধড়া চূড়া
আবার কেবা পরিয়ে দেবে হায় ?
তমাল তলে বসলে মেলি পা,
বাছুরটী আর চাটবেনাত গা !
ক্লান্ত হলে চাইবি কারে জল
কার কোলে তুই এলিয়ে দিবি গায় ?
ক্ষুধা পেলে আবে কেবা ফল
ঘামূলে ও-মুখ মুছিয়ে দিবে তায় ?
( ৫২)

রাখালরাজ
সেথাও যদি উপদ্রবই করি
তারা কি তাের সইবে আচরণ?
সেথাও যদি মাখন দধি হরিস,
তােয় যে কটু কইবে অকারণ!
বেণু যদি বাজা রাখালরাজ
কেমন করে করবে তারা কাজ ?
ববেনাত তাের বাঁশরীরবে
যদি বা হয় পরাণ উচাটন
কলস যদি হরিস্ ঘাটে, তবে
হাবে কিরে তথায় বন্ধুগণ ?
?
রাজা হওয়া যদিই এত সখ
রাজা ত তােয় করেছিলাম মােরা ;
ছিল তু তোর মন্ত্রী পারিষদ,
গােধন মৃগ,—তারাই হাতী ঘােড়া।
উইয়ের ঢিপির সিংহাসনের 'পরি,
মাথায় দিলাম পাতার মুকুট গড়ি,
কণ্ঠে দিলাম গুঞ্জাফলের মালা
হস্তে বাঁধি রাঙা রাখীর ভােরা।
হেথায় ফেলি রাখালরাজের লীলা
কেমনে তুই থাকবি মাখনচোরা ?

পর্ণপুট
* -
মথুরার দ্বারে
চরণে মিনতি প্রহরি তােমার, বসােনা অমন বেঁকে,
মােরা তােমাদের রাজারে হেরিতে এসেছি গােকুল থেকে।
ঘেঁধড়া পর, পথধূলি ভরা শরীরে ঘামের রেখা ;
তাই বলে কিরে যেতে হবে ফিরে, পাব না কানুর দেখা ?
তুমি জাননা, প্রহরি, তােমার রাজাটি মােদের কে ?
এই ধূলিমাখা বুকে মাথা রেখে মানুষ হয়েছে সে।
আমরা কাঙাল, আমরা গােয়াল, সে আজ অনেক বড়।
ও চরণে ধরি তােরণ-প্রহরী, তাড়ায়ােনা, দয়া কর।
.
আমাদের কানু তার কাছে যেতে তাে-র পায়ে সাধাসাধি!
চোখে আসে জল মুখে আসে হাসি, তাইত হাসি কি কাঁদি।
দাড়াইয়া ঠায় বারে ধূলা পায়, কানু শুনে তাই যদি,
কত ব্যথা মরি পাবে সে, প্রহরী, আঁখিনীরে ব’বে নদী।
রাজার দণ্ড ধরেছে কানাই ছেড়েছে মােহন বাঁশী
সেই হ’তে তার বুঝি মুখ ভার, নাই খেলাধূলা হাসি।
আহা সে কতনা পেয়েছে যাতনা কেঁদেছে মােদেরে ছাড়ি।
অমন করিয়া দিওনাক ঠেলি, জকুটি করােনা বারি ।
কালীদহ হতে এনেছি তুলিয়া তার তরে শতদল,
যে বনে বেড়াত চরাত গােধন, সে বনের পাকা ফল,
শাঙলীর দুধে মথিয়া নবনী, ধবলীর দুধে ক্ষীর
এনেছি মালতীফুলে মালা গাঁথি যমুনার কালো নীর।
( ৫৪ )

বৃন্দাবন অন্ধকার
এনেছি পাঁচনী, শিখিচুড়া, ননী, কেঁচানরঙীন ধড়া,
বাঁশৰন ঢুড়ি এনেছি বাঁশুরী যতনে ছিদ্রকরা।
গােটা গােকুলের আঁখিজলে ভেজা এসেছি আশিস্ নিয়ে,
ভাঙ্গা হৃদির রাঙ্গা আঁখি আর-একবার বল গিয়ে।
বলিস্ তাহার রােপিত লতাটি আজি ফুলে-আলােকরা,
বেরি নীপতল আসিয়াছে জল যমুনা দু'কূল ভরা।
যা ছিল মুকুল এখন তা ফল, চারা বাঁধিয়াছে ঝাড়,
আদরের বুধু হয়েছে ডাগর শিঙ উঠিয়াছে তার।
কোথা রবে তার রাজসভা, দ্বারি, রবেনা সে গৃহকোণে,
বুকে এসে ছুটে পড়িবে সে লুটে একবার যদি শােনে।
নয়ন রাঙায়ে দিওনা তাড়ায়ে প্রহরী নিঠুরহিয়া,
দিব ক্ষীর সর ফলফুল তােরে,একবার বল গিয়া।
মৃন্দাবন অন্ধকার
নন্দপুরচন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার,
চলেনা চল মলয়ানিল বহিয়া ফুলগন্ধকার।
জ্বলেনা গৃহে সন্ধ্যাদীপ
ফুটে বনে কুন্দনীপ,
ছুটেনা কলকণ্ঠ সুধা পাপিয়া পিক চন্দনার।
বৃন্দাবন অন্ধকার।
{ ৫৫ )

পর্ণপুট
ছোঁয়না তৃণ গােঠের ধেনু, ব্রজের বনে বাজেনা বেণু,
করেনা শ্যামরাধিকা লয়ে শারিকাগুক দ্বন্দ্ব আর।
পিয়ালফুলপরাগ মাখি’
আয়ত-তরলায়িতআঁখি,
হরিণ আজি লেহন করে চরণসুধাসল কার?
বৃন্দাবন অন্ধকার।
শিখীরা আর মেলিয়া পাখা
করেনা আলাে তমালশাখা
কমলকলি ফুটেনা, অলি লুটেনা মকল তার।
চেনা কারাে নবনীসর,
হেলায় লুটে অবনী’পর
করেনা দধিমস্থ বধু নাচায়ে চারু চন্দ্রহার।
বৃন্দাবন অন্ধকার।
ফেনিল কেলি সলিলে নাহি, তটিনী আর ছুটেন গাহি,
পাটনী কাদি’ তরণী ব্যাধি করেছে খেয়াৰহ্ম তার।
নূপুর হার হারানাে ছলে
গােপীরা সাজে যমুনাজলে
করেনা দেরী অজিকে হেরি হাসিট শ্যামচন্দ্রমার।
বৃন্দাবন অন্ধকার।
বাতাসে শসি’ বেতসীবন
হুতাশে মরে হতাশমন,
রচেনা কোলে ঝুলনদোলে মিলনপ্রেমানন্স-হার,
সবার। শােকবিবশবেশে
মুরছি পড়ে দিবসশেষে,
গাঁথেনা মালা, ভরিয়া ডালা তুলেনা ফুল বলনার।
বৃন্দাবন অন্ধকার।

পাদমেকং ন গলামি
গােপললনা নায়কহীনা
শােকশায়কে শায়িত দীনা,
নয়ননীরে বাড়ায় ব্যথা-পাথাল ভানুনন্দনার।
চিৎকুমুদী ঢুলিছে মুদি,
থেমেছে গীত কণ্ঠ রুধি,
গােকুল মৃৎপিণ্ড হলাে চলেনা হৃৎস্পন্দ আর।
বৃন্দাবন অন্ধকার।
পাদমেকং ন গচ্ছামি
ব্ৰজের সখী ব্ৰজের সখা, কাদছ কেন আকুল রােলে ?
আমার সাধের গােকুল ছেড়ে কোথাও আমি যাইনি চলে।
রজের মাঝে পেয়ে আমায় শিহরে ঐ ব্ৰজের দেহ,
প্রতি হৃদয়স্পন্দে আছি, কেঁদনা ভাই তােমরা কেহ।
ব্রজের বাটে, ব্রজের ঘাটে, ব্রজের গােঠে, মাঠের ঝে
শঙ্খলতায় পুষ্পপাতায় আছি হেথায় নানান, সাজে।
কঁছি মিছে, নয়ন মুছে দেখ চেয়ে এইযে আমি।
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি।
বরণ আমার বিলীন হ’ল ব্ৰজের শ্যামল দূৰ্বাদলে
শাঙণ গগন মগন করি কালিন্দীর ঐ কালো জলে।
ময়ূর-নাচা তমাল বনে সংশয়ে চাও মাঝে মাঝে,
ভুল তাত নয়, আমার চাচর চিকুর চূড়া হােথাই রাজে।

পর্ণপুট
গােপাঙ্গনার অঙ্গটে আলিঙ্গিতে আহলাদিয়া
গলে’ গলে’ নালাে গিয়া কালিন্দীতেই আমার হিয়া।
রসাল-শাখার শুক শারিকা করছে আজো আমার নাম-ই,
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি।
বেণুর বনে বাজলে বাঁশী চমকে উঠ চেন’ নাকি ?
কালীদহের নীলােৎপলেও দেখনিকি আমার আঁখি?
কৃষ্ণ-সারের চরণ পাতে থমকে দাড়াও চাওযে, পিছে,
আমার চরণশব্দ সে ত,একেবারে নয়ক মিছে।
বন্ধুজীবে রক্ত অধর,—কিসলয়ে নখর রুচি
পদ্মদলে চরণ দুলে,-কুন্দ ফুলে হাস্য শুচি,
চিনি-চিনি চিতে নার’ চমকে উঠে চাওযে থামি,
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি ।
পাটলঅশােকপলাশবাগে ফাল্গুনে মের রঙের মেলা,
পরাগরাগের হােলির ফাগে উচিত আমায় চিনে ফেলা।
বকুলডালে বেতস বনে বাদল বায়ে ঝুলন করি,
ব্যাকুল চোখে চেয়েও থাকো যেন আমায় ফেল্লে ধরি
দেখছনা ঐ চলছে আমার রাসের “লীলা চুপে চুপে,
হাজার ঢেউয়ে পৌৰ্ণমাসীর পূর্ণ শশীর হাজার রূপে।
উদাস বায়ুর পরশ দিয়ে বিবশ করি দিবস যামী,
বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পা-দমেকং ন গচ্ছামি।
( ৮ )

মাননীপ্রতিমা
মানসীপ্রতিমা
মাধুরী জাগি মঞ্জরিয়া রচিল তনু-লতিকা
পুঞ্জীভূত কুঞ্জশশাভা নয়ানে,
উঠিল প্রীতি গুঞ্জরিয়া লইয়া মধু গীতিকা
ফুটিল হয়ে মঞ্জুভাষা বয়ানে।
বিনয়, চারু চরণ হয়ে লুটিছে চুমি ধরণী
ফুটিছে ভূমিকমলে কোন্ মায়াতে।
শান্তি কেশকলাপ হয়ে দুলিছে ঘনবরণী
শরণ মাগে নয়ন তার ছায়াতে।
কুচির শুচি পুণ্যরুচি দুগ্ধফেনে উথলি
ভাতিছে বিধুবদনে স্মিত হসনে,
লাজ-শােণিমা অধররূপে বিরাগে উজলি,
সুষমা রচে কুন্দ-সিত দশনে।
শুভ বাসনা লাক্ষা-ক্ষীরে লভিয়া সিত-শোণিমা
কপােলে ফুরে পুলকে প্রতি পলকে,
সতীসুলভ সমুদারতা
বহিয়া গুণ-গরিম।
জাগে ললিত বিধুললাট-ফলকে।
( ৫৯ )

পণপুট
দৃঢ়তা রাজে নাসিকা হয়ে, ধীরতা হলো রসনা,
শ্রীল-তা জাগি জ্বলতা হয়ে বিলসে,
যুগলপাণি-মৃণালে, বাণী কমলা-সেবারাধনা
সুরভি যশে জীবনীরসে বিকসে।
লােচন দুটি হইয়া ফুটি করুণা, ছলছলিয়া
তাপিত জনে স্নাপিছে সুধা বিলায়ে।
ঋজুতা চারু চিবুক-তটে রয়েছ ঢলঢলিয়া
সৌম শম কণ্ঠে আছে মিলায়ে ।
মঙ্গল শ্রী-অঙ্গ ভরি, ভঙ্গি হয়ে শােভিয়া
রয় শুভা শােভনশীল সীতারে,
দ্যুলােক, নারী-জীবনে তব নবীন রূপ লভিয়া
ভূলােকে পারিজাতের ভাতি বিহারে।
চিকুসুমসুষমা দিয়ে গঠিল শত সতীমা
শতেক দলে তােমার হৃৎ-কমলে,
সকল শুভ পাবন-গুণ মিলনে নব প্রতিমা,
বিধি-মানসদুহিতা অয়ি অমলে।
তােমারি প্রীতি-পূজার যাগে সুকৃতি নিতি আহরি,
কুসুম ধূপ যােগায়, সুখ বেদনা,
তােমারি প্রেমকল্পবনে বিহরি তপ আচরি’,
দেবতা অয়ি, আমার সাধনা।
( ৬' }

বধূ-বরণ
বধ,-বরণ
কনককুম্ভ ভরি’ আনাে তুমি সতীতীর্থের জলে,
মণিমঞ্জষা ভরি আনাে দেবি অধিবাস-মঙ্গলে।
তুলসীর লাগি আনাে দীপমালা, অশথের ঝারা-নীর,
গােধনের তরে নীবার-শম্প, দেবশিলা লাগি ক্ষীর।
অরুন্ধতীর প্রসাদী পুণ্যে ভরিয়া সেবার থালা,
তমসাতীরের তপােবন ফুলে সাজাও পূজার ডাল!!
বটতরুমূলজড়িত দেউলে আরতি বাজেনা হায়,
জাগ্রত কর নবকলেবরে নিদ্রিত দেবতায়।
অয়ি শুচিশীলে, চম্পকবনে তুলসীলতার মত
লৌহবলয়ে কর পবিত্র কাঞ্চনভূষা যত।
সতী-রমণীর অনুমরণের চিতানল-শিখাসম
সী থিভরা আনাে সিন্দর লেখা বিদূরি দুরিততম।
শত জনমের ভমিলনের শতেক শুভ্রতা,
শাখার আকারে বেড়ি লও করে হে দেবি যজ্ঞাহুতা।
দেহে শােভে হেমে-রমার গরিমা, শঙ্খে বাণীর ভাতি,
গেহে লভে যেন কমলা ভারতী দীপারতি দিবারাতি।
অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠার পুটে সত্য মণিটি রাখ;
হাসি দিয়া শত গৃহকর্মের ক্লান্তিবেদনা ঢাক।
ফুটায়ে তুলিও দিনের সাধনা যশের গন্ধে ভরা,
কথাগুলি যেন তােমার বলিয়া মধুরসে যায় ধরা।
( ৩১ )

পর্ণপুট
চরণপরশে ভবনঙ্গন কর’ পঙ্কজময়,
সুরভি পরাগ হউক তাহার ধূলিকঙ্করচয়।
তব নিশ্বাসে মন্দার-বাসে গন্ধিত হােক ধূপ,
অমৃতের তুলী তব অঙ্গুলি গৃহে দিক্ নব রূপ।
কুসুম-শয়ন
আজি সখি, আমাদের কুসুমশন।
মধুগন্ধে ভরপূর
বায়ু বহে ফুরফুর
হিয়া দুটি দুর-দুর, অলস নয়ন।
আজি সখি আমাদের কুসুমশান।
অজি যেন সৃষ্টিছাড়া, সৰ্ববাধাবল্কহারা,
রসাবেশে মােতােয়ারা আ-লুলিত তনু,
ভুলি সব দুখ জ্বালা চৌদুিকের ঝালাপালা
অলির শিঞ্জিনী দিয়া রচ ফুলধনু।
কাটা যদি রহে ফুলে ব্যথা তার যাও ভুলে,
কাননে কাঙাল করি করলো চয়ন।
আজি প্রিয়ে আমাদের কুসুশয়ন ।
কিম্বা আজি রঙ্গভরে কৌমুদী-তরঙ্গ’পরে
বাহিয়া সেফালিঘন রাজহংসতরী,
( ৬২ )

কুসুম-শয়ন । কল্পসুষমার দেশে চল সখি যাই ভেসে যােজনগন্ধার গন্ধপন্থা অনুসৰি, আফিমফুলের চুম লভিয়া ঘনাবে ঘুম ; পরীরা পাখার বায়ে উড়াবে অলক, বুলায়ে শিরীষ ফুল, ভুলাবে তার ভুল, নয়নপলাশে পুনঃ জাগাবে পলক। বকুলমালিকা টুটি তুলে রবে শির দুটী কদম্বের উপাধান করবে বহন। আজি সখি আমাদের কুসুমশন । মানসকুমুদবনে চলো বাই সন্তরণে, সােমকান্তস্বিন্ন নীরে অচ্ছেদ-তড়াগে, মিলাইব চখাচখী বারিচর সখাসখী, বউকথা-কও গাবে সুরভি বেহাগে ! কিম্বা চল দুলি গিয়া তারাকুঞ্জদোলে, প্রিয়া, আকাশকুসুম দিয়া দু’হাতে ছড়ায়ে। চন্দ্রমল্পী-সীধুপানে চকিত চকোর-গানে বিধুপরিবেষ গায়ে পড়িব গড়ায়ে ! ত্যজি ধরণীর সাজ এস সখি এস আও; মুকুলদুকূল দিব করিয়া বয়ন। আজি সখি আমাদের কুসুমশন। ( ৬৩ )

পর্ণপুট
কিশােরী বথ
আমার কোরক-বধূ
অঞ্চলভরা সৌরভ তার অন্তরভরা মধু।
ফুটেছে শুভ্র যূথীর মতন,
মৌনমধুর সৌম্য শােভন,
আলােক-নীহারে নােক-মুকুতা টুলটুল করে বায় ।
নীপের মতন নাহি শিহণ
নহেক উগ্ৰ চম্পা যেমন
বকুলের মত ব্যগ্ৰ অধীর করেনাক মদিরায়।
আমার নবীন বধূ,
অঞ্চলভরা পরিমল তার-অন্তরভরা মধু।
জীবন-সখীটি মম
সঙ্কোচমুঠি তার কর দুটি পঙ্কজ-কলিম।
ললিত লতিকা লজ্জায়ােচনা
ঢল ঢল নীল কুসুমলােচ,
পেশল তরল তনিমা ভরিয়া সরল গরিমা তায়।
সে যে চির-অবলম্বনশীল।
জানেনাক ছল কৌশললীলা;
তরুর শাখাটি জড়ায়ে লয়ে ঘুমায়ে পড়িতে চায়।
আমার কিশােরীজায়া,
করুণপরা করদুটি—তার পঙ্কজমমী কায়া।
( ৬৫ )

কিশােরী-বধূ
কিশােরী-কান্তা মাের,
শুভ্রকৃচির অন্তুর-বেলা,-গুচি তার আঁখিপাের।
নব নিদাঘের ভাগীরথীসমা
বহিয়া নিভৃতে মায়াদয়া ক্ষমা,
শুভ সংসার-সৈকতে শশাতে পুণ্যের মহিমায়।
নাহি উদ্বেল আবিল প্লাবন,
শীতল শান্ত স্বচ্ছ জীবন
ধীরি ধীরি যেন কুলু-কুলু বয় ঝিরিঝিরি মলয়ায়।
দরদী দয়িতা মাের,
লসিতরুচির হসিত তাহার, শুচি তার আঁপিলাের।
আমার আদুরী প্রিয়া
কণ্ঠ তাহার তুষে জনে জনে বচন-মাধুরী দিয়া।
শারিকার মত নহে সে মুখরা,
কোকিলার মত সে নহে প্রখরা,
ময়ুরীর মত রূপগৌরবে টলে টলে নাহি যায়।
সে-যে মাের শ্যাম বনের পাখিটি,
শিষে হরে মন—সচকিতদিঠি,
চায় এ হৃদয়-কুলায়-নিলয়ে লুকাইতে আপনায়।
আমার সােহাগী প্রিয়া-
কণ্ঠ তাহার বন্টে অমিয়া, পােষ মানে তার হিয়া।
---

পপুট
প্রত্যাবর্তন
তােমার সাথে মিলতে হেথা, ও কিশােরী, তােমার তরে
আবার আমি এলাম ফিরে ছেলেবেলার খেলার ঘরে।
কথায় কথায় মান অভিমান,
অল্পেতে বর দুই চোখে বান,
কঁদতে গিয়ে হেসে ফেলি তেমনি আবার লীলা ভরে,
কাজের বােঝা হাল্কা হলাে আবার তােমার খেলাঘরে
যৌবনের এই শৈলপথে বছর দশেক এলাম নামি,
ধূলাখেলায় হেলাফেলায় তােমার পাশে গেলাম থামি।
অভিজ্ঞতার গুল্মবাধা-
জটিলতার গােলকধাঁধ,
বিদ্যানের আলােকলার বাধন ছিড়ে কেটে আমি
তােমায় লয়ে খেলতে প্রিয়ে বছর দশেক এলাম নামি।
সুখের স্বপন ফিল আঁখে জুড়াইল তৃষার জ্বালা,
দোলাইলে আমার গলে আবার কুমুদ-মৃণাল-মালা।
কুণ্ঠাদ্বিধা-চিন্তাবিহীন
সরল মধুর ফিল সে-দিন,"
পিছন হতে চোখ টিপে মাের ধরলে যেদিন চপল বালা,
আবার কিশাের-কোকনদে ভরুল সফল জীবন ডালা।
( ৩৬' )

দুর্দিনের বরণ
দুর্দিনের বরণ
হলে তােমার বরণ প্রিয়ে মরণ নদীর ধারে,
বােধন হলাে রােদন ভরা বেদনাঝঙ্কারে।
কোথায় প্রমােদ কোথায় হাসি ?
বাজলনাক সানাই বশী,
হাহাধ্বনি উঠলাে শুধু শশাকের পারাবারে।
আসনিক পূর্ণিমাতে পুষ্পশােভন রথে,
তােমার সাথে প্রথম দেখা অঞপিছল পথে।
শ্মশানমাঝে, জীবনসাথী,
অল্প চিতায় বাসরবাতি,
বাসর-রাতি ভল অকাল অমার আঁধিয়ারে।
আস’নি সই হ’তে আমার সুখের সহচরী ;
শােকের দিনেই দিলদরদী আল কৃপা করি।
সেই হ’তে ঐ আঁচল টিয়ে
অশ্রুতে মমর রইল ভিজে,
সেই হ’তে সই বলে আমার সকল বেদনারে।
দশটী বছর ঘনীভূত দুইটি দিনের পুটে,
দুইদিনে প্রেম দশটী বছর অগিয়ে গেল ছুটে।
সুখের দিনের প্রথম মিলন
দুখের রাতে শিথিলবাধন,
অশ্রুজলের মিলন অটুট এ-পারে ও-পারে ।
{ ৬৭ )

পর্ণপুট
প্রেমের স্মৃতি
কিশােরপ্রীতির মধুর স্মৃতি লুপ্ত হয়েও লুপ্ত নয়,
চমকে উঠে যখন তখন, মানসতলেই সুপ্ত বয় ;
পেয়রাগাছের ফাকে ফাঁকে,
পায়রাগুলাের ঝাকে ঝাকে,
পল্লীপথের বাঁকে বাঁকে,
বকবাতাবীর
কুঞ্জবনে,
পিউতানে, যুঁইশিউলিবাগে সে প্রেম জাগে গুঞ্জরণে।
কিশাের ভালবাসার আলাে লুপ্ত হয়েও লুপ্ত নয়,
লতায় পাতায় বনের পথের যথায় তথায় গুপ্ত বয় ;
সাজপূজনীর শখের ডাকে
নােলক নাকে, চপল আখে,
লুকোচুরি খেলতে থাকে দীঘির বাঁধা ঘাটটি ভরি’
বালকলার খেলাধুলায় বেড়ায় পাড়ার বাটটি ধরি।
বােশেখ মাসের অশােকতলায় হােলীর দিনে রাসবাড়ীতে,
পাথর-পূজার পৌরহিত্যে, শিশুপাঠের মাষ্টারীতে,
পূজার দিনে আটচালাতে,
দীপান্বিতায় দীপ জ্বালাতে
সাজের দ্বারে জলঢালাতে যে বীজ বুকে উপ্ত হয়,
অঙ্কুরিত রূপটি তাহার লুপ্ত হয়েও লুপ্ত নয়।

প্ৰমবিরহ
প্রথম বিরহ
শূন্য এ গৃহ আজ
শয্যা অজিকে হয়নিক তােলা, পড়ে আছে গৃহকাজ।
কুন্তলবনসৌরভে তব এখনাে এ গৃহ ভরা,
জাগিছে তৈল আলতায় তব দেওয়াল চিত্র করা।
সি দূর টীপের কৌটা আরসী সব খােলা আছে পড়ি,
চুলের দড়িটি চিরুনী তােমার ভূয়ে যায় গড়াগড়ি।
তব পদরেখাআঁকা
এ আঙনে প্রতি অণুকণাতেই তুমি রহিয়াছ মাখা।
আজি তুমি গৃহে নাই,
পায়ের শব্দ শুনিলে তবুও চমকি ফিরিয়া চাই,
দূরে রুনঝুনি শুনি শুনি যেন চারিদিকে তােমা খুজি,
মনে হয় সবি এলােমেলাে হেরি এখনি ফিরিবে বুঝি।
জড়ের অঙ্গে এমন করিয়া জীবন সপিয়া গেলে,
আমারি সঙ্গে শ্বসিয়া শ্বসিয়া তারাও অশ্রু ফেলে।
কেমনে বল গােরই
তােমার চরণচিহ্নে পাবন এ ভবনে তােমা বই ?
তব স্মৃতি গৃহময়,
ঘর ছাড়ি তাই, তব স্মৃতি পুন সে ঘরেই টেনে লয় ।
আজি মনে হয় কত অবসর বৃথায় গিয়াছে চলি
বলা হয় নাই, কত কথা হয়, করিয়াছি বলি-বলি।
}
(৬৯)

পণপুট
কপােতকূজনে গৃহখানি যেন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কঁদে,
হুহু করে উঠে ধুধু মনােমৰু, ঘুঘু যত ডাকে ছাদে,
গৃহের লক্ষ্মি মম।
এ গৃহ পূজার পরদিনে যেন ব্যথিত দেউল সম।
{
কিশােরী প্রিয়া,
কিশােরি, করেছ যেন পলিত ধরারে পুন ললিতকিশােরী !
জাগে সে উল্লাসে ভরা, জড়তা জীর্ণতা জরা আজিকে বিসরি
অজের মাধুরী অঙ্গে শাপ মুক্তা হাসে রঙ্গে কুজার মতন।
সবি যেন রাঙা-রাঙা কচি-কচি ঢলঢল পেলব চিকন।
কুঞ্চিত শিথিল সবি কাঞ্চন মরীচি লভি লাবণ্যে মঞ্জুল,
কগাল হাসি হেসে ধন আজি সখী বেশে বাধে যেন চুল।
কৈশােরের বেণুবীণে ভৈরবী বােধন, শুভ বিভাসী মূচ্ছনা,
জাগাল প্রেমের অর্ঘ্যে বনগিরিপ্রান্তরের অন্তর-ব্যঞ্জনা।
চললাস্যে কলহান্তে ফেনিল উচ্ছল মম জীবন অধীর,
তটভূমি চুমি চুমি সুরাতরঙ্গিণী সম করিল মদির।
কম্বাশ্রমে শকুন্তলা সম যেন জরা ভেদি জাগিল যৌবন,
সমগ্র নিখিল হলো রসে গন্ধে ছন্দে অলিমুখর যৌবন,
আজিকে গিরি যেন গৈরিক বসন ত্যজি বধুসজ্জা করে,
পরিয়া ময়ুরকন্ঠি, আজি তার সব শিলা লীলারূপ ধরে।
}

বয়ঃসন্ধি
বয়ঃসন্ধি
কৈশাের-কোরক হতে সহসা কখন
যৌবনের সম্পদে হলে বিকশিত,
কবে গেল পলাশের কুণ্ঠিত কুঞ্চন,
সৰ্ব্ব অঙ্গ কণ্টকিয়া হলো হরষিত ?
হৃদয়-গহনে তব, পুষ্পধনু ধরি,
সহসা পশিল কবে প্রথম নিষাদ ?
তুলিল তুমুল রােল তপােবন ভরি’
একসঙ্গে বিহঙ্গেরা ঘােষিল সংবাদ ?
কুসুমের বক্ষে কবে গৃঢ় কক্ষতলে
ফলের সূচনা হলাে পরাগের দলে?
২
অয়ি ইন্দ্রায়ুধময়ি জানিনা কখন,
বর্ণ হতে বর্ণান্তরে করেছু প্রয়াণ।
সুসন্থত হয়ে এলাে তনুর বসন
সংযত হইয়া এলো কলহাস্তান।
চরণের চপলতা কবে সংগােপনে
হরণ করিল আঁখি, পারিনি ধরিতে,
শিথিল বিতান কবে উন্মদ পবনে
মঞ্জুল কুর্মুল হলো হৃদয়-তরীতে ?
পীন হলো কবে ক্ষীণ, ধনী হলাে, দীন,
একতারা কবে হলে সাততারা বীণ?
(• ৭১ )

পর্ণপুট
;
বুঝি সে ফান রাতি, দক্ষিণ সমীরে
উড়িয়া পড়িয়াছিল বক্ষের অঞ্চল,
নব নৃপ পুরে চুপে প্রবেশিল ধীরে
কৈশােরের সিংহাসন যাহে টলমল
বিনা রণে পেল তার কবচ কৃপাণ
সশঙ্ক প্রকৃতি-বর্গ দাড়াল সরিয়া ।
লাজে ভয়ে অন্তঃপুরে করিল প্রয়াণ
কৈশােরসজনী যত গুণ্ঠন পরিয়া।
ধরিতে নারিনু আমি, চোরের মত
মৰ্ম্মের সুড়ঙ্গ পথে পশিল যৌবন।
যে দিন কৈশাের তব লইল বিদায়
চিত্তরাজ্যে দৃশ্য আহা হইল কেমন?
উঠিল কি হাহাকার বিরহ ব্যথায়
শ্যামহারা বৃন্দাবন বিধুর যেমন?
সেদিন কি নেত্রে তব ফুটেছিল জল ?
উরস কি হয়েছিল খাস-দুরুদুরু ?
রচিতে রচিতে নব বরণমঙ্গল
সুখে দুখে হতেছিল মন উড়ুউড়?
জানি না কখন কবে কৈশােরের মধু
যৌবনের সীধু হলো, অয়ি প্রাণবধু।
• ( ৭২ )

মুগ্ধ আবাহন
মুগ্ধ আবাহন
ওগাে, মহুয়াবনের সাকী,
এস-মুখমদিরায় মুকুলে মধুপে মাতায়ে বকুলশাখী।
কপােল-পিয়ালা ঢলঢল ভায়
গােলাপী সরাব টলটল তায়,
তব তুলতুলে আঙুর-আঙুলে মুদাও আমার আঁখি।
ওঙ্কা, বারুণীপুরীর সাকী
তব রূপসীধু পিয়ে পিয়ে প্রিয়া,
রসে অবশ হােক মম হিয়া,
তব প্রেমরস-দ্রাক্ষাকুঞ্জে ঢুলে পড়ে যেন থাকি।
এস দ্রাক্ষাবনের সাকী।
ওগাে, শৈলসানুর রাণী,
আনাে ও-বাহুর অটল অটুট শিলার নিগড়খানি।
পাষাবি, উরস পাষাণকারায়
চন্দনশীত উৎস ধারায়
বন্দী যেন গাে আপন হারায়, না শুনে মুক্তি-বাণী।
ওগো, পাষাণদেশের রাণী
বীরবালা আজি রণ অবসান,
চরম সপিয়া কবচ কৃপাণ,
বিদ্রোহী পায়ে পড়িছে লুটায়ে চির পরাজয় মানি,
ওগাে শৈলপুরীর রাণী।
( ৭৩ )

পণপুট
ওগাে, অসিতদেশের প্রিয়া,
এসসা খঞ্জন-আঁখির ভুরুর অনলতা নিয়া।
দূর দিগন্ত, ঘনবন গিরি
উজলি ধ্বান্ত কুহেলিকা চিরি,
মসীসিন্ধুর শশী তুমি উদি’ আলােকিলে মম হিয়া।
ওগাে, কজ্জলকেশা প্রিয়া,
আঁক’লাে ইন্দ্রনীল-শলাকায়
রস-অঞ্জন আঁখির পাখায়,
স্বপনে ঢুলাও যাদুকরি, মায়া-অনুরঞ্জন দিয়া।
ওগো নিকষদেশের প্রিয়া ।
ওগাে, স্বপনপুরীর পরী,
এস লম্বিত ইন্দ্রধনুর মালিক হতে ধরি।
তারার কুসুম ছড়ান্তে ছড়াতে,
ছায়াপথ বেয়ে নাম’ এ ধরাতে,
কনকের দীপে জোনাকি-ফিকি পড়ে যাক্ ঝরি ঝরি!
ওগাে, স্বপনলােকের পরী,
তাজালরচা লঘুসঞ্চার
প্রজাপতিখচা দুটী পানার
ছায়ায় হাওয়ায় মােহন মায়ায় চেতনা লহগাে হরি।
ওগো, কল্পবনের পন্নী।
( ৭৪

পাহাড়িয়া প্রিয়া
পাহাড়িয়া প্রিয়া
ওগাে পাহাড়িয়া প্রিয়া,
হেথায় তুলসী-কুঞ্জে কি দিয়ে তুষিব তােমার হিয়া
কোথা বীর-তরু তমাল নমেরু দেবদারু চারু নীপ ?
পলাশ-শ্রীর ললাটের 'পরে কোথা সে চাদের টিপ ?
শিরীষ-বালার অলক দুলায়ে পবন হেথা না ফুরে,
মহুয়ার বনে মাতিয়ী হেথায় মৌমাছি নাহি ঘুরে।
বনদেবী হেথা শৈলসােপানে এলায় না তার বেণী
কোথা দিগন্তে তরঙ্গায়িত তুঙ্গ গিরির শ্রেণী ?
হেথা শিলাজ গলায়ে ঝরেনা গেরুয়া উৎসবারি ।
সিকতাহৃদয় বিদারি এখানে ভরেনাক কেহ ঝারি,
কোথায় উদার অবাধ জীবন ভূধরের পাদমূলে !
চপল চরণে কোথা ছুটাছুটি
গিরিনদী-কূলে-কূলে ?
ওগাে পাহাড়িয়া প্রিয়া
হেথায় বঙ্গ-অঙ্গনে তব কি দিয়ে তুষিব হিয়া ?
ওগাে, পাহাড়িয়া বালা,
বল্লীবলয় ভুজে তব, গলে কূটমল্লিকা-মালা।
প্রকৃতি হেথায় ,সুকৃতির রূপে বেঁধেছে কুটীরখানি,
আলিপনাআঁকা
ছায়গুপে এস গিরিবরাণী ।
পূর্ণ কুম্ভ তব মেখলায় পাণি-বন্ধন যাচে,
ক, হেথায় তব চুম্বন আশায় আশায় আছে।
(৭৫)

পণপুট
ফুলপল্লব-ভূষণ তেয়াগি ভবন-ভুষণ পর
টান’ শির 'পরে লাজ-গুণ্ঠন, শঙ্খবলয় ধর।
আঁক’ সীমন্তে সিন্দ-লেখা, বাঁধ’ কুন্তল রাশি,
হােক অচপল চরণযুগল, সংযত হাে হাসি।
পিঞ্জরে হেথা পড়িয়াছ বাঁধা গিরিকুঞ্জের পাখী,
হরিণ-নয়নে ঘেরিয়া বেড়িল শত তরুণীর আঁখি।
ওগাে পাহাড়িয়া বধূ,
হরিত পর্ণপুটে আনাে গিরি-প্রকৃতি-হৃদয়মধু।
মুক্তি
( ১ )
এস সখি মুক্তি-লােকে রুদ্ধ গৃহমাবে
বাহিরে খুলিয়া যত সংসার-শৃঙ্খল,
হেথা এস মুক্ত শ্লথ সুষমার সাজে
বিগলিয়া কৰ্ম্মক্লান্ত যৌবন তরল।
এলায়ে গুষ্ঠিত কুণ্ঠা মুকুলিত লাজ,
ফুটে উঠ’ কণ্ঠ-বৃন্তে চম্পার মতন।
রাখি উপাধানতলে সৰ্ব্ব ভূষাসাজ,
পর’ প্রেমকল্পতরু-সঞ্জাত ভূষণ।
( ৭৬ )
,

হেথা হৈম সিকতায় মাণিক্য-সন্ধানে
মন্দাকিনী-তটে খেলা বভসে হরষে,
কভু বা অঙ্গের ভূষা রাখিয়া সােপানে
অবিশ্রান্ত জলকেলি অচ্ছেদ-সরসে।
ইহ-স্মৃতি হারাইয়ে, গৃহের নন্দনে
এস প্রিয়ে, লভ’ মুক্তি নিবিড় বন্ধনে।
)
.
উঠ সখি জাগ’ জাগ’ পােহায় রজনী
মৃদঙ্গে উঠিছে দূরে কুঞ্জভঙ্গ গান।
ভােরের বৈরাগী পথে বাজায়ে খঞ্জনী
টহল গাহিয়া দিল টলাইয়া প্রাণ।
সুপ্তি-সুষমার সুখ-স্বপ্নপুরী হতে
গৃহাঙ্গনে ফিরে এস, ওগাে, মায়াময়ি,
ভিড়াও মানস-তরী কতটপথে
বিলাস-তরঙ্গ ত্যজি, অসন্থ, অয়ি ।
আললাকে পুলকে মেলি আঁখির পলক
আলুলিত যৌবনেরে করিয়া সংহত,
মুছি তন্দ্রালস আঁখি, গুছায়ে অলক
শিথিল তনুর কর শাসন-সংযত।
ধীরে ফেলি পাদযুগ লাজসঙ্কুচিত,
অলিন্দ অঙ্গন পুনঃ কর পঙ্কজিত ।
( ৭ )

পর্ণপু
হাফেজের আত্মদান
বধিতে হরিণ হিয়া
কোথা হতে এলাে প্রিয়া
তােমার অলকে এত ফাঁস,
তােমার নন-কূপে
স্বপনেরা ব্যাধরূপে
নীরবে গােপনে করে বাস।
তব চিকন চির চুলে চামেলি চমকি উঠে,
‘আদীন-প্রবাল গুলি ও-অধরতটে লুটে,
সুরার সুরভি সুর
শিরায় শােণিতে ছুটে
মদালস তব মৃদুহাস।
শীত বায়ু-চঞ্চল
তব পীত অঞ্চল
বিতরিছে আতরের বাস।
প্রিয়ে তব রূপ নিতে সবার গরব গুড়া,
হুরী পরী গড়াগড়ি লুটায় হীরার চুড়া।
লাজে হেম উষা ম্লান
জ্যোছনা শামায়মান,
বাগে বাগে গােলাপ হতাশ,
মিছে আভরণ ফেলি
পিছে আবরণ ঠেলি,
কর যদি সুষমা প্রকাশ।
তব-গমন-পথের পরে পাতি’ দেই এই হিয়া,
ঘুমালে চরণরেণু রুমালে মুছাইয়া প্রিয়া,
( ২৮ )

অপরাধ কার
ও স্মিত কপােল-কূপে
পরাণ সঁপিয়া দিয়া,
নিবারিব মরুভূ-পিয়াস,
তব তনু লতিকার
ছোঁয়া পেতে একবার
হতে পারি চির ক্রীতদাস ।
অপরাধ কার ?
মিছে সখি ধরাে অপরাধ।
না চাহি আপনা পানে মিছামিছি অভিমানে
দোষ ধরি’ যােব করি’ ঘটাও প্রমাদ।
জান নাকি, কোন দিন নহে অলি লােভহীন,
তপ আচরিতে সেত ঘুরেন কাননে ?
মধু-গন্ধে পুলকিয়া
রূপ-ভাতি ঝলকিয়া
কমল ফুটালে কেন অমল আননে?
যেন পক বিফল
রসভরা ঢল ঢল
কেন এত মনােহর অধর রতন ?
শুকের কি উপবাস ?
শুধু কি ভুখের শ্বাস ?
ক্ষুধা যে জগন-ধৰ্ম্ম তাহা কি নূতন ?
পড়িয়া জলের কাছে
এ মীন কেমনে বাড়ে
সে কথা জানিয়া, সখি, কেন কর ছল ?
( ৭৯ )
''
,

পণপুট কেন তব বাহু-লতা আঁখিপুট-টভরা শ্রান্তি-জ্বালা-কান্তিহরা ছায়াঘেরা স্বচ্ছ বারি কেন টল মল ? এটা সখি কার ভুল ? চোয়ায়ে তারুণ্য ফুল, লাবণ্যে আনিলে কেন বারুণীর বান? যদি তায় অবশেষে এ মক্ষী যায়গাে ভেসে কেন দোষ ধর’ ? তার কতটুকু প্রাণ? মিছে দূষ’ অধীর সাতপাকে জড়াইল এই তরুশাখা ? চকোরে শাসিছ বৃথা, গৃহ ভরি, শুচিস্মিতা, দন্তরুচি-চন্দ্রিকায় বিরচিয়া রাকা। নিয়ত ঝঙ্কিয়মান বাণী, বীণাবেণুতান, মানস কুরঙ্গ সে অবােধ সরল, অতিলােল প্রাণ তার ও কটাক্ষ বজ্রসার, হানে যে নিশিত শর নয়ন তরল। নখের ভাতিতে যদি ফুটে গুল নিরবধি বুলবুল আঁখি মুদি বসিবে কি তপে ? সুলভ সম্মুখে তার রূপশিখা অনিবার শলভ সাধে কি আর তনু মন সঁপে ? দুৰ্বল দীনের ঘরে এ সবকিসের তরে ? লিঙ্গার অপ্সরােলীলা কেন এখন? পদে পদে অপরাধ নিতি যদি পরমাদ, তবে কেন অকুষ্ঠিত মুগ্ধ আয়ােজন ? ( ৮% )

দিনে ও রাতে
দিনে ও রাতে
আন-দিনের মরু পার হয়ে যাই কিসের আশে আশে ?
রাতে-- চিকুর ছায়ার শান্তি তরে বাহু-লতার পাশে ;
ধূলায় মলায় ক্লিন্ন স্বেদে
সারাদিনের দুঃখ খেদে
ধৌত করে ফেলব বলে তােমার প্রেমোল্লাসে।
সারা দিনের প্রহর জুড়ায় আমার রাতের মধু যামে,
প্রিয়ে-শ্রমের শিরে তমার প্রেমের শান্তিধারা নামে।
বঞ্চনা ভুল দিবসভরা, লাঞ্ছনা লাজ তপ্ত ত্বরা,
সবই উড়ে পলায় দূরে তােমার মলয়-শ্বাসে।
যদি রাতে তােমার সােহাগ, তেজে প্রাণ নাহি দেয় ভরে
খর-- দিনের তাড়ন কালাের পীড়ন সইবা কেমন করে ?
নিশার প্রবােধ পুরস্কারে
শ্ৰমােৎসাহ উষায় বাড়ে
রাতের চুমাই শ্রান্ত প্রাণের সকল ব্যাধি নাশে।
যত— অরসিকের মেলায় দিনে এ কান ঝালাপালা,
রাতে তােমার বাণীর সুধায় জুড়ায় তাহার ক্ষুধাআলা।
ঐ অধরের জ্যোছনা আশায়,
রৌদ্রে সহি রুদ্রতৃষায়,
দিনের দাহন সহি প্রেমে গাহন অভিলাষে ।
( ১ )

পর্ণপুট
স্পর্শ
( উত্তর চরিত)
কে দিল ঢালিয়া হরিচন্দন-পল্লবরস সঙ্গে
নিঙাড়ি ইন্দুকিরণাঙ্কুর মরি মরি মাের অঙ্গে ?
কে দিল এ মনঃপরিতৰ্পণ জীবনৌষধি বিত্ত,
অমৃত-সিক্ত করিল তিক্ত তাপ জর্জর চিত্ত ?
সঞ্জীবন এ পরিমােহন যে পুরাপরিচিত স্পর্শ,
অঙ্গে ভাঙ্গে প্রেমতরঙ্গে জাগায় নবীন হর্ষ।
সন্তাপজাত মূৰ্চ্চা ঘুচায়ে পরমানন্দ-বন্যা,
করিছে বিবশ আনি’ নব রস-জড়তা পূলকজা ।
ভুষণ
প্রিয়ে,
চেয়েছিলে
ভূষণ, ভূষণ
সবি সঙ্গে আছে।
আছে হৃদয়-মঞ্জষাতে আছে আমার অঙ্গে আছে।
আজকে বুকের রক্ত দিয়ে, আতা দিব পরাইয়ে,
সােহগে সই দুলিয়ে দেব চুমার নােলক নাকের কাছে
রচিব হার একটা হাতে, মেখলাটি অনুস্টাতে--
তােমার কাণে প্রেমের গানে রচি-ছল নূতন ছাঁচে।
পায়ে দিব হিয়ার নূপুর, বাজবে প্রিয়। ঝুমুর-ঝুমুর
‘ভূষণ পরে দেখবে বয়ান আমার দুটী নয়ান-কাচে।

সমস্যা
সমস্যা
তােমায় কোথা ভূষণ দিব, সুন্দরি ?
অঙ্গল গন্ধশােভায় আছেই সদা মুঞ্জরি'।
আতা কোথা পবে তুমি ?
ধরণী – ওই চরণ চুমি,
শিউরে উঠে ভূই-চাপাতে, ভ্রমর আসে গুঞ্জরি’
তােমায় কোথা ভূবণ দিব, সুন্দরি ?
চুম্ব-মধুর বিশ্বধরে তাম্বলীরস সয় কি কেহ ?
অঙ্গরাগের ঠাইটি কোথা ? গুলবাগই যে তােমার দেহ।
হিরণ ক্ষোভে হবেই মাটী
হােনা কঁচা, হােন খাঁটী,
-লাজে কঁাকন চুড়ি কাঁদবে রুনু ঝুন করি।
তােমায় বেথা ভূষণ দিব, সুন্দরি ?
p
কাজল বৃথা পরবে কোথা, ও চোখে কি সাজবে ভালো ?
কাজল হ'তে উজল আরাে যুগল ভুরু অনেক কালো।
চঁচির চিকন চুলে প্রিয়ার
ঝাপটা গীথি মানায় কি আর?
ধরার ভূষণ পরবে পরী অ-মৃত রূপ গুণ ধরি?
তােমায় কোথা ভুষণ দিব, সুন্দরি ?

পর্ণপুট
চির মিলন
তােমার সনে নয়ক আমার নূতন পরিচয়,
অনন্তকাল বাসছি ভালো এমনি মনে হয়।
মােদের মিলন দেখেই বুঝি
কপিল ঋষি পেলেন খুঁজি,
সূত্র তাহার,-প্রকৃতি আর পুরুষ সমন্বয়।
মােরা যখন ছিলাম শুধু মূচ্ছনা-সঙ্গীত,
মােদের পরিণয়ে ছিলেন ব্রহ্মা পুরােহিত।
তারপরে সে দেশবিদেশে,
নূতনরূপে নূতন বেশে,
জন্মে জন্মে হচ্ছে মােদের মিলন-অভিনয়।
যুক্ত ছিলাম হয়নি যখন পরিণয়ের প্রথা,
হয়ত তুমি মহীরূহ-হয়ত আমি লতা।
হয়ত চখা এবং চখী,
নয়ত বনের সখাসখী,
আজকে মােদের মানব-সমাজ পত্নীপতি কয়।
মানুষ মােদের ঘুচায়নি এই ক্ষণিক ব্যবধান,
মিলায়েছে সেই সনাতন চির যুগের টান।
সেই সৃজনের আদি হতেই,,
হয়নি ছাড়া কোন মতেই ।
‘তুমি’ বলেই ভালবাসি, স্বামী বলেই নয়।
( ৮৪ )
।

দেহের মিলন
দেহের মিলন
দেহের মিলন মাবোই মােদের প্রেমের হলো জয়,
এই মিলনই করল তারে অনন্ত অব্যয়।
শরীরী চিত্তযুগল
জানা আনন্দ অমল,
জানাক তৃপ্তি, ছিল কেবল তৃষাময় ।
দ্বৈতবনের মিলনে আজ হরষধারা ছুটে,
হাজার হাজার রােমাঙ্কুরে কুসুম উঠে ফুটে।
যে সাধ ছিল কোন্ স্বপনে, দুটী দেহের আলিঙ্গনে
সফল সৃজন হয়ে তা আজ জাগাল বিস্ময় ।
দেহের মিলন-মৃণালে প্রেম, কমল হয়ে হাসে,
চারি চোখের নীল গগনে উঁদ হয়ে সে ভাসে,
১ক্ত বেণীর ধারার মত
চবে এ প্রেম অবিরত,
বিশ্বপ্রেমের পারাবারে শেষে তাহার লয়।
}
অমর করে রেখে যাব এই মিলনের ফল,
হাজার গানে মুখর হবে মিলন-মঙ্গল।
এই মিলনের ইতিকথা তত্ত্ব নিদান গভীরতা,
মনঃশিলায় লিপির রূপে রহিবে অক্ষয়।
( ৮৫ )

পর্ণপুট
প্ৰন্দ্ৰলােপ
দুই হওয়া বিধির পীড়ন,
রাত্রি দিন ব্যবধান,
বাঁধাবাঁধি সাবধান,
প্রচণ্ড প্রয়াসে শুধু শিথিল মিলন।
নয়নের বাতায়নে
বসি শুধু দুই জনে
নিতি মিলিবার লাগি প্রাণ-প্রসারণ !
দুইটী খাঁচায় থাকি
ছট ফট দুটা পাখী
শুধু ব্যর্থ ডাকাডাকি চঞ্চু বিদারণ ।
মাংস অস্থিপঞ্জরের
রন্ধহীন কন্দরের
গাত্রে প্রতিহত দুটী নদীর নৰ্ত্তন,
দ্বৈতরূপে দুৰ্ব্বহ জীবন।
এক হলে বাঁচে দুটী প্রাণ।
দুই-ই তৃষা, দুই-ই জল দাউ দাউ-টল মল,
মৃগতৃষা জ্বল জ্বল সারা দিনমান।
দুটী প্রাণ ধারা লয়ে
এক মহানদী হরে
সকল ব্যাকুল জ্বালা করুক নিৰ্বাণ,
কল কল সুগভীর আত্মানন্দোচ্ছল নীর,
তনু তায় তটসম হােক মজ্জমান ।
প্রেম-সিন্ধুলক্ষ্যপানে ছুটুক অলক্ষ্য টানে
সান্দ্র প্রেমানন্দে হাে দ্বন্দ্ব অবসান!
অদ্বয়েরে চায় দুটী প্রাণ।
( ৮৬ )

সর্ণতা
সম্পূর্ণতা
গগনে কোটি তারকা হয়ে তােমার পানে চাহিয়া রই,
পরাণ ভরি নিরখি কোটি নয়নে,
গহনে কোটি কোরক হয়ে ক্ষুটন-ব্যথা নীরবে সই,
তােমার তরে রচিতে ফুলশয়নে।
অযুত নদীলহরী হয়ে চরণে লুটি তাথৈই,
চিকন চারু চিকুর হই ও-শিরে ।
তােমারি স্বেদ অপনােদনে মধু-পবন-জীবন বই,
তনুতে অনুলেপন হই উশীরে।
অশ্রু হয়ে গণ্ডে দুলি,হাস্যে ফুটি আস্যে অই
পুলকে উঠি কন্টকিয়া হরষে,
নুমালে তুমি স্বপন হয়ে জাগিয়া তােমা ঘেরিয়া লই
আবেশ মােহে মূরছি এই উরসে।
তােমার প্রতি অণুটি চাই, ইহ জীবনে লভিনু কই ?
শরীরী
হয়ে
তােমারে, সতি, লভিনি,
বাসনা তাই তনুটি তব ভূষিতে পুড়ে ভস্ম হই,
মরিয়া লভি করিয়া তােমা যােগিনী।
( ৮৭ )
}

পর্ণপুট
.
চির-তরুণী
তব মনােবন মাঝে কার বীণাবেণু বাজে? বলগাে প্রিয়া,
কে তােমারে চুপে চুপে রাখে নব নব রূপে সঞ্জীবিয়া?
কোন চির সুন্দরী নিতি তুলে মঞ্জরি' প্রতিমা তব ?
অবিরত মধু ক্ষরে আলসে এলায়ে পড়ে অলি যে পিয়া।
F
সেই মুখে হাসি রাশি সেই ভালবাসাবাসি, মানসহরা,
একই সেই তনুমন একই কথা অনুখন আকুতি ভরা,
তবু যা যখন লভি, মনে হয় যেন সবি সরস নব,
কে রহি ও-অন্তরে সদা ফুল-খেলা করে তােমারে নিয়া ?
কল্প-লক্ষ্মী
=
‘চিত্রিত’ তব নেত্র –-লতা বদনখানিতে, বধু,
দিল ‘সঙ্গীত’ বীণা-ঝক্তৃত তােমার বাণীতে মধু।
চুম্বনে পেয় ও-অধরে ঘন কিবা ‘কবিতার রস,
বিনােদ-বেণীতে ‘বয়ন’-বিলাস, গ্রীবা গায় তার যশ
গতি ভঙ্গিতে-‘লাস্যের লীলা, সুন্দর করে গেহ,
যৌবনে ক্ষোদি ‘ভাস্কর-কলা বন্ধুর করে দেহ।
কারু শৃঙ্খলা চারুকৌশল—মিলন-মেলার ভূমি,
নিখিল শিল্পে পরিকল্পিত কল্প-কমলা তুমি।
( ৮৮ )

চন্দ্ৰমালা
চন্দ্ৰমালা।
প্রিয়ার বদন শারদবিধু বিম্বিত মাের জীবন-সরে,
ছন্দ-দোদুল তরঙ্গে তা’ হাজার হাজার রূপটি ধরে।
কলধ্বনির সুরের সূতায়
গাঁথছি মােহন মালিক তার
ভাবছি গেঁথে এই উপহার সমপিব কাহার করে ?
তােমায় যা’ না নিবেদিত, হে মহাকাল, ধ্বংস কর',
কেবল তুমি সজীব রাখ, যা’ কিছু সব অঙ্গে ধর।
তুমি আদর করবে জানি তােমায় সঁপি মাল্য খানি,
ছন্দে গাঁথা চন্দ্ৰমালা ধর’ তােমার মৌলি’ পরে ।
বিফল আয়ােজন
আজিকে ভাঙিয়া গড়াগড়ি মম পূর্ণকুন্ত দুটী,
দ্বারের দু'ধারে রম্ভার তরু শুকায়ে পড়েছে লুটি।
এলেনা দেবতা মন্দির মাঝে,
বৃথা আয়ােজন ব্যথা হয়ে বাজে,
ফুল-মঞ্জরী তােরণ মাল্যে ঝলসি ঝরিছে টুটি।
কুম চুয়া চন্দনলেখা হলাে ধূলিময় মসী,
দহে মলাে ধূপ পিয়াসে হুতাশে নিরাশায় শ্বসি’ খসি'।
শুভ যৌবনে শােভা-সম্ভার,
ভাষায় ভূষায় ষােড়শােপচার,
বিফল হয়েছে দেবতা আমার, শিথিল অর্ঘ্যমুঠি ।
( ৮ )
}

পর্ণপুট বিরহতপের শেষ সে দিন ফানে যবে মদকল পিকরবে অরণ্য জাগিল, ত্যজি রেণুঘন শ্বাস, রসাল-মুকুল-মূলে মল্লিকা বকুল ফুলে ছুটিল করীর কুম্ভে মদিরা উচ্ছাস। সেদিন এলেনা বধু সুরভি করীমধু গড়ায়ে পড়িল ঝরি ধরণীর বুকে, বনশ্রী-কপােল 'পরে বসন্তের বিধারে চুম্বন উঠিল ফুটি অশােকে কিংশুকে। তােমারি আশায় স্বামি খেলিনু এ সঙ্গে আমি হােলীরঙ্গ দিবা যামী লাবণ্যের ফাগে, যতনে জালিনু দীপ পরিনু রতনটীপ অধর করিনু রাঙা তাম্বুলের রাগে। জাগিনু চঁদিনী রাতি রাখিনু মালিকা গাঁথি নিচোল আঁচলে, পল্লবিনী বল্লীসমা ফুল্লপীনা মনােরমা, তরু আলিঙ্গন মাগি লুটিনু ভূতলে । যৌবনের ভরা কূলে মাধুরীতরঙ্গ দুলে, তনু রােমাঞ্চিত কেলিকদম্বের প্রায়, সেদিন এলেনা প্রিয়, দেহকান্তি কমনীয় হয়ে নীল হলাহল দহিল আমায়। কুসুম-শয়ন পাতি ০

বিরহতপের শেষে
অকস্মাৎ এল যবে,
ভস্ম করি মনােভবে
পুন ধ্যাননিমীলিত রুদ্রের নয়ান,
জীর্ণ পর্ণে মর্মরিত
বনহৃদি জর্জরিত
ঝলসিয়া শুষ্ক শীর্ণ ধরার বয়ান।
শতগ্রন্থি বেশবাস,
ধুসরিত কেশপাশ
উড়ে যেন গৃধিনীর রুক্ষ পক্ষজাল।
যেন ধূ ধূ বালুকায়
নিদাঘতটিনীপ্রায়
কোনরূপে রাখিয়াছি কৰােটি কঙ্কাল।
তােমার করুণা লাগি বিরহ-যামিনী জাগি
অরুণ কোটরগত খঞ্জননয়ন |
আশাতৃষা রসাবেশ, ধূপায়িত, পাংশুশেষ,
অঙ্গার করেছে মৰ্ম্ম মুৰ্ম্মর-দহন।
সহসা আসিলে বঁধু,
নাহি সুধা, নাহি মধু,
নাহি কোনাে আয়ােজন ভাষায় ভূষণে,
গৃহে নাহি দীপজালা গাঁথা নাহি বনমালা
নাহি রসগন্ধডালা বরিব কেমনে ?
বিরহ তপের শেষ,
এস এস হৃদয়য়শ,
এস নীল্পক মাের, মন্মথমথন,
আজি ভস্ম সবি মম,
শুধু হৃদে রাজে প্রেম-হেম-সিংহাসন।
দহনে উজ্জ্বলতম
( ৯১ )

পূর্ণপুট
ব্যর্থবিলাস
তব লাবণ্য-অচ্ছেদ-নীরে করেছি কেবল জল-খেলা,
লালসা তাপিত এ তনু জুড়াতে কেটে গেছে মাের সারাবেলা।
সবােজ সুরভি কলতরঙ্গে
এলায়ে দিয়াছি অলস অঙ্গে
হষ রঙ্গে চল বিভঙ্গে নিখিল বিশ্বে করি হেলা।
তব লাবণ্য-সরােবরে আমি করেছি কেবল জল-খেলা।
সাধক-সংঘ ডেকেছে ভূৰ্য্যে, শঙ্খেমঠের পুরােহিত।
বিষাণ ডমরু বাদনে ডেকেছে জীবন সমরে স্মরজিৎ।
কত অভিযান কত উৎসব
তুলিয়াছে দূরে কল কলরব,
ভাগ করে নেছে জয়-বৈভব মহামানবের মহামেলা,
তব লাবণ্য-সরােবরে আমি কলেছি কেবল জল-খেলা।
যাত্রীরা সব পথে যেতে যেতে ডাকিয়াছে মােরে ‘আয় আয়,
শুনেও শুনিনি, প্রহর গুণিনি, বিভাের ছিলাম হায় হায় ।
বাণীরে ভুলিয়া মরালের তার
কণ্ঠ ধরিয়া দিয়েছি সাতার,
পদ্মারে ভুলে পদ্মে মজেছি আঁকড়ি ধরেছি ফুলভেলা।
তব লাবণ্য-সরােবরে আমি করেছি কেবল জল-খেলা।

ফুষ্ঠিত
কুঠিত
তুমি জ্ঞানী গুণবান,
তব সখী হ’তে নাই যে শকতি, তাই কঁদে মম প্রাণ।
পূজিতে জানিনা, তােমার গরিমা বুঝিনে তােমার ভাষা,
বচন-দৈন্যে
বুঝাতে পারি না হৃদয়ের ভালবাসা।
তােমার যা’ প্রিয় আলােক সাধনা, মাের তা অন্ধকার,
মম অস্বচ্ছ হৃদয়ে ফুটে না প্রতিবিম্বটি তার।
কৃপায় নীরবে চেয়ে চেয়ে যবে অলকে বুলাও কর,
লজ্জাকাতর সঙ্কোচে মাের কুষ্ঠিত অন্তর।
আমি এ অবােধ নারী,
তােমার চরণে লুটে-পড়া ছাড়া আর কি করিতে পারি?
তুমি যে কর্মবীর,
উন্নত-কায় উদার-হৃদয়, ভূধরের মত বীর।
ক্ষুধিতে তুষেছ যােগায়ে অন্ন, তাপিতে ছত্র ছায়ে,
হে ত্যাগি ! কতই লাঞ্ছনা তুমি সয়েছ আমার দায়ে ।
হৃদয়-রুধিরে শ্রমজল করে’ রাখিয়াছ সংসার,
ঝঞ্চ-ফেনিল তটিনী-বক্ষে অটল কর্ণধার ।
বুদ্ধির দোষে জালজাল যতই জড়ায়ে তুলি,
নিশিদিন জাগি হাসিমুখে তুমি একে-একে দাও খুলি।
আমি এ অবলা নারী-
তব চরণের দাসী-হওয়া ছাড়া কি আর করিতে পারি ?
( ৯৩ )

পর্ণপুট
;
তুমি যবে গাও গান,
আমি শুধু শুনি বুঝিনাক গুণি, রস-তাল-লয়-মান।
স্রোতধারাসম কতদূর হতে শ্রোতা চলে আসে ছুটে,
সখ্যোপহার অৰ্যোপচার বহি অঞ্জলিপুটে ;
দেশ-বিদেশের কত অজ্ঞাত হৃদিগুলি লও জিনি,
আমার মাথায় যে মাণিক জ্বলে আমিই তাহা না চিনি,
এত গৌরব সৌরভ রাশি কোথা হ'তে নাহি বুঝি,
মৃগমদময়ী মৃগীর মতন মরি সারা বন খুঁজি।
আমি এ অবােধ নারী
প্রেমের কোরক ভক্তিতে ফুটে কেমনে রুধিতে পারি ?
তুমি ভালবাস কত
পেলে এক কণা জুড়ায় বাসনা, ঢাললা ঝরণার মত।
রােগের শয়নে অরুণ নয়নে জাগিয়াছ সারারাতি
পক্ষের পুটে আচ্ছাদি সবি নিয়েছ বক্ষ পাতি।
অতিকরুণায় দিয়াছ লজ্জা, সজ্জা করি না তাই,
দেবি বলি ডাকো, দাসী-হওয়া ছাড়া মাের যে তৃপ্তি নাই
লােহার আঘাত সহিয়া অঙ্গে বুলালে কনক-কর,
প্রতিদান দিতে ক্ষণেকের তরে দিলে-কই অবসর ?
আমি দীন হীনা নারী
কেশ দিয়ে তব পদধূলি মুছি, আর কি করিতে পারি ?
( ৯৪
৯৪ )

কুণ্ঠাহরণ
কুঠাহরণ
এ অধম রূপহীনে, হে সুন্দরি, করেছ সুন্দর,
অনলে অঙ্গার যেন চন্দ্রিকায় বন্ধুর ভূধর।
শােভিয়াছি পদ্মকোষে রেণুমাখা মধুপের প্রায়,
লজ্জারুণ গণ্ড’পরে কালাে আঁখি যেমন মানায়।
হে কমলা, এ নির্ধনে করিয়াছ কুবেরের মত,
রেণু হয় স্বর্ণরেণু তব পদ চুমিয়া নিয়ত।
ঢালিছ প্রবাল হেম মুক্তা হীরা, অশ, হাসে ভাষে,
এ কুটীরে কোথা রাখি ? দিশেহারা করিলে যে দাসে !
তপে তুষ্টা ৰাণী মাের, মম ধ্যান ধারণার ছবি,
মূর্তিমতী এ মন্দিরে, এ মুখেরে করিয়াছ কবি।
গুঞ্জরি’ উঠিল প্রাণ, কিংশুকেও অর্পিলে সৌরভ,
কল্পলতা! বরষিছ কুসুমিত কবিত্ব-বৈভব।
আজিকে জীবন যেন অনুপ্রাসঝঙ্কৃত মূচ্ছনা,
তােমারি মঞ্জীরশিঞ্জে করে ছন্দ তােমারি অর্চনা।
হে নিৰ্মলা পূতশীলা, এ পঙ্কিলে করেছ নিৰ্ম্মল,
সংহত সংযত নত করি মাের যা ছিল চপল !
শঙ্খম্বনে সন্ধ্যাদীপে তব শুভ কঙ্কণ-নিনে,
পুণ্যের বােধন হলােশূন্য গৃহে কল্যাণের সনে।
সার্থকতা লভে দিব্য জ্যোতির্ময় তােমার নয়ন,
প্রতি পদপাতে মােরে নেতারূপে করিয়া শাসন।
( ৯৫ )

পর্ণপুট
-
প্রিয়া
খুলকোরক-দন্তে শােভন সুন্দর মুখখানি,
যেন বা মূর্ত পরমােৎসব বর্তুল পীন পাণি,
কণ্ঠে আমার যেন তা চন্দ্রকান্তমণির হার,
তব মুখেন্দুমরীচিতে স্বেদ-বিন্দু-বিলাস যার ।
বাণী তব, ম্লান জীব-রাজীবের বিকাসিকা, অবিরাম
এ তি মণ্ডলে বীণাপাণি হয়ে তুলে মঙ্গল-সাম।
অৰ্পণ করি ইন্দ্রিয়-পরিতৰ্পণ মধুরস,
অবসাদহত চিত্তে সতত রসায়নে করে বশ।
তােমার দৃষ্টি দুগ্ধের হ্রদে নিত্য করাও স্নান,
করিয়া রাজীব-কুটুলনিভ প্রণামাঞ্জলি দান।
নয়নে জ্যোৎস্না, কমলা কমলা আমার গেহে,
জীবনের সার হৃদয় আমার মূর্ত দ্বিতীয় দেহে।
বর্ষোপলের মতন শীতল চারু অঙ্গুলি তব,
যেন ঘনসারসিত সুকুমার
লবলীক
পরশ তােমার মূর্তপ্রসাদ, সব তাপ হরে মম,
চন্দন-নদে পরমানন্দে অবগাহনের সম।
হাস্য মােহন করে মাের মন সুধালিম্পনে ভরা,
পুলকাঞ্চিত ও-তনু ললিত ইন্দু মৃণালে গড়া।
বেপথু পুলক স্বেদে মণ্ডিত তনু তব প্রেমমাখা,
প্রাট-সমীরে স্পন্দিত ধীরে পুষ্পিত নীপশাখা।
কল নব।

শ্রীক্ষেত্ৰমঙ্গল
শ্রীক্ষেত্ৰমঙ্গল
এযে-মহামিলনের ক্ষেত্র,
শত শত দলে মিলন-কমলে ফুটে হেথা জ্ঞান-নেত্র।
অসীমার সনে সসীম মিশেছে, চেতন মিশেছে জড়ে,
নীলিমার সাথে দেউল মিলেছে, কেতন মেতেছে ঝড়ে।
সিন্ধু-আকাশে অবিশ্রান্ত দিগন্তে কোলাকুলি,
মিলন-স্বপন হেরিছে তপন লহরী-দোলায় দুলি'।
সন্ন্যাস সনে মিলে সংসার মঠে মঠে সুখে দুখে,
ত্রিদিব নামিয়া বসুধা উঠিয়া চুমে হেথা মুখে মুখে
এযে-মহামিলনের ক্ষেত্র
ফুটে
অনন্তে
অন্তর হেথা, ছুটে দিগন্তে নেত্র ।
এযে পরম প্রেমের স্বর্গ
নর সহ শিলারূপে করে লীলা হেথায় অমর বর্গ।
অযুতকণ্ঠে বিভুবন্দনা স্বরসঙ্গমে ছুটে,
মিলনানন্দ-মধু-মুচ্ছনা জড় জঙ্গমে উঠে
দীন-ধনবান নাহি ব্যবধান, মান অভিমান দলি’
চণ্ডাল দ্বিজ প্রসাদ-প্রসাদে রচে প্রেমমণ্ডলী।
লক্ষ কমল কুটুল জাগে প্রাঞ্জলি পাণিপুটে,
হৃদয়ের হ্রদে হেথায় নদীয়া-চঁাদের বিম্ব ফুটে ।
এযে-পূজা জপ তপে স্বর্গ,
হেথা মঠে মঠে সিন্ধুর তটে সবে লভে অপবর্গ।
( ৯৭ )

পর্ণপুট
হেথা—নাহি লাজভয়বন্ধ,
বাজিছে পাবন জীবন-শঙ্খে ভুবনবিজয় ছন ।
নহে কুষ্ঠিত হিন্দু-দয়িতা অবগুণ্ঠন ফেলি,
হেথায় বিলাসী ব্যসনে উদাসী রেখেছে ভূষণ ঠেলি'।
জড় জরা হেথা শৈশব সনে হয়েছে ঐকতানী
হেথা যৌবন মুদিছে নয়ন যুক্ত করিয়া পাণি।
ভক্তি এখানে মহাকীৰ্ত্তনে নাচিছে ‘বাহ’-হারা
নাহি মেতে ভায় সরে' র’বে হায় এ-প্রেমরাজ্যে কারা :
হেথা—নাহি ক্ষতি ক্ষয় দ্বন্দ্ব,
স্বত নত হয় হেথায় হৃদয় নাহি অবিনয়-গন্ধ ।
হেথা—অহমিকা করি’ চূর্ণ,
উদারতা করে দীনতা সুধায় অন্তর পরিপূর্ণ।
বিরাট বিশাল দেউলের ভাল রাজে নীলিমার তলে,
উজলিয়া বেদী বিরাটপুরুষ মহামহিমায় জ্বলে ।
উদাস উদার হেথা পারাবার ভতিছে বিশ্বরূপ,
তাহার কেশরে চরণ রাখিয়া নাচিছে বিশ্বভূপ।
কল্প ত্রিদিব অক্ষয় শিবভাণ্ডার দেছে খুলে,
বিরাটের নিতি বন্দনা-গীতি ধায় অনন্তকূলে।
হেথা-অভিমান করি’ চূর্ণ
তৃণ হতে হীন দীনতর ভাবে মনপ্রাণপরিপূর্ণ।
( ৯৮ )

শ্রীক্ষেত্ৰমঙ্গল
হেথা—এস নর মােহমত্ত,
ক্ষণেকের তরে ত্যজ তমােরজঃ ভজ শােকাপ সব্দ।
জীবনেরগ্লানি
ধুয়ে
অভিমানী ছেড়ে এস কোলাহল,
পিও হরিণাম-শতদল-মধু পরিণামে সম্বল।
ত্যজি ঘৃণাঘাের লালসার-ডাের বাধন কঠোর ছিড়ি,
হয়ে সবহারা ছুটে এস কারা-গণ্ডীপাথর চিরি।
নামাও স্বিন্ন সংসার-ভার, জাগ’ ম্রিয়মান
মেল বিলােচন ভজ’ অশােচন পাপ-বিমোচন ধন।
এসমম মন মদমত্ত,
ক্ষণেক এ ধামে মজ’ বিভুনামে, ভজ’ ভগবৎতত্ব।
হেথা—হের তুমি কত তুচ্ছ,
হের চারিধার বিরাট বিশাল অসীম উদার উচ্চ ।
নিম্নে উদ্বে সিন্ধু গগনে নয়ন মেলিয়া চাও,
জগদিলের মন্দির-তলে জগৎ ভুলিয়া যাও ।
সবি মায়া, এক মায়াধীশ ছাড়া ভবে নাহি কেহ আর,
ভেবে দেখাে মন, ফুটুক নয়ন, লুটুক ও-দেহভার ।
সব ভয় লাজ কবি জয় আজ জয়নাদ কর’ প্রেমে,
বিশ্বনাথের রথঘর্ঘরে ধুকধুকি যা থেমে।
হের—তুমি কত হীন তুচ্ছ,
বৈশ্বানরের খাণ্ডবদাহে তুমি শুধু তৃণ-গুচ্ছ ।
( ৯৯ )

পর্ণপুট
ভুবনেশ্বর
(মনির)
শান্ত তুঙ্গ হে দিব্যাঙ্গ দেবমন্দির,
জেগে আছ কত কাল তুলি উচ্চ শির।
তুমি বুঝি ছিলে আগে অনুচ্চ চঞ্চল,
দেবতার ছত্ৰসম কোমল ধবল ?
কত সন্ধ্যা-আরতির মঙ্গল বাজনা,
পূজামন্ত্র, পুস্পাঞ্জলি, পুণ্য আরাধনা
তােমা ঘেরি ঘেরি লভি শিলার আকার
গড়িয়া তুলেছে চুড়া তােরণ প্রাকার ।
ধ্যানমগ্ন শান্ত শত যােগর মহিমা
দেছে তােমা স্তব্ধ স্থির প্রশান্ত গরিমা।
ঘনীভূত ভক্তিপুঞ্জ অটল ভাস্বর
করিয়াছে অবিচল সৌম্য মনােহর।
প্রাঙ্গণ-তুলের তব যত হলো ক্ষয়,
লভিল ও-দিব্যদেহ তত উপচয়।
( বিন্দুসবােবর)
পুণ্য সত্ত্ব-রসােদয়ে দ-বিগলিত
সাধকের অশ্রুবিন্দু হইয়া মিলি
কত যুগ যুগ হতে, ওগে! সােবর,
ৰচিয়া তুলেছে তােমা বিরাট সুন্দর।
( ১০০ )

প্যালামো
কোটি কোটি তীর্থযাত্রী করি প্রণিপাত
খনিয়া তুলেছে তােমা ওগাে পুণ্যখ্যাত।
লক্ষকোটি সাধকের অর্ঘ্য-পুষ্পসব
মধুর করেছে তােমা দিয়াছে সৌরভ
সাধুর অমল শুভ্র হৃদয় কোমল
প্রতিবিম্বে ফুটায়েছে সিত শতদল।
সতীর অকস্পর্শে জেগেছে শৈবাল
তার শুভ্র শঙ্খশ্রীতে ছুটেছে মরাল।
পুঞ্জ পুঞ্জ পুস্পাঞ্জলি অর্ঘ্যনিবেদন
তব বক্ষে মন্দিরের করেছে সৃজন।
প্যালামৌ
ঐ যে গিরির গায় শােভিছে গিরি,
তমাল পিয়াল ছায় রয়েছে ঘিরি’
নীলাকাশে দিক শেষে ধূমাইয়া ঠিক মেশে।
দুলােক দেশের পথে সাজানাে সিড়ি।
স্বপনপুরীটি বুঝি মায়ায় গড়া,
পালকদুলানো-শত-পরীতে-ভরা।
কাছে বি যাও যত,
আরাে দূর, দুর কত?
নীল মরীচিকা যেন বুদ্ধিহরা।
( ১০১ )

পর্ণপুট
যেখানে আঙুল দিয়ে বালুকা খুঁড়ে,
জলপান করে রাহী আঁজুল পূরে।
যে নদী শুকানাে মরা,
দেখিবে, দু’কূলভরা
পার হয়ে কিছু পরে আসিতে ঘুরে।
পাষাণ-চিরিয়া যেথা ফোয়ারা ঝরে,
কোলবালা সাজে যেথা সিনান করে।
কোমরে দু’হাত দিয়ে নারী ফেরে জল নিয়ে,
তিনটী গাগরী রাখি মাথার’ পরে।
কালাে পাথরের ছবি নিখুত হেন
কিশােরী চলেছে ছুটে যমুনা যেন,
কে বলিবে ঝোপে ঝাড়ে উজান বহাতে তারে
বাশরীটি বারে বারে বাজিছে কেন ?
আপনার বাহুবল, প্রাণের প্রভু,
তরুণী এ দুটী সার, ভুলেনা কভু,
পতিরে বিধিতে এলে বুকে তীর ধরে ফেলে ;
প্রেম সে মাতাল বটে অটল তবু।
বকুলের বালা পরে বালক-বালা,
গলে শােভে লালনীল স্ফটিকমালা।
পাখীর পালক চুলে,
পুতির”নােল দুলে,
মহুয়ার ছায়াতলে নাট্যশালা।
( ১২ )

প্যালামৌ
মহুয়ার মদে চোখ ঘােরালাে ভারি,
জোরালাে জোয়ান কোল ধনুকধারী,
ভালুকে ধরিয়া কাণে গুহা হতে টেনে আনে,
বালক ঝপায়ে পড়ে পৃষ্ঠে তারি।
চকিত চটুল মৃগ আয়ত-আঁখি
ছুটেছে পিয়ালরেণু গায়েতে মাখি।
রঙীন-স্বপন-আঁকা
শিখীরা ছড়ায় পাখা,
একসাথে ধরে তান হাজার পাখী ।
মহুয়ার ফুলে সুরা চুয়ায়ে পড়ে,
মাদলে শিরীষ ফুল বাদল ঝরে।
দাড়ালে বকুল-মূলে
পা দু'খানি ডুবে ফুলে,
রূপ-অভিমানে নীপ শিহরি’ মরে ।
নদীতটে জ্যোছনার ফিনিক ফুটে,
মাণিক উজলে বনরাণীর মুঠে;
এলায়ে চিকন চুল
দু’কানে রতন দুল,
জোনাকী-চুমকি-খচা আঁচল লুটে।
ঢেউএর উপরে ঢেউ শােভিছে গিরি,
যেথায় নাহিয়া দিঠি আসিছে ফিরি ;
নাগবালাদের দেশে।
নিয়ে যায় দূতী এসে,
ঐ খানে আছে তার সুড়ং সিড়ি।
( ১০৩ )

পর্ণপুট
বন্ধু মানে
হেথা কাশীরাম কবি রসধাম বিলাললা অমৃত ভারতমন্ত্র ।
বাঙালী জাতির একাধারে শ্রুতি ইতিহাস স্মৃতিপুরাণতন্ত্র ।
পাঁচালীর পিতা দাশরথি হেথা পল্লীগীতার ললিত ছন্দে,
শক্তিভক্তি-সাধকবৃন্দে যুক্ত করিল মিলনবন্ধে,
প্রেমের গোঁসাই ঠাকুর নিমাই লভিল হেথায়ই বিরাগ-দীক্ষা,
‘লােচন’ কণ্ঠ ভাবগদগদ পথে করে ভবমােচন ভিক্ষা।
নরহরি কবিরাজ গােবিন্দ রসতরঙ্গে ডুবাল বঙ্গে,
ভক্তিপাগল কমলাকান্ত নৃত্যে মাতিল শ্যামার সঙ্গে।
বঙ্গবাণীর দারুতরীখানি সােণা করি দিল ভারতচন্দ্র,
কলঝঙ্কারে ‘কঙ্কণ’ বাণী-বেণুতে ফুটাল নবীন বন্ধ
হেথা রঘুনাথ ছুতনা অন্ন না রচিয়া শ্যামাজন নিত্য,
কবি ঘনরাম দিল শ্ৰীধৰ্ম্মমঙ্গল গীতে অমৃত বিত্ত।
হরিকীৰ্ত্তনে নৰ্তনশীল হেথাকার প্রতি বিটপীবল্লী।
সাধুদরবেশ বাউলের দেশ, ব্রজরজে গড়া সকল পল্লী।
শঙ্কর সুখী এর ধুতুরায়, শঙ্করী খুসী ইহার শঙ্খে,
বৈষ্ণব-বেদ হেথা উদীরিত অজয়-গঙ্গামাতার অঙ্কে।
গিয়াছে সেদিন, ধানের ক্ষেতের ধুলিগুলি ছিল রতনচূর্ণ,
দীঘি মীনে-ধনী, মণিভরা খনি, পীন বেণুধনে ভবন পূর্ণ।
ক্ষুধাতৃষাবােগে আজি দেশ ভােগে শাসে রবিত ভৌম মন্ত্রী,
লুতন্তুতে গুষ্ঠিত তবু আজো
তবু আজো বুক হ’তে ছাড়িনি তন্ত্রী।
L
( ১০৪ )

নিদাঘে মহানদীকূলে
.
নিদাঘে মহানদীলে
বড় আশা করে আজি আসিলাম চিরতৃষাতুর,
মহানদি, তব জলে তৃষ্ণাঙ্খলা করিবারে দূর।
বড়শাধ ছিল এই তৃষাশুষ্ক আঁখিযুগ দিয়ে
অমল অমেয় তব বারিরাশি নিব সবি পিয়ে।
নদী মধ্যে রাজ্ঞীগণ মহামান্যা তুমি মহানদী
ভেবেছিনু তপ্ততৃষা যাবে চলে দেখা পাই যদি।
কিন্তু দেবি একি দেখি ধূধূ শুধু বালুকাকঙ্কাল
তৃষ্ণাহরা কোথা শান্তি ? কোথা রসভাণ্ডার বিশাল ?
মূর্তিমতী তৃষ্ণা তুমি শুকণ্ঠা আজি ভিখারিণী,
দাউ দাউ জ্বলে জ্বালা-মৃগতৃষা অনলবাহিনী।
কোন সুধাসিন্ধু লাগি অগস্ত্যের তৃষ্ণা বহ হায় ?
কোন্ মন্ত্র জপিতেছ, মহাশ্বেতা, অমালিকায় ?
বড় আজ দিনু লাজ প্রার্থী হয়ে ওগাে মনস্বিনি,
তপস্বিনী তুমি দেবি এবে নিঃস্বা আগে তা জানিনি।
অতিদানরিক্তা আজি ফিরাবে কি তুমি প্রার্থিজন ?
মৃৎপাত্রে আতিথ্য বয়ে আনিবেনা রঘুর মতন ।
তুমি অন্নপূর্ণা, শুনি আসিলাম তােমার সকাশ,
কিন্তু একি মূৰ্ত্তি তব ? এত তব নহে মা কৈলাস।
শ্মশানবাসিনী তুমি, অট্টহাস্য মুখে অবিরল,
নৃ-কঙ্কালভস্মমুষ্টি ভিক্ষা দিতে তােমার সম্বল।
}

পর্ণপুট
সপ্তগ্রাম
রাঢ়বঙ্গের রাজধানী তুমি, প্রাচীলক্ষ্মীর সিংহদ্বার,
বিজয়ধ্বজা বহেনাক আজ তব গৌরব শৃঙ্গ আর। .
জাগে অমারাতি, কোথা হেমবাতি ? দীপচূড়া আজ ধ্বংসশেষ,
ধরে না তরণী কেলি-কুতূহলে তােয় লাগি রাজহংস-বেশ।
সিংহল চীন রােম কার্থেজে বহেনাক পােত পণ্যভার,
বিশাল স্বর্ণ-ভাণ্ডার আজি শূন্য হয়েছে অন্নদার ?
লুপ্ত তােমার কীর্তি-গরিমা শ্মশান হয়েছ সপ্তগ্রাম,
লক্ষ্মীবাণীর মিলনতীর্থ অজি তুমি অভিশপ্ত ধাম।
সাধু শ্ৰীমন্ত তব মেখলায় পরায়ু না মতি-চন্দ্রহার,
‘ধনপতি’ ‘চাদ’ আসে না বেচিতে এল-লবঙ্গ গন্ধভার ।
অভ্রংলিহ হৰ্ম তােমার পণ্য-বীথিকা লুপ্ত আজ,
মুক্তা কিনিতে মগধ-বণিকে পাঠায় না আর ‘গুপ্তরাজ'।
বসেনাক আর ত্রিবেণী ক্ষেত্রে চারুশিল্পের রত্নহাট,
অতলে ডুবেছে শৌর্য্য তােমার পাতালে নিহিত প্রত্নপাট
জ্ঞান-বিজ্ঞান-কলা-বাণিজ্যে পরম পূজ্য সপ্তগ্রাম,
বস্মৃত আজি কাল-সিন্ধুতে তােমার বিশ্বব্যাপ্ত নাম ।
(১০৬)
{

সপ্তগ্রাম
গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর সঙ্গমভূমি পুণ্যময়,
বঙ্গ-প্রয়াগ, অঙ্গে তােমার পাপী পাপলেশশূন্য হয়।
নিত্যানন্দ নৃত্যানন্দে বিলাল এখানে নিত্য-ধন,
রঘুনাথ হেথা নিল ঝুলি কঁাথা তেয়াগি হৰ্ম্ম-বিত্ত-জন।
উদ্ধারণে উদ্ধারপীঠ, লুটি তব পূত মৃত্তিকায়,
এখনাে ‘মাধবী-কুঞ্জ' গরবে তাহার সুরভি কীর্তি গায়।
প্রত্নধনের ধাত্রী, জননী রত্নগর্ভা, সপ্তগ্রাম,
শূন্যে আজিকে বিলীন মলিন তােমার পুণ্য দীপ্তিদাম।
দিগবিজয়িনী চতুষ্পঠীর নাহি এ শ্মশানে চিহ্ন আর,
‘সরস্বতীর বালুতে লুপ্ত সরস্বতীর ছিন্ন হার।
আজি গঙ্গার তটে তটে আর নিখাত হয় না যজ্ঞ-যুপ,
শিবের বদলে শিবা রাজে মঠে, জ্বলে না দেউলে অর্ঘ্য-ধূপ। •
শশাচনীয় তব পরিণাম ফল নিয়তির অনিবাৰ্য্যতার,
লক্ষ্মী গেছেন গােলােক ফিরিয়া পেচক নিয়েছে রাজ্যভার ।
মথুরা কোশল গৌড় গিয়াছে, তুমিও গিয়েছ সপ্ত-গ্রাম,
যুগে যুগে জয়ী রুদ্র এমনি ধ্বংস-প্রয়াসে আপ্তকাম ।
( ১০৭ )

পণপুট
প্রশ্মক্ষেত্র
হিমগিরি তব পূজা-মন্দির, সােপান-বেদিকা শৈলমালা,
দেবের পাদ্য নদীর কোশায়, কেদার-কানন, অর্ঘ্য-ডালা।
কুঞ্জ-কূজনে কল গুঞ্জনে পূজা শুরু গৃহে নিত্য নব
মহাসিন্ধুর দুন্দুভি-নাদে জীমূতমন্দ্রে আরতি তব।
গৃহ-প্রাঙ্গণ ভরা আলিপনে, শুকানাে প্রসাদী ফুলের স্তুপে,
তব ঘাট ভরা কুশাঙ্গুরীতে, তব বাট ভরা দগ্ধধূপে।
ব্যানযােগজপে জ্ঞানযাগতপে প্রতি রেণু পূত তিলকামৃত,
তােমার মাটিতে ঘঁটিতে সতত ভব-ভয়ে তনু কণ্টকিত।
গােধন তােমার করেছে পােষণ তাপস-জীবন, দেবের যাগ,
নৃপের ঋদ্ধি,-ধাত্রী বলিয়া লভেছে শ্রদ্ধা-সেবার ভাগ।
নীবার-দর্ভে তৃপ্ত শ্বাপদ যজ্ঞে প্রহরী হয়েছে বনে,
আশ্রমশিশু বিক্ৰমে দমি’ যেথা কেশরীর দশন গণে।
বেণুকর-ধনে নাচিয়া নাচায় ক্ষণিরাজ নিজ ফণার’ পরে,
রচে দেবতার কৃত্তি-মেখলা, সিন্ধু-শয্যা,“ছত্র ধরে।
শাখামৃগ তব সতীর ভক্ত, রথীর রথের চূড়ায় রহে,
দেবীপাদপীঠ সিংহের শির, মকর গঙ্গাদেবীরে বহে।
দেবের ব্যজনে লােমশ পুচ্ছ দিয়াছে তােমার চমর-বধু,
তুচ্ছ জীবন করে সমুচ্চ মধুমক্ষিকা বিতরি মধু।
মৃগমদ-রস-গন্ধবিনােদে বলে দেবীরে গন্ধসার,
দ্বিরদ,-কুম্ভ, শুক্তি,-মৰ্ম্ম বিদারি দিয়াছে মুক্তাহার ।
( ১০৮
১৮ }

শিলা, কুঙ্কুম-সিন্দুর, দিল কঙ্কালমাল। টঙ্কে ভেদি,
কুশশমী নিজ হৃৎপঞ্জরে পিঙ্গল করে যজ্ঞবেদী।
হৃদয়-তন্তু দিয়া কীট তব বুনেছে দেবীর ক্ষৌমপট,
বক্ষোধির-লাক্ষাধারায় রাতুল করেছে চরণ-তট।
‘কৃষ্ণ-কৃষ্ণ রাম-রাম’ বিনা শুক-মুখে নাই অন্য বুলি,
ক্রৌঞ্চ আপন বক্ষেরুধিরে রামায়ণী ধারা দিয়াছে খুলি।
তিত্তিরি কতপােবনে বসি উপনিষদের তত্ত্ব কয়,
কৃতকপুত্র শিখিকরিমৃগ করিল মাতৃ-মমতা জয়।
অটবী পেলেছে ঋষিগণে বট-অশােক-বি-কুঞ্জছায়,
হােমধূমে তার কষায় নয়ন অরুণ কুসুমপুঞ্জে ভায়।
ঋষির হবিতে সমিধ যােগায়ে তরুগণ তব যজ্ঞরত ,
জট-বল্কল অক্ষমালিকা ভৃঙ্গার ধরে ঋষিরই মত।
দারু তৃণ চারুশিলায় মিলিয়া দিল দেবতায় সুরভি রস
দেউলে দহিয়া মরিয়া লভিল ধুপগুগগুলু অমর যশ।
শুচি নিরাময় করেছে গােময় কমলা মায়ের আঙিনাতল,
দেবশােভা লাগি ফুটে তব ফুল, দেবসেবা লাগি জনমে ফল ।
বহে শুভাশিস দূৰ্বার শীষ, মঙ্গলমৃৎ, মৃগ-বােচনা।
ধান্য তােমার অন্নদা মা’র অঞ্চলঝরা কনক-কণা।
বৈশাখী ঝারা জাহ্নবীধারা পুণ্যতরুর গাত্রে ঢালে,
তুলসী-কুঞ্জ সান্ত্বনা-বাণী গুঞ্জরে মহাযাত্রাকালে।
স্বরগের ঘাটে নিতি খেয়া দিতে ভীষ্মমারে করেছ ব্ৰতী ।
স্নাত পাতকীর পাপ হরে রেবা সরযু কাবেরী সরস্বতী।
র
( ১০৯ )

পণপুট
অলােকামৰ্ষ জড়ের শীর্ষ ঋষির চরণে ছোঁয়ায় শিলা,
জগজ্জননী করে গিরিকূটমনঃশিলায় তনয়ালীলা।
সত্ত্বমধুর পুলকাঙ্কুর-সঞ্চার সম ভক্ত-দেহে,
শতেক তীর্থ, মঙ্গলপীঠ জাগিয়া উঠিল তােমার গেহে।
অম্বুধি কোটি কম্বকণ্ঠে মঠমন্দিরে গাহিছে জয়,
যাগসম্ভব অদ্ভুদ তব ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে বন্দী রয়।
ব্রহ্মী উষায় জাগি মৃদঙ্গে মঙ্গলারতি-শঙ্খতারে,
তব সুত চায় ভক্তসভায় রক্ত তরুণ অরুণ পানে।
স্নানপথ হতে সিক্ত বসনে ডেকে আনে গৃহী অনাথজনে,
'ভােগে’ দেবতার ক্ষুধা হরে বলি’ রন্ধনে গৃহযজ্ঞ গণে।
পঞ্চযজ্ঞ সারি তব গৃহে অভ্যাগতেরে তুষিয়া নিতি ,
তৃতীয় প্রহরে আমিষশূন্য হবিষ্যান্নগ্রহণ রীতি।
সাধিয়া নিত্য সন্ধ্যাকৃত্য সুপ্তি তােমার ক্লান্তিহরা,
পালঙ্কে স্বপ্নে নেহারে জট্টা-কর-দণ্ড-ধরা।
নিশাতমঃ আরতি আলােকে, ভােজ্য তােমার পূজার ভােগ,
দেউল-সােপানই শয্যা তােমার, তুলসীর মাটি বিনাশে লােগ।
হরিনাম-লেখা তিলকই ভূষণ, তীর্থের ধূলি অঙ্গরাগ,
গার্হপত্য মরণের চিত, সেই অনলেই নিত্য যাগ।
পূজাফুলে দিন গণে বিরহিণী, হরি বলি ফেলে উষ্ণশ্বাস’
তনয়র নাম ‘শিবকিঙ্করী” তনয়ের নাম ‘দুর্গাদাস'।
জননী তােমার অন্নপূর্ণা, জনক, - শ্মশানে বিরাগী যযাগী,
তব অপত্য ইহ-পত্ৰ-শুভ-মিলনের সুফলভােগী ।
( ১২০ )

ধৰ্ম্মক্ষেত্র
মঠ-মন্দির-প্রতিমাগঠনে পরিকল্পিত শিল্পকলা,
সঙ্গীত তব পূজারই অঙ্গ,-ভক্তি তরল নয়নে-গলা।
তব সাহিত্য সতীর সতের সত্যশূরের কীর্তি গায়,
ধ্রুববাণী ছাড়া অন্য বারতা ইতিহাস নাহি বহিতে চায় ।
গৃহীর ভক্তি সাধুর সাধনা মিলিয়া যােগীর জ্ঞানের সাথে,
শিলা-বিগ্রহে দারু-পুত্তলে জাগ্রত করে জগন্নাথে।
জননী জানিয়া গৃহে গৃহে গৃহী পূজে নির্ভয়ে রুদ্রাণীরে, .•
হেরি রুদ্রের দক্ষিণ মুখ ডরে না শিহরে, দাড়ায় ঘিরে।
কৰ্ম্মে তােমার শুধু অধিকার বিভুপদে-পা কৰ্ম্মফল,
মরণ মিথ্যা, অমরার সে’ত নব বাস পরার ছল।
মােহ-মেঘে প্রেম রহিলে মগন নিখিল ভুবন বিস্মরিয়া,
অভিশাপ আসে উদ্যত জটা বিদ্যুচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া ।
পতির চিতায় শােয় তব নারী, নিখিল-শিয়রে মা হয়ে জাগে,
ব্রহ্মচারিণী, ব্রহ্মবাদিনী, শাশ্বত বিনা কিছু না মাগে। •
এ-নর-জনম,-প্রােষিত জীবন, ভােগসুখ-পূতি-পিশিতক্লেদ,
গৃহদাহে দ্বিজ আর সব ফেলি খুঁজে ফিরে নিজ যজুদে।
ধর্মাচরণে পরিণয় তব, উজলিতে কুল চাও যে সুত।
বর্জন তরে অর্জন তব, আনমার্জনা, হইতে পূত।
কৰ্ম্মবলের লাগি যৌবন অতিথিরই তরে গৃহীর গেহ।
পুনর্জন্ম জিনিতে জনম, আত্মারই লাগি দেহীর দেহ।
যােগের লাগিয়া স্বাস্থ্য স্বস্তি, তপের লাগিয়া কঠোর যােগ।
শুধুপ্রবৃত্তি-পরিপাক তরে নিবৃত্তিমুখী অচিরভােগ।
'( ১১১ )

পর্ণপুট
ইন্দ্রদেবের প্রসাদের লাগি হােমানলে দেয় আহুতি হােত।
তরুণশক্তি লভি জন্মিতে ইচ্ছামরণবরণ প্রথা।
তব ব্রতকৃশ ঋষি-শিষ্যের ক্ষীণ তর্জনী-হেলন-ভরে,
রথীর কিরীট, উদ্ধত বাজি, উদ্যত অসি নমিয়া পড়ে।
নৃপতি তােমার প্রকৃতি পিতা, জনক শুধুই জন্মহেতু।
প্রসাদ, অটবী এ-পার-ও-পার, মাঝখানে চির ত্যাগের সেতু।
আৰ্তে তারিতে, সত্যে সেবিতে, ক্ষাত্রশক্তি অস্ত্র ধরে,
শির’ হতে ‘সারে’ বড় গণি প্রাণ সঁপে প্রাণাধিক ব্রতের তরে
দীন ভিখারীর ক্ষুদের লাগিয়া বাধা ভগবান কুটার দ্বারে,
দৈন্য তােমার মধ্যমাণিক লক্ষ নিধির কণ্ঠহারে ।
হরিনামামৃতে গীতাঞ্জলিতে আত্মার নিতি করাও স্নান,
কূলে কূলে ভরা প্রেমবন্যার কুলুকুলু তানে জুড়াও কাণ।
স্তন্যের সহ দিলে এ কণ্ঠে পাপতাপহর হরির নাম,
আশিস্ তােমার বরেরই সমান, সতত পূরায় মনস্কাম।
শিখালে ক্ষমিতে চির বৈরীরে, বীরবৈরী নমিতে পায়,
কীৰ্ত্তন-পথ-ধূলি তুলি হাতে দিলে সস্নেহে মাথায় গায়।
অঞ্জলি দিলে কুসুমে ভরিয়া, প্রণিপাতে দিলে নােয়ায়ে শির,
বক্ষ ভরালে মােক্ষ-আশায়, চক্ষে ঝরালে ভক্তি-নীর।
তুমি যে মােদের ধর্মক্ষেত্র, ভারতমাতার কর্মভুমি,
ধন্য জনম, তােমার জীবন-মরণ-শরণ-চরণ চুমি।
১ম খণ্ড সমাপ্ত

কুঞ্চিকা পৃ: ১। বঙ্গবাণী, কলিকাতা-টাউনহলে ৭ম বঃ সাহিত্য সম্মিলনীর মঙ্গল, চরণ-সঙ্গীত। শিখণ্ড - শিখিপুচ্ছ। জ্ঞান-গােবিন্দ –পদক জ্ঞানদাস ও গােবিন্দদাস। নেশচন—শ্রীচৈতন্যমঙ্গল কার । শ্যামাঙ্গী-শ্যাম-শ্যামা-সঙ্গীতময়ী। কবিরাজ-শ্রীচৈতন্যচরিতা মৃতের পরিবেষক কৃষ্ণদাস। তমসাতীর্থ বাল্মীকির আলম। ২। প্রভাকর-১। সূয্য, ২। প্রভাময় হস্ত, ৩। ঈশ্বরগুপ্তে, সংবাদ প্রভাকর-পত্রিকা। এ-রাজপুত। গৃহমন্দিরে, দীনবন্ধু সাহিত্যে গার্হস্থ্য ভাবের ১ম প্রবর্তক। ভূদেব ---১। ব্রাহ্মণ, ১। ভূদেববাবু। পাঞ্চজন্য—নীনচন্দ্র কাব্যে শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। হৈম ১} স্বণময়, ১। হেমবাবুর। বঙ্গম -বীণা। পরিবেশ (৪) মণ্ডল--সূয্যের চারিপাশে জ্যোতিৰ্ম্মণ্ডল (Ilalo), “লক্ষ্যতে স্ম তদনন্তরং রবিবদভীমপরি বেশমণ্ডলঃ” --- কাহাসি কান্না ইঃ-রবি বাবুর ‘রাজা' হইতে। দ্বিজরাজ : দ্বিজে। গােছমাধুরী--দাশুরায় গােষ্ঠসঙ্গীত রচয়িতা। পৃঃ ৩। ডামর—কোলাহলময়, ভীষণ । পৰ্য্যাপ্তং মা রমণীরডামরত্ব সংধত্তে গগনতলপ্রয়াণবেগ।” -মালতীমাধব । ইচাপ-~~ রামধনু। দুরিত পাপ করােটি খৰ্পর। মহাশঙ্খহায়-- হাড়ের মাল। মেঘপঙ্কভার --শৃঙ্গাগ্রল গ্রাম্বুদবপক্ষ••• ককুষ্মানিব চিত্রকূটং”-- কাঃ পিনাক-শিবধ অট্টহাসি-- ‘রাশীভূত শঙ্করত্যাহাসঃ কাঃ ত্রিতাপ-আধিদৈবিকাদি। পৃ: ৫। তিন ঋণ—পিতৃঋণ, ঋষিঋণ ও দেবঋণ-মানবের সহজাত খণত্রয়।..শফরী-পুঁটিমাছ। গণ্ডুষজলমাত্রই তাহার সম্বল। p ২। সত্য, ----- পৃ: ৭। কাষায়—রক্তবর্ণ। লুলিত -অবসন্ন। চারিপাশে....আঁখি - “শুচো চতুর্ণাং জ্বলং শুচিস্মিত হবিভুজাং মধাগত সুমধ্যমা। বিজিত্য নেত্র প্রতিঘাতিনীং প্রভাষনন্যদৃষ্টিঃ সবিতারমৈত।” শুয়ে হ'ল কঁপে -ব্যাসদেবের সমক্ষে পাণ্ডুধৃতরাষ্ট্র-জননীৰ কথা স্মর্তব্য। কেদারী---কেদারী রাগিণীর রূপ দ্রষ্টব্য। পৃঃ • | উত্তম—ধ্রুবের বৈঃ ভ্রাতা। ৩। ধ্রুবতারা। সুচি ও সুনীতি (দ্যৰ্থক) -- ধ্রুবের মাতৃদ্বয়। পৃ: ১১। শ্বাশ্বত(?)শাশ্বত। তব ঋক মন্ত্রে —শতদ্রর উদ্দেশে বিশ্বামিত্রের ঋকের অনুবাদ “তীথ-সলিলে” দ্রষ্টব্য। এই ঋকের দ্বারা- বিশ্বামিত্র দুস্তর শতকে ‘সুপ্রতর করেন। পুষ্কর তীর্থে ইনি তপস্যা করেন। কলাশিশু-শকুন্তলারূপা। শকুন্ত—পক্ষী। শুক--ভগবান কৃশাশ্ব হইতে প্রাপ্ত সমন্ত্র, অস্ত্র, তাড়কাবধে পুরস্কারস্বরুপ রামচন্দ্র প্রাপ্ত হন-এতানি সরহানি.... বিশ্বামিত্রমুপসংক্রান্তানি তেন চ তাড়কাবধে প্রসাদীকৃতানি আৰ্য্যশ্য।' --উত্তরচরিত। কামৰূপং কামরুচিং মােহমাবরণং তথ জম্ভকং •••• করতে।” রামায়ণ। রাজপরীক্ষা---হরিশ্চলের কথা। অভিশপ্তা -অহল্যা। যজ্ঞদ্রোহী —তাড়কা ইত্যাদি। মাতৃহা —(১) ভৃগুরাম (২) দেশদ্রোহী। গায়ত্রী --বিশ্বামিত্রই গায়ত্রীর ঋষি। অতিবলা বলা ও অতিবলা রহস্যময় মন্ত্রবিদ্যা । বিশ্বামিত্র রামচন্দ্রকে দান করেন –“গৃহাণ দে ইমে বিদ্যে বলা মতিবলাং তথা। ন মে শ্ৰমােজরাবােভ্যাং ভবিতা নাঙ্গবৈকৃতং,” ইত্যাদি-রামায়ণ। সতাশিব,-শূর-সতী-রামচন্দ্র ও সীতা। রাজর্ষিজনক। “জনকানাং রঘুনাঞ্চ সম্বণ কস্য ন প্রিয়। যত্র দাতা গ্রহীতা চ স্বয়ং কুশিকনন্দন।” উঃ চঃ। পৃঃ ১২। রুণ্যে অরুণা মদনভম্মের পূর্বের উমা। কী মাল্য। অপর্ণা -তপস্বিনী উমা,-গলিত পৰ্ণ পৰ্য্যক্ত আহার করিতেন না। .

‘স্বয়ং বিশীর্ণক্রমপর্ণবৃত্তি পরাহি কাষ্ঠা তপসস্তয়া পুনঃ। তদপ্যপাকীর্ণমতঃ প্রিয়ংবদাং বদন্তপর্ণেতি চ তাং পুরাবিদ।” পৃ: ১৪। ঘনসার-কপূর! কুসুম' স্থলে -কুঙ্কুম পাঠ্য। বােচনা-~- গােরােচনা। ক -যজ্ঞে ধৃত ঢালিবার হাত। রসব্ৰহ্ম- রসােবৈ সঃ।" শেন-বাজপাখী। জটাশুষ্ক জটিলতা। পৃ: ১৫। অশান --সংজ্ঞাহীন। ভক্ত-রামচন্দ্রাদি। প্রহরণ --- । পৃ: ১৮। রায় --রামমােহন। সেন -কেশবচন্দ্র। ঠাকুর—‘মহর্ষি সাগর—বিদ্যাসাগর। দত্ত - রমেশচন্দ্র - অক্ষয়কুমার ইঃ। মিত্র রাজেন্দ্রলাল দীনবন্ধু ইং। গুপ্ত—ঈশ্বরচন্দ্র রজনীকান্ত ইঃ। বসু চন্দ্রনাথ, অমৃতলাল ইঃ। মতি—মতিলাল দোষ। স্বর্ণ -- হারাণী স্বর্ণময়ী। তারক—পালিত। মণি -- মহারাজ মণীন্দ্র । শ্ৰীকৃষাস-পাল। মৈত্র অক্ষয়কুমার, হেরম্ববাবু। অবনী-- অবনীন্দ্রনাথ। সৈন্যাপত্যেকর্ণেল সুরেশ বিশ্বাস। চিত্ত--- দেশবন্ধু। সেন—দীনেশচন্দ্র। সরকার যদুনাথ। শাস্ত্রী--- রাজেন্দ্রনাথ, হরপ্রসাদ। অরবিন্দ ঘােষ। পৃ: ১৯। ভিটা—ফুলিয়াগ্রামে। বল্মীক -বাল্মীকির জন্মস্থান। কধুকী - ‘অন্তঃপুরচরােবৃদ্ধে বিপ্রােগুণগণান্বিত সৰ্ব্বকায্যার্থকশন্সঃ কঞ্চুকীত্যভিধীয়তে।” রতি অনুরক্তি। সিতিম-শুভ্র। পৃ: ২ | হবন-যজ্ঞ। বিদায়-ভার - দাশরথি লােক-শিক্ষক। গােরস -- দুগ্ধ—‘গােরস গলি গলি ফিরে সুর বৈঠল বিকায়। নবমন্ত্র-- ব্রাহ্মধৰ্ম্ম। নিরসন-দাশুরায় পাঁচালীতে ‘যে-কৃষ্ণ-সেই কালী এই সত্যের প্রচারক। শিক্ষাশালা - বিশ্ববিদ্যালয়। পৃঃ১১/১২ ! লােকোত্তর—অলােকসামান্য। দৃগ্বিহঙ্গ—দৃক : দৃষ্টিরূপ পক্ষী। অয়ােরূঢ়—লৌহকঠোর। পিশঙ্গ—পিঙ্গল (কুমুদ্রতীরেণুপিশ বিগ্রহং)। প্রাংশুল্য—প্রাংশুলভে ফলে লােভাদুদ্বাহুর বামন। প্রাংশু-বিরাট-দেহ। নিৰ্ম্মন—নীরাজন—নিছনি।

পৃঃ ২৩। দ্বিজরাজ—চন্দ্র। রবি-রবীন্দ্রনাথ তখন ইউরােপে। শূর দুর্গাদাস—রাণাপ্রতাপ ইঃ। সুরধুনী—(১) গঙ্গা, (২) সুরের বাহ। মন্দির ত্যজি—এখানে দ্বিজরাজ ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ। নটরাজ- নাট্যগুরু। মঞ্জীর—রঙ্গমঞ্চের ব্যঞ্জনা। দ্বিজরাজ – বিহগরাজ। প্রঃ ২৪। বােধিমের শাখা-ত্যাগী ও জ্ঞানিব্যক্তিগণ। চিত্ত-মেধ~- যে যজ্ঞে চিত্তকে উৎসর্গ করা হইল। প্রবালকীটের সাধনা ... প্রবালদ্বীপ বহুলঙ্গ বৎসরের প্রবালাস্থির সমবায়। পৃ: ২৫। সাহস বিত্ত তাের+প্রায়শ-চিত্ত মাের। ৭ অক্ষরের মিল । ইন্দ্রগণের—শাসকগণের। বিষ্ণুচরণ স্বিন্ন... - ভগীরথের মত। পৃঃ ২৮। গঙ্গাধর-ধন্বন্তরিকল্পসৰ্ব্বশাস্ত্রজ্ঞ মহাজ্ঞানী কবিরাজ । অশ্বীদু’জন—অশ্বিনীকুমারদ্বয়। অনাময়—স্বাস্থ্য। শসঞ্জীব-- মৃতসঞ্জীবন। ভ্রান্তিমেধ -যে যজ্ঞে ভ্রান্তিই বলি-স্বরূপ। স্থণ্ডিল -- যজ্ঞভূমি। গঙ্গাধর-নামের জন্য ‘জটাজালে ঝরে ইঃ। পৃঃ২৯। কল্যাণীবাণী-কল্যাণময়ী সরস্বতী ও কান্তকবির কাব্যগ্রন্থের নাম । পৃ: ৩০। প্রপঞ্চইন্দ্রিয়গােচরগত জ্ঞান। প্রসাদ-রাঞ্জ প্রসাদ। ম. পৃ: ৩১। নীলকণ্ঠ—পদাবলী-রচয়িতা, বিখ্যাত গীতাভিনয়ের গুরু। মধুখ-মােম। দ্রোণ পুষ্প - গলঘেসে ফুল, রাঢ়দেশের মাঠে ফুটে। নাহি চন্দ্ররাজ্ঞী রূপ তার,দক্ষযজ্ঞের প্রারম্ভ স্মর্তব্য। পৃ: ৩২। মেধ্য পবিত্র। নীলকণ্ঠ-ময়ুর। শিখণ্ডক - ময়ূরপুচ্ছ। পৃ: ৩৩। তটুকু যৈছনেবাঢ়ত মৃণালক সূত। ধু-পূর্ণিমা-বসন্ত পু। পৃ: ১৪। আশাবৃন্ত--‘আশাবন্ধঃ কুসুমসদৃশ.. বিপ্রয়ােগে রুণদ্ধি। মেঘ। পৃ: ৩৫। কত-রৰ। কক—কঁচুলী। কদম্বের শাখা ইঃ-উত্তরচরিছ হইতে গৃহীত অলঙ্কার। অসন্নদ্ধ—আবােল তাবােল। স্নাতক ব্রহ্মচর্য আশ্রম হইতে গার্হস্থ্যধর্মে প্রবেশােম্মুখ যুবক। পৃঃ ৪২। 'পাউস’ প্রাবৃটের প্রাকৃতরূপ-রাদেশে প্রচলিত, বৃষ্টির সময় মাছ ধরিবার সুযােগবিশেষ। খুটে-স্থলে-ঘুটে পাঠ্য। ৫ পৃ: ৫। বিয়ােগিনী এই ছন্দ সংস্কৃতকবিরা বিলাপের জন্য ব্যবহার করিতেন। যেমন কালিদাসের রতিবিলাপে অজবিলাপে। পৃঃ ৫৫ | ‘অন্ধকার বৃন্দাবন' কবিতাটির খ্যাতিবৃদ্ধিতে ব্যথিত হইয়া কোন কোন সাহিত্যিক বলেন, এ কবিতায় কবির কোন কৃতিত্ব নাই, কারণ ঠিক এই ভাবেরই একটি কবিতা ‘প্রচার-পত্রিকায় নবকৃষ্ণ বাবু লিখিয়াছেন। সে কবিতাটিও সুন্দর, কিন্তু ত তাহা আপন গুণে লােক কান্ত হইয়া উঠে নাই। এই কবিতাটীকে হীনপ্রভ করিবার জন্য ইদানীং সেটীর মুহুর্মুহু ডাক পড়ে। প্রাচীন বৈষ্ণব কবিগণ কবিতার ভাবটীর সঙ্গে ভাষা ও অন্যান্য উপকরণ সবই দিয়া গিয়াছেন। কাজেই এ বিষয়ে নবকৃষ্ণবাবুরও কৃতিত্ব নাই, কালিদাসবাবুরও কৃতিত্ব নাই। যদি কিছু কৃতিত্ব থাকে তবে রচনা-ভঙ্গিতে। কৌতূহলী পাঠক দুইটীই পাশাপাশি পড়িয়া দেখিলেই পারেন। পৃঃ ৫৯। ঘনবরণী-মেঘবরণী । লক্ষা-ক্ষীরে দুধে আলতায়। পৃঃ ৬৩। নয়ন-পলাশ—চোখের পাতা। সােমকান্তস্বিন্ন-কবিপ্রসিদ্ধি আছে, চন্দ্রিকাসম্পাতে চন্দ্রকান্ত মণি স্বেদসিক্ত হয়। সীধু- আসব, সুরা। চখাচখী রাত্রিতে মিলিত হয় না বলিয়া কবি প্রসিদ্ধি আছে...সেজন্য ‘মিলাইব চখাচখী’ এবাক্য অলঙ্কৃত। পৃ: ৬৭। বিবাহের কুশণ্ডিকার পর দিন কবির হঠাৎ মাতৃবিয়ােগ হয়। পৃ: ৭১। চরণের চপলতা, ধরিতে। বিদ্যাপতির ‘বয়ঃসন্ধি হইতে। পলাশ দল, পাপড়ি। বিতান•••পাল। পৃঃ ৭৫। ‘পাহাড়িয়া শব্দে কবি ছােটনাগপুর অঞ্চলের পাহাড়কে লক্ষ্য করিয়াছেন। বীরতরু...অর্জুন বৃক্ষ। নমেরু রুদ্রাক্ষ বৃক্ষ । কুটমল্লিকা, কূটজ (কূট...গিরিকুট) কুড়চী। কস্তু --(মঙ্গল) শঙ্খ। ছায়ামণ্ডপ...আঙিনার ছানাতলা। পৃ: ৭৬। মুক্তির ১ম পংক্তিতে মুক্তি’ ও ‘রুদ্ধ’ ও শেষ পংক্তিতে ‘মুক্তি f ও ‘বন্ধন’ অলঙ্কারের সৃষ্টি করিয়াছে। পর প্রেম•••ভূষণ এক সূতে সকলমবলামণ্ডনং কল্পবৃক্ষ। কাঃ পৃঃ ৭৭। হেথা হৈম.••••••••হরযে... মন্দাকিনাঃ সলিল শিশিরৈঃ... যত্র কন্যাঃ। অচ্ছেদ (অচ্ছ..নিৰ্ম্মল+উদক) কাদম্বরীর বিখ্যাত হ্রদ। অলিন্দ অঙ্গন •••••পঙ্কজিত•••এ পংক্তি অলঙ্কৃত। পৃঃ ৭৮। মুছাইয়া’:স্থলেমুছায়ে পাঠ্য। আদীন,••Aden. : ৭৯। কপােলকূপ, গালের টোল “কূপাে যস্যঃ (গওয়াের সুস্মিতায়াঃ...... শুক-ও-বিম্ব...‘দশতি বিম্বফলং শুকশাবক। পৃঃ ৮। সাতপাক বিবাহের ১টী অনুষ্ঠান। রাকা...পূর্ণিমা। অতিলােল.. তরল,•••‘ক বত হরিণকানাং জীবিতং চাতিলােলং কাঃ | শলভ, পতঙ্গ। বারুণী—সুরা। নিশিত•••ধারালাে। পৃ: ৮২। প্রশ্চোতনং নু হরিচন্দনপল্পবানাং ?•••মূচ্ছামানন্দেন জড়তা পুনরাতননাতি ইত্যাদি ভবভূতির আট পংক্তির অনুবাদ। পৃঃ ৮৮। চিরতরুণীর ভাবটীর সূত ধরিয়া কবি ‘ক্ষুদকুঁড়ায় ১৬টী সনেট রচনা করিয়াছেন। কল্পলক্ষ্মী’.. চিত্রকলা, সঙ্গীত, কবিতা, বয়নকলা, নৃত্যকলা ও ভাস্কৰ্যকলার মুর্তিমতী মিলন-প্রদর্শনী। পৃ: ৮৯। জীবন-সরে•••জীবন-সরােবরে। কাল ১) রুদ্রদেব, (২) অনন্ত- কাল। চন্দ্ৰমালা-প্রেমসঙ্গীত। বিফল আয়ােজনে যৌবনময় দেহকেই মন্দির কল্পনা করা হইয়াছে। পৃ: ৯। পল্লবিনী—সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতেব। কাঃ পৃঃ ৯১। কোটরগত-খঞ্জনের উপমায় তরু-কোটরের কথা ভাবিতে হইবে। মনােভব ••মদন। ধূপায়িত•• ধূপের মত গন্ধদান করিয়া ভস্মীভূত। মুৰ্ম্মর-তুষানল। গন্ধভালা–অধিবাসের জন্য গন্ধ- দ্রব্যের বরণডালা। কবিতাটির ভাব কুমারসম্ভব হইতে গৃহীত। পৃ: ৯২। স্মরজিৎ এখানে শিবের এ নামটিরই সার্থকতা। পদ্ম.. কমলা। পৃঃ ৯৪। বুলালে কনক কর,-স্বর্ণালঙ্কারের ব্যঞ্জনা লক্ষণীয়।

০ পৃঃ ৯৫। সার্থক লভে, "নয়ন নীধাতু+করণে লুট, তাই নেতারূপে নী ধাতুর কাজ করিয়া এখানে নয়ন সার্থক। পৃঃ ৯৬ ‘প্রিয়া' কবিতার উপকরণ উত্তরচরিত হইতে সংগৃহীত। “তৰ মূৰ্ত্তিমানিব মহােৎসবঃকরঃ।” “দশনমুকুলৈমুর্খালােকমুখং’ ‘ম্লানস্য জীবকুসুমস্য বিকাশনানি সন্তর্পণানি সকলেন্দ্রিয়-. মােহনানি। এতানি তে সুবচনানি সরােরুহাক্ষি কর্ণামৃতানি • মনসণ্ট রসায়নানি।” “ইয়ং গেহে লক্ষ্মী.. অয়ং কণ্ঠে বাহুঃ শিশির মসৃণােমৌক্তিকসর......।” ‘পয়তি হৃদয়েশং স্নেহনিস্যন্দিনী তে+ ধবলবহুলমুগ্ধা দুগ্ধকুল্যেব দৃষ্টি।” ত্বং জীবিতং ত্বমসি মে হৃদয়ং দ্বিতীয়ং ত্বং কৌমুদী নয়নয়ােরমৃতং ত্বমঙ্গে।” “কাতাদর বিন্দ-বুটলনিভাে মুগ্ধঃ প্রণামাঞ্জলিঃ••• I” “স এবায়ং তস্যাস্তুহিন- করকোপম্যসুভগঃ । ময়া লব্ধ পাণিললিতলবলীকদলনিতঃ । “সস্বেদয়ােমাঞ্চিতকম্পিহাঙ্গী জাতা প্রিয়স্পর্শসুখেন বৎস। মরু- বান্তঃপ্রবিধুতসিক্তা কদম্বষ্টি: ক্ষুটকোরকেব।”...“বাহুরৈব- ময়ূখ চুম্বিতস্যন্দি চন্দ্রমণিহারবিভ্রমঃ।” “প্রসাদই মূৰ্ত্তন্তে স্পর্শঃ স্নেহার্দ্রশীতল'—“জ্যোস্নাময়ব মৃদুবালমৃণালকল্প ••••• অসাবস্যাঃ স্পর্শেবপুষি বহুলচন্দনরসঃ। ঘনসার-কপূর। কুটাল (কুউল নহে)..-কোরক। শ্রুতি ••১। কর্ণ, ২। বেদ। পৃঃ ৯৮। বাহ .. বাহ্যজ্ঞান। শিবভাণ্ডার...মঙ্গল ভাণ্ডার। । পৃ: ৯৯। বিলােচন.. চক্ষু । মায়াধীশ-ব্রহ্ম, শ্রীকৃষ্ণ। ধুকধুকি..সংশয়। পৃঃ১০৪। অমৃত ভারত...‘মহাভারতের কথা অমৃতসমান। দীক্ষা : মহা- প্রভুর দীক্ষা হয় কাটোয়ায়। লােচনকণ্ঠ : ভিক্ষা,•••••• লােচন••• লােচনদাস। কণ্ঠ.. নীলকণ্ঠ। ভবমােচন মুক্তি। গােবিন্দ•••মহাকবি গােবিন্দদাস। নরহরি সরকার ঠাকুর, শ্রীখণ্ড,ধুতুরা-বর্ধমান জেলায় ধুতুরার প্রাকুৰ্য খুব বেশী। শঙ্খ... সতীপীঠ ক্ষীরগ্রামের ছদ্মবেশী শাঁখারীর কাছে যােগাদ্যা জননী

।
-
৫
ব্রাহ্মণকন্যাবেশে শাখা পরেন। বৈষ্ণৰ বেদ...অধিকাংশ
বৈষ্ণবগ্রন্থ এই জেলায় রচিত। ভৌম•••মঙ্গল গ্রহ। বঙ্গবাণীর...
ভারতচন্দ্র।"ঈশ্বরী পাটনীর খেয়া-নৌকার কথা স্মৰ্ত্তব্য। তা
•মাকড়সার জাল। বেণুধনেস্থলেধেনুধনে হইবে।
পৃ:১•৫। রঘুর মতন. রঘু বিশ্বজিৎযজ্ঞে নিঃস্ব হইলে কৌৎস গুরুদক্ষিণা
সংগ্রহের জন্য রঘুর দ্বারে প্রার্থী হন, রঘু মৃৎপাত্রে তাহাকে
অৰ্যদান করেন। ‘স মৃন্ময়ে বীতহিরন্ময়াৎ পাত্রে নিধায়ার্ঘ্য
মনর্থশাল। তপ্রকাশং যশসা প্রকাশ প্রগামাতিথি
মাতিথেয়। মহাশ্বেতা...কাদম্বরীর মহাশ্বেতার কথা স্মরণীয়।
পৃঃ১০৬। আজ ধ্বংসশেষ+ রাজহংসবেশ•••৬ অক্ষরের মিল। সাধু শ্ৰীমন্ত
ইত্যাদি। ••••••। বঙ্গসাহিত্যে সুবিখ্যাত উক্ত বণিকগণ সপ্তগ্রামে
বাণিজ্য করিতে আসিতেন। সপ্তগ্রামের বেনে সব কোথাও
না যায়। ঘরে বসে সুখে মােক্ষ নানা ধন পায়। তীমধ্যে
পুণ্যতীর্থ অতি অনুপাম। দুইদিন সাধু তথা করিয়া বিশ্রাম ।
কিনে বেচে নানাদ্ৰব্য নায়ে দিল ভরা। বাহ বাহ বলি সদাগর
করে ত্বরা। কবিকঙ্কণ । অভ্রংলিহ•••ব্যামস্পর্শী
পৃঃ১০৭। রঘুনাথ সপ্তগ্রামের নবলক্ষপতি ভূস্বামীর সন্তান, নিত্যানন্দ
ও হরিদাসের ধর্ম প্রভাবে সর্বস্বত্যাগ করিয়া শ্রীগৌরাঙ্গের
শরণাপন্ন হন। উদ্ধারণ দত্ত...শ্রীচৈতন্যনিত্যানন্দের পরম ভক্ত।
সরস্বতীর হার,•••সরস্বতী, অধুনালুপ্ত স্থানীয় নদী।
পৃঃ১০৮। কুশাঙ্গুরী:-শ্রাদ্ধাদিতে যজমানকে ধারণ করিতে হয়। আশ্রম
শিশু শকুন্তলাপুত্ৰ সৰ্ব্বদমন।
বেণুকধনেকালিয়দমনের
কথা। কৃত্তিমমখলা, •••শিবের বাঘছাল সাপে বাধা।
ধরে কংসকারা হইতে ব্ৰজের পথে শ্রীকৃষ্ণের শিরে। রথী
এখানে অর্জুন। গন্ধসার"কস্তুরী মৃগ।
পৃঃ১০৯। দিরদ কুম্ভ বিদারণ করিয়া গজমুক্তা দিয়াছে। টঙ্ক...টাঙি।

টি•••গুটিপােকা ও লাক্ষাকীট। ক্রৌঞ্চ,ক্রৌঞ্চবধূর শােকই বাল্মীকির কণ্ঠে ১ম শ্লোকত্ব লাভ করে। তিত্তিরি... তৈত্তিরীয় উপনিষদ তিত্তিরি-প্রােক্ত। কৃতকপুত্র, পুত্রবৎপ্রতিপালিত, যেমন শকুন্তলার হরিণশিশু, উত্তরচরিতের সীতার ময়ুর ও হস্তি শিশু। জটাবল্কল ঋষির মত, • এ অলঙ্কারটি কাদম্বরী হইতে গৃহীত কথাসরিৎসাগরেও আছে। কযায়.. রক্তবর্ণ । অক্ষমালিকা --রুদ্রাক্ষের হার। দারু, চুন। তৃণ, ••উশীরাদি গন্ধতৃণ। মৃগরােচনা,:::গােরােচনা। পৃ:১১। আলােকামৰ্ষ জড় বিন্ধ্য। ঋষি, অগস্ত্য। সাত্ত্বিক রসে. সত্ত্বরসানুভূতিতে স্বেদবেপথুরােমাঞ্চ ইত্যাদি লক্ষণ প্রকট হয়। যাগসম্ভব ‘যজ্ঞাদ্ভবতি পর্জন্যঃ'। পঞ্চযজ্ঞ, ব্ৰহ্মযজ্ঞ বেদপাঠ, দেবযজ্ঞ হােম, পিতৃযজ্ঞ তপণ, নৃযজ্ঞ অতিথি-সেবা, ভূত • যজ্ঞ...বলি । গার্হপত্য...সাগ্নিকগৃহীর যজ্ঞাগ্নি। গৃহী অবিচ্ছেদে আমরণ হবি ও ইন্ধনযােগে রক্ষা করে। পূজাফুলে দিন... ‘বিন্যসন্তী ভুবি গণনয়া দেহলীমুক্তপুষ্পঃ। কাঃ পৃঃ১১১। কর্মে যাহার কৰ্ম্মফল..‘কৰ্মণ্যেধিকারস্তেমা ফলেষু কদাচন। গীতা ॥ দক্ষিণ...প্রসন্ন। “রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন পাহি। বর্জনতরে অর্জন... আদানং হি বিসৰ্গায়। পৃঃ১১২। মরণ.••ছল..‘বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়...নবানি দেহী। অভিশাপ...যেমন শকুন্তলার পক্ষে দুর্বাসার। শাশ্বত';'মাগে... ‘যেনাহং নামৃত স্যাম তেনাহং কিং কুৰ্য্যাম’ মৈত্রেয়ীয় উক্তি উপনিষদে। প্রােষিত•••প্রবাসস্থ রথীর। যেমন শকুন্তলায় দুয্যন্তে। নৃপতি..হেতু ‘স পিতা পিতরসাং কেবলং জন্মহেতৰঃ কাঃ গ্রন্থকারের নিবেদন পর্ণপুট ১ম খণ্ডের ৪র্থ সংস্করণ প্রকাশিত হইল। ১ম সংস্করণে প্রিয়ব শ্ৰীযুক্ত কৃষ্ণবিহারী গুপ্ত ও শ্ৰীযুক্ত শরৎচন্দ্র ঘােষাল মহাশয় যে কবিতা নির্বাচন করিয়াছিলেন, তাহাদের কতকগুলি পর্ণপুট ২য় খণ্ড গিয়াছে ২য় ও ৩য় সংস্করণে সেগুলির বদলে নুতন কবিতা সংযােজিত হইয়াছিল চতুর্থ সংস্করণে আরও ৮৯টী নূতন কবিতা সংগৃহীত হইয়াছে। ধামর্শে নামক দীর্ঘ কবিতাটির আখ্যানবস্তুর সহিত সাধারণ পাঠক পরিচিত নহে সেজন্য উহা বাদ দেওয়া গেল—অবিরা দুটী ছােট কবিতাও বাদ পড়ি ২য় সংস্করণের পর্ণপুট পড়িয়া কবিভ্রাতা সুপণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত মােহিত, মজুমদার ও মদীয় সুযােগ্য ছাত্র শ্রীমান কৃষ্ণদয়াল বসু কতকগুলি দেখাইয়া দেন-৩য় ও ৪র্থ সংস্করণে আমি সেগুলিকে যথাসাধ্য সংশাে করিয়া লইয়াছি। মােহিতবাবু পর্ণপুটের প্রত্যেক কবিতার সমালাে করিয়া আমাকে ১২/১৩ পৃষ্ঠাব্যাপী সুদীর্ঘ পত্র লেখেন—তাহাতে আম। যথেষ্ট উপকার হইয়াছে। আমি কাব্যেস আলঙ্কারিকতা সম্বন্ধে অনেক উদাসীন ছিলাম—মােহিতবাবু ও শ্রীমান্ কৃষ্ণদয়াল ঐদিকে আমার সৎ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন—সেজন্য তাঁহাদের নিকট আমি ঋণী। পর্ণ কবিতাগুলির স্তরবিভাগের জন্য আমি শরৎবাবুর কাছে ঋণী। পরি, গ্রন্থশেষের ‘কুঞ্চিকার জন্য সুহৃদর অর্থনামা রসময়বাবুকে কৃতজ্ঞতা জান ভরসা করি, রসজ্ঞ পাঠক রসময়বাবুর শ্রমের মর্যাদা বুঝিবেন। শ্রীকালিদাস রায় শ্রীপঞ্চমী, ১৩৩৩ সাল। কড়ই, বর্ধমান। .

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Parnaput Ed. 4th

Author
Roy,kalidas
Title
Parnaput Ed. 4th
File name
Parnaput Ed. 4th
Text
OCR done
Citation
1938
Published
2009/11/6
Publisher
Sisir Kumar Neogi,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
134
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Roy,Kalidas
DLI number
513038
Barcode
4990010020054.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
xh8GOAeCj7t
Download PDF

Parnaput Ed. 4th