Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Gramer Goribder Proti Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
গ্রামের গল্পীদের প্রতি
কৃষ-সমস্যা সপীয়
প্রত্যবের আয়মিক খসড়া
ভিআই.নেন
6
1918 y 2009
অ
বিভূতি গুহ ও অরুণ মিত্র
শনাল বুক এলে লিমিটেড,
কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা
প্রাণকরেন দত্ত
মাশনাল বুক এজেন্সী লিমিটেড,
১২, বঙ্কিম চাটার্জি স্টীট, কলেজ স্কোয়ার
কলিকা
এন বাংলা সরণ
জানুয়ারী, ১৯৪৮
দ্বিতীয় বাংলা সংস্করণ
সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫
দাম এক টাকা
•, রমানাথ মজুমদার জট, নববিধান সে হইতে
শ্রীযুক্ত ৰীৰেশ্নর মুখােপাধ্যায় কর্তৃক মুজিত।
গ্রামের গরীবদের প্রতি
(১৯০৩)
ভি, আই. লেনিন
অনুবাদক-বিভূতি ও
माको
গ্রামের গরীবনের প্রতি
বিষয়
পৃষ্ঠা
ভূমিকা
১। শহরে মজুরদের লড়াই
২। সােল ডেমােক্রাটা কি চায়?
৩। ধন ও দারিদ্র্য-গ্রামে মালিক মজুর
৪। মধ্যবিত্ত কৃষকরা কোন পথে যাইবে। তার সম্পত্তির
মালিক ও ধনীদের পক্ষ লইবে, না, মজুর ও গরীবদের দিকে
যাইবে?'
৫। সমস্ত জনসাধারণ ও মজুরদের জন্য সােল ডেমােজাট
কি উন্নতি লাভের চেষ্টা করে?
৪৭
t
সমস্ত কৃষকদের জন্য সােশ্যাল ডেমোেক্রট কি কি সুবিধা
আয় করিতে চেষ্টা করে?
গ্রামাঞ্চলে শ্রেণীসংগ্রাম
কৃষক সম্পর্কীয় প্রাথমিক খসড়া (১৯২০)
. swift qui jit : ', FW ভূমিক লেনিনের গ্রামের গরীবদের প্রতি ও কৃষক-সমস্যা সম্পর্কীব প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া” একত্রে দ্বিতীয় বার বাংলা ভাষায় মুদ্রিত হইল। প্রথম বার এই পুস্তকের ২২০০ খানা ছাপা হইয়াছিল ১৯৪৪ সালের জানুয়ারী মাসে। কয়েক মাস আগেই প্রথম বারের বইগুলি ফুরাইয়া গিয়াছে। কলিকাতার প্রেসে কাজের ভিড বেশী বলিয়া দ্বিতীয় বার ছাপাইতে অনেক সময় লাগি গেল। এইবাবে অপেক্ষাকৃত ভালো কাগজ ব্যবহার করা হইয়াছে, ছাপানােব খরচও দ্বিগুণ লাগিয়াছে, কিন্তু দাম বাড়ানাে হয় নাই। মার্কস ও এঙ্গেলস্ কৃষক-সমস্যা সম্পর্কে কতকগুলি মূলনীতি বা তত্ব পাড়া করিয়াছেন। সেই সবের বনিয়াদের উপরে লেনিনই প্রথমে সে-সিদ্ধান্ত গডিয়া তুলিযাছেন, যে-সিদ্ধান্ত হইতে পরিষ্কার বুঝা যায় যে কৃষকদের সম্পর্কে মজুরশ্রেণীর নীতি কি হইবে। উনিশ শতকের নবম দশকের ভিতরই লেনিন এই সিদ্ধান্তে পঁহুছিয়াছিলেন যে, মজুর আর কৃষকের মধ্যে বিপ্লবী যােগাযােগ না ঘটিলে জাত, জমিদারী প্রথা ও ধনিকপ্রথার উচ্ছেদ কিছুতেই করিতে পারা যাইবে না। এই সমস্যাটিকে ভালােভাবে বুঝিবার জঙ্গ তিনি এই বিষয়ে লেখা নানান দেশের অনেক পুথি-পুস্তক পডিয়াছিলেন। অন্য কোন পন্থী তাে নই, আর কোনাে মার্কস-পন্থীও তাঁহার মতাে এত বেশী চিন্তা কৃষক সমস্যা সম্বন্ধে করেন নাই। তাই, তিনি পবিষ্কার বুঝিয়াছিলেন যে, কৃষকদের প্রশ্নকে এড়াইয়া গি ‘মজুরদের পাটি কিছুতেই আপন উদ্দেশ্য সাধনের পথে আগাইয়া যাইতে পারিবে না।
১৯০১ সালে লেনিনের “মজুরদের পাটি ও কৃষক” নামীয় লেখাটি ববি হ্য। এই লেখাটির মােদ্দা কথা এই: মুক্তির লড়াই-এ মজুরশ্রেণী সামনের কাতারে থাকিবে, কিন্তু কৃষকদেরও সঙ্গে পাইতেই কইবে। কৃষকেরা সঙ্গে না থাকিলে মুক্তি-সংগ্রাম কিছুতেই চলিতে পারে না। এই লেখায় তিনি আরাে দেখাইছন যে, গ্রামদেশে দুইটি সামাজিক লড়াই চলিতেছে,-(১) ক্ষেত মজুরের সাথে গ্রামের ধনিকদের (ধনী কৃষকদের) লড়াই, আর (২) গােটা কৃষকশ্রেণীর সাথে গােটা জমিদারশ্রেণীর লড়াই। অর্থাৎ, শহরের কল-কারখানা মজুরদের যেমন শ্ৰেণী-সংগ্রাম (কল-কারখানার মালিকদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাইতে হয়, গ্রামেও ঠিক সেই বকমেরই শ্রেণী-সংগ্রাম চলে,-জমিদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে কৃষকশ্রেণীর লড়াই, ধনী কৃষকদের বিরুদ্ধে ক্ষেতমজুরদের লড়াই। লেনিন বলিলেন, গ্রামের এই শ্রেণী-সংগ্রামকে বাড়াইয়া তুলিতে হইবে। “রাশির সােখা ডেমক্রাসির (কমিউনিস্টদের) কৃষক সম্পর্কীয় কর্মপদ্ধতি” নাম দি আর একটি বিখ্যাত লেখার রচনা লেনিন শেষ করেন ১৯০২ সালের মার্চ মাসে। এই লেখায় তিনি “মজুরদের পাটির কৃষক-কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে অত্যন্ত জোরালাে ব্যাখ্যা করিযাছেন। ইহাতে বলা হয় যে, কৃষক-বিপ্লব যখন ঘটিবে তখন কাড়ি-নেওয়া জমি ফিরাইয়া পাষাতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ করিয়া রাখিলে কৃষকদের চলিবে না, তাহাদের জমিদারের জমি দখল করিযা লইতে হইবে, জমিকে জাতীষ সম্পত্তিতে পরিণত করাই হইবে তাহাদের দাবী। এই দুইটি লেখার বন্যিদের উপরে লেনিন তাহার গ্রামের গরীবদের প্রতি রচনা করিয়াছেন। ১৯০৩ সালের কপালে ইহা রাশিয়ার বাহিরে প্রথম ছাপা হয়। ইহার ভাষা খুবই সহজ ও সরল। এইরূপ সহজ-সরল ভাষায় লিখিবার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, লেখা-পড়া না-জানা কৃষকেরাও তাদের সমস্যা বুক। লেনিনের “কি করিতে হবে?
[ । ] পুস্তকখানা পড়িযা যেমন সকলে পাটি গড়নের সমস্যা বুঝিয়াছিলেন, তাঁহার গ্রামের গরীবদের প্রতি পড়িয়াও তেমনই সকলে বুঝিলেন যে, গ্রামদেশে শ্রেণী-সংগ্রাম চালাইবার কর্মকৌশল কি হইবে? তৃতীয়, কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় কংগ্রেসের বৈঠক ১৯২০ সালের জুলাই মাসে মস্কোতে বসিয়াছিল। এই কংগ্রেসে পেশ করিবার জন্য লেনিন একটি কৃষক-সমস্যা সম্পর্কীয় প্রস্তাবের খসড়া ঐ বছরেরই জুন মাসে তৈযার করিয়াছিলেন। এই খসড়া প্রস্তাবটিও “গ্রামের গরীবদের প্রতি’র সহিত ছাপানাে হইল। কারণ, লেনিনের রুশ বিপ্লবের আগেকার ও পরেকার রচিত এই দুইটি লেখা এক সঙ্গে পড়া আবশ্যক। কৃষক-সমস্যা সম্বন্ধে তিনি যে-সিদ্ধান্ত গড়িয়া তুলিয়াছেন এই দুইটি লেখা হইতে উহার পুরাপুরি পরিচয় পাওয়া যাইবে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যেক সভ্যের ও কৃষক সভার প্রত্যেক সংগঠকের এই পুস্তকখানা গভীর মনােযোগ দিয়া পড়া একান্ত কর্তব্য। শুধু নিজেরা পড়িলেই চলিবে না, হাজার হাজার লােককে এই বইখানা পড়াইতেও হইবে। যাহারা পড়িতে জানেন না, তাঁহাদের পড়িয়া নানাে ও বুঝানােও আবশ্যক। “গ্রামের গরীবদের প্রতি পড়িবার সময় সকলে ফুটনােটগুলিও অবশ্যই পড়িয়া লইবেন। তখনকার দিনে যাহাদের সােশ্যাল ডেমােজাট বলা হইত তাহাদের আজ বলা হয় “কমিউনিস্ট”, তখনকার “সােশ্যাল ডেমক্র্যাটিক লেবার পার্টি” হইল আজিকার কমিউনিস্ট পার্টি”, আর বই-এতে লিখিত “সােশ্যাল ডেমক্রাসি” মানে হইল কমিউনিস্ট মতবা”। ১১ই সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫ মুফফর আহমদ
No text on this page.
MWEMA
7uityaji,
1vi
গ্রামের গরীবদের প্রতি
(কৃষকদের জন্য সােস্যাল ডেমােক্রাটদের
উদ্দেশ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা)
(৯) শহরে মজৱদেৱ লড়াই
অনেক কৃষকই হয়ত আজকাল শহরের মঞ্জুর গােলমালের খবর
শুনিয়াছেন। তাঁহাদের অনেকে হয়ত নিজেরাই সেন্ট পিটার্সবুর্গ
(বর্তমান লেনিনগ্রাড-অনুবাদক) বা মস্কোতে বাস করিয়াছেন এবং
কারখানায় কাজ করিযাছেন, পুলিস যাহাকে বলে দাঙ্গা, সেই দাঙ্গাও
দেখিয়াছেন। এই গােলমালে অংশ গ্রহণ করার জন্য কর্তৃপক্ষ যেসব
মজুরকে শহর হইতে গ্রামে বিতাড়িত করিছিল সেই সব মজুরের সঙ্গে
হ্যত অনেকের পরিচয় হইয়াছে। আবার অনেকে হয়ত মজুরদের প্রচারিত
ইস্তাহার বা মজুরদের লড়াই সম্বন্ধে বই পড়িয়াছেন।
কেউবা হয়ত
যাহারা শহরে যাতায়াত করে সেই সব লােকের কাছে শহরে কি হইতেছে,
সেই সব গল্প শুনিয়াছেন।
প্রথম প্রথম ছাত্ররাই বিদ্রোহ করিত, কিন্তু এখন সব বড় বড় শহরে
হাজার হাজার মজুর জাগিয়া উঠিয়াছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মজুদের
লড়াই হয়, তাহাদের মনিব, কারখানার মালিক বা পুজিপতিদের বিরুদ্ধে।
মজুররা স্টাইক ঘােষণা করে। একই সময়ে কারখানার সমস্ত মজুর কাজ
১০ গ্রামের গরীবদের প্রতি বন্ধ করিয়া দেয়। বেশী মজুরী বা দিনে দশ এগার ঘন্টার পরিবর্তে আট ঘণ্টার বেশী না খাটিবার দাবী তারা করে। মজুরের জীবনে দুঃখ লাঘবের জন্য অন্যান্য দাবীও তাহার তােল। তাহারা চাষ, কারখানা- ঘরের অবস্থা আরাে ভাল করা হউক, যন্ত্রপাতিগুলি এমন ভাবে বিশেষ কায়দায় ঘিরিযা রাখা হউক যাহাতে মজুরেরা বিকলাঙ্গ হওযার হাত হইতে রক্ষা পায়। তাহারা চায়, তাদের সন্তানেরা যাহাতে স্কুলে পড়িতে পারে, রােগীদের জন্য যেন হাসপাতালে উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হয়, তাহাদের বাসের ঘর যেন কুকুর-বিডালের খােপের মত না হইয়া মানুষের বাসের উপযােগী কিন্তু মজুরদেব এই লড়াই-এ পুলিস হস্তক্ষেপ করে। পুলিস মজুরদের ধরে, তাহাদের জেলে দেয়, বিনাবিচারে তাহাদেব গ্রামে পাঠাইয়া দেয়, এমন কি সাইবিরিষায় পর্যন্ত নির্বাসন দেয়। গভর্নমেন্ট মজুরদের স্টাইক ও সভা-সমিতি নিষেধ করিবা আইন করে। কিন্তু মজুর পুলিস ও গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই চালাইতেই থাকে। মজুররা বলে আমরা লাখ লাখ মজুবের দল বহুদিন শিবদাড় বাঁকা রাখিয়াছি। বহুদিন নিজেরা সর্বহা থাকি ধনীদের জন্য প্রাণপাত করিযাছি। বহুদিন আমাদের উপর তাহাদেব ডাকাতি চলিত দিয়াছি। আমরা একজোট হইয়া ইউনিয়ন গঠন করিতে চাই, মজুরদের এক করিয়া মজুরদের এক বিরাট সব (মজুরের পাটি) গডিতে চাই, ভাল জীবন যাপনের জন্য আমাদের সমস্ত শক্তি এক কবিতে চাই। নূতন এবং উন্নত সমাজব্যবস্থার জন্য আমরা চেষ্টা কবিতেছি , এই নূতন এই নূতন এবং উন্নত সমাজ ধনী-গৰীৰ কেই থাকিবে না , সবাইকে কাজ করিতে হইব। মুষ্টিমেয ধনিক আৰ সকলের শ্রমের ফল ভােগ করিবে না, যাহারা খাটি। খায় তাহারা সকলেই সেই ফল ভােগ করিবে। কল-কারখানা ও অন্যান্য উন্নতির উপকরণ লাখ লাখ মঞ্জুবকে বঞ্চিত করিয়া মুষ্টিমেয় শহরে মজুরদের লড়াই লােককে ধনী করিবার জন্য আর ব্যবহার করা হইবে না, সকলেরই কাজকে সহজ করিবার জন্যই ইহার ব্যবহার হইবে। এই নুতন এবং উন্নত ধরনের সমাজকেই বলে সােস্যাটি, সমাজ। এই সমাজ সম্বন্ধে শিক্ষাকেই বলে সােশ্যালিজম। এই উন্নত সমাজের জন্য মজুরদের যেসঙ্গ লড়াই করে তাহাকেই বলে সােল ডেমােক্রটিক পারি। প্রায় সব দেশেই (কশিয়া এবং তুর্কি ছাড়া) এই রকম প্রকাশ পাটি আছে। কুশিয়াতেও মজুর এবং শিক্ষিত লােকদের মধ্য হইতে লােখালিস্ট দের লইয়া এই রকম পাটি গঠিত হইয়াছে। ইহারই নাম সােল ভেমােক্রাটিক লেবার পাটি। গভর্নমেন্ট এই পাটিকে দমন করে। সমস্ত বিধি-নিষেধ সত্বেও কিন্তু পাটি গােপনে কাজ চালায় , পাটি কাগজ বাহির করে, বই বাহির করে এবং গােপন সমিতি গড়ি তুলে। মজুররা শুধু গােপনেই একত্র হয় না, তাহারা দলে দলে রাস্তায় বাহির হইযা পড়ে, তাহাদের নিশান উড়ায়। সেই নিশানে লেখা থাকে আট ঘণ্টা দিনের জয় হউক। জয় হউক মুক্তির। জয় হউক সােশ্যালিজমের।” গভর্নমেন্ট এই জন্য মজুরদের নৃশংসভাবে দমন করে। এমন কি তাহাদের উপর গুলি চালাইবার জন্য সরকার ফৌজও পাঠায়। রুশ ফৌজ যানােভ, সেন্টপিটার্সবুর্গ, রিগা, স্টিভ-অণ্ড ও জলাটুস্ট-এ রুশ মজুরদের হত্যা করিয়াছে। কিন্তু মজুররা আত্মসমর্পণ করে নাই। তাহারা লড়াই চালাইতেছে। তাহারা বলে আসুক দমননীতি, আনুক জেল, আ আটক আর নির্বাসন, মৃত্যুও আসুক না কেন, আমরা কিছুতেই ভয় পাই না। আমাদের উদ্দেশ্য ন্যায্য। যাহারা খাটিয়া খায়, তাহাদের সবারই মুখ- শান্তি ও মুক্তির জন্য আমরা লড়াই করিতেছি। আমরা লড়িতেছি হিংসা ও অত্যাচার দূর করিবার জন্ঠ, অগণিত জনগণের দারিদ্র্য দূর গ্রামের গরীবদের প্রতি করিবার জন্য। মজুরেরা ক্রমশ শ্রেণী-সচেতন হইতেছে। সব দেশেই দিনের পর দিন সােশ্যাল ডেমোেক্রটদের সংখ্যা বাড়িয়াই চলিযাছে। সমস্ত দমননীতি সদেও আমাদের জয় হইবেই। গ্রামের গরীবদের স্পষ্টভাবে বুঝিতে হইবে, সােশ্যাল ডেমােজাট কি রকম লােক, তাহার কি চায় এবং তাহারা যদি জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভের কাজে সােশ্যাল ডেমোেক্রটদের সাহায্য করিতে চায় তবে তাহাদের কি করা কর্তব্য। [ সােশ্যাল ডােমােজাট : বর্তমানে কুশিয়ার বলশেভিক পাটি বা কমিউনিসট পাটিকেই আগে রুশ সােশ্যাল ডেমোটিক লেবার পাটি" বলিত। কল সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটিক লেবার পার্টির প্রথম কংগ্রেস বসে ১৮৯৮ সালে মিস্ক শহর। হতে মাত্র ১ জন প্রতিনিধি বােগ দিয়াছিলেন। কিন্তু ৯ জনকেই গ্রেফতার করা হয়। লেনিন তখন সাইৰিলিয়ায় নির্বাসনে থাকায় যােগ দিতে পারেন নাই। পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস বসে ১৯০৩ সালে ক্রসেস শহরে কিন্তু পুলিসের উৎপাতে লণ্ডনে উহাকে স্থানান্তরিত করিতে হয়। এই লণ্ডন অধিবেশনেই পাটৰ ভিতর পঃ দুইটি ভাবধারা দেখা দেয়-সংস্কারপন্য অর্থনীতিবাদী ও বিবপন্ধু মার্কসবাদী। বিপ্লবীরাই সংখ্যায় বেশী হয়। তাই তাহাদের বলা হয় বলশেভি। সংস্কারপন্থীরা সংখ্যায় কম হওয়ায় তাহাদের বলা হয় মেশেভি। কিন্তু উভয় দলই তখনও একই রুশ সােশ্যাল ডেমোেক্রটিক লেবার পার্টির ভিতর ছিল। ১৯১২ সালে এগ শহরে ষষ্ঠ নিখিল ফল পাটি কনফারেন্স সে। সেই কনফারেন্সে মেশেভিকদের পাটি হইতে তাড়াইয়া দেওয়া হয় ও রুশ সােশ্যাল ডেমোেক্রটিক লেবার পাটি খাঁটি বিৰপন্থী মার্কসবাদী পার্টিতে পরিণত হয়। ১৯১৭ সালে এপ্রিল মাসে বিখ্যাত ‘এলি নিয়ে লেনিন পাটির নাম পরিবর্তন করিয়া কউনিসটু পাটি রাখিবার নির্দেশ দেন। কারণ, ইউরােপের বিভিন্ন দেশের তথাকথিত মার্ক সাদী পাটি গুলি বাহার নিজেদের সসাশ্যাল ডেমােক্রাট বলি তাহার সাম্রাজ্যবাদী মহাযুদ্ধে যােঙ্গ দিয়া বিপ্লবী মার্কসবাদী আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। তাই লেনিন মার্কস-এঙ্গেল এর নির্দেশিত নাম কমিউনিসই পাটি ই রাখিবার কথা বলেন। তাই পুস্তকখানির সব জায়গায় সােশ্যাল ডেমোেক্রট কথাটার বদলে কমিউনিসই মনে করিয়া পড়িলেই বর্তমানের সঙ্গে তুলনার সুবিধা হইৰে।-অনুবাদক] শহরে মজুরদের লড়াই (২) সােশ্যাল ডেমোেক্রাল্লা কি চায় ? সােশ্যাল ডেমােক্রাটদের প্রথম ও প্রধান কাজ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করা। নূতন এবং উন্নততর সােশ্যালিস্ট সমাজের জন্য লড়াই করিবার উদ্দেশ্যে বৃহৎ ও প্রকাশ্য সম্বে রুশ মজুর শ্ৰেণীকে এক করিবার জন্য তারা রাজনৈতিক স্বাধীনতা চায়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা কি ? ইহা বুঝিতে হইলে কৃষকদের বর্তমান মুক্ত অবস্থার সঙ্গে ভূমিদাসপ্রথার তুলনা দিই আরম্ভ করিতে হইবে। ভূমিদাস-প্রথায় জমিদারের হুকুম ছাড়া কৃষকেরা বিবাহ পর্যন্ত কৰিতে পারিত না। আজ কৃষকেরা কাহারও হুকুম ছাড়াই বিবাহ করিতে পারে। ভূমিদাসের যুগে জমিদারের আমলারা যে-সব দিন ঠিক কবিয়া দিত সেই সব দিনে জমিদারের জন্য কৃষকদের খাটিতে হইত। আজ কৃষকদের নিজ মালিক বাছিয়া লইবার স্বাধীনতা আছে, কোন্ দিন খাটিবে, কত মজুরীতে খাটিবে তা বাছিয়া লইবারও স্বাধীনতা আছে। আগের আমলে জমিদারের হুকুম ছাড়া কৃষকেরা নিজগ্রাম ছাডিযা যাইতে পারিত না। আজ কৃষকেরা যেখানে খুশি যাইতে পারে—অবশ্য যদি মি ( গ্রাম্য সমাজ) অনুমতি দেয়, যদি ট্যাক্স বাকী না থাকে, যদি সে ছাড়পত্র পায, যদি পুলিস বা ম্যাজি- স্টেটের অন্যখানে বসবাসের নিষেধাজ্ঞা না থাকে। তার মানে এই যে, আজও কৃষকদের ইচ্ছামত যেখানে সেখানে যাইবার পুরা স্বাধীনতা নাই, তাহার গতিবিধি পুরাপুরি অবাধ নয়, আজও কৃষক অর্থ ভূমিদাস। আমবা এখনই দেখাইব রুশ কৃষকদের কেন এই অবস্থা এবং এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য তাহাদের কি করিতে হইবে। ভূমিদাস প্রথায় জমিদারের হুকু ছাড়া কৃষকেরা সম্পত্তি গ্রহণকরিবার স্বত্ব লাভ করিতে পারি না, বা জমি, কিনিতে পারি না। আজ ১ঃ গ্রামের গরীবদেব প্রতি কৃষকেরা যে-কোন ধরনের সম্পত্তির অধিকারী হইতে পারে (কিন্তু আজও কৃষকেরা ইচ্ছামত মির ছাড়িয়া যাইতে পারে না, অথবা জমি হস্তান্ত করিতে পারে না)। দাস আমলে জমিদারেরা কৃষকদের চাবুক মারিতে পারিত। আজ জমিদাবেরা কৃষকদের চাবুক মারিতে পারে না, যদিও দৈহিক শাস্তির ব্যবস্থা আজও আছে। পারিবারিক, ব্যক্তিগত ও সম্পত্তির ব্যাপারে এই স্বাধীনতার নাম ব্যক্তিস্বাধীনতা। মজুর ও কৃষকদের তাহাদের পারিবারিক জীবন ও ব্যক্তিগত ব্যাপারে ইচ্ছামত চলিবার স্বাধীনতা আছে ( অবশ্য পুরা স্বাধীনতা নয়), ইচ্ছামত সম্পত্তি ও এম প্রয়ােগের ( মালিক বাছিবার) অধিকার আছে। কিন্তু কি রুশ মজুর, কি সমস্ত রুশীয় জনসাধারণ, কাহারই ইচ্ছামত জাতীয় জীবন চালাইবার স্বাধীনতা নাই। কৃষকেরা যেমন ছিল ব্যক্তিগত জমিদারের দাস, তেমনি সমস্ত জনসাধারণ সরকারী কর্মচারীর দাস। সরকারী কর্মচারী নির্বাচনের অধিকার রুশ জনসাধারণের নাই, সমস্ত দেশের জয় আইন করিবার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার নাই। রায় ব্যাপার আলােচনার জন্য সভ করিবার অধিকারও রুশ জন- সাধারণের নাই। এমন কি আমরা খবরের কাগজ বাহির করিতে পারি , বই ছাপাইতে পারি না, সরকারী কর্মচারীদের হুকুম ছাড়া রাষ্ট্রের ব্যাপারে সকলের জয় সকলের কাছে কিছু বলিতে পারি না। অথচ আমাদের উপর এই কর্মচারীদের আমাদের কোন সন্মতি না লইয়াই নিযুক্ত করা হইয়াছে, যেমন কৃষকদের মত না নিয়াই জমিদারেরা গােমস্তা নিযুক্ত করিত। যেমন কৃষকরা ছিল জমিদারের দাস, তেমনি রুশ জনসাধারণ এখনও সরকারী কর্মচারীদের দাস, ভূমিদাসত্বের আমলে যেমন কৃষকদের ব্যক্তি- স্বাধীনতা ছিল না, তেমনি আজও রুশ জনসাধারণের রাজনৈতিক সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা কি চায়? স্বাধীনতা নাই। রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ হইতেছে, সমস্ত জনসাধারণ সংক্রান্ত ব্যাপারে, বাষ্ট্রের ব্যাপারে কাজ চালাইবার জন্য জনসাধারণের অধিকার। রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ, জনসাধারণের রাষ্ট্রীয় ডুমায় ( পালিমেন্ট আইনসভা) প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার। কেবলমাত্র সমস্ত জনসাধারণের নির্বাচিত এই রকমের স্ত্রীয় ডুমায় সমস্ত আইন আলােচনা ও পাস করিতে পারে বা সমস্ত ট্যাক্স ও কর ধার্য্য করিতে পারে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ, জনসাধাৰণেব নিজ কর্মচারী বাছাই করিবাৰ অধিকার, রাষ্ট্রে সমস্ত কাজেব আলােচনা করিবার জন্য ইচ্ছামত যে-কোন সভা ডাকিবার অধিকার, কোনও অনুমতি না লইয়া ইচ্ছামত যে-কোন কাগজ ও বই বাহির কবির অধিকার। ইউরােপের অন্যান্য দেশের জনসাধারণ অনেকদিন আগেই নিজেদের জন্য রাজনৈতিক অধিকার পাইয়াছে। কেবলমাত্র তুরস্কে ও রুশিয়ায় জনসাধারণ আজও সুলতানের গবর্নমেন্টের বাস্বেচ্ছাচারী জার গবনমেন্টের রাজনৈতিক দাস। জার-স্বেচ্ছাতন্ত্রের অর্থই হইতেছে, জারের অসীম ক্ষমতা। দেশের শাসনতন্ত্র গঠনে বা শাসনব্যবস্থায় জনসাধারণের কোন হাত নাই। জার একাই তার ব্যক্তিগত সর্বময় ক্ষমতার সাহায্যে সমস্ত আইন জারী করে ও সমস্ত কর্মচারী নিযুক্ত করে। অবশ্য, জার সমস্ত কল আইন বা সমস্ত রুশ কর্মচারীকে জানিতে পারে না। দেশের ভিতর কি হইতেছে না হইতেছে তাহার সমস্তও জার জানিতে পারে না। সব চাইতে বড় ও বিশিষ্ট মুষ্টিমেয় কর্মচারীদের কথায়ই জার সায় দেয়। একজন লােক প্রাণপণ ইচ্ছা থাকিলেও কুশিয়ার মত এতবড় বিবাট দেশ একলা শাসন করিতে পারে না। জার রুশিয়া শাসন করে না। স্বেচ্ছায় এক ব্যক্তির শাসন—একথা বলা শুধু বুলি আওড়ান মাত্র। শিয়াকে শাসন করে সব চাইতে ধনী ও উচ্চবংশীয় রাজকর্মচারীরা। এই মুষ্টিমেয় লােক খুশিমত যা জানায়, জার শুধু সেইটুকু জানিতে পারে।
গ্রামে গরীবদের প্রতি এই উচ্চস্তরের মুষ্টিমেষ সন্ত্রান্ত লােকদের বিরুদ্ধে যাইবার কোন ক্ষমতা আরের নাই। তার নিজে একজন জমিদার ও সন্ত্রান্ত বংশেরই একজন। শৈশব হইতেই জার শুধু মাত্র এই উচ্চবংশীযদের আবহাওয়ায় মানুষ হইয়াছে, ইহারাই জারকে লালন পালন করিয়াছে ও লেখাপড়া শিখাইয়াছে। অবশিষ্ট রুশ জনসাধারণ সম্বন্ধে এই সন্ত্রান্ত ভদ্রলােকেরা বা ধনী জমিদারেবা যাহা জানে, জার শুধু ততটুকুই জানে। প্রত্যেক ভােলােস্ট আপিসে একই ছবি দেওয়ালে টাঙ্গান আছে দেখা যাইবে উহাতে দেখান হইয়াছে জার তৃতীয় আলেকজাণ্ডারের (বর্তমান জারের পিতা) অভিষেক-উৎসবে আগন্তক ভােলােস্ট মাতবরদের জার বলিতেছেনাত সম্প্রদায়ের নেতাদের মানিয়া চল।” বর্তমান জার দ্বিতীয নিকোলাস ঐ একই কথার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। ইহার অর্থ, জারেরা নিজেরাই স্বীকার করে যে তাহারা শুধুমাত্র সন্ত্রান্ত সারের সাহায্য লইয়া ও তারেই মারফৎ দেশ শাসন করিতে পারে। ‘সাত সম্প্রদায়কে মানিয়া চল, কৃষকদের সম্বন্ধে জারের এই কথা আমাদের ভালভাবে মনে রাখিতে হইবে। যাহারা জারের গবনমেন্টকে সব চাইতে ভাল গবনমেট বলে তাহার যে মিথ্যাবাদী সেকথা আমাদের পৰিকাৰ বুঝিতে হইবে। এই সব লােক বলে, অন্যান্য দেশে গবর্নমেন্ট নির্বাচিত হয়; কিন্তু নির্বাচিত হয় ধনীরাই , এবং তাহারা অন্যায়ভাবে দেশ শাসন করে, গরীবদের উপর জুলুম চালায়। রুশিতে গবর্নমেন্ট নির্বাচিত নয; একজন সর্বম ক্ষমতা সম্পন্ন জার দেশ শাসন করে। আর ধনী-দরিদ্র সবার উপরে। তাহাদের মতে ধনী গরীব সবার সম্বন্ধেই সমানভাবেই জার ধ্যায়পরায়ণ। এই সব কথা শুধু ধাপ্পাবাজী মাত্র। প্রত্যেক কৰাসী জানে আমাদের সরকায় কেমন ন্যায়পরায়ণ। সবাই জানে, একজন সাধারণ মজুর বা ফেত মজুর বার কাউন্সিলের সভ্য হইতে পারে কিনা। সমস্ত ১৭ সােঙ্গল ডেমােক্রাটরা কি চায়? ইউরােপীয় দেশে কারখানার মজুর ও ক্ষেত মজুরেরা রাষ্ট্রীয় ডুমার ( পার্লামেন্ট) প্রতিনিধি হইতে পারে, এবং তাহারা সমস্ত জনসাধারণকে মজুরদের দুর্দশ সম্বন্ধে খােলাখুলি বলিতে পারে, ভালাে ব্যবস্থার জন্য এক হইতে ও লড়াই করিতে মজুরদের ডাকও দিতে পারে। জনসাধা- রণের এই প্রতিনিধিদের বক্তৃতায় কেহই বাধা দিতে সাহস পায় না। কোন পুলিস তাহাদের উপর হুকুম চালাইতে সাহস করে না। রুশিয়ার কোন প্রতিনিধিমূলক গভর্নমেন্ট নাই এবং শুধু যে ধনী ও উচ্চ সম্প্রদায়ই কুশিকে শাসন করে তাহা নয়, ইহাদের সব চেয়ে নিকৃষ্ট অংশই শাসন চালায়। কুশিয়ায় শাসন চালায় তাহারাই, যাহারা জারের দরবারে যড়যন্ত্র পাকাইতে ওস্তাদ, যাহারা ক্ষতি করিতে সুচতুর, জারের নিকট মিথ্যা ও দুর্নাম রটানই যাহাদের পেশা, আর যাহারা জারের চাটুকার। তাহার শাসন চালায় গােপনে। জনসাধারণ জানে না এবং জানিতেও পারে না, কোন্ কোন্ নূতন আইন তৈরী করা হইতেছে, কোন্ যুদ্ধের বড়যন্ত্র চলিতেছে, কোন্ নূতন ট্যাক্স বসান হইতেছে, কোন কোন্ কর্মচারীকে কি কারণে পুরস্কার দেওয়া হইল, কাহাকেই বা বরখাস্ত করা হইল। কণিয়ার মত সরকারী কর্মচারীর এত ভিড় আর কোথাও নাই। নির্বাক জনগণের মাথার উপরে আছে গভীর জঙ্গলের মত সরকারী কর্মচারীর ভিড়—সাধারণ মজুর এই অরণ্যের ভিতর দিয়া পথ পায় না, কোন দিনই স্যায়বিচার পাইতে পারে না। আমলাতন্ত্রের ঘুষখােরী, লুণ্ঠন ও জুলুমের বিরুদ্ধে কোন অভিযােগই প্রকাশ হয় না; সমস্ত অভিযােগই সরকারী দফতরের টালবাহানার আড়ালে ধামাচাপা পড়ে। একজন নিঃসঙ্গ মানুষের আওয়াজ জনসাধারণের কাছে পৌছিতে পারে না, সে-আওয়াজ গভীর জঙ্গলের মধ্যে হারাইয়া যায়, পুলিসের জুলুম কুঠরীতে হার টুটি চাপিয়া ধরা হয়। জনসাধারণের যারা নির্বাচিত হয় না, ১৮ গ্রামের গরীবদের প্রতি জনসাধারণের নিকট যাহাদের কোন কৈফিয়ৎ দিতে হয় না, এইরূপ কর্মচারীর দল এক ঘন জালের সৃষ্টি করিযাছে, আর অসংখ্য নরনারী মাছির মত এই জালে পডি ছটফট করিতেছে। জার-স্বেচ্ছাতন্ত্র হইতেছে আমলাতন্ত্রের স্বেচ্ছাতন্ত্র। জার-স্বেচ্ছাতন্ত্রের অর্থ জনসাধারণের বিউদালঅধীনতা-আমলাতন্ত্রের, বিশেষ করিয়া পুলিসের অধীনতা। আর জার-স্বেচ্ছাতন্ত্র হইতেছে পুলিস স্বেচ্ছাতন্ত্র। তাইতাে মজুষেবা নিশান হাতে করিয়া রাস্তায় আসিয়া দাডা, সেই নিশানে লেখা থাকে স্বেচ্ছাতন্ত্র ধ্বংস হউক।” “রাজনৈতিক স্বাধীনতার জ্য হউক।” তাইতাে শহরের মজুরদের লড়াই-এর এই আওয়াজ গ্রামের লাখ লাখ গরীবকে নিতে হইবে। মজুরদের মতই সমস্ত দমন- নীতি তুচ্ছ করি, শত্রুর সমস্ত ভীতি ও জুলুম উপেক্ষা করিয়া, প্রথম পরাজয়ে হতাশ না হইয়া, ক্ষেত মজুর ও গরীব কৃষকদের আগাইয়া আসিতে হইবে সমস্ত রুশ জনসাধারণের মুক্তির জন্য নিশ্চিত সংগ্রামে। এবং প্রথম দাবী করিতে হইবে, সাধারণের প্রতিনিধিদের ডাকা হউক (গণ-পরিষদ-অনুবাদক)। সমস্ত রুশিয়া জুড়ি জনসাধারণ নিজেদের কাউন্সিলার ািচিত করুক। এই সব কাউন্সিলাররা উচ্চতম পরিষদ গঠন করুক। এই পরিষদ ফশিয়ায় প্রতিনিধিমূলক গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠা করিবে, পুলিস ও রাজকর্মচারীর দাসত্ব হইতে জনসাধারণকে মুক্তি দিবে, জনসাধাৰণকে স্বাধীনভাবে সভা করিবার, কথা কহিবার ও স্বাধীন সংবাদপত্রের অধিকার দিবে। সবার আগে সোশ্যাল ডেমােক্রাটরা ইহাই চায়। তাহাদের প্রথম দাবী, রালৈতিক স্বাধীনতার দাবীর অর্থ ইহাই। আমরা জানি যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ডুমায় স্বাধীন নির্বাচনের অধিকার এবং সভা ও ছাপাখানার স্বাধীনতাই মজুরশ্ৰেণীকে একচোটে দারিদ্র্য ও জুলুমের হাত হইতে মুক্তি দিবে না। শহর ও গ্রামের সােস্যাল ডেমােক্রাটা কি চায় ? গরীবদের পক্ষে ধনীদের জন্য পরিশ্রম করার দায় হইতে একচোটে মুক্তি লাভের কোন দাওযাই নাই। নিজেদের ছাড়া অন্য কাহারও উপর মজুরের আশা ভরসা করিতে পারে না। দাবি হইতে নিজেকে নিজে মুক্ত না করিলে অন্য কেহ মজুরদের মুক্ত করিয়া দিবে না। আর নিজেদের মুক্ত করিতে হইলে, গােটা দেশের, গােটা রুশিয়ার মজুরদের এক হইয়া একটি সংগঠন, একটি পার্টি গঠন করিতে হইবে। কিন্তু লাখ লাখ মজুর এক হইতে পারে না, যদি স্বেচ্ছাচারী পুলিস সরকার সমস্ত সভা, মজুরদের সমস্ত কাগজ প্রকাশ ও মজুর প্রতিনিধি-নির্বাচনে নিষেধ করে। এক হইতে হইলে, তাহাদের ইচ্ছামত যে-কোন সজঘ গঠনের অধিকার চাই, একজোট হইবার অধিকার চাই, চাই রাজনৈতিক স্বাধীনতা। রাজনৈতিক স্বাধীন মজুরদের দারিদ্র্য হইতে একেবারেই মুক্তি দিবে । কিন্তু ইহাতে দারিজের বিরুদ্ধে লড়িবার হাতিয়ার মজুরের পাইবে। ইহা ছাড়া অন্য কোন পথ নাই, মজুরদের একতা ছাড়া দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়ির অন্য কোন উপায় হইতে পারে । কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকিলে কোটি কোটি লোেক এক হইতে পারে না। ইউরােপের সমস্ত দেশে, যেখানে মজুরেরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাইয়াছে, সেখানে মজুরেরা অনেকদিন হইল একজোট হইতে আরম্ভ করিয়াছে। ইউরােপের সর্বত্র, যাহাদের জমি নাই, কারখানার মালিকানা নাই, মজুরীর বিনিময়ে অন্যের জন্য যাহারা আজীবন খাটে, সেই মজুরদের বলা হয় সর্বহারা। পঞ্চাশ বছর আগে মজুরদের একজোট হইবার প্রথম ডাক আসিয়াছিল “দুনিার মজুর এক হও!” গত পঞ্চাশ বছর এরিয়া গােটা দুনিয়ায় এই আওয়াও ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হইয়াছে, লাখ লাখ মজুরের সভায় এই আওয়াজ উচ্চারিত হইয়াছে, দুনিয়ার সব ভাষায় সােল ডেমােজাটদের লাখ লাখ পুথিপত্রে এই কথা পাওয়া যাইবে।
গ্রামের গবীবদের প্রতি অবশ্য, লাখ লাখ মজুরকে একটি সম্বে, একটি পাটিতে একত্র করা বড় সােজা নয়। ইহার জন্য চাই সময়, ধৈৰ্য্য, দৃঢ়তা ও সাহস। মজুরের দারিদ্রের জাতাকলে পিষ্যিা মরিতেছে, পুজিপতি ও জমিদারের অধীনে অশেষ খাটুনির জালে তাহারা আবদ্ধ, প্রাযই তাহাদেব ভাবিবারও পর্যন্ত সময় হয় না কেন তাহারা চিরকাল গরীব থাকে, ইহার হাত হইতে মুক্তির উপাযই বা কি। মজুরদের একজোট হইবার বিরুদ্ধে সমন্ত চেষ্টা প্রয়ােগ করা হয়; কুশিয়ার মত দেশে যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা নাই সেখানে সােজাসুজি পাশবিক জুলুমের সাহায্য নেওয়া হয়, অথবা যে-সব মজুর শােস্যালিজম প্রচার করে, তাহাদের কাজে নেওয়া হয় না, কিংবা হ্যত ছল-চাতুরীর সাহায্য নেওয়া হয়। কিন্তু দারিদ্র্য ও নিপীড়নের হাত হইতে যাহার মেহনৎ করে তাহাদের সকলের মুক্তির মহৎ আদর্শের জন্য লড়াই-এর পথ হইতে কোন জুলুম, কোন দমননীতিই সর্বহারা মজুরকে হটাইতে পারিবে না। সােস্যাল ডেমোেক্রাট মজুরদের সংখ্যা দিনের পর দিন বাডিৱাই চলিযাছে। আমাদের প্রতিবেশী জার্মানির কথাই ধরা যাক, তাহাদের প্রতিনিধিমূলক গভর্নমেন্ট আছে। আগে, জার্মানিতেও অবাধ যেচ্ছাচারী রাজতন্ত্র ছিল। কিন্তু পঞ্চাশ বছরের উপর হইল, জার্মান জনসাধারণ বলপ্রযােগ দ্বারা স্বেচ্ছাতন্ত্র ধ্বংস কবিয়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করিয়াছে। কুশিয়ার মত জার্মানিতে আর মুষ্টিমেয় রাজ কর্মচারী মিলিয়া আইন তৈয়ার করে না—আইন তৈরী করে অনলা- রশের নির্বাচিত পরিষদ, পার্সিয়ামেণ্ট, যাহাকে জামান বলে রাইখস্টাগ। সমস্ত সাবালক পুরুষ এই পরিষদের ডেপুটি (প্রতিনিধি) নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। ইহাতে বুঝা যায় সােস্যাল ডেমােকাটা কত ভােট পাইল। ১৮৮৭ সালে সমস্ত ভােটের দশ ভাগের এক ভাগ সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা পাইয়াছিল। ১৮৯৮ সালে (রাইখস্টাগের শেষ নির্বাচনের তারিখে) সােল ডেমোেকাটদের ভােটের সংখ্যা ছিল ইহার s সােল ডেমোেকাট কি চায়? প্রায় তিন গুণ বেশ, সমস্ত ভােটের চার ভাগের এক ভাগ বেশ প্রায় বিশ লাখেরও উপর সাবালক পুরুষ সােল ডেমাে- কাট দলের পার্লামেন্টারী প্রার্থীর পক্ষে ভােট দিয়াছিল। জার্মানির ক্ষেত মজুরদের ভিতর এখনও সােস্যালিজমের বিশেষ প্রসার হয় নাই , কিন্তু তাহাদের ভিতর দ্রুত প্রসার বাড়িতেছে। কিন্তু যে-দিন ক্ষেত মজুর, দিনমজুর এবং গ্রাম্য সর্বহারা ও গরীব কৃষক জনগণ তাদের শহরের ভাইদের সঙ্গে একজোট হইবে, সেদিন জার্মান মজুরদের জয় হইবে, সেদিন তাহারা এমন অবস্থার সৃষ্টি করিবে যাহাতে যাহারা মেহনৎ করে তাহাদের উপর জুলুম আর তাহাদের দারিদ্র্য নিঃশেষ হইবে। কি উপায়ে সােস্যাল ডেমােক্রটিক মজুররা দারিদ্র্যের হাত হইতে জনসাধারণকে মুক্ত করিতে চায়? কেমন করিয়া যে করিতে হয় জানিতে হইলে, বর্তমান সমাজব্যবস্থা অগণিত জনগণের দারিদ্র্যের কারণ স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে হইবে। বড় বড় শহর বাড়িয়া উঠিতেছে, বিরাট দোকান-পাট আর ঘর-বাড়ী তৈরী হইতেছে, রেলপথ গড়া হইতেছে, শিল্প ও কৃষিতে সব রকম যন্ত্রপাতি ও উন্নততর কৌশল প্রয়ােগ করা হইতেছে, কিন্তু কোটি কোটি লােক গরীবই থাকিয়া যায়, নিজ পরিবারের সামান্য জীবিকার জন্য তাহাদের আজীবন খাটিতে হয়। ইহাই শেষ নয় ক্রমশ অধিক সংখ্যায় লােক বেকার হইতেছে। শহরে ও গ্রামে, ক্রমশই বেশী লােক কোন কাজই পাইতেছে । গ্রামে তাহারা অনাহারে দিন কাটা, শহরে তাহারা সােনালী দল” এবং “খালি পাযের দল” (বেকার ছমছাড়া সর্বহার-অনুবাদক) ভারী করে, শহরতলীতে তাহারা পশুর মত খুপরিতে অথবা মস্কোর খিটত মার্কেটের মত ভয়াবহ বন্তীতে আশ্রয় নেয়। কেন এমন হয় ? ধন-দৌলত বিলাস বাড়িয়াই চলিযাছে, অথচ কোটি কোটি মানুষ যাহার নিজ মেহনতে এই সব ধন-দৌলত পয়দা করে ২২ গ্রামের গরীবদের প্রতি তাহারাই থাকে গরীব ও অভাবগ্রস্ত। কৃষকেরা না খাইয়া মরে, মজুরেরা বেকার হইয়া পথে পথে ঘুরে, অথচ, ব্যবসায়ীরা রুশিয়া হইতে কোটি কোটি পুড, শত বিদেশে চালান দে, আর কারখানা বন্ধ হইয়া যায়, কারণ জিনিস বিক্রয় হয় না, জিনিসের বাজার নাই। ইহার প্রথম কারণ, বেশীর ভাগ জমি, সমস্ত কল-কারখানা, যন্ত্রপাতি, দালান-কোঠা, জাহাজ প্রভৃতি মুষ্টিমেয় ধনীর সম্পত্তি। কোটি কোটি লােক এই কলকারখানায়, এই জমিতে খাটে, কিন্তু এই সমস্তরই মালিক কয়েক হাজার ধনিক, জমিদার, ব্যবসাদা, কারখানাওয়াল। জনসাধারণ এই ধনীদের জন্য, মজুরীর জন্য, এক টুকবা রুটির জন্য খাটে। মজুরের কোন রকমে জীবন ধারণের জন্য বাহা দরকার, তাহার অতিরিক্ত সমস্তই যায় ধনী মালিকদের হাতে , ইহাই মালিকদের মুনাফা, তাহাদের আয়”। উৎপাদনের ব্যবস্থায় উন্নততর কৌশল ও যন্ত্রপাতি প্রযােগের ফলে যে সুবিধা হয় তাহার সবটাই যায় জমিদার ও পুজিপতিদের হাতে তাহারা অগণিত ধন-দৌলত জমায়, আর মজুররা পার উচ্ছিষ্টের টুকরা মাত্র। মজুরদের কাজের জন্য একত্র করা হয় বড় একটা কৃষিক্ষেত্রে বা বড় একটা কারখানায় কযেক শত বা কয়েক হাজার মজুর কাজ করে। এমনি করিয়া যখন মজুরদের এক করা হয়, আর ইহার সঙ্গে যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হয়, কাজের ফলও তখন বেশী হয় ; আলাদা ভাবে ও যন্ত্রপাতি ছাড়া কয়েক ডজন মজুর আগে যাহা উৎপাদন করিত এই ব্যবস্থায় একজন মজুরই তার চেয়ে অনেক বেশী উৎপাদন করে। কাজ বেশী ফলপ্রসূ হওয়ার সুবিধাটুকু ভােগ করে মুষ্টিমেয় বড় বড় জমিদার, ব্যবসাদার ও কারখানাওয়ালা, যাহারা মেহনৎ করে তাহা নয়। প্রায়ই একথা শোনা যায় যে, জমিদার বা ব্যবসাদারের লােককে “কাজ দেয় অথবা গরীকে চাকুরি দেয়। যেমন একথা শােনা যায় যে, কাছাকাছি কোন কারখানা বা জমিদার স্থানীয় কৃষকদের খাওয়ায়।
সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা কি চায়? কিন্তু আসলে মজুরেরা নিজ শ্রমের দ্বারাই নিজেদের খাওয়ায়। কিন্তু জমিদারের জমিতে, কিংবা কারখানায় বা রেলে কাজ করার । পাইবার জন্য, মজুর যাহা কিছু উৎপাদন করে তাহার সবটাই মালিককে দিতে বাধ্য হয়, মজুর নিজে পায় কণামাত্র ভিক্ষা। কাজেই প্রকৃতপক্ষে জমিদার বা ব্যবসাদাবরা মজুরদের কাজ দেয় না, মজুররাই নিজেদের মেহনতে গড়া মালের অধিকাংশই ছাডিষা দিতে বাধ্য হয়। ইহার পরিবর্তে তাহাদের কিছু জুটে না। এইভাবে মজুররা সকলকেই তাহাদের পরিশ্রমের দ্বারা জীযাইয়া রাখে। ইহা ছাড়া সমস্ত আধুনিক দেশে জনসাধারণের দারিদ্র্যের কারণ, মজুরদের তৈরী সব জিনিস পদ। হয় ক্রিীর জন্য—বাজারের জন্য। কারখানাওয়ালা বা কুটিরশিল্পী, জমিদার বা ধনী কৃষক যাই কেন উৎপাদন করুক না, সে পশুপালনই হোক বা ফসল বপন ও কাটাই হােক, সব কিছুই বিক্রীর, জন্য, টাকায় পরিণত করার জন্য উৎপন্ন করা হয়। টাকাই সর্বত্র শাসক হইযা বসিয়াছে। মানুষের শ্রমে তৈরী সব জিনিসই টাকার পরিবর্তে বিনিময় করা যায়। টাকা মানুষকেও কিনিতে পারে, অর্থাৎ যাহার কিছুই নাই, পসাওয়ালা লােকের জন্য খাটিতে তাহাকে বাধ্য করিতে পারে। আগেকার দিনে, ভূমিদাস-প্রথার আমলে, জমিই ছিল শাসক শক্তি, যাহাৰ জমি ছিল, তাহারই ছিল ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব। এখন টাকার মূলধনই হইতেছে শাসক শক্তি। টাকার দ্বারা এখন সব জমি কিনিতে পারা যায়। টাকা না থাকিলে জমি খুব কম কাজেই লাগে। কারণ লাঙ্গল বা অন্য যন্ত্রপাতি কিনিতে গেলে টাকা চাই, গরু-ঘােড়, কাপড়-চোপড় বা শহরে অন্য জিনিস কিনিতে গেলে টাকা চাই, ট্যাক্স দেওযারতাে কথাই নাই। টাকার প্রযােজন বলিয়া প্রায় সব জমিদারই ব্যাঙ্কে জমি বন্ধক রাখে। টাকার জন্য গভর্নমেন্ট দুনিয়ার বড়লােক ও ব্যাঙ্কওয়ালাদের কাছ হইতে অর্থ ধার করে এবং ইহার সুদ বাবদ বছরে গ্রামের গরীবদের প্রতি বছরে কোটি কোটি রুবল দেয়। টাকার জন্য আজ সবাই সবার বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই চালাইতেছে। সবাই চায় সস্তায় কিনিতে ও চড়া দরে বেচিতে, একজন আর একজনকে ভিড়াইতে চায়, যত বেশী পারে মালপত্র বেচিতে, কম দর হাঁকিয়া অন্যকে হটাইতে চায়, লাভের বাজার বা লাভজনক গহিদার খবর অঙ্গের কাছ হইতে গােপন রাখিতে চেষ্টা করে। টাকার জন্য এই সাধারণ কাড়াকাডিতে ক্ষুদে ব্যক্তি, স্কুলে কারিগর অথবা স্কুলে কৃষকদেরই সব চাইতে বেশী বিপদ বড় বড় ব্যবসাদার বা ধনী কৃষকেরা প্রতিবারই তাহাদের হটাইয়া দেয়। ক্ষুদেদের সঞ্চিত পুজি কিছুই নাই, সে দিন আনে দিন খায় , একটা গােলমাল বা বিপদ আসিলেই তাহাকে শেষ পুঁজিটুকুও বন্ধক দিতে হয় অথবা গােৰু-ঘােড় জলের দরে বেচিত হয়। কুলা (ধনী কৃষক) বা মহাজনের হাতে একবার পডিলে, সেই ঘর হইতে বাহির হওয়ার সম্ভাবনা তাহার খুবই কম , অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাহাকে সর্বস্বান্ত হইতে হয়। প্রতি বৎসর হাজার হাজার, লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক ও কারিগর ভিটেমাটি ছাড়িয়া, সমাজের হাতে সব কিছু সপিয়া দিয়া দিন-মজুর হয়, ক্ষেত মজুরী করে, অপটু মজুরে, সর্বহারায় পরিণত হয়। এদিকে টাকার জন্য কাড়াকাড়িতে ধনী আরও ধনী হইয়া উঠে। ব্যাঙ্কে লাখ লাখ, কোটি কোটি রুবল তাহারা জমায় , নিজেদেব অর্থ ছাও, ব্যাঙ্কে জমান অন্যের টাকাও তাহাদের বড়লােক হইবার পথে সাহায্য করে। কুদ্ৰব্যক্তি কয়েক কুডি অথবা কয়েক শত কবল ব্যাঙ্কে অথবা সেভিং ব্যাঙ্কে জমা রাখে এবং রুবলে তিন চার কোপেক হিসাবে সুদ পায়, এই সব কুড়ি ও শ’ হইতে ধনিকে লাখ লাখ রুবল মুনাফা কামায়, এই সব লাখ লাখ রুবল ব্যবহার করিয়া খনিকেরা তাহাদের পয়দা বাড়ায় এবং রুবল পিছু দশ বিশ কোপে করিয়া লাভ করে। এই যখন অবস্থা, তখন সােল ডেমােক্রাটরা বলে যে, জনসাধারণের D সােল ডেমােক্রাটরা কি চায় ? २४ দারিদ্র্য দূর করিবার একমাত্র উপায় বর্তমান ব্যবস্থার আগাগােড়া পরিবর্তন এবং সোশ্যালিস্ট, ব্যবস্থার পত্তন, অর্থাৎ, বড় বড় জমিদারের হাত হইতে জমি, কারখানাওয়ালার কাছ হইতে কারখানা, ব্যাঙ্কওয়ালার হাত হইতে টাকার পুজি কাডিয়া লওয়া, ব্যক্তিগত সম্পত্তির উচ্ছেদ করা ও সমগ্র দেশের মজুরদের হাতে তুলিয়া দেওয়া। এই সব করা হইলে, ধনিকগণ যাহারা অন্যের শ্রমের ফলে জীবন ধারণ করে, তাহারা মজুরদের শ্রমের উপর আর অধিকার খাটাইতে পারিবে না। মজুরেরা নিজেরাই ও তাহাদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ইহার ভার লইবে। তখন সকলের সম্মিলিত অমর ফল ও যন্ত্রপাতি এবং উন্নত কৌশল প্রয়ােগের সুবিধা সমন্ত মত জনসাধারণ, সমস্ত মজুরেরাই পাইবে। ধন-দৌলত আরও দ্রুত বাড়িতে থাকিবে, কারণ পুজিপতিদেব পরিবর্তে যখন তাহাদের নিজেদের জন্য খাটিতে হইবে, মজুররা তখন আরও ভাল কাজ করিবে, খাটুনির সময় কমিবে, মজুরের জীবনের মান উচ্চতর হইবে, তাহাদের জীবনের সমস্ত অবস্থারই আমূল পরিবর্তন হইবে। কিন্তু আমাদের গােটা দেশটার বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করা বড় সােজা ব্যাপার নয়। ইহার জন্য যথেষ্ট কাজ এবং কঠোর সংগ্রাম প্রযােজন। সমস্ত ধনিক, সমস্ত সম্পত্তিওয়ালা লােক, সমগ্র বুর্জোয়াজি, তাহাদের সমস্ত শক্তি প্রয়ােগ করিয়া নিজেদের ধন-দৌলত রক্ষা করিবে। রাজকর্মচারী ও ফৌজ নিকশ্রেণীকে রক্ষার জন্য আগাইয়া আসিবে, কারণ, গভর্নমেন্টই ধনিক শ্ৰেণীদের হাতে। পরের শ্রমের ফলে যাহারা বচিয়া থাকে, তাহাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সমস্ত মজুরকে এক হইয়া বুর্জোয়া শব্দের অর্থ কল-কারখানার ও সমস্ত সম্পত্তির মালিক। এই সমস্ত মালিকদের একত্রে বুর্জোয়াজি বলে। বড় সম্পত্তির মালিককে বলে বুর্জোয়। ক্ষু সম্পত্তির মালিককে বলে পেটি বুর্জোয়। বুর্জোয়া ও লটারিত্নেটের (সর্বহারা) অর্থ মালিক ও মজুর, ধনী ও গরীব, কিংবা যাহারা অন্যের এমের ফলে জীবনধারণ করে এবং যাহারা মজুৱীৰ এই অন্যের হইয়া খাটে।--অনুবাদক গ্রামের গরীবদের প্রতি দাড়াইতে হইবে, মজুরদের একত্র হইতে হইবে এবং সমস্ত গরীবকে এক মজুর শ্রেণী, এক সর্বহারা শ্রেণীর মধ্যে সবদ্ধ হইতে সাহায্য করিতে হইবে। এই লড়াই মজুর শ্রেণীর পক্ষে খুব সহজ হইবে না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মজুরদের জয় নিশ্চয়ই হইবে, কারণ বুর্জোযারা, যাহারা অন্যর শ্রমের উপর জীবন ধারণ করে, জনসাধারণের ভিতর তাহারা সংখ্যার দিক দিয়া নগণ্য অংশ, আর মজুরশ্ৰেণী সংখ্যায় অনেক বেশী। মালিকদের বিরুদ্ধে মজুর মানেই হইতেছে কয়েক হাজারের বিরুদ্ধে কোটি কোটি। রুশিয়ার মজুরেরা এই লড়াই-এর জন্য একটি সােশ্যাল ডেমোেক্রটিক লেবার পার্টিতে সঙ্ঘবদ্ধ হইতে শুরু করিয়াছে। যদিও পুলিসের চোখে ধূলি দিয়া গােপনে একত্র হওয়া কঠিন, তবুও সংগঠন বাড়িয়াই চলিয়াছে ও ক্রমশ শক্তিশালী হইতেছে। রুশ জনসাধারণ যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাইবে, তখন মজুর শ্রেণীকে এক করিবার কাজ, সােস্যালিজমের আদর্শ তাহাদের মধ্যে জার্মান মজুরদের চেয়েও দ্রুত আগাইয়া চলিবে। (৩) ধন ও দারিদ্র্য গ্রামে মালিক ও মজৱ এখন আমরা জানিতে পারিযাছি, সােস্যাল ডেমোেক্রটরা কি চায়। দারিদ্র্যের হাত হইতে জনসাধারণের মুক্তির জন্য তারা ধনিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করিতে চায়। শহরের মতই বা উহার চেযও বেশী দারিদ্র্য আছে গ্রামে। গ্রামে দারিদ্র্য কত বেশী এখানে তাহা বলার প্রযােজন নাই। যে-মজুর গ্রামে গিযাছে, এবং প্রত্যেক কৃষক ভালভাবেই জানে গ্রাম কত গরীব, সেখানে কত ক্ষুধা, কত দুঃখ, কত নিঃস্বতা। কিন্তু কৃষক জানে না, এই শশাচনীয় অবস্থা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কারণ কি, এই দারিদ্র্য দূর করিবার পথই বা কি। ইহা জানিতে ধন ও দারি—গ্রাম মালিক ও মজুর হইলে শহরে ও গ্রামে অভাব ও দারিদ্র্যের কারণ প্রথমে খুঁজিতে হইবে। ইহা আমরা আগেই সংক্ষেপে আলােচনা করিযাছি এবং দেখিয়াছি যে গরীব কৃষক ও কৃষি মজুরদের শহরের মজুরদের সঙ্গে এক হইতে হইবে। কিন্তু ইহাই যথেষ্ট নয়। আমাদের দেখিতে হইবে, গ্রামে কোন শ্রেণীর লােক ধনী ও মালিকদের পক্ষ লইবে, কোন্ শ্রেণীর লােকেই বা মজুরদের, সােল ডেমােক্রাটদের সমর্থন করিবে। আমাদের দেখিতে হইবে জমিদার ছাড়া আরও অনেক কৃষক আছে কিনা যাহারা পুজি জমাইতে পারে ও অন্যের শ্রমের উপর নির্ভর করিয়া জীবন ধাবণ করিতে পারে। এই ব্যাপারের গােড়ায় যাইতে না পারিলে, দারিদ্র সম্বন্ধে যত কথাই বলা হউক না কেন, কোন ফলই হইবে না, আর গ্রামের গরীবরা কখনই বুঝিতে পারিবে না গ্রামের কোন কোন লােক নিজেরা একত্র হইবে এবং শহরের মজুরদের সঙ্গে একত্র হইবে এবং এই মিতালি খাটি করিতে হইলে কি করিতে হইবে, যাহাতে জমিদার ও ধনী কৃষকেরা কৃষকদের ঠকাইতে পারে। এ কথা জানিতে হইলে খোজ লওয়া দরকার এমে জমিদারেরা কত শক্তিশালী আর ধনী কৃষকদেরই বা ক্ষমতা কতখানি। জমিদারদেরই প্রথম ধরা যাক। জমিদারদের হাতে কতখানি জমি আছে, তাই দিয়া জমিদারদের শক্তির পরিমাণ করা যায়। ইউরােপীয় কশিয়ায় কৃষকদের জমি ও ব্যক্তিগত জমি সমেত মােট ২৪ কোটি ডেসিয়াটিন জমি আছে(জারের জমি বাদে , ইহার কথা পরে বলা হইবে)। ইহার ভিতর ১৩ কোটী ১০ লাখ ডেসিয়াটিন জমি * জমিসংক্রান্ত এই সমস্ত ও পরবর্তী সংখ্যাগুলি অনেক পুরাতন। ইহা ১৮৭৭-৭৮ সালের হিসাব। আমাদের হাতে আরও আধুনিক কোন সংখ্যা নাই। গা ঢাকা দিয়াই শ গভর্নমেন্ট টিকিয়া থাকিতে পারে এবং সেই এই সমস্ত দেশের জনগণের জীবন সম্ব।ে সম্পূর্ণ ও খাঁটি খবর আমাদের দেশে খুব অল্পই সংগৃহীত হয়। --লেনিন ২৮ গ্রামের গরীবদের প্রতি কৃষকদের হাতে অর্থাৎ এক কোটিরও বেশী পরিবারের হাতে, অথচ ১০ কোটি ৯০ লাখ ডেসিয়াটি জমি ব্যক্তিগত মালিকের হাতে, অর্থাৎ ৫ লাখেরও কম পরিবারের হাতে। গড় ধরিলে দেখা যায়, প্রত্যেক কৃষক পরিবারের ১৩ ডেসিযাটিন জমি আছে, অথচ ব্যক্তিগত মালিকদের প্রতি পরিবারের হাতে আছে ২১৮ ডেসিয়াটিন জমি। কিন্তু এখনই আমরা দেখিতে পাইব, জমি আরও কত বেশী অসমান ভাবে বিভক্ত রহিয়াছে। ব্যক্তিগত মালিকদের ১০ কোটি ৯০ লাখ ডেসিযাটিন জমির ভিতরে ৭০ লাখ ডেসিয়াটিন হইতেছে রাজবংশীযদের জমি, অর্থাৎ রাজপরিবারের লােকেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। রুশিতে জাব এবং তাহার পরিবারবর্গই প্রথম ও সব চাইতে বড় জমিদার। একটি পরিবার ৫ লাখ কৃষক পরিবারের চেয়েও বেশী জমি রাখে। তা ছাড়া, গির্জা ও মঠের হাতে আছে প্রায় ৬০ লাখ ডেসিযাটিন জমি। আমাদের পুরােহিতেরা কৃষকদের নিকট মিতব্যযিতা ও ত্যাগের বাণী প্রচার করে, কিন্তু তাহারা নিজেরাই ভালােমন্দ সব উপায়ে প্রচুর পরিমাণ জমি হাত করিযাছে। আরও ২০ লাখ ডেসিযাটিন জমির মালিক বড় ও ছােট শহরগুলি- এবং প্রায় ঐ পরিমাণ জমি আছে ব্যবসায়ী এবং নানা রকম শিল্প কোম্পানী ও কপােরেশানের হাতে। ৯ কোটি ২০ লাখ ডেসিযাটিন জমি ( ঠিক সংখ্যা হইতেছে ৯,১৬,০৫,৮৪৫, কিন্তু সংক্ষেপের জন্য আমরা মােটামুটি সংখ্যা দিব) আছে ব্যক্তিগত মালিকদের ৫ লাখের কম (s,৮১,৩৫৮) পরিবারের হাতে। এই পরিবারের অর্ধেকই আবার খুবই ক্ষুদে মালিক। তাহাদের প্রত্যেকেরই ১০ ডেসিয়াটিনের কম জমি আছে এবং সবাই মিলিয়া ১০ লাখেরও কম ডেলিয়াটি জমি ভােগ করে। আর অন্যদিকে, ১৬ হাজার পরিবারের প্রত্যেকে এক হাজার ডেসিয়াটিনেরও উপর জমি ভােগ করে , ইহাদের সকলের মিলিত জমির ধন ও দারিদ্র-গ্রামে মালিক ও মজুর পরিমাণ সাড়ে ছয় কোটি ডেসিয়াটিন। কি অন্তহীন জমি যে বড় জমিদারদের হাতে গিয়া পড়িয়াছে, তাহা এই ঘটনা হইতে দেখা যায় যে, এক হাজারেরও কম (১২৪) পরিবারের প্রত্যেকের হাতে ১ হাজার ডেসিয়াটিনেরও বেশী জমি আছে এবং একত্রে তাহারা ২ কোটি ৭০ লাখ ডেসিয়াটিন জমির মালিক। ২০ লাখ কৃষক পরিবারের সমান জমি আছে এক হাজার পরিবাবের হাতে। এ কথা স্পষ্ট যে, লাখ লাখ, কোটি কোটি লোেক চরম দুর্দশা ও অনাহারে দিন কাটাইতে বাধ্য হইবে এব এই অনশন ও চরম দুর্দশা চলিতেই থাকিবে, যতদিন এই বিপুল জমি মাত্র কয়েক হাজার ধনিক পরিবারের হাতে থাকিবে। এ কথা স্পষ্ট যে সরকারী কর্তৃপক্ষ, গভর্নমেন্ট (এমন কি জারের গভর্নমেন্টও) এই সব বড় জমিদারের তালেই সব সময় নাচিবে। এ কথা স্পষ্ট যে, গ্রামের গরীবেরা কাহারও নিকট হইতে বা অন্য কোন স্থান হইতে কোন সাহায্য আশা করিতে পারে না, তাহাবা যতদিন না এই জমিদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে প্রবল ও কঠোর লড়াই চালাইবার জন্য একটি শ্রেণী হিসাবে একজোট হয়। এই সময়ে একটা কথা বলা দরকার যে, জমিদার শ্রেণীর ক্ষমতা সম্বন্ধে অনেকের ( অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিরও) সম্পূর্ণ ভুল ধারণা আছে, তাহারা বলে যে, “রাষ্ট্রের হাতে আরও বেশী জমি আছে। কৃষকদের এইসব বদ পরামর্শদাতারা বলে, “এখনও কুশিয়ার অনেক অংশ (জমির) রাষ্ট্রের হাতে।” [এই কথাগুলি “বিপ্লবী শি” (Revolyutsionaya Rossiya, No 8, P. ৪) নামক পত্রিকার ৮ম সংখ্যার ৮ম পৃষ্ঠা হইতে গৃহীত ]। নিম্নলিখিত বিষয় হইতে তাহাদের ভুল ধারণা জন্মিয়াছে : তাহারা নিয়াছে যে, ইউরােপীয় কুশিয়ার ১৫ কোটি ডেসিয়াটিন জমির মালিক রাষ্ট্র। ইহা সত্য। কিন্তু তাহারা ভুলিয়া যায় যে, এই ১৫ কোটি গ্রামের গরীবদের প্রতি ডেসিয়াটিন জমির প্রায় সবটুকুই সুদূর উত্তরে, আর্কাজেল, ভােলােগ, ওলােনটু ভিন্ন ও পার্ম প্রদেশগুলিতে অবস্থিত অনাবাদী বনজঙ্গল। যে-জমিগুলি এখন পর্যন্ত চাষ-বাসের অনুপযােগী, সেই জমিগুলিই কেবল রাষ্ট্র নিজের হাতে রাখিয়াছে। রাষ্ট্রের হাতে ফসলের উপযােগ জমির পরিমাণ ৪০ লাখ ডেসিয়াটিনেরও কম, এবং এই সব আবাদী রাষ্ট্রীয় জমি (যেমন সামারা প্রদেশে যেখানে এই জমির পরিমাণ খুব বেশী) ধনীদের কাছে খুব অল্প প্রায় নামমাত্র খাজনায় পত্তন দেওয়া হয়। ধনীরা এই সৰ জলির হাজার হাজার ডেসিয়াটিন পত্তন দিয়া কৃষকদের আবার খুব চড়া খাজনায় জমা দেয়। যাহারা বলে যে, রাষ্ট্রের মালিকানায় অনেক জমি আছে, তাহার কৃষকদের খুবই বদ পরামর্শদাতা। আসল ব্যাপার হইতেছে এই যে, বড় বড় ব্যক্তিগত মালিকের হাতে (জারও তাহাদের মধ্যে একজন) বহু পরিমাণ ভাল জমি আছে, আর রাষ্ট্রই হইতেছে এই সব বড় বড় মালিকদের হাতে। যতদিন পর্যন্ত গ্রাম্য গরীবেরা একত্র না হয় এবং ঐ ভাবে দুর্বার শক্তিতে পরিণত না হয়, ততদিন “রাষ্ট্র” জমিদার শ্রেণীর হুকুমের তাবেদার থাকিবে। আর একটি বিষয় আমাদের ভােলা উচিত নয় . আগের দিনে প্রায় সব জমির মালিকই সভ্রান্ত পরিবার (nobles) ছিল। এই সম্রান্ত পরিবার এখনও প্রচুর জমির মালিক (১৮৭৭-৭৮ সালে ১,১৫,০০০ সম্রান্ত ভদ্রলােক ৭ কোটি ৩০ লাখ ডেসিয়াটিন জমির মালিক ছিল)। কিন্তু আজিকার দিনে টাকার পুজিই ইয়াছে শাসক শক্তি। ব্যবসাদার ও ধনী কৃষকরা অনেক বড় বড় জমি কিনিয়াছে। ৩০ বৎসরের (১৮৬৩-১৮৯২) হিসাবে দেখা গিয়াছে যে মােট ৩ কোটি রুবলেরও বেশী মূল্যের অভিজাত বংশীয়দের জমি বেহাত হইয়াছে। (কেনা জমির অপেক্ষা বেচা জমির পরিমাণ কত বেশী সেই হিসাব অনুযায়ী) ব্যবসাদার ও ভদ্রলােক নগরবাসীর জমি কিনিয়াছে ধন ও দারিদ্র্য-গ্রামে মালিক ও মজুর ৩১ ২৫ কোটি রুবল মূল্যের। কৃষক, কসাক এবং অন্যান্য গ্রামবাসীরা ( আমাদের সরকার অভিজাত বংশীয” ও পরিচ্ছন্ন ভদ্রলোেক” হইতে সাধারণ লােককে পৃথক করিবার জন্য ঐ নামকৰণ কৰিছে। জমি কিনিয়াছে ৩০ কোটি রুবল মূল্যের। ইহার অর্থ, গড়ে প্রতি বৎসর সমস্ত কুশিমায কৃষকেরা কোটি রুবল মূল্যের জমিতে স্বত্ব লাভ করে। দেখা যাইতেছে, বিভিন্ন রকমের কৃষক আছে এমন কৃষক আছে যাহারা গরীব ও না খাইয়া মরে, আবার এমন কৃষক আছে যাহার ধনী হইতেছে। তাহা হইলে দেখা যায়, ধনী কৃষক, যাহারা জমিদারদের সহিত থাকিতে চাষ, যারা মজুরদের বিরুদ্ধে ধনীদের পক্ষ লইবে, তাহাদের সংখ্যা বাড়িতেছে। গ্রামের গরীব, যাহারা শহরের মজুরদের সহিত একত্র হইতে চায়, তাহাদের খুব ভালােভাবে চিন্তা করিয়া স্থির করিতে হইবে এই ধরনের কতজন কৃষক আছে, তাহারা কতটা শক্তিশালী এবং এই শক্তির বিরুদ্ধে লড়িবার জন্য কি ধরনের সংগঠন প্রযােজন। আমরা কিছু আগেই কৃষকদের বদ পরামর্শদাতার কথা উল্লেখ করিযাছি। এই সব বদ পরামর্শদাতারা খুব বলিয়া বেড়ায়, কৃষকদের এই রকম সংগঠন তাে আছেই, যেমন মি বা গ্রাম্য সমাজ। তাহারা বলে, মিম্ একটা বিরাট শক্তি। মিস্ কৃষকদের ঘনিষ্ঠ ভাবে একত্র করে, মিরের ভিতর কৃষকদের বিপুল সংগঠন (বিরাট, অসীম)। ইহা ভুল। ইহা নিছক গল্প মাত্র। দয়াপ্রবণ লােকদের আবিষ্কৃত রূপকথা, কিন্তু নিছক রূপকথাই। আমরা যদি রূপকথায় কান দিই, তাহা হইলে শহরের মজুরদের সঙ্গে গরীব কৃষকদের এক হওয়ার আমাদের আদর্শকে ধ্বংস করা হইবে, প্রত্যেক গ্রামবাসী ভাল করিয়া চারিদিক বিচার করিয়া দেখুক • এই মি বা কৃষক সমাজ, গ্রামের গরীবদের প্রতি কি সমস্ত ধনীদের, যাহারা অন্যের শ্রমের উপর জীবন কাটায় তাহাদের বিরুদ্ধে গরীবদের লড়াইয়ের সংগঠনের মত? না, ইহা তাহা নয়- হইতেও পারে না। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক ‘সমাজে অনেক মজুর, অনেক সর্বহারা কৃষক আছে, এবং তাহাদেরই পাশে আছে ধনী কৃষক যারা মজুর খাটায় এবং “চির স্বত্বে জমি কিনে। এই ধনী কৃষকেরা “সমাজেরও সভ্য এবং ইহারাই সমাজের মুরুব্বি, কারণ ইহাদের হাতে আছে সমস্ত ক্ষমতা। আমরা কি ইহাই চাই। এই সংগঠন, যাহার সভ্যদের ভিতর ধনীও আছে এবং ধনীরাই যাহার মুরুব্বি ? নিশ্চয়ই না। আমরা চাই ধনীদের বিরুদ্ধে লড়াই করিবার সংগঠন। তাই মি আমাদের কোন কাজেই আসিবে না। আমরা চাই ছােবব্ধ সংগঠন, এমন লােকেদের সংগঠন যারা বুঝিয়াছে যে শহরের মজুরদের সহিত এক হইতেই হইবে। গ্রাম্য সমাজ ছােবদ্ধ সংগঠন নয়, উহা সরকারী সমিতি। যাহাবা ধনীদের জন্য গতর খাটাব ও ধনীদের বিরুদ্ধে যাহাদের লড়াই, গ্রাম্য সমাজ’ তাহাদের লইয়া গঠিত নয়। গ্রাম্য সমাজে সব রকমের লােকই আছে—তাহারা ইহার ভিতর থাকিতে চায় বলিযাই নয়, তাহাদের পূর্ব পুরুষ এই একই জমিতে বাস করিত এবং একই জমিদারের জন্য কাজ করিত সেই জঙ্গই। কর্তৃপক্ষ তাদের সমাজের সভ্য সাব্যস্ত করিযাছে বলিয়াই তাহারা সভ্য। গরীব কৃষকেরা সমাজ ত্যাগ করিয়া যাইতে পারে না, কোন নূতন লােককেও তাহারা সমাজে আনিতে পারে না। আমাদেব গ্রামে আমাদের সমিতির একজন লােকের দরকার, অথচ হয়তাে পুলিস অন্য জিলার (ভােলােস্ট) তাহার নাম রেজিষ্ট্রী করিয়াছে, সুতরাং তাহার আর যােগ দেওয়ার উপায় নাই। না, আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সংগঠন চাই। যাহারা পরের শ্রমের উপর জীবন ধারণ করে, তাহাদের ধন ও দারিদ্র—গ্রামে মালিক ও মজুর বিরুদ্ধে লড়িবার জন্য কেবলমাত্র মজুর ও গরীব কৃষকদের স্বেচ্ছাবদ্ধ সংগঠনই আমাদের কাম্য। মি যখন শক্তি হিসাবে গণ্য হইত সে-দিন বহুকাল হইল চলিয়া গিযাছে, আর ফিরিবে না। মিরের শক্তি তখনই ছিল যখন কদাচিৎ এমন কৃষক দেখা যাইত যে-ছিল জমীহীন মজুর, কিংবা শ্রমিক হিসাবে চাকুরীব খোঁজে কুশিয়ার এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্তে দৌড়াদৌড়িই ছিল যাহার গতি। তখন ধনী কৃষক প্রায় ছিল না বলিলেই হয়, আর ভূমিদাসের মালিক জমিদারদের দ্বারা সকলেই সমান শােষিত হইত। কিন্তু আজ টাকাই হইতেছে প্রধান শক্তি। আজ একই সমাজের সভ্যেরা টাকার জন্য বন্য পশুর মত পরস্পরের সঙ্গে মারামারি কাটাকাটি করে। কখন কখন অর্থবান কৃষকেরা জমিদারদের চেয়েও ভালােভাবে তাহাদেব কৃষক ভাইদের বঞ্চনা ও শােষণ করে। আজ আমরা মিরের সমিতি চাই না। আমরা চাই টাকার শক্তির বিরুদ্ধে, মূলধনী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই-এর উপযােগী সংগঠন। চাই বিভিন্ন সমাজের সমস্ত গ্রাম্য মজুর ও গ্রাম্য গরীব কৃষকদের সমিতি, কোন বাছ-বিচার করিযা সমস্ত ধনী কৃষক ও জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করিবার জন্য শহরের মজুরদের সঙ্গে সমস্ত গ্রাম্য কৃষকদের একা। আমরা জমিদারের শক্তি দেখিয়াছি। এইবার আমরা দেখিতে চেষ্টা করিব ধনী কৃষকদের সংখ্যা কত এবং তাদের শক্তি কতখানি। আমরা জমিদারদের শক্তির বিচার করিয়াছি, তাহাদেব সম্পত্তি, তাহাদের জমির পরিমাপে। জমিদারের ইচ্ছামত জমি হস্তান্তর করিতে পারে, তাহারা স্বাধীনভাবে জমি বেচা-কেনা করিতে পাবে। তাই জমির পরিমাণ দেখিয়া তাহাদের মত সুন্নভাবে বিচার করা সম্ভব। অন্য দিকে, কৃষকদের আজও স্বাধীনভাবে জমি হস্তান্তর করিবার অধিকার নাই, তাহারা আজও অর্থ-ভূমিদাস, নিজ নিজ গ্রাম্য সমাজে আবদ্ধ।
গ্রামের গরীবদের প্রতি তাই জমির ভাগের পরিমাণ দেখিয়া ধনী কৃষকদের ক্ষমতা বিচার করা অসম্ভব। জমির ভাগ ধনী কৃষকদের ধনী করে নাই, তারা যথেষ্ট পরিমাণ জমি কিনেও। তারা “চিবকালের জন্য” (অর্থাৎ স্থায়ী অত্বে) এবং “অনেক বৎসরের জন্য” (অর্থাৎ লিজ, বা পত্তন) জমি কিনে। জমিদারদের নিকট হইতে কিংবা তাহাদেরই মত অন্য কৃষকদের নিকট হইতে তাহার জমি ক্রয় করে। যেসব কৃষক জমি ছাড়িয়া চলিয়া যায়, প্রয়ােজনের তাগিদে যাহার জমি পত্তন দিতে বাধ্য হ্য, তাহাদের নিকট হইতে ইহার জমি নেয়। এই সব কারণে, কাহার কত ঘােড় আছে, তাহারই পরিমাপে ধনী, মধ্যবিত্ত ও গরীব কৃষকদের পার্থক্য চিার করা ভাল। যে-কৃষকের অনেক ঘোড়া আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে ধনী কৃষক , যদি সে অনেকগুলি ভারবাহী পণ্ড রাখে, তাহা হইলে বুঝা যায় যে সে অনেকখানি জমি চাষ করে এবং তাহার সামাজিক ভাগ ছাড়াও জমি আছে এবং সঞ্চিত পুজি আছে। এখন গােটা রুশিয়ায় (ইউরােপীয় কুশিয়া, সাইবেরিয়া ও ককেসাস বাদে) বহু ঘােড় আছে এমন কৃষকের সংখ্যা আমরা হিসাব করিতে পারি। অবশ্য মনে রাখিতে হইবে যে গােটা কুশিয়ার মােটামুটি সংখ্যা আমরা দিতে পারি প্রত্যেক জিলা ও এদেশের (Uyezds and subernias) মধ্যে পার্থক্য যথেষ্ট। যেমন শহরের আশে পাশের ধনী ক্ষেত মালিকেরা বেশী ঘােড়া রাখে না। অনেকে বাজারের জন্য বাগান করে। ইহা খুব লাভের ব্যবসা। অনেকে বেশী ঘােড়া রাখে না, গরু রাখে আর দুধ বিক্রী করে। কুশিয়ার সব অংশেই এমন কৃষক আছে যাহারা জমি হইতে অর্থ করে না, ব্যবসা করে। [ নােট —ভূমিদাসের মুক্তি পাবে শিরার কৃষকরা ছিল ভূমিদাস। তাহাদের স্বাধীন কোন অধিকারই ছিল না। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার লেশও ছিল না। ক্রিমিয়ায় বুয়ে দুর্বল হইয়া ও স্থানে স্থানে কৃষক বিমোহে ভীত হইয়া আর ১৮৬১ সালে ভূমিদসদের মুক্তি দেয়, কিন্তু কৃষকরা একেবারে মুক্ত হয় না, কিউদাল দাসত্বের বহু হি তখনও বর্তমান থাকে। মুক্তির মুখপ কৃষকদের দিতে হয় ২•• কোটল।
ধন ও দারিদ্র গ্রামে মালিক ও মজুর তাহার তেলের কল চালায়, পরে খোসা ছাড়ানাের কল ও অঙ্গ কাজ গলায়। যে-কেহ গ্রামে বাস করিয়াছে সেই তাহার গ্রামের বা জিলার ধনী কৃষকদের জানে। কিন্তু আমাদের কাজ হইতেছে, গােটা রুশিয়ায় ধনী কৃষকের সংখ্যা কত এবং তাহাদের ক্ষমতাই বা কতখানি, ইহা জানা , যাহাতে গরীব কৃষকদের অনুমানের উপর নির্ভর করিযা অন্ধের মত পথ হাতড়াইতে না হয়, যাহাতে তাহারা নিশ্চিন্ত ভাবে নিতে পারে, কে-ই বা তাহাদের বন্ধু আর কে-ই বা তাহাদের শত্রু। এইবার দেখা যাক, ঘােডার সংখ্যার দিক দিযা কত কৃষক ধনী, আর কত গরীব। আমরা আগেই বলিয়াছি যে, গােটা কুশিয়ায় প্রায় এক কোটি কৃষক পরিবার আছে। ইহাদের প্রায় দেড় কোটি ঘােড় আছে (১৪ বৎসর আগে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭০ লাখ, কিন্তু পরে এই সংখ্যা কমিয়াছে)। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ১০টি পরিবারে ১৫টি ঘােড় আছে। কিন্তু আসল কথা হইতেছে এই যে, তাহাদের ভিতর যাহার অনেক ঘােড়র মালিক, তাহারা সংখ্যায় কম, আর অধিকাংশের কোন ঘােড়ই নাই বা খুব কম ঘােড় আছে। কমপক্ষে ৩০ লাৰ কৃষক আছে, যাহাদের ঘােড়া নাই এবং প্রায় ৩৫ লাখের কেবল একটি করিয়া ঘােড় আছে। এই সব কৃষক একেবারে নিঃস্ব অথবা খুব গরীব। গ্রামের গরীব বলিতে আমরা ইহাদের বুঝি। এক কোটির ভিতর ইহাদের সংখ্যা ৬৫ লাখ অর্থাৎ প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ। তারপর আসে মধ্যবিত্ত কৃষক, যাহাদের প্রত্যেকের এক জোড়া করিয়া ঘােড়া আছে। এই ধরনের প্রায় ২০ লাখ কৃষক পরিবার আছে এবং তাহাদের মােট ঘােড় আছে প্রায় ৪০ লাখ। তার পর আসে ধনী কৃষক। ইহাদের প্রত্যেকের এক জোড়ারও বেশী ঘােড় আছে। ইহারা সংখ্যায় ১৫ লাখ পরিবার কিন্তু তাহারা মােট ৭৫ লাখ গ্রামের গরীবদের প্রতি ঘােড়ার মালিক। * ইহার অর্থ ছয় ভাগের এক ভাগ পরিবার মােট অর্ধেক ঘােড়র মালিক। এই সব জানিবার পর এইবার আমবা ধনী কৃষকদের ক্ষমতা সম্বন্ধে সঠিক বিচার কবিতে পারি। তাহাদের সংখ্যা বেশী নয় বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গ্রামে তাহাদের সংখ্যা শতকরা ১০ হইতে ২০টি পরিবাব পর্যন্ত গড়াইতে পারে। কিন্তু এই পরিবারগুলি সংখ্যায় অল্প হইলেও সব চাইতে ধনী। গােটা কুণিযায় অন্য সব কৃষকদের মােট যত ঘােড় আছে, তাহারাও প্রায় ততগুলি ঘােড়রই মালিক। ইহার অর্থ এই যে, তাহারা কৃষকদের মােট ফসল জমির অর্ধেক জমিতে চাষ করে এবং তাহাদের পরিবারের প্রযােজনের অপেক্ষা অনেক বেশী ফসল তাহাদের হাতে আসে। যথেষ্ট পরিমাণ ফসল তাহারা বিক্রী করে। নিজেদের খাদ্যের জন্য ন্য—প্রধানত বিক্রীব জন্ত ও টাকা পাইবার জন্য তাহারা ফসল উৎপন্ন করে। এই সব কৃষকেরাই টাকা জমাইতে পারে। তাহারা সেভিংস ব্যাঙ্কে ও ব্যাঙ্কে টাকা জমায়। তাহারা ভোগ-দখল স্বত্বে জমি কিনে। আমরা দেখিয়াছি কৃষকরা বছরে কত জমি কিনে , ইহার অধিকাংশ জমিই ধনী কৃষকদের হাতে যায়। গরীব কৃষকরা জমি কেনার কথা ভাবিতেও পারে না, তাহাদের যথাসর্বস্ব দিয়া কোনক্রমে অনার * আমরা আবার বলিতেছি যে, সংখ্যাগুলি মােটামুটি গড় হিসাবেই ধরা হইয়াছে। ধনী কৃষকদের সংখ্যা ঠিক ঠিক ১৫ লাখ নাও হইতে পারে, সাড়ে বার লাশ, সাড়ে সতের লাখ ৰা যি লাশও হইতে পারে। তাহাতে বিশেষ ছুি পার্থক্য হইবে না। হাজার ব লাখের শেষ সংখ্যাটি পৰ্যন্ত হিসাব করাই বড় কথা নয়, ধনী কৃষকদের শক্তি ও অবস্থা বুঝাই বিশেষ প্রয়ােজন, যাহাতে আমরা আমাদের শত্রু মিত্র চিনিতে পারি, যাহাতে আমরা ফাকা কলায় ও মিথ্যা গরে প্রতারিত না হই এবং ধনী ও গরীবদের অবস্থা সঠিকভাবে বুঝিতে পারি। এমের প্রত্যেক কর্মীকে সাবধানে নিজের ও আশেপাশের গ্রামের অবস্থা দেখিতে হইবে। তাহা হইলে দেখা যাইবে, আমরা ঠিকই হিসাব করিয়াছি এব গড়ে সর্বত্র এই একই অবস্থা। প্রতি একটি পরিবারে ১টি কি বড় জোর ২টি এনী কৃষক পরিবার, আর ২টি মধ্যবিত্ত কৃষক আর বাকী সৰগৰীৰ কৰক।-লেনিন ধন ও দারি-গ্রামে মালিক ও মঞ্জুর হইতে বাঁচিবার চেষ্টাতেই তাহারে দিন যায়। জমি কেনা দূরের কথা, রুট কেনার অর্থও অনেক সময় তাহাদের জুটে না। ইহা হইতে দেখা যায় যে, ব্যাঙ্ক, বিশেষ করিযা কৃষি ব্যাঙ্ক সমস্ত কৃষকদের জমি কেনার সাহায্য করে না কৃষকদের প্রতারিত করিবার জন্য অনেক সময় অনেকে এই কথা বলিয়া থাকে, অনক সমষ খুবই সরল প্রকৃতির লােকও ইহা সত্য বলিয়া থাকে, শুধুমাত্র অল্প কযেকজন ধনী কৃষককে সাহায্য করে। ইহা হইতে আরও দেখা যায় যে, আগে যে-সব কৃষকদের পরামর্শদাতাদের কথা বলা হইয়াছে, তারা যখন বলে যে কৃষকেরা জমি কিনিতেছে, জমি মূলধনীর হাত হইতে মজুরের হাতে চলিয়া যাইতেছে, তখন তারা ভুল বলে। জমি কখন মজুরের হাতে, গরীব শ্রমজীবীর হাতে যাইতে পারে না, কারণ জমি কিনিতে টাকা লাগে। আর গরীব কৃষকের তো হাতে বাড়তি নগদ টাকা থাকে না। জমি যাইতে পারে কেবল ধনী ও পয়সাওালা কৃষকদের হাতে, মূলধনীর হাতে অর্থাং সেই সব লােকের হাতে যাহাদের বিরুদ্ধে গ্রামের গরীবদের শহরের মজুরের সঙ্গে এক যােগে লড়িতে হইবে। ধনী কৃষকেরা যে শুধু জীবন স্বত্বে জমি কিনে তাহাই নয়, তাহারা প্রায়ই বহু বছরের জন্য জমি পত্তন নেয়। বড় বড়, খণ্ড খণ্ড জমিতে পত্তন লইয়া তাহারা গরীবদের জমি পাওয়ার পথে বাধা দেয়। যেমন পলটা প্রদেশের কনস্টাটিনােগ্রাড জিলায় ধনী কৃষকেরা কি পরিমাণ জমি পত্তন নিয়াছে তাহার হিসাব লওয়া হইয়াছে। সেখানে কি দেখা যায়? প্রতি ১৫টি পবিবারে গড়ে দুইটি পরিবার ৩০ ডেসিয়াটিন বা তাহার বেশী জমি পত্তন নিয়াছে। এই ধনী কৃষকের সংখ্যায় খুব কম, কিন্তু তাহারা সমস্ত পত্তনি জমির অনেকের মালিক এবং প্রত্যেকের গড়ে ৭৫ ডেলিয়াটি জমি অাছে। কিংবা টরিডা প্রদেশের কথা ধরা যাক। এখানে হিসাব হইযাছে, রাষ্ট্রের নিকট হইতে সিম অর্থাৎ “গ্রাম্য সমাজের মারফৎ কৃষকরা যে-জমি পত্তন নিয়াছে, তাহার গ্রামের গরীবদের প্রতি কতখানি ধনী কৃষকেরা দখল করিয়াছে। দেখা গিয়াছে যে, ধনীরা মােট পরিবারের মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ, কিন্তু তাহারা গ্রাস করিয়াছে পত্তনি জমির চার ভাগের তিন ভাগ। সর্বত্রই টাকার অঙ্কের অনুপাতে যে অতি অল্প সংখ্যক ধনীদেরই হাতে অর্থ আছে তাহাদের মধ্যে জমি ভাগ হইয়াছে। তা ছাড়া, কৃষকরা নিজেরাই অনেক জমি পত্তন দেয়। অনেকে জমা ছাডিয়া দেয়, কারণ তাহাদের গরু-ঘােড়া নাই, বীজ নাই, ক্ষেত খামার চালাইবার কোন কিছুই নাই। আজিকার দিনে টাকা ছাড় জমি কোন কাজে লাগে না। যেমন সামার প্রদেশের নােভুজে, জিলায় প্রতি ৩টি ধনী কৃষক পরিবারের ভিতর একজন, এমন কি দুইজন পর্যন্ত নিজ বা পাশের “সমাজে বিলিকরা জমি পত্তন নেয়। যাহাদের কোন ঘােড় নাই বা একটি মাত্র ঘােভা আছে, সেই সব কৃষকই সামাজিক বিলিকরা জমি পত্তন দেয়। টরিডা প্রদেশে তিন ভাগের এক ভাগ কৃষক পরিবারই জমি পত্তন দেয়। অর্থাৎ আড়াই লাখ ডেসিয়াটিন বা কৃষকের অধিকারের সামাজিক বিলির জমির মােট চার ভাগের এক ভাগই পত্তন দেওয়া হয়। এই আড়াই লাখ ডেসিয়াটিনের ভিতর দেড় লাখ ডেসিয়াটিনই (পাঁচ ভাগের তিন ভাগ) ধনী কৃষকেরা পত্তন নেয়। ইহা হইতেও বিচার করা যায় যে, মি গরীব কৃষকদের উপযােগী সমিতি কিনা। “গ্রা সমাজে যাহার টাকা আছে তাহারই হাতে ক্ষমতা। কিন্তু আমরা চাই সমস্ত সমাজের গরীবদের একটা সংগঠন। জমি কেনার এই সব কথা কৃষকদের ঠকাইবার জন্যই বলা হয়। সতাষ লাঙ্গল, ফসল কাটা যন্ত্র ও অন্যান্য উন্নত যন্ত্রপাতি কিনিতে কৃষকদের সাহায্য করার কাহিনী সম্বন্ধে ঐ একই কথা খাটে। জেন্টতে (ইউনিয়ান বাের্ডের মত—অনুবাদক) অড়িত ও সমবায় সমিতি খােলা হয়, আর কৃষকদের বলা হয়, উন্নত যন্ত্রপাতির ব্যবহারে কৃষকদেরও ধন ও দারিদ্র্য—গ্রামে মালিক ও মজুর অবস্থার উন্নতি হইবে। এ সমস্তই ধাপ্পাবাজী। এই সব উন্নত যন্ত্রপাতি সব সময়ই ধনীর হাতে যায় , গরীবরা প্রকৃতপক্ষে কিছুই পায় না। কায়ক্লেশে জীবন ধারণের চিন্তাই যখন প্রবল, তখন লাগল আর ফসল কাটা যন্ত্রের কথা ভাবিবার তাহাদের অবসর কোথায় ? কৃষকদের সাহায্য করিবার এই সব ব্যবস্থা ধনীদের সাহায্য করা ছাড়া আর কিছুই নয়। যাহাদের জমি নাই, গৰু-ঘােড় নাই, সঞ্চিত অর্থ নাই, সেই সব গরীব জনসাধারণের কাছে সব থেকে উন্নত যন্ত্রপাতি সস্তা হইলেই বা কি কাজে আসিবে? একটা উদাহরণ দেওয়া যাউক। সামারা প্রদেশের একটা জিলায় ধনী ও গরীব কৃষকদের সমস্ত উন্নত যন্ত্রপাতির একটা হিসাব করা হইয়াছিল। দেখা গিয়াছিল যে, সমস্ত পরিবারের পাঁচ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ সবচেয়ে ধনীরা উন্নত যন্ত্রপাতির প্রায় চার ভাগের তিন ভাগের মালিক, আর গরীবরা—যাহারা মােট পরিবারের সংখ্যার অক— তাহারা মাত্র ৩০ ভাগের এক ভাগের মালিক। মােট ২৮ হাজার পরিবারের ভিতর ১০ হাজারের ঘােড় ছিল না বা একটি ঘােড়া ছিল, এই জিলার মােট ৫,৭২৪টি উন্নত যন্ত্রপাতির ভিতর এই ১০ হাজার পরিবারের ছিল মাত্র সাতটি। এই সব অর্থনৈতিক উন্নতি, লাঙ্গল ও ফসলকাটা যন্ত্রের এই সব বুদ্ধি যাহা নাকি সমস্ত কৃষককে সাহায্য করিতেছে, তাহার ৫,৭২৪টির ভিতর সাতটি হইল গরীব কৃষকদের ভাগে। যে সমস্ত লােক “কৃষি ক্ষেত-খামারের উন্নতির কথা বলে, তাহাদের নিকট হইতে গ্রামের গরীবদের পাওনা ইহাই। অবশেষে ধনী কৃষকদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হইতেছে যে, তাহারা ক্ষেতমজুর ও দিনজুর খাটায়। জমিদারের মত ধনী কৃষকেরাও অন্যের শ্রমের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষক জনসাধারণ নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হইবা যায়, আর তাহারই ফলে জমিদারদের মত তাহারাওধনী হইয়া জমিদারদের মত তাহারাও যত কম পারে মজুরী দিয়া, নেত উঠে।
৫০ গ্রামের গরীবদের প্রতি মজুরদের নিকট হইতে যত বেশী পারে নিংড়াইয়া কাজ আদায় করিতে চেষ্টা করে। যদি লাখ লাখ একেবারে সর্বস্বান্ত কৃষক না থাকিত, যাহাদের অন্যের জন্য এম করা ছাড়া উপায় নাই, যাহারা অন্যের মজুরী করিতে, নিজ শ্রমশক্তি বিক্রয় করিতে বাধ্য,তাহা হইলে ধনী কৃষকদের অস্তিত্বই থাকিত না। ক্ষেত-খামার চালান তাহাদের অসম্ভব হইত। তাহা হইলে দখল করার মত “জয় পাওয়া” জমাও থাকিত না, খাটাইবার মত মজুরও থাকিত না। সমস্ত রুশিয়ায় ১৫ লাখ ধনী কৃষক নিশ্চয়ই কমপক্ষে ১০ লাখ ক্ষেতমজুর ও দিনমজুর খাটায়। ইহা সুস্পষ্ট যে, সম্পত্তিওয়ালা ও সম্পত্তিহীন, মালিক ও মজুর, বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের বিরাট লড়াই-এ ধনী কৃষকেরা মজুরশ্রেণীর বিরুদ্ধে সম্পত্তিওয়ালাদের পক্ষ লইবে। আমরা ধনী কৃষকদের ক্ষমতা ও অবস্থা দেখিলাম। এইবার গ্রামের গরীবদের অবস্থা দেখা যাউক। আমরা আগেই বলিয়াছি যে, গ্রামের গরীবরা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশী, রুশিয়ার কৃষক পরিবারের প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ। প্রথমেই দেখা যায়, ঘোডা নাই এমন পরিবারের সংখ্যা কমপক্ষে ৩০ লাখ—হষতে আজ ইহার চেয়ে বেশী, ৩৫ লাখ হইবে। প্রত্যেকটি দুর্তিক, প্রত্যেকটি অজন্মায় হাজার হাজার পরিবার ধ্বংস হইয়া যায়। লােকসংখ্যা বাড়ে, জমিতে ভিড়ও লাগে, অথচ সব ভাল জমি জমিদার ও ধনী কৃষকেরা গ্রাস করিয়া নিয়াছে। প্রতি বৎসরই ক্রমেই বেশী সংখ্যক লােক ধ্বংস হইয়া চলিয়াছে, তাহারা শহরে যায়, কারখানায় যায়, ক্ষেতমজুরীর জোগাড় দেখে, অথবা অপটু সাধারণ মজুর হয়। যে-কৃষকের ঘােড়া নাই সে সম্পূর্ণ সম্পত্তিহীন কৃষক, সে সর্বহারা। সে জীবন ধারণ করে (জীবন ধারণ । কোনক্রমে দেহটা টিকাইয়া রাখে বলিলেই ঠিক কথা হইবে) জমি ভােগ করিয়া নয়, ক্ষেত-খামারের সাহায্যে নয়, মজুরী খাটিয়া। শহরের মজুরেরই সে ভাই। যে-কৃষকদের ঘােস নাই, জমিও তাদের কাজে ১১ ধন ও দারিদ্র—গ্রামে মালিক ও মজুর লাগে না, তাহাদের অর্ধেকেই ভাগে জমি পত্তন দেয়, কারণ জমি চাষ করিবার ক্ষমতা তাহাদের নাই, অন্যেরা বিনা মূল্যে সমাজের কাছে জমি ছাড়িয়া দেয় (সময়ে সময়ে জমি ছাডিয়া দিবার অনুমতির জন্য কিছু দিতেও হয়।) যে-কৃষকের ঘােডা নাই সে এক ডেসিয়াটিন, কি বড় জোর দুই ডেসিয়াটিন জমি চাষ করে। বরাবরই বছরের কযেক মাস তাহাকে রুটি কিনিতে হয় (অবশ্য কিনিবার যদি সঙ্গতি থাকে), নিজের ফসলে তাহার আদৌ কুলায় না। যে-সব কৃষকের একটি ঘােডা আছে, তাহাদের অবস্থাও বিশেষ ভাল না—তাহাদের সংখ্যাও কুশিয়ায় ৩৫ লাখ হইবে। অবশ্য ইহার ব্যতিক্রমও আছে, এবং আমরা আগেই দেখাইযাছি যে, এখানে-সেখানে এক ঘােড়াওয়ালা কৃষকদের অবস্থা মাঝামাঝি রকম সচ্ছল—কেউ বা বেশী। কিন্তু আমরা এই সব ব্যতিক্রম বা বিশেষ একটা জিনার কথা লইযা মাথা ঘামাইব না। আমরা গােটা কুশিয়ার কথা বলিতেছি। যদি আমরা সমস্ত এক ঘােড়া- ওয়ালা কৃষকদের ধরি, তাহা হইলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তাহা বিরাট এক নিঃষের দল। কৃষি-প্রধান প্রদেশগুলিতেও তারা তিন চার ডেসিয়াটিন, কদাচিৎ পাঁচ ডেসিয়াটিন জমি চাষ করে , আহার তাহার নিজের ফসলে সারা বছর চলে না। ফসল হয় সে-বছরেও তাহার খাদ্য, যে-কৃষকের ঘােড় নাই তাহার চেয়ে ভালাে নয়। ইহার অর্থ, তাহাকে বরাবর অনাহারে ও ক্ষুধায় দিন কাটাইতে হয়। তাহার ক্ষেত-খামার ধ্বংসের পথে, গরু-ঘােড় দুর্বল ও তাহাদের খড়-বিচালী, দানা-পানির অভাব। ভালাে ভাবে জমি চাষ করার অবস্থা সে কৃষকের নাই। উদাহরণ স্বরূপ ভরােনেজ প্রদেশে এক ঘােড়ওয়ালা কৃষক হার ক্ষেত-খামারে বছরে ২০ বলের বেশী খরচ (গরু-ঘােড়র খাদ্য বাদে) করিতে পারে না। (ধনী কৃষকরা ইহার দশ গুণ খরচ করে)। জমির Gર গ্রামের গরীবদের প্রতি খাজনা, গরু-ঘােড়া কেনা, কাঠের লাঙল ও অন্য যন্ত্রপাতি মেরামত, রাখালের মাহিয়ানা এবং আর সব কিছুর জন্য বছরে ২০ রুবল। ইহারই নাম কি ক্ষেত-খামার করা? দুঃখকষ্ট, অশেষ খাটুনি ও চিরন্তন মানসিক অশান্তি ছাড়া ইহা আর কিছুই নয়। ইহা স্বাভাবিক যে, এক ঘােড়াওয়ালা কৃষকদের বেশ অনেকেই তাহাদের ভাগের জমিও পন দিতে বাধ্য হয়। নিঃশ্বের কাছে জমিও কোন কাজে লাগে না। তাহার টাকা নাই, জমি হইতেও তাহার টাকা আসা দূরে থাকুক, যথেষ্ট আহারও জুটে না। অথচ খাদ্য, কাপড়-চোপড়, ক্ষেত-খামার, ট্যাক্স— সব কিছু জরুই চাই টাকা। রােনেজ প্রদেশে সাধারণত এক ঘােড়ওয়ালা কৃষককে বছরে { ট্যাক্স দিতে হয় আঠার কবল, অথচ তাহার সমস্ত খরচের জয় বছরে ৭৫ রুবলের বেশী সে রােজগার করিতে পারে না। এই অবস্থায় তাহাকে বেণী জমি কিনিতে বলা, উন্নত যন্ত্রপাতির কথা অথবা কৃষি ব্যাঙ্কের পরামর্শ দেওয়া, নিছক ঠাট্টা ছাড়া আর কিছুই নয়, এই সব জিনিস গরীবদের জন্য সৃষ্টি হয় নাই। কৃষক টাকা পাইবে কোথা হইতে ? তাহাকে কাজের জোগাড় দেখিতে হয়। যে-কৃষকের ঘােডা নাই তাহারই মত এক ঘােড়ওয়ালা কৃষককেও এই কাজের সাহায্যেই নিজেকে বাঁচাইয়া রাখিতে হয়। কিন্তু এই কাজ কথাটার অর্থ কি? ইহার অর্থ অন্যের জন্য মজুরীর আশায খাটা। ইহার অর্থ এক ঘােড়াওয়ালা কৃষকের স্বাধীন ক্ষেত-খামারের কাজ প্রায় অর্ধেক বন্ধ হইয়া আসিয়াছে। সেও অন্যের ভাড়াটিয়া, সর্বহারায় পরিণত হইযাছে। সেই জন্যই এই সব কৃষকদের অসবহারা বলা হয়। তাহারাও শহরের মজুরদের ভাই, কারণ তাহারাও মালিকদের দ্বারা সকল রকমে শােষিত হয়। সােস্যাল ডেমােক্রাটদের সঙ্গে একত্র হইয়া সমস্ত ধন ও দারিদ্র-গ্রামে মালিক ও মজুর ধনীদের বিরুদ্ধে, সমস্ত সম্পত্তির মালিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ছাড়া তাহাদেরও অন্য কোন গতি নাই, মুক্তি নাই। রেলপথ নির্মাণের কাজ করে কে? কাহারা দালালদের দ্বারা শােষিত হয় ? কাঠ কাটা ও কাঠ ভাসানাের কাজ করে কে? ক্ষেতমজুরের অথবা দিনমজুরের কাজ করে কে? শহরে ও বন্দরে সাধারণ অপটু মজুরের কাজ করে কে? সব সমযেই এই সব কাজ করে গ্রামের গরীব কৃষক, যাহার একেবারেই ঘােডা নাই, কিংবা একটি মাত্র আছে , ঐ গ্রাম্য সর্বহারা ও অর্থ সর্বহারার দল। আর কুশিয়ায় তাহাদের সংখ্যাই বা কি বিপুল। হিসাবে দেখা গিয়াছে যে, রুশিয়ায (ককেসাস ও সাইবিরিয়া বাদে) বছরে ৮০ লাখ, কখনও ৯০ লাখ ছাড়পত্র নেওয়া হয়। এই সবগুলি প্রবাসী মজুরদের জন্য। ইহারা শুধু নামে মাত্র কৃষক , প্রকৃত পক্ষে তাহারা ভাড়াটিয়া, দিনমজুর। শহরের মজুরদের সঙ্গে তাহাদের সকলকে এক হইতে হইবে—এবং গ্রামে আশা ও জ্ঞানের প্রতিটি রশ্মি এই একতা মজবুত ও শক্ত করিবে। “কাজ” সম্বন্ধে আর একটি কথা ভােলা উচিত নয়। সরকারী কর্মচারী ও তাহাদেরই মত চিন্তা করিতে অভ্যস্ত লােকে কৃষকদের সম্বন্ধে বলিষা বেড়াইতে ভালবাসে যে, তাহাদের দুইটি জিনিসের প্রয়ােজন” জমি (কিন্তু বেশী নয়-বেশী থাকার কথাও নয়, কারণ ধনীর সবই গ্রাস করিয়া নিয়াছে) এবং একটি “কাজ”। আর তাহারা বলে যে, জনসাধারণকে সাহায্য করিতে হইলে দেশে যত বেশী সম্ভব ব্যবসা চালাইবার চেষ্টা করিতে হইবে এবং বেণী “কাজ” ‘দিতে হইবে”। এই সব কথা নিছক ভণ্ডামি। গরীবের জন্য “কাজ”-এর অর্থই হইতেছে দিনমজুরী। কৃষকদের “কাজ দেওয়ার অর্থই হইতেছে তাহাদের দিনমজুরে পরিণত করা।
s: গ্রামের গরীবদের প্রতি সাহায্যের চমৎকার পন্থা। ধনী কৃষকদের জন্য অবশ্য স্বতন্ত্র ধরনের “কাজ” আছে, যার জন্য পুজি চাই, যেমন—ময়দার কল বা অন্য কোন কল তৈরী, ফল ওডানাের যন্ত্র কেনা, ব্যবসা প্রভৃতি। টাকাওয়ালা লােকের এই সব কাজের সঙ্গে গরীবদের দিনমজুরীকে গুলিয়ে ফেলা গরীবকে ঠকানাে। অবশ্য গরীবদের এইভাবে ঠকানােত ধনীদেরই সুবিধা। প্রত্যেকটি কৃষক যে-কোন “কাজ” নিতে পারে এবং সেজন্য তাহার পুজিও আছে, এই ধরনের হুল করায় ধনীদেরই সুবিধা হয়। কিন্তু যাহারা সত্যই গরীবদের মঙ্গল চায, তাহার গরীবদের পুরাপুরি সত্যই বলিবে এবং সত্য ছাড়া আর কিই বলিবে না। মধ্যবিত্ত কৃষকদের কথা বলা বাকী আছে। আমরা দেখিয়াছি বে, সমস্ত রুশিয়ায় মােটামুটি তাহাদেরই মধ্যবিত্ত কৃষক বলা যায়, যাহাদের এক জোড়া ঘােড় আছে। আমরা আরও দেখিয়াছি যে, মােট এক কোটি পরিবারের ভিতর এই দেশে মােটামুটি ২০ লাখ মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার আছে। মধ্যবিত্ত কৃষকদের অবস্থা ধনী কৃষক ও সর্বহারার মাঝখানে, তাই তাহাদের মধ্যবিত্ত কৃষক বলা হয়। তাহার জীবনধারণের মাপকাঠিও মাঝামাঝি গােছের, ফসল ভালাে হইলে তাহার একরকম চলিয়া যায়, কিন্তু দারিদ্র্য সব সময় লাগিয়াই আছে। সঞ্চয় তাহার যৎসামান্য কিংবা হয়তাে কিছুই নাই। তাই হার ক্ষেত-খামারেরও বড় শশাচনীয় অবস্থা। টাকার জোগাড় করা তাহার পক্ষে খুবই শক্ত, ক্ষেত-খামার হইতে কচিৎ কদাচিৎ সে দু’পয়সা করিতে পারে। যদিও বা কিছু হাতে আসে তাহাতেও কোনরকমে দুই বেলা মাত্র চলে। কাজের খোঁজে বাহির হওয়ার অর্থ ক্ষেত-খামার অমনি ফেলিয়া যাওয়া, ফলে সবই বংস হইয়া যাইবে। ইহা সত্বেও অনেক মধ্যবিত্ত কৃষক কাজের খোজ করিতে ধন ও দারিদ্র-গ্রামে মালিক ও মজুর ১৫ বাধ্য হয়। তাহারাও ভাড়াটিয়া মজুর হয়। প্রযােজনের তাগিদে জমিদাবের নিকট আত্মবিক্রয় করিতে, দেনা করিতে বাধ্য হয়। একবার দেনা জড়াইয়া পডিলে আর মুক্ত হওযা মধ্যবিত্ত কৃষকের পক্ষে কদাচিৎ সম্ভব, কারণ ধনী কৃষকদেব মত ইহাদেব কোন নিয়মিত আষ নাই। দেনা জড়াইয়া পড়া মানেই গলায় ফাঁসি জড়ানাে। একেবারে নিঃশেষে ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত সে দেনাদারই রহিয়া যায়। প্রধানত মধ্যবিত্ত কৃষকরাই জমিদারের খপ্পরে যাই পডে, কারণ ঠিকা কাজের জন্য জমিদাবের এমন কৃষক প্রয়ােজন যে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয নাই, যাহার একজোড়া ঘােড়া ও ক্ষেত-খামারের জন্য অঙ্গ জিনিসপত্র আছে। মধ্যবিত্ত কৃষকের পক্ষে কাজের খোঁজে যাওযা সহজ ন—তাই সে ফসলের কিংবা পশুচারণের জমির বদলে “ওত্রে কি” পত্তনের বা শীতের সময় অগ্রিম অর্থ গ্রহণের জন্য নিজেকে জমিদারের নিকট দাসত্বের বন্ধনে বেচিয়া দেয়। জমিদার এবং মহাজন ছাড়াও, মধ্যবিত্ত কৃষক তাহাব ধনী প্রতিবেশীর দ্বারা নিপীড়িত হয়। ইহারা মধ্যবিত্ত কৃষকের চোখের সামনে তাহার জমি কাডিয়া নেয় এবং তাহাকে কোন না কোন উপায়ে উৎপীড়ন করার সুযােগ ছাড়ে না। এই হইতেছে মধ্যবিত্ত কৃষকের জীবন—সে এও নয় ও-ও নয়। সে প্রকৃত ক্ষেত-খামার ভােগীও হইতে পারে না, আবার দিনমজুরও হইতে পারে না। প্রত্যেক মধ্যবিত্ত কৃষকই প্রভুদের সঙ্গে পাল্লা দিতে এবং সম্পত্তির মালিক হইতে চায়, কিন্তু খুব অল্প লােকই এইরূপ হইতে পারে। অল্প কয়েকজন মাত্র অন্যের * ওএেকি—এই কথাটি হবুহ অর্থ “কাটিয়া নেওয়া জমি। ১৮৬১ সালে যখন ভূমিদাসদের মুক্তি দেওয়া হয়, তখন তাহাদের জমির সবচেয়ে ভালো অংশ জমিলাররা কাটিয়া লইত। পরে আবার জমিদাররা এই সব জমি খুব উচু খাজনায় কৃষকদের পত্তন দিত। এমই এই খাজনা কৃষকরা খাটি শােধ দিত-অনুবাদক।
গ্রামের গরীবদের প্রতি কিন্তু মজুররা এমের সাহায্যে দু’পসা করিতে চেষ্টা করে এবং ক্ষেতমজুর ও দিনমজুর খাটাইয়া অন্যের পিঠে চাপিয়া ধন-দৌলত করে। কিন্তু বেশীর ভাগ মধ্যবিত্ত কৃষকেরই মজুর খাটাইবার অর্থ নাই বরং তাহার নিজেরাই মজুর খাটে। যখনই ধনী ও গৰীবে, সম্পত্তির মালিক ও মজুরে লড়াই বাধে, তখন মধ্যবিত্ত কৃষক থাকে ঠিক মাঝামাঝি। কোন দিকে যাইবে সে ঠিক পায় না। ধনীরা তাহাদের পক্ষে যােগ দিবার জন্য তাহাকে গকে, বলে: “তােমার তাে ক্ষেত-খামার আছে, তুমি তাে সম্পত্তির মালিক, নিঃস্ব মজুরদের সঙ্গে তােমার কি সম্বন্ধ।” বলে। “নীরা তােমাকে ছলে কৌশলে ঠকাইবে, সমস্ত ধনীদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই-এ যােগ দেওয়া ছাছা তােমার অন্ত গতি নাই।” যেখানেই সােস্যাল ডেমােক্রটিক মজুররা মজুর শ্রেণীর মুক্তির জন্য লড়াই করিতেছে, সেখানেই, সব দেশেই মধ্যবিত্ত কৃষকদের জন্য এই লড়াই চলিতেছে। কুশিয়াতেও সবে এই লড়াই শুরু হইয়াছে। সেই জন্যই এই ব্যাপারটা খুব ভালােভাবে বিচার করা রিকার এবং মধ্যবিত্ত কৃষকদের দলে টানিবার জন্য ধনীরা যে চালাকী করে, তাহা সুস্পষ্ট বােঝা দরকার। কেমন করিয়া এই সব জুয়াচুরির মুখােপ খুলিয়া দেখা যায় এবং মধ্যবিত্ত কৃষককে তাহাদের প্রকৃত বন্ধু খুজিতে সাহায্য করা যায়—তাহা আমাদের শিখিতেই হইবে। যদি রুশ সােস্যাল ডেমােক্র্যাটিক মজুররা এখনই খাটি পথ পায়, তাহা হইলে আমাদের কমরেড জার্মান মজুরদের অপেক্ষা অনেক সহজে গ্রামের মজুর ও শহরের মজুরদের ভিতর একটা স্থায়ী মৈত্রী গঠন করা যাইবে এবং মেহনত করিয়া যাহাঁরা বীচে তাহাদের সৰুণ শক্রর বিরুদ্ধে কত জয়লাভ করা যাইবে।
মধ্যবিত্ত কৃষকরা কোন পথে যাইবে? তাহাৱা সম্পত্তির মালিক ও ধনীদের পক্ষ লইবে, না, মজর ও পরীবদেশ্ন দিকে যাইবে? নানা বকম অর্থনৈতিক সুবিধা দিবে বলিষা (সন্তাষ লাঙ্গল, কৃষি ব্যাঙ্ক, বাস লাগানাের প্রথা প্রচলন, গরু-ঘােভা ও সার সপ্তায় বিক্রি ইত্যাদি) সম্পত্তির মালিক বুর্জোয়ারা মধ্যবিত্ত কৃষকদের দলে টানিতে চায়। দলে টানিবার জন্য তাহারা মধ্যবিত্ত কৃষকদের সব রকম কৃষি সমিতিতে (কেতাবে যাহাকে সমবায় সমিতি বলে—যেগুলি কেত খামারের উন্নতির জন্য কৃষকদের একত্র করে তাতে যােগ দিতে বলে। এই সব করিয়া বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত কৃষককে, এমন কি গরীব কৃষক ও অর্থ সৰ্বহারাকেও পর্যন্ত মজুরের সঙ্গে তাহাদের একতা ভাঙিয়া বুর্জোযাদের পক্ষে, মজুর ও সর্বহারার বিরুদ্ধে লড়াই-এ নামাইতে চাপ দেয়। ইহার উত্তরে সােস্যাল ডেমােক্রটিক মজুর বলে : উন্নত কৃষি খুব ভাল জিনিস। সস্তায় লাল কেনা কিছুমাত্র অন্যায় নয়, আজ কাল ব্যবসাদাররা যদি নেহাৎ বোেকা না হয়, তাহা হইলে বেশী ক্রেতা জুটাইবার জন্য সস্তায় মাল বিক্রি করে। কিন্তু যখন গরীব ও মধ্য- বিত্ত কৃষকদের বলা হয়, উন্নত কৃষি ও সস্তা লাল তাহাদের সকলের দারিদ্র্য দুচাইয়া নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করিবে এবং ধনীদের ক্ষতি না করিয়াই ইহা সম্ভব, তখন শুধু তাহাদের প্রতারণা করা হয়। এই সমস্ত উন্নতি, সস্তা দর এবং সমবায় সমিতিতে (জিনিস- পত্ৰ কোকেনার সমিতি) নীদের পক্ষে আরও ঢের বেশী লাভ জনক হইবে। ধনীরা আরও বেশ শক্তিশালী হয় এবং মধ্যবিত্ত ও গরীব কৃষকদের আরও বেশী নিপীড়ন করে। যতদিন ধনী ধনী ৮ গ্রামের গরীবদের প্রতি থাকিবে, যতদিন তাহারা বেশীর ভাগ জমি, গরু-ঘােড়া,, যন্ত্রপাতি ও অর্থের মালিক থাকিবে—এই সব যতদিন টিকিয়া থাকিবে, ততদিন গরীব, এমন কি মধ্যবিত্ত কৃষকও অভাবের হাত হইতে রেহাই পাইবে । এই সব উন্নতি ও সমবায় সমিতির সাহায্যে এখানে সেখানে দুই চার জন মধ্যবিত্ত কৃষক হতে ধনী হইতে পারে, কিন্তু জন- সাধারণ ও সমস্ত মধ্যবিত্ত কৃষক ক্রমশ দারিদ্রের পাঁকে ডুবিয়া যাইবে। সমস্ত মধ্যবিত্ত কৃষকদের সদি ধনী হইতে হয়, তাহা হইলে ধনীদের সরাইতে হইবে এবং তাহাদের সাইবার একমাত্র পথ, শহরের মজুরের সঙ্গে গ্রামের গরীবদের মিল ঘটানাে। বুর্জোয়ারা মধ্যবিত্ত কৃষকদের (এমন কি গরীবদেরও) বলে: তােমাদের সভায় জমি দিব, সস্তায় লাঙ্গল দিব। তাহার বদলে আমাদের কাছে বিক্রয় কর তােমাদের আত্মাকে, ধনীদের বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়িয়া দাও । সােল ডেমােজাট মজুররা বলে: সত্যিই যদি খুব সস্তায় জিনিস পাও, যদি অর্থ থাকে নিশ্চয়ই কিনি ফেল ; সে তাে ভাল ব্যবসা। কিন্তু আত্মবিক্রয় করিও না। মজুরের সহযােগিতায বুর্জোয়া- দের বিরুদ্ধে লড়াই না করার অর্থ নিঃস্ব ও চির-অভাবগ্রস্ত হইয়া থাকা। জিনিসপত্র যদি সস্তা হ্য, ধনীরা আরও ফুপি উঠিৰে, আরও ধনী হইবে। কিন্তু তােমার যখন সঙ্গতি নাই তখন জিনিসের দর জলের মত সস্তা হইলেও তােমার কোন কাজেই লাগিবে না, যদি না বুর্জোযাদের হাত হইতে তুমি টাকাকড়ি জোগাড় করিতে পার। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বুর্জোয়া-সমর্থকেরা এই সব সমবায় সমিতি (সস্তায় কিনিয়া লাভে বিক্রির সমিতি) লইয়া খুব হৈচৈ করে। বিপ্লবী সমাজতন্ত্রবাদী” নামধারী এমন লােক আছে যাহার বুর্জোয়াদের অনুকরণে বড় বড় বুলি কপ চায় ও বলে, কৃষক সমবায় ? মধ্যবিত্ত কৃষকরা কোন্ পথে যাইবে ? সমিতি ছাড়া অন্য কিছু চায় না। ইহারা শিয়ায় নানা রকমের সমবায় সমিতি গঠনের বন্দোবস্ত করিতে শুরু করে। কিন্তু কুশিয়াব খুব কম সমবায় সমিতি আছে-রাজনৈতিক স্বাধীনতা না পাওয়া পৰ্য্যন্ত বেশী সমিতি হইবেও না। কিন্তু জার্মানির কথা ধরা যাক। সেখানে কৃষকদের বহু সমবায় সমিতি আছে। কিন্তু এই সব সময় সমিতি হইতে কে বেশী লাভ করে? গােটা জার্মানিতে দুধ ও দুধের জিনিস বিক্রযের সমিতিতে ১ লাখ ৪০ হাজার ক্ষেতওয়ালা কৃষক আছে এবং এই ১ লাখ ৪০ হাজার কৃষকের (সহজভাবে বুঝাইবার জন্য মােট সংখ্যা ধরা হইয়াছে) ১১ লাখ গরু আছে। জার্মানিতে ৪০ লাখ গরীব কৃষক আছে। ইহাদের মধ্যে মাত্র ৪০ হাজার জন এই সব সমিতির সভ্য: ইহাতেই দেখা যায় যে শতকরা মাত্র একজন গরীব কৃষক এই সব সমবায় সমিতির সুবিধা পায়। এই ৪০ হাজার গরীব কৃষকের মাত্র ১ লাখ গরু আছে। মধ্যবিত্ত ক্ষেত-খামারওয়ালা ও মধ্যবিত্ত কৃষকের সংখ্যা সেখানে ১০ লাখ, ইহাদের মধ্যে ৫০ হাজার (শতকরা ৫ জন) সমবায় সমিতির সভ্য, আর তাহাদের গরুর সংখ্যা ২ লাখ। অবশেষে আছে ধনী ক্ষেত-খামাবওয়ালারা (জমিদার ও ধনী কৃষক সমেত)। ইহাদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ, ইহাদের ভিতর ৫০ হাজার জন (শতকরা ৭ জন!) সমবায় সমিতির সভ্য। ৮ লাখ গরু ইহাদের হাতে আছে। তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, সমবায় সমিতিগুলি কাহাদের প্রথমে ও সবচেয়ে বেশী সাহায করে। সভায় কিনিয়া লাভে বিক্রয় করার জন্য সমিতি গঠন করিয়া মধ্যবিত্ত কৃষকদের বাঁচানাে সম্বন্ধে যাহারা হৈ-চৈ করে তাহারা যে কৃষকদের কি ভাবে ফাঁকি দেয় তাহাও দেখা গেল। সােস্যাল ডেমােক্রাটরা গরীব ও মধ্যবিত্ত উভয় কৃষককেই তাহাদের সঙ্গে যােগ দিতে আহ্বান করে। ইহাদের নিকট হইতে গরীব ও মধ্যবিত্ত কৃষককে ছিনাইয়া গ্রামের গরীবদের প্রতি হাত করিবার জন্যই সব সময় বুর্জোয়ারা চেষ্টা করে। কিন্তু ইহার জন্য তাহার মূল্য দিতে চায় খুবই কম। আমাদের দেশেও দুধ-মাখন প্রভৃতির সমবায় সমিতি গঠন শুরু হইয়াছে। আমাদের দেশেও অনেক লােক আছে যাহারা চীৎকার করে : আটেল, মিয় এবং সমবায় সমিতি-ইহাই হইল কৃষকের দাবি। কিন্তু দেখা যাক এই সব আটেল, সমবায় সমিতি ও সামাজিক পনি জমি হইতে কাহাবা লাভ করে। কমপক্ষে শতকরা ২০টি পরিবারের কোন গরু নাই , ৩০টির পরিবার পিছু একটি গরু আছে , ইহারা নিরুপায় হইযা দুধ বেচিতে বাধ্য হয়, তাদের নিজেদের ছেলেপিলেও দুধের অভাব অনাহারে বিড়াল কুকুরের মত মারা যায়। আর ধনী কৃষকদের প্রতি পরিবাবের তিন চারিটি গরু আছে। কৃষকদের মােট গরুর অর্ধেকই ইহাদের। তাহা হইলে এই সব দুধ-মাখনের সমবায় সমিতি হইতে কে লাভ করে? সােজা কথায, মধ্যবিত্ত ও গরীব কৃষকরা যাহাতে তাদের সঙ্গে থাকে সেই চেষ্টা করা এবং উহাদের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মাননা যে বুর্জোযার বিরুদ্ধে সমস্ত শ্রমজীবীর এক- জোট লড়াই-এর পথে নয—ব্যক্তিগতভাবে ছােট ঘােট ক্ষেত-খামার ওয়ালা কৃষকরা নিজেদের সামাজিক অবস্থা হইতে উঠিযা ধনী কৃষকের সহযগিতায় দারিদ্র্যের কবল হইতে রেহাই পাইতে পারে—এ সমস্তই জমিদার ও বুর্জোয়া কৃষকেরই স্বার্থ গুরু করে। বুর্জোয়া সমর্থকরা ক্ষুদ্র কৃষকদের সহিত বন্ধুত্বর ভান করি এই সব প্রচেষ্টা সমর্থন করে ও প্রাণপণে এই সব উৎসাহিত করে। অনেক সরল লােক ভেড়ার চামড়ার ছদ্মবেশের আড়ালে যে বাঘ আছে তাহাকে দেখিতে পায় না এবং বিশ্বাস করে যে এই সব বড় বড় বুর্জোয়া বুলি শুনাইলেই বুঝি গরীব ও মধ্যবিত্ত কৃষকদের সত্যই সাহায্য করা হয়। এই যেমন তাহারা তাহাদের লেখা কেতাৰে মধ্যবিত্ত কৃষকরা কোন পথে যাইবে ? ও বক্তৃতায় বুঝাইবার চেষ্টা করে যে, ক্ষুদ্র ক্ষেত-খামার সব চাইতে লাভের জিনিস, ইহাতে সব চাইতে বেশী আয় হয়, ইহাতে বেশ উন্নতি হ্য, ইহাদের মতে এই জন্যই সর্বত্র এত ক্ষুদ্র ক্ষেত-খামারওয়ালা কৃষক আছে এবং এই জন্যই তারা এমন ভীষণ ভাবে জমি আঁকড়াইযা থাকে, (সমস্ত ভাল জমি ও সব অর্থের মালিক বুর্জোয়ারা, আর গরীবদের সারা জীবন টুকরা টুকরা জমি সম্বল করি কাটাইতে হ্য—এজন্য নয়!) এই সব বাক্যবাগীশেরা বলে, গরীব কৃষকদের বেশী অর্থের দরকার পড়ে না, ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত কৃষকরা বড় খামারী কৃষকদের চেয়ে বেশী সঞ্চয়ী ও পরিশ্রমী এবং সরল জীবন যাপন করিতে জানে , ঘােড়র জন্য শুকনাে ঘাস না কিনি তাহারা খড় খাওযাইয়াই সন্তুষ্ট থাকে। দামি কল না কিনিয়া তাহারা খুব ভােরে উঠে, বেশী সময় খাটে আর কলের সমানই মাল পয়দা করে , মেরামতের কাজের জন্য বাহিরের লােককে অর্থ না দিযা কৃষক নিজেই রবিবারে কুড়াল লইয়া মিস্ত্রির কাজ করে—বড় খামারী কৃষকদের চাইতে ইহাতে অনেক সন্তা পড়ে, দামি ঘােড় বা ষাঁড়কে খাওযানাের বদলে তাহারা লাঙল দিবার জন্য গরু ব্যবহার করে, জার্মানিতে সমস্ত গরীব কৃষকেরা গরু দিয়া লাঙল চালায় এবং আমাদের দেশেও জনসাধারণ এত গরীব হইয়া গিয়াছে যে তারা শুধু গরু দিয়া নয়, পুরুষ ও স্ত্রীলােক দিযাও লাঙল চালাইতে শুরু করিযাছে! কত লাভজনক, কত সস্তা এই সব। মধ্যবিত্ত ও গরীব চাষীরা যে এত পরিশ্রমী, তাহারা যে এত সরল জীবন যাপন করে, তাহারা যে বাজে ব্যাপারে সময় নষ্ট করে না, সােশ্যালিজমের কথা না ভাবি শুধু নিজ নিজ খামারের কথাই ভাবে, দ্রলােক হইবার জন্য বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে যাহারা স্টাইক করে সেই মজুরদের পথ না ধরি যে তাহারা ধনীদেরই আদর্শ বলিয়া জানে—ইহা সত্যই কত প্রশংসনীয়। সকলে যদি এইরূপ পরিশ্রমী ও মিতব্যয়ী হইত, মদ না খাইত, বেশী গ্রামের গরীবদের প্রতি সঞ্চয় করিত, দামি কাপড় জামায় কম খরচ করিত, আর তাহাদের যদি ছেলেপিলে কম হইত তাহা হইলে সবাই সুখী হইত এবং অভাব ও দারিদ্র্য থাকিত না। মধ্যবিত্ত কৃষকদের জন্য বুর্জোয়ার এই সব মিঠা বুলি বলিযা থাকে এবং এমন নির্বোধ লােক আছে যাহারা এই সব কথায় বিশ্বাস করে ও ইহারই পে ধরে। আসলে, এই সব মধুমাখা কথা কৃষকদের বঞ্চনা ও উপহাস করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই সব মুখমিষ্টি লােকেরা লাভজনক ও সস্তা ক্ষেত-খামার বলিতে সেই অভাব ও নিতান্ত ঠোর অবস্থাকেই বুঝা যাহার ফলে মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদে কৃষকেরা সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাটিতে, এক টুকরা রুটির লােভ সংবরণ করিতে ও খরচের কানাকড়িটি পর্যন্ত আপ্রাণ বাঁচাইবার চেষ্টা করিতে বাধ্য হয়। তিন বছর ধরিযা একই প্যান্ট পরা, গরমের দিনে খালি পাষ চলা, এক টুকরা সুতা দিযা কাঠের লাঙল মেরামত করা, ঘরের চাল হইতে পচা খড় লইয়া গরুকে খাওযানাে, খুবই লাভজনক ও পন্যা” সন্দেহ নাই! একজন বুর্জোযা বা ধনী কৃষককে এই রকম “স” ও “লাভজনক খামারে বসাও—শীঘ্রই সব মিষ্টিকথা সে ভুলিয়া যাইবে। জশিয়ার এই সব নির্বোধ লোেক যাহারা কৃষকদের মঙ্গল চায়, অথচ যখন তখন এই সব মিঠা বুলি কপচায়, তাদের নারানিকি” বা “ক্ষু খামারে উৎসাহী সমর্থক বলা হয়। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীরা* বােকে না বলিয়া তাহাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। জানিতেও এই রকম অনেক মিষ্টিমুখ লােক আছে। এডওয়ার্ড ডেভিড নামে ইহাদেরই একজন সম্প্রতি একটি মস্ত কেতাব লিখিয়াছে। ইহাতে তিনি বলিয়াছেন যে বড় ক্ষেত খামারের চেয়ে ছােট কেওখামারগুলি অনেক বেশী লাভে, কারণ, স্কুলে কৃষকরা অষখা বেশী অর্থ ব্যয় করে না, চাষের অ বােড় রাখে না এবং লাঙলটার দুধের গরই ব্যবহার করে।লেনিন।
মধ্যবিত্ত কৃষকরা কোন পথে যাইবে? অনেক সময় যে-সব লােক ক্ষুদে কৃষির প্রশংসা করে তাহারা কৃষকদের সাহায্য করিতে চায়, কিন্তু আসলে তাহারা শুধু ইহাদের ক্ষতিই করে। এই সব মিষ্টি কথায় তাহারা কৃষকদের ঠকায়, যেমন লটারিতে কৃষকরা ঠকে। লটারি ব্যাপারটা কি বলিতেছি। ধরা যাক, আমার একটা গরু আছে—যাহার ৫০ রুবল দাম। আমি গরুর বদলে টাকা চাই, সেই জন্য সবাইকে এক কুবল দামের টিকেট বিক্রয় করিলাম। প্রত্যেকেরই এক রুবলের বদলে গরুটি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। জনসাধারণকে ঠকানাে সহজ, ক্রমাগত বল আসিতে থাকে। যখন এক শত রুবল সংগ্রহ হইল, তখন আমি লটারি করিলাম। যাহার নাম উঠিল সেই এক কবলে গরু পাইল, অন্যেরা কিছুই পাইল না। জনসাধারণের কাছে গরু “সন্তা” হইল? আদৌ না, বরং অনেক মূল্য তাহাদের দিতে হইল, কারণ তাহারা মােট যে-টাকা দিল তাহা গরুর মূল্যের দ্বিগুণ, কারণ দুই জন লােক মাত্র (যে লটারি চালাইল ও যে গরু পাইল) কোন কাজ না করিযা টাকা করিল। কিন্তু এই টাকা আসিল ১৯টি লােকের ক্ষতি করিয়া, কারণ তাহাদের টাকা মারা গেল। অতএব দেখা গেল যে, যাহারা বলে জনসাধারণের পক্ষে লটারি সুবিধাজনক, তাহারা শুধু জনসাধারণকে ঠকাইতেছে। সমবায় সমিতি (সস্তায় কেনা ও লাভে বেচার সমিতি), উন্নত কৃষি, ব্যাঙ্ক এবং ঐ সব ধরনের জিনিসের মারফৎ যাহারা কৃষকদের দুঃখ-দারিদ্র্য হইতে মুক্তি দিতে চায়, তাহারা কৃষকদের ঠিক এই ভাবেই ঠকায়। লটারিতে যেমন একজন জিতে, আর সবাই হারে, এখানেও ঠিক তেমনই একজন মধ্যবিত্ত কৃষক হয়ত খুব চালাকি করিযা ধনী হইতে পারে, কিন্তু তাহার সঙ্গী ৯৯ জন কৃষক আজীবন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। কোনদিনই তাহার অভাব ঘুচে না বরং সে আরও নিল হইয়া পড়ে। প্রত্যেক গ্রামবাসী আহার সমাজ ও সমস্ত জিলার উপরে আরও একটু নজর দিক, কতজন মধ্যবিত্ত কৃষক আছে গ্রামের গরীবদের প্রতি যাহারা ধনী হইয়া অভাব ভূলিয়াছে? আর, কত জনই বা আছে যাহারা কোনদিনই অভাবের হাত হইতে রেহাই পাইবে না? কতজন নিঃস্ব হইয়া গ্রাম ছাড়িতে বাধ্য হইযাছে? আগেই দেখানাে হইয়াছে, গােটা কুশিযায় ২০ লাখের বেশী মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবার নাই। ধরা যাক, সস্তায় কেনা ও লাভে বিক্রয় করার জন্য যতগুলি সমিতি এখন আছে, তাহার দশ গুণ সমিতি গড়া হইল। তাহা হইলে কি ফল হইবে? যদি এক লাখ মধ্যবিত্ত কৃষকও ধনীর পর্যায়ে উঠিতে পারে, তাহা হইলে যথেষ্ট বলিতে হইবে। ইহার অর্থ কি? ইহার অর্থ শতকরা ৫ জন মাত্র মধ্যবিত্ত কৃষক ধনী হইবে। কিন্তু বাকী ৯৫ জনের দশা কি হইবে? তাহাদের অবস্থা আগের মতই থাকিবে, অনেকের অবস্থা আরও খারাপ হইবে। গরীবেরা আরও বেশী নিঃশ্ব হইবে। অবশ্য, বুর্জোযারা চায় যে, যত বেশী সম্ভব মধ্যবিত্ত ও গরীব ধনীদের সমান হইতে চেষ্টা করুক। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লড়াই না করিয়া দারিদ্র্যের অবসান সম্ভব শহর ও গ্রামের মজুরদের সঙ্গে একজোট হইয়া পরিশ্রম, মিতব্যয়িতাও ধনী হওয়ার উপর আস্থাস্থাপন—ঠিক এই জিনিসই বুর্জোয়ারা চাষ। কৃষকদের ভিতর এই সব বঞ্চনামূলক বিশ্বাস ও আশা জাগাইযা রাখিবার জন্য বুর্জোয়ারা প্রাণপণ চেষ্টা করে। মিষ্টি কথায় তাহাদের ঠাণ্ডা রাখিতে চায়। এই মিষ্টভাষী লােকদের ভণ্ডামির মুখােশ খুলিতে তিনটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেই যথেষ্ট হইবে। প্রথম প্রশ্ন : যতদিন শিয়ায় উৎপাদনের জমির ২৪ কোটি ডেসিয়া- টিনের ভিতর ১০ কোটি ডেসিয়াটিন ব্যক্তিগত জমিদারদের মালিকানায় থাকিবে, অথবা যতদিন ১৬ হাজার খুব বড় জমিদারের হাতে সাড়ে ছয় কোটি ডেসিয়াটিন জমি থাকিবে, ততদিন মজুর জনসাধারণের অভাব ও দারিদ্র্য ঘুচিবে কি?
মধ্যবিত্ত কৃষকরা কোন পথে যাইৰে? দ্বিতীয় প্রশ্ন : যতদিন ১৫ লাখ ধনী কৃষক পরিবার (মােট ১ কোটির ভিতর। কৃষকের ফসলি জমির অর্ধেক, কৃষকের গরু-ঘােড়ার অবক এবং কৃষকদের সঞ্চযের অর্ধেকের অনেক বেশী আত্মসাৎ করিয়া রাখিবে, ততদিন কি মজুর জনসাধারণ দুঃখ-দারিদ্র্যের হাত হইতে রেহাই পাইবে ? যতদিন কৃষক বুর্জোয়ারা গরীব ও মধ্যবিত্ত কৃষকদের নিপীডন করি, অন্যের শ্রম, ক্ষেতমজুর ও দিন মজুরদের খাটাইয়া টাকা করিবে, বড় লােক হইবে, ততদিন কি ইহাদের দুঃখ ঘুচিবে? যতদিন পর্যন্ত ৩৫ লাখ কৃষক পরিবার ধ্বংসের মুখেই আগাইতে থাকিবে, গরীবও সর্বদা অনাহারে কাল কাটাবে এবং নানা রকম দিনমজুরীর দ্বারা তাহাদের সামান্য খাদ্যের সংস্থান করিবে, ততদিন কি ইহাদের দুর্দশার শেষ হইবে ? তৃতীয় প্রশ্ন : টাকাই যখন আজকাল সর্বপ্রধান শক্তি, আজকাল যখন টাকায় সব কিছুই কেনা যায-কল-কারখানা, এমন কি নরনারী পৰ্য্যন্ত দিনমজুর ও মজুরদাস হিসাবে কিনিতে পাওয়া যায়, তখন কি মজুর জনসাধারণ দুঃখ-দারিদ্র্যের হাত হইতে রেহাই পাইতে পারে? আজকাল, যখন টাকা ছাড়া কেহ ক্ষেত-খামার করিতে বা বাঁচিতে পারে -আজ, যখন ক্ষুদ্র খামারি কৃষক ও গরীব কৃষককে বড় খামারি কৃষকের বিরুদ্ধে টাকার জন্য লড়িতে হয়-যখন কযেক হাজার জমিদার, ব্যবসাদার, কারখানাওযালা এবং ব্যাঙ্কওয়ালা কোটি কোটি রুবল হাত করিযাছে, এবং ইহার উপর যেখানে কোটি কোটি রুবল জমা আছে, সেই সব ব্যাঙ্ক যখন তাহাদেরই হাতে, তখন কি মজুর জনসাধারণ দুঃখ-দারিদ্র্যের হাত হইতে রেহাই পাইতে পারে ? খামার অথবা সমবায় সমিতির সুবিধা সম্বন্ধে মিষ্টি কথা বলিয়াই এই সব প্রশ্ন এড়ানাে যায় না। এই সব প্রশ্নের শুধু একটি মাত্র উত্তরই আছে। প্রকৃত সমবায়, যাহা মজুর শ্ৰেণীকে বাঁচাইতে পারে, তাহা হইতেছে সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে লড়িবার জন্য শহরের সোশ্যাল গ্রামের গরীদের প্রতি ডেমােক্রাটিক মজুরদের সঙ্গে গ্রাম্য গরীবদের ঐক্য। যত তাড়াতাড়ি এই ঐক্য গড়িয়া উঠে ও শক্তিশালী হ্য, মধ্যবিত্ত কৃষক তত শীঘ্রই বুঝিতে পারিবে যে বুর্জোয়াদের এই সব প্রতিশ্রুতি মিথ্যা এবং তত শীঘ্রই মধ্যবিত্ত কৃষক আমাদের পক্ষে যােগ দিবে। বুর্জোয়ারাও ইহা জানে, এবং সেইজন্যই মিষ্টি কথা ছাড়াও সােশ্যাল ডেমােক্রাটদের সম্বন্ধে তাহারা নানা রকম মিথ্যা ছড়ায়। তাহারা বলে যে, সােখাল ডেমােক্র্যাটরা মধ্যবিত্ত ও গরীব কৃষকদের সম্পত্তিচ্যুত করিতে চায়। ইহা মিথ্যা কথা। বড় বড় সম্পত্তিওয়ালা, যাহারা অন্যের এমের উপর ভর করিয়া জীবনধারণ করে, কেবলমাত্র তাহারেই সম্পত্তি সাোল ডেমােক্রটরা কাড়িয়া লইতে চায়। ক্ষুদ্র এক মধ্যবিত্ত ক্ষেত-খামারী কৃষকগাহারামজুর খাটায় না, তাহাদের সম্পত্তি সােখাল ডেমোেক্রাটা কখনও কাড়িয়া লইবে না। সােস্যাল ডেমােক্র্যাটরা সমস্ত এমরত জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষায় উদ্যোগী , তাহারা শহরের মজুর, যাহারা অন্যের চেয়ে বেশী শ্রেণীসচেতন ও বেশী ঐক্যবদ্ধ, শুধু যে তাহাদেরই স্বার্থ রক্ষা করে তাহা নয়, কৃষিমজুর, ক্ষুদ্র কারিগর এবং কৃষক যতক্ষণ পর্যন্ত না তাহারা মজুর খাটায়, ধনীদের অনুকরণ করিতে চেষ্টা করে এবং বুর্জোয়াদের পক্ষ নেয, সােশ্যাল ডেমােক্রাট তাহাদের স্বার্থ রক্ষা করে। তাহারা কৃষক ও মজুরে অবস্থার সমস্ত রকম উতির জন্য লড়াই করে, যে-সব উন্নতি এখনই বুর্জোয়াদের ধ্বংস করিবার আগেই চালু করা যায়, এবং যেগুলি বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লড়াই-এ সাহায্য করিবে। কিন্তু সােশ্যাল ডেমোেক্রটরা কৃষকদের ভুল পথে চালিত করিতে চায় । তাহারা কৃষকদের গােটা সত্যটাই বলে। তাহারা কৃষকদের সােজাসুজি সাবধান করিয়া দেয় যে, যতদিন বুর্জোয়াদের হাতে ক্ষমতা থাকিবে, ততদিন কোন উন্নতিই জনসাধারণের অভাব ও দারিদ্র্য মধ্যবিত্ত কৃষকরা কোন পথে যাইবে? চাইবে না। সােশ্যাল ডেমােক্রাট কে এবং কি চায়, যাতে তাহা সমস্ত জনসাধারণ জানিতে পারে, সেজন্য সোশ্যাল ডেমােক্রাট একটি প্রােগ্রাম তৈযার করিযাছে। প্রােগ্রামের অর্থ, পাট ক্ষে সব জিলিল পাইতে চেষ্টা করে এবং তাহার স লড়াই করে তাহারই সংক্ষিপ্ত, সােজাজি ও সুস্পষ্ট বিবরণ। একমাত্র সােল ডেমােক্রটিক পাটিই সকলে দেখিতে ও বুঝিতে পারে এমন সােজাও সুস্পষ্ট প্রােগ্রাম দেয যাহাতে শুধু এমন লােক দিয়াই পাটি গঠিত হয যাহারা বুজেযা শ্রেণীর দাসত্ব হইতে সমস্ত অমরত জনগণের মুক্তির জন্য লড়াই করিতে চায—যাহারা জানে এই লড়াই-এ তাহা- দের একত্র হইতে হইবে এবং কেমন করিযাই বা লড়াই চালাইতে তাঁহা ছাড়া এমিক জনসাধারণের দুঃখ-দারিয়ে কারণ কি এবং মজুরদের একতা কেন ক্রমশ বাড়ি যাইতেছে ও শক্তিশালী হইতেছে তা সােস্যাল ডেমােক্রাটরা তাহাদের প্রােগ্রামে বুকাইয়া দেওয়া দরকার মনে করে। জীবন বড় কষ্টকর—এই কথা বলা এবং বিদ্রোহের আহ্বান দেওয়া ইহাই যথেষ্ট নয় , গলাবাজি অভ্যাস আছে, এমন যে-কোনাে ব্যক্তি এই কাজ করিতে পারে, কিন্তু ইহার কোন মূল্য নাই। শ্রমিক জনসাধারণের জানা দরকার, কেন তাহারা এই দুঃখকষ্ট্রে বাস করে এবং দারিদ্র্য দূর করিবার লড়াই-এ তাহারা কাহাদের সহিতই বা একত্র হইবে। ইবে। সােল ডেমােক্রাটরা কি চায় তাহা আমরা বলিয়াছি এমিক জনসাধারণের দুঃখকষ্ট ও দারিদ্র্যের কারণও আমরা দেখাইয়াছি। আমরা দেখাইয়াছি গ্রামের গরীবরা কাহাদের বিরুদ্ধে লড়বে এবং লড়িবার জন্য কাহারে সহিত একত্র হইবে।
৮ গ্রামের গরীবদের প্রতি এইবার আমরা দেখাইব, লড়াই করিলে মজুর-কৃষকদের অবস্থার কি কি উন্নতি এখনই করা যায়। e) সমস্ত জনসাধারণ ও মজরদের জন্য সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা কি উন্নতি লাভ চেষ্টা করে ? সমস্ত শমরত জনগণের উপর লুট, নিপীড়ন ও অন্যায় বন্ধ করিবার জয় সােস্যাল ডেমােক্রটরা লড়াই করে। মুক্তি পাইতে হইলে সবার আগে মজুর শ্ৰেণীকে এক হইতে হইবে। আর এক হইতে হইলে মজুর শ্রেণীর এক হইবার স্বাধীনতা, এক হইবার অধিকার থাকা চাই, অর্থাৎ তাহার রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকা চাই। আমরা বলিয়াছি, স্বেচ্ছাচারী সরকারের অর্থ জনসাধারণকে সরকারী কর্মচারী ও পুলিসের দাস করা। তাই মুষ্টিমেয় কয়েকজন রাজ- সভাসদ, কয়েকজন খুব টাকাওয়ালা লােক এবং জনকযেক সম্মানী লােক, যাহাদের রাজদরবারে খাতির আছে, তারা ছাড়া আর সমন্ত লােকেরই রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রযােজন। কিন্তু কৃষক ও মজুরদেরই সব চেয়ে বেশী রাজনৈতিক স্বাধীনতা দরকার। সরকারী কর্মচারী ও পুলিসের অত্যাচার ও খাম-খেয়াল হইতে ধনীরা নিজে- দের জন্য মুক্তি ক্রয় করিতে পারে। ধনীরা সর্বোচ্চ স্থানে নিজেদের অভাব অভিযােগের কথাও বলিতে পারে। ইহার ফলে, পুলিস ও কর্মচারীরা গরীবের চেয়ে ধনীদের খাটায় কম। পুলিস ও সরকারী কর্মচারীদের ঘুস দেওয়ার মত টাকা কৃষক ও মজুরদের নাই, তাহাদের নালিশ শুনিবার লােকও নাই, ইহাদের বিরুদ্ধে আদালতে মােকদ্দমা করিবার অবস্থাও তাহাদের নাই। যতদিন প্রতিনিধি- মজুরদের জন্য সোশ্যাল ডেমােক্রাটরা কি উন্নতি লাভের চেষ্টা করে? ৫৯ মুলক গভমেন্ট না হয়, যতদিন প্রতিনিধিদের জাতীয় পরিষদ না হয়, ততদিন কৃষক-মজুররা পুলিস ও সরকারী কৰ্ম্ম- চারীদের জুলুম খামখেয়াল ও অপমানের হাত হইতে রেহাই পাইবে । এই রকম প্রতিনিধিমূলক জাতীয় পরিষদই শুধু জনসাধারণকে সরকারী কর্মচারীদের দাসত্ব হইতে মুক্তি দিতে পারে। প্রত্যেক বুদ্ধিমান কৃষকেরই সােশ্যাল ডেমােক্রাটদের পক্ষ নেওয়া উচিত, কারণ জারের গভর্নমেন্টের নিকট সােস্যাল ডেমােজাটদের প্রথম ও সর্ব- প্রধান দাবি, প্রতিনিধিমুলক জাতীয় পরিষদ ডাকা হউক। ধনী, দরিদ্র ও শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের ভােটে এই সব প্রতিনিধির নির্বাচন করিতে হইবে, সরকারী কর্মচারীরা কোনরূপ হাত দিতে পারিবে না, পুলিস কর্মচারী বা জেমসকি নাচালনিকরা নির্বাচন পরিচালিত করিতে পারিবে না, জনসাধারণের প্রতিনিধিদেরই তৰাৰ ধানে নির্বাচন পরিচালিত হইবে। এই রকম অবস্থায, জনসাধারণের প্রতিনিধির জনসাধারণের সমস্ত প্রধাজনীয় বিষয় সম্বন্ধে আলােচনা করিতে পারিবে এবং রুশিয়ায় আরও ভাল ব্যবস্থা চালু করিতে পারিবে। সােস্যাল ডেমােক্রাটরা দাবি করে, বিনা বিচারে আটক করিবার ক্ষমতা পুলিসের হাত হইতে কাড়িযা লওযা হউক। খুশিমত যাহাকে ইচ্ছা গেরেফতার করিলে সরকারী কর্মচারীদের কঠিন শাস্তি দিতে হইবে। সরকারী কর্মচারীরা যাতে এই সব আইন ভাজিতে না পারে, সেইজন্য জনসাধারণ কর্মচারীদের নির্বাচিত করিয়া দিবে এবং সরকারী হুকুম না লইয়াই যে-কোন কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করার অধিকার যে-কোন লােকের থাকিবে। পুলিশের বিরুদ্ধে জেমসকি নাচালনিকের কাছে, আর জেমসকি নাচালনিকের বিরুদ্ধে গভর্নরের কাছে নালিশ করি লাভ কি? জেফি গ্রামের গরীবদের প্রতি নাচালনিক নিজ ক্ষমতাবলে পুলিসকে বক্ষা করিবেই, গভর্নরও রক্ষা করিবে জেকি নাচানিককে এবং ফরিয়াদির নিজেরই শান্তি পাওয়ার সম্ভাবন্ম বেশী, তাহাকে হয়তাে জেলে অথবা সাইবিরিয়ায নির্বাসনে যাইতে হইবে। যখন রুশিয়ায় জাতীয় পরিষদ ও নির্বাচিত আদালতের নিকট নালিশ করিবার অধিকার, নিজ অভাব-অভিযােগ সম্বন্ধে স্বাধীনভাবে খোলাখুলি বলিবার ও কাগজে লিখিবার অধিকার থাকিবে ( যাহা অন্য দেশে অনেক দিন হইতেই আছে। শুধু তখনই কর্মচারীরা বুঝিতে পারিবে যে তাহাদেরও অন্যকে ভয় করিয়া চলিতে হইবে। রুশ জনসাধারণ এখনও সরকারী কর্মচারীদের দাস। সরকারী কর্মচারীদের হুকুম ছাড়া জনসাধারণ সভা ডাকিতে পারে না, বই বা খবরের কাগজ ছাপাইতে পারে না। ইহা কি দাসত্ব নয় ? স্বাধীনভাবে যদি সভা না ডাকা যায়, যদি বই না ছাপানাে যায়, তাহা হইলে সরকারী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বা ধনীদের বিরুদ্ধে প্রতি কারের উপায় কি? জনসাধারণের দারিদ্র্য সম্বন্ধে যে-বই বা যে- বা প্রকৃত সত্য প্রকাশ করে, তাহাই অবশ্য সরকারী কর্মচারীরা বন্ধ করিয়া দেয়। এই বইখানাও সােস্যাল ডেমােক্রটিক পাটিকে গােপনে ছাপাইতে এবং গােপনেই বিলি করিতে হইবে, যে-কোন লােকের নিকট এই বই পাওয়া গেলে তাহার বিচার ও জেলের ঘােরাঘুরির আর শেষ থাকিবে না। কিন্তু সােখাল ডেমােজাট মজুররা ইহাতে ভয় পায় না, তাহারা আরও বেশী বেশী ছাপা, জনসাধারণকে আরও বেশী বেশী খাঁটি বই পড়িতে দেয়। আর কোন জেল, কোন জুলুমই জনগণের স্বাধীনতার লড়াইকে ঠেকাইতে পারে না। সােশ্যাল ডেমোেক্রটরা দাবি করে যে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পার্থক্য মজুরদের জন্য সােশ্যাল ডােমাক্রাটরা কি উন্নতি লাভের চেষ্টা করে? ৬১ দূর করা হউক, সমস্ত নাগরিকের সমান অধিকার দেওয়া হউক। বর্তমানে আমাদের দেশে আছে ট্যাক্সদাতা ও ট্যাক্স না-দেওয়া সম্প্রদায়, বিশেষ অধিকার প্রাপ্ত ও অধিকার বর্জিত সম্প্রদায় -অভিজাত ও সাধারণ লােক , এমন কি সাধারণের জই চাবুক আজও রহিয়া গিয়াছে। অন্য কোন দেশেই মজুর ও কৃষকদের এমন হীন অবস্থা নাই। রুশিয়া ছাড়া অন্য কোন দেশেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এমন বিভিন্ন আইন নাই। আজ সময় আসিয়াছে যখন রুশ জনসাধারণেরও দাবি করা উচিত, সন্ত্রান্ত সম্প্রদায় যেসমস্ত অধিকার ভােগ করে কৃষকদেরও সেই সমস্ত অধিকার থাকিবে। আজও যে চাবুক ব্যবহার করা হয় এবং ভূদাসপ্রথা উচ্ছেদের ৪০ বৎসর পরেও মাখাগুতি ট্যাদাতা সম্প্রদায়” আজও যে বজায় আছে, ইহা কি চরম লজ্জার কথা নয় ? সােল ডেমােক্রটরা দাবি করে যে, জনসাধারণের এক স্থান হইতে অন্যত্র যাতায়াতের এবং ইচ্ছামত পেশা বাছিয়া লইবার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকুক। এক স্থান হইতে অন্য স্থানে যাতায়াতের এই স্বাধীনতার অর্থ কি? ইহার অর্থ, বিনা হুকুমে নিজ ইচ্ছামত যত্রতত্র যাতাযাতের অধিকার কৃষকদের থাকিবে, অন্যের হুকুম ছাড়া নিজ ইচ্ছামত যে-কোন গ্রাম বা শহরে উঠিযা যাইবার তাহাদের অধিকার থাকিবে। ইহার অর্থ, রুশিযও ছাড়পত্র তুলি দিতে হইৰে (অন্যান্য দেশে ছাড়পত্র অনেক দিন আগেই তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে), নিজ ইচ্ছামত যে-কোন স্থানে বসবাস করিতে গেলে বা কাজ করিতে গেলে কোন পুলিশ কর্মচারী বা জেমকি নাচালনিক কোন কৃষককে বাধা দিতে পারিবে না। রুশ কৃষকরা আজও সরকারী কর্মচারীদের এমন দাস যে, কোন শহরে স্বাধীন ভাৰে ঘােরাফেরা করার বা কোন নৃতন জিলায় বসবাস করার গ্রামের গরীবদের প্রতি স্বাধীনতাও তাহাদের নাই। মন্ত্রীরা গভর্নরদের হুকুম দেয় যে সরকারী অতি ছাড়া যেন বসবাস করিতে দেওয়া না হয়। কৃষকদের অপেক্ষা গভর্নররাই ভাল জানে, কৃষকদের পক্ষে কোন স্থানে বাস করা ভাল ! কৃষকরা যেন শিশু, কর্তাদের হুকুম ছাড়া এক পা-ও নড়িতে তাহারা সাহস পায় না। আমি জিজ্ঞাসা করি, ইহা কি দাসত্ব নয়? ইহা কি অপমানকর নয়, যখন প্রত্যেকটি অসৎচরিত্র অভিজাতবংশীয লােক একজন ব্যৰু কৃষকের উপর হুকুম চালায় ? অজন্ম ও জনসাধারণের দুর্দশা” ( দুর্ভিক্ষ) নামে একখানা বই আছে। বইখানি লিখিয়াছেন বর্তমান কৃষিমন্ত্রী” গেমােলােভ। বইখানার বক্তব্য মােটামুটি এই যতদিন কৃষকদের দেবতা জমিদারদের লােক দরকার ততদিন কৃষকদের অত্র বাইয়া বাস করা উচিত নয়। মন্ত্রী মহাশয় খােলাখুলি বলিয়াছেন, এতটুকুও দ্বিধা করেন নাই। তিনি ভাবেন, তিনি যাহা বলিতেছেন, কৃষকরা তাহা নিবে , বুঝিবে না। জমিদারদের যখন সস্তা দরে মজুর দরকার, তথন কৃষকদের অন্যত্র যাইতে দাও কেন? জনসাধারণ যতই জমিতে ভিড় জমাইবে, জমিদারদের ততই সুবিধা। কৃষকরা যতই গরীব হইবে, ততই সস্তায় তাহাদের খাটানাে যাইবে, ততই তাহারা সব রকমের জুলুমের কাছে মাথা নত করিতে বাধ্য হইবে। পুরানাে আমলে বেইলিফেরা (Bailiffs) জমিদারের স্বার্থ রক্ষা করিত-এখন করে জেমসকি নাচালনিক ও গভর্নর। আগেকার দিনে কৃষকদের আস্তাবলে ধরিয়া চাবুক মারার হুকুম দিত বেইলিরা, আজকাল ভােলােস্ট আফিসে ধরিয়া চাবুক মারার হুকুম দেয় জেমসকি নাচালনিকরা। সােল ডেমােক্র্যাটরা দাবি করে, স্থায়ী সৈন্যবাহিনী তুলিয়া দিয়া জনসেন গঠন করা হউক, সমস্ত জনগণকে সশস্ত্র করা হউক। স্থায়ী সৈন্যবাহিনী জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন, জনগণকে গুলি করিবার মজুরদের জঙ্গ সােস্যালাডেমােজাটবা কি উন্নতি লাভের চেষ্টা করে? ৬৩ জই ইহাদের শিক্ষা দেওযা হব। সৈন্যদের যদি বছরের পর বছর ব্যারাকে আবদ্ধ রাখিয়া অমানুষিক ভাবে কুচকাওয়াজ শিখানাে না হইত, তাহা হইলে কি তাহারা তাহাদের কৃষক-মজুর ভাইদের গুলি করিতে রাজী হইত? তাহার কি অনাহারী কৃষকদের বিরুদ্ধে যাইত। শত্রুর আক্রমণ হইতে দেশকে রক্ষা করিবার জন্য স্থায়ী সৈন্যের এয়ােজন হয় না, গণসেনাই যথেষ্ট। প্রত্যেকটি নাগরিক যদি সশস্ত্র হয়, শত্রুকে ভয় করিবার কারণ শিার নাই। আর তাহাতে জন- সাধারণও যান্ত্রিকভাবে গঠিত সৈন্যব্যবস্থার চাপ হইতে মুক্তি পাইবে। ফৌজের বাবতে কোটি কোটি রুবল খরচ হয় বছরে, আর, এই সব অর্থ জোগায় জনসাধারণ , তাই তাে ট্যাক্সের বােঝা এত ভারী এবং জীবন যাপন করা এত কষ্টকর। এই ভাড়াটিয়া সৈন্য রাখার ব্যবস্থা জনসাধারণের উপর সরকারী কর্মচারী ও পুলিসের ক্ষমতা আরও বাড়াইয়া দেয়। বিদেশী জনসাধারণকে লুট করিবার জন্য, এই যেমন, চীনাদের নিকট হইতে জমি কাড়িয়া লইবার জন্য এই রকম জঙ্গী কাযদার দরকার হয়। জনসাধারণের ইহাতে কোনই লাভ নাই, ট্যাক্স বাড়ার ফলে তাহাদের বােঝ শুধু বাড়িই চলে। স্থায়ী সৈন্যের বদলে জাতি সশস্ত্র হইলে সমস্ত কৃষক, সমস্ত মজুরের বােক যথেষ্ট পরিমাণে কমিয়া যায়। তেমনি সােখাল ডেমােক্রাটদের পরােক্ত ট্যাক্স রহিতের দাবিতেও অনেক সুবিধা হয়। যে-সব ট্যাক্স কোন নির্দিষ্ট জমি বা ক্ষেত-খামারের উপর ধার্য হয় না, কেনা জিনিসের বেশী দাম দিয়া যে-ট্যাক্স জনসাধারণকে পরােক্ষ ভাবে দিতে হয়, তাহারই নাম পরােন ট্যান্স। চিনি, ম, কেরােসিন, দিয়াশলাই এবং অন্য সব ব্যবহার্য জিনিসের উপর গভর্নমেন্ট ট্যাক্স বসায় ; ব্যবহার বা কারখানাওয়ালা এই টা সরকারকে দেয়, অবশ্য এই অর্থ তাহার গ্রামের গরীবদের প্রতি নিজেদের পকেট হইতে দেয় না, খরিদ্দারের নিকট হইতেই তাহারা ইহা উসুল করে। স্পিরিট, চিনি, কেরােসিন, দিয়াশলাইয়ের পর বাড়িয়া যায়, ফলে, এক বােতল শিবিট বা এক পাউণ্ড চিনি কিনিতে হইলে প্রত্যেক খরিদ্দাবকে জিনিসের দামের উপরও ট্যাক্স দিতে হয়। ধরা যাউক, এক পাউণ্ড চিনির দাম ১৪ কোপেক, তাহার ভিতর ৪ কোপেই ট্যাক্স, চিনির কলওয়ালা সরকারকে আগেই ট্যাক্স দিয়া দিয়াছে, এখন সেই টাকা প্রত্যেক খরিদ্দারের নিকট হইতে আদায় করিয়া লইতেছে। তাই দেখা যায়, পরােক্ষ ট্যাক্স হইতেছে ব্যবহার্য জিনিসের উপর ট্যাক্স। এই ট্যাক্স খরিদ্দারকে দিতে হইতেছে, কেনা জিনিসের বেশী দাম দিয়া। অনেক সময় বলা হয় যে, পনােক ট্যাক্সই সব চেয়ে ন্যায্য ট্যাক্স যে যে-পরিমাণ জিনিস কিনিতেছে সেই অনুপাতে তাহাকে ট্যাক্স দিতে হইতেছে। কিন্তু, আসলে তাহা নয়। পরে ট্যাক্সই সব চেয়ে অন্যায় ট্যাক্স। কারণ ধনী- দের চেয়ে গরীবদেরই ঘাড়ে এই ট্যাক্সের বােঝা বেশি কষ্টদায়ক। একজন কৃষক বা মজুরের আয়ের চেয়ে একজন ধনীর আষ দশ গুণ, এমন কি এক গুণ বেশী। কিন্তু ধনীদের কি একশ গুণ বেশী চিনি লাগে? না দশ গুণ স্পিরিট, দিয়াশলাই বা কেরােসিন লাগে! নিশ্চয়ই নয়! বড় জোর ধনী পরিবার একটি গরীব পরিবারের চেয়ে তিন গুণ কেনােসিন, চিনি বা স্পিরিট কেনে। অর্থাৎ গরীবের চেয়ে ধনীর পকেট হইতে তাহার আয়ের অল্প অংশই কায়। ধরা যাক, গরীব কৃষকের আয় বছরে ২০০ রুবল , যে-সব জিনিসের উপর ট্যাক্স আছে, ধরা যাউক, কৃষক ৬০ রুবলের সেই সব জিনিস কেনে, অর্থাৎ বেশী দরে কেনে (চিনি, দিশালাই, কেরােসিনের উপর আবগারী শুক চাপানাে আছে অর্থাৎ মাল- উৎপাক বাজারে মাল আনিবার আগেই এ দেয় , স্পিরিট তৈরী মজুরদের জন্য সােস্যাল ডেমােক্রাটবা কি উন্নতি লাভের চেষ্টা করে? ৬৫ করে গভর্নমেন্ট, তাই সেক্ষেত্রে সরকারই উচ্চর ঠিক করিয়া দেয় , তুলার জিনিস, লােহা এবং অঙ্গান্য জিনিসের দর বাড়ে, কারণ খুব বেশী শুক ছাড়া সস্তা বিদেশী মাল কুশিয়ায় ঢুকিতে দেওয়া হয় না)। এই ৬০ রুবলের ভিতর ২০ রুবল হইতেছে ট্যাক্স। অর্থাৎ গরীব কৃষককে তাহার আযের প্রতি রুবলে ১০ কোপে দিতে হয় পরােক্ষ ট্যাক্স হিসাবে ( প্রত্যক্ষ ট্যাক্স, জমির ক্ষতিপূরণ, জমি পরিত্যাগ বাবদ খাজনা, জমির ট্যাক্স, জেমস ভাে, ভােলােস্ট ও গ্রাম ট্যাক্স, এই সবের কথাতাে বাদই গেল)। ধনী কৃষকের আয়, ধরা যাউক, এক হাজার রুবল , যে-সব জিনিসের উপর ট্যাক্স আছে সেই সৰে সে দেডশ’ বল খরচ করে এবং ট্যাক্স বাবদ দেয় ৫০ রুবল (ঐ দেড়শ’ রুবলেরই ভিতর)। ইহার অর্থ, ধনী কৃষক তাহার আয়ের প্রতি রুবলে মাত্র ৫ কোপে পরােক্ষ ট্যাক্স দেয়। যে যত ধনী সে তাহার আযের তত কম অংশ পরােক ট্যাক্স হিসাবে দিয়া থাকে। এই জন্যই পরােক্ষ ট্যাক্স সব চেয়ে অন্যায় ট্যাল্প । পরােক্ষ ট্যাক্স গরীবের উপর ট্যাক্স। জনসাধারণের দশ ভাগের নয় ভাগই কৃষক ও মজুর এবং পরােক্ষ ট্যাক্সের দশ ভাগেৰ আট ভাগ কি নয ভাগই তাহারা দেয় , এবং খুব সম্ভব, কৃষক ও মজুরের আয় সমস্ত জাতির আয়ের দশ ভাগের চার ভাগের বেশী নয়। তাই সােস্যাল ডেমােক্র্যাটরা পরােক্ষ ট্যাক্স রহিতের দাবি করে এবং আয়ের উপর ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির উপর ক্রমবশাল গরে ট্যাক্স বসানাের দাবি করে। ক্রমবর্ধমানের অর্থ, যাহার আয় যত বেশী, তাহার ট্যাক্সও তত বেশী। যাহার এক হাজার রুবল আয়, প্রতি রুবলে তাহাকে এক কোপে করিয়া দিতে হইবে, দুই হাজার রুবল আয় হইলে প্রতি রুবলে দুই কোপে দিতে হইবে, ইত্যাদি। যাহাদের সব চেয়ে কম আয (ধরা যাউক, গ্রামের গরীবদের প্রতি কবলের কম), তাহাদের কোন ট্যাক্স দিতে হইবে না। সব চেয়ে বেশী ধনীকে সব চেয়ে বেশী ট্যাক্স দিতে হইবে। এই রকম ট্যাক্স, অর্থাৎ আমেয় উপর ট্যাক্স বা আরও সঠিক ভাবে বলিতে গেলে, ক্রমবর্ধমান হারে আয়ের উপর ট্যাক্স, পরােক্ষ ট্যাক্সের চেয়ে অনেক বেশী খায্য। সেই জন্য সােল ডেমােক্রাটরা পরােক্ষ ট্যাক্স রহিতের চেষ্টা করে এবং ক্রমবর্ধমান আযকর চালু করিবার দাবি করে। স্বভাবতই, সমস্ত মালিক, সমস্ত বুর্জোয়া এই আইন চালু করিবার বিপক্ষে, তাহারা ইহাকে বাধা দেয়। কেবলমাত্র গ্রামের গরীব ও শহরের মজুরদের একতার • বুর্জোয়াদের নিকট হইতে এই সুবিধা আদায় করা যায়। সর্বশেষে, সমস্ত রুশিয়ার জঙ্গ, বিশেষ করিয়া গ্রামের গরীবদের জ, সােস্যাল ডেমোেক্রটরা একটি খুব জরুরি উন্নতির দাবি করে। ইহা হইতেছে, বিনা বেতনে শিশুদের শিক্ষা। আজকাল শহরের চেযে গ্রামে অনেক কম স্কুল আছে , তাহা ছাড়া, কেবলমাত্র ধনীরাই, বুর্জোয়ারাই নিজেদের শিশুদের ভালােভাবে শিক্ষা দিতে পারে। কেবলমাত্র সমস্ত শিশুদের অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাই জনসাধারণকে বর্তমান অজ্ঞতা হইতে অনেকটা মুক্তি দিতে পারে। এই অজ্ঞতার জন্য গ্রামের গরীবরাই সব চেয়ে বেশী কষ্ট লােগ করে ; তাই বিশেষ করিয়া তাহাদেরই প্রয়ােজন শিক্ষার। অবশ্য আমরা খাঁটি ও বিনা বেতনে শিক্ষা চাই, সরকারী কর্মচারী ও পুরােহিত- দেয় দেওয়া শিক্ষা ন। সােল ডেমােজাট আরও দাবি করে যে, প্রত্যেকের নিজের ইচ্ছামত যে-কোন ধর্মমত গ্রহণ করিবার অধিকার থাকিবে। ইউ- নােপীয় দেশগুলির ভিতর একমাত্র কুশিয়া ও তুরস্কেই প্রচলিত (গোঁড়া) ধর্মমতাবলম্বী ছাড়া অন্যের বিরুদ্ধে অতি লজ্জাজনক আইন রহিয়া মজুদের জন্য সােস্যাল ডেমােক্রাটরা কি উন্নতি লাভের চেষ্টা করে? ৬৭ গিয়াছে—যেমন সিস ম্যাটিক, ডিসেন্টার ও ইহুদীদের বিরুদ্ধে। এই আইন কোন বিশেষ ধর্মমত গ্রহণ করা বা প্রচার করা নিষেধ করে অথবা ঐ সব ধর্মমতালখীদের কতকগুলি অধিকার কাভিয়া লয়। এই সব আইন অত্যন্ত অন্যায়, স্বেচ্ছাচারমূলক ও কলঙ্কময়। নিজ ইচ্ছামত যে-কোন ধর্মমত গ্রহণ করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রত্যেকের থাকিবে; শুধু তাই নয়, নিজের ধর্ম প্রচার ও যন্ত্র পরিবর্তন করার স্বাধীনতাও তাহার থাকিবে। কোন সরকারী কর্মচারী কাহারও ধর্ম সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করিতে পারিবে না ইহা হইবে সেই ব্যক্তির বিবেকের বিষয়, ইহাতে কেহ হাত দিতে পারিবে না। কোন সর্বপ্রধান ধর্ম বা গীর্জা থাকিবে না। আইনের চোখে সমস্ত ধর্ম, সমস্ত গীর্জাই সমান থাকিবে। বিভিন্ন ধর্মের পুরােহিত দের সেই ধর্মের লােকেরাই বেতন দিবে, কোন ধর্মের সমর্থনের জন্যই রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করিতে পারিবে না, কোনও পুরাে- হিতের জন্য অর্থ মঞ্জুর করিতে পারিবে না, সে প্রচলিত গীর্জা, সিস- ম্যাটিক, ডিসেন্টার বা অন্য যাহা হউক না কেন। ইহারই জন্য সােন্তাল ডেমোেক্রটরা লড়াই করে। যতদিন পর্যন্ত না এই সব সংস্কারগুলি বিধাহীন ও সুস্পষ্টভাবে গৃহীত হয়, ততদিন পর্যন্ত জন- সাধারণ ধর্মমতের উপর পুলিসের কলম নিপীড়ন হইতে, অথবা কোন একটি ধর্মকে পুলিসের সাহায্যদান যে-ব্যাপারও লজ্জাজনক নয—তাহার হাত হইতে রেহাই পাইবে না। সােল ডেমােজাট সমস্ত জনসাধারণের জঙ্গ, বিশেষ করিয়া গরীবদের জন্য কি কি উন্নতি চায়, তাহা দেখানাে হইল। এখন দেখা যাউক, মজুরদের জন্য, শুধু শহর ও কারখানার মজুরই নয়, কৃষিমজুরদের জন্যও সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা কি কি উন্নতি চায়। কারখানার মজুররা অনেক বেশী ঘেষাঘেষি অবস্থায় বাস করে, তাহারা বড় বড় কারখানায় কান কম গ্রামের গরীবদের প্রতি করে। শিক্ষিত সােশ্যাল ডেমোক্রাটদের সাহায্য পাওয়া তাহাদের পক্ষে সহজ। সেইজন্য শহরের মজুরই প্রথম মালিকদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করিযাছে, এবং কতকগুলি সুবিধাও আদাষ করিযাছে। এমন কি, ফ্যাক্টরী আইন পাস করাইতে পারিযাছে। কিন্তু, এই সব সুবিধা যাহাতে সমস্ত মজুরই পায় সেইজন্য সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা লড়াই করে, যেমন কুটিরশিল্পী, যাহার মালিকদের জন্য শহরে কিংবা গ্রামে বাড়ীতেই কাজ করে, দিনমজুর, যাহা ঘােট ঘােট মালিক ও কারিগরদের অধীনে কাজ করে, ঘর তৈরীর কাজে নিযুক্ত মজুর (ছুতারমিত্রী, ইট প্রস্তুতকারক মজুর প্রভৃতি), কাঠকাটা মজুর, সাধারণ মজুর ও অন্য সকলের মতই কৃষি মজুর। সমস্ত শিয়া ব্যাপী এই সমস্ত মজুররা আজ কারখানার মজুরদের আদর্শে ও তাহাদের সাহায্যে একত্র হইতে শুরু করিয়াছে, উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থার জন্য,কাজের সময় কমাইবার জন্য,মজুরীরিজন্য লড়াই-এ তাহারা একত্র হইতেছে। সোশ্যাল ডেমােক্রাটদের কাজ হইতেছে উন্নত জীবনের জন্য এই লড়াইতে সমস্ত মজুরকে সমর্থন করা, সবচেযে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সবচেয়ে বিশ্বাসী মজুরদের একত্র কবিবার জন্য শক্তিশালী ইউনিয়ন গঠন করিত মজুরদের সাহায্য করা, বই, ইস্তেহার বিলি করি ও যাহারা আন্দোলনে নূতন আসিয়াছে তাহাদের নিকট অভিজ্ঞ মজুর পাঠাইয়া সব রকমে সাহায্য করা। যখন আমবা রাজনৈতিক অধিকার পাই, তখন প্রতিনিধিদের জাতীয় পরিষদে আমাদের লােকও অর্থাৎ মজুরদের প্রতিনিধি সােস্যাল ডেমােজাটর থাকিবে। অঙ্গ দেশের কমরেডদের মত তাহারাও মজুরদের রক্ষার জন্য আইনের দাবি করিবে। মজুরদের জন্য সােশ্যাল ডেমােক্রটিক পার্টি কি কি সুবিধা চায়, তাহার সবগুলিই এখানে বলা হইবে না সে-সব আমাদের প্রােগ্রামে এবং “রুশিয়ায় মজুরদের আদর্শ” নামে একখানা বই-এ বিস্তৃতভাবে বলা হইয়াছে। এই সব সুবিধার কয়েকটি প্রয়ােজনীয় বিষয় এখানে বলা মজুরদের জন্য সােশ্যাল ডেমোেক্রটরা কি উন্নতি লাভের চেষ্টা করে। হইবে। কাজের সময় ৮ ঘণ্টার বেশী হইবে না। সপ্তাহে একদিন ছুটি থাকিবে। বাড়তি সময (ওভারটাইম) খাটানাে ও রাত্রির কাজ একেবারে নিষিদ্ধ হইবে। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বালকদের অবৈতনিক শিক্ষা দিতে হইবে, সুতরাং ঐ ব্যসের আগে কেউ মজুরি খাটিতে পারিবে না। স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপদজনক, এমন শিল্পে মেযেরা কাজ করিতে পারিবে না। কাজের সময বিকলাঙ্গ হইলে--এই যেমন, ফসলের ঘােসা ছাঁটাই কল, খােসা ঝাড়াই কল, প্রভৃতির কাজে আহত হইলে—মালিক মজুরদের ক্ষতিপূরণ দিবে। সমস্ত মজুরদের সাপ্তাহিক মজুরি দিতে হইবে। বর্তমানে যেমন কৃষিমজুরদের দুই মাসে একবার বা তিন মাসে একবার মজুরি দেওয়া হয়, তাহ চলিবে না। মজুরদের পক্ষে নিয়মিতভাবে প্রতি সপ্তাহে জিনিস পত্ৰ দিয়া নয়, নগদ টাকায় মজুরি পাওয়া খুবই প্রয়ােজন। মালিকদের অভ্যাস হইতেছে, মজুরির বদলে খুব চওড়া দরে খেলে জিনিস গ্রহণ করিতে মজুরদের বাধ্য করা। এই অপমানকর নিযম রহিত করার জন্য জিনিসপত্র দিযা মজুরি দেওয়ার প্রথা একেবারে নিষিদ্ধ করিয়া দিতে হইবে। তারপর, বৃদ্ধ মজুরদের রাষ্ট্র হইতে পেন্সন দিতে হইবে। মজুররা নিজেদের শ্রমে সমস্ত ধনী শ্রেণীকে, সমস্ত রাষ্ট্রকে বাঁচাষ, সুতরাং সরকারী কর্মচারীদের মতই তাহাদেরও পেন্সন পাইবার অধিকার আছে। মালিকরা নিজেদের অবস্থার সুযােগ লইযা যাহাতে মজুরদের স্বার্থ রক্ষার নিয়ম-কানুনের খেলাফ করিতে না পারে এজন্য ইনস্পেক্টর নিযুক্ত করিতে হইবে। ইস্পেক্টররা যে শুধু কারখানাই দেখিবে তাহা নয়, জমিদারদের বড় বড় ক্ষেত-খামার এবং সাধারণভাবে যেখানেই দিন মজুর খাটানাে হয় সে-সমস্ত কারবারই দেখিবে। কিন্তু এই ইম্পেক্টররা সরকারী কর্মচারী হইলে চলিবে না, মন্ত্রী বা গভর্নররাও তাহাদের নিযুক্ত করিবে না, পুলিসের হাতেও তাহারা থাকিবে না। এই ইম্পেক্টরদের মজুররাই নির্বাচন করিবে। যে-সব লােকের উপর মজুরদের আস্থা আছে এবং যাহাদের গ্রামের গরীবদের প্রতি মজুররা স্বাধীনভাবে নির্বাচিত করিযাছে, রাষ্ট্র হইতেই তাদের মাহিয়ানা দিতে হইবে। মজুরদের এই সব নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেখিবে, যেন মজুরদের ঘরবাড়ী উপযুক্ত অবস্থায় থাকে, মালিকরা যেন মজুরদের কুকুর- বেড়ালের খােপের মত ঘরে বাস করিতে বাধ্য করিতে সাহস না পায় (কৃষি মজুরদের বেলায় যাহা প্রায় ঘটিয়া থাকে, যেন মজুরদের ছুটির নিয়ম ঠিকমত পালন করা হয়, ইত্যাদি। আবার ইহাও মনে রাখিতে হইবে যে, মজুরদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা মজুরদের কোন কাজেই আসিবে না, যতদিন না রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়া যায, যতদিন পুলিসের হাতে সৰ্ব্বময় কর্তৃত্ব থাকে, যতদিন না পুলিশকে জনসাধারণের নিকট জবাবদিহি করিতে হয়। একথা সবাই জানে যে, পুলিস শুধু মজুর প্রতিনিধিদেরই গেরেফতার করে না, প্রত্যেক মজুর যে তাহার মজুর ভাইদের পক্ষ লইয়া কিছু বলিতে, আইন ভাঙ্গিতে অথবা মজুরদের একত্র হইবার ডাক দিবার সাহস করে, তাহাকেই পুলিস গেরেফতার করে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাইলে মজুর প্রতিনিধিরা অনেক কাজে লাগিবে। খারাব কাজের জন্য কাটাই, জরিমানা বাবদ কাটাই সমস্ত মালিকদেরই ( কারখানাযাল, জমিদার, কন্ট্রাক্টর, ধনী কৃষক) এইভাবে মজুরি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করিয়া দিতে হইবে। মালিকদের পক্ষে নিজ ইচ্ছামত মজুরদের মজুরি কাটিয়া লওয়া বে-আইনী ও স্বেচ্ছাচার। জরিমানা, কাটাই, বা অন্য যে-কোন অছিলায় মালিক মজুরের মজুরি ঘটিতে পারিবে না। মালিক নিজেই বিচারক ও কর্ম-পরিচালকের কাজ ( চমৎকার হাকিম যে মজুরের মজুরি হইতে কাটাই টাকা নিজের পকেটেই পূরে!) করিতে পারিবে না, তাহাকে উপযুক্ত আদালতে যাইতে হইবে। সেখানে সমান সংখ্যক মালিক ও মজুরের প্রতিনিধি থাকিবে। কেবলমাত্র এই ধরনের আদালতই মজুরদের বিরুদ্ধে মালিকের ও মালিকদের বিরুদ্ধে মজুরদের সমস্ত অভিযােগের ভাললা বিচার করিতে পারিবে।
মজুরদের জন্য পােশ্যাল ডেমােকাটা কি উন্নতি লাভের চেষ্টা করে? ৭১ সমস্ত মজুর শ্রেণীর জন্য সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা এই সমস্ত সুবিধা পাইবার চেষ্টা করে। প্রত্যেক জমিদারির মজুর, প্রত্যেক ক্ষেতের মজুর, প্রত্যেক কন্ট্রাক্টরের কাজে নিযুক্ত মজুর তাদের আস্থাভাজন লােকদের সহিত একত্র হইয়া আলােচনা করিবে, কি কি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা তাহারা করিবে, কি-কি দাবিই বা তাহারা তুলিবে (কারণ, বিভিন্ন কারখানায়, বিভিন্ন ক্ষেতে, বিভিন্ন কন্ট্রাক্টরের কাজে বিভিন্ন রকমের দাবি হইবে)। সমস্ত কুশির সােশ্যাল ডেমােক্রাটিক কমিটিগুলি পরিষ্কার ও সঠিক ভাবে নিজেদের দাবি গঠন করিতে ও এইসব দাবিগুলি যাহাতে সমস্ত মজুর, মালিক ও সরকার জানিতে পারে সেই ছাপানাে ইন্তেহার বাহির করিতে মজুরদের সাহায্য করিতেছে। সমস্ত মজুর যখন তাহাদের দাবির জন্য এক হইয়া পাড়া, মালিকরা তখন নত হইতে বাধ্য হয ও দাবি মানিয়া লয়। শহরের মজুররা এইভাবে অনেক সুবিধা পাইয়াছে, এবং আজকাল গ্রাম্য কুটিরশিল্প ও কারিগররা এবং কৃষি মজুররাও তাহাদের দাবির জন্য লড়াই করিতে এক হইযা সংগঠন করিতে শুরু করিয়াছে। যতদিন আমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাই, ততদিন আমরা পুলিশের চোখের আড়ালে গােপনে লড়াই চালাই, কারণ ইস্তেহার বাহির করিতে ও মজুরদের একত্র হইতে পুলিস নিষিদ্ধ করে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাইলে আমরা ব্যাপকতর ও সম্পূর্ণ প্রকাশ্যভাবে লড়াই চালাইব, যাহাতে রুশিয়ার সমস্ত শ্রমরত জনগণ জুলুমের হাত হইতে রেহাই পাইবার জন্য এক হইযা দাঁড়াইতে পারে। মজুরদের সােখাল ডেমােক্রাটিক পার্টিতে যত বেশী মজুর একত্র হইবে, তাহারা ততই শক্তিশালী হইবে— সমস্ত জুলুম, সমস্ত মজুরির দাসত্ব, বুর্জোয়াদের জন্য খাটিতে বাধ্য হইবার অবস্থা হইতে মজুরশ্রেণী তত শীঘ্রই মুক্তি পাইতে পারিবে।
৭২ গ্রামের গরীবদের প্রতি আমরা বলিযাছি সােস্যাল ডেমােক্রটিক পাটি শুধু মজুরদের জন্যই সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে না, সমস্ত কৃষকদের সুবিধার জন্য চেষ্টা করে। এখন দেখা যাক কৃষকদের জন্য তাহারা কি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে। (৬) সমস্ত কৃষকদের জন্য সােশ্যাল ডেমোেক্রা কিকিসুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে? সমস্ত অমরত জনসাধারণের পরিপূর্ণ মুক্তি পাইতে হইলে গ্রামের গরীবদের শহরের মজুরদের সঙ্গে একত্র হইয়া বুর্জোষালের (ধনী কৃষক সহ) বিরুদ্ধে লড়াই করিতে হইবে। ধনী কৃষকরা চেষ্টা করিবে কেতন এরদের যত বেশী সময় ও যত কঠিনভাবে পারে যত কমসম্ভব মজুরিতে খাটাইতে, ও অন্যদিকে, শহর ও গ্রামের মজুররা চেষ্টা কবিবে ক্ষেত মজুম, যাহারা ধনী ও কৃষকদের জন্য খাটে, তাহাদের জন্য বেশী মজুরি, উন্নত অবস্থা, নিয়মিত ছুটি প্রভৃতি আদায় করিতে। ইহার অর্থ গ্রামের গরীবরা নিজেদের ইউনিয়ন গঠন করিবে। ইহার ভিতর ধনী কৃষক থাকিবে না। এ-কথা আমরা আগেই বলিযাছি, বারবার বলিবও। কিন্তু কুশিয়ায ধনী, গরীব সমস্ত কৃষকই বহু বিষয়ে এখনও দাস রহিয়া গিয়াছে, তাহারা নিকৃষ্ট কালাে” ট্যাক্সদাতা সম্প্রদায় হিসাবে গণ্য হয়, তাহারা পুলিস কর্মচারী ও জেমসকি নাচালনিকের দাস , দাস আমলে যেমন তাহাদের ফিউদাল প্রভুদের জন্য খাটিতে হইত, আজকাল তেমনি অট্রকি ব্যবহারের জন্য, জমাজমি ব্যবহারের জন্য, পশুচারণ ভূমি অথবা মাঠের মূৰ বাবদ জমিদারের জন্য প্রায়ই খাটিতে হয়। এই নূতন দাসত্ব হইতে সমস্ত কৃষকই মুক্তি পাইতে চায়, কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করতে চেষ্টা করে? সকলেই সমান অধিকার পাইতে চায়। সকলেই জমিদারকে ঘৃণা করে; কারণ, জমিদাররা তাহাদের জমি, পশুচারণ ভূমি ও মাঠ ব্যবহারের জন্য মূল্য হিসাবে “ট্রাবােটকি করিতে (খাটিযা খাজনা দেওয়া—অনুবাদক), দাসমজুরি খাটিতে এখনও কৃষকদের বাধ্য করে, অনধিকার প্রবেশের অজুহাতে খাটায়, জমিদারের জমির ফসল কাটিবার ‘সম্মানের জন্য কৃষক মেযেদের পাঠাইতে বাধ্য করে। জমি- দারের জন্য এই সব কাজের বােঝ ধনী কৃষকদের চেয়ে গরীব কৃষকদেরই বেশী। ধনী কৃষকরা প্রায়ই এই সব কাজের বদলে জমিদারকে মূল্য ধরিয়া দিতে পারে। তবুও ধনী কৃষকদের জমিদারবা ভালােভাবেই নিংড়াইয়া নেয়। সেইজন্য গ্রামের গরীবরা ধনী কৃষকদের পাশাপাশি পাড়াইয়াই তাহাদের অধিকারের অভাবের বিরুদ্ধে, সব রকম বাচিনা, সব রকম স্ট্রাটেকি’র বিরুদ্ধে লড়াই করিবে। সমস্ত দাসত্ব, সমস্ত দারিদ্র্য আমরা শুধু তথনই শেষ করিতে পারি, যখন সমস্ত বুর্জোয়া শ্রেণীকে ( ধনী কৃষক সহ) হটাইতে পারি। কিন্তু এমন অনেক রকমের দাসত্ব আছে, যাহার অবসান সেই সময়ের আগেই ঘটানাে যায়, কারণ ধনী কৃষকরাও ঐ দাসত্বের বােয় বেশ নিপীড়িত হয। এখনও কুশিয়ায় অনেক জেলা ও অনেক স্থান আছে যেখানে কৃষকরা প্রায় পুরাপুরি ভূমিদাসেরই মত। তাই তাে রুশ মজুর ও গ্রাম্য গরীবদের একই সঙ্গে দুই হাতে দুই দিকে লড়াই চালাইতে হইবে। এক হাতে সমত মজুদের সঙ্গে একযােগে সমস্ত বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লড়াই, এবং অন্য হাতে সমস্ত কৃষকদের সঙ্গে একযােগে গ্রাম্য কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ফিউদাল জমিদারের বিরুদ্ধে লড়াই। যদি গ্রামের গরীবরা ধনী কৃষকদের বাদ দিয়া নিজেদের ইউনিয়ন (সমিতি) না গড়ে, তাহা হইলে ধনী কৃষকরা তাহাদের হাত করিযা ঠকাইবে এবং নিজেরাই জমিদার হইয়া বসিবে, আর গরীবরা শুধু গরীবই থাকিবে না, এক ৭; গ্রামের গরীবদের প্রতি হইবার অধিকারও তাহারা পাইবে না। ফিউদাল দাসত্বের বিরুদ্ধে যদি গ্রামের গরীবরা ধনী কৃষকদের পাশাপাশি দাঁড়াইয়া লড়াই না করে, তাহা হইলে তাহারা একই স্থানে আবদ্ধ ও শৃঙ্খলিত থাকিবে। শহরের মজুরদের সঙ্গে একত্র হইবার স্বাধীনতাও তাহারা পাইবে না। জমিদারের বিরুদ্ধে আঘাত হানিয়া এবং অন্তত ফিউদাল দাসত্বের সবচেয়ে হীন ও ক্ষতিকর ব্যবস্থা উচ্ছেদ করিযাই গ্রামের গরীবদের কাজ শুরু করিতে হইবে। এই লড়াই-এ অনেক ধনী কৃষক ও বুর্জোয়া দলের লােকও গরীবদের পক্ষ লইবে, কারণ সকলেই ফিউদাল বংশীযদের ঔদ্ধত্যে অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু জমিদারদের ক্ষমতা খর্ব হইবামাত্র তখনই ধনী কৃষকদের স্বরূপ প্রকাশ হইয়া পড়িবে এবং সব কিছু গ্রাস করিবার জন্য তাহারা থাবা বাড়াইবে। তাহাদের থাবা সব কিছু আয়ত্তে আনিবার পক্ষে খুব উপযােগী, কারণ তাহারা ইতিমধ্যেই অনেক কিছুই গ্রাস করিয়াছে। সেইজন্য আমাদের হুশির থাকিতে হইবে এবং শহরের মজুরদের সঙ্গে অচ্ছেদ্য দৃঢ় ঐক্য গঠন করিতে হইবে। জমিদারদের পুরানাে অভ্যাস ভাঙ্গিয়া ফেলিতে ও ধনী কৃষকদের খানিকটা পােব মানাইতে শহরের মজুররা সাহায্য করিবে (যেমন তাহারা তাহাদের মালিক কলওয়ালাদের খানিকটা পােব মানাইতে পারিয়াছে)। শহরের মজুরদের সহযােগিতা ছাড়া গ্রামের গরীবরা দাসত্ব, দারিদ্র্য ও দুঃখকষ্টের হাত হইতে কখনই রেহাই পাইবে না, শহরের মজুর ছাড়া গ্রাম্য গরীবদের সাহায্য করিবার আর কেহ নাই, এবং গ্রামে তাহারা নিজেদের ছাড়া আর কাহারও উপর ভরসা করিতে পারে না; কিন্তু কতকগুলি সুবিধা অামরা প্রথমেই বিরাট লড়াই-এর একেবারে গোড়াতেই পাইতে পারি। রুশিয় এমন দাসত্ব আছে, যাহা অন্য দেশে অনেক আগেই শেষ হইয়া গিয়াছে এবং আমলাতন্ত্র ও জমিদারের এই ফিউদাল দাসত্ব, সমস্ত ৭৫ কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে ? রুশ কৃষক এখনই শেষ করিয়া দিতে পারে। এখন দেখা যাক ফিউদাল দাসত্বের হাত হইতে সমস্ত রুশ কৃষকের মুক্তির জন্য রুশ সােশ্যাল ডেমোেক্রটিক লেবার পার্টি সবার আগে কি কি সুবিধা চায়, যার ফলে সমগ্র রুশ বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই-এ গ্রামের গরীবদের হাত খােলা থাকিতে পারে। রুশ সােস্যাল ডেমােক্রাটিক লেবার পাটির প্রথম দাবি, জমি সংক্রান্ত সমস্ত ক্ষতিপূরণের টাকা, সমস্ত মুক্তি-খাজনা (quit rent ), “ট্যাক্সদাতা” সম্প্রদায় হিসাবে যাহা কিছু দেয় এখনই বন্ধ করিতে হইবে। ফিউদাল সম্রান্তদের সমিতিগুলি এবং এই সম্ভান্ত বংশীয়দের রক্ষাকর্তা রুশিযার জারের গভর্নমেন্ট—ইহারা যখন দাসত্ব হইতে কৃষকদের মুক্তি দিল তখন কৃষকরা নিজেদের জমিই কিনিয়া লইতে বাধ্য হইল—বংশানুক্রমে যে-জমি তাহারা আবাদ করিযা আসিয়াছে তাহারই জন্য তাহাদের মূল্য দিতে হইল ! ইহা নিছক কাতি। সম্রান্তদের সমিতি জারের গভর্নমেন্টের সাহায্যে সােজাসুজি কৃষককে লুটিয়া নিল। অনেক জায়গায় জারের গভর্নমেন্ট ফৌজ পাঠাইয়া অন্ত্রের সাহায্যে দাসমুক্তি আইন চালু করিল, এবং যে-সব কৃষক অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়তনের নিঃম্বের ক্ষেত গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল, সামরিক শক্তির দ্বারা তাহাদের দমন করিল। ফিউদাল সম্রান্তদের সমিতিগুলি দাসমুক্তির সময়ে সামরিক সাহায্যে নিৰ্যাতন ও গুলি না চালাইয়া কৃষকদের এমনি নির্লজ্জভাবে লুঠ করিতে পারিত না। কৃষকদের সব সময়ই মনে রাখিতে হইবে কেমন করিয়া ফিউদাল সন্ত্রান্ত ও জমিদারদের সমিতিগুলি তাহাদের লুঠ করিয়াছিল ও ঠকাইযাছিল, কারণ, তখনকার মত এখনও জারের গভর্নমেন্ট যখনই কৃষক সংক্রান্ত কোন নূতন আইন করিবার জন্য কমিটি নিযুক্ত করে, তখন জমিদার ও সরকারী কর্মচারী ছাড়া আর কাহাকেও সেই কমিটিতে নেয় না। কিছুদিন আগে জার একটি ইন্তেহার বাহির করিয়াছে গ্রামের গরীবদের প্রতি [১১ই মার্চ (২৬শে ফেব্রুয়ারী) ১৯০৩]। তাহাতে কৃষক সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন ও উন্নত করার কথা অঙ্গীকার করা হইয়াছে। কাহারা এই পরিবর্তন ও উন্নতি সাধন করিবে? সেই সরকারী কর্মচারী আর ফিউদাল সন্ত্রান্তের দল। নিজের অবস্থার উন্নতি করির জন্য কৃষক সমিতি গঠন করিত না পারা পৰ্যন্ত কৃষকরা ঠকিতেই থাকিবে। জমিদার, জেমদকি নাচালনিক ও সরকারী কর্ম- চারীরা যাহাতে কৃষকদের উপর আর হুকুম চালাইতে না পারে, সেই দিন আজ আসিয়াছে। প্রত্যেক পুলিশ কর্মচারীর দাসত্ব, অসৎচরিত্র সন্ত্রান্ত বংশীয় যুবক যাহারা এখন জেমসকি নাচালনি পদে অধিষ্ঠিত তাহাদের দাসত্ব, প্রত্যেক পুলিশ ক্যাপ্টেন ও গভর্নরের দাসত্ব, কৃষকের পক্ষে এসব শেষ করিয়া দিবার দিন আজ আসিয়াছে। কৃষকদের দাবি করিতে হইবে, নিজেদের বাপার কৃষকদের নিজেদেরই মীমাংসা করিতে দেওয়া হউক। নূতন আইন তৈয়ার করা, পাস করা ও চালু করার ক্ষমতা কৃষকদের নিজেদেরই দেওযা হউক। স্বাধীন- ভাবে নির্বাচিত কৃথক কমিটি গঠনের দাবি কৃষকরা তুলিবে। যত দিন না তাহারা ইহা পায়, ততদিন সর্বদাই সন্ত্রান্তের দল ও সরকারী কর্মচারীরা তাহাদের লুঠ করিবে ও ঠকাইবে। সরকারী রক্ত-শােষকদের হাত হইতে কৃষকদের কেহই মুক্ত করিবে না, যতদিন না তাহারা নিজেরা মুক্ত হয়, যতদিন না তাহারা নিজেরা একত্র হয় এবং নিজে দের ভাগ্য নিজেরাই রচনা করিবার ভার নেয়। সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা শুধু যে জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকা, মুক্তিখাজনা ও অন্যান্য জুলুমদারি ট্যাক্স এখনই রহিত করার দাবি করে, তাহা নয়; তাহারা আরও দাবি করে যে, জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ যে-টাকা জনসাধারণের নিকট হইতে লওয়া হইয়াছে, তাহা জনসাধারণকে ফিরাইয়া দিতে হইবে। যেদিন ফিউল ;
কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে? ৭৭ সম্রান্তদের সমিতিগুলি কৃষকদের দাসত্ব হইতে মুক্তি দিয়াছে, সেইদিন হইতে সমগ্র শির কৃষকরা এই বাবদ কোটি কোটি রুকল দিয়াছে। কৃষকদের দাবি তুলিতে হইবে—এই টাকা ফিরাইয়া দেওয়া হউক। বড় বড় ফিউদাল সম্রান্ত জমির মালিকদের উপর বিশেষ ট্যাক্স বসানাে হউক, গীর্জার জমি ও রাজপরিবারের জমি কাডিয়া লওয়া হউক, প্রতিনিধিদের জাতীয় পরিষদ এই অর্থ কৃষকদের সুবিধার জন্য ব্যয় করুক। কোন দেশের কৃষকই কুশিয়ার মত এত নিষ্পেষিত ও এত গরীব ন্য। কুশিয়ার মত কোন দেশেই এমন লাখ লাখ লোেক না খাইয়া মরে না। অনেক দিন আগেই ফিউদাল সম্রান্তদের সমিতি তাহাদের লুটিয়াছে ও ফিউদাল জমিদারদের বংশধরেরা জমির ক্ষতি পূরণ ও মুক্তিখাজনা বাবদ প্রচুর অর্থ দিতে কৃষকদের বাধ্য করিয়া আজও লুটিয়া লইতেছে—তাই রুশিয়ার কৃষকরা না খাইয়া মরে। এই অপরাধের জন্য ডাকাতদের কৈফিয়ৎ দিতে হইবে। বড় বড় সম্রান্ত জমিদারদের নিকট হইতে অর্থ লইযা দুর্ভিক্ষপীড়িতদের প্রকৃত সাহায্য দেওযা হউক। অনাহারী কৃষকরা ভিক্ষা চায় না, সাহায্য চায় না; তাহাদের দাবি করা উচিত, বছরের পর বছর রাষ্ট্র ও জমিদারদের যে-অর্থ তাহারা জোগাইয়াছে, তাহাই তাহাদের ফিরাইয়া দেওয়া হউক। তাহা হইলেই প্রতিনিধিদের জাতীয় পরিষদ ও কৃষক সমিতি অনাহারী কৃষকদের প্রকৃত সাহায্য করিতে পারিবে। ইহা ছাড়া, সােশ্যাল ডেমোেক্রটিক লেবার পার্টি দাবি করে যে, যৌথ দায়িত্ব (ট্যাক্স দিবার জন্য গ্রাম্য সমাজের সমস্ত কৃষককেই একত্র দায়ী করা হইত-অনুবাদক) এখনই রহিত করা হউক। কৃষকদের স্বাধীনভাবে জমি হস্তান্তর করিবার বাধাপ যেসব আইন আছে তাহা এখনই তুলিয়া দেওয়া হউক। ১৯০৩ সালের ১১ই মার্চের (২১শে ফেব্রুয়ারি) জারের ঘােষণায় যৌথ ৭৮ গ্রামের গরীবদের প্রতি দায়িত্ব তুলি দিবার কথা আছে। এই বিষয়ে একটা আইন পাস হইয়া গিয়াছে। কিন্তু ইহাই যথেষ্ট নহে। কৃষকদের জমি হস্তান্তর করিবার বাধাস্বরূপ যেসব আইন আছে সে-সমস্তই এখনই রহিত করিতে হইবে, নতুবা যৌথ দাযিত্ব না থাকিলেও কৃষকরা মুক্তি পাইবে না, অৰ্দ্ধদাসই থাকিয়া যাইবে। জমি হস্তান্তর করিবার পরিপুর্ণ স্বাধীনতা কৃষকদের দিতে হইবে। বিনা হুকুমে যাহাকে খুশি জমি পত্তন দিবার বা বিক্রয় করিবার অধিকার কৃষকের থাকিবে। জারের রাজ-আ ইহা করিতে দেয় না। সম্রান্ত সম্প্রদাষ, ব্যবসায়ী ও শহরের লােকেরা নিজেদের জমি স্বাধীনভাবে হস্তান্তর করিতে পারে, কিন্তু কৃষকরা পারে না। মুজিকদের (কৃষক) প্রতি শিশুর মত ব্যবহার করা হয়, তাহাকে দেখাশুনা করিবার জন্য পাত্রীর মত একজন নাচালনিক চাই। কৃষককে তাহার ভাগের জমি বিক্রয় করিতে দেওষ হইবে না, পাছে সে অর্থ উড়াইয়া দেয়। দাস-মালিকদের যুক্তির ধারাই এই রকম। অনেক নির্বোধ লােক এই কথায় বিশ্বাস করে ও কৃষকদের মঙ্গল চাহিয়া বলে, কৃষকদের জমি বিক্রয় করিতে দেওয়া উচিত নয়। এমন কি নারােদনিকি (যাহাদের কথা আগেই বলা হইয়াছে) ও যাহারা নিজেদের সােশ্যালিস্ট রিভলিউশনারি” বলে, তাহারাও এই যুক্তি মানিয়া ল্য এবং বলে যে কৃষকদের জমি বিক্রয়ের ক্ষমতা দেওয়ার চেয়ে কৃষকদের কতকটা দাসের মত থাকা ভাল। সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা বলে? ইহা ভণ্ডামি ছাড়া, সম্রান্তদের মত ছাড়া আর কিছুই নয়, ইহা শুধুমাত্র মিষ্টি কথা! যেদিন সােস্যালি- জম হইয়া যাইবে, যেদিন বুর্জোয়াদের উপর মজুরদের জয় হইবে, সেই দিন সকলেই জমির মালিক হইবে, কাহারও জমি বিক্রয়ের অধিকার থাকিবে না। কিন্তু ইতিমধ্যে কি অবস্থা হইবে? সান্ত- দের ও ব্যবসায়ীদের জমি বিক্রয় করিতে দেওয়া হইবে, আর কৃষকদের কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে ? জমি বিক্রয় করিতে দেওয়া হইবে না। সম্রান্তরা ও ব্যবসায়ীরা স্বাধীন থাকিবে, আর, কৃষকরা থাকিবে অর্ধদাস? কর্তৃপক্ষের নিকট কি কৃষকদের হুকুম ভিক্ষা করা চলিতেই থাকিবে ? ইহা মিষ্টি কথার আড়ালে লুকানাে নিছক বঞ্চনা। যতদিন সম্রান্তরে ও ব্যবসাদারদের জমি বিক্রয়ের অধিকার থাকিবে, ততদিন কৃষকদেরও জমি বিক্রযের অবাধ অধিকার ও জমি হস্তান্তরের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকিবে, ঠিক যেমন আছে সন্ত্রান্ত- দের ও ব্যবসায়ীদের। সমস্ত বুর্জোয়াশ্রেণীর উপরে যখন মজুরশ্রেণীর জয়লাভ হইবে, তখন বড় বড় মালিকের নিকট হইতে তাহারা জমি কাডিয়া লইয়া বড় বড় জমিতে যৌথ কৃষি চালু করিবে, মজুররা একত্র হইয়া আবাদ করিবে এবং ক্ষেত পরিচালনার জন্য বিশ্বাসী লােকদের স্বাধীনভাবে নির্বাচিত করিবে। এম বাঁচাইবার জন্য তাহারা কলের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করিবে; তাহারা পালা করিয়া দিনে (shift) ৮ ঘণ্টার (এমন কি ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত) বেশী কাজ করিবে না। তখন যেসব ক্ষুদ্র কৃষক পুরানাে প্রথায় ব্যক্তিগতভাবে ক্ষেত চালাইতে চাহিবে, তাহারা বাজারের জন্য উৎপাদন করিবে না, যাহার তাহার নিকট বিক্রয় করিবে না , মজুর সমিতির জন্য উৎপাদন করিবে। ক্ষুদ্র কৃষকরা মজুর সমিতির শস্ত, মাংস, শাক-সজি দিবে এবং মজুররা তাহার বদলে দিৰে কলের যন্ত্রপাতি, গরু-ঘােড়, জমির সার, কাপড়-চোপড় ও কৃষকের অন্যান্য প্রযােজনীয় জিনিস ; ইহার জন্য কৃষকদের দাম দিতে হইবে না। তখন ক্ষেত-খামারের হােট ও বড় কৃষকদের ভিতর অর্থের জন্য কোন লড়াই থাকিবে না, অন্যের জন্য মাহিনা করা মজুরও থাকিবে না; সমস্ত মজুররা নিজেদের জন্যই খাটিবে, খাটুনি বাচাইবার সমস্ত উপায় এবং সমস্ত যন্ত্রপাতি শব্দ গ্রামের গরীবদের প্রতি দের সুবিধায় লাগিবে, তাহাদের কাজ সহজ করিতে সাহায্য করিবে, এবং তাহাদের জীবন যাপনের প্রণালী উন্নত করিবে। কিন্তু প্রত্যেক বিবেচক লােক বুঝিতে পারে যে একবারেই সােশ্যালিজম পাওয়া যাইবে না : সােখালিজ পাইতে হইলে সমস্ত বুর্জোয়াশ্রেণী ও প্রত্যেক গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই চালাইতে হইবে, রুশিয়ার সমস্ত মজুরশ্রেণীর সঙ্গে সমস্ত গ্রামের গরীবদের এক সুদৃঢ় ও অচ্ছেদ্য মৈত্রী গঠনের জন্ত আমাদের এক হইতে হইবে। ইহা এক মহান আদর্শ, আত্মােৎসর্গ করিবার উপযুক্ত আদর্শ। কিন্তু যতদিন আমরা সােস্যালিজম না পাইতেছি, বড় মালিকরা দে মালিকদের বিরুদ্ধে অর্থের জন্য লড়াই করিবে। বড় বড় জমির মালিক ইচ্ছামত জমি বিক্রয় করিতে পারিবে, আর ক্ষুদে কৃষকরা পারিবে না। আমরা আবার বলি। কৃষকরা শিত নয়, তাহারা কাহাকেও তাহাদের উপর হুকুম চালাইতে দিবে না, সভ্রান্ত ও ব্যবসা- দাররা যেসব অধিকার ভােগ করে কৃষকরাও সেই সমস্ত অধিকার ভােগ করিবে—অবাধভাবেই ভােগ করিবে। এই কথা বলা হয় যে, কৃষকের জমি নিজের জমি নয়, ইহা সামাজিক জমি, সকলকে সামাজিক জমি বিক্রযের অধিকার দেওয়া যায় না। ইহাও মিথ্যা কথা। সম্রান্ত ও ব্যবসাদারদের কি নিজেদের সমাজ নাই? সান্ত ও ব্যবসাদাররা কি জমি ও কারখানা কেনার জয় বা অন্য কিছু একসঙ্গে করার জন্য কোম্পানি গঠন করে না। তাহা হইলে, সম্রান্ত সমাজের জন্য বাধা নিষেধ নাই কেন? হইলে অপদার্থ পুলিসরা কৃষকের বেলাতেই বা বাধা নিষেধ দিতে এত উৎসাহ প্রকাশ করে কেন? সরকারী কর্মচারীদের কাছ হইতে কৃষকরা কোনদিনই ভালাে কিছু পায় নাই, মারপিট, থাকানি আর জুলুম। যতদিন না কৃষকরা নিজেদের ব্যাপার নিজে পাইয়াছে শুধু কৃষকদের অত কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে? ৮১ দের হাতে নেয়, যতদিন না তাহার সমান অধিকার ও পূর্ণ স্বাধীনতা পায়, ততদিন তাহারা ভালাে কিছুই পাইবে না। কৃষকরা যদি তাহাদের জমি সামাজিক জমি হিসাবে রাখিতে চায, কেহই তাহাতে বাধা দিতে সাহস পাইবে না। তাহারা স্বেচ্ছায় যৌথ সমাজ গঠন করিবে এবং যাহাকে ইচ্ছা ও যে-কোন শর্তে ইচ্ছ৷ ইহার ভিতর লইবে, যে-কোন আকারে হউক তাহারা স্বাধীনভাবে সামাজিক চুক্তি করিবে। কৃষকদের সামাজিক ব্যাপারে যেন কোন সরকারী কর্মচারীই নাক ঢুকাইতে সাহস না পায। কৃষকদের ব্যাপারে বিধি-নিষেধ আবিষ্কারের জন্য মাথা ঘামাইতে যেন কেহ না আসে। সােগাল ডেমােক্রাট কৃষকদের জন্য আরও একটি বিশেষ সুবিধা পাইতে চেষ্টা করে। তাহারা সম্রান্ত সম্প্রদায়ের নিকট কৃষকদের দাসত্ব, ফিউদাল দাসত্ব এখনই খর্ব করিতে চায়। যতদিন দারিদ্র্য থাকিবে, ততদিন দাসত্ব একেবারে ঘুচিবে না, এবং দারিও ঘুচিবে যতদিন জমি ও কারখানা বুর্জোয়াদের হাতে আছে, যতদিন পৃথিবীতে টাকাই সর্বপ্রধান শক্তি, যতদিন না সােখালি সমাজের প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু কণিষার গ্রামে এমন হীনতম দাসত্ব আছে যাহা বিদেশে কোথাও আর নাই, যদিও সেখানে সােখালিজম প্রতিষ্ঠা হয় নাই। কুশিয়ায় এখনও অনেক ফিউদাল দাসত্ব বর্তমান, যাহা সমস্ত জমিদারদের পক্ষে লাভজনক, যা কৃষকদের উপর দুর্বহ বােঝা—যাহা সব কিছুর আগে এখনই রহিত করা যায় ও তাহাই করিতে হইবে। ফিউদাল দাসত্ব বলিতে আমরা কি বুঝি দেখা যাক। যাহারা গ্রামে বাস করে, তাহারা এই ধরনের ঘটনার কথা জানে। কৃষকের জমির পাশেই জমিদারের জমি। মুক্তির সর ২ গ্রামের গরীবদের প্রতি ফেসব জমি কৃষকদের পক্ষে অতি প্রয়ােজনীয় সেগুলি কৃষকদের জমি হইতে কাড়িন্না লও হইযাছিল, পশুচারণ ভূমি, বন, জলা এইভাবে কড়িয়া লওয়া হইযাছিল। এই সব ওট্রেজকি, পচারণ ভূমি ও জলা ছাড়া কৃষকদের চলে না। কৃষকরা পছন্দ করুক আর নাই করুক, বাধ্য হইয়া জমিদারের কাছে জলায় গরু ঘােড়া পাঠাই- বার হুকুম অথবা পশুচারণ ভূমি পত্তন বা ঐ ধরনের একটা কিছুর এ যাইত। জমিদাররা জমিতে ক্ষেত করে না, তাহাদের কোন টাকাও না থাকিতে পারে। তাহারা শুধু কৃষকদের দাসত্বের উপরই বাঁচে। এই ওট্রেজ কি ব্যবহারের জন্য কৃষকদের জমিদারের অঙ্গ বিনা মজুরিতে কাজ করিতে হয়, কৃষকরা নিজেদের ঘােড় দিয়া জমিদারের জমিতে লাঙল দেয়, জমিদারের ফসল ও খড় কাটে, জমিদারের বাড়িয়া দেয়, সময় সময় গাড়ি করিয়া নিজেদের সার জমিদারের জমিতে দিযা আসে, ঘরে বােনা কাপড়, ডিম, হাঁস, মুরগী প্রভৃতিও জমিদারকে পাঠায়। অবিকল দাসপ্রথার আমলেরই মত। দাস আমলে কৃষকরা জমিদারের সীমানার মধ্যে বাস করিত, আর বিনা মজুরিতে জমিদারের জন্য খাটিত, এবং আজকার দিনে জমিদারের জন্য বিনা মজুরিতে কৃষকদের খাটিতে হয় সেই সব জমি ব্যবহারের জন্যই যাহা মুক্তির সময়ে সন্ত্রান্তদের সমিতিগুলি কৃষকদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়াছিল। বাৰ্চিনার (ক্ষেতের গােলামি) সহিত ইহার কোন তফাত নাই। কোন কোন প্রদেশে কৃষকরা ইহাকে সত্যই বার্চিনা বা পল্লি বলিয়া থাকে। একেই আমরা বলি ফিউদাল দাসত্ব। দাসমুক্তির সময়ে জমিদাররা ও সন্ত্রান্তদের সমিতিগুলি সমত ব্যাপারটা এমনভাবে সাজাইয়াছিল যাহাতে পুরানাে ভাবেই কৃষকদের দাসত্বের ভিতর রাখা যায়। ইচ্ছা করিয়াই তাহারা কৃষকদের ভাগের জমি কমাইয়া উহার মাঝখানে জমিদারের জমি কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদাষ করিতে চেষ্টা করে? ঢুকাইয়া দিত। ফলে, কৃষকদের মুরগী ছাড়ি দিলেই উহার জমি- দারের জমির মধ্যে বে-আইনী প্রবেশ করা ছাড়া উপায় থাকিত না, ইচ্ছা করিয়াই তাহারা কৃষকদের সব চেয়ে খারাপ জমি হস্তান্তর করিত। জমিদারের জমি দিবা জলায যাইবার পথ আটক করিত। এক কথায়, তাহারা এমনভাবে ব্যাপারটাকে সাজাইত যে কৃষকরা ফান্দে পড়িত এবং আটক হইত। এখনও অসংখ্য গ্রাম আছে যেখানে ঠিক দাসপ্রথারই মত কৃষকরা স্থানীয় জমিদারের মুঠির ভিতরে। এই সব গ্রামে ধনী ও গরীব কৃষক উভয়কেই হাত পা বাঁধা অসহায় অবস্থায় জমিদারের দয়ার উপর ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। এই রকম অবস্থায় গরীব কৃষকরা ধনী কৃষকদের চেয়ে বেশী কষ্ট লােগ করে। ধনী কৃষকদের সময় সময় কিছু জমি থাকে, এবং জমিদারের জন্য খাটিতে নিজেরা না যাইয়া নিজেদের মজুর পাঠাইয়া দেয়। কিন্তু গরীব কৃষকদের কোন পথই নাই, জমিদারদের দয়ার উপর তাহাদের নির্ভর করিতে হয়। এই দাসত্বের ভিতর কৃষকদের এক মুহূর্তও হাফ ছাড়িবার অবসর থাকে না, অন্য স্থানে কাজ দেখি- বার জন্য জমিদারের কাছ ছাড়িয়া যাইবারও উপায় নাই, সমস্ত গ্রামের গরীব ও শহরের মজুদের সঙ্গে এক সমিতিতে এক পার্টিতে একত্র হইবার কথা চিন্তা করিবারও তাহার ফুরসৎ থাকে না। এখন দেখা যাক, এই ধরনের দাসত্ব এই মুহূর্তে অবিলম্বে উচ্ছেদের সম্ভাবনা আছে কি না। এই উদ্দেশ্যে সশস্যাল ডেমােক্রা- টিক লেবার পাটি দুইটি উপায়ের কথা তােলে। কিন্তু আমরা আবার বলিতেছি যে, একমাত্র সােস্যালিজমই গরীবদের সমস্ত দাসত্ব হইতে মুক্তি দিতে পারে, কারণ যতদিন ধনীদের হাতে ক্ষমতা থাকিবে, ততদিন কোন কোন ভাবে তাহারা গরীবদের সর্বদা নিপীড়ন করিবেই। এক আঘাতে সমস্ত দাসত্ব উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়, কিন্তু ৮. গ্রামের গরীদের প্রতি সব চাইতে হীন, সব চেয়ে জঘন্য রকমের দাসত্ব ফিউদাল দাসত্ব, যাহ গরীবদের উপর, মধ্যবিত্ত ও এমন কি ধনী কৃষকদের উপরও একাণ্ড বােঝ, তাহা খর্ব করা সম্ভব, কৃষকদের জন্য এখনই কিছু সুবিধা করা সম্ভব। এই উদ্দেশ্যে পেীছাইবার জন্য দুইটি পথ আছে। প্রথম পথ : ক্ষেতমজুর, গরীব কৃষকদের প্রতিনিধি, আর ধনী জমিদারদের প্রতিনিধি লইয়া লইযা স্বাধীনভাবে নির্বাচিত চ্চিারালয়। দ্বিতীয় পথ : স্বাধীনভাবে নির্বাচিত কৃষক কমিটি। এই সব কৃষক কমিটিগুলির হাতে ক্ষমতা থাকিবে, শুধু বার্শিনা রহিতের ব্যবস্থা সম্বন্ধে আলােচনা ও পন্থা নির্দেশই নয়, শুধু দাসত্বের রেশ গুলির উচ্ছেদই নয়, ওট্রেকি’ বাজেয়াফত করিয়া কৃষকদের ফিরাইয়া দিবার ক্ষমতাও ইহার থাকিবে। এই দুইটি উপায় সম্বন্ধে আরও একটু তলাইয়া দেখা যাক। বিশ্বাসী লােকদের দ্বারা গঠিত স্বাধীনভাবে নির্বাচিত কোর্ট দাসত্বের বিরুদ্ধে কৃষকদের নালিশ সংক্রান্ত সমস্ত মামলাগুলির বিষয় বিকেনা করিবে। যেসব ক্ষেত্রে কৃষকদের দারিদ্র্যের সুযােগ লইয়া জমিদাররা কৃষকদের খাজনা বাড়াইয়া দিয়াছে, সেখানে খাজনা কমাইবার ক্ষমতা এই সৰ কোটের থাকিবে। যেসব ক্ষেত্রে গ্রীষ্মের কাজের জমিদাররা শীতকালেই কৃষকদের খুব কম মজুরিতে বহাল রাখে, সেখানে অতিরিক্ত আদায়ের হাত হইতে কৃষকদের মুক্তি দিবার ক্ষমতা কোর্টের থাকিবে অবস্থা বিচার করিয়া এই কোট উপযুক্ত মজুরি ঠিক করিয়া দিবে। অবশ্য, এই কোটে সরকারী কর্মচারী থাকিবে ; ইহাতে থাকিবে স্বাধীনভাবে নির্বাচিত বিশ্বাসী লােক। কৃষি- মর ও গ্রামের গরীবরা তাহাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করিবে এবং ৮৫ কৃষকদের কষ্ট কি কি সুবিধা আদায় করতে চেষ্টা করে? এই সব প্রতিনিধিদের সংখ্যা ধনী কৃষক ও জমিদারদের প্রতিনিধি- দের অপেক্ষা কোনক্রমেই কম হইবে না। মজুর ও মালিক সংক্রান্ত মামলার বিচারও এই কোট করিবে। যখন এই ধরনের কোট স্থাপিত হইবে, তখন মজুর ও সমস্ত গ্রামের গরীবদের স্বার্থরক্ষা সম্ভব হইবে। একজোট হওয়া ও কোন্ কোন্ লােক মজুর ও গরীবদের পক্ষ লইবে বলিয়া বিশ্বাস করা যায় তাহাও ঠিক করা সহজ হইবে। অন্য উপায়টি আরও বেশী জরুরী। ইহা হইতেছে, প্রত্যেক জেলায় ক্ষেতমজুর, গরীব, মধ্যবিত্ত ও ধনী কৃষকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি লইযা স্বাধীনভাবে কৃষক কমিটি গঠন করা। (কৃষকরা ইচ্ছা করিলে একটি জেলায় কয়েকটি কমিটিও গঠন করিতে পারে, হয়তাে তারা প্রত্যেক ইউনিয়নে এবং প্রত্যেক বড় গ্রামে কমিটি গঠন করিতে চাহিবে)। কৃষকদের ঘাডের উপর দাসত্বের বােঝার কথা কৃষকদের চেয়ে আর কেউ বেশী বুঝে না। জমিদার, যাহারা আজও ফিউদাল দাসত্বের উপর জীবন ধারণ করে, কৃষকদের চেয়ে আর কেউ বেশী ভালভাবে তাহাদের মুখোেশ খুলিয়া দিতে পারিবে । কৃষক কমিটি ঠিক করিবে, কোন কোন ওট্রেজ কি, কোন কোন্ মাঠ বা পশুচারণ ভূমি অথবা ঐ জাতীয় কিছু অন্যায়ভাবে লওয়া হইয়াছিল, তাহারাই ঠিক করিবে এই সব জমিগুলি বিনা খেসারতে লওযা হইবে, না, যাহারা জমি কিনিয়াছে, বড় বড় সাজদের নিকট হইতে অর্থ লইয়া তাহাদের খেসারত দিতে হইবে। সমা- দের সমিতিগুলি কৃষকদের যে-ফাদে ফেলিয়াছে, তাহার কবল হইতে নিশ্চয়ই কৃষক সমিতিগুলি কৃষকদের মুক্তি দিবে। কৃষক সমিতি গুলি কৃষকদের ব্যাপারে সরকারী কর্মচারীদের হস্তক্ষেপের অবসান ঘটাইবে, তাহারা দেখাইবে কৃষকরা নিজেদের ব্যাপার চালাইতে পারে ও চালাইতে চাহে, নিজেদের দাবিদাওয়া সম্বন্ধে একমত হওয়ার গ্রামের গরীবদের প্রতি জন্য তাহারা কৃষকদের সাহায্য করিবে, শহরের মজুরদের সহিত মিতালি করিতে ও গ্রামের গরীবদের পক্ষে সত্যসত্যই পাড়াইতে কে কে চায়, কৃষক সমিতিগুলি তাহাও কৃষকদের বুঝিতে সাহায্য করিবে। কৃষকদের নিজেদের পায়ে দাড়াইতে ও নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে লইতে সুদূর গ্রামাঞ্চলে কৃষক সমিতিগুলিই হইবে প্রথম ধাপ। সেই জন্যই সােস্যাল ডেমােক্রাটিক মজুররা কৃষকদের সাবধান করিয়া দেয়- সম্রাদের কোন সমিতি বা সরকারী কোন কমিশনের উপর কৃষকরা যেন কোন আ না রাখে, সমস্ত জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদ দাবি করিতে হইবে, কৃষক সমিতি প্রতিষ্ঠার দাবি করিতে হইবে, সমস্ত রকমের বই ও কাগজ বাহির করিবার পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করিতে হইবে। যখন খবরের কাগজে, কৃষক সমিতিতে, জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদে সকলেরই নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে নিজ মত ও ইচ্ছা প্রকাশের অধিকার থাকিবে, তখন শীঘ্রই দেখা যাইবে, কাহারা মজুর শ্রেণীর পক্ষে, আর কাহারাই বা বুর্জোয়া শ্রেণীর দলে। আজ অধিকাংশ লােকই এই সব ব্যাপারে আদৌ মাথা ঘামায় না, অনেকেই নিজে দের প্রকৃত মত গােপন রাখে, অনেকে এখনও নিজেদের মন জানে , কেহ কেহ ইচ্ছা করিয়াই মিথ্যা কথা বলে। কিন্তু যখন এই সম্বন্ধে সকলেই ভাবিতে শুরু করিবে, তখন কোন কিছুই ঢাকিবার প্রয়ােজন পড়িবে না, সব কিছুই শীঘ্রই পরিষ্কার হইয়া উঠিবে। আমরা আগেই বলিয়াছি বুর্জোয়ারা ধনী কৃষকদের নিজেদের পক্ষে টানিবে। যত শী এবং যত পরিপূর্ণভাবে আমরা কৃষক দাসত্ব কৃষকদে জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে? চাইতে পারি, তত শীঘ্রই কৃষকরা নিজেদের জন্য এটি স্বাধীনতা পাইতে পারিবে, তত শীঘ্রই গ্রামের গরীবরা নিজেদের ভিতর একত্র হইবে এবং তত শীঘ্রই ধনী কৃষকরা অবশিষ্ট বুর্জোয়াদের সহিত মিশিৰে। তাহারা এক হউক, হাতে আমরা ভয় পাই না, যদিও আমরা ভালােভাবেই জানি এই একতার ফলে ধনী কৃষকরা আরও শক্তিশালী হইবে। কিন্তু আমরাও এক ইব, আমাদের একত, শহরের মজুরদের সঙ্গে গ্রামের গরীবদের একতা অনেক বেশী বিস্তৃত হইবে, ইহা হইবে কযেক লাখের বিরুদ্ধে কোটি কোটির একতা। আমরা জানি, বুর্জোয়ারা মধ্যবিত্ত কৃষক, এমন কি গরীব কৃষকদের পর্যন্তও দলে টানিবার চেষ্টা করিবে (এখনই চেষ্টা করি- তেছে!), বুর্জোয়ারা তাহাদের ঠকাইতে চেষ্টা করিবে লােভ দেখাইবে, তাহাদের ধনীর কোঠায় তুলিবার আশা দিয়া তাহাদের মধ্যে ভাঙন ধরাইতে চেষ্টা করিবে। মধ্যবিত্ত কৃষকদের দলে টানি বার জন্য বুর্জোয়ার কৌশল ও বঞ্চনা আমরা দেখিয়াছি। তাই, আগে হইতেই গ্রামের গরীবদের হুশিয়ার করিয়া দিতে হইবে, এবং সমস্ত বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে শহরের মজুরদের সঙ্গে বিশেষ বন্ধুত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করিতে হইবে। প্রত্যেক গ্রামবাসী চারিদিকে ভালাে করিয়া নজর দিক। সান্ত- দের বিরুদ্ধে, জমিদারদের বিরুদ্ধে ধনী কৃষকদের কত কথা বলিতে শােনা যায়। জনসাধারণ যে-জুলুম ভােগ কমে, সে-সম্বন্ধে তাহার কত অভিযােগই না করে। জমিদারের পতিত জমি সম্বন্ধেও তাহারা কত কথা বলে। কৃষকরা যদি জমি পায়, তাহা হইলে কি চমৎকার হয়, এই সম্বন্ধে তাহারা খােলাখুলি আলােচনা করিতে কতই না আগ্রহণীল। ধনীদের কথা কি আমরা বিশ্বাস করিতে পারি? না, পারি
গ্রামের গরীবদের প্রতি
। তাহারা সাধারণের জন্য জমি চায় না, নিজেদের জন্যই চায়।
তাহারা পূবে ও ইজারাতে অনেক জমি দখল করিযাছে, তবুও
তাহারা সন্তুষ্ট নয়। এতে দেখা যায় যে, জমিদারদের
বিরুদ্ধে খুনীদের সঙ্গে বেশী দূর গ্রামের গরীবদের যাওয়া
চলিবে না। তাহাদের সঙ্গে শুধু প্রথম কয়েক পাই যাওয়া
চলিবে, তাহার পরে তাহারা ভিন্ন পথ ধরিবে।
এই সমস্ত হইতেই বুঝা যায়, এই প্রথম ধাপের সনে
পরের ধাপগুলি ও আমাদের শেষ এবং সব চেয়ে জরুরী
বাপের কেন আমরা খুব পরিষ্কার পার্থক্য টানি। গ্রামে
প্রথম ধাপ হইবে কৃষকদের পরিপূর্ণ মুক্তি, তাহাদের পূর্ণ অধিকার
লাভ, ওট্রেজকি’ ফিরিয়া পাওয়ার জন্য কৃষক সমিতি গঠন। কিন্তু
আমাদের শেষ ধাপ গ্রামে ও শহরে সর্বত্র একই রকম হইবে।
আমরা জমিদার ও বুর্জোয়ার নিকট হইতে সমস্ত জমি ও
কারখানা কাড়িয়া লইব এবং সােশ্যালিস্ট, সমাজ প্রতিষ্ঠা
করিব। প্রথম ধাপ ও শেষ ধাপের মধ্যে অনেক লড়াই চলিবে,
এবং যাহারা প্রথম ধাপ ও শেষ থাপের পার্থক্য বুঝিতে
গােলমাল করে তাহারা লড়াই-এর পথে বাধা দেয়
ও না বুঝিয়া গ্রামের গরীবদের ঠকাইতেই সাহায্য
সমস্ত কৃষকের সঙ্গে একযােগে গ্রামের গরীবর প্রথম ধাপ
চলিবে কিছু কুলাক (ধনী কৃষক) হয়তো দলে ভিড়িবে না।
হয়তাে শতকরা একজন কৃষক কোন-না-কোন আকারেই দাসত্ব
ভােগ করে না। কিন্তু কৃষকসাধারণ এক হইয়াই আগাইতে থাকিবে,
কারণ সমস্ত কৃষকই সমান অধিকার চায়। জমিদারের দাসকে
সকলেরই হাত পা বাধা। কিন্তু সমস্ত কৃষক মিলিয়া কখনই শেষ
কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে ? কাপ পর্যন্ত আগাইবে না। সমস্ত ধনী কৃষক মজুরদের বিরুদ্ধে দাড়াইবে। তখন গ্রামের গরীব ও শহরের সােখাল ডেমােক্রাটিক মজুরদের ভিতর দৃঢ় একতার দরকার হইবে। যাহারা কৃষকদের বলে যে, তাহারা একেবারেই প্রথম ও শেষ ধাপ শেষ করিতে পারে, তাহারা কৃষকদের ঠায়। ককদের নিজেদের ভিতর বিরাট লড়াই, গ্রামের গরীব ও ধনী কৃষকদের মধ্যেকার বিরাট লড়াই-এর কথা তাহারা ভুলিয়া যায়। তাই, সােগাল-ডেমোেক্রটিরা কৃষকদের এই আশা দেয় না যে, দেশে এখনই সুখশান্তি উপচাইয়া পড়িবে। তাই, সােখাল-ডেমােজাট প্রথমে লড়াই-এর পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে, সমস্ত বুর্জোযার বিরুদ্ধে মজুর শ্রেণীর বিরাট গণসংগ্রাম চালাইবার স্বাধীনতা চায়। তাই, সােল ডেমােকাটা ঐ অথচ নিশ্চিত প্রথম ধাপের জন্য পরামর্শ দেয়। অনেক লোেক মনে করে, দাসত্ব খর্ব করা ও ওট্রেজ কি ফিরিয়া পাইবার জ কৃষক সমিতি গঠন করার দাবি এক রকম প্রাচীর বা বাধা বরূপ, যেন আমরা চলিতে চাই, এই পৰ্যন্তই শেষ, ইহার বেশী আর আগাইব না। সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা কি বলে সে সম্বন্ধে তাহা ভাল করিয়া চিন্তা করে না। ওট্রেজকি ফিরিয়া পাইবার ও দাসত্বের বাঁধন আগা করিবার জন্য কৃষক সমিতি গঠনের দাবি বাধা নয়। বরং ইহা আগা- ইবার দরজা। আরও বেশ দুর আগাইতে হইলে, শেষ লক্ষ্যের জন্য বড় ও খােলা পথ ধরিতে হইলে, কুশিয়ার সমস্ত অমরত জনসাধারণের পরিপূর্ণ মুক্তি পাইতে হইলে এই দরজার ভিতর দিযা আমাদের যাইতে হইবে। এই দরজার ভিতর দিয়া না গেলে কৃষকরা দাস ও মুখ থাকিবে, অধিকার এবং প্রকৃত ও পূর্ণ স্বাধীনতার আস্বাদ পাইবে নাগজুরের কে শ, কে মিত্র তাহাও নিজের বুঝিতে পারিবে না। সেই জন্যই সােশ্যাল ডেমােক্রাটরা এই দরজার দিকে নির্দেশ দেয় এবং বলে, সমস্ত কৃষক, সমস্ত জনসাধারণের প্রথম কাজ এই দরজায় ঘা দেওয়া এবং সম্পূর্ণভাবে গ্রামের গরীবদের প্রতি এই দরজা ভাঙ্গিয়া ফেলা। কিন্তু অনেক লােক আছে যাহারা নিজেদের “নারােনিকি” ও “সােশ্যালিস্ট রিভলিউশনারী” বলে, তাহারাও কৃষরে মণ চায়, তাহারাও হাত পা ছুড়িয়া হল্লা করে ও তাহারা কৃষকদের সাহায্য করিতে চায়। কিন্তু তাহারা এই দরজাটি দেখিতে পায় না। এই সব লােক এমন যে তাহারা একথাও বলে যে, ইচ্ছামত জমি হস্তান্তর করিবার মত কৃষকদের দেওয়ার প্রয়ােজন নাই ! তাহারা কৃষকদের মঙ্গল চায় বটে, কিন্তু ঠিক দাসদের মালিকের মতই তাহারা যুক্তি দেয়। এই সব বন্ধুরা বিশেষ কাজে আসে না। যে-প্রথম অর্গল ভাঙ্গিয়া ফেলিতে হইবে তাহাই যদি দেখিতে না পাইল, তাহা হইলে কৃষকদের জন্য দুনিয়ায় সব কিছু ভালাে চাহিবার মূল্য কি? শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও শুধু জমিদারের বিরুদ্ধেই ন, গ্রাম্যসমাজে, মিরের ভিতর ধনী কৃষকদের বিয়েও সােশ্যালিজমের জন্য মুক্ত জনসাধারণের লড়াই-এ পথই যদি দেখিতে না পাও, তাহা হইলে সােশ্যালিজম চাওয়ার মূল্য কি? তাই তাে সােশ্যাল ডেমােক্র্যাটরা এই প্রথম ও সবচেয়ে কাছের দরজার উপর এত জোর দেয়। এ ক্ষেত্রে সদিচ্ছা প্রকাশ কঠিন নয়। জন- সাধারণকে ঠিক পথ দেখান, কেমন করিয়া প্রথম ধাপে নেওয়ালা ৰায় জনসাধারণকে তাই পরিষ্কার করিযা বুঝাইয়া দেওয়া, ইহাই হইতেছে কঠিন কাজ। কৃষকরা যে দাসত্বের চাপে নিষ্পেষিত হইতেছে, তাহারা যে আজও অৰ্ধাস, এ সম্বন্ধে গত ৪০ বৎসর ধরিয়া কৃষকের অনেক বা অনেক কথাই বলিয়াছে, অনেক পুস্তকই লিখিয়াছে। কশিয়ায় সােশ্যাল-ডেমােজাটদের জন্মের অনেক আগেই কৃষক বন্ধুরা ডজনে ডানে বই লিখিয়াছে। এগুলিতে তাহারা দেখাইয়াছে ‘ওট্রেজ কি’য় যারা জমিদাররা কেমন করিযা কৃষকদের লুঠ করিয়াছে ও দাসে পরিণত করিয়াছে। সমস্ত সৎ লােকই আজ বুঝিতে পারে যে এখনই, অবিলম্বে কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে? কৃষককে সাহায্য দেওয়া, এই দাসত্বের হাত হইতে অন্তত কিছু রেহাই দেওয়া দরকার, পুলিস চালিত গভমেন্টের কর্মচারীরাও ইহা আলােচনা করিতে শুরু করিয়াছে। এখন প্রশ্ন হইতেছে, ইহার জন্য কি করা যায়, প্রথম ধাপকি হইবে, কোনটা প্রথম দরজা, যাহা ভাজিয়া ফেলিতে হইবে। অনেক লােক ( যাহারা কৃষকের মঙ্গল চাষ ) এই প্রশ্নের দুই রকমের উত্তর দেয়। প্রত্যেক গ্রাম্য সৰ্বহারাকে এই দুইটি উত্তর বুঝিবার চেষ্টা করিতে হইবে এবং এ-সম্বন্ধে পরিষ্কার মত গঠন করিতে হইবে। নারােনিকি ও “শােস্যালিস্ট রিভলিউশনারীরা” এই প্রশ্নের উত্তর একভাবে দেয়। তাহারা বলে, প্রথম কাজ হইতেছে কৃষকদের ভিতর নানা রকম সমিতি (সমবায় সমিতি) গঠন করা। ‘মির’কে শক্তিশালী করিতে হইবে, ব্যক্তিগত কৃষককে স্বাধীনভাবে নিজ জমি হস্তান্তর করিবার অধিকার দেওয়া হইবে না। গ্রাম্য সমাজ” অর্থাৎ ‘মিরের অধিকার আরও বাড়ানো হউক এবং ক্রমশ রুশিয়ার সমস্ত জমি সামাজিক জমিতে পরিণত করা হউক। কৃষকদের জমি কিনিবার সমস্ত সুবিধা দিতে হইবে, যাহাতে জমি খুব সহজে পুজিদারদের হাত হইতে মজুরের হাতে যাইতে পারে। সােগাল-ডেমােক্রাটদের উত্তর অন্য রকম। সম্রা ও ব্যবসাদারদের যে-সব অধিকার আছে, কৃষকদের নিজেদের জন্য সবার আগে সেই সব অধিকার পাইতে হইবে। স্বাধীনভাবে নিজ জমি হস্তান্তর করিবার অধিকার কৃষকদের পাইতে হইবে। ওট্রেজকি’ ফিরিয়া পাইবার এ এবং অত্যন্ত জন্য রকমের দাসত্ব ঘুচাইবার জন্য কৃষক সমিতি গঠন করিতে হইবে। আমরা মির’-এর একতা চাই না, আমরা চাই সমস্ত শিয়াব্যাপী গ্রাম্য সমাজর ভিতর সমস্ত গ্রামের গরীবদের একতা , আমরা চাই গ্রাম্য সর্বহারাদের সঙ্গে শহরের সর্বহারাদের একতা। সমবায় সমিতি এবং সামাজিকভাবে জমি কেনা সব সময়ই ধনী কৃষকদের পক্ষে লাভজনক ।
গ্রামের গরীবদের প্রতি হইবে, এবং সর্বদাই মধ্যবিত্ত কৃষকদের চোখে ধূলি দিতে সাহায্য করিবে। রুশ গভর্নমেন্ট মনে করে, কৃষকদের কিছু সুবিধা দেওয়া দরকার। কিন্তু সব চাইতে কম করিয়া সে কাজ সারিতে চায় সরকার চায়, কর্মচারীরাই সব কিছু করুক। কৃষকদের হুশিয়ার থাকিতে হইবে, কারণ, সম্রান্তদের সমিতিগুলি কৃষকদের যেমন ঠকাইত, সরকারী কর্মচারীর কমিশনও তাহাদের ঠিক তেমনি খারাবভাবেই ঠকাইবে। কৃষকদের দাবি করিতে হইবে, স্বাধীনভাবে নির্বাচিত কৃষক কমিটি গঠন করা হউক। দরকারী কথা হইতেছে যে, সুবিধার জন্য সরকারী কর্মচারীদের আশায় থাকিলে চলিবে না-কৃষকদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে লইতে হইবে। আমরা যদি প্রথমে শুধু একটা ধাপও আগাইতে পারি, আমরা যদি প্রথমে শুধু দাসত্বের হীনতম রূপগুলিও উচ্ছেদ করি—তাহা হইলে কৃষকরা অন্তত নিজেদের ক্ষমতা বুঝিতে পারিবে, স্বাধীনভাবে পরস্পরের ভিতর বুঝাপড়ায় আসিতে পারিবে ও একত্র হইতে পারিবে। কোন সৎলােকই অস্বীকার করিতে পারে না যে ওট্রেজকির সাহায্যে প্রায়ই কৃষককে দাস অবস্থায় রাখা হয়। কোন সৎলােকই অস্বীকার করিতে পারিবে না যে, আমাদের দাবি প্রাথমিক এবং সবচেয়ে ন্যায্য দাবি . ফিউদাল দাসত্বের উচ্ছেদের জন্য সরকারী কর্মচারীদের বাদ দিয়া কৃষকদের স্বাধীনভাবে নির্বাচিত তাহাদের নিজ কমিটি গঠন করিতে দেওয়া হউক। বাধীন কৃষক কমিটিতে (এবং সমস্ত কুশিয়ায় স্বাধীন প্রতিনিধি পরিষদে), শহরের সর্বহারাদের সঙ্গে গ্রামের সর্বহারাদের বিশেষ বন্ধ সুদৃঢ় করিতে সােগাল-ডেমােক্রটরা একেবারে গােড়া হইতেই সব রকম চেষ্টা করিবে। গ্রাম্য সর্বহারাদের সুবিধাজনক সমস্ত পন্থাই সােখাল ডেমােজাট সমর্থন করিবে এবং যত শীঘ্র ও ঐক্যবদ্ধভাবে সম্ভব প্রথম ধাপে অগ্রসর হইতে তাহাদের সাহায্য করিবে—ইহার দ্বিতীয় ধাপ, তৃতীয় থাপ ও এইভাবে যতদিন পর্যন্ত না শেষ লক্ষ্যে পৌছানাে যায়—যতদিন কৃষকদের জয় কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে ? পৰ্যন্ত না মদের গরিপুর্ণ আয় হয় ততদিন তাহাদের সমস্ত উপযুক্ত পন্থা গ্রহণে সাহায্য করিবে। কিন্তু আজই কি আমরা বলিতে পারি, কাল দ্বিতীয় ধাপে কি কি দাবি উঠিবে? না, আমরা তা পারি না, কারণ, আমরা জানি না ধনী কৃষকদের ব্যবহার কিরূপ হইবে। অনেক শিক্ষিত লােক, যাহারা সমবায় সমিতি সম্বন্ধে ও পুজিদারের হাত হইতে মজুরের হাতে জমি চলিয়া যাওয়া সম্বন্ধে চিন্তা করে তাহাদের ব্যবহারই বা কিরূপ হইবে, তাহাও আমরা জানি না। হতে তাহারা প্রথম ধাপের পরেই জমিদারদের সঙ্গে হাত মিলাইবে না, হয়তো তাহারা জমিদারের শাসন পরিপূর্ণভাবেই উচ্ছেদ করিতে চাহিবে। বেশ ভাল কথা! এই রকম ঘটুক, তাহা সোশ্যাল-ডেমােক্রাটা খুবই চায়। তাহারা শহর ও গ্রামের সর্বহারাদের পরামর্শ দিবে তাহারা যেন দাবী করে যে, জমিদারদের নিকট হইতে সমস্ত জমি কাড়িয়া লইয়া জনসাধারণের বাধীন রাষ্ট্রের হাতে দেওযা হউক। সােস্যাল-ডেমােক্রাটরা দেখিবে, যেন ইহার ভিতর দিয়া গ্রামের সর্বহারা ঠকিনা যায়, যেন হারা সর্বহারার পরিপূর্ণ মুক্তির জন্য শেষ লড়াই-এর জন্য তাহাঙ্গর শক্তি সুদৃঢ় করিতে পারে। কি অবস্থা ভিন্ন রকমের মােড় নিতে পারে , আসলে ভিন্নভাবে মােড় নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সবচেয়ে জঘন্য রকমের দাসত্বের বাঁধন আগা হওয়ার ঠিক পরের মুহূর্ত হইতেই ধনী কৃষক এবং অনেক শিক্ষিত লােক জমিদারদের সঙ্গে এক হইয়া যাইতে পারে এবং তখন সমস্ত গ্রাম্য সর্বহারার বিরুদ্ধে দাড়াইৰে সমস্ত গ্রাম্য বুর্জোয়া। সেই ক্ষেত্রে শুধু জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাইয়া যাওয়া হাস্যকর মাত্র। তখন সমস্ত বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই করিতে হইবে। তাই, আমাদের প্রথম কৰি হইৰে । এই লড়াই-এর জয় যথাসম্ভব বেশী স্বাধীনতা ও বেশী সুবিধা, এই লড়াই সহজ করিবার জন্য মজুরদের অবস্থার উন্নতি সাধন।
গ্রামের গরীবদের প্রতি যাহাই হউক, অবস্থার মােড় যে দিকেই ঘুরুক না কেন, আমাদের প্রথম, প্রধান ও অপরিহার্য কর্তব্য হইতেছে, গ্রামের সর্বহারা ও অসর্বহারা এবং শহরের সর্বহারাদের মধ্যে বন্ধু সুদৃঢ় করা। ইার জন্য আমাদের এখনই, অবিলম্বে, জনসাধারণের জন্য অবাধ রাজনৈতিক স্বাধীনতা, কৃষকদের জন্য পূর্ণ সমান অধিকার ও ফিউদাল দাসত্বের উচ্ছেদ চাই। যখন এই বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত ও সুদৃঢ় হইবে, তখন মধ্যবিত্ত কৃষকদের দলে টানিবার জন্য বুর্জোয়ারা যে-সব চলজুয়াচুরির আশ্রয় নেয় তাহার স্বরূপ প্রকাশ করা আমাদের পক্ষে সহজ হইবে। সমস্ত বুর্জোযার বিরুদ্ধে, সরকারের সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে তখন আমরা সহজে ও অবিলম্বে দ্বিতীয় তৃতীয় এবং শেষ ধাপে অগ্রসর হইতে পারিব। সােজা জযলাভের দিকে আগাইয়া যাইতে পারিব এবং শীঘ্রই সমস্ত মজুর সাধারণ পরিপুর্ণ মুক্তি লাভ করিবে। (৭) গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী-সপ্রাম, শ্ৰেণী-সংগ্রাম কি? মানুষের একটি অংশের সঙ্গে আর একটি অংশের লড়াই, সমস্ত সুবিধা যাহাদের হাতে সেই নিপীড়ক ও পরগাছাদের বিরুদ্ধে সমস্ত ভােটাধিকারহীন, নিপীড়িত মজুর জনসাধারণের লড়াই, সম্পত্তির মালিক বা বুর্জোযাদের বিরুদ্ধে মজুরসাধারণ বা সর্বহারাদের লড়াই। কুশিয়ার গ্রামে গ্রামে বরাবর এই বিরাট লড়াই চলিয়াছে, আজও চলিতেছে, যদিও সবাই ইহার কথা টের পায় না, ইহার তাৎপৰ্যও বুঝে না। ভূমিদাসপ্রথার আমলে সমস্ত কৃষক তাহাদের নিপীড়ক জমিদারশ্রেণীর বিরুদ্ধে, আর এই জমিদারদের সমর্থক ও রক্ষক জারের গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধে লড়িয়াছে। সেদিন কৃষকরা একত্র হইতে পারে নাই, অজ্ঞতায় তাহারা সম্পূর্ণভাবে ডুবিয়াছিল। সেদিন তাহাদের ভাই-এর কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে? মত টানিয়া লইবার ও সাহায্য কবির জন্য শহরের মজুর ছিল না তবু তাহারা সাধ্যমত লড়িয়াছিল। সরকাবের নিষ্ঠুর নির্যাতনে তাহারা ভয় পায় নাই, ফাসি ও বন্দুকের গুলিকে তাহারা ভয় করে নাই। যে- পুরােহিতরা প্রাণপণে বুঝাইতে চেষ্টা করিত যে দাসপ্রথা বাইবেল কর্তৃক অনুমােদিত ও ভগবানের পবিত্র নির্দেশ সম্মত (মেট্রোপলিটান ফিলারেট ঠিক এই কথাই বলিযাছিল কৃষকরা তাহাদের কথা বিশ্বাস করে নাই। কৃষকরা আজ এক স্থানে, কাল এক স্থানে বিদ্রোহ করিযাছিল, এবং শেষ পর্যন্ত সরকার নত হইতে বাধ্য হইল , কারণ ভয় ছিল পাছে সমস্ত কৃষকের ব্যাপক বিদ্রোহ শুরু হয়। দাসপ্রথার শেষ হইল, কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবে নয়। কৃষকরা ভােটাধিকার হীন রহিয়া গেল। তাহারা বহিয়া গেল নিকৃষ্ট, মাথাপিছু ট্যাক্সদাতা ‘কালাে সম্প্রদায়। ফিউদাল দাসত্বের মুঠির ভিতর হইতে তাহারা বাহির হইল না। কৃষকদের ভিতর অসন্তোষ থাকিয়া গেল। তাহারা পরিপূর্ণ ও প্রকৃত স্বাধীনতার জন্ত চেষ্টা করিতে লাগিল। ইতিমধ্যে এক নূতন শ্রেণী-সংগ্রাম দেখা দিল, বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সবহারার সংগ্রাম। ধন-দৌলত বাড়িতে লাগিল, অনেক রেল ও কলকারখানা তৈরি হইতে লাগিল, শহরে অনেক লােক বাড়িল, ঐশ্বৰ্য্য বাড়িল, কিন্তু এই সব ধন-দৌলত হাত করিল মুষ্টিমেয় লােক। আর, জনসাধারণ আরও গরীব ইতে লাগিল। অনাহার ও দুঃখ-কষ্ট বাডিযা চলিল। তাহাদের ঘরবাড়ী ছাড়িয়া.বিদেশে বিভূঁইয়ে অচেনা লােকের জন্য মজুরি খাটিতে যাইতে হইল। সমস্ত ধনীর বিরুদ্ধে সমন্ত গরীবের এক বিরাট সংগ্রাম শহরের মজুররা শুরু করিল। এক সােল জেমােক্রটিক পার্টি গঠন করিবার জন্য শহরের মজুররা একত্র হইল। ধাপে ধাপে আগাইয়া, বিরাট শেষ লড়াইয়ে, সমস্ত জনসাধারণের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি লইয়া তাহারা সুদৃঢ় ভাবে একজোট হইয়া লড়াই চালাইবার জন্য পাটি গড়িল।
গ্রামের গরীবদের প্রতি শেষকালে কৃষকদেরও ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিল। গত বৎস, ১৯০২ সালের বসন্তকালে, পােটাভ, খারভ ও অন্যান্য প্রদেশের কৃষকরা জমিদারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করিল। তাহাদের শখের গােলা তাতিয়া তাহাতে ঢুকিয়া পড়ি, নিজেদের মধ্যে শস্য ভাগ-বাটোয়ারা করিয়া নিল। যে-সকল শষ্ণ কৃষকরাই বুনিয়াছিল, কৃষকরাই কাটিয়াছিল, কিন্তু লুই করিযাছিল জমিদারেরা, সেই শস্য তাহারা ক্ষুধিতদের বিলাইয়া দিল। তাহারা নূন করিযা জমি বিলির দাবি করিল। এই সীমাহীন জুলুম আর কৃষকরা সহিতে পারিল না। তাহারা অন্যভাবে বাঁচিবার দাবি করিল। কৃষকরা স্থির করিল-ইহাতে তাহার ভুল করে নাই যে বিনা লড়াই-এ খাটিয়া মরার চেয়ে জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া মরা ভালাে। কিন্তু তাহাদের কপাল ফিরিল না। জারের সরকার তাহাদের সাধারণ সাঙ্গাকারী ও ডাকাত বলিয়া ঘােষণা করিল (যে-শস্য কৃষকরা নিজেরাই বুনিয়াছে ও কাটিয়াছে, তাহাই ডাকাত জমিদারের কাছ হইতে লইবার অপরাধে ! শত্রুর বিরুদ্ধে যেমন ফৌজ পাঠানাে হয় তাহাদের বিরুদ্ধেও তেমনি ফৌজ পাঠাইয়া তাহাদের হারানাে হইল। কৃষকদের গুলি করা হইল। বহু কৃষক মরিল। অনেককে নিষ্ঠুরভাবে চাবুক মারা হইল, তাহাতেও অনেক মরিল। তুর্কীরা তাহাদের শত্রু খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যে-অত্যাচার করিয়াছিল তাহার চাইতেও নিষ্ঠুর অত্যাচার ইহাদের উপর চলিল। জারের প্রতিনিধি গভর্নররা ছিল জঘন্য অত্যাচারী, পেশাদার অত্যাচারী। কৃষকদের স্ত্রী-কন্যাদের ফৌজের লােকের বেইত করিল। তার উপরে, এই সব কৃষকদের সরকারী কর্মচারীদের কোর্টে বিচার করা হইল, জমিদারদের ৭ লাখ ফু দিতে কৃষকরা বাধ্য হইল। এই কলঙ্ক ময় গুপ্ত বিচারে, অত্যাচার কুঠরির এই বিচারে, কারের প্রতিনিধি গভর্ণর ওবােলেখি এবং জাৱে কৰ্মচারীয় কৃষকদের উপর কোন বন ও কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে। অত্যাচার করিয়াছে, তাহা বলিবার জয় উকিল দিবার হুকুমও দেওয়া হইল না। কৃষকরা খায্য কারণেই লড়িয়াছিল। জারের কর্মচারীরা যাহাদের চাবুকের আঘাতে ও গুলি করিয়া হত্যা করিয়াছিল, রুশিয়ার মজুর শ্ৰেণীয় সেই সব শহীদদের স্মৃতিকে সর্বদাই সম্মান করিবে। এই শহীদরা এমরত জনসাধারণের স্বাধীনতা ও মুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই লড়াই করিয়াছিল। করা পরাজিত হইয়াছে সত্য, কিন্তু তাহারা বারবার বিদ্রোহ করিবে, এই প্রথম পরাজয়ে তাহারা ঘাবড়াইবে না। শ্ৰেণীসচেতন মজুররা কৃষকদের এই লড়াই-এর কথা শহর ও গ্রামের যথাসম্ভব বেশী সংখ্যক এমরত জনসাধারণের কাছে প্রচার করিতে সব রকম চেষ্টা করিবে এবং আরও সাফল্যজনক লড়াই-এর জন্য প্রস্তুত হইবে। ১৯০২ সালের এখন কৃষক বিজােহ কেন মন করা সম্ভব হল; সারের কর্মচারীদের অয়লাভ নয়, কৃষক ও মজুরের জয়লাভ করিতে ইলে কি করা দরকার, ইহা পরিষ্কার বুঝিতে শ্ৰেণীসচেতন মরা প্রাণপণে ককদের সাহায্য করিবে। কৃষক-বিক্রোহ দমন করা হইল, কারণ, ইহা ছিল অজ্ঞ ও বুদ্ধিহীন জন- সাধারণের বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে কোন রাজনৈতিক দাবি তােলা হয় নাই, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামাে পরিবর্তনের কোনদাবি দেওয়া হয় নাই। কৃষক বিদ্রোহ দমন করা গিয়াছিল কারণ, আগে বইতে ইহার অন্ত কোন আয়ােজন করা হয় নাই, কারণ, গ্রামের মজুররা তখনও শহরের মজুমদের সালে একতাব হয় নাই। কৃষকদের প্রথম লড়াই-এ পরাজয়ের এই তিনটিই কারণ। বিদ্রোহ সফল করিতে হইলে চাই সুস্পষ্ট উলে, আগে হইতে আরােজন, গােটা শিয়ায় বিক্রেহের ব্যাপ্তি ও শহরের মজুরদের সঙ্গে একযােগে সংগঠন। শহরের মজুরদের লড়াই-এ অগ্রগতির প্রতিটি মাপ, প্রত্যেকটি সােশ্যাল ডেমোেক্রটিক বই ও খবরের কাগজ ।
১৮ গ্রামের গরীবদের প্রতি গ্রামের সর্বহারাদের কাছে শ্ৰেণ-সচেতন মজুরের প্রতিটি বক্তৃতা সেই দিন ঘনাইয়া আনিবে, যে-দিন আবার বিদ্রোহ দেখা দিবে এবং জলাভও হইবে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই কৃষকরা বিদ্রোহ করিয়াছিল, কারণ দুঃখ কষ্ট- তাহারা আর সহিতে পারিতেছিল না, কারণ লড়াই ছাড়া নির্বাক পর মত তাহারা মরিতে অস্বীকার করিয়াছিল। কৃষকরা এত লুঠন, অত্যা চার ও জুলুম ভােগ করিযাছে যে, মুহূর্তের জন্যও অন্তত তাহারা জনরবে টিত জারের দয়ার কথা বিশ্বাস না করিয়া পরিল না। তাহারা না ভাবিয়া পারে নাই যে, প্রত্যেক বিবেচ্য লােকই ই ধ্যায্য মনে করিবে যে ক্ষুধিত জনসাধারণের ভিতর শস্য বিলি করা হউক। শত বিলি করা হউক তাহাদের মধ্যে, অন্যের জন্য যাহারা আজীবন খাটিয়াছে, যাহারা ফসল বুনিয়াছে, কাটিয়াছে, অথচ যাহারা অনাহারে মরিতেছে, আর, “সম্রান্তদের” গােলাষ ফসল উপচাইয়া পড়িতেছে। মনে হয় কৃষকরা ভূলিয়া গিয়াছিল যে, সম্পত্তির মালিকদের জন্য খাটাইবার উদ্দেতে জন- সাধারণকে অনাহারের মুখে ঠেলি দিয়া ভালাে ভালােজমি, কল-কারখানা ধনী, জমিদার ও বুর্জোয়ারা গ্রাস করিযা নিয়াছে, কৃষকরা ভুলিয়া গিযাছিল যে ধনীদের শুধু পুরােহিতের শাস্ত্র-বচনই রক্ষা করে না, জায়- সরকারের অগণিত আমলা ও কৌজও তাহাদের রক্ষা করে। জা-সরকার কৃষকদের এই সব কথাই স্মরণ করাইয়া দিয়াছিল। জার-সরকার নির্মমভাবে কৃষকদের দেখাইয়া দিয়াছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতা কি, ইহা কাহারই বা চাকর ও রক্ষাকর্তা। আমরা বার বার কৃষকদের এই শিক্ষা স্মরণ করাইয়া দিব, তখন তাহারা সহজেই বুঝিতে পারিবে রাষ্ট্রের গঠন পরিবর্তন করা কেন দরকার এবং কেনই বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা সরকার। কৃষক-বিদ্রোহের লক্ষ্য তখনই সুস্পষ্ট হইবে যখন বেশী বেশী লােক এই সব বুঝিতে পারিবে, যখন লিখিতে পড়িতে ও নিজের কথা কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে ? ভাবিতে সক্ষম প্রত্যেকটি কৃষক এই তিনটি প্রধান দাবিরসহিত পরিচিত হইবে, যে-দাবিগুলির জন্য একবার প্রথমেই লড়াই করা দরকার। প্রথম দাবি হইতেছে, বর্তমান স্বেচ্ছাচারী গভমেন্টের পরিবর্তে শি- মার প্রিয় প্রতিনিধিমুলক গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠার জন্য একটি জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদ ডাকা হউক। দ্বিতীয় দাবি হইতেছে, যে-কোন বই বা খবরের কাগজ ইচ্ছামত বাহির করিবার অধিকার প্রত্যেকের থাকিবে। তৃতীষ দাবি হইতেছে, অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে কৃষকদের সম্পূর্ণ সমান অধিকার আইনত স্বীকার করা হউক এবং সমস্ত রকম ফিউদাস দাসত্ব উচ্ছেদ করিবার মুল উদ্দেশ্য লইয়া নির্বাচিত কৃষক কমিটি গড়া হউক। এইগুলিই হইল সােস্যাল ডেমােক্রাটদের মূল ও প্রধান দাবি। এইগুলি বুঝিতে জনসাধারণের স্বাধীনতার লড়াই-এ প্রথমে কি শুরু করিতে হইবে তাহা বুঝিতে কৃষকের কষ্ট হইবে না। কৃষকেরা যখন এই দাবি গুলি বুঝিতে পারিবে, তখন কৃষকরা ইহাও বুঝিতে পারিবে যে আগে হইতে অনেক দিন ধরিয়া দৃঢ়ভাবে একটানা কাজের ভিতর দিয়াই এই লড়াই-এর জন্য আযােজন করিতে হইবে এবং এই সব আযােজন আলাদাভাবে করা যায় না, শহরের সােখাল ডেমােক্রাটিক মজুরদের সঙ্গে একযােগেই করিতে হইবে। প্রত্যেক শ্ৰেণী-সচেতন কৃষক ও মজুরকে তাহার চারিদিকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, বিশ্বাসী ও নির্ভীক কমরেডদের একত্র করিতে হইবে। তাহাদের বুঝাইতে হইবে সােস্যাল ডেমােক্রাটরা কি চায়, যাহাতে তাহারা প্রত্যকে বুঝিতে পারে লড়াই-এর রূপটা কি এবং কি কি দাবিই বা তুলিতে হইবে। শ্ৰেণী-সচেতন সােস্যাল ডেমােক্রাট ধীরে ধীরে, সাবধানে, কিন্তু দ্বিধাহীন ভাবে সােশ্যাল ডেমোেক্রসির মতবাদ কৃষকদের শিখাইতে থাকুক, তাহাদের সােখাল ডেমােক্রাটদের বই পড়িতে দিক ও বিশ্বাসী লোেকদের ১০০ গ্রামের গরীবদের প্রতি ছােট ছােট বৈঠকে এই সব বই বুঝাইযা দিক। কিন্তু সােশ্যাল ডেমােজাসির মতবাদ শুধু বই হইতেই শেখা যায় না । জুলুম ও অন্যায়ের প্রত্যেকটি ঘটনা বাহা আমাদের সামনে ঘটে তাহার প্রত্যেকটি উদাহরণ দিই এই সব মতবাদ বুঝাইতে হইবে। সােল ডেমােক্রাসি হইতেছে সমস্ত রকমের জুলুমের বিরুদ্ধে, সমস্ত রকম লুঠ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই-এর মতবাদ। সে-ই খাটি সোশ্যাল ডেমােক্রাট, যে জুলুমের কারণ বুঝে এবং প্রত্যেকটি জুলুমের বিরুয়ে সমস্তজীবন ধরিয়া লড়াই করে। ইহা কেমন করিয়া হইতে পারে ? বেণ-সচেতন সােস্যাল ডেমােক্রটরা নিজ শহর বা গ্রামে একত্র হইয়া নিজেরাই ঠিক করিবে, সমস্ত মজুর শ্রেণীর সব চেয়ে বেশী সুবিধার জন্য কেমন করিয়া ইহা করা যাইতে পারে। কেমন করিয়া ইহা সম্ভব তাহার দুই একটি উদাহরণ দিতেছি। ধরা যাক, একজন সােখাল ডেমােক্রটিক মজুর তাহার গ্রামে বেড়াইতে আসিয়াছে, অথবা কোন সােশ্যাল ডেমাে- জাটিক মজুর যে-কোন একটা গ্রামে গিয়াছে। গ্রামটি মাকড়সার জালে আবদ্ধ মাছির মত পূর্ণপাশের জমিদারের ক্ষমতার মুঠির ভিতরে ; জমিদারদের এই দাসত্ব এড়াইবার উপায় নাই, এই দাসত্বের হাত হইতে রেহাই নাই। সােল ডেমােক্রটিক কর্মীটির কাজ হইবে সবচেয়ে বিবেচক, বুদ্ধিমান ও বিশ্বাসী কৃষকদের বাছিয়া লওয়া, যাহারা ন্যায্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় উৎসাহী, অথচ পুলিসের কুত্তাদের মুখােমুখি হইলেই যাহারা ভয় না পায়। তাহাদের এই অন্তহীন দাসত্বের কারণ কি তাহা বুঝাইতে হইবে, বলিতে হইবে সন্ত্রান্তদের সমিতির সাহায্যে জমিদাররা কেমন করিয়া কৃষকদের ঠকাইয়াছিল ও লুঠ করিয়াছিল, বলিতে হইবে, নীরা কতটা শক্তিশালী ও জায়ের সরকারই বা তাহাদের কেমন করিয়া সমর্থন করে। সােস্যাল ডেমোেক্রটিক মজুরদের দাবি সম্বন্ধেও তাহাদের বলিতে হইবে। যখন কৃষকরা এই সব বুঝিতে পারিবে তখন তাহার পরের কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে? কাজ হইবে সবাই বসিয়া জমিদারকে বাধা দেওয়ার একটা উপায় ঠিক করা, তাহাদের প্রথম এবং প্রধান দাবিগুলি পেশ করার উপায় ঠিক করা, ঠিক যেন শহরের মজুররা মালিকদের কাছে দাবি পেশ করে। যদি জমিদারের দাসদের ভিতর কয়েকটা গ্রাম থাকে বা একটা বড় গ্রাম থাকে, তবে সবচেয়ে ভালাে কাজ হইবে বিশ্বাসী লােকের সাহায্যে নিকটস্থ সােশ্যাল ডেমােক্রাটিক কমিটি হইতে একটি ইহার জোগাড় করা , ঐ ইত্যাহারে সােল ডেমােক্রাটিক কমিটি বিস্তৃতভাবে দেখাইবে, কৃষকরা কি ভাবে দাস ভােগ করে এবং তাহাদের প্রথম দাবি তৈয়ার করিবে : খাজনা কানন, শীতকালে খাটুনির জন্য মজুরদের উপযুক্ত মজুরি, কৃষকদের গৰু-ঘােড়া যদি জমিদারের জমিতে ঢুকে তাহা হইলে কৃষকদের উপর নির্মম অত্যাচার বন্ধ করা অথবা অন্যান্য উপযুক্ত দাবি। যাহারা লেখাপড়া জানে, সেই সমস্ত কৃষক এই ইস্তাহারের মারফত জানিতে পারিবে প্রকৃত সমস্যাটা কি। যাহারা পড়িতে জানে না, তাহাদের ইহা বুঝাইয়া দিতে হইবে। তখন কৃষকরা বুঝিতে পারিবে যে, সােশ্যাল ডেমােজাট তাহাদের বন্ধু এবং সােশ্যাল ডেমােক্রটরা সমস্ত লুঠের প্রতিবাদ করে। তখনই কৃষকরা বুঝিতে শুরু করিবে, যত সামান্য হউক না কেন কি কি সুবিধা এখনই পাওয়া যাইতে পারে, এবং শহরের সােশ্যাল ডেমােজাটিক মজুরদের সঙ্গে একসঙ্গে লড়াই করিয়া সমস্ত দেশের জন্য কি কি বিততর উন্নতিই বা পাইতে হইবে। তখনই কৃষকরা বড় লড়াই-এর জন্য তৈরি হইতে থাকিবে, কেমন করিয়া বিশ্বাসী লােক জোগাড় করিতে হয় এবং কেমন করিয়া তাহাদের দাবির জন্য একত্র হইতে হয় তাহাও তাহারা শিখিবে। সময়ে সময়ে তাহারা স্ট্রাইকও সংগঠন করিতে পারিবে, যেমন মজুররা করে। একথা ঠিক যে শহরের চেয়ে গ্রামে এ-কা করা কঠিন, কিন্তু ইহা অসম্ভব নয়। অন্যান্য দেশে গ্রামে ক্ষেতমজুরদের সফল স্টাইক হইয়াছে, যেমন যখন কাজের খুব ভীড়, যখন জমিদার ও ধনী ১০২ গ্রামের গরীবদের প্রতি কৃষকদের মজুর দরকার হয় খুব বেশী সেই সময়ে যদি গ্রামের গরীব স্টাইকের জন্য প্রস্তুত হয়, যদি দাবি সম্বন্ধে সকলে একমত হইয়া থাকে, যদি এই সব দাবি কোন ইস্তাহারে বুঝানাে বা সভায় ভালাে- ভাবে ব্যাখ্যা করা হইয়া থাকে, তাহা হইলে সবাই এক যােগে দাড়াইবে এবং জমিদারকে নামিতে হইবে, অন্তত তাহার লােত কমাইতে হইবে। যদি স্ট্রাইক সর্বসম্মত হয় এবং কাজের ভীড়ের দিনে শুরু হয়, তাহা হইলে জমিদার এমন কি সরকার পক্ষের ফৌজ থাকা স কিছু করা কঠিন হইবে । কাজের সময়টা নষ্ট হইবার ভয় জমিদারের থাকিবে এবং শীঘ্রই জমিদার অনেকটা ঠাণ্ডা হইবে। একথা ঠিক যে, স্টাইক নূতন জিনিস এবং নূতন জিনিষ প্রথমেই ভালােভাবে হয় না। শহরের মজুররা আগে হইতে জানি না কেমন করিয়া এক হইয়া লডিতে হয়, তাহারা জানি না কি কি দাবি পেশ করিতে হয়। তাহারা প্রথমে যন্ত্রপাতি ভাঙ্গিত ও কলকারখানা নষ্ট করিত। এখন মজুররা লড়াই-এ পরস্পরের সঙ্গে একযােগে ডাইতে শিখিয়াছে। প্রত্যেকটি নূতন কাজ শিখিয়া লইতে হয়। এখন মজুররা বুঝিতে পারিযাছে যে একত্রে আঘাত দিলে তাহারা আশু সুবিধা পাইতে পারে। ইতিমধ্যে জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ বাধা দিতে শিখিতেছে এবং বৃহৎ ও চরম ফলপ্রসু লড়াই-এর জন্য ক্রমশই বেশী বেশী তৈরি হইতেছে। তেমনি কৃষকরা সবচেয়ে জঘন্য লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে দাড়াইতে শিখিবে, কিছু কিছু সুবিধার দাবির জন্য এক হইতে শিখিবে এবং ক্রমশ দৃঢ়ভাবে সমস্ত দেশব্যাপী স্বাধীনতার বৃহত্তর লড়াই-এর জন্য তৈরি হইতে শিখিবে। শ্ৰেণীসচেতন কৃষক ও মজুরের সংখ্যা বাড়িবে, এবং সােখাল ডেমােজাট- দের গ্রাম্য কমিটিগুলি আরও শক্তিশালী হইবে। কৃষকদের ঘাড়ে জমিদারের দাস, পুরােহিতের জুলুমবাজি, পুলিসের নৃশংসতা ও আমলা- কৃষকদের জন্য কি কি সুবিধা আদায় করিতে চেষ্টা করে ? ১০৩ তান্ত্রিক অত্যাচারের প্রত্যেকটি ঘটনা জনসাধারণের চোখ খুলিয়া দিবার কাজে সাহায্য করিবে, বাধা দিবার কাজে এবং জোর করিযা শাসনতন্ত্র পাল্টাইর পন্থাষ তাহাদের অত্যন্ত করিবে। এই বই-এর গােড়াতেই বলা হইয়াছে যে,শহরের মজুররা রাস্তায় রাস্তায় ও ময়দানে বাহির হইয়া আসে এবং প্রকাশ্যভাবে স্বাধীনতার দাবি করে। তাহারা তাহাদের নিশানে লেখে ও আওয়াজ তােলে। “স্বেচ্ছাতন্ত্র ধ্বংস হউক।” এমন দিন শীঘ্রই আসিবে যে-দিন শহরের মজুররা শুধু রাস্তায় রাস্তায় আওয়াজ তুলিয়া কুচকাওযাজই করিবে না, বৃহৎ ও চরম লড়াই-এর জষ্ঠ বিদ্রোহ করিবে—যেদিন মজুররা একযােগে ঘােষণা করিবে: “হ্য স্বাধীনতা লাভ কৰিব, না হয় লড়াই করি মরিব”, যে-দিন লড়াই-এ শহীদ শত শত মজুরের স্থানে হাজার হাজার নূতন ও আরও দৃঢ়চেতা মজুর আগাইয়া আসিবে। সেদিন কৃষকরাও কুশিয়ার একপ্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত শহরের মজুরদের সাহায্যে অগ্রসর হইবে এবং কৃষক ও মজুরের স্বাধীনতার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করিবে। জারের সমর্থকরা সেদিন এই আঘাত সহিতে পারিবে না। সেদিন মজুরের জয হইবে। মজুর শ্ৰেণী জুলুম হইতে সমগ্ৰ অমরত জুনসাধারণের মুক্তির জন্য প্রশস্ত পথ দিয়া আগাইয়া চলিবে। মজুরশ্রেণী এই স্বাধীনতার সুযােগ লইয়া সােস্যালিজমের জন্য লড়িবে। ১৯০৩ সাল শেষ
No text on this page.
কৃষক-সমস্যা সম্পর্কীয় প্রস্তাবের
প্রাথমিক খসড়া (১৯২০ )
[ কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয়
কংগ্রেসের ]
লেনিন
অনুবাদক-অরুণ মিত
No text on this page.
কৃষক-সমস্যা সম্পকীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া (১৯২০ ) [কমিউনিসট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় কংগ্রেসের জন্য) কৃষক-সমস্যা সম্পর্কে বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর কর্মকৌশল নির্ধারণে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অপারগ হয়, শুধু তাই নয়, এই সমস্যাটা ঠিক মতাে সম্মুখে উপস্থিত করিতেও সে পারে নাই। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের এই অক্ষমতার কারণ কি তাহা কমরেড মাখলেভস্কি * তাহার প্রবন্ধে চমৎকার বুঝাইয়া দিয়াছেন। কৃষকদের সম্বন্ধে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের কমিউনিস্ট কাৰ্য্যচীর বিক (theoretical) সূত্রগুলিও কমরেড, মাখলেভস্কি বিকৃত করিয়াছেন। এই সুত্রগুলির ভিত্তিতে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের কংগ্রেস (১৯২০ সালের ১৫ই জুলাই যাহার অধিবেশন আরম্ভ হইকে) কৃষক প্রশ্ন সম্পর্কে একটা সাধারণ প্রস্তাব তৈয়ার করিতে পারে এবং আমার মতে করা উচিত। এরূপ প্রস্তাবের একটা খসড়া নিচে দেওয়া গেল। ১। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত শহর ও এমশিল্পের শ্রমিক শ্রেণাই শুধু পল্লীর শ্রমজীবী জনগণকে ধনিক বড় জমিদারের কবল হইতে, ধ্বংস ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ হইতে মুক্ত করিতে পারে। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা যতদিন থাকিবে ততদিন বার বার যুদ্ধ বাধিতে বাধ্য। কমিউনিস্ট • “দি কনিছনিসটু ইন্টারন্যাশনাল' পত্রিকার স্বাদশ সংখ্যায় (জুলাই, ১৯২০) জে, মাখলে স্কি যে-প্রবন্ধ লেখেন, লেনিন তাহার উল্লেখ করিতেছেন।
১০৮ কৃষক-সমস্যা সম্পর্কীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া শ্রমিকশ্রেণীর সহিত সহযােগিতা ছাড়া পল্লীর শ্রমজীবী জনগণের মুক্তি নাই। জমিদার (জমির বড় বড় মালিক) ও ধনিকদের প্রভুত্ব উচ্ছে করিবার জন্য কমিউনিস্ট শ্রমিকশ্রেণী যে-বৈপ্লবিক সংগ্রামে প্রবৃত্ত, সেই সংগ্রামে তাহাকে নিঃস্বার্থ ও ঐকান্তিক সমর্থন এবং তাহার সহিত সহযগিতা স্থাপন করিলে তবে পল্লীর শ্রমজীবী জনগণ মুক্তি লাভ করিবে; ইহা ছাড়া তাহাদের মুক্তির অন্য কোনাে পথ নাই। পক্ষান্তরে, যুদ্ধ ও ধনতন্ত্রের কবল হইতে মানুষকে উদ্ধার করিবার যে- ঐতিহাসিক ব্ৰত এমশিল্পের শ্রমিকদের রহিয়াছে, তাহা তাহারা পালন করিতে পারিবে না যদি তাহারা তাহাদের সঙ্কীর্ণ পেশার গণ্ডীতে তাহাদের রুজি-রােজগারের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের গণ্ডীতে আবদ্ধ থাকে, যদি তাহারা শুধু তাহাদের নিজেদের অবস্থার উন্নতি লইয়াই ব্যাপৃত থাকে। কেননা কোনাে ক্ষেত্রে তাহাদের অবস্থা তাে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পেতি বুর্জোয়ার সমতুল্য, সে-অবস্থা একেবারে অসহনীয় নয়। শুধু নিজেদের অবস্থা উন্নয়নের দিকে সব নজর দিলে তাহাদের চলিবে না। উন্নত অনেক দেশে শ্রমিক অভিজাতদের ব্যাপারে ঠিক ইহাই ঘটে। এই শ্রমিক অভিজাততন্ত্রই হইতেছে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের তথাকথিত সমাজতন্ত্রী দলগুলির ভিত্তি। ইহারা কাৰ্য্যত সমাজতন্ত্রের সব চাইতে বড় শত্রু , ইহারা সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে, প্রকৃতপক্ষে ইহারা জঙ্গী মনােভাবাপন্ন পেতি বুর্জোয়া ছাড়া আর কিছু নয় এবং শ্রমিক-আন্দোলনে ইহারা বুর্জোয়া শ্রেণীর দালাল। এমিকশ্রেণী যখন শােষকদের উচ্ছেদ করিবার সংগ্রামে সমস্ত মজীবী ও শােষিতদের নেতা ও অগ্রবর্তী দলরূপে আত্ম-নিয়ােগ করে, শুধু তখনই সে প্রকৃত সমাজতান্ত্রিকভাবে কাজ করে এবং শুধু তখনই তাহাকে সত্যকার বিপ্লবী শ্রেণী বলা যায়। কিন্তু কাজ করা যায় না যদি না পল্লী অঞ্চলে শ্রেণী-সংগ্রাম প্রসারিত করা হয়, যদি না পল্লীর শ্রমজীবী কৃষক-সমস্যা সম্পৰ্কীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া জনগণকে শহরের শ্রমিকদের কমিউনিস্ট পাটির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করা হয়, যদি না শহরের শ্রমিকশ্রেণী পল্লীর শ্রমজীবী জনগণকে শিক্ষাদান ২। পল্লীর শেষিত মজীবী জনগণকে সংগ্রামে পরিচালিত করা, মত স্বপক্ষে টানি আনা শহরের শ্রমিকদের অবশ্য কর্তব্য , পল্লীর এই শশাষিত শ্রমজীবী জনগণ সমস্ত ধনতান্ত্রিক দেশে নিম্নলিখিত শ্রেণীগুলিতে বিভক্ত। (ক) কৃষি-শ্রমিক, যাহারা বৎসর, ঋতু বা দিন হিসাবে মজুরির বিনিময়ে ধনতান্ত্রিক চাষ-আবাদে পরিশ্রম করিযা জীবিকা অর্জন করে। এই শ্রেণীকে পল্লীর অন্যান্য সম্প্রদায় হইতে পৃথক ও স্বতন্ত্র ভাবে সংগঠন করা (রাজনৈতিক, সামরিক, ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায়, সংস্কৃতি ও শিক্ষা প্রভৃতি বিভিন্ন রূপ সংগঠন), এই শ্রেণীর মধ্যে প্রবল প্রচারকার্য ও আন্দোলন চালানাে, এই শ্রেণীকে সােভিয়েট রাষ্ট্রক্ষমতা ও শ্রমিকদের ডিক্টেটরি (একনায়কত্বের) পক্ষে লইয়া আসা সমস্ত দেশের কমিউনিস্ট পাটির মুল কর্তব্য। (খ) আধা-শ্রমিক কৃষক অর্থাৎ যাহার কিছুটা ধনতান্ত্রিক কৃষি বা এম-শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করি এবং কিছুটা নিজস্ব বা খাজনা-করা জমিতে কাজ করি কোনাে রকমে জীবিকা নির্বাহ করে। তাহাদেব এই অমি তাহাদের পরিবারের ভরণপােষণ পুরাপুরি চালাইবার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সমস্ত ধনতান্ত্রিক দেশে পল্লীর জনগণের এই সম্প্রদায়টা সংখ্যায় খুব বেশী। বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিরা এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সমাজতন্ত্রীরা” এই সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ও বিশেষ অবস্থান কিছুতেই পরিষ্কার করিয়া বুঝিতে দেয় না; কেহ কেহ ইচ্ছা করিয়া শ্রমিকগণকে প্রতারণা করে, কেহ কেহ ৰ অন্ধভাবে রুটিন আঁকড়াইয়া থাকিয়া এই সম্প্রদায়কে সমগ্র বক” শ্রেণীর সহিত উলাইয়া ফেলে। শ্রমিকদের ;
কৃষকসমস্যা সম্পর্ক প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া প্রতি এই বুর্জোয়া প্রবঞ্চনা সব চাইতে বেশী দেখা যায় জার্মানিতে ও ফ্রান্সে। তবে আমেরিকায় ও অন্যান্য দেশেও উহা দেখা যায়। কমিউনিস্ট পাটির কাজ যদি ঠিকমতাে সংগঠন করা যায়, তাহা হইলে এই সম্প্রদায় নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট পার্টির অনুগামী হইবে। কারণ, আধা- শ্রমিকদের অবস্থা খুবই খারাব ; সােভিযেট রাষ্ট্রক্ষমতা বা শ্রমিকশ্রেণীর ডিক্টেটরি প্রতিষ্ঠিত হইলে তাহারা অবিলম্বে অত্যন্ত লাভবান হইবে। (গ) ছােট কৃষক, অর্থাৎ যাহাদের নিজস্ব বা খাজনা-করা অল্পস্বল্প জমি আছে এবং যাহারা বাহিরের মজুর না খাটাইযা নিজেরাই সেই জমি চাষ করিয়া পরিবার প্রতিপালন করে। শ্রমিকশ্রেণীর জযে কৃষকদের এই স্তর নিঃসন্দেহে লাভবান হয়, কারণ শ্রমিকশ্রেণী অষলাভের সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগকে নিম্নলিখিত সুবিধাগুলি পূর্ণ মাত্রায় দিবে : (১) বড় জমিদারকে খাজনা বা শস্যের ভাগ (ফ্রান্স, ইতালি ও অন্যান্য দেশে বর্গাদার ব্যবস্থা ইহার দৃষ্টান্ত। তাদের আর দিতে হইবে না; (২) বন্ধক হইতে তাহারা রেহাই পাইবে, (৩) জমিদারের বহু প্রকার অত্যাচার এবং জমিদারের উপর নানাভাবে নির্ভরতা হইতে তাহারা অব্যাহতি পাইবে (বনমহাল ব্যবহার ইত্যাদি), (৪) শ্রমিকরাষ্ট্রে নিকট হইতে তাহারা অবিলম্বে আবাদের কাজে এবং অন্যান্য ব্যাপারে সাহায্য পাইবে (যথা, শ্রমিকশ্রেণী যেসব বড় বড় ধনতান্ত্রিক আবাদ বাজেযাত করিবে সেগুলির কৃষি-যন্ত্রাদি ও ঘরবাড়ী ব্যবহার করিবার সুবিধা তারা পাইবে, ধনতন্ত্রের আমলে যে পল্লী-সমবায় ও কৃষিসমবা সমিতিগুলি প্রধানত ধনী ও মধ্য- বিত্ত কৃষকের সেবায় নিযুক্ত থাকে সেগুলিকে শ্রমিকরা অবিলম্বে এমন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করিবে যাহা দরিদ্রের অর্থাৎ শ্রমিক, আধা-শ্রমিক ও হােট কৃষকদের সহায়ক হইবে ইত্যাদি)। এই সঙ্গে কমিউনিস্ট পাটি যেন একপা পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করে যে, ধনত হইতে কমিউনিজমে পবিবর্তনের কালে অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণীর কৃষক-সম সম্পৰ্কীষ প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া ডিক্টেটরির কালে কৃষকদের এ স্তরটা, অন্ততপক্ষে এই স্তরের একটা অংশ নিশ্চয়ই অবাধে ব্যবসাবাণিজ্য করা এবং অবাধে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার ভােগ করার দিকে ঝুঁকিবে, কারণ, খুব কম পরিমাণে হইলেও ব্যবহার-দ্রব্যের বিক্রেতা হিসাবে এই তরটা ইতিমধ্যেই মুনাফা ওমালিকানা করার অভ্যাসে দূষিত হইয়া গিয়াছে। তবে যদি অমিকনীতি দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করা যায় এবং জয়ী শ্রমিকশ্রেণী যদি শক্ত ভাবে জমিদার ও বড় কৃষকদের সহিত চরম বােঝাপড়া করিয়া লয়, তাহা হইলে এই তর বেশী টালবাহানা করিবে না এবং মােটামুটি শ্রমিক বিপ্লবের পক্ষেই থাকিবে। ৩। সমস্ত ধনতান্ত্রিক দেশে একত্রে উপরােক্ত তিনটি সম্প্রদায়ই গ্রামবাসীর মধ্যে সংখ্যায় সব চাইতে বেশী। অতএব শ্রমিক বিপ্লবের সাফল্য শুধু শহরে নয়, পল্লী অঞ্চলেও সুনিশ্চিত। ইহার একটা উল্টা মত ব্যাপক ভাবে ছড়াইয়া আছে; কিন্তু এই মত যে টিকিয়া রহিয়াছে তাহার কয়েকটি কারণ আছে—প্রথমত, বুর্জোয়া বিজ্ঞান ও স্ট্যাটিসটিকসের ( তালিকা- বিজ্ঞানের) ক্রমাগত প্রতারণা, শােষক জমিদার ও মহাজন আর পল্লীর উপরােক্ত তিন শ্রেণীর মধ্যে যে গভীর ব্যবধান রহিয়াছে, তাহা ঢাকিয়া রাখিবার জন্য বুর্জোয়া বিজ্ঞান ও স্ট্যাটিসটিকস সর্বপ্রকারে তৎপর, বড় কৃষক আর আধা-শ্রমিক ও ছােট কৃষকের মধ্যেকার ব্যবধানও উহার গকিয়া রাখিতে চেষ্টা করে ; দ্বিতীয়ত, পল্লীর দরিদ্রদের মধ্যে অকৃত্রিম, বৈপ্লবিক, কমিউনিস্ট প্রচারকার্য, আন্দোলন ও সংগঠন পরিচালনা করিতে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বীরদের এবং অগ্রসর দেশে সাম্রাজ্যবাদী সুবিধাভােগে দূষিত শ্রমিক অভিজাতরে অনিচ্ছা ও অক্ষমত; এমিক শ্রেণীর বিপ্লব আর বুর্জোয়া গবর্নমেন্ট ও বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদের প্রতি কৃষক-সমস্যা সম্পর্কীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া •• সুবিধাবাদী কোনাে শনােযােগ দেয় নাই, তাহারা সমস্ত মােযােগ নিবদ্ধ করিয়াছে তত্ত্বে ও কাৰ্যে বুর্জোয়াদের সহিত আপােস কি ভাবে করা যায় তাহারই আবিষ্কারে; তৃতীয়ত, তত্ত্বক্ষেত্রে মার্কসবাদ এবং কাৰ্যক্ষেত্রে কশিয়ার শ্রমিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতা যে-সত্য প্রমাণিত করিয়াছে সেই সত্য উপলব্ধি করিতে অপারগতা, এই অপারগতা এমনই অনড় যে ইহাকে মানসিক সংস্কার বলিয়া ধরা যায় (অন্যান্য বুর্জোয়াগণতান্ত্রিক ও পালা- মেন্টারি কুসংস্কারের সহিত সম্পর্কিত), সত্যটা এই—সমন্ত দেশে এমন কি অত্যন্ত অগ্রসর দেশগুলিতেও ভয়ানক রকমে নিষ্পিষ্ট, ঐক্যের অভাবে বিচ্ছি, বিপর্যস্ত ও অর্ধ-বর্বর অবস্থায় জীবনযাপন করিতে বাধ্য ঐ তিন শ্রেণীর পল্লীবাসী অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক হইতে সমাজ অনুবাদের জয় সম্বন্ধে আগ্রহান্বিত বটে, কিন্তু উহাদের জোর সমর্থন বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণী আপনা হইতেই সঙ্গে সঙ্গে পায় না; বিপ্লবী শ্রমিক শ্ৰেণী রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার পর, জমিদার ও ধনিকদের সহিত কঠোর বােঝাপড়া করার পর তবে উহাদের দৃঢ় সমর্থন পাইতে পারে, এই সব নির্যাতিত সম্প্রদায় যখন কাৰ্য্যক্ষেত্রে দেখিবে যে, তাহাদের এমন এক প্রতিষ্ঠ নেতা ও নেতা ও রক্ষক রহিয়াছে যে তাহাদের সাহায্য করিবার ও ঠিক পথ দেখাইবার সামর্থ্য রাখে তখন অর্থাৎ এই অভিজ্ঞত লাভের পর তবে তাহারা বিপ্লবী শ্রমিককে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করিতে পারে; মার্কসবাদ ও রুশ বিপ্লবের অভিজ্ঞতা এই সত্য প্রমাণিত করিয়াছে, এই সত্য কিছুতেই হৃদয়ঙ্গম করা হয় না। ৪। অর্থনৈতিক দিক হইতে মধ্যবিত্ত কৃষক” বলিতে বােঝায় সেই সব ছােট চাষী যাহাদের নিজস্ব সম্পত্তিরূপে বা ইজারালওযা হােট ছােট জমি আছে, যে-জমি হইতে তাহারা কোনাে রকমে পরিবার প্রতিপালন করিয়া কিছু উক্ত রাখে এবং প্রায়ই সেজমিতে তাহার বাহিরের মজুর খাটাইয়া থাকে। এই সব জমি হতে পরিবারের ভরণ-পােষণ চালানাের কৃষক-সমস্যা সম্পৰ্কীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া পর তাহাদের যে উদ্বৃত্ত থাকে তাহা মূলধনে রূপান্তরিত করা চলে, অন্তত ভালাে ফসল হইলে তো বটেই। আর প্রতি দুই বা তিনটি আবাদের মধ্যে একটিতে বাহিরের মজুর লাগানাে হয়। অগ্রসর ধনতান্ত্রিক দেশে মধ্যবিত্ত কৃষকের ভালাে দৃষ্টান্ত রহিয়াছে জার্মানিতে ৫ হইতে ১০ হেক্টর জমিতে যাহাদের আবাদ। ১৯০৭ সালের সোস হইতে জানা যায় যে, জার্মানিতে এই সন্ত্র- দাযের নিযুক্ত কৃষি-মজুরের সংখ্যা এই সম্প্রদায়ের যত আবাদ আছে তাহার মােট সংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ। ফ্রান্সে এই সম্প্রদায় সম্ভবত আরও কিছু বেশী বাহিরের শ্রমিক নিযুক্ত করে, কারণ সেখানে আঙুরের ন্যায় বিশেষ বিশেষ ফসলের আবাদ রহিয়াছে, যে-সব আবাদে বেশী পরিমাণে এমনিবােগের প্রয়ােজন। বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণী কৃষকদের এই স্তরকে নিজেরপক্ষে টানিয়া আনিবার কাজে যেন ব্যাপৃত না হয়, অন্তত ও ভবিষ্যতে অথবা এমিক-ডিক্টেটরির প্রথম আমলে নষ; কিন্তু তাহার কর্তব্য হইবে এই ভরকে নিরস্ত করা অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণী ও ধনিকশ্রেণীর মধ্যে সংগ্রামে নিরপেক্ষ করিয়া রাখা। দুই শ্রেণীর মধ্যে একবার ইহার প্রতি একবার উহার প্রতি এই ওর ঝুকি পড়িতে থাকিবেই , অগ্রর ধনতান্ত্রিক দেশে নূতন যুগের প্রান্তে এই স্তরের ঝোক প্রধানত ধনিকশ্রেণীর দিকেই থাকিবে। কারণ এই স্তরের মধ্যে সম্পত্তিভােগীর দৃষ্টিভঙ্গী ও মনােভাবই প্রবল , মুনাফা, অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পত্তি সম্বন্ধে আগ্রহ প্রত্যক্ষ, শ্রমিকের * এক হেক্টর প্রায় আড়াই একরের সমান।অনুবাদক। + ঠিক সংখ্যাগুলি এই ৫ হইতে ১০ হেক্টর জমির আবাদের সংখ্যা ৬,৫২,৯৮ (সব জাবাদের সংখ্যা ৫৭,৬,৮২) , এই আবাদগুলিতে বিভিন্ন রকমের মজুর নিযুক্ত করা হয় ৪,৮৭,৭০৪ জন, আর এই আবাদগুলিতে বাহারা কাজ করে সেই সব পরিবারের লােকসংখ্যা হই ২০,৩,৬৩৩। আর ১৯৩২ সালের সেলস অনুযায়ী এই সম্প্রদায়ের আবাদের সংখ্যা ছিল ৩,৮৩,৩১, , তন্মধ্যে ১,২৬,১৩৬টি আবাদে নতুন নিযুক্ত করা হয় । विषक अयूबमब মজুরদের সংখ্যা ১,৪৬,৩৪৪ আর পরিবারগুলির লােকসংখ্যা হইতেছে ১২,৫,১৬৯। মা আবাদের মােট সংখ্যা ২,৫৬,৩৪৯।
১১০ কৃষক-সমস্যা সম্পকীয প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া প্রতি বিরুদ্ধতা প্রত্যক্ষ। বিজয়ী শ্রমিকশ্রেণী খাজনা ও বন্ধক উচ্ছেদ করি এই স্তরের অবস্থা সরাসরি উন্নত করিয়া দিবে। অধিকাংশ ধনতান্ত্রিক দেশে শ্রমিকরা যেন সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত করে , যে-কোন ক্ষেত্রে শ্রমিকরা ঘােট ও মধ্যবিত্ত কৃষকের জমিগুলি রাখিবার ব্যবস্থাই যে শুধু কবিবে তাহা নয়, তারা সাধারণের যত জমি খাজনা করিত তাহার পরিমাণ বাড়াইষা দিবার ব্যবস্থাও করিবে ( খাজনা বিলােপ)। এই ধরনের ব্যবস্থা অবলম্বনের সঙ্গে সঙ্গে ধনিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে অনমনীয় সংগ্রাম পরিচালনা করিলে এই ভরকে নিরপেক্ষ করিবার নীতি নিশ্চই সফল হইবে। শ্রমিকরাষ্ট্রকে অতি সাবধানে এবং ধীরে ধীরে, দৃষ্টান্ত স্থাপন দ্বারা, মধ্যবিত্ত কৃষকের উপর কোনাে রকম জোরজুলুম না করি যৌথ কৃষিতে যাইতে হইবে। ৫। বড় কৃষকেরা হইতেছে কৃষির ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাপক , ইহার সর্বদাই কিছু শ্রমিক নিযুক্ত কবে, “কৃষকশ্রেণীর” সহিত ইহাদের একমাত্র সম্পর্ক হইতেছে এই যে, উহারা সংস্কৃতিতে অনুন্নত, ইহাদের জীবনযাত্রার অভ্যাস অন্যান্য কৃষকদের মতে এবং ইহারা নিজেদের আবাদে নিজেরা পাটে । বুর্জোয়া স্তরগুলির মধ্যে ইহারা সব চাইতে বড় স্তর এবং ইহারা বিপ্লবী এমিকশ্রেণীর প্রত্যক্ষ ও কঠোর শত্রু। পল্লী-অঞ্চলে কমিউনিস্ট পাটির সমগ্ৰ কাৰ্য্যে এই স্তরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনার প্রতি প্রধান মনােযােগ নিবদ্ধ করিতে হইবে, এই সব শােষকের রাজনৈতিক মতবাদের প্রভাব হইতে শ্রমজীবী ও শােষিত অধিকাংশ পল্লীবাসীকে মুক্ত করিবার দিকে সব চাইতে বেশী নজর দিতে হইবে। শহরের শ্রমিকশ্রেণীর জয়লাভের পর কৃষকদের এই তর হইতে সর্ব- প্রকার প্রতিরােধ-ধ্বংসাত্মক কাৰ্য্য ও বিপ্লব-বিরােধী প্রত্যক্ষ সশস্ত্র আক্রমণ নিশ্চয়ই আত্মপ্রকাশ করিবে। অতএব এই স্তরকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতাহীন কৃষক-সমস্যা সম্পর্কীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া করিয়া ফেলিবার জন্য অবিলম্বে মতবাদ ও সংগঠনের দিক দিয়া প্রয়ােজনীয় লােকশক্লি প্ৰস্তুত করিবার কাজে বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীকে হাত দিতে হইবে এবং এমশিল্পে ধনিক উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিরােধের প্রথম লক্ষণ দেখা দেওযা মাত্র এই স্তরের উপর প্রবল, নিষ্করুণ ও মর্মান্তিক আঘাত করিতে হইবে। এই উদ্দেশ্যে পল্লীর শ্রমিকদের হাতে অস্ত্র দিতে হইবে এবং গ্রামে সােভিযেট সংগঠন করিতে হইবে, এমনভাবে এই সােভিয়েটগুলি সংগঠন করিতে হইবে যে, শশাষকরা যেন উহাতে স্থান না পায়, শ্রমিক ও আধা- শ্রমিকেরই যেন উহাতে প্রাধান্য থাকে। কিন্তু সব চাইতে বড় কৃষকদেরও সম্পত্তি বাজেয়াফত করা কোনাে অবস্থাতেই বিজযী শ্রমিকশ্রেণীর আশু কাজ হইতে পারে না, কারণ তখনও এই সব আবাদকে সমাজের সম্পত্তিতে পরিণত করিবার উপযােগী বৈষযিক অবস্থা বিশেষত যন্ত্রপাতির ব্যাপারে উপযােগী অবস্থা এবং উপযােগী সামা- জিক অবস্থা সৃষ্টি হয় নাই। হয়তাে খুব কদাচিৎ ব্যক্তিগত কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে এই সব কৃষকের জমির যে অংশগুলি ঘােট ঘােট খণ্ডে ইজারা-দেওয়া সেইগুলি কিংবা যে অংশগুলি অাশেপাশের চাষীদের জন্য বিশেষ প্রয়ােজন, সেইগুলি বাজেয়াফত করিতে হইবে, ছােট কৃষকগণকেও নির্দিষ্ট কতকগুলি শর্তে বড় কৃষকদের কৃষিযন্ত্রাদি বিনা মূল্যে ব্যবহার করিতে দেওয়া হইবে। তবে সাধারণ নিয়ম হিসাবে শ্রমিকরা যেন বড় কৃষকের জমি তাহাদেরই হাতে থাকিতে দেয় ; একমাত্র যদি তাহারা এম- জীবী ও লােষিতদের গভর্নমেন্টের বিরুদ্ধাচরণ করে তাহা হইলে তাহাদের জমি বাজেয়াফত করা হইবে। রুশ শ্রমিক বিপ্লবে কতকগুলি বিশেষ অবস্থার জন্য বড় কৃষকদের বিরুদ্ধে লড়াই জটিল হইয়া পড়ে এবং অনেক দিন ধরিয়া চলে। তথাপি রুশ এমিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতা হইতে দেখা যায় যে, প্রতিরােধের সামান্যতম চেষ্টার জন্য কঠোর শিক্ষা দিয়া দিলে এই স্তর শ্রমিকরাষ্ট্রের আদেশ বিখতভাবে পালন করে, এমন কি সমস্ত ১১ কৃষক-সমা সম্পর্কীয প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া এজীবীর সমর্থক ও নিফর্ম ধনীদের সম্বন্ধে করুণাহীন যে-গভর্নমেন্ট তাহার প্রতি এখন এই সব কৃষক খুব ধীরে ধীরে হলেও শ্রদ্ধাবানহইযা উঠিতেছে। কুশিয়ার শ্রমিক শ্রেণী বুর্জোয়া শ্রেণীকে পরাভূত করে; কিন্তু বড় কৃষকদের বিরুদ্ধে তাহার সংগ্রাম কতকগুলি বিশেষ অবস্থার জন্য জটিল ও ব্যাহত হয়। সে-অবস্থা হইতেছে এই : ১৯১৭ সালের ৭ই নভেম্বর (২৫শে অক্টোবর)-এর পর রুশ বিপ্লবকে জমিদারদের বিরুদ্ধে সমস্ত কৃষকের সংগ্রাম-রূপ ‘সাধারণ গণতান্ত্রিক অধ্যাযের মধ্য দিয়া অর্থাৎ মূলত বুর্জোযা-গণতান্ত্রিক অধ্যাযের মধ্য দিয়া যাইতে হয, সংখ্যায় ও সংস্কৃতিতে শহরের শ্রমিকদের দুর্বলতা; পরিশেষে, বিরাট ভূভাগ এবং খারাব যােগাযােগ-ব্যবস্থা। ইউরােপ ও আমেরিকা অগ্রসর দেশগুলিতে যে- পরিমাণে এই বাধাবিঘ্ন নাই, সেই পরিমাণে সেখানকার বিপ্লবী শ্রমিক- শ্ৰেণীকে বড় কৃষকদের প্রতিরােধের জন্য আরও তৎপরতার সহিত প্রস্তুত হইতে হইবে এবং আরও দ্রুত, আরও দৃঢ়ভাবে ও আরও সাফল্যের সহিত সে-প্রতিবােধ তাহাকে জয় করিতে হইবে এবং প্রতিরােধের সমস্ত সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করিতে হইবে। ইহা একান্ত প্রযােজন , কারণ এরূপ পূর্ণজয় না হওয়া পর্যন্ত পল্লীর শ্রমিক, আধা-শ্রমিক ও ছােট কৃষকরা শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রক্ষমতাকে সুপ্রতিষ্ঠ মনে করিতে পারে না। ৬। বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীকে অবিলম্বে জমিদারদের, জমির বড় বড় মালিকদের সমস্ত জমি বিনাশর্তে বাজেয়াফত করিতে হইবে। এই জমিদাররা হইতেছে সেই সব লােক যাহারা ধনতান্ত্রিক দেশে সরাসরি বা তাহাদের চাষীদের মারফত বরাবর কৃষিমজুর ও আশপাশের হােট কৃষকগণকে ( অনেক সময় মধ্যবিত্ত কৃষকদের কোনাে কোনাে অংশকে শােষণ করে, যাহারা নিজেরা খাটে না, যাহারা অধিকাংশ সামন্ত প্রভুদের বংশধর (কশিয়া, জার্মানি ও হাজারিতে সামন্ত অভিজাত, ফ্রান্সে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ‘সেইঞর’, ইংলণ্ডে লর্ড, আমেরিকায় প্রাক্তন দাস-মালিকগণ), কিংবা কৃষক-সমস্যা সম্পকীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া ১১৭ যাহারা খুব ধনী মহাজন, কিংবা যাহারা এই উভয় প্রকার শােষক ও নিমার এক সংমিশ্রণ। কো-অবস্থাতেই যেন বাজেয়াফত জমির জন্য জমিদারগণকে ক্ষতিপূরণ দিবার ব্যবস্থা বা ক্ষতিপূরণ দিবার পক্ষে প্রচারকার্য কমিউনিস্ট পার্টিতে চলিতে না দেওয়া হয়, কারণ ইউরােপে ও আমেরিকায় বর্তমান অবস্থায় উহার অর্থ দাড়ায় সমাজতন্ত্রবাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা এবং শ্রমজীবী ও শােষিতদের নিকট হইতে নূতন নজর আদায়ের ব্যবস্থা করা। যুদ্ধ এই শ্রমজীবী ও শষিতগণকেই সব চাইতে বেশী দুর্দশাগ্রস্ত করিয়াছে, আর লক্ষপতি ও কোটিপতির সংখ্যা বাড়াইয়াছে এবং তাহাদিগকে আরও বিত্তশালী করিয়াছে। এ অবস্থায় জমিদারগণকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া বা দেওয়ার কথা বলার অর্থ সমাজতন্ত্রবাদ ও শ্রমজীবী শােষিত জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। এখন এ হইল, বিজয়ী শ্রমিকশ্রেণী বড় বড় মালিকের যে-জমি বাজেয়াফত করিবে তাহা কিভাবে চাষ করা হইবে? অর্থনৈতিক দিক দিয়া অনগ্রসর ছিল বলিযা ফশিয়ায় এই জমি কৃষকদের ব্যবহারের জন্য বিলি করিয়া দিবার পদ্ধতিই প্রধানভাবে অবলম্বন করা হয়। কদাচিৎ কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে তথাকথিত “সােভিয়েট আবাদ” সংগঠন করা হয় , শ্রমিকরা ভূতপূর্ব কৃষিমজুরগণকে রাষ্ট্রের কর্মচারীতে রূপান্তরিত করিয়া এবং রাষ্ট্র চালনা করে যে-সব পঞ্চায়েৎ (সােভিয়েট) তাহাদিগকে সেগুলির সদস্য করিয়া এই সব আবাদ চালায়। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের অভিমত এই যে, অগ্রসর ধনতান্ত্রিক দেশের বেলায় ঠিক পদ্ধতি হইবে সেখানকার অধিকাংশ বড় আবাদ বজায় রাখিয়া সেগুলি রুশিয়ার সাভিয়েট আবাদের ধানে পরিচালিত করা। তবে এই নিয়ম লইয়া বাড়াবাড়ি করিলে বা বাধাগতের মতাে এই নিয়ম খাটাইতে থাকিলে অত্যন্ত ভুল হইবে। পরখাপহারীর বাজেয়াফত ১৮ কৃষকসম সম্পৰ্কীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া জমির অংশ বিশেষ বিনামূল্যে আশেপাশের ঘােট কৃষকদের মধ্যে এবং কখনও কখনও মধ্যবিত্ত কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করিতে না দিলে অত্যন্ত ভুল হইবে । প্রথমত, বৃহৎ পরিমাণে উৎপাদন স্বল্প পরিমাণে উৎপাদন অপেক্ষা পদ্ধতির দিক দিয়া শ্রেষ্টতর, এই যুক্তি তুলিয়া জমি বন্টনের বিরুদ্ধে আপত্তি করা হয়, কিন্তু ইহার অর্থ প্রায়ই দাড়ায় একটা অবিসংবাদিত সত্য তত্ত্ব জাহির করার খাতিরে নিকৃষ্ট সুবিধাবাদের আশ্রয় লওয়া এবং বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা। বিপ্লবের সাফল্য নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে শ্রমিকশ্রেণী যেন সামযিক উৎপাদন হ্রাসে পিছপাও না হয়, যেমন উত্তর আমেরিকায় দাসপ্রথার বুর্জোয়া শত্রুরা ১৮৬৩-৬৪ সালের গৃহযুদ্ধের ফলে সামযিকভাবে কার্পাস উৎপাদন হ্রাস পাইবে জানিও পিছপা হয় নাই। বুর্জোয়াদের নিকট উৎপাদনের জন্যই উৎপাদন প্রয়ােজনীয , কিন্তু শ্রমজীবী ও শষিত জনগণের নিকট সব চাইতে প্রয়ােজনীয় জিনিস হইতেছে শােষকগণকে উচ্ছেদ করিযা এমন অবস্থা সৃষ্টি করা যাহাতে শ্রমজীবীরা নিজেদের জন্যই এম করিতে সমর্থ হইবে, ধনিকদের জন্য নয়। শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম ওমূল কর্তব্য হইতেছে শ্রমিকশ্রেণীর জয় ও সে জয়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। শ্রমিকশ্রেণীর ক্ষমতা স্থিতিলাভ করিবে না যদি মধ্যবিত্ত কৃষকগণকে নিরপেক্ষ করিয়া দেওয়া হয় এবং ছােট কৃষকদের সকলের না হােক, অনেকের সমর্থন পাইবার সুনিশ্চিত ব্যবস্থা করা হয়। দ্বিতীয়ত, বৃহৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানাে তাে বড় কথা, যেরূপ আছে সেইরূপ রাখিতে হইলেই পল্লীর শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে পূর্ণ বিকশিত বৈপ্লবিক চেতনা থাকা প্রয়ােজন। ভালাে রকম ট্রেড ইউনিয়ন শিক্ষা ও রাজনৈতিক-সাংগঠনিক শিক্ষা লাভের পর পল্লীর শ্রমিকদের মধ্যে বৈপ্লবিক চেতনা পূর্ণ বিকশিত হইতে পারে। যেখানে এরূপ অবস্থা সৃষ্টি হয় নাই কিংবা যেখানে বুদ্ধিমান ও সুদক্ষ কশ্মীদের উপর এই কাজের ভার দেওয়া বক-সমস্যা সম্পৰ্কীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া সম্ভব নয়, সেখানে তাড়াহুড়া করিযা বৃহৎ সরকারী আবাদ প্রবর্তন করিতে গেলে শ্রমিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা খর্ব হইবে। এরূপ অবস্থায় যত দূর সম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করিতে হইবে এবং সােভিয়েট আবাদ” সৃষ্টির জন্য খুব সতর্কভাবে আযােজন করিতে হইবে। তৃতীয়ত, সমস্ত ধনতান্ত্রিক দেশে, এমন কি সব চাইতে অগ্রসর দেশ- গুলিতে মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা এখনও টিকিযা আছে—এই সব দেশে এখনও জমির বড় বড় মালিকরা আশেপাশের ছােট কৃষকগণকে আধা-সামন্তপ্রথায় শশাষণ করিয়া থাকে , যথা, জার্মানিতে ‘ইন্সলযতে’, ফান্দে মেতেইয়ের, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শস্যের গীদারগণ এই শোষণ চালাইয়া থাকে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ প্রদেশগুলিতে প্রধানত নিগ্রোরাই এই পদ্ধতিতে শােষিত হয় বটে, কিন্তু শুধু নিগ্রো নয় শ্বেতাঙ্গরাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এইভাবে শােষিত হয়। এই সব ক্ষেত্রে এমিরাষ্ট্রের কর্তব্য হইতেছে ছােট কৃষকরা আগে যে-সকল জমি খাজনা করিত সেই সকল জমি তাহাদিগকে বিনা খাজনায় ব্যবহার করিতে দেওয়া, কারণ এক্ষেত্রে অঙ্গ কোনাে অর্থনৈতিক ভিত্তি বা কাৰ্যনির্বাহের ভিত্তি নাই, এবং এক কথায় উহা সৃষ্টিও করা যায় না। বড় বড় আবাদের যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণরূপে বাজেয়াফত করিয়া রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত করিতে হইবে এবং সেই সঙ্গে এই খাড়া ব্যবস্থা থাকিবে যে, বড় সরকারী আবাদগুলিতে যন্ত্রপাতির যে-চাহিদা আছে তাহা মিটানাের পর এই সব যন্ত্রপাতি আশেপাশের ছােট কৃষকগণকে বিনামূল্যে ব্যবহার করিতে দেওয়া হইবে, কি কি শতে দেওয়া হইবে তাহা শ্রমিকরা ঠিক করিয়া দিবে। শ্রমিক বিপ্লবের পর প্রথম আমলে অবিলম্বে বড় জমিদারদের জমিদারী বাজেযাত করিতে তাে হইবেই, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বড় জমিদারকে প্রতি বিপ্লবের নেতা এবং সমগ্র পল্লীবাসীর নিষ্ঠুর শােষক হিসাবে নির্বাসিত বা কৃষক-সমা সম্পর্কীয় প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া অন্তরীণ করা অবশ্য কর্তব্য। এই শ্রেণীর মধ্যে এমন সব লােক আছে বাহাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সংগঠন-ক্ষমতা বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক কৃষি সৃষ্টির পকে মূল্যবান , শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই শ্রমিকশক্তি যত দৃপ্রতিষ্ঠ হইতে থাকিবে তত এই সব লােককে বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক কৃষি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কাজে লাগাইবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা করিতে হইবে , অত্যন্ত নির্ভরযােগ্য কমিউনিস্ট কশ্মীদের বিশেষ নিয়ন্ত্রণে এই চেষ্টা চালাইতে হইবে। ৭। শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রশক্তি শােষকদের সমস্ত প্রতিরােধ একেবার দমন করিয়া এবং নিজের পূর্ণস্থিতি সাধন করিযা ও নিজেকে চুড়ান্ত শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়া যখন সমগ্র শিল্পকে বৃহৎ সম্মিলিত উৎপাদন ও আধুনিক পদ্ধতির ভিত্তিতে (সমগ্র জাতীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিদ্যুৎশক্তি দ্বারা চালু করিবার পরিকল্পনা উহার মূল) পুনঃসংগঠিত করিবে, তখনই ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের জয় এবং সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা কায়েম হইল বলিয়া মনে করা হবে। ধু ইহার ফলেই শহরগুলি অনগ্রসর ও বিক্ষিপ্ত পল্লী এলাকাগুলিকে মৌলিক পদ্ধতিগত ও সামাজিক সাহায্য দিতে সমর্থ হইবে, যে-সাহায্যে কৃষির এবং সাধারণভাবে কৃষিশ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাইবার ভিত্তি রচিত হইবে। ইহার ফলে আবার জমির ছােট ছােট চাষীরা দৃষ্টান্তের অনু- প্রেরণায় এবং নিজেদের স্বার্থের খাতিরে বৃহৎ সম্মিলিত যন্ত্রচালিত কৃষি অবলম্বনে উদ্বুদ্ধ হইবে। এ অবিসংবাদিত সত্য তত্ত্ব সমস্ত সমাজতন্ত্রী কথায় মানি লইয়াছিল; কিন্তু কাৰ্যত সুবিধাবাদী দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক, সুবিধাবাদী জার্মান ও বৃটিশ “ইশিতেক্ষনেতার, সুবিধাবাদী ফরাসী লগেটিটু, ও অন্যা ািবাদীরা উহা বিকৃত করিতে থাকে। তাহারা অপেক্ষাকৃত দূরবর্তীর ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি বিক্ষিপ্ত করিয়া 27 Dist
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.