Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Manjari Ed. 1st

Ray, Surendranarayan · 2010/04/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মঞ্জরী।
“নাইতাে তেমন বনে কুসুম
মনে যেমন ফোটে ফুল”
গিরীশচন্দ্র ?
শ্ৰীসুরেন্দ্রনারায়ণ রায় প্রণীত।
প্রথম সংস্করণ
প্রকাশক
শ্রীজ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়
ঘুঘুডাঙ্গা।
১৩১১

কলিকাত
৮নং শান্তিরাম ঘােষের স্ত্রী,
“তারা-প্রেস”
রাজকুমার মজুমদার কক মুদ্রিত।

উৎসর্গপত্র।
পরমারাধ্যা স্নেহময়ী
শ্ৰীযুক্ত রাণী কৃষ্ণকামিনী চৌধুরাণী
শ্রীশ্রীচরণকমলে-
মা থাকিতেও অতি শিশুকাল হইতে তােমাকেই
মা বলিয়া জানি, মা বলিয়া ডাকি। তুমি আমার
পিসিমা, কিন্তু তোমাকে আমি মায়ের অধিক মনে
করি। মােরই স্নেহ যত্নে আমার জ্ঞান বুদ্ধি শরীর
বার্ধত ; আমার যাহা কিছু, সকলই তোমার মহিমা মণ্ডত ;
এ গল্প গুলি ও তােমারই স্নেহের কোলে রচিত ;-তাই
তোমারই পাদপতে অৰ্পণ করিয়া ধন্য হইলাম।
তোমার স্নেহের সন্তান
সুরেন্দ্র কুটীর, শুধুডাঙ্গা পাে,
১লা বৈশাখ ১৩১৯ সাল ।
সুরেন।

No text on this page.

সুদীপত্র।
ঠাকুরদাদা
রােগী।
সহধর্মিণী ।
চুম্বক।
হীরকখণ্ড।
ইন্দ্রাণী ।
৪ ।
প্রথম পত্র।
৮
শিক্ষিত।
তুলার খেলা
গ্রন্থকারের নূতন পুস্তক “তন্বী যন্ত্রস্থ।

No text on this page.

ভূমিকা। “মঞ্জরীর” একটা ভূমিকা লিখিয়া দিবার জন্য আমি বিশেষভাবে অনুরুদ্ধ হইয়াছি। যাঁহারা বাঙ্গলা-ভাষায় ছােট গল্প লিখিয়া প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছেন, তাহাদের কাহারও উপর এই ভূমিকা লিখিবার ভার অর্পণ করিলে সঙ্গত ও শােভন হইত। কিন্তু গ্রন্থকার আমার লিখিত ভূমিকাই চান। আমি দেখিতেছি, আমার পক্ষে ইহা একটী শুভযোগ। গ্রন্থকারের বহু যত্ন চেষ্টায় লিখিত পুস্তকের সঙ্গে আমার যুক্তাক্ষর বঞ্চিত ও “অ”কার প্রধান নামটা যদি ছাপার অক্ষরে থাকা যায়, মন্দ কি? অপরের লিখিত পুস্তকের ভূমিকা লিখিতে হইবে; কি বল প্রয়ােজন ও সুশােভন, তাহা অনেক ইংরাজী বাঙ্গলা গ্রন্থে অপরের লিখিত ভূমিকা পাঠ করিয়াও আমি নিরাকরণ করিতে পারি নাই। ভূমিকার অর্থ কি সমালোচনা ? অথবা এংকারের প্রশংসাপত্র ? ভূমিকা অর্থে যদি সমালোচনা হয়, তাহা হইলে আমি যাহা লিখিতেছি তাহা নিশ্চয়ই ভূমিকা নহে। তারপর গ্রন্থ- কার যখন আমার নিকট প্রশংসাপত্রের প্রার্থী নহেন, তখন সে অর্থে ও আমার ভূমিকা সম্পূর্ণরূপেই নিরর্থক।

ভুমিকা।
নাই।
আজকাল বাঙ্গালা ভাষার ছােট গল্প লেখার একটা
‘আমল” আসিয়াছে। ইহা সাহিত্যের পক্ষে শুভসূচক
কি না, বর্তমান প্রসঙ্গে সে কথার আলােচনার অবকাশ
কিন্তু ঘােট গল্প-পাঠকের সংখ্যা যে দিন দিন
বাড়িতেছে, বর্তমান সময়ের মাসিক পত্রগুলি তাহার
প্রকৃষ্ট নিদর্শন। যে মাসিক
পত্রের প্রতি
সংখ্যায়
একটী বা ততােধিক ছােট গল্প না থাকে সে পত্রে
প্রতিপত্তি ও প্রতিষ্ঠালাভ সম্ভবপর নহে।
সাহিত্যৰথী, প্রতিভাবান শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মহাশয় বলিয়াছেন যে, আজকাল অনেক ছোট গল্প বাহির
হয়। সেগুলি ৰে “ছােট” সে বিষয়ে সন্দেহ নাই, কিন্তু
সেগুলি গল্প নহে। কথাটী সম্পূর্ণ সত্য। অনেকেই মনে
করিয়া থাকেন, ছােট গল্প রচনা খুব সহজসাধ্য--ইহাতে
সাফল্য-লাভ অনায়াসলভ্য। যাহার লেখাপড়া অধিক দূর
অগ্রসর হয় না, সে যেমন হােমিওপ্যাথীক চিকিৎসক হয়,
তেমনই যে ব্যক্তি বাণীর সেবা করিতে গিয়া অপর কোন
উপকরণ সংগ্রহ করিতে না পারে সে ছোটগল্পের
লেখক হয়। কিন্তু আমার বোধ হয়, হােমিওপ্যাথীক
চিকিৎসার যে নৈপুন্য অত্যাবশ্যক, ছােট গল্প রচনায়
লেখকের লিপিকুশলতা ও তদনুরূপ প্রয়ােজনীয়।
•

ভূমিকা। অনুভূতি, আন্তরিকতা, ভাবের সংযম ও ভাষার সমৃদ্ধি সাহিত্য সাধনায় সাফল্য-লাভের সুপ্রশস্ত রাজ- পথ। ছােট গল্প লেখকের পক্ষেও এই পন্থাবলম্বনই সর্বতােভাবে বাঞ্ছনীয় ও কর্তব্য। যাহাদের লেখনীর গতি অবাধ, অপ্রতিহও, দ্রুত, যাহারা বর্ণনার ঝোঁক সামলাইতে অসমর্থ, যাহারা বিদ্যাবত্তার পরিচয় দিবার জন্য অকারণে বাক্য-পল্লবের সৃষ্টি করিয়া ভাষার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করেন, ছোট গল্প রচনায় সিদ্ধিলাভ তাহাদের পক্ষে অসম্ভব। অবান্তর প্রসঙ্গও অপ্রাসঙ্গিক কথার অবতারণা ছােটগল্পে সর্বথা পরিবর্জনীয় ও পরিহার্য। বর্ণনা বাহুল্যেও তেমনই ছােট গল্প শ্রীহীন হইয়া যায় । ছােটগল্পে কথােপকথন প্রবর্তন করিবার প্রলােভন পরিহার বিধেয়। • কথােপকথন অনেক সময়ে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির সহায়তা করে সত্য, কিন্তু নিপুন কলাশিল্পী ব্যতীত তাহার ব্যবহার অপরের সাধ্যায়ত্ত নহে। পরন্তু, কথােপকথনের প্রত্যেক কথাটীর উপযোগিতা ও সাথকতা প্রতিপন্ন না হইলে গল্পের সৌন্দর্য্য বিনষ্ট হইবার আশঙ্কা সমধিক প্রবল হয়। আমার যাহা ধারণা অন্ততঃ ছােট গল্প লিখিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছি, সংক্ষেপে তাহাই বলিলাম। • ] ভুমিকা। ‘মঞ্জরীর” লেখক মহাশয় কয়েকটা ছােট গল্প লিখিয়াছেন। গল্পগুলি ছােটও বটে, গল্পও বটে। আমি উপরে ছােট গল্প রচনার সাফল্য লাভের যে উপায় নির্ধারণ করিবার চেষ্টা করিয়াছি, তাহার সহিত এই আলােচ্য গল্পগুচ্ছের পূর্ণ সঙ্গতি পরিলক্ষিত হইয়া থাকিলেও নবীন গ্রন্থকারের প্রথম উদ্যমে যতটা সাফল্য লাভ সম্ভব তাহার প্রভূত পরিচয় এ গ্রন্থে আছে। নবীন গ্রন্থকারের পক্ষে ইহা অল্প শ্লাঘার কথা নহে। ছােট গল্পের যাহা জান’ তাহা এই নবীন লেখক ধরিতে পারিয়াছেন। গল্পগুলি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলিবার প্রয়ােজন দেখি না। সে বিচার পাঠকগণ করিবেন। তবে একটা গল্পের উপসংহার ভাগ সম্বন্ধে একটা কথা আমি বলিতে চাই। লতিফের পক্ষে এমন করিয়া প্রকাও ডাকাতের দলটাকে ডিনামাইটে উড়াইয়া দিয়া নিজের প্রনয়িনীকে লইয়া “চাচা আপন বঁাচা” এই প্রবচনের অনুসরণ শোভন হয় নাই। ইহাতে আদর্শ খাটো হইয়া গিয়াছে। গল্পাংশে এই প্রকার দুই একটা কল পার- লক্ষিত হয়। নবীন লেখকের পক্ষে এরূপ ক্ৰটা সম্পু। স্বাভাবিক। • ]

ভূমিকা।
ক্রটাৰ উল্লেখ করিলাম, গুণের ও একটু পরিচয়
দেওয়া প্রয়ােজন “তুলার খেলা” গল্পটী যেমন সুন্দর,
তেমনই সময়ােপযােগী হইয়াছে। এই গল্পটাতে মান
বাবুর চিত্র বড়ই পরিস্ফুট হইয়াছে এবং লেখক ৰে
পরে ছোট গল্প লিখিয়া যশােভাজন হইবেন, তাহার
যথেষ্ট প্রমাণ এই গল্পে পাওয়া যায়।
উপসংহারে একটী কথা বলিব। এই গল্পগুলির
স্থানে স্থানে ভাৰবিন্যাস শিথিল হইয়া গিয়াছে, এবং
ভাষার পরিমার্জন ও প্রসাধনের অবকাশও আছে। সত্বর
গ্রন্থ প্রকাশের ব্যস্ততা বশতঃ মুদ্রাকর প্রমাদেরও
অসদ্ভাব নাই। তথাপি এ কথা বলা যাইতে পারে
নবীন লেখকের এই প্রথম উদ্যম বিফল হইবে না।
সৰ্বান্তঃকরণে আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে তাহার এই
উপচীয়মান সাহিত্য বিটপী ফল ফুলে মণ্ডিত হইয়া
বাণীর কুঞ্জের শােভাবর্ধন করিবে।
শ্রাজলধর সেন।

No text on this page.

মঞ্জরী।
দাগনহাশয়।
-১ese
সন্তোষ তাহার দাদামহাশয়ের পাকা চুল তুলিতে
তুলিতে গল্প শুনিতে ব্যস্ত ; গল্পের রাজতখন
কেবল, রাক্ষস খােক্ষসের আবাস হইতে, কি করিয়া
পলায়ন করা যায়, রাজকন্যার সঙ্গে সেই পরামর্শ করিতে,
ছিল।
এমন সময় সন্তোষের মাতা বাহিরের ঘরের
দরজাটী ঠেলিয়া, ঈষৎ ঘােটামণ্ডিত মুখখানি বহির
করিয়া, ক্রুদ্ধ স্বরে বলিলেন, পড়াশুনা নাই, কেবল দিন
রাত্রি গল্প শুনা? উনিইতাে কেবল গল্প ব'লে বলে

মঞ্জরী ছেলেটার মাথাটা খেলেন। ওর কি আর কিছু হবে? সে স্বরে বালক চমকিয়া দরজার দিকে চাহিল, মায়ের সেই ক্রুদ্ধ মূর্তি দেখিয়া, ব্যাকুল ভাবে দাদামহাশয়ের মুখের দিকে চাহিল। দাদামহাশয়ও ব্যাকুল হইলেন; আম্‌ আমৃত করিয়া বলিলেন, এই যাচ্ছে, এখনতাে মাষ্টার আসেনি? পুত্রবধু বলিলেন, মাষ্টার আসেনি ব'লে কি পড়তে নেই ? যা’, পড়তে যা’। সন্তোষ আবার দাদামহাশয়ের মুখের দিকে চাহিল ; দাদামহাশয় সস্নেহে বলিলেন, তা দাদা এখন পড়তে যাও--রাত্রে আবার গল্প বলব এখন। নিতান্ত অনিচ্ছায় সন্তোষ পড়িতে গেল। তখন সান্ধ্য-আকাশে দু একটা মাত্র তারা সবে ফুটিতে আরম্ভ করিয়াছে। বৃদ্ধ কালীশঙ্কর বসু উঠিয়া-সন্ধ্যা করিতে ঘাটে গেলেন। চক্ষু মুদিয়া তিনি ভগবানকে ডাকিতেছিলেন—কি পৌত্র সন্তোষ- কুমারের সুকুমার মুখখানি স্মরণ করিয়া মেহবিগলিত ইতেছিলেন, তাহা আমরা ঠিক বলিতে পারি না। -~ ( ২ ) কালীশঙ্কর বসুর পত্নী, তিন মাসের সন্তান হরিপদকে রাখি, পতির কোলে মাথা রাখিয়া স্বর্গারােহণ করেন। ২]

মঞ্জরী
কালীশঙ্কর বসু আয় বিবাহ করিলেন না। মাতৃহারা
সন্তানকে একাই পিতা ও মাতার স্নেহে প্রতিপালন
করিতে লাগিলেন। অনেকে তাঁহাকে বিবাহ করিতে
অনুরােধ করিলেন, বৃদ্ধ, সে কথায় উত্তর দিতেন না-
ঈষৎ হাসিতে চেষ্টা করিয়া, তাঁহার দুই চক্ষু জলে
তরিয়া যাইত। কাজেই কেহ কোন কথা বলিতে সাহস
করিত না। তাঁহার মাতাও অনেক পূর্বে পরলােক
গমন করিয়াছিলেন। সংসারে বিশেষ কোন নিকট
আত্মীয় স্ত্রীলােক ছিলেন না। কাজেই হরিপদের সমস্ত
ভার একা কালীশঙ্করকেই বহন করিতে হইত। তাঁহার
অবস্থা নিতান্ত মন্দ ছিল না। চাকুরী ছাড়িয়া দিয়া,
দেশে গিয়া, যাহা কিছু পৈত্রিক সম্পত্তি ছিল তাহাতেই
কালীশঙ্কর দিন যাপন করিতে লাগিলেন। গ্রামে এনট্রান্স
স্কুল ছিল। হরিপদ বৃত্তির সহিত এট্রান্স পাশ করিল।
বৃদ্ধের সে দিন আনন্দের পরিসীমা ছিলনা। বৃদ্ধ তখন
স্থির করিলেন, এইবার হরিপদকে বিবাহ দিয়া আবার
মূতন করিয়া সংসারী হইবেন। অনেক খুজিয়া একটী
দরিদ্র ভদ্রলােকের সুন্দরী কন্যার সহিত আপনার পুত্রের
বিবাহ দিলেন। হরিপদের সম্বন্ধ অনেক স্থান হইতে
আসিয়াছিল, অনেক স্থানে অর্থ প্রাপ্তির সম্ভাবনাও
[ ৩

মঞ্জরী
ছিল, পাত্রীটী ভাল দেখিয়া, কিছু না লইয়াই এই
বিবাহ দিলেন। পুত্রবধুটী ছােট, স্নেহ-প্রবণ বৃদ্ধ তাহাকে
আপনার কন্যার ন্যায় প্রতিপালন করিতে লাগিলেন—
সেও শ্বশুরের সহিত কথাবর্তা বলিত; বিশেষ তেমন
কিছু লজ্জা করিত না। বৃদ্ধের বড় আশা ছিল, শেষ
বয়সে আবার তাহার সংসার সুখের হইবে। মানুষ
যাহা ভাবে তাহা হয় না। কালীশঙ্কর বসুরও তাহা
হইল না। বধু ক্রমশঃ নিতান্ত মুখরা হইয়া উঠিল।
বৃদ্ধ অন্তরে বড়ই কষ্ট অনুভব করিতে লাগিলেন।
তখনও তাহার আশা ছিল, বৌমা এখনও ছেলেমানুষ,
বয়সে তাহার সব দোষ শুধরাইয়া যাইবে। ক্রমে বধু
অপরাজিতা মাতৃপদে অধিষ্ঠিত হইলেন, কিন্তু তাহার
স্বভাবের পরিবর্তন হইল না। দুইটী সন্তান উপন্যুপরি
নষ্ট হইবার পর, সন্তোষের জন্ম। বৃদ্ধ অতি আদরে
পৌত্রটীকে লালন পালন করিতে লাগিলেন। তাঁহার
সমস্ত ভালবাসা ক্ষুদ্র শিশুটী অধিকার করিয়া বসিল।
বৃদ্ধ সমস্ত সংসারের ভার, সঞ্চিত অর্থাদি সমস্তই পুত্রকে
প্রদান করিলেন। পৌলটীকে লইয়া বৃদ্ধ প্রায় সমস্ত দিন
অতিবাহিত করিতেন। কিন্তু ক্রমশঃ তাহাতেও বাধা
পড়িতে লাগিল। সন্তোষ তাঁহার নিকটে আসিলে পবধু
৪ ]

মঞ্জরী বিরক্ত হইতেন, কিন্তু বালক তাহা বুঝিত না। সে দিবা-রাত্রি দাদামহাশয়ের কাছে থাকিতে ভালবাসিত। বৃদ্ধ পৌত্রকে মুহূর্ত ছাড়িয়া থাকিতে পারিতেন না। হরিপদ তথন উপার্জনক। কাজেই পিতৃঋণ ক্রমশঃই বিস্মৃত হইতে লাগিলেন। যুবতী পত্নীর মতের বিরুদ্ধে স্বাধীন ভাবে চলা দিন দিন তাহার পক্ষে অসম্ভব হইয়া উঠিল। ( ৩ ) সে দিন রথ। সমস্ত দিন বৃষ্টি–সন্ধ্যার কিছু পূর্বে আকাশ একটু পরিষ্কার হইয়াছিল, গাছের মাথায় অস্ত- মিত-সূর্য-কিরণ চিক্ চিক্ করিয়া হাসিতেছিল। সন্তোষ জেদ ধরিল সে রথ দেখিতে যাইবে। দাদামহাশয় কি করেন! যত আবদার তাহার দাদামহাশয়ের কাছে। সাটীনের জামাটী ওকুলওয়ালা টুপিটী সন্তোষকে পরাইয়া দাদামহাশয় তাহাকে রথ দেখাইতে লইয়া গেলেন। বুথতলা সেখান হইতে প্রায় অর্ধ মাইল হইবে। কতকগুলি কাগজের ফুল, এক পকেট চিনে বাদাম ভাজাদুই একটা খাইতে খাইতে দাদামহাশয়ের সহিত সন্তোষ রথ দেখিয়া সন্ধ্যার একটু পরে ফিরিয়া আসিম। [

মঞ্জরী
সন্তোষকে রথ দেখিতে লইয়া যাইবার সময় তাহার
-মাতাকে বলিয়া যাওয়া হয় নাই। ইহাতে অপরাজিতা
অত্যন্ত অপমানিতা ও বিরক্ত হইয়াছিল। সবে মাত্র
কালীশঙ্কর অন্দরের উঠানে প্রবেশ করিয়া যেমন
কোল হইতে সন্তোষকে নামাইয়া দিলেন, অমনি বধূ
অপরাজিতা সন্তোষের হাত ধরিয়া বলিলেন, কে তােকে
এই বৃষ্টিতে রথ দেখতে যেতে বলেছে ? যখন অরে
ধরবে তখন হবে কি ? অপ্রস্তুত হইয়া কালীশঙ্কর
বলিলেন, ওর তত দোষ নাই, আমি নিয়ে গিয়েছিলুম,
আর বৃষ্টিতে এখন ধরে গেছে! গুরুগর্জনে অপরাজিতা
বলিল, ধ'রে গিয়েছে বইকি ? ও কি ? আবার অতগুলি
চীনে বাদাম খেয়েছে বুঝি ? মেরে ফেলবে দেখছি।
বৃদ্ধ আরও অপ্রস্তুত হইয়া বলিলেন, না, না, বেশী থার
নাই, দু একটা খেয়েছে। কুপথ্যি আবার কতগুলাে
দিতে হয়? তা যা’র যাবে সেই বুঝবে, অন্যের কি ?
ফেল, নষ্ট ছেলে, শীগগির সব ফেলে দে—বলিয়া
দ্রুতবেগে সন্তোষের 'হাত মােচড়াইয়া চীনে বাদামগুলি
অপরাজিতা ফেলিয়া দিল। চীনে বাদামের শােকে বালক
কাঁদিয়া উঠিল। ছি বৌমা ! ছি বৌমা! লাগছে যে!
বলিয়া বৃদ্ধ পৌকে নিজের কাছে টানিয়া আনিলেন।
].
**

মঞ্জরী
স্বাধীন ইচ্ছায় আঘাত পাইয়া গর্বিত রমণ শশুরের
নিকট হইতে সন্তানকে টানিয়া লইয়া আর বাইরে
যেতে হবে না—ভিতরে চল” বলিয়া জোর করিয়া ঘরের
দিকে টানিয়া লইল। বালক ভীতিসূচক দৃষ্টিতে বৃদ্ধের
মুখের দিকে চাহিয়া ক্রন্দনজড়িত স্বরে ডাকিল, “দাদা-
মহাশয়!” দুঃখে, অভিমানে, ক্রোধে, শােকে, বৃদ্ধের
চক্ষু ফাটিয়া জল বাহির হইল। অতি কষ্টে বৃদ্ধ
বলিলেন, “যাও দাদা, কি করব ?” এ সমস্ত কিছু
মাত্ৰ হৃক্ষেপ না করিয়া অপরাজিতা সন্তোষকে টানিয়া
লইয়া চলিল। নীরবে বৃদ্ধ চক্ষের জল মুছিতে মুছিতে
বাহিরের দাওয়ায় আসিয়া বসিলেন।
( ৪ )
স্নান করিবার কিছু পূর্বে, যখন সন্তোষ আসিয়া
দাদামহাশয়কে বলিল, দাদামহাশয়, স্নান করিবে না?
তখন দাদামহাশয় সুর করিয়া কাশীদাসের মহাভারত
পড়িতে ছিলেন। পপৗত্রের স্বর কর্ণে প্রবেশ করা মাত্র,
দাদামহাশয় ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। আর মহাভারত
পড়া হইল না। “হ্যা দাদা, যাই” বলিয়া পৌত্রের সহিত
ঘরের দাওয়ায় আসিয়া বসিলেন। চাকর তামাক দিয়া
[৭

গেল। “আমি ধরাইয়া দিই, আমি ধরাইয়া দিই” বলিয়া
কলিকাটা লইয়া টানাটানি করিতে বালক হঠাৎ কলিকাটা
ফেলিয়া দিল। ছিটুকাইয়া আগুন পড়িয়া সন্তোষের পা
ঈযৎ পুড়িয়া গেল। দাদামহাশয় অতি ব্যস্ত হইয়া
পৌত্রকে কোলে তুলিয়া লইলেন। সন্তোষ কাদিতে
লাগিল। বৃদ্ধ নানারূপে পৌত্রকে সান্ত্বনা করিতে
লাগিলেন। ক্ষত স্থানে নারিকেল তৈল লাগাইয়া
সন্তোষকে বলিলেন, এস দাদা, তােমার ঘুড়ি লাটাই
তৈয়ারী করিয়া দিই। উৎসাহে বালকের কান্না থামিয়া
গেল। “কই দাও না, দাদা!” বলিয়া পৌত্র দাদা-
মহাশয়কে ব্যস্ত করিয়া তুলিল। বৃদ্ধ কি করেন, একটা
সূতা বিহীন কাঠিম লাটায়ে পরিণত করিয়া ঘুড়ি
তৈয়ারী করিতে বসিলেন। বালক সতৃষ্ণ নয়নে তাহা
দেখিতে লাগিল। ঘুড়ি লাটাই পাইয়া বালক আনন্দে
বাড়ীর ভিতর ছুটিয়া গেল, বৃদ্ধ বিষয় মনে স্নান করিতে
গেলেন। বালক তাহার ক্ষত-যন্ত্রণা ভুলিয়া গিয়াছিল,
কিন্তু বৃদ্ধ তখন তাহা ভুলিতে পারিলেন না।
ইতি মধ্যে সন্তোষের পায়ে
আগুন পড়ার
৮ ]

মঞ্জরী
সংবাদ বাড়ীর ভিতর গিয়াছিল। সন্তোষ দাদামহাশয়
প্রদত্ত ঘুড়ি লাটাইটী লইয়া বাড়ীর ভিতর গিয়া মাকে
দেখাইয়া বলিল, দেখ দাদা কেমন ঘুড়ি লাটাই
দিয়াছে। পুত্রকে দেখিয়া অপরাজিতা গর্জিয়া বলিল,
মরনি
?-পুড়ে মরলে আপদ যেত। ছেলেটাকে
পুড়িয়ে মেরে, আবার ঘুড়ি আর লাটাই দিয়ে আদর
জানান হয়েছে। বলিয়া পুত্রের হস্ত হইতে ঘুড়ি
লাটাই কাড়িয়া ফেলিয়া দিল। সন্তোষ ব্যাকুলভাবে
কাঁদিয়া উঠিল। বৃদ্ধ তখন স্নান করিয়া সবে মাত্র বাটী
আসিয়াছেন, তখনও সূর্যের স্তব পাঠ শেষ হয় নাই।
পৌত্রের ক্রন্দন শুনিয়া আর থাকিতে পারিলেন না,
ছুটিয়া বাড়ির ভিতর গেলেন। পুত্রবধূ তাহাকে দেখিয়া
যাহা মুখে আসিল তাহা বলিল। প্রহারের মাত্রা আরও
বাড়িয়া উঠিল। কাতর কণ্ঠে সন্তোষ বলিল, দাদা! মা
আমায় মেরে ফেলে। তেমনি করুণ-কোমল-ভগ্ন-কণ্ঠে
বৃদ্ধ বলিল, কি করিব দাদা? পাষাণী রমণীর সে কাতর
কণ্ঠ হৃদয়ে আঘাত করিল না। হতভাগা ছেলে মর,
আমার সুমুখে মর, বেঘােরে আগুনে পুড়ে মরুবি কেন ?
বলিয়া সজোরে পুত্রকে ধাক্কা দিল। সন্তোষ পড়িতে
পড়িতে দাদামহাশয় তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন, কিন্তু
[ ৯

মঞ্জরী
বন্ধের আর সহ হইল না, দুঃখে ক্রোধে বিরক্ত হইয়া
বলিল, বোমা, যা খুসি কর, আমি আর এ সব চোখে
দেখতে পারবনা। আজই কাশী যাব। বৃদ্ধ নীরবে গৃহ
হইতে চলিয়া গেল। বালক দাদামহাশয়ের সঙ্গে
যাইবার চেষ্টা করিল, মাতা হাত ধরিয়া টানিয়া
রাখিলেন। ভীত বালক একবার ব্যাকুলভাবে ডাকিল,
“দাদামহাশয়!” দাদামহাশয় তখন বাহিরে চলিয়া গিয়া-
ছিলেন, বালকের স্বর কাণে গেল না। ক্রোধে অভিমানে
বৃদ্ধ নিজের জিনিষপত্র গুছাইয়া লইয়া পৌত্রের সহিত
একবার দেখা করিবার প্রত্যাশায় বাড়ীর ভিতর দিকে
চাহিলেন। বালককে তাহার মাতা ধরিয়া রখিয়াছিল,
কাজেই তাহার সহিত বৃদ্ধের সাক্ষাৎ হইল না। বন্ধ
বার বার সতৃষ্ণ নয়নে বাটীর ভিতরের দিকে চাহিতে
লাগিলেন। এমনি করিয়া তিন ঘণ্টা কাটিয়া গেল।
কেহ তাহাকে আহার করিতে ডার্কিল না অভুক্ত বৃদ্ধ
নিজের বাড়ী হইতে নিজে অনাহারে বিদায় হইলেন।
অলক্ষণ পরেই বৃদ্ধের পুত্র হরিপদ আফিস হইতে আসিয়া
নিজের শয়ন গৃহে প্রবেশ করিল। দেখিল পুত্রকে
খাটের সঙ্গে বাধিয়া রাখিয়া অপরাজিতা নিদ্রা যাইতে-
ছেন, বালকও বন্ধন অবস্থায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছে।
১ ]

মঞ্জরী
ব্যাপার কিছু বুঝিতে না পারিয়া হরিপদ স্ত্রীকে
ভাকিলেন, পুত্রের বন্ধন মুক্ত করিয়া দিলেন। পুত্র
দাদামহাশয় বলিয়া ছুটীয়া বাহিরে গেল। গৃহিণী অতি-
রঞ্জিত করিয়া সেদিনের ঘটনাটি বর্ণনা করিলেন। বুড়াে
কবে তামাক খাইতে খাইতে ছেলেকে পুড়াইয়া মারিবে,
এ কথাও বলিতে ছাড়িলেন না। হরিপদ পূৰ্ব্ব হইতেই
পুত্রকে অত্যধিক আদর দেওয়ার জন্য পিতার উপর
আন্তরিক বিরক্ত ছিল—এ সমস্ত নিয়া আরও বিরক্ত
হইল।
( ৬ )
এদিকে বৃদ্ধ বাড়ীর বাহির হইয়া ক্রমাগত পিছনে
বাড়ীর দিকে চাহিতে চাহিতে যাইতে লাগিলেন, পা আর
উঠে না। সন্তোষের সহিত একবার সাক্ষাৎ না করিয়া
বৃদ্ধের যাইতে সরিল না। বাড়ীর নিকটেই একটী বট
বৃক্ষের তলায় বসিয়া পেত্রের সহিত সাক্ষাতের প্রতীক্ষা
করিতে লাগিলেন। দিন যায় না; রৌদ্র পড়িয়া আসিল,
কিন্তু সন্তোষ আসিল না। হতাশে বৃদ্ধের দীর্ঘ নিশ্বাস
পড়িল! ঠিক সেই সময়ে তাহার কাণে গেল, দাদা
মশাই! উৎফুল্ল হৃদয়ে গদগদ কণ্ঠে বৃদ্ধ বলিলেন, এই
[ ১১

মঞ্জরী
যে দাদা! মুহুৰ্ত্ত মধ্যে ছুটিয়া আসিয়া বালক দাদা-
মহাশয়ের হাত ধরিল। বৃদ্ধ সাদরে, দারূণ আবেগে
আগ্রহে পৌকে বুকে তুলিয়া লইলেন। পৌত্র
বলিল,-দাদামশাই, কোথা যাচ্ছ, আমি যাব। বৃদ্ধ
হাসিয়া বলিল, কোথা যাবে দাদা? আমি ঢের দূর
যাচ্ছি। সন্তোষ বলিল, না দাদা, আমায় নিয়ে চল।
এইখানে মা আমায় মেরে ফেলবে। আমায় বেঁধে
রেখেছিল। বৃদ্ধের চোখের জলে বুক ভাসিয়া গেল।
সন্তোষ তাহার ক্ষুদ্র হাত দুখানি দিয়া দাদামহাশয়ের
চোখের জল মুছাইয়া বলিল, দাদামহাশয়, তুমি কেঁদনা,
তুমি যেওনা—দাদামশাই তুমি গেলে আমি বাঁচব না।
বালকের কথায় বৃদ্ধের অভিমানের বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেল।
সস্নেহে বলিল,-না দাদা আমি যাবনা, চল বাড়ী যাই।
( ৭ )
.
কালীশঙ্কর চোরের মত নিজের বাটীতে নিজে
প্রবেশ করিলেন। পুত্রের সহিত সাক্ষাৎ হইল, পুত্র
কোনও কথা বলিল না। পৌত্রের মমতায় বৃদ্ধ পুত্রের
এই অমানুষিক ব্যবহার নীরকে সহ করিলেন। নিতান্ত
সঙ্কুচিত ভাবে বৃদ্ধের দিন কাটিতেছিল। একদিন
১২ ]

মঞ্জরী
সন্ধ্যার সময় সন্তােষ আসিয়া ডাকিল, দাদামশাই, একটা
গল্প বলনা? বৃদ্ধ পৌকে নিজের কাছে বসাইয়া গায়ে
হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন, কিরে, তাের গা গরম
কেন? জ্বর হয়েছে বুঝি ?-হ্যা দাদা, মাথা ব্যাখা
করছে। তুমি একটা গল্প বলনা, আমি শুনতে শুনতে
ঘুমাই। বৃদ্ধ নিজের পাশে শােয়াইয়া মাথা নাড়িতে
নাড়িতে গল্প বলিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে চাকর
আসিয়া ডাকিল,-থােকা বাবু পড়তে চলমাষ্টার
এসেছে। ব্যাকুলভাবে বালক বৃদ্ধের মুখের দিকে
াহিল। কালীশঙ্কর বলিলেন—খােকার আজ শরীর
খারাপ, পড়বে না। মাষ্টারকে যেতে বল। কিছুক্ষণ
গল্প শুনিতে শুনিতে বালক ঘুমাইয়া পড়িল, বৃদ্ধ
সঙ্গে বালককে বুকে করিয়া বাড়ীর ভিতর শােয়াইয়া
আসিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে, বৃদ্ধ যখন দাওয়ায়
বসিয়া তামাক খাইতেছিলেন ও এক একবার পৌত্রের
দর্শন প্রত্যাশায় বাটীর ভিতরের দিকে চাহিতেছিলেন,
সেই সময় হরিপদ আসিয়া বলিল, বাবা, তােমার সঙ্গে
একটা কথা আছে। ব্যস্ত হইয়া বৃদ্ধ বলিলেন, কি কথা
বাবাদাদা ভাল আছে তাে? সে কথার কোনও
উত্তর না দিয়াই হরিপদ বলিল,-শােন তুমি
[ ১৩

মঞ্জরী
আদর দিয়ে দিয়ে থােকার মাথাটা খেলে। তােমার
কাছে থাকলে, আর ওর কিছু হবে না। কাজেই ওকে
আমাকে আর কোথাও পাঠাতে হবে। বৃদ্ধ অপ্রস্তুত
হইয়া বলিল, না না ছেলে মানুষ, ওকে আর কোথায়
পাঠাবে ? আমার তাে বয়স হয়েছে, আমি না হয়
কোথাও তীর্থে চলে যাই। ছেলে মানুষ, মা বাপ ছাড়া
হ'লে ওর বড় কষ্ট হবে। হরিপদ বলিল, সে বেশ
কথা—তুমি আজই কাশী রওনা হও। দিন ভাল আছে।
পিতার উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া, হরিপদ চাকর
ডাকিয়া কর্তার জিনিষ পত্র গুছাইতে আদেশ দিল।
এটা ওটা করিতে যাত্রার সময় আসিল-বৃদ্ধ পুত্রকে
বলিল, একবার খােকাকে দেখে যাই, কাল জ্বর হয়ে
ছিল”-বাধা দিয়া হরিপদ বলিল, “না না, এখন আর
দেখা করে কি হবে? ঘুমুচ্ছে, আর উঠলে কি তােমায়
যেতে দেবে? গাড়ীতে উঠবে চল, সময় হয়ে এল।”
বৃদ্ধ কোনও কথা বলিলেন না। নীরবে পুত্রের সহিত
ৰাইতে যাইতে হঠাৎ যেন বৃদ্ধের কাণে গেল, ক্ষীণকে
বালক ডাকিতেছে, “দাদামশাই ।” বৃদ্ধ থমকিয়া পাড়া-
ইলেন, পুত্র বলিল, “এসনা, দাড়ালে কেন?” বৃদ্ধের
মর্মান্তিক যন্ত্রণা পুত্র কিছুই বুঝিল না। এতদিন বুদ্ধ
।

অকারী
নিয়র চেষ্টায় যাহা করিতে পারেন নাই, তাই পুজে
চেষ্টায় তাহা ঘটিল।
সেই দিন সন্ধ্যার পর হইতে, সন্তোষের কার বাড়িতে
লাগিল, সে চারিদিকে চাহিয়া আকুল কঠে ডাকিল,
“দাদামশাই!” কইতে তাহার দাদামহাশয় “কি দাদা”
বলিয়া ছুটিয়া আসিলেন না। বালক কম্পিতকণ্ঠে আবার
আরও উচ্চৈঃস্বরে ডাকিল, “দাদামশাই।” অবােধ বালক
জানিত না, তাহার দাদাযহাশয় তখন বহুদূরে চলিয়া
গিয়াছে। অপরাজিতা বালকের ব্যাকুলভাব দেখিয়া
মনে মনে ভাবিলেন, বুড়াে ছেলেটাকে কি যাদুই ক'রে
গেছে। রাত্রি বারটার পর হইতে সন্তোষের বিকারের
লক্ষণ দেখা দিল। উদাসভাবে বালক বিছানার চাদর
অাঁচড়াইতে অচড়াইতে, কাতরকণ্ঠে ডাকিতে লাগিল,
“দাদামশাই।” হরিপদ ব্যস্ত হইয়া ডাক্তার আনিলেন।
ডাক্তার আসিয়া কোনও আশা দিতে পারিল না।
রাশিকৃত ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া চলিয়া গেলেন। রাত্রি
তখন প্রায় প্রভাত হইয়া আসিয়াছিল, গৃহকোণের দীপটা
তৈল অভাবে ক্ষীণভাবে জ্বলিতেছিল, চারিদিকে চাহিয়া
[ ১৫

মঞ্জরী
সন্তোৰ আৰুলক ক্ষীণস্বরে প্রাণের আবেগে ডাকিল,
“দাদামশাই?” সঙ্গে সঙ্গে তাহার প্রাণবায়ু বাহির
হইয়া গেল। ঠিক সেই সময়েই গৃহেয় দীপটা একবার
জলিয়া নিভিয়া গেল। অপরাজিত চীৎকার করিয়া
সন্তোষের বুকের উপর পড়িল। হায়! তখনও যেন
তাহার কর্ণে প্রতিধ্বনিত হইতেছিল, বৃদ্ধ যেন তেমনি
করুণ, কোমল ও আকুলকণ্ঠে বলিতেছেন, “কি ক’বুব
দাদা।”
১৬]

রােগী।
কলিকাতা মেডিকেল কলেজের দ্বিতলস্থ কোন একটা
ককে একটী পরম সুন্দর মুসলমান বুক অঞ্জনা-
বস্থায় পড়িয়া আছে। আজ তিন দিবস হইল, একবারও
তাহার জ্ঞান হয় নাই। যুবকের সৌন্দর্য্যে সকলেই
মুগ্ধ—ডাক্তার সাহেব পৰ্যন্ত যথেষ্ট মনােযােগপূর্বক
যুবকের তত্ত্বাবধান করিতেছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু
হইতেছে না। নিস্তব্ধ রাত্রি, শীতকাল, ঠাণ্ডা বাতাস--
পথ নির্জন, সকলেই সুপ্তিতে মগ্ন। কেবলমাত্র সুশ্রুষা-
কারিণী একটি খৃষ্টান যুবতী অনিমেষশােচনে পীড়িত
যুবকের দিকে চাহিয়া ছিল। যুবতী অনিন্দ্যসুন্দরী।
গ্যাসের তীব্র আলােক রােগীর মুখে পড়িয়াছে-বড় বড়

মঞ্জরী । চক্ষু দুইটি মুদ্রিতযেন অঘাের নিদ্রায় নিদ্রিতএই গুরুতর ব্যাধিতেও তাহার লাবণ্যের কিছুমাত্র হানি হয় নাই। যুবকের বয়স বেশী নয়, ২৪২৫ বৎসর হইবে। কমলে কৃষ্ণ ভ্রমরের ন্যায় অল্প অল্প ঋরেখায় সেই সুন্দর মুখখানিকে আরও সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে—অনেক্ষণ গেল-যুবতী পূৰ্ব্ববৎ নিশ্চলা, বাজ্ঞানশূন্য। এইবার যুবকের চক্ষু দুইটি অল্প স্পন্দিত হইল। আবার ধী স্থির-আবার নড়িল। এইবার যুবক একবার চক্ষু মেলিয়া চাহিয়া অসহ গ্যাসের আলােকে আবার চক্ষু মুদিত করিল। কিছুক্ষণ পরে যুবক আবাৰু ক্ষুরুন্মীলম করিল। এবার আর চক্ষু বুজিল না। ধৱেছুরিদিকে ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিতে শিল। রজনী তথ- গভীর, সমস্ত জগৎ নিস্তব্ধকবল অসহ্য যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুমূর্য রােগীর অস্ফুট মর্মান্তিক যন্ত্রণাধ্বনি, ক্ষণে ক্ষণে ক্ষত হইতেছিল। যুবক সুশ্রুষাকারিণীর দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আমি কোথায় ? অনির্বচনীয় আনন্দে অস্ফুটস্বরে ভগবানকে ধন্যবাদ দিয়া সুকারিণী বলিল, ভগবান আপনাকে রক্ষা করিয়াছেন, আপনি উত্তম স্থানে আছেন। যুবক বলিল, আমি কত দিন এ স্থানে আছি ?—সু- কারি উত্তর করিল, আজ তিন দিন আপনি অঞ্জন ১৮ ]

মঞ্জরী
ছিলেন, এই আপনার প্রথম জন হইল। যুবক
একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিল—সঙ্গে সঙ্গে কি যেন
একটা ভীষণ চিন্তার রেখা তাহার সমস্ত বদনমণ্ডলে
প্রতিফলিত হইল। যুবক মুহূর্তে তাহা গােপন করিয়া
মুবতীর প্রতি কোমল বৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া জিজ্ঞাসা
করিল,-আপনি বােধহয় দয়াবতী সুক্ৰষাকারিণ? যুবতী
ঈষৎ লজ্জিতভাবে উত্তর করিল, আপনার অনুমান মিথ্যা
নহে। যুবক সতৃষ্ণ নয়নে কৃতজ্ঞ স্বরে বলিল, আপনি
আমার ধন্যবাদ গ্রহণ করুন আপনার এ খ৭ আমার
চিরদিন মনে থাকিবে। লজ্জিত হইয়া সুকারিণ
উত্তর করি আমি সামান্যা সুশ্রুষাকারি মাত্র
কর্তব্যের অধিক কিছুই করি নাই। যুবক এতক্ষণ রমণ
মুখখানি অনিমেষলাের্মন্ধে, দেখিতেছিলেন। পরে একটা
দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া চক্ষু দু’টি মুদ্রিত করিল।
প্রতিধ্বনির মত যুবতীও একটী দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া
নিকটে তাহার নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিল। ঠিক
সেই মুহূর্তেই ঠং ঠং করিয়া রাত্রি চারিটা বাজিয়া গেল।
. সহরময় হল পড়িয়া গিয়াছে—সকলের মুখেই এক
لا

মঞ্জরী
কথা—হাটে, মাঠে, পথে, বাজারে, ষ্টেশনারি, দোকানে
সবারই মুখে এক কথা, এক আলােচনা-ট্রামগাড়ীতেও
অন্য কোনও গল্প নাই—কেবল ভয়ানক ভয়ানক চুরি
গল্প-কলিকাতায় এক অদ্ভুত চোরের আগমন হইয়াছে।
পকেটে নােট রাখিয়া দাও, কিছুক্ষণ পরে দেখিবে, তাহা
আর নাই—তুমি কিছুই টের পাইবেনা। যখন তুমি
নােট বাহির করিবে, দেখিবে নােটগুলি সামান্য সাদা
কাগজে পরিণত হইয়াছে। টাকার তােড়া লইয়া
যাইতেছবাড়ী গিয়া দেখিবে পয়সার তােড়া হইয়া
গিয়াছে। এ আজব সহরে সবই আজব! ট্রেনে তুমি
বাড়ী যাইবার জন্য উঠিলে, দুই একটা ষ্টেশন পরেই
আর একটী ভদ্রলােক সেই গাড়ীতে উঠিলেন—দিব্য
পােষাকপরিচ্ছদ—ডাক্তার, কন্ট্রাক্টর, প্রফেসর, মার্চেন্ট
বা কোন উকীল বলিয়া আত্ম পরিচয় দিলেন। তােমার
কেমন একটু নিদ্রা পাইল, পরবর্তী ষ্টেশনে গাড়ী
থামিবার ঝাকিতে তােমার তথ্রা ছুটীয়া গেল—দেখিলে
সে ভদ্রলােকটী নাই—তােমার মনে কোনও সন্দেহই
নাই, হঠাৎ ঘড়িটী দেখিবার প্রয়ােজন হইল, যাহা
দেখিলে স্বপ্ন কি জাগ্রত বুঝিতে পারিলে না—ঘড়ি,
চেইন ইত্যাদি সবই আছে-তবে তােমার যেটী ছিল,

মঞ্জয়ী
সেটা নাই—সােনার চেইনের পরিবর্তে স্কুলের চেইন
হইয়াছে—বহুমূল্য স্বর্ণ বড়ির পরিবর্তে একটা কুরু-
ভাইজার” টিক টিক করিতেছে। অদ্ভুত ব্যাপার-অথচ
সেই চোরের কোনও সন্ধান হইতেছে না। সহর জুড়িয়া
লােকের ভয়, যে এত বড় ক্ষমতাবান—সে হয়ত কৰে
তাহাদের দেহটা বেমালুম চুরি করিয়া তাহার পরিবর্তে
একটা নূতন দেহ রাখিয়া যাইবে।
চৌরঙ্গীর কোন একটা সাহেবপল্লীতে সেই সুবা-
কারিণী যুবতী একটী ছােট বাড়ীতে বাস করেন। যুবতী
কুমারী, কেহই নাই—তবে তাহার খুড়তুতাে ভাই
অ্যারাটুন তাহার পাণিপ্রার্থী প্রত্যহ সে দেখা করিতে
আসে—কিন্তু যুবতী তাহাকে কেন জানি না, এ পর্যন্ত
ভালবাসিতে পারে নাই। অ্যারাটুন ভালবাসার কথা
বলে-যুবতী তাহার কোনই উত্তর দেয় না—অথচ দুই
জনে বেশ হাসিয়া খেলিয়া কথা কয় ; অটুন যুবতীর
হৃদয় ভালরূপ বুঝিয়া উঠিতে পারে না। তখন প্রায়
স্যা—আকাশের রং প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন হইতেছিল ;
অতগত সূর্যের রক্তিমাভা তখনও গগণপ্রান্ত হইতে
[ ২১

মামী
মিয় নাই। সুনীল গগণের কোন প্রান্তে জ্যোতিষীৰ
দু একটা নক্ষত্র দেখা যাইতেছিল-যুবতী তাহার বড়
আদরের বারান্দায় সজ্জিত টবগুলিতে জল দিতেছিল।
এমন সময় মারাটুন আসিয়া ডাকিল, “ক্লারা”! যুবতী
মুখ ফিরাইয়া বলিল,-কে-অ্যারাটুন? এস ভাই, ব’স।
অ্যারাটুন বলিল, আজ আর আমার বসিবার অবসর
নাই, নিতান্ত তােমাকে না দেখিয়া থাকিতে পারি না
তাই আসিয়াছি। অ্যারাটুন পুলিসের ডিটেকটিভ
বিভাগে কাৰ্য্য করিত। তাই ক্লারা হাসিয়া বলিল, আজ
আবার কাহার আলিপুরে বাসস্থান স্থির করিয়া দিবে মনে
করিয়াছ? অ্যারাটুন বলিল, সে সুবিধা বড় নাই,আমি
যাহার অনুসন্ধান করিতেছি সে বড় চতুর লােক।
তােমার নিকট বােধ হয় গল্প করি নাই—এই চতুরকে
আমি জীবনে একবার দেখিয়াছিলাম-সে যেরূপ
চতুরতায় আমার চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করে, তাহা তুমি
নিলে আশ্চর্য হইবে—আমি বােৱে মেলে বিশেষ
কাৰ্যানুয়ােধে যাইতেছিলাম। আমাদের বােখে মেলের
পার্শ্ব দিয়া যখন পঞ্জাব মেল অতিক্রম করিয়া যাইতেছিল,
কখন রাত্রি ১১টা বাজিয়া গিয়াছে। ঠিক সেই মুহূর্তে
মনে হইল চল পাব মেল হইতে চকিতের মত কে
২২ ]

মঞ্জরী
একজন আমাদের চলন্ত গাড়ীর পা জানের উপর পাকা-
ইয়া পড়িল। আমি সেই মুহূর্তেই দেখিলাম, লােকটা
ছায়ার মত নিঃশব্দে একটা দ্বিতীয় শ্রেণী গাড়ীর দরজা
খুলিয়া ঢুকিয়া পড়িল। পরের ষ্টেশনে আমি গাড়িখানি
লক্ষ্য করিয়া যাইয়া দেখিলাম, একটা সুশ্রী যুবক সেই
গাড়ীতে বসিয়া একখানি সংবাদ পত্র পাঠ করিতেছেন।
আমি বিস্মিত হইলাম! এরূপ লোেক যে চলন্ত গাড়ী
হইতে লাফাইয়া পড়িতে পারে, আমি তাহা ধারণা
করিতে পারিলাম না। তথাপি মনের সন্দেহ অপােদনের
জন্য তাহার অনুসন্ধান করিলাম। দ্বিতীয় ষ্টেশনে আমি
আমার জিনিষ পত্র লইয়া সেই কামরায় প্রবেশ করিলাম,
তখনও যুবক নিবিষ্ট চিত্তে সংবাদপত্র পাঠ করিতে
ছিলেন। আমি বিছানা বিছাইয়া শুইয়া পড়িয়া নিদ্রায়
ভান করিয়া রহিলাম। যুবকের অলক্ষ্যে দুই একবার
শহাকে দেখিয়া লইলাম—ভাল কিছুই বুঝিতে পারিলাম
। আমি স্থির করিলাম, ষ্টেশনে টিকিট পরীক্ষা হইবে
-তখনই আমার অনুমান সত্য মিথ্যা বুঝিতে পারি
এবং সেইরূপ ব্যবস্থা করিব। অর্থ ঘণ্টা পরেই টেনে
গাড়ী থামিল। একজন ইংরেজ আরােহী উঠিলেন
দেখিলাম লােকটা যেমন দৈর্ঘ্যে, তেমনি প্রস্থে সেইরূপ
[ ২৩

মঞ্জরী
মাংসপেশ দৃঢ় ও সবল—দেখিলেই খুব বলবান শােক
বলিয়া মনে হয়—ইংরেজী এক পাশে বসিয়া সংবাদ
পত্র পড়িতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে যুবক অতি
সুন্দর ইংরেজীতে সাহেবটিকে বলিলেন, মহাশয় , সংবাদ
পত্র পরিবর্তন করিতে আপত্তি আছে কি? সাহেবটী
ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, কিছু মাত্র না। ধন্যবাদ দিয়া
যুবক সংবাদপত্র বিনিময় করিলেন। শক্তিশালী ব্যক্তি
মাত্রেই সাধারণতঃ সরল চিত্ত হয়। দেখিলাম সাহেবটা
সরল ও ভদ্র ; নতুবা অপরিচিতের এই অনুরােধ তিনি
রক্ষা করিতেন কিনা সন্দেহ। কিছুক্ষণ পরেই সাহেবটা
বিস্মিতনেত্রে যুবকটীর প্রতি চাহিলেন, যুবকটাও সাহেবের
ধুথের প্রতি স্থির দৃষ্টি করিলেন। আমি ব্যাপার কিছুই
বুঝিলাম না। মুহুর্ত মধ্যে যুবক শিকারের প্রতি ব্যাঞ্জের
মত আমার উপর লাফাইয়া পড়িলেন। সঙ্গে সঙ্গে
ইংরাজ তদ্রলােকটীও আমাকে আক্রমণ করিলেন। আমি
তাহাদের হস্ত হইতে মুক্ত হইবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা
করিলাম-কিন্তু ইংরেজীর গায়ে অসীম শক্তি—আমি
ঘন্টা বাজাইবার চেষ্টা করিলাম, “তাহারা আমাকে জোর
করিয়া গাড়ীর মেয়ে ফেলিয়া দিল। আমি চীৎকার
করি মনে করিলাম, যুবক আমার ভাব বুঝিতে
২৪ ]

মঞ্জরী
পারিয়াই আমার নাক ও মুখের উপর একখানি রুমাল
ঢাপিয়া ধরিল। রুমালের তীব্র গন্ধে আমি অজ্ঞান হইয়া
পড়িলাম। যখন আমার জ্ঞান হইল তখন দেখি-
আমি ওয়েটিং রুমে রহিয়াছি। অনেকগুলি পুলিশ
কর্মচারী সেই ইংরেজটীকে ঘিরিয়া বসিয়া আছে।
আমি ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, সে যুবক পলায়ন
করিয়াছে? পুলিশ কর্মচারীরা আমাকে আনুপুৰ্ব্বিক
সমস্ত বিবরণ বলিল। যে সংবাদপত্রখানি ইংরেজের
সহিত পরিবর্তন করা হয়, তাহার এক পার্শ্বে পেনসিলে
লেখা ছিল-“আমি ডিটেকটিভ, এই লােকটী খুনী
আসামী, আমি ইহাকে গ্রেপ্তার করিব, আপনার সাহায্য
প্রার্থী।” যুবকের কথায় বিশ্বাস করিয়া ইংরাজ ভদ্র
লােকটী সাহায্য করে। আমি বন্দী হইবার পর, গাড়ী
ষ্টেশনে আসিলেই আমায় ইংরেজ ভদ্রলােকটীর জিম্মায়
ৰাখিয়া সে পুলিশ ডাকিতে যায়—আর ফিরে নাই।
আমি তাহার উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করিলাম। আমার
কিছু চুরি গিয়াছে কিনা, জানিবার জন্য পকেট পরীক্ষা
করিয়া দেখি, একখানি কার্ড রহিয়াছে, বিম্বিত হইয়া
দেখিলাম, তাহাতে লেখা আছে—মীর্জা রহমান”।
নামটা আমার মুখ হইতে অস্ফুট উচ্চারণ হইতেই
[ ২৫

मथब्रो ইংরাজ ভদ্রলােকটা লাফাইয়া উঠিয়া বলিলেন,-কি সর্বনাশ! আমি সে ভয়ঙ্কর চোরের সাহায্য করিয়াছি। এই অভূতপূর্ব ব্যাপার কেহই অনুমান করেন নাই- পুলিশ কর্মচারী সকলেই বিস্মিত হইলেন। কি ভয়ানক লােককে হাতে পাইয়া ধরিতে পারিলাম না ভাবিয়া আমিও বড় অনুতপ্ত হইলাম। যাহা হউক যাহার জুয়াচুরীর অদ্ভুতত্ব দর্শনে সমস্ত ভারতবর্ষীয় পুলিশ মুগ্ধ—আমি সেই চতুরকে এইবার ধরি। ক্লারা বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া বলিল,-তুমি ধরিবে ? এত বড় বড় ডিটেকটিভ যাহাকে ধরিতে পারিলেন না,তুমি তাহার কি করিবে? এরাটুন একটু কঠোর হাসি হাসিয়া বলিল, আমার কৃতিত্বে তুমি চির দিন অবিশ্বাসিনী। ভাল--আমি তােমায় বিশ্বাস করিতে অনুরােধ করি না; কিন্তু আমার এমন দিন আসিবে, যেদিন নিশ্চয়ই আমার কৃতিত্ব তােমাকে মুগ্ধ না করিয়া পারিবে না। ক্লারা কিছুই বলিল না, বিস্মিত নেত্রে এরাটুনের মুখ পানে চাহিল। এটুন “গুভ রজনী” বলিয়া বিদায় হইল। ( ৪) এতকাল মেডিকেল কলেজের বারায় রে

মঞ্জরী
আসিয়াছে। শীতের রৌ-বড়ই প্রিয়—অনেক রােগ
বারাস্তায় বসিয়া রৌদ্র উপভােগ করিতেছিল-বারায়
এক পায়ে অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থান, সেই, যুবক ক্লারার
সহিত গড়াইয়া কথােপকথন করিতেছিল,-ক্লারা বলিল,
লতিফ! একটা কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি-বড়ই
সুসংবাদ! যে ভয়ঙ্কর চোরের গল্প তােমার নিকট
বলিয়াছিলাম, আমার ভাই এরাটুন আজ রাত্রি
১২টার সময় তাহাকে গ্রেপ্তার করিবে। তাচ্ছিল্যেয় ভাবে
লতিফ, বলিল, তুমি এ সংবাদ জানিলে কি প্রকারে?
ক্লারা একটু হাসিয়া বলিল, সে একটু অদ্ভুত রকমের।
কাল আমি ডিউটী করিয়া রাত্রে বাড়ী গিয়া দেখি-
আমার ভাই এরাটুন—আমার অপেক্ষায় বসিয়া বসিয়
চেয়ারের উপরেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। কেবল এক টুকরা
কাগজের উপর লেখা আছে—“কল্য রাত্রি ১২টার সময়
ইনস্পেক্টর যেন কুড়ি জন কনষ্টেবল লইয়া মেডিকেল
কলেজের সম্মুখে ছদ্মবেশে অপেক্ষা করেন। যদিও সে
আমার কাছে কিছু প্রকাশ করে নাই, আমিও তাহার
কাছে কোনও কথা প্রকাশ করি নাই, তবে আমার
মারণা নিশ্চয়ই কিছু সন্ধান পাইয়াছে। ভগবান
করুন যদি সে এই চোরকে গৃরিয়া গবর্ণমেন্টের প্রশংসা
-

মরী
ভাজন হয়, তাহাতে আমার আনন্দই হইবে। পাৰে
বােব হইল লতিফ, এ কথাগুলি মনােযােগ পূর্বক
নিল না বা শনিবার প্রয়ােজন বােধ করিল না।
তবে ক্লারাকে বলিল,-দেখ ক্লারা, কাল আমি রাত্রে দেশ
হইতে সংবাদ পাইয়াছি—আমার প্রজারা সব বিদ্রোহী
হইয়া পড়িয়াছে। এ সময়ে আমার সেখানে থাকা
নিতান্ত প্রয়ােজন। আর আমি অপেক্ষা করিতে পারি-
তেছি না—অথচ তােমাকে ছাড়িয়া যাওয়া আমার পক্ষে
অসম্ভব। তুমি আমাকে
তুমি আমাকে যেরূপ ভালবাস, আমি
তােমাকে ততােধিক ভালবাসি। তাই বলিতেছি—ক্লার
আজ আমরা বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন করিয়া তােমাকে
পত্নীরূপে লইয়া দেশে যাই। মুহূর্ত দেরী আমার একটা
যুগ বলিয়া বােধ হইতেছে। ক্লারা কোনই আপত্তি
করিল না। বলিল-তােমার যাহাঁতে সুবিধা, আমার
তাহাতে কোনও আপত্তি নাই। বলা বাহুল্য ক্লারার
অভিভাবক কেহই ছিল না-সে নিজেই তাহার সর্বময়ী
কত্রী। সেই দিনই নিকটস্থ কোনও একটা হােট
গির্জায় ক্লাৱা ও লতিফের টাই কার্য সম্পন্ন হইয়া
২ ]

ময়ী
গভীর রাত্রি-টং টং করিয়া প্রেসিডেন্সি কলেজের
ঘড়িতে ১২টা বাজিয়া গেল। এরাটুন কলেজের
তুর্থে পুলিশগুলিকে লুকাইত রাখিয়া কলেজের
উপরে উঠিয়া গেল। যে ঘরে লতিফ ছিল, সেই ঘরের
সেই খাটিয়া শূন্য-ব্যস্ত হইয়া এরাটুন, সুকারিণীকে
জিজ্ঞাসা করিল, ৮ নং রােগী কোথায় ? সুকারিণী
যাহা উত্তর দিল, তাহাতে এরাটুনের মস্তক ঘুরিয়া
গেল—সে আর দাঁড়াইতে পারি না। সুকারিণীর
সমুখের চেয়ারে বিনা অনুমতিতেই বসিয়া পড়িল।
সুকারিণী বলিলেন, আপনি অমন করিতেছেন
কেন? রােগী দিব্য সুস্থ হইয়া ডাক্তারের অনুমতি
লইয়া হাসপাতাল ত্যাগ করিয়াছেন। এরাটুন নিরাশ
ব্যঞ্জক পরে মুকারিণীকে বলিল, আমি ব্যস্ত হইতেছি
কেন শুনিবেন ? সে রােগী কে জানেন? শুকারি
উৎকণ্ঠিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, কে ? এরাটুন
উত্তেজিত ধরে বলিল, এই সেই কলিকাতার বিখ্যাত
ভদ্রলােক বেশী যাদুকর জুয়াচোর “মির্জা রহমান।
যাকারিণী ত্যাহত কদলী বৎ ভয়ে থর থর্ক্স
tv

.
মরী
করিয়া কাপিতে লাগিল। এরাটুন বলিল, পানি
পলাইয়াছে, ধরা পড়িবার সম্ভাবনা অল্প। সে. অতি
চতুর, পুলিশ বিভাগের আমি ছাড়া আর কেইই তাহাকে
প্রত্যক্ষ করে নাই। আমি ছাড়া তাহার ধরা পড়িবার
সম্ভাবনা অতি অল্প। এই বলিয়া ব্যস্তভাবে এরাটুন
কলেজের ফটকের বাহিরে আসিয়া পুলিশদিগকে
সেদিনকার মত বিদায় দিয়া দ্রুতপদে ক্লারার বাটীর
অভিমুখে যাত্রা করিল। নিস্তব্ধ পল্লী-কেহই জাগ্রত
নাই। এরাটুন ক্লারার শয়ন কক্ষ অন্ধকার দেখিল
ভাবিল, হয়ত ক্লারা ঘুমাইয়াছে। নিঃশব্দে প্রবেশ দ্বার
ঠেলিল, দ্বার খুলিয়া গেল। এরাটুন ব্যস্তভাবে ডাকিল
‘ক্লারা!” কেহই উত্তর দিল না। ঠিক সেই মুহূর্তেই
এরাটুনের মস্তকে কে যেন গুরুতর আঘাত করিল।
সে অস্ফুট চীৎকার করিয়া
ভূতলে
পতিত হইল।
)
গাছের পাশে গাছ-অন্ধকারের কোলে অন্ধকার
নির্জনতার সহিত নির্জনতা মিলিত হইয়া সুন্দরবনকে
অতি ভয়ানক স্থান করিয়া তুলিয়াছিল। ঘূরিয়া ফিরিয়া
ভিতর দিয়া যেথলার মত সুন্দরবনকে বেষ্টন করিয়া
• ]

बधी শীটী বহিতেছি—তাহার নিকটেই গভীরতর জঙ্গলের ভিতর একখানি বাড়ী। বাড়ীখানি বৃহৎ নয় কিন্তু বৃ। ভিতরে অনেকগুলি কক্ষ, নিম্নতলে জানালা নাই- উপরের ঘরগুলিতে দৃঢ় লােহার শিমণ্ডিত জানালা। তাহারই একটী সজ্জিত কক্ষে, একটা যুবক অন্যমনে পায়চারী করিয়া বেড়াইতেছিল। যুবকের মুখ দেখিলেই বােধ হয়—সে যেন কি এক ভীষণ কল্পনাময় চিন্তা- স্রোতে নিমগ্ন। অনেক্ষণ পরে অস্ফুটস্বরে যুবক বলিল, এ সব আমি ত্যাগ করিব-ক্লারা তুমিই আমার ধ্যান জ্ঞান। আজ হইতে আমার জীবন অন্য পথে চালিত হইবে। তােমাকে লইয়া সৎপথে জীবন যাপন এ সংসারে যাহারা আমার চরিত্র ও কার্যত প্রকৃরূপে অবগত—তাহাদের স্মৃতি হইতে আমাকে আমি চিরদিনের জন্য দূরে রাখিব। পাপলব্ধ অর্থ যথেষ্ঠ করিয়াছি। তাহার এক কপর্দকও আমার প্রয়ােজন নাই। তাহাদের সমাধি আমার গত কৃত কর্মের সহিত, এইখানেই চিরদিনের জন্য হইবে। এমন সময় দ্বার খুলিবার ঘণ্টার শব্দ হইল, দরজা খুলিয়া একল লােক প্রবেশ করিল। লতিফ, ব্যস্তভাবে জিজ্ঞাসা করিল, এরাটুনের কি হইল? লােকটী বলিল, আপনার করিব। [ ৩১

আদেশমত তাহাকে নীচের কয়েল ধরে বকৰিশ্না বাধা
হইয়াছে। লতিফ, উল্লাসিত হইয়া বলিল, তােমার
উপর যড় খুশী হইলাম। আমার প্রত্যেক লােককে
এইখানে আজ এই সময় উপস্থিত থাকিতে বলিয়াছিলাম,
তাহারা সকলেই উপস্থিত আছে? লােকটা বলিল,
আমাদের দলের একটা বালক পৰ্যন্ত আজ এ বাটীতে
অনুপস্থিত নাই। সকলেই আপনার জন্য নীরবে হল
ধরে অপেক্ষা করিতেছে। লতিফ, বলিল,-উত্তম, আমার
অনুমতি ব্যতীত কেহ যেন বাহিরে না যায়। অভিবাদন
করিয়া লােকটা চলিয়া গেল।
সপ্তমীয় ৮ ; কৃষ্ণ মেঘের ভিতর গাছের আড়ালে
খ বক্ করিয়া জ্বলিতেছিল। নদী কুলকুল করিয়া
বহিয়া যাইতেছিল-সমস্ত জগৎ নিস্তব্ধ-একটা পাতা
পৰ্যন্তও নড়িতেছিল না। এমন সময় ধীরে ধীরে একটা
খুবক, অতি সন্তর্পণে বাড়ীচীর চারি কোণে কি যেন
পুতিয়া দিল--তাহার পর একবার বাড়াটার দিকে
চাহিয়া দেখিল—তখন যুবকের চক্ষু দিয়া দর দর করিয়া
জল পড়িতেছিল। এটা হৃদয় বিরক নিশাসের সহিত
৩২]

মঞ্জরী
মুখ অপু বরে বলিল, এ সংসারে যাহারা আমায়
বড় আদরের, বড় প্রিয়, আমি স্বহস্তে তাহাদের মূল্যবান
জীবন বিসর্জন দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে দিয়াশলাই দিয়া
পূর্বোক্ত প্রােথিত দ্রব্যের সংযােজিত পলিতায় আগুন
ধরাইয়া ছুটীয়া নদী কিনারায় আসিল। নদীতীরে ঘােট
একখানা নৌকা বাঁধছিল—নৌকায় একটা যুবতী
উৎকণ্ঠিতনেত্রে বনপথের দিকে চাহিয়াছিল। যুবতী
উন্মুক্ত কেশরাশি চঞ্চল বায়ু হিল্লোলে দুলিতেছিল।
অল্প অল্প চালােক বৃক্ষান্তরাল হইতে যুবতীর মুখে
পড়িতেছিল-জলেও রজত রেখার মত দুই তিনটা রেখা
পড়িয়া নদীর তরঙ্গে দুলিয়া দুলিয়া ঝ ঝক্ করিতেছিল।
এমন সময় যুবক ডাকিল ক্লারা!”—যুবতী দৌড়ি
যুবকের গলা ধরিয়া বলিল,-“লতিফ,?”
ঠিক সেই মুহূর্তেই দুম করিয়া একটা ভয়ানক শব্দে
সহিত ডিনামাইট প্রভাবে লতিফের দল বল লইয়া
সেইখানে সেই বৃহৎ বাড়ী ভূমিসাৎ হইয়া গেল। প্রেমের
জয় হইল, লতিফের নৌকাও লােতবেগে ভাসিয়া চলিল।
[ ৩৩

সহধর্মিনী।
3
•
কুয়াশাচ্ছন্ন শীতকালের প্রভাত; অত্যন্ত বাতাস বহিতে
ছিল—শীতল বাতাস যেন হাড়ের ভিতর প্রবেশ
করিয়া সমস্ত উষ্ণ রক্ত শীতল করিয়া দিতেছিল। দু’
এক ফোটা বৃষ্টিও পড়িতেছিল। সাঁওতাল পরগণার
উপত্যকাতলবাহিনী দারা নদী মন্থর প্রবাহে বালুকাকীর্ণ
পথ বহিয়া যাইতেছিল। কুয়াশার মধ্য দিয়া ভেলু
গ্রামবাসিগণের পর্ণকুটীরগুলি অস্পষ্ট দেখা যাইতেছিল।
নদীতটে একখানি ঘােট ডিঙ্গা বাধা। নৌকাখানি অতি
জীর্ণ-তীরে দাঁড়াইয়া তেলুগ্রামের ভীল জাতীয় বন্ধ
মালাই সর্দার তাহার পুত্র কালুকে বলিল, বাহু তুই
৩]

এ সময় পারে যাসনি-কখন জমিদার হলপ দেবে,
তারতাে কিছুই ঠিকানা নাই—তুই আজ ঘর ছেড়ে
বাসনি। গলায় বিচিত্র কড়ির মালা, পরিবানে মােটা
সূতার মলিন বস্ত্র, মাথায় ঝুটি, তাহাতে কতকগুলি
পাখীর পালক গোঁজা-কৃষ্ণকায় বলিষ্ঠ যুবক, কত
ধনুক অবনত করিয়া বলিল, কেন বাপি তুই ভাবছিস?
তুই ভেরীর আওয়াজ দিলেই হামি অমনি চলিয়া
আসিব। ওপারে একটা বড় শের বেরিয়েছে, মেরে
আসিব। জানিসতত ভালু গিরামের লােকেরা একেত্তো
করে আমাকে ডেকে পেঠিয়েছে—হামি না গেলে তাদের
শিকার হোবে না। আমি না গেলে তারা কি ভাববে?
কিছুক্ষণ ভাবিয়া বৃদ্ধ মালাই সর্দার বলিল, তা তুই যা-
গিরামের ঢের গরু বাছুর মেরেছে-কিন্তু ভেরীর
আওয়াজ শুনলেই জাবি—তুইতে শুনেছিস হমাদের
জমিদারের সাথে আর একটা জমিদারের লড়াই বেঁধেছে,
বদমাস জমিদারের ঘরবাড়ী লুট করিবার মতলবে
আছে—শুছি জেনানাদের বেইজ্জৎ করবে। দন্তে
দন্ত ঘর্ষণ করিয়া ঝালু সদম্ভে বলিল, হামাদের জান
থাকতে জমিদারের জেনানাদের বেইজ্জৎ করবে?
তাহার সবল মাংস পেশীর সমস্ত শিরাগুলি কীত হইয়া
[ ৩৫

মঞ্জরী
উঠল। মালাই সর্দার বলিল, আমি তাই তােক
যেতে বারণ কছিল—বাপি! তুই কিছু ভাবিসনি।
মার জান্ থাকতে জমিদার বেইজ্জৎ হােবে না। দুই
যেমন ভেরী বাজাবি, হামি অমনি আসবাে। পুত্রের
গৌরবপূর্ণ বীরত্ববােদ্দীপক মুখচ্ছবি দেখিয়া পুত্রবৎসল
বুদ্ধ অন্তরে অতিশয় প্রীত হইল। স্নেহ কোমল দৃষ্টিতে
পুত্রের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “বালু-হামি তা
জানি—তুই আমার বেটা-কালী মা তাের ভাল কর্ষে।”
বৃদ্ধ চলিয়া গেল। বালু লাফাইয়া উঠিয়া নৌকা খুলিয়া
দিল-ক্ষুদ্র তরণী দারার তরঙ্গ ভঙ্গ করিয়া চলিল।
( ২ )
.
ক্রমে বেলা বাড়িতে লাগিল-কুয়াশাও কাটিয়া
গেলক্ষীণ দিবালােকে প্রকৃতির অশ্রুসিক্ত মুখে হাসি
কুটিয়া উঠিল। নৌকা হইতে তেলু গ্রামের বৃক্ষসমাকীর্ণ
কুটারগুলি দেখিয়া বালুর হৃদয় উৎসাহে পূর্ণ হইল।
সে দ্বিগুণ বলে নৌকা চালনা করিতে লাগিল। পরপারে
নির্জন ঘাটে একটী ভীল যুবতী সতৃষ্ণ নেত্রে বালুর
নৌকার দিকে চাহিয়াছিল। বালু সেই দিকে দৃষ্টিপাত
]

মঞ্জরী
করিল। তাহার বুকের ভিতর যেন নাচিয়া উঠিল।
উল্লাসরাশি তাহার চোকের কোল দিয়া মুখময় ছড়াইয়া
পড়িল। যুবতীর হৃদয়ে যে কত আনন্দ তাহা সে ভাষায়
প্রকাশ করিতে জানে না। কিন্তু তাহার স্বাস্থ্য প্রতি-
ফলিত মুখচ্ছবিতে তাহা দিব্য প্রকাশ পাইতেছিল।
যুবক আরও জোরে দাঁড় টানিয়া সত্বর নৌকা কুলে
ভিড়াইল। যুবতী ছুটিয়া আসিয়া নৌকাপূরােলগ্ন বন্ধন বন্ধু
দৃঢ়ভাবে ধরিল। স্রোতে অনিচ্ছাস্বত্বেও নৌকাখানির মুখ
যুবতীর সুগঠিত পদতল স্পর্শ করিল। যুবক লাফাইয়া
তীরে নামিয়া যুবতীকে দৃঢ় আলিঙ্গন পাশেবদ্ধ করিয়া
কোমল মধুরহৃদয়স্পর্শীস্বরে বলিল—বিজলী তুই এসেছি।
লজ্জা আসিয়া যুবতীর মুখ অবনত করিয়া দিল। বিজলীর
সহিত অল্পদিন হইল বালুর বিবাহ হইয়াছিল। তখনও
বেলা অধিক হয় নাই। প্রভাতে সূর্যের স্নিগ্ধ কম্পর্শে
বৃক্ষগুলির জড়তা ক্রমশঃ দূরীভূত হইতেছিল। অদূরে
মধ্য হইতে ঘুঘুর প্রণয়ণীর প্রতি কোমল প্রেম সম্ভাষণ
না যাইতেছিল-থাকিয়া থাকিয়া ঝােপের আড়াল
হইতে শ্যামা শিস দিতেছিল। বাতাসের শৈত্য তথন
অনেক কমিয়া আসিয়াছিল। মোয়া
ফুলের
উগ্র মিষ্ট গন্ধ
বাতাসে মিশিয়া একটা নেশার মত উৎসু করিতেছিল।
{ ৩৭

রী
দুইজনে নৌকাখানি চড়ার উপর টানিয়া তুলিয়া ভী
শতী নিকটবর্তী কুটীরের দিকে অগ্রসর হইল।
বিজলীর পিতার বাটীর প্রাঙ্গণে একটা শিরীন
গাছের তলায় ভীল যুবকেরা অগ্নিকুণ্ড জ্বলিয়া বালুর
আগমন প্রতীক্ষায় তাহার চারিদিকে বসিয়াছিল।
পর্ণকুটীর কয়েকখানি মাটীর দেওয়ালে ঘেরা পরিষ্কার
পরিচ্ছন্ন, অঙ্গন গােময় লিপ্ত খট্ খট্ করিতেছিল, একটা
সূচ পড়িলে, পাওয়া যায়। চারি পাশে আম, জাম ও
পেয়ারার কয়েকটী গাছ, কিছু দূরে সবুজ কলাইয়ের
ক্ষেত্র। বহিরঙ্গণে দুইটা বলিষ্ঠ মহিষ বাঁধা—সমস্ত
গৃহস্থালী যেন বেশ শ্ৰীসম্পন্ন বলিয়া মনে হয়। ধীরে
বীরে প্রাঙ্গণে ঝালু ও বিজলী প্রবেশ করিল। ঝালুকে
দেখিয়া ভীল যুবকেরা যুগপৎ আনন্দধ্বনি করিয়া উঠিল ;
আনন্দ গর্বে বালুর মুখ রক্তিমাভা ধারণ করিল। তার
পর সকলে অতি সত্বর ঢাক, ঢােল, মাদল, কাড়া বাজাইয়া
বর্ষা, তীর, ধনুক ইত্যাদি লইয়া ব্যাঘ্র শিকারে বাহির
হইল। গাছের পর গাছ শালবন, মাঝে মাঝে বাজরার
ক্ষেত, তাহার ভিতর প্রবেশ করিলে মানুষ দেখা যায় না,
উচু নিচু বন্ধুর ভুমি-সকলে চীৎকার করিয়া ঢোল
•
৩৮]

মঞ্জরী ৰাজাইয়া শীকর সন্ধান করিতে লাগিল। দুই একটা বন্ধ বরাহ ও শশক প্রভৃতি শিকারীদের তীক্ষ্ণ বাণে ইহলােক ত্যাগ করিয়া শিকারীদের হৃদয়ে পৈশাচিক হর্ষ সঞ্চার করিল। অনেকক্ষণ পরে একটি উলুবনের ঝোপের মাথা ঈষৎ নড়িতেছে দেখা গেল। শিকারীরা ‘ঐ বাঘ’ ‘ঐ যে বাঘ' বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল, ব্যাঘ্রের ভীষণ গর্জন শােনা মাত্রেই অমানুষিক সাহসে ঝালু অগ্রবর্তী হইয়া তাহার তীক্ষ বর্ষা স্থির করিয়া ধরিল। মুহূৰ্ত্তমধ্যে ব্যাস্ত্র ঝালুকে লক্ষ করিয়া বর্ষার উপর লাফাইয়া পড়িল। বর্ষা বিদ্ধ ব্যাঘ্রের অন্তিম আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে সেই জয়ােৎ- ফুল্ল বিরাট তীলের দল ঝালুকে ‘‘বাহবা দিয়া শতাধিক বর্ষা—পতিত ব্যাঘ্রের দেহে নিক্ষেপ করিল। প্রিয়তমের বিজয় উল্লাসে উল্লাসিত বিজলী ছুটিয়া গিয়া ঝালুর হজ ধরিল। মূহুর্ত মধ্যে তাহার সমস্ত অানন্দ চকিতের মত মিশাইয়া গেল। ভাত দৃষ্টিতে চাহিয়া দেখিল, ব্যাঘ্রের ভীষণ—নখাঘাতে ঝালুর মহস্তটি ক্ষত-বিক্ষত হইয়া একেবারে অন্য হইয়া গিয়াছে। জয়লব্ধ তীলযুবক ৰালুর সেদিকে কোন দৃষ্টিই ছিল না। ( ৪ ) বাড়ীতে আসিয়াই বিজলী তাহার স্বামীর ক্ষতস্থানে মঞ্জরী । কতকগুলি ব লতার বস করিয়া বাধিয়া দিল। তখন বাহিরে একটা বিরাট ভােজর আয়ােজন হইতেছিল। বন্যশূকরের দেহ অগ্নিকুণ্ডে দগ্ধ হইতেছিল-আজ বিজলীয় বড় আনন্দ সে হাসিয়া হাসিয়া প্রাঙ্গণময় ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতেছিল। কখনও বা ঝালুর কাছে গিয়া বসিয়া গল্প করিতেছিল। ইহার মধ্যে শতাধিকবার বালুর ক্ষত কেমন আছে জিজ্ঞাসা করিয়াছে। বন্য মধুপজাত তীব্ৰসুরা পান করিয়া কেহ মাদোল বাজাইতেছিল, কেহ বা গান গাইতেছিল, কেহ বা বিচিত্র অঙ্গভঙ্গী সহকারে বশীর তালে তালে নাচিতেছিল। সকলেই আজ আনন্দে বিহ্বল। সে বিরাট ভােজে বনবাসী ভীলেরা যেমন সরল নির্মল আনন্দ উপভােগ করিতেছিল, আমাদের কোন সভ্য সম্প্র- দায় বিপুল অর্থব্যয়ে সেরূপ আনন্দ উপভােগ করিতে সমর্থ হন না। তখনও সন্ধ্যা হয় নাই, একটিও গাছের পাতা নড়িতেছিল না--প্রকৃতি স্থির গম্ভীর ভীষণ ভাবময়ী, দেখিতে দেখিতে সমস্ত আকাশ মেঘে ছাইয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ানক ঝড় ও জল; সেরূপ দারুণবর্ষণ বহুদিন ভেলু- গ্রামবাসীরা দেখে নাই। মুহুর্মুহু অশনিপাত শব্দ সেই দারুণ ঝড়ের মধ্যে মিলিত হইয়া ভীষণ দানবের মত কিয়া থাকিয়া হুহুঙ্কার করিতেছিল। প্রবল ঝটিকায় [৫

মঞ্জরী
শিথিল মূল বৃক্ষ সকল ভূপতিত হইতে লাগিল। কাহারও
ষর পড়িয়া গেল, কাহারও চাল উড়িয়া গেল, বাহিরে
বাধা মহিষেরা দড়ি ছিড়িয়া ভীতিব্যঞ্জক শব্দ করিতে
করিতে লাঙ্গুল তুলিয়া সচল মেঘখণ্ডের মত সেই অন্ধকারে
ছুটাছুটি করিতে লাগিল। সমস্ত গ্রামবাসীর একটা
বিকট ভীত ৰােল সমুখিত হইল। এমন সময় পরপারের
তেল-গ্রাম হইতে মূহু মূহু ভেরীর ক্ষীণ প্রতিধ্বনি শ্রুত
হইতে লাগিল। সে ধ্বনি ঝালুর কর্ণে যাওয়ামাত্র
তাহার মৌয়া মদের নেশা কাটিয়া গেল। ঝালু বস্ত্র
সংবৃত করিয়া বর্ষাটী হাতে তুলিয়া লইয়া নিঃশব্দে সেই
তীষণ দুর্যোগের মধ্যে নদীতট লক্ষ্য করিয়া ছুটিল। কেহ
তাহা দেখিয়াও দেখিল না। দেখিল একজন—সেও
নিঃশব্দে একটী বর্ষা লইয়া ঝালুর অনুসরণ করিল।
মৃত্যুর ছায়ার মত সেই সূচীভেদ্য অন্ধকার সমুদ্র ভেদ
করিয়া ত্বরিতপদে ঝালু নদী তীরে আসিয়া উপস্থিত
হইল। চারিদিকে তাহার ক্ষুদ্র নৌকাখানি সন্ধান করিল,
পাইল না। যেখানে নৌকাখানি বাঁধা ছিল, সেখানে
অগাধজল, ভীষণ স্রোত উভয়কুল ভাসাইয়া দারানদী
প্রায় দ্বাদশগুণ আয়তন বারণ করিয়াছে। কালু বুঝি
৪১

মঞ্জরী
পাৰ্বতীয় নদীর বিপুল স্রোত বৃদ্ধির জন্যই তাহার নৌকা-
খানি অন্তর্হিত হইয়াছে, আর পাইবার আশা নাই।
তখন সে নিরাশ প্রাণে, নিঃস্পন্দদেহে আকাশের দিকে
হতাশভাবে দৃষ্টিপাত করিল, দেখিল অন্ধকারের পর
অন্ধকার! সম্মুখে ভীষণ খরস্রোতাদারা নদী, পশ্চাতে
চাহিয়া দেখিল, অগাধ শালবন, উর্ধে চাহিয়া দেখিল,
শালবন বাত্যা-বিক্রম-মিশ্রিত বনাদ। সেই অন্ধকারে
নদীর কি বিশাল আস্ফালন। উত্তাল-তরঙ্গমালা যেন
লক্ষ লক্ষ উৰ্দ্ধণ অজগরের মত মূহুর্মুহু ভীষণ গর্জন
করিতেছে। আবার ভেরী বাজিয়া উঠিল, সমস্ত দেহের
উষ্ণ রক্ত এক সঙ্গে ঝালুর মস্তকে প্রবেশ করিল। তাহার
বড় বড় উজ্জ্বল চক্ষু দুইটী অন্ধকারে নক্ষত্রের মত জ্বলিয়া
উঠিল। তাহার মনে হইল, প্রাতঃকালে সে পিতৃসকালে
প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছে, ভেরীর শব্দ শােনামাত্র সে
পরপারে আসিয়া উপস্থিত হইবে। হায়! বুঝি আজ
হার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতে পারিল না। তাহার বাম
হল্প ভগ্ন, এই ভীষণ তরঙ্গ ঠেলিয়া পরপারে জীবিত
অবস্থায় যাওয়া মনুষ্যের পক্ষে অসম্ভব। ঝালুর শিরায়
শিরায় তড়িৎ ছুটিতেছিল, সে উন্মত্তের মত সমস্ত নদী-
কীর অনুসন্ধান করিল; অবলম্বনের কিছুই পাইল না।

अखत्री
বাহিরে ভীষণ ঝড় ভীল-যুবকের অন্তরে তাহা অপেক্ষা
অধিক ঝড় বহিতেছিল ; উন্মত্ত ভীল-যুবক দুই হস্ত যুক্ত
করিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া ভক্তিতরে প্রাণের
আবেগে ডাকিল—হে কালি মায়ি। হামায় ওপারে
পাঠিয়ে দে। ঠিক সেই সময়ে কে তাহার অঙ্গ স্পর্শ
করিল। চমকিত হইয়া ঝালু পশ্চাতে চাহিয়া দেখিল
বিজলী। বিজলী সাগ্রহে বলিল,-“ঝালু” তুই না বলে চলে
এলি কেন? ভীলযুবক সংক্ষেপে সমস্ত ব্যাপার বলিল।
বিজলী স্থিরভাবে সমস্ত শুনিয়া দৃঢ়ভাবে বলিল, ‘তুই
ভাবছিস কেন ঝালু ? আমি তােকে পারে লিয়ে যাব।
বিস্মিত হইয়া ভীলযুবক যুবতীর মুখের দিকে চাহিল
বিদ্যুতালােকে দেখিল, যুবতীর মুখে এক স্বর্গীয় জ্যোতিঃ--
দৃঢ়তা ও কোমলতার অপূর্ব সম্মিলন। ঝালু উত্তেজিত
কণ্ঠে বলিল, তুই বলছিস কি? হামার হাত ভাঙ্গা, তুই
আমাকে কেমনে পারে লিয়ে যাবি ? যুবতী দৃঢ়স্বরে
বলিল— লিয়ে যাব, রাজাকে বাঁচাতে জান দিলে চেয়
পূণ্য আছে আমি তােকে সে পূণ্য লিতে দিব। ঠিক সেই
সময়ে আবার ভেরী বাজিয়া উঠিল—সে স্বরে বিচলিত
হইয়া বিজলী উত্তেজিত কণ্ঠে ভীলযুবকের হস্ত ধরি
বলিল, “কেন দেরী ক’চ্ছেস আয় নদীতে ঝাপ জি”,
.
[ ৪

মঞ্জরী
বিদ্যুতালােকে দেখিল, দারার বুকে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ
তাণ্ডব-নর্তনে ছুটিতেছে, আবার ভেরী বাজিল-এবার
যেন অতি দীর্ঘ, অতি ব্যাকুলভাবে ভেরী বাজিয়া উঠিল।
বিজলী বালুর গায়ে ধাক্কা দিয়া বলিল—ভাবছি কি ?
আয় আমরা নদীতে ঝাঁপ দি, তুই আমাকে ধরে সাঁতার
দে, বিজলী ঝালুকে টানিয়া নদীতীরে লইয়া গেল।
আকাশে বজ্ৰ ভয়ঙ্কর গর্জন করিয়া উঠিল, ঠিক সেই
মূহুর্তেই “জয় কালি মায়ি” বলিয়া ভীলদম্পতি নদীর মধ্যে
লাফাইয়া পড়িল।
( ৬ )
অনেকক্ষণ ধরিয়া সেই উত্তাল-তরঙ্গমালার ঘাত-প্রতি
ঘাত অতিক্রম করিয়া ভেলু-গ্রাম হইতে প্রায় দেড় ক্রোশ
দূরে ঝালুর পদ মৃত্তিকা স্পর্শ করিল। তখন ঝড় থামিয়া
গিয়াছে, আকাশ পরিষ্কার—অল্প অল্প জোছনা ফুটিতেছে,
বিজলী অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল, ঝালু তাহাকে
টানিয়া তীরে তুলিল। বিজলী তখন বড় বড় খাস
টানিতেছিল, কথা বলিবার শক্তি ছিল না-উৎফুল্ল স্নান
সৃষ্টিতে স্বামীর মুখের দিকে চাহিল, সে দৃষ্টি বড় পবিত্র,
কব্য-পালন-জনিত আনন্দ-মণ্ডিত; দারুণ পরিশ্রমে সমস্ত
৪৫ ]

মঞ্জরী অঙ্গ শিথিল, সমস্ত শক্তি যেন মূহুর্তের জন্য প্রবল হইয়া তাহার চাহনিতে ফুটিয়া উঠিল। অস্পষ্ট চালােকে ঝালু তাহা স্পষ্ট দেখিতে পাইল—কাতরকণ্ঠে ঝালু জাকিল--বিজলী ? সৈকত-ভূমি ঘিরিয়া প্রতিধ্বনিত হইল, “বিজলী”। ঠিক সেই মুহূর্তেই আবার ভেরী বাজিয়া উঠিল। কঠোর নির্ঘোষে ভেরীর আকুল আহ্বানঝালু আর স্থির থাকিতে পারিল না--কঠোর কর্তব্য তাহার হৃদয়ে জাগিয়া উঠিল। একবার বিজলীর অধরে অধর সংলগ্ন করিয়া চক্ষের জল মুছিয়া দৃঢ়ভাবে বর্ষাটী ধরিয়া বালু উঠিয়া দাঁড়াইল। আবার ভেরী বাজিয়া উঠিল। তাহার কিছু ভাবিবার অবসর নাই, দেখিবার অবসর নাই—কঠোর কর্তব্য পরায়ণ ভীলযুবক উন্মত্তের মত তীর- বেগে ভেরীর শব্দের অনুসরণ করিয়া ছুটিল। সেই নির্জন সৈকতে জ্যোৎস্নার আলােকে, মুমুর্ষ ভীলযুবতী স্বামীর ধর্মের সহায়তায় সহধর্মিণী নাম সার্থক করিয়া অতু গৌরবে স্বর্গারােহণ করিল। [৫ চুম্বক । ( ১ ) সে আজ অনেক দিনের কথা, তখন আমি হিলিতে পােষ্ট মাষ্টার ছিলাম। হিলি স্থানটী অতি মনােরম। প্রকৃতি সেখানে যেন শােভা ছড়াইয়া দিয়াছে। সেখানকার লােক- গুলি খুব সরল ছিল। আমি সেখানে সামান্য পোষ্টমাষ্টার হইয়া জমীদারের সমতুল্য মান্য পাইতাম। সেখানে একটা আশ্চৰ্য্য রহস্যপূর্ণ ঘটনা শুনিয়াছিলাম। আজ সেই ঘটনাটা বলিব। আমাদের পাড়ার জগদ্বন্ধু বাবু একজন ধনীব্যক্তি ছিলেন, তাহার অতুল বৈভব ; একমাত্র পুত্র বিনয়কুমার বড় আদরের ছেলে-ছেলে ভাল ; গ্রাম্যলে এন্টাল পড়িতেছে, এখনও বিবাহ হয় নাই। গৃহিণীর বড় ই মঞ্জরী হার অষ্টাদশ বৎসরের বিনয়ের বিবাহ দিয়া এক নববধু গৃহে আনেন। কর্তা জগদ্বন্ধু বাবু আজ নয়' ‘কাল নয় করিয়া পুত্রের এন্ট্রান্স পাশের অপেক্ষায় আছেন। বিনয় যথার্থ বিনয়ে ভূষিত। হিলির ক্ষুদ্র গ্রামের সকলেই হাকে ভালবাসিত। বিনয় প্রত্যহ ১০টার সময় হাঁটিয়াই স্কুলে যাইত ; স্কুল নিকটবর্তী—সঙ্গে কেহ যাইত । তাহার যাইবার পথে, কবরখানা বলিয়া একটা স্থান ছিল, সেই স্থানটি প্রায় এক মাইল লইয়া বেষ্টিত ; সমতল ভূমি হইতে কবরখানা অনেক উচ্চ এবং তাহা জঙ্গলে পূর্ণ ও ভীতিকর ছিল। জনশ্রুতি, বহুপূর্বে কোন মুসলমান ধনীব্যক্তির আদরের কন্যার মৃত্যুতে ঐ কবরভূমি নির্মিত হয়। ঐ খানেই সেই আদরিণী কন্যার সমাধি হইয়াছিল। লােকে বলিত কবর- থানায় ভূত আছে। কল্পনাদেবীর কোন কোন বরপুত্র জনসাধারণে গল্প করিত যে, ঐ উচ্চ ভূমিতে চন্দ্রিমার রাত্রে শুভ্রবস্ত্রে মণ্ডিত কোন স্ত্রীলােক দেখিয়াছে ; কেহ কেহ বলিত, মুখে আগুন প্রকাণ্ড এক কঙ্কাল বিশিষ্ট মনুষ্যকে মুখ হইতে অগ্নি উদগীরণ করিতে করিতে, মড়ার মাথা লইয়া খেলা করিতে দেখিয়াছে—আবার কেহ বলিত, বিশাল ভীমাকৃতি শরীর, মস্তকহীন, বক্ষে দুই চক্ষু ( ,

खत्री
সেই ময়দানে ঘুরিয়া বেড়াইতে দেখিয়াছে ; তাহার চক্ষু
হা আগুনের মত জ্বলে,—ইত্যাদি নানাপ্রকার জনরবে
দিনের বেলায়ও সেখানে গ্রামের কেহ যাইতে সাহস
করিত না। শুনা যায়—আমার পূর্বে, আমারই পথে
এখানে একজন ভদ্রলােক আসিয়াছিলেন, তাহার এক কন্যা
একদিন উল্লিখিত স্থানে বেড়াইতে যায়। বেড়াইয়া
আসিয়াই
মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এই ঘটনার পর হইতেই
উক্ত স্থানের প্রবাদ সম্বন্ধে লােকের মনের বিশ্বাস আরও
বৃঢ়তর হইয়াছিল।
( ২ )
সােমবার বিনয়কুমার স্কুলে যাইতেছিল, তখনও
১০টা বাজে নাই, দিনটা একটু মেঘলা মেঘলা, টিপ টিপ,
বৃষ্টি পড়িতেছে। রাস্তায় কাদা, ছাতা মাথায় দিয়া বিনয়
হাঁটুর কাপড় তুলিয়া স্কুলে যাইতেছিল, কবরখানার
নিকটবর্তী হইয়া তাহার মনে পূর্বের জনশ্রুতি সম্বন্ধে
নানারূপ কথা উদয় হইয়া ভীতি সম্পাদন করিতেছিল।
এমন সময় দেখিল কবরখানার মধ্যস্থলের একটা ঝােপের
আড়াল হইতে দ্বাদশ কি ত্রয়ােদশ বর্ষী বালিকা হাত,
পানি দিয়া বিনয়কুমারকে ডাকিল। বিনয় দেখিল, এমন
৪৮]

মঞ্জরী সুন্দর মুখ, এমন সুন্দর চক্ষু, এমন সুন্দর চুল ইতিপূর্বে সে কখন দেখে নাই, সে বালিকাকে কোন দেবী বলিয়া মনে করিল। সে তাহার ইঙ্গিত প্রত্যাখ্যান করিতে পারিল না ; বা সে সময় তাহার কোন ভাবের উদয় হইল না। সে যেন কিসের আকর্ষণে বালিকার নিকট গেল। বালিকা, বিনয়ের হাত ধরিয়া একটু হাসিয়া বলিল—“এখানে একটু বসিয়া যাও না।” বিনয়ের কর্ণে সুধা বর্ষিত হইল। সে কোন আপত্তি করিল না, ৰা তাহার আপত্তি করিবার কোন শক্তিই ছিল না। বালিকা বিনয়ের হাত ধরিয়া আস্তে আস্তে ঝোপের ভিতর লইয়া গেল। ঝোপের ভিতরে একটী ঘােট দরজা ছিল, সে তাহাতে আঘাত করিবামাত্র খুলিয়া গেল—তাহার সংলগ্ন সিড়ি, নীচে যাইবার পথ বলিয়া বােধ হইল। আশ্চর্যের বিষয় তাহার ভিতর সুৰ্য- কিরণে আলােকিত হইতেছিল। বিনয়কুমারকে সঙ্গে করিয়া বালিকা ভিতরে নামিয়া গেল। বালিকা বিনয়কে একখানি কোচের উপর বসাইল। গৃহটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, দুগ্ধ-ফেননি শয্যা, তাহার উপরে নানারূপ “সুগন্ধবিশিষ্ট পুষ্প ছড়ান ও অন্যান্য সুগন্ধ দ্রব্যের সুরভিতে গৃহ আমােদিত। এক পাশে একটী দেরাজের [ ৪৯

মঞ্জরী
।
উপর নানারূপ বাজাইবার যন্ত্র সজ্জিত। বিনয়ের তখন জ্ঞান
নাই, তাহার মনে হইতেছে—আমি বাড়ীতেই আছি।
সে যে কবরখানার মধ্যস্থিত গৃহে বসিয়া—তাহা তাহার
একবারও মনে হইতেছিল না। বালিকা ‘পান খাবে’
বলিয়া একটী স্বর্ণ-নিৰ্ম্মিত ডিবার মধ্য হইতে মৃগনাতি
ইত্যাদির দ্বারা সুগন্ধসম্পন্ন তাম্বুল বিনয়কুমারকে খাইতে
দিল। বিনয় মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় পান মুখে দিয়া বলিল,-ভাই,
তােমার নাম কি ? বালিকা
বালিকা একটু হাসিয়া বলিল,
‘সােফিয়া।” বিনয় হাত ধরিয়া চিবুক নাড়িয়া বলিল,-
সােফিয়া তুমি বড় সুন্দর।
লজ্জায় বালিকার গণ্ড রক্তিম
বর্ণ ধারণ করিল। সুন্দরীর সকলই সুন্দর-লজ্জানতা
সুন্দরীর অপূর্ব সৌন্দর্য্যে বিনয় আত্মবিস্মৃত হইয়া দেখিতে
লাগিল। আমােদ-আহ্লাদে দুই তিন ঘণ্টা কাটিয়া গেল।
বালিকা বলিল,-ভাই বেলা গেল, বাড়ী যাও। বিনয়ের
তখন বাড়ী যাইবার কথা মনে পড়িল, সে উঠিয়া
দাড়াইল। বালিকা বিনয়ের হাত দুটী ধরিয়া করুণ-দৃষ্টিতে
জিজ্ঞাসা করিল,-কাল আসবে ? “নিশ্চয়” এই বলিয়া
বিনয় সােফিয়াকে দুই বাহুতে জড়াইয়া ধরিয়া একটা
চুম্বন করিয়া বলিল,-এমন সুন্দর মুখ কি ভােলা যায় ?
সােফিয়া ব্রীড়াবনতমুখী হইয়া বলিল,-তবে নিশ্চয়
৫০ ]

মঞ্জরী
আসবে ? “ নিশ্চয় আসবাে”। সােফিয়া দুটী পান
আনিয়া বিনয়ের মুখে গু’জিয়া দিয়া চুম্বন প্রত্যর্পণ
করিল। বিনয় ধীরে ধীরে বাহিরে আসিয়া গৃহাভিমুখে
প্রস্থান করিল। যতক্ষণ পর্যন্ত কবরখানা দেখা গেল,
ততক্ষণ পর্যন্ত যেন সােফিয়ার মুখ তাহার গণ্ডে সংলগ্ন
ছিল। কবরখানা দৃষ্টিপথের বহিভূত হইলেই যেন
কোন অভূতপূর্ব শক্তিবলে সােফিয়ার স্মৃতি তাহার মন
হইতে অপস্মৃত করিয়া লইল। সােফিয়া সম্বন্ধে তাহার
আর কোন কথা মনে রহিল না। তাহার মনে হইতে
লাগিল, সে যেন স্কুল হইতে বাড়ী ফিরিতেছে ।
বিনয় প্রত্যহই স্কুলে যায়, প্রত্যহই সােফিয়ার সহিত
কবরখানাতে দেখাও হয়—সমস্ত দিন আমােদ
আহলাদে কাটাইয়া ঠিক স্কুল হইতে প্রত্যাবর্তন সময়ে
বাড়ীতে ফেরে। মধ্যাহ্নের কথাতাহার বৈকালে মনে
থাকিত না—কোথায় ছিলাম, স্কুলে গিয়াছিলাম কিনা,
ইত্যাদি কিছুই
তাহার মনে পড়িত না। তাহার মনে
হইত, স্কুলেই গিয়াছিলাম ; ঠিক পরদিন স্কুলে
যাইবার সময়েই আপনা আপনি সােফিয়ার কথা
[ ৫১

মঞ্জরী অহ মনে পড়িত, সে একমুহূৰ্ত্ত গৃহে থাকিতে পারি না কোন প্রকারে দুইটী অন্ন মুখে গুজিয়া কবরখানাভিমুখে গমন করিত, ভাবি দু’একটা কল্প বলিয়াই স্কুলে যাইবে কিন্তু তাহা ঘটিত না। কবরখান হইতে প্রত্যহই সােফিয়া সেই ঝুপসির পার্শ্ব হইতে হাত- ছানি দিয়া ডাকিত। বিনয় নিকটে গেলেই হাত ধরিয়া নিম্নসিড়িতে হাসিতে হাসিতে নামিয়া যাইত। বিনয়- কুমার জগৎ সােফিয়াময় দেখিত, তাহার মনে হইত, সংসার পিতা মাতা আত্মীয়স্বজন, সব একদিকে, দিকে সােফিয়া-সােফিয়াই তাহার জীবন-সূর্যের কেন্দ্র। জগদ্বন্ধু বাবু দেখিলেন, পুত্রের শরীর ক্রমশঃই ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে। বিনয়ের সে কান্তি নাই, সে লাবণ্য নাই, সব যেন শুকাইয়া গিয়াছে। পিতা ভাবিলেন, অত্যন্ত পরিশ্রম করিয়া পড়াশুনার জন্য বোধ হয় ঐরূপ হইবে। একদিন জগদ্বন্ধু বাকু বিনয়কুমারকে ডাকিয়া বলিলেন, “বাবা জীবনই মনুষ্যের সৰ্ব্বাপেক্ষা মূল্যবান বস্তু, স্বাস্থ্য তাহারই আনুসাঙ্গিক ; দেখিতেছি তােমার স্বাস্থ্য ক্রমেই খারাপ হইয়া যাইতেছে, পড়াশুনা কম করিও। স্বাস্থ্য কিলে জীবনে অনেক শিক্ষা করিতে পারিবে; নতুবা স্বাস্থ্য নষ্ট করিয়া পড়িবার কোনই প্রয়ােজন নাই।” ৫২ ]

মঞ্জরী
( 8 )
ইহার পর মাসাবধি গেল। বিনয়ের কোন স্বাস্থ্যো-
মুতি দেখা গেল না। সে যেন ক্রমেই আরাে শুকাইয়া
দুৰ্বল হইয়া পড়িতে লাগিল। যে “বিনয় ইতিপূর্বে
১৫ সের ওজনের মুগুর এক্সারসাইজ করিত, আজ সে একটা
মুগুর দুই হাতে তুলিতে কষ্ট বােধ করে। বিনয়ের এই
প্রকার অবস্থা দেখিয়া পিতা বড়ই ভীত হইলেন। গ্রামের
কবিরাজ রামশরণের মত লইয়া পুত্রকে স্কুলে যাইতে
নিষেধ করিলেন—বিনয় শুনিল না। উত্তরে বলিল,-
এক্জামিনট। নাদিয়া পড়াশুনা ছাড়তে পারিতেছি না---
বলিয়া স্কুলে গমন করিল। কবরখানার নিকটবর্তী
হইলেই সোফিয়া আসিয়া বিনয়কুমারের দুই হাত ধরিয়া
বলিল,আজ এত দেরী কল্পে কেন ? বিনয়কুমার উত্তর
করিল,—বাবা বলেছেন আর স্কুলে যাবার প্রয়ােজন
নাই। সােফিয়া প্রেম পূর্ণ সজল-নয়নে বলিল,-তাহলে
আর তুমি আসিবে না? বিনয়কুমার উত্তর করিল,--কি
ক'রে আর দেখা হবে, সােফির। ? বালিকার আর সহ
হইল না। তাহার দুই চক্ষু জলে ভরিয়া আসিল।
বিনয়ের বুকে মুখ লুকাইয়া অশ্রুজলে বিনয়ের বুক
ভাসাইয়া ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বলিল,-তবে কি তােমার
[ ৫৩

মঞ্জরী . সঙ্গে এই শেষ দেখা ? বিনয়েরও সে মর্মস্পশীকথা সহ হইল না; বিনয় দৃঢ়ত হইয়া বলিল, প্রাণ যায় সেও ভাল, লজ্জা পাইতে হয়, সেও ভাল, তবু তােমাকে ত্যাগ করিতে পারিব না। বালিকা সােফিয়া সেদিনকার মত কতকটা আশ্বস্ত হইল। একদিন দুইদিন করিয়া সপ্তাহ কাল কাটিল। বিনয় প্রত্যহই পিতার সম্মতিতেও স্কুলে যায়—তিনি আর একদিন পুত্রকে ডাকাইয়া বলিলেন, তােমাকে বােজ বারণ করি তবু স্কুলে যাও, আজ আর স্কুলে যাইও না। বিনয় কোন উত্তর না করিয়া মাতার নিকট হইতে ভাত চাহিয়া লইয়া খাইতে বসিল। আহা- রান্তে পিতার বারণ কত্ত্বেও স্কুলে গেল। পিতা যে রাগ করিবেন, ইহা বিনয়ের মনে তখন স্থান পাইল না। চুম্বকে লৌহ আকর্ষণ করিলে, লৌহকে যেমন বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও যাইতে বাধ্য করে বিনয়কেও সােফিয়া তেমনই রূপ- কণে পিতার অনিচ্ছাসত্বে যাইতে বাধ্য করি। জগদ্বন্ধু বাবুর কেমন সন্দেহ হইল, তিনি স্কুলে যাইয়া বিনয়ের নাম কৰ্ত্তন করিয়া আনিতে মনস্থ করিলেন। স্কুলে গিয়া শুনিলেন, পুত্র প্রায় তিন মাস হইল স্কুলে যায় না—শুনিয়া জগদ্বন্ধু বাবু চমকিত হইলেন। ভাবি- লেন বিনয় যদি স্কুলে না আসে, তবে যায় কোথায় ? ৫৪ ]

মঞ্জরী
বাড়ীতে ফিরিলেন, কাহাকেও কিছু বলিলেন না—এমন
কি গৃহিণীকে এ সংবাদ জানিতে দিলেন না—পরদিন
বিনয় যখন স্কুলে গেল, পশ্চাৎ পশ্চাৎ একটী ভৃত্যকে
কোথায় যায় গাের্পনে অনুসন্ধান করিবার অনুমতি
করিলেন। ভৃত্য বিনয়ের অজ্ঞাতে তাহার অনুসরণ
করিল; সে দেখিল, বিনয়কুমার কবরখানার উপর
উঠিল, তারপর আর বিনয়কুমারকে দেখা গেল না।
ভৃত্য একে ছােট লােক—তাহাতে সম্মুখেই এক আশ্চর্য
ব্যাপার দেখিয়া অন্তরে অন্তরে বড়ই ভীত হইল—সে
আর সেখানে অপেক্ষা করিল না। বিনয়কুমার পুনরায়
প্রত্যাবর্তন করে কিনা দেখিবার সাহস করিল না।
বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়া ভৃত্য বলিল,-বাবু, দাদাবাবু
কবরখানায় গেল—আর ফিরিল না। জগদ্বন্ধু বাবু শুনিয়া
আশ্চৰ্য্য হইলেন। ঠিক চারিটার সময় বিনয় প্রত্যা-
বর্ধন করিল। পরদিন বিনয় যখন স্কুলে গেল, জগদ্বন্ধু
বাবু পুত্রের অলক্ষ্যে অনুসরণ করিলেন-দেখিলেন বিনয়
কবরখানার উপরে উঠিল, আড়াল বােপের হইতে
অপ্সরাবৎ একটা সুন্দরী বালিকা আলুলায়িত কেশে
বন-বালিকার মত ছুটিয়া আসিয়া বিনয়ের হাত ধরিল।
বিনয় যেন কি বলিল, পরে উভয়ে নিকটস্থ ঝােপের ভিতর
[ ৫৫

মঞ্জরী
গেল, পরে আর কিছুই দেখিতে পাইলেন না। জগদ্বন্ধু বাৰু
আশ্চর্যান্বিত হইয়া ঝেপের নিকটে গেলেন, দেখি-
লেন তাহার ভিতরে একটী ক্ষুদ্র দ্বার। দ্বার ভিতর
হইতে ঔদ্ধ, স্থানটী মনুষ্য-পদবিক্ষেপে অপেক্ষাকৃত অঙ্গ
স্থান অপেক্ষা পরিষ্কৃত ছিল। জগদ্বন্ধু সেইখানে অনেকক্ষণ
দাড়াইয়া রহিলেন। এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা করিয়া ক্রমে
চারিটা বাজিল, সেই সময়ে সেই ক্ষুদ্র দ্বার দিয়া সোফিয়া
ও বিনয়কুমার বাহির হইল। সােফিয়া হাসিয়া হাসিয়া
কত বলিল, জগদ্বন্ধু বাবু শুনিতে পাইলেন না কেবল
এইমাত্র শুনিতে পাইলেন, “কাল আসিবে তাে ?” বিনয়
উত্তর করিল “আসিব।” এই বলিয়া গৃহাভিমুখে গমন
করিল। সােফিয়াও সেই ক্ষুদ্র দ্বার দিয়া নীচে নামিয়া
গেল। জগদ্বন্ধু বাবু পুত্রের ভবিষ্যত ভাবিতে ভাবিতে
-বদনে ধীরে ধীরে গৃহে আসিলেন। গৃহিণী
জিজ্ঞাসা করিলেন,—তুমি আজ বিষ কেন? জগদ্বন্ধু
বাবু দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন,—“আর
বিনয়কে বাঁচাইতে পারিলাম না—বুঝি তাহাকে পরীতে
পাইয়াছে।”
পরদিন ঠিক দশটার সময় বিনয় স্কুলে যাবার জন্য
প্রস্তুত হইপি বারণ করিল, পুত্র শুনিল না-
৫৬]

মঞ্জরী
জগদ্বন্ধু বাবু বিনয়কে রাস্তা হইতে ধরিয়া আনিয়া
বৈঠকখানায় বসাইলেন। বিনয় আবার যাইবার জন্য
ঘর হইতে জোর করিয়া বাহির হইল ; পিতা বাধা দিতে
পারিলেন না। এই অষ্টাদশবর্ষীয় রুগ্ন যুবকের বল
দেখিয়া জগদ্বন্ধু বাবু আশ্চর্যান্বিত হইলেন। ভৃত্যের
সাহায্যে আবার বহুকষ্টে বিনয়কে ধরিয়া আনিয়া বৈঠকখানা
ঘরে বন্ধ করিলেন। পিঞ্জরাবদ্ধ ব্যাঘ্রের ন্যায় গৃহ ভাঙ্গিয়া
বাহির হইবার জন্য বিনয়কুমার যথেষ্ট চেষ্টা করিতে লাগিল।
তখন তাহার জ্ঞান ছিল না, চক্ষু দুটী রক্তজবাবৎ হইয়াছিল,
কোন অনৈসর্গিক বস্তু যেন তাহাকে আকর্ষণ করিতেছিল।
বিনয়কুমার ঘুরিয়া ঘুরিয়া পাগলের মত বলিতে লাগিল,
সােফিয়া দাড়াও, আমি যাইতেছি—পরমুহূর্তেই সে দরজা
ভাঙ্গিবার জন্য ভিতর হইতে চেষ্টা করিতে লাগিল। আবার
‘তাশ্বাসে আগ্রহপূর্ণ ভাবে বলিতে লাগিল,—ওগো আমায়
একবার ছেড়ে দাও, একবার আমার সােফিয়াকে দেখে
আসি-সসাফিয়া! সােফিয়া ! তােমায় দেখতে পেলুন
—ইত্যাদি বলিয়া আপনা আপনি শিরে করাঘাত করিয়া
চুল ছিড়িতে লাগিল—এইরূপ যন্ত্রণা ভােগ করিয়া চারিটা
বাজিল--তখন তাহার পূর্ববৎ জ্ঞান হইল।
তাহাকে বন্ধ করিয়া রাখা হইরাছে তাবিয়া, পাইল না-
(৫৭

মঞ্জরী
তাই স্থিরভাবে জিজ্ঞাসা করিল,—বাবা আমায় বন্ধ করে
রাখা হয়েছে কেন? জগদ্বন্ধু বাবু কোন উত্তর না দিয়া
বিনয়কুমারকে ছাড়িয়া দিলেন। সমস্ত রাত্রি বিনয়ের
কোন উপসর্গ দেখা গেল না, আবার পরদিন পূৰ্ব্ববৎ বেলা
১০টার পর হইতেই বিনয়ের বিকৃতভাব দেখা দিল।
সেদিনও সেই ভাবে বন্ধ করিয়া রাখা হইল। পুনরায়
বৈকালে পূৰ্ব জ্ঞান ফিরাইয়া পাইল ; মধ্যাহ্নের কথা কিছুই
মনে পড়িল না। দিনের পর দিন গেল, এইরূপে সপ্তাহ
কাটিয়া গেল—জগদ্বন্ধু বাবু বড়ই ভীত হইলেন, পুত্রের
অবস্থা দিন দিন বড়ই শােচনীয় হইতে লাগিল। হিলির
সমস্ত ডাক্তার কবিরাজকে দেখান হইল, কেহই কোন রােগ
নির্ণয় করিতে পারিল না। কাজেই বাধ্য হইয়া পুত্রের
চিকিৎসার জন্য কলিকাতায় আসিলেন। অনেক বিজ্ঞ
ডাক্তার দেখান হইল, কোনরূপ ফল দর্শিল না। শেষে
একজন ডাক্তার বলিলেন, অতিরিক্ত অন্যায় অত্যাচারের
জন্য ঐরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে,
অবস্থা ঘটিয়াছে, একটী সুন্দরী বয়স্থা
কন্যার সহিত যত শীঘ্র পারেন বিবাহ দিন, তাহা হইলে
সমস্ত উপসর্গ সারিয়া যাইবে। ডাক্তারের মতের সহিত
জগদ্বন্ধু বাবুরও মত মিলিল। তিনি শীঘ্রই বিনয়ের বিবাহ
দিয়া কলিকাতায় বাসা ভাড়া করিয়া কিছুদিনের জন্য
৫৮ ]
*

মঞ্জরী
থাকিবেন এইরূপ মনস্থ করিলেন, কাৰ্যেও তাহাই হইল।
ঈশ্বরানুগ্রহে ক্রমে ক্রমে বিনয়কুমার সম্পূর্ণ সুস্থ হইল।
জগদ্বন্ধু বাবু কালিঘাটে জোড়া মহিষ পূজা দিয়া আট মাস
পরে পুত্র, পুত্রবধু লইয়া স্বদেশ গমন করিলেন।
আসিয়াই কবরখানার সেই ক্ষুদ্র দ্বারটী দৃঢ়রূপে গাঁথাইয়া
দিলেন।
( ৫ )
চন্দ্রকিরণ, বিধৌত সমীরণ হিল্লোলে বাড়ীর পার্শ্বের
খিড়কীর মর্মর নিৰ্ম্মিত সােপানে বসিয়া বিনয়কুমার স্ত্রীর
সহিত কথােপকথন করিতেছিল। চন্দ্রকিরণ অসীমা
সুন্দরীর সুন্দর বদনে প্রতিফলিত হওয়াতে সুন্দরবন আরও
সুন্দর দেখাতেইছিল। অমর বিনিন্দিত কৃষ্ণ অলকাগুচ্ছ
সমীরণ হিল্লোলে অসীমার বদনমণ্ডলে পতিত হইয়া
ভাসমান মেঘযুক্ত চন্দ্রের মত দেখাইতেছিল। বিনয় সেই
রূপে তন্ময় হইয়া ভাবিতেছিল - এমনসুন্দর বােধ হয়
পৃথিবীতে আর কিছুই নাই। অসীমাসুন্দরীর গলায়
একছড়া বেলফুলের মালা ছিল, সেও চন্দ্রকিরণে চন্দ্রিমার
মত স্নিগ্ধরূপে বিনয়ের চক্ষু জুড়াইতেছিল। বিনয় ভাবিতে-
ছিল, ফুলের গায়ে ফুল কেমন সুন্দর দেখায়—তাই বুঝি
{ ৫৯

মঞ্জরী, কবিরা ফুলের এত আদর করেন—তাই বুঝি প্রেমিকেরা ফুলের মালা গাঁথিয়া আদরের আদরিণীকে কত আদরে আবেগভরে গলায় পরাইয়া দেন-তাই বুঝি হিন্দুরা মাল্যবদল করিয়া ফুলের বিনিময়ে স্কুল কিনিয়া থাকে। বিনয় অসীমাসুন্দরীর হাত ধরিয়া প্রাণের আবেগে বলিল, অসীম, তুমি বড় সুন্দর। অসীমা ও প্রাণের আবেগে নিজ ভূজপাশে স্বামীর কণ্ঠদেশ বেষ্টন করিয়া তাহার গণ্ডস্থলে একটী চুম্বন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল- আর সােফিয়া ? বিনয় একটু বিষন্নতার হাসি হাসিয়া বলিল,-আমি কি এক অদ্ভুত শক্তিবলে আকৃষ্ট হইয়াছিলাম তাহা বলিতে পারি না—অসীম! তুমি দেবীপ্রতিমাসে আকর্ষণী শক্তি-ধারিণী

(হীরক খণ্ড)
(১)
তুমি
মি এত বিমর্ষ কেন রােস্তমজী?”
এই বলিয়া একটী বুবর্তী একটী যুবকের হাত ধরিয়া
তাহার মুখের দিকে চাহিল। যুবতী সুন্দরী,চক্ষু দুটা
বড় সুন্দর ; তাহার চাহনিটা আরও সুন্দর। তখন অনন্ত
নীল সমুদ্রে অস্তাচলগামী সূৰ্য্য ঢলিয়া পড়িয়া ছিল। ঝাঁক
বাধিয়া সামুদ্রিক পক্ষী শ্বেত মেঘ ধরে মত
আকাশের গায়ে ভাসিয়া যাইতেছিল। বিক্ষিপ্ত তরঙ্গ
রাশি বন্দরের তলদেশে লাগিয়া, বিক্ষিপ্ত মুরাশির

মঞ্জুরী
কায় উছলিয়া পড়িতেছিল। যুবক বােম্বের কোন বন্দরে
দাঁড়াইয়া উদাস ভাবে সমুদ্রের দিকে চাহিয়াছিলেন।
যুবতীর কথা যুবক শুনিতে পাইলেন না। যুবক বড়
চিন্তিত ; তাঁহার চিন্তার কারণ অর্থ ; সম্রান্ত বংশের সন্তান,
পিতার অতুল ধনসম্পত্তি, তিনি বােম্বের ধনকুবের বিশেষ।
যুবক তাঁহার পিতার এক মাত্র পুত্র, পিতার ইচ্ছার
বিরুদ্ধে তিনি এমেলিকে বিবাহ করিতে চান, তাহাতেই
তাহার পিতা বিরক্ত হইয়া তাহার নিতান্ত আবশ্যকীয়
খরচ পত্র পর্যন্ত বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। ঋণ করিয়া তিনি
একটা হােটেলে আছেন, ক্রমশঃই ঋণ বাড়িতেছে, পরি-
শশাধের উপায় নাই, এরূপ ভাবে কয়দিন চলিবে ? তাই
যুবক আজ বড় চিন্তিত, সুন্দরী এমেলি তাহার এরূপ
ভাব কখন দেখে নাই। সদানন্দ পুরুষ,-চিন্তা কাহাকে
বলে জানেন না; তাঁহার এই হঠাৎ পরিবর্তনে এমেলি
বড়ই আশ্চর্যান্বিতা হইয়াছেন। বােম ভিতরের কথা
এমেলিকে কিছুই বলেন নাই। এই সমুদ্র তীরে একদিন
দুইজনে কথা বলিয়া শেষ করিতে পারেন নাই, আজ সেই
রােস্তম নীরব। এমেলি আবার ডাকিল “বােস্তম”।
এইবার রােস্তমের চমক ভাঙ্গিল সে ধীরে ধীরে এমেলির
মুখের দিকে চাহিল। সে দৃষ্টি শান্ত, শীতল, মধুর প্রেমপূর্ণ
৬২]

মঞ্জরী
—কিন্তু দীপ্তিহীন ও উদভ্রান্ত। যুবতী বলিল—য়ােস্ত।
তুমি অমন কোরে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলে যে?
রােন্তম অতি যত্নে কোমল হস্তে সন্তর্পণে সাগ্রহে
বুবতীর হাত দুটী জড়াইয়া ধরিয়া
জড়াইয়া ধরিয়া বলিল—আমি আর
একবার পিতাকে বলিব, পায়ে ধরিয়া তাহার নিকট
তােমার সহিত বিবাহের সম্মতি প্রার্থনা করিব, দেখি
কি হয় ? এমেলির চক্ষু দুটী.অপূর্ণ হইয়া উঠিল, রুদ্ধকর্মে
বলিল-রুস্তম। আমার জন্য আর কত কঠোরতা
সহ করিবে ? রুস্তম একটু মৃদু হাসিল, সেই একটু হাসির
ভিতর এমেলির প্রতি তাহার উদ্বেলিত প্রেমরাশি উছলিয়া
পড়িল ; সে হাসিতে কত দৃঢ়তা, ভাষায় তাহা প্রকাশ
হয় না। ঐ ম্লান হাসিটুকুই বুঝি রুস্তমের হৃদয় ভাৰ
প্রকাশের সম্পূর্ণ উপযােগী। রুস্তম এমেলির হাত
ধরিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া গেল।
(২)
প্রাসাদ তুল্য হৰ্ম্মের সুসজ্জিত কক্ষে বসিয়া বােম্বের
ধনকুবের পান্থজী নিবিষ্ট মনে উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলােকে
হিসাবের খাতা পত্র দেখিতেছিলেন। পান্থজী কিঞ্চিৎ দীর্ঘ ও
কৃশ, সমস্ত চুলদাড়ি শুভ্র। চক্ষু উজ্জ্বল ও সতেজ,ললাট কিঞ্চিৎ

মরী
কুঞ্চিত দেখিলেই দৃঢ় চেতা বলিয়া মনে হয়। ধীরে
ধীরে রুস্তমজী সেই কক্ষে প্রবেশ করিল। পদশকে
একবার বৃদ্ধ মুখ তুলিয়া দেখিলেন, চলমার ভিতর হইতে
তাহার উজ্জ্বল চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল; ইঙ্গিত করিয়া পুত্রকে
সম্মুখস্থ আসনে বসিতে বলিলেন, আবার তেমনি নিবি
মনে হিসাবের খাতা পত্র দেখিতে লাগিলেন। প্রায়
অর্ধবণ্টা কাল পি পুত্র নীরব! তাহার পর কাগজ
পত্র গুছাইয়া রাখিয়া চেয়ারখানি একটু পুত্রের নিক
টানিয়া লইয়া পুত্রের মুখেরদিকে স্থির দৃষ্টি রাখিয়া
গম্ভীর স্বরে বলিলেন রুস্তম! বােধ হয় তুমি তােমা
ভুল বুঝিতে পারিয়া থাকিবে। রুস্তম বলিলেন, আমি
কিছুই করি নাই, কিন্তু আপনি আমার প্রতি এরূপ
নিষ্ঠুর ব্যবহার করিতেছেন কেন?
কেন? তুমি এমেলিকে পরিত্যাগ কর।
আমি তাহা পাৱিব না, আপনার পুত্র হইয়া আমি
প্রবঞ্চক হইব কিরূপে? এমেলি আমাকে বিশ্বাস করে,
আমি বিশ্বাস ভঙ্গ করিতে পারি না। পিতা মার্জনা
করুন, এমেলিকে বিবাহের অনুমতি দিন। দৃঢ়স্বরে
বৃদ্ধ বলিলেন—তাহা কখনই হইবে না। তুমি এমেলিকে
বিবাহ করিতে পারিবে না। দুড়িটা, দেখিতেছি,

মঞ্জরী
তােমাকে একেবারে যাদু করিয়াছে। “না বাবা আমিই
অপরাধী, আমিই তাহাকে দেখিয়া প্রথম মুগ্ধ হইয়াছিলাম,
সরল বিশ্বাসে সে আমায় ভাল বাসিয়াছে, তাহার কোন
অপরাধ নাই ” তুমি কি বলিতে চাও, তুমি আমার বিরুদ্ধে
এমেলিকে বিবাহ করিবে ? না তাইতাে আপনার নিকট
অনুমতি প্রার্থনা করিতেছি ; এমেলির উচ্চবংশে জন্ম।
তাহা আমি জানি কিন্তু দরিদ্র,জানি সে সুন্দরী,
কিন্তু ভবিষ্যতে তােমার লাভের কোনই সম্ভাবনা নাই।
সম্ভাবজীর কন্যার সহিত তােমার বিবাহ দিতে চাই,
তাহার কন্যাটও মন্দ নয়, ভবিষ্যতে তুমিই তাঁহার অতুল
বিভবের অধিকারী হইবে।
পিতা আমি আপনার এক মাত্র পুত্র। আপনার
কোন বিষয়েরই অভাব নাই—এই বােম্বাই নগরে আপনি
প্রধান ধনী।
তাহা জানি; কিন্তু আরও বড় হইতে দোষ কি?
উপস্থিত সময়ে অর্থোন্নতি সমাজ উন্নতির প্রকৃষ্ট উপায়,
এরূপ অবস্থায় বুদ্ধির দোষে তাহা নষ্ট করা উচিত নয় ;
অতএব তুমি এমেলিকে বিবাহের অশ। পরিত্যাগ কর।
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া রুস্তমজী কছিল—অর্থ
অপেক্ষা কি এসংসারে আর কিছুই প্রার্থনীয় নাই ?
[ ৬৫

মঞ্জরী
থাকিতে পারে কিন্তু বড় একটা কিছু দেখিনা
অর্থই সম্মান, অর্থ ভিন্ন এসংসারে কোন সুখই হয় না।
না বাবা! আরাে কিছু আছে—সে শান্তি, সরল নিঃস্বার্থ
প্রণয় ; আপনি অনুমতি করুন আমি সেই পরম শান্তি
লাভ করি ।
কিঞ্চিৎ ক্রুদ্ধস্বরে পান্থজী কহিলেন—আমাকে অধিক
বকাইও না, শান্তি কি তাহা বুঝিবার এখনও তােমার
বয়স হয় নাই, আমি তােমার শুভই করিব, পরে বুঝিবে
সন্তাবজীর কন্যাকে বিবাহ করায় তােমার কি লাভ
হইয়াছে ?
কাতরকণ্ঠে রুস্তম কহিল, আপনার চরণে নিয়তই
অপরাধ করিতেছি, আপনি চির স্নেহময় আমার প্রতি
কঠোর হইবেন না। এমেলিকে বিবাহ করিবার
অনুমতি দিন, বলিয়া রুস্তমজী পিতার চরণ স্পর্শ করিল,
পান্থজী উঠিয়া দাঁড়ালেন, দৃঢ়স্বরে পুত্রকে বলিলেন—তাহা
কখনই হইবে না, আমার মতের বিরুদ্ধে চলিলে, তােমার
পক্ষে অশুভ হইবে। দ্রুতপদে বৃদ্ধ কক্ষ হইতে বাহির
হইয়া গেলেন। সেই হৰ্ম্মতলে পড়িয়া যুবক একবার
জানালার দিকে চাহিল, নীল আকাশ সহস্র চক্ষু প্রসারিত
করিয়া প্রেম-পূর্ণ দৃষ্টিতে ধরণীর প্রতি সাগ্রহে চাহিয়া

মঞ্জরী
আছে। স্থির, ধীর, অচঞ্চল একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া
ধীরে ধীরে রুস্তম কক্ষ ত্যাগ করিল।
(৩)
“ঋণদায় বড়দায়”। ক্রমশঃই রুস্তম ব্যতিব্যস্ত হইয়া
পড়িতে লাগিল। ধনী সন্তান, সংযত হইয়া চলিতে শিক্ষা
করে নাই, এ অবস্থাতেও সে পৃদ্মের স্বভাব পরিত্যাগ
করিতে পারিল না। ঋণ ক্রমশঃই বাড়িতে লাগিল।
এ অর্থ কষ্টে অপমানের হাত হইতে কেমন করিয়া নিস্তার
পাওয়া যায়, স্তম কেবল তাহাই চিন্তা করিতে লাগিল।
এক দিন রুস্তম বােম্বাইয়ের এক বিখ্যাত রত্নবণিকের
দোকানে গেল ; রত্নবণিক তাহাকে চিনিত , পূর্বে বহু
লক্ষ টাকার জহরত তাহার নিকট বিক্রয় করিয়াছে।
খুব সম্মানের সহিত রত্নবণিক স্বয়ং রুস্তমের অভ্যর্থনা
করিল। রুস্তম রত্নবর্ণিককে বলিল--আমাকে এমন এক
খণ্ড হীরক দিতে পারেন, যাহার আর একখানি পাওয়া
দুষ্কর। রত্নবণিক একখানি হীরক দেখাইলেন—সচরাচর
সেরূপ হীরক দেখা যায় না। রুস্তমজীও হীরক চিনিতেন--
দুষ্প্রাপ্য বুঝিতে পারিয়া সেইখানিই লইবার ইচ্ছা প্রকাশ
করিলেন। পাঁচলক্ষ টাকা মূল্য স্থির হইল। রুস্তমজী
[ ৬৭

মঞ্জরী
কিছুদিন পর মূল্য পরিশােধ করিবেন, বলিয়া হীরক খণ্ড
গ্রহণ করিলেন। রত্নবণিক বিশেষ কোন আপত্তি করিল
। কারণ সে রুস্তমজীকে চিনিত, বােম্বাইয়ের বিখ্যাত
ধনকুবেরের পুত্রের নিকট পাঁচ লক্ষ টাকা আদায় করা
বিশেষ কষ্টকর নয়, তাহা তাহার ধারণা ছিল। রুস্তম
হীরক খণ্ড আনিয়া আর একটী জহরতের দোকানে
আড়াই লক্ষ টাকায় বাঁধা রাখিল। বাজারের ঋণ সমস্ত
পরিশােধ করিয়া দিয়া পূৰ্ব্বাপেক্ষা নিজেদের বাসস্থান
ও আহারাদির বন্দোবস্ত অপেক্ষাকৃত ভাল করিল।
এমেলি এসমস্ত লক্ষ্য নিল : কিন্তু ভিতরের কথা
কিছুই জানিতে পারিল না।
( 3 )
কলসীর জল গড়াইয়া খাইলে কয়দিন থাকে ? বিশেষ
রুস্তমের পক্ষে এ অর্থ অতি সামান্য। আবার ক্রমশঃ
ঋণ দায়ে জড়িত হইয়া পড়িতে লাগিল, রুস্তম আবার
বিষঃ হইল, আর তেমন ভাবে এমেলির সহিত ভাল
করিয়া কথা বলে না, সর্বদাই কি চিন্তা করে। এমেলি
তাহা লক্ষ্য করিল। সরলা বালিকা রুস্তম ভিন্ন এসংসারে
কিছুই জানে না। রুস্তমের সুখেই তাহার সুখ-রুস্তমের
দুঃখেই তাহার দুঃখ-রুস্তমের সঙ্গে সঙ্গে এমিলিও

মধুরী দিন দিন মলিন হইয়া পড়িল-রুস্তম তাহা লক্ষ্য করিল ; রুস্তমের বুক ভাঙ্গিয়া যাইতে লাগিল। আবার কি উপায়ে অবস্থার পরিবর্তন হইবে রুস্তম কেবল তাহাই চিন্তা করিতে লাগিল। একদিন রুস্তুম আবার সেই রত্ন- বণিকের সহিত সাক্ষাৎ করিল। বুবণিক টাকার কথা কিছু তুলিলেন না; তিনি জানিতেন, সুযােগ হইলেই রুস্তম তাহার টাকা পরিশােধ করিবে। রুস্তম রত্ন- বণিককে বলিল, শীঘ্রই আমি আপনার টাকা পরিশােধ করিব, কিন্তু উপস্থিত আমি বড় বিপদে : পড়িয়াছি, আপনার সেই হীরক খণ্ড আমার প্রিয়তমার অত্যন্ত পছন্দ হইয়াছে, তিনি ঠিক এইরূপ আর একখানি হীরক চান, আপনাকে সংগ্রহ করিয়া দিতেই হইবে; মূল্য আপনি যাহা চান আমি তাহাই দিব। রত্নবণিকের চক্ষু উজ্জল হইয়া উঠিল। তিনি ভাবিলেন, একটা মস্ত সুযােগ, প্রেমের দায়ে আমি যাহা চাই, রুস্তমজীকে সেই মূল্যেই হীরক খণ্ড ক্রয় করিতে হইবে। বুতুবণিক মাথা চুলকাইয়া ধীরে ধীরে বলিলেন—তাইতাে বড় মুন্মিলে ফেলিলেন। ঠিক ঐরূপ আর একখানি হীরক খণ্ড কোথায় পাইব? বিশেষ তাহা দুষ্প্রাপ্য জিনিষ—যাহোক আপনাকে পনের দিন পর আমি দিতে পারিব কি না

মঞ্জরী
তাহার উত্তর দিব। রুজী বলিলেন,--তাহা হইলে
আপনি কিছু বায়না গ্রহণ করুন। রত্নবণিক ভাবিল
উপস্থিত এ চটা দর স্থির করিয়া বায়না লইলে ভবিষ্যতে
অধিক লাভের সম্ভাবনা থাকিবে না। তাই সে একটু
ইতস্ততঃ করিয়া বলিল—দেখুন জিনিষ আমার দোকানে
নাই, কত মূল্যে সংগ্রহ করিতে পারিব তাহাও স্থির নাই
এরূপ অবস্থায় কিরূপে আপনার নিকট বায়না গ্রহণ
করি ?—জিনিষ সংগ্রহ হইলে যাহা হয় একটা মূল্য স্থির
করিয়া লইবেন। রুস্তমজী একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া
বলিল—যাহােক আপনি চেষ্টায় থাকিবেন। নতুবা
আমার মান থাকে না। রুস্তমজী চলিয়া গেল। রত্নবণিক
একটা মস্ত দাও হাতে আসিয়াছে ভাবিয়া উৎফুল্ল হইয়া
উঠিল।
৫
৫ ।
পরদিন রুস্তমজী সংবাদ পত্রে তাহার হীরক খণ্ডের
মত আর একখানি হীরক খণ্ডের জন্য পূর্ব পরিচিত
রবণিকের বিজ্ঞাপন দেখিলেন, মূল্য চারিলক্ষ টাকা
নির্ধারিত করা হইয়াছে। এইরূপে এক সপ্তাহ কাটিয়া
গেল-সংবাদ পত্রে দেখিলেন, বঙ্গবণিক হীরকখণ্ডের
• ]

মঞ্জরী
জন্য দশলক্ষ টাকা দিতে প্রস্তুত। তিনি তাহার এক ধনী
বন্ধুর সহিত সাক্ষৎ করিলেন, তাহার নিকট হইতে আড়াই
লক্ষ টাকা লইয়া হীরকখণ্ডটী মহাজনের নিকট হইতে
ছাড়াইয়া আনিয়া বন্ধুর হস্তে দিয়া বলিলেন—এইরূপ এক
খানি হীরক খণ্ডের জন্য বােম্বের বিখ্যাত রত্নবণিক
দশলক্ষ টাকা মূল্য দিবে বলিয়া বিজ্ঞাপন দিয়াছে।
তুমি এই হীরকখণ্ড খানি তাঁহার নিকট লইয়া গিয়া
বিক্রয় কর, তােমার টাকা বাদে আমার টাকা আমায়
ফিরাইয়া দিও। হীরকখণ্ড কাহার প্রকাশ করিও না।
তাহাতে আমার সম্মানের লাঘব হইবে। বন্ধু স্বীকৃত
হইলে—লুব্ধ বণিক অধিক লাভের আশায় হীরকখণ্ড
দশলক্ষ মুদ্রায় ক্রয় করিলেন। হীরকখণ্ড বিক্রয়ের দুই
চারিদিন পর পূর্বকৃত হীরকের সমস্ত টাকা পাঠাইয়া
দিয়া রতুবণিককে একখানা পত্র দিলেন “মহাশয় আপনার
হীরকের মূল্যের টাকা পাঠাইলাম, পূর্বে আপনাকে যে
হীরকের কথা বলিয়া ছিলাম উপস্থিত তাহা আমার
প্রয়ােজন নাই।” দুরাকাঙ্ক বণিক কেন অধিক লাভের
আশায় পূর্বে বায়না লয় নাই, ভাবিয়া আপনার বুদ্ধিকে
ধিক্কার দিতে লাগিল।
( ৩১

অঞ্জরী
( ৬ )
যখন সময় ভাল আসে তখন ধূলা ধরিলে সােণা হয়।
কন্তমজীরও তাহাই ঘটিল। রুস্তমজী হীরক বিক্রয়ের
টাকায় আমদানী রপ্তানীর ব্যবসা খুলিল। দুই বৎসরের
ভিতর রুস্তমজী বােম্বাই নগরের একজন, বিখ্যাত বণিক
হইয়া উঠিল। তাহার আর অর্থের কষ্ট নাই। আর
দুশ্চিন্তায় তাহাকে অনিদ্রায় নিযাপন করিতে হয় না।
এমেলিও রুস্তমেরসুখে সুখী। প্রফুল্ল কমল তখন আরও
প্রফুল্ল হইয়া উঠিয়াছে। বৃদ্ধ পান্থজী দেখিলেন, পুত্র
উপার্জনক্ষম, তাহার আনন্দ হইল আর পুত্রের উপর
রাগ রহিল না। তিনি সাদরে এমেলির সহিত রুস্তমের
বিবাহ দিয়া তাহাকে পুত্রবধু রূপে গ্রহণ করিলেন।
একদিন সন্ধ্যায় উদ্যানস্থিত হ—প্রাসাদ কক্ষে বসিয়া
সাদরে রুস্তম এমেলির হাত দুটী ধরিয়া বলিলেন—আমার
সৌভাগ্যের কারণ কি জান? এমেলি আগ্রহপূর্ণ দৃষ্টিতে
রুস্তমের মুখের দিকে চাহিল—তখন পুষ্পগন্ধপূর্ণ মন্দ মলয়
ধীরে ধীরে এমেলির কৃষ্ণকুঞ্চিত কেশরাশি আন্দোলিত
করিতেছিল। রুস্তমজী বলিলেন-“এই হীরক খণ্ড”।
একখানি অত্যুজ্জ্বল বৃহৎ হীরক খণ্ড এমেলির হতে
২ ]

ছিলেন। গৃহের আলােক-জ্যোতিতে তা আর
উল দেখাইতেছিল। তিনি হীরক সম্বন্ধীয় সময়
ঘটনা এমিলিকে বিবৃত করিয়া বলিলেন,-এই হীরক খ
পুনরায় দশ লক্ষ মুদ্রায় ক্রয় করিয়া আনিয়াছি। ইহা
তুৰি যত্ন করিয়া রাখিও। স্মরণ রাখিও
মরণ রাখি আমাদের
সৌভাগের মূল এই “হীরক খও”।
s

দ, হন্দ্রাণী ইন্দ্রা-ইন্দ্রাণী” ওকি ?—বলিয়া ভয়বিহ্বল। বিমলচন্দ্রের নবপরিণীতা পত্নী সুলােচনা বিমলচন্দ্রকে জড়াইয়া ধরিল। তখন রাত্রি গভীর-নৈশবায়ু জানালার পার্শ্ব হইতে ইহুঙ্কার শব্দে গৰ্জন করিতেছিল। অল্প অল্প বৃষ্টিও পড়িতেছিল। বিমলচন্দ্র চমকিত হইয়া বলিলেন-- তুমি এত ভয় করিতেছ কেন? লােচনা আরও ভীত হইয়া বলিল--ঐ শােন। বিমলচন্দ্র স্থিরকর্ণে শুনিলেন, কে যেন সেই দুর্যোগের মধ্যে নৈশবায়ু শব্দ ভেদু করিয়া গম্ভীরস্বরে ডাকিতেছে--ইন্দ্রা-ইন্দ্রাণী ; বিমল- চন্দ্র একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন-আহা! ও বড় দুর্ভাগা! সুলােনা বলিলেন—কে দুর্ভাগা ? বিমল- ৭ ] মঞ্জরী চন্দ্র বলিলেন,-যাহার স্বরে তুমি ভয় পাইতেছিলে। বল কি ? ও কি মানুষের স্বর? বিমলচন্দ্র বলিলেন- হাঁ। সুলােচনা বলিল—এই দুৰ্যোগে পশুপক্ষীও যে এ সময় আশ্রয় ত্যাগ করে না, এমন সময় কি মানুষে বাড়ীর বাহির হয়? বিমলচন্দ্র দুঃখ-বিজড়িত স্বরে একটী দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিলেন-আমি ঐ দুর্ভাগ্যের জীবনী বলিতেছি, তুমি শােন- “এই গ্রামের নিকটেই শ্যামপুকুর বুলিয়া একটী গ্রাম আছে, সেই গ্রামে শ্ৰীশচন্দ্র চক্রবর্তী বলিয়া একটী ভদ্র- লােক বাস করিতেন, তিনি এ গ্রামের নূতন বাসিন্দা, কোথা হইতে আসিয়াছিলেন কেহ জানিত না, কেবল তাহার স্ত্রী ভিন্ন আর কেহই সঙ্গে ছিল না। শ্রীশচন্দ্রের বাবহারে গ্রামের সকলে তাহার একরূপ অনুগত হইয়া পড়িল। শ্রীশচন্দ্রের সুকণ্ঠ ছিল, আমিও তাহার গান শুনিয়াছি—সেই তাহার ইম রাগিণীর “নাথ! আমি এসেছি তােমার চরণতলে ঐ শান্তি-স্নিগ্ধ করুণা-নীরে ডুববাে বলে।” আজিও আমার অন্তরের স্তরে স্তরে গাঁথা আছে। “এক বৎসর দুই বৎসর ক্রমে তিন বৎসর কাটিয়া গেল ; সুখবসন্ত পবনহিল্লোলিত নবপুস্পটীর মত, ঐশ- [ ৭৫

ত্রের সী ইত্রাণ সুখবায়ু-হিল্লোলে, হিল্লোলিত হইতে
ছিল, তখন কেহই জানিতে পারে নাই, কেহই বুঝিতে
পারে নাই, কোন মুহূর্তে এই সুখ-পবন ও মুখশান্তির
কাল হইবে । একদিন সন্ধ্যাকালে যখন চন্দ্র কিরণ
ঐশচন্দ্রের কুটীর-সম্মুখস্থ উদ্যান-বাটীকা উদ্ভাসিত করিয়া,
নীলবসনাত লজ্জাবতী নববধূর ন্যায় ধীর-পদবিক্ষেপে
সৌন্দৰ্য্যগরিমা ছড়াইয়া কৃষ্ণ-মেঘান্তরাল হইতে উকি
দিতেছিল, দু একটা পাপিয়া নিস্তব্ধ-রজনীর নিস্তব্ধতা
ভঙ্গ করিয়া অন্তর কাপাইয়া গগনপ্রান্তে মিশাইয়া
ৰাইতেছিল, ঠিক সেই সময়ে একটী যুবক তাড়াতাড়ি
শচন্দ্রের পতাকুঞ্জ হইতে বাহির হইয়া গেল। পর
মুহূর্তেই যেন সৌন্দর্য্যের কোন জীবন্ত-মূৰ্ত্তি চারিদিক
চাহিয়া চকিতহারিণীর ন্যায় চঞ্চলচরণে শচন্দ্রের বাটীর
খিড়কী দরজা দিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। কিছুক্ষণ
পরে শ্রীশচন্দ্র সেই গৃহে আসিলেন। শ্ৰীশচন্দ্র ডাকিলেন—
ইণি! ইন্দ্রাণী শুনিতে পাইল না। চঞ্চল বায়
ইন্দ্রাণী অঞ্চল লইয়া তখন নব-কৌতুকে মত্ত ছিল।
আবার শচন্দ্র তাকিলেন-ইজ্জাণি! এইবার ইন্দ্রাণ
চমক ভাজিল ; চাহিয়া দেখিল সম্মুখে শ্রীশচন্দ্র। চন্দ্র
বলিলেন-ইত্যাণী তােমার চোখে জল কেন? ইজা
৭ ]

মঞ্জক্ট।
বলিল—কই না? স্বর কিন্তু তখনও অ-বিজড়িত
ছিল। তারপর অনেক কথাবার্তা হইল। কিন্তু হিমানি
আবৃত চন্দ্রের ন্যায় স্বচ্ছমূৰ্ত্তি হইলেও কেমন একটু
বিষন্নতার ভাব ইন্দ্রাণীতে রহিয়াই গেল। শ্ৰীশচন্দ্র দুই
হাজার টাকা স্ত্রীর নিকট রাখিয়া বলিলেন—সিন্দুকের
ভিতর রাখিয়া দাও। ইন্দ্রাণী ধীরে ধীরে নােটগুলি
প্রাচীরে গ্রথিত সিন্দুকের ভিতর রাখিয়া দিলেন।
“ইহার দুই চারিদিন পরেই সেই:লতামণ্ডপে একটী
যুবক ধীরে ধীরে আসিয়া প্রবেশ করিল। কিছুক্ষণ
পরে ইন্দ্রাণীও চারিদিকে চাহিয়া আপনাকে যেন লুক্কাইত
করিয়া চঞ্চল-চরণে সেই লতামণ্ডপে প্রবেশ করিল।
লতামণ্ডপে যে যুবক ইন্দ্রাণীর জন্য অপেক্ষা করিতে-
ছিল, সে ইন্দ্রাণীকে দেখিয়াই বলিল—তুমি তো সবই
জান, তােমার স্বামীর নিকট আমার আর মুখ দেখাইবার
পথ নাই, তাঁহার নিকট হইতে দুই হাজার টাকা
লইয়া ব্যবসায় প্রবৃত্ত হই, অর্বাচীন মূখ আমি, পরের কথায়
ইহাতে নাবিয়াছিলাম ; ব্যবসা না শিখিয়া অব্যবসায়ীর
মত ব্যবসা করিতে গেলে, লােকসান হওয়া যে স্বতঃসিদ্ধ
তাহা আমি তখন বুঝি নাই; দৃষ্টিহীন মুখের ভবিষ্যৎ
যাহা হওয়া উচিত, আমারও তাহাই হইয়াছে। যাহারা
t

सपनो দোকান হইতে পারে জিনিষ লইয়াছেন-“আজ দিন, কাল দিব” করিয়া এক পয়সাও দিতেছেন না; অথচ আমার মহাজনের টাকাও যথেষ্ট বাকী—সমস্ত দোকানে জিনিৰ বিক্রয় করিয়া প্রায় এক হাজার টাকা হইবে; কিন্তু আমার বাজারে দেনা তিন হাজার টাকা, এই টাকা দিতে পারিলে, আমার ব্যবসা মাটী হইবে। পরিশেৰে আমাকে টাকার জন্য জেলে যাইতে হইবে। তাই আমি বড় বিপদে পড়িয়া তােমার নিকট আসিয়াছি, তুমি আমাকে কোনরূপে দুই হাজার টাকা সংগ্রহ করিয়া দাও। ইন্দ্রাণী শুকমুখে যুবককে বলিল,--টাকাটা তা কাছে চাও না কেন? তিনি অবশ্যই দিবেন। যুবক বলিল--জানি তিনি দিবেন, কিন্তু তাঁহার নিকট চাহিবার আর যে মুখ নাই। তাহার নিকট যাওয়া অপেক্ষা জেলে খাওয়া আমার সহস্রগুণে ভাল। ইন্দ্রাণী নিশ্চল প্ৰন্তৰ- মৃত্তির ন্যায় ধীরভাবে যুবকের সন্ত কথাগুলি শুনিল। কণ্ঠস্বর কেমন যেন ভাঙ্গা ভাঙ্গা করিয়া ইন্দ্রাণী বলিল— আচ্ছা দিব, কল্য সন্ধ্যার সময় তুমি আসিও। যুবক আহলাদে অব্যক্ত কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হৃদয়ে ইন্দ্রাণীর দিকে চাহিল, তাহার চক্ষু ফাটিয়া জল ঝরিতেছিল,—কিছুক্ষণ বুবকের মুখে কথা সরিল না। পরে ধীরে ধীরে বাপ ৭৮] মঞ্জরী কণ্ঠে বলিল, ইষণ ! আজ তুমি আমার প্রাণদান করিলে, এ গণ পরিশােধের শক্তি আমার নাই-বলিয়া যুবক বিদায় লইল। ইন্দ্রাণীও চক্ষু মুছিয়া বাড়ীর ভিতর গেল । “সময় কাহারও জন্য অপেক্ষা করে না; কিন্তু কেহ এই সময় স্থায়ী হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে ; কেহ শীঘ্র কাটাই- বার জন্য ব্যস্ত হয়। দারুণ দুশ্চিন্তায় ইন্দ্রাণীর নি হইল না। প্রাতঃকাল হইল, ফল-ফুল-শােভাময়ী পৃথিবী অনন্ত শােভাবিস্তার করিয়া হাসিতে লাগিলেন। দিন কাটিল, সন্ধ্যা হইল এক একটী করিয়া তারা উঠিয়া সব নীল গগন ভরিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে চাদও উঠিল। মৃদুমন্দ বায়ুহিল্লোলে কুঞ্জবনস্থ সমস্ত পম্পরাশি হাসিল। এমন সময় ঐশচন্দ্র ইন্দ্রাণীর কক্ষে প্রবেশ করিলেন। সেদিনও ইন্দ্রাণী জানালার দিকে চাহিয়া যেন কি দেখিতেছিল, কি যেন ভাবিতেছিল-প্রীশচন্দ্র ইন্দ্রাণীকে ডাকিলেন-- আদর করিয়া এ বিমর্ষতার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। ইন্দ্রাণী একটু বিষাদের হাসি হাসিয়া বলিল—কই কিছু না। চন্দ্র বলিলেন--ইন্দ্রাণী শুধু আজ নয় আজ কয়দিন হইতে তুমি কি এক রকম হইয়া গিয়াছ কেন? আমাকে থুলিয়া বল। ইন্দ্রাণী পূৰ্ব্ববৎ হাসিয়া বলিল—কই কিছু মা এমন সময় শচন্দ্র হঠাৎ একবার জানালার দিকে [ ৭৯

মঞ্জরী
চাহিলেন। দেখিলেন, একটা লােক (অবশ্য ভদ্রলোক
বলিয়াই বােধ হইল) বাহির হইতে জানালা দিয়া ঘরের
ভিতর উকি দিয়া দেখিয়া তৎক্ষণাৎ নীচে নামিয়া গেল।
শ্রীশচন্দ্র চমকিত হইয়া বলিলেন-ও কে ইন্দ্রাণী ও
ইন্দ্রাণীর মুখ শুকাইয়া গেল। বাতাহত-কদলীপত্রবৎ
কঁপিতে লাগিল। কম্পিতকণ্ঠে বলিল—কই কিছু না।
বল কি ? কিছু না, আমি যে স্বচক্ষে একটী লােককে
জানালায় উকি দিতে দেখিলাম। শ্ৰীশচন্দ্রের সন্দেহাগ্নি
জ্বলিয়া উঠিল। সে ভাব ইন্দ্রাণীকে বুঝিতে না দিয়া
বলিলেন-লােকটাকে আমি বাহির হইতে দেখিয়া আসি।
চঞ্চলকণ্ঠে ইন্দ্রাণী --কিছু না, তােমার মিছে সন্দেহ—এই
ৰলিয়া শ্ৰীশচন্দ্রের হাত ধরিল। শ্ৰীশচন্দ্রের সন্দেহাগ্নি
দ্বিগুণ মাত্রায় জ্বলিয়া উঠিল। তিনি ইন্দ্রাণীর হাত ছাড়াইয়া
তখনি বাহিরে গেলেন। এ দিকে কিছুক্ষণ পরেই ইন্দ্রাণী
আলমারি খুলিয়া কতকগুলি নােটলইয়া কম্পিতপদে সেই
কুঞ্জবনে প্রবেশ করিল, দূর হইতে শ্রীশচন্দ্র সব দেখিলেন,
প্রচ্ছন্নভাবে শ্ৰীশচন্দ্র ইন্দ্রাণীর অপেক্ষা করিতে লাগি-
লেন। কিছুক্ষণ পরেই ইন্দ্রাণী ও যুবকটী কুঞ্জবন হইতে
বাহির হইল। যুবক কি যেন বলিয়া বাগানের বাহিরে
চলিয়া গেল। ইন্দ্রাণী বাড়ীর ভিতর গেল। শ্ৰীশচন্দ্র
• ]

মঞ্জ সৰু লক্ষ্য করিলেন। হতে বন্দুক ছিল, ইচ্ছা করিলে যুবকের মস্তকের খুলি উড়াইয়া দিতে পারিতেন; কিন্তু আহা করিলেন না। অসহনীয় অব্যক্ত যাতনা নীরবে বলে চাপিলেন। আজ তাহার মনে হইল এ সংসার দেবতা বচনা নয়, ইহা দৈত্যের কল্পনারও অতীত ; সুন্দর কান্তি, এমন বিমল জ্যোতিঃ, এমন মাধুরী মাখান হাসি, ইহাতেও এত কুটিল, ইহাতেও এত অবিশ্বাস। বিক প্রেম ! ধিক্ সংসার ! কাহাকে বিশ্বাস কৰিব ? এই বলিয়া শচন্দ্র সেস্থান পরিত্যাগ করিলেন। “আমার মাথা ঘুরিতেছে, সমস্ত শরীরে কে যেন আগুন ধরাইয়া দিয়াছে, উঃ কি যন্ত্রণা! বলিয়া ইন্দ্রাণী শষ্যায় পার্শ্ব পরিবর্তন করিল। পার্শ্বে ঐশচন্দ্র বসিয়া বলিলেন- তাইতাে যন্ত্রণা বাড়িল কেন ? নাও, এই আর এক পাশ ঔষধ খাও। গো-ও ঔষধে যেন নাক জ্বলিয়া যায়, যাতনা আরও বৃদ্ধি হয়। কে বলিল, পাগল না কি!-- বলিয়া শ্ৰীশচন্দ্র একদাগ ঔষধ চালিয়া ইন্দ্রাণীকে খাওয়াই- লেন। ইন্দ্রাণও মনুমবুক পুড়িয়া গেল—বলিয় বক্ষস্থল চাপিয়া ধরিল। ঐশচন্দ্র তীব্র হাসি হাসিয়া বলিলেন—পরের বুকে আগুন আলিয়া দিলে নিজের বুকেও অমনি করিয়া আগুন জলে। ণিী কার- { ৮১ মী নয়নে শ্রীশচন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—আমি কার বুকে আগুন দিয়াছি? ধন মেঘমালা বিতাড়িত বিদ্যুতের ন্যায় ভয়ঙ্কর ভাবে একটু হাসিয়া কর্কশকণ্ঠে ঐশচন্দ্র বলিলেন—কাহার বুকে আগুন জ্বালাইয়া । দিয়াছ জান না? ইন্দ্রাণী আবার শ্রীশচন্দ্রের মুখের দিকে চাহিল, সে চক্ষুতে কত প্রেম কত ভালবাসা শ্ৰীশচন্দ্র তাহা দেখিয়াও দেখিলেন না। শ্ৰীশচন্দ্র গর্জিয়। বলিলেন-মৃত্যুর সময় মিথ্যা কথা বলিয়া পাপের বােঝ। বাড়াইও না। তেমনি কাতর উদ্বেগপূর্ণ দৃষ্টিতে তেমনি কোমল-মধুরস্বরে ইন্দ্রাণী বলিল—আমি তােকই মিথ্যা কথা বলি নাই। শ্রীশচন্দ্র বলিলেন—মিথ্যা কথা বল নাই, অবিশ্বাসি, দ্বিচারিণী স্বামীর বুকে আগুন জ্বালাইয়া দেও নাই ? ইন্দ্রাণী বিস্মিত হইয়া বলিল- স্বামীর বুকে ? শ্ৰীশচন্দ্র আর কঠোর বিকৃতস্বরে বলি- লেন-ই-আজ কুঞ্জবনে গােপনে কাহার সহিত দেখা করিতেছিলে ? “ইন্দ্রাণী বলিল—ও তাই আমাকে সন্দেহ করিয়াছ? শ্ৰীশচন্দ্র বিকৃতকণ্ঠে বলিলেন-সন্দেহের আর অপরাধ এখনও সত্য কথা বলিয়া পাপের প্রায়শ্চিত্ত কর, মৃত্যুর বেশী বিলম্ব নাই, আমি তােমাকে ঔষধ বলিয়া বিষ ৮২]

মঞ্জুরী
হইয়াছিল,
দিয়াছি। ইন্দ্রাণী গম্ভীরস্বরে বলিল—তাহাতে আমার
দুঃখ নাই, তুমি বলিলে আমি নিজ হস্তে বিষ খাইতে
পারিতাম, যদি তােমার সন্দেহই
তবে
আমাকে কেন মরিতে বলিলে না, আমি নিজে নিজেই
মরিতাম—কেন মিথ্যা সন্দেহে ভগবানের চরণে অপরাধী
হইলে ? শ্ৰীশচন্দ্র বলিলেন-পাপীয়সি! ভগবানের পবিত্র
নাম তােমার ও পাপমুখে শােভা পায় না। আমি তাে
পাপী ; পাপী না হইলে, এ সুখের সংসারে এ যন্ত্রণা
কেন পাইব ?, জান না ইন্দ্রাণী—জান না, আমার বুকে
যে আগুন জ্বালাইয়া দিয়াছ, শত সহস্র কেন, কোটী
কোটী নরকে সে অগ্নি নাই ; আমার আবার পাপে ভয়
কি? আমার আবার নরকে ভয় কি? ইন্দ্রাণী কাতরকণ্ঠে
বলিল—তুমি মিথ্যা সন্দেহে এ দারুণ যন্ত্রণা ভােগ
করিতেছ ; আমি সত্য বলিতেছি আমি নির্দোষী ;
শ্ৰীশচন্দ্র তীব্র হাসি হাসিয়া বলিলেন—পাপীয়সি তুমি
নির্দোষী? ইন্দ্রাণী বলিল-হ। আমি নির্দোষী-
সহস্রবার নির্দোষী। ভগবান যেরূপ সত্য ও পবিত্র
আমিও সেইরূপ পবিত্র ; তুমি যাহাকে কুঞ্জবনের ভিতর
দেখিয়াছিলে, সে আমার দাদা প্রফুল্লকুমার।
“কি বলিলে, ইন্দ্রাণী সত্য নাকি ? তবে কি আমি
[৮৩

তোমাকে মিথ্যা সন্দেহে বিষ দিয়াছি।
বিষ দিয়াছি। হ্যা মি
সন্দেহে—তুমি মহাপাপী, নরাধম—বলিয়া একটী ফুল্লকান্তি
যুবক সেই গৃহে প্রবেশ করিল। বজ্রাহত ব্যক্তির ন্যায়
শচন্দ্র স্তম্ভিত হইয়া চাহিয়া দেখিল সম্মুখে প্রফুল্লকুমার।
ইন্দ্রাণী কাতকঠে বলিল—দাদা তুমি মিথ্যা সন্দেহ
করিতেই—ওঁর কোন দোষ নাই, আমি নিজে বিষ
খাইয়াছি। শ্ৰীশচন্দ্র কম্পিতকণ্ঠে বলিলনা, প্রফুল্লবাৰু
আমি স্ত্রী হত্যাকারী নারকী। সন্দেহের বশবর্তী হইয়া
আমার স্বর্ণ প্রতিমাকে আমি স্বহস্তে বিষ দিয়াছি-
জান না প্রফুল্লবাবু জান না—আমি ঔষধ বলিয়া বিষ
খাওয়াইয়াছি। সরলা অবলা আমার কথা বিশ্বাস করিয়া
সেই বিষ সুধা বলিয়া পান করিয়াছে। প্রফুল্ল কাদিয়া
বলি-কাহারও দোষ নয়, এ দোষ আমার--আমি
কেন লুকাইয়া টাকা চাহিতে আসিয়াছিলাম তােমার
কাছে চাহিতে আমার বড় লজ্জা করিয়াছিল, অথচ
সমুখে কারাগার, তাই অনন্যোপায় হইয়া ইন্দ্রাণীর
নিকট টাকা লইতে আসিয়াছিলাম। হায়! হায়!
গােপন করিতে গিয়া কি সর্বনাশ করিলাম। ইন্দ্রাণী
কাতকণ্ঠে বলিল—দাদা কাদিও না। এ সময় চোখের
আল কেন? আমার সময় হইয়াছে, আমি এইবার যাই,
৮৫ ]

মঞ্জরী
এই বলিয়া শচন্দ্রের প্রতি চাহিয়া বলিল--নাথ! আমি
তােমার দাসী, তােমার কোন দোষ নাই ।
এ ভ্রান্তি
জগতে ঘটিয়া থাকে ; তােমার কাছে যদি আমি সমস্ত
গােপন না করিতাম, তাহা হইলে এ সৰ্ব্বনাশ ঘটিত না।
কেহ যেন স্বামীর নিকট কখনও কিছু গােপন না করে--
গোপন করার ফল বড় বিষয়।
লুকান কাজ একটাও
ভাল নয়। আপনার দেবতার অজ্ঞাতে কোন কাজ করিতে
নাই। আমি তাই করয়াছি বলিয়া এই প্রায়শ্চিত্ত
হইতেছে আমার আর কোন দুঃখ নাই—দুঃখ তোমায়
ছাড়িয়া যাইতে হইতেছে ; আমি যে তােমার মন হইতে
সন্দেহ দূর করিয়া যাইতে পারিলাম, ইহাই আমার যথেষ্ট
সৌভাগ্য। তাই বলিতেছি, একবার তেমনি করিয়া
তেমনি সাদরে ইন্দ্রাণী বলিয়া ডাক--আমি তােমার
চরণ ধূল লইয়া সুখে, মরি।- ইন্দ্রাণীর মুখ প্রফুল্ল হইয়া
উঠিল, সে হাত বাড়াইয়া স্বামীর পদধূলি মসুকে লইল।
অনুতাপদগ্ধ ব্যাকুল শ্ৰীশচন্দ্র ‘ইন্দ্রাণী” বলিয়া ইন্দ্রাণীর
বুকের উপর পড়িলেন, সেই মুহূর্তেই সতী-লক্ষ্মী, সরল।
ইন্দ্রাণী সতীলােকে প্রস্থান করিল।
“ইহার পর হইতে আর কেহ শ্ৰীশচন্দ্রকে দেখিতে পায়
কেবল মধ্যে মধ্যে অন্ধকার রাত্রে ৪৪ রান
নাই।

মঞ্জরী
প্রামের লােকে শুনিতে পায়—কে যেন নিকটস্থ শশানে
হৃদয়বিদারক স্বরে গগন বিদীর্ণ করিয়া ডাকিতেছে-
“ইন্দ্রা। ইন্দ্রাণি।”
৮ )

== প্রথম পত্র। নিঝরিণীর সহিত ফুলশয্যার রাত্রিতে যখন প্রভাত- কুমারের প্রথম কথা হয়, তখন সে নিঝরিণীকে প্রত্যহ পত্র লিখিতে অনুরােধ করে। নিঝরিণী স্বীকারও করিয়াছিল। দুঃখের বিষয় একদিন দুইদিন করিয়া সপ্তাহ কাটিল, তবুও নিঝরিণীর পত্ৰ আসিল না। প্রভাত অনেক ভাবিয়। চিন্তিয়া চারি পৃষ্ঠাপূর্ণ একখানি প্রেমপত্ৰ উৎফুল্ল হৃদয়ে-- নেক সােনার স্বপৰমানস নয়নে দর্শন করিয়া—অতি সন্তর্পণে একদিন বৈকালে মােড়ের ডাক বাক্সে ফেলিয়া দিল। মধ্যাহে যখন নিঝরিণী পিত্রালয়ে হাসিয়া খেলিয়া ছােট ভাই, বােন, দিদি প্রভৃতির সহিত ভাত লইয়া কাড়াকাড়ি, ছড়াছড়ি করিতেছিল, এমন সময় প্রভাত [ ৮৭

মঞ্জরী
কুমারের সেই সষ-রঞ্জিত লিখিত খামের চিঠিখানি
পৌছিল। পিয়ন বাহিরে পত্র লইবার জন্য ডাকা-
ডাকি করিতেই নিঝরিণীর ছােট ভাই নলিন ছুটিয়া গিয়া
পত্রখানি আনিয়া নিঝরিণীর হাতে দিল। নিঝরিণীর
বুক
কঁপিতে লাগিল। ( বলা বাহুল্য সে স্বামীর চিঠি
বুঝিতে পারিয়াছিল । লজ্জায় তাহার দুই চক্ষু বুজিয়া
আসিতে লাগিল। চিঠিখানি দেখিতেও সাহস হইল না
কি করিবে ভাবিয়া পাইল না। দৌড়িয়া গিয়া তাহার
শয়ন গৃহের দরজা বন্ধ করিয়া দিল। তাহার হাতে যে
তখন উচ্ছিষ্ট ছিল তাহা তাহার স্মরণেই আসিল না।
তাড়াতাড়ি চিঠিখানি খুলিয়া -ফেলিল ; ঠিক এমন সময়ে,
কার চিঠি, বরের চিঠি বুঝি, বলিতে বলিতে তাহার দিদি
প্রভৃতি সকলেই সেই দরজায় ধাক্কা দিতে লাগিল।
নিঝরিণীর চিঠিখানি আর পড়া হইল না, বা পড়িবার
সাহসও হইল না। টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া প্রভাত
'কুমারের বড় সাধের, বড় আদরের পত্রখানি জানালা
দিয়া ফেলিয়া দিল। কে জানে সেই সময় তাহার হাতখানি
কেন ঝাপিয়া উঠিল। সরলা নিঝরিণী বুঝিল না—সামান্য
কারণেও পুরুষের চঞ্চল মন সব সময় সত্য কারণ উপলব্ধি
না করিয়া মিছামিছি একটা ভয়ঙ্কর কাৰ্য করিয়া ফেলে।
৮৮ ]

সেই সঙ্গে সে তাহার সুখের পথের প্রথম কষ্টক সৃজন
করিল।
এ দিকে প্রভাত প্রত্যহ দুইবার করিয়া ডাকের
সন্ধান লইতে লাগিল; পিয়ন আসিলেই প্রভাত সকলের
আগেই দৌড়িয়া যায়; অনেকেরই চিঠি আসে, কিন্তু
প্রভাতকুমার যাহার চিঠি চায় তাহার চিঠি আসে না।
পিয়নের উপর প্রভাতের বড় রাগ হইতে লাগিল। কিন্তু
এ অবস্থায় আমরা প্রভাতকে দোষী করিতে পারি না।
মানবের স্বভাবই এইরূপ। আশায় আশায় অনেক দিন
গেল--তবুও-নিঝরিণীর পত্র আসিল না। এবার নিঝরি-
শীর উপর প্রভাত কুমারের বড় রাগ হইল। সে অার
নিঝরিণীকে ভালবাসিবে না,আর তাহার মুখ দেখিবে না-
প্রতিজ্ঞা করিল ও অন্য বিবাহ করিয়া নিঝরিণীকে জব্দ
করিবে তাহাও মনে মনে স্থির করিল। প্রভাতকুমারের
মনে হইতে লাগিল,চিঠি না লিখার কারণ আর কিছুই
নয়—হয়ত নিঝরিণী তাহাকে পছন্দ করে না, বা ভাল
বাসে না। নিঝরিণীর চিঠি পাইবার যত বিলম্ব হইতে
লাগিল-প্রভাতকুমারের হৃদয়ের আগুন ক্রমেই তত
বাড়িতে লাগিল। সংসার অনভিজ্ঞ অর্বাচীন যুবক
জানিত না, শিম বরের বালিকা একদিনে স্বামীকে
[ ৮৯

মঞ্জরী
স্বামী বুঝিয়া ভালবাসিতে পারে না, এরূপভালবাসাও নিতান্ত
অসম্ভব; বালিকা এক দিনেই আপনার ভবিষ্যত বুঝিয়া
লজ্জা ত্যাগ করিতে পারে না; হৃদয়ের সাধ থাকিতেও
হৃদয় খুলিয়া ভালবাসার কথা বলা বা হৃদয়ের ভাব প্রকাশ
করিয়া পত্র লেখাও অনেক সময় সম্ভব পর নয়। নিঝরি-
ণীরও লজ্জা বশতঃ আজ লিখিৰ কাল লিখিব করিয়া আৰু
পৰ লেখা হইল না।
একদিন দুইদিন করিয়া বৎসর কাটিল, প্রভাত কুমা-
বের হৃদয়ের সেই অলীক বিশ্বাস বাড়িল বই কমিল না ।
পিতামাতা বুঝিলেন, পুত্রের ভবিষ্যত দাম্পত্য সুখ তাহারা
নষ্ট করিয়াছেন। প্রভাতকুমার মায়ের বড় আদরের
ছেলে। প্রভাতের মাতার প্রভাত ভিন্ন আর কোন
সন্তানাদি ছিল না। সে একদিন মাতাকে বলিল, আমার
অন্য বিবাহ দাও নতুবা আমি গৃহে থাকিব না। মাতা
অনেক বুঝাইতেন, চঞ্চলমতি যুবক কিছুতেই বুঝিত না।
সময় বুঝিয়া একদিন প্রভাতের মাতা পুত্রকে বলিলেন,
“বাবা! যাহার সহিত বিবাহ দিয়াছি তাহাকে কি
ভাসাইয়া দিব ? সে বালিকা—তাহার কি অপরাধ
বাবা? এখানে আসিলেই সব সারিয়া যাইবে, আমি
এই মাসেই ফেমাকে আনিব।” প্রভাতকুমার বলিল,-

মঞ্জরী ও বউ দেখ মা, আমার স্পষ্ট কথা শােন, অামি এই বিবাহে সুখী নই, আমার অন্য বিবাহ দিতে পার দাও, নতুবা যেমন আছি সেই ভাল। আনিলে নিশ্চয়ই আমি বাট পরিত্যাগ করিব, এই বলিয়া দ্রুতপদে সে স্থান হইতে প্রস্থান করিল। মা পুত্রের ভাব দেখিয়া বড়ই বিমর্ষ হইলেন। তাহার চক্ষু দিয়া জল পড়িল। ভাবি- লেন, আহা! সরলা বালিকার কি অপরাধ ? ভগবান এ কি করিলে ? প্রভাতের সুমতি দাও। একটা কা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি--এখানে সে কথাটা বলা প্রয়ােজন। প্রভাতকুমারের বাড়ীর পাশে রামহরি বসু নামে একজন দরিদ্র কায়স্থ বাস করিতেন। তাহার একটা মাত্র কন্যা ছিল। তাহার নাম অপমা- অনুপমার বয়স বার কি তের বৎসর হইবে ! অবস্থার অস্বচ্ছলতা বশতঃই অনুপমার পিতা অনুপমার বিবাহ এ পর্যন্ত দিতে পারেন নাই। আজ কাল আমাদের ঘরে ঘরে এই অবস্থা; অনেক দরিদ্র ব্যাও এইরূপ বিবাহ যােগ্যা বয়স্থা কন্যা লইয়া বিব্রত; কি করিবে সমাজের অবস্থা যেরূপ-তাল ঘরে বিবাহ দিতে হইলে, বহু টাকার প্রয়ােজন। দরিদ্রের পক্ষে যে কি ভয়ানক, যাহার বিবাহ- যােগ্য কন্যা গৃহে, তিনি সম্যক অবগত আছেন।

মঞ্জরী
;
অনুপমার পিতা উপস্থিত বড়ই বিব্রত; কন্যাকেও গৃহে
রাখিতে পারেন না। ভাল পাও মিলে না। স্বামী স্ত্রীর
মুখে অন্ন উঠে না, অনুপমাই, তাহাদের এখন আলােচ্য
বিষয় হইয়া দাড়াইয়াছে। পূৰ্বে পাত্ৰাপাত্র বিবেচনা
করিতেন, এখন সে বিবেচনারও অবসর নাই। যাহা হউক
যেরূপ হউক কোনএকটী পাত্রের হস্তে কন্যা সমৰ্পণ করিতে
পারিলেই নিশ্চিন্ত হন। অনুপমা দেখিতে মন্দ নহে।
প্রভাতকুমার প্রত্যহ সন্ধ্যার সময় বাড়ীর ছাদে বসিয়া
আপন ভবিষ্যত কত ভাবে; কিন্তু ভাবিয়া কুল পায় না।
আকাশে যেমন অনন্ত মেঘ,একের পর একে আকাশ
ছাইয়া ফেলে; সেইরূপ প্রভাতকুমারেরও হৃদয়গগন চিন্তায়
আচ্ছন্ন, ক্ষণকাল ও অশাস্তির বিরাম নাই ; তাহার চিন্তার
অন্তু নাই। একদিন প্রভাতকুমার সন্ধ্যায় ছাদে বসিয়া
আছে, আকাশের চাদ হাসিতেছে । মনচোরা মধুপবন
চাদের অময়িকর হরণ করিয়া জগৎময় ছড়াইয়া দিয়া
সংসারতাপিত জীবকে একটু প্রফুল্ল করিতেছে। বােধ হয়
প্রভাতও সে অমিয় কিরণে সুখী হইত; কিন্তু কই প্রভাত
কুমারের তাে হৃদয় জ্বালা জুড়াইল না,—তাহার অনন্ত
চিন্তা অবিরাম গতিতেই চলিয়াছে। পাশের ছাদে অনুপমা
বসিয়া আকাশ পাতাল কি ভাবিতেছিল। তাহার মনে
৯২।

মঞ্জরী
হইতেছিল, আমি জন্মাইলাম কেন? আমি না জন্ম গ্রহণ
করিলে তাে পিতা মাতার হাসি মুখ ভার হইত না—হে
জগদীশ্বর ! হে লজ্জা নিবারণ ! হে তাপহারী মধুসূদন !
আমায় তােমার চরণে স্থান দাও। আমি আমার ফুটো-
মুখ এই অনন্ত আশা-ফুল যৌবন লইয়া তােমার চরণে
করিয়া যাই। আর যদি তা না হয় আমার উপায় কর,
পিতা মাতা নিশ্চিন্ত হউন। সে সময় মলয় পবন পূর্ণিমার
চঁাদকে লইয়া বড় রঙ্গ করিতেছিল। কোথা হইতে সব কাল
কাল মেঘগুলিকে ডাকিয়া আনিয়া চাদের হাসিমুখ ভাৰ
করিয়া দিতেছিল। সমীরণের রঙ্গ দেখিয়া থাকিয়া থাকিয়া
মেঘের আড়াল হইতে চাদ একবার হাসিতেছিল।
সেই সময় প্রভাতকুমার শিশির-সাত যুঁই ফুলের
মত অশ্রুসিক্ত বালিকাকে দেখিল। প্রভাতকুমার জগৎ
ভুলিয়া গেল ; সে যেন এরূপ শোভা আর দেখে নাই;
অনিমেষ নয়নে সেই অনুপমার অনুপম রূপ রাশি দেখিতে
দেখিতে তন্ময় হইয়া গেল। তাহার মনে হইতেছিল,
অনুপমার রূপ দেখিয়া যেন চাদ তাহার মেধের ঘোমটা
টানিয়া দিয়া মুখ লুকাইয়া ঘোমটার আড়াল হইতে উঁকি
দিয়া সে অনিন্দ্য-রূপসুধা পান করিতেছিল। ঠিক সেই সময়
অনুপমার মনে হইতেছিল, চাদ বুঝি তার দুঃখ বুঝিয়া
[ ৯৩

মঞ্জরী বিব বদনে সরিয়া যাইতেছে। এমন সময় মা ডাকিলেন ; অনুপমা “যাই মা” বলিয়া একটা সুদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া নীচে নামিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে প্রতাতকুমারেরও জীবনের ােের পরিবর্তন ঘটিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনেরও পরিবর্তন হয়। নিঝরিণীর স্বভাবও পরিবর্তন হইয়াছিল। বিবাহ প্রায় তিন বৎসর হইয়া গিয়াছে এখন সে আর দশম বর্ষীয়া বালিকা নহে, এখন নিঝরিণীর ত্রয়ােদশ বর্ষীয়া কৈশােরী। এখন তাহার ভাল মন্দ বুঝিবার অনেকটা ক্ষমতা হইয়াছে এবং স্বামীর প্রতি প্রজাপতির নির্বন্ধ- সূত্রে অনুরাগও বৃদ্ধি পাইয়াছে। একদিন বৈকালবেলা ছাদে বসিয়া অনেক কাটিয়া কুটিয়া কম্পিতহস্তে আজ এই তিন বৎসরের পর প্রভাত কুমারকে পত্র লেখার জন্য অনেক ক্রটী স্বীকার করিয়া—অতি নম্রভাবের একখানি পত্র লিখিল ; কিন্তু অদৃষ্টে দুঃখ থাকিলে, সুখ, কিছুতেই আসে না। যথা সময়ে পত্রখানি পৌছিল, প্রভাতকুমার সে পত্র ঘৃণায় পড়িল না। পত্র খানি পড়িলে হয়ত ভ্রম অনেকটা দূর হইত। প্রভাতকুমারের তখন অনুপমার অনুপম রূপ জ্যোতিঃতে হৃদয়াকাশ আচ্ছন্ন হইয়া ছিল। সে গগনপটে প্রথম বিকিরণের ন্যায় নিক বিণীর মূর্তি প্রকাশ না ৯ ] মঞ্জরী হইতেই গাছ মেঘে তাহ আচ্ছন্ন করিয়াছিল। অনেক কথা কাটাকাটির পর,অর্থ-লােলুপ প্রভাতের পিতা পুনরায় প্রভাতের বিবাহের স্থির করিলেন। মনে মনে ভাবিলেন, দোষ কি? অনেকেই তাে দুইটী বিবাহ করিয়া থাকে, তাহাতে পুত্রও সে বিবাহে সুখী নয়, কিছু অর্থও পাওয়া যায়, পরিশেষে ভাবিলেন, ইহাতে পুণ্য ভিন্ন পাপ নাই। কেন না বিপন্ন কন্যাদায়গ্রস্ত লােকের কুল রক্ষা করা হইতেছে। বলা বাহুল্য কন্যাদায়গ্রস্ত রামহরি বসুই প্রভাতের সহিত কন্যার বিবাহের স্থির করিয়াছিলেন। ক্রমে বিবাহের দিন আসিল। প্রভাতকুমারের হৃদয়ে আর আনন্দ ধরে না। সে দিনরাত্রিই কেবল অনুপ- মার সুন্দর মুখখানি ভাবিতে লাগিল। এ বিবাহে সকলেরই আনন্দ। প্রভাতের মাতাও নিমরাজি গোছ হইয়াছেন,--কি করিবন, প্রভাতের পিতারও মত, আর পুত্রেরও ইচ্ছা-কাজেই তাহার অমত করিবার উপায় নাই; কেবল একজনের এ আনন্দেও আনন্দ নাই—সে আর কেই নয়--প্রভাতের খুল্লতাত ভ্রাতা ধীরেন্দ্রমােহন, সে কেবল ভাবে আহা! বালিকা, তাহার কি অপরাধ? কেন দাদা তাহাকে পরিত্যাগ করিতেছেন। তাহার উপায় কি হইবে? বীরেন্দ্র তঁহার জ্যেষ্টতাত মহাশয়ের

মঞ্জরী
ব্যবহারে বড়ই মর্মাহত হইয়াছিল, আর সময় নাই,
বিবাহের দিন নিকটত্তী। ধীরেন্দ্রমােহন সকলকেই
অনেক করিয়া বুঝাইল। তাহার কথায় কেহই কর্ণপাত
করিল না। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া সে নিঝরিণীকে এক
পত্র লিখিল, পত্রে লেখা ছিল, আপনার স্বামী
অন্য বিবাহের জন্য বড়ই ব্যগ্র হইয়াছেন এখন আপনি
ছেলে মানুষ নহেন। আপনার ভাল মন্দ আপনার
হাতে, যাহা ভাল বিবেচনা করেন, তাহাই করিবেন।
এ ঘাের বিপদের সময় আপনার এখানে উপস্থিত
থাক। নিতান্ত প্রয়ােজন। পত্র যথা সময়ে পৌছিল।
নিঝরিণী পত্র পড়িয়া অনেক কাদিল, আপনার অদৃষ্টকে
আপনার বুদ্ধিকে যথেষ্ট ধিক্কার দিয়া পত্ৰ খানি তাহার
মাতার নিকট দিল। পত্র পড়িয়া মাতাও ভয়ানক ব্যস্ত
হইলেন, কৰ্ত্তাও শুনিলেন--নিঝবিণীর দাদাও শুনিল।
বাড়ীতে হঠাৎ বৈশাখী ঝড়ের মত একটা হুলুস্থুল
পড়িয়া গেল। নিঝরিণীর দাদা প্রতিজ্ঞা করিলেন, এ
বিবাহ যদি বন্ধ করিতে না পারেন, তবে তিনি আর
দেশে ফিরিবেন না।
কাল বিবাহ, নিঝরিণীর দাদা প্রভাতের নিকট,
প্রভাতের পিতার নিকট অনেক কাকুতি মিনতি
৯]

মঞ্জরী
লাক,
করিলেন। এভাতের পিতা বড় কঠিন लिनि
মৃদু হা করিয়া বলিলেন, “পূর্বে আসিলে হইত—এখন
আমি কি কৰিব? ভদ্র লােককে কথা দিয়াছি,উল্টাইতে
ঙ্গে পারি না” ইত্যাদি নানা কথায় নিরিণর ভ্রাতার
মুখ বন্ধ করিয়া বিদায় দিলেন, নিঝরিণীর ভ্রাতা বিফল
মনােরখ হইয়া ফিরিলেন। কলিকাতায় তাহার অনেকগুলি
সহপাঠী ছিল,সকলকেই তঁাহার এই বিপদের কথা জানা-
ইলেন। সকলেই প্রতিজ্ঞা করিল, যাহাতে এ বিবাহ
হয় তাহাই করিবে। তখনই কি একটা পরামর্শ
হইয়া গেল।
কি সর্বনাশের কথা! আজ বিবাহ, বর নাই--
লােকের কর জাতি যায়-প্রভাতের পিতা পুত্রে
অনুসন্ধান করিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ পুত্রের কোন
সন্ধান পাইলেন না। ক্রমে সন্ধ্যা হইল। লয় উপস্থিত,
রামহরি বাবু চৰুে ধুতুরাফুল দেখিতেছিলেন।
এ দিকে
একজন নিরীহ ভদ্রলােকের জাতি যায়, ও অপর দিকে
প্রভাত নাই। প্রভাতের পিতা বড়ই বিপদে পড়িয়াছেন।
*এত টাকার লােভও পরিত্যাগ করিতে পারেন না~~~~
অথচ প্রভাতকে পাওয়া যাইতেছে না—নিতান্ত অনিচ্ছা
সওে সেই সঙ্গে আপন ভ্রাতুস্পুত্র শীরেন্দ্র মােহনের

মঞ্জরী সহিত অনুপমার বিবাহ কাৰ্য্য সম্পাদন করিলেন । ইহাকেই বলে প্রজাপতির নির্বন্ধ। এ দিকে একটা পুরাতন গলির ভিতর কোন একটা জীর্ণ কক্ষে প্রভাতকুমার সংজ্ঞাশূন্য অবস্থায় শায়িত, পার্শ্বে অপরূপ রূপলাবন্যসম্পন্ন একটী যুবতী বসিয়া বাতাস করিতেছে। যুবতী অনিমেষ-লােচনে প্রভাত- কুমারের মুখের দিকে চাহিয়া আছে। হৃদয়ের কি ভাব জানি না, কিন্তু দর্শনলিপ্সা যেন মিটিতেছে না। প্রভাতকুমার ধীরে ধীরে চক্ষুরুন্মীলন করিল। সে স্বপ্নে দেখিতেছিল, অনুপমার সহিত তাহার বিবাহ হইতেছে-- কিন্তু অনুপমা দিতেছে—পার্শ্বে ধীরেন্দ্র, তাহারও চকে জল ; প্রভাতকুমারের বিবাহে তত আনন্দ হইতেছিল । সব আনন্দই যেন ভাসা ভাসা-অস্থায়ী ভাবের তরঙ্গ একটির পর একটি হৃদয়ে মিলাইয়া যাইতেছিল। এমন সময় আকাশে পূর্ণজ্যোতির মত কি এক অপূৰ্ব আলাে তরঙ্গ উথিত ক্রমে সেই জ্যোতির মধ্য হইতে একটী কিশােরী সুন্দরী হাসিতে হাসিতে একছড়া ফুলের মালা আদর করিয়া প্রভাতের গলায় পরাইয়া দিল, প্রভাতেরও হাত যেন ইচ্ছা কি অনিচ্ছাসত্বে সে অনুভব করিতে পারিল না) আপন গলার মালাছড়াটী সেইপ্রস্ফুটিত কুসুমবৎ বালিকার ১৮ হইল।

মঞ্জরী
গলায় পরাইয়া দিল। প্রভাতকুমার সবিস্ময়ে তাহিয়া দেখি,
বালিকাকে মেযেন কোথায় দেখিয়াছে। ভাল মনে পড়িতেছে
। এমন রুপ যেন অনুপমারও নয়। আহ! কি স্বর্গীয়
দেবী মূর্তি। ক্রমে ক্রমে মনে পড়িল, বালিকার মুখ যেন,
নিঝরিণীর মত। জাগ্রত হইয়াও বিষ্ময়ে দেখিল, পাশে
সেই স্বপ্ন-দৃষ্টা বালিকা-প্রভাতের মনে হইতেছিল, সে
যেন তখনও স্বপ্ন দেখিতেছে। সে বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা
করিল, তুমি কে গা? বালিকা যেন একটু অপ্রতি
হইয়া উত্তর করিল-“আমায় চিন্তে পাচ্ছ না? আমি
নিঝরিণী”।
“তুমি নিঝরন্ট’ আমি কি স্বপ্ন দেখছি? বালিকা
লজ্জাবনত হইয়া বলিল, না স্বপ্ন দেখছেন না।
প্রভাত। আমি কোথায় ?
নিঝরিণী। আমাদের ভাড়াটীয়া বাড়ীতে।
প্রভাত। আমি এমন কোরে এখানে এলাম ?
নিঝরিণী। আপনি আপনার কোন বন্ধুর বাড়ীতে
খেলা কুরিতে ছিলেন, আমার দাদা সেখান থেকে কি
যেন একটা ওষুধের সাহায্যে অজ্ঞান করে আপনাকে
এনেছেন। আমি আপনার চরণে অনেক অপরাধ করি-
যাছি, আমায় মার্জনা করুন।

মঞ্জ
ৰালিকা পদক প্রভাতের পা দুখানি জড়াইয়া
ধরিল। প্রভাতকুমার অতি যত্নে বালিকার দুই হ
এৰি সেই ফুল্লাবিন্দনিন্দিত অঙ্গ আপন অঙ্গে মিশাইল
অশ্রুসিক্ত-করে প্রভাতকুমার বলিল, নিঝরিণী আমি
নিতান্ত মুর্থ, তাই তােমা হেন অঙ্গেও
করিয়াছিলাম।
নিরিণীর সে আদর হৃদয়ে রাখিবার আর স্থান হইল
না, আদরে প্রভাতের ক জড়াইয়া ধরিয়া বলিল,-
মােৰ কাৰু নয়, দেখ ধু সেই প্রথম পত্রখানিয়।
১]

শিক্ষিত।
হরিপ্রসন্ন কলিকাতায় হে মাষ্টারি করিয়া
৭৫, পঁচাত্তর টাকায় স্ত্রী চঞ্চাকে লইস। একটা ক্ষুদ
সুখের সংসার পাতিয়া ছিলেন। পত্নী চঞ্চলা একটু
চঞ্চলাই ছিল, কেননা
চঞ্চলার সরউষিত যৌবন
তাকে একরূপ অস্থির করিয়া তুলিয়াছিল। চঞ্চল--
সুন্দরী ; কেঁকড়া কোকড় কাল কাল কেশগুচ্ছ চঞ্চলার
পৃষ্ঠদেশ সৰ্ব্বদাই আচ্ছন্ন করিয়া রাখিত ; চ-কাধিবার
সখ, তাহার বড় ছিল না। স্বামী স্কুলে যাওয়ার পর,
সমস্ত দুপুর বেলা চঞ্চল--বঙ্কিম, দীনবন্ধু, কাজকৃষ্ণ,
গিরীশ ইত্যাদি গ্রন্থাবলী লইয়া একরূপ কাটাইয়া দিত।
চঞ্চলার বর্ণ গৌর, হাত পাগুলি রাঙ্গা পদ্মের মত, ঠোঁট
দুখানি রাঙ্গা টুকটুকে ক্ষুদ্র,
ক্ষীণ-কটী, কোমল
[১০১
v
উচ্চ-ৰক্ষ,

শরীর, জগতের সব সৌন্দর্য যেন তাহাতেই মিশিয়া রহিয়াছে। চঞ্চলা রাস্তার ধারে পবাক্ষের খড়খৰি খুলিয়া গাড়ী, ঘােড়, লােকজন দেখিয়া দেখিয়া ভাবিত, এ অনন্ত জনস্রোত ফুরায় না কেন? আবার চারিটা বাজিবার পূব্বেই, রান্না ঘরে যাইয়। স্বামীর জন্য দু চার- থানা পবেটা, একটু তরকারী ও মােহন ভােগ তৈয়ারী করিয়া কার্পেটের আসনখানি বিছাইয়া জলখাবার সাজাইয়া রাখিত। বারান্দায় কলসী করিয়া জল মানিয়া ঘটার উপর গামছা ইত্যাদি সমস্ত প্রস্তুত করিয়া রাখি। হরিপ্রসন্ন গৃহে আসিয়া দেখিতেন, তাহার গৃহ- লক্ষ্মী সমস্ত প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছে। চুটীয়া গিয়া চঞ্চলা স্বামীর চাপকানের বােয়াম, জুতার ফিতা ইত্যাদি সযত্নে খুলিয়া দিত। হরিপ্রসন্ন বালিকা-পত্নীর যত্নে • ময় হইয়া সেই সুন্দর মুখে আশেভরে শতসহস্র চুম্বন করিতেন। দিন সুখেই কাটিতেছি। ইতিমধ্যে ভূপে নামক একটা অষ্টাদশ বর্ষীয় যুবক হরিপ্রসন্ন বাবুর নিকট এফ,এ, ক্লাসের পড়া বুঝিয়া লইতে আসিল। তারপর সে মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর প্রায়ই আসিত; হরিপ্রসন্নবাবু ভ্রাতৃ স্নেহে, সযত্নে তাহাকে পাঠ্য বিষয় বুঝাইয়া দিতেন। ভূপেন্দ্র বুদ্ধিমান, সচ্চরিত্র মেধাবী ছাত্র, তাহাকে যে শিক্ষিত

মঞ্জরী
হরিএস, ভালবাসিবেল, তাহাতে আর আশ্চয্য কি ?
ভূপেরে সহিত ক্রমে ক্রমে চঞ্চলা ও পরিচয় হরিপ্রসন্ন
করিয়া দিলেন। কাজ কৰ্ম্ম সারিয়া চঞ্চলা মধ্যে মন
স্বামীকে আহারের জন্য ডাকিত
ডাকিতে আয়। দরজার
নিকট দাড়াইয়া ভূপেরে পড়া শুনি ৩। হরিণ
দরজার দিকে চাহিয়া চঞ্চ-কে দে।পলে বলিতেন, এম,
ভিতরে এস, বস, মজ্ঞা কি ? ভূপে মা ছোট দেক
তুল্য। চঞ্চলও বাহিরে একাকী থাকতে, ৩৩ সাংস
করত না কাজেই ধীরে ধীরে আসিরা ২-৩ঃ বুৰ
সম্মুখে মাটীতে বসত। এমনি নয় যে , মে
চঞ্চলার সঙ্কোচ দূর হইল। ক্রমে ভূপে '৭ মার “ন্ধা
করিত না। নির্দোষ হাসি-ঠাট্টার-গঞ্জ ঐ;
চঞ্চলার চলিত। হরিপ্রসন্ন তাহাতে ‘* গানে না,
বা তঁাহার মনে কোনরূপ বি:দ্ধভাশের উদয় হই,
। কোনকোন দিন হরপ্রসন্ন কেন বন্ধুবান্ধব
বাড়ীতে গিয়া রাত্রি করিয়া আসিতে ; সেদিন সৃপেন্দ্র
নিয়মিতু সময়ে আসিয়া চঞ্চর সাত গল্প ,
• পড়া শুনা আর হইত না। ভূপেঞ্জের মম যেন দিন দিন
কেমন হইয়া আসিতে লাগিল। তাহা সে নিজেই
ভালরূপ বুঝিতে পারি না। কিন্তু এই চাঞ্চল্য বাসা
[১৩

মর্থরাঁ ঝি শ্যামের মা বেশ মনে মনে বুঝিল। একদিন সন্ধ্যায় হরি- প্রসন্ন বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াইতে গিয়াছেন। ভূপে আসিয়া দেখিল, হরিপ্রসন্ন বাসায় নাই। সে একখানি বঙ্কিমের নভেল লইয়া নাড়া চাড়া করিতে লাগিল। এমন সময় রায় শেষ করিয়া চঞ্চলা আসিয়া বলিল “কি ঠাকুরপাে কতক্ষণ এসেছ ? কম্পিত কণ্ঠে৭৫অনেক্ষণ এসেছি”বলিয়া ভূপে আরও কি যেন বলিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু মুখে আসিল না। বুকের ভিতর গুর গুর করিয়া কঁপিতেছিল,এমন সময় জানালা দিশা একটা দমকা হাওয়া শাসিয়া আলো নিভাইয়া দিল । মানসিক অদম চাঞ্চলল দূপেন্দ্র চঞ্চলার হাত পৰিয় কম্পিত কণ্ঠে অস্পষ্ট- ধরে বলিয়া উঠিল “চপলা আমি তােমায় ভালবাসি, একটি দারুণ মানসিক উদ্বেগ হঠাৎ প্রকাশ হইলে মানুষ যেমন আপনি প্রান্ত হইয়া পড়ে ..ভূপে বহু কষ্টে এই কথা গুলি উচ্চারণ করিয়া নিতান্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িল। চঞ্চলারও কোন কথা ফুটিল না, সে অপ্রত্যাশিত ঝটি- কায় কম্পিত লতাটির মত থরথর করিয়া কাপিতে লাগিল। মুহূর্ত পরে ভূপেন্দ্র চঞ্চলার হাত ছাড়িয়া দিল। তৎক্ষণাৎ চঞ্চলা সে গৃহ পরিত্যাগ করিয়া গেল । ফিরিয়া গেল। পরদিন হইতে ২৩ দিন ভুপেন্দ্র আর ভূপে বাটা

মঞ্জরী
হরিপ্রস বাটীতে আসিল না। এই ঘটনার পর
হইতে চলায় কি যেন একটা অজানিত চিন্তায় সন্তু
হৃদয় আচ্ছন্ন করিয়া দিল; সে নিজের মনের ভাৰ
নিজেই ভাল করিয়া বুঝিতে পারিল না, কিন্তু এই অজা-
নিত চিন্তায় সে একটা আনন্দ অনুভব করিতে লাগিল
হরিপ্রসন্ন এ সব লক্ষ্য করিয়া লক্ষ্য করিলেন না। সময়
দিন রাত তবিয়া ভাবিয়া দুই তিনদিন পরে কম্পিড়
হতে চলা ভুপেন্দ্রকে অনেক কষ্টে এক পত্র লিখিত
আমি তােমার জন্য ব্যাকুল, ভূমি অতি অব কল
সিবে। চিঠিখানা সন্তর্পণে বিকে দিয়া বলিল, বি,
এ পত্রখানা ভুপেন বাবুকে দিয়ে আসতে পারবি?" ৰি
বলিল, “পারবো না কেন?" কিন্তু মনে মনে তাবিল,
এ ছেলেমানুষদের সঙ্গে ছেলেমানুষিমী করতে আছে?
এরা তাে ধরা পড়বেই। মাঝে হইতে আমি কেন
দেবী হই। বাবুকে এই চিঠিখানা আগেই দেখাচ্ছে
হইবে।- ভাবিয়া চিঠিখানি লইয়া খুলে গেল। হৰি
প্রসন্ন জাহিরে অাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল--কেন কি ?
“এই চিঠিখানি দেখিলেই বুঝিতে পারিবেন" বলিয়া ৰি
চিঠিখানি হরিপ্রসন্তের হাতে দিল। হরিপ্রসন্ন তাড়াতাড়ি
খাম ছিড়ি ভাবিলেন বােধ এ চলা তাহাকেই টি
[১৫

खो ; লিখিয়াছে। মুহূর্ত মধ্যে সে ভ্রম দূর হইল। সৰ্ব্বনাশ? ধীরচেতা যথার্থ শিক্ষিত হরিপ্রসন্ন ইহাদের পরিণাম ধীরভাবে চিন্তা করিতে লাগিলেন, মুখে কোন- রূপ চাঞ্চল্য প্রকাশ পাইল না ; ভাবিলেন দোষ তাহারই, কাহাকেই প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে। কঠোর কর্তব্য- পরাণ হরিপ্রসন্ন বিকে চিঠিখানি ফিরাইয়া দিয়া বলিলেন “চিঠিখানি ভূপেন্দ্রকে দিও।” কি আশ্চর্য্য হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিল, তাহার মুখে কোন কথা সরিল না, কিন্তু প্রাণে একটা দারুণ খটকা বাঁধিয়া গেল। হরি- প্রসন্ন শরীর অসুস্থ বলিয়া চুটী লইয়া গঙ্গাতীরে বেড়া- ইতে গেলেন। আত্মতত্ত্বান্বেষু হরিপ্রসন্ন নিজের কটা গুলি পরিষ্কার দেখিতে পাইলেন। অবস্থিত চিত্ত যুবক যুবতীর সংযােগে বিষময় ক ফলিবে, জাহার আর আশ্চর্য্য কি ? তাহার স্ত্রীর প্রতি যতটুকু কৰ্তব্য ছিল, তাহা তিনি করেন নাই। তিনি তাহাদের এই সুযোেগ দিয়াছেন, এখন তাহাদের দোষ দিতে পারেন না। তথাপি তিনি আপনাকে সৌভাগ্য- শালী বিবেচনা করিলেন—কেননা পত্রের তিনি স্পষ্ট বুঝিয়াছিলেন তখনও তাহাদের অধঃপতন ঘটে নাই। এখনও ফিরাইবার পথ আছে। তিনি ।

মঞ্জরী সেই বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলেন। বেড়াইতে বেড়াইতে রাত্রি হইল। তিনি বাড়িতে ফিরিয়া আসিলেন, স্ত্রীকে কিছুই বললেন না বরং হাসিয়া গল্প করিয়া সমস্তু রাত্রি কাটাইয়া দিলেন। পরদিন স্বাভাবিক ভাবে স্কুলে যাইবার সময় বলিলেন “দেখ, আমার এক বন্ধুর বাট নিমন্ত্রণ আছে, রাত্রিতে খুব সম্ভব আসিব । আসিলেও রাত্রি অনেক হইবে, কেননা, ষ্টার- থিয়েটারে অভিনয় দেখিতে যাইব এইরূপে স্ত্রীর নিকট বিদায় লইয়া হরিপ্রসন্ন গােপনে বাড়ীর প্রতি তীক্ষ্ণদৃষ্টি ৰাখিলেন। সন্ধ্যার পরে ধীরে ধীরে ভূপেন্দ্র চঞ্চলার গৃহে প্রবেশ করিল। কেহই লজ্জায় কাহারও প্রতি চাহিতে পারিল না। দীপ্ত-আলােকে অন্ধকার হইতে হরিপ্রসন্ন সবই লক্ষ্য করিতে লাগিলেন। তখনই তিনি সিড়িতে একটু একটু শব্দ করিয়া উপরে উঠিতে লাগিলেন। চঞ্চলা দেখিলেন, সর্বনাশ স্বামী ফিরিলেন যে। মুহূর্ত মধ্যে ভয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ভুপেন্দ্র খাটের নীচে আশ্রয় লইল। খুব স্বাভাবিক ভাবেই হরিপ্রসন্ন চঞ্চলাকে তেমনি আদর মাখা স্বরে বলিলেন, “আমার থিয়েটারে যাওয়া হইল না, মিছামিছি আর কেন রাত্রি- স পরের বাড়ীতে করি, এই ভাবিয়া বাটী ফিরিয়া [ ১৭ মঞ্জরী আসিলাম। রান্না হইবেনা জানিয়া বিয়ের নিকট কিছু খাবারও আনিতে দিয়াছি” বলিয়া ঝিকে ডাকিলেন। {ৰ উপরে আসিলে, হরিপ্রসন্ন বলিলেন, “এই ঘরে দুই- খানি খাবার জায়গা কর” চকশা আশ্চর্য হইয়া বলিল দুইখানা জায়গা কার জন্য? “হরিপ্রসন্ন বলিলেন দেখি- জেই পাইবে।* বি কথিত মত দুইখানি জায়গা করিয়া বাবার দুই অংশে বিভাগ করিয়া দিল। হরিপ্রসঙ্গ বেশ বীরভাবে খাটের নীচে তাকাইয়া ডাকিল,ভূপেন কি? বেরিয়ে এল এই বলিয়া ভূপেন্দ্রকে মৃতবৎ খাটের নি হইতে হরিপ্রসন্ন টানিয়া বহিরে আনিল । চলাে আজ যেন পৃথিবীর সমস্ত স্থিরতা লইয়া পাষাণ মূর্তির ন্যায় অচঞ্চল হইয়া দাড়াইয়া রহিল। হরিপ্রসন্ন ভূপেন্দ্রকে একী আসনে বসাইয়া বলিলেন,খাও না ভাই লজ্জা কি? দোষ তাের কিছুই নয়। দোষ সম্পূর্ণ লামার। ভাই, যৌবনে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না,সৈ না বুঝিয়া পাপপণে যাহাই হউক আমি তােমাকে সর্বান্তঃকরণে করিলাম।” কথা না বলিয়া ঘর হইতে বহির হইয়া গেল তখন ধীরে ধীরে চঞ্চলাকে নিকটে ডাকিয়া হরিপ্রসন্ন বলিলেন,-নারীর স্বভাবই চল, তাহাতে বুৰতীরা মঞ্জরী সযত্নে বক্ষণীয়। তরুণবয়সে স্বামী বা আত্মীয়স্বজনের তাহাদের প্রতি সর্বতােভাবে দৃষ্টি রাখা কর্তব্য। আমার এ কৰ্ত্তব্যহীনতা আজ তােমায় নষ্ট করিতে বসিয়াছে। যাহা হউক, তুমি এখনও আমাকে ভাল বাসিতে পার নাই। যদি ভূপেন্দ্রকে লইয়াই সুখী হও, আমি তােমাকে তাহার নিকট পাঠায়া দিব। অনুতাপ-দগ্ধ বালিকা স্বামীর পা দুখানি জড়াইয়া ধরিয়া বলিল, “আমি বুঝিতে পারি নাই—আমাকে ক্ষমা কর” হরিপ্রসন্ন হাসিয়া বলিলেন, “আমি অনেকক্ষণ তােমায় ক্ষমা করিয়াছি, কিন্তু তুমি বাস্তবিক কলঙ্কিণী না হইলে ও মনে মনে পেরে রূপ-মােহে-মুগ্ধ হইয়াছ, আমি তােমাকে কি বলিয়া গ্রহণ করিব ?” চঞ্চলা ব্যাকুলভাবে কাদিতে লাপিল। অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া হরিপ্রসন্ন গম্ভীর- ভাবে বলিলেন, “তুমি অপরিণত বয়ষ্কা বালিকা, সংসারের কিছুই জাননা। আচ্ছা তােমাকে আমি মার্জণা করিতে পারি, কিন্তু আমি যাহা বলিব, তাহা প্রতিপালন করিতে পারিবে?” এক নিশ্বাসে চঞ্চলা বলিল, আমায় যাহা বলিবে, আমি তাহাই করিব।” হরিপ্রসন্ন বলিলেন, “তােমাকে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে।” চঞ্চলা বলিল, “কি প্রায়শ্চিত্ত করিব বল,” হরিপ্রসন্ন বলিলেন, “হিনৰৎসর [ ১০১

प्रशद्रो
;
কঠোর ব্রহ্মচর্ষের এত লইয়া তােমাকে থাকিতে হইবে
আতপতঙুল সিদ্ধ করিয়া একসন্ধ্যা আহার করিবে। এক
কাপড় অঙ্গে শুকাইয়া লইবে, পরিবর্তন করিতে পারিৰে
না, তৈল মাখিতে পাইবে না, কেশবিন্যাস করিতে পাইবে
। এইরূপ কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনপূর্বক যদি তিন বৎসর
অতিবাহিত করিতে পার, তাহা হইলে তােমাকে আমি
সৰ্বান্তকরণে মার্জণা করিয়া পুনরায় গ্রহণ করি।”
মগ্নপ্রায় ব্যক্তির কুলপ্রাপ্তির ন্যায় সাগ্রহে চঞ্চল কঠোর
ব্রহ্মচর্য অঙ্গীকারপূৰ্ব্বক পতি-পদ আননীরে সিক্ত
করিতে লাগিল। চঞ্চলা চাঞ্চল্য বিসর্জন দিয়া হাস্যমুখে
তিনবৎসর কঠোর ব্রহ্মচর্য্যে রত হইল। আর এদিকে
সেই রাত্র হইতেই ভূপেন্দ্রকে আর কেহ দেখিতে পায়
নাই। অনেকেই বলে, সে বিরাগী হইয়া বিন্ধ্যাচলে
আছে। হরিপ্রসন্নের এই অপূর্ব ক্ষমাশীলতার গুণে
দুইতী পতিত চরিত্র পবিত্র হইল।

লার খেলা।
মাখনলাল ঘোষ কোন সওদাগর আফিসে ৬০
টাকা বেতনে ক্যাসিয়ারিপদে কর্ম করেন। এই সামান্ত
আয়ে কোনরূপে হার সংসারযাত্রা নির্বাহ হইত।
পত্নী চারুশীলা অতি নিপুনা গৃহিনী ছিলেন, তাহারই
পরিচালন গুণে এই সামান্য আয়েও মাখনলালের
বিশেষ কোন অসুবিধা ভােগ করিতে হইত না। তাঁহার
একটি বিবাহ যােগ্য কন্যা ও একটি ঘােট পুত্র ছিল।
বাল্যকাল হইতে মাখনলালের জ্যেতিষ-শাস্ত্রের উপর
প্রগাঢ় অনুরাগ দেখা যাইত, সে আগ্রহ প্রৌঢ় বয়সেও
সমানভাবে তাহাকে অধিকার করিয়াছিল। অবসর
সময়ে তিনি জ্যোতিষ শাস্ত্র লইয়া অনেকটা সময়
অতিবাহিত করিতেন। সখ করিয়া পাড়ার ২১ জনের
[১১

মঞ্জরী
ঠিকুজি কোষ্টিও প্রস্তুত করিয়া দিতেন। তাহার গনণায়
উপর সাধারণের একটা শ্রদ্ধা ছিল।
আজকাল কলিকাতায় তুলার খেলার একটা প্রবল
হজুক চলিতেছে, ইতর, ভদ্র অনেকেই খেলিতেছেন।
কেহ বিশেষ কিছু লাভবান হইয়াছেন কিনা জানিনা,
কিন্তু খেলা সমানভাবে চলিতেছে। অনেকে নিজেদের
চলিত ব্যবসায় বন্ধ করিয়া এই ব্যবসায়ে মাতিয়াছেন।
পলির মােড়ের পানওয়ালারা তুলার নম্বরের কাগজ
দোকানে ঝুলাইয়া রাখিয়াছে। ইহা ব্যতীত প্রতি
রাস্তায় ঘর ভাড়া লইয়া কতলােক এই খেলার আফিস
খুলিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। প্রতি দোকানেই অসম্ভব
ভিড়। সন্ধ্যার সময় অত ভিড় শুড়ির দোকানেও হয় না।
সময় বুঝিয়া দু একজন ব্যবসায়ী জ্যোতিষী তুলার নম্বর
ঠিক গণিয়া দিবেন অঙ্গীকারে বিজ্ঞাপন দ্বারা রাস্তা ছাইয়া
ফেলিয়াছেন। টামে, পথে, বাজারে, রেলে তুলার
খেলার গল্প। চারি আনায় এক টাকা, একটাকায় আট
টাকা, নয়টাকা, কলম পিসিয়া মাথা ঘামাইয়া এক
মাসের রােজগার বিনা পরিশ্রমে একদিনে পাওয়া যায়,
ইহা কি কম লাভের কথা ? দরিদ্র দেশের লােক উন্মুক্ত
না হইবে কেন? শুনিয়াছি গৃহস্থ ঘরের মেয়েরাও
১১২]

মঞ্জরী
বাড়ীর অভিভাবককে মুকাই বেহারার মারফতে
এই খেলা খেলিতেছেন।
মাখনলালকে অফিস হইতে ফিরিয়া আসিবার সময়
অনেকগুলি দোকানের সম্মুখ দিয়া আসিতে হইত।
প্রথমে তাহার এ বিষয়ে
এ বিষয়ে লক্ষ্য ছিল না। একদিন
ব্যাপারটা কি জানিতে আগ্রহ হওয়ায় ঐ রূপ একটা
দোকানের সম্মুখে দাড়াইয়া অনেকক্ষণ দেখিলেন। এক
হইতে দশ পর্যন্ত একটা সাইন বাের্ডে নম্বর লেখা
রহিয়াছে ; তাহার একপাশ্বে কোন নম্বর এক টাকা,
কোন নম্বরে পাঁচ টাকা, এমন কি কোন কোন নম্বরে
১০১১ টাকা পর্যন্ত লেখা আছে। নম্বরের তাৎপর্য
এই যে,-যে অঙ্কটি আমি মনােনীত করিলাম, সেই
অঙ্কটি যদি সেই দিনে বিলাতে মার্চেন্ট অফিস হইতে
তুলার যে দর নির্ধারিত হইবে তাহার শেষ অঙ্কটির
সহিত সমান হয়, তাহা হইলে ঐ অঙ্কের লিখিত
টাকা লাভ পাওয়া যাইবে। দাড়াইয়া দাড়াইয়া অনেকক্ষণ
দেখিয়া, মাখনলাল বাড়ী ফিরিয়া আসিলেন, তাহার
মাথার ভিতর তুলার নম্বর ঘুরিতেছিল। অনেকক্ষণ
মাথা ঘামাইয়া, অনেক অঙ্ক কসিয়া একটা নম্বর স্থির
করিলেন। পরদিন অফিস হইতে ফিরিবার সময় সাগ্রহে
[ ১১৩

মঞ্জরী
অনুসন্ধান লইলেন, কোন্ নম্বর উঠিয়াছে! দুরদৃষ্ট বশতঃ
তাহার মনােনত নধর সে দিন মিলল না। সে দিন
তিনি আরও দ্বিগুণ উৎসাহে অনেক পরিশ্রমে পুনরায়
নম্বর নির্ধারিত করিলেন, সেবার তাহার নম্বর ঠিক
হইল। ক্রমশঃই তঁাহার উৎসাহ বাড়িতে লাগিল।
তিনি প্রত্যই
প্রত্যহ একটা কারয় নম্বর ঠিক করিতে
লাগিলেন, এবং প্রায়ই সে নম্বর মিলিতে লাগিল।
তিনি তুলার খেলা কখন ও খেলেন নাই, কিংবা খোবার
ইহার ইচ্ছ। ছল না, এটা খেয়ালের বশবর্তী হইয়াই
তিনি প্রতাহ নধুর নির্ধারিত করিতেন, নম্বর মিলিলে
তাহার যে আনন্দ উপস্থিত হইত, তাহা তিন কাহারও
নিকট প্রকাশ করিতেন না। কিন্তু, আমের নেশার
মত নম্বর নির্ধারণের জন্য প্রত্যহ ব্যাকুল হইতেন।
রাত্রে দু এক জায়গায় টি উসনি ছিল, তারপর ফিবিয়,
তুলার খেলার অঙ্ক লইয়া,বসিতে। কোন কোন দিন
এই কাৰ্যে অনেক রাত্রি হইয়া পড়িত, চারুশালা
বিরক্ত হইয়া বলিতেন রোজ রাত জেগে জেগে ও ছাই
কর কি ? মাখনলাল অপ্রতিত হইয়া শিত আস্তে
বলিতেন, কিছু একটা অঙ্ক মেলাচ্ছি। এমনি করিয়া
তিন চারি মাস কাটিয়া গেল।
১১৪ ।
t

মঞ্জরী
পাড়ায় পুটিরাম বাড়য্যে বলিয়া একটি ভদ্রলােক
বাস করিতেন। তাহার পিতা অনেক গুলি নগদ অর্থ
রাখিয়া যান। পুত্র নানা প্রকারে তাহা নিঃশেষ
কুরিয়া এখন শূণ্য ভাণ্ড হইয়াছেন। তষের উপর
পুটীমের অগাধ বিশ্বাস। সেই সূত্র ধনলালের সহিত
তাহার বিশেষ ঘনিষ্টতা। পুটীরাম ভাগ্যপরিবর্তনের জন্য
সৰ্ব্বদা ব্যস্ত, ঘোড় দৌড়ের পেণা, লটাও টিকিট কিছুতেই
তাহার ভাগ্য পরিবর্তন ঘটে নাই, সম্প্র ৩ তুলার খেলার
জন্য ক্ষেপিয়া উঠিয়াছে। দুরদৃষ্টবশতঃ লাভের পরিমাণ
অপেক্ষ। লোকসানের পরিমাণ তাহার
অধিক
হইয়াছে। একদিন সন্ধার মাখনলাল তুলার
নম্বর নির্বাচনে নিবিষ্ট ; বিমৰ্য বদনে পুটিরাম আসিয়া
উপস্থিত হইল! মাখনলাল থাতা পোল সরাইয়া রাখিয়া
বলিলেন--এস এস, তোমার মুখ এত ভার (কেন ? দীর্ঘ
নিশ্বাস ফেলিয়া পুটুরাম বলিল--আমি ভাই আজ
অনেক গুলি টাকা হেরেছি। মাখনলাল হাসিয়া বলিল
কেনহে এত দেখে শুনে নম্বর ধরেছ, তবু হার, পুটীরাম
বলিল-“আরে ভাই ওর কিছু ঠিক নাই, ফেভরিট নম্বর
দেখিয়াই টাকা দিয়েছিলুম, সবই বরাত।” অবজ্ঞার
স্বরে মাখনলাল বলিল-“কে বললে ঠিক বলা যায় না,
[ ১১৫

মঞ্জরী হয়। আমি গণিত শাস্ত্রে মেলে না এমন বিষয়ই নাই। আমি নম্বর বলে দিই, কেমন ঠিক হয় না দেখ।” বিষ্মিত ও উৎ- সাহিত হইয়া পুটীরাম বলিল—বল কি? এও তুমি জান- নাকি? আরে ছ্যা এতদিন বলতে ব্যাটা রােজ গিয়ে হাছি। মাখনলাল গম্ভীরভাবে বলিলেন—এর আর জানা জানি কি ভাই ? একটু গুনে গেথে দেখলেই ঠিক বলা যায়, তুমিওত আমাকে কোন দিন কিছু বল নাই। পুটিরাম বলিল—আমি কি ছাই জানি, যে তােমার এ বিদ্যা আছে ; যাকগে যা হবার হয়েছে, তুমি ভাই কালকের নম্বরটা বলে দাও, কিছু মেরে আনি । মাখনলাল অনেক গুণিয়া গাঁথিয়া একটা নম্বর বলিয়া দিলেন। পরদিন হাসিতে হাসিতে পুটিরাম আসিয়া বলিল—ভাই তােমার গণবার কি বাহাদুরী, ঠিকঠাক মিলেছে, আজ আশি টাকা পেয়েছি। ফেভরিট নম্বর দেখে যে ব্যাটাবা ধরেছিল, সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসেছে। আজ ভাল একটা নম্বর বলে দাও। মাখনলাল দ্বিগুণ উৎসাহে আর একটী নম্বর বলিয়া দিল। সেবারও ঠিক হইল। সেবারও ঠিক হইল। লােকের মুখে মুখে, সহরের সর্বত্র এ কথা রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। সন্ধ্যার পর মাখনলালের বাড়ীতে দুর্গোৎসব ব্যাপার। সকলের

মঞ্জরী
-
মুখেই তার পনার সুখ্যাতি। সে গণনা প্রায়ই নিভূল
হয়। তাহার অকাট্য তুলার নম্বর কখনই নিস্ফল হয় না।
ক্রমশঃই মাখনলালের নিজের মনেও এ ধারণা বদ্ধমূল হইয়া
উঠিল। রাত্রির টিউশনি ছাড়িয়া দিয়া তুলার নম্বর
লইয়া মাতিল।
সুখ্যাতি মানুষকে অধঃপাতের নিয়ন্তরে নামাইয়া
দেয়। আবার এই সুখ্যাতিই মানুষের সর্ববিধ উৎসাহ
ও উন্নতির মূল। মাখনলাল সুখ্যাতির প্রভাবে দারুণ
উৎসাহে গনণ কাৰ্য্য চালাইতে লাগিল। একদিন
চারুশীলা স্বামীকে বলিল,-দেখ ও সব খেলায় মাতা ভাল
নয়। মাখনলাল হাসিয়া বলিল, আমিত আর নিজে
খেছি না। চারুশীলা বলিল-দেখ নিজে না খেলেও
ও সংস্রব ভাল নয়। মানুষের মন না মতি, কখন কি
হয় বলা যায় না। মাখনলাল বলিল-পাগল আর কি!
চারুশীলা বলিল পাগল কেন? এই ত খেয়ালে পড়ে
টিউশনি কয়টা ছেড়ে দিলে। লজ্জিত হইয়া মাখনলাল
বলিলকি করি বল, দশজন ভদ্রলােক বাড়ীতে আসে,
ভাদের ফেলে কি করে যাই। চারুশলা বলিল—তুমি
যাই বল, আমার কিছুই ভাল বোধ হচ্ছেনা। হয়ত
তুমি ও কবে ওদের সঙ্গে পড়ে নিজে খেলবে। মাখনলাল
[ ১১৭

মঞ্জরী হাসিয়া বলিল--ও সব বাজে বিষয় নিয়ে কেন নি খারাপ কচ্ছ, আমি কি পাগল হয়েছি ? কিন্তু তাহার হৃদয় যে সুখ্যাতির অহঙ্কারে আচ্ছন্ন হইয়া আসিতেছিল, তাহা সে এমেও বুঝিতে পারিল না। তাহার নিজের গনণার উপর নিজের একটা দারুণ বিশ্বাস গভীরভাবে অঙ্কিত হইতে ছিল। এইরূপে এক বৎসর কাটিয়া গেল। পরের গুণিয়া দিয়া মাত্র মৌখিক সুখ্যাতিলাভ করিবার দারুণ মােহে বিবাহযােগ্য কন্যাটির কথা একরূপ সে ভুলিয়া গিয়াছিল। একদিন চারুশীলা বলল- “পরের গুণে দিয়ে দিয়ে দিব্যি নিশ্চিন্তে দিন কাটায়ে টিউসন গুলােও ছেড়ে দিলে, মেয়ে গলায় আর রাখা যায় না, তার বিয়ের কচ্ছ কি ?” এমন দেখা যায়, যে কথা মানুষ রােজ শশানে, ভাবের কোন ব্যত্যয় ঘটে না, সময়ে সেই কথাতেই মানুষের ঘােতর পরিবর্তন বটে। আজ মাখনলালের চমক ভঙ্গিয়া গেল । সুখ্যাতির মােহ সুখ-স্বপ্ন হঠাৎ ভাঙ্গিয়া গিয়া সে দারুণ অন্ধকারময় নিজের ভবিষ্যৎ দেখিয়া শিহরিয়া উঠিল। নিজের মনে একটা অজানিত পীড়া অনুতৰ করিতে লাগিল। রাত্রে ভাল নিদ্রা হইল না, তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে নানারূপ দুঃস্বপ্ন দেখিয়ে ১৮ ]

মঞ্জরী
লাগিল। পরদিন অফিসে গেল। কিন্তু তাহার মনের
অসচ্ছলতা কিছুতেই দূর হইল না। বাঙ্গালীর কন্যা-
জায়, তাহাতে দরিদ্র ভদ্রলােকের ! সৌখিন সুখ্যাতির
প্রলোভনে সে এক বৎসরকাল নিশ্চেষ্ট
নিশ্চেষ্ট অবস্থায়
আপনার সর্বনাশ আপনি ডাকিয়া আনিয়াছে, ভাবিয়া
আপনাকে শত সহস্র ধিক্কার দিতে লাগিল
যদি এই বৎসরকাল বিনামূল্যে ব্যবস্থা পত্র না দিয়া
কিঞ্চিৎ মূল্য গ্রহণ করিত, তাহা হইলে তাহাকে এ
আসন্ন বিপদে পড়িতে হইত না। সন্ধ্যার পর গণা-
ইতে অনেক লােক আসিল। সে নিজের শরীর
অসুস্থ বলিয়া সকলকে বিদায় করিয়া দিয়া শয্যা
প্রহণপূর্বক আকাশ পাতাল ভাবিতে লাগিল।
সকলেরই দিন যায়—দিন কাহারও পড়িয়া থাকে
-মাখনলালেরও দিন কাটিতে লাগিল। হিণী
কন্যার বিবাহের জন্য ক্রমশঃই ব্যস্ত হইয়া পড়িতে
লাগিলেন।
মাখনলালের কোনই উপায় নাই, চতু-
র্দিকেই,অন্ধকার। কন্যার বিবাহ না দিলেই নয়,
ভাবিয়া ভাবিয়া মাখনলাল কেমন এক রকম হইয়া
গেল। একদিন রাত্রে চারুণী কন্যার বিবাহের
জন্য স্বামীকে বড়ই পীড়াপীড়ি করিয়া ধরিল।
[১১৯

মঞ্জরী
মাখনলাল নিরুত্তর শয্যায় পড়িয়া রহিল। সমস্ত রাত্রি
নানারূপ চিন্তা করিয়া ভাগ্য ফিরাইবার জন্য সে দৃঢ়-
প্রতিজ্ঞ হইল । পূৰ্বেই বলিয়াছি যে তাহার নিজের
গনণার উপর তাহার নিজের একটা গভীর বিশ্বাস
ছিল। সে মনে মনে স্থির করিল, খুব ভাল করিয়া
গুণিয়া তুলার খেলা খেলিবে। কিন্তু টাকা কোথায় ?
অনেক ভাবিয়া স্থির করিল-অফিসের ক্যাশ হইতে
হাজার টাকা একদিনের জন্য লইবে। কিন্তু এ কথা
তাবিতে তাহার হৃদয়ে সহস্রবার আঘাত করিয়াছিল ;
কিন্তু নিজের
গণনার উপর
দারুণ বিশ্বাস থাকায়
আশঙ্ক। অধিকক্ষণ স্থায়ী হইল না। প্রভাতে উঠিয়াই
পূর্বের মত খাতা পেন্সিল লইয়া তুলার নম্বর গণনা
করিতে আরম্ভ করিল। তিন চারিবার করিয়া গুণিয়া
একটি নম্বর স্থির করিল। আজ প্রাতঃকালে স্বামীকে
খাতাপত্র লইয়া বসিতে দেখিয়া চারুশীলা বিরক্ত
হইয়া বলিল—“ও আবার কি হচ্ছে ? মিছে আর
কেন পরের ঝঞ্চাট বয়ে মবুছ ? মেয়ে পার করবাব
উপায় দেখ।” পত্নীর প্রতি তীব্র দৃষ্টিপাত করিয়া
কর্কশ-কষ্ঠে মাখনলাল বলিল,-“হাঁ, তাই কচ্ছি।”
স্বামীর চক্ষুতে পৈশাচিক দীপ্তি দেখিয়া সতী-লক্ষ্মী

মঞ্জরী নিজে খেবে ওতে অন্তরে শিহরিয়া উঠিল, সন্দিগ্ধভাবে কম্পিত-কণ্ঠে বলিল,-“তুমি আজ বুঝি ?” দৃঢ়ভাবে মাখনলল বলিল,-“হু”। ভীত- কণ্ঠে চারুশীলা বলিল,—“না, না, তুমি ও খেলা কখনও খেলাে না। জুয়াখেলা খেতে নাই, লােকের সর্বনাশ হয়।” অদৃষ্টে যা আছে তাই হবে। মাখনলাল বলিল,-“আবার ললাকে বড়লােকও হয়।” মাখনলাল অফিসে গেল। আত্ম-বিশ্বাস তাহাকে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য করিয়া তুলিয়াছিল। অফি- সের তহবিল হইতে এক হাজার টাকা সংগ্রহ করিয়া পর কম্পিত-পদে একটী তুলার খেলার দোকানে প্রবেশ করিয়া নির্ধারিত নম্বরে হাজার টাকা ধরিল। চিন্তাক্লিষ্ট উদ্বেগপূর্ণ যুখভাব লইয়া সন্ধ্যার পর মাখনলাল, গৃহে ফিরিয়া আসিল। স্বামীর মুখভাব দেখিয়াই চারুশীলা বুঝিতে পাৰিল, স্বামী বিশেষ কোন অন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছেন। উৎকণ্ঠিত-চিত্তে ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করিল,—“খেলে এলে বুঝি ?” মাখনলাল স্ত্রীর দিকে মুখের উদার- দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল—“হ”। চারুশীল চঞ্চল- [১২১ . ছুটির ১ মঞ্জরী ৫ ভাবে জিজ্ঞাসা করিল,-“টাকা পেলে কোথায়?” শুকণ্ঠে মাখনলাল বলিল,-“অফিসের ক্যাশ থেকে নিয়েছি।” চারুশীলার বুকের ভিতর গুর করিয়া কাপিয়া উঠিল। আতঙ্কে কম্পিত-কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল-“কত টাকা?” এক নিশ্বাসে রুদ্ধ-কণ্ঠে মাখনলাল বলিল,“হাজার টাকা।” কথাটি মুখ হইতে বাহির হইতে না হইতেই চারুশীলার জল-খাবারের থালা হাত হইতে ঝনাৎ করিয়া পড়িয়া গেল, সে থর থর করিয়া কাপিতে লগিল। পরদিন আফিসের ফিরতি-মুখে সাগ্রহে মাখন- লাল দোকানে যাইয়া যাইয়া জিজ্ঞাসা করিল-“কত নম্বর ?” উত্তরে যাহা শুনিল কর্ণ তাহা বিশ্বাস করিতে চাহিল না। শুকষ্টে সাগ্রহে : আবার জিজ্ঞাসা করিল,-“কত নম্বর বলিলেন ?”-হায়, এবার তাই, তাহার নির্ধারিত নম্বর নহে। মাতা- শের মত টলিতে টলিতে মাখনলাল গৃহে ফিরিয়া আসিয়া বুকের উপর বসিয়া পড়িল। পিতাকে দেখিয়া বালক পুত্ৰটী ছুটিয়া পিতার নিকট আসিতেছিল কিন্তু তাহার অস্বাভাবিক মুক্তি দেখিয়া [১২২ মঞ্জরী আর অগ্রসর হইল না, ভীতভাবে পিতার মুখের দিকে চাহিল। দারুণ উদ্বেগ উৎকণ্ঠা লইয়া চারুশীলা জিজ্ঞাসা করিল,-“কি হলাে?” মাখন- লাল কোন কথা বলিল না-স্ত্রীর মুখের দিকে চাহিল। সে দৃষ্টি স্নান, নিষ্প্রভ, অস্বাভাবিক—উন্মা- দের মত। হয়

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Manjari Ed. 1st

Author
Ray, Surendranarayan
Title
Manjari Ed. 1st
File name
Manjari Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1912
Published
2010/04/6
Publisher
Gynendranath Mukhopadhaya, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Fiction
Keywords
Chumbak
DLI number
511209
Barcode
4990010018378.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
yaqe4I0oC7f
Download PDF

Manjari Ed. 1st