Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly

Puja

2010/04/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পূজা
সন্ন্যাসী দাদা বন্ধুদের দিয়া যে ভাবে পূজা করান সেই প্রণালী
অবলম্বনে লিখিত। মন্ত্রের অর্থ বুঝিয়া তবে তাহার স্পষ্ট
উচ্চারণে অভিপ্রায় সম্পূর্ণ সিদ্ধ হয়। সেইজন্য
প পুস্তিকার বহুল প্রচার প্রয়ােজন
লিয়া মনে করি। যাঁহাদের জন্য
প্রকাশিত হইল তাহাদের
কাজে লাগিলে কৃতার্থ
বােধ করিব।
রাসপূর্ণিমা ১৩৪৬
সাধারণ-পাঠ্য শ্লোকগুলি * চিহ্নদ্বারা এবং অবশ্য পঠনীয় শ্লোকগুলি
* চিহারা নির্ধারিত করা হইয়াছে।

প্রকাশক :
চুনীলাল সান্যাল
৩৩ এ রসারােড, কালীঘাট, কলিকাতা।
প্রাপ্তিস্থান :-
১। শ্ৰীযুক্ত সদানন্দ ব্রহ্মচারী,
৫২৪৬ লক্ষ্মীকুণ্ড, বেনারস।
২। @যুক্ত সর্বানন্দ ব্রহ্মচারী,
নাটশাল মঠ, পােঃ গেঁওখালী, মেদিনীপুর।
৩। যুক্ত হিমাংশুকুমার রায় চৌধুরী,
বরিশাল।
৪। শ্ৰীযুক্ত চুনীলাল সান্যাল,
৩৩ এ রসরােড়, কালীঘাট, কলিকাতা।
Muhlic Library
Uttarpar:: !!!,.'...
Accn. NO..২৬৪6CDate.৩.০৫. ৫৮-৫
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
প্রিন্টার-শ্ৰীঅপূর্বকৃষ্ণ বসু, ইণ্ডিয়া প্রেস লিমিটেড, বেনারস্ ব্রাঞ্চ
।

৬,
ভূমিকা
সাধারণতঃবিশেষতঃ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে
ভগবান ও সাধন-ভজন সম্বন্ধে অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধার জন্য
আমরাই দায়ী।
আমাদের কথা, ভাব ও কাজ দেখিয়া
লােকেরা ভগবানে বিশ্বাস কবিতে, সাধন-জন করিতে লুব্ধ
হয় না। আনন্দময়ের উপাসকের পক্ষে সর্বদা আনন্দে থাকা,
সকলকে আনন্দ দেওয়া একান্ত আবশ্যক।
সংশয় ও নিরাশ
ভাব নাস্তিকের পক্ষেই শােভা পায় । যে ভগবানে বিশ্বাস
করে, তাহার কোনও অন্যায় কাজ করিবার সাহস বা প্রবৃত্তি
না থাকাই উচিত।
আমি যে আছি—তাহা অস্বীকার করিতে পারি না। আগে
আমি, তাহার পরে আমার বিচার ও বিচারলব্ধ বিষয়। আমার
অস্তিত্ব স্বতঃসিদ্ধ । এই ‘আমি’র অনুসন্ধান করিতে গিয়া সাধক
একটা তত্ত্বের পরিচয় লাভ করেন; যাহা এক ফোটা রক্তকে
এমন সুন্দর একটা পুষ্ট মানব-শরীরে পরিণত করিয়াছেন,
যিনি আমার এই দেহ-ইন্দ্রিয় সৃষ্টি করিয়াছেন, যাঁহার সহিত
যােগ থাকায় আমি বাঁচিয়া থাকি, আমার চোখ দেখিতে পায়,
নিতে পায়, মন চিন্তা করিতে পারে, যাহার
।
কাণ

{ [ ৩ ] প্রকাশের অভাবে আমাদের আত্মীয়-স্বজনগণ পর্যন্ত আমাদিগকে মুখে আগুন দিয়া বিদায় দিতে বাধ্য হন, যাঁহার প্রকৃত তত্ত্ব, স্বরূপ-লক্ষণ বাক্য-মনের অগােচর । তত্ত্বদর্শী ঋষিগণ তাঁহাকে সচ্চিদানন্দ বলেন। তিনি জগতের অনন্ত বৈচিত্র্য, অনন্ত সৌন্দৰ্য-মাধুৰ্য-লাবণ্য, অনন্ত শক্তি-জ্ঞান- আনন্দের মূল প্রস্রবণ। তিনি অশেষ কল্যাণ গুণের আকর। তাহা হইতে বা হাতে এই অনন্ত জগৎ সৃষ্ট, পরিণত বা বিবর্তিত। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান্, সর্বব্যাপী—একাধারে বিধান ও বিধাতা। জীব-জগৎ তাহার মূর্ত বা প্রকটিত অবস্থা। তিনি পূর্ণস্বরূপ, যাঁহাকে জানিলে আর কিছু জানিতে বাকি থাকে না, যাহাকে পাইলে আর কিছু পাইবার আকাঙ্ক্ষা থাকে না। তিনি আমাদের ঈস্পিততম পরম পরম প্রিয়, চরম গতি। শাস্ত্রে ভগবান সম্বন্ধে সগুণ-নিগুণ, সক্রিয়-নিষ্ক্রিয়, সাকার-নিরাকারাদি অনেক বিরুদ্ধ ভাবের কথা দেখিতে পাওয়া যায়। ভগবানে রহিয়াছে যাবতীয় বিৰুদ্ধ ভাবের অপূর্ব সমন্বয় । ইহার কোন ভাবের ভিতরই তাহাকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি যে বাক্য-মনের অগােচর। সাধক আপন আপন অধিকার অনুসারে তাহার অভিলষিত তত্ত্ব ভগবানের ভিতরে আস্বাদ করিবার যােগ্যতা লাভ করে। ভগবৎ-তত্ত্ব অনির্বচনীয়। ভগবান, এমন কি তাহার সাধকগণ পৰ্যন্ত অয়স্কা মণির ন্যায়--সেখানে যে যাহা চায়, সে তাহা পায় দূর [ ৩ ] সাধন কি?—ভগবৎ-প্রাপ্তির, পূর্ণতা লাভের সহজ, সুন্দর ও স্বাভাবিক উপায়ের নাম সাধনা। যাহা দ্বারা আমাদের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণ পরিণতি লাভ হয়- তাহাই সাধনা। শরীরটা সুস্থ, সবল ও কার্যক্ষম হইবে; মনটা জ্ঞানে, প্রেমে, আনন্দে ভরপূর থাকিবে; সব জীবকে আমার প্রেমাস্পদের শ্রীভগবানের জীয়ন্ত বিগ্রহ জানিয়া সকলের কল্যাণ সাধনে, শান্তি বিধানে আমরা সচেষ্ট থাকিব ইহাই সাধনার লক্ষ্য। সাধনা সম্বন্ধে লােকের বিকৃত ধারণা করিতে পারিলে আমাদের বিশ্বাস, এমন কি অবিশ্বাসী নাস্তিক পর্যন্ত সাধন-ভজন করিতে লুব্ধ হইবেন। শরীরে স্বাস্থ্য, মনে আনন্দ কে না চায় ? ভগব-বিধান জানিয়া, তদনুসারে চলিয়া, জীবনের উন্নতি লাভ করিয়া পরমানন্দে বাস করাই সাধন-ভজনের উদ্দেশ্য। যাহারা উন্নতি ও শান্তি- লাভের জন্য সচেষ্ট, তাহারা অজ্ঞাতসারে আমাদের শ্রীভগ- বানের সাধনা করিতেছেন। সাধন-তত্ত্ব অবগত হইলে তাহারা বুঝিতে পারিতেন কি উপায়ে সহজ সুন্দর ও স্বাভাবিক ভাবে চরম উন্নতি ও পরম শান্তি লাভ করা যায়। শাস্ত্র, গুরু ও বিবেকের সাহায্যে জানিতে হইবে আমার জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য কি—অর্থাৎ আমি কি করিতে আসিয়াছি, কোথায় আমার জীবনের চরম সার্থকতা এবং কি উপায়ে আমি সেই পূর্ণ পরিণতি ও পরম শান্তি লাভ করিতে পারিব। পণ্ডিতগণ বিশেষভাবে বিচার করিয়া দেখিয়াছেন, অর্থাদি আত্মীয়-স্বজন ভােগৈশ্বৰ্য্য [ ৩ ] সাময়িক সুখ দিলেও সে সুখ স্থায়ী হয় না। তাহাতে প্রাণের প্রকৃত পিপাসা মিটে না। ঋষিগণ জীবনে প্রত্যক্ষ করিয়া প্রমাণিত করিয়া গিয়াছেন—জীবের চরম উদ্দেশ্য ভগবৎ-প্রাপ্তি; ভগবৎ-প্রাপ্তির অর্থই পূর্ণ পরিণতি বা চরম শান্তিলাভ। আমাদের দেহ, মন ও আত্মার যাবতীয় কাৰ্যগুলিকে ভগবৎ- প্রাপ্তির পূর্ণতা লাভের অনুকূল করিয়া ভােলাই আমাদের সাধনা। জ্ঞানের বা জ্ঞানীর সাহায্যে এই পরম তত্ত্ব ও তাহার প্রাপ্তির উপায় জানিয়া লইতে হইবে, কর্মক্ষেত্রে জীবনকে তদনুসারে চালিত করিয়া পরম শান্তি লাভ করিতে হইবে, অর্থাৎ জীবনের উদ্দেশ্য সফল করিয়া তুলিতে হইবে। সাধন-প্রণালী সাধারণতঃ দুইভাগে বিভক্ত। ১। সাধন অবস্থার জন্য । ২। সিদ্ধ অবস্থার জন্য। ১। ভগবানকে-ভগবৎ-তত্ত্বকে নিত্য সিদ্ধ স্বয়ং প্রকাশ বলা হয়। সাধন-ভজন শুধু তাহার বাধাগুলিকে দূর করিয়া দেয় মাত্র। “নিত্য সিদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম সাধ্য কভু নয়। শ্রবণাদি শুদ্ধচিত্তে করয়ে উদয় ।” চৈ চ । “নিমিত্তম প্রয়ােজকং প্রকৃতীনামাবরণভেদস্তু ততঃ ক্ষেত্রিক- বৎ।” পাতঞ্জলি। এই আবরণ-মলিনতা, অজ্ঞানতা, সংস্কার, কামনা, বাসনা, আসক্তি, অহঙ্কার, নিজ সুখস্পৃহা ও প্রতিষ্ঠার মােহ আদি। বলা বাহুল্য এইগুলি দূর করিতে সকল সম্প্রদায়ই [ ৩ ] লীলারস আস্বাদন, আনন্দপ্রতিষ্ঠা দ্বারা তিনি আনন্দরসে বিভাের ও সমাহিত থাকেন। প্রকৃত সাধকের চোখে সংসার ভগবানের আনন্দধাম, জীব -পােষাকপরা শিব, ভগবানের জীয়ন্ত বিগ্রহ। মা-বাপ- অন্নপূর্ণা-বিশ্বনাথ ; স্বামী—শিব, রাম বা কৃষ্ণ; স্ত্রী-ভগবতী, সীতা বা রাধা ; ছেলে-বালগােপাল ; মেয়ে—কুমারী ভগবতী। সকলের ভিতর দিয়া তাহার ধ্যান ও দর্শন লাভের জন্য তাহারা প্রার্থনা করেন—সকলের সেবাই পরিণত হয় তাহাদের পূজায়। জীবন হয় মধুময়, কাৰ্য্য হয় সাধনময়, নিদ্রা হয় সমাধি। পূজা—শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বা তত্ত্বের সান্নিধ্য দ্বারা শ্রেষ্ঠতা লাভ করা। উপাসনা—উপাস্যের সান্নিধ্য দ্বারা উপাস্যের ভাবে পরিভাবিত হওয়া ;—যেমন আগুনের সান্নিধ্যে দেহ গরম হয়, বরফের সান্নিধ্যে দেহ শীতল হয়। কোন আদর্শ জীবন বা আদর্শ তত্ত্ব সম্মুখে রাখিয়া ধ্যান-ধারণা, সমাধি দ্বারা তঁাহাতে প্রীতি ও তঁাহার প্রিয় কার্য সাধনের দ্বারা তন্ময়তা লাভ করাই পূজার উদ্দেশ্য। আদর্শ চরিত্র অবলম্বন করিয়া নিজের জীবন আদর্শস্থানীয় করিয়া তুলিতে যাঁহারা সচেষ্ট, তাহারা মানুন আর না মানুন, সেই আদর্শচরিত্রেরই পূজা করিয়া থাকেন। ‘মুক্তিৰ্হিত্বান্যথা খ্যাতিঃ স্বরূপেণাবস্থিতিঃ। আমাদের শাস্ত্রে সিদ্ধিকে স্বরূপ উপলব্ধি, মুক্তিকে অন্যথা খ্যাটি বিসর্জন পূর্বক স্বরূপে অবস্থিত বলা হইয়াছে।

হার রহিয়াছে নিজের গলায়, অথচ গলার দিকে না চাহিয়া
আমরা হারের অন্বেষণে ব্যস্ত। কস্তুরী রহিয়াছে মৃগের
নিজ নাভিদেশে, অথচ কস্তুরীগন্ধে লুব্ধ হরিণ পাগলের
ন্যায় ছুটিয়া বেড়াইতেছে। ভগবান রহিয়াছেন আমাদের
ভিতরে, তাহার শক্তিতেই সব কাজ সাধিত হইতেছে, তিনি
আমাদের ভিতরেই লীলারত। অথচ আমরা ভিতরের দিকে।
চাহিয়া বাহিরে তাহাকে খুজিয়া বেড়াইতেছি। আমাদের
ভিতরের লুক্কায়িত তত্ত্বকে তাই বাহিরের মুর্তিতে আরােপ
করিয়া, শাস্ত্রোক্ত বিধান মতে সাধনা দ্বারা তাঁহার স্বরূপ উপলব্ধি
করিয়া, ধ্যান-ধারণা ও সমাধি দ্বারা তাহাতে তন্ময়তা লাভ করিয়া
তখন আমাদের ভিতরেই সেই অদৃষ্ট তত্ত্বের দর্শন লাভ করি।
যাহা সত্য হইয়াও অসত্য বা অসম্ভব মনে হইত, তাহাতে
সত্যারােপ করিয়া সেই সত্য প্রত্যক্ষ করাই আমাদের সাধনের
সুতরাং আমাদের পূজা-বিস্মৃত স্বরূপ-তবে
পুনৰুপলব্ধি।
অসাধক অবস্থায় যার মত হওয়া তাে দূরের কথা,
যাহার
অস্তিত্বে পৰ্যন্ত বিশ্বাস করিতে পারিতাম না, সদ্গুরু সেইরূপ
একটা আদর্শ জীবন চোখের সামনে ধরিয়া তাহার সঙ্গে কতকটা
পরিচয় করাইয়া দিলেন। পরে তাহার সান্নিধ্যে তাহার তত্ত্ব
উপলব্ধির পরিণামে নিজের ভিতরটা যতই তভাবে ভাবিত হইতে
লাগিল, ততই আমি অজ্ঞাতসারে তাহার মত হইতে লাগিলাম।
পরিশেষে এমন একটা সময় আসিল, যখন সেই আদতত্ত্বে
উদ্দেশ্য।

; [ ৩ ] সমাহিত হওয়ার ফলে নিজে সেই আদর্শের সাপ্যলাভ করিয়া আদর্শময় হইয়া গেলাম। যাহা অসম্ভব মনে হইয়াছিল, তাহা সত্য তত্ত্বে পরিণত হইল। সাধনা দ্বারা সাধক ইষ্টতত্ত্বে সমাহিত হইয়া ইষ্টময় হইয়া যান। ব্রহ্মবি ব্ৰহ্মৈব ভবতি কথাটার প্রকৃত অর্থ তখন বুঝিতে পারা যায়। যে কোন তত্ত্ব যে পর্যন্ত সিদ্ধ জীবনে দৃষ্ট হইয়া সাধনা দ্বারা উপলব্ধ হইয়া নিজের জীবনে প্রত্যক্ষীভূত না হয়, সেই পর্যন্ত সেই তত্ত্বের প্রকৃত অর্থ আমরা বুঝিতে পারি না। দীক্ষার মন্ত্র থাকে একটি শব্দ। ইষ্টের জীবনের ভিতর দিয়া উপলব্ধি হয় তার অর্থ; সাধনা দ্বারা প্রতি তত্ত্বে তাহার লীলা অনুভব করার ফলে হয় তাহার প্রাণপ্রতিষ্ঠা ; ফলে আসিয়া পড়ে মন্ত্রের সিদ্ধি। সাধনার জন্য বৈদিক যুগে শিষ্যকে গুরুগৃহে যাইতে সেখানে শিষ্যকে গুরুর মত অনুসারে সব কাজ করিতে হইত। তাহার ফলে শিষ্য যাবতীয় উচ্ছলতার হাত হইতে রক্ষা পাইয়া প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করিবার সুযােগ কারণ, স্বাধীনের অর্থ স্ব-এর, আত্মার, ভগবানের, ভগব-বিধানের অধীন হওয়া। সংযত শুদ্ধ শিষ্য, শাস্ত্র গুৰু ও বিবেকের সাহায্যে নিজের জীবনের লক্ষ্য নির্ণয় করিয়া সেই লক্ষ্যের পূর্ণ বিকাশ ও স্বরূপ, সদ্গুরু বা ইষ্টতত্ত্বের ভিতর দিয়া উপলব্ধি করিয়া সেই আদর্শে জীবন গঠন করিয়া তাহাতে তন্ময় লাভের ফলে নিজের ভিতরে বীজাকারে নিহিত ভগবৎ- পাইত।

[ ॥• ]
শক্তিকে পূর্ণ বিকশিত করিয়া তুলিবার সুযােগ পাইত। গুৰু
স্বধৰ্ম্মতত্ত্ব, নিজের প্রতি কর্তব্যরূপ আশ্ৰমতত্ত্ব এবং সমাজের
জীবজগতের প্রতি কর্তব্যরূপ বর্ণতত্ত্ব ও তাহাদের সাধন-প্রণালী
উত্তমরূপে বুঝাইয়া দিতেন। নিজের জীবনে ভগবদিচ্ছা
অবগত হইয়া স্বধর্ম পালন দ্বারা সেই ইচ্ছা পূর্ণ করিবার জন্য
ব্ৰতী হওয়ার নামই ছিল দীক্ষা। গুরুকে—নিজের ইষ্টকে মনে
হইত নিজের ভিতরকার বীজরূপে নিহিত ভগবচ্ছক্তির পূর্ণ
বিকশিত অবস্থা। তাহার আদর্শে জীবন গঠন করিয়া
তাহাতে তন্ময়তা লাভের ফলে ঠিক তাহার মতন হইয়া উঠাই
ছিল সাধনার উদ্দেশ্য।
সাধকগণকে সাধারণতঃ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা
যায়। জ্ঞানীর প্রধান লক্ষ্য ব্রহ্মে তাদাত্ম-লাভ; উপায়-
আত্ম-অনাত্ম তত্ত্বের বিবেক। যােগীর লক্ষ্য ব্রহ্মের সহিত
যুক্ত থাকা; উপায়—ব্ৰহ্মজ্যোতিঃর ধ্যান বা
ব্রহ্মজ্যোতিঃর ধ্যান বা অনাসক্ত,
ফলাকাঙ্ক্ষাবজ্জিত হইয়া যজ্ঞার্থে কৰ্ম্মসাধনা। ভক্তের লক্ষ্য
ভগবৎ-প্রেম লাভ করা, জীবনে কথা, ভাব ও কাজের ভিতর
দিয়া ভগবৎ-ইচ্ছা সফল করিয়া তােল; উপায়-ভগবানে
আত্মনিবেদন, সর্বত্র ভগবং-লীলার অনুভূতি, জীবজগৎকে
ভগবদ্‌-বিভূতি জানিয়া জীবের সেবাদ্বারা ভগবানের সেবা
করা। ভক্তিযোগের মধ্যে আবার শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য
ও মধুর ভাবের সাধকও দৃষ্ট হয়।
পূজা এক রকম Auto-suggestion-নিজের অনু-

[ ৩ ] ভূতিকে আদর্শ চরিত্রে আরােপিত করিয়া তাহার ভিতরে ভগবদ্ভাবের ধ্যানের দ্বারা ভগবত্তা উপলব্ধি করিয়া সেই ভগবৎ-তত্ত্বকে ভগবদ্ভাবকে নিজের ভিতরে ফুটাইয়া বাহির করিয়া, অনুভব করিয়া, ভগবদ্ভাবে পরিভাবিত হইয়া যাওয়াই পূজার উদ্দেশ্য। তিনি আমাদের ভিতরে রহিয়াছেন, তাহাকে আমরা দেখিতে পাই না, তাঁহার অস্তিত্বে বিশ্বাস করিয়া মনকে বাহ বিষয় হইতে উঠাইয়া লইয়া কল্পনার সাহায্যে ভিতরে সেই ভগবৎ-তত্ত্বের ধ্যান করিতে করিতে সেই লুক্কায়িত ভগবৎ-তত্ত্ব আমাদের অনুভবে আইসে। যে সব তত্ত্ব স্থূল দৃষ্টিতে দর্শন করা যায় না, চিন্তার সাহায্যে ধারণায় আনা যায় না, সেই তত্ত্ব উপলব্ধি করিবার একমাত্র উপায়—যিনি সেই তত্ত্ব উপলব্ধি করিয়াছেন, তঁাহার উপদেশ মত সাধন-ভজনের দ্বারা সেই তত্ত্ব উপলব্ধির চেষ্টা করা। অপরােক্ষদর্শীর অনুভূত সত্য লইয়া আমাদের শাস্ত্র। বিজ্ঞান এবং দর্শন তাহাকে খণ্ডন না করিয়া কালে মণ্ডন করিতে বাধ্য হইবে ইহা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। এইজন্য বিজ্ঞানের বহুল প্রচার আমরা এত ভালবাসি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসিবে, যখন শিক্ষিত সম্প্রদায় আমাদের সাধন-পদ্ধতিকে বিজ্ঞানসম্মত ও কল্যাণ প্রদ মনে করিয়া সাধনার ভিতর দিয়া সিদ্ধিলাভে সচেষ্ট হইবেন। ভগবান জগৎ সৃষ্টি করিয়া সমস্ত সৃষ্ট পদার্থে অনুপ্রবিষ্ট হইলে জগতের সব কাজ তাঁহার সান্নিধ্যে, তাহার ইচ্ছায়,

।
[ ৫ ]
তাহার শক্তিতে সাধিত হইতেছে। জীবের অহঙ্কার, জীবের ও
ভগবানের মাঝখানে পঁাড়াইয়া তাঁহাকে দেখিতে দেয় না ;
তঁাহার সব কাজকে নিজের কাজ বলিয়া প্রচার করিয়া সব
কাজকে বিকৃত করিয়া ভগবৎ-লীলা আস্বাদ করিতে, ভগবৎ-ইচ্ছা
সফল হইতে, ভগবৎ-লীলা অনুভব করিতে বাধা দেয়। ফলে
আনন্দধাম মনে হয় একটা সংসারের বন্দিশালা, লীলা মনে হয়
একটা কৰ্মভােগ, কর্মে আলিয়া পড়ে একটা বন্ধনবােধ, আত্মীয়
হইয়া পড়ে অনাত্মীয়, আপন হইয়া পড়ে পর, জীবনটা আনন্দের
ফুরণ না হইয়া ঘাড়ে পড়ে একটা দুর্বিষহ বােঝ। রঞ্জুকে
কল্পিত সপবােধে নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত আনন্দ স্বরূপকে মনে
করিয়া ফেলি—অনিত্য মলিন ত্রস্ত ভীত অশান্ত দুঃখ-প্রপীড়িত।
ভগবান ও জীবের ভিতরকার এই কল্পিত আবরণটা অপসারিত
হইয়া যাহাতে স্বপ্ৰকাশ ভগবান অবাধিতভাবে প্রকাশিত অনু:
ভূত হন, তাহার ইচ্ছা যাহাতে আমাদের জীবনে পূর্ণ সফলতা
লাভ করিয়া আমাদের দেহাদিকে তঁাহার হাতের একটি যন্ত্ররূপে
পরিণত করে, আমাদের জীবনকে যাহাতে তঁাহার লীলারসের
স্ফুরণরূপে, আনন্দের প্রকাশরূপে অনুভব করিয়া, জগৎকে
আনন্দধামরূপে জীবকে পােষাকপরা শিবরূপে অনুভব করিয়া
আমরা তাহার লীলারস আস্বাদ করিতে করিতে তাহার আনন্দে
বিভাের হইয়া তন্ময়তা লাভ করিতে পারি, তাহাই পূজার
সাধন-ভজনের উদ্দেশ্য ।
ওঁ তৎসৎ

ওঁ
সকালে ও সন্ধ্যার পুজা
বিষ্ণুস্মরণ :-
** ওঁতৎসৎওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা
পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম। ১।
ওঁ (নিগুণ সগুণ ব্ৰহ্ম) তৎসৎ ( তিনিই সৎস্বরূপ)
তদ্বিষ্ণোঃ ( সেই বিষ্ণু ভগবানের, অনিৰ্দেশ্য সৰ্বব্যাপক
পরমাত্মার) পরমং পদং (শ্রেষ্ঠস্বরূপ ও তৎ প্রাপ্তির উপায় )
সূরয়ঃ (সংযত তত্ত্বদশী ঋষিগণ) দিবি (স্বর্গে কারণ-শরীরে
কূটস্থে স্থিত হইয়া) সদা আততং চক্ষুঃ ইব (বিস্তৃত চক্ষুর ন্যায়
বিশ্বচক্ষুরূপে-যেন তিনি সব দেখিতেছেন, শুনিতেছেন,
জানিতেছেন এইভাবে) পশ্যন্তি (দেখেন, শুনেন ও জানেন)।
অথবা-দিবি (আকাশে) চক্ষুঃ যথা আততং (যেমন
অব্যাহতভাবে—অবাধিতভাবে) পশ্যতি দেখে) তথেতি
( ঠিক সেইরূপে দেখেন)। ঋষিগণের অপরােক্ষ দর্শন খুলিয়া
যাওয়ায় তাঁহারা সর্বত্র ভগবানকে দেখেন।
' দেখিতেছেন—এই বিশ্বাস চিত্তশুদ্ধির সহায়। অর্থাৎ ভগবান
আছেন, তিনি সব দেখিতেছেন, সব জানিতেছেন। সত্যবাদী,
সত্যদশী ঋষিগণ তাহার সাক্ষী।।
তিনি সব

=-
২
।
পূজা
সৰ্ব্বতঃপাণিপাদংতৎসৰ্ব্বতােহক্ষিশিয়ােমুখম
সৰ্বতঃ শ্রুতিমল্লোকে সৰ্বমাৰ্বত্য তিষ্ঠতি। ২
তৎ [ বিষ্ণুঃ ] (সেই ব্যাপক পরমাত্মা) সৰ্ব্বতঃ
( সর্বত্র ) পাণিপাদং (হস্তপদবিশিষ্ট সকল জীবের হাত-পায়ের
ভিতর দিয়া কাজ করেন। সর্বতো অক্ষিশিয়ােমুখং (সব
জায়গায় চক্ষু, মস্তক ও মুখবিশিষ্ট সকলের চোখ দিয়া দেখেন,
মুখ দিয়া ভােজন করেন ও কথা বলেন, সকলের মাথার ও চক্ষুর
মধ্যে তঁাহার মাথা ও চক্ষু বৰ্তমান) সৰ্বতঃ শ্রুতিমৎ ( সর্বত্র
শ্রবণেন্দ্রিয়যুক্ত সকলের কাণের ভিতর দিয়া তিনি শ্রবণ করেন)
লােকে (ব্রহ্মাণ্ডে) সমাবৃত্য তিষ্ঠতি (সকলকে আবৃত
করিয়া তিনি অবস্থিত ; সকলের মধ্যে গুপ্তভাবে থাকিয়া
প্রকাশ পাইতে তৎপর ;-জগতের যাহা কিছু সে সব
তাঁহারই প্রকাশ)! অর্থাৎ একই শক্তি যেমন বিভিন্ন আধারের
ভিতর দিয়া প্রকাশ পায়, বিভিন্ন কাৰ্য্য সাধন করে, আমাদের
ভগবানও তেমনই আমাদের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ে অধিষ্ঠিত থাকিয়া
বিভিন্ন কাৰ্য্য সম্পাদন করাইতেছেন। আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি
তাহার প্রকাশের যন্ত্রবিশেষ। ২।
সৰ্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সৰ্বেন্দ্ৰিয়বিবর্জিত
অসং সৰ্বভূচ্চৈব নিগুণং গুণভােক্তৃ চ ৷৩৷৷
তৎ (তিনি) সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং (জীবের সকল ইন্দ্রিয়ের
গুণ বা শক্তির প্রকাশক ) [ এইজন্য হাতে আমরা ইন্দ্রিয়ের

নাই)। পূজা গুণ আরােপ করিয়া তাহাকেও ইন্দ্রিয়যুক্ত মনে করি ; অচল •তিনি ] সৰ্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতঃ (তাহার নিজের কোনও ইন্দ্রিয় অসং (অনাসক্ত অস্পৃষ্ট হইয়াও) সভৃৎ (সকলকে ভরণ করিয়া থাকেন) নিগুণং চ (নিজে গুণরহিত গুণাতীত হইয়াও) গুণভােতূ ( গুণসকলের ভােক্তারূপে কল্পিত) [ মনে হয়, তিনিই যেন গুণসকল ভােগ করিতেছেন ]। অর্থাৎ শক্তি যন্ত্রের সাহায্যে কাজ করিলেও সে নিজে যেমন যন্ত্র হইতে স্বতন্ত্র, ভগবানও সৃষ্টি-স্থিতি-য়ের কাৰ্য্য সাধন করিয়াও নিজে অবিকৃত, নির্লিপ্ত। ৩। বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ। । সূক্ষ্মত্বাৎ তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থৎ চান্তিকে চ তৎ। ভূতানাং (ভূতগণের) বহিঃ ( বাহিরে ) চ (এবং) অন্তঃ ( ভিতরে) [ তিনি সকলের ভিতরে বাহিরে অবস্থিত ] অচরং (স্থাবর) চরং (জঙ্গম) ( অর্থাৎ চরাচর সর্বত্র তিনি বৰ্তমান] সূক্ষমাৎ ( সূক্ষ অতীন্দ্রিয় তত্ত্ব বলিয়া) অবিজ্ঞেয়ং (তিনি অজ্ঞাত) [ তাহাকে আমরা জানিতে পারিতেছি না ] দূরস্থং (তিনি দূরে ) তৎ অস্তিকে চ (তিনি নিকটেও) [ সৰ্ব্ব- ব্যাপী বলিয়া কাছেও তিনি, দূরেও তিনি ]। অর্থাৎ ভগবান সূক্ষাতত্ত্ব মন-বুদ্ধির অতীত বলিয়াই আমরা তাকে জানিতে পারি না। তিনি দ্রষ্টা বলিয়া দৃশ্য নন। ৪।

পূজা অবিভক্তং চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিত। ভূতভর্তৃ চ তজজ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্ৰভবিষ্ণু চ।৫। ভূতেষু চ ( প্রাণীদের ভিতরেও) অবিভক্তং (অভিন্ন এক বহুত্বহীন) [ সদপি-হইয়াও ] বিভক্তমিব চ স্থিতং (বিভক্ত পৃথক পৃথক রূপে অনুমিত হন) ভূতভর্তৃ (ভূতগণের পালন- কর্তা) গ্রসিষ্ণু (প্রলয়কালে গ্রহণশীল—যাহাতে সব নয় হয়। প্রবিষ্ণু চ (উৎপত্তির কারণও) তৎ জ্ঞেয়ং (তিনি জ্ঞাতব্য ) [ তিনি জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয়কারূপে জানিবার বিষয়]। অর্থাৎ তিনি এক অখণ্ড তত্ত্ব। বহুত্বের ভিতর দিয়া বহুভাবে প্রতীয়মান হইলেও তিনি এক অদ্বিতীয় তত্ত্ব, তিনি জগৎজীবের মধ্য দিয়া অকৰ্ত্তা অভােক্তা হইয়াও ভােক্তারূপে অনুভূত । ৫। জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে। জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সৰ্বস্য বিষ্ঠিত। তৎ (ব্ৰহ্ম) জ্যোতিষা অপি জ্যোতিঃ (সূৰ্য্যাদি প্রকাশকেরও প্রকাশক ; “ন হত্র সূৰ্য্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতে ভান্তি কুহেয়মগ্নি। তমেব ভান্তমমুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সৰ্ব্বমিদং বিভাতি।” তাহার নিকট সূৰ্য-চন্দ্র তারকা প্রকাশ পায় না—অগ্নির কথা আর কি বলিব ; তাহারই প্রকাশে ইহারা সকলে প্রকাশিত ; এ সকল তাহারই প্রকাশ । । ।

পূজা বিশেষ) তমসঃ (অজ্ঞান হইতে প্রকৃতি হইতে) পরম্ উচ্যতে (শ্রেষ্ঠ বলিয়া কথিত “আদিত্যবৰ্ণং তমসঃ পরস্তাৎ” অজ্ঞানের অতীত বলিয়া তাহাকে সূৰ্যবৎ প্রকাশক বলা হয় )। অর্থাৎ তঁাহারই প্রকাশে সব প্রকাশিত। তঁাহার তত্ত্ব বাক্য-মনের তাগােচর-জ্ঞানস্বরূপ যে বলা হয় তাহাও অজ্ঞানস্বরূপ নন এই ভাব প্রকাশ করিবার জন্য । জ্ঞানং (তিনি নিত্য নম্বরূপ) জ্ঞেয়ং ( তিনি জ্ঞেয়রূপে বর্ণিত) জ্ঞানগম্য (সাধক-হৃদয়ে চিরূপে প্রতিভাত) [ তিনি একাধারে জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতা] সর্বস্ত হৃদি (সকলের হৃদয়ে বিশুদ্ধ বুদ্ধিতে) বিষ্টিতম্ (অধিষ্ঠিত অর্থাৎ বর্তমান) এক অখণ্ড, অদ্বয় তত্ত্ব একাধারে ভােক্তা, ভােগ্য, ভােজন; জ্ঞাতৃ, জ্ঞেয়, জ্ঞান ; দ্রষ্টা, দৃশ্য, দর্শনরূপে তিনভাগে বিভক্ত; জ্ঞাতাও তিনি, জ্ঞেয়ও তিনি, জ্ঞানও তিনি। অর্থাৎ পরমাত্মা এক অদ্বয় তত্ত্ব হইয়াও ছিন্নমস্তার ন্যায় একাধারে ভােক্তা, ভােগ্য, ভােজন; জ্ঞাতা, জ্ঞেয়, জ্ঞান; দ্রষ্টা, দৃশ্য, দর্শনরূপে তিনভাগে বিভক্ত বলিয়া অনুমিত। ৬। * প্রভাতে যঃ স্মরেন্নিত্যংদুর্গা দুর্গারদ্বয়ম। আপদস্তস্য নশ্যন্তি তমঃ সূর্যোদয়ে যথা ॥৭। যঃ (যে ) নিত্যং প্রভাতে (প্রতিদিন নিয়মিত প্রভাত সময়ে) দুর্গা দুর্গা অক্ষরদ্বয়ম্ (“দুর্গা” “দুর্গা” এই দুইটা তক্ষর) স্মরেৎ (স্মরণ করে) তস্য আপদঃ (তাহার সমস্ত আপদ) অখণ্ড ২

পূজা
সূর্যোদয়ে তমঃ যথা (সূৰ্য উদয় হইলে যেমন অন্ধকার নাশ
হয় ) [ তথা ] নশ্যন্তি (নাশ হয় )।
অর্থাৎ যে আপনাকে সর্বদা দুর্গতিহারিণী মা দুর্গার
অভয় কোলে অবস্থিত মনে করে, দুঃখ কষ্ট ভাবনা চিন্তা
তাহার কাছেও যাইতে পারে না। নিশ্চিন্তমনে ভগবৎ
ধ্যান করিতে সে কখনও বাধা পায় না। ৭।
# হে বিশ্বনাথ করুণাময় রাত্রিকালে
স্থিত্বা ত্বয়া সহ সুখং বিগতমােইহম।
গ্লানিশ্চ দেহমনসােহপি বিনির্গত মে
প্রাতঃ প্ৰয়ামি বহিরীশ বৈব গেহে।৮৷৷
হে করুণাময় বিশ্বনাথ (হে করুণাময় জগদীশ্বর) রাত্রি-
কালে ( রাত্রিতে) ত্বয়া সহ (তােমার সহিত) সুখং স্থিত্বা
(সুখে থাকিয়া) অহম বিগতশ্রমঃ (আমি বিগতশ্রম
হইয়াছি, আমার শ্রম অপনােদন হইয়াছে) মে (আমার)
দেহমনসঃ অপি (দেহ ও মন হইতেও) গ্লানিঃ চ (গ্লানিও)
বিনির্গত (বিদূরিত হইয়াছে)। হে ঈশ (হে জগৎপতে)
প্রাতঃ (অধুনা প্রাতঃকালে) তব এব গেহে (তােমারই
শ্ৰীমন্দিরে) বহিঃ প্রয়ামি (বহির্গত হইতেছি )।
অর্থাৎ মা যশােদা যেমন ভােরবেলা তাহার প্রাণের
গােপালকে সাজাইয়া গােচারণে পাঠাইতেন, প্রত্যেক সাধকও

৭ পূজা সেইভাবে ভােরবেলা মায়ের ধ্যানে শুদ্ধ সুন্দর তন্ময় হইয়া মায়ের সংসারে মায়ের সঙ্গে লীলা করিতে গমন করেন। ৮। ওঁ লােকেশ চৈতন্যময়াধিদেব শ্রীকান্ত বিষ্ণো ভবদায়ৈব। প্রাতঃ সমুখায় তব প্রিয়ার্থ সংসারযাত্ৰামনুবৰ্ত্তয়িয্যে ॥৯৷৷ হে লােকেশ (হে ত্রিলােকের নাথ) হে চৈতন্যময় (হে সৰ্ব্বভূতে চিন্ময়স্বরূপ) অধিদেব (হে দেবাদিদেব) হে শ্রীকান্ত (হে শ্রীকান্ত, সর্বৈশ্বৰ্য্যাধিপতি ) হে বিষ্ণো (হে সৰ্বব্যাপি পরমেশ্বর ) ভবদাজ্ঞয়া এব (তােমার আজ্ঞানুসারেই ) প্রাতঃ সমুথায় (প্রাতে উত্থান করিয়া) তব প্রিয়ার্থং তােমার প্রিয় কাৰ্য সাধন করিবার নিমিত্ত) সংসার- যাত্রা অনুবৰ্ত্তয়িয্যে (সংসার-যাত্রা অনুপালন করিব )। ৯। প্রার্থনা—( প্রাতে) ** সেবাব্রতং জনহিতঞ্চরিতুঞ্চ তত্র শক্লোমি যেন ভগবংস্তব কিঙ্করােহহম্। মাং পশ্য চালয় বিভাে সততঞ্চ বক্ষ পূর্ণাভবত্বনুদিনং ময়ি তে শুভেচ্ছা৷১ ৩ ৷৷

পূজা
ভগব (হে ভগবান) অহং (আমি) তব (তােমার)
কিঙ্করঃ (আজ্ঞাকারী ভৃত্য) জনহিতং (জীবের কল্যাণ প্রদ)
সেবাব্রতং (সেবারূপ ব্রত) চরিতুঞ্চ (পালন করিতে) তত্র
(তােমার সংসারে) শক্লোমি (যেন সমর্থ হই)। মাং পশ্য
(আমাকে দেখ, দেখিও) চালয় (চালিত করিও) সততং চ
রক্ষ ( সর্বদা রক্ষা করিও) ময়ি ( আমাতে) তে (তােমার)
শুভেচ্ছা (জীবহিত সাধনরূপ ইচ্ছা) অনুদিনং ( প্রত্যহ)
পূর্ণা ভবতু (যেন পূর্ণ সফল হয়)। অর্থাৎ আমার জীবনে
তােমার ইচ্ছা পূর্ণ সফলতা লাভ করুক। ১০।
#জানামি ধৰ্ম্মং ন চ মে প্রবৃত্তি
জানামধৰ্ম্মং ন চ মে নিবৃত্তি।
হয়। হৃষীকেশ হৃদি স্থিতেন
যথা নিযুক্তোহস্মি তথা কয়রামি৷১১।
অহং (আমি) ধৰ্ম্মং (ধৰ্ম্মকে) জানামি (জানি—কি
কাজ করা উচিত তাহা আমি জানি ) ন চ মে প্রবৃত্তিঃ ( তবুও
তাহা সাধনে আমার প্রবৃত্তি নাই) অধৰ্ম্মং (অধৰ্ম্মকেও)
জানামি ( জানি—কি করা উচিত নয় তাহাও জানি) ন চ মে
নিবৃত্তিঃ (তবুও তাহা হইতে নিবৃত্ত হই না) হৃষীকেশ (হে
হৃষীকেশ ইন্দ্রিয়-নিয়ামক-ইন্দ্রিয়গণ যাহার আদেশ পালন
করিতে বাধ্য ) হৃদি স্থিতেন ত্বয়া (আমার হৃদয়ে অবস্থিত

পূজা
তােমা কর্তৃক) যথা নিযুক্তোহস্মি (যেভাবে যে কাৰ্য
সাধনে নিযুক্ত হইব) তথা কয়রামি (তাহ যেন করি
অর্থাৎ করিতে পারি )। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণ যেন তােমার কথার
অবাধ্য না হয়, তুমি আমাকে তােমার নির্ধারিত পথে
চালাও। ১১।
( সন্ধ্যায়)
### আজ্ঞাপিতস্য চ পুরা জনসেবনায়
জাতং প্রভো ভবনে ভ্রমতঃ প্রমাদাৎ।
দেহে মনস্যপি চ মে মলিনত্বমীশ
যেনাবসীদতি মহেশ মমান্তরাত্মা ॥১২।
হে প্রভাে (অনুগ্রহ নিগ্রহ করিতে সমর্থ ) হে ঈশ্বর
(হে শক্তিমান চালক)পুরা (পূর্বে ) ভবনে (সংসারণ্যে)
জনসেবনায় (জীবের সেবার কাজে ) আজ্ঞাপিত (অনুমতি
প্রাপ্ত) মে (আমার) ভ্ৰমতঃ প্রমাদাৎ (ভ্ৰম-প্রমাদ বশতঃ )
দেহে মনসি চ (দেহ ও মনে) মলিনত্বং জাতং (মলিনতা উৎপন্ন
হইয়াছে) যেন (যে হেতু) মম অন্তরাত্মা (আমার অন্তরাত্মা)
অবসীদতি (অবসাদগ্রস্ত হইয়াছে—ঠিকভাবে আমাকে
চালাইতে আমার ভিতর দিয়া প্রকাশ পাইতে পারতেছে না)।
অর্থাৎ তােমার আদেশে তােমার কাজ করিতে গিয়া নিজের

১০
পূজা
অজ্ঞানতা বশতঃ চিত্তকে মলিন করিয়া তােমার দর্শনে অসমর্থ
হইয়াছি। ১২।
;
সন্ধ্যাসমাগমমহহ মম জীবিতস্য
জ্ঞাত্বা চ মে জিগমিষাং তব সন্নিধানে।
প্রক্ষাল্য ধূলিমলিনং তনয়ং স্বকীয়ং
ক্রোড়ে নয়াশু জগদীশ কৃপানিধান ॥১৩৷৷
অহাে (হায় ) সন্ধ্যাসমাগমং (সন্ধ্যা উপস্থিত হইয়াছে )
মম জীবিতস্য (আমার প্রাণের ) তব সন্নিধানে জিগমিং
(তােমার কাছে যাইবার ইচ্ছা) জ্ঞাত্ব (তুমি জানিয়া)
হে কৃপানিধান (হে কৃপাময় পরম পিতা) ধূলিমলিনং
(ধূলা ময়লা) প্রক্ষাল্য (পরিষ্কার করিয়া) স্বকীয়ং তনয়ং
( তোমার নিজের সন্তানকে) আশু ( শীঘ্র) ক্রোড়ে (তোমার
অভয় কোলে) নয় ( লইয়া যাও ) [ তােমার ইচ্ছায় সংসারে
খেলা করিতে গিয়া তােমার আদেশ লঙ্ঘন করিয়া ভ্রমপ্রমাদ
বশতঃ দেহ ও মনকে অপবিত্র করিয়া ফেলিয়াছি—যাহার
জন্য আমার আত্মা পৰ্যন্ত অবসাদগ্রস্ত হইয়াছে। এখন সন্ধ্যা
উপস্থিত, তােমার কাছে না গেলে যে আমার আর চলে না।
আমি তাে তােমারই সন্তান, তুমিও কৃপানিধান—সন্তানের দুঃখ,
সহ্য করিতে অসমর্থ। দয়া করিয়া আমার সব মলিনতা দূর
করিয়া আমাকে তােমার অভয় কোলে স্থান দাও ]।

পূজা
১১
অর্থাৎ সকালবেলায় গিয়াছিলাম অকাজ হইতে কাজের
দিকে, মার কোল হইতে সংসারের দিকে—খেলার দিকে।
সন্ধ্যাবেলায় যাইতে হইবে কাজের ভিতর হইতে অকাজের
দিকে, বিশ্রামের দিকে, খেলা ফেলিয়া মায়ের দিকে। ।
সন্ধ্যাবেলা সাধক, শব্দ-স্পশাদির ভিতর দিয়া ভগবানের
আহ্বান অনুভব করিয়া তাহার কাছে ছুটিয়া যাইবার জন্য
ব্যস্ত হন। ১৩।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ :-
নিজেকে সকল প্রকারের ঋণ হইতে মুক্ত করিয়া
ভগবানের কাছে যাইতে হইবে। পঞ্চমহাযজ্ঞ এই
উদ্দেশ্যে সাধিত হয়। সকলের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
করিয়া মনে মনে সকলের অনুমতি গ্রহণ করিয়া সকলের
আশীর্বাদ লইয়া পূজায় বসা চিত্তশুদ্ধির অনুকূল। ইহাতে
সাধন-ভজনের প্রধান বিপ্ন যে অহঙ্কার, তাহাও সংযত
থাকে।
## ওঁ গুরুভ্যো নমঃ ওঁ বান্ধবেভ্যো নমঃ
ওঁ জীবেভ্যো নমঃ ওঁ দেবেভ্যো নমঃ
ওঁ বিশ্বরূপায় পরমাত্মনে নমঃ ॥ ১৪।
ওঁ গুরুভ্যো নমঃ [ যাহাদের নিকট হইতে আমরা
প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ জ্ঞানলাভে সমর্থ হইয়াছি সেই ] (গুরু-

১২
পূজা
দিগকে নমস্কার ) ওঁ বান্ধবেভ্যো নমঃ ( পিতা, মাতা, ভাই, বন্ধু
প্রভৃতি বান্ধবগণকে নমস্কার ) ওঁ জীবেভ্যো নমঃ (জীবগণকে
নমস্কার) ওঁ দেবেভ্যো নমঃ (দেবগণকে নমস্কার ) ও
বিশ্বরূপায় পরমাত্মনে নমঃ ( বিশ্বরূপ পরমাত্মাকে
নমস্কার)। ১৪।
শুদ্ধি :—শুদ্ধিতত্ত্বকে সাধারণতঃ জলশুদ্ধি, আসনশুদ্ধি
ও ভূতশুদ্ধি—এই তিনভাগে বিভক্ত করা হয়।
জলশুদ্ধি :–জলের শুদ্ধি ও জলদ্বারা দেহাদির শুদ্ধি।
মন্ত্রপূত
জলদ্বারা দেহ এবং সাধন-শ্লোকাদি পাঠ দ্বারা
মন শুদ্ধ করা হয়।
আসনশুদ্ধি :–পূজার সময় শরীরের ভিতরে বিশেষ
ভাবে বিদ্যুতের ক্রিয়া চলিতে থাকে। তখন মাটির সঙ্গে শরীরের
যােগ থাকিলে শরীরস্থ বিদ্যুৎ মাটিতে গিয়া বিশেষ অনিষ্ট
সাধন করিতে পারে। এজন্য এমন শুদ্ধাসনে বসিতে হইবে,
যাহার ভিতর দিয়া শরীরস্থ বিদ্যুৎ মাটিতে যাইতে না পারে।
(চেলাজিন কুশােত্তর আসন অভাবে কম্বলাদি প্রশস্ত)। তাহার
পরে এমনভাবে বসিতে হইবে, যাহাতে দেহের সঙ্গে মাটির
যােগ না থাকে এবং দেহের ভিতরে বিদ্যুতের ক্রিয়া সুন্দর
ভাবে চলিতে পারে অর্থাৎ মেরুদণ্ড যেন সােজা ভাবে থাকে।
ভগবৎ-সকাশে প্রার্থনা করিতে হইবে এবং মনে দৃঢ় সঙ্কল্প :
করিতে হইবে যেন উদ্দেশ্য-সিদ্ধির পূৰ্বে আসন হইতে উঠিতে

পূজা
না হয়। অতএব আসনশুদ্ধির মধ্যে (১) শুদ্ধাসনে
উপবেশন (২) মাটির সঙ্গে যােগ না রাখা (৩) মেরুদণ্ড
সােজা রাখিয়া বসা এবং (৪) সিদ্ধিলাভে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়া
এই চারিটি বিষয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখিতে হইবে।
D
সমং কায়শিবােগ্রীবং কৃত্বা শুদ্ধাসনে স্থিতঃ ।
নারায়ণং নমস্কৃত্য চিন্তয়ামি সদা হরিম ॥১৫
কায়শিয়ােগ্রীবং (শরীর মস্তক এবং গ্রীদেশকে)
সমং কৃত্বা (সরলভাবে রাখিয়া ) শুদ্ধাসনে , বিশুদ্ধ আসনে )
স্থিতঃ (উপবেশন পূৰ্ব্বক) নারায়ণং নমস্কৃত্য { নারায়ণকে
নমস্কার করিয়া) সদা হরিম চিন্তয়ামি (নিযত শ্রীহরিকে
চিন্তা করিতেছি)। ১৫।
ভূতশুদ্ধি :–১৬-২১ শ্লোকের বিশেষ গবে ২০ শ্লোকের
সাহায্যে নিজকে পঞ্চভূতের (পঞ্চভূতের সাত্ত্বিক ভাব-প্রধান মন
বুদ্ধি অহঙ্কার ও চিত্তাদির, রাজসিকভাব-প্রধান পঞ্চপ্রাণের
এবং তামসিকভাব-প্রধান স্থূলদেহের) হাত হইতে মুক্ত করা
এবং পরে স্বরূপ প্রতিষ্ঠ হইয়া অর্থাৎ কামনা বাসনা আসক্তি
অজ্ঞানতা ও দ্বন্দ্বভাব রহিত হইয়া নিজকে জ্যোতির্ময়রূপে
• অনুভব করিয়া সেই ব্ৰহ্ম জ্যোতি দ্বারা ভূতগুলিকে নিজের
ত্রিবিধ দেহকে শুদ্ধ ব্ৰহ্মভাবে পরিবিত করিয়া তালাই
ভূতশুদ্ধির উদ্দেশ্য। ক্রিয়া-বিশেষের সাহায্য, গায়ত্রীর সাধনা

১৪ পূজা ভূতশুদ্ধির সহায়। সাধন-শ্লোক পাঠ এবং উদ্বোধনও ভূত- শুদ্ধির সহায়। প্রথমে ভূতের হাত হইতে নিজের শুদ্ধিলাভ, তৎপরে ভর্গোদেবের সাহায্যে ভূতগুলিকে শুদ্ধ করা ভগবৎ-কাৰ্য্য সাধনের যােগ্যতা দান করাই ভূতশুদ্ধির উদ্দেশ্য। সাধনশ্লোক পাঠ :- * নিৰ্মানমােহ। জিতসঙ্গদোষা অধ্যাত্মনিত্যা বিনিবৃত্তকামাঃ । দ্বিৈবমুক্তা সুখদুঃখসংজ্ঞৈ- গচ্ছন্ত্যমূঢ়াঃ পদমব্যয়ং তৎ॥১৬৷৷ নিৰ্মানমােহাঃ (যাঁহাদের অভিমান ও মােহ দূর হইয়াছে। জিতসঙ্গদোষাঃ ( যাহারা আসক্তিশূন্য) অধ্যাত্মনিত্যাঃ ( ঘাঁহারা আত্মজ্ঞাননিষ্ঠ) বিনিবৃত্তকামা (যাহাদের সমস্ত কামনা বাসনা বিশেষরূপে নিবৃত্ত হইয়াছে) সুখদুঃখ- সংঃৈ দ্বঃৈ বিমুক্তাঃ (ঘঁহারা সুখ-দুঃখত্মক দ্বন্দ্ববিমুক্ত ) [ তে] অমূঢ়াঃ (উক্ত প্রকার অমূঢ়গণ) তৎ (সেই পরব্রহ্মের ) অব্যয়ং পদং (মােক্ষপদ) গচ্ছন্তি (প্রাপ্ত হন)। ১৬।

১৫ D পূজা ## বিহায় কামান্যঃসৰ্বানপুমাংশ্চরতিনিস্পৃহঃ। নিৰ্ম্মমাে নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি ॥১৭। যঃ পুমান্ (যে পুরুষ) সৰ্বান্ কামা বিহায় (সৰ্ব্ব- প্রকার কামনাদি ত্যাগ করিয়া) নিস্পৃহঃ ( নিস্পৃহ হইয়া) নির্মমঃ (মমত্বরহিত) নিরহঙ্কারঃ (অহঙ্কার-বর্জিত) চরতি { সংসারে ] (বিচরণ করেন) স শান্তিম্ অধিগচ্ছতি (তিনি শান্তি লাভ করেন )। ১৭। উদ্বোধন :- উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবােধত। ক্ষুরস্য ধার। নিশিতা দুরত্যয় দুর্গং পথস্তৎ কবয়াে বদন্তি। ১৮৷ বােধন—সমস্ত শক্তির মূলাধার শ্রীভগবান আমাদের ভিতরে আছেন। তাহাকে স্মরণ করিয়া অনুভব করিয়া নিজকে সঁহার শক্তিতে শক্তিমান করিয়া ভগবৎ-কাৰ্য্য সাধনের উপযুক্ত করিয়া তােলা, এক কথায় নিজের ভিতর দিয়া লুকায়িত ভগবৎ শক্তিকে বােধিত করা, বিকশিত করা, কার্যক্ষম করিয়া তােলই বােধনের উদ্দেশ্য। উত্তিষ্ঠত (উঠ) জাগ্রত (জাগ) বরান (শ্রেষ্ঠকে) প্রাপ্য (প্রাপ্ত হইয়া) নিবােধত (পূর্ণতা লাভ কর) পথঃ (পথ) [Pengara Joikrishna Public Library A% ২৬৪৬ ৫ ০, ৬০.৫.৬৫

}
।
১৬
পূজা
ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা (ক্ষুরের ধারের ন্যায় নিশিত) দুরত্যয়
( অতি কষ্টে অতিক্রম করিতে পারা যায়) কবয়ঃ (তত্ত্বদর্শি-
গণ) তৎ দুর্গং (সেই পথ অতি দুর্গম) বদন্তি (বলিয়া
গিয়াছেন)। ১৮।
উত্থাতব্যংজাগৃতব্যংযােক্তব্যং ভূতিকৰ্ম্মসু।
ভবিষ্যতীত্যেৰংমনঃকৃত্বা সততমব্যথৈ॥১৯৷৷
উখাতব্যং (উঠ) জাগৃতব্যং (জাগ) ভবিষ্যতীতত্যবং
নিশ্চয় কৃতকাৰ্য্য হইবে এই ভাবে) মনঃ কৃত্বা (দৃঢ় প্রতিজ্ঞ
হইয়া) সততং ( সৰ্ব্বদা ) অব্যথৈঃ ( অনলস হইয়া)
ভূতিকৰ্ম্মস্থ (কৰ্ত্তব্যসাধনে) যােক্তব্যং (নিযুক্ত হও )। ১৯।
ভূতশুদ্ধি :
মূলাধারে প্রসুপ্তাংআংকুণ্ডলীং শক্তিরূপিণী
সহস্রারেসমুখাপ্য দেহংস্মরামিভাস্বর।২০
মূলাধারে প্রপ্তাং স্বাং (মূলাধারে সুপ্ত নিজের )
শক্তিরূপিণীম্ (শক্তিরূপিণী) কুণ্ডলীং (কুলকুণ্ডলীকে) সহস্রারে
(সহস্রারচক্রে ) সমুত্থাপ্য (সমুথিত করিয়া) দেহং ( নিজ
দেহকে) ভাস্বরং (তেজোময়) স্মরামি (চিন্তা করিতেছি)।
সুপ্তা কুণ্ডলিনীকে প্রাণায়ানাদি প্রক্রিয়ার সাহায্যে
সহস্রারে তুলিয়া তত্রস্থ সদাশিবের সঙ্গে মিলাইয়া নিজের
দেহকে জ্যোতির্ময়রূপে ধ্যান করিবে। ২০।

১৭ = পূজা #ভূভুবঃস্বতৎসবিতুর্বরেণ্যং ভর্গোদেবস্য ধীমহিধিয়ে যাে নঃ প্রচোদয়াৎওঁ। আপাে- জ্যোতিঃরসসহমৃতংব্ৰহ্মভূর্ভুবঃস্বরােম ॥২১৷৷ ওঁ ভুঃ ভুবঃ স্বঃ (ভূলােক, ভুবলােক ও স্বলোকে) দেবস্য সবিতুঃ ( সবিতৃদেবের) বরেণ্যং (বরণীয়) তৎ ভর্গঃ (সেই পরম জ্যোতিঃ) ধীমহি ( আমরা ধ্যান করি) যে (যিনি) নঃ (আমাদের) ধিয়ঃ (বুদ্ধিবৃত্তিগুলিকে) প্রচোদয়াৎ (প্রকৃষ্ট কাৰ্য্যে নিয়ােজিত করুন)। জ্যোতিঃ (সেই ভর্গোদেবের পরম জ্যোতিঃ) আপঃ ( সৰ্ব্বব্যাপী) রসঃ অমৃতং (রস আর অমৃতস্বরূপ) ভূঃ ভুবঃ স্বঃ (ভূলােক, ভুবলােক, অলোক ) ব্ৰহ্ম (সমুদয় ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া) ওঁ (ওঙ্কাররূপে বিরাজ করিতেছেন)। ‘ভূভুবঃ স্বঃ উচ্চারণ করিয়া প্রাণায়ামের সাহায্যে মনকে মূলাধার হইতে সহস্ৰারে তুলিয়া সেখানে তৎসবিতুর্বরেণ্যং ভর্গোদেবস্য ধীমহি' উচ্চারণ করিয়া নিজকে ব্ৰহ্মজ্যোতির ভিতরে নিমগ্ন চিন্তা করিবে তাহার পরে ‘ধিয়াে যো নঃ প্রচোদয়াৎ' উচ্চারণ করিয়া মনে করিবে সেই জ্যোতিঃ যেন তােমার অন্তরিন্দ্রিয় (চিত্ত, অহঙ্কার, বুদ্ধি ও মন) এবং বহি- রিন্দ্রিয়ে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগকে শক্তিযুক্ত করিয়া ভগবৎ- কাৰ্য সাধনে নিযুক্ত করিতেছেন। নিজের ভিতরে যে জ্যোতিঃ দর্শন করা হইল, যে আনন্দ আস্বাদ করা হইল, তাহা সর্ব- ১৮ পূজা জীবের সর্বভূতের ভিতরেও অনুভব করিতে হইবে। ফলে, অহঙ্কার করিবার আর হেতু থাকিবে না। ২১। ধ্যান-(ধামতত্ত্ব ) ## দ্বন্দ্বীতীতং ত্রিগুণরহিতং স্বপ্রকাশস্বরূপম শান্তাকারং গগনসদৃশং নির্বিকারং বরেণ্যম। ভক্তৈর্জষ্টংবিমলনিলয়ংযােগিভিধানগম্যং নিত্যানন্দ পরমসুখদং চেতসাতঃস্মরামি৷৷ দ্বন্দ্বাতীতং (সুখদুঃখাদি, শীতােষ্ণাদি দ্বন্দ্ব্যতীত) ত্রিগুণ- রহিতং (সত্ত্ব রজঃ তমঃ ত্রিগুণরহিত) সুপ্রকাশস্বরূপ (স্বপ্রকাশ স্বরূপ) শান্তাকারং (শান্তাকার ) গগনসদৃশং (গগনসদৃশ ব্যাপী ) নির্বিকারং ( নির্বিকার ) বরেণ্য ( সকলের বরণীয় ) ভক্তৈঃ (সিদ্ধ ভক্তবৃন্দ কর্তৃক ) জুষ্টং (পরিলেবিত ) বিমলনিলয়ং (বিমল আনন্দধাম স্বরূপ) যােগিভিঃ (যােগীদের কর্তৃক) ধ্যানগম্যং (ধ্যান দ্বারা গম্য) নিত্যানন্দং (নিত্যানন্দস্বরূপ) পরমসুখদং (পরমসুখদ) তং (সেই ভগবদ্ধামকে) চেতস (চিত্ত দ্বারা) স্মরামি (আমি চিন্তা করি)। অর্থাৎ কূটস্থে অবস্থিত ভগবৎধাম জ্যোতির্ময়, গুণাতীত, নির্বিকার, আনন্দরস-পরিভাবিত ও সিদ্ধজন-সেবিত । ।

পূজা
১৯
নিজকে সেই জ্যোতির্ময় ভগবৎধামে নিজের ইষ্টের সম্মুখে
অবস্থিত চিন্তা করিবে। ২২।
(স্বরূপতত্ত্ব )
#নাহং বিদিকো বর্ণো নাশ্রমী সঙ্গবজ্জিত।
নিক্রিয়াে নিস্পৃহঃ শান্তঃ সর্বোপাধিবিবজ্জিত।
অহং (আমি) বিপ্ৰাদিকঃ বর্ণঃ (ব্রাহ্মণাদি বর্ণ )
ন (নহি) আশ্রমী (ব্রহ্মচৰ্য্যাদি আশ্রমবাসী) ন (নহি )
[ আমি ] সঙ্গবর্জিতঃ (অনাসক্ত) নিষ্ক্রিয়ঃ (কর্তৃত্বাভিমান
রহিত) নিস্পৃহঃ (স্পৃহাশূন্য) শান্তঃ (শান্ত) সর্বোপাধি-
বিবর্জিতঃ (সকল প্রকার উপাধি বজ্জিত)।
অর্থাৎ আমরা ভগবানের অংশ বা স্বরূপ, অসঙ্গ,
গুণাতীত, নির্বিকার, সচ্চিদানন্দস্বরূপ ও সর্বোপাধি
বিনিম্মুক্ত। ২৩।
নাহং দেহােন মে দেহাে নিষ্কলাে গগনােপমঃ।
মিরাকারো নিরাধারঃ শুদ্ধবিজ্ঞানবিগ্রহঃ ॥২৪৷৷
অহং (আমি) দেহঃ (দেহ) ন (নহি) দেহঃ (দেহ)
মে (আমার) ন (নহি)। [ আমি ] নিষ্কলঃ ( নিষ্কলঙ্ক ভেদ
রহিত, পূর্ণ) গগনােপমঃ (গগনসদৃশ ব্যাপী ) নিরাকার
(নিরাকার) নিরাধারঃ (নিরাধার) শুদ্ধবিজ্ঞানবিগ্রহঃ (শুদ্ধ

পূজা বিজ্ঞানবিগ্রহস্বরূপ) অর্থাৎ শুদ্ধ চিন্ময়স্বরূপ দেহাতীত গুণাতীত আত্মভাবে স্থিত হইতে চেষ্টা করিবে । ২৪। #অহংদেববানচালত্যাহস্মিহ্মৈবাস্মিনশােক- ভাক। সচ্চিদানন্দরূপপাহহংনিত্যমুক্তস্বভাববান্ অহং দেবঃ (আমি দেবতা) অন্যঃ চ ন অস্মি (আর অপর কিছু নহি ) ব্ৰহ্ম এব অস্মি (আমি নিশ্চয় ব্রহ্মস্বরূপ) শােকভাক্ ন (শােক-দুঃখাদি আমাতে নাই) অহং সচ্চিদানন্দ- রূপঃ (আমি সচ্চিদানন্দস্বরূপ) নিত্যমুক্তস্বভাববান্ (নিত্য- মুক্ত আত্মসংস্থ; আপন স্বরূপে রহিয়াও লীলারত)। ২৫। #সত্যপিভেদাপগমেনাথতবাহংনমামকীনং সামুদ্রোহি তরঙ্গঃ কচন সমুদ্রোন তারঙ্গঃ ॥২৬৷৷ ভেদ-অপগমে সত্যপি [ ভগবানে ও জীবে ](পারমার্থিক দশায় ভেদ যদি না থাকে তবুও ) [ আমি বলিব ] নাথ (হে নাথ) অহং তব (আমি তােমার) ত্বং (তুমি) মামকীনঃ (আমার) ন (নহ )। [যেমন] তরঙ্গঃ (তরঙ্গ) সামুদ্রঃ হি । (সমুদ্রেরই) সমুদ্রঃ (সমুদ্র) কচন (কখনই) তরঙ্গঃ (তরঙ্গের) ন (নহে)। অর্থাৎ আমাতে ও আমার আরাধ্য ভগবানে স্বরূপতঃ ভেদ যদি না-ও বা থাকে তথাপি যতক্ষণ আমার কর্তৃত্বাভিমান থাকিবে ততক্ষণ আমি নিজকে ভগবানের দাস মনে করিয়া আমি আমার উপাস্যের পূজা করিতে থাকিব। ২৬।

পূজা # ইষ্টদেবস্বরূপাে যঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ। শুদ্ধো বুদ্ধঃ প্রমুক্তশ্চ গুরুরাদর্শমানবঃ ॥২৭৷ গুরু আদর্শমানঃ (গুৰু আদর্শ মানুষ) যঃ (যিনি) ইষ্টদেবস্বরূপঃ (ইষ্টদেবের প্রতিমূর্তি) সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ (সচ্চিদানন্দের ঘনীভূত মূৰ্ত্তিসদৃশ ) শুদ্ধঃ বুদ্ধ প্রমুক্তঃ চ (শুদ্ধ, বুদ্ধ এবং মুক্তস্বরূপ)। অর্থাৎ ইষ্টদেবকে সম্মুখে দেখিতে পাই না, তাঁহার প্রকৃত তত্ত্বও আমি জানি না, তাই তঁাহাকে জানিবার জন্য আমি এমন একজন আদর্শ মানবের সাহায্য লইয়াছি যাহার কথা, ভাব ও কাজের মধ্য দিয়া ইষ্টতত্ত্ব আমার নিকট অনুভব- বেদ্য হইতে আরম্ভ করিয়াছে । তিনিই আমার সদ্গুরু। অনেক সম্প্রদায় সাধন-রাজ্যে গুরুকেই প্রধান ভাবে অবলম্বন করেন। ২৭। দেহাবস্থিতচৈতন্যং সমারােপ্যেষ্টবিগ্রহে। তস্মািংশ্চ ভগবদ্ভাবং চিন্তয়ামি প্রত্নত৷৷২৮৷৷ দেহাবস্থিতচৈতন্যং [ আমার ] { দেহের ভিতরে অন্তৰ্য্যামিরূপে যে চৈতন্য অবস্থিত তাহাকে) ইষ্টবিগ্রহে ২২ পূজা (ইষ্টমুর্তিতে) সমারােপ্য (সম্যক্‌রূপে আরােপ করিয়া) তস্মিন্ চ (তাহার ভিতরে) প্রযতুতঃ (অতীব যত্নের সহিত) ভগবদ্ভাবং ( ভগবদ্ভাবকে) চিন্তয়ামি ( চিন্তা করিতেছি)। অর্থাৎ গুরুদেবের বর্ণিত অন্তর্যামী চিদানন্দময় ভগবদ্‌- ভাবকে আমার সম্মুখস্থ ইষ্টবিগ্রহে আরােপ করিয়া আমার ধ্যানের সাহায্যে তাঁহার ভিতরে ভগবৎ-তত্ত্ব উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করিব। তন্ময়তা লাভের ফলে গুরুর ভিতর দিয়া আস্তে আস্তে ইষ্টতত্ত্ব ও ভগবৎ-তত্ত্ব ফুটিয়া বাহির হইতে থাকে। চঞ্চল বিক্ষিপ্ত মনকে সঙ্কল্প-বিকল্পের হাত হইতে রক্ষার জন্য একজন আদর্শ মানুষের শরণাগত হওয়া, তাহাতে আত্মনিবেদন করিয়া, তাহার আদেশকে ভগবৎ আদেশ জ্ঞান করিয়া তদনুসারে জীবন গঠন করা সাধন-রাজ্যে ভগবৎ-প্রাপ্তির প্রধান সহায়। ভগবৎ-তত্ত্ব-ভগবানকে আমরা দেখিতে পাই না, অনু- ভব করিতে পারি না, জ্ঞান দ্বারা ধরিতে পারি না। তাহার পরিচয় পাই শাস্ত্র ও গুরুবাক্যের মধ্যে এবং প্রকৃতির সৌন্দৰ্য্য ও কার্যকলাপের ভিতরে। প্রকৃতি দর্শনের ফলে নজরে পড়ে কে এই প্রকৃতির ভিতরে বসিয়া আত্মপ্রকাশ করিতেছেন- কে প্রকৃতির ভিতরে বসিয়া লীলা-রস বিস্তার করিতে বসিয়াছেন। ভাবিতে ভাবিতে মনে হয়, কে যেন প্রকৃতির ভিতরে বসিয়া আমাকে ডাকিতেছেন; অনন্ত,সৌন্দৰ্য্য তখন পরমসুন্দরের কথা মনে করাইয়া দেয়, পরমসুন্দরের জন্য পূজা পাগল করিয়া তােলে। ফলে আরম্ভ হয় অনুসন্ধান। অবলম্বন করি সদ্গুরু ও শাস্ত্রের আশ্রয়। ২৮। এহেহি কৃষ্ণ সকদেব ভবাতিথিং হে ভক্তবৎসল গৃহাণ নিমন্ত্রণং মে। প্রেমাঞপাদ্যপরিধৌতপাদাষুজে তে আত্মানমেব কুসুমাঞ্জলিমুৎসৃজামি॥২৯৷৷ এহি (এস) কৃষ্ণ (হে কৃষ্ণ) সকৃদেব (এক- বারটি) এহি (এস) ত্বং (তুমি) অতিথিঃ ভব (অতিথিরূপে আমার সম্মুখে, আমার হৃদয়ে আবিভূত হও)। হে ভক্ত- বৎসল (হে ভক্তবৎসল) মে (আমার) নিমন্ত্রণং (নিমন্ত্রণ ) গৃহাণ ( গ্রহণ কর)। তে (তােমার) প্রোপাদ্যপরিধৌত পাদাষুজে (প্রেমা রূপ পাদ্য দ্বারা পরিধৌত চরণকমলে) আত্মানম্ এব (আমার আত্মাকেই) কুসুমাঞ্জলি (কুসুমাঞ্জলি- রূপে) উৎসৃজামি (উৎসর্গ করিয়া দিব)। অর্থাৎ হে আমার প্রাণারাম ইষ্টদেব শ্রীকৃষ্ণ, একবার আমার সম্মুখে আবিভূত হও, আমি আমার এই আত্মাকে তােমার চরণে নিবেদন করিয়া জীবন সফল করিতে চাই। ২৯। * # এহেহি কৃষ্ণ সকদেব ভবাতিথিমে পাদাম্বুজে তব নিবেদনমেতদেব।

২৪ পূজা ৫ প্রাণেশ হে হৃদয়কোমলপদ্মতল্পে ত্বংশায়য়ামিসুচিরং ন বিসর্জয়ামি ৩০ | এহেহি......অতিথিমে (এস, হে কৃষ্ণ একবারটি এস, আমার অতিথিরূপে আবির্ভূত হও) তব (তােমার ) পাজাম্বুজে (শ্রীপাদপদ্মে) এতৎ এব (এই একমাত্র) নিবেদন (নিবেদন)। হে প্রাণেশ (হে প্রাণেশ) হৃদয়কোমলপদ্মতল্পে ( হৃদয়ের কোমল পদ্মশয্যায়) ত্বাং (তােমাকে) সুচির ( চিরকালের জন্য ) শায়য়ামি (শয়ন করাইয়া রাখিব ) বিসর্জয়ামি ন (আর কদাপি যাইতে দিব না)। অর্থাৎ হে আমার ঈপ্সিততম ইষ্টদেব, আমি তোমাকে আমার হৃদয় হইতে সহজে আর যাইতে দিব না। ৩০। বহপীড়াভিরামং মৃগমদ- তিলকং কুণ্ডলাক্ৰান্তগণ্ডম কঞ্জাক্ষং কস্তুকণ্ঠং স্মিতসুভগ- মুখং স্বাধরে ন্যস্তবেণুম্। শ্যামং শান্তং ত্রিভঙ্গং রবিকর- বসনং ভূষিতং বৈজয়ন্ত্যা বলে বৃন্দাবনস্থং যুবতিশতবৃতং ব্ৰহ্মগােপালবেশম। ৩১ ৷ পূজা বহপীড়াভিরামং (ময়ুরপুচ্ছের দ্বারা পীড়িত হইলেও মনােজ্ঞ) মৃগমদতিলকং (মৃগমদতিলকযুক্ত কপাল) কুণ্ডলাক্রান্তগণ্ডম্ (গণ্ডস্থল কুণ্ডল দ্বারা ঈষৎ আক্রান্ত) কঞ্জাক্ষং (পদ্মবৎ মনােজ্ঞ আঁখি ) ককণ্ঠ (কম্বুর ন্যায় কণ্ঠ) স্মিতসুভগমুখং. (বদন সদা হাস্যযুক্ত ও আনন্দময়) স্বাধরে ন্যস্তবেণুম (অধরে ন্যস্ত বেণু) শ্যামং (শ্যামবর্ণ) শান্ত ( শান্ত ) ত্রিভঙ্গং ( ত্রিভঙ্গ) রবিকরবসনং (রবিকর- সমুজ্জ্বল পীতবর্ণ বসনধারী) বৈজয়ন্ত্যা ভূষিতং (বৈজয়ন্তী মালা- ভূষিত) বৃন্দাবনস্থং (শ্ৰীবৃন্দাবনধামস্থ ) যুবতিশতবৃত (শত যুবতীবৃন্দ-বেষ্টিত, অসংখ্য সিদ্ধজন-সেবিত) ব্রহ্মগােপাল- বেশম্ (ব্ৰহ্মগােপাল বেশধারী শ্রীভগবানকে) বলে (আমি ধ্যান করি)। অর্থাৎ জীব নামরূপ লইয়া ব্যস্ত, তাই জীবকে আকর্ষণ করিবার জন্য আ নাদের শ্রীভগবান অনন্ত সৌন্দৰ্য-মাধুর্যে বিভূষত হইয়া অবতীর্ণ। ভগব-বিমুখ জীব পৰ্য্যন্ত আজ সজ্ঞানে অজ্ঞানে তঁাহার রূপে আকৃষ্ট, গুণে কোন মতে তাহার উপর একটা লােভ হইলেই কাজ আপনা আপনি সাধিত হইবে। “তত্র লােল্যমপি মূল্যমেকলং জন্মকোটি সুকুতেন ল ভ্যতে”। ৩১। * অনন্তবিশ্বাশয় বীৰ্যশালিন্ বিশ্বস্থসৌন্দৰ্যনিদানভৃত। মুগ্ধ। হইল। পরের পূজা মাধুৰ্য্যলাবণ্যরসৈকসিন্ধে। হে সচ্চিদানন্দ নমাে নমস্তে ॥৩২৷ অনন্তবিশ্বায় (অনন্ত বিশ্বের আশ্রয়) বীৰ্যশালিন(অনন্ত বীৰ্য্যশালী) বিশ্বস্থসৌন্দৰ্যনিদানভূত (সমস্ত সৌন্দর্য্যের নিদান- ভূত) মাধুৰ্য্যলাবণ্যরসৈকসিন্ধো (মাধুৰ্য্য লাবণ্য রসের একমাত্র সমুদ্রস্বরূপ ) হে সচ্চিদানন্দ (হে সচ্চিদানন্দ) তে নমো নমঃ তােমাকে বার বার নমস্কার)। অর্থাৎ সগুণ ব্ৰহ্ম অশেষ কল্যাণ গুণের আকর—সত্ত্বা, চৈতন্য ও আনন্দের ঘনীভূত মূর্তি। ৩২। * সর্বজ্ঞাননিধিগুণৈক- নিলয়ে ভাবাশ্রয়ঃ সৰ্বগ ত্বং সর্বত্র সদা সমঞ্জসতয়া সৰ্বান্তরাকর্ষক। ধ্যেয় সিদ্ধজনৈৰ্ম্মদীয়- হৃদয়ে ধুত্বেষ্টদেবদ্যুতিং সার্থং মে কুরু জীবনং করুণ দীনৈকবন্ধো বিভাে॥ ৩৩। সৰ্বজ্ঞাননিধিঃ (সৰ্ব্বজ্ঞানের সাগর) গুণৈকনিলয়ঃ (নিখিল গুণের একমাত্র আশ্রয়) ভাবাশ্রয়ঃ (শান্ত-দাস্যাদি পূজা সর্ববিধ ভাবের আশ্রয়) সৰ্বগঃ ( সর্বব্যাপী) ত্বং (তুমি) সর্বত্র সদা (সকল স্থানে এবং সকল সময়ে ) সমঞ্জসতয়া (সৰ্ব্বগুণের অপূর্ব সমন্বয়ের দ্বারা) সৰ্বান্তরাকর্ষকঃ ( সকলের চিত্ত আকর্ষণকারী) সিদ্ধজনৈঃ ধ্যেয়ঃ (সিদ্ধজন কর্তৃক ধ্যেয়)। দীনৈকবন্ধে। (হে দীনের একমাত্র বন্ধু ) বিভাে (হে বিভু) করুণয়া (কৃপা পরবশ হইয়া) মম হৃদয়ে (আমার হৃদয়ে ) ইষ্টদেবদ্যুতিং ধৃত্বা (ইষ্টদেশের জ্যোতির্ময়রূপে আবির্ভূত হইয়ামে জীবনং (আমার জীবন সার্থং কুরু (সার্থক কর)। অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণে সর্বভাবের, সর্বগুণের পূর্ণ পরিণতি ও পূর্ণ সামঞ্জস্য বর্তমান; তাই তিনি পূর্ণতাপ্রাপ্ত আদর্শ, পূর্ণ অবতার ও সর্বচিত্তাকর্ষক। হে পূর্ণতাপ্রাপ্ত আদর্শ সর্বচিত্তাকর্ষক, তুমি আমার ইষ্ট কৃষ্ণবিগ্রহরূপে আমার হৃদয়ে আবির্ভূত হইয়া আমার জন্ম এবং জীবন সফল কর। ৩৩। ; ## বিশ্বজীবনবিমােহনচ্ছবিঃ কোহসি দেব যদুদেসি মে পুরঃ। ত্বং পিরামি হৃদয়েন নির্ভরং তিষ্ঠ তিষ্ঠ সবিধে ক্ষণং মম ॥৩৪৷৷ দেব কঃ অসি (হে লীলাময় দেবতা, তুমি কে?) যদ মে পুরঃ (যে আমার সম্মুখে) বিশ্বজীবনবিমােহনচ্ছবিঃ (বিশ্ব- জনের নয়নবিমােহন রূপে) উদেসি (আসিয়া উপস্থিত হইলে)

২৮
০
পূজা
ত্বাং (তােমার রূপমাধুরী) হৃদয়েন ( সমস্ত অন্তর দিয়া)
নির্ভরং (একান্তে, নির্ভয়ে, পূর্ণ ভাবে) পিরামি (আম পান ।
করিব) তিষ্ঠ (অপেক্ষা কর) মম সবিধে (আমার সম্মুখে)
ক্ষণং তিষ্ঠ (অল্পক্ষণের জন্য দণ্ডায়মান থাক)। অর্থাৎ হে
দেব, তুমি ভুবনমােহন রূপে, কে তুমি আমার সম্মুখে আসিয়া
উদিত হইলে? দয়া করিয়া একটু দাঁড়াও, আমি একবার প্রাণ
ভরিয়া তােমায় দেখিয়া লই। ৩৪।
আধারভূতা জগতত্ত্বমেকা
মহীস্বরূপেণ যত স্থিতাসি।
অপাং স্বরূপস্থিতয়া ত্বয়ৈতদা-
প্যায্যতে কৃৎস্নানঘ্যবীৰ্যে৷৩৫৷
ত্বম্ একা (তুমিই একমাত্র) জগতঃ (জগতের) আধার
ভূত (আধারস্বরূপা) যতঃ (যে হেতু) মহীস্বরূপেণ (মহী-
স্বরূপে অর্থাৎ জগৎস্বরূপে) স্থিতা অসি (অবস্থান করিতেছ)
অলঙ্ঘ্যবীর্য্যে (হে অলঙ্ঘ্য বীৰ্য্যশালিনি জননি) অপাং
স্বরূপস্থিতয়া ত্বয়া (জলরূপে অবস্থিত তােম। কর্তৃক)
কৃশ্নং আপ্যায্যতে ( সমগ্র বিশ্ব সম্যক্‌রূপে আপ্যায়িত
হইতেছে)।
অর্থাৎ জগন্ময়ী মা, তুমি স্থূল ও সূক্ষভাবে জগতে ব্যাপ্ত
হইয়া রহিয়াছ। জগতে যা কিছু দেখি, সে সমস্তই তােমার

পূজা
রূপবিভূতি। তুমিই সূক্ষভাবে বর্তমান থাকিয়া ইহাদের
পরিণতি ও তৃপ্তিবিধান করিতেছ। ৩৫।
ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিরনবীৰ্য্যা
বিশ্বস্ত বীজং পরমাসি মায়া।
সম্মােহিতং দেবি সমস্তমেতত্ত্বং
বৈ প্রপন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ ॥৩৬৷
ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিঃ ( তুমিই বৈষ্ণবীশক্তি) অনন্তবীৰ্য্যা
(অনন্তবীৰ্য্যা) বিশ্বস্ত বীজং (বিশ্বের বীজ) পরমা মায়া
অসি (পরমা মায়া হও ) দেবি (হে দেবি) সমস্তম্ এতৎ
(এই সমস্ত জীব-জগৎকে) সম্মােহিতং (তুমিই মুগ্ধ করিয়া
রাখিয়াছ) ত্বং বৈ প্ৰপন্না (আবার তােমাকেই একমাত্র আশ্রয়-
রূপে গ্রহণ করিলে) ভুবি (এ জগতে) মুক্তিহেতুঃ (মুক্তি-
হেতুস্বরূপা হও)।
অর্থাৎ তুমিই বৈষ্ণবীরূপে জীব-জগতের সমস্ত শক্তির
তােমারই মায়ায় জীব-জগৎ মােহিত, আবার
তুমিই প্রসন্না হইয়া জীবের মুক্তির কারণ হও ! ৩৬।
মূল কারণ।
বিদ্যা; সমস্তাস্তব দেবি ভেদাঃ
স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু।

পূজা
ত্বয়ৈকয়পূরিতমম্বয়ৈতৎ
কাতে স্তুতিঃ স্তব্যপরাপরােক্তি ॥৩৭।
দেবি (হে দেবি) সমস্তাঃ বিদ্যাঃ (এ জগতের সমস্ত
বিদ্যা) তব ভেদাঃ (তােমারই ভেদ) জগৎসু (এ জগতে)
সমস্তাঃ (সকলেই) খ্রিয়ঃ (স্ত্রী) সকলা: (সকলেই তােমার
অংশবিশিষ্টা) ত্বয়া একয়া অম্বয়া (একমাত্র তুমিই মাতৃ-
স্বরূপে ) এতৎ (এ সমস্ত বিশ্বকে) আপূরিতম্ (পূর্ণ করিয়া
রাখিয়াছ)। কা তে স্তুতিঃ (তােমার আর স্তুতি কি ?) স্তব্য
পরা (তুমি স্তব্যের পরে) পরােক্তিঃ (বাক্যের পরে)।
অর্থাৎ জগতের যত প্রকার জ্ঞান দেখিতে পাই, সে সব
তােমারই আংশিক প্রকাশ মাত্র, জগতে স্ত্রী-পুরুষ সবই তােমার
বিকাশ, তােমার সত্ত্বা, চৈতন্য, আনন্দ দ্বারা জগৎ পরিপূরিত।
তুমি ছাড়া যখন কিছুই নাই তখন তােমার আর কি স্তব
করিব? ৩৭।
** ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব
ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব।
ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিণং ত্বমেব
ত্বমেব সৰ্বং মম দেবদেব ॥৩৮৷'
ত্বমেব মাতা (তুমিই মা) ত্বমেব পিতা চ (তুমিই
(

পূজা আবার পিতা) ত্বমেব বন্ধুঃ (তুমিই বন্ধু ) ত্বমেব সখা চ ( তুমিই আবার সখ) ত্বমেব বিদ্যা (তুমিই বিদ্যা) ত্বমেব দ্রবিণং (তুমিই ধন-দৌলত ) দেবদেব (হে দেবের দেব, দেবাদিদেব ) ত্বমেব মম সৰ্ব্বং (তুমিই আমার যথাসর্বস্ব)। অর্থাৎ তুমি ভাবাশ্রয়; তাই যে যেরূপে যেভাবে তােমাকে ডাকে তুমি তাহার কাছে সেইরূপে সেইভাবে গিয়া উপস্থিত হও। আবার তুমি একাধারে আমাদের যথা- সৰ্বস্ব। ৩৮। #প্রেয়ঃ পুত্ৰাৎ পেয়ে বিত্তাৎ প্রেয়ােন্য- স্মাৎসৰ্ব্বম্মাদ্যদেমােন্তরতম আত্মা ॥৩৯৷ পুত্ৰাৎ প্রেয়ঃ (পুত্র হইতেও প্রিয়) বিত্তাৎ প্রেয়ঃ (বিত্ত হইতেও প্রিয়) অন্যস্মাৎ সৰ্ব্বস্মাৎ প্ৰেয়ঃ (অন্য যাহা কিছু তৎসমুদয় হইতেও প্রিয়) যৎ এষঃ (যাহা তাহা এই) অন্তর, তমঃ আত্মা (অন্তরতম আত্মা)। অর্থাৎ তুমি আমাদের অন্তরাত্মা, তােমাকে লইয়া, তুমি আছ বলিয়া সব আত্মীয়-স্বজন আমাদের প্রিয়। তােমার অপ্রকাশে ইহাদিগকে আমরা মুখে আগুন দিয়া বিদায় দিয়া থাকি। ৩৯।

পূজা * মাতা রামচন্দ্রঃ পিতা রামচন্দ্র সখা রামচন্দ্রঃ সখী রামচন্দ্রঃ সৰ্বস্বং মে রামচন্দ্রো দয়ালুর্নান্যং জানে নৈব জানে ন জানে।৪০। রামচন্দ্র মাতা (রামচন্দ্র আমার মা) রামচন্দ্রঃ পিতা ( রামচন্দ্র আমার পিতা) রামচন্দ্রঃ সখা (রামচন্দ্র আমার সখা) রামচন্দ্রঃ সখী (রামচন্দ্র আমার সখী) দয়ালু রামচন্দ্রঃ মে সর্বস্বং (পরমদয়ালু রামচন্দ্র আমার যথাসর্বস্ব) অন্য জানে ন (আমি অন্য আর কিছুই জানি না) জানে নৈব (নিশ্চয়ই জানি না) জানে ন (জানিতে পারি না)। অর্থাৎ ভগবান দয়ালু রামচন্দ্র আমার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে আছেন বলিয়া সকলে আমাকে এত ভালবাসেন। তিনি সকলের মূল বলিয়া আমি আর কিছু জানি না, আর কিছু চাহি না। ৪০। * আত্মা ত্বং গিরিজা মতিঃ সহচর প্রাণাঃ শরীরং গৃহং পূজা তে বিষয়ােপভােগ- রচনা নিদ্রা সমাধিস্থিতি।

f পূজা সঞ্চারঃ পদয়াের প্রদক্ষিণবিধিঃ স্তোত্রাণি সৰ্বা গির যদ যৎ কৰ্ম্ম করােমি তৎ তদখিলং শন্তো তবারাধনা।৪১। ত্বং আত্মা (তুমি অাত্মা) মতিঃ গিরিজা (পার্বতী আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি) প্রাণাঃ সহচরাঃ (আমাদের প্রাণাদি তােমারই সহচর) শরীরং গৃহং (শরীর তােমার মন্দির) বিষয়ােপভােগরচনা তে পূজা (বিষয় সমূহের উপভােগ তােমারই পূজা; তুমিই যে ভিতরে বসিয়া লীলারত-তাহ। অনুভবে আসিবে) নিদ্রা সমাধিস্থিতিঃ (নিদ্রা তােমারই সমাধিতে অবস্থান, তােমাকে নিয়া নিদ্রা যাওয়া হইতে সমাধি বড় কিসে?) পদয়ােঃ সঞ্চার প্রদক্ষিণবিধিঃ (পদ-সঞ্চারণ তােমারই মন্দির প্রদক্ষিণ বিধি ) সৰ্বা গির স্তোত্রাণি (সৰ্ব্ব- প্রকার বাক্যাদি তােমারই স্তোত্র) শন্তো (হে শম্ভা) য বৎ কৰ্ম্ম করােমি (যাহা কিছু কৰ্ম্ম আমি করি) তৎ তৎ অখিলং (তৎসমুদয় সকলই ) বারাধনা ( তােমার আরাধনা)। অর্থাৎ চিত্ত শুদ্ধ ও শান্ত হইলে সাধকের অন্তদৃষ্টি খুলিয়া যায়। সে তখন তাহার নিজের ভিতরে ভগবৎলীলা- দর্শন করিবার যােগ্যতা লাভ করে; তখন তাহার সব কাজই যে পূজায় পরিণত হইয়া যায়।

৩৪
পূজা
“স্য জ্ঞানময়ং তপঃ” তাহার তপস্যা জ্ঞানময়। সেই
তপস্যা হইতে সাধিত হইতেছে ভগবানের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় তত্ত্ব।
এই সাধনার অনুষ্ঠানের ভার স্বয়ং প্রকৃতিদেবীর উপর। ইহার
যন্ত্র জীব-জগৎ, মন্ত্র শব্দ ব্ৰহ্মতত্ত্ব বিধান প্রাকৃতিক নিয়মাবলী
ভগবৎ-কাৰ্য রহস্য। তাই সমস্ত কর্মই যজ্ঞ। শব্দ, স্পর্শ,
রূপ, রস, গন্ধের আদান-প্রদানজনক বিষয়েপভােগ করাই
তাহার পূজা; নিদ্রা সমাধিস্থিতি; চলাফেরা তাহাকে প্রদক্ষিণ
করা; সমস্ত কথাবার্তাই তঁাহার স্তবস্তুতি। আমরা যাহা
কিছু করি—সবই যে তাহার অরাধনা। “কথা গানং নাট্যং
গমনমপি বংশীপ্রিয়সখী” সে অবস্থায় সবই চিদানন্দ জ্যোতিতে
ভরপূর; সবই আমাদের শ্রীভগবানের লীলারসে মাতােয়ারা,
লীলারসের স্ফুরণ।
জীব-জগৎ যখন তাহার আনন্দের স্ফুরণ, লীলা বিভূতি;
তখন আমাদের সব কাজকে সঁহার লীলার সহায় করিয়া
তােলাই হইবে তাহার পূজা। আমাদের সমস্ত কাজের মধ্য
দিয়া যে তাহার পূজা সাধিত হইতেছে তাহা অনুভব করিতে
হইবে। পূজা হইবে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ন্যায় স্বাভাবিক,
পূজা হইবে অবিচ্ছিন্ন কাৰ্যপ্রবাহ, পূজা হইবে আমাদের
জীবনগত কাৰ্যকলাপ।
অহঙ্কার, ভেদভাব, আসক্তি, অজ্ঞানতা—সমস্ত অনর্থের
কারণ। সুতরাং আমাদের গৌণ পূজা হইবে এই অজ্ঞানতা
অহন্তা মমতাদি দূর করিবার চেষ্টা, মুখ্য পূজা হইবে আমাদের

৩৫
পূজা
জীবনে ভগবৎ-লীলার আস্বাদন বা অনুভূতি। আমার ভিতরে
। বাহিরে বসিয়া তিনি কি করিতেছেন তাহার অনুভূতি লাভ
করাই হইবে আমাদের পূজার মুখ্য উদ্দেশ্য। এই পূজা নিয়া
মুনি-ঋষিগণ সর্বদা আনন্দে বিভাের, ভাবে সমাহিত
থাকিতেন। আমাদের সব কাজকে এই পূজায় পরিণত
করিতে হইবে, আমাদের জীবনে তাহার লীলারস আস্বাদ
করিতে হইবে।
এই নিত্য সাধন-তত্ত্ব আস্বাদ করিবার জন্য ভগবদবিমুখ
জীবের নৈমিত্তিক পূজাতত্ত্ব অবলম্বন করিতে হইবে। বিশেষ
বিশেষ সময়ে বিশেষ বিশেষ কাজের মধ্য দিয়া পূজাতত্ত্ব অনুভব
করিতে হইবে। ৪১।
সর্বেশঃ সর্বগঃ সাক্ষী সৰ্বেন্দ্ৰিয়নিয়ামক।
বিধাতাসৰ্ব্বদৃক্কৰ্ত্তাকরুণাময়ঈশ্বরঃ৪২।
সৰ্ব্বেশঃ ( সকলের নিয়ন্তা ) সর্বগঃ ( সৰ্ব্বব্যাপী )
সাক্ষী (সাক্ষিস্বরূপ) সৰ্বেন্দ্ৰিয়নিয়ামকঃ (সর্ব ইন্দ্রিয়ের
নিয়ামক) বিধাতা ( বিধাতা) সৰ্ব্বদৃক (সৰ্ব্বদ্রষ্টা) প্রভু
(কর্তা, স্বতন্ত্র মুখ্য কর্তা) করুণাময়ঃ ঈশ্বরঃ (করুণাময় ঈশ্বর)।
অর্থাৎ ভগবানে এই সব লক্ষণ বর্তমান দেখিতে পাওয়া
যায়। ৪২।

পূজা ওঁ যততা বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে যেন জাতানি জীবন্তি। যৎ প্রযন্ত্যভিসংশিন্তি তদ্বিজিজ্ঞাসস্বতদব্রহ্ম তদব্রহ্মেতি।৪৩৷ যততা বা (যাহা হইতে) ইমানি ভূতানি (এই সমুদয় জগৎ) জায়ন্তে (জাত হয়) যেন জানি জীবন্তি ( ঘঁহার শক্তিতে জাতভূত সমুদয় বাঁচয়া থাকে) যৎ প্রযন্ত্যভিসংবিশন্তি ( যাহাতে গমন করিয়া পুনরায় লয়প্রাপ্ত হয়) তৎ বিজিজ্ঞাসস্ব (তাহাকে সবিশেষ জানিতে তৎপর হও) তদ্বন্ধ তদ্রহ্মেতি (তিনিই ব্ৰহ্ম তিনিই ব্ৰহ্ম তাহাকে অনুসন্ধান কর) ব্ৰহ্মই জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয়কৰ্ত্তা। ৪৩। ##সত্যংজ্ঞানমনন্তংব্ৰহ্মওঁআনন্দরূপমৃত যদ্বিভাতি ওঁ শান্তং শিবমদ্বৈতম্ ॥৪৪৷৷ যৎ (যাহা) আনন্দরূপমমৃতং (আনন্দরূপে অমৃত রূপে) শান্তং শিবমদ্বৈতং (শান্ত, শিব ও অদ্বৈতরূপে) বিভাতি (প্ৰকাশ পাইতেছে ) [ তাহা ] সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম (সত্য- স্বরূপ, জ্ঞানস্বরূপ ও অনন্তস্বরূপ ব্ৰহ্ম)। ৪৪।

পূজা নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানা- মেকো বহুনাং যাে বিদধাতি কামান্। তমাত্মস্থং যেইনুপশ্যন্তি ধীরা- স্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষা॥৪৫৷ অনিত্যানাং (তাবৎ অনিত্য বস্তুর মধ্যে) নিত্যঃ (এক- মাত্র নিত্য) চেতনানাং (সকল চেতনের) চেতনঃ (একমাত্র চেতন) এক যঃ (একাকী যিনি) বহুনাং কামান্ (জগতের সকল প্রকার কাম্য বস্তু) বিদধাতি ( বিধান করিতেছেন) যে ধীরাঃ (যে ধীরগণ) ত আত্মস্থং (তাহাকে নিজের আত্মাতে) অনুপশ্যন্তি সাক্ষাৎ দৃষ্টি করেন) তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী (তাহাদের শান্তি শাশ্বতী) ইতরেষা ন (অপর ব্যক্তিদিগের তাহা কদাপি হয় না)। অর্থাৎ যিনি সমস্ত অনিত্য পদার্থের অতীত হইয়াও তাহাদের মধ্যে নিত্যরূপে বৰ্তমান থাকিয়া সমস্ত জীবে চৈতন্য সঞ্চার করেন, যিনি সকল জীবের যথা প্রাপ্য বিধান করেন, তাঁহাকে যে জানে শুধু সেই নিত্য শান্তি লাভ করে। ৪৫। #*ওঁশ্রোত্রস্য শ্রোত্ৰংমনসােমনঃ যদ্বাচোহ . বাচম্। সউ প্রাণস্য প্রাণশ্চক্ষুশ্চক্ষুঃ॥৪৬৷৷ যৎ ( যিনি) শ্রোতস্য শ্রোত্রং (শ্রবণের শ্রবণ) মনসাে মনঃ (মনের মন) বাচো হ বাচম্ (বাক্যেরও বাক্য) স উ ৪ * পূজা (তিনিই আবার) প্রাণস্য প্রাণঃ (প্রাণের প্রাণ ) চক্ষুষঃ চক্ষু (চক্ষুর চক্ষু)। অর্থাৎ সেই একই ভগবৎ-শক্তি আমাদের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের ভিতর দিয়া বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন ভাবে অনুভূত হয়। আমাদের বিষয় গ্রহণ, ধ্যান-ধারণাদি তাহারই বিভিন্ন প্রকাশ। তিনিই সকলের মূলাধার। তাহার আসল তত্ত্ব ইন্দ্রিয়াদির অতীত অবস্থায় না গেলে অনুভবে আসে না। ৪৬। যঃ সতত্ত্বে তিন সৰ্ব্বতত্ত্বস্তান্তরঃ, যং সৰ্বতত্ত্বং ন বেদ, যস্য সৰ্ব্বতত্ত্বং শরীর, যঃ সৰ্ব্বতত্ত্বং যময়তি স আত্মা অন্তর্যামী। যঃ ( যিনি ) সৰ্ব্বতত্ত্বেতিষ্ঠন (সর্বতত্ত্বে বর্তমান থাকিয়া) সৰ্ব্বতত্ত্বস্থান্তরঃ (সৰ্ব্বতত্ত্বের অন্তরে অবস্থিত) যং (যাহাকে ) সৰ্ব্বতত্ত্বং ন বেদ (সৰ্ব্বতত্ত্ব জানে না) সৰ্ব্বতত্ত্বং যস্য শরীরং (সৰ্ব্বতত্ত্ব যাহার শরীর) যঃ সর্বতত্ত্বং যময়ত (যিনি সর্ব- তত্ত্বের নিয়ামক ) স অন্তর্যামী আত্মা (তিনিই অন্তর্যামী পরমাত্মা)। অর্থাৎ যিনি সর্বতত্ত্বে অবস্থিত থাকিয়া সকল তত্ত্বকে আপন আপন কাৰ্যসাধনে নিযুক্ত রাখেন-যাহাকে কোনও তত্ত্ব জানে না তিনিই আমার পরমাত্মা। ৪৭। * তমীশ্বরাণাং পরমং মহেশ্বরং তং দেবতানাং পরমঞ্চ দৈবতম্। ।

পূজা
পতিং পতীনাং পরমং পরস্তাদ
বিদাম দেবং ভুবনেশমীডম্ ॥৪৮৷৷
ঈশ্বরাণাং পরমং মহেশ্বরং (যিনি সকল ঈশ্বরের উপরে
পরম মহেশ্বর) তং (তাহাকে ), দেবতানাং পরমং দৈবত চ
( যিনি দেবতাদের উপরে পরম দেবতা) পতীনাং পতিং
(পালনকর্তাদেরও পালনকর্তা) পরস্তাৎ পরমং ( সর্ববিষয়ে
শ্রেষ্ঠ) ভুবনেশ (ভুবনের ঈশ্বর ) ঈড্যং দেবং (পূজ্য দেব)
তং (তাহাকে) বিদাম (আমরা জানিব)। অর্থাৎ তুমি
সমস্ত ঈশ্বরের ঈশ্বর, দেবতার দেবতা, তােমার শক্তিতেই
সকলে শক্তিমান্, তােমার জ্ঞান ও আনন্দের কথা লইয়া
সকলে জ্ঞান ও আনন্দ বিতরণ করিতেছে। ৪৮।
ওঁ রসে। বৈ সঃ। রসং
হেবায়ং লব্ধানন্দীভবতি
তৃপ্তীভবতি অমৃতীভবতি।৪৯।
সঃ (তিনি, সেই পরমাত্মা) রসে বৈ (রসস্বরূপ)
অয়ং (এই জীব) রসং হি (সেই রসস্বরূপ পরব্রহ্মকে )
লব্ধ। এব (লাভ করিয়াই) আনন্দীভবতি (আনন্দিত হয়েন )
তৃপ্তীভবতি (তৃপ্ত হয়েন) অমৃতীভবতি (অমৃতময় হয়েন)।
অর্থাৎ তিনিই আমাদের সমস্ত আনন্দের শান্তির মূল
প্রস্রবণ! ৪৯।

৪০
পূজা
ওঁযৎ প্রাপ্য ন কিঞ্চিদ্বাঞ্ছতি ন শােচতি
ন রমতে নােৎসাহীভবতি। ৫০ |
যৎ প্রাপ্য (ঘঁহাকে প্রাপ্ত হইলে) [ মানুষ ] ন কিঞ্চিৎ
বাতি (আর কিছুই চায় না) ন শােচতি (শােক করে না।
ন রমতে (আর কোন জিনিষে আসক্ত হয় না) ন উৎসাহী
ভবতি ( আর কোন জিনিষের জন্য উৎসাহ করে না)। অর্থাৎ
তােমাতেই জীবের পূর্ণ তৃপ্তি ও পূর্ণ পরিণতি। ৫০।
ওঁ যজজ্ঞানান্মত্তো ভবতি স্তক্কো ভবতি
আত্মারামাে ভবতি ॥ ৫১।
যৎ জ্ঞানাৎ (যাহার জ্ঞান লাভ করিলে) [ মানুষ ]
মঃ ভবতি (বাহজ্ঞান-রহিত আনন্দে উন্মত্ত হয়) স্তব্ধঃ ভবতি
(স্তব্ধ হয়) আত্মারামঃ ভবতি (আত্মারাম হয়)। ৫১।
**
রূপং রূপবিবজ্জিতস্য ভবতাে ধ্যানেন যৎকল্পিতং
স্তুতানির্বচনীয়তাইখিলগুরােদূরীকৃত যন্ময়া।
ব্যাপিত্বঞ্চ নিরাকৃতং ভগবততা যত্তীর্থযাত্রাদিনা
ক্ষন্তব্যংজগদীশ তদ্বিকলতাদোষত্ৰয়ং মৎকৃতম

৪১
পূজা
রূপবিবর্জিত ভবতঃ ( রূপবিবর্জিত তােমার) ধ্যানেন
(ধ্যানের দ্বারা) যৎ রূপং কল্পিতং (যে রূপ কল্পনা করা
হইয়াছে) অখিলগুরােঃ অনির্বচনীয়তা (অখিল গুরুর
অনির্বচনীয়তা) স্তুত্যা (স্তুতি দ্বারা) যৎ ময়া দূরীকৃত
( আমা কর্তৃক যে দূরীকৃত হইয়াছে) ভগবতঃ ব্যাপিত্বঞ্চ
( ভগবানে সৰ্বব্যাপি ভাব) তীর্থযাত্রাদিন (তীর্থযাত্রাদির
দ্বারা) যৎ নিরাকৃতং (যে খণ্ডিত হইয়াছে) জগদীশ (হে
জগদীশ) মৎকৃতম্ (আমার কৃত) তবিকলতাদোষত্ৰয়ং
(সেই বিকলতা দোষত্রয়) ক্ষন্তব্যং (তােমার ক্ষমার যােগ্য)।
অর্থাৎ অরূপ তােমাতে আমার ধ্যানের সুবিধার জন্য রূপ কল্পনা
করিয়াছি, অব্যক্ত তােমাকে স্তব দ্বারা প্রকাশ করিতে চেষ্টা
করিয়াছি, সৰ্বব্যাপী তােমাকে তীর্থপরিক্রমাদি দ্বারা সীমাবদ্ধ
করিয়াছি। তুমি আমার এই ত্রিবিধ অপরাধ ক্ষমা কর। ৫২।
ন্যাস :
* দেহেন্দ্রিয়াণি চ মনাে ন তু মে তবৈব
স্বাত্মীয়বান্ধবগণা ন তু মে তবৈতে।
সৰ্ব্বং ত্বদীয়মিতি মে প্রিয়মেব সৰ্বং
ত্বৎপ্রীতয়ে সততমেব নিয়ােজয়ানি৷৷ ৫৩
ন্যাস-ন্যাস প্রধানতঃ ত্রিবিধ (১} অঙ্গন্যাস দ্বারা
আমার বলিতে কিছু আছে কি না (২) কন্যাস দ্বারা আমি

২২ পূজা কর্তা কি না অনুভূত হয়। ইহার ফলে নির্মম নিরহঙ্কার ভাব লাভ করিয়া (:) ব্যাপক ন্যাসের—সৰ্বত্ৰ ব্ৰহ্মানুভূতির যােগ্যতা লাভ হয়। দেহেন্দ্রিয়াণি মনঃ চ (দেহ ইন্দ্রিয় এবং মন ) ন মে ( আমার নয়) তু তব এব (পরন্তু তােমারই) স্বাত্মীয়বান্ধব- গণাঃ (ধন, আত্মীয় বান্ধবগণ) ন মে (আমার নয়) তু এতে তব (পরন্তু ইহারা তােমার ) সৰ্ব্বং ত্বদীয়ং (সকলই তােমার) ইতি (এইজন্য ) সৰ্ব্বং ( সকলেই) মে প্রিয়ম্ এব (আমারও প্রিয়)। ত্বৎপ্রীতয়ে এব (তােমারই প্রীতির জন্য) সততং নিয়ােজয়ানি (সর্বদা ইহাদিগকে নিযুক্ত করিব)। অর্থাৎ আমার এই দেহ, ইন্দ্রিয়গণ এবং আত্মীয়স্বজন—ইহারা কেহই আমার নিজের নহে; আমার সঙ্গেও যাইবে না। ইহারা সব তােমার বলিয়াই আমার এত প্রিয়। সুতরাং অনাসক্ত অনুরাগী হইয়া ইহাদিগকে তােমার কাজে নিযুক্ত রাখা আমার একান্ত কৰ্ত্তব্য। ৫৩। * দেহস্য বীজমতিসূক্ষ্মমণুপ্রমাণং সৃষ্টং ত্বয়ৈব সুবিচিত্ৰতয়া চ পুষ্ট। সৰ্বাত্মন পরিণতং কৃতিযােগ্যদেহে কর্তৃত্ববুদ্ধিৰিহনাস্তু কদাপিনাথ॥৫৪৷৷ দেহস্য বীজম (এই দেহের বীজ) অণুপ্রমাণম্ অতি সূক্ষ

পূজা
( অণুপ্ৰমাণ অতি সূক্ষম ছিল) ত্বয়া এব সৃষ্টং (তুমিই ইহা
সৃজন করিয়াছ) সুবিচিত্ৰতয়া পুষ্ট চ (এবং অতি সুন্দর
বিচিত্রভাবে ইহার পরিপুষ্টি সাধন করিয়াছ) সৰ্বাত্মনাপরিণতং
( সর্বাত্মারূপে সকল বিষয়ে তুমিই ইহার সুন্দর পরিণতি
সাধন করিয়াছ) নাথ (হে নাথ) ইহ কৃতিযােগ্যদেহে
এই কৃতি-কৌশলপূর্ণ দেহে অর্থাৎ এই সৰ্ব্ব কাৰ্য্য করিবার
যােগ্যতা-বিশিষ্ট শরীরে ) কর্তৃত্ববুদ্ধি (আমার কর্তৃত্ববুদ্ধি )
কদাপি ন অস্তু (যেন কখনও না হয়)। অর্থাৎ এই দেহ
ছিল এক ফোটা রক্ত; তুমি নিজে ইহাকে এমন সুন্দর পুষ্ট
পরিণত সব কার্যক্ষম দেহে পরিণত করিয়াছ। সুতরাং
এই দেহে এবং ইহার কাৰ্য বিষয়ে আমার একটা মিথ্যা
কর্তৃত্বাভিমান থাকা উচিত নয়। ৫৪।
# যন্ত্ৰী ত্বমেব তব যন্ত্রমিদং শরীরং
স্বয়েচ্ছয়ৈব পরিচালয়সি প্রভুত্বাৎ।
এবং মনােহপি মম দেব মতং ত্বয়ৈৰ
বুদ্ধিঃ স্থিরা মম হৃষীকপতেই ভূয়াৎ ॥৫৫৷৷
ত্ব এব যন্ত্ৰী (তুমিই যন্ত্রী) ইদং শরীরং তব যন্ত্র
(এই শরীর তােনার যন্ত্র) প্রভুত্বাৎ ( তুমি প্রভু বলিয়া)
স্বয়া ইচ্ছয়া এব (তােমার নিজের ইচ্ছামতই) পরিচালয়সি
[ ইহাকে ] (পরিচালনা কর) এবং মম মন অপি (এইরূপ

৪৪ পূজা আমার মনও) ত্বয়া এব মতং (তােমা কর্তৃকই পরিচালিত হয়, মননীকৃত হয়, তুমি মন হইয়া আমার মনের মধ্যে থাকিয়া আমার মনকে চালিত করিতেছ “যেনাহুমনােমত” তুমি যে আমার মনেরও মন)। দেব হৃষীকপতে (হে দেব হৃষী- কেশ) অত্র মম বুদ্ধিঃ (এই বিষয়ে আমার বুদ্ধি ) স্থিরা ভূয়াৎ (সুস্থিরতা লাভ করুক। অর্থাৎ তুমি যন্ত্রী, আমার এই দেহ তােমার হাতের একটি যন্ত্র মাত্র ; তুমি নিজেই ইহাকে নিজের ইচ্ছা মত চালাইতেছ। আমার মন সম্বন্ধেও ঠিক এই কথা। আমি যেন এই তত্ত্ব কখনও না ভুলি। ৫৫। * ত্বং সর্বভূতেষু বিরাজসে সদা সর্বেষু জীবেম্বসি জীবনং স্বয়ম ত্বদ্দর্শনং সৰ্বগ মেহস্তু সৰ্ব্বত- স্তবৈব পূজাস্তু চ কৰ্ম্মভিৰ্ম্মম ॥৫৬। ত্বং সদা সর্বভূতেষু বিরাজসে (তুমি সৰ্ব্বভূতে সদা বিরাজমান) সর্বেষু জীবেষু স্বয়ং জীবনম অসি (সর্বজীবের মধ্যে তুমি নিজেই জীবন রূপ ধারণ করিয়া আছি, তুমিই আমাদের প্রাণের প্রাণ, তোমাকে নিয়াই আমরা বাঁচিয়া আছি) সৰ্বগ (হে সৰ্বব্যাপী) সৰ্ব্বতঃ ত্বদর্শনং মে অস্তু (সৰ্ব্বত্র সর্বভূতে !

৪৫
পূজা
তােমার দর্শন আমার লাভ হউক) মম কৰ্ম্মভিঃ চ ( আমার
• সকল কর্ম দ্বারাও) তব পূজা অস্তু এব (তােমরই পূজা
হউক)। অর্থাৎ তুমি জগৎ সৃষ্টি করিয়া তাহাতে অনুপ্রবেশ
করিয়াছ, তােমার সত্তা চৈতন্য ও আনন্দের প্রকাশেই আমাদের
জীবন মন ও আনন্দ ; তােমাকে সর্বত্র দর্শন করা, অনুভব করা
ও সেবা করাই আমার চরম সাধনা। ৫৬।
উপচার সমর্পণ :-
#যৎকরােমিদামিযজুহােমিদামিযৎ।
যত্তপস্যামি গােবিন্দ তৎকরােমি ত্বদর্পণ।
যং করােমি (আমি যাহা কিছু করি) যৎ অামি
( যাহা কিছু আহার করি) যৎ জুতােমি (যাহা কিছু যজ্ঞ
করি) যৎ দদামি (যাহা কিছু দান করি) যৎ তপস্যামি
( যাহা কিছু তপস্যা করি) গােবিন্দ ( হে গােবিন্দ) তৎ
(তৎসমুদয়) ত্বদর্পণং করােমি (তােমাতেই সমর্পণ করিতেছি)।
অর্থাৎ আমার সব কাজ যেন তােমার পূজায়, তােমার তৃপ্তি-
সাধনে, তােমার জীবের কল্যাণসাধনের জন্য সাধিত
হয়। ৫৭।
০
* ত্বদ্ধ্যানােহন্যন্ন চ চিন্তয়ানি
ত্বৎকৰ্ম্মতাে বা করবাণি নান্যৎ।

পূজা
দ্রব্যাণি সৰ্বাণি চ মে তবৈৰ
ত্বযেব তেষাং ভবতু প্রয়ােগঃ ॥ ৫৮।
বৃদ্ধানতঃ অন্যৎ (তােমার ধ্যান ছাড়া অন্য কিছু)
ন চিন্তয়ানি( চিন্তা যেন না করি) ত্বৎকৰ্ম্ম বা অন্যৎ (তােমার
কৰ্ম্ম ছাড়া অন্য কোন কৰ্ম্মও) ন করবাণি (যেন না করি)
মে সৰ্ব্বাণি দ্রব্যাণি চ (আমার এই যাহা কিছু সবই) তব এব
( তােমারই ) ত্বয়ি এব (তােমারই প্রীত্যর্থে) তেষাং প্রয়োেগঃ
ভবতু ( যেন ইহাদের প্রয়োেগ সাধিত হয় )। অর্থাৎ তােমার
ধ্যান ছাড়া অন্য কাজ যেন আমি না করি। ৫৮।
* আত্মানমাত্মীয়গণাংস্তথৈব চ
যাভিঃ ক্রিয়াভিঃ পরিতােষয়াম্যহম্।
তাভিঃ সদৈবেশ্বর তৃপ্তিরস্তু তে
তাভিস্তবৈবাচ্চনবুদ্ধিরস্তু মে॥ ৫৯।
অহং যাভিঃ ক্রিয়াভিঃ ( আমি যে সমুদয় কৰ্ম্ম দ্বারা)
আত্মান আত্মীয়গণান (আমার নিজ আত্মা এবং আত্মীয়গণকে)
পরিতােষয়ামি (পরিতুষ্ট করি ) ঈশ্বর (হে জগদীশ্বর) তাভিঃ
(সেই সমুদয় কৰ্ম্ম দ্বারাই) সদা তে তৃপ্তিঃ অস্তু এব (যেন ,
নিয়ত তােমার তৃপ্তি সাধিত হয়)। তাভিঃ (সেই সমুদয়
কৰ্ম্ম দ্বারা) তব এব অর্চনবুদ্ধিঃ মে অস্তু (তােমারই অর্চনা

পূজা ৪৭ করিতেছি এই বুদ্ধি যেন আমার হয়)। অর্থাৎ আমার নিজের এবং আত্মীয়গণের তৃপ্তির জন্য আমি যেন এমন কিছু করি না, যাহা তােমার অনুমােদিত নহে, যাহা তােমার পূজায় পরিণত হইবে না। আমার সব কাজ যেন তােমার পূজায় পরিণত হয়—তোমার তৃপ্তি বিধান করে। ৫৯। * শব্দম্পৰ্শাদিভিস্তে প্রকৃতিরবিরতাং যাং সপৰ্যাং বিধত্তে, তস্যা মৰ্ম্মগ্রহাে মে ভবতু হৃদি সদা ভক্তিভাবশ্চ দেব। তৎপূজায়াং মপি প্রকৃতিসহকৃতে দীয়তাং মেহধিকার- স্তুলীলায়াঞ্চ যােগো মম ভবতু সদা সুস্থিরপ্রসাদাৎ। ৬। প্রকৃতিঃ (প্রকৃতিদেবী, জগন্ময়ী মা আমার ) শব্দ- স্পর্শাদিভিঃ (শব্দ-স্পর্শাদি দ্বারা) অবিরতাং (নিরন্তর) যাং সপৰ্যাং বিধত্তে (যে পর্যায়ক্রম বিধিপূর্বক পালন করিতেছে) তস্যাঃ মে মৰ্ম্মগ্রহঃ ভবতু (তাহার মৰ্ম্ম যেন আমার উপলব্ধি হয়) দেব (হে লীলাময় পরমাত্মা) মম অপি (আমারও) হৃদি সদা ভক্তিভাবশ্চ (হৃদয়ে যেন সর্বদা ৪৮ পূজা ভক্তিভাব বিরাজ করে ) প্রকৃতিসহকৃতৌ ( প্রকৃতিদেবীর তালে তালে) তৎপূজায়াং (সেই পূজায় ) মে অধিকারঃ দীয়তাং (আমাকে অধিকার প্রদান কর) ত্বপ্রসাদাৎ (তােমার প্রসাদে) সদা সুস্থিরঃ (সদা সুস্থির হইয়া) তুল্লীলায়াং চ (তােমার লীলাতেও) মম যােগঃ ভবতু (যেন আমার চিত্ত যােজিত হয়)। অর্থাৎ প্রকৃতিদেবী শব্দ- স্পশাদির ভিতর দিয়া তােমার পূজা করিতেছেন, আমি সেই প্রকৃতিরই সন্তান ; সুতরাং আমারও উচিত সেই পূজার রহস্য অবগত হইয়া আমার নির্দিষ্ট অধিকার অনুসারে সেই পূজায় যােগদান করা। দয়া করিয়া আমাকে তােমার লীলায় যােগদান করিবার যােগ্যতা দান কর। ৬০। ; ৫ মাের্পতে তুচ্চরণেইয়মাত্মা প্রতীচ্ছ হে স্বস্য ধনং স্বয়ং ত্বম্। কিঞ্চিন্নিজস্বং ন হি বিদ্যতে মে যদ্দীয়তে তুচ্চরণে মুকুন্দ ॥ ৬১। ময়া ( আমা কর্তৃক) অয়ম্ আত্মা (এই আত্মা) ত্বচ্চরণে ( তােমার চরণে) অর্পতে (অর্পিত হইতেছে) হে ( হে সৰ্বাত্মন্) ত্বং স্বয়ং (তুমি নিজে ) স্বস্য ধনং (তােমার নিজের এই ধন) প্রতীচ্ছ ( গ্রহণ কর); মুকুন্দ (হে মুক্তিদাতা) ত্বচ্চারণে (তােমার চরণে ) যদ্দীয়তে (যাহা কিছু অর্পিত

৪৯
পূজা
হইয়াছে) [ তাহাতে ] মে নিজস্বং কিঞ্চিৎ ন বিদ্যতে হি
• ( আমার নিজস্ব কিছুমাত্রও নাই)। অর্থাৎ আমার এ আত্ম।
তুমিই আমাকে প্রদান করিয়াছ। আমার এমন কিছুই নাই
যাহা তােমাকে দিতে পারি। তুমি নিজের ধন নিজে গ্রহণ
করিয়া আমাকে কৃতার্থ কর। ৬১।
মাং মদীয়ং সকলং সম্যক্‌
মম ইষ্টদেবতায়ৈ পরমাত্মনে সমর্পয়ামি।
মং (আমাকে) মদীয়ং সকলং সম্যক্ (আমার যাহা
কিছু আছে সমস্তই সততভাবে) মম ইষ্টদেবতায়ৈ (আমার
ইষ্টদেবতা) পরমাত্মনে (পরমাত্মার কাছে সমর্পয়ামি (সমর্পণ
করিতেছি )। অর্থাৎ আমার বলিতে যাহা কিছু আছে, সে
সব তােমাকে নিবেদন করিয়া দিতেছি। ৬২।
যদ্যৎকৃতংহৃষীকেশ তৎসৰ্বংনময়া কৃতম।
ত্বয় কৃতন্তু ফলভুক্ ত্বমেব মধুসূদন। ৬৩।
হৃষীকেশ (হে হৃষীকেশ ) য যৎ কৃতং (যাহা কিছু
করা হইয়াছে) তৎসৰ্ব্বং (সেই সমুদয় ) ময়া ন কৃতং
(আমা কর্তৃক কৃত হয় নাই) তু (পরন্তু) ত্বয়া কৃতং
(তােমা কর্তৃক কৃত হইয়াছে); মধুসূদন (হে মধুসূদন) ত্বমেব

পূজা ফলভুক্ (সেই সমুদয়ের ফলভভাক্তা তুমিই)। অর্থাৎ হে আমার অন্তর্যামী চালক, আমা দ্বারা যাহা কিছু কৃত হইয়াছে, তাহার সব আমার ভিতর দিয়া তােমা দ্বারাই কারিত হইয়াছে। সুতরাং ইহার যদি কিছু ফল থাকে তাহা তােমারই প্রাপ্য। ৬৩। হৃদাসনমধিষ্ঠায় প্রসীদ মম পূজয়া। ত্বয়িপ্রীতেহৃষীকেশক্লেশঃসংক্ষীয়তেংখিল৷৷ হৃষীকেশ (হে হৃষীকেশ ) হৃদানম্ (হৃদয়-আসনে) অধিষ্ঠায় (অধিষ্ঠান করিয়া) মম পূজয়া ( আমার পূজা দ্বারা) প্রসীদ (তুমি নিজগুণে প্রসন্ন হও)। ত্বয়ি প্রীতে (তুমি প্রসন্ন হইলে ) অখিলঃ ক্লেশঃ ( যাবতীয় ক্লেশ) সংক্ষীয়তে ( সম্যক্‌রূপে ক্ষয়প্রাপ্ত হইবে)। ৬৪। গায়ত্রী :—নিজ নিজ ইষ্টদেবের । ৬৫। প্রণাম :- * অখণ্ডমণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্। তৎপদংশিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ । অখণ্ডমণ্ডলাকারং (অখণ্ড মণ্ডলাকারে পূর্ণ ও ব্রহ্মাণ্ড- ব্যাপী, সৰ্ব্বভূতে পূর্ণরূপে যিনি বিরাজমান ) যেন চরাচরম্ ব্যাপ্তং (যিনি চরাচর ব্যাপিয়া রহিয়াছেন) তৎপদং (ভগ-

পূজা
বানের সেই পরম পদ ও তাহার প্রাপ্তির উপায়) যেন দর্শিতং
• (যিনি দেখাইয়া দেন) তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ (সেই শ্রীগুরু-
দেবকে নমস্কার)। ৬৬।
অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।
যেন (যিনি) অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য (অজ্ঞান তিমিরান্ধের )
চক্ষুঃ (চক্ষু) জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া (জ্ঞানাঞ্জন শলাকা দ্বারা)
উন্মীলিতং (উন্মীলিত করিয়াছেন) তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ
(সেই শ্রীগুরুদেবকে নমস্কার)। ৬৭।
মন্নাথঃ শ্রীজগন্নাথােমদ্গুরুঃ শ্রীজগদ্গুরু
মমাত্মা সৰ্ব্বভূতাত্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।
মন্নাথঃ (আমার যে নাথ) শ্রীজগন্নাথঃ (তিনিই
শ্রীজগন্নাথ) মদগুরু (আমার গুরু) শ্রীজগদগুরুঃ (তিনিই
সমস্ত জগতের গুরু) মমত্মা (আমার আত্মাই) সৰ্বভূতাত্মা
( সর্বভূতের আত্মা) তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ (সেই শ্রীগুরু-
দেবকে নমস্কার)। অর্থাৎ যিনি সকলের ভিতর বসিয়া
আমাকে ও সকলকে পালন করিতেছেন, সকলের ভিতর দিয়া
আমাকে ও সকলকে শিক্ষা দিতেছেন, যিনি আমার ও সকলের

পূজা ভিতরে একই পরমাত্মারূপে অবস্থিত, আমি সেই ভগবানরূপী শ্রীগুরুদেবকে নমস্কার করি। ৬৮। ব্ৰহ্মানন্দং পরমসুখদং কেবলং জ্ঞানমুর্নিং দ্বাতীতং গগনসদৃশং তত্ত্বমস্যাদিলক্ষ্য। একং নিত্যং বিমলমচলং সৰ্ব্বধীসাক্ষীভূতং ভাবাতীতং ত্রিগুণরহিতং সদ্গুরুংতং নমামি ব্ৰহ্মানন্দং (ব্রহ্মানন্দ স্বরূপ) পরমসুখদং (পরমানন্দ দায়ক) কেবলম (একমাত্র কেবল) জ্ঞানমূৰ্ত্তিম্ (জ্ঞান-বিগ্রহ) ঘাতীতং (দ্বাতীত) গগনসদৃশং (গগনসদৃশ ব্যাপক ) তত্ত্বমস্যাদিলক্ষ্যম (তৎ ত্বম্ অসি” আদি বাক্যের লক্ষ্য) তং (সেই) একং (এক) নিত্যং (নিত্য) বিমল অচলং (বিমল অচল) সৰ্বধীসাক্ষীভূতং (সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তির সাক্ষিস্বরূপ) ভাতীতং (ভাবাতীত) ত্রিগুণরহিত (ত্রিগুণরহিত) সদ্গুরুং নমামি (সদগুরুদেবকে আমি নমস্কার করিতেছি)। ৬৯। সচ্চিদানন্দরূপায় কৃষ্ণায় পরমাত্মনে। নমাে বেদান্তবেদ্যায় গুরবে ব্ৰহ্মসাক্ষিণে। সচ্চিদানন্দরূপায় (সচ্চিদানন্দ স্বরূপ) কৃষ্ণায় (চিত্তা- কৰ্ষণকারী ইষ্টরূপধারী) পরমাত্মনে (পরমাত্ম স্বরূপ) বেদান্ত- পূজা বেদ্যায় (বেদান্তবদ্য) ব্ৰহ্মসাক্ষিণে (সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ) গুরবে নমঃ (শ্রীগুরুদেবকে, জ্ঞানদাতাকে নমস্কার)। অর্থাৎ তাহাকে বিধাতারূপে ভক্তি করিয়া, তঁাহার বিধানমতে চলিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইব। ৭। * কৃষ্ণং স্মরামি মমৈকবল্লভং কৃষ্ণং ভজামি মমৈকরক্ষকম। কৃষ্ণং জপামি মমৈক সাধনং কৃষ্ণং নমামি মমৈকজীবনম ॥৭১ মমৈকবল্লভং (আমার একমাত্র বল্লভ) কৃষ্ণং স্মরামি (শ্ৰীকৃষ্ণকে স্মরণ করি ) মমৈকরক্ষকম্ (আমার একমাত্র রক্ষক) কৃষ্ণং ভজামি (শ্ৰীকৃষ্ণকে ভজনা করি) মমৈক- সাধনং (আমার একমাত্র সাধন) কৃষ্ণং জপামি (শ্রীকৃষ্ণের নাম জপ করি) মমৈকজীবনম্ (আমার একমাত্র জীবনের সম্বল) কৃষ্ণং নমামি (শ্রীকৃষ্ণকে আমি করি )। ৭১। নমস্কার যং ব্রহ্মাবরুণেন্দ্ররুদ্রমরুতঃ স্তুন্তি দিব্যৈঃ স্তবৈ- বেদৈঃ সাঙ্গপদক্রমােপনিষদৈ- গায়ন্তি যং সামগা।

পূজা
ধ্যানাবস্থিততদূগতেন মনসা
পশ্যন্তি যং যােগিন
যস্যন্তং ন বিদুঃ সুরাসুরগণা
দেবায় তস্মৈ নমঃ ॥৭২।
যং (যাহাকে) ব্ৰহ্মা-বরুণ ইন্দ্র-রুদ্র-মরুতঃ (ব্রহ্মা, বরুণ,
ইন্দ্র, রুদ্র, মরুৎ প্রভৃতি দেবগণ) দিব্যৈঃ স্তবৈঃ (দব্য স্তবদ্বার)
স্তুন্তি (স্তুতি করেন) যং সামগাঃ (যহাকে সামবেদের
গায়কগণ) সাঙ্গপদক্রম-উপনিষদৈঃ বেদৈঃ (অঙ্গ-পদক্রম
উপনিষদাদি সহ বেদগান দ্বারা) গায়ন্তি (কীৰ্ত্তন করেন)
যং যােগিনঃ (ঘঁহাকে যােগিগণ ) ধ্যানাবস্থিততদগতেন মনসা
( ধ্যানে অবস্থিত থাকিয়া উদগত চিত্ত দ্বারা পশ্যন্তি { উলব্ধি
করেন) সুরাসুরগণাঃ (দেবাসুরগণ) যস্য অন্তং (যাহার
অন্ত) বিদুঃ ন (পরিজ্ঞাত নহেন) তস্মৈ দেবায় নমঃ (সেই
দেবতাকে নমস্কার)। ৭২।
* ওঁযস্মিন্সৰ্বে যতঃ সর্বে যঃসৰ্বঃসৰ্ব্বতশ্চযঃ।
যশ্চ সৰ্বময়াে দেবস্তস্মৈ সর্বাত্মনে নমঃ ॥৭৩৷৷
যস্মিন্ সর্বেব (যাহাতে সব) যতঃ সৰ্ব্বে (যাহা হইতে সব)
যঃ সৰ্বঃ (যিনি সব) যঃ সর্বতঃ চ ( এবং যিনি সর্বত্র ) যশ্চ

পূজা
সময়ঃ দেবঃ (যিনি সর্বময় দেবতা) তস্মৈ সৰ্বাত্মনে নমঃ
(সেই সর্বাত্মা শ্রীভগবানকে নমস্কার)। ৭৩।
# যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমাে নমঃ ॥৭৪৷
* যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমাে নমঃ ॥৭৫৷
* যা দেবী সর্বভূতেষু বিদ্যারূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমাে নমঃ ॥৭৬৷৷
* যা দেবী সর্বভূতেষু কান্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমাে নমঃ ॥৭৭
* যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমাে নমঃ ॥৭৮৷৷
যা দেবী (যে দেবী) সর্বভূতেষু (সৰ্ব্বভূতের মধ্যে)
মাতৃ-শক্তি-বিদ্যা-কান্তি-শান্তিরূপেণ (যাতৃরূপে, শক্তিরূপে,
বিদ্যারূপে, কান্তিরূপে, শান্তিরূপে) সংস্থিতা (বিরাজমানা)

পূজা
তস্যৈ নমঃ (তাহাকে নমস্কার) তস্যৈ নমঃ (তাহাকে নমস্কার)
তস্যৈ নমঃ নমঃ নমঃ (তাহাকে বার বার নমস্কার কবি)। অর্থাৎ,
জগতে যত কিছু আত্মীয়-স্বজন, শক্তি, জ্ঞান, মাধুৰ্য্য, শান্তি আদি
দেখিতে পাই, সে সব শ্রীভগবানেরই বিভূতি। আমাদের এই
সব বিভূতি অবলম্বন করিয়া যাহার বিভূতি তাঁহার কাছে
যাইতে হইবে। ৭৪-৭৮।
শরণাগতদীনাৰ্তপরিত্রাণপরায়ণে।
সৰ্বাহিরে দেবি নারায়ণিনমােহস্তুতে।
শরণাগতদীনাত্তপরিত্রাণপরায়ণে (হে শরণাগত দীন ও
আৰ্ত্তের পরিত্রাণপরায়ণে) সৰ্বস্যর্তিহরে (হে সৰ্ব্বজীবের
আৰ্ত্তিহারিণি) দেবি নারায়ণি (হে দেবি নারায়ণি) তে নমঃ
অস্তু (তােমাতে যেন আমার নমস্কার যুক্ত হয়)। অর্থাৎ
দুঃখহারিণী সকলের আশ্রয় মা ভগবতীকে নমস্কার । ৭৯।
# সৰ্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সৰ্বার্থসাধিকে।
শরণ্যেম্বকে গৌরিনারায়ণিনমােহস্তুতে৷৷
সৰ্বমঙ্গলমঙ্গল্যে (হে সর্বমঙ্গল ও মঙ্গলের উপায়
স্বরূপিণি) শিবে (হে কল্যাণদাত্রি ) সৰ্বার্থসাধিকে (হে
সৰ্বার্থসাধিকে) শরণ্যে (হে শরণ্যে) এ্যম্বকে (হে ত্রিনয়নে)
গৌরি নারায়ণি (হে গগৗরি, হে নারায়ণি) তে নমঃ অস্ত্র

পূজা
(তােনাতে আমার নমস্কার যুক্ত হউক)। অর্থাৎ যিনি
নিজে মঙ্গলময়ী হইয়া সকলকে মঙ্গলের পথে লইয়া যান,
যিনি জীবের কল্যাণ সাধনে তৎপরা, যিনি সকলের যথার্থ
বাসনা পূর্ণ করেন, যিনি জীবের আশ্রয়, যিনি ভূত-ভবিষ্যৎ
ও বর্তমান দেখিতে সমর্থ, যিনি বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণে অনুভূতা, যিনি
জীবের চরম গতি, সেই মহামায়া ভগবতী দেবীকে
নমস্কার। ৮০}
৯ সৰ্বম্বরূপে সৰ্বেশে সর্বশক্তিসমন্বিতে।
ভয়েভ্যন্ত্রাহি নেদেবিদুর্গেদেবিনমােহস্তুতে
সৰ্বস্বরূপে ( অয়ি সৰ্বস্বরূপে) সর্বেশে (অরি সর্বেশ্বরি)
সর্বশক্তিসমন্বিতে(অয়ি সৰ্বশক্তিসমন্বিতে) দেবি (অয়ি দেবি)
ভয়েভ্যঃ (সর্বপ্রকার ভয় হইতে) নঃ ত্রাহি ( আমাদিগকে
ত্রাণ কর)। দুর্গে দেবি (অয়ি দুর্গে দেবি) তে নমঃ অস্তু
তােমাতে আমাদের নমস্কার যুক্ত হউক)। অর্থাৎ বিশ্বরূপা
বিশ্বেশ্বরী সর্বশক্তিময়ী; সেই সৰ্ববিপদ হইতে ত্রাণকারিণী
দুর্গ। ভগবতীকে নমস্কার। ৮১।
## ওঁ যাে দেবােহগ্নৌ যােহ,
যাে বিশ্বং ভুবনমাঝিবেশ।

৫৮ পূজা য ওষধিষু যাে বনস্পতি তস্মৈ দেবায় নমাে নমঃ ॥৮২। যঃ দেবঃ অগ্নৌ ( যে দেবতা অগ্নিতে) যঃ অল্প, (যিনি জলে) যঃ বিশ্বং ভুবন আবিবেশ (যিনি বিশ্বভুবনকে আবিষ্ট করিয়া রহিয়াছেন) যঃ ওষধিধু (যিনি ওষধিতে) যঃ বনস্পতি ( যিনি বনস্পতিতে ) [ বিরাজমান রহিয়াছেন ] তস্মৈ দেবায় নমাে নমঃ (সেই দেবতাকে বার বার নমস্কার )। অর্থাৎ জগৎ-জীব শ্রী ভগবানের মূৰ্ত্তি জানিয়া—আমি সকলের ভিতর দিয়া তাহার দর্শন, ধ্যান ও সেবা করিতে চেষ্টা করি সকলের কাছে নত থাকি। ৮২। খং বায়ুমগ্নিং সলিলং মহীঞ্চ জ্যোতিষি সত্ত্বানি দিশাে মাদীন। সরিৎসমুদ্রাংশ্চ হরেঃ শরীরং যৎ কিঞ্চ ভূতং প্রণমেদঃ ॥ ৮৩। খং (আকাশ) বায়ুম (বায়ু) অগ্নিং (অগ্নি) সলিলং (জল) মহীং চ (এবং পৃথিৱী) জ্যোতিংষি (জ্যোতির্ময় পদার্থ- সমূহ) সত্ত্বানি (সকল প্রকার প্রাণিসমুদয়) দিশঃ ( দশদিক্‌) দ্রুমাদী (বৃক্ষাদি) সরিৎসমুদ্ৰান্ চ (নদী-সমুদ্র প্রভৃতি) যৎ কিঞ্চ ভূতং যাহা কিছু তৎসমুদয়) হরেঃ শরীরং (শ্রীহরির পূজা বিভূতি বা অংশ) অনন্যঃ (অন্য কিছু নয়—মনে অবধারণ করিয়া) প্রণমেৎ (বিধিপূর্বক প্রণাম করা উচিত)। অর্থাৎ জীব-জগৎকে পরমাত্মারই মূর্তি মনে করিয়া সকলের নিকট নত থাকিবে। ৮৩। স্মরণ :- * স্তনন্ধয়ানাং স্তনদুগ্ধপানে মধুনিং মকরন্দপানে। দানে দয়ালােরথ ভক্তগানে পশ্যামি মূর্তিং করুণাময়ীং তে৷৮৪৷৷ স্তন্ধয়ানা (স্তন্যপায়ীদের) স্তনদুগ্ধপানে (মাতৃস্তনদুগ্ধ পান করিবার সময়ে) মধুব্রানা? (ভ্রমরকুলের) মকরন্দপানে (মধুপান কালে) দয়ালঃ (দয়ালু ব্যক্তির) দানে (দান করিবার সময়ে ) অথ ভক্তগানে (আর ভগবদ্ভক্তদের নাম- গানে) তে করুণাময়ী মূর্তি (তােমার করুণাময়ী মূর্তি ) পশ্যামি (দেখিতে পাই)। ৮৪। লীলাঃ শিশূনাং গৃহচত্বরেষু গবাং প্রচারেষু চ বৎসলীলাঃ। জলে চ পশ্যন্ জলপক্ষিলীলাঃ স্মরামি লীলাময়বিগ্রহং ত্বাম॥৮৫।

পূজা
গৃহচত্বরেষু (গৃহপ্রাঙ্গণে ) শিশূনং লীলাঃ (শিশুদের
খেলা) গবা প্রচারেষু (গােচারণ-ভূমিতে) বৎসলীলাঃ চ
গাে-বৎসের লীলা) জলে চ জলপক্ষিলীলাঃ পশ্যন্ (আর
জলে জলপক্ষীর কেলি দেখিয়া ) লীলাময়বিগ্রহং বাম্ (লীলা-
ময় মূর্তি তােমাকে) স্মরামি ( স্মরণ করি)। ৮৫।
* বনস্পতৌ ভূভৃতি নিঝরে বা
কূলে সমুদ্রস্য সরিটে বা।
যত্রৈব চিত্তে সমুদেতি ভক্তি-
স্তত্রৈব পশ্যামি তবৈব মূর্তি।৮৬।
বনস্পতৌ ভূভৃতি নিঝরে বা (বনস্পতি, পৰ্ব্বত অথবা
ঝরণায়) সমুদ্রস্য কূলে (সমুদ্রের কূলে ) সরিটে বা (অথবা
নদীতটে) যত্রৈব (যেখানেই) চিত্তে ভক্তিঃ সমুদেতি (চিত্তে
ভক্তির আবির্ভাব হয়) তত্রৈব (সেখানেই ) তবৈব মূর্তি
পশ্যামি (তােমারই মূর্তি দেখিতে পাই)। অর্থাৎ ভগবান
সৰ্ব্বভূতে বিরাজমান; চিত্ত শুদ্ধ ও শান্ত হইলে সর্বত্র ঈশ্বরের
দর্শন লাভ হইয়া থাকে। ৮৬।
প্রার্থনা :-
আমি আমার নিজের ইহকাল ও পরকালের জন্য কিছুই।
চাই না; আমি না চাহিতে যে আমাকে এই দেহ-ইন্দ্রিয়,
প্রাণ-মন দান করিয়াছে, ইহাদের তৃপ্তি ও ভােগের জন্য

পূজা
যাবতীয় ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছে, যে আমার কোনও
অভাব রাখে নাই, আমাকে সুখে রাখিবার জন্য যে সর্বদা
ব্যস্ত, আমাকে সুখে না রাখিলেই যাহার চলে না, তাহার
নিকট আমার কি আর কোনও প্রার্থনা থাকিতে পারে ?
তবে যদি, হে ঠাকুর, আমার মুখে একটা প্রার্থনা শুনিতে
তােমার সাধ হইয়া থাকে, তবে তাহা এই যে, যাহা তােমার
প্রাণের নিগূঢ় ইচ্ছা, যে জন্য তােমার এই প্রপঞ্চ রচনা,
তােমার সেই ইচ্ছা তুমি সফল করিয়া, তুমি নিজে তৃপ্ত হইয়া
আমাকে তৃপ্তি দান কর। তাই বলিতেছি, ঠাকুর, এ জগতে
তােমার স্বর্গরাজ্য আবির্ভূত হউক, সর্বত্র তােমার ইচ্ছা পূর্ণ
সফলতা লাভ করুক, তােমার জীবের সর্ববিধ কল্যাণ সাধিত
হউক, সকলে সুখে থাকুক।
& ন ধনং ন জনং ন সুন্দরীং
কবিতাং বা জগদীশ কাময়ে।
মম জন্মনি জন্মনি ভবতাদ
ভক্তিরহৈতুকী ত্বয়ি ॥৮৭।
জগদীশ (হে জগদীশ) ন ধনং ন জনং ন সুন্দরীং
কবিতাং বা কাময়ে (আমি ধন, জন, সুন্দরী স্ত্রী, কবিত্ব-শক্তি
বা অন্য কিছুই চাই না) মম জন্মনি জন্মনি (আমার জন্মে জন্মে)
ত্বয়ি (তােমাতে) অহৈতুকী ভক্তিঃ ভবতা (যেন অহৈতুকী

পূজা ভক্তি বর্তমান থাকে)। অর্থাৎ হে জগদীশ, আমি কেবল তােমার উপর অহৈতুকী অচলা ভক্তি রাখিতে চাই। ৮৭। নচেৎহং রাজ্যং সকলজনকাম্যং সুবিপুলং ন যাচেইহং স্বর্গং সকলজনসেব্যং সুখময় নযাচেইহং মােক্ষং সকলজনলক্ষ্যৎ সুবিমলং সদা যাচে দাস্যং সকলতপসাং দুর্লভধনম্। অহং (আমি) সকজন কাম্যং (সকন জনের কাম্য ) সুবিপুলং ( অতি বিপুল ) রাজ্যং (রাজত্ব) যাচে ন (চাহি না অহং (আমি) সকলজনসেব্যং (সকল জনের ঈঙ্গিত) সুখ- ময়ং ( সুখময় ) স্বর্গং (স্বর্গ) যাচে ন (কামনা করি না) অহং (আমি) সকলজনলক্ষ্যং (সকল জনের বাঞ্ছিত) সুবিমলং (সুবিমল) মােক্ষং (মােক্ষ ) যচে ন (পাইতে চাহি না) সকলতপসং (সকল প্রকার তপস্যার) দুর্লভধনং (দুর্লভতম ধন) [ তে ] দাস্যং (তােনার দাসত্ব) সদা যাচে ( আমি সর্বদা প্রার্থনা করি)। অর্থাৎ তােমার দাভাব ছাড়া আমি রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য, স্বর্গ, এমন কি—পরম মুক্তিও চাই না। ৮৮। নাথ যােনিসহস্ৰষু যে যে ব্ৰজাম্যহম্। তেযুতেচলা ভক্তিরচ্যুতাস্তু সদা ত্বয়ি।

পূজা
নাথ (হে নাথ) যে যে যােনিসহস্রেষু (যে যে শত
সহস্র যােনিতে) তাং ব্ৰজামি (আমি ভ্রমণ করি) অচ্যুত
(হে অচ্যুত) ভেষু তেষু (সেই সেই সমুদয় জন্মেই) ত্বয়ি
(তােমাতে) অচলা ভক্তিঃ সদা অস্তু (সৰ্ব্বদা যেন অচল
ভক্তি হয়)। ৮৯।
যা প্রীতিরবিবেকিনাং বিষয়েম্বনপায়িনী।
স্বামনুস্মরত সা মে হৃদয়ান্মাপসৰ্পতু॥৯s |
অবিবেকিনাং (অবিবেকীদের) বিষয়েষু (বিষয়ের প্রতি)
যা (যেরূপ) অনপায়িনী (নিশ্চল) প্রীতিঃ (প্রীতি) দ্বাম
অনুস্মতঃ মে (তােমাকে নিয়ত স্মরণকারী আমার ) হৃদয়াৎ
(হৃদয় হইতে) সা (সেইরূপ প্রীতি) মা অপসতু (যেন
অপসূত না হয়)। অর্থাৎ কৃপণের মনটা যেমন অর্থের উপর
পড়িয়া থাকে, পেটুকের যেমন মিষ্টান্নের প্রতি সৰ্ব্বদা লােভ
থাকে, আমার মনটাও যেন সেইরূপ সর্বদা তােমার চিন্তায়
বিভাের থাকে। আমি যেন তােমাকে ছাড়া আর কিছুই
চাই। ৯০।
নাস্থা ধৰ্ম্মেন বসুনিচয়ে নৈব কামােপভােগে
যদ্ভাব্যং তদ্ভবতু ভগব পূৰ্ব্বকৰ্ম্মানুরূপ।

৬৪
পূজা
এতৎ প্রার্থং মম বহুমতং জন্মজন্মান্তরেখাপ
তৎপাদম্ভোরুহযুগগতা নিশ্চলা ভক্তিরস্তু।
ভগব (হে ভগবান) ধৰ্ম্মে আস্থা ন (ধৰ্ম্মে আস্থা নাই)
বসুনিচয়ে ন (অতুল ঐশ্বর্য্যে নাই) কামােপভােগেন এব
(কামােপভােগেও নাই) পূৰ্ব্বকৰ্ম্মানুরূপম(পূর্বজন্ম কৰ্ম্মানুরূপ)
যদ্ভাব্যং (যাহা হইবার) তদ্ভবতু (তাহা হউক) মম বহুমত
এতৎ প্রার্থং (আমার সর্বপ্রকার জ্ঞানবুদ্ধি মতে ইহাই একমাত্র
প্রার্থনীয়) জন্ম-জন্মান্তরে অপি (আমার জন্ম-জন্মান্তরেও
যেন) তৎপাদম্ভোরুযুগগতা (তােমার পাদপদ্মযুগলগামিনী)
নিশ্চলা ভক্তিঃ অস্তু (নিশ্চলা ভক্তি লাভ হয়)। অর্থাৎ
আমি ধন বা ঐশ্বৰ্য্য কামনার ভিখারী নই। পূৰ্ব্ব কৰ্ম্মফল
অনুসারে যাহা মিলে তাহাতেই তৃপ্ত; কেবল তােমার চরণে
অচলা ভক্তি ছাড়া আর কিছুই চাই না। ৯১।
# বিশ্বানি দেব সবিতদুরিতানি পরাসুব
যদ্ভদ্রং তন্ন আনুব। ৯২।
দেব সবিতঃ (হে সবিতৃদেব) বিশ্বানি ( সর্বপ্রকার )
দুরিতানি (অশুভ, পাপ) পরাসুব (পরাভূত হউক) যদ ভদ্র
( যাহা শুভ, কল্যাণকর) নঃ তৎ আসুব (আমাদের নিকট
তাহাই আবির্ভূত হউক)। অর্থাৎ জগতে সব পাপ
দূর
হইয়া
মর্ত্যে তােমার স্বর্গরাজ্য ফিরিয়া আসুক। ৯২।

পূজা
* * অসততম সময় তমসাে মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যোৰ্ম্মামৃতং গময়। অবিরাবীৰ্ম্ম এধি।
রুদ্র যত্তে দক্ষিণং মুখংতেন মাং পাহি নিত্যম্ ।
অসতঃ (অসৎ হইতে) মা (আমাকে) সময় (সতে
লইয়া যাও) তমসঃ (অন্ধকার হইতে) মা (আমাকে) জ্যোতি
গময় (আলােতে লইয়া যাও) মৃত্যোঃ (মৃত্যু হইতে) মা
(আমাকে) অমৃতং গময় ( অমৃতে লইয়া যাও) আবিঃ (হে
স্বপ্ৰকাশ) আবীঃ মে এধি (বার বার অবিচ্ছিন্ন ভাবে
পূর্ণরূপে আমার নিকট প্রকাশিত হও)। ৰুদ্ৰ (হে রুদ্র)
যৎ তে দক্ষিণং (তােমার যে কল্যাণকারী, বরাভয়প্রদ)
মুখং (মুখ) তেন মাং নিত্যং পাহি (তাহা দ্বারা সর্বদা
আমাকে রক্ষা কর)। অর্থাৎ আমাকে বিষয়-বিষ হইতে
তােমার আনন্দধামে লইয়া যাও, আমার অজ্ঞানান্ধকার
হে প্রকাশস্বরূপ, আমার নিকট চিরপ্রকাশিত
থাক। কুপথ হইতে রক্ষা করিবার সময় আমি যেন তােমার
স্নেহাবনত নয়নযুগল দেখিতে পাই; তাহা হইলে শাস্তিভােগে
আমার কষ্ট থাকিবে না। ৯৩।
;
• ## ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়ামঃ
ভদ্রং চক্ষুভিরবলােকয়ামঃ।

পূজা ভদ্রং মনােভিশ্চিন্তয়ামঃ ভদ্রং বাহুভিঃ সাধয়াম ৷ ৯৪। ভদ্রং (মঙ্গলময় বাণী) কর্ণেভিঃ (কর্ণদ্বারা) শৃণুয়ামঃ ( আমরা যেন শুনি) চক্ষুভিঃ (চক্ষুদ্বারা) ভদ্রং (মঙ্গলময় দৃশ্য) অবলােকয়ানঃ (যেন আমরা অবলােকন করি ) মনােভিঃ ( মনদ্বারা) ভদ্রং (শুভ) চিয়ামঃ (যেন আমরা চিন্তা করি) বাহুতিঃ (হস্তদ্বারা) ভদ্রং (শুভকৰ্ম্ম) সাধ- য়ামঃ ( যেন আমরা সাধন করি)। অর্থাৎ আমি সর্বব ইন্দ্রিয় দ্বারা আমার হৃষীকেশের, সৰ্বেন্দ্ৰিয় নিয়ামকের পূজা করিতে চাই। হৃষীকেণ হৃষীকেশসেবনং ভক্তিরুমা। ৯৪। ন ত্বহং কাময়ে রাজ্যং ন স্বর্গং নাপুনর্ভবম্। কাময়ে দুঃখপ্তানাং প্রাণিনামাৰ্ত্তিনাশনম । অহং রাজ্যং (আমি রাজত্ব ) কাময়ে ন (কামনা করি না) স্বর্গং ন (স্বর্গও না) অপুনর্ভবং ন (মুক্তিও চাই না) তু (পরন্তু) দুঃখপ্তানাং (দুঃখ-সন্তপ্ত) প্রাণিনাং (প্রাণীদিগের ) আর্তিনাশনম্ (সকল প্রকার আৰ্ত্তিনাশ) কাময়ে (আমি একমাত্র কামনা করি)। ৯৫। w ## সর্বেহত্র সুখিনঃ সন্তু সৰ্ব্বে সন্তু নিরাময়াঃ। সৰ্বে ভদ্ৰাণিপশ্যন্তু মা কশ্চিদ্দঃখমাপুয়াৎ ॥৯৬৷৷

৬৭
পূজা
অত্র (এ জগতে) সর্বেব (সকলেই) সুখিনঃ (সুখী )
সন্তু (হউক) সৰ্বে (সকলেই ) নিরাময়াঃ (নিরাময়) সন্তু
(হউক) সৰ্বে (সকলেই) ভদ্ৰাণি (শুভ) পশ্যন্তু (দর্শন
করুক) কশ্চিৎ (কেহই যেন) দুঃখং (দুঃখ ) মা আপুয়াৎ
(প্রাপ্ত না হয়): ৯৬।
সৰ্বস্তরতু দুর্গাণি সৰ্ব্বো ভদ্ৰাণি পশতু।
সর্ব: সদ্বুদ্ধিমাপ্নোতু সৰ্বঃ সৰ্বত্ৰ নতু।
সর্বঃ (সকলে) দুর্গাণি তরতু (বিপদ হইতে উত্তীর্ণ
হউক) সৰ্ব্বঃ (সকলে) ভদ্ৰাণি পশতু ( সর্বত্র মঙ্গল দর্শন
করুক) সঃ (সকলে) সদ্বুদ্ধি আপ্নোতু (সদুদ্ধি প্রাপ্ত হউক)
সব (সকলে) সৰ্ব্বত্র নতু (সৰ্বত্ৰ আনন্দ করুক)। ৯৭।
দুৰ্জ্জুন: সজ্জনাে ভূয়াৎসজ্জনঃ শান্তিমাপুয়াৎ।
শান্তা মুচ্যেত বন্ধেত্যো
মুক্তশ্চান্যান্ বিমােচয়েৎ ॥ ৯৮।
দুজ্জনঃ সজ্জনঃ ভূয়াৎ (দুৰ্জ্জন সজ্জন হউক) সজ্জন
শান্তিম আয়াৎ ( সজ্জন শান্তি লাভ করুক) শান্তঃ বন্ধেভ্যঃ
মুচ্যেত (শান্ত বন্ধন হইতে মুক্তিলাভ করুক ) মুক্তঃ চ অন্যান্
বিমােচয়েৎ (এবং মুক্ত হইয়া অপর সকলকে বন্ধনমুক্ত
করুক)। ৯৮।

৬৮ পূজা বিসর্জন :- অন্তঃসুপ্তস্য তবৈব তত্ত্ব- মিষ্টে সমারােপ্য প্রবােধিতং যৎ। দৃষ্টাৰ্চ্চনান্তে পুষি স্বকীয়ে বিসৰ্জনাৎ প্রাপ্ত তদাত্মরূপঃ ॥৯৯৷৷ অন্তঃপ্ৰসুপ্ত তব (অন্তর্নিহিত এবং প্রসুপ্ত তােমার) যৎ তত্ত্বং (যে তত্ত্ব) প্রবােধিত এব (পরিজ্ঞাত হইয়াছে) [ তাহাই ] ইষ্টে সমারােপ্য (আমার ইষ্টমূর্তিতে সর্বতােভাবে আরােপ করিয়া) অর্চনান্তে দৃষ্ট। (পূজান্তে তােমাকে দর্শন করিয়া) স্বকীয়ে বপুষি (নিজের দেহে) বিসর্জনৎ ( বিসর্জন দিয়া) তদাত্মরূপঃ প্রাপ্তঃ (তদাত্মরূপ প্রাপ্ত হইয়াছি)। অর্থাৎ ভগবান রহিয়াছেন আমার নিজের ভিতরে ; অথচ আমি তাহা অনুভব করিতে পারি না। তাই নিজের আদর্শ ইষ্ট অথবা গুরুর মধ্যে সমস্ত ভগবদ্ভাব আরােপ করিয়া ধ্যানাদির সাহায্যে সেখানে ভগবদ্ভাব অনুভব করিতে হয়। ধ্যানের পরি-- পাবস্থায় চিত্ত যখন ভগবদ্ভাবে পূর্ণরূপে সমাহিত হইবে, তখন অনুভবে আসিবে যে, সেই ভগবদ্ভাব নিজের ভিতরেই বৰ্ত্তমান। আদর্শের চিন্তা করিতে করিতে নিজের সূক্ষ্মদেহ আদর্শের অনুরূপে পরিণত হইতে থাকে। পরে তৎসাদৃশ্য লাভ হয়। ইষ্টকে বিসর্জন করা হয় নিজের ভিতরকার জ্ঞান-গঙ্গায় ;

পূজা যাহা মন হইতে বাহিরে, তাহা প্রত্যক্ষীভূত হয় নিজের ভিতরে। ৯৯। হােম :- ব্যষ্টিং সমারােপ্য সমষ্টিতত্ত্বে বিশ্বম্বরূপং সুদৃঢ়ীকৃতং যৎ। তত্ত্বং সমগ্রং পরমাত্মতত্ত্বে সমর্প সিদ্ধং তব শুদ্ধতত্ত্বম্।১ • • ৷৷ ব্যষ্টিং (ব্যষ্টিতত্ত্বকে) সমষ্টিতত্ত্বে (সমষ্টিতত্ত্বে) সমারােপ্য (সম্যক্ আরােপ করিয়া,আত্মনিবেদন দ্বারা সমষ্টির ভিতরে প্রত্যক্ষ করিয়া ) বিশ্বস্বরূপং (বিশ্বের স্বরূপ) যৎ সুদৃঢ়ীকৃতং (যাহা সুদৃঢ়ীকৃত হইয়াছে) সমগ্র ত্বং (সেই সমুদয় সমগ্র তত্ত্ব নিঃশেষে ) পরমাত্মতত্ত্বে (পরমাত্মতত্ত্বে) সমর্প (সমর্পণ করিয়া) তব শুদ্ধত্বম্ (তােমার বিশুদ্ধতত্ত্ব) সিদ্ধং (সিদ্ধ হইয়াছে)। অর্থাৎ সমষ্টি-জগতে যত তত্ত্ব বর্তমান, আমার ব্যন্তিদেহের সব তত্ত্বেই সেই সেই তত্ত্ব বর্তমান। ব্যষ্টি সমষ্টির অংশ, সমষ্টির সঙ্গে অভেদ ভাবাপন্ন; তাই নিজের এক এক তত্ত্বকে সমষ্টির এক এক তত্ত্বে নিবেদন করিয়া সমষ্টিগত তত্ত্ব- গুলিকে—জীব-জগৎকে শ্ৰী ভগবানের দেহরূপে তনু ওব করিয়া বিশিষ্টাদ্বৈত তত্ত্ব আস্বাদ করিলাম। তাহার পরে সমষ্টিগত জীবের এক এক তত্ত্বকে অপরের এক এক তত্ত্বে বিলীন পূজা করিয়া একমেবাদ্বিতীয় এই শুদ্ধ অদ্বয় তত্ত্ব আস্বাদ করিলাম।১০০। ওঁ অন্নময়ায় স্বাহা ইদমন্ন। প্রাণময়ায় স্বাহা এষ প্রাণঃ। ওঁ নােময়ায় স্বাহা এতন্মনঃ। ওঁ বিজ্ঞানময়ায় স্বাহা এত বিজ্ঞান। ওঁ আনন্দময়ায় স্বাহা এষ আনন্দঃ। ওঁ পরমাত্মনে স্বাহা এষ আত্মা। ইদম্ অন্নম্ (এই ব্যষ্টি অন্ন) অন্নময়ায় (সমষ্টি অন্নময়ে) স্বাহা (আহুতি দিতেছি ) এষঃ প্রাণঃ (এই ব্যষ্টি প্রাণ) প্রাণময়ায় (সমষ্টি প্রাণময়ে) স্বাহা (আহুতি দিতেছি ) এত মনঃ (এই ব্যষ্টি মন) মনােময়ায় (সমষ্টি মনেময়ে ) স্বাহা (আহুতি দিতেছি) এত বিজ্ঞানং (এই ব্যষ্টি বিজ্ঞান) বিজ্ঞান- ময়ায় (সমষ্টি বিজ্ঞানময়ে) স্বাহা (আহুতি দিতেছি) এষঃ আনন্দঃ (এই ব্যক্তি আনন্দ) আনন্দময়ায় (সমষ্টি আনন্দময়ে) স্বাহা (আহুতি দিতেছি) এষঃ আত্মা (এই ব্যষ্টি আত্মা) পরমাত্মনে (পরমাত্মাতে) স্বাহা (আহুতি দিতেছি )। অর্থাৎ নিজের ভিতরকার ব্যষ্টিগত অনুময়াদি কোষগুলি জগদ্ব্যাপী সমষ্টিগত অনুময়াদি কোষের অংশ, তাহার তালে তালে চালিত; ইহা অনুভব করিতে করিতে নিজের ব্যষ্টিভাবকে আর পৃথক্‌ রাখা যায় না। তখন স্বগত-ভেদযুক্ত এক বিশিষ্ট ; পূজা অদ্বৈত তত্ত্ব অনুভূত হইতে আরম্ভ করে। মনে হয়, এক সর্ব- ব্যাপী পরমাত্মতত্ত্ব রহিয়াছেন; সমস্ত জীব-জগৎ যেন তাহার দেহ। তাহার পরে সেই সমষ্টিগত অনুময় তত্ত্ব, সমষ্টিগত প্রাণময়ে, আবার সমষ্টিগত প্রাণময়, মনােনয়, বিজ্ঞানময়, আনন্দময় তত্ত্বগুলি যথাক্রমে সমষ্টিগত মনােময়, বিজ্ঞানময়, আনন্দময় পরমাত্মায় লীন হইয়া যাওয়ার ফলে একমাত্র শুদ্ধ পরম অদ্বৈত তত্ত্ব অনুভবে আসিতে আরম্ভ করে। ১০১। ওঁ প্রাণময়ায় স্বাহা। ওঁ মনােময়ায় স্বাহা। ওঁ বিজ্ঞানময়ায় স্বাহা। ও আনন্দময়ায় স্বাহা। ও সৰ্ব্বং খন্বিদং ব্ৰহ্ম ৷৷ ১০২। প্রাণময়ায় স্বাহা [ অনুময়কে ](প্রাণময়ে আহুতি দিয়া) মনোেময়ায় স্বাহা (তৎপরে মনােময়ে প্রাণময়কে আহুতি দিয়া) বিজ্ঞানময়ায় স্বাহা (তৎপরে মনােময়কে বিজ্ঞানময়ে আহুতি দিয়া) আনন্দময়ায় স্বাহা (তৎপরে বিজ্ঞানময়কে আনন্দময় আহুতি দিয়া) [ অনুভবে আসিবে ] ইদং সৰ্ব্বং খলু ব্ৰহ্ম এই সমস্তই ব্ৰহ্মস্বরূপ)। ১০২। •শান্তিপাঠ :- ও সহ নাৰ্ববতু। সহ নৌ ভুক্ত। সহ- ,

৭২
পূজা
বীৰ্যং করবাবহৈ। তেজস্বিনাধীতমস্তু
মা বিদ্বিষাবহৈ। ১০৩।
নৌ (আমাদের দুইজনকে—আচাৰ্য্য ও শিষ্যকে) সহ
( এক সঙ্গে) অতু (তিনি রক্ষা করুন) সহ নৌ ভুক্ত,
( আমাদের দুইজনকে তিনি একত্রে পালন করুন) সহবীৰ্যং
করবাবহৈ ( আমরা একসঙ্গে যেন বীৰ্য্যলাভ করি) নৌ অধীতং
তেজস্বি অস্তু (আমাদের দুইজনের অধীত জ্ঞান ব্ৰহ্মবিদ্যা
পূর্ণ বিকাশ লাভ করুক) মা বিদিষাবহৈ (আমরা দুইজনে
যেন পরস্পর কোন প্রকার বিদ্বেষপরায়ণ না হই)। অর্থাৎ
ভগবান এক, তাহার জগতে ভেদভাব থাকা উচিত নহে।
আমরা সকলে একসঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া বাস করিব, চিন্ত
করিব, আনন্দ করিব;—সকলে মিলিয়া এক হইব। ১০৩।
ওঁ মধু বা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধব।
মাধ্বীর্ন সন্তােষধী। মধু নক্তমুতােষসঃ।
মধুমৎ পার্থিবং রজঃ। মধু দ্যৌবস্তু নঃ পিতা।
ও মধুমান্নো বনস্পতিঃ মধু অস্তু সূৰ্য্য।
মাধ্বীর্গাবাে ভবন্তু নঃ ॥ ওঁ মধু ওঁ মধু ওঁ মধু।
বাত (বায়ু) মধু ঋতায়তে (সকল ঋতুতেই মধু বহন
করে) সিন্ধঃ (নদীসকল) মধু রন্তি (মধু ক্ষরণ

१७ পূজা করে) নঃ ওষধীঃ (আমাদের ওষধিবৃক্ষগণ) মাধ্বীঃ সন্তু (মধুময় হউক) মধু নক্তং ( রাত্রি মধুময় হউক) উত উষসঃ (ঊষাও মধুময় হউক) পার্থিবং রজঃ (এ পৃথিবীর রজঃ) মধুমৎ (মধুময় হউক) দ্যোঃ (অন্তরীক্ষ) মধু অস্তু (মধুময় হউক) নঃ পিতা (আমাদের পিতৃলােক মধুময় হউক) না বনস্পতিঃ (আমাদের বনস্পতি) মধুমান্ (মধুময় হউক ) সূৰ্যঃ (সূৰ্য্যদেব) মধুমান অস্তু (মধুময় হউক) নঃ গাবঃ ( আমাদের গাে-সকল) মাধ্বীঃ ভবন্তু (ধুময় হউক) ওঁ মধু ওঁ মধু ওঁ মধু (সর্বত্র সকলই মধু—কেবল মধু-মধু হউক)। অর্থাৎ স্কুল, সূক্ষম এবং কারণ-জগৎ মধুময় শ্রীভগবানে চিত্ত সমাহিত হইলে জগৎ আনন্দময় মনে অনিন্দময় হয়।১০৪। • * অহো নিমুগ্নস্তব রূপসিন্ধেী পশ্যামি নান্তং ন চ মধ্যমাদিম। অবাক্‌ চ নিস্পন্দতরাে বিমূঢ়ঃ কুত্রাস্মি কোস্মীতি ন বেদ্মি দেব।১০৫৷৷ অহাে (আঃ মরি মরি ) তব রূপসিন্ধো (তােমার রূপ- সাগরে নিমগ্নঃ ( নিমজ্জিত হইয়া গিয়াছি) ন অন্তং ন মধ্য আদিং চ পশ্যামি (না আদি, না অন্ত, না মধ্য—কিছুই দেখিতেছি না) দেব (হে দেব) নিস্পন্দতরঃ (নিঃস্পন্দের

৭৪
পূজা
ন্যায়) অবাক্‌ বিমূঢ়ঃ চ (বাকশূন্য ও বিমূঢ়,-স্তব্ধ হইয়া
গিয়াছি) কুত্র অস্মি ( আমি কোথায় আছি) কঃ অস্মি ইতি
(আমি কে ইত্যাদি কিছুই) ন বেঘি (জানিতে পারিতেছি
)। অর্থাৎ আমি তােমার রূপসাগরে নিমজ্জিত থাকিয়া
আনন্দে মুগ্ধ হইয়াছি। ১০৫।
ও শান্তি !
ওঁ শান্তি !!
ও শান্তি !!!

সব সময়ের পূজা। দৃশ্যের অস্তিত্ব হইতে আমার অস্তিত্ব যে বেশী সত্য, তাহাতে সন্দেহ নাই। আমি’র স্বরূপ লইয়া বিবাদ থাকিলেও ‘আমি’র অস্তিত্ব স্বতঃসিদ্ধ। এই ‘আমি’ যার প্রকাশ, যিনি এই ‘আমি’র ভিতর বসিয়া—জগতের ভিতর বসিয়া লীলা করিতেছেন, তাহার অস্তিত্ব সম্বন্ধেও প্রাচীন ঋষিদের মনে সন্দেহ আসে নাই। সর্বত্র তাহার লীলাদর্শন, তাহার ধ্যান সব জীব-জগতের মধ্য দিয়া তাহার সেবা করা ছিল তঁাহাদের প্রধান সাধনা। তিনি আছেন—তিনি আমাদের একমাত্র আশ্রয়, সমস্ত অস্তিত্ব-শক্তি জ্ঞান আনন্দের মূলাধার। তিনি আমাদের সর্বাপেক্ষা বেশী প্রিয়, আত্মা হইতেও প্রিয় কলিয়া পরমাত্মা। নিজের ভিতরে—জগতের ভিতরে বসিয়া তিনি কিভাবে লীলারত, তাহা উপলব্ধি করিয়া নিজের জীবনকে তাঁহার লীলার সহায় করিয়া ভােলা ছিল তাহাদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি আমাদিগকে কি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিয়াছেন, আমাদের নিকট তিনি কি চান, তাহা হইতে নিজ নিজ স্বধৰ্ম্ম নির্ণয় করিয়া সেই স্বধৰ্ম্মপালনই ছিল তাহাদের সাধনা বা যজ্ঞ। সমষ্টিগত প্রকৃতির ভিতর দিয়া তাঁহার কার্যপ্রণালী অনুভব করিয়া নিজের ব্যষ্টি-জীবনকে তাঁহার সেই সমষ্টিগত বিধানের তালে ৭৬ পূজা তালে চালিত করিতে তাহারা ছিলেন সচেষ্ট। তাই জীবন- গত সব কাজকে ‘ভগবদিচ্ছা পূরণ’-রূপ সাধনায় পরিণত করিতে তাহারা চেষ্টা করিতেন। ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করিয়া সমস্ত প্রকৃতি কি করিতেছেন, প্রকৃতিদেবী কিভাবে তাহার সন্তানদিগকে অকৰ্ম্ম হইতে কৰ্ম্মের দিকে চালাইতেছেন, তাহা অনুভব করিয়া নিজের জীবনকে অকৰ্ম্ম হইতে কর্মের মধ্যে লইয়া গিয়া প্রকৃতির তালে তালে চালিত করিতে তাহারা চেষ্টা করিনে। তাই তাহাদের প্রার্থনা ছিল, “হে ভগবন্! রাত্রে তােমার কৃপায় দেহ-মনের অবসাদ দূর হইয়াছে, এখন তােমারই আদেশে সংসারে তােমার কাৰ্য্য সাধন করিতে যাইতেছি, তুমি আমাকে দেখিও, চালাইও, রক্ষা করিও।” স্নানের সময়ে তাঁহাদের প্রার্থনা ছিল,-“জল দ্বারা দেহের বহির্ভাগমাত্র পরিষ্কার করিতে পারি, তুমি দয়া করিয়া আমার দেহের ভিতরটা, মন-প্রাণ আদি সব তত্ত্বগুলিকে পবিত্র করিয়া দাও।” কোন কাজ করিতে যাওয়ার আগে তাঁহাদের প্রার্থনা ছিল,—“জীব তােমারই জীয়ন্ত বিগ্রহ, তাহাদের ভিতর দিয়া-তােমার সেবা করিতে যাইতেছি। আমার সব কাজ যেন তােমার সেবায় পরিণত হয়। আমি কথা, ভাব ও কাজের দ্বারা যেন কাহারও অনিষ্ট সাধন না করি।” কোন ব্যক্তি বা কোন সুন্দর দৃশ্য দেখিয়া তাহারা বলিতেন, “ইহা- দের সৌন্দর্য্য আমার পরমসুন্দরকে স্মরণ করাইয়া দিতেছে।

৭৭
পূজা
ঠাকুর, তুমি তাে ইহাদের ভিতরে আছ। একবার ইহাদের
মধ্য দিয়া প্রকট হইয়া আমাকে দেখা দাও। তারপর ইহাদের
ভিতর দিয়া তােমাকে সেবা করা সহজ হইয়া পড়িবে।”
ছেলের ভিতর দিয়া তঁাহারা বাল-গােপালের, মেয়ের
ভিতর দিয়া কুমারী ভগবতীর, মা-বাপের ভিতর দিয়া অন্নপূর্ণা-
বিশ্বনাথের, স্বামীর ভিতর দিয়া শিব, রাম বা কৃষ্ণের, স্ত্রীর ভিতর
দিয়া দুর্গা, সীতা বা রাধার ;-এক কথায় তঁাহার। জীবের ভিতর
শিবের অনুসন্ধান করিতেন। ইহাদের দেখিবামাত্র বলিতেন,
“হে ঠাকুর, তুমি ইহাদের মধ্যে রহিয়াছ । তােমার শক্তিতে
ইহারা দেখিতেছে, শুনিতেছে, বাঁচিয়া গাছে। তুমি ইহাদের
ভিতর হইতে একবার প্রকট হইয়া দেখা দাও। তারপরে
ইহাদের সেবা আপনা হইতে পূজায় পরিণত হইয়া যাইবে !”
আহার করিবার বা করাইবার সময় তাহারা অনুভব করিতে চেষ্টা
করিতেন,—“কে ইহাদের ভিতর বসিয়া আহার করিতেছে!”
সন্ধ্যাবেলা শব্দ-স্পশাদির ভিতর দিয়া ভগবানের আহ্বান
অনুভব করিয়া তাহার কাছে ছুটিয়া যাইবার জন্য তঁাহারা ব্যস্ত
হইতেন; প্রার্থনা করিতেন,-“কত যুগ হইল যেন তােমাকে
ছাড়িয়া আসিয়াছি আর তােমার বিরহ সহ্য হয় না। বুদ্ধির
দোষে যাহা কিছু ময়লা লাগিয়াছে, তাহা ধুইয়া পরিষ্কার করিয়া
লইয়া আমাকে তােমার অভয় কোলে স্থান দাও আমার যে
আর কেহই নাই।” নিদ্রার সময়ে ভবান কিভাবে আদর
করিয়া ঘুম পাড়াইতেছেন, মিলনানন্দ আস্বাদ করাইতেছেন,
;

৭৮
পূজা
তাহা অনুভব করিতে করিতে প্রকৃতির শিশু প্রকৃতির কোলে
ঘুমাইয়া পড়িতেন; তাই তাহাদের নিদ্রা হইত সমাধি-স্থিতি।
প্রাচীন ঋষিগণ ছিলেন প্রকৃতির শিশু। তাহারা
চলিতেন মায়ের আঁচল ধরিয়া প্রকৃতির তালে তালে। অনুভব
করিতেন, তিনিই তঁাহাদের জন্য সব করিতেছেন, তাহাদের
সব ভার তাহার উপরে, তিনিই তাহাদের সুখের জন্য, কল্যাণের
জন্য, আনন্দ দেওয়ার জন্য মহাব্যস্ত। ভাবনা-চিন্তা ভঁহাদের
মনে স্থান পাইত না, অনাবশ্যকীয় দ্রব্য বা চিন্তার ভার
তাহাদিগকে পীড়িত করিত না। তাহারা ছিলেন নিত্যশুদ্ধ,
বুদ্ধ মুক্ত পুরুষ ; নগ্ন শিশুর ন্যায় সরল, পবিত্র, সুন্দর।
তাহারা কিভাবে সব কাজকে পূজায় পরিণত করিতেন, সব
সময়ের পূজার মধ্যে তাহারই একটা আভাস দেওয়া হইল।

প্রভূমে বিছানায় বসিয়া পূজা
বিষ্ণুস্মরণ ঃ-১ শ্লোক।
ইষ্টমন্ত্র জপ :-
প্রাতঃস্মরণীয় -৭ শ্লোক।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ঃ-১৫ শ্লোক।
প্রার্থনাঃ-৮-১১ শ্লোক।
কর্তব্য অবধারণ ঃ-
-
ভ্রমণের সময় পূজা
ইষ্টমন্ত্র জপ ঃ-
ধামতত্ত্ব ঃ-২২ শ্লোক।
প্রার্থনাঃ-সকালে—পূর্বগােষ্ঠের অনুকূল ৮, ১০, ১১ শ্লোক।
বৈকালে—উত্তরগােষ্ঠের অনুকূল ১২, ১৩ শ্লোক।
স্তবঃ-শ্ৰীমূর্তিদর্শন [ স্তব (ক)]
ব্ৰহ্মানুভুতি ঃ-সত্য-প্রাণ-আনন্দ প্রতিষ্ঠা।
স্নানের সময় পুজা
বিস্মরণ ঃ-১ শ্লোক।
সাধনশ্লোক পাঠ ঃ-১৬, ১৭ শ্লোক ।

পূজা
দেহকে শ্রীভগবানের মন্দির মনে করিবে।
আত্মেন্দ্রিয়সমাযুক্তং দেহং শ্রীহরিমন্দির।
স্নানেন শােধন: তস্য বিধেহি কৃপয়া তব। ১০৬।
আত্মেন্দ্রিয়সমাযুক্তং দেহং (আত্মা ইন্দ্রিয়াদি সমাযুক্ত
এই দেহ) শ্রীহরিমন্দিব (শ্রীহরির মন্দিরস্বরূপ); তব
কৃপয়া (তােমার কৃপায়) মানেন (স্নানের দ্বারা) তস্য
শােধনং (তাহার শােধন) বিধেহি ( বিধান কর)। অর্থাৎ
হে ভগবান, আমি জলদ্বার দেহ শুদ্ধ করিতে পারি, কিন্তু
আমার মনের নিকট জল পৌছায় না। তুমি কৃপা করিয়া
আমার চিত্ত শুদ্ধ করিয়া দাও। ১০৬।
;
অদ্ভিৰ্গাত্রাণি শুদ্ধন্তু মনঃ সত্যেন শুদ্ধতু।
বিদ্যাতপােভ্যাং ভূতাত্মা বুদ্ধিজ্ঞানেন শুদ্ধতু। ১০৭।
গাত্রাণি অদ্ভিঃ শুদ্ধন্তু (জলদ্বারা শরীর শােধিত হউক)
মনঃ সত্যেন শুদ্ধতু (সৎ চিন্তা দ্বারা মন বিশােধিত হউক)
ভূতাত্মা বিদ্যাতপােভ্যাং (ব্ৰহ্মবিদ্যা ও তপস্যা দ্বারা ভূতাত্মা
শুদ্ধিলাভ করুক) বুদ্ধিঃ জ্ঞানেন শুদ্ধতু (বুদ্ধি পরাজ্ঞানের
দ্বারা পরিশুদ্ধ হউক)। অর্থাৎ জলদ্বারা স্থূলদেহ, সৎ ভাবনা
দ্বারা মন, ব্ৰহ্মবিদ্যা ও তপস্যা দ্বারা ভূতাত্মা এবং জ্ঞানের দ্বারা
বুদ্ধি শুদ্ধ হউক। ১০৭।

- ; পূজা ৮১ তর্পণ :- আব্ৰহ্মভুবনাল্লাকা দেবর্ষিপিতৃমানবাঃ। ময়া দত্তেন তােয়েন তৃপান্তু ভুবনত্রয়ম্ ॥ ১০৮ ! অব্ৰহ্মভুৎ (ব্ৰহ্ম হইতে ভুবন পর্যন্ত) লােকাঃ (লােকসকল) দেবর্ষিপিতৃমানবাঃ (দেবতা, ঋষি, পিতৃ- লােক এবং সমস্ত মানব) ভুবনয়ম ( এই তিন ভুবনের সমস্ত) ময়া দত্তেন তােয়েন (আমা কর্তৃক প্রদত্ত এই জলদ্বার) তৃপ্যন্ত (তৃপ্তিলাভ করুন)। অর্থাৎ জীবনিচয় ভগবৎ- আদেশে ভগব-বিধানে আমার সেবায় নিযুক্ত। আমরা সকলের নিকট ঋণী ; এই ঋণ শােধ না হইলে নিশ্চিন্ত মনে ভগবৎ আরাধনা করা অসম্ভব। তারপরে সর্বব্যাপী ভগবান সজীবে অধিষ্ঠিত। তিনি সকলের অন্তর্যামী পরমাত্মা। সকলের ভিতর দিয়া তাহার দর্শন, ধ্যান ও সেবা দ্বারা সর্বত্র তাহাকে উপলব্ধি করিতে হইবে। যিনি সর্বব্যাপী, তাহাকে শুধু নিজের ভিতরে—শুধু সাধু মহাত্মার ভিতরে অনু ব করিলে তাঁহার সর্বব্যাপিত্ব-ভাব উপলব্ধি করা হয় না। তাই তপণ দ্বারা-শুভ কামনা দ্বারা-সৰ্ব্বজীবের তৃপ্তিসাধনের ব্যবস্থা দেখা যায়। ১০৮। শান্তিপঠঃ-৯৬ শ্লোক। আহারে পূজা বিষ্ণুস্মরণ :-১ শ্লোক। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ - ১৫ শ্লোক। ।

৮২
পূজা
অশোধন :-
এতদন্নাদিকং সৰ্বমচ্ছিদ্ৰমস্তু । ১০৯ |
এতৎ সর্বং (এই সমুদয়) অন্নাদিকং (অন্নাদি খাদ্য
প্রভৃতি) অচ্ছিদ্রম্ অস্তু (দোষরহিত হউক)।
অর্থাৎ খাদ্য-দ্রব্য ভালরূপ পরীক্ষা করিয়া ভগবানে
নিবেদন করিবার উপযুক্ত হইলে ভগবানের নাম স্মরণ করিয়া
তাহাকে নির্দোষ পবিত্র করিয়া লইতে হইবে। ১০৯।
অল্প-অর্পণ :-
এতদন্নাদিকং সৰ্বম্ ওঁ ব্ৰহ্মাৰ্পণমস্তু। ১১০।
এতৎ অন্নাদিকং সর্বং (এই সমস্ত অন্নাদি ) ওঁ ব্ৰহ্মাৰ্পণ
অস্তু (পরব্রহ্মে সমর্পিত হউক)। অর্থাৎ ভােজনের উদ্দেশ্য
শুধু উদরপূরণ এবং ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধন না হইয়া, যাহাতে
ভিতরে সব তত্ত্বে অবস্থিত দেবতাদের, এমন কি, পরমাত্মার
পৰ্যন্ত তৃপ্তিবিধান করে, সেজন্য প্রার্থনা করিবে। ১১০।
ব্ৰহ্মাপণং ব্রহ্মহবিঃ ব্রহ্মাগ্নৌ ব্ৰহ্মণা হুতম্।
ব্ৰহ্মব তেন গন্তব্যং ব্ৰহ্ম কৰ্ম্মসমাধিনা। ১১১।
অর্পণং ব্রহ্ম (অর্পণ-যন্ত্র ব্রহ্ম) হবিঃ ব্রহ্ম (অর্পণের দ্রব্য
ঘৃতাদিও ব্রহ্ম) ব্ৰহ্মাগ্নৌ (যাহাতে হবন করা হইতেছে, সেই
অগ্নিও ব্ৰহ্ম)ব্ৰহ্মণাহুতং (যাহা কর্তৃক হবন করা হইতেছে, সেও
ব্ৰহ্ম) ব্ৰহ্মকর্মসমাধিনা (এই ব্ৰহ্ম যজ্ঞ অনুষ্টান দ্বারা) তেন
।

পূজা ব্ৰহ্ম এব গন্তব্য (হবনকারী ব্ৰহ্মকেই প্রাপ্ত হয়)। অর্থাৎ এক অখণ্ড অবিভক্ত ভগবান লীলাচ্ছলে আপনাকে প্রধানতঃ কৰ্ত্তা-কৰ্ম্ম-করণ, ভােক্তা-ভােজ্য-ভােজন, জ্ঞাতা-জ্ঞেয়-জ্ঞান আদি ত্রিপুটীতে বিভক্ত করিলেন। সুতরাং আমাদের আদান- প্রদানের সব দ্রব্যও তিনি, আদান-প্রদানের ক্রিয়াও তিনি এবং তাহার কৰ্ত্তাও তিনি। আমার আহার বিষয়ে নিজের কোনও কর্তৃত্বাভিমান নাই জানিয়া ভগবদিচ্ছায় তঁাহারই তৃপ্তিসাধনের জন্য আহার করিতেছি-এই কথা স্মরণ রাখিতে হইবে। ১১১। বলিরক্ষণ :- ভােজন :- প্রাণায় স্বাহা, আপানায় স্বাহা, সমানায় স্বাহা, উদানায় স্বাহা, ব্যানায় স্বাহা। ১১২। প্রাণায় স্বাহা, অপানায় স্বাহা, ইত্যাদি (আমার প্রদত্ত অন্নাদি প্রাণ-অপান-সমান-উদান-ব্যান নামক পঞ্চবায়ুর তৃপ্তি সাধন করুক )। অর্থাৎ একই প্রাণশক্তি দেহের বিভিন্ন তত্ত্বে, বিভিন্ন যন্ত্রে অধিষ্ঠিত থাকিয়া দেহধারণের আবশ্যকীয় যাবতীয় কার্য সম্পাদন করিতেছে। ভুক্ত দ্রব্যকে পরিপাক করিয়া তাহার অপরিপক্কাংশ মলরূপে ত্যাগ করা, সারাংশ রক্তে পরিণত করিয়া যেখানে তাহার যতটুকু দরকার তাহার ব্যবস্থা করা, সব যন্ত্রগুলিকে শুদ্ধ ও পুষ্ট করিয়া সর্বকাৰ্যক্ষম করিয়া তােলা এবং অন্তিম সময়ে স্কুলদেহ ত্যাগ

৮৪
পূজা
করিয়া সূক্ষমদেহকে আপন আপন কৰ্ম্মানুসারে দেহান্তরে লইয়া
যাওয়া একই প্ৰাণবায়ুর অর্থাৎ প্রাণ-অপানাদি পঞ্চবিভূতির
কাৰ্য।১১২।
যঃ অয়ং
নমস্কার :-
যােহয়ং দেবােহন্তরে তিষ্ঠ পদত্যং চতুর্বিধ।
যেন দত্তমিদং সৰ্ব্বং তস্মৈ পরাত্মনে নমঃ ॥ ১১৩।
দেব (এই দেবত। যিনি ) অন্তরে তিন
( আমাদের ভিতরে অবস্থিত থাকিয়া) চতুব্বিধম্ অন্নং পচতি
( চ্য, চোষ, লেহ, পেয় এই ঢারি প্রকার খাদ্যদ্রব্যের
পরিপাক সাধন করেন) যেন ইদং সর্বং দত্তং (যিনি আমাদের
এই সমস্ত অন্নের ব্যবস্থা করিয়াছেন) তস্মৈ পরাত্মনে নমঃ
সেই পরমাত্মাকে আমরা নমস্কার করি )। ১১৩।
কার্ধক্ষেত্রে পুজা
কাৰ্য্যরহস্য চিন্তন ঃ-১০, ১১ শ্লোক ।
ইষ্টমন্ত্র জপ :-
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ :-১৫ শ্লোক।
ওঁ দেবাে বা বিতা প্রার্থয়তু শ্রেষ্ঠতমায় কৰ্ম্মণে ॥১১৪।
শ্রেষ্ঠতমায় কৰ্ম্মণ (সৰ্বশ্রেষ্ঠ কৰ্ম্মসাধনের নিমিত্ত) দেব
বা সবিতা প্রার্থয়তু (সবিতা দেবতার নিকট প্রার্থনা করবে)।
অর্থাৎ-ভগবান ভঁহার অনন্ত শক্তি ভর্গেদেবের দ্বারা

পূজা ৮৫ আমাদিগকে সব কাজ করিবার যােগ্যতা দান করেন। তাঁহার ঐ শক্তি যাহাতে আমাদের ভিতরে বসিয়া অবাধিত ভাবে শ্রীভগবানের প্রিয় কাৰ্য্য সাধন করিতে পারে, সেজন্য প্রস্তুত হইতে হইবে এবং ভর্গোদেবের নিকট প্রার্থনা করিতে হইবে।১১৪। তৎকৰ্ম্মকৃৎ তৎপরমস্তদ্ভুক্তঃ সঙ্গবজ্জিত। নিব্বৈরঃ সৰ্ব্বভূতেষু পরাত্মনি সমাহিতঃ ॥ ১১৫। তৎকৰ্ম্মৎ (যিনি ভগবানের কাৰ্য্য সাধন করেন) তৎপরমঃ ( ভগবৎ-প্রাপ্তি ব্যতীত যিনি আর অন্য কিছু চান না) তদ্ভক্তঃ ( ভগবৎ-তৃপ্তিবিধানই যার জীবনের একমাত্র সাধনা) সবজ্জিতঃ (দেহে এবং দেহের যাবতীয় সুখ- উপকরণে যাহার কোনরূপ আসক্তি নাই) সর্বভূতেষু নিব্বৈরঃ ( সমস্ত জীবে মৈত্রীভাবাপন্ন ) পরাত্মনি সমাহিতঃ (ভগবানে বঁহার চিত্ত স্থির হইয়া গিয়াছে, যিনি ভগবানে তন্ময় হইয়া গিয়াছেন, তিনিই আমার কাজ করেন)। অর্থাৎ অনাসক্ত, ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত, অনন্যশরণ হইয়া শুধু যজ্ঞার্থে ভগবৎ-তৃপ্তি বিধানের জন্য কাৰ্য্য করিয়া যাইতে হইবে। ১১৫। কায়েন বাচা মনসেন্ট্রিয়ৈৰ্বা বুদ্ধ্যাত্মনাবানুস্মৃতেঃ স্বভাবৎ। করােমি য যৎ সকলং পরস্মৈ নারায়ণায়ৈব সমর্পয়ামি ॥১১৬ কায়েন (শরীরের দ্বারা) বাচা (বাক্য দ্বারা) মনসা ( মন দ্বারা) বা ইন্দ্রিয়ৈঃ (অথবা ইন্দ্রিয়ের দ্বারা) বুদ্ধ্যা وا পূজা (বুদ্ধি দ্বারা) আত্মনা (স্ব-ইচ্ছায়) বা অনুস্মৃতেঃ স্বভাবৎ (অথবা পূৰ্ব্বজন্মগত সংস্কারের দ্বারা চালিত হইয়া স্বভাবের প্রেরণায়) য যৎ করােমি (আমি যাহা কিছু করি) সকলং (সেই সমস্তই) পরস্মৈ নারায়ণায় এব ( সর্বভূতের আশ্রয় পরমাত্মার নিকটই) সমৰ্পয়ামি (সমৰ্পণ করিতেছি )। অর্থাৎ আমার শারীরিক, বাচনিক, মানসিক সমস্ত কৰ্ম্ম ভগবানের অনুমােদিত, ভগবানের ইচ্ছা পূরণে সাধিত হওয়া দরকার। ১১৬। ইতঃ পূৰ্ব্বং প্রাণবুদ্ধিদেহধৰ্ম্মাধিকারতে জাগ্রৎ-স্বপ্ন- প্রসুপ্তাবস্থাসু মনসা বাচা হস্তাভ্যাং পামুদরেণ শিশ্না য যৎ স্মৃতং যদুক্তং যৎকৃতং তৎসৰ্ব্বং ব্ৰহ্মাৰ্পৰ্ণং ভবতু স্বাহা।১১৭৷ ইতঃ পূর্বং (এতদিন পর্যন্ত) প্রাণবুদ্ধিদেহ ধৰ্ম্মাধি- কারতঃ ( প্রাণ বুদ্ধি দেহ ধৰ্ম্মের বশে ) জাগ্রৎস্বপ্নপ্রসুপ্তাবস্থা (জাগ্রত, স্বপ্ন ও প্রসুপ্ত অবস্থায়) মনসা বাচা হস্তাভ্যাং প্যাম উদরেণ শিশ্ন (মন, বাক্য, হাত, পা, উদর ও শিশ্ন দ্বারা) যদ যৎ স্মৃতম্ উক্তং কৃতং (যাহা কিছু চিন্তিত, কথিত বা কৃত হইয়াছে) তৎসৰ্ব্বং ব্রহ্মার্পণং ভবতু স্বাহা (তৎসমুদয় পরব্রহ্মে অর্পিত হউক)। অর্থাৎ আমার ইন্দ্রিয়াদি যেন ভগবানের অনুমােদন ছাড়া কোন কাজ করে না। ভঁহার ইচ্ছা পূরণে তাহার প্রতি সাধনে যেন সর্বদা নিযুক্ত থাকে। সব কাজের আগে ভাবিয়া দেখিবে—ভগবান তােমার নিকট পূজা ৮৭ কি চান, কিভাবে কাৰ্য্য সাধিত হইলে তােমার কাজ ভগবৎ- পূজায় পরিণত হইতে পারিবে। ১১৭। শয়নের সময় পুজা ক্ষমা প্রার্থনা :- অংহােভিরেতং মলিনং স্বকায়ং লীলানিকেতং ব্যদধাং নু ভূমন্। বিজ্য দোষান্ নয় মা সমীপং মম হৃদস্যঃ হ* বিদ্যতেহস্মিন্ ॥১১৮|| ভূমন্ (হে ভূমা) এতং স্বকায়ং (আমার এই দেহ) লীলানিকেতং ব্যদধাং (যাহা তােমার লীলা সম্পাদনের জন্য সৃষ্টি করিয়াছ) অংহােভি: মলিনং (আমার অহংকার দ্বারা তাহাকে আমি মলিন করিয়া ফেলিয়াছি ); দোষান্ বিমৃজ্য (আমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করিয়া, মলিনতা দূর করিয়া) মাং সমীপং নয় (আমাকে তােমার কাছে টানিয়া লও)। ত্বং অন্যঃ (তােমা ছাড়া অন্য ) মম (আমার) অস্মিন্ ( এই জগতে ) কুহ বিদ্যতে (কে আছে ? অর্থাৎ, আর কেহ নাই)। অর্থাৎ হে নাথ, তুমি ছাড়া আমার আর কেহ নাই। আমি তােমার লীলার যন্ত্র। এই দেহকে ‘অহংকারের বশে মলিন করিয়া ফেলিয়াছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করিয়া নিজের কাছে টানিয়া লও।১১৮। * কুহ=কোহ (কি শৰাৎ নিপাতনে সিদ্ধ)।

৮৮
পূজা
শব্দাদিভােগা পরিমুচ্য হুতি-
বিকৃষ্য তেভ্যো নু যথা প্ৰপন্ন।
মামাশু কৃত্বা নয়তে সকাশং
সংমােহ তে প্রেষ্ঠ তথা বিধাৎ ॥ ১১৯।
তুতিঃ (তােমার আহ্বান) শব্দাদিভােগা পরিমুচ্য
(শব্দ-স্পর্শাদি ভােগ হইতে জোর করিয়া টানিয়া আনিয়া)
তেভ্যঃ বিকৃষ্য (তাহাদের উপর একটা বিতৃষ্ণা জন্মাইয়া)
যথা প্ৰপন্নং মাং ( যেভাবে শরণাগত আমাকে) আণ্ড কৃত্ব
(সত্বর করিয়া) তে সকাশং নয়তে (তােমার কাছে লইয়া যায়)
প্রেষ্ঠ (হে প্রাণারাম) সংমােহ (তােমার প্রেমে বিভাের
করিয়া) তথা বিধাৎ (সেইরূপ ব্যবস্থা কর)। অর্থাৎ হে
প্রাণারাম, তােমার আহ্বান আমাকে শব্দ-স্পর্শাদি ভােগ্য
বিষয় হইতে জোর করিয়া টানিয়া আনিয়া তোমার কাছে যে-
ভাবে উপস্থিত করিয়াছে, এখন আমাকে সত্বর করিয়া তােমার
কাছে নিয়া তােমার প্রেমসাগরে ডুবাইয়া রাখ। ১১৯।
ভাে অন্তরাত্মম্নহ বীমাণে।
মায়া স্বলীলাং মতিবিমাত্তে।
আদেশবাণীরবমত্য নূনং
কিয়ন্তি পাপানি ততান ভূমৌ॥ ১২০ ।
ভাে অন্তরাত্ম'(হে আমার অন্তর দেবতা) অহ তে মায়া
(আশ্চৰ্য্য তােমার মায়া) মতিবিভ্ৰমাৎ (বুদ্ধিবিপর্যয় হেতু)

পূজা ৮৯ তে স্বলীলাং (তােমার স্বকীয় লীলা) বীক্ষমাণঃ (দেখিতে দৈখিতে) নূহ্ আদেশবাণীঃ অবমত্য (তােমার আদেশ-বাণী নিশ্চয় অবমাননা করিয়া) ভূমৌ (পৃথিবীতে) কিয়ন্তি পাপানি (কত রকমের পাপ) ততান (বিস্তার করিয়াছি)। অর্থাৎ তােমার অপার মায়ার কথা কি বলিব! তােমার লীলা দেখিতে দেখিতে, কখন কিভাবে তােমার আদেশ ভুলিয়া, এত পাপ করিতে আরম্ভ করিলাম, তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। ১২। কষায়মুগ্ৰং বিনিহত্য তেজসা ক্লিষ্টাশ্চ বৃত্তীঃ প্রবিধায় মে বিভাে। বৈগুণ্যরাশিং পরিদহ বিশ্রমে যথা তদঙ্কে ভবতাত্তথা কুরু। ১২১। হে বিভাে (হে সর্বশক্তিমা) তেজসা (তােমার জ্যোতিঃ দ্বারা) উগ্রং কষায়ং বিনিহত্য (আমার তীব্র মলিনতা দূর করিয়) ক্লিষ্টা বৃত্তীঃ প্রবিধূয় ( আমার ক্লেশদায়ক চিত্ত- বৃত্তি পরিষ্কার করিয়া) বৈগুণ্যরাশিং পরিদহ ( সমস্ত পাপরাশি পুড়িয়া ছারখার করিয়া) যথা তদন্তে বিশ্রমঃ ভবতা (যাহাতে তােমার অভয় কোলে বিশ্রাম লাভ করিতে পারি তথা কুরু (তুমি তাহার ব্যবস্থা কর)। ১২১। শক্তিহীনং ক্রিয়াহীনং ভক্তিহীনং জনার্দন। গৃহীত্বা কৃপয়া নাথ দাসত্বং দেহি মে প্রভাে। ১২২। জনার্দন (হে জনার্দন) শক্তিহীনং (শক্তিহীন) ক্রিয়া-

পূহ
হীনং (ক্রিয়াহীন) ভক্তিহীনং (ভক্তিহীন) মাং (আমাকে)
কৃপয়া গৃহীত্ব (দয়া করিয়া গ্রহণ করিয়া) নাথ (হে স্বামিন)
প্রভো (হে নিগ্রহানুগ্রহসমর্থ প্রভু) মে (আমাকে) দাসত্বং
(তােমার সেবার ভার) দেহি (অর্পণ কর)। অর্থাৎ আমার
এমন ক্ষমতা নাই যাহাতে তােমার সেবার অধিকার লাভ
করিতে পারি। তুমি আমার স্বামী; তুমি আমার সম্বন্ধে যাহা
কিছু বিধান করিতে পার ; তাই দয়া করিয়া আমাকে তােমার
সেবার অধিকার দান কর। ১২২।
সাধন শ্লোকপাঠঃ -১৬, ১৭ শ্লোক।
প্রার্থনা ঃ-
বেণুনাদং সমাকৰ্ণাত্রাগতং হৃতমানসম্।
বিধায় প্রেমসম্পত্তিং লীনং ত্বয্যেব মাং কুরু। ১২৩।
বেণুনাদং সমাকর্ণ (তােমার বংশীধ্বনি শ্রবণ করিয়া)
মানসং ( মন প্রাণ হারাইয়া) অত্র আগতং (তােমার
কাছে উপস্থিত আমাকে ) প্রেমসম্পত্তি বিধায় (তােমার
প্রেম-সম্পত্তি দান করিয়া) ত্বয়ি এব মাং লীনং কুরু
(তােমাতেই আমাকে লীন করিয়া লও)। অর্থাৎ তোমার
আহ্বান আমাকে জোর করিয়া লইয়া আসিয়াছে। এখন,
দয়া করিয়া তােমার প্রেম-সাগরে আমাকে ডুবাইয়া রাখ,
আমি যেন আমাকে একেবারে ভুলিয়া যাই। ১২।

পূজা ৯১ প্রভভ ন শক্তিম লেশতেহস্তি জ্ঞানং তথা প্রেম ন চান্তি কিঞ্চিৎ । যেভােত্তমঃশ্লোকগুণানুবাদান কৃত্বায়াং ত্বাং পরমাত্মভূতম। ১২৪। প্রভাে (হে প্রভু) মম লেশতঃ অপি শক্তিঃ ন অস্তি ( আমার বিন্দুমাত্রও ক্ষমতা নাই । জ্ঞানং তথা প্রেম ন কিঞ্চিৎ অস্তি (জ্ঞান অথবা প্রেমও কিছুমাত্র নাই ) যেন উত্তমঃশ্লোক- গুণানুবাদা কা ( যাহাতে উত্তমঃশ্লোক শ্ৰী ভগবানের গুণগান করিয়া) পরমাত্মভূতং ত্বম্ (পরমাত্মস্বরূপ তােমাকে) আগুয়াম্ (প্রাপ্ত হইতে পারি )। অর্থাৎ আমার বিদ্যা বুদ্ধি কিছুই নাই। তুমি দয়া করিয়া আমাদ্বারা তােমার গুণগান করাইয়া আমাকে তােমার প্রেমে মাতাইয়া রাখ। ২৪। হূতত্ত্বয়াহং তত আগতােহস্মি প্রেমামৃক্কৌ বিনিমজ্য বােধয়। অন্তর্মম ত্বং প্রতিতত্ত্বমীশ নােষি লীল। ইহ মা তু তা যাঃ ।। ১২৫। অহং ত্বয়াহুতঃ(আমি তােমা কর্তৃক তােমার আহ্বানে আকৃষ্ট হইয়াছি) অতঃ আগতঃ অস্মি (তাই তােমার কাছে উপস্থিত f মা =মা, তু= অবধারণে, তাঃ যাঃ = পূর্বোক্তাঃ লীলা (যাঃ লীলাঃ তু ভদােষি তাঃ মাং বােধয়)।

৯২
পূজা
হইয়াছি); প্রেমাম্বন্ধৌ (তােমার প্রেমামৃত-সাগরে) বিনিমজ্য
(আমাকে ডুবাইয়া রাখিয়া ) ঈশ (হে জগদীশ) ত্বং (তুমি)
মম অন্ত প্রতিতত্ত্বম (আমার ভিতরের প্রতি তত্ত্বে বিরাজিত
থাকিয়া) যাঃ লীলাঃ তু ইহ তনােষি (তুমি যে লীলা এ সংসারে ও
আমাতে বিস্তার করিয়া আছ) তাঃ মা বােধয় (তাহা আমাকে
বুঝাইয়া দাও)। অর্থাৎ তুমি আমাকে বাধ্য করিয়া টানিয়া
আনিয়াছ। এখন আমাকে তােমার প্রেমে বিভাের করিয়া
তােমার লীলারস আস্বাদ করিবার যােগ্যতা দান কর। ১২৫।
অনাত্মনা তে ন হি তৃপ্তিরস্তি
ত্বমাত্মনাত্মানমবেক্ষ্য তৃপ্তঃ।
মামত্মভাবং নয়সে ন যাবৎ
তৃপ্তিঃ কুতন্তে ভবিতেহ তাবৎ ॥ ১২৬ ।
অনাত্মনা (আমার আত্মজ্ঞান লাভ হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ
পাওয়া পর্যন্ত) তে (তােমার) তৃপ্তিঃ ন হি অস্তি (তােমার
কোন মতেই তৃপ্তি নাই) ম (তুমি) আত্মনা আত্মান অবেক্ষ্য
( তােমার নিজকে আমার ভিতরে পূর্ণভাবে ফুটাইয়া বাহির
করিয়া, দর্শন করিয়া) তৃপ্তঃ (তৃপ্তিলাভ করিয়া থাক) মাম্
আত্মভাবং যাবৎ ন নয়সে (আমাকে যে পর্যন্ত তােমার ভাবে
পরিভাবিত না করিবে) তাবৎ কুতঃ ইহ তে তৃপ্তিঃ ভবিতা (সে
পৰ্য্যন্ত কি করিয়া তুমি আমার সম্বন্ধে তৃপ্তিলাভ করিবে)?
অর্থাৎ তুমি নিজকে নিজে আস্বাদ করিবার জন্য আমাকে

পূজা
ও জগৎকে সৃষ্টি করিয়াছ। তাই আমাকে পূর্ণ পরিণত করিয়া
আমার ভিতরে তােমার নিজকে নিজে পূর্ণভাবে দর্শন করিতে
যে পৰ্যন্ত সমর্থ না হইবে, সেই পৰ্যন্ত তােমার তৃপ্তি কোথায়?
তােমাকে সুখী করিবার জন্য আমিও ব্যস্ত; তাই আমাকে
তোমার মনের মত করিয়া তুমি নিজে তৃপ্ত হইয়া, আমাকে
সুখী কর। ১২৬।
;
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ - ১১ শ্লোক।
আত্ম-নিবেদন ঃ- ৬১ শ্লোক।
মিলনানন্দ অনুভূতি ঃ- ১০৫ শ্লোক।

স্তব (ক) বাসন্তচুতমুকুলেম্বলিঝতেষু কুঞ্জে মঞ্জুকলকোকিলকুজিতে। সম্পূর্ণশারদসুধাকরমগুলেষু সৌন্দৰ্য্যসাগর হরে তব মূর্তিমীক্ষে৷ প্রফুল্লপন্মেষ সরােবরেষু, তারাবিচিত্রে, নভঃস্থলে। মাতুঃ স্তনে কারুণিক চিত্তে গােবিন্দ পশ্যামি তবৈব মূর্তি ॥২॥ বিচিত্ৰপুষ্পসু বনস্থলী সুগন্ধমানিবীজিতা। বিহঙ্গসঙ্গীতনিনাদিতা গােবিন্দ পশ্যামি বৈব মূর্তি৷ ৩৷ শিখণ্ডিকেকা নবমেঘশব্দে ভেকালিকণ্ঠাশ্চ নবান্ধুপাতে। ঝিল্লীরঃ সুপ্তজনে নিশীথে উদ্বোধয়ন্ত্যঙ্গ বৈব মূর্তি ॥৪॥ হে অনন্ত সৌন্দৰ্য-রত্নাকর ! হে আমার মনঃপ্রাণহরণ- কারী হরি! ভ্রমরগুঞ্জন-নন্দিত নব বসন্তের চূতমঞ্জরীতে, কল- কোকিলমুখরিত কুঞ্জশ্রীতে, পরিপূর্ণ শরচ্চন্দ্রমণ্ডলে আমি তােমার অপরূপ রূপ দর্শন করি। ১। বিকশিত-কমলশত-লাঞ্ছিত সরােবরে, দীপ্ততারকালি- খচিত নভঃস্থলে, (প্রেমকরুণার অপূর্ব নিঝর ) মাতৃস্তনে, কারুণিকের পবিত্র চিত্তমাঝে, হে গােবিন্দ! আমি তােমারই মূর্তি দর্শন করি । ২। সুগন্ধ মন্দানিলবীজত, বিচিত্র কুসুমসমাকীর্ণ, মধুর বিহঙ্গ-কাকলীনিনাদিত বনস্থলীতে, ওগাে গােবিন্দ, আমি যে তােমারই মূৰ্ত্তি প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি। ৩। নব মেঘধ্বনি, শ্রবণে উন্মত্ত ময়ুরের এককাধ্বনি, প্রথম ধারাপাতে উৎফুল্ল ভেকসমূহের শব্দ, নিদ্রার স্তব্ধ রজনীর পূজা মাণিক্যখণ্ডেরিব দীপ্যমানৈঃ খদ্যোতপুঞ্জের্নিচিতানগণ্যৈঃ। বহুমা ৰীক্ষ্য ঘনান্ধকারে স্মরমি তে রূপমপূর্ববরূপম্ ॥৫॥ প্রত্যগ্রসিন্দুররসৈরিবার্জে বালাতপৈবিচ্ছুরিতেহন্তরীক্ষে । পশ্যামি সন্ধ্যাম্বুদবিভ্রমেষু প্রেমাভিরামাং তব কৃষ্ণমূর্তি ॥৬॥ উদ্ভিন্নগরুত্মতসুপ্রকাশৈঃ ক্ষেত্রে কীর্ণেষ, নবীনশস্যৈঃ । স্নিগ্ধেষ, পশ্যামি চ পল্লবেষ, বিশ্বাভিরামং তব কৃষ্ণরূপম্ ॥৭৷৷ কঙ্কালমালাবহুলেতিরৌদ্রে শ্মশানদেশে শবধুমধূক্সে। প্রচণ্ডবাতক্ষুভিতেহবে চ প্রেক্ষে মহারুদ্ৰ তথৈব মুর্তি ॥৮॥ ঝিল্লীরব, হে অঙ্গ! হে সকল রূপের একমাত্র আকর! ইহারা আমার মনে তােমার রূপের অপূৰ্ব উদ্বোধন করে। ৪। ঘন অন্ধকারে অগণিত মণিমাণিক্য-খচিত দীপ্তখদ্যোতপুঞ্জ- সমলঙ্কত বৃক্ষসমূহ দর্শনে-হে অপরূপ! তােমার রূপ আমার স্মৃতিপথে উদিত হয়। ৫। . অম্লানসুন্দর সিদ্ব-রসে অভিষিক্ত নবােদিত অরুণচ্ছটা- বিচ্ছুরিত আকাশে, সন্ধ্যার মেঘমালার অপূর্ব বিলাস দর্শনে, হে প্রেমসুন্দর, তােমার কৃষ্ণমূৰ্ত্তিই আমি দেখিয়া থাকি। ৬। শস্যক্ষেত্রে মরকত-মণিশ্যাম উদগতশীর্ষ নবীন শস্যে ও স্নিগ্ধ শ্যাম পল্লবে আমি তােমার বিশ্ববিমােহন কৃষ্ণমূৰ্ত্তি প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি। ৭। বহুল কঙ্কালমালা পরিবেষ্টিত ভয়াবহ শাশানপ্রদেশে, শ্মশানানদগ্ধশবধূমে, প্রচণ্ড বাত্যাবিক্ষোভিত মহাসাগরে, হে মহাৰুদ্ৰ ! আমি তােমারই রুদ্রমূর্তি দেখিয়া থাকি। ৮।

পূজা গাঢ়ান্ধকারামু কুহুপা দিগ্ব্যাপিঘােরাঘটা চৈব। দম্ভোলিভীমনিতে, বীক্ষে মহাবিরাজস্য তবৈব মূর্তি ॥৯৷৷ শশাঙ্কতারাপ্রতিবিম্বগর্ভাংন্তোয়াশয়া স্বচ্ছজলা সমীক্ষ্য। উদেতি চিত্তে তব কাপি মূর্তিরনবৈচিত্র্যময়ী মুকুন্দ ॥১০। পুণ্যানি তীখানি তপােবননি দৃষ্ট। সরিৎসাগরসঙ্গমাংশু। নামাবশেষাংশ্চ পুরাণদেশান পুরাতনং ত্বং পুরুষং রামি॥১১৷ লীলাঃ শিশুনাং গৃহচত্বরেষু, গং প্রচারেষু চ বৎসলীলাঃ। জলে চ প জলপক্ষিলীলাঃ রামি লীলাময়বিগ্রহং ত্বম্ ॥১২৷৷ ঃ অমা-রজনীর গাঢ় অন্ধকারে যখন সকল দিক্‌ ঘাের ঘনঘটাচ্ছন্ন হয়, মুহুর্মুহুঃ বজ্রধ্বনি হইতে থাকে—হে সর্বত্র বিরাজমান মহাদেব, আমি তখন সেই ভীষণতার মধ্যে তােমার মূর্তিই দেখিতে পাই। ৯। নিৰ্ম্মল-সলিলা সরসী—যাহার গর্ভে রহিয়াছে চন্দ্র-তারকার প্রতিবিম্ব, তদ্দর্শনে-হে (ভক্তি-মুক্তি-প্রেমদাতৃ) মুকুন্দ। তােমার অনন্ত বৈচিত্র্যময়ী মূর্তি আমার অন্তরে ভাসিয়াউঠে।১০। পুণ্যতীর্থসকল, পবিত্র পােবন, সরিৎসাগরসঙ্গম পুরাণ- নামাবশেষ প্রসিদ্ধ দেশসকল দর্শন করিয়া, হে চির-পুরাতন ! তােমাকেই আমি স্মরণ করিয়া থাকি। ১১। গৃহাঙ্গনে শিশুদিগের ক্রীড়া, গােঠে গােঠে গো-বৎসগণের লীলা, জলে জলপক্ষিগণের বিহার দর্শনে তােমারই লীলাময় বিগ্রহ আমার স্মৃতিপথে উদিত হয়। ১২।

পূজা
শুনন্ধয়ানাং স্তনদুগ্ধপানে মধুব্ৰতানাং মকরন্দপানে।
দানে দয়ালােরথ ভক্তগানে পশ্যামি মূর্তিং করুণাময়ীং তে ॥১৩
সতীষ, নারীষ, চ সর্বভূতপ্রকামসন্তর্পণদীক্ষিতা।
পূর্ণাঙ্গপূর্ণাম্বিব লক্ষয়েহহং মূর্ডিং হরে সত্ত্বময়ীং তবৈব ॥১৪৷
বনতো ভুভূতি নিৰ্বরে বা কূলে সমুদ্রস্য সরিটে বা।
যত্রৈব চিত্তে সমুদেতি ভক্তিস্তত্রৈব পশ্যামি তবৈব মুর্তিম, ১৫৷
কীটে পভঙ্গে চ সরীসৃপে চ মীনে পশৌ পক্ষিণি মানবে চ।
স্কুলে চ সূক্ষে চ জলে স্থলে যে পশ্যামি তে রূপমনন্তরূপ ॥১৬৷৷
স্তন্যপায়ী শিশু যখন মাতৃবক্ষঃ হইতে স্তনামৃত পান
করে, মধুব্রত মধুকর যখন মকরন্দ পান করে, পরদুঃখকাতর
দয়ালু যখন আর্ত-ব্যথা বিমােচনে উদ্যত হন, প্রেমিক-ভক্ত
যখন সকল মন প্রাণ ঢালিয়া দিয়া ভগবৎ-সঙ্গীত গাহিতে
থাকেন, তখন হে ভগবন্! আমি তােমার করুণাময়ী মূর্তিই
তাহাদের ভিতর দেখিয়া থাকি। ১৩।
সতীনারী—সৰ্ব্বভূতের পরম তৃপ্তিবিধান যাহার জীবনের
ব্রত-অন্নপূর্ণার ন্যায় যিনি অন্নদানে মুক্তহস্তা, সেই নারীর
ভিতরে আমি তােমার সত্ত্বময়ী মূর্তিই দেখিয়া থাকি। ১৪।
বনস্পতি, পৰ্বত, নিঝর, সমুদ্রকূল, নদীতট যেখানে
যেখানেই আমার চিত্তে ভক্তিরসের উদয় হয়, সেইখানেই যে
আমি তােমার পরমমূর্তি দেখিয়া থাকি। ১৫।
কীটে, পতঙ্গে, সরীসৃপে, মৎস্যে, পশুতে, পক্ষীতে,

৯৮
পূজা
ভূতেষু সর্বেষু চরাচরে দূরে সমীপে ঢ পুরশ্চ পশ্চাৎ।
বিলােকয়াম্ৰ্দ্ধমধশ্চ তির্যক হে কৃষ্ণ তে রূপমনন্তরূপ ॥১৭
অহহ নিমগ্নস্তব রূপসিন্ধো পশ্যামি নান্তং ন চ মধ্যমাদিম।
অবাক্ চনিস্পন্দতরাে বিমুঢ়ঃকুত্রাম্মিকোশ্মীভি ন বেষ্মিদেব।
নমস্তে নমস্তে বিভাে বিশ্বমূৰ্তে নমস্তে নমস্তে হরেইচিন্ত্যশক্তে।
নমস্তে নমস্তেখিলাশ্চৰ্য্যসিন্ধো মহাদেব শষ্যো নমস্তে নমস্তে।
মানবে, স্কুলে, সূক্ষো, জলে, স্থলে সর্বত্রই যে আমি তোমার
অনন্ত রূপ দর্শন করিয়া থাকি। ১৬।
চরাচরে, সৰ্ব্বভূতে, দূরে, সমীপে, সম্মুখে, পশ্চাতে,
উন্ধে অধঃস্থলে, পার্শ্বে সর্বত্রই হে কৃষ্ণ! আমি তােমার
অনন্ত রূপ দেখিয়া থাকি। ১৭।
অহে! আমি তোমার অপার রূপ-পারাবারে নিমজ্জিত
হইয়াছি—আদি-অন্ত-মধ্য কিছুই দেখিতেছি না। বাক্যহীন,
অতি নিঃস্পন্দ বিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছি ; কোথা হইতে আসিয়াছি
—কে আমি—কিছুই আর স্মরণে আসিতেছে না। ১৮।
প্রণাম, প্রণাম হে বিশ্বমূর্তি, হে বিভাে, তােমাকে প্রণাম।
অচিন্ত্যশক্তি হরি হে, তােমাকে প্রণাম। হে নিখিল-বিস্ময়-
পারাবার তােমাকে প্রণাম। হে মহাদেব, হে শভো, প্রণাম
প্রণাম প্রণাম। ১৯।
৩০

স্তব (খ) হে দেব হে দয়িত হে জগদেকবন্ধো, হে কৃষ্ণ হে চপল হে করুণৈসিন্ধো। হে নাথ হে রমণ হে নয়নাভিরাম, হাহা কদানুভবতাসি পদং দৃশশার্মে ॥১॥ অংশালম্বিতমকুণ্ডলভরং মন্দোলতং কিঞ্চিৎকুঞ্চিতকোমলাধরপূটং সাচিপ্রসারেক্ষণ। আলােলাঙ্গুলিপল্লবৈরলিকামাপ্রয়ন্তং মুদা মূলে কল্পতরােস্ত্রিভঙ্গললিতং জানে জগন্মােহনম, ॥২৷৷ হে গােপালক হে কৃপাজলনিধে হে সিন্ধুকন্যাপতে হে কংসক হে গজেন্দ্রকরুণাবারীণ হে মাধব। হে দেব, হে প্রিয়, হে জগতের একমাত্র বন্ধু, হে কৃষ্ণ, হে চপল, হে করুণৈকসিন্ধু, হে নাথ, হে রমণ, হে নয়নাভিরাম, হায়! হায়! কখন তুমি আমার সকল নয়ন জুড়িয়া বসিবে। ১। জানি গাে জানি তোমায় জানি—জগৎকে তুমি মােহিত করিয়াছ, তােমার বাম কুণ্ডল স্কন্ধদেশ স্পর্শ করিয়াছে, যুগল ঈষৎ উন্নত, সুকোমল অধরপুট সামান্য কুঞ্চিত, নয়নে বঙ্কিম দৃষ্টি, লীলায়িত কোমল অঙ্গুলির মােহন স্পর্শে মধুর মুরলীকে সুরে ভরিয়া তুলিয়াছ—এইরূপে তুমি কল্পতরুমূলে মধুর ত্রিভঙ্গিম ঠামে দাড়াইয়া আছ। ২। হে গােপালক, হে কৃপাসিন্ধু, হে শ্ৰপতি, হে কংস- বধকারী, হে গজেন্দ্রকরুণাসাগর, হে মাধব, হে রামানুজ, ১০০ পূজা হে রামানুজ হে জগয়গুরাে হে পুণ্ডরীকাক্ষ মাং হে খােপীজননাখ পালয় পরং জানামি ন বাং বিনা ॥ কস্তুরীতিলকং ললাটফলকে বক্ষঃস্থলে কৌস্তুভং নাগ্রে নবমৌক্তিকং করতলে বেণুং করে কঙ্কণম্। সর্বাঙ্গে হরিচন্দনং চ কলয় কণ্ঠে চ মুক্তাবলীঃ গােপন্ত্রীপরিবেষ্টিততা বিজয়তে গােপালচুড়ামণিঃ ॥৪॥ লােকানুদয় শ্রুতিং মুখরয় ক্ষৌণীরুহা হয় শৈলান্ বিদ্রবয়ন, মৃগা বিবশয় গােৰ্বমানায়। গােপান সংভ্রমন, মুনীন, মুকুলয়ন, সপ্তশ্বরান, জ্বয়ন, কারার্থমুদীরয়নবিজয়তে বংশীনিনাদঃ শিশশঃ ॥৫॥ হে ত্রিজগতের গুরু, হে কমললােচন, হে গােপীজনবল্লভ, আমাকে তুমি পালন কর, তােমা ভিন্ন আর কাহাকেও আমি শ্রেষ্ঠ বলিয়া জানি না। ৩। গােপবংশের চূড়ামণি শ্রীকৃষ্ণের জয় হউক—ললাটে তাহার কস্তুরী-তিলক, বক্ষে কৌস্তুভমণি, নাগ্রে নব মুক্তা, হস্তে বেণু, মণিবন্ধে কঙ্কণ, সর্বাঙ্গে হরিচন্দন, গ্রীবার আন্দোলনে কণ্ঠের মুক্তাবলী মুখরিত, গােপনারীগণ কর্তৃক তিনি পরিবেষ্টিত। ৪। যে বংশীর সুরে ত্রিলােক আকুল হয়, অপৌরুষেয় বেদবাণী উচ্চারিত হয়, বৃক্ষলতাদি হর্ষোৎফুল্ল হয়, প্রস্তর বিগলিত হয়, মুনিগণের মৌনব্রত ভঙ্গ হয়, সপ্তসুর ঝঙ্কত হইয়া ওঁকারের মাহাত্ম প্রকাশিত হয়, সেই চিরশিশু শ্ৰকৃষ্ণচন্দ্রের বংশী- ধ্বনির জয় হউক। ৫।

তব (গ) ওঁ নমস্তে সভে তে সৰ্বলােকায়ায় নমস্তে চিতে বিশ্বরূপাত্মায়। নমােহদ্বৈতত্ত্বায় মুক্তিপ্রদায় নমো ব্ৰহ্মণে ব্যাপিনেনিগুণায় ॥১i ত্বমেকং শরণং ত্বমেকং বরেণ্যং ত্বমেকং জগৎকারণং বিশ্বরূপ। ত্বমেকং জগৎকর্তৃপাতৃপ্রহর্তৃ ত্বমেকং পরং নিশ্চলং নির্বিকল্পম, ॥২॥ ভয়ানাং ভয়ং ভীষণং ভীষণানাং গতিঃ প্রাণিণাং পাবনং পারনানান। মহােচ্চৈঃপদানাং নিয়ন্তু ত্বমেকং পরেষাং পরং রক্ষকং রক্ষকাণাম, ॥৩॥ করি। তুমি নিত্য, তুমি সবলােকের আশ্রয়—তােমাকে নমস্কার তুমি জ্ঞানস্বরূপ; বিশ্বের আত্মস্বরূপ, অদ্বৈত-তত্ত্ব, মুক্তিদায়ক, তােমাকে নমস্কার। তুমি সর্বব্যাপী, নিগুণ ব্ৰহ্ম,তােমাকে নমস্কার। ১। তুমি একমাত্র শরণ্য অর্থাৎ আশ্রয়, তুমি অদ্বিতীয় বরণীয়, তুমি একমাত্র জগতের কারণ, তুমি বিশ্বরূপ ; একমাত্র তুমি জগতের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং অন্তে সংহার-কর্তা, তুমি একমাত্র পরমপুরুষ নিশ্চল ও নানাবিধ কল্পনাশূন্য। ২। তুমি ভয়ের ভয়, তুমি ভয়ানকের ভয়ানক, তুমি প্রাণী- দিগের একমাত্র গতি, পবিত্রকারীদিগেরও পবিত্রকারক।

১০২ পূজা পরেশ প্রভাে সর্বজপাবিনাশি অনিৰ্দেশ্য সর্বেন্দ্রিয়গম্য সত্য। অচিন্ত্যাক্ষর ব্যাপকাব্যক্তত্ব জগভাসকাধীশ পায়াদপায়াৎ ॥৪। ভদেকং স্মরামগুদেকং জােম- স্তদেকং জগৎসাক্ষিরূপং নমঃ। সদেকং নিধানং নিরালমীশং ভবাম্ভোধিপােতং শরণং ব্ৰজামঃ ॥ ৫॥ তুমি উচ্চপদাধিষ্ঠিত ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর প্রভৃতিরও নিয়ামক, তুমি শ্রেষ্ঠ পদাৰ্থসকলের শ্রেষ্ঠ ও রক্ষকদিগের রক্ষক। ৩। হে পরেশ (হে পরমেশ্বর ) হে প্রভাে, তুমি সৰ্বরূপ অবিনাশী, অনিৰ্দেশ্য এবং সর্বেন্দ্রিয়গম্য- অতীন্দ্রিয়-তত্ত্ব। হে সত্যরূপ! হে অচিন্ত্য! হে অক্ষর! হে ব্যাপক! হে অব্যক্ত তত্ত্ব! জগদ্ভাসকাধীশ ! (জগদ্ভাসক চন্দ্র-সূৰ্য্যাদির অধীশ্বর) অথবা হে জগদ্ভাসক! হে অধীশ ! তুমি আমাদিগকে অপায় অর্থাৎ সমস্ত আপদ-বিপদ হইতে রক্ষা কর। ৪। সেই একমাত্র ব্রহ্মকে আমরা স্মরণ করি, সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্মনাম আমরা জপ করি ; সেই এক জগৎসাক্ষি-স্বরূপ ব্ৰহ্মকে আমরা প্রণাম করি। সেই তুমি সৎ, একমাত্র জগতের নিধান অর্থাৎ আশ্রয়ভূত, স্বয়ং নিরালম্ব অর্থাৎ আয়শূন্য ; সেই তুমি ঈশ্বর, ভবসমুদ্রের তরণীস্বরূপ! আমরা তােমার আশ্রয় গ্রহণ করিলাম। ৫।

পরিশিষ্ট। গবতত্ত্ব জগতের সারতত্ত্ব কি তাহার অনুসন্ধান চলিয়াছে আবহ- মান কাল হইতে । বিজ্ঞান ছুটিনে বাহিরের অণুপর- নাণুর দিকে, তিনি আবিষ্কার করিলেন একটা মহতী শক্তি। দার্শনিক ছুটিলেন ভিতরের দিকে, তাহাব নজরে পড়িল আমি- সাধক শক্তিকে অনুভব করিলেন সচ্চিদানন্দময়ী রূপে,—তাহার বর্ণনা করিলেন স্রষ্টা-পাতা-বিধাতা আদি ভাবে। জ্ঞানী আমিকে খুজিতে গিয়া পাইলেন পাকা ‘আমি’র কতকটা আভাস, তাহার নাম দিলেন ব্রহ্ম। এই ব্রহ্মের স্বরূপ-সম্বন্ধে উপস্থিত হইল মতভেদ, সিদ্ধান্ত হইল তিনি একাধারে সগুণ নিগুণ—সব । “দ্বাবেব ব্ৰহ্মণঃ রূপে ক্ষরঃ অক্ষরঞ্চ সগুণে নিশ্চ।” ভাষ্যকারগণ কেহ সগুণ, কেহ নিগুণ ভাব নিয়া বিব্রত হইয়া পড়িলেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলিলেন, তিনি সগুণ নিগুণ এবং তাহারও উপরে, ভাষা তাহাকে সীমাবদ্ধ করিতে পারে না। “অদ্বৈতং কেচিদিচ্ছন্তি দ্বৈতমিচ্ছন্তি চাপরে। সমং তত্ত্বং ন জানন্তি দ্বৈতাদ্বৈতবিবর্জিত।” ভগ- বানের শান্তভাব ও লীলাভাবের মধ্যে কোটি শ্রেষ্ঠ তাহা নিয়াও বাদানুবাদ দুদখা দিল। সাধক বলিয়া বলিলেন, উভয় [ ২ ] ভাবই সমান,-যে যাহার প্রিয় তাহার সবই তাহার কাছে সুন্দর মনে হয়,-“তস্য সর্বৈব সুন্দরং যােহি যস্য প্রিয়ােনর।” প্রিয়তমের জাগ্রত লীলায়িত ভাবও সুন্দর, ঘুমন্ত শান্ত ভাবও সুন্দর। জ্ঞানীর ব্রহ্মভাব, যােগীর পরমাত্ম ভাব, ভক্তের ভগবদ্ভাব আসলে যে একই অদ্বৈত তত্ত্ব, ভাগবত সে তত্ত্ব মুক্তকণ্ঠে ঘােষণা করিলেন। গােস্বামীপাদ বলিলেন, যেখানে সমস্ত বিরুদ্ধ ভাবের অপূর্ব সমন্বয় সেখানেই ভগবদ্ভাব পাইবে। সাধক ধ্যানের ভিতরে অনুভব করিলেন, ক্রমে অহঙ্কার দূর হইতে লাগিল, মনের সংস্কার লােপ পাইতে লাগিল, পরিণামে অমনস্ক অবস্থায় অনুভব করিলেন যে, চরম তত্ত্বকে (Neumena) জানা যায় পাওয়া যায় এমন কি তাহাতে তন্ময়তা লাভ করিয়া তাহা হওয়া যায়। যাহারা কথা নিয়া গবেষণা নিয়া তৃপ্ত তাহাদের আলোচনায় তৃপ্তি পাওয়া যায় না। তাহাদের শুধু একটা অস্তিত্ব মানিলেই চলে। সাধক ভক্তের যে ভগবানই সর্বস্ব ; শান্ত-দাস্যাদি সব ভাবের ভিতর দিয়া এমন কি সমস্ত ইন্দ্রিয় দ্বারা তাহাকে আস্বাদ না করিলে তাহার চলে না। সাধক যে শুধু কথায় ভগবানের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়া ভাবের রাজ্যে ও ব্যবহারে তাহাকে বাদ দিয়া ভগবান্ শূন্য ভাবে ভগববিহীন দেশে বাস করিতে অসমর্থ। তাহারা বুঝিয়াছেন যে, তাঁহাদের ভগবান্ না হইলে চলে না, চলিতে পারে না এবং কখনও চলিবে না। তাই ত তঁাহারা বলেন, [ ৩ ] হে ভগবান, পণ্ডিতগণ তােমাকে অব্যক্ত অচিন্ত্য নিগুণ নিষ্ক্রিয় নিরাকার বলিয়া, বাক্য-মনের অগােচর ভাবিয়া ধ্যান- ধারণার অতীত জানিয়া নিশ্চিন্ত থাকুন, তাহাতে আমাদের কিছু বলিবার বা ভাবিবার নাই; আমাদের যে তােমাকে বাদ দিলে চলে না। তুমি অনন্ত হও তাহাতে আমাদের ক্ষতি নাই, তােমাকে জানিয়া বুঝিয়া ভাবিয়া দেখিয়া পাইয়া যে শেষ করা যায় না, ইহা আমরাও জানি। কিন্তু তাই বলিয়া আমরা কি মনে করি যে, আমরা যত কিছু দেখি, তাহার মধ্যে তুমি একটুও নাই? যত কিছু জানি তাহার মধ্যে তােমাকে একটুও জানা হয় না? আমরা যত কিছু পাই তাহার মধ্যে তােমাকে একটুও পাই না। আমরা যত কিছু আনন্দ করি, সে সবই তােমাকে বাদ দিয়া? কোন্ বীর- পুরুষ, কোন্ জ্ঞানী, কোন্ প্রেমিক মাতৃস্নেহের বা দাম্পত্য- প্লেনের ইয়ত্তা করিতে পারিয়াছেন ? তােমাকে জানিয়া বুঝিয়া পাইয়া শেষ করিতে পারি না বলিয়াই ত’ তুমি এত মধুর !–“ধরা যদি দিতে, ফুরাইয়া যেতে, তােমারে ধরিতে কে চাহিত আর।” তুমি অনন্ত বলিয়াই ত’ এত লােভনীয়, এত স্পৃহণীয়, এত বরণীয়। তাই ত’ তুমি অনন্তকাল ধরিয়া অনন্ত জ্ঞানীকে, অনন্ত প্রেমিককে, অনন্ত সাধককে তােমার নামে, তােমার গুণে, তোমার প্রেমে মােহিত করিয়া তােমার অনন্ত লীলার সহায় করিয়া রাখিয়াছ। হে অরূপ, হে অমূৰ্ত্ত, তুমিই ত’ আবার জগদ্ব্যাপী বিশ্বমূর্তি। এই জগৎই যে

=
[ ৪ ]
তােমার প্রকটিত বা ব্যক্ত অবস্থা। তুমিই ত’ “বিশ্বরূপ,
বিশ্বনাথ, বিশ্বজীব বিগ্রহ।” তুমিই ত’ অরূপ হইয়াও.
অনন্ত রূপ ধরিয়া অনন্ত পােষাক পরিয়া অনন্ত ভাবে অনন্ত
লীলারস বিস্তার করিয়া আছ। তুমি যখন সর্বব্যাপী, তখন
সকলের ভিতর দিয়া তােমাকে দর্শন করা, সকলের ভিতর
দিয়া তােমার ধ্যান করা, সকলের ভিতর দিয়া তােমার পূজা,
করা, সকলের ভিতর দিয়া তােমার সেবা করাই যে আমার
প্রধান সাধনা ! ঠাকুর, তুমি না সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কর্তা?
সুতরাং আমরা যে আসিয়াছি তােমা হইতে, বাঁচিয়া রহিয়াছি
তােমাকে লইয়া, আবার সেই চরম দিনে তােমাতেই মিলিয়া
গিয়া আমাদের লয় হইতে হইবে। তুমিই ত’ “শ্রোত্রস্য শ্রোত্র
মনসে মনে যদ্বাচো হ বা স উ প্রাণস্য প্রাণঃ চক্ষুষশ্চক্ষুঃ।”
তুমি আমাদের চোখের ভিতরে আছ, তাই ত’ আমাদের চোখ
দেখিতে পায়, কানের ভিতরে আছ, তাই ত’ আমাদের কান
শুনিতে পায়, মনের ভিতরে আছ, তাই ত’ আমাদের মন চিন্তা
করিতে পারে, তােমাকে নিয়াই ত’ আমরা “হেলে-দুলে হেসে-
খেলে বেড়াতেছি কুতূহলে।” তােমাকে ছাড়া যে আমাদের
কিছুই থাকে না, এমন কি আমরাও থাকি না। যাঁহাকে ছাড়া
আমার চলে না, যাহাকে ছাড়া আমি বাঁচি না, যাহাকে ছাড়া
আমার কান শুনিতে পায় না, চোখ দেখিতে পায় না, মন চিন্তা
করিতে পারে না, তাহাকে বাদ দিলে নাকি আমার চলে !
ঠাকুর, তােমার অভাব যে আমাদের কি অভাব, তােমাকে না।

[ ৫ ] পাওয়ায় যে আমাদের কি ক্ষতি—ইহা বুঝিতে না পারার মত অভাব যে আমাদের আর কিছুই নাই। তুমি তুমি যে আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয়, পুত্র হইতে প্রিয়, বিত্ত হইতে প্রিয়, অন্য যাহা কিছু আছে তাহার সকল হইতে প্রিয়,—এমন কি আমার আত্মা হইতেও প্রিয়,তাই ত’ তুমি পরমাত্মা। “প্রেয় পুত্ৰাৎ প্রেয়াে বিত্তাৎ প্রেয়ােহন্তস্মাৎ সর্বস্মাৎ যদেষঃ অন্তরতম আত্মা।” যাঁহাকে পাইলে আমার আর কিছু পাইতে বাকী থাকে না, যাহাকে জানিলে আমার আর কিছু জানিতে বাকী থাকে না, সেই ঈপ্সিততমকে সেই পরম প্রেমার প্রাণারামকে যাহার বাদ দিতে চায়, যাহাদের বাদ দিলে চলে, তাহারা যে মহা অন্ধ। যাহারা প্রকৃতি প্রকৃতি, বিজ্ঞান বিজ্ঞান বলিয়া ভগবানকে বাদ দিতে চায়, তাহারা একবারও ভাবিয়া দেখে না যে, সেই প্রকৃতির অন্তরাত্মা কে। সকলের সত্তা কায় রাখিবার জন্য, সকলের পূর্ণ পরিণতি লাভের জন্য, সকলের জ্ঞানবৃদ্ধির জন্য সকলকে আনন্দে ডুবাইয়া রাখিবার জন্য তিনি কিরূপ সচেষ্ট। প্রকৃতিদেবী তাহার প্রাণারাম অন্তরাত্মার জন্য, সেই পরম স্বামীর চরম তৃপ্তির জন্য তাহার পূর্ণ বিকাশের জন্য যে কত ব্যস্ত—তাহা তাহারা একবারও ভাবিয়া দেখে পুরুষ-চৈতন্যের সান্নিধ্য ব্যতীত, পুরুষ-চৈতন্যকে বাদ দিলে প্রকৃতির যে অস্তিত্ব পৰ্যন্ত বজায় থাকে না। আর পুরুষ-চৈতন্য লইয়া যে প্রকৃতি আনন্দময়ী, চৈতন্যময়ী, তাহাকে ইহারা অচৈতন্য বলিতেও কুণ্ঠা বােধ ।

করে না। যে প্রকৃতি লইয়া তাহার আলােচনা করে তাহা যে প্রকৃতি-পুরুষের যুগলমূৰ্ত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়, তাহাও তাহাদের ভাবিবার বুঝিবার অবকাশ নাই। হে সৎ- স্বরূপ! আকাশের শােভা, সমুদ্রের গাম্ভীৰ্য, পাখীর সঙ্গীত, কুসুমের সৌন্দৰ্য্য, বালকের হাসি, মাতার বাৎসল্য, স্ত্রীর সােহাগ—যাহারা সর্বদা আমাদের মন হরণ করিয়া আমাদের মাতাইয়া ভুলাইয়া রাখিয়াছে, তাহারা যে তােমারই সত্তার ক্ষণিক আংশিক বিকাশ মাত্র। হে জ্ঞানস্বরূপ! ব্যাস, বশিষ্ঠ, বুদ্ধ, শঙ্কর, সক্রেটিস, নিউটন, ক্যান্ট, হেগেল প্রভৃতির জ্ঞান যে তােমার চিদ্বিভূতির শুধু কণামাত্র। হে আনন্দস্বরূপ! যিশু, মহম্মদ, চৈতন্য, নানক প্রভৃতির প্রেম যে তােমারই আনন্দের সামান্য বিলাস-বিভূতি মাত্র। যে ‘তােমা ছাড়া কিছু হইতে পারে না, কিছু থাকিতে পারে না, সে তােমাকে নাকি বাদ দিলে চলে ! হে “ভয়ানাং ভয়ং ভীষণং ভীষণানাম”, হে “গতিঃ প্রাণিনং পাবনং পানাম,” হে পালক, হে রক্ষক, হে বিভু, হে প্রভু, হে ভূতভর্তা, হে গ্রহিষ্ণু, হে প্রভবিষ্ণু, হে নিত্য, হে সৰ্বগত, হে স্থাণু, হে অচল, হে সনাতন, হে ‘সৰ্বেন্দ্ৰিয়- গুণাভাস সৰ্বেন্দ্ৰিয়ৰিবৰ্জিত’, হে “বিভক্তেযু অবিভক্ত” হে সর্বব্যাপী, হে চরম গতি, হে পরম পতি, হে অজর, হে অমর, হে শুদ্ধমপাপবিদ্ধম, হে কবি, হে মনীষি, হে পরিভু, হে স্বয়ম্ভু, হে ‘যথাতথ্যতােহর্থে’-র বিধানকারী, হে ‘সত্যং জ্ঞানম্ অনন্তম, হে শরণ্যম, হে বরেণ্যম হে শান্তং শিবং

[ ৭ ]
সুন্দরম, হে আনন্দরূপমমৃত, হে আমার যথা-সর্বস্ব, নিজ
গুণে দয়া করিয়া আমার নিকট প্রকাশিত হও,—তােমার এই
সত্যের জ্ঞানের আনন্দের বিভূতি যেন সর্বদা আমাকে
মাতাইয়া বিভাের করিয়া রাখে।
ভগবান, ইষ্ট ও গুরুতত্ত্ব
ভগবান, ইষ্ট ও গুরু এই তিন তত্ত্ব মিলাইয়া অনেক
সম্প্রদায়ে অনেক সাধনের ব্যবস্থা দেখা যায়। সুতরাং এই
তিন তত্ত্ব সম্বন্ধে একটু আলােচনা অপ্রাসঙ্গিক নহে। ভগবান্
সর্বব্যাপী সচ্চিদানন্দ স্বরূপ। যাহা হইতে বা যাহাতে জগৎ
সৃষ্ট, পরিণত বা বিবর্তিত, যিনি আমাদের সমস্ত সত্তার, শক্তির,
জ্ঞানের আনন্দের মূল প্রস্রবণ, সেই ভগবান্ যেন একখানা
বিস্তৃত গালিচা, একখানা মায়ার চাদর গায়ে দিয়া জগৎ-জীব
রূপে প্রতীয়মান হইতেছেন। আমরা মায়ার আবরণের
ভিতর দিয়া তাহাকে দেখিতে পাই না। এখন যদি কোনাে
জায়গায় চাদরটা একটু ছিড়িয়া যায়, তবে সেখান হইতে আমরা
গালিচার কতটুকু অংশমাত্র দেখিতে পাই! সেই অংশটুকু সৰ্বতো-
ভাবে গালিচার অনুরূপ—যদিও সীমাবদ্ধ; আর সেই সীমা
গালিচার নয়, চাদরের গায়ে। এই যে ভগবানের সাধক ভক্তের
নিকট সীমাবদ্ধ সচ্চিদানন্দ ভাবে পূর্ণ প্রকাশ, তাহাই ইষ্ট ।
যাহার ভিতরে ভগবানের সব লক্ষণ বৰ্তমান তিনি সীমাবদ্ধ
রূপে প্রতীয়মান হন আমাদেরই পূর্ণ দর্শনের অভাবে। যিনি

৩ যেমন [ ৮ ] ইষ্ট, অভিলষিত, প্রার্থিত, যাহাকে দেখিলে আর দেখার কিছু বাকী থাকে না, যাহাকে পাইলে আর পাওয়ার কিছু বাকী থাকে না, যিনি আমার সমস্ত অভাব পূরণ করিয়া আমাকে তৃপ্ত, শান্ত, পূর্ণ করিতে পারেন তিনি আমার ইষ্ট। চাদরখানা যত ছেড়া যাইবে গালিচা ততই অধিকতর ব্যাপক রূপে দৃষ্ট হইবে, তেমনি ইষ্টের ধ্যানে আমরা যতই সমাহিত হইব, ততই তার ব্যাপকতা ফুটিয়া বাহির হইবে। এইজন্য সাধনরাজ্যে সীমাবদ্ধ ইষ্টতত্ত্বের লক্ষণে “নমস্তে জগদ্ব্যাপিকে বিশ্বমূৰ্ত্তে” আদি ভাবের সমাবেশ দেখিতে পাওয়া যায়। যেমন ভূগােলে সমস্ত পৃথিবীর ধারণা করিবার জন্য সীমাবদ্ধ মানচিত্রে দূরত্বের পরিমাণ লিখিয়া দেওয়ায় জ্ঞানলাভের সাহায্য হয়, অথচ পৃথিবীকে সীমাবদ্ধ করা হয় না, তেমনই ইষ্টকে ধারণার সুবিধার জন্য সীমাবদ্ধ রূপে চিত্রিত ও কল্পিত করিলেও তাহার সর্বব্যাপিত্বে বাধা হয় না। যিনি সর্বশক্তিমান্, তিনি জীবের উপলব্ধির সুবিধার জন্য সীমাবদ্ধ ভাবে সীমাবদ্ধ চিত্তে প্রতীয়মান হইতে পারেন না বলায় আমরা যে সর্বশক্তিমান্‌কে কতটা সীমাবদ্ধ করিয়া ফেলি তাহাও চিন্তনীয়। ইষ্টতত্ত্ব আদর্শপ্রাপ্ত নরনারী রূপে বা তত্ত্বরূপে আগত ও শ্রীভগবানের সীমাবদ্ধ ভারূপে অনুভূত। ইষ্টতত্ত্ব ভগবৎ-তত্ত্বেরই আংশিক ভাবের অনুভূতি। প্রত্যেক ইষ্টতত্ত্ব অনন্ত সৌন্দৰ্য-মাধুৰ্য্য দ্বারা চিত্তাকর্ষক। অনন্ত শক্তি গুণ-প্রেম-জ্ঞানাদি দ্বারা জীবের চালক।যাণপরম করুণা- ।

[ ৯ ] ময় বলিয়া জীবের দুঃখে বিগলিত-হৃদয়,—যাহার শারীরিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক বৃত্তিগুলি পূর্ণরূপে পরিণত ও অপূর্ব সামঞ্জস্যযুক্ত। যিনি সমস্ত জীবের সমস্ত অভাব দূর করিয়া পূর্ণতা লাভের অনন্ত আনন্দ লাভের সহায়ক। এক কথায় জীবের পূর্ণ আদর্শ। এই ইষ্টতত্ত্ব অবতার ভাবে বর্ণিত। অবতার বহু প্রকার–পূর্ণ অবতার, অংশ অবতার, গুণাবতার, শক্তির অবতার ইত্যাদি। ইহার মধ্যে কালী তার আদি শক্তিরূপে এবং রাম কৃষ্ণাদি জীবভাবে অবতাররূপে প্রসিদ্ধ। যে অবতার যাহার নিকট অনুকূল, চিত্তাকর্ষক ও পূর্ণতাপ্রাপ্ত মনে হইবে তিনিই হইবেন তাহার ইষ্ট। গুরুতত্ত্ব ইষ্টতত্ত্বের প্রতিমূর্তি বা প্রতীক; সংযত শুদ্ধ শান্ত হওয়ার ফলে যাঁহার ভিতরে নিত্যসিদ্ধ ইষ্টতত্ত্ব প্রায় পূর্ণভাবে প্রকটিত, যাহার কথা ভাব এবং কাজের মধ্য দিয়া ইষ্টতত্ত্বের প্রায় পূর্ণভাবে স্ফুরণ উপলব্ধ হয় তিনিই আমার গুরু। ভগবানের অসীম ভাবের ধারণা করা কঠিন বলিয়া ইষ্টতত্ত্বের ব্যবস্থা হইয়াছে, আবার ইষ্টতত্ত্বও সুলভ নয় বলিয়া গুরুত্বের প্রয়ােজনীয়তা স্বীকার করা হইয়াছে। যাহাতে সাধন-রাজ্যে বিকৃতি না ঘটে এইজন্য এই তিন তত্ত্ব মিলাইয়া দেখিবার ব্যবস্থা আছে। উপনিষদ্ বেদান্তাদি গ্রন্থোক্ত ভগবৎ-তত্ত্বের সব লক্ষণগুলি ইষ্টতত্ত্বের সহিত মিলাইয়া দেখিতে হইবে। পৰ্যন্ত ভগবৎ-তত্ত্বের সঙ্গে ইষ্টতত্ত্বের লক্ষণগুলি সুন্দরভাবে মিলিয়া না যাইবে, সে পর্যন্ত মনে করিতে হইবে, তিনি আমার ; যে [ ১০ ] ইষ্ট হইবার যােগ্য নহেন। যাহার ভিতর দিয়া ইষ্টতত্বের অবাধিত ফুরণের সম্ভাবনা নাই—মনে রাখিতে হইবে, তিনি আমার গুরু হইবার উপযুক্ত নন। গুরুই ইষ্টের প্রতীক, ইষ্ট ভগবানের প্রতীক; গুরু পৌছাইয়া দিবেন ইষ্টের কাছে, ইষ্টের ভিতর দিয়া আমরা পৌছিব ভগবানের কাছে। যাঁহারা গুরু ও ইষ্টের সাহায্য ব্যতীত ভগবানকে উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করেন, দেহধারীর পক্ষে তাহাদের পন্থাটা অনেকটা কঠিন বলিয়া ভক্তিমার্গ ইষ্ট ও গুরুতত্ত্বের দিকে এতটা দৃষ্টি খিয়াছে। ঋমিছন্দ-দেবতা-বিনিয়ােগ ঋষি-(ঋষ, অপরােক্ষ দর্শনে) যাঁহার অপরােক্ষ দর্শন খুলিয়া গিয়াছে তিনিই ঋষি। ভগবান অনন্ত, তাহার সৃষ্ট সব পদার্থও অনন্ত। জীব অসংখ্য, জীবের জীবনের লক্ষ্যও তাই বহু এবং সেই লক্ষ্যসিদ্ধির উপায়ও অসংখ্য। ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য সাধন-প্রণালীও বিভিন্ন । যে সাধক যে উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য যে ভাবের সাধন-প্রণালী অবলম্বন করিয়া সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন, তিনিই সেই নির্দিষ্ট তত্ত্ব লাভের নির্দিষ্ট সাধন-প্রণালীর ঋষি। ঋষয়ঃ মন্ত্রদ্রষ্টা চ তে স্মারক ন তু কারকা”। তত্ত্ব নিত্য, প্রকৃতির বিধান প্রণালীও নিত্য। যে বিধান অবলম্বনে যে তত্ত্ব সাক্ষাৎকার হইতে পারে সেই প্রণালীও নিত্য । ঋষিগণ সাধন-বলে সেই মন্ত্রসাধন- { ১১ ] প্রণালী আবিষ্কার করিয়াছেন মাত্র, তাহার মন্ত্রের সৃষ্টিকর্ত নহেন। যে প্রণালী অবলম্বনে যে ছন্দে যে ভাবের কম্পন জন্মাইয়া যে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় তাহাই সেই নির্দিষ্ট সাধন- প্রণালীর ছন্দ। দেবতা শব্দ দ্যোতনার্থক ও ক্রীড়ার্থক দিব, ধাতু হইতে সাধিত। প্রকৃতির বিভিন্ন স্তরে বিন্নি তত্ত্বে পরমাত্ম-চৈতন্য কিভাবে প্রকাশ পায়, কিভাবে লীলারত থাকে, তাহা লইয়াই দেবতাতত্ত্ব। ভগবৎ-চৈতন্যের বিভিন্ন প্রতিবিম্ব বা বিভূতি বিভিন্ন ভাবের লীলাভাবই দেবতাতত্ত্ব। কোন সাধনা কিভাবে অনুষ্ঠিত হইলে কি প্রয়ােজন সাধিত হয় তাহা লইয়াই বিনিয়ােগ-তত্ত্ব। : প্রথমে ঠিক করিতে হইবে, আমরা কি চাই—আমাদের লক্ষ্য কি। তারপরে জানিতে হইবে সেই লক্ষ্য কাহারও জীবনে সিদ্ধ হইয়াছে কি না। যিনি সেই লক্ষ্যে সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন তিনি হইবেন সেই মন্ত্রের সেই লক্ষ্যসিদ্ধির ঋষি। কি উপায়ে সিদ্ধিলাভ হইয়াছে তাহা হইবে সেই মন্ত্রের ছন্দ। স্নায়ুকেন্দ্রে সেই শক্তি নিহিত-সেই স্নায়ুকেন্দ্রে প্রাণবায়ুকে ও মননশক্তিকে চালিত করিয়া সেখানকার সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করিয়া সেই কেন্দ্রে সেই শক্তির প্রকাশ ও কার্যপ্রণালী উপলব্ধি করা হইর সেই সাধন-প্রণালীর দেবতাতত্ত্ব। তারপরে ! [ ১২ ] সেই জাগ্ৰত শক্তিকে উদ্দেশ্য সাধনে নিযুক্ত করিয়া উদ্দেশ্য সফল করাই বিনিয়ােগ-তত্ত্ব। প্রথমেই জানিয়া লইব প্রকৃতপক্ষে আমি কি চাই। 'তারপরে দরকার হইবে সেই পথে আদর্শ সিদ্ধগুরুর উপদেশ, কৃপা ও সাহায্য। তারপরে দরকার হইবে সেই আদিষ্ট প্রণালী অবলম্বনে সাধন করা; ফলে হইবে সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধি বা সেই দেবতার দর্শন। ঋষি-তত্ত্বদশী গুরু, ছন্দ-সাধন- প্রণালী, দেবতা—অপূর্ব সুপ্ত আধ্যশক্তি, বিনিয়ােগ—সেই শক্তিকে সাধন-বলে জাগ্রত করিয়া নির্দিষ্টভাবে চালাইয়া কার্যক্ষেত্রে পূর্ণ সিদ্ধিলাভ-উদ্দেশ্যের সফলতা। ঘল, ত, মহস্য } সাধারণ দৃষ্টিশক্তির বাহিরের অনেক বস্তু আমরা যেমন দূরবীক্ষণের সাহায্যে দেখিতে পাই, সেইরূপ আমাদের সাধারণ অনুভূতির বাহিরের অনেকগুলি তত্ত্ব আমরা নির্দিষ্ট স্নায়ুকেন্দ্র বিশেষে মন স্থির করিয়া অনুভব করিতে পারি। স্নায়ুকেন্দ্র ( Nerve-centre) গুলির মধ্যে যে অনেক অলৌকিক তত্ত্ব নিহিত আছে তাহা বিজ্ঞানসম্মত। যেমন অণুবীক্ষণ দূরবীক্ষণের সাহায্যে আমরা অনেক সূক্ষম ও দূরস্থ বিষয় দর্শন করিয়া থাকি, যােগিগণ তেমনি স্নায়ুকেন্দ্র বিশেষে প্রাণশক্তি চালিত করিয়া এবং সেখানে মন স্থির করিয়া অনেক অতীন্দ্রিয় তত্ত্ব প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। স্কুল বিষয়ের দর্শনের জন্ম যেমন অণুবীক্ষণ [ ১৩ ] • দূরবীক্ষণ প্রভৃতি যন্ত্র আছে, সূক্ষম বিষয় অনুভূতির জন্য তেমনি আমাদের বিশিষ্ট বিশিষ্ট স্নায়ুকেন্দ্রের মধ্যে সেইরূপ সেই সব তত্ত্ব উপলব্ধির শক্তি নিহিত আছে। নির্দিষ্ট স্নায়ুকেন্দ্র খারাপ হইলে আমরা যে দর্শন-শ্রবণাদি শক্তিলাভে বঞ্চিত হই, এ কথা বিজ্ঞানসম্মত। সাধন-রাজ্যে এই বিভিন্ন প্রসিদ্ধ স্নায়ুকেন্দ্রই এক একটি যন্ত্রবিশেষ। এক এক মন্ত্র সাধনার জন্য—এক এক বিষয়ে সিদ্ধিলাভের জন্য—এক একটি কেন্দ্র নির্দিষ্ট আছে। দূরবীক্ষণ দিয়া দেখার ভিতর আমরা তিনটি তত্ত্ব দেখিতে পাই। একটি দূরবীক্ষণ তত্ত্ব, আর একটি তাহাকে কেন্দ্রগত (Focus) করার প্রণালী, অপরটি মন স্থির করা। ইহার ভিতরে প্রথমটি যন্ত্র, দ্বিতীয়টি তন্ত্র, তৃতীয়টি মন্ত্রতত্ত্ব। এইরূপ সাধন-রাজ্যের জন্য বিশিষ্ট স্নায়ুকেন্দ্রগুলি যন্ত্র, সেই সেই স্থানে প্রাণশক্তির (Nervous energy) সঞ্চালন প্রণালীর নাম তন্ত্র, সেই স্থানে চিত্ত স্থির করিবার নাম মন্ত্র। যেমন চক্ষু দেখিবার জন্য, কান শুনিবার জন্য নির্দিষ্ট যন্ত্র, সেইরূপ সূক্ষম বিষয় প্রত্যক্ষ করিবার জন্য সূক্ষ্ম যন্ত্রের ব্যবস্থা আছে। দিব্য 'দর্শন লাভ না করিলে দিব্যতত্ত্ব দর্শন করা যায় না। বর্তমান পূজা প্রণালীর মধ্যে আমরা যে রং-বেরঙ্গের চিত্র আঁকিতে দেখি, সেই সব চিত্রগুলি ছিল ভিতরের যন্ত্রের যন্ত্রনিহিত শক্তিকে জাগ্রত করিবার জন্য প্রাণ- প্রতিষ্ঠা ও বােধন করিবার জন্য যে সব অনুষ্ঠান ও মন্ত্রের বিধান আছে, সেই সব ছিল তন্ত্র ও মিন্ত্রতত্ত্বের প্রতীক। প্রতীক প্রতীক।

[ ১৪ ] অবলম্বনে তত্ত্বে গিয়া পৌছান ছিল লক্ষ্য। এখন আমরা তাত্ত্বিক ভাব ও যােগপ্রণালী ভুলিয়া গিয়া শুধু প্রতীকে সীমা বদ্ধ থাকিয়া আসল তত্ত্বগুলিকেও বিকৃত করিয়া ফেলিয়াছি। ফলে শুনিতে পাওয়া যায়—কলিতে দেবতা দর্শন, ইষ্ট দর্শন অসম্ভব। মগ্র “মননাৎ ত্ৰায়তে যস্মাৎ তস্মাৎ মন্ত্র উদাহৃতঃ।” যাহার মননের দ্বারা, চিন্তার দ্বারা, ধ্যানের দ্বারা সংসার-সাগর হইতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়, দুঃখ-কষ্টের হাত হইতে মুক্ত হইয়া পরমা- নন্দ প্রাপ্তি ঘটে তাহারই নাম মন্ত্র । মন্ত্র বহু প্রকার ; যদিও সকল মন্ত্রের উদ্দেশ্য এক। মন্ত্রের অর্থ ভাল করিয়া বুঝিলে আমরা দেখিতে পাইব যে, তাহার মধ্যে, বিশেষতঃ তাহার বীজের মধ্যে আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও তৎ প্রাপ্তির উপায় নিহিত আছে। সাধারণতঃ মন্ত্রের মধ্যে তিনটি অংশ থাকে,—প্রণব, বীজ ও দেবতা। একাক্ষর মন্ত্রগুলির মধ্যেও এই তিন তত্ত্ব নিহিত। প্রণব সর্বব্যাপী ভগবৎ-তত্ত্ব প্রকাশ করে, বীজ ব্যষ্টি-জীবনের লক্ষ্য নির্ধারিত করে, দেবতা সেই লক্ষ্যপ্রাপ্তির উপায় জানাইয়া দেয়। বটের বীজে যেমন একটা পূর্ণ পরিণত ফলে ফুলে সুশােভিত বৃক্ষে পরিণত হইবার শক্তি নিহিত, মন্ত্রের বীজের মধ্যেও সেইরূপ বিশিষ্ট জীবের পূর্ণ পরিণতি লাভের শক্তি নিহিত আছে। ০ [ ১৫ ] ওঁকারের মধ্যে অতি সুন্দরভাবে সৰ্বব্যাপী ভগবৎ-তত্ত্ব-পরমাত্ম- তত্ত্ব নিহিত। বীজের মধ্যে ব্যষ্টি-ভাবাপন্ন প্রত্যক্-চৈতন্যের সব তত্ত্ব নিহিত। দেবতাতত্ত্বের মধ্যে কিরূপে আমাদের ভিতর- কার অন্তরেন্দ্রিয়, বহিরিন্দ্রিয় ও দেহাদির সব তত্ত্বের মধ্য দিয়া সেই প্রত্যক্-চৈতন্য পূর্ণ ভাবে পরিণতি লাভ করিতে পারে, সেই সব তত্ত্ব নিহিত আছে। ভগবৎ-চৈতন্য প্রকৃতির সব স্তরের মধ্য দিয়া কিভাবে প্রকাশ পায়, লীলা করে—তাহা লইয়া দেবতা। দেবতা সাক্ষাৎকার করার অর্থ-সেই সব তত্ত্বগুলির মধ্য দিয়া ব্যক্তি-সমষ্টি ভাবে ভগবৎ-চৈতন্যকে অবাধিত ভাবে ফুটাইয়া বাহির করা-উপলব্ধি করা। প্রণব হইতে বুঝা যাইবে আমার ভগবান কি তত্ত্ব, বীজ হইতে জানা যাইবে আমার স্বরূপ কি, আমার সঙ্গে ভগবানের কি সম্বন্ধ, ভগবানের কি বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণ করিবার জন্য আমাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। দেবতার অর্থের মধ্য দিয়া আমরা জানিতে পারিব কি উপায়ে আমার সে উদ্দেশ্য পূরণ হইতে পারে । প্রথমতঃ মন্ত্রের অর্থ বুঝিয়া লইতে হয়, তারপর মন্ত্রের সাধনার দ্বারা যখন মন্ত্র চেতন ( জাগ্রত হয়, তখন ভিতর হইতে সেই তত্ত্বগুলির স্ফুরণ হয় অর্থের ভিতর দিয়া যাহা বুঝিয়াছিলাম তাহা প্রত্যক্ষ হয়। “ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায়” মন্ত্রে সাধকের সিদ্ধাবস্থায় “ও”এর ভিতর । দিয়া ভগবৎ তত্ত্বের (সমষ্টিভাবের) উপলব্ধি হইবে,“ক্লীং” বীজের ভিতর দিয়া তাহার ভিতরে ইষ্ট কৃষ্ণভের (ব্যষ্টিভাবের) স্ফুরণ - ;

[ ১৬ ] হইবে এবং “কৃষ্ণায়” এই দেবতাতত্ত্বের ভিতর দিয়া তাহার জীবন কৃষ্ণময় হইয়া তাহার জীবনের ভাব ও কাজ কৃষ্ণ সদৃশ হইয়া পড়িবে। প্রত্যেক মন্ত্র সাধন-প্রণালীর একটা চুম্বক আকারের সাঙ্কেতিক চিহ্ন। মন্ত্রের তিনটি অংশের মধ্যে প্রণবের সাহায্যে আমরা ভগবৎ-তত্ত্ব, বীজের সাহায্যে আমাদের ভিতর- কার সুপ্ত ভগবৎ শক্তি এবং দেবতাতত্ত্বের দ্বারা আমরা আমাদের পূর্ণ বিকাশের ভগবৎ-প্রাপ্তির সাধন-প্রণালী জানিতে পারি। স্ত্রীলােকদিগকে যে প্রণব বাদ দিয়া দীক্ষা দেওয়ার প্রণালী বাঙ্গালা দেশে দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা অবৈজ্ঞানিক এবং যুক্তিবিৰুদ্ধ। স্ত্রীলােকদিগকে দাবাইয়া রাখিবার জন্য যাহারা এই যুক্তি আবিষ্কার করিয়াছেন তাহারা ভুলিয়া যান যে, মৈত্রেয়ী গার্গী বাচাবী প্রভৃতি বৈদিক ঋষিগণও স্ত্রী-জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। স্ত্রী-দেবতা কালী, দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতী প্রভৃতিকে মাতৃজাতির পক্ষে স্পর্শ করা নিষিদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে। মায়ের জাতকে এইভাবে অবমাননা করিয়া ভগবানের মাতৃ ভাব উপলব্ধি করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। ওঁকারের ভিতরে আমরা ‘অ’কার ‘উ’কার ও ‘ম’কার এবং অর্ধমাত্রা এই তত্ত্বগুলি দেখিতে পাই। ভগবানের একাংশ ব্যক্ত (Emmanent) জগৎরূপে সৃষ্ট পরিণত রা বিবর্তিত ; অপরাংশ অব্যক্ত (Transcendental)। ইহাই অর্ধমাত্রা।

[ ১৭ ] অধিকারী বিচার এক যখন বহু হইলেন তখন হইতে জগতে নানাত্বের সৃষ্ট হইল। জগতে দুই টি পদার্থ দুইটি মনুষ্য এমন পাওয়া যায় না যাহারা সর্বাঙ্গে ঠিক এক ভাবাপন্ন। ভিতরে মিল থাকিলেও বাহিরে বৈচিত্র্য। আমগাছ জামগাছ নহে, রাম রাবণ নহে। প্রত্যেকে যেন তাহার নির্দিষ্ট কাজ করিতে আসিয়াছে। একের কাজ অন্যের দ্বারা সম্পন্ন হওয়া সহজ নয়। পূজন্মগত, উত্তরাধিকারী ভাবে প্রাপ্ত, অথবা ভগবদ্‌-দত্ত শক্তি অনুসারে মানুষের গুণ নির্ধারিত হয়, এবং শিক্ষা-দীক্ষা দ্বারাও আমরা কোনও নির্দিষ্ট কাৰ্য্য সাধনের যােগ্যতা অর্জন করি। তাহার পরে আজ আমি যে কাজ করিতে অসমর্থ, কিছুদিন পরে হয়ত সে কাজ করিবার ক্ষমতা লাভ করিব, যেমন নিম্নশ্রেণীর ছাত্র ক্রমে উচ্চ শ্রেণীতে উঠিবার যােগ্যতা লাভ করে। নিম্নশ্রেণীর ছাত্র উচ্চ শ্রেণীর গ্রন্থ লইয়া বিব্রত থাকিলে সে না পারিবে উচ্চ শ্রেণীর পাঠ বুঝিতে, না পারিবে নিজের শ্রেণীর পাঠ শিক্ষা করিয়া উন্নতি লাভ করিতে। সাধন-রাজ্যেও সকলে সকল কাজ করিতে সমর্থ নহে। এইজন্য সাধন- রাজ্যেও নানাবিধ শ্রেণীবিভাগ দেখিতে পাওয়া যায়, এবং আজ আমার পক্ষে যাহা বােঝা বা করা অসম্ভব, কিছুদিন পরে আমিই হয়ত সেই কাজ করিবার যােগ্যতা লাভ করিব। এখানেও উন্নতলাভের সঙ্গে সঙ্গে সাধন-প্রণালীর কোন কোন বিষয় পরিবর্তন আবশ্যক হইয়া পড়ে। সব কাজের

[ ১৮ ]
ভিতর একটা নিত্য আর একটা নৈমিত্তিক ভাব দেখিতে
পাওয়া যায়। নৈমিত্তিক ভাবগুলি দেশ-কাল-পাত্র ভেদে
পরিবর্তন লাভ করে। নিত্য ভাবগুলি প্রায় একভাবেই
থাকিয়া যায়। গুণকৰ্ম্মের বিচার ছাড়িয়া দিয়া এবং ক্রমােন্নতির
কথা ভুলিয়া গিয়া আমরা আমাদের জীবনটাকে অনেক অংশে
নীরস করিয়া ফেলিয়াছি। অধিকারী বিচারটা ঠিকভাবে
অনুষ্ঠিত হইলে, জাতিভেদ কৰ্ম্মবিভাগ শুধু বংশগত না হইয়া
গুণকৰ্ম্মগত হইলে আমাদের উন্নতিলাভটা অনেকাংশে স্বাভাবিক
হইত, জীবনটা এত নীরস বােধ হইত না। বৈষ্ণবমতের
বিধিমার্গ ও রাগমার্গ, তন্ত্রমতের পশ্বাচার ও বীরাচার, এমন
কি প্রাচীন জাতিভেদ প্রথা অধিকারী বিচারের প্রধান দৃষ্টান্ত।
*।
গুরুবাদ ও দীক্ষা
সকল কাজেই গুরুর—উপযুক্ত শিক্ষকের দরকার।
যে-কাজে সিদ্ধিলাভ করিয়াছে, সে সে-কাজে শিক্ষা দিতে
সুদক্ষ-সে সে-কাজের প্রকৃত কুলগুরু। বিজ্ঞান শিক্ষা
করিতে হইলে জগদীশবাবুর ন্যায় বৈজ্ঞানিকের সাহায্যলাভ
শ্রেয়ঃ, তাহা অস্বীকার করা যায় না। সাধন-রাজ্যেও যিনি
আমাকে দেখিয়া আমার সব অবস্থা বুঝিতে পারেন, আমার
প্রতি স্নেহশীল, আমার দ্বারা তাহার নিজের স্বার্থ সিদ্ধ করিতে
বেশী চেষ্টা না করিয়া আমার উন্নতি ও শান্তিবিধানে সমধিক
সচেষ্ট, আমার গন্তব্যপথে যিনি নিজে অগ্রসর হইয়া সিদ্ধি-

[ ১৯ ] লাভ করিয়াছেন, সেই সংযত শুদ্ধ দক্ষ প্রেমিক জ্ঞানী তত্ত্বদর্শী •পুরুষই আমার গুরু হইবার চালক হইবার উপযুক্ত পাত্র। অনুপযুক্ত লােক গুরুর আসন গ্রহণ করার ফলে দেশে প্রচুর অনিষ্ট সাধিত হইতে বসিয়াছে। সব কাজেই সিদ্ধিলাভের জন্য দীক্ষালাভের দরকার। কাজে ব্রতী দীক্ষিত তীব্র সঙ্কল্পযুক্ত না হইলে সিদ্ধিলাভ অনিশ্চিত। প্রাচীনকালে ত্ৰিজাতি গুরুর আশ্রমে গিয়া সাবিত্রীমন্ত্রে দীক্ষা লাভ করিত। গুরু জীবনের লক্ষ্য ও তাহার সাধনপ্রণালী নির্ধারণ করিয়া দিয়া উন্নতি ও শান্তির সহায় হইতেন, আমি যাহা করিতে আসিয়াছি তাহা সুচারুরূপে সম্পন্ন করিবার সহজ সুন্দর ও স্বাভাবিক প্রণালী আমরা দীক্ষা হইতে লাভ করিতান। আমাদের প্রকৃত বাসস্থান ছিল ভগবৎ-ধামে—সেখানে আমরা আপন আপন অধিকার অনুসারে ভগবৎ-সেবা নিয়া বিভোর থাকিতাম। এখানে আসিয়া আমরা আমাদের প্রকৃত স্বরূপ, ভগবানের স্বরূপ, তাঁহার সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ ও আমাদের জীবনের কর্তব্য ভুলিয়া গিয়াছি। সদ্গুরু আমাদের এই ভুল ভাঙ্গিয়া আমাদের প্রকৃত স্বরূপ ও কর্তব্য নির্ধারণ করিয়া দিতেন। দীক্ষালাভের পরে আমরা ভগবানের হইয়া যাইতাম-আমাদের সব কাজ হইয়া যাইত পরকীয়, পরমাত্মা সম্বন্ধীয়, সংসার হইয়া যাইত ভগবৎ-ধান, জীবকে মনে হইত পােষাক পরা শিব, কৰ্ম্ম হইয়া যাইত যজ্ঞ, সৰ্বত্ৰ ব্ৰহ্মদর্শন ব্রহ্মানুভূতি ও ব্রহ্মসেবা হইয়া ?

।
[ ২ ]
পড়িত আমাদের জীবনের লক্ষ্য। নিজে উন্নতি ও শান্তি
লাভ করিয়া সকলকে উন্নত করা ও শান্তির পথে লইয়া
যাওয়ার চেষ্টা হইয়া পড়িত আমাদের স্বাভাবিক কৰ্ম্ম। দীক্ষা
দ্বারা হামরা ভগবানের হইয়া যাইতাম--আত্মীয়-স্বজন হইয়া
পড়িত ভগবদ্‌-বিভূতি, স্বার্থের ভাব গিয়া আসিয়া পড়িত একটা
প্রেমের তাব। আমাদের সমস্ত সম্বন্ধগুলি সমস্ত কাজগুলি
হইয়া পড়িত শান্ত, পবিত্র, অতি মধুর, অতি সুন্দর।
সময়-তত্ত্ব
আমাদের বৎসর
ছয় ঋতুতে বিভক্ত। জগৎ-জীব
এভগবানের মূর্তি—তাহার বিভূতি। এক এক ঋতুতে তিনি
এক এক ভাবে প্রকাশ পান। তাহার প্রকাশের ভিন্নতা অনু-
সারে প্রকৃতিদেবীও বিভিন্নভাবে বিভিন্ন উপচার দ্বারা তাহার
প্রাণারামের পূজা করিয়া থাকেন। আমরা প্রকৃতিদেবীর
সন্তান; আমাদের পূজাও আপন আপন অধিকার অনুসারে
প্রকৃতিদেবীর তালে তালে তঁাহার পূজার সাহায্য করা।
বৈষ্ণবধৰ্ম্মের সখী ও মঞ্জরীদের সেবা ও ধ্যান বিভাগ এই তত্ত্ব
সুন্দর ভাবে
প্রকাশ করে। শ্রীভগবানের প্রকাশ এবং
লীলা-রহস্যও দিনরাত্র এমন কি ঘণ্টা মিনিট সেকেণ্ড অনুসারে
পরিবর্তিত হইয়া থাকে। তাই প্রকৃতিদেবীর পরমপুরুষের
সেবা বাপূজার মধ্যেও আমরা এই কালগত ভেদ দেখিতে পাই।
বৈষ্ণবদের অষ্টকালীয় সাধন-প্রণালী এইদিকে বিশেষভাবে
দৃষ্টি রাখিয়াছে । আৰ্য ঋষিগণ এই সব বিচার করিয়া

[ ২১ ] ঋতুভেদে, মাসভেদে, তিথিভেদে, বারভেদে, দিন-রাত্রভেদে, এমন কি মুহূর্তভেদে, সাধনভেদ ভগবৎ উপলব্ধি-ভেদ নির্ণয় করিয়া রাখিয়াছেন। যােগশাস্ত্রে কখন কোন নাকে শ্বাস চলিতে থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখিয়া তদনুসারে সাধনভেদ চিন্তার ভেদ নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন। দক্ষিণ নাকে শ্বাস বহিতে থাকিলে পুরুষ, এবং বাম নাকে শ্বাস বহিতে থাকিলে স্ত্রী- দেবতার ধ্যান প্রশস্ত। দিনে পুরুষ-দেবতার, রাত্রে স্ত্রী-দেবতার, শুক্লপক্ষে পুরুষ-দেবতার, কৃষ্ণপক্ষে স্ত্রী-দেবতার, উত্তরায়ণে পুরুষ-দেবতার, দক্ষিণায়নে স্ত্রী-দেবতার সাধনা বিধেয়—এইরূপ বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়। এইভাবে কালের সমস্ত অবয়বের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া তাহার মধ্যে একটা অপূর্ব সমন্বয় বাহির করিয়া পূজার শুভ মুহূর্ত নির্ণয় করা হইয়াছে— ত্রিসন্ধ্যায় গায়ত্রীদেবীর ধ্যান তিন ভাবের। মােটর উপর সকালবেলায় আমরা বিশ্রাম হইতে কাজের দিকে যাই; সেইজন্য সকালবেলার সাধনায় যাহাতে আমাদের কাৰ্যগুলি ভগবানের অনুমােদিত হয়—কাজের মধ্য দিয়া আমরা আমাদের জীবনে ভগবদিচ্ছা সফল করিয়া তুলিতে পারি, সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা হইয়াছে। সন্ধ্যাবেলায় আমরা কাজ হইতে অবকাশের দিকে—বিশ্রামের দিকে যাই, সেইজন্য সন্ধ্যাবেলার সাধনায় কার্যক্ষেত্রে ভ্রম- প্রমাদ বশতঃ আমাদের দেহ-মনে যে সব মলিনতা ও অবসাদ আসিয়াছে তাহা দূর করিবার দিকে বেশী দৃষ্টি রাখি। রাত্রের [ ২২ ] পূজা আমাদের ভগবানের সঙ্গে মিলনানন্দ অনুভূতির চেষ্টা। বৈষ্ণবশাস্ত্রের পূর্ব-গােষ্ঠ ও উত্তর-গােষ্ঠের ধ্যান এই ভাবকে অতি সুন্দররূপে প্রকাশ করে। পূৰ্ব-গােষ্ঠে—সকালবেলা আমাদের গরুগুলি—ইন্দ্রিয়গুলি (“গাবস্তিষ্ঠন্তি অত্র ইতি গােষ্ঠ, গাবঃ ইন্দ্রিয়াণি”—গরুগুলি যেখানে থাকে তাহার নাম গােষ্ঠ ; গরুগুলি আমাদের ইন্দ্রিয়গণ) সেখানে যাহাতে শব্দাদি বিষয়ের ভিতর দিয়া ভগবানকে আস্বাদ করে, ইন্দ্রিয়গুলি যাহাতে সর্বত্র ভগবানের অনুসন্ধান করে, ভগবৎ-কাৰ্যসাধনে সচেষ্ট থাকে, সেইদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়। সন্ধ্যাবেলায় উত্তর-গােষ্ঠের সময় আমাদের ইন্দ্রিয়রূপ গরুগুলিকে বিষয় হইতে ফিরাইয়া আনিয়া শুদ্ধ করিয়া ভগবৎ-অনুভূতিতে লাগাইয়া রাখিবার ব্যবস্থা আছে। সকালবেলা আত্মার গতি থাকে বহির্মূখী, আত্ম। তখন বুদ্ধি-মন-প্রাণ-ইন্দ্রিয়ের ভিতর দিয়া আত্মপ্রকাশ করিতে লীলারস আস্বাদ করিতে বাহিরের দিকে যায়। সন্ধ্যাবেলা আত্মার গতি থাকে বাহির হইতে ভিতরের দিকে। ইন্দ্রিয়- গুলিকে তখন প্রাণে, প্রাণকে মনে, মনকে বুদ্ধিতে, বুদ্ধিকে আত্মায়, আত্মাকে পরমাত্মায় লীন করিয়া জীবাত্মা পরমাত্মার মিলনানন্দ অনুভব করিতে চেষ্টা করে। সমস্ত দিনকে অষ্ট- প্রহরে বিভক্ত করিয়া তাহার এক এক প্রহরের জন্য বিভিন্ন কাজের বিভিন্ন ভাবের সাধনার ভিতর দিয়া ভগবৎ-তত্ত্ব আস্বাদ করিবার ব্যবস্থা দেখা যায়।

[ ২৩ ] পঞ্চকোশ-বিবেক কোশ অর্থ আবরণ; শাস্ত্রমতে পরমাত্মা অন্নময়, প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময় ও আনন্দময়,–এই পাঁচটি আবরণের মধ্যে অবস্থিত। “পঞ্চেমু কোশে বিরাজমান বুদ্ধির্ভবানী প্রতি- দেহগেহ।” পরমাত্মার কাছে যাইতে হইলে তাহাকে উপলব্ধি করিতে হইলে অন্নময় অর্থাৎ স্থল শরীরের, তৎপরে প্রাণময়ের অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যু আদি ব্যাপারে, মনােমর অর্থাৎ কল্পনার ভাবনা-চিন্তার, বিজ্ঞানময়ের অর্থাৎ বিচার-বুদ্ধির, আনময়ের অর্থাৎ সংস্কার প্রভৃতির অধ্যাস হইতে মুক্ত হইতে । হইবে। তৎপরে সব সংস্কার অজ্ঞানতার পরপারে গিয়া নিজের নিত্য-শুদ্ধ-বৃদ্ধ-মুক্ত সচ্চিদানন্দ স্বরূপে অবস্থান করিতে হইবে। পঞ্চকোশ বিবেক এখন পঞ্চকোশী ভ্রমণে পর্যবসিত হইয়াছে। শাস্ত্রের উদ্দেশ্য ছিল—পঞ্চকো ভেদ করিয়া পরমাত্মার কাছে উপস্থিত হওয়া। নেতি নেতি সাধন নেতি অর্থ ‘ন ইতি—আমি ইহা নই। আমি দেহ নহি, সুতরাং স্থূলদেহের সুখ-দুঃখে আমি বিচলিত হইব না; আমি সূক্ষমদেহ নহি, সুতরাং সুখ-দুঃখ পাপ-পুণ্য কল্পনা-জল্পনা ভাবনা-চিন্তা আমাতে শােভা পায় না; আমি কারণদেহ নহি, সুতরাং অজ্ঞানতা সংস্কার আদি আমাকে স্পর্শ করিতে পারে আমার প্রকৃত স্বরূপ বাক্যমনেৰ অগােচর—নিত্য-শুদ্ধ- ।

[ ২৪ ] বুদ্ধমুক্তস্বরূপ। ষট্চক্রদে পঞ্চকোশ-বিবেক এই সাধন প্রণালীর সহায়। নেতি নেতি সাধনার পরে ইতি ইতি সাধনার ব্যবস্থা দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাতে নিজের আত্মাকে ভর্গোদেবকে ব্রহ্মশক্তিকে সব তত্ত্বে সব চক্রে লইয়া গিয়া সব তত্ত্বকে ব্রহ্মভাবে পরিভাবিত কবিয়া ব্যষ্টিভাবে নিজ দেহকে, সমষ্টিভাবে জগৎ ব্রহ্মাণ্ডকে ব্রহ্মময় করিয়া তুলিয়া ব্ৰহ্মময় রূপে অনুভব করিবার ব্যবস্থা দেখিতে পাওয়া যায়। র শচক্র ভেদ চক্র সমবেদক স্নায়ুজাল সমূহ; ইহারা এক একটা স্নায়ু- কেন্দ্র বিশেষ। মেরুদণ্ডের বহির্ভাগে বামপার্শ্বে চন্দ্ৰতুল্যা ইড়!, দক্ষিণে সূৰ্য্যতুল্যা পিঙ্গলা, এবং মধ্যে চন্দ্র-সূৰ্য-বহ্নি- রূপা সুষুম্না নাড়া বর্তমান। ইহা মেরুদণ্ডের উদ্ধাদেশস্থ ফুফু হইতে নিম্নস্থ মূলাধার পর্যন্ত বিস্তৃত। ইহার সর্ব- নিম্নে গুহ ও লিঙ্গের মধ্যভাগে মূলাধার চক্র (Ginglion coccygeal) বর্তমান, যােগশাস্ত্র মতে ইহা রক্তবর্ণ চারিদল বিশিষ্ট। এখানে শিশুব্রহ্মা ও ডাকিনী শক্তি বিরাজিত। এখানে সার্ধ ত্রিবন-বেষ্টিত কুলকুণ্ডলিনী ত্রিগুণময়ী প্রকৃতি অধিষ্ঠিতা। ইহার উপরে লিঙ্গমূলে স্বাধিষ্ঠান চক্র (Pelvice plexus) বর্তমান। ইহা ছয়টি দল বিশিষ্ট। এখানকার দেবতা চতুভুজ নারায়ণ, শক্তি রাকিণী। তদূর্দ্ধে নাভিমূলে দশ দল মণিপুর (Solar plexus )। এখানকার দেবতা রুদ্র, [ ২৫ ] শক্তি লাকিনী। ইহার উপরে হৃদয়ে দ্বাদশ দল অনাহত চক্র (Cardiac plexus )। ইহার দেবতা ঈশান, শক্তি কাকিনী। মতবিশেষে ইহা জীবাত্মার স্থিতিস্থান। কণ্ঠদেশে ষােড়শদল বিশুদ্ধাখ্য চক্র। ইহার দেবতা মহাদেব, শক্তি শাকিনী। অদূদ্ধে জমধ্যে দ্বিদ আজ্ঞাচক্র , এখানকার দেবতা শিব, শক্তি হাকিনী। সর্বোপরি শিরােদেশে সহস্রদল বিশিষ্ট সহস্রার পদ্ম। ইহা শূন্যকার অধােবদন, সদাশিবের স্থিতিস্থান। বলা বাহুল্য, শৈব বৈষ্ণব সাধকগণ ইহার এক এক চক্রে আপন আপন সাম্প্রদায়িক দেবতাকে ইষ্টজ্যোতিঃকে বসাইয়া সর্বোপরি আপন ইষ্টদেবের স্থান নির্ণয় করিয়াছেন। বহু সম্প্রদায়ের সাধকগণ এই চক্রের ভিতর দিয়া চিত্তকে উপরে তুলিয়া এবং নীচে নামাইয়া জপাদি কাৰ্য্য সাধন করিয়া থাকেন, চক্রবিশেষে চিত্তকে স্থির করিয়া সেখানে আপন ইষ্টদেবের ধ্যানে মগ্ন থাকেন। বৈষ্ণবমতে এই সুষুম্না যমুনা নদী এবং শাক্তমতে ইহাই গঙ্গানদী। স্বাধিষ্ঠান পৰ্য্যন্ত ক্ষিতিতত্ত্ব-প্রধান অন্নময়ের, স্বাধিষ্ঠান হইতে মণিপুর পর্যন্ত অপতত্ত্ব প্রধান প্রাণময়ের, মণিপুর হইতে অনাহত পৰ্যন্ত তেজ-প্রধান মনােময়ের, অনাহত হইতে বিশুদ্ধাখ্য পর্যন্ত বায়ুতত্ত্ব-প্রধান বিজ্ঞানময়ের, বিশুদ্ধাখ্য হইতে আজ্ঞাচক্ৰ পৰ্যন্ত আকাশতত্ত্ব প্রধান আনন্দময় কোশের স্থান নির্দিষ্ট আছে। তন্মধ্যে আবার অন্নয়ম 37মাগু-প্রধান স্থূলদেহের, প্রাণময়, মনােময়, বিজ্ঞানময় রজোগুণ-প্রধান মূলাধার হইতে [ ২৬ ] সূক্ষমদেহের, আনন্দময় সত্ত্বগুণ-প্রধান কারণদেহের স্থিতিস্থান। সহস্রার অপ্রাকৃত গুণাতীত কোশাতীত ব্ৰহ্মতত্ত্বের স্থান । যে তত্ত্ব সম্বন্ধে বিচার বা ধ্যান করিতে হইবে, সাধক নিজের চিত্তকে সেই তত্ত্বের স্থিতিস্থান-রূপ চক্রে সমাহিত করিয়া বিশেষ উপকার লাভ করেন। অনেক যােগী শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে এই চক্রগুলির ভিতর দিয়া উঠা-নামার সঙ্গে সঙ্গে আপন আপন ইষ্টমন্ত্র অথবা অজপা আদি জপ করিয়া থাকেন। এই ছয়টি চক্রের ভিতরকার রাস্তাটি খুলিয়া তাহার ভিতর দিয়া যাতায়াতের কর্তৃত্ব লাভ করিয়া অনেক সাধক অনেক অলৌকিক তত্ত্ব সাক্ষাৎকার লাভ করেন, অনেক অলৌকিক ঘটনা দর্শন করাইয়া থাকেন। গ্রন্থিভেদ ত্রিবিধ গ্রন্থি ভেদ করিয়া ব্রহ্মে স্থিতিলাভ করার ব্যবস্থা দেখিতে পাওয়া যায়। এই ত্রিবিধ গ্রন্থি—ব্রহ্মগ্রন্থি, বিষ্ণুগ্রন্থি ও রুদ্রগ্রন্থি নামে প্রসিদ্ধ। চণ্ডীতে মধুকৈটভ বধের দ্বারা সত্যে প্রতিষ্ঠিত হইয়া নিজের সসীম ভাব দূর করিয়া সর্বত্র ব্রহ্মানুভূতি দ্বারা ব্ৰহ্মগ্রন্থি ভেদের ব্যবস্থা দেখিতে পাওয়া যায় । মহিষাসুর বধের দ্বারা প্রাণে প্রতিষ্ঠিত হইয়া সর্বত্র এক মহাপ্রাণের খেলা দর্শন করিয়া অহঙ্কারকে সব রকমে দূর করিয়া বিষ্ণুগ্রন্থি ভেদ করিতে হয়। শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের দ্বারা আনন্দে প্রতিষ্ঠিত হইয়া সর্বত্র ব্রহ্মানন্দ অনুভব করিয়া [ ২৭ ] রুদ্রগ্রন্থি ভেদ করিতে হয়। ত্রিবিধ কৰ্ম্মবাসনা-বীজই মুক্তির ভগবৎ-প্রাপ্তির অন্তরায়। ব্ৰহ্ম গ্রন্থি ভেদ দ্বারা এই প্রারব্ধ কৰ্ম্ম, বিষ্ণুগ্রন্থি ভেদ দ্বারা সঞ্চিত কৰ্ম্ম এবং রুদ্রগ্রন্থি ভেদ দ্বারা আগামী কর্মবীজ দগ্ধ হইয়া যায়। স্থূলদেহের সংস্কার ব্ৰহ্মগ্রন্থি ভেদ দ্বারা, সূক্ষমদেহের সংস্কার বিষ্ণুগ্রন্থি ভেদ দ্বারা এবং কারণদেহের সংস্কার রুদ্রগ্রন্থি ভেদ দ্বারা সাধিত হয় । প্রথমটির দ্বারা পুষৈণা, দ্বিতীয়টির দ্বারা বিত্তৈষণা এবং তৃতীয়টির দ্বার। লােকৈষণা দূর হইয়া গীতােক্ত প্রকৃত সন্ন্যাসের অধিকার লাভ হয়। বলা বাহুল্য, লােকৈষণা দূর করাই সর্বাপেক্ষা কঠিন। কুলকুণ্ডলিনী কুলকুণ্ডলিনী মূলাধারে অসুপ্তা সাৰ্দ্ধৰিবলয়বেষ্টিত নিদ্রিতা জগতের ও দেহের প্রত্যেক পরমাণুতে অনন্ত শক্তি নিহিত। সেই অনন্ত শক্তি স্বরূপতঃগুণাতীত, অব্যক্ত, অর্ধমাত্রা। তাহার উপরে কারণ, সূক্ষম ও স্থুলশরীরগত আবরণ রহিয়াছে। ওঁকারের ভিতরে যেমন ‘অকার, “উ'কার, ‘ম’কার ও অর্ধমাত্রা নিহিত, প্রত্যেক পরমাণুর প্রত্যেক স্নায়ুকেন্দ্রের ভিতরেও সেইরূপ অৰ্দ্ধাত্রা কারণ-সূক্ষম-স্থলব বৰ্ত্তমান। সেই কেন্দ্রে অৱস্থিত শক্তিকে জাগ্রত করিয়া তাহার গুণাতীত তত্ত্ব অবগত হইয়া তাহাকে কারণ-সূক্ষম-স্থল তত্ত্বের মধ্য দিয়া পূর্ণভাবে বিকশিত করিয়া ভােলাই কুণ্ডলিনী জাগ্রত করার উদ্দেশ্য।

[ ২৮ ] আমাদের দর্শনযন্ত্রের কেন্দ্রে (Optic Nerve-centre) এমন শক্তি নিহিত আছে, যাহাকে জাগ্রত ও পূর্ণ বিকশিত করিতে পারিলে আমরা স্থূল-সূক্ষম-কারণ জগতের সব তত্ত্ব এমন কি গুণাতীত তত্ত্বও দর্শন করিতে পারিব। দেহের ভিতরে অসংখ্য মায়ুকেন্দ্র বর্তমান। তাহার এক এক কেন্দ্রে এক একটি শক্তি িিহত। ঐ কেন্দ্রস্থ শক্তি সাধারণতঃ সুষুপ্ত। গুলিকে জাগ্রত করিয়া এক এক বিষয়ে অসীম শক্তি লাভ করা যায়। দেহস্থ সমস্ত কেন্দ্রগুলিকে জাগ্রত পূর্ণ পরিণত করিয়া তােলাই কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত করার উদ্দেশ্য। আমাদের মন সাধারণতঃ পড়িয়া রহিয়াছে স্কুলজগতে। স্কুলজগতের কেক মূলাধারে। স্কুলজগৎ সম্বন্ধেও আমরা অনেক বিষয়ে অজ্ঞ। আমাদের মনের মধ্যেও এমন শক্তি নিহিত আছে, যাহা দ্বারা আমরা সর্বজ্ঞতা লাভ করিতে পারি। সেইজন্য আমাদের মূলাধারে সুপ্ত মনকে মূলাধার হইতে সহস্ৰারে তুলিয়া লইয়া তাহাকে পূর্ণভাবে পরিণত করিয়া স্নায়ুকেন্দ্রের ভিতরকার সব যন্ত্রগুলিকে কার্যক্ষম করিয়া লইতে হইবে । তারপরে সেই মনকে দেহস্থ বিভিন্ন তত্ত্বের ভিতর দিয়া লইয়া যাইবার সময় আজ্ঞা হইতে অনাহত পর্যন্ত কারণশরীরের, অনাহত হইতে মণিপুর পৰ্যন্ত সূক্ষশরীরে, মণিপুর হইতে মূলাধার পর্যন্ত স্কুল- শরীরের সমস্ত তত্ত্বগুলি অবগত হইয়া ভিতরে কুণ্ডলিনীর সার্ধ- ত্রিবলীরূপ আবরণ মুক্ত করিতে হইবে। আমাদের দর্শন- সমস্ত [ ২৯ ] শ্রবণ ইত্যাদি যাবতীয় কেন্দ্রগুলিকে সূ-সূক্ষা-কারণ ভাব পৰ্যন্ত প্রসারিত করিয়া তাহাদের লুক্কায়িত শক্তিকে পূর্ণ পরিণত লাভ করানই কুণ্ডলিনী জাগ্রত করার উদ্দেশ্য । লুক্কায়িত শক্তিকে প্রকট করা, সমস্ত বাধা দূর করিয়া অবাধিত ভাবে দর্শন-শ্রবণশক্তি লাভ করাই কুণ্ডলিনী জাগ্রত করা। ইহার ফলে আমাদের দূরদর্শন দূরশ্রবণাদি যােগবিভূতি- গুলি লাভ হয় । সাধনবলে প্রতােক ইন্দ্রিয়ে অপর সকল ইন্দ্রিয়ের সমগ্র শক্তি আবিভূত করা যায়। কান দিয়া দেখা, হাত দিয়া শােনা পর্যন্ত সম্ভবপর হইয়া থাকে। শ্রীকৃষ্ণে এই সকল বৃত্তিগুরি পূর্ণ পরিণতি সাধিত হইয়াছিল। “অঙ্গানি যস্য সকন্দ্রিয়বৃত্তিমন্তি পশ্যন্তি পান্তি কয়ন্তি চির জগন্তি” ইত্যাদি মন্ত্র তাহার সাক্ষী। সাধক এক এক স্নায়ুকেন্দ্রে মন স্থির করিয়া সেই সেই কেন্দ্র- সংক্রান্ত পূর্ণ শক্তি লাভ করিতে পারে। সমস্ত লুক্কায়িত শক্তিকে জাগ্রত করিয়া ভােলাই কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত করিয়া ভােলা। মূৰ্ত্তিতত্ত্ব মূৰ্ত্তি শব্দের অর্থ প্রকটিত বা ব্যক্ত অবস্থা। “মূর্ল্ড’ ধাতুর উত্তর ‘ক্তি প্রত্যয় দ্বারা মূৰ্ত্তি শব্দ সাধিত ; প্রকটিত বা ব্যক্ত অবস্থা “মূর্তি”। পূজা শব্দের অর্থ—শ্রেষ্ঠ অবলম্বনে নিজকে শ্রেষ্ঠ করিয়া তুলিবার চেষ্টা। সুতরাং মূর্তিপূজার অর্থ ভগবানের অতীত। [ ৩০ ] বিকাশ,জীব জগৎ-তত্ত্ব, অবলম্বনে শ্রেষ্ঠতা লাভের চেষ্টা ব্যক্ত অবস্থা অবলম্বনে অব্যক্ত পরমাত্ম-তঞ্জে পৌছিবার চেষ্টা ; অব্যক্তের ব্যক্তিরূপে পরিণতি বা বিবর্তন, আনন্দ আস্বাদন করিবার করাইবার জন্য, নিজকে প্রকাশ করিবার জন্য । অব্যক্ত যখন অব্যক্ত, তখন তাহা অন্ততঃ অনেকেরই ধারণার আর ব্যক্ত যখন অব্যক্তকে প্রকাশ করিবার জন্য, অব্যক্তকে গ্রহণযােগ্য করিয়া তুলিবার জন্য, তখন কেহ যদি এই ব্যাবস্থা অবলম্বনে অব্যক্তাবস্থায় পৌছিতে চেষ্টা করে, তবে তাহাকে অস্বাভাবিক বা নিন্দাহ বলা উচিত নয়। প্রকাশ ব্যক্তিভাবে ও তাত্ত্বিক ভাবে। আমরা যে সব মূর্তি দেখি, তাহা 'গদর্শ-তত্ত্বের বা আদর্শপুরুষের প্রতীক। এই আদর্শ-তত্ত্বের বা আদর্শপুরুষের সাহায্যে আদর্শ জীবন লাভ করিবার চেষ্টা করাকেই মূর্তিপূজা বলে। দুর্গা কালী আদি তাত্ত্বিক এবং রাম কৃষ্ণ বুদ্ধ আদি ঐতিহাসিক আদর্শ অবলম্বন যে শ্রেষ্ঠতা লাভের সহায়, তাহা স্বীকার্য। অশ্বীকার করা যায় না যে, মূর্তিপূজা অনেকাংশে বিকৃত হইয়া পড়িয়াছে। তবে ভাবিয়া দেখা উচিত যে, কোন্ অনুষ্ঠান অনধিকারীর হাতে পড়িয়া বিকৃত হয় নাই। সেজন্য দরকার ধ্বংসের নহে— শােধনের। এক ভাব ধ্বংস করিয়া যে ভাব স্থাপন করিবে, তাহ যে ঠিক এবং তাহা যে বিকৃত হইবে না এ কথা কে বলিতে পারে ? আদর্শ মূর্তি অবলম্বনে কিভাবে আদর্শ জীবন লাভ করা যায় তাহ; ধ্যান-ধারণা-সমাধি আদি তত্ত্বের ।

[ ৩১ ] অন্তর্গত। বলা বাহুল্য মূৰ্ত্তি দ্বারা অমূর্তকে সীমাবদ্ধ করা হয় নাই,—“নমস্তে জগদ্ব্যাপিকে বিশ্বমূৰ্ত্তে” আদিস্তবতাহার সাক্ষী। তার পরে ব্যক্ত অব্যক্ত, সগুণ নিগুণ উভয় ভাবই যখন তাহার, উপনিষদের ঋষিগণ পৰ্যন্ত যখন উভয় ভাবের সমানভাবে প্রশংসা করিয়া গিয়াছেন, তখন ইহার কোনও ভাবকে অপর ভাব অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে করা যেন উচিত মনে হয় না। ব্যষ্টি-সমষ্টিতত্ত্ব হিন্দু-সাধন-প্রণালীর মধ্যে আমরা ব্যষ্টি-সমষ্টিতত্ত্বের একটা অতি সুন্দর আভাস পাই। জগতের প্রতি তত্ত্ব প্রতি পরমাণু পরস্পর সম্বদ্ধ। একে অন্যের সাহায্য ব্যতীত চলিতে পারে না—আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের নিকট চিরকৃতজ্ঞ এমন কি, কেহই আমা হইতে পৃথক নহে, সকলেই আমার আত্মার বিভূতি, আমার শ্রীভগবানের সন্তান-সন্ততি। ছেলে- মেয়েকে কষ্ট দিয়া কেহ মা-বাপকে সুখী করিতে পারে না। এইজন্য জীবসেবা দ্বারা শিবের সেবার দিকে আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ধৰ্ম্মের প্রকৃত স্বরূপ বলা হইয়াছে—“যাহা নাহি নিজ সুখ অনুরােধ”। “কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছার দিকে আমাদের প্রধান লক্ষ্য, “আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা” কাম বলিয়া ত্যাজ্য। আমাদের ভগবান সর্বব্যাপী—“বাসুদেবঃ সমিতি’, ‘নমস্তে জগদ্ব্যাপিকে বিশ্বমূৰ্ত্তে”, “বিশ্বরূপ-বিশ্বনাথ-বিশ্বজীব-বিগ্ৰহম” আদি আমাদের স্তবের মন্ত্র। “যাহা যাহ নেত্র পড়ে তাহা [ ৩২ ] কৃষ্ণস্ফূর্তি”, “যত্র যত্র মনে যাতি ব্ৰহ্মণস্তত্র দর্শন” আমাদের গুরুবচন। “ত্রিভুবন যে মায়ের মূর্তি জেনেও কি তাই জান না”—আদি আমাদের সঙ্গীত। সর্বত্র ব্ৰহ্মদর্শন, ব্ৰহ্ম-উপলব্ধি, ব্ৰহ্মসেবা আমাদের জীবনের লক্ষ্য। যত কিছু বিভূতিমৎ পদার্থ, তাহাতে আমরা খুজিব শ্রীভগবানের অবতার। আমরা তৰ্পণ দ্বারা সমস্ত জীবের তৃপ্তিবিধানে দীক্ষিত, পঞ্চ- মহাযজ্ঞাদি নিত্যকর্মের দ্বারা আমরা সব জীবের সেবায় অভ্যস্ত, আমরা আমাদের নিবেদিত অন্ন অতিথি-অভ্যাগত জীব-জন্তুকে প্রদান করিয়া অবশিষ্ট অংশটুকু মাত্র গ্রহণ করিতে আদিষ্ট। আমরা পরােপকার মানি না; কারণ, কেহই আমাদের পর নহে, সকলেই আমাদের আত্মার পরমাত্মার বিলাস-বিভূতি, লীলা-স্বীকৃত বিগ্রহ। হায়, এমন উদার জীবন্ত ধৰ্ম্মের আজ এই দুর্দশা! অদ্বৈতবাদের স্থানে আসিয়া পড়িয়াছে ভেদবাদ। সর্বত্র ভগবৎ-দর্শন সর্বত্র ভগবৎ-ধ্যান সর্বজীবের ভিতর দিয়া তাঁহার সেবা আমাদের সাধনার সারতত্ত্ব। সত্য-প্রতিষ্ঠা, প্রাণ-প্রতিষ্টা, আনন্দ প্রতিষ্ঠা সত্য শব্দের অর্থ যাহা ষড়বিধ বিকাবর্জিত নিত্য। ‘জায়তে অস্তি বর্ধতে বিপরিণমতে অপক্ষীয়তে নশতি'- এই ছয়টি বিকার যাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না, যাহা [ ৩৩ ] তিনকালে একভাবে অবস্থিত, যাহার অস্তিত্ব সম্বন্ধে কোন সন্দেহ থাকিতে পারে না, যাহা চরম তন্তু তাহাই সত্য। প্রতিষ্ঠার অর্থ স্থিতি। আমাদের চিত্ত যখন সত্যে স্থিরতা লাভ করিবে, তখন আমরা হইব সত্য-প্রতিষ্ঠ। আমাদের চক্ষু আদি ইন্দ্রিয়গুলি তখন সব জিনিষের ভিতর দিয়া সৎকে খুজিবে, সৎকে দর্শন করিবে, মন তখন সত্য ছাড়া আর কিছুই চিন্তা করিবে না। জগৎকে যাবতীয় পদার্থকে যখন আমরা সতেরই বিভূতিরূপে উপলব্ধি করিব—তাহাকে ছাড়া অপর কিছু দেখিব না, শুনিব না, স্পর্শ করিব না, ভাবিব না—যখন আমরা সর্বদা সতের ধ্যানে বিভাের থাকিব তখনই হইব আমরা সত্য-প্রতিষ্ঠ। তখন আমাদের কর্ণ সব শব্দের মধ্য দিয়া সত্যস্বরূপ ভগবানের মধুর শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনিতে পাইবে না, চক্ষু তাহার ভুবনমােহন রূপ ছাড়া আর কিছু দেখিতে পাইবে না, ত্বক্ তাহার সুখময় স্পর্শ ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করবে না, জিহ্বা তাহার অমৃত রস ছাড়া আর কিছু পান করিবে না, নাক উঁহার গাত্র-গন্ধ ছাড়া অন্য কোনও গন্ধ গ্রহণ করিবে না, মুখ তাহার কথা ছাড়া অন্য কথা বলিবে , পদ তাহার পথ ছাড়া অন্য পথে বিচরণ করিবে না, মন তাহার কথা ছাড়া অন্য কথা ভাবিতে পারিবে না, বুদ্ধি চিত্ত তাহার সংস্কার ব্যতীত অন্য সংস্কার ছাড়িয়া দিয়া হাতে তন্ময় হইয়া থাকিবে,—সর্বত্র তাহার দর্শন, ব্যান ও উপলব্ধি লইয়া যখন আমরা সমাহিত থাকিব, তখন আমরা হইব সত্য- [ ৩৬ ] তাঁহাকে বাহির করিতে চেষ্টা কর। শয়নের সময় বিছানার মধ্যে তাঁহার ধ্যান করিতে করিতে মায়ের কোলে সমাহিত থাকিতে চেষ্টা কর। প্রত্যহ কাতর প্রাণে ভঁহাকে ডাক, তাহাকে দেখিতে চেষ্টা কর। চিত্ত শুদ্ধ ও শান্ত হইলে সর্বত্র তাঁহার দর্শন লাভ করিয়া জীবন সফল করিতে পারিবে। তখন ছােট ছেলেমেয়েগুলি দেখিয়া বাল-গােপাল কুমারী ভগবতী, মা-বাপের ভিতর দিয়া অন্নপূর্ণা-বিশ্বনাথ, স্বামী-স্ত্রীর ভিতর দিয়া কৃষ্ণ-রাধা, শিব-দুর্গা, রাম-সীতা,—সব জীবের ভিতর দিয়া শিবের দর্শন, ধ্যান ও সেবা স্বাভাবিক হইয়া পড়িবে, জগৎ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হইবে, তুমি সত্যে প্রতিষ্ঠিত হইবে, অসত্য তােমার নিকট হইতে দূরে পলায়ন করিবে। অন্যাস- ক্রিয়া এই উপলব্ধির সহায়। প্রাণ-প্রতিষ্ঠা-প্রাণ-প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রাণে স্থিতিলাভ, সর্বত্র প্রাণশক্তির লীলা দর্শন করিতে করিতে প্রাণশক্তির অনুভূতিতে প্রতিষ্ঠিত থাকা। প্রাণ পরব্রহ্ম,—প্রাণ ভগ- বানের সেই শক্তি, যাহা দ্বারা বা যাহাতে জীব-জগৎ সৃষ্ট, পরিণত বা বিবর্তিত। জীব ও জগৎ সেই মহাপ্রাণেরই ঘনীভূত মূর্তি। আমাদের ব্যষ্টিপ্রাণ সেই সমষ্টিগত মহাপ্রাণেরই অংশ, সেই প্রাণ-সাগরের বিভিন্ন লহরী। তিনিই একবিন্দু রক্তের মধ্যে অবস্থিত থাকিয়া আমাদের এই দেহকে পুষ্ট, পরিণত ও সৰ্ব-কাৰ্যক্ষম করিয়া আমাদের ভিতরে বসিয়া সমস্ত কাজ সুসম্পন্ন করিতেছেন। আমাদের দেহের পরিণতি, ।

[ ৩৭ । মনের বৃত্তি—সবই যে সেই প্রাণের খেলা। জগতের সমস্ত কাৰ্যকলাপের মধ্যে আমরা সেই প্রাণশক্তির লীলা দর্শন করিয়া অহঙ্কারের হাত হইতে মুক্তিলাভ করিয়া সৰ্ব্বত্র ভগবৎ- লীলা দর্শনের যােগ্যতা লাভ করি। তখন আর বলিতে হইবে যে, আমি কাজ করি ; তখন আমরা বলিব যে, সব কাজ যেন আমার ভিতর দিয়া কারিত হইয়া যাইতেছে। করত্যাস- ক্রিয়া প্রাণ-প্রতিষ্ঠার সহায়। আনন্দ-প্রতিষ্ঠা—আনন্দ হইতে জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় ক্রিয়া সাধিত। আমাদের আনন্দগুলি সেই ব্ৰহ্মানন্দেরই অংশমাত্র। সেই ব্রহ্মানন্দই আমাদের অন্তঃকরণ ও বহিঃ- করণগুলির ভিতর দিয়া আসিবার সময় তাহাদের রঙে রঞ্জিত হইয়া বিষয়ানন্দরূপে অনুভূত হয়। সকল আনন্দই যে সেই ব্ৰহ্মানন্দের বিভূতি । এইসব বিকৃত আনন্দগুলির মধ্য হইতে কামনা-বাসনা আদি বিকৃতি দূর করিতে পারিলেই ইহারা ব্ৰহ্মানন্দে পর্যবসিত হইবে । শান্ত-দাস্য-সখ্য-বাৎসল্য- মধুর আদি সম্বন্ধগুলিকে, এইসব সম্বন্ধ-জনিত আনন্দগুলিকে আসক্তি-সংস্কার ও স্বার্থের পূতিগন্ধ হইতে মুক্ত করিয়া শুদ্ধ ও পূর্ণতাপ্রাপ্ত করিয়া তুলিলে ইহারাই স্বর্গীয় দাস্য-সখ্যাদি ভাবে পর্যবসিত হইবে। তখন বুঝিতে পারিব, এইসব আনন্দ সেই ব্ৰহ্মানন্দেরই বিচিত্র স্ফুরণমাত্র। সৃষ্টির লীলার মূলে রহিয়াছে আত্মপ্রকাশের আনন্দ-সুরণের ইচ্ছা। সেই আনন্দেই সব প্রতিষ্ঠিত। তখন সব আনন্দের ভিতর দিয়া

[ ৩৮ ]
ব্ৰহ্মানন্দ অনুভব করিয়া সব আনন্দকে ব্ৰহ্মানন্দে পর্যবসিত
করিয়া সর্বত্র, সেই আনন্দের লীলা দর্শন করিতে করিতে
সেই আনন্দে প্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইব।
আমি ভগবানে প্রতিষ্ঠিত, তাহার শক্তিদ্বারা পরিচালিত,
তিনি আমার সকল সুখ-শান্তি ও আনন্দের প্রস্রবণ। আমার
স্থিতি, ক্রিয়া ও আনন্দ ভগবানকে লইয়া। আমাকে
বাঁচাইয়া না রাখিলে, ঠিক পথে না চালাইলে, পূর্ণানন্দে
বিভাের ও সমাহিত করিয়া না তুলিলে আমার ভগবানের চলিবে
না,—তাহার বিশ্রাম নাই;-এই অনুভূতি জাগাইয়া ভােলাই
সত্যাদি প্রতিষ্ঠার প্রধান লক্ষ্য।
পুজার অঙ্গবিভাগ
পূজা সাধক ও সিদ্ধ অবস্থা ভেদে প্রধানতঃ দ্বিবিধ।
সিদ্ধাবস্থার পূজা ভগবৎ-ভাবে বিভাের অবস্থায় ভগবৎ-লীলার
সহায় হওয়া। সাধক অবস্থায় পূজা-প্রণালী সেই সিদ্ধ
অবস্থা লাভের জন্য। এই পূজার বিষয়ই এখানে আলােচ্য।
ভগবানে প্রীতি এবং তাঁহার প্রিয় কাৰ্যসাধনই তাহার পূজা।
যাহাকে ভালবাসি, অজ্ঞাতভাবে আমরা তাহার মত হইয়া
পড়ি—তাহার ভাবে ভাবিত থাকি-তাহার প্রিয়কাৰ্য্য
সাধন করিতে বাধ্য হই। সুতরাং আসলে প্রীতি থাকিলেই
তাহার প্রিয় কাৰ্য্য সাধন করা হয়। আমাদের চলিত পূজা
প্রীতির দিকেই বেশী লক্ষ্য রাখিয়াছে। এই পূজা সাধারণতঃ
তিনভাগে বিভক্ত—শুদ্ধি, ধ্যান ও উপলব্ধি ।
সঙ্কল্প, স্বস্তি

[ ৩৯ ] বাচন, জলশুদ্ধি, আসনশুদ্ধি, ভূপসারণ ও ভূতশুদ্ধি—এই সব শুদ্ধিতত্ত্বের অন্তর্গত। ধ্যানতত্ত্ব সাধারণতঃ তিনভাগে বিভক্ত—ধামতত্ত্ব, স্বরূপতত্ত্ব ও ভগবৎ-তত্ত্ব। উপলব্ধির ভিতরে ন্যাস, উপচার-সমর্পণ, পঞ্চদেবতা, গুরু ও ইষ্টের পূজা, জপ, আত্মনিবেদন, হবন ও বিসর্জন ক্রিয়া দেখিতে পাওয়া যায়। পূজার শ্লোকগুলির মধ্যে এই তত্ত্বগুলির দিকে যথাসম্ভব দৃষ্টি রাখা হইয়াছে এবং এই তত্ত্বগুলিকে বর্তমান দেশ-কাল- পাত্র অনুসারে সকলের গ্রহণযােগ্য করিয়া তুলিবারও চেষ্টা করা হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত সকল সম্প্রদায়ের সাধন-প্রণালীর দিকে লক্ষ্য রাখিয়া সকল সম্প্রদায়ের সাধনপ্রণালীর সার-অংশে যে কি সুন্দর সাদৃশ্য আছে, তাহার একটা আভাস দেওয়া হইয়াছে। সাধারণ ভাবে একটা ব্যবস্থার নমুনা দেওয়া হইলেও সাধকগণ যাহাতে আপন আপন রুচি ও অধিকার অনুসারে শ্লোক- বিশেষের সাহায্যে পূজা করিতে পারেন, এবং আপন আপন বিধানমতে ধ্যান ও পাছ-অৰ্যাদি উপচার দ্বারা পূজা করিতে পারেন, সেদিকেও দৃষ্টি রাখা হইয়াছে। উপচার সমর্পণ, ধ্যান-জপাদির স্থানে আপন আপন দীক্ষা, শিক্ষা ও অভিরুচি অনুসারে পূজা করাই প্রশস্ত। নিম্নে সাধারণ চলিত পূজার অঙ্গগুলির একটু সংক্ষিপ্ত আভাস দেওয়া গেল। সন প্রত্যেক কাজেরই এক একটা উদ্দেশ্য থাকে—সাধনা সেই উদ্দেশ্যসিদ্ধির সহজ-সুন্দর ও স্বাভাবিক উপায়। আর্ত,

[ ৪ ]
জিজ্ঞাসু, অর্থার্থী ও জ্ঞানী—এই চতুর্বিধ লােকে ভগবানের
ভজনা করে। তন্মধ্যে প্রথম তিন দলের উদ্দেশ্য সহজেই
বুঝিতে পারা যায় । যে পর্যন্ত অভাব-বােধ আছে সে
পৰ্য্যন্ত অভাবপূরণের প্রবৃত্তিও স্বাভাবিক। যদি কিছু
প্রার্থনা করিতে হয়, তবে তাহা ভগবানের নিকট করাই
বিধেয়। কোনও ভক্তকে তুচ্ছ জ্ঞান করা উচিত নয়। আমরা
স্বীকার করি আর না করি আমাদের ভিতর হইতে যে
কামনা-বাসনা, সুখ-স্পৃহ প্রতিষ্ঠার মােহ একেবারে যায় নাই
তাহা অস্বীকার করা যায় না। তবে কামনা ত্যাগ করিতে
চেষ্টা করিতে হইবে। নিষ্কাম ভক্ত তাহার প্রাণারামের
নিকট কিছুই প্রার্থনা করেন না। অযাচিত ভাবে তিনি যাহা
পাইয়াছেন সেইজন্য যে তাহার চিত্ত কৃতজ্ঞতায় বিক্রীত হইয়া
গিয়াছে।
তবে তাহার একটি কামনা থাকিতেও পারে,
সেইটি এই যে,-হে ঠাকুর, তােমার প্রতি আমার যেন অচলা
অহৈতুকী অব্যভিচারী ভক্তি বর্তমান থাকে, আমার জীবনে
যেন তােমার ইচ্ছা পূর্ণ সফলতা লাভ করে। প্রার্থনার ভিতরে
এই তত্ত্ব নিহিত আছে ।
*।
স্বস্তিবাচন
স্বস্তিবাচন শান্তির প্রার্থনা। এই শান্তি শুধু নিজের নয়
সর্বভূতের। এই শান্তিলাভ নির্ভর করে আমার অহঙ্কারের
উপরে নহে, ইহা নির্ভর করে সর্বোপরি শ্রী ভগবানের উপরে,

[ ৪১ ] • তাহার পরে তাহার বিভূতি-স্বরূপ দেবতাদের উপরে। তাই স্বস্তি-বাচনে শ্রীভগবানের নিকট—ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি আদি দেবতাগণের নিকট, আমাদের সব তত্ত্বে অধিষ্ঠিত ব্ৰহ্ম- চৈতন্যের নিকট শান্তি ও অভীষ্ট কৰ্ম্মের সুফলতার জন্য প্রার্থনার ব্যবস্থা দেখিতে পাওয়া যায় । আমরা সব জীবের নিকট কৃতজ্ঞ, সকলের নিকট ঋণী। সকলে তৃপ্ত হইয়া এই ঋণ হইতে মুক্তি না দিলে আমার ভগবৎ-প্রাপ্তির সম্ভাবনা বিরল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভিতরে এই তত্ত্ব দেখিতে পাওয়া যাইবে। ভূপসারণ পঞ্চভূত এবং পঞ্চভূতের তৈয়ারী জীব-জগৎ অনেক সময় আমাদের সাধন-ভজনে বাধা দেয়। এই বাধা হইতে মুক্তিলাভের জন্য সব ভূতদের নিকট সর্বোপরি ভূতনাথের নিকট কৃপাপ্রার্থনার ব্যবস্থা আছে। অপসৰ্পন্তু তে ভূতা যে ভূতা ভুবি সংস্থিতাঃ। যে ভূত বিঘ্নকারিণঃ তে নশন্তু শিবাজ্ঞয়া । পৃথিবীস্থ বিঘ্নকারী সব ভূত শিবের আদেশে বিনাশ প্রাপ্ত এখানে অনেকে বিনাশপ্রাপ্ত হউক (নশ্যন্ত)-এর স্থানে ‘শুদ্ধ হউক’ (শুদ্ধন্তু ) পাঠ করেন। শত্রুর ভিতরকার অনিষ্টকারী বৃত্তি দূর হইয়া শত্রু মিত্রভাবাপন্ন হউক, কাহাকেও আমি যেন শত্রুভাবে না দেখি—এই ভাবটি বেশী সুন্দর। হউক।

[ ৪২ ] উপকরণ-শুদ্ধি পূজার জন্য দরকার নিজের দেহের ও চিত্তের শুদ্ধি এবং পূজার উপকরণ যাহা ভগবানকে নিবেদন করা হইবে, প্রসাদ- রূপে ভগবৎ-জীবকে প্রদান করা হইবে তাহারও শুদ্ধি সম্পাদন। উপকরণ পুষ্প-ভােজ্যাদি অক্ষত ও বিশুদ্ধ কি না তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখিতে হইবে; ভগবানের নাম স্মরণ করিয়া সেগুলি শুদ্ধ করিয়া লইতে হইবে। দেহ ও চিত্তশুদ্ধির কথা পূর্বে বলা হইয়াছে। গুরুর পূজা গুরুর ধ্যান ও উপচার সমর্পণ দ্বারা গুরুদেবের পূজার ব্যবস্থা আছে। অাসল কথা, গুরুর গুণকৰ্ম্মের পরিচিন্তন দ্বারা গুরুতত্বে সমাহিত হইয়া নিজে গুরুভাবাপন্ন হইয়া যাওয়া—নিজকে গুরুর সব গুণগুলিতে বিভূষিত করিয়া তােলাই গুরুপূজার উদ্দেশ্য। নিজ নিজ বিহিত প্রণালী অনুসারে গুরুদেবের পূজা করাই বিহিত। তবে মূল তবে মূল উদ্দেশ্যটির দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে হইবে। পদেবতার পূজা দেবতা ভগবৎ-চৈতন্যের বিভিন্ন তত্ত্বে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ। আমার ভগবান আমার ইষ্ট আমার পঞ্চতত্ত্বে- ‘আমার পঞ্চকোশে কিভাবে প্রকাশিত হইয়া, প্রকাশিত [. ৪৩ ] থাকিয়া, আমার কল্যাণ ও শাস্তির ব্যবস্থা করিতেছেন, এক কথায় আমার জীবন সার্থক করিয়া তুলিতেছেন, তাহা উপলব্ধি করিয়া তাহার সহায় হওয়াই পঞ্চদেবতার পূজার মুখ্য উদ্দেশ্য । আমার ইষ্ট আমার মূলাধারে কিভাবে অবস্থিত থাকিয়া কিভাবে কি কাৰ্য্য সাধন করিতেছেন তাহার উপলব্ধি গণেশ- পূজা দ্বারা অনুভব করা যায়। আমার ইষ্ট কিভাবে মণিপুরে অবস্থিত থাকিয়া আমার জীবন ধারণের আমার শান্তি- লাভের সহায় হইতেছেন—সূর্যের পূজার দ্বারা আমরা সেই তত্ত্ব অবগত হই। এইভাবে অনাহতে বিষ্ণুতত্ত্বের, বিশুদ্ধাখ্যে শিবতত্ত্বের, আজ্ঞাচক্রে শক্তিতত্ত্বের, সহস্রারে ইষ্টতত্ত্বের অবস্থিতি ও কার্যপ্রণালী অবগত হওয়া যায়। সাধকগণ আপন আপন ইষ্টতত্ত্বকে সহস্রারে অবস্থিত মনে করিয়া অপর অপর চক্রগুলিতে পঞ্চদেবতাদির স্থিতি ও কার্যপ্রণালী অনুভব করিতে চেষ্টা করেন। এইজন্য কোন্ তত্ত্বে কোন্ দেবতা অবস্থিত, সে সম্বন্ধে মতভেদ দেখিতে পাওয়া যায়। সাধক আপন আপন অভিরুচি অনুসারে পঞ্চদেবতার পূজা করিবেন। ইষ্টের পুজা আপন আপন অভিরুচি অনুসারে ইষ্টদেবের ধ্যান ও পূজা, স্কুলে পাদ্য-অর্থ্যাদি উপচারে এবং ক্ষেম মানসিক উপচারে করা বিধেয়।

[ ৪৪ ]
বােধন, প্রাণপ্রতিষ্টা, আবাহন
বােধন শব্দের অর্থ প্রবুদ্ধ করা—জাগাইয়া তােলা।
ভগবান চিরজাগ্রত; তাঁহাকে আবার জাগ্রত করিতে হইবে
কেন? জাগ্রত হইতে হইবে সাধকের নিজকে। যেমন
নিজের চোখ বন্ধ করিলে আমরা সব অন্ধকার মনে করি, ঠিক
সেইরূপ আমরা নিদ্রিত বলিয়া সকলকে, এমন কি, ভগবানকে
পর্যন্ত আমরা নিদ্রিত মনে করি। আমাদের দেহের জড়তা
দূর করিয়া, চিত্তের অজ্ঞানতা ও সংস্কার দূর করিয়া আমাদের
ভিতরকার সব তত্ত্বগুলিকে ভগবৎ-অনুভূতির যােগ্য করিয়া
তােলাই প্রকৃত বোধন-তত্ত্ব। তখন অনুভবে আসিবে—ভগবান
আছেন; তিনি জাগ্রত, জীবের কল্যাণসাধনে তৎপর,—ইহাই
বােধন-তত্ত্ব।
প্রাণপ্রতিষ্টা শব্দের অর্থ—উপাস্য মূর্তিকে নিজের
ইষ্টকে শুধু মাটির মুর্তিতে বা কাগজের ছবিতে পর্যবসিত না
রাখিয়া তন্মধ্যে ভগবৎ-তত্ত্বের ধ্যান দ্বারা তাহাকে জীয়ন্ত
করিয়া ভােলা। অনুভব করিতে হইবে তিনি জীয়ন্ত সত্যরূপে
আমাদের সম্মুখে উপস্থিত, আমাদের সব কাজ দেখিতেছেন,
সব মনের ভাব জানিতেছেন, তিনিই আমাদের ভিতরে বাহিরে
থাকিয়া সব কাজ চালাইতেছেন। ইষ্টমন্ত্র, মন্ত্রের অর্থ ও মন্ত্রের
চৈতন্যের একীকরণের দ্বারা ইষ্টের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করিতে হয়।
মন্ত্র-চৈতন্যের ফলে অনুভবে আসিবে আমার ইষ্টই
যেন সেই মহতী প্রাণশক্তি, যাহা দ্বারা জগৎ-চক্র সুচারুরূপে
*,,

[ ৪৫ ]
পরিচালিত হইতেছে। (এই প্রসঙ্গে মন্ত্রতত্ত্ব দ্রষ্টব্য)। -প্রাণ
প্রতিষ্ঠার সময় নিজের ভিতরে ব্রহ্ম-চৈতন্যকে জাগ্রত করিয়া
অনুভব করিয়া সেই চৈতন্যকে ইষ্টের ভিতরে আরােপ করিয়া
অনুভব করিয়া ইষ্টকে ব্ৰহ্মস্বরূপে চিন্তা করিতে হয়, অনুভব
করিতে হয়।
আবাহন শব্দের অর্থ ডাকিয়া আনা। যিনি সর্বব্যাপী
তাহাকে আবার ডাকা কি ? তাহাকে ডাকা মানে তিনি
যে কাছে আছেন, তাহা অনুভব করা। নিজকে শুদ্ধ শান্ত।
সমাহিত করিয়া ভগবৎ-কৃপার সাহায্যে সম্মুখে ইষ্টের ভিতরে
ভগবৎ-তত্ত্ব প্রকটিত ভাবে দর্শন করা। আবাহন-এই
যােগ্যতা লাভের জন্য প্রার্থনা করা এবং সর্বব্যাপী ভগবানকে
মূর্তিমানরূপে নিজের ইষ্টে প্রত্যক্ষ করা।
তাস
নি পূৰ্ব্বক ‘অস্ ধাতু হইতে ন্যাস শব্দ সাধিত। “অস
ক্ষেপণে স্থাপনে চ।” অস্ ধাতুর অর্থ ক্ষেপণ করা এবং
স্থাপন করা। যাহার যে স্থান নয়, সে যদি জোর করিয়া
সে স্থান দখল করিয়া বসে, তবে তাহাকে সে স্থান হইতে
তাড়াইয়া দিয়া সেখানে তাহার প্রকৃত মালিককে বসাইয়া
দেওয়ার নাম ন্যাস-ক্রিয়া। স্বর্গ ইন্দ্রের রাজ্য; মহিষাসুর
গায়ের জোরে সে স্থান দখল করিয়া স্বর্গের রাজা হইয়া
বসিয়াছে—“স্বর্গাৎ নিরাকৃতা দেবা ইন্দ্রোভূৎ মহিষাসুরঃ।”

* * * * * [ ৪৬ ]। এইরূপ আমাদের এই দেহ, দেহের বিচিত্র যন্ত্রগুলি আমরা সৃষ্টি করি নাই, ইহাদের উপর আমাদের কোনও কর্তৃত্ব নাই, মৃত্যুর সময়ে ইহাদিগকে আমরা সঙ্গে লইয়া যাইতে পারিক -চরম নির্বাণের সময় ইহারা আমাদের সঙ্গে যাইবে না; তিনি দয়া করিয়া এই দেহ, আত্মীয়-স্বজন, ধন-দৌলত এবং অপর সব সুখের উপকরণগুলি আমাদিগকে শুধু ভােগ করিবার কতকটা অধিকার দিয়াছেন মাত্র। আমার দেহ, আমার ছেলে-মেয়ে, আমার ঘরবাড়ী প্রভৃতিকে ‘আমার ‘আমার’ বলা সম্পূর্ণ ভুল। অথচ আমাদের অহঙ্কাররূপী মহিষাসুর ইহাদের উপর জোর করিয়া আমিত্ব স্থাপন করিয়া ইহাদের মালিক সাজিয়া বসিয়াছে। ইহারা কেহ আমার সঙ্গে আসে নাই, আমার সঙ্গেও যাইবে না। এ সব মার, আমরা জোর করিয়া ইহার সহিত আ' উপসর্গটি যােগ করিয়া নানা উপসর্গের সৃষ্টি করিয়াছি। “আমার” এই শব্দটির ভিতর হইতে এই আগন্তুক অনর্থকারী “আ” উপসর্গটি দূর করিয়া “এ সব মার, আমার ভগবানের” এই তত্ত্ব অনুভব করাই ন্যাস-ক্রিয়ার উদ্দেশ্য। অন্যাসক্রিয়ায় মন্ত্রের ভিতরে আমাদের বিভিন্ন অঙ্গে বিভিন্ন তত্ত্বে বিভিন্ন দেবতার—বিভিন্ন ভগবৎ-শক্তির চিন্তা করিবার ব্যবস্থা আছে। উদ্দেশ্য ঐ সব অঙ্গ ঐ সব তত্ত্ব শ্রীভগবানের—আমাদের নয় এই তত্ত্ব উপলব্ধি করা। অঙ্গ- দেহ; অন্যাস দেহের বিবিধ তত্ত্বের ন্যাস, ইহাদের উপর বৃথা [ ৪৭ ] কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ। এই সব আমার নয়—ইহারা আমার প্রিয়তমের ; সুতরাং আমার অতি আদরের সামগ্রী। ইহা- দিগকে ভালবাসিতে হইবে, যত্নে রাখিতে হইবে অথচ ইহা দিগকে আমার বলিলে চলিবে না। অঙ্গ্যাস-ক্রিয়ার ফলে আমরা অনাসক্ত অনুরাগ্র হইতে শিক্ষা লাভ করি। কন্যাস :-আমার এই দেহটা ছিল একটা পরমাণুর মত অতি সূক্ষম। কি করিয়া কাহার শক্তিতে ইহা পুষ্ট পরিণত সৰ্ব্বকার্যক্ষম একটি যন্ত্রে পরিণত হইল, তাহা আমি কেন, কোন দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিকেরও অনুভবে আইসে না। এই দেহের কলকজা, শিরা-স্নায়ু ইন্দ্রিয়াদি এবং ইহাদের কাৰ্য্য- প্রণালী হৃদয়ঙ্গম করিতে শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক পর্যন্ত স্তম্ভিত পরাহত। কিভাবে ভুক্তদ্রব্য রক্তে পরিণত হয়, কিভাবে যন্ত্র- গুলির কাৰ্য্য সাধিত হয়, সে বিষয়ে আমাদের কোনও কর্তৃত্ব বজ্ঞান নাই। আমাদের সংস্কারগুলি কোথা হইতে উৎপন্ন, আমাদিগকে কোথায় লইয়া চলিয়াছে, কিভাবে আমাদিগকে চালাইতেছে—তাহার তত্ত্ব প্রায় কিছুই আমরা জানি না। নদীর স্রোতে ফুল ভাসিয়া চলিয়াছে,সে যদি বলে যে, আমি স্রোতের চালক, আমার কলম যদি বলে আমি হাতকে লিখিতে বাধ্য করিয়াছি তাহা হইলে যেমন হাসি পায়, আমাদের সব কাজগুলির মধ্যে আমাদের বৃথা কর্তৃত্বাভিমান দেখিয়াও কেহ সেইরূপ হাসিয়া থাকেন। তাই তত্ত্বদর্শী জ্ঞানী বলেন—“কাজগুলি আমি করি না, ইহারা আমার হয়ত

।
[ ৪৮ ]
ভিতর দিয়া কারিত হইতেছে। আমি কর্তা নই, আমি
যন্ত্র মাত্র।
এইজন্যই গতায় অর্জুনকে শুধু নিমিত্তমাত্র :
বলা হইয়াছে। এই বৃথা কর্তৃত্বাভিমান দূর করিয়া, অহঙ্কারের
হাত হইতে কর্তৃত্ব বুদ্ধি কাড়িয়া লইয়া যিনি প্রকৃত কৰ্ত্তা
তাহার উপর কর্তৃত্ব-বুদ্ধি অর্পণ করাই করন্যাস-ক্রিয়ার উদ্দেশ্য।
করা-না-করার কওঁ। আমি নহি, কৰ্ত্তা » ভগবান-ভগবৎ-শক্তি,
এইরূপ অনুভূতির ফলে নিরহঙ্কার ভাব আপনা হইতেই আসিয়া
পড়ে। অন্যান্স কন্যাস দ্বারা আমরা নির্মম নিরহঙ্কার ভাব
লাভ করি। দুঃখের বিষয়, এইসব ন্যাস-ক্রিয়া এখন প্রায়
কেবল নীরস মন্ত্রোচ্চারণে ও অঙ্গুলি সঞ্চালনে পর্যবসিত।
ব্যাপকন্যা'স সর্বভূতে, সৰ্ব্বব্যাপী ভগবৎসার
ভগবৎ-কাৰ্যপ্রণালীর এবং ভগবৎ-আনন্দের উপলব্ধি লাভ
করাই ব্যাপকন্যাসের উদ্দেশ্য । জীব-জগৎ ভগবানের
মূর্তি, ভগবদ্-বিকাশ—এই মূর্তির ভিতর দিয়া তাহার
অস্তিত্ব ও লীলা-দর্শন, তাহাতে সত্যপ্রতিষ্ঠা প্রাণ-প্রতিষ্ঠা ও
আনন্দ-প্রতিষ্ঠার অধিকার লাভ করাই ন্যাস-ক্রিয়ার স্বাভাবিক
পরিণতি। ব্যাপকন্যাসে সাধকের একটি সুন্দর ফুল একটি
সুন্দর বালক দেখিলেই মনে হয়-“আমার চোখ সৌন্দর্য্য
ভালবাসে তাই তুমি এমন সুন্দররূপে আমার সম্মুখে উপস্থিত
এ ফুলও নয় বালকও নয়, ঠাকুর তুমি নিজেই এই রূপ ধরিয়া ,
আসিয়াছ।” ব্যাপকন্যাসের সাধক সর্বত্র তাঁহার দর্শন
লাভ করিয়া সর্বত্র তঁাহার লীলা অনুভব করিয়া সমাহিত

[ ৪৯ ]
হইয়া যায়। সব ন্যাসগুলির একই উদ্দেশ্য। আমাদের
শ্রীভগবান কিভাবে অনন্ত রূপ ধারণ করিয়া অনন্ত লীলারস
বিস্তার করিয়া বসিয়াছেন তাহার একটা সুন্দর অনুভূতি লাভ
করিয়া সর্বত্র তঁাহার দর্শন, ধ্যান ও সেবার মােগ্যতা লাভ
করাই এই ন্যাস-ক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল।
উপচার সমপণ
উপচার শব্দের অর্থ পূজার উপকরণ,যে যে দ্রব্য এবং
যে যে ভাব দ্বারা পূজা সাধিত হয়। পূজা করা যায় শ্রেষ্ঠ
মানুষের, তত্ত্ববিশেষের ও শ্রীভগবানের। “গৌরবিত-প্রীতি-
হেতু-ক্রিয়া পূজা”। শ্রেষ্ঠের অনুকরণে শ্রেষ্ঠতা লাভের চেষ্টাই
যে পূজা, এই পূজা যে একান্ত স্বাভাবিক তাহা আমরা অনেক
সময় ভুলিয়া যাই। টাকার পূজক, সংস্কারের পূজক, বদ
অভ্যাসের পূজক, কামনা-বাসনা-আসক্তির পূজক পৰ্যন্তও যখন
সাধক ভক্তের, আদর্শ মানুষের পূজাকে বিদ্রুপ করিতে বসেন,
তখন দুঃখ হয়—হাসিও পায় ।
আমাদের প্রয়ােজনীয় যতগুলি জিনিষ তাহার সবগুলিই
হইয়াছে পূজার উপকরণ। আমরা আত্মভাবে ভগবানের পূজা
করিতে বাধ্য।
নিজের খাওয়ার দরকার তাই ভগবানকে
খাওয়াইতে চাই, নিজের হাত-পা আছে তাই ভগবানে হাত-পা
আরােপ করি ; প্রথম অধিকারীর জন্য পূজার উপকরণ প্রাচীন
কালের অনুকূলভাবে ছিল। পাদ্য-অর্থ্যাদি পঞ্চ, দশ বা

[ ৫ ] যােড়শ প্রকার প্রয়ােজনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উপচার- গুলিও যে পবির্তনীয় তাই আমরা একবারও ভাবিয়া দেখি না। যে যে বিষয়গুলি আমাদের প্রয়ােজনে আসে—যেমন মানের ও পানের জল, খাদ্যদ্রব্য, সুন্দর পুষ্প, সুগন্ধ দ্রব্য ইত্যাদি, সেই সকল পূজ্যব্যক্তিকে ভগবানকে নিবেদন করিয়া সেই নিবেদিত দ্রব্যগুলি সকলকে লইয়া ভােগ করা ছিল বাহ- উপচার সমৰ্পণ। পূজার আধিভৌতিক উপচারগুলিকে পাদ্য- : অর্থ্যাদি পঞ্চ, দশ বা ষােড়শভাগে বিভক্ত করা হয়। আধিদৈবিক উপচারগুলি মনের যাবতীয় সত্তি। সর্বোপরি আধ্যাত্মিক উপচার আমাদের আত্মা। সেইদিকে বেশী দৃষ্টি রাখিয়াই বলা হয়, “পূজা আত্মনিবেদনম”,“আত্মনিবেদনই শ্রেষ্ঠ পূজা। উপচার সমর্পণকালে ত্রিবিধ ভাবগুলির দিকে দৃষ্টি রাখা বিধেয়। আপন আপন অভিৰুচি অনুসারে উপচার সমর্পণ করাই কৰ্ত্তব্য। একটু অগ্রসর হইলে যখন ভগবানের সৰ্বব্যাপিত্ব একটু অনুভবে আসে, ভগবানকে ছেলে-মেয়েদের ভিতরে বালগােপাল কুমারী ভগবতীরূপে, মা-বাপের ভিতরে অন্নপূর্ণাবিশ্বনাথরূপে, স্বামী-স্ত্রীর ভিতরে কৃষ্ণরাধা, সীতারাম, দুর্গাশিবরূপে,—এক কথায় জীবকে শিবরূপে ভগবানের জীয়ন্ত বিগ্রহরূপে অনুভবে আসিতে আরম্ভ করে, তখন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব এমন কি সব জীবের ভিতর দিয়া তাহাদের আবশ্যকীয়, দ্রব্য অর্পণ করিয়া আমরা উপচার-সমর্পণ ক্রিয়া সাধিত করি । এমন কি নিজের সব কাজগুলি বিষয়ভােগ গ্রহণগুলি তখন tal FM - - -r৭" | $ [ ৫১ ] পূজায় পরিণত হয়, “পূজা তে বিষয়ােপভােগরচনা” ইহার সাক্ষী। “আহার কর মনে কর আহুতি দাও শ্যামা মাকে” এই ভাবের মধ্যেও আমরা এই তত্ত্ব নিহিত দেখিতে পাই। ইহারও উপরের অবস্থায় প্রকৃতিদেবী অনন্ত সৌন্দৰ্য্য মাধুৰ্য্য এক কথায় শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধাদি ভােগ্য উপকরণের ভিতর দিয়া কিভাবে পরমপুরুষের সেবা করিতেছেন সেই তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করিয়া সাধক উপচার-সমর্পণের মধ্য দিয়া তাঁহার সব দর্শনকে ভগবদ্দর্শনে, সব চিন্তনকে ভগবৎ-ধ্যানে, সব কাজকে ভগবৎ-পূজায় পরিণত করিয়া ফেলেন। গীতার “ব্ৰহ্মাৰ্পণং ব্রহ্মহবিঃ” প্রভৃতি শ্লোকের মর্ম তখনই ঠিকভাবে গৃহীত হয়। ভগবান সৰ্বব্যাপী, সৰ্ব্বভূতান্তরাত্মা ; সীমাবদ্ধ রূপের ভিতর দিয় অসীম অরূপ-তত্ত্বে, সাধারণ উপচার- সমর্পণের ভিতর দিয়া সৰ্বজীবের সেবাব্রতে লইয়া যাইবার এমন সুন্দর কৌশল আর কোথাও দৃষ্ট হয় না। জীব শ্রীভগবানের জীয়ন্ত বিগ্রহ, জীবের ভিতরে তাহার প্রিয়তম প্রাণারাম অবস্থিত, জীবের সেবাই শিবের সেবা, এই তত্ত্ব আমরা মূর্তির ভিতর দিয়া অমূৰ্ত্তের পূজার মধ্যে দেখিতে পাই। সিদ্ধ অবস্থায় সব জীবের স্নানের ভিতর দিয়া আমরা আমাদের শ্রীভগবানের স্নান, সব জীবকে খাওয়াইবার মধ্য দিয়া আমরা শ্রীভগবানকে অন্নপ্রদান, সব জীবের কল্যাণ ও তৃপ্তিসাধনের মধ্য দিয়া আমরা আমাদেব ভগবানের সেবার কাৰ্য্য সাধন করি। আমাদের দেখা তখন ভগবৎ-দর্শনে, - [ ৫২ ] আমাদের সেবার কাজ ভগবৎ-সেবায়, আমাদের জীবহিত চিন্তা মৈত্রী ভাবনায় ভগবদ্ধ্যানে পরিণত হয়। সর্বজীবের তৃপ্তিসাধনই যে সাধনার লক্ষ্য—এই তত্ত্ব আমরা সাধনের অনুষ্ঠানগুলির মধ্যেও সুন্দরভাবে দেখিতে পাই। স্নান- আহারাদি যাবতীয় কাৰ্য যাহাতে পূজায় পরিণত হয়, ভগবৎ- প্রীতি সম্পাদনে সাধিত হয়, উপচার-সমর্পণ আমাদিগকে সেই তত্ত্ব শিক্ষা দেয়। যিনি ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ডোদর, তাঁহাকে কি বস্ত্র পরাইব? কি খাইতে দিব ? তিনি বিশ্বরূপ “সর্বভূতময়াে হরিঃ” তাই জীবের সেবাই শিবের সেবা। নিজের আত্মীয়- স্বজনের এমন কি জীব মাত্রের স্নান-আহারাদি দ্বারা আমরা শিবের তৃপ্তি-বিধান করি। ধ্যান শব্দের অর্থ তগতভাবে চিন্তন। ধ্যানের পূর্বে ধারণার অভ্যাস করিবার ব্যবস্থা আছে। চিত্তকে কোন নির্দিষ্ট স্থানবিশেষে, ব্যক্তিবিশেষে বা তত্ত্ববিশেষে ধরিয়া রাখা অর্থাৎ বিষয়ান্তর হইতে প্রত্যাহৃত করিয়া এক স্থানে স্থির করিয়া ধরিয়া রাখার নাম ধারণা। তারপর চিত্তকে সেখানে স্থির করিয়া শান্তভাবে সেই লক্ষ্যবিষয়ে একাগ্রতা লাভ করিয়া তন্ময়তা লাভ করা ধ্যানের উদ্দেশ্য। এই ধ্যানকে তৈলধারাবৎ অবিচ্ছিন্ন চিত্তপ্রবাহ রূপে বর্ণনা করা হয়, অর্থাৎ ধ্যেয় বিষয়ে এমনভাবে একাগ্রতা আনিতে হইবে যাহাতে

[ ৫৩ ]
চিত্তের ভাব-প্রবাহের মধ্যে বিচ্ছেদ না ঘটে।
এধ্যানন্তু
তৈলধারাবদবিচ্ছিন্নস্মৃতি সন্তানরূপা ধ্ৰুবানুস্মৃতিঃ।”
ধ্যান করা যায় যে কোন বিষয় অবলম্বনে, তবে সাধারণতঃ
কোন আদর্শ পুরুষ (গুরু প্রভৃতি), অবতার (ইষ্টতত্ত্ব) বা
ভগবান বা ভগবৎ-শক্তি সম্বন্ধে একাগ্রভাবে চিন্তা করার
নামই ধ্যান । আমরা সাধারণতঃ ভগবৎ-চিন্তনকে ধ্যান
বলিয়া মনে করি। অনেকে নিগুণ তত্ত্বের ধ্যান করেন বলিয়া
শুনিতে পাই, কিন্তু তাহার ভিতরেও আমরা একটা সগুণ
ভাব দেখিতে পাই। স্থূলরূপটা যেমন একটা ব্যবিশেষের
আকার আদি স্কুলগুণ, দয়া প্রেম ইত্যাদিও সেইরূপ একটা
মানসিক সূক্ষম ভাবের গুণ। যিনি মনের অতীত, তাঁহাকে
স্কুলে সীমাবদ্ধ করাও যেমন ভুল, সূক্ষম বিশেষণের দ্বারা সীমা-
বদ্ধ করিতে যাওয়াও তদ্রুপ ভুল। অনেকেই প্রকৃতির সাহায্যে
ভগবানের ধ্যান করিয়া থাকেন। পুষ্পদির সৌন্দৰ্য্য তাহাদের
চিত্তে পরমসুন্দরের কথা জাগাইয়া দেয় ; বন্ধুর প্রীতি, মার
বাৎসল্য, স্ত্রীর আদর সােহাগ সেই পরমপ্রেমময়ের কথা
মনে করাইয়া দেয়। কেহ কেহ প্রকৃতির ভিতরে একটা
অচিন্ত্য শক্তি কিভাবে কাৰ্য্য করিয়া যাইতেছে তাহার অব
লম্বনে সেই পরমশক্তিমানকে ধ্যান দ্বারা উপলব্ধি করিতে
চেষ্টা করেন। ইহাদের অনেকে, সেই মহতী শক্তি আমাদের
ভিতরে থাকিয়া, কিভাবে একটা সামান্য পরমাণু হইতে
আমাদের দেহকে এমন সুন্দরভাবে তৈয়ার করিয়া আমাদের

[ ৫৪ ] পরিণতির ও শান্তির কারণ হইতেছে, তদবলম্বনে পরমশক্তি মানকে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেন। জগতের সব পদার্থের সব তত্ত্বের ভিতর দিয়া ভগবৎ-লীলা উপলব্ধি করা তাহাদের উদ্দেশ্য। কেহ কেহ বা ভগবানকে জ্যোতির্ময় মনে করিয়া নিজের ভিতরে স্থানবিশেষে তাহাকে জ্যোতির্ময় রূপে অনুভব করেন। কাহারও মতে স্থানবিশেষে তত্ববিশেষে চিত্তের ধারণা ও ধ্যান ভগবদ্দর্শনের তত্ত্ব-সাক্ষাৎকারের সহায়। মনে করুন আমার সম্মুখে একটি দেওয়ালে উপর্যুপরি সাতটা ছিদ্র রহিয়াছে, তাহার সর্বনিম্নের ছিদ্র দিয়া আমি একটা পায়খানা দেখিতে পাই, তাহার উপরের ছিদ্র দিয়া দেখা যায় একটা বাগান, তাহার উপরের ছিদ্র দিয়া ক্রমান্বয়ে বৈঠকখানা, একতালার ছাদ, দোতালার ছাদ এবং তেতালার ছাদে অবস্থিত একটি মন্দির। এখন মন্দির দেখিবার জন্য আমাকে সর্বোপরি যে ছিদ্রটি আছে, তাহার ভিতর দিয়া দৃষ্টিপাত করিতে হইবে। অনাহত চক্রে, কূটস্থে, সহস্রারে ধ্যান করার ভিতরে আমরা এইরূপ একটা তত্ত্ব উপলব্ধি করি। এখানে ছিদ্রের কূটস্থের প্রভৃতির স্থলে আধারে সপ্তমী বলা হয় নাই। কারণ ঐ ছিদ্রের ভিতরে মন্দিরটি বা সূক্ষম চক্রটির ভিতরে ইষ্টাদি মূর্তি বা তত্ত্ব অবস্থিত নহে। ওখানে মন স্থির করিলে নির্দিষ্ট মন্দিরটি বা তত্ত্বটি দর্শনে আসিবে, নতুবা আজ্ঞাচক্রের মত সূক্ষ স্থানে সর্বব্যাপী ভগবদ্দর্শন অসম্ভব, কূটন্থে মনস্থির করিয়া ধ্যান করিতে করিতে ভগবৎ-তত্ত্ব উপলব্ধি হইবে।

[ ৫৫ ] যে জিনিষে বা তত্ত্বে মন স্থির করিয়া ধ্যান করা যায় আমাদের চিত্ত তদ্ভাবে ভাবিত হইয়া থাকে। এইরূপে একাগ্রভাবে বস্তু, ব্যক্তি বা তত্ত্ববিষয়ে চিত্ত একাগ্র করিয়া তন্ময়তা লাভের উপায় ধ্যান। বেদান্তের মনন ও নিদিধ্যাসনও ধ্যানবিশেষ। ভক্তের ধ্যান-প্রণালী এইরূপ হইলেও তাহার মধ্যে একটু বিশেষত্ব লক্ষিত হয়। কোন কোন ভক্ত তাহার গুরু বা ইষ্টের মূৰ্ত্তি অবলম্বনে তন্ময়তা লাভের চেষ্টা করে। আমাদের দেহটা ভিতরের ভাবের স্থূল অভিব্যক্তি; স্কুলের অবলম্বনে আমরা সূক্ষের তত্ত্ব অবগত হই। মূর্তি সম্মুখে রাখিয়া তাহার ধ্যান করিতে করিতে সেই গুরু বা ইষ্টের সূক্ষম তত্ত্বগুলি, সূক্ষম ভাবগুলি আমাদের নিকট প্রতিভাত হইতে আরম্ভ হয়। তখন মনে হয় আমাদের গুরু বা ইষ্ট যেন মূর্তির ভিতরে জাগ্রত ও বােধিত হইয়া রক্তমাংসের শরীরে দণ্ডায়মান। ধ্যানের একটু উন্নত অবস্থায় ইষ্টের সব ভাবগুলি আমাদের মানস চক্ষে ফুটিয়া উঠে। তখন আমাদের মনটা এমনভাবে ইষ্টগত হইয়া পড়ে যে, আমরা ইষ্টের সমস্ত তত্ত্বগুলি অবগত হইয়া ইষ্টময় হইয়া পড়ি। এইরূপ ভাবের ভিতর দিয়াই একলব্য দ্রোণের মূর্তির সাহায্যে দ্রোণের সব ধনুর্বিদ্যা অবগত হইয়াছিলেন। গুরু বা ইষ্টকে ধ্যানের অবস্থা বিশেষে নিজের ভিতরে চিন্তার ব্যবস্থা আছে। নির্দিষ্ট চক্রবিশেষে মন স্থির করিয়া ইষ্টকে “তায়ােবৎ” নিজের ভিতরে চিন্তা করিতে হইবে। তাপ বা বিদ্যুৎ যেমন ধাতুনির্মিত দ্রব্যের [ ৫৬ ] ভিতর প্রবেশ করিয়া তদাকারে আকারিত হয়, সূক্ষম ইষ্ট বা গুরুত্ব ধ্যানের সাহায্যে সেইরূপ আমাদের প্রতিতত্বে অনু- প্রবেশ করিয়া আমাদের আকারে আকারিত হয়। একদল সাধক আছেন যাঁহার ভগবানকে অঙ্গুষ্ঠভাবে নিজের দেহের ভিতরে, জগদ্দেহের ভিতরে উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করেন। অঙ্গে (দেহে) স্থিত (উপলব্ধ) বলিয়া তাঁহারা ভগবানকে ‘অঙ্গুষ্ঠ নাম দিয়াছেন। “অঙ্গে স্থিত ইতি অঙ্গুষ্ঠ”। নিজের ভিতরে গুরু বা ইষ্টের অবস্থিতি বুঝিতে হইলে মনে করিতে হইবে আমি যেন চিৎ হইয়া শুইয়া আছি, আর আমার গুরু বা ইষ্ট যেন আমার বুকের উপর চিৎ হইয়া শুইয়া ভিতরে গিয়া আমার সমস্ত দেহে, সমস্ত তত্ত্বে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া আমার আকারে আকারিত হইয়া পড়িলেন। তখন আমার মস্তিষ্কের মধ্যে যেন তাহার মস্তিষ্ক, আমার বুকের মধ্যে যেন তাহার বুক, আমার পিঠের মধ্যে যেন তাহার পিঠ, আমার হাতের মধ্যে যেন তাহার হাত ; এক কথায় আমার প্রতি অবয়বে যেন তঁাহার প্রতি অবয়ব। তখন আমার প্রতিতত্ত্বে তাঁহার প্রতিতত্ত্ব এমনভাবে অনুভূত হইতে আরম্ভ হয় যে, নিজের শরীরে হাত দিয়া নিজের শরীর স্পর্শ করিয়া-ইষ্টকে স্পর্শ করিয়াছি ভাবিয়া সাধক তন্ময়তা লাভের মধ্য দিয়া সমাহিত হইয়া পড়েন। এইরূপ সাধনার ফলে সাধক ধ্যান করিতে বসিয়া অনেক সময় ইষ্টময় হইয়া পড়েন। তখন চিত্তের সমাহিত অবস্থায় যে পদার্থ বা যে তত্ত্বের দিকে নজর পড়িবে [ ৫৭ ] 'তাহাকেও ইষ্টময় বলিয়া অনুভূত হইবে। “যাহা যাহা নেত্র পড়ে তাহা কৃষ্ণস্ফুর্তি।” “কৃষ্ণবর্ণ এক শিশু মুরলী বাজায়” “যত্র যত্র মনাে যাতি ব্ৰহ্মণস্তত্র দর্শন” এই ভাবের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। তখন সাধকের ইষ্টের অনুমােদিত কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজ করিবার, ইষ্টের চিন্তন ছাড়া অন্য চিন্তা করিবার শক্তি প্রায় লােপ পায়। ইষ্টের যাবতীয় গুণ তাহাতে সংক্রানিত হইয়া সে তখন ইষ্টের সাদৃশ্য প্রাপ্ত হয়। ইষ্ট যেমন জগতের সুখে সুখী সমষ্টিভাবাপন্ন, সেও তখন তদ্ভাবে ভাবিত হইয়া নিজের সব সীমাবদ্ধ ভাব হারাইয়া ফেলে। ইহার ফলে ইষ্ট এমন কি নিজের ভিতরে সর্বব্যাপী ভগবত্তত্ব স্ফুরিত হওয়ায় সাধকের পৃথক অস্তিত্ব লােপ পায়; ইহাই আত্ম-নিবেদন। এই ভাবে ভাবিত সাধকের মুখ দিয়া বাহির হইয়াছিল, “ব্ৰহ্মবিদ ব্রহ্মব ভবতি,” “অনলহ” (আমিই সেই তত্ত্ব অর্থাৎ ঈশ্বর) “তত্ত্বমসি” “সােহহ” “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” “I and my father are one". ধ্যানের বিষয় প্রধানতঃ তিনটি—ধামতত্ত্ব, স্বরূপতত্ত্ব, ইষ্টতত্ত্ব বা ভগবৎ-তত্ত্ব। ধামতত্ত্ব :—সকল সাধকের মতেই ভগবৎ-ধাম প্রাকৃত গুণ বজ্জিত জ্যোতির্ময় চিন্ময় আনন্দরসে পরিপূর্ণ। সেখানে কোনরূপ অভাব দুঃখ কষ্ট কামনা বাসনা আসক্তি হিংসা দ্বেষ প্রভৃতির ছায়ামাত্রও দেখিতে পাওয়া যায় না। সেখান কার যাহা কিছু সে সবই যেন চিন্ময় আনন্দ সুধারস

[ ৫৮ ]
নিঙড়াইয়া তৈয়ার করা হইয়াছে। অদ্বৈতবাদীর মতে
সেখানে কোনরূপ গুণের খেলা বৈশিষ্ট্যভাব বর্তমান নাই,
সেখানকার সবই এক সমরসপূর্ণ অদ্বৈতানন্দভাবে ভরপূর ।
দ্বৈতবাদীর মতে সেখানে প্রাকৃত জাগতিক কোনও পদার্থ বা
ভাব না থাকিলেও সেখানে শ্রীভগবান ও তাহার ভক্ত পরিকর
এবং ইহাদের লীলারসের অনুকূল সমস্ত উপকরণগুলি চিন্ময়
আনন্দরস দ্বারা সংগঠিত।
আসল কথা এই যে, ধামতত্ত্ব
জ্যোতির্ময় আনন্দভাবে পরিপূর্ণ। এই ভগবৎ-ধামকে
বৈষ্ণবগণ গােলােক, শৈব-শক্তগণ কৈলাস, যােগিগণ সহস্রার,
খৃষ্ট ও মুসলমানগণ স্বর্গ আদি নামে অভিহিত করেন।
লেখকগণ আপন আপন ধারণা অনুসারে ভগবৎ-ধামে আপন
আপন আনন্দের উপকরণগুলির সদ্ভাব কল্পনা করিতে দ্বিধা
বােধ করেন না। অভাবক্লিষ্ট মানব তাহাদের প্রার্থিত বিষয়-
গুলির সদ্ভাব সেখানে কল্পনা না করিয়া থাকিতে পারে না।
ভগবদ-বিকাশের জন্য ভগবৎ-অনুভূতির জন্য লীলাতত্ত্ব
আস্বাদ করিবার জন্য ধ্যানযােগে সাধকের চিত্তকে ভগবৎ-ধামে
পরিণত করিতে হইবে। জমিটি অনুকূল না হইলে তাহাতে
ভগবৎ-প্রকাশ অসম্ভব বা অস্বাভাবিক। এইজন্য অবতার
গ্রহণের পূর্বে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করিয়া তথায় পরিকরগণ
আগেই গিয় অবতীর্ণ হইয়া স্থানটিকে পারিপার্শ্বিক অবস্থা
গুলিকে ভগবৎ-অবতারের অনুকূল উদ্দীপন-বিভাব করিয়া
তােলেন। সাধকদের ভিতরে ভগবানকে অবতীর্ণ করিতে

[ ৫৯ ] হইলে, অবতীর্ণ দেখিতে হইলে, হৃদয়টিকে অবতরণের অনুকূল, ভবিগুলিকে উদ্দীপন-বিভাব করিয়া তুলিতে হয়। এখানে ভূমিটি জীবের সহস্রার। স্বরূপতত্ত্ব প্রায় সকল মতেই জীবের প্রকৃত বাসস্থান শ্রীভগবানের আনন্দধামে। সে ভগবানের অংশ বা প্রতিবিম্ব। সে নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত সচ্চিদানন্দস্বরূপ—তাহার না আছে অভাব, না আছে দুঃখ-কষ্ট। অদ্বৈতমতে তাহার সঙ্গে ভগবানের সঙ্গে কোন ভেদভাব নাই ; স্বরূপ-বিস্মৃতিই তাহার সমস্ত কল্পিত দুঃখ-কষ্ট ও বন্ধনের কারণ। স্বরূপ অনুভূতির দ্বারাই সে ভগবৎ-স্বরূপ প্রাপ্ত হইতে পারে । দ্বৈতমতে সে শ্রীভগবানের অংশ বা প্রতিবিম্ব—সে তাহার শ্রীভগ- বানের সঙ্গে দাস্য সখ্য বাৎসল্য বা মধুর ভাবে সম্বদ্ধ। সাধনা দ্বারা স্বরূপপ্রতিষ্ঠ হইয়া সে তাহার শ্রীভগবানের আপন আপন ভাবের অনুকূল সেবাধিকার লাভ করে। সম্প্রদায় বিশেষে দীক্ষার সময় গুরু শিষ্যকে তাহার স্বরূপ দেখাইয়া বা বুঝাইয়া দেন। তদনুসারে একটা নামও রাখা হয়। সাধক তখন বুঝিতে পারে সে ভগবানের কাছে কিভাবে ছিল, কিভাবে তঁাহার সেবা করিত। তখন মনে মনে সেই তত্ত্ব অস্বাদ করাই হয় তাহার প্রধান সাধনা। এই উভয় মতেই সাধক স্বরূপতঃ জ্যোতির্ময় সচ্চিদানন্দস্বরূপ। স্বরূপ-বিস্মৃতি দেহের আসক্তিই তাহার বন্ধন ও কষ্টের কারণ। ভূতশুদ্ধি, ষট্চক্রভেদ পঞ্চকোশ-বিবেক, নেতি ৰেতি ভাবনা দ্বারা সাধক

[ ৬ ]।
সচ্চিদানন্দস্বরূপে অবস্থিত থাকিতে চেষ্টা করে। (ইষ্টতত্ত্ব
“গুরু, ইষ্ট ও ভগবান” এই প্রবন্ধে এবং মূল শ্লোকের ব্যাখ্যায়
দ্রষ্টব্য)।
জপ
ভগবান পতঞ্জলি বলেন “তস্য বাচক: প্রণবঃ”; ওঁকার
ভগবানের বাচক; “তজ্জপস্তদর্থভাবন”-মন্ত্রের জপের অর্থ
সেই মন্ত্রের অর্থ ভাবনা। কোন্ মন্ত্রের কি অর্থ তাহার
আলােচনা পূৰ্বেই মন্ত্রতত্ত্বের ভিতরে করা হইয়াছে। প্রত্যেক
মন্ত্রের পৃথক পৃথক্ অৰ্থ অভিজ্ঞ সাধকের নিকট বুঝিয়া লইতে
হয়। সমস্ত মন্ত্রের মধ্যে একই উদ্দেশ্য বলিয়া মন্তার্থ কতক
পরিমাণে সহজবােধ্য। মন্ত্রের অর্থ লইয়া ভাবনা করা
বহুদিনের সাধন সাপেক্ষ। ভাবনা শব্দের সম্বন্ধে বলা
হইয়াছে “ভাবিতং বনং চন্দনেন যথা”—চন্দনবনের অপর
কাঠগুলির মধ্যেও যেমন চন্দনের গন্ধ পাওয়া যায় অর্থাৎ সেই
দ্রবের পরমাণুগুলিতে চন্দনের গন্ধ অনুপ্রবিষ্ট হইয়া যেমন
তাহাকে চন্দনময় করিয়া তােলে, সেইরূপ সাধক মন্ত্র তত্ত্বের
রহস্য ভাবিতে ভাবিতে তন্ময়তা লাভ করেন। এই তন্ময়ত।
লাভ করাই ভাবনা। যেমন কোন ঔষধকে কোনও পাতার
রসে ভিজাইয়া রাখতে রাখিতে যখন তাহার প্রত্যেক পরমাণু
সেই রসের ভাবে পরিভাবিত হয়, তখন আমরা তাহাকে
ভাবনা দেওয়া” বলি। ছানাকে রসে ডুবাইয়া রাখিলে রস

[ ৬১ ] সেই ছানার প্রত্যেক অণুতে প্রবেশ করিয়া ছানাকে রসময় করিয়া তােলে, তখন সেই রসময় (রসগােল্লা) হইয়া উঠাকে আমরা রসের ভাবনা দেওয়া বলি। মন্ত্রের অর্থ ভাবনার দ্বারা সাধক মন্ত্রের অর্থ চিন্তা করিতে করিতে মন্ত্রময় হইয়া পড়েন। এই মন্ত্রময় অর্থাৎ মন্ত্রের জীয়ন্ত বিগ্রহ হইবার চেষ্টাকেই আমরা মন্ত্র জপ বলিয়া থাকি। কতবার মন্ত্র জপ করা হইল অন্যমনস্ক হইয়া জপের সংখ্যা- পূরণ মন্ত্রজপ নয়। এখন মন্ত্ৰজপের সাধন-প্রণালী বুঝিতে চেষ্টা করা যাউক। মন্ত্রজপের সঙ্গে প্রাণায়াম, ষট্‌চক্র ভেদ, পঞ্চকোশ বিবেক প্রভৃতি সাধন-প্রণালীর বিশেষ সম্বন্ধ বৰ্ত্তমান। এই সব তত্ত্বগুলি জানা থাকিলে কিম্বা বুঝিয়া সইতে পারিলে মন্ত্রজপ কতকটা সহজসাধ্য হয়। প্রায় প্রত্যেক তান্ত্রিক মন্ত্রের মধ্যে একটি ওঁকাররূপ ব্যাহৃতি, একটি বীজ এবং একটি দেবতার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ব্যাহতি ভগবৎ-আকর্ষণে আকৃষ্ট হইয়া তাহার কাছে যাইবার প্রণালী। মূলাধার হইতে নাভিচক্রস্থ মণিপুর পর্যন্ত ‘অ’কারের স্থান, সেখান হইতে অনাহত চক্র (হৃদয়ের পিছনে) পৰ্যন্ত ‘উকারের স্থান, সেখান হইতে আজ্ঞাচক্ৰ পৰ্যন্ত ‘ম’কারের স্থান, তাহার উপরে সহস্রার অর্ধমাত্রার স্থান। ওঁকার উচ্চারণ করিয়া চিত্তকে মূলাধার হইতে সহস্রানে ভগবৎ-সন্নিধানে লইয় গিয়া সেখানে ভগবানে তন্ময় লাভ করিতে হইবে; পরে বীজ উচ্চারণ করিয়া নিজের ভিতরে কোন্ শক্তি নিহিত, কোন্ [ ৬২ ] কাজ করিবার জন্য ভগবান আমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন এই তত্ত্ব । উপলব্ধি করিতে হইবে। তারপরে দেবতার নাম উল্লেখ করিয়া চিত্তকে আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামাইয়া প্রতি চক্রে প্রতি তত্ত্বে প্রবেশ করাইয়া সেই সব তত্ত্বগুলিকে ভগবদ্-জ্যোতিঃতে ভগবৎ-শক্তিতে পরিপূরিত করিয়া নিজকে জ্যোতির্ময়রূপে চিন্তা করিতে হইবে। শেষে মূলাধারে স্থিত হইয়া নিজকে সেই বীজের পূর্ণ পরিণত অবস্থা প্রাপ্ত ইষ্টময় চিন্তা করিতে হইবে। বৈদিক যুগের প্রধান মন্ত্র ছিল গায়ত্রী ; তাহার ‘ভূভুবঃস্বঃ আদি ছিল সপ্তব্যাহৃতি। ভূর্ভুবঃ আদি ব্যাহৃতি উচ্চারণ করিয়া চিত্তকে ভােলা হইত সহস্ৰারে, সেখানে গিয়া তৎসবিতু- বরেণ্য আদি উচ্চারণ করিয়া ব্ৰহ্মজ্যোতিঃর ধ্যান করিয়া তাহাতে তন্ময়তা লাভ করা হইত। তারপরে ধিয়াে যােন আদি উচ্চারণ করিয়া নিজের ভিতরকার অন্তরেন্দ্রিয় ও বহিরিন্দ্রিয়- গুলিকে ব্ৰহ্মজ্যোতিতে পরিপূর্ণ ব্ৰহ্মভাবে পরিভাবিত করিয়া নিজকে ব্ৰহ্মস্বরূপ চিন্তা করা হইত। সব জপের সঙ্গে প্রাণায়ামাদি ক্রিয়ার বিশেষ সম্বন্ধ। সব জপের প্রথম কাজ ভগবানের কাছে যাওয়া (যেমন বৈষ্ণবদের অভিসার-তত্ত্ব), দ্বিতীয় কাজ ভগবানে তন্ময়তা লাভ করা (যেমন বৈষ্ণবদের মিলনতত্ত্ব), তৃতীয় কাজ ভগবৎ-শক্তি ভগবদ্ভাব লইয়া উপর হইতে দেহের প্রতিতত্ত্বকে ভগবদ্ভাবে পরিভাবিত করিয়া ভগবন্ময় হইয়া যাওয়া। অভিসার-মিলন ও রসােদর-তত্ত্ব এইখানে চিন্তনীয়। বৈষ্ণবদের [ ৬৩ ] জপের দ্বারা ইষ্টতত্ত্বকে নিজের ভিতরের প্রতিতত্বে আস্বাদ করিয়া ইষ্টময় হইয়া যাইবার সুযােগ লাভ হয়। “তােমার স্বর্গরাজ্য মর্তে আবির্ভূত হউক, মর্ত্যধাম স্বর্গধামে পরিণত হউক, আমাদের ভিতর দিয়া তােমার ইচ্ছা পূর্ণ সফলতা লাভ করুক”—জপের মধ্যে এই তত্ত্বের একটা সুন্দর আভাস পাওয়া যায়। বৈষ্ণবদের হরেকৃষ্ণ ইত্যাদি নামজপের মধ্যেও আমরা এই উঠা-নামার প্রণালী সুন্দরভাবে দেখিতে পাই। এই নাম- জপের ফলে সাধক কৃষ্ণময় হইয়া যান। কৰ্ম্ম হইতে জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয়; কৰ্ম্মই যজ্ঞ। সমস্ত জগৎ এক বিরাট যজ্ঞশালা,-যে যজ্ঞের হােত-হবি- হরন, দ্রষ্টা-দৃশ্য-দর্শন-সমস্ত ত্রিপুটি একমাত্র ব্রহ্ম। জগদ্ব্যাপী চলিতেছে এই মহাযজ্ঞ ; আমরা সজ্ঞানে অজ্ঞানে সেই মহা যজ্ঞের নির্দিষ্ট অংশ পূরণ করিয়া যাইতেছি। ইহা বুঝিয়া আমাদের সমস্ত কাজকে সেই মহাযজ্ঞের তালে তালে সাধন করিতে পারিলে—অর্থাৎ আমাদের সব কাজকে ভগবৎ-ইচ্ছ। পূরণে নিযুক্ত করিতে পারিলে আমাদের সব কাজ যজ্ঞে পরিণত হইবে। এইজন্য ভগবৎ-তৃপ্তির, ভগবৎ-প্রাপ্তির অনুকূল সব কাজকেই যজ্ঞ বলা হয়। অন্যোন্যব্যবচ্ছেদ ‘অহং'তত্ত্ব . আমাদের ব্যষ্টি-দেহাদিকে সমষ্টি হইতে পৃথক ১২ ইহারই ফলে [ ৬৪ ] মনে করাইয়া একটা অনর্থের সৃষ্টি করে। আত্ম-পর, সুখ-দুঃখ আদি দ্বন্দ্বভাব দেখিতে পাওয়া যায় । | ‘অহংকার দূর করিয়া ব্যষ্টিতত্ত্বকে সমষ্টিতত্ত্বের সহিত অভেদ জানিয়া, ব্যক্তিকে সমষ্টির অঙ্গীভূত মনে করিয়া, সমষ্টির তালে তালে ব্যষ্টি যে চালিত হইতেছে—তাহা অনুভব করাই সমস্ত যজ্ঞাদির মুখ্য উদ্দেশ্য। প্রাচীন বৈদিক যুগে কৰ্ম্মমাত্রকেই যজ্ঞ বলা হইত। সমাজে যে সব কাজে বহু লােক একত্রিত হইয়া উৎসব করিত, আনন্দ করিত তাহারই সাধারণ নাম ছিল যজ্ঞ। ক্রমে ভগবৎ- প্রাপ্তির অনুকূল কৰ্ম্মের নাম রাখা হইল যজ্ঞ। গীতায় দ্রব্যযজ্ঞ, জপষজ্ঞ, তপােযজ্ঞ, জ্ঞানযজ্ঞ প্রভৃতির যে উল্লেখ দেখা যায়, তন্মধ্যে জ্ঞানযজ্ঞেরই প্রাধান্য স্বীকৃত হইয়াছে। সৰ্ব্বব্যাপী ; সর্বত্র তাহার দর্শন, ধ্যান ও সেবাই জ্ঞানযজ্ঞরূপে বর্ণিত। অনাসক্ত ফলাকাঙ্ক্ষা-বর্জিত হইয়া জীবের কল্যাণ ও শান্তির জন্য, ভগবৎ-তৃপ্তির জন্য, ভগবৎ-প্রাপ্তির জন্য অনুষ্ঠিত কৰ্ম্মমাত্রকেই যজ্ঞ বলা হয়। জীবহিতার্থ নিষ্কাম কর্মের মধ্যে জীবসেবার জন্য, ভগবৎ-প্রাপ্তির জন্য সর্বাপেক্ষা প্রধান স্বার্থ- ত্যাগ হইল পরহিতার্থে নিজের জীবন দান করা, নিজকে যজ্ঞের পশুরূপে অর্পণ করা। প্রাচীন যজ্ঞে ইড়াভক্ষণ একটা প্রধান কর্ম ছিল-এই ইড়া ছিল যজ্ঞভাগ, যজ্ঞে প্রদত্ত দ্রব্য ; যজ্ঞের ফল সকলে মিলিয়া ভােগ করা হইত। ভগবান যীশুকে যজ্ঞের পশু বলা হইয়াছে, কারণ তিনি জীবের কল্যাণের জন্য ভগবান [ ৬৫ ] জীবন দান করিয়াছিলেন। যজ্ঞে অর্পিত পশুর রক্ত ও মাংস- ভক্ষণের প্রথা প্রায় সকল ধর্মেই দেখিতে পাওয়া যায়। এই মাংসাদি ভক্ষণের অর্থ সৰ্বতােভাবে তাহার মতন হইতে চেষ্টা করা,—পরিণামে ভগবৎ-তৃপ্ত্যর্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করা। আসল কথা হইল ভগবৎ-প্রাপ্তির জন্য কৰ্ম্ম। পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে যজ্ঞের মধ্যে জ্ঞান শ্রেষ্ঠ। এই জ্ঞান বিশিষ্টাদ্বৈত তত্ত্ব এবং শুদ্ধ অদ্বৈত তত্ত্ব। ব্যভিভাবকে সমষ্টিভাবে আহুতি দিয়া বিশিষ্ট অদ্বৈত তত্ত্ব আস্বাদ করার, এবং সমষ্টি—স্থলাদি তত্ত্বকে ক্রমান্বয়ে সমষ্টি সূক্ষম কারণ এবং পরমাত্ম-তত্ত্বে আহুতি দিয়া শুদ্ধ অদ্বৈত তত্ত্ব আস্বাদ করার প্রণালী কালে জ্ঞানযজ্ঞ বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। হোম • জগতে রহিয়াছেন শুধু এক ভগবান এবং জীব-জগৎরূপ হার দেহ। জগৎও পূর্ণ জীবও পূর্ণ। জীবও পূর্ণ। সকলের ভিতর দিয়া অনন্তরূপ পােষাক পরিয়া অনন্ত রূপে, অনন্ত ভাবে, আমাদের লীলাময় অনন্তদেব অনন্ত লীলারস বিস্তার করিয়া বসিয়াছেন। কোন জিনিষকে খণ্ডিত করিতে হইলে দতিরিক্ত অন্য আর একটি জিনিষের প্রয়ােজন হয়। অখণ্ড তত্ত্বকে খণ্ডিত করা শুধু কল্পনা-জগতেই সম্ভবপর। তাই আমাদের ‘অহং’তত্ব একটা কাল্পনিক আত্ম-পর দ্বন্দ্বভাবের সৃষ্টি করিয়া জগৎকে এতটা অশান্ত করিয়া তুলিয়াছে। ফলে,

[ ৬৬ ]
অহঙ্কারবশে আমরা আত্মার ত্যি সগত ভাব ভুলিয়া গিয়া
“আমি তুমি” ভাবের সৃষ্টি করিয়া আমাকে সুখী করিবার
জন্য “তােমার” অনিষ্ট সাধন করিতে দ্বিধা বােধ করি না।
এই কাল্পনিক ভেদভাব বা দ্বন্দ্বভাব দূর করিবার জন্যই
আমাদের বৈদিক হােমক্রিয়া। অনুময়াদি ব্যষ্টি পঞ্চতত্ত্বগুলি
জগদ্ব্যাপী সমষ্টিগত পঞ্চতত্ত্বেরই অচ্ছেদ্য অংশ, তাহারই তালে
তালে তাহাবই কাৰ্য্য সাধন করিয়া চলিয়াছে।
এক একটি
ব্যষ্টিতত্ত্বকে সমষ্টিগত সেই সেই তত্ত্বে আহুতি দিয়া, নিজের ব্যষ্টি-
ভাব দূর করিয়া সমষ্টিগত ভাব উপলব্ধি করা, অর্থাৎ বিশিষ্ট
অদ্বৈত তত্ত্ব উপলব্ধি করা হােমের প্রথম উদ্দেশ্য। ইহার ফলে
সাধক অনুভব করিতে পারেন—জগদ্ব্যাপী রহিয়াছে একটিমাত্র
স্থূল দেহ, তার মধ্যে লীলা করিতেছে একটিমাত্র প্রাণ, একটিমাত্র
মন, একটিমাত্র আত্মা। তখন সাধক এ সমরসে নিমগ্ন হইয়া
লীলাময় ভগবানের লীলাতত্ত্ব আস্বাদ করেন।
হােমের ক্রিয়া :—প্রথমে ব্যষ্টিভাবকে সমষ্টিভাবে আহুতি
দেওয়া। ব্যষ্টি অনুনয় কোশকে সমষ্টি অন্নয় কোশে আহুতি
দেওয়ার ফলে রহিল এক অনুময় কোশ, মন্ত্র হইল “অন্নময়ায়
স্বাহা ইদম্ অন্ন”, দূর হইল অন্নময় সম্বন্ধে সব চিন্তা, ফুটিয়া
বাহির হইল নিজের প্রাণময় কোশ। ক্রমে অনুভবে আসিল
সমষ্টিব্যাপী একটা মহাপ্রাণ, এবং আমার ব্যষ্টিপ্রাণ তার
অচ্ছেদ্য
অংশ ।
তখন ব্যষ্টিপ্রাণকে আহুতি দেওয়া
হইল সমষ্টি প্রাণে,
অনুভবে আসিল এক সমষ্টিপ্রাণ,

[ ৬৭ ] মন্ত্র হইল “প্রাণময়ায় স্বাহা প্রাণ”। প্রাণ শান্ত হওয়ায় ধরা পড়িল মন । ক্রমে নজরে পড়িল একটা সমষ্টিব্যাপী মন (There is a mind common to all)। দেখা গেল, ব্যষ্টিমন সনষ্টিমনেরই অংশ, তাহারই তালে তালে চালিত। ব্যষ্টিমনকে আহুতি দেওয়া হইল সমষ্টিমনে, মন্ত্র হইল “মনােময়ায় স্বাহা এতৎ মনঃ”, লােপ পাইল মনের বৃত্তি, জাগিয়া উঠিল বিজ্ঞান-তত্ত্ব। পূর্ববৎ ব্যষ্টিবিজ্ঞানকে আহুতি দেওয়া হইল সমষ্টিবিজ্ঞানে, মন্ত্র হইল “বিজ্ঞানময়ায় স্বাহা এত বিজ্ঞানম”। তখন অনুভবে আসিল আনন্দ-তত্ত্ব, ব্যষ্টি-আনন্দ আহুত হইল সমষ্টি-আনন্দে, মন্ত্র হইলা “আনন্দ- ময়ায় স্বাহা এষ আনন্দঃ”। রহিল একমাত্র আনন্দ; তাহা নিবেদিত হইল পরব্রহ্মে । রহিল একমাত্র ব্রহ্ম,একমেবাদ্বিতীয় তত্ত্ব। সব মিলিয়া রহিয়া গেল এক সৰ্বব্যাপী আত্মা, আর তার অবরণ ও প্রকাশ যন্ত্ররূপে সমষ্টিভূত পঞ্চকোশ অর্থাৎ জীব- জগৎ-“ব্ৰহ্ম দেহী, জগৎ তাহার দেহ হইল বিশিষ্টাদ্বৈত অনুভূতি। পরে সেই সমষ্টিগত অনুময়কে প্রাণে আহুতি দেওয়ার ফলে অন্নময় প্রাণে লয় পাইল; সেই প্রাণকে মনে আহুতি দেওয়ায় মনও আবার লয় হইল বিজ্ঞানে; সেই সমষ্টি- বিজ্ঞানকে আনন্দে আহুতি দেওয়ায় বহিয়া গেল সমষ্টিগত আনন্দ ; সেই আনন্দকে ব্রহ্মে আহুতি দেওয়ায় রহিয়া গেল শুধু ব্ৰহ্ম-অনুভাবে আসিল শুদ্ধ অদ্বৈত-তত্ব। এই আহুতি- গুলির মন্ত্র হইল, “অন্নময়ায় স্বাহা”, “প্রাণময়ায় স্বাহা” [ ৬৮ ] “মনােময়ায় স্বাহা”, “বিজ্ঞানময়ায় স্বাহা”, “আনন্দময়ায় স্বাহা”। বিশিষ্টাদ্বৈত ও শুদ্ধাদ্বৈত অনুভূতিই হবনের উদ্দেশ্য। বিসর্জন ভগবান সম্বন্ধে শাস্ত্র ও গুরুমুখে সামান্য জ্ঞান লাভ করিযা, গুরুর উপদেশ মত আমার ইষ্ট-বিগ্রহে ভগবত্তত্ব সম্বন্ধে যতটুকু জানি—সেইটুকু আরােপ করিয়া, প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও বােধনাদি দ্বারা সেই বিগ্রহকে সঞ্জীবিত করিয়া, ন্যাস, উপচার-সমর্পণ, আত্মনিবেদন ও ধ্যানাদির সাহায্যে ভগবত্তত্ত্ব অনুভব করিবার জন্য এতদিন চেষ্টা করিলাম। গুরুর আশীর্বাদে ও ভগবৎ- কৃপায় এতদিনে আমার ইষ্টমূর্তির ভিতর দিয়া ইষ্টতত্ত্ব স্ফুরণ হইতে আরম্ভ হইয়া আমাকে মুগ্ধ ও সমাহিত করিয়া তুলিয়াছে— সৰ্ব্বতত্ত্বে প্রকৃতির সর্বত্র ইষ্টতত্ত্বের স্ফুরণ যে কি জিনিষ, তাহা অনুভবে আসিতে আরম্ভ করিয়াছে। আজ এই ইষ্টমূর্তির ধ্যান করিতে করিতে প্রথমতঃ বাহজ্ঞান হারাইতে বসিলাম, নিজের অস্তিত্ব লােপ পাইল—নিজে যেন ইষ্টময় হইয়া গেলাম; ইষ্ট ছাড়া জগতে আর কিছুই অবশিষ্ট রহিল না। কিছুক্ষণ পরে যখন জ্ঞান হইতে আরম্ভ করিল—যখন নিজের শরীরের কথা মনে পড়িল, তখন দেখি, আমার এই ত্রিবিধ দেহের প্রতিতত্ত্বে আমার জীয়ন্ত ইষ্ট-বিগ্রহ পূর্ণরূপে বিরাজিত ও লীলারত । ইষ্টতত্ত্ব আর আমার বাহিরে নয় ; তিনি এখন আমার ভিতরে প্রতিতত্ত্বে প্রতি অনুভূতিতে পূর্ণভাবে বিরাজিত। বাহিরের মৃন্ময় ইষ্টমূর্তির তখন আর আবশ্যক রহিল না। তিনি আমার ;

[ ৬৯ ]
ভিতরে জ্ঞান-গঙ্গায় নিমজ্জিত হইয়া আমাকে তন্ময় করিয়া
তুলিয়াছেন। ইষ্টর বিসৰ্জ্জন করিতে হয় নিজের ভিতরকার
জ্ঞান-গঙ্গায়। প্রথম অধিকারীর বাহিরের গঙ্গায় ইষ্ট বিসর্জন
শুধু একটা প্রতীক মাত্র। শরীরের অস্থিগুলির পূর্ণ জ্ঞান
লাভের জন্য বিদ্যার্থিগণ বাহিরের একটা কঙ্কালদেহের সাহায্য
লন। ভিতরের জ্ঞান প্রকাশ পাইলে বাহিরের প্রতীকের
আর দরকার হয় না ।
নার্থী হি ভবেত্তাব যাবৎ পারং ন গচ্ছতি।
উত্তীর্ণে তু সরিৎপারে নাবা বা কিং প্রয়ােজন।
উল্কাহস্তো যথা কশ্চিদ্ দ্রব্যমালােক্য তত্ত্বতঃ ।
জ্ঞানেন জ্ঞেয়মালােক্য পশ্চাজ জ্ঞানং বিসর্জয়েৎ।
যাহার জন্য জপ-তপ আদি সাধনা, সে হৃদয়-দুয়ারে দণ্ডায়-
এখন কি আর জপ-তপ লইয়া ব্যস্ত থাকিলে চলে!
প্রাচীন পূজা-পদ্ধতির দ্বারা নিজের ভিতরে জগতের
ভিতরে শ্রীভগবানের দর্শন ধ্যান ও সেবাদি দ্বারা জীবন
সার্থক করিবার যে প্রণালী নির্ধারিত ছিল, বর্তমান পূজা-
প্রণালীর ভিতরেও আমরা সেই লক্ষ্য দেখিতে পাইলাম।
ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ
হরি ওঁ তৎসৎ
=
মান ;

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Puja

Author
Not Available
Title
Puja
File name
Puja
Text
OCR done
Citation
1939
Published
2010/04/16
Publisher
Chunilal Sanyal, Calcutta
Language
Sanskrit
Pages
189
Library
Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly
Classification
Bengali Verse
Keywords
Puja
DLI number
511293
Barcode
4990010018454.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
yJDs3kRlr6v
Download PDF

Puja