Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Marmmabani
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মর্মবাণী
ঐকালাচঁাদদালাল প্রণীত
মূল্য চারি আনা
প্রেম-নিকেতন হইতে
চিদানন্দ দালাল কর্তৃক প্রকাশিত।
শান্তিপুর, নদীয়া।
শান্তিনিকেতন প্রেসে
শ্রীজগদানন্দ রায় কর্তৃক মুদ্রিত।
শান্তিনিকেতন, বীরভূম।
সমর্পণ
অন্তরের গুঢ় ভাব, মনের গোপন আশা,
সুখ-দুখ-ভরা মাের ব্যক্ত বা অনুক্ত ভাষা,
জীবনের শুভ দিনে কত আনন্দের কথা,
দারুণ দুর্দিনে যত মৰ্ম্মভেদী শােক ব্যথা,
সকলি জানেন যিনি-পরম সমজদার,
যার কাছে দোষ ত্রুটি নাহি কিছু লুকাবার,
একান্ত সুহৃদ যাঁকে প্রাণের দরদী জানি,
তাহাকেই অর্পিলাম অকিঞ্চিৎ মৰ্ম্মবাণী।
No text on this page.
নিবেদন
এই কবিতাগুলি পূর্বে মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রে ভিন্ন নামে
প্রকাশিত হইয়াছিল; এক্ষণে পরিবর্তিত আকারে গ্রন্থিত হইল।
শ্রদ্ধাস্পদ কবিবর স্বর্গীয় সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং বন্ধুবর শ্ৰীযুক্ত
করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায় অনুগ্রহ করিয়া এই পুস্তকের কোনও
কোনও কবিতা দেখিয়া দিয়াছিলেন; এজন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা
জানাইতেছি।
শান্তিনিকেতন
}
শ্রীকালাচঁাদ দালাল
অগ্রহায়ণ, ১৩২১
No text on this page.
সূচী ৫ ৪ ভিক্ষা আরতি . এ এ ৩০ । বাসনা নির্ভর এ এ এ ৬ ০ ০ ••• ২ সাধনা ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ ও ৮ यांचा ••• যুবকের প্রতি ••• থােক। ••• ১২ প্লাবন দাতা কর্ণ ০ ০ ০ * ০। . . . ••• শারদোৎসব বিজয়ানন নববর্ষ ০ ০ ০ ও ০ ২৮ বর্ষশেষ উপহার জননী। লক্ষ্মীমেরে পিতৃতর্পণ ••• ৩১ ০ ০ ০ + + + ৩৪ ৩৬ মাতৃ-তর্পণ ••• ০ এ । ৪২ পরিসমাপ্তি ••• ৪৮
No text on this page.
মন্মবাণী
দয়ার সাগর বিভু আছ তুমি সবঠাই,
চাহিলে আকুল প্রাণে অন্তরে দেখিতে পাই।
সংসার-সঙ্কট মাঝে দুখে তাপে সর্বক্ষণ,
কাতর ক্রন্দন শুনি দাও তুমি দরশন।
পাপে অনুতাপে যবে হৃদয় দহিয়া যায়,
আর্তস্বরে তাশ্রুভরে ডাকি যদি হে তোমায়,
সে করুণ আবাহন কভু না বিফল হয়,
পাপ-ভয়-হারী হরি দাও তুমি বরাভয়।
আছ তুমি সর্বভূতে ইথে তৃপ্ত নহে মন,
থাক হে হৃদয়ে মম পরাণের প্রিয়ধন ;
তােমার পরশে আমি কৃতার্থ হইয়া যাই,
প্রেমময় তব ঠাই এই চাই—এই চাই।
মৰ্ম্মবাণী
আরতি
প্রভাতে বিমল আলো, সায়াহ্নে গাঁধার,
মধ্যাহ্নে প্রখর তাপ সৃজন যাহার ;
যাঁহার সৃজন বৃক্ষলতা ফুলফল,
জলস্থল গিরিনদী এই ভূমণ্ডল ;
রবিশশী গ্রহতারা যার ইচ্ছাক্রমে,
প্রাণময় সমীরণ সারা বিশ্বে ভ্রমে ;
যাহার কৃপায় লভি দৈনিক অশন,
নিশাতে সুনিদ্রা করে শান্তি নিবারণ ;
জড়-মরদেহে যিনি চেতনা বিতরি,
অলক্ষিতে পালিছেন দিবা বিভাবরী ;
জ্ঞানধর্মে আমাদের করিয়া স্বাধীন,
কত ভাবে কল্যাণ সাধেন নিশিদিন ;
বিপদ সম্পদ, সুখ দুঃখ সমুদায়,
সকলের মূলে
যার শুভ অভিপ্রায়-
করিছে মােদের সদা মঙ্গল বিধান ;
গাও মন তানুক্ষণ তার গুণগান।
;
;
মৰ্ম্মবাণী
বাসনা
করুণা-নিধান প্রভু নিখিল জগৎপতি,
বিপদে সম্পদে তুমি এই জীবনের গতি।
দুঃখ শোক বিভীষিকা পরিবৃত এ ধরায়,
অবাধে জীবন কাটে শুধু তব করুণায়।
সংসারের তপ্ত পথে ভার বহি সারাদিন,
শ্রান্ত ক্লান্ত প্রাণ মন, শরীর অবশ ক্ষীণ ;
অশান্তি অভাবে যবে সব আশা হয় শেষ,
সুখ-শান্তিরূপে তুমি প্রাণে কর পরবেশ।
অশান্ত হৃদয়ে তুমি ঢাল কৃপা-শান্তিজল,
তব প্রেম-অন্ন লভি পাই প্রাণে নব বল ।
তােমার প্রসাদে প্রভু সব জ্বালা দূরে যায়,
তাই এ তাপিত প্রাণ তোমার শরণ চায়।
দাও হে ভরসা দীনে, আজি করি এ মিনতি.
তব স্বরূপের মাঝে ঘিরে রাখ বিশ্বপতি ;
অতৃপ্তি হউক দূর, কৃতার্থ হউক প্রাণ,
তন্ময় হইয়া থাকি—এই কর ভগবান্ !
মর্মবাণী
নির্ভর
অরূপ দেবতা তুমি, চোখে কভু দেখি নাই,
বিরাজ স্বরূপে সদা তাহার প্রমাণ পাই।
অন্তরে বাহিরে তুমি আছ বিশ্বচরাচরে,
সাড়া দাও হৃদি মাঝে, ডাকিলে ব্যাকুল স্বরে।
এ ধরায় রােগ শােক দুঃখ ভয় অগণন,
প্রতিপদে অন্তরায়, প্রতিক্ষণে অনটন
প্রত্যেক পলকে দেখি প্রলয়ের সম্ভাবনা।
তবু ত রয়েছি মােরা, লভি তব কৃপাকণা।
মােদের পালন তরে তুমি দয়া-অবতার,
না বুঝে তােমার ভাব, করি মােরা হাহাকার !
তিলেক নির্ভর নাই, তােমা প্রতি অবিশ্বাস,
তাই ত মােদের দিন কাটে করি হা-হুতাশ !
অবােধ আমরা, নাহি বুঝি তব প্রেম-রীতি;
সুখ দুঃখ সবেতেই তুমি শুভ সাধ নিতি।
নির্বিঘ্নে আমরা হেথা নির্ভয় হইয়া থাকি,
যদি তােমা পরে সদা অটল বিশ্বাস রাখি।
মৰ্ম্মবাণী
সাধনা
যাহা করি, যাহা বলি, যাহা ভাবি মনে,
সকলি জানিছ তুমি থাকিয়া গােপনে।
তব কাছে কিবা মাের আছে অগােচর,
অদৃষ্ট-বিধাতঃ ওগাে প্রাণের ঈশ্বর !
যথন যে ভাবে মােরে রাখ প্রেমময়,
তাহাতেই মম চিত প্রীত যেন রয়।
সকলি ত হয় দেব ইচ্ছায় তােমার,
তব বিধি খণ্ডিবারে সাধ্য ওগাে কার ?
সদা শিরে ধরি তব আদেশ-বচন,
থাকি যেন এ সংসারে দাসের মতন।
নিরন্তর পূর্ণ করি অধীনের হিয়া,
বিরাজ হে বিশ্বরাজ করুণা করিয়া ।
শিব-সিদ্ধিদাতা তুমি এ বিশ্বাস করি,
তােমার কৃপায় প্রভু এ জীবন ধরি ;
রাখ দেব এ দাসেরে অভয় শরণে,
তব ইচ্ছা পূর্ণ হােক জীবনে মরণে!
মৰ্ম্মবাণী
রহস্য
এ সংসারে সব দেখি বিচলিত বিনশ্বর,
এই আছে, এই নাই, ক্ষণে ক্ষণে ভাবান্তর।
সুখ দুঃখ জীবভাগ্যে ঘুরিতেছে চক্রবৎ,
সম্প বিপদে সদা সমাচ্ছন্ন এ জগৎ।
জন্মিয়া মরিতে হয়—সবাকার গতি এই,
অজয় অমর বর কারাে ভালে লেখা নেই।
জরা অসামর্থ্য যবে অধিকার করে দেহ,
শত চেষ্টা করিয়াও নিবারিতে নারে কেহ।
ধন জন যৌবন চিরদিন নাহি রয়,
স্বাস্থ্য বল রূপকান্তি কালবশে হয় ক্ষয়।
অসার অস্থায়ী লয়ে মত্ত হয়ে আছি সবে,
ভাবি না ত একদিন সব ছেড়ে যেতে হবে ।
সংসার রহস্য এই,—এতে মােরা আছি ভুলে,
নিরন্তর দেখি তবু দিব্যদৃষ্টি নাহি খুলে।
চিরস্থির কিছু নহে—সরিতেছে অবিরাম
সকলি হেথায়—তাই সার্থক সংসার নাম।
মৰ্ম্মবাণী
যাত্রা
ভব-সাগরের 'পরে অনন্তের পাড়ি,
ভেসেছে জীবন-তরী বিহীন কাণ্ডারী।
মােহের কুহেলি যবে ঢাকে চারিদিক,
কোটি গন্তব্য পথ, নাহি হয় ঠিক।
বাধা-বিঘ্ন-ঝঝিড়ে ছিড়ে আশ-পাল,
সংশয় আবর্তে ভাঙে বিশ্বাসের হাল,
তরী হয়ে বাণচাল দিগ্বিদিকে ধায়,
সংসার বিপাকে পড়ি তলাইয়া যায় ?
এ মহাসঙ্কট মাঝে কে বাঁচায় তারে ?
তুমি বই, কর্ণধার । কে রাখিতে পারে ?
তুমিই চালাও তারে, হে জীবন-স্বামী!
অনন্ত গন্তব্য পথে দীর্ঘ দিবা-যামী।
তুমি বিনা কেবা আছে করিতে নিস্তার ?
বিপদসঙ্কুল এই ভব-পারাবার !
শুধু তব কৃপা-স্রোত অবলম্ব করি,
কুতূহলে যায় চলে এ জীবন-তরী।
রহস্য-রাত্রির পারে দিব্য ধ্রুবালােক ;
সেইখানে হে দেবতা, খেয়া শেষ হােক !
মৰ্ম্মবাণী
যুবকের প্রতি ঃ
হে যুবক ! সুহৃদের শুভাকাঙক্ষা লও,
নিরপেক্ষ-নিরাপদ—দীর্ঘজীবী হও।
বিভুপদে মাগি ভিক্ষা, দাও ভাই সৎ-শিক্ষা,
স্বজাতির হিতব্রতে দৃঢ় হয়ে রও।
ত্যজি নীচ সুখ-স্বার্থ সাধ উচ্চ পুরুষার্থ,
অপ্রেম উপেক্ষা যত অকাতরে সও।
কাহাকে দিও না ব্যথা,
হিতকর সত্যকথা,
নির্ভয় নিঃশঙ্ক মনে সজনে কও।
সত্যেতে রাখহ প্রীতি, কিসের ভাবনা ভীতি?
সত্যের বিপুল বল-কাহাকে ডরাও ?
কৰ্ত্তব্য বুঝেছ যাহা,
সযতনে পলি তাহা.
উপহাস লােকনিন্দা হাসিয়া উড়াও।
লজ্জার যে অনুরােধ, তৃণতুল্য কর বোধ,
সিদ্ধির সুখদ ধামে যদি যেতে চাও
যত্নের অসাধ্য নাই--সবারে বুঝাও।
* “যুবক” মাসিক পত্রের উদ্দেশে লিখিত
মর্মবাণী
খােকা ৪
প্রিয়তম খােকা রে আমার !
চঁাদ-মুখে হাস একবার ;
দন্তহীন মুখে হাসি, আমি বড় ভালবাসি,
গাল-ভরা হাসি তাের অতি চমৎকার ;
দেখিতে বাসনা বড় অন্তরে আমার।
প্রিয়তম খােকা রে আমার !
হাসি-মুখে কঁাদ রে আবার ;
হাসি সহ কান্না তব,
অপরূপ অভিনব,
জগতে তেমন কিছু নাহি দেখি আর,
মুখে হাসি চোখে কঁাদা যেমন তােমার।
প্রিয়তম থােকা রে আমার !
মা ' বা ' বলে ডাক একবার ;
অাধ আধ কথা তাের, বড় ভাল লাগে মাের,
সাধ যায় তাের কথা শুনি অনিবার ;
ফেলিয়া সকল কাজ—বিষয় ব্যাপার ।
খােকার জন্মােৎসব উপলক্ষ্যে লিখিত।
মর্মবাণী
প্রিয়তম খােকা রে আমার ।
তাের স্বর নহে তুলনার ;
কোকিল পাপিয়া ধ্বনি, কঠোর বলিয়া গণি,
তাের স্বর কাছে তুচ্ছ বীণার ঝঙ্কার !
শ্রবণে বরষে যেন অমৃতের ধার।
প্রিয়তম থােকা রে আমার !
তাের সম কেবা আছে আর ?
নবনী মাখন ফেলি, লুচি মণ্ডা অবহেলি,
মুখে দাও কাদা মাটি, জঘন্য অঙ্গার ;
ভাল মন্দ তাের কাছে নাহিক বিচার !
প্রিয়তম খােকা রে আমার !
তাের মনে নাহিক বিকার ;
তোের নাহি হিংসা দ্বেষ, ঘৃণার নাহি ত লেশ,
ভাব না কে পর, আর কেবা আপনার;
তােমার সমান সুখী কেবা আছে আর ?
প্রিয়তম খােকা রে আমার ।
তােমা বিনা ঘর অন্ধকার ;
যে ঘরে না থাক তুমি, সে যেন শ্মশান ভূমি,
তুমি যে অমূল্য নিধি সধন সার ;
যে তােমারে পায় ঘরে বহুভাগ্য তার।
মৰ্ম্মবাণী প্রিয়তম খোকা রে আমার । উজলি এ আঁধার আগার- নিরাময় দেহে রও, তুমি চির সুখী হও, তাের সুখে সুখ মাের-আনন্দ অপার ; হৃদয়-রঞ্জন থােকা তুই বাপ-মা’র। প্রিয়তম খোকা রে আমার ! তােকে লয়ে সুখের সংসার ; দীর্ঘজীবী হয়ে থাক, বংশের গৌরব রাখ, তাের তরে 'আজি এই কামনা সবার ; থাকুক্ তোমার শিরে কৃপা বিধাতার ।
১২
মণীবাণী
প্লাবন *
অকস্মাৎ শুনি একি শােক-কোলাহল !
ভেসে গেল, ডুবে গেল—কি ভীষণ জল!”
বাঁধ ভাঙি দামােদর,
গরাসিল চরাচর,
হাট, মাঠ, পল্লী, বাট গেল রসাতল ।
চারিদিকে শুধু বারি,
একি হল! ভিটা বাড়ী
জলে ডুবে হয়ে গেল সব সমতল !
কোঠা ছাদ ভেঙে চূরে,
কোথা ফেলে দিল দূরে,
এই বল ধরে জল হইয়া তরল !
শুষ্ক লঘু পত্র প্রায়,
কত চালা ভেসে যায়
দূর গ্রামান্তরে—স্রোত এতই প্রবল।
উচু নীচু ঘর দ্বার,
হ’ল যেন পারাবার,
কোথাও রহিল নাকো দাড়াবার স্থল।
*
১৩২৩ বঙ্গাব্দের শ্রবণ মাসের প্রবল বন্যায় দামােদর নদের
বাঁধ ভাঙ্গিয়া বর্ধমান, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, হুগলী ও হাওড়া জেলার
বহু গ্রাম ও নগর জলে প্লাবিত ও দুর্দশাগ্রস্ত হয়। এই দুর্ঘটনা
অবলম্বনে লিখিত।
মর্মবাণী
গাড়ী পাল্কী সব বন্ধ,
এ বড় বিষম বন্ধ,
জলেতে করিল কল-গাড়ীকে অচল।
মিলে কোনও যান,
কি করে বাঁচায় প্রাণ,
সকলেরি গতি বুঝি মরণ কেবল।
জীবন রক্ষার লাগি,
হয়ে সরবস্ব ত্যাগী,
কত লােক দিগ্বিদিকে ছুটে দলে-দল।
একি শুনি আচম্বিতে ভীম-কোলাহল ।
কখনাে দেখিনি হেন সর্বনেশে জল !
একি বিসদৃশ হায় !
জীবনে জীবন যায়,
পশু শিশু নারী নর জলে হ’ল তল ।
স্রোত-মুখে ইতস্ততঃ,
ভেসে যায় কত শত,
নিমগ্ন জীবের মৃত দেহ অবিরল।
সবাই ডুবিয়া মরে,
কেবা কারে রক্ষা করে,
জলে সর্বনাশে--যথা নাশয়ে অনল।
ছাদে গাছে নৌকা চড়ে, কিংবা কপালের জোরে,
যাহারা বাঁচিল প্রাণে—তাহে বা কি ফল ।
অন্ন বস্ত্র ধন ধান,
সকলি নাশিল বান,
তৃণগাছি কাহারাে না রহিল সম্বল।
কিবা খায়, কিবা পরে,
কিসে প্রাণরক্ষা করে,
অশন বসনাভাবে সবাই বিহ্বল।
১৪
বাণী
মরিল কাহারাে পতি,
কারাে গেল পুত্রবতী
পত্নী, কারো পিতামাতা আত্মীয় সকল ।
ডুবিল সন্তান কা’র,
পেয়ে সন্ধান তার,
শােকে তাপে কত আঁখি ঝরে অবিরল।
পিতৃমাতৃহীন কত,
পুত্র কন্যা শত শত,
অনাথ হইল !---একি দুর্ভাগ্যের ফল ।
এমন দেখিনি কভু সৃষ্টিছাড়া জল ।
মর্মবাণী দাতা কর্ণ মরে নাই কুন্তীসুত কর্ণ বীরবর! অক্ষয় জীবন তার, সে ত নহে মরিবার, বিধাতা দিয়েছে তারে অমরত্ব বর। কর্ণ যে দাতার শ্রেষ্ঠ, নিখিল মানব প্রেষ্ঠ, অপূর্ব দানের গুণে হয়েছে অমর। সে যে দানবীর—বীরকুল অলঙ্কার। বীর কি কখনাে মরে ? চিরজীবী মর্ত্যোপরে, বীরের কেবল হতে আছে অধিকার। পুরুষের বীরধৰ্ম্ম, পুরুষের বীরকৰ্ম্ম, বীরত্বেই অমরত্ব- -মহত্ত্ব অাের। সে বীরত্ব অপার্থিব, বহু পুণ্যে পায় জীব,
মর্মবাণী
;
সে বীরত্ব শারীরিক জড়-শক্তি নয়।
অদ্ভুত তাহার রীত,
দেখি বিশ্ব চমকিত,
সে বীরত্ব মনােময়-কোষ মধ্যে রয়।
সে বীরত্ব আছে যার,
ধরা বশীভূত তার,
করে সে সবার হিয়া মন অধিকার ;
নরনারী সমুদায়,
পূজনীয় বলি তায়,
পরম ভকতি ভরে করে নমস্কার ।
যেই বীরে সে বীরত্ব,
ভবে সেই মহাসত্ত্ব,
ধন্য ধন্য পুরুষত্ব—মনুষ্যত্ব তার।
দাতা কর্ণ সেই বীর,
বীর হয়ে মহাধীর,
সে চাহেনি প্রতিশোধ দিতে শত্রুতার।
চিনি ছদ্মবেশ অরি,
মরণ স্বীকার করি,
কবচ কুণ্ডল তারে করিল অর্পণ ;
আপনার প্রাণ দিয়া,
তুষিতে শত্রুর হিয়া,
দাতা কর্ণ সম আর পারে কোন জন?
মৰ্ম্মবাণী ১৭ যাচকের প্রত্যাখ্যান, করেনি সে মতিমান- দিনেকের তরে তার অতুল্য জীবনে ; সত্যে নিষ্ঠা দৃঢ়তার দৃষ্টান্তের স্থল আর কর্ণের সমান কেহ মিলেনি ভুবনে। ধরিয়া ধনুক তীর, কাটিয়া শত্রুর শির, সে চাহেনি পরিচয় দিতে আপনার ; করেছে অনেক রণ, বহু বার-বিনাশন, তবু “যােধ” খ্যাতি তার ঘোষে না সংসার। খ্যাত হতে যোধ বলি, জন্মেনি সে মহাবলী, জন্মেছিল দেখাতে দাতৃত্ব নরগণে ; দান-ধৰ্ম্ম রক্ষা তরে, করাত ধরিয়া করে, কাটিলেক পুত্রশির মিলি পত্নীসনে ! ফেলি নয়ন জল--অকাতর মনে। কর্ণ যদি মরে ! অমর কে হবে ভবে ? ২
১৮
মৰ্ম্মবাণী
মরিয়াছে রণবীর মহাশূর কত !
প্রবল-প্রতাপ মহারাজ শত শত !
মরেনি সে দানবীর কর্ণ মহামতি ;
সত্যসারময় দেহ দয়ার মুরতি।
জীবিত রয়েছে সেই,
কভু তার মৃত্যু নেই,
যাবৎ, দিনেশ চন্দ্র—যাবৎ ধরণী
তাবৎ অমর কর্ণ বীর-শিরােমণি।
মৰ্ম্মবাণী
শারদোৎসব
বছর অন্তরে পুনঃ শরৎ আইল,
চারিদিকে হাসি প্রকাশিল ;
বাঙালার সমুদয়-
আজি কিবা সুখময়,
অনুপম শারদীয় শােভায় ভাতিল ;
বিমল আনন্দে তাই সবাই মাতিল।
••
নিশাতে বিটপী শাখে খদ্যোতের দল,
ক্রীড়া করে হইয়া বিহ্বল
হেরিয়া চন্দ্রের ভাতি,
দারুণ ঈর্ষায় মাহি,
নিজের কিঞ্চিৎ জ্যোতি প্রকাশ করিল
যেন কনকের কুচি শোভিতে লাগিল।
:
কুসুম কোরক প্রাতে হোর প্রস্ফুটিত,
মধুকর হইল মােহিত ;
মর্মবাণী
নবপুষ্প মধুপানে,
শ্রবণ মধুর তানে,
গুন গুন রব ধরি করিল মােহিত
প্রকৃতি হইল আজি অতি সুশশাভিত।
••
কেন আজি প্রকৃতির এত শােভা হল ?
দেশবাসী কেন বা হাসিল ?
শরতের আগমনে
ঘাট মাঠ পল্লী বনে,
মায়ের আনন্দময়ী রূপ দেখা দিল ;
তাই ত সবার মন আনন্দে ভরিল।
দীন জন্মভূমি কোলে বাঙালী সন্তান,
মােহ-ঘােরে ছিল অচেতন ;
কেন আজি জাগরিত,
হেন আনন্দিত চিত,
জানাতে কি মার কাছে দুখের কাহিনী ?
এসেছেন দুখহরা দুর্গতিনাশিনী।
বালক যুবক বৃদ্ধ ধনী কি নির্ধন ;
সবে আজি পুলকিত মন।
মৰ্ম্মবাণী ২১ দেবের বাঞ্ছিত ধন, মহা-শক্তি আগমন, ঘুচিল সবার তাই ক্ষীণতা দীনতা, যে দিকে ফিরাই আঁখি হেরি প্রফুল্লতা । বাঙালীর ঘরে আজ কত আয়ােজন- নানাবিধ বসন ভূষণ, মিষ্ট অন্ন ফল মূল, কিছু নাই অপ্রতুল, গন্ধ-পুষ্প- -বিধিমত দিয়া উপচার কাঙালী বাঙালী পূজা করে শারদার!
মর্মবাণী
বিজয়ানন্দ
এস ভাই ! আজি বিজয়া দশমী,
করি সবে আলিঙ্গন,
বিজয়ানন্দে মিলনানন্দ,
করি প্রীতি-সম্ভাষণ।
আজি, ভাই ! এস বরষের দিনে,
হৃদয়-কপাট খুলি,
প্রাণের ভিতরে টেনে লই সবে,
নীচতা হীনতা ভুলি।
এস শুভ দিনে অশুভ যা-কিছু
সব করি পরিহার,
ভুলি অভিমান, ভুলি অপমান,
ভুলি ঘৃণা অবিচার।
ত্যজি অবসাদ, জড়তা, বিষাদ,
হৃদয়ে আনন্দ লয়ে,
হাসি মুখে এস ভাই বন্ধু সবে,
মিলে যাই এক হয়ে।
মৰ্ম্মবাণী
(আর) কেন ভাই বৃথা কর হিংসা দ্বেষ,
কেন ভাব সবে পর ?
কেন বড় ভাব আপনা-আপনি
?
হীন দেখ চরাচর।
কেন অহং জ্ঞানে হইয়া বিভাের,
পায়ে ঠেল দীন জনে ?
মিছে ভেদাভেদ, ছােট বড় জ্ঞান,
কর সদা মনে মনে !
এই ভেদজ্ঞান, এই অভিমান,
এই ঘৃণা অহঙ্কার,
ক’দিনের তরে ? দুই দিন পরে
কভু না রহিবে আর।
তবে কেন আর ছাড়াছাড়ি হয়ে,
থাক ভাই ভাই সবে ?
সরল হৃদয়ে, সবে এক হলে,
ভবের মঙ্গল হবে।
(আজ) শত্রু মিত্র হও, যেখানে যে রও,
আমার মিনতি ধর,
যত অপরাধ, যত অবিচার,
যত দোষ, ক্ষমা কর।
দোষী অপরাধী, বাদী প্রতিবাদী,
যে যাহার কাছে হও,
২৪
মৰ্ম্মবাণী
(তবে)
বিনীত বচনে, অনুতাপ সনে,
মানা চাহি লও।
ভুলে যাও ভাই, বিপক্ষের ভাব,
ভুলে যাও প্রতিশােধ,
পরস্পরে এবে ক্ষমা কর ভাই,
এই করি নুরােধ।
এস ভাই । আজি বিজয়া দশমী,
মার কথা সবে স্মরি,
মায়ের নামেতে আত্ম পর ভুলে
প্রেমে কোলাকুলি করি।
আনন্দরূপিনী মােদের জননী,
নিরানন্দ কেন র’বে !
এক মা’র ছেলে, আমরা সকলে,
কেন ভিন্ন ভাব তবে ?
এস এস তবে, মায়ের মণ্ডপে
মিলিয়া সকল ভাই,
জয় মহাশক্তি, জয় ব্রহ্মময়ী,
পরাণ খুলিয়া গাই।
মর্মবাণী
নববর্ষ
বিষুব-সংক্রান্তি রাতি হল অবসান,
নবরাগে উদয় হইল অংশুমান।
গাইল আইল আজি বরষ নূতন,
পুরাতন গত হল জন্মের মতন।
তার সঙ্গে সম্বন্ধ ঘুচিল একেবারে,
ডুবিল সে অতীতের সাগর-মাঝারে !
মাস ঋতু সম্বৎসর বিধির আজ্ঞায়,
চিরদিন এক আসে এক চলে যায়।
যে যায় চলিয়ে তার সম্বন্ধ না থাকে,
ফিরে আর আসে না সে শত শত ডাকে।
দেখিতে দেখিতে এক বর্ষ চলে গেল,
পুনরায় বাঙালায় নব বর্ষ এল।
পহেলা বৈশাখ আজি-বর্ষার দিন,
আমােদিত বাল যুবা প্রৌঢ় প্রাচীন।
হাসিছে ভাসিছে সবে সুখের সাগরে,
দুঃখ লেশমাত্র নাই কাহারাে অন্তরে।
আনন্দের ধ্বনি আজি শুনি ঘরে ঘরে,
ভগবতী স্মরি সবে মঙ্গল আচরে।
মর্মবাণী
ধরিয়া বালক-দল সুললিত তান,
হরষে গাইছে কি মনােমদ গান।
শুদ্ধচিত সমাহিত হয়ে নারীগণ,
বরষের ফলাফল করিছে শ্রবণ।
কি দরিদ্র কিবা ধনী গৃহবাসী যত,
সবে আজি সাধ্যমত দানধ্যানে রত।
বিমল পবিত্র ভাব মানসে সবার,
ক্ষীণমতি হীনজন পরম উদার।
ব্যবসায়ি-কাৰ্যালয়ে মহা মহােৎসব,
কত লােক আসে যায় হয় কলরব।
কুসুম-পল্লব-মালে দ্বার সুশোভিত,
ধূপ-ধূনা-গন্ধে গৃহ করে আমােদিত।
খুলিয়া নূতন খাতা ধনি-মহাজন,
সমাগত অধমর্ণে করে সম্ভাষণ।
নিরন্তর মুক্তদ্বার মিষ্টান্ন-ভাণ্ডার,
ছোট বড় সকলের হতেছে সৎকার।
এই যে বর্ষের দিন, এ দিনে কি সবে,
কেবল আনন্দ ভোগে বিমােহিত রবে ?
শুধুই কি ভবিষ্যতে নয়নে ধরিবে,
অতীতের পানে ফিরে দৃষ্টি না করিবে ?
মর্মবাণী
অতীতের দোষ পাপ না করি স্মরণ,
কিরূপে হইবে বল চরিত্র গঠন ?
মতি নাহি থাকে যদি দোষ সংশােধনে,
উন্নতির পথে তবে চলিবে কেমনে ?
গত ক্রটি গণনায় নাহি আসে যার,
জীবনের উন্নতি না হয় কভু তার।
অতীত বরষস্মৃতি অতি শুভকরী,
এস ভাই চলি মােরা এই বাক্য ধরি।
২৮
মর্মবাণী
বর্ষশেষ
বিধির বিধানে একবর্ষ চলে যায়,
নব বর্ষ পুনরায় আসিল ধরায়।
স্রষ্টার নিয়ম-ক্রমে,
কালচক্র সদা ভ্রমে,
সুশৃঙ্খল গতি তার অতি চমৎকার ;
বর্ষ শেষে নববর্ষ আসে বার বার।
সৃষ্টিতে সকলি বাঁধা নিয়মে ধাতার,
কোথাও না দেখি কভু অন্যথা তাহার ।
অলঙঘ্য নিয়মে কাল,
এইরূপে চিরকাল,
আনিছে নূতন মাস ঋতু সম্বৎসর--
নূতন শতাব্দী, নবযুগ-যুগান্তর।
এ জগতে নিত্য নূতনের অভ্যুদয়,
বিধির ইচ্ছায় পুরাতন নাহি রয় ।
প্রথমে নূতন যাহা,
পরে পুরাতন তাহা,
অবশেষে একবারে লয় হয় তার ;
বিচিত্র ব্যবস্থা তার বুঝে সাধ্য কার ?
মৰ্ম্মবাণী
কে গণিতে পারে কত বর্ষ চলে গেল,
নববর্ষ নাম লয়ে কত বর্ষ এল !
এক যায় এক আসে,
চিরদিন ধরা-বাসে,
অনন্ত কালের এই লীলা-অভিনয়,
দেখিয়া না হয় কার বিস্ময় উদয় ।
আসিয়া
নূতন
বর্ষ হয় পুরাতন,
মানবের পরমায়ু করিয়া হরণ।
সুবােধ চতুর সেই,
সময় থাকিতে যেই,
আলস্য-শয়নে নাহি থাকে অচেতন,
আপন কর্তব্য পালে করিয়া যতন।
মর্মবাণী
উপহার
আজ বিয়ের দিনে কি দিব হায় তােমায় উপহার।
জান ধন দৌলত নাইক—অতি অভাগ্য আমার।
আছে স্নেহ প্রীতি ভালবাসা পার্থিব ধন
বল এর সাথে কি তুল্য হয় রজত কাঞ্চন?
তবে এই লয়ে আজ তুষ্ট হও, তৃপ্ত কর প্রাণ ;
আমি বিধির কাছে যাচি তব কুশল কল্যাণ।
তুমি সুখী হও, সুস্থ রও, স্বস্তি কর লাভ ;
হৃদে জাগুক উচ্চ অশ-ধম্মের প্রভাব।
তুমি লভ পিতার গুণ-গরিমা সুচরিত্র-বল
সাধ সযতনে জাতির হিত, দেশের মঙ্গল।
তুমি হাসিমুখে মনের সুখে করহ সংসার ;
এই শুভদিনে হৃদয়-মনের কামনা আমার ।
••
শ্ৰীমান মণিনাথ প্রমাণিকের শুভ-পরিণয় উপলক্ষে।
মর্মবাণী
জননী
মা তুমি সামান্য নও অমরার দেবী ;
জননী জনম-স্থান,
স্বর্গ হতে গরীয়া,
ধন্য হয় এ জীবন মা তােমায় সেৰি ;
মানবীর রূপে তুমি মূর্তিমতী দেবী।
মা গাে, তব তুল্য আর আছে কোন্ জন ;
তােমাকে হইলে ছাড়া,
শিশু হয় দিশেহারা,
তুমি যে পরম ধন—শিশুর জীবন ;
তানন্ত মহিমা তব—বিদিত ভুবন ।
তব দরশনে হয় আনন্দ অপার,
পরশে পরম প্রীতি,
থাকে না ভাবনা ভীতি,
দূরে যায় সমুদায় মনের বিকার ;
সংসার স্বরগ যেন হয় একাকার।
* জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।
মৰ্ম্মবাণী
;
তব কণ্ঠধ্বনি যেন মােহন বাঁশরী ;
কর যবে সম্ভাষণ,
শান্ত হয় প্রাণমন,
শত দুঃখ শত জ্বালা পলকে পাসরি ;
কি যে মন্ত্র তব বাণী, আহা মরি মরি !
ক্ষমা দয়া স্নেহ প্রীতি মায়া বা মমতা,
তাপত্য-পালন, সেবা,
এ জগতে জানে কেবা-
তােমার সমান ? সরলতা সহিষ্ণুতা,
এত গুণ তােমাকেই দিয়াছেন ধাতা।
-
সংসারের মাঝে মাতঃ! তুমি গাে যেমন,
তেমন কে আছে আর ?
কার স্নেহ অনিবার ?
তুমি স্নেহরূপা ধাত্রী ধরিত্রী-ভূষণ,
জননী, প্রসূতি—তব গুণ অতুলন।
কত যত্ন মা তােমার সন্তানের তরে ;
বুকের শাণিত দিয়ে,
রাখ তারে জীয়াইয়ে,
তােমার কৃপায় শিশু বল শক্তি ধরে ;
তােমার আশ্রয় পেয়ে সংসারে বিচরে।
মর্মবাণী
-সাঙ্গ হত মানবের সব লীলাখেলা ;
সংসারের অভিনয়,
নিশ্চয় পাইত লয়,
ভেঙে যেত সুন্দর এ ধরণীর মেলা ;
সন্তানে করিতে মা গাে যদি অবহেলা।
প্রজাপতি জীব-সৃষ্টি রক্ষার কারণে,
সৃজিয়া জননী মূৰ্ত্তি,
রাখিলা অদ্ভুত কীর্তি ;
মাতৃভক্তি-ডোরে বদ্ধ জগবাসি-জনে ;
থাকিত না সৃষ্টি কভু জননী বিহনে ।
৩
মর্মবাণী
লক্ষ্মীমেয়ে
ননীর পুতলি তুই, কনক চাপার কলি ;
অফুটন্ত ঊষালােকে সহসা ঝরিয়া পলি।
দুলােকের দেবশিশু ভূলােকের খেলা-ঘরে,
এসেছিলি পথ ভুলি শুধু দু-দিনের তরে।
আমাদের সাথে খেলি সােয়াস্তি হ’ল না তাের ;
তাই বুঝি চলে গেলি রাখিয়া স্মৃতির ঘাের।
স্বহস্তের স্মৃতি-কীর্তি—তাের ফেলা মসী-চিহ্ন,
কম্বলে সম্বল আছে—কিছু নাই ইহা ভিন্ন।
আহ্নিকের কালে তুমি চুপি চুপি আসি পাশে,
তাকাতে বাবার পানে কোলে বসিবার আশে।
তােজন-সময়ে রোজ বসিতে বাবার সনে;
ডাকিলে আড়ে চেয়ে চলে যেতে ক্ষুন্ন মনে।
* পূজনীয় পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত রাধারমণ গােস্বামী জ্যোতিষর
মহাশয়ের কনিষ্ঠা কন্যা; জন্ম-১৩২৬ সালের ২৬শে আষাঢ়,
মৃত্যু-১৩২৭ সালের ৩১শে শ্রবণ। তাঁহার পিতা, মাতা এবং
দাদারা তাহাকে আদর করিয়া যথাক্রমে লক্ষ্মীমেয়ে, গ, বাসু,
গনা, পচা বলিয়া ডাকিতেন। সংসারে তাহার স্মৃতির জন্য বাহিক
কোনও চিহ্ন নাই; কেবল সে যে কম্বলের উপরি দোয়াতের কালী
কেলিয়াছিল, তাহাই তাহার শেষ চিহ্ন।
মর্মবাণী
‘গনু ‘গনা’ ‘বাসু ‘পচা কত কি যে নাম ধরে,
জননী দাদারা তােরে ডাকিত স্নেহের ভরে।
আদরে তােমারে বাবা ডাকিতেন “লক্ষীমেয়ে”;
সারা দিতে বলিয়া “কি”, নিকটে আসিতে ধেয়ে।
কোথা হায়! কোলে আয়, চুমু দে রে ফুলৰাণী !
উকি দিয়ে দেখ চেয়ে, দিতেছি যে হাতছানি।
মায়াময়ী মানময়ী আমাদের ফাঁকি দিয়া,
কোথায় অজানা দেশে আছ তুমি লুকাইয়া ?
এত সাধি, এত ডাকি—পাই না উত্তর তাের ;
পরাণ মানে না হয় । ডাকিব জনম-ভাের।
তাের নিদারুণ স্মৃতি অন্তরে জ্বলন্ত লেখা ;
বাহিরে রহিল শুধু অস্থায়ী কালীর রেখা।
মর্মবাণী
পিতৃ-তর্পণ
কিন্তু তব মৃত্যু !
একি দুর্ঘটনা, বাবা! কি দুর্দৈব হায়!
তােমার নিয়তি একি ? বুঝা নাহি যায়।
জন্মিলে মরিতে হয়,
তা’তে তত ক্ষোভ নয়,
একি মৃত্যু বলা যায় ?
দুরন্ত বসন্ত রােগে,
অসহ যন্ত্রণা ভােগে,
নিস্তার পাইতে আর না দেখি উপায়,
ত্যজিলে পরাণ শেষে উদ্বন্ধনে হায়!
প্রাণ দিয়ে ত্রাণ নিলে,
বড় দাগা দিলে,
কি কাজ করিলে হায় রােগের জ্বালায় !
আদরের মেয়ে ছেলে,
মােরে নাবালক ফেলে,
কেমনে নিদয় হয়ে লইলে বিদায় ?
একি বিসদৃশ বিধি,
শশাকে দুঃখে দহে হৃদি,
কি দারুণ জ্বালা-ওগাে কি বিষম দায়।
মােদের কি হবে তুমি ভাবিলে না হায় !
উহু!
মর্মবাণী
বৈশাখে পূর্ণিমা তিথি নিশীথ রজনী।
রােগীর শুশ্রুষা করে,
নিদ্রা যান অকাতরে,
পিতৃশয্যা পাশে—দাদা, দিদি ও জননী।
আমি ত বালক হাবা,
ঘুম ভেঙে দেখি, বৰা
দাড়ায়ে শিয়রে—শূন্যে চরণ দুখানি।
অমনি কাঁদিয়া ডাকি,
“বাবা, বাবা” হায় একি !
সাড়া নাই, শব্দ নাই, নাই মুখে বাণী ।
নিকটে নাহিক কেহ,
দেয়ালে ঝুলিছে দেহ
সরল সহজ ভাবে-নাহি তাহে প্রাণী।
পূর্ণিমা নিশাতে এত,
আঁধার ঘেরিবে তাত,
স্বপনেও মােরা কেহ আগে নাহি জানি।
কাল-বৈশাখের রাতি গেল ব হানি।
বাল্যকালে ছিলে বাবা, পিতৃ-মাতৃহীন।
আত্মীয় স্বজন কেহ,
পালেনি করিয়া স্নেহ,
মর্মবাণী
অনাথের প্রায় তব কেটেছিল দিন।
সহায় সম্বল নাই,
নাই দাড়াবার ঠাই,
যতন অভাবে দেহ বিশীর্ণ মলিন।
ফেলি কপালের ঘাম,
নিজ হাতে করি কাম,
হয়েছিলে বয়ােপ্রাপ্ত—পরের অধীন।
বংশের সন্ত্রম জানি,
ঈশ্বর ধনাট্য মানী,
তােমাকে দিলেন স্থান দেখি ভাগ্যহীন।
বাড়াতে কুলের মান,
করিলেন কন্যাদান,
মানিলেন ধন্য—পেয়ে জামাতা কুলীন।
ঈশ্বরের কৃপা লভি,
ক্রমেতে হইল সবই
টাকা কড়ি ঘর বাড়ী-ঘুচিল দুর্দিন।
সক্ষম পুরুষ ধন্য,
হলে শেষে মান্য গণ্য,
আয়-ব্যয়-সঞ্চয়ে আছিলে সমীচীন ;
বিষয়-কম্মেতে বড় সুদক্ষ প্রবীণ।
মর্মবান
৩৯
বিষয় ব্যাপারে তুমি ছিলে বিচক্ষণ।
কৰ্ম্মপটু শ্রমশীল,
কাটাতে না এক তিল
সময়-অলসে* বিনা কাজে অকারণ।
ছিলে সদা কৰ্ম্মে রঙ,
কৰ্ম্মই জীবনে ব্রত,
শ্রমের মাহাত্ম করেছিলে প্রদর্শন।
ব্যবসা-কাৰ্য্যের রীতি,
কূট তত্ত্ব অর্থনীতি,
অভাবে স্বভাবে হয়েছিল উদ্ঘাটন।
বাল্যের কঠোর ক্লেশ,
গুরুদত্ত উপদেশ
সমছিল চিরদিন মনেতে স্মরণ।
দুঃখেতেই সুখ জানি,
কষ্টকে সৌভাগ্য মানি,
দৃঢ়ভাবে করেছিলে জীবন গঠন।
তুচ্ছ করি তভাগ সুখ,
নিবারিলে পর দুখ,
বিলাস সম্ভোগে তব ছিলনাক মন।
মর্মবাণী
খদ্দের খাতক যত,
সবে ছিল অনুগত,
করিতে সবার সাথে মিষ্ট আচরণ।
আজিও দৃষ্টান্ত স্থলে,
প্রতিবেশিগণে বলে-
“বড় ভাল ছিল প্রেমাদ মহাজন ;
অর্থদানে অধমর্ণ করেছে পালন।”
কারবারে করেছিলে প্রচুর অর্জন।
বাণিজ্যে শ্রীবৃদ্ধি হয়,
এটা শুধু কথা নয়,
তােমার জীবনে তার পাই নিদর্শন।
আমরা নির্বোধ অতি,
নহে স্থির মতি গতি,
ব্যবসা-কাৰ্যেতে নাই যত্ন প্রাণপণ।
এটা ছাড়ি, ওটা ধরি,
খামখেয়ালিতে পড়ি
খােয়ায়েছি টাকা কড়ি—তব দত্ত ধন ।
“ন দেবায় ন ধৰ্ম্মায়”,
পাঁচ ভূতে খেল হায় !
স্মৃতি কীর্তি কিছু নাহি হ’ল সংস্থাপন।
মর্মবাণী
মােরা মূঢ় হীন-শক্তি,
নাহি পিতৃ-প্রেম ভক্তি,
করিনু তব দিব্য গুণানুসরণ।
তােমার অজ্জিত অর্থ,
অপাত্রে পড়িয়া ব্যর্থ,
অযােগ্য আমরা তব অভাগা নন্দন ;
মােদের হইল সার আক্ষেপ ক্রন্দন।
২
মর্মবাণ
মাতৃ-তর্পণ
মা গাে ! এ কি সর্বনাশ! তুমি কোথা গেলে ?
এ সংসারে আমাদের অসহায় ফেলে।
সেবারে বিধির বরে,
ফিরে পেয়েছিনু ঘরে,
সাত দিন গঙ্গাবাস * করে তুমি এলে।
আমাদের অকল্যাণ,
এই ভেবে ম্রিয়মাণ,
কতই সঙ্কোচ কত ভয় মনে পেলে !
জীবন-সংগ্রামে বুঝি,
কালের সহিত যুঝি,
এবারে মােদের তরে আর নাহি র’লে।
তােমার অভাবে আজ,
শিরেতে হানিছে বাজ,
হাহাকার করে নাতিপুতি মেয়ে ছেলে।
* দুরারােগ্য বিসূচিকা মােগে মরণাপন্ন অবস্থায় মাতা গঙ্গা-
তীরস্থ হইতে ইচ্ছা করেন। তথায় তিনি এক সপ্তাহ থাকি
আরােগ্য হইয়া গৃহে ফিরিয়া আসেন।
মর্মবাণী
৪৩
মায়ার শরীর ও মা !
কত তব দয়া ক্ষমা,
এখন কি স্নেহপ্রীতি সব পাসরিলে ।
ভূমানন্দে দিব্যজ্ঞানে,
“হরেকৃষ্ণ” রূপ ধ্যানে,
স্বচ্ছন্দে সজ্ঞানে তুমি গোলােকে পশিলে।
ও মা, মা গাে! আজ তুমি সত্যি চলে গেলে?
মা গাে, তুমি এ সংসারে ছিলে যে কমলা !
অন্ন বস্ত্র স্নেহ প্রীতি,
আমরা পেয়েছি নিতি,
তােমার প্রসাদে ছিল গৃহের শৃঙ্খলা ।
আত্মীয় স্বজনগণে,
পাড়া-প্রতিবেশী সনে,
কি সখ্য সদ্ভাবে তুমি দিন গুয়াইলা।
ছােট বড় সৰ্বজনে,
যথাযােগ্য সম্ভাষণে,
প্রেম-ডােরে সকলেরে অাবদ্ধ রাখিলা।
কর নাই বিসম্বাদ,
অপকার, অপবাদ,
রূঢ় বাক্যে কারাে প্রাণে দাও নাই জ্বালা।
০ মৰ্ম্মবাণ অনাসক্ত ধনমানে, সদা মুক্তহস্ত দানে, অন্যের অভাবে হলে নিজে নিঃসম্বল। দেব-দ্বিজে দৃঢ় ভক্তি, ধৰ্ম্মকর্মে অনুরক্তি, অতিথি-বৈষ্ণব সেবা, নাম-জপ-মালা; ব্রত, তীর্থ, উপবাস, গঙ্গাস্নান বার মাস- এই করে’ মা তােমার জীবন কাটিলা ; আজন্ম আছিলে নিষ্ঠাবতী পুণ্যশীলা। অশীতি বরষ মা গাে এ জগতে ছিল ! বিশ বর্ষ অন্ধ হয়ে, দারুণ যাতনা স’য়ে, কত শােক তাপ লয়ে দিন কাটাইল ? কখন হইয়া ত্যক্ত, মুখেতে করনি ব্যক্ত “বিধির অবিধি তাই এ দুঃখ ভুঞ্জিল।” সংসারের ঝক্কাবাতে, বজ সম উৎপাতে, ভীষণ বসন্তরােগে মাতার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হইয়া যায় মর্মবাণ হয় নাই তব চিত্ত অশান্ত উতলা। সদা প্রীতিপূর্ণ মন, প্রেমে প্রসন্ন বদন, সার্থক “প্রসন্নময়ী” নাম পিতা দিলা; যথার্থই তুমি গাে মা ঈশ্বরের * বালা। বৃদ্ধা হয়ে মা তােমার ঘটেনি প্রমাদ। হলে চক্ষু দৃষ্টিহীন, বলিয়াছ অনুদিন “মাের প্রতি বিধাতার এও আশীৰ্বাদ। দেবদেবী দেখাশােনা, তীর্থস্থানে আনাগােনা, এ-লােকের ক্রিয়াকাণ্ড হয়ে গেল বাদ। ক্ষোভ নাই হয়ে অন্ধ, হৃদে হেরি শ্রীগােবিন্দ- রাধারাণী—ধ্যানে পাই অমৃত আস্বাদ। যখন মানসে চাই, প্রকট দেখিতে পাই, অন্তরে বিরাজে রাঙা যুগল শ্রীপাদ । আমার পিতার নাম প্রেমাদ ; মাতার নাম প্রসন্নমী; মাতামহের নাম ঈশ্বরচন্দ্র।
মৰ্ম্মবাণী
স্মরণে মননে পুণ্য,
এ জীবন মানি ধন্য,
দূরে যায় অন্তরের খেদ অবসাদ ;
অন্ধ করে বিধি মােরে মিটালেন সাধ।”
কত যত্নে মা মােদের করেছ পালন ;
দিনেকের ক্লেশ তব করিনি ক্ষালন।
মােদের হইলে রােগ,
তােমারি সে কষ্টভােগ,
অনাহারে অনিদ্রায় সময়-যাপন।
কতই শুশ্রষা সেবা,
অত আর পারে কেবা?
যত করিয়াছ মা গাে মােদের কারণ।
মােদের সুখের লাগি,
দিনে খেটে রাতে জাগি,
সাধ্যমতে করিয়াছ কত আয়ােজন।
অজ্ঞানে দিয়াছি কষ্ট,
করেছি অনেক নষ্ট,
তথাপি করনি তুমি পীড়ন তাড়ন।
স্নেহভরে মিষ্ট স্বরে,
মােদের শিক্ষার তরে,
বলিয়াছ কত হিত অমূল্য বচন।
মর্শবাণী
তােমার সে সব কথা,
মনে করে’ পাই ব্যথা,
করিনি তােমার প্রতি যােগ্য আচরণ ;
এমনি দুষ্কৃত আমি অতি অভাজন।
পিতৃমাতৃ-কাৰ্য্যে হয় জীবনের সুখ।
জনক-জননী-সেবা,
এর চেয়ে ধৰ্ম্ম কিবা ?
এ কৰ্ম্মে বঞ্চিত আমি, মনে রৈল দুখ।
সংসারে জড়িত হয়ে,
অর্থের ভাবনা লয়ে,
রহিলাম পরবাসে পরবৃত্তিভুক্।
পুত্ৰকৰ্ম্ম হ’ল ব্যর্থ,
দূরে গেল পরমার্থ,
হইলাম অকৃতার্থ আমি অহম্মুখ।
মাের কপালের লেখা,
অন্তিমে হ’ল না দেখা,
“স্বর্গাদপি গরীয়সী” মায়ের শ্রমুখ।
এই খেদে আজি মাের ফেটে যায় বুক!
মর্মবাণী
পরিসমাপ্তি ॥
চলে গেলে সবে ফেলে, ওগগা মহােদয় !
কাটিয়া সংসার-মায়া,
কাদায়ে সন্তান, জায়া,
প্রতিবেশী, আত্মপর, বন্ধুসমুদয়।
আরব্ধ পার্থিব কাজ,
শেষ বুঝি হ’ল আজ,
নিৰ্মাণ করিয়া ব্ৰহ্ম-উপাসনালয় ।
তাহার প্রতিষ্ঠা-ভার,
দিয়া পুত্রে আপনার,
রাখি নিত্যানন্দ পাণ্ডুলিপি অবস্থায় ;
•
*
পূজনীয় পণ্ডিত বীরেশ্বর প্রামাণিকের লােকাত্তর-প্রাপ্তি;
১৩ই কার্তিক, ১৩১৯।
+ শান্তিপুর ব্রহ্ম-মন্দিরের গৃহনির্মাণ শেষ হইলেই ইহার মৃত্যু
হয় ; ইহার প্রতিষ্ঠা-কাৰ্য্য করিয়া যাইতে পারেন নাই।
+ নিত্যানন্দচরিত সম্পূর্ণ লিখিয়া গিয়াছেন; পুস্তকাকারে
মুদ্রিত হয় নাই।
মর্মবাণী
অদ্বৈতবিলাস গ্রন্থ *
আজিও না হ’তে অন্ত,
অকস্মাৎ কেন তুমি লইলে বিদায় !
তােমার বিয়ােগে মােরা,
মৰ্ম্মাহত লক্ষ্যহারা,
দেখিতেছি এ সংসার পূর্ণ কালিমায়।
অপােগণ্ড শিশুগণ,
বােঝে না ‘মৃত্যু’ কেমন,
তাই ভাবে ফিরে বুঝি পাইবে তােমায় ;
ধূলা মাটি গায়ে মাখি,
পথপানে দৃষ্টি রাখি,
থাকে সবে তব আগমন প্রতীক্ষায়।
তুমি আসিবেনা আর,
এ কথা বুঝান ভার,
এরা যে অবােধ শিশু, না মানে প্রত্যয়।
যাঁহাকে দেখেছে চক্ষে,
উঠিয়াছে যার বক্ষে,
সে দেহের পরিণাম পঞ্চভূতে লয় ।
শ্ৰীঅদ্বৈতবিলাস গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ২০শ ফরম পৰ্য্যন্ত
মুদ্রিত দেখিয়া গিয়াছেন; গ্রন্থখানি তাহার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত
হইয়াছে।
৪
মর্মবাণী
এ সত্য দুর্বোধ অতি,
এতে—সুকুমার-মতি
শিশু কেন ? যুবাদেরও প্রবােধ না হয়।
কি বলে সান্ত্বনা দেব,
বিধান, বােচন, দেব, *
কঁদিয়া আকুল আজি না দেখে তােমায়।
যে অনাথ শিশু লাগি,
হয়েছিলে গৃহত্যাগী,
সয়েছ অশেষ ক্লেশ পালিতে যাহায় ;
কেমনে তাহারে ফেলি,
আজি তুমি গেলে চলি,
দয়া মায়া সব কি গাে ভুলে গেলে, হায় !
তুমি যে দয়ার নিধি,
এ তব কেমন বিধি,
তুমি কি থাকিবে আজি নির্দয়ের প্রায় !
বিধান-বিধানশরণ অনাথ বালক, এক বৎসর বয়সের
সময় হইতে প্রতিপালিত হইতেছে।
বােচন—জ্যেষ্ঠ পৌত্র নিত্যানন্দ।
দেব-দেবানন্দ, কনিষ্ঠ পুত্র।
+ নিজের বাসভবনে থাকি অনাথ শিশুটির প্রতিপালনের
অসুবিধা ঘটায় তিনি তাহাকে লইয়া কিছুদিনের জন্য গৃহান্তরিত
হইয়াছিলেন।
মর্মবাণী
;
পরের হিতের লাগি,
ছিলে সদা অনুরাগী,
আজীবন সেবিয়াছ দীন অভাগায় ;
নিজের অভাব জেনে,
তবু দেছ সঙ্গোপনে
অন্নবস্ত্র দীন জনে, দেখি অনুপায়।
গরীবের শিক্ষা তরে,
অনাহারে অকাতরে,
করেছ অবৈতনিক নৈশ-বিদ্যালয় ;
দারিদ্র্যের নিষ্পেষণ,
সহিয়াছ অনুক্ষণ,
অম্লান বদনে হয়ে প্রশান্ত হৃদয় ;
কর্তব্যের গুরুভার,
শিরে ধরি অনিবার,
চলেছ সংসার-পথে—তীব্র জ্বালাময়।
এবে শান্তিধামে গিয়া,
জুড়াক তাপিত হিয়া,
যে জ্বাল হেথায় কভু জুড়াবার নয় ।
পরমাত্মা সনে মিশি,
রহ এবে দিবানিশি,
কাটুক তােমার কাল ধ্যান ধারণায়।
মৰ্ম্মবাণী
সত্যে ছিল দৃঢ় প্রীতি,
লােক-সমাজের ভীতি,
ধৰ্ম্ম হতে বিচলিত করেনি তােমায়
নাম-গানে ছিল মতি,
তাহে হাে সদ্গতি,
সামীপ্য, সাযুজ্য লভি রহ সাধনায়।
ব্ৰহ্মযােগ ব্ৰহ্মজ্ঞান,
ব্রহ্মানন্দ-রস পান
কর এবে পরলােকে হইয়া তন্ময়।
তােমার গৌরব-স্মৃতি,
আমরা স্মরিয়া নিতি,
কথঞ্চিৎ শান্ত করি এ তপ্ত হৃদয়।
মােদের সান্ত্বনা দেহ,
দেহ অপার্থিব স্নেহ,
আর তব শুভ আশীর্বাদ, বরাভয় ;
আমাদের মতি গতি ধৰ্ম্মে যেন রয়।
-
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.