Makardah Saraswat Library, Howrah
Kantar Phool
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কাতান্ন ফুল
No text on this page.
কালা ফুল
(গল্পেপন্যাস)
ঐসুধাকান্ত রায়চৌধুৱী প্রণীত
প্রকাশক
ইণ্ডিয়ান, প্রেস লিমিটেড
এলাহাবাদ
১৯২১
সর্ব শত্ব রচিত]
[মূল্য • আনা
প্রাপ্তিস্থান
ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড-এলাহাবাদ।
ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস
২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রকাশক
শ্রী অপূৰ্ব্বকৃষ্ণ বস্তু
ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড-এলাহাবাদ ।
কান্তিক প্রেস
২২, সুকিয়া স্ট্রীট, কলিকাতা।
ঐকালাচঁাদ দাতাল কর্তৃক মুদ্রিত।
কাটার ফুল
কান্তি-
সত্যি দিদি, মেয়েমানুষের প্রাণ বড় হালকা
ফুলের ঘায়ে মুড়ে পড়ে–লজ্জা, উঃ কি লজ্জা,
কোন্ মুখে তার কাছে দাঁড়াব।
অমিয়া-~-
বােন, অতীতটাকে মুছে ফেল, যা হবার হয়ে
গেছে, ফিরে আবার জীবনটাকে নতুন করে
গড়ে তোেল—এই রকমেই জীবন গড়ে।
কান্তি
জানি দিদি-ভাঙা-গড়া জীবনের খেলা—তবু
কেন এই রীতি যেন নারী-চরিত্রে খাপ খায়
। দুই কূলের মাঝখানে, দাঁড়াবার শক্তি
আমাদের নেই।
কঁাটার ফুল
অমিয়া
যে কূল ভেঙে গেছে—তার কথা আর মনে
ধরে রাখিসূনে,-সমাজের মধ্যে যখন তাের
প্রেমের আসন পেতেছি—তখন আর দোমনা
না হয়ে-ঐ আসনেই সতী-লক্ষী হয়ে স্থির
হয়ে বােস।
কান্তি
পারি কই, কতবার ভাবি—দূর ছাই-অতীতকে
আর ভাবনা। তবু দিদি পেরে উঠি না,
ঘুরে ফিরে সেই ছবি চোখের
ছবি চোখের আগে ভেসে
ওঠে।
অমিয়া--
ভগবানের এই মর্ত্ত-রাজ্যে, কয়জনের আশা
পূর্ণ হয়,-চোখ মেলে দেখ—চারদিকেই তাে
বুক-ভাঙা কান্না ; তবু তারি মধ্যে শান্তি খুঁজে
নিতে হয়-নইলে কি প্রাণ বাঁচে?
২
কাটার ফুল
কান্তি
সব বুঝি দিদি—তবু মন মানে না, মায়ের বুকের
পিণ্ডসম ছেলে যখন মরে যায় কি ভীষণ
ব্যথাই মায়ের বুকে বাজে--তবু সে-ব্যথা ভুলে
গিয়ে মায়ের মুখে আবার তাে হাসি ফোটে। সব
বুঝি, তবু অবুঝের মত, অশ্রু ফেচি। কেবলি
মনে হচ্ছে বুঝি এদুঃখের আর অবসান নেই।
অমিয়া—
বােন, স্বামীরূপে যাকে দশ জনের মাঝখানে
আললাবাতির শত শত প্রদীপের অগ্নির সামনে
বরণ করেছি তার মনে কষ্ট দিনে।
কান্তি
দিদি-যদি তাকে কষ্টই দেব’ তবে নিজের
বুকে এত কষ্ট পাই কেন! তার মনে পাছে
কোন বেদনা জেগে ওঠে সেই আতঙ্কেই ত
তাই ত এই জ্বালা !
মরচি।
কাটার ফুল অমিয়া— তার পায়ে নিঃশেষে নিজেকে দিয়ে ফেল—সব জ্বালার অবসান হয়ে যাবে, শান্তি পাবি। অনেক রকমে অনেক প্রবােধ বাক্যে বুঝাইয়া অমিয়া আপনার স্বামীর বৈকালের জল-খাবার তৈয়ারি করিবার জন্য চলিয়া গেল। কান্তি শূন্য ঘরে মাদুরের উপর বসিয়া অশ্রুজলে কি ভাবিতে লাগিল। ছােট বেলা হইতেই কান্তি বড় কোমল- স্বভাব। আশৈশব তাহার মধ্যে কেমন একটি মাতৃ- ভাব জাগিয়া আছে। সকলকেই আপনার করিয়া লইতে তাহার একটুও বাধিত না। মাতৃত্বের আশ্চৰ্য্য অমৃত-ধারায় তাহার নারীচিত্ত এতটা ভয়- পূর ছিল যে, সে কাঠিন্যকে মনের মধ্যে আমল দিতে পারে না। কান্তির ছােট বেলার খেলার সঙ্গীদের মধ্যে, নৃপেন্দ্র ছিল একজন। এই যুবকটি লেখায় পড়ায়
কাটার ফুল
হাসি গল্পে-
গল্পে খেলায় সদাই আনন্দে মাতিয়া থাকিত।
বিদ্যালয় হইতে ফিরিয়া আসিয়া প্রত্যহ কিছুক্ষণ সে
কান্তিকে পড়া বুঝাইয়া দিত। কান্তির পিতা
মনােমত নৃপেন্দ্রকে আপনার ছেলের মতই ভাল
বাসিতেন। কাজেই
নৃপেন্দ্র
-সব রকমেই
কান্তির সঙ্গে আপনার জনের মত মিশিত। এই
মেলা-মেশার ভিতর দিয়া নৃপেন্দ্রের তরুণ হৃদয়টি
কেমন করিয়া ধীরে ধীরে কান্তির দিকে অনেকটা
ঝুকিয়া পড়িয়াছিল সে খবর নৃপেন্দ্র অনেক দিন
পৰ্য্যন্ত টের পায় নাই। যেবার নৃপেন্দ্রর পিতা
কয়েক মাসের জন্য ময়নাপুর ছাড়িয়া উত্তর-পশ্চিম
অঞ্চলে বেড়াইতে গেলেন সেবার বাকীপুরে বসিয়া
নৃপেন্দ্র টের পাইল তাহার তরুণ হৃদয়টি ময়নাপুরের
একটি বৃহৎ তেঁতুল গাছের নীচের আটচালা বাড়ীতে
মনােমত বাবুর কন্যার কাছে পড়িয়া আছে।
গ্রামের মধ্যে সাহসিকতার জন্য নৃপেরে খুব
কাটার ফুল একটা নাম ছিল । দিনে, দুপুরে সন্ধ্যায় রাত্রিতে কেবল মাত্র একটি মীরজাপুরী লাঠী লইয়া যােব বছরের স্কুলে পড়া ছেলে নৃপেন্দ্র অবলীলাক্রমে শ্মশানে পাক দিয়া আসিত। মনে হইত বুঝি শ্মশানের ভূত-নৃপেনকেই ভয় ভয় করিত বেশী । যে বছর সে কুড়ি বছর বয়সে ডাক্তারী পড়িতে আরম্ভ করিল সেই বছর শ্মশান হইতে একটি মড়ার মাথার খুলি আনিয়া বেশ সযত্নে নিজের পড়িবার ঘরে টেবিলের উপর সাজাইয়া রাখিয়াছিল। সেই মড়ার মাথার খুলি ঘরের মধ্যে টেবিলের পরে দেখিয়া কান্তি খুব ভয় পাইয়াছিল। মড়ার মাথার খুলি দেখিয়া ভয় পাইলেও সেইদিন হইতে নৃপেষ্ট্রের পৌরুষ সম্বন্ধে কান্তি অনেকটা নিঃসন্দেহ হইয়া- ছিল। পুরুষের পুরুষের পৌরুষ নারীকে এবং নারীর সলজ্জ নারীত্ব পুরুষকে যে স্বাভাবিক নিয়মে আকর্ষণ করে ঠিক সেই নিয়মে নৃপেন্দ্র এবং কান্তি পর-
কাটার ফুল
}
স্পরের নিকট একান্ত আকাঙক্ষার বস্তু হইয়া উঠিল ।
কান্তি এবং নৃপেন্দ্রের মধ্যে যে একতা পলে পলে
গভীর হইয়া উঠিল সেই একতার অন্তরে একটা
মঙ্গলের ভাব ছিল বলিয়াই সেই আকর্ষণ হঠাৎ
নভেলি প্রেমের আহা-উহুর মত, অসংযমে উন্মাদ
হইয়া উঠে নাই। এই রকমের একটি সরস ভাবে
বন্দী হৃদয় বাকীপুরে একটু চঞ্চল হইয়া উঠিল ।
অবশ্য নৃপেন্দ্র সে চাঞ্চল্যকে কোন দিনও বাহিরে
উচ্ছাসে প্রকাশ করে নাই।
বাকীপুর হইতে ফিরিয়া আসিয়া নৃপেন্দ্র আপনার
ঘরে বসিয়া কি একটা কেতাব পড়িতেছে—এমন
সময় আঁচলের খসখসানি-চুড়ির টুন্ ইন—তাহার
কাণে গেল ;
বই হইতে চোক
তুলিয়া চাহিতেই
দেখিল কান্তি তাহার ঘরের সমুখ দিয়া তাহার
(অর্থাৎ নৃপেনের) মায়ের ঘরের দিকে গেল।
নৃপেন্দ্র তৎক্ষণাৎ উঠিয়া সটান নিজের মায়ের ঘরে
কাটার ফুল
গিয়া উপস্থিত হইল।
নৃপেন্দ্রকে দেখিয়া কান্তি
বলিল, “বাকীপুরে খুব ফুর্তিতে ছিলে চেহারার
অনেকটা বদল হয়ে গেচে।” হাসিয়া নৃপেন্দ্র বলিল,
“নিশ্চয়ই খুব ফুর্তিতে ছিলাম। কারণ গম্ভীর হয়ে
বসে থাকা আমার প্রকৃতি নয়।”
ছেলের
এই কথা শুনিয়া মাতা স্নেহলতা
বলিলেন, “অশান্ত প্রকৃতিকে এখন একটু শান্ত কর ।
বয়েস ত এই বাইস বছর হল। যে রকম করে থােক
আগামী ফাল্গুনে বিয়ে দেব।” মায়ের কথা
শুনিয়া নৃপেন্দ্র বেশ সপ্রতিভ ভাবেই বলিল— “বিয়ে
করা বড় খারাপ। কেবল বৌয়ের গােলাম সেজে
থাকতে হয়---ঐ দেখ না ওবাড়ীর ছােট দাদা বিয়ে
করার পর থেকে সব রকমের আড়া আর গল্প
ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকে।
যদি-বা কখনো
বারান্দায় আমাদের সঙ্গে দু একপাট দাবা খেতে
বলেন অনি—বৌদিদি কোন্ তকে ঘরের মধ্যে
কাটার ফুল - দরজার কোল ঘেঁসে-ঝু ঝন্ করে আঁচলের খুঁটে-বাঁধা চাবির গোচ্ছা বাজিয়ে যান—অমনি দাদা উসখুস করতে থাকেন। কিছুক্ষণ উসখুস্ করেই অম্নি-- এই আসি বলে ঘরে ঢুকে পড়েন। আর সহজে বের হবার নামটি করেন না। আমরা মাঠে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করি—ঘরে ঢােকবার মন্ত্র পড়চি না। স্নেহলতা- তুই বড় ফাজিল হয়েচিস্। সকলেই কি তাের ছােট দাদার মত বৌয়ের আঁচল-ধরা হয়। কান্তি মিথ্যে কথা-বোৱা কখনাে কাউকে ওরকম করে আর আগলে বসে থাকে না। তােমার ঐ রকম সব কথা। নৃপেন্দ্র- যা ঘাট হয়েছে—মােদ্দা আমি বিয়ে কচ্ছি না।
কাটার ফুল
স্নেহলতা-
আচ্ছ। যা এখন পড়া করগে–বিয়ে না হয় না
কল্লি ।
মায়ের এই শেষ কথায় অবশ্য নৃপেন্দ্রকে উঠিতে
হইল। কিন্তু নৃপেন্দ্র আসলে নানা গল্পের বাহানায়
কিছুক্ষণ কান্তির সামনেই থাকিতে চাহিয়াছিল।
নিজের মধ্যে কোনদিক দিয়া কোন রকমের কোন
অসংযম না আসে সেদিকে নৃপেন্দ্রর দৃষ্টি বরাবর
কাজেই সে উঠিয়া আপনার ঘরে আসিল।
ছিল।
( ২ )
কান্তি
দিদি,-আমি মেয়ে মানুষ, নিজের মনের কথা
এগিয়ে বলা আমার দ্বারা সম্ভব নয়-
অমিয়া-
ছুড়ি, তােরা পড়বি প্রেমে—আর আমি করব
ঘটকালি । পারব না, বল্ কি বকশিস্ দিবি?
ম
কাটার ফুল
কান্তি
দিদি,—তােমার জোরে কথা বার বদ অভ্যাস
ছাড়। গলাটা না হয় আমার কল্যাণে একটু
খাটো কর।
আশে-পাশে, মা বাবা মাসীমা
পিসিমা রয়েচেন কারো কানে গেলে বিপদ!
অমিয়া
বেশ কথা, দিব্যি আরামে নিরাপদে হেসে খেলেই
বুঝি প্রেমে পড়তে হয়। আইদিদির গান মনে
নেই ?
সই---পীরিতির বড় জ্বালা লো
বড় জ্বালা।
কান্তি--
সত্যি দিদি-কি জানি কেন
সেদিন সে
অমন করে হাঁ করে এক দৃষ্টে আমার মুখের
দিকে তাকিয়েছিল দেখে আমি মাথায় কাপড়
দিয়ে চলে এলুম বটে—কিন্তু---
১১
কাটার ফুল
অমিয়া-
দূরহ ছুড়ি—কিন্তু আবার কি, বল্ না মুখ
যদি ফুটল ত—-বল্ ব শুনি—তখন তাের কি
মনে হয়েছিল ?
কান্তি
দিদি, সেদিন থেকে ওর সামনে বেরুতেই লজ্জা
করে। ওরকম ভাবে চারচোখে চাওয়া কোন
দিন হয়নি। কি বেলহাজ ব ত ?
অমিয়া
বােন, নৃপেন্দ্র বড় সাবধানী। সহজে অমন
ভাবে আত্মহারা হয়ে তাকিয়ে থাকার ছেলে সে
নয়। তবে কি জানিস্-হাজার হােক—তবু
সে পুরুষ।
মনের ধড়ফড়ানি আর কতক্ষণ
চেপে রাখবে ?
কান্তি
চাইতে বারণ করে কে, তাই বলে দিদি অমন
কাটার ফুল
-
;-মুখে না বল্লি
করে সকলের সামনে চেয়ে থাকবে-বড় লজ্জা
দিছল ! ছিঃ !
অমিয়া -
সেই চাওনিটা, লজ্জাই দি—আর সরমই
দিক—তবু তাতে তুই মনে মনে খুসী ত হয়ে-
ছিলি।—এতদিনের মনের টান ;
-চোখেই না হয় প্রেমের কথা বল্লি।
কান্তি-
ঐ দিদি—ঐ দেখ, আবার আচে, আমি যাই,
তাের খুকীর জামা সেলাই করিগে।
অমিয়া -
বাঃ মজা ত বেশ। বােস, ছুড়ি ! আচে-
বেচারা তাের চাদমুখ দেখতে—আর তুই চল্লি
খুকীর জামা সেলাই কৰ্ত্তে ।
কান্তি
ছাড় দিদি-কি করচ-—আমার বড় লজ্জা করে ।
কাটার ফুল
অমিয়া-
ন্যাকামি ছাড়–লজ্জা করে ;-আবার দেখতে
পেলেও ত কম উসখুস করিস্ নে।
কান্তি ও অমিয়ার রসালাপে বাধা দিয়া হঠাৎ
নৃপেন্দ্র সেখানে আসিয়া বলিল—“অমিয়া দি, চুরি-
করে মায়ের বাটা থেকে একটা নয় দুটো নয় একে-
বারে তিনটি পান মুখের মধ্যে পুরে দিছলুম—চুরির
শাস্তি পেতে আর দেরী হ’ল না।
চুণে মুখ পুড়ে
গেছে—দাও একটু খয়ের দাও।”
এই কথায়
অমিয়া একটু মুচকিয়া হাসিয়া কান্তির হাতে
আলগােছে একটি চিমটি দিয়া বলিল,-“কান্তি। যা
বাটায় থেকে একটু খয়ের নিয়ে আয়।” কান্তি
একটু খয়ের আনিয়া একটি ছােট কাগজের উপর
তাহা নৃপেন্দ্রর সম্মুখে রাখিয়া দিল।
নৃপেন্দ্র
চট, করিয়া তাহা মুখের মধ্যে পুরিয়া দিল। কিছু
ক্ষণ বাদে গল্প করিয়া নৃপেন্দ্র কান্তির দিকে চোক
১৪
কাটার ফুল তুলিয়া বলিল, “কান্তি, হঠাৎ পড়া শুনা বন্ধ করে দিলে—এই তােমার বিদ্যানুরাগ।” এই কথার জবাব দিবার জন্য কান্তি চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। কেমন একটু লজ্জায় মাথা নীচু করিয়া হাতের বুড়া আঙুলের নখ দিয়া মাটি খুড়িতে লাগিল। অসাবধানতা হেতু মাটিতে বুড়া আঙুলের চাপ জোরে দেওয়ায় ডান হাতের চুড়ি ঠু করিয়া বাজিয়া উঠিল। সেই ঠুন টুন্ শব্দে নৃপেন্দ্র কতটা মুগ্ধ হইয়াছিল বলিতে পারি না! অন্তত সেই শব্দে কান্তির নিজের মন চমকিয়া উঠিল—মাটি হইতে হাত তুলিয়া লইল। ইতিমধ্যে তাহার এক- রাশ কালো চুলের কয়েক গাছা তাহার চোখের উপর উড়িয়া পড়ায় সে হাত দিয়া তাহা সরাইয়া দিতেই আবার হাতের চুড়ি ঠুনুঠুন বাজিয়া উঠিল। কান্তি আবার সাবধান হইয়া বসিল। কিছুক্ষণ পরে নৃপেন্দ্র চলিয়া গেলে, অমিয়া মৃদু হাসিয়া কান্তির
কাটার ফুল
আঁচল টানিয়া বলিল, “ছুড়ি, তুই বড় সয়তান।
মুখে কথা বলি না—কেবলি চুড়ির দােলে নৃপেন্দ্রের
মন কাপালি।
কান্তি
সত্যি দিদি। যখনি এক একবার অসাবধানে
চুড়ি দুটো ঐ রকম বেজে উঠছিল তখনি আমারি
কেমন লজ্জা কচ্ছিল ।
অমিয়া
চোরার পড়া শুনা দেখচি, এইবার মাটি হবে ।
-খয়ের চাইতে এল এই বাড়ী। যে বাটায়
পান চুরি করেছিল সেই বাটায় ত খয়ের ছিল।
হঠাৎ এমন সময় সদা-আনন্দিত। সেই সঙ্গে
সরসরসিকা কান্তির মাতামহী ( যিনি এতক্ষণ
বেড়ার আড়াল দিয়া পাশের ঘরে বসিয়া নাতনিদের
রসের গল্প শুনিতেছিলেন) তাহাদের
সম্মুখে
উপস্থিত হইয়া একগাল হাসিয়া বলিলেন—“ওলো
কাটার ফুল
দিদিমণিরা, যে বাটায় মনের পান চুরি হয়েছে সেই
বাটায় খয়ের চেয়েচে—বুদ্ধিমানের কাজই করেচে
প্রেমিকের কাজ করেচে।” হঠাৎ দিদিমার মুখে
এই কথা শুনিয়া কান্তির মাথায় যেন বজ্রাঘাত
হইল।
অমিয় থতমত খাইয়া নিজেকে একটুকু
সালাইয়া বলিল, “দিদিমা তােমার দুটি পায়ে পড়ি
—খবরদার এসব কথা কাউকে বোলােনা। আমাদের
মাথা খাও যদি বল।”
দিদিমা-
তবে বল্ আমার কথা রাখবি।
অমিয়!
একশবার রাখব।
দিদিমা-
চটপট, কান্তির আঁচলের
সঙ্গে নৃপেন্দ্রের
কেঁাচার খুঁটে গেরো দেবার বন্দোবস্ত করে
-
ফেল।
কাটার ফুল
কান্তি-
দিদিমা, তুমি ভারি দুষ্ট,
কেবল ঐ সব।
দিদিমা—
দুষ্ট নাতি আমার,লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমের
মধু চাখবার চেষ্টা—তা হচ্ছে না, সতী হয়ে
তাের প্রেমে ভাগ বসাব। ভেবেচি কি—
বাসর ঘরে নাতজামাইয়ের ডানদিকে আমিও
কোল বালিস হয়ে শুয়ে থাকব।
( ৩ )
বিমলা--
মা, কান্তি ৩ নৃপেন্দ্রকে অনেকটা মনে মনে
ধরে’ বসেচে।
দিদিমা-
তােদের শাস্ত্র আর পাজীপুথি গঙ্গার জলে ফেলে
দেও বালাই রাখিসনে। গণের মিলের চেয়ে
মনের মিল অনেক বড়। ওর সঙ্গেই বিয়ে দে।
১৮
কাটার ফুল
,
বিমলা-
ভেবে দেখ মা, রক্ত মাংসের টানের উপর দিয়ে
সমস্ত জীবনের ভাবী কল্যাণ যেন নষ্ট না হয়।
দিদিমা-
দেখ, বিমল ! মেয়ে পুরুষ দেখে দেখে আজ
আমার এই নারী-জীবনের বয়েসটা কম হলেও
তাই সত্তর। প্রেমের কোন্দি উচ্ছঙ্খল আর
কেন্ দিটা মঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত সেটা বেশ বুঝি।
যেখানে মনের মিল হয়ে বিয়ে হয় সেই খানে
শাস্ত্র বড়—সেইখানে শাস্ত্র গৌরবের সঙ্গে বিবাহের
অনুষ্ঠানের কৃত্যকে সমাধা করে। যেখানে মনের
মিল নাই অথচ বিয়ে—সেটা অধিকাংশ সময়েই
মনে এক-কাজে আর একের ব্যভিচার ঘটায়।
বিমলা—
তা বুলুম। কিন্তু সমাজকে ত আর অগ্রাহ্য
কৰ্ত্তে পারি না।
১
কাটার ফুল
দিদিমা--
মঙ্গলের জন্যেই ত মানুষ সমাজের সৃষ্টি করেছে
অমলের জন্যে নয়। কাজেই, ব্যক্তিগত
জীবনটাও যদি সত্যিকার মঙ্গলে গড়ে ওঠে
তবে সেই সঙ্গে সমাজেরও মঙ্গল হবে।
বিমলা-
এ বিয়ে হলে সমাজে যে আমাদের একঘরে
কবে।
দিদিমা-
তা কি কৰ্বি বল ? সমাজের ইজ্জতের চেয়ে
কি মানুষের প্রাণ ছােট ? তাই যদি হয়
তাহলে কান্তিকে মেরে ফেলেদে। আপদ
বালাই সব চুকে যাক্।
বিমল
ভগবান ভরসা। দেখি উনি কি করেন। ওঁর
বন্ধু হরেন্দ্র ভট্টাচাৰ্য ত এই বিয়ের ঘাের বিরােধী।
কঁাটার ফুল
–
দিদিমা-
কলির অধৰ্ম্ম। তাই ভট্টাচাৰ্য্য সত্য-শাস্ত্র ত্যাগ
করে টিয়ে পাখীর রামনাম পড়ার মতন পুথির
কতগুলি বােল মুখস্থ করে রেখেছে। কান্তির
বাপকে একবার জিজ্ঞেশ করিস তাে-স্ত্রী বেঁচে
থাকতে হিন্দু জাতির কোন শাস্ত্র মতে সে আবার
বিয়ে কল্লে।
বিমলা
তাতে আর শেষ কি, হিন্দু শাস্ত্রেই বরং বহু
বিবাহের আইন আছে।
দিদিমা-~-
স্ত্রী যদি স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী হয়—তাহলে এক খ্রী
ছাড়া দুই স্ত্রী হলে স্বামীর অস্তিত্ব থাকে কই, দুই
স্ত্রীতেই তো আধে আধে একটা পূর্ণ হয়ে গেল।
বিমলা-
ছাই মাথা মুণ্ড আমি ও শাস্ত্ৰ বুঝিনা, সবটারই
২১
কাটার ফুল
এক একটা ব্যাখ্যা গরুর স্যাজের মত লেগে
আছে।
এমন ব্যাখ্যার শাস্ত্রও বাবা দেখিনি।
দিদিমা-
তাই বলি ও ব্যাখ্যার শাস্ত্র ছেড়ে সত্য শাস্ত্রে
নির্ভর করে, নৃপেন্দ্রর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দে।
অনর্থক একটা বিভ্রাট ঘটাস নে।
কেবল নাক
মুখ চোক বুজে শাস্ত্র মেনে মেনেই ত সমাজে
অধৰ্ম্মের এমন ব্যাভিচার হচ্ছে।
দিদিমার সহিত তর্কে আঁটিতে না পারিয়া বিমলা
(কান্তির মা) রান্না ঘরের দিকে চলিয়া গেলেন।
এই দিদিমা বয়েসে
সেকেলে হইলেও বুদ্ধি
শুদ্ধি নিতান্ত পক্ষে একেলে ছিল। দিদিম।
একেলে ভাবে চিন্তা করিতেন বলিয়া সেকেলে বুড়ি
গিন্নিদের মহলে তিনি বড় বেশী আমল পাইতেন
བ |
অথচ একেলে একেবারে পাখনা ঝাড়া উদীয়
মান সাহেব বিবিদেরও তিনি দুই চক্ষে দেখিতে
२२
কাটার ফুল
করিতেন।
করিয়াছিল যে,
পারিতেন না। বিবি সাজিয়া হট হট করিয়া মেয়েরা
পুরুষের গা ঘেসিয়া টেনে টামে বসাটাকে তিনি
শুধু অন্যায় মনে করিতেন না--বিশ্রী রকমে ঘৃণা
কোন এক ইংরাজী নবীস একদিন
দিদিমাকে বেশ যুক্তি তর্কের জাল পাতিয়া
বুঝাইবার চেষ্টা
ডাইভােস প্রথাটা :
স্ত্রী এবং পুরুষের তরফ হইতে ভাল এবং মঙ্গলকর।
আর বিবাহ ব্যাপারটা, কনট্যাক্ট আইনের
মতই হওয়া বাঞ্ছনীয় যেহেতু ইহাতে
যেহেতু ইহাতে সবদিক
হইতে ব্যক্তিস্বাধীনতার মার্গ সতত প্রসস্থ থাকে।
ইংরাজী-পড়া নব্য ছােকরার এই কথা শুনিয়া
দিদিমা সেদিন বড়ই রাগিয়া বলিয়াছিলেন “এই
রকমের ব্যক্তিস্বাধীনতা জঙ্গলের বরদের জন্য
মনুষ্যসমাজের জন্য নহে।
এক কথায় দিদিমা হিন্দু ধৰ্ম্ম-শাস্ত্রের যেটা
সত্যিকার জ্ঞানের দিক সেটাকে, সর্বতো ভাবে
কাটার ফুল
মানিতেন। যেখানে সেই শাস্ত্রের ব্যাখ্যা স্বার্থপরতার
জন্য অথবা বিশেষ কোন একজনের সুবিধার জন্য
সত্যের পথ ছাড়িয়া কুব্যাখ্যার সদর রাস্তায় নামিয়াছে
-সেই খানেই তিনি শাস্ত্রের ব্যাখ্যায় বিমুখ। এই
জন্য, নব্য সমাজ যখন দেখিত তিনি, মাছ মাংস না
খাইয়া দেশী বিধবার মত সাদা ধুতি পরিয়া যথারীতি
সন্ধা আহ্নিক করিতেছেন—তখন তাহারা হাসিত,
কোন কোন যুবক বিবরলে তাহাকে ম্যাড,ক্যাপ,
বলিয়াও বিদ্রুপ করিত। আবার যখন দিদিম।
সমাজের কু-প্রথার শ্রাদ্ধ করিতে বসিয়া যাইতেন
তখন, সাবেক দলের লােকেরা নাক সিটকাইত।
যাহােক এই রকম একটি রক্ষণশীলা, সমাজ
সংস্কারক দিদিমার কাছে কাম্ভি, অবাধে এবং বেশ
সহজে নিজের মনের সব কথা বলিত । দিদিমা
যেমন কান্তির সখী ছিলেন—আবার তেম্নি কান্তির
মনে সৎশিক্ষা দানের বেলায় তিনি গুরুও ছিলেন।
२४
কাটার ফুল
বিবাহের লগ্ন যতই সন্নিকট হইয়া আসিল ততই
কান্তির
বুকের ভিতরটা কঁপিতে লাগিল। চারি-
দিকে উৎসবের হাসি আর আনন্দ, তার মাঝখানে
কান্তির মনে কি দুঃখের অগ্নি জলিতেছিল তাহা
কেহ টের পাইল না। দিদিমা এক মাস আগেই
অন্য লােকে চলিয়া গিয়াছেন। এখন কে এই বিপদ
ঝঞ্চা হইতে কান্তিকে রক্ষা করিবে ?
তামিয়া সারাদিন কাদিয়া যখন আর পারিল না
একেবারে মরিয়া হইয়া কান্তিকে ঘরের কোন হইতে
টানিয়া বুকের সঙ্গে চাপিয়া ধরিয়া বলিল “বােস
মৃত্যুর হাত কেউ এড়ায় না-- মরন একদিন নিশ্চিত।
চল বােন পুকুরে ঝাপ দিবি। একমুহূর্তে কান্তির
প্রাণের ভিতর বিদ্যুৎ খেলিয়া গেল। মরা ধড়ে
প্রাণের আবেগ সঞ্চার হইল সে বলিল “দিদি আজ
এই শুলগ্নে মরণের কণ্ঠেই তবে বরমাল্য পরাইয়া
কাটার ফুল
দি সব জ্বালা যন্ত্রণার অবসান হইয়া যাক।” বজ্র
কঠোর স্বরে পিছন হইতে কে আসিয়া বলিল ন্যাকা
কান্না ছেড়ে দে—বিয়ের সময় হল এখন ওঠ
বিমলা জিবে কামড় দিয়া বলিলেন “কান্তি বিয়ে হয়ে
গেলে বিষ খেয়ে মরিস এখন আমাদের ইজ্জত বাঁচা
দশ মাস অনেক কষ্টে পেটে ধরেছি এমন করে আর
মজাসনে।
একসঙ্গে পিতা এবং মাতাকে সম্মুখে দেখিয়া
কান্তিক চোখের জল মুছিয়া হঠাৎ কেমন শুদ্ধ হইয়া
গেল। রক্ত মাংসের শরীর মুহূর্তের মধ্যে যন্ত্রের
মত হইয়া গেল।
যথা নিয়মে বিবাহ হইয়া গেল। বাসর ঘরে বর
বধূকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করিবার জন্য সকলেই আসিল।
আসিল না কেবল অমিয়া। সে তখন মঙ্গল উৎসবের
মাঝখানে আপন স্বামীর কক্ষে অমঙ্গলের অশ্রু
ফেলিতেছিল। নব বিবাহিত কেশবলাল স্ত্রীকে একান্ত
কাটার ফুল
বিমর্ষ দেখিয়া নিজেও গম্ভীর হইলেন। অন্যান্য অল্প
বয়সের মেয়েরা বাসর ঘরের অস্বাভাবিক গাম্ভীৰ্য্য
দেখিয়া একে
একে সব সেখান হইতে সরিয়া
পড়িল।
শ্ৰীচরণেষু,
দিদি ! এইত এতদিন শ্বশুরবাড়ী আছি-এখনো
স্বামীর সঙ্গে একটি বারও আলাপ হয়নি। দুরে
দূরেই আছি। উনি দু একদিন আদর করেই কাছে
ডেকেছেন তবু যাইনি। শেষটায় উনি বিরক্ত হয়ে
আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। ঘরের
মধ্যে শুতে যাই-থাকি স্বতন্ত্র শয্যায়। স্বামী
ভাবছেন এটা আবার কেমন ধারা। ইতি মধ্যেই কেউ
কেউ আমার ভূত ঝাড়বার জন্যে সাদা সরষে কেনবার
জন্যে শ্বশুর মশায়কে পরামর্শ দিচ্ছে। কেউ কেউ
আমার মেজাজ একরােখা বলে আমায় ফঁাটা-পেটা
কাটার ফুল
করবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। দিদি, আর ত
সয় না। যা হয় একটা করতে হবে। এরকম
করে মনের বােঝা আর কত দিন বইব। কেমন
থাক লিখো।
অভাগী কান্তি।
( ৪ )
অমিয়া
তােমার কি অভিপ্রায় এখন, কান্তির যা হবার
তা হয়েছে। তােমার জীবনটাকেও কি মাটি
-
কবে ?
নৃপেন্দ্র
দিদি, মাটি নয়। জীবনের উপরে সত্যি কার
অগ্নি-পরীক্ষা শুরু হয়েছে। হয়ত এই ঘটনার
ভিতর দিয়েই যা সত্য তাই ফুটে উঠবে।
অমিয়া
দেখ, আমরা মেয়েমানুষ, মেয়েদের ধরণ কতকটা
২৮
কাটার ফুল
বুঝি।
যদি সত্যই কান্তির জীবনকে মঙ্গলে
প্রতিষ্ঠা করা তােমার অভিপ্রায় হয়, তা হলে এক
কাজ কর—তুমি আস্তে আস্তে রয়ে সয়ে কান্তিকে
বুঝতে দাও যে তুমি তার সঙ্গে ধীরে ধীরে সম্বন্ধ
ছিন্ন করে।
নৃপেন্দ্র
দিদি-সম্বন্ধ যা হয়েছে সে ছিন্ন হবার মত নয়।
বরং সম্বন্ধ যতই সত্য হবে আমার বিশ্বাস
কান্তিকে ততই মঙ্গলের ভিতর নিয়ে যাবে।
অমিয়া–
দেখ ভেবে। এ জায়গায় অবিশ্যি উপদেশ কাজ
করেন। কিন্তু কান্তির অবস্থা বড় শােচনীয় হয়ে
গেল। কোন উপায় নাই যে তােমার সঙ্গে আর
মিলন হবে।
নৃপেন্দ্র
দিদি ওকথা আর মুখে এনন। চোখের জলে
কাটার ফুল
মিলনের আশা ভেঙ্গে গেছে-প্রার্থনা করি নির্মল
হাসির তরঙ্গে সেই মিলন কান্তি স্বামীর ঘর লাভ
করুক।
আমার কাছে ও কল্পনা বড় জঘন্য
মনে হয়।
হঠাৎ নৃপেন্দ্রের মুখে এত বড় একটা নিঃস্বার্থ
ভাব দেখিয়া অমিয়া প্রথম কেমন একটু চমকিয়া
উঠিল-পরক্ষণে, ঘৃণায় তাহার মন ভরিয়া উঠিল।
ভাবিল ছিঃ পুরুষজাতি এনি ক্ষণ প্রেমী, যাহার
জন্য কান্তি বুকে দুঃখের দাবাগ্নি জ্বালিয়া বসিয়া
আছে—সে আজ ক মুহূৰ্ত্তে কান্তির সব বন্ধনকে
অস্বীকার করিতেছে। মিয়াকে স্তব্ধ দেখিয়া
নৃপেন্দ্র বলিল, “দিদি, আজ আসি, পরে দেখা কর।
তবে কান্তির সম্বন্ধে আর কোন কথা আমায় বােলনা।
যা হলনা, তা নিয়ে জীবনটাকে প্রতিদিন বিড়ম্বিত
করা কোন কাজের কথা নয়। বিড়ম্বনা জীবনের ধর্ম
মঙ্গলই হচ্ছে সবটার উপরে।
নয়।
কাটার ফুল
অমিয়া-
তাই হােক। কিন্তু মুখের কথায় যেটা সহজ,
কাজে সেটা বড় কঠিন।
নৃপেন্দ্র
তাকি জানিনা দিদি। তবু যা শ্রেষ্ঠ তাইত নেবার
চেষ্টা করতে হবে। থাক, আজ অসি। পারিত
পরে দেখা কৰব ।
( ৫ )
কল্যাণীয়াসু।
বোন, দৃষ্টকে ধিক্কার দিনে। মানুষের সফলতা
সেই খানে যেখানে মানুষ প্রতিদিন মঙ্গলের সাধনায়
নিজের ছোট খাট দুর্বলতাকে জয় করে। প্রেম
জিনিষটা ছােট নয়—সেটা খুব বড়। তার বৃহৎ
রূপকে যেদিন উপলব্ধি করবি সে দিনই দেখবি
দেহের ভােগ সেটা ছােট হয়ে যায়—প্রীতিটা পূর্ণ
কাটার ফুল রূপে সকলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। সেই বড় প্রীতির রাজ্যে তুই সকলকে সমান দেখবি। কোন দৈন্য থাকবেনা। ভেবেনে সংসারে ভােগের রাজ্যে এজম্মের মত অধিকার নেই--পরজন্মে হয়ত সে রাজ্যের যেটা কাম্য সেটা পাবি। আমার বিশ্বাস, মানুষ এক জন্মে সব দিকের পূর্ণতা পায়না সবদিকের গ্রহণীয় যা তা ভােগ করে উঠতে পারে না। এই জন্মে যা পেলিনা, পরজন্মে পাবি। জন্মে জন্মে কেবলি পূর্ণতাকে অংশে অংশে কেবলি সঞ্চয় করাই মানুষের ধর্ম। সকল দুঃখের উপরে তাের জীবনের মঙ্গল সাধনা ধন্য হউক। এই আশীর্বাদ করি। ইতি তাের দিদি। কেশব লাল- কান্তি, অনেক দিন ত অপেক্ষা করে রইলুম।
কাটার ফুল এখনাে কি ধরা দেবে না? থাক, বন্দী কৰ্ত্তে চাইনা। কিন্তু তােমার মুক্তি কিসে সে খবরও তো আমায় জাতে দিলেন ? কান্তি-- সে খবর তােমার পক্ষে শােনা কঠিন। কিন্তু তার চেয়েও কঠিনতর সেটা আমার পক্ষে তােমার কাছে বলা। কেশব- তবে থাক কান্তি, আরো কিছুদিন সময় দাও, রক্তমাংসের শরীর আমার । ভাল মন্দকে স্থির ভাবে গ্রহণ করে নেবার মত আজো তেমন ভাবে কোন সাধনা করিনি। তবে একটা কথা! পার্কে কি সেটা সইতে ? কান্তি-- সব কিছু সইবার জন্যই বােধ হয় আমাদের জন্ম। অন্তত সইবার ধাকাতেই আমার জীবনে এত বেদনা।
কাটায় ফুল কেশবলাল- দোহাই তােমার কান্তি, জীবনের যৌবনে কেবলি আশা করেছি আমার বিবাহিত জীবনে সুখী হ’ব। আমার সে সুখ কল্পনায় বস্ত্র নিক্ষেপ করােনা। তােমরা নারী,—মাতৃত্বের পুণ্যধারা তােমাদের অন্তরের সামগ্রী-তােমার দুঃখতাপের মাঝখানে চির-কল্যাণের অধিষ্ঠাত্রী -তােমরা লক্ষমী- তােমার তরফ থেকে যেন আমার বুকের উপর কোন রকমের বজ্র না আসে। কান্তি-অশ্রু মােচন করিয়া) ক্ষমা কর, আমায় ক্ষমা কর। আমি লক্ষী নই আমি মাতা নই—আমি, পাপী। জগতে পুড়তে এসেছি—পােড়াতে এসেছি। তবে সেই কথা শােন, শােন, তুমি আমায় ছাড়। একটা কর। নয় আমায় গ্রহণ কর-নয় আমায়
কাটায় ফুল
উঠিল।
ছাড়। এরকম সমস্যার মাঝখানে আর থাকতে
পারিনা।
কেশবের এই কথায় কান্তি আর থাকিতে
পারিল না ।
তাহার মনের ভিতরটা হুহ করিয়া
সে ত চিরকাল সকলকে ভালবাসিয়াছে,
সেই জন্যই ত—সমাজের স্বামীকে মনের মধ্যে
আসন দিতেছে—ক্ষণে ক্ষণে পূৰ্বস্মৃতি তাহাকে
সমস্যা হইতে সমস্যান্তরে লইয়া গিয়া কেবলি বিপথের
অন্ধকারে লইয়া যাইতেছে। সেই জন্যই তো
কেবলি অমিয়ার কাছে বার বার ধন্না দিয়া আসিয়া
পড়িতেছে।
বাপের বাড়ী আসিয়া অবধি কান্তি কেশবের
নিকট হইতে কম পক্ষে পাঁচখানা চিঠি পাইয়াছে কিন্তু
একটিরে জবাব দিতে পারে নাই—দিবেই বা কোন
অথচ কেশবের দেবচরিত্র, নিজের প্রতি
( অর্থাৎ কান্তির প্রতি কেশবের) তাহার একান্ত
কাটার ফুল নির্ভর এবং বিশ্বাসও কান্তিকে অনেকটা আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছে--তাই যখন অমিয়া বলিল “তাঁর পায়ে নিজেকে নিঃশেষে দিয়ে ফেল” তখনি কান্তির ভিতরটা কঁাপিয়া উঠিল। নৃপেন্দ্রকে সে যে ভালবাসা দিয়াছিল সেটা ত এখনো বুকের মধ্যে শিকড় গাড়িয়া বসিয়া আছে। অন্যদিকে আবার কেশব নূতন মোহের জাল পাতিতেছে। কোমলপ্রাণ কান্তি বড় সমস্যায় পড়িল। নিজের মনের ভাল মন্দের সঙ্গে বিচার করিতে করিতে কান্তির জলভরা চোখের পাতার উপর নিদ্রার তন্দ্রাভার নামিয়া পড়িল। স্বামীর জলখাবার তৈরী করা শেষ করিয়া অমিয়া কান্তির ঘরে আসিয়া দেখিল, কান্তি মাদুরের উপর ডান হাতের উপর মাথা রাখিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে -চুলগুলি খােলা। কি সুন্দর মুখ- বেদনার মলিনতায় ফ্যাকাশে চোখের কোলে তখনন
কঁাটার ফুল
অশ্রু সম্পূর্ণ শুকাইয়া যায় নাই। এই দৃশ্য দেখিয়া
অমিয়ার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল। তাহার চোখে
প্রবল অশ্রু আসিল—খুব কতকটা অশ্রু ফেলিয়া
অমিয়া আঁচলে চোক মুছিল। মনের মধ্যে কেমন
একটা বিরুদ্ধভাব জাগিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ
থাকিয়া নিজের মনেই বলিল “ধৰ্ম্ম, সমাজ, শাস্ত্র
সব যা-যা চুলােয়। যাক ছুড়ি নৃপেন্দ্রের
সঙ্গেই কোথাও বাহির হইয়া যাক”-পরক্ষণে,
জীব কামড়াইয়া বলিল “ছিঃ ছিঃ একি কথা
বলিলাম। অকল্যাণ-অকল্যাণ। একি করিলাম,
ভগবান রক্ষ! কর। শত অপরাধ ক্ষমা কর।
--রমণীর যাহা গৌরব কান্তিকে সেই গৌরবে বড়
কর, তাহার নারীজন্মের সফলতায় বজ্র হানিওনা।
সন্ধ্যায় যখন কান্তির ঘুম ভাঙিয়া গেল, সে তখন
সসব্যস্ত হইয়া দিদির রান্নাঘরের চৌকাটে গিয়া
মাথায় কাপড় টানিয়া বসিল। কিছুক্ষণ পরে রান্না-
কাটার ফুল
ঘরের পাশে আঁটগাছের জঙ্গলে খস্ খস, করিয়া
উঠিতে অমিয়া রান্নাঘরের দাওয়ায় আসিয়া দেখি-
লেন অদূরে নৃপেন্দ্র দাঁড়াইয়া আছে। নৃপেন্দ্রকে
দেখিয়া অমিয়া মাথায় কাপড় টানিয়া ইঙ্গিতে
নৃপন্দ্রকে ডাকিল।
নৃপেন্দ্র রান্নাঘরের পিছনে
আসিয়াছে জানিয়া কান্তির মনে সমস্যার তরঙ্গ
কাপিয়া উঠিল। একবার ভাবিল ছুটিয়া গিয়া
নৃপেরে পা জড়াইয়া ধরিয়া বলে “আমায় বাঁচাও
আমায় লইয়া যাও, এমন করিয়া আর পারিনা!”
পরক্ষণে কেশবের স্নিগ্ধশান্তমুখচ্ছবি তাহার মাতৃত্বে
ভরা হৃদয়ের দ্বারে বার বার উকি মারিতে লাগিল।
এক নারী এমন করিয়া দুই টানের মাঝখানে কতক্ষণ
থাকিবে। বুক ভাঙ্গিয়া অশ্রুজল তাহার চক্ষুকে
ভরিয়া তুলিল, বার বার আঁচল দিয়া সে চোক
মুছিল।
ক্রমশ, অমিয়া আসিয়া বলিল “কান্তি
নৃপেন্দ্র একবার দুটি কথা বলিতে চায়—চল ওঠ,
-
কাটা । দিদির এই অনুরােধ কান্তির মনের উপর একটা বােঝার মত চাপিয়া বসিল। পায়ে পায়ে যেন সঙ্কোচের শৃঙ্খল পড়িয়া গেল। বুক দুর দুর কাঁপিতে লাগিল। দিদির কথার কোন জবাব না দিয়া সে মাথা নিচু করিয়া অনেকক্ষণ বসিয়া রহিল। দিদি অনেক মিনতি করিয়াও কান্তিকে রান্নাঘরের চৌকাট হইতে নড়াইতে পারিলেন না। অগত্যা সে নৃপেন্দ্রকে বলিল “তুমি একবার না হয় মুহূর্তের জন্য ভিতরে এস।” নৃপেন্দ্র- দিদি যাক। দেখা করায় যখন এত বাধা এসেছে তখন আর দেখার প্রয়ােজন নেই। সম্বন্ধটা এই রকম করে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাক।” এই বলিতে বলিতে নৃপেন্দ্রের কণ্ঠ জড়াইয়া আসিল। রুমালে চোখ মুছিয়াই সে আর কিছু না বলিয়া হঠাৎ সেখান হইতে অদৃশ্য হইয়া গেল।
কাটার ফুল
অমিয়া নৃপেরে চলিয়া যাওয়ার পর অনেকক্ষণ
পর্যন্ত স্তব্ধ হইয়া সেই দাওয়ায় দাঁড়াইয়া রহিল
তখন ভটবনের উপরে একসার আমগাছের মাথায়
অন্ধকারের পর্দা সরাইয়া ধীরে ধীরে চন্দ্রোদয় হইল।
বেড়ার ফাঁক দিয়া তাহারি কিরণ-রশ্মি কান্তির
বেগুনি-বর্ণের সাড়ীর ঘােমটার ভিতরে--কান্তির
মুখ পদ্মের উপর আসিয়া পড়িল-মনে হইল যেন
ফোটা ফুলে রাত্রির বিদায় অশ্রু জমিয়া আছে।
অমিয়া ধীরে ধীরে রান্নাঘরে ঢুকিয়া বলিলেন—“চল
এখন একটু ঘরে বসি।” এতক্ষণ নানা চিন্তার
সমস্যায় কান্তি ব্যথার একটা স্বপ্নে ডুবিয়া ছিল।
হঠাৎ দিদিকে সম্মুখে দেখিয়া সে শিহরিয়া উঠিল,-
মাথায় কাপড় সরাইয়া বলিল,-“সে কি চলে গেল ?
অমিয়া
অনেকক্ষণ ত অপেক্ষা করে ছিল। শেষটায় চলে
গেল।
কাটার স্কুল
কান্তি
কোন কথা বলে গেল না-অমি চলে গেল।
অমিয়-
শুধু-চোখের জল ফেলে চলে গেল।
হঠাৎ কান্তি চৌকাট ছাড়িয়া উঠিয়া রান্নাঘরের
দাওয়ায় গিয়া উপস্থিত হইল। অমিয়া কি একটা
অমঙ্গলের আশা করিয়া কান্তির পিছন পিছন
গেল। দাওয়ায় আসিয়া কান্তি অনেকক্ষণ শূন্যের
দিকে তাকাইয়া সেইখানেই বসিয়া পড়িল। সহসা
স্তব্ধতার মােহ ভাঙ্গিয়া সেই ভাট বনে ঐ যে
মানুষের ছায়ার মত দেখা দিল ।
কে ও? নৃপেন্দ্র।
কান্তি
নৃপেন্দ্রকে
দেখিয়া তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড়
টানিয়া সম্বত হইয়া বসিল।
নৃপেন্দ্র--
বেশী নয়। দুটি কথা বলে—বিদায় নেব। তার
পর আর আমাকে খোজ কোরনা।
৪১
*টার ফুল কান্তি--- এতদিন ত চুপ করে ছিলুম। দিলে কই আমায় চুপ করে থাকতে ? নৃপেন্দ্র এতদিন পরে আজ এসেচি-মঙ্গল উদ্দেশ্য নিয়েই আজ এসেচি -আজই-আর নয়, তার পর আর দেখা পাবে না। কান্তি-- কেন-সাত জন্ম ধরে কি এতই পাপ করে ছিলুম যে প্রাণের ভিতর যার জন্যে অগ্নি জেলে বসে আছি—তার দেখাও পাব না- নৃপেন্দ্র- যাক-সে কথা—যা হবার তা হয়েচে-কেশবের বিশ্বাসী এবং প্রেমী হৃদয়ে কোন আঘাত দিও না। তাকে আমি চিনি—কোন সময় সে আমার সহপাঠী ছিল। জীবনে বড় আশা করে আসছে বিবাহের ৪২ কাটায় ফুল ভিতর দিয়েই সে জগতের সব মহলকে পাবে। তার জীবনকে যদি বিফল কর তাহলে বড় পাপ হবে। কান্তি- ক্ষমা কর—আমায় ক্ষমা কর—এই রকম করে কি আমার সঙ্গে এতদিনের সম্বন্ধ একেবারে ছিন্ন - করে দেবে। নৃপেন্দ্র- কান্তি—যদি সত্যিকার সম্বন্ধ রাখতে চাও যদি এই সম্বন্ধ মঙ্গলের বলে নিতে চাও তাহলে মঙ্গলকেই পূজা কর। তােমার কাজে যদি কোন দিকে অমঙ্গল হয়—সব দিকে অমঙ্গল হবে। কেশবের জীবন যদি অমঙ্গলে নষ্ট হয়—সে অমঙ্গল থেকে আমরা কেউ নিষ্কৃতি পাব না। কান্তি স্পষ্ট করে বল আমি কি কৰ্ব । এমন করে আর ত পারি না।
কাটার ফুল
নৃপেন্দ্র
যেটাতে কেশবের জীবনে সব দিকে সফলতা
হয়—সতী সাধ্বীর মত তাই কর। তােমায়
নিষ্কৃতি দিলুম। এই সম্বন্ধের গৌরব সেইখানে
-যেখানে, আমাদের মনে কেবল কল্যাণের শিখা
জ্বলবে। কেশবকে ভালবাস। আমার সম্বন্ধ
সম্বরণ করে—কেশবকে ভালবাস। তাই যদি সত্য
হয় বুঝব আমার জীবনের কল্যাণবিধায়িনী
শুধু মর্ত্যলােকের নারী নয়—অমরার দেবী।
কান্তি
আশীর্বাদ
কর,-আশীর্বাদ
কর--তােমার
প্রেমের গৌরবে জীবন ধন্য হক।
( ৬ )
কান্তি--এতদিন পরে দেখুঁচি--আমার জীবনের
প্রতি তােমার একটা টান হয়েছে।
০৪
কাটার ফুল
কান্তি-
সে টানের গােড়ায় তােমার টান যে ঢের বেশী,
আমার সব অপরাধ ত ধুয়ে ফেলে-
=
কান্তি–বড় সঙ্কোচ তােমার : কাছে কাছে আছ
-তবু ধরা ছোঁয়ায় আস না।
কতবার বলে
অপরাধ—সেই সঙ্গে কতবার তােমার চোখের
কানায় কানায় অশ্রু ফুটে ওঠে—তবু সে অপরাধ
কি—আজ পর্যন্ত বল্লে না :
কান্তি-
আর পারি না—ক জড়িয়ে আসে।
বলব।
বলার আগে নিবেদন
এই বলিয়া অশ্রুজলে কান্তি কেশবের কোলের
উপর পড়িয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া গুমরিয়া গুমরিয়া
ফুলিয়া কাঁদিল। তখন নিস্তব্ধ রাত্রি। কেবল
কেশবের ঘরে একটি মাত্র বাতি জ্বলিতেছিল।
তবু আজ
৪৫
কাটার ফুল
কেশব স্নেহা হইয়া কান্তিকে বুকের সঙ্গে জড়াইয়া
ধরিয়া বলিল “ওঠ। যদি কোন অপরাধ হয়ে থাকে
--এই অশ্রুজলে তার প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে।”
কান্তি
উঃ কি জ্বালা। তােমার পায়ে আমার সব দিয়েছি
—মনের সব ঠাই তােমার জন্যে—তবু তুমি
আমার অপরাধ না জেনে নিলে,-এই মিলনে
সংশয় থেকে যাবে। আমার অপরাধ জান-~-
তার পর ইচ্ছে হয় এমনি করে বুকে ঠাই দিও
ইচ্ছে হয় পদদলিত করে চলে যেও-কোনটায়
আমার অমঙ্গল হবে না।”
এই বলিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে কান্তি হাত বাস্ক
হইতে নৃপেন্দ্র সম্বন্ধে নিজের লেখা বিস্তর চিঠি—সেই
সঙ্গে নৃপেরে শেষ কএকখানি পত্র বাহির করিয়া
কেশবের সামনে রাখিয়া দিল
কাটার ফুল
সব কাগচগুলি পড়িয়া কেশবের সুন্দর মুখ কালাে
হইয়া গেল। উজ্জ্বল চোখের কোলে এক মুহূর্তে
কে যেন অনেকটা কালি ঢালিয়া দিল। সেই মরা
মুর্তি দেখিয়া কাস্তির বুক কাপিয়া উঠিল।
আতঙ্কে তাহার শরীর হিম হইয়া গেল। তাড়াতাড়ি
সে হাতে মুখ ঢাকিয়া শয্যায় উপুড় হইয়া শুইয়া
রহিল। দ্বিতীয় বার চোক মেলিয়া কেশবের সেই
মুর্তি দেখিবার মত সাহস আর রহিল না।
চিঠি গুলি পড়িবার কিছুক্ষণ পরেই কেশব আর
কোন দিকে তাকাইল না-আস্তে আস্তে ঘরের
কট খুলিয়া সেই অন্ধকারে কোথায় চলিয়া গেল।
দ্বার ভেজাইয়া যায় নাই। কান্তি টের পাইল কেশব
ঘর হইতে বাহির হইয়া গিয়াছে। ভাবিয়াছিল
কিছুক্ষণ পরেই আবার কেশব ফিরিবে। অনেকখানি
সময় অতিবাহিত হইয়া গেল তবু কেশব ফিরিল
না। কান্তি ভয়ে জড় সড় দেহ লইয়া উঠিল।
৪৭
কাটার ফুল
ভাল করিয়া কাপড় আঁটিয়া পরিয়া সেও ঘরের
বাহিরে গেল -- সেখানেও ভীষণ অন্ধকার ।
শ্রাবণ মাস—আকাশে প্রচুর কালাে মেঘ। অদূরে
এক সার ঝাউবনে শ্রাবনের ভিজে বাতাস সো সে।
করিতেছে—মাঝে মাঝে আকাশের বদীর্ণ করিয়া
বিদ্যুৎ ঝিলিক মারিয়া অন্ধকার রাত্রির বুকে অগ্নির
দারুণ বিভীষিকা সৃষ্টি করিতেছে। মাঝে মাঝে এক
এক পশলা বৃষ্টিও হইতেছে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত
কান্তি ঘরের বারান্দায় দাঁড়াইয়া রহিল। আর পারিল
—-আতঙ্কে সমস্ত শরীর ঠক্ ঠক্ করিয়া কাপিতে
লাগিল,এমন সময় পিছন হইতে ঘরের মধ্যে কে
ফস্ করিয়া প্রবেশ করিল ।
কান্তির সমস্ত দেহে
কি যেন ছন্ মম্ করিতে লাগিল। ভয়ে ভয়ে পিছন
ফিরিয়া দেখিল ঘরের দরজা বন্ধ : বন্ধ দরজা
দেখিয়া কান্তির
বুকের ভিতরটা ধড়াস করিয়া উঠিল।
এক নিমেষে সমস্ত পৃথিবীটা তাহার কাছে নিতান্তই
৪
কাটার ফুল
“কিছু না” মনে হইল। এত দিনের সমস্যা-পীড়িত
মনের উপর হইতে জ্বর ছাড়া ঘামের মত সব বােঝা
নামিয়া গেল।
বার কএক ভাবিবার চেষ্টা করিল
এখন কি করা কর্তব্য, সব সমস্যা অতিক্রম করিয়া
মনের ভিতর হইতে উত্তর আসিল “মৃত্যু।”
আঁঠাল গাছের বন জঙ্গল মাড়াইয়া বেশ নির্ভয়
চিত্তে কান্তি সম্মুখের দিকে হাঁটিয়া চলিল। পায়ে
ভিজা বনের ভিজা ঘাসের ছিন্ন আগাগুলি জড়াইয়া
উঠিল ; দু একবার বায়ু কম্পিত আঁচলের খুট
কণ্টকিত মােটাগাছে লাগিয়া গেলেও সে তাহা
ছাড়াইয়া ক্রমাগত ঘঁটিয়া চলিল। দিঘীর ঘাটে
আসিয়া দাঁড়াইল। অন্তিম ব্যবস্থার পূর্ব মুহূর্তে
একবার ঘাটের সােপানে বসিয়া জীবনের পুরাণ স্মৃতি
ভাবিতে বসিল। সে কত ঘটনা। বিদ্যুৎ এর
চমকের মত একবার নৃপেন্দ্রের স্মৃতি তাহার এই
মৃত্যু-আচ্ছন্ন অন্ধকার অন্তরটি আলােকিত করিয়া
১
কাটার ফুল
তুলিল পরক্ষণেই ব্যর্থতর বিড়ম্বনায় সে হৃদয়
গভীরতর কালিমা জড়াইয়া আসিল।
কান্তি যেন্নি
দিঘীর জলে ঝাপাইয়া পড়িতে গেল অমি পিছন
হইতে কে তাহাকে টানিয়া ধরিল। বাধা পাইয়া
কান্তি পিছনে ফিরিল। পলকে বিদ্যুতের আলােয়
চারিদিক আলো হইয়া গেল। সেই আলােয় কান্তি
দেখিল তাহাকে বুকের মধ্যে কেশব চাপিয়া ধরিয়াছে।
( ৭ )
এই ঘটনার পর অনেক দিন পর্যন্ত কেশব
কান্তিকে, ঠিক পূর্বের মত আকর্ষণ করিতে পারে
নাই, কেমন একটা সঙ্কোচের জন্য সে নিজেই
তফাতে তফাতে থাকিত। অথচ এই যে পরস্পরের
মধ্যে ব্যবধান ইহা সংসারে অন্যের কাছে তেমন
ভাবে ধরা পড়িল না। যাহারা ইহা লক্ষ্য করিয়া-
ছিল তাহাদের
কাছে ইহা অস্বাভাবিক ঠেকে
নাই কারণ বিবাহের পর হইতেই তো কাতির
কাটার ফুল
ব্যবহার এনিই ছিল। ক্রমশঃ কান্তি সংসারের
সামগ্রীর মধ্যে আপন গৃহিণীপনার দাবী ধীরে ধীরে
প্রকাশ করিতে শুরু করিল। কেশব,
খাইয়াই স্কুলে যাইত, কিন্তু স্কুলে যাইবার পূর্বে
তাহাকেই আপন জামা কাপড় নিজেই গুছাইয়া
লইতে হইত। সহসা কেশবের নিত্য আবশ্যকীয়
জিনিষ পত্রের ব্যবস্থায় কান্তির নিপুন হাতের স্পর্শ
পড়িল ।
ঘরের মধ্যে কেশবের চারিদিকের খুঁটিনাটি
গােচ গাছের মধ্যে ধীরে ধীরে ব্যবস্থার এ ফুটিয়া
উঠিল। ক্রমশঃ সারাদিনের মাষ্টারির পরিশ্রমের
পর চারিটার পর গৃহে ফিরিয়া কেশব ভৃত্যকে
ডাকাডাকি না করিয়াও মুখ হাত ধুইবার জল সেই
সঙ্গে জলখাবারের বস্তুও পাইতে লাগিল।
একদিন কেশব তাহার
তাহার বড় ভাইয়ের স্ত্রী
জ্ঞানদাকে বলিল “বউদিদি, আজ বড়ই ইচ্ছে হচ্ছে
কাটার ফুল
বিকেলে মটর সুটির ঘি-ভাত সেই সঙ্গে আলুর চপ,
খাই।”
জ্ঞানদা রাজি হইলেন। কিন্তু বারটা
বাজিয়া একটা না বাজিতেই কম্প দিয়া ম্যালেরিয়ার
ভূত জ্ঞানদার ঘাড়ে এমনি চাপিয়া বসিল যে
তাঁহাকে বিনা বাক্য ব্যয়ে শয্যা গ্রহণ করিতে হইল।
যথা সময় এই খবরটা সহজেই কেশবলাল
শুনিলেন। লালমােহন, জ্ঞানদার ছােট ছেলে তাহার
কাকাকে এই সংবাদটা স্কুলেই শুনাইয়া দিল।
রাত্রিতে গরম ভাত সেই সঙ্গে মাছের ঝোল কিম্বা
ঐ শ্রেণীর কোন ব্যঞ্জনের আশায় কেশবলাল আসনে
বসিয়া আছে এমন সময় রেণুকা কেশবের মাসীর
মধ্যম কন্যা একটি থালায় মটর সুটির ঘি-ভাত সেই
সঙ্গে খান চারেক আলুর চপ, এবং উপরন্তু ফুলকপির
চাটনি এই কএকটি জিনিষ সাজাইয়া আনিয়া, কেশবের
সামনে রাখিয়া দিল। অবাক হইয়া কেশব বলিল
“বউদি ত জ্বরে পড়েছেন এ সব কেমন করে হল”?
কাটার ফুল
পাইল।
রেণুকা-
যে বউদি জ্বরে পড়েন নি এ রান্না আঁরি খেয়ে
দেখ ভারি চমৎকার হয়েছে। আমি চেকেচি।
কেশবলাল সে দিন বাস্তবিক অনেকটা তৃপ্তি
আহার শেষ করিয়া ঘরে গিয়া দেখিল
শুইবার বিছানায় মাথার ঝুলিশের ডান দিকে একটি
পানের ডিবায় কএকটি পান সাজান আছে। এই
রকম ভাবে কেশবলালের নিজের উঠবার বসিবার
কক্ষ দিনে দিনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হইয়া উঠিল।
একদিন রবিবারে ঠিক মধ্যাহে কেশব তাহার
হাত বাস্কের ভিতর হইতে পাঁচ টাকা কোথায় অদৃশ্য
হইয়াছে এই লইয়া বাড়ীর চাকর বাকর সেই সঙ্গে
ছোট ছােট ছেলে মেয়েদের উপর একটু চোক
রাজাইতেই ফস্ করিয়া কান্তি তাহার সম্মুখে আসিয়া
বলিল, “ওটাকা আমি নিয়েছি। ওপাড়ার কলু বউ
যে আমাদের বাড়ী তেল দেয় তার বউ অন্তঃসত্ত
কাটার ফুল
উঠেছে।
তাই সাধে দিয়েছি।” কান্তির কথা শেষ হইতেই
পাশের ঘর হইতে জ্ঞানদা মুখ নাড়া দিয়া বলিলেন,
“নবাবের বিটির নবাবী দেখ--নিজের ভাত কোথায়
তার নাই খোজ কলুর বউর সাধে আবার টাকা দেয়,
দিনকে দিন নানা দিক দিয়ে কেবল গিন্নিপনা চাগিয়ে
কেন আমরা কি সব ভেসে এসেছি যে,
টাকায় হাত না দিয়েও চোক রাঙ্গানি দেখব।”
কেশৰলাল বউদির এত চড়া মেজাজ দেখিয়া
একটু বিরক্ত হইয়াই ঘরের বাহিরে চলিয়া গেল।
কান্তি মাথায় কাপড় টানিয়া কোন কথা না বলিয়া
রান্না ঘরে গিয়া শীল নােড় লইয়া বাটন বাটিতে
বসিল। বাড়ীর ছােট ছােট ছেলে মেয়েরা হঠাৎ
গম্ভীর হইয়া গেল।
এই ঘটনার পর হইতে বড় বউ ছোট বউর,
দোষ বাহির করিতে পারিলে আর ছাড়িতেন না।
কান্তির এতদিনের স্বামীর সঙ্গে তেমন বনি বনাও না
৪
কাটার ফুল
হওয়া সত্ত্বেও কান্তির উপদ্রবকে কেশব নিত্য অম্লান
বদনে সহ করিতেছে এই কথা জ্ঞানদা যখন তখন
পাড়া ময় রাষ্ট্র করিতে লাগিল। জ্ঞানদার এই
ব্যাপার দেখিয়া একদিন কেশবলাল বলিল--
“বউদিদি, ব্যাপার কিছুই বুঝি না। কান্তি
যত দিন আপন মনে মুখ গুজে ঘরে বসে থাকতো
তত দিন তােমরা ওর শত দোষ দেখেও এমন
পাড়া মাতাওনি। যখন সে ঘরের কাজে মন দিল
অম্নি তার সাবেকী দোষ ধরে এত বাক্য জাল
বিনিয়ে ফল কি ?”
জ্ঞানদা:
ঠাকুর পো, থাক আমরা কিছু বলব না। বউ
নিয়ে সুখে থাক তাইত চাই। আমরা লেখা পড়া
শিখিনি মুরুক্ষু—কেবল
পরের
দোষ ধরে
বেড়াই। এই মুখ বন্ধ কলুম যা তােমাদের
ইচ্ছে তাই কর। বিধবা হয়েচি নইলে আলাদা
কাটার ফুল
হয়ে যেতুম। এমন করে ঘাড়ের বােঝা হয়ে
থাকতুম না,কপাল আমার। ছােট বউ রাণী
হয়ে থাক। দাসীর মত হয়েও যেন দুই বেলা
চারটি খেতে পাই এইটুকু দৃষ্টি রেখো।
বউদিদির এই কথায় কেশবলল যেমন দুঃখিত
হইল তেমনি বিরক্ত হইল। আর কোন জবাব না
দিয়া আপনার শুইবার ঘরে যাইয়া বিছানায় চিৎ
হইয়া শুইয়া কপালের উপর দুই হাত ভাঁজ করিয়া
কি ভাবিতে লাগিল।
( ৮ )
কান্তি, তােমার সঙ্গে মিলন হল খুব সমস্যার পর।
কান্তি
আমার অপরাধ মার্জনা করে আমায় আজ বুকের
কাছে নিলে আমিও নিঃসংশয় হলুম। মনের
সব ময়লা ত তুমিই ধুয়ে মুছে
দিলে।
কাটায় ফুল তােমার মনের সব ময়লা ধুয়ে সব অমঙ্গলের উপরে তােমায় তুলেচে নৃপেন্দ্র। তাই এত ধাক্কার ভিতর দিয়ে তােমার নারী জীবনের অমৃত ধারায় আমায় ভিজিয়ে কান্তি তােমার কাছে আর ত কিছু গােপন নেই তুমি ত সবই জান। সে যে আলো আমায় দিয়েছে, তাতে করেই তো তােমার এমন সত্য মুক্তির দেখা পেলুম। সে ছিল বলেই তাে, আজ তােমার কাছে এমন করে নির্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে আপনার ভিতর বাহির উদঘাটিত করে ধরা পড়েছি। কেশব- সত্যি বলেছ কান্তি, আমাদের দুজনার প্রণয় রাজ্যে সে সত্যিকার পুরােহিত। সে যে রাখী বেঁধে দিলে তাতে আমরা বন্দী।
কাটার ফুল কান্তি কি ভাবে তার দিকে এগিয়ে ছিলাম আর কি ভাবেই সে আমায় কোন রাজ্যে এনে পৌঁছে দিলে ! কেশব- ঐই ত মানুষ। দেখিয়ে দিলে নিজের জীবনে * ভােগাতীত প্রেম কেন শুভ্র, কেমন উজ্জ্বল। কান্তি তােমার মধ্যে আমায় সেই তো ডুবিয়েছে। কেশব--- সে আমাদের দুজনারই পূজার পাত্র। সে ছিল তাইত প্রেমের আলো এমন করে দেখলুম। কান্তি- যাক সে কথা। দাও আমায় সেই অবকাশ, যেটাতে তােমার সংসারে নিজের সমস্ত হৃদয় মন দিয়ে কাজ কর্তে পারি।
কাটার ফুল বউদি বিধবা। তিনি যতই অন্যায় করুন তবু কে যেন কোন রকমে আঘাত করাে না। সুখে দুঃখে তাকে আমাদেরই মধ্যে রাখতে হবে; দাদা আমায় পিতার মত স্নেহ করেছেন। কান্তি- আমার জীবনের ব্যক্তিগত সমস্ত শান্তি চুলােয় যাক কোন ক্ষতি নেই তাতে। কিন্তু সংসারে যেখানে, অকারণ তােমার উপর বজ পড়বে সেখানেও কি বুক পেতে দাড়াবার অধিকার আমার নেই ? কেশব- সে অধিকার ত সকল সতীরই আছে। কান্তি-- ঐ যে অন্ধ মেয়েটি না দেখে কাল বড়দির ছেলের দুধ ফেলে দিলে সে জন্যে কি তার উপরে কাটার ফুল ঝাটা চালানােটা ঠিক হয়েছে। হয় ও ঝির পেটের মেয়ে তবুও ত সে মানুষ ; আমাদের মত ঐ অন্ধ বেচারীরও ত শরীর রক্ত এবং মাংসে গড়া। এর জন্যে শুধু বলেছিলাম “বেচারী অনাথা, ওকে মেরে কোন পুণ্য হবে। তাই এই দুদিন ভাতই খেলেন না। কেশব- এরকমের অনেক দোষ আছে বউদির তবু বলি সব দোষের প্রতিবাদ করে তবু তাঁকে স্বেচ্ছায় কোন রকমের অন্যায় কষ্ট দিও না। কান্তি স্বেচ্ছায় কষ্ট দেওয়া আমার অভিপ্রায় নয়, তা কখনাে দেব না। যিনি তােমার শ্রদ্ধার পাত্রী তাকে আমারে শ্রদ্ধা করা উচিত জানি তবু যদি অসাবধানে কোন ভুল হয় ক্ষমা করে নিও। এমন সময় রেণুকা আসিয়া বলিল,“বড় বােঠান
কাটার ফুল
ছােট বােঠানকে ডাকচেন।” কান্তি তাড়াতাড়ি
মাথায় কাপড় টানিয়া, স্বামীর কক্ষ হইতে বাহির
হইয়া আসিয়া জ্ঞানদার ঘরে ঢুকিতেই ঠেকার করিয়া
জ্ঞানদা বলিলেন “বাড়ীর গিন্নি হয়েচ তায়ে আবার
ধার্মিক পেরাণ ! দোর গােড়ায় ভিকিরি, দান কর ।
আমরা সব নিষ্ঠুর। (ভিখারীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিয়া) ওগাে, এই মা ঠাকরুণ বড় দাতা, আঁর কাছে
ভিক্ষে চাও টাকা কাপড় পাবে।” জ্ঞানদার এই
কথা কান্তির বুকে শেলের মত বি ধিল, তবু স্বামীর
অনুরােধ স্মরণ করিয়া সে কোন কথা বলিল না।
মনের সমস্ত ক্রোধকে, দাঁতে ঠোটে কামড়াইয়া
চাপিয়া রাখিল।
এই রকম করিয়া জ্ঞানদা যখন তখন ঠেলেস
দিয়া কান্তির বুকে আঁচড় টানিয়া টানিয়া কথা
বলিতে লাগিলেন। কান্তি সে সব উপদ্রব সহিয়া
যাইতে লাগিল। জ্ঞানদা ফাঁক খুঁজিতেছিলেন যে
কাটার ফুল
রাগের মাথায় কান্তি জ্ঞানদাকে দুই কথা শুনাইয়া
দিক। সেই কথা লইয়া পাড়ায় নাকি কান্না কাদিয়া
ঘােট বউর বদনাম কেৰ্ত্তন করিবেন। যখন দেখিলেন
জ্ঞানদার কোন কথায় কান্তি পালটা জবাব না দিয়া
ঘাড় হেঁট করিয়া কাজই করিয়া যাইতেছেন তখন আর
তার সহ্য হইল না। আপন বিষে জর্জরিত সপের
ন্যায় একদিন জ্ঞানদ। হঠাৎ কেশবের সম্মুখে হাজির
হইয়া বলিলেন “কুলটার সংসারে আমি থাকিতে
পারিব না।” কেশব এই কথায় চিত্ত সংযম হারাইয়া
বলিল
“বউদিদি, সবটারই একটা সীমা আছে
তােমার স্বভাবটার মধ্যে পূর্বে, যে মাতৃত্ব ছিল
দিনে দিনে সব এখন লােপ পাইতেছে।
জ্ঞানদা---
ঠাকুর পপ, উপদেশ শুনতে আসিনি আমাকে
বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দাও।
ইচ্ছে হয় যেতে পার। আমি যেতে বলতে
কাটার ফুল
পারি না।” এই বলিয়া কেশব ঘরের বাহির হইয়া
পাড়ার কোন এক বন্ধুর বাসায় চলিয়া গেল।
এদিকে জ্ঞানদা উঠানে বসিয়া নাকি কান্নায় বুকের
কাপড় ভিজাইয়া দিলেন। কান্তি একবার ভাবিল
জ্ঞানদাকে বুঝাইয়া বলে, পরক্ষণে ভাবিল “থাক
দরকার নাই হয় ত মুখ ঝামটা দিয়া কি আবার
বলিয়া উঠিবেন। এই ভাবিয়া কান্তি রান্নাঘরে
ঢুকিয়া কি একটা ভাজিতে বসিল
এমন সময়
জ্ঞানদার ছেলে সেই রান্নাঘরের দরজার চৌকাটের
সামনে উপস্থিত হইয়া বলিল “কাকীমা ক্ষিদে
পেয়েচে।” স্বামীর জন্য কিছু মােহনভােগ তৈয়ারী
করিয়া একটি ছােট কশার রেকাবীতে কান্তি রাখিয়া-
ছিলেন; সেই মােহনভােগ ভাসুর পাের হাতে দিয়া
কান্তি বলিল “এই নাও।” জ্ঞানদ। এই দেখিয়া
চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন। এখানে ওরে
হতচ্ছাড়া ছােড়া খানে, ওর হাতের খাবার আর
কাটার ফুল
খাসনে জাত মানের ভয় ঠাকুর পাের না থাক
আমার আছে।” ছেলে মার এই কথা শুনিয়া ফ্যাল
ফ্যাল করিয়া কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকাইয়া
রহিল। কান্তি আর সহ্য করতে না পারিয়া
উনানের নিকট হইতে উঠিয়া-আসিয়া লালমােহনের
হাত হইতে মােহনভােগের বাটী কাড়িয়া লইয়া
অশ্রুজড়িত কণ্ঠে বলিলো “খানে, ফের যদি আমার
কাছে খাবার চাইতে আসিস্ ত টের পাবি।” কাকী
মার এই কঠিন বাক্যে লালমােহন কাঁদিয়া ফেলিল।
রাত্রিতে যখন কেশব বাড়িতে ফিরিল তখন
কান্তি নিজের শয্যায় উপুড় হইয়া শুইয়া কঁাদিতে
ছিল। অন্যদিকে জ্ঞানদা, জিনিষ পত্র গুছাইয়া হা-
হুতাশ করিতেছিলেন।
রেণুকা কেশবকে সব
ঘটনা খুলিয়া বলিতেই কেশব রাগে জ্বলিয়া উঠিল।
ঠিক সেই ক্রোধের সময় জ্ঞানদা, কেশবের সম্মুখে
উপস্থিত হইয়া বলিলেন “ঠাকুর পাে, বাপের বাড়ী
*
কাটার ফুল
পাঠাতে মন সরে না সেকি ছােট বউর অনুগ্রহে
রাখার জন্য ? বাছা আমার ক্ষিদের জ্বালায় একটু
খাবার চাইলে অম্নি হাতের থেকে খাবার কেড়ে
নিলে গো—বলি আমাদের কি স্বামী ছিল না।
বিয়ে কি কেবল তােমরাই করেচ। এ কোন্
রকমের স্বামিভক্তি। যাক কাজ নেই। আমরা
আজই চলুম, আমার বাপের বাড়ীর লােক এসেছে।”
চলে ত চল না। এমন করে হাড় জ্বালানর
চেয়ে যাওয়াই ভাল। এমন যন্ত্রণাও তাে
দেখিনি।
জ্ঞানদা কিছুদিন পিত্রালয়ে গিয়া রহিলেন।
কিন্তু আবার নিজের গরজেই ফিরিতে হইল।
গােড়ায় ভাবিয়াছিলেন নানা রকম নাকি কান্না আর
লাগালাগিতে বুঝি কেশব কান্তিকে পায়ে ঠেলিবে।
কিন্তু তাহা হইল না। অগত্যা ঘুরিয়া সেই ছােট
কাটার ফুল বউর সংসারেই আসিয়া ধন্না দিয়া পড়িতে হইল। কান্তির মনে যাই থাকুক সে কিন্তু জ্ঞানদার প্রতি সদ্ভাব দেখাইল। যথাযথ সম্মান দেখাইয়া চলিত। মনের অনিচ্ছা স্বত্বেও ধীরে ধীরে জ্ঞানদা দায়ে পড়িয়া ছােট বউর মনের সপক্ষে সব কাজে তাল দিতে লাগিলেন। বিপক্ষে মত দিবার মত সাহস আর রহিল না। অনেক দিনের টানা হঁাচড়া এবং দুঃখ ব্যথার ঝড় ঝাপটির পর কান্তি এখন সংসারে যেন একটু হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল । ( 9 ) শ্রাবণের আকাশ মেঘের স্তরে স্তরে ভীষণ কালো রূপ ধরিয়াছে, ঝুপ ঝুপ করিয়া বাড়ীর চারিদিকের বাঁশ আর ভাটবন কাপাইয়া বৃষ্টি পড়িতেছে। কান্তি রান্নাঘরে বসিয়া কেশবের ফর- মাজ মত প্যাজ দিয়া খিচুড়ী উনানের উপর চাপাইয়া কাটার ফুল দিয়া উনানের পাশেই একটি বঁটি লইয়া কয়েকটা আলুর খােসা ছাড়াইতেছিল, এমন সময় কেশব সেই রান্নাঘরে আসিয়া উপস্থিত হইল। কেশবকে দেখিয়াই কান্তি মাথায় কাপড় টানিয়া বলিল, “অত ব্যস্ত হলে রান্না ভাল হবে না।” কেশব- ব্যস্ত হচ্ছি না। আচ্ছা রান্না করে নাও। কান্তি এতক্ষণ অন্যদিক চাহিয়া কথা বলিতেছিল। হঠাৎ স্বামীর মুখে দৃষ্টি পড়ায় দেখিল কেশবের সুন্দর উজ্জ্বল মুখে একটা দুশ্চিন্তার কালো ছায়া পড়িয়াছে। ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার মুখে অমন চিন্তার ছায়া কেন, কি হল!” কেশব কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া বলিল, “রান্নার আর দেরী কত ? কান্তি বেশী দেরী নাই আর দশ মিনিটের মধ্যে সব
কাটার ফুল
হয়ে যাবে। ক্যান কি হয়েছে বল না, অমন
করে থাকলে ভয় হয় ?
কিছু না। তুমি রেধে স্যাও।
স
খাওয়া দাওয়া শেষ হইলে কেশব কান্তিকে
জানাইল কলিকাতায় হাসপাতালে যে রােগে
শয্যাশায়ী হইয়া নৃপেন্দ্র পড়িয়া আছে সে রােগ
হইতে বাঁচা দায়। সেখানকার এক ডাক্তার বন্ধু
কেশবকে আরো লিখিয়াছেন যে, আর বেশী দিন
নৃপেন্দ্র বাঁচিবে না। কান্তির হাত পা ঠাণ্ডা হইয়া
গেল। দেখিতে দেখিতে তাহার চক্ষু দুইটি অশ্রু-
জলে ভরিয়া উঠিল। মাথা নীচু করিয়া কত কি
ভাবিতেছে এমন সময় কেশব স্ত্রীর পিঠে হাত দিয়া
বলিল, “কান্তি, ভেবে আর কোন উপায় নাই। চল
আজই রাত্রের গাড়ীতে আমরা কোলকাতায় যাই।
কাটার ফুল
দেখি সেবায় চেষ্টায় কিছু যদি হয় । এ খবর
শুনে আর থাকতে পারি না। স্বামীর মুখে এই
কথা শুনিতেই কান্তির বেদনা-ক্লান্ত অন্তরে অত্যা-
নন্দের ধাক্কা লাগিল-দুঃখের অশ্রুবিন্দু মুহূর্তে
আনন্দধারায় প্রবল বেগে বহিতে লাগিল। এমন
প্রেম, এমন স্বামীর সােহাগ, এমন দরদ, কে
কল্পনা করিতে পারিত। কান্তি স্বামীর কোলের
উপর আছাড় খাইয়া খুব কতকটা অশ্রু ফেলিয়া
আত্মসম্বরণ করিয়া বলিল, “এমনি করে পলে
পলে আমায় নির্মল কর, পবিত্র কর।”
রাত্রির গাড়ীতেই কেশব এবং কান্তি কলিকাতায়
রওনা হইল। বাড়ীর অন্যান্য লােকের কাছে
ইহাদের হঠাৎ কলিকাতা যাওয়ার খবরটা জানা
জ্ঞানদা এ সম্বন্ধে কোন রকম কথা
রহিল।
ঘাটাইলেন না।
৬৯
কাটার ফুল
কান্তি নৃপেন্দ্রের
এক সঙ্গে কান্তি ও কেশবকে হাসপাতালে
দেখিয়া জীর্ণ দেহে নৃপেন্দ্র অনেকটা বল লাভ
করিল।
কেশব দেখিল নৃপেন্দ্রের চক্ষে হাসির
আড়ালে অশ্রু জাগিয়া উঠিয়াছে।
শীর্ণ কঙ্কাল দেখিয়া বলিল, “এমন অবস্থা আমাদের
জানালে না কেন?”
নৃপেন্দ্র--
যে রােগে পড়েছি এ চিকিৎসা ও সেবার
বার, সেই জন্যে কাউকে আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে
নেই।
তােমাদের দেখে খুব খুসী হলুম।
(কেশবের দিকে ফিরিয়া) ভাই কেশব, ধন্য
তোমার হৃদয়। বড় খুসী হয়েচি, আজ
তােমাদের এমন মিলন দেখে। মৃত্যুর পূর্বে ভাই
ক্ষমা চেয়ে যাচ্চি; এই মিলনের মাঝে অনেক
দিন কাটা হয়ে ছিলাম ।
কেশব কিছু বলিতে পারিল না। তাহার দুই
কাটার ফুল
চক্ষু হইতে অনর্গল অশ্রু ঝরিতে লাগিল। কান্তি
আঁচলে চোখ মুছিয়া বলিল, “সহরে বাড়ী ভাড়া
করেছি সেইখানে থাকবে; হাসপাতালে এ অযত্নে
তােমার এমন অবস্থা হয়েছে।”
কোন রকমে একটি মােটরকারে কেশব আর
কান্তি নৃপেন্দ্রকে মেও হাসপাতাল হইতে সহরের
বাড়ীতে লইয়া গেল। এক মাস ধরিয়া কেশব এবং
কান্তি নানা রকমে নৃপেন্দ্রের জন্য সেবা করিয়া কত
খাটিল, মৃত্যুর দূত তাহাদের প্রাণের আকাঙ্ক্ষাকে
কোনরূপ গ্রাহ্য করিল না। একদিন মধ্যাহ্নে
নৃপেন্দ্র চিরদিনের মত চক্ষু মুদিল। মৃত দেহের
শয্যার এক পার্শ্বে কেশব, অন্যদিকে কান্তি তখন
বসিয়াছিল। যখন ডাক্তার বুক পরীক্ষা করিয়া
বলিলেন “সব শেষ হইয়া গেছে”—মুহুর্তের জন্য
কান্তি চঞ্চল হইয়া নৃপেন্দ্রের মুখের উপর ঝুকিয়া
কাটার ফুল
পড়িল ।
পরক্ষণে স্থির হইয়া মাথায় কাপড় টানিয়া
স্বামীর দিকে চোখ তুলিয়া বলিল-“এখন কি
ব্যবস্থা কৰ্বে ?” কেশব বাষ্প-আপ্লুত কণ্ঠে
বলিল, “মদন (কেশবের বন্ধু ) যা হয় কবে।
আমরা পাশের ঘরে যাই।”
মাথায় কাপড় টানিয়া কান্তি স্বামীর পিছন পিছন
পাশের ঘরে চলিল।
চল
সমাপ্ত
१२
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.