Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sushoma

Darbesh,kiranchand · 2009/09/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দরবেশ গ্রন্থাবলী-১০
সুসােমা
কিরণচঁাদ দরবেশ
এক টাকা

প্রকাশক
শ্রীহরিদাস চট্টোপাধ্যায়
নসার্স গুরুদাস চাটার্জি এণ্ড সন্স্
২• ১ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
১৩২৭
•
৬১ নং বহুবাজার স্ত্রী, কলিকাতা
কুন্তলীন প্রেসে
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস দ্বারা মুদ্রিত
১৯২১

প্রিয়তম বন্ধু
শ্ৰীযুক্ত তারাচরণ চক্রবর্তী
করকমলে-
}
বন্ধু,
তুমি যে কুঁড়িটি দেখেছ গুটিতে,
সােহাগ-সমীরে
সুধীরে ফুটিতে,
হােক সে বাসহীন,
হােনা অতি ক্ষীণ,
তােমারি করে
চাহে সে টুটিতে,
মরণ-জীয়নে
অসীমে লুটিতে।
বারাণসী
শ্রীপঞ্চমী
১ ফাল্গুন, ১৩২৭

No text on this page.

সূচি না দিতে গ্রহণ ... • • ••• | ৭ । ।। ••• ১9 ঋগ্বেদীয় ব্ৰহ্ম স্তোত্র (১) ঋগ্বেদীয় ব্ৰহ্ম স্তোত্র (২) ** ••• ব্ৰহ্ম মন্দির ১৭ ।।। ৫ । ১৯ । বিদায় মিলন উষা অগ্নি ৩ • । ।।। ৪০ । বন •• ••• ৪১ ••• ৪৫ ১০০ । বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ৫৮ ••• : • ••• ১। । এ ৬১ ••• ••• আশুতােষ সম্বর্ধনা মিলন সঙ্গীত বিবাহ যৌতুক বিবাহের স্নেহেপহার বিবাহ মঙ্গল নবজাত শিশু ৬৩ !!! ••• ৬৬ ৭৬ ••• ••• ••• ৭৯ ••• • ৮৩ ৫। ।।। • ৮৭ ৮১ •• । ১২ ।। ••• আমি কবি হাসিয়ে দিলে ইয়ে’ মাহাত্ম্য বদন-ভঙ্গি গিন্নি কৰ্ত্তা ভাড়াটে বাড়ী প্রবীন ••• ।। ৯৮- ৫। ১০২ ৫০৫ ১০ ৪ • •

না দিতে গ্রহণ
অনেক দিনের পরে আসিয়াছি এই,
যাহা দিব ভেবেছিনু তাতাে সাথে নেই।
এতদিন যাহা দিছি চরণে সঁপিয়া,
কিছু দেই নাই বঁধু, তমা জানাইয়া ;
নীরবে নীরবে দিছি, দিতে ছিল সাধ ;
তুমি মিটায়েছ মাের সকল আদ।
আজি বহুদিন পরে লাগাইলে হাওয়া,
ভেবেছিনু দিব—যাহা বাকী আছে দেওয়া।
আঁচল খুঁজিতে গিয়া পাইয়াছি লাজ,
যাহা দিব—তাতত মাের সাথে নাই আজ।
কবে কোন্ পথে জানি—ছেড়া শাড়ী দিয়া,
আমার সঞ্চিত ধন গেল গড়াইয়া ।
বিস্ময়ে চাহিয়া দেখি ওহে বিশ্বেশ্বর!
সে মাের সাধুটি তব চরণ উপর।
কলিকাতা। ১ বৈশাখ, ১৩২১
৭।

সৃষ্টিয় আদিম যুগে, বধির নীরব
কি' এক বিরাট শূন্য-নিস্তব্ধ ভৈরব,
নৃত্য-ছলে হিল্লোলিত দিক-দিগন্তরে।
স্থিতি-শূন্য অন্ধকার, আতুর অন্তরে
নৃত্য-হীন নৃত্যে দিত তাল। যাহা নাই
বৰ্তমান, ছিলনা তা কভু কোনাে ঠাই ;
যাহা আছে—তা’ও নাহি ছিল। বসুন্ধরা,
সৌন্দর্যের মহালক্ষ্মী, সুখ-শােভা ভরা,
শস্য-শম্প-পত্র-পুষ্প-সম্ভারে সাজিয়া,
আলােকে বাতাসে খেলি ছিলনা বাঁচিয়া ।
কোথা ছিল অন্তহীন সুনীল আকাশ ?
কোন্ গুপ্ত চির-লুপ্ত মহা-সপ্রকাশ
মহাশূন্য করিত বিরাজ—শূন্য-হীন।
কে ছিল সে পুরাতন শাশ্বত নবীন?
এ বিশাল বিপুলতা করি আচ্ছাদন,
ছিলনা তাে অসীমের শূন্য আবরণ !
লােক-লােকান্তর ছিল সুপ্ত অগােচর।
ঝটিকা-তরঙ্গময়ী মন্থির সাগর,
বসুন্ধরা-কন্যারত্ন-জনম-সম্ভবা,-
কোথা ছিল সঙ্গোপনে আসন্ন-প্ৰসবা,
৮

কোন্ দিব্য সুতিকা-আগারে ?—ব্যাকুলিতা-
উদ্বেগ-সংক্ষুব্ধ-নন্দিতা—ব্যথিতা—ভী।
৫
মরণ ছিলনা কভু মৃত্যু-রূপে বাঁচি।
দুষ্প্রাপ্য তপস্যা-লব্ধ অমরতা যাচি
ফিরিত না দেবতা-সমাজ। দিবা-রাতি,
বর্ষ-মাস, জলে নাই নিয়মের বাতি।
ছেদ-হীন বিরাম-বিহীন দগ্ধ-হিয়া
মহাকাল, অনাহত পক্ষ ঝাপটিয়া
বিরাজিত অনন্তের অন্তর-আকাশে।
বায়ু-হীন ধমনীর জীবন-নিশ্বাসে
ছিল কি জীবিত কোনাে অজ-অদ্বিতীয় ?
বরণ-চাতুরীহীন কোন্ উত্তরীয়
উড়াইয়া কি বিরাট বিপুল হিল্লােলে,
কে নাচিত শব্দহীন অবিরাম দোলে ?
হে বিরাট অন্ধকার, আদি-পিতামহ,
হে সুন্দর নিস্তব্ধ মহান্, তব গৃহ
ছিল প্রতিষ্ঠিত, কোন্ অন্ধ তমসার
বন্ধু হীন তমিস্র পাথারে ? মনীষার
দীপ্ত প্রভা-পুঞ্জ, তরল কিরণ-মাখা
চাপল্য-চটুল, তিলেক ছিলনা আঁকা
তােমার গম্ভীর মৌন উদার ললাটে।

সমস হে ধ্বান্ত বিশাল, মহা-ঠাটে
মহিমার মহান্ শিখরে,—কোন্ ধ্যানে
তব রূপ ছিল নিমগন ?—কেবা জানে
কাহার সন্ধানে ! তােমার অবিদ্যমান
অখণ্ড তিমিরে, কি বিরাট মহা-প্রাণ
বিপুল বিরহে কাদিল গােপন দাহে
কাহার লাগিয়া ? তব অশ্রুর প্রবাহে
ভাসিয়া নিস্তব্ধ কুল, উঠিল বাঁচিয়া
কোন্ মুক্ত মহা-সিন্ধু পুলকে নাচিয়া ?
সৃষ্টির আদিম ভাষা বুদ্বুদ হিল্লোলে
ফুটিল অনন্ত-ব্যাপী সিন্ধুর কল্লোলে
‘তপ’ ‘তপ’ ‘তপ’ রবে। করুণ নয়ানে,
কে চাহিল কবে কোন্ দিগন্তের পানে ?
ছুটিল প্রশান্ত দূতি সে নয়ন হতে,
'রবি-রশ্মি প্রকাশিল দীপ্তিময় পথে।
তােমার ক্রন্দন-রাশি সিন্ধুর আকারে
বাহিয়া পুলক-বন্যা বিপুল পাথারে
ভাসাইল তিমির-পরাণ। এক বিন্দু
অশ্রু তার, ছিল কি সঞ্চিত ওই ইন্দু-
শােভাহীন স্থির অন্ধ নয়ন যুগলে ?
পরাণের গুপ্ত-কোণে নিবিড় অতলে,
১০

সে অশ্রু মাখিয়া দিল উন্মাদ চেতনা !
তাই এ সৃষ্টির নব নন্দিত বাসনা
বন্দিল একান্ত হাস্যে তােমায় সুধীরে।
সে বাসনা আদি-মাতা সিন্ধুর শরীরে
শুভ ক্ষণে শুভ বীজ করিল সঞ্চার।
ধন্য সিন্ধু ! ধন্য সেই সার্থক বিহার ।
জয় জয় বসুন্ধরা অনিন্দ্য-সুন্দরী।
আদি-মাতা উধীর স্নিগ্ধ অঙ্কোপরি
কল-হাস্য-মুখরিতা শিশু সুকুমারী।
হে বালিকা, ধন্য লীলা চাপল্য বিথারি।
কত গ্রহ চন্দ্র তারা ফুটিল হিল্লোলে
তােমার সুনীল সূক্ষ্ম অম্বর-নিচোলে।
হে কিশােরী, তারুণ্যের লাবণ্য-ছটায়
এ কি সৌন্দর্য্যের স্তুপ নীরব ঘটায়
ধীরে ধীরে বিকশিল স্নিগ্ধ বক্ষে তাের
হেমকূট গিরির আকারে ! ভাব-ভাের
প্রেম-মুগ্ধ সদ্য-স্ফুট তরুণ পরাণ,
কি শাশ্বত সঙ্গীতের সুরে ধরি তান
ছুটিল কাহার পানে তটিনী হইয়া।
হে যুবতী, কোন্ অলি কি গান গাইয়া
বসন্ত ছড়ায়ে দিল তব সারা দেহে।
১১

দুরন্ত কামনা-মাখা কি অটুট স্নেহে,
কি অজানা ব্যাকুল ব্যাথায়, মরি মরি
তব প্রাণ উঠিল নাচিয়া। বিভাবরী
কৌমুদী-কুকুমে সাজি সাজালাে আদরে !
দিবস হাসিয়া দিল রক্ত পট্টাম্বরে !
হুতাশন লয়ে স্নিগ্ধ অযুত বর্তিকা,
দিকে দিকে আলাইল মিলনের শিখা !
মুগ্ধা লুক্কা জ্যোতির্ময়ী ওগাে বসুন্ধরা,
কার প্রতীক্ষায় ছিলে সাজি স্বয়ম্বর ?
কোন্ মিলনের মধু মাদকতা খানি,
দিগন্ত-মন্থন স্বরে কি কহিল বাণী ?
কোন্ শুভ উদ্বাহের মন্ত্রের ভাষণে,
কারে দিলে বর-মাল্য স্বামী-সম্ভাষণে ?
ধন্য মাতা জননী আমার ! বল্ মােরে
বল মাগাে, শুনি আমি নিস্পন্দ-বিভােরে
সে সুন্দর পুরাতন গাথা ! বলল মাতা,
কেমন আমার সেই দিব্য জন্মদাতা ।
কোথায় বসতি তার—কোন্ দূরদেশে?
কোন্ গগনের কোন্ গােপন প্রদেশে?
শুভ্র আলােকের রথে কিরণ বিথারি
জ্যোতির্ময় ছায়া পথে, মুক্ত ব্যোমচারী

আসে কি মা, তব সম্ভাষণে ? তাই কি মা,
তাের বক্ষ এত সুশীতল ?-নাই সীমা
অপার স্নেহের ? বল্ মােরে বল্ ধীরে,
পিতা মাের জন্মদিনে হেরি শিশুটিরে
সঙ্গীহীন একক অক্ষম, চেয়েছিল
করুণায় ক্ষুদ্র মুখপানে? রেখেছিল
স্নিগোজ্জ্বল আশীষ-হস্তটি ক্ষণতরে
মস্তকে আমার ? আমি চেয়ে সকাতরে
দীপ্তিময় শ্রমুখের পানে,আমি গাে মা,
একান্ত একেলা,নীরবে মাগিয়া ক্ষমা
চরণ-রাজীবে, কি ধ্যানে ছিলাম লীন ?
আপন সন্তানে হেরি অতিশয় দীন,
সে কেমনে রয়েছে বসিয়া, বহুদূরে,
একান্ত দুর্গম দুর্গে,-স্বপনের পুরে?
আর কত দিন, -কত যুগ-যুগান্তর
মিথ্যা আবরণ রচি আমার অন্তর
ঘুমাইবে মােহ-ঘুমে? অটুট নিগড়ে
আর কতদিন হেন বন্দী রব ঘরে ?
বলল মাতা বসুন্ধরা জননী আমার,
পিতৃ-দরশন পাব কত দিনে আর ।
বারাণসী। ১০ শ্রাবন, ১৩২২
১৩

ঋগ্বেদীয় ব্ৰহ্ম স্তোত্র (১)
(ঋগ্বেদ। ১ মণ্ডল ৮১ সূক্ত)
;
নমস্তে পরম-পিতা মহর্ষি মহান,
বিশ্ব-যজ্ঞশালে হেরি তব অধিষ্ঠান;
বিশাল ব্ৰহ্মাণ্ডব্যাপী তব হােম-শিখা,
অনন্ত কালের ভালে পরাইছে টিকা
প্রথম আগত যত ঋত্বিক-সুজনে,
তুমি তােষিয়াছ দেব, ধন-ধান্য সনে ;
সে অনাদি পন্থা সুখে করি আলম্বন,
যুগান্ত ধরিয়া জাগে তােমার পূজন।১
।
!
* কোথা তব বাসগৃহ—আশ্রম—কুটীর,
যেথা বসি বিশ্ব-সৃষ্টি করিলে হে ধীর।
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড-খণ্ড রচনা করিয়া,
অম্বরের চন্দ্রাতপ দিলে টাঙাইয়া! ২
অনন্ত তােমার আঁথি, অনন্ত বদন,
অনন্ত তােমার হন্ত, অনন্ত চরণ ;
অপরূপ ভঙ্গিমায় পক্ষ সঞ্চালিয়া,
দূলােক ভূলােক কত দিয়েছ রচিয়া। ৩
১৪

কোথা সে কানন চারু—অটবী মহা
যে উপকরণে সৃষ্টি করিলে নির্মাণ,?
জ্ঞানী তাে জানেনা, কোথা দাঁড়াইয়া তুমি-
ধারণ করিছ এই সুবিশাল ভূমি। ৪
আজি এই যজ্ঞশালে হয়ে অধিষ্ঠান,
কোথায় তােমার ধাম বল হে মহান্ !
ঋত্বিকের সাজে তুমি করিতেছ যাগ,
যজ্ঞেশ্বর রূপে পুন লহ যজ্ঞভাগ। ৫
কি দূলােক কি ভূলােক—রয়েছ আবরি,
নির্বোধ আমরা তাই চিনিতে সিহরি ।
ইন্দ্র কবে নন্দনের জানাবে সন্ধান,
তােমারে চিনিব কবে হে মাের মহান ! ৬
তুমি বাচস্পতি, তুমি মনের মনন,
সকল কল্যাণ মাঝে তােমার জনন।
চিত্ত চমকিত তব বিত্ত ও বৈভবে,
দীনের এ যজ্ঞাহুতি আজি নিতে হবে।
৩০ ফাল্গুন, ১৩২১

ঋগ্বেদীয় ব্রহ্ম স্তোত্র (২)
(ঋগ্বেদ। ১০ মণ্ডল, ৮২ সূক্ত )
নিবাত হিল্লোলহীন কারণ-নিবহে,
অক্ষয় অব্যয় দ্যুতি ঘনিভূত বহে ।
সে দিব্য জ্যোতির মাঝে, কবে কোন দিন
ফুটিয়া উঠিল বিশ্ব শাশ্বত নবীন !
হে বিশাল বিশ্বকর্মা পুরুষ-পুরাণ!
কি বিশাল দ্যাব-পৃথি করিলে নির্মাণ !
ব্রহ্মাণ্ডের আদি-পিতা ওহে জন্মদাতা।
সৰ্ব্ব দেবতার সাজে তুমিই বিধাতা।
কে তুমি কোথায় তুমি—কোন্ দিকে ধাম।
কৰ্ম্ম শেষে কোন দেশে লভিবে বিশ্রাম ?
কারণ-পয়ােধি গর্তে কোথা স্থির ভূমি?
হে বিরাট বিশ্ব-প্রাণ ! যেথা আছ তুমি।
দিকহারা পান্থ প্রায় কুহেলি ধাঁধায়,
ভ্রান্ত মােরা ভ্রমিতেছি বিভ্ৰম-আঁধায় !
কল্পনায় তব লাগি যজ্ঞ-আয়ােজন,
কত স্তুতি—কত ঘটা-পঠন-পূজন।
তুমি কোন্ দূরে রহি হাসিতেছ লুকি;
মানবের ব্যর্থ চেষ্টা হেরি হে কৌতুকী !
১৬ চৈত্র, ১৩২১

ব্ৰহ্মমন্দির
যেই দিন রাজা শ্রীরামমােহন বঙ্গের হেরি বিষাদ-ক্লান্তি,
রুদ্ধ কণ্ঠ মুক্ত করিয়া, নাশিয়া অসীম বিপুল ভ্রান্তি, ,
চির পুরাতন উপনিষদের চির পুরাতন পরম ব্রহ্ম,
ঘােষণা করিলা নবীন বঙ্গে ব্ৰহ্ম-বাদের বিমল ধৰ্ম্ম ;
সেই দিন তব ভারত-বক্ষে পত্তন হলাে সুদৃঢ় ভিত্তি
সপ্ত সিন্ধু মন্থন করি ছুটিল জগতে তােমার কীর্তি।
জয় জয় জয় প্রেম-মন্দির, প্রণব-পুটিত মহা পবিত্র,
বাঙালীর তুমি বিজয়-মঞ্চ, ভারতের তুমি গরব-চিত্র।
এক পুরাতন মঙ্গল ধাতা চাহিল মেলিয়া করুণ নেত্র,
তেত্রিশ-কোটী আবরণ ভেদি সে আলাে ছাইল ভারতক্ষেত্র।
দেবতা পূজিতে দেবেন্দ্রনাথ সত্য-সারথি মহা-মহর্ষি,
ব্ৰহ্ম-সূত্র-গ্রন্থনকারী সে মহাপুরুষ ত্রিকালদর্শী।
আবার ধ্বনিল ভারত ব্যাপিয়া উদারা মুদারা তারার সপ্ত,
বেদান্ত-বাণী বহি’ দিগন্তে তােমার মহিমা হইল ব্যপ্ত।
জয় জয় জয় প্রেম-মন্দির, প্রণব-পুটিত মহা পবিত্র,
বাঙালীর তুমি বিজয়-মঞ্চ, ভারতের তুমি গরব-চিত্র।
গেয়ান-কৰ্ম্ম-মিলন-ক্ষেত্র ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র,
উল্লাসে তুলি তােমার পতাকা প্রচারিলা বাণী জলদ-মন্দ্র।
তােমার স্নিগ্ধ শীতল ছায়ায় জুড়াইল চিতলভিল শিক্ষা,
ওঁকার-পূত-ঝঙ্কার মাঝে নব ভারতের হইল দীক্ষা।
২
১৭

পিপ ব্যভিচার দুর্নীতি যত পলাইয়া গেল মােহন মন্তে,
গাহিল ভারত অভিনব গাথা তরুণ লহরে নবীন যন্ত্রে।
জয় জয় জয় প্রেম-মন্দির, প্রণব-পুটিত মহা পবিত্র,
বাঙালীর তুমি বিজয়-মঞ্চ, ভারতের তুমি গরব-চিত্র।
ভাই অঘােরের বিভাের পরাণে হােম-শিখা যবে হইল দীপ্ত,
সে আলােক লােভে কত পতঙ্গ আসিল ছুটিয়া হইয়া ক্ষিপ্ত ।
তব আশ্রয়ে শঙ্কিত কত কম্পিত চিত লভিল শান্তি,
তব নিৰ্কর করুণার ধারা ধৌত করিল সকল ক্লান্তি।
জননীর মত সন্তানে যত লইলে টানিয়া অভয় বক্ষে,
মৃত প্রাণে দিলে অমৃত সিঞ্চি তােমার অচল অটল সৌধ্যে।
জয় জয় জয় প্রেম মন্দির, প্রণব-পুটিত মহা পবিত্র,
বাঙালীর তুমি বিজয়-মঞ্চ, ভারতের তুমি গরব-চিত্র।
দীপ্ত পাবক হৃদয়ে জালিয়া প্রেমের পাগল বিজয়কৃষ্ণ,
দিক-দিগন্তে করিলা প্রচার ভুলিয়া আহার বিগত-তৃষ্ণ;
সে মহা আহুতি বাংলার যত পাপ ইন্ধন করিল ভস্ম,
হাসিল ভারত প্রমােদ-পুলকে হেরিয়া তােমার বিমল হাস্য ;
তব অন্দরে উঠিল বাজিয়া নব কীৰ্ত্তন মধু মৃদঙ্গ,
নমিল চরণে পিপাসিত চিত,ধন্য হইল কাঙাল বঙ্গ।
জয় হে জয় হে প্রেম-মন্দির, প্রণব-পুটিত মহা পবিত্র,
বাঙালীর তুমি বিজয়-মঞ্চ, ভারতের তুমি গরব-চিত্র।
বরিশাল, ১০ মাঘ, ১৩১৭
১৮

বিদায় মিলন
(ঋগ্বেদ।
১৫ মণ্ডল ৯৫ ফুক্ত অবলম্বনে)
৩
পুরুরবা
ক্ষিপ্তা ক্ষণপ্রভা প্রায় মুহুর্তের লাগি
দীপ্তোজ্জল বিজলী বিকাশি, অনুরাগী
অনুগত জনে ছলনায় ভুলাইয়া,
কোথা যাও হে নিঠুরা?—চিরতরে হিয়া
দলিয়া কোমল রাঙা চরণের তব
কঠিন নির্দয়াঘাতে ? আজি প্রিয়ে, কব
মনের ঘুমন্ত সাধ ছিল যাহা মনে
এতদিন হৃদয়-নিভৃতে সঙ্গোপনে ;
সুপ্তা সিংহী যথা নীরবে বিবরে বসে,
যতক্ষণ শাবক তাহার, খেলা-রসে
নাচিয়া বেড়ায় কাছে কাছে। আজি প্রিয়া,
বজ্ৰনাদে সিংহী মম উঠেছে জাগিয়া
হেরিয়া দুদ্দিন-ঘন ; আজি অকারণে
লালসা-শাবক তার সঙ্গিহীন বনে
বেষ্টিত বিপদ-জালে। ক্ষণেক দাড়াও
ওগাে, ক্ষণতরে দয়া করে’ শুনে যাও
দুরন্ত প্রাণের মম উন্মাদ প্রলাপে।
আজ শেষ দিন প্রিয়ে! কোন্ অভিশাপে
জানি হইব হারা ও সুধা পরশ।

এস শুভে, এস কাছে! এ উরস
সযতনে বড় সাধে রেখেছি পাতিয়া,
তােমার ক্ষণিক উপবেশন লাগিয়া ।
বিফল বিলাপে বলল কি ফল রাজন্ ?
তরুণ অরুণােজ্জল ঊষর মতন,
আমি হেসেছি তব অন্তর-গগনে,
বাসনা-শিশির সিক্ত হিয়া-ফুলবনে
ক্ষণতরে ছড়াইতে নবীন কিরণ
আবার চলিয়া যাব, এ চারু বরণ
ঢাকিয়া ধূমল ওই মেঘের আড়ালে,
ক্ষণস্থায়ী উষারি মতন। বসিয়া বিরলে,
শত জন্ম অশ্রুজলে ধৌত কর যদি
ধরার কঠিন বক্ষ ; কিম্বা চক্ষু মুদি
একান্ত ধেয়ানে যদি রহ উপবাসি,
তবু মােরে নারিবে রাখিতে। হে বিলাসী,
যাও ফিরে আপনার গৃহে। সমীরণ
যায় বহি উল্লসিত মনে, অকারণ
বিলাইয়া শীতল-প্রবাহ, ধরণীর
তাপিত প্রাণীরে ; কে আছে এমন বীর,
কে পারে ফিরাতে বলল, একান্তে সাধিয়া,
সদাগতি প্রভঞ্জনে? বিফলে কঁদিয়া

পাইবে না কোনো ফল আর। যাও ওহে,
যাও ঘরে।
পুরুরবা
তােমার বিলাস-লাস-মােহে
ভুলিয়াছিলাম প্রিয়ে, কর্তব্য আপন।
রাজার বিশাল বােঝা করিনি বহন।
নিশ্চিন্ত তুণীর মাঝে তীক্ষ বাণ যত,
ছিল সুখে নিদ্রামগ্ন। চটুল মন্মথ,
কুসুম-সায়ক হানি করেছিল চুরি
সামান্য বাণের যত গৰ্ব্ব ও চাতুরী।
খরধার অসি, হারায়ে ফেলিয়াছিল
খরধার তার, ওই তব স্বচ্ছ নীল
নয়ন যুগলে।
হের প্রিয়ে, বীর শূন্য
রাজ্য মাের আজি। যত দুঃখ-দৈন্য,
ধীরে বিস্তারিয়া তার করাল বদন,
গ্রাসিয়াছে সর্বগ্রাসী সিন্ধুর মতন,
জয়--বিহীনা এই দীনা রাজধানী।
একি শুধু তব তরে নহে? ওগগা রাণী,
নিরাভরণার সাজে রাজ্য-লক্ষ্মী মম,
বিফলে ফিরিয়া গেছে ভিখারিণী সম,
রুদ্ধ কক্ষে করিয়া আঘাত। মনে পড়ে,
কুজিত নিকুঞ্জ মাঝে—ক্ষণেকের তরে-
;
?
২১

বিপন্ন প্রজার ঘন আসন্ন ক্রন্দন,
শিথিল করিয়া দিত ও-ভুজ-বন্ধন।
কিন্তু মিথ্যা দারিদ্রের মিথ্যা দুঃখ-রাশি
বেশীক্ষণ পারে নাই উচ্চ কল-হাসি
ঢাকিবারে মিথ্যা-আবরণে। কত গান!
কত হাসি-ভস-কৌতুক! মম প্রাণ,
কি মধু মাধুরী মাঝে ছিল গাে তন্ময় ।
এ মােদের মুকুলিত যমক হৃদয়,
তরল লিঙ্গার দলে উঠিত ফুটিয়া
সুনিবিড় আলিঙ্গনে! শ্রান্ত-ক্লান্ত হিয়া,
আবেশ-বিহ্বলে মরি ঘুমাইত সুখে
ভূজে ভূজে বুকে বুকে আর মুখে মুখে !
সে কি শুধু বসন্তের প্রায়, আশা দিয়ে
দুই দিনে ফুরাইবে বলে’? হায় প্রিয়ে,
ক্ষুদ্র সে দুদিন তার লয়ে মসি-শিখা,
অনন্ত কালের ভালে কি জ্বলন্ত টিকা,
নীরবে আঁকিয়া দিল ! সে ক্ষুদ্র দুদিন,
সুদীর্ঘ জীবনে থাকি জাগ্রত নবীন,
প্রতিদিন দহিবে আমারে !
*
উর্বশী
ত্যজ শােক ?
আজ এ শেষের দিন শুভ দিন হােক!

ওগাে রাজা, ওগাে প্রিয়, ওগাে সুখময়, আমি কি ভুলিয়া গেছি তােমার প্রণয় ? মনে পড়ে, মুকুলিত বিনােদ সােহাগ- বসন্ত-সান্ত্বনা-মাখা নব অনুরাগে, স্বচ্ছ স্নিগ্ধ বিদগ্ধ এ দুইটি পরাণ, তরুণ স্বপন-রাজ্য করিয়া নির্মাণ, ঘুমাইত কি যেন কি সুখে। পড়ে মনে, তােমার চটুল মধু মনমথ-বণে, একে একে, পদে পদে, অবশ হৃদয়, ছেড়ে দিল জীবনের রাজ্য সমুদয় । জড়িত কুঞ্চিত মম শঙ্কিত পরাণ, কবে কোন্ ফুল-ঘায়ে হারাইল জ্ঞান। পাওনি কি প্রতিদান তব প্রণয়ের ? আমি কি বাসিনি ভাল? এ হিয়া-গেহেরু মুক্ত করি সব রুদ্ধ দ্বার-বাতায়ন, আমি কি একান্ত মনে করিনি বরণ ? বুকে বুকে মুখে মুখে অধরে অধরে! এ নব যৌবন খানি দিয়েছিনু ধরে তব উপভােগ লাগি ! এই ক্ষীণা লত, একান্ত তােমারি ছিল চির অনুগতা। ০ পুরুরবা তােমার প্রণয়ে মজি ওগাে বরাননা,

ওগাে মাের অন্তরের একান্ত-আপনা,
তােমার প্রণয়ে মজি, তােমারে পাইয়া,
• অন্য নারী হেরি নাই নয়ন তুলিয়া।
। তােমার সপত্নীগণ নীরবে কাদিয়া,
নীরবে ফিরিয়া গেছে সাধিয়া সাধিয়া
ব্যর্থ চেষ্টা লয়ে ; সুখ ফুরাইয়া গেলে,
একটি মলিন হাসি অধরে উদ্বেলে
যেমন নীরবে ফুটি হতাশে তাকায়,
আবার নীরবে কাঁদি তিমিরে লুকায়।
ঝরা কুসুমের পাশে সৌরভ তাহার,
যেমন গুমরি দুখে করে হাহাকার।
তাই আজ তাহাদেরি দীর্ঘশ্বাস রাশি,
উড়াইয়া নিয়ে গেল যত সুখ-হাসি।
হায় প্রিয়ে, বৃথা এই জীবন-বন্ধন।
অশেষ বেদনা ভরা সুদীর্ঘ ক্রন্দন।
উর্বশী
নহে দেব, নহে তব বিফল জীবন।
হেরিয়া তােমার জন্ম, সুর-নরগণ,
সমস্বরে উঠেছিল জয়ধ্বনি করি;
দুর্দম অসুরকুল ভয়ে থরহরি
কম্পমান হয়েছিল আপন আলয়ে;
দেবকন্যাগণ, শুভ মাঙ্গলিক লয়ে
২৪

; এসেছিল করিবারে তােমারে বরণ- স্মিতহাস্যা পুলক-চঞ্চলা ; পিকগণ, উঠেছিল সুখে গুঞ্জরিয়া ; বেগবতী নটিনী তটিনী, ভুলিয়া আপন গতি, নিমেষের তরে হয়ে স্থিরা অচঞ্চলা, কি গান গাহিয়াছিল মদির-বিহ্বলা। সমস্ত প্রকৃতি, লয়ে আপন সম্ভার, পুলকে নাচিয়াছিল, হেরিয়া তােমার শুভ জন্ম-সুধীর বিকাশ ! তব তরে, দ্য-ভীত ম্লান ক্ষুব্ধ বিশ্ব-চরাচরে, পড়েছিল আনন্দের সাড়া! আজ তুমি ভুলেছ কি সে সকল কথা? বিশ্ব ভূমি ঐ হের কি উৎসুক রয়েছে চাহিয়া, কবে তুমি শুভক্ষণে উঠিবে জাগিয়া। জাগাে জাগাে পুরুরবা ! চেয়ে দেখ আজ, বিষন্ন মলিন সর্ব দেবতা সমাজ। আজিকার এই নব বিমল প্রভাতে, ছিন্ন কর সব মােহ দৃপ্ত পদাঘাতে ! পুরুরবা ৮ আজি মনে পড়ে, সেই প্রথম যৌবনে বসন্ত-মলয়-বহা কুসুম-কাননে- নব বিকশিত শুভ্র ফুল-বীথি সম, ২৫

ফুটিয়া উঠিল যবে হিয়া-ফুল মম!
কি যেন স্বপন-মাখা গােপন সন্ধানে
পরাণ খুজিত করে তৃষিত নয়ানে !
কোন্ মধু স্মৃতি-কণা স্মরণে পশিয়া
আঁকড়ি ধরিতে কারে চাহিত নাচিয়া !
তার পর একদিন, কোন্ শুভক্ষণে,
কোন্ মহা মাহেন্দ্র-মুহূর্তে, তব সনে
হােলা দেখা! দেবরাজ ইন্দ্রের আহ্বানে
গিয়েছিনু স্বর্গলােকে। নৃত্য-গীত-গানে
হেরিলাম সুর-সভা কলিত মুখর
শুভ্র হাসিটির মত নিৰ্ম্মল ভাস্বর।
হেরিলাম শত শত কৌমুদী-নিন্দিত
ফুল দিব্য দেবাঙ্গনা—সুরেন্দ্র-বন্দিতা।
তার মাঝে প্রস্ফুটিত যেন শতদল,
তােমার লাবণ্য-মাখা শােভা ঢল ঢল
হাসিয়া উঠিল মম হিয়া-সরােবরে।
শূন্য-মনে দেহ লয়ে ফিরিলাম ঘরে।
চির স্বচ্ছ সুনির্মল প্রফুল্ল পরাণ,
অন্তরে আলিয়া দিল দীপক শ্মশান।
সারা নিশি কাটিল হুতাশে—নিদ্রাহীন।
প্রভাত-বিহগ-গানে, প্রফুল্ল নবীন
অরুণ-কিরণ-উষা আসিল হাসিয়া-
২৬

'
পূর্বাচলে স্বর্ণমেঘে ভাসিয়া ভাসিয়া-
দগ্ধ মম মসী-লিপ্ত অভিশপ্ত শিরে
ঐকান্তিক আশীৰ্বাদ সম। ধীরে ধীরে
কণ্টক-শয়ন ত্যজি চলিনু কাননে,
জুড়াইতে সুশীতল সমীর সেবনে
প্রস্ফুটিত প্রভাত-সুষমা। কি হেরিনু
নন্দন কাননে ? প্রতি অণু-পরমাণু
উঠিল নাচিয়া, হেরিয়া ও-দিব্য জ্যোতি
উদ্যানের অরুণ দোলায়! মূর্তিমতী
উষা মরি হাসিল কাননে, এ আমার
অন্ধকার চিতে পরাইতে জ্যোতিহার
কিরণ-ভূষণ। তােমারে ঘেরিয়া সুখে,
হেরিনু অপ্সরা-কুল স্মিত হাস্য-মুখে
কেহ বসি, কেহ বা শয়নে ;—শত শত
অগণিত জ্যোতিন্ময়ী তারকার মত।
মাঝে শােভে তক দীপ্ত চারু চন্দ্রানন
কৌমুদী-বিভায় ! হেরি মম আগমন,
অসময়ে ভাঙিল চাঁদের হাট! সবে,
চঞ্চল চরণে কোথা লুকালাে নীরবে
ব্যাধ-শরে ভীত ত্ৰস্তা কুঙ্গিনী সম ;
অথবা যেন রে,সবিতার দিব্য হেম
জ্যোতির্ময় রথে, যােজিত অযুত-সংখ্য
২৭

.
তুরঙ্গম রাজি, হিল্লোলি গগন-অঙ্ক
তড়িতে লুকালাে। শুধূ ছিলে একা তুমি-
উজলিয়া নন্দনের ম্লান বন-ভূমি।
এতদিনে ফিরে পেনু হারানাে পরাণ !
এতদিনে যৌবনের বাড়িল সম্মান !
যা কিছু আছিল ঢাকা হৃদয়-নিভৃতে,
এতদিনে সে সকল পাই দেখিতে ।
তব ফুল্ল নিমীলিত নয়নে চাহিয়া,
প্রস্ফুটিত হলাে মম এ তরুণ হিয়া।
অযাচিত ঢেলে দিনু তনু-মন-প্রাণ,
আগ্রহে যাচিমু তার শুভ প্রতিদান।
উর্বশী
;
শুনি নাই বচন তােমার। হেরি তব
অনিন্দিত অনুপম কান্তি অভিনব,
হই আপন-হারা। পুলকে নিশ্বসি
ভুলিলাম অমরার রূপসী উর্বশী
আমি; বারনারী-ভালবাসা পরিহাস
মাের। তব প্রেম-মাখা মৃদু মধু ভাষ,
তড়িৎ সঞ্চারি মম হিয়ার পরাণে,
কঁদিয়া উঠিল কোন্ অকথিত গানে !
মাতালের মত নীরবে পড়ি ঢলি
বক্ষের উপরে! শুধু প্রিয়তম বলি

একবার ডাকিলাম আবেশ-উতালে। পুরুরবা = লইলাম বক্ষে টেনে বাহুর আড়ালে। যক্ষের রক্ষিত কোন্ গুপ্ত রত্ন-ধন, এ দীন-দরিদ্রে মরি, কে গাে বিতরণ করে গেল! কোন্ ভাগ্য বলে, সকরুণ মিনতি আমার, নিমীলিত লাজারুণ মেখে দিল প্রস্ফুটিত সরােজ-আননে। মিথ্যা স্বর্গ ত্যজি এ মর্ত্যের ভবনে ফুটন্ত নন্দন যেথা হাসিল গােপনে, নন্দিত নিকুঞ্জে মম একান্ত শয়নে। সঙ্গে তুমি—ওগাে নিঃসঙ্গিনী! বক্ষে তুমি- সব সাধনার চির পরিণতি-ভূমি! অঙ্কে তুমি-সােহাগ-জড়িতা লতা স্নিগ্ধ- শােভাময়ী! ওগাে বরাননা, লুব্ধ দিগ্ধ অনুগত আমি, একান্ত নির্ভর ভরে ছিঃ নিদ্রামগ্ন, তােমারে লইয়া ক্রোড়ে! চুম্বন-চুণিত তব কুন্তল-আড়ালে, সমস্ত ভাবনা মম লুকালাে বিরলে ! অঙ্গের পরশ-মাখা রস-আলিঙ্গনে, মরণ কঁাদিয়া দুখে মরিল চরণে। আঁখি, হেরি নবনীত ফুল তনুখান, । ২৯

কি দিব্য স্বপন-রাজ্য করিল নির্মাণ।
সব ভেঙে গেল আজি একটি নিশ্বাসে !
অকালে সকল সাধ মরিল তরাসে !
ধিক্ রে জীবন ! ধিক্ কৌতুক-বিলাস!
এক ক্ষুদ্র অনুপল নাহি রে বিশ্বাস।
উর্বশী
হে নাগর, ভুলে যাও পুরাতন কথা।
তােমার করুণ-স্বরে পাই বড় ব্যথা—
দয়াহীনা প্রেমহীনা আমি। পুরাতন
পরিত্যক্ত প্ৰেম-আলাপনে হে রাজ,
নাই কোনাে ফল। ঝরা-কুসুমের হেরি
ছিন্ন শুষ্ক তাপদগ্ধ লুষ্ঠিত মাধুরী,
কি ফল সে আলােচনে, কবে ছিল তার
বিকশিত
ফুল।
হাসি লাবণ্য-সম্ভার ?
প্রণয়ের এই তাে ধরণ । চায়,-পায়
একান্তে সাধিয়া ; পুন হারাইয়া যায়
হায়রে নিমেষে। নিদাঘ-আতপ-তাপ,
ধৌত করে আপনার জ্বলন্ত সস্তাপ
বরষার সরস ধারায় ; শরতের
নবীন কিরণ-ছুপ্ত পিঙ্গল মেঘের
অনন্ত বাসনা-মাখা মৃদু-মন্দ্র রব,
নীরবে বিতরে তারে শীতল শৈশব ।

আবার তুষার শ্বেত হেমন্ত-শিশির
নিমেষে করিয়া দেয় ধরণীর শির
জরা-গ্রস্ত শুভ্র-কেশ বৃদ্ধের মতন;
পুনরায় বসন্তের মলয় পবন
যৌবন ফিরিয়া আনে ফুল্ল মরকত,
রাজকুল-ধুরন্ধর যযাতির মত ।
যেরূপ দিবস-নিশি আসে আর যায়,
সেইরূপ সুখ-দুখ নাচিয়া বেড়ায়।
তােল মুখ ওগাে প্রিয়, ওগাে প্রাণেশ্বর,
তােল মুখ, মুছে ফেল নয়ন-নিঝর।
মনে রেখাে নাথ, তােমারি আধান মম
শরীরে সঞ্চারি, রহিয়াছে মুক্তা সম
এ শুক্তি-আগারে। ভুলিব কেমনে তব
“অফুরন্ত
প্রীতি ! তােমার কুমার নব
জন্মিবে যখন, সে সুধা বদন চাদ
কঁাদাইবে মােরে, পাতিয়া মােহের ফাদ
অন্তরে আমার। সে বদনে তব ছায়া,
রচিবে আমারি লাগি কি মােহন মায়া
বজ্ৰ-বন্ধনের ডাের! ছিড়িব বন্ধন ;-
তােমারে ভেটিবে আসি তােমার নন্দন,
আমি পড়ে রব একা! ভুলে যাও দুখ ;
প্রসন্ন হইবে তুমি হেরি পুত্র-মুখ ।

পুরুরবা
বৃথা মােরে ছলিয়ােনা আর। বৃথা লােভ
দেখায়ােনা-কল্পনা-স্বপন। নাহি ক্ষোভ
সন্তানের লাগি। কে এমন আছে মুখ
জ্ঞান-বুদ্ধিহীন, ভুলিবে এ শূন্য তর্ক
ব্যর্থ বাক্য-জালে লাে ত্ৰিলােক-বিমােহিনী ?
জানি আমি তােমারে চতুরা! জানি জানি
কেমন সে সন্তান তােমার,-ভবিষ্যৎ
বংশধর দুলাল আমার! মনােরথ
পূর্ণ হবে এতদিনে, এই ক্ষুদ্র বীর
বালক হইতে। হারাইয়া স্বাদু ক্ষীর
মাতৃ-বক্ষ-দীর্ণ দ্রবধারা—উচ্চৈস্বরে
সন্তান আমার কাদিবে বেদনা ভরে,
স্নেহহীনা নিষ্ঠুর। সে জননীর লাগি,
করুণ-কাতর স্বরে স্নেহ কোল মাগি।
মাতৃহারা-বক্ষহারা—স্তন্যদুগ্ধহারা,
কে পারে ত্যজিতে শিশু শুধু তুমি ছাড়া?
উর্বশী
=
হে মাজ, নিষ্ঠুর বচনে বৃথা আর
দিয়ােনা বেদনা ওগাে, হৃদয়ে আমার ।
সােহাগিনী শৈবলিনী বহি যায় যবে
তরঙ্গ-হিল্লোলে নাচি কুলুকুল রবে-

গান গেয়ে আপন গৌরবে, ঢেলে দিতে ললিত যৌবন কান্তি প্রফুল্লিত চিতে অনন্ত প্রসান্ত ওই সিন্ধুর চরণে নিমেষের তরে তার পড়ে কি গাে মনে, কোন্ হতভাগ্য বসি স্তব্ধ বেলাভূমে, শীতল সুস্নিগ্ধ মন্দ মলয়ার চুমে, কবে হারায়েছে তার উশৃঙ্খল প্রাণ, শুনিয়া সে উন্মাদিনী তটিনীর গান ? কুলে হেরি শ্রান্ত জন, যদি দয়া বশে হেলায় খেলায় নাচি তরঙ্গ উলসে,- করে বিন্দু বারি দান তৃষিত অধরে অকারণে, শুধু ক্ষণিক কৌতুক ভরে ছুয়ে যায় যদি তার রােমাঞ্চিত দেহে বেপথু সঞ্চারি ; তরঙ্গিনী দোয়ী নহে তায়। কে না জানে প্রিয়তম, অপ্সরার নবনীত কম তনু মাঝে, শতধার বজ সম পাষাণ হৃদয় ;-স্নেহহীন- মায়াহীন—প্রেমহীন—নিরস—কঠিন। পুরুরবা তবে দগ্ধ কর মােরে—ওগাে দগ্ধ কর বজানলে পােড়াইয়া সৰ্ব্ব তাপ হর- নিরদয়া কঠিনা রমণী ! এই মম

অনাদৃত ব্যর্থ প্রাণ, শুষ্ক তৃণ সম
তারে দাও জ্বালাইয়া -অবহেলা ভরে ;
বিন্দু ভষ্ম যেন তার না-রয় এ ঘরে।
সমস্ত হৃদয় হয়ে একটি নিশ্বাস,
নীরবে মরণ মাঝে লভুক আশ্বাস।
হের ওই সবিতার হেম-রশ্মি রথ,
পূর্বাচলে আলােকিয়া অন্ধকার পথ,
বিকশিছে ধীরে কনক-কিরণরেখা।
নীরব প্রকৃতি-রাণী
ধূয়ে
মসী লেখা
স্বর্ণ ঝারি প্রবাহিত জ্যোতির্ময় স্রোতে,
নিশির শিশির-সিক্ত দুস্থ বক্ষ হতে,
জাগিয়াছে মুখর চঞ্চলা। নীড়ে নীড়ে,
বিহগ কাকলি-ধ্বনি ললিত সুধীরে
কহে ডাকি,আমানিশা হলাে অবসান।
অখিল ব্ৰহ্মাণ্ড-জোড় সমস্বর স্থান,
গাহে আজি আমারই বিদায়ের গান।
এসএসকর আলিঙ্গন! দুটি প্রাণ
এক হােক্, স্বপ্ন সম ক্ষণিক মিলনে।
তোমার অমল শুভ্র জ্যোতির কিরণে,
ক্ষণতরে অন্ধকার কর গাে বিনাশ,
হীনা এই নন্দনের মূর্ত-পরিহাস
৩৪

বার-যােষিদের প্রাণ হতে।
পুরুরবা
০
বনাননে,
একান্ত তােমারি আমি জীবনে মরণে।
এস তপ্ত বক্ষে ফুল্ল কুসুমের সর্ম !
তােমার বাসনাময় রূপ অনুপম,
সযত্নে মুছিয়া দিক্ সকল বাসনা
অসার এ প্রাণ হতে। আর তত দিবনা
ছেড়ে!-শুন শুন ত্রিদিবের অধিপতি।
শুন দিক্-পাল! সবার চরণে নতি
এ ভাগ্য-হীনের। হের দৃঢ় আলিঙ্গনে
এই তাে বেঁধেছি আমি হৃদয়ের ধনে,
হৃদয়ের কনক-পিঞ্জরে। এই মহা
পুণ্য-বলে মাের, প্রতপ্ত শশাণিত-বহা
দীর্ণ প্রাণ, হােক্ চির নন্দিত শীতল ।
এ রত্ন-সুকৃতি মম কর গাে সফল।
অনন্ত—যুগান্ত কাল মাের প্রাণ-প্রিয়া,
আমার বক্ষের আড়ে থাক্ লুকাইয়া।
দেহ বর দীনজনে হে দেব-সমাজ ।
প্রেমের সাধনা মম সিদ্ধ কর আজ।
উর্বশী
লহ-লহ দেবতার আশীর্বাদ নাথ।

এস দোহে দেবােদ্দ্যেশে করি প্রণিপাত ।
ওই শুন অন্তরীক্ষে বাণী-অশরীরী-
তুমি রবি, আমি তব কিরণ-কিঙ্করী।
তােমার উজল বর্ণে লুকাইয়া আমি,
যুগে-যুগে জেগে রব হে হৃদয়-স্বামী!
প্রতি প্রভাতের জাগরণে, তুমি হবে
সবিতা-সুন্দর ; পুলক-আলােকে রবে
ব্রহ্মাণ্ড আবরি। নিত্য আমি তব সনে
খেলিব চাতুরী-খেলা প্রভাত-শবনে,
আঁধার ও আলােকের মহা-সন্ধি স্থলে
দাড়ায়ে অমল স্নিগ্ধ উদয়-অচলে।
তব সনে যুক্ত প্রাণে রব চিরদিন,
অথচ একান্ত মুক্ত স্বতন্ত্র স্বাধীন
বার-রমনীর মত। সমস্ত ধরণী,
গম্ভীর সংযত চিতে করি জয় ধ্বনি,
চাহিবে মােদের পানে স্তম্ভিত বিব্রত,
দন্ত-ভরা উচ্চশির করি অবনত ।
মােদের মিলন হেরি, দুঞ্জিয় দুর্জন
সংসারের শল্য যত,হয়ে ক্ষুন্ন মন
নীয়বে লুকাবে মুখ কোন্ অন্ধকারে –
প্রাণভয়ে ভীত । সাধু-সজ্জনের দ্বারে
ধ্বনিবে আনন্দ-রব-মঙ্গল-আরতি,

গভীর উদাত্ত স্বরে শান্ত সাম-গীতি।
দেবতার অভিশাপে,—এই মহা-ক্ষণে
নিবিড় পল্লব-ঢাকা নিকুঞ্জ ভবন,
বিদায়ের অশ্রুধারা দিবে ধৌত করি
রজনীর অসংবৃত কৌতুক লহরী।
বাহু-বন্ধ হইবে শীথিল ; প্রাণে প্রাণে
জাগিবে বেদনা ; বিহগ-কাকলি গানে
চমকি চাহিয়', এস্ত পদে শ্ৰন্ত বাসে
কোমল চরণ কত ছুটিবে আবাসে।
পুরুরবা
তােমার-আমার এই মিলনের ক্ষণে,
কবির কোকিলকণ্ঠ বীণার স্বপনে
গাহিবে কী মহাকাব্য উদার অমৃত ;
কোন্ মহাকবি পদে হইবে লুষ্ঠিত
সে গানের প্রতি তান—প্রত্যেক আখর ;
অনন্ত কালের বক্ষ রহিবে মুখর।
কত কবি হেরি ছবি হইবে পাগল !
ঝরিবে জ্যোতির রেণু করুণু কোমল।
সবিতা-উষার এই মিলনের গান,
মৃত বিশ্বে সঞ্চারিবে পুলক-পরাণ । •
বারাণসী। ২ শ্রাবন, ১৩২২

ঊষা
(ঋগ্বেদ। ১ মণ্ডল, ৪৮ ও ১২৩ সূক্ত )
হে দেব-দুহিতা উষা, কর আগমন
উজলিয়া দশদিক। দেহ দেবি, ধন,
দেহ অন্ন; সুপ্রভাত কর বিতাবরি ।.
দানশীলা পুণ্যবতি, এস দয়া করি।
কুবের ভাণ্ডার তব,-কর উদঘাটন
বার তার ; মৃদু ভাষে কর সম্ভাষণ,
জাগায়ে প্রাণের মম ঘুমন্ত চেতনা।
অনন্ত দিগন্ত-কোলে তােমার সাধনা
সার্থক হউক আজি দেবি! আশা করে’
পাইতে বিপুল ধন, ধন-লুব্ধ নরে
যেরূপ সাগর-বক্ষে সাজায়ে তরণী
করে যাত্রা; সেইরূপ হে রবি-ঘরণী,
চড়িয়া কিরণ-রথে জাগায়ে অ্যালােক
এস, ছড়াইয়া দেবি, অমৃত আলােক।
এস দেবি, এস রাণি, কর আগমন ;.
গৃহ-অধিষ্ঠাত্রী নেত্রী গৃহিণী মতন
পালন কর গাে সবে। তব আগমনে,.
স্থাবর-জঙ্গম-প্রাণী পুলকিত মনে
নমিছে চরণ প্রান্তে ; প্রান্ত পাস্থ্যচয়,
নিশথ-বিরাম শেষে ছাড়িয়া আয়,
;
••

.
চলিল গন্তব্য-পথে ; নীড় ছাড়ি পাখী,
উড়িল গগন বাহি তব জ্যোতি মাখি,
অন্বেষণ করিবারে দিনের আহার।
হে নীহার-রাণি, খােল তােমার দুয়ার,
স্নিগ্ধ জ্যোতি মেখে দাও সুপ্ত ধরাটিরে।
পদ্ম-হস্ত বুলাইয়া শুভ্র ধরা-শিরে
হাস দেবি ; হেরি হাসি, মৃত্যু-ভীত জন,
আয়ু শেষ হলাে বলি করুক ক্রন্দন।
লাজ-রক্ত-রাগে রঞ্জি বিপুল কৌতুকে,
অবগুণ্ঠনের কুণ্ঠা মুক্ত হয়ে সুখে
এলাে শুভ্র উষা-রাণী । কালিমা-আঁধার,
ত্রস্ত হয়ে কালি-মুখ লুকালো তাহার।
পশ্চাতে সবিতা-দেব জ্যোতির্ময় বুথে
দিল দেখা। হেন স্তৈন কে আছে জগতে ?
হেরিয়া স্বামীর চেষ্টা, কৌতুকে যুবতী
মৃদু হাসি রাঙা পদে করিল প্রণতি।
সােহাগে খুলিয়া গেল বক্ষের বসন,
দীপ্ত অনুরাগে বদ্ধ প্রেম আলিঙ্গন।
পতি-উষ্ণবক্ষে সতী মুখ লুকাইয়া,
ধীরে ধীরে জ্যোতি মাঝে গেল মিলাইয়া ।
জগৎ বিস্ময়ে মরি, নমিল চরণে ;
পড়িল প্রাণের সাড়া এ মহা-মিলনে।
২২ ভা, ১৩২১

অগ্নি
(ঋগ্বেদ। ১ মণ্ডল, ৬৫ সূক্ত, ৩৪ ঋক্‌
হে হিরণ্য-রে বত্নি, হে হব্য-বাহন,
স্নিগ্ধ মধু তীব্র জ্যোতি কর বিকীরণ।
যেমন নিরাশ-প্রাণে, লুব্ধা আশা-রাণী
সিঞ্চে শান্তি,—সেই মত তব মধু-বাণী ।
পৃথিবীর মত তুমি প্রশস্ত ধূমল,
পৰ্ব্বতের মত তুমি স্থির অবিচল ;
জলের মতন তুমি জীবের জীবন,
অনন্ত অম্বুধি মত তােমার গর্জন ;
যুদ্ধ-গামী অশ্ব প্রায় গতি অতি দ্রুত,
মথিয়া বিশ্বের শক্তি হও সমুখিত ;
স্নেহশীলা ভগিনীর স্নেহের মতন,
তােমার বর্ধিত স্নেহে সিন্ধু নিমগন।
সকল জঞ্জাল মুক্ত কর হুতাশন,-
দাবানলে দগ্ধ করে অরণ্য যেমন।
২২ ভাদ্র, ১৩২১
৪০

বন
নিবিড় বনভূমি বিথারি অঙ্গ,
নীরব ধ্যানে কার মাগিছে সঙ্গ।
বিশাল দেহ ভার
অসহ বসুধার
রুধিয়া শ্বাস যেন হেরিছে রঙ্গ,
নীরব ধ্যানে কার মাগিছে সঙ্গ।
একাকী সাথীহীন দাড়ায়ে নীরবে, •
গহন-বীণাখানি বাজিছে কি রবে ।
ক্ষণেক থেকে থেকে
বাতাস যায় হেঁকে
ঝকরি জটাজুট অটুট গরবে
গহন-বীণাখানি বাজিছে কি রবে।
p
নিখাদে মধ্যমে ধ্বনিছে অভিনব,
ব্যাকুল মর্মরে উঘারে নানা রব।
কোমল কল তান,
গভীর সাম-গান,
মিশিয়া এক তারে করিছে কি স্তব।
ব্যাকুল মর্শের উঘারে নানা রব।
: ৪১

নীহার-রাণী উষা সবুজ পত্রে
লিখেছে প্রেম-লিপি কিরণ-ছত্রে।
ছায়াতে শঠ শাখী
সে লিপি রাখে ঢাকি,
হেরিবে রবি তারে অযুত নেত্রে ;
লিখেছে প্রেম-লিপি কিরণ-ছত্রে ।
দাড়ায়ে গৌরবে বিশাল শিখরী,
করুণা-জ্যোতি ভালে পড়িছে ঠিকরি
জড়িত লতা-রাণী
অথির প্রেম-বাণী
নিরস তরু শুনি বুঝিল কি করি ।
করুণা জ্যোতি ভালে পড়িছে ঠিকরি
বিহগ কাকলিয়া মুখরে কলতান,
ভ্রমর-গুঞ্জনে ফুলের ভাঙে মান।
ক্লান্ত কাঠুরিয়া
দেহটি এলাইয়া
মরমে গুমরিয়া মৃদুল গাহে গান ;
ভ্রমর-গুঞ্জনে ফুলের ভাঙে মান।
;
প্রখর রবি-করে হারায়ে স্পন্দ
বিটপী পাড়াইয়া বিশাল স্কন্দ।
৪২

সবুজ পাতা-ঢাকা
ছায়াটি
বুকে আঁকা,
আঁধারে আলাে সনে লেগেছে দ্বন্দ্ব ;
বিটপী দাড়াইয়া বিশাল স্কন্দ ।
কে যােগী সমাহিত ধেয়ান মগনে ?
নয়নে এক-দিঠি চাহিয়া গগনে ?
ঝিঝিরা অবিরাম,
ধ্বনিছে প্রাণায়াম,
মােহন বাঁশ বাজে অমৃত লগনে ;
নয়নে এক-দিঠি চাহিয়া গগনে।
হরিণ নিরখিছে শাবক অনিমিখ,
সভয়ে খনে খনে চাহিছে চারিদিক।
কে জানে কোন্ কোণে
নিবিড় ঘন বনে
শমন-রূপী ব্যাধ লুকায়ে আছে ঠিক ;
সভয়ে খনে খনে চাহিছে চারিদিক।
পরশ-সমীরণে হারায়ে তন্দ্রা,
গােধূলি সহবাসে জাগিল সন্ধ্যা।
নিকষ কালাে মুখে
তিমির হাসে বুকে
কি শিশু প্রশবিল জনম-বন্ধ্যা !
গােধূলি সহবাসে জাগিল সন্ধ্যা।
'৪৩

নথর নিশীথিনী নিবিড় কাননে,
হাসিছে একাকিনী জ্যোছনা-আননে।
কুম কম হারে
রসাল ফল ভারে
আনত তনুখানি আবৃত বসনে ;
হাসিছে একাকিনী জ্যোছনা-আননে।
কত কি আছে ঢাকা তৃষিত বুকে তার,
সারাটি জীবনের মরম হাহাকার।
কনক অঙ্গুলে
পরাণ লয়ে তুলে
বেদনা বনফুলে নীরবে গাঁথে হার ;
সারাটি জীবনের মরম-হাহাকার।
নিবিড় বন-ভূমি বিথারি অঙ্গ,
গভীর ধ্যানে কার মাগিছে সঙ্গ!
অনাদি যুগ বহি ।
নীরবে যায় সহি
আতপ-তাপ কত ঝটিকা-রঙ্গ ;
গভীর ধ্যানে কার মাগিছে সঙ্গ।
১৬ শ্রাবন, ১৩২২
৪৪

নন্দিতা নীল সিন্ধু-মাতার
উজলি শীতল অঙ্ক।
উৰ্ম্মি-মথিত উছল বক্ষে,
গােপন হিয়ার সুরভি কক্ষে,
সার্থক কোন্ সাধনা লক্ষ্যে
লালিত তুমি হে শঙ্খ
ত্যজি অতলের সুশীতল গেহ,
মাতৃ-মমতা-বর্ধিত-স্নেহ,
লইয়া শুভ্র কঙ্কাল দেহ
তােমার সমুখান ;
মহা-মহর্ষি দধীচির মত
নীরবে সাধিলে লােক-হিত ব্ৰত,
জীবনে মরণে হয়ে সংহত
পরাণ করিলে দান।
ছাড়িয়া কোমল জননীর কোল,
ধরায় ছড়ালে সুধা-হিল্লোল,
স্নিগ্ধ তীব্র গম্ভীর রােল
বাজিল গগন গায় ;

মধুর ধ্বনির রন্ধ্রে রন্ধে,
মঙ্গল নাচে জীমূত-মন্দ্রে,
গ্রহ তারা আর তপন চন্দ্র
মুগ্ধ নয়নে চায়।
নব স্বর-লােক করিয়া সৃষ্টি
ভূতলে ঢালিলে আশীষ-বৃষ্টি,
কোন্ স্বপনের স্নিগ্ধ দৃষ্টি
বুলাইল স্নেহ-কর!
সুধা
কণ্ঠের
মঙুল রবে
মােহিত-মগন বিশ্ব-মানবে,
বিমল শান্তি পীযুষ-আসবে
মত্ত হে চরাচর।
শুভ-মঙ্গল-শােভন কর্মে,
অশুভ-নাশন-পূজন-ধৰ্ম্মে,
বাজে তব রাগ সকল মৰ্ম্মে,
সমভাবে সুখে-দুখে
তরুণ অরুণে করুণ লহরে
তব গুঞ্জন গগনে বিহরে,
থমকিয়া উষা চমকি শিহরে,
লুকায় রবির
বুকে।
৪৬

প্রভাত-কাকলি-ধ্বনির লগনে
বাল-রবি হাসে উদয় গগনে,
জাগ্রত ধরা কৰ্ম্ম-মগনে
গাহে জীবনের গান;
“মধ্য-দিনের তপ্ত তপনে,
রক্ত-রবির আঁখির দাপনে,
তব ও কার মন্ত্র বপনে
বাজে মঙ্গল তান।
!
দিনকর যবে মরণের শ্বাসে
দিবা-অবসানে স্নান মুখে হাসে,
সম্ভাযযা তারে গম্ভীর ভাষে
তুমি হে বৈতালিক !
সন্ধ্যা-বধূর আবাহন-রাগে,
সান্ধ্য-গগনে ধ্বনিছ সােহাগে;
ক্লান্তি-কুহেল ক্ষান্তির যাগে
তুমি মহা ঋত্বিক।
তব ফুৎকারে আঁধার বিনাশে,
নিশীথে আলােক-অনল বিকাশে,
সে অনলে শশী-তারকারা হাসে
পরি কৌমুদী-মালা
৪৭

তটিনীর বুকে, পাদপ-নিকরে,
দেবালয়ে, পথে, সৌধ-শিখরে,
পুলক-প্লাবিত জ্যোছনা ঠিকরে,
স্বরগ-স্বপন ঢালা।
শুনিয়াছ তুমি, উদার মহান্
মহাসাগরের কল্লোল গান,
সে সুগম্ভীর ভৈরব তান
প্রাণের পবে জাগে;
সিন্ধু-গামিনী নদীর ভাষণ
শিখায়েছে সুধা কল-কল স্বন,
কালের ঝুলনে মৃদু ও ভীষণ
হিন্দোলে সুর-ফাগে ।
মন্দিরে তুমি আরতি-অঙ্গ,
উৎসব দিনে উলাস-রঙ্গ,
উদ্বাহে উলু-রবের সঙ্গ
তব মঙ্গল ধ্বনি ;
তােমার আরাবে যােদ্ধ, পরাণ
বৰ্ম্মের নীচে বহিছে তুফাণ,
পিধান-বদ্ধ লুব্ধ কৃপাণ
নাচে মৃদু ঝন্ঝনি।
৪৮

;
তােনারে পাইয়া মদন-মােহন
ছাড়িল ললিত মুরলী গাহন,
বিফল গােপীর চটুল চাহন,
পিরীতির রস-গীত
শঙ্খ হে, তব ডঙ্কার রবে
ভারত-যুদ্ধে সাজে কৌরবে,
ক্ষত্ৰ-শােনিত-মহা-উৎসবে
তুমি ছিলে পুরােহিত।
হিন্দোলে যবে বাসুকীর শির,
ঘন কম্পনে নাচে ধরা-নীর,
তব ভৈরব-নিনাদ গভীর
সঘনে ফুকারি ডাকে ;
নিদাঘ তাপের প্রদাহ যেমন,
তেমনি সে স্বর দহে তনু-মন,
কাপায়ে ভূধর কান্তার বন
গগনে নাচিতে থাকে।
ভেদিয়া যখন মেঘ-আবরণ,
ঠিকরি আকাশে বিজলী-বরণ,
ভীষণ দৈত্য করি গরজন
ভুতলে নামিয়া আসে,
৪৯

।
তখন ব্যাপিয়া নিখিল ভুবনে,
তব নাদ বাজে ভবনে-ভবনে,
বসিয়া রুদ্ধ দ্বার-বাতায়নে
কম্পিত সবে ভাসে।
উৎসব মাঝে বন্ধুর দল
;
গৃহ-প্রাঙ্গণে করে কোলাহল,
দুঃখ-দিনের চক্ষের জল,
কেহ নয় তার ভাগী
তুমি জ্বালাইয়া মঙ্গল বাতি
শুভ দিনে সুখে কর মাতামাতি,
নীরবে কাটাও সুদীর্ঘ রাতি
রােগের শিথানে জাগি
ধন্য হে তুমি সুধীর সুজন,
অষুনিধির বুক-চেরা ধন,
মরণে পেয়েছ নব যৌবন,
কোমল করুণ প্রাণ ;
নবীনার নব সঙ্গ-রসে,
লালসা-ছুপ্ত অধর পরশে,
বাজাও রাগিনী ললিত হরষে,
উছলে পুলক-বান।

p
চন্দ্রের চারু অমল জ্যোছনা
যে-নারীর পদ-নখর-তুলনা,
তুমি হে তাহার গ্রীবার কামনা,
কন্তু তােমার নাম ;
সার্থক তব নন্দিত স্বরে
নন্দন নাচে প্রতি ঘরে ঘরে,
সকল বেদনা গুমরিয়া করে,
মঙ্গলে বিশ্রাম।
রমণী অধরে পাতিয়া আসন
গুঞ্জরি কর প্রণয়-শাসন,
সােহাগ-জড়িত রাখীর বাঁধন
বেঁধেছ সতীর করে ;
যে-ভবনে তুমি রয়েছ অচলে,
চঞ্চল সেথা আছে অবিচলে,
জনার্দনের চারু করতলে
শােভিছ পুলক ভরে।
কোটি-অৰ্ব্বদ করি পরাভব
তােমার সংখ্যা জাগে অভিনব,
অমূল তােমার বিত্ত-বিভব,
উঠিছে উদধি ছাপি;

তাই কি লক্ষ্মী পদ্মের নীরে,
বিছায়ে চরণ তােমার শরীরে,
ভক্ত মানবে ডাকিছে সুধীরে
হাতে লয়ে হেম-ঝাঁপি ?
জীবন-প্রভাতে মেলিয়া নয়ান
শুনি প্রথম তব শুভ গান,
শিশির-সিক্ত কুসুম সমান
যেদিন ফুটিল হিয়া ;
যৌবনে কোন মুখর নিশিতে,
তব মঙ্গল সুধা-সঙ্গীতে,
বাঁধিল আমারে প্রেম-শীকলিতে
প্রাণের পরাণ-প্রিয়া!
আজি মরণের কূলে দাড়াইয়া
উৎসুক আমি রয়েছি চাহিয়া,
জীবন-বীণাটি উঠিবে গাহিয়া
তােমার রাগিনী কবে ;
শেষ খেয়া যবে লইয়া আমায়
নীরবে নাচিবে অকূল সীমায়,
শান্ত পরাণ যেন গাে ঘুমায়
তােমার মহান্ রবে ।
১৪ আবন, ১৩২২
৫২

শ্রীকৃষ্ণ
৩
ব্রজ-অঙ্গনা-আঙিণা লজ্জি, গােপী-অঞ্চল হইয়া মুক্ত,
যেদিন কংশ করিয়া ধ্বংশ হইলে বীৰ্য-গরিমা যুক্ত ;
রুদ্ধা জননী উদ্ধার করে সাধিলে যে-কাজ ছিল অসাধ্য,
হস্তে লইলে সুদর্শন হে,-ছাড়িয়া মােহন মুরলী-বাদ্য
;
সেই দিন হতে ভারত-গাথায় গ্রথিত হইল নবীন সূক্ত,
জীর্ণ ভারতে শীর্ণ পাদপে শ্যাম পল্লব হইল যুক্ত।
পাঞ্চজন্য-শঙ্খ নিনাদি আবার এস হে ভারতবর্ষে,
নব জাগরণে দেহ জাগাইয়া-বিপুল পুলকে অমিত হর্ষে।
জরাসন্ধ ও কাল্-যুবনের দারুণ দম্ভ না-করি গ্রাহ,
রৈবত-শিরে রত্নধী-তীরে প্রতিষ্ঠাপিলে নবীন রাজ্য।
রাজসূয়-যাগে পাণ্ডব জাগি পাইল তােমার অচল সৌখ্য,
দিগ্বিজয়ী সে বাহিনী ফিরিল সকল ভারত করিয়া ঐক্য।
সমরে অটল বীর-বিক্রমী নারায়ণী-সেনা তােমার সৃষ্টি,
তােমার কুহকে ক্ষত্রিয় যত চমকি চাহিল মেলিয়া দৃষ্টি।
পাঞ্চজন্য-শঙ্খ নিনাদি আবার এস হে ভারতবর্ষে,
নব জাগরণে দেহ জাগাইয়া—বিপুল পুলকে অমিত হর্ষে।

তব ইঙ্গিতে কুরুক্ষেত্রে বাজিল দামামা ভীম বাদি,
করি একত্র ক্ষত্রিয় যত রচিলে রাজ্য নব বিচিত্র ।
ধন্য তুমি হে মান্য-সারথী, শক্তি তােমার ভারতে ব্যক্ত,
তােমার তুৰ্য্যে আৰ্য্য-জাতির ছুটিল তপ্ত ধমনী-রক্ত।
প্রিয়া-প্রাণাধিকা দুখিনী রাধিকা, ত্যজিলে তাহারে বহুর কাৰ্য্যে,
ধন্য হে তব পুণ্য কাহিনী, মুগ্ধ ভারত তােমার শৌর্য্যে।
পাঞ্চজন্য-শঙ্খ নিনাদি আবার এস হে ভারতবর্ষে,
নব জাগরণে দেহ জাগাইয়া—বিপুল পুলকে অমিত হর্ষে।
1
সুপ্তি-স্বপন ভঙ্গ হইল পাইয়া তােমার দীপ্ত সঙ্গ,
চিত্রক-তুলি কাব্য-কাকলি কেন কহে শুধু চারু-ত্রিভঙ্গ ?
বাজুক-না কেন বৃন্দা-বিপিনে মুরলীর গান ললিত ছন্দে,
মদির-বিভােলা ব্রজ-কুলবালা ছুটুক না কেন প্রণয়ানন্দে ;
চঞ্চলা নারী-অঞ্চললাপরি রচিত হেরিয়া তােমার শয্যা,
লাঞ্ছিত মােরা বঞ্চিত আজি বুঝিতে তােমার মহতী চৰ্য্যা।
পাঞ্চজন্য-শঙ্খ নিনাদি আবার এস হে ভারতবর্ষে,
নব জাগরণে দেহ জাগাইয়া-বিপুল পুলকে অমিত হর্ষে।

যে-একছত্র রাজ্য রচিতে করিয়াছ তুমি বিপুল চেষ্টা,
পৃথি-প্রথিত সে মহা-মিলনে কোন ক্রুর বিধি হইল দ্বেষ্টা ?
যতেক বর্ণ জাতি ও ধৰ্ম্ম, শাশ্বত এক পতাকা লক্ষ্যে,
বিমল সৌখ্য দুঃখ ভুলিয়া ঐক্য হবেনা মাতৃ বক্ষে ?
ভাঙিবেনা কি হে তম-ঘুমঘাের? জাগিবেনা কেহ সত্য-ধৰ্ম্মে ?
ভারতের ভীতি-বিদ্বেষ-ধাঁধা শেল সম রবে বিধিয়া মৰ্ম্মে ?
পাঞ্চজন্য-শঙ্খ নিনাদি আবার এস হে ভারতবর্ষে,
নব জাগরণে দেহ জাগাইয়া-বিপুল পুলকে অমিত হর্ষে।
৫
হে পুরুষ, ওহে চতুর সারথী, চেয়ে দেখ মেলি অরুণ নেত্র,
নিকষ-নিবিড়-তন্দ্রা-জড়িত নিদ্রামগ্ন ভারত-ক্ষেত্র।
আবার ভারতে বাজাও শঙ্খ, ধৰ্ম্ম-রাজ্য হােক প্রতিষ্ঠা,
শিখাও সকলে তােষর কর্ম তােমার ঐক্য তােমার নিষ্ঠা।
কুরু-প্রাঙ্গণে বস্ত্রহরণে যে পাপ-কালিমা হইল যুক্ত,
এত অপমানে দৈন্য-দহনে সে কলঙ্ক কি হয়নি মুক্ত ?
পাঞ্চজন্য-শঙ্খ নিনাদি আবার এস হে ভারতবর্ষে,
নব জাগরণে দেহ জাগাইয়া—বিপুল পুলকে অমিত হর্ষে।
২৮ শ্রাবন, ১৩২১

বঙ্কিমচন্দ্র
••
হে সৌম্য, ভাষার রম্য কুসুম কাননে-
ভাবের সুতায় গাঁথি, বসি’ নিরজনে
যে-মালা রচিলে ভূমি, পরাইবে বলে
হীন-পরিধানা দীনা বঙ্গমাতা গলে,
সে মা দুর্লভ অতি; সৌরভে তাহার
বাঙ্গালা উঠিল মাতি,—ঘুচিল আঁধার ;
সুপ্ত অলি দীপ্ত মুখে ঝঙ্কারিয়া সুখে,
লুটাইল নব-স্ফুট কুসুমের বুকে ;
মাখিয়া সুবাস মলয়া আসিল ছুটে
বহিতে সম্বাদ দিক-দিগন্তরে; কেটে
গেল লাজ-রক্ত অভিশপ্ত দীর্ঘ নিশি,
উষার আলােকে বঙ্গ উঠিল বিভাসি।
ধন্য তুমি পুণ্যময়, ধন্য দ্বিজোত্তম !
ধন্য তব দীপ্ত রাগ বন্দেমাতরম্।
বরিশাল। ২৬ চৈত্র, ১৩১৪

রবীন্দ্রনাথ
শুভ্র উষারাণী পূর্ব নীলিম গগনে,
একবার শেষ চেয়ে বঙ্কিম-নয়নে
বাঙ্গালার ভাবােদ্যানে, ধীরে থিরে মরি
লুকাইল হাসি মুখ, চারু নেত্রে হেরি
বাল-বি-কিরণ-বিকাশ। বিথারিয়া
দীপ্ত জ্যোতি, অমৃত-আলােক ছড়াইয়া,
হীরক-মণ্ডিত পূত কল্পনার রথে,
এলাে রবি দিব্য দেহধারী।-বীণা হাতে,
ললিত ত্রিদিব ছন্দে, অন্ধকার নাশি,
বিতরিল সুধাকণ্ঠ, শান্তোজ্জল হাসি।
বঙ্গোদ্যানে'রঙ্গোল্লাস ঝঙ্কার শুনিয়া,
বিস্ময়ে বিশ্বের লােক রহিল চাহিয়া
পলক-বিহীন নেত্রে।
হে উজল রবি,
বন্দে তােমা ক্ষীণ ছন্দে দীন-হীন কবি।
বারাণসী। ২৫ কার্তিক, ১৩২১
৫৭

. আশুতােষ-সম্বৰ্ধনা !
স্বাগত হে মতিমান।
বাংলার চির উজ্জ্বল কৃতি
সন্তান গরীয়ান।
বাণীর বিমল মন্দির মাঝে
তােমারি রচিত সঙ্গীত বাজে,
পুরাতন দেহে ওগাে পুরােহিত,
দিয়েছ নবীন প্রাণ।
চির-কাঙালিনী জননী মােদের
নিভৃত কুটীরে লাজে
কোন্ নিরজনে ছিল লুকাইয়া
নিরাভরণার সাজে।
তুমি ঘুচাইয়া ছিন্ন বসন,
পরায়েছ তারে মুকুতা-রতন,
বুচি মহিমার উচ্চ আসন
বসায়েছ তার মাঝে।
বিধান-শাস্ত্রে পণ্ডিত ওগাে
স্বাধীন বিচারপতি।
ন্যায়ের মহিমা রাখিয়াছ তুমি
গণিয়া লাভ-ক্ষতি।
* কলিকাতা ৮নং আল থ্রট সাউথ-সুবীরবাণ-কালেজ ছাত্রাবাসে শ্ৰীযুত আশুতােষ
মুখোপাধ্যায় মহােদয়ের আগমন উপলক্ষে রচিত। (৬ এপ্রিল, ১৯১৭)।

জাগায়ে দেশের সুপ্ত পরাণ
আনিয়াছ তুমি কৰ্ম্মের বান,
হে কৰ্ম্মবীর, তােমার আহ্বান
ফিরায়ে দিয়েছে মতি।
সমাজের তুমি শির্ষ-সেবক,
মানে নাই ভয়-বাধা ;
জাগ্ৰত সদা তােমার প্রতিভা
ঘুচাতে দেশের আঁধা।
বাংলার মৃত শ্মশান-যন্ত্র,
জীবন জেগেছে তােমার মন্ত্রে,
ধ্রুব কল্যাণ উদার তন্ত্রে
তােমার বীণাটি সাধা।
ওগাে ব্রাহ্মণ, ওগাে ঋত্বিক,
বঙ্গের মহীয়ান।
লহ এ ক্ষুদ্র ভকতি-অর্ঘ্য
সরল প্রীতির দান।
যাত্ৰীক মােরা বাণী-মন্দিরে,
বন্ধুর পথে চলিয়াছি ধীরে,
তােমার আশীষ বহিয়া এ শিরে
সার্থক হবে প্রাণ।
কলিকাতা। ২০ চৈত্র, ১৩২৩
৫৯

মিলন সঙ্গীত
উৎসব-শেষে উৎসুক প্রাণ মিলন-হরষে মাতি,
শত ত্রুটি লয়ে দাড়ায়ে আঁধারে মাগিছে আশীষ-বাতি।
নাহি আয়ােজন নন্দন-ফুল,
নাহি চন্দন ধূপ গুগ শুরু,
পূজার অর্ঘ্য আছে শুধু তার ভকতি-কুসুম-কাতি।
সরল মনের লহ অঞ্জলি,
উলাসে চিত্ত উ উছলি,
বাণীর বিমল মন্দির পথে তােমরা রহিয়াে সাথী।
ও-পার হইতে নবীন বরষ,
আসিবে যখন বহিয়া হরষ,
পুন যেন পাই সঙ্গৱস, করযােড়ে এ মিনতি।
আজি যেই বাণী পাই শুনিতে,
বাজুক সে ধ্বনি হিয়ার বীণাতে,
হাসুক তপন তমস-গগনে নাশিয়া আঁধার রাতি ।
কালীঘাট। ১৫ চৈত্র, ১৩২৩
-
* কলিকাতা খিদিরপুর-অ্যাকাডেমীয় পুরস্কার বিতরণ-সভার জন্য রচিত।

বিবাহ-যৌতুক
(অমলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীমতী লীলা দেবী )
আজি তাপস-বক্ষ দুয়ারে একি রে
মঙ্গল-সুরে সাহানা গান !
কোন অমল হৃদয় লীলার কমলে
কে করিল আজি সম্প্রদান !
কতনা ঝঝা কতনা বাতে
কতনা তীব্র বেদনা-ঘাতে,
নিবিড় নিকষ আঁধার রাতে
যে-হিয়া হয়নি কম্পমান ;
আজি কোন্ সুরপুরে, কি গানের সুরে,
খুলে গেল সেই মুদিত প্রাণ।
বুঝি খুলি-খুলি করি এতদিন ধরি
হুতাশে আছিল মুহমান ;
আজি কুসুম-সায়কে রতির নায়ক
হানিল এ কোন্ মােহন-বাণ !

বাদল দিনের মাদলাঘাতে,
চকিত চাঁদের তরল রাতে,
এ কোন্ শিথিল কোমল হাতে
আগল ধরিয়া দিল গাে টান।
কোন্ কাজল-জলদ বক্ষ বিদারি
বুনিল তারকা-মণির থান।
আশা-নিরাশায় ফিরে-ফিরে চায়
নবীন দুইটি তরুণ প্রাণ ;
আজি কৌমুদী-সাত কুমারের তটে
মহা-মিলনের অর্ঘ্য দান।
অমল গগনে অমল চাদ,
অমল ধরায় অমল বাঁধ,
অমল হিয়ায় লীলার ফাদ,
হেরিয়া উছলে পুলক-বান।
হলাে বসুন্ধরার গন্ধ-বাতাসে
দুইটি হৃদয়ে একটি প্রাণ।
বারাণসী। ৩২ আষাঢ়, ১৩২৩
* এই কবিতাটির ভাব ও ভাষা পরম স্নেহাস্পদ স্বর্গীয় ভাই নলিনীরঞ্জন
বন্দ্যোপাধ্যায়ের ; কেবল গাঁথুনীটি আমার।
৬২

বিবাহের স্নেহেপহারঃ
মণি! আজ তাের বিয়ে ।
আজি শুভ প্রতিপদে,
ত্রিদিবের দেশ হতে,
এসেছে দেবতা তাের ফুল-মালা নিয়ে ;
আজ তাের বিয়ে।
সঁপিয়াহৃদয়-মন
যে-যজ্ঞ সেধেছ বােন,
পূৰ্ব্ব জন্মে বহু পুণ্যে সংসার-আসরে ;
আজি তাের শুভ দিন,
লহ যজ্ঞ-ফোটা চিন,
পুষ্পিত প্রাঙ্গণ মাঝে দিব্য এ বাসরে।
পরিধানে রক্ত চেলি,
ভক্ত সাজে এস চলি,
দেহ-মন-প্রাণ ঢালি দেহ স্বামী পদে ;
অনন্ত জীবন-পথে
চল দোহে এক বথে,
এক ধ্যানে এক প্রাণে সম্পদে বিপদে।
* বর—ইউপেন্দ্রকিশাের অচার্য চৌধুরী। কনে'—শ্ৰীমতী সুনীতিবালা দেবী
( মণি )। উপহার দাত্রী-দিদি। তারিখ-১৭ অগ্রহায়ণ, ১৩২১।

স্বামী-যে নারীর প্রাণ,
বিধাতার পুণ্য দান,
প্রেমময় মূর্তিমান মত্তলােক মাঝে ;
বিশ্বের অমৃত দ্যুতি,
বাসনার পূর্ণাহতি,
পূর্ণ তৃপ্তি পূর্ণ শান্তি চরণে বিরাজে।
হয়ে স্নাত শুদ্ধ নত,
সাধ হর-গৌরী ব্রত,
সে ব্রত জীবন-ব্যাপী সেব-অনুষ্ঠান ;
ভােগের রঞ্জিত পটে,
তেয়াগ উঠিবে ফুটে
যেই দিন হবে তাের ব্রত সমাধান।
যে-দেশে চলেছ তুমি,
সে নহে বিদেশ ভূমি,
আদরে আপন ভাবি থেকে। ফুল্ল-মনে ;
শাশুড়ী মায়ের মত,
হয়ে তার অনুগত,
সন্ত্ৰমে করিয়াে নতি যত গুরু জনে।
দাস-দাসী প্রতিবাসী,
হেরি তাের পুণ্য হাসি,
করুক সকলে ধন্য কল্যাণ কামনা ;
৬৪

যেন রে কাঙাল তরে
করুণায় আঁখি ঝরে,
সংসারের সুখ-হলে তাদের ভুলােনা।
আজি উৎসবের মাঝে,
দীপ্ত এ শ্যামল সঁঝে,
গুপ্ত যে বেদনা বাজে অন্তর দলিয়া ;
তুলে’ সে ব্যথার কথা,
বিদায়ের অশ্রুগাথা,
দিবনা রে ভােরে ব্যথা, কাজ নি বলিয়া।
সাজায়ে বরণডালা,
লয়ে দিব্য ফুল-মালা,
এলো সব কুলবালা এ মধু নিশিতে ;
ক্ষুদ্র দুটি নদ-নদী,
বিধি মিলাইল যদি,
ধন্য হােক পুণ্য-প্রেমে রম্য অবনীতে।
।
লাবণ্য মাখিয়া অঙ্গে,
দুকূল ছাপায়ে রঙ্গে,
থেকো দোহে এক সঙ্গে তরঙ্গ-বিভ্রমে ;
তােমাদের ভালবাসা,
মিটায়ে প্রাণের আশা,
হােক চির পরিণত বিশ্ব-প্লাবী প্রেমে।
১৪ অগ্রহায়ণ, ১৩২১

বিবাহ-মঙ্গল
শ্ৰীমান্ মণিময় চট্টোপাধ্যায় (নন্দ)
শ্ৰীমতী সুবােধবালা দেবী।
খালিয়া। ২০ বৈশাখ, ১৩২৩, শুক্লা-প্রতিপদ।
অথ যাত্রা
টা-ডুমাডুম্ টা-ডুমাডুম্ বাজলাে বিয়ের বাজনা,
নন্দবাবুর সুরু হলাে বরের সাজে সাজ না।
বাসাে খুলে ভায়া আমার পড়লে বিষম ফাঁপরে,
অনেক ভেবে ঠিক হলােনা—মানাবে কোন্ কাপড়ে ।
সরু পাড়ের ফ্যাসান এখন, চওড়াটাও মন্দ নয়,
কোন্ কাপড়ে নেকনজরে চাইবে সে জন’ সন্দ’ হয়
ফিফিকে রঙ হয়ে গেছে জুতো-জোড়ার বার্ণিশে,
চুল রয়েছে এলাে-মেলাে মাথার টেড়ির কার্নিসে।
এষ্টাকিনের পৃষ্ঠাসনে হয়ে গেছে মন্ত ঘেঁদ,
দেখােসে নেই তেমন গন্ধ,—নন্দবাবুর বড়ই খেদ !
এই জামাটা নয়কো ভাল, কেমন নরম ইস্তিরি,
এমন সাজে যায় কি যাওয়া আতে নতুন ইস্তিরী?

বাড়ীর ভিতর পুলক ঢালা-মায়ের বুকে মহােল্লাস,
সুজলা-বােন তিড়িং নাচে, দাঁতের ফাঁকে মিঠে হাস।
ঠাকুরমা’টি ঘুচে কাজে, বিশেষ দক্ষ চঁাচানে,
সকল আঁচল গোঁজা আছে বায়ের ট্যাকের পেছনে।
দিব্য-বৌয়ের
নব্য হবার সাধ জেগেছে আজ মনে,
ভাবছে, যে জন আসচে ঘরে টেক্কা দেবে তার সনে।
সবাই মিলে কী হট্টগােল ! বরের বাপ যে নাই এ ভীড়ে ?
পুবের কোঠায় বসে বুঝি গড়গড়াটা টানছে ধীরে !
বৈবাহিকের সঙ্গে তাহার এ বিষয়ে মস্ত মিল,
ইকোর চুমায় ঘুমায় এরা মনের দ্বারে দিয়ে খিল ;
থাক বা না-থাক অগ্নিকণা কন্ধে-দেবীর উদরে,
এদের কাছে থাকবে ইকো কায়মি-করা কদরে।
সাজ লো ভালো নন্দ-ভায়া, হয়েই গেল অনেক রাত,
সকল গুরুজনের পায়ে কলাে সুখে প্রণিপাত।
যাত্রা হলাে শুভক্ষণে নতুন জীবন গড়নে,
মনে মনে মাগুলাে আশিষ বিশ্বনাথের চরণে।
সুবােধ ছেলে নন্দবাবু সভ্য ভব্য ভিরুটি,
এবার হবে আরাে সুবােধ থাকবেনা কো তিরুটি।
.
* কবি-পত্নি।
৬৭

অথ বিবাহ
আজি প্রাঙ্গণ মাঝে,
উৎসুক দুটি তরুণ হৃদয়
সেজেছে নবীন সাজে।
হাতে লয়ে শুভ বরণের থালা
চৌদিকে ঘিরি হাসে পুরবালা,
যুগল পরাণ পুলকে উতালা,
মঙ্গল শাঁখ বাজে।
উর্ধে অমল অম্বর জোড়া
সুনীল চন্দ্রাতপ,
নিম্নে মেদিনী মদির-বিপােরা
হেরিতেছে উৎসব ;
সম্মুখে শিলা নারায়ণ-হরি,
ব্রাহ্মণ দল প্রাঙ্গণ ভরি,
শান্ত শীতল শ্যাম বিভাবরী,
সাক্ষী রয়েছে সব।
এস মণিময়, ঋত্বিক সাজে
লভিতে চরম শিক্ষা;
এ নব নিশার নীরবতা মাঝে-
হবে জীবনের দীক্ষা ।
৬৮

পরিয়া বক্তচেলির বসন
ভক্তের সাজে লহগাে আসন,
যুক্ত-যুগল-করে দুইজন
বিভু পদে মাগ ভিক্ষা।
কাল অমানিশি গেছে পােহাইয়া,
আজি প্রতিপদ চাদ
ওই হের দোহে পূরবে চাহিয়া
উষা পাতিয়াছে ফঁাদ ।
মলয় বহিয়া অমৃত বারতা
কানে কানে কহে অকথিত কথা
এস ঋত্বিক, এস পূজা-রতা,
টুটে যাক্ লাজ-বাঁধ।
;
বন্ধুর এই জীবনের পথে
দুইজনে পাশা-পাশি,
হও আগুয়ান সত্যের রথে
কণ্টক-রিপু নাশি।
দুইটি হৃদয় চলিতে চলিতে
হলাে যদি দেখা এ মধু নিশিতে,
আজি উল্লাস-মঙ্গল-গীতে
দুয়ে’ হােক মেশামিশি ।

ভােগ-লালসার রঞ্জিত পটে
ওই যে সােনালী রেখা,
স্বর্ণ তুলির বর্ণে, নিপটে
‘তেয়াগ রয়েছে লেখা।
তােমাদের নব যুগল জীবনে
সে তুলি ফুটিয়া উঠুক গােপনে,
দারুণ ঝঙ্কা যৌবন-রণে
জীবনের পেয়ে দেখা ।
লহ শুভাশিষ মস্তকে দেহে
স্মরিয়া শ্রীভগবান,
দলিয়া ব্যর্থ সংসার-মােহে
সার্থক কর প্রাণ।
যুগলের স্নেহ-হস্ত পরশে
স্বস্তি-নিঝর ঝরু হরষে,
ধৰ্ম্মে সমাজে দেশে আর দশে
করে যেন যশ গান ।
অথ দ্বিরাগমন
তােরা উলু-উলু দেলো।
আজি শুভদিনে, এ সুখের ঘরে:
নূতন
অতিথি এলো।
৭০

চারিদিকে মরি, রমণীর সারি
মিঠে সুরে কোলাহল;
শুভ মঙ্গল শঙ্খ নিনাদে
নাচিছে শিশুর দল।
গুরু-গর্বিত যে আছ যেখানে
এস সবে হাসি মুখে ;
আমার নূতন
দিদি-মণিটিরে,
সমাদরে লও বুকে।
নবীন ধান্য-দুর্বার দলে
আশীষিয়া স্নেহভরে,
ওমা নন্দিতা নন্দ-জননী,
বধু তুলে লও ঘরে।
ডান-কোলে রাখ ছেলেটি তােমার,
বাম-কোলে নব-বধূ ;
আশিষ-বচনে আদরে যতনে
বরিষ অমিয়া-মধু।
কোথা মেজদিদি ?-নদের তক
আনন্দ দেখ আজ,
ওর দশা হেরি আমি হেসে মরি,
পেটে ক্ষুধা মুখে লাজ ।
৭১

ঠাকুমা কোথায় ?—তােমার ভাগ্যে
পুরাতন একাদশী,
দেখে যাও তব নব সতীনের
অনুপম মুখ-শশী ।
দিব্য-বধুর আশা আছে মনে,
হয়ে যাবে বাজি মাৎ ;
সবে কয়গাছি চুলই পেকেছে,
এখনাে রয়েছে দাত।
শিষ্ট শান্ত নন্দ-ভায়াটি
নীরবে বসিয়া আছে ।
ওরে কেউ কিছু শুধায়ােনা আজ,
কাজ নাই গিয়ে কাছে।
রেণু, চারু, বুড়ি, পতন, ডগরি,
টি, পাঁচি, রাই, কালী,
সরােজী, হিরণী, পঙ্কি ও গণি,
দেজি, সুকি, দুলি, ফেলি,
ক্ষিরী আর অমি, মান্তি ও ক্ষমী,
রঙ্গিণীগণ যত,
কারাে দাত উচু, কারাে নাক নীচু,
রূপসীর নানামত ;
१२

কারাে ঠোঁটে মিশি, কারাে পান গালে,
কেউ ধলো, কেউ কালাে ;
ভায়ারে লইয়া সারাটি রজনী
ঢষ্টা করেছে ভালো।
ছােট আর বড় সবাই সমান,
তুলনায় নহে কম;
নয়ন-বাণের হানায় ভায়ার
বন্ধ হয়েছে দম।
বাসর ঘরের আসরের ফেড়
কর্ণ রয়েছে লাল ;
হেরিয়া সঙ্গে নব সঙ্গিনী
ওর ঠিক নাই তাল ।
দেলটা হয়েছে অদল-বদল,
নূতন গড়েছে মায়া';,
বােধ হারাইয়া রাতারাতি মরি,
সুবােধ হয়েছে ভায়া।
এস নব বধু, নবীন আবাসে
এস গাে সুবােধবালা !
যুগ-যুগান্ত কান্ত-আলয়ে
রহ ঘর করি আলা।
৭৩

দক্ষিণে ওই দেবতা তােমার,
চির-সাধনার ধন ;
দেব-মন্দিরে বসতি করিতে
আজি তব আগমন।
পতি-কুলে রহ স্থির-অনিমেষ,
উজ্জ্বল ধ্রুব তারা ;
জীবন-পাথারে তরী খানি যেন
হয়না কো দিকহারা।
অরুন্ধতীর মত সতী হও,
স্বামি-কুল কর ধন্য ;
অন্নপূর্ণা জননীর মত
ক্ষুধিতে বিতর অন্ন ।
লক্ষ্মীর মত তব গৃহ হােক
ধন ও ধান্য ভরা ;
কলুষ-নাশিনী
গঙ্গার মত
হও সন্তাপ-হরা।
সাবিত্রী-প্রায় পতি সেবা তব
হােক জীবনের ব্রত ;
দ্রৌপদী মত রন্ধন-পটু ।
(যেটা মাের মনােমত ) !
৭৪

সীতার সমান জীবনে মরণে
হও পতি-অনুগামী ;
তােমারে পাইয়া চির সুখী হােক
শশুর, শাশুড়ী, স্বামী।
নমিয়া লক্ষ্মী-জনার্দনের
চরণে,-ভকতি ভরে,
নব দম্পতি নবীন পরাণে
এস এস আজি ঘরে।
অথ ফু-ইন্টপু
সদ্য লেখা পদ্য আমার অনেক কাগজ ছিড়ে,
তবু তাে এই দীনের দিকে চাইলােনা কেউ ফিরে।
নতুন দিদির মিঠে হাসি সবটা ভায়ার তরে,
আমার পরাণ তাই দেখে আজ হচড়-পাঁচর করে।
ভায়ার ভাগ্যে কাজলা-আঁখির না-হানা বাণ,
আমার ইনাম হায়রে, কেবল লুচি দু'চার খান।
ইতি—তােমাদের দাদু।
}
২০ চৈত্র, ১৩২২
৭৫

নবজাত শিশু
টুকটুকে তাের গাল দুখানি,
ফুটফুটে তাের কায়াটি
নীল আকাশের জালের ফাসায়
গড়িয়ে-পড়া মায়াটি।
তক্তকে ঐ ঠোট দুটিতে
ফকফকে তাের হাসিটি ;
আসক দিয়ে বাসক শাখে
জড়িয়ে দেবার ফাসিটি।
কোন্ গগনের কোন্ লগনে
কখন হলাে সাগর সেচা,
শুক্তি-রাণীর মুক্তাটি গাে
ব্যক্তি হলাে সদ্য কাচা !
মেঘের দেশের পাথােয়াজের
তােয়াজ করা ভঙ্গিমায়,
কোন্ রূপসী নৃত্য করে
আকাশ-সভার আঙ্গিনায়
ওড়ণা-ওড়া উতাল বাতাস
খসিয়ে দিলে কানের দুল ;
পড়লাে এসে মােদের ঘরে
হয়ে গিয়ে পথের ভুল।
বন্ধুবর শ্রীযুক্ত হরিপদ আচার্যের কা-জন্ম উপলক্ষ্যে।
•
*
৭৬

উষা-রাণীর বসন-ভূষা
ছড়ায় শােভা চৌদিকে
পাপীর শ্বাসে তাপীর ত্রাসে
হয়নি হাওয়া ফিফিকে ;
রবির রথে পূবের পথে
পড়েনি কো হুড়মাড়ি,
তরুর শিরে কিরণ-রুলির
ছােটে নাই কো পিচকারী
এমন সময় কোন্ শােভাটি
ছড়ায় আভা ভঙ্গিতে ?
ভােরের পাখী উঠলে ডাকি
কাহার মধুর
সঙ্গীতে
?
আয়রে সােনা, শিশির-কণা,
আয়রে নতুন এই দেশে ;
মায়ের বুকের ধুকধুকিটি,
কেঁদোনা মা আবেশে।
সাত রাজার ঐ মাণিক-রাঙা
তরুণ অরুণ ছড়ায়ে,
থারে মােদের ঘরের আলো
মায়ের বুকে জড়ায়ে ।
৭৭

বাবা বসে ভাবছে ত্রাসে
দিতে হবে তাের বিয়ে,
জামাই-পণের মস্ত থলে’
জোগাড় হবে কি দিয়ে।
দিদি তােমার হাছে থােশে,
অত-শত নাই জানা,
দৌড়ে এসে ঘরের কোণে
বােনের সুখে আটখানা।
ছােট্ট তােমার কুটিদাদা,
হয়েছে যে মুখটি ভার,
ভাবছে বুঝি কে এলো এ
মায়ের বুকের ভাগীদার।
দেখে তােরে রূপের ঝুড়ি
ফুরফুরিয়ে বইছে বায় ;
ফুটলো ভােরের কনক-কলি,
আয়রে সােনা আয়রে আয় !
।
n
১৬ মাঘ, ১৩২১
৭৮

শিশু-মঙ্গল
স্বর্গ মর্ত্ত জুড়িয়া আজিকে কেন এত ডাক-হাঁক ?
স্বর্গে হইল দুন্দুভি নাদ, মর্ত্যে বাজিল শাখ।
ফুটিল মনের বনের কলিতে একটি শুভ ফুল,
কোন্ দেবতার বক্ষের মণি? কোন অমরীর দুল?
কোন্ নন্দনে কোন পারিজাত ফুটিল আসিয়া হেথা ?
কোন্ গগনের পূর্ণচন্দ্র সৃষ্টি করিল ধাতা ?
তারকার মত, কুসুমের মত, সুধাধারা-মাখা মধু;
কোন্ চকোরের প্রাণের ক্ষুধা, কোন্ প্রেমিকার বঁধু?
কে সে ভক্ত পূজা-অবশেষে ছড়ালাে শান্তি-জল ?
কোন্ দেশ হতে এলি এ মরতে, বলরে শিশুটি বল ।
ক
গভীর রজনী ; উঠিল হাসিয়া চারু চতুথী-চাঁদ;
চারিদিক ঘিরি তারকার মালা পাতিল প্রেমের ফাদ ।
শিশিরের কণা-সিক্ত বয়ানে ফুলের হাসিটি ফুটে,
ত্রিদিব মথিয়া আনন্দ ঢেউ ছাপায়ে দুকূল ছুটে।
মুক্ত শান্তি করিতেছে খেলা, নাহি সেথা ভয়-ক্ষুধা ;
হেন মুহূর্তে স্বৰ্গ-রাজ্যে হারাইয়া গেল সুধা।
* বন্ধুবর শ্রীযুক্ত হরিপদ আচার্যের দৌহিত্রের জন্ম উপলক্ষ্যে।
৭৯।

ত্রিদিব জুড়িয়া আকাশ নাড়িয়া পড়িল বিষম সাড়া ;
কোথা হারাইল সুধার কলস, ভাবে তাই দেবতারা।
অতি বিস্ময়ে দেখে তার চেয়ে, সুধার ফোটাটি এসে,
মর্ত্যভূমির কুঞ্জ-কাননে গড়াইয়া পড়ে হেসে।
দেখি কৌতুকে দেবদেবীগণ হাসিয়া পড়িল লুটি,
মেখে সেই হাসি হাসিল সুধাটি, পরায় পাইয়া ছুটি।
অন্ধ-তমস-বন্ধন মাঝে কাটিল দশটি মাস,
ছেড়ে নন্দন, কত ক্রন্দন, কত দীর্ঘশ্বাস।
সুধার কণাটি ভাবে মনে মনে, পেয়েছি আলাের দেশ;
ঘুচিয়া যে গেল আঁধারের কালাে, দুঃখের হলাে শেষ।
জ্ঞানহীন শিশু, বােঝেনি এখনাে—এ যে নিদারুণ কারা;
মাণিকের বাঁধে হীরকেব খাদে সােনার শিকল-পারা।
বুঝিবে যে-দিন, কাদিবে সে-দিন হুতাশ-মাখানাে প্রাণে ;
তপ্ত হৃদয়ে, সকরুণ-সুরে, গাহিবে খেদের গানে।
এখন তাহার নাহি অবসর, এখন কেবল হাসে;
চারিদিক বেড়ি আনন্দ-সাড়া, সকলেই সুখে ভাসে।
চাঁদ হাসিতেছে গগনের কোলে পরিয়া তারার মালা,
কুসুম হাসিছে কুঞ্জ-কাননে হেরিয়া সুধার আলা।
দাদা মহাশয় টানিছে তামাক, সুখে দিয়ে গোঁফে তা',
সুন্দর শিশু সুরূপ হেরিয়া বদনে নাহিকো রা'।

চশমার ফাকে, শিশুটির দিকে মিন্টু-মিট্‌ করি চায়,
মনে ভাবে—বুঝি স্বরগ রাজ্য গড়াইয়া পড়ে গায়।
সকলের চেয়ে সাধু দিদিমা-টি হেসে হেসে হলাে খুন,
তিলেক মধ্যে নবীন পুরুষ করিয়া বসিল গুণ।
শিশুটির হাসি যেন সুধা-ফাঁসি, গলায় বাঁধিয়া দেছে ;
আমােদ-মগন। সাধের দিদিমা উঠিল উলাসে নেচে।
শুন শুন ওগাে কুঞ্জ-শিশুর রঙ্গিণী দিদি-মণি !
বিনা সাজ-গােছ নবীন নাগর আপন হবেনা ধনি !
বয়স তাে আর তত কঁচা নয়,—হইয়াছে কিছু বেশী
ভুলিবে কি কভু হেরিয়া নাগর শুধু মুখে মিঠা হাসি?
এলায়িত কেশ নূতন ফ্যাসানে আবার বাঁধিতে হবে,
বেণী দোলাইয়া তেরছ-নয়নে আবার চাহিতে হবে।
সাবান মাখিয়া পাউডার ঘসি কর দেহ ঝ-মক্ ;
পাছা-পেড়ে সাড়ী পরিধান করি মিটাইতে হবে সখ।
পুরাণে সােহাগ পুন ঝালাইয়া করিবে নূতন তর,
যৌবন সেচি কেঁচে গণ্ডুষ আহলাদে পুন কর।
তবে যদি ধনি, নবীন নাগর ক্ষণেক ফিরিয়া চায়,
নতুবা কেবল মুখের মিঠায় বঁধু কি ভুলানাে যায় ?
ফুটিবে আবার বাসি ফুল তব পড়িবে সােহাগে ঢলি ;
ছড়াবে সুবাস, লুঠাইবে মধু,—এসেছে যখন অলি।
১১

এস শিশুধন, কর আগমন, এস হে মত্তলােকে ;
দীনহীন কবি.ডাকে ক্ষীণ ভাষে, বরণ করিয়া তােকে।
অনন্ত-রাজ গণ্ডি ছাড়িয়া কোন্ দেশে কবে তুমি,
অর্থ-পথেতে থামিয়া গিয়াছ, হারায়ে কৰ্ম্মভূমি।
• সেইখান হতে আবার করিলে নূতন করিয়া যাত্রা ;
দেখাে দেখাে ভাই, পুনরায় যেন ছাড়িয়া যেয়ােনা মাত্রা।
তােমার মতন আমরাও এই দীর্ঘ পথের সঙ্গী,
বুঝিনা তাে সেই অচেনা-রাজার কেমনতর যে ভঙ্গি।
আর আসা-যাওয়া যায়না তাে সওয়া, মিছে এই গতাগতি
জানিনা বুঝিনা কোথ। এর গােড়া, কোন্ খানে পরিণতি।
তবু তাে রে ভাই, চলিতে হইবে, বহিতে হইবে বােঝা ;
হাসিতে কঁদিতে নাচিতে হইবে,—এই তাে ইহার মজা!
তুমি আমাদের নবীন সঙ্গী,—আসিলে মৰ্ত্তভূম ;
চল চল ভাই, আগু হয়ে যাই, মুখে বলি যাে-হুকুম।
আজিকে আদরে, সােহাগের ভরে, এলে তুমি ভাঙা ঘরে ;
আজ আমাদের সুখের সিন্ধু উথলি উথলি পড়ে।
কুলবালাগণ দেয় উলু উলু , সুধা ঝরে চৌদেশে
মঙ্গল মধু শঙ্খ নিনাদে, আয় আয় শিশু হেসে !
}
}
২৩ ভা, ১৩২১ সাল
২

আমি কবি
ভাইরে, আমি একটি কবি ।
কাব্যি লিখতে যা কিছু চাই,
আছে আমার সবই।
.
দোয়াত-পােরা আছে কালি,
কলম আছে এক হালি,
কাগজ আছে মােটা বালি
দিস্তা-খানেক জড় ;
প্রাণে বইছে তরুণ রস,
( নেহাৎ বেশী নয় তাে বয়স
দোষের মধ্যে গিন্নি নিরস,
কাব্যিতে নয় দর।
জ্যোছনা রাতে চাঁদের হঁাকে,
- রুদ্ধ বাতায়নের ফঁাকে,
চোখ দুটি মাের চেয়ে থাকে
যদিয়াে কাব্যি রসে,
ভয় হয় চাঁদ দেখে দেখে,
বুকটা কখন বসে বেঁকে,
-ফুসফুসিটা ওঠে পেকে,
গিন্নির নােয়া খসে।

বাড়ী আমার গলির মধ্যে,
অতি নিবিড় অবরুদ্ধে,
. ঘরে মশা-মাছির যুদ্ধে
ব্যস্ত সকাল-সাঁঝে ;
দুইবেলা না জোটে আহার,
গিন্নির তাই মুখখানি ভার,
আমার কিন্তু বইছে জোয়ার
প্রাণের ভাজে ভাজে।
ছাতে বসে শুনচি ভারি,
বাহির পথের কি হুড়মাড়ী,
মটর বাইক সারি সারি
চলছে কল-রোলে ;
খাতায় লিখচি গাঁয়ের কথা,
নদীর ধারের নীরবতা,
কত ফুল ফল বৃক্ষ লতা
মনের চোখে দোলে।
শীতে যখন কোৰ্তা গায়ে,
শুয়ে আছি লেপের ছায়ে ।
বালিস বুকে উপুর হয়ে
লিখচি ফাগুন মাস ;
৮ঃ

-বসন্তের কী মস্ত বাহার,
মলয় হাওয়ার গােপন বিহার,
ভােরা-কুলের ফুলের তেহার,
মাঠের নানা চাষ।
ধন্যবৃক্ষ দাওয়ায় উঠি
কিরূপে হয় ঘরের খুটি,
মাঘে আম্রমুকুল ফুটি
বাগানটি কি তােকা ;
আপন কক্ষে মনের মিশে
যাচ্ছি সে সব কলম পিষে ;
এমনি আমার সজাগ-দিশে,
পুথি-গত চোপা।
আষাঢ় মাসে নদীর বাঁকে,
গাঁয়ের নারী কলসী কাখে,
জলের লাগি পঁড়িয়ে থাকে,
আছে আমার জানা
. জানি তাদের শঙ্কা-সরম,
নিলাজ যুবার তােয়াজ-ধরম,
তাইতে বেরােয় গরম গরম
কাব্যি-রসের দানা।
৮৫.

যদিও আমি সহর ছেড়ে,
যাইনি,কভু কিছুর তরে,
তবু জানি কোথায় ওড়ে
বুবেরঙের পাখী
কোথায় কোকিল ডাকে কুহু,
বিরহী কয় উহু উহু,
বিদ্যা আমার আছে বহু,
হুবহু সব শিখি। .
এত যােগাড় এত যন্ত্র,
এত আমার জগৎ-মন্ত্র,
আমার রসাল কাব্যি-তন্ত্র
গভীর এবং পষ্ট ;
তবু যদি কবি বলে
দাও মালা আমার গলে,
জাবাে তবে দেশের ভালে
আছে বহুৎ কষ্ট ।
কলিকাতা। ২৩ পৌষ, ১৩২১
১৬

হাসিয়ে দিলে
এই
হাসিয়ে দিলে এবার ওরা, .
হাসিয়ে দিলে ভাই!
সােনার সারা বিশ্ব জোড়া
কেবল নাকি ছাই।
কেবল খানিক ছাইরে,—ওরে
কেবল খানিক ছাই।
হাসিয়ে দিলে এবার মােরে,
হাসিয়ে দিলে ভাই।
তুমি-আমি রাধু-বুধু,
আছি কেবল শুধু-শুধু,
এত প্রবীন জায়গা-জমিন
তিলেক নাই কো ঠাই ;
মদির বাতাস, উদার আকাশ,
তরুণ উষার অরুণ বিকাশ,
এ সব নাকি ভুলের প্রকাশ,
কিছুই ইহার নাই।
হাের হােত হােঃ হাসিয়ে দিলে,
হাসিয়ে দিলে ভাই!
৮৭

সৎ কি অসৎ ভালো-মন্দ,
মুক্ত কিবা নিছক বন্ধ,
' নাক কান আর আঁখির দ্বন্দ্ব,
সন্দেহ তাে নাই;
দেখুছছা যা’ তা সবই মিছে,
যা’ দেখনি তাই যে আছে,
বুঝতে হবে আঁচে আঁচে,
সবই পাঁচের চাই।
হােত হােত হােঃ হাসিয়ে দিলে,
হাসিয়ে দিলে ভাই
!
বিরাট বিশাল শূন্য জুড়ে
তুমি-আমি বেড়াই ঘুরে’
অকার-আকার সব একাকার,
'কে কার কিসের সই ?
আমরা নাকি পরমব্রহ্ম ।
সেইটে জানা-ই চরম ধৰ্ম্ম !!
দেখে নিজের মৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম
ভরসা। কিন্তু নাই ।
হােঃ হােঃ হােঃ হাসিয়ে দিলে,
হাসিয়ে দিলে ভাই!
বারাণসী। ২১ বৈশাখ, ১৩২২
৮৮,

‘ইয়ে মাহাত্ম .
|
বিশ্ব যেদিন হাস্য মুখে জালাে,
বাণী-রাণীর আগমনী
মাগলাে ;
মৌন মুঢ় বুকের তলে
শােনিত-রঙা শতদলে
ভাষার মুখর ফুলকুমারী ফুটলাে,
ভাব-মলয়ার সােহাগ-সুবাস
ছুটলাে ;
হিল্লোলে,
কোমল হাতের লীলা-কমল
বহে গেল নয়টি ধারা
কল্লোলে ;
বয়ান-ভরা জাগলাে হাস্য
নয়ন-কোণে করুণ লাস্য
শান্ত রৌদ্র বীর বীভৎস
সকলে,
জাগলাে ভীষণ জাগলাে মােহন অতলে ;
তুমি ছিলে কোন সায়রে
মগনা ?
ভাষা-রসের কোন্ লহরে
লগনা?
মন্দরের চূড়া নিয়ে
কোন্ বাসুকীর দড়া দিয়ে
উঠলে তুমি ওগাে ইয়ে, মন্থনে ?
• ভাষার অটুট মাল্য খানি
গ্রন্থনে?

বাক্য যেথা মৌন নীরব
কথাহীন,-
তুমি সেথা বাঁচাও তারে
চিরদিন।
• সকল রসের আলাপনে
তুমি জাগাে সঙ্গোপনে
সকল কথার সমাপনে
নিত্য তােমার চিত্তে আসন হে
প্রবীণ
আছ লীন;
{
সভার মাঝে বক্তা সাজে দাড়ায়ে,
বাক্য যখন বচন ফেলে
হারায়ে ;
তখন ইয়ে, তুমি এসে
নীরব কণ্ঠে দাড়াও হেসে
অকুল তটে কোমল বাহু বাড়ায়ে,
দাঁত-চিবানাে ঘ্যাঙানি দাও ছাড়ায়ে।
সকল রসের ভাষ্য তুমি
প্রাণ-পিজার যত্নে পােষা
তােমার মধু গুঞ্জরণে
ইয়েটি,
টিয়েটি।
বাণী-রাণীর কুঞ্জবনে
রঙীণ রাগের শিঞ্জী বাজে
কি ভৈরবে কি মল্লারে
সােহাগে,
বেহাগে।

ধন্য তুমি বিপথ-বারণ, হে মহৎ!
ওগাে ইয়ে, তােমার পায়ে
দণ্ডবৎ।
যে বােঝেন তােমার তত্ত্ব
জ্ঞান নাই তার যত্ব-ণত্ব
তুমি ছাড়া ভাষা ব্যর্থ
তােমার দয়ায় বাক্য বাঁচে বচনে।
রচনে ;
২৩ শ্রাবণ, ১৩২২

বদন ভঙ্গি
বাদল-দিনের মাদল যখন উঠলল বেজে গগনে,
আমি তখন ঘরের মাঝে বেজায় চিন্তা মগনে।
আকাশ-সভার বৈঠকেতে ছুটলাে রে সুর সঙ্গীতে,
অপ্সরারা তালে তালে নাচছে কতই ভঙ্গিতে ;
কণ্ঠহারের পান্না খানি ঝিলিক মারে হামেসা,
ওস্তাদিতে মস্ত চতুর,—ওযে ওদের নিজ পেশা !
উতাল বাতাস মাতাল হয়ে ঢলাঢলির চুড়ান্ত,
ফুলেরা সব পড়লাে ঝরে, সকল মধু বাড়ন্ত।
স্বর্গে যখন হানাহানি বাদল দিনের যাজনে,
আমি তখন মত্ত আছি সূক্ষ্ম-তত্ত্ব গাজনে।
চট করে’ ভাই বুঝে নিলাম, সৃষ্টিকর্তা নয় চতুর,
আমাদের এই মুখের সামনে কারােই কেন নাই মুকুর!
থাক্তাে যদি এক-একখানা আয়না বাঁধা সম্মুখে,
নিত্য যত ভঙ্গি করি, কবুতাম রে তা কোন্ মুখে ?
অনেক বাচন বেঁচে যেতাম প্রাত্যহিকের ব্যাপারে,
অনাবশ্যক ঘটুচে যত, ঘট তে কি আর তা পারে ?
থাকতো যদি চোখের সামনে বদন-দেখা আর্সিখান,
ঘুচে যেত ভরং করে’ ওস্তাদিতে সুর-শিখান।
৯২

মুখটি বেঁকে, মুণ্ডু নেড়ে, নিজের হাতে ধরে’ কান,
পারতেম কি রে, তােয়াজ করে’ ফুলিয়ে গলা দিতে টান ?
আপন চোখে দেখে তখন আপনারই এই বদন-দ,
আপনা হতে ছিড়ে যেতাে তানপুরার ঐ সুরের বাঁধ।
ফুরিয়ে যেত গাহেন গাওয়া আসর করে’ সরগরম,
মজলিশের ঐ এজলাসেতে চাকুরী হতে শেষ-খতম।
এম্‌নি ধারা মেঘলা-রাতে আগল-দেওয়া কুটীরে,
কোমল বাহুর আড়ে যখন সােহাগ ওঠে ফুটি রে ;
আধাে-আধাে গদো-গদো কতই ভাবের মহড়া,
গাল-ফুলানন ঠোঁটের কোণে প্রেমের খাড়া পাহারা;
অকারণের কাজে যত বহরম্ভের অভিমান,
সকল যেতাে বিফল হয়ে থাকতো যদি আদিখান।
নাকি-কান-ঘােয়া-বদন ঝিলিক দিতে নয়নে,
বেজায় বাধা পড়ে যেতে প্রণয় সােহাগ চয়নে।
ধর,—যখন তুমি-আমি বসে আছি অকাজে,
এনি-ধারা বা-দিনে আকাশ-জোড়া ঝাঁঝ বাজে ;
আত্ম-তত্ত্বের গভীর সত্য ভাবৃচি দিয়ে গোঁপে তা,
স্বয়ং আমার কী মহত্ত্ব, হচ্ছে সে সব বারতা :
রাজা-বাদা মেরে দিয়ে উজীর সুরু করেছি,
রাজকন্যার বরমাল্য স্বয়ং গলায় পরেছি;

“ফুরিয়ে যেতে ফষ্টি তখন, বিকট রসের রঙ্গিমা,
দর্পণেতে দেখতে পেলে আপন ভুরু-ভঙ্গিমা।
আকাশের ঐ গুরু-গম্ভীর ডম্বুরাটির ধরণে,
আমি যখন ছড় চিনিনাদ কৰ্ত্তা-গিরির করণে ;
দাত-খামাটি চোখ,
-রাঙাণি দন্তে-দন্ত ঘর্ষণে,
গিন্নি যখন আছেন সুধু তপ্ত বারি বর্ষণে ;
চাকর-বাকর স্ত-ব্যস্ত দেখে আমার ভিরকুটি,
চক্ষু যখন মাতাল হয়ে ললাট পরে যায় উঠি ;
মেঘের মতম বেজায় আওয়াজ, ঝড়ের মতন হয় কোন,
রগড় হত, তখন যদি দেখতে পেতাম নিজ-বদন।
এমনিতর সকল কাজে সকাল-সাঁঝের ব্যাপারে,
অনেক রাস্তা কমে যেতে। জীবন-পথের সফরে।
অনেক বাক্য অনেক কাৰ্য্য জবাব দিতে চাকরী,
চিত্ত তখন বাহির ছেড়ে থাকতাে ভিতর আঁকড়ি।
ফুরিয়ে যেতে হানাহানি কানাকানি গােপনে,
চিন্তা হত গরু-রাজী ভাই, অলীক স্বপন বপনে।
তাইতাে বলি, বিধির এবার হয়ে গেছে মস্ত চুক,
আসি বিনা আমরা সবে দেখতে পাইনা আপন মুখ ।
১৯ আষাঢ়, ১৩২২

গিন্নি
গিন্নি, তুমি হে আমার সৰ্ব্ব ;
উদ্যত-ফণা জাগ্রত সদা
নাশিতে সকল গৰ্ব ।
তুমি হে আমার ভবের পাড়ির
অতি পুরাতন নৌকা ;
তুমি হে আমার ভােগ-বন্ধনে
ইন্ধন-ছাড়া চৌকা।
তুমি হে আমার গ্রীষ্মের দিনে
গরম জলের টব,
স্নানে কিবা পানে লাগ যেই খানে
তীব্র সে অনুভব।
}
তুমি হে আমার শীতের দিনের
ঠাণ্ডা বরফ জল,
দাঁতের আঁকুনি মুখের বাঁকুনি
দেহের কাপুনি-কল।

তুমি হে আমার দিবসের মেঘ,
সদা ঘড়ঘড় শব্দ ;
সূৰ্য্য তােমার বজ্রনিনাদে
আড়ালে থাকিয়া জব্দ।
তুমি হে আমার সান্ধ্য-ভ্রমণে
ছড়ির আকারে ছাতা ;
দুপুরের ধূপে, বরষার ঝুপে,
খুজে তো মিলেনা পাতা।
তুমি হে আমার নিশীথ-প্রদীপে
বাকা-করে’-কাটা পলতে ;
ধোয়ার আঁধারে চিনি ফাফরে,
বেশীখন নারে জ্বতে।
তুমি হে আমার আয়েসের কালে
রবি ঠাকুরের কাব্য ;
কত যে হেঁয়ালী কিছুই বুঝিনা,
পড়িয়া যেতেছি দিব্য।
বঙ্কিম তব বঙ্কিম রসে
শঙ্কিত হয়ে অতি,
আসমান-ছাকা আসমানী রূপে
করেছে তােমারে নতি ।

তব হাসি মুখ, যখন আমার
বাক্সেতে ঝনঝন্ ;
প্রলয়-মূৰ্ত্তি তখনি তােমার,
যবে করে ঠন্ঠ।
")
তােমায়-আমায় ভীষণ একত,
বাঁধা যে শক্ত ছাদে ;
দেখে আমাদের ক্ষিপ্ত-মিলন
বিধাতা-পুরুষ কঁাদে।
বিধাতা এখন হয়েছে ফাফর
তােমার-আমার চোটে
এত টানাটানি, ছাড়াতে পারেনি,
এমনী বেঁধেছি খােটে।
এস এস প্রিয়ে, ভুবন কঁপায়ে,
এস হে সন্নিকট ;
তুমি-আমি দুই সংসারে সঙ,
মন্ত্র-শেষের ফটু ।
১৯ আশ্বিন, ১৩২১
৯৭

কর্তা
কর্তা, তুমিই আমার সব !
অসনে-বসনে কিবা অনসনে
সদা করি অনুভব।
তুমি হে আমার জীর্ণ তরীর
কাণ্ডারী বড় পাকা,
কোনাে মতে অতি সন্তর্পণে
বান-চাল হতে রাখা।
প্রভাতে উঠিয়া তােমারি লাগিয়া,
আফিসের ভাত রাঁধি,
ভিজা ইন্ধনে রন্ধনশালে
ধোয়ার ফাফরে কঁাদি।
হাত-বেড়ি সনে শাক-চচ্চড়ি
যুঝে হয় অবসন্ন ;
দশটার আগে নিত্য যােগাই
গরম গরম অন্ন।
তুমি আর তব বংশধরের
জঠর-অংশ হতে,
যদি কিছু বাঁচে, তাই খেয়ে মাের
দিন কাটে কোনাে মতে।

তুমি হে আমার গ্রীষ্মের কালে
প্রবল ঝড়ের হাওয়া ;
সম্ভব নহে ধূলির আঁধারে,
দুচোখ মেলিয়া চাওয়া।
০
তুমি হে আমার শীতের দিনেতে
দগ্ধিতে হুতাশন ;
তব উত্তাপে শরীর ভেদিয়া
তেঁতে ওঠে প্রাণ-মন ।
কলম পিষিয়া আফিসেতে খাও
সাহেবের কান-মলা;
দিবসের শেষে উল্লাসে তাই
ভিজাইতে যাও গলা।
.
সারা দিনে পাও যা-কিছু ইনাম,
সকল করিয়া জড়াে,
ঘরেতে আসিয়া দুনাে সুদ সহ
আমার উপরে ঝাড়াে।
তুমি হে আমার মাইকেল-কবি,
. ঘাের ঘন-ঘটা রব ;
গুরু-গম্ভীর ভম্বরু নাদে
অম্বর পরাভব।

তুমি হে আমার চালক-যন্ত্র,
* কলুর ঘরের ঘানি ;
চোখে ঠুলি বেঁধে তােমারে ঘেরিয়া
সারাটা জীবন টানি।
অন্দরে আমি বদ্ধ আঁধারে,
কিছু নাই—ঠন্ ;
বাহিরে তােমার খাসা বােসনাই,
কত ঝড়-লণ্ঠন।
অতি গাঢ় রস বঁধুয়া তোমার,
কিছুতে মােটে-না গলে ;-
ভাল হতো এই জমাট পিরীতি
খানিক তরল হলে।
তােমার সস্তা গৃহস্থালীর
রেস্ত যা কিছু আমি ;
শাস্তু-নজিরে মস্ত দেব।
তুমি মাের সেরা স্বামী !!
তােমারি কৃপায় উদর পূর্ণ,
(যদিও অন্নে নয় );
প্রতি বছরের অন্নপ্রাসনে
পাও তার পরিচয়।

পুন্নাম হতে লভেছ মুক্তি,
ধন্য পুণ্যবাণ !
পুণ্যের চোটে বাড়িছে দৈন্য,
ভাগী আমি আধখান।
তুমি আছ বলে’ দুবেলা দুমুঠো
খেতে কোনো মানা নাই ;
এ গুণের তব নাহিক তুলনা,
কৃতার্থ আমি তাই।
ধন্য বিধাতা, নির্জনে বসি’
গড়েছে মাণিক-জোড়া ;
জীবন-যজ্ঞে আচমন তুমি,
মন্ত্রের আদি গােড়া।
১৪ অগ্রহায়ণ, ১৩২৩

ভাড়াটে’ বাড়ী
নিজ্জীব হৃদয়-হীন পাষাণ সমান
নীরবে দাড়ায়ে তুমি অচঞ্চল-প্রাণ
হে নিঠুর ভাড়াটিয়া গৃহ ! তব বুকে
নাহি বিন্দু মমতার ছায়া-সুখে-দুখে
বজড়িত করুণ-পরাণ। মহােল্লাসে
খেলিয়াছে কত শিশু মিলি, কলহাসে
মুখরিয়া তােমার প্রাচীর ; নব অনুরাগে
যুবক-যুবতী কত প্রণয়-সােহগে
যাপিয়াছে দীর্ঘ নিশি রভস-মন্থরে ;
কত ক্ষুব্ধ প্রাণ নিত্য ব্যথিত অন্তরে
কাদিয়াছে; হেরিয়াছ কত মৃত্যু-শােক,
কত দীর্ণ দীর্ঘশ্বাস, উৎসব-আলােক।
স্থির মনে পুরাতনে দিয়েছ বিদায়,
নৃতনে লয়েছ বরি বারনারী প্রায় ।
১০২

কমলার কমণীয় চরণ পরশে
তােমার পাষাণ তনু নবীন হরষে,
হয় নাই কোনাে দিন পুলকে ব্যথিত।
কত শঙ্খ-জয়ধ্বনি রয়েছে অঙ্কিত
তোমার অচল দেহে, কত জাগরণ,
কত বেদনা-অপন; কত ঝঙ্কা-রণ,
কত অশ্রু-বারি ! নীরবে রয়েছ খাড়া
অভিশপ্ত ছায়া সম কুল-লক্ষ্মী হারা
ইষ্টকের স্তপ ! তব ভূত ইতিহাস,
কত গুপ্ত লীলা-খেলা লাবণ্য-বিলাস
আঁকিয়াছে প্রতি পত্রে। শুনেছ পাষাণি,
কত শত সংসারের জীবন কাহিনী
প্রাণ-শূন্য প্রাণে। জড় মাঝে তুমি জড়!
একান্ত নিশ্চল মৃত নীরব নিথর!
৫,
২৪ শ্রাবন, ১৩২২

প্রবীণ
( রবীন্দ্রনাথের “বলাক।” কাব্যের প্রথম কবিতার অনুবৃত্তি)
ওরে প্রবীণ ! সকল যুগের সাচা !
ওরে স্বত, ওরে নত,
কচি ওদের আদর দিয়ে বাঁচা।
রক্ত-আলাের মদে হয়ে ভাের,
মও তা'রে ভাবছে আপন জোর,
বিকার ঘরে খুলে দিয়ে ঘোর,
তাই তুলেছে এমন বেহুস নাচ।।
ওরে শান্ত, বাঁচা ওদের বাঁচা।
ক
খাচা ওদের দুলছে ঝড়ো হাওয়ায় ;
এক গাছি খড় নাইরে চালে,
ওদের ঘরে, ওদের ঘরের দাওয়ায়।
ঐ যে নবীন, ঐ যে কচি-কুঁড়ি,
বেঁটার ডগায় ঝুলছে-ঝুরি-ঝুরি,
দেখি যেন যায়না ঝড়ে উড়ি
ওদের উতাল দোল-দেওয়া এ খাঁচা।
বড়ের হাওয়ায় কচিদের আজ বাঁচা।

ঘরের পানে তাকায়না রে কেউ ;
বাইরে কোথায় বান ডেকেছে,
সেই জোয়ারে লাগাতে চায় ঢেউ
ফুরফুরিয়ে হাওয়ার তালে ওড়ে,
ঘর ভেসে যায় উতল বানের তােড়ে,
কচি ডানার ক্ষণিক কঁাচ। জোরে
তুচ্ছ ওদের আপন ঘরের মাচা।
আয়রে গর , চড় ই দলে বাঁচা।
ওরা তোদের শুনবেনা রে মানা ;
ঠোট উচিয়ে আসবে তেড়ে,
ওরা ভাবে, শক্ত ওদের ডানা।
তোদের দেওয়া ঘরের দানা খেয়ে,
নাচছে ওরা পরের পানে চেয়ে,
ভাবছে, খানিক পাখীর বুলি গেয়ে
গুলিয়ে দেবে মিথ্যা এবং সাচা।
রে শাশ্বত, ইকো ওদের বাঁচা।
সবুজ নেশায় ওই যে মাতামাতি,
কতক্ষণ বা রইবে খাড়া ?
ফুরিয়ে যাবে প্রভাত হলে রাতি

ওরে শান্ত ! যুগ-যুগান্ত জোড়া!
ওরে প্রাচীন! সকল আদির গােড়া!
থামিয়ে দিয়ে কচি ডানার ওড়া
ফিরিয়ে নিয়ে আয়রে ঘরের বাছ;
নরম ডানায় সয় কি গরম নাচা?
আরে টেনে বদ্ধ ঘরের মাঝে ;
রুদ্ধ করে ঘরের ছেলে,
লাগা ওদের আপন ঘরের কাজে।
যেমন ধারা যুগ-যুগান্ত ধরে
বাঁচিয়ে এলি কতই উতাল ঝড়ে ;
আপন বিত্ত ফেলে ধূলার 'পরে
নিশ হয়ে বিশ্বে একি যাচা!
ঘরের ছেলে ঘরে এনে বাঁচা।
চির প্রবীণ, তুই যে চিরজীবী;
কত এলে কতই গেলাে,
ভালােনা রে তাের এ ঘরের ঢিবি ।
চেয়ে চেয়ে দেখলি বহুং মাতা
অখণ্ড তাের রইল পুথির পাতা,
তাের এ বাঁধন শক্ত হাতের গাঁথা,
ছিড়বেনা রে অটুট মাল্যগাছা ;
হােন। ওদের যতই উতাল নাচা।
১৭ ফান, ১৩২৫
সমাপ্ত ।
১০ ৬

অয়ংতে শৰ্ষণাবতি সুসেমায়ামধি প্রিয়।
আজীকীয়ে মদিং তমঃ ।
ঋগ্বেদ ৮ম ৬৪ ১১ ঋক্‌ ।
ইমং মে গংগে যমুনে সরস্বতি শুদি স্তোমং সূচতা পরুষ্ণা ।
অসিক্কা মরুদ্বধে বিতস্তয়াজীকীয়ে “হ্যা সুসােময়া ।
ঋগ্বেদ। ১০ম ৫ ফু ও ঋক্‌ ।
According 10 Yaska the Sushomà is the Indus.
Max Muller's India, What can it teath us.
(1883) PP, 165 to 173.
।

যথারীতি ত্রিসন্ধ্যা বিধি পালন করিতে ইচ্ছুক, তাঁহাদের পক্ষে এই পুস্তক- খানি বিশেষ উপযােগী হইবে। পুস্তকখানির কাগজ ও ছাপা ভাল, মূল্যও কম।” L বরিশাল-হিতৈষী :-“এ যাবত সন্ধ্যা এমন সরল ও সহজ কবিতায় আর অনূদিত হয় নাই।” নায়ক :—“এই অনুবাদের জন্য দরবেশ মহাশয়কে ধন্যবাদ করি।” বাঙ্গালী :-“অনুবাদ খুব সরল হইয়াছে।” Bengalee : -"The metrical translation of the whole piece has been done in a way that can not be too highly praised. We wonder the rendering could be made so simple, charming and impressive. পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী :–অনুবাদের কবিত্ব ভাল লাগিল। আপ- নার এই উদ্যম প্রশংসনীয়।” অধ্যাপক পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ -“আমার নিকট ইহা ভালই লাগিয়াছে। আপনি অক্ষরানুগত হইতে গিয়া পদলালিত্যের হানি করেন নাই, ইহা প্রশংসার বিষয়।” অধ্যাপক ললিত কুমার বিদ্যারত্ন :—“এরূপ গীতি কবিতার ভাষায় ত্রিসন্ধ্যার সরল অনুবাদ করিয়া আপনি সমাজের উপকার করিয়াছেন, সন্দেহ নাই। এ উদ্যম সখা প্রশংসনীয়।” মূল্য চারি আনা। শ্রীবৃন্দাবন-শতক মানসী ও মর্মবাণী :-“এখানি ভারতবর্ষের অদ্বিতীয় বৈদান্তিক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত-সন্নাসী শ্রীমৎ প্রবধানন্দ (পূর্ব নাম প্রকাশমন্দ। সরস্বতী বিরচিত “শ্রীশ্রীবৃন্দাবন শতকম” নামক মূল সংস্কৃত গ্রন্থের বাঙ্গালা পদ্যানুবাদ। অনুবাদক মূল গ্রন্থ নিবদ্ধ ১২৬টি শ্লোক যথাযথ ভাবে সহজ অথচ সুমিষ্ট ভাষায় বিবিধ ছন্দে পদ্যে অনুবাদ করিয়াছেন, এবং অনুবাদে কে গুলির প্রকৃত ভাবার্থ রক্ষা কল্পে '} 1 যথেষ্ট চেষ্টা করিয়াছেন, বুঝিতে পারা যায়। আমরা পুস্তকধানি আগ্রহের সহিত পাঠ করিয়াছি। যাহারা যথার্থ বৈষ্ণব ধৰ্ম্ম পরায়ণ, এই গ্রন্থখানি পাঠ করিয়া তাহারা নিশ্চয়ই পরিতৃপ্তি লাভ করিবেন। গ্রন্থারম্ভেই বাদক মহাশয় প্রবধানন্দ সরস্বতীর একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং কাশীধামে গৌরাঙ্গের সহিত উক্ত সরস্বতীর বিখ্যাত বিচার কাহিনী প্রকাশ করিয়া গ্রন্থখানিকে অধিকতর উপভােগ্য করিয়াছেন। বিচার-কাহিনীটি যেমন কৌতুহলজনক, তেমনই শিক্ষা প্রদ। পুস্তকখানির কাগজ ও ছাপা ভাল, মুল্যও অধিক নয়।” নব্যভারত :—“অনুবাদ প্রাঞ্জল ও সুন্দর।” অধ্যাপক হারাণচন্দ্র চাকলাদার আপনার অনুবাদ উৎকৃষ্ট হইয়াছে ; অনুবাদে মূলের ভাব বিশেষ নিপুণতার সহিত রক্ষিত হইয়াছে।” দ্বিতীয় সংস্করণ। মূল্য আট আনা। জপজী মহাত্মা গুরুনানক বিরচিত। শিখ ধৰ্ম্ম গ্রন্থ “শ্রীশ্রীগুরু গ্রন্থ সাহিবজী”র প্রথম অধ্যায়। বাঙ্গালা অক্ষরে গুরুমুখী ভাষায় মূল ও তন্নিম্নে কবি দরবেশের সুললিত পদ্যানুবাদ। মহাত্মা গুরুনানকজীর জীবনী সহ। মূল্য ছয় আনা। ৫. স্বামী পূৰ্ণানন্দ স্বরূপঙ্গী বি. এ-“সদ্গুরু কৃপায় আপনার ব্যয় ভক্ত সাধকের হৃদয়ের আবেগে সেই স্বভাব সিদ্ধ মহাপুরুষের জ্ঞান ও ভক্তি ভাবের প্রবাহ, কবিতার ছত্রে ছত্রে শােভা পাইতেছে। স্বামী সেবানন্দজী :—“জপজ পাইবার দিন থেকে প্রত্যহ পাঠ করছি। এই অমূল্য রত্নখানি আপনি বঙ্গভাষায় অনুবাদ করে’ কি উপকার করেছেন, তা আমি কি লিখব! কবিতাগুলি অতি সুন্দর হইয়াছে।” রায় সাহেব বিধুভূষণ মজুমদার –“অপূৰ্ব্ব গ্রন্থ হইয়াছে।” অধ্যাপক হারাণচন্দ্র চাকলাদার-অনুবাদ বড় কঠিন কাজ। তাহা আপনি যেরূপ সুচারু ভাবে সম্পন্ন করিয়াছেন, তাহাতে আনন্দিত হইয়াছি।”

প্রবাসী :-“গ্রন্থকারের ভাষা বেশ প্রাঞ্জল। কৃত্রিমতার দ্বারা
ভাবকে কোথাও আড়ষ্ট করিয়া তোলা হয় নাই।”
সঙ্গীত-সুধা
ভগবান বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী-দেব বিরচিত সমগ্র সঙ্গীতাবলি
একত্র সংগৃহিত। গোঁসাইজীর একখানি সুন্দর হাফটোন চিত্র সহ।
মূল্য দুই আনা।
কুল সঙ্গীত
কবি দরবেশ এই গ্রন্থে তদীয় পিতৃদেব সাধক চুড়ামণি স্বর্গীয়
কুচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কয়েকটি সুললিত সাধন-সঙ্গীত একত্রে সংগ্রহ
করিয়াছেন। ভূমিকায় রচয়িতার জীবনী এবং কুল-শাস্ত্রের মনােজ্ঞ
আলােচনা করা হইয়াছে। সাধক মাত্রেরই অবশ্য পাঠ্য। মূল্য দুই
বিজলী সঙ্গীত
গ্রন্থকারের তরুণ বয়সের আকাঙ্ক্ষা ও আবেগ পূর্ণ সঙ্গীতাৰলি।
নব যুগের নূতন ধর্মাকাঙ্ক্ষার গভীর অভিব্যক্তি। চতুর্থ সংস্করণ।
মূল্য চারি আনা।
গানের খাতা
গ্রন্থকারের বাল্য বয়সের রচিত বিবিধ সঙ্গীত এই পুস্তকে
সংগৃহীত হইয়াছে। ইহার মধ্যে অনেকগুলি গান পূর্ববঙ্গে বাউল
ও বৈরাগীগণের মধ্যে সুপ্রচলিত। মূল্য আট আনা।
প্রাপ্তি স্থান :-
মেসাস গুরুদাস চাটার্জি এণ্ড সস্, ২০১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
অথবা
১৭৭নং হাবাগ, বেনারস সিট, গ্রন্থকারের নিকট।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sushoma

Author
Darbesh,kiranchand
Title
Sushoma
File name
Sushoma
Text
OCR done
Citation
1920
Published
2009/09/12
Publisher
Haridas Chattopadhyay,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
119
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Agni
DLI number
513372
Barcode
4990010020356.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
y5Ah38x6rXV
Download PDF

Sushoma