Bally Sadharan Granthagar
Sawpno-shesh
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
স্বপ্ন-শেষ
শ্রীবিশ্বপতি চৌধুরী, এএ
১৩৩৭
মূল্য দেড় টাকা
রসচ-সাহিত্য-সংসদ
সবিতা রায় কর্তৃক প্রকাশিত
১-সি, লেক রােড, কালীঘাট,
কলিকাতা
নাথ ব্রাদার্স প্রিন্টিং ওয়ার্ক
-হইতে
কালীপদ নাথ কর্তৃক মুদ্রিত
৬নং চালতাবাগান লেন,
কলিকাতা
উপহার ••• রসচ-সাহিত্য-সংসদ হইতে প্রকাশিত অন্যান্য গ্রহ- শ্ৰীঅসমঞ্জ মুখােপাধ্যায় প্রণীত ১১ জমা-খরচ खौ বৱ-ভাত্তার ১) মুক্তাঝারি ৮০ y০ শ্রীবিশ্বপতি চৌধুরী প্রণীত ঘূর্ণি (উপন্যাস) শ্রীকালিদাস রায় প্রণীত প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত কবিতাবলী হইতে সঙ্কলিত -আদর্শ চয়ন-গ্রন্থ- আহরণী ঋতুমঙ্গল ( ২য় সংস্করণ ) বল্লৱী : ৩য় ঐ ) রসকদম্ব (কমিকগানের বই ) লাজাঞ্জলি ক্ষুদকুড়া পর্ণপুট ১ম (৪থ সংস্করণ। পর্ণপুট ২ (২য় ব্রজবেণু ( ২য় প্রাপ্তিস্থান-রসচক্র-সাহিত্যসংসদ ১-সি, লেক রােড, কালীঘাট বরেন্দ্র লাইব্রেরী-২০৪, কর্ণওয়ালিস্ স্ত্রীট, কলিকাতা ও প্রধান প্রধান পুকাল । . . ১০ - -
দক্ষিণ-কলিকাতার সাহিত্য-সেবকগণের মিলন-সংসদ
ৱসচক্রের
রসজ্ঞ সদস্যবৃন্দের করকমলে।
No text on this page.
স্বপ্ন-শেষ গােটা দুপুরটা এবং অর্ধেকটা বৈকাল দিবানিদ্রায় কাটাইয়া সন্ধ্যার কিছু পূর্বে নিবারণচন্দ্র হাই তুলিয়া, তুড়ি দিয়া, ‘আলিস্যি’ ভাঙ্গিয়া জাগিয়া উঠিল, এবং নরম একটা বালিস কোলের উপর তুলিয়া লইয়া সুমুখের পােলা জানালাটার ভিতর দিয়া নিদ্রালস চক্ষু দুটির অর্থহীন উদ্দেশ্যহীন ফঁাকা অলসদৃষ্টি বাহিরের দিকে মেলিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। জানালাটার কোলেই একটা সরু গলি এবং তার পরেই একটি জীর্ণ সংস্কারবিহীন দোতালা বাড়ীর ইট-বারকরা পুরাতন দেয়াল, এবং তাহাতেই সংলগ্ন একটা সেকেলে ধরণের আলকাতরা-মাখান ছছাট্ট ভাঙ্গা জানালা—তাও বদ্ধ। সুতরাং অলস নিবারণচন্দ্রের অলসতর চক্ষুদুটির বেশীদূরে চলিয়া গিয়া পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িবার বিশেষ ভয় ছিল না।
-স্বপ্ন-শেষ- আজ সকাল হইতেই বৃষ্টি শুরু হইয়াছে। নিবারণচন্দ্র আহারান্তে দ্বিপ্রহরে শয্যায় গিয়া যখন শুইয়া পড়িয়াছিল, তখন আকাশটা একবারে ভাঙ্গিয়া পড়িবার মত হইয়াছিল; কিন্তু আকাশটা সেনি সত্যসত্যই ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল কিনা তাহা আর নিবারণচন্দ্রের দেখা হয় নাই। তারপর একেবারে সন্ধ্যার পর্বে এই কিছুক্ষণ হইল চোখ মেলিয়া উঠিয়া বসিয়া সে দেখিল—আকাশটা আই রহিয়া গিয়াছে,—কিন্তু, তখন পর্যন্ত ভিজে ভিজে ; অনেকক্ষণ ধরিয়া কাদিয়া কাদিয়া অবশেষে শ্রান্ত হইয়া কেহ যদি চুপ করে, অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার চোখের পাতা দুটো যেন ভারি-ভারি এবং ভিজে-ভিজে দেখায়, অনেকটা সেই রকম। সুমুখের ভাঙ্গা জানালাটা দিয়া তখনও অল্প অল্প জল চোয়াইতেছিল এবং জানালাটার কোলের কাণিশের ফাটলে যে শিশু অশ্বথ গাছটি আজ বছর খানেক হইল ভূমিষ্ঠ হইয়া অল্প অল্প করিয়া বাড়িয়া উঠিতেছিল, তাহারি কচি কচি পাতা এবং সরু সরু ডালগুলি সারাদিন জলে ভিজিয়া ক্ষান্তবর্ষণ সন্ধ্যার জ’লাে হাওয়ায় শির শির করিয়া কাপিয়া কাপিয়া উঠিতেছিল। নিবারণ চুপ করিয়া সেই দিক পানে চাহিয়া বসিয়া রহিল। আজ বছর খানেক হইল নিবারণচন্দ্র তার পূর্বের বাস ছাড়িয়া এই নৃতন বাসাটিতে উঠিয়া আসিয়াছে, এবং বছরখানেক ধরিয়া সে সুমুখের এই ভাঙ্গা বাড়ীটার ইট-বারকরা জীর্ণ দেয়াল এবং তাহার গায়ে-বসান জীর্ণতর এই বদ্ধ জানালাটার দিকে ২ স্বপ্ন-শেষ চাহিয়া চাহিয়৷ এমনই অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল যে, ইহার দিকে চাহিয়া একটিমাত্র চিন্তাকেও মনের ত্রিসীমানায় আসিতে না দিয়া সে বােধ হয় একটা গােটাদিন পরম নির্বিকারভাবে কাটাইয়া দিতে পারিত। তার নিঃসঙ্গ কর্মহীন, দায়িত্বহীন, নিরুদ্বেগ জীবনযাত্রা এবংএই জনপ্রাণিহীন লােক-কোলাহলশূন্য, নির্জন খালি বাড়ীটার অলস, নির্জন, উদ্দেশ্যশূন্য অস্তিত্বের মধ্যে কোথায় যেন বেশ একটি সূক্ষ্ম যােগসূত্র ছিল। আজ একবৎসর ধরিয়া এই বাড়ীটির দিকে চাহিয়া চাহিয়া নিবারণ দেখিয়া আসিতেছে একটিবারের জন্যও সুমুখের সেই জানলাটা পােলা ত দূরের কথা, একটু নছিলও না, একটিবারের জন্যও একদিন কাপিয়া উঠিল না। কেবল বাদলার দিনে, দুযোগের রাতে যেদিন তার মত নীরস, নিরর্থক একঘেয়ে জীবনটার মাঝখানেও হঠাৎ মুহর্তের জন্য কে আসিয়া যেন নাড়া দিয়া চলিয়া যায়, সেইদিন কেবল এই ভাঙ্গা নির্জন খালিবাড়ীটার ঐ জীর্ণ ছােট্ট ভাঙ্গা জানালাটা মাঝে মাঝে খট খট করিয়া নড়িয়া উঠিত। কিছুক্ষণ সেইভাবেই চুপ করিয়া বসিয়া থাকিয়া নিবারণ অলস এবং জড়িতকণ্ঠে ডাকিল-“বেহারী!” কিন্তু কোন সাড়া আসিল না। গলার স্বরটাকে অতিকষ্টে আর একটু জোর করিয়া লইয়া সে আবার ডাকিল—“বেহারী!”—তথাপি কোন সাড়া আসিল না। ধীরে ধীরে কোলের উপর হইতে বালিসট। শয্যার উপর নামাইয়া রাখিয়া নিবারণ উঠিবার চেষ্টা করিতেছিল, হঠাৎ একটা খট খট শব্দে চমকিয়া উঠিয়া, সেই ভাঙ্গা বাড়ীটার দিকে চাহিয়াই কি মনে করিয়া সে নিশ্চল হইয়া আবার বসিয়া পড়িল। তার মনে হইল এতদিনের সেই বদ্ধ জানালাটা ভিতর হইতে কিসের আকর্ষণে সহসা যেন নড়িয়া উঠিল,—সে অবাক হইয়া সেই দিক পানে চাহিয়া রহিল। তার বুকটা কেন কে জানে যেন ভিতর হইতে দুর দুর করিয়া উঠিল,কেমন যেন ভয়-ভয় করিতে লাগিল। অস্বাভাবিক আকস্মিক কিছু একটা চোখের সুমুখে ঘটিতে দেখিলে লােকে যেমন স্তম্ভিত হইয়া সেইদিক পানে একদৃষ্টে চাহিয়া নিশ্চল হইয়া থাকে, সে ঠিক সেইভাবে ঘনায়মান সন্ধ্যার আলো ও ছায়ার আবছায়ার মধ্যে ভূতাবিষ্টের মত একদৃষ্টে সেই জানালাটার দিকে চাহিয়া নিস্পন্দ হইয়া বসিয়া রহিল। খানিকক্ষণ ধরিয়া খট্ খট্ শব্দ করিয়া নড়িয়া চড়িয়া হঠাৎ এক সময় জানালাটা সত্যসত্যই তার চোখের সুমুখে আজ খুলিয়া গেল। তার পরেই দেখা গেল, এই এতদিনের বদ্ধ জীর্ণ নিঃশব্দ জানালাটার কোল ঘেঁসিয়া দাড়াইয়া রহিয়াছে একটি সুন্দরী কোমলাঙ্গী বালিকা আর তার কোলে একটি তেমনই সুন্দর নিটোল নধর শিশু,—পরিপূর্ণ প্রাণ-প্রাচুর্যে টট ঢল করিতেছে। সেই দিক পানে অবাক হইয়া কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া হঠাৎ কি মনে করিয়া শয্যা ত্যাগ করিয়া উঠিয়া পড়িয়া নিবারণ ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল এবং হঠাৎ অত্যন্ত জোরে চেঁচাইয়া উঠিল, “বেহারী—এই বেহারী!” নীচের উঠান হইতে উত্তর আসিল—“আজ্ঞে !” এবং সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়াইতে ৪ —স্বপ্ন-শেষ- দৌড়াইতে বেহারী আসিয়া সুমুখে দাড়াইল,-তার চোখে মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন। নিবারণচন্দ্রকে সে অনেকদিন হইতে দেখিয়া আসিতেছে, কিন্তু তাহাকে চেঁচাইয়া কথা বলিতে বা ধমকাইতে সে বড় একটা দেখে নাই; আজ হঠাৎ তাহাকে এরূপ ভাবে চীৎকার করিয়া ডাকিতে শুনিয়া বেহারী বেশ একটু ভয় পাইয়া গিয়াছিল—সে তটস্থ ভাবে সুমুখে আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিল— “বাবু।” স্বাভাবিক নরম সুরে নিবারণ বলিল—“তামাক সেজে ঘরে দিয়ে আয় দেখি !"—কথাটা শেষ করিয়াই দড়িতে ঝােলান একটা গামছা টানিয়া লইয়া কাপে ফেলিয়া চটিজোড়ার মধ্যে পাদুটে। প্রবেশ করাইয়া দিয়া নিবারণ সিড়ি দিয়া নীচে নামিয়া গেল। মুখ হাত পা ধুইয়া কাপড় ছাড়িয়া নিবারণচন্দ্র যখন চটিজোড়াটা চৌকাঠের বাহিরে ছাড়িয়া ঘরে ঢুকিল তখন সন্ধ্যা হইয়াছে। সুমুখের বাড়ীর সেই জানালাটার দিকে চাহিয়া সে দেখিল, সেই জীর্ণ ভাঙ্গা জানালাটা কখন এক সময়ে আবার রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু সমস্ত দিনব্যাপী দুর্যোগের ঘন্ধকারপূর্ণ কালো মেঘের গুমােট ভাঙ্গিয়া একটা মলিন ছিন্ন মেঘের বাতায়নের ধারে কখন একসময় চুপি চুপি আসিয়া দাড়াইয়াছে—প্রতিপদের চন্দ্রখানি—নিৰ্ম্মল, নিটোল, শুভ্র।
২
নিবারণচন্দ্রের বয়স হইয়াছে,তা প্রায় পঞ্চাশের কাছা-
কাছি, কিন্তু আজও সে অবিবাহিত। অনেকেই বিবাহ করে না
পয়সার অভাবে; নিবারণচন্দ্রের কিন্তু পয়সার ভাবনা আদবেই
ছিল না।
তার বাপ গােবিন্দচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তার এই
একমাত্র বংশধরটির জন্য দেশে যে প্রকাণ্ড জমিদারী রাখিয়া
গিয়াছিলেন, তাহার আয়ে একটি কেন দশটি বিবাহ করিলেও
নিবারণকে অন্নের চিন্তা কোন দিনই করিতে হইত না,কিন্তু
তথাপি সে বিবাহ করিল না।
নিবারণ ছেলেবেলা থেকেই বড় বেশী অলস-দেহে এবং
মনে। তার আর একটি স্বভাব ছিল, সে ভুলিয়াও কখন
কোনরূপ ঝঙ্কাট বা গােলমালের দিকে ঘেঁসিতে চাহিত না।
ছেলেবেলায়, যে সময় তাহারি সমবয়স্ক সঙ্গীরা ছুটাছুটি হুড়াহুড়ি
করিয়া, সর্বাঙ্গে ধূলা মাখিয়া মাতামাতি করিয়া বেড়াইত, সেই
সময় বালক নিবারণচন্দ্র সকলের অজ্ঞাতসারে চুপি চুপি কখন
সেখান হইতে সরিয়া পড়িয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাচিত—পাছে ছুটাছুটি
স্বপ্ন-শেষ
করিতে গিয়া হাত-পায়ে আঘাত লাগে।
ছেলেবেলা হইতে
আজ পর্যন্ত তাহাকে কেহ কখন জোরে হাটিতে বা জোরে কথা
বলিতে শুনে নাই। দুনিয়ার যতকিছু ঝঙ্কাট এবং গণ্ডগােল
হইতে নিজেকে কোনও রকমে বাঁচাইয়া যাওয়াই ছিল তার
জীবনের একমাত্র কাজ।
তারপর বাল্য কাটাইয়া নিবারণ হঠাৎ একদিন সেবনে
পদার্পণ করিল, কিন্তু সুখ অপেক্ষা সোয়াস্তির ভিখারী এই অলস
নির্জীব প্রাণীটির মনের গতির বিশেষ কোনও পরিবর্তন বাহির
হইতে লক্ষ্য করা গেল না। সঙ্গী সে বাল্যেও ভালবাসিত না,
যৌবনেও ভালবাসিতে শিখিল না। বড়লােকের ছেলে, সুতরাং
গ্রামের অনেকেই আসিয়া চারিপাশে ঘিরিয়া রাখিবার বিধিমত
চেষ্টা করিল।-বয়স অল্প, মাথাটাও কাচ। সুতরাং চর্বণ করিতে
বিশেষ কষ্ট হইবে না—এমনিটাই ছিল তাদের ধারণা, কিন্তু
দাত ফুটাইতে গিয়া তাহারা দেখিল,সকলের অজ্ঞাতসারে অল্প
বয়সেই এই কচি মাথাট। কখন এক সময় শুকাইয়া, পাকিয়া
একেবারে ঝুনা হইয়া গিয়াছে। তাহারা ভাবিয়াছিল ছেলেবেলায়
যে লোকটা ছুটাছুটি হুড়াহুড়ি করিয়া হাত পা ভাঙ্গিবার ভয়ে
তাহাদের কাছ হইতে সর্বদা দূরে দূরে থাকিতে চাহিত, আজ
আসন্ন যৌবনের স্বপ্নময় ক্ষণটিতে তাপােষের উপর অলসভাবে
তাকিয়া হেলান দিয়া বসিয়া বসিয়া খােসগল্প এবং আরও
পচরকম ফষ্টি-নষ্টি করিবার বেলায় সেই লোকটাই সাগ্রহে
তাহাদিগকে আহ্বান করিবে; কিন্তু এখানেও সে পৃষ্ঠভঙ্গ দিল
৭
এবং তাহাদের ভয়ে অন্দরে গিয়া সেই যে গা ঢাকা দিল, তার পর হইতে তার টিকিটি পর্যন্ত কেহ আর দেখিতে পাইল না। অল্প বয়সেই নিবারণের মার মৃত্যু হয়। সংসারে থাকিবার মধ্যে ছিল, বৃদ্ধ গােবিন্দচন্দ্র এবং তারই দূর সম্পর্কীয় এক বৃদ্ধা ভগিনী। গােবিন্দচন্দ্রের অনেকগুলি পুত্র-কন্যা জন্মিয়াছিল, কিন্তু কেহই বেশী দিন টিকিয়া থাকে নাই। অবশেষে অসংখ্য সন্ন্যাসীর জটা নিংড়ান জল, পিরের দরগার চৌকাঠের মাটি, নানান জানােয়ারের নখর, শৃঙ্গ এবং খুর, নানান জাতীয় অদ্ভুত অদ্ভুত বৃক্ষের অদ্ভুততর শিকড় এবং তাহার উপর অসংখ্য মাদুলি, কবচ ও বিচের গুণেই হোক বা অন্য যে কারণেই হৌক অবশেষে নিবারণচন্দ্র সত্য সত্যই টিকিয়া গেল। কিন্তু মৃত্যুর দেশ হইতে জোর করিয়া কবচ ও মাদুলি দিয়া বাঁধিয়া ফিরাইয়া আনা এই ছেলেটি বাঁচিয়া থাকার দেশে আসিয়াও মরণের দেশের অনেকখানি আবহাওয়া নিজের চারিদিকে ধরিয়া রাখিল, এবং বঁচিয়া থাকিয়াও যে সকল লক্ষণ দেখাইতে লাগিল তাহ সজীব অপেক্ষা নির্জীব পদার্থের মধ্যেই অধিক পরিমাণে দেখিতে পাওয়া যায়। এহেন নিবারণচন্দ্রের বয়স যখন ২১ কি ২২, সেই সময় গােবিন্দচন্দ্রের হইল স্বর্গলাভ, এবং সমস্ত জমিদারীটা, একরাশ ঝঞ্চাট ও দায়িত্ব পশ্চাতে লইয়া তার ঘাড়ের উপর লাফাইয়া পড়িবার জন্য হঠাৎ একমুহূর্তে থাবা মেলিয়া
দাড়াইল। গগাবিন্দচন্দ্রের অন্তরঙ্গ এক উকিল বন্ধু ছিল।
লােকটী প্রবীণ, বিচক্ষণ এবং সৎ। কলিকাতা হাইকোর্টে তার
বেশ পশার এবং নামডাক ছিল। মামলামােকর্দমা বা বিষয়
সংক্রান্ত কোন গােলযােগ উপস্থিত হইলেই গােবিন্দচন্দ্র তার
এই উকিল বন্ধুটির শরণাপন্ন হইতেন। আজ এই দুর্দিনে
নিবারণ তাহাকেই চিঠি লিখিয়া দেশে আনাইল, এবং কাদিয়া
কাটিয়া পায়ে ধরিয়া একটা কাণ্ড বাধাইয়া বসিল। পিতৃবন্ধু
অটল, তাহাকে অনেক সান্ত্বনা দিয়া বুঝাইয়া বলিলেন,-
“অত অধীর হলে ত চলবে না বাপু! তােমাকেই ত এতবড়
জমিদাটার সমস্ত ভার আজ থেকে ঘাড়ে নিতে হবে, এখন
থেকে শক্ত না হলে চলবে কেন?”
নিবারণ এবার সত্যসত্যই হতাশ হইয়া পড়িল ; সে
অটলের পা-দুটো জড়াইয়া ধরিয়া পাঁচ বৎসরের শিশুর মত
করিয়া ডুগরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল,-“আমাকে বাঁচান কাকাবাবু,
আমি ওসব ঝঞ্চাট পােয়াতে পারবাে না।”
অটল ধমকাইয়া উঠিলেন—“পারবাে না কি রকম? তবে কি
পৈতৃক জমিদারীটা একবারে বরবাৎ করে দিতে চাও?”
নিবারণ আর কোন কথা বলিল না, সে হতাশ ভাবে ফ্যাল ফ্যাল
করিয়া অটলের মুখের দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
বিচক্ষণ অটলচন্দ্ৰ বুঝিলেন, ব্যাপার বড় সুবিধার নয়। অবশেষে
অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া পাঁচজনের সহিত পরামর্শ করিয়া
নিকটবর্তী আর একটা জমিদারের নিকট নিবারণের সমস্ত
;
-স্বপ্ন-শেষ- এবং মাটকোঠা। এখানে আসিয়া সে কয়েক বৎসর পরম নিশ্চিন্ত ভাবে, নিঝঞ্চাটে কাটাইয়া দিল। বিবাহের বয়স তার অনেক দিনই হইয়াছিল—অর্থের অভাবও ছিল না, তথাপি নিবারণ বিবাহ করিল না—পাছে ঝঞ্চাট বাড়িয়া যায়। পাড়ার লােকে তাহার সহিত যাচিয়া বন্ধুত্ব করিতে আসিলে সে যেমন চাকরকে দিয়া বলিয়া পাঠাইত, সে বাড়ী নাই—পাছে ঝঞ্চাটে পড়িতে হয়,—ঠিক তেমনি করিয়াই তার বক্ষের দরজায় নবযৌবন যখন আসিয়া ঘা মারিতে লাগিল, সে ভিতর হইতে বলিয়া পাঠাইল—“বাড়ী নাই—বাড়ী নাই!” বিবাহ করাতে হয়ত সুখ আছে কিন্তু সােয়াস্তি কোথায় ? অর্থের জন্য তাহাকে না হয় মাথা ঘামাইতে হইল না; কিন্তু তার পর ? অর্থ দিয়া চাল ডাল কেনা যাইতে পারে কিন্তু দায়িত্ব, দুশ্চিন্তা, রােগ, শােক, এ সকলের হাত হইতে নিষ্কৃতি, সে ত আর অর্থ দিয়া কেনা যায় না; সুতরাং নিবারণচন্দ্র ঠিক করিল, জীবনে সে কখন বিবাহ করিবে না, এবং যেমন আছে ঠিক এমনি ভাবেই সারাটা জীবন পরম নিশ্চিন্ত ও নির্বিকার ভাবে আহার করিয়া এবং নিদ্রা দিয়া কাটাইয়া দিবে, এবং ইহারই মধ্যে যেটুকু নূতনত্ব এবং বৈচিত্র্য তাহার সাধ্যায়, তাহা সে যােল-আনার যায়গায় আঠার-আনা ভােগ করিয়া লইবে, যথা-বাদলার দিনে খিচুড়ি ও ইলিসমাছভাজা, শীতের দিনে গলদা চিংড়ি ও ফুলকপি, গ্রীষ্মের দিনে ল্যাংড়া আম স্বপ্ন-শেষ- । এমনি আরাে কত কি,তার উপর আছে ডিটেকটিভ উপন্যাস, এবং তারও উপর আছে মধ্যে মধ্যে বায়স্কোপ দেখিতে যাওয়া, সুতরাং অলম্ অতিবিরেণ। কু, এইভাবে বাড়ীর পর বাড়ী বদলাইয়া আরও ২০ট বৎসর আহার করিয়া, ঘুমাইয়া, ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়িয়া এবং মধ্যে মধ্যে বায়স্কোপ দেখিয়া কাটাইয়া, আজ একবৎসর হইল সে এই নৃতন বাড়ীটিতে উঠিয়া আসিয়াছে। বয়স তার এখন পঞ্চাশের কাছাকাছি, কিন্তু মাথায় টাক পড়ায় এবং সুমুখের কয়েকটা দাত সকাল সকাল পড়িয়া যাওয়ায় তাহাকে দেখিলে ৬০ বছরের কম বলিয়া মনে হয় না। এই নূতন বাড়ীটিতে উঠিয়া আসিয়া অবধি একটা বৎসর সে বড়ই শান্তিতে কাটাইয়াছে। বাড়ীটি একটি সরু গলির মধ্যে ; সুতরাং গাড়ীঘােড়ার ঘড় ঘড়ানির বালাই নাই; তাহার উপর সুমুখের যে বাড়াটা হইতে সে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা করিয়াছিল, কিছুদিন পরেই জানিতে পারিল সে বাড়ীটি আজ কয়েকবৎসর ধরিয়া খালি পড়িয়া রহিয়াছে, এবং আরও কতবৎসর যে এই ভাবেই খালি পড়িয়া থাকিবে তাহারও কোন ঠিকঠিকানা নাই। বাড়ীটির দুই সরিকে মামলা চলিতেছিল, এবং এই মামলার ফলে কোন পক্ষ যে এই বাড়ীর মালিক হইবেন তাহারও কোন স্থিরতা ছিলনা। ফলে বাড়ীটি খালিই পড়িয়া রহিল, এবং একে অনেককেলে পুরাতন বাড়ী, তাহার উপর অনেক দিন যাবৎ সংস্কার
স্বপ্ন-শেষ
হওয়ায় দিন দিন জীর্ণ-দীর্ণ হইয়া কঙ্কালসার হইয়া
পড়িতে লাগিল। সে যাহাই হোক, এই ভগ্ন-জরাজীর্ণ
বাড়ীটির কাছ হইতে কোনরূপ শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা না থাকায়
নিবারণ হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল, এবং তার শয়নকক্ষের বাতায়ন
পথে ইহারই রুদ্ধ ভগ্ন জানালাটির দিকে চাহিয়া পরম নিশ্চিন্ত
নির্বিকার ভাবে দিনের পর দিন কাটাইয়া দিতে লাগিল।
১২
৩ যেদিন সন্ধ্যায় নিবারণচন্দ্র প্রথম আবিষ্কার করিল, সুমুখের ঐ ভাঙ্গাবাড়ীর ভাঙ্গা জানালাটা চিরকালের জন্য রুদ্ধ হইয়া যায় নাই, ঠিক তার পর দিন সকাল ৯ট। আন্দাজের সময় সে বাহিরের ঘরে তক্তপােষের উপর তাকিয়া হেলান দিয়া অর্ধ- শায়িত অবস্থায় অত্যন্ত নিবিষ্টভাবে একটা ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়িতেছিল। গভীর রাত্রে অন্ধকারপূর্ণ একটা সরু গলির মধ্যে গােয়েন্দা দেবেন্দ্ৰবিজয়ের কানের পাশ দিয়া এই কিছুক্ষণ হইল উপরিউপরি তিনটি গুলি শন্ শন্ শব্দে ছুটিয়া গিয়াছে। উত্তেজনা উৎকণ্ঠা এবং আশঙ্কায় নিবারণচন্দ্রের একেবারে দম আটকাইয়া যাইবার উপক্রম, এমন সময় সেই কক্ষে একটি দশ এগার বৎসরের বালিকা প্রবেশ করিল—কোলে তার মােটাসােটা একটি উলঙ্গ শিশু। নিবারণ কিন্তু ইহার কিছুই টের পাইল , সে তখন ডিটেটিভের পশ্চাৎ পশ্চাৎ কল্পনায় অনেকদূর পৰ্য্যন্ত চলিয়া গিয়াছে। মেয়েটি ঘরে ঢুকিয়া কোন কথা না বলিয়া প্রথমেই ছেলেটিকে তক্তপােষের উপর বসাইয়া দিল, তারপর কোমরের কসিটা শক্ত করিয়া আটিয়া লইল। তখনও নিবারণচন্দ্র সেই ভীষণ স্থান হইতে ফিরিয়া আসে নাই এবং গােয়েন্দাপ্রবর বীরবর দেবেন্দ্রবিজয়ের জীবন তখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ হয় নাই। সুতরাং নিবারণচন্দ্র কিছুই জানিতে পারিল না। মেয়েটি এই মােটাসােটা ভারি ছেলেটীকে এতটা বহিয়া আনিয়া হাঁপাইয়া পড়িয়াছিল,-কাপড়টাকে ঠিক করিয়া পরিয়া লইয়া সে তক্তপােষের একপ্রান্তে ছেলেটির পাশে ধীরে ধীরে বসিল।কিন্তু গােয়েন্দা দেবেন্দ্রবিজয় তখন পর্যন্ত শত্রুকবলে—জীবন-মরণের সন্ধি-স্থলে।-এমন সময় হঠাৎ মেয়েটির অসাবধানতায় শিশুটি তক্তপােষের উপর হইতে সশব্দে মেঝের উপর মুখ ঠুকিয়া পড়িল, এবং তারপরই এই দস্যি শিশুটি এমনি বিকটম্বরে কাদিয়া উঠিল যে, গােয়েন্দা দেবেন্দ্র- বিজয়কে শকবলে মৃত্যুর মুখে ফেলিয়া নিবারণচন্দ্রকে লাফাইয়া বই ফেলিয়া উঠিয়া পড়িতে হইল। মেয়েটি শশব্যস্তে ছেলেটিকে কোলে তুলিয়া লইল এবং নানাপ্রকারে তাহাকে ভুলাইতে চেষ্টা করিতে লাগিল। নিবারণচন্দ্র প্রথমটা অবাক হইয়া গিয়াছিল, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে প্রকৃতিস্থ করিয়া লইল। এক মুহূর্তে গতকল্যকার সেই জানালা খােলার অপূৰ্ব্বতা তার মনের মধ্যে জাগিয়া উঠিল। ছেলেটি একটু শান্ত হইলে নিবারণ জিজ্ঞাসা করিল-বড় লেগেছে কি ? মেয়েটি তাহাকে কোলে করিয়া ঘরময় পাচারি করিতে করিতে বলিল— “না, তেমন বেশী লাগেনি।” ছেলেটি কিছুক্ষণ ফোপাইয়া
অবশেষে শ্রান্ত হই। তার দিদির কাধে মাথা রাখিয়া ঘুমাইয়া
পছিল।
মেয়েটি অত্যন্ত সন্তর্পণে ধীরে ধীরে তাহাকে
তক্তপােষের উপর শোয়াইয়া দিল, এবং তক্তপােষের উপর
হইতে তালপাতার একটা পা কুছাইয়া লইয়া তাহার পাশে
বসিয়। ধীরে ধীরে তার মাথায় হাওয়া করিতে করিতে নিবারণের
দিকে চাহিয়া বলিল-“আপনাদের বাড়ার মেয়ের। বুঝি দেশে
চলে গেছেন?"
নিবারণচন্দ্র এতক্ষণ চুপ করিয়া হত ভঙ্গের মত এই মেয়েটির
কাস্যকলাপ দেয়া হইতেছিল ; এ অবস্থায় কেমন করিয়া
সে সে এই সম্পূর্ণ অপরিচিতা বালিকাটির সহিত আলাপ
কবিব তাহা তার মাথায় কিছুতেই জোগাইতেছিল না—অথচ
চুপ করি বসিয়া থাকাটাও যে নেহয় অশােভন হইতেছে
'তাহও সে বেশ স্পষ্ট বুঝিতে পারিতেছিল,—এমন সময় মেয়েটি
নিজেই প্রথমে কথা কহিয়া তাহাকে প্রকাণ্ড একটা সমস্যা-
সমাধানের গুরুভার হইতে বাচাইয়া দিল।
ঘাড় চুলকাইয়া—দু’চারবার ঢােক গিলিয়া লইয়া নিবারণ
উত্তর দিল, “মেয়েরা ত কেউ এ বাড়ীতে থাকে না।”
মেয়েটি আবার জিজ্ঞাসা করিল—“তারা সব দেশে থাকেন
বুঝি?”
নিবারণ অনেক কষ্টে এই মেয়েটিকে বুঝাইয়া দিল যে, এ
দুনিয়ায় সে একা, এবং তাহার সহিত স্ত্রীলােকের সম্পর্ক তার
মার মৃত্যুর পর হইতে একপ্রকার উঠিয়াই গিয়াছে। মেয়েটি
১৭
দুঃখের কথা ভাবিতে শিখিয়াছে, এবং এই দায়িত্বটুকু যতই
কেন ক্ষুদ্র হউক না-তাহার মনকে একেবারে অলস এবং
একঘেয়ে হইয়া পড়িয়া থাকার দুর্গতি হইতে অনেকখানি
চাইয়া দিয়াছে।
২০
3
একদিন সুভার বাপের সহিত নিবারণের হঠাৎ আলাপ
হইয়া গেল। যদিও নিবারণচন্দ্র ইহ। আদবেই চায় নাই এবং
এই পরম আকস্মিক ঘটনাটি যে কোনদিন ঘটিতে পারে সে
সম্বন্ধে যে সচেতন ছিল না। লােকটি বয়সে নিবারণ অপেক্ষা
কিছু ছােট হইবে। সেদিন রবিবার, হাতে একট। চটের
থলে লইয়া বিড়ি ফুকিতে ফুকিতে গােলগাল ছােটোখাটো
গৌরবর্ণ এই লােকটি বাজার করিতে যাইতেছিল, হঠাৎ
নিবারণের বাইরের ঘরের জানালাটার ভিতর দিয়া তাহাকে
দেখিতে পাইয়া ধীরে ধীরে সেই কক্ষে প্রবেশ করিল এবং
কোনরূপ ভূমিকা না করিয়াই একেবারে অনর্গল বকিতে সুরু
করিয়া দিল—“নমস্কার মশাই, আপনি বােধ করি আমাকে
চিনতে পারছেন না, আর চিনবেনই বা কি করে?—প্রথমত,
মশায় ত বাড়ীর বারই হন্ না, দ্বিতীয়তঃ, আমরা হচ্ছি গরীব-গুর্ব
লােক,—তা যাক, আমার আজ ভাগ্যি বলতে হবে যে, মহাশয়ের
মত মহৎব্যক্তির দর্শন লাভ হােলাে।”
; ইহার উত্তরে কি যে জবাব দেওয়া যাইতে পারে, তাহা নিবারণচন্দ্রের মাথায় জোগাইল না—সে হাঁ করিয়া এই অপরিচিত লােকটির মুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল। আগন্তুক লােকটি ইতিমধ্যে নিঃশেষপ্রায় বিড়িটায় শেষটান দিয়া সেটাকে জানালা গলাইয়া রাস্তায় ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া আবার বকিতে সুরু করিয়া দিল—“মহাশয়ের বাড়ীর গায়েই এ গরীবের বাস, কিন্তু এ যাবৎ একদিনও মহাশয়ের চরণ দর্শন কপালে ঘটে উঠলাে না; ন'টার মধ্যে নাকে কাণে গুজে বেরুতে হয় মশাই, আর ফিরতে সেই সন্ধ্যে হয়ে যায়। পথটি ত আর সােজা নয়, কোথায় চোরবাগান আর কোথায় খিদিরপুর উক- বুঝুন, মশাই ঠেলাখানা একবার। আজ রবিবার পেলুম, বেরুবার তাড়া নেই, বেলায় বাজার করতে যাচ্ছিলুম, দেখলুম, মশাই বসে রয়েছেন, ভাবলুম এই সুযােগে আলাপটা ক'রে রাখতে দোষ কি। তা মশায়কে বিরক্ত করছি না বােধ হয়, কি জানেন দাদা, আমরা হচ্ছি গরীব-গেরােস্ত লােক আর আপনারা হচ্ছেন-” কথাটাকে সমাপ্ত হইতে না দিয়াই লােকটী হঠাৎ কি মনে করিয়া বলিয়া উঠিল—“আমার মেয়ে সুভার কাছে আপনার সব কথাই শুতে পাই; মেয়েটা ত মশাই আমাদের একরকম পর করে দিতে বসেছে।” এমনিভাবে আধঘণ্টাটা অনর্গল বকিয়া এবং উত্তরে দু একটা ‘’ কিম্বা ‘না’ মাত্র পাইয়া সুভার বাপ যুক্ত ঘনশ্যাম গাঙ্গুলী সেদিনকার মত বিদায় লইল, এবং নিবারণচন্দ্র সেদিন স্নান করিবার পূর্বে ২২
অনেকক্ষণ ধরিয়া ঠাণ্ডা তিলের তৈল ব্ৰহ্মতালুতে ঘসিয়া ঘসিয়া
মাখিল।
দ্বিপ্রহরে আহারাদি সারিয়া নিবারণ শয্যায় গিয়া শুইয়া
পড়িয়াছিল—একটু একটু তন্দ্রাও আসিতেছিল,—এমন সময় সুভা
আসিয়া ডাকিল-“দাদামশাই!"
ধীরে ধীরে নিবারণ উওর দিল—“কি দিদি !"
শব্যাপ্রান্তে নিবারণের মাথার শিয়রে বসিয়া তাহার মাথায়
ধীরে ধীরে হাত বুলাইয়া দিতে দিতে সুভা বলিল, “তুমি লােকের
সঙ্গে ভাল করে কথা কইতে পার না কেন দাদামশাই?”
ব্যাপারটা বুঝিতে নিবারণের বেশী দেরী হইল না—সেও একটু
হাসিয়া উত্তর দিল—“কথা বলছি কেন রে পাগলী,-কেন
তেব সঙ্গে ত আনি রাত দিনই বছি।"
“আমার সঙ্গে খুব ব’কে, কিন্তু আর কারুর সঙ্গে কথা
কইতে পার না কেন ? বাবা মার কাছে বলছিল, তুমি বড় লােক
কিনা এই গরীবদের সঙ্গে কথা কইতে চাও না। আমি কত
করে বােঝাতে চেষ্টা করলুন যে, আমার দাদামশাই সে রকম
লোক নয়, লােকে ভুল বােঝে, তারা বিশ্বাসই করলে না! তুমি
আমার সঙ্গে যেমন কথা কও, তেমনি সকলের সঙ্গে কইলেই ত
আর কেউ কিছু বলতে পারে না—না, সত্যি সত্যি তুমি আর
ওরকম করো না। দাদামশাই—লােকে নিন্দে করবে যে।”
নিবারণচন্দ্র বালিকার এই উপদেশ কতখানি শুনিল তাহা
ভগবানই জানেন ;-কেহ নিন্দা বা সুখ্যাতি করিলে তাহার যে
স্বপ্ন-শেষ
কি পরিমাণে ক্ষতি বা বৃদ্ধি হইতে পারে তাহাও সে যে কতদূর
হিসাব করিয়া দেখিল তাহাও জানেন সেই অন্তর্যামী। কিন্তু এই
ক্ষুদ্র বালিকাটি যে তাহার নিন্দা শুনিয়া ব্যথিত হইয়া একবুক
সহানুভূতি এবং দরদ লইয়া তার মাথার শিয়রে আসিয়া
দাড়াইয়াছে, ইহারই পরম তৃপ্তিটি সে চোখ বুজিয়া নীরবে
কিছুক্ষণ ভােগ করিয়া লইল।
২৪
০ ইহার পরের রবিবারে ঘনশ্যাম আসিয়া আলাপ জমাইয়া তুলিবার যােগাড় করিতেই নিবারণ হঠাৎ এই অস্বাভাবিক ভাবে বকিতে সুরু করিয়া দিল, যে সে নিজেই নিজের ভবিগতিক দেপিয়া অবাক হইয়া গেল। সে পূর্ব হইতেই ঠিক করিয়া রাখিয়াছিল, সুভার বাপ এবার তাহার সহিত আলাপ করিতে আসিলেই সে যে করিয়া হউক প্রমাণ দিবে যে, সে ভদ্রলােকের সহিত অনায়াসে নির্ভয়ে কথা কইতে পারে এবং এই অসম- সাহসিকের কায্যে সে কাহারও অপেক্ষা কোন অংশে কম যায় না ;—সুতরাং সে পূর্ব হইতেই প্রস্তুত হইয়াছিল। কিন্তু প্রথমট। সে কিছুতেই খুঁজিয়া পাইতেছিল না, কি কথা সে কহিবে। ঘনশ্যাম জিজ্ঞাসা করিল, “ভাল আছেন নিবারণবাবু!” সে উত্তর দিল—“?"—ইহার অধিক কি উত্তর সে দিবে? ঘনশ্যাম জিজ্ঞাসা করিল-“মহাশয়ের বুঝি বাড়ী থেকে মােটেই বেরুনাে হয় না?"—সে বলিল—না, মাঝে মাঝে বেরুই ত!”—ইহার বেশী আর কি বলা যাইতে পারে ?
মনে মনে সে মহাবিরক্ত হইয়া উঠিতেছিল। এমন সময়
ঘনশ্যাম আবার কথা তুলিল-“মহাশয়ের পয়সার ত আর অভাব
নেই, একটা মােটর কেনেন না কেন? দিব্যি বিকেলের দিকট।
গড়ের মাঠের দিকে একটু আর পায় কে?—নিবারণ
কথাটাকে শেষ করিতে না দিয়াই হঠাৎ কবে বায়স্কোপে মােটর
ডাকাতির কি একটা পালা দেখিয়াছিল, তাহারই মূল গল্পটা
অত্যন্ত এলােমেলাে ভাবে বকিয়া যাইতে সুরু করিয়া দিল—
যদিও ঘনশ্যামের প্রশ্নের সহিত এই গল্পটির বিশেষ কোনও সম্পর্ক
ছিল না। মৌখিক পরীক্ষার সময় পরীক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে
ইস্কুলের ছেলেরা ইতিহাসের একটা গােটা যুদ্ধের বিবরণ যেমন
চোখ কান বুজিয়। নিশ্বাস রুদ্ধ করিয়া কোনও রকমে আওড়াইয়া
দিয়া হাক ছাড়িয়া বাচে, ঠিক তেমনি করিয়া মিনিট দশেকের
মধ্যে একটা গােটা ডিটেকটিভ উপন্যাস কোনও মতে উগরাইয়া
দিয়া নিবারণ হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল, এবং ইহার পর সে যদি একটি
কথাও আজ না বলে তাহা হইলেও কেহ তাহার দোষ ধরিতে
পারিবে না। এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হইয়া সে শ্রান্ত ক্লান্ত ভাবে
তাকিয়াটায় হেলান দিয়া চক্ষু মুদিয়া চুপ করিয়া পড়িয়া রহিল।
ঘনশ্যাম বলিল—“বাঃ, আপনি ত দিব্যি গল্প জমাতে পারেন
মশাই!”
সে চক্ষু মুদিয়াই উত্তর দিল—“হ!”
ঘনশ্যাম আবার বলিল—“তা যাই বলুন নিবারণবাবু, আপনার
কিন্তু একটা মােটর কেন৷ নিতান্তই দরকার।”
২৬
—স্বপ্ন-শেষ- স নিবারণ—“হু' ‘না’ কিছুই বলিল না। ঘনশ্যাম বলিল—“আপনার তন্দ্রা আসছে বুঝি ?—তা হলে বিরক্ত করবে না—আজ নমস্কার তা হলে তার পরই হঠাৎ কি ভাবিয়া বলিয়া উঠিল—্যা, একটা কথা বলছিলুম-গােট। ত্রিশেক টাকা যদি কিছু দিনের জন্যে নিবারণ সেই ভাবেই চক্ষু মুদিয়া জড়িতকণ্ঠে ডাকি। “বেহারী।” বেহারী অসিয়া উপস্থিত হইল। “আমার ঘর থেকে ক্যাশবাক্সটা নামিয়ে নিয়ে আয় বলিয়া নিবারণ আবার চক্ষু মুদিল। ঘনশ্যাম আওড়াইয়া যাইতে লাগিল—“আপনার ভরসাতেই এ পাড়ায় রয়েছি, তা না হলে আমার মাথার উপর আছেই বা কে আর থাকলেই বা কে কার মুখ তাকায় বলুন আপনি যে দয়া করে আমাদের মত লােককে ধরে বসতে দেন, এই না আমাদের ভাগ্যি !—এমন শিবতুল্য লােক কি আর একালে জন্মায় মশাই—তাইত সেদিন গিন্নীকে বলছিলুম-তারকেশ্বর যাবো, তারকেশ্বর যাবো করছ,-বাড়ীর গায়েই সাক্ষাৎ তারকেশ্বর রয়েছেন—যাও গিয়ে একদিন দেখে এসােগে—সাধে কি সুভ। আমার— এমন সময় বেহারী ক্যাশবাক্স লইয়া সেই কক্ষে প্রবেশ করিল; এবং ইহার কয়েক মিনিট পরেই তিনখানি দশটাকার নােট টাকে গুজিয়া,নূতন একটা বিড়ি ধরাইতে ধরাইতে ঘনশ্যাম গাঙ্গুলী নিবারণের বৈঠকখানা হইতে বাহির হইয়া গেল। ২৭
সেদিন বৈকালে সুভা আসিতেই নিবারণ অত্যন্ত উৎসাহের
সহিত বলিয়া উঠিল—“কি, আমি ভদ্রলােকের সঙ্গে কথা কইতে
পারি না, নয়?” তাহার দৃঢ় বিশ্বাস হইয়াছিল, ঘনশ্যাম বাড়ী গিয়া
নিশ্চয় সুভার মার নিকট বলিবে—এমন মজলিসী লােক সে আর
জীবনে দুটী দেখে নাই, এবং সুভা নিশ্চয়ই তাহা শুনিয়াছে।
সুভা কিন্তু ইহার বিন্দুবিসর্গও জানিত না, সুতরাং সে এ কথার
কোনও অর্থই খুঁজিয়া পাইল না। সে সংক্ষেপে বলিল—“তার
মানে?”
নিবারণ সগর্বে বলিয়া উঠিল—“তার মানে, তাের বাপকে
আজ একেবারে কথার তােড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার যােগাড়
করেছিলুম তা জানিস্ !—একটানা ১৫টি মিনিট একবারও না
থেমে বকে গেছি;-কথা কই না তাই-নইলে একবার মুখ
খুলে,—নিয়ে আয় না তাের কত ভদ্রলােক আছে—-হু।”
একসঙ্গে এতগুলাে কথা এত তাড়াতাড়ি বলিতে নিবারণকে
সুভা এই প্রথম শুনিল, এবং এই সকল কথা বলিবার সময় তার
মুখে-চোখে এমন একটা উত্তেজনা এবং উৎসাহ সে আজ
লক্ষ্য করিল, যাহা নিবারণের পক্ষে অত্যন্ত বেশী অস্বাভাবিক
এবং বেখাপ্পা বলিয়া তার চোখে ঠেকিতে লাগিল। নিবারণের
মুখের দিকে চাহিয়া অবশেষে সে হাসিয়া ফেলিল।
নিবারণও ইতিমধ্যে বােধ হয় নিজের অস্বাভাবিকত্ব সম্বন্ধে
সচেতন হইয়া গিয়াছিল—সে তার নিজস্ব স্বাভাবিক কোমল
স্বরে বলিল, “হাসলি যে দিদি ?”
২৮
-স্বপ্ন-শেষ
••
সুভা আবার হাসিল; কিন্তু কেন কে জানে তার চোখের
কোণে কখন তার অজ্ঞাতসারে এক ফোটা অশ্রু সঞ্চিত হইয়া
উঠিয়াছিল।
সেইদিনই সন্ধ্যার পর নিবারণ শয্যার উপর কিয়া হেলান
দিয়া বসিয়াছিল—সুভা পার্শ্বে বসিয়া ধীরে ধীরে মাথায় হাত
বুলাইয়া দিতে দিতে অত্যন্ত করুণকণ্ঠে বলিল—“তােমাকে
কারুর সঙ্গে কথা কইতে হবে না দাদামশাই—তুমি শুধু আমার
সঙ্গে কথা কয়য়া-তা হলেই হবে-বুঝলে।” সে স্বর অতান্ত
গাঢ় এবং সহানুভূতিপূর্ণ। নিবারণ কোন কথা বলিল না, সে
কেবল সুভার কোমল ছােট্ট হাতখানি দুই হাত দিয়া চাপিয়া
ধরিয়া চুপ করিয়া চক্ষু বুজিয়া শুইয়া রহিল।
২৯
ইহার পর গােটা চারিটা বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। সুভা এখন আর বালিকাটি নাই—সে এখন ষােড়শী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিবাহ হয় নাই। না হওয়ার একটা কারণও ছিল। ঘনশ্যাম গাঙ্গুলীর স্বগ্রামস্থ নীলরতন চট্টোপাধ্যায়ের জীবিত কালে তাহারি পুত্র শ্রীমান বিমলের সহিত সুভার বিবাহের কথা খুব ছেলেবেলা হইতেই একরকম পাকাপাকি হইয়া গিয়াছিল। নীলরতনের অবস্থা মন্দ ছিল না, জমি-জারাত এবং ছছাট-খাটো কিছু জমিদারী ছিল—তাহাতেই মােটা ভাত এবং মােটা কাপড় বেশ স্বচ্ছন্দে চলিয়া যাইত ; ছেলেটিও বেশ সুপাত্র। গ্রামের স্কুল হইতে সে প্রবেশিকা পরীক্ষায় জলপানী পাইয়াছিল। তখন সুভার বয়স ৭ কি ৮ বৎসর। ঘনশ্যাম তখন দেশেই থাকিত ঋণের দায়ে চাকরীর সন্ধানে তখন পর্যন্ত তাহাকে ভিটামাটি খােয়াইয়া কলিকাতায় পালাইয়া আসিতে হয় নাই। সামান্য যাহা জমি-জারাত ছিল তাহাতেই তাহার সংসার খুব স্বচ্ছলে না হইলেও নেহাত অস্বচ্ছলেও চলিত না। তাহার পর খুড়ার
সহিত সামান্য কয়েক বিঘা জমি লইয়া গিল মােকর্দমা।
পুরা ৩টি বছর ধরিয়া মামলা গড়াইল ঘনমূর যাহা কিছু
জমিজমা ছিল, মােকর্দমার খরচ জোগাইতে যে সমুদয় একে
একে বাঁধা পড়িয়া গেল—তথাপি কিন্তু মামলায় সে জিতিতে
পারিল না।
তাহার পর ভিটামাটি বেচিয়া, স্ত্রী এবং তিনটি কন্যাকে
স্যালকের স্কন্ধে চাপাইয়া দিয়া সে কলিকাতায় পলাইয়া আসে
চাকরীর সন্ধানে। এ যখনকার কথা বলিতেছি, তখন
সুভার উপরের দুটি ভগিনীর বিবাহ হইয়া গিয়াছে। কলিকাতায়
আসিয়া জোগাড়ে ঘনশ্যাম খুঁজিয়া পাতিয়া অবশেষে জেটি
সরকারের একটা কাজ জোটাইয়া লইল, এবং মাহিনা ও উপরিতে
দুই তিন বৎসরের মধ্যেই হাতে কিছু জমাইয়া ফেলিল। হার
পরই সে স্ত্রী-কন্যাদের কলিকাতায় আনাইল, এবং নিবারণচন্দ্রের
বাড়ীর গায়ের ভাঙ্গা বাড়ীটি নামমাত্র ভাড়ায় রক্ষা করিয়া লই
কোনও রকমে দিন গুজরান করিতে লাগিল।
ইতিমধ্যে সুভার বিবাহের কথা সে অনেকবার নীলনের
নিকট পাড়িয়াছিল, কিন্তু পুত্র বি, এ পাশ না করা পয্যন্ত
তিনি ঘনশ্যামকে
অপেক্ষা করিতে বলিলেন। ভার
বয়সও তখন অল্প, সুতরাং ঘনশ্যামের ও বিশেষ ভাড়া
ছিল না। তার পর হঠাৎ একদিন ঘনশ্যাম শুনিল
মাত্র তিন দিনের জ্বরে নীলরতন সহসা হার্টফেল করিয়া মারা
গিয়াছে। এবং তাহার বড় ভাই তারিণী চট্টোপাধ্যায়
-
হইয়া দাঁড়াইয়াছেন বিমলের অভিভাবক। ঘনশ্যামের সহিত
নীলরতনের কথাই ছিল, এ বিবাহে বরপক্ষ কন্যাপক্ষের নিকট
পণস্বরূপ কিছুই লইবেন না—কেবল নেহাত ‘নেমকৰ্ম্ম হিসাবে
যে সকল জিনিস না দিলেই নয়, তাহাই দিয়া ‘নমােনমাে’ করিয়া
কোনও রকমে ঘনশ্যাম কন্যাদায় হইতে মুক্ত হইবে। সুতরাং
সে নিশ্চিন্ত হইয়াই বসিয়াছিল। আজ হঠাৎ নীলরতনের মৃত্যু
সংবাদে তার মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল, এবং বিশেষ
করিয়া তারিণীচরণের কথা ভাবিয়া সে একবারে বিশহাত
মাটির তলায় বসিয়া গেল। এই পরিণীচরণকে চিনিতে তাহার
বাকি ছিল না। হাঁড়ি ফাসিয়া যাইবার ভয়ে গ্রামের লােকে
তাহার নাম প্রান্তে মুখে আনিত না, এবং শুনা যায়,
প্রাতঃকালে উঠিয়া তাহার মুখ-পঙ্কজ দর্শন করিয়া ফেলিয়া
অনেককেই নাকি অনেক প্রকার বিপদে পড়িতে হইয়াছে।
এহেন তারিণীচাটুয্যে যেদিন শ্রীমান বিমলচন্দ্রের অভিভাবক
হইয়া দাঁড়াইলেন সে দিন ঘনশ্যাম চক্ষে সরিষাফুল দেখিতে
আরম্ভ করিল। তথাপি একবার শেষ চেষ্টা করিয়া দেখিবার
জন্য তারিণীর সহিত সে অবসরমত একদিন দেখা করিল এবং
বিমলের সহিত সুভার বিবাহের কথা পাড়িয়া বসিল।
নীলরতনের সহিত দেনা-পাওনা সম্বন্ধে যে সকল কথাবার্তা
হইয়াছিল, ঘনশ্যাম তারিণীকে সে সমুদয় স্মরণ করাইয়া
দিল।
হাসিয়া আপ্যায়িত করিয়া তারিণী বলিল—“আহা, এত
ঘরের কথা হে ঘনশ্যাম—আপােষে দেনাপাওনার কথাটা
চুকিয়ে ফেল্লেই ত হয়।”
ঘনশ্যাম হাতযােড় করিয়া বলিল—“নীলরতনদার সঙ্গে
আমার কথাই তাে ছিল তারিণী-দা, শাখা হাতে দিয়ে কন্যা
সম্প্রদান করবো-আজ তবে আবার
কুঞ্চিত করিয়া তারিণী বলিল, “তা, আমিই কোন্ লাখ,
পঞ্চাশ চাইছি তােমার কাছ থেকে হে!"
কতক আশ্বস্ত হইয়া ঘনশ্যাম বলিল-“তা বেশ বলুন কি
দিতে হবে আমাকে।”
চোখ বুজিয়া কিছুক্ষণ কি ভাবিয়া তারিণী বলিল, “চার
হাজার টাকা নগদ, বাস্, আর কিছু নয়।”
ঘনশ্যামের চক্ষু কপালে ঠেলিয়া উঠিল—“চার হাজার টাকা
কোথায় পাবাে তারিণী-দা?”
কুঞ্চিত করিয়া তারিণী বলিল, “না পাও মেয়ের বিয়ে
অন্য যায়গায় দাওগে যাও না ভায়া—কেউ ত মাথার দিব্যি
দিযে ধরে রাখে নি।” সুতরাং ঘনশ্যামকে সেখান হইতে
হতাশ হইয়া ফিরিয়া আসিতে হইল।
এ যখনকার কথা বলিতেছি তখন সবে মাত্র সুভারা
কলিকাতার বাটীতে উঠিয়া আসিয়াছে, এবং সুভার বয়স তখন
এগার কি বার হইবে। দেশে সুদের বাড়ী এবং বিমলদের বাড়ী
একেবারে পাশাপাশি। এই দুই ব্রাহ্মণপরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠতাও
ছিল খুব বেশী। ছেলেবেলায় বিমলের আড়াই ছিল সুভাদের
৩
স্বপ্ন-শেষ বাড়ীতে। ইস্কুল হইতে ফিরিয়া, কাপড় জামা না ছাড়িয়াই অর্ধেকদিন বিমল সুভাদের বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইত এবং সেই খানেই জল-যােগের পালা সারিয়া ঘুড়ি এবং লাটাই লইয়া তাহাদের ছাতে গিয়া উঠিত তার পর বিমল প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ হইয়া কলেজে পড়িবার জন্য কলিকাতায় চলিয়া আসিল। ওদিকে ঘনশ্যামও মােক- র্দমায় হারিয়া ভিটামাটি খােয়াইয়া চাকরীর সন্ধানে কলিকাতায় চলিয়া আসিল,—আর সুভা তার মার সহিত তার মামার বাড়ীতে গিয়া আশ্রয় লইল। সুতরাং এই কয়টা বৎসর বিমলের সহিত সুভার একবারও দেখা হইবার সুযােগ ঘটিয়া উঠে নাই। তার পর হঠাৎ একদিন বিমল শুনিল, সুভারা কলিকাতায় আসিয়া বাসা ভাড়া লইয়াছে। তার জ্যেঠা তারিণীচরণের জ্যেষ্ঠ পুত্র কলিকাতা হাইকোর্টে ওকালতী করিত। সেই সূত্রে তারিণীচরণের সংসারটি আজ বৎসর খানেক হইল কলিকাতায় উঠিয়া আসিয়াছে, এবং বিমল ও তার বিধবা মা ইহাদেরই পরিবার-ভুক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। বিমল এই সময় বি, এ পাশ করিয়া আইন পড়িতেছিল। ৩৪
সেদিন সন্ধ্যার সময় আফিস হইতে ফিরিয়া রান্নাঘরের
দরজার কাছ হইতে ভিতরের দিকে একবার মাত্র উকি মারিয়াই
ঘনশ্যাম হাকিল—“কাকে ধরে এনেছি, দেখেছ ?” সুভার-মা
ঝােল সাতলাইতেছিল,—শব্দায়মান কড়াটাকে মেঝের উপর
নামাইয়া রাখিয়া উঠিয়া দাড়াইতেই চৌকাঠের গােড়ায় জুতা
ছাড়িয়া ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া বিমল তাহার পদধূলি
লইয়া নমস্কার করিল।
“অমনি-ই আশীর্বাদ করছি বাবা—আর প্রণাম করতে
হবে না।” বলিয়াই সভার মা একটা কাঠের পিঁড়ি আগাইয়া
দিল এবং বিমল তাহার উপর বসিলে তাহার দিকে সস্নেহ
দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল, “তুই যে বড্ড রােগা হয়ে গেছি, বিমল,
—আমি প্রথমটা তােকে চিন্তেই পারি নাই।”
বিমল হাসিয়া বলিল, “তুমি আর মা চিরকালটাইত আমাকে
রােগা হতে দেখে আসছ, পিসীমা।”
“নারে, সত্যি সত্যি তুই বড্ড রােগা হয়ে গেছিস”—বলিয়াই
ইহার কয়েক দিন পর রবিবারের এক সকালে নিবারণের
নিকট গিয়া বিমলের সহিত সুভার বিবাহের কথা পাড়িয়া
ঘনশ্যাম একেবারে কান্নাকাটি করিয়া ধন্না দিয়া পড়িল—“এ যাত্রা
আমাকে উদ্ধার করিতেই হবে, নিবারণবাবু।”
অত হাতে পায়ে ধরাধরির কোনই প্রয়ােজন ছিল না,
কেন না সুভার বিবাহের জন্য চারি হাজার টাকা খরচ করিতে
নিবারণ কোন দিনই নারাজ হইত না। তথাপি ঘনশ্যাম বুক
চাপড়াইল, কাদিল, হাহুতাশ করিল, পায়ে ধরিল, এবং আরও
অনেক কিছু করিয়া বসিল, এবং সে যে কতকষ্টে এই অতিবড়
কৃপণ এবং অর্থপিশাচ লােকটিকে অভিনয় দেখাইয়া, কঁাদিয়া
কাটিয়া কবুল করাইয়া আসিয়াছে, বাড়ী গিয়া তাহা
ফেনাইয়া বাড়াইয়া এতখানি করিয়া গৃহিণীর কাছে বলিয়া
নিজের বাহাদুরীতে খুব খানিকটা গর্ব অনুভব করিল।
আড়াল হইতে সুভা সমস্তই শুনিয়াছিল—তার কান্না পাইতে
লাগিল। তার এই এত বড় ভালমানুষ শিবতুল্য দাদামশাইটির
Ob
উপর এই যে অমানুষিক অত্যাচার,—এই যে তাহাকে ঠকাইয়া বােকা বানাইয়া আসিবার হৃদয়হীন মিথ্যা বাহাদুরী, ইহার প্রত্যেকটি কণ্টক তার বুকের মধ্যে বিধিতেছিল। সুভা জানিত তাহার বিবাহের নাম করিয়া নিবারণের নিকট হইতে টাকা আদায় করা কত সােজা, এবং জানিত বলিয়াই ঘনশ্যামের এই সব অলীক এবং মিথ্যা বাহাদুরী তাহার নিকট অসহ বােধ হইতে লাগিল, এবং ইহাতে ঘনশ্যামের উপর তার যে পরিমাণে অশ্রদ্ধা এবং অভক্তি আসিতেছিল; নিবারণের প্রতি ঠিক সেই পরিমাণেই শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে তার বুকখানি ভরিয়া উঠিতেছিল। তার মনে হইতেছিল, এক্ষণি গিয়া নিবারণের পা দুটো জড়াইয়া ধরিয়া বলিয়া আসে,-“এসংসার তােমার জন্যে নয়, দাদামশাই, তুমি এ সংসারের অনেক উর্জে।” সেই দিনই সন্ধ্যার সময় নিবারণ আপনার শয়নকক্ষে শয্যার উপর অর্ধশায়িত অবস্থায় একখানি ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়িতেছিল, এমন সময় সুভা সেই কক্ষে প্রবেশ করিয়া ডাকিল- —“দাদামশাই!” বইটাকে মুড়িয়া রাখিতে রাখিতে নিবারণ বলিল, আয় দিদি আয়—আজ সমস্ত দিন কোথায় ছিলি দিদি ?" নিবারণের পাশে শয্যার উপর বসিয়া পড়িয়া সুভা বলিল, “কাল রাত থেকে মার জ্বর হয়েছে কিনা, তাই রান্নাবান্নার হাঙ্গাম সারতে দেরী হয়ে গেল, দাদামশাই!” তার মাথায় সস্নেহে হাত বুলাইয়া দিতে দিতে নিবারণ বলিল “তাই ভালাে, আমি ভাবলুম বুঝি দিদি আমার এখন থেকেই মায়া কাটাতে শুরু করে দিলে।" সুভা চুপ করিয়া মুখ নীচু করিয়া বসিয়া রহিল—কেন কে জানে তার কান্না পাইতে লাগিল। সে রাতে বাড়ী ফিরিয়া শয্যায় শুইয়া অনেক রাত পর্যন্ত সুভার নিদ্ৰা আসিল না। বিমলের সহিত তার বিবাহ হইবে ইহা অপেক্ষা আনন্দের বিষয় আর কি হইতে পারে? সে সত্যসত্যই বিমলকে ভালবাসিত, এবং যে দিন তারিণীচরণের নিকট হইতে ফিরিয়া আসিয়া ঘনশ্যাম বিমলের আশা ত্যাগ করিয়া মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িয়াছিল, সে দিন সুভা সত্যসত্যই দুনিয়াটা অন্ধকার দেখিয়াছিল। তার পর কতসময় সে কল্পনা করিয়াছে বেশ হয়, যদি হঠাৎ বিমলের জ্যাঠা তারিণীচরণ একদিন রাত্রে ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া স্বপ্ন দেখে,—জটাজুটধারী কোন্ এক মহাপুরুষ তাহার শিয়রে দাড়াইয়া রােষকষায়িত লােচনে বলিতেছে-সে যদি বিমলের সহিত সুভার বিবাহ না দেয় তাহা হইলে তার সর্বনাশ হইবে। এমনি আরও কত কি কথা,তার পর তারিণীচরণ আসিয়া ঘনশ্যামের পায়ে ধরিয়া ক্ষমা চাহিবে এবং অবশেষে বিমলের সহিত তার বিবাহ দিতে বাধ্য হইবে। এমনি আরাে কত কি আবােল-তাবােল কল্পনা, যার মাথা নাই অথচ যা মানুষকে হাসায় কাদায়। আজ কিন্তু সুভার কল্পনা সত্যে পরিণত হইতে বসিয়াছে—দুদিন পর সত্য- ৪০ সত্যই বিমলের সহিত তার বিবাহ হইয়া যাইবে। কিন্তু এই অতিবড় আনন্দের এবং সুখের অবস্থাটিকে পুরাপুরি উপলব্ধি করিতে গিয়া তার মন আজ বার বার ক্ষুন্ন হইয়া ফিরিয়া ফিরিয়া আসিতেছিল। তার মন বার বার ভিতরে ভিতরে এই বলিয়া শিহরিয়া উঠিতেছিল যে, তার বাপের মত সেও তার এই উদার, স্নেহময় দাদামশাইটির উপর অত্যাচার করিতেছে ত? তার কান্না আসিতে লাগিল। কেন এই বৃদ্ধটির সহিত তার আলাপ হইল ? কেন এই আত্মীয়-স্বজন-হীন অসহায় বৃদ্ধটা তার সমস্ত অসহায়তা এমন করিয়া তার চোখের সুমুখে মেলিয়া ধরিল ?-সে শ্বশুরবাড়ী চলিয়া গেলে এই অসহায় অকর্মণ্য বৃদ্ধটির অবস্থা যে কি হইবে, তাহা ভাবিতে গিয়া আজ সুভা বার বার মনে মনে শিহরিয়া উঠিল। তার মনে হইতে লাগিল সে যেন জানিয়া শুনিয়া এই বৃদ্ধটির উপর অত্যাচার করিতে বসিয়াছে, এবং এই অত্যাচারটা যাহাতে ঘটা করিয়া সম্পন্ন হইতে পারে তাহার জন্য তাহারি নিকট হইতে ফাকি দিয়া, ঠকাইয়া টাকা আদায় করা হইতেছে। ছট ফট করিয়া শয্যা ত্যাগ করিয়া সুভা জানালার ধারে আসিয়া দাড়াইল। তার যেন দম আটকাইয়া যাইতেছিল--বাহিরের উদার মুক্ত প্রকৃতির দিকে চাহিয়া সে যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল । সেই রাত্রেই শয্যায় শুইয়া নিবারণের মনের মধ্যে ঘুরিয়া ফিরিয়া বিমল নামক একটি যুবকের কাল্পনিক চেহারা বার বার ভাসিয়া উঠিতেছিল। এই যুবকটিকে সে কখন চক্ষে দেখে নাই ৪১ -কেবল নাম শুনিয়াছে মাত্র, কিন্তু তাহার মােলায়েম নামটি মনের মধ্যে বার বার আওড়াইয়া তার দৃঢ় ধারণা হইয়া গেল—সে অত্যন্ত সুন্দর এবং কমনীয়। একথা যতই সে ভাবিতে লাগিল ততই তার মনটা কেন কে জানে ভিতরে ভিতরে দারুণ ক্ষুণ্ণতায় ভরিয়া উঠিতে লাগিল। আজ প্রথম নিবারণের মনে হইল—সেও একদিন যুবক ছিল এবং হয়ত বা সূন্দরও ছিল। তার এই একঘেয়ে নীরস জীবনটার মাঝ- খানে কবে যে যৌবন আসিয়াছিল এবং কবে যে অনাদর এবং অবজ্ঞা মাত্র পাইয়া অভিমান করিয়া চলিয়া গিয়াছে, তাহার কথা কোনদিন মনেই আসে নাই। তাহারি সামান্য ইতিহাস খানির পুরাতন ছিন্ন পৃষ্ঠাগুলি যে কোনদিন উল্টাইয়া দেখিবার জন্য তার তাগিদ আসিবে তাহা সে কল্পনাতেও ভাবিতে পারে নাই-আজ কিন্তু সত্যসত্যই তাগিদ আসিল। কেন কে জানে নিবারণের আজ মনে হইতে লাগিল তার সমস্ত জীবন ধরিয়া সে কেবল ভুলই করিয়া আসিয়াছে। যে দায়িত্ব এবং ঝঙ্কাটের দিকে সভয়ে চাহিয়া জীবনের সমস্ত সাধ আহলাদকে সে নষ্ট করিয়া ফেলিয়াছে, আজ তার মনে হইতে লাগিল সেগুলাে হয়ত ঠিক ততটা ভয়ঙ্কর নয়। সে মনে মনে কল্পনা করিল,—সুভার ভারি কোন পীড় হইয়াছে, এবং সারারাত ধরিয়া মাথার শিয়রে বসিয়া সে সেবা করিতেছে ;-ইহার মধ্যে ঝঞ্চাট সে কোথাও খুঁজিয়া পাইল না, বরং যাহা পাইল তাহা তার মনের মধ্যে বেশ একটি অপূৰ্ব আত্ম- ৪২ স্বপ্ন-শেষ- প্রসাদ এবং তৃপ্তি আনিয়া দিল। আজ প্রথম যেন তার হুস হইল সূভা যুবতী এবং সুন্দরী, এবং দুনিয়ার আর পাঁচজন যুবতীর মতই কাহারও স্ত্রী হইবার সম্ভাবনা তার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে বর্তমান। এতদিন ধরিয়া দিনরাত কাছাকাছি থাকিয়াও যাহার যৌবন এবং সৌন্দৰ্য্য তার চোখে কোনদিন ধরা পড়ে নাই, আজ একটি কাল্পনিক সুন্দর যুবকের পাশে তাহাকে কল্পনায় দাড় করাইয়া দিয়া তাহারি যৌবন এষং সৌন্দৰ্য্য সম্বন্ধে সে সহসা পূর্ণমাত্রায় সচেতন হইয়া উঠিল, এবং সেই সঙ্গে বার বার করিয়া তার মনে পড়িয়া যাইতে লাগিল—সে বৃদ্ধ এবং কুৎসিত। কিছুদিন পূর্বে বটতলার কি একটা ডিটেকটিভ উপন্যাস সে পড়িয়াছিল—কি করিয়া এক অসহায় বৃদ্ধ ভদ্রলােকের যুবতী সুন্দরী স্ত্রীকে একটি ধনী লম্পট যুবক শুধু কেবল সৌন্দয্যের মােহে ভুলাইয়া ফুসলাইয়া বাহির করিয়া লইয়া গিয়াছিল, এবং তাহার পর পাছে কোনরূপ গােলমাল উঠে, সেই ভয়ে, সেই বৃদ্ধটিকে কি নৃশংসভাবেই না হত্যা করা হইয়াছিল। আজ কেমন করিয়া কে জানে তার হঠাৎ মনে হইয়া গেল—সুভা যেন তার বিবাহিতা স্ত্রী এবং বিমল নামক এই যুবকটি তাহার হাত হইতে তাহাকে ভুলাইয়া, ফুসলাইয়া, ফাকি দিয়া কাড়িয়া লইয়া যাইতে আসিয়াছে। তাহার পরই সুভার সম্বন্ধে এমন সব কল্পনা এবং চিন্তা তার মনের মধ্যে উঠিতে লাগিল, যাহার কথা ভাবিয়া সে নিজেই হঠাৎ কেমন যেন লজ্জিত হইয়া উঠিল,তার মনে হইতে লাগিল, সে যেন গােপনে গােপনে এই সরল ৪৩
মেহপ্রবণ বালিকাটির বিরুদ্ধে জঘন্য একটা ষড়যন্ত্রে
লিপ্ত হইয়াছে। তার মনে হইতে লাগিল পরদিন প্রাতঃকালে
সুভা আসিয়া যখন তার সম্মুখে দাঁড়াইবে, তখন কি করিয়া সে
তাহার মুখের পানে তাকাইবে? তার দৃষ্টির মধ্যে নিশ্চয়ই
এমন কিছু থাকিবে যাহাতে করিয়া তাকে ধরিয়া ফেলা সুভার
একটুও শক্ত হইবে না।
৪৪
ন প্রভাতে শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিয়া জানালার দিকে চোখ পড়িয়া যাওয়া মাত্র নিবারণ দেখিল—সুভাদের সেই ছােট ভাঙ্গা জানালার ভিতর দিয়া তাহাদের ভাড়ার ঘরের যে অংশটা দেখা যাইতেছে,তাহারই একধারে একটা বঁটি লইয়া বসিয়া সুভ৷ ঘাড় হেট করিয়া তরকারী কুটিতে ব্যস্ত। এক মুহুর্তে তাহার যৌবন এবং সৌন্দৰ্য্য নিবারণের চক্ষের উপর দিয়া বিদ্যুতের মত ঝলকিয়া গেল। তার মনে হইতে লাগিল,-এই একটি রাত্রের ব্যবধান সুভার কৈশাের এবং যৌবনটির মাঝখানে মুহুর্তের মধ্যে কখন অসীম হইয়া উঠিয়াছে। বায়স্কোপে নায়িকার কৈশােরের দু-চারিটা মাত্র দৃশ্য দর্শকের চোখের সুমুখে ধরিয়া—তারপর হঠাৎ যেমন দশ বৎসরের পরের ঘটনা হইতে পালা শুরু করিয়া দেওয়া হয়, অথচ এই দশটা বৎসর প্রকৃতপক্ষে দর্শকের চক্ষের সম্মুখে নিমেষেই কাটিয়া যায়, ঠিক তেমনি করিয়া নিবারণের চক্ষের সম্মুখে সুভার কৈশাের যেন এক রাত্রেই শেষ হইয়া গেল, এবং যেখান হইতে সে আজ নূতন করিয়া পালা শুরু করিয়া দিল, সেখানে সে যুবতী এবং সুন্দরী। ৪৫ দ্বিপ্রহরে সুভা আসিয়া যখন তার শয়নকক্ষে প্রবেশ করিল, নিবারণ তখন সবে আহার সারিয়া শয্যায় আসিয়া শুইয়া পড়িয়াছে। সুভার পদশব্দে সে ইচ্ছা করিয়াই চক্ষু মুদিল। সুভা আসিয়া ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে দিতে ডাকিল-ঘুমুচ্ছো নাকি দাদামশাই?” সে সেইভাবে চক্ষু মুদিয়াই উত্তর দিল, “না ঠিক ঘুমােই নি-মাথাটা বড্ড ধরেছে, তাই চোখ বুজে পড়ে আছি।” “মাথা টিপে দোবাে দাদামশাই ?” বলিয়া সুভা শয্যাপ্রান্তে বসিল। “না কিছু করতে হবে না, একটু চুপ করে ঘুমােত পারলেই সব সেরে যাবে’খন--,-বলিয়া নিবারণ যেমন চোখ বুজিয়া শুইয়াছিল, তেমনই শুইয়া রহিল।-কেন কে জানে সুভার মুখের দিকে তাকাইয়া কথা বলিতে আজ তার সাহসে কুলাইয়া উঠিতেছিল না। সুভা কিন্তু কোন কথা শুনিল না—সে জোর করিয়া মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল এবং কিছুক্ষণ পর নিবারণ নিদ্রা গিয়াছে ভাবিয়া পা টিপিয়া টিপিয়া সে কক্ষ হইতে বাহির হইয়া গেল। সন্ধ্যার পর নিবারণের মাথার যন্ত্রণা কমিয়াছে কিনা খোঁজ লইতে আসিয়া সুভা দেখিল, নিবারণ বাড়ীতে নাই। বিহারীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করাতে সে বলিল,-বায়স্কোপে গিয়াছেন। সুভার মনে কেমন যেন খটকা লাগিল, যে নিবারণ তাহাকে সঙ্গে লইয়া বায়স্কোপ দেখিতে একদিনও যায় নাই, এমন কি ৪৬
—স্বপ্ন-শেষ--
কোনদিন কোনও কারণে সুভার না যাওয়া হইলে, যে-নিবারণ
সেদিনকার মত বায়স্কোপ যাওয়া বন্ধ করিয়া দিত, আজ সেই
নিবারণ তাহাকে না জানাইয়া এই যে গােপনে বায়স্কোপ
দেখিতে চলিয়া গেল, সুভার নিকট ইহা কেমন যেন স্বাভাবিক
এবং সহজ বলিয়া মনে হইল না। তার দ্বিপ্রহরের ব্যবহারের
মধ্যেও সে যেন একট। আড়-আড় ছাড়-ছাড় ভাব লক্ষ্য করিয়া-
ছিল। মাথা ত তার ইতিপূৰ্বে কতদিনই ধরিয়াছে; কিন্তু
এমন নিরপেক্ষ ঔদাসীন্য সে ত নিবারণের মধ্যে কোনদিন লক্ষ্য
করে নাই। তারপর সন্ধ্যার সময় আসিয়া সে যখন শুনিল,
নিবারণ তাহাকে না জানাইয়া বায়স্কোপ দেখিতে গিয়াছে, তখন
সে স্পষ্ট ধরিয়া ফেলিল, ইহার মধ্যে কোথাও একটা কিছু
নিশ্চয়ই তাহার অজ্ঞাতসারে ধীরে ধীরে গজাইয়া উঠিতেছে ;
কিন্তু অনেক ভাবিয়াও এই ‘একটা-কিছুর সন্ধান সে কোনমতেই
করিয়া উঠিতে পারিল না।
পরদিন সকালবেলা আসিয়া নিবারণকে সুমুখে পাইয়া সুভা
বলিল—“তুমি কাল সন্ধ্যার পর কোথায় গেলে দাদামশাই?”
মাথা চুলকাইয়া, দুবার ঢােক গিলিয়া লইয়া নিবারণ বলিল,
“একটু কাজে বেরিয়েছিলুম।”
তার মুখের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া সুভা বলিল—“তবে
বেহারী বল্পে বায়স্কোপ দেখতে গেছ!”
নিবারণ এবার সত্যসত্যই বিপন্ন হইয়া পড়িল। তার মনে
হইতে লাগিল, একটা মিথ্যা চাপা দিতে গিয়া সে আজ তার
••
৪৭
।
অন্তরের অনেক কিছু গােপন রহস্য ফাস করিয়া ফেলিয়াছে,
এবং সুভার কাছে হয়ত বা সে ধরা পড়িয়া গিয়াছে।
“কথা কইছছা না যে?” বলিয়া সুভা তার মুখের দিকে
চাহিল । সে দৃষ্টি নিবারণের পক্ষে সত্যসত্যই অসহ বােধ
হইতে লাগিল। পুলিশের জেরার সময় অপরাধীর মনের অবস্থা
যেরূপ হয়, নিবারণের মানসিক অবস্থা আজ ঠিক তদ্রুপ হইয়া
দাড়াইয়াছিল।
সুভা বলিল—“বুঝেছি দাদামশাই, তুমি আজকাল আমাকে
আর আগেকার মতন” এই অবধি বলিয়াই স্বভা হঠাৎ
থামিয়া গেল—“ওকি তুমি কঁদছে নাকি দাদামশাই?”—সুভা
গিয়া হাত ধরিতেই বৃদ্ধ নিবারণ হঠাৎ অসহায় বালকের মত
ডুকাইয়া কঁদিয়া উঠিল।
কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেকে সামলাইয়া লইয়া নিবারণ লজ্জায়
একবারে আড়ষ্ট হইয়া গেল। তার মনে হইতে লাগিল, সে
আজ সুভার নিকট সম্পূর্ণরূপে ধরা পড়িয়া গিয়াছে; কিন্তু কেন
কে জানে সঙ্গে সঙ্গে সে খানিকটা হাঁফ ছাড়িয়াও বাঁচিল। তার
মনে হইতে লাগিল, যে কথাটা সুভাকে স্পষ্ট করিয়া প্রকাশ
করিয়া বলিবার মত দুঃসাহস তাহার কোন দিনই হইত না,
তাহার এই ক্ষণিক দুর্বলতার ইঙ্গিত আজ তাহাই প্রকারান্তরে
তাহাকে আভাসে বুঝাইয়া দিতে পারিয়াছে। একটা বিপদকে
প্রতিদিন প্রতিক্ষণে ভয় করিতে করিতে হঠাৎ একদিন সেই
বিপদটা আসিয়া পড়িয়া চুকিয়া গেলে পর মানুষ যেমন একটা
৪৮
স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়িয়া বাঁচে এবং হঠাৎ মরিয়া হইয়া উঠিয়া
অতিরিক্ত রকম সাহস প্রকাশ করিতে থাকে, ঠিক তেমনি
করিয়া নিবারণ আজ হঠাৎ ভিতরে ভিতরে মরিয়া হইয়া উঠিল।
তার ধারণা হইয়াছিল সুভা নিশ্চয়ই তার অন্তরের কথা জানিয়া
ফেলিয়াছে। তাই সুভা যখন তাহাকে বলিল—“তুমি বুঝি
এখন থেকে আমার মায়া কাটাবার চেষ্টা করছে দাদামশাই?”
সে তখন টানিয়া হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিল-“দোষ কি শুধু
আমারই সুভা? শুধু কেবল বুড়ো বলে তুইও কি
আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছি না, দিদি ?”
সুভা এ কথার অর্থ ঠিক পুরাপুরি হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল
, অথবা ইচ্ছা করিয়াই হৃদয়ঙ্গম করিতে চাহিল না। তার
মনে হইল, এটা নিছক রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু
রসিকতা করিতে গিয়া কোন দিন মানুষের স্বর যে কাপিয়া উঠে,
ইহা সুভা আজ এই প্রথম দেখিল।
কিসের একটা সুদূর
সম্ভাবনা তার মনের মধ্যে সহসা ভাসিয়া উঠিতে যাইতেই সে
প্রাণপণ শক্তিতে তার কণ্ঠ চাপিয়া ধরিয়া তাহাকে নীচের দিকে
জোর করিয়া ঠেলিয়া নামাইয়া দিল, এবং কথাটাকে সহসা চাপা
দিয়া বলিয়া উঠিল—“কাল কিসের পালা ছিল, দাদামশাই ?
৪১
?
পরদিন সকালে নিবারণ বাহিরের ঘরে একলাটি চুপ করিয়া
বসিয়াছিল এমন সময় ঘনশ্যাম আসিয়া দু-চারটে বাজে কথার
পরই হঠাৎ সুভার বিবাহের কথা পাড়িয়া বসিল
“তাহলে তারিণী চাটুয্যের সঙ্গে পাকাপাকি করে ফেলি কি
বলেন?”
“সে আপনারা বুঝুন-আমি কি বলব বলুন!" বলিয়া
নিবারণ তাকিয়াটা কোলের উপর টানিয়া লইল।
“আমরা বুঝবাে কি রকম ?—আপনিই ত হচ্ছেন সব, সুভা
ত আপনারই জিনিষ নিবারণবাবু।"—ঘনশ্যাম সাগ্রহে তার
মুখের পানে তাকাইয়া রহিল।
কি একটা কথা হঠাৎ নিবারণের গলা পর্যন্ত আসিয়া থামিয়া
গেল। ঘনশ্যাম আবার বকিয়া যাইতে লাগিল—“তারিণী
চাটুয্যের মত লােক যে সুভার সঙ্গে বিমলের বিবাহ দিতে
রাজী হয়েছেন সে ত আর সুভার বাপের দিকে চেয়ে নয়
নিবারণবাবু!—সে কেবল তার দাদামশায়ের মুখ তাকিয়ে।”
এই সকল হেঁদো কথা নিবারণের আদপেই ভাল লাগিতে- ছিল না। সে চুপ করিয়া বসিয়া বহিল। ঘনশ্যাম আবার বকিয়া যাইতে লাগিল, “গৃহিণী তাই সেদিন বলছিলেন—তুমি আমি ওর মিথ্যে বাপ মা,সত্যি ! মায়ের কাজ করলে ওর দাদামশাই।”—নিবারণ তথাপি {ে ওর দিল না। বেগতিক বুঝিয়া ঘনশ্যাম এবার সােজাসুজি কাজের কথা পাড়িল- “তাহ'লে চার হাজারেই রাজি হয়ে : কি বলেন ? ঐ চার হাজার আর তার ওপর খাও' গা এদিক-ওদিক করে আরও একটা হাজার ধরে রাখুন। হঠাৎ কি মনে করিয়া নিবারণ :: ::—“ও চার হাজারের জন্য আপনাকে ভাবতে হবে না .. সে আরও কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা দিয়া ঘনশ্যাম ব.. উঠিল—“সে কি আর জানি না মশায়,ভগবান আপনজীবী করুন,সুভার আমার ভাবনা কি ; তাইতাে ";";ক বলি,আর জমে অনেক তপস্যা করেছিলি তাই এম------ বিরক্ত হইয়া নিবারণ বলিয়া উঠি- “আমাকে কি কথা বলতে দেবেন না?” জিব কাটিয়া চক্ষু বিস্ফারিত ::। ঘনশ্যাম বলিল,- “মুভার বিবাহ-কথা যা কি? সে ত আপনিই কইবেন দাদা-আমরা কেবল নির্বাক শ্রোতা মাত্র। সে কথায় কান না দিয়া নিবারণ বলল-“বলছিলুম স্বভার বিবাহ না হয় কোন রকমে হয়ে গেল, কিন্তু দেশের সমস্ত
স্বপ্ন-শেষ
জমিজাৱাৎ মায় পৈতৃক ভদ্রাসনটুকু পর্যন্ত যে বাঁধা পড়ে রইলাে
তার খালাসের করছেন কি?”
এই অসংলগ্ন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটীর কোন একটা নির্দিষ্ট
তাৎপর্য ঘনশ্যাম হঠাৎ নিরূপণ করিয়া উঠিতে পারিল না।
সুতরাং ইহার যে কি জবাব দেওয়া যাইতে পারে তাহাও সে
ঠিক করিয়া উঠিতে না পারিয়া নিবারণের মুখের দিকে হাঁ
করিয়া চাহিয়া বসিয়া রহিল।
নিবারণ আবার বলিল—“মেয়ের বিবাহ না হয় হয়ে গেল,
কিন্তু ঐ কচি ছেলেটার ভবিষ্যৎও ত ভাবতে হবে।”
হঠাৎ কোথায় কি যেন একটা খেই পাইয়া গিয়া ঘনশ্যাম
বলিয়া উঠিল—“হবে বই কি—একশবার ভাবতে হবে কিন্তু
হারে পােড়া কপাল-”এই পৰ্য্যন্ত বলিয়াই ঘনশ্যাম হঠাৎ
কেঁাচার খুটটা শুষ্ক চোখ দুটার উপর বুলাইয়া লইল, এবং
কিছুক্ষণ চুপ করিয়া
করিয়া থাকিয়া
থাকিয়া হঠাৎ গলা
গলা কাপাইয়া
গদগদকণ্ঠে বলিতে লাগিল, “যদি দু-বেলা দুমুঠো অন্ন যােগাবার
ক্ষমতা দাও নি, তবে বাছাদের এই হতভাগার ঘরে পাঠালে
কেন, ঠাকুর।”
সে কথায় কান না দিয়া নিবারণ বলিল—এক কাজ করুন
কেন!”
ঘনশ্যাম লাফাইয়া উঠিল—“কি করব বলুন দাদা!”
কি একটা কথা বলিতে গিয়া নিবারণ বলিতে পারিল না।
সে হঠাৎ চুপ করিয়া গেল।
=
রুদ্ধ নিশ্বাসে ঘনশ্যাম জিজ্ঞাসা করিল—“কি করতে হবে
বলুন, নিবারণবাবু!”
কিসের যেন একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত পাইয়া ঘনশ্যাম ভিতরে
ভিতরে এক নিমেষে নিজের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আশান্বিত হইয়া
উঠিল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া হঠাৎ নিবারণ
বলিয়া উঠিল—“দেখুন ঘনশ্যাম বাবু, আপনার সমস্ত জমি-
জারাত, মায় ভদ্রাসন নিজের গাঁটের কড়ি দিয়ে খালাস ক'রে
দিতে পারি—যদি-”এইখানে হঠাৎ একবারে ঢােক গিলিয়া
লইয়া নিবারণ আবার বলিল-“যদি সুভার সঙ্গে আমার
তাহার মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া ঘনশ্যাম লাফাইয়া উঠিল—
“সে ত আমাদের চোদ্দপুরুষের ভাগ্যি নিবারণবাবু”
সে আরাে কত কি বলিতে যাইতেছিল—হঠাৎ চাহিয়া দেখে,
নিবারণ উঠিয়া দাঁড়াইয়া চটিযােড়ার মধ্যে পা ঢুকাইয়া
দিতেছে।
বাড়ী গিয়া ঘনশ্যাম স্ত্রীর নিকট খুব খানিকটা লাফালাফি
করিল,-এবং সে যে কত কৌশলে এবং কি পরিমাণ বুদ্ধি
খরচ করিয়া এই পরম উদাসীন চিরকুমার জমিদারটিকে শুধু
কেবল কথার মারপ্যাচে ভুলাইয়া এ বিবাহে সম্মত করিয়াছে,
এবং কিরূপ চালাকি করিয়া ঠকাইয়া সে এই অতিবড় কৃপণ
বৃদ্ধটিকে তার সমস্ত নষ্ট সম্পত্তি নিজের গাঁটের কড়ি দিয়া
উদ্ধার করিয়া দিবার ভার লইতে বাধ্য করাইয়াছে, তাহাই
বাড়াইয়া এতখানি করিয়া বলিয়া মনে মনে খুব খানিকটা গর্ব
স্বপ্ন-শেষ
অনুভব করিল। সুভার মা কিন্তু এই পরম শুভ সংবাদটিতে
তেমন করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতে পারিল না,যদিও সংসারে
এবং ছেলেপুলের ভবিষ্যৎ মঙ্গলের দিকে চাহিয়া জোর
করিয়া ইহার বিরুদ্ধে বাধা দিতেও সাহস করিল না।
কথাটা সুতার কানে পৌছিতে দেরী হইল না।-লজ্জায়
ঘণায় তার মাথা খুঁড়িয়া মরিতে ইচ্ছা যাইতে লাগিল। তার
মনে হইতে লাগিল, এই যে এত দিন ধরিয়া সে সকাল নাই,
সন্ধ্যা নাই যখন তখন নিবারণের সহিত অবাধে মেলামেশা
করিয়া আসিতেছে, ইহাতে তার নারীত্ব প্রতিপলে,
প্রতিদণ্ডে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হইয়াছে। নিবারণের
সেদিনকার যে রসিকতাটার অর্ধেকটামাত্র বুঝিয়া সে মনে
হকপাক করিয়া মরিতেছিল, আজ তাহারি সম্পূর্ণ রূপটি দেখিয়া
সে ভয়ে শিহরিয়া উঠিল। ঘৃণায় এবং বিতৃষ্ণায় তার বুকের
ভিতরটা একেবারে পুড়িয়া যাইতে লাগিল। তার মনে হইতে
লাগিল, সে যেন নিলামের মাল, এবং নিবারণ যেন সর্বোচ্চ
দর হাঁকিয়া তাহাকে কিনিয়া লইয়া যাইতে আসিয়াছে।
এই বৃদ্ধটিকে সে একদিন দেবতা জ্ঞানে কতই না শ্রদ্ধা
করিয়াছে।-আজ নিজের উপর পর্যন্ত তার ধিকার আসিতে
লাগিল,তার মনে হইতে লাগিল স্তুপীকৃত কুপ্রবৃত্তি এবং লালসা
ভিতরে লুকাইয়া রাখিয়া বার্ধক্যের মুখােস পরিয়া এই প্রতারক
ভণ্ড লােকটা এতদিন ধরিয়া গােপনে গােপনে তিল তিল
করিয়া তার নারীত্বকে অপমানিত করিয়া আসিয়াছে।
৫৪
পরদিন নিবারণের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া ঘনশ্যাম বিবাহের
সমস্ত পাকাপাকি করিয়া ফেলিল। ঠিক হইল, বিবাহের
পরই নিবারণ নিজের খরচায় ঘনশ্যামের সমস্ত নষ্ট সম্পত্তি
উদ্ধার করিয়া দিবে, এবং উপস্থিত বিবাহের খরচার জন্য সে
ঘনশ্যামকে হাজার টাকার একটা চেক লিখিয়া দিল। ইতি-
পূর্বে তারিণী চাটুযয্যর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া ঘনশ্যাম দেনা-
পাওনার কথা একপ্রকার চুকাইয়া ফেলিয়াছিল, এবং উভয়
পক্ষ হইতেই দিন দেখাদেখি চলিতেছিল, এমন সময় হঠাৎ
একদিন তারিণীচরণ ঘনশ্যামের নিকট হইতে এই মর্মে এক
পােষ্টকার্ড পাইল যে বিশেষ কোনও কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও
তাহাকে বাধ্য হইয়া সুভার অন্যত্র বিবাহ স্থির করিতে হইয়াছে
এবং সে জন্য সে আন্তরিক দুঃখিত ইত্যাদি।
সম্বন্ধটা ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় তারিণী মনে মনে সত্যসত্যই ক্ষুন্ন
হইয়াছিল।নগদ চার হাজার টাকা হয়ত সে অত্রও
পাইতে পারে, কিন্তু নিবারণের মত একটি শসালােলােক অথচ
নিঃসন্তান ব্যক্তির সহিত কুটুম্বিতার সৌভাগ্য মানুষের
জীবনে একবার বেশী দু-বার আসে না।
আজ নিবারণের বিবাহ! সুভারা সেই ভাঙ্গা বাটা
ছাড়িয়া সেই পাড়ারই আর একটা বাড়ীতে উঠিয়া গিয়াছে।
ঘনশ্যাম আয়ােজনের কোনও ক্রী করে নাই ;কারণ সে
জানিত—কড়ি যতই লাগুক না কেন, পশ্চাতে গৌরীসেন
রহিয়াছে। সন্ধ্যা ৭টার লগ্নে বিবাহ। তারপর ৯টা, ১০টা এবং
১২টায়ও লগ্ন ছিল, কিন্তু নিবারণের ইচ্ছামত সন্ধ্যার লগ্নেই
বিবাহ স্থির হইয়া গিয়াছিল।
ঘনশ্যাম সম্প্রতি কন্যার বিবাহােপলক্ষে যে বাড়ীটিতে উঠিয়া
গিয়াছিল, নিবারণের বাড়ীর ছাদ হইতে সে বাড়ীটি দেখা
যাইত। আজ সকালে শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিয়াই নিবারণ
শুনিল, বিবাহবাড়ীতে সানাই ভৈরবী ধরিয়াছে। কেন কে
জানে সানায়ের এই প্রভাতী সুরটা তার নিকট আজ বড় বেশী
করুণ বলিয়া মনে হইতে লাগিল—এ যেন শুধু কেবল কান্না
আর কান্না। তার মনে হইতে লাগিল, এ যেন সুভার কান্না
বাতাসে বাতাসে করুণ হইয়া ভাসিয়া আসিতেছে। একটা
৫৬
দারুণ অবসাদে তার সমস্ত চিত্তটা যেন ভারাক্রান্ত হইয়া
উঠিল।
সন্ধ্যার কিছু পূৰ্বে একটা ভাড়াটে ট্যাক্সি করিয়া পুরােহিত
ও নাপিত মাত্র সঙ্গে লইয়া বর আসিয়া নামের দরজায়
বাড়াইল। ঘনামের উৎসাহের অন্ত ছিল না—সে নিজে আসিয়া
হাত ধরিয়া বর নামাইল ।
নিবারণের মুখে কিন্তু উৎসাহের লেশমাত্র ছিল না; তার,
কেমন যেন ভয়-ভয় করিতেছিল। চারিদিকের কোলাহল এবং
লােকের ঠেলাঠেলিতে তার যেন দম আটকাইয়া যাইবার উপক্রম
হইতে লাগিল। ভার মনে হইতে লাগিল—সকলে মিলিয়া
তাকে যেন পিষিয়। মারিয়া ফেলিবার মােগাড় করিতেছে।
সে কল্পনায় দেখিতে লাগিল, এই সকল গণ্ডগােল এবং কোলাহল
আজ হইতে তার সঙ্গ লইতেছে, এবং জীবনের শেষ দিন
অবধি তাহাকে ঠিক এমনি করিয়াই ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিবে।
সে যে স্বেচ্ছায় এ বিবাহে রাজী হইয়াছে—একথা বিশ্বাস
করিতে তরে মন আজ কিছুতেই রাজী হইতেছিল না;-তার
মনে হইতেছিল, কেহ যেন জোর করিয়া ভয় দেখাইয়া টানিয়া
হিচড়াইয়া তাহাকে এই দারুণ গণ্ডগােল এবং ঝঙ্কাটের
অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে ঠেলিয়া ফেলিয়া দিয়াছে, এবং উঠিবার চেষ্টা
করিলেই লাঠি মারিয়া তার মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া দিবে।
সভায় গিয়া বসিয়া সে একবার নিজের অবস্থাটা ভাবিয়া
লইবার চেষ্টা করিল। আর কয়েক মিনিট পরেই সুভার সহিত
৫৭
;
তাহার বিবাহ হইয়া যাইবে; এখনি হয়ত ছাদনাতলায় তার
ডাক পড়িবে, তারপর ছাইভস্ম কত কি হইবে, শাঁখ বাজিবে,
হলুধ্বনি উঠিবে, হট্টগােলে কাণ পাতিবার জো থাকিবে না,
তারপর শুভদৃষ্টির পালা। বিশ্বদুনিয়াটাকে আড়াল করিয়া দিয়া
একটীমাত্র বস্ত্রখণ্ডের অন্তরালে সুভার সহিত তাহাকে দৃষ্টি
বিনিময় করিতে হইবে,—নিরারণের বুকের ভিতরটা সহসা
কাপিয়া উঠিল—তার সমস্ত শরীর ঝিম্ ঝিম্ করিতে লাগিল।
কি করিয়া সে তাকাইবে ?—অসম্ভব!—অসম্ভব!
সে কল্পনায় দেখিতে লাগিল—দেহ নাই, শুধু দুটা অগ্নিচক্ষু
তার মুখের দিকে একদৃষ্টে কটুম করিয়া তাকাইয়া রহিয়াছে-
নিবারণ ভয়ে চক্ষু মুদিল।তার সর্বাঙ্গে ঘাম ছুটিতে লাগিল।
হঠাৎ কি মনে করিয়া পার্শ্বোপবিষ্ট একটা লােককে ডাকিয়া সে
বলিল, “ঘনশ্যামবাবুকে একবার ডেকে দিতে পারেন ?”—তার
গলার স্বর কপিতেছিল।
লােকটি তার মুখের দিকে
একবার মাত্র তাকাইয়াই
শশব্যস্তে বলিয়া উঠিল—“আপনি কি অসুস্থ বােধ করছেন?”
"না ও কিছু না-আপনি দয়া করে ঘনশ্যামবাবুকে একবার
ডেকে দিন।”—বলিয়া মখমলের তাকিয়াটার উপর হেলান দিয়া
শুইয়া পড়িয়া সে চোখ বুজিল।
পরমুহূর্তেই হন্তদন্ত হইয়া কোমরে একটা গামছা জড়াইয়া
ঘনশ্যাম ছুটিয়া আসিল এবং কোন কথা না শুনিয়াই চেঁচামেচি
করিতে সুরু করিয়া দিল—“সমস্ত দিন খাওয়া নেই—আমাদের
৫৮
মতন মুটেমজুর লােক ত আর নন,-ঝাড়ু মার শাস্তরের
মুখে,যত ব্যাটা গাঁজাখাের মিলে দেশটাকে একবারে—তার
ওপর আজকালকার চাকরবাকরও হয়েছে তেমনি এক এক
ব্যাটা যেন এক এক তেজচন্দরের নাতি-ব্যাটারা জোরে জোরে
বাতাস করতে পারিস না!-হারামজাদা গুয়াের ব্যাটা
কোথাকার।”
বক্তৃতা শেষ করিয়া নিবারণের পাশে গিয়া বসিয়া পিঠে
হাত বুলাইয়া দিতে দিতে অত্যন্ত করুণ এবং সহানুভূতিপূর্ণ কণ্ঠে
ঘনশ্যাম জিজ্ঞাসা করিল-“বল কি কষ্ট হচ্ছে বাবাজী ?” সে
কথার কোন উত্তর না দিয়া নিবারণ বলিল—“আপনার সঙ্গে
একটা কথা আছে—একটু আড়ালে যেতে চাই।”
উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়া ঘনশ্যাম বলিল—কোন গােপনীয় কথা
নাকি?”
“হা।”
আড়ালে গিয়া নিবারণ বলিল—“ঘনশ্যামবাবু আমাকে ক্ষমা
করবেন, এ বিবাহ আমি করতে পারবাে না।”
ঘনশ্যাম কি বলিতে যাইতেছিল,-তাহাকে থামাইয়া দিয়া
নিবারণ বলিল--আপনার পায়ে পড়ি ঘনশ্যামবাবু এযাত্রা
আমাকে বাঁচান! এখনও অনেক লগ্ন আছে, আপনি গিয়ে
তারিণীবাবুর হাতে পায়ে ধরে রাজী করে বিমলকে নিয়ে
এসে কন্যাসম্প্রদান করুন—তাতে যত টাকা লাগে আমি দিতে
রাজী আছি-দোহাই ঘনশ্যামবাবু, আমাকে বাঁচান আপনি!”
ঘনশ্যাম মুখে খুব খানিকটা দুঃখ প্রকাশ করিল, মনে মনে
কিন্তু খুব খুশী হইয়া গেল। সে জানিত টাকা ফেলিতে
পারিলে তারিণীকে রাজী করা একটুও শক্ত হইবে না। মাঝে
হইতে টাকাটাও পাওয। যাইবে, অথচ জামাইও মনের মত
হইবে। মুখে কিন্তু সে যথেষ্ট আপশােষ করিল, এবং নিজের
পােড়া কপালকে ধিক্কার দিয়া দিয়া একবারে বিব্রত করিয়া
তুলিল। কিন্তু একটা সন্দেহ কাটার মত বুকের মধ্যে খচ খচ,
করিয়া বিঁধিতে লাগিল,-নিবারণ সেই যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল,
তাহার সহিত সুভার বিবাহ দিলে, সে তার সমস্ত নষ্ট সম্পত্তি
নিজের খরচায় উদ্ধার করিয়া দিবে, বিমলের সহিত সুভার
বিবাহ হইলে সে প্রতিজ্ঞা সে না রাখিতেও পারে ত!
নিবারণ কম্পিত কণ্ঠে বলিল-“আপনি একটা ট্যাক্সি করে
এখুনি বেরিয়ে পড়ুন! যত টাকা লাগে দিতে রাজী আছি-
তারিণী চাটুয্যেকে রাজী করে আসুন!”
কতই যেন বিব্রত এবং বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে এমনিভাবে
ঘনশ্যাম কাদ কাদ স্বরে বলিয়া উঠিল—“গরীব লোেক বলে
এমনি করেই অপমান করতে হয়, নিবারণবাবু! গরীব হয়েই
হয় পড়েছি, তাই বলে কি মান সন্ত্রম আত্মমর্যাদা এ সব
আমাদের কিছুই নেই বলতে চান?”
নিবারণের সত্যসত্যই কান্না আসিতেছিল—নিজের উপর
তার আজ ভয়ানক রাগ হইতে লাগিল মুখে কিন্তু সে একটি
কথাও বলিতে পারিল না।-কিই বা বলিবে সে?
-ব-শেষ--
ঘনশ্যাম বুঝিল, ঔষধ ধরিয়াছে-সে আবার বলিতে লাগিল
“করুন অত্যাচার !–গরীব হয়ে জন্মেছি যখন তখন সইতে
হবে বৈকি হাজার বার সইতে হবে!"
নিবারণ কেবল ডাকিল—“ঘনশ্যাম
বাবু !” তার স্বর
অশ্রুভারাক্রান্ত। ঘনশ্যাম তেমনিই বকিয়া যাইতে লাগিল
-“বলুন,তােমার সমস্ত সম্পত্তি উদ্ধার করে দেবে। যে
বলেছিলুম তাও রাখতে পারলুম না নিশ্যাম বাবু !-বলুন!
বলুন!—ও-গরীব বলে আমরা কি”
অত্যন্ত করুণ এবং সহানুভূতিপূর্ণ কণ্ঠে নিবারণ বলিল
“আমাকে অতটা নীচ ভাববেন না, ঘনশ্যাম বৰু! আজ রাত্রেই
সব বন্দোবস্ত করে তবে জলগ্রহণ করব-তা জানবেন?”
৬১
সত্যসত্যই প্রতিশ্রুত সমস্ত অর্থ ঘনশ্যামকে বুঝাইয়া দিয়া নিবারণ সে রাত্রে জলস্পর্শ করিয়াছিল। সৰ্বসমেত পনের হাজার টাকার একটি চেক ঘনশ্যামের নামে লিখিয়া দিয়া নিবারণ সে রাত্রে খালাস পাইল, এবং বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া মনে মনে ভাবিল,-এ যাত্রা সে খুব জিতিয়া গিয়াছে। নিবারণের নিকট হইতে নগদ পনেটি হাজার টাকা বেমালুম আদায় লইয়া ঘনশ্যাম সে রাত্রে খুব খানিকটা আস্ফালন করিয়া লইল। যে-সকল আত্মীয়স্বজন তাহার দুর্ভাগ্য অপেক্ষা সৌভাগ্যের দিকে চাহিয়াই ভিতরে ভিতরে হিংসায় জর্জরিত হইয়া উঠিয়া এই বিবাহটাকে অতি বড় পৈশাচিক এবং জঘন্য হৃদয়হীনতা বলিয়া চেঁচাইয়া পাড়া মাথায় করিয়াছিল, আজ তাহাদিগকে সুমুখে পাইয়া ঘনশ্যাম মনের সাধে খুব খানিকটা শুনাইয়া দিল, এবং হাত মুখ নাড়িয়া বক্তৃতা করিয়া তাহা- দিগকে বুঝাইয়া দিল যে, পূর্ব হইতেই সে চিউর মস্তিষ্কটি খেলাইয়া এমন একটা অব্যর্থ ফন্দি আঁটিয়া রাখিয়াছিল যাহাতে এই আহাম্মক বিয়ে-পাগলা লােকটা বিবাহ- সভা হইতে নিজে হইতেই সরিয়া পড়িতে বাধ্য হয়। অথচ যে বিপুল অর্থের দিকে চাহিয়া তাহাকে দয়া করিয়া কয়েক মুহুর্তের জন্য মাত্র বরবেশে সভায় বসিবার অধিকার দেওয়া হইয়াছিল, তাহা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করিয়া লওয়া হইয়াছে, তা না হইলে সেকি এমনি হৃদয়হীন এবং নরাধম যে সত্যসত্যই ঘাটের মড়ার সহিত কন্যার বিবাহ দিয়া যক্ষের ধন আগলাইয়া বসিয়া থাকিবে ? এবার আর কেহই তাহার বুদ্ধিমত্তা ও সহৃদয়তার প্রশংসা না করিয়া থাকিতে পারিল না, এবং একবাক্যে স্বীকার করিল যে করিল যে লেখাপড়া লেখাপড়া না শিখিলেও বুদ্ধিতে সে হাইকোর্টের জজেদের কান কাটিয়া দিয়া আসিতে পারে। সুভার মাকেও এবার তার স্বামীর প্রশংসা করিতে হইল। সমস্ত গণ্ডগােল চুকাইয়া নিবারণ যখন বাড়ী ফিরিল তখন রাত ১টা বাজিয়া গিয়াছিল। সে নিজ কক্ষে আসিয়া অন্ধকারে হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া একটা বাতি জালিল ;-তার পর কি মনে করিয়া সেটাকে ফু দিয়া নিবাইয়া দিয়া অন্ধকারে শয্যায় গিয়া শুইয়া পড়িল। কিছুক্ষণ শয্যায় শুইয়া থাকিবার পর তার কেমন যেন দম্ আটকাইয়া যাইতে লাগিল। তার মনে হইতে লাগিল, তার বুকের উপর কে যেন চাপিয়া বসিয়াছে, -সে শশব্যন্তে ঘর হইতে বাহির হইয়া সিড়ি দিয়া ছাতে উঠিয়া গেল।
চারিদিক নীরব, নিস্তব্ধ—কোথাও সাড়াশব্দের লেশমাত্র নাই,-কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার, থম্থমে রাত্রি। নিবারণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল-সে যেন তার মার কোলে ফিরিয়া আসিয়াছে। কিছুক্ষণ এইভাবে দাড়াইয়া থাকিয়া হঠাৎ এক- সময় নিজের অজ্ঞাতসারে স্বপ্নাবিষ্টের মত সে ছাদের পূর্ব- দিককার আলিসাটার ধারে আসিয়া থমকিয়া দাড়াইল। অদূরে একটা বাড়ীর ছাতের উপর কালো একটা সামিয়ানার তলায় দীর্ঘ দীর্ঘ ছায়া ফেলিয়া আলাে এবং অন্ধকার সৃষ্টি করিয়া অসংখ্য অস্পষ্ট মনুষ্যমূর্তি ব্যস্ত হইয়া এদিকে ওদিকে ছুটাছুটি করিতেছে, এবং তাহাদের দূরাগত কোলাহল স্বপ্নের মত ক্ষীণ হইয়া বাতাসে বাতাসে ভাসিয়া আসিতেছে। নিবারণের মনে হইতে লাগিল—সে দাড়াইয়া দাড়াইয়া স্বপ্ন দেখিতেছে। সে চুপ করিয়া মােহাবিষ্টের মত সেই দিক পানে চাহিয়া নীরবে দাড়াইয়া রহিল। কতক্ষণ এইভাবে সে দাড়াইয়াছিল তাহা সে নিজেই জানিতে পারে নাই—হঠাৎ একসময় একসময় কিসের একটা কোলাহলে সচকিত হইয়া উঠিল,-এবং চাহিয়া দেখিল, সেই স্বপ্ন-দৃষ্ট মায়াপুরীটার ছাতের উপরকার সেই অসংখ্য ছায়ামুর্তি কখন একসময় ছাদের আলিসার ধারে কাতারে কাতারে আসিয়া দাঁড়াইয়া নীচের দিকে ঝুকিয়া পড়িয়া দ্বিগুণতর ব্যস্ততাসহকারে কোলাহল করিতে আরম্ভ করিয়া দিয়াছে, এবং চারিদিক হইতে শখ ও হুলুধ্বনি উঠিয়া এই ৬৪ স্বপ্নপুরীটিকে কখন এক সময় তার অজ্ঞাতসারে বাস্তব- জগতের রাশি রাশি বস্তুপিণ্ডের মাঝখানে বসাইয়া দিয়া গিয়াছে। রুদ্ধ নিশ্বসে নীচে নামিয়া আসিয়া নিবারণ আবার তার সেই অন্ধকার শয়নকক্ষে প্রবেশ করিল; এবং আলাে না ভ্রালিয়াই হাতড়াইয়া হাতড়াইয়া শয্যায় গিয়া শুইয়া পড়িল। সম্মুখের জানালাটা খােলা ছিল, তাহার ভিতর দিয়া দেখা- যাইতেছিল,—সুভাদের পূর্বেকার সেই ভাঙ্গা বাড়ীটা, অন্ধকারের মধ্যে কালো একটা বস্তুপিণ্ডের মত খাড়া হইয়া রহিয়াছে। সেই দিক পানে চাহিয়া হঠাৎ নিবারণ ভয়ে শিহরিয়া উঠিল তার মনে হইতে লাগিল একটা কালাে দৈত্য তার দিকে কটু- মট করিয়া তাকাইয়া রহিয়াছে। ছেলেবেলায় সে তার পিসীমার নিকট গল্প শুনিয়াছিল, দৈত্যের মায়াবলে ঘরবাড়ী পাহাড়পৰ্বত প্রভৃতি যে কোনও রূপ গ্রহণ করিয়া অন্ধকারে চুপ করিয়া বসিয়া থাকে, তারপর ভ্রান্ত পথিক তাহাকে নির্জীব বস্তুপিণ্ড মাত্র ভাবিয়া তখন নির্ভাবনায় পরম নিশ্চিন্ত মনে সেই পথ দিয়া যাইতে থাকে, তখন হঠাৎ একসময় নিজমূর্তি ধারণ করিয়া তাহার উপর গিয়া পড়িয়া ঘাড় মটকাইয়া তার রক্ত শােষণ করে। এই ভাঙ্গা বাড়ীটার দিকে চাহিয়া চাহিয়া আজ তার মনে হইতে লাগিল এও সেইরূপই কোন একটা দৈত্য,
=
তাহার রক্ত শােষণ করিবার জন্য ভাঙ্গাবাড়ীর রূপ পরিয়া
অন্ধকারে জড়পিণ্ডবৎ নিঃসাড় হইয়া দাড়াইয়া রহিয়াছে।
ধড় মড় করিয়া শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিয়া পড়িয়া নিবারণ ভয়-
কম্পিত কণ্ঠে ডাকিল—“বেহারী, বেহারী !” এবং সে আসিতেই
আলাে জালিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া বলিল—“এখুনি
একটা ট্যাক্সি ডেকে আন!”
সে অবাক হইয়া নিবারণের অদ্ভুত
অত মুখের দিকে
চাহিয়া ভয়ে
ভয়ে বলিল—“এত রাত্রে কোথায় যাবেন,
বাবু?”
“হাওড়া ষ্টেশনে।”
অবাক হইয়া বিহারী বলিল—“দেশে যাবেন নাকি ? কিন্তু
এত রাত্রে ত কোন গাড়ী নেই।”
অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া নিবারণ বলিল—“দেশে যেতে যাবে।
কেন? আর কোন চুলােয় কি আমার ঠাই নেই ?-কাশী
আছে, বৃন্দাবন আছে"
কথাটা শেষ করিতে না দিয়াই বিহারী বলিল—“এত রাত্রে
ত কোন গাড়ীই ছাড়ে না, বাবু !"
অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া নিবারণ চেঁচাইয়া উঠিল—“আজ না
ছাড়ে-কাল সকালে ছাড়বে তাে ?”
হাতজোড় করিয়া বিহারী
বলিল-“ন, এখন থেকে
ইষ্টিসনে বসে থেকে কি হবে, হুজুর?”
নিবারণ চেঁচাইয়া উঠিল—“আমার খুসি,আমি সারা-
স্বপ্ন-শেষ- রাত ইষ্টিসনে বসে থাকবো-তুই ট্যাক্সি ডেকে দিবি কিনা বল ?” পরদিন সকালে বরকনেকে আশীর্বাদ করিয়া যাইবার জন্য নিবারণকে ডাকিতে আসিয়া ঘনশ্যাম দেখিল-বাড়ীর দরজায় তালা লাগান ; সুমুখের মুদিকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলগত- কল্য অনেক রাত্রে তিন খানা ট্যাক্সিতে মালপত্র বােঝাই করিয়া তাহারা কোথায় চলিয়া গিয়াছে । ৬৭
পথের বাঁকে
কাশীর হরিশ্চন্দ্ৰ-ঘাট রােডের উপরকার একটা বাড়ীর
দ্বিতলের একটা কক্ষে বসিয়া চারিটি প্রাণী তাস খেলিতেছিল।
অদূরে মেঝের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া একটা লােক বালিসের
উপর ক্রমাগত মুখ ঘসিতেছিল এবং মধ্যে মধ্যে বিড়বিড় করিয়া
মাথামুণ্ডু কি যে বকিতেছিল তা সেই জানে।
যে ঢারিটি প্রাণী তাস খেলিতেছিল, তাহাদের মধ্যে একটি
স্ত্রীলােক, বাকী তিনটি পুরুষ। স্ত্রীলােকটির বয়স অল্প-বড়
জোর আঠার উনিশ হইবে, দেখিলে কিন্তু আরও কম বলিয়া
মনে হয়। চেহারা যে খুব ভাল তা নয়,তবে চোখ দুটো
ডাগর এবং নীচেকার ঠোটের কুঞ্চনটুকুর মধ্যে বেশ একটু
ব্যঞ্জনা আছে।
যুবতীটির সামনাসামনি যে লােকটা বসিয়াছিল, তাহার
চেহারাটাকে লইয়া লােকে আর যা করে করুক, তাচ্ছিল্য
করিতে যে পারিবে না, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। সে
৩
যেমন মােটা তেমনি কালাে এবং তেমনি লম্বা। পরণে
ফরাসডাঙ্গার মিহি জরিপাড় ধুতি, গায়ে সিল্কের পাতলা গেঞ্জি
এবং গলায় একছড়া সৰু সােণার হার কষ্টিপাথরে কনকরেথাটির
মত মধ্যে মধ্যে চিক্ চিক্ করিয়া উঠিতেছিল ।
লােকটা জাতিতে শুড়ি।আসিয়াছিল গয়ায় বাপ মায়ের
পিণ্ড দিতে। স্ত্রীকে সঙ্গে আনে নাই, পাছে ব্ৰহ্মচর্যের ব্যাঘাত
হয় ;-বাপ-মায়ের পিণ্ডদান ব্যাপার,ছেলেখেলা ত আর নয় ।
যাহা হউক সেখানে বিধিমতে চৌদ্দপুরুষের পিণ্ড চটকান
শেষ করিয়া সম্প্রতি কাশীতে আসিয়াছে,-মৎলবটা দিন পনের
এখানে থাকিয়া এই অল্প সময়ের মধ্যে যতটা পারা যায় পুণ্যসঞ্চয়
করিয়া কলিকাতায় ফিরিবে ।
ঘরের মধ্যে বাদবাকী যে কয়টি জীব উপস্থিত ছিল, বাবুর
পরিচয়েই তাঁহাদের পরিচয়, সুতরাং অলমতি বিরেণ।
তাস খেলা পুরাদমে চলিতেছিল,হঠাৎ তাহারি মধ্যে
একজন বলিয়া উঠিল,-“আচ্ছা লগিজাংটা গেল কোথায় বল
দেখি—সে শালা সন্দেশ চাপা পড়ল না ত?”
শেষ পিটা তুলিয়া লইয়া নূতন আর এক বাজি খেলিবার
জন্য তাস ভাজিতে ভাঁজিতে মােটা লােকটা বলিল-“সে
শালা এখানে ভাল সন্দেশ না পেয়ে সটান্ কলকাতায় ভীমনাগের
দোকানে গিয়ে হাজির হয়েছে নিশ্চয়ই।” কথাটা শেষ হইবার
সঙ্গে সঙ্গেই সেই বিরাট মাংস-সমুদ্র আলােড়িত করিয়া লােকট।
বেদম হাসিতে সুরু করিয়া দিল।
—স্বপ্ন-শেষ মেঝের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া যে লােকটা বালিশে মুখ ঘষিতেছিল-সে সহসা গৰ্জন করিয়া উঠিল—“চোপরাও বেয়াদ—ব্রহ্মচর্য চকে যাচ্ছে, মাইরি !-নগদ পাঁচসিকের ব্রহ্মচর্য বাবা।” সে কথায় কাণ না দিয়। পটুলী বলিয়া উঠিল—“সত্যি লগিজাংটা গ্যালো কোথায় বল দেখি?” মােটা লােকটা তার ছােট্ট ছোট্ট পিটপিটে চোখ দুটোকে আরও ছোট্ট করিয়া মুখ টিপিয়া ঈষৎ হাসিয়া বলিল, “সিথের সি দর মুছবে না-ভয় নেই পটুলী !” ইহার উত্তরে পটুলী কি বলিতে যাইতেছিল—হঠাৎ সিড়িতে কাহার দ্রুত পদশব্দ শুনা গেল, এবং পর মুহর্তেই লম্বাগিজাং তার সাত ফিট লম্বা বাঁকারির মত লিকলিকে দেহ- যষ্টিপানিকে লইয়া পাইতে হঁপাইতে সেই কক্ষে প্রবেশ করিল, এবং কাহাকে কিছু বলিবার অবসর মাত্র না দিয়াই এক নিশ্বাসে আওড়াইয়া যাইতে লাগিল—“পটুলী হচ্ছে কুলীন বামুনের মেয়ে। বাকুশালা হচ্ছে ওর বাপ, আর আমরা হচ্ছি খুড়াে, জ্যাঠা, মেসসা, পিসে—যার যা খুসী,—মনে থাকে যেন।” সকলে প্রায় এক সঙ্গেই বলিয়া উঠিল—“তার মানে ?” (म কথায় কোন উত্তর না দিয়াই সে বলিয়া উঠিল—“পলী, তুই ও-ঘরে পালা শিগগির—না ডাকলে বেয়ােস নে খবরদার।” কথাটা শেষ করিয়াই সে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল এবং সিড়ির নিকট গিয়া উপর হইতেই হাঁক দিল—“সটা ওপরে ৭০ —স্বপ্ন-শেষ – চলে আসুন, গাঙ্গুলী-মশাই,—সিদে ওপরেওদিকে নয়- বদিকে সিড়ি।” পরক্ষণেই লগিজাংএর পশ্চাং পশ্চাৎ গাঙ্গুলী মশাই নামক নুতন জীবটি আসিয়া ঘরে প্রবেশ করিলেন। মােটাসােটা খাটো লােকটি,-গোঁফদাড়ী কামান, কিন্তু কানে এবং নাকে অনেকখানি পােষাইয়া লইয়াছেন। পাতলা জ্যালজেলে উড়ানীর ভিতর দিয়া পৈতা এবং নেয়াপাতি ভুড়িটির কতকট। দেখা যাইতেছে ;-বয়স ৪০/৪৫ হইবে—দেখিতে মােটের উপর ভালই—বেশ ভদ্র লােকের মতই চেহারা। নাক মুখ চোখ সবই বেশ ধারাল-কিন্তু চোখের চাহনির মধ্যে কোথায় এমন একট। কিছু আছে তাহার দরুণ তাহার মুখখানা সব জড়াইয়া কেমন যেন বােকা-বোকা দেখায়। ঘরে ঢুকিয়াই লগিজাং সুরু করিয়া দিল—“এরই কথা। আপনাকে বলেছিলুম ব-দা! দিগজ কুলীন এরা ! আমাদের পটলের সঙ্গে দিব্যি মানাবে—কি বল যা ? বাঁকুচন্দ্র ইতিমধ্যেই ব্যাপারটা বুঝিয়া লইয়াছিল—সে উঠিয়া দাড়াইয়া এই দিগগজ কুলীন-পুত্রটিকে যথাসম্ভব খাতির করিয়া বসাইল এবং সকলে আসন গ্রহণ করিলে গলার স্বর- টাকে যতদূর সম্ভব মােলায়েম করিয়া তুলিয়া বলিল—“তা বাবাজীর নামটি শুতে পাই কি?” চতুগুণ মেলায়েম কঠে উত্তর হইল—“আজ্ঞে এ অধমের নাম নকুড়চন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় আপনারা অবশ্য পরে—নকুড় বলেই ডাকবেন।” ৭১ বগ-শেষ- শতকরা নিরেনব্বই জন মােটা মানুষের মত সাহা- মহাশয়েরও হাসি-রােগ ছিল—সে অতিকষ্টে এ যাত্রা নিজেকে কোন মতে সামলাইয়া লইল,-এবং ক্ষতিপূরণস্বরূপ খানিকটা কাসিলগােটাকতক ঢেকুর তুলিল এবং অবশেষে বারকতক হাই তুলিয়া ধাতে ফিরিয়া আসিল। লম্বাগিজাংটা বলিল—“কি বিনয়ী দেখেছেন বন্ধু দা?” বাঁকুরাম উত্তর করিল—“হবে না কেন ভায়া—এত বড় বনেদী বংশের ছেলে !—তা বাবাজীর কি করা হয় ? অসম্ভব রকম গম্ভীর হইয়া উঠিয়া নকড়চন্দ্র উত্তর করিলেন- “প্রফেসরি।” “বেশ বেশ!—হিন্দু কলেজে বুঝি ?” “আজ্ঞে না, ক্ষুদিরামবাবুর ইস্কুলে।” “তা বেশ, আমরাও বিদ্বান পাত্রই খুঁজছিলুম—তা ভালই হােল। কি বল ভায়া”—বলিয়া সাহা মহাশয়ের দিকে তাকাইতেই—তিনি কি একটা কথা বলিতে গিয়া হঠাৎ তাকিয়ার মধ্যে মুণ্ডটিকে যথাসম্ভব পুতিয়া ফেলিলেন ; কিন্তু অকিয়ার বাহিরে রহিলেন যে কটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ—তাহাদের দুর্দশার আর অন্ত রহিল না, বিশেষ করিয়া বিপুল ভুড়িটির। সে দিক হইতে দ্রুত চক্ষু ফিরাইয়া লইয়া অতিকষ্টে এই অতি বড় সংক্রামক ব্যাধিটির হাত হইতে কোনও মতে আত্ম- রক্ষা করিয়া বকুচন্দ্র বলিল—“তা বেশ ভালই হােল -পেটে একটু বিদ্যে না থাকলে আজকালকার দিনে ৭২
কথাটাকে শেষ করিতে না দিয়াই আরও গভীর হইয়া
উঠিয়া নকুড়চন্দ্র বলিল—“আর একটা কথা বলছিলুম—
“বল বাবা বল।”
নকুড়চন্দ্র বলিয়া যাইতে লাগিল—“দেখুন,মিথ্যে প্রবঞ্চনা
এসব আমি মােটেই পছন্দ করি না—তা সে আপনারা ভালই
বলুন আর মন্দই বলুন।” তারপর একটা ঢােক গিলিয়া লইয়া
সে আবার বলিল—“দেখুন, আমার আর এক সংসার ছিল, সে
সংসার আজ অবশ্য দু’বৎসর হােলাে গত হয়েছেন—বুঝলেন
কি না!”
“বিলক্ষণ—বিলক্ষণ, কুলীনের ছেলের ওসব ধর্তব্যের মধ্যেই
নয়, তাও আবার সে স্ত্রী বেঁচে নেই, হু।”
কথাটা শেষ করিয়াই বাঁকুচ লম্বাগিজাংএর দিকে চাহিয়া
বলিল “তা হলে পটলকে একবার
কথাটা শেষ হইবার পূর্বেই লগিজাং এক লক্ষে পাশের
ছােট ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই
পটুলীর হাত ধরিয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া আসিল।
কন্যাকে নকুড়চন্দ্রের ঠিক সম্মুখেই বসাইয়া দেওয়া হইল।
সকলে মনে করিয়াছিল নকুড়চন্দ্র পটুলীকে দেখিয়া না জানি কি
কাণ্ডটাই করিবে, হয়ত তাহার চতুষ্পটি দন্ত বাহির হইয়া
পড়িবে, হয়ত কৃতকৃতার্থের মত অনবরত অঙ্গ মোড়া দিয়া দিয়া
সে শরীরের সমস্ত গ্রন্থিগুলােকে খুলিয়া ফেলিবে, হয়ত
শুশুকের মত অনবরত ডিগবাজী খাইতে থাকিবে এবং হয়ত
৭৩
-স্বপ্ন-শেষ- ; নান বা আরও এমন কিছু করিয়া বসিবে যাহা তাহারা কল্পনাও করিতে পারে নাই; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহার কোনটাই সে করিল না, অত্যন্ত গম্ভীরভাবে একবারমাত্র তাহার মুখের দিকে তাকাইয়া বলিল, “অপছন্দ করবার কিছু নেই—মিথ্যে কষ্ট দেওয়া নিয়ে যান।” পটুলী উঠিতেছিল -লাগিজাং বলিয়া উঠিল—“নান জিজ্ঞেস করলেন না?” অত্যন্ত গম্ভীরভাবে নকুড়চন্দ্র বলিল—“তােমার কি?-বল, বল, লঙ্গ৷ কি—আমরা সবাই তােমার আপনার লােক—কেউ ত আর পর নই" মাতালটা হঠাৎ যাঁড়ের মত চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল— “খবরদার—মুখ সামলে !—দুনিয়ায় আমি ছাড়া পল্লীর আপনার লোক কেউ নেই—কোন শালা না—কথাটা শেষ করিয়া সে আবার বালিসের উপর মুখ ঘসিতে লাগিল। পরমুহুর্তেই দেখা গেল—সাহা মহাশর কোমরের কসি আটিতে আঁটিতে ঘর হইতে মত্তমাতঙ্গের মত বাহির হইয়া যাইতেছে- হাসির বেগ এবার তাহাকে বেসামাল করিয়া তুলিয়াছিল। এই বেখাপ্পা ব্যাপারটাকে কোনও রকমে মানাইয়া লইবার জন্য লগিজাং বলিয়া উঠিল—“গাঙ্গুলী মশায়ের পাগলের ওষুধ-টযুধ কিছু জানা আছে? এই দৈবটৈব,—ডাক্তারী কবরেজী করে করে হার মেনে গেছি, মশাই।” ভয়ে ভয়ে সেই অদ্ভুত জীবটির দিকে পিট পিট করিয়া ৭৪ স্বপ্ন-শেষ- চাহিতে চাহিতে অত্যন্ত মৃদুকণ্ঠে নকুড়চন্দ্র বলিল—“একেবারে বদ্ধ পাগল—ওঁকে ছেড়ে দিয়ে ভাল কাজ—” কথাটা শেষ হইবার পূর্বেই পট্লী পার্শ্বোপবিষ্ট বকুচন্দ্রকে অলক্ষিতে টিপিয়া দিল। তাহার মুখের দিকে একবারমাত্র চাহিয়াই বাঁকু বলিয়া উঠিল—“তাহলে বাবাজীর অনুমতি হল পটল এখন “স্বচ্ছন্দে, স্বচ্ছন্দে মেয়েদের কষ্ট দেওয়াটা আমি, বুঝলেন কি না!” কেহ কিছু বুঝিল কি না ভগবানই জানেন—কিন্তু পটল সুন্দরী বুঝি—কত বড় ফাড়ার হাত হইতে সে সাচিয়া গেল। পটুলী চলিয়া যাইবার পর লগিগাং এইবার সােজা- সুজি কাজের কথা পাছি। বসিল। সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছিল- মৌতাতের সময় যায়-যায়,তার আর কিছুই ভাল লাগিতে ছিল না। “তাহলে পাজিপুথি দেখে একটা শুভদিন স্থির করে আপ- নাকে খবর দেবে। এখন ; আর দেনা-পাওনার কথা—সে ত আপনাকে পথেই সব বলেছি। দাদার আমার ঐ একমাত্র সন্তান,-তাহলে কাল সন্ধ্যা নাগদি আপনার এখানে- কথাটা শেষ না করিতে দিয়াই নকুড়চন্দ্র বলিল—“হাতে পাজি মঙ্গলবার মশাই।” কথাটা শেষ করিয়াই সে একটি ছেড়া পকেট পঞ্জিকা তাহার উড়ানীর মধ্যে হাত চালাইয়া দিয়া কোথা হইতে বাহির করিয়া ফেলিল।
অতঃপর দিনস্থির হইতে অধিক বিলম্ব হইল না। আগামী শনিবার দিন ভাললগ্নও অনেক আছে,—স্থির হইল ১২টার লগ্নে বিবাহ হইবে। “তাহলে আজকে এই পর্যন্ত বলিয়া নকুড়চন্দ্রের মুখের দিকে একবারমাত্র চাহিয়াই লগিজাং হতাশ হইয়া পড়িল। উঠিবার বা নড়িবার কোনরূপ লক্ষণ লােকটার শ্রীমুখপঙ্কজের ত্রিসীমানার মধ্যে সে খুঁজিয়া পাইল না। বেগতিক দেখিয়া বাঁকুচন্দ্র বলিল—“তুমি তাহলে বাবাজীকে একটু এগিয়ে দিয়ে এসাে-সিড়িটা কিন্তু বড় অন্ধকার একটু দেখে শুনে নিয়ে যেও!” কথাটা শেষ করিয়াই বাঁকুচন্দ্র নিজেই উঠিয়া পাড়াইলেন। অগত্যা বাবাজী উঠিলেন। লগিজাং আগে হইতেই উঠয়া দাড়াইয়াছিল ; নকুড়চন্দ্র ঘর হইতে বাহির হইবার জন্য চৌকাঠে পা দিতেই সে সিড়ি দিয়া নামিতে সুরু করিয়া দিল- তার আর একমুহূৰ্ত্ত সবুর সহিতেছিল না। কিন্তু সিড়ির শেষ ধাপ অবধি নামিয়া গিয়াও সে পশ্চাতে কোনরূপ পদশব্দ শুনিতে পাইল না ;—উপরে ফিরিয়া আসিয়া দেখে, নকুড়চন্দ্র আবার পুৰ্ব্বস্থানে দিব্য নিশ্চিন্ত হইয়া গিয়া বসিয়াছেন এবং ধীরে সুস্থে বাক্যালাপ সুরু করিয়া দিয়াছেন,আর বাঁকুচন্দ্র উপয়ান্তর না দেখিয়া বেয়াকুবের মত দাড়াইয়া দাড়াইয়া কেবল হু-হা দিয়া যাইতেছে। নকুড়চন্দ্র বলিতেছিল—“আসল কথা কি জানেন—আমি একটু গােপনে কাজটা সম্পন্ন করতে চাই—বরযাত্রীর টাভীর কেউ আসবে না—পুরুত নাপিত পর্যন্ত না—সে সব আপনারাই ঠিক করে রাখবেন, আমি শুধু চুপি চুপি এসে বিয়েটি করে যাব—বুঝলেন কিনা!—আপনারা হয়ত জিজ্ঞেস করবেন- এরূপ করবার কারণটা কি? বাধা দিয়া বাঁকুচন্দ্র বলিল—“বিলক্ষণ বিলক্ষণ!—মানুষের কত সুবিধে অসুবিধে থাকতে পারে,-বাবাজীকে আর কারণ দেখাতে হবেনা!—তাহ'লে শনিবার রাত ১২টার লগ্নই ঠিক রইল—সিড়িটা বড় অন্ধকার, নামবার সময় একটু দেখে নেবাে বাবাজী— সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া নকুড়চন্দ্র বলিতে লাগিল— “দেখুন, কারণ বিনা কোন কায্যই হয় না।” বাধা দিয়া লগিজাং বলিয়া উঠিল—“বটেই ত ! এক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই একটা কারণ আছে ; তবে কিন৷ আর একদিন শুনলেই চলবে’খন,এখন ত প্রায় রােজই দেখা হবে।” নকুড়চন্দ্র এতক্ষণ এলো-মেলো ভাবে বসিয়াছিলেন, এইবার পায়ের উপর পা দিয়া দিব্য গুছাইয়া বসিলেন, এবং হাত মুখ নাড়িয়া আরম্ভ করিলেন—“ওসব কাজের কথা নয় মশাই দোষই বলুন আর গুণই বলুন, লুকোচুরি জিনিষটা আমি মােটই পছন্দ করি না—বুঝলেন কিনা!” লম্বাগিজাং কিছু বুঝিল কিনা ভগবানই জানেন—কিন্তু অতঃপর তাহাকে একটি গােটা মহাভারত মরদের মত খাড়া দাড়াইয়া শুনিতে হইল। ৭৭
স্বপ্ন-শেষ
নকুড়চন্দ্র আরম্ভ করিলেন-“তবে বলি শুনুন,বছরখানেক
আগে আর এক জায়গায় আমার সম্বন্ধ হয়েছিল—সব ঠিক্ ঠাকু,
বুঝলেন কিনা!”
বাকুচন্দ্র বলিল—“বুঝতে পেরেছি ;-তার পর ভেঙ্গে গেল
আর কি!”
“আজ্ঞে হ্যা—ভেঙ্গে গেল।”
হাফ ছাড়িয়া বাঁচিয়া লগিজাং বলিল—“কথায় বলে চন্ম
মৃত্যু বিবাহ
আরও জাকিয়া বসিয়া নকুড়চন্দ্র আরম্ভ করিল।
বলেছেন—জন্ম মৃত্যু বিবাহ—ওর ওপর মানুষের হাত নেই।
এক্ষেত্রেও তাই হােলল ;—চোখের সামনে ভেঙ্গে গেল—ঠায়
দাড়িয়ে দেখলুম-কি করতে পারলুম বলুন?—ব্যাপারটা তবে
খুলে বলি শুনুন"—বলিয়া নকুড়চন্দ্র উদ্যোগপর্ব শেষ করিয়া
যুদ্ধপর্ব শুরু করিলেন। লম্বাগিজাং এবং বকুচন্দ্র হাল ছাড়িয়া
দিল। “তবে বলি শুনুন—সব ঠিক্ ঠা। পাড়ার ছেলেরাই
সম্বন্ধ ঠিক করেছিল—খাসা মেয়ে—সেও বাপ মায়ের একমাত্র
সন্তান-বুঝলেন কিনা—"
বাঁকুচন্দ্র বা লগিজাং কেহই কোন উত্তর দিল না।
নকুড়চন্দ্র আবার আরম্ভ করিল—“কাল যেন বিয়ে—আজ
ঠিক এমনি সময়টায় বাসায় বসে আছি;—কিছুক্ষণ হােল
পাড়ার ছেলেরা গড়ের বাদ্যি আর বােসনাইওয়ালাদের অগ্রিম
বায়না দিয়ে আসবে বলে ৩০ টাকা নিয়ে গেছে ;—চারদিকে
৭৮
6
বিয়ের লগন্স,-আগে থাকতে বায়না দিয়ে না রাখলে চলবে কেন বলুন !—আপনারা হয়ত জিজ্ঞেস করবেন--মত টাঘটির কি দরকার ছিল— বাধা দিয়া লাগিজাং বলিয়া উঠিল—“আজ্ঞে না—তা আমরা আদবেই জিজ্ঞেস করব না—সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত পাকতে পারেন। “তবু বলি"-বলিয়া নকুচন্দ্র আরম্ভ করিল—“আমার ওসব সন্ট নেই বঝেছেন কিনা-মেয়ের বাপ ধরে বসল—রােসনাই করে বর না এলে-বুঝেছেন কিনা—একমাত্র মেয়ে—একটু সাধ আহলাদ—বুঝেছেন কি না—" কেহ কোন কথা বলিল না-লগিজাং এবং বাকৃচন্দ্র কেবল হতাশ ভাবে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাইলসে দৃষ্টি যেমন করুণ, তেমনি বিষাদময়। নকুড়চন্দ্র বলিয়া যাইতে লাগিল—“হা কি বলছিলুম- বাইরের ঘরে বসে আছি-কাল বিয়ে কত ভাবনা মাথায় বঝেছেন কিনা !—ও মশাই, কোথা থেকে দুষমনের মতন চেহারা এক ব্যাটা এসে হাজির—অামার ত চক্ষু চড়ক গাছ ; সে এসে করলে কি জানেন-কড় কড় করে আমার বাঁ হাতটা না ধরে তিন হ্যাচকা মেরে বল্পে—“খবরদার-মাধুরীকে যদি বিয়ে করবি ত খুন করে ফেলব—ছেলেবেলা থেকে ওকে আমি জীবন-যৌবন সমর্পণ করে বসে আছি তা জানি। তার পর মশাই কোথেকে একটা প্রকাণ্ড চুরি না বার করে বল্পেও
কিনা।”
মুখখা হয়েছ কি—এই ছুরি দিয়ে তােমার নাড়িভুড়ি’
বুঝেছেন
সহসা অত্যন্ত বেয়াড়া এবং বাজখাই কণ্ঠে মাতালটা চেঁচাইয়া
উঠিল—“পট্ৰলীকে বিয়ে করতে হয় কর, আপত্তি নেই—কিন্তু
গাত্ৰস্পৰ্শ বা রাত্রিবাস করেছ কি খুন করেছি—সতীলক্ষ্মীর ওপর
অত্যাচার সহ্য করতে পারব না বাবা—তাতে ফাসী যেতে হয়
সাে ভী আচ্ছা।”
সেই দিক পানে সভয়ে চাহিতে চাহিতে নকুড়চন্দ্র সহসা
উঠিয়া দাড়াইল। তাগ বুঝিয়া লম্বাগিজাং বলিয়া উঠিল—
“সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে বাদ বাকীটা শােনা যাবে এখন
আপনিও আসুন, না বন্ধু-দা-সিড়িটা কিন্তু একটু দেখে
নামবেন নকুড় বাবু
নকুড়চন্দ্র এবার আর আপত্তি করিল না—সিড়ি দিয়।
নামিতে নামিতে সে বলিয়া যাইতে লাগিল-এর পর আর বিয়ে
করি কোন্ সাহসে বলুন!—মাঝ থেকে ৩০টা টাকা বুঝলেন
কিনা,—আর পাড়ার ছেলেদেরই বা দোষ দিই কি করে
বলুন-বায়না করে ফেলেছে—সেটা আর ফেরত চাইবে কোন্
মুখে
ইতিমধ্যে তাহারা সদর দরজার নিকট আসিয়া পৌছিয়াছিল,
-লগিজা বলিল—“বুঝতে পেরেছি—সেই জন্যেই এবার
আর পাঁচ কাণ করতে চান না—তা সে না করাই ভাল-তা
হলে ঐ কথাই রইল—ইতিমধ্যে আপনার সঙ্গে দেখা করব’খন।”
৮০
সে ভাবিয়াছিল—ইহার পর পরস্পর নমস্কার এবং বিদায়-
সম্ভাষণের পালাটা শেষ হইলেই যবনিকা পতন হইবে—কিন্তু
নকুড়চন্দ্র সহসা আরম্ভ করিল-“মনে করবেন না আমি ভয়
পেয়েছিলুম—আসল কথা কি জানেন—”
কিন্তু আসল কথাটা আর বলা হইল না-হঠাৎ দ্বিতলের
একটা জানালা খুলিয়া গেল—এবং সেই মাতালটা রাস্তার দিকে
ঝুকিয়া পড়িয়া চীৎকার করিয়া উঠিল—“খবরদার-খুন করে
ফেলব বলছি-একেবারে দুঃশাসনের রক্তপান!”
“আচ্ছা নমস্কার মশাই-শনিবারেই তাহলে—” কথাটা শেষ
না করিয়াই নকুড়চন্দ্র হন্ হন্ করিয়া বেগে চলিতে সুরু করিয়া
দিলেন। লম্বাগিজাং এবং বাঁকুচন্দ্র হাফ ছাড়িয়া বাঁচিল;
তিন লক্ষে সিড়ি পার হইয়া-উপরে আসিয়া দেখে, বড়বাবু
এবং পটলী হাসিয়া লুটাপুটি খাইতেছে। সেদিকে লক্ষ্য মাত্র
করিয়া ঝড়ের মত উদ্দামভাবে তাহারা পাশের ঘােট ঘরটার
মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল এবং মিনিট কয়েক পরেই বাহির হইয়া
আসিয়া বলিল—“এখন হাস বাবা যত পার !–শালা পিত্তি
পড়িয়ে তবে ছাড়লে–শালার ঘরের শালারে আমার।”
হাসিতে হাসিতে বড়বাবু বলিল—“বাপ-আমার যা দুর্দশা
হয়েছিল, কি বলব মাইরি-শেষকালে ভাবলুম পেট ফেটে না
মরে যাই।”
পটুলী বলিল—“আমারও প্রায় তাই-অতি কষ্টে হাসি সামলে
বসেছিলুম-শেষকালটায় আর পাম না,তখন বাকুকে একটা
খোঁচা দিলুম-কি ভাগ্যিস বাকু আমার অবস্থা বুঝতে পেরেছিল- তা না হলেই হয়েছিল আর কি,—ঠিক দম আটকে মরে যেতুম ।" লগিজাং বলিল—“কি রকম চিজ খানি আমদানি করেছি বল বাবা!” বড়বাবু বলিল-“তা একশ বার তারিফ করতে হবে।” বকুচন্দ্র বলিল—“শালা কি নিরেট্ রে বাবা।—এই সেদিন পাড়ার ছেলেরা ক্যাবলা বানিয়ে ৩০ টাকা ভােগা দিলে-তৰু ব্যাটার চেতনা হােলাে না-দিব্যি বিশ্বাস করে গেল।” লগিজাং বলিল-“আমাদের কিন্তু বিয়ে—মায় ফুলশযয্য পৰ্যন্ত গড়াতে হবে বড়বাবু!” খুব একটা বীরত্বব্যঞ্জক দৃষ্টি চতুর্দিকে সঞ্চারিত করিয়া বড়বাবু বলিল—“নিশ্চয়ই !—যখন ধরেছি তখন চুড়ান্ত করে ছাড়ব—তাতে দু-চারশ টাকা বেরিয়ে যায় কুছ পরােয়া নেই- দুচো মেরে হাত গন্ধ করতে রাজী নই বাবা!” লগিজাং বলিল—“নিশ্চয়ই!—একি নিলুমল্লিকের বাগান- বাড়ী দেওয়া !শালা ৫০ টাকার একটা নােট বার করে বলে কিনা এর ভিতর চালিয়ে নিতে হবে,—তক্ষুণি মুখের উপর বলে দিলুম—তাের নােটে আমি" পটুলী বলিল—“তাত হােনল, কিন্তু আমার প্রাণটা যে যাবে।” মুখখানা বিকৃত করিয়া লগিজাং বলিয়া উঠিল—“মাইরি ? -কি সতীলক্ষী আমার রেজায় গেলেন একেবারে লে লে আদিখ্যেতা রাখ।” ৮২
শনিবার। রাত প্রায় ১১টা হইবে,-নকুড়চন্দ্র আসিয়া
দ্বিতলের হল-ঘরটায় বরশয্যায় বসিয়াছে। বাড়ী হইতে সে
সাধারণ পােষাকেই আসিয়াছিল—এখানে আসার পর চেলির
কাপড়, গরদের পাঞ্জাবী, জরিপাড় সিল্কের চাদর প্রতি শ্ৰীঅঙ্গে
উঠিয়াছে। হলঘরটা দস্তুরমত সাজান হইয়াছে—কোথাও
অনুষ্ঠানের ত্রুটি নাই।
বরযাত্রী মাত্র একজন আসিয়াছিল—একটি ৫ বৎসরের
শিশু। পরণে একখানি কোরা লাল পেড়ে ধুতি—গায়ে অনেক
কালের পুরাণ লাল সিঙ্কের একটি পাঞ্জাবী—স্থানে স্থানে
পােকায় কাটিয়া গিয়াছে। ছেলেটি বড় বােগা এবং ক্ষীণজীবী
-মুখখানি কিন্তু ভারি সুন্দর। ভাসা ভাসা ডাগর চোখদুটি
সর্বদাই যেন ছল ছল করিতেছে এবং তার সেই স্বাস্থ্যহীন
ম্লান মুখখানির উপর একটা করুণ বিষাদের ছায়া আঁকিয়া
দিয়াছে। ছেলেটা চুপ করিয়া নকুড়চন্দ্রের পাশে বসিয়াছিল।
হঠাৎ অত্যন্ত মৃদুকণ্ঠে বলিল—কৈ মা এলাে না বাবা?”
তার মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলাইয়া দিতে দিতে মেহার্ড- কণ্ঠে নকুড় বলিল—“এই এলাে বলে !—তাের বুঝি আর দেরী সইছে না রে ভুলােযা?” ছেলেটি কোন কথা বলিল না— কেবল চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। আজ দু’বৎসর হইল তার মা মারা গিয়াছে ।-সে কিন্তু ইহার কিছুই জানিত না-বুঝিত না। এইটুকু কেবল জানিত-একদিন ভােরবেলা শয্যা হইতে উঠিয়া মাকে ডাকিতেই তাহাদের পাড়ার একজন স্ত্রীলােক দৌড়িয়া আসিয়া তাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়াছিল। তার পর একটু বেলা হইতেই তার বাপ কোথা হইতে ভিজা কাপড়ে বাড়ী ফিরিয়া আসিল এবং তাকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়া ছােট ছেলের মত করিয়া ফোপাইয়া ফোপাইয়া কাদিতে লাগিল।সে জিজ্ঞাসা করিল-“মা কোথায়?”—তার বাপ কোন উত্তর দিল না—আরও জোরে তাকে বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরিল। তার পর কতবার সে তার বাপকে জিজ্ঞাসা করিয়াছে,-“মা কবে আসবে বাবা?” তার বাপ বলিত—“এইবার আসবে!” এমনি করিয়া দু-দুটা বৎসর কাটিয়া গিয়াছে—মার স্মৃতি তার ক্ষুদ্র বুকখানি হইতে অনেকখানি মুছিয়া আসিয়াছিল। ইদানীং সে তার মার কথা বড় একটা জিজ্ঞাসা করিত না কখন সখন যদি বা করিত–সেরূপ ব্যাকুলতার সহিত নয়। এমনি করিয়া সে তার মাকে অনেকটা ভুলিয়া আসিতেছিল- ৮৪
*
হঠাং আজ কয়দিন হইতে তার এই সুপ্ত স্মৃতিটাকে জাগাইয়া
দিবার জন্য তার বাপ কেন যে এত উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছে
তাহা ভগবানই জানেন। তার মা নাকি ফিরিয়া আসিতেছে।
এবার নাকি তাহাকে ছাড়িয়া সে আর কোথায়ও যাইবে না-
এক মুহূর্তের জন্যও না। তাহাকে কত আদর করিবে--কত
চুমা খাইবে—এবং কাদিলেই বুকের মধ্যে টানিয়া লইবে—
এমনি আরাে কত কি! মার চেহারা ইদানীং প্রায় সে ভুলিয়া
গিয়াছিল—আজ কয়দিন হইতে অনেক চেষ্টা করিয়া সে তার
ছােট্ট বুকখানির মধ্যে মােটামুটি একটা ছবি আঁকিয়া লইয়াছে-
খুব অস্পষ্ট-খুব আবছা।
বিবাহের লগ্ন উপস্থিত খুব খানিকটা হাঁক ডাক করিয়া
লগিজাং বর লইয়া গেল—ভুলেও তার বাপের হাতটি
ধরিয়া ধীরে ধীরে চলিল—তার দারুণ ইচ্ছা যাইতেছিল বাপকে
জিজ্ঞাসা করে—তাহারা তার মার কাছে যাইতেছে নাকি?
—কিন্তু লােকজন দেখিয়া সে কেমন জড় সড় হইয়া গিয়াছিল।
-তার পর স্বপ্ন একেবারে স্বপ্ন!-একটা ছােট ঘরের মধ্যে
ঢুকিয়া সে দেখে-তার মা সাজিয়া শুজিয়া ঘােমটা দিয়া একটা
পিড়ির উপর বসিয়া রহিয়াছে ; তার পর তার বাপ তার
মার খুব নিকটেই আর একটা পিড়িতে গিয়া বসিল—এবং
তাহাকেও হাত ধরিয়া পাশে বসাইয়া লইল,-অত্যন্ত ক্ষীণকঠে
সে জিজ্ঞাসা করিল-“মা নাকি বাবা ?”
“হ্যা-মা, যা না-ভয় কি কোলে বসগে যা না রে পাগলা।”
৫
তার কিন্তু যাইতে পা সরিল না—কৈ তার মা ত তাকে
ভাকিল না—তার দিকে একবার ফিরিয়াও তাকাইল না ত -
তার ভাল লাগিতেছিল না—সে তার বাপের কোলের কাছে
আরও নিবিড় ভাবে ঘেসিয়া বসিল।
পুরােহিত হইয়াছিল সে দিনকার সেই মাতালটা।—অবশ্য
চিনিবার উপায় নাই—সে দিন তার প্রকাণ্ড গোঁফ ছিল—আজ
সকালে কামাইয়া ফেলিয়াছে। সে মাথা মুণ্ড যা তা কতকগুলাে
মন্ত্র পড়াইল ;—সম্প্রদান করিল বাঁকু।
বড়বাবু দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিতেছিলেন এবং মধ্যে মধ্যে
লগিজাংএর কানে কানে বলিতেছিলেন—“অনুষ্ঠানের ত্রুটি
একটু হয়নি বাবা-একি তােমার নিলুমল্লিকের গার্ডেনপাটি
পেয়েছয়্যার।
লগিজাং বলিল—“নিশ্চয়ই !–আসরে যখন নামা গেছে-
তখন চুড়ান্ত না করে ছাড়া হবে না বাবা!—মাইরি বলছি বড়-
বাবু, আমার যেন মনে হচ্ছে—পটুলীর সত্যি সত্যি বিয়ে হচ্ছে!
বড়বাবু সগর্বে বলিল—“তবে আর বাহাদুরীটা কি!”
মন্ত্র পড়া শেষ হইয়া গেল। স্ত্রী-আচার ব্যাপারটা অবশ্য
ফাক পড়িল, কিন্তু বর বড় কি কনে বড় এ সমস্যাটার সমাধান
বাকী রহিল না-সাতপাক ঘুরানও যথারীতি হইয়া গেল
অবশেষে চারি চক্ষুর মিলনও বাদ পড়িল না।
ছেলেটি বরাবর তার বাপের পাশে চুপটি করিয়া ফ্যাল
ফ্যাল করিয়া চাহিয়া দাড়াইয়াছিল—একবার যেন তার মনে
হইল-তার মা ঘােমটার ভিতর হইতে তার দিকে স্নেহপূর্ণ
দৃষ্টিতে চাহিতেছে—সে চাহনি বড় সুন্দর-বড় করুণ!
কিন্তু সে চকিতের জন্য।
তার পর বর-কনে বাসর ঘরে গিয়া বসিল। মকমলের শয্যা,
-সাটিনের তাকিয়া, তাহাতে জরির বিচিত্র কারুকার্য্য।
ভুলােকে কোলের কাছে টানিয়া লইয়া নকুড় বলিল—“তাের
মার কাছে গেলিনে ভুলাে ?"-ভুলাে তার মুখের পানে চাহিয়া
চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
বড়বাবু দরজার কাছে দাড়াইয়াছিল—সে হঠাৎ চাপিতে
না পারিয়া বিকট শব্দে হাসিয়া উঠিল। লম্বাগিজাংএর অবস্থাও
কাহিল হইয়া আসিয়াছিল—সে হঠাৎ বড়বাবুর হাত ধরিয়া
হিড়, হিড়, করিয়া টানিতে টানিতে একবারে পাশের ঘরে নিয়া
গিয়া ফেলিল, এবং মেঝের উপর পড়িয়া লুটোপুটি খাইয়া
হাসিতে আরম্ভ করিল।
নকুড়চন্দ্র অপ্রস্তুত হইয়া গিয়াছিল-ভুলাের ত কথাই
নাই—সে কিছুই বুঝিতে না পারিয়া ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তার
বাপের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
ঘরের মধ্যে ছিল কেবল কন্যাকৰ্ত্তা বাঁকুচন্দ্র। একটু প্রকৃতিস্থ
হইয়া নকুড় বলিল—“মা হারা ছেলে কিনা—সকাল থেকে একে
বলে রেখেছি আজ তাের মা আসবে—বুঝেছেন কিনা!”
বাঁকুচন্দ্রেরও হাসি আসিতেছিল—সে অতিকষ্টে সামলাইয়া
লইয়া বলিল—“বটেই ত বটেই তা—তা আমি একবার বাইরে
৮৭
স্বপ্ন-শেষ থেকে আসছি বাবাজী,তােমার ত আর শালী শালা এখানে কেউ নেই যে আমােদ আহলাদ করবে—যাক দেশে গিয়ে এক- দিন—” কথাটা শেষ না করিয়াই বাঁকুচন্দ্র ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল এবং পাশের ঘরে গিয়ে বদ্ধ হাসির বেগ মুক্ত করিয়া দিয়া দম ছাড়িয়া বাঁচিল। হাসির বেগটা কথঞ্চিৎ কমিলে সে বলিল—“এখন কি করা যায় বল দেখি?” লম্বাগিজাং বলিল—“কি আর করা যাবে ?—যখন এতদূর গড়িয়েছে—তখন আরও খানিকটা গড়াতে দেওয়া যাক্। দেখাই যাক না ব্যাটার দৌড় কতদূর পর্যন্ত !—পটুলীটা কিন্তু সাবাস মেয়ে বাবা!—কার সাধ্যি ধরে ভদ্র ঘরের মেয়ে নয়!—কি রকম লজ্জাশীলাটির মতন বসে আছে-একবারে হুবহু বিয়ের ক’নেটি—মায় চোখের ভাবটি পৰ্য্যন্ত।” বাঁকুচন্দ্র বলিল—“ওর মা কত বড় ছেনাল ছিল, সেটা ভাব একবার।” বড়বাবু বলিল—“বাকুরও বাহাদুরী আছে কিন্তু পাকা মুরুবির ভাবটি কেয়া বজায় রেখে এসেছে বল দেখিকে বলবে ও আমাদের বাঁকুচন্দ্র !” লম্বাগিজাং বলিল—“আমিও ঠিক পারতুম—মাত্রাটা যে আজ একটু বেশী হয়ে পড়েছেনইলে— বাকু বলিল—“তা ত বুঝলুম—কিন্তু এখন আমাদের কি করতে হবে বল দেখি—আমার ত শরীর বইছে না বাবা!” bilo
বড়বাবু বলিল—“বাঃ আসল কাজই ত এখনও বাকী রয়েছে ;
বর কনেকে ঘরে শুইয়ে আড়ি পাততে হবে মাইরি !--- না
হলে আর মজাটা কি হােলল !”
লম্বাগিজাং একেবারে লাফাইয়া উঠিল—“ঠিক বলেছ বড়
বাবু,বারান্দার দিকের খড়খড়ির পাখী তুলে দেখতে হবে
শালা করে কি !—ওঃ সে যা মজা হবে মাইরি!—চিরকাল গল্প
করতে পারা যাবে যে, একটা নুতন কিছু করা গেছে !
সুধু টাকা থাকলেই কাপ্তেনী করা যায় না বাবা—তার সঙ্গে
রসজ্ঞান চাই ;-এ সব কি আর নিলুমল্লিকের কাজ।--সাধে
বাবাজীবন যৌবন তােমাকে সমর্পণ করে দেউলে হয়ে বসে আছি
বড়বাবু" বলিয়াই সে বড়বাবুকে আবেগভরে জড়াইয়া ধরিয়া
অত্যন্ত জোরে জোরে সশব্দে চুমা খাইতে আরম্ভ করিয়া দিল।
এ দিকে বাসরঘরে বসিয়া পটুলী ফাইয়া উঠিতেছিল,
তার মনে হইতেছিল।—ছুটিয়া কোথাও পলাইয়া যায়।একি
করিতেছে সে।এমন ধারাটা সে যে স্বপ্নেও কখন ভাবিতে
পারে নাই—তার কান্না পাইতে লাগিল।
নকুড়চন্দ্র বলিতেছিল—“দূর পাগলা! মার কাছে যাবি
তাতে আবার ভয় কিসের ?—যা না যাঃ!”—তার পর এদিক
ওদিক চাহিয়া অত্যন্ত মৃদু চাপা কণ্ঠে বলিল-শুদ্ধ ! তুমি
একটু আদর করে ওকে একটিবার কোলে তুলে নাও
লক্ষীটি। সকাল থেকে ও মার কাছে যাব, মার কাছে যাব
করে একবারে অস্থির হয়ে রয়েছে-
পটুলী কিন্তু নড়িল না—কাঠের মত শক্ত হইয়া বসিয়া
রহিল। মনটা তার শত সহস্র বাহু হইয়া এই শীর্ণ মাতৃহারা
শিশুটিকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইবার জন্য বার বার প্রসারিত
হইতে চাহিতেছিল—কিন্তু তারপর ?—তারপর চারিদিক হইতে
বিদ্রুপের হাসিতে বাড়ীখানা ফাটিয়া যাইবে—অসহ্য অসহ!
তার মনে হইতেছিল—ছুটিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া যায়,
কিন্তু যাইবেই বা কোথায়? এখুনি সকলে মিলিয়া জোর করিয়া
তাহাকে আবার ঘরের মধ্যে আনিয়া পুরিয়া দিবে এবং তার
পর হয়ত এমন একটা কিছু কাণ্ড করিবে যাহা কল্পনা করিতেও
তার ভয় হয়। এখনি হয়ত এক নিমিষে সমস্ত রহস্য ভাঙ্গিয়া
দিবে—হয়ত বেচারা নিরীহ ব্রাহ্মণকে রাস্তায় বাহির করিয়া
দিয়া ক্ষেপাইয়া পাগল করিয়া তুলিবে এবং খুব একটা বাহাদুরী
করিতেছে মনে করিয়া যাড়ের মত চীৎকার করিয়া পাড়াশুদ্ধ
লােককে হয়ত জাগাইয়া তুলিবে।আর ঐ শীর্ণ মাতৃহারা
শিশুটি !-পটুলী সহসা মনে মনে শিহরিয়া উঠিল। হয়ত
লােকের কোলাহল এবং ঠেলাঠেলিতে বাপের নিকট হইতে
বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িয়া ক্ষুদ্র প্রাণটি তার কখন এক সময় নিঃশব্দে
বাহির হইয়া যাইবে—কেহ টেরও পাইবে না।—পটুলীর
ইচ্ছা যাইতে লাগিল চীৎকার করিয়া সে কাদিয়া উঠে।
হঠাৎ বাহিরে কাহার পদশব্দ শুনা গেল। পরমুহূর্তেই
বকুচন্দ্র আসিয়া অত্যন্ত গভীরভাবে বলিল—“শুধু শুধু আর
রাত জেগে কষ্ট পাওয়া কেন বাবাজী—আমি বলি কি হুড়কো
গ-শেষ- বন্ধ করে শুয়ে পড়!—তুইও শুয়ে পড় পটলী, তাের আবার রাত জাগা অভ্যেস নেই—রাতও ত বড় কম হােল না—” বলিতে বলিতে বাঁকুচন্দ্র অদৃশ্য হইয়া গেল। পটুলীর বুকটা হঠাৎ ধড়াস করিয়া উঠিল—চাহিয়া দেখে কখন এক সময় হুড়কো দিয়া ব্রাহ্মণ ধীরে ধীরে তাহার অতি নিকটে আসিয়া বসিয়াছে। “ও কি কাদছ নাকি?” বলিয়া নকুড় তাহার মাথায় ধীরে ধীরে হাত দিতেই সে ডুরাইয়া কাদিয়া উঠিতে গিয়া প্রাণপণ বলে নিজেকে সামলাইয়া লইল। পরমুহুর্তেই কাহার কোমল স্পর্শে শিহরিয়া চাহিয়া দেখে—কখন এক সময় চুপে চুপে সেই শীর্ণ মাতৃহারা শিশুটি নীরবে তার কোলের উপর আসিয়া বসিয়াছে। প্রাণপণ বলে তাকে বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া পলী পাচ বৎসরের ছােট্ট মেয়েটির মত করিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাদিতে লাগিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আর একজনের চাপা কান্না তার কাণে আসিয়া পৌছিতেছিল। কিছুক্ষণের জন্য ঘরখানা নিস্তব্ধ হইয়া রহিল—একেবারে গভীর নিস্তব্ধতা!—কোথায়ও একটু শব্দ নাই—কেবল পাশের বারান্দা হইতে কাহাদের চাপা হাসির আওয়াজ মধ্যে মধ্যে অস্পষ্ট শুনা যাইতেছিল। হঠাৎ এক সময় ভাঙ্গা সজল কণ্ঠে নকুণ্ড ডাকিল-“ভেলুর মা!” অত্যন্ত চাপা এবং ভাঙ্গা কণ্ঠে উত্তর আসিল—“কি!” “তােমার কষ্ট হচ্ছে নয় ?-শুয়ে পড়। আমি আলােটা নিবিয়ে দিইas
পাশের বারান্দার চাপা হাসি স্পষ্টতর হইয়া উঠিল। নকুড়-
চন্দ্ৰ আলােটা নিবাইয়া দিয়া আসিয়া শুইল—ইতিপূৰ্বেই ভুলােকে
কোলের কাছে টানিয়া লইয়া পটুলী শুইয়া পড়িয়াছিল ;
সে মধ্যে মধ্যে তাকে বুকের মধ্যে চাপিয়া চাপিয়া ধরিতেছিল।
কতক্ষণ পরে নকুড় আবার ডাকিল—“ভেলুর মা !” অত্যন্ত
শান্ত পরিষ্কার কণ্ঠে উত্তর আসিল—“কি?”
“ভেলু ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝি?”
“না”—বলিয়া পটুলী ভুলােকে আরও নিবিড় ভাবে বুকের
মধ্যে চাপিয়া ধরিল।
নকুড় বলিল—“ঘুম পাচ্ছে বুঝি তােমার ?”
“না-আপনি ঘুমােন।”
নকুড় কিন্তু ঘুমাইল না—সে কত কি মাথামুণ্ড বকিয়া
যাইতে লাগিল।-কেমন করিয়া তাহারা দুজনে নূতন সংসারটি
গড়িয়া তুলিবে—কেমন করিয়া তাহারা ভুলােকে জানিতেই
দিবে না তার মা নাই। তারপর তাহাদের যখন সন্তান-সন্ততি
জন্মইবে, তখন তাহারাও জানিবে ভেলু তাহাদের সহােদর
এমনি আবােল তাবোল কত কি কল্পনা—যাহার কোন ভিত্তিই
নাই —অথচ যাহা একটি রাত্রের জন্য সব চেয়ে সত্যিকারের বস্তু।
বারান্দার হাস্য-কোলাহল কখন থামিয়া গিয়াছিল—কেবল
মধ্যে মধ্যে পাশের ঘর হইতে জড়িত কণ্ঠের বাগবিতণ্ডা অস্পষ্ট
শােনা যাইতেছিল।
তারপর নকুড়চন্দ্র তার পূর্বন্ত্রীর কথা পাড়িল—তাহাকে
১২
কত ভালই না সে বাসিত-পটুলীকে সে তেমনি করিয়াই ভাল। বাসিবে। সেবার কে একজন গণৎকার তাহাকে বলিয়াছিল— তার স্ত্রীর প্রকাণ্ড একটা ফাড়া আছে—রক্ষাকবচ ধারণ না করাইলে কি হয় বলা যায় না—সে তার কথা বিশ্বাস করে নাই। এবার কিন্তু সে ঠেকিয়া শিখিয়াছে—সে গণৎকারের ঠিকানা তার জানা আছে-কালই গিয়া সে রক্ষা কবচ তৈরী করাইয়া লইয়া আসিবে—এমনি কত কি সে বকিয়া যাইতে লাগিল-- কত কল্পনা-কত স্বপ্ন—পটুলীর ডাক্ ছাড়িয়া কাদিয়া উঠিতে ইচ্ছা যাইতে লাগিল। তারপর কখন এক সময় নকুড় ঘুমাইয়া পড়িল—অন্ধকার ঘরখানা খা খা করিতে লাগিল। একটি রাত্রি—কেবল একটি রাত্রির বিশ্রাম ;-তার পর আবার সেই শান্তিহীন বিরামহীন উদ্দেশ্যহীন একঘেয়ে পথ- যাত্রা।কোথায় এর শেষ তাহা কে জানে—তার নিশ্বাস রুদ্ধ হইয়া আসিতেছিল। নিদ্রিত মুলােকে বুকের মধ্যে প্রাণপণে চাপিয়া ধরিয়া পটুলী ডুকাইয়া কাদিয়া উঠিল। গভীর নিস্তব্ধ রাত্রি।-পটুলী ধীরে ধীরে উঠিল—ধীরে অতি ধীরে ঘরের কপাট খুলিয়া সম্মুখের খােলা ছাতটার উপর আসিয়া সে দাড়াইল।চারিদিক নীরব নিস্তব্ধ—কোথাও স্বপ্ন-শেষ জাগরণের সাড়াটি পর্যন্ত নাই—কেবল দূরে—অনেক দূরে কোন্ এক দেবালয় হইতে নহবতের ক্ষীণ অস্পষ্ট সুরটুকু বাতাসে ফিরিতেছিল। পটুলী ছাদের আলিসাটার ধারে নীরবে আসিয়া দাড়াইল ;-যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল অন্ধকার আর অন্ধকার ! ঠিক এমনি গভীর নিস্তব্ধ এক অন্ধকার রজনীতে তার মা হয়ত গৃহত্যাগ করিয়াছিল—পটুলীর সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিল —সেও কি তবে?—হঠাৎ কি মনে করিয়া বাসরঘরের দিকে ফিরিয়া তাকাইতেই তার মনে হইল—সে ঘরখানা যেন কতদূরে সরিয়া গিয়াছে—আর তাহার ভিতর হইতে যেন একটি অসহায় শিশুর ক্ষীণ কাতর আর্তনাদ অনেকদূর হইতে বাতাসে অস্পষ্ট হইয়া ভাসিয়া আসিতেছে।-সে উৰ্দ্ধমুখে একবার আকাশের দিকে তাকাইল। মাথার উপরকার লক্ষ- নক্ষত্র যেন একযােগে বলিয়া উঠিল,কত যুগের কত পথহারা নাবিককে অকূল-সমুদ্রে পথ দেখাইয়া আসিয়াছে যে তারাটি আমাদের মধ্যে—তাহাকে ভােমার পথের কথা জিজ্ঞাসা করেছি -সে শুধু বল্লে--জানি না। রাত্রি প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে,হলঘরের মধ্যে ছটি প্রাণী মড়ার মত ঘাড়াঘাড়ি হইয়া ঘুমাইতেছিল। এককোণে একটা হারিকেন একরাশ ভূষা উড়াইয়া নিব নিব করিয়া ১৪ অলিতেছে। সেই আধ আলাে আধ অন্ধকারের মধ্যে লােক- গুলােকে ঠিক যেন ভূতের মত দেখাইতেছিল। অন্ধকারে একটি স্বীলােক নীরবে পা টিপিয়া টিপিয়া সেই কক্ষে প্রবেশ করিল; তারপর হেঁট হইয়া একবার কি দেখিয়া লইয়া একটি লােকের মাথার শিয়রে আসিয়া বসিয়া তাহাকে খুব জোরে ধাক্কা দিতে লাগিল। লােকটা বড় মড় করিয়া উঠিয়া পড়িয়া—সভয়ে বলিয়া উঠিল—“কে ?---" সে আরও কি বলিতে যাইতেছিল—দুই হাতে প্রাণপণে তার মুখ চাপিয়া ধরিয়া কম্পিত চাপা-কণ্ঠে স্ত্রীলােকটি বলিল-“চেঁচিও না- আমি পটুলী !" সে স্বর এত গম্ভীর এবং সংযত যে লম্বাগজা ভয় পাইয়া গেল—ভূতাবিষ্টের মত সে পীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিল। ছাদের উপর আসিয়া পলী বলিল—“আমাকে কলকাতায় নিয়ে চল।” লম্বাগিজাংএর তখন পর্যন্ত নেশার ঝোক সম্পূর্ণ কাটে নাই —অন্ধকারে পটুলীর মুখ যেটুকু দেখা যাইতেছিল—তাহা কোন জ্যান্ত মানুষের বলিয়া তার মনে হইল না। পটুলী আবার বলিল—“দুজনের ট্রেণভাড়া ছাড়াও পাঁচ টাকা আমার সঙ্গে আছে—আর এক মিনিট দেরী নয়, বেরিয়ে পড়।” লগিজাং কি বলিতে যাইতেছিল-বাধা দিয়া পটুলী
বলিয়া উঠিল-“নগদ ১০০ টাকা দোবাে—আর কথা কোয়াে
-ভােরের ট্রেণ ধরতেই হবে।”
=
দুইটি প্রাণী নির্জন অন্ধকার পথে ধীরে ধীরে বাহির হইয়া
পড়িল। কয়েক পা চলিয়াই লগিজাং সহসা বলিয়া উঠিল—
“ওকি ! তুই অমন করে হঠাৎ কেঁদে উঠলি কেন পী-
আমার বড় ভয় করছে মাইরি!"—সে কথার কোন উত্তর
আসিল না। মাথার উপরকার লক্ষকোটি নক্ষত্র একবার
পরস্পরের মুখের দিকে তাকাইল।
রাখালী
গােলদাস বাড়ীর দাওয়ায় বসিয়া তামাক খাইতেছিল, হাত
চারেক দূরে একটি পােনের ষােল বছরের ছেলে একটা ছেড়া
মাদুরের উপর বসিয়া দুলিয়া দুলিয়া পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করিতে-
ছিল।
দাওয়ার সম্মুখেই খানিকটা খালি জায়গা, তাহাতে
গাছপালার চিহ্নমাত্র নাই; কেবল একপাশে গােয়া-ঘরের
গা ঘেসিয়া পাঁশগাদার ধারে একটা চামেলীর ঝাড়, গরীবের
ঘরের অবিবাহিতা কন্যার মত সমস্ত অনাদর ও অবহেলার মধ্যেও
আপনার যৌবনকে নীরবে পত্রপুষ্পে পরিস্ফুট করিয়াছিল।
গকুলদাসের আট বছরের মেয়ে রাখালী ফুল তুলিয়া তুলিয়া
কোচড়ে জড় করিতেছিল, আর আপন মনে গুন্ গুন্ করিয়া
গান গাহিতেছিল।
কোটাকে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়া রাখিয়া, খখক
করিয়া কাসিতে কাসিতে গােলদাস ডাকিল, “এক ঘটি জল
দিয়ে যা ত রাখালী।
ফুল তুলিতে তুলিতে রাখালী উত্তর দিল, “আমি এখন
পারবাে না, নীলুদাদা ত রয়েছে, তাকে বল না।”
"সে যে পরীক্ষার পড়া পড়ছে।”
“আর আমি যে ফুল তুলছি।”
“যাবি নে ত ?”
নীলুদা যা না।”
গােলদাস এবার তাড়াদিয়া উঠিল, “তুই যাবি কিনা তাই বল।”
রাখালী এবার আর কোন কথা বলিল না, সে চুপ করিয়া
গড়াইয়া রহিল।
নীলু বলিল, “আমি এনে দেবাে?”
“না ওকেই আনতে হবে”—বলিয়া গােলদাস গর্জন করিয়া
উঠিল, “যা বলছি শিগগীর।” রাখালী তবুও নড়িল না।
“আনবিনে ত? আচ্ছা তুই কত বড় মেয়ে তাই দেখছি।”
বলিয়া গােকুলদাস উঠিয়া দাড়াইবার বন্দোবস্ত করিতেছিল,
এমন সময় রান্নাঘর হইতে রাখালীর মা ঝঙ্কার দিয়া উঠিল, “কি
হয়েছে রে, রাখালী ?”
গােকুলদাসের আর উঠা হইল না। রাখালী এতক্ষণ কি
করিবে তাহাই ভাবিতেছিল, মার গলার সাড়া পাইয়া সে
কাদিয়া উঠিল—“একটু জল নিয়ে এলে নীলুদা যেন ক্ষয়ে যায়,
আমি কক্ষণাে যাবে না, কিছুতে যাব না।”
রাখালীর মা রান্নাঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া হাতমুখ
নাড়িয়া সুরু করিয়া দিল, “আমার মেয়েকে বকবার তুমি কে
.
বল ত! কেন, নীলে কি জল আনতে পারতাে না, তার গতরে
কি পােকা ধরেছে, না হাত দুখানা একেবারে খসে গেছে।”
গােলদাস চুপ করিয়া বসিয়া রহিল এবং গিন্নীর সুরটা
উদারা মুদারা হইতে ক্রমে তারার দিকে অগ্রসর হইতেছে দেখিয়া
হুকাটা লইয়া আস্তে আস্তে সেখান হইতে সরিয়া পড়িল।
রাখালীর মা এবার নীলুর উপর পড়িল। সে নানান রকম
মুখভঙ্গি করিয়া বলিতে লাগিল, “নবাবপুরের মতন বসে বসে
গেলবার জন্যে তােমাকে রাখা হয়নি; গতর খাটিয়ে খেতে পার,
থাক, নইলে নিজের পথ দেখ,-এখানে ওসব নবাবী চলবে না।"
নীলমণি একটি কথাও বলিল না,সে নীরবে বসিয়া রহিল ;
তাহার চোখ দুটা দিয়া বড় বড় জলের ফোটাগুলা টপটপ
করিয়া কোলের উপর আসিয়া পড়িতে লাগিল।
পালা সাঙ্গ করিয়া রাখালীর মা রান্নাঘরে দিকে চলিয়া গেলে
রাখালী পা টিপিয়া টিপিয়া নীলমণির কাছে আসিয়া বসিয়া
বলিতে লাগিল, “আমি আর কখনও এমন কাজ করবে না
নীলুদা, তুমি চুপ করতােমার পায়ে পড়ি।
রান্নাঘর হইতে রাখালীর মা বলিয়া উঠিল, “রাখালী!”
সে কোন উত্তর দিল না। রাখালীর মা আবার ডাক দিল,
“রাখালী।” খুব বিরক্তভাবে রাখালী উত্তর দিল, “কি ?”
“ওখান থেকে এখুনি চলে আয় বলছি।”
সে চীৎকার করিয়া বলিল, “আমি কক্ষণাে যাব না, বেশ
করব এখানে থাকব, খুব করব এখানে থাকব।
সে আজ তের চৌদ্দ বৎসর আগেকার কথা গােকুলদাসের
প্রথম পক্ষের স্ত্রী যশােদা তখন বাচিয়া আছে। ওপাড়ার
হরিশমণ্ডল আসিয়া একদিন একটি দুই বছরের কচি ছেলে
গােলদাসের কোলের উপর ফেলিয়া দিয়া বলিয়াছিল, “তােমার
ত ছেলেপুলে হল না ভাই, তা এটিকে যদি মানুষ কর।”
গােল বলিল, “কাদের ছেলে, কি বৃত্তান্ত কিছুই জানা
নেইহঠাৎ-”
বাধা দিয়া হরিশ বলিল, “সে সব না জেনে কি আর আমি
এনেছি গােকুলদা? ও আমাদের স্বজাত এমন কি ওর মার
সঙ্গে আমাদের কুটুম্বিতে পৰ্য্যন্ত আছে।”
যশােদা ছিল বন্ধ্যাসেও খুব বুকিয়া পড়িল, কাজেই
ছেলেটিকে গােলদাস বাড়ীতেই রাখিয়াছিল।
হরিশ চলিয়া যাইতেছিল, পিছু ডাকিয়া গােল জিজ্ঞাসা
করিল, “ওর বাপ-মারা পরে গােলমাল করবে না ত?”
“সে বিষয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার, কেন না ওর বাপ
মা কেউই বেঁচে নেই—
হরিশমণ্ডল চলিয়া যাইতে গােকুল ছেলেটিকে বুকের মধ্যে
জড়াইয়া ধরিল। মনে মনে বলিতে লাগিল, “আহা, অনাথ
ছেলে।”
তারপর যশােদার নীলমণি, “যশােদার নীলমণি"র মত
হইয়াই আদরে আদরে দিন দিন বাড়িয়া উঠিতে লাগিল।
কিন্তু সে সুখ অনাথ-বালকের কপালে বেশী দিন সহিল না।
নীলমণি যখন পাঁচ বছরের, সেই সময় হঠাৎ একদিন তিনদিনের
জ্বরে যশােদার মৃত্যু হইল। তাহার একবৎসর পরে যশােদর
এক মাসতুতাে বােনকে গােলদাস হঠাৎ একদিন বিবাহ করিয়া
ঘরে আনিয়া তােলে এবং আরও দুই বৎসর পরে রাখালীর
জন্ম হয় ; ইহাই নীলমণির ক্ষুদ্র জীবনের ক্ষুদ্র ইতিহাস।
গােকুলদাস সেদিন সকালে উঠিয়া হাটের দিকে যাইতেছিল,
এমন সময় পথে ননী মাষ্টারের সঙ্গে দেখা। গােলদাস পায়ের
ধূলা লইয়া প্রণাম করিতেই সে বলিল, “ওহে গােল, ক’দিন
থেকে তােমাকে একটা কথা বলব বলব মনে করছি-তা আর
হয়ে উঠেনি।”
হাত ঘােড় করিয়া গােল বলিল, “আজ্ঞে করুন মাষ্টার
মশাই।”
“বলছিলাম কি, পরীক্ষার পর নীলমণিকে এখানে আর না
রেখে, কল্কাতায় কলেজে পড়ার জন্যে পাঠালে আমার মনে হয়
খুব ভাল হয়। ওর পড়ানাের পার যে রকম, তাতে মনে
হয় ও পরে একটা মানুষ হবে।”
১০১
স্বপ্ন-শেষ
অত পয়সা কোথা থেকে
কথাটা সমাপ্ত হইতে না দিয়া ননী মাষ্টার বলিল, “সেও
একটা কথা বটে।” তার পর খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া
আবার বলিল, “আচ্ছা, জমিদার বাবুকে বলে কিছু করতে
পারি কি না দেখি।”
গােলদাস সেদিন আর হাটে গেল না, বাড়ী ফিরিয়া
আসিয়া সে ডাকিল, “নীলু !”
পড়িতে পড়িতে ছুটিয়া আসিয়া নীলমণি তাহার সম্মুখে
দাড়াইল। রাখালী অদূরে একটা বিড়াল ছানার ল্যাজের সঙ্গে
একটু রসিকতা করিতেছিল; সেও ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া
দাড়াইল। গােকুল বলিল, “তুই খেলা করগে যা না রাখালী।”
সে বলিল, “না যাব না।”
আজ কয় দিন হইতে রাখালী এই একটা জিনিষ ক্রমাগত
লক্ষ্য করিয়া আসিতেছে যে, তার বাপ যখন তখন চুপি-চুপি
নীলমণির সঙ্গে কি সব কথাবার্তা কহেন। এটা তার
মােটই ভাল লাগিত না এবং ইহাতে কেমন একটা ভয়ও
তাহার হইত।
গােলদাস আবার বলিল, “যা না রাখালী।”
“আমি থাকি না বাবা।” কথাটা রাখালী এমন কাতরভাবে
বলিল যে, গােকুলদাস আর কোনও কথা বলিতে পারিল না।
সে মনে মনে ভাবিল, সেই ত একদিন শুনবেই, তার চেয়ে
আগে থাকতেই শুনে রাখুক। তার পর গােলদাস ননী
১০২
মাষ্টার যে সব কথা কিছুক্ষণ পূর্বে তাহার কাছে বলিয়াছিল,
সে সমুদয়ই নীলমণিকে বলিল। নীলমণি চুপ করিয়া রহিল।
গােলদাস বলিল, “কি করবি বল্।”
নীলমণি মাথা হেঁট করিয়া বলিল—“এখনও সময় আছে,
পরীক্ষাটার কি ফল হয় দেখা যাক। তারপর"
রাখালী এতক্ষণ নীরবে দাড়াইয়া সব কথা শুনিতেছিল,
হঠাৎ ভাঙ্গা গলায় কঁপা স্বরে বলিয়া উঠিল, “আমি আর কক্ষপণ
ঝগড়া করবে না, নীলু দা, তুমি কোথাও যেও না, তােমার
পায়ে পড়ি।”
গােকুল রাখালীকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিল—নীলমণির
চোখ দুইটা জাল করিয়া উঠিল।
১৩
তার পর অনেক বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। রাখালীর মার
মৃত্যু হইয়াছে, গােলদাসও আর ইহজগতে নাই। নীলমণি
এখন কলিকাতায় চাকরী করিতেছে।
সেদিন রবিবার। বেলা তখন প্রায় বারােটা হইবে।
জানালা দিয়া শীতকালের মিহি রৌদ্র তখন ঘরের মেঝের উপর
আসিয়া পড়িতেছিল। নীলমণি সেইখানটিতে বসিয়া একখানা
খবরের কাগজের উপর চোখ বুলাইয়া যাইতেছিল। এমন
সময় রাখালী আসিয়া ডাকিল, “ভাত যে জুড়িয়ে গেল।”
“এই যাই,” বলিয়া খবরের কাগজের উপর হইতে চোখ
দুইটা তুলিয়া লইয়া নীলমণি রাখালীর মুখের পানে একদৃষ্টে
চাহিয়া রহিল। এবং খানিকক্ষণ এইভাবে থাকিয়া হঠাৎ
বলিয়া উঠিল, “তাই ত, তুই যে খুব বড় হয়েছিল, রাখালী।
একটু হাসিয়া রাখালী (উত্তর দিল, “চিরকালই বুঝি কচি
খুকীটি থাকব?”
“তাের বয়স কত হল ?”
১০৪
-সঃ-শেষ- হিসাব করিয়া রাখালী বলিল, “এই ফাগুনে পনের পড়ব।” “বলিল, কিরে! না—আর চুপ করে বসে থাকা চলে না দেখছি, একটা ঘটক টটকও যে পাই নে।” “কেন, ঘটক কি করবে?” বলিয়া বিরক্তভাবে রাখালী নীলমণির মুখের পানে তাকাইয়া রহিল। “কি করবে? বল কি পাত্রের সন্ধান করবে।” “কেন আমার ত—” কথাটাকে শেষ না করিয়াই রাখালী বলিল, “ভাত জুড়িয়ে গেল যে !” কি একটা কথা বলিতে গিয়া নীলমণি দরজার দিকে চাহিয়া দেখে রাখালী সেখানে নাই—সে কখন চলিয়া গিয়াছে। ভাত খাইতে বসিয়া নীলমণি দেখিল, রাখালী প্রতিদিনকার মত সেখানে বসিয়া নাই। বুড়াে ঝি কলের ধারে বসিয়া বাসন মাজিতেছিল, নীলমণি বলিল, “রাখালী কোথায় গেল জান, ঝি ?” সে বলিল, “দিদিমণি ত ঘরে শুয়ে আছেন।” “এমন অবেলায়?” “মাথাটা নাকি বড় ধরেছে।” ভাত খাইয়া উঠিয়া নিজের ঘরে আসিয়া নীলমণি চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। রাখালী তাহার উপর রাগ করিয়াছে এবং সে রাগের কারণটা যে কি তাহা বুঝিতে নীলমণির বেশী দেরি হইল না।
মরিবার সময় গােলদাস নীলমণিকে বলিয়া যায়; সে
যেন রাখালীকে বিবাহ করিয়া সংসারী হয় ; রাখালীকে অন্য
হাতে দিবার কথা পাড়িয়া সে যে আজ খুবই অন্যায় করিয়াছে,
সেটা সে নিজেই বুঝিতে পারিয়াছিল, কিন্তু সে যে বিবাহই
করিবে না ঠিক করিয়াছে। যদি সে রাখালীকে ছাড়িয়া অন্য
কাহাকেও বিবাহ করিত, তাহা হইলে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা ছিল
কিন্তু সে ত আর তা করিতেছে না।
রাখালীর শুইবার ঘরে ঢুকিয়া নীলমণি ডাকিল, “রাখালী !”
রাখালী দেওয়ালের দিখে মুখ ফিরিয়া শুইয়াছিল।
কোন উত্তর দিল না।
নীলমণি আবার ডাকিল, “রাখালী।”
সেইভাবে থাকিয়া সে উত্তর দিল, “কি?”
“তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ ?”
সে বিরক্তভাবে উত্তর দিল, “যাও মিছে বিরক্ত করতে এস
—আমার বড় মাথা ধরেছে-ঘুমােতে দাও।”
নীলমণি আস্তে আস্তে চলিয়া গেল।
পরদিন নীলমণির ভাত খাইবার সময় রাখালী আসিল না ;
আফিস যাইবার সময় নীলমণি অনেক সাধ্যসাধনা করিল, সে কিন্তু
উঠিল না—এবং কেন যে রাগ করিয়াছে তাহাও বলিল না।
আফিস হইতে ফিরিয়া আসিয়া নীলমণি রাখালীর ঘরে
ঢুকিয়া দেখে রাখালী সেখানে নাই; ঘর হইতে বাহিরে আসিয়া
বুড়াে ঝিকে জিজ্ঞাসা করিল, “রাখালী, কোথায় জান, ঝি?”
১৬
স্বপ্ন-শেষ
“দিদিমণি ত এখানে নেই।"
“সে কি!”
“কেন, তিনি ত আজ তিনটের গাড়ীতে দেশে চলে
গেছেন।”
“দেশে?—মহেশপুরে? কার সঙ্গে?
“রামহরির সঙ্গে।”
নিজের ঘরে আসিয়া, জামা কাপড় না ছাড়িয়াই নীলমণি
তক্তপােষের উপর শুইয়া পড়িল।
১০৭
৪ গােলদাস ও তাহার স্ত্রীর মৃত্যুর পর নীলমণি সেই যে রাখালীকে লইয়া কলিকাতায় চলিয়া আসিয়াছিল, তার পর আর দেশে ফিরিয়া যায় নাই। সেই হইতেই রাখালীর দূর- সম্পৰ্কীয়া এক মাসী তার বিধবা কন্যাকে লইয়া গােলদাসের ভদ্রাসনখানিতে বাস করিয়া আসিতেছিল। সন্ধ্যা হইতে আর বেশী দেরি নাই। রাখালীর মাসী তুলসী তলায় বসিয়া মালা ফিরাইতেছিল, এমন সময় অন্ধকারে রাখালী আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া দাঁড়াইল। অন্ধকারে আগন্তুককে চিনিতে না পারিয়া রাখালীর মাসী বলিল, “কে গা বাছা তুমি?” “আমি রাখালী" বলিয়া রাখালী সেইখানে বসিয়া পড়িল। “রাখালী ? বলা কওয়া নেই হঠাৎ যে—নীলমণি ভাল আছে ত?” “এই তােমাদের দেখতে এলাম।” “তবু ভাল, মাসীকে যে ভুলেও মনে পড়েছে, এই না Job
আমাদের ভাগ্যি।”—কথাটাকে শেষ করিয়াই মাসীর চীৎকার
উঠিল, “ওরে বিলি, কে এসেছে দেখে যা !”
বিন্দু রান্নাঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া দাড়াইতেই
মাসী বলিল, “কে, বল্ দেখি ?"
সে বলিল, “কে ত চিনতে পারছি নে।”
“চিনতে পারছিস নে ? ওযে আমাদের রাখালী! আহা ;
ফুলী যদি আজ—* মাসী কাপড়ের খুটটা শুকনাে চোখের উপর
বারবার ঘষিতে সুরু করিয়া দিল।
“আমি তােমাকে সেই একরত্তিটি দেখেছিলাম, তার পর
ত আর দেখিনি।”—বলিয়া বিন্দু রাখালীর কাছ ঘেসিয়।
আসিয়া বসিল।
মাসী আবার আরম্ভ করিল, “আহা, ফুল আমাকে কত
ভালই বাসতােমার পেটের বােনও এত করে না।" ক্ষণকাল
নীরব থাকিয়া সে আবার বলিতে লাগিল, এমন মানুষও যায়
গা! তাও কি বুড়ো হাবড়া হয়েছিল? সবই ভগবানের খেলা
তা না হলে—কথাটাকে শেষ না করিয়াই সে বলিল, “তা তুই
কার সঙ্গে এলি ? তাের নীলুদা সঙ্গে করে এনেছে বুঝি ?”
“না, আমি রামহরি দাদার সঙ্গে এসেছি।” কথাটা রাখালী
এতই নীরস ভাবে বলিল যে, অন্য কেহ হইলে তার পর আর
সে সম্বন্ধে কোন কথা তুলিত না। মাসী কিন্তু তবু বলিল,
“কেন সে কি নিজে আসতে পারতাে না? এতই কাজের লোেক
হয়েছে সে ?”
—স্বপ্ন-শেষ
রাখালী কোনও উত্তর দিল না, সে চুপ করিয়া বসিয়া
রহিল।
মাসী আবার আরম্ভ করিল, “একেই বলে নেমখহারাম রে,
একেই বলে নেমখহারাম। যার খেয়ে মানুষ
কথাটা আর বেশীদূর অগ্রসর হইতে না দিয়া বিন্দু বলিল,
“তােমার সে কথায় কাজ কি মা? জান না শােন না, ফস
করে একজনের নামে যা-তা বলাটা ঠিক নয়।
সে তখন রাখালীর একটা হাত ধরিয়া বলিল, “এস বােন
আমার সঙ্গে এস।”
বিন্দুবাসিনীর জীবনটা নিতান্তই একঘেয়ে ধরণের ছিল।
তার যখন আট বছর বয়স সেই সময় এক পঞ্চাশ বছরের বুড়ার
সঙ্গে তাহার বিবাহ হয় এবং দশ বৎসর বয়সে বিধবা
হয়। চৌদ্দ বৎসর বয়সে তাহার নামে এক মিথ্যা কলঙ্ক রটে।
সেই হইতে সে এমনি কঠোর ভাবে নিজেকে বাড়ীর ভিতর
আবদ্ধ করিয়া রাখিতে সুরু করিয়াছিল যে, পাড়ার কেহই
জানিতে পারিত না সে বাঁচিয়া আছে কি মরিয়া গিয়াছে।
তার পর ক্রমে সে পঁচিশে পা দিয়াছে, কিন্তু এখনও সে ঠিক
তেমনই আছে—একও পরিবর্তন হয় নাই। তার মা ছিল
কিন্তু ঠিক তার বিপরীত। সে সমস্ত দিন পাড়ায় পাড়ায়
ঘুরিয়া বেড়াইত এবং ঘরে ঘরে ঝগড়া বাধাইয়া দিয়া মজা
দেখিত। মুখটা কিন্তু তার ভারি মিষ্ট ছিল।
রান্নাঘরে গিয়া প্রদীপের ক্ষীণ আলােকে রাখালীর মুখের
দিকে চাহিয়া বিন্দু চমকিয়া গেল,তার চোখ দুইটা একেবারে
জবাফুলের মত লাল হইয়া রহিয়াছে।
১১১
একটা পিড়ি সরাইয়া দিয়া বিন্দু বলিল, “বােস বােন।”
অনেকক্ষণ দুইজনে চুপ করিয়া রহিল, কাহারও মুখে কথা
নাই। কিছুক্ষণ পরে বিন্দু বলিল, “এখানে ক’দিন থাকবে
তুমি?”
অন্যমনস্কভাবে রাখালী উত্তর দিল, “ঠিক বলতে পারি নে।”
বিন্দু চুপ করিয়া রহিল।
পরদিন দুপুর বেলায় খাওয়া দাওয়া সারিয়া রাখালী আপনার
ঘরে গিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল।
দেওয়ালের কুলুঙ্গীর উপর একরাশ ছেড়া বই খাতা জড়াে
করা ছিল, সে সেইগুলিকে নামাইয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিতে
লাগিল। এসব নীলমণির ছেলেবেলাকার বই। রাখালী
অনেকক্ষণ ধরিয়া সেগুলিকে নাড়াচাড়া করিতে লাগিল। তার
পর হঠাৎ কি মনে করিয়া সেগুলিকে একজায়গায় জড়াে করিয়া
ঘরের জানালা দিয়া পাশের পােড় জমিতে ফেলিয়া দিল এবং
আস্তে আস্তে মেঝের উপর উপুড় হইয়া শুইয়া পড়িল।
বিকালে বিন্দু আসিয়া দরজায় ঘা দিতে রাখালী দরজা
খুলিয়া দিল ; বিন্দু বলিল, “আয় চুলটা বেঁধে দিই।”
“না, আজ আর চুল বাঁধবাে না।” বলিয়া রাখালী ঘর হইতে
বাহিরে যাইবার উপক্রম করিতেছিল, বিন্দু তাহার হাতটা জোর
করিয়া চাপিয়া ধরিয়া বলিল, “আচ্ছা না হয় চুল নাই বাঁধলি,
তা বলে ঘরের ভিতর আসতে ত কোন দোষ নাই।” বলিয়া
সে রাখালীকে ঘরের ভিতর লইয়া গিয়া খিল বন্ধ করিয়া দিল।
১১২
“আমি তাের দিদি হই, আমার কাছে কোন কথা লুকোস
নে—তাের কি হয়েছে বল।”
রাখালী
চুপ
করিয়া বসিয়া রহিল।
“বলবি নে” বলিয়া বিন্দু রাখালীর মাথাটা নিজের বুকের
মধ্যে টানিয়া লইয়া আস্তে আস্তে হাত বুলাইয়া দিতে
লাগিল। রাখালী ছােট মেয়ের মত ফোপাইয়া ফোপাইয়া
কাদিয়া উঠিল।
কেন কে জানে, রাখালীকে দেখিয়া পর্যন্ত বিন্দু তাহাকে
প্রাণ ঢালিয়া ভালবাসিয়া ফেলিয়াছে। তাহার একঘেয়ে
জীবনটার মাঝখানে হঠাৎ সে যেন একটা বৈচিত্র্যের সুখস্বপ্ন
দেখিতে আরম্ভ করিয়াছে এবং সেটা কোন্ দিন হঠাৎ ভাঙ্গিয়া
যাইবে এই আশঙ্কায় সে মাঝে মাঝে চমকিয়া উঠে।
পরদিন প্রাতঃকালে বিন্দু এবং রাখালী রান্নাঘরে কুটনা
কুটিতেছিল, এমন সময় বিন্দুর-মা আসিয়া সেইখানে বসিল
এবং হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “ হারে রাখালী, তুই কি মনে
করেছি চিরকাল এইভাবেই থাকবি, বিয়ে-থা বুঝি আর করতে
হবে না? আচ্ছা পাগলী মেয়ে ত!
বিন্দু বলিল, “সে ও নিজে বুঝবে না।”
“ঐ ত হয়েছে একালের মেয়েদের দোষ। নিজেরাই হয়েছেন
সব কর্তা, গুরুজনদের কথা তাে আর শুনবেন না; তা যাক
এখন একটা কথা শশান্ দিকি বিন্দি, ও পাড়ার রমেশকে
চিনিস ত?”
১১৩
“কে রমেশ, সেই ঘাড়ছাটা ফচকে ছোঁড়াটা ?”
“তাের যেমন কথার ছিরি!” বিন্দুর-মা আরও কি বলিতে
যাইতেছিল, বাধা দিয়া বিন্দু বলিল, “ আসল কথাটা কি তাই
খুলে বল না।”
“বলছিলাম কি, ছোড়ার বিষয় আশয় বেশ আছে—বলিয়া
বিন্দুর-মা কটাক্ষে একবার রাখালীর মুখের পানে চাহিয়া
লইল। তার পর আবার আরম্ভ করিল, “দেখতে শুনতেও
বেশ, আর তা ছাড়া
বাধা দিয়া বিন্দু বলিল, “তাতে তােমারই বা কি আর
আমারই বা কি মা?"
“না, আমাদের আর কি! তবে বলছিলাম কি রাখালীর
সঙ্গে তার
“চুপ কর মা-ও কথা তুমি আর কখনাে মুখে এনােনা
বলছি। তােমার কি একটু আলেও নেই !”
বিন্দুর-মা এবার ঝঙ্কার দিলা উঠিল, “কেন বলত, ও বুড়ো
হাতী মেয়েকে সে যে নিজে থেকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছে,
এই না ওর ভাগ্যি। পাড়ার লােকে কি বলে জানিস ?বলে
ও মেয়ে”
গলার স্বরটাকে যতদূর সম্ভব কড়া করিয়া বিন্দু বলিয়া উঠিল,
“পাড়ার লােকের কথা শােনবার জন্যে আমরা বসে নেই মা।
অন্য কথা থাকে ত বল, আর নইলে এখান থেকে উঠে যাও।”
সুরটাকে একটু নামাইয়া লইয়া বিন্দুর-মা আবার আরম্ভ
১)
১১৪
করিল, “আহা, পাড়ার লােকে বলে বলেই কি আর আমরা
তাই বিশ্বাস করছি? না আমরা রাখালীকে চিনিনে ? সতী-
সাধ্বীর মেয়ে ও, ওর নামে কুচ্ছে যারা রটাবে তাদের জিভ
খসে পড়বে; তবে কি না বলছিলাম, রমেশ ছেলেটি
“রমেশের নাম তুমি মুখে এনাে না মাসে হাড়হাবাতে
ছোড়া।
“তাের ঐ কেমন এক কথা বিন্দি—সে হাড়হাবাতে কিনা
তুই কি করে জানলি?”
“সে আমি খুব জানি মা হাড়ে হাড়ে জানি।
সন্ধ্যের সময় ঘাট থেকে বাড়ী ফিরছিলাম, সে আমাকে শুনিয়ে
এমন সব কথা বলতে লাগলাে, ছি ছি ছি।” বলিয়া বিন্দু
ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলিতে লাগিল।
“ওটা কিছু নয়, বয়সের সময় অমন দোষ পুরুষ মানুষের
একটু না আধটু থাকেই।
অত কথায় কাজ কি, তাের
বাপেরও”
“তােমার পায়ে পড়ি মা, তুমি এখান থেকে উঠে যাও।”
বলিয়া বিন্দু নিজেই ঘর হইতে চলিয়া গেল।
সে দিন
আফিস হইতে ফিরিয়া মীলমণি নিজের ঘরের জানালার
ধারে চুপটি করিয়া বসিয়াছিল ; কিছুই ভাল লাগিতেছিল না;
আজ প্রায় দুই সপ্তাহ হইতে চলিল রাখালী চলিয়া গিয়াছে—
কিন্তু ইহার মধ্যে সে তাহাকে একখানিও পত্র দেয় নাই এবং
সে মনে মনে ঠিক করিয়াছিল, আগে সে কখনই পত্র লিখিবে
। আজ কিন্তু তাহার মনটা হঠাৎ কেমন হইয়া গিয়াছে।
সম্মুখের বাড়ীর বারান্দায় বসিয়া একটি ছেলে আর একটি
মেয়ে নিরিবিলিতে পুতুল খেলিতেছিল। নীলমণি অনেকক্ষণ
ধরিয়া সেইদিকে চাহিয়া রহিল, তার পর হঠাৎ উঠিয়া দাড়াইল
একং কাগজ কলম লইয়া রাখালীকে পত্র লিখিতে বসিল।
লিখিল, “তুমি চলে এস, আমার উপর রাগ করে থাকতে আছে?”
লিখিতে লিখিতে নীলমণির চোখ দুইটা জলে একেবারে
ভাসিয়া যাইতে লাগিল; ছেলেবেলেকার সেই অভিমানিনী
রাখালীর মুখখানি আজ তার মনের মধ্যে বারবার জাগিয়া
উঠিতেছিল।
১১৬
সম্মুখের বাড়ীর সেই ছেলেটি আর মেয়েটি তখন পৰ্যন্ত
খেলা করিতেছিল। নীলমণির মনে হইতে লাগিল, ছুটিয়া গিয়া
তাহাদের দুইজনকে বুকের মধ্যে চাপিয়া ধরে।
নীলমণি যে বিবাহ করিবে না স্থির করিয়াছিল, রাখালীই
ছিল তার মূল কারণ। গােকুলদাসের কথা যে তাহার মনে
ছিল না তাহা নয়; কিন্তু রাখালীকে স্ত্রীভাবে দেখিতে তাহার
মন কোন দিন রাজী হয় নাই। তাহার বুকের মাঝখানে স্ত্রীর
জন্য যে অংশটুকু যৌবন নিজের হাতে খালি করিয়া রাখিয়াছিল,
মনে মনে সে রাখালীকে তার ত্রিসীমানার মধ্যে এক দিনের
তরেও আনিতে পারে নাই। কাজেই সে ঠিক করিয়াছিল
জীবনে কখনও সে বিবাহ করিবে না; এবং কোন একটি
সুপাত্র দেখিয়া তারই হাতে রাখালীকে দিয়া সে নিজে নিশ্চিন্ত
হইবে, এমনিটাই সে বরাবর মনে করিয়া আসিয়াছিল।
সেদিনকার সেই ঘটনাতে সে কিন্তু রীতিমত আশ্চর্য হইয়া
গিয়াছে। রাখালী যে চুপে চুপে ভিতরে ভিতরে তাহাকে
স্বামীর আসনে নিশ্চিন্তভাবে বসাইয়া দিয়াছে, এমন একটুও
আভাস ত সে তার ব্যবহারের মধ্যে বা কথাবার্তার মধ্যে পূর্বে
একদিনের তরেও টের পায় নাই।
নীলমণি চুপ করিয়া গালে হাত দিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল
এখন তার কি করা কর্তব্য।
১১৭
পুকুরঘাট হইতে স্নান করিয়া বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া ৰাখালী
দেখে, তার নামের একখানা চিঠি দাওয়ার উপর পড়িয়া
রহিয়াছে ; সে সেখানা তুলিয়া লইয়া ঘরের ভিতর গিয়া খিল
আঁটিয়া দিল। তারপর সে যখন ঘর হইতে বাহিরে আসিল,
তখন তার চোখ দুটো একবারে জবাফুলের মত লাল হইয়া
উঠিয়াছে।
সে বরাবর ভাড়ার ঘরে গিয়া একটা বঁটি লইয়া
আলু ছাড়াইতে বসিয়া গেল।
রান্নাঘর হইতে বিন্দু ডাকিল, “রাখালী।” চাপা গলায় সে
উত্তর দিল, “কি!”
“ওখানে একলাটি না বসে, আমার কাছে এসে কুটনাে
কোট না বােন।”
রাখালী বঁটি এবং আলুর চুবড়ি লইয়া রান্নাঘরে গিয়া বসিল।
রাখালীর মুখের দিকে চাহিয়া বিন্দু বেশ বুঝিতে পারিয়াছিল
একটা কিছু হইয়াছে। তাহার নামে যে একটা চিঠি আসিয়াছে
সে খবরও বিন্দু জানিত এবং তার চোখ দুটা হঠাৎ রাঙ্গা
।
হইয়া উঠিবার কারণও যে ঐ চিঠিরই মধ্যেই আছে, একথাও
সে খুব ভাল করিয়াই বুঝিতে পারিয়াছিল। কিন্তু সে সম্বন্ধে
কোন কথাই সে তুলিল না।
সেই দিনই সন্ধ্যার কিছুপূৰ্বে দাওয়ায় বসিয়া রাখালী
বিন্দুর একখানা ছেড়া কাপড় সেলাই করিতেছিল; এমন সময়
হঠাৎ কার জুতার শব্দে সে চমকিয়া উঠিল এবং পরক্ষণেই
সম্মুখে একজন অপরিচিত যুবককে দেখিয়া সে থতমত খাইয়া
তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল।
যে লােকটি তাদের উঠানে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, দরজার
আড়াল হইতে তার চেহারাখানা দেখিয়া সেই দুঃখের সময়ও
রাখালীর হাসি পাইতে লাগিল। লােকটির বয়স বেশি নয়-
ত্রিশের ভিতর ; রংটা মেটে মেটে, মাথার সমুখ দিকে লম্বা লম্বা
চুলগুলাে চোখ অবধি আসিয়া পড়িয়াছে, পিছন দিক কিন্তু
একবারে খুর দিয়া কামাননা। গায়ে কালাে রঙের একটা
পাঞ্জাবী-স্ত্রীলােকের সেমিজের মত হাঁটু ছাড়াইয়াও আধহাতটাক
বুলিয়া রহিয়াছে। পায়ে বাণিস করা অয়েলক্লথের একজোড়া
প, তাতে আবার সােনালী রঙের বগলস আঁটা; হাতে
একগাছা মহিষের শিঙের ছড়ি, তার ধরিবার জায়গাটাতে
একগাছা বেলফুলের মালা জড়াননা। লােকটি এদিক ওদিক
চাহিয়া ডাক দিয়া বলিল, “মাসী আছ ?”
“এই যাই গাে” বলিয়া রান্নাঘর হইতে মাসী বাহির হইয়া
আসিয়া বলিল, “কি খবর বাবা?”
১১১
“কাল বানােয়ারী তলায় যাত্রা হবে—বিদ্যেসুন্দরের পালা।
আমি সুন্দর সাজছি—দেখতে যেও মাসী।”
“যাবাে বৈ কি বাবা।”
“যাবাে বৈকি নয়, নিশ্চয় যাওয়া চাই—আর মেয়েদেরও সঙ্গে
নিয়ে যেও।”
লােকটা চলিয়া যাইতে বিন্দুর মা রান্নাঘরে টুকিয়া দেখে বিন্দু
মুখখানা হাঁড়ির মত ভারি করিয়া একটা পিড়ির উপর বসিয়া
আছে। সে ঘরে ঢুকিতেই বিন্দু খুব কঠোর ও দৃঢ়স্বরে বলিয়া
উঠিল, “রমেশ, কার হুকুমে আমাদের বাড়ীর ভিতর অমন করে
বলা কওয়া নেই ঢেকে মা ?”
“ও যে আমাদের আপনার জন রে”—বলিয়া বিন্দুর মা ঘর
হইতে বাহির হইয়া যাইবার উপক্রম করিতেছিল, বিন্দু বাধা
দিয়া বলিল, “একটা কথা শুনে যাও মা।”
“কি
“ও যদি ফের আমাদের বাড়ীর ভিতর অমন করে ঢােকে ত
আমি তা সহ্য করবে না বলছি।”
“আচ্ছা তাই হবে লাে।” বলিয়া সে আবার পালাইবার
চেষ্টা করিতেছিল, বিন্দু আবার বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, “আচ্ছা
লল, নয় মা; বিন্দু বেশি কথা বলে না, কিন্তু সে যে কথা
একবার মুখ দিয়ে খসায়, অক্ষরে অক্ষরে তা পালন হয়ে থাকে
এটা যেন মনে থাকে।”
ব না।”
৮
নীলমণির চিঠির জবাবে রাখালী যাহা লিখিয়াছিল, তাহা
পড়িয়া নীলমণি স্তম্ভিত হইয়া গেল। সে লিখিয়াছে, আর যেন
সে তাহাকে পত্র না লেখে এবং ভবিষ্যতে সে যেন তার সঙ্গে
কোন রকম সম্পর্কের দাবি না করে। পত্রখানা পড়িয়া নীলমণি
এবার সত্যসত্যই বড় মর্মাহত হইয়া পড়িয়াছিল, তথাপি সে
মাথা ঠাণ্ডা করিয়া আবার পত্র লিখিতে বসিল। রাখালী কিন্তু
তার কোন জবাবই দিল না। নীলমণি আবার একখানা পত্র
লিখিল।
সে লিখিল—“এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এ রকম
করে রাগ করে থাকা কি উচিত,-লম্মিটি ফিরে এস।” এবারও
রাখালী কোন জবাব দিল না।
নীলমণির শেষ পত্ৰখানা যখন রাখালীর হাতে পড়িল, সে
তখন খাওয়া দাওয়া সারিয়া ঘরের ভিতর মাদুরের উপর পড়িয়া
একটু ঘুমাইবার চেষ্টা করিতেছিল। বিন্দু আসিয়া তাহার
হাতে চিঠিখানা দিয়া চলিয়া গেল। চিঠিখানা সে তিন চারি
বার করিয়া পড়িয়া শেষ করিল। শেষ কালে কি ভাবিয়া, দোয়াত
১২১
কলম এবং কাগজ লইয়া লিখিতে বসিল। দুই চারি ছত্র
লিখিয়াই সে কি ভাবিয়া কাগজখানাকে টুকরা টুকরা করিয়া
ছিড়িয়া জানালা দিয়া ফেলিয়া দিল এবং দোয়াত ও কলমটা
কুলুঙ্গির উপর তুলিয়া রাখিয়া, আবার মাদুরের উপর আসিয়া
ইয়া পড়িল।
রাখালী মনে মনে ঠিক করিয়াছিল, নীলমণি নিশ্চয়ই
তাহাকে স্ত্রীর আসনে বসাইবার উপযুক্ত মনে করে নাই এবং
সেই জন্যই অন্যলােকের স্কন্ধে তাহাকে চাপাইয়া দিয়া সে নিজে
রেহাই পাইতে চায়। আজ অবশ্য সে ক্ষমা চাহিতেছে, কিন্তু
তিরস্কারের ভয়ে ত আর মানুষের ভিতরটা কিছু বদলাইয়া
যায় না। আজ যে নীলমণি তাহাকে ফিরিয়া যাইবার জন্য
এত অনুনয় বিনয় করিতেছে, ইহার মধ্যে আছে শুধু কর্তব্যের
শুষ্ক তাগিদ, প্রাণেরও নয়—বুকেরও নয়। সে একদিন তাহার
বাপের কাছে অনেক উপকার পাইয়াছে, ইহারই জন্য মানুষ
মানুষকে যেটুকু খাতির করিয়া চলে, তার চেয়ে এক চুলও
বেশী দরদ ত ইহার মধ্যে নাই! নীলমণি লিখিয়াছে, “এই
সামান্য ব্যাপার নিয়ে এত দিন ধরে রাগ করে থাকাটা কি
উচিত ?” নীলমণি যে এই ঘটনাটাকে এত সামান্য বলিয়া
উড়াইয়া দিতে পারিয়াছে, ইহার অস্বস্তিটাই রাখালীর বুকের
ভিতর বিষফোড়ার মত টন্ টন্ করিয়া উঠিতে লাগিল।
১২২
ন এই ঘটনার চারি পাঁচ দিন পরে একদিন সকালে পুকুর হইতে স্নান করিয়া রাখালী ভিজাকাপড়ে বাড়ী ফিরিতেছিল, এমন সময় পথের মাঝখানে রমেশ তাহাকে শুনাইয়া শুনাইয়া কতকগুলি রসিকতা করিতে লাগিল। সে বাড়ী ফিরিয়া জল- স্পর্শ পৰ্য্যন্ত করিল না, এবং ইহার জন্য সে নীলমণিকেই শত সহস্রবার করিয়া অভিশাপ দিতে লাগিল। সেই দিনই বিকালের দিকে বিন্দু ও রাখালী দাওয়ায় বসিয়া তেঁতুল ছাড়াইতেছিল, এমন সময় বাহির হইতে কে ডাকিল, “রাখালী”। বিন্দুর মা গােয়াল ঘরে দুধ দুহিতেছিল, বাহিরে আসিয়া সাড়া দিল—“কে গা?” বাহির হইতে উত্তর আসিল—“আমি নীলমণি”। “কে আমাদের নীলু?—তা বাহিরে কেন বাবা, ভিতরে এস”—বলিয়া বিন্দুর মা মাথার কাপড়টা একটু টানিয়া দিল। বিন্দুর মাকে প্রণাম করিয়া উঠিয়া নীলমণি জিজ্ঞাসা করিল, “রাখালী কোথায় মাসী ?”
“সে ত এইমাত্র এইখানেই ছিল”—বলিয়া সুর টানিয়া
বিন্দুর মা হাঁকিয়া উঠিল, “ওলাে অ—রাখালী, তাের নীলুদা
এসেছে যে-বেরিয়ে আয় না লাে।”
ভিতর হইতে কিন্তু কোন উত্তর আসিল না। বিন্দুর মা
তখন ঘরের ভিতরে চলিয়া গেল এবং কিছুক্ষণ পর ফিরিয়া
আসিয়া বলিল, “সে দেখা করতে চাইছে না বাপু, আমি কি
করবাে বল।”
একটা বুকভাঙ্গা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া নীলমণি বলিল,
“তাকে বলুন একটা বিশেষ দরকারি কথা আছে।”—তার পর
কি ভাবিয়া বলিয়া উঠিল, “না থাগে কাজ নেই”।
নীলমণি চলিয়া যাইতে বিন্দু বলিল, “এটা কিন্তু তাের খুবই
অন্যায় হয়েছে রাখালী।”
রাখালী চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। বিন্দু আরও কি বলিতে
যাইতেছিল, চাপা গলায় রাখালী বলিল, “আমাকে কোন কথা
বােলাে না দিদি ; দোহাই তােমাদের।”
১২৪
তার পর আর ও একমাস কাটিয়া গিয়াছে। আজ কদিন
নীলমণির শরীরটা বড় ভাল যাইতেছিল না। প্রত্যহ রাত্রে
তার একটু একটু ঘুষঘুষে জ্বর হইতেছিল। সেদিন রবিবার,
আফিস বন্ধ—সে খাওয়া দাওয়া সারিয়া কি একখানা বই
পড়িতেছিল, এমন সময় পিয়ন আসিয়া একটা পােষ্টকার্ড তার
হাতে দিয়া গেল। পােষ্টকার্ড আসিতেছে মহেশপুর হইতে,
লিখিয়াছেন হরিশ ভট্টাচাৰ্য। নীলমণি পত্ৰখানা এক নিশ্বাসে
পড়িয়া ফেলিল—“পত্রপাঠ তুমি আমার সঙ্গে দেখা করিবে,
বিশেষ দরকার আছে।”—বাস এইটুকু পত্র। নীলমণি দুইবার
তিনবার পত্রখানি পাঠ করিল, কিন্তু কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে
পারিল না। হরিশ ভট্টাচার্যের সঙ্গে তার কি এমন দরকার
থাকিতে পারে ?—তবে কি রাখালীর কোন-নীলমণির মাথাটা
ঘুরিতে লাগিল; ছেলেবেলাকার সেই দুরন্ত রাখালী তার
চোখের সম্মুখে ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতে লাগিল।
;
সেই দিনই সন্ধ্যার কিছু পূর্বে বিন্দুর মা সদর দরজার কাছে
জড়াইয়া প্রাচীরের গা হইতে শুষ্ক ঘুটেগুলাকে খসাইয়া খসাইয়া
একটা চুবড়ির মধ্যে জড় করিতেছিল, এমন সময় হাঁপাইতে
পাইতে নীলমণি আসিয়া তাকে জিজ্ঞাসা করিল, “বাড়ীর
সব খবর ভালাে ত মাসী?”
তিন চার হাত তফাতে সরিয়া গিয়া বিন্দুর মা বলিল, “তুমি
বাপু আমাদের এখানে আর এস না, একদফা ত জাতজন্ম সব
খেয়েছ—তার উপর
কথাটা শেষ হইবার পূর্বেই বিন্দু কোথা হইতে ঝড়ের মত
আসিয়া পড়িয়া দৃঢ়স্বরে বলিয়া উঠিল, “তুমি চুপ কর মা,
তােমাকে কোন কথা বলতে হবে না।”
তার সে সময়কার চেহারা দেখিয়া বিন্দুর মা চমকিয়া উঠিল
তার এই লাজুক মেয়েটি, যে নাকি কখন অন্য পুরুষের মুখ
পর্যন্ত দেখি না, সে আজ হঠাৎ এমন নির্লজ্জ ভাবে একজন
অপরিচিত যুবকের সম্মুখে দাড়াইয়া এমন ভাবে কথা কহিতে
পারে এটা তার কাছে আজ ভারি আশ্চৰ্য্য বােধ হইতে লাগিল।
তার মার দিকে হৃক্ষেপ পর্যন্ত না করিয়া বিন্দু বলিল,
“রাখালী ভাল আছে নীলমণি, তুমি তাকে মাফ কর।” তার
স্বর কম্পিত এবং খুব গাঢ়।
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া নীলমণি বলিল, “আমি তবে
এখন আসি।”
“না যেতে পারবে না, কক্ষণাে না,তা হলে রাখালী
আপনােষে মরে যাবে।”
১২৬
“কেন, তার কি কোন বাধা দিয়া বিন্দু বলিল, “না না অসুখ করেনি—সে বেশ ভালই-আছে—তবু তুমি যেতে পারবে না।” নীলমণি কিছুই বুঝিতে পারিল না—সে হতভম্বের মত চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে— চারিদিক নিস্তব্ধ-কাহারও মুখে কথা নাই—তিনজনেই নিস্তব্ধ। হরিশ ভটচাজ সহসা পিছন দিক হইতে আসিয়া খুব কর্কশকণ্ঠে চীৎকার করিয়া উঠিল, “আমার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে তােমাকে ডেকেছিলাম—মেয়েদের সঙ্গে ইয়ার্কি দেবার জন্যে নয়।” নীলমণি কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা দিয়া বিন্দু বলিয়া উঠিল, “সে জন্যে অন্য কাউকে মাথা ঘামাতে আমরা ডাকি নি -আপনি এখান থেকে চলে যান। হরিশ ভট্টাচাৰ্য অবাক হইয়া গেল---সে আজ সত্য সত্যই ভয় পাইল। মেয়েমানুষের গলার আওয়াজে যে এতটা তেজ থাকিতে পারে, ভট্টাচাৰ্য্য তা কথনও স্বপ্নেও ভাবে নাই। সে তবু চেঁচাইয়া উঠিল, “একটা জারজের সঙ্গে গেরস্ত ঘরের মেয়েরা অন্ধকারে দাড়িয়ে চুপি চুপি কথা কয়, এটা খুব ইজ্জতের কথা, নয়। তাই চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করা হচ্ছে।” বিন্দুর মা এই সময় কি বলিতে যাইতেছিল, বিন্দু দৃঢ়কণ্ঠে বলিয়া উঠিল—“তুমি চুপ কর মা।” সে তবু কি বলতে যাইতে- ছিল ; বিন্দু চেঁচাইয়া উঠিল, “আমার হুকুম তুমি চুপ কর।” তার পর খুব গম্ভীর এবং দৃঢ়স্বরে সে বলিল, “পারেন ত এক- ১২৭
—স্বপ্ন-শেষ
ঘরে করে দিন গে, যান হরিশকাকা, এর বেশী ত আর কিছু
করতে পারেন না।”
নীলমণি এতক্ষণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। সে এইবার
বলিল, “কি হয়েছে তাই খুলে বলুন না কেন মশাই।”
হরিশ ভট্টাচাৰ্য্য কি বলিতে যাইতেছিল, বাধা দিয়া বিন্দু
বলিল, “কাউকে কোন কথা বলতে হবে না, আমি নিজেই সব
বলছি।” তার পর গলাটাকে আরও গভীর এবং আরও দৃঢ়
করিয়া লইয়া সে বলিতে লাগিল, “তবে শােন নীলমণি। ক্ষের্মী
বােষ্টমীকে মনে পড়ে? সেই ছিল তােমার মা। এতদিন এ
কথা কেউ জানত না—সেদিন মরবার সময় সে সব কথা বলে
ফেলেছে। এ কথা এ গ্রামের সকলেই বিশ্বাস করেছে।” এই
অবধি বলিয়াই বিন্দু ডাকিল—“রাখালী।”
নীলমণি রাস্তার উপর বসিয়া পড়িল। ঝড়ের মত রাখালী
আসিয়া তাহার পায়ের উপর লুটাইয়া পড়িয়া কাদিতে কঁদিতে
বলিল,-“আমাকে মাপ কর নীলুদা—এমন কাজ আর কক্ষপণ
করবে না; আমায় তােমার কাছে কলকাতায় নিয়ে চল! তুমি
অমন করে বসে থেকো না নীলুদা, তােমার পায়ে পড়ি।”
১২৮
তরুণী ভাৰ্য্যা
গাঙ্গুলীদের সংসারটি ছিল একটি আস্ত চিড়িয়াখানা।
মধ্যে নানান রকমের জীব বাস করিত এবং কারুর সঙ্গে কারুর
মিল বড় একটা দেখা যেত না।
বড় হরিচরণ, সে ছিল পাক্কা জমীদার ; বিষয়-বুদ্ধিতে সে
তার পূর্বপুরুষদেরও টেক্কা দিয়ে উঠেছিল, এবং জমিদারী বাড়া-
বার জন্য সে করেনি হেন কাজ নেই, যদিও তার ছেলেপুলে
হয়নি এবং তার নিজের সম্বন্ধে খরচপত্র আদবেই ছিল না।
পত সে মােটা কাপড়, মােটা জামা এবং বিলাসিতা
তার আদবেই ছিল না। তারপর, খাওয়া দাওয়া সম্বন্ধে
তার চেয়ে গরীব তার প্রজাদের মধ্যে একটিও ছিল না,
কেননা, খেত সে পােরের ভাত, মাগুর মাছের ঝােল আর
পাতি-লেবু—তাতেও মাঝে মাঝে চোয়া ঢেকুর উঠত, অম্বল
হত, এবং কবরেজ মশায়ের ডাক পড়ত।
বয়স তার হয়েছিল প্রায় ষাটের কাছাকাছি। সে ছিল কর্তার
১২১
প্রথম পক্ষের সন্তান। আর যে দুটি ভাই তার ছিল, তারা ছিল
কর্তার দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে। বাপের জ্যেষ্ঠপুত্র বলেই হােক বা
যে কারণেই হােক সেও দুটি বিবাহ করেছিল, অবশ্য একটির
অবর্তমানে—কিন্তু ষষ্ঠীঠাকরুণের কৃপণতা তবুও ঘােচনি।
মেজ পরিণীচরণ, সে ছিল একটি নিরেট মাথামােটা লােক
এবং তার দেহটা ছিল তার চেয়েও নিরেট এবং তার চেয়েও
মােটা। সে কুস্তি লড়ত, মাটি মাখত, শনি-মঙ্গলবার হলে
হনুমানজীর সুমুখে সিল্পী চড়াতে এবং লুঙ্গি এঁটে, গায়ে বুটি-
দার পাঞ্জাবী উড়িয়ে, মােটা একগাছা পাকা গা লাঠিহাতে
করে গদাইলস্করী চালে গ্রামময় ঘুরে বেড়াত ; গ্রামের লােকে
ভয় করত কিন্তু ঐ লিকলিকে পাতলা অজীর্ণরােগী হরিচরণকেই
বেশি বেশি। তারিণীচরণের সব চেয়ে বন্ধু ছিল কালুডােমের
ব্যাটা মুরারি। বিশ্বদুনিয়াটার মধ্যে সে এই একটিমাত্র জীবকে
পেয়েছিল যার সঙ্গে তার মনের প্রাণের কথা হতে পারে।
মুরারির চেহারাটি ছিল লােহার ভাটাটির মত,—ঠিক তেমনি
নিরেট এবং ঠিক তেমনি কালাে।
ছােট শ্যামাচরণ তিন বার এন্টাল ফেল করে গত বৎসরে
হঠাৎ পা পিছলে পাশ হয়ে গিয়েছিল এবং কলকাতায় থেকে
পড়াশুনা করছিল। সে নাকিসুরে গান গাইত, চিবিয়ে চিবিয়ে
কথা বলত এবং প্রতিদিন বৈকালে বিডনস্কোয়ারের ঘাসের উপর
বসে উদাস দৃষ্টিতে উপরের দিকে চেয়ে থাকত।
তার পর অন্দরমহলে যে একটিমাত্র জীব বাস করত
১৩০
প্ন-শেষ-.
বৈচিত্র্যের দিকে থেকে সে সকলকে ছাপিয়ে উঠেছিল। রমার
বয়স হয়েছিল বড় জোর পচিশ কি ছাব্বিশ। সে কিন্তু কথায়
কথায় বলত তার তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। তার
ছেলেপুলে একটিও হয়নি এবং সেই জন্যেই সে নিঃসঙ্কোচে ব'লে
বেড়াত যে, যদি তার সময়ে ছেলে হােতত তা হলে সে আজ
নাতির মুখ দেখতে পেত।
সে চওড়াপেড়ে কাপড় পরত না, হাতে দু-একগাছা
চুড়ি ছাড়া অন্য কোন
কোন গহনা গায়ে রাখত না এবং চুল
বাঁধবার সময় সুমুখের চুলগুলােকে এমন অসম্ভব রকমে পিছনের
দিকে টেনে তুলে দিত যে হঠাৎ দেখলে মনে হােত,
তার সামনের চুলে টাক ধরেছে, যদিও তার মাথায় চুল
ছিল যথেষ্ট ঘন এবং কোকড়া। এ সম্বন্ধে কেউ কিছু বলে
সে বলত, “বয়স ত আর কিছু কমছে না—দিন দিন বাড়তেই
চলেছে।”
সংসারের কোন কাজই তাকে করতে হােত না এবং
দায়িত্ব ছিল তার চাইতে কম। সে কিন্তু যখন-তখন বত
যে, তার মরবার পর্যন্ত ফুরসত নেই এবং এমন করে
সে আর পারে না। এ হেন বড় বৌয়ের সব চেয়ে প্রিয়পাত্র
ছিল তারিণীচরণ, কারণ সংসারের মধ্যে সেই ছিল সব চেয়ে
অকর্মণ্য এবং আহাম্মক। সে যখন-তখন এবং যার তার কাছে
বলে বেড়াত যে, তার এই অকর্মণ্য দেবরটিকে নিয়ে সে আর
পারে না এবং এই অকর্মণ্য জীবটির ছল করে তার
১৩১
খাশুড়ীঠাকরুণ যে মস্ত বড় একটা দায়িত্বের বােৰা তার ঘাড়ের
উপর চাপিয়ে দিয়ে গেছেন, একথা সে যার তার কাছেই বলে
বেড়াত; যদিও তার বিয়ের অনেক আগেই শ্বাশুড়ীঠাকরুণ
গঙ্গালাভ করেছিলেন।
মােট কথা, তার এই অকর্মণ্য দেবরটির সম্বন্ধে সে
নিজেকে মা’র আসনে নিয়ে নিশ্চিন্ত ভাবে বসিয়ে দিয়ে-
ছিল, যদিও তারিণীর চেয়ে সে মাত্র দু বছরের বড় ছিল।
পাড়ার লােকে কিন্তু এটাকে নেহাৎই বাড়াবাড়ি বলে মনে
রমার বিয়ে হয়েছিল একটু ডাগর বয়সে, অর্থাৎ তার যখন
বিয়ে হয়েছিল তখন সে জগতের সকল বস্তুই বুঝতে শিখেছিল।
এমনি বয়সে, তার বিবাহ হয় চরহাটার পঞ্চাশ বছর বয়সের
জমিদার হরিচরণ গাঙ্গুলীর সঙ্গে।
রমার মার ছিল ফিটের ব্যারাম, বর দেখে তিনি সেই যে
শয্যা নিলেন, সে রাত্রের মত আর উঠলেন না।
পরদিন বরকনে বিদায় হ’বার কিছু পূৰ্বে রমার মা রমাকে
তাহার নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে খিল বন্ধ করে দিলেন।
ঘরের এক কোণে অনেক দিনের পুরানাে একটা কাঁঠাল
কাঠের সিন্ধুক ছিল, রমার-মা আঁচলের চাবির খােললা থেকে
একটা চাবি বেছে নিয়ে তাই দিয়ে সিন্ধুকের ডালাটা খুলে ফেলে
সিন্ধুকের মধ্যে ঝুঁকে পড়ে হাতড়ে হাতড়ে কি খুঁজতে
লাগলেন। কিছুক্ষণ পর একটা অনেক দিনের ভাঙ্গা পুরাতন
১৩২
তামার কমণ্ডলুর ভিতর থেকে ভাজ-করা এক টুকরা ময়লা বালির কাগজ বার করে রমার মা বল্লেন, “এইটে খুলে দেখ, দেখি মা কি আছে।” রমা দেখলে, সেই অনেক দিনের পুরাণ জীর্ণ কাগজ খানিতে আঁকা রয়েছে দুখানি আলতা-পরা পায়ের ছাপ। “নমস্কার কর রমা, ও হচ্ছে তাের প্রপিতামহীর পায়ের ছাপ ; তিনি যখন স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাবার জন্যে পায়ে আলতা পরেছিলেন, ও হচ্ছে তার সেই সময়কার পায়ের ছাপ ; আজ তােকে তাের গরিব-মা যে জিনিষ দিলে, রমা, রাজ- রাজেশ্বরও সে জিনিষ তার মেয়েকে দিতে পারে না।” সেদিন রমা বুঝেছিল ঐ আলতাপরা পায়ের ছাপ দুখানির ভিতর দিয়ে কত বড় দায়িত্বের বােঝা তার ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার বুকের সব ক'টা পাঁজরকে মােড় দিয়ে এই কথাটাই ক্রমাগত গুমরে উঠতে লাগলাে যে সে কি এতই অপদার্থ ! নিজেকে সামলে রাখবার পক্ষে সে কি নিজেই যথেষ্ট নয়? তবে আবার এ রক্ষাকবচের কি এত দরকার ছিল ? হােলই বা বৃদ্ধ স্বামী, তাই বলে কি? তার বুক ফেটে কান্না আসতে লাগলাে। যে জিনিষটা ভুলবাে বলে মানুষ মনে করে সেই জিনিষটাই সব চেয়ে জোর করে বুকের উপর চেপে বসে। রমার হয়েছিল ঠিক সেই অবস্থা। সে তার স্বামীর বার্ধক্যের কথাটাকে বিশেষ করে ভােলবার চেষ্টা করুততা এবং সেই জন্যেই এই কথাটাই তার ১৩
মনে রাত-দিন জেগে উঠতাে, যে তার স্বামী বৃদ্ধ। এমনি
করে বিধাতা-পুরুষের উপর কারচুপি করতে গিয়ে বার বার
টোর খেয়ে যখন সে দেখলে যে বুড়ােকে জোয়ান করে ভােলা
যায় না তখন সে ধরুল উল্টোপথ।
যখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারল যে বুড়ােকে জোয়ান করে
ভােলা যাবে না। তখন সে করল কি? না, জোয়ানকে বুড়ে
করে ফেলবার চেষ্টা করতে লাগলাে। স্বামীকে নিজের মতন
করে তৈরী করে তুলতে না পেরে সে শেষ কালে নিজেকেই
স্বামীর মতন করে গড়ে তুলতে লাগলাে। সেই দিন থেকে
হঠাৎ সে এমন পাকা গিন্নী হয়ে উঠতে লাগলাে যে দেখে
নে পাড়ার লােকে একবারে অবাক হয়ে গেল।
বেলা তখন বারােটা হবে,-তারিণী খেতে বসেছিল আর
সুমুখে বসে রমা দেখা শুনা করছিল। তারিণীর স্বভাব ছিল,
সে যতক্ষণ খেত ততক্ষণ ক্রমাগত বকতে থাকতাে । তা সে
কেউ শুনুক আর নাই শুনুক। আজও সে বকছিল, “দেখ
বউদিদি, সেদিন এক ব্যাটা পেশােয়ারী পালােয়ান এসেছিল, ও
তার কি চেহারা বৌদি ; তুমি বরং মাধুরীকে জিজ্ঞাসা করে
দেখাে=”
সে আরাে কত কি বলতে যাচ্ছিল, রমা কথাটাকে শেষ
করতে না দিয়েই বলে উঠল, “ওসব হাড়-জালানাে কথা
আমি শুনতে চাই না; ওরকম করে যার তার সঙ্গে কুন্তি লড়া
টড়া আর হচ্ছে না, এ আমি এখন থেকে বলে রাখচি।
তুমি মনে করছ আমি কিছু টের পাই নি, নয়?—সব টের
পেয়েছি।”
ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, কোন এক মুসলমান পালােয়ানের
সঙ্গে কুস্তি লড়তে গিয়ে গাঙ্গুলীদের মেজবাবু সেদিন এমন
স্বপ্ন-শেষ
বে-কায়দায় পড়েছিলেন যে, তিন চার মিনিট তাকে অজ্ঞান
অবস্থায় পড়ে থাকতে হয়েছিল। এ খবরটা রমা তাদের পুরাণে
চাকর মথুরার কাছ থেকে পেয়েছিল।
কথাটা যে ইতিমধ্যেই রমার কানে গিয়ে পৌঁছেছিল তারিণী
তা ঘুণাক্ষরেও জানত না হলে কুস্তি বা পালােয়ানদের
নাম পর্যন্ত রমার কাছে মুখে আনত না। সে আজ সত্য সতই
মুস্কিলে পড়ে গেল, কোন রকমে রমার মুখ থেকে সরে পড়তে
পারলে সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে এমনিটা তার মনে হচ্ছিল।
পাতের ভাত তার শেষ হয়ে গিয়েছিল ; সে দুধের বাটীটা তুলে
নিয়ে চুমুক দেবার উদ্যোগে করছিল, এমন সময় রমা সুরটাকে
একটু নরম করে নিয়ে বলে উঠল, “আর ভাত নিলে না যে বড়?”
“তবে দুটি দাও,” বলে সে দুধের বাটিটা আবার
যথাস্থানে নামিয়ে রেখে দিল।
ঠাকুরকে ভাত দিয়ে যেতে বলে এসে রমা আরম্ভ করল,
“এমন করলে মানুষ কদিন পরে বল ত ; যদি জিজ্ঞাসা না
করতুম তা হলে আধপেটা খেয়ে উঠে যেতে ত; কাল যদি
মরে যাই তখন
ই-না কিছু না বলে তারিণী লক্ষ্মী ছেলেটির মত ভাতের
গ্রাসগুলি একটির পর একটি মুখের মধ্যে পুরে দিতে লাগলাে।
তারিণী খেয়ে উঠে গেলে পর যে কি সকড়ি নিতে এসেছিল
রমা তাকে বল্পে “বাবুকে একবার বাড়ীর ভেতর আসতে বলে
আয় ত, বিন্দি।”
হরিচরণ ঘরে প্রবেশ করতেই রমা বলে উঠল, “শুধু জমিদারী দেখলেই হয় না, সংসারও একটু দেখতে হয়।” "কি দেখতে হবে বল না”,-বলে হরিচরণ খাটের উপর গিয়ে বসে পড়ল। “তােমার হাতে ত অনেক ঘটক রয়েছে, তাদের কথাটাকে শেষ করতে না দিয়েই হরিচরণ বলে উঠল, “তাদের লাগিয়ে দিতে হবে তােমার জন্যে একটি জোয়ান দেখে বর খুঁজে আনবার জন্যে এই ত।” “দেখ সব সময় ঠাট্টাতামাসা ভাল লাগে না বলছি; তুমি ত আর কচি খােকাটি নও আর আমিও কিছু কচি খুকিটি নই— তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে।” “কার তােমার না আমার ?” “দুজনেরই।” “বিশ্বাস করতে পারলুম না,” বলে হরিচরণ এমন ভাবে ঘাড় নাড়তে সুরু করে দিল যে রমার আপাদমস্তক জলে উঠল। “তুমি না বিশ্বাস করলে ত বড় বয়েই গেল।” বলে রমা রাগ করে হন্ হন্ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, হরিচরণ গিয়ে হাত ধরে ফিরিয়ে এনে বলে, “আরে পাগল, আমি ঠাট্টা কর- ছিলুম, এটা আর বুঝতে পারলে না,—যাক এখন কি বল দেখি, রিণীর জন্যে একটি ভাল দেখে মেয়ে দেখতে হবে, নয় ?” রমা কিন্তু কথাটা আর তুল্লে না—সে মুখখনাকে ভার করে দাড়িয়ে রইল। ১৩৭
রাত্রে শয্যায় শুয়ে হরিচরণ ডাকল, “মা” কোন উত্তর
নেই।
আস্তে একটা ঠেলা দিয়ে হরিচরণ আবার ডাকল, “রমা।”
সে বিরক্তভাবে উত্তর দিলে, “আমার শরীরটা আজ ভাল নেই,
শুধু-শুধু ডেক না।” হরিচরণ পাশ ফিরে শুলাে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ রমা বিছানার উপর উঠে বসল এবং
কোন কথা না বলে স্বামীর পা দুটোর উপর উপুড় হয়ে পড়ে
চীৎকার করে বলে উঠলাে, “ওগাে তােমার পায়ে পড়ি, তুমি
অমন করে আমাকে জালিও না।” তার পর সে কি কান্না!
সে কান্না আর থামতে চায় না।
হরিচরণ এটা বরাবর লক্ষ্য করে এসেছে, যে দিনই রমাকে
সে বুড়াের দল থেকে তাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছে, সেই দিনই
এই রকম ধরণের একটা-না-একটা কাণ্ড সে বাধিয়ে বসেছে।
অথচ এমন ধারণাটা সে যে কেন করে, অত বড় দুদে জমিদার
হরিচরণের অত সূক্ষ্ম বিষয়বুদ্ধিও তার কোন তল্লাস করে উঠতে
পারত না।
পরদিন সকালে স্নানাদি সেরে রমা তার মার দেওয়া সেই
রক্ষাকবচখানিকে মাথায় ঠেকিয়ে বার বার বলতে লাগল,
“ওগাে সতীলক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, তুমিই কেবল জান কেন অমন
রাতদিন বার্ধক্যকে ডাকছি—আর কেউ তা জানে না।”
বেলা তখন আটটা হবে ; আখড়ার আলের উপর বসে
তারিণী গায়ের মাটি ঝাড়ছিল আর মুরারি কুস্তির মাটি থেকে
কাকর বেছে এক জায়গায় জড় করছিল। তারিণী হঠাৎ
বলে উঠল, “হারে মুরারি, আমি যে সেদিন পড়ে গিয়ে
অজ্ঞান হয়ে গেছলুম, এ কথা বৌদিদির কানে কে তুলল
বল ত?”
“ভগবান জানেন।” বলে সে কঁাকর বাছতে সুরু করে দিলে।
কিছুক্ষণের জন্য দু’জনেই নিস্তব্ধ হয়ে রইল; তার পর
মুরারি হঠাৎ বলে উঠল, “আচ্ছা মেজবাবু, তুমি বৌদিদিকে
অত ভয় কর কেন?”
“ভয় করি না ছাই করি, ভারি ত বৌদি।”
“তুমি পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছলে-বৌদিদি তােমাকে
বু বকলে?”
“একটুখানি।”
“তুমি কি বলে ?”
;
১৯
;
“আমিও খুব দু’চার কথা শুনিয়ে দিলুম, বন্ধুম, মেয়ে-
মানুষের ও সব কথায় কাজ কি ; তুমি যেমন আছ তেমনি
থাক।”
“ইস” বলে মুরারী উঠে দাড়াল।
“মাইরি বলছি,” বলে তারিণী তার অনাবৃত উরুদেশে প্রচণ্ড
একটা চপেটাঘাত করে বসল।
তারিণী বুঝেছিল কথাটাকে আর একটু আগাতে দিলেই সে
নিশ্চয় ধরা পড়ে যাবে, কাজেই সে অন্য কথা পেড়ে বসল
“দেখ, মুরারি, বাঙ্গলার মত জোলাে দেশে যতই কেন মেহন্নত
কর না, শরীর ঠিক তৈরী হবে না; শরীর যদি সত্যি সত্যি
তৈরী করতে হয় ত কাশ্মীর, মূলতান বা পেশােয়র ঐ সব
অঞ্চলে গিয়ে দিনকতক চেপে থাকতে হয়।”
“যে পাকা খেলােয়াড় হয় সে কানা কড়িতেই খেলে—
শরীর যাহার তৈরী হবে, তার আবার এদেশ-সেদেশ কি?”
বলে মুরারি কোদাল দিয়ে মাটিগুলােকে সমতল করে দিতে
লাগলাে।
তা বটে, কিন্তু পােষ্টাই দেশ হলে একটু শীগগির হয়।”
মুরারি কি একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গিয়ে
বলে উঠিল, “সেজবাবু আসছে না?”
দরমার ফাঁক দিয়ে উকি মেরে দেখে তারিণী বলে উঠল,
“শ্যামই ত বটে, সঙ্গে আবার চার পাঁচটি ইয়ারও রয়েছে,
বােধ হয় ভােরের ট্রেণে এসেছে।”
৫
১৪০
কিছুক্ষণ পরেই শ্যামবাবু এবং তার বন্ধু ক’টি আখড়ার মধ্যে এসে প্রবেশ করলেন। তারিণী বা মুরারির দিকে লক্ষ্য না করেই শ্যাম তার নিকটস্থ বন্ধুটিকে বলতে লাগল, “এইটি হচ্ছে আখড়াবাড়ী, এখানে পালােয়ানেরা সব কুস্তি টুস্তি লড়ে; বাইরে থেকে মাঝে মাঝে বড় বড় পালােয়ানেরা সব এখানে এসে লড়ে যায়" ইত্যাদি ইত্যাদি। ছিপ ছিপে পাতলা বখা গােছের একটি ছােরা হনুমান- জীর মূর্তিটিকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, “এটি কি?” অপর একটি ছােকরা বলে উঠল, “ওটি হচ্ছে তােমার Statue.” সকলে হাে হাে করে হেসে উঠল। শ্যাম এবং তার বন্ধুরা সকলে চলে গেলে মুরারি বলে উঠল, “আচ্ছা মেজবাবু, এরা সব মেয়ে মানুষ না বেটা ছেলে?” “কেন বল্ দেখি ?” “পুরুষমানুষে না কি আবার অমন চিবিয়ে চিবিয়ে কথা কয়, অমন ঢং করে চলে ?” “তুই ওদের এক জনকে বিয়ে করে ফেল না”, বলেই তারিণী এমন বিকট শব্দে হেসে উঠলাে, যে মুরারি পর্যন্ত হঠাৎ চমকে উঠলাে; সে মনে করেছিল, না জানি কি ভয়ানক রসিকতাটাই সে আজ করে ফেলেছে। সেই দিনই সন্ধ্যার সময় তারিণী আর মুরারি গঙ্গার ধারে বসে গল্প করছিল, এমন সময় মতি সেঁকরার ব্যাটা মদনা ছুটতে ১৪১
--শেষ
ছুটতে এসে খবর দিলে যে তার বড় ভাই জটাধারীকে সেজবাবু
এবং তার কলকাতার বন্ধুরা মিলে তেমাথানির কাছে ফেলে
ভয়ানক মারছে। তেলীদের হােট বৌ জল তুলে ফিরছিল,
বাবুরা তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে নানান রকম বিশ্রী কথা বলছিলেন
—জটাধারী কেবল এই কথাটি বলেছিল, এমন ধারা করতে
নেই; এই তার অপরাধ।
তারিণী এবং মুরারি যখন ঘটনাস্থলে এসে হাজির হলাে
তখন পর্যন্ত পুরা দমে প্রহার চলছিল, বেচারার সর্বাঙ্গ বেয়ে
রক্ত ঝরছিল। রাস্তায় অনেক লােক জড় হয়ে ছিল কিন্তু কেউ
কিছু বলতে সাহস করছিল না; হাজার হােক কলকাতার ছেলে,
তার উপর আবার সেজবাবুর বন্ধু।
তারিণী এসেই যে ছােকরাটি জটাধারীর বুকে চেপে বসে
ছিল তার টুটিটা ধরে বিড়ালছানার মত তুলে ধরলে এবং সে,
কিছু বলবার পূর্বেই এমন একটি ধাক্কা তাকে দিয়ে বসল যে
সে বেচারা টাল সামলাতে না পেরে রাস্তার ধারে যে খানা ছিল
তারি মধ্যে গিয়ে পড়ল।
শ্যামবাবু তার মেজ দাদাকে কি বলতে যাচ্ছিল, তারিণী
তার গালে এমন একটি চপেটাঘাত বসিয়ে দিলে যে তার আর
বাকশক্তি পর্যন্ত রহিল না।
অপর বন্ধু ক’টিরও ঠিক ঐ দশা হলাে; কেউ খানায় পড়লাে,
কেউ ভােবায় পড়লাে, কারুর জামা ছিড়ল, কারুর নাক কাটলাে
—মােট কথা চক্ষের নিমিষে একটা প্রলয় কাণ্ড হয়ে গেল।
;
১৪২
পরদিন প্রাতঃকালে তারিণীকে ডেকে হরিচরণ খুব কড়া
সুরে বললেন, “হ্যারে, তুই শ্যামের বন্ধুদের মেরেছিস।
সে চুপ করে দাড়িয়ে রহিল। দাদার মুখের উপর সে কোন
দিন কথা বলতে পারত না।
হরিচরণ আবার বল্লে, “কেন মেরেছিস বল না গাধা?”
সে তেমনি ভাবেই চুপ করে দাড়িয়ে রইল।
“বসে বসে খেয়ে গায়ে বড় তেল হয়েছে নয় ; তােমার
পালােয়ানী আমি ঘােচাচ্ছি, রােসাে।”
তারিণী ভাত খেতে যেতেই রমা বলে উঠল, “তােমার
আলায় কি আমাকে দেশত্যাগী হতে হবে ঠাকুরপাে? তুমি
দিন দিন একটি গুণ্ডা হয়ে উঠছে দেখছি।
তারিণী সেই সবে ভাতে হাত দিয়েছে, তার হাত থেমে
গেল ; সে চুপ করে বসে রইল; তার চোখ দিয়ে ফোটায় ফোটায়
অশ্রুধারা ভাতের থালার উপর ঝরে পড়তে লাগলাে।
রমা তারিণীর হাত দুটোকে ধরে বলে উঠল, “মাথা খাও
ঠাকুরপাে, অমন করে ভাতের থালা কোলে করে কেঁদ না,
আমি আর কখন তােমাকে বব না।”
তারিণী প্রকৃতিস্থ হলে রমা বল্পে, “এযে তােমার অন্যায় রাগ
ঠাকুরপাে, দোষ করলে বকবাে না; আজ যদি আমার শাশুড়ী-
ঠাকরুণ বেঁচে থাকতেন তা হলে তিনি বকতেন না? আমি
তােমাকে পেটে ধরিনি বৈ ত নয়।”
তারিণী বল্লে, “তুমি ত আমাকে কতদিন বকেছ আমি কি
;
১৪৩
--শেষ- কোন দিন রাগ করেছি? আজ যে তুমি শুধু-শুধু বকলে তাই ত— “শুধু শুধু ত বকিনি ঠাকুরপাে; তুমি নাকি তাদের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছ?” “কেন দিয়েছি তা ত জান না।” “না বল্লে কেমন করে জানব বল।” সব কথা খুলে বলবার জন্যে রমা তারিণীকে অনেক সাধ্য সাধনা করতে লাগলাে, সে কিন্তু কিছুতেই কোন কথা বল্লে না। তার পর মুরারিকে ডেকে তার মুখে যখন সকল কথা শুনল তখন সে একবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল । হরিচরণকে ডেকে সে বলে, “এ বাড়ীতে আর একদণ্ড থাকবে না; তুমি এখুনি আমার জন্যে পাল্কী ডাকিয়ে দাও।” সেই দিন সন্ধ্যার সময় শ্যামকে ডেকে হরিচরণ বল্পে, “দ্যাখ, তাের ঐ ইতর বন্ধুদের এখুনি এ গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলে দিগে যা। কাল সকালে উঠে যদি শুনি ওরা যায় নি ত সব ব্যাটাকে ধরে জেলে দোবাে, এ আমি বলে রাখছি—এখানে ওসব ইতরামি খাটবে না।” ১৪৪ গাঙ্গুলীদের প্রকাণ্ড বসতবাটীর ঠিক গায়েই ছিল ঠাকুর- বাড়ী ; মাঝখানে ছিল যাবার আসবার একটা সরু পথ। রমা প্রত্যহ সন্ধ্যার সময় দেবালয়ে আরতি দেখতে আসতাে। সেদিন সন্ধ্যার সময় মন্দিরের একদিকের একটা দেয়াল ঘেঁসে দাড়িয়ে রম। আরতি দেখছিল। পুরােহিতঠাকুর আরতি করছিলেন; সুন্দর সুঠাম গৌরবর্ণ এই তরুণ ব্রাহ্মণটি প্রতিদিন গাঙ্গুলীদের ঠাকুরবাড়ীতে আরতি করতে আসততা এবং আরতি শেষ হয়ে গেলে সান্ধ্যভােগের প্রসাদ গামছার খুটে বেঁধে নিয়ে বাড়ী ফিরে যেত। আরতি শেষ হয়ে গেলে পুরােহিত ঠাকুর রমার দিকে চেয়ে বল্লে, “বৌদিদি, আমি বােধ হয় পাঁচ সাত দিন আসতে পিরবাে না, সে ক’দিনের জন্যে আর একটি জানাশােনা বামুনের ছেলেকে দিয়ে যাবােসে বােজ এসে পূজো করে যাবে।” “তা না এস ক্ষতি নেই, কিন্তু এক কথা তােমাকে বলে ১৪৫
রাখি, তুমি আর কখনও আমাকে বৌদিদি বলে ডেকো না ;
ডাকবার দরকার হয় ত মা বলে ডেকো, বুঝলে?” কথাটা শেষ
করেই রমা ঝড়ের মত মন্দির থেকে বেরিয়ে গেল। ব্রাহ্মণ
সেদিন সত্য সত্যই বড় অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তারিণীর সঙ্গে
সে ছেলেবেলায় এক সঙ্গে পড়ত, সেই সূত্রে সে রমাকে বৌদিদি
বলে ইস্তকনাগাদ ডেকে এসেছে, আজ বৌদিদি বলে সে যে কি
এমন অপরাধটা করে বসল তা সে বুঝতে পারল না।
পরদিন সকালবেলা তারিণীকে ডেকে রমা বল্লে, “আমি
তােমার বিয়ের সম্বন্ধ করছি, এবার যদি আবার সেবারকার
মতন কেলেঙ্কারি কর ত, আমি এ বাড়ী ছেড়ে চলে যাবে, এ
আমি বলে রাখছি আগে থাকতে।”
মাথা চুলকে, হাত কচলে তারিণী বল্লে, “আর যা বলবে
শুনব বৌদি, ঐটি কেবল—”
“আমি কোন কথা শুনতে চাই না; বুড়াে হাড়ে আর
কতদিন এমন করে খাটবাে? একটি ছােটখাট বৌ না হলে
আমি আর একা সংসার করে উঠতে পারছি না।”
রাত্রে হরিচরণ শুতে এলে রমা বল্লে, “বুড়াে বয়সে একটি
ছােট বৌ নিয়ে দিন কতক সাধ আহ্লাদ করব, তা দেখছি
তােমরা হতে দেবে না।”
হরিচরণ বল্লে, “বেশ ত কালই ঘটক লাগিয়ে দিচ্ছি—দেশে
মেয়ের অভাব না কি।”
কিছুদিন পর একদিন দুপুর বেলায় তারিণী খাওয়া দাওয়া
১৪৬
সেরে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল, এমন সময় রমা
সেই ঘরে প্রবেশ করল, সঙ্গে তার একটি গােলগাল ঘােট
মেয়ে।
ঘরে প্রবেশ করেই রমা বল্লে, “আমার মাথার দিব্যি
ঠাকুরপাে, অমত কোরাে না,-এমন মেয়ে আর পাবে না।”
তারিণী মহামুস্কিলে পড়েছিল—সে কি বলে? এদিকে
রমাও নাছােড়বান্দা—শেষকালে তারিণীকে রাজী হতে হলাে।
সন্ধ্যার কিছু পূৰ্বে মুরারিদের দরজার কাছ থেকে তারিণী
ডাক দিল, “মুরারি বাড়ী আছিস?”
সে বেরিয়ে আসতেই তারিণী বলে, “নে, তৈরী হয়ে নে,
এখুনি কাশী যেতে হবে।”
“সে কি ?"
“যা বলি তাই শশান্ না।”
“আমি যে কিছু বুঝতে পারছি না।”
“বুঝেও দরকার নেই।
“বাড়ীতে একবার বলে আসি।”
“তবে তুই থাক, তাের গিয়েও কাজ নেই।”
“ভাববে যে।”
“সে বন্দোবস্ত না করে যাচ্ছি না ; আমার শশাবার ঘরের
বিছানার উপর বৌদিদির নামে একখানা চিঠি লিখে রেখে
এসেছি, তাইতে সব কথা লেখা আছে।”
“কাশী যাচ্ছ তাও লিখে এসেছ নাকি?”
১৪৭
“আমি এমনি গাধা কি না।”
সেই দিনই রাত্রে তারিণীর সেই কাগজের টুকরাটা রমার
হাতে পড়লাে—সে কিছু বল্লে না, আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে
(য়ে পড়ল।
পরদিন সকল কথা শুনে হরিচরণ বল্লে, “তােমার আদরেই
ত ও অত বেড়ে উঠেছে।”
রমা ফোস করে উঠলাে, “তার জন্যে ত কাউকে ভুগতে হচ্ছে
না; আমি বেশ করব, আদর দোবাে, খুব করব আদর
দোবাে।”
১৮
আজ প্রায় মাসখানেক হতে চল্প তারিণী বাড়ী ছেড়ে চলে গেছে। বাগানের দিকের খােলা বারান্দায় রমা চুপ করে বসেছিল ; হাতে তার কোন কাজই নেই। জীবনটা তার নেহাইৎ এক- ঘেয়ে হয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল ; কিছু পূর্বে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, আকাশ তখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ পরিস্কার হয়ে যায় নি, একটা নীরব অবসাদের ভাব প্রকৃতির বুকখানা জুড়ে বসেছিল, রমা অন্যমনস্কভাবে বাগানের দিকে চেয়ে চুপ করে বসেছিল ! সমস্তই তার কাছে আজ কেমন যেন ফাকাফকা ঠেকছিল। তার জীবনটা কি ভয়ানক একটা বিড়ম্বনা ! আজ চুল বাঁধবার সময় সে আরসিতে নিজের মুখখানা দেখে সত্যই চমকে উঠে- ছিল ; এমন করে মানুষ যে কখন নিজের যৌবনকে জোর জবরদস্তি করে দুমড়ে মুচড়ে বিকৃত করে ফেলে এমন ধারা ঘটনা বুঝি বিশ্বদুনিয়ার কোন ইতিহাসে আজ পর্যন্ত দেখা যায় নি। তার কান্না আসতে লাগলাে । ১৪১
স্বপ্ন-শেষ
.
এই সময় আবার দেবালয়ের নহবৎখানা থেকে পূরবীর
একটা তান সন্ধ্যার সেই ঝিরঝিরে বাতাসে করুণ হয়ে ভেসে
আসছিল, সে যেন কেবলি কান্না—আর কান্না ; সে যেন কেবলি
বলতে চায়, “ব্যর্থ, সব ব্যর্থ।”
হরিচরণ এসে আস্তে আস্তে ডাকলে, “মা, ও রমা।”
বাগানের দিকে চেয়েই রমা উত্তর দিলে, “কেন?”
“আরতি দেখতে যাবে না ?”
“না।”
“কেন?”
“ওসব আর ভাল লাগে না।”
“তারিণীর জন্যে তােমার বড় মন কেমন করছে নয়, রমা ?”
“তুমি তার বড় ভাই, তােমার মন কেমন করছে না, আমার
করবে?”
“তুমি যে তাকে পেটের ছেলের মতন করে ভালবাসতে, রমা।”
“ভুল করেছিলুম, আজ তার জন্যে আপশােষ করছি।
নিজের ওপর অমন করে অত্যাচার আর কখন করব না; কেন
কিসের জন্যে ?”
“আমি ত বরাবরই তােমাকে সে কথা বলে এসেছি রমা।”
“যাও, মিথ্যে আর বকিও না”, বলে রমা চুপ করে বসে
রইল! হরিচরণ আস্তে আস্তে সেখান থেকে চলে গেল।
কাশীতে গিয়ে তারিণীরা যে বাড়ীতে উঠেছিল তারি নীচের
তালায় থাকত এক ঘর ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণের সংসারে থাকবার মধ্যে ছিল ব্রাহ্মণ নিজে, ব্রাহ্মণী, আর বার তের বছরের একটি ঘােট মেয়ে। বেলা তখন আটটা হবে, পরিণী গঙ্গাস্নান করে বাড়ী ফিরে দেখে, ব্রাহ্মণী মেয়েটাকে ভয়ানক মারছে আর মেয়েটি দাড়িয়ে দাড়িয়ে নীরবে তাই সহ্য করছে, মুখে একটি কথা নেই, কেবল চোখদুটি দিয়ে অবিশ্রান্ত ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে অনেক কষ্টে সে যাত্রা মেয়েটাকে ব্রাহ্মণীর হাত থেকে রেহাই দিতে পেরেছিল। মুরারি তখন পর্যন্ত ঘুমােচ্ছিল, আগের দিন রাত্রে তার জ্বর হয়েছিল। তারিণী উপরে এসে একটা ধাক্কা দিয়ে তাকে, জাগিয়ে দিয়ে বলে, “তুই ত এখানে যাঁড়ের মতন পড়ে পড়ে ঘুমােচ্ছিস আর নীচে যে বানীবুড়ী মেয়েটাকে একেবারে আধ- মরা করে ফেল্লে, তাকি একবার উঠে দেখতে নেই ? ভাগ্যিস, আমি এসে পড়েছিলুম, তা না হলে মেয়েটাকে ত মেরেই ফেলেছিল।” চোখ কচলাতে কচলাতে শয্যার উপর উঠে বসে মুরারি বল্লে, “তা আমি আর কি করব বল? অমন ধারা ত রাতদিনই হচ্ছে; কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে বইত নয়।” “কুড়িয়ে পাওয়া কি রকম?” “ঐ রকমই ত শুনলুম।” “কে তােকে বল্লে ?” ১৫১
“কেন বামুন ঠাকুর নিজেই।”
করুণায় তারিণীর বুকখানা একবারে ভরে উঠল। ব্রাহ্মণ
বাড়ী আসতেই তারিণী তাকে সকল কথা বলে। সে বলে, “কি
করব বল বাবা, আমি ও মাগীকে ঢের মানা করেছি, ওকি
শশানে; এখন মেয়েটাকে কোন রকমে পাত্রস্থ করতে পারলে
আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।”
“তা পাত্রের সন্ধান করুন না।”
“পাত্র বল্লেই ত পাত্র আসে না, বাবা ; কে ওকে বিয়ে
করতে যাবে বল ?”
“কেন?”
“কুল শীল যে ওর কিছুই জানা নেই।”
“তারিণী কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, তার পর হঠাৎ বলে
উঠল, “কুছ পরােয়া নেই, আমি ওকে বিয়ে করব।”
১৫২
বেলা তখন প্রায় দশটা হবে, শীতকালের মােলায়েম রৌদ্র- টুকু বারান্দার উপর এসে পড়েছিল, রমা সেইখানটিতে বসে চুল কোচ্ছিল। অদূরে গােয়ালঘরে একটা গরু থেকে থেকে করুণভাবে ডেকে উঠছিল, আগের দিন রাত্রে তার বাছুরটি মারা গেছে। রমা চুপ করে বসে বসে তাই শুনছিল। বারান্দার ঠিক নীচেই পুকুর ধারে গােয়ালারা একটা খড়পাের নকল বাছুরকে সুমুখে ধরে গাভীটাকে ভােলাবার চেষ্টা করছিল, রমা বসে বসে তাই দেখছিল। আজকের প্রভাতটা তার কাছে যেন বিশ্বসৃষ্টির মাঝখানকার একটা অতি বড় গােপনীয় রহস্যের মত ঠেছিল, তার মনে হচ্ছিল, এই দুনিয়াটা একটা ধড়পােরা একটা বিরাট প্রতারণা-এর মধ্যে কিছু নেই, আছে শুধু খড় আর ফাঁকি। হঠাৎ সেইখানে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হিরে ঝি খবর দিলে,মেজবাবু কোথা থেকে কাদের একটা মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ী ফিরেছেন।
“আমাকে কোন কথা শােনাতে আসি না তােরা,” বলে
রমা তেমনি ভাবেই বসে রইল।
তারিণী বিয়ে করে বাড়ী ফিরেছে—তাতে আর হয়েছে
কি? এমন ধারাটা ত হতেই পারে ; রমার কাছে এটা আজ
কিছুমাত্র নূতন বলে মনে হােল না; আজ তার কাছে দুনিয়ায়
কোন বস্তুই বিচিত্র বলে মনে হচ্ছিল না—সবই যেন পুরাতন,
সবই যেন দেখা-দেখা।
প্রায় আধঘণ্টা পরে রমার হঠাৎ চমক ভাঙ্গল-সে যেন
এতক্ষণ জেগে স্বপ্ন দেখছিল।
রান্নাঘরে যেতে হলে তারিণীর ঘরের সমুখ দিয়ে যেতে
হােতত ; রমা তারিণীর ঘরের কাছ বরাবর এসে কি মনে করে
ফিরে যাচ্ছিল, এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে তারিণী বলে উঠলাে
“জাত যাবে না বৌদিদি! ভয় নেই।” সে আরাে কত কি বলতে
যাচ্ছিল, রমা এক নিশ্বাসে সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে গেল।
সে আবার বারান্দায় এসে বসে পড়ল। আজ বিশ্ব দুনিয়ার
মধ্যে এই বারান্দাটাই তার কাছে সব চেয়ে সত্য বলে মনে
হচ্ছিল, আর সব মিথ্যা, আর সব ফঁাকি।
গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল, গাঙ্গুলীদের মেজবাবু নাকি
কোথা থেকে একটা চড়ালের মেয়ে বিয়ে করে ঘরে ফিরেছে।
হরিচরণ একজন পুরাণাে সেরেস্তাদারকে দিয়ে বলে পাঠা-
লেম যে, তার সঙ্গে গাঙ্গুলীবংশের ভবিষ্যতে আর কোন সম্পর্ক
থাকবে না।
১৫৪
স্বপ্ন-শেষ
তারিণী বল্লে “বয়েই গেল।”
ঘরে ঢুকে সে তার নব পরিণীতা স্ত্রীকে বল্লে, “তােমার বাবা
ঠিকই বলেছিলেন, দেইজি চিরকাল দেইজিই থাকে।”
তারিণী আজকাল আর সে তারিণী নাই। সে কুস্তি লড়া
ছেড়ে দিয়েছে, মাটি মাখা ছেড়ে দিয়েছে। মুরারি দিনের মধ্যে
সাতবার এসেও তার দেখা পায় না।
কাশী থেকে আসবার সময় বামুনঠাকুর তাকে বিশেষ করে
সাবধান করে দিয়েছিল, “জমীদারের কাণ্ড, দেখাে বাবা কেউ
যেন মেয়েটাকে বিষ খাইয়ে না মারে।” তারিণীর হয়েছিল
সে রাত দিন আগলে বসে থাকত।
সেই ভয়।
১৫৫
আজ প্রায় এক মাস হতে চল্প তারিণী বাড়ী ফিরে এসেছে,
এই দীর্ঘ একটা মাসের মধ্যে একটিবারের জন্যও রমা তার
কোন সংবাদ নেয় নি। তারিণী আলাদা থাকত, আলাদা খেত।
তার রান্নাঘর হয়েছিল আলাদা, ভাড়ার হয়েছিল আলাদা এবং
আলাদা একটি পাচকও রেখেছিল।
বসন্তকালের সন্ধ্যা, বাগানের গাছপালাগুলাে ফুলে ফুলে
পাতায় পাতায় একবারে ভরে উঠেছে সবই যেন পরিপূর্ণ, সবই
যেন প্রচুর। রমা নিজের ঘরের জানালার ধারে বসেছিল ;
একটা ফুরফুরে বাতাস চাপার তীব্র গন্ধ গায়ে মেখে মাতালের
মত জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছিল ;—আজ একমাস
পরে হঠাৎ রমার আরতি দেখতে যাবার ইচ্ছা হল।
তখন পুরােহিতঠাকুর আরতি করছিলেন, রমা এসে মন্দিরের
দেওয়াল ঘেসে দাড়াল।
আরতি শেষ হয়ে গেলে রমা ঠাকুর প্রণাম না করেই মন্দির
থেকে ঝড়ের মত বেরিয়ে গেল।
আপনার শয়নকক্ষে এসে সে তার মায়ের দেওয়া সেই
রক্ষাকবচখানিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাে
আর বলতে লাগলাে, “ওগাে সতী লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, আমাকে
বাঁচাও আমি মরতে বসেছি।” সে বিছানায় পড়ে গড়াগড়ি
দিয়ে কাঁদতে লাগলাে।
রাত্রে ঘরে শুতে এসে হরিচরণ ডাকল—“রমা।”
“কি?” তার গলার স্বর তখন পর্যন্ত ভার-ভার।
“ওকি তুমি কঁদছিলে নাকি?”
রমা ছােট মেয়ের মত করে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাে, ওগাে
তােমার পায়ে পড়ি আমাকে বাঁচাও।”
রাত তখন শেষ হয়নি, অল্প অল্প ফরসা হয়ে আসছে।
রমা শয্যা ছেড়ে উঠে একেবারে তারিণীর ঘরের দরজায় ঘা
দিতে সুরু করে দিলে।
দরজা খুলে দিয়ে তারিণী কি বলতে যাচ্ছিল, রমার মুখের
দিকে চেয়ে সে চুপ করে গেল।
অনেকক্ষণ ধরে জোর করে কান্নার বেগকে বুকের মধ্যে
চেপে রাখলে হঠাৎ সে যেমন দম ফেটে বেরিয়ে পড়ে,
ঠিক তেমনি করে রমা চীৎকার করে উঠলাে, “এমনি করেই
মাতৃ-ঋণ শােধ করতে হয় নয়, ঠাকুরপাে ?”
তার পর ঘুমন্ত নূতন
বৌয়ের চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে
টেনে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে, সে আবার চীৎকার করে
উঠলল, “একটিবার গিয়ে পায়ে ধরলে তাের কি এতই অপমান
হােত, পােড়ারমুখী ?”
১৫৭
তার পরই সে কি কায়া ! মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ে রমা
ঘােট মেয়ের মত গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগলাে। তারিণী
রমার পা দুটোকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, “তােমার পায়ে
পড়ি বৌদিদি, আমাকে এবারটা শুধু মাফ কর।”
উঠে দাড়িয়ে তারিণীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে রমা বলে
উঠলাে, “তােমাদের মাফ করব না ত কাকে মাফ করব,
ঠাকুরপাে? তােমরাই যে আমার সব, তােমরাই যে আমার
নারায়ণ, তাই তােমরা যেদিন ছেড়ে গেলে সেদিন থেকে
কত পাপই একে একে বুকের মধ্যে জমা হয়ে উঠেছে। এতদিন
পর তােমাদের চিনেছি ঠাকুরপাে, এখন তােমরা তাড়িয়ে
দিলেও আর যাচ্ছি না।”
সেই দিন সন্ধ্যার সময় রমা এসে নূতনবৌকে ডাকলে চল
বােন, আরতি দেখে আসিগে।”
আজ তার বুকে এতটুকু সঙ্কোচ নেই; সে যে আজ শ্বশুড়ীর
দায়িত্ব মাথায় করে দেবালয়ে যাচ্ছে, আজ যে তার কোন দিকে
তাকাবার অবসর নেই।
••
১৫৮
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.