Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Bijayangoradhip Maharaja Ram Natak

Mukhapadhyay, Ramchandra · 2009/09/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বিজয়নগরাধিপ মহারাজা রাম
নাটক
এরানচন্দ্র মুখােপাধ্যায়
প্রণীত।
৯৯১
কলিকাতা
বাল্মীকি যন্ত্রে
শ্ৰীকালীকিঙ্কর চক্ৰবৰ্তি কর্তৃক
প্রকাশিত।
১৩১৭

নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ
মহারাজা রাম
বিজয় নগরের অধিপ।
রাণী
মন্ত্রী।
হেমাঙ্গিনী ও হেমাবতী রাজার দুহিতা।
কুমার
রাজার পুত্র।
ভদ্রক
রাজপরিবারের পালিত, কুমারের
বন্ধু।
যশরাজ ও মহিমান
মােহিনী
অম্বালিকা
জীবন
প্রধান নাগরিক, রাজার বন্ধু ।
কুহকিনী, রাণীর সহচরী।
হেমাঙ্গিনীর সহচরী।
ঐ
সহচর।
যুদ্ধাগত রাজগণ, সেনাপতি
সৈন্যগণ পরিচারিকাবর্গ কৃষকদ্বয়
ইত্যাদি।

বিজয় নগরাধিপ মহারাজারাম
নাটক।
প্রথন আঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
বিজয়নগর, চতুর্দিকে নন্দোৎসব ও নগরসজ্জা।
একটা রাজপথে মহিমান ও যশরাজের প্রবেশ ।
যশ ।
;
মহি।
কুসুম উৎসবের এমন ধুম, আর
কখন হয় নি। শোভা সজ্জায় সহর
শতদলে ফুটেছে ; আনন্দ দিক ব্যেপে
তরঙ্গায়িত হচ্ছে ।
রণীর উৎসাহেই
উথলে উঠেছে এত।
আশ্চর্য! এ দিকে
স্বামীর অবস্থা এই, আমাদের মেলা-
খেলা, কিসে ভাল লাগে।
কার ভাব কেটা
যশ ।
মহি।

২
মহারাজারাম।
•
জানে । কিন্তু আমরা তার বন্ধু, সত্যই,
এ আমোদ আমাদের বিষবৎ।
যশ।
আরাে
মহি।
নগরই রাজ্যের মুখ, রাজা আঁখি তার ;
আঁখি মুদে, মুখে হাসি ভাল কি দেখায় ?
সত্য, আহা, হেন রাজা কি রকম করে
জানি বল, আমরা তঁার বিকৃতি কারণ ;
ঝপ দিয়া পড়তে ইচ্ছ। তঁার উদ্ধারেতে।-
{ক্ষণ বিরমে )
রীর শোক(ই) এর, অবশ্য কারণ।
আঃ,
কি বল বা, অপরে আসক্ত, মুগ্ধ, অন্ধ
হয়ে যিনি, মুখ(ও) দেখতে যার চান নাই,
সিংহাসনচ্যুত করে, অজ্ঞাত বাসেতে
রেখে এক রূপ, কি লাঞ্ছনা করেছেন,
ঊরই মৃত্যুতে কি এত হয় ? অসম্ভব !
মহি। ২া, তা, কিন্তু-উৎপত্তিএর, পরক্ষণেই,
মৃত্যু সম্বাদটার। ভোজ বাজীময়, এ
মানব চরিত্র ; ছোঁয়া পেলে কিছুরি র,
কি দ্রব্য কি গুণে, ভাব অদ্ভুত দেখায়।
মন(ও) নিজে আপনিই কখন উন্মত্ত,
কখন রিপু-আগুনে ছার ধাতু মাত্র ।

প্রথম আঙ্ক।
যশ ।
মাংসের এ, রস ও উত্তাপে, কতক্ষণ
থাকে বল বিবেক আকাশ পরিষ্কার ?
জীবনের খেলা ভাই, কিছুই বলেনা ।
কিছুই অসম্ভব নয় ; যে জন একদা,
পাষাণে পরিণত প্রেম, ভাঙ্গতে পেরেছে
নূতন প্রেম লেগে, সে আবার যে, পূর্ব
প্রণয়ের জন্য, ক্ষিপ্ত, উন্মাদ হবে না,
কে বুলিতে পারে ?
হ। তা বটে; কিন্তু—আচ্ছা,
ঢল, কাল একবার পীড়াপীড়ি করে,
দেখব গিয়ে তারে ; বার যদি করতে পারি
নিগুঢ় ভাব ।
কিন্তু তা, বলচি আমি আগে,
দেখবে তুমি, প্রকাশ পেলে ভাব, সে আর
কিছু নয়, দুশ্চিন্তা, যে কারণেরি হােক ।
আর কি কারণে হবে, ( সৌভাগ্য প্লাবনে,
দিক ভাসিতেছে তঁার ) শোক চিন্তা বই ।
দেখনি কি, চিন্তা তার খেই ছাড়া নয়,
বয়ে পড়েছেন দূরে যদিও কোথায়,
প্রকাশ পায় যা, সে, একই চিন্তা-পথের
অন্ডায় নিশ্বাস ফেল। বায়ু রােগ মাত্রে
নর, আত্ম জ্ঞান হত, ভায়া বেড়ায় ।
মহি।
}

মহারাজারাম।
•
আত্ম জ্ঞান দৃঢ় এতে, গভীরে গভীরে।
চেতনে তুলিলে, তিনি কঠিন শ্রমেতে
কি খনিতে খাটছিলেন, স্পষ্ট বুঝা যায়,
অঙ্গের ক্লেদ দেখে ; বিভ্রমে ভাষা ধেতি
অঙ্গ নয়।
যশ।
যাই হোক, এমন সময়ে,
বিশেষ চেষ্টাই এর করাই উচিত।
বায়ু রোগই, বাহ্য ভাবে বােধ যেন হয় ।
কেমন কেমন ভাব, নিভৃতে পলাতে
কেন ইচ্ছা; কি করেন সেথা, কিবা আছে ?
মহি। যাই হোক, প্রকাশ যদি পায়, দেখিবে
তখনি, এখন কি কাজ। এস এখন ?
( উভয়ের প্রস্থান)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
একটি গৃহ।
হেমাঙ্গিনী চিন্তাভরে উপবিষ্ট, হেমাবতী দাঁড়াইয়া।
হেমাব। আমার পাখিটিকে জীবন বুঝি ধর্তে
পারেনি। যে উৎসবের গােল, কোথাও ত

প্রথম আঙ্ক।
পাবে না বসতে, হয় ত উড়ে উড়ে কোথা
গিয়ে পড়বে। দিদি, তার ত বাসা নেই, তা
সে কি এই রাতে কোথা মরে যাবে?—যদি
তা যায়, তবে আমি এই রাত্তিরকে শাপ
দেব, এ চাঁদের মুখ আর কখনই
দেখ ব না।
হেমাঙ্গি। (হেমাবতীর মুখ পানে তাকাইয়া )
কি সুন্দর এ, হেমা, তুমি স্নেহ
শিখেছ, ব্যাকল হতে শিখেছ, দরদ
শিখেছ।
( দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ )
আহা, আঃ, কি চমৎকার বস্তুই
হে ঈশ্বর, মানবহৃদে তুমি দিয়েছ ;
বিদ্যুৎও কখন মেঘে এমন সুন্দর
ক্রীড়া করতে পারে না!
( হেমাবতীকে বিস্মিত দেখিয়া )
তুমিও এক দিন,
হেমা, এই স্নেহের ছবি ছিলে । মায়ের
চক্ষু, তুমি নড়িলে চমকিত, ছুটিলে
আকুল হতো, পড়িলে অন্ধকার দেখত ।
সেই চক্ষু প্রহরী তােমার ঘুমায়েছে ।
সেই প্রীতির চামর, সুখের দোলন
বাহু-যুগ নেই আর। সকল ভয়ের
;

মহারাজারাম ।
।
নিরাপদ হৃদ-দুর্গ সেই, ভেঙ্গে গেছে ।
এমন বস্তুতে তুমি বঞ্চিত হয়েছ,
হেমা, মিলবে না বা আর, সংসার দিলেও।
( দীর্ঘ নিশ্বাসে অধোমুখ )
হেমব। হা মা, মা গো, তুমি কোথায় ! (রােদন )
হেমাঙ্গি।
না না আর তার,
নাম ধরে ডেকো না, ডেকো না আর তারে।
খুব (ই) তোমূত্রা করেছ তাঁর, অগ্নি কুণ্ডের
খু টি হয়ে, পোড়ায়েছ রে দে তােমরা তারে।
ছিড়ে ছিড়ে খাওয়ায়েছ গৃধ ফুল দিয়ে,
ঝুলাইয়ে রেখে এই সংসার আগায়,
হৃদের বড়সী হয়ে।
হেমাব।
ও মা !
হেমাঙ্গি।
জানি না তো ?
তােমারই যন্ত্রণা হেতু হয়ে ছিলে তঁার,
যখন, এ জীবন-যােগের ধ্যাত তার,
শপ:বর দিয়ে স্তরে ত্যজিলেন, করে,
হৃদ-রাজ্য অন্ধকার, সংসার শ্মশান
মাত্র, কিবা অরি ছিল ইহ লােকে তঁার,
অপমান, ঘৃণা, লজ্জা, অনুতাপ আদি
অসহ্য দহন মাঝে, ছট ফটি বিনা ।
তােমরাই তখন, হেমা, বাধা হতে তঁার,

প্রথম কাঙ্ক।
;
শান্তিরাজ্য পলানার, জুড়াবার স্থান।
একবার তোমাদের অছাড়িয়া ভূমে
ফেলে পলাতেন, এসে সরোদনে পুন,
বার বার মুখচুস্ব করিতেন স্নেহে,
যত্নের হারান ধন পেয়ে যেন বুকে ।
ওঃ হেমা, কি জঘন্য পাপ জীব আমরা ;
নিশ্চিন্ত রয়েছি আমরা। এ সকল ভুলে !
( দীর্ঘ নিশ্বাস ),
হেমাব । হা মা, মা আমার, ম–অত্যন্ত রোদিন )
হেমাঙ্গি। ( হেমাবতীকে ব্যাকুল দেখিয়া মনে মনে )
কি করলাম !–কেঁদো না,
হেম, চুপ কর ।
হেমব ।
তুমি মনে করে কেন,
দিলে আমা, মায়ের কথা ?
হেমাঙ্গি।
আশ্চর্য এ !
বুন, একবার মাত্র মনে পলো বলে
তােমার, মায়ের কথা, কাদিলে তাতেই,
অন্তর আমার, খুলে যদি তোমা পারি
দেখাতে, দেখিবে তুমি, কঠিন পেঁচের
দুঃখ-ঘটিকা-যন্ত্র উহা, স্মৃতি-শলাকা,
মুহূর্তে মুহূর্তে যাতে আঘাত করিছে ।
কেঁদে কিবা ফল বল ; চক্ষের জলেতে,

মহারাজারাম।
কঠিন দুর্দৈব কভু কোমল হয় না।
হেমাব । হা দিদি, আমি তবে কিছুই ত জানি না।
হেমাঙ্গি। কেন, এখন ত তুমি বুঝতে পার এও,
পাপিনী রাণী কেমন শত্রু তােমাদের ।
কি করেছে বাবাকে, কেমন ছিন্ন ভিন্ন,
করেছে সংসার ছাড়া মাকে, লাঞ্ছনায়।
নাম মাত্র রাজপুত্র, রাজকন্যা তােমরা ।
হেমাব আঃ, ডরায়ে মৰুক সে, অন্ধকার মাঝে ?
হেমাঙ্গি। অম্বালিকে অসচে এই, উৎসব দেখগে,
না হয় ।
তৃতীয় দৃশ্য।
( সেই গৃহ, হেমাঙ্গিনী, হেমাবতী ও অম্বালিকা। )
এ কি, তোমরা এখনাে সাজনি ?
বাসন্তী উৎসবে আজ নগর ফটেছে ;
পদ্মের কলিকা তাের, রাজার দুহিতা,
এ কি ভাব তােমাদের ?—কোণের বধূও
হয়েছে ঘরের ব’র ; বড় কাঙ্গালিও

প্রথম অঙ্ক। ৯ পরেছে যেমন হোক ভাল বস্ত্রখানি ; বিধবাও হাসছে আজ- হেমাঙ্গি। হাসুক সকলে, সখি, হাসিবারি দিন, তুমিও হাস গে। অম্বা। কারে লয়ে হাসব বল, তুমিই আমাদের আনন্দ ঝড়ের শিরবতী ? (হেমাবতীর প্রতি) চল, হেমা, চল ? হেমাব। না, আমি যাব না। ( একদিগের আসনে গিয়া উপবেশন 1) অস্থা। ( বিস্মিত ভাবে ) আঁা, একি, হেমাঙ্গি! এ কি ভার তোমাদের ? আশা করে আছে সকলেই। হেমাঙ্গি। কি জন্যে ? কি জন্যে ? লয়ে যেতে, কুসুম ক্রীড়ার ঘরে ; নয়ন রঞ্জন, স্পর্শপ্রীতিকর আর রমণীয় ঘ্রাণ, যা কিছু সংসারে আছে ডুবাতে হাতে। ক্রীড়া-ঘরে লয়ে গিয়ে ভাসাতে সঙ্গীতে ; শোনাতে সঙ্গীত আর শুনিতে সঙ্গীত। ভােজন আগারে বস্তু খাওয়াতে এমন জিহ্বা দুবে যাবে যার মধুর অস্বাদে

মহারাজারাম।
কেন,
শয়ন মন্দিরে শেষে কুসুম-শয্যায়,
রেণুর বালিসে সুখে করাতে শয়ন,
পাড়াতে যেখানে ঘুম শান্তিনিমজ্জনে ।
কিবা আমাদের সুখ তােমাদের লয়ে,
ইহা চেয়ে আর, কি আমােদ এর বাড়া।
হেমাঙ্গি। আঃ সখি, কি এ সব, বুঝিতে যে পারিনে।
আমাদের এই করে সুখী যদি হও,
নাক, কান, আমাদের শরীর এ সব,
লয়ে যাও তবে।
অন্যা।
একি কথা বল ?
হেমাঙ্গি।
চক্ষু কর্ণ তুষতে চাও, তাই লয়ে যাও
আমাকে তুবার কৈ কিছুই ত বল্লে না?
অম্ব। তা, সত্য, সংসারে আছে এমন কি, যাতে
মন তােষা যায়, মন যদি আপনি না
তুষ্ট হয়।
হেমাঙ্গি। অঃ, না, অস্বা, সামান্যতে তুমি
তুতে পার উহা । এক্টী বাক্যে, ক্ষুদ্র বুকে।
‘আহ’ বলে যদি তার পাশেতে দাঁড়াও,
সকল বন্ধন ছিড়ে ছুটে এসে মন
তোমার চরণ তলে লুঠিতে থাকিবে,
দেখিবে তােমারে যেন সংসারের প্রভু।

প্রথম অঙ্ক।
অম্বা। ( ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া )
সখি, একটা কথা, তােমা, বলিতে সাহস
করি, শােন যদি কথা-দেখ, আর কেন ;
যা হবার হয়ে গেছে ; সংসারে সকলি
হয় । আমি বলি, সুখ নৈলে অকারণ
জীবন যদি, সব ভুলে সুখ (ই) খুজতে হয় ।
দেখ, তােমার মা আর নাইত এখন,
হাত(ই) বা কি আছে তার ; তাই আমি বলি,
সংসারে এখনো, সুখ যাতে হয়, কর ।
রাণীর সঙ্গে সদ্ভাব করে, জ্ঞান কর,
তাকেই আপন মা।
হেমাঙ্গি।
কি, কি বলিলে তুমি ?
ধিক্‌, ধিক সে সুখেতে, সুখ মহাশত্রু
আমার। হা, মা আমার নেই বলে আর,
ভুলব
আমি তারে ? যার জীবনী শােষণে
এখনো জীবিত এই ? কে আমি, বলত?
মায়েরি সৰ্ব্বস্থ নই, ভারি ক্রীত দাসী,
শরীরের রক্তে কেনা-যাও অম্বালিকে,
আমার সম্মুখ হতে, ও কথা বলাে না।
ওঃ, বিশ্বাসঘাতিনী আমি, মহা কৃতঘ্ন,
মাকে যদি ভুলি আমি, নাই তিনি বলে,
তঁার(ই) শক্ত প্রতি পুনঃ প্রীতি দৃষ্টে চাই।

মহারাজারাম।
=
অম্বা। ( অপ্রতিভ ভাবে ?
না, ভা, দেখ, এমন কিছু মনে করো না।
তােমাকে আমরা ভালবাসী আন্তুরিক
তাই,—সত্য বল চি, ভালবাসী অকপটে
তােমাকে সবাই
হেমাঙ্গি।
ওঃ না, না ; না অম্বালিকে,
অকপট ভালবাসা উহাকে বলাে না,
পবিত্র প্রণয় নাম কলঙ্কিত হবে।
মিশিতে পারেনা স্বার্থ প্রণয়ে কখন,
গর্মেতেও মিশে উহা, এও বলতে পারি।
স্বার্থ রস সংসারের পাতায় পাতায়,
শিরায় শিরায় তার ; কিন্তু প্রেমমূলে
স্বার্থ থাকা দূরে থাক, মিশিতেও ওতে
পারে না কখন, দূরে থাকতে না পায়।
উজ্জ্বল প্রেগজ্যের আকাশেতে কভু,
স্বার্থ ক্ষু মেঘ খণ্ড দেখা নাহি যায় ।
হ অম্বালিকে, ঢলে যবে পড়ে প্রেম
বস্তুর উদ্দেশে, সব স্বার্থ তলাইয়ে
যায় তার স্রোতে !
তা সখি, আমি জানি না,
কেমন ভালবাসি।
হেমাঙ্গি।
স্বার্থ শূন্য কি উহা

প্রথম অঙ্ক।
বলতে পার হেন ?জেনো স্বার্থ ও প্রণয়ে
বড় বিপরীত ভাব। উর্ধেতে দাঁড়ায়ে,
আকর্ষিয়া তোলে স্বার্থ বস্তুকে উহার
আপনার দিকে, পুষ্ট করিতে আপনা ;
উচ্চে থাকা দূরে থাক, সমক্ষেত্রে কভু
দাঁড়ায় না প্রেম তার বস্তুর সহিত,
দ্রব হয়ে ঢলে পড়ে চরণে উহার ;
অবশেষে স্বত্ত্বা শুদ্ধ বিসর্জন দিয়ে
মরে তার লেগে-দেখ অলিকে, তুমি
ভগ্নীর স্বরূপ ছিল না আমার, এক
দিন ?
এখনও তাই আছি, বল যদি
অম্বা।
তুমি ।
হেমাঙ্গি। বলচ তুমি, ভালবাস আমাকে না?
অম্বা। কেমন করে বলব।
হেমাঙ্গি।
দেখ, তুমি আমাকে
তােমার মুখে টেনে নিতে চাচ্চ, আমার
দুঃখে দুঃখী না হইয়ে। এই কি তােমার
অকপট প্রেম, স্বার্থ শূন্য ?
( অম্বালিকা সলজ্জে অধোমুখ)
যাও সখি,

মহারাজারাম ।
আনন্দ উৎসব সব, সব বয়ে গেল।
( প্রস্থান, হেমাবতীর তৎপশ্চাৎ প্রস্থান।)
চতুর্থ দৃশ্য
( অম্বালিকা একাকিনী ক্ষণ নিস্তব্ধে ।)
আ, একি ; আমি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেলাম
একেবারে যে ; গেলাম, ধূলা হয়ে উড়ে !
{ মেনিভাবে প্রস্থান।)
পঞ্চম দৃশ্য।
উৎসব গৃহ আলােকিত, সুসজ্জিত ও সুগন্ধিত। কুসুমসিংহাসনে
কুসুম শয্যায় উন্মনাভাবে রাণী উপবিষ্ট। পাশ্বে সঞ্জীকৃত অপর
সিংহাসন। সম্মুখে বহুবিধ কুসুম কাৰুকার্য্যের উপহার ও গন্ধদ্রব্য।
সহচরী ও পরিচারিকা বৰ্গ রাণীর সজ্জা ও সেবায় নিযুক্ত, নর্তকীরা
যন্ত্রসহ প্রস্তুত।
এক সহচরী। দেখত, কি চমৎকার সাজ হলাে ! ইচ্ছা
তার পথ হারিয়ে, অন্ধ হয়ে দাড়িয়ে ;

প্রথম অক্ষু।
জানে না কোথা আর পথ তার।—কি দেব
চক্ষের মণি ।
দ্বিতীয়।
এখন কোথায় ?
দ্বিতীয় ।
কি দেবে সত্যি, জানিনা ত।
তৃতীয়। সকলি হয়েছে ; আর, এখন কেবল
একটি হলেই হয়।
প্রথম ।
সেটি কি, বল না ?
তৃতীয়।
( সকলেই তাহার মুখ নিরীক্ষণ)
যা নৈলে সব সাজানই
মিছে ; যেটি দিলে খালি, কিছুই না দাও
তাতেই কেমন শােভা !
সেটী কি বল না ?
তৃতীয়। মহারাজকে এনে দাও; দেখবে এখনি,
যত সাজ সকলি, সহস্র চোখ খুলে,
তাকাবে ফুটে।
প্রথম।
হ্যা, ঠিক; সেটি মােহিনী
পরাল বলে এনে।
রাণী । ( সম্বরিত নিশ্বাসে ।
যাক, থাক আর সব ;
আর কাজ নেই, বসো। নাচ হােক একটু।
নর্তকীগণের মধ্যে একজনে গীত ও নৃত্য, অপর সকলে বিবিধ
৩•
বাদ্য বাদন।

মহারাজারাম। গীত । রাগিণী ইমন।—তাল একতালা। গাওরে যশগীত সবে তার ; রাজরাজেশ্বরী রূপেতে যাহার, সিংহাসন হয়েছে ভার। কাঞ্চনফুলের চরণপদ্ম, কামিনী, বকুল পঞ্চম পায়, কি শোভারে, হৃদরে রে, প্রফুল্ল কমল মালা ; গাথা, জাতী, জ, তী, সেঁউতী সিমন্তহার, ওরটউৎপল চন্দ্রমা তার, শােভিত ভালােপরে ; দোদুল্য কদম্ব কুণ্ডল কর্ণে, জ্বলিছে মুকুট গােলাব রত্নে, বিবিধ সুগন্ধি আমোদ, অঙ্গে, বীজনী উড়ায় । ( সঙ্গীত বিরামে মােহিনীর প্রবেশ ।) যষ্ঠ দৃশ্য। একজন । মােহিনী। ( মােহিনীর অগমে সকলে তটস্তভাব) কি মােহিনি, মহারাজ আসছেন ? আচেন নাচ উঠে সর, নাচ গালি দিয়ে ; রােদে বৃষ্টি আজু শেয়ালির বিয়ে । অসচেন- প্রাণভয় আশা, কুল ভরা ছাই ; যে চাহিবে যত, দেব ভায়ে তাই। আসচেন- প্রথম অঙ্ক। ১৭ হা করে সবে, কি খাব বা যেন, যুঠর মধ্যে ছা, পলায় না যেন। আসছেন- আসনে, আস চেন, এসেছেন রাজা, ঢাক ঢোলে কাটি, সাত ভাল বাজা। সহচরী। বাবা, ঘাট হয়েছে আমার। দ্বিতীয়। কি হলাে? বল ভাল করে ? মােহিনী । শোন, ভালকরে তবে ; শোন ভাল করে, খুলে কাণে ছিপি, ঢোকে যেন কাণে, বচনের ঢিবি। আসিছেন রাজা, পাছ পায় চলে, কাছ করে দূর, বায়ু ফেলে ঠেলে । তৃতীয়। কি, তিনি কোথা গেলেল ? মােহিনী। যে দিকে দুচোখ ? যে দিকেতে সোজা হয়ে আছে নাকি। তৃতীয়। হা, এলেন না মহারাজ এমন সাধেতে ! মােহিনী। কপাল এ সব, কপালেই করে, আশার যে ফল, কপালেই ধরে । গল বন্তে গিয়ে, জানালাম কথা, রাণীর নামেতে নমাইয়া মাথা। বােকা হয়ে যেন, রহিলেন চেয়ে,

মহারাজারাম।
স্বপ্ন ভাঙ্গ। লােক, ধন্ধবৎ হয়ে ।
উঠিয়া বারেক, বলেন আবার,
উঠ বস্ হলো, এরূপে ক বার ।
উঠে একবার, এসে চারি পা,
চেয়ে মাের পানে, মুখ করে হায়,
বল গে রাণীরে, অসুখ আমার।”
ভাঙ্গা বাধ স্বরে বেল বঁাহার।
অপরাধ যেন মার্জনা করেন,
মার্জনা যেন অপরাধ করেন।
দুই চো যেন পূরে এলাে নীরে,
পাছে ফিরে গেলা, চলে ধীরে ধীরে।
একজন। হা, কি হলাে! এত সাধে পলো এত ছাই!
রাণী। যাও তোমরা সব, ভেঙ্গে দাও, যাও চলে।
( মােহিনী ব্যতীত রাণীর ও সকলের বিমর্ষভাবে প্রস্থান।
মােহিনী! (ইতস্ততঃ ক্ষণকাল চাহিয়া 1 )
কুহক কুটিল পথে কানাড়ে বেড়াই,
মানুষের মন পথ খুজে নাহি পাই ?
দেখিব কেমন রাজা ভাড়া-উড়ি খেলে,
সব জাল উড়ে নেব, খেই হাতে পেলে।
( প্রস্থান।)

প্রথম অঙ্কু।
অষ্টম দৃশ্য।
নিশীথ নিস্তব্ধ উপবন; ঝিল্লীর বা; উপরে চন্দ্র তারকা
জ্বলিত আকাশ। রাজা একটী কুঞ্জ পাশে দাঁড়াইয়া।
তারকামণ্ডল জ্বলচে, ঝিল্লীরব তবু ।-
কোথাও কি আছে স্থান এ হতে নির্জন,
পৃথিবীর চক্ষু যেথা না দেখে আমায় ;
কি শব্দ, কর্নেতে আঘাত করে, লক্ষ্য
কাইয়া না দেয় আমারে, গিয়ে আমি
নিবিদ হই যথা?-আঃ, না, কোথা স্থান।
চক্ষু কর্ণ নষ্ট করে, আপন অন্তরে
ৰুদ্ধ হব তবে? ওঃ, সেই, সেই স্থান
আরাে ভয়ঙ্কর, পূর্ণ, বিপ্লব বিগ্রহে,
দাবানল ঘাের যথা, অগ্ন্যুৎপাত মহা !
কোথা তবে যাব আর, কোথা স্থান আছে ?
হা স্বর্গ, শান্তি কোথা? নরহত্যা করেছি
আমি, কণ্ঠা কাটিয়াছি ; হৃদয়ে আশ্রিত,
বিশ্বাসী জনের বক্ষে ছুরি হানিয়াছি।
( অধীর ভাবে ক্ষণ পরিক্রমণে )
হ, আমি এসংসারের রাজা যে ছিলাম;
বিশ্বের সৌন্দর্যে মন ক্ৰীড়িত আমার,
বিচরণােন্মত্ত পক্ষী ক্রীডে যথা গাছে,

মহারাজারাম।
পত্রে পত্রে চুম্বী ফল ! কে ঘুচালে সেই
সৰ্বগত অধিকার। কেন এবে দেখি,
প্রত্যেক আমােদস্থলে পদার্পণ করতে,
গর্জি উঠে অরি দল, অভ্যন্তর হতে।
কার সৈন্য এরা সব, কোথা হতে এলাে ?
সত্যেরি বিদ্রোহী আমি, সত্য সেনা এরা।
সত্যের এ মুখ রাজ্য, যে রাজ্যের প্রজা,
সামান্য একটী পাখী, ক্ষুদ্র পল্লবেতে,
'চীৎকারে ঘােষিছে নিজ সুখৈশ্বৰ্য্য গীত।
সত্যের আশ্রিত জন মৃত্যুমুখে হাসে।
কিন্তু আমি সিংহাসনে, রাজ-রাজেশ্বর,
অটল গভীর ভাবে স্তব্ধ চতুর্দিক,
চাহিতে সহস্র লােক উঠে খাড়া হয়,
ঐশ্বৰ্য্য, সম্ভোগ আশে, ফিরে, পাছে পাছে
কেন তবে জীবম্মত ? মৃত্যুও ত ভাল !
হ, কেহ কি পারে আমা, দেওয়াইতে আর,
এক পদ মাত্র ভূমি সত্য শান্তি রাজ্যে,
সমস্ত রাজত্ব, এই পরিধেয় সুদ্ধ,
দিই আমি তারে ?--কার সাধ্য পারে দিতে ;
অণুমাত্র যে রাজ্যের পাওয়া নাহি যায়,
জ্যোতিপূর্ণ এ আকাশ বিনিময় করে,
অনন্ত রতন গর্ভ। পৃথী দিয়ে কিম্বা।
?

প্রথম অঙ্ক।
( উদাসভাবে ক্ষণ নিস্তব্ধে।
দুৰ্বদ্ধি, করে আম মােহনিদ্রাভিভূত,
কোথা লতে ছিলি ? এই যোৱ, ঘােরতর
রাজ্যে ?—কে চিয়াল আমা?—ধ্বনি, বজধ্বনি !
“মরেছেন রাণী তাের পাপিষ্ঠ আচারে,
তোরে ভালবেসে, ভোরে বিশ্বাস করিয়ে।'
ভয়ঙ্কর এ চেতন!—বিভীষিকা দেশ,
বেড়ে দৃষ্টি একেবারে অন্ধকার, আয়,
দুর্মতি, এখনাে তোরে চাই আমি, আয়;
লতে কি পারিস তুই হেন মুগ্ধ করে,
অনন্ত কাল আমা?—না, তুই অপদার্থ,
আভাসে যাস ভেঙ্গে। (ক্ষণ নীরবে )
হা প্রবঞ্চিত আমি ;
খােয়ায়েছি স্পর্শ-মণি সংসার কষে,
অনুৰ্ধাৰ্য্য সে রতন, কোন তলগত ;
স্মরণ -দর্পণে মাত্র দেখি মূৰ্ত্তি ছায়া,
মরীচিকা অনুসারে, যায় প্রাণ যাক ।
( দীর্ঘ নিশ্বাসে প্রস্থান।

২২ মহারাজারাম । নবম দৃশ্য। রাণী। একটি নির্জন গৃহ, একটা দ্বারমাত্র খােল, একটা মাত্র দ্বীপ স্থিরও মভাবে জ্বলিত, রাণী মৌন- ভাবে উপবিষ্ট, মন্ত্রীর প্রবেশ। মন্ত্রী। একি, একলা যে, অমন করে?—কেন আমা? উৎসব ছেড়ে যে এক অমন কয়ে? আঁা? রাণী। (মুখ তুলিয়া) বাবা ! ( পুনৰ্বার অবনত মুখ) মন্ত্রী। কি, কি হলাে, বল ? আমি কিছুই বুঝছিনে; মহারাজ কোথা ? ওঃ বাবা, তুমি, তুমি বাবা আমাকে ভাসিয়ে দেও; আমি তােমাকে খয়েই আছি। আর আমার কে আছে। তুমি আমাকে ভাসিয়ে দাও ; আম অকুল পাথারে গিয়ে মরিগে । মন্ত্রী। আঃ কেন ? আমি ত এখন নই আশ্রয় তোমার পর্বত আশ্রয়ে তুমি রয়েছ এখন ; দক্ষিণাত্যের ঈশ্বর, মহারাজারাম, আশ্রয় তোমার। • রাণী। না, না বাবা; ওঃ, ও নাম করােনা আর । বিষ ও নাম, বজ, বাবা, }

প্রথম অঙ্ক।
আগুন ও নাম, কাণে অমর। যা তুমি
বল আমা, আমি আর শুন্‌ব না ও নাম।
বীণায় মিশায়ে গায় যদি কেহ, শুনব
তবুও; বায়ুর হিল্লোলে; মৃদু হয়ে
কাণে যদি আসে কভু, দিব কাণে হাত।
মন্ত্রী। কেন, কেন ; এত কেন ? নিষ্ঠুর আচার
করেছেন কি কিছু মহারাজ ।
রাণী।
আমি তা
জানি না; আমি তা আর বল্ৰ না। না বাবা,
আমি তা তােমাকে আর বলে জ্বালাতন
করব না। ভাসায়ে দাও আমাকে। আমি বৈত
আর, গলগ্রহ কেউ নেই এ সংসারে
তােমার । নিশ্চিন্ত হও তুমি ; আর কেন।
মন্ত্রী। হা, আমি কি তােমার মঙ্গলে বিরত ?—আঁা?
ভােমার কথা, বক্ষে শেল বিচে আমার ।
দুর্ভাগা আমি, ও, ধিক্‌ আমাকে ? আমি কি-
হা, আর আমার এই আছে কি সংসারে
তুমি বই! বয়সের বােৰা শিরে করে,
এত কষ্টে কার্যক্ষেত্রে কার জন্যে বল,
বিশ্রাম আমার নাই ?-ওঃ, কৃতঘ্ন তুমি,
কত সন্তান, ব ব আমি, যদি তুমি-
রাণী। অপরাধ আমার ক্ষমা কর বাবা।-হা,

২৪
মহারাজারাম।
মন্ত্রী ।
মরণ(ই) আমার ছিল ভাল।( উভয়েই ক্ষণ নিস্তব্ধ )
দেখ দেখি,
জীবন হেলেছে এই বয়সের ভারে
আমার, এখন তুমি(ই) তার একমাত্র
বু টি বল তে; আমার এ জীবন তােমারি
মঙ্গলায়ে, জান ভা? সামান্য আঘাত
পাও যদি তুমি, আমি হৃদকম্প টলি।
তুমি যদি আমা ভূমিশায়ী কর, কর ;
কিন্তু, বলাে না এ, আমি তোমায় ভাসতে
চাই।
রাণী। বাবা, আমারি অদৃষ্ট মন্দ। কোন
সামান্য লোকের ভাৰ্যা হলেও ত আমি,
স্বামীর আদরিণী হতে পারিতাম!
৬
মন্ত্রী।
বল, সত্য, সত্যই কি তবে, মহারাজ
অশিষ্ট আচার কোন করেছেন তোম।
প্রতি ? জান, এই রাজ্য আমি(ই) গড়েছি।
আমা প্রতি কৃতজ্ঞতা তাওত ঔার আছে ?
দুহিতা। আমার তুমি সংসারের মাঝে।
বিশেষ এ অবস্থায় তার দোষ লও ?
বিকৃত এ ভাব তঁার, দুর্ভাগ্যে সবার ।
রাণী। আঃ বাবা, আমার সর্বনাশ করাই

প্রথম অঙ্ক।
২৫
রোগ তার। দুরাচার, বড়ই কপট,
বড় প্রতারক, বড় কৃতঘ্ন, দুঃশীল,
বিশ্বাসঘাতক দ্য, কন্টা-কাট। নর ।
কি আর বলিব আমি।
মন্ত্রী।
আঃ না, আত নয় ;
স্থির হয়ে বল ; তিনি দেশ খ্যাত রাজা,
প্রতিষ্ঠা অটল তার, ভারত ভিতরে।
স্বামী হন তোমার।
রাণী।
বাবা, আলেয়াকে
পথদর্শক দেখায়ে দিও না। আমার
সঙ্গে তিনি, বড়ই চাতুরী খেলিছেন।
তােমাকে বলিলে তুমি মন নাহি দাও।
রোগ রোগ সদা কর, বলিলে পরেই ;
কিন্তু মন আমার কিছুতেই বােঝে না।
মন্ত্রী।
কেন, মনের এ ভাব কিসে হয় বল ?
রাণী। আন্তরিক ঘৃণা তিনি করেন এখন
আমাকে। উৎসবে আজ আহ্বান করলাম,
কত আয়োজন করে, সখিদের লয়ে,
কতই বিরক্ত হয়ে, কত ইতস্ততঃ
করে, শেষে, এলেন না, শরীর অসুখ
হয়েছে ওজর করে।-বাবা, কি বলিব,
অশৌচ বস্ত্রের ন্যায় স্মৃতি এখন
৪

২৬
মহারাজারাম।
;
হয়েছি আমি তাঁর। ( সজলনয়ন)
মন্ত্রী।
আঃ কেন, কান্না কেন ?
অবােধ বালিকা ভাব সকলি তােমার ।
চুপ কর ; এই ত কারণ, তা অমুখ(ও)
হতে পারে ; আরাে এও, আমােদের মভি
হতেও পারে তঁার, বিকৃতাবস্থায়।
যাই হােক্, তত্ত্ব আমি শীঘ্রই জানিব ।
ঘুমাও গে, রাত্রি কত হয়ে গেছে- যাও।
সামান্য বিষয়ে কেন গুৰুভাব আন।
( প্রস্থান।)
দশম দৃশ্য।
রাণী একাকিনী ক্ষণচিন্তায় ।
হা, রাজ্য আমার সুখ সিংহাসন, রাজা
গৌরব-মুকুট; ভেসে যাবে কি আমার,
এমন অদৃষ্ট-ভরা, অকুল পাথারে ?
বাবা, আমার কি তুমি, হবে না কিছুতে?
( দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগে চিন্তাভরে অবস্থান।)

প্রথম অঙ্ক
একাদশ দশ্য
*
রাণী ;-মােহিনীর প্রবেশ ।
মােহিনী। কি ভাব টা,—বল দেখি?
রাণী।
ব’ব আর মাথা!.
মােহিনী। ঐ কথাই বটে, তাতে ভাবনা কি তাের ?
বাপে আগে তাের, তুই হাতে আন দেখি।
রাজ্যের ঘুৰুক কল, তাঁর হাত দিয়ে ।
রাজার অন্তর আছে, আমি আছি আর।
রাণী। মনের উপরে কার, কি বিদ্যা বা খাটে!
মােহিনী। যােগিনীর বেটি আমি, কাপালির মেয়ে,
আঁধার দেখাব সৃষ্টি, কুহক ছাঁদিয়ে।
রাণী। কুহক কুহক তোর, বড়াই কেবল,
ভ্যাড়াকে দেখাগে যা, ও সব ভােগল।
মােহিনী। কি বলিস? নাক, কান কেটে দেব এই।
কেটে তুই নাক, কান, মাথা মুড়াইয়ে,
পথে বের করে দিস, গালে ছাপ দিয়ে।
না হলে কড়ার তেলে পােড়াইস মুখ,
পাথর ঝলয়ে দাঁতে, দিস্ যত দুখ ।
এত দিন কই, তার কি দেখলি তবে ?
মােহিনী। এইত পেয়েছি হাত দেখাব এখন,
রাণী।

মহারাজারাম।
আপন আনায় মাঝে পেয়েছি যখন।
শাপিনী, বিষুনী, ঘাের অন্ধ নাগপুরে,
পেলে কি নাগ-বিদ্যা লাগে দিক যুড়ে ?
ডুবেছে রাজার মন, আন্ধু অন্ধকারে।
নাকারে সাকারাকরি দেখাইবারে-
য, যা তুই এখন, যা ঘুমাগে বাতাসে।
গড়িব রাজার মনে আপনার আশে ।-
ঘাের অগ্নিকুণ্ডে ফেলিব কখন।
কখন ছিড়ি প্রবল ঝক্কায় ।
মেঘে তুলে কভু ফিরাব গগণ,
ফেলে দিব কভু পাষাণের গায় ।
জ্ঞান শূন্য, নিয়ে বিভীষিকা দেশে।
চিয়াইয়ে, ফেলে পলাইব শেষে।
নরকের গন্ধে, অচেতন হবে।
পিচাসের শূলে, বিন্ধিয়া ঝুলিবে।
ত্রাসেতে পলায়ে যেত না এসে।
এ হৃদ-কুটিরে, নেবে স্থান শেষে।
রাণী। দেখিব কেমন বিদ্যা, দেখিব তা তাের।
মােহিনী। দেখি, দেখি, বাজী করে দেব ভোের।
উভয়ের প্রস্থান।

প্রথম অঙ্ক।
দ্বাদশ দৃশ্য।
ঊষা,—পূৰ্ব দিকভাগ পরিষ্কার, মলপ্রভা চন্দ্র ও প্রভাতি তারা
মাত্র গগনে। শয়ন মন্দিরের অলিন্দে উযামুখে অৰ্দ্ধমুক্ত
পরিচ্ছদে, আলুলায়িতকেশা হেমাঙ্গিনী একাকিনী
সঙ্গীত। অম্বালিকা প্রচ্ছন্ন ভাবে।
রাগিণী কালাংড়া—তাল আড়া ঠেকা।
গগণ প্রান্তরে শশী, বরণ উদাসে । যা ছিল কিরণ-ধন,
সংসারেরে বিতরণ, করে শেষে নিমগণ, অৰুণের গ্রাসে। পবন
বহিছে স্বনে, বিরাম না জানে, সংসার সংসার লেগে, না জানে
আপনে ; কেবল নরের মন, নরেরে বিদ্বেষে।—(নীরবে অবস্থান।)
অম্বা। (স্বগত) ওঃ কি স্বার্থপর আম্! এ স্বার্থের স্থান
কোথা হবে, সত্য ! এ সৃষ্টিতে ত, কৈ, এর
আধার নেই? অদৃশ্য, ভয়ঙ্কর কোন,
নরকে অবশ্য, পড়তে হবে এর ভারে।
হেমাঙ্গি, সামান্যমতি নস্ তুই। আমি
চিনতে পারিনিক ভােরে ।ওঃ দেবতা তুই!
দেবতাই বটিস, দেব মুর্তিও তাের।
বক্ষ তাের ঊষাবতী পূৰ্বাকাশ হতে,
দীপ্ত। কেশ-দাম দোলে পবন হিল্লোলে ;
শান্তির প্রতিমা সম বুদন সুস্থির।

মহারাজারাম।
৫
আঃ আমি, পূজিব তােরে, দেবতাই তুই।
( হেমাঙ্গিনির নিকটে অগ্রসর।)
হেমা। প্রত্যুষেই যে ? কি মনে করে ?
অস্বা।
একবার
তােমাকেই দেখতে।
হেমা।
কেন, এত তৎপরতা?
আশ্চৰ্য্য আমাতে কিছু ঘটেছে ?
অম্বা।
দেবত্ব
ভাব, আছে তোমাতে; এত দিন আমি তা
জানিতাম না, তাই প্রেম ভাবে তােমাকে
দেখিতে ছিলাম। আজ ভক্তিভাবে দেখব
তোমায় একবার ।
হেমা।
সে কি, কি কথা এ ?—
জাগ্রত দেবতা ত, আছেন তোমাদের।
সাত প্রদক্ষিণ, কর গিয়ে তারে বেড়ে ;
দেবত্ব দুরে থাক, মনুষ্যত্বও) আমেেত
কোথা?
অম্বা। আর না, হেমা, আর না ; ভেঙ্গেছে
অজ্ঞানের আবরণ আমার ; এখন
তােমার আঘাত অঙ্গে লাগিছে বড়ই।
এই ভিক্ষা, আজ হতে অবিশ্বাস আর
করােনা আমায় ; আমি তােমারি এ জেনো।

প্রথম অঙ্ক।
যান নি ?
হেমা। বড় সুমধুর বাক্য জিহ্বাতে তােমার,
শুনলাম।
অম্বা। (ক্ষিন্ন ভাবে) দুর্ভাগা আমি! তবু(ও) সন্দেহ ?
জিহ্বার বাক্য নয় হেমা, অন্তুরেরি, তা
যাই তুমি বল। ( অধােমুখ)
হেমা।
বল, বল যা বলিবে ?
অম্বা। (ক্ষণ নিস্তব্ধে )
আমারি এ দোষ ; বলি, বলতে যা এসেছি।
জান, কাল মহারাজ রাণীর আহ্বানে,
কুসুম-ক্রীড়া উৎসবে যান নি ?
হেমা। ( আশ্চৰ্য্য ভাবে )
তা, আঁর মনের ভাব তিনিই জানেন।
অম্বা। জান ত ভা, মহারাজ শান্তি-উদ্যানেই
করেছেন ভর, ত্যেজে রাণীর আয়ত্য
দেশ?--কেন, বলি আমি, নিগুঢ় কারণ।
সে আর কিছুই নয়, কেবল ইহাই,
এখন চৈতন্য তঁার উদয় হয়েছে
মনে। কি কাজ যে তিনি করেছেন, জ্ঞান
হয়েছে সম্পূর্ণ ভার। তােমার মায়ের
শােক, মহা প্রবল এখন তঁাতে। তাই
তিনি সদা চিন্তামগ্ন, কাজেতে বিরত।
লােকে বলে চিন্তাবায়ু রোগসূত্ৰ কিছু।

৩২
মহারাজারাম।
হেমা। আঃ অদ্ভুত কথা !
অম্বা।
রাণী সব বুঝেছেন।
কুসুম উৎসবে তাই এত ঘটা গর,
রাজার মনের ভাব বুঝতে ভাল করে।
রাজা না আসায় কাল সারারাত্রি তিনি,
কাল কীট দংশে, ছট ফট করেছেন।
(হেমাঙ্গিনী আশ্চৰ্যভাবে অম্বালিকার মুখ নিরীক্ষণ )
সকলি ইহার সত্য, মিথ্যা কিছু নয়।
এই লও দ্রব্য দিই তােমাকে একটি,
শেষের দিনের এই লেখা-চিঠি দেখ,
তোমার মায়ের। আম, বিশ্বাস করে এ,
(জান ও আঁমারে তিনি কেমন ভাবতেন।)
মহারাজে দিতে দেন । (কিন্তু থি, ধিক,
ওঃ ধিক্‌ আমাকে) আমি রাণীর ভয়ে, এ,
এত দিন দিই নাই তঁাকে। লও তুমি,
তােমাকে দিলাম। তুমি ইহার দ্বারাই
মনােগত ভাব বুঝতে পারিবে তোমার
পিতার।
(পত্র প্রদান। হেমাঙ্গিনী কম্পিত হস্তে পত্র গ্রহণ)
হেমা।
সখি, আঃ কি এ, মায়ের এ লেখা ?
মায়ের ?—আঃ, অম্বালিকে, কি বলব তোমাকে।
এ আমার, ও, আমার মায়ের লেখা ?-মা !

প্রথম অঙ্ক |
অঃ সখি ! কি দিব তােমা, এস, এস, তােমা,
বুকে থুই সখি ( জড়াইয়া ধরিয়া, পরে পরিত্যাগে।)
হা, মা, এ লেখা তোমার ?
কি লিখেছ তােমার স্বামীকে মৃত্যুকালে ?
সখি, এস, এস, তোমা আলিঙ্গন করি (পুনরালিঙ্গন)
কোথায় তােমাকে খােব সখি, এস, এস ।
( অম্বালিকাকে লইয়া প্রস্থান।)
ত্রয়ােদশ দৃশ্য।
একটি গৃহ; মন্ত্রী, যশরাজ ও মহিমান। যশরাজ ও মহিমানের
প্রস্থান। মন্ত্রী চিন্তাভরে উপবিষ্ট। রাণীর প্রবেশ ।
রাণী। (মন্ত্রীকে চিন্তামগ্ন দেখিয়া )
মেঘাচ্ছন্নের ন্যায় যে, মুখখানি ভার,
অবনত। কিসের ভাবনায় এমন
মগ্ন ভাব! ( নিকটবর্তী হইয়া)
কি বাবা, কি ভাব? আমারি কি
ভাবন ?
মন্ত্রী। (চমকিতভাবে) আঁা, হঁা;-বাছা, তুমিই স্বপ্ন আমার
ভেঙ্গেছ। হ, সত্য, আমি বুঝেছি এখন,
প্রবঞ্চনা খেলিছেন তেমা সঙ্গে রাজা।
৫

৩৪
মহারাজারাম ।
সহচরেরাও তার উশিরিল তাই ।
যশ ও মহির বাক্যে আভাস বেৰুল ।
হৃদয়-ক্ষেত্রের তুমি লতিকা বাজার,
রস-স্রোতগতি তার, তুমিই বুঝিবে।
অনুমান আমাদের মাত্র। আমি বাছা
কীটপূর্ণ বিষক্ষেত্রে বরাপেছি তােমাকে।
দংশনে ব্যাকুল আর জ্বালায় অস্থির
হতে দেখে, স্থির আছি। আমার কোমল
অঙ্কর, স্নেহ-বীজের, উদ্ধাৱিব তােমা
আমি। ভাল আমাদের, দুঃখের সাগরে
দরিদ্রতা অন্তরীপ। যাব আমি চলে
প্রতিজ্ঞা করেছি আমি, সব পরিত্যেজে
এ রাজ্যের, তোমা লয়ে চলে যাব দূরে।
রাণী। আ বাবা, ভাতেও আমি ব্যথা পাব ; পাৰ,
এমন বেদনা যাতে মরব আমি শেষে।
ফুটন্তু সৌভাগ্যে, আমি, জন্মেছি তােমার।
তুমিই আমারে, বাবা, কুসুমের কীট
করেছ ; তনুর আমি, স্পর্শে দ্রবে যাই ।
উজ্জ্বলকোমলদল, দলায়ে বেড়ান,
সৌরভ আম্রাণ করি, অভ্যাস আমার ।
গৌরব চূড়ায় চড়ে, ব্যাপক দৃষ্টিতে,
সুখরাজ্যসীমা আমি দেখিন্তি কখন।

প্রথম অঙ্কু।
রাজা গৌরবের
চূড়া,
রাজ্য এ আমার,
অসীম নয়নভরা সুখ অধিকার।
ছাড়িলে এ সব, বাবা, মরিব নিশ্চয়।
মন্ত্রী। কি বল এ ? তৃপ্ত আছ তবে তুমি ? সুখী
তবে তুমি, রাজার এ হতাদরেও কি ?
রাণী। গাছের লাঞ্ছনায় ঝড়ে, তৃপ্ত যেমন
পাখী!
মন্ত্রী।
খেপেছ কি তুমি কি করিব বল?
রাণী। মানুষের হাত যা, তাই কর। মনকে
ধরে ভদ্র কে করিতে পারে ? করে করে
বাঁধিলেও যা, আকাশ ব্যেপে উড়ে । ভাগ্যে
থাকে যদি, স্বর্গ সুখ, স্বামী আদরের,
হবে ; জীবনের সুখ, তাই রক্ষা কর
বাবা? সৰ্ব্বনাশ হতে চলল আমাদের
দেখ না ? রাজ্যের সব ক্ষমতা যা কিছু
গেল বলে আমাদের। পথের কুকুর
সম, হেয়াদ হতে চল্লাম আমরা।
মন্ত্রী! আমায়ও কি অবহেলা, করে থাকে রাজা ?
রাণী। অভাগী(ই) কারণ তার ! হেমাঙ্গি, কুমার,
রাণীর ছেলে তার। ভদ্রক, কুমারের
বন্ধু । ভদ্রকেরি হাতে, রাজ্য ও সেনানী
ক্রমে।

মহারাজারাম।
ওঃ,
মন্ত্রী।
ভদ্ৰক কি পারে, আমার অনিষ্ট
করতে? জীবন, ও সবু(ই) আমা হতে তার ।
রাণী। বন্ধুত্ব সদাই বাবা, ফেরে, হাতে হাত
ধরে ।
মন্ত্রী। তাই বলে কি আমি ভাবিতে সহসা
পারি, অমঙ্গল কিছু তার ? সেই দৃশ্য,
এখনাে অন্তরে আছে দেদীপ্য আমার ।
বলি তবে শােন, সেই অদ্ভুত, গভীর,
‘সুপবিত্র দৃশ্য-চিত্ৰ দুৰ্গ হস্তগত,
ঘাের গেলযােগ, ধূমে অন্ধকার দিক্‌ !
অগ্নি, অস্ত্র, মৃত্যুর এই চারিদিকে।
স্ত্রীলােক, বিবশ, ক্ষিপ্ত, তার মাঝে ; বক্ষে
প্রিয় পুত্র, শূন্য চক্ষে হেরে চতুর্দিক।
আমার, (ওঃ তখন কি আমি ? সংহারক
শত্ৰু ) মুখ পানে চেয়ে, একেবারে অস্ত্র
তলে, ভীতি শূন্য, স্থির ! বলিল কি, (বড়
নরাধম আমি, ওঃ, যদি আমি ভুলি তা,
এ জীবনে ) “যোদ্ধা, তুমি আমার হলেও
পরম শত্রু, আমার এই প্রাণ পুত্র
দিলাম তােমার হাতে। তােমার ধৰ্ম্মেতে
রক্ষা করা হয় এরে, রক্ষা করো। আজ
সংসার সম্মুখে তুমি দৃষ্টান্তু দেখাও,

প্রথম অঙ্ক।
৩৭
মহত্ব কি নীচত্বের নিজ। এই পুত্র
চিত্ৰ দুর্গের স্বামীর ; হত তিনি আজ
তােমার রাজার হাতে ; পত্নী আমি তাঁর।
নিরাশ্রয় পুত্রে, হাতে দিলাম তােমার ।
ধৰ্ম্ম সাক্ষী করে আমি, তােমার সাক্ষাতে
প্রাণ ত্যজিলাম এই।” সহসা মরিল
বামা বক্ষে ছুরি হানি—আমি কি কখন,
ভদ্রকের বিপরীতে অনিষ্টের ভাব
আনতে পারি, বিশ্বাসঘাতক হয়ে ?
রাণী।
ভরে
বাবা, হা, তবে কি তুমি আমার মায়ের
সকলি গিয়েছ ভূলে ? মনে কর দেখি,
আজীবন যিনি তােমা সংসার দেবতা
জ্ঞানে, পূজিলেন পােড়াইয়ে প্রাণ,
শেষের কামনা ভার আমারি মঙ্গল।
বিপদে না উপায় পেয়ে ভদ্রকের মা,
ভদ্রকেরে দেয় তােমা; কার মনােবাঞ্ছা
পূর্ণ করবে তুমি?
ও কথা, তা, কেন বল ?
তােমার মায়ের কাছে, ধৰ্ম্মতঃ, কাৰ্যতঃ
বাধ্য আমি। সকল ধর্মের ধর্ম, তুমি(ই)
আমার ।
মন্ত্রী।

মহারাজারাম।
রাণী।
আরাে দেখ তা, সেই সে ভদ্রক,
শত্রু হয়ে দাড়াইছে তােমার আবার ।
মন্ত্রী। যাও, বাছা যাও ; দেখি কি সংসার গতি।
( উঠিয়। প্রস্থান। রাণীও চিন্তাভরে প্রস্থান।)
চতুর্দশ দৃশ্য।
উদ্যানের একাংশ। একটি তমাল বৃক্ষকে ঘুরিয়া রাজা পরি-
ক্রমণ। তিনি গভীর চিন্তামগ্ন। মহিমান ও যশরাজের
প্রবেশ। রাজা তাঁহাদের আগমন অজ্ঞাত।
যশ। দেখ, এ কেমন ভাব, বাহ্যজ্ঞান নেই।
উভয়ে রাজার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ক্ষণেক ফিরিয়া পরে রক্ষের
অপর ভাগ দিয়া রাজার সম্মুখবর্তী। রাজা তাহাদের
দেখিয়া সহসা দণ্ডায়মান।
মহি। ধন্য, ধন্য মহারাজ, আপনার রাজ্যে
সামান্য প্রজার(ও) নাই অধিকার সীমা।
আমাদের ভাগ্যে যাই হােক ।
রাজা।।
কেন, সে কি ?
রাজ্য, এ রাজা, সব তােমাদের(ই) ইচ্ছায়
নমনীয় ?

প্রথম অঙ্ক।
৩৯
;
মহি। মহারাজ আমূরা, আমাদের
সুখরাজ্য, আপনার হৃদরাজ্য হতে
দূর হয়েছি।
অঃ, ভাই সুখরাজ। আর
নাই উহা—কখন(ও) ছিল না; মরীচিকা
দেশ এবে, মৰুভূম ছাের ! প্রবঞ্চিত
করেছি তােমাদের। সংসার এ সকলি
ব্যাপ্ত, যাও সুখে, দূর ভ্রমণ করগে ;
নরকে এসো না।
যশ।
কি বলেন, মহারাজ ?
আর আপনার কাছে অগ্রসর হই,
ধৃষ্টতা এও। ক্ষমা কৰুণ অপরাধ
অামাদের।
মহি।
কেন আপনি হেয় জ্ঞান
করিছেন আপনাকে ? নরকুল শ্রেষ্ঠ
আপনি, রাজ-রাজেশ্বর ?
রাজা।
রাজা আমি,-রাজা?
কুটির(ও) আমারো কেন, নাই অভ্যন্তরে ;
সৃষ্টি, মহা দুর্যোগ প্রায় এই, আমার
পক্ষে!
মহি।
দেব ! দয়া কি করবেন, আমাদের
প্রতি ? আপনার আমরা এরূপ ভাবের

মহারাজারাম।
কারণ জানিতে চাই। সৰ্ব্বদাই আমরা,
অনুমান করি মাত্র, নানা মত। রোগ,
ঈশ্বর করুন নাই হোক্। এ কি তবে
রাজমহিষীর শোকে বিহ্বল আপনি
এত ?
রাজা। শােক! আঃ, সে ত, সুপবিত্র প্রেমের
আসনে বসে। শােক!—আ, ভাই, অন্তরে
আসিলে শােক, স্বর্গীয়, পবিত্র, সহস্র
স্রোতে ভাসতে থাকে উহা ; মেহ, ভক্তি, দয়া
উথলিয়া উঠে হয় অকুল পাথর !
এমন পরিপ্লত ভাব কোথায় আমাতে।
জীবগি উত্তেজ আর সঞ্চলনকারী,
শােক, নাই হৃদরে আমার। মহা পাপ
গুৰুতর পাপাঘাতে, অন্তুর উষ্ণতা,
উড়ে গেছে আমার, জমেছে কাল-শিরে,
পাকিছে, পচিছে, তাহে কটোৎপন্ন সদা,
দরদ, যাতনা কত কি বলিব আর।
বিরাম আমার নাই।
যশ।
কি এমন পাপ,
মহারাজ, আপনাতে, এত ভয়ঙ্কর ?
মহি। মহিষিরে হতাদর তাতেই কি এত ?-
রাজাদের পুরাবৃত্ত এতেই ত পূর্ণ ;

প্রথম অঙ্ক।
৪১
কত ভাৰ্য্যা পরিত্যাগ, কতই গ্রহণ ।
সংসারে এ সাধারণ, কে লয় এ খোজ ?
রাজা। সংসারে এ সাধারণ-সংসার বিষম !
( অনন্য মনে প্রস্থান।)
মহি। তাই বটে, ঠিক, আমি যা বলেছি।
যশ।
কিন্তু,
পাগলেও যে সে খেই ধরে ।
দেখবে ক্রমে।
{ উভয়ের অপর দিক দিয়া প্রস্থান।)
পঞ্চদশ দৃশ্য।
রাজার পুন প্রবেশ ।
গেছে? ( চতুর্দিক নিরীক্ষণ করিয়া চিন্তা ভরে )
পূর্ণ পুরাবৃত্ত রাজাদের এতে !
ও প্রভুত্ব ! কি ক্ষীণ, চঞ্চল তাের চূড়া!
সুস্থিরে মানব তথা কে বসিতে পারে ?
সাধারণ সংসারে, এ ! কি তুমি সংসার !
ডোব তবে, কিম্বা আমা পলাইতে দাও
তােমা হতে কোথ। দ্য পূর্ণ, ভয়ঙ্কর
মহারণ তুমি ; কে তােমাতে কার নয় !

৪২
মহারাজারাম।
( ক্ষণ নীরবে পরিক্রমণে )
সকলি অগ্রাহ্য করা সেই কি শান্তি তবে ?
সেই কি সুখের পথ ? মন কি তাতেই
তৃপ্ত ? ভয়ের ভয়ে কি, অন্ধ হওয়া ভাল
তবে ?–আঃ না, চক্ষু পেয়ে দেখুৰ বিভীষিকা,
মর ব ডরাইয়ে, ভাল সে ও দর্শনের
সুখ বড়, অতুল্য । আমাতেও এই
সুখ, দেখিতেছি আমি আপন দুর্দশা।
না, আমি, সে সুখের পরিবৰ্ত্ত করব না।
কখন, যাই হোক ললাটেতে।—বিধাত!
এই কি বিধান শেষে করিলে আমার,
আপনা চর্বিত করে শাসিব আপনি ?-
ওঃ ধর আমার হাত, ধর, সৃষ্টি ধর?
{ অধীর ভাবে উপবেশন ও ক্ষণকাল
নিস্তব্ধ ভাবে থাকিয়া)
উপায় কি এখন, ভবে ?—নাই কিছুই ।
রব আমি এবে এই সংসার শানে,
সমাধি মন্দির প্রায় স্বদয়ে ধরিয়ে,
সেই মৃত প্রতিমূৰ্ত্তি ; জানি না বা আর,
কিসে হবে প্রায়শ্চিত্ত সে পাপ রাশির -
মানুষ মরিল মানুষের তরে, জানে
কে তাহার মুল্য ; ছার সংসার এ কাছে।

প্রথম অঙ্ক।
৪৩
এখনো যা আছে, করি তাই, তার লেগে ।
পূজা কৰি তঁারঅংশ সন্তানগণেরে ;
কিন্তু তাও পারি কই ?–পারিনাক তাও ।
অস্পৃশ্য পাতকী আমি, কেমনে ছু ইব
স্নেহের পবিত্ৰাধার ! কেমনে হেরিব
পাপের নিস্তেজ চোখে উজ্জ্বল দর্পণ,
দিব্য খর প্রেম জ্যোতি যাহে প্রতিভাতে ।
রাণি ! এড়াতে কি পারব আমি তোর হাত
কভু ? পর ব ন ভা, তবে, শীঘ্র গ্রাস কর !
( অবসন্ন ভাবে পতন )
==
যেড়িশ দৃশ্য।
রাজা অচৈতন্য ভাবে পতিত, সহসা অন্ধকার গঢ়, মোহিনীর
আলুলায়িত কেশে কুহকিনী সজ্জায় প্রবেশ । তাহার রাজার
নিকটে নিঃশব্দে গমন, রাজার অঙ্গে জলসেক ও বীজন।
রাজার সংজ্ঞা প্রাপ্তে, মহা বিদুৎ ও বজ্রনাদ। মােহিনী
অদৃশ্য হইয়া উব্ধ হইতে মৃত রাণীর স্বর অনুকরণে ।
মহারাজ।
রাজা। ( চমকিত ভাবে) কি এ সব ? আঁা, কি ? কি এ সব ?
আশ্চৰ্য্য ? আশ্চর্য্য! ওঃ আশ্চর্য !-হা তুমিই কি
প্রিয়ে!—মােহ, ঘাের মােহ ! শারীর ইন্দ্রিয়,

৪৪
মহারাজারাম
অর ইন্দ্রিয়, সব বিকল আমার।
কি দেখিলাম এ, কি শুনিলাম!—হা আমি!
মোহই কি এ ? প্রত্যক্ষ কিছু কি এ নয় ?
মােহই অবশ্য ; কোথা সংজ্ঞার জগতে,
এ সব ? হা, সংজ্ঞা রাজ্যে যাও দেখিতেছি
এও ত আশ্চর্য ; এ শরীর ও জীবনী,
ক্রিয়া, সকলি অদ্ভুক্ত, অদ্ভুত সকলি !
( বহির্ভাগে লোকের কথোপকথন। রাজা স্থির ভাবে
সেই দিক লক্ষ্যে দণ্ডায়মান।)
(মহিমান ও যশরাজের প্রবেশ ।)
রাজা। এই যে এখানে এরা ;
তবে কি ঘটিল ।
( বেগে আসিয়া মহিমানের হাত ধরিয়া)
এ কি, কি এ, মহিমান ?
মহি। (অাশ্চর্য ভাবে) কৈ, কি, মহারাজ ?
রাজা । ( অপর হস্তে যশরাজের হাত রিয়া)
যশরাজ, কি সব ?
কি, কই মহারাজ ?
রাজা। দেখনি তােমরা কিছু ? অন্ধ কার, বজ,
বিদ্যুৎ ?
যশ ।
কখন দেব ?
রাজ।।
এই মাত্র ?
যশ ।
কৈ, না ?
যশ ।

প্রথম আন্ধু।
;
রাজা। প্রবঞ্চনা কিছু নয় আমার সঙ্গে ত?
মহি। আঃ দেব, এমন সাধ্য এমন ধৃষ্টতা ?
• (রাজা উভয়ের হস্ত ত্যাগ করিয়া পশ্চাৎ ফিরিয়া
কিছু দূর গমন)
যশ। দেখ লে? এই দেখ ভাব!
সত্য, কি ভাব এ।
( ভদ্রক, মন্ত্রী ও অপর পরের প্রবেশ।)
মহি।
সপ্তদশ দৃশ্য।
(রাজা, মহিমান, যশরাজ, ভদ্রক, মন্ত্রী প্রভৃতি।)
মহি। (রাজার নিকটবর্তী হইয়া )
মহারাজ, রাজ্য চিন্তা করুন ক্ষণেক ?
সহসা ভদ্ৰক এই যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে।
রাজা। ( চমকিত ভাবে )
ভদ্রক। কৈ, কোথা? কেন, কি ঘটেছে সেথা ?
(ভদ্রকের নিকটবর্তী হইয়া )
কি ভদ্রক, তুমি যে সহসা ?—সৈন্য দল ?-
কুমার ?
ভদ্রক। আজ্ঞা, আমার অপরাধ, ক্ষমা
কৰুন ; বিস্ময় এত আমা হতে। শুভ

৪৬
মহারাজারাম।
সব ; পলাতক নই অামি সমরের ।
সৈন্যদল দৃঢ় বদ্ধ তেলিঙ্গানা বুকে।
কুমারের কি চিন্তা ? যবন রাজাদের
প্রবল আক্ৰমে, তার শীর্ষক চুড়াও
কম্পিত নয়।
রাজা। (মনে মনে) ইচ্ছা তােমারি, হা ঈশ্বর! ( প্রকাশ্যে )
তবে, কি সম্বাদ?
ভট্রক।
আজ্ঞা, ইদঘরের ক্ষেত্রে,
‘ভয়ঙ্কর যুদ্ধে জয়ী আমরা। দক্ষিণ
গলকও, সব(ই) হস্তগত আমাদের।
যশ। কি অানন্দ!
কি গৌরব, কি চমৎকার এ !
রাজা। তােমার এ, বড়ই প্রতিষ্ঠার কাজ,
মহি।
ভদ্ৰক ।
মহি। শত্রুরা কোথায় ?-কিরূপে এখন ?
যশ । যুদ্ধ হলাে কি রকমে, বলুন বিশেষ ?
ভদ্রক। উত্তরে শক্ররা ছিন্ন ভিন্ন ভাবে ফিরচে।
মহারাজ এলে পরে যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে,
শত্রুদের ইতস্ততঃ সঞ্চলন দেখে,
বুঝলাম আমরা, তার প্রবল উদ্যমে,
আক্রমণ একবার করবে আমাদের।
আমরাও দৃঢ়রূপে সম্বদ্ধ হলাম ।

প্রথম অঙ্ক।
৪৭
বলুন ?
মহি। অনুমান, আমরাও করেছিলাম তা।
আপনাদের কৌমার বীৰ্য্যকে, শত্রুরা
পরীক্ষা বারেক করবে, মহারাজ এলে।
ভদ্রক। বিদ্যুৎ বজের অংশ বুঝেছে তা তারা।
যশ । তার পর, কি
ভদ্রক।
রাত্রি শেষ ক'লে,
চরের জানাল এসে শত্রুরা নিকট
সত্বরেই আমরাও প্রস্তুত হলাম।
প্রভাতে একেবারে, বাল সূৰ্য্য কিরণে,
উভয় সৈন্যের, হাসতে লাগ্ল করবার ।
(রাজার অধিকতর মনোনিবেশ
মহি। তার পর ?
ভদ্রক।
শত্রুদের অশ্ব, দর্পে এসে
আরম্ভিল যুদ্ধ । অশ্বপতি আমাদের,
কুমার, সে আক্রম অবহেলে গ্রহণ
করলেন। পদাতিকেরাও সঞ্চরণে ক্রমে
হলাে অগ্রসর এসে। অন্যান্য অধ্যক্ষ
সকলকে লয়ে আমি বিষম সমর
উত্থান করলাম । চারিদিক ময় ত্বরা।
ভাঙ্গিয়া উঠিল যুদ্ধ, সাগরে তরঙ্গে।
ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড চারিদিক ময় ।
সহিল শত্রুরা যুদ্ধ, যাবৎ অধ্যক্ষ,

৪৮
মহারাজারাম।
বহুতর ভূমিশায়ী না হলে তাদের।
আকাশে উঠিল সূৰ্য্য দ্বিপ্রহর স্থানে।
ভঙ্গ দিয়ে শেষে তারা প্রস্থান করিল,
দিবসের মত। ক্ষণ বিরাম নিশ্বাস
ফেলিলাম আমরাও।
রাজা।
পুনরাক্রমণ,
শত্রুরা কি করেছিল ?
ভদ্রক।
আজ্ঞা হঁা; শুনুন।
তার পর দিবমান আমাদের, গেল,
পান ভোজনাদি আর বিশ্রাম লভিতে।
ঘাের ঘন-ঘটা দেখা দিল সন্ধ্যাসঙ্গে।
নিবিড় আঁধারে, ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রনাদ
একেবারে চতুর্দিক ভেঙ্গে উপস্থিত।
বিষম দুর্যোগে আমরা অতীব সতর্কে,
রহিলাম ।পাহারায় সৈন্যগণ খাড়া,
ভূমে হানি শেল, ভর দিয়ে তাতে, সয়ে
কোন মতে ঝঞা। নিদ্রা শূন্য আমরাও,
( কুমার ও আমি এক বস্ত্রাবাসে ) শুনি,
সহসা শিবির অগ্রে ঘের কোলাহল।
বিপদ জ্ঞাপক, বেজে উঠিল দামামা ।
আস্তে ব্যস্তে উভয়েই, (বৰ্ম পরিতেও
অবকাশ হলােনাক ) অস্ত্র ধরে ত্বরা

প্রথম অঙ্ক।
৪৯
বাহিরে এলাম। দেখি শত্রুগণ পুন,
ঘের পরাক্রমে এসে আক্রম করেছে।
মহি। ওঃ, পামরের দেখি যে বড়ই নাছোড়।
ভদ্রক। হেতু আছে। তার পর, উন্মত্তের প্রায়
কুমার, গভীর যুদ্ধে প্রবেশ করলেন।
সৈন্য সুশৃঙ্খল করে অমিও হলাম,
অনুবন্তী তার । যুদ্ধরব মিশে গেল
দুর্যোগ গর্জনে। একাকার অন্ধকারে,
কেবা দেখে কারে ।
যশ ।
মহাকাণ্ড, ভয়ঙ্কর !
ভদ্রক। বিপক্ষের আমার আগে, অল্প ক্ষণেই
ভঙ্গ দিল। দক্ষিণ ভাগে মহাকল্লোল ;
সেই দিকে কুমারের সন্ধানে গেলাম ।
দেখি খামাদের সৈন্য, ব্রাসে ইতস্ততঃ
ভঙ্গ দিচ্ছে। এক স্থানে চক্রাকারে যেন,
বিপক্ষেরা, ঘিরে কারে, অস্ত্র বর্ষিতেছে ।
অভ্যন্তরে শুনিলাম কুমারের রব,
বিপদ জ্ঞাপক, (“কে আছরে, কে আছ’) হা,
এই কথা ! ( অভিভূত ভাবে ক্ষণ নীরব )
রাজা হতাশ্বাস ভাবে ভদ্রকের মুখ নিরীক্ষণ ও শির ধারণ ।
কি ঘটিল তার পর?
ভদ্রক।
বলি ;
মন্ত্রী।
৭

মহারাজারাম।
!
বন্ধুর বিপদ জেনে, কেমন করে যে,
বিপক্ষদের কঠিন চক্র ভেদ করে,
ভিতরে গেলাম তার, বলতে পারি না তা।
বােধ হয় তার তুল্য সহজে কিছুই,
কখন করিনি আমি, জীবনে। ( দীর্ঘ নিশ্বাসে নীরব।
রাজা। (কিঞ্চিৎ দৃঢ় ভাবে ) ভদ্রক,
ওঃ, বােধের হৃদয় তাের বাছা ! যা হোক,
বল, অবিচল চিত্তে ।
মহি ।
কি হলো, বলুন?
ভদ্রক। বিদ্যুৎ আলোকে দেখি কুমার একাকী,
বহু সংখ্যক শত্রুর অস্ত্র, কোন মতে
নিবারণ করিছেন। আহম্মদ, জ্যেষ্ঠ
পুত্র যবনের, অসি উত্তলি, লক্ষ্যেছে
শির দেশ ভার।
( রাজাকম্পিত ভাবে আসন ধারণ)
আমি আর, সে আঘাত
কোন রূপে নিবারণ উপায় না দেখে,
একেবারে উভয়ের মধ্যে পড়িলাম।
আঘাত আমার অস্ত্রে প্রতিঘাত পেয়ে
পড়িল তবু, বক্ষে আমার। কিন্তু সেই,
দুরাত্মাকেও আর অস্ত্র তুলতে হলাে না।
কুমারের অস্ত্রাঘাতে তখনি সে দিল,

প্রথম আন্ধু। মহি। ভূমে আলিঙ্গন । রাজা। আ, ঈশ্বর! ( দীর্ঘ নিশ্বাস ) সর্ব শুভ। ভদ্রক। ঘটেছিল শেষে কি যে, আমি তা জানি না। শুনিলাম সৈন্যের, আমাদের দৃষ্টান্তে, উত্তেজিত হয়ে, একেবারে শত্রুদের দূর করে দেয়। রাজা। তুমি তা জাননা কেন ? ভদ্রক। অচৈতন্য তখন আমি, সেই আঘাতে। রাজা। কি, এমন আঘাত দেখি ? ; ( ভদ্ৰক আঘাত দর্শন ) অঃ এ তোমার আঘাত নয়, বক্ষে, বন্ধুত্বের গৌরব- পদক ধরেছ। এস, আলিঙ্গন করি। ( আলিঙ্গন) তােমাদের দ্বারা, হেন যুদ্ধ জয়, বাছা, রাম রাজার পরম সৌভাগ্য। এখন, করলে আপনাদের ঝুলতে পারা যায় দিতে, সমস্ত রাজ্যের ভার ।—কি বলেন, মন্ত্রি মহাশয় ? মন্ত্রী। বটে। রাজা। বিশ্রাম করগে, মহি।

৫২
মহারাজারাম ।
শ্ৰন্তু তুমি।
ভদ্রক।
আজ্ঞা, কোথা, বিশ্রামাবকাশ ?
সমস্ত যবন রাজ্য এক যােগ হ’ল,
আমাদের বিপক্ষে। বিরার, বিজাপুর ;
গলক, সকলেই ব্রাশে একত্রিত,
আত্মরক্ষা করতে, আর উদ্ধার করিতে
যবন গৌরব কম নয় আকাঙ্ক্ষাও ;
পারেন যদি তবে, হিন্দুকুল বিলেপি
করিবেন, একেবারে দাক্ষিণাত্য হতে।
মহি। ওঃ বটে ?
চক্রান্ত কি হয়েছে তবে ?
ভদ্রক।
হয়ে
গেছে ! গত যুদ্ধে তাই, বিরারের সৈন্য
কিছু সহসা আসায়, দ্বিতীয় আক্রম
তারা, করতে সাহসী হয়।
বটে, তাতেই ?
রাজা। অঃ মন্ত্রি মহাশয়, রক্ষা তবে কৰুন
আপনি সব । আপনি ভিন্ন কে পরিবে ?
মহেদ্যোগ কৰুন ত্বরা। এখনি পাঠান,
এ সংবাদ, দক্ষিণে যাবৎ হিন্দুরাজ্য ।
সকলের সাহায্য, আকর্ষণ করুন।
এ বিপদ আমাদের উপরেই, নয়

প্রথম তঙ্ক।
!
সুধু, হিন্দুরাজ্য শিরে সমস্ত, বলিতে।
ভদ্রক। যা হয় উপায় এর শীঘ্রই কৰুন।
চারিদিকে শত্রচ্ছাস বড় ভয়ঙ্কর।
আক্রমক নই আর আমরা সেখানে।
অধিকার রক্ষা মাত্র করাই হতেছে।
মহি। উপস্থিত সৈন্য যা এখানে শীঘ্র যাক ।
অপর যা আয়োজন ক্রমে হতে থাক।
রাজা।
( মন্ত্রীর প্রতি)
উপস্থিত সৈন্য যাহা, আশু যাক তবে?
মন্ত্রী। যাক্ তবে যা আছে, এখানে সৈন্য ।
রাজা। (ভদ্ৰক প্ৰতি )
বাছা,
বিলম্ব তােমার আর তবে সয় নাক ;
শীঘ্র উপস্থিত, যাও, হও গে যুদ্ধেতে।
বিশ্রাম করিও বাছা, কাৰ্য্য সমাপনে।
এক দিক দিয়ে রাজা ও অপর দিক দিয়া মন্ত্রী ব্যতীত
সকলের প্রস্থান ।
।

মহারাজারাম ।
অষ্টাদশ দৃশ্য।
?
t
মন্ত্রী একাকী ।
বৃথা এ নকুতা আর “রাজ্য রক্ষা কর।”
তুমি হর্তা, তুমি কর্তা, তুমিই বিধাতা।
বাক্যের নিশ্বাসে আমি উড়ব কি এখন ?
এত লঘু, এত মুঢ় ? ধিক্‌, আম ধিক!
এই ত যুদ্ধের ভার ভদ্রকেরি প্রতি।
অসার কার্যের ভার আমার উপরে।
গাথিবে সে অট্টালিকা, উপাদান তার
বহিতে থাকিব আমি, এই ত বিচার ? (ক্ষণ নীরবে )
হা সত্য, সত্যই কি আমার, হলো শেষ,
উত্তর অয়ন ? তবে এখন কি আমি,
চলিলাম পশ্চাদ্বী হতে ? সত্য কথা;
ভদ্রকেরি মৃদুল-বাল-কিরণ বড়
মনােরম, হয়েছে সবার। এত করে,
অন্তরে লাগায়ে অগ্নি, এত কাল ধরে
আলাে করে রাখিলাম মুখ এ রাজ্যের,
নিৰ্বাপিত দীপ প্রায় এখন কি শেষে
পড়ে রব এক কোণে ?—তাহাই কি হবে ?
(মেনি ভাবে প্রস্থান)

প্রথম অঙ্ক।
উনবিংশ দৃশ্য।
হেমাঙ্গিনীর গৃহ, হেমাঙ্গিনী ও হেমাবতী।
ভদ্রকের প্রবেশ ।
হেমাব। এই বড় দাদা, এই এসেছেন দিদি,
আবার।
হেমাঙ্গি। এখনি কি যাবে ?
ভদ্রক।
হ্যা, এই মাত্র ।
হেমাব। না, আজ রাতে আমি তােমা যেতে দিব না।
থাক আজ রাতে? (হাত ধরিয়া)
ভদ্রক।
কেন, দুবার ভ দেখলে ?
আগেই তােমাকে এসে দেখা দিয়ে গেছি।
হেমাঙ্গি। জয়ের কথা শুনে কি ভাব দেখলে তার?
ভদ্রক। প্রীত, কিন্তু প্রতি বাক্যে, হৃদয় কেঁপেছে,
বিপদ কোথায় তার।
হেমাঙ্গি।
জেনো, এ, ভদ্রক,
সত্য, সত্যই বিরত আমাদের প্রতি
নয়, স্নেহ গতি তাঁর। প্রস্রবণ মুখে
পাথর চাপিলে, সেও, অন্তঃশিল বয়,
গতি তার যে দিকেতে। মুক্ত কর ভারে
তােমরা।

মহারাজারাম ।
হেমাব। ( উচ্চরবে )
রাণীকে দূর করে দাও দাদা?
ভদ্রক। ওঃ, ও কি ? এত চীৎকার !
( হেমাবতী অপ্রতিভ।
আর তবে আমি
অপেক্ষা কর ব ন ; আমা প্রয়ােজনে তথা
আকর্ষণ করছে।
হেমাঙ্গি।
যাও তবে, সাবধানে,
সতর্কে সর্বদা থেকো। অভীষ্ট সিদ্ধির
প্রতিষ্ঠাই হয় যেন প্রধান উপায় ।
তাই বলে পুন যেন, প্রাণ তুচ্ছ করে
প্রতিষ্ঠা চেও না। প্রাণ(ই) সৰ্ব্ব অভীষ্টের
প্রধান সাধন।—সৈন্য যাবে কবে তবে?
ভদ্রক। এখানে যে সৈন্য আছে আশু যাবে তাই।
সমস্ত হিন্দু রাজ্য সাহায্য আকর্ষণে,
মহােদ্যোগ হয়ে থাকবে ক্রমে।
হেমাঙ্গি।
শুভ হোক।
ঈশ্বর করুন তোম। সমর বিজয়ী ।
ভদ্রক অর্থে, তৎপশ্চাৎ হেমাঙ্গিনী ও
হেমাবতীর প্রস্থান ।
প্রথম অঙ্ক সমাপ্ত ।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দশ্য
তেলিঙ্গানা, ভদ্রক ও কুমারের শিবির, শিবিরের এক প্রান্ত,
ধৈবল ও মহাবল প্রহরীকাৰ্য্যে দণ্ডায়মান, চতুর্দিকে বৃক্ষাবলি,
সমস্ত নিস্তব্ধ, সম্মুখে একটী অশ্বথ বৃক্ষে হুতুমের ডাক।
ধৈব ।
মহা। রাত্রি কত হলো? এই শব্দে আরো করে,
রাত্রিকে গভীর।
দু প্রহর হলো প্রায় ।
( শৃগালাক বহির্ভাগে)
এই দুপপারের ডাক ; ডেকে চল্লো ওই ।
মহা। (ইতস্তত দেখিয়া ) নিস্তব্ধ এমন এই শান্তিময় কাল,
শয্যায় দিয়েছে পাশ যারা, এ কেবল
তাদের পক্ষেই।
ধৈব ।
অঃ, না ; আমাদেরি ইহা ।
আমাদের এই কাল, আমাদেরি জন্যে।
এই যে হাসিছে চন্দ্র অসংখ্য তারকা,
সুধা-ছড়া-ছড়ি-খেলা খেলি কার সঙ্গে?
৮

মহারাজারাম ।
এই যে কুসুমবালা খোলে চুপে চুপে,
হৃদয়-ভাণ্ডার তার, অতুল্য শােভার,
কে পায় এমন, হেন, কার উপভােগে ?
এই যে আসিছে বায়ু নিঃশব্দে কেমন,
কত গন্ধাকার গন্ধু চুরি করে লয়ে,
সযতনে প্রেমভরে কাহারে মাখাতে ?
আমরাই সংসার সার, আমাদেরি লেগে ?
অসার গুলাই পড়ে নিদ্রার কুহকে,
অলীক স্বপনসুখে মুগ্ধ হয়ে আছে।
প্রভাতে আসিবে তারা চাটতে আমাদের
উচ্ছিষ্ট বসন। এই চন্দ্র, এই ফল,
থাকবে পড়ে মাত্র, শােভা-সুখ-খাদ্য শূন্য।
মহা। তা শরীরের বাধ্যতা গুলার, এড়াতে
পারলে হাত, বটে।
জয় মাত্র(ই) পেরূষের।
শরীরবিজয়ী যত দূর আরা, সৃষ্টি
আমাদের পদানত সেই পরিমাণে।
এই জ্ঞান না থাকাই, আৰ্য সন্তানের,
এতেক দুর্গতি আজ। ইন্দ্রিয় (সবার
আধিক্যেই তারা, ক্রমে নিস্তেজ নির্জীব,
যবনের গ্রাসগত। দাক্ষিণাত্যতেও
এ রােগের বাহুল্য বড়। বিজয় নগর
ধৈব।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
একাকী কেবল মাত্র আছে ঘাড় তুলে।
আজ কাল তার(ও) ভাব বড় ভাল নয় ;
কৰ্ত্তব্য আলস্যভরে উঠিতে উঠিতে,
প্রয়ােজন যাচ্চে ডুবে। তাইত ঘটেছে,
দেখিছ না? সৈন্য আসতে এদিকে ডুবিল।
মহা। মহারাজও রােগগ্রস্ত এমন সময়ে ।
তা মন্ত্রি মহাশয়(ও) কি এরি মধ্যে এত
পরিবৰ্ত্ত হয়েছেন ?
ধৈব ।
বিজ নগরের
অদৃষ্ট এ, কি বলিব আর চল যাই । ( প্রস্থান)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
( শিবিরের এক নির্জন প্রান্তে কুমার ও ভদ্রক। দূরে বস্ত্রাবাস
সকলে আলো জ্বলিতেছে। তাহাৱা পৰ্যবেক্ষণে।)
;
কুমার। আশায় ভুলায়ে আর এ রকম করে,
কত দিন রক্ষা কর ব সকলের মন।
চারি দিক, ভেসে উঠল ; আত্মরক্ষা দায়।
সকলি ঘুচাব আমরা অতি সত্বরেই,
সাহায্য না আসে যদি। তুমি বল্লে, সৈন্য
শীঘ্রই আসছে। কৈ, দেখ, নিশ্বাস না ফেলে,

মহারাজারাম।
এত দূর করেছি আমরা, দিন যাচ্চে,
আমার অন্ত:করণ যেন ছিড়ে লয়ে।
ভদ্রক। বৃথা। আকুবাকু ; কাৰ্যসূত্রে আমাদের
বাধা পড়ে আছে পা, রাজসভার স্তম্ভে।
কুমার। শীঘ্রই নাশ হবে এই রাজ্য। লেগেছে
মূলের মজ্জায় এর আলস্যের কীট।
রাজার সঙ্গেতেও কি রাজ্যও ডুবেছে ?
ওঃ, এত কি সহ যায় ।
ভদ্রক।
বৃথ। এ রোদনে।
আমরা এ রাজ্যের কণ্ঠার-প্রাণ বই
নই, আলস্য ভুজঙ্গ গ্রাসে আর সব ।
কুমার । ( ক্ষণচিন্তায়) আশ্চৰ্য্য বড়ই দেখি, সংসারের ভাব!
জীবন আর কি, বল, চঞ্চলতা বই ?
ভদ্রক। অঃ, তাতে কি সনেহ; সমাধিগত তারা,
যারা ভােগ সুখে তুষ্ট-কাৰ্যই জীবন।
কুমার। উদ্দেশ্য যাদের নেই জীবনে কিছুই,
এই এত শোভাময়ী সুখপূর্ণ পৃথী,
তাদের ত কিছুই নয়, মৃত্যুশয্যা মাত্র
ভদ্রক। হ ভাই সত্য, ওঃ সত্য! ( দীন নিশ্বাস ত্যাগ )
কুমার। ( ভদ্রকের অভিভূত ভাব দেখিয়া ) দেখ ভাই, আমি
এত চেষ্টা করেও তোমার গুণ সব
অনুকরণ করতে পারিলাম না।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
ভদ্রক।
কেন,
আমার কি গুণ দেখলে ?
কুমার।
উদ্দেশ্যবিহীন
লোকের জীবন যে, বড়ই অকারণ,
এই ভাবে তুমি এত, মনে ব্যথা পেলে,
শত শত জনে আমি চক্ষে দেখি সদা
এরূপ দুর্দশাগ্রস্থ, কিন্তু কৈ, তাতে ত
আমার মন, এত উত্তেজিত হয় না।
ভদ্রক। হা কুমার, ভাই তুমি বুঝিতে পারনি,
আমি বড় স্বার্থপর ; আপন দুঃখেই
আমি এত অভিভূত! ( কুমার আশ্চর্যভাবে ভদ্রকের
মুখ নিরীক্ষণ।)
আশ্চর্য হয়াে না।
কুমার। আঁা, সে কি, ভদ্রক ?
ভদ্রক।
যাক, যেতে দেও, দেখ--
কুমার । আঁা, আমি এত দিন, তােমার অবনত
মুখকে, ও তােমার কুঞ্চিত ললাটকে
চিন্তাশীলতার ভাব জান্তাম। বল,
তােমার অন্তরে, ভাই, কিসের বেদনা ?
ভদ্রক। না না, আমি তা, কার সাক্ষাতে বলিব না।
কুমার। কেন, কার সাক্ষাতে না ? (ক্ষুব্ধ ভাবে )
ভদ্রক।
দুঃখিত হয়ো না।
ভাই, তুমি আমার অন্তরের সকল

মহারাজারাম।
?
ভাব(ই) জান। হৃদয়ের বন্ধুর নিকটে
হৃত ভাব, কিছুই গােপন থাকে না।
কুমার। আমি ত তাই জেনে পরিতৃপ্ত ছিলাম।
ভদ্রক। দেখ, যা এত দিন তোমার কাছে আমি
গোপন রেখেছি, তা তোমাকে বলিবার
উপযুক্ত নয়।
কুমার।
আর না, ভাই, আর না।
জানিলাম, ভদ্রক, আমিও একজন
সামান্য !
ভক ।
না, না, এত কিসে? দেখ কুমার,
দেখ আমি এত দিন যা, তােমার কাছে
গােপন রেখেছিলাম, আজন্মেও তার
আভাস(ও) তোমাকে জানতে দিতাম না; কিন্তু
তুমি তা কেন শুতে চাও? তাতে তুমি
সুখী হবে না।
আমার তাতে সর্বনাশ
হলেও, তুমি তা, বল আমাকে।
ভদ্রক।
শুনিবে ?
তবে এইমাত্র বলি শোন ;-মেঘ খণ্ড
ভাসিছে, এই যে দেখচ, চঞ্চল বায়ুতে,
ও কি নিজে চঞ্চল ?—না বায়ুর চাঞ্চল্যে
ওর চঞ্চলতা?-ডাই, আমারাে জীবনে
?

দ্বিতীয় তঙ্ক।
কোন উদ্দেশ্যই নেই। তােমার চঞ্চল
জীবনে, আমার এ জীবন ভাসমান ।
উদ্দেশ্যহীন জীবন যে বৃথা ধারণ,
তােমার বাক্য, আমার তাই মনে পড়ে
নিশ্বাস পড়েছে।
কুমার।
ওঃ, ভাই, সত্য কথা এ । (ক্ষণবিলম্বে)
নিস জেনো তা, যদি কখন আমার
শিরে উঠে, মুকুট, বিজয় নগরের,
পদতলে তােমার জেনো, চিত্ৰদুর্গের
যত অধিকার।
ভদ্রক।
না, না, কুমার, আমি সে
আশা রাখিনে। প্রভুত্ব বাসনা আমার
অন্তরে ঝলচে না। সে অনলোপ্তশ্বাস
নয় এ। দুর্গন্ধ শ্বাস এ, কোন পুরাণ
ক্ষতের, হৃদয় যাতে পচেছে আমার ।
কুমার। কি ভা, বল, আমা বল ? (হস্ত ধারণ)
ভদ্রক।
অাজ সে অামার,
বিষম ব্যথায় হাত দিয়েছিলে তুমি,
তাতেই শিহরি অঙ্গ, নিশ্বাস পড়েছে।
ভাই, তুমি সংসারের রাজত্ব দিলেও,
সুখী করতে আমাকে পারিবে না ।
কুমার।
আমার

৬৪
মহারাজারাম
সমস্ত মন প্রাণেও কি, তার, উপায়
হবে না?
ভদ্রক।
উপায় নাই তার ! কি জন্যে
শুনিতে তা চাও তুমি ? আগ্রহ করাে না ;
তুমি তাতে হবে না। সুখী।
কুমার।
বল, আমার
দুঃখেও মুখ ? ( অধিক দৃঢ়রূপে হস্ত ধারণ)
ভদ্রক।
ভাই, আমি বলতে পারব না। জিহ্বা
'পুড়ে যাক আমার, বলি যদি আমি তা ।
কুমার। হা আমি ! ( হস্ত ত্যাগ করিয়া অধোমুখ ।
ভদ্ৰক ।
তবে তুমি শুনিবে নিতান্তই ?
বলব তবে শোন ;-দেখ, তােমার মায়ের
মৃত্যুর উপলক্ষ মাত্র যেই, সুখের
তােমার কণ্টক মাত্র ; তার বিপরীতে
চেষ্টাতেও পরিতৃপ্ত আছ তুমি। কিন্তু,
দেখ দেখি, পিতৃহন্তা মাতৃহন্তা, যিনি
আমার, রাজ্য ধন, পরিবার সকল
ধ্বংসকারী, তাঁর আমি প্রতিকুলেতেও
চিন্তিতে সক্ষম নই ; বরং তারই অন্নে
জঘন্য এ জীবন পুষে, তারি কাজে রত ।
( কুমার আশ্চর্য্য ভাবে ভদ্রকের প্রতি দৃষ্টি)
সহস্র আশায় দেখ, তােমার জীবন
;

দ্বিতীয় অঙ্ক।
কুসুমিত, চতুর্দিকে আমি কি নিরখি ?
অপার মর ভূম। সম্মুখে আমার
নাই কোন আকর্ষণ, সহজে বহিতে
দুঃখ-ভারি এ জীবনে।
কুমার।
ওঃ ভদ্রক, এই,
এই বিষ পােৱা ! ( অবনত মুখে)
ভদ্রক।
আঃ না, কুমার, এমন
মনে করো না যে, দ্বেষ ভাব আছে কিছু,
তোমার পিতার প্রতি, অন্তরে আমার ।
তিনিই দ্বিতীয় পিতা আমার এখন।
অঙ্কুরিত একের রসে আঁমি, পালিত
অপরের রসে। তারি মুখে পিতৃভাবি
নিরখি এখন আমি। ভ্রাতৃ ভাবে তােমা
আলিঙ্গন করে স্নিগ্ধ হই। আত্ম সুখ
সব ভুলে গিয়ে, আমি, তােমাতে আকৃষ্ট।
অন্য ভাব ভেবাে না আমার প্রতি।
কুমার।
ভাই,
আমিই তােমার, সব সুখ নষ্টকারী ;
শত্রু হলে পরস্পর আমরা, হয় ত
সুখী হতে পারিতাম ।
ভদ্রক।
বিপরীত জ্ঞান !
প্রণয় তােমার, ভাই, অমূল্য আমার ।

মহারাজারাম।
সংসারে আমার আর হতে পারে যাহা
করেছি তা আমি। আমি আত্মত্ব বিনাশ
করেছি কুমার ; আমি আর আমি নাই ।
দুঃখ হাত এড়ায়েছি। যা কিছু দেখিছ
এ, তােমারি এখন। কায় মন প্রাণ যা,
সকলি তোমার । আমি তােমার মায়ের
প্রতিহিংসা লওনের সহায়তা করে,
প্রতিহিংসার আক্ষেপ নিবৃত্তি করিব।
নিষ্কণ্টক, সুশৃঙ্খল, রাজ্য করে দিয়ে
তােমার, রাজ্যের খেদ নিবৃত্তি করিব ।
সংসারের সুখের প্রবাহ সংবর্ধিত
করে তােমার, আমিও সে প্রবাহে হয়ে
সঞ্চলিত, আপনাকে সুখী জ্ঞান করব।
কুমার, আমাকে তুমি, সুখ পবনের
তােমার, মেঘখণ্ড জেনে ! (দীর্ঘ নিশ্বাস )
কুমার।
কিছুই জানি না আমি ! ( উভয়ে ক্ষণ নিস্তব্ধ )
ভদ্রক।
এস এই দিকে ।
{ কুমারের হস্ত ধারণে লইয়া প্রস্থান)
ভাই ভদ্রক,

দ্বিতীয় অঙ্ক।
ততীয় দৃশ্য।
শিবিরের অপর এক ভাগ, মহাবল, ও ধৈবল,
প্রহরী কার্য্যে। দ্বিজবরের প্রবেশ ।
ধৈর। কে আসে ?
দ্বিজ । (ব্যাকুল ভাবে অ, আ ভাই,দ্বিজবর ভাই
সব গেল, ৰুদ্ধ হয়ে মলাম আমরা।
বিজাপুর, বিরদি সব একাকার।
দক্ষিণের অধিকার গেছে সব ; সৈন্য
আসার খেই নেই। পিছনে দৃঢ় বন্ধ
শক্ররা।
মহা।
কে বল্লে ?
দ্বিজ ।
এই মাত্র দূত এলাে
অধ্যক্ষদের কাছে গেল। আঃ, অকারণে
বিদেশে, বিপাকে পড়ে প্রাণ হারালাম।
কোথা পুত্র পরিবার ।
•
ধৈব ।
ঘটিবেই এত,
আগেরি এ জানা কথা -সৈন্য কত দূর
?
দ্বিজ। কৃষ্ণানদীতীরে তারা আজ দেখা দেছে।
ধৈব। ডুবুক সকল ; যায় প্রাণ যাক্। প্রাণ
নষ্ট করিবার সন্ধি সব এ, বুঝেছি।

মহারাজারাম।
;
দ্বিজ । উদ্ধার উপায় আর কিছুমাত্র নেই ।
শত্রুদের হাতে আমরা, অখণ্ডন ইহা ।
মহা। ঈশ্বর আছেন, দেখ এখনো যা হয় ।
অধ্যক্ষের কি উপায় করেন দেখিয়ে ।
ধৈব। উপায় কি আছে আর ; প্রাণ দান কর।
অপমানে ঘাড় পেতে। ইহাই হবে ।
মহারাষ্ট্র সৈন্য তারা আজি যারে চলে ;
লােভের ঢেউয়ের তারা আগে আগে চলে ।
* লাভ আশা শূন্য বুঝলে, তিলব্ধ রবে না।
দ্বিজ হত বুদ্ধি আমি ভাই জানি না কি হবে।
ধৈর। ধর্মের বিদ্বেষী শত্রু, তার হাতে পলে,
কিসে প্রাণ রক্ষা হবে, মুসলমান তাতে।
দ্বিজ। বিজয় নগরের মনে এই ছিল শেষে ?
ধৈব। মরেছি ত আমরা, যাতে বিজয় নগর(ও)
যায়, কর তাই ; শত্রু হই আমরাও ।
দ্বিজ । আমরাও যাব, পুম, বিজ নগরের
কোপে, রাজ্য, পরিবার, ধন, সব যাবে ।
( ক্ষণ বিরাম)
মহা। উপায় কি এখনো আছে ? চল সকলে,
প্রধান অধ্যক্ষের। কোথ? চল সবাই।
সকলের প্রস্থান ।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
চতুর্থ দৃশ্য।
শিবিরের অপর এক নির্জন স্থানে, কুমার মোন ভাবে ;
ভদ্রক একখানি পত্র পাঠান্তে
ভদ্রক। অভিভূত হয়ো না; তােমারি আমি চির ।
পরীক্ষিত রত্ন আমি শত আঘাতের।
উপস্থিত চিন্তা কর এখন, সতর্কে।
ঘটে প'লাে কি বিপদ, দেখ দেখি ভেবে ?
হেলায় মলাম আমরা শত্রু হাতে পড়ে।
কুমার। ভাব পরিবৰ্ত্ত বোধ হয়েছে দিদির,
মন্ত্রির। কুচক্র ঠিক ঘটেছে সেখানে,
প্রাণ প্রতি আমাদের ; নৈলে কেন ঘটবে,
হেন দশা ! দেখ মন্ত্রী, সেই মন্ত্রী ভাই!
প্রাণ রক্ষা করেছেন বল তাই সদা ;
ক্ষুদ্র প্রাণ রক্ষেছেন নাশতে বড় করে ।
অামার সঙ্গেতে দেখ তুমিও কুচক্রে।
এই ত কৰ্ত্তব্য জ্ঞান, এই ধৰ্ম্ম দৃঢ়!
তুমি আরাে সদা তঁার বাধ্যতা জানাও।
ভদ্রক। না, না, বিপথে পুত্ৰও কখন, পিতার
অনুগামী হবে না। যে জীবন প্রতি
কোন আস্থা নাই, তার রক্ষার নিমিত্ত

মহারাজারাম।
এত কি বাধ্যতা। তবে আমি তার কাছে
অবশ্য কৃতজ্ঞ বটি, নই যে তা নয়।
কুমার। দেখ ভাই ভদ্রক, এক মাত্র ভরসা
তুমিই আমার, আর সকলি গিয়েছে।
( ভদ্রকের হস্ত ধারণ)
ভদ্রক। সে কি, দেখ অন্ধ প্রায় তােমার পশ্চাদে
ফিরচি আমি।
কুমার।
তোমার আজ্ঞানুবর্তী আমি;
বল যাহা হয়, আমি এখনি দৌড়িব
ঊর্ধ শ্বাসে।
ভদ্রক।
শান্ত হও; বিপদ বড়ই
ভয়ঙ্কর, যবে নিজে মন্ত্রী আমাদের
বিপক্ষ। বােধ হয় উপায়ান্তর নাই ।
যাও আছে, তাও তত সুনিশ্চয় নয়।
কুমার । অনন্য উপায় মাঝে অনিশ্চয়(ও) জেনো
অবলম্বনীয় ।
ভদ্রক।
আছে কিন্তু
কুমার ।
কি, কঠিন ?
প্রাণ যাচ্ছে।
ভদ্রক।
সন্ধুির প্রস্তাব ; যদি তারা
সম্মত হয় তাতে। শত্রু চেয়ে এখন,
মিত্র আমাদের মহাশত্রু। রাজ্য আর

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৭১
আমাদের নাই জেনো, পরহস্ত গত ;
রাজার দুর্দশা সেই, প্রাণ আমাদের
শত্রু হাতে। শত্রুদের মিত্র করে, নাশ,
মিত্র মহাশত্রু আগে।নৈলে রাজ্য গেছে,
প্রাণ(ও) গেছে আমাদের।
কুমার।
একান্ত সম্মত
আমি এতে ভাই ।ভদ্রক, কি বলব,
তােমারি বুদ্ধি বলে বাঁচি যদি এখনাে ;
রক্ষা যদি হয় সব। চল তবে যাই
অধ্যক্ষদের কাছে ; তারা যাতে সম্মত
হয় এতে, করিগে ভা।
ভদ্রক।
সম্মত এখনি
হবে তারা। তারাও ত বিপদাপন্ন; তা
শেষে টেকে যদি সর মন্ত্রির হুঙ্কারে ।
মার হাটাদের কৌশলে বদ্ধ করতে হবে।
কুমার ! আগে তবে তাদের প্রতিজ্ঞা পাশে বদ্ধ
করিগে ।
ভদ্রক।
প্রতিজ্ঞাপাশ কালে টেকে কম ।
( প্রস্থান।)

তৃতীয় অঙ্ক |
প্রথম দৃশ্য।
-
রাণীর গৃহ। রাণী চিন্তাভরে অবস্থান। মােহিনী রাণীর
শিশুকে কোলে লইয়া প্রবেশ।
মােহিনী। (রাণীকে চিন্তাযুক্ত দেখিয়া )
ভাবিতে ভাবিতে, ভাবনা সার,
কাজ তলে মন নামে না অার।
হারাইলে পথ আঁধার দিক,
অতল খালেতে পতন ঠিক।
ভেবনা ভেবনা করি হে বারণ,
ছেলে ন্যও কোলে (মাের) সােণার বরণ।
( ছেলে প্রদানােত)
রাণী। (সক্রোধে )
যা, যা, যাঃ, তোর কথায় আমার গা জ্বলে ।
মােহিনী। আমার কাজে তবে ?
কাজে তাের ব্রহ্মাণ্ড
রাণী ।
জ্বলে।

তৃতীয় অঙ্ক ।
মােহিনী। তবে অতি-কাজে মাের ?
রাণী।
জানি না যা-
মােহিনী। জান না দেখিবে তার কিবা ফল,
শত পোড়ে নাশি বিষের গরল,
তবে সে অমৃত, শরীরের বল ।
জাবে যদি সব মুলের কারণ,
জাবে যদি কার সম্বন্ধ কেমন
তবে কি ঘটে ও কপালে এমন ?
রাণী। কথার ছাদুনী তাের বচনের আড়,
কিছুই বুঝি না, দেখা কাজ যা কেবল ।
মােহি। থাক, ধৈর্য্য ধরে দিন কত আর,
ছেলে নে এখন কোলে একবার ।
সুখের বস্তু করিলে হেলা,
পা দিয়ে হবে লক্ষন। ঠেলা ।
( ছেলে প্রদান, রাণী ছেলে লইয়া ক্ষণ তার মুখ নিরীক্ষণে )
রাণী। তুমি কি রাজার ছেলে ? রাজপুত্র ? আঁা, কি ?
রাজপুত্র, রাজার ছেলে ?—লােকে কি বলে?
রাজার ছেলে ?—বলুক, আমি তা বলি না।
মােহি। ও কি সােহাগ, আঁ ?
রাণী।
রাজপুত্র, আমিও তা
মুখে বলি, কিন্তু মনে বলিতে পারি না।
মােহি। মরণ আর কি।কি কথা?

৭৪ মহারাজারাম। রাণী। রাণী । ৫ রাণী। কেন, কি কথা? মােহি। রাজার নয় ত কার ? আঁা, রাজার ? তবে রাজার ছেলে তুমি, রাজপুত্র ?- মােহি। আ মরি, খেলি নাকি? কে, আমি? না তুই খেপেচিস। সিংহাসনে বসিবে যে, রাজার ছেলে সে, আর সব ত তোর আমার ছেলে, এই আত্র। মােহি। বটে তা, হঁা; বড় দুঃখিত হলাম। রাণী। দুঃখিত হলে? আঃ, আমি কৃতার্থ হলাম ! মােহি। বটে! আর কোন্ শালি তাের কাছে আসে । রাণী। রাগ টুকু হলাে দেখচি । মােহি। একেবারে, আমা, হেয় করে দিলি তুই। তুই যে আমা, করে দিলি ছার ? মােহি। বটে, আমি তাের জন্যে মরি। রাণী। মর, আমি তাই চাই; তাের সঙ্গে মারি ত কথা। তুই কি না বলি, “বড় ! রাণী।

তৃতীয় অঙ্ক।
৭৫
দুঃখিত হলাম!”-তাের সঙ্গে কি, দুঃখিত
হওয়ার কথা বার্তা?
মােহি। (ক্রোধে )
বটে, আমি করি না
কিছুই?—ভর সয় না তাের কিছুতেই ?-
ভাল, আজ আমি চলিলাম এই,
দেখাব কারখানা জগতে যা নেই।
যা থাকে অদৃষ্টে রাজার ঘটুক,
হয় সােজা হােক, না হয় ফাটুক ।
রাণী। কি করবি জানি না, প্রাণে মারবি নাকি?
মােহি।
প্রাণে মারবনাক, মরতে থাকবে বাকি।
( মােহিনার আস্ফালনে প্রস্থান।)
দ্বিতীয় দৃশ্য।
{ রাণী ব্যাকুলভাবে ছেলে কোলে লইয়া দাঁড়াইয়া ।।
দুর্ধর্য বাঘিনী বশ করা ভার!-
কাজের গরজে ওর জ্বালা সই -
বিষম সঙ্কট বস্তু, ওর হাতে
দিতে হয়েছে যে, বেঁধে প্রাণ বুকে।
ডাইনি জানে না তার কি মরম ।-

৭৬
মহারাজারাম ।
সংসার আমার যার এক দিকে ।
আঃ কত দিনে সে কমনীয় আশা।
এসে যে পেঁছিবে, তরে এ বিষম,
কাটায় জড়িত (ঘারতর পথ।
( ধীরে ধীরে প্রস্থান ।
তৃতীয় দৃশ্য।
( উদ্যানে রাজা একটি বৃক্ষতলে, বৃক্ষস্কন্ধে ঠেস দিয়া উপবিষ্ট।}
( হেমাঙ্গিনীর প্রবেশ। হেমা রাজাকে এতদবস্থায় দেখিয়া।)
এই কি আসন, হায়, এই কি বিরাম !
( নিকটবর্তী হইয়া রাজার প্রতি)
বাবা,— রাজা চমকিতভাবে চক্ষুন্মীলন ও হেমাঙ্গি-
নীক দেখিয়া বিস্মিত ও বিমর্ষভাব )
বাবা, আমি হেমা তোমার।
রাজা। ( অবনত মুখে )
এখানে
হেমা, কেন এসেছ ?
হেমা।
একবার তোমার
কাছে ।
রাজা ।
ওঃ—আমার কাছে, হেমা, কেন বল ?
জানি আমি দুঃখী ভােমরা, আমা কাছে কেন ?

তৃতীয় অঙ্ক। ৭৭ • দিতে পারি আরো দুঃখ আমি তোমাদের । পৃথীতে আশ্রয় তােম্রা পাবে না কোথাও ; ভাঙ্গিলে ত বাসা, পাখি, উড়ে দেশান্তরে ? হেমা। আঃ, বাবা, তবে কি তুমি আমাদের ত্যাগ করলে ? আমাদের তবে পৃথীতে আশ্রয়ে কাজ কি ?-মা, তুমি কোথা? কেহ আমাদের সংসারে নাই ; ডাক তোমারি কাছে যাই { সজল নয়নে অবনত মুখ ।) রাজা। (হেমাঙ্গিনীর প্রতি চাহিয়া কম্পিত কলেবর এবং ক্ষণ- পরে দ্রুত আসিয়া হেমাঙ্গিনীকে ধরিয়া ।) হেমাঙ্গি, মা, মা আমার, মা ! আমাকে তােরা রক্ষা কর। হেমা। ( ক্ষণনিস্তব্ধে ) কি বলিছ, বাবা? রাজা তুমি, তােমার ইচ্ছায় এই জগৎ ভেসে যায়। ক্ষুদ্র জীব আমরা। ছাড়, আমরা যাব চলে, তােমার এ ইচ্ছ, আছে অবশ্য ধরায় স্থান। বনফল খেয়ে, রব, তিন ভাই বুনে, বন বাসে। মা বলে বস্ব বৃক্ষের সুশীতল কোলে ; বাবা বলে আলিঙ্গিব তারেই, পরম্পর মুখে, দেখব আমরা অনন্ত জগৎ, সুখে আমরা সেখানেও • রব।

৭৮
মহারাজারাম।
রাজা। ওঃ হেমা, সৌভাগ্যশালী তােরা; তােরা
পবিত্র মূরতি ; এই সৃষ্টি, সুখাগার
তােদের, যথায় যাস; প্রকৃতি তোদের
বন্ধু। আমি রাজা নই, হেমা, কিছু নই
আশ্ৰয় সংসার নয়, প্রতি বিদ্রোহী
আমার। আশ্রয় দিতে,—উদ্ধার করিতে
পারিস, কি তে'রা আমা? (হেমাঙ্গিনীর ক্রোড়ে
মুখ রাখিয়া )
হেমা। (ক্ষণনিস্তব্ধে )
কি তােমার কথা
বুঝতে যে পারি না।
রাজা।
বুঝে কি করিবে ?
তোদের বা সাধ্য কি তা ; কার সাধ্য আছে ?
আর তােরা আমা কাছে আসিস না কেউ ;
“বাবা” বলে ডাকিস না, যে রবে আমার,
অস্তিত্ব চুর্ণিয়া যায়, অন্তুর খায়।
তোদের দে ভুলতে আমা, ভাবিতে দে এই,
এ সংসারে আমি যেন নেই আর। একা,
নিভৃত লােকেতে কোন, নিস্তব্ধ নীরব।
যাও হেমা যাও, যাও আমা কাছ হতে।
ভয়ঙ্কর কথা বাবা, কেন শুনি সব।
যাই আমি, পত্র একখানি দিয়ে তবে।
(পত্র লইয়া প্রদান।
==
হেমা।

তৃতীয় অঙ্ক।
৭৯
রাজা। পত্র ? কোথাকার,-কার ?
(পত্রের হস্তাক্ষর দেখিয়া বিস্মিতভাবে একবার হেমাঙ্গিনীর
প্রতি ও একবার পত্রের প্রতি দৃষ্টি। তাহার
হস্ত কম্পিত এবং তিনি বাক্য রহিত।
হেমা।
মায়ের এ পত্র।
রাজা। ( হেমাঙ্গিনীর হাত ধরিয়া)
বাছা, বল, বল্ আমা? মহা অপরাধী
আমি ; বল, কোথা তিনি?
হেমা। (বিস্মিতভাবে ) কোথ। তিনি ? বাবা,
জান না কি ?
রাজা। (অনুনয়ে) নিত্য আমি, শুনি কথা ভার।
সহস্র অপরাধী আমি ; বাছা, আর কেন?
খুব ত হয়েছে, আর আমি, পরিনাক
সৈতে। কেন প্রবঞ্চনা, বাছা, সন্তান ত
হেমা। ক্ষিপ্তের ন্যায় যে কথা; কি বলিছ
বাবা ? আর ভারে কেহ দেখাতে কি পারে ?
ইহলােকে আর তারে দেখাতে পারব না।
এ পত্ন মৃত্যুকালের তার, তােমা প্রতি।
অম্বালিকা কাছে তিনি দিতে দেন তােমা,
দেয় নাই সে তোমায় এত দিন, সাহস
করে।

মহারাজারাম।
রাজা।
আঃ পাপিনি, তবে এ আমার কাছে
কেন? ছোঁব না আমি এ, লয়ে যা।
( পত্র পরিত্যাগে কিছুদূর গমন)
হা অম্বা,
হেমা। কি, এ !–কেন আমি হায়—
রাজা। { ফিরিয়া আসিয়া।) হেমাঙ্গি, যাবে না ?
দুঃখিভ এ ভাব কেন আমারে দেখাও।
দেখি পত্র ; বাছা তুমি, দুঃখিত হয়াে না।
( হেমাঙ্গিনীর হাত হইতে পত্র লইয়া, অক্ষরের প্রতি দৃষ্টি করিয়া )
জীবন্ত, জীবন্ত এ যে! প্রতি অক্ষরেই
জীবন-জ্যোতি ! প্রতি রেখার অভ্যন্তরে
সহস্র মূরতি যেন দীপ্ত আমা প্রতি।
{ পত্রের বাহির সম্বােধন পড়িয়া )
ওঃ কারে এ সম্বােধন! হা, আমি কোথায় ?
পত্ৰ খুলিতে হস্ত কম্পিত হওয়ায় হেমাঙ্গিনীকে প্রদান।
খােল এ, হেমাঙ্গি, খোল ?
( হেমাঙ্গিনী পত্ৰ খুলিয়া প্রদাননাদ্যত।)
, না; এ তুমিই
পড় ; শুনি আমি।
( হেমাঙ্গিনী পড়িতে উদ্যত, রাজা বারণ করিয়া ।)
একটু থাম।
( দৃঢ় রূপে আসনে বসিয়া )

তৃতীয় অঙ্ক। পড় তবে ? হেমা । ( পাঠ) ৪ ( পত্র। মহারাজ, আমি মলাম। আমি কে, আর কি বলব, আমি আপনার কেউ নই। আপনি আমার সেই শরচ্চন্দ্র, সংসারের শােভা, আমার জীবনের জীবন, আমি আপ- নাকে বঞ্চিত হয়ে, সংসার অন্ধকার দেখছি, আমার হুতাসে প্রাণ অন্ত হলাে। হেমা। হা মা, মাগো ! (রোদন) রাজ।। ( কম্পিত ) কঁাদ কেন, হেমা, পড় পড় ? ( হেমাঙ্গিনী পুনর্বার পাঠ ) পৃথিবীর পল্লব রাশিতে আমার ছায়া নাই, পৃথিবীর সরােবরে আমার শান্তি নাই। স্বামিন ! আমি মলাম, হৃদ- য়ের আগুনে দগ্ধ হয়ে।” ( রাজা চকিত ভাবে সহসা উত্থান ) হেমা। কোথা যাও, বাবা ? রাজা। পড়, পড়? হেমা । (পুনৰ্ব্বার পাঠ ) “আমি কি চাই ;-আমার হৃদকম্প হচ্ছে—এক বিন্দু চক্ষের জল?—হা, এমন কি সৌভাগ্য করেছি!—একটী নিশ্বাস কি তবে ?-হা নাথ, তাই অভাগিনীর পক্ষে অমুল্য নিধি, ১১ ৮২ মহারাজারাম। আশার অতিরিক্ত ফল, বহনের অনুপযুক্ত দান। নাথ সেই নিশ্বাসের যৎকিঞ্চিৎ বসেই আমার মৃত্যু অস্থিও দগ্ধ কঙ্করের ন্যায় শতধা ফেটে যাবে। আমি মলাম, নাথ, মলা, আপ- নারি প্রেম পিপাসায় শুদ্ধ হয়ে।” (হেমাঙ্গিনী অত্যন্ত রোদন) রাজা। ( ক্ষণ নিস্তব্ধে ) পড়, পড়? হেমা। তুমি কি বাবা, অন্য মন হচ্চ ? রাজা। অসান । হেমা। সারা হয়ে গেছে ; আর নাই কিছু। রাজা। তবে কি হৃদয় তাঁর এখানেই ভয় ? হেমাঙ্গি? (কম্পিত কলেবর) হেমা। বাবা, কম্প হচ্ছে কেন? বসাে, ধরি একটু। ( রাজাকে ধরিয়া বসান) রাজা। চক্ষে জল তোমার এসেছে, কত আর নিশ্বাস পড়েছে। ধন্য তুমি, অশ্রু, শ্বাস দ্বার খােলসা তােমার। আমার সকলি রােধ । হৃদকম্প তাই, তাতেই হেমাঙ্গি। (ক্ষণ পরে) হেমাঙ্গি, যাও তুমি ছেড়ে দিয়ে আমাকে। হেমা। না, না ; আর একটু ধরি ; বড় কম্প হচ্চে। ( রাজা অবসন্ন ) বাবা, বাবা, একি, একি? রাজা। (ক্ষণ পরে উঠিয়া ) ছাড়, ছাড় আমা? (হেমাঙ্গি ধরিয়া বসাইতে উদ্যত ) ;

তৃতীয় অঙ্ক।
ছাড়, ছাড় আমাকে, পৃথিবী ডুবে গেল,
আকাশ ভেঙ্গে পলাে, পলাই, আঃ পলাই !
( জোড়ে ছাড়াইয়া লইয়া বেগে প্রস্থান)
( হেমাঙ্গিনী ব্যাকুল ভাবে পশ্চাদ পশ্চাদ প্রস্থান।)
চতুর্থ দৃশ্য।
সেই স্থান, মহিনীর কুহকিনী বেশে প্রবেশ ।
মোহিনী।
( চতুর্দিক নিরীক্ষণে ও ক্ষণ পরিক্রমণে )
রাণীর পতি, আপন যদি, না হয় তাতে, আমার কি ?
দুষ্টার মতি, সফল গতি, আপন গরজে, করিতেছি ।
রাণীর ছেলে, মুকুট পেলে, আমার আশা, সফল ভায়।
কুমার ভেসে, গেলে দূর দেশে, মনের খেলা সুযােগ পায় ।
হারানে রতন, করব আপন, কুড়ায়ে পেলে, যে পায় তার,
হৃদয়-হারে, গাথিব তারে, ছিড়িতে পারে, শকতি কার ?
রাজার বেটা, অভিমান সেটা, পড়ে না আঁখি আমার পানে,
ভাল, ভাল তা, অভিমান যা, ডুবায় সব, মায়া তুফানে।
আশার ফল, পড়ে না তল, ফেলিব ছিড়ে পায়ের তলে,
ভূমে গড়াইলে, তবে নেব তুলে, আপন আলয়ে যাইব চলে।
( ক্ষণ নীরবে)

৮৪
মহারাজারাম।
উথল যৌবন রূপে ভরা পুরা,
দল মল করে, প্রাণে পাই পীড়া।
চাহনে উমুরী দুড়, দুড় হিয়া,
ফলাইয়ে বুক যায় শ্বাস দিয়া।
নখে ছিড়ে ফেলে দিব তার সুখ,
ক্ষণ যদি পারি জুড়াতে এ বুক।
( বহির্ভাগ লক্ষ করিয়া )
আর কেন হেমা, চলে যাও ঘরে,
}
“কেন খােজ আর, সে বাবার তরে।
ঘুরে ঘুরে পুন, এই হেথা এলাে,
কুহকের পথ, সব এলো মেলাে।
( রাজার অবনত মুখে, চিন্তাভরে ধীরে ধীরে প্রবেশ)
দৃশ্য সহসা পরিবর্তন, অন্ধকার, উপরে মেঘ, বিদ্যুত বজ্রধ্বনি।
রাজা বিস্মিত ভাবে দণ্ডায়মান, মােহিনী অন্তর্ধান ।
পঞ্চম দৃশ্য।
( রাজা চতুর্দিক দেখিয়া )
এ কি, কি হলো?—প্রলয়! (স্তম্ভিত ভাবে দণ্ডায়মান)
মােহি। (মেঘ মধ্য হইতে মৃত রাণীর স্বরানুকরণে বিকৃতভঙ্গীতে)

তৃতীয় অঙ্ক। চলে যাও, চলে যাও, এ রাজ্যেতে আর এসােনাক তুমি। ( রাজা হৃদকম্প হস্ত দ্বারা বক্ষ ধারণ ও ব্রাসিত চক্ষে উর্ধ দৃষ্টি, মোহিনী পুন সেই স্বরে) যাও চলে, শীঘ্র যাও ? এ রাজ্যেতে আর পাও বাড়ায়েনা কভু। রাজা! (মৃদু ভগ্ন স্বরে) কে তুমি? মােহি। (বিকট উচ্চ স্বরে ) কে আমি ?—(বজ্র শব্দ ও বিদ্যুৎ) রাজা। (সত্রাসে ) প্রিয়ে, দাসেরে তোমার রক্ষা কর। (ভূপতিত ) (অন্ধকার কিঞ্চিৎ অপগম ; সমস্ত স্থির ।) মােহি। রাজা ?- রাজা। (চমকিত ভাবে উৰ্ধ দৃষ্টে) প্রিয়ে ? মােহি। কি গুণে আমার, এমন করিছ তুমি ? রাজা। ( ব্যস্তে ) গুণ ? হা,–গুণ ত- গুণে ভাল কখনই বাসিনিক তোম। তা বাসিলে অন্য কেন অনুরক্ত হব ; তুমি সৰ্ব্ব গুণাধার। প্রিয়ে, আমি বড়, বড়, অপরাধী তোমা কাছে । মােহি। থাক, থাক, আর কাজ নেই। আমি বলচি সার তােম-- ,

মহারাজারাম।
এসো না কখন অার এ রাজ্যেতে । যাও,
সংসারের সুখ যাতে, ভোগ কর গিয়ে।
ন্যায়ানায় জ্ঞান মাত্র, বুদ্ধির সে বন্ধ।
সংসারে, মনের খেলা, জীবনের সার।
সৃষ্টি ও জীবন ;-জেনো, জীবনের শক্তি,
সৃষ্টিতে করিবে ক্রীড়া, নৈলে কি কারণে?
উভয়ই নিস্ফল ! কাৰ্য্য ফল মানবের,
সৃষ্টিরাভিপ্রায়, বৃথা চিন্তা মানবের।
ইচ্ছার দর্পেতে ফের, সংসারাধিকারে।
যাও রাজা, যাও সুখে, ত্যেজে অলীকত।
রাজা। (ক্ষণ বিস্মিত ভাবে থাকিয়া )
কি কথা এ বল প্রিয়ে ; ছলনা কি কর ?
মােহি। ছলনা ? বিশ্বাস নয় ?—দেখ রাজা দেখ ?-
তোমা জন্য দুঃখ ভুগে কি দশা আমার।
তুমি আর এ রকমে আত্ম অন্তু করে,
এরূপ দুর্দশাগ্রস্থ কেন হও বল ।
নর আদি সৃষ্টি সব, নর সুখ ভােগে।
সংসার ক্ষেত্রেতে নর গাছের অঙ্কর ;
সুখের পবনে যদি পল্লব বিস্তারি,
সুখমূর্তিধরে, মৃত্যু সেই মুর্তি সহ
প্রতিষ্ঠিবে এনে, ইহ লোকে। দুঃখ তাপ
অসঙ্গত, সয়ে যদি পোড়া মূর্তি ধরে-

তৃতীয় অঙ্ক।
৮৭
দেখ চেয়ে আম পানে, দেখ, এই দেখ ?-
বিদ্যুৎ, বিদ্যুতালাকে মেঘ অন্তরালে, রাজা, ৰুম কেশা, শুষ্ক,
কৃষ্ণবরণ', লােহিতলােচনা ভীষণ কুহকিনী মূর্তি দর্শন। বজ্র
ধনি, কম্পন ও গাঢ় অন্ধকার। মােহিনী অন্তর্ধান।
ষষ্ঠ দৃশ্য।
রাজ।।
এ কি ? কি এ সব দেখি ? কোথ, কোথা আমি ?
একি সেই পৃথিবী, সেই লােক ?—কখন
না। কখন, দেখিনি যা, স্মৃতি জ্ঞান আছে।
অন্য কোন লােকে আমি ; অন্য লোক(২) এই।
ওঃ, আমি মরেছি, পরলােক(ই) এই সত্য।
জন্ম, মৃত্যু ক্ষণ বোধ থাকে না তৎপরে ।
পার্থিব পাপের মূর্তি, বিদ্যমান হয়ে,
শাস্তিছে আমায় এসে ; বিভীষিকা
দেখচি এ সব, ঘোর পাপ ফল-হা আমি!
পলও এ শাম্ভিবন, আকাশ, তারকা,
ছলনা ছেড়ে ; হা, দেখি আমি, কোথা আমি।
( বিবর্ণ ও হতাশ মুখে ভূপতন, কিছু পরে যশ, মহি, ও
লােরেনজোর আগমন দেখিয়া উঠিয়া )
এই সব মূর্তি আসছে শান্তিতে (পলায়নােদ্যত।)

মহারাজারাম।
সপ্তন দৃশ্য
রাজা, যশরাজ, মহিমান, ও লোরেন জো।
যশ ।
ও কি ও,
দেখ, মহারাজ যান—
মহি। ( দ্রুত নিকটস্থ হইয়া } মহারাজ অম্রা ।
রাজা। ( ফিরিয়া) তোমরা কে ভাই ?
মহি।
দেব আপনারি দাস।
( রাজা ফিরিয়া গমন)
যশ ।
মহি।
মহারাজ ?
রাজা। (কিরিয়া) কি দেখাবে, দেখাও আমারে ?
কি শাস্তি দেবে দাও ? (যশ ও মহির মুখ নিরীক্ষণ }
দেব, ক্ষমা কৰুন।
রাজা ।
এত কেন, খেলে যাও, তোমাদের খেলা ।
যশ । কি বুঝছেন আপনি?
লোরেন।
শােক্ত কছু হােয়েছে ।
যশ।
মহারাজ, পর্তুগীস দেশী, এক জন
বিজ্ঞ চিকিৎসক ইনি, দেখতে একবার
আপনাকে এসেছেন।
(কিছুকাল লােরেনের মুখপানে চাহিয়া থাকিয়া)
ওঃ, হা আমি ; { বিমুখ )
রাজা।
;

তৃতীয় অঙ্ক। হি। রাজা। কে তুমি? মহি। চিতে আমায় কি পারছেন না ? রাজা। মহির আকারে তুমি ছদ্মবেশী কেট। ভয়ঙ্কর মােহমূর্তি তোমরা এ সব। { সহসা প্রস্থান।) অষ্টম দৃশ্য। যশরাজ, মহিমান ও লোরেনজো । যশ । ( মহির প্রতি) কি ভাব? লােরেন প্রতি) লোরেন। আপনি কি বলেন ? যাই হোক, মহারাজে আমি সেরে দিব, সারব আমি মন্তর-চিকিৎসা জানে আমি ; ভূত ছেড়ে দিতে পারি, ডান ছেড়ে দিতে পারি, সব- ( যশ ও মহির হাস্য ) মহি। ভূত অনুমান আপন করেছেন তবে, আনুন, ভুতের দেশ বুঝেছি আর । লােরেন। ভূত নয় কোথা ; আমি মহারাজে সারব ; আমার দেশের লোক কছুই চায় না,

মহারাজারা।
মহারাজের দোয়া ; দেশের বিদ্যা আর
উৎপন্নি যা, এ দেশে দেখায়ে, এর সঙ্গে
মিল চায় একটা, বাণিয্য কাজ করতে।
( সকলের প্রস্থান।)
নবম দৃশ্য।
হেমাঙ্গিনীর গৃহ। হেমাঙ্গিনী, হেমাবতী ও অম্বালিকা। হেমাঙ্গিনী
বিয়েত্তেজিত ভাবে রাজার সাক্ষাৎ ঘটনা বর্ণন। তাঁহার চক্ষু
বিকসিত, মুখ বিবর্ণ। অম্বা ও হেমা অাশ্চর্যভাবে শ্রবণ।
হেমাঙ্গি। কোথা যে উদ্যান মধ্যে, এই আগে আগে,
আর খুঁজে পেলাম না। ব্যাকুল অন্তরে
চারি দিকে ধাইলাম, কেমন যে হলো,
কোথায় এসেছি যেন, চিনি না কিছুই।
সকলি নুতন যেন ; সে পথ (ও) হারায়ে
গেল, যেখানেতে কথা। অন্ধ হয়ে ফিরতে,
উদ্যানের বা’র হয়ে পড়লাম কেমনে।
অন্তুর আকুল কাণে চক্ষেও লাগে বন্ধু।
হেমাব। আমি হলে ছাড় তাম না কিছুতেই পাছ;
দত্তম সঙ্গে সঙ্গে জামা ধরে তার।
সাধ্যি, ঘঁা, তোমার বড়, সব চেয়ে কি না ?

তৃতীয় অঙ্ক।
হেমাঙ্গি। আ সখি, এখন তিনি বাবা আমাদের।
বাবা বলে মনে আমরা করিব এখন
তঁারে। তিনি আমাদেরি ; তঁার দুঃখে আজ
আকুল হয়েছে মন আমার। উদ্ধার
করিব, আমরা তঁারে।-হা, কি দশা তার !
অঘা। উন্মত্ত মত, সত্যিই কি তিনি?
হেমাঙ্গি।
সেই ভাব ;
শােকে কি না করতে পারে ? আর সখি আমরা,
সুখী তারে করিতে কি পারব ?—কখন না।
এখন কেবল তার সঙ্গে একবার
একত্বর হয়ে, কেঁদে সুখী হব মাত্র,
মায়ের জন্যে।
অঘা।
হা, হাত আর কি!
হেমাব ।
দিদি,
আমিও এবার যাৰ, বাবাকে দেখিতে ?
পত্র পেয়ে প্রথমেই কি ভাব দেখিলে ?
হেমাঙ্গি। এস্ত, আশ্চর্য, অবাক। মা বুঝি জীবিত,
তার জ্ঞান হয়েছিল।
আহা, আজ তিনি,
থাকিতেন বেঁচে।
হেমাঙ্গি।
সখি, আর তাকে এনে,
সংসারের সুখে সুখী করতে পারিব না;

মহারাজারাম।
।
স্বর্গে সুখী করব তারে সংসার হতেও,
আকাঙ্ক্ষিত কাৰ্য্য তার সেখানে পাঠায়ে ।
দুল্লালসা জিব, সখি, পােড়া দুষ্টার।
জোকের শোষক মুখে দিব ক্ষার বিষ ।
বিকৃত মুখ ভদীতে পপি শাস্তি পাক।
হেমব । নাক কাণ কেটে দিয়ে, মাথা নেড়া করে ।
( অম্বা, হেমাবতীর মুখপানে চাহিয়া ঈষৎ হাস্য।
হেমাঙ্গি। মনের আকাঙ্ক্ষা সখি পেতেছে না পথ।
‘স্ত্রী জীবন অপদার্থ ! কেন এ জীরে,
চৈতন্য অনল সঙ্গে সংযোগিছে কাল,
প্রতিক্ষণে মৃত জড় রাশি, জানি না তা ;
নিবাতে, না জ্বালিতে সে অনল?হা ধিক
আমায় ! মা বৃথা সখি ধরেছিলেন, এ
মাংসপিণ্ড উদরেতে। তঁারি রক্তের ত
এই হাত ; এ বড়ই কৃতগ্ন ; তার সে
জীবন হন্তার প্রতি, প্রতিহিংসা লতে,
কেন এ তাকায়ে আছে কুমার, ভদ্রক
পানে। কিছুই না পারে আত্ম-মুক্ত হোক।
জননীর চক্ষু জলে সিক্ত এ ধরার,
উপম্ব খেয়ে কেন কলঙ্কিত হয়।
হেমাঙ্গিনীর অধীর ভাবে প্রস্থান তাৎ হেমা ও অম্বার প্রস্থান ।

তৃতীয় অঙ্ক।
দশন দৃশ্য ।
একটি রাজপথে যশরাজ ও মহিমান। কয়েকজন সম্রান্ত
নাগরিকের প্রবেশ ।
একজন। কি মহাশয় এ? কি কথা এ শুনি ?—যুদ্ধে
কুমার ভদ্রক নাকি রাজ্যের বিদ্রোহী,
শত্রুদের সঙ্গে যোগে ?
মহি।
}
অসম্ভব কথা;
বিজনগরের যারা ঋতুর বাতাস,
তারা যে সহসা ফিরবে, অকরণে স্থির
হােন আপনারা, আছে অবশ্য কারণ।
দ্বিতীয়। রাজপরিবারের অন্তরঙ্গ আপনারা
শীঘ্রই সত্যতা এর সন্ধান কৰুন।
হুলুস্থুল পড়ে গেছে নগরেতে ; লোকে
রাজপথ পরিপূর্ণ ; বিস্ময় সন্ত্রাসে
ছুটচে লোক এ ওরে সুধ'য়ে। যুদ্ধাগত
রাজগণ সঙ্গে মন্ত্রী, রাজার উদ্দেশে।
সৈন্যের পচিালিত চারদিকময়।
সময়ে আমরা সব আত্মচিন্তা করি ।
মহি।
স্থির হোন, অবশ্য এ জনরব মাত্র।
কুমার, ভদ্ৰক কিসে রাজ্যের বিদ্রোহী ?

১৪
মহারাজারাম।
কি কারণে? রাজ্য এ ত তাদেরি এখন।
অভিপ্রায়, অবস্থা-গতি কিসে বোধ এ ?
যশ। কারণ অবশ্য কিছু অভ্যন্তরে আছে।
তীয়। মন্ত্রী মহাশয়(ই) নিজে আরো যে ব্যাকুল।
নগর মুস্থির হাতে থাকে কি রকমে ?
মহি।
যা আপনারা, আমরা সন্ধানি কারণ।
প্রথম। আপনারাই আমাদের সর্বপক্ষে নেতা;
নগর আপনাদের হাতে, রাধুন নগর।
( সকলের প্রস্থান।)
একাদশ দৃশ্য।
সেই শান্তি উপবন। জালে ঘেরা একটা সুপক্ক ফল বৃক্ষে, একটা
নিশাচর পক্ষী অ'দ্ধ ; রাজা ব্যর্থতার সহিত উহাকে
মােচন। রাণী ধীরে ধীরে রাঙ্গার নিকটবর্তনী।
৩
রাজা। আমারি পরীক্ষা জন্য, সকলি এ (দখি।
ও—আমি উদ্ধার করব, মুক্ত করব এরে।
হ! এই ত সংসার? ( মুক্ত করিয়া )
যাও উড়ে বিহঙ্গ।
আমারে উদ্ধার করে, কে আছে এমন ?
( পক্ষকে ছাড়িয়া দেওন)

তৃতীয় অঞ্চ। রাণী। রাণী । ( নিকটবর্তী হইয়া ) মহারাজ! ( রাজার চমকিতভাব দেখিয়া ) আপনারি দাসী।-কি ভাব? কিসের চিন্তায় মগ্ন নির্জনে একাকী ? আমাকে বঞ্চনা করে, কি সুখ গােপনে সম্ভোগ করচেন এসে ? শুনিব বলুন, বলুন মহারাজ ? রাজা। (হস্তদ্বারা মুখ ঢাকিয়া) ঃ—এই মুর্তিটাই দারুণ ভয়ঙ্করা, হৃদকম্পকারী মুত্ত! বিরক্ত আপনি বুঝি আমার আসায় । অপরাধ ক্ষমা, রাজা, কৰুন আমার, চলিলাম আমি। ( গমনােদ্যত ) রাঙ্গা। যাও কেন, থাক, থাক ; নরকমূৰ্ত্তি তােমরা, আর কত কাল, শাস্তিবে আমায় হেন! একেবারে ভেঙ্গে এস, উথলি নরক, আগুন তুফান- মুর্তি! গ্রাস কর আমা, চূর্ণ কর আমা; নিস্বত্ত্বা করে পুন, দেখাও শান্তি-রাজ্য! রাণী। কি মহারাজ ? নরকমুর্তি আমি এখন ? এই শেষে বটে? (ক্রোধভরে গমনােদত, রাজা শীঘ্র আসিয়া পথ রােধ।) কেন, কেন না, হাড়

মহারাজারাম
।
?
পথ, যাই ।
রাজা।
থাক, দে ও শান্তি, যা ভােগ
হয়ে, তোমার যা শান্তি।
রাণী। { ক্ষণ কাল রাজার প্রতি চাহিয়া ) এ কেমন ভাব,
বলুন আমাকে রাজা ? আত্মহত্যা নৈলে
হব আমি ; আত্মহত্যা হব, সম্মুখেতে,
আপনার আজ। আমি আপনার মুখে
শুনিব সে বজ্রকথা, প্রাণের উমুরি
যা আমার। বলুন, বলুন কি শুনি ?
( রাজার প্রতি দৃঢ় ভাবে দৃষ্টি।)
রাজা। কি আর শুনিতে চাও?—তােমারি জন্যেতে,
( যার প্রতিমূৰ্ত্তি তুমি, সম্মুখে, আমার )
স্বর্গ, মর্ত, ত্রিভুবন সম্মুখে দাঁড়ায়ে
অপরাধী আমি। যার জন্যে এত, সেই
।
তুমি, তােমার কাছেও, কত দোষে দোষী।
আপনার কাছে পাই, আপনি ধিক্কার।
কৃতঘ্ন, বিশ্বাসঘাতী, তােমা জন্যে আমি,
নর হত্যাকারী নর, পাতকী পিশাচ।
দেও, হে পাতকযােনি, এ পাপের শাজা।
রাণী। ( কম্পিতকলেবর, চতুর্দিক নিরীক্ষণ ও ভূমে পড়িয়া)
ওঃ স্বর্গ, ধৰ্ম, ঈশ্বর !–হা ঈশ্বর তুমি ।
রাজা। (ক্ষণ নিরীক্ষণে) অঃ মায় অভিনয় এমন সুসঙ্গত!

তৃতীয় অঙ্ক।
রাণী । (সহসা উঠিয়া ) কি, তবে বলব এখন, বব মহারাজ?
কেন তবে তখন, মনে নাই সে দিন ?
কৰুন দেখি মনে, একবার ? আমার
জন্যে যদি এত, আমি কি পড়েছিলাম,
পায়ে আপনার ? আমি বড়ই কি দায়ে
পড়েছিলাম, তাই, অপিনি আমায় কি,
উদ্ধার করিতে গিয়ে, নরকে পতিত ?
এলায়ে যে আপনিই চরণে আমার
পড়েছিলেন, দ্রব হয়ে, রক্ষ আমারে
বলি। মনে নাই সে দিন কি ? কাপুৰুষ,
লম্পট, কামুক, হেয়, দুরাচার, আপনি
কৃতঘ্ন, বিশ্বাসঘাতী, প্রবঞ্চক শঠ।
পরম ধার্মিক লোকে জানে আপনাকে,
মহা সত্যবাদী, এই, এই কি সে ফল ?
{ রাজা স্তম্ভিতভাবে তাহার প্রতি দৃষ্টি। রাণী ক্ষণবিরামে ।
কেন তবে তখন আমারে, এত করে,
এতেক দেখায়ে, মুখে সুমধুর বাঁশি,
মাথায় অনল দীপ্তি, মৃগঘাতী ব্যাধ,
সরলা কুরঙ্গী আমা আকর্ষণ করে,
বক্ষে ছুরী ?—আমি ত ছিলাম ভাল,
মেহময় পিতার একমাত্র কন্যা,
আদরিণী; প্রেমোচ্ছাসে ভাসায়ে আমারে,

মহারাজারাম ।
এনে ফেলে, কোথায় আপনি অপমৃত।
আদর-তরঙ্গে আমি মেহের সলিলে
আজীবন ভেসেছি। ওঃ, নিষ্ঠুর আপনি,
কঠিন পাষাণ ! বৃন্ত হ'তে ফুলটিকে
ছিড়ে যে, নিষ্ঠ র সেও। নরঘাতী দস্যু
আপনি। বাধে না শত হত্যা আপনারে।
(রাজা কম্পিত কলেবরে বক্ষধারণ। রাণী ক্ষণবিরামে।
মা গো, আমি এমন শতছিদ্র তরীতে
ভরেছিলাম সুখ-ভরা ! সুখবাসা
বাঁধিয়া ছিলাম অগ্নিগিরি শিরে! আমি
নাশ যে হলাম। হে স্বর্গ, হে দেবতারা,
তােমরা সকলে সাক্ষী ।
{ রাজা চমকিতভাবে প্রস্থানােত। রাণী সম্মুখস্থ হইয়া)
কোথা যান, যান
দেখি ? গলায় পা দিয়ে, মাৰুন আমাকে
আগে ?
রাজা। ( ভূতলে পতিত হইয়া )
আমারেই কর হত্যা, আমি(ই) জানি
শত দোষে দোষী, মুর্তি, চারিদিকেতেই।
আমারেই হত্যা কর?
( স্তব্ধভাবে ) কি এ, মহারাজ ?
রাজা। বল, কিসে আমার, যাবে এ পাপরাশী,
রাণী।

তৃতীয় অঙ্ক।
৯৯
রাণী।
তুমি না শাস্তিলে আমা, হত্যা শান্তি বিলা।
রাণী। আপনি লােহার অস্ত্র, ছার তৃণ আমি;
আপনা শাস্তিব আমি? রক্ষুন আমারে,
ধর্মের দোহাই, দেব! ( চরণে পতন )
রাজা।
বিষম ছলনা, (ওঃ ! )
( উঠিয়া গমনােত)
(সম্মখীন হইয়া)
ধর্মসাক্ষী করে ( মনে আছে কি এখন ?)
বিবাহ সময়ে বদ্ধ অঙ্গীকারে আপনি,
রক্ষা করিবেন আমা, সকল বিপদে।
রাজন্ ! চাই না আমি কিছুমাত্র আর,
রাখুন আপন ধৰ্ম্ম রাখতে যদি হয়,
রাজা আপনি, ধৰ্ম্ম মূর্তি ।কুমার, ভদ্রক,
রাজ্যের বিদ্রোহী, যােগে শত্রুদের সঙ্গে।
বাবারে করিতে দূর, আমারে নাশিতে ;
রাজ্য ছারখার ক তে মুসন্মানে এনে ।
(রাজা স্তম্ভিতভাবে তাঁহার মুখ নিরীক্ষণ। সহসা অন্ধকার,
বিদ্যুৎ ইত্যাদি। মােহিনী বহির্ভাগ হইতে রাণীকে আকর্ষণ ।)
ওঃ কি অদ্ভুত কাণ্ড এ, সকলি যা দেখি ।
কোথা মূর্তি তিরােহিত, ঘোর অন্ধকার ;
(প্রস্থান।)
রাজা।

মহারাজারাম
দ্বাদশ দৃশ্য
চতুর্দিক ব্যপ্তি অনল ; মধ্যে মােহিনী দিব্যাঙ্গন বেশে উপবিষ্ট।
রাজার প্রবেশ পূৰ্ব্বক স্তম্ভবৎ দণ্ডায়মান ।
মােহিনী। পরীক্ষা দেখাও রাজা, পরীক্ষা দেখাও
অনল মধ্যেতে দেখ, কমনীয় রূপ ।
( রাজা ত্রাসে স্তম্ভবৎ দণ্ডায়মান। অগ্নি জ্বলিতে জ্বলিতে সহসা
নিৰ্ব্বাণ।
অন্ধকার ও বিদ্যুৎ ইত্যাদি, পরে মোহিনী সহ সকল
অপগম । রাজা কম্পিত কলেবরে সন্ত্রাসিত চক্ষে চতুর্দিক নিরী-
ক্ষণ। মন্ত্রীসহ যুবাগত রাজগণ প্রবেশ। রাজা তাহাদের দেখিয়া )
কোথা, কোথা দেবগণ, রক্ষ আসি আম।
অদ্ভুত বিষম ঘােরে পড়ে হত জ্ঞান।
ত্রয়ােদশ দশ্য।
রাজ। উক্ত অবস্থায়, যুদ্ধাগত নৃপতিগণ ও মন্ত্রী।
একজন । হিন্দুকুল চুড়ামণি, রাজ রাজেশ্বর,
রাখুন আপনি সব ।
কি অজ্ঞা বলুন ?

তৃতীয় অঙ্ক।
১০১
দ্বিতীয়। হিন্দুকুলের গৌরব,রক্ষা, দেশ রক্ষা,
ধন প্রাণ মান রক্ষণ। কুমার ভদ্রক
রাজ্যের বিদ্রোহী ; রাজ্য রক্ষা চাই আমরা।
রাজা। আদেশ কৰুন তবে, অস্ত্র ধরি আমি।
তৃতীয়। আঃ, ধৰ্মমূৰ্ত্তি আপনি।
দ্বিতীয়।
এতদূর নয়,
প্রয়ােজন আমাদের। আদেশে আনার,
সকলি পারিবে হতে। স্বাক্ষর করুন,
নির্বোধ বালকদের, পদচ্যুতি পত্রে ;
মন্ত্রি মহাশয়ে দিন যুদ্ধের যে ভার।
সময় বহিয়া যায় ।
চতুর্থ।
স্বাক্ষর করুন,
প্রস্তুত উভয় পত্র।
দ্বিতীয়।
স্বাক্ষর কন ?
(পত্র বাহির করিয়া প্রদান। রাজা হতবুদ্ধি ভাবে চতুর্দিক
নিরীক্ষণ ও অন্যমনস্ক পত্র স্বাক্ষর।)
মন্ত্রী। পিতা ও আত্মীয় পক্ষে, কেমন বিষম,
করিতে বিৰুদ্ধাচার স্নেহ বস্তু যারা ;
ভূমে হ'তে কোলে তুলে নিয়েছি যাদের,
তাদেরি ফেলিতে ভূমে, বাধ্য করল তারা।
রাজা। (রাজা হতবুদ্ধিভাবে সকলের প্রতি দৃষ্টি')

মহারাজারাম।
সকলে। জয়, মহারাজ, জয়, জয় আপনার।
( সকলে কোলাহল রাজা সহসা একদিক দিয়া প্রস্থান, অপর
সকলের অন্যদিক দিয়া প্রস্থান।)
চতুর্দশ দৃশ্য।
সেই স্থান।
( মােহিনী কুহকিনীবেশে নাচিতে নাচিতে ।।
বেস, হয়েছে, বেস্ হয়েছে, আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।
বঁধ ভেঙ্গেছে, স্রোত নেমেছে, আমার কপাল ভরে।
আহা
বেস, হয়েছে, বেস, হয়েছে, আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।
বাঁধ ভেঙ্গেছে, স্রোত নেমেছে, আমার কপাল ভরে।
গগণ-তারা, গগণ ছাড়া, পড়ুক সাগর কুল ।
অলক্ষণ, বলুক আর জন, আমি গণব ফুল ।
আহা-
বেস, হয়েছে, বেস হয়েছে, আকাশ ভেঙ্গে পড়ে ।
বাঁধ ভেঙ্গেছে, স্রোত নেমেছে, আমার কপাল ভরে।
খেপুক রাজা, আমার সাজা, এভাবে কেমন করে ।
চল্লাম আমি, হৃদের স্বামী, নিইগে হাতে ধরে ।
( নাচিতে নাচিতে প্রস্থান।)
---

চতুর্থ অঙ্ক।
।
প্রথম দশ্য।
;
তেলিঙ্গানা; কুমার ও ভদ্রকের শিবির। শিবিরের এক প্রান্ত।
পৰ্যবেক্ষণে কুমার ও ভদ্রক, এক ভাগে ভদ্ৰক পরিক্রমণ ও
অপর ভাগে কুমার দাড়াইয়া সঙ্গীত।
রাগিণীশঙ্করা। ভাল—আড়াঠেকা।
যামিনী গভীরে ডুবে, সংসার সব, অতি নীরবে।
প্ৰবহ সমীরণে, খেলে ঢেউ কিরণে, ভাসে তাহে
চন্দ্র তারকা সব ॥
ভদ্রক। ( নিকটবর্তী হইয়া )
কি, গীতের তানে যে, ক্ষণে ক্ষণে, ভাবেতে
নিমগ্ন হচ্ছিলে ?
কুমার।
ভাই, কখন আমার
অভিষ্ট যদি আমি সিদ্ধ করতে পারি, তা,
আমার রাজ্যকে আমি, শান্তিময় করব,
শরৎ যামিনী প্রায়।
ভদ্রক।
বড়ই উজ্জ্বল,

মহারাজারাম ।
কুমার।
অভিলাষ এ !
ভাই, শান্তি অভিলাষী
বড় আমি ; যদিচ এ স্বভাব আমার,
সমর কঠিন ক্ষেত্রে, বীর দর্প তাপে,
উষ্ণকটি জাত বৃক্ষ সমান কঠিন,
তথাপি মজ্জায় এর সঞ্চরিত আছে,
কোমল তরল রস। ভাই, এ কেবল
তুমিই আমার রক্ষা করেছ স্বভাব,
নৈলে, প্রলয়ের দৈত্য হয়ে পড়িতাম
আমি। দেখ, তাদের উত্তর ত এখন,
বিলক্ষণ আশাময়। রাতেই এখনি
জানাবে এসে দূত, ধৰ্য অভিপ্রায় যা,
তাদের, আমাদের প্রতি। অনুকুল তা
নিশ্চয় (ই) হবে জানি আমি।
কি বলা যায়।
( পদশব্দ শুনিয়া)
ভদ্রক।
কে, কেও ?
দূত প্রবেশ করিয়া) রাজধাণীর দূত।
ভদ্রক।
কি সম্বাদ ?
( দূত ভদ্রকের হস্তে পত্র প্রদান। ভদ্ৰক পত্ৰ লইয়া পাঠ । )
কুমার। (দূতের প্রতি) কি সম্বাদ এতদিন পরে দেশের ত,
মঙ্গল ? সৈন্য যােট ত, আড়ম্বরে হচ্চে?--

চতুর্থ তঙ্ক।
কিন্তু, তুমি কেমন করে এলে ?
দূত।
শত্রুরা,
সব পলাতক আজ, মন্ত্রি মহাশর
অগে। সব পরিস্কার, নদীতীর হতে।
( ভদ্ৰক পড়িতে পড়িতে দূতের প্রতি দৃষ্টি ও পুনর্বার পাঠ।)
কুমার। কি, মন্ত্রিমহাশয় সসৈন্যে নাকি ?
দূত।
আত্তে।
ভদ্রক। যাও দূত, মহারাজে বল গে, আমরা
সাধ্যমত শিরােধার্য্য করিব আদেশ
তার । ( কুমারের প্রতি) পত্র দেখ। দূতের প্রস্থান।)
কুমার। (পত্র পাঠান্তে) বাবা পদচ্যুত করলেন,
ভদ্ৰক ?
ভদ্রক।
ক্ষতি কি, আমরা কিছু তার কথা
শুনিতে প্রস্তুত নই।
কুমার ।
তবু তিনি বাবা,
তঁার এ মুখের বাক্যে, বড় কষ্ট হ'ল
আমার ।
ভদ্রক।
মনে ও করো না; তোমার বাবা,
আর বাবা কি আছেন? কেবল আকৃতি
মাত্র তাঁর ; বাবা আর বলোনা তারে।
কুমার। না ভাই, ও বলোনাক; বাবা আমি তারে
বল্ব ; তিনি আমায় খড়ম হস্তে, সংহারে
•
১৪

মহারাজারাম।
উদ্যত হলেও, আমি, বাবা বলে তারে,
তারেই ধরব ; তা ভিন্ন আমি, নিরাপদ
আশ্রয়, জানি না আর কিছুই।ভদ্রক,
চমকে মন, না জাতে, ডেকে উঠে যারে,
আমি ভারে ডাব, বাবা বলে ডাক্ব। দেই
পতন কালেও ভারি নাম ধরে, এই
সংসার ত্যাগ করব।
যাকু ভাই, তা নয় ;-
আমার এ বলা, তুমি কিছু দৃঢ় হও।
সামান্য আঘাতে এই, ভগ্ন হলে এত,
সংসারে কিছুই নয় অসম্ভব ! দেখতে
পাবে, কত বজ্রাঘাত হেন, যার শব্দে
স্তম্ভবৎ হতে হবে। (দুতের প্রবেশ)
কে আসে ও,-দূত?
ভদ্রক।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
কুমার, ভদ্ৰক ও দূত।
ভদ্রক। ও, তুমি পোঁছেছ ?
কুমার। (তটস্তে )
কি, কি সম্বাদ ?-তোমার
চনে, টাঙ্গান প্রাণ, আমাদের ;--বল?

চতুর্থ অঙ্ক।
কি তাদের অভিপ্রায় ; মন্ত্রী উপস্থিত ;
এক যােগ শীত্র ত্বরণ হওয়াই উচিত।
প্রভাে, কি বলিব, সব বিপরীত হলাে।
বিপক্ষের আর পক্ষ নয় আমাদের।
সন্ধির প্রস্তাৰ সব উলটিয়া গেছে।
যাত্রা তারা করেছে, আমাদের বিপক্ষে।
গলকণ্ডরাজ, সব নষ্ট করেছেন।
পুত্রহত্তা আপনারা তাঁর, সেই রােষে।
“মিত্ৰতা কাফর সঙ্গে ; মহম্মদ বাণী
প্রাণ নাশে যাহাদের। শত্রু পুন যারা,
চির-শত্রু, পৌত্তলিক! এ যােগে যদি না,
নি-হিন্দু ভারত হবে, তবে আর কিসে ?”
এইরূপ বাক্যে তার সব ফিরে গেল।
আগেই তাদের যাত্রা আমাদের প্রতি।
প্রহরের মধ্যে তারা এসে দেখা দিবে।
কুমার। হা, আমরা অতলে পলাম !
ভদ্রক। (ক্ষণ চিন্তায়) এস শীঘ্র ।
;
(সহসা প্রস্থান। কুমার তৎপশ্চাৎ পশ্চাৎ প্রস্থান।
দুত অপর দিক দিয়া প্রস্থান।

মহারাজারাম।
তৃতীয় দৃশ্য।
একটা অনাবৃত স্থান। কয়েকজন সৈন্যাধ্যক্ষ।
;
একজন। এখনো সকলি রক্ষা হতে পারে; কিন্তু
মুহূর্ত বিলম্ব নয় আর ।
দ্বিতীয়।
প্রস্থানের
এখনি আদেশ কর। মন্ত্রির দয়ায়
অবশ্য পাব স্থান।
তৃতীয়।
বিজয় নগরের
বহু দুটা আমরা, কেটে ফেলে চলিলাম !
প্রথম। কি করি তা বল শেষে যুবরাজদের
অদৃষ্টে, ই-ছিল ; হাত কি, চল আমরা-
বিদায় লয়ে, চল, তাদের কাছে, যাই ।
দ্বিতীয়। লোক নকুভার কাল নাই আর ; তাতে
বিশেষতঃ দুঃখ বৈ, সুখ নাই। শিবির
ভেঙ্গে, মার হাটারা এতক্ষণ, দূরে চলে
গেল ।
তৃতীয়।
আঃ ঈশ্বর, রেখো, প্রাণটা তাদের ।
প্রথম। যদি তার ছদ্মবেশে, কোন রূপ করে,
আবর্তে একবার পেঁছিতে পারেন,
-

চতুর্থ অঙ্ক।
তথাকার রাজাদের সাহায্যের বলে,
অবশ্য সকল শেষে উদ্ধার করবেন ।
( সকলের প্রস্থান।)
চতুর্থ দৃশ্য।
•
একটি নির্জন প্রান্তে কুমার ও ভদ্রক।
কুমার।
আর কি ফল, সঙ্গে, দেখা করে তাদের
কেবল বিকৃত মুখ দেখানই হবে।
ভদ্রক। এখন কেবল মাত্র দুটি পথ আছে ;-
মন্ত্রির শরণ লওয়া, কিম্বা ছদ্মবেশে
আৰ্যবৰ্ত্ত পলায়ন। কিন্তু এখনি(ই) তা ;
ক্ষণমাত্ৰে শত্ৰু এসে এস্থান ঘেরিবে।
কুমার। (ক্ষণ চিন্তায়। ছদ্মবেশ দেও আমা, তাহাই পরিব ।
রাজ্যে আমি দেখাব না, এ মুখ কখন ।
ভদ্রক। কিন্তু প্রাণ আমাদের সংশয় এ দিকে।
রাজ্যে গেলে, মিথ্যা, শী অপগম হবে ;
সত্যের জ্যোতিতে সব পরিস্কার করতে
পারিব তখন আমরা।
কুমার।
হীন, অপরাধি
ভাবে, রাজ্যে প্রবেশিতে কখন পারব না।
দর হতে আগে হােক্ এভাব মােন ;

মহারাজারাম।
=
তবে যাব রাজ্যে, রাজ্য, ডাকলে আমাদের।
ভদ্রক। ভৃত্যদের বেশ এই, ঢাক অঙ্গ এতে;
রাত্রি পােহইয়া গেল, শীঘ্র ওই বনে,
আশ্রয় লইগে, দিনমানকার মত।(পরিচ্ছদ প্রদান)
কুমার। (পরিচ্ছদ গ্রহণে উষা মুখে তাকাইয়া )
অঃ, প্রভাতি তার রূপ এক-চোখি উষা,
নিশা ক্রোড় থেকে যেন, কেড়ে নিতে আসছে
আমাদের। তমােচর হলাম আমরা।
ভদ্রক। কিছুই আশ্চৰ্য্য নয়, বলেছি তােমাকে।
উঠিতে, পড়িতে কিম্বা, ওলট, পালটে,
এক(ই) ভাব পাওয়া চাই, আটপিটে হয়ে ।
( কুমারকে পরিচ্ছদ পরিধানে অপারক দেখিয়া ভদ্ৰক দেখাইয়া
দেওম।)
কুমার। রাজবেশ পাবে আমাকে, বলেছিলে ;
ইহাই পরালে শেষে!
ভদ্রক। (কুমারের মুখ প্রতি দৃঢ় দৃষ্টে) প্রাণ এ পরাতে
পারি, যদি সাজে ভাল ; চাও তুমি তা কি ?
কুমার। না ভাই ঘাট হয়েছে আমার। আমার
এখন উপযুক্ত ইহাই, অধিকার
আর কিবা আছে, ভাই, রাজপরিচ্ছদে।
ভদ্রক। না, না, এর সুরে সুত্রে দৃঢ় অধিকার
আমাদের ত্যাগ করচি বটে ইহ, অঙ্গ
;

চতুর্থ অঙ্ক।
হতে, কিন্তু সতত অন্তরে পরে থাকত।
রাজা সেই, রাজ্য চিন্তা করে যে ; কিরীটী,
সিংহাসন ভরে, বসে যেই, ছত্র তলে,
রাজা নয় সে ; চিন্তাই আকাক্ষিত পদে
প্রতিষ্ঠিত করে রাখে মানুষে, যেমন
সংস্থিত হােক না কেন সে, সংসারে। কিন্তু
হীন, ক্রীয়া শূন্য, দেব বিগ্রহ(ও) পাষাণ।
নরক চিত্তাকারী, স্বর্ণখটে বসেও
নারকী। উচ্চ স্বর্গবাসী, উচ্চ অভিলাষী
দরিদ্রও)।
কুমার। দুঃখিত কিছু নই আমি এতে।
(পরিচ্ছদ ত্যাগ করিয়া ভদ্ৰককে প্রদান।)
লও, কিন্তু রাখ ইহা লুকায়ে সঙ্গেতে ;
শক্ত হস্তে পড়ি যদি, এ বেশে কখন
যবন রাজারে মুখ দেখাতে পারব না।
( ভদ্ৰক কুমারের পরিচ্ছদ লইয়া, আপম পরিচ্ছদ উম্মােচন, ও
তাহা হইতে একখানি পত্ৰ গােপনভাবে গ্রহণ ।)
ওকি, ও পত্র নাকি ?
ভদ্রক। ( অপ্রস্তুত ভাবে) হ্যা।
কুমার।
কোথাকার পর?
ভদ্রক। চল, এ, এখনকার কথা নয়; অন্য
অবসরে বন্সিৰ সে সব।
৩

মহারাজারাম। কুমার। কি আবার, সংক্ষেপে না হয়, বল ? বিরারের রাজা ভদ্রক। লিখেছেন- ফু মার। কি সম্বাদ তবে, বল শীঘ্র, কি কথা তাঁর ; পড় না, পড়া যেতে পারে, উষার উজ্বল মুখে ধরে। ভদ্রক। রাত্রি গেল, আশ্রয় লই গে চল। কুমার। বল আগে আমা? ভদ্রক। তুমি বড় উদ্ধত; শুনিবে ?—শােন তবে, আমা প্রতি এই পত্র বুিরার রাজার। (পত্ৰ খুলিয়া পাঠ।) • “মহাত্মা ভদ্রক, একবার আপনাকে আপনি স্মরণ করুন; ভেবে দেখুন, আপনি কি হয়েছেন। যে দুরাত্মা আপনার পিতৃহন্তা, রাজ্যভ্রষ্ট কারী, আপনি তারি অনুদাষ। আশ্চৰ্য্য ! সামান্য তৃণাঙ্কুরও, যে কোন রসেই পরিবর্জিত,হােক, বীজানু- রূপ মূৰ্ত্তি ও গুণ ধারণ করে। অধিক কি প্রয়ােজন, তবে এইমাত্র বলি, আপনার যদি ইচ্ছা হয় এবং অনুরোধও করি, আপনি অবিলম্বে এসে আমাদের সঙ্গে মিলিত হােন্। আপ- নার রাজ্য, রামরাজার রাজ্যের দ্বারা পরিপুষ্ট করে আমরা আপনাকে অর্পণ করব। যদি একান্তই এতে অসম্মত হন,

চতুর্থ অঙ্ক।
তবে নির্যই আমরা আপনাকে, কাফর গণ্য করে আপনার
প্রাণ নাশের চেষ্টা পাব। এই পত্রের প্রতি বিশ্বাসের নিমিত্ত
ইহাতে মহম্মদের নাম অঙ্কিত করলাম।”
( পাঠান্তে পত্র ছিড়িয়া ফেলন।)
কুমার । (ক্ষণ নিস্তব্ধে) কেন এ ছিড়িলে ভাই, অবিবেক কাজ
করিলে তুমি, কেন সঙ্গে এলে আমার ।
দুরাশা আমার ভাগ্য ; বিজয় নগর
জয়ী হবে এবার যে, সন্দেহ তাতেও। •
অতঃপর তুমি যদি রাজা হও, অন্য
অপেক্ষায়, সে সব রাজ্যে, সুখ তাতেও
অামার।
ভদ্রক।
বলেছি আর্মিত সব, তােমাকে।
আর কেন, চল ; তুমি আমাকে ধরেই,
সাগরে দিয়েছ ঝাপ, কখন তােমাকে
ত্যাগ করে যাবনা আমি।
কুমার । ( ক্ষণ নীরবে )
আঃ মৃত্যু, কোথা !
ভদ্রক। চল শীঘ্র, দিন যে প্রকাশ হয়ে পলাে ।
কুমার। যাবে তুমি ?—এস তবে।-ওঃ দুর্ভাগা আমি !
( উভয়ের প্রস্থান। )
কতকগুলি যবন সৈন্য ও একজন অধ্যক্ষ অশ্ব অরােহণে প্রবেশ ।
অধ্যক্ষ। এরি মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে চলে গেছে ?
আশ্চর্য !–দৌড়াও চারি দিকে ; নদীদিকে
৩

১১৪ মহারাজারাম ? চল সব ? একজন। কুমার, ভদক, অবশ্যই বনে আছে, যায়নি, তাদের সঙ্গে তারা। অধ্যক্ষ। দক্ষিণে সকল যাক; বন ঘেরি গিয়ে, চল আম্রা সকলেই।—চল সব চল ? ( সৈন্যের রঙ্গভূম অতিক্রম করিয়া প্রস্থান।) পঞ্চম দৃশ্য। - একটা প্রান্তর দৃশ্য ; নিকটে মহাবন ; দুইজন কৃষক ; একজন ভূমে পড়িয়া নিদ্রাগত, অপর জন নিদ্রা ত্যাগ উঠিয়া বসিয়া। ওরে মদো, ওট, কাগ ডাকচে, পুবে ফরসা মেরেছে ; গৰু গাে কর। ( মদো উঠিয়া ঘুমের ঘােরে মাথা গুজিয়া উপ- বেশন।) ঘুম ভাঙ্গারে, চ, রাত পেয়ালাে। ম’দো। ( বিরক্তভাবে ) তাড়া তাড়ি করচিস ক্যান? বাড়ি গিয়েও ত পড়ে ঘুম মারা। লাঙ্গল ত আর জুড়তে হবে না। প্রথম। গৰু সব কে কোথায় গিয়ে পড়বে যে- ম’দো। পড়ক যাঃ, পড়ুক না ক্যান? কাৰু ত খেত খােলা নেই যে নাগবে? বাছা ঘন সব, দে দোয়ার ওয়ার মেরে গাছ তলায় পড়ে ঘুম, মাৰুক।

চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম। আরে, গৰু সব কে কোথায় বয়ে পড়বে, খুঁজে
পাবি নে ।
ম’দো। পাই যা ; গৰু নিয়ে কি করবি ? শালার
যুদ্ধ থাকতে ত আর লাঙ্গল চলতে হবে না। এই চাষা
বেটার। যদি ভূয়ে হাল না ফেড়ে, ত কি খেয়ে সব মদ্দানি
করে, একবার দ্যাখা যায়। আর নয় জল আহার করে
যদ্দিন বাচি বাঁচ ব।
প্রথম। তা কার কাছে এ দুঃখ কর চিস? এই যে, সব
মাঠ, ডাকলে কথা কয়, ঘাসে খড়ে চড় চড় ক’রচে, দেখে
বুক
ফেটে যাচ্ছে। আবাদ হলে সোণৰ ফলত, খেয়ে সংসার
বাত।
ম’দো। শলাৱা দ্যাশ নেবেন, দশ নেবেন, এর দ্যাশ
উনি নেবেন, ওর দ্যাশ ইনি নেবেন। তাই কাটা কাটি করে
মরচেন । অ মর, বসুমতীর কি ওর আছে ; যে যা পারিস,
নে না, নিয়ে খা; কত খাবি। (পাচনি লইয়া উঠিয়া উর্দমুখে)
ই-ই-ই—সামলা;-বুদো, ই-ই-ই— উভয়ের প্রস্থান)
ষষ্ঠ দৃশ্য।
সেই স্থান। কুমার ও ভদ্রকের প্রবেশ ।
কুমার। অঃ ভাই, ধিক ধিক্ ; নির্বোধ আমরা বড় !

মহারাজারাম ।
;
তৃপ্তি নাই আমাদের ; শান্তিধ্বংস কারী
আমরা, সংসারের এই। মধু আহরণ
করিতে অামরা চাই কাঠ কোপাইয়া
চিনিনা সৌরভ পূর্ণ কোমল কুসুম !
প্রকৃতি সন্তান সত্য, কৃষকেরা এই ;
প্রশান্ত বক্ষেতে যার, শান্ত ভাবে শুয়ে
অমৃত কলস স্তন, পান করে সুখে।
অামরা সুন্দর বেশ ছিন্ন করি তার !
রাজ্য ধনে কাজ কি ? ভাই কেন বিবাদ ?
দুৱাকাক্ষা তৃপ্ত নয় । তৃপ্তিতেই মুখ
হয় যদি, একটি ফলে তৃপ্তি আছে, এই
অসীম, সৃষ্টি-ভাণ্ডারে । ধন্য কৃষকেরা !
তোমরা হিত দিলে আজ ! আর ভদ্রক,
রাজোর আকাক্ষী নই আমি, সুখী এখন
হতে পারব আমি, পদ মাত্র ভূমে, পেলে,
তোমার সহবাস মাত্র।
ভদ্রক।
এস এখন,
প্রাণ রক্ষা কর আগে বনে প্রবেশিয়ে ।
সকল বিষয়ে তুমি দ্রব হয়ে পড়।
কুমার। ( কিঞ্চিৎ দূর গমনে বন প্রতি দৃষ্টি করিয়া)
আহা, দেখ ভাই, সত্য, কেমন সুন্দর
এ বন ! আরো যেন সুন্দর দেখছি আজ। (আহা,)
}

চতুর্থ অঙ্ক।
১১৭
এত দিন পরে আজ হের রে নয়ন,
প্রকৃতির মুখ, দেখ, খােল রে ঘােমটা ।
লাবণ্য আধার বুঝি, পড়েছে চলকি,
বিধাতার, নৈলে হেথা, কেন বা নিরখি,
রূপ ছড়াছড়ি। তৰুকুল, না বিচারি
কে বা কোন জাতি, একাকারে জড়াজড়ি ;
লতা তাহে অঙ্গ ঢালি, বিলাসালিঙ্গনে,
চুষিছে অধর কার, কার গ্রীব-দেশ,
অঙ্গের চালনে কত স্খলিত ভূষণ।
আনন্দের দর্পে মত্ত বিহঙ্গম কুল,
সমুজ্জ্বল অঙ্গরাগে বিজলী প্রকাশি,
ধাইছে, বসিছে, তানে পুরিছে গহন,
মোহরা গাইতে কেহ, গাইছে অন্তরা,
প্রতিধ্বনি সহ গীত বন বেড়ি ফিরে।
সুমন্দ মলয় সহ মিলি অলিরাজ,
গায়ক ভিখারী বেশে, ফেরে কুঞ্জে কুঞ্জে,
পরিমল মাঙি, সদাব্রতে স্বভাবের ।
এই সদাব্রতে আজ, আমিও অতিথি ।
ভদ্রক। বড় দ্রব হয়ে গেলে, আবার দেখিযে ।
কুমার। সত্য, ভাই, আমি সব ভুলতে পারি, এই
সৃষ্টি-দুখ দেখে, শান্তি প্রতিমার । ভাই,
আমি প্রতিহিংসা লেগে, কভু উত্তেজিত

১১৮
মহারাজারাম।
1
)
হতাম না, বোধ হয়, দিদি না থাকিলে ।
{ বহির্ভাগে বহুতর কণ্ঠ স্বর ।
ভদ্রক। এ কি।শীঘ্র এস ?
কুমার ।
শত্ৰু এরি মধ্যে হেথা !
( দ্রুত উভয়ের প্রস্থান।)
(সৈন্যগণ ব্যস্তভাবে রঙ্গভূমে ক্ষণকাল এদিক ওদিক গতিবিধি ।)
সপ্তম দৃশ্য।
বনের একাংশ।
কুমার ও ভদ্রক, চঞ্চলভাবে ।
কুমার। কিন্তু এখন কি, চারি দিকে শত্রু ; নেই
অব্যাহতির উপায় । পরিচ্ছদ দাও ;-
অস্ত্র ধর? ( তাড়াতাড়ি উভয়ে পরিচ্ছদ পরিধান)
ভদ্রক।
তুমি একটু থাক এইখানে।
কুমার। কোথা যাবে তুমি ?
ভদ্রক।
শীঘ্র আস চি। ( দ্রুত প্রস্থান)
কুমার।
এ কি! তবে,
তুমিও কি ভদ্ৰক হৈ ! আর আমি,-যাও,
প্রতিবন্ধক হব না তােমার। { ক্ষণ চিন্তায়) কি, এই
ভূমি পাদ(ও) তবে, যাকে আশ্রয় দাঁড়ায়ে,

চতুর্থ অঙ্ক।
১১৯
ফেটে দুই খণ্ডে, ত্যাগ করিবে আমায়?--
কি কাজ জীবনে আর, কি কাজ অস্ত্রেতে।
;
কুমার।
( অস্ত্র পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক ভূমে উপবেশন। বহির্ভাগে মানু-
যের রব। কুমার উঠিয়া আবার অস্ত্র ধারণ ।)
কি, অপমান হব শক্ত হাতে ? জীবন।
ভদ্রক। ( ফিরিয়া আসিয়া )
উপায় নাই আর, চারি দিকেই শত্রু।
এই মাত্র পথ ; শীঘ্র, এই পথ ধরে,
সিংহ বধ করি আমরা শিকারে সে দিন
যে গুহায়, আশ্রয় লগে সেথা, শীঘ্র—
( ভদ্রকের মুখ পানে চাহিয়া )
তুমি ?
ভদ্রক।
আমি তােমারি জন্যে, আশু তােমায়
ত্যাগ কর চি। শত্রু সব দ্রুত অনুসরে
চারি দিক হতে ; আমরা এড়াতে পারব না,
কিছুতে তাদের হাত। যুদ্ধেতে আটক
করে রাখি তাদের ক্ষণেক, গােলযােগে,
চারি দিককার শত্রু একত্বর করে ;
গুহায় পেঁছিতে তুমি পারবে ততক্ষণ ।
কুমার। কি কাজ আমার প্রাণে, তােমার জীবন,
যায় যদি শত্ৰুহাতে।
ভদ্রক।
আমার জীবনে,

মহারাজারাম ।
;
আক্রোশ তাদের নাই তত, কৌশলেতে
প্রাণ আমি, রক্ষা করতে পারব কোন মতে ';
যদি ঘটে নাহি উঠে বিষম কিছুই।
তােমার জীবন প্রতি আক্রোশ তাদের
গলকণ্ড-রাজপুত্রে বধেছ তুমিই ।
কুমার। (ক্ষণ চিন্তায়।
না আমি যাব না, যুদ্ধ করি তোম। সঙ্গে।
তােমাকে ত্যাগ আমার, মৃত্যু অপেক্ষাও
ভয়ঙ্কর বোধ হচ্চে।
( নিকট শব্দ )
ভদ্রক। ( ত্রস্তভাবে )
যাও, যাও শীঘ্র,
শত্রু এসে পলো দেখ।
( কুমারকে মেন দেখিয়া ক্রোধে )
ভীৰু তুমি, ভীৰু
হতেও ভী।
এত ভয়ঙ্কর, তোমার
বোধ হচ্ছে আমাকে ত্যাগ করা ? সব কি
ঘুচাতে চাও তুমি, শত্রুর হাতে মরে ?
মহা ভীৰু সেই, যেই, বিপদেতে মৃত্যু
শ্রেয় করে। পৃথিবী পৰ্যাপ্ত আছে, যাও,
গিয়ে যুঝ, তার সহ মিলে, আমা জন্যে।
অন্ধকার যদি দেখ দিক, দুই চক্ষু
থাকতে, থাক, তবে থাক, মরি দুই জনে,
• মেষ প্রায় চক্ষু মুদে, কুপে ঝপ দিয়ে।

চতুর্থ অস্ক।
কুমার। আর না, ভাই, যাচ্ছি আমি, আর তােমায়
মনেও করব না, প্রাণ দিব উদ্যমেই।
( কুমারকে দূঃখিতভাবে প্রস্থাননাদ্যত দেখিয়া ।)
ভদ্রক। দাড়াও একটু ; এস, আলিঙ্গন করি
একবার। ( আলিঙ্গন। কুমার মৌনমুখ, ভদ্রক
দীর্ঘ নিশ্বাসে।)
যাও, চিন্তা করাে না কিছুই। (কুমারের প্রস্থান।)
অষ্টম দৃশ্য।
ভদ্রক। যবনসৈন্য কতকগুলি প্রবেশ ।
একজন। এই, এই, এই রে।
দ্বিত’য় ।
কৈ, আর একজন ?
তৃতীয়। দ্যাক, দ্যাক, দৌড়াে, দৌড়াে। ( যাইতে উদ্যত )
ভদ্রক। (করবারি ধারণে অগ্রসর } খাড়া রও।
প্রথম।
এ কি
এক লা যুদ্ধ আমাদের সঙ্গে ?
(সৈন্যগণ আক্রমণে উদ্যম। অপর সৈন্যগণ বহির্ভাগ
হইতে দেখিয়া বাহিরে কোলাহল। বিজাপুর ও তেলি-
জানার রাজার দ্রুত প্রবেশ। )
বিজাপুর রাজ। যুদ্ধ কেন আর ; অস্ত্র রাখ।
(সৈম্যের যুদ্ধে বিরত। ভদ্রকের প্রতি। )

মহারাজারাম।
,
বন্দী আনি আমাদের।
ভদ্রকা উচিত ব্যবহার করুন আমা প্রতি।
গলকরাজ।—গৌরব আপনার বাড়াব বন্ধুতায়।
বিজনগরের রাজা হবেন আপনি।
আসুন, বন্ধুর হাত গ্রহণ করুন। (হাত বাড়াইয়া )
শীঘ্র দেখাইয়া দিন, কুমার কোথায় ?
পিতৃহন্তা-পুত্র সেই আপনার, পুত্র
হন্তা, আমার । ( ভদ্রক মেনিভাবে নীরব)
কি চিন্তা করিছেন এত ?
বিষ চাটিছেন আপনি, মধু বোধ করে।
( ভদ্রক অধিকতর অবনত মুখ।
কাল নেই আর, শীঘ্র দেখাইয়ে দিন।
বিপক্ষ বিৰুদ্ধে আমরা নিশাতেই যাব।
বন্ধুতা গ্রহণে, সঙ্গে, চলুন উল্লাসে ;
পিতৃ সিংহাসনে আপনি বসিবেন শী।
বন্ধুতার বিশ্বাসেতে কুমারে দেখান ?
ভদ্রক। ওঃ, এই কি, বিশ্বাস বন্ধুতার?-যবন,
হত্যাকর আমায় ? { অস্ত্র ধারণ )
গলকগুরাজ।—( ক্রোধে )
কাফর, হাড়ে হাড়ে,
নিশ্চয় মরণ হবে আমাদের হাতে।
(সকলে মিলে ভদ্ৰককে আক্রমণ ও যুদ্ধ করিতে করিতে প্রস্থান।)

চতুর্থ তা।
নবমদ শ্য।
একটা নির্জন প্রান্তরে হেমাঙ্গিনী ও জীবন, সম্ম খে
একটা বট বৃক্ষ।
জীবন। এই বট তলে, বসুন একটু,
কাতর আপনি, হয়েছেন বড়।
হেমাঙ্গি। কোথায় যাচ্ছি যে, ভাই, বুঝিতে পার ছিনে ;
অন্তর আমার ভেঙ্গে গেছে, উড়ে গেছে,
আশা ও ভরসা, কষ্টে টেনে নিয়ে যাচ্চি
এ শরীর।
জীবন।
রাজকন্যা আপনি, আপনার
একি সয় ? তখনি, বলেছিলাম আমি,-
পথের এ কষ্ট, তাতে পড়ব কোথা, শত্রু
হাতে, নিৰ্বদ্ধির কাজ কেন করিলেন ?
শিবিকা কেন বা ফেলে, পায়ে চলে আসা।
সঙ্গে নাই লোক জন, কেবল এ আমি।
হেমাঙ্গি। পাগল তুমি, বােঝ না; কুমার, ভদ্রক,
আর কি পদস্থ আছে, রাজকন্যা বেশে,
আড়ম্বরে যাব তাই, সাক্ষাতে তাদের ?
কোথায় এখন তারা!
জীবন।
চারি দিকময় শত্রু,
বা’র হয়ে চলে যেতে, এখনও ঔার,
;
০

১২৪
মহারাজারাম ।
পারেননি উত্তরে বনে মাঝে নিশ্চয়(ই)
আছেন আশ্রয় নিয়ে ।
হেমাঙ্গি।
চল, আর আমি
বিশ্রাম চাই না ; কত দূর হবে বন ?
জীবন। অল্প দুর আছে আর, বেশী দূর নেই।
( উভয়ের প্রস্থান ।
দশন দৃশ্য।
বনমাঝে, ওহ সন্নিক ট কুমার।
দেখিনি আঁধার কভু এ হতে গভীর।
এ হতে, বিচ্ছিন্নকারী আঘাত(ও) পায়নি।
অনশনে অবসন্ন হইনি এমন।-
ভদ্রক, এখন আমি জানিতে পারতেছি,
কি তুমি আমার ছিলে—জীবন জীবন!
পলাতে পারি না আমি ; কার্যকরী বল
নাহিক আমার আর কিছুই আমাতে
আর হতে পারিবে যে, বুঝিতে পারছি না ।
না
( বহির্ভাগে ভদ্রক
ও কোথায় তােরা আম, লয়ে যাস?
( আশ্চর্ধ ভাবে
কুমার।

চতুর্থ অঙ্ক।
১২৫
নৈলে
একজন। (বহির্ভাগে )—এই বনে দেখায়ে দিন,
হুকুম ত শুনলেন, কাটব আমরা এখনি ।
ভদ্রক। আর আমি যাব নাক, যা হয় তা কর।
কুমার। ভদ্ৰকে, দেখতে আমা, এনেছে শত্রুরা।
( তুলয়ার ধারণ)
বহির্ভাগে। একগুয়ে আপনি ;-চল,
;-চল, নিয়ে চল রে ।
এক জুন। ও-এর এই দিকেই অসচে; দেখি ভাব।
( কুমার অপসৃত। মােহিনী কুহকিনী বেশে সহসা দৃশ্যে
প্রবেশ ও চঞ্চল ভাবে ইতস্তত ক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া
কুমারের পশ্চাৎ অপসৃত। শৃঙ্খলবদ্ধ ভদ্রককে
লইয়া কতকগুলি সৈন্যের প্রবেশ ।)
সৈন্যাধ্যক্ষ । আপনার দশ' ভেবে দেখুন, পরের
জন্যে কেন প্রাণ দেন। দেখুন একটি
আঘাতে আর আপনি নেই। বেঁচে থাকিলে
কি সুখ না হতে পারে, এই এ জীবনে।
রাজেশ্বয় রাজা, পূজ্য, দেশ ও বিদেশে ।
ভদ্রক। (ক্ষণ মোঙাবে থাকিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগে )
শীঘ্র হত্যা কর আমা।
কুমার। ( অন্তরালে ) হত্যা করবে বটে?
( অস্ত্রধারণ, সহসা অন্ধকার দৃষ্টে শরীর জড়বৎ বোধে স্তব্ধ।
একজন সৈন্য। ভাব কি, কিসের শব্দ হয় ?
দ্বিতীয়।
শেয়ালটা

মহারাজারাম।
হবে।
ভদ্রক। (চকিত ভাবে) কুমার কখন, পড়বে না তোদের
হাতে ; স্বচক্ষেও যদি দেখে সে, আমার
মৃত্যু। অন্তরের ভাই, সে আমার ; রক্ষা,
করিবে সে অন্তর আকাঙক্ষা। দেয় যদি
প্রাণ, দেবে অবশেষে, ঘোর প্রতিশােধ
আমার মৃত্যুর লয়ে। কাপুৰুষ নয়
সে, পতঙ্গবৎ তাই, দেবে প্রাণ।
কুমার। (ফিরিয়া)
আঃ, কি !
এখনও তাই ?-কি এ, শরীর আমার
এমন কি জন্যে ?
অধ্যক্ষ।
বড় ভয় আমাদের
তার কি না ?—কর হত্যা, দরকার নেই
দেরিতে আর । (সৈন্যেরা হত্যা করিতে অসি নিষ্কাষণ)
ভদ্রক। ( আবেগে) আঃ, আমি, জীব, আর কেন,
সংসারের বড়সী কেটে যাও। উদ্দেশে
আলিঙ্গন কর, তাঁরে একবার, যিনি
মায়াগুণ আকর্ষণে, হৃদয় ছিড়িয়া
ফিরলেন এত কাল, সংসারে তােমায়।
কুমার, তােমার ভাই ম'লো, ফেলে তোম।
একাকী বিপদে। (বস্ত্র দ্বারা মুখাবরণ)
( কুমার কম্পিত কলেবরে ভুতলে মুচ্ছিত হইয়া পতন ।)

চতুর্থ অঙ্ক।
১২৭
একজন। কি শব্দ আবার ভাই ?
অধ্যক্ষ।
দেখ একজন শীঘ্র ?
এক জন প্রস্থান। অপর এক জন ভদ্রকের প্রতি অস্ত্রাঘাত,
ভদ্রকের পতন । প্রস্থিত সৈন্য ত্রাস-বিকৃতভাবে দ্রুত প্রবেশ ।
অধ্যক্ষ। কি, কি ?
আজ্ঞা— বিকৃতমুখে তাঁহার মুখ পানে)
অধ্যক্ষ।
সৈন্য। ভয়ঙ্কর পেতনী। ( গা ঝাকিয়া চক্ষু আবরণ)
অধ্যক্ষ। যাক্ ষা-
একজন।
রাত্রিকালে হিঁদুর মরা !
অধ্যক্ষ।
আয়।
সৈন্য।
কি, বল?
( অধ্যক্ষের অগ্রে ও তৎ পশ্চাৎ সকলের প্রস্থান)
মােহিনী দৃশ্যে প্রবেশ ও ক্ষণকাল ইতস্ততঃ চাহিয়া, ক্ষণ চিন্তা-
মগ্ন ও পুনর্বার ইতস্ততঃ চাহিয়া প্রস্থান)
একাদশ দৃশ্য।
ভদ্রকের মৃত দেহ পতিত। কুমার মােহাপগমে দ্রুত আসিয়া।
কি, কি, আঁা, কি হলো?—কোথা ভদ্ৰক ?-ভদ্রক
ওঃ হত্যা, হত্যা করতে এনেছিল তােমায়।
( উচ্চৈস্বরে )

মহারাজারাম।
{
ভদ্রক, কোথা গেলে ?—কতক্ষণ(ই) অজ্ঞান
ছিলাম। ( অনুসন্ধান )
সত্যই কি, আঁশত্রুরা তোমাকে
হত্যা করতে পেরেছে ? (দেহ পাইয়া)
কি, কি, আঁা, এ কি ভাই -
নেই তুমি ? (ভূপতন ও ক্ষণ অভিভূত থাকিয়া)
ওঃ, হা, আমি, কাপুৰুষ। যা, যা,
করবার, অঙ্গ হতে ; শত্ৰু, কোথা তােরা ?
( অস্ত্র ত্যাগে বিবশভাবে দ্রুত প্রস্থান ও ক্ষণপরে পুনৰ্ব্বার
ফিরিয়া আসিয়া )
কৃতঘ্ন, আঃ কত আমি, প্রাণ দিলে যে,
এ ছার জনের জন্যে, দেহটাও তার
.
আমি অবহেলে ফেলে চলিলাম? দেহ,
কর্তব্য তােমার করে পরে মরি আমি।
( দেহ লইয়া প্রস্থান।)
দ্বাদশ দৃশ্য।
মােহিনী ঐ স্থানে প্রবেশ ।
রাজ্যের আশা, সব ফরসা, ভদ্ৰক বল, ভাঙ্গিল এই,
দেখিল চোখে, দু দিন দুখে, কাটিয়ে শেষে, আমারি সেই।

চতুর্থ অঙ্ক।
১২৯
মােহিনী রূপ, বিলাসকুপ, দেখাব তারে, কত সাজনে,
স্বপন-খেলা, চোখেতে মেলা, দেখিবে সব, চমক মনে।
ভুলে ইহলােক, দেখিবে যে লোক, ছড়াছড়ি তায়, সুখের মেলা,
ঘুচাইয়ে দুখ, হাসিবে সে মুখ, খেলিবে যে সনে, মনের খেলা।
( অমনি গীত ও নৃত্য।} রাগিণী খাম্বাজ-তাল একতালা।
কি হলাে আমারে, কেবা এসে ধরে, ঢলে পড়ি সুখ-ভারে।
আমি কাপালির মেয়ে কুহকী, কবে দেখেছি এ সুখ বাকি,
কঠিন পাষাণ, করে আলিঙ্গন, মরেছি, প্রেম বিকারৈ।
হেন ননী ছানা, মুখের নাছনা, পিয়েছি, কবে মুতারে।
কোথা বিশাল হেন উরসে, বাহুর ছাদনে, প্রগাঢ় পরশে,
এলায়ে কবে বা, অঙ্গ আবেশে, পড়েছি সুখের ধারে।
ছুটেছি সে দিন, দেখেছি যে দিন, কানন এরে বিহারে,
কেলে যাগ যােগ, পণ্ড কর্ম ভোগ, ঢাকেছি রাণীর দ্বারে ।
এত দিন পরে, আশা এল করে, ধরা সে দিতে আমারে,
এই রাত এলে, নিয়ে যাই চলে, পর্বত নিজ আগারে। (প্রস্থান ।)
ত্রয়োদশ দৃশ্য।
বনের একাংশ, কুমার ভদ্রকের শব রাখিয়া, উম্মত্তভাবে এক এক
বা উহার নিকটে আসিয়া উহা দর্শন ও পুনর্বার চতুর্দিক
ভ্রমণ। হেমাঙ্গিনী ও তীবন কিঞ্চিৎ দুর প্রবেশ ।
জীবন। এ, এই যুবরাজ! (দাড়াইয়া উভয়ে কুমারের ভাবদর্শন)
হেমাঙ্গি।
কি করছে, জানি না ।

মহারাজারাম।
কি সম্পত্য ওখানে? হত পশু যেমন
সিংহ, রক্ষা করে, ও যে, এদিক ওদিক
যাচ্ছে, পুন ছুটে এসে, দেখিছে উহাই।
এমন যত্নের বস্তু, কি ওখানে ওর ?
জীবন। আমরা এসেছি যে, বুঝিতে এখন তা
পারেন নাই উনি। বিহ্বল হয়ে যেন
রয়েছেন কিসে ?
হেমাঙ্গি।
দুঃখ ভিন্ন, আর কিসে?
( অগ্রসর হইয়া )
কুমার ! ( কুমার উহঁদের প্রতি বিস্ময় দৃষ্টিতে স্তম্ভবৎ )
কুমার, হাঁ রে, কি ? কি ভাব দেখ চি?
উম্মত্তের ন্যায় চক্ষু কেন? কি, পাগল
হয়েছ ?—ভক কোথা? (কুমার তদবস্থায় )
ডাক তারে ত্বরা;
ভদ্রকে ডাক ; চল, সিংহাসন প্রস্তুত
তোমার জন্যে ; সব উদ্ধার হবে, চল
নাগরিকেরা তােমায় রাজ্যভার দিতে
ব্যাকুল হয়েছে। তারা ক্রোধেতে অধৈৰ্য্য,
তােমাদের প্রতি এই অন্যায় আচারে।
সকলি তাচ্ছিল্য তারা করিতে উদ্যত,
পেলে একবার তোমা।
কুমার।
বসাতে কি চাও,

চতুর্থ অঙ্ক।
সিংহাসনে, ঘৃণ্য দাস এক জনে? দিদি,
বিক্রীত হয়েছি আমি ভদ্রকের কাছে
দেখ এই, ( শব দেখাইয়া )
দেখ, এই মহাত্মা ভূতলে,
আমারি জন্যেতে পড়ে, আকাশে উড়ায়ে
দিয়ে অমূল্য জীবন। অকাতরে পড়ে ;
আমারি মঙ্গলে যেন, অণু অণু করে
দিচ্চেন মৃত্তিকা গ্রাসে প্রিয় এ শরীর। '
দিদি, দেখ, দেখ চেয়ে ?
হেমাঙ্গি। (শব দেখিয়া ) এ কি।—হ ভদ্রক।
সকল আশার শেষ, এই করে গেছ ? (ভূপতন )
জীবন। এ কি হয়েছে, আঁা, এ যে আশ্চর্য ব্যাপার!
( হেমাঙ্গির প্রতি)
স্থির হােন, আঃ, চুপ কৰুন। স্থির, স্থির
হােন্ ?
হেমাঙ্গি। ভাই ভদ্রক, এ কি, এ কি করেছ ?
জীবন। শান্ত হােন্ ?
হেমাঙ্গি।
এত দিন কঁদিনি ত। আর
সহ বিপদেও কাদব না, প্রতিজ্ঞা যে
ছিল। ভাই, ভাই রে, তুমি কি সহােদর
জীবন। (কুমারের প্রতি) কিরূপে এ কাণ্ড ঘটল ?

১৩২
মহারাজারাম।
কুমার।
আমাকেই,
গুপ্ত স্থানে দেখাইয়া দেন নাই বলে,
শত্রুরা করেছে হত্যা, আমার সাক্ষাতে।
হেমাঙ্গি। ধন্য, ধন্য তুমি ভাই ; দেবতা তুমি ! হা,
ভদ্রক, জালাম তবে, মঙ্গল কিছুই
নাই আর আমাদের। ক্ষণকাল নিস্তব্ধে কুমারের প্রতি)
কুমার, তুমি কি,
যাবে না ? যাবে না ? বল ভাল করে ?
এত পরেও মায়ের প্রতিহিংসা লও।
বল তা কুমার, যাবে কি না এখনাে।
তঁার জন্যে প্রাণ দিতে চাও কি না বল ?
এই দেখ, ভালবাসা প্রাণ দেওয়া সাক্ষী।
( শব দেখাইয়া )
মাতৃভালবাসা চেয়ে সংসারে কি আর ?
প্রাণ যতক্ষণ আছে, অন্যায়ের তার,
প্রতিশােধ লবে কি না? নাই যদি যাও,
আমিও যাব না, প্রাণ এখনি ঘুচাব।
কি জন্যে আর ; মৰুক গাে সে হেমাবতী
রাক্ষসীর গ্রাসে ।
কুমার । ( ক্ষণকাল বিরামে। দিদি, কেমনে কি করব,
মনের হাত পা ভেঙ্গে গিয়েছে আমার,
রসাতলে পড়ে। আর, হবে না সংসারে,
?

চতুর্থ তঙ্ক।
আমা হতে কিছু। যাও দিদি, কিছুতেই
আর, লয়ে যেতে তুমি, পারবে না আমায়।
হেমাঙ্গি। একান্ত যাবে না তুমি, এই কি নিশ্চয় ?
কুমার। আমা হতে আর কিছু হবে না সংসারে,
ভদ্রকের মৃত্যু যবে সূচক্ষে দেখেছি,
এক পাও নড়ি নাই। হৃদয় প্লাবিয়ে
উত্তেজনা বাক্য তার এখনো ভাসছে ।
অসাড় পাষাণ আমি, কঠিন অচল !
দুর্ভাগ্য করেছে অামা নরাধম নর।
হেমাঙ্গি। তবে কি সকল তুমি ভাসাইয়া দিলে ?
যে প্রতিজ্ঞায় এত দূর, পূর্ণ নয় তাও ?
তবে, তবে আমি, করি কি? সংসার, স্বর্গ ?
এখনি নিপাত কর আমায়। কুমার,
এরি জন্যে কি, এত করিলাম? তুমি কি,
এত যতনের এই করলে শেষ ?-যাও,
আর আশা করি না তােমার। এত দিনে
জালাম, আমার মাকে, হত্যা করলে তুমিই ।
হত্যা করলে এই প্রিয় ভদ্রকে আবার,
হত্যার উপরে। হত্যা করলে আমাকেও,
সকলের দৃঢ় বাঞ্ছা একা নষ্ট করে।
কাপুৰুষ, নরাধম তুমি, যাও, মৃত্যু
খোঁজ গিয়ে ধুলার ভিতরে - জীবন,

১৩৪
মহারাজারাম।
অভাগী হেমারে, হাতে দিলাম তােমার।
রক্ষা করাে তারে।—এস, কুমার, এখন
হত্যা কর আমাকে, পাপ যজ্ঞে তোমার
পূর্ণাহুতি হােক।
কুমার। (কম্পিতকলেবরে। হা, আমি, কোথা ঈশ্বর!(ভূ-পতিত)
জীন। যুবরাজ, উঠন, উঠন।—যুবরাজ ?
কুমার। আঃ ভাই, চল, তােমরা যেখানে লয়ে যাবে,
যাব আমি, অগ্নিকুণ্ডে হােক্, যাব চল।
নরকে বা অন্ধকূপে, যাব, চল যাব ।
( ক্ষণ বিব্লাম। হেমাঙ্গিনী তৎপরে )
হেমাঙ্গি। কুমার, ভাই বলি, আমার কথা শুন;
তুমিই শেষায় এখন আমাদের,
ভদ্ৰক গিয়েছে যবে। দেশে চল, এখনো
প্রতিজ্ঞা পূর্ণ কর ; মায়ের ঋণ শােধ ।
নাগরীকের। সবাই তােমার পানে চেয়ে
আছে। ভদ্রকের মৃত্যু, আরো উত্তেজিত
করিবে তাদের। চল, কর্তব্য যা কর ।
সংসারে ত সুখ আর হবে না নিশ্চয়,
যে হয় শেষের বিলি করিব সকলে ।
জীবন। শবের উপায় আগে করিগে চলুন।
(শব লইয়া সকলে অবসন্ন ভাবে প্রস্থান।)

পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
শান্তি উদ্যান। রাজা অন্যমনস্ক। মােহিনী নিঃশব্দে কিঞ্চিৎ দূরে।
মােহি। ( অনুচ্চস্বরে ) হায় হায় হায়রে, হায় হায় হায় ;
এমন জালের পাখী পাশকেটে যায় ?
হেমাঙ্গি, ডাকাবুকী, ডাকিনী বালাই,
উড়ে পড়ে নিয়ে এলো মুখে দিয়ে ছাই ।
দিনের বেলায় তাই পেয়েছিল হাত,
রা’তে হলে দেখাতাম চৌঘুরি মাতা-
রাণী আসূচে—( সহসা অন্ধকার ও বিদ্যুৎ দেখাইয়া
অপমৃত) (রাজা চমকিতভাবে দাঁড়াইয়া )
পরীক্ষার ছলনা, বিস্ময়,
এই ত শান্তি ঘাের ? এর পরে হয় ত
রোরবাদি আছে।—কি আশ্চৰ্য্য সকলি এ,
প্রকৃতই যেন ; দেখি আবার অদ্ভুত !
( একটি বৃক্ষাভিমুখে গমন।)

চতুর্থ অঙ্ক। দ্বিতীয় দৃশ্য। রাণী। রাণী । (রাজা। রাণী রাজার নিকটবর্তী, রাজা সহসা ফিরিয়া রাণীকে দেখিয়া স্তম্ভবৎ।) রাজা, আজু একবার শেষ কথা আজ- রাজা। শেষ?—শেষ তবে আজ?—কি হইবে হে। শেষ হবে আজ,আঃ কি দেখাবে দেখাও ! শান্তি, ভুলে গেছি আমি, তােমার মুরতি ! মহারাজ - রাজা। বল শীঘ্র বল, কি করিব ? এই যদি শেষ হয়, প্রাণ শেষ হোক ! রাণী। শুনছেন চারিদিকে, কি এ কোলাহল ? কুমার এখানে, তার নাগরীকগ', সিংহাসনে বসাইছে আমারে নাশিতে। করুন আমারে রক্ষা, ধর্মের দোহাই। ( চরণে পতন ) রাজা। ( ক্ষণচিন্তায়) এই কি সমষ্যা শেষ, স্নেহের সঙ্কটে; দেখি ভাল, কোথা, কিবা পাতক মুরতি ? ( করবার উন্মােচন । কুমারের প্রবেশ, রাণী সত্বর প্রস্থান । রাজা কুমারকে উপস্থিত দেখিয়া )

পঞ্চম তঙ্ক।
তৃতীয় দৃশ্য।
-
কেমন সংযােগ সব, এই উপস্থিত।
এই ত কুমার(ই) ঠিক;—আশ্চৰ্য্যই বা কি?
এই ত আমি(ই। সেই, হস্ত, পদ সমাবিষ্ট,
ইন্দ্রিয় সকল ফুল্ল, দেখিতে আবার
ইহলোকে সেই লােক ।—আয় দৈত্য, আয়! ( গমনে)
দুরাত্মা, রে দৈত্য, ধর অস্ত্র, হত্যা করব
আমি তোরে ।
কুমার ।
বাবা—আমি বিদ্রোহী ত নই,
আপনার ; আমায় দুষ্টের অভিষন্ধি
বিদ্রোহী করেছে
রাজা। (হাসিয়া ) ঠিক, সত্য বলিতেছ ;
মন্দাভিষন্ধির তুমি বিদ্রোহী কুমার !
বাবা আমা বলিস না ; জানি আমি তুই
পুত্র নস্ আমার ; ধর অস্ত্র, মায়াবী ?
কুমার। মায়াবী কি আমি, বাবা-হা মায়াবী আমি !
মায়াবী আমি নই, বাবা, পুত্ৰ বৈ নই ।
চূর্ণ কর এই শির, দেখিবে ইহাতে,
তােমারি চিন্তার চিন্তা। কাট এ শরীর,
খুলে ফেল শিরা সব, দেখিবে বহিছে,
তােমারি রক্তের রক্ত। চিরে ফেল বুক,

মহারাজারাম।
হৃদপিণ্ড নাচে, দেখবে, জীবনী জীবনে
তােমারি তা'। আগুনে পােড়াও, দেখ যদি
অণমাত্র বাহিরায়, আমা হতে কিছু
তােমার বিরূপ, তবে বিজাতক আমি,
তােমার বিদ্রোহী যােগ্য, মায়াবী, বঞ্চক।
পুত্ৰ কভু পিতৃ শত্রু হইতে পারে না।
কি আছে তাহার তাতে পিতার বিরূপ।
(রাজা কুমার প্রতি ক্ষণস্থির দৃষ্টে কুমারের গলা ধরিয়া)
রাজা। কুমার(ই। তুই আমার, ভাবি তােরে তাই ;
কুমার(ই) আমার যেন তুই সে কুমার।
(আঃ) বঞ্চনাও কি মধুর, মধুরে মধুর!
( কুমারের বক্ষে মস্তক স্থাপন, উভয়ে উভয়কে ক্ষণ অনুভব
রাজা সহসা কুমারকে পরিত্যাগ করিয়া)
আঃ বঞ্চিত হলাম, মজিলাম আমি ত !
কোথায় পড়তেছি ? দূর পাষণ্ড, মায়াবী ;
ভুলাতে আমায় তুই পারিবিনা,—আয় ?
( অসি উত্তোলন)
কুমার। কেন এ নিষ্ঠর বাক্য—বাবা, আঃ, আমায়
হত্যাই কৰুন, আর বলিতে চাহি না-
( পদতলে পতন )
রাজা।( বিমুখ হইয়া) ওঃ, পাষাণ জড় আমি, মিথ্যা যদি এও,
দূর হ প্রতিজ্ঞা, ধর্ম ;—কি ধৰ্ম দেখাই,

পঞ্চম আঙ্ক।
১৩৯
প্রকৃতি বিৰুদ্ধাচারে ? মােহ যদি এও,
মােহেরাে আংশিক সুখ অনুভব করি,
অতুল্য তা দূরগত ব্যাপ্ত মুখ চেয়ে।
এই যেন সেই লােক, এই সে কুমার,
পদতলে আমার ; লাঞ্ছিত, পরিত্যক্ত,
আমারি সে হারাধন পড়ে পদতলে।(ওঃ)-
কুমার, পুত্র আমার !– কুমারের উপরে পতিত, কুমা-
রকে গাঢ় আলিঙ্গন, চুম্বন
ইত্যাদি)
কুমার। ( চরণ ধারণে) আপনারি দাস,
বাবা !
রাজা ( ক্ষণ বিহ্বলভাবে ) হা, গেলাম আমি, নষ্ট যে হলাম ।
(জোরে কুমারকে তােলাইয়া)
দুষ্ট, ভুলায়ে আমায় ফেলি দিলি তুই?
পণ্ডিত করিলি আমা নষ্ট, ভ্রষ্ট, ছার ?
( কম্পিত কলেবর )
দেবতার, স্থির কর আমা, স্থির কর ;
রে মায়াবী ধর অস্ত্র, নিরস্ত্র জনেরে,
বধ করিব না আমি।
কুমার ।
এ কি, দেখি বাবা!
রাজা। বাবা বলে করিস না, সম্ভাষণ আর?-
ধর অস্ত্র, ধরিবি না ? ( অস্ত্র আস্ফালন )
কুমার।
তােমার বিৰুদ্ধে ? •
}

মহারাজারাম।
ওঃ, যা, অস্ত্র অঙ্গ হতে, (খুলিয়া ফেলন)
তােমার বিরুদ্ধে
জানি না আমি, বাবা, ধরিতে অস্ত্র ।
রাজা।
ছাড়
এখনাে কুহ বৃচি ? ধর অস্ত্র ধর ;
পাতক পরীক্ষা তাের অস্ত্রেতে দেখাই।
( দৃঢ়রূপে অস্ত্র ধারণ)
কুমার। ( হতাশভাবে ইতস্ততঃ ক্ষণ নিরীক্ষণ)
অস্ত্রেতেই শান্তি তবে হােক এ যাতনা।
ভাইরে ভদ্রক, দেখা দাও একবার
স্বর্গ রাজ্যে, দেও দেখা, ধর, ধর আমা!
রাজার অস্ত্রেতে পতন, পরে ঘাের আঘাতে সংজ্ঞা হীন ভূপতিত ।
সহসা অন্ধকার, বিকট কণ্ঠশব্দ, বজ্ৰশব্দ ও বিদ্যুৎ। ক্রমে অন্ধকার
পরিষ্কার সমস্ত স্থির, কুমারের দেহ অপমৃত। রাজা স্তম্ভবৎ ক্ষণ
দাঁড়াইয়া, উম্মত্তের ন্যায় বিকট চিৎকারে লম্ফ ঝম্ফ প্রস্থান ।
চতুর্থ দৃশ্য।
রাজপথ। দূরে বহির্ভাগে কোলাহল । নাগরিকেরা বিবশভাবে
অভিনয় স্থল দিয়া এদিক ওদিক ধাবিত। যশরাজ ও মহিমা-
নের ত্রস্তভাবে প্রবেশ ।
কিন্তু দাঁড়াও, আমার বােধ হয় এটা,
জুনরব।

পঞ্চম অঙ্ক। ১৪১ যশ । মহি। যাই হােক্, নগর বাঁচাতে এখনি প্রস্তুত ভাল । মন্ত্রী মহাশয় পরাজয় নিশ্চয়ই সে, হয়েছে কি হােক। কিন্তু হত তিনি আরাে, শুছি যে। মহি। হবেন তাও, যদি, না হয়েও থাকেন। যশ । সাংঘাতিক, আঃ এ যুদ্ধ পরাজয় ! মহি। নগর বাঁচাও এখনাে যা হবে কর। মহারাজে দে তে, যুবরাজ উদ্যানে গেছেন ; লয়ে রে নগর সুদৃঢ় কর সৈন্য সংস্থাপনে। ( অতি নিকট কোলাহল ) যশ। এ আবার কি ঘটিল ? মহি। কি ব্যাপার সব ? কতকগুলি নাগরিকের প্রবেশ । একজন। গেল, গেল, রক্ষা-হা, রক্ষা, রক্ষা করুন? শত্রুরা নগর দ্বারে। যশ। আঁা, কি, কি বল এ ? তবে কি সকলি সত্য ? মহি। শীঘ্র এস তবে? দ্বিতীয়। মহারাজ, যুবরাজে হত্যা করে, ক্ষেপে ১ ৪২ মহারাজারাম। ছুটেছেন। মহি । ক্ষেপেছ কি তােমরাই ? বুকে তৃতীয়। ছুরি মারিলেন রাজবালা, কুমারের দশা দেখে । কোথা হতে আন্চ তােমরা ? দু'ট বচন সব মুখে ভরা ;-যমপুরী হতে ? ( নিকটে পুনৰ্ব্বার কোলাহল, সকলে সেই দিক লক্ষ্য, নাগ- রিকগণে বেষ্টিত রাজা উম্মতভাবে প্রবেশ ।) মহি। এ কি, মহারাজ, উন্মত্ত যে, ঘর ? (ধরিতে উদ্যত) রাজা। (অস্ত্র আস্ফালনে) কেটেছি কুমাররূপ মহাদৈত্য সেটা; কাটিব সকলে আজ সম্মুখে যে পড়ে। নরকের দেশ করব, কেটে ছারখার কাটিব সকলি আজ, কাট, কাট, কাট! ( আক্রমণ, মহি ও যশ ভিন্ন সকলের পলায়ন। রাজা এক দিক দিয়ে স্থান।) মহি। এই দশা শেষ হলাে নগরের ভাই। যশ । শত্রুরা নগর দ্বারে ঘোর যুদ্ধ করতে প্রাণ রক্ষা দেখ । চল, হেমাবতী বুঝি, এখনাে জীবিত, আছে লয়ে ভারে চল, পলাই কোথাও দুরে, পুরী ছেড়ে এই । ( প্রস্থান।)

পঞ্চম অঙ্ক।
১৪৩
পঞ্চম দৃশ্য।
একটি গৃহ। অম্বালিকা ও হেমাবতী। চতুর্দিক কোলাহল পূর্ণ।
হেমাবতী ব্যাকুল ভাবে, অম্বাকে ধরিয়া ।
হেমব। কোথা দিদি, দাদা কোথা, ভয় হচ্ছে, ধর আমা।
চারিদিকে, এ কি হলাে, কোথা আমা, ফেলে তঁারা ?
চল আমা, নিয়ে চল, দিদি, দাদা, আছে যেথা।
এখনো যে, এলেন না, বল তারা কোথা গেছে ?
( দীর্ঘ নিশ্বাসে হেমার মুখ প্রতি চাহিয়া )
জানি না আমি, কোথা তারা।
নিয়ে যেতে তােরে পারিব না।
তােরি ভাবনা, ভাবিতেছি।
কি করিব আমি, জানি না ।
পারি কি মরতে, বল দেখি?
অস্ত্র এনে আমি, দিই তোরে ?
হেমব । (সরােদনে অস্বার বক্ষে পতন )
কি হয়েছে, বল আমা, কোথা ভরা, বল, বল ?
তুমিও কি, ফেলে আমা, পলাবে এ, ভয় মাঝে?
অম্বা।
ফেলে তােমা পলাব না, তার চিন্তা নেই।
( নিকট কোলাহল।)
ঐ শোন, শত্রুতে পুরী, ঘিরে এলো সব।
এই এলো বলে তারা-রাজার দুহিত,

১৪ ৪
মহারাজারাম।
নিষ্কলঙ্ক কুলে জন্ম ; যবনের হতে (অতি নিকট শব্দ)
পারিবি না মরতে? এ(ই) এই অস্ত্র আছে নে।
(অস্ত্র প্রদান)
হেমাব ।
দাদা, দিদি, কোথা, বলে দেও।
ছুটিয়া পলাই, আমি সেথ।।
অম্বা। যেতে তুমি সেথা পারিবে না।
এই পলে এই, শত্রু হাতে।
পার যদি মরতে, ধর অস্ত্র ? (কম্পিতকলেবর )
হেমাব। জানি না ত আমি, মরুতে, কেমন করে হয়।
তুমি মার তবে। দিদি, তােমরা গেছে কোথা (রােদন)
অম্বা। স্বর্গে চলে গেছে তারা, তুমি যাও সেথা।
মরেছেন দুজনেই, নেই ইহলােকে।
হেমাব । ( ক্ষণ অবাক দৃষ্টে অর মুখ পানে চাহিয়া )
হা দিদি, দাদা,দেও অস্ত্র, জানি আমি মরতে।
পার ব মরতে, আমি, আমি এখন, এখনি।
অস্ত্র লইতে উদ্যত )
দ্রুত মহিমান ও যশরাজের প্রবেশ ।
মহি। কি, কি, (হমাবতী ভয় নাই, শীঘ্র এস।
অম্বা। রক্ষা করুন, আপনারা, রাজবংশ শেষ।
যশ । কাল নেই, শীঘ্র এস, এস, এস, এস।
( হেমবতী অধৈৰ্য ভাবে রোদন ও ছট ফট। সকলে
তাঁহাকে লই: প্রস্থান।)

পঞ্চম অঙ্ক।
১৪৫
ষষ্ঠ দৃশ্য।
রাণীর গৃহ। রাণী ব্যাকুল ভাবে ছেলে কোলে লইয়া পরিক্রমণ।
অম্বর দ্রুত প্রবেশ ।
রাণী।
আঘা।
( অম্বকে দেখিয়া )
কোথা যাই, অম্বা, হা, বাবা, বাবা আমার !
অন্ধ, সব আমা, ছেড়ে গেছে, কেউ নেই
(ছেলে দেখাইয়া )
এই গলগ্রহ কেন ছাড়তে পারছি না।
ছুটে পলাতাম আমি।
ফেলে দিয়ে যা,
ওরে, মমতায় প্রাণ যায়, সব গেল,
রাজ্যের মায়ায় পড়ে এই।
জ্বালাস, নে অম্বা,
আর আমা, সব গেছে, তুই(ও) যা, কেন হেথা ?
দেখুন বারেক চেয়ে, কি তুমুল ঝড়,
নগরের দ্বার সব কাপয়ে ভাঙ্গিছে।
রাজ্যের সমৃদ্ধি রা’শ, জ্বলে সব গেল,
লালসা আগুণ শিখা, ধরে আপনার !
সর্ব দগ্ধ হলো এই, একাকার ভয়ে,
খুঁজি শয্যা আমরাও ; ভস্মের মাঝারে,
টুকুক লালসা শিখা। শ্মশানের শাস্তি,
রাণী।
অম্বা ।

১৪৬
মহারাজারাম।
')
বিজয় নগর পাকু। ( রাণীর মূচ্ছ, অম্বা ধরিয়া
এখনি ঘুমাবে ?
দেখ আগে বিভীষিকা, ঘুমায়ে তা পর।
(চেতন করাইয়া )
কুমার মরেছে, শত্রু হেমাঙ্গি মরেছে।
দেশ ছাড়ল, হেমাবতী, মহি, যশ সঙ্গে।
মরেছে তােমার বাপ; সাধের সে রাজা,
উন্মত্তে পশেছে যুদ্ধে, দেখ কি বা হয়।
( দ্বারদেশে সৈন্যগণের কোলাহল, অম্বা দ্রুত প্রস্থান ।
রাজার মৃত দেহ লইয়া কতকগুলি সৈন্যের প্রবেশ । )
রাণী।
( রাজার মৃত দেহ দেখিয়া )
এ কি, এ কি, মহারাজ, কি হয়েছে হায় ! ( মূচ্ছ।)
একজন। দ্যাখ, দ্যাখ হয়ে গেল নাকি ?
দ্বিতীয়। নিয়ে চ এদের, বন্দী করে।
( যবনিকা পতন।)
সমাপ্ত।
PRINTED BY-*, K. CHAKRAVARTI AT THE VALMIKI PRESS.
NO. 55 AMHERST STREET, CALCUTTA.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Bijayangoradhip Maharaja Ram Natak

Author
Mukhapadhyay, Ramchandra
Title
Bijayangoradhip Maharaja Ram Natak
File name
Bijayangoradhip Maharaja Ram Natak
Text
OCR done
Citation
1910
Published
2009/09/19
Publisher
Kalikinkar Chakraborty,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
154
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Mohini
DLI number
512470
Barcode
4990010019543.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
yZORlrIzSVY
Download PDF

Bijayangoradhip Maharaja Ram Natak