Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Saral Upanishad
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সরল উপনিষদ।
ঈশােপনিষৎ।
ষােড়শীচরণ মিত্র।
No text on this page.
সরল উপনিষদ
(ঈশােপনিষত)
মূল, শঙ্করভাষাবলম্বনে অন্বয়, টীকা,
বাঙ্গালা প্রতিশব্দ ও বঙ্গানুবাদ
এবং
শ্ৰীষােড়শীচরণ মিত্র।
কর্তৃক
সরল ব্যাখ্যা সমেত।
২০শে আশ্বিন ১৩২৯ বঙ্গাব্দ
মুল্য । আট আনা।
প্রকাশক- সন্তোষকুমার মিত্র। -৪৫ নং গ্রে স্ত্রী, কলিকাতা। প্রিন্টার শ্রীগোষ্ঠবিহারী মান্না। মিত্র প্রেস ৪৫ নং গ্রে স্ত্রী, কলিকাতা ভুমিকা ; ৰে আৰ্যজাতির অতি আদরের ধন। বেদ শব্দ বিদ ধাতু হইতে উৎপন্ন, বিদ অর্থে জানা অতএব বেদ অর্থে জ্ঞান। জ্ঞান মধ্যে যে জ্ঞান সৰ্বশ্রেষ্ঠ অর্থাৎ ব্ৰহ্মজ্ঞান, তাহাই বেদে নিহিত আছে ; বেদ ব্ৰহ্মজ্ঞান শিক্ষা দিতেছে ইহা ব্ৰহ্মজ্ঞানের সােপান। ইহা আবােহণ দ্বারা পরমাত্মজ্ঞানে উপস্থিত হইতে পারা যায়। এহ্ম নিত্য অনাদি ও অনন্ত সুতরাং এই জ্ঞানও নিত্য, অনাদি ও অনন্ত। বেদপাঠে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হইবে বলিলে ইহা বুঝিতে হইবে যে ধ্যান ও সাধনার সহিত বেদপাঠ করিতে হইবে। কেবল সাধারণ পাঠ দ্বারা অর্থজ্ঞান লাভ করিলেই বেদপাঠ হয় না উহার প্রত্যেক মন্ত্রটা ধ্যান করিতে হইবে; পবিত্র হৃদয়ে বাসন শূন্য হইয়া মনের বাহগতি রােধ করিয়া একমনে ধ্যান দ্বারা উহার প্রকৃত অর্থ বােধ হইবে এবং বেদরূপ সােপান অবলম্বনে ব্রহ্মলােকে আরােহণ করিতে পারিবে। কোন কোন ইউরােপীয়ের মতে বেদ অসভ্য বর্বর জাতির কল্পিত দেবতার ভীতিবিহ্বল স্তুতিগান। তাহারা কেবল বেদের বাহ্যিক পাঠ দ্বারা এই সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইয়াছে প্রকৃত অর্থজ্ঞান তাহাদের হয় নাই। কিরূপে হইবে ? প্রাচ্য- জ্ঞান লাভের জন্য যে ধ্যান ও সাধনা প্রয়ােজন তাহা তাহারা অবলম্বন করে না বা করিবার ইচ্ছা ও ক্ষমতা নাই কেবল সংস্কৃত শব্দের ইংরাজী অনুবাদ পাঠ করিলেই বেদপাঠ হইল না। উহার প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞান লাভ করা বহু আয়াসসাধ্য ; ব্ৰহ্মজ্ঞানের পখিক ভিন্ন অপরে সে আয়াসে প্রবর্তিত হইতে পারে না। যাহারা সামান্য পরিশ্রমে বিদ্যার আললাচনা করিতে চাহে, যাহারা সংসারের নানা কর্মে নিমজ্জিত থাকিয়া ব্যস্ত মনে মধ্যে মধ্যে বেদ, পড়িতে চাহে তাহার জন্য বেদ ব্ৰহ্মজ্ঞানের দ্বার উদঘাটন করেননা। যাঁহাদের শরীর ও মন পবিত্র, যাহাদের হৃদয়ে ঈশ্বরভক্তি অতীব বলবতী, যাহারা বিষয় ভােগলিঙ্গ কতক পরিমাণে সংযত করিয়াছেন, তাঁহারাই বেদের প্রকৃত অর্থ জ্ঞানে সমর্থ অতএব তাহারাই বেদ পাঠের অধিকারী। যাহারা অপবিত্র খাদ্য দ্বারা শরীরকে অপবিত্র করিয়াছে যাহারা মনকে পাপচিন্তা হইতে বিরত করিতে পারে নাই, যাহারা ঘােরতর সংসারী ও স্বার্থপর এবং বিষয় ভােগে নিমজ্জিত তাহার ব্রহ্মজ্ঞান লাভের অযােগ্য অতএব বেদপাঠের অনধিকারী। সুতরাং গােখাদক বহিবিস্কার উপাসক ঘােরর স্বার্থপর ও বিষয়ী, আত্মম্ভরী ০ ; ইউরােপবাসী যে বেদমন্ত্র ঘৃণা চক্ষে দৃষ্টি করিবে এবং বেদোপদিষ্ট তত্ত্বজ্ঞান লাভে অসমর্থ হইবে তাহার আর আশ্চৰ্য্য কি ? এইজন্যই প্রাচীন শাস্ত্রকার বলিয়াছেন বেদে শূদ্রের অধিকার নাই। তবে যিনি জন্মত শূদ্র হইলেও ব্রাহ্মণ যােগ্য গুণে ভূষিত তাহাকে শূদ্র বলা অন্যায়, তাহার পক্ষে বেদপাঠে মানা নাই। উপনিষদ বেদের সারাংশ। উপনিষদ শব্দ উপ পূৰ্ব্বক নি পূৰ্ব্বক যদ ধাতু হইতে নিষ্পন্ন হইয়াছে উহার অর্থ সত্বর নিশ্চয় ভাবে যাহার দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া যায়। অর্থাৎ উপনিষদ দ্বারা শীঘ্র নিশ্চিতরূপে ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ হয়। অতএব সাধক মাতের পক্ষেই উপনিষদ পাঠ একান্ত আবশ্যক। শ্ৰীমদভগবদগীতাকেও উপনিষদ বলা হইয়াছে, যদিচ গীতা বেদের অংশ নহে তত্রাচ ব্রহ্মজ্ঞান লাভের পক্ষে বিশেষ প্রয়োজনীয় বিধায় উহা মহাভারতের অন্তর্গত হইলেও উহা উপনিষদ। বলা বাহুল্য উহা দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রিয় শিষ্য অর্জুনকে জ্ঞান ভক্তি ও কৰ্ম্মমার্গ অবলম্বন করিতে শিক্ষা দিয়াছেন এবং ব্রহ্মজ্ঞান প্রার্থীর পক্ষে উহাই প্রথম পাঠ্য পুস্তক। তৎপরে বেদের সংহিতা ও উপনিষদ পাঠ্য। উপনিষদ স্থানে স্থানে অতি দুরূহ, উহার অর্থবােধ অতি কঠিন ; পূজ্যপাদ শঙ্করাচার্ষের ভাষ্যও অনেক স্থলে এরূপ ভাবে লিখিত যে তাহার সম্যক অর্থজ্ঞান বহু আয়াস সাধ্য এবং বর্তমান কালে ভারতবাসী ইউরােপবাসীর অনুকরণে গভীর চিন্তা দ্বারা যে জ্ঞান লাভ হয় তাহা উপার্জনে অসমর্থ। ইউরােপ প্রদিষ্ট পথ অবলম্বনে আমরা কেবল অবেক্ষণ ও পরীক্ষণ দ্বারা জ্ঞান লাভ করিতে চাই। কিন্তু যে জ্ঞান উহার অতীত যে জ্ঞান কেবল অবেক্ষণ পরীক্ষণ দ্বারা প্রাপ্তিযােগ্য নহে, পরন্তু তাহা ব্যতীত ধ্যান ধারণা ও সাধনা আবশ্যক তাহা প্রাপ্তির চেষ্টা অামাদের পক্ষে দুঃসাধ্য হইয়াছে। এইজন্য এই ক্ষুদ্র পুস্তকে উপনিষদের সরল ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। ইহা দ্বারা উপনিষদের কথঞ্চিৎ রস আস্বাদন করিতে পারিলে উপনিষদ পাঠের আকাঙ্ক্ষা বদ্ধিত হইয়া উহার প্রকৃত অর্থ জ্ঞান জন্য ঔৎসুক্য জন্মিবে ইহাই এই ক্ষুদ্র ব্যাখ্যাকারের উদ্দেশ্য। উপনিষদ পাঠে যে কেবল পরলােকের কাৰ্য্য হইবে তাহা নহে; ইহাতে ইহলােকেরও লাভ আছে। মনুষ্য উপনিষদ প্রদত্ত জ্ঞান লাভ করিতে পারিলে মন হইতে কাষ ক্রোধ লােভ মােহ প্রভৃতি রিপুগণ দূরীকৃত হইয়া মানবকে দেবভাবে উপনীত করিবে; তদ্বারা মানবের সুখ বৃদ্ধি করিবে ও সাংসারিক দুঃখে শান্তি প্রদান করিবে। প্রাচীন আর্যঋষিগণ যােগবলে “একমেবাদ্বিতীয়ং” এই মহাবাক্য নিহিত সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য প্রাপ্ত হন। তাহারা এই সত্যই উপনিষদে নানা ভাষায়, নানা ভাবে পুনঃ পুনঃ উক্তিদ্বারা বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছেন। ঐ মহাবাক্যের অর্থ, এক ভিন্ন দ্বিতীয় নাই। এই সমস্ত বিশ্বসংসার যাহাতে কত মানব কত জীব জন্তু কত উদ্ভিদ ও প্রস্তরাদি দ্রব্য আছে সমস্তই প্রকৃত পক্ষে একই পদার্থ পরমাত্মা পরব্রহ্মের প্রতিরূপ মাত্র। এই যে অসংখ্য জড় ও জীব চতুর্দিকে অসংখ্য নাম ও রূপ ধারণ করিয়া বিরাজ করিতেছে তাহা সমস্তই সেই পরব্রহ্ম, তাহা হইতেই উৎপত্তি, তাহাতেই স্থিতি এবং পরে তাহাতেই নয় প্রাপ্ত হইবে ; এ সকল তিনিই। তাহা হইতে ইহাদের পৃথক সত্ত্বা নাই। তিনি এই সকল ভিন্ন ভিন্ন নাম ও রূপ ধারণ করিয়া বিশ্বলীলা প্রদর্শন করাইতেছেন এবং সময় আগত হইলে এই অনিত্য শ্বিলীল সম্বরণ করিবেন ও এই সকল বস্তু হাতে লয় প্রাপ্ত হইবে। উপনিষদ পাঠে এই সত্যের সম্যক উপলব্ধি হইবে। মানবমণ্ডলীর মধ্যে এই সত্যের যতই বিস্তার হইবে ততই পরব্রহ্ম পরমেশ্বরে ভক্তি, মানকে প্রেম, অপর জীবে দয়া, পাপে ঘৃণা, পাপীর প্রতি অহিংস মানব হৃদয়ে গাঢ়রূপে গ্রথিত হইবে। অতএব উপনিষদ পাঠ সকলেরই কর্তব্য। অধুনা শিক্ষিত ভারতবাসী ইউরােপীয় শিক্ষার প্রভাবে ও ইউরােপীয় সভ্যতার প্রবল আকর্ষণে নিতান্ত স্বার্থপর ও ঘোরতর বিষয়ী হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে ধর্মভাব একেবারেই লােপ প্রাপ্ত হইয়াছে। প্রাচীন আৰ্য্যধৰ্ম্মে অথবা কোন ধর্মেই তাহাদের আস্থা নাই ; ধর্মাচরণে তাহারা একান্ত উদাসীন ; ভারতবাসীর হৃদয়ে যে স্বাভাবিক ধর্মভাব নিহিত আছে তাহা ইউরােপীয় জড়বাদীদের ভ্রমাত্মক যুক্তি বলে সমূলে বিনষ্ট হইবার উপক্রম হইয়াছে। ইংরেজী শিক্ষিত ভারতবাসী বুঝে না যে ইউরােপীয়দিগের, ধৰ্ম্মহীনতা এ দেশে আনয়ন করিলেই আমরা ইউরোপীয় হইতে পারি না। তাহাতে আমাদের আর্যজাতির বিশেষত্ব নষ্ট হইয়া যাইবে কিন্তু ইউরােপীয়ের গুণ সকল আমরা লাভ করিতে পারিব না। ধৰ্ম্মই আৰ্যজাতির জীবন, ধৰ্ম্মে আস্থাই এবং ধর্মাচরণই আৰ্যজাতির বিশেষত্ব ; ইহা নষ্ট হইলে আমাদের পৃথিবীর কৰ্ত্তব্য শেষ হইয়া যাইবে এবং আমরা আমেরিকার রেড ইণ্ডিয়ান ও আফ্রিকার বর্বরজাতির দায় ইউরােপীয়দিগের প্রভাবে বিনাশ প্রাপ্ত হইব। যদিচ ইংরেজী শিক্ষিতদিগের মধ্যে প্রভাব লােপ পাইতেছে বাহাদিগকে আমরা অশিক্ষিত মনে করি অর্থাৎ ইংরেজী ভাষানভিজ্ঞ লােক ও স্ত্রীলােক মধ্যে ধর্মভাবের স্রোত এখনও প্রবলরূপে বহিতেছে। এই ধৰ্ম্মভাব আমাদের মধ্যে সজীব বলিয়া এই জাতি এখনও পৃথিবীতে বিদ্যমান। কত কত প্রাচীন সভ্যতা প্রাচীনকালে অত্যুদিত হইয়া বিনাশ প্রাপ্ত হইয়াছে—কিন্তু আমরা মৃতপ্রায় হইলেও এখনও জীবিত আছি আমাদের হৃদয় এখনও স্পন্দিত হইতেছে ; ঈশ্বরের নামে, ঈশ্বরের গুণগানে এখনও ইউরােপীয় ভাবে অশিক্ষিত ভারতবাসীর মন নাচিয়া উঠে। ভারতবাসীর প্রধান কার্য—ইউরােপীয় সভ্যতার ধর্ম হীনতা হইতে ভারতবর্ষকে রক্ষা করিতে হইবে। যাহার চক্ষু আছে তিনি নিশ্চয়ই দেখিতে পাইবেন যে ইউরােপীয় সভ্যতা কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যশালী কিন্তু অন্তঃসারবিহীন ইহা বাহ্যিক আড়ম্বর দ্বারা মানবের অভাব ও ভােগতৃষ্ণা বাড়াইয়া মানবকে একান্ত স্বার্থপর, বাহসুখপ্রয়াসী, এবং তজ্জন্য নিতান্ত অসুখী করিয়াছে। ইউরােপীয় সভ্যতা যে কতদূর অনিষ্টকর তাহা গত সমগ্র-পৃথিবী-জড়িত যুদ্ধে বিশেষরূপে প্রকাশ পাইয়াছে। অতি সামান্য কারণে সেই যুদ্ধের আগুন জ্বলিয়া উঠে কিন্তু ইউরােপীয় নামে-সুসভ্য জাতি মধ্যে ঘােরতর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পরস্পাপহরণ-প্রিয়তা ও অতীব স্বার্থপরতা উহার প্রকৃত কারণ। জার্মাণির অভিপ্রায় কিসে পৃথিবী মধ্যে অধিকার বিস্তার দ্বারা ইংলণ্ড ফ্রান্স ও রুধিয়াকে বিধ্বস্ত করিয়া সমগ্র পৃথিবীতে সাম্রাজ্য ও বাণিজ্য বিস্তার করিবে। ফ্রান্স ও ইংলণ্ডের অভিপ্রায় কিসে জাৰ্ম্মাণি আপনার ক্ষমতা বৃদ্ধি করিতে না পারে। এই কারণে এই ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইয়া কত নােক ও কত অর্থ নাশ কত দেশ অরণ্যপ্ৰায় হইয়াছে তাহা বর্ণনাতীত। ইউরােপীয় বাহ বিজ্ঞানের যত কিছু উচ্চ শিক্ষা কেবল মানুষ মারিবার ও দেশ অরণ্যে পৰ্য্যবসিত করিবার জন্য অপব্যবহৃত হইয়াছে। অধৰ্মীর হন্তে বিজ্ঞান মানবের উপকার না করিয়া ঘােরতর পাপকার্যে নিযুক্ত হইয়াছিল। ইউরােপীয় সভ্যতার মধ্যে যে কিছু শ্ৰেষ্ঠ বলিয়া আমরা মনে করি সে সমস্তই পরপীড়নে ও ঈশ্বরের সৃষ্টিনাশ ৪ন্ত নিয়ােজিত হইয়াছিল অতএব এ সভ্যতার অনুকরণ দ্বারা ইহার ঘােতর ধর্ম হীনতা ও স্বার্থপরতা এ দেশে আনয়ন করা কোন ক্রমেই যুক্তিসিদ্ধ নহে। এরূপ বিজ্ঞান শিক্ষা অপেক্ষা অজ্ঞানতা যে অনেক ভাল তাহার কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। অপন্ন ভাবে ইউরােপীয় সভ্যতার আলােচনা করিলেও দেখিতে পাওয়া যায় উহা মানব হৃদয়ে পাশব বৃত্তির অধিক পরিমাণে জাগরুক করিয়াছে। ইউরােপীয় সভ্যতার যে দিকে দৃষ্টিপাত করা যায় সেই দিকেই স্বার্থপরতা আত্মম্ভরিতা, অপরের সহিত প্রতিদ্বন্দিতা এবং অপরকে ঘৃণার চক্ষে দেখা, বিরাজ করিতেছে। ইউরােপীয় সভ্যতার প্রধান ফল ঐ সকল জাতির প্রভূত বনােপাৰ্জন। এই ধনােপাৰ্জন বাণিজ্য ও নানাবিধ কলকারখানা হইতে ঘটিয়াছে। এরূপ বহু ধন লাভ দ্বারা ঐ সকল দেশের বাহ্যিক চাকচিক্য অনেক বৃদ্ধি পাইয়াছে সত্য; অনেক বৃহৎ বৃহৎ অট্টালিকা ও রাজযােগ্য প্রাসাদ ও নানাবিধ বিলাসের দ্রব্য সৃষ্টি হইয়াছে ও হইতেছে বটে; কিন্তু তাহার দ্বারা মানবের সুখবৃদ্ধি না হইয়া কষ্টই বৃদ্ধি হইয়াছে। ধনের উপার্জন অনেক হইতেছে বটে কিন্তু ঐ ধন দেশের শ্রমজীবী দিগের দ্ররিদ্রতা মোচন করে নাই। তাহারা যদিচ ঐ ধন লাভের একমাত্র সহায়, তাহারাই যদিচ স্বকীয় শারীরিক পরিশ্রম দ্বারা ঐ ধন অর্জন করিতেছে তাহাদের দুর্দশা মোচন হইতেছে না। ঐ ধন দেশমধ্যে প্রসারিত না হইয়া উহা কেবল জনকতক লােকের কোষ পূরণ করিতেছে ; যাহাদের দ্বারা ঐ ধন অর্জিত হইল তাহারা কষ্টে উদর পূরণ করিয়া কোনরূপে জীবন ধারণ করিতেছে। ইহাতে নানারূপ কুফুল ফলিতেছে। ধনীলোকগণের হৃদয়ে সর্বগ্রাসিতার উদয় হইয়া, হৃদয় কঠিন ও স্বার্থপর করিয়া উহাদিগকে ঘােতর বিলাসী করিয়া তুলিয়াছে এবং শ্রমজীবীদিগের প্রতি সহানুভূতি উহাদের হৃদয় হইতে, একেবারেই লােপ পাইয়াছে। উহাৱা আপনাদিগকে শ্রেষ্ঠ মনুষ্য বিবেচনা করিয়া অপর সাধারণ মানবকে ঘৃণার চক্ষে দেখিতেছে। যীশু খ্রীষ্ট শিক্ষিত মানবের প্রতি ভ্ৰাতৃভাব উহাদের মন মধ্যে প্রবেশ করিতে অসমর্থ। এইরূপ নিকৃষ্ট হৃদয় মানব স্বদেশী বা বিদেশী সাধারণ লােকের উপকার না করিয়া অপকারই করিয়া থাকে। অপরদিকে শ্রমজীবীগণ বহু শ্রম দ্বারা উপার্জিত অর্থে তাহাদের কোন অংশ নাই দেখিয়া ধনীদিগের প্রতি একান্ত বিদ্বেষ ভাব হৃদয়ে পােষণ করিতেছে। তাহারা কতকটা নিজদোষে কতকটা ধনীদিগের সর্বগ্রাসিতার জন্য নানা অভাব সহ করিতেছে ও বহুতর কষ্ট পাইতেছে। ধনীলােকগণ শ্রমজীবীদিগকে আত্মপদতলে রাখিবার প্রভূত চেষ্টা করিয়া তাহাতে সফলতা লাভ করিয়াছে। শ্রমজীবীগণ অল্প পিরশ্রমিক লইয়া বহু পরিশ্রম করিতেছে। এইরূপ অধিক পরিশ্রম করিয়াও তাহারা স্বয়ং অথবা সন্থানগণকে অর্থাভাবে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারে না এবং অজ্ঞতা বশত সে পক্ষে তাহাদের দৃষ্টি একেবারেই নাই। তাহারা যে অল্প বিশ্রামের সময় পায় তাহা পানাদি কুৎসিত আমােদে এবং বিবাদ বিসম্বাদে ক্ষেপণ করে। এইরূপে তাহাদের মধ্যে পাশববৃত্তি অতি প্রবল। প্রকৃত মনুষ্যত্ব উভয় শ্রেণীর কোন শ্রেণী মধ্যে নাই। অতএব এই ঘৃণিত সভ্যতা ও এই অসদুপায়ে অর্জিত ধন লইয়া কি হইবে। যাহাতে এই ইউরােপীয় সভ্যতা দূরীভূত হইয়া মানবে প্রেম ও ভ্রাতৃভাব জগতে স্থাপিত হয় তাহাই করা কর্তব্য। এ সভ্যতা আমাদের দেশ আক্রমণ করিয়াছে, যাহাতে ইহার বিস্তারের প্রতিরােধ হয় তাহা সকল ভারতবাসীরই একান্ত কর্তব্য। সভ্যতা হইতে ভারত রক্ষা করিতে হইবে তাহা নহে পরন্তু সমগ্র পৃথিবী হইতে কেবল এই বর্তমান ইউরোপীয় সভ্যতা দূরীকৃত করিতে হইবে নতুবা মানবের দুঃখের শান্তি হইবে না। ইউরােপীয় জাতির অপর এক প্রধান দোষ ইহারা শ্বেতেতর জাতিকে অতীব ঘৃণা করে এবং খেতের জাতি ইহাদের স্বার্থসাধন জন্য জন্মিয়াছে মনে করে। এইজন্য খেতেতর জাতির উপর ইউরােপীয়ের অত্যাচারে পৃথিবীর ইতিহাস কলঙ্কিত রহিয়াছে। ইউরােপীয় সভ্যতার তরঙ্গ রােধ করিবার একমাত্র উপায় আমাদের প্রাচীন সনাতন ধর্মের বহুল প্রচার। উপনিষদ নিহিত “একমেবাদ্বিতীয়ং” মহাবাক্যের অর্থ যত মানবগণ উপলব্ধি করিতে পারিবে এবং উহা কার্যে পরিণত করিতে পারিবে ততই স্বার্থপরতা, ধর্মহীনতা, জাতি বিদ্বেষ ও শ্রেণী বিদ্বেষ পৃথিবী হইতে অন্তর্হিত হইবে। মানব হৃদয়ে ঈশ্বরভক্তি যতই জাগুরুক হইবে, যতই মানব প্রত্যেক জীবকে ঈশ্বরের অংশ বলিয়া জানিতে পারিবে ও প্রত্যেক জীবের অন্তরে পরমাত্মা পরমেশ্বর বিরাজমান দেখিবে ততই তাহার হৃদয় হইতে মানব প্রতি ঘৃণা ও স্বার্থপরতা অর্থলােভ এবং শ্রেণী বিদ্বেষ ও জাতি বিদ্বেষ লােপ প্রাপ্ত হইবে। পরমাত্মা জ্ঞানের প্রসারের সহিত হৃদয়ের সঙ্কীর্ণতা দুর হইয়া আত্মপর ভেদ ক্রমশ হ্রাস হইবে এবং মানবের প্রতি প্রেম ও জীবে দয়া মানব অন্তঃকরণে উদ্ভূত হইবে। অতএব উপনিষদের বহুল প্রচার আবশ্যক। সংস্কৃত ভাষা জানুন আর নাই জানুন সকল ভারতবাসীই যাহাতে উপনিষদের জ্ঞান আয়ত্ত করিতে পারেন তাই সকল বিশ্ব হিতৈষীর একান্ত প্রার্থনীয়। ইউরােপীয় সভ্যতার স্রোত উপনিষদরূপ বাঁধ দ্বারা রােধিতে হইবে। নতুবা ভারতবর্ষের পক্ষে এবং সমগ্র পৃথিবীর পক্ষে শ্রেয়ঃ নাই। অতএব সকলে মিলিয়া উপনিষদ ও প্রাচীন শাস্ত্র-সমুদ্র মন্থন করিয়া অমৃত উত্তোলন করুন এবং সেই অমৃত কেবল ভারতবর্ষে লুকাইয়া রাখিবার দ্রব্য নহে হ সমস্ত পৃথিবীস্থ মানবকে বিলাইতে হইবে। ইউরােপীয় যদিচ আমা দর বর্তমান রাজনৈতিক দুরবস্থা জন্য এবং উহাদের আত্মম্ভরিতার দরুণ এদেশবাসীকে ঘৃণা করে তাহা হইলেও আমাদের কর্তব্য আমরা ছাড়ব না। আমরা আৰ্য্য শাস্ত্রোক্ত জ্ঞান দ্বারা ইউরােপীয় অন্ধকারময় হৃদয়ের মলা দূর করিতে চেষ্টা করিব তাহাই ভারত-সন্তানের কাৰ্য্য সেই কাৰ্যে ভারত-সন্তানের অবহেলা করা কৰ্তব্য নহে। উপনিষদের অর্থ যাহাতে সংস্কৃতানভিজ্ঞ পাঠক বুঝিতে সমর্থ হন তাহা এই সংস্করণে চেষ্টা করা হইয়াছে। আপাততঃ শুক্ল যজুৰ্বেদীয় ঈশােপনিষৎ মুদ্রিত হইল। ।
ive ইহাতে মূল, পূজ্যপাদ শঙ্করাচাৰ্য কৃত ভাষ্য অবলম্বনে অন্বয় ও টীকা, বাঙ্গল। প্রতিশব্দ ও বাঙ্গালানুবাদ প্রদত্ত হইল এবং ইহার দ্বিতীয় অংশে কেবল মূল ও সরল ব্যাখ্যা প্রদত্ত হইল। পাঠকের সুবিধার জন্য ঐ ব্যাখ্যার সহিত মূল পুনৰ্ব্বার অর্পিত হইল। পাঠক ব্যাখ্যা মধ্যে পুনরুক্তি অনেক দেখিতে পাইবেন তাহা উপনিষদেরই অভিপ্রায় অবলম্বনে লিপিবদ্ধ হইয়াছে ; অতএব আশা করি উহাতে পাঠক বিরক্ত হইবেন না। “একমেবাদ্বিতীয়ং” রূপ মহাবাক্যই উপনিষদের সৰ্বশ্রেষ্ঠ সত্য তাহাই পুনঃ পুনঃ বুঝাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে। আশা করি উপনিষদের এই ক্ষুদ্র সংস্করণ সংস্কৃতানভিজ্ঞ পাঠককে উপনিষদ পাঠে প্রবৃত্ত করাইবে। ভবিষ্যতে অপর কয়েটী উপনিষদ এইরূপে মুদ্রিত করিবার অাশা রহিল। পাটনা ১৭ই জানুয়ারী ১৯২২ মাঘ ১৩২৮ ঘােড়শীচরণ মিত্র।
No text on this page.
ঈশােপনিষৎ। ঈশা বাস্তমিদং সর্ববং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ। তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মাগৃধঃ কস্যস্বিদ্ধনং। ১ জগত্যাং পৃথিব্যাং ( জগতে) যৎকিঞ্চ (যাহা কিছু) জগৎ গচ্ছতীতি নশ্বর চরাচরং (নশ্বর চরাচর বস্তু সকল আছে। ইদং সর্বং (এই সকল ) ঈশ পরমেশ্বরেণ (পরমেশ্বর দ্বারা) বাস্তম্ ব্যাপ্তং (পরমেশ্বর এই সকল ব্যাপ্ত আছেন—তিনি এই সকলের অন্তরে ও বাহিরে বিরাজ করিতেছেন) তেন হেতুনা ত্যক্তন ত্যাগেন (অতএব বিষয়াসক্তি ত্যাগ দ্বারা ) ভুঞ্জীথাঃ পালয়েথাঃ ( ভােগ কর, পালন কর) মা গৃধঃ গৃধিং আকাক্ষং মা কার্ষ(ধন বিষয়ে আকাঙ্ক্ষা করিও না) কম্বি কস্যচিৎ ধনং (ধন কাহার ? ) অখবা মা গৃধঃ কস্যস্বিৎ ধনং ( কাহারও ধন আকাভক্ষা করিও না)। এই বিশ্বজগতে যাহা কিছু নশ্বর চরাচর পদার্থ আছে তাহা সমস্তই পরমাত্মা দ্বারা ব্যাপ্ত, তিনি ইহার অন্তরে, ও বাহিরে বিরাজ করিতেছেন অতএব বিষয়াসক্তি ত্যাগ দ্বারা আত্মাকে ভােগ কর ; আত্মজ্ঞানরূপ সুখ আস্বাদ কর। নশ্বর বিষয়াকাঙ্ক্ষা করিও না ; ধন কাহার ? অর্থাৎ কাহারও নহে। এই শ্লোকে আত্মজ্ঞানের বিষয় বলা হইল। দ্বিতীয় শ্লোকে কর্মের কথা বলা হইতেছে। যদি আত্মজ্ঞান লাভে অসমর্থ হও তাহা হইলে কৰ্ম্ম আচরণ কর। কুন্নেবেহ কৰ্ম্মাণি জিজীবিদ্বেচ্ছতংসমা। এবং ত্বয়ি নান্যথেকােহস্তি ন কৰ্ম্ম লিপ্যতে নরে। ২ যস্তু আত্মগ্রহণশক্তঃ (যিনি পূৰ্ব্ব শ্লোকোক্ত আত্মজ্ঞান লাভে অশক্ত তিনি কর্মাণি অগ্নিহােত্রাদীনি (অগ্নিহােত্র নামক যজ্ঞ প্রভৃতি অর্থাৎ শাস্ত্রবিহিত শুভকৰ্ম্ম সকল ) কুন্ এব (করিয়াই) শতং সমান সম্বৎসরান (শত বর্ষ) জিজীবিষেৎ জীবিতুম ইচ্ছে (জীবন ধারণ করিতে ইচ্ছা করিবেন) এবং এবম্প্রকারেণ (এইরূপে) ত্বয়ি জিজীবিষতি নরে (তােমার পক্ষে অর্থাৎ এইরূপ কৰ্ম্ম করিয়া যে মনুষ্য শতবর্য বাঁচিয়া থাকিতে চাহে তাহার পক্ষে অন্যথা প্রকারান্তরং (অন্য উপায় নাস্তি (নাই) যে প্রকারেণ ( ২ ) ( যাহার দ্বারা) কৰ্ম্ম ন লিপ্যতে (কোন কর্ম তােমাতে লিপ্ত না হয় অথবা কোন কর্মে তুমি লিপ্ত না হও) যিনি আত্মজ্ঞান লাভে অসমর্থ তাহার পক্ষে উপদেশ এই যে, তিনি শাস্ত্রবিহিত শুভকৰ্ম্ম করিবার জন্য শতবর্ষ পরমায়ু আকাঙ্ক্ষা করিবেন এইরূপ দীর্ঘকালপৰ্যন্ত শুভ সকাম কৰ্ম্ম করিতে করিতে কর্মে নিষ্কামত্ব লাভ করিবেন ইহা ভিন্ন কর্মে নিষ্কামত্ব লাভের অপর উপায় নাই। অসুৰ্যা নামতে লােক। অন্ধেন তমসাবৃতাঃ। তংস্তে প্ৰেত্যাভিগচ্ছন্তি যেকে চাত্মহননা জনাঃ । ৩। অসুৰ্যাঃ অসুরবাসযোগ্যা (অসুরদিগের বাস যােগ্য) নাম ইতি প্ৰসিদ্ধা অন্ধেন অদর্শনাত্মকেন (দৃষ্টি রহিত যেখানে দেখিতে পাওয়া যায় না) তমসা অন্ধকারেণ (অন্ধকার দ্বারা অর্থাৎ অজ্ঞান দ্বারা আবৃতঃ আচ্ছাদিত ( আবৃত তে ( সেই সকল ) লােকা লােক্যম্ভে কৰ্ম্মফলানি ভজন্তে ইতি লােকাঃ (যে স্থানে জীব কৰ্ম্মফল ভােগ করে তাহাকে লােক বলে যথা ভূলােক, ভুবলোক স্বর্গলোক ইত্যাদি) যে কে ( যাহারা) অত্মহনঃ আত্মানং স্লীতি ( আত্মাকে যাহারা হনন করে অর্থাৎ যাহারা আত্মজ্ঞানবিহীন অতএব প্রকৃতপক্ষে আত্মঘাতী) তে (তাহারা) তা লােকাল (সেই লোক সকলে - সেই সূলে) প্ৰেত্য মৃত্ব। {মরণান্তে) অভিগচ্ছস্তি (গমন করে)। যাহারা আত্মজ্ঞান রহিত তাহারা মৃত্যুর পর অন্ধ তমসাচ্ছন্ন অসুর লােকে গমন করে। সেই আত্মা যাহার জ্ঞানের কথা উপরে বলা হইয়াছে তিনি কিরূপ তাহা নিম্নের কয়েকটা শ্লোকে বলা হইতেছে। অনেজদেকং মনসাে জবীয়াে নৈনদ্দে অপুব পূৰ্বমর্ষ। তদ্ধাবতেন্যানতত্যতি তিষ্ঠৎ তস্মিন্নপপ মাতরিশা দধাতি । ৪। তৎ (তিনি—শব্দ এখানে উহ আছে। অনেজৎ ন এজৎ এজ, কম্পনে কম্পনং চলনং ব্যবস্থা প্রচ্যুতি: তদ্বর্জিতং ( অচল অর্থাৎ সৰ্ব্বদা একভাবে অবস্থিত) একং সৰ্ব্বদা একরূপং বা অদ্বিতীয়ং (তিনি সর্বদা একরূপ অথবা অদ্বিতীয়) মনসঃ (মন হইতে অর্থাৎ চিন্তাশক্তি হইতে) জবীয় জববস্তুরং ( অধিক বেগগামী) ( ৩ ) দেবাঃ দ্যোতনাৎ দেব চক্ষুরাদীনি ইন্দ্রিয়াণি (যাহারা আলােকিত করেন তাহারা দেবতা, চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়গণ আমাদিগকে জ্ঞান দ্বারা আলােকিত করেন অতএব এখানে তাহদের দেবতা বলা হইয়াছে এ স্থলে দেবাঃ অর্থে জ্ঞানেন্দ্রিয় সকল ) পূৰ্বমর্ষৎ পূৰ্ব্বং গতং (অগ্রে গত) এনৎ (ইহাকে) ন অণুবন্ ন প্রাপ্তবস্তঃ (চক্ষুরাদি দেবতাগণ অগ্রগামী হইয়াও ইহার সহিত ধাবমান হইতে পারে না। তৎ (তিনি) তিষ্ঠৎ স্থিরং ( স্থিরভাবে থাকিলেও) অন্যান্ (অন্যকে অর্থাৎ মন, চক্ষু ইত্যাদিকে) অত্যতি অতীত্য গচ্ছতি (অতিক্রম করেন) তস্মিন ( হাতে সেই আত্মায় মারিশ্যা মারি অন্তরীক্ষে শয়তি গচ্ছতীতি (মারি অর্থে যিনি অন্তরীক্ষে গমন করেন অর্থাৎ বায়ু) অপঃ (জল) দধাতি বিজতি ধারয়তি বা (ধারণ করে)। এই শ্লোকে মারিশ্যা অর্থে বায়ু ও অপঃ অর্থে জল বুঝিতে হইবে। অথবা মারিশ্যা অর্থে জগতের বিধাতা হিরণ্যগর্ভ ও অপঃ অর্থে প্রাণীদিগের প্রণিধারণ প্রভৃতি ক্রিয়া ও কৰ্ম্মফল বুঝিতে হইবে। তিনি অদ্বিতীয়, তিনি নিশ্চল অথচ মন হইতেও দ্রুতগামী চক্ষুদি ইন্দ্রিয়গণ অগ্রগামী হইয়াও তাহার সহিত ধাবমান হইতে পারে না। তিনি স্থির থাকিয়াও ধাবমান অন্যকে অতিক্রম করেন। তিনিই বায়ু ও জলকে ধারণ করিয়া আছেন। অথবা বিশ্ববিধাতা হিরণ্যগর্ভ তাঁহাকেই আশ্রয় করিয়া আছেন। প্রাণীগণ তাহা হইতেই কর্মে প্রেরিত হয় ও কৰ্ম্মফল ভােগ করে। তদেজতি তজৈতি তরে তবন্তিকে। তদন্তস্য সর্বস্য তদু সর্বস্যাস্য বাহ্যতঃ ॥ ৫। তৎ আত্মতত্ত্বং (তিনি-পরব্রহ্ম বা পরমাত্মা) এজতি চলতি (চলেন) তৎ ন এঙ্গতি (তিনি চলেন না অর্থাৎ নিশ্চল) তৎ দুরে (তিনি দূরে অবস্থিত) তদ উ অন্তিকে সমীপে অপি (তিনি নিকটেও) তৎ সৰ্বস্ত অস্য (এই সমস্ত জগতের) অন্তঃ ( অভ্যন্তরে আছেন) তৎ উ অ সৰ্বস্ত বাহ্যতঃ (এই সমুদয় বিশ্বজগতের বাহ প্রদেশেও আছেন। তিনি সচল এবং নিশ্চল তিনি সকল পদার্থের দূরেও আছেন এবং নিকটেও আছেন। তিনি সমুদয় বিশ্বসংসারের অন্তরেও আছেন এবং বাহিরেও আছেন। প্রথম শ্লোকে যে ঈশাবাদ্যমিদং সৰ্ব্বং বলা হইয়াছে সেই কথাই এই শ্লোকে বিশদরূপে বুঝান হইতেছে। অর্থাৎ পরমাত্মাই সমুদয় বিশ্বসংসার ব্যাপিয়া রহিয়াছেন। তিনিই সর্ব জগতের আধার ও আশ্রয়স্থান।
( 4 ) যস্তু সর্ববাণি ভূতানি আত্মবোমুপতি। সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে ৷ ৬ ৷ যঃ (যে ব্যক্তি) সৰ্বাণি (সকল) ভূতানি ( ভূতগণকে) আত্মনি (পরমাত্মাতে- পরমেশ্বরে) এব অনুপশ্যতি (দেখেন) সৰ্ব্বভূতেষু (সকল জীবে) চ আত্মানং (পরমেশ্বকে) অনুপশ্যতি ততং তস্মাৎ এব দর্শনাৎ (সেই রূপ দেখার দরুণ অর্থাৎ পরমাত্মায় ও জীবে ভেদজ্ঞান না থাকায়) ন বিজুগুপ্সতে ঘৃণাং ন করােতি ( ঘৃণা করেন না)। যিনি সর্বভূতে পরমাত্মা এবং পরমাত্মাতে সৰ্ব্বভূত অবস্থিত দেখেন তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না। যস্মিন্ সর্বাণি ভূতানি আত্মৈবাভূদ বিজানতঃ। তত্র কো মােহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ ঃ ৭৪ যস্মিন কালে (যখন) সৰ্বাণি ভূতানি (সৰ্ব্বভূত) আত্মা এব অভূৎ পরমার্থাত্ম- দর্শনাৎ আত্মৈব সংবৃত্তঃ (পরমার্থ দর্শনারা আত্মা বলিয়া বােধ হয়) বিজানতঃ ( যিনি সম্যকজ্ঞাত অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে আত্মজ্ঞান লাভ করিয়াছেন তাহার) তত্র তস্মিন কালে (তখন) একত্বমনুষ্যতঃ (একত্বদর্শী অভেদ জ্ঞানীর পক্ষে কঃ মােহ ক শােক (মােহই বা কি শােকই বা কি ? অর্থাৎ শোক মােহ থাকে না। যখন সর্বভূতে আত্মজ্ঞান হয় অর্থাৎ সৰ্বভুতই আত্মার স্বরূপ সৰ্ব্বভূতেই আত্মা বিরাজ করিতেছেন এইরূপ জ্ঞান হয় সেই একতত্ত্বদশী অভেদ জ্ঞানীর পক্ষে শােকই বা কি, মােহই বা কি ? অর্থাৎ শােক মোহ থাকে না। সপৰ্যগাচ্ছুমকায়মণং অাবিরং শুদ্ধমপাপবিং। কবিমনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভু যাথাতথ্যতােহথা বাদাৎ শাশ্বতভ্যঃ সমাস্য। ৮। সঃ আত্মা (সেই আত্মা) পৰ্য্যগৎ পরি সমন্তাৎ অগাৎ গতবা আকাশব্যাপী ( আকাশর ন্যায় চতুর্দিক ব্যাপী) শুক্রং জোতিষ্মৎ দীপ্তিমান্ (জ্যোতির্ময়) অকায়ং ( অশরীর, স্থূলদেহবিহীন) অব্ৰণং অক্ষত (স্থূলদেহ না থাকায় তিনি অক্ষত) অাবির আবাঃ শিরাঃ যস্মিন্ ন বিদ্যন্তে ইতি (শিরারহিত) শুদ্ধং নিৰ্ম্মলং অবিদ্যামল- রহিত ( নিৰ্ম্মল, অবিদ্যারূপ মল তাহাতে নাই ) অপাপবিদ্ধং ধৰ্মধৰ্ম্মাদি c .
( ৫ ) পাপবর্জিতং (পাপবর্জিত-পাপ তঁাহকে স্পর্শ করিতে পারে না) কবিঃ ক্রান্তদর্শী সৰ্ব্বদৃক (সৰ্ব্বদ্রষ্টা) মনীষী মনসঃ ঈষিতা (মনের প্রভু অর্থাৎ সৰ্বজ্ঞ ) পরিভূঃ সৰ্ব্বেং পরি উপরি ভবর্তীতি পরিভূঃ (সর্বোপরি বিরাজ মান অথবা সৰ্বশ্রেষ্ঠ) স্বয়ঃ স্বয়মেবভবতীতি (স্বয়ং জন্মিয়াছেন) সঃ (তিনি) যথাতথ্যতঃ যথাতথাভাব যথাতথ্যং ( যথাতথ্যরূপে—যেখানে যেরূপ উচিত সেইখানে সেইরূপ) শাশ্বতীভ্যঃ নিত্যাভ্যঃ (নিত্য চিরকাল) সমভ্যঃ সংবৎসরাখ্যেতঃ প্রজাপতিভ্যঃ ( সমনামক প্রজাপতিগণকে। অর্থান্ কৰ্ম্মফল সাধনতঃ কৰ্তব্যপদার্থান্ ( কৰ্ম্মফল সাধন জন্য কর্তব্য কৰ্ম) ব্যদধাৎ বিহিতবান (বিহিত করিয়াছেন, দিয়াছেন) তিনি সৰ্ব্বদিগ্ধ্যাপী, জ্যোতির্ময়, স্থূলদেহবিহীন, স্থূলদেহবিরহিত হওয়ায় শিরা ও ক্ষত রহিত, শুদ্ধ, পাপবর্জিত, তিনি স্বৰ্ব্বদশী সৰ্ব্বজ্ঞ সৰ্ব্বোপরি বিরাজমান, ও স্বজন্তু; তিনি সংসখ্য প্রজাপতিগণকে যথােপযুক্তরূপে কৰ্তব্য বিধান করিতেছেন। তন্ধমঃ প্রবিশন্তি বেহবিদ্যামুপাসতে। তছো ভূয় ইবতে তমাে য উ বিদ্যায়াং রঃ ৯। যে ( যাহারা অবিদ্যা বিদ্যায়াঃ অধ্যা অবিদ্যা তাং কৰ্ম্ম ইত্যর্থ অবিদ্যাং অগ্নিহােত্রাদিলক্ষণাং ( অবিদ্যা অর্থে বিদ্যা হইতে অন্য অর্থাৎ অগ্নিহােত্রাদি শাস্ত্র বিহিত সকাম কৰ্ম্ম) উপসিতে তৎপর সন্তঃ অতিষ্ঠন্তি ( উপাসনা করে- কৰ্ম্মোপাসনা করে অর্থাৎ শাস্ত্রবিহিত কৰ্ম্মের সকাম অনুষ্ঠান করে) তে (তাহারা অন্ধং তম (অজ্ঞানান্ধকার আত্মজ্ঞান অভাবে প্রকৃত তত্ত জানায় আমি আমার ইত্যাদি অভিমানজনক অজ্ঞানতা) প্রবিশন্তি (প্রবেশ করে) যে ( যাহারা) উ { পুনশ্চ বিদ্যায়াং কৰ্ম্ম হিত্বা শাস্ত্রবিহিতং কৰ্ম্মানুষ্ঠান পরিত্যজ্য (শাস্ত্রবিহিত কৰ্ম্মানুষ্ঠান ত্যাগ করিয়া কেবল দেবতাজ্ঞানে) রতাঃ (রত) (তাহারা) ভুয়া ইব বহুতরমেব ( অধিকতর) তমঃ ( অজ্ঞানান্ধকার) প্রবিশন্তি (প্রবেশ করে ) যাহারা কেবল শাস্ত্রবিহিত কৰ্ম্মানুষ্ঠান করেন তাহারা অজ্ঞানান্ধকারে প্রবেশ করেন আর যাঁহারা কৰ্ম্মানুষ্ঠান ত্যাগ করিয়া কেবল দেবতারাধনা করেন তাহারা উপেক্ষা অধিকতর অন্ধকারে প্রবেশ করেন। অন্যদেবাহুর্বিয়াহদাহুরবিদ্যুয়া। ইতি শুশ্রম ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে। ১০। অন্তৎ পৃথক্ এব ( পৃথক ) বিদয়া (বিদ্যাদ্বারা) ক্রিয়তে ফলং ইতি আহুঃ বদন্তি (বিদ্যাদ্বারা পৃথক ফল প্রাপ্ত হওয়া যায় ইহা পণ্ডিতগণ বলিয়া থাকেন।
( ৬ ) অবিনয় অন্যৎ (অবিদ্যা অর্থাৎ কৰ্ম্মানুষ্ঠান দ্বারা পৃথক ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়- অর্থাৎ বিদ্যার ও অবিদ্যার ফল এক নহে উহ। পৃথক পৃথক-একটী হইতে দেবলোক প্রাপ্তি অপরটী হইতে কেবল পিতৃলােক প্রাপ্তি) ইতি (ইহা) শুশ্রুমঃ শ্রুতবস্ত ( শুনিয়াছি) ধীরাণাং ধীমতাং (জ্ঞানীদিগের নিকট হইতে) যে (যাহারা) নঃ অস্ম শ্যম্ ( অমাদিগকে) তৎ ( কর্ম দেবতাজ্ঞানং চ) বিচচক্ষিরে বাখ্যাতবন্ত ( ব্যাখ্যা করিয়াছেন) পণ্ডিতগণ বলেন বিদ্যার ফল এক ও অবিদ্যার ফল অপর যে আচাৰ্য্যগণ ঐ তত্ত্ব আমাদিগকে উপদেশ দিয়াছেন তাহাদের নিকট হইতে আমরা শুনিয়াছি। বিদ্যাঞ্চাবিদ্যাঞ্চ যন্তদ্বেদোভয়ং সহ। অবিদয়া মৃত্যুং তীত্ব বিদ্যমৃতমতে ॥ ১১। যঃ যিনি বিদ্যাং দেবতাজ্ঞানং চ অবিদ্যাং (কৰ্ম্ম ) চ তৎ উভয়ং সহ (ঐ দুইটাই এক সঙ্গে অনুষ্ঠেয় ইতি বেদ (জানেন। (তিনি) অবিদায় ( কর্ম দ্বারা) মৃত্যুং তী। (মৃত্যুকে অতিক্রম করিয়া) বিদ্যা দেবতাজ্ঞানেন দেবতাজ্ঞান দ্বারা ) অমৃতত্ত্ব অমরভাবত্বং ( অমরত্ব) অণুতে প্রগােতি (প্রাপ্ত হন। যিনি সকাম কৰ্ম ও সকাম দেবোপাসনা এই উভয় এক সঙ্গে অনুষ্ঠান করেন তিনি ক্রমশঃ দুইটার এক অনুষ্ঠানের ফলে অমরত্ব অর্থাৎ দেবত্ব লাভ করেন। অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেহস্যুতিমুপাসতে। ততাে ভূয় ইবতে তমাে য উ সম্ভ,ত্যাং রতঃ ॥১২। যে (যাহারা অগ্নিহােত্রাদি কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া) অসতিং, সম্ভবনং সতিঃ সাবস্য কাৰ্য্যং সা সতিঃ তস্যাঃ অন্যা অসম্ভুতিঃ অব্যাক্তা প্রকৃতিঃ (যাহার সস্তৃতি অর্থাৎ উৎপত্তি নাই তাহা অসম্ভুতি এই বিশ্বজগতের আধার কাম্য কর্মের বীজ সমুদয় পদার্থের মূল কারণ মূলপ্রকৃতি ইহা অনাদি ও অনন্ত উৎত্তি ও বিনাশ হীন) তাং { তাহাকে) উপিসতে (উপাসনা করে) তে (তাহারা } অন্ধং তমঃ অদর্শনাত্মকং অজ্ঞানং ( অজ্ঞানান্ধকারে ) প্রবিশন্তি ( প্রবেশ করে ) যে উ ( যাহারা ও) সত্যাং (উৎপত্তিশীল হিরণ্যগর্ভাদিতে) র (আসক্ত অর্থাৎ উপাসনা করে) তে (তাহারা) ততঃ (তাহা হইতে) ভূয়ঃ ইব (অধিকতর) তমঃ ( অন্ধকারে ) ( প্রবেশ করে ) যাহার উৎপত্তি রহিত মূল প্রকৃতির উপাসনা করে তাহারা অজ্ঞানন্ধকারে প্রবেশ করে এবং যাহারা হিরণ্যগর্ভাদির উপাসনা করে তাহারা উহা হইতে অধিকতর অন্ধকারে প্রবেশ করে।
( ৭ ) অন্যদেবহুঃ সম্ভবাদন্যদাহুরসম্ভবা। ইতি শুক্রম ধীরাণাং মে নস্তদ্বিচচক্ষিরে । ১৩। সম্ভবাৎ (হিরণ্যগর্ভাদি উপাসনা হইতে) অন্যৎ ( পৃথক ) এব ফলং আহু ( পণ্ডিতগণ বলেন) অসম্ভবাৎ অব্যাকৃৎ অব্যাক্তােপাসনাৎ ( প্রকৃতির উপাসনা হইতে) অন্যৎ ( পৃথক ) ফল ইতি (ইহা) শুশ্রুম (আমরা শুনিয়াছি) ধীরাণাং ( পণ্ডিতদিগের নিকট হইতে) যে (যাহারা) তৎ (তাহা-ঐ উভয় ফল) না ( আমাদিগকে) বিচচক্ষিরে ব্যাখ্যাবন্তঃ (ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যে সকল পণ্ডিতগণ আমাদিগকে উপদেশ দিয়াছেন তাহাদের নিকট শুনিয়াছি যে হিরণ্যগর্ভাদির উপসনার ফল এক ও প্রকৃতির উপাসনার ফল অন্য । সতিঞ্চ বিনাশঞ্চ যস্তদ্বেদেভিয়ং সহ। বিনাশেন মৃত্যুং তীবা সত্যামৃতমতে। ১৪। যঃ ( যিনি সম্ভুতি অসম্ভুতিঞ্চ এখানে সস্তৃতি অর্থে অসস্তুতি- ছন্দানুবােধে অকারের লােপ হইয়াছে। বিনাশঞ্চ বিনাশঃ ধর্মঃ যস্য কাৰ্য্যস্ত তং হি (এস্থলে বিনাশ শব্দের অর্থ হিরণ্যগর্ভাদি বুঝিতে হইবে—যাহার বিনাশ হয় অথবা যাহার উপাসনার ফল বিনাশ--এই শেষােক্ত অর্থই প্রশস্ত ) তৎ উভয়ং (সেই দুইটাই ) বেদ (জানেন অর্থাৎ উভয় উপাসনাই পুরুষের অনুষ্ঠেয় ইহা জানেন) (তিনি) বিনাশেন ( বিনাশ দ্বারা—হিরণ্যগর্ভর দেবতাদিগের উপাসনা দ্বারা মৃত্যু তীব্ধ। (মৃত্যু অতিক্রম করিয়া) সদ্ভুত্যাং ( প্রকৃতির উপাসনা দ্বারা) অমৃতং (অমরত্ব) অশ্ন তে প্রাপ্নোতি (প্রাপ্ত হন। যিনি প্রকৃতি ও হিরণ্যগর্ভের একসঙ্গে উপাসনা করেন তিনি এই উভয় অনুষ্ঠানের ফলে ক্রমশঃ উন্নত হইয়া পরে অমৃত অর্থাৎ অমরত্ব প্রাপ্ত হন। হিরন্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখং । তত্ত্বং পূষপাণু সত্য ধৰ্ম্মায় দৃষ্টয়ে। ১৫। হিরন্ময়ন পাত্রেণ (সুবর্ণ পাত্রের দ্বারা অথবা জ্যোতির্ময় আবরণ দ্বারা। সত্যহ ব্ৰহ্মণঃ (পরব্রহ্মের) মুখং দ্বারং (ব্ৰহ্ম প্রাপ্তির দ্বার) অপিহিতং ( আচ্ছাদিত) হে পূষণ জগতঃ পােষক (হে জগৎ পোষক হে পরমাত্মন্) তৎ (সেই আবরণ) সত্যধর্মায় (সত্যধৰ্ম্ম অনুষ্ঠানের জন্য দৃষ্টয়ে (সত্যসাক্ষাৎকারের জন্য অপবৃ অপসারয় (উন্মোচন করুন) হিরন্ময় পাত্রের দ্বারা সত্যের মুখ আবৃত হে জগৎ পােক সত্যধর্ম আচরণ ও সত্যদৃষ্টির জন্য সেই আবরণ উন্মোচন করুন।
( ৮ ) পূষম্নেকর্ষে যম সূৰ্য্য প্রাজাপত্য ব্যুহ রশ্মী সমূহ তেজো যং তে রূপং কল্যাণমং তত্তে পশ্যামি, যােহসাবসো পুরুষঃ সােহহমস্মি॥১৬। হে পূষন জগতঃ পােষণাৎ পূষা তত সম্বোধনে (হে জগৎ পোেষক!) একর্ষে এক এব ঋষতি গচ্ছতি একষি: (হে একাকী গমনশীল) যম সৰ্ব্বস্ত সংযমনৎ যমঃ (হে সৰ্ব্বসংযমকারিন্) হে সুৰ্য্য রক্ষীণাং প্রাণানাং বনাঞ্চ স্বীকণাৎ সূৰ্য্যঃ (সূৰ্য্য জগৎ হইতে রস ও প্রাণ গ্রহণ করেন এবং সর্বজগতে রস ও প্রাণ দান করেন) প্রাজাপত্য প্রজাপতেঃ অপত্যং (হে প্রজাপতিপুত্র) রশ্মীন্ (সূৰ্য্যরশ্মী সূৰ্যতেজ ) বৃহ বিগময় ( সম্বরণ করতেজো সমূহ একীকুরু উপসংহর ( উপসংহার কর) তে (তােমার) যৎ {যে} কল্যাণমং রূপং (কল্যাণতম রূপ অত্যন্ত শােভন রূপ) তৎ (তাহা) তে (তােমার প্রসাদে ) পানি ( আমি দেখিব। যঃ ( যিনি ) অসে (এই অর্থাৎ আদিত্য মণ্ডলস্থ ) পুরুষঃ (পুরুষ অর্থে যিনি মানবাকার অবয়ববিশিষ্ট অথবা সমগ্র জগৎ পূর্ণ করিয়া আছেন অথবা সমস্ত জগতের অন্তরাত্মা) সােহহমস্মি ( তিনিই আমি। হে জগৎ পােষক। হে যম, হে সূর্য, হে প্রাজাপত্য তােমার রশ্মী অপনয়ন কর এবং তেজ সম্বরণ কর যাহাতে আমি তোমার কল্যাণতম রূপ দেখিতে পাই। এই সমগ্র বিশ্বব্যাপী যে পরমাত্মা তিনিই আমি। বায়ুরনিল মমৃতমথেদং ভন্মান্তং শর রং। ও ক্রতে স্মর কৃতং স্মৰ ক্ৰতাে স্মর কৃতং স্মর। ১৭। অথ ইদানীং (এক্ষণে ) মরিষ্যতঃ মম (মৃত্যুকাল উপস্থিত আমার) বায়ু (প্রাণবায়ু) অনিলং সর্বাত্মকং অধিদৈবতং অমৃতং প্রতিপদ্যতাং ( সর্বাত্মক চিরস্থায়ী মহাবায়ুতে পরিণত হউক ) ইদং শরীরং ভস্মান্তং ভূয়াৎ ( এই শরীর অগ্নিতে আহুত হইয়া ভস্মীভূত হউক) ও (ঈশ্বর স্মরণ করিতেছেন) হে ক্ৰতো ( ক্রতু অর্থে যিনি ক্রিয়া করেন অর্থাৎ মন হে মন স্মর ( স্মরণ কর) কৃতং নিজকৰ্ম্ম যাহা যাবজ্জীবন করিয়াছ তাহা স্মরণ কর। তো স্মর কৃতং স্মর ( অতিশয় প্রয়ােজন বিধায় পুনরুক্তি করা হইয়াছে। এক্ষণে আমার মৃত্যুকাল উপস্থিত আমার প্রাণবায়ু অমৃতময় মহাবায়ুতে মিশ্রিত হউক। আমার দেহ অগ্নিতে আহতিস্বরূপ হইয়া ভস্মীভূত হউক। ও ব্রহ্ম । হে মন নিজ কৃতকাৰ্য্য ও কর্তব্য স্মরণ কর, স্মরণ কর, স্মরণ কর।
( 9 ) অগ্নে নয় পথ রায়ে অস্মান্ বিশ্বানি দেব বয়ুনানি বিদ্বান্। যুষােধ্যস্মৰ্জ্জুহুরাণমেনন ভূতিষ্ঠাং তে নম-উক্তিং বিধেম ॥ ১৮। হে অগ্নে অস্মন্ (আমাদিগকে) রায়ে ধনায় কর্মফল ভােগয় (কর্মফল ভােগ জন্য ) সুপথা সুমাৰ্গেন (সুপথ দ্বারা) নয় গময় ( লইয়া যাও হে দেব [ ত্বং ] বিশ্বানি সৰ্বাণি বয়ুনানি কৰ্মাণ জ্ঞানানি বা (কৰ্ম্ম অথবা জ্ঞান) বিদ্বান্ জান (জ্ঞাত আছ) অম্মৎ ( আমাদিগের হইতে) জুহুরাণং কুটিলং বঞ্চত্মানং ( প্রবঞ্চনাকারী) এনঃ পাপং (পপি) যুযযাধি বিয়ােজয় ( যুদ্ধকর নিশকর) ততঃ বয়ং বিশুদ্ধা সন্তঃ ইষ্ট প্রাঙ্গ্যাম ইত্যভিপ্রায় 1. হে তুভ্যং (তােমাকে ভূয়িষ্টাং বহুতরাং (বহু বহু ভূরিভূরি) নমঃ উক্তিং (নমস্কার বচনং) বিধেম পরিচয়েম { নমস্কার দ্বারা তােমাকে প্রসাদিত করিব ) হে অগ্নি কর্মফল ভােগ জন্য আমাদিগকে সুপথে লইয়া যাও ; হে দেব তুমি সমুদয় কর্ম ও জ্ঞান জ্ঞাত আছে ; আমাদিগের মন মধ্যে যে প্রবঞ্চনাত্মক পাপ আছে তাহা বিনাশ কর। আমরা ভূরি ভূরি তােমার স্তুতি করিতেছি। ওঁ পূর্ণ মদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণ মুদচ্যতে পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণ মেবাবশিষ্যতে । ও { ওঙ্কার স্মরণ করিয়া) পূর্ণং অদঃ ( উহ।) পূর্ণ মিদৎ (ইহা এই সমগ্র বিশ্ব ) পূর্ণাৎ (পূর্ণ হইতে) পূর্ণং উদচ্যতে । উদগত হয়) পূর্ণস্য (পূর্ণের) পূর্ণং আদায় ( লইলে) পূর্ণং এব (পূর্ণ ই) অবশিষ্যতে ( অবশিষ্ট থাকে) ও যাহাকে উহা বলিয়া নির্দেশ করা যায় তিনি পূর্ণ অর্থাৎ পরব্রহ্ম পূর্ণ ; যাহাকে ইহা বলিয়া নির্দেশ করা যায় অর্থাৎ এই সমগ্র বিশ্ব তাহাও পূর্ণ। পূর্ণ হইতে পূর্ণ উৎপন্ন হয় অর্থাৎ পরব্রহ্ম হইতে বিশ্ব উদগত হয় এবং পূর্ণ হইতে পূর্ণ লইলে অর্থাৎ পরব্রহ্ম হইতে বিশ্ব উৎপন্ন হইলেও পূর্ণই অবশিষ্ট থাকে। ও শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তি ইতি ঈশােপনিষদ সমাপ্ত ২
No text on this page.
উপনিষদের সমুল ব্যাখ্যা। জগৎ শব্দের অর্থ। (ঈশা) ঈশা বাস্তমিদং সর্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ। এই যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দেখিতেছ ইহা কি তাহাই ঈশােপনিষদের প্রথম শ্লোকের প্রথমার্ধে বলা হইয়াছে। এই শ্লোকার্ধের অর্থ এই যে,—এই বিশ্বজগতে যাহা কিছু নশ্বর চরাচর পদার্থ আছে তাহা সকলই পরমাত্মা পরমেশ্বর দ্বারা ব্যাপ্ত, সকলের অভ্যন্তরে ও বাহিরে পরমাত্মা বিরাজ করিতেছেন। গচ্ছতীতি জগৎ। গম ধাতুর অর্থ গমন করা, যাহা গমন করে তাহাই জগৎ ; যাহা থাকে না, যাহা স্থায়ী নহে, যাহা অনিত্য, তাহাই জগৎ। এই প্রকাণ্ড বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যখন নামকরণ হইয়াছিল, যখন ইহাকে প্রথম জগৎ নামে অভিহিত করা হয় তখনই আমাদের ভারতীয় তত্ত্ব মানসম্পন্ন ঋষিগণ ইহার প্রধান প্রণের বিষয় অবগত ছিলেন, ইহা অস্থায়ী ইহা নশ্বর। এই শ্লোকার্ধে জগত শব্দ দুইবার ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রথম—জগত্যাং শব্দের অর্থ জগতে—এই স্থলে এই শব্দে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বুঝিতে হইবে। দ্বিতীয় জগৎ শব্দটীর এই স্থলে অর্থ নশ্বর। অর্থাৎ জগতের প্রধান গুণ নশ্বরতা তাহা ব্যক্ত করা হইয়াছে। যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ --ইহার অর্থ, বিশ্বসংসারে যাহা কিছু নশ্বর পদার্থ আছে। এক্ষণে বিশ্ব বা জগৎ কি তাহা বুঝিবার চেষ্টা করা যাউক। আমরা প্রতিদিন প্রাতে পূর্বদিকে নভােমণ্ডলে সুবর্ণময় গােলাকার যে পদার্থ দেখি এবং যাহা প্রাতঃকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সমস্ত দিনে পৃথিবীকে সুর্য্য। প্রদক্ষিণ করিতেছে বলিয়া বােধ হয় তাহার নাম প্রাচীন ঋষিগণ সূৰ্য্য দিয়াছেন। সূৰ্য্য অর্থে প্রসবিতা যিনি প্রসব করিয়াছেন, তিনি এই সৌর জগৎ প্রসব করিয়াছেন। এই সূৰ্য্য একটা প্রকাণ্ড গােলাকার অগ্নিময় আলােকময় তেজোময় পদার্থ। পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকেরা স্থির করিয়াছেন ; সৌরজগৎ। ( ১২ ) যে ইহা পৃথিবী হইতে ৯২৭,৩,০০০ নয় কোটা সাতাইশ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থিত ; ইহার আকার পৃথিবী অপেক্ষা ১৩,৩১,০০০ তের লক্ষ একত্রিশ সংস্র গুণ বড় এবং ওজনে পৃথিবী অপেক্ষা ৩,৩০,০০০ তিন লক্ষ তেত্রিশ সহস্র গুণ বেশী। কিরূপে সূর্যের পৃথিবী হইতে দূরত্ব, ইহার আকার ও ওন স্থির হইল ও তাহা কতদুর প্রকৃত ইহা এস্থলে বিচাৰ্য নহে। যাহারা সে বিষয়ে আলােচনা করিতে চাহেন তাহাদিগকে পাশ্চাত্য জ্যোতির্বিজ্ঞান শাস্ত্রের চর্চা করিতে হইবে। আমরা সে আলােচনা করিতে অসমর্থ ; অতএব পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত আমরা সত্য বলিয়া স্বীকার করিতে বাধ্য। এই প্রকাণ্ড তেজোময় আলােকময় ও অগ্নিময় পদার্থের চতুর্দিকে অপর কতকগুলি জড়পিণ্ড অনবরত ঘুরিতেছে ; তাহাদিগকে গ্রহ বলে। তন্মধ্যে পৃথিবী একটা ; অপর গ্রহগুলির নাম, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি প্রভৃতি। আমরা বাহত দেখিতে পাই যে সূৰ্য্য পৃথিবী প্রদক্ষিণ করিতেছেন, অতএব অশিক্ষিত লােক মাত্রেই মনে করে যে পৃথিবী একস্থানে অবস্থিত ও সূৰ্য্য দিনমানে তাহার পূর্বভাগ হইতে পশ্চিমে গমন করিতেছেন। কিন্তু বাস্তবপক্ষে সূর্গকে পৃথিবী প্রভৃতি গ্রহণ নিজ নিজ কক্ষ অবলম্বনে প্রদক্ষিণ করিতেছে। এই সকল গ্রহের সহিত কতকগুলি উপগ্রহ আই তাহারা এক একটী গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে যেমন, চন্দ্র আমাদের পৃথিবী গ্রহকে প্রদক্ষিণ করিতেছে অতএব চন্দ্র পৃথিবীর উপগ্রহ। এতদ্ব্যতীত আরও অনেক প্রকাণ্ড অথবা অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র পদার্থ অন্তরীক্ষে সূৰ্য্যকে আশ্রয় করিয়া ভ্রমণ করিতেছে, ইহাদের কেন্দ্র সূৰ্য্য। সূৰ্য্য ও তাহার অবলম্বনে যে সকল গ্রহ উপগ্রহ প্রভৃতি আকাশে ভ্রমণ করিতেছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সেই অংশকে সৌরজগৎ নামে অভিহিত করা হয়। ইহা বিশ্বের বা জগতের একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। রাত্রিকালে আকাশে নেত্ৰপাত করিলে আমরা দেখিতে পাই, অসংখ্য তারকাগণ সমুদয় আকাশের সহিত পূৰ্ব্ব হইতে পশ্চিমে সন্ধ্যা হইতে প্রাতঃকাল প্রতি রাত্র ভ্রমণ করিতেছে। কিন্তু বাস্তবিক ঐ নক্ষত্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। সকল পূর্ব হইতে পশ্চিমে ভ্রমণ করতেছে না, আমাদের পৃথিবী পশ্চিম হইতে পুৰ্ব্বদিকে ঘুরিতেছে। যে কারণে সূৰ্য্য ভ্রমণ করিতেছে ও পৃথিবী স্থির আছে বলিয়া বােধ হয় সেই কারণেই নক্ষত্র সকল নভােমণ্ডলের সহিত রাত্রিকালে একদিক হইতে অপর দিকে গমন করিতেছে বলিয়া ( ১৩ ) প্রতীয়মান হয়। বস্তুতঃ আমাদের পক্ষে এক স্থানে উহার অবস্থিত আছে বলিলে বিশেষ ভুল হয় না। ঐ সকল নক্ষত্র মধ্যে ছয় সাতটী ব্যতীত সবগুলিই এক একটা প্রকাণ্ড সূৰ্য্য-প্ৰায় ও এক একটা সৌরজগৎ তুল্য নাক্ষত্রিক জগতের কেন্দ্র। আমাদের সূৰ্য্য যেমন প্রকাণ্ডাকার, অগ্নিময় ও আলােকময় ঐ নক্ষত্রগুলিও সেইরূপ বৃহদায়তন বিশিষ্ট এবং ঐরূপ তাপ ও আলােক বিকীরণ করিতেছে। তন্মধ্যে অনেকগুলি আমাদের সূৰ্য্য অপেক্ষাও বহুগুণ বৃহদাকার ; আমাদের সূর্যের যেরূপ গ্রহ উপগ্রহ প্রভৃতি আছে উহাদের প্রত্যেকেরও ঐরূপ গ্রহ উপগ্রহ আছে এবং ঐ সকল গ্রহ উপগ্রহ তাহাদিগকে প্রদক্ষিণ করিতেছে। অতএব আমাদের সৌরজগতের ন্যায় লক্ষ লক্ষ কোটী কোটা অপর সৌরজগৎ বা নাক্ষত্রিক জগৎ এই বিশ্বে ভ্রমণ করিতেছে। ঐ নক্ষত্র সকল বহু দূরে অবস্থিত বলিয়া আমরা উহাদিগকে অত ক্ষুদ্র দেখি ; অধিক সংখ্যক নক্ষত্র এতই ক্ষুদ্র যে, আমরা দূরবীক্ষণ যন্ত্র বিনা তাহাদিগকে দেখিতে পাই না এবং অনেকগুলি এরূপ আছে যাহাদিগকে দূববীক্ষণের সাহায্যেও আমরা দেখিতে পাই না। আমরা পূর্বে বলিয়াছি যে সূর্য ও নক্ষত্র-গুলি নিশ্চল অর্থাৎ পৃথিবীর হিসাবে তাহারা এক স্থানে অবস্থিত মনে করিলে বিশেষ ভ্রম হয় না, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আমাদের সূৰ্য্য নিজ গ্রহ উপগ্রহগণ লইয়া বিমান পথে একদিকে অতি দ্রুতভাবে চলিতেছেন এবং সেইরূপ প্রত্যেক নক্ষত্রও নিজ নাক্ষত্রিক গ্রহ উপগ্রহ লইয়া আকাশ পথে তভাবে ভ্রমণ করিতেছে। আমাদের সৌরজগৎও এই অসংখ্য কোটী কোটী নাক্ষত্রিক জগৎ একত্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নামে অভিহিত হইয়া থাকে। উপরে আমরা ছয় সাতটী নক্ষত্রের কথা বলিয়াছি যাহা অপর নক্ষত্রের তুল্য নহে; তাহারা আমাদের এই সৌরজগতের গ্রহ, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি শনি প্রভৃতি ; ইহাদের নিজের আলােক নাই উহারা সূৰ্য্যালােকে আলােকিত হইয়া আমাদের চক্ষে নক্ষত্র বলিয়া প্রতীয়মান হয় কিন্তু উহারা নক্ষত্র হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন, দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পৰ্যবেক্ষণ করিলে জানা যায় যে উহারা পৃথিবীর ন্যায় সূৰ্য্যকে প্রদক্ষিণ করতেছে। আমরা উপরে যে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের বিবরণ দিলাম তাহা পাশ্চাত্য বিজ্ঞান অবলম্বন করিয়া। উপনিষদের আলােচনায় পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের কথা অপ্রাসঙ্গিক মনে হইতে পারে; কিন্তু ঈশ্বর জ্ঞান লাভ করিতে হইলে ঈশ্বরের সৃষ্টির জ্ঞান নিতান্ত আবশ্যক বলিয়া পাশ্চাত্য শাস্ত্রে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সম্বন্ধে যাহা বিবৃত আছে তন্মধ্যে কিঞ্চিৎ বিবরণ অতি সংক্ষেপে আমরা এস্থলে দিলাম। শিক্ষিত পাঠকের ( ১৪ ) পক্ষে এসকল পুরাতন কথা কিন্তু এই ক্ষুদ্র পুস্তক শিক্ষিত ও অশিক্ষিত উভয়েরই জন্য অতএব শিক্ষিত পাঠক এই সকল জ্ঞাত বিষয়ের উল্লেখ জন্য ক্ষমা করিবেন। আমরা পূৰ্বেই ভূমিকাতে বলিয়াছি যে উপনিষদ যে শিক্ষা দিতেছে তাহা ধ্যানগম্য। উপনিষদ ঈশ্বর জ্ঞান দান করে। এই জ্ঞান তর্কে প্রাপ্ত হওয়া যায় না ইহা কেবল উপদেশ দ্বারা লাভ করা যায় না। ধ্যানের আবশ্যকতা। এই জ্ঞান লাভ করিতে উপদেশ ও ধ্যান উভয়ই অবশ্যক। উপনিষদ শাস্ত্রে ঈশ্বর জ্ঞান সম্বন্ধে উপদেশ অতি সংক্ষিপ্ত ভাবে দেওয়া আছে ; এক একটা উপদেশ এক একটী শ্লোকে বা শ্লোকার্ধে অথবা শ্লোকের চতুর্থাংশে নিহিত আছে ; এই শ্লোক বা শ্লোকার্ধ বা শ্লোক-চতুর্থাংশকে মন্ত্র বলা যায় এই মন্ত্র ক্রমাগত ধ্যান করিতে হইবে, এই ধ্যান করিতে করিতে ইহার অর্থের সম্যক উপলব্ধি হইবে; একটী উপদেশ হইতে অপর উপদেশ স্বতঃই আপন মনে উদয় হইবে। প্রাচ্য ধৰ্ম্মজ্ঞান এইরূপে লাভ করিতে হয়। ইহা ব্যতীত পরীক্ষণ অবেক্ষণ বিচার ও তর্ক প্রভৃতি যে সকল উপায় পাশ্চাত্য বিজ্ঞান সম্বন্ধে ফলদায়ক হয় তাহা ও কতক পরিমাণে প্রয়ােজন। আমাদের মন ঈশ্বরের অংশ, ইহাতে সকল জ্ঞান নিহিত আছে। ন কেবল জ্ঞান ভুলিয়া বাহ্য বস্তু লইয়া বিব্রত ; মনকে বহির্মুখী আসক্তি ত্যাগ করাইয়া তাহাকে ধ্যান দ্বারা অনুমুখ করাইতে পারিলে ঈশ্বর জ্ঞান লাভ হয়। বহির্দেশে আমাদের মন নানাদিকে ধাবিত কোন দিকেই সবিশেষ মনঃ সংযােগ করিতে পারে না উহাকে বাহ হইতে নিবৃত্ত করিয়া অন্তরে একীকৃত করিয়া একটা বিষয়ে সংযােগ করিতে পারাই ধ্যান। এই ধ্যান দ্বারা অন্তর্নিহিত জ্ঞান প্রস্ফুটিত সকল জ্ঞানের জন্যই মনঃসংযােগ আবশ্যক ; ঈশ্বর জ্ঞান লাভের জন্য উহা অধিকতর প্রয়ােজনীয়, উহা না হইলে ঈশ্বর জ্ঞান হইবে না। ঈশ্বর সমুদয় বিশ্ব ব্যাপিয়া আছেন ইহা ধ্যান করিতে গেলে আগে বিশ্বের ধ্যান আবশ্যক। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের ধ্যান কিরূপে করিতে হইবে তাহার কোন এক প্রশস্ত পথ নাই । বিভিন্ন লােক স্বকীয় প্রকৃতি ও জ্ঞানানুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পথ অবলম্বন করিবেন, তবে মোটামুটি দুই একটা কথা বলা আবশ্যক। মনে করুন আপনি আপনার কলিকাতাস্থ বা অপর কোন নগরীস্থ অথবা গ্রামস্থ বাটীতে বসিয়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধ্যান করিতেছেন। আপনি সার্ধ তিন হস্ত পরিমিত ক্ষুদ্র মানব, দেড় বর্গ হস্ত পরিমিত আপনে বসিয়া চিন্তা করিতেছেন, দেখুন আপনি কত সামান্য স্থান • অধিকার করিয়া আছেন, সে তুলনায় আপনার বাটী অনেক বৃহৎ তাহাতে স্ত্রী পুরুষ বালক বালিকা প্রভৃতি অনেকে বাস করিতেছে; আপনার বাটীর তুলনায় আপনার গ্রাম কত বড়, গ্রামের তুলনায় আপনার জেলা, জেলার তুলনায় বাঙ্গালা দেশ কত বৃহৎ ইহাতে কত গ্রাম নগর নগরী, কত নদ নদী কত মনুষ্য পশু পক্ষী ইত্যাদি আছে এই বাঙ্গালা দেশ হইতে ভারতবর্ষ কত বিস্তৃত ইহাতে ৩৩ কোটী মানব বাস করিতেছে তাহাদের মধ্যে অনেকে নানারূপ আকাঙ্ক্ষায় নানা পথে বিচরণ করিতেছে, এইরূপ ভারতবর্ষ হইতে পৃথিবী ও পৃথিবী হইতে সৌর জগৎ ও তৎপরে বিশ্বব্রহ্মাও চিন্তা করিতে হইবে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আয়তন ধ্যান করিতে হইবে। আর এক ভাবে দেখুন। প্রথমতঃ এই মানব দেহের চিন্তা করুন ; ইহা একটী অত্যক্তৃত যন্ত্র ; ইহা মাংস, মেদ, অস্থি, শিরা প্রভৃতিতে অতি সুচারুরূপে গঠিত ; আমাদের বিনা চেষ্টায় এমন কি আমাদের অজ্ঞাতসারে কিরূপ সুশৃঙ্খলভাবে আমাদের শরীর-ক্রিয়া সাধিত হইতেছে ; শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অংশ স্ব স্ব নির্দিষ্ট কাৰ্য্য সুকৌশলে সম্পাদন করিতেছে ; চক্ষু দেখিতেছে, কর্ণ শ্রবণ করিতেছে, নাসিকা আঘ্রাণ লইতেছে, জিহ্বা আস্বাদ লইতেছে ; ইহারা এই সকল কাৰ্য্য না করিলে আমাদের জীবন অতি কষ্টকর হইত এমন কি প্রাণনাশও হইতে পারিত। এইগুলি হইল বাহেন্দ্রিয় মানব দেহের কতকগুলি যন্ত্র এরূপ আছে যাহা না থাকিলেও মানুষ জীবন ধারণ করিতে পারে কিন্তু অপর কতকগুলি যন্ত্র আছে যথা—হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, পাকস্থলী, যাহা না থাকিলে মানব প্রাণধারণ করিতে পারে না। এতদ্ভিন্ন মানব শরীরে সহস্র সহস্র শিরা আছে যাহাতে অনবরত রক্ত চলাচল করিতেছে। ইহাদের কাৰ্য প্ৰণালী অতি বিস্ময়কর সে বিষয়ের আলােচনা এস্থলে অসম্ভব, যিনি এ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করিতে চাহেন তাহাকে পাশ্চাত্য শরীর বিজ্ঞানের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হইবে। আবার অতি সহজেই এই মানব দেহ বিনষ্ট হয়। এই দেহের কাৰ্য যেরূপ আমাদের বিনা চেষ্টায় বা অজ্ঞাতসারে চলিতেছে। সেইরূপ এই পৃথিবীর কাৰ্য্য ও এই জগতের কাৰ্য্য সুশৃঙ্খলরূপে চলিতেছে ; পৃথিবী একরূপেই সূৰ্য্যকে পরিক্রম করিতেছে ; সূৰ্য্য আলোক ও তাপ দিতেছেন; সময়ে বৃষ্টি দিয়া বৃক্ষাদি ও শষ্যাদি উৎপন্ন ও বর্ধন করিতেছেন। আবার আর একভাবে এই বিশ্বের ধ্যান করুন -আমি অতি ক্ষুদ্র মানব কিন্তু আমার এই ক্ষুদ্র দেহই কত কত বিভিন্ন রূপধারী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রভৃতির সমষ্টি আমার মত কত কোটী কোটা মানব এই পৃথিবীতে বিচরণ করিতেছে-কিন্তু • ; ( ১৬ ) তাহাদের প্রত্যেকের মূর্তি অপরের মুৰ্ত্তি হইতে বিভিন্ন ; একজনের সহিত অপরের এরূপ পার্থক্য আছে যাহাতে উভয়কে বিনা আয়াসে চিনিতে পারা যায়। এইরূপ পশুপক্ষী প্রভৃতি কত কোটী কোটী রূপ বিভিন্ন আকারের জীবজন্তু আছে । কত বৃক্ষলতাদি উদ্ভিদ ; কত প্রস্তর মৃত্তিকাদি জড়পদার্থ অসংখ্য নব নব রূপ ধারণ করিয়া এই পৃথিবীতে বিরাজ করিতেছে। পৃথিবীতে যেরূপ নানা জাতীয় ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী ও পদার্থ আছে সেইরূপ অপরাপর গ্রহগুলিতে ও অন্যবিধ অসংখ্য জীব কতরূপ দেহ ধারণ করিয়া স্বস্ব কাৰ্যে ব্যাপৃত আছে। ইহা আলােচনা করিলে মস্তিষ্ক আলােড়িত ও হৃদয় বিস্ময়ে অভিভূত হয়। অপর এক ভাবে দেখুন। ক্ষুদ্র মানব দেহ কত স্বল্পস্থায়ী ; কেহ জন্মমাত্রেই মরিতেছে ; কেহ অম্লাধিক সময় জীবন ধারণ করিয়া মানবলীলা সম্বরণ করিতেছে ; কিন্তু যিনি যতই দীর্ঘজীবী হউন না কেন ১০০ বা ১২০ বৎসরের অধিক বাঁচেন না। চিন্তা করুন একজন বাঙ্গালীর জীবন সমগ্র বাঙ্গালী জাতির জীবনের তুলনায় কত ক্ষুদ্র ; বাঙ্গালীর পর বাঙ্গালী মরিতেছে কিন্তু বাঙ্গালী জাতি সহস্রাধিক বর্ষ জীবিত আছে এবং ভবিষ্যতে কত বর্ষ জীবিত থাকিবে তাহা কে বলিতে পারে। এইরূপ সমগ্র বাঙ্গালী জাতির জীবনী মানবজাতির জীবনীর তুলনায় কত ক্ষুদ্র এবং মানবজাতির জীবন পৃথিবীর জীবনের তুলনায় কত স্বল্পস্থায়ী। আবার পৃথিবী সৌরজগৎ সৃষ্টির কত পরে সৃষ্ট হইয়াছে এবং সৌরজগৎ অপরাপর নাক্ষত্রিক জগতের তুলনায় এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় কত স্বল্পস্থায়ী তাহা কে বলিতে পারে ? এইরূপ ধান করিতে করিতে আমরা জগতের আয়তন, বিবিধ ও অস্থায়িত্ব, সম্বন্ধে কথঞ্চিৎ উপলব্ধি করিতে পারি। ইহার সম্যক উপলব্ধি মানবের ক্ষমতাতীত, মানব অতি ক্ষুদ্রমতি ; মানবের সীমাবদ্ধ বুদ্ধির পক্ষে অসীম জগতের অসীম গুণের সম্পূর্ণ জ্ঞান অসম্ভব। অতএব আপাততঃ ধ্যান দ্বারা এই অসম্পূর্ণ জ্ঞানলাভ করিয়াই আমাদিগকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে। যদিচ এই জগৎ এত বৃহৎ, এত দীর্ঘকালস্থায়ী ও অসংখ্যরূপ দ্রব্যে পরিপূর্ণ ইহা নশ্বর ও অনিত্য ; ইহা চিরস্থায়ী নহে। ইহার আদি আছে অন্ত ও আছে। সত্য বটে আমরা ক্ষুদ্র ক্ষণস্থায়ী মানব, জগতের আদি দেখিনাই এবং অন্ত ও দেখিতে পাইব না কারণ আমরা জগৎ হইতে পৃথক নহি জগতের অংশ। জগৎ যখন ছিল না আমরাও ছিলাম না; জগৎ যখন থাকিবে না আমরাও থাকিব না ;সুতরাং আমরা কিরূপে জগৎ নশ্বর।
( ১৭ ) উহার আদি বা অন্ত দেখিতে পাইব ? জগতের মধ্যাবস্থায়, জগৎ সৃষ্টির বহুপরে- পৃথিবীর সৃষ্টি ও পৃথিবী সৃষ্টির বহুপরে, মানবের সৃষ্টি এবং জগৎ অন্তের বহুপূৰ্ব্বে বর্তমান পৃথিবীর লয় হইবে এবং অপর কত কত পৃথিবী সৃষ্ট হইবে তাহা কে বলিতে পারে। অতএব আমরা ক্ষুদ্র-শরীরী, অল্পমতি, ক্ষণজীবী মানব কিরূপে জগৎ সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করিব। আমরা এ সম্বন্ধে যাহা কিছু জ্ঞান লাভ করিয়াছি তাহা প্রাচ্যঋষিগণের প্যান সম্ভত অনুভব ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক গণের যুক্তিপূর্ণ অনুমান দ্বারা। এক্ষণে এই উভয় মার্গ অবলম্বন করিয়া আমাদিগকে জগৎজ্ঞান ও ঈশ্বর জ্ঞান লাভ করিতে হইবে। কিন্তু এ স্থলে আমরা জগৎ সৃষ্টির প্রসঙ্গ উত্থাপন করিব না, উপনিষদ আলােচনা করিতে করিতে আমরা যথাস্থানে ঐ বিষয়ের উপদেশ প্রাপ্ত হইব। এক্ষণে জগতের নশ্বরতা সম্বন্ধেই আলােচনা করিব। আমরা যেদিকেই দৃষ্টিপাত করিনা কেন সৰ্ব্বদিকেই জগতের নশ্বরতার যথেষ্ট প্রমাণ পাই। এই মানব দেহ নশ্বর ইহা অঙ্গ আছে কল্য হয়ত থাকিবে না। আজ যে মনুষ্য ধনজন যৌবন গর্বে মত্ত হইয়া আপনার ক্ষমতা অপরের উপর বিস্তারিত করিয়া অপরকে উৎপীড়ন করিতেছে, তাহাদের ধন অপহরণ করিয়া আপনার অর্থলালসা পরিতৃপ্ত করিতেছে, কাল সেই লােক শমন কবলে পতিত হইতেছে তাহার অসদৰ্জিত ধন অপরের করতলগত হইতেছে। আজ যে রাজ- প্রাসাদ আকাশ মার্গে আপনার দেহ উত্তোলন করিয়া চতুর্দিকস্থ অট্টালিকাকে উপহাস করিতেছে কল্য সেই অট্টালিকা কামানের গোলায় ভস্মীভূত অথবা কালস্রোতে ভগ্নীভূত হইবে। ভূতত্ত্ব আমাদিগকে শিক্ষা দিতেছে যে পৃথিবীর উপরিভাগেব ও অনেক পরিবর্তন হইয়াছে ও অনবরত হইতেছে। এই যে বিস্কৃত বঙ্গদেশ, ইহার এক সময়ে অস্তিত্ব ছিল না ; এই স্কুলে অতলসাগর বিদ্যমান ছিল। যেখানে এক্ষণে অসংখ্য তড়িৎযান, বাষ্পষান ও অধান প্রভৃতি অনবরত ধাবিত হইতেছে সেস্থল অপার সাগর তরঙ্গের লীলাস্থান ছিল। পৃথিবীর অনেক স্থলে এক সময়ে নগর গ্রাম অবস্থিত ছিল ও কত কত মণীষী তথায় মানব জীবন অতিবাহিত করিয়া গিয়াছেন সে সবস্থল এক্ষণে সাগর গর্ভে পতিত হইয়াছে। যে স্থলে এক্ষণে সর্বোচ্চ পর্বত হিমালয় নিজ ধবল শিখর উচ্চে উত্তোলন করিয়া দণ্ডায়মান সে স্থলে এক সময়ে সমুদ্রগর্ভ ছিল। এইরূপে পৃথিবীর উপরিভাগস্থ পরিবর্তন অনবরত ঘটিতেছে ও ঘটিবে। সেইরূপ আবার এই পৃথিবী ও অনিত্য ইহা আদিতে ছিল না এবং পরেও চিরকাল থাকিবে না। এই যে গ্রহ সকল ;
( ১৮ ) যাহা পৃথিবীর ন্যায় সূর্যের চতুর্দিকে স্ব স্ব কক্ষ অবলম্বনে ভ্রমণ করিতেছে এবং তন্মধ্যে কেহ কেহ আয়তনে পৃথিবীর অপেক্ষা বহুগুণ বৃহৎ, এই সকল গ্রহগণ ও চিরস্থায়ী নহে, এগুলিও এক এক সময়ে সৃষ্ট হইয়াছে এবং পরে বিলুপ্ত হইবে। এই যে সৌরজগতের কেন্দ্র স্বরূপ সূর্যদেব যিনি এই সৌরজগৎ প্রসব করিয়াছেন এবং ভবিষ্যতে সমগ্ৰ সৌরজগৎ আপনাতে হয় করিবেন ইনিও চিরস্থায়ী নহেন। ইহারও জন্ম ও মৃত্যু আছে ; ইহারও আদি ও অন্ত আছে। সেইরূপ আবার সমস্ত নাক্ষত্রিক জগৎ ও আদি ও অন্তবান। অতএব সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই নশ্বর ও অস্থায়ী। ; •• বিশ্বের নশ্বরতা বিবিধ -এক, ক্রমিক পরিবর্তন ; দ্বিতীয় কল্পাস্থকলাপ। এই নশ্বর জগতে কোন পদার্থ ই স্থায়ী নহে; কোন পদার্থ কোন জীবজন্তু চিরকাল ‘বা কোনকাল এভাবে থাকে না। সমুদয় দথ্য ও নশ্বরতা দ্বিবিধ। জীবই পরিবর্তনশীল ; সকলই অনবরত এক অবস্থা (১) ঐমিক রূপান্তর হইতে অপর অবস্থাতে নীত হইতেছে। এই মানব শরীর দুই মুহূর্ত্তেও একরূপ থাকে না কিছু না কিছু পরিবর্তিত হইতেছে ; সুস্থকায় শিশুর দেহ অনবরত বৰ্ধিত ও পুষ্ট হইতেছে ; বৃদ্ধের দেহ শীর্ণ ও দুর্বল হইতেছে ; যুবার দেহ কখন পুষ্ট কখন ক্ষীণ হইতেছে। ঐ রুপ বৃক্ষাদি উদ্ভিদ পদার্থ প্রতি মুহুর্তে বর্ধিত হইতেছে অথবা উহার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ শুষ্ক হইতেছে এবং ক্রমশ: মৃত্যুমুখে পতিত হইতেছে। প্রস্রাদি সকল দ্রব্যই ঐরূপ, কখন একভাবে থাকে না ; সূর্যের তাপ ও আলােকে এবং বায়ুর দ্বারা ঐ সমুদয় পদার্থের রাসায়নিক অথবা কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটতেছে। অতএব এই নামরূপময় জগতের নামরূপ ক্রমাগত পরিবর্তিত হইতেছে। এই পরিবর্তনই জগতের স্বভাব। অনবরত একটী রূপ বিনষ্ট হইয়া অপর রূপ গঠিত বাস্তব পক্ষে দেখিলে এই প্রক্রিয়ার নাম বিনাশ দেওয়া যায় না--- ইহা সৃষ্টির একটা প্রকরণ ; পদার্থ একরূপ ত্যাগ করিয়া অপরূপ ধারণ করিতেছে অথবা একরূপ পদার্থ স্বীয় কলেবর পরিবর্তন করিয়া অপর কলেবর ধারণ করিতেছে। যেমন অন্ত যে দীর্ঘাকার বৃক্ষ আকাশে মস্তক উত্তোলন করিয়া আছে, এবং ফলপুষ্প ছায়া দ্বারা মানবজাতি এবং পশু পক্ষীর বহুতর হিতসাধন করিতেছে কল্য হয়ত সেই বক্ষ ঝড়ে, অথবা কালক্রমে শুষ্ক হইয়া, ভূমিতলে পতিত হই, মৃত্তিকাকার ধারণ করিতেছে কি অগ্নি সংযােগে অঙ্গারে ও বাষ্পে পরিণত হইতেছে। অন্য যে মানবদেহ সুন্দর মূর্তি ধারণ করিয়া ভূমণ্ডলে বিচরণ করিতেছে হইতেছে।
( ১৯ ) এবং নানাবিধ পুণ্য অখবা পাপকার্সের আচরণ করিতেছে, কল্য সেই দেহ মৃত্যুকরতলগত হানান্তর অগ্নিদগ্ধ হইয়া অঙ্গর, জল ও বায়বীয় পদার্থে পরিণত হইতেছে অথবা কবরস্থ হইয়া মৃত্তিকা জল ও বায়বীয় পদার্থের রূপ ধারণ করিতেছে। ইহাকে প্রকৃত পক্ষে বিনাশ বলা যায় না ইহ সাধারণ পরিবর্তন মাত্র। যদি চ আমাদের চক্ষে আপততঃ ইহা বােধ হয় যে ঐ দ্রব্যের বিনাশ হইল তাহা নহে প্রকৃত পক্ষে জগতে অনবরত পরিবর্তন ঘটিতেছে কিন্তু কোন পদার্থেরই বিনাশ নাই। সকল পদার্থই একভাব ছাড়িয়া অপর ভারে অবস্থিতি করিতেছে। যেমন মৃত্তিকা হইতে ঘট প্রস্তুত হইয়া অগ্নিসংযোগে তাহা দগ্ধ করিয়া তাহাকে নুতন আকার ধারণ করাইলাম ; যে ব্যক্তি ঘট কি দ্রব্য হইতে প্রস্তুত হইয়াছে জানে না সে ঘটের মধ্যে মৃত্তিকা দেখিতে পায় না; পরে আবার ঐ ঘট ভগ্ন হওয়ায় আমরা উহা ফেলিয়া দিই এবং উহা ভুমিতলে পড়িয়া ক্রমে, পদাঘাত বা অপর কঠিন দ্রব্যের আঘাতে চূর্ণীকৃত হইয়া ক্রমশঃ পুনরায় মৃত্তিকাতে পরিণত হয় ;'পুনশ্চ মৃত্তিকা হইতে জল সংঘােগে হয়ত কোন বৃক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া পরে কাষ্ঠে পরিণত হয়, কিন্তু কোন অংশ ধ্বংস হয় না। সকল সকল দ্রব্যই পঞ্চ মহা- সুতাত্মক এবং প্রত্যেক দ্রব্যেরই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলি এক মহাভূত হইতে অপর গহাভূতে পরিবর্তিত হইতেছে, ইহা কেবল রূপান্তর মাত্র, উহার দ্বারা নামরূপের পরিবর্তন হয়, পদার্থের বিনাশ হয় না। ইহাকে ক্রমিক রূপান্তর বল। যাইতে পারে। অপরবিধ নাশকে আমরা কল্পান্তক লোপ নামে অভিহিত করিয়াছি। এই যে বিশাল জগৎ, ইহা আদিতে ছিল না এবং অন্তেও থাকিবে না। আদিতে কেবল সেই একমাত্র অচিন্তনীয়, অনির্বচনীয় রমাত্মা ছিলেন কন্তুক লোপ । এবং অন্তেও তিনি এক থাকিবেন, মধ্যে এই বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাহা হইতে উদ্ভূত হইয়া কিয়ৎকাল তাহাতেই অবস্থিত থাকে এবং পরে সময় আগত হইলে তাহার ইচ্ছাতেই তাহাতেই লয় প্রাপ্ত হয়। পরমাত্মা পরমেশ্বরই ব্ৰহ্মরূপ ধারণ করিয়া সৃষ্টি করেন, বিষ্ণুরূপ ধারণ করিয়া রক্ষা করে এবং মহেশ্বররূপে নামরূপময় জগতের লয় করেন। এই সৃষ্টি ও স্থিতিকালকে শাস্ত্রে ব্রহ্মার দিন বলে এবং প্রলয় কালকে এহ্মার রাত্রি বলে। দিবার প্রারম্ভে ব্রহ্মা মহানিদ্রা হইতে জাগরিত হইয়া সৃষ্টি আরম্ভ করেন এবং সমগ্র বিভাগে সৃষ্টি ও স্থিতির কাৰ্য্য হইয়া দিবাবসানে প্রলয় আরম্ভ হয় ; এই প্রলয়কাল ব্ৰহ্মার রাত্রি তিনি এই সময়ে সৃষ্টি কাৰ্য্য হইতে বিরত হইয়া বিশ্রাম করেন। এই দিবাকে ; ( ২০ ) এক কল্প বলে ; এইরূপে-কল্পের পর কল্প আসিতেছে ও যাইতেছে ; প্রত্যেক কয়ে কত কত জগৎ সৃষ্ট হইয়া কল্পান্তে ঈশ্বরে বিলীন হইতেছে। এইরূপে কত কত ব্ৰহ্মাণ্ড সৃষ্ট হইয়া পুনরায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে এবং ভবিষ্যতে পুনরায় সৃষ্ট ও লয় প্রাপ্ত হইবে। ইহাই কল্পান্তক লােপ। অতএব আমরা ইহা শিক্ষা করিলাম যে জগৎ নশ্বর। ইহা অনিত্য ; ইহা চিরস্থায়ী নহে। ইহার কোন অংশ কখন একভাবে থাকে না ; ইহা অনবরত র পান্তরিত হইতেছে এবং অবশেষে কল্পাঙ্কে ব্রহ্মার রাজাগমে একেবারে পরমাত্মা পরমেশ্বরে লীন হইবে। পরমেশ্বর হইতে সৃষ্টির আরম্ভে ক্রমশঃ উদ্ভূত হইয়া অনবরত রূপান্তরিত হইয়া অবশেষে পরমেশ্বরেই লয় প্রাপ্ত হইবে। এক্ষণে আমাদের ঈশা বাস্তং শব্দের অর্থ বুঝিতে হইবে। এই নশ্বর জগতে যে কিছু পদার্থ আছে তৎসমুদয়ই ঈশ্বর দ্বারা ব্যাপ্ত। পরমাত্মা পরমেশ্বর সকল পদার্থকে ব্যাপ্ত করিয়া আছেন। তিনি সকল ঈশা বাং। পদার্থেই অভ্যন্তরে ও বাহিরে বিরাজ করিতেছেন, তিনিই সকল পদার্থ। তিনি বিশ্ব সংসারের মূল ও আধার। সমস্ত জগতই তঁাহা হইতে উদ্ভূত হইয়াছে ৩ হাতেই লীন হইবে; সেইরূপ জগতের স্থিতি কালে তাহাতেই অবস্থিতি করে। অবস্থিতি করে। জগৎ তাহারই দেই। তিনিই জগদাকার ধারণ করিয়া বিশ্বলীলা করিয়া থাকেন এবং লীলাবসানে প্রলয় কালে সেই দেহ সম্বরণ করেন। সমুদ্র তরঙ্গ যেরূপ সমুদ্র দেহ হইতে উখিত হওনান্তর নানাবিধ আকার ধারণ পূর্বক বিভিন্ন বর্ণে রঞ্জিত কলেবরে কিয়ৎক্ষণ দ্রুতবেগে ধাবিত হয় এবং পরক্ষণই সমুদ্র মধ্যে মিশাইয়া যায়, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ও সেইরূপ। সমুদ্র তরঙ্গ যে আকারই ধারণ করুক না কেন এবং যে বর্ণেই শোভিত হউক না কেন, উহা সমুদ্র জল ভিন্ন আর কিছুই নহে। ঐ তরঙ্গ সমুদ্র-জল ব্যপ্তি, সমুদ্র-জলময়। উহার যে অংশ উঠাইয়া দেখ না কেন, দেখিবে উহাতে সেই লবণাক্ত স্বচ্ছ জল আছে ; উহার ভিন্ন ভিন্ন আকার, পৃথক পৃথক বর্ণ, অতি ক্ষণস্থায়ী তাহা উহার নিত্য অংশ নহে, উহার ক্ষণস্থায়ী মূর্তি; কিন্তু লবণাক্ত স্বচ্ছ জলই উহার অপেক্ষাকৃত নিত্য পদার্থ। ঐ পদার্থই তরঙ্গের আকার ; তরঙ্গ বলিলে যে দ্রব্য ও যে রূপ আমাদের অন্তরে উদিত হয় ; অপবা সমুদ্রতীরে দাড়াইলে তরঙ্গ নামধেয় যে দ্রব্য আমরা দেখি তাহা জল দ্বারা ব্যাপ্ত ; উহা আর কিছুই নহে ঐ জলই ভিন্ন ভিন্ন মূৰ্ত্তি ধারণ করিয়া ইতঃস্তুত ধাবিত হইতেছে। অপর একটা উদাহরণ দেখা যাউক। স্বর্ণ হইতে অমবা অনেকরূপ অলঙ্কার প্রস্তুত করিয়া থাকি। বালা, হার, বাজু, ;
- ( ২১ ) তাবিজ প্রভৃতি স্ত্রীলোক বা বালক বালিকার অলঙ্কার, ঘড়ি ও ঘড়ির চেন ও চসমার ডাটি প্রভৃতি প্রয়ােজনীয় দ্রব্য, এ সকলই সুবর্ণ হইতে প্রস্তুত হইয়া নানা আকারে অ মাদিগের দেহের শােভা বর্ধন অথবা প্রয়ােজনীয় কাৰ্য্য সাধন করিতেছে। এই সকল দ্রব্যর ভিন্ন ভিন্ন নাম ও পৃথক পৃথক রূপ। বালা বলিলে আমাদের মনে একরূপ মূর্তির উদয় হয় ও চেন বলিলে অপর মূর্তির উদয় হয় আবার বালাও কতরূপ আছে এবং চেনও কতরূপ আছে। কিন্তু সকল বালা, সকল দেন ও সকল সুবর্ণময় অলঙ্কারই সুবর্ণ দ্বারা ব্যাপ্ত। সুবর্ণই উহার আধার; সুবর্ণ হতেই উহার উৎপত্তি সুবর্ণেই উহার স্থিতি এবং উহা ভাঙ্গিলে সুবর্ণই থাকিবে। কুম্ভকার মৃত্তিকা হইতে কত দ্রব্য প্রতি করে। হাঁড়ি, কলসী, সরা, নানাবিধ পুকূল মৃত্তিকা হইতে প্রস্তুত হয়। ঐ সকল দ্রব্যের নানা নাম ও নানা রূপ হইলেও উহ। মৃত্তিকা ভিন্ন আর কিছুই নহে; মৃত্তিকা হইতেই উহার উৎপত্তি, মৃত্তিকাতেই উহার স্থিতি, মৃত্তিকাতেই উহার লয়! কাষ্ঠ হইতে কত দ্রব্য প্রস্তুত হয়, চেয়ার, টেবিল, খাট, বাক্স প্রভৃতি নানা দ্রব্য নানা নাম ধারণ করিয়া আমাদের নানা কাৰ্য্য সম্পাদন করে; কিন্তু ঐ সকল দ্রব্য কাষ্ঠ ভিন্ন আর কিছুই নহে, উহা কাঠ হইতে প্রস্তুত, কাঠেই স্থিত এবং ভাঙ্গিয়া গেলে কাঠই অবশিষ্ট থাকে। অতএব ঐ সকল দ্রব্য কাষ্ঠ দ্বারা ব্যাপ্ত। উহার নাম ও রূপ অনিত্য কিন্তু উহার আধার কাঠই অপেক্ষাকৃত নিত্য। সেইরূপ এই বিশাল অসংখ্য নামধেয় ও অসংখ্য রূপবিশিষ্ঠ জগৎ সেই পরমাত্মা পরমেশ্বর হইতে আদিতে আবির্ভূত হইয়াছে, অন্তে ঠাইতেই তিরােভূত হইবে, এবং মধ্যে তাহাতেই অবস্থিত আছে। জগং প্রকাশ কালে সমগ্র জগৎ পরমাত্মা দ্বারাই ব্যাপ্ত। এই শ্লোকার্ধেই উপনিষদের সমুদয় শিক্ষা অতি সংক্ষেপে নিহিত হইয়াছে। যিনি সম্যকরূপে ইহার অর্থ উপলব্ধি করিয়া সেই মত নিজ আচরণ অবলম্বন করিতে সমর্থ হইয়াছেন তিনিই মুক্ত। অতএব ইহার সম্যক অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা এবং সেই মত কাৰ্য্য করা অতি কঠিন। আমরা অজ্ঞান, ভেদজ্ঞানী মানব ইহা বুঝিতে হইলে আমাদিগকে অনবরত এই শ্লোকের 5্যান করতে হইবে ইহার জন্ম জন্মান্তর ধ্যান করিতে করিতে চিত্তশুদ্ধি হইয়া সত্যজ্ঞান দ্বারা আমাদের বুদ্ধি আলােকিত হইবে এবং আমরা মুক্তিমার্গে ক্রমশঃ অগ্রসর হইয়া অশেষে আমাদের পিতামাতা, আমাদের আত্মা, আমাদের স্বরূপ, সেই সৰ্বশক্তিমান পরমাত্মা পরমেশ্বরে উপশমিত হইব।
( ২২ ) তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথ, সেই কারণে বিষয়াসক্তি ত্যাগ দ্বারা আত্মাকে ভােগ কর। অতএব বৈরাগ্য দ্বারা আত্মজ্ঞানরূপ সুখভােগ কর। যদি এই সমস্ত জগৎ নশ্বর হইল, যদি এ সমস্তই মিথ্যা, কেবল সেই পরমাত্মা পরমেশ্বরই বৈরাগ্য। সত্য তবে এ সকল ইয়া ব্যস্ত হইবার প্রয়ােজন ক? আমরা চতুর্দিকে যে সকল বস্তু দেখি এবং যাহা লইয়া নিজের চিত্তবিনোদ করি, তাহা যদি সকলই মিথ্যা হয় তবে সেই সবল পদার্থ প্রতি আমাদের হৃদয়ে যে আসক্তি আছে তাহা ত্যাগের নিতান্ত আবশ্যক। ধন, মান, যশ পুত্র, কলত্র, সকলই অস্থায়ী ও অনিত্য ; অদ্য যাহা লইয়া আমি এত বাস্ত কলা তাহ। হয়ত ধ্বংস প্রাপ্ত হইবে, আমি প্রাণপণে চেষ্টা করলেও তাহা রক্ষা করিতে পারব না। যে পুত্র বা কলত্রকে আমি প্রাণসম ভালবাসি তাহার সময় আসিলে সে সে আমাকে ছাড়িয়া চলিয়া যাইবে, আমি কোন মতে তাহাকে রাখিতে পারিব না। যে শান ও যশ এক্ষণে আমার বলিয়া আমি গর্ব করিতেছি তাহা হয়ত সামান্য কারণে নষ্ট হইবে, লোকে আর আমাকে সেরূপ সম্মান করিবে না, সে যশ আর আমার থাকিবে না। আর আমিও ত চিরজীবী নহি ; আমার জীবন ও নশ্বর, অতি ক্ষণস্থায়ী। আমিই বা কতকাল বাচি। মরিলে ঐ মান ঐ যশ লইয়া কি করিব। উহা আমার কোন কাৰ্য্যে আসিবে। তাতএব বৈরাগ্য অভ্যাস কর। যে সকল বস্তু এক্ষণে তোমার নিকট প্রেয় বোধ হয়, যে সকল বস্তু প্রাপ্তির জন্য তুমি এত সত্ন এত চেষ্টা করিতেছ এবং অছ তাহার লালসা ত্যাগ কর। আমার পুত্র আমার স্ত্রী আমার দ্রব্য ইত্যাদি চন্তাতে মগ্ন থাকিও না। অহং ভাব ত্যাগকর। অামার আমার করিয়া বিব্রত হইও না। বৈরাগ্য অভ্যাস কর। বৈরাগ্য কাহাকে বলে ? বিষয়াসক্তি ত্যাগই বৈরাগ্য। ঈশােপনিষদে আত্মজ্ঞান শিক্ষাদান হইতেছে ; প্রথম শ্লোকাদ্ধে জগৎ নশ্বর ও পরমাত্মা সৰ্বব্যাপী তাহা বলা হইল। এই জ্ঞানশিক্ষা সহজ নহে; এক্ষণে আমরা কেবল ইহা কর্ণে শুনিলাম, হৃদয়ে সম্যক উপলব্ধি করিতে পারি নাই। যে দিন পারিব, যে দিন Fরমাত্মা রমেশ্বরকে সঙ্গীব ও সৰ্ব্ব বস্তুতে দেখিব, সে দিন আমার পূর্ণ বিবেক লাভ হইবে, আমি মুক্ত হইব। অতএব প্রথম কোর্ক ধ্যান করিতে করিতে ক্রমশঃ আমাদের বিবেক লাভ হইবে । এক্ষণে এই শ্লোকের দ্বিতীয়ার্ধে যাহাতে বৈরাগ্য লাভ হয় তাহাই বলা হইতেছে। ঈশ্বর লাভের উপায় বিবেক ও বৈরাগ্য। এত উদ্বিগ্ন ( ২৩ ) বৈরাগ্য না হইলে ঈশ্বর লাভ হয় না। অতএব উপনিষদ শিক্ষা দিতেছেন বিষয়াসক্তি ত্যাগ কর কেন না বিষয় অবিনশ্বর, অস্থায়ী, ক্ষণভঙ্গুর। যে দ্রব্য ঐরূপ, তাহার জন্য ব্যস্ত হওয়া কি উচিত। তাহা ত্যাগ করিয়া অবিনশ্বর বস্তু লাভে বান হও। বিষয়ে আসক্তি ত্যাগ করিবে, কিন্তু বিষয় ভােগ ত্যাগ করা প্রয়ােজন নাই, অগা বিষয়ভােগ ত্যাগ মানবের পক্ষে অসম্ভব। আমি দেহা আমার দেহ রক্ষা করা একান্ত আবশ্যক, খাদ্য দ্বারা দেহ রক্ষা হয় খাদ্যের সিয়াস। অভাবে দেহের বিনাশ হয়। খাদ্য রসনাকে পরিতৃপ্ত করে ; এজন্য খাদ্য রানেন্দ্রিয়ের বিষয়। কিন্তু ইহা অতি প্রয়ােজনীয় পদার্থ ইহা ত্যাগ অসম্ভব ; ইহার উপভােগ অনিবার্য। অতএব কিরূপে ইহার উপভােগ করিব। ইহার প্রতি আসক্তি ত্যাগ করিয়া দেহরক্ষা কওঁব্য জ্ঞানে অন্নাদি ভােজন করিব। ভােজনে যে সুখ হয় তাহা উপভােগ করিব বটে কিন্তু তাহাতে আসক্তি থাকিবে না। অর্থাৎ ভােজনে সুখ হয় বলিয়া অধিক খাইব না অথবা ক্ষুধার উদ্রেক না হইলে খাইব না এবং যে খাদ্য রসনার প্রিয় সেই খাই খাইব অপর স্বাস্থ্যকর খাদ্য খাইব না এরূপ করিব না, অথবা ক্রমাগত বা অপর সময়ে খাদ্ধের চিন্তা করিব না। এক কথায় বলিতে গেলে পেটুক হইব না। যাহার খাদ্যে অধিক আসক্তি আছে তাহাকে পেটুক বলা যায়। আর একটা উদাহরণ দেখা যাউক। আমি গৃ আমার স্ত্রী পুত্র কন্যা, ভ্রাতা ভগিনী প্রভৃতি পরিবার বর্গ আছে ; উহাদের ভরণ- পোষণ আমার উপর নির্ভর করিতেছে। ঐ ভরণপােষণ জন্য আমার অর্থোপার্জন আবশ্যক ; ইহা আমার কর্তব্য, ইহাই আমার জীবনের প্রধান কার্য ; ইহা যদি না করি তাহা হইলে কর্তব্যে বিমুখ হওয়া হইল। অতএব অর্থোপার্জন করিতে হইবে, এবং তজ্জন্য যে পরিশ্রম, যেরূপ যত্ন ও চেষ্টা করা প্রয়ােজন তাহা করা আমার পক্ষে একান্ত কর্তব্য। কিন্তু তাই বলিয়া একেবারে নিতান্ত অর্থলোলুপ হওয়া উচিত নহে; অর্থলাভের জন্য চেষ্টা করিবে বটে কিন্তু তজ্জন্য অসদুপায় অবলম্বন করিবে না অথবা অপর কর্তব্য ত্যাগ করিবে না। মানবের ত্রিবিধ কর্তব্য (১) ঈশ্বনােপাসনা (২) দেশ ও সমাজসেবা (৩) পরিবার প্রতিপালন। অর্থো- পাৰ্জন দ্বিতীয় ও তৃতীয় কর্তব্যের অতি ক্ষুদ্র অংশ; অতএব অর্থোপার্জনে আসক্ত হইয়া অপর কর্তব্য ভুলিবে না। যিনি প্রকৃত জ্ঞানী তিনি সকল কৰ্ম্মই যথাবিধ সম্পাদন করেন, কোন একটীর প্রতি আসক্ত হইয়া অারটীর অবহেলা করেন না। যিনি কৰ্ম্মযােগ তিনি সকল কৰ্ম্মই নিষ্কাম ভাবে করেন। কিছু পরিমাণ ধন সঞ্চয় করা ( ২৪ ) মানবের পক্ষে প্রয়ােজন কিন্তু তজ্জন্য প্রাণ মন সংযােগ দ্বারা প্রভূত অর্থ সংগ্রহ করা অথবা বহুধন উপার্জন করিয়া তাহা বিলাসিতায় ব্যয় করা কর্তব্য নহে; যাহারা ঐরূপ, তাহারা ধনসক্ত, তাহারা অর্থকেই মানব জীবনের উদ্দেশ্য মনে করিয়া তাহার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে। অর্থকে প্রধান লক্ষ্য না করিয়া উহা কেবল অপর উদ্দেশ্য সাধনের উপায় মনে করিয়া অপরাপর কর্তব্যের সহিত শমম অবলম্বনে অনাসক্ত ভাবে অর্থোপার্জন যিনি করেন তিনিই যথার্থ বৈরাগ্যবান ; তাহার মনের এই অনাসক্ত ভাবই বৈরাগ্য। শ্রীমৎভগবদগীতায় ভগবান বলিয়াছেন কৰ্ম্মত্যাগ শ্রেয় নহে; কর্মে অাসক্তি ত্যাগই যথার্থ ত্যাগ। অতএব বিষয় সকল নশ্বর জ্ঞানে তাহাতে অশক্তি ভাগ কর। এই বৈরাগ্য কিরূপ লাভ করিব? কিরূপে আমার হৃদয় বিষয়াসক্তি ত্যাগ করিতে পারিবে ? চিন্তা ও অভ্যাসের দ্বারা। জগৎ যে নশ্বর তাহা কখন ভুলিবে না। যখনই হৃদয়ে বিষয় বাসনা উপস্থিত হইবে; যখনই ধন, যশ, ক্ষমতা প্রাপ্তির ইচ্ছা বলবতী হইবে, তখনই মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিবে যে ঐ সকল বিষয় নশ্বর, উহা আমার নিকট চিরকাল থাকিবে না, সংসার ধম্ম পালন করিতে হইলে ঐ সকল প্রয়োজন অথবা সংসার ধৰ্ম্ম পালনে উহা আমাদের সহায়, তদ্ব্যতীত উহার অপর মূল্য কিছুই নাই। আমাদের নিত্য অবিনশ্বর আয়ার পক্ষে উহা কোনই আবশ্যকে আইসে না। মানবের কর্ম সাধন জন্য ঐ সকল বিষয় যতদূর নিতান্ত প্রয়োজন তাহা লাভেরই চেষ্টা করিব তথ্যতীত অধিক আর নিষ্প্রয়োজনীয় ; এবং উহাতে আসক্ত হইয়া স্বকীয় প্রধান কাৰ্য্য ঈশ্বরােপাসনা ও অপরাপর কাৰ্য্য অর্থাৎ মানব জাতির বা স্বদেশ ও জাতির নিষ্কাম সেবা ভুলি না। ঐ সকল বিষয় প্রাপ্তিই মানব জীবনের লক্ষ্য নহে উহা কেবল মনুষ্যের দ্বিতীয় ও তৃতীয় উদ্দেশ্য সাধনের কথঞ্চিৎ সহায়। ধনের আদর ধনের জন্য করিবে না উহা হইতে পরিবার প্রতিপালনরূপ স্বকৰ্ম্ম সাধিত হয় বলিয়াই ঐ পরিমাণে উহার আদর করিবে। ধন ক্ষমতা, যশ দ্বারা কোন কোন কৰ্ম্ম সম্পাদিত হয় এব উহা লাভের জন্য যত্ন করিবে বটে কিন্তু উহাই একমাত্র ক্ষ্য মনে করিবে না। অপর কর্তব্য হইতে হৃদয় মন অপসারিত করিয়া উহাতেই একেবারে ঢালিয়া দিবে না। যখন দেখিবে তোমার মন, ধন ক্ষমতা যশ, প্রার্থী হইয়া তোমার অপৰ কৰ্ম্ম সাধনে বিরতি বা অংহেল, আচরণ করতেছে ; তখন দেখিবে তুমি ঐ সকল প্ৰেৰ কৰ্ম্মে আসক্ত হইয়া শ্ৰেয় কৰ্ম্ম অবহেলা করিতেছ তখনই বুঝিবে তুমি গুদ মার্গ ত্যাগ করিয়া অশুভ হেয় মার্গ অবলম্বন করিয়াছ। যখন তুমি কেবল কর্তব্য সাধন জন্য, ঐ সকল বিষয়কে ( ২৫ ) কর্তব্য সাধনের উপর জ্ঞান কবিয়া উহা লাভের জন্য চেষ্টা করিবে, আত্মপ্রীতি আত্মগরিমা বা আত্মসুখ জন্য নহে, তখনই তুমি সত্য মার্গ অবলম্বন করিয়াছ বুঝিতে হইবে। কর্তব্য সাধন জন্য বিষয়াকাঙ্ক্ষা করা এবং তজ্জন্য যতটুকু অর্থ প্রয়ােজন তাহাই উপার্জন করা বৈরাগ্যের প্রতিকূল নহে । সংসারে তোমার যে কিছু কাৰ্য্য করিতে হইবে তাহা ঐ ভাবে করিতে অভ্যাস করিবে। এই অভ্যাস দ্বারাই আসক্তি রহিত হইবে। এই অভ্যাস দ্বারাই বৈরাগ্য লাভ করিবে। মাগৃধঃ কস্তস্বিদনঃ ১। ভাষ্যকারে এই শোকাশের দুইটা অর্থ করেন প্রথম, অপবের ধনে আক। কবিও না। অপর অর্থ. ডি করিও না ধন কাব ?-এই দ্বিতীয় অপই প্রশ” : স্বকীয় ( পর উভয়বিধ কাম্য পদার্থে লোভ ভাগকর পরর অগে লা কলা সনত বটেই পরদ্রব্যে লােভ নিশ্চয়ই করিব না অপায়ে পরদব্য প্রাপ্তির 1.6া নিশ্চয়ই কবিবে না কারণ তাহা পাপ। দুপায়েও প্রার আকাঙ্ক্ষাও ত্যাগ করিবে। যিনি মােক্ষমার্গ অবলম্বন করিয়াছেন তাহার পক্ষে লােভ একান্ত ক্ষতিকারক, তাহার হৃদয়ে যতক্ষণ লােভ থাকিবে তিনি ঐ মার্গে অগ্রসর হইতে পাবিবেন না। যিনি সংসারী, যিনি বিষয়াসক্ত, যিনি ইহকালের উন্নতির জন্য শাস্তি তাহার পক্ষেও লোভ বিপ্নজনক ও কষ্টকর। যে সকল বিষয়ে আমাদের লােভ হয় তাহা সকল কিছু প্রাপ্তি সম্ভব নহে হৃদয়ের সকল আকাঙ্খা কিছু মিটিবার সম্ভব নহে, এবং আকাক্ষা না মিটিলে কেবল কষ্টই হয় । অতএব মুমুক্ষু ও বিষয়ী উভয়েরই পক্ষেই লােভ অনুষ্ঠিত হইতেছে। ধন কাহাব ? কাহারও নহে। এখানে ধন শব্দে সব্বপ্রকার কাম্যবস্তু বুঝিবে। ক্ষী চঞ্চল। তিনি অধিক দিন একস্থানে থাকে না । অদ্য যে ধনী কল্য হয়ত সে দরিদ্র ; অদ্য যে দরিদ্র কল্য হয়ত সে ধনী হই। আমি আজীবন পরিশ্রম করিয়া অনেক কষ্ট সহ্য করিয়া যে ধন উপার্জন করিলাম, মৃত্যু সময়ে সে ধন ফেলিয়া আমাকে চলিয়া যাইতে হইবে । সে ধন অপরের ব্যবহারে আসিবে ; হয়ত আমার উত্তরাধিকারী সেই কষ্ট সঞ্চিত ধন বৃথা ব্যয় অথবা মন্দকার্যে ব্যয় করিবে। ধনী মে কাৰ্য একান্ত ঘৃণা করে তাহার পরলােকাণ্ঠে তাহার পুত্র সেই কার্যে পিতৃসঞ্চিত ধন নষ্ট করিতেছে। এইরূপ ঘটনা প্রত্যহ হইতেছে। অতএব ধনলালসা ত্যাগকর। যলভসে নিজকম্মোপাত্তং বিত্তং তেন বিনােদয় চিং। নিজ কম্মদ্বারা যে সন লাওস ৩াহা দ্বারাই নিজ bিও পসঃ ক। টাকা টাকা ( ২৬ ) করিয়া উন্মত্ত হইও না। অর্থান্বেষণে বিব্রত হইয়া অপর গুরুতর কর্তব্য ত্যাগ করিও না। কুম্নেবেহ কৰ্ম্মাণি জিজীবিষেচ্ছতং সমা। এবং বয়ি নাথেতােহস্তি ন কৰ্ম্ম লিপ্যতে নরে ॥২ প্রথম শ্লোকে জ্ঞান মার্গের কথা বলা হইয়াছে, এই শোকে কৰ্ম্ম মার্গের বিষয় উক্ত হইতেছে -ইহ লােকে শুভ কৰ্ম্ম করিয়া শতবর্ষ জীবিত থাকিবার ইচ্ছা করিবে। ইহা ভিন্ন নিষ্কাম কৰ্ম্ম শিক্ষার অপর উপায় না। ঈশােপনিষদের এই দ্বিতীয় শ্লোকটার ভাবার্থ বুঝিবার জন্য কৰ্ম্ম কি ও সকাম ও নিষ্কাম কৰ্ম্ম কাহাকে বলে তাহার আলােচনা প্রয়ােজন, অতএব আমরা এই স্থলে ঐ বিষয়ের আলোচনা দ্বারা উহা বুঝিবার চেষ্টা করি। আমরা যাহা করি তাহাই কৰ্ম। শয়, উপবেশন, দণ্ডায়ন, ধাবন, কথােপকথন প্রভৃতি সকল কাৰ্য্যই কৰ্ম্ম নামে অভিহিত হইয়া থাকে। মানব বন্ম বিনা এক মুহূর্তও জীবন ধারণ করিতে পারে না। কারণ জীবন ধারণ কেবল কতকগুলি কৰ্ম্ম সমষ্টি, যেরূপ, শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ * ক্ষেপণ, খাদ্য পরিপাক করণ, শরীরের মধ্যে রক্ত চলাচল করণ ; চিন্তা করণ, সুখ দুঃখ বােধ করণ ইত্যাদি। কতকগুলি কৰ্ম্ম এরূপ আছে যাহা করিতে নানৰ অসমর্থ হইলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ; অপর কতকগুলি কৰ্ম্ম এরূপ আছে যাহা না করিতে পারিলে জীবন নিন বা অতিকষ্টকর হয়। আমরা যে কিছু কৰ্ম্ম করি তাহা দেহদ্বার ; দেহই আমাদের কর্মক্ষেত্র আমরা শরীরী, শরীরই আমাদের জীবন ধারণের প্রধান ক্ষেত্র; অতএব আমাদের যাহা কিছু কৰ্ম্ম আছে তাহা দেহদ্বারা সম্পন্ন হয়। দেহদ্বারা সম্পন্ন হয়। দেহের সহিত দেহের সহিত পৃথিবীর ঘনিষ্ট সম্বন্ধ ; পৃশ্রীজাত ও পৃথীস্থিত দ্রব্যাদির দ্বারাই আমাদের দেহ সৃষ্ট ও পােষিত ও দেহের জন্ম হইতে আমাদের পার্থিব কৰ্ম্ম আরম্ভ হয় ও দেহের বিনাশেই পার্থিব কৰ্ম্ম শেষ হয়। আমরা যে সকল কৰ্ম্মকে মানসিক কৰ্ম্ম বলি তাহাও প্রথমে মন হইতে আরম্ভ হইয়া স্থূলদেহ দ্বারা সম্পাদিত হয় ; যখন আমরা চিন্তা করি অথবা দয়া, দুঃখ, ক্রোধ প্রভৃতি কোন ভাব আমাদের মনে উদয় হয় তখন ঐ ভাবের শেষ কৰ্ম্ম আমাদের স্থূল শরীরের মস্তিষ্ক দ্বারা সম্পন্ন হয়। অতএব সকল করেই সম্পন্ন স্থান দেই। এই দেহের বিনাশ হইলেই কৰ্ম্ম বন্ধ হইবে অতএব দেহের হাতে অসময়ে নাশ না হয়, যাহাতে অপৰিণত বসে ম না হয় তাহা করা সকলেই কৰ্তব্য। এই ( 27 ) মানবদেহ সাধারণতঃ একশত বর্ষ পৰ্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। সত্য বটে যােগীঋষিরা শতবর্ষের বহু উৰ্দ্ধকাল জীবিত থাকেন, তাহারা কি উপায়ে এরূপ দীর্ঘজীবন লাভ করেন তাহা আমরা অবগত নহি, এবং সে উপায় অবলম্বন করা আপাততঃ আমাদের পক্ষে সাধ্যাতীত; তাহা অবলম্বন করিতে গেলে আমাদিগকেও যােগী হইতে হইবে। অতএব গৃহীর পক্ষে শতবর্ষই জীবনের পরিমাণ ধরিয়া শতবর্ষ জীবিত থাকিবার চেষ্টা ও যত্ন করিবে। যাহাতে তুমি দীর্ঘজীবন লাভ করিতে পার এবং সুস্থ শরীরে জীবন যাত্রা সম্পাদন করিতে পার এবং সেই সঙ্গে ধর্ম ও কৰ্ম্ম করিতে পার তৎপক্ষে যত্নবান হইবে । কম্মের দুই ভাব—সকাম ও নিষ্কাম। এই দুই ভাবের সম্যক আলোচনা এস্থলে অসম্ভব তাহা করিতে গেলে ঐ সম্বন্ধেই একখানি পৃথক্ পুস্তক পূর্ণ হইয়া যায়। অতএব আমরা এস্থলে সংক্ষেপে উহা বুঝিবার কাৰ্ম্মের দুই তার। চেষ্টা করিব। সাধারণ মানবের অন্তঃকরণ স্বভাবতই বাসনা পূর্ণ। উহা সততই স্ত্রী, পুত্র, ধন, ক্ষমতা, যশ প্রভৃতি লাভের জন্যই বিব্রত। এই সকল বিষয় প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা মানব হৃদয়ে অতীব বলবতী ; এই আকাক্ষা দ্বারা উত্তেজিত হইয়া মানব যে সকল কর্ম করে তাহা সকাম কৰ্ম্ম। ফলপ্রাপ্তির ইচ্ছায় যে কৰ্ম্ম করা যায়, কোন বিষয় লাভের জন্য যে কন্মে আমরা প্রবৃত্ত হই, কোন উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য যে কষ্মে আমরা রত থাকি এবং উদ্দেশ্য সফল হইলে বিরত হই, তাহাই সকাম কৰ্ম্ম। ধনলাভের জন্য আমি ব্যবসা করিতেছি, চাকরী করিতেছি আমরা নানাবিধ বিষয় কৰ্ম্ম করিতেছি এ সকলই যদি কেবল ধন কামনা করিয়া করি তাহা হইলে ইহা সকাম কৰ্ম্ম। সেইরূপ, ক্ষমতা বা যশোলাভ জন্য যে কম্ম করি, পুণ্য সঞ্চয় অথবা স্বর্গলাভের জন্যও যাহা করি তাহাও কামনার সহিত করি সুতরাং তাহাও সকাম। চিন্তা করিয়া দেখিলে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে সাধারণ মনুষ্য যাহা কিছু করে তাহাই কামনা পূর্ণ ও আকাঙ্খ- ময় অতএব সকান। আমার নিজের বা পরিবারবর্গের অথবা স্বজাতির ও স্বদেশের কিম্বা সমগ্র মানব জাতির লাভ বা উগ্নতিকল্পে ফলাকাঙ্খী হইয়া যাহা কিছু করি তাহাই সকাম কৰ্ম্ম। যে কর্মের ফল আমাদের প্রিয়, বে কৰ্ম্ম সফল হইলে আমরা উল্লাসিত হই এবং নিষ্ফল হইলে দুঃখিত হই তাহা মঙ্গল কই হউক অথবা অমঙ্গল কৰ্মই হউক তাহা শ্রেয়ই হউক বা হেয়ই হউক তাহা সকাম কৰ্ম্ম । কর্মকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে যথা—শুভ, অশুভ ও মিশ্র। ধে কর্ম শুভ ফল উৎপাদন করে, অর্থাৎ যাহা মানবেব শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ( ২৮ ) • অথবা বৈষয়িক অভাব দূরীকরণার্থ প্রযুক্ত হয় এবং যাহা একের অভাব পূরণ জন্য অপরের অভাব বৃদ্ধি না করে তাহাই শুভ কৰ্ম্ম। যদিচ শুভ কৰ্ম্ম কাহাকে বলে তাহা আমরা সকলেই কিছু না কিছু বুঝি এবং সেই বােধ অনুসারে স্বীয় কার্য সম্পাদন করি তত্রাচ উহার সঠিক পরিভাষা * দেওয়া কঠিন। অতএব উহা আমরা সাধারণ উদাহরণ দ্বারা বুঝিবার চেষ্টা করিব। ঈশ্বরাধনা, ধৰ্ম্মোপদেশ, বিদ্যাদান, সৎপাত্রে দান প্রভৃতি কম্ম সকল শুভ ; ইহাতে কাহারও পক্ষে অশুভ ফল প্রসব হইতে পারে না। ঈশ্বরারাধনা দ্বারা আমার মন পবিত্র ও ভক্তিযুক্ত হয় উহাতে আমার ধৰ্ম্মে উন্নতি হয় এবং আমাকে মােক্ষমার্গে অগ্রসর করিয়া দেয় অতএব উহা আমার পক্ষে নিতান্ত শুভ ফল উৎপাদন করে; এবং উহাতে কাহারও অনিষ্ট হয় না। বরঞ্চ উহাতে আমার পাশ্ববর্তী লােকের উপকারও হইতে পারে। অতএব উহা শুভ কৰ্ম্ম। অতএব উহা শুভ কৰ্ম্ম। ধর্মোপদেশ দ্বারা আনি উপদিষ্টের অজ্ঞানতা দূর করিবার চেষ্টা করিতেছি এবং তদ্বারা আমার ও পচর্চা বৃদ্ধি পাইতেছে এবং ইহার দ্বারা কাহারও অনিষ্ট সম্পাদন হইতেছে না অতএব ইহা শুভ কৰ্ম্ম। মনে কর যে দেশে জুলাভাব আছে তথায় পুষ্করিণী খনন করিয়া দাম, কোন স্থানে মূতন রাস্তা প্রস্তুত দ্বারা তথাকার লােকের কষ্ট লাঘব করিম অথবা বিদ্যালয় বা পুস্তকালয় স্থাপন দ্বারা তৎঙানীয় লােকের জ্ঞানার্জনে সুবিধা করিয়া দিলাম। এ সকলই শুভ কাৰ্য্য। যে কম্ম মানবের অভাব বা দুঃখ বৃদ্ধি করে তাহা অশুভ ; যে ক কোন ব্যক্তির পক্ষে নঙ্গজনক নহে তাহা অশুভ যেমন নরহত্যা--ইহা কাহারও পক্ষে মঙ্গলদায়ক নহে, ইহাতে কাহারও প্রকৃত লাভ নাই অশুভ ক। যে কাৰ্য্য অধিকাংশ লােকের পক্ষে ক্ষতিজনক তাহাই অশুভ কৰ্ম্ম। কোন কর্মটা শুভ কোন কৰ্ম্ম অশুভ তাই বিচার করিতে গেলে ইহাই দেখা আবশ্যক যে উক্ত কাৰ্য্য দ্বারা কোন ব্যক্তির প্রকৃত সুখ ও উন্নতি হইবে কি না এবং উহা মানব জাতির বা সমাজের পক্ষে উপকারী কি না। যে কার্য্য হইতে কৰ্ত্তার এবং যে ব্যক্তির প্রতি কৰ্ম্ম প্রয়ােগ হইল উভয়ের অথবা উভয়ই যে সমাজ সেই সমাজের বা সমগ্র মানব জাতির পক্ষে অমঙ্গলদায়ক তাহাই অশুভ। মানব সমাজের কতকগুলি সাধারণ নৈতিক নিয়ম আছে সেই নৈতিক নিয়মের বিরুদ্ধ কাৰ্য্যগুলিই অশুভ কাৰ্য্য। যদিচ ভিন্ন ভিন্ন সমাজের ভিন্ন ভিন্ন । Definition, ( ২৯ ) মিশ। নিয়ম আছে তা অধিকাংশ সমাজ মধ্যে কতকগুলি নিয়ম একই রূপ ; ঐ সকল নিয়ম বিরুদ্ধ কাৰ্য অশুভ, অত এব পরিহার্য। যে কৰ্ম্ম শুভাশুভ ফল উৎপাদন করে তাহা মিশ্র কৰ্ম্ম। ওহি হয়ত একের পক্ষে মঙ্গলজনক অপরের পক্ষে অমঙ্গকর। দুই একটা উদাহরণ দ্বারা বুঝিবার চেষ্টা করা যাউক। অসৎপাত্রে না জানিয়া দান একটা মিশ্ৰ কৰ্ম্ম ; দাতা দান গ্রাহীর প্রতি যে দয়ানুভব করিয়া দান করিলেন এবং কথঞ্চিৎ স্বার্থত্যাগ করিলেন তাহাতে তাহার মনের নৈতিক উন্নতি হইল বটে কিন্তু যে ব্যক্তি দান গ্রহণ করিল দাতাকে প্রবঞ্চনা করণ অন্য তাহার মনের অবনতি হইল। ধনেপাৰ্জন একটা মিশ্ৰ কৰ্ম্ম ; ইহাতে শুভ ও অশুভ উভয় কলই সাধারণতঃ হইয়া থাকে। এস্থলে আমরা সদুপায়ে ধনােপানের কথা বলিতেছি, অসদুপায়ে ধনােপার্জন এস্থলে আলােচ্য নহে, উই। অশুভ কাৰ্য্য। সদুপায়ে যে ব্যক্তি ধনােপার্জন করে তাহাকে শারীরিক ও মানসিক কতকগুলি পরিশ্রম করিতে হয়। আলস্য মানবের পক্ষে অতি অমঙ্গলদায়ক। নাভিলাষী উদ্যোগী ব্যক্তিকে আলস্য ত্যাগ করিয়া পরিশ্রম করিতে হয় এবং ঐরূপ পরিশ্রম করায় এবং ঐরূপ পরিশ্রম দ্বারা শারীরিক ও মানসিক বৃত্তিগুলির সমধিক চর্চার হেতু উহা অধিকতর পুষ্ট ও কার্যক্ষম হয় ইহাতে মানবের উন্নতি হইয়া শুভ ফল উৎপাদন করে। মনুন্য ইহাতে সদা সর্বদা ব্যাপৃত থাকিলে মানবের ষড়রিপুর মধ্যে এক প্রধান রিপু লােভের বৃদ্ধি হয়। লােভের বশবর্তী মানব অপর প্রয়ােজনীয় কাৰ্য্য অবহেলা করে এবং অনবরত এই কাৰ্যে রত থাকে, ইহাতে তাহার মনের নৈতিক অবনতি হয়। এই কারণে ইহাকে মিশ্ৰ কৰ্ম্ম বলা যায়। এইরূপ সাধারণ মানবের অধিকাংশ কৰ্ম্মই মিশ্র ফলদায়ক। এক্ষণে নিষ্কাম কৰ্ম্ম কাহাকে বলে তাহা বুঝিবার চেষ্টা করা যাউক। উপরে বলা হইয়াছে যে ফলানুরাগী হইয়া আমরা যে কৰ্ম্ম করি তাহা সকাম। ফল কামনা তাগি করিয়া কৰ্তব্য জ্ঞানে যে কৰ্ম্ম করা যায় তাহা নিস্কাম কৰ্ম্ম। নিষ্কাম। দান করলে লােকে সুখ্যাতি করিবে, বা পূণ্য হইবে, স্বর্গলাভ হইবে, এ উদ্দেশে নহে, যথাসাধ্য দান করা সকলের কৰ্তব্য, অভাবী লােকের অভাব পূরণ করা কর্তব্য বলিয়া স্বকীয় কোন স্বার্থলাভের আকাঙ্খা না করিয়া যে দান তাহাই নিষ্কাম। আমার কর্তব্য আমি করিতেছি, উহা না করিলে কর্তব্যের টী হইবে, উহার লাভালাভের প্রতি লক্ষ্য করা, এরূপ মনােভাবের সহিত যে কৰ্ম্ম করা যায় তাহা নিষ্কাম কৰ্ম্ম।
} যে সকল কার্য্য করি তাহা দুই প্রকার মনােভাবের সহিত করা যাইতে পারে, প্রথম সুখের জন্য, দ্বিতীয় কর্তব্য জ্ঞানে। এই দ্বিতীয় কৰ্ম্মই নিষ্কাম কৰ্ম্ম ! উদাহরণ দ্বারা বুঝিবার চেষ্টা করা যাউক। তুমি জ্ঞানী, বহু ধৰ্মপুস্তকপাঠে ও সদাসর্বদা ধৰ্ম্ম চিন্তা দ্বারা তােমার ধর্মজ্ঞান হইয়াছে, তােমার কর্নধ্য লােককে ধৰ্ম্ম শিক্ষা দেওয়া। তুমি এই জ্ঞান দান কর্তব্য বিবেচনায় যদি কর, ইহা যশ ও পুণ্য লাভের জন্য নহে এই জ্ঞানে যদি কর তাহা হইলে ইহা নিষ্কম ভাবে করা হইল। এই জ্ঞান দান জন্য তােমার যশােলাভ হওয়া সম্ভব, তুমি জান ইহা দ্বারা তােমার নিশ্চয়ই সুকৃতি অর্জন হইবে এবং তজ্জন্ত পর জন্মে তােমার সুফল ফলিবে; কিন্তু তুমি যদি ঐ সকল ফল কামনায় এই কৰ্ম্ম না কর, ভবিষ্যৎ বা বর্তমান লাভালাভের প্রতি তােমার দৃষ্টি না থাকে ; ঐ লাভালাভের দ্বারা তুমি ঐ কৰ্ম্মে নিযুক্ত না হও কেবণকৰ্ম্ম করাই তােমার উদ্দেশ্য হয় ; তাহা হইলে ঐ কৰ্ম্ম নিষ্কাম কৰ্ম্ম হইল। সকাম বা নিষ্কাম কৰ্ম্ম কর্মীর মনােভানের উপর নির্ভর করে। বর্মী স্বকীয় বা পরকীয় লাভের উদ্দেশে তৎপ্রতি আসক্ত হইয়া যে কাৰ্য্য করে তা সকাম , স্বকীয় বা পরকীয় লাভ যে কর্মের লক্ষ্য নহে কে কৰ্ম্মই সে করে লক্ষ্য তাহাই নিষ্কাম। সকল প্রকার কষ্যই সকাম বা নিষ্কাম ভাবে করা যাইতে পারে। উদাহরণ দ্বারা বুঝিবার চেষ্টা কর, যাউক। নরহত্যা মহাপাপ বলিয়া সকল মানব সমাজে গণ্য হইয়া থাকে। যদি বিনা কারণে অথবা কোন কারণে আমি কোন মানবের প্রাণনাশ করি তাহা হইলে আমি ঐ মহাপাপ করিলাম জন্য আমি সমাজের নিকট দোষী হইলাম এবং বিচার পতির নিকট দণ্ডনীয় বিচারপতি আমার প্রাণ দণ্ডের আদেশ দিলেন, ও জল্লাদ আমার প্রাণ দণ্ড করিল। আমি কাম ক্রোধ লােভ প্রভৃতি রিপুর বশবর্তী হইর স্বকীয় স্বার্থসিদ্ধির মানসে নরহত্যা করিলাম এজন্য আমার কর্ম সকাম ও ঘোরতর অশুভ কৰ্ম্ম, উহা মহাপাপ। বিচারপতি আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ লইয়া, দেশের আইন অনুসারে হত্যাকারীর প্রাণদণ্ড উচিত এই জন্য, তিনি বিচারপতি তাহার উহা কর্তব্য বিবেচনায়, প্রাণ দণ্ডের আদেশ দিলেন তিনি নিস্কামভাবে ঐ কাৰ্য্যের অজ্ঞ। দিলেন এবং জল্লাদ বিচারপতির আস্তে পালন করা কর্তব্য জ্ঞানে উহাই সম্পাদন করিল। অতএব এই দুই ব্যক্তিই নরহত্যা নিস্কান ভাবে করিলেন উহাদের পক্ষে ঐ কাৰ্য্য পাপ নহে; উহা তাহাদের কর্তব্য কৰ্ম্ম। কিন্তু আমি একজন তৃতীয় ব্যক্তি, আমি দেখিলাম এক ব্যক্তি আমার সম্মুখে নরহত্যা করিল আমি রাজ- কর্মচারীর নিকট ধৃত করাইতে পারিতাম তাহা না করিয়া আমি স্বয়ং তাহাকে হইলাম।
; ( ৩১ } শাস্তি দিবার অভিপ্রায়ে হত্যা করিলাম অতএব আমি ও পাপ করিলাম আমার কৰ্তব্য উহা নহে আমার কর্তব্য উহাকে ধরাইয়া দেওয়া অথবা উহার বিরুদ্ধে বিচারপতির নিকট সাক্ষ্য দেওয়া অতএব আমার কর্তব্যের অধিক কাৰ্য্য করায় ঐ কাৰ্য্য নিষ্কাম ভবে করিলাম না। উহা সকামভাবে করা হইল; নরহত্যা দেখিয়া আমার অন্তঃকরণে যে ক্রোধ অথবা দ্বেষ হইল তাহা দ্বারা উত্তেজিত হইয়া ঐ কাৰ্য্য করিলাম অতএব উহা সকাম কৰ্ম্ম নিষ্কাম নহে। অপর একটা উদাহরণ দেখা যাউক; বাঙ্গালার অনেক স্থান এরূ। আছে যাহা রােগ প্রপীড়িত। তুমি ধনী, তােমার কৰ্তব্য পনের ন্যাহার করা। তুমি সেই স্থলে চিকিৎসালয় স্থাপন কৰিলে। এই কাৰ্য্য তুমি সকাম ও নিষ্কাম উভয় ভাবেই করিতে পার। যদি প্রশংসা লাভের জন্য অথবা শাসন কর্তার নিকট হইতে উপাধি লাভের প্রত্যাশায় কিম্বা পুণ্য লাভের উদ্দেশে এই কাৰ্য কর তাহা হইলে তুমি উহা সকাম ভাবে করিলে কিন্তু যদি তুমি উহা কৰ্তব্য জ্ঞানে কর, যদি তুমি ইহা মনে কর যে ঈশ্বর তােমাকে ধন দিয়াছেন নিধনের সাহায্য জন্য, নিধনের উপকার জন্য, যদি তুমি ইহা বুঝ যে ধন তােমার নহে ইহা অপরের জন্য তােমার হস্তে ন্যস্ত হইয়াছে ; ইহা ঈশ্বরের, তঁাহার কাৰ্য্য জন্য তোমার নিকট রাখা হইয়াছে ; তুমি তাহার কর্মচারী মাত্র তাহার কাৰ্য্যেই উহা ব্যয় হইবে তাহা হইলে তুমি নিষ্কাম ভাবে ঐ কর্ম কর্মফলে স্পৃহা না থাকারই নাম নিষ্কাম কর্ম। আমরা শাস্ত্র বিহিত শ্রদ্ধাদি যে সকল কৰ্ম্ম করি তাহার শেষ মন্ত্র দ্বারা আমরা সেই কৰ্ম্মফল শ্রীকৃষ্ণে অৰ্পণ করি ঐ মন্ত্র আমরা, ব্রাহ্মণের দ্বারা উক্ত হইয়া অর্থ না বুঝয়া তােতা পাখীর ন্যায় আবৃত্তি করি। সুতরাং উহার অভিপ্রায় যে নিষ্কাম কৰ্ম্ম তাহা হয় না। পরন্তু যাজক ও পূজক উভয়েই ঐ কৰ্ম্মের প্রধান লক্ষ্য নিষ্কাম কৰ্ম্ম অভ্যাস হইতে বঞ্চিত হই। প্রত্যেক মানবেরই কতকগুলি কৰ্তব্য কৰ্ম্ম আছে এই সকল কৰ্ম্ম করাই মানব জীবনের উদ্দেশ্য। ইহা সুচারুরূপে সম্পাদন করাই মানবের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইহা সুচারুরূপে সম্পন্ন হইলেই প্রকৃত কৰ্তব্য কর্ম। সুখ লাভ হয়। এই কৰ্তব্য কৰ্ম্ম চারিভাগে বিভক্ত করিবে। ও মানসিক ও আধ্যাত্মিক করা যায় যথা :- ১। স্বকীয় ও স্বপরিবারের ভরণপোষণ উন্নতি সাধন। ২। স্বজাতি ও স্বদেশের উন্নতি সম্পাদন।
( ৩২ ) ৩। মানব জাতির উন্নতি সম্পাদন। ৪। ঈশ্বরারাধনা। এ সকল কাৰ্যই কিছু না কিছু যথাসাধ্য সম্পাদন করা সকল মানবেরই কর্তব্য। ইহার কোনটাই একেবারে অবহেলা করা কাহারও উচিত নহে। এক্ষণে দ্বিতীয় শ্লোকের অর্থ বুঝিবার চেষ্টা করা যাউক। জ্ঞানমার্গের কথা প্রথম শ্লোকে বলা হইয়াছে। যদি তুমি বিষয়ানুরাগ ত্যাগ করিয়া জ্ঞান মার্গ অনুসরণ করিতে না পার তাহা হইলে তােমার পক্ষে কোন পথ অবলম্বন করা উচিত তাহাই দ্বিতীয় শ্লোকে বলা হইতেছে। পূর্বেই বলা হইয়াছে মানব ইহ- লােকে কৰ্ম্ম করিতে আসিয়াছে, কৰ্ম্মই মানবজীবনের কষ্য ও উদ্দেশ্য। কৰ্ম্মত্যাগ মানুষের পক্ষে অসম্ভব ; কোন না কোন কৰ্ম্ম মানব অনবরত করিতেছে। কয় ভিন্ন মানবের শরীর যাত্রা সম্পন্ন হয় না। সমস্ত বিশ্বসংসার জীবই কোন না কোন কৰ্ম্ম করিতেছে। যিনি বিশ্বসংসারের স্রষ্টা ও আধার যাহা হইতে এই সমগ্র বিশ্ব উদ্ভূত ও যাহাতেই লীন হয় তিনিও অনবরত কৰ্ম্ম করিতেছেন। তিনি কৰ্ম্ম ত্যাগ করিলে প্রলয় উপস্থিত হয় ও সমস্ত সংসারের নাশ হয়। অতএব হে মানব তুমি ক্রমাগত কৰ্ম্ম কর। কৰ্ম্ম করিতে গেলে জীবিত থাকা প্রয়ােজন। অধিকাংশ কৰ্ম্মই সময় সাপেক্ষ। মনে কর তুমি #ী জীবনের আবশ্যকতা। স্বজাতি বা স্বদেশের উন্নতিকল্পে বদ্ধপরিকর হইয়া কোন কার্যা আরম্ভ করিয়াছ। মনে কর তােমার দেশে লােক সকল অশিক্ষিত ও অজ্ঞ, তুমি যাহা দেশমধ্যে শিক্ষা প্রচলন হয় তাহার চেষ্টা করিতেছ। এ কাৰ্য্য এক দিনে, এক বৎসরে বা দশ বৎসরে অথবা এক জনের কিম্বা অল্প লােকের যত্ন সম্পন্ন হইবার নহে। ইহার জন্য বহু লােককে তােমার মত্তে আনয়ন করিয়া উহাদের সাহায্যে দীর্ঘকালব্যাপী তানবরত চেষ্ট!, হু অর্থব্যয়, বহু পরিশ্রম করিতে হইবে। যদি কাৰ্য্য আরম্ভ করিয়াই অথবা অল্প মাত্র সাধন করিয়াই তােমার মৃত্যু হইল তাহা হইলে ঐ কাৰ্য্য হয়ত অসম্পূর্ণ রহিল। হয়ত অপর কেহ তুমি যাহা করিতেছিলে তাহা কৰিল না অথবা তুমি যেরূপভাবে করিতেছিলে সেরূপ ভাবে করিল না অতএব ঐ কৰ্ম্ম কিছুদিন স্থগিত রহিল। অতএব তােমারস্বল্প জীবন ঐ কর্মের বিঘ্নকর হইল। এজন্য এই শ্লোকে বলা হইতেছে দীর্ঘজীবনের আবশ্যক। অতএব দীর্ঘজীবনের আকাঙ্খা শুভ কৰ্ম্ম সাধন জন্য করিবে; স্বকীয় ভােগের জন্য নহে। মানব সকামী। আমাদের অধিকাংশ কৰ্ম্মই সকাম এবং ঐ সকল সকাম কই আমরা ক্রমাগত কবিতেছি; কিন্তু মােক্ষলাভ করিতে গেলে নিষ্কাম কৰ্ম্ম করিতে । ( ৩৩ ) হইবে। উহা শিক্ষা করা আবশ্যক। কিরূপে নৈফৰ্ম লাভ করিতে পারি তাহ এই শ্লোকে বলা হইয়াছে। ক্রমাগত শাস্ত্রবিহিত শুভ কৰ্ম্ম করিবে, আজীবন উহা করিতে করিতে মন পবিত্র ও স্বার্থশূন্য হইবে। শাস্ত্রীয় শুভ কৰ্ম্ম শাস্ত্রীয় শুভ কৰ্ম্ম কি ? শাস্ত্রে নানারূপ শুভ কর্মের বিধান আছে, তন্মধ্যে দুই একটীর উল্লেখ দ্বারা বুঝিতে চেষ্টা করা যাউক। ঈশ্বরারাধনা একটী শুভ কৰ্ম্ম। ঐ কৰ্ম্ম অনবরত করিতে করিতে ঈশ্বর ভক্তি বৃদ্ধি পাইবে এবং তৎসঙ্গে স্বার্থপরতার নাশ হইবে। স্বার্থের নাশ হইতে তােমার অন্তঃকরণে নিষ্কাম ভাব ক্রমশঃ আবির্ভাব হইবে। যজ্ঞাদি কাৰ্য্য শুভ কৰ্ম্ম ; পুষ্করিণী খননাদি পূৰ্ত্ত কাৰ্য্য শুভ কৰ্ম্ম। ঐ সকল কাৰ্য্য করিবার জন্য কতকটা স্বার্থত্যাগ আবশ্যক সুতরাং উহা সকামভাবে করিলেও অভ্যাস। উহা অল্পে অল্পে স্বার্থত্যাগ শিক্ষা দিবে। হৃদয় হইতে সকাম ভাব দূরীকৃত করিয়া তৎপরিবর্তে নিষ্কাম ভাব আনয়ন করা অতি কঠিন। কেবল অভ্যাস দ্বারা ঐ ভাব প্রাপ্ত হওয়া যাইতে পারে। অতএব ক্রমাগত শুভ কৰ্ম্ম দ্বারা স্বার্থত্যাগ শিক্ষা করিবে এবং অনবরত শুভকর্ম সম্পাদন দ্বারা মন ক্রমশঃ উন্নত, পবিত্র ও নিৰ্ম্মল হইবে; বৈষয়িকতা, সংসারের মােহ, অল্পে অল্পে হ্রাস হইবে, নির্লিপ্ততা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইবে। সকামী বিষয়ী ব্যক্তি এইরূপে শুভ কৰ্ম্মের অভ্যাস দ্বারা নিষ্কাম ভাব লাভ করিবে; ইহা ব্যতীত অপর পন্থা নাই। এই শ্লোকে কৰ্ম্ম করার কথাই বলা হইয়াছে ; কৰ্ম্মত্যাগের কথা বলা হয় অনেকে মনে করেন গৃহস্থাশ্রম অপেক্ষা সন্ন্যাসাশ্ৰম ভাল ; কারণ গৃহস্থাশ্রমে অনেক সময় ঈশ্বরকে ভুলিয়া যাইতে হয় কর্মত্যাগ। ধনােপাৰ্জন প্রভৃতি বৃথা কার্ষে নিযুক্ত থাকিতে হয় ঈশ্বরােপাসনার সময় পাওয়া যায় না; মন সর্বদা সাংসারিক কাৰ্যে বিব্রত থাকে অতএব ঐ আশ্রম ধৰ্ম্মোন্নতির পক্ষে বিরােধী ; সুতরাং গৃহস্থাশ্রম ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাসশ্রম অবলম্বন করা সকল মানবেরই কর্তব্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহা ঠিক নহে পূর্বেই বলা হইয়াছে। কৰ্মত্যাগ মানবের পক্ষে অসম্ভব; মানব কৰ্ম্ম করিতেই আসিয়াছে এবং অনবরত কর্মই করিবে যাহাকে সন্ন্যাসী বলি, তিনিও ক্রমাগত কৰ্ম্ম করিতেছেন ; ঈশ্বরারাধন এবং ধর্মোপদেশরূপ প্রধান কৰ্ম্ম তিনি করিতেছেন। অতএব সন্ন্যাসী কর্মত্যাগী নহেন তিনিও আমার ন্যায় কর্ম করিতেছেন। আমার ন্যায় তাহাকেও শরীর পালন করিতে হয় ; আমি মানসিক । নাই।
( ৩৪ ) • বা শারীরিক পরিশ্রম দ্বারা ধনেপাৰ্জন করি এবং তদ্বারা স্বকীয় ও পরিবারবর্গের ভরণপােষণ সম্পাদন করি, তিনি ভিক্ষাদ্বারা স্বকীয় খাদ্য ও বস্তু আহরণ করেন। কেবল প্রভেদ এই যে আমাকে অধিক পরিমাণে এই কাৰ্য্য করিতে হয় তাহাকে অল্প পরিমাণে করিতে হয়। কিন্তু সকল ব্যক্তিই বাহ্যিক কৰ্ম্ম সম্পাদনের সময় ইচ্ছা করিলে হৃদয়ে ঈশ্বর চিন্তা করিতে পারেন ; যাহার হৃদয়ের অবস্থা ঐরূপ, যিনি তাহার অন্তঃকরণ সর্বদা ঈশ্বরে ন্যস্ত করিয়া শারীরিক ও সাংসারিক কৰ্ম্ম প্রতিপালন করিতেছেন তিনি প্রকৃতত্যাগী ও প্রকৃত সন্ন্যাসী। কৰ্ম্মফল ত্যাগই প্রকৃত ত্যাগ, উহাই প্রকৃত সন্ন্যাস ; কৰ্ম্মত্যাগ বিধেয় এবং সম্ভব নহে। আমরা উপরে যে চারিশ্রেণীর কর্তব্য কর্মের উল্লেখ করিয়াছি তাহার মধ্যে একটি হেয় ও অপরটা শ্রেয় নহে। যিনি যে কাৰ্য্য করিতে সক্ষম যিনি যে কাৰ্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতে পারেন তাহার পক্ষে সেই কাৰ্য্যই শ্রেয়। প্রাক্তন কর্মধারা প্রত্যেক মনুষ্য কোন না কোন কৰ্ম্ম করিতেসক্ষম অতএব সেই কৰ্ম্ম করিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। যেস্থানে, যে পরিবারবর্গের মধ্যে জন্মিলে যেরূপ শরীর ও মন প্রাপ্ত হইলে পূর্বজন্মাভ্যস্ত কৰ্ম্ম অধিকতর সুচারুরূপে করিবার সুবিধা হইবে ঈশ্বর তাহার জন্য সেইরূপ বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছেন। সকল কর্মই করা আবশ্যক ও সকল কর্তব্য কৰ্মই ঈশ্বরের কৰ্ম্ম। যিনি যে আশ্রমে আছেন তাহার পক্ষে সেই আশ্রমের কাৰ্য করা আবশ্যক। যৰি আমি সেই কাৰ্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়া অপর কাৰ্য্য করিতে সক্ষম হই নিশ্চয়ই অপর কাৰ্য্য আমার হস্তে ন্যস্ত হইবে, তদ্বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। আমি গৃহী ২৫ বৎসর বয়সে আমি বিদ্যাভ্যাস শেষ করিয়া ধনােপার্জনে নিযুক্ত আছি, মনে কর ৫৫ বৎসর বয়সে আমার ধনােপার্জন কার্য শেষ হইল আমি পুত্র পরিবারবর্গের ভরণপােষণ জন্য যথাসম্ভব বন্দোবস্ত করিলাম ; আমি যদি অপর কর্তব্যকাৰ্যে মন না দিয়া থাকি ; যদি এই ত্রিংশ বৎসর স্বদেশের কাৰ্যে অথবা মানবজাতির কাৰ্যে মনোেযােগ না করিয়া থাকি তাহা হইলে সেই কাৰ্য্য করিতে পারিব না অতএব আমার জীবন কষ্টকর হইবে আমি কর্মহীন হইয়া আলস্যে সময়ক্ষেপ করিব। কিন্তু ধনােপার্জনের সঙ্গে যদি অপর কর্তব্যগুলির প্রতি মনোেযােগ করিয়া থাকি তাহা হইলে পনােপাৰ্জন শেষ হইলেই অনায়াসে অপর কৰ্ত্তব্যে মনােনিবেশ করিতে পারি। অতএব চাৰিশ্রেণীর কর্তব্য কাৰ্য সকলেরই করা আবশ্যক, উহা সকলের পক্ষেই বিধেয়। অসুৰ্যা নাম তে লোক অন্ধন তমসাবৃতাঃ। তাংস্ত প্ৰেত্যাভিগচ্ছন্তি যে কে চাত্মহনন জনাঃ।৩ ( ৩৫ ) যাহারা আত্মার অস্তিত্বে অবিশ্বাসী অতএব আত্মঘাতী তাহারা মৃত্যুর পর অন্ধ তমসাবৃত অসুরলােকে গমন করে। পরমাত্মা পরমেশ্বর প্রধানতঃ দুইভাবে জগতে প্রকাশিত হন। এক আত্মা- অপর জড়। যাহার জ্ঞানী ও সম্যকদর্শী তাহার এই উভয় ভাবেই সেই নির্বিকার নির্বিকল্প পব্রহ্মেরই উপলব্ধি করেন। পরমাত্মা পরমেশ্বর সর্বত্র সর্বদ্রব্যে বিরাজমান আছেন এবং তিনিই সর্বদ্রব্য, তাহা আমরা ঈশ্বরের দুইভাব। প্রথম শ্লোকের ব্যাখ্যায় বিশেষরূপে দেখিয়াছি। এস্থলে সে বিষয়ের পুনরালােচনা অনাবশ্যক। যদিচ প্রকৃত জ্ঞানী পরমাত্মার এই উভয় ভাবেরই একত্র সমাবেশ সৰ্ব্বদ্রব্যে দর্শন করেন ; কিন্তু সাধারণ মনুষ্যের এই দিব্যদৃষ্টি নাই তাহারা পরব্রহ্মের এই দুইভাবকে বিভিন্ন মনে করে। অপর এক শ্রেণীর লােক আত্মার অস্তিত্ব বিষয়ে একেবারে অজ্ঞাত ; তাহারা জড় পদার্থের অস্তিত্বই বিশ্বাস করে জড়পদার্থ ভিন্ন যে অপয় কিছু আত্মঘাতী। তত্ব এ জগতে আছে তাহা তাহাদের উপলব্ধি নাই। তাহারা জড় লইয়াই ব্যস্ত, জড়জগতই তাহাদের জীবনের সীমা, জড়জগতই তাহাদের উন্নতি ও অবনতির রঙ্গভুমি। জড়জগতই তাহাদের কাৰ্য্যস্থল। ইহারা জড়বাদী, ইহারা অজ্ঞানী। ইহাদের মধ্যে অনেক লােক এরূপ আছে যাহারা বাহিক শাস্ত্রে পণ্ডিত এবং তাহাদিগকে সচরাচর আমরা শিক্ষিত ও পণ্ডিত নামে । অভিহিত করিয়া থাকি কিন্তু বাস্তবপক্ষে তাহারা প্রকৃত জ্ঞান হইতে বঞ্চিত ; তাহারা মূখ। যে জ্ঞানে মানুষের মনুষ্যত্ব আনয়ন করে ; যে জ্ঞানে মানব জ্ঞানমার্গে ক্রমােন্নতি লাভ করিতে পারে সেই শ্রেষ্ঠজ্ঞান তাহাদের হৃদয় আলােকিত করিতেছে না ও তাহাদের ধীশক্তিকে নিষ্কাম কৰ্ম্মমার্গে প্রেরণ করে না। এই সকল লােক আত্মায় অবিশ্বাসী। পরমাত্মার জ্ঞান ইহাদের নাই অতএব ইহাদিগকে আত্মঘাতী নামে অভিহিত করা যায়। এই সকল দৈহিক সুথপরায়ণ লােক আত্মাকে হত্যাই করিতেছেন বুঝিতে হইবে। আত্মা তাহাদের পক্ষে মৃত, আত্মা যদি তাহাদের জীবিত থাকিত তাহা হইলে তাহারা তৎসম্বন্ধে এরূপ ঔদাসিন্য অবলম্বন করিতে পারিত না। আত্মা সকলেরই হৃদয়ে অবস্থিত কিন্তু যাহারা তাহা ভুলিয়া যায় বা তৎপ্রতি অমনােযােগী হয় আত্ম স্বীয় আলােকে তাহাদের বুদ্ধি উজ্জলিত করেন না। তাহাদের হৃদয় ধৰ্ম্মালেক হইতে বঞ্চিত এবং তাহারা অনায়াসেই কু-কর্মে প্রবৃত্ত হয়। এরূপ লােক অন্ধকারাচ্ছন্ন অসুরলোকে গমন করে। ।
( ৩৬ ) আত্মঘাতী লােক দুই প্রকারের। প্রথম, যাহারা সদাই কুকর্মে রত তাহারা ঈশ্বরে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসী। ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকিলে তাহারা কখন কুকর্ম করিতে পারে না। তাহারা নিজ স্বার্থলাভের জন্য অপর মানব প্রতি অত্যাচার করে এবং তাহাদিগের অনিষ্ঠ করে এইরূপ লােক প্রথম শ্রেণীর আত্মঘাতী। সকল মানবের হৃদয়েই পরমাত্মা বিরজি করিতেছেন; সকল মানবই পরমেশ্বরের প্রিয় সুতরাং কোন মানবের অনিষ্ঠ করিলেই পরমেশ্বরের অপ্রিয়কার্য করা হইল। সুতরাং এইরূপ লােককে আত্মঘাতী বলা হয়। ইহারা পাশব বৃত্তিসম্পন্ন ইহাদের অন্তঃকরণে দেবভাব বা ধর্মভাব আদৌ নাই। ইহাদিগকে আসুরিক মানব বলা যাইতে পারে। এই প্রথম শ্রেণীর আত্মঘাতীগণের অন্তঃকরণ ও মল, বাহ্যিক কৰ্ম্মও মন্দ। ইহারা ধর্মদ্রোহী ও সমাজদ্রোহী সুতরাং ইহারা সৰ্ব্বতােধিক আত্মঘাতী। দ্বিতীয় শ্রেণীর আত্মঘাতীগণ কুকর্ম করে না বটে কিন্তু নিতান্ত স্বার্থপর এবং কোন ভালকৰ্ম্ম করে না। কেবল নিজের স্বার্থ, নিজের শারীরিক সুখভােগ লইয়াই ব্যস্ত পরমেশ্বর বা পরমেশ্বরের আধার মানবের কোনরূপ উপকার বা লাভের জন্য কিছুমাত্র চেষ্টা করে না। এরূপ লােক যদিচ সমাজের পক্ষে একেবারে মন্দ নহে কিন্তু তাহারাও সমাজের ক্ষতিকারী। ঈশ্বর যে মানবকে অর্থ ও ক্ষমতা ও অধিকার দিয়াছেন তাহার কর্তব্য সেই সকলের সদ্ব্যবহার করা অর্থাৎ যাহার দুঃখ আছে তাহার দুঃখমোচন করা যাহার অভাব আছে তাহার অভাব মােচন করা, যে ব্যক্তি তাহা করেনা সে আত্মদ্রোহী সে পরমাত্মা পরমেশ্বরের বিরােধী। সে পরমাত্মার আদেশ গ্রাহ্য করে না তঁাহাতে তাহার বিশ্বাস নাই। তাহার অস্তিত্ব স্বীকার করে না কিম্বা মৌখিক স্বীকার করিলেও কাৰ্যতঃ তাঁহাকে অস্বীকার বা অবমাননা করে। সুতরাং তাহারাও আত্মদ্রোহী বা আত্মঘাতী। ঐরূপ আত্মঘাতী লােক মৃত্যুর পর অন্ধকারাবৃত নিরানন্দময় অসুরলােকে গমন করে। হিন্দুশাস্ত্রে অসুর নামে একশ্রেণীর জীবের উল্লেখ আছে। ইহারা দেবতা- দিগের বিরােধী। পুরাণে দেবাসুরের চিরকালব্যাপী যুদ্ধের বর্ণনা অনেক আছে। এই যুদ্ধে অধিকাংশ সময়েই অসুরগণই জয়লাভ করিয়া থাকিত এবং দেবতাগণ পরাজিত হইয়া স্বৰ্গত্যাগ করিতে বাধ্য হইতেন এবং সর্বতােভাবে লাঞ্ছিত ও যথেষ্ট কষ্টগ্রপ্ত হইতেন।
; ( ৩৭ ) যাহারা এই দেবার যুদ্ধের অর্থ বুঝেন না তাহারা এই সকল বিবরণ বালকোপযােগী উপকথা মনে করিতে পারেন। ইহার প্রকৃত গূঢ় অর্থ আছে। তাহা শাস্ত্রের সকল গৃঢ়তত্ত্বের ন্যায় ধ্যানগম্য। অতএব এই বিষয়ের আলােচনা হইতে আমরা বিরত রহিলাম। শাস্ত্রে অনুরের বর্ণনা হইতে প্রমাণ হইতেছে যে যাহাদের ধর্মজ্ঞান নাই যাহারা সৎকৰ্ম্ম করে না ও সৎকর্মীর বিরােধী ; যাহারা মনুষ্য দ্বারা যজ্ঞাদি শাস্ত্র বিহিত পুণ্যকৰ্ম্ম করণে বিগ্ন প্রদানের চেষ্টা করে তাহারাই অসুর। ইহারা অসৎ কর্মী ও সৎকর্ম বিরােধী। ইহারা যে স্থানে বাস করে তাহার নাম অনুরলােক। যাহারা পৃথিবীতে জীবদ্দশায় কেবল জীবন ধারণ, পান ভােজন ও শারীরিক অপর বৈধ ও অবৈধ সুখভােগে রত ছিল অর্থাৎ যাহাদিগকে উপরে আত্মঘাতী বলা হইয়াছে তাহারাই মৃত্যুর পর অসুরুত্ব প্রাপ্ত হয় ও অসুরলােকে গমন করে এবং তথায় বাস করে। শাস্ত্রকারেরা বলেন এই দৃশ্যমান বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সপ্তলােকের। ইহার একলােককে ভূলোক বলে, আর ছয়টী লােক ইহা হইতে পৃথক স্থানে অবস্থিত নহে; ইহারই সহিত একস্থানে সংশ্লিষ্ট ভাবে স্থিত তবে উহারা আমাদের অসুরলােক। ইন্দ্রিয়-গােচর নহে। আমরা স্থূলদেহী, আমরা স্কুল ইন্দ্রিয় বিশিষ্ট অতএব আমরা কেবল স্থূলদেহযুক্ত ভূলোকই দেখিতে পাই উই আমাদের ইন্দ্রিয়গােচর এবং উহাতেই আমরা বাস করি। আমরা এই স্থলে তিনটী লােকের কেবল কথঞ্চিৎ আলােচনা করিব। অপর ৪টী আমাদের বর্তমান চর্চার বিষয় নহে। এই তিনটী লােকের নাম ভূঃ ভুবঃ ও স্বর্গ অথবা নরলোক, পিতৃপােক ও লােক অর্থে যাহা দেখা যায় এবং যথায় সুখ দুঃখ ভােগ করা যায় ; অতএব লােক অর্থে আবাস স্থান হইতেছে। মানব জীবদ্দশায় ভূলোক বা নরলােকে বাস করে; মৃত্যুর সময় তাহার প্রণবায়ু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডস্থ মহা বায়ুতে মিলিত হয়। জীবের প্রাণ স্থূলদেহ হইতে বৰ্হিভূত হইয়া বিশ্ব প্রাণে সংযুক্ত হয়। স্থূলদেহ প্রাণত্যক্ত হইয়া কালক্রমে গলিত হইয়া অথবা অগ্নি দ্বারা ভস্মীভূত হইয়া ক্ষিতি ও অপে পরিণত হয়, শরীরস্থ বায়ু অগ্নি ও আকাশ জাগতিক বায়ু তেজ ও ব্যামে মিলিত হয়। জীবাত্মা স্থূলদেহ হইতে বিমুক্ত হইয়া সূক্ষ্মদেহ ও কারণ-দেহ লইয়া প্রেতলােকে গমন করেন। এই প্রেতলােক সপ্ত অংশে বিভক্ত তন্মধ্যে সর্ব নিকৃষ্ট অংশকে অসুরলােক বলা যায়। ইহা অন্ধকারময় ও নিরানন্দ স্থান ; এখানে যাহারা বাস করে তাহারা নরকযন্ত্রণা ভােগ করে। ইহাকে ( ৮ ) নরক বলা যাইতে পারে। কারণ মানব তাহার পাপের শাস্তি কতকটা এইখানেই প্রাপ্ত হয় বাকী শাস্তি পুনরায় জন্মগ্রহণ করিয়া মর্ত্যলােকে প্রাপ্ত হয়। নরক বলিয়া কোন স্থান যেখানে বাহ্য হইতে পাপীর প্রতি উৎপীড়ন হয় তাহা নাই। অসুরলােকে পাপাত্মা অসুর যে কিছু শাস্তি পায় তাহা নিজের অন্তর হইতে পায়, যমদূত আসিয়া ডাঙ্গস মারে না বা মলের কূপে ডুবাইয়া রাখে না। উহা আন্তরিক শাস্তির অতি রঞ্জিত অলঙ্কার মাত্র। আসুরিক মানব জীবদ্দশায় কেবল আহার বিহার পান ভােগ প্রভৃতি ইন্দ্রিয় সুখে মত্ত থাকায় উহাদের ইন্দ্রিয় সুখলিগা এত প্রবল হয় যে তাহারা উহা ব্যতীত থাকিতে পারে না। পার্থিব সুখেচ্ছা মৃত্যুর পরও বলবতী থাকে কিন্তু স্থূলদেহের ও ইন্দ্রিয়বিষয়ের অভাবে ঐ ইচ্ছা তৃপ্ত করিতে পারে না। সুতরাং তজ্জন্য নিতান্ত কষ্টভােগ করে। ইহাই অসুরদিগের শাস্তি এবং ঐ নরকই উহাদের ভােগ করিতে হয়। আত্মঘাতী ব্যক্তি মরণান্তে অসুরত্ব প্রাপ্ত হইয়া অসুরলােকে বাস করে ও অসুর ভােগ্য শাস্তি ভােগ করে। ঐরূপ শান্তিভােগ দ্বারা তাহারা বুঝিতে পারে যে ইন্দ্রিয় সুখ সকল অনর্থজনক ও কষ্টকর এবং কেহ কেহ প্রতিজ্ঞা করে আর এরূপ কাৰ্য্য করিবে না। বহুকাল এইরূপে কাটাইয়া পাপ ক্ষীণ হইলে নির্দিষ্ট পথে বিচরণ করিয়া পুনরায় মর্ত্যলােকে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পুনর্জন্মের পর অনেকে ঐ সব ভুলিয়া যায়, কেহ কেহ ঐ প্রতিজ্ঞা রাখিতে পারে। অতএব উপনিষদের উপদেশ এই যে মানব তুমি আত্মজ্ঞান লাভ করিতে চেষ্টা কর। আত্মা কি তাহা নিম্ন দুইটা শ্লোকে বর্ণিত হইতেছে, উহা পাঠ করিয়া উহার অর্থ সম্যক বুঝিতে চেষ্টা করিবে। দীর্ঘকালব্যাপী ধ্যান দ্বারা প্রত্যেক মন্ত্রীর অর্থের সক উপলদ্ধি হইবে। অনেজদেকং মনসাে জৰীয়ে নৈনদ্দে আপ্তব পূর্বমর্ষ। শুদ্ধাবতােহানত্যেতি তিষ্ঠৎ তস্মিন্নপাে মাতবিশ্বাদধাতি ॥৪। দেজতি তমৈজতি তদূরে তদ্বন্তিকে। তেদন্তরস্য সর্বস্য তদু সর্বস্তস্য বাহ্যতঃ ॥৫॥ শাস্ত্রে পরমেশ্বরের যে সকল বর্ণনা আছে তাহা পাঠের পূর্বে আমাদের মনে করা আবশ্যক পরমেশ্বর নিগুণ আমরা সগুণ ; তিনি নির্বিকল্প ও নির্বিকার আমাদের মন সবিকল্প ও সবিকার । আমাদের মত মানবের পক্ষে পরমাত্মা পরমেশ্বর কল্পনাতীত, অচিন্তনীয় ও অনির্বচনীয়। যাহা আমরা কল্পনা করিতে ( ৩৯ ) পারি, যাহা আমরা চিন্তা করিতে পারি তাহাই আমরা বাক্যের দ্বারা প্রকাশ করিতে পারি। যিনি আমাদের মনের অতীত তাহাকে আমরা বাক্য দ্বারা প্রকাশ কৰিব কিরূপে। অতএব শাস্ত্রে পরমাত্মা পরব্রহ্মের যে কিছু বর্ণনা আছে তাহা তাহার সঠিক বর্ণনা নহে, তাহার দ্বারা তাঁহার প্রকৃত উপলব্ধি আমাদের হইতে পারে না; তিনি অতুলনীয় অতএব মনুষ্য তাহাকে সীমাবদ্ধ বুদ্ধির সীমার অভ্যন্তরে আয়ন জন্য নিজবােধগম্য তুলনার দ্বারা প্রকাশ করিতে চেষ্টা করিয়াছে। নিগুণকে সগুণ উপমা দ্বারা বুঝা ভিন্ন মানবের পক্ষে অপর উপায় নাই। সুতরাং শাস্ত্রকার ঋষিগণ এই প্রথা অবলম্বনে পরমাত্মা কি তাহা সাধারণ মানবকে বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছেন। এই দুইটী শ্লোকস্থ মন্ত্র গুলি কেবল পাঠ করিলে ও উহার অর্থবােধ হইলেই যথেষ্ট নহে উহা কেবল মৌখিক জ্ঞান, মন্ত্রগুলি এক মনে ধ্যান করিতে হইবে এইরূপে ক্রমশঃ জন্মজন্মান্তর তাহার উপাসনা করিলে তবে মানব প্রকৃত জ্ঞানলাভ করিতে পারিবে এবং তাহাকে দর্শন করিতে সমর্থ হইবে। প্রাণীর সহজ-লক্ষ্যগুণগুলির মধ্যে গতি বল ও আয়তন প্রধান। এই শ্লোকে পরমাত্মাতে এইগুণগুলি আছে তাহাই বর্ণনা করা হইয়াছে। যদিচ বেগবত্তা প্রাণীর একটী শ্রেষ্টগুণ তাহা হইলেও পরমেশ্বরকে একপক্ষ হইতে দৃষ্টি করিলে তাহার গতি নাই ; তিনি অনেজং নিস্পন্দ নিশ্চল। তিনি একস্থান হইতে অপর স্থানে গমন করেন না; সুতরাং গতিহীন । যিনি সদা সর্বত্র বিরাজ করিতেছেন তিনি একস্থান হইতে অপর স্থানে কিরূপে গমন করিবেন। এমন কোন স্থান নাই যথায় তিনি অবিদ্যমান ; সুতরাং তাহাকে কোনস্থানে গমন করিতে হয় না অতএব এইশ্লোকে প্রথমেই তাহাকে গতিহীন বলা হইয়াছে। জীব পরিবর্তনশীল ; তাহার পরিবর্তন অতি অবশ্যই ক্রমাগত হইতেছে। কিন্তু পরমাত্মা একভাবেই সর্বক্ষণ বিরাজ করিতেছেন অতএব তিনি সর্বদা সর্বত্র একরূপে বর্তমান এজন্য তাহাকে এক বলা হইয়াছে। যদিচ পরমাত্মা গতিহীন তথাচ অপরপক্ষে তিনি অতি বেগবান এমন কি মন হইতে অধিকতর বেগবান্। পরমেশ্বরের গতি না থাকিলেও তিনি সৰ্ব্বাপেক্ষা বেগবান ইহার অর্থ এই যে তিনি সদাসর্বত্র সমভাবে মনসাে অৰীয়। বিরাজ করেন। তজ্জন্য তাহাকে একস্থান হইতে অবস্থানে যাইতে হয় না; তুমি যে স্থানেই যাওনা কেন দেখিতে পাইবে অনেজৎ। একং।
( ৪০ ) তােমার পূর্বেই তিনি তথায় উপস্থিত আছেন। মানবের মন সর্বাপেক্ষা দ্রুতগামী এক্ষণে আমার মন পাটনায় আছে কিন্তু পরক্ষণেই উহা কলিকাশ অথবা বােম্বাই বা লণ্ডনে কল্পনাবলে যাইতে পারে এরূপ বেগ কোন প্রাণীর বা কোন দ্রুতগতি যানের নাই। অত এব অপর বেগবান দ্রব্য বা বলের অপেক্ষা মন অধিকর দ্রুতগামী। এই মন্ত্রে বলা হইতেছে যে পরমেশ্বর মন হইতেও অধিকতর বেগবান। কারণ মনকেও কল্পনা করিতে কিছুক্ষণ সময় লাগে কিন্তু পরমেশ্বরের পক্ষে সে অল্প সময়েরও প্রয়ােজন নাই তিনি পূর্ব হইতেই তথায় বিরাজ করিতেছেন, অর্থাৎ তিনি ভুি, সদা সর্বত্র বিদ্যমান। ইনি অগ্রগামী হইলে মানবের ইন্দ্রিয়গণ ইহার নিকটবর্তী হইতে পারে না। এইস্থলে ইন্দ্রিয়গণকে দেবতা বলা হইয়াছে। মানবের দশ ইন্দ্রিয় ; পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, যথা--চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক ও নৈনদ্দেবা আপুবন পুৰ্ব্বমর্ষৎ। পঞ্চ' কর্মেন্দ্রিয়, যথা-হস্ত, পদ, বাক্য, উপস্থ, পায়ু। মনুষ্যগণ জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা জ্ঞান আহরণ করে। আমরা যে কিছু বাহিক জগতের জ্ঞানলাভ করি তাহা জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা ; দর্শন, শ্রবণ প্রভৃতি কাৰ্য্যদ্বারা আমরা বাহবস্তুর সহিত মনঃসংযােগ করি এবং তাহার স্বরূপ অবগত হই। ইন্দ্রিয়গণকে দেবতা কেন বলা হইল ইহা প্রশ্ন হইতে পারে—দ্যোতনাৎ দেবাঃ অর্থাৎ যাহারা প্রকাশ করেন। স্বর্গীয় দেবতাগণের উপাসনাদ্বারা আমরা ক্রমে পরমেশ্বরের স্বরূপ জ্ঞানলাভ করিতে পারি অতএব দেবতা। তঁাহারা দেবতা নামে অভিহিত হন। মানবের জ্ঞানেন্দ্রিয়গণ বিশ্বসংসারে পরমেশ্বরের পার্থিব ক্রিয়া মানব চিত্তসকাশে প্রকাশ করে অতএব ইঞ্জিয়গণকেও দেবতা বলা হইয়াছে। “মনসে জবীয়ঃ” ও নৈনবাে আপু বন পূৰ্বমর্ষৎ” এই দুইটা মন্ত্রের একভাবে এই অর্থ হইতে পারে যে পরমাত্মা পরমেশ্বর ইন্দ্রিয় ও মনের অগােচর। তিনি স্থির থাকিলেও অন্যেরা ধাবমান হইয়া তাহাকে অতিক্রম করিতে পারে । অন্য বস্তু বা প্রাণী যতই কেন দ্রুতগামী হউক না তাহাকে অতিক্রম করিতে পারে না অর্থাৎ এমন কোন স্থানে যাইতে পারে না তদ্ধাৰতােহস্তানত্যতি তিষ্ঠৎ। যেখানে তিনি নাই। মানবের মন বা ইন্দ্রিয় এরূপ স্থানে গমন করিতে পারে না যেখানে তিনি বিরাজ করেন না। অতএব তিনি সর্বত্র সমভাবে বিদ্যমান আছেন। এককথা বারম্বার বলার প্রয়ােজন এই যে পুন পুনঃ এই মন্ত্র গুলি চিন্তা করিতে ও একমনে ধ্যান করিতে হইবে।
( ৪১ ) মাতরি অন্তরীক্ষে য়তি গচ্ছতি ইতি মারিখ অর্থাৎ যিনি অন্তরীক্ষে যাতায়াত করেন। ইহার দুইটী অর্থ, বায়ু ও হিরণ্যগর্ভ ব্ৰহ্মা। অপঃ অর্থে কৰ্ম্ম বা কর্ম ফল ; তাঁহাকে অর্থাৎ নিত্য চৈতন্য স্বরূপ পরব্রহ্মকে, তম্নিপে মারিখা দখাতি। আশ্রয় করিয়া বায়ু প্রাণিগণের প্রাণধারণাদি ক্রিয়া সম্পাদন করিতেছে। বায়ু সকল প্রাণীর প্রাণের আশ্রয় স্থান ; বায়ুর সাহায্যে মানব জীবিত থাকিয়া ধাবন দণ্ডায়ন বাক্য কথন নিশ্বাস প্রশ্বাস বহন প্রভৃতি সমস্ত প্রাণ কাৰ্য্য করিতে সমর্থ হইতেছে; বায়ু না থাকিলে এ সকল কার্য সম্পন্ন হইত না। অতএব বায়ু জীব জগতের একান্ত আবশ্যকীয় পদার্থ এবং এই বায়ুর আশ্রয় স্থান তিনিই—সেই পরব্রহ্ম। ইহার দ্বিতীয় অর্থ এই যে-পরমাত্মা যখন বিশ্ব সৃষ্টির মানস করেন তখন তাহা হইতে কাৰ্য্যশক্তি আবির্ভাব হয়, ইহারই নাম হিরণ্যগর্ভ বা কাৰ্য্য ব্ৰহ্ম বা শব্দব্রহ্ম। এই হিরণ্যগর্ভ অন্তরীক্ষে বাস করেন; ইনিই বিশ্বন্ধিতা সুত্ৰাত্ম তিনি প্রাণিগণকে কাৰ্যে প্রবৃত্ত করান, কাৰ্য্য করিবার ক্ষমতা প্রদান করেন, ও কর্মফল ভােগ করান। অতএব এই মন্ত্র দ্বারা কথিত হইতেছে যে বিশ্বের সৃষ্টিকাৰ্য ও প্রাণিদিগের রক্ষণ কার্য সম্পাদনকারী অন্তরীক্ষ নিবাসী বিধাতার তিনিই আশ্রয়। পঞ্চম শ্লোকে বলা হইতেছে তিনি গতিহীন হইয়াও গতিশীল বলিয়া প্রতীত হন, তিনি দূরেও আছেন নিকটেও আছেন তিনি সকল পদার্থের ভিতরেও আছেন বাহিরেও আছেন। অর্থাৎ তিনি সর্বব্যাপী ও সর্বত্র বিরাজমান। তিনি সচল ও নিশ্চল ; এই দুইটা কথা অসংলগ্ন ও পরস্পর বিরােধী; পরমাত্মার প্রতি এরূপ গুণাৱােপ কেন করা হইয়াছে ? এই বাক্যগুলি সাধারণ পাঠকের পক্ষে বালকোপযােগ অসঙ্গত ও যুক্তিহীন মনে হইতে পারে। কিন্তু পাঠক মনে রাখিবেন যে পরমাত্মা পরমেশ্বর জ্ঞানের ও যুক্তির অগােচর, দ্রব্য বা জীবের যে কিছু গুণের পরিচয় আমাদের আছে, তিনি সেই সকল গুণের অতীত এবং সেই সকল গুণ তাহা হইতেই উদ্ভূত এবং তাহাতেই সমাবিষ্ট। তঁাহা সম্বন্ধে এ সকল বাক্য অসংলগ্ন মনে হইলেও অসংলগ্ন নহে এবং পরস্পর বিরােধী গুণ সকল তঁাহা হইতেই উৎপন্ন হয় ও তাহাতেই স্থিত আছে ও পরে প্রলয় কালে তাহাতেই অন্তহৃত হইবে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্লোকে পরমাত্মা পরমেশ্বরের যে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহা অনেকের পক্ষে দুরূহ মনে হইতে পারে এবং এরূপ ব্যক্তি মনে করিতে পারেন ইহায় সম্যক উপলব্ধির চেষ্টা করা বৃথা উহাতে কোন ফল লাভ হইবে না। এতদ্ব্যতীত বিষয়াসক্ত লােক মনে করিতে পারেন ইহাতে পারলৌকিক লাভ ( ৪২ ) হইবে কিনা কে জানে কোন পার্থিব লাভের সম্ভাবনা যখন নাই তখন এই বিষয় লইয়া বৃথা আলােচনার প্রয়ােজন কি ? ইহার উত্তরে নিম্নের দুইটা শ্লোক রচিত হইয়াছে। আত্মজ্ঞান কেবল পারত্রিক সুখের জন্য নহে ইহলােকেও উহার উপকারিতা আছে তাহাই দেখান হইতেছে। নিম্নের শ্লোকদ্বয়ে পরমাত্মার বর্ণন ও হইয়াছে এবং আত্মজ্ঞানের ঐহিক লাভ ও বিবৃত হইয়াছে। বস্তু সৰ্বাণি ভূতানি আত্মবােমুপতি। সর্বভূতেষু চাত্মানং ততােন বিজুগুপ্সতে ॥৬॥ যস্মিন সর্বাণি ভূতানি আভূৈদ বিজানতঃ। তত্র কো মােহঃ কঃ শােক একত্মমনুপশ্যতঃ ॥৭। যিনি সৰ্ব্বভূত পরমাত্মা পরমেশ্বরে অবস্থিত এবং সর্বভূতে পরমাত্মা বিদ্যমান ইহাদর্শন করেন অর্থাৎ জানেন তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না। সৰ্ব্বভূতে পরমেশ্বর দর্শন দ্বারা যখন জ্ঞানী ব্যক্তির সমগ্র জীবে একত্ব জ্ঞান লাভ হয় তখন তাহার মােহই বা কি এবং শােকই বা কি ? অর্থাৎ শােক মােহ থাকে না। পঞ্চম শ্লোকে বলা হইয়াছে পরমাত্মা সৰ্ব্বভূতের অন্তরেও আছেন বাহিরেও আছেন। এই সত্যের সম্যক উপলব্ধির পার্থিব লাভ এই শ্লোক দুইটীতে বিস্তৃত হইল। মানব সাধারণতই দন্তশালী আমি, তুমি, সে, এই ভেদজ্ঞান বর্তমান মানবের হৃদয় অভিভূত রাখিয়াছে, এবং তজ্জন্য আমি শ্রেষ্ঠ, তুমি নিকৃষ্ট, আমি ভাল, তুমি অথবা সে মন্দ, আমি বুদ্ধিমান বা বলবান, তুমি অথবা সে নির্বোধ বা দুৰ্বল, এই অহঙ্কার দ্বারা অনবরত চালিত হইয়া মানব পার্থিব জীবন অতিবাহিত করিতেছে। এই ভেদ জ্ঞানই কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ, মাৎসর্যের মূল কারণ। এই ভেদজ্ঞান না থাকিলে মনুষ্য ষড়রিপুর বশবর্তী হইয়া অশেষবিধ দুঃখজনক কাৰ্য্যে ব্যাপৃত থাকিত না। এই ভেদজ্ঞান থাকায় মনুষ্য মনুষ্যকে ঘৃণা করে, দুঃখ দেয় ও নানাবিধরূপে উৎপীড়ন করে, কিন্তু যাহার এই ভেদজ্ঞান নাই তিনি কাহাকেও ঘৃণা করেন না, তিনি সকলকেই পরমাত্মার অংশ জানিয়া ভক্তি ও শ্রদ্ধা করেন। যিনি প্রকৃত ঈশ্বর ভক্ত যাহার ভক্তি কেবল লােক দেখান বা মৌখিক নহে তিনি জানেন মনুষ্য কেন সকল জীবই পরমেশ্বরের সন্তান ; পাপীর হৃদয়েও তিনি আছেন এবং পুণ্যবানের অন্তরেও তিনি বর্তমান। তাহা ব্যতীত এ বিশ্বজগতে কোন প্রাণী বা পদার্থ নাই ও থাকিতে পারে না; অতএব কোন প্রাণীর প্রতি দ্বেষ করিলে তঁাহার প্রতি দ্বেষ করা হইল, এই জ্ঞান যাহার আছে তিনি কিরূপে কোন প্রাণীকে ঘৃণা করিবেন ?
( ৪৩ ) ষষ্ঠ শ্লোকে উপনিষদ শিক্ষা দিতেছেন যে সৰ্ব্বভূতে ঈশ্বর দেখিতে পাইলে অপর মানবের প্রতি ঘৃণা হৃদয়ে আর স্থান পাইবে না। প্রকৃত পরমার্থজ্ঞান হইলে আমরা বিশ্বপ্রেমিক হইব। আমি যদি কেবল বিশ্বপ্রেম। স্বকীয় শারীরিক ও বৈষয়িক মুখভােগ লইয়া ব্যস্ত থাকি, অপরের সুখ দুঃখের প্রতি কিছুমাত্র দৃষ্টিপাত না করি আমার হৃদয় স্বার্থপর হইয়া উঠিবে। কিন্তু আমি যদি নিজের বাহ্যিক সুথে অনাস্থাবান হইয়া পরের দুঃখে দুঃখিত হইয়া সেই দুঃখমােচনের চেষ্টা করি তাহা হইলে আমার অন্তঃকরণে পরপ্ৰেম ক্রমাগত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতে থাকিবে এবং এইরূপে জন্ম জন্মান্তর পর সেবা করিতে করিতে আমি প্রকৃত বিশ্বপ্রেমিক হইব। এই বিশ্বপ্রেম হইতে আত্মজ্ঞান জন্মিবে। কেহ কেহ বলিতে পারেন, পাপীর প্রতি ঘৃণা না করিলে পাপের প্রশ্রয় দেওয়া হইবে তাহাতে পাপের আরও বৃদ্ধি হইবে। যাহারা এরূপ কথা বলেন তাঁহাদের প্রতি বক্তব্য এই যে পাপের প্রতি বিদ্বেষ ও পাপীর প্রতি ঘৃণা এই দুইটী পৃথক। পাপের প্রতি ঘৃণা তামাদের সকলেরই অন্তঃকরণে থাকা কর্তব্য তাহা থাকিলে সাধারণ মানবের পাপ পথে পতিত হওয়া অতি সহজেই হইতে পারিবে কিন্তু পাপীর প্রতি ঘৃণা করিবে না। পাপী পিপ কেন করে ? অজ্ঞানতা- বশতঃ ও পূৰ্বপূৰ্ব জন্মৰ্জিত ষড়রিপুর প্রবলতা জন্য। কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ, মাৎসৰ্য, এই ষড়রিপু আমাদিগকে পাপে প্রবর্তিত করায় ; যাহারা এই রিপুগণকে দমন করিতে শিক্ষা করে নাই তাহারা উহাদের বশবর্তী হইয়া পাপাচরণ করে। আমরাও কোন না কোন পূর্বজন্মে কোন না কোন রিপুর বশবর্তী হইয়া পাপকাৰ্য্য করিয়াছি এই ভাবিয়া পাপীকে ঘৃণা করিবে না; যথাসাধ্য তাহাকে শোধরাইবার চেষ্টা করিবে। ইহাই ঈশ্বর ভক্তের কর্তব্য। তত্ত্বজ্ঞানীর পক্ষে যেমন অপর মানবের প্রতি ঘৃণা থাকে না সেইরূপ উহার শােক মোহ ও থাকে না ইহাই সপ্তম শ্লোকে বলা হইয়াছে। একমেবাদ্বিতীয়ং এই সর্বোচ্চ সত্য শিক্ষা দেওয়াই উপনিষদের মুখ্য উদ্দেশ্য। এই সত্যই নানাভাবে ভিন্ন ভিন্ন বাক্যে উপনিষদ ক্রমাগত শিক্ষা দিতেছেন। এই বিশ্বসংসারে এক ভিন্ন দ্বিতীয় বস্তু নাই; এই যে একমেবাদ্বিতীয়ং। অসংখ্য প্রকাশতঃ নানা বস্তু দেখিতেছি ইহা অজ্ঞানীর চক্ষে বিভিন্ন বােধ হইলেও ইহা পৃথক নহে; ইহা সকলই তিনি—সেই একই ক। তিনি সর্বভূতে ও সর্ব দ্রব্যে আছেন এবং সৰ্ব্বভূত ও সর্বদ্রব্য তাহাতে আছে। দ্বিতীয় পদার্থ বা ভূত বা শক্তি কিছুই নাই। সাধারণ মানবের এই ৩ ( ৪৪ ) একত্বজ্ঞান নাই; সে অনবরত আমি আমার লইয়াই ব্যস্ত। আপনাকে অপর হইতে পৃথক্ জ্ঞান করিয়া কেবল এই ভিন্নজীবের মােহ। বৈষয়িক উন্নতি ও ঐহিক সুখের জন্য লালায়িত। এইরূপ মানবের হৃদয় মায়াচ্ছন্ন। আমার সুখ, আমার ক্ষমতা, আমার অর্থ, আমার যশ কিসে হইবে এই বিষয়েই সে ব্যাপৃত। আমার স্ত্রী, আমার পুত্র, আমার কন্যা এইরূপ ভাবিয়া সে আপন পরিবারস্থ লােককে ভালবাসে অন্য ব্যক্তি পর তাহার সহিত আমার কোন সম্বন্ধ নাই এই ভাবিয়া অন্যের প্রতি অনাস্থাবান হয়। ইহাই মােহ। কতকগুলি প্রাণী অতীত কর্মসূত্রে আবদ্ধ থাকা প্রযুক্ত বর্তমান জীবনে এক পরিবার মধ্যে জন্মগ্রহণ করিয়া বা একস্থানে বাস করিয়া পরস্পরের প্রতি পরস্পরের কর্তব্য সম্পাদন করে বলিয়াই তাহারা আপনার ও অন্য ব্যক্তি পর এইরূপ মনে কঅত্যন্ত ভ্রম। যাহারা আমার সহিত কৰ্মসূত্রে গ্রথিত থাকায় আমার পরিবার ভুক্ত, তাহাদের প্রতি আমার কর্তব্য আছে সত্য, সে কৰ্তব্য আমার সম্পাদন করা কর্তব্য। পিতা মাতার সেবা করা একান্ত করণীয়, পুত্রাদির লালন পালন ও শিক্ষাদান আমার উচিৎ, কিন্তু আমার ইহাও জানা আবশ্যক যে এই সকল কাৰ্য্য দ্বারা আমি কেবল পূর্বজন্মকৃত ঋণ শােধ করিতেছি। যাহারা পূর্ব পূৰ্ব্ব জন্মে আমার হিতসাধন করিয়াছেন তাহার প্রতিদান আমাকে এজন্মে করিতে হইতেছে। এই সকল ঋণ শােধ কাৰ্যে একেবারে মুগ্ধ হইয়া মানবের অবশ্য করণীয় অপর কর্ম ত্যাগ সর্বতাে- ভাবে অবিধেয়। সমুদয় বিশ্বসংসার এবং সমগ্র জগতের কাৰ্য্য জন্য আমি জন্মগ্রহণ করিয়াছি সমস্ত বিশ্বের উন্নতি কল্পে আমার যথাসাধ্য যত্ন করা উচিত, ইহা ভুলিলে চলিবে না। পরিবারবর্গ বিশ্বের একাংশ মাত্র, এই ক্ষুদ্রাংশের প্রতি কায়মনােবাক্য সম্পূর্ণ সমর্থণ করিয়া অপর বৃহৎ বৃহৎ কর্তব্যে অবহেলা করাই মােহ। অপরকে দমন করিয়া অপরের ক্ষতি করিয়া কেবল স্বকীয় ধন, ক্ষমতা, যশ লইয়া বিব্রত থাকাই মােহ। যাহার আত্মজ্ঞান আছে তিনি জানেন স্ত্রী পুত্র কন্যা প্রভৃতি পরিবারবর্গ কেহই তাহার নহে। নিজ নিজ কর্মফল ভােগ জন্য আমার সংশ্রবে তাহারা আসিয়াছে, কর্ম শেষ হইলেই আমার মুখাপেক্ষা না করিয়াই চলিয়া যাইবে, কোন মতেই তাহাদের আমার নিকট রাখিতে পারিব না। অতএব কেন আমার আমার ভাবিয়া চিরজীবন মুগ্ধ থাকি। আমার স্ত্রী অথবা সন্তান বিমােগে আমি নিতান্ত শােকে অভিভূত হই কিন্তু ইহা ভাবি না যে উহার সময় হওয়াতেআমার সহিত যে কৰ্ম্মবন্ধ ছিল তাহা ( ৪৫ ) আপাতত সম্পন্ন হওয়াতে সে অপর ক্ষেত্রে কৰ্ম্ম-সাধন জন্য চলিয়া গেল, সুতরাং তজ্জন্য শােক করা বৃথা ও নিষ্প্রয়ােজন। আমারও যখন সময় আসিবে আমিও এই মর্ত্যদেশ ছাড়িয়া যাইব। তবে কেন বৃথা শােক করি। শােক মােহ হইতে উৎপন্ন হয় ; মােহ থাকিলে শােক হয় না। ইহলােক সুখের স্থান মনে করিয়া আমরা মরণকে ভয় করি, ইহাও আমরা মােহবশতই করি। অতএব যাহাতে সকল দুঃখের কারণ মােহ দূরীকরণ জন্য আত্মজ্ঞান লাভ হয় তাহা সৰ্ব্বতােভাবে চেষ্টা করা কর্তব্য। এক্ষণে কিরূপে সর্বভূতে ঈশ্বর দর্শন করিতে পারা যায় তাহা দেখা যাউক। পুনরুক্তি দোষ হইলেও পুনঃ পুনঃ এ বিষয় আলােচনা করা আবশ্যক। উপনিষদ যে সকল সত্য শিক্ষা দেন তাহা কেবল কর্ণে শুনিলে বা অর্থ বুঝিলে তাহার সম্যক উপলব্ধি হইল না। তাহার সম্যক ধারণা, হওয়া চাই—তাহা কাৰ্য্যে পৰ্য্যবসিত করা চাই। আমরা আসক্তির বশবর্তী হইয়া কায়মনবাক্য-দ্বারা যে সকল কর্ম করি তাহা উপনিষদ নিহিত সত্য দ্বারা চালিত যাহাতে হয় তাহা করা প্রয়ােজন। আমরা এ অবস্থায় উপনীত হইতে গেলে চেষ্টা ও অভ্যাস আবশ্যক। যাহার বেরূপ ভাবনা তাহার সিদ্ধিও সেইরূপ। কোন সত্যের সম্যক উপলব্ধি করিবার জন্য আমাদের শাস্ত্রকারগণ জপ করিতে বলেন। পুৰ্বেই বলা হইয়াছে উপনিষদের এক একটা শ্লোক বা শ্লোকাংশ মন্ত্র নামে অভিহিত হইয়াছে। এই মন্ত্র সকলের এক মনে ধ্যান করিতে করিতে মানবের হৃদয়ে উহা প্রােথিত হইবে এবং তাহার সমুদয় কৰ্ম্ম মন্ত্রাদিষ্ট পথ অবলম্বন করিবে। ইহাতে বহু আয়াস ও বহু কাল ব্যাপী অভ্যাসের প্রয়ােজন সত্য কিন্তু জীবনও অসীম। আমরা অনন্তকাল জন্মের পর জন্মগ্রহণ করিতেছি ও করিব, এ জীবনে যাহা আৰম্ভ করি তাহার কোন বৃহৎ কাৰ্য্যই এ জীবনে সম্পন্ন হয় না বা হইবার নহে। জন্ম জন্মান্তর চেষ্টা করিয়া ভবিষ্যত কোন জীবনে তাহা সিদ্ধ হইবেই হইবে; কেবল কায়মনােবাক্যে চেষ্টা করা চাই। এ উপনিষদ ভাণ্ডার হইতে একটা মন্ত্র যাহা ভাল লাগে তাহা লইয়া একমনে প্রত্যহ প্রাতঃকালে দৈনিক কাৰ্যারম্ভে পূর্বে অন্ততঃ কিছুক্ষণ জপ করিতে হইবে। এইরূপে ঐ মন্ত্রী অনেক দিন পর্যন্ত ধ্যান করার পর উহা হৃদয়ে গ্রথিত হইবে তখন অপর একটা লইয়া পুনরায় ঐরূপ জপ আরম্ভ করিবে। ইহাই ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভের একমাত্র উপায়। শােক মােহেয় হস্ত এড়াইতে হইলে এই পথাবলম্বন ভিন্ন অপর মার্গ নাই। নিয়ে শ্লোকে পুনরায় আত্মর বর্ণন হইয়াছে - ( ৪৬ ) ল পৰ্যগাচ্ছুমকায়মব্রণ মাবিরং শুদ্ধমপাপবিদ্ধ। কবিমনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভু যাথাতথ্যােেহথান ব্যদধা শাশ্বতীত্যঃ সমাভ্যঃ ॥৮|| সেই পরমাত্মা সৰ্বদিগ্ব্যাপী, তিনি জ্যোতিষ্মৎ, তিনি অকায়, তিনি অক্ষত, নির্মল, স্থূল শরীর বর্জিত, পাপ পুণ্য হীন, সৰ্ব্বদর্শী, মনের প্রভু, সর্বোপরি বিরাজমান এবং স্বয়ম্ভু। তিনি প্রজাপতিগণকে নিত্য যথাযুক্ত স্বকীয় কর্মে নিযুক্ত করিয়াছেন। তিনি সর্বব্যাপী ও সর্বস্থানেই আছেন। আকাশ যেরূপ সৰ্ব্বস্থানেই বিদ্যমান তিনিও সেইরূপ সৰ্ব্বস্থানেই ‘বিরাজ করিতেছেন। এরূপ স্থান বিশ্বসংসারে নাই যেখানে তিনি নাই। সকল বস্তু ও প্রাণী ও শক্তির সপৰ্য্যগাৎ। মধ্যে ও বাহিরে তিনি আছেন। সকল বস্তুই ও সকল প্রাণীই তাহাতে আছে ও তিনি সৰ্ব্বভূতে সৰ্ব্ব পদার্থে আছেন। তিনি শুক্র অর্থাৎ শুদ্ধ অত এক জ্যোতিষ্মৎ। সূৰ্য্য ও তারকা দি তাহা হইতেই জ্যোতিঃ প্রাপ্ত হইয়া বিশ্ব সংসারকে আলােকিত করিতেছে। তাহার দীপ্তিই উহাদিগকে দীপ্তিমান করিয়াছে সুতরাং তিনি স্বয়ং দীপ্তিমান। তিনি সর্ব জগতের শরীর স্রষ্টা; সৰ্ব্ব পদার্থের দেহ বিধান করিয়াছেন কিন্তু স্বয়ং অশরীরী। তিনি স্থূলদেহ বিবর্জিত। তিনি সর্বদেহের মধ্যে আছেন । সমুদয় স্থূল পদার্থের অন্তরে প্রবিষ্ট হইয়া বিরাজ করিতেছেন কিন্তু সেই স্থূল দেহ তঁাহার নহে। সৃষ্টিকালে তিনি স্থূল দেহাদি ধারণ করিয়া জগৎলীলা সম্পাদন করেন ; সৃষ্টি ও স্থিতির অন্তে প্রলয় কালে সেই স্থূলদেহ সম্বরণ করেন এবং সর্বভূত যাহা এক্ষণে পৃথক পৃথক দেহ লইয়া জগতে প্রকাশিত তাহা তাহাতে লীন হয়। সর্ব বিশ্বের স্থূলদেহ বিদেহী তাহাতে উপশমিত হয়। আমাদের যে দেহ চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করি তাহাই আমাদের সূল দেহ। এই দেহ অন্ন হইতে গঠিত এবং অন্ন দ্বারা বর্ধিত ও পরিক্ষিত এইজন্য ইহার অপর একটী নাম—অন্নময় কোষ। এই স্থূল দেহ সাধারণত রােগাক্রান্ত সুতরাং ক্ষতবিশিষ্ট। ইহাতে শিরা সকল বিদ্যমান; শির দ্বারা আমাদের শরীরে রক্ত চলাচল করিয়া অকায়।
( ৪৭ ) শরীর রক্ষা করিতেছে। অক্ষত ও শিরাহীন দেহ নাই। অতএব অক্ষত অবির এই দুই শব্দের দ্বারা ইহাই বলা হইল যে পরমাত্মার স্থূল দেহ নাই। কিন্তু ইহা মনে রাখা আবশ্যক যে যদিচ তাহার স্থূল দেহ নাই তিনি সকল স্থূলশরীরে বর্তমান আছেন। প্রকৃতপক্ষে স্থূল দেহ ময় সমগ্র জগৎ তাহারই দেহ কিন্তু ইহার সহিত তাহার অস্থায়ী সম্বন্ধ ইহা তাহার স্থায়ীভাব নহে, কিয়ৎকালের বিকার মাত্র। সৃষ্টির আরম্ভে তিনি বিশ্বরূপ ধারণ করিয়া জগতলীলা সম্পাদন করেন এবং প্রলয় কাল উপস্থিত হইলে এই সমগ্র বিশ্ব সংসার তাহাতেই উপশমিত হয় এসকল কিছুই থাকে না কেবল একমাত্র তিনিই থাকেন। তিনি শুদ্ধ, নিৰ্ম্মল অর্থাৎ অবিদ্যারূপ মলা তঁাহাতে নাই। অবিদ্যা অর্থে অজ্ঞানত ; ঈশ্বর জ্ঞানময় ; তিনি সর্বজ্ঞ এবং সকল জ্ঞানই তাহা হইতে আবির্ভূত অতএব তাহাতে অজ্ঞানতারূপ মল থাকিবে কিরূপে। শাস্ত্রে অনেক স্থলে জ্ঞান আলােকের সহিত তুলনা করা হইয়াছে এবং অজ্ঞানতাকে অন্ধকার বলা হইয়াছে। আলােক যেরূপ জীবকে পার্শ্ববর্তী দ্রব্যের স্বরূপ দর্শাইয়া দেয় এবং অন্ধকার জীবকে দেখিতে দেয় না তাহার চক্ষু আবৃত রাখে, জ্ঞানও সেইরূপ। জ্ঞানী মানব পাপ পুণ্য কৰ্তব্যাকৰ্তব্য স্পষ্টরূপে বুঝিতে পারেন অজ্ঞানী তাহা পারে না, সুতরাং জ্ঞান আলােক, অজ্ঞানতা অন্ধকার। সেইরূপ আবার জ্ঞান নিল অজ্ঞানতা মলাস্বরূপ। অজ্ঞানতাই মানবকে কুৎসিত কার্যে লিপ্ত করে তাহার মনের শুদ্ধত্ব ও পবিত্রতা নষ্ট করে। আমরা যে কিছু পাপ করি তাহা অবিদ্যার উত্তেজনায় ; যিনি পাপের কুফল বিশেষ- রূপে জ্ঞাত আছেন তিনি পাপকার্যে লিপ্ত হন না; যে ব্যক্তি উহা জানে না সেই পাপকর্ম করে। কেহ কেহ বলিতে পারেন যে অনেক ব্যক্তি এরূপ আছেন যাহারা মন্দকর্মের ফলাফল জ্ঞাত থাকিয়াও অনেক সময়ে পাপকাৰ্য্য করে। বাস্তব পক্ষে ইহাদের জ্ঞান প্রকৃত জ্ঞান নহে, উহা মৌখিক জ্ঞান। যে জ্ঞান কেবল কণ্ঠাগ্রে বিদ্যমান অথবা কর্ণাভ্যন্তবে মাত্র প্রবেশ করিয়াছে হৃদয়ে নিহিত হয় নাই, যাহা কাৰ্য্যে পৰ্য্যবশিত হয় নাই, যাহা মানবের ষড়রিপুকে বশীভূত করিয়া মানবকে চালিত করে না তাহা বাহ্যিক জ্ঞান, পদ্মপত্রে জলের ন্যায় তাহা মানব মনকে স্পর্শ করিয়াও তাহাতে সংযুক্ত হয় না। সে জ্ঞান তাহার নহে। নদীর পার্শ্ববর্তী গ্রাম স্পর্শ করিয়া নদীর জল অনবরত চলিতেছে, এই জল যতক্ষণ গ্রামবাসী উঠাইয়া লইয়া তাহাতে নিজ নিজ ক্ষেত্র সিঞ্চন না করে ততক্ষণ ঐ জল উহা হইতে গ্রামবাসীর কৃষিকার্য্যের কোন উন্নতি হইল না। তাহার নহে, ( ৪৮ ) যে জ্ঞান আমার কর্ণ বাহিয়া চলিয়া গেল, যাহা দ্বারা আমার কাম-ক্রোধ- লােভ-মােহ-মদ-মাৎসৰ্য্য-রূপ বালুকাময় হৃদয়-মরুভূমি সিঞ্চিত হইল না তাহাতে, আমার কি লাভ হইল ? কি প্রয়ােজন সাধিত হইল ? সে ধন আমার নহে তাহ পরের। পরমেশ্বর অপাপবিদ্ধ অর্থাৎ তিনি পাপ পুণ্য বর্জিত তিনি পাপ ও পুণ্যের অতীত; তাহাকে পাপ বা পুণ্য স্পর্শ করিতে পারে না। অপাপবিদ্ধ। তিনি উভয়ের অতীত। তিনি কবি অর্থাৎ সর্বদশী ; ভূত ভবিষ্যৎ বৰ্তমান কিছুই তাহার অজ্ঞাত নহে, তিনি মনীষী, মনের প্রভু। পরিভূ, সকল বস্তুর উপরে ও অন্তরে বিরাজ করিতেছেন। সয়—নিজেই আবির্ভূত হইয়াছেন, অপর কেহ তাহার কবি ইত্যাদি। ‘জন্ম হেতু নহে। তিনিই কৰ্ম্মফল বিধাতা সংখ্য প্রজাপতিগণকে যথাযুক্ত কাৰ্য্যে নিয়ােজিত করিয়াছেন। অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেহবিদ্যামুপাসতে। ততো ভূয় ইবতে তমাে য উবিদ্যায়াং রতাঃ ॥৯/ তন্যদেবাহু বিদ্যুয়াহদাহুরবিদ্যুয়া। ইতি শুক্রম ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে ॥১০ | বিদ্যাঞ্চাবিদ্যাঞ্চ যস্তদ্বেদোয়ং সহ। অবিছয়া মৃত্যু তীত্ব। বিদ্যমৃতমশ্নতে ॥১১৷৷ এই তিনটা শ্লোকের অর্থ স্পষ্টরূপে বুঝিতে গেলে, বিদ্যা অবিদ্যা ও অমৃত এই তিনটী শব্দের অর্থ বুঝা চাই। ইহার সম্যক্ আলােচনা এস্থলে সম্ভবপর নহে অতএব আমরা সংক্ষেপে এই তিনটী শব্দের অর্থ আলােচনা করিব। আত্মজ্ঞান লাভের তিনটী মার্গ আছে, যথা জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি। এই তিনটা মার্গ মধ্যে এক বা একাধিক মার্গের নিষ্কাম অনুসরণে আত্মজ্ঞান লাভ হয়। সকাম অনুসরণে আত্মজ্ঞান লাভ হয় না। যাহাদের হৃদয় বৈরাগ্যবান যাহারা ত্যাগী তাহারাই কেবল আত্মজ্ঞান লাভ করিতে সক্ষম, অপরে নহে। ইহা ঈশােপনিষদের প্রথম শ্লোকেই বিবৃত হইয়াছে। নিষ্কাম ভাব বা নৈফৰ্ম লাভ কিরূপে হইতে পারে তাহা দ্বিতীয় শ্লোকে উক্ত হইয়াছে। এক্ষণে এই তিনটা শ্লোকে সকাম জ্ঞান বা বিদ্যা ও সকাম কৰ্ম্ম বা অবিদ্যাতে কি ফল তাহাই বিবৃত হইতেছে।
( ৪৯ ) অবিদ্যা। ; অবিদ্যা শব্দ শাস্ত্রে নানা অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে কিন্তু বিশেষ বিবেচনা দ্বারা বুঝা যায় যে ঐ শব্দের সকল অর্থেরই মূল একই ও সকল অর্থেরই অন্তরে একই ভাব নিহিত, উহা আত্মজ্ঞানের অভাব। অবিদ্যা শব্দের প্রধান অর্থ মায়া বা মহামায়া। সৃষ্টির প্রাক্কালে এই জগৎ ও যাবতীয় জাগতিক পদার্থ কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। কেবলমাত্র এক বিশুদ্ধ, নিৰ্ম্মল, অচিন্তনীয়, অনির্বচনীয়, পরমাত্মা, পরমেশ্বর বিদ্যমান ছিলেন। তিনি জগৎ সৃষ্টির অভিপ্রায় করিলেন এক আমি বহুধা হইব, বহু আকার ধারণ করিয়া জগৎলীলা আরম্ভ করিব। তাহার এই অভিপ্রায় এই বাসনাই মহামায়া নামে শাস্ত্রে অভিহিত। এই বাসনা হইতেই সমস্ত জগং উখিত, ইহাতেই স্থিত ও ভবিষ্যতে ইহাতেই উপশমিত হইবে। মহামায়া বা অবিদ্যা জগৎ সৃষ্টি করিয়া পরমাত্মাকে জগৎ দ্বারা আবৃত করিলেন সুতরাং পরমাত্মা ইন্দ্রিয়ের অগােচর হইলেন এবং অস্থায়ী জগৎই স্থায়িরূপে প্রতিভাত হইল। অবিদ্যাই বিশ্বকে পরমাত্মা হইতে পৃথক বােধ করায় এজন্য ইহা ইমােময়। মহামায়ার মায়াজালে আবৃত হইয়া মানব বাহ্যিক বিশ্বসংসারই দেখিতে পায় উহার অন্তরস্থ পরমাত্মা পরমেশ্বরকে দেখিতে পায় না। এইরূপে মানবের মানস চক্ষু মায়াবদ্ধ থাকায় মানব কেবল জগতের বাহ্যিক আকারই দেখে এবং ঐ জগৎ স্থায়ী প্রকৃত ও সৎ বিবেচনায় জাগতিক ভােগেই মত্ত থাকে। এই ভােগ বাসনা মানুষকে ক্রমশঃ স্বকীয় পার্থিব উন্নতির জন্য সপরায়ণ করে ও পার্থিব সুখভােগ অভিভূত করে। ইহা মহামায়ারই কাৰ্য্য অতএব এই পার্থিব ভােগ বাসনা ও পারমার্থিক চিন্তা বিষয়ে অমনোেযােগিতাই অবিদ্যার দ্বিতীয় অর্থ। আমরা অবিদ্যা বা বিষয় বাসনা দ্বারা প্ররােচিত হইয়া যে সকল অজ্ঞানাত্মক কৰ্ম্ম করি তাহাও অবিদ্যা ; এই শ্লোকত্রয়ে অবিদ্যা এই অর্থেই ব্যবহৃত হইয়াছে। অর্থাৎ অবিদ্যা অর্থে কৰ্ম্ম যাহা মানবকে আত্মজ্ঞান হইতে বঞ্চিত করে এবং লােভ মােহ কায়া উত্তেজিত করাইয়া স্বকীয় স্বার্থ লাভে যত্ন পরবশ করায়। অতএব অবিদ্যার তৃতীয় অর্থ অজ্ঞানাত্মক কৰ্ম্ম। বিদ্যা অর্থে দেবতাজ্ঞান, উহা দেবপাসনার ফল। পরমাত্মা কর্তৃক নিয়ােজিত হইয়া দেবতাগণ পৃথক পৃথক্ বিশ্বপরিচালন কাৰ্য্য করিতেছেন। সেই কাৰ্য্যের জ্ঞান তাহাদের উপাসনা দ্বারা ঋষিগণ লাভ করিতেন। বিদ্যা। দেবতাগণ ঐশ্বরিক শক্তিমাত্র, তাঁহাদের উপাসনা দ্বারা আঁহাদেরই শক্তি ও কার্যের জ্ঞান উদ্ভূত হয়। ঐ জ্ঞান জাগতিক জ্ঞান, উহা ( ৫৩ ) আত্মজ্ঞান হইতে পৃথক। ঈশােপনিষদে দেবতাজ্ঞান বিদ্যা নামে অভিহিত হইয়াছে ও আত্মজ্ঞান জ্ঞান নামে আখ্যাত হইয়াছে। দেবতাজ্ঞান সকাম উহা হইতে মানব নিজ মঙ্গল ও নানাবিধ উন্নত প্রাপ্তির চেষ্টা করে। উহ আত্মজ্ঞান হইতে নিকৃষ্ট ফল প্রদান করে। বেদে নানাবিধ দেবতার বহুতর স্তুতিগান আছে ইহাতে প্রমাণ হইতেছে যে বেদ দেবােপাননার উপদেশ দিয়েছেন, কিন্তু উহ সাধারণ মানবের পক্ষে। বেদের মন্ত্রগুলি দেবতাগণকে সন্তুষ্ট করিয়া মানবের স্বার্থ লাভের উপায় প্রদর্শন করিতেছে কিন্তু জ্ঞানীর চক্ষে বেদ আত্মজ্ঞানের সােপান ; উহা প্রকৃত পক্ষে জ্ঞানমার্গাবলম্বীকে আত্মজ্ঞান ও সাধারণ মানবকে দেবব্যপাসনা শিক্ষা দিয়া ভক্তিমার্গ অনুসরণ করিতে শিক্ষা দিতেছে। জ্ঞানী দেবতাস্তুতির মধ্যে পরব্রহ্মের স্তুতি দর্শন করেন; কারণ দেবতাগণ পরব্রহ্মেরই অংশ, তাহারা তাহারই দ্বারা নিয়ােজিত হইয়া তাহারই কাৰ্য্য করিতেছেন। সকাম দেবব্যপাসনা এবং উহা হইতে লব্ধ সকাম দেবতা জ্ঞানই বিদ্যা। যে জ্ঞানদ্বারা মানব স্বকীয় উন্নতি লাভের চেষ্টা করে তাহাই দেবতাজ্ঞান তাহাই বিদ্যা। দেবতাজ্ঞান ব্ৰহ্মজ্ঞান অপেক্ষা নিকৃষ্ট হইলেও উহা সাধারণ মানব পক্ষে একান্ত প্রয়োজনীয় ; যিনি ব্রহ্মজ্ঞানের অনুপযােগী তাহার পক্ষে দেবতাজ্ঞান বিধেয়। সকাম দেবতাজ্ঞান অপেক্ষা আত্মজ্ঞান অধিকতর শ্রেষ্ঠ। এস্থলে অমৃত শব্দে মুক্তি বা নিৰ্বাণ নহে কেবল অমরত্ব যাহা দেবতাগণ প্রাপ্ত হন। মুক্তি কেবল আত্মজ্ঞান হইতে হয় কিন্তু দেবতা উপাসনা ও দেবতা জ্ঞান দ্বারা কেবল দেবভাব প্রাপ্ত হওয়া যায়। ভগবান মুক্তি। শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমৎভগবদগীতার নবম অধ্যায়ের পঞ্চবিংশতি শ্লোকে কহিয়াছেন, যে বাঁহার পিতৃগণের উপাসনা করেন তাহারা পিতৃ লােকে গমন করেন ও যাহারা দেবতার অর্চনা করেন তাহারা দেবত্ব লাভ করেন এবং যাহারা আমার উপাসনা করেন তাহারা আমাকে প্রাপ্ত হন। অতএব দেবতাজ্ঞান বা দেবব্যপাসনা হইতে মুক্তি হয় না কেবল দেবলােকে গমন করা যায়। দেবলােকই এস্থলে অমৃত। যাহারা কেবল অবিদ্যার উপাসনা করে তাহারা গাঢ় অন্ধকারে প্রবেশ করে। যাহারা কেবল বিদ্যার উপাসনা করে তাহারা আরও অধিকতর অন্ধকারে প্রবেশ করে। অর্থাৎ যাহারা কেবল কাম্যকর্মের অবিদ্যা সেবার ফল। অনুষ্ঠান করে তাহারা স্বার্থপর হয়। যেমন কোন ব্যক্তি কেবল ধন, ক্ষমতা, যশ লাভের চেষ্টা করে এবং ঐ চেষ্টা কেবল স্বকীয় সাংসারিক সুখের জন্ধই করে তাহারা ঐরূপ কর্মকরণ ফলে নিতান্ত স্বার্থের বশীভূত ( ৫ ) হয় এইরূপ লােক অতি শীঘ্রই পাপকাৰ্য্যে রত হইয়া থাকে। পাপাচারণই অবিদ্যার ফল। অতএব তাহারা ইহ জীবনে অজ্ঞানান্ধকারে অভিভূত হয় এবং পরকালে অন্ধকারময় নিরানন্দ অসুরলােকে গমন করে। সেইরূপ আবার যাহারা কেবল বিদ্যানুশীলন করে, অর্থাৎ কাম্যকৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া কেবল ইন্দ্র বরুণাদি দেবতার প্রাকৃতিক কার্য সম্পাদনের জ্ঞান চর্চা করে তাহারাও আত্মজ্ঞান রূপ আলােক হইতে বঞ্চিত হইয়া অন্ধকারে কেবল বিদ্যাচর্চার ফল। প্রবেশ করে। দেবতাজ্ঞান সকাম জ্ঞান কারণ উহা হইতে পার্থিব ফল লাভ হয়। অতএব ঐ জ্ঞান শ্রেয়তর নহে। বিদ্যানুশীলন করিয়া মন আত্মজ্ঞান বিরহিত হইয়া অজ্ঞানতারূপ পাপে পতিত হয়। এরূপ ব্যক্তির মন প্রকৃত জ্ঞান হইতে দূরে অবস্থিতি করে ও উক্ত জ্ঞানের অবহেলা করে ইহারা কেবল পার্থিব বিষয়েই লিপ্ত থাকে ইহাদেয় হৃদয় আত্মজ্ঞানের দিকে আকর্ষিত হয় না। ইহারাও ভূবলোক বা পিলােকের নিরানন্দ ও অন্ধকার অংশে স্বার্থপরায়ণ মানবের গম্যস্থানে যায়। ইউরােপীয় আধুনিক নাস্তিক জড়বাদী বৈজ্ঞানিকগণ জাগতিক শক্তিসমুচয়ের আলােচনা দ্বারা ঈশ্বরে অবিশ্বাসী হইয়াছেন। ইহারাও এই শ্রেণীর লােক। বিদ্যার উপাসনা, দেবতাজ্ঞান ভিন্ন অপর জ্ঞান নাই এই বিশ্বাস হৃদয়ে নিহিত করিয়া, মানবকে আত্মজ্ঞান হইতে দূরে অপসারিত করে। উহার ফল কেবল বাহ্যিক জ্ঞান ও তজ্জন্য আত্মম্ভরিতা ও পার্থিব বিষয়ে আসক্তি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় ও শুভকৰ্ম্ম করণে অবহেলা হয়। নবম শ্লোকের অর্থ এই যে বিদ্যা ও অবিদ্যা এই দুইটীর ফল এক নহে । উহা পৃথক শাস্ত্রজ্ঞগণ এই কথা বলিয়াছেন। একের ফল পাপাচরণ অপরের ফল বিষয়াসক্তি এই উভয় ফল বিভিন্ন হইলেও মানবের মনকে অজ্ঞানান্ধকারে অভিভূত করে। নবম শ্লোকে উক্ত হইয়াছে যে অবিদ্যার উপাসক ও বিদ্যার উপাসক উভয়েই অন্ধকারে পতিত হয় অর্থাৎ আত্মজ্ঞান প্রাপ্ত হয় না। দশম শ্লোকে বলা হইয়াছে এই দুই উপাসনার ফল পৃথক অর্থাৎ অবিদ্যার ফল পাপাচরণ ও বিদ্যায় ফল বিষয়াসক্তি ও আত্মজ্ঞানের অভাব। একাদশ শ্লোকে বলা হইয়াছে উভয়ের একত্র আচরণে দেবলোেক প্রাপ্তি হয়। মানব মৃত্যুর পর প্রথমতঃ পিতৃলােকে গমন করে, যাহারা পাপী তাহারা অধিক সময় ঐ লােকের অন্ধকারময় নিরানন্দ স্থানে অধিক দিন বাস করে, তৎপরে পিতৃ- লােকের উৎকৃষ্ট অংশের ও দেবলােকের মধ্য দিয়া নিদ্রিত অবস্থায় গমনান্তর পুনশ্চ জীবাকারে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। যাহারা পুণ্যাত্মা তাঁহার পিতৃলােকের নিম অংশ নিদ্রিত অবস্থায় গমনায় পিতৃলােকের বর্জী অংশে ও দেলােকে বহুদিন কাটাইয়া পুনশ্চ পৃথিবীতে আগমন করেন। এই দেবলােকে বাসই অমরত্ব লাভ। বিদ্যা ও অবিদ্যা এই দুইএর একত্র উপাসনায় এই দেবলােকে বাস বা অমরত্ব লাভ হয়। বেদে ও অপরাপর শাস্ত্রে সাধারণ মানব পক্ষে দেবােপাসনা ও শুভকর্মের বিধান আছে। যাহারা দেবােপাসনা করেন তাহারা পাপকাৰ্য করিতে পারেন না; যাঁহার শুভকর্মে প্রবৃত্ত হন তাহাদের দেবব্যপাসনার প্রবৃত্তি অধিকতর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় অতএব এই দুই কাৰ্যে মানবকে উত্তরােত্তর পবিত্র মার্গে লইয়া সকাম শুভকর্মাবলম্বী করায়। উহার ফল অমরত্ব। অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেইস্যুতিমুপাসতে। ততে ভূয় ইবতে তমাে য উ সভৃত্যাং রতাঃ ॥১২৷ অন্যদেবাহুঃ সম্ভবাদন্যদাহুরসম্ভবৎ। ইতি শুশ্রম ধীরাথাং যেনস্তচিচক্ষিরে ॥১৩৷ সতিঞ্চ বিনাশঞ্চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ। বিনাশেন মৃত্যুং তীত্বা সত্যামৃতমতে ॥১৪৷ যাহারা প্রকৃতির উপাসনা করে তাহারা অন্ধ তমসায় প্রবেশ করে যাহারা হিরণ্য গর্ভাদির উপাসনা করে তাহারা অধিকতর অন্ধকারে প্রবেশ করে। সম্ভতি উপাসনার ফল পৃথক ও অসম্ভতি উপাসনার ফল পৃথক ইহা ঐ পণ্ডিতগণের প্রমুখাৎ শুনিয়াছি যাহারা ঐ তত্ব আমাদের নিকট ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যিনি জানেন উভয়ের একত্র উপাসনা কর্তব্য তিনি সম্ভতি দ্বারা বিশ অতিক্রম অসন্ত তি দ্বারা অমৃত ভােগ করেন। নবম হইতে একাদশ তিনটী শ্লোকে সকাম জ্ঞান ও সকাম কৰ্ম্মের কথা বলা হইয়াছে এক্ষণে সকাম ভক্তির ফলাফল বিবৃত হইতেছে। সকাম জ্ঞান ও সকাম কৰ্ম্মে যেন মুক্তিলাভ বা আত্মজ্ঞান হয় না সেইরূপ সকাম ভক্তিতেও আত্মজ্ঞান হয় না উহা কেবল মানবকে দেবােলােকে লইয়া যাইতে পারে ইহাই এই তিনটী শ্লোকের উপদেশ । অসম্ভতি অর্থে যাহার সম্ভ,তি বা জন্ম হয় নাই উহাকে মুলপ্রকৃতি ও বলা যায়। ইহাই অবিদ্যা বা মহামায়া। ইহা সৃষ্টির প্রাক্কাল হইতে অবস্থিত এবং কল্পান্তস্থায়ী। সৃষ্টির বাসনা পরমেশ্বরের হৃদয়ে সর্বদাই বিদ্যমান এবং ইহা হইতেই সৃষ্টি হইতেছে এজন্য ইনি সৃষ্টির অধীন নহেন অতএব ইহাকে জন্ম অসতি। রহিত বলা হইয়াছে। মানব হৃদয়ে যে কিছু বাসনার উদয় হয় তাহার সমস্ত বীজ প্রকৃতিতে নিহিত এবং তাহা হইতে উত্থিত হয় ; প্রকৃতিই বাসনার কারণ এবং বাসমা দ্বারা উত্তেজিত হইয়া আনব যে সকল পাপাচরণ করে তাহা অবিদ্যা বা প্রকৃতি জনিত। অতএব প্রকৃতির উপাসনায় মানব শুভফল প্রাপ্ত হয় না ঐ উপাসনায় কেবল অশুভ কাম্য কৰ্ম্মানুষ্ঠানে নিয়োজিত হয়। মনে কর অর্থলাভের বাসনা আমার হৃদয়ে আছে আমি সেই বাসনা চরিতার্থ জন্য যে পূজা বা আরাধনা করি তাহাই প্রকৃতির আরাধনা এবং প্রকৃতি সেই আরাধনার ফল আমাকে প্রদান করেন। সুতরাং আমি ক্রমাগত ধনােপাৰ্জন করিতে লাগিলাম কিন্তু সেই সঙ্গে নিষ্কাম দেবব্যপাসনা না করিয়া হৃদয় নিৰ্ম্মল না হইয়া বরঞ্চ ক্রমাগত অসদুপায়ে ধন লাভের ইচ্ছা বলবতী হইয়া কুপথ অবলম্বনে আমাকে প্রবৃত্ত করিতে লাগিল। সুতরাং অজ্ঞানাত্মক অন্ধকারে উত্তরােত্তর পতিত হইতে লাগিলাম। ইহাই প্রকৃতির পৃথক উপাসনার ফল। সন্তুতি অর্থে যাহার জন্ম হইয়াছে। সৃষ্টির প্রথমে পরমাত্মা পরমেশ্বর হিরণ্য- গর্ভকে সৃষ্টি করিলেন। তিনিই কাৰ্য ব্ৰহ্ম তিনিই সৃষ্টির কাৰ্য্য আরম্ভ করেন তৎপরে দেবতাগণ সৃষ্ট হইয়া তাহার সংযােগে বিশ্ব সম্ভুতি। জগতের ক্রমােব কার্য সম্পাদিত করিতে লাগিলেন। এই হিরণ্যগর্ভাদি দেবগণই সস্তৃতি নামে এস্থলে আখ্যাত হইতেছেন। হিরণ্য- গর্ভের উপাসনায় অনিমাদি ঐশ্বৰ্য্য প্রাপ্তি হয়। ঐ সকল ঐশ্বৰ্য্য সিদ্ধি নামেও অভিহিত হইয়া থাকে উহা কতকগুলি অমানুষিক ক্ষমতা। প্রকৃত পক্ষে উহা অমানুষিক নহে তবে বর্তমান সময়ে তাহা সাধারণ মানবের নাই। ঐশ্বৰ্য্য ৮ প্রকার (১) অনিমা, পরমাণুর ন্যায় সূক্ষ্ম হইতে সমর্থ হওন (২) লঘিমাতুলার মত লঘুত্ব প্রাপ্তির ক্ষমতা (৩) প্রাপ্তি-দূরস্থিত দ্রব্যাদি পাইবার ক্ষমতা ; (৪) কাম্য-স্বেচ্ছামত কাম্য পদার্থ প্রাপ্তির ক্ষমতা (৫) মহিমা-পৰ্বতাদির ন্যায় বৃহত্ব লাভের ক্ষমতা ; (৬) ঈশিত্ব-সকলকে শাসন করিবার ক্ষমতা, (৭) বশিত্ব—সকলকে বশে রাখিবার শক্তি (8) কামাবসায়িত অপ্রতিবন্ধ ইচ্ছা শক্তি প্রাপ্তি। এক্ষণে অনায়াসেই বােধগম্য হইবে যে কেবল প্রকৃতির উপাসনা দ্বারা বাসনার বুদ্ধি প্রাপ্ত হইবে এবং কেবল হিরণ্যগর্ভাদির উপাসনা দ্বারা অষ্টবিধ ঐশ্বৰ্য্য লাভ হইয়া স্বার্থ সাধনের পথ সুগম হইবে। অতএব এই দুই উপাসনাই সকাম ভক্তি প্রস্ত; ঐ উপাসনাদ্বয়ের ফল পৃথক হইলে উহা উভয়ে স্বার্থপরতায় অর্থাৎ অদর্শনাত্মক অন্ধকারে লইয়া যাইবে। এজন্য এই উভয়ের পৃথক উপাসনা বর্জনীয়। উভয় উপাসনার একত্র অনুসরণ দ্বারা প্রকৃতি ও হিরণগর্ভের একত্ব জ্ঞান লাভ হইবে; এবং তদ্বারা স্বার্থপরতার নাশ হইয়া দেবলােকে গমন করিতে পারিবে বা ।
( ৫৪ ) অমত্ব লাভ করিবে। যদিচ ঐ পথ আত্মজ্ঞানান্বেষীর পক্ষে অবিধেয় সাধারণ মানবের পক্ষে উহা শুভকর উহা তাহাকে দেবপােক বা স্বর্গে উত্তোলন করিবে। উপরােক্ত ছয়টা শ্লোকে প্রবৃত্তি মার্গের ফলাফলের কথা উক্ত হইয়াছে এক্ষণে নিবৃক্তিমার্গ উদঘাটন জন্য ব্রহ্মকে সম্বোধন করা হইতেছে। হিরন্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখং। তৎং পূষন্নপাৰ্বণু সত্যধৰ্ম্মায় দৃষ্টয়ে। ১৫। সুবর্ণময় বা জ্যোতির্ময় পাত্র দ্বারা ব্রহ্মের প্রাপ্তিমার্গ আবৃত হে জগৎ পােষক ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভের জন্য ঐ আবরণ উন্মােচন কর। প্রবৃত্তি মার্গে আত্মজ্ঞান লাভ হয় না, অতএব উপাসক এক্ষণে নিবৃত্তি মার্গ অনুসরণ জন্য ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিতেছেন। হিরণয় পাত্রের অর্থে ধনলোভরূপ আবরণ দ্বারা, বিষয় বাসনা দ্বারা, ব্রহ্মজ্ঞান আবৃত হে জগৎপোষক! হে পরব্রহ্ম তাহা অপসারিত কর আমরা তােমার সত্যরূপ অবলােকন করি। বিষয় ভােগ লালসায় আমরা হিরন্ময় পাত্র। ব্রহ্মজ্ঞানে বঞ্চিত, উহা আমাদের হৃদয় হইতে দূরীকরণ দ্বারা হে পরমেশ্বর ব্রহ্মজ্ঞান লাভের মার্গ উদঘাটন কর। ইহার অপর অর্থ এই যে এই বিশ্বসংসারকে আমরা যেভাবে দেখি তাহাতে ইহা আত্মজ্ঞানকে আবৃত রাখে। অর্থাৎ বিশ্বসংসারকে ঈশ্বর হইতে পৃথক ভাবিয়া ইহাকেই পরম বস্তু জ্ঞান করিলে উহা আত্মজ্ঞানের আবরণ স্বরূপ হয়। এই বিশ্বসংসার সূর্যের জ্যোতির্ময় রশ্মি সংযােগে আমরা দেখিতে পাই সূর্যের রশ্মি ইহাতে পতিত হইয়া ইহাকে দীপ্তিমান কয়িয়াছে, ইহাই জ্যোতির্ময় আবরণ। এই সংসাররূপ আবরণ উন্মােচন কৰিলেই আত্মজ্ঞান লাভ হইবে। এই উভয় অর্থেরই মূলে সে একভাব প্রাপ্ত হওয়া যায় ; বিষয় বাসনা অপসারিত হইলে প্রবৃত্তি মার্গ ত্যাগ করিয়া নিবৃত্তিমার্গ অবলম্বন দ্বারাই ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ হয়। পূষম্নেকর্ষে যম সূৰ্য্য প্রাজাপত্য বৃহ রশ্মী সমূহ তেজো, যত্নে রূপং কল্যাণমং তত্তে পশ্যামি, যােহসাবসৌ পুরুষঃ সােহহমশ্মি । ১৬। হে জগৎ পোষণকারী হে একাকী গমনশীল হে সৰ্বসংমকারি প্রজাপতিতনয় সুৰ্য তােমার তেজ সম্বরণ কর তোমার কল্যাণতম রূপ দর্শন করি। আমিই এই সূমণ্ডলস্থ পুরুষ। ;
( ৫৫ ) পূষণ অর্থে সূর্য-যিনি জগতের পােষণ করেন। পূষণ শব্দ দুই অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। পঞ্চদশ শ্লোকে এই শব্দ পরমাত্মা ও সূৰ্য্য এই দুই অর্থই বুঝা যায় এই শ্লোকে ইহার সূৰ্য্য অর্থ লইয়াই ভাষ্যকারগণ পুষ। ব্যাখ্যা করিয়াছেন অতএব আমরাও সেই অর্থ এখানে ব্যবহার করিলাম। পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকদিগের মতে সূৰ্য্যই সৌরজগতের প্রাণ স্বরূপ উহাই সৌর- জগতের সর্বশক্তির আধার। এই জগৎ, তাপ, আলােক, তড়িৎ প্রভৃতি শক্তির দ্বারা চালিত সেই সকল শক্তিই সূৰ্য্যমণ্ডল হইতে সৌরজগৎ প্রাপ্ত হইতেছে। এমন কি যে শক্তির বলে আমাদের প্রাণ ধারণের কার্য সম্পাদন হইতেছে সে সমস্তই আমরা সূৰ্য্য হইতে প্রাপ্ত হইতেছি। সূৰ্য না থাকিলে এজগতের অস্তিত্বই থাকিত না। এজন্য প্রাচীন শাস্ত্রকারগণ ও সূৰ্য্যকে জগৎ পোষক নামে অভিহিত করিয়াছেন। একষে তিনি একাকী গমন করিতেছেন; পৃথিবীর পােষণ কাৰ্য্য তিনি একাই করিতেছেন। যম—সৰ্বসংযমকারী, সকল শক্তির দান বা সংহার তিনিই করেন। সূৰ্য্যরশগ্রহণকারী প্রজাপতিতনয়। সূৰ্য্যই নিজ রশ্মি ও তেজ বিস্তার করিয়া আমাদের চক্ষে ধাধ। লাগাইয়া আমাদের নিকট অসৎ বস্তু জগৎ প্রকাশ করিতেছেন এবং সেই জগতের বাহরূপ প্রকাশ দ্বারাই জগতের প্রকৃত ব্রহ্মরূপ আবৃত রাখিয়াছেন। অতএব সূর্যের নিকট প্রার্থনা হইতেছে যে হে সূৰ্য্য তােমার রশ্মি সম্বরণ কর যাহাতে আমি তােমার কল্যাণতম রূপ দেখিতে পাই। জগৎ সংসার আমার চক্ষু হইতে পরমাত্মার মঙ্গলময় মূর্তি আবৃত করিয়াছে। তােমার রশ্মি সংষত কর যে আমি সংসার সম্বন্ধে অন্ধ হই এবং সূর্যমণ্ডলস্থ আদিত্য পুরুষকে দেখিতে পাই। আমিই সেই পুরুষ এই জ্ঞান আমার যেন হয় । বায়ুরনিমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরং ও দ্রুততা স্মর কৃতং স্মৰ ক্ৰতাে স্মর কৃতং স্মর॥১৭। এক্ষণে আমার মৃত্যুকাল উপস্থিত ; আমার প্রাণ বায়ু অমৃতময় মহাবায়ুতে মিশ্রিত হউক; আমার দেহ ভস্মীভূত হউক। হে মন নিজ কৃত কৰ্ম্ম স্মরণ কর ও ; কর্তব্য স্মরণ কর। আত্মজ্ঞান প্রভৃতির চর্চা করিয়া উপাসক মৃত্যুকালে কি করিবেন তাহাই এই শ্লোকে বলা হইতেছে। আমাদের শরীরাভ্যন্তরে যেরূপ সমুদয় দেহব্যাপী প্রাণ বায়ু ( ৫৬ ) আছে সেইরূপ শরীরের বাহিরে জগৎব্যাপী প্ৰাণবায়ু আছে। জীব এই অনন্ত প্রাণবায়ু হইতে নিজ প্রাণ বায়ু জীবদ্দশায় ক্রমাগত আকর্ষণ করে তাহা হইতেই জীবন ধারণ করিতে সক্ষম হয়। মনে কর যেন আমরা জীবন সমুদ্রে ভাসিতেছি এবং জীবন সমুদ্রের জল আমাদের শরীরের প্রত্যেক কণাকে অনুপ্রাণিত করিয়া আমাদিগকে জীবিত রাখিয়াছে ইহাই প্রাণময় কোষ কিন্তু ইহা কোষের খায় দেহকে আবৃত রাখে নাই ; ইহা প্রত্যেক জীবানুর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া উহাকে জীবিত রাখিতেছে। আমাদের শরীরের কোন অংশ ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া অকর্মণ্য হইলে বুঝিতে হইবে উহা হইতে প্রাণবায়ু বহির্গত হইয়া গিয়াছে। প্ৰাণবায়ু জীবদেহ হইতে একেবারে বহির্গত হইলে জীবের মৃত্যু হয়। উক্ত প্রাণবায়ু নষ্ট বা ধ্বংস হয় না উহা জাগতিক প্রাণ বায়ুতে মিলিত হয়। তাহাই এস্থলে উক্ত হইতেছে আমার প্রাণ অমৃত অর্থাৎ কল্পান্তস্থায়ী প্রাণ বায়ুতে মিশ্রিত হউক। বায়ুতে মিশ্রিত হউক। আমার দেহ ভস্মীভূত হউক। হে মন এই সময়ে তুমি পরমাত্মা পরমেশ্বর (ও) স্মরণ কর এবং নিজকৃত কর্ম ও স্মরণ কর। অন্তকালে ঈশ্বর স্মরণ করিতে করিতে দেহত্যাগ করিতে পারিলে মুক্তি হয় এবং সেই সময়ে নিজকৃত কৰ্ম্ম স্মরণ করিতে মৃত্যুকালে কর্তব্য। পারিলে তাহার শুভাশুভ ফলের বিষয় চিন্তা করিতে সমর্থ হইলে পরজন্মে অশুভ কৰ্ম্মের প্রতি বিরক্তি উদ্ভব হইবে। অতএব ঐ সময়ে এই দুইটী বিষয়ই স্মরণ করা কর্তব্য। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদগীতায় অষ্টম অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকে বলিতেছেন :- যিনি অন্তকালে আমাকে স্মরণ করিতে করিতে দেহত্যাগ করিবেন তিনি আমাকে প্রাপ্ত হইবেন ইহাতে কোন সংশয় নাই। অতএব মৃত্যুকালে যাহাতে ঈশ্বর স্মরণ হয় তাহা করা অতীব বিধেয়, কিন্তু যাহারা জীবদ্দশায় জীবনের কর্তব্য সাধন করিবার সময় সদাসর্বদা পরমেশ্বরের স্মরণ করে নাই, যাহারা সংসারের কর্মক্ষেত্রে ও ভােগ বিষয়ে লিপ্ত থাকিয়া পরমেশ্বরের উপাসনা হইতে বিরত থাকে এরূপ ব্যক্তির পক্ষে অন্তিম কালে ঈশ্বরকে ভক্তির সহিত স্মরণ করা ও তাহার চরণে মন প্রাণ সমর্পণ করা অতীব দুঃসাধ্য। এজন্য শ্রীকৃষ্ণ গীতার অষ্টম অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে বলিতেছেন আমাকে সদাসর্বদা স্মরণ করিবে। সংসার রূপ কর্মক্ষেত্রে সতত নিযুক্ত থাকিয়াও পরমাত্মাকে অহরহঃ ভক্তির সহিত চিন্তা করিবে এবং এইরূপ আজীবন করিলে তবে মরণ সময়ে ঈশ্বর স্মরণ অনায়াস সাধ্য হইবে। নতুবা প্রাণত্যা কালে কেবল নিজ সংসারের ( ৫৭ ) মুখদুঃখ ও স্ত্রী পুত্রের ভাবনা ভাবিতেই কলেবর ত্যাগ করিবে; সুতরাং তােমাকে নিজ পাপপুণ্য ফল ভােগ জন্য কিয়ৎকাল ভুবলোক ও স্বর্গলােকে থাকিয়া পুনরায় জরামরণ দুঃখাক্রান্ত এই মর্তলোকে আগমন করিতে হইবে। আগ্রহের সহিত উপরােক্ত প্রার্থনা করা হইতেছে এজন্য পুনরুক্তি করা হইয়াছে, উহা আগ্রহের লক্ষণ। অগ্নে নয় সুপথা রায়ে অস্মা বিশ্বানি দেব বয়ুনানি বিদ্বান্। যুযযাধ্যস্মৰ্জ্জুহুরাণমেনন, ভূষিষ্ঠাং তে নমউক্তিং বিধেম ॥১৮ হে অগ্নি! কৰ্ম্মফলভােগ জন্য আমাদিগকে সুপথে লইয়া যাও ; হে দেব তুমি আমাদের কর্ম জ্ঞাত আছে, আমাদের মন মধ্যে যে প্রবঞ্চনাত্মক পাপ আছে তাহা ধ্বংস কর আমরা পুনঃপুনঃ তােমাকে নমস্কার করিতেছি বা তােমার ভূরিভূরি স্তুতিগান করিতেছি। উপাসক এ পর্যন্ত আত্মজ্ঞান লাভে সমর্থ হন নাই, এক্ষণে মৃত্যুকাল উপস্থিত সুতরাং অগ্নির নিকট প্রার্থনা করিতেছেন যেন ভূবলেক ও স্বর্গলােকের মধ্যে সুগম পথ দ্বারা তাহাকে গন্তব্য পথে লইয়া যাওয়া হয়। উপাসক মৃত্যুকালে পরমাত্মার স্মরণ করিতে না পারিয়া অগ্নির স্তুতি করিতেছেন। তিনি ব্রহ্মলােকে গমন করিতে অসমর্থ সুতরাং তাহাকে পিতৃলােক বা ভূবলোক ও স্বর্গলােকের মধ্য দিয়া পুনরায় মত্তলােকে আগমন করিতে হইবে। পাপ পুণ্যানুযায়ী তাঁহাকে অল্পাধিক কাল ঐ দুইলােকে বাস করিতে হইবে। যাহার পাপ কৰ্ম্ম অধিক তাঁহাকে অধিকদিন ভুবলােকে ও স্বল্পকাল স্বর্গলােকেও যাহার পুণ্যকর্ম অধিক তিনি অধিককাল স্বর্গলােকে বাস করিয়া পৃথিবীতে অনুরক্তি বশতঃ পুনশ্চ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিবেন। ঐ গমনাগমনের জন্য তাহাকে সুগম পথ দ্বারা লইয়া যাইবার জন্য অগ্নির নিকট প্রার্থনা করা হইতেছে। অগ্নিই পৃথিবীতে ব্ৰহ্মতেজের প্রতিনিধি তিনি আমাদের পাপপুণ্য সমুদয় বিদিত আছেন। তাভ কম্মের ফল আমাদিগকে ভােগ করিতেই হইবে কেহ রক্ষা করিতে পারিবে না; অগ্নি কেবল আমাদিগকে সুখ গম্য মার্গ দিয়া লইয়া যাইতে পারেন । এবং তিনি আমাদের হৃদয় হইতে পাপের বীজ নষ্ট করিতে পারেন । তিনি তার করুন ইহা উপাসক প্রার্থনা করিতেছেন। এবং তজ্জন্য পুনঃপুনঃ অখিকে নমস্কার করিতেছেন।
( ৫৮ }
ও পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুচ্যতে।
পূর্ণ পূর্ণমালায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।
ও শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তি।
হরি ও
ঈশােপনিষদ শেষ হইল। পরব্রহ্মের স্মরণান্তর শান্তি প্রার্থনা হইতেছে
সমাধ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.