Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Roosiar Itihas
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সিয়ার ইতিহাস
শ্রীরাজকৃষ্ণ রায় প্রণীত
[ পরিশিষ্ট সমেত )
কলিকাতা,
৯৭ নং কলেজ স্ট্রীট, বেঙ্গল মেডিক্যাল লাইব্রেরী হইতে
শ্রীগুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত
৩৭ নং মেছুয়াবাজার স্ক্রীট,-বীণাযন্ত্রে
শ্রীশরচ্চন্দ্র দেব দ্বারা মুদ্রিত।
২৫ এ অাষাঢ়, ১২৯২
No text on this page.
ৰুসিয়ার ইতিহাস। প্রথম অধ্যায় রুসিয়ার বিবরণ। । তুরস্ক দেশের ন্যায় 'রুস সাম্রাজ্য কিয়দংশে ইউরােপে এবং কিয়দংশে এসিয়াতে স্থিত। এসিয়ার সমস্ত উত্তর ভাগ রুসিয়ার অধীন। বিভিন্ন জাতীয় বহুসংখ্যক লোেক এই দেশে ইতস্তত বাস করে। কিন্তু দেশটি অতি বৃহৎ বলিয়া লােক-বসতি ঘন না হইয়া বিরল। সেই সকল লােক গৃহ পালিত পশুগণের খাদ্য সংগ্রহ করিবার জন্য নানাস্থানে ভ্রমণ করিয়া বেড়ায়। সাইবিরিয়া নামক দেশটি এসিয়ার প্রায় সমস্ত উত্তর ভাগ নিজের সীমাবদ্ধ করিয়া আছে। এই সাইবিরিয়া রুসিয়ার অন্তর্গত। সাইবিরিয়া দেশটিতে শীতের প্রাদুর্ভাব অতিশয় বেশী। তত্রস্থ লােকেরা বড় গরিব। তাহারা পশুচৰ্ম্মে শরীর ঢাকে, এবং বেশীর ভাগই কুটীরে বাস করে। রুস- সম্রাট তাহার প্রজাগণের মধ্যে যাহাদিগকে শত্রু বিবেচনা করেন, তাহাদিগকে এই ভয়ঙ্কর স্থানে নির্বাসিত করেন। ইউরােপ রুসিয়ার যে অংশ স্থিত, উহা খুব বৃহৎ। প্রায় আমেরিকার ইউনাইটেড ষ্টেটসের ন্যায় বড়। তা ছাড়া ইউরােপের প্রত্যেক রাজ্যের অপেক্ষা উহার পরিসর বেসী। উহার লােকসংখ্যা ৬,৩০,০০,০০০ ছয় কোটী ত্রিশ লক্ষেরও অধিক। রুসিয়ার সম্রাট একজন যথেষ্ট ক্ষমতাশালী রাজা। তিনি তাহার ইচ্ছানুসারে প্রজাগণকে পালন ও শাসন করেন। তঁাহার ইচ্ছা ব্যতীত কোন আইন কানুন হইতে পারে না। কিন্তু বর্তমান সম্রাটের পিতা প্রজা- দিগের শাসন সম্বন্ধে অনেক সুনীতি প্রচার করিয়া গিয়াছেন।
২ . রুসিয়ার ইতিহাস। সম্রাটের নানা স্থানে রাজ-অট্টালিকা আছে। কিন্তু তিনি প্রধানতঃ সেন্ট পিটার্সবর্গের রাজপ্রাসাদেই অবস্থান করিয়া থাকেন। তাঁহার অনেক সৈন্য আছে। তিনি সর্বদা বহু-সৈন্য-মণ্ডলী-বেষ্টিত হইয়া কালক্ষেপ করেন। মানচিত্রে দেখিতে পাওয়া যায়, ইউরােপের অন্তর্গত রুস রাজ্য, উত্তরে উত্তর বা ফোজান সমুদ্র হইতে দক্ষিণে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিস্তৃতির পরিমাণ প্রায় ১০০০* এক হাজার ক্রোশ। রুসিয়ার পূৰ্ব্বসীমায় ইউরাল বা ঔরাল পৰ্বত ; পশ্চিম সীমায় ফিনল্যাণ্ড উপসাগর, বটিক সাগর, প্রসিয়া, অষ্ট্রিয়া এবং তুরস্ক রাজ্য। এই বৃহৎ রাজ্যের আবহাওয়া নানারূপ। ফোজান সমুদ্রের নিকটবর্ত্তী হ্রদ সকল বৎসরের মধ্যে নয় মাস কাল বরফে আচ্ছন্ন হইয়া থাকে। রুসিয়ার মধ্যাংশে কানাডা রাজ্যের ন্যায় দারুণ শীত ; দক্ষিণাংশের আবহাওয়া উষ্ণ ও সুখকর। এখানে আঙ্গুর ও অন্যান্য নানারূপ সুমিষ্ট ফল উৎপন্ন হয়। রুসিয়ার রাজধানীর নাম সেন্ট পিটার্সবর্গ। উহা নিভা নদীর তীরে স্থাপিত। নিভা নদী ফিল্যাণ্ড উপসাগরে প্রবাহিত হইতেছে। সেন্ট পিটার্স- বর্গ সুন্দর নগর। এই নগরে যেরূপ নানাবিধ চমৎকার দৃশ্য দেখিতে পাওয়া যায়, সেরূশ দৃশ্য পৃথিবীর আর কোথাও নাই। সেন্ট পিটার্সবর্গে অনেক বড় বড় অট্টালিকা আছে। সেই সকল অট্টালিকাবাসীরা এত ধনী যে, তাহাদের মধ্যে কতকগুলি ব্যক্তি দুই তিন শত ভৃত্য রাখিয়া থাকেন। ; । অবশিষ্ট বিবরণ। রুসিয়ার আর একটি প্রধান নগরের নাম মস্কাউ। উহার আয়তন প্রায় সেন্ট পিটার্সবর্গের ন্যায়। উহা একটি প্রসিদ্ধ প্রাচীন নগর। পুৰ্বে সেখানে রুসের জারা বা করিতেন। কিন্তু রুসেরা ১৮১২ খৃষ্টাব্দে সসৈন্য নেপাে- ৩ অবশিষ্ট বিবরণ লিয়ন বােনাপাটিকে সেখানে প্রবেশ-বাধা দিবার জন্য উহার অধিকাংশ অগ্নিসংযােগে ভস্মীভূত করিয়াছিল। সেই অবধি আজ পর্যন্ত, সেখানে আর রাজধানী নাই। যাহাহউক, অন্যান্য লােকের থাকিবার নিমিত্ত মস্কাউ নগর পুনরায় নির্মিত হইয়াছে। সেন্ট পিটার্সবর্গে বিবিধ বাণিজ্য দ্রব্য দেখিতে পাওয়া যায়। ইংবাজ দের জাহাজ সেখানে গিয়া শণ, লৌহ, চর্ম, চর্বি এবং অন্যান্য বাণিজ্য দ্রব্য আনয়ন করে। কিন্তু মস্কাউ নগর জলপথ হইতে অনেক দূরে থাকাতে কোন নৌ-বাণিজ্যের সুবিধা হয় না। রুসিয়ার জার অর্থাৎ সম্রাটের ন্যায় পৃথিবীতে অন্য কোন রাজার নানাবিধ মনুষ্যের উপর আধিপত্য নাই। তাহার ইউরােপের অন্তর্গত রাজ্যের মধ্যে অন্ততঃ ১৬০ ষাট প্রকার বিভিন্ন জাতির বসতি আছে। উহারা বিভিন্ন ভাষায় কথা কহে এবং বিভিন্ন উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করিয়া থাকে। কিন্তু তাহার এসিয়ার অন্তর্গত রাজ্য মধ্যে ভিন্ন-জাতীয় লােকের সংখ্যা আরও বেশী। ইউরােপীয় রুসিয়ার উত্তর বিভাগে ল্যাপল্যাণ্ডার, সামইডেস প্রভৃতি কয়েক জাতীয় মনুষ্য আছে। উহারা দেখিতে খৰ্বাকার ও পাণ্ডুবর্ণ । উহারা অতি অসভ্য। যাহারা সমুদ্রের নিকটবর্তী স্থানে বাস করে, তাহাদের মৎস্যই এক মাত্র আহার। তাহারা এরূপ মৎস্যাশী যে, তাহাদের গাত্র হইতেও মৎস্যের গন্ধ নির্গত হয়। আমেরিকার উত্তর ভাগের এইমক্স ইণ্ডিয়ান জাতির সহিত ইহাদিগের সাদৃশ্য আছে। শীতকালে ঐ সকল লােকের বড় কষ্ট হয়। উত্তর প্রদেশে চার ভাগের তিন ভাগ সময়ে শীতের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সেখানে কখনও কখনও একা- ধিক্রমে ছয় মাস রাত্রি থাকে। কিন্তু এই দীর্ঘকালব্যাপী অন্ধকারেও তাহারা অভ্যাসবশতঃ তেমন কষ্ট অনুভব করে না। যদিও তাহারা লেখা পড়া জানে না, যদিও তাহাদের পুস্তকাদি নাই, তথাপি তাহারা মৌখিক গল্পে ও অন্যান্যরূপ রসিকতায় সুখে কাল যাপন করে। ঐ সকল জাতির ইতিহাস নাই। তাহারা ইতিহাস রাখিবারও প্রয়ােজন মনে করে না। এক বংশের পর এক বংশ যাইতেছে আর সেই সঙ্গে তাহাদের বংশানুক্রমিক ঘটনাও বিলুপ্ত হইতেছে। তাহারা যুদ্ধ-ব্যাপার ৪ রুসিয়ার ইতিহাস। বা অন্য কোন বিশেষ ঘটনা জানে না। সে সকল লােকের পূর্বপুরুষেরা যেরূপে জীবন যাপন করিয়া গিয়াছে, উহারাও ঠিক সেইরূপে চলিতেছে। উহারা রুসীয় সম্রাটের শাসন স্বীকার করে, কিন্তু কখনও তঁাহাকে দেখিতে পায় না। কারণ, শীতের অত্যন্ত প্রাদুর্ভাব বশতঃ সম্রাট সে প্রদেশে গমন করেন না। ইউরােপীয় রুসিয়ার দক্ষিণ এবং পশ্চিম অংশে তাতার জাতীয় লােকেরা বাস করে। উহারা দ্রুতগামী অশ্বারােহণে বড় আমােদপ্রিয়। উন নদীর সীমায় কসাক নামে এক জাতীয় লােকের বসতি; উহারাও অশ্বারােহণ- প্রিয়। তা ছাড়া উহারা বড় বড় বা লইয়া শত্ৰুদিগের সহিত ভয়ানক যুদ্ধ করে। উহাদের হস্ত-কৌশল এরূপ যে, দেড় শত হস্ত দূর হইতে শত্রুর প্রতি বর্গা নিক্ষেপ করিতে পারে। ইহা ছাড়া রুসরাজ্যে য়িহুদী, পােল, জৰ্ম্মণ এবং গিপসি জাতির বসতি আছে। নগরবাসীরা ইচ্ছা ও সুবিধা মত জীবিকা নির্বাহের উপযােগী কাজ কৰ্ম্ম করিয়া থাকে। রুসিয়ার অন্তর্গত পােলণ্ডের সম্মুখস্থ প্ৰদেশ সৰ্ব্বাপেক্ষা উৰ্ব্বর। তত্রস্থ লােকেরা স্ব স্ব প্রতিবেশীগণকে উৎপন্ন শস্য দিয়া সাহায্য করে। রাজ্যের উত্তর ভাগ কেবল শীত-প্রধান নহে, উহার অধিকাংশ জলাভূমি এবং নিবিড় অরণ্যে পরিপূর্ণ। সেই সকল অরণ্যে বহুসংখ্যক হিংস্র জন্তু দেখা যায়। রুসের পশুললামের জন্য বিশেষ বিখ্যাত। তাহারা ইংলণ্ড প্রভৃতি অন্য অন্য দেশে পশুলােম রপ্তানি করিয়া থাকে। তাছাড়া তাহাদের দেশে যে প্রস্তুত পশুচৰ্ম্ম পাওয়া যায়, তাহার রং, গন্ধ এবং কোমলতা পৃথি- বীর অন্য কোন স্থানের চৰ্ম্মে নাই। ঐ চৰ্ম্ম খুব উৎকৃষ্ট।
তৃতীয় অধ্যায় পিটার দি গ্রেট। প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে রুসিয়ার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হইল। এক্ষণে ইহার ইতিহাসের কথা কিছু বলা উচিত। পূৰ্বেরুসরাজ্য অসভ্যদিগের বাসভূমি ছিল। একশত বৎসরের কিছু অধিক হইতে ক্রমে ক্রমে ইহার অবস্থা পরিবর্তিত হইয়া আসিতেছে। সম্রাট পিটার দি গ্রেটের সিংহাসন আরােহণের পূর্বে রুসরাজ্য সভ্যজাতিদিগের রাজ্যের ন্যায় পরিগণিত হইতে পারে নাই। পিটার দি গ্রেট একজন অদ্ভুত লােক ছিলেন। যদিও তিনি স্বীয় রাজ্যকে সভ্য পদবীতে স্থাপিত করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, তথাপি আপনাকে সভ্য ভব্য করিতে পারেন নাই। ফল কথা, কিয়দংশে তিনি অসভ্যের ন্যায় জীবন যাপন করিতেন। রুসিয়ার সম্রাটদিগকে জার (Czar) কহে। জার পিটার পঞ্চবিংশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে রাজসিংহাসন পরিত্যাগ করিয়া, জ্ঞান-শিক্ষার জন্য সমস্ত ইউরােপ খণ্ডে ভ্রমণ করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি কোন প্রসিদ্ধ বিশ্ব-বিদ্যা- লয়ে প্রবেশ করেন নাই, কিম্বা কোন প্রাচীন ভাষা শিক্ষাতেও মনোেযােগ দেন নাই। পিটারের জ্ঞান-শিক্ষা অন্যরূপ ছিল। তার মধ্যে একটি এই ;—তিনি হলণ্ড দেশে গমন করিয়া, ছদ্মবেশে একজন নৌ-সূত্রধরের নিকট জাহাজ নিৰ্মাণ-কাৰ্য্য শিক্ষার নিমিত্ত, শিক্ষানবিশরূপে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তিনি সেখানে গিয়া যে বাড়ীতে অবস্থান করিতেন, সে বাড়ী আজিও আছে। তা’র পর তিনি ইংলণ্ডে গিয়া পুনৰ্ব্বার জাহাজ নির্মাণ-কাৰ্য শিক্ষা করিয়া- ছিলেন। ইহা ছাড়া তিনি অন্যান্যরূপ শিল্পকাৰ্য্য ও অস্ত্র-চিকিৎসাও শিক্ষা করিয়াছিলেন। ফল কথা, যাহাতে তাহার এবং তাহার প্রজাবর্গের মঙ্গল। সাধিত হইতে পারে, এইরূপ কোন প্রকার জ্ঞান শিক্ষায় তিনি অবহেলা করেন নাই। তিনি বিদেশে এক বৎসরের কিছু অধিক কাল থাকিয়া ।
৬ রুসিয়ার ইতিহাস। শুনিতে পাইলেন যে, তাহার ভগিনী রুরাজ্যের সম্রাজ্ঞী হইবার চেষ্টা করিতেছেন। এই বিরক্তিকর সংবাদে তিনি বাধ্য হইয়া সকল প্রকার কাৰ্য-শিক্ষা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক অনতিবিলম্বে মস্কাই নগরে ফিরিয়া আসি- লেন। আসিয়াই ষড়যন্ত্রকারীদিগের কয়েক ব্যক্তির প্রাণ সংহার করিলেন এবং ভগিনীকে কারাগারে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিলেন। তার পর, পিটার দি গ্রেটের অধিকাংশ সময় যুদ্ধ-ব্যাপার এবং রাজ্য- শাসনে অতিবাহিত হইতে লাগিল। এই জন্য তিনি তাহাব আরব্ধ শিল্পাদি কাৰ্য-শিক্ষার পূর্ণ সীমায় উপস্থিত হইতে পারিলেন না। কিন্তু যতদূর শিক্ষা করিয়াছিলেন, তাহা নিস্ফল হয় নাই। তাহার ফলে রুসিয়ার অনেক উন্নতি হইতে লাগিল। পিটার প্রত্যহ প্রত্যুষে ৫টার সময় শয্যা হইতে গাত্রোখান করিয়া সমস্ত দিন রাজ-সংক্রান্ত কার্যে ব্যাপৃত থাকিতেন। তার পর, রাজকার্য সম্পন্ন করিয়া সন্ধ্যার সময় বিশ্রাম লাভ করিতেন। সে সময়ে তাহার নিকট তীব্র মদিনাপূর্ণ একটি বৃহৎ বােতল থাকিত। তিনি যে পর্যন্ত না জ্ঞানশূন্য হইতেন, ততক্ষণ পান করিতেন। এই সুরাপান অভ্যাসের সহিত তাহার চরিত্রগত অত্যাচার, তঁাহার কি বন্ধু, কি শত্রু, সকলের পক্ষেই ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিত। পিটার এক এক সময় দুঃখ করিয়া বলিতেন যে, তিনি রুসরাজ্যের অনেক দোয় সংশােধন করিয়া- ছেন বটে, কিন্তু নিজের বেলা পারেন নাই। পিটারের নিকট যাহারা অপরাধী হইত, তিনি তাহাদিগকে স্বয়ং বেত্রা- ঘাত করিতেন। সামান্য লােকের কথা দূরে থাক, রুসরাজ্যের প্রথম শ্রেণীর সম্রান্ত লােকদিগকেও পিটারের বেত্রাঘাত সহ করিতে হইত। এমন কি, সময়ে সময়ে তাহার প্রিয়তমা পত্নী ক্যাখাইনের পৃষ্ঠেও সেই বেত্র সবলে নৃত্য করিত। তবু ক্যাথারাই স্বামীর নিকট সর্বদা দোষের উপযুক্ত শাস্তি পাইতেন না। হাজার হোক্, রাজার রাণী কি না। কেহ কেহ বলেন, পিটার দি গ্রেট গােপনে গোপনে তাহার পুত্রকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করিয়া নিহত করিয়াছিলেন। পিটারের অনেক দোষ, হিল, অনেক অত্যাচার ছিল; তথাপি তাহার নাম রুসিয়ার সমস্ত সম্রাটের ৩ ।
পিটার দি গ্রেটের উত্তরাধিকারিগণ। ৭ অপেক্ষা প্রসিদ্ধ। এরূপ হইবার কারণ এই, তিনি প্ৰজাগণের মঙ্গল সাধ- নের জন্য বহু দিন ধরিয়া কঠিন পরিশ্রম করিয়াছিলেন। পিটার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জারেদের অপেক্ষা রাজ্যের যথেষ্ট উন্নতি করিয়াছিলেন। চতুর্থ অধ্যায়। পিটার দি গ্রেটের উত্তরাধিকারিগণ। ১৭২৫ খৃষ্টাব্দে, ৫৩ বৎসর বয়সে পিটার দি গ্রেট প্রাণত্যাগ করিলে তাহার সহধর্মিণী রাণী ক্যাথারাইন সিংহাসনে আরােহণ করিলেন। ক্যাথা- রাইন জনৈক দরিদ্র গ্রাম্য লােকের কন্যা। কিন্তু তাহার রূপ অতিশয় অপ- রূপ ছিল। এই রূপের বলেই তিনি পিটার দি গ্রেটের সহধর্মিণী হইয়া ছিলেন। রাণী ক্যাথারাই দোষে গুণে জড়িত ছিলেন। দোষের মধ্যে সুরাপানটাই বেশী। রাণী ক্যাথারাইন প্রায় দুই বৎসর কাল রাজ্য-শাসন করিয়াছিলেন। পরে রাজপপৗত্র দ্বিতীয় পিটার সিংহাসনে আরােহণ করিলেন। দ্বিতীয় পিটার ১৭৩০ খৃষ্টাব্দে হইলােক ত্যাগ করেন। তাহার ভ্রাতপুত্রী এ আভানয়না রাজসিংহাসন প্রাপ্ত হইলেন। অভিনয়না উচ্চদরের রাণী ছিলেন, এবং অনেকগুলি প্রশংসার কাৰ্যও করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রশংসিত কাৰ্য্য সমূহের মধ্যে তুষার-প্রাসাদ (Palace of Ice) সৰ্ব্বা- পেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই ভূষার-প্রাসাদ দেখিতে বড় মনােহর। একটি বরফময় হ্রদের মধ্যস্থলে উহা নির্মিত হইয়াছিল। কাষ্ঠ এবং প্রস্তরের পরিবর্তে উহার ছাদ, ভিত্তি, গৃহ সমস্তই বৃহৎ বৃহৎ বরফ খণ্ডে গঠিত হইয়াছিল। খাট, পালঙ, মেজ প্রভৃতি সমস্ত আসবাবও বরফের। রাত্রিকালে যখন উহার মধ্যে আলাে দেওয়া হইত, তখন দেখিলে বােধ হইত, সমস্ত প্রাসাদটি যেন অনন্ত হীরকে ঝম করিতেছে। এ আভানয়নার পর রাজকুমারী এলিজাবেথ সিংগাসনের উরাধি:
রুসিয়ার ইতিহাস। কারিণী হন। এলিজাবেথ পিটার দি গ্রেটের কন্যা। তিনি ১৭৪০ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনারূঢ় হইয়া ২২ বৎসর কাল রাজ্য শাসন করিয়াছিলেন। তার পর ১৭৯২ খৃষ্টাব্দে তৃতীয় পিটার রুসিয়ার রাজা হন। পিটার দি গ্রেটের ন্যায় ইহারও পত্নীর নাম ক্যাথারাইন। কিন্তু পতিপত্নী একসঙ্গে দীর্ঘকাল রাজ- সিংহাসনে উপবেশন করিতে পারেন নাই। এমন শুনিতে পাওয়া যায়, রাণী ক্যাথারাইন একাকিনী রাজ্যপ্রয়াসিনী হইয়া, স্বামীকে ষড়যন্ত্রে সিংহাসনচ্যুত ও হিত করিয়াছিলেন। কিন্তু যদিও রাণী ক্যাথরাইন এরূপ অত্যাচারিণী ছিলেন, তথাপি তাহার রাজ্যশাসনী বুদ্ধি বিশেষ প্রখরা ছিল। এই বুদ্ধিবলেই তিনি পৃথিবীর অন্যান্য সুপ্রসিদ্ধ রাজারাণীদের মধ্যে অন্যতরা উপযুক্তা বলিয়া গণ্য হইয়াছেন। ১৭৯৬ খৃষ্টাব্দে মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে রাণী ক্যাথারাইন তুরস্কৃদিগকে স্বরাজ্য হইতে দূরীভূত করিবার জন্য চেষ্টা করিয়াছিলেন। যদ্যপি তিনি তাহা করিতে পারিতেন, তাহাহইলে তাহার রাজ্য, ভূমধ্যস্থ সাগর হইতে উত্তর সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হইত। কিন্তু কাৰ্যসিদ্ধির পূর্বেই তঁাহাকে ইহলােক পরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল। রাণী ক্যাথেরাইনের মৃত্যুর পর, তদীয় পুত্র পল ৪৩ বৎসর বয়ক্রমে রাজসিংহাসন প্রাপ্ত হইলেন। মাতার ন্যায় পলের কাৰ্যকরী রাজবুদ্ধি আদৌ ছিল না। তা ছাড়া তিনি একবােকা ও অস্থিরচিত্ত ছিলেন। প্রজারা তাহাকে দুরন্ত পাগল বলিত। পলের চরিত্র ক্রমে ক্রমে সকলের পক্ষে এরূপ অসহ হইয়া উঠিয়াছিল যে, কতকগুলি সম্রান্ত ব্যক্তি ষড়যন্ত্র করিয়া তাঁহাকে হত্যা করিয়াছিলেন। সম্রাট পলের জ্যেষ্ঠ পুত্র আলেকজান্দার সিংহাসনে আরােহণ করিলেন। এই সম্রাট ১৮০১ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৮২৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত-রাজ্যশাসন করিয়া- ছিলেন। আলেকজান্দার সম্রাট নেপোলিয়নের সহিত যুদ্ধ-ব্যাপারে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন। নেপােলিয়ন সসৈন্যে মস্কাউ নগরে প্রবেশ করাতে রুসেরা বারুদে অগ্নি দিয়া উহা ভস্মীভূত করিয়াছিল। সেই সূত্রে নেপােলিয়নের সৈন্যগণ একবারে বিনষ্ট হইয়া গিয়াছিল। পলের তৃতীয় পুত্র দ্বিতীয় আলেকজান্দার ১৮৫৫ খৃষ্টাব্দে পিতৃ- পিটার দি গ্রেটের উত্তরাধিকারিগণ। সিংহাসন প্রাপ্ত হন। তিনি অনেকগুলি প্রয়ােজনীয় কার্য সম্পাদন করেন। তাহার সময়ে কুসিয়ায় নানাবিধ শিল্প-কার্যের শ্রীবৃদ্ধি হয়। ১৮৭৪ খৃষ্টা- দের ২৩ জানুয়ারি মহারাণী ভিক্টোরিয়ার দ্বিতীয় পুত্র এডিনবরার ডিউক আলফেড আৰনেষ্ট আলবার্টের সহিত কুসিয়ার দ্বিতীয় আলেকজান্দারের একমাত্র কন্যা মেরী আলেকজান্দ্রোর শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়। সেন্ট পিটার্সবর্গের “উইন্টার প্যালেস (Winter Palace) নামক রাজপ্রাসাদে এই শুভ বিবাহ সম্পন্ন হইয়াছিল। সে বৎসর দ্বিতীয়, আলেকজান্দার রাজশকটে আবােহণ করিয়া, ভ্রমণ করিবার সময়, নিহিলিষ্টদিগের দ্বারা ডিনামাইট নামক বারূদপূর্ণ ব্যোম যন্ত্রের আঘাতে নিহত হইয়াছেন। কুসিয়ায় পূৰ্বে নিহিলিষ্টদিগের প্রাদুর্ভাব ছিল না। দ্বিতীয় আলেকজান্দারের সময় হইতেই উহাদিগের দল বল বৃদ্ধি হইতেছে। উহাদিগের মূলমন্ত্র মনুষ্যমাত্রেই সমান। মনুষ্যের আবার মনুষ্য রাজা কি ? হয় সকল মনুষ্যই রাজা, নয় সকলেই প্রজা-অর্থাৎ সকলেই একরূপ। এইজন্য উহারা রাজহত্যা-ব্ৰতে ব্ৰতী হইয়াছে। রুসিয়ার বর্তমান সম্রাট, দ্বিতীয় আলেকজান্দারের পুত্র। ইনি সিংহাসনে আরােহণ করিয়া তৃতীয় আলেকজান্দার নাম ধারণ করিয়াছেন। পিটার দি গ্রেট হইতে কুসিয়ার বর্তমান সম্রাট পর্যন্ত সকলেরই ভারত অধিকার। করিবার ইচ্ছা বলবতী হইয়া আসিতেছে। বর্তমান সম্রাটের পিতা দ্বিতীয় আলেকজান্দার মধ্য এশিয়ার মার্ভ প্রভৃতি অনেক স্থান যুদ্ধে অধিকার করিয়া ক্রমশঃ ভারতবর্ষের দিকে অগ্রসর হইতেছেন। এক্ষণে ইনি পিতৃপথা- বলম্বী হইয়াছেন। আজ আমরা যে ইংরাজ-রুস-যুদ্ধের আয়ােজন দেখি- তেছি, ইহার সূত্রপাত পিটর দি গ্রেট করিয়া গিয়াছেন। গত ৩০ মার্চ রুসিয়ার অতর সেনাপতি কমারফ, সহকারী সেনাপতি আলিখানফের সহিত পাঁজদে, এপ্রিল মাসে মারুচক প্রভৃতি আফগানরাজ্যভুক্ত কয়েকটি স্থান রুসি- স্নার অধীন করিয়াছেন। পাঁজদের যুদ্ধের সময় ফুসীয়দের হন্তে দশ হাজার আফগান সৈন্য নিহত হয়। এই যুদ্ধের প্রধান গােলযােগ রুমিয়া ও আফগান স্থানের সীমা নির্ধারণ লইয়া। ইংরেজ পক্ষ হইতে ভাৰ পিটার্স লডেন মধ্যস্থ হইয়া বিবাদী ভূমির বিবাদ মিটাইতে গিয়াছিলেন, কিন্তু কার্যে কিছুই রুসিয়ায় ইতিহাস। হয় নাই। আজ পর্যন্ত ভয়ানক গােলযােগ চলিতেছে। ভবিষ্যতে যে কি হইবে, তাহা ঈশ্বরই জানেন। তবে সিংহ ভক্ষুকের যুদ্ধনীতির ব্যাপার দেখিয়া আমাদের মনে বিপদের আশঙ্কাটাই জাগিতেছে। আজ কয়েক মাস ধরিয়া উভয় পক্ষে যেরূপ যুদ্ধের আয়ােজন, সন্ধিপ্রস্তাব ও সন্ধিভঙ্গ হইয়া আসিতেছে, সে সকল বিষয় এই ক্ষুদ্র পুস্তকে লিখিবার স্থান নাই। পাঠকগণ সমস্ত সংবাদ পত্রেই সে বিষয়ের বিশেষ বিবরণ জানিতে পারিতে ছেন বলিয়া আমরা উহাতে হস্তক্ষেপ করিতে ইচ্ছুক নহি। তবে, যে সকল বিষয় সংবাদপত্রে প্রায় পাওয়া যায় না, উহাই এই পুস্তকে সন্নিবেশিত হইল। ইহাতে রুসিয়ার সংক্ষিপ্ত বিবরণ, সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ইত্যাদি বিষ- যুই লিখিত হইল। পঞ্চম অধ্যায়। রুসিয়ার আয়তন। পূর্বে কুসিয়ার ভৌগলিক বিবরণ সংক্ষেপে এক প্রকার বলা হইয়াছে। এক্ষণে উহার বিষয় অন্য স্থান হইতে আরও কিছু বলা যাইতেছে। পিটার দি গ্রেটের রাজসিংহাসনপ্রাপ্তির পূর্বে ইউরােপে রুসিয়া রাজ্য বিশেষ ক্ষমতাপন্ন ছিল না। পিটরের সময় হইতেই রুসিয়ার নাম ও প্রভাব যথেষ্ট বাড়িয়া আসিতেছে। ক্রমে ক্রমে রুসিয়া, পার্শ্ববর্তী অনেক পরকীয় রাজ্য পূর্ণরূপে ও খণ্ডরূপে দখল করিয়াছে। সুইডেন, পারস্য, তুরস্করাজ্যের অনেক অংশ ক্লসিয়ার কবলে প্রবিষ্ট হইয়াছে। পােল শুরাজ্যও এক্ষণে ফুসিয়ার অধীন। রুসিয়া ইউরােপের একার্ক অংশ লইয়াছে। সমস্ত উত্তর-এসিয়া এবং অধিকাংশ মধ্য-এসিয়াও রুসিয়ার দেহপুষ্টি করিতেছে। আমেরিকার কিয়দংশও রুস্সম্রাটের দখলে ছিল, কিন্তু উহা তিনি অপরকে বিক্রয় করিয়াছেন। যাই হউক, তবু রুসিয়ার আয়তন এত বড় যে, সে সসা- গরা পৃথিবীর সাত ভাগের এক ভাগ অধিকার করিয়া আছে। ফল কথা, রুসিয়ার আয়তন। ১১ রুস্সম্রাটের ন্যায় পৃথিবীর অন্য কোন রাজাই এত বড় ভূখণ্ডের অধিপতি নহেন। রুসিয়ার সীমানিৰ্দ্ধাৰণ সূক্ষ্মরূপে হইবার নহে। তবে ভৌগলিকেরা মােটামুটি করিয়া এইরূপ সীমা-মীমাংসা করিয়াছেন। যথা- রুসীয় পােলণ্ড এবং বলটি সাগরস্থ দ্বীপপুঞ্জের সহিত ইউরােপীয় রুসিয়ার পরিমাণ ২০৭৮,৬৪৬ বর্গ মাইল। নব, জিলা দ্বীপ ব্যতীত ফোন ও প্রশান্ত সাগরস্থিত দ্বীপাবলীর , সহিত রুসরাজ্যভুক্ত সাই- বিরিয়া প্রদেশের পরিমাণ প্রায় ৪,৮৬৬,৬৪৩ বর্গ মাইল। যদিও নব জিলা দ্বীপের দক্ষিণাংশ আজিও আবিষ্কৃত হয় নাই, তথাপি উহার পরিমাণ ৮৩,২৭১ বর্গ মাইল। এইরূপে সমগ্র রুসিয়া রাজ্যের পরিমাণ-ফল প্রায় ৭, ২৮,৫৬১ বর্গ মাইল। তন্মধ্যে ১,৩৬৪,৮১৫ বর্গ মাইল পরিমিত স্থান উত্তরাংশে এবং ৫,৬৬৩,৭৪৬ বর্গ মাইল পরিমিত স্থান দক্ষিণাংশে অবস্থিত। ইউরােপীয় রুসিয়াতে যে সকল প্রদেশ সম্ভক্ত হইয়াছে, তাহারা এই নিজ রুসিয়া, (কখন কখন মস্কভি নামেও অভিহিত); ড কসাকদের রাজ্য ; কৃষ্ণ সাগরের তটস্থ ভূমিখণ্ড; তাতারদের সম্বন্ধযুক্ত কাজান ও অষ্ট্ৰাকান প্রদেশ; বায়ারমিয়া ; লাপ লণ্ড, ইঙ্গিয়া, কেরিলিয়া, ফিলণ্ড, অস্ট্রো- বােথিনিয়া, এন্থােনিয়া,লিভােনিয়া, আবে এবং আলাউদ দ্বীপপুঞ্জ ও ডেগাে, ঈসেল প্রভৃতি দ্বীপ এই সকল পূৰ্ব্বে সুইডেনের অধিকারভুক্ত ছিল, এক্ষণে কুসিয়ার। এক সময়ে পােলণ্ড রাজ্য নিম্নলিখিত স্বাধীন গবর্ণমেন্টগুলিতে বিভক্ত ছিল, যথা—ভিটেস্ক, মােঘিলেভ, মিঙ্কাস, বলিনিয়া, গর্ডন, ভিনা, পােডােলিয়া, বিয়ালিষ্ট এবং ওয়াসা, এহেন পােলণ্ডের অধিকাংশ স্থান এক্ষণে রুসিয়ার অন্তর্ভুক্ত।' ক্রিমিয়া, ক্ষুদ্র তাতার, বিশ্বাৱাবিয়া, এবং তুরস্কদের নিকট জয়লব্ধ মাভিয়ার কিয়দংশ এবং তুরস্ক, পারস্বরাজের নিকট হইতে জয়লব্ধ জর্জিয়া ও ককেস পর্বতমালার অন্তর্গত ককেসীয় প্রদেশ এক্ষণে সাধিপতির অধিকৃত।
ষষ্ঠ অধ্যায়। ৫ ০০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ লােকসংখ্যা! ১৭৭০ খৃঃ বিশ্বারাবিয়া রুসিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়, তােকসংখ্যা ১৭৭১ খৃঃ ক্রিমিয়ারাজ্য (১৭৮৩ খৃষ্টাব্দে সাজ্যভুক্ত হয়) লােকসংখ্যা ৪৬,০০০ ১৭৮৫ খৃঃ জর্জিয়া (১৮৩১ খৃষ্টাব্দে সাজ্যভুক্ত হয়) লােকসংখ্যা ৪••,”। ১৭৮৫ খৃঃ ক্ষুদ্র পােলণ্ড এবং উক্রেইন, লােকসংখ্যা ১৭৯৪ খৃঃ লিথুয়ানিয়া ও পােডলিয়া প্রভৃতি স্থানের সহিত পশ্চিম-রুসিয়া, লােকসংখ্যা ৮,৫০,০০০ ১৭৯৫ খৃঃ কৌরলণ্ড, লােকসংখ্যা ১৮০৩ খৃঃ লেখি ও ককেসীয়প্ৰদেশ, লােকসংখ্যা ১৮৮৯ খৃঃ ফিলগু, লােকসংখ্যা ১,৪••••• ১৮১৩ খৃঃশ্চিব, লােকসংখ্যা ১৪, ১৮১৫ খৃঃ (১৮৩২ খৃষ্টাব্দে রুসিয়ার অন্তভুক্ত) পােলণ্ড, ব্রাজ্য, লোকসংখ্যা ৪,••••• ১৮২৭ খৃঃ এরিভান্ ও তন্নিকটবর্তী স্থান, লােকসংখ্যা ১৮২১ খৃঃ তুরস্কীয় আরমেনিয়া, লােকসংখ্যা সমষ্টি ২৩,২৫,০০০ সমগ্র কুসিয়ার লােকসংখ্যা সঠিক জানা যায় নাই। কেহ বলেন, ৫,০০,০০,০০০ পাঁচ কোটি, কেহ বলেন, ৬,১০০,,০০০ ছয় কোটি দশ লক্ষ। শেষের সংখ্যা ম. হুওতের মন্টিবন্ নামক পুস্তকের নূতন সংস্করণে দেখিতে পাওয়া যায়। পিটার পার্লির মতে ৬,৩০,০০,০০০ হয় কোটি ত্রিশ লক্ষেরও বেশী। কাহার মতে আবার ৫৫,৩৪০,০০০ পাঁচ কোটি তিপ্পান্ন লক্ষ চল্লিশ হাজার। এই শেষের হিসাৱ মত রুসজ্যান্তভুক্ত লােকদিগকে * এই পুস্তকের প্রথম অধ্যায় দেখ লােকসংখ্যা। ০ ০ ০ ০ ০ ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত করিয়া লইলে, নিম্নলিখিতরূপ বিভাগ দেখিতে পাওয়া যায়। যথা- রুসীয় গ্ৰীক চার্চ লােকসংখ্যা ৪৫,০০০,০০০ ৭ং সম্প্রদায়ভুক্ত রাকলুইস ৩৫,০০ ইউনাইটেড গ্রীক ও ইউনাইটেড, আর্মেনীয় সমেত নােমা কাথলিক স্বতন্ত্র আর্মেনিয়া ২৫,০০০ অবর্গ কনফেস সম্প্রদায় (প্রােটেষ্টান্ট ) ২,০০,০০ রিফৰ্ম্মড চার্চ সম্প্রদায় মােরিভিয়া মেনােনাইট, মুসলমান ২,৫০,০০০ য়িহুদী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী (লামা-উপাসকসম্প্রদায়) ভারতবর্ষীয় (ফেটিচিজম (?) উপাসকসম্প্রদায়), পুত্তলপূজক ১৭,০০০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ১) ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৮০০ সমষ্টি ৫৫,৩৪০,০০০ ৩ জেনেরাল আলেকজান্দার ডি কিরীফ বলেন, এক্ষণে জারের প্রজাসংখ্যা ১০,•••••০০ দশ কোটি। ০ দশ কোটি। প্রয়ােজন হইলে সকলেই যুদ্ধ করিতে পারে। রুসিয়া এদিকে যে সকল পররাজ্য অধিকার করিয়াছে, সেই সেই খুলে দাস-ব্যবসায় ছিল না, বা যাহা ছিল, তাহাও উঠিয়া গিয়াছে। কুসিয়ার অধিকৃত অন্যান্য স্থানের যে সকল অংশে দাসব্যবসায় আজিও প্রচলিত আছে, তত্তাবৎ স্থানের সম্ভ্রান্ত লােকদিগের সংখ্যা ৭,৫০,০০০ এবং কৃতদাস- গণের সংখ। ৩৬,০০,০০০। সম্ভ্রান্ত-প্ৰজাগণের ) রাজকর নাই। তাহারা যুদ্ধব্যাপারে লিপ্ত হন না বা তজ্জন্য রাজদণ্ড পান না। ১৮১১ খৃষ্টাব্দে ফরাসী সৈন্যকে বাধা দিবার জন্য যে দরবার হইয়াছিল, তাহাতে নিম্নলিখিত প্রজাগণ অস্ত্রধারণ করিবার আদেশ পাইয়াছিল, ৬,৪৩, { ১৪ রুসিয়ার ইতিহাস। ১৩৫ ব্যবসায়ী, ৬৩,৮৯,২৭৯ রাজভৃতিভুক্ত কৃষক, ১০,১১৩,১৭৭ সাধারণ কৃষক, ১,৭৭,৬৩৬ রাজপরিবারগণের মহারা সংগ্রহকারী কৃষক, ১,১২,৪৫৩ স্বাধীন ব্যক্তি। সে সময়ে সৰ্ব্বশু দ্ধ ১,৮৩,৩৫,৬৮০ জন লােক যুদ্ধার্থে অস্ত্রধারণ করিয়াছিল। রুসিয়াতে সর্বশুদ্ধ তিনটি লােক-শ্রেণী দেখিতে পাওয়া যায়। প্রথম শ্রেণী—জমিদার প্রভৃতি সম্রান্তগণ ; : দ্বিতীয় শ্রেণী-ব্যবসায়ী, নাগরিক, বেসরকারী কর্মচারী এবং ধর্মযাজক ; তৃতীয় শ্রেণী-কৃতদাস, সৈনিক, নাবিক ও স্বাধীন শিল্পকর। সপ্তম অধ্যায়। রুসীয় গবর্ণমেন্ট। রুসিয়া রাজ্য স্বেচ্ছাচার রাজতন্ত্রে নিয়ন্ত্রিত। জারের হস্তেই রাজ্যের সমস্ত আইন কানুন ; তঁাহার অধীনে রাজকাৰ্যনিৰ্বাহক সভা আছে। সেই সভা কাৰ্যবিশেষে নানা ভাগে বিভক্ত। কিন্তু কোন সভারই ইচ্ছামত কাৰ্য্য করিবার ক্ষমতা নাই। জারের আজ্ঞানুসারে সকলকেই কাৰ্য্য করিতে হয়। এই সকল সভার প্রথমিটর নাম রাজ্যের রাজকীয় মন্ত্রিসভা (Imperial Couicil of State)। উহা চারি শাখায় বিভক্ত হইয়া কেবল একজন (General President) সাধারণ সভাপতির অধীনে কাৰ্য্য করে। দ্বিতী- যটি প্রিন্সপাল স্টাফ, বা এটাট, মেজর ( Principal Staff or Etat Ma• jor); এই সভায় যুদ্ধ সম্বন্ধীয় ও সেনাবিভাগীয় কার্য সম্পন্ন হয়। তৃতী- টি কাৰ্যনিৰ্বাহক ব্যবস্থাপক সভা (Executive Senate); ইহা আট ভাগে বিভক্ত। এই আট ভাগে তিনটি কাৰ্য্য হইয়া থাকে-রাজাজ্ঞা পালন হইল কি না, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মােকদ্দমা এবং রাজ্যসম্বন্ধীয় তদারক। চতুর্থটি ধৰ্ম্ম- সভা (Holy or Governing Synod ), ইহাতে থৰ্মসংক্রান্ত বিষয়ের আলাে- চনা হয়। কুসিয়ার কাৰ্যনিৰ্বাহক সভাগুলি প্রধানতঃ দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম বিভাগসুপ্রিম গৱৰ্ণমেন্ট সম্বন্ধে এবং দ্বিতীয় বিভাগ নিম্নলিখিত হিসাবে- রুসীয় গবর্ণমেন্ট। • ১ম, বৈদেশিক কাৰ্যনিৰ্বাহক মন্ত্রিসভা (Ministry for Foreign Affairs)। ২য়, সামুদ্রিক মন্ত্রিসভা (Ministry of the Marine)। ৩য়, অভ্যন্তরীণ কাৰ্য্য নিৰ্বাহক মন্ত্রিসভা (Ministry for International Affairs) বা হােম ডিপার্টমেন্ট (Home Department),ইহার সহিত কাৰ্যনিৰ্বাহক ফৌজদারী আদালত ( Executive Police) সংযুক্ত আছে। ৪র্থ, সাধারণ শিক্ষাসভা ( Ministry of Public Instruction); এই সভায় বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ বিদ্যালয়, শিক্ষাসমিতি এবং ধৰ্ম্মের বিষয় আলােচিত হয়। ৫ম, রাজস্ব, ব্যবসা u foterFTUAC (Ministry of Finsnce, Trade, and Manufactures) I ৬ষ্ঠ, বিচারসভা (Ministry of Justice)। এই সকল বিভাগের যে কোন কর্মচারী জার কর্তৃক নিযুক্ত হন, তাহাকেই স্ব স্ব কার্যের দায়িত্ব বুঝাইয়া দেন। বড় দুঃখের বিষয় যে, রুসিয়ার ন্যায় সৰ্ববৃহৎ রাজ্যের রাজশাসন বড় স্বেচ্ছাচারপূর্ণ। এক ব্যক্তির হস্তে সর্বপ্রকার ভার থাকিলে বাস্তবিকই বড় গােলযােগ ঘটে। একজন মানুষ হাজার বিজ্ঞ হইলেও সৰ্ব্ববিধ কাৰ্য সু, শৃঙ্খল ও ন্যায় রূপে করিতে পারে না। রুসিয়ার দশাও তাই। কেবল জার (সম্রাট) যাহা করিবেন, তাহাই ঠিক, কাজে কাজে রাজ্যশাসনের প্রতি সূক্ষ্ম রূপে দৃষ্টি পড়ে না, সম্রাট, মন্দকে ভাল বলিলেন, কাজেই তা ভাল হইল; আবার ভালকে মন্দ বলিলেন, কাজেই মন্দ হইল। এইরূপ স্বেচ্ছায় কাৰ্য্য করিলে আলােক আঁধার দুইই দেখা যায়। আর এক কথা, সংবাদপত্র রাজা প্রজা ও দেশের উন্নতির মূল। উহাতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন মনােভাব ব্যক্ত হইয়া বেশীর আগে সকলের মঙ্গল সম্পাদনই হইয়া থাকে, কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় যে, রুসিয়াতে যে সকল সংবাদপত্র আছে, সেগুলির কোন ক্ষমতাই নাই, সাক্ষীগােপাল-কলের পুতুল। ফুসরাজের ইচ্ছানুসারে তাহাদিগকে চালিত হইতে হয়। রাজ্যে রাজকর্তৃক একটা অন্যায় বা মা- ত্মক কাৰ্য্য হইল, সে কথা কাহারও.সাধ্য নাই যে মুখ ফুটিয়া বলে। সংবাদ পত্ৰসম্পাদকদিগকে মনের কথা মনেই চাপিয়া রাখিতে হয়। এই সকল অন্তু- রায় থাকাতে রুসগবর্ণমেন্টের প্রজাপালন, রাজ্যশাসন সকলই যেন বিভ্রাটের ছায়া।
রুসিয়ার ইতিহাস। ( যে সকল বিচারার্থী—কি রাজধানীর কি গ্রামের-সকলকেই স্বয়ং সম্রাটের নিকট আবেদন কয়িতে হয়। স্বয়ং সম্রাট সমস্ত কার্যের কর্তা অথচ একাকী সকল কাৰ্য্য করিয়া উঠিতে পারেন না। এইজন্য অনেক ব্যক্তিকে অনেক কষ্ট পাইতে হয়। যাহারা দূর হইতে আসে, তাহাদের আরও কষ্ট। কাৰ্য্য- সূত্ৰবশতঃ প্রত্যেক বিভাগে প্রজাগণকে ব্যতিব্যস্ত হইতে হয়। ঐ সকল বিভাগে ঘু লওয়ার বড় বাড়াবাড়ি দেখা যায় । ঘু না দিলে কোন ব্যক্তি শীঘ্র সম্রাটের নিকট হইতে পারে না, কাজেই দায়ে পড়িয়া রাজকর্মচারী দিগকে ঘু দিতে হয়। রুসিয়ার গবর্ণমেন্ট, আফিসগুলিতে প্রজার সর্বনাশ মূলক ঘুম্ লইবার যেরূপ অত্যাচার, পৃথিবীর অন্যান্য কোন স্থানেই তেমন দেখিতে পাওয়া যায় না। রুসীয় গবর্নমেন্ট আফিগুলিতে এরূপ উৎকোচ প্রচলনের প্রধান কারণ, রাজকর্মচারীরা অল্প হারে বেতন পান, সুতরাং রাজার অবিচারে ও অত্যাচারে প্রজার সর্বনাশ হয়। এমন কি, রুসীয় ধৰ্ম্মাধিকরণেও (আদালতে) এই উৎকোচরূপ অধৰ্ম্মের শ্রোত প্রবাহিত হইতেছে। যে সকল বিচারপতি রাজাজ্ঞায় বিচারকার্যের ভার পাইয়াছেন, তাহারাও ঘুস খাইয়া দোষীকে নির্দোষী ও নির্দোষীকে দোষী সাব্যস্ত করিয়া গুরুতর দণ্ড প্রদান করেন। ঘুসের অত্যাচারে অনেক সময় অনেক নিরীহ ব্যক্তিকেও প্রাণদণ্ড ভােগ করিতে হয়। লাল সাহেব তদীয় সচরিত্র” সমক গ্রন্থে লিখিয়াছেন, “ফুসিয়ার রাজকীয় ক্যাবিনেট কাউন্সেল হইতে সামান্য থানা পর্যন্ত সকল স্থানেই ঘুস ও অত্যাচারের বাড়াবাড়ি। এই সকল রাজকীয় কার্যালয়ে প্রত্যহ যে সকল উৎকোচ গ্রহণ ও অত্যাচার ঘটিয়া থাকে, তাহা প্রতিদিন নােট-বুকে লিখিয়া রাখিলে এক বৎসরে একখানা বৃহৎ পুস্তক হইয়া পড়ে।” বিসপ, জেমস্ সাহেবও এই কথা বলেন। তাঁহার মতে “রুসিয়ায় সম্রাট স্বেচ্ছাচারপতন্ত্র রাজা হওয়াতে প্রত্যেক রাজ কাৰ্যালয়ে উৎকোচ গ্রহণ ও অত্যাচারে এত বেশী যে, শুনিলে অসব বলিয়া মনে হয়। কুসিয়ায় এই সকল কুপ্রথা বহুকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে।” এক্ষণে আবার এই সকল কুরীতি কুনীতি এতদূর বুদ্ধমূল হইতেছে যে, রুসিয়ায় যতকাল স্বেচ্ছাচারী রাজা থাকিবেন, ততকাল ইহার মূলােৎপাটন হইবে না।
সুশিল্প। ১৭ রুসীয় সম্রাটের রাজনীতি ও শাসননীতির দোষে অনেক সময়ে প্রজাগণকে বার-পর-নাই ক্লেশ ভােগ করিতে হয়। রাজা সকল সময়ে সকল কাৰ্য্য স্বয়ং দেখিতে পান না, সুতরাং রাজকর্মচারীদের কথায় বিশ্বাস করিয়া এক একটা ভয়ানক অন্যায় কাৰ্য্য করিয়া বসেন। সময়ে সময়ে এইরূপ অন্যায় কাৰ্য্যের ফলভােগও তাহাকে করিতে হয়। এ বিষয়ে একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতেছে । -প্রথম আলেজান্দার এক সময়ে সাইবিরিয়ার গবর্ণর জেনেরেল স্পিরাংঙ্গী, (General Speranskii)র কথায় ৫০০ সাইবিৰীয় প্রজাকে কারারুদ্ধ করিয়া- ছিলেন। তাহারা ভাবিয়াছিল, সম্রাট সুবিচার করিবেন, কিন্তু এক্ষণে অন্যায়রূপে কারারুদ্ধ হওয়াতে সকলেই সম্রাটের উপর বড় বিরক্ত হইয়া উঠিল। অন্যান্য প্রজারাও রাজার এই গর্হিত কাৰ্যে ক্রুদ্ধ হইয়া, বড়যন্ত্র করিয়া তাহাকে হত্যা করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। যদ্যপি সম্রাট আজফ সমুদ্রস্থ টেগার নামক দ্বীপে স্বাভাবিক মৃত্যুমুখে পতিত না হইতেন, তা হইলে নিশ্চয়ই তাহাকে ষড়যন্ত্রীদের হস্তে নিহত হইতে হইত। রুসিয়ার সম্রাটদের এইরূপ ভয়ঙ্কর স্বেচ্ছাচারিতা দোষেই নিহিলিষ্টদিগের দল সৃষ্ট হইয়াছে। পূর্বে ইহাদের কথা বলা হইয়াছে। এই হলে স্ত্রী পুরুষ উভয় প্রকার লােকই আছে। • অষ্টম অধ্যায়। সূক্ষাশিল্প। যে দেশের লােকদের সর্বদাই রাজার মুখ চাহিয়া চলিতে হয়, অনেক সময়েই তাহাদের আত্মােন্নতির ব্যাঘাত ঘটে। আত্মােন্নতির ব্যাঘাত ঘটিলে স্বদেশের উন্নতিরও অনেক ক্ষতি হয়। রুসিয়ার সাধারণ লােকের ও দেশের এইরূপ ব্যাঘাত ও ক্ষতি দেখিতে পাওয়া যায়। স্বয়ং রাজা স্বেচ্ছাচারী হওয়াতে সাধারণ প্রজাবর্গের মনের ইচ্ছা মনেই রহিয়া যায়। সম্রাট যাহা নিজে পসন্দ করেন, সেইরূপ দ্রব্যেরই প্রয়ােজন, অনুসন্ধান ও রুসিয়ার ইতিহাস। সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া প্রায় অন্য নূতন বা প্রয়ােজনীয় সামগ্রী রুসিয়ায় দেখিতে পাওয়া যায় না। এই জন্য রুসিয়ায় এখনও অনেক প্রয়ােজনীয় লিঙ্গ সামগ্রীর অভাব রহিয়াছে। ৰাজার অনুৎসাহে বৈদেশিক বাণিজ্য ফুসিয়া দেশে তত পসার বৃদ্ধি করিতে পারে নাই। রুস সম্রাটের রাজসভায় ৰন্ত্রী প্রভৃতি যে সকল অমাত্যবর্গ থাকেন, সূক্ষ্মশিল্প বিষয়ে তাঁহাদেরও তত জ্ঞান নাই। যত টুকু আছে, তাও আবার বাজার ইচ্ছার সহিত না মিশিলে কোন কার্যেরই হয় না। পূৰ্বে পিটার দি গ্রেট ছদ্মবেশে দেশ বিদেশে ভ্রমণ করিয়া স্কুলশিল্প ও সূক্ষ্মশিল্প শিক্ষা সম্বন্ধে যেরূপ মনােযােগ দিয়াছিলেন এবং কাৰ্য্যেও যেরূপ কতকটা পরিণত করিয়াছিলেন, সেই প্রথা যদি আজিও পরবর্তী সম্রাটদিগের দ্বারা চলিয়া আসিত, তাহা হইলে রুসিয়া আজ ইংলণ্ড, ফ্রান্স, ইটালি, আমেরিকা প্রভৃতি উন্নতিশীল রাজ্যের শিল্পৰ্যের সহিত টুকর দিতে পারিত। রুসিয়াবাসী ধনিগণ ভূমি সম্পত্তি সইয়াই ব্যস্ত। তথাপি তাহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ আজ কাল শিল্প-সামগ্রীর উন্নতি সম্বন্ধে, মনােযােগ দিতেছেন। মধ্যবিত্ত লােকেরা এখনও অনেক দূরে পড়িয়া আছে। দরিদ্রদের তাে কথাই নাই। তাহারা চালিত না হইলে চলিতে পারে না, কারণ তাহাদের নিতান্ত অর্থাভাব। ফল কথা, যত দিন স্বয়ং সম্রাট না এ বিষয়ে মনােযােগী হইতেছেন, তত দিন শিল্পের উন্নতি কোন মতেই হইতে পারিবে না। নবম অধ্যায়। সৈন্য ও রণতরী। রুস-সম্রাটের ন্যায় পৃথিবীর অন্য কোন রাজার সৈন্য-সংখ্যা প্রচুর নহে। এই অপর্যাপ্ত সৈন্যবলেই রুসরাজ সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ভূখণ্ডের অধিকারী। ফুসের সৈন্স দেখিয়া ইউরােপের অন্যান্য রাজারা কুসরাজের সহিত লড়াই ঝগড়া করিতে বড় সাহসী হন না। এই সৈন্য-সংখ্যার পরাক্রমেই ফসিয়ায় ইংলণ্ডায় বাণিজ্যের পথ প্রায় বন্ধ হইয়া রহিয়াছে। এই জন্যই সৈন্য ও রণতরী। ১৯ রুসের আমদানী অপেক্ষা রপ্তানির ভাগই বেশী। কাহারও কারও মতে রুস-সম্রাটের সৈন্য সংখ্যা দশ লক্ষ, কাহারও মতে যা আট লক্ষ। ইহার মধ্যে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার সৈন্য সর্বদা রুসিয়ার সীমা রক্ষার জন্য নিযুক্ত আছে। বাকী সাড়ে আট লক্ষ সৈন্য তবে কি করে? কারণ আছে। রুসরাজ অপরাপর রাজাদের যে সকল রাজ্য যুদ্ধক্ষেত্রে জয় করিয়া নিজের করিয়া লইয়াছেন, সেই সকল রাজ্য শক্তভীতি হইতে নির্বিবাদে রাখিবার জন্য এ হেন প্রকাণ্ড সৈন্যমণ্ডলীর প্রয়ােজন। রুসরাজ যে সকল রাজ্য স্ববশে আনিয়াছেন, তত্রস্থ লােকদিগকে মনে তেমন বিশ্বাস করেন না—বিশ্বাস করেন, এই দশ লক্ষ সেনার অস্ত্রমুখে। রুসীয় গবর্ণমেন্টের আয় অপেক্ষা ব্যয় বেশী। সেনা-বিভাগে প্রতি মাসে যেরূপ অর্থ ব্যয় হয়, তাহা তুলনায় অতিরিক্ত হইয়া দাঁড়ায়। প্রত্যেক সৈনিকের বেতন ও রসদ অন্যান্য দেশের প্রত্যেক সৈনিকের অপেক্ষা পরতায় কম হইলেও রুসিয়ার পক্ষে বেশী। রুসীয় গবর্ণমেন্টের নিযুক্ত ক্রীত- দাসেরা রাজার তরফে কৃষিকাৰ্য্য করে। কিন্তু রাজার আদেশে তাহার সকলে যুদ্ধবিদ্যাতেও শিক্ষিত। তাহারা সচরাচর যেরূপ ‘ভাতা’ ও মাহি- য়ানা পায়, তাহা কুসিয়ার অন্য কোন স্বাধীন কৃষকের পক্ষে হইলে বড় কষ্ট কর হইয়া উঠে। কিন্তু ঐ সকল রাজভৃত্য অভ্যাস বশতঃ ঐরূপ সামান্য অবস্থাতে থাকিয়াও বেস বলিষ্ঠ ও হৃষ্টপুষ্ট হয়। অল্প পাইয়া, অল্প খাই এরূপ পররাজ্য আক্রমণকারী সৈন্য কোন দেশে দেখা যায় না। তবে তাদের একটি আশা থাকে, যখন তাহারা অন্য কোন রাজার রাজ্য জয় করিতে পারে, তত্রস্থ লুষ্ঠিত দ্রব্য হইতে সকলেই কিছু কিছু পুরস্কার পায়। যাহা হউক, প্রথম নিকোলাস (প্রথম আলেজান্দার) ভূপতির সময় হইছে ফুস সৈন্যদের অবস্থার কিছু উন্নতি হইয়াছে। ১৮৩০ খৃষ্টাব্দে পােলণ্ডদেশে বন বিভাগ এবং পারস্য ও তুরস্কের রাজভাণ্ডার হইতে অপৰ্যাপ্ত পরিমাণে যে টাকা রুল বাজভাণ্ডারে জমা হইয়াছিল, এক্ষণে সেই টাকাতেই রুঙ্গ স্যৈগণের গ্রাসাচ্ছাদনের অনেকটা সুবিধা হইয়াছে। তদ্বতী’ সেই টাকা দেশের রাজপথ, সেতু জলাশয়, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ প্রভৃতিতে ব্যন্বিত হুইতেছে।
রুসিয়ার ইতিহাস। : পিটার দি গ্রেটের পূর্বে রুসিয়ায় উচ্চদরের নৌ-বিদ্যা প্রচলন ছিল না। তিনি হলও, ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশে গিয়া স্বয়ং উক্ত হিতকরী বিদ্যা শিখিয়া আসিয়াছিলেন। তাহার সময় হইতেই রুসিয়াতে রণতরীর সৃষ্টি হয়। এক্ষণে রুসিয়া রণতরীর বলে বলীয়ান হইয়া জলযুদ্ধেও ইতস্ততঃ অগ্রসর হইতেছে। এক্ষণে রুসিয়া তরফে বণ্টিক সাগর ও কৃষ্ণসাগরে ম্যান অব ওয়ার, ফিগেট, করভেট, ব্রিগ, স্কুনার, কটার, ইয়াট, ষ্টিমার এবং অন্যান্য জলমানের সংখ্যা অনেক বাড়িয়াছে। দশম অধ্যায়। পুলিষ, পােঞ্চাপিস ইত্যাদি। আমাদের দেশেও পুলিষের যেরূপ অত্যাচার, ফুসিয়াতেও সেইরূপ। বিশেষতঃ রুসিয়া পুলিষ কৰ্মচারীদিগের নিকটে বৈদেশিকদিগকে সময়ে সময়ে বড় কষ্ট পাইতে হয়। রুসীয় পুলিষগুলি কেবল চোর ধরিবার জন্য নয়, সেখানে রাজনীতির চর্চা হইয়া থাকে। পুলিষের লােকসংখ্যাও অনেক। প্রত্যেক বড় বড় শহর, বিভাগ এবং উপবিভাগে বিভক্ত। প্রত্যেক অলেই এক একটি করিয়া পুলিষ-আপিস আছে। সেই সকল পুলিষ সৰ্ব্বদা নগরবাসীদিগের কার্যের উপর দৃষ্টি রাখে; বিশেষতঃ বৈদেশিক লােকদিগের উপর উহাদের দৃষ্টি অচল। ডাক্তার লায়াল দেখিয়াছিলেন, মস্কাউনগরে এক জন হেড পুলিষ-মাষ্টার, একজন পলিটিক্যাল অফিসার, তিন জন উচ্চ শ্রেণীর পুলিষ-মাষ্টার, ২০ জন ইনেস্পেক্টার এবং প্রত্যেক ইনেস্পেক্টারের সহিত দুই জন সার্জন, ৮৮ জন সব-ইনেস্পেক্টার এবং তাহাদিগের সহিত প্রয়োজনীয় লােক জন, ১০৮০ জন গােয়েন্দা এবং ২০০ শতের অতিরিক্ত কনেষ্টবল, ছিল। ঐ সকল পুলিয় কর্মচারীদিগের মধ্যে কসাক এবং জোৰমিস লােকের সংখ্যাও বড় কম ছিল না। সে সময়ে মস্কাউনগরে দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার লােক ছিল। তাহাদিগের রক্ষণাবেক্ষণ ও শাসনের ধর্ম ও ধর্মযাজকগণ। । জন্য মস্কাউনগরের পুলিষ কর্মচারীদিগের সংখ্যা অতিরিক্ত। তথাকার পুলিষের লােকেরা প্রজা-রক্ষণের ভার-রক্ষার ভান করিয়া জবরদস্তীতে অর্থ ভক্ষণ করিত। প্রজারা প্রাণের দায়ে ঐ সকল ধুরন্ধকে ঘুস দিয়া ঘুসির ঘা এড়াইত। মস্কাউ পুলিষের বড় বড় কর্মচারীরা বৎসরে কেবল ১৫০ টাকা বেতন পাইত। সেই বেতনে আবার ঘােড়র খােরাক এবং পােষকের খরচ যােগাইতে হইত। কাজেই ঘুসের বাড়াবাড়ি হইত। লায়াল সাহেব যাহা দেখিয়া গিয়াছেন, রুসিয়ায় আজিও তাহা বৰ্ত্তমান। রুসিয়া যেন ঘুসের দেশ! আপিসে আপিসে ঘুস, কথায় কথায় ঘুস! সেখানকার পােষ্ট আপিসেও চিঠি পত্রের সঙ্গে ঘুসের চলন ! আমাদের এখানে রেলওয়ে, জেটিতে, আদালতে, পুলিষে এবং অন্যান্য কাৰ্যে অনেককে ঘুস দিয়া কাৰ্য্য-সাধন করিতে হয় বটে, কিন্তু রুসিয়ায় কিছু বাড়াবাড়ি। ঘুস দাও, তােমার পত্রখানি শীঘ্র গন্তব্য স্থানে চলিয়া যাইবে, নহিলে হয়ত পত্রের কোন খবরই পাওয়া যাইবে না। রুসিয়ার কষ্টম-হাউসে মাল আম- দানী ও রপ্তানীর ঘুস বড় চড়া। । একাদশ অধ্যায়। ধর্ম ও ধর্মযাজকগণ। রুসিয়ার সম্রাট খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী। প্রােটেষ্টান্ট, রােমান ক্যাথলিক, গ্রীক চর্চ, প্রিটেবেরিয়া প্রভৃতি কয়েক সম্প্রদায়ে খৃষ্ট ধর্ম বিভক্ত। রুসিয়াধিপতি এবং তাঁহার রুসীয় প্রজাগণ গ্রীক-চচ্চমতাবলম্বী। এক চর্চের মধ্যে সমাধিস্থ ব্যক্তিগণকে পূজা করিতে পারা যায় না, কিন্তু সেই সকল ব্যক্তির স্বতন্ত্র প্রতিমূর্তিকে পূজা করা যাইতে পারে। গ্রীক চর্ডের মূল বিশ্বাস, রােমান ক্যাথলিক ধৰ্ম্মের সহিত বড় বিভিন্ন নহে; কিন্তু ক্রিয়াকলাপ সম্পূর্ণ বিভিন্ন। কসীয় গির্জায় ভজনার সময়ে কোনরূপ বাদ্যযন্ত্র বাদন করা নিষিদ্ধ। কেবল খৃষ্টীয় পুরােহিতেরা ভজনার সময় উচ্চ গম্ভীর স্বরে বাইৱেল সূত্র রুসিয়ার ইতিহাস। পাঠ করেন। কোন পৰ্ব্বাহে, কি কোন বিশেষ ধৰ্ম্মকার্যের সময়ে রুসিয়ার খৃষ্টানগণ খুব জাঁকজমকের সহিত ধৰ্ম্মমন্দিরে গিয়া ভজনা করে। রােমান ক্যাথলিকেরা সে জাকজমকের সহিত টক্কর দিতে পারে না। যদিও অন্যান্য শ্ৰীকচচ্চ মতাবলম্বীরা কনস্তান্তিনােপলের পেত্রিয়াককে তাহাদের প্রধান ধৰ্ম্ম- সমাজপতি বলিয়া বিশ্বাস করে, কিন্তু রুসীয়েরা তঁাহার সেই শ্ৰেষ্ঠতা স্বীকার করে না। তাহাদের মত রুসের রাজাই তাহাদের ধর্মসমাজপতি। খৃষ্টীয় পুরােহিতেরা দুই ভাগে বিভক্ত—গার্হস্থ্য (Secular) এবং কৌমারব্রতী (Monastic )। রােমীয় চর্ডেও এই দুইটি বিভাগ আছে। গৃহস্থ পুরাে- হিতেরা সংসার-ধৰ্ম্মও করে এবং ধর্মযাজনও করে। কৌমারব্ৰতীরা যাবজ্জীবন অবিবাহিতাবস্থায় থাকিয়া ধৰ্মচচ্চায় কালক্ষেপ করে। কৌমারব্রতাবলম্বী খৃষ্টীয় সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীরা উচ্চ দরের জ্ঞান ও সদাচরণবিশিষ্ট না হইলে এই উচ্চ পদ হইতে বিচ্যুত হয়। চির-কুমার-ব্ৰতধারীদিগের মধ্য হইতে উচ্চ দরের ধর্মযাজকদিগকে গ্রহণ করা যায় ; এবং তাহাদিগকে ক্ষমতানুসারে মেটোপলিটা, আর্ক-বিশপ, বিশপ, আর্কি মণ্ডইট বা ফ্ল্যাবট, হিগৌমিন বা প্রায়ার এবং মঙ্ক প্রভৃতি উপাধি দেওয়া হইয়া থাকে। গার্হস্থ্য ধৰ্ম্মযাজকদিগের সংখ্যা বেশী। তাঁহাদিগের মধ্যে আঞ্চলিক পুরােহিত বা পােপের পরিগণিত। কসিয়ার সাধারণ ধৰ্ম্মযাজকেরা প্রায় মূখ ও অলস এবং কতকটা কৃষিকার্যের জ্ঞান ব্যতীত অন্য বিষয়ে জ্ঞানশূন্য। উহারা প্রায় সমাজের সহিত মিশ্রিত হয় না। ক্রীতদাসগণের উপরেই আধিপত্য করে। রুসিয়ার পৌরহিত্য পদ বংশানুক্রমিক হইয়া থাকে। গৃহস্ত ধর্মযাজকের বিবাহ করে, কিন্তু যদি কাহারও পত্নীবিয়ােগ হয়, তবে তাহাকে জীবনের অবশিষ্ট কাল একাকী অতিবাহিত করিতে হয়। রুসিয়ার ধর্মযাজকেরা রাজার নিকট হইতে নিস্কর ভূমি প্রাপ্ত হয়। তা ছাড়া তাহার পরলােকগত সন্ন্যাসী- দের সমাধি-মৃত্তিকা বা ছবি লইয়া ধনী ব্যক্তিদিগের বাটী গিয়া প্রসাদ স্বরূপ অর্পণ করে, এবং তৎপরিবর্তে কিছু কিছু অর্থ পায়। লােকের জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু হইলে, তাহার আত্মীয়ের মঙ্গল লাভের আশায় ঐ সকল ধর্মযাজককে কিছু কিছু দর্শনি দিয়া থাকে। রুসিয়ার ধর্মযাজকগণ ধৰ্ম্মসম্বন্ধে কিছু না জানুক, কিন্তু আত্মগৌরবের জন্য বড় লালায়িত। ধর্মযাজকের মুখে যেরূপ চলিত মুদ্রা ও রাজস্ব। ধৰ্ম্মের ভান করে, মনে তেমন নয়। উহাদের ন্যায় রুসিয়ার সাধারণ লােক- দিগেরও ধর্মবিশ্বাস মৌখিক। এক জন ধৰ্ম্ম-যাজকের বক্ষঃস্থলে সিভিল অর্ডারের “জেন্টিল সােসাইটি” (Genteel Society )র পদক দেখিলে রুসেরা তাহাকে যত দূর খাতির করে, ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে তা’র সিকিও নহে। আজ পর্যন্ত রুসিয়াতে রুসীয়-গ্রীকচর্ডের অনুমােদিত ধৰ্ম্মের কোনরূপ মতভেদ হয় নাই। ইহার প্রধান কারণ, রাজশাসন। রাজার আইনে এরূপ লিখিত আছে যে, কোন দেশীয় রুস সাইবিরিয়াতেও নির্বাসিত হইয়া যারপর নাই কষ্টভােগ করিলেও স্বেচ্ছায় এই ধর্ম ত্যাগ করিতে পারিবে । এক সময়ে এই ধর্মের কতকগুলি লােক র্যাকনিক্স, অর্থাৎ ধৰ্ম্মা- স্তরগ্রাহী হইয়া ধৰ্ম্মদ্রোহ উপস্থিত করিয়াছিল, কিন্তু রাজ-প্রতাপে তাহারা কৃতকার্য হইতে পারে নাই। ডাক্তার ম্যাকৃমিচে এই বিষয় লিখিয়া গিয়াছেন। তিনি আরও বলেন, তদানীন্তন রুস-সম্রাট ঐ সকল ধর্ম- দ্রোহীদের ভাবভঙ্গী দেখিয়া নিজের অনিষ্ট-চিন্তা করিয়াছিলেন। এই জন্য তাহাদিগকে যমালয় স্বরূপ সাইবিরিয়ার অভেদ, অন্ধকারময় সুড়ঙ্গ-গর্ভে চিরকালের ন্যায় আটক রাখিয়াছিলেন। দ্বাদশ অধ্যায়। চলিত মুদ্রা ও রাজস্ব। রুসিয়া রাজ্যে সােণা রূপার খনি থাকিতেও টাকার চলনটা বড় ভাল নয়। স্বর্ণমুদ্রা তত দেখাই যায় না। রুবল নামে এক প্রকার রৌপ্যমুদ্রার চলন আছে। ঐ রুবল যেমন পুরা আকারে চলে, সেইরূপ আবার আধ সিকি দশা ও বিভাগেও রাজ্যময় চলিত হয়। বাজার-ভাও বুঝিয়া কখন একটি রুবলের মূল্য আমাদের টাকার হিসাবে ২০১০ পড়তায় বাড়িয়াছিল, কখন আবার ১১০ পড়তায় কমিয়াছিল। কিন্তু এক্ষণে একটি রুবলের মূল্য ১০০ টাকা। রূবল মুদ্রা রৌপ্য ব্যতীত গবর্ণমেন্ট করেন্সি নােটরূপেও ব্যবহৃত হয়। প্রথমে যখন রুল-নােট-প্ৰচলন আরম্ভ হইয়াছিল, তখন ২৪ রুসিয়ার ইতিহাস। রাজার মৎলব ছিল যে, রূপার রুবলের মত নােটেরও মূল্য সমান থাকিবে, কিন্তু প্রজা সাধারণে রূপার বদলে কাগজ দেখিয়া নােট গ্রহণে বড় সম্মত হইল না। সুতরাং কম দরে চলিতে লাগিল। একখানা রুবল নােটের মূল্য একটা রৌপ্য রুবলের সিকি মূল্যে দাঁড়াইল। তা ছাড়া একুশ্চেঞ্জের দর বুঝিয়া রুবল নােটের মূল্য কম বেশী হয়। যাহা হউক, মোটের উপর একখানা রুবল নােটের মূল্য সচরাচর আমাদের ১০ দরে বিক্রয় হয়। রুসিয়াতে একটি রূপার সিকি কুবলে একখানা রুবল-নােট পাওয়া যায়। কোপে নামে এক প্রকার তাম্র-মুদ্রারও প্রচলন আছে। ১০০ কোপেকে একখানা রুবল নােট পাওয়া যায়। কুসিয়ায় রুবল অপেক্ষা কোপেকের চলনই বেশী। রুস টাঁকশালে এক সময়ে প্লাতিনা ধাতুর মুদ্রা তৈয়ার হইয়াছিল, কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই হঠাৎ ঐ ধাতুর মূল্য হ্রাস হওয়াতে মুদ্রারও দর কমিয়া গিয়াছিল। এই এক্ষণে প্লাতিনা-ধাতু-মুদ্রার আর প্রচলন নাই। রুসিয়ায় যত সংখ্যক ব্যাঙ্ক নােট চলিতেছে, উহার মূল্য ১,০০,০০,০০,০০০ এক শত কোটি রুবল অর্থাৎ আমাদের পৌনে দুই শত কোটি টাকা। সেন্ট পিটার্সবর্গের এসাইনেশিওনই ব্যাঙ্ক (-Assignationnoi Bank) হইতে রুবলনােটের আদান প্রদান হয়। সাইবিরিয়া প্রদেশে ঔরাল পর্বতের খনিতে স্বর্ণ পাওয়া যায়। ঐ সকল স্বর্ণখনির কতকগুলি রুস গবর্ণমেন্টের খাসে এবং অপরগুলি অন্যান্য সওদা- গরের দখলে আছে। ১৮২৭ খৃষ্টাব্দে ঔরাল পৰ্ব্বতের সমস্ত খনি হইতে ১২১ মােণ ১৪ সের স্বর্ণ উঠিয়াছিল ; উহার মূল্য ৬০,০০,০০০ ষাট লক্ষ টাকা। রুসিয়ার অন্তর্গত কলিভানােভক্রেসেঙ্কস এবং ষ্টারশ্চিঙ্কস্ নামক দুইটি স্থানে যে সকল রৌপ্য-খনি আছে, তন্মধ্যে ১২টি খনি রুস গবর্ণ- মেণ্টের নিজের। ঐ ১২টি খনি হইতে ১২০০ শত পাউণ্ড বা ইংরেজি ৪৩,২০০ তেতাল্লিশ হাজার দুই শত-পাউণ্ড বা বাঙ্গালা ৫২৩/৫ পাঁচ শত তেই মােণ পাঁচ সের রৌপ্য উৎপন্ন হয়। ইহা ছাড়া ৩৮,০০০ আটত্রিশ হাজার পাউণ্ড, সীস ধাতু পাওয়া যায়। ঔরাল পৰ্বতে ছয়টি এবং অণ্টাই পৰ্বতে একটি রাজ- কীয় তাম্ৰখনি আছে। ঐগুলি হইতে ৫২,০০০ হাজার পাউণ্ড, তা উঠিয়া ব্যবসায়, বাণিজ্য ও উৎপন্ন দ্রব্য। থাকে। তা ছাড়া ২৭টি বেসরকারি খনি হইতে ১৫৯,০০০ পাউড তাত্র উং- পন্ন হয়। উহা হইতে শুল্ক স্বরূপ ২০,৮০০ পাউড, গবর্ণমেন্টকে দেওয়া হয়। সরকারী ও বেসরকারী লৌহখনিগুলি হইতে বাৎসরিক ২,০০,০০০ পাউড, লৌহ উৎখাত হয়। বেসরকারী খনিগুলি হইতে রুসীয় গবর্ণমেন্ট প্রতিবৎসর ১,২০০,০০• রুবল শুল্ক প্রাপ্ত হন। সকল প্রকার খনিতে ১৬০,••• এক লক্ষ ষাট হাজার মজুর খাটে। পূৰ্ব্বাপেক্ষা এক্ষণে সমস্ত খনির কাৰ্য্য অনেক বৃদ্ধি হইয়াছে। গবর্ণমেণ্ট ও স্বতঃ পরতঃ বিলক্ষণ লাভ করিতেছেন। বেসরকারী খনিব্যবসায়ীগণকে পরিশ্রমের মূল্য দিয়া মজুর খাটাইতে হয়, কিন্তু রুসীয় গবর্ণমেন্ট নির্বাসিত লােকদিগের দ্বারা অধিকাংশ খনিকাৰ্য্য সমাধা করিয়া থাকেন। কয়েদীদের মােটামুটি ভাতেপােড়া গােছের যৎকিঞ্চিৎ আহার দিয়া নিজের লভ্যাংশটা বেস্ বুঝিয়া লন। অর্ধশতাব্দী পূৰ্বে রুসরাজ্যের বাৎসরিক রাজস্ব ৪৫০,•••••• পঁয়, তাল্লিশ কোটি রুবল বা ৭৮,৭৫,০০,০০০ আটাত্তর কোটি পঁচাত্তর লক্ষ টাকা আদায় হইত। এক্ষণে একশত কোটিরও বেশী হইয়াছে। ক্রীতদাসদের মাথাগুন্তি কর (Capitation tax)*, সরকারি কৃষকদের খাজনা(Obrok), সুরা ও লবণের একচেটিয়া ব্যবসা, কষ্টম হাউ, খনি, টাকশাল, ষ্টাম্প, ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য শুল্ক হইতে এই রাজস্ব আদায় হয়। এই টাকা হইতে সরকারি কর্জ করা টাকার সুদ ৪০,০০০,০•• চার কোটি রুবল বা তদপেক্ষা বেশী রুবল প্রতি বৎসর খরচ হইয়া যায়। অবশিষ্ট টাকা রাজকাৰ্য-সংক্রান্ত ব্যাপারে ব্যয়িত হয়। ত্রয়ােদশ অধ্যায়। ব্যবসায়, বাণিজ্য ও উৎপন্ন দ্রব্য। কুসিয়ায় বহির্বাণিজ্য ও অন্তর্বাণিজ্য, দুই প্রকার বাণিজ্যই দেখা যায়, • ১৮৬১ খৃষ্টাব্দে সগবর্ণমেণ্ট ক্রীতদাসত্ব-প্রথা উঠাইয়া দিয়াছেন। ইহাতে ২,৬৩,০০০ দুই কোটা তদাস মুক্তিলাভ করিয়াছে।
রুসিয়ার ইতিহাস। তবে অবাণিজ্যাপেক্ষা বহির্বাণিজ্যই বেশী। কুসিয়া যে সকল দেশের সহিত বাণিজ্য করে, তন্মধ্যে গ্রেট বৃটনই প্রধান। ১৮৩৫ খৃষ্টাকে রুসিয়াতে সৰ্বশুদ্ধ ৮,৭৩,৩৪,৪৮০ টাকার দ্রব্য আমদানি হইয়াছিল, তম্মধ্যে এক গ্রেট বৃটন হইতেই ৩১৭,১৫,৮৩০ টাকার সামগ্রী; বাকি টাকার জিনিষ অন্যান্য দেশ হইতে। সেই বৎসরের রুসীয় রপ্তানি দ্রব্যের মূল্য ৮,৬৩,৬২,৬৭• টাকা, তন্মধ্যে গ্রেট বৃটনে ৪০,১,৩০,৩৯০ টাকার দ্রব্য রপ্তানি হইয়াছিল। গ্রেট বৃটন হইতে আমদানি দ্রব্যের মধ্যে কাপড়, ক্লামিশ্রিত পশম, দড়ির জন্য মােটা সূতা, তুলার জিনিষ, কাফি, নীল, সীসধাতু, মসলা, চিনি, রেশম, তামাক, সুরা, পশমী জিনিষ এবং ঔষধের গাছগাছড়াই প্রধান। কুসিয়া হইতে ঐ দ্বীপে রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে ধাতুভস্ম, পশুলােম, বাহাদুরী কাষ্ঠ,পাট, শােণ, চৰ্ম্ম, লৌহ, তিসি, মাদুর, জাহাজের পালের কাপড়, পশম, ক্যাম্বি, সাবা, মােমবাতি, ধাতুর তার, পটাশ, পশম-জমানাে কাপড়, লবণজারিত মৎস্য ও মাংস, মৎস্যশিরিশ ও চৰ্বিই প্রধান। বিশেষতঃ এক চব্বির রপ্তানিতে রুসিয়ার অপরাপর রপ্তানি দ্রব্যের অর্ধেক লাভ হয়। ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দে আমদানি ও রপ্তানি দ্রব্যের মাসুলে কুসীয় গবর্ণমেন্ট ৩,৪৮,৬৪,২০০ টাকা পাইয়াছিলেন ; তম্মধ্যে এক গ্রেট বৃটন হইতেই ১,১৬, ৯৯,৮৬০ টাকা শুল্ক আদায় হইয়াছিল। কুসিয়ার যে সকল বন্দর হইতে মাল আমদানি ও রপ্তানি হয়, তাহাদের মধ্যে বণ্টিক সাগরে, সেন্টপিটার্সবর্গ, রিভেল এবং রিগা; শ্বেত সমুদ্রে, আর্কেলে এবং কৃষ্ণসাগরে ওড়েসা বন্দর। সেই সকল বন্দরে বিদেশীয়েরা কেবল বহিবাণিজ্য করিতে পায়, কিন্তু অন্তবাণিজ্য দেশীয়দিগের একচেটিয়া।, গ্রেট বৃটনের সহিত রুসিয়ার বাণিজ্য-সম্বন্ধ বৃদ্ধি না হইয়া বরং হ্রাস হইয়াছে। এরূপ হইবার কারণ এক্ষণে রুসিয়া, আমেরিকা এবং তুরস্কের সহিত প্রচুর পরিমাণে মাল আমদানি ও রূপ্তানি করিয়া থাকে। ফ্রান্স, অষ্ট্রিয়া এবং হলণ্ড প্রভৃতির সহিতও রুসিয়ার বাণিজ্য সম্বন্ধ বৃদ্ধি হইয়াছে। বহির্বাণিজ্য ব্যতীত রুসিয়ার অন্ত- বাণিজ্য বড় কম নহে। রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন অংশে দেশীয়েরা মাল আম- দানি ও রপ্তানি করিয়া থাকে। ১৮৩৬ খৃষ্টাকে অন্তবাণিজ্যের জন্য বটিক সাগরে ১১২৫ এবং কৃষ্ণসাগরে ৪৩৫৬ খানি বাণিজ্যপােত ছিল। সেই বৎ ব্যবসায়, বাণিজ্য ও উৎপন্ন দ্রব্য। २१ সরে বৈদেশিক মাল খালাস করিবার জন্য রুসিয়া ৯৪২ খানি জাহাজ রাখিয়াছিল। পূৰ্ব্বে রুসিয়ায় বৈদেশিকেরা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করিতে পাইত, কিন্তু এক্ষণে শুল্ক দিতে হয়। রুসিয়ায় দেশীয় সওদাগরেরা মূল ধনের তারতম্যে তিন ভাগে বিভক্ত। ১৮২৯ খৃষ্টাব্দে যে সকল সওদাগরের প্রত্যেকের পঞ্চাশ হাজার রুবল মূলধন ছিল, তাহাদের সংখ্যা ১৪৯৭। উহারাই প্রথম শ্রেণীর সওদাগর। দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রত্যেক সওদাগরের মূলধন ২০ হাজার রুবল। উহাদের সংখ্যা ৩১৯৮। এবং তৃতীয় শ্রেণীর প্রত্যেক সওদাগরের মূলধন ৮ হাজার রুবল। উহাদের সংখ্যা ৬৮,২১২। ঐ সকল সওদাগরের মধ্যে ৭৫২৫ জন য়িহুদী এবং ১০৫০ জন মুসলমান ছিল। এক্ষণে ক্রমে ক্রমে সওদাগরের সংখ্যা খুব বৃদ্ধি হইতেছে। ১৮৬১ হইতে ১৮৫১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ১০ বৎসরের মধ্যে রুসিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্য দ্বিগুণ বাড়িছে। ১৮৭০-১৮৮০ খৃষ্টাবে চুয়ান্ন হইতে একানব্বই কোটি টাকার জিনিষ আম- দানি ও পঞ্চান্ন কোটি হইতে ছিয়ানব্বই কোটি টাকার জিনিস রপ্তানি হই- যাছিল। রুসিয়ায় রেলওয়ের বিস্তার হওয়াতে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য পূৰ্ব্বা- পেক্ষা খুব বাড়িয়াছে। ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে প্রায় ১৫,০০০ পনর হাজার মাইল রেলপথ খােলা হইয়াছিল। বর্তমান সময় পর্যন্ত আরও বেশী হইয়াছে। বিশেষতঃ ভারতীক্রমণের অভিপ্রায়ে রুস্-রেলওয়ে আফগানিস্তানের সীমা পর্যন্ত আসিয়া উপস্থিত। ১৮৮২ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রুসীয় টেলিগ্রাফ লাইন ৬০,••• ষাট হাজার মাইল বিস্তৃত হইয়াছিল ; এক্ষণে আরও অগ্রসর হইয়াছে। এইবার রুসিয়ার উৎপন্ন দ্রব্যের বিষয় কিছু বলা যাউক। রুসিয়ায় অন্যান্য দেশের ন্যায় বহুপূৰ্বে ব্যবহারিক শিল্পের (Manufacture)এর চলন হই- যাছিল, কিন্তু পঞ্চদশ ও ষােড়শ শতাব্দীতে জার প্রথম ইভান ও দ্বিতীয় ইভানের রাজত্বকালে রুসিয়া স্বাধীন হইয়াছিল বলিয়া উক্ত উভয় জার স্ব স্ব সময়ে ফসিয়ার উন্নতির জন্য জৰ্ম্মণি, নিদারুলণ্ড ও ইতালী দেশ হইতে ভাল ভাল শিল্পকর অনাইয়াছিলেন। ঐ সকল শিল্পী রাজাজ্ঞায় মস্কাউ, ইয়ারােলা, লেঙ্ক এবং কীব নামক নগরগুলিতে কাৰ্য্য ভারত“রিষা- রুসিয়ার ইতিহাস ২৩১৬২৪। ছিল। তৎকালে ঐ সকল স্থানের কারখানায় পশমী কাপড়, লিনেন কাপড়, অস্ত্রশস্ত্র প্রভৃতি তৈয়ার হইত। কিন্তু রমানফ পরিবারের সিংহাসন প্রাপ্তির পূৰ্ব্বে আত্মবিগ্রহ উপস্থিত হওয়ায় এবং সুইডেন ও পােলণ্ডের রুসিয়ার প্রতি দৃষ্টি পড়ায়, রাজ্যশাসন বিশৃঙ্খল হইয়া পড়িয়াছিল। সুতরাং সে সময়ে রুসিয়ার নবজাত ব্যবহারিক শিল্পেরও সর্বনাশ ঘটিয়াছিল। এইরূপে কিছুকাল গেলে পর পিটার দি গ্রেটের সময় হইতে পুনৰ্বার রুসীয় শিল্পের উন্নতি আরম্ভ হয়। ১৮১৫ খৃষ্টাব্দে সৰ্ব্বসমেত ৩২৫০টি কারখানা ছিল। সেই সকল স্থানে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার কারিকর ও মজুর খাটিত। ১৮২৯ খৃষ্টাব্দে কারখানার সংখ্যা বাড়িয়া ৫২৬৯টি হইয়াছিল। ঐ সকলের কারিকর ও মজুরের সংখ্যা ১৮৩৯ খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভে ৬,৮৫৫টি কারখানা ছিল এবং উহাতে ৪,১২,৯৩১ মজুর খাটিত। ঐ সময়ে রুসিয়ায় পশমী জিনিষের ৬১৬, রেসমী জিনিষের ২২৭, ভূলার জিনিষের ৪৬৭, লিনেন কাপড়ের ২৬৭, চর্বি গলা- ইবার ৫৫৪, মােমবাতি তৈয়ার করিবার ৪৪৪, সাবান তৈয়ার করিবার ২৭, খাতুর তার তৈয়ার করিবার ৪৮৬ এবং চামড়া তৈয়ার করিবার ১১১৮টি কারখানা ছিল। কারখানা সম্বন্ধে মস্কাউ নগর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ ছিল। তার নীচে বুডিমির, নিজনীনবগরদ, সরাটোব, এবং সেন্ট পিটার্সবর্গের খ্যাতি ছিল। এক্ষণে এই সকল কল-কারখানার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হইয়াছে, সুতরাং মজুরের সংখ্যাও তদুপযুক্ত ৰাড়িয়াছে। রুসিয়ার কারখানাগুলিতে কয়েক প্রকার লৌহকাৰ্য, পালের কাপড়, থলে, চৰ্ম্ম, শােণ ও পাটের পদা ব্যতীত প্রায় অন্যান্য সামগ্রী তেমন উৎকৃষ্ট নয়। খােলাভটির মদের দৌলতে ২৭ কোটি রুবল উপার্জিত হয়। তন্মধ্য হইতে রুসীয় গবর্নমেন্ট শুল্কস্বরূপ ১ কোটি রুবল পাইয়া থাকেন। রুসিয়ায় মদ ও মদের ব্যবসাতে খুব ঘুষ ও ঘুষি চলে। মক্কাউ প্রদেশে রেশম ও ভূলার কতকগুলি কারখানা আছে। সেখানে কতকটা কাৰ্যসিদ্ধিও হইয়া থাকে। ইংলণ্ড এবং ফরাশি প্রভৃতি দেশ হইতে ভাল ভাল শিল্পকরেরা সেখানে আসিয়া সূক্ষ্ম শিল্পের বিশেষ উন্নতি করিয়াছে। পিটাসবর্গ নগরের সহয় তলীতে কতকগুলি বড় বড় রাজকীয় কল-কার- ব্যবসায়, বাণিজ্য ও উৎপন্ন দ্রব্য। খানা আছে। সেই সকল কারখানায় গবর্ণমেণ্ট তরফের মজুরের কাজ করে। ঐ সকল কারখানায় কাচ ও চীনা বাসনের কাৰ্য বেশীর ভাগে হইয়া থাকে। উহাদের মধ্যে একটি কারখানায় দুইটি বৃহৎ দর্পণ প্রস্তুত হইয়াছিল। একখানি দর্পণ টেরিডার রাজপ্রাসাদে এবং অপরখানি অপশি হাউসে ডিউ অব ওয়েলিংটন কর্তৃক উপহার প্রদত্ত হইয়াছিল। ঐ দুই- খানি বৃহৎ দর্পণের মধ্যে একখানির দৈর্ঘ্য ১৯৪ ইঞ্চ এবং প্রস্থ ১০০ ইঞ্চ। তত বড় আয়না পৃথিবীর আর কোথাও নাই। আলেকজান্দ্রাস্কি জাবদ নামক ভূলার কারখানাটি খুব বড়। ঐ কারখানায় যেমন জিনিষপত্র প্রস্তুত হয়, তেমনি ঐ সকল জিনিষপত্ৰ প্ৰস্তুত করিবার যন্ত্রাদিও ঢালাই হয়। অধি- কন্তু সেখানে খেলিবার তাসও তৈয়ার হয়। ঐ তাস বিক্রয় করিয়া বাৎসরিক দুই লক্ষ টাকা লাভ হয়। সেন্টপিটার্সবর্গ হইতে ৩৪ ভাষ্ট* (কসীয় পথমান বিশেষ) দূরে কোলপিংসই গ্রামে জাহাজ তৈয়ার করিবার একটি বৃহৎ কার- খানা আছে। উহাতে ইংলণ্ডের ন্যায় পােত-নির্মাণের ভাল ভাল জিনিষ তৈয়ার হয়। ফুসিয়ায় লৌহের কারখানার সংখ্যাই সর্বাপেক্ষা বেশী। উহার কতক- গুলি সরকারী ও কতকগুলি বেসরকারী। ঐ সকল কারখানায় যুদ্ধাস্ত্র ও ছুরি, কাঁচি, কাঁটা প্রভৃতি সকল প্রকার লােহার জিনিষ প্রস্তুত হয়। সাই- বিরিয়ার সীমান্তে একাটারিনবর্গ নগরের নিকট ইয়াকড়লে পরিবারের লৌহ-কারখানাটি বিশেষ প্রসিদ্ধ। উহাতে প্রত্যহ ছয় হাজারের অতিরিক্ত মজুর কাজ করে। রুসিয়ার আরমেনীয়, বুকারীয় এবং যিহুদীরা প্রধানতঃ তদ্দেশজাত বাণিজ্য-দ্রব্য লইয়া চীন, পারস্য, এসিয়ামাইনর প্রভৃতি দেশে বিক্রয় করে। পূৰ্ব্বে ভলগা নদীর উত্তর তটস্থ মকারিফ নগরে যথাসময়ে একটি বৃহৎ মেলা হইত। ঐ মেলাতে চারি দিকের লোক আসিয়া স্ব স্ব দ্রব্যাদি ক্রয় বিক্রয় করিত। কিন্তু ১৮১৭ খৃষ্টাব্দে, ঘটনাক্রমে হউক, বা কাহার ইচ্ছাক্রমেই হউক, তত্রস্থ বাজারের বহুসংখ্যক গৃহ অগ্নিযােগে ভস্মীভূত হওয়াতে ঐ মেলা এখন নিজনী নবগরদ নামক নগরে হইয়া থাকে। রুসিয়ায় দুইটি * ইংরাজি দেড় মাইলে এক ভাই’ (Verst) হয়।
রুসিয়ার ইতিহাস ৩ নবগরদ নগর আছে-একটি বৃহৎ নবগরদ, একটি নিজনী-( Nijni )-নবগরদ অর্থাৎ ঘােট নবগরদ। নিজনী নগর পিটার্সবার্গ হইতে ৭৫০ মাইল এবং মস্কাউ হইতে ২৬০ মাইল দূরে, ভগ এবং ওকা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। নিজনী নবগরদ নগর যে স্থানে অবস্থিত, সেখানে চতুর্দিক হইতে নানাবিধ বাণিজ্য দ্রব্যের ক্রয় বিক্রয়ের সুবিধা হয়। রুস সম্রাট পিটার দি গ্রেট এক সময়ে ঐ নগরেই রাজধানী স্থাপন করিতে ইচ্ছুক হইয়াছিলেন। নিজনী-নবগরদ নগরে দেশীয় ও বিদেশীয় ক্রেতা বিক্রেতাদের জন্য সারিবন্দি বাজার আছে। প্রতি বৎসর আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সেখানে দুই মাস কালব্যাপী একটি মহামেলা হইয়া থাকে। ঐ মেলাতে চীন, ভারত, বর্ষ, তাতার, পারস্য, সার্কেসিয়া, আর্মেনিয়া, বুকারিয়া, তুরস্ক, গ্রীস, ইতালী, পোলণ্ড, জম্মণি, ফুন্সি, ইংলণ্ড, আসিয়া-মাইনর প্রভৃতি দেশের বণিক গণ স্ব স্ব দেশীয় পরিচ্ছদে ভূষিত হইয়া, দীর্ঘশ্মশ্রযুক্ত রুসীয়দের সহিত মিশিয়া এক অপূর্ব শােভা ধারণ করে। সেই মেলাতে বিদেশীর সংখ্যা ১,৩০,০০০ এবং দেশীয়দের সংখ্যা ২৫,০০০ মাত্র হয়। রুসীয় গবর্ণমেন্টের ব্যয়ে ১,০০,০০,০০০ রুবলে ঐ মেলাভূমির বাজার প্রস্তুত হইয়াছে। কিন্তু গবর্ণমেন্টের ইহাতে লাভ ভিন্ন ক্ষতি হয় নাই। কেন না প্রতি বৎসর সেই স্থান হইতে ৭৮ লক্ষ রুবল ভাড়া পাওয়া যায়। নিজনী-নবগরদ হইতে অনেকগুলি ষ্টীমার ভলগা নদী বাহিয়া অাকান এবং কাস্পিয়ান হ্রদের নিকটবর্তী স্থানে মাল মসলার নেওয়া দেওয়া করে। তিব্বতের সমতল প্রদেশের সীমান্তে লডক নামক স্থানেও একটি বৃহৎ মেলা হয়। নিজনী-নবগদ হইতে তাতারদেশীয় বণিকেরা সেই মেলায় আসিয়া বস্ত্র বিক্রয় করে। চীনের বণিকেরা চৈন চার বিনিময়ে সেই সকল বস্ত্র ক্রয় করে। কুসিয়াবাসীরা সেই চা বিক্রয় করিয়া থাকে। ইংলণ্ডে যে চা যায়, তদপেক্ষা এই চা উৎকৃষ্ট।
চতুর্দশ অধ্যায়। ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, পুস্তক ইত্যাদি। রুসিয়ার সাহিত্যের কথা বলিতে গেলে, প্রথমে ডাক্তার বাউরিং সাহেবের মন্তব্যটির প্রতি মনােযােগ করা উচিত। তিনি রুসীয় সাহিত্য-সার-সংগ্রহ (Russian Anthology) নামক গ্রন্থের ভূমিকায় লিখিয়াছেন, “কুসীয় মুদ্রাযন্ত্র হইতে যে সমস্ত গ্রন্থ বাহির হয়, তাহাতে জাতীয় উন্নতির বিষয় বড় লেখা থাকে না।” রুসরাজ্যে উচ্চশ্রেণীর লােকদিগের মধ্যে যাহা কিছু পাঠক পাওয়া যায়। যদিও অনেকগুলি দেশীয় গ্রন্থকার, সম্রাট কিম্বা ধনী- দিগের অনুগ্রহভােগী, তবু তাহাদের পরিশ্রমানুসারে অর্থ লাভ হয় না। দেখিতে গেলে রুসিয়ার গ্রন্থকারেরা প্রায়ই সাধারণ লােকদিগের নিকট উৎ- সাহ পান না। আবার এ দিকে জ্ঞানচর্চার তেমন প্রখর স্রোতঃ না থাকাতে, কোন কোন গ্রন্থকার অপরের নিকট সাহায্য পাইয়াও, উচ্চদরের চিন্তাশক্তি পূর্ণ পুস্তক লিখিতে পারেন না। যদিও লােমসফ, মূরভিপ, করমুজি, পৌদ্ধি প্রভৃতি গ্রন্থকারেরা রুসিয়ার মধ্যে প্রথম শ্রেণীর গ্রন্থকার বলিয়া পরিচিত, তথাপি তাহাদের গ্রন্থগুলি আজিও যেন চিন্তা ও ভাষার শৈশবা- বস্থার পরিচয় দিতেছে। অধিক সংখ্যক পুস্তকই জৰ্ম্মণ ও ফরাসী ভাষা হইতে অনুবাদিত। ঐ সকল পুস্তকের কাটতি বড় কম। কাজিনের “রুসিয়ার ইতিহাস রুসরাজ্য মধ্যে সর্বাপেক্ষা পরিচিত ও আদৃত। কিন্তু যেকালে সে পুস্তকখানিরও গ্রাহকসংখ্যা কম, তখন অন্যে পরে কা কথা ? উক্ত ইতিহাস ১৮১৮ ও ১৮১৯ খৃষ্টাব্দে চাদা সংগ্রহ দ্বারা মুদ্রিত হইয়া কেবল চারি শত ছয় জন গ্রাহকের হাতে পড়িয়াছিল। ঐ গ্রাহকদিগের মধ্যে ৫ জন পাদরি, ৪০ জন সওদাগর, ও ৩ জন কৃষক; বাকী ৩৫৮ খণ্ড অবশ্য সন্ত্রাঙ্ক ব্যক্তিরাই খরিদ করিয়াছিলেন। বহু দিনে ঐ ইতিহাস দুই বারে * ব্রিউয়ার সাহেব বলেন, কবির পোফিন রুমীর বায়। ।
৩২ কুসিয়ার ইতিহাস। ১,৫০• খণ্ড প্রকাশিত হইয়া বিক্রীত হইয়াছিল। ইহারই নাম ফুসীয় সাহি- ত্যের উৎসাহ! কুসীয় মুদ্রান্ত্রে যে সকল পুস্তক মুদ্রিত হয়, তত্তাবতের পাণ্ডুলিপি অর্থে রুস গবর্ণমেন্ট কর্তৃক পঠিত ও পরীক্ষিত হইয়া থাকে। ছাপিবার হুকুম হইলে ছাপ, নতুবা ছাপাইয়া রাখ। বৈদেশিক গ্রন্থাদিও বিনা জামিনে রুসিয়ার সীমায় প্রবেশ করিতে পারে না। বৈদেশিক ভ্রমণকারীদের ব্যবহার্য পুস্তকও বিনা পরীক্ষায় কুসিয়ার মুখ দেখিতে পায় না। বিশেষতঃ যে সকল বিদেশীয় গ্রন্থে কুসিয়ার প্রতি অল্পমাত্ৰ তীব্র কটাক্ষের চিহ্ন থাকে, কাহার সাধ্য যে, সে সকল তথায় লইয়া যায় ? যে কোন রুসীয় গ্রন্থকার গবর্ণমেন্টের বিনানুমতিতে রাজা বা রাজা- সংক্রান্ত উচিত কথা লিখিতে গিয়া স্বাভিমত প্রকাশ করেন, তঁাহার গ্রন্থ মুদ্রিত হওয়া ত দূরের কথা, তাহাকে চিরজীবনের জন্য সাইবিরিয়াতে গিয়া বাস করিতে হয়। রুসিয়ার সর্বপ্রধান কবি আলেজান্দার পৌস্কিনকে এইরূপে সম্রাট প্রথম আলেজান্দার কর্তৃক নির্বাসন-দণ্ড ভােগ করিতে হইয়াছিল। এই সকল কারণেই রুসিয়ায় রাজভয়ে ভাল ভাল পুস্তক প্রচারিত না হইয়া জঞ্জালের ভাগই বৈশী। তবে যে সকল গ্রন্থ কেবল বিজ্ঞান-সম্বন্ধীয়, তাহাদেরই বিনা বিগ্নে বংশ বৃদ্ধি হয়। এইরূপ বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ রুসিয়ার বৈজ্ঞানিক সভাগুলি হইতে ফরাসী ও শ্লাভনিক ভাষায় অনবরত দেখা দিতেছে। ঐ সকল গ্রন্থ গুণের ও গৌরবের বটে। যাই হউক, রাজদৌরাত্মে ভীত হইয়া রুসিয়ার গ্রন্থকারেরা যেমন বাধীন-মত-পূর্ণ গ্রন্থ লিখিতে পারেন না, তেমনি কিন্তু অন্যরূপ ভাল গ্রন্থও সময়ে সময়ে প্রকাশিত হয়। ম. সফিকফ, রুসীয় পুরাতত্ত্বসম্বন্ধীয় একটি রচনাতে লিখিয়াছিলেন, যখন ১৫৫১ খৃঃ অব্দে কুসিয়ায় সর্বপ্রথম মুদ্রান্ত্রের আরম্ভ হয়, তখন হইতে ১৮১৩ খৃঃ অব্দ পর্যন্ত রুসরাজ্যে রুসসা-শ্লাভনিক ভাষায় সৰ্ব্বশুদ্ধ ৮০,০০০ আশী হাজার গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছিল। ডাক্তার গ্রাভিল বলেন, এক্ষণে ঐরূপ গ্রন্থের ধারাবাহিক সংখ্যা অনেক হইয়াছে। সেন্ট পিটার্সবর্গের ছাপাখানাগুলিতে ছাপিবার জন্য যে সকল সীসায় অক্ষর ব্যবহৃত হয়, উহা অতি উৎকৃষ্ট। রুসীয় অক্ষরনিৰ্ম্মাদিগকে জয় ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, পুস্তক ইত্যাদি। ৩৩ যথেষ্ট প্রশংসা করা উচিত। এ বড় আশ্চর্যের কথা যে, জণি আধুনিক সাহিত্য ইত্যাদি সম্বন্ধীয় ভূরি ভূরি গ্রন্থ প্রকাশ করিবার জন্য রাশি রাশি অক্ষর ঢালাই করিতেছে, কিন্তু রুীয় মুদ্রাক্ষরের নিকট চমৎকারিত্বে পাড়া- ইতে পারে না। তাহা ছাড়া জৰ্ম্মণির লিপজিগ্ নগরে হাজার হাজার পুস্তক ছাপিবার জন্য যে কাগজ প্রস্তুত হয়, তাও রুসীয় কাগজ অপেক্ষা অনেক নিকৃষ্ট। কিন্তু তাহা হইলে কি হইবে? রুসেরা অন্যান্য দেশের লােকের ন্যায় কাগজ ব্যবহার করিতে জানে না। সম্প্রতি কৃষিগেজেটে কাগজ ব্যব- হার সম্বন্ধে একটি প্রস্তাব লিখিত হইয়াছে। উহা এই ;-“আপাততঃ ইউরােপে কাগজ প্রস্তুত সম্বন্ধে একটি *** হিসাব সংগৃহীত হইয়াছে। সমগ্র পৃথিবী মধ্যে ৩,৯৮৫টি কাগজ প্রস্তুত করা কল ; তাহাতে প্রতিবৎসর ২ কোটী ৩৮ লক্ষ মণ কাগজ প্রস্তুত হয়। ইহার অর্ধেক ছাপার জন্য ব্যবহার হয়, অপর অর্ধেক অন্য কাজের জন্য। বিগত দশ বৎসরের মধ্যে কেবল ছাপার জন্য ২৮ লক্ষ মণ কাগজ বাড়িয়াছে। মাথাপিছু কত কাগজ খরচ হয়, তাহারও হিসাব বাহির হইয়াছে। ইংরজে পাঁচ সের আড়াই পােয়া ; মার্কি পাঁচ সের এক ছটাক ; জৰ্ম্মণ চারি সের; ফরাসী তিন সের আড়াই পােয়া ; ইতালী ও অস্ট্রিয়াবাসী এক সের আড়াই পােয়া; স্পেন্ দেশের লােক আড়াই পােয়া ; রুস আধ সের; এবং মেক্সিকো দেশীয় লােক এক সের।” এই হিসাব-তালিকায় সেরাই সকলের নীচে দাঁড়াইতেছে। বিদ্যাচর্চার দৌড় খুব যে ! সেন্ট পিটার্সবর্গের পুস্তকের দোকানগুলির অপেক্ষা মস্কাট নগরের দোকানগুলি বেস্ পরিপাটী ; পুস্তক সাজাইবার কেতাও বেস্। ইংলণ্ডের লণ্ডন নগর, ফুান্সের পারিস নগর এবং অস্ট্রিয়ার ভিয়ানা নগরের পুস্তকের দোকানগুলি যেমন রাস্তার সঙ্গে সমান জমি,কিন্তু মস্কাউ নগরের পদ্ধতি আর এক রকম। সমস্ত দোকান দোতালার উপর। অতস্থ কোন কোন পুস্তকের দোকানে রুস গ্রন্থকারগণের নামতালিকা আছে। সেই সকল গ্রন্থকারের নামাবলী একত্র ছাপাইলে আট পেজী ফৰ্ম্মার দুই শত পৃষ্ঠার একখানি পুস্তক হইতে পারে। অন্যান্য দেশের বড় বড় নগরে ফয়ী, ইতালীয়, জৰ্ম্মণ ও ইংবেজি ভাষার পুস্তক যে পরিমাণে পাওয়া যায়, ফসিয়ার বড় বড় ;
রুসিয়ার ইতিহাস। নগরেও সেই পরিমাণে পাওয়া যাইতে পারি, কিন্তু রুসদের অজ্ঞতা প্রযুক্ত আজি ও সেরূপ হইতে পারে নাই। কস-গবর্ণমেন্টের কড়া মেজাজে পড়িয়া কখন কখন গ্রন্থকারদের ছাপা বহি জলহি হয়। আজ কাল রুসরাজ্যে যে সকল পুস্তক মুদ্রিত হয়, গ্রন্থকার ও পুস্তকবিক্রেতাদের উপর তাহার দায়িত্ব সম্পূর্ণ। অনেক পুষ্টিক- বিক্রেতা রাজভয়ে স্বাধীনভাবে পুস্তক বিক্রয় করিতে পারে না। কোন কোন দোকানদার পুস্তকের দোকান খুলিয়া লােকসানের উপর লােক্সান সহে। কেহ বা বিরক্ত ও ভীত হইয়া অপর কোন সাহসিক লােককে দোকান আধা-দরে বেচিয়া ফেলে। কখন কখন দোকানদারদের প্রতি এরূপ কঠিন রাজাজ্ঞা হয় যে, উহাদের মধ্যে কতকগুলি লােককে বহুমূলের নুতন চক্চকে গ্রন্থরাশি জ্বলন্ত অগ্নির মুখে আহুতি দিতে হয়। অনেক টাকার জিনিষ পােড়াইয়া দোকানদারকে দেউলিয়া হইতে হয়। কি বিভ্রাট। এত কষ্টে পড়িয়াও পেটের দায়ে অনেক দোকানদার পুস্তক বিক্রয় করে। সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং মস্কাউ নগরের মধ্যে ও সহরতলীতে যে সকল ধনী ও জমীদার বাস করেন, তাহাদেরই দ্বারা উহাদের জীবিকা নির্বাহ হয়। রুসীয় ধনী ও জমীদারদের মধ্যে অনেকে পুস্তক পাঠ অপেক্ষা আলমারি সাজাইয়া রাখিতে ভালবাসেন। যদি এই সখটুকুও না থাকিত, তা হইলে রুসিয়ায় পুস্তক ব্যবসায়ের বড় ব্যাঘাত ঘটিত। ঐ সকল বড় বড় লােকের নিকট পুস্তকবিক্রেতারা সময়ে সময়ে এক এক থেকে অনেক টাকার পুস্তক বেচে। কুলীয় ধনী পাঠকেরা গ্রন্থের মধ্যে উপন্যাসটাই বেশী পড়েন। ফরাসী ভাষার আদিরসাক্রান্ত পুস্তকগুলাও তাহাদের পক্ষে সংক্রামক রােগ। ইংরেজি হইতে ফরাসী ভাষায় অনুবাদিত অদ্ভুত রসের উপন্যাস পড়া ঐ সকল লােকের বড় ভাল লাগে। কিন্তু অন্যরূপ অনুবাদিত পুস্তক ভাল হইলেও, রুসীয় সম্ভ্রান্তদের কাছে “আঃ ছ্যা! হইয়া পড়ে। * রুসিয়ার রাণী দ্বিতীয় ক্যাথাৱাইনের এক জন প্রিয়পাত্র এক সময়ে এক জন পুস্তক- বিক্রেতাকে বলিয়াছিলেন, “নীচে বড় বড় ও উপরে ছােট ছােট সুন্দর পুস্তকাশিতে আমার জন্য একটি পরিপাটী গ্রন্থমন্দির (Library) সাজাইয়া দাও।” আজ কাল অনেক সেখিীন ধনী ও জীমদার, পুস্তকবিক্রেতাদের এই ধরণের হুকুম দিয়া থাকেন।
ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, পুস্তক ইত্যাদি। . এক্ষণে আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গ, মস্কাউ ও অন্যান্য স্থানের কতকগুলি সাম- য়িক ও সংবাদপত্রের তালিকা দিতেছি। সেন্ট পিটার্সবার্গ হইতে ১। জনাল ডি সেন্ট পিটার্সবর্গ পলিটিক্ এট লিটারেরি Journal de St. Petersbourg Politique et Litteraire ) / Fotos fua ato 11 ভাষায় ছাপা হয়। রাজকীয় সংবাদপত্র। ২। দি ইভালিড (The Invalid )। কুসীয় ভাষা, প্রাত্যহিক, সমর- সংক্রান্ত বিষয় লিখিত হয় । ৩। সেন্ট পিটার্সবার্গ-গেজেট (Gazette of St. Petersburg )। রুসীয় ও জৰ্ম্মণ ভাষায় সপ্তাহে দুই বার স্বতন্ত্র মুদ্রিত হয়। বিজ্ঞান বিদ্যালয় হইতে প্রকাশিত। রুস গবর্ণমেন্টের উপদেষ্টা। ৪। সিনেট গেজেট (Gazette of the Senate)। কুসীয় ভাষা ; সাপ্তাহিক। ইহাতে সিনেটের আইন কানুন প্রকাশিত হয়। ৫। জর্নাল অব কমাস (Journal of Commerce)। রুমীয় ও জৰ্ম্মণ ভাষা। সপ্তাহে তিন বার প্রকাশিত হয়। ৬। দি নর্দার্ণ বী (The Northern Bee)। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ক সংবাদপত্র ; সপ্তাহে তিনবার প্রকাশিত হয়। ৭। দি পেটিয়ট, (The Patriot)। রুসীয় ভাষা। রাজনীতি ও সাহিত্য বিষয়ক। পাক্ষিক। ৮। আর্চিস অব দি নর্থ (Archives of the North)। রাজনীতি, ইতিহাস ও লােকবিজ্ঞানমূলক। পাক্ষিক । ১। সাভােনিয়া (Slavonian)। সাহিত্য ও যুদ্ধসংক্রান্ত। পাক্ষিক। ১০। ন্যাশন্যাল মিসেলেনি (National Miscellany)। ইতিহাস, সাহিত্য ও লােকবিজ্ঞানসম্বন্ধীয়। রুসীয় ভাষা। মাসিক। ১১। রেজিষ্টার অব ডিস্কভারিজ (Register of Discoveries)। প্রাকৃতিক ইতিহাস, শারীর বিদ্যা ও কিমীয় বিদ্যাবিষয়ক। ১২। জর্ণাল অব মেনুফেকচরস ও কমাস(Journal of Maluafac-
রুসিয়ার ইতিহাস।
+
tures and Commerce )। রাজ-সচিৰ কর্তৃক প্রতিমাসে প্রকাশিত।
ইহাতে জাতীয় শিল্পের আবিষ্কার, পরীক্ষা, ব্যবস্থা ও নিয়ম সকল অথাযথ
বিবৃত হয়।
১৩। গেজেট অব কমার্স (Gazette of Commerce )। সপ্তাহে
দুই বার প্রকাশিত। রুস ও জৰ্ম্মণ ভাষা। ইহাতে বিদেশীয় ও স্বদেশীয়
বাণিজ্যের বিষয় লিখিত হয়।
১৪। জর্নাল অব দি মাইনিং কোস্ (Journal of the Mining
Corps )। রুস ভাষা।
১৫। জাল অব দি মিনিষ্টার অব, পবলিক ইষ্টকস (Journal of
the Minister of Public Instruction)। রুস ভাষা।
১৬। জার্ণাল অব ওয়েজ এণ্ড, কমিউনিকেসনু (Journal of Ways
and Coinmunications) ফরাসী ও কস ভাষা।
১৭। সেন্ট পিটার্গার জীটং (St. Petersburger Zeitung)।
১৮। নবয় ব্রিমিয়া (Novoy Bremya )। রুস ভাষা।
১৯। নিবন্তি (Nevosti)।*
২০। স্বিয়েৎ (Suiett)।
২১। অফিসিয়াল্ মেসেঞ্জার (Offical Messenger)।
মস্কাউ নগর হইতে ৬
২২। দি মস্কাউ গেজেট (The Moscow Gazette)। রুস ভাষা।
২৩। দি মস্কাউ কুরিয়ার ( The Moscow Courier)।
২৪। দি মস্কাউ টেলিগ্রাফ ( The Moscow Telegraph)।
২৫। দি কুরিয়ার অব ইউরােপ, (The 'Courier of Europe)।
দি জর্ণাল অব এগ্রিকল্চর (The Journal of Agriculture) ।
ত্রৈমাসিক। ইহা অতি উৎকৃষ্ট সাময়িক পত্র।
২৭। দি জর্নাল অব ফিজিক্স, (The Journal of Physics)।
মাসিক পত্র।
আজকাল এই সংবাদপত্রখানা, যাহাতে রুস ইরেকে শীর্ষ যুদ্ধ বাধে, তাহাই
দিনরাত্রি লিখিত হইতেছে।
সাধারণ শিক্ষা। ৮। দি জর্নাল অব ফ্যাশন্স্ (The Journal of Fashions)। ২৯। দি রেসিং ক্যালেণ্ডার বা আমেচিয় মেগেজিন (The Racing Calender or Amateur's Magazin) অন্যান্য স্থান হইতে ৩০। ওয়ারসা হইতে টাম্রাট, (Tagblatt)। ৩১। ফিলণ্ড হইতে ফিলণ্ড (Finland)। ৩২। হেলসিংফর্স হইতে ডাব্লাড়, (Dagblad) । ৩৩। লেম্বর্গ হইতে প্রেগলও (Przegland)। ৩৪। টি ফলিস্ হইতে কাকাজ (Kabkaz)। ইহাতে রাজকর্মচারী প্রিন্স, দণ্ডকফ কর্মাকফের রাজকার্যের বিষয় লিখিত হয়। এতদ্ব্যতীত রুসরাজ্যে আরও অনেকগুলি সংবাদপত্র আছে। সকলেই একযােগে একসুরে ইংরেজের বিরুদ্ধে রুসিয়াকে উত্তেজিত করিতেছে। সকলেরই ইচ্ছা, রুসভল্লুক বৃটিশসিংহকে পরাজিত করিয়া ভারত আক্রমণ করুন। আজ কাল এই সকল সংবাদপত্রে যুদ্ধ সম্বন্ধে অনেক অন্যায় কথা লিখিত হইতেছে। পঞ্চদশ অধ্যায়। সাধারণ শিক্ষা। কৃষক, ক্রীতদাস ও সাধারণ ব্যক্তি এই তিন ভাগে কুসিয়ার প্রজাগণ বিভক্ত। তন্মধ্যে কৃষক ও ক্রীতদাসের সংখ্যা চারি ভাগের তিন ভাগ অপে- ক্ষাও বেশী। উহারা সকলেই কৃষি ও মজুয়ের কাৰ্য্য করে। গবর্ণমেণ্ট হইতে বিদ্যা শিক্ষার উৎসাহ পায় না। কেবল কোন কোন স্থলে দুই এক জন পর, হিতৈষী বেসরকারী ধনী ব্যক্তি ঐরুপ লােকদের জন্য নিজ ব্যয়ে বিদ্যালয় স্কুপন্ন করিয়া উহাদিগকে যাহা কিছু শিক্ষা দেন। কিন্তু ঐরূপ হিতৈষী ماي " রুসিয়ার ইতিহাস। ধনীদিগের সংখ্যা এত অল্প যে, তদ্বারা শিক্ষা সম্বন্ধে কোন সুফল ফলে না। সুতরাং, রাজ্যের বার আনা অপেক্ষা বেশী লােক চিরমুখ। মূখের অশেষ দোষ, শিক্ষা দিলেও শিখিতে চায় না। শিক্ষাদাতাকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে। ডাক্তার লায়াল রুসিয়ায় অবস্থানকালে দেখিয়াছিলেন, এক জন ধনশালী ব্যক্তি তঁাহার অধীনস্থ মজুরদিগকে লেখা পড়া শিখাইবার জন্য, ল্যাঙ্কা টেরিয়ান্ ধরণের একটি স্কুল খুলিয়াছিলেন; কিন্তু সাধারণ লােকে তাহাকে উপহাস করিয়াছিল । ঐ সকল লােকের কথা ছাড়িয়া দিলে সাধারণ বিদ্যা-শিক্ষার চলনটা কেবল ধনী ও ধর্মযাজকদের মধ্যে প্রচলিত দেখা যায়। ধনী সন্ত্রান্তের বাড়ীতে শিক্ষক রাখিয়া স্ব স্ব সন্তানগণকে লেখা পড়া শিখান। দরিদ্র সন্ত্রান্তের সাধারণ শিক্ষাগারে স্ব স্ব সন্তানদিগকে, বিদ্যা শিক্ষার্থে পাঠাইয়া থাকেন। সমস্ত রুসরাজ্য সাধারণ শিক্ষা সম্বন্ধে সাত ভাগে বিভক্ত। এক এক ভাগের প্রধান নগরে এক একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সেই সকল বিশ্ব- বিদ্যালয় এই ;—পিটার্সবার্গ, মস্কাউ, উইলনা, ডরপাট, খারকব, কাজান এবং ফিলণ্ডের অন্তর্গত হেলসিফর্স। এতদ্বতীত পােলও প্রদেশ রুসি- য়ার অন্তর্গত হওয়ায় ওয়াসার বিশ্ববিদ্যালয়টি অষ্টম স্থানীয় হইয়াছে। ঐ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে জৰ্ম্মণ-প্রণালীতে শিক্ষা দেওয়া হয়। ধর্মশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, ব্যবহার-শাস্ত্র (আইন) ও দর্শনশাস্ত্রের আলােচনা অধিক পরিমাণে হইয়া থাকে। ফুসীয় গবর্ণমেন্টের কঠিন শাসনে অধ্যাপকেরা ছাত্রদিগকে সকল রূপ বিদ্যা শিখাইতে পারেন না। রুসিয়ায় যে কয়েক প্রকার বিদ্যার অনুশীলন হয়, তন্মধ্যে চিকিৎসাশাস্ত্রের ফলই বেশীর ভাগে দেখা যায়। ঐ আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত সম্বন্ধ রাখিয়া প্রত্যেক বড় বড় নগরে গবর্ণমেন্টের তরফে এক একটি ব্যায়াম ও প্রাথমিক শিক্ষার বিদ্যালয় আছে। ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে ঐরূপ ধরণের বিদ্যালয়গুলিতে ৪৬৮ চারি হাজার ছয় শত আট জন অধ্যাপক ও শিক্ষক, ৮০,০০০ আশী হাজার ছাত্র এবং ৮,০০০ আট হাজার ধাত্রীছিল। সিয়ার ধূম্মাক্রান্ত বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১,৪৯৮ এক হাজার চারি শত- আটানব্বই। উহাতে ছাত্রসংখ্যা প্রায় ৫৫,০০০ পঞ্চান্ন হাজার। এই রাজদণ্ড। হিসাবে ঐ রাজ্যে ধর্ম ও সাধারণ শিক্ষা সম্বন্ধে ১,৫০,০০০ এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজারও হয় কি না সন্দেহ। গড়ে প্রতি ৪০০ চারি শত লােকের মধ্যে এক জনের শিক্ষালাভ হয়। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আরও কয়েকটি বিদ্যালয় আছে। সেখানে কেবল সৈনিক, নাবিক, ইঞ্জিনিয়র এবং চিকিৎ- সকেরাই শিক্ষা লাভ করেন। সাধারণ শিক্ষা সচিব এবং রুসীয় গ্রীক ডাইরেকৃটিং সাইনদের অধীনে ব্যায়াম-বিদ্যালয়, ধৰ্ম্ম-বিদ্যালয়, এবং সাধারণ বিদ্যালয়গুলি চালিত হয়; কিন্তু সাময়িক বিদ্যালয় প্রভৃতি চারি প্রকার বিদ্যালয়ের ভার যুদ্ধ-মন্ত্রী এবং হােম-ডিপার্টমেন্ট-মন্ত্রীর হস্তে থাকে। কুসীয় আদালতে ফরাসী ভাষা প্রচলিত। যদিও রুসিয়ায় সাধারণের বিদ্যাশিক্ষার চর্চা নাই, কিন্তু যাহারা শিক্ষা করে, তাহারা কেবল নিজের কুর্সীয় ভাষা নয়, জৰ্ম্মণ ও ফরাসী ভাষাতেও বেস ব্যুৎপন্ন হয়। বােড়শ অধ্যায়। রাজদণ্ড। রুসীয় গবর্ণমেণ্ট অনেক সময় ইচ্ছা করিয়া গুরুতর দোষীদিগকে ছাড়িয়া দেন। ইহাতে অপকার ভিন্ন উপকার হয় না। ঐ সকল দোষীরা আবার অত্যাচার করে, সুতরাং প্রজাদের বড় ক্ষতি হয়। এক সময়ে রুসিয়ার রাণী এলিজাবেথ ফরাসী পণ্ডিতমণ্ডলীর নিকট প্রশংসা পাইবার জন্য খুনীদিগকেও বিনা দণ্ডে নিষ্কৃতি দিয়াছিলেন। এইরূপ রুসিয়ার অন্যান্য সম্রাটেরাও কখন কখন করিয়া থাকেন। ইহাতে লােক-সাধারণের নিকট প্রশংসা পাইবার পরিবর্তে অখ্যাতি লাভ করিয়া থাকেন। এক দিকে এইরূপ হয়, অন্য দিকে আবার আর এক রূপ। রুসিয়ায় দুই প্রকার ভয়ানক রাজদণ্ড প্রচলিত আছে ;-বেত্রাঘাত ও সাইবিরিয়ায় নির্বাসন। বেত্রাঘাত এত কঠিন যে, অনেক সময়ে যন্ত্রণায় অপরাধীদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটিয়া থাকে। সাইবিরিয়ায় নির্বাসন, সাধারণ দণ্ডের মধ্যে পরিগণিত ; কিন্তু বিচারের দোষে নির্দোষীদিগকেও নির্বাসিত হইতে ৪ ? রুসিয়ার ইতিহাস। হয়। দণ্ডিত ব্যক্তিরা দুরন্ত সৈনিকদিগের দ্বারা পশুবৎ নিপীড়িত হইয়া পূর্ণ শীতের সময় সাইবিরিয়ায় রাজদণ্ড ভােগ করিতে যায়। বােধ হয়, অনবরত পায়ে হাঁটিয়া এক হাজার ক্রোশ গমন করিলেও তত কষ্ট হয় , যত কষ্ট কসীয় গবর্ণমেন্টের বেত্রাঘাতে ও অস্ত্রাঘাতে হইয়া থাকে। সাইবিরিয়ায় নির্বাসিত অপরাধীদিগের মধ্যে সৈনিকদের পীড়নে অনেক ব্যক্তিকেই পথিমধ্যে ইহলােক ত্যাগ করিতে হয়। একখানা কাপড় দিয়া অপরাধীদের চক্ষু ও মুখ ঢাকা দেওয়া হয়। মর্টন বলেন, রুস রাজ্যের অন্তর্গত ওডেসা নগরের কারাগারে এক সময়ে রুস গবর্ণমেণ্ট ভয়ানক অত্যাচার করিয়াছিলেন। নিকোলাস্ বা প্রথম আলেকজান্দার বর্ণা আক্রমণের সময় হুকুম দিয়া দুই জন ইংরেজ চিকিৎসককে ধৃত করিয়া, ওডেসার কারাগারে রাখিয়াছিলেন, পরে তঁাহা- দিগকে দারুণ শীতের সময় সাইবিরিয়ায় নির্বাসন করিয়াছিলেন। ঐ সময়ে উহারা পীড়িতাবস্থায় অনাচ্ছাদিত শরীরে ও নগ্ন-পদে তথায় গমন করিয়াছিলেন। ডাক্তার ক্লার্ক বলেন, যে সময়ে তিনি রুসিয়ায় গিয়াছিলেন, সে সময়ে সম্রাট পল সিংহাসন ভােগ করিতেছিলেন। পল ভয়ানক দুরন্ত ও পাগল রাজা ছিলেন। তিনি জোর করিয়া প্রজাদিগকে সং-সাজার মত পােষাক পরিতে অজ্ঞা করেন। অনেকে উহা পরিধান করিতে অনিচ্ছুক হওয়াতে সাইবিরিয়ায় নির্বাসিত হয়। তা ছাড়া আরও অনেক ভদ্র ও ইতর লোককেও ঐ দণ্ডভােগ করিতে হইয়াছিল। এই জন্য কয়েক জন সম্রান্ত ব্যক্তি ষড়যন্ত্র করিয়া ১৮০১ খৃষ্টাব্দের ১লা মার্চ সেন্ট পিটার্সবর্গের রাজ প্রাসাদে তাহাকে নিহত করিয়াছিল।
সপ্তদশ তাধ্যায়। রাজদত্ত গৌরব-চিহ্ন ও উপাধি। অন্যান্য সভ্য দেশে যেমন রাজোপাধির চলন আছে, রুসিয়াতেও সেইরূপ দেখা যায়। রুসিয়ার রাজোপাধি সমরসংক্রান্ত ব্যক্তিদিগকেই অধিক পরি- মাণে দেওয়া হইয়া থাকে। এক জন সিভিলিয়ানের অপেক্ষা এক জন মিলিটারী কর্মচারীর রাজদত্ত উপাধির সম্মান বেশী, এই জন্য সিভিলিয়া- নেরাও যুদ্ধসংক্রান্ত কার্যভার পাইবার চেষ্টা করেন। রুস গবর্ণমেন্টের এ ফিকির মন্দ নহে। এক উপাধির তারতম্য দেখাইয়া দেশময় যুদ্ধ-নীতি শিক্ষার বেস্ ফাঁদ পাতিয়াছেন। আমাদের ইংরেজ গবর্ণমেণ্ট উপাধি দেওয়া দূরে থাকুক, ভারতবর্ষীয়দিগকে ভলটিয়ারও করিতে চাহেন না। ইহাতে রাজার রাজ্য-রক্ষার সুবিধা বই অসুবিধা নাই, তবু কেন ইংরেজরাজ ভয় করেন, বলিতে পারি না। যাহা হউক, এই সমর-সঙ্কটের সময় ভারত- বর্ষীয়েরা ইংরেজ গবর্ণমেন্টের ভারতবর্ষের সর্বপ্রধান রাজকর্মচারী লডডফা- রিণের নিকট ভলটিয়ার হইবার যেন একটু আশা পাইতেছেন। ঈশ্বর আমাদের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করুন। ইউরােপীয় ও আসিয়িক রুসিয়া, ফিলণ্ডের গ্রাণ্ড উচি এবং ককেসীয় শাসন-বিভাগ ব্যতীত ৬ ষাটটি গবর্ণমেন্টে বিভক্ত। এই সকলের উপর সুপ্রিম গবর্ণমেন্ট। জার (Czar) উহার সর্বময় হর্তা কৰ্ত্তা বিধাতা। তিনি যেমন রাজকৰ্মচারিগণকে নিজে নিযুক্ত করেন, সেইরূপ উপযুক্ত ব্যক্তি- দিগকে গৌরবসূচক উপাধিও দিয়া থাকেন। ক্লার্ক বলেন, কুসিয়ায় সৰ্ব্বশুদ্ধ ছয়টি প্রধান অর্ডার (Orders) বা রাজ- দত্ত সম্মানসূচক উপাধি আছে। ঐ উপাধিগুলির প্রত্যেকের অপর কয়েকটি করিয়া শাখা-উপাধি আছে। রুসীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে যাঁহারা রাজ- দত্ত উপাধি পাইবার যােগ্য,তাহারা চতুর্দশ শ্রেণীতে বিভক্ত, ঐ সকল লোক গুণানুসারে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর সম্মান প্রাপ্ত’ ইত্যাদি রূপে গণ্য 82 রুসিয়ার ইতিহাস। হইয়া থাকেন। ঐ চতুর্দশ শ্রেণীর প্রথম ৮টর উপাধি বংশানুক্রমিক। উহা নূতন লােকে পায় না। বাকী ৬টি শ্রেণীর উপাধি ব্যক্তিগত; কিন্তু বংশ- গত নহে। যে সৰ্বোচ্চ ছয়টির উপাধির কথা বলা হইল, উহার প্রথম ও দ্বিতীয়টি কেবল রাজের উচ্চদরের কৰ্ম্মচারীরাই পাইয়া থাকেন। এই দুইটি উপাধির প্রথমটি যাহাকে দেওয়া হয়, তাহাকে “হাই এসেলেসি” ( High Excellency, এবং দ্বিতীয়টি যাঁহাকে দেওয়া হয়, তাহাকে কেবল "এসেলেন্সি” (Excellency গৌরবার্থক শব্দ প্রয়ােগে সম্বােধন করিতে হয়। অবশিষ্ট উপাধিধারিগণের গৌরব-সূচক সম্বােধন শব্দ “নােবলুনে” (Nobleness)। সে ব্যক্তি যেরূপ রাজদত্ত উপাধিধারী, তাহাকে পত্র লিখি- বার সময় সতর্ক হইয়া পত্রের শিরােনামে ও সম্বােধনপদে উপাধির সেই রূপ কথা গুলি লিখিয়া দিতে হয়। ডাক্তার লায়ালের “রুস-মণ” স্তকের ( য় খণ্ড) ৪৫০ পৃষ্ঠায় লিখিত আছে যে, এক সময়ে রুসিয়ার পােষ্ট আকিস্ গুলিতে চিটিপত্র গ্রহণের বিষম কায়দা ছিল। যে লােকের নামে পত্র লিখিত হইত, যদি উহাতে তাহার উপাধি ( Title) না থাকিত, তাহা হইলে কোন পােষ্ট আফিস ঐ পত্র গ্রহণ করিত না। সে দিন এখন আর নাই। ডাক্তার ক্লার্ক (L. L. D.) সাহেবের মতে রুসিয়ায় সর্বোচ্চ দরের ছয়টি রাজদত্ত উপাধি ( Orders) আছে, কিন্তু ডাক্তার রাজা স্যার শৌরীন্দ্র- মােহন ঠ কুর ( Kt. Mus. Doc.) প্রণীত “অর্ডারস্ অব নাইটহুড' (Or. ders of Knighthood) নামক পুস্তকের ২য় খণ্ডে লিখিত আছে যে, তথায় নয়টি সর্বোচ্চ রাজদত্ত উপাধির প্রচলন দেখা যায়। সেই নয়টি উপাধি (Orders) এই ;-১, সেন্ট এর উপাধি (Order of St. Andrew); 2, 6770 prietaracara tapfer (Order of St. Catherine) : ৩, আলেকজান্দার নিউস্কির উপাধি (Order of Alexander Newsky (বা Nevskoi ]); ৪ সেট এনের উপাধি ( Order of St. Jun); ৫, সেন্ট, জর্ডের সামরিক উপাধি (Military Order of St. George); ৬, সেন্ট রডিমিরের উপাধি (0rder of St. Vladimir ); ৭; সেন্ট জনের উপাধি (Order of St. John); ৮, শ্বেত ঈগলের উপাধি ( Order of the White Eagle) এবং ৯ সেন্ট ষ্টানিলেয়সের উপাধি (Order of St. • ।
রাজদত্ত গৌরব ও উপাধি। ০৩ Stanislaus )। এই সকল উপাধিধারীরা সচরাচর নাইট" (Knight) বলিয়া অভিহিত হন। নিয়ে ঐ ছয়ট উপাধির বিশেষ বিবরণ দেওয়া যাইতেছে ; রুস সম্রাট সমস্ত ফুসীয় উপাধির গ্রাণ্ড, মাষ্টার, কি “সে ক্যাথারাই” উপাধিটি কেবল সীলােকদের জন্য বলিয়া তিনি উহার গ্রাণ্ড, মাষ্টাব নন। রুসিয়ার গ্রাণ্ড, ডিউকুগ। খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হইবার সময় “টে এণ্ড, “আলেকজাণ্ডার নিউস্কি”, “হােয়াইট, (শ্বেত) ঈগল” এবং “সেন্ট এ উপাধিব নাইট (Kright) হন। অন্যান্য রাজবংশীয়েরা নিৰ্বাচিত হইয়া ঐ সকল উপাধি পাইয়া থাকেন। গ্রাণ্ড চেসেরা খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হই- বার সময় “সেন্ট ক্যাথরাইন" উপাধি পান, কিন্তু অন্যান্য ডচেসেরা বেশী বয়স না হইলে পান না । “গেন্ট এণ্ড,” উপাধিধাবী নাইটগণের নির্বাচন অনুসা র উপাধিদান- সভার এক জন চান্সেলর নিযুক্ত হন। তা ছাড়া ঐ সভায় এক জন ধনাধ্যক্ষ এবং এক জন কার্যাধ্যক্ষ থাকেন। ঐ তিন জন কর্মচারী রাজসভা হইতে নির্ধাচিত হন। উহাদের দ্বারা উপাধিদান-সভার সমস্ত কাৰ্যের নিয়মাবলী নির্ধারিত হয় ঐ উপাধিদান-সভা ( Chapter) একটি মহৎ কাৰ্য্যে ব্রতী। উহার ১,০০,০০০ দুই লক্ষ রুবলের একটি ফগু আছে। সেই অর্থ হইতে সেন্ট পিটার্গের রজকীয় বিদ্যালয়ে দরিদ্র রাজবংশীয়া বালিকার বিদ্যা শিক্ষা করিয়া থাকেন। তা ছাড়া অন্যান্য দরিদ্র সন্ত্রা? বংশীয় নারীরাও সেখানে শিক্ষিতা হন। রুসরাজ্ঞী এই মহৎ কার্যের প্রতিষ্ঠাত্রী। যে সকল মেম্বরের বংশগত মৰ্যদা আছে, তঁাহাদিগকে ব শানুক্রমিক উপাধি দেওয়া হয়; কিন্তু ক্রীতদাসগণকে ব্যক্তিগত উপাধি দেওয়া যায়। বাসকারগণ ব্যক্তিগত সম্মানসূচক উপাধি প্রাপ্ত হন। রুসীয় সওদাগরের ১৮৩২ খৃষ্ট কেব ১০ই এপ্রিল হইতে বংশগত উপাধি পাইয়া আসিতেছেন। যে সকল উপাধিধারীর মসহরা (পেন্সন) পান, তাহাদের সংখ্যা সীমা- বন্ধ। যাহা মসহরা পান না, তাহাদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশী। প্রত্যেক উপাধিযোগ্য ব্যক্তিকে উপাধির শেণী অনুসারে অর্থ দিয়া উপাধি লাভ করিতে হয়। উহাদের প্রদত্ত অর্থ ফসিয়ার খাজনাখানায় জমা হয়।
রুসিয়ার ইতিহাস। সেই টাকা আবার দুৰ্ব্বল ও অকর্মণ্য রাজকর্মচারীদের ভরণ পােষণ জন্য ব্যয়িত হয়। বৈদেশিক, সার্কেসীয় এবং অপরাপর যাহারা উপাধি-পদক প্রাপ্ত হন, তাহাদিগকে আর রাজকর দিতে হয় না। প্রতি বৎসর ৮ই নবেম্বর “সেন্ট মাইকেলের দিন” (St. Michael's day) নামক পৰ্ব্বাহে উপাধিদানের সাধারণ সভা হয়। সেই দিন সেন্ট পিটার্সবর্গ ও মস্কাউ নগরনিবাসী নাইটগণ প্রত্যেক উপাধির জন্য ছয় জন মেম্বর নির্বাচন করিয়া কাৰ্যনিৰ্বাহক সভার হস্তে তাহাদের ভাৰাৰ্পণ করেন। সাইবিরিয়া ও সার্কেসিয়া প্রদেশে যে সকল রাজকর্মচারী অন্তত পাঁচ বৎসর কাল বিশেষ গুণের সহিত কাৰ্য করেন, তাহারা স্ব স্ব গুণানুসারে উপাধি পান। সৈন্যসংক্রান্ত কর্মচারীরা অন্ততঃ পনর বৎসর কাৰ্য্য না করিলে কোনরূপ উপাধি পান না। রাজকার্য্যের শ্রেণী অনুসারে প্রত্যেক মেম্বরের উপাধিরও শ্রেণী আছে। এক বারেই কোনও ব্যক্তি সর্বোচ্চ উপাধি পাইতে পারেন না। প্রথমে নিম্ন দরের উপাধি, পরে উচ্চ দরের উপাধি-পদক প্রাপ্ত হন। কিন্তু সময়ে সময়ে এ নিয়ম খাটে না। উপাধিপ্রাপ্ত লােকেরা অপরাধ বা অপমানের কাৰ্য্য করিলে, তাহাদের নিকট হইতে উপাধি-পদক ও সনদ ফিরিয়া লওয়া হয়। যে সকল রাজকর্মচারী ও ধৰ্ম্ম-যাজক কাৰ্যদোষে পদচ্যুত হন, তঁাহারাও আর উপাধির অধিকারী থাকিতে পারেন না। সেন্ট পিটার্সবর্গের বিজ্ঞান-বিদ্যা-মন্দির হইতে প্রতি পাঁচ বৎসরে উপাধি-পদক ও উপাধি-সনন্দ-প্রাপ্ত মেম্বরগণের একখানি পুরা তালিকা প্রকাশিত হয়। উপাধির অর্ডার (Order) এবং পদক ( Medal) ভিন্ন সিয়ায় সম্মা- নের আরও একটি অলঙ্কার প্রভৃতি উপাধি-চিহ্ন আছে। যুদ্ধসংক্রান্ত উপযুক্ত অফিসার ও জেনোলদিগকে স্বর্ণ ও হীরকমণ্ডিত তরবারি দেওয়া হয়। উহাতে “টু করেজ” (To courage) শব্দটি লেখা থাকে। কখন কখন ঐ সকল ব্যক্তিকে এক একটি গৌরবসূচক পদও দেওয়া যায়। রুস-সম্রাজ্ঞীর সহচরীরা (Ladies in waiting) তাহার প্রতিমূৰ্ত্তি- শােভিত হীরক-মণ্ডিত এক প্রকার অলঙ্কার ধারণ করেন। সভ্যা রমণীরা ৫।
সেন্ট এণ্ডর র উপাধি। ৪৫ ২। ৪৬০ st : ১ ৪। (Court Ladies) সাধারণতঃ সম্রাজ্ঞীর নাম-স্বাক্ষরিত হীরকমণ্ডিত পদক ব্যবহার করিয়া থাকেন। ঐ সকল অলঙ্কার (Decorations) এবং পদক ( Medals) নীল রঙের ফিতায় বাঁধিয়া অঙ্গে ধারণ করিতে হয়। ১৮৩৪ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসে রুস-সম্রাট, এবং সম্রাজ্ঞীর আদেশানুসারে ভিন্ন ভিন্ন উপাধিধারী ও উপাধিধারিণীগণের যেরূপ মসহরার হার নির্ধারিত হইয়াছিল, তাহা নিম্নে প্রদর্শিত হইল ;- ১। সেন্ট এর নাইটগণ ৮০০ হইতে ১০০০ রুবল ক্যাথারাইন (১ম শ্রেণী) (২য় শ্রেণী) ১০ হইতে ১৩০ বা ২০০ আলেকজান্দার নিউস্কি ৫০০ হইতে ৭০০ জর্জ ১৫০,২০০,৪০০ বা ১০০০ ) ব্লডিমির ১০০,১৫,৩০০ বা ৬০০, এ ১ম শ্রেণী) ২০০ হইতে ৩৫০ (২য় শ্রেণী) (৩য় শ্রেণী) (৪র্থ শ্রেণী) ষ্টানিলেয় ৮৬,১১৫ বা ১৪৩ যে সকল বিদেশীয় মােক রুস সরকারে কাৰ্য করেন, তাহার কেবল উপাধি-ভূষণ পান, মসহরা পান না। ব্লডিমির নাইটগণের সংখ্যা ৬০। ৬০ জনের বাৎসরিক মসহ ১,৫৮,৬৬০ রুবল। ০০০ ৮। ১২০ ১৫০ ১০০ ১০। ৪০ , ০০ ০ সেন্ট-এর উপাধি। (THE ORDER OF ST. ANDREW.) ১৬১৮ খৃষ্টাব্দের ২০ ডিসেম্বরে পিটার দি গ্রেট, কর্তৃক এই উপাধি সৃষ্ট হইয়াছিল। ইউরোপের অন্যান্য সভ্য, রাজসভার সহিত স্বীয় রাজসভার গৌরববৃদ্ধি এবং তুরস্কের সহিত স্বীয় রাজ্যস্থ সম্ভান্তগণের উৎসাহ বন্ধন জন্য পিটার দি গ্রেট, এই উপাধি প্রচলন করিয়াছিলেন।
৪৬ রুসিয়ার ইতিহাস। সেন্ট, এ, রুস-সাম্রাজ্যের পরম হিতৈষী মহাপুরুষ। মস্কোভী * ন- শ্রুতি অনুসারে জানা যায় যে, সেট এও নগৰনিবাসী সুভােনীয়দের নিকট স প্রথম খষ্টধর্য “চার করিয়াছিলেন। এই জন্য তাহার গৌরবার্থ তন্নামে এই উপাধি সৃষ্ট হয়। সেট এ উপাধি রুসাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানসূচক। সম্রাটের বিশেষ অনুগ্রহ না হইলে এই উপাধি কেহই পায় । এই উপাধির সহিত আলেজান্দার নিউস্কি, সেট, এন্ এবং সেন্ট ষ্টানিলেয় উপাধিও একত্রে প্রদত্ত হয়। “সেট, এণ্ড,” উপাধিলাভার্থী নাইটকে ১৪০টি রৌপ্য রুবল ফী দিতে হয়। এই উপাধিধারী দ্বাদশ জন সাধারণ মেম্বর এবং তিন জন পাদরী মেম্বর বাৎসরিক ৬,০৯২ কবল মসহারা ভােগ করেন। এই উচ্চতম উপাধির পদক বা ভূষণ অনেক দিন ধরিয়া অনেক রকমের হইয়া আসিতেছিল, কিন্তু এক্ষণে ইহার আকার ক্রুশের ন্যায় 'হইয়াছে। সেই ক্রুশপট্টের উপরে নীল মিনা নিৰ্মিত সেট এণ্ডর প্রতিমূর্তি। সেন্ট এর উভয় হ”ে “Sunctus Andrets Protector Russi e” পদস্তিত বাক্য গুলির প্রথম অক্ষর S. A. P. B. শিখিত। তা ছাড়া তিনটি রাজকুটের সহিত সামাজ্যের ঈল পক্ষীর উপর, সই মূর্তি সংস্থাপিত। আশমানী ও নীল রঙের চওড়া ফিতা দক্ষিণ স্কন্ধ হইতে বাম দিকের উরুসন্ধি পর্যন্ত উত্তরীয়ের ন্যায় ঝুলাইয়া, তদুপরি এই পদক ব্যবস্কার করিতে হয়। সেট, এ, ক্রুণধারী নাইটগণের তফত দার সবুজ মখমলের এক প্রকার কোরা আছে, কোন উৎসবের সময় বা নিমন্ত্রণ-সভায় এই পদক বক্ষোলগ্ন করিয়া গমন করিলে সেই গৌরব-পরিচ্ছদ পরিধান করিতে হয়। তা ছাড়া তাদের বক্ষোদেশের দক্ষিণাংশে আর একটি স্বর্ণ নক্ষত্রপদক থাকে। সেই পদকের উপর সাম্রাজ্যের দুইটি ঈগল পক্ষ। অঙ্কিত এবং রুস ভাষায় “বিশ্বাস ও ৰাজভক্তির জন্য পদটি লিখিত থাকে। সেন্ট ক্যাথারাইনের উপাধি। (THE ORDER OF ST. CATHERINE. ) ১৭১৪ খৃষ্টাব্দের এই ডিসেম্বর পিটার দি গ্ৰট কর্তৃক এই উপাধি সৃষ্ট হইয়াছিল। এই উপাধির দুইটি শ্রেণী আছে। রাজপরিবারস্থ নারীগণ সেন্ট ক্যাথারাইনের উপাধি। ৪৭ ব্যতীত, কেবল অপর দ্বাদশটি সন্ত্ৰাস্তবংশীয় রমণীর ভাগ্যে এই উপাধি ঘটিয়া থাকে। সেট, ক্যাথারাইন উপাধির দ্বিতীয় শ্রেণীর পদক বিদেশীয় উচ্চপদস্থ রমণীরা পাইয়া থাকেন। উহার সংখ্যা ৯৪টি। তা ছাড়া রাজবংশীয়া নারীরাও এই উপাধি পাইয়া থাকেন। এই উপাধি-পদকের আকার অষ্টকোণবিশিষ্ট নক্ষ। ইহার মধ্যস্থল লােহিত বর্ণ। মধ্যস্থলে রুসীয় রাজমুকুট অঙ্কিত আছে। রাজমুকুট বেষ্টন করিয়া প্রতিপা ' শ্লোক (Motto) লিখিত থাকে। বামবঙ্গে এই উপাধি- পদক ধারণ করিতে হয়। রুসীয় আইনানুসারে এই উপাধিধারিণী স্ত্রীলোকেরা প্রত্যহ ঈশ্বরের নিক। প্রথম পিটারের মুক্তি এবং রাজপরিজনের সহিত বর্তমান সম্রাটের কুশল প্রার্থনা করেন। এই সকল নারী স্ব স্ব ব্যয়ে অসভ্যদিগের হস্ত হইতে খৃষ্ট ধর্মাবলম্বিগণকে উদ্ধার করেন। সেন্ট ক্যাথারাই ইষ্টটিউ• শনের কার্য- নিহ-ভার এই সকল নারীদের হস্তে অর্পিত হয়। প্রতি বৎসর ২৫এ নবেম্বর এই উপাধির বাৎসরিক উৎসব হয়। আলেজান্দার মিউস্কির উপাধি। (THE ORDER OF ALEXANDER NEWSKY.) এক সময়ে রুসিয়ার অন্তর্গত নবগরদ নগর ইয়ারের পুত্র আলে- জান্দারের অধীনে ছিল। ১১৪০ খৃষ্টাব্দে নবগ রদ নগর লইয়া আলেজান্দারের সহিত সুদি, ফি, সুইড এবং লিভােনীয় ও জৰ্ম্মণ নাইট গের যু ঘটে। সুইড গণ বলপুক নিতা নদীর নিকট পর্যন্ত প্রবেশ করিয়াছিল। কিন্তু ইয়াবােস্লার পুত্র আলেজান্দার ভয়ানক যুদ্ধ করিয়া তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিয়াছিলেন। এই বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য সে সময়ে তিনি রসগণের নিকট “নিউস্কি (Newsky) এই নব নাম প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। পিটার দি গ্রেট নিভা নদীর তীরে নব রাজধানী সেন্ট পিটার্সবর্গ নগর স্থাপনের সময় এই মহাপুরুষের নাম চিরস্মরণীয় করিবার জন্য ইচ্ছুক হইয়া- রুসিয়ার ইতিহাস। ছিলেন। নিউস্কির নামে তিনি একটি উপাধি সৃষ্টি করিতে চেষ্টিত হইয়া- ছিলেন, কিন্তু মনের চেষ্টা কার্যে পরিণত করিবার পূর্বেই তাহার মৃত্যু হইয়াছিল। যাই হোক, তাহার পত্নী রাণী ক্যাথারাই স্বামীর ইচ্ছা পূর্ণ করিয়াছিলেন। ক্যাথারাই এই উপাধি সৃষ্টি করিয়া তদীয় সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু মেন্সিককে সর্বাগ্রে ইহা দ্বারা গৌরবিত করিয়াছিলেন। এই উপাধি- দান-কাৰ্য ১৭২৫ খৃষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিলে হইয়াছিল। আলেকজান্দার নিউস্কির উপাধিপদক লাল মিনা করা অষ্ট কোণাকার। প্রত্যেক কোণে এক একটি করিয়া সুবর্ণ ঈগল পক্ষী উপবিষ্ট । ইহার মধ্য- ভাগে শাদা মিনার কাৰ্য। সে স্থানে অশ্বপৃষ্ঠে সেন্ট, আলেজান্দার নিউস্কির প্রতিমূর্তি। রুস-ভাষায় পদকের প্রতিপাদ্য শ্লোক আমাদের পিতৃ- ভূমির গুণজন্য ” লিখিত থাকে। সিভিল ও মিলিটারী উভয় শ্রেণীতেই এই উপাধি বৰ্ত্তে। ইহার আর শ্রেণীবিভাগ নাই। সামরিক বিষয় সম্বন্ধে যাহারা মেজর-জেনেরেল (Major-General ), তাহারাই এই উপাধি প্রাপ্ত হন। এই উপাধিপ্রাপ্ত নাইটের সংখ্যা কেবল বার জন। উহার মধ্যে পাঁচ জন পাদরী ও সাত জন অপর মেম্বর। এই বার জন নাইট বৎসরে ৭৩১৪ রুবল ও ৮ কোপেক বৃত্তি পান। ৩০ সেপ্টেম্বর এই উপাধির সাম্বৎসরিক উৎসব হয়। সেন্ট, এনের উপাধি। " (THE ORDER OF ST. ANN.) এই উপাধি পূৰ্বে হলষ্টী স্নেউইগ পরিবারের ছিল। সম্রাজ্ঞী এ এবং তৃতীয় পিটারের কন্যা ডচেস্ এন পেটোনার সম্মানার্থ ডিউক চার্লস ফেডরিক কর্তৃক (১৭৩৫ খৃষ্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারি) কীল (Kiel) নগরে সৃষ্ট হইয়াছিল। প্রথমে এই উপাধির একটি শ্রেণী ছিল, ও পনর জন নাইট এই উপাধি- পদক পাইতেন। এই উপাধির সৃষ্টিকর্তা চার্লস্ ফেডরিকের পুত্র সম্রাট তৃতীয় পিটার কুসিয়ায় এই উপাধি আনয়ন করেন। রুস-সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় সেন্ট জর্জের সাময়িক উপাধি। ৪৯ সেন্ট ক্যাথরাইনের রাজত্বকালে গ্রাণ্ড, ডিউ এই উপাধির বিতরণকর্তা ছিলেন। এই গ্ৰাণ্ড, ডিউকই পরে সম্রাট প্রথম পন্ নাম ধারণ করেন। ১৭৯৬ খৃষ্টাব্দে সম্রাট পল রাজসিংহাসনে আরােহণ করিয়া হষ্টী-সেউইগ পরিবারের এই উপাধিকে রুসীয় উপাধি বলিয়া ঘােষণা করিয়া দেন। পূৰ্ব্বে ইহার শ্রেণী-বিভাগ ছিল না, কিন্তু সম্রাট পল কর্তৃক বিদেশীয় ও দেশীয়দের জন্য ইহা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হইল। আরও তিনি আদেশ দিলেন যে, এর উপাধিপদকধারীরা সেন্ট এনের উপাধি-পদকও ব্যবহার করিতে পারিবেন। ১৮১৫ খৃষ্টাব্দে সম্রাট প্রথম আলেজান্দার আবার ইহাতে চতুর্থ শ্রেণী যােগ করিলেন। ঐ শ্রেণী কেবল সামরিক লােকদের জন্য হইল। চতুর্থ শ্রেণীর মেয়েরা স্ব স্ব তরবারির মুষ্টি স্থানে উপাধিপদক ব্যবহার করিবার আদেশ পাইলেন। ১৩ ই ও ১৪ ই ফেব্রুয়ারি এই উপাধির বাৎসরিক উৎসব হয়। এই উপাধিপদকের মধ্যস্থলে সেন্ট, এনের নামের আদ্য অক্ষর ও নক্ষত্র অঙ্কিত থাকে। ইহার প্রতিপাদ্য শ্লোক “ঈশ্বরভয়, ন্যায় ও বিশ্বাসের বন্ধুগণের প্রতি” (Amant, just, piet. fidem.)। যে সকল বিদেশীয় ব্যক্তি রুসীয় রাজদরকারে কাৰ্য করেন না, অথচ উপযুক্ত,সেন্ট এন্” উপাধি বেশীর ভাগ তাহাদিগকেই দেওয়া হইয়া থাকে। সেন্ট জর্জেৱ সাময়িক উপাধি। (THE MILITARY ORDER OF ST, GEORGE.) ১৭৬৯ খৃষ্টাব্দের ২৬এ নবেম্বরে (কেহ কেহ বলেন, ৭ই ডিসেম্বরে ) স্কুলসম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথারাইন কর্তৃক এই উপাধি সৃষ্ট হয়। সৈন্য ও নৌবিভাগীয় উপযুক্ত কর্মচারিগণকে গুণের পুরস্কার দিবার জন্য এই উপাধির সৃষ্টি। ইহা চারি শ্রেণীতে বিভক্ত। তন্মধ্যে মেজর জেনেলেরাই কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাইট হইতে পারেন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদক কেবল কর্ণেলদের প্রতিই বর্তে। ০ রুসিয়ার ইতিহাস। সেন্ট জর্জ উপাধি পাইবার নিমিত্ত কাহাকেও ফী দিতে হয় না। এই উপাধিধারিগণের সৰ্বশুদ্ধ বার্ষিক বৃত্তি ১৯৭১ রুবল। যে দিবস এই উপাধি সৃষ্ট হয়, প্রতি বৎসর সেই দিবস ইহার উৎসব হইয়া থাকে। উৎসবের সময় কেবল জেনেরেলদিগকে সমপরিচ্ছদে উপ- স্থিত হইতে হয়, অন্যান্য মেম্বরদের পক্ষে সে নিয়ম নাই। ‘সেন্ট বুভিমিরের উপাধি। (THE ORDER OF ST. VLADIMIR.) ১৭৮২ খৃষ্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর (কাহার কাহার মতে ৪ঠা অক্টোবর) মহারাণী দ্বিতীয় ক্যাথারাই, তাঁহার সাম্বৎসরিক রাজ্যাভিষেক মহােৎ- সবের সময়ে মহাপুরুষ ব্লডিমিরের নাম স্মরণাৰ্থ এই উপাধির সৃষ্টি করেন। তিমির ৯৭৬ খৃঃ অব্দে কুসিয়ায় খৃষ্টধর্ম প্রচার করিয়া রুসদের নিকট ধৰ্ম্ম-প্রচারক (Apostle) আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সম্রাট প্রথম পল তাহার রজত্ব সময়ে এই উপাধির প্রথা উঠাইয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার পুত্র আলেকজান্দার সেন্ট জর্জ উপাধির সহিত পুনৰ্বার ইহা প্রচার করিয়া যান। যে সকল ব্যক্তি দেওয়ানী ও যুদ্ধবিষয়ে এবং সাহিত্য শিল্প ও বিজ্ঞানে বিশেষ পরাকাষ্ঠা লাভ করেন, তাহাদিগকে এই উপাধি অর্পিত হয়। এই উপাধি চারি শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রতি বৎসর উপাধিদান-সভা হইতে এক- দিন এই উপাধি বিতরিত হয়। এই উপাধিপদকে হীরকাদি মণ্ডিত থাকে না। সেন্ট-ডিমির-উপাধি-পদকের এক পৃষ্ঠে এই উপাধি কৃষ্টির তারিখ রুসীয় ভাষায় লিখিত থাকে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর উপাধিধারীরা বেশীর ভাগ দক্ষিণ বক্ষে একটি নক্ষত্র-চিহ্ন ব্যবহার করিতে পারেন। বক্ষের মধ্যস্থলে ওখানি পত্রে (S, R, K. W.) অর্থাৎ সেন্ট ব্লডিমির দি এপসােল লিখিত থাকে। উপাধি-পদকের মধ্যস্থলস্থ বেষ্টনীতে রুস ভাষায় লিখিত থাকে—“উপযােগিতা সম্মান ও গৌরব *। ২৭ সেপ্টেম্বর এই উপাধির বার্ষিক উৎসব হয়। যদি এই উপাধিধারী কোন নাইটের মৃত্যু হয়,তাহা হইলে তাহার বিধবা পত্নী স্বামীর মৃত্যুর পর এক বৎসর কাল পুরা মসহ পান।
সেন্ট জনের উপাধি। (THE ORDER OF ST. JOHN.) ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দে প্রথমতঃ পপালণ্ডে এই উপাধির সৃষ্টি হয়। প্রথম পলের সময় হইতে প্রবর্তিত হইয়া এক্ষণে দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হইয়াছে। এক শ্রেণী গ্ৰীক চর্চ এবং অপর শ্রেণী রােমান ক্যাথালিক ধর্মাবলম্বীদের জন্য এক্ষণে প্রথম শ্রেণীর উপাধিধারী নাইটের সংখ্যা ৯৮টি, কিন্তু পূৰ্বে ৩৯৩টি ছিল। তাহা ছাড়া এতৎ সম্বন্ধীয় গ্ৰাণ্ড ক্রসের নাইটের সংখ্যা ৩২টি পৰ্যন্ত হইত। শ্বেত ঈগলের উপাধি। (THE ORDER OF THE WHITE EAGLE.) চতুর্থ ডিমিরের সময়ে জর্জ অসিলিন্স্কি সাধারণ তন্ত্রের পােলও রাজ্যের চ্যান্সেলার ছিলেন। তিনি টেনেজিনের সেনারি (seignory) প্রাপ্ত হইয়া আপনাকে কাউন্ট বলিয়া পরিচিত করিয়াছিলেন। সেই সময়ে তিনি কুসিয়ার সমাট এবং পােপকে অনুরােধ করিয়াছিলেন যে, তাহারা তাহাকে কুমার (Prince) বলিয়া অভিহিত করেন। যাই হউক, তিনি এই উপাধি পাইতে না পাইতেই আপন ইচ্ছায় নিষ্কলঙ্ক কুমারী (Immaculate Vergin) নামে একটি উপাধি সৃষ্টি করিলেন। •১৬৩৪ খৃষ্টাব্দে অষ্টম পােপ আৰ্বান এই উপাধির ব্যবস্থা অধিকতর পাকা করিলেন। এক্ষণে এই উপাধি “শ্বেত ঈগলের উপাধি (Order of the white Eagle) নামে প্রচলিত হইয়া আসিতেছে। ইহার কেবল একটি শ্রেণী আছে। এই উপাধির সনন্দ পত্ৰসৰ্ব্বদা জার কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়। রুসদের জন্য রুসীয় ভাষায় এবং পােলদের জন্য পােল এবং রুসীয় উভয় ভাষায় এই সন লিখিত হইয়া থাকে। অন্যান্য রুসীয় উপাধিগুলি কেবল খৃষ্ট ধর্মাবলম্বীদিগকে প্রদত্ত হইয়া থাকে; কিন্তু এই উপাধি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী রাও পাইয়া থাকেন। পারসিয়ার শাহ এবং অন্যান্য প্রাচ্য রাজারা রুস সম্রাটের নিকট হইতে এই উপাধি পাইয়াছেন। এই উপাধির ফী ১৫০ • কবল।
সেন্ট ৪ানিলেয়সের উপাধি । (THE ORDER OF THE ST. STANISLAUS.) ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দের ৭ই মে ষ্টানিলেয় অগষ্ট পনিয়াটকি, তাহার বন্ধু এবং সিংহাসনাধিকারীদিগের জন্য এই উপাধির সৃষ্টি করেন। তিনি তদীয় রাজ্যের পরম হিতৈষী মহাপুরুষ সেন্ট ষ্টানিলেয় এবং আপনার নামে ইহা প্রচলিত করেন। এই উপাধির নাইট সংখ্যা ১০০ শত নির্ধারিত আছে। ইহা ছাড়া বিদেশায়েরাও এই উপাধি স্বতন্ত্র পাইয়া থাকেন। ইহা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। শ্ৰেণী অনুসারে নাইটগণকে, ১০৩০ বা ১৫ রুবল ফী দিতে হয়। প্রথম শ্রেণীর ৩০ জন, দ্বিতীয় শ্রেণীর ৬০ জন, তৃতীয় শ্রেণীর ৯০ জন নাইট, ১৪২, ১১৪ এবং ৮৫ কবল বাংসরিক বৃত্তি পাইয়া থাকেন। যাহারা যখন নিম্ন শ্রেণী হইতে উচ্চ শ্রেণীতে উখিত হন, তখন উচ্চ শ্রেণীর বৃত্তি পাইবার মধ্যসময়ের মধ্যে কোনরূপ বৃত্তি পান না। যে সকল উপাধিধারী সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করেন, তাহারা আর বৃত্তি পান না। উপাধিধারীদের বিধবারা স্বামীর মৃত্যুর পর এক বৎসর কাল পুরা মহারা পাইয়া থাকেন। উপাধিধারীর মৃত্যু হইলে উপাধি-পদক অবশ্যই সম্রাটকে ফিরাইয়া দিতে হয় ; না দিলে উহার মূল্য ফেরত দিতে হয়। এপ্ৰেল, বা ৭ই মে এই উপাধির বার্ষিক উৎসব হয়। গত ২০ এ এলে সেন্টপিটার্সবর্গের “সেন্টপিটার্সবার্গার জীট” নামক সংবাদপত্রে লিখিত হইয়াছে, বর্তমান রুস সম্রাট তৃতীয় আলেকজান্দার, জেনেবল কমারফের নিকট সেন্ট, জর্জ উপাধির অনেকগুলি পদক (Crosses) পাঠাইয়াছেন। তাহার যে সকল সৈন্য খুদ্ধ নদীতটে আফগান- দিগের সহিত যুদ্ধকালে যৎপয়ােনাস্তি বীরত্ব দৰ্শাইয়াছে, তাহাদিগকে ঐ পদকগুলি দেওয়া হইবে। তা ছাড়া রুস-সেনাপতিকে বলা হইয়াছে, অন্যান্য বীরগণের নাম লিখিয়া শীঘ্রই যেন সম্রাটের নিকট পাঠান হয়। জেনারেল কমারফ আফগান-যুদ্ধে জয়লাভ করাতে, সম্রাট সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে একখানি হীরকমণ্ডিত তরবারি পারিতােষিকস্বরূপ প্রদান করিয়া- ছেন। তাহার পর তারের সংবাদে জানা গিয়াছে যে, এই সকল পারিতােষিক- প্রদান-ধ্যাপার সমাধা হইয়া গিয়াছে।
অষ্টাদশ অধ্যায়। ব্যবহারিক শিল্প (INDUSTRIAL ART); স্থপতি ( ARCHITEC. TURE ); ভাস্করীয় কাৰ্য্য (ScuLPTURE); সূক্ষ্মশিল্প ( FINE ART ), ইত্যাদি। রুসসাম্রাজ্যে ব্যবহারিক শিল্পের অভাব নাই। নিয়ে কয়েকটি প্রসিদ্ধ স্থানের বিবরণ সহ উহার দৃষ্টান্ত দেওয়া গেল। সেন্ট পিটার্সবার্গ। এই মহানগর রুসিয়ার রাজধানী। সুইডেনের অধিপতি একাদশ চার্লসের সময় কতকগুলি সুইড সৈন্য নিভা নদীর তীরে নিষ্কর ভূমি পাইয়া- ছিল। তখন ঐ স্থান অস্বাস্থ্যকর ছিল। এক্ষণে সেই স্থানেই বর্তমান মহানগর সেন্ট পিটার্সবার্গ স্থাপিত আছে। ১৭০৩ খৃষ্টাব্দে বণ্টিকৃ সমুদ্র- তটে পিটার দি গ্রেট রুস-সাম্রাজ্যের একটি নূতন রাজধানী নিৰ্মাণ করিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন। তথায় তিনি এই উদ্দেশে প্রথমে একটি গৃহ নির্মাণ করাইয়াছিলেন। সেই গৃহটি কাষ্ঠ-নির্মিত। আজিও পর্যটকেরা উহা দেখিতে পায়। তাহার উপরিভাগে এক্ষণে ইষ্টকরাশি রহিয়াছে। সময়ে কত পরিবর্তন ঘটে। যে স্থান এক সময়ে অতিসামান্য ছিল, আজ তথায় পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার স্বরূপ সেন্ট পিটার্সবার্গ শােভা বিস্তার করি- তেছে। ক্রমে ক্রমে যেমন রাজার পর রাজা হইতেছেন, সেইরূপ সেন্ট পিটার্সবর্গের শােভার পর শােভা বাড়িতেছে। এই জন্য কলিকাতার ন্যায় সেন্ট পিটার্সবর্গেরও নাম হইয়াছে “প্রাসাদ-নগর” (The City of Palaces.)। সেন্ট পিটার্সবর্গে কেবল সম্রাটভবনের সৌন্দৰ্য নয়, অপরাপর ধনীদেরও মনােহর অট্টালিকাশ্ৰেণীর শােভা ক্রীড়া করিতেছে। চারি দিকে সুবিস্তৃত রাজপথ। প্রত্যেক রাজপথের দুই পার্শ্বে বড় বড় অট্টালিকা। রুসগবর্ণ- মেন্টের আদেশে কুশ্রী ও অস্বাস্থ্যকর গৃহ রাখিবার যাে নাই। রাক্সাজ্ঞায় ৫৪ রুসিয়ার ইতিহাস। প্রত্যেক গৃহস্বামীকে প্রতিৎসর একবার করিয়া বাড়ী মেরামৎ ও চুণকাম করিতে হয়। অট্টালিকাশ্রেণী যদিও ইষ্টকনিৰ্ম্মিত, কিন্তু সর্বদা সুধাধবলে ধবলিত থাকায় সুন্দর দেখায়। রাজপুতানার জয়পুর নগরও এই ধরণের রাজধানী, তবে ইষ্টকের বদলে প্রস্তরের বাড়ীই যথেষ্ট। নিভা নদী ও তাহার শাখা-নদীগুলি কর্তৃক কতিপয় দ্বীপ সৃষ্ট হইয়াছে। সেই সকল দ্বীপের উপর সেন্ট পিটার্সবর্গ রাজধানী নির্মিত। এই নগর দ্বাদশ-পল্লী বা মহল্লায় বিভক্ত। সেন্ট পিটার্সবর্গের পরিধি ৯ ক্রোশ এবং ব্যাস ৩ ক্রোশ। প্রত্যেক পল্লী বা মহল্লার সীমা শাখানদী বা খালের দ্বারা নির্ধারিত হইতেছে। সুতরাং লোকজনের গতায়াতের জন্য সেতুর সংখ্যা সত্তরটি। তন্মধ্যে অর্ধেকগুলি প্রস্তরনির্মিত, বাকি অর্ধেকগুলির কতক- গুলি লৌহ ও কতকগুলি কাষ্ঠগঠিত। প্রতিবৎসর বসন্তকালে সাভােগা হ্রদ হইতে রাশি রাশি বরফ ভাসিয়া আসিয়া নিভা নদীতে জমাট হইয়া পড়ে, এইজন্য ঐ নদীর উপর কোন স্থায়ী থেমাে বা পিল্পে-পুল (Pillar bridge) নির্মিত হয় নাই। সকলের যাওয়া আসার জন্য উহার উপর দোল-পুল (Hanging bridge) আছে। টেস্ নদীর উভয় পারে যেমন লণ্ডন নগর অবস্থিত, সেইরূপ নিভা, নদীরও উভয় তটে সেন্ট পিটার্সবর্গ নগর দাঁড়াইয়া আছে। গ্রীষ্মকালে ঐ নগরের দুই তীরস্থ দুই অংশ এক করিবার জন্য তিনটি বৃহৎ বৃহৎ ভাসা-পুল (Pontoon bridge) নির্মিত হয়। ঐ তিনটির মধ্যে যেটি সৰ্বশ্রেষ্ঠ সেতু, তাহার দৈর্ঘ্য ১২৫০ এবং বিস্তার ফুট, নাম “ইহা সেতু” (Isaac Bridge)। অপর দুইটির মধ্যে একটির নাম “টয়েস্কয় সেতু” (Troitskoi Bridge), দৈর্ঘ্য ২৪৪৬ ফুট ; অপরটির নাম “ভক্রেসেন্সক সেতু” (Voskresenskoi Bridge), দৈর্ঘ্য ১২৬০ ফুট। ঐ তিনটি সেতুর উপরিভাগে বড় বড় তক্তা পাতা, দুই দিকে মানু- ষের যাতায়াতের জন্য পদপথ ( Foot-path) এবং স্থিরভাবে ভাসিয়া থাকিবার জন্য বড় বড় লৌহ-খোল (Partoon) গুলি নঙ্গর করা থাকে। নিভা নদীর উপর ২৪৫৬ ফুটের অপেক্ষা দীর্ঘাকার সেতু নাই, কিন্তু ঐ নদীর এক এক স্থলের বিস্তার ৩৫০০ ফুট পর্যন্ত দেখা যায়। ইউরােপের কোন রাজধানীই নিতার ন্যায় মনােহর নদীতটে স্থাপিত নয়।
সেন্ট পিটার্সবর্গ। বসন্ত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা কালে সেন্ট পিটার্সবর্গের সেতুগুলির যেমন প্রয়ােজন হয়,শীতকালে তেমন নয়। শীতের সময় নিভা ও তাহার শাখানদীগুলি জমাট বরফে আচ্ছন্ন হইয়া থাকে। তখন তাহার উপর দিয়া হাঁটিয়া পারাপার হওয়া যায়। কেবল নদী নয়, অর্থন পথ ঘাট সমস্তই বরফে ঢাকিয়া যায়। * পথে গাড়ী চলে না, নদীতে নৌকা চলে না। তখন লােকেরা নৌকার ন্যায় এক প্রকার চক্ৰহীন গাড়ী (Sledge) ব্যবহার করে । রুসিয়ায় বন্ধু হরিণ নামে এক জাতীয় হরিণ, আছে। বরা হরিণ, মানুষ বা বড় বড় কুকুরে ঐ সকল নৌকা টানিয়া লইয়া যায়। প্রকৃতির কাণ্ড অদ্ভুত! জলে গুলে নৌকা চলে । গ্রীষ্মের সময় বরফ গলিয়া যায়, সুতরাং তখন ঠেলাগাড়ীর (Sledge)এর ব্যবহার বন্ধ হয়। তখন পথে ড্রস্কি (Drosky) + নামক চারি চাকার ঘােড়ার গাড়ী চলে। প্রকৃত নৌকা জলে ভাসে। সেন্ট পিটার্সবর্গের রাস্তাগুলি বড় ভাল নয়। প্রত্যেক রাস্তায় পাথরের টুকরা বিছাইয়া দেওয়া হয়। শীত ও গ্রীষ্মকালে বরফ ও জলের সর্ষণ জন্য রাস্তা বন্ধুর হইয়া পড়ে। গাড়ী ও লােকের যাতায়াতের বড় সুবিধা হয় না। সম্রাট প্রথম আলেজান্দার, এক বার ইংলণ্ডে গিয়াছিলেন, সেই সময়ে তিনি তত্ৰন্থ রাস্তাগুলি দেখিয়া আসিয়া স্বীয় রাজধানীর দুর্দশা মােচনে মন দিয়াছিলেন। তাহার দ্বারা সেন্ট পিটার্সবর্গের পথে পথে ফুট- পাথ নির্মিত হয়। যাই হউক, পূৰ্ব্বাপেক্ষা এক্ষণে সেন্ট পিটার্সবর্গের পথ- গুলি অনেক ভাল হইয়াছে। সেন্ট পিটার্সবার্গ নগরের মধ্যে জলযুদ্ধ-ব্যবস্থাপক-সমাজ-প্রাসাদই (Admiralty) সৰ্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। এই প্রাসাদ নিভা নদীর তটে অবস্থিত। অত্যন্ত শীতের সময় যখন তাপমান (Thermometer) ঘরে পারদ খুব নীচে নামিয়া পড়ে এবং বাতাস বন্ধ হয়, তখন আকাশ হইতে অনবরত ক্ষুদ্র ক্ষু বরফখণ্ড পড়িতে থাকে। উহাতে কুসিয়ার রাজধানী সেন্টপিটাসবগও তদুত্তর স্থান সকল কতক কতক আচ্ছন্ন হয়। প্রত্যেক বরফ টুকরা ছয়টি সমভুজ ও সমকোণবিশিষ্ট। প্রত্যেকের আকার একটি মটরের আধ খানি। f ডাঝি এক রকম বেঞ্চ-সাজান গাড়ী। ইহাতে শকটচালক ব্যতীত ও হইতে ৬ জন লােক পিঠাপিঠি করিয়া বসিতে পারে। বেঞ্চের শেষ ভাগে কোচ মান বসিয়া গাড়ী হকায়।
রুসিয়ার ইতিহাস। ইহা দীর্ঘে ১৪০০ এবং প্রস্থে ৬৭২ ফুট। যুদ্ধ-জাহাজ নির্মাণ করিবার জন্য এখানে চারিটি স্থান আছে। এই প্রাসাদের মধ্য হইতে তিনটি বড় বড় রাস্তা বাহির হইয়া গিয়াছে। ইহার পরেই উইন্টার প্রাসাদ (Winter Palace) গণ্য। ইহাও নিভা নদীর তীরে সুশােভিত। ইহার যে অংশ নদীর দিকে, তাহার দৈর্ঘ্য ৭২১ ফুট। ১৮৩৭ খৃঃ এই রাজপ্রাজাদ অগ্নিসংযোগে দগ্ধ হইয়াছিল। পরে পুনৰ্ব্বার নির্মিত হইয়াছে। উইন্টার প্রাসাদের বাহিরের ও ভিতরের গঠন- সৌন্দৰ্য্য খুব চমৎকার। উইন্টার প্রাসাদের কিঞ্চিৎ দূরে বড় হার্মিটেজ, ও ছােট হামিটেজ, নামে অপর দুইটি সুন্দর প্রাসাদ আছে। একটি সুচারু সেতু পথের উভয় পার্শ্বস্থ এই দুইটি প্রাসাদকে এক করিয়া রাখিয়াছে। ইহা ছাড়া সেন্ট পিটার্সবর্গে আরও অনেকগুলি রাজপ্রাসাদ আছে। তন্মধ্যে মৰ্ম্মর-প্রাসাদ (Marble Palace) এবং টোরিডা প্রাসাদ (Taurida Palace) অতি পরিপাটি। রুসরাজী দ্বিতীয় ক্যাথারাই তঁাহার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রিয়পাত্র কাউন্ট, অর্লফের জন্য মৰ্ম্মর-প্রাসাদটি নির্মাণ করাইয়াছিলেন। পরে সম্রাট পলের সময় পোলণ্ডের শেষ রাজার এই প্রাসাদে বাস করিয়াছিলেন। সেনাপতি পোটেকি কর্তৃক টোরি প্রাসাদ নির্মিত হইয়াছিল। রুসীয় ইতিহাসে লিখিত আছে যে, পটেকি ক্রিমিয়া-যুদ্ধে গিয়া প্রাণ হারাইবার অব্যবহিত পূর্বে এই প্রাসাদে মহারাণী ক্যাথারাইনকে একটি মহা-ভােজ দিয়াছিলেন। ১৮২৫ খৃঃ গ্ৰাণ্ড ডিউ মাইকেলের একটি বৃহৎ অট্টালিকা নির্মিত হয়। ইহাও সেন্ট পিটার্সবর্গের অন্যতম অলঙ্কার স্বরূপ। রুস-গবর্ণমেন্টের রাজকার্য নির্বাহের জন্য সেন্ট পিটার্সবর্গে অনেকগুলি বড় বড় অট্টালিকা আছে। তন্মধ্যে ইসহাক স্কোয়ারে সিনেট হাউস নামক অট্টালিকাটি অন্যতম। এটাট, মেজর ( Etat Major) নামক অট্টালিকা খুব প্রকাণ্ড। এই স্থানে যুদ্ধ-সংক্রান্ত বিষয়ের আলােচনা হয়। তা ছাড়া রুস-রাজ্যের মানচিত্র (Map) অঙ্কিত হয়। মানচিত্র আঁকিবার জন্য অনেক লােক নিযুক্ত সেন্ট পিটার্সবর্গ। ৫৭ আছে। ঐ সকল মানচিত্র বিক্রীত হয়। তা ছাড়া এ স্থলে মুদ্রাযন্ত্র আছে। উহাতে রাজকাৰ্যসম্বন্ধীয় কাগজপত্র ছাপা হয়। এটাট, মেজর অট্টালিকায় একটি বৃহৎ লৌহগৃহ আছে। উহা ২৫০ ফুট দীর্ঘ, ১০০ ফুট প্রস্থ এবং ৭০ হইতে ৮০ ফুট উচ্চ। ঐ লৌহ-গৃহে ১৭১৯ খৃষ্টাব্দ হইতে যুদ্ধসংক্রান্ত সমস্ত কাগজ পত্র রক্ষিত হইয়া আসিতেছে। কাগজগুলি এরূপ ভাবে শ্রেণীবদ্ধ আছে যে, প্রয়ােজন হইলে তৎক্ষণাৎ যে কোন কাগজ বাহির করা যায়। এটাট মেজরে ১২০০ লােক কৰ্ম্ম করে। তন্মধ্যে ১০০০ লােক সেইখানে বরাবর থাকে। ২০০ লােক কাৰ্য্য করিতে আসে, কাৰ্য্য সারিয়া বাড়ী যায় । সেন্ট মাইকেল প্রাসাদে সম্রাট প ষড়যন্ত্রীদের হস্তে গােপনে নিহত হইয়াছিলেনবলিয়া আজ পর্যন্ত রুসিয়ার কোন রাজা বা রাজবংশীয় লােক সেখানে বাস করেন না। এক্ষণে এই প্রাসাদে “হােটেল ভু জিনী” (Hotel du Genic) নামে একটি সামরিক বিদ্যালয় স্থাপিত আছে। ইঞ্জিনিয়ারের ঐ বিদ্যালয়ে শিক্ষা করে। নৃতন ও পুরাতন অস্ত্রাগার, অস্ত্রনির্মাণাগার, পােষ্ট আফিস্ এবং টঙ্ক- শালা এই কএকটি অট্টালিকাও দৈখিবার যােগ্য। উইন্টার প্রাসাদের সম্মুখ দিকে একটি দ্বীপের উপর নগর রক্ষাৰ্থ যে দুর্গটি নির্মিত হইয়াছে, উহাও অতি বৃহৎ ও চমৎকার। বিজ্ঞান ও সূক্ষ্ম শিল্প শিক্ষা দিবার জন্য সেন্ট পিটার্সবর্গে কএকটি বৃহৎ বৃহৎ অট্টালিকা আছে। প্রত্যেকটিই দেখিবার যােগ্য। তাহাদের মধ্যে রাজকীয় বিজ্ঞান-মন্দিরটিই সর্বাপেক্ষা ভাল। পিটার দি গ্রেট নিভা নদীর দক্ষিণ তটে এই অট্টালিকাটি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। ইহার মধ্যে নানাবিধ বহুমূল্য সামগ্রী সংগৃহীত আছে। ইহাতে পশুশালা, খনিজ পদার্থ- শালা, আসিয়িক ও মিশ্রদেশীয় চিত্রশালা, শুষ্ক উদ্ভিজ্জ ও শুষ্ক কীটসংগ্রা- হিকা, প্রাচীন মুদ্রা-সংগ্ৰাহিকা, আসিয়িক রুসীয় এবং অন্যান্য দেশীয় বর্তমান মুদ্রাসংগ্ৰাহিকা, এবং একটি বৃহৎ পুস্তকালয় সমেত অদ্ভুত দ্রব্য- শালা আছে। এই বিজ্ঞান-মন্দিরে পিটার দি গ্রেটের একটি সামগ্ৰীকক্ষ আছে। উহাতে তাহার নিজের হস্তকৃত অনেক গুলি শিল্প-সামগ্রী , ৫৮ রুসিয়ার ইতিহাস। তাঁহার একটি প্রতিমূর্তি আছে। তিনি পল-টোয়াতে যে আরবীয় অশ্বে আবােহণ করিয়াছিলেন, সেই অশ্ব এবং আর দুইটি তাহার স্নেহের পাত্র কুকুরের মৃতদেহ জীবিতের ন্যায় শােভা পাইতেছে। নিভা নদীর দক্ষিণ তটে রাজকীয় শিল্পাগারটিও খুব বড়। রাণী এলিজা- বেথ কর্তৃক ইহার ভিত্তি স্থাপন হয়, কিন্তু কাৰ্যতঃ রাণী দ্বিতীয় ক্যাথা- রাইনের সময়ে নির্মিত হয়। এই আগারে বহুসংখ্যক চিত্র, খােদিত মূর্তি সজ্জিত আছে। এখানে প্রতি তৃতীয় বৎসরে দেশীয় শিল্পকরদের কারুকার্যের একটি প্রদর্শনী হইয়া থাকে। এই শিল্পাগার-সংলগ্ন একটি শিল্পবিদ্যালয় আছে। উহাতে সম্রাটের ব্যয়ে তিন চারি শত ছাত্র শিল্প- বিদ্যা শিক্ষা করে। যথাসময়ে যে ছাত্র যে বিষয়ে উপযুক্ত হয়, তাহাকে সরকার হইতে সেইরূপ কাৰ্য দেওয়া হইয়া থাকে। আবার যে সকল ছাত্র সর্বোৎকৃষ্ট হয়, তাহারা কুস গবর্ণমেন্টের ব্যয়ে নানাদেশে ভ্রমণ করিয়া শিক্ষার মাত্রা পূর্ণ করে। সুক্ষ্ম-শিল্প সম্বন্ধে অপরাপর সভ্যদেশা- পেক্ষা রুসিয়া যে, এখনও নীচে পড়িয়া আছে, তাহা এই পুস্তকের অষ্টম অধ্যায়ে বলা হইয়াছে। যাই হউক, এক্ষণে রুসসম্রাট রুসছাত্রগণকে বিদেশে গিয়া শিল্প শিক্ষা করিবার যে প্রথা বাহির করিয়াছেন, ইহা রুসিয়ার মঙ্গলের বিষয়। ইহার পর “হােটেল দি মাই” (Hotel des Mines) নামক শিক্ষা- লয়। এখানে রাজ্য ও সৈন্যসংক্রান্ত কাৰ্য্য পাইবার জন্য অনেকগুলি ছাত আকরিক ইঞ্জিনিয়ারি শিক্ষা করে। এখানে প্রায় ৩৪ শত ছাত্র শিক্ষা পায়। প্রথম আলেজান্দারের সময় সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। রাজকীয় রুশবিদ্যালয় নামে আর একটি উচ্চ দরের বিদ্যালয় আছে। সে- খানে দেশীয় সাহিত্যের উন্নতিবিষয়ক চর্চাটা বেশী হইয়া থাকে। তা ছাড়া সেন্ট পিটার্সবর্গে দুইটি স্ত্রীবিদ্যালয় আছে। একটি সন্ত্রান্ত নারী- বিদ্যালয়, অপরটি ক্যাথারাইনের বিদ্যালয়। প্রথমটিতে আট শত এবং দ্বিতীয়টিতে ছ্য শত ছাত্রী অধ্যয়ন করে। রাজ্ঞী ক্যাথারাই এই দুইটি বিদ্যালয়ের চিরস্থায়িত্বের জন্য অনেক টাকা দিয়া গিয়াছেন।
সারকোসিলাে। সেন্ট পিটার্সবর্গে “আওয়ার লেডি অব কজান”, সেন্ট আলেকজান্দার নিউস্কি, সেন্ট পিটার, সেন্ট পল, ক্যাথলিক গির্জা,ইংলিস্ চাচ্ছ, আরমানী গির্জা, লুথারীয় গির্জা এবং একটি মহম্মদীয় মসিদ বিশেষ প্রশংসার যােগ্য। বগাে ডি লুইয়া হাসপাতাল, দরিদ্রের হাসপাতাল প্রভৃতি কএকটি চিকিৎসালয়ও প্রশংসার মােগ্য। প্রথম চিকিৎসালয়টিতে প্রায় দুই হাজার রােগী থাকিতে পারে। ইস্হাক স্কোয়ারের মধ্যস্থলে সেন্ট পিটাল বর্গের স্থাপনকর্তা পিটার দি গ্রেটের একটি বৃহৎ মূর্তি আছে। ১৫০০ টন ওজনে এক খণ্ড বৃহৎ লােহিত প্রস্তরের চূড়ার উপর পিটার দি গ্রেটের মূর্তি স্থাপিত। একটি বৃহৎ পিত্তল- নির্মিত ঘােটকীর উপর পিটার দি গ্রেটের পিত্তলনির্মিত মূর্তি। দেখিলে বােধ হয় যেন মহাবীর পিটার পৰ্ব্বতের উপরেও অবলীলাক্রমে অশ্বারােহণে ধাবিত হইতে পারিতেন। ২ ক্রোশ দূর হইতে ঐ বৃহৎকায় লােহিত প্রস্তর- খণ্ড আমীত হইয়াছিল। দ্বিতীয় ক্যাথারাইনের আদেশে ফরাসী ভাস্কর “ফাকনেট, এই অদভুত পৰ্বত ও মূর্তি নির্মাণ করিয়াছিলেন। পৰ্বতগাত্রে ল্যাটিন ও রুস ভাষায় লিখিত আছে : “To Piters the First, Catherine the Second, 1782." ক্রষ্টা। সেন্ট পিটার্সবর্গের দশ ক্রোশ দূরে নিভা নদীর মােহানাস্থিত একটি দ্বীপের উপর ক্রষ্টাড নামক নগর ও দুর্গ স্থাপিত। দুর্গটির চারি ধারে বহুসংখ্যক কামান আছে। এই নগরস্থ নদীগর্ভে রুসীয় যুদ্ধ পােতগুলি থাকে। এই নগরের বারাকগুলিতে ২৫ হাজার সৈন্য থাকিবার স্থান আছে। সারকোসিলাে। সেন্ট পিটার্সবর্গ হইতে ২২ ভাষ্ট দূরে এই নগর অবস্থিত। এখানে ইষ্টকনিৰ্ম্মিত ও পথের কাজ করা একটি বৃহৎ রাজপ্রাসাদ আছে। উহার সম্মুখভাগে প্রায় ৮০০ ফুট জমী। সেই জমীর উপর ইতস্ততঃ থাম, খিলান ইত্যাদি শােভা পাইতেছে। রাণী এলিজাবেথ এই প্রাসাদ নির্মাণ রুসিয়ার ইতিহাস। করিয়াছিলেন। রাণী ক্যাথারাইন জীবনের শেষভাগে এই প্রাসাদেই অব- স্থিতি করিতেন। এই প্রাসাদসংলগ্ন উদ্যানগুলি ইংরেজি ধরণে নির্মিত। প্রাসাদের অভ্যন্তরস্থ গৃহগুলি ফেমশূন্য নানাবিধ চিত্রপটে সজ্জিত। ঐ সকল গৃহের যে গৃহটিতে প্রিন্ পটেমকি থাকিতেন, উহার মেজে কাষ্ঠের অদ্ভুত কারুকার্যে সুশশাভিত। ইহার অন্তর্গত নৃত্যশালা দীর্ঘে ১৪০ এবং প্রস্থে ৫২ ফুট। ইহং দ্বিতল গৃহ। ইহা ভিন্ন আর একটি গৃহ আছে, তাহার নাম সিমহল (Cabinate of Mirrors)। ঐ গৃহের মধ্যে দর্পণসজ্জিত ২৬০ ফুট দীর্ঘ একটি কাষ্ঠমঞ্চ (Gallary)। এই প্রাসাদের যেখানে যেখানে প্রস্তর ও ধাতুনির্মিত প্রতিমূর্তি আছে। এই প্রাসাদের অন্তর্গত ভজনালয়টি নানাবিধ মনােরম সজ্জায় সজ্জিত। ভজনালয়টি আগাগােড়া গিটী করা কাষ্ঠে গঠিত। অলপ চেসমীর জলযুদ্ধে তুর্কীদিগকে পরাজিত করাতে, তাহার সম্মানের জন্য এই প্রাসাদসংলগ্ন একটি উদ্যানে বৃহৎ জলস্তম্ভ দণ্ডায়মান আছে। ঐ স্তম্ভ দেখিবার মােগ্য। নবগরদ। নবগরদ নগরে যতগুলি সুন্দর জিনিষ আছে,তন্মধ্যে সেন্ট সােফিয়ার গির্জা একটি। কনস্তান্তিনােপল নগরে জষ্টিনিয়াস যেরূপ ধরণের একটি বৃহৎ ধৰ্ম্ম- মন্দির নির্মাণ করিয়াছিলেন, ইহা তাহার অনুকরণ। বােধ হয়, নগরদের সেন্ট সােফিয়া গির্জা রুসরাজ্যের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ধৰ্ম্মমন্দির। ৯৮৮ খৃষ্টাব্দে ব্লডিমির দি গ্রেট কর্তৃক সর্বপ্রথম ইহার ভিত্তি স্থাপিত হয়। তার পর ১০৫১ বা ১০৫৭ খৃষ্টাব্দে নবগরদের গ্রেট ডিউক রডিমির যারাভিচ প্রস্তর বা ইষ্টকে ইহার নির্মাণ-কাৰ্য্য সমাধা করেন। অনন্তর ১৩৪০ খৃষ্টাব্দে এই গির্জা অগ্নিতে পুড়িয়া যায়। নবনির্মিত গির্জার সঙ্গে তদানীন্তন গির্জার কোন কোন অংশ আজিও দৃষ্ট হয়। এই গির্জায় আজিও অনেক পুরাতন চিত্র আছে। সেই সকল চিত্রে মেরী, যিশুখষ্ট ও অন্যান্য সেন্ট- দের মূর্তি অঙ্কিত আছে। ডাক্তার ক্লার্ক বলেন, খৃষ্টধর্মান্তৰ্গত চিত্রপটই রুসিয়ায় খৃষ্টধৰ্ম্মর সূত্রপাত করিয়াছে। ঐ সকল ছবি আসিবার পূর্বে সেখানে পৌত্তলিক ধৰ্ম্ম প্রচলিত ছিল। ৯৯১ খৃষ্টাব্দে ব্লডিসির দি গ্রেট টর্শক, বা টর্জক। ৬১ খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। ব্লডিমির প্রথমে পুত্তল, পূজক ছিলেন। তঁাহার ৮০০ প্রণয়িনী ছিল। কিন্তু গ্রীক সম্রাটের ভগিনীর সহিত যখন তাহার বিবাহ-সম্বন্ধ ঠিক হয়, তখন তাহাকে পুল-পূজা ও ঐ ৮০০ প্রেমিকার প্রেম বিসর্জন দিয়া খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করিতে হইয়াছিল। এরূপ না করিলে তাহার এই খৃষ্টানী বিবাহ হইবার উপায় ছিল না। তার পর, বিবাহের দিন ব্লডিমিরের ২,০০০০ কুড়ি হাজার প্রজা ও ছয়টি পত্নীর গর্ভজাত বারটি পুত্র এক সঙ্গে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। ব্লডিমির গ্রীকরাজ-ভগিনীকে বিবাহ করাতেই সেই সময় হইতে কুসিয়ায় আজ পর্যন্ত গ্ৰীক চর্চ মতানুযায়ী খষ্টধর্ম চলিয়া আসিতেছে। এক দিনে এত লােকের খৃষ্টধর্ম গ্রহণ আর কোথাও হইয়াছে কি না, তাহা আমরা জানি না। খৃষ্টধর্মাবলম্বীরা তা বলিতে পারেন। নবগরদ ও রুসরাজ্যের অন্যান্য স্থানে গ্রীক চর্চ মতানুসারে যিশুখৃষ্ট ও সেন্টগণের খােদিত মূর্তি এবং চিত্রপট পূজিত হয়। ঐ সকল দেখিতে সুন্দর ও তাহাদের ভাস্করীয় এবং চৈত্ৰ কাৰ্য্য রুস কারিকরগণের ক্ষমতা- পরিচায়ক। নবগরদের দুর্গটি যদিও মােটামুটি ধরণের, কিন্তু শত্রু-বিজয়ের গঠন- প্রণালীতে হীন নহে। পঞ্চদশ খষ্টাব্দে মস্কাউ নগরের ক্রেলি নামক দুর্গের ধরণে ইহার অনেকটা নূতন আকার হইয়াছে। ভাইনি ভলােসক। এই স্থান বড় বড় খালের জন্য প্রসিদ্ধ। ঐ সকল খাল কাস্পীয় হ্রদ ও বলটিক্ সমুদ্রে গিয়া মিশিয়াছে। উহাদের দৈর্ঘ্য মােটের উপর প্রায় ৫০০০ ভাষ্ট অর্থাৎ ৩৭৫০ ক্রোশ। প্রতি বৎসর ঐ সকল খালে পাঁচ ছয় হাজার বাণিজ্য:নৌকা যাতায়াত করে। ইহাতে স্থানীয় অন্তবাণিজ্যের বড় সুবিধা হইয়াছে। টশ বা টর্জক। এই নগর ভাইনি ভলােস হইতে ৭১ ভাষ্ট দূরে অবস্থিও। এখানে উত্তম জুতা, পরিস্কৃত চৰ্ম্ম এবং সােণা রূপার জরির কাজ করা কোমরবন্ধ রুসিয়ার ইতিহাস। প্রস্তুত হয়। ও গাছের ছালের সহিত মােটা চামড়াকে পাতলা করা হয় এবং উহাকে লালরঙে যঞ্জিত করিবার জন্য এক প্রকার পােকা শুকাইয়া রাখা হয়। সুগন্ধ করিবার জন্য এক প্রকার ঔদ্ভিজ্জ তৈল উহাতে মাখান হইয়া থাকে। এই চর্ম “রুসচৰ্ম” নামে প্রসিদ্ধ। ইহা ছাড়া এই নগর রুস্ খৃষ্টানদের একটি তীর্থ। এখানে একটি উষ্ণপ্রস্রবণ আছে। তদুপলক্ষে প্রস্তর ও ইষ্টকনিৰ্ম্মিত কুড়িটি গির্জা স্থাপিত হইয়াছে। চতুর্দিক হইতে যাত্রীরা আসিয়া এখানে ধর্মোৎসব করে। ভা। টর্শক নগর হইতে ৬৩ ভাষ্ট দূরে ভন্ন নদীর উপর ভার নগর অবস্থিত। এখানে অনেকগুলি বড় বড় বাড়ী ও দোকান আছে। ইতালীদেশস্থ পৰ্যটক ব্যবসায়ীরা এখানে আসিয়া নগরবাসীদিগকে নানাবিধ দ্রব্য বিক্রয় করে। মস্কাউ (মস্কো)। সেন্ট পিটার্সবর্গের পরেই এই নগরটির প্রশংসা করা করা যায়। কিবি- টকি (Kibitki )*. শকটে আরােহণ করিয়া ভার নগর হইতে ১৫ ঘণ্টায় মস্কাউ নগরে যাওয়া যায়। এই নগরের প্রায় ৪ ভাষ্ট দূরে পেত্রোস্কির রাজপ্রাসাদ। সেন্ট পিটার্সবর্গ হইতে মস্কাউ নগরে যাইবার সময় রু সম্রাটেরা ঐ প্রাসাদে কিয়ৎকাল বিশ্রাম করেন। প্রাসাদটি যদিও ইষ্টক- নিৰ্ম্মিত ও যদিও উহার গঠনপ্রণালী তেমন সুন্দর নয়, তথাপি খুব প্ৰকাণ্ড। মস্কাউ নগরে এসিয়া ও ইউরােপের অন্তর্গত অনেক স্থানের স্থপতি ও ভাস্করীয় কার্যের নমুনা দেখা যায়। সুদূর উত্তর সমুদ্র-তীরস্থ স্থান হইতে কাষ্ঠগৃহ; সুইডেন ও ডেনমার্ক হইতে পঙ্খের কাজ করা ইষ্টকালয় ; টাই- রােল হইতে চিত্রিত প্রাচীর ; কনস্তান্তিনােপল হইতে মসিদ ; বুকারিয়া • * এই শকট প্রাচীন শক (Sythian) জাতি ব্যবহার করিত। এক্ষণে কালমুখও নগাই তাতার জাতির মধ্যে ইহার বেশী প্রচলন। তাহারাই ইহাকে কিবিট কি বলে। রুসিয়ার প্রায় সর্বত্র এই শকট দৃষ্ট হয়।
মস্কাউ (মস্কো)। হইতে তাতারী মন্দির ; চীন হইতে কাষ্ঠমন্দির, বারাণ্ডা ও মণ্ডপ; স্পেন হইতে কাবারেৎ ; ফ্রান্স হইতে সৌঙ্গিক কারাগার (Dungeon), কারাগার ও সাধারণ কাৰ্যালয়; বরাম হইতে স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ ; নেপলস্ হইতে ছাদ, চাতাল ও বাগানের রেলিং আসিয়া মস্কাউ নগরের শােভা বর্ধন করিতেছে। এখানে যেমন ভিন্ন ভিন্ন দেশের গৃহ, সেইরূপ ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন পরিচ্ছদধারী লােকের ভিড়ে রাজপথগুলি সর্বদা অস্থির হইতে থাকে। গ্রী, তুর্কী, তাতার, কসাক, চীনে, মস্কোভীয়, ইংরেজ, ফরাসী, ইতালীয়, পােল, জৰ্ম্মণ প্রভৃতি বহু জাতির লােক মস্কাউ নগরে বাস করে। এখানে নানাবিধ মনােহর ছবি বিক্রয় হয়। ক্রেমলিন্ দুর্গের সম্মুখভাগে “প্লেস 'ডি গালিজিন” নামক একটি বৃহৎ ভূখণ্ডে হাট বসে। ঐ স্থানে শ্বেত ময়ুর, পালকের পাখা, পায়রা, সকল প্রকার কুকুর, গায়কপক্ষী, বন্দুক, পিস্তল প্রভৃতি বিক্রীত হয়। মস্কাউ হইতে ২০ ক্রোশ দূরে টি নিটির কভেন্ট (The Convent of Trinity) অবস্থিত। উহার সৌন্দর্য্য ও ঐশ্বৰ্য্য অনেক। উহার এক ক্রোশ দূরে আর একটি কভেন্ট আছে। উহার প্রাচীরবেষ্টনের মধ্যে একটি গথিক গির্জা নির্মিত। ঐ গির্জা একটি উন্নত স্তুপের উপর শােভা পাইতেছে। স্তুপের তলদেশে একটি মন্দির মধ্যে লেজারসের মােম- নির্মিত চমৎকার প্রতিমূর্তি আছে। ক্রেলি দুর্গের সম্মুখে সেন্ট বেসিল গির্জা দাঁড়াইয়া আছে। খৃষ্টাব্দে দ্বিতীয় ইভান্ বাসিলােভিচ, তাতারীয় রুচি অনুসারে ঐ গির্জা নির্মাণ করাইয়াছিলেন। ঐ গির্জার মধ্যে সুবর্ণরসরঞ্জিত অনেকগুলি ক্রুশ আছে। সেগুলির শােভা বড় মনােহর। মস্কাউ নগরে যতগুলি প্রসিদ্ধ স্থান আছে, তন্মধ্যে ক্রেমলিন্ বা ক্রেম দুর্গ একটি। ইহার প্রধান ফটকের নাম পবিত্র তােরণ (Holy Gate)। এই স্থানের গৌরব বড়, সুতরাং মাথার টুপী হাতে না লইয়া কেহই ইহার মধ্যে প্রবেশ করিতে পায় না। এই দুর্গের মধ্যে একস্থলে ভূগর্ভে একটি বিরাট ঘন্টা আছে। ঐ ঘণ্টা ঢালাই হইয়া অবধি আজ পর্যন্ত এক স্থানেই পড়িয়া আছে। উহা এত ভারি যে, আজ পর্যন্ত কোন স্থলে । ১৫৩৮ ৬৪ রুসিয়ার ইতিহাস। A টাঙানাে হইতে পারে নাই। ক্রেমলিন দুর্গে এক সময় আগুন লাগাতে ঐ ঘণ্টা বড় তাতিয়া উঠে। তত্তস্থ লােকেরা ঠাণ্ডা করিবার জন্য উহাতে জল ঢালিয়া দেয়। গরমে নরম-কাজেই ঘণ্টার গায়ে একটা ভয়ানক চিড় ফুটিয়া কতকটা অংশ ভাঙিয়া গিয়াছে। আজিও সে দাগটা রহি- ছে। ঐ বিরাট ঘণ্টার পরিধি (বেড়) ৬৭ ফুট ৪ ইঞ্চি, ব্যাস (বেড় লম্বাই) ২২ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং উচ্চতা (খাড়াই) ২১ ফুট ৪ ইঞ্চি। ঐ ঘণ্টা ওজনে ৪,৪৩,৭৭২ পাউণ্ড, *। যদি ১০ টাকা হিসাবে প্রতি পাউণ্ড, ধরা যায়, তাহা হইলে উহার মূল্য ৬,৬৫,৬৫৮ টাকা হয়। ঐ ঘণ্টাতে পিস্তল, রূপা ও কতকটা সােণা আছে শুনা যায়। পাঠক মহাশয়। আমাদের দেশে, “হাতীর গলায় ঘন্টা বলিয়া একটা প্রবাদ আছে, কিন্তু রুসিয়ায় “ঘণ্টার গলায় হাতী” প্রবাদটা খাটিতে পারে কি না ? রুসিয়ার সামান্য লােকেরা প্রতি বৎসর এক দিন ঘটা করিয়া ঐ ঘণ্টাকে ভক্তিভরে প্রদক্ষিণ ও সেলাম করে। যাই হউক, এরূপ একটা প্রকাণ্ড হইতে প্রকাগুতর ঘণ্টা পৃথিবীর আর কোথাও নাই। ইহা ছাড়া মস্কাউ নগরে আরও একটি বৃহৎ ঘণ্টা আছে। তন্মধ্যে সেন্ট ইভানের বেলফিতে যে মহাখাটা টাঙানাে আছে, তাহার ওজন সাতান্ন টনেরও বেশী। ঐ ঘণ্টা যখন বাদিত হয়, তখন সমস্ত মস্কাউ নগর গম্ভীর শব্দে পরিপূর্ণ হইয়া উঠে। ক্রেমলিন্ দুর্গে বিরাট ঘণ্টা ছাড়া একটি বিরাট কামান আছে। উহার ফাড় এত বড় যে, এক জন মানুষ সটান হইয়া তন্মধ্যে বসিতে পারে। ঐ কামান ১৮২ ফুট লম্বা এবং উহার পাটী ১০ ইঞ্চি পুরু। ১৬৯৪ খৃষ্টাব্দে উহা নির্মিত হইয়াছিল। বিরাট কামানের নিকট আরও কতকগুলি বৃহৎ কামান আছে। যদিও সে গুলির ব্যাস (বেড়) তত বড় নহে, কিন্তু দৈর্ঘ্য ঐ কামানের অপেক্ষা বেশী। ক্রেলি দুর্গে রুস্সম্রাটদের প্রাচীন বাসগৃহ আছে। উহা গথিক ধরণে নির্মিত। দুর্গস্থ রাজকীয় ধনাগার খুব প্রশংসার যােগ্য নহে। উহার গঠনপ্রণালী মােটামুটি রকমের। ক্রেমলিন দুর্গের পুরাতন রাজপ্রাসাদে * ইংরেজি ২ পাউণ্ডে বাঙ্গালা ১০ ছটাক হয়।
মক্কাউ (মস্কো)। পিটার দি গ্রেটের জন্ম হইয়াছিল। নেপোলিয় বােনাপার্ট মস্কাউ নগরে অবস্থান কালে এই প্রাসাদেই বাস করিয়াছিলেন। পৰ্যটকেরা এই প্রাসাদকে “বেলভিডিয়ার প্রাসাদ” বলিয়া থাকে। রুসকর্তৃক পরাজিত কজান, সাইবিরিয়া, অস্ত্রাকা, ক্রিমিয়া প্রভৃতি রাজ্যের রাজমুকুট এই দুর্গন্থ রাজভাণ্ডারে সংরক্ষিত আছে। রুস্ সম্রাজ্ঞী এ এবং সম্রাট দ্বিতীয় পিটার প্রভৃতিরও রাজমুকুট এখানে রহিয়াছে। কিন্তু মূল্যবান মাণিক্যাদি রত্নগুলি অনেক মুকুটে নাই। সেগুলি লইয়া তাহাদের স্থানে অল্প মূল্যের প্রস্তর সংলগ্ন করা হইয়াছে। রাজভাণ্ডারের এক স্থানে একখানি হস্তিদন্তের বড় চিরুণী ও সােণা রূপার নানাবিধ কু জা, বাটি, গেলাস, রেকাব প্রভৃতি শোভা পাইতেছে। কুসিয়ার পূর্বতন রাজারা সেই চিরুণীতৈ শ্মশ্রু পরিষ্কার করিতেন। এক স্থানে একটি গােলাকার রৌপ্য বাক্স আছে। পিটার দি গ্রেটের পিতা আলেক্সিস্ সাম্রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের আইন কানুন সংগ্রহ করিয়া তন্মধ্যে রাখিয়া গিয়াছেন। একটি কক্ষে পূর্বতন দেশােদ্ধারকারীদের পরিচ্ছদ ও অলঙ্কার সজ্জিত আছে। অলঙ্কারগুলি বহুমূল্য নানাবিধ রত্নে মণ্ডিত হওয়াতে তত্তাবতের শােভা ও চাকচিক্য বিশেষরূপে বৃদ্ধি হইয়াছে। এক স্কুলে মেরী মাগডে- লিনের অস্থি সংগৃহীত রহিয়াছে। রুসেরা বলে, ঐ সকল অস্থির রােগ প্রভৃতি বিনাশ করিবার ক্ষমতা আছে। অপর একটি ক্ষুদ্র কক্ষে ওনিক্ষ নামক মণির উপরে ভার্জিন মেরী ও শিশুখৃষ্টের প্রতিমূৰ্ত্তি খােদিত রহিয়াছে। ঐ মণিটির আকার দীর্ঘে ৩ ইঞ্চি এবং প্রস্থে ২ ইঞ্চি। ঐ কক্ষের এক স্থানে অনেকগুলি রৌপ্যনিৰ্ম্মিত বৃহদাকার জালা আছে। সম্রাট পল ঐ সকল জালা দান করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে যযালটি জালা এত বড় যে, তন্মধ্যে তিন হইতে চার গ্যালন পর্যন্ত তৈল থাকিতে পারে। ঐ সকল জালায় উৎকৃষ্ট পবিত্র তৈল আছে। মস্কাউ হইতে ঐ তৈল চালান হইয়া সমস্ত রুসিয়ার অন্তর্গত গ্রীক চর্চে ধৰ্ম্মকর্মের জন্য ব্যবহৃত হয়। • ক্রেলি দুর্গের অন্তর্গত একটি ধর্মমন্দিরে গ্রীক ও সাভােনিক ভাষার অনেকগুলি হস্তলিখিত পুঁথি আছে। তন্মধ্যে শেষােক্ত ভাষারই পুঁথি অধিক। তা ছাড়া সেখানে মাইকেল ফিওডবােভিচের কন্যা • এনের রুসিয়ার ইতিহাস। স্বহস্তলিখিত একখানি বাইবেল আছে। উহার কাগজ, কালি ও লেখা বড় সুন্দর। সেন্ট পিটার্সবর্গের চিত্রশালায় পিটার দি গ্রেটের স্বহস্তনির্মিত অনেক গুলি জিনিষের কথা পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে। মস্কাউ নগরের ক্রেলি দুর্গেও তৎকৃত অনেকগুলি জিনিষ আছে। তন্মধ্যে একটি কাষ্ঠনির্মিত বাক্সের ভিতর পিটার দি গ্রেটের স্বাক্ষরিত একখানি পত্র আছে। তিনি ১৬৯৭ খৃষ্টাব্দে হলণ্ডের অন্তর্গত সার্ড হইতে মক্কা নগরস্থ ধৰ্ম্মাধ্যক্ষকে উহা লিখিয়াছিলেন। ক্রেমলিন দুর্গে আর একটি অপূৰ্ব্ব সামগ্রী আছে। উহা “ক্রেলি দুর্গের আদর্শ”। রাণী দ্বিতীয় ক্যাথরাইনের আদেশে ও ব্যয়ে জনৈক পারিস হইতে শিক্ষাপ্রাপ্ত রুস-ভাস্কর উহার নির্মাণ-ভার লইয়াছিলেন। নিৰ্মাণ-কাৰ্য্য সম্পূর্ণ না হইতেই উহার একটি ভিত্তি ভাঙ্গিয়া পড়ে। সুতরাং রাণীর আদেশে নির্মাণ-কাৰ্য্য স্থগিত হইয়া যায়। যাই হোক্, উহা যত দূর নির্মিত হইয়াছে, তাহাতে ৫০,০০০ পঞ্চাশ হাজার রুবল খরচ পড়ি- য়াছে। কিন্তু সম্পূর্ণ হইলে ৫,০০,০০,০০০ পাঁচ কোটি রুবল ব্যয় হইত। এইবার মস্কাউ নগর সম্বন্ধে আরও একটি কথা বলিয়া এই অধ্যায় শেষ করা যাউক। মস্কাউ নগর একটি বিস্তৃত সমতলভূমির উপর অবস্থিত। ইহার পরিধি ১৩ ক্রোশ, দৈর্ঘ্য ৪ ক্রোশ এবং বিস্তার ও ক্রোশ। এখানে মস্কয়া, যাওসা ও নেগলিনিয়া নামে তিনটি নদী প্রবাহিত হইতেছে। ১৮১২খৃষ্টাব্দে নেপােলিয় বােনাপার্টির কমিয়া আক্রমণের সময় এই নগরের তিন ভাগের দুই ভাগ অগ্নিতে দগ্ধ হইয়া গিয়াছিল। তার পর ১৮২৪ খৃষ্টাব্দে আবার নির্মিত হই- য়াছে। ইহা চার ভাগে বিভক্ত, ১ ক্রেমলিন্ বা ক্রেমল*; ২ কিতাই-গরদ ; ৩ বিলয়-গরদ বা শাদা শহর; এবং ৪ জেলিয়ানয়-গরদ বা মাটীর শহর। তা ছাড়া বডি” অর্থাৎ শহরতলী আছে। প্রথম-ক্রেলি বা ক্রেম। মঞ্জুয়া নদীর উত্তর তটে এই অংশ * তাতার ভাষায় ক্রিম, ৰ। ক্রেম, অর্থে দুর্গ, কেল্লা, গড়। তা হইতেই ক্রেমলিন্ বা ক্রেমল হইয়াছে।
মস্কাউ (মস্কো)। ৬৭ অবস্থিত। ইহার চারি দিকে উচ্চ প্রাচীর। ক্রেলি ত্রিকোণাকার, প্রত্যেক কোণে বৃহৎ গােলাকার স্তম্ভ আছে। ক্রেমলিনের অন্তর্গত গৃহগুলি প্রায় প্রস্তরনির্মিত। যেগুলির সমস্ত ভাগ প্রস্তরের নয়, তাহা- দের ভিত্তি প্রস্তরের ও উপরিভাগ ইষ্টকের। গৃহগুলির গায়ে শাদা, নারেঙ্গী, হলদে, নীল, সবুজ প্রভৃতি নানাবিধ রঙ। ক্রেলি বিভাগে যত অট্টালিকা আছে, তৎসমস্তই রুস্ গবর্ণমেন্টের নিজের। এখানে অপর লােকের একখানিও বাড়ী নাই। ক্রেলিনে ভার্জিন মেরী, সেন্ট মাইকেল প্রভৃতি চারিটি উৎকৃষ্ট ধর্মমন্দির আছে। ক্লার্ক সাহেব অত্রস্থ প্রাচীন রাজপ্রাসাদের কথা যাহা বলিয়াছেন, তাহা পূৰ্বে বলিয়াছি। তা ছাড়া এখানে একটি নূতন রাজপ্রাসাদ আছে। রাণী এলিজাবেথ উহা আরম্ভ করেন, কিন্তু সম্রাট পলের সময়ে উহার নির্মাণ-কাৰ্য্য সমাধা হয়। ১৮১২ খৃষ্টাব্দে নেপােলিয়ন বােনাপার্টির সময়ে ঐ রাজপ্রাসাদ ধ্বংস হইয়া যায়। তার পর ১৮১৭ খৃষ্টাব্দে সম্রাট আলেজান্দার কর্তৃক উহা পুন- নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। উক্ত সম্রাট ইহা ছাড়া ক্রেমলিনে রাজকীয় চিত্রশালা নামে একটি বৃহৎ ও পরিপাটী বাটী নির্মাণ করেন। প্রাচীন রাজ- প্রাসাদস্থ অনেকানেক অদ্ভুত সামগ্রী সেই বাটীতে আনীত হইয়াছে। অভ্রস্থ অস্ত্রাগার খুব বড়। ১৮১২ খৃষ্টাব্দে উহার কিয়দংশ বারুদাগ্নিতে উড়িয়া যায়। মস্কাউ হইতে নেপােলিয়ন বােনাপার্টির হটিয়া যাইবার সময় রুস-সৈন্যগণ তাহার ৯০০ কামান কাড়িয়া লইয়াছিল। ঐ সকল কামান ক্রেমলিনের অস্ত্রাগারের চতুর্দিকে সজ্জিত আছে। ক্রেমলিনে অনেকগুলি সরকারী অফিস আছে, তন্মধ্যে রাণী দ্বিতীয় ক্যাথারাই কর্তৃক স্থাপিত সিনেট-গৃহই খুব উৎকৃষ্ট। কুড়ােফ মনাষ্টারি ও ভনেসেস্কই ননারিও দেখিবার যােগ্য। দ্বিতীয়।-কিতাই-গরদ বা চীনে শহর। ইহা মস্কাউ নগরের দ্বিতীয় অংশ, কিন্তু ক্রেলি বিভাগ অপেক্ষা আকারে বড়। অত্রহ গৃহগুলি ইষ্টক ও প্রস্তর-নির্মিত এবং নানা বর্ণে চিত্রিত। গৃহগুলির উপরে লােহার ছাদ। কিতাই-গরদের মধ্যস্থলে একটি উচ্চ স্তম্ভ আছে। সম্রাট পল, মিনি ও পােজাস্কি নামক দুই জন রুস-বীরের নামে উহা উৎসর্গ করিয়া রুসিয়ার ইহািস। গিয়াছেন। ঐ দুই বীর সপ্তদশ খৃষ্টাব্দের প্রারম্ভে মস্কাউ হইতে পােল- দিগকে তাড়াইয়া দিয়াছিলেন। এই বিভাগে ৯১০ হাজার দোকান আছে। ঐ সকল দোকানে নানাবিধ দ্রব্য বিক্রয় হয়। ক্রেতারা দোকানের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারে না, বাহিরে দাড়াইয়া ইচ্ছামত সামগ্রী ক্রয় করে। রাত্রিকালে কোন দোকানের মধ্যে আগুন বা আলে রাখিবার হুকুম নাই। কিতাই-গরদে অনেকগুলি গির্জা আছে, তন্মধ্যে সেন্ট নিকোলাস্ নামক গির্জাই সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। 'তত্রস্থ লােকদের বিশ্বাস যে, মথি, মার্ক, লুক, জন, টাইট ও অপর কএক জন খৃষ্টধৰ্ম্ম-প্রচারকের মৃত দেহ সেই গির্জায় প্রােথিত আছে। মস্কাউ প্রদেশের শিশুনিবাস (Foundling Hospital) এই স্থানে আছে। উহা ১৭৬৩ খৃষ্টাব্দে নিৰ্ম্মত হইয়াছে। এই শিশুনিবাসে প্রতি বৎসর প্রায় ১৫/১৬ হাজার দরিদ্র বালক ও বালিকা সরকারী খরচে খাইতে পারিতে পায়। বালকেরা ২৪ বৎসর এবং বালিকারা ২০ বৎসর পর্যন্ত এখানে থাকে। তার পর তাহাদিগকে বিদায় দেওয়া হয়। এই শিশুনিবাসের একটি ফণ্ড, আছে। ফণ্ডের টাকা অনেক। আর্চডিক কক্স বলেন, ডিমিড নামে এক জন ধনী রুস ঐ ফণ্ডে এককালে কুড়ি লক্ষ টাকা দান করেন। তৃতীয়।-বিলয়-গরদ বা শাদা শহর। পূৰ্বে এই বিভাগের চতুষ্প শাদা দেওয়ালে ঘেরা ছিল বলিয়া এই নাম হয়। এক্ষণে শাদা দেওয়াল নাই। এখানে ধনীদের অনেক বাড়ী ও বড় বড় প্রাসাদ আছে। এই স্থলেই গবর্ণর-জেনেরলের প্রাসাদ, মেডিকো-চিরর্জিকাল একাডেমি, পােষ্ট আফিস, থিয়েটার প্রভৃতি শােভা বিস্তার করিতেছে। অত্রস্থ সামরিক ব্যায়াম- মন্দির (Military excercise house) অতি প্রকাণ্ড। শীতকালে হাজার হাজার সৈন্য এক সঙ্গে সেই বাটীর প্রাঙ্গণে যুদ্ধ শিক্ষা করে। চতুর্থ।-জেলিয়ানয়-গরদ বা মাটীর শহর। এখানে প্রশংসার যােগ এমন কিছুই নাই। পঞ্চম।-বডি বা মস্কাউ নগরের শহরতলী। এখানে পল, গালি- জি, সিরিমেীফ, প্রভৃতির স্থাপিত হাসপাতাল ও অনেকগুলি গির্জা আছে। তা ছাড়া অত্রস্থ জেলখানা ও হরিণবাড়ীও দ্রষ্টব্য বটে।
জাতি। ৬৯ ব্যবহারিক শিল্প সম্বন্ধে পাঠক মহাশয়কে কএক স্থলের বিবরণ দেওয়া গেল। কিন্তু রুস রাজ্যের অনেক স্থানে আরও যে কতরূপ কাণ্ডকারখানা আছে, তাহা এই ক্ষুদ্র পুস্তকে লেখা অসম্ভব। উনবিংশ অধ্যায়। জাতি। রুসিয়ায় নানাবিধ মানুষের বাস। নানা জাতি; কাজেই ভাষা, আচার ব্যবহার, রীতিনীতিও নানাবিধ। প্রধানতঃ ককেশীয় ও মঙ্গোলীয় বংশ হইতে রুসিয়ার সমস্ত জাতি উৎপন্ন হইয়াছে। ককেশীয় বংশােদ্ভব পােকদিগের সংখ্যা অনেক বেশী। মঙ্গোলীয় বংশােদ্ভব জাতির সংখ্যা রুসিয়া রাজ্যের সমস্ত লােকসংখ্যার শতাংশের একাংশ মাত্র। রুসিয়ায় সুভােনীয় সুদ বা ফী, তাতার বা তুর্কী, জৰ্ম্মণ, য়িহুদী এবং গ্রীক জাতি ককেশীয় বংশােদ্ভূত। সমস্ত লােকসংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ সাভােনীয় জাতি। সাভােনীয়েরা রুস, পােল, লিথুওনীয়, লেটি, বল্পচীয় এবং সাভীয় প্রভৃতি বংশে বিভক্ত। তন্মধ্যে এক রুসেরাই সমস্ত লােকসংখ্যার তিন ভাগের দুই ভাগ হইবে। রুসেরা প্রধানতঃ রাজ্যের মধ্যস্থলে অর্থাৎ নিপার এবং ভলগা নদীর মধ্যবিভাগে বাস করে। তাহারা অন্যান্য প্রদেশে অন্যান্য জাতির সহিত মিশিয়াও কালক্ষেপ করিয়া থাকে। 671175 PH ( Grcat Russians) OR CRIS FT, (Little Russians) এই দুই ভাগে বিভক্ত। উক্রেন নামক দেশে ছােট রুসেরা বাস করে। কসাক জাতি উহাদেরই সন্তান। পােলেরা প্রধানতঃ পােলণ্ড প্রদেশে বাস করে। তা ছাড়া বলিনিয়া, পােড়ােলিয়া এবং গ্রড়নাে রাজ্যেও তাহাদিগকে দেখা যায় । যদিও উহাদের আচার ব্যবহার রুসদের অপেক্ষা অনেক অংশে ভাল, কিন্তু ব্যবহারিক শিল্প জ্ঞান সম্বন্ধে তাহাদের তুল্য নয়।
৭০ রুসিয়ার ইতিহাস। উইন এবং মিংস রাজ্যে লিথুনীয়েরা বাস করে। উহারা কৃষি- ব্যবসায়ী। কিন্তু আজিও তেমন সভ্য হইতে পারে নাই। লিথুনিয়দের বাসস্থানের উত্তরে কোলণ্ড এবং নিভােনিয়া প্রদেশে লেট্রি জাতির বাস। রুীয় ও লিথুওনীয় জাতির সহিত তাহাদের ভাষা মিলে না। উহারা কৃষিকাৰ্য্য বই অন্য কাৰ্য্য করে না। উহাদের মধ্যে যাহারা কৌতূলণ্ডে বাস করে, তাহারা 'কুর’ নামে অভিহিত হয়। সম্রাট আলেকজান্দারের সময় পর্যন্ত লিথুওনীয় ও লেট্টি জাতি জৰ্ম্মণদিগের অধীন ছিল। ব্লেচ, বা বল্লচীয় জাতি তুরস্কদেশের সীমাবর্তী বিশ্বারাবিয়া রাজ্যে বাস কতক গুলি সারভীয় জাতীয় লােককে তাহাদের সহিত বাস করিতে দেখা যায়। এন্থােনিয়া, ফিল ও, ল্যাপলণ্ড ও নিভেনিয়া প্রদেশে সুদ বা ফিন জাতির বাস। সুদ জাতির দুইটি বিভাগ, প্রাচ্য ও প্রতীচ্য। প্রতীচ্যদিগকে বটিক ফী বলে। প্রাচ্য সুদেরা ইউরাল পৰ্ব্বতের পশ্চিম দিকে এবং মধ্য-ভল্গা নদীর তীরে বাস করে। কিন্তু এই উভয় সুদ বা ফী জাতির মধ্যে ২ • ক্রোশ স্থান ব্যাপিয়া রুসেরা বাস করে। কিরূপে বা কখন্ প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সুদ জাতির এরূপ স্বতন্ত্র ঘটিয়াছে, বলা যায় না। রুসিয়াবাসী ককেশীয় বংশের তৃতীয় শাখা তুকী। তাহারা সচরাচর তাতার নামে প্রসিদ্ধ। কিন্তু তাহাদের ভাষা তুর্কী ভাষা। তাহারা পূর্বে রুসিয়ার কোন অংশে বাস করিত না। নবম এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গোল এবং অন্যান্য বিজেতৃজাতির সহিত তথায় আগমন করে। এক্ষণে রুসিয়ায় যে সকল তুর্কী আছে, উহারা কজানের তাতার, বস্কীর, মেসেরিয়েক এবং নগে তাতার এই চারি ভাগে বিভক্ত। এই চারি প্রকার দুর্কীর মধ্যে কজানের তাতারগণ বিশেষ সভ্য। বস্কীরগণ ইউরাল পৰ্ব্বতের দুই পাশে বাস করে। আজিও তাহারা সৰ্ব্বদা ভ্রমণ করিয়া বেড়ায়। মেসে রিয়েকগণ বস্কীরদিগের সহিত একত্র বাস করে। এবং পশুচারণ ও মধু- চক্রের ব্যবসায় করিয়া থাকে। নগে * ভাতারেরা ক্রীমিয়া এবং তত্রস্থ * বোধ হয়, ইহাদের পূর্বপুরুষেরা পেরিাণিক নাগবংশ ছিল। পণ্ডিতবর টড, বলেন, তাতার দেশী নাগন, নামক এক ব্যক্তির বংশধরগণ বোধ হয় হিন্দুপুরাণের নাগ ও তক্ষক জাতি। সুপ্রসিদ্ধ ইতিহাসবে। দি গায়ে কর্তৃক তক্ষকগণ তক্ক মােগল নামে অভিহিত হইয়াছে।
জাতি। ৭১ ষ্টেপে বাস করে। উহারা আজ সমুদ্র এবং ককেশ পর্বতের মূল পৰ্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছে। উহাদের মধ্যে কতকগুলি লােক পরিশ্রম করে এবং অপরগুলি ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়া বেড়ায় । যাহারা টিউটানিকবংশীয়, সম্ভবতঃ তাহারা তুর্কীদের অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী। টিউটানিকবংশীয়েরা জৰ্ম্মণ ও সুইড়। উহাদের সহিত কিয়দংশে জৰ্ম্মণ ও দিনেমারেরা মিশ্রিত হইয়াছে। জৰ্ম্মণবংশীয় অনেকগুলি লােক বটিক সাগরের নিকট, রুস রাজ্যের দুইটি রাজধানী, ভলগা নদীর মধ্যাংশে এবং সমুদ্রবন্দরে বাস করে। ফিলণ্ড উপসাগরের উত্তর এবং বোথানিয়া উপসাগরের পশ্চিম তীরে সুইড়গণকে দেখা যায়। ভিনা, গ্রড়ননা, ভলিনিয়া এবং পােডডালিয়া প্রদেশে য়িহুদীরা বাস করে। ঐ সকল স্থানের নগরেই ইহাদিগকে অধিক পরিমাণে দেখা যায়। রাজ্যের দক্ষিণ অঞ্চলে গ্রীক জাতির বাস। তত্রস্থ গ্রীকেরা ব্যবসা বাণিজ্য করে। ক্রীমিয়া উপদ্বীপের কোন কোন গ্রাম কেবল গ্রীক জাতির দ্বারাই পরিপূর্ণ। ঐ সকল গ্রামবাসী গ্ৰীক কৃষি ও উদ্যানের কাৰ্য্য করিয়া থাকে। কালমুখ বা কাল্মক * নামক জাতির শারীরিক গঠন দেখিলে ও ভাষা শুনিলে, উহাদিগকে মঙ্গোল বংশােদ্ভূকবলিয়া নির্ধারণ করা যায়। ১৭৭০ এবং ১৭৭২ খৃষ্টাব্দে চীন গবর্ণমেন্টের নিমন্ত্রণে কালমুখের সুঙ্গোরিয়া নামক স্থানের সমতল-ভূমিতে গিয়া বাস করিয়াছিল। রুসিয়া রাজ্যে যে সকল কালমুখ আছে, উহারা সুঙ্গোরীয় যাত্রীদিগের অবশিষ্ট। ইহারা কুসিয়ার দক্ষিণ- পূৰ্ব্বস্থ ঊষর-ভূমিতে (Steppe )এ বাস করে। কালমুখ জাতি পাঁচ ভাগে বিভক্ত। এই পাঁচ ভাগের প্রথম ভাগের পরিবার সংখ্যা ১২,০০০; অবশিষ্ট চারি ভাগের লােকসংখ্যা একত্র করিলেও প্রথম ভাগের অপেক্ষা কিছু কম। গ্রীষ্মকালে ঐ জাতির এক দল সৈগা নামক হরিণ শিকার করিয়া বেড়ায়। কিন্তু শীতকালে কেবল গৃহপালিত পশুদিগের উপরই নির্ভর করে। উহারা পৰ্বতশৃঙ্গে পশু চারণ করিয়া থাকে। যে প্রদেশে অত্যল্প মাত্রও, চাষযােগ্য ভূমি না থাকে, সেখানেও উহারা ৩৫,০৭,০০০ ঘােড়, গরু, উট, ভেড়া, ছাগল লইয়া বাস করিতে পারে। উহাদিগের অঞ্চল হইত যে সকল পুরাণে এই জাতির উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়।
१२ রুসিয়ার ইতিহাস। সামগ্রী রুসিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি হয়, তদ্বারা ১৫,০০,০০০ টাকা পাওয়া যায়। ঐ সকল দ্রব্যের মধ্যে পশম, কেশ, বসা, মেষ ও মেষ- শাবকের চর্ম এবং অন্যান্য চৰ্ম্মই বেশী। কালমুখেরা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। পূৰ্ব্বে তিব্বত দেশের লাশা নগরস্থ দলােই লামার ধর্মব্যবস্থা-মতে উহারা চালিত হইত। কিন্তু ১৮০০ খৃষ্টাব্দে সম্রাট পল উহাদিগকে ইচ্ছামত স্বীয় লামা পছন্দ করিয়া লইতে বলেন। সেই নূতন লামার বিধি অনুসারে এক্ষণে উহারা বৌদ্ধধৰ্ম্ম মানিয়া আসিতেছে কালমুখেরা প্রকৃত পক্ষে অস্ত্রাকানের শাসন- কৰ্ত্তার শাসনে চলে না। উহাদিগের এক জন স্বতন্ত্র বাজনৈতিক দলপতি আছেন। সেই দলপতির উপাধি খাঁ। তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ হইতে সমাট-প্রেরিত এক ব্যক্তি এবং আট জন মন্ত্রী ও বিচারপতির সহিত সমস্ত শাসন-কাৰ্য করেন। কালমুখেরা ঘােড়া, কুকুর, বিড়াল, ইদুর প্রভৃতি জন্তুর কাঁচা মাংস পৰ্যন্ত খায়। উহারা অশ্বদুগ্ধ ও গােদুগ্ধ হইতে কৌমিস (Koumiss) নামক সুরা প্রস্তুত করিয়া পান করে। কালমুখ জাতির আকার দেখিয়া হঠাৎ স্ত্রীপুরুষ প্রভেদ করা যায় না। উহারা যদিও অসভ্য, তবু ল্যাপলাণ্ডার জাতি অপেক্ষা অনেক সভ্য। উহাদের তাবুতে অনেক প্রকার তৈজস পত্র, মাদুর ও বস্ত্র সজ্জিত থাকে। সেই সকল জিনিষ দেখিতে সুন্দর, উহাতে শিল্পকার্যের অনেক পরিচয় পাওয়া যায়। কালমুখ জাতি আর এক বিষয়ে প্রশংসার মােগ্য। উহারা বহুকাল হইতে কামানের বারুদ সৃষ্টি করিয়া আসিতেছে। কালমুখীয় স্ত্রীলােকেরা অশ্বারােহণ করিয়া পুরুষদের সঙ্গে ভ্রমণ করিতে পারে। কালমুখেরা ঘােড়দৌড়, কুস্তি, শিকার প্রভৃতি আমােদেই সৰ্ব্বদা কাল যাপন করে। তাস, সতরঞ্চ খেলাতে উহারা নিকৃষ্ট নহে; তবে জুয়া খেলাটা দোষের মধ্যে গণ্য করে না। কালমুখ জাতি সঙ্গীত ভালবাসে। বললাইকা নামে উহাদের এক প্রকার ততযন্ত্র আছে। উহাতে কেবল দুই গাছি তঁাত বঁধা থাকে। উহারা ঐ বললাইকা বীণা বাজাইয়া নাচ গাওঁনা করে। নাচিবার সময় উহাদের পা নড়ার চেয়ে হাত ও গা-ই বেশী নড়ে। করাজ্যে যত প্রকার জাতি আছে, তন্মধ্যে কালমুখ জাতির শরীর- জাতি। গঠন, আচার ব্যবহার, রীতি নীতি অদ্ভুত। উহাদের আকার দেখিলে যেন দৈত্য বলিয়া বােধ হয়। কালমুখের চুল মােটা, রঙ কালাে, ভাষা কর্কশ। লালা জাতি কালমুখ জাতি অপেক্ষা অনেক খর্ব। কালমুখ জাতি রুস- রাজ্য ব্যতীত তিব্বত, ভারতবর্ষ ও পারস্যের উত্তর সীমার বহির্ভাগে এবং চীনদেশেও অবস্থান করে। কসাক জাতি কালমুখ জাতির সম্মান করে। এই সূত্রে ঐ উভয় জাতির মধ্যে বিবাহ-প্রথা প্রচলিত আছে। কালমুখগশের বুদ্ধি তীক্ষ। এই জন্য খাস রুসিয়ার লােকেরা কালমুখ জাতীয় ভৃত্য রাখে। কালমুখেরা অন্যা- পেক্ষা অল্প দিনের মধ্যে চিত্রবিদ্যা শিখিতে পারে। কুসিয়ায় গ্রীশীয় বা মেলাে-রুস নামে আর এক জাতীয় লােক আছে। ইহাদের বাসস্থান দক্ষিণে এয়ি (Ae) নদী ও উত্তরে আজব সমুদ্রের মধ্যবর্তী ভূভাগ। তা ছাড়া অন্যান্য স্থানেও ইহাদের বসতি আছে। মেলাে- রুসেরা রুসিয়ার অন্যান্য জাতি অপেক্ষা অনেক সভ্য, পরিশ্রমী, সৎ, দয়ালু, নম্র, সাহসী, অতিথিসৎকারী ও ধার্মিক। ইহারা এরূপ অদ্ভুত পরিশ্রমী য়ে, যে স্থান ঊষর-মরু সদৃশ, সেখানেও শস্য উৎপন্ন করিতে পারে। মেলো- রুসেরা গরুর গাড়ি করিয়া প্রত্যহ ১১১২ ক্রোশ পথ পৰ্যটন করে। ইহার পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। ইহাদের ঘরবাড়ীও পরিষ্কার ও চুণকাম করা। মেলো-রুসদের আকার ও মুখশ্রী পােলজাতির ন্যায়। কসাক জাতিও এইরূপ। মেলো-রুস ও উ-কসাকদের অবিবাহিতা স্ত্রীলােকদের পরিচ্ছদ একই রূপ। মেলাে-রুসজাতি বড় আমােদপ্রিয়। রুসসাম্রাজ্যে কসাক নামে এক প্রকার জাতি আছে। উহারা এক শাখায় বিভক্ত। ডন নদীর বিস্তৃত তীর-ভূমিতে ডকসাক জাতির বাস। ইহারা অতি তেজস্বী ও যুদ্ধপ্রিয়। শান্তি অপেক্ষা ইহারা সৰ্ব্বদা যুদ্ধ করিতে বড় ভালবাসে। সাবলা (Sabla) নামক অস্ত্রই ইহাদের প্রধান যুদ্ধাস্ত্র। পােল এবং মেলাে-রুসেরা এই অস্ত্রকে সাবেল* ( Sabel) বলে। ইহাদের ঋরিচ্ছদ দেখিতে ভাল, বিশেষতঃ টুপী অতি সুন্দর। টুপীতে কালাে পশ- মের থােপ ও পালক সাজান থাকে। রুস গবর্ণমেন্ট কঙক কসাকগণ * আমাদের বিল” নামক মৃৎখনারে সহিত এই অস্ত্রটার নামে ঐক্য আছে।
৭৪ রুসিয়ার ইতিহাস। শস্যের জন্য নিষ্কর ভূমি ও মৎস্তের জন্য জলাশয় পায়। ইহাদিগকে কোন রূপ রাজকর দিতে হয় না। যাহারা রাজসরকারে সৈন্যসংক্রান্ত কার্য্য করে, তাহারা পঁচিশ বৎসরের পর সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়; পরে আর চাকুরি করিতে হয় ল। ডন নদীর তীম কজনকায়া ও তুষ লােসকায়া নগরে কসাকজাতীয় অনেক গণ্য মান্য পােক বাস করে। কসাকেরা মৎস্য-ধারণে বড় নিপুণ। কসাকজাতীয় একটি অষ্টমবষয় বালকও ডন নদী হইতে আধ পাউড * বা আধ পুড, ওজনের মৎস্য ধরিতে পারে। কসাকজাতীয় স্ত্রীলােকেরা বড় সুন্দরী। উহারা পুরুষদের সঙ্গে একত্র হইয়া নৃত্য করে। কসাকীয় নৃত্য, তাতা ও চীন জাতির নৃত্যের ন্যায়। কসাকেরা সঙ্গীতামােদের হ্মময় ব্যাগপাইপ, (তুবড়ী যন্ত্রবিশেষ) নামক বাদ্য-যন্ত্র বাজায়। ডকসাকজাতীয় লােকেরা নৃত্য গীতের সময় অশ্লীলতা ব্যবহার করে। এরূপ দোষ প্রায় সকল জাতিরই দেখিতে পাওয়া যায়। ড-কসাক জাতির প্রধান নগরের নাম সাস্ক, অপর নাম শ্চর্চায় । কসাকেরা বড় সুরাপায়ী। যদি প্রস্তুত সুরা বড় তীব্র হয়, তবে ইহারা উহাতে কিঞ্চিৎ লবণ মিশ্রিত করিয়া পান করে । পুৰ্ব্বে কসাকেরা রুসীয় সৈন্যদলে প্রবিষ্ট ছিল না। ১৫৭১ খৃষ্টাব্দে ইহারা রুসীয় সৈন্যসংক্রান্ত কাৰ্যে প্রবেশ করে। ১৭৩৪ খৃষ্টাব্দে কসাকেরা অন্য স্থান হইতে ভন্ন নদী তীরস্থ প্রদেশে সর্বপ্রথম উপনিবেশ স্থাপন করে। এক্ষণে কসাক জাতির এই কয়টি শাখা দেখিতে পাওয়া যায়- ডন্-কসাক, মেলাে-রুক্ষ্মীয় কসাক, কৃষ্ণসাগরীয় বা চার্ণোমস্কি কসাক, ভরার কসাক, গ্রিবেস্কয়ের কাক, ওরেবর্গের কসাক, ইউরা আল্পসের কসাক ও সাইবিরিয়ার কসা। ড-কসাকাতির সাইবিরিয়ার কাক-শাখাই সৰ্ব্বপ্রধান। ষােড়শ শতাব্দীতে ডন নদীর তীর হইতে এক দল বীৰ্যশালী কসাক-সৈন্য পূর্ব দিকে বহু দূর গমন করিয়াছিল। ঐ সৈন্যদলের সংখ্যা ছয় সাত হাজার। দলপতি * রুসীয় ওজন পরিমাণ। এক পাউডে ইংরেজি ৩৬ পাউণ্ড, বা বাঙ্গালা ১৭ • সাড়ে, সঃ সেঃ হয়।
জাতি। ৭৫ বা সেনাপতির নাম জেমা। তিনি সেই সৈন্যগণকে লইয়া পামিয়া দেশ ভেদ করিয়া যেখানে উপস্থিত হইয়াছিলেন, সেই স্থানই আজ সাইবিরিয়া নামে প্রসিদ্ধ। মহাবীর জেমাকের বীৰ্যবলে এসিয়ার সমস্ত উত্তর ভাগ- সাইবিরিয়া দেশ এক্ষণে কুসিয়ার অধিকারভুক্ত। কসাক জাতির আচার ব্যবহার, রীতি নীতি, শারীরিক গঠন ইত্যাদি দেখিলে, উহাদিগকে আমাদের পুরাণ-বর্ণিত শক’ জাতিকে মনে পড়ে। নামের সঙ্গেও ঐক্য দেখা যায়। * তাতার দেশ পূৰ্ব্ব ও পশ্চিম এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত। মুসল- মানেরা পশ্চিম ভাগকে দুরাণ কহে, ইহাকে পাশ্চাত্য তুর্কীস্তানও বলে। তুরাণ কতকগুলি ক্ষুণ্ড্র রাজার রাজ্য ছিল; কিন্তু সম্প্রতি রুসিয়ার জার সেই সকল রাজাকে পরাজয় করিয়া আপনার আধিপত্য বিস্তার করিয়াছেন। তাতারের পূর্ব ভাগ চীনের অধীন, ইঙ্গরেজেরা উহাকে চাইনি-টার্টারি অর্থাৎ চীন-ভাতার বলে। তুরাণ বা তুর্কীস্তান ছয় ভাগে বিভক্ত ; তুর্কীস্তান, খিবা, বুখারা, থােকন, তুর্কমানিয়া ও কুন্দজ। তুরাণে নানা জাতির বসতি। তন্মধ্যে তাজিক ও উজ্বৰেগ নামক দুইটি জাতি অপেক্ষাকৃত সভ্য ও পরিশ্রমী। ইহারা বুখারা, খােকন ও কুন্দজ প্রদেশে বাস করে। পারস্য, ভারতবর্ষ, তিব্বত ও চীনদেশের লােকের সহিত ইহারা বাণিজ্য করিয়া থাকে। অবশিষ্ট সমুদায় অধিবাসী অসভ্য। পাশুপাল্যই উহাদিগের একমাত্র জীবিকা। যখন যেখানে তৃণ ও জলের সুবিধা দেখে, তখন সেইখানে গিয়া অবস্থিতি করে। * হরিবংশের ১১৪শ অধ্যায়ে লিখিত আছে, কালবন শক, তুখর, দরদ, পারদ, খশ ও পব প্রভৃতি শত শত পাৰ্বতীয় ম্লেচ্ছগণের সহিত মথুরাপুরীতে শ্রীকৃষ্ণকে আক্রমণ করিতে গিয়াছিলেন। এ দিকে দেখা যাইতেছে, শক =Syllians; জাজাটিস ও অক্ষস, নদীর মধ্যস্থলে তােখানিস্তানের লোক তুখার বা তুষার; দুর্দিস্তানের লােক দরদ; পারদ = Parthians ; প=পারস্যের পূর্বে ইহাদের বাস, ইহাদের ভাষা IPehlvi বা পালী। এই সকল জাতির নিবাস মধ্য-এসিয়ায়। হিন্দু-পুরাণে শকদ্বীপ বলিয়া যে একটি স্থানের কথা লিখিত আঙ্কে উহাও মধ্যএসিয়ায় অবস্থিত। হিরোডােটস, টানিটস, প্লিনি, টলেমি প্রভৃতি প্রাচীন পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা ঐ স্থানকে সিখিয়া বলিয়া গিয়াছেন। আরও তাহার ঐ প্রদেশে শকি (Sacm) নামে একটি জাতির কথা বলিয়াছেন। অামদের বিবেচনায় বর্তমান কলাকেরাই প্রাচীন শকিদের সন্তান। যবনিক ভাষায় “কে” শব্দের অর্থ পৰ্কত। পৰ্ব্বতে বাস কৱিত বলিয়া কো-শক বা কসাক নাম হইয়াছে।
রুসিয়ার ইতিহাস। সেখানকার সমুদায় নিঃশেষ হইলে স্থানান্তরে চলিয়া যায়। এইরূপে উহাদি- গকে সৰ্ব্বদাই স্থান ত্যাগ করিতে হয়। সুতরাং উহাদিগের নিয়মিত বাসস্থান নাই, মেষ-মাংস উহাদিগের প্রধান আহার; অশ্বমাংস পরম সুখাদ্য। উহারা সচরাচর গবী, অশ্বা, ছাগী, হরিণী ও উদ্ভীর দুগ্ধ পান করে। উহাদের কেহ কেহ অশ্ব, উষ্ট্র ও উর্ণা বিনিময় করিয়া অন্যদেশীয় লােকের নিকট হইতে অস্ত্র ও অন্যান্য প্রকার দ্রব্য লইয়া থাকে। দাস-বিক্রয় উহাদের এক প্রধান ব্যবসায়। রুসিয়া ও পারস্যের প্রান্তভাগে কি স্ত্রী কি পুরুষ, যাহাকে দেখিতে পায়, সুযােগ পাইলে তাহাকে ধরিয়া আনে। পরে ঐ হতভাগ্য ব্যক্তিকে দাসরূপে বিক্রয় করে। এ দেশের অধিকাংশ লােক মুসলমান- ধর্মাবলম্বী। তুরাণের লােকেরা ছয় সপ্তাহ অন্তর কোন এক নূতন স্থানে গমন করে। উহাদের স্ত্রীলােকেরাই স্থানান্তরে যাইবার সময় তাবু খুলিয়া বাঁধে এবং উটের পিঠে উঠাইয়া দেয়। অভীষ্ট স্থানে গিয়া পুনৰ্ব্বার তঁাবু স্থাপন করে। কিন্তু পুরুষেরা অতি অলস, কেবল তাবুর নিকট বসিয়া ধূমপান ও মদিরা-পান করে। স্ত্রীলােকেরা কৃষিকাৰ্য ও পশুপালন করিয়া থাকে। পুরু- যেরা অশ্বারােহণ করিতে ভালবাসে বলিয়া অশ্বগণকেই অবিরত যত্ন করে। তাতারদেশীয় লােকেরা অশ্বারােহণে সর্বাপেক্ষা পটু। তুরাণে উত্তম রূপ কৃষিকাৰ্য হয় না বলিয়া, পশু-মাংসই তুরাণীদের প্রধান খাদ্য। অশ্বমাংসের ন্যায় উহারা গােমাংস ও মেষমাংসও ভক্ষণ করে। এ দেশে চা-পান খুব প্রচ- লিত। তুরাণীরা চৈন-পরিচ্ছদই সৰ্ব্বাপেক্ষা ভালবাসে। চীন দেশের সম্রাট তাতার-বংশােদ্ভূত। রুসিয়ার অন্তভুক্ত, অস্ত্রাকান প্রদেশে তাতার, রুস, হিন্দু এবং আর- মাণীরা বাস করে। উহারা সামুদ্রিক মৎস্য ও লবণের বাণিজ্য করিয়া থাকে। তুকমান তাতারের অন্যান্য তাতারগণের ন্যায় নহে। ইহারা বুখারা ও পারস্যেরশাগত দেশে মনুষ্য চুরি করে। বুখারায় ঐ সকল অপহৃত মনুষ্য ক্রীতদাস রূপে বিক্রীত হয়। তুকমান তাতারেরা সশস্ত্রে দলবদ্ধ হইয়া অশ্বা- রােহণ পূৰ্ব্বক পারস্যের কোন এক নগরে আপতিত হয় এবং শত শত মনুষ্য জাতি। ৭৭ ও পশু অপহরণ করিয়া আপনাদের তাবুতে পলায়ন করে। এই জাতি বড় নিষ্ঠুর; ইহারা যাহাদিগকে ধরিয়া আনে, তাহাদের মধ্যে যাহারা বৃদ্ধ থাকে, তাহাদিগকে নিহত করে। বৃদ্ধ ক্রীতদাসের মূল্য বেশী হইবে না বলিয়াই পাপিষ্ঠেরা এইরূপ নৃশংসের কাৰ্য্য করে। দুরাত্মারা চৌর্য-কাৰ্যে কৃতকাৰ্য্য হইলে অপহৃত ব্যক্তিদিগের মধ্যে এক জনকে আপনাদিগের দেবতার নিকট বলি দেয়। দুরাচারেরা মুসলমান ধর্ম মানে বটে, কিন্তু কোরান বা মসিদের কোন ধার ধাবে না। ডাকাতি ইহাদের প্রধান উপজীবিকা। ডাকাতি করিবার জন্যই ইহারা অশ্বারােহণ ও যুদ্ধ-শিক্ষা করে। তুকমান-তাতারেরা অন্যান্য তাতারদের ন্যায় তেমন অশ্ব-মাংস-প্রিয় নয়, কিন্তু মেষমাংস খুব ভাল- বাসে। যখন ইহারা কোন অতিথিকে আহারের জন্য নিমন্ত্রণ করে, তখন একটা বৃহৎ কটাহে একটা গােটা ভেড়া সিদ্ধ করে। তার পর ঐ মাংস খণ্ড খণ্ড করিয়া ঝােল সমেত এক একটা কাষ্ঠপাত্রে কতকটা করিয়া ঢালে। প্রত্যেক পাত্রে দুই জন লােক আহার করিতে বসে। ইহারা পাত্র হইতে হস্তদ্বারা মাংসখণ্ড তুলিয়া লয় এবং কুকুরের ন্যায় মাংস-মাখা ঝােল চাটিয়া খায়। তুর্কমান-তাতারদের পুরুষেরা কৃষ্ণ মেষচৰ্ম্মের টুপী এবং স্ত্রীলােকেরা উচ্চ শ্বেত পাগড়ী পরিধান করে। স্ত্রীলােকেরা উত্তমরূপ সূচীকাৰ্য্য জানে। তাহাদের কৃত ভাল ভাল গালিচায় তঁাবুগুলি সজ্জিত হয়। রুসিয়ার অন্তভুক্ত সাবুকেসিয়া প্রদেশে সারকেসীয় জাতির বাস। পৃথিবীর মধ্যে এই স্থানের লােকেরাই সৰ্ব্বাপেক্ষা অতিথি-ভক্ত। নিতান্ত দরিদ্র পরিবারদিগের মধ্যেও একটি করিয়া অতিথিশালা আছে। কোন কোন অতিথিশালায় ১০টি হইতে ১০০টি টেবিল সাজান থাকে। অতিথিরা। দলবদ্ধ হইয়া তথায় আহার করে। সারকেসীয় স্ত্রীলােকেরা বড় সুন্দরী। কিন্তু এরূপ সুন্দরী হইলেও হিন্দু, চীন এবং তুরস্কদেশীয়া স্ত্রীলােকের ন্যায় অবরুদ্ধ থাকে না। তাহারা অতিথিশালায় গিয়া অতিথিগণের সহিত সাক্ষাৎ করে না। কিন্তু অতিথিরা নিমন্ত্রিত হইয়া তাহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করি- বার জন্য বাস-বাটীতে আইসে। দেহের চমৎকার রূপই সাকেসীয় রমণীদের এক প্রকার কালস্বরূপ। কারণ নিষ্ঠর তুর্কীরা অনেক সুন্দরী সাকৈসীয় ৭৮ রুসিয়ার ইতিহাস। মেষ রমণীকে ক্রয় করিয়া লইয়া যায়। সারকেসীয় বালিকারা পৰ্যন্ত পশম, শণ ও পাট দ্বারা উত্তম উত্তম কাপড় বুনিতে পারে। সাকেসীয় পুরুষেরাও পরম সুন্দর। যুদ্ধই উহাদিগের প্রধান কাৰ্য্য। কৃষিকাৰ্য্য এবং গৃহকাৰ্য স্ত্রীলোক, বালক এবং ক্রীতদাসগণের প্রতি অর্পিত হয়। পুরুষেরা যুদ্ধ-কাৰ্যেই লিপ্ত থাকে। প্রত্যেক পুরুষের সঙ্গে বন্দুক, পিস্তল, ছােরা ও ভরবারি থাকে। সম্রান্তদিগের সঙ্গে ধনু ও বাণপূর্ণ ভূণ থাকে। এই সকল অস্ত্র দ্বারাই তাহাদিগের মধ্যে ভদ্রাভদ্র চিনিতে পারা যায়। সাকেসীয়দিগের পরিচ্ছদ কৃষ্ণবর্ণ, তাহার গঠন মােটামুটি। বা ছাগ-চৰ্ম্মের টুপী বড় আদরের জিনিষ। বালকেরা শৈশব অবস্থা হইতেই শরীর শক্ত করিতে শিক্ষা করে। তিন বৎসর বয়সের সময় অভিভাবকের বালকদিগকে গৃহে না রাখিয়া এক জন অপরিচিত লােকের হস্তে সমর্পণ করে। বাটীতে থাকিলে পিতা মাতার অত্যন্ত আদরের হইবে বলিয়া এইরূপ করা হইয়া থাকে। সেই অপরিচিত ব্যক্তিকে পালক-পিতা বলে। সেই ব্যক্তি প্রতিপাল্য বালককে অশ্বারােহণ এবং লক্ষ্যভেদ শিক্ষা দেয়। বালক অশ্বারােহণে পালক- পিতার সহিত উচ্চ পর্বতের উপর আরােহণ করিতে শিক্ষা করে ; ভয়ঙ্কর অন্ধকারময় উপত্যকা মধ্যে ধাবিত হয়। এইরূপে ক্রমাগত শিক্ষা লাভ করিয়া বয়ঃস্থ ও সবল হইলে পর পিতা মাতার নিকট গমন করে। জর্জিয়া রাজ্য কুসিয়ার অন্তর্গত। সাকেসিয়া অপেক্ষা এই রাজ্য অধিক উর্বর। কিন্তু অত্রস্থ লােকেরা তেমন সুন্দর ও পরিশ্রমী নহে। সাকেসীয় রমণীরা যেমন সূচীকাৰ্যে নিপুণ, জর্জিয়ার রমণীরা সেইরূপ শয়ন-সুখাভিলাষিণী। এই সকল রমণী আপন আপন মুখে ও ভ্রতে নানা- বিধ চিত্র করিয়া থাকে। মস্তকে টিয়ারা ( Tiara) নামক এক প্রকার অনুন্নত মুকুট ধারণ করে। জর্জিয়ার লােকেরা অত্যন্ত সুরাপায়ী। এক জন সামান্য মজুরও প্রত্যহ পাঁচ বােতল মদ্য পান করে। ইহাদিগের মদের পিপাও অতি অদ্ভুত। ইহারা একটা মহিষের লাঙ্গল ও পদ সমেত আদত চামড়ার খেলে সুরা পরিপূর্ণ করিয়া রাখে। উহা দেখিলে বোধ হয়,যেন একটা জীবন্ত মহিষ শুইয়া আছে জাতি। ৭৯ জর্জিয়ার ললাকেরা রুসিয়ার গ্রীক-চৰ্চ্চ-মতাবলম্বী খৃষ্টান। সাইবিরিয়ায় যে কএক প্রকার জাতি আছে, তন্মধ্যে অস্তিয়াক ও সাময়েদ, জাতিই অপেক্ষাকৃত প্রসিদ্ধ। অস্তিয়াদের গৃহ বাসের ন্যায় আকারবিশিষ্ট। গৃহে একটি মাত্র দরােজা থাকে ; কিন্তু উহা এত ক্ষুদ্র যে, অল্পবয়স্ক বালক বালিকা ব্যতীত অন্যকে অনেকটা নত হইয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিতে হয়। দরােজার ন্যায় গৃহের জানালাও একটি। উহাতে কাচের বদলে মাছের ছাল আঁটা থাকে। গৃহের মধ্যে একটি গর্তে দিবা- রাত্র অগ্নি জ্বলে। সাইবিরিয়ায় অত্যন্ত শীত বলিয়াই এইরূপ ধরণে গৃহ নির্মিত হয়। অস্তিয়াকেরা একটা বৃহৎ গামলায় খাদ্যদ্রব্য রাখিয়া সকলে এক সঙ্গে আহার করে। কখনও কখনও তাহাদের কুকুরেরাও তাহা- দের সঙ্গে আহার করিয়া থাকে। অস্তিয়াক্ জাতির বাড়ীতে স্বতন্ত্র কুঠরী থাকে না, ঘােড়ার আস্তাবলের ন্যায় কাঠের বেড়া থাকে। উহারা তন্মধ্যে মৃগচর্ম পাতিয়া শয়ন করে। প্রত্যেক লােক নিজের ঘেরায় আহার, উপবেশন ও শয়ন করে। কেবল আগুন পােহাইবার সময় সকলে একত্র হয়। অস্তিয়া জাতি যদিও দরিদ্র, তথাপি তাহাদের অনেক কুকুর আছে। ঐ সকল কুকুর খুব চতুর, ও তাহারা অশ্বের কাৰ্যও করে। এক জন অস্তি- একটা কুকুরের উপর আরােহণ করিয়া স্বীয় গন্তব্য স্থানে গমন করিতে পারে। কুকুরকে বেত্রাঘাত করিতে বা তাহার মুখে লাগাম দিতে হয় না। ইঙ্গিত-বাক্য বলিলেই সে আরােহীর ইচ্ছানুসারে যায়, আসে ও থামে। ঐ সকল কুকুর শ্বেত বর্ণ, গাত্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাল দাগ। উহাদের শরীরের অপেক্ষা লাঙ্গলের লােমই দীর্ঘ ও মনােহর। কখন কখন দুইটা কুকুর জোয়াল কঁাধে করিয়া স্বীয় প্রভুর চক্ৰহীন শকট টানিয়া লইয়া যায়। বৃহৎ চক্ৰহীন গাড়ী টানিতে হইলে ১২টি কুকুরের প্রয়ােজন হয়। যখন কুকুরদিগকে সাজ পাইবার প্রয়ােজন হয়, তখন তাহাদিগকে কাছে ডাকি- লেই আপনার ঘাড় পাতিয়া দেয়। ঘােড়ার ন্যায় ধরা বাঁধা করিয়া সাজ পরাইতে হয় না। কিন্তু ঐ সকল কুকুর গাড়ী টানিবার সময়ে প্রথমতঃ ভয়ানক চীৎকার করিতে থাকে, কিয়ৎকাল পরে নীরব হয়। অস্তি ৮০ রুসিয়ার ইতিহাস। যাকেরা একটা উচ্চ স্থান নির্মাণ করিয়া খাদ্যদ্রব্য রক্ষা করে। পাছে তাহাদের কুকুরের খাদ্যদ্রব্য চুরি করে, এই জন্য এইরূপ উচ্চ স্থানের প্রয়াে- জন হয়। অস্তিয়াকেরা পশমী পরিচ্ছদের জন্য কখন কখন উৎকৃষ্ট কুকুর নিহত করে । অস্তিয়াকদের কুকুর ব্যতীত বা-হরিণ সম্পত্তিও আছে। উহারা অতি শান্ত। অস্তিয়াকেরা সহজে উহাদের দ্বারা শকট-চালনা করে। এক একখানি বৃহৎ শকটে সারি বাঁধিয়া চারিটি বল্ল-হরিণ সংঘােজিত হয়। যে হরিণটি সৰ্ব্বপ্রথমে থাকে, কেবল তাহারই মস্তকে বন্ধ ( লাগাম) বাঁধা থাকে । পশ্চাদ্বত্তী তিনটি হরিণ কম্পাসের মধ্যে অবস্থান করে। বরা-হরিণের। শকট লইয়া পৰ্বতে আরােহণ করিতে পারে। দৌড়িয়া যাইবার সময় লাফাইয়া যায়। বহু দূর গিয়া যখন ক্লান্ত হয়, তখন শুইয়া পড়ে। কিয়ৎ- কাল বরফের উপর মুখ চাপিয়া রাখে ; শীতল হইলে আবার শকট টানিতে থাকে। বন্ধু-হরিণের পৃষ্ঠ অপেক্ষা স্কন্ধদেশ দৃঢ়, এই জন্য অস্তিয়াকেরা উহার স্কন্ধোপরি আরােহণ করে। বক্সা-হরিণদিগকে কোন খাদ্য দিলে খায় । উহারা পৰ্ব্বতের উপর ভ্রমণ করিয়া এক প্রকার শৈবাল ভক্ষণ করে। কেহ হাতে করিয়া উহা তুলিয়া দিলে মুখ বন্ধ করিয়া থাকে। সাইবিরিয়ার বল্পা-হরিণেরা আমাদের দেশের স্বপাকভােজী না কি ? বল্লা-হরিণ জীবনে মরণে অস্তিয়াকৃদের ব্যবহারে লাগে। মৃত বন্ধু- হরিণের চৰ্ম্মে অস্তিয়াক্ জাতির পরিচ্ছদ হয়। কি পুরুষ, কি স্ত্রী, সকলেই চৰ্ম্মে আপাদমস্তক আবৃত করে, কেবল মুখ খােলা থাকে। তাও আবার হস্তসংলগ্ন সলােমচৰ্ম্মনির্মিত দস্তানায় বারংবার চাকিতে হয়, নহিলে শীতের দাপটে ফাটিয়া যায়। অস্তিয়াদের ধনুক নিজেদের আকার অপেক্ষা লম্বা। উহারা সেই ধনুকে লৌহফলা-সংযুক্ত লম্বা লম্বা তীর বসাইয়া নিক্ষেপ করিয়া বন্য পশু বিনাশ করে। রুস্ সম্রাটের নিকট প্রতি বৎসর প্রত্যেক অস্তিয়াকে দুইটি করিয়া শাবল (শাবর) জন্তুৰ চৰ্ম্ম করস্বরূপ পাঠাইতে হয়। এই জন্য উহারা অন্য জন্তু অপেক্ষা শাবল শিকার করিতে সৰ্ব্বদা চেষ্টা করে। শাবলের ললামে কসীয় সম্রান্তদের উৎকৃষ্ট পরিচ্ছদ জাতি। অস্তিয়াকেরা যখন বন্ধু-হরিণের চৰ্ম্মে আপাদমস্তক আচ্ছাদন করিয়া শিকার করিতে বাহির হয়, তখন তাহাদিগকে শাদা ভালুকের মত দেখায়। শিকারের সময় উহারা বরফ-জুতা পায়ে দেয়, নহিলে বরফে ডুবিয়া মরে। দুইখানা চওড়া কাঠে বরফ-জুতা প্রস্তুত হয়। উহার দুই মুখ নৌকার ন্যায়। অস্তিয়াকেরা ঐ জুতা পায়ে বাঁধিয়া ইচ্ছামত যাতায়াত করিতে পারে, কোনরূপ বিপদের আশঙ্কা থাকে না। অস্তিয়া জাতির ধর্মও অদ্ভুত। উহারা এক ঈশ্বর স্বীকার করে, কিন্তু অন্যান্য দেবতারও পূজা করিয়া থাকে। তা ছাড়া আরও ব্যাপার আছে। কোন ব্যক্তির মৃত্যু হইলে, আত্মীয়েরা তাহার কাষ্ঠনির্মিত মূর্তি স্থাপন পূৰ্ব্বক ক্রমাগত তিন বৎসর কাল পূজা করিয়া শেষে ভূগর্ভে প্রােথিত করে। পুরােহিতের মৃত্যু হইলে তিন বৎসরে পূজা শেষ হয় না-পাঁচ ছয় বৎসর লাগে। কখন কখন কোন মৃত পুরােহিতের কাষ্ঠমূর্তি চিরকালের জন্য পূজিত হয়। এতাে গেল মরা মানুষ-পূজার কথা। মরা পশুও অস্তিয়া জাতির দেবতা! উহারা ভালুক, নেকড়ে বাঘ বা অন্য কোন হিংস্র জন্তু নিহত করিলে, তাহার অন্ত্রাদি বাহির করিয়া লয়। অন্ত্রশূন্য উদরে খড় কুটা পূরিয়া যেমন পেট তেমনি করে। পরে সকলে মিলিয়া সেই মৃত পশুটাকে লাথি মারে, মুখভঙ্গি করে, তাহার চোকে মুখে থুথু দেয়। অবশেষে সেটাকে কুটীরের একটা কোণে দাঁড় করাইয়া ভক্তিভরে পূজা করে। এরই নাম ‘জুতাে মেরে দণ্ডবৎ।” অস্তিয়াকেরা পূজার সময় চীৎকার করিয়া নৃত্য ও অস্ত্রচালনা করে। ইষ্ট দেবতাকে সােণা, রূপা, পশুলােম ও বল্গা-হরিণ উপহার দেয়। দুরাত্মারা দেবতার তৃপ্তির জন্য বা-হরিণকে অতি নিষ্ঠুরের ন্যায় নিহত করে। থামিয়া খামিয়া গাত্রে অস্ত্রাঘাত করাতে নিরীহ হরিণ যার-পর-নাই কষ্ট পায়। রুসসম্রাট অস্তিয়াকৃদিগকে খৃষ্টান করিবার জন্য বস্ত্র ইত্যাদি, পাঠাইয়া অল্পসংখ্যক অস্তিয়া লােভে পুড়িয়া খৃষ্টান হইয়াছে। রুসসম্রাট এ দিকে যেমন, আর দিকে তেমন নহেন। তিনি টাকার লােভে অস্তিয়া- দের নিকট মদ পাঠাইবারও অনুমতি দেন। একে তাে অস্তিয়াকের। যারুপ নাই অসভ্য, তার উপর আবার মদ! ইহাতে শুভ না অশুভ ঘটে ? আমু দেন।
রুসিয়ার ইতিহাস। । দেয় ইংরেজরাজও এ বিষয়ে টেক্কা দিয়াছেন ! “এক ভষ্ম আর ছার ; দোষ গুণ ক’ব কার ?” সাইবিরিয়ার সর্বোত্তরে উত্তর সাগরের নিকট সামােয়েদ জাতির বসতি। এই জাতি রুসসম্রাটের অধীন বটে, কিন্তু রুসজাতিকে কদাচিৎ দেখিতে পায়। ভয়ঙ্কর শীত বলিয়া সেরা ইহাদের দেশের দিকে যাইতে চাহে না । সামমায়েদগণ বঙ্গা-হরিণের চৰ্ম্মে তঁাবু নিস্মাণ করিয়া বাস করে। ইহারা অস্তি- যাকূ জাতি অপেক্ষা অধিকতর অসভ্য। ইহাদের স্ত্রীলােকেরা অদ্ভুত রকমের পরিচ্ছদ পরিধান করে। সেই পরিচ্ছদে নানা প্রকার পশুলােম ও চৰ্ম্ম সংযুক্ত থাকে। মস্তকে থােপ্পাদার টুপী। মস্তকের পশ্চাতে চুলের বেণী সহিত প্লটন নামক জন্তুর সুদীর্ঘ লাঙ্গল ঝুলিতে থাকে। সেই বেণী ও লাঙ্গলের শেষ ভাগে পিত্তল-চাক্তির গােছা ঝম ঝম্ করিয়া বাজে। যেমন বেশ ভূযা, তেমনি খাদ্য ! সামােয়েদ জাতির পোশাক দেখিলে হাসি আসে, খাবার দেখিলে ভয় পায়। ক্ষুধার সময় একটা বরা-হরিণ হত্যা করিয়া সকলে মিলিয়া তাহার কঁচা মাংস খাইয়া ফেলে। খাইবার সময় সক- লের মুখে গালে কাঁচা মাংসের কঁচা রূক্ত মাখামাখি হইয়া অতি ভীষণ হইয়া উঠে। হাড় হইতে মাস কামড়াইবার কায়দা দেখিলে বাঘেও লজ্জা পায়। সাইবিরিয়ার পূর্ব দিকে লীনা নদীর নিকটে ইয়াকট, নামে এক জাতি আছে। ইহাদের বা-হরিণ বা কুকুর সম্পত্তি নাই। ইহারা অশ্ব ও গাে লইয়া কালক্ষেপ করে। ইহারা বৃষের উপর আরােহণ করে এবং অশ্বমাংস খায়। অশ্বমুণ্ড ইহাদের পক্ষে সর্বাপেক্ষা সুখাদ্য ! ইহাদের গাভীগুলি একটি স্বতন্ত্র কুঠরীতে থাকে, কিন্তু ইহারা গােবৎসগণের সহিত আর একটি কুঠরীতে অবস্থান করে। বুরেইৎ নামে আর এক প্রকার জাতি আছে। উহারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী এবং তঁাবুতে বাস করে। সাইবিরিয়ার পুৰ্ব্ব-দক্ষিণ দিকে কাকাটকা বা কাস্কটকা উপদ্বীপ। অত্রস্থ লােকদিগকে কাকাদেল বলে। ইহারা পরিশ্রম করা অপেক্ষা সুরা ভাল- বাসে। কাকাদেল জাতি সমুদ্রতটে গিয়া সিন্ধুঘােটক শীকার করে এবং তাহাই বিক্রয় করিয়া জীবিকানির্বাহ করিয়া থাকে। যাই হউক, এই জাতি উদ্ভিদ ও জন্তু। অতিথির প্রতি দয়ালু ও উপকারীর নিকট কৃতজ্ঞ। কেহ ইহাদের উপকার করিলে, ইহারা কখন তাহা বিস্মৃত হয় না। এক সময়ে না এক সময়ে তাহার প্রত্যুপকার করে। কাকাদেলের বাটীতে কোন অতিথি আসিলে, গৃহস্বামী নিতান্ত দরিদ্র হইলেও, তাহাকে পাচ ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত তাহার করায়। যখন আর সুবিধা না থাকে, তখন মুখ ফুটিয়া কিছু বলিতে পারে না; অতি- থিকে খাদ্যসামগ্রীর তারতম্য দেখায়। অতিথি গৃহস্বামীর অনাটন বুঝিতে পারিয়া অন্যত্র প্রস্থান করে। বিংশ অধ্যায়। উদ্ভি ও জন্তু। কুসিয়ায় প্রয়ােজপেক্ষা শস্য জন্মে। রাইসরিষাই অন্যান্য শস্যাপেক্ষা বিদেশে রপ্তানি হয়। দক্ষিণে নিপার নদী ও উত্তরে ভল্লা নদী, ইহার মধ্যস্থ ভূখণ্ডে অধিক পরিমাণে রাইসরিষা উৎপন্ন হইয়া থাকে। বার্লি, জই, গম প্রভৃতি শস্যও যথেষ্ট জন্মে। ওকা, ডন, ও দেশনা নদীর নিকট মিলেট ( Millct) জন্মিয়া থাকে। রুসিয়ার দক্ষিণ প্রদেশে ভারতবর্ষীয় শস্য পাওয়া যায়। ইউরােপের অন্যান্য দেশপেক্ষা রুসিয়ায় পাট ও শণের চাষ অধিক। উক্রেইন অঞ্চলে তামাক উৎপন্ন হয়। রুসিয়ায় শস্যের ন্যায় সুমিষ্ট ফল ভাল জন্মে না। উত্তর দিকের জলবায়ু অত্যন্ত শীতল বলিয়া কেবল বন্য বেরি ও মন আপেল জন্মে ; কিন্তু দক্ষিণ দিকের জলবায়ু অপেক্ষাকৃত ভাল বলিয়া পি, আপিকট, কুইন্স, ভুত ও আখরােট, প্রভৃতি ফল উৎপন্ন হয়। ক্রিাঃ । উদ্যান গুলিতে বাদাম ও ডালিম জন্মে। অল্প স্থানেই আঙুর ফল উৎপন্ন হয়। তরকারির মধ্যে আলু, কপী, গাজর, সাগম, শশা, লাউ, মূলা, কঁচুড়, শতমূলী ও চিচিঙ্গা প্রভৃতি অধিক পরিমাণে জন্মিয়া থাকে। রুসিয়ার বনবিভাগে অনেক আয় হইয়া থাকে। বন সমূহে বাহাদুরী • ৪ রুসিয়ার ইতিহাস। যে সকল কাষ্ঠ, জ্বালানিকাষ্ঠ, টার, পিচ ও পটাশ প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। রুসিয়ার উত্তরভাগে যত অরণ্য আছে, দক্ষিণভাগে তত নাই; এমন কি, উভয়ের মধ্যে তুলনা করিলে শেষের ভাগে অরণ্য নাই বলিলেও চলে। কসিঘায় নানাবিধ জঙ্ক দেখিতে পাওয়া যায়। তন্মধ্যে অশ্বই সৰ্বান পেক্ষ। সংখ্যায় অধিক। মেষ ও ছাগের ভাগও বড় কম নয়। উহাদের চর্ম বিদেশে প্রচুর পমািণে রপ্তানি হয়। বিশেষতঃ রুসিয়ার ছাগ-চৰ্ম্মে মরােক্কো-চৰ্ম প্ৰস্তুত হইয়া থাকে। শূকরের সংখ্যা বড়ই কম। জাতি মরুভূমিতে ভ্রমণ করিয়া বেড়ায়, তাহাদের উঠু-সম্পত্তি যথেষ্ট। উহাদের মধ্যে কাহারও কাহারও ১০০০ এক হাজার উঠু আছে। অস্ত্রা- কান প্রদেশে মহিষ দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু সংখ্যায় কম। হংস, রাজহংস এবং কুকুট সংখ্যায় অনেক। যে সকল হলে অনেক হ্রদ ও পুষ্করিণী আছে, তত্তৎ স্থানে হংস ও রাজহংসের সংখ্যা বড় বেশী। উত্তরপ্রদেশেই কেবল বা-হরিণ দেখা যায়। বিয়ালােভিজা নামক স্থানের অরণ্যপ্রদেশে বাইস, সৰ্বোত্তরভাগে নানাবিধ হরিণ, খরগাে ও বন্য শূকর আছে। চর্মের জন্য যে সকল হিংস্র ও বন্য জন্তু শিকার করা হয়, তন্মধ্যে ভল্লুক, ক্ষুদ্র ভল্লুক, নেড়ে বাঘ, শৃগাল, গ্লট, নকুল, মেরু-বিড়াল, কাঠবিড়ালী, এবং ভোঁদড় প্রভৃতির সংখ্যাই অধিক। উযর- ভূমিতে নেকড়ে বাঘ, চিতা বাঘ, শৃগাল ও বন্য শূকর অনেক দেখা যায় । রুসিয়ায় নানাবিধ পক্ষী আছে । একবিংশ অধ্যায় i - রুসিয়ার পূৰ্ব্ব-কথা । নবম খৃষ্টাব্দের মধ্যভাগের পুর্বে রুসিয়া, ইতিহাসের মধ্যে স্থান পায় নাই। ৮৫০ খষ্টাব্দে নবথরদবাসীদের সহিত প্রতিবেশিগণের ভয়ানক রুসিয়ার পূর্ধ্ব-কথা। বিবাদ সংঘটিত হয়। প্রতিবেশীদের পীড়নে নবগরদস্থ লোকেরা যার-পর- নাই ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠে। এই জন্য তাহারা রুরি নামক এক জন প্রবল-ক্ষমতাপন্ন দকে তাহাদের সাহায্য করিবার জন্য আহ্বান করে। রুরিকৃ এক জন বণ্টিকৃ-দ্য বলিয়া প্রসিদ্ধ। তিনি রুসিয়ায় আসিয়া নব- গরদনিবাসিগণকে বিপদ হইতে উদ্ধার করেন। অনন্তর রুরি রুসিয়ার অধিকাংশ ভূখণ্ডের অধিপতি হইয়া একটি রাজবংশ স্থাপন করিলেন। সেই রাজবংশ ১৫৯৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চলিয়া আসিল। রুরিবংশীয় সেন্ট ব্লডিমির দি গ্রেট (৯৮০-১০১৫) রুসিয়ায় রাজত্ব করিয়াছিলেন। তিনি ৯৮৮ খৃষ্টাব্দে সম্রাট দ্বিতীয় বেসিলের ভগিনী এনাকে বিবাহ করেন। বিবাহের সময় তাহাকে গ্রীকৃ-চৰ্চ-মতানুসারে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করিতে হইয়াছিল। ব্লডিমির বিশেষ পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন। তিনি স্বীয় বলে পার্শ্ববর্তী অনেক প্রদেশ জয় করিয়াছিলেন। কিন্তু, তাহার মৃত্যুর পর পুনৰ্ব্বার জয়-লব্ধ রাজ্যগুলি খণ্ডীকৃত হইয়া যায়। তার পর (১০৫৭-৭৫) শ্বেত-রুসিয়ার অধিপতি প্রথম এ আপনাকে কুসিয়ার প্রধান অধিপতি বলিয়া ঘােষণা করেন। ১২২৩ খৃষ্টাব্দে তাতারবংশীয় প্রসিদ্ধ জেঙ্গি খাঁর পুত্র তোশি ৫,০০,০০০ পাঁচ লক্ষ তাতার-সৈন্য লইয়া রুসিয়ায় প্রবেশ করেন। আজব সমুদ্রের নিকট কান্ধা নদীতটে রুসিয়ার রাজবংশ যুদ্ধে পরাজিত হয়। অনন্তর ১৩৬১ খৃষ্টাব্দে তাতাররাজবংশীয় তাতার খাঁর মৃত্যু হইলে রুসিয়ার পুনৰ্ব্বার পরিবর্তন সংঘটিত হয়। সেই সময় হইতে (১৪৮০ ) তৃতীয় ইভানের সময় পর্যন্ত রুসীয় পরাজিত রাজার তাতারদের সহিত ক্রমান্বয়ে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধোপলক্ষে ১৩৮২ ও ১৪৪১ খৃষ্টাব্দে মস্কাউ নগর দুই বার ভস্মীভূত হয়। তৃতীয় ইভানের সময় হইতে রুসিয়ার ইতিহাসে নূতন যুগ আরম্ভ হইল। তিনি পােল ও লিথুনীয়গণকে যুদ্ধে পরাজিত করিলেন , কানের তাতার- গণকে করদ করিলেন এবং রুসিয়ার অন্তর্গত হৃত রাজ্যগুলি একচ্ছত্র করি- লেন। তিনি আপনাকে রুসসাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলিয়া ঘোষণা করিয়া দিলেন। তাহার উত্তরাধিকারিগণের মধ্যে ১৫০ ৫-৩৩) চতুর্থ বেসিল, রুসিয়ার ইতিহাস। অনন্তর ১৫ ৫৯ (১৫৩৩-৮৪) চতুর্থ ইভা ও (১৫৮৪-৯১) ফিওভাের রুসসাম্রাজ্যের যথেষ্ট উন্নতি করিয়াছিলেন। চতুর্থ বেসি ক্রমাগত পােল ও তাতারদের সহিত যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকিতেন। চতুর্থ ইভান্ সর্বপ্রথম রুস-রাজ-বংশে জা! ( Czar) উপাধি প্রবর্তিত করেন। তিনি ১৫৫২ খৃষ্টাব্দে কজান এবং ১৫৫৪ খৃষ্টাব্দে অাকান প্রদেশ জয় করিয়া লন। খৃষ্টাব্দে ডকসাকগণকে অধীন করিয়া, তাহাদের সাহায্যে সাইবিরিয়া জয় করেন। ১৫৮১ খৃষ্টাব্দে এই ঘটনা হইয়াছিল। চতুর্থ ইভা যথেষ্ট ক্ষমতাপন্ন রাজা ছিলেন বটে, কিন্তু নিষ্ঠুরতা তঁাহার ব্রত ছিল। ফিওভাের বড় দুৰ্বল রাজা ছিলেন। ১৫৯১ খৃষ্টাব্দে তঁাহার মৃত্যু হয়। তঁাহার মৃত্যু- তেই রুসিয়ার রুরি রাজবংশের পুরুষ-শাখার শেষ হয়। রুরিবংশের পুরুষ-শাখা ৭৩৬ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিল। এই সময়ের মধ্যে সর্বশুদ্ধ ৫৬ জন রাজা হইয়াছিলেন। ফিওডােরের শ্যালকের নাম বােরিস্। তিনি ফিওডােরের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। ফিওডােরের মৃত্যুর পর রুসিয়ার ধর্মযাজক ও সম্রান্তগণ একত্র হইয়া তাহাকে রাজসিংহাসন দান করিলেন। তিনি ১৫৯৮ হইতে ১৬০৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজ্য শাসন করিয়াছিলেন, কিন্তু শেষে অত্যন্ত স্বেচ্ছাচারী ও নিষ্ঠুর হইয়াছিলেন। ফিওডােরের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই ক্রমাগত নয় বৎসর কাল রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী লইয়া প্রতিযােগিতা ও বিবাদ চলিতে লাগিল। অবশেষে ১৬১৪ খৃষ্টাব্দে রুবিকের দৌহিত্রবংশীয় মাইকেল রােমান সকলের সম্মতিক্রমে রাজা হইলেন। ইহা হইতেই রুসিয়া প্রকৃতপক্ষে ইউরােপীয় রাজ্য মধ্যে গণ্য হইল। ১৬১৪ হইতে ১৬৪৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত মাইকেল, রােমান নিজ শক্তি বিস্তার ও পূৰ্বপরাজিত রাজ্য সমূহ পুনরুদ্ধার করিয়া নির্বিঘ্নে রাজদণ্ড পরিচালনা করিয়াছিলেন। কিন্তু ইহাকে বাধ্য হইয়া সুইডেনের রাজাকে ইঙ গ্রিয়া ও কেরিলিয়া, এবং পোলণ্ডের, অধিপতিকে স্মলেন্ নামক প্রদেশ ছাড়িয়া দিতে হইয়াছিল। যুদ্ধের অপেক্ষা রােমাফের রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শাসন অতি সুন্দর ছিল। পুৰ্ব্ববর্তী রাজারা যে সকল কার্য্যের জন্য সাধারণের নিকট নিন্দনীয় হইয়া- ছিলেন, ইনি সেই সকল অন্যায় কাৰ্য্য উঠাইয়া দেন। ইনি ১৬২৯ খৃষ্টাব্দে রুসিয়ার পূর্ধ্ব-কথা। ফ্রান্সের সহিত এবং ১৬২৩ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডের সহিত বাণিজ্য সম্বন্ধীয় সন্ধি করিয়া স্বদেশের বিশেষ উন্নতি সাধন করেন। রােমানফের অন্যতম পুত্র আলেসিস। ইনি ১৬৪৫ হইতে ১৬৭৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করিয়াছিলেন। ইহার পত্নীর নাম সােফিয়া। সুপ্রসিদ্ধ পিটাৰ দি গ্রেট, ইহাদের পুত্র। পিটার দি গ্রেট ১৬৮৯ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনা রূঢ় হইয়া মাতার তত্ত্বাবধানে ভ্রাতা ইভানের সহিত ৭ বৎসর কাল একত্রে রাজ্য করিয়াছিলেন। তাহার পর তিনি জীবনের অবশিষ্ট ভাগ একাধি- পত্যে যাপন করেন। সে বিষয় এই পুস্তকের তৃতীয় অধ্যায়ে বিবৃত হইয়াছে।
পরিশিষ্ট। বীরত্রয়ের বলাবল । ফরাসী ও রুষ দুই জনের উপরই ইংরাজকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিতে হই- য়াছে। কোন্ দিন রুষ ককাশস হইতে কাবুল লম্বিয়া কাশ্মীরে আসিয়া পড়েন, কোন্ দিন ফরাসী আনাম হইতে লেয়স লন্সিয়া আভায় আসিয়া পড়েন, এই ভাবনায় বৃটিশ-সিংহকে ব্যাকুল করিয়া ফেলিয়াছে। ভারতের ভাবনায় ইংরাজকে বরাবরই ব্যাকুল থাকিতে হইয়াছে। ইংরাজের পর- রাষ্ট্র লইয়া যত গোলষােগ, তাহার অধিকাংশই ভারতের জন্য। উনবিংশ শতাব্দীতে ইংরাজ যত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, প্রায় সমস্তই ভারতের জন্য। পাছে রুষ তুরস্ককে পদানত করিয়া ভারত-যাত্রার পথ প্রশস্ত করিয়া লয়েন, এই ভয়েই ইংরাজ ক্রিমিয়া-ক্ষেত্রে তুরস্কের হইয়া রুষের সহিত যুদ্ধ করিয়া- ছিলেন। মিশর স্বায়ত্ত করিয়া না রাখিলে ভারতের পথ স্বায়ত্ত থাকিবে না, এই জন্য ইংরাজ মিশর লইয়া মত্ত হইয়াছেন। ভারতের ভয়েই ইংরা- জকে আফগানস্থানে তিন বার অর্থ-শােণিতের শ্রাদ্ধ করিতে হইয়াছে। এখনও ভারতের জন্য ইংরাজকে পূর্ব পশ্চিমের দিকে নিরন্তর চকিত-নেত্রে চাহিয়া থাকিতে হইয়াছে। পশ্চিমে প্রবল তুষভল্লুক ; পূৰ্বে প্ৰবল ফরাসি- শাৰ্দল। দুই দিকে দুই বীর। মধ্যে, ভারতে বীর ইংরাজ বিরাজ করিতে- ছেন। এক বার তিন বীরের বলাবলটা আলােচনা করিলে ক্ষতি কি? ফরাসীর বল। প্রথমে ফরাসীরই বলাবল পরীক্ষা করিয়া দেখিব। ফরাসীর বলবিক্রম বড় বাড়িয়াছে। প্রষের নিকট পরাজিত হইয়া অবধি ফরাসী নিজের বল ক্রমেই বাড়াইতেছেন। সৈনিক সংগ্রহের সুবিধার জন্য যেরূপ আইন কানুন করিতে হয়, ফরাসী ১৮৭৫ অব্দে তাহা করিতে অমনােযােগী হন যে কিছু ত্রুটী অভাব ছিল, ১৮৮২ অব্দে তাহা দূর করিয়াছেন। বিংশ ছইতে চত্বারিংশ পর্যন্ত বয়সের যত ফরাসী-পুরুষ আছে, নিতান্ত নাই।
পরিশিষ্ট। ৮৯ দুৰ্বল এবং বিকলাঙ্গ না হইলে সকলেই গভর্মেন্টের আদেশে অস্ত্র ধারণ করিতে বাধ্য। ফরাসী-সেনা দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ সৰ্ব্বদা যুদ্ধার্থ প্রস্তুত, যুদ্ধাৰম্ভ হইলে ইহাদিগকেই অগ্রে যাইতে হয়; অপর ভাগ ইহা- দিগের সাহায্যার্থ প্রস্তুত থাকে। হয় এক ভাগে, না হয় অন্য ভাগে কাৰ্য্য করিতে প্রত্যেক ফরাসীই বাধ্য। পূৰ্বে অনেকেরই অব্যাহতি ছিল। যিনি পরিবারের একমাত্র রোজগারী, তাহার অব্যাহতি ছিল। টাকা দিয়াও অনেকে অব্যাহতি পাইত। এখন আর সেরূপ অব্যাহতির পথ নাই। ফরাসী গভর্মেন্ট স্বদেশের সামরিক বল বাড়াইবার জন্য প্রাণপণে লাগিয়া- ছেন। অতি কঠোর আইন প্রণয়নেও কুণ্ঠিত হন নাই। কিন্তু এরূপ আইনের কঠোরতাতেও ফরাষী জাতি অসন্তুষ্ট নহে, জাতীয় বলবৃদ্ধির জন্য সকলেই লালায়িত। ফরাসীর যুদ্ধাৰ্থ প্ৰস্তুত সৈন্যের মধ্যে ৫১৮৬৪২ পদাতিক, ১৩০১৪৬ অশ্বসাদী। ইহাদিগের সাহায্যার্থ রক্ষিত সৈন্যের (Reserve) সংখ্যা অনেক অধিক। দুই রকমে ফরাসীর ২৫০ ০০০০ সৈন্য উপস্থিত আছে। যাহারা এখন কোন সৈনিক-বিভাগে নাই, অথচ যাহাদিগকে গভর্মেন্ট মনে করিলেই ডাকিতে পারেন, এমন যুদ্ধনিপুণ সৈনিক অনেক আছে। তাহাদিগকে লইয়া হিসা করিলে ফরাসী সৈনিক-সংখ্যা সর্বশুদ্ধ ৩৭ লক্ষ ৫০ হাজার হইবে। কুরুক্ষেত্ৰ-সমরে পাণ্ডবদিগের সাত এবং কোরবদিগের ১৯, মােটে এই ১৮ অক্ষৌহিণী সৈন্য উপস্থিত হইয়াছিল। প্রত্যেক অক্ষৌ- হিণীতে ২১৮৭০ রথী, ২১৮৭০ গজী, ৬৫৬১০ তুরঙ্গমী, ১০৯৩৫০ পদাতি ; মােট ২১৮৭০০ সৈনিক ছিল। সুতরাং দুই পক্ষে কুরুক্ষেত্রে ৩৯৩৬৬০০ সৈনিক উপস্থিত ছিল। ফরাসী যে মনে করিলেই অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্য সমবেত করিতে পারেন, তাহাতে কি আর সন্দেহ আছে ? রণতরীও ফরাসীর অল্প নহে। ইংরাজের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক। ফরাসীর ৩০২ খানা রণতরীতে ১৮০২ টা কামান লাগান আছে। রণতরী জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার সৈনিক প্রস্তুত আছে। ফরাসী জলে স্কুলে বল বাড়াইয়াছেন। এত অল্প দিনের ভিতর এত বল আর কেহই কখনও বাড়াইতে পারেন নাই। সামরিক ব্যয়ও অনেক বাড়িয়াছে। মূল-সৈনি- ১২ রুলিয়ার ইতিহাস। কে ব্যয় ১৮৬৯ অকে ১৫৩৬৬২৯৭ টাকা ছিল, আর বৎসর ২৪২১২২৮০০ টাকা হইয়াছে। রণতরীর বার্ষিক ব্যয় ৮১৮২৮১৫০ টাকা। আয় যথেষ্ট আছে, ব্যয়ও যথেষ্ট হইতেছে। ফরাসীর বার্ষিক ১৪২৩৩৭৩৪৬১ ব্যয় ১৪২৩২৬৬২০০ স্থিতি ১০৪২৬ ফরাসী গভর্মেন্ট এত ব্যয় করিয়াও দেউলিয়া নহেন। তাঁহাদের আয় ক্রমেই বাড়িতেছে। সাহস ও বিক্রম ফরাসীর যে কম নহে, তাহা সকলেই জানেন। বিজ্ঞানে ফরাসী কাহারই কাছে ছােট নহেন, সুতরাং অস্ত্রশস্ত্রে, রণতরীর উৎকর্ষে, সমরবিদ্যায় ফরাসী কাহারও অপেক্ষা হীন নহেন। ফরাসী শত্রু ইংরাজের উপেক্ষণীয় নহে। রুষের বল। রুষেরও বিষম বল। সৈন্য সংগ্রহে রুষরাজ ক্রমেই অধিক আগ্রহ শালী হইতেছেন। ২১ বৎসর অতিক্রম করিলেই প্রত্যেক রুষ পুরুষকে সামরিক বিভাগে কাৰ্য্য করিতে হয়। যাহারা শিক্ষিত ; তাহারা যদি ১৭ বৎসর বয়সে ভলন্টীয়র হইয়া সৈনিক বিভাগে প্রবেশ করিয়া কিছুদিন কাৰ্য করেন, তবে তাহাদিগের পরে কিছু সুবিধা হয়। সৈনিক বিভাগে কাৰ্য্য ছােট বড় সকলকেই করিতে হয়। কসাক প্রভৃতি ভিন্নজাতীয় রুষ- প্রজাদিগকেও যুদ্ধকার্যে প্রবৃত্ত হইতে হয়, ইহাদিগকে কর দিতে হয় না, যুদ্ধে বরাদ্দমাফিক সৈনিক-সাহায্য প্রদান করিতে হয়। শান্তির সময়ে ফুষের সৈনিক সংখ্যা ৭৭০০০০, যুদ্ধের সময় ২২০০০০০, মিলিশিয়া ধরিলে যুদ্ধের সময় রুবের সৈন্য-সংখ্যা ৩২ লক্ষ। মনে করিলে রুগভর্মেন্ট সৈন্য-সংখ্যা যে আরও বাড়াইতে পারেন, তাহা সকলেই বুঝিতে পারিতেছেন। ইহারা যে অষ্টাদশ অঙ্কেহিণীর অপেক্ষাও অধিক সৈন্য সংগ্রহ করিতে পারেন, তাহাও সহজেই বুঝা যাইতেছে। যুণতরীর সংখ্যা রুষের সকলের অপেক্ষা অধিক। বটিক সাগরে ২১৬ খানা, কৃষ্ণ সাগরে ১০০ খানা, সাইবীনিয়ায় ১৬ খানা, আল হ্রদে ৬ পরিশিষ্ট। খানা, কাস্পীয় হ্রদে ২৭ খানা, পালওয়ালা ৮ খান, মোট রুষের এই থানা রণতরী। কিন্তু রুষ-রণতরীর মধ্যে অধিকাংশই দুর্বল এবং ক্ষুদ্র। রুষরণতরীতে মােট ৭৫৭ টা বই কামান নাই। সামুদ্রিক সমরে রুষ এখনও তাদৃশ শক্তিলাভ করেন নাই। অস্ত্রশস্ত্র বিষয়েও রুষ ইংরাজ ও ফরাসীর অপেক্ষা হীন। অর্থবলও তত নাই। কিন্তু সামরিক ব্যয় কম নহে। সূল-সেনায় রুষগভমেন্টের ২৭৫৮৪২৮০০ টাকা খরচ, রণতরীতে ৪৩৭৬১৭১০ টাকা খরচ। রুষের বার্ষিক আয় ১৬৩২২৯৭৯০ বার্ষিক ব্যয় স্থিতি রুষের বৎসর বৎসর প্রায় ৫ কোটী টাকা ধার হইতেছে, টাকার বাজারে পৰু একেবারে কমিয়া গিয়াছে, অধিক সুদে টাকা ধার করিতে হইতেছে, তবুও সামরিক শক্তি ক্রমে বাড়ান হইতেছে। যথেচ্ছাচার শাসনপ্রণালী দশাই এই। পরিণামে রুষ-জারকে ঘাের বিপদে পড়িতে হইবে। কিন্তু সে ভয় এখন তাহাকে কিছুমাত্র শান্ত বা সাবধান করিতে পারিতেছে না, এরূপ অশান্ত এবং অসাবধান শত্রু সহসা গােলযােগ ঘটাইতে পারে। সুতরাং এরূপ শত্রুও একেবারে উপেক্ষণীয় নহে। শত্রুও ভয়ের পাত্র। ১১১২১৫০০০ ৪৮১২০৮১০ ইংরাজের বল। ফরাসী বা ফুষের মত ইংরাজ যত ইচ্ছা সৈন্য স্বরাজ্যে সংগ্রহ করিতে পারেন না। ফরাসী ও রুষগভর্মেন্ট প্রত্যেক পুরুষকেই সামরিক কার্যে জোর করিয়া টানিয়া লইতে পারেন, ইংরাজ তাহা পারেন না। রুষ বা ফরাসীর মত ইংরাজ গভর্মেন্টের একটা বৃহতী সেনা বরাবর পোষণ করিবার অধিকার নাই। ১৬৯০ অব্দের অধিকার-বিধি (Bill of Rights) সে ক্ষমতা কাড়িয়া লইয়াছে। পাছে রাজা সৈন্যসাহায্যে ইয়ার্টদিগের মত প্রজাদের স্বাধীনতাহরণে অগ্রসর হন, এই ভয়ে ইংরাজ জাতি রাজশক্তি এইরূপে সংকোচিত করিয়া দিয়াছেন। সৈন্যরক্ষার ক্ষমতা গভমেন্ট রুসিয়ার ইতিহাস প্রতি বৎসর কমন্স হাউসের নিকট গ্রহণ করিতে হয়। কমন্স হাউসের অমতে গভর্মেন্ট একটীও অতিরিক্ত সৈনিক নিযুক্ত করিতে পারেন না। খাস সৈনিক ছাড়া, ইংরাজের মিলিশিয়, ইয়ােমারি এবং ভলণ্টীয়র এই তিন প্রকার অতিরিক্ত সৈন্য আছে। ইহাদিগের বিদেশে যাইবার অধিকার নাই। স্বদেশরক্ষার্থই ইহাদিগের অবস্থিতি। খাস সৈনিক দুই ভাগে বিভক্ত, কড়াইয়ে এবং রক্ষিত। খাস সৈনিক নিজ রাজ্যে এবং উপনিবেশে কাজ করে। ভারতের জন্য স্বতন্ত্র খাস ইংরাজ সৈনিক বরাদ্দ আছে। ১৮৮৪ অব্দে ইংরাজ গভমেন্টের কোন্ সৈন্য কত থাকিবার কথা, প্রকৃত প্রস্তাবে কত ছিল, তাহার একটা হিসাব দিতেছি। কত ছিল খাস লড়াইয়ে সৈন্য স্বরাজ্যে ও উপনিবেশে রিসার্ভ বা রক্ষিত ৩৩৫০০ রকম কত বরাদ্দ ১২৭৬১১ ১২৬৮৫৩ ১৯৬৮৭ ১ম শ্রেণী ২য় শ্রেণী ৯০ ০ ০ ১৬৯৩ ১১৭৮২৩ ১৪৪ ০৪ ১১২৬৭ ৫ ২৪৭৯২১ ২০ ৭৩৩৬ ৬৭৫৩১০ ৪৯২৬৫৬ ৬১৬৪১ ৬২৭৭৯ ৬৩৬৯৫১ ৫৫৫৪৩৫ মিলিশিয়া ১৪২৮৭৪ ইয়ােমারি ভণ্টীয়র মােট ভারতে মােট সহসা সৈন্যবৃদ্ধি করিবার অধিকার গভমেন্টের নাই।. পার্লেমেন্টের মত.হইলেও শীঘ্র সৈন্য সমবেত করিবার শক্তি ইংরাজের নাই। ভলটীয়র প্রভৃতি ত্রিবিধ সৈনিকদিগের স্বদেশেই অবস্থিতি। স্বদেশরক্ষাৰ্থ পেশাদার সৈনিক রাগ চাই। সুতরাং বিদেশে গিয়া ইংরাজ যে, যত ইচ্ছা সৈন্য লইয়া লড়িবেন, তাহারাও যাে. নাই। রুষ ফরাষীর সহিত সৈন্যসংখ্যায় টক্কর দেন, এমন ক্ষমতা ইংরাজের, আছে কি না পাঠক অনায়াসেই বুঝিতে পারিলেন।
পরিশিষ্ট। । রণতরীর বলেই ইংরাজ এত দিন আধিপত্য রক্ষা করিতেছেন। সেই রণতরীও ইংরাজের ২৪৬ খানা বই নাই। রুষের রণতরীবল সংখ্যায় যেমন, ক্ষমতায় তেমন নহে। কিন্তু ফরাসীর রণতরীবল বড় বাড়িয়াছে। ইংরাজের ইহাতে ভীত হইয়াছেন। ভীত হইয়াছেন বটে, কিন্তু সহসা নিজের বলবৃদ্ধির ক্ষমতা নাই। ইংরাজের রণতরীর উপরই প্রধান ভরসা। রণ- তরীর সংখ্যা-নির্দেশ বা বলাবল বাঁধিয়া দিবার অধিকার এখনও কমন্স হাউসকে দেওয়া হয় নাই। স্বদেশে গােলােগ বাধাইবার অধিকার না কি রণতরীর তত নাই, বিদেশীয় শত্রুর সঙ্গেই ইহার প্রধান সম্পর্ক, এই জন্যই রণতরীর উপর এখন কমন্স, হাউসের একাধিপত্য হয় নাই। ফরাসীর ৩০২ খানা রণতরীতে ১৮০২টী কামান আছে, ১ লক্ষ ৮০ হাজার লােক আছে। ইংরাজের ২৪৬ খানা রণতরীতে কত কামান আছে, আমরা জানি না। কিন্তু ৬৩ খানা প্রধান তরীতে ৬১১টা কামান আছে, তাহা আমরা জানি। সমস্ত রণতরীতে যে ফরাসীর অপেক্ষা অধিক কামান নাই, তাহাও আমরা অবগত আছি। রণতরীর লােকসংখ্যাও ফরাসীর অপেক্ষা অল্প। ফরাসীর ১ লক্ষ ৮০ হাজার আছে, ইংরাজের ভারত এবং উপনিবেশ লইয়াও. ৫৮ হাজারের অধিক নাই। ধনবল ইংরাজের যথেষ্ট আছে, কিন্তু ফরাসীরও নিতান্ত কম নহে। ইংরাজ স্থলসৈন্যের জন্য ১৮৮৪ অব্দে ১৫৬০৬৭০০০ টাকা দিয়াছেন; জলসৈন্যের জন্য ১০৬২ ০৭০০০ টাকা দিয়াছেন। ইংরাজের বার্ষিক আয় ৮৬৫৪৯০ ০০৩) বার্ষিক ব্যয় ৮৬৪৩৬২২৯°১ স্থিতি ১১২৭৭১১ উপসংহার। ইংরাজ স্বদেশীয়:সৈনিক বলে ফরাসী বা রুষের সমকক্ষ নহেন। কিন্তু তাই বলিয়া তাহার সামরিক বল কম নহে। এখন ভারতে তাহার ভার- তীয় সৈন্য অধিক নাই, অধিক রাখিবার প্রয়ােজনও নাই। স্বদেশরক্ষার জন্য ইংরাজের স্বদেশে যে সৈন্য আছে, তাহাই যথেষ্ট। এই সৈন্য '৯৪ রুসিয়ার ইতিহাস। লইয়াই ইংরাজ এত দিন ইউরােপে প্রাধান্য রক্ষা করিয়া আসিয়াছেন। এইরূপ সৈন্য লইয়াই ওয়েলিংটন অসীম সেনার অধিনায়ক বীরবর বােনা- পার্টিকে পরাজিত করিয়াছিলেন। ঘরের ভাবনা ইংরাজের নাই। ভাবনা উপনিবেশ এবং ভারত লইয়া। উপনিবেশের ভাবনাও তত নহে। রুষ ও ফরাসী-ইংরাজের উপনিবেশের উপর আক্রমণ করিবেন না, ভয় ভারত লইয়া। রুষ বা ফরাসী যদি ভারতের সমীপে ইংরাজের সহিত বলপরীক্ষায় প্রবৃত্ত হন, তাহা হইলে আর উপনিবেশের উপর আক্রমণ করিবার অবসর পাইবেন না। পাইলেও ইংরাজ, যে সৈন্য আছে, তাহা লইয়াই স্বদেশ এবং পেনিবেশ রক্ষা করিতে পারিবেন। ভারত নিজের বলেই বলীয়া। ইংরাজ মনে করিলেই ভারতের সামরিক বল স্বকাৰ্য- সাধনে নিযুক্ত করিতে পারেন। ভারতবাসীকে সন্তুষ্ট রাখিলেই ইংরাজ অতি সহজে স্ববল বাড়াইতে পারিবেন। এই বিশাল ভারতসাম্রাজ্যে লােকের অভাব নাই, শৌর্যবীর্যের অভাব নাই, সাহস এবং রাজভক্তির অপ্রতুল নাই। ফ্রান্সের লােকসংখ্যা ৩ কোটি ৮০ লক্ষও হইবে না; রুষিয়ার লােকসংখ্যা ৮ কোটী ৫০ লক্ষ ; আর এই ভারতের লােকসংখ্যা ২৬ কোটীরও অধিক। এই ভারত-সাম্রাজ্যই ইংরাজের প্রধান সহায়, ভারতবাসীই ইংরাজের প্রধান বল ।নববিভাকর, ২৯ পৌষ, ১২৯১। রুষের অপরাধ নাই। ইংরাজ যখন যেখানে অধিকারবৃদ্ধি করিবেন, তখন সেইখানে। সভ্যতা, সুশাসন, স্বাধীনতা বিস্তারিত হইবে, অধিকৃত প্রদেশের অধিবাসী- দিগের সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি হইবে; আর অন্য কোন জাতি কোন স্থানে অধিকার বৃদ্ধি করিলে সেরূপ হইবে না, এ কথা বলিলে জগৎ বিশ্বাস করিবে কেন ? ইংরাজ পৃথিবীর চারি দিকে নিজের রাজ্য বিস্তার করিতেছেন,তাহাতে কোন দোষ নাই,আর রুষ মধ্য-এশিয়াতে অধিকার বিস্তার করিলেই যত দোষ, এ কথা লােকে বুঝিবে কেন ? ইংরাজ এশিয়ার মধ্যে সভ্যতম প্রদেশে- (ভারতে) অধিকার বিস্তার করিলেন, তাহাতে পৃথিবীর কেবল মঙ্গলই হইল, আর রুষ এশিয়ার অসভ্যতম প্রদেশে (মধ্য-এশিয়ার তুকমান প্রদেশে) পরিশিষ্ট। অধিকার বিস্তার করিলেন, তাহাতে কোন মঙ্গলই সাধিত হইল না, এ কথা বলা কোন প্রকারেই যুক্তিসঙ্গত নহে, সুবুদ্ধির কাজও নহে। ইহাতে লােকে ইংরাজদিগকে স্বার্থপর ও পরশ্রীকাতর বলিয়া মনে করিতে পারে। ইংরাজ চিরকালই বলিতেছেন, রুষ মধ্য-এশিয়ার স্বাধীনতা হরণ করিয়া পৃথিবীর অমঙ্গল সাধন করিতেছেন। ইহাতে কি রুষ বিরক্ত হইতে পারেন ? সকল ইংরাজ এরূপ পরশ্রীকাতরতা প্রকাশ করেন না সত্য, কিন্তু এরূপ পরশ্রীকাতর ইংরাজের সংখ্যা যে অধিক, সে বিষয়ে ত আর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই ? রুষকে দোষ দেন না এমন ইংরাজ আমরা অল্পই দেখিতে পাই। রুষকে যাঁহারা দোষ দিয়া থাকেন, তাহাদেরই সংখ্যা অধিক। অধিকাংশ ইংরাজ-লেখকের এই ধূয়া। মার্ভিণ ও ম্যালিসন প্রভৃতি সাহেবের এই সুরেই গান ধরিয়া আসিতেছেন। অধিকাংশ ইংরাজ রাজনীতিকেরই এই নীতি। পামারষ্টোন হইতে বীকন্সফীল্ড পর্যন্ত সকলেই এই রুষবিদ্বেষিণী নীতি অবলম্বন করিয়া জীবন কাটাইয়া গিয়াছেন, এখনও চর্চিল প্রভৃতি টোরিগণ এই নীতি প্রচার করিতেছেন। বাস্তবিক এশিয়ায় অধিকার বিস্তার করিয়া ইংরাজ যাহা না করিয়াছেন, রুষ তাহা করিয়াছেন। মধ্য-এশিয়ায় কোন কালে যে সুখ-শান্তি ছিল না, রুষ তাহা প্ৰদান করিয়াছেন। ইংরাজের যদি ভারত জন্য রুষ-ভীতি না থাকিত, তাহা হইলে মুক্তকণ্ঠে এ কথা স্বীকার করিতেন। স্বার্থহানির ভয়ই ইংরাজকে অপ্রকৃতবাদে প্রবৃত্ত করিয়াছে। ইংরাজ-লেখকদিগের স্বার্থ- প্রণােদিত অন্যায়বাদ দেখিয়া আমরা বাস্তবিকই বড় ব্যথিত হইয়া থাকি। ম্যালিসন হউন, মার্ভি হউন, আর ম্যাকগ্রেগর হউন, সকলেরই এক ধূয়া। সকলেই রুষকে গালি দিয়া আসিতেছে। কিন্তু মনের ভাব গােপন করা সহজ নহে। আমরা অদ্য অন্য লেখকের কথা ছাড়িয়া দিয়া কর্ণেল ম্যালি সনকে লইয়াই পড়িলাম। এই মহাপুরুষ সম্প্রতি এই হুজুক পাইয়া এক- খানি ১৯১ পৃষ্ঠা পরিমিত ক্ষুদ্র পুস্তক প্রকাশ করিয়াছেন। মহাপ্রভু রুষ- আফগান প্রশ্নের মীমাংসা কৰ্বিতে প্রবৃত্ত হইয়া লেখনী ধারণ করিয়াছেন। মীমাংসার সঙ্গে খোজ খবর নাই, কেবল রুষকে আগাগােড়া দোষ দিয়া- ছেন, আর প্রকৃত উদারনীতিক ইংরাজদিগকে গালি দিয়াছেন। ম্যালিসন রুসিয়ার ইতিহাস। নূতন কথা একটাও বলিতে পারেন নাই। তঁাহার ক্ষুদ্র গ্রন্থে, প্রায় ৫০০০ ০০টা পংক্তি আছে। এই পঞ্চ সহস্র পংক্তির ভিতর এমন একটা কথাও নাই, বাহা শত বার কথিত হয় নাই । এমন একটাও যুক্তি নাই, মাহা টোরি-সম্প্র- দায় সহস্র বার প্রয়ােগ করেন নাই। সবই সেই পুরাতন বস্তাপচা পূতিগন্ধময় গোঁড়া টোরিদিগের চিরন্তন কথা, “রুষ দনু, দভাবে আস্তে আস্তে মধ্য- এশিয়ায় প্রবেশ করিয়া লােকের স্বাধীনতা হরণ করিতেছে, খিবা, বােখারা, মাৰ্ব্ব সকল স্থলেই রুষ শঠতার জোরে অধিকার বিস্তার করিয়াছে। যাহা অন্য স্থানে করিয়াছে, আফগানস্থানেও তাহাই করিবে। রুষের একই লক্ষ্য, ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়াই দুষ্ট পাপাত্মা রুষের শেষ উদ্দেশ্য।” এই পুরাতন কাহিনী সকল ইংরাজ-লেখকেরই সম্বল। কর্ণেল ম্যালিসনও এই সম্বল লইয়া আসরে অবতীর্ণ হইয়াছেন। জানি না, তাঁহার মুখে এই পুরাতন কাহিনী শুনিয়া ইংরাজ জাতির মনে কিরূপ ভাবের উদয় হইবে, আমাদের কিন্তু ঘৃণা ধরিয়াছে। ম্যালিসনের গ্রন্থখানি পাঠ করিয়া আমাদের ধারণ। হইয়াছে, এংলাে-ইণ্ডিয়ান লেখকদিগের লেখনী কখনই নিরপেক্ষ ভাবে পরিচালিত হইতে পারে না। আরও ধারণা হইয়াছে, এংলাে-ইণ্ডিয়ানদিগের হৃদয়ে রুষের প্রতি যেন একটা চিরন্তন বিদ্বেষ জন্মিয়া গিয়াছে। এংলাে- ইণ্ডিয়ান সম্পাদকদিগের এরূপ একটানা লেখা আমরা ক্ষমা করিতে পারি । লােককে হুজুকে মাতানই ইহাদিগের কাজ। কিন্তু যিনি ঐতিহাসিকের আসনে বসিয়া এরূপ একটানা ধরণে লৈখনী চালনা করিয়া থাকেন, তাহাকে আমরা কোন মতেই ক্ষমা করিতে পারি না। অারও বলি, যেখানে হৃদয়ে স্বার্থপরতা উথলিয়া উঠিতেছে, সেখানে লেখকের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধাই বা হইবে কিরূপে? ম্যালিসন, মার্ভিণ, ম্যাক্- গ্রেগর, হ্যালি প্রভৃতি যে যে ইংরাজ রুষ-কথা লিখিয়াছেন বা বলিয়াছেন, তাহাদেরই হৃদয় প্রকাশিত হইয়া পড়িয়াছে। ভাষা ভিন্ন হইলেও সুর সকলেরই এক। “কুষ এশিয়ার যে সকল স্থানে অধিকার বিস্তার করিতেছে, তাহার সামরিক ও বাণিজ্যিক গৌরব বড় অধিক, পরিণামে এই সকল প্রদেশ কুষের আর্থিক ও রাজনীতিক শক্তি যে কত বাড়াইয়া দিবে, তাহার ঠিকানা নাই।” এই সুর ধরিয়া সকলেই আপনাদের হৃদয়ের পরিচয় দিয়া- -- পরিশিষ্ট। ৯৭ ছেন। পাঠক ইহার অর্থ কি তাহা বােধ হয়, অনায়াসেই বুঝিতে পারিয়া- ছেন। ইহার অর্থ, “রুষের ক্রমশঃই সমৃদ্ধি বৃদ্ধি হইতেছে, যাহা ইংরাজের পাওয়া উচিত ছিল, রুষ তাহা পাইতেছে, এটা ইংরাজের স্বার্থের অনুমােদিত নহে। ইংরাজ-রাজনীতিকেরা ইহা বুঝিয়াও তাহার প্রতিকার করেন নাই। তাহাদের সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইবে না। রুষকে অগ্রসর হইতে দিয়া ইংরাজ-রাজনীতিকেরা মহাভ্রমে পতিত হইয়াছেন, স্বদেশের স্বার্থে আঘাত করিয়াছেন। কেন বাপু, ইহাতে স্বদেশের স্বার্থহানি হইয়াছে ? কেন বল দেখি, তুমি রুষকে অগ্রসর হইতে দিবে না? বিধাতা কিছু আর সমস্ত ধয়াখানা ইংরাজের জন্য সৃষ্টি করেন নাই। এতটা স্বার্থপরতা দেখিলে কি পৃথিবী শুদ্ধ লােকে উপহাস করিবে না ? এইরূপ সর্বগ্রাসিনী স্বার্থপরতার জন্যই ত ইংরাজ সমস্ত ইউরােপের সহানুভূতি ও সম্মান হারাইয়া এখন সকলের বিদ্বেষ-পাত্র হইয়া পড়িয়াছেন। নিজের বলাবল বুঝিয়া কথা বলা উচিত। কথার দোষেই সমস্ত নষ্ট হইয়া থাকে। রুষবিদ্বেষী, স্বার্থমত্ত, মুখদৃপ্ত, কথা- সৰ্বস্ব অনুদারনীতিক ইংরাজদিগের দোষে ইংল্যাণ্ডের যে কখন কি সৰ্ব্ব- নাশ হইবে,তাহা ভাবিয়া আমরা বাস্তবিকই আকুল হইয়াছি। বৃটিশ গভমেন্ট যত দিন না এই সকল গৃহ-শত্রুকে শাসন করিতে পারিবেন, তত দিন বৃটিশ সাম্রাজ্য নিরাপদ হইবে না।-নববিকর, ২৭এ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯২ অপরাধ ইংরাজেরই অধিক। অপরাধ রুষের নহে। ইংরাজ কলুষিত নেত্রে এবং কলুষিত হৃদয়ে দেখেন বলিয়াই রুষকে দোষ দিয়া থাকেন। বাস্তবিক নিরপেক্ষ ব্যক্তি মাত্রেই রুষের এশায়িক নীতির প্রশংসা করিয়া থাকেন। পূর্বে যেখানে অরাজকতা ছিল, রুষশাসনে এখন সেখানে সুখ শান্তি হইয়াছে। পূর্বে যেখানে দ-ভয়ে লােকে শশব্যস্ত ছিল, এখন সে স্থান নিরাপদ হইয়াছে। ইংরাজের ভারত অধিকারে পৃথিবীর যে উপকার হইয়াছে, রুষের তুর্কস্থান ও ককাশস আঁধি- কারেও সেই উপকার হইয়াছে। তথাপি কতকগুলি লোকের প্রকৃতি কেমন ৯৮ রুসিয়ার ইতিহাস। জুষিত, তাঁহারা রুষের অহরহ নিন্দা করিয়া তাহাদিগকে উত্তেজিত ও বিরক্ত করিতেছেন। রুষকে ভাল বলিতে হয়, তাহারা কখনই ভদ্রতার সীমা অতি- ক্রম করেন নাই। রুষ বরাবরই ভদ্র-বাক্যে ইংরাজকে ঠাণ্ডা করিবার চেষ্টা করিতেছেন; বরাবরই বলিয়া আসিতেছেন, “আমরা মধ্য-এশিয়ার অরাজক দেশগুলি অধিকার করিয়া সমাজের মঙ্গলসাধন করিব। আফগানস্থানের উপর আমাদের দৃষ্টি নাই, লোভ নাই। ভারতের চিন্তা আমাদের স্বপ্নেও হয় না।” রুষ-ভীত ইংরাজ কি এ কথায় বিশ্বাস করিতে পারেন ? ইংরাজ ক্রমাগত পীড়াপীড়ি করিতেছেন, ক্রমাগত রুষকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিবার জন্য চেষ্টা করিতেছেন। ১৮৬৪ অব্দে ইংরাজ চরম সীমায় উঠিলেন, রুষকে প্রত- জ্ঞাবদ্ধ করিবার জন্য মহাহুলস্থুল লাগাইয়া দিলেন। রুষসচিব প্রিন্স, গর্চা- কফ, মনে মনে হাসিলেন, ইংরাজের অকারণ অতিভীতি এবং স্বার্থপরতা দেখিয়া একটু বিরক্ত হইলেন। তবুও অধীরতা প্রকাশ করিলেন না, বলিলেন । “Russia is now in the presence of a more solid and compact, less unsettled and better organized social state, fixing for us with geographical precision the limit up to which we must ad. vance and at which we must hait." “আমরা এখন একটা অপেক্ষাকৃত শাসিত প্রদেশের নিকটে উপস্থিত হই- আছি। সেই পৰ্য্যন্ত গিয়াই আমরা থামিব, সেইখানেই আমাদের ভৌগাে- লিক সীমা নির্দিষ্ট হইবে।” গর্জাকফের এ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হয় নাই। ১৮৬৪ অব্দের পর কষ সারা- খিবা, মার্ভ অধিকার করিয়াছিলেন। কিন্তু এগুলি রুষের প্রতিজ্ঞাত অগন্তব্য প্রদেশের অন্তৰ্ভত নহে। এ সকল প্রদেশেই অরাজকতা এবং অত্যাচার বিরাজ করিতেছিল, অধিবাসীদিগের মধ্যে অধিকাংশই রুষকে সাদরে গ্রহণ করিয়াছিল, আর গর্চাকফ ত স্পষ্টই বলিয়াছিলেন ; “Russia is now in the presence of a more solid and compact c. state.” এই রূপ প্রদেশের “নিকট” রুষ উপস্থিত হইয়াছেন, এরূপ প্রদেশের “ভিত্তয় উপস্থিত হইয়াছেন, এ কথা ত গর্চাকফ বলেন নাই। বাস্তবি খস পরিশিষ্ট। গর্চাকফ যাহা বলিয়াছিলেন, তাহা অণফগানস্থানকে লক্ষ্য করিয়া। আফগান স্থান লইয়াই ইংরাজের ভয়। সেই ভয় নিবৃত্তির জন্যই গচ্চাকফকে প্রতিজ্ঞা করিতে হইয়াছিল, সরাস, মার্ভ ও খিবার সহিত ইংরাজের কোন কাল কোন সম্বন্ধ নাই। সে দিকে রুষের গমনে ইংরাজের বাধা দিবারও কোন । অধিকার নাই। গর্ফাকফের প্রতিজ্ঞার পর রুষ যদি কাগারিয়ার দিকে যাই- তেন, তাহা হইলে কি ইংরাজের কোন কথা বলিবার অধিকার থাকিত ? ভদ্রলােকে গর্ফাকফের প্রতিজ্ঞার ইহা ভিন্ন অন্যরূপেৰ্থ কখনই করিবেন । ডিউক অব আর্গাইল, সকল বিষয়ে গ্লাডষ্টোনের নীতির পক্ষপাতী নহেন, তিনিও বৃদ্ধ বয়সে কতকটা প্রেষ্টীজভক্ত এবং যুদ্ধের পক্ষপাতী হইয়া পড়িয়া- ছেন। কিন্তু আগাইলও স্বীকার করিয়াছেন, গর্দাকফ ১৮৬৪ অব্দে কে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, তাহা ভঙ্গ হয় নাই। সে দিন সীমান্ত-বিষয় লইয়া পালেমেন্টে যখন মহান্দোলন হইয়াছিল, তখন আর্গাইল স্পষ্টাক্ষরে বলিয়া- ছিলেন ; “The Russian advances are all in complete accordance with the policy of Prince Gortchakoff s circular of 1864, which insisted on the inevitability in the interest of order, of Russia absorbing the semicivilized Central Asian States." “সুশাসনের খাতিরে রুষ মধ্য-এশিয়ার অর্ধসভ্য প্রদেশগুলি যে অধি কার করিবেন, তাহা বিধির নির্বন্ধ। গর্চাকফ ১৮৬৪ অকে যে ঘােষণা করি- য়াছিলেন, রুষ তাহার তিলমাত্ৰও অন্যথা করেন নাই।” আৰ্গাইলের এ কথার-উপর যাহারা কথা কহিবেন, তঁাহারা নিতান্তই দৃপ্ত এবং ধৃষ্ট। টোরি লর্ড সলবেরি না কি রুষের উপর শঠতা ও বিশ্বাসঘাত কতার আরােপ করিয়াছিলেন, সেই জন্যই আগাইলকে ন্যায়ের খাতিরে, ভদ্র তার খাতিরে রুষের পক্ষ সমর্থন করিতে হইয়াছিল। আৰ্গাইলের মুখে প্রকৃত রহস্য অবগত হইয়া সমগ্র লর্ড হাউস যখন ছি ছি করিতে লাগিলেন, তখন সলস্বৈরিকে অগত্যা বলিতে হইয়াছিল, “আমি রুষের প্রতি শঠতার আরােপ করি নাই।* "I impute no intentional deception to the Russian Government, but in view of the lessons of history it wonld be unwise to rest the defence of India on Russian guarantees." “রুষ ইচ্ছাপূৰ্ব্বক ঠকাইতেছেন, এ কথা আমি বলি নাই, তবে রুষের প্রতিজ্ঞার উপর নির্ভর করিয়া ভারতের সীমারক্ষণে উদাসীন থাকা উচিত নহে ইহাই আমার কথার উদ্দেশ্য।” অগাইলের চাপাচাপিতে প্রধানতম টোরিকে যাহা স্বীকার করিতে হই- *, রুসিয়ার ইতিহাস। য়াছে, ম্যালিসন, ম্যাকগ্রেগর প্রভৃতি টোরি দুর্নীতিকেরা তাহা স্বীকার করিতে সম্মত নহেন। ইহারা রুষকে গালি দিবার জন্য অভিধান নিঃশেষিত করিয়া ফেলিয়াছেন। কিন্তু ইহাতেও আমরা বিস্মিত হই নাই। সিংহ ব্যাঘ্রের গর্জন শীঘ্ৰ থামিয়া যায়, গােমায়ুরব সারা রাত্রি শুনিতে পাওয়া যায়। এশিয়ায় রুষের পুরাতন অধিকার। রুষ সেই অধিকার-সংলগ্ন অরাজক প্রদেশগুলি অধিকার করিতেছেন, ইহাতে যদি রুষের পাপ হইয়া থাকে, তবে ত ইংরাজের মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত নাই। ইংরাজ যেখানে অধিকার বিস্তার করিয়াছেন, তাহার শত শত যােজন দূরেও তাহার অতি অতি তস্যাতি বৃদ্ধ পিতামহ বা মাতামহদিগের কোন কালে পদার্পণ হয় নাই। পরদেশাধিকারে ইংরাজকে ত পৃথিবীর কোন জাতিই পরাজিত করিতে পারেন নাই। ডিউক অব, আগাইল ত স্পষ্টই বলিয়াছেন; "The Russian annexations are insignificant as compared with those of Great Britain of the same period." “ইংরাজ যে সময়ের মধ্যে যত পরদেশ অধিকার করিয়াছেন, তাহার সহিত তুলনায় রুষের সেই সময়ের অধিকার অতি সামান্য।” তবুও এত রাগ! ম্যালিসনী-দলের স্বদেশানুরাগের খুরে নমস্কার। ইহা- দের যে কত দিনে চৈতন্য হইবে, তাহা আমরা তাবিয়া স্থির করিতে পারি নাই।-নাবিভাকর, ২৭ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯২ রুষ-সমরে বিষম সঙ্কট। এবার রুষ সমরে প্রবৃত্ত হইলে ইংরাজকে বিষম সঙ্কটে পড়িতে হইবে। ক্রিমীয় সমরে ইংরাজ যাহাদের সাহায্য পাইয়াছিলেন, এ বার তাহাদের সাহায্য পাইবেন না। জৰ্ম্মণী ও অষ্টিয়া তুরস্ককে ইংরাজের সহিত মিশিতে, দিবেন না। এ বার এশিয়ার রাজ্য লইয়া বিবাদ, ইউরােপে যাহাতে না শশাণিতপাত হয়, জৰ্ম্মণী তাহা করিবেন। জৰ্ম্মণী যাহা করিবেন, অন্যে তাহাতে বাধা দিবেন না বরং সহায়তাই করিবেন। ইংল্যাণ্ড ইতালীর আশা পরিত্যাগ করুন। ইতালী ইংল্যাণ্ডের সহিত যােগ দিলে, ফ্রান্সও রুষের দিকে ঢলিবেন। এ বার বড়ই অসুবিধা। ইংরাজ কৃষ্ণসাগরে প্রবেশ করিতে পাইবেন না। তুরস্ক বসফোরসের পথ ইংরাজকে ছাড়িয়া দিয়া কখনই জম্মু- নীর বিষ-নয়নে পড়িবেন না। ইংল্যাণ্ডকে অবমানিত করিবার মতলবেই বিষমার্ক বটিকা চালন করিতেছেন। অষ্টিয়া, রুষিয়া ও জৰ্ম্মণী তিন জনের ভিতর ভিতর এক অভিসন্ধি আছে। ইংল্যাণ্ডের সাবধান হইয়া চলা উচিত। কৃষ্ণ সাগরে প্রবেশ করিতে পাইলেও এবার ইংরাজ সহজে রুষের কিছু পরিশিষ্ট। ১১. করিতে পারিবেন না। কৃষ্ণসাগরে রুষ পুৰ্ব্বাপেক্ষা রণতরীর সংখ্যা অনেক বাড়াইয়াছেন। এখন সেখানে রুষের ১০০ খানা রণতরী আছে। কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী দুর্গগুলিরও শক্তি অনেক বাড়ান হইয়াছে। ওডেসা এবং খর্সন দুর্গে কামানের সংখ্যা অনেক বাড়ান হইয়াছে। ক্রিমীয়াতেও শিবাষ্ট- পলের দুর্গ আবার দৃঢ়তর করা হইয়াছে। ক্রিমীয়া ও রুভূমির মধ্যস্থ পেরিকোপ যােজটীর ধারে নৃতন দুর্গশ্রেণী বিরাজ করিতেছে, কৰ্চ্চ, যেনি- কেল, কাফা, আজভ এবং তাগারগ দুর্গে দুর্গম হইয়াছে। একেই ত ইংরাজ কৃষ্ণ সাগরে প্রবেশ-লাভ করিতে পাইবেন না, পাইলেও রুষ-রণতরীর সংখ্যা- ধিক্য জন্য বাধা পাইতে হইবে। সে বাধা অতিক্রম করিলেও ইংরাজকে চারি দিকে দুর্গ ও কামান-রাজির জন্য বড়ই বিড়ম্বনা ভােগ করিতে হইবে। তাই বলিতেছি, কৃষ্ণ সাগরের দিকে ইংরাজের রুষ-পথ বন্ধ। আবার উত্তর-পশ্চিমে বলটিক সাগরের দিকেও সেই দশা। এবার ইংরাজ বটিক সাগরেও রণতরীর ক্রীড়া করিতে পাইবেন না। জৰ্ম্মণী সে দিকেও বাধা দিবেন। সুইডেন, দেন্মার্ক ও জৰ্ম্মণী অনুমতি না দিলে বলটিক সাগরে গিয়া রণতরীর ক্রীড়া করেন এমন সাধ্য ইংরাজের নাই। কিন্তু জৰ্ম্মণী ইহার মধ্যেই ভিতর ভিতর সুইডেনকে নাচাইয়া রাখিয়াছেন। দেন্মার্কও জৰ্ম্মণীর মন্ত্র ছাড়া চলিতে পারিবেন না। বলটিক সাগলেও সুতরাং ইংরাজের পথ বন্ধ । আর পথ পাইলেও এ বার সে দিকে রুষকে আঘাত করা ইংরাজের পক্ষে বড়ই কঠিন। এবার ভুনামণ্ডী, রেভেল, নার্ভা, ষ্ট্যান্ড, ভাইবর্গ, ফেড়িকশাম, রচেনৃশাম দ্বীপ, স্বীবর্ণ দ্বীপপুঞ্জ, হাঙ্গিয়ুদ, আবাে এবং আলাণ্ড দ্বীপপুঞ্জে রুষ দুর্গাদি পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিকতর দুর্ভেদ্য করিয়া রাখিয়াছেন। উপকূল প্রদেশ চারি দিকেই দৃঢ়তর করা হইয়াছে। সেণ্ট পীটর্সবর্গের কাছে ত ইংরাজের ঘেসিবারই যাে নাই। সেন্ট পীটর্স- বর্গ একেবারে শতরীর অস্পৃশ্য। সেন্ট পীটর্সবর্গের নিকটেই ষ্ট্যাড দ্বীপ। এই দ্বীপের দুর্গরহ্মার্থ ১৮ মাইল পথে কামান সাজান আছে। দ্বীপের উত্তর ও দক্ষিণ দুই দিক দিয়া দুইটী সাগরশাখা আছে। দুইটাই শত্রুর অষ্য। দুইটাই দুর্গমরূপে রক্ষিত। দক্ষিণ সাগর-পথের ধারে ক্রমাগত দুর্গ প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রথম দুর্গে ৮৮টী বড় বড় কামান সাজান আছে। আবার নিকটবর্তী কটলাইন দ্বীপ হইতে মুহূর্ত মধ্যে ১০০টী প্রকাণ্ড কামান আনা যাইতে পারে। উত্তর দিকের সাগর-পথটী ২০০ঢ়ী কামান দ্বারা রক্ষিত হইতেছে। নিজ কটলাইন দ্বীপটীও দুর্গশ্রেণী দ্বারা পরিক্ষিত। ইহা ছাড়া সাগর-গর্ভে কত টর্পেডো আছে, তাহার ঠিকানা নাই। এখানে রুষ-রণতরীরও সংখ্যা কম নহে। ষ্ট্যাড এরূপে রক্ষিত থাকিতে কাহার সাধ্য সেণ্ট পীটর্সবর্গে প্রবেশ করে ?
১০২ রুসিয়ার ইতিহাস। * আবার সেন্ট পীটর্সবর্গের উত্তর দক্ষিণ দুই দিকই বহু দূর ধরিয়া দুর্গদ্বারা সম্পূর্ণরূপে দুর্ভেদ্য। উত্তরে সেন্ট পীটবর্গ নগরীতে এবং নীভা নদীর উত্তর কূলে দুর্গরাজি বিরাজ করিতেছে, দক্ষিণেও নীভা নদীর দক্ষিণ কূলে দুর্গরাজি বিরাজমান আছে। ইহা ছাড়া ইস্থানিয়ার উপকূলে দুর্গশ্রেণী সজ্জিত আছে। চারি দিকের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলিই দুর্জয় সৈনিক এবং দুর্দান্ত কামান দ্বারা রক্ষিত হইতেছে। পৃথিবীর আর কোন রাজ্যের কোন নগরই সেন্ট পীটবর্গের ন্যায় দুর্গম এবং দুর্ভেদ্য নহে। ইহার উপর আবার বল- টি সাগবে ১৮৫৪ অকের অপেক্ষা এখন রুষের রণতরী অনেক বাড়িয়াছে। বটিক সাগরে এখন রুষের ২১৬ খানা রণতরী আছে। ১৮৫৪ অব্দের সমরে ইংরাজ-পােত-সেনাপতি সার চালস্ নেপীয়র বটিক সাগরে যেরূপ মহাগর্বে পােতক্রীড়া করিয়া রুষকে ভীত করিয়াছিলেন, এবার কোন পােতসেনাপতিই সেরূপ করিতে পারিবেন না। ইংরাজ কৃষ্ণ সাগরে গিয়া কিছু করিতে পারিবেন না, বটিক সাগরেও কিছু করিতে পাইবেন না। রুষ রাজ্যের উপর এ বার ইংরাজ কোন দিকেই আক্রমণ করিতে পারিবেন না। এ বার যুদ্ধ হইলে ইংরাজকেই রুষের আক্র- মণ হইতে আত্মরক্ষা করিতে হইবে। এ বার কেবল মধ্য-এশিয়ার আফগান সীমায় ইংরাজ রুষের সহিত বল পরীক্ষা করিতে পাইবেন। সেখানে সৈন্য সমবেত করা কিরূপ দুঃসাধ্য, সে দিকের পথ ঘাট কিরূপ দুর্গম, তাহা আমরা অনেক বার পাঠকদিগকে দেখাইয়া দিয়াছি। ইংরাজ যদি চারি দিক না ভাবিয়া চিস্তিয়া-যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন, তবে বড়ই বিষম সংকটে পড়িবেন। ক্ৰিমীয়া- সময়ে যে সকল সুবিধা ছিল, এ বার তাহা নাই। ফান্স, তুরস্ক এবং সার্দিনী- য়ার সাহায্য নাই ; কৃষ্ণ সাগর ও বলটিক সাগরের পথ খােলা নাই; রুষের দুর্গাদির অবস্থা সেবাকার মত অরক্ষিত নাই। এ বার বড়ই বিষম সমস্যা। সে বার তত সুবিধা থাকিতেও ইংরাজকে যে ক্লেশ পাইতে হইয়াছিল, তাহা মনে হইলে এখনও শরীর কঁপিয়া উঠে। এ বার সে সকল সুবিধা নাই, বরং অসুবিধা অনেক বাড়িয়াছে। এ বার যুদ্ধ হইলে যে কি সর্বনাশ হইবে, তাহা ভাবিলে একেবারে জ্ঞানশূন্য হইতে হয়। এবার যুদ্ধ বাধিলে ভারতের অর্থ- শােণিত লইয়াই ইংরাজুকে কুরুক্ষেত্র শেষ করিতে হইবে। সে সৰ্ব্বগ্রাসী মহাসমরে ভারতের সর্বস্ব বলি দিতে হইবে। তাই বলিতেছি, এ বার বড়ই বিষম সংকট। এ সংকটে যদি ইংরাজ সাধ করিয়া পতিত হন, তবে জানিব, নিতান্তই বিধি আমাদের প্রতি বাম হইয়াছেন।-নববিভাকর, ২রা আষাঢ়, সম্পূর্ণ ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.