Bally Sadharan Granthagar
Kuntalin Puraskar
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কুন্তলীন পুরস্কার
১৩০৬ সন ।
*
.,
...::.
এইচ বস্তু, পারফিউমার
৬২ নং বৌবাজার ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
কুন্তলীন প্রেসে মুদ্রিত।
:
প্রকাশকের নিবেদন।
বিগত বংসরের কুন্তলীন পুরস্কারের জন্য,
রচনার মধ্য হইতে যে কয়েকখানি পুরস্কারে উপযুক্ত
হইয়াছে তাহা প্রকাশিত হইল। পুরস্কৃত রচনার মধ্যে
প্রথম আটটী পুরস্কার তৃতপূ৭ টি বিউন ও বর্তমান
প্রভাত সম্পাদক সুবিখ্যাত লেখক ‘স ক্ত বাবু, নগেন্দ্র
নাথ গুপ্ত মহাশুর অন্ন গ্রহ করিয়া নির্বাচন করিয়া
দিয়াছেন। জন্য তাহার নিকট কৃতজ্ঞ আছি।
আমাদের গ্রাহক ও অ2}াইকা মাহাদের অনুগ্রহে
আমরা বংসর বংসর এই প্রকার পুরস্কার দ্বারা সাহিত্য
চস্টায় লেখক লেখিকাদিগকে কিঞ্চিং পরিমাণে উৎসাহিত
করিতেছি এবং পুরস্কৃত গল্প গুলি পুস্তকাকারে প্রকাশিত
করিয়া ভদ্রসাধারণকে উপহার দিতে সমর্থ হইতেছি,
তাহাদের নিকট আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
করিতেছি। আমাদের প্রস্তুত কুন্তলীন দেলখাে ।
ইত্যাদির ক্রেতা মাত্রেই নে এই সনুষ্ঠানের সাহায্যকারী
তাহাতে সন্দেহ নাই।
বর্তমান বৎসরের কুন্তলীন পুরস্কারের নিয়মাবলী
পুস্তকের শেষভাগে প্রকাশিত হইয়াছে।
কুন্তলীন আফিস
৪ঠা শ্রাবণ, ১৩০৭।
নিবেদক
শ্রী এইচ বস্তু।
ceeeeeeeeeeee
সূচী
বিষয়
পৃষ্ঠা
অদ্ভুত-হত্যা
অদল বদল
অবগুণ্ঠিতা
দুর্ভাগা
রঙ্গিয়া
৩৯
১৬
শােভা
গহনার বাক্স
৬২
৭১
রেলে চুরি
আমার কাহিনী
৭৯
প্রতিশােধ
০ ০ ০
৯৮
বিমাতা
সরােজিনী
১০৮
বুদ্ধিমান রাজার স্বর্গযাত্রা
১২০
প্রথম পুরস্কার্ক, অদ্ভুত-হত্যা। ( ১ ) কৃত্রিম-মুদ্রা প্রস্তুত করিবার অপরাধে অভিযুক্ত কোন ব্যক্তির সম্বন্ধে বিশেষ অনুসন্ধানের নিমিত্ত আমাকে ময়মনসিংহ অঞ্চলে যাইতে হইয়াছিল। প্রায় সপ্তাহ কাল তথায় থাকিয়া সে মােকদ্দমার যথাসম্ভব প্রমাণাদি সংগ্রহ করিয়া গােয়ালন্দ-ট্রেণে রাত্রে কলিকাতা প্রত্যাবর্তন করি। পরদিন প্রাতঃকালে কাগজ পত্র গুছাইয়া রিপােটাদি লিখিয়া নিজের কোন প্রয়ােজন বশতঃ জনৈক বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে যাইর উদ্যোগ করিতেছি এমন সময়ে এক জন কনেষ্টবল যথারীতি লম্বা সেলাম ঠুকিয়া, একখানা সরকারী চিঠি আমার হস্তে প্রদান করিল। চিঠির উপরে লাল কালিতে বড় বড় ইংরেজী অক্ষরে লিখিত “অতি দরকারী”—এ দুটী কথা সৰ্ব্ব-প্রথমে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। কনেষ্টবলকে বিশ্রাম ঘর দেখাইয়া দিয়া, ত্রস্ত হস্তে চিঠি খুস্ক্রিয়া পত্র পড়িতে লাগিলাম । পত্রে প্রধান কর্মচারী সাহা, লিখিয়া পাঠাইয়াছেন, তাহার সার মৰ্ম্ম এই “আজ চারি দিবস গত হইল, মির্জাপুর ঈটের একটী ছাত্রাবাসে মহেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একটী ছাত্র অতি আশ্চৰ্য্যরূপে হত হইয়াছে। পুলিশ যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়া? এ পর্যন্ত খুনের কিনারা করিতে পারে নাই। তুমি মুহূৰ্ত্তমাত্ৰ গৌণ না করিয়া উক্ত হত্যা ব্যাপারের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইবে। মুচিপাড়া থানার পুলিশ কর্মচারী হত্যা ব্যাপারের প্রথম অনুসন্ধান করিয়াছে।” পত্রখানি পাঠ করিয়া আমার বন্ধুদর্শনবাসনা পলকে বিলুপ্ত কুন্তলীন পুরস্কার। হইল। সেই কৃত্রিম মুদার জটিল মােক দমার গুরু ভার হইতে মুক্ত হইতে না হইতে আবার এক হত্যা কাণ্ডের গুরুতর ভার মস্তকে বহন করিতে হইবে ভাবিয়া মন অবসন্ন হইয়া পড়িল। কিন্তু উদ্ধতন কস্মচারীর আদেশ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আমাকে প্রতিপালন করিতে হইবে, সুতরাং আর ইতস্তত না করিয়া কনেষ্টবলকে বিদায় দিয়া গাড়ােয়ানকে গড়া প্রস্তুত করিতে আদেশ করিলাম এবং কিঞ্চিৎ জলনােগান্তে অবিলম্বে মুচিপাড়া থানার উপস্থিত হইলাম। সেখানকার ভারপ্রাপ্ত কৰ্মচারীকে বড় সাহেবের লিখিত পত্রের মর্ম জ্ঞাত করাইলে তিনি আমাকে উক্ত হত। বাপরের প্রধান অনুসন্ধানকারী ক স্মচারীর সহিত সাক্ষাৎ করার দিলেন। অনুসন্ধানকারী কয়চারীর নাম সুশীল বাবু ; সুশীল বাবু আমার পৃর্প পরিচিত। ইনি আমাকে হত্যা সম্বন্ধে নিজ তদন্তে সহদর তথ্য সংগ্রহ করিতে পারিয়াছিলেন, তাই। একে একে সন্তুষ্টির সহিত সনস্ত বন করিলেন। হত্যাসংক্রান্ত অমূল বিবরণ শুনিয়া আমি বুঝিতে পারলাম, এ ব্যাপারের কিনারা করা বড় সহজসাধ্য নহে। পুলিশ নুসন্ধানে এ সম্বন্ধে যতদূর জানা গি”েছ, তাহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে প্রকট হইল --- “মহেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ী বিক্রমপুর অঞ্চলের বন্ধুয়ােগিনী গ্রালে । ইহার পিতার নাম হরপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়। মহেশ কলিকাতা সিটি কলেজের দ্বিতীয় বাসক শ্রেণীতে অধ্যয়ন করিতেন। মির্জাপুরের এক ষ্টুডেন্ট মেসে ইহার বাসা ছিল। ৬ শ্ৰীশ্রীদুর্গা পূণার বন্ধে সেই মেসের অধিকাংশ ছাত্ৰই বাড়ী চলিয়া গিয়াছিল, কেবল তিন জন বি, এ, পরীক্ষার্থীর সহিত মহেশচন্দ্র বন্ধের সময় ও সেই মেসেই ছিলেন। মেসের দালানটি দ্বিতল ; উপরে চারিটী ঘর, নীচে দুটিী । মেসে অধিক ছাত্র না থাকায়, পড়া শুনার সুবিধার নিমিত্ত চারিটী ঘরে চারি জন ছাত্র শুইবার বন্দোবস্ত করিয়া লইয়াছিলেন। নীচের একটী ঘরে রান্না; এবং অপরটীতে খাওয়া-দাওয়ার কার্য সম্পন্ন হইত। মেসে এক্ষণে একটী মাত্র ব্রাহ্মণ দ্বারাই সৰ্ব্ব কাৰ্য্য চালিত হয়। ব্রাহ্মণটী রাত্রে মেসে থাকে না। ২৬শে আশ্বিন রাত্রিতে, মহেশচন্দ্রকে অন্যান্য অদ্ভুত-হত্যা। রাত্রির ন্যায় সকলে সুস্থ শরীরে আপন ঘরে পড়িতে দেখিয়াছেন। পর দিবস প্রত্যুষে অতুল বাবু নামে-ঐ-মেসেরই অন্যতম ছাত্র যখন মহেশচন্দ্রের ঘরের মধ্য দিয়া নিম্নতলে যাইতেছিলেন, তখন তাহাকে ছিন্ন-কণ্ঠ, রক্তাক্ত কলেবর দেখিতে পাইয়া উচ্চ চীংকারে সকলকে সেখানে এক এ করেন। পরে, তথায় উপস্থিত সকলের পরামর্শ মত অগৌণে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ অনুসন্ধান করিয়া সে ঘরে একখানা রক্ত-রঞ্জিত বড় কাটারী ও একপাটি নাগরা জুতা প্রাপ্ত হইয়াছেন। এ গুলি ইতিপূৰ্ব্বে মেসের কে কখন দেখে নাই। হত্যাকারীর এ পর্যন্ত কোন সন্ধান পাওয়া যায় নাই। আশ্চর্যের বিষয়, হত্যাঙ্গারে একটা সামান্য জিনিস কিম্বা একটা কপর্দক ও স্থানান্তর হয় নাই। মহেশের ঢাবি তাহার পকেটে পাওয়া গিয়াছে ; উক্ত ঢাবি দ্বারা পুলিশ মহেশের পোর্টমেন্ট ও হাত বা খুলিয়া টাকা পয়সা মহেশের লিখিত হিসাবের মিল মতনই পাইয়াছেন। “মহেশের সহিত যে সে মেসে কাহারও মনােমালিন্য বা বিবাদ এমনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। তিনটা ছাত্র ও ব্রাহ্মণের ‘জবানবন্দীতে হত্যার অনুসন্ধানে কার্যকরী হইতে পারে, এরূপ কোন কথাই প্রকাশ পায় না। ইহাদের কেহ কাহাকে মহেশের হত্যাকারী বলিয়া সন্দেহ করেন না। পরন্থ নহেশের সহিত সকলেরই সদ্ভাব ছিল বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায়।” পুলিশের এই রিপাের্ট দেখিয়া এবং ব্রাহ্মণ ও ছাত্র এরের জবানবন্দী আনুপূর্বিক মনােযােগ সহকারে পাঠ করিয়া অনুসন্ধানের কোন সূত্রই বাহির করিতে পারিলাম না। তবে জুতা ও কাটারখানা দেখিতে হইল । সুশাল বাবু তৎক্ষণাৎ সে গুলি আমার সঙ্গে উপস্থিত করি- লেন। আমি তখন পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পাইলাম, রক্তাক্ত কাটারিখানা অপূর্ব ব্যবহৃত। জুতাখানিও একেবারে অব্যব- হৃত বলিয়াই বােধ হইল। উহা পায়ে দেওয়ার কোন চিহ্নই পরিলক্ষিত হইল না। সুতরাং এ গুলি অনুসন্ধানের পক্ষে কোন সহায়তা করিবে, এরূপ মনে করিতে পারিলাম না। আমি সেখানে আর বেশী সময় ৪ কুন্তলীন পুরস্কার। অপেক্ষা না করিয়া সেই মেসটী দেখিতে মনস্থ করিলাম এবং সুশীল বাবুর সহিত সেই মেসে যাইয়া উপস্থিত হইলাম। তখন পূজোপলক্ষে স্কুল কলেজাদি বন্ধ ছিল, সুতরাং সকলকেই বাসায় প্রাপ্ত হওয়া গেল। আমি প্রথমে হত্যাগৃহ এবং তৎপরে মেসের অন্যান্য স্থান যথারীতি পরীক্ষা করিলাম ; কিন্তু হত্যা সম্বন্ধে কোন নূতন তথ্যই সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইলাম না। পরিশেষে আমি হত্যাগৃহে প্রথম উপস্থিত সেই অতুল বাবুকে নিম্নলিখিত প্রশ্ন গুলি জিজ্ঞাসা করিলাম, এবং উত্তর আমার নােট-বহিতে লিখিয়া লইলাম। আমি। আপনি সে দিন প্রাতেই প্রথম সে কক্ষে পদার্পন করিয়া- ছিলেন, না, রাত্রে সে কক্ষের ভিতর দিয়া আর কোন বার নীচে নামিয়া ছিলেন ? অতুল বাবু। না, সেই প্রথম আমি সে কক্ষে প্রবেশ করি । যে রাত্রে মহেশ খুন হয়, সে রাত্রে সর্বশেষ তাহাকে কে জীবিত দেখিয়াছিলেন ? অ, বাবু। সর্বশেষ কে জীবিত দেখিয়াছিলাম, মনে নাই। আমরা সকলেই একসঙ্গে নীচের ঘর হইতে উপরে আসিয়া আপন আপন কক্ষে পড়িতে বসিয়াছিলাম । আমি। আপনারা সেদিন শয়ন করিবার পূর্কে আর নীচে যান আমি । নাই ? অ, বাবু। আমি সেদিন আর নীচে যাই নাই। আমি তখন আর দুজনকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহারা তদুত্তরে বলিলেন; সে রাত্রে তাহাদের কাহারও নীচে যাইবার প্রয়াে- জন হয় নাই। আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম। আপনাদের মেসের ছাত্রগণ ব্যতীত অন্য কাহারও সহিত মহেশ বাবুর বিশেষ জানাশুনা ছিল বলিয়া আপনারা জানেন ?” অ, বাবু মহেশ বাবুর বিশেষ বন্ধু ত কেহ দেখিতে পাই না। আমি। মহেশ বাবুর কাহারও সহিত শত্রুতা বা মনােবিবাদ ছিল, বলিতে পারেন?
৫ অদ্ভুত-হত্যা। অ, বাবু। না, মহাশয়, তাহার সহিত কাহারও শত্রুতার কথা আমরা পরিজ্ঞাত নহি। আমি। হত্যার দিনে মহেশ বাবু সমস্ত দিবস কি মেসেই ছিলেন, , কোথাও বাহির হইয়াছিলেন ? অ, বাবু। (খানিক চিন্তার পর) হাঁ, মহেশ বাবু সেদিন মধ্যাহ্ ভােজনের পরে বাহিরে গিয়াছিলেন। আমি। কোথায় গিয়াছিলেন, বলিতে পারেন ? অ, বাবু। না, তাহা বলিতে পারি না। আমি। মহেশ বাবুর কি বেড়াইবার অভ্যাস ছিল ? অ, বাবু। মধ্যে মধ্যে বেড়াইতে যাইতেন.বৈ কি। আমি। হত্যার তারিখে কোন্ সময়ে বাসায় প্রত্যাবর্তন করেন? অ, বাবু। বােধ হয় রাত্রি ৭টা, কি ৮টার সময়।. আমি। মহেশ বাবুর স্বভাব চরিত্র কেমন ছিল, আপনার বিশ্বাস। অ, বাবু। ( একটু বিরক্তির সহিত ) ও গুলি কি বলিব ? আমি তখন অপেক্ষাকৃত গম্ভীর স্বরে বলিতে লাগিলাম, “দেখুন, আপনারা সকলেই বিদ্বান্ ও বুদ্ধিমান। অবশ্য বুঝিতে পারিতেছেন, এ হত্যার কিনারা করা বড় সহজ সাধ্য নহে। কেহ অর্থলােভে এ নৃশংস কাণ্ড সম্পন্ন, করিয়াছে, অবস্থাপৰ্যবেক্ষণে, এমন বিশ্বাস আমি করিতে পারিতেছি না। ঈর্ষামূলেই বােধহয় এ লােমহর্ষণ হত্যা সংশাধিত হইয়াছে। এক্ষণে যদি আমি হত ব্যক্তির সম্বন্ধে সমস্ত কথা অবগত হইতে না পারি, তবে প্রকৃত দোষীর অনুসন্ধান কিরূপে করিতে সমর্থ হইব? আর অবশ্য ইহাও আপনারা বুঝিতে পারিতেছেন, যদি কোন প্রকারেই এ হত্যার কূলকিনারা করা না যায়, তবে পুলিশ শেষ কালে আপনাদের লইয়াই টানাহিড়া করিতে পারে। কে জানে, আপনাদের কেহ এ ব্যাপার বিজড়িত নহেন ? এ বাড়ীতে অপর কেহ বাস করেনা, মহেশ বাবুর সহিত অন্য কাহারও শত্রুতা ছিল না একথা আপনারাই বলিতেছেন; এমতাবস্থায় কাহার উপর প্রথম সন্দেহদৃষ্টি ।
কুন্তলীন পুরস্কার। পড়িতে পারে; তাহা আপনারাই ভাবিয়া দেখুন। ত্যাগৃহে প্রাপ্ত কাটারি-খানি সম্পূর্ণ নূতন, সুতরাং হত্যাকারী যে পুরাতন-পাপী নহে, ইহাই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তবে—একপাটী নাগরাজুতা পাওয়া গিয়াছে বটে, কিন্তু কে বলিতে পারে ইয়া আপনাদের চালাকি নয় ? আমি এতদূর বলিলে ছাত্র বাবুটী অপেক্ষাকৃত কাতরস্বরে বলিলেন, “ক্ষমা করুন মহাশয়, আমি যাহা জানি, বলিতেছি। আমার বিশ্বাস মহেশবাবু নিপলক্ষ চরিত্র ছিলেন না। আমি। কাহার সঙ্গে, কোথায়, মহেশ বাবুর আসা যাওয়া ছিল, বলিতে পারেন ? অ, বাবু। সে সম্বন্ধে কিছুই বলিতে পারি না। তবে তিনি মধ্যে মধ্যে অনেক রাত্রির পর বাসায় আসিতেন এবং মাঝে মাঝে একটা ঝি শ্রেণীর স্ত্রীলােক তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিত। আমি। ঝির ঠিকানা আপনি জানেন ? অ, বাবু। না, মহাশয়, ঠিকানা জানি না । আমি। ঝিকে দেখিলে চিনিতে পারিবেন ? অ, বাবু। হাঁ, পারিব বৈ কি ? ইত্যার তারিখেও দিনের বেলায় ঝি তাহার নিকট আসিয়াছিল । সে দিন হত্যার কথা জানিতে পান, সে দিন প্রথমে কে সদর দরজা খুলিয়াছিলেন ? অ, বাবু। সম্ভবতঃ সদর দরজা খােলা ছিল । সদর দরজার খিলান ত অভগ্ন ; তবে হত্যা কিরূপে সংঘটিত হইল, আপনাদের বিশ্বাস ? অ, বাবু। সদর দরজা মধ্যে মধ্যে খােলাও থাকে। সে রাত্রে আমরা কেহ দরজা ভেজাই নাই। বামনটী চলিয়া গেলে, কোন দিন দরজা ভেজান যায়, কোন দিন বা যায় না। আমি। বামনটী কেমন, কতদিন যাবৎ এখানে কাজ করিতেছে ? অ, বাবু। অনেক দিন। বামনটী খুব বিশ্বাসী, সে আমাদের বড় যত্ন করে। } আমি । আমি । বােধ হয় অদ্ভুত-হত্যা। আমি এপর্যন্ত জিজ্ঞাসা করিয়া লইয়া সুর্ণাল বাবুর সহিত মেস হইতে বহির্গত হইলাম। তখন বেলা ১টা বাজিয়া গিয়াছে। সুতরাং আর থানায় না বাইর, সুশা বাবুকে আমহাষ্ট ফুটে গাড়ী হইতে নামাইয়া দিয়া, বরাবর বাসাভিমুখে অগ্রসর হইতে গাড়ােয়ানকে আদেশ করিলাম । } ? আমি অনুসন্ধানের সূত্র উদ্ভাবনাথ সত চিন্তা করিতে লাগিলান, প্রথমে ততই নিরাশা-সাগরে নিমগ্ন হইতে আরম্ভ করিলাম। আমি বুকিয়া উঠিলাম না, এ হত। কাহার দাবা সাধিত হইয়াছে। ধনপহরণ মানসে কি এ হত। সবটত হওয়া সম্ভব ? তাহা হইলে এক গাছি তৃবও বিপর্যয় ঘটল না! কেন ? শুনিয়াছি, মহেশের চরিত্র ভাল ছিল না, তবে কি অপর কোন মন্দ চরিত্র প্রতিদ্বন্দী দ্বার। এ কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াছে ? অসম্ভব কি ? কিন্তু সে ব্যক্তির অনুসন্ধান কিরূপে করিব ? মেসের কেহ ত কুচরি নহে? সদর দরজার খিলান অভগ্ন এমতাবস্থায় সহজে বাহিরের লােক কিরূপে ভিতরে প্রবেশ করিবে কিন্তু যদি সদর দরজা সে রাত্রে খােলাই থাকিয়া থাকে, তবে এই এক কথার উপর নির্ভর করিয়া মেসস্থ ছাদিগকে দোষী সাব্যস্ত করা ) যুক্তিাক্ত নহে। আচ্ছা, একটা লােক একই বাড়ীতে খুন হইল, আর বাড়ীর অপর কেহই ইহার বিন্দু বিসর্গও জানিতে পারিল না, ইহা বা কি প্রকারের কথা ? হত্যাগৃহে এক খান। নগর জুতা প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে, তবে কি হত্যাকারী কোন হিন্দুস্থানী ? কিন্তু তাহা হইলে জুতাখানি একেবারে অব্যবহৃত থাকিবার কারণ কি ? এ জুতা পায়ে দেওয়া হইয়াছে বলিয়া ত কিছুতেই বােধ হয় না। মেসের ছাত্র হইতে জানিলাম, একটী নি মহেশের কাছে আসা যাওয়া করিত, হত্যার তারিখে ও আসিয়াছিল ; {স ঝি কে ? তাহার সন্ধানের উপায় কি ?—এবধিধ নানা প্রশ্ন ক্রমে ক্রমে মনে উদিত ও লয় প্রাপ্ত হইতে লাগিল। শেষে যখন আর ভাবিয়া চিন্তিয় কিছু •হির করিতে পারিলাম না ; কোন সূত্রাবলম্বনে অনুসন্ধান কাৰ্য্য আরম্ভ ৮ কুন্তলীন পুরস্কার। করিব, তাহার কিছুই নির্ধারণ করিতে সমর্থ হইলাম না; তখন অগত্যা তখনকার মত এই সিদ্ধান্ত করিলাম যে, আজ রজনীযােগে গুপ্তভাবে মির্জাপুরের সেই ছাত্রবাসে ছাত্রদিগের কথাবার্তা শুনিতে চেষ্টা পাইব। যদি প্রকৃত প্রস্তাবে ইহারা হতা ব্যাপারে সংসৃষ্ট থাকে কিম্বা এ সম্বন্ধে কিছু পরিজ্ঞাত থাকে, তবে খুব সম্ভবতঃ ইহাদিগের মধ্যে আজ এ বিষয়ের গােপনীয় কথাবার্তা চলিতে পারে। তখন বােধ হয়, হত্যা সম্বন্ধে কিছু না কিছু সন্ধান পাইতে পারিব । এইরূপ স্থির করিয়া স্নানাহার সমাপনান্তে শয্যায় পড়িয়া একটু বিশ্রাম ভােগ করিতেছি, এমন সময়ে হঠাৎ মনে পড়িল, এ হত্যা- সম্বন্ধে ডাক্তার সাহেব কি অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা আমি এপর্যন্ত জানিতে পারি নাই। অনুসন্ধান কাৰ্য্য আরম্ভ করিবার পূর্বে এ তথ্যটী জানিয়া লওয়া আমার পক্ষে একান্ত কর্তব্য;—এই মনে করিয়া তৎক্ষণাৎ গাবােথান পূর্বক ধড়া চূড়া' পরিধান করিয়া পুনরায় মুচিপাড়া থানাভিমুখে রওনা হইলাম । যথাকালে মুচিপাড়া থানায় পহুছিয়া সরকারি ডাক্তারের রিপাের্ট পাঠে যাহা অবগত হবলাম, তাহাতে সন্দেহ আরাে বর্ধিত হইল। ডাক্তার বলেন, মৃত্যুর পূৰ্ব্বে হত ব্যক্তিকে ক্লোরােফর্ম প্রয়ােগে হতচেতন করা হইয়াছিল। পরে অজ্ঞানাবস্থায় তীক্ষ্ণ অস্ত্রাঘাতে ইহাকে হত্যা করা হইয়াছে। কি ভয়ানক কথা! জীবিতাবস্থায় হতা করিলে পাছে আহত ব্যক্তির আর্তনাদে অন্যান্য লােক' জাগরিত হইয়া পড়ে, এজন্য পূর্বাহ্রে সাবধান হইয়া হত্যাকারী ইহার উপর বিষ প্রয়ােগ করিয়াছিল ! হত্যাকারী তবে ত নিতান্ত সামান্য ব্যক্তি নহে ! মেসেরই কোন ছাত্র কি তাহা হইলে আন্তরিক বিদ্বেষবশে, গুপ্ত কারণে, অপর সকলের অজ্ঞাতে এরূপ সাবধানতা সহকারে হত্যাকাণ্ড সমাধা করিল ? সন্দেহ ক্রমে দৃঢ় হইতে লাগিল। এ সময়ে একবার মহেশের মৃত দেহ দেখিতে ইচ্ছা হইল, কিন্তু সে সুবিধা ঘটিয়া উঠিল না। আমার কলিকাতা পহুছিবার বহু পূৰ্বেই, ডাক্তারের পরীক্ষার পর উক্ত মৃতদেহের সৎকার ইহয়া গিয়াছিল। *, ০ অদ্ভুত-হত্যা। নানা বিষয়িণী চিন্তার পর অবশেষে আমি প্রথম অনুসন্ধানকারী কৰ্ম্মচারী সুশীল বাবুর সহিত পুনৰ্ব্বার সাক্ষাৎকরিলাম। এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “সুশীল বাবু, কি সূত্রে অনুসন্ধান কাৰ্য্য আরম্ভ করিব ?” সুশীল বাবু হাসিয়া উত্তর করিলেন, “সূত্র বাহির করিবার জন্যই ত টিকটিকির প্রয়ােজন।” সুশীল বাবু ডিটেক্টিভ কে টিকটিকি বলিতেন। আমি পুনৰ্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি সেদিন ঘর তল্লাসের সময় কাহারও কাছে ক্লোরােফর্ম আছে কি না, অনুসন্ধান করিয়াছিলেন কি ?” সুশীল বলিলেন, “না, আমরা ত তখন জানিতাম যে হত ব্যক্তির উপর প্রথমে ক্লোরােফর্ম প্রযুক্ত হইয়াছিল।” আমি তখন হাসিয়া বলিলাম “অনুসন্ধানের সকল সুযােগ আমি কলিকাতা আসিবার পূর্বেই শেষ হইয়া গিয়াছিল, সুতরাং এখন এ অদ্ভুত হত্যা সম্বন্ধে তদন্ত করিয়া কৃত কাৰ্য্যতার আশা করা বিড়ম্বনা মাত্র।” ইহার উত্তরে সুশীল বাবু বলিলেন, “ ভাল মনে পড়িল ;—সে দিন মহেশ চন্দ্রের হাত বাক্স অনুসন্ধানের সময় ইহার ভিতরের কতকগুলি চিঠি পত্র আমি সঙ্গে লইয়া আসিয়াছিলাম, অবকাশাভাবেসে গুলি এ পর্যন্ত পড়ি নাই। আপনার ইচ্ছা হইলে আপনি তাহা পড়িয়া দেখিতে পারেন, যদি কোন সূত্র বাহির হয়।” এই বলিয়া তিনি কতকগুলি বিশৃঙ্খল চিঠিপত্র আনিয়া আমার সম্মুখস্থ টেবিলে ফেলিয়া চলিয়া গেলেন। আমিও তখন আর কিছু করিবার নাই ভাবিয়া সেগুলি হইতে এক এক খানি পত্র লইয়া আগ্রহ সহকারে আপন-মনে পড়িতে লাগিলাম। পাঁচ সাত খানি চিঠির পর একখানি চিঠি পাঠ করিয়া আমি একেবারে চমকিয়া উঠিলাম। চিঠিখানি অবিকল এই রূপ;- —নং হাড়কাটা গলি। ২৬শে আশ্বিন। প্রাণের মহেশ, তুমি আর এখন আসিতেছ না কেন? বিধু বাবুর সহিত ঝগড়া করিয়া আমায় পরিত্যাগ করা কি তােমার উচিত? আজ কুন্তলীন পুরস্কার। যা হয়, একটা হইয়া যাইবে। বিধু বাবু বাড়াবাড়ি করিলে, তাহাকে আমার কাছে আসিতে বারণ করিব। আমার কুন্তলীন একেবারে ফুরাইয়া গিয়াছে। দেলখােস নামে নাকি এক প্রকার নূতন এসেন্স বাহির হইয়াছে, দেখিতে পাই কি ? ঝিকে পাঠাইলাম, তুমি আজ অবশ্য অবশ্য আসিবে, অন্যথা না হয়। ইতি। তােমারই ভালবাসার নলি।” পত্ৰখানা দুইবার পড়িয়া আমি আর স্থির থাকিতে পারিলাম না। পত্রের তারিখ দেখিয়া অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পাইল। এ পত্রে ঝির সন্ধান পাইলাম। বিধু বাবু, নামে কোন ব্যক্তির সহিত মহেশের মননামালিন্য ছিল, পত্র পড়িয়া বুঝিতে পারিলাম । 'এক্ষণে যেন অনু- সন্ধানের কিছু কিছু সূত্র বাহির হইল, মনে করিলাম। আমি আর বিলম্ব না করিয়া ধড়াচূড়া ছাড়িয়া একটী ফি বাঙ্গালী বাবু সাজিলাম। তাহার পর চিঠিখানা পকেটে পুরিয়া, আমার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত গাড়াে- য়ানকে সেখানে অপেক্ষা করিতে বলিয়া পদব্রজে রাস্তায় বাহির হইলাম। ( 3 ) হাড়কাটা গলির সেই বাড়ী খুজিয়া বাহির করিতে বিশেষ বিলম্ব হইল না। আমি একেবারে ‘সপাসপ উপরে যাইয়া উপস্থিত হইলাম । তখন অপরাহ্ন পাঁচটা—সন্ধ্যার প্রাক্কাল। গৃহ কর্তী বেশভূষা পরিপাটী করিতেছে। আমি চির-পরিচিতের ন্যায় একখানা কেদার টানিয়া বসিয়া পড়িলাম। যুবতী তখন আমার অভ্যর্থনার্থ তাড়াতাড়ি আপন কাৰ্য্য সমাধা করিয়া ঝিকে তামাক আনিবার নিমিত্ত আদেশ করিল। আমি ইত্যবসরে আপন মনে অনুচ্চস্বরে বলিতে লাগিলাম, “বিধু বাবুর এতক্ষণ এখানে আসিবার কথা ছিল, কই তিনি যে আসিলেন না!” যুবতী উত্তরচ্ছলে বলিল, “কই, সে ত আজ কয়দিন আসিতেছে । সেই যে সে দিন মহেশের সঙ্গে মারা মা” এ পর্যন্ত বলিয়া যুবতী আমার মুখের দিকে চাহিল। আমি যেন নিতান্ত অন্যমনস্কভাবে উত্তর অদ্ভুত-হত্যা। করিলাম, “তা কাজট। কি ভাল হয়েছিল ? আমি সমস্তই শুনিতে পাইয়াছি। বিধু আমার পরম বন্ধু। যুবতী। কই, আপনাকে ত একদিনও এখানে দেখি নাই। আমি। এতদিন আসিবার প্রয়ােজন পড়ে নাই; তাই আসি নাই; কিন্তু সেদিনকার ঘটনার পর বিধু প্রতিজ্ঞা করিয়াছে; সে আর কখনও এখানে একাকী আসিবে না । যুবতী। তা মহাশয়; আমার দোষ কি বলুন? বাস্তবিক; সেদিন মহেশের কাজটা ভারি অন্যায় রকমের হয়েছিল। ভদ লােকের গায়ে হাত তােলা, জুতাে মারা, এ গুলি নেহাত ছােট লােকের কর্ম। এই বলিয়া প্রবর্তী স্বহস্তে প্রস্তুত পানের খিলি দুটী আমাকে প্রদান করিল। আমি সমস্ত ব্যাপার ইতিমধ্যে বেশ বুঝিতে পারিয়াছি। এক্ষণে আমার মনে হইতে লাগিল, এ জুতােমার কাণ্ডের প্রতিশােধ লইতে বিধু বাবু নামক ব্যক্তির পক্ষে মানসিক উত্তেজনা-প্রাবল্যে মহেশের জীবনলীলা সাঙ্গ করা একেবারে অসম্ভব নহে। ইহা ২৬শে আশ্বিনেরই ঘটনা। যাহা হউক, অধুনা আমার পক্ষে এই বিধু বাবুর অনুসন্ধান লওয়া বিশেষ প্রয়ােজন হইয়া পড়িল; কিন্তু এখানে আমি বিধু বাবুর বন্ধু বলিয়া পরিচয় প্রদান করিয়াছি, সুতরাং সােজাসসাজি ইহাকে সেকথা জিজ্ঞাসা না করাই যুক্তিযুক্ত মনে করিলাম। ইতিমধ্যে, ঝি-মূর্তি, একটী রূপার হুকা হাতে করিয়া সেই কক্ষে প্রবিষ্ট হইল। এবং আমাকে দেখিয়া বলিল,- “এটী যে নূতন বাবু !” যুবতী তদুত্তরে বলিল “ইনি বিধুভূষণের বিশেষ বন্ধু !” ঝী। কোন্ বিধুভূষণ ? যুবতী। আঁ—নেকি ? মুখুয্যে বিধূ—সেই ২১ নম্বর কলুটোলার। এতক্ষণে সহজেই আমার কার্য সিদ্ধ হইয়াছে ;-আমি ঘটনাক্রমে বিধুর ঠীকানা অবগত হইলাম। সুতরাং আর সেখানে অপেক্ষা করিবার দরকার নাই ভাবিয়া, ঝির কথার উত্তরচ্ছলে অন্যমনস্ক ভাবে বলিলাম বধু বাবুর ত এখনই এখানে আসিবার কথা ছিল, দেরী হইতেছে ১২ কুন্তলীন পুরস্কার। কেন, বুঝিতে পারিতেছি না। তা, আমি একটু দেখিয়া, আসিতেছি।” এই বলিয়া আমি “২১নং কলুটোলা” ঠিকানাটি মনে রাখিয়া সে বাড়ী হইতে বহিষ্কৃত হইলাম। এবং অবিলম্বে মুচিপাড়া থানায় আসিয়া পঁহুছিলাম। তখন সন্ধ্যা হইয়াছে। আমি আসিয়া দেখি, সুশীল বাবু আমার 'প্রতীক্ষায় বসিয়া আছেন। আমি যথাসম্ভব সংক্ষেপে তাহাকে সমস্ত ঘটনা বুঝাইয়া বলিলে, তখনই বিধুর সম্বন্ধে তদন্ত করা উচিত বলিয়া পরামর্শ স্থির হইল। দুই জন পুলিশ কনেষ্টবল, পুলিশ-পােষাক পরি- হিত সুশীল বাবু এবং বাঙ্গালী বাবু আমি—শকটাররাহণে অগৌণে কলুটোলায় যাইয়া উপস্থিত হইলাম। বলিয়া রাখা ভাল, হত্যাহে প্রাপ্ত কাটারি এবং নাগরা জুতা আমাদিগের সঙ্গে লইয়াছিলাম। তাহাদিগকে গাড়িতে পথের উপর অপেক্ষা করিতে বলিয়া আমি একাকী সেই ২১নং বাড়ীতে প্রবেশ করিলাম। এটী একটী ছােটখাট ডিস্পেন্সারী। অনুসন্ধানে জানিলাম, সুধীর বাবু নামে জনৈক ভদ্র লােক এ ডিস্পেন্সারীর স্বত্বাধিকারী। তিনি সপরিবারে ইহারই উপরতলে বাস করেন, নীচের ঘরে ডাক্তারখানা। আরাে জানিলাম, সত্য সত্যই বিধুভূষণ নামে উক্ত সুধীর বাবুর এক ভাইপাে এ বাড়িতে বাস করেন। তিনি এক্ষণে বেকার অবস্থায়ই আছেন। আমি যে সময় সেখানে উপস্থিত হইয়াছিলাম, সে সময় ডাক্তার বাবু বাসায় ছিলেন না। সুতরাং ডাক্তারখানার কম্পাউণ্ডারকে বিধু বাবুকে সংবাদ দিতে বলিয়া নীরবে সেখানে অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। কম্পাউণ্ডার উপরে চলিয়া গেল, এবং অল্প সময়ের মধ্যে আরক্ত- নয়ন, বিষাদ-বদন, রুক্ষ-কেশ এক যুবক সমভিব্যাহারে সে কক্ষে প্রবিষ্ট হইল। যুবকের মুখাকৃতি ও ভাবগতি সন্দর্শনে আমার মনের দারুণ সন্দেহ একেবারে বিশ্বাসে পরিণত হইল। আমি একটু ব্ৰস্ততার সহিত অথচ মৃদুস্বরে যুবককে বলিলাম, আমি সুকাটা গলি হইতে আসিয়াছি। পথে গাড়ীতে ‘নলি’ অপেক্ষা করিতেছে, আপনি একটু বাহির হইতে পারেন ?” যুবক অদ্ভুত-হত্যা। সংক্ষেপে উত্তর করিল “আমি আজ বড় অসুস্থ।” আমি তখন ব্যগ্র- ভাবে বলিলাম, “তবে আপনি একটু এখানেই অপেক্ষা করুন, আমি তাহার নিকট হইতে এই আসিতেছি।” এই বলিয়া ত্বরিতপদে সদর রাস্তায় আসিয়া পড়িলাম, এবং কয়েক মুহূর্তের পর দলবলসহ সুশীলকে সে বাড়ীতে উপস্থিত হইতে উপদেশ দিয়া, পুনরায় ডাক্তারখানায় প্রবেশ করিলাম । এবারে তাড়াতাড়ি আসিয়াই আমি দৃঢ়মুষ্টিতে বিধুর দক্ষিণ হস্ত ধারণ করিয়া, বস্ত্রাভ্যন্তর হইতে সেই নাগরা জুতা- খানি বাহির করিয়া বলিলাম, “দেখ দেখি বিধু, তুমি এ জুতা সেদিন রাত্রিকালে মহেশের হত্যাগৃহে ফেলিয়া আসিয়াছিলে কি না!” আমার কথা শুনিয়া ও ভাবভঙ্গী দেখিয়া বিধু ফ্যা ফ্যা করিয়া আমার দিকে দৃষ্টিপাত করিল এবং স্বীয় হস্ত ছাড়াইয়া লইবার চেষ্টা পাইল। তখন আমি আমার মুষ্টি দৃঢ়তর করিয়া বলিলাম, “সে চেষ্টা বৃথা ; তুমি মহেশের হত্যাকারী, তােমাকে আমি গ্রেপ্তার করিলাম। ইত্যবসরে কনেষ্টবলসহ সুশীল বাবু সে গৃহে প্রবেশ করিলেন। আমি তাহাকে বলিলাম, “আসামী গ্রেপ্তার হইয়াছে, এক্ষণে থানায় ; চলুন।” বিধু এ সকল দেখিয়া-শুনিয়া একেবারে দমিয়া গেল। আমি তাহাকে লক্ষ্য করিয়া পুনৰ্বার বলিতে লাগিলাম, “দেখ, বিধু, আমি সমস্তই জানিতে পারিয়াছি; তুমি হাড়কাটাগলিতে ‘নলির’ বাড়ী মহেশ কর্তৃক প্রদত ও অবমানিত হইয়া প্রতিশােধ লইবার মানসে, উত্তেজনা- বশে, সেদিনই মহেশকে খুন করিয়াছ ছি এ বিষয়ের সমস্ত প্রমাণাদি আমি সংগ্রহ করিয়াছি, এক্ষণে চল, তােমাকে হাজতে লইয়া যাইব।” আমি এতটুকু বলিয়া দেখিলাম, বিধু আমার সমস্ত কথা শুনিতেছে কি না সন্দেহ। কারণ, ক্রমে যেন তখন তাহার সংজ্ঞা বিলুপ্ত হইতে আরম্ভ করিল। তদনন্তর আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “বিধু, তুমি এক্ষণে কি বলিতে বা করিতে চাও ? সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে উত্তর করিল, “মহাশয়, আমার কিছু বলিবার বা করিবার নাই। পাপ গােপনে • ১৪ কুন্তলীন পুরস্কার । থাকে না। পাপের ফল অবশ্যই ভুগিতে হইবে । চলুন, আমি কোথায় যাইব।” আমি বলিলাম, “তুমি হত্যাপরাধ স্বীকার করিতেছ?” সে উত্তর করিল, “আর মিথ্যা বলিব না; আমি হত্যা করিয়াছি।” আমরা সেখানে বসিয়াই উপস্থিত কতিপয় ভদ্র লােক সমক্ষে বিধুর স্বীকারােক্তি এবং তৎকর্তৃক বর্ণিত হত্যার আমূল বিবরণ লিপিবদ্ধ করিলাম। অবমানিত হইয়া, উত্তেজনা-বশে নে এ ভীষণ কার্যে ব্রতী হইয়া- ছিল ; মহেশ যাহাতে চীৎকার করিতে না পারে, তজ্জন্য যে পূৰ্ব্বাহেই ক্লোরােফর্ম প্রয়ােগ করিয়াছিল ; অনুসন্ধানকারীকে বিপথে চালিত করিবার জন্য যে হত্যাগৃহে স্বেচ্ছাপূৰ্ব্বক নাগরাজুতা রাখিয়া আসিয়া- ছিল, একে একে এ সমস্তই বিধু স্বীকার করিল। এইরূপে বিধুর জমানবন্দী সমাপ্ত হইলে আমরা তাহাকে থানায় লইয়া চলিলাম । বলা বাহুল্য, এই অদ্ভুত-হত্যার মােক মা দায়রা সােপ হইল, এবং দায়রায়, জজ সাহেব ও জুরির বিচার, বিধুভূষণ চিরনিৰ্বাসন দণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত হইল। এরজনীচন্দ্র দত্ত। হেডমাষ্টার, বেজুড়া স্কুল, (শ্রীহট্ট)। এ।
দ্বিতীয় পুরস্কার ২০১ অদল বদল। প্রথম পরিচ্ছেদ। - + 4 সে আজ কয়েক বৎসর পূর্বের কথা; কার্তিক মাসের শেষে একদিন 'আমি-- বেলা..বারােটার সময় যথারীতি:আফিসে.আসিয়া বসিতেই : • চাপড়াস..বদ্ধ এক হিন্দুস্থানী মুসলমান মূৰ্ত্তি আমার সন্নিকটবর্তী হইয়া বলিল ‘বড়া সাহেব আপকো সেলাম দিয়া বাবুজি !’ বড় সাহেব আমা- দের ডিটেকিটভ পুলিশের সুপারিণটেডেন্ট; আমি তখন সবে ডিটে- কিট ডিপার্টমেন্টে প্রবেশ করিয়াছি; আমি ডিটেটিভের সবই- পেক্টর, বাঙ্গালায় যাকে বলে গােয়েন্দা দারােগা। বড় সাহেব আমার উপর কিছু প্রসন্ন ছিলেন; অল্প দিনের মধ্যে আমার কিঞ্চিৎ সুনামও জন্মিয়াছিল; এবং কোন জটিল মকদম। 'তদন্ত করিবার আবশ্যক হইলে; অনেক সময় সিনিয়ার দাবােগার পরিবর্তে আমার উপরই তদন্তের ভার পড়িত। আজও সেইরকম একটা কিছুর প্রত্যাশা করিয়া বড় সাহেবের আফিস রূমে প্রবেশ করিলাম। সাহেব তখন মাথা গুজিয়া কি লিখিতেছিলেন; আমার গৃহ প্রবেশ মাত্র সাহেব এক চোখের চসমার ভিতর দিয়া একবার আমার দিকে চাহিলেন; এবং কোন কথা না বলিয়া বাম হস্তে আমার সম্মুখে একখান বাঙ্গালা খবরের কাগজ ফেলিয়া দিলেন; আমি তাহাকুড়াইয়া লইয়া খুলিলাম; নাম দেখিলাম .সদর ও মফঃস্বল’;..ইহা কলিকাতা কিম্বা মফঃস্বলের কোন নগর হইতে বাহির হয় কি না জানি না; এখন পর্যন্ত ইহার অস্তিত্ব বর্তমান আছে কি না জ্ঞাত নহি; ইহা সঞ্জীবনী অপেক্ষা কিছু ছােট আকারের সাপ্তাহিক পত্রিকা, এ কাগজ সর্ব প্রথম এই কুন্তলীন পুরস্কার। দেখিলাম। প্রথম পৃষ্ঠা উলটাইতেই, সম্পাদকীয় মন্তব্যের’ নীচে নীল পেন্সিলের মােটা দাগ দেওয়া একটা প্যারা আমার নজরে পড়িল, বুঝিলাম ইহাই দেখিবার জন্য সাহেব কাগজখানি আমায় দিয়াছেন, আমি প্যারাটি আগাগােড়া পড়িলাম ;- “মালদহের বন্ধুবিহারী সাহা নামক একজন হাতুড়ে ‘কুন্তলীন’ নামক বিখ্যাত কেশ তৈলের বিক্রয়াধিক্য দেখিয়া লাভবান হইবার আশায় ‘কুন্তলীনের’ নামের অনুকরণে ‘কুন্তল তৈল’ নামক এক প্রকার কেশ তৈল প্ৰস্তুত করিয়াছে, আমরা এই তৈল ব্যবহার করিবার জন্য এক শিশি উপহার পাইয়াছি, কিন্তু সৌভাগ্যবশতঃ ইহা ব্যবহার করিবার পূর্বেই ইহার অসাধারণ গুণের কথা অবগত হই- য়াছি। এই তৈল ব্যবহার করিয়া দুই জন লােক ভব-যন্ত্রনা হইতে মুক্তিলাভ করিয়াছে, আর দুই জন লােক শঙ্কটাপন্ন অবস্থায় হাঁস- পাতালে পড়িয়া আছে, ডাক্তার সাহেব সযত্নে চিকিৎসা করিতেছেন, রােগীদ্বয় বাঁচিবে কি না এখনাে বলা যায় না; নিজ মালদহ হইতে আমরা এ সংবাদ পাইয়াছি, বন্ধু সাহার ‘কুন্তল তৈল’ আর কোথাও কোন বিভ্রাট ঘটাইয়াছে কি না তাহা আমরা এখনাে জানিতে পারি নাই। আমরা সংবাদ পাইলাম বন্ধু সাহার নামে ম্যাজিষ্ট্রেট গ্রেপ্তারী ওয়ারেন্ট বাহির করিবার পূর্বেই সে চম্পট দিয়াছে, পুলিশ এ পর্যন্ত তাহার কোন সন্ধান করিতে পারে নাই।” সংবাদটা দুইবার মনে মনে পড়িলাম। তাহার পর কাগজ খানা ধীরে ধীরে টেবিলের উপর রাখিয়া সাহেবকে বলিলাম “কিছু বুঝিতে পারিলাম না, বন্ধু সাহা হাতুড়ে সন্দেহ নাই; হাতুড়েদের মতই হয়ত সে কাণ্ডজ্ঞান হীন মূখ এবং হয়ত এই তৈলের বিভিন্ন উপাদানের রাসা- য়নিক ক্রিয়ায় ইহা বিষাক্ত হইয়াছে; কিন্তু এমন বিষাক্ত হইল যে তাহা মাখিয়াই দুইটা মানুষ মরিয়া গেল আর দুজন মর মর; তৈলে যে এমন কোন উগ্র বিষ ছিল তাহার কিছু প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে ?” সাহেবের লেখা শেষ হইয়াছিল, তিনি চেয়ার খানা অল্প ঘুরাইয়া লইয়া আমার মুখের দিকে চাহিলেন, এবং অল্প হাসিয়া বলিলেন, অদল বদল। ১৭ “আমিও কিছু না বুঝিতে পারিয়া ম্যাজিষ্ট্রেটকে এক খান অফিসিয়াল পত্র লিখিয়াছিলাম, তিনি উত্তর লিখিয়াছেন তৈলে সে উগ্র উদ্ভিজ্জ বিস বৰ্তমান, পরীক্ষ! দার। তাই প্রমাণিত হইয়াছে। মৃত ব্যক্তিদ্বয়ের পাকাশয় Chemical Examiner এর কাছে পাঠান ইয়াছিল, পাকাশয়ে এই বিয়ের অধিনে ছিল। আমি আকাশ হইতে ছিলাম, বিষ্ময় দত সাহেবের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলান, পাকশয়ে নিস পাওয়া গিয়াছে। তাহা হইলে আপনি বলিতেছেন তৈল মায়ি। ইহারা মরে নাই, খাইয়া মরিয়াছে ?” সাহেব বললেন, “ কাট। আমার নিকট ও আগাগোড়া রহস্য পূর্ণ বলিয়! বােধ হইতেছে । সমস্ত ঘটনার full rep:rt আমি পাই নাই, ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধু সাহাকে পরিবার জন্য একজন expert ডিটেক্টিভ নিক্ত করিবার নিমিও অনুরােধ করিয়াছেন,- বুঝিয়াছ তােমাকে ডাকিয়াছি কেন ?" এ সম্বন্ধে সাহেবের সঙ্গে আমার আরও দুই চাবিট। কথা হইল । তাহার পর সাহেব সহসা দড়ি খুলিয়া বলিলেন, “তােমাকে আজই লুপ মেলে নাইতে হইবে। আর দু ঘণ্টা না সময় আছে, এখন গুডুবাই। টুপিট। মাথার তুলিয়া সাহেব কাশ, ধরে উঠি! গেলেন, আমি ও আর বিলম্ব না করিয়া বাহিরে আসিলাম । লুপমেল বেলা তিনটার সময় বড়। ছাড়ে ; আমি তাড়াতাড়ি বাসায় আসিয়া দরকারী কয়েকটা জিনিস না একটা ওকে পুরিয়া হাবড়। রওনা হইলাম । সেনে আসিয়া গাড়ী ছাড়িতে মিনিট দশেক মাত্র সময় ছিল, জিনিষপত্র গুছাইয়া গাড়ীর মধ্যে একটু ভাল করিয়া বসিতেই গাড়ী ছাড়িবার ঘন্টা বাজিল, গার্ডের নইলে শিশ দেওয়া হইল, এবং প্লাটফ য় কতি করিয়া হুস ইস শব্দে (টুণ ছুটিয়া চলিল। রাত্রি প্রায় সাড়ে এগারটার সময় রাজমহলে উপস্থিত হইলাম। সেই রাতেই ঢাকের নৌকায় গঙ্গা পার হইয়া আমি গাে-শকটের অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম। গাড়ীর খোজ করিতেছি শুনিয়া পাঁচ সাত জন গাড়ােয়ান আসিল, এবং আমাকে ঘেরিয়া গঁড়াইয়া প্রায় এক ১৮ কুন্তলীন পুরস্কার। সঙ্গে সকলেই জিজ্ঞাসা করিল, “কঁহা জানে হােগা সাব রাঁংরেজা ?” ‘রাঁংরেজা কিরে বাপু? শেষে বুঝিলাম, ইংরেজবাজার বা ইংরেজাবাদ, মালদহের সিভিল ষ্টেসন ইহাদের নিকট এই সংক্ষিপ্ত নামে পরিচিত। পাচ সিকা মাত্র দিয়া আমি রংরেজার জন্য গাড়ী করিলাম। গাড়ােয়ান আমার বিছানা বিছাইয়া দিলে, ধূলিধূসর মস্তকটি উপাধানে ন্যস্ত করিয়া শুইয়া পড়িলাম। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। সকাল বেলা যখন নিদ্রা ভাঙ্গিয়া গেল, তখন দেখি প্রভাত রৌদ্রে মুক্ত প্রকৃতি পরিপ্লাবিত, ধীরে ধীরে শীতল বাতাস বহিতেছে, গাড়ী প্রশস্ত পথ বহিয়া মন্থর গতিতে চলিতেছে, পথের উভয় পার্শ্বে মাটির উচু আইল দেওয়া তুতের ক্ষেত, আমের বাগান, পাখীর কলগান, বনের ছায়া, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিচ্ছন্ন কৃষক কুটীরে বালক বালিকার হর্ষ কল্লোল, আর অনেক দূরে ধুসর গিরি শ্রেণীর উপর প্রাতঃ-সূর্য্যের দীপ্তালােক, আমি গাড়ীর মধ্যে উঠিয়া বসিলাম। বেলা তিনটার সময় মালদহ আসিয়া প্লৌছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে আমাকে মালদহে আসিয়া কোন অপরিচিত ব্যক্তির আতিথ্য গ্রহণ করিতে হয় নাই, আমার বালা-বন্ধু কমলকৃষ্ণ বাবু সে সময় মালদহের ডিস্টলারি সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন, তাঁহার স্কন্ধেই ভর করিলাম । তিনি আমাকে সহসা উপস্থিত দেখিয়া অত্যধিক আনন্দিত হইলেন। অপরাহ্বে স্নানাহার শেষ করিয়া, তাম্বুল চর্বণ করিতে করিতে, আমি আমার এই আকস্মিক অভিজানের বৃত্তান্ত তাহার নিকট বিবৃত করিলাম। দেখিলাম তিনি বন্ধু সাহার সম্বন্ধে অনেক কথা জানেন ; আমাকে কৌতূহলা ক্রান্ত দেখিয়া তিনি তাহার সম্বন্ধে দুই এক কথা বলিলেন, আমি বলিলাম, “তাহার সম্বন্ধে যাহা জানিতে পারিয়াছ আগাগােড়া বল।” কমলকৃষ্ণ বাবু বলিতে আরম্ভ করিলেন, “বন্ধু সাহার অবস্থা এমন ছিল না যে আমি তাহার বিষয়ে কোন খবর রাখি, তবে তাহার পলায়নের পর বিষয়টা কিছু অদল বদল। ; } interesting হইয়া উঠায় দিগম্বর বাবুর কাছে কথা প্রসঙ্গে যাহা শুনিয়াছি তাহাই তােমাকে বলি; দিগম্বর বাবু আমাদের এ অঞ্চলের একজন বড় জমিদার, প্রথম যৌবনে বন্ধু তাহার একজন মােসাহেব ছিল ; তাহাদেরই গ্রামের ছাত্রবৃত্তি স্কুলে সে কিছুদিন পড়িয়াছিল, কিন্তু সরস্বতীর অকৃপাবশতঃ ছাত্রবৃত্তি পাশ করিতে পারে নাই, অব- শেষে সে মালদহে আসিয়া ‘সারদাসুন্দরী (দিগম্বরের মাতার নাম) দাতব্য চিকিৎসালয়ের’ কম্পাউণ্ডারের এসিষ্টান্ট নিযুক্ত হয়; কিছু দিন এসিষ্টান্টগিরি করিয়া দিগম্বর বাবুর অনুগ্রহে তাহার কম্পাউণ্ডারের চাকরীটি লাভ হয়, কিন্তু দীর্ঘকাল তাহার চাকরী কর। পােমাইয়া উঠিল না, সে সর্বদাই বলিত, প্রতিভাশালী ব্যক্তির কখন চাকরী করিয়া পােয় ন', প্রতিভা বিকাশই তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য, তাই সে চাকরী ছাড়িয়া আবিস্কার কার্যে মনঃসংযােগ করিল, কিন্তু বাঙ্গালা দেশে নাকি সৰ্ব্বদা সার হফ্রে ডেভি বা ক্রিস্টোফার কলম্বাস জন্মগ্রহণ করে না, তাই বেচারার আবিস্কারের মধ্যে তেমন originality ছিল , অর্থাৎ সে যখন দেখিল প্রতিভা খাটাইয়া কিছু আবিস্কারও করা চাই সঙ্গে সঙ্গে অর্থ উপাণ্ডনও চাই, তখন আর কিছু আবিস্কারের সুবিধা না পাইয়া কুন্তল-তৈল’ নামে একটা কেশ-তৈল আবিস্কার করিয়া ফেলিল। বােধ হয় কুন্তলীনের বিক্রয়াধিক্য দেখিয়া ও তাহার খ্যাতির কথা শুনিয়া সে ইহার নামের অনুকরণে নিজের তৈলের নাম রাখিয়াছিল, এরকম অনুকরণ আজ কাল আমাদের দেশের একটা রােগ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যাহা হউক শুধু এই তৈল আবিস্কার করিয়া ক্ষান্ত হইলেই হয় ত বেচারীকে কোন বিপদে পড়িতে হইত না, সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা নিরীহ লােকের প্রাণও যাইত না।” আমি বাধা দিয়া বলিলাম-“বল কি তুমি, তাহা হইলে কি সে তৈল বিষাক্ত নয় ? আমি বিশেষ প্রমাণ পাইয়াছি এ তৈলে উগ্র উদ্ভিজ্জ বিষ বৰ্তমান আছে।” কমলকৃষ্ণ হাসিয়া বলিলেন, “আরে ভাই কথাটা শােনই, অনেক রহস্য আছে, বুঝিতেছ না মাখিবার তেল খাইয়া মানুষ মরিয়াছে, বিষ থাক বা না থাক, মাখিবার তেল আর কে খায় ?”
২০ কুন্তলীন পুরস্কার। আমি বললাম, “তােমার গল্প শেষ না হইলে আর এ রহস্যের অন্ত পাইতেছি না, --বল।" কনলকৃষ্ণ বলিতে লাগিলেন, “বন্ধু সাই। শু | তৈল প্রস্তুত করাই ক্ষান্ত হইল না, বয়। চিন্তিয়া পেটের বায়ারানের একটা পেটে ৪ মে সন বাহির করিল, তার নাম দিল উদরাময়ের মধে। এ মহেযদের আর কোন গুণ ছিল কি না জানি না, কি ? এমন ভয়ঙ্কর আঠা৷ে ব তাহা আর কহতব্য নয়, বোস কর এই মহৌষধ দিন। ভাঙ্গ। কচি ৪ নােড়া দেওয়া চলে। এ পর: অমর। পরে পাইয়ছ, সেই ক শাহ এখন বলব। তৈল ও উদরানরের ঔপ আবিস্কার কর। বন্ধু সাইতাহার ভূতপূর্ব মনিব ‘সারদাসুন্দর দাতব্য চিকৎসালরের' ও দিন বর বাবুর পারিবারিক চিকিৎসক ডাক্তার কে, সি, দ ও এম, আর, সি, পি (এডিন) মহাশয়ের নিকট দুই শিশি উপহার পাঠাইল, এব তাহাকে পত্র লিবিয়া জানাইল নে নদি তিনি এই তৈল ও মহৌষধের উপকারিতা সম্বন্ধে একট। সকেট দেন তাহলে তাহার হেপকার হয়। ডাক্তার জানাইলো, তাদের গুণাগুণ পরীক্ষা করি। তিনি সাটিফিকেট দিবেন; শিশি দুটি আপাতত; তাহার নিকট রহিল। তৃতীয় পরিচ্ছেদ। কমলকৃষ্ণ বলনে,-“ এই ঘটনার তিন দিন পরে মালদহের সেসন বসিল। রাজশাহীর সেলন জজ সাঙ্গোপাঙ্গ সঙ্গে লইরা দা ওরা করিতে আসিলেন। দেখিতে দেখিতে বিচারালয় সজীব হইয়া উঠিল, দাওরা আরম্ভ হইবার দিন আদালতের স বা সুবৃহং নিৰবৃক্ষ মূল ও অদূরবর্তী ছারাচ্ছন্ন আশ্র ত র ত ল উকীল, মােক্তার, সাক্ষী, আসামী ও ফরিয়াদী পক্ষীয় লােক, স্কুলের ছাত্র, দোকানদার সর্বশ্রেণীর জন সমাগমে এক বৃহৎ হাটের আকার ধারণ করল, এরূপ হইবার বিশেষ কারণও ছিল, জন আরবথনট কোম্পানীর সহিত জমিদার দিগম্বর বাবুর একট। হাটের অধিকার লইয়া বিবাদ উপস্থিত হয়; এক দিন হাটে } অদল বদল । ২১ উভয় পক্ষীয় লোকই উপস্থিত ছিল, কথায় কথায় তাহাদের মধ্যে বিবাদ বাধিয়া গেল, প্রথমে মুখে মুখেই চলিতেছিল, শেষে লাঠি চলিতে লাগিল, আরবগনট কোম্পানীর এক পাইকের দাঠিতে দিগম্বর বাবুর একটা লাঠিয়ালের মাথা ভাঙ্গিয়া না, সেই আদতেই বেচারা মরিয়া গিয়াছে। দাওয়ার প্রথম দিনই এই মকার বিচার হইবে রূপ স্থির হইয়াছিল, উভয় পক্ষই প্রবল, কলিকাতা হইতে দুই পক্ষই বড় বড় ব্যারিষ্টার আনাইয়াছেন। পেট। বড়িতে টন টন করিয়া এগারট। বাজিরা গেল, কষ্টেল বেষ্টিত আসামী কাঠগড়ার' মধে, আনা ৩ হইল, জজ সাহেব খাস কামরা হইতে বাহির হইয়া বিচারকের আসনে উপবেশন করিলেন, ব্যারিষ্টার সাহেবের আসিয়া বিচারালয়ের বিভিন্ন কাছাসন শােভিত করিয়া বসিলেন, এবং সামলা মাথার দিয়া সরকারী উকীল বিচার গৃহে প্রবেশ করিলেন । প্রথমে সরকারী উকীল মে কদম আরম্ভ করিলেন। মকদার করিয়াদী পক্ষের কয়েকজন প্রধান সাগর জমানবন্দী শেষ হইলে, একজন বড় রকমের সাক্ষার সময় আসিল, এই সাক্ষ। আর কেহ নহে, দিস্বর বাবুর পারিবারিক চিকিৎসক নি; কে, সি, দত্ত, এল, আর, সি, পি মহাশয়। কিন্তু এখনও তিনি উপস্থিত হন নাই, একে বিলাত ফেরত ডাক্তার, তাহার উপর আবার এল, আর, সি, পি (এডিন), মামলা মকদ্দমার তিনি তােয়াক্কাই রাখেন না, কিন্তু সেসন আদালতের কথা স্বতন্ত্র, তাহার উপর হাকিম সেরকম কড়া, খাতির না করিয়া উপায় নাই। কোর্টে যখন তাহার উপস্থিত হওয়ার দরকার ঠিক সেই সময়টিতে তিনি হাট কোটে পরিশােভিত হইয়া, তাহার ডগকার্ট খানিতে করিয়া বিচারালয়ে উপস্থিত হইলেন। এখানে দত্ত সাহেবের কথা তােমাকে একটু বলি ; তাহার একটু প্রাকৃতিক বিকৃতি জন্মিয়াছিল, দুর্ভাগ্যবশতঃ সহধম্মিনীর নব-যৌবন বর্তমানেই পঁয়ত্রিশ বৎসর মাত্র বয়সে তাহার মস্তকের সম্মুখের নিবিড় কেশ রাশি উঠিয়া গিয়া দুই চারি গাছি মাত্র চুল মরুভূমে ওয়েশিসের ২২ কুন্তলীন পুরস্কার। মত বিদ্যমান ছিল। বন্ধু সাহা তাহাকে পুনঃ পুনঃ অনুবােধ করিয়া- ছিল যেন তাহার আবিস্কৃত কুন্তল তৈল যথারীতি ব্যবহার করা হয়, তাহা হইলে তাহার লুপ্ত কেশরাজি অঙ্কুরিত হইয়া তাহার অনুর্বর মস্তক সুশােভিত করিবে। কাছারীতে সাক্ষী দিতে যাইবার কয়েক মিনিট পূৰ্বে বন্ধু সাহার সেই তৈলের কথা তাহার মনে পড়িল, শিশিটা তখন ও খােলন নাই, মনে করিলেন ‘তৈলটা একটু মাথায় লাগাইয়া যাই না কেন ? শিশি বাহির করিয়া চাকরকে সেই তৈল তাহার মাথায় উত্তমরূপে লাগাইয়া দিবার আদেশ করিলেন। চাকরট। শিশির কর্ক খুলিয়া অর্ধ ছটাক পরিমাণ তরল পদার্থ তাহার মস্তকের উপর উত্তমরূপে অনুলিপ্ত করিয়া দিল। অতঃপর তিনি মস্তকে হাট আটয়া কাছারীতে সাক্ষ্য দিতে চলিলেন । আমি তােমাকে একটা কথা এতক্ষণ বলি নাই, বন্ধু সাহা যে কুন্তল তৈল ও উদরাময়ের মহৌষধ আবিস্কার করিয়াছিল, তাহাদের শিশি ঠিক এক রকমরে, শুনিয়াছি শিশির উপর লেবেল লাগাইবার ভার দিয়াছিল একটা নিরক্ষর চাকরের উপর, চাকরটা লেবেল গুলা অদল-বদল করিয়া ফেলিয়াছিল, অর্থাৎ কুন্তল তৈলের লেবেল উদরা- ময়ের মহৌষধের শিশিতে লাগাইয়াছিল, আর মহৌষধের লেবেল লাগাইয়াছিল তৈলের শিশিতে; ইহাতে যে ফল ফলিল তাহা বুঝিতেই পারিতেছ, কারণ আমি পূৰ্বেই বলিয়াছি উদরাময়ের মহৌ- ষধটা ভয়ানক আঠালাে জিনিস। কাজেই সেই আঠালাে উদরাময়ের মহৌষধ অতি পরিপাটিরূপে দত্ত সাহেবের মস্তকে লিপ্ত হইল। কোর্টের দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া তিনি হাট খুলিবেন, উঠাইতে গিয়া দেখেন তাহা মাথার উপর আঁটিয়া বসিয়াছে। এরূপ অলৌকিক ঘটনার কারণ কি তাহা বুঝিতে না পারিয়া তিনি আর একবার হাটের এক কোণ ধরিয়া সজোরে টান দিলেন, কিন্তু বৃথা চেষ্টা! শিরীষের আটা বরং ভাল, বিস্তর টানাটানিতে হাট একটুও নড়িল না, এদিকে টাকের উপর ঔষধ শুখাইয়া চামড়ায় টান ধরিয়াছে, মাথা চুলকাইবার অদল বদল। জন্য তিনি অস্থির হইয়া পড়িলেন, কিন্তু হায়, হিমাচলের অভ্রভেদী শিরে চির বরফস্তুপের মত তাহার মস্তকে সােলা-হাট অটুট রহিল। এ দিকে আর সময় নাই, তাঁহার আগের সাক্ষী অনেকক্ষণ সাক্ষীর ‘কাটরা’ হইতে নামিয়া গিয়াছে, অগত্যা তিনি হাট মাথায় দিয়াই সাক্ষীর কাটরায় উঠিলেন ; দেখিয়া অনেকে পূর্ণ বিস্ময়ে তার দিকে চাহিল, কারণ হাট মাথায় দিয়া কোন সাহেব বা বাঙ্গালীকে সাক্ষী দিতে আর কখনও তাহারা দেখে নাই। জজ সাহেবট কিছু অতিরিক্ত রােখা, সাক্ষীরা তাঁহার হস্তে নিগ্রহ ভােগ করে বলিয়া একটা জনরব ছিল। জজ সাহেব ডাক্তারের মাথায় হাট দেখিয়া তৎপ্রতি দুই একবার তীক্ষ কটাক্ষ পাত করিলেন, কিন্তু ডাক্তারকে যখন হ্যাট অপসারণ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন দেখিলেন, তখন গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “আদালত গৃহে মাথায় হাট রাখা নিয়ম বিরুদ্ধ এ কথা একজন শিক্ষিত সাক্ষীকে স্মরণ করাইয়া দেওয়া লজ্জাজনক।” ডাক্তারের গলদঘৰ্ম্ম হইতেছে, তিনি বুকের পকেট হইতে রুমাল বাহির করিয়া ললাটের ঘৰ্ম্ম অপসারণ করিয়া বলিলেন, “মহাশয়, আমি ইচ্ছা করিয়া মাথায় হাট রাখি নাই, আমার-- সাহেব—“আপনার ইচ্ছাতেই হােক আর অনিচ্ছাতেই হােক কোর্টে আপনার মস্তক উন্মুক্ত করিতে হইবে, ভারতেশ্বরীর বিচার- সনের প্রতি অসম্মান প্রকাশ করিবার আপনার অধিকার নাই।” ডাক্তার—“আমার ইচ্ছা বা অনিচ্ছা—” সাহেব এবার গর্জন করিয়া উঠিলেন, বলিলেন, “আপনার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কথা কোটের জানিবার কোন আবশ্যক নাই, আপনি এই মুহূর্তে হাট খুলিবেন কি না ?” ডাক্তার-“কি বিপদ, কোট কি আমার কথাটা—” জজ সাহেব—ইহা নিতান্ত বেয়াদবী! আমি আপনার কোন কথা শুনিতে চাহি না, আগে মাথা খুলুন, পরে কথা ; আর যদি বিন্দু মাত্র বিলম্ব করেন, তবে আমি আপনাকে ২৪ কুন্তলীন পুরস্কার। ডাক্তার আবেগের সহিত বলিলেন, “মহাশয়, আমার কৈফিয়ৎটা নিয়া—” জজ সাহেব এবার বুটি: এর রূলট। টেবিলের উপর আছড়াইয়া সক্রোধে চীৎকার করিয়া বলিলেন-‘চাপসী, অব উ কে টোপ জোরসে উ তার লাও, পোর, আমি ইহাকে আদালত অবজ্ঞার জন্য কুড়ি টাকা জরিমানা করলাম। পেস্কার জরিমানার ওয়ারেট লিখিতে বসল । চাপড়াসী হুজুরের হুকুমে ডাক্তার সাহেবের হাট খুলিবার জন্য সাক্ষীর কাটরার নিকট উপস্থিত হইল, কি ৪ ভামকান্ত ডাক্তার সাহেবের বিরাট ঘুসি উত্তো- লিত দেখিয়া অগাইতে ভরসা করিল না, এখন তাহার অবস্থাটা অনেক পরিমাণে “না ধরি•ে রাজা বধে ধরিলে ভুজঙ্গ সীতার হরণে যথা মারীচ কুরঙ্গ।" একদিকে জজ সাহেবের হুঙ্কার, অন্যদিকে ডাক্তারের ঘুসি, দুইটাই সমান আতঙ্কজনক-চাপ ছাসী বেচারা প্রমাদ গর্ণিল । জজ সাহেব তাহার হুকুম তামিল হইল না দেখিয়া চেয়ার ছাড়িয়া লাফাইয়া উঠিলেন, চাপড়াসার দিকে চাহিয়া উচ্চৈঃস্বরে হাকিলেন— “চাপড়াসী-গাধা, সুয়ার, তোমার। কডর হ্যায়, জোরসে নেকালাে উসকে টোপী, অবি নে কালো, পেঙ্কার, আমি সাক্ষীকে আরাে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা করিলাম। একে ত ভারি ধুমধামের মকদম, তাহার উপর বড় বড় ব্যারিষ্টার আসিয়াছে ; পূৰ্বেই বলিয়াছি সহরের অধিকাংশ লোেক আসিয়া জড় হইয়াছিল, বিচারের মধ্যপথে বিচার গৃহে এই প্রহসন আরম্ভ হওয়ায় ঘরের দ্বার ও বারান্দায় আর তিল ফেলিবার স্থান রহিল না, সকলের দৃষ্টি ডাক্তারের উপর, ব্যাপার দেখিয়া সকলেই শশব্যস্ত, কিছু বুঝতে না রিয়া সকলেই বিস্ময়াকুল। ডাক্তার সাহেব কিন্তু এত লােকের সাক্ষাতে এরূপ অপনানিত হইয়া একেবারে ক্ষেপিয়া উঠিলেন, তাঁহার চোখ মুখ দিয়া আগুন ফুটতে লাগিল, ললাট বহিয়া টন্ টন্ করিয়া ঘাম ঝরিতে অদল বদল। লাগিল, তাহার ধৈর্য্যের বাধন ছিড়িয়া গেল, জজ সাহেবকে লক্ষ্য করিয়া তিনি উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন,-“পাশ কেন, আপনি এই মুহুর্তে পাচশশা টাকা জরিমানা করুন না কেন, জরিমানার ভয়ে কে কখন অস ধ কৰ্ম্ম সাধন করিতে পারে ? আপনি শুধু রাগই করিতেছেন, বুঝিতে পারি- তেছেন না যে হাটটি আমার মাথার কায়েমীভাবে বসিয়া গিয়াছে ; আমি চেষ্টার ত্রুটী করি নাই, কিন্তু হাজার টানাটানিতেও ইহা খুলিবে । যাহা হউক আমি আপনার আক্ষেপ রাখিব না, দেখুন ইহা অন্য উপায়ে খুলি।” বলিয়া দত্ত সাহেব পকেট হইতে এক খানা ছুরী বাহির করিলেন, এবং তাহা খুলিয়া সােলা-হ্যাটের উপর তাহার অগ্রভাগ বসাইয়। জোরে টানিলেন, তাহার পর সেই ফাকে অঙ্গুলি প্রবেশ করাইয়া সজোরে টানিতে লাগিলেন, সােলা-হাটের ক্ষুদ্র প্রাণ সে বিষম টান সহ্য করিতে পারিল না পড় পড় শব্দে মাথার উপর হইতে হাট উঠিয়া আসিল, মাথায় লুপ্তাবশিষ্ট যে দুই চারি গুচ্ছ কেশ বর্তমান ছিল এই বিপুল টানে তাহাদের ও অস্তিত্ব লােপ পাইল, এবং হাটের এক পরদা সােলা টাকট জুড়িয়া বিরাজ করিতে লাগিল, কি রকম শােভা হইল কিছু অনুমান করিতে পার ?” কমলকৃষ্ণ হাসিয়া আমাকে এই কণ। জিজ্ঞাসা করিলেন। আমিও হাসিয়া উত্তর করিলাম, “তাহা আর পারি না?” ‘ছাদিত শরদভ্রেণ শশি লেখেব দৃশ্যতে', তার পর ? “তাহার পর অ’র কি ? হাসির গররা পড়িয়া গেল ; সাক্ষী দেওয়া শেষ হইলে ডাক্তার অগ্নি-মূর্তিতে আদালত হইতে বাহির হইয়া বন্ধু সাহাকে তেলের সার্টফিকেট দিবার জন্য ঘােড়ার চাবুক হাতে করিয়া ছুটলেন, বন্ধু ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া তাহার সার্টিফিকেটের হাত হইতে সে যাত্রা রক্ষা পাই। ডাক্তার মাথার পঙ্কোদ্ধার করিতে তিনখানা ‘ভিনােলিয়া সােপ' খরচ করিলেন, মাথার গরম দূর করিবার জন্য মাথায় দু বােতল ‘কুন্তলীন’ মালিশ করিতে হইয়াছিল, ইহার পর বােধ করি তাহার মাথা কিছু ঠাণ্ডা হইয়াছে।”
কুন্তলীন পুরস্কার। চতুর্থ পরিচ্ছেদ। কমলকৃষ্ণ বলিতে লাগিলেন, “ডাক্তারের এই ঘটনার পরদিন পাব্রিক ওয়ার্কস্ ডিপার্টমেন্টের ওভারসিয়ার মাথা ও ঘাড় উত্তমরূপে চাদর দিয়া ঢাকিয়া আমার বাসার কাছ দিয়া যাইতেছিল, তখন বেলা আটটার বেশী হয় নাই ; আমি তাহাকে ডাকিয়া তামাক খাইতে বসাইলাম, দেখি বেচারা মাথায় পাকড়ি ‘ঙ’ হইয়া ঘাড় উচু করিয়া বসিল, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম তােমার মাথায় কি কোন রকম বেদনা হইয়াছে, না ঘাড়ে ফিক্ লাগিয়াছে ? ওরকম করিয়া চাদর জড়াইয়াছ কেন ?' ওভারসিয়ার বলিল, ‘মহাশয় দুঃখের কথা আর কি বলিব, বন্ধু সাহা নামক একটা হাতুড়ে এই সহরে ‘কুন্তল তৈল’ নামে একটা তেল আবিস্কার করিয়াছে। কাল রাত্রে তাহাই একটু মাথায় দিয়া শুইয়াছিলাম, মধ্যে মধ্যে আমার মাথাটা ঘােরে, ভাবিলাম, তেলটা বােধহয় ভাল, সস্তাও কটে। তেলটি মাথায় মালিশ করিবার সময় আমার চাকর বলিল ‘ভারি আঠালাে তেল’, আমার দুর্ব দ্ধি আমি বলিলাম, ‘আঠালাে হােক, ভাল করে মালিশ কর। সে মাথার কাছে আধ ঘণ্টাটেক বসিয়া মালিশ করিল, আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম ; সকাল বেলা উঠিয়া দেখি, বালিশ ট মাথার সঙ্গে দিব্য জোড়া লাগিয়া গিয়াছে, কষ্টে সৃষ্টে বিছানায় উঠিয়া বসিলাম, বালিশটও যিশুখৃষ্টের ক্রুশ কাষ্ঠের মত মাথার সঙ্গে আড় হইয়া বাধিয়া উঠিল। কি করি, অনেক বিবেচনার পর খােল-হইতে বালিশটা খুলিয়া ফেলা হইল, কিন্তু ওয়াড় ত মশায় আর কিছুতে মাথা ছাড়িতে চায় না, বিস্তর টানাটানি করিয়া দেখা গিয়াছে, আর এ বেশে বাহিরই বা হই কি করিয়া ? অগত্যা ঘাড়ে মাথায় চাদরটা জড়াইয়া একবার সেই ‘রাসকেলের কাছে যাইতেছি, অবস্থাটা একবার তাহাকে দেখাইয়া আসি। এমনি রাগ হইতেছে, বেটাকে ঘা কত দিয়া আসি আর বলিয়া আসি যে যদি আমার মাথার এ আটা না ছাড়াইয়া দেয় ত তার নামে ক্ষতি পূরণের মােকদ্দমা আনবাে.।”—ওভারসিয়ার চলিয়া গেল, কিন্তু বন্ধু সাহার যেরকম সুখ্যাতি বাহির হইয়াছিল, তাহাতে তাহাকে হাজির পাওয়া 4, অদল বদল । ২৭ সহজ হইল না। ইহার দিন কয়েক পরে যখন তাহার ‘কুন্তল তৈল’- রূপি ‘উদরাময়ের মহৌষধ সেবন করিয়া দুই জন লােক মরিল, আর দুই জন সরকারী ডাক্তার খানায় আসিয়া মরণাপন্নভাবে তিন চারি দিন কাটাইয়া ডাক্তারের বিশেষ চেষ্টায় বাচিয়া উঠিল, তখন চারি দিকে একটা মহা হুলস্থূল পড়িয়া গেল, তাহাকে arrest করিবার জন্য ম্যাজিষ্ট্রেট ওয়ারেন্ট বাহির করিলেন। কিন্তু তাহার পূর্বেই যে সে কোথায় গা ঢাকা দিয়াছে, পুলিশের সাধ্য নাই যে তাহাকে খুঁজিয়া বাহির করে ! তাহার অন্তর্ধানের পর তাহার বাসাখানা তল্লাসী করা হইয়াছিল, পাওয়া গিয়াছে কি জান? গােটা কত কেরােসিনের বাক, একখানা ভাঙ্গা চৌকি, সরলজ্বর চিকিৎসা, বিশুচিকা দর্পণ, বৈজ্ঞানিক সামগ্রী প্রস্তুতের সহজ উপায়, প্রভৃতি কয়েকখানা পুথি, আর তাহার মহৌষধ কয়েক ডজন, এ সকল জিনিস এখন ম্যাজিষ্ট্রেটের নাজিরের জিম্বায় আছে। এ সকল জিনিষ যখন লইয়া যাওয়া হয়, তখন তাহার তুলে বাহির করা ময়লা বালিশটার নীচে দুখানা পত্র পাওয়া গিয়াছে, পত্ৰ দুখানা ভারি মজার, দেখিতে ইচ্ছা কর ত কাল এক সময় ম্যাজিষ্ট্রেটের কোটে যাইও, হেড় ক্লার্কের কাছ হইতে লইয়া দেখাইব।” পরদিন কোর্টে গিয়া পৰ দুখানি দেখিয়া আসিলাম, দেখিলাম একখান বহরমপুর হইতে আর একখান বর্ধমান হইতে আসিয়াছে। আমি হে ক্লার্ককে বলিয়া একটা কাগজে পেন্সিল দিয়া পত্ৰ দুখানা নকল করিয়া লইলাম। বদ্ধমানের পত্রখানি এইরূপ:- মার্ণবরেষু। মহাসয়, এই কলীজুগে হরেক রকম জুআচুরির কতা হামেসা শ্রেবন করিআ আসিতেছি। কিন্তুক এ রকম জুআচুরি এই প্রেথম দেখিলাম। অন্য জুআচোরেরা ধন লইয়া খ্যান্ত হয় কিন্তুক আপুনি প্রান পর্যন্ত নষ্টো করিবার উপক্ৰোম কৰিআছেন। আমার মাতা ঠাকুরানি কিছু কাল জাবদ পেটের পীড়েয় কষ্টে পাইতেছিলেন, বিধায় আপনার উদরাময়ের মহৌসদের বিজ্ঞাপন দ্রিষ্টেঐ মহৌসদ আনা- ২৮ কুন্তলীন পুরস্কার। ইআ তাহাকে সেবন করিতে দিই, একবার সেবনের পর পীড়ে উপসােম হওয়া দুরের কথা তিনী ক্রেনস। তাে ভেদ বমীতে অস্থির হইআ পড়িলেন, অগত্যে ঔসদ বন্দ করি আছি। যাহা হইবার হই আছে, মাতাঠাকুরানি পদ্ম, পুন্যিফলে এ জাত্রা রইধ্যে পাই আছেন, আমার কাছে ফাকা দি আ যে দান আদায় করি আছেন, পত্রোপাট তাহা ফেরত পাঠাইবেন, নচেৎ আমী বঙ্গোবাসী পত্রিকায় আপনার জুআচুরির কতা প্রেকাশ করি আপত্রে লিখিবো জানিবেন, অধীক লেখা বাহুল ইতি- নি; 2 নিত্রান পরামাণিক। দ্বিতীয় পখানি আরো অত, ভাষা এত পরিশুদ্ধ না হইলেও ইহা অপেক্ষা তাহাতে অধিক রস আছে, তাহা এই ; শ্ৰীযুক্ত বি, বি, সাহা এও কোণ মালদহ। মহাশয়, আমার পুএ এ মান্ কৃষ্ণকিশাের সান্যাল আপনার কুন্তল তৈলের বিজ্ঞাপন দেখিয়া ভ্যালুপে এবল ডাকে ঐ তৈল এক শিশি আনাইয়া লইয়াছিল, কিন্তু আমার নিকট এ কথা প্রকাশ করে নাই শুনিয়াছি ঐ তৈল মালিশ করিলে কেশহীন স্থানে কেশােত হয়, এই কথা বিজ্ঞাপনে পাঠ করিয়াই সে এ কাজ করিয়াছে ; বাবাজীর মাথায় কেশ প্রচুর আছে, কিন্তু তাহার অষ্টাদশ বৎসর বয়স হইল, এ পর্যন্ত দাড়ি গোঁফের কোন চিহুমাত্র প্রকাশ না হওয়ায় বাবাজী কিঞ্চিৎ ব্যতিব্যস্ত হইয়া তাড়াতাড়ী দাড়ী গোফ লাভের আশায় মুখ মণ্ডলে মালিশ করিবার অভিপ্রায়ে ঐ তৈল আনাইয়াছে, এবং মুখে এক দিন মাত্র মালিশ করিয়াছে, ঐ এক দিনের মালিশেই তাহার মুখে চিরস্থায়ী কালাে বার্ণিসের পত্তন হইয়াছে, পিয়ার্সের সাবান দূরের কথা, নারি- কেলের ছােবড়া ঘসিয়াও সে বাণিস চটাইতে পারিলাম না; বাবাজীবন লােক সমাজে মুখ দেখাইতে অক্ষম ইইয়া বাড়ীর ভিতরেই সৰ্ব্বদা বাস করিতেছেন, এবং কয়েক দিন হইতে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হইয়াছে। তৈলের খােসবাের্টও অতি চমৎকার, বােধ করি ইহার মধ্যে কয়েক ।
অদল বদল।
ফোঁটা করিয়া ছারপােকা, তেলাপােকা, এবং ঝেলােপোকার আরক
আছে, যাহা হউক কয়েক দিন ধরিয়া মুখের উপর এসেন্স দেলখােস’
লাগাইয়া গন্ধটাকে নষ্ট করা গিয়াছে, কিন্তু বঙ্গটি কিসে অনুহিত হয়
তাহা লিখিলে পরমােপকৃত হইব। দাম আর ফেরত চাই না।
আপনার এ ব্যবসায় কত দিনের? সাবধান হইয়া ব্যবসায় চালাইবেন,
নতুবা পেটের দায়ে পিঠে বিস্তর খাইতে হইবে। ইতি---
। নবকিশাের সান্যাল।
আমি পত্ৰ দুখানি নকল করিয়া লইয়া হেড ক্লার্ককে ফেরত দিয়া
বলিলাম, “মহাশয় বন্ধু সাহার আসল বা কোথায় জানেন কি ?”
ক্লোক বলিলেন, “শিব , এখান হইতে এগারো বারো ক্রোশ
হইবে, গঙ্গা তীরবর্তী সমৃদ্ধ গ্রাম, ইচ্ছা করেন ত ইমরে যাইতে পারেন,
আই, জি, এস, এ, কে |পনার তিলােত্তম।' ইমার আজ বেলা
চারিটার সময় সিরাজগঞ্জ ছাড়িবে ।"
আমি প্রথমে মাজিট ও তাহার পরে পুলিশ সুপারিটেনডেন্ট
সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া সেই দিনই মারণােগে সিরাজগঞ্জ
যাত্রা করিলাম। সিরাজগঞ্জে বন্ধু সাহার বিস্তর অনুসন্ধান করিলাম,
সেখানে তাহার নিজের ঘরবাড়ী কিছুই নাই, লােকট। মামার বাড়ী
থাকিত, কিন্তু এই ঘটনার পর হইতে একেবারে নিরুদ্দেশ।
: দীনেন্দ্রকুমার রায়
বারাে, গায় কাড় রাজ্য।
=
তৃতীয় পুরস্কার ১৫, অবগুণ্ঠিতা। মাতা অনেক চেষ্টা করিয়াও মেয়ের চরিত্র সংশােধন করতে পারিলেন না। দুই বৎসরের কন্যা শৈলবালাকে লইয়া জননী বামাসুন্দরী বিধবা হন। স্বামী রামজীবনের অবস্থা নিতান্ত মন্দ ছিলনা; নগদ অর্থ ও যৎকিঞ্চিৎ ভূসম্পত্তি রাখিয়া তিনি পরলােক গমন করেন। সরিকী মােকদ্দমায় জমিটুকু রক্ষা করিতেই বামাসুন্দরীর নগদ অর্থ গুলি নিঃশেষিত হইয়া যায়। সে আজ দশ বৎসরের কথা; এক্ষণে এই যৎকিঞ্চিৎ ভূসম্পত্তি ও কন্যা শৈলবালাই বিধবার একমাত্র সম্বল; তিনি ভাবিয়াছিলেন, কন্যাটীকে গুণবতী করিয়া যােগ্য পাত্রে সমৰ্পণ করিতে পারিলেই তাহার সাধ ও কর্তব্য পূর্ণ হয়। কিন্তু মায়ের শত চেষ্টাতেও মেয়ে মায়ের মনের মত হইল না। শৈলর গুণের চেয়ে রূপের ভাগই বেশী ছিল। নিভৃত কাননের এক প্রান্তে বন-মল্লিকার শুভ্র কুটলি যেমন আরণ্য. প্রকৃতিকে খণ্ড সুষমায় অলঙ্কত করে, তাহার ও অপূর্ব রূপ রাশি বিধবার জীর্ণ কুটীর শত শশাভায় শশাভিত করিয়া রাখিয়াছিলন। শৈলর ক্ষুদ্র হৃদয়টুকু তাহার এই অপরূপ রূপগর্বে সর্বদা স্ফীত হইয়া থাকিত। সে পৃথিবীতে আর কাহাকেও আপনাপেক্ষা সুন্দরী মনে করিনা, এবং গ্রাম্য বালিকা বিদ্যালয়ের সতীর্থ বালিকা বৃন্দের সহিত প্রতি কথায় তাহার নাসিকাদেশ ও যুগল কুন পূৰ্ব্বক যথাসাধ্য পরস্পর সন্নিহিত ইয়া এই ভাই প্রকাশ করিত। শৈলর সঙ্গে কথায় কাহারও আঁটিয়া কুন্তলীন পুরস্কার। ৩১ উঠিবার সাধ্য ছিলনা। মা যাহা বলিতেন শৈল তাহার বিপরীত করিয়া বসিত। বামাসুন্দরী একাকিনী গৃহকাৰ্য্য করিয়া উঠিতে পারিতেন না। শৈল কোন দিন ভুলিয়াও তাঁহার সাহায্য করিত না। শৈলবালা আপনার ইচ্ছামত বিদ্যালয়ে “গুরুমার” নিকট “উপস্থিত হইয়া বাকী সময় টুকু রায়েদের বকুল বাগানে, মুখুয্যেদের বাঁধা ঘাটে এবং ভুলু চাষীর ছােলার ক্ষেতে পুরুষােচিত ক্ষমতা ও গুণ বিস্তার করিয়া কাটাইয়া দিত। মাত। যদি কোন দিন শাসন করিতে গিয়া বলিতেন “শৈল, যেটের বাছ। তুই সােমত্ত মেয়ে হতে চল্লি, এখনও কি তাের বুদ্ধি সুদ্ধি হ'ল না? অমন করে পথে ঘাটে বেড়ান আর ভাল দেখায় না। এত বড় মেয়ে হলি, খড়গাছি ভেঙ্গে দু’খান কত্তে শিলি না, আজ বাদে কাল পরের ঘর করবি, শাশুড়ী ননদে লাথি ঝাঁটা খেতে খেতে তাের জিউ যাবে, ল ক্ষী মা, বতরিবংগুলাে ছাড়”,-তাহা হইলে সেদিন মেয়েকে পড়া হইতে খুজিয়া আনিতে এবং ভাত খাওয়াইবার জন্য সাধিতে সাধিতে মাতাকে অনেকখানি বেগ পাইতে হইত। ২ ) পাত্র পাত্রীর রূপ গুণ থাক বা না থাক্-বঙ্গদেশের অত্যুব্বর মৃত্তিকার গুণে তাহাদের বিবাহলতা সামাজিক “শুভঙ্করের” আৰ্যানু- সারে যথা সময়ে পুষ্পবতী হইতে ভুলেনা ! শৈলবালা “বিবাহ” অপেক্ষা বসু মহাশয়ের “নূতন পাঠ” এবং রায় মহাশয়ের বকুল গাছটীকেই” বেশী বুঝিত। কিন্তু “পাড়া পড় সীর” চোখে যে ঘুম ছিল না, সেজন্য একঘরে হইবার ভয়ে বামাসুন্দরী শৈলর পাত্ৰান্বেষণে বিলম্ব করা যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে করিলেন না। কে মনে করিয়াছিল, অসহায় দরিদ্রা বিধবার এমন অপদার্থ কন্যাটীকে গ্রাম্য-জমিদার-পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ স্বয়ং বিবাহ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিবেন ? আজ কাল প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায়, পিতামাতা যখন উপাধিধারী পুত্রের বিবাহের জন্য পণ ও যৌতুকের লম্বা লম্বা ফর্দ প্রস্তুত করিতে ব্যস্ত থাকেন, তখন পুত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল SS6 ৩২ কুন্তলীন পুরস্কার। পুস্তক-প হইতে আপনার শান্ত নয়ন যুগল উৎসারিত করিয়া একটু সৌন্দর্যের জন্য ইতস্ততঃ প্রধাবিত করেন এবং ভাবী পত্নীর সহিত “সূর্যমুখী”, “কমলমণি” অথবা “ভ্রমরের” সাদৃশ্য পাইতেই অধিকতর ব্যগ্র হন! শৈলবালার সেই আধ-প্রস্ফুটিত সৌন্দর্যের অপূৰ্ব্ব মাধুরী কোন্ শুভক্ষণে সত্যেন্দ্রকে মুগ্ধ করিয়াছিল, কুসুমেষ মকরকেতনই কেবলমাত্র তাহা অবগত আছেন ! জমিদার পুল জামাতা হইবেন, বামাসুন্দরী স্বপ্নেও ভাবেন নাই । পাত্রপক্ষ প্রস্তাব করিবামাত্র তিনি সাদরে স্বীকৃত হইলেন। নাথের ন্যায় বিদ্বান্, ধনবান, সুরূপ, সচ্চরিত্র পাত্রে কন্যাদান করিয়া তাহার আবৈধব্যের মনােবাঞ্ছা পূর্ণ করিলেন। ষে রূপরাশি বন্য বকুলের অযত্ন থিত মালিকাতেই শতগুণে বর্ধিত হইত, তাহা আজ পুষ্পরাগগচিত সুবর্ণহারে সংযুক্ত হইয়া স্বামিহ প্রদ্যোদিত করিল । ( ৩) গ্রামের অর্ধেক খানি জায়গা জুড়িয়া জমিদার অন্নদাগােবিন্দের বৃহৎ ভবন। রাজধানীর ধনি-প্রসাদের ন্যায় ইহা শ্বেত মর-স্ফটিক খচিত, সুরুচিসম্পন্ন (?) চিত্রাবলী পরিশােভিতা মনােহারিণী অট্টা- লিকা না হইলেও ইহাতে গ্রাম্য সৌন্দর্যের অভাব ছিল না ! পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাই এই সৌন্দর্যের প্রধান উপাদান। “ড়েনের গ + ম্যালে- রিয়া” ইহার ত্রিসীমানায় পদার্পণ করিতে পারিত না । সুস্বচ্ছ সরােবর সমূহ, তাহার চতুষ্পশ খর্জুর তাল নারিকেল বৃক্ষ সমাচ্ছন্ন; প্রত্যেক প্রকোষ্ঠের পর সুদৃশ্য উপবন বিচিত্র বর্ণ কুসুমে পরিশােভিত। মধ্যে মধ্যে আম, কঁাটাল, কদলী প্রভৃতি আবশ্যকীয় বিটপি-শ্রেণী। কোথায় ও সুশীতল বাপী-সলিলে রাজহংস ক্রীড়া করিতেছে, কোথায়ও বা সুমন্দ মলয়ানিল সঞ্চালিত রক্ত পদ্ম-থর !– এই কবিজনারাধ্যা। প্রকৃতি সুষমার তুলনা কোথায় ? নিদাঘ অপরাহু শেষ প্রায় । অন্তপুর দীঘিকার কালো জল ঘন বিন্যস্ত আম্র বৃক্ষের ছায়া-পাতে আরও কালাে হইয়াছে। ইতস্ততঃ কমলিনী কোরক ফুটিয়া উঠিতেছে। এমন সময়ে শৈলবালা নিস্তব্ধ অবগুণ্ঠিতা। ৩৩ সােপানাবলী অলঙ্কার ঝঙ্কারে মুখরিত করিয়া জলে নামিল। তাহার নিমজ্জমা দেহ মৃণালে পূর্ণ পরিস্ফুট আনন-পদ্ম প্রাকৃতিক সরােজ- শােভাকে স্নান করিয়া দিল ! সন্ধ্যায় প্রস্ফুট কমল দর্শন সকলের ভাগ্যে ঘটে না ;—কেবল অদূরস্থিত সহকার শাখান্তরালে লুক্কায়িত থাকিয়া একটী ভাগ্যবান সুপুরুষ এই অনৈসর্গিক শােভা সন্দর্শন করিতেছিলেন—তিনি সত্যেন্দ্র নাথ ! হঠাৎ শৈলর দৃষ্টি সেদিকে পড়ল। সত্যেন্দ্রকে দেখিয়া শৈল তাড়াতাড়ি অদ্র বস্ত্র মাথার টানিয়া দিল , তাহার এত সাধের বৈকালিক খােপাটী জলে ভিজিয়। গেল । সত্যেন্দ্র আর আ ত্মগােপন করিয়া থাকিতে পারিলেন না। হাসিতে হাসিতে নিকটে আসিয়া বলিলেন “ছি শৈল, অবেলায় ভিজা কাপড় মাথায় দিও না, অসুখ করবে। শীগগীর ফেলে দেও।” শৈল। তুমি দুষ্টুমী করিয়া আমায় লুকিয়ে দেছিলে কেন? সত্যেন্দ্র। তা না হলে তােমাকে দে«তে পাই কই ? তােমার খালি তিন হাত ঘােমটা দেখে আমার লাভ? শৈল। তবে এখন বিবি সাজতে হবে নাকি ? সত্যেন্দ্র। আচ্ছা আর কোন দিন লুকিয়ে দেব না; এখন ভিজে কাপড় ফেল। ঘােমটা ফেলার কারণ যে শুধু লজ্জা, তাহা নহে; শৈলর সেই বাল। এক গোঁয়ামী এখনও দূর হয় নাই। সে ঘােমটা ফেলা দূরে থাক, আরও খানিক লম্বা করিয়া টানিয়া বেশী জলে সরিয়া দাড়াইল। সত্যেন্দ্র তখন আসল কথা পাড়িয়া বলিলেন “শৈল, তােমায় শুধু লুকিয়ে দেবার জন্য আসিনি, কালই আমি কলিকাতায় যাচ্ছি । ভট্টাচাৰ্য মশায়ের কাছে গিয়াছিলাম, তিনি সন্ধ্যার সময় যাত্রা করিয়া থাকিতে বলিলেন। একটু পরেই চলে যাব, তাই একবার তােমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম ; তাতে এমন যদি অপরাধ হয়ে থাকে বল চলে যাচ্ছি।” শৈলবালা এ সব কথায় নরম হইবার মেয়ে নয়, সে বলিল, ৩৪ কুন্তলীন পুরস্কার। “তা কলিকাতায় যাবে যাওনা ; আমি ঘোটা না খুলিলে কি কল্কাতার রাস্তা খোলসা হচ্ছে না?” সত্যেন্দ্ৰ হতাশ্বাস হইয়া পড়িলেন। সহসা বুদ্ধি করিয়া বলিলেন তা নয় গেলাম, কিন্তু পূজার ছুটীতে আবার সময় তােমার কি কি জিনিষ আনতে হবে তা না জানলে কেমন করে যাই ?” এবার ঠিক জায়গায় ঔষধ পড়িয়াছিল। শৈল নরম হইয়া বলিল “তুমি কি কি আবে আগে বল, তবে কাপড় দেবাে।” সত্যেন্দ্র। তুমি যা চাইবে, তাই দিব। লক্ষ টাকার জিনিষ । কথাট। হটাৎ বলিয়া ফেলিয়া সত্যেন্দ কিছু অপ্রস্তুত হইলেন। কিন্তু শৈলর কাছে কাজের কথা ফাক সাইবার সম্ভাবনা নাই ; সে কথাটী ধরিয়া বলিল “ আমিও তাই চাই—লক্ষ টাকার জিনিন, তার কম হ'লে আর কোন দিন ঘোমটা খুলবাে না। এই নাও” বলিয়া শৈল মাথার কাপড় ফেলিয়া দিল । সলিলসিক্ত হওয়ায় শৈলের রূপ আরও বাড়িয়াছিল ; কুন্তলীকৃত বেণী বহিয়া বারিবিন্দু কপােল ছড়াইয়া পড়িতেছিল, সত্যেন্দ্রনাথ সতৃষ্ণনয়নে এই অপূৰ্ব্ব সৌন্দৰ্য্যসুধা পান করিতে করিতে “তবে আসি, শৈল,বলিয়া বিদায় গ্রহন করিলেন। ৮ ; (. ১. পূজা আসিয়াছে। মেঘ নীল নিল গগনে সুধাকর হাসি- তেছে। দিবসন। প্রকৃতি পূর্ণাঙ্গী ; প্রতি পুষ্পেপুত্রে, প্রতি নদীকল- তানে, প্রতি কোকিল কাকলীতে, প্রতি গিরি-নিঝরে তাহার অতুল সৌন্দর্য, উছলিয়া পড়িতেছে ! গ্রাম, পথ বহিয়া একখানি গোশকট চলিয়াছে। গাড়ােয়ান এক- বার গরুর লেজগাছি মলিয়া দিয়া “মর, মর এদিকে” বলিতেছে ; কখন ও হস্তস্থিত চ য়ঁর জুখানির সহিত গাে-বেচারীর পৃস্থিত চম্মে র বল পরীক্ষা করিতেছে ! ভিতরে একটী যুবক আরােহী। তাঁহার মলিনতাক্লিষ্ট মুখমণ্ডল দেখিয়া বুঝা যায় কোন বিষাদপূর্ণ চিন্তা তাহাকে এই শারদীয় প্রকৃতির সুখ-উপভােগ হইতে বঞ্চিত করিয়া অবগুণ্ঠিতা। রাখিয়াছে। যুবক আপনার পকেট হইতে একখানি পঠিত পত্র বাহির করিয়া পুনরায় পড়িতে লাগিলেন :- “প্রিয়তম ! তোমার পত্রে জানিলাম, তুমি শীঘ্রই বাড়ী আসিতেছ। সেইদিন পুকুরের ধারে ঘােমট। ফেলার প্রতিজ্ঞাটী মনে আছে ত ? সেইটী স্মরণ করিয়া দেওয়ার জন্যই এই পত্র লিখিলাম ! লক্ষ টাকার জিনিষ ভুলােনা নেন, তাহা হইলে তােমার সঙ্গে আড়ি। ইতি তােমার প্রেমাকাক্ষিণা শৈল। পত্র পড়িয়া সত্যেন্দ্রনাথ আরও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন ! কি কুক্ষণে তিনি একটী বেফাঁস কথা বলিয়া ফেলিয়া ছিলেন, সেই দিন হইতে “ভাবিতে উচিত ছিল প্রতিজ্ঞ। যখন"-- এই নীতি বাক্যের তাৎপর্য নম্মে মৰ্ম্মে অনুভব করিতেছেন। এবার কলিকাতা গিয়া পড়া শুনাতেও বিলক্ষণ ক্ষতি হইয়াছে। পূজায় বাড়ী আসিবার সময় কলিকাতা বাজারের অদ্ধেক দ্রব্য তিনি পাের্টমেন্টসাং করিয়াছেন, তথাপি প্রতি ক্ষতির পক্ষে যথেষ্ঠ হইল না মনে করিয়া চিন্তিত হইতেছে। দেখিতে দেখিতে গাড়ী জমিদার মহাশয়ের সিংহদ্বারে আসিয়া লাগিল । জিনিষ পত্র তােলর ধূম, ডাক্ হাক্, হৈ চৈ পড়িয়া গেল। পিতা মাতার স্নেহাশীৰ্বাদ-সম্ভাষণ, অনুচরভৃত্যের আদর আপ্যায়িতের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ বাড়ী আসিলেন, কিন্তু তাহার মনে সুখ নাই । ৭ এক হাত ঘােমট। টানিয়া শৈলবাল। সত্যেন্দর শয়ন মন্দিরে প্রবেশ করিল। সত্যেন এক থানি শোেকায় ঠেস দিয়া আকাশ পাতাল ভাবিতেছিলেন। শৈলকে দেখিয়া বলিলেন “শৈল ভাল আছ ?” শৈল। বিধাতা যেমন রেখেছেন। শৈল কিন্তু ওসব বাজে কথায় ভুলছে না, আমার জিনিষ কোথায় ? সত্যেন্দ্র । ঘােমটা না খুলে দিব না। শৈল । না দিলে ঘােমটাও খুলবাে না। } নাই। কুন্তলীন পুরস্কার। সত্যেন্দ্র একটু শুষ্ক হাসি হাসিয়া পাের্টমেন্টের ভিতর হইতে একে একে আয়না, চিরুনী সাড়ী, বডি প্রভৃতি শৈলের পদ প্রান্তে রাখিতে রাখিতে বলিলেন “দেখ দেখি শৈল, এবার আরবারের চেয়ে কত বেশী জিনিষ এনেছি ;-এখন দেহি পদ পল্লবমুদারম্””! শৈল। তা “মানভঞ্জনের” পালাই গাও আর “হনুমানের বস্ত্রহর- নের” পালাই গাও, আমার জিনিষ চাই ই। এই বুঝি তােমার লক্ষ টাকার জিনিষ! আয়না, চিরুনী আর বুঝি কেহ কোন দিন চক্ষে দেখে অত টাকার কথা দূরে থাক্-একটা নুতন জিনিষই বা কই ? সত্যেন্দ্র যেন অকূল সাগরে তীর পাইলেন। তাঁহার মুখমণ্ডল হইতে চিন্তার কৃষ্ণ ছায়া অপসারিত হইল—বলিলেন “আচ্ছা, তার জন্য কি ? এবার তােমার জন্য নূতন জিনিষ ও এনেছি, এখন খুসী হবে তাে ?” তারপর আর একটী বাকা হইতে দুই শিশি ‘কুন্তলীন", ও এক শিশি দেলখো” বাহির করিয়া শৈলর হাতে দিয়া বলিলেন “দেখ কেমন নূতন জিনিষ ; অয়না, চিরুনীই যেন চক্ষে দেখিয়াছ, এমন সুন্দর সুগদি তেল তাে আর চোখে দেখা কপালে ঘটে নাই। এখন ঘােমটা খুলিয়া একটু মাথায় দাও দেখি, তা হলে তােমার গরম মেজাজট। সু ঐ নরম হবে।” শৈল শিশি গুলি হাতে করিয়! নাড়িয়া চাড়িয়া রাগে তাম্বুলরস- রাগরঞ্জিত অধর দুইটী ফুলাইয়া বলিল—“ছাই,তেল, ছেলে ভুলাতে এসেছেন। আমি এ চাই না”—বলিয়া ঘরের মেজেয় শিশি তিনটী সজোরে নিক্ষেপ করিল। শিশি চূর্ণ হইয়া তৈল গুলি সুমসৃণ মেজে বহিয়া ঢেউ খেলিতে লাগিল ! আজ এই প্রথম সত্যেন্দ্ৰ শৈলর ব্যবহারে মর্মাহত হইলেন। তিনি আর কোন বাক্যব্যয় না করিয়া শােফায় আসিয়া বসিলেন। শৈল ও ক্রোধভরে নিজ পালঙ্কে গিয়া শয়ন করিল। এতক্ষণ পঞ্চমীর ক্ষীণ চন্দ্র পশ্চিম গগনে হেলিয়া পড়িয়াছিল তাহার মুচ্ছাতুর মৃদুকররাশি উন্মুক্ত দ্বার ও বাতায়ন দিয়া তৈল-নিষিক্ত মেজেয় পড়িয়া অস্পষ্ট চন্দ্রমণ্ডল সৃজন করিতেছিল । সত্যেন্দ্র বসিয়া । } অবগুণ্ঠিতা । ৩৭ ; বসিয়া এই শােভন শশাভা দেখিতেছিলেন। শৈল ইতঃমধ্যে রাগে ফুলিয়া ফুলিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল; কিন্তু তখনও সে দুই হাতে ঘােমটা ধরিয়া আছে, পাছে কেহ “চুরি করে চায়” ! এ রহস্য দেখিয়া সত্যেরে মনে পড়িতেছিল ‘‘আমার হদয় প্রাণ সকলি করেছি দান, কেবল সরমখানি রেখেছি। চাহিয়া নিজের পানে নিশিদিন সাবধানে সযতনে আপনারে ঢেকেছি।” —ভাবিতে ভাবিতে সত্যেন্দ্রর চক্ষু দুটি মুদিয়া আসিল, তিনি শােফাতেই নিদ্রিত হইয়া পড়িলেন। ( ৬ ) গভীর রজনী। হঠাৎ একটী গুরুতর পতন শব্দে সত্যেন্দ্রর নিদ্রাভঙ্গ হইল। ততক্ষণ চন্দ্রদেব অস্ত গিয়াছেন, প্রদীপও নিবিয়া গিয়াছে। সত্যেন্দ্র অনুভব করিলেন, ঘরের মধ্যে কি যেন নড়াচড়া করিতেছে। তিনি,ভয়চকিতচিত্তে তাড়াতাড়ি উঠিয়া আলাে জ্বালিয়া দেখিলেন একটী অপরিচিত লােক ঘরের মেজেয় পড়িয়া আছে! শিশির চূর্ণিত এক খণ্ড কাচ তাহার দক্ষিণ পাঁজরায় দারুণ বিদ্ধ হইয়া গিয়াছে। স্থানে স্থানে আরও দুই চারি খানি কাচ ফুটিয়াছে। তাহার সর্বাঙ্গ মাখিয়া গিয়াছে। উঠিবার সামর্থ্য পর্যন্ত নাই ! তাহার নিকটে একটী বৃহৎ বােকা পড়িয়াছিল। সত্যেরে চীংকারে বাড়ীর ভূতেরা দৌড়িয়া আসিয়া তাহাকে ধৃত করিল। লােকটী কেবল কঁদিতে লাগিল। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ ও অনুসন্ধানের পর জানা গেল,—সে একটী পাকা চোর। গভীর নিশীথে সত্যেন্দ্রনাথের গৃহদ্বার উন্মুক্ত থাকায় সুবিধা পাইয়া কোন ক্রমে প্রবেশ লাভ করে। তাহার সঙ্গে সুষুপ্তিকর ঔষধ ছিল, তাহার আঘ্রাণ দ্বারা শৈলকে গভীর নিদ্রিত করিয়া তাহার গাত্ৰস্থিত যাবদীয়
কুন্তলীন পুরস্কার।
বহুমূল্য অলঙ্কার এবং গৃহজাত অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্যাদি যাহা পাইয়াছিল
চুরি করিতেছিল। ঘরের খানিক মেজে যে তৈল পিচ্ছিল ছিল, সে
তাহা জানিত না! হঠাৎ পা দেওয়ায় পড়িয়া গিয়া এ দুর্দশা। তাহার
নিকট সেই বােকাটীতে শৈলর সমস্ত অলঙ্কার ও অপহৃত দ্রব্যাদি
পাওয়া গেল। তাহাকে তৎক্ষণাৎ পুলিশে দেওয়া হইল ।
??
পরদিন সত্যেন্দ্ৰ শৈলকে নির্জনে পাইয়া বলিলেন “কি শৈল, লক্ষ
টাকার জিনিষটা বুঝলে ত কেমন ? এখন খুসী হয়েছ !
ইতঃপূৰ্বেই শৈল তাহা বুঝিতে পারিয়াছিল। সে হাসিতে হাসিতে
বলিল “হাঁ, ভাগ্যি তেলটা এনেছিলে, তাই আমার লাখ টাকার
গহনা পত্র গুলাে পেলাম্। এসব দেবতার কাও!''
সত্যেন্দ্র। খবরদার, আর কোন দিন ঘােমট। দিওনা যেন!
খবরদার, আজই আমার জন্য এক ডজন ঐ তেল আনতে
পাঠান হয় যেন!
বলা বাহুল্য উভয়েই উভয়ের এই সাবধান-বাক্য পালন করিয়াছিল।
সুরেশচন্দ্র সাহা
ঘােড়ামারা, রাজশাহী।
চতুর্থ পুরস্কার ১০
দুর্ভাগা।
আমার পিতার নাম তারানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ভাগলপুরে
জজকোর্টের উকিল। ওকালতীতে তাঁহার বেশ পশার ছিল। আমি
পিতা মাতার একমাত্র আদরিণী কন্যা । আমার আর ভাই বােন ছিল
। আমাদের বাড়ীর পাশে আর কোন প্রতিবেশী না থাকায়,
আমার আর খেলার সাথী কেহ ছিল না। আমি নিয়ম মত লেখা পড়া
করিতাম। মায়ের নিকট শেলাই শিখিতাম। বৈকালে পিতার উদ্যানে
বেড়াইতে যাইতাম। আমাদের একটি হরিণ শিশু ছিল। আমি
উদ্যানে গিয়া তাহার সহিত খেলা করিতাম । এইরূপে জীবনের নয়
বৎসর অতীত হইল ।
( ২ )
আজ কয়েক দিন হইল আমার পিতা কোন কাৰ্য বশতঃ কলি-
কাতায় গিয়াছেন।
আজ তাঁর আসিবার কথা। কলিকাতা যাইবার
সময় বাবা আমার জন্য অনেক জিনিৰ আনিবেন বলিয়াছিলেন, সেই জন্য
আমি আনন্দে তাহার আসিবার সময় প্রতীক্ষা করিতেছিলাম। যথা
সময়ে আমার পিতা বাড়ী আসিলেন এবং তাহার সহিত একটা বালক ও
আসিল। ছেলেটি দেখিতে ফুটফুটে সুন্দর বয়স আন্দাজ চতুর্দশ
বৎসর। বাবা মায়ের নিকট ছেলেটীর পরিচয় দিলেন। নাম
নরেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়, পিতার নাম রমানাথ মুখােপাধ্যায়, সওদাগরি
টাকা বেতনে কৰ্ম্ম করিতেন। নরেন্দ্রনাথ অতি
শৈশবে মাতৃহীন । রমানাথ বাবু দ্বিতীয় বার দার পরিগ্রহ করেন
আফিসে ৬০১
৪০
কুন্তলীন পুরস্কার।
নাই। আমার পিতার সহিত রমানাথ বাবুর অত্যন্ত প্রণয় ছিল।
তাঁহারা উভয়ে একত্রে লেখা পড়া করিয়াছিলেন। পিতা কলিকাতা
গিয়া পরদিনই রমানাথ বাবুর সহিত দেখা করিতে যান, গিয়া
দেখিলেন তিনি বিচিকা রােগে আক্রান্ত হইছেন। অনেক
চিকিৎসা সত্ত্বেও তাহার জীবন রক্ষা হইল না। একমাত্র পুত্রকে
অকূল দুঃখ-সাগরে ভাসাইয়া তিনি ইহলােক পরিত্যাগ করিলেন।
মৃত্যুকালে তিন সহস্র টাকা ও নরেন্দ্রনাথকে আমার পিতার হাতে
দিয়া বলিয়াছিলেন, “ভাই তারানাথ ! আমি আমার পুত্রকে এবং এই
টাকা তােমার হাতে দিয়া চলিলাম, তুমি উহাকে দেখিও।”
আহা নরেন বড় দুর্ভাগা।
( ৩ )
নরেন্দ্রনাথু আমাদের বাসায় থাকিয়া লেখা পড়া শিখিতে লাগি-
লেন। আমার জনক জননী তাহাকে পুত্রের ন্যায় স্নেহ মমতা
করিতেন। নরেন্দ্রনাথকে কয়েক দিন আমার পর পর ঠেকিল।
তিনিও আমার সহিত কথা কহিতে লজ্জা বােধ করিতেন। কিছুদিন
এইরূপে কাটল ।
এখন নরেন্দ্রনাথের সহিত আমার খুব ভাব। তাহাকে আমি
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার ন্যায় ভালবাসি এবং দাদা বলিয়া ডাকি। তিনি
আমার নাম করিয়া অর্থাৎ বিনাপাণি বলিয়া ডাকেন। আমরা একত্রে
লেখা পড়া করি। একত্রে আহার ও একত্রে ভ্রমণ করি।'
এইরূপে আমার জীবনের আরও পাঁচ বৎসর অতীত হইল।
আমার বয়স এখন চতুর্দশ বৎসর। আমি আজও অবিবাহিতা। জানি
কেনআজও আমার বিবাহ হয় নাই। আমার পিতার অর্থের
অভাব ছিল না, আর আমি কুৎসিতাও নই। আমাকে সকলেই
সুন্দরী বলিত। তবে কেন যে আমার বিবাহে এত বিলম্ব
হইতে লাগিল তাহা বলিতে পারি না। এত বড় মেয়ে অবিবাহিতা
বলিয়াযৈ আমার পিতা মাতার ভাবনা আছে সেরূপ বােধ হইত না।
আমারও বিবাহের কথা বড় একটা মনে হইত না।
দুর্ভাগা। ৪১ ( ৪ ) এইরূপে পিতা মাতার স্নেহে ও আদরে আমার দিন যাইতে লাগিল। এখন আমি একলাই থাকি। নরেন্দ্রনাথের সহিত আমার বড় একটা সাক্ষাৎ হয় না। নরেন্দ্রনাথ এখন যৌবনে পদার্পণ করি- য়াছেন। আর আমিও নিতান্ত বালিকা নই। এরূপ স্থলে তাহার সহিত সৰ্ব্বদা সাক্ষাৎ হওয়া উচিত নয়, তাহা আমি বুঝিতাম । তবে নরেন্দ্র যখন অন্দরে আসিতেন তখন দাদা বলিয়া তাহার নিকট যাইতাম। তাঁহার কাছে পড়া বলিয়া লইতাম। কিন্তু নরেন্দ্রনাথ আমার সহিত কথা কহিতে দেন সঙ্কুচিত হইতেন। পড়া বলিয়া দিতে গেলে প্রায়ই গােলমাল হইয়া যাইত, প্রায়ই ভুল করিতেন। আমি যখন তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া পড়া বলিতাম তখন তিনি অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া থাকিতেন। আমি পড়া মুখস্থ করিতে করিতে চাহিয়া দেখিতাম তিনি সস্নেহ দৃষ্টিতে আমায় দেখিতেছেন। আমি দেখিতে পাইলাম, দেখিয়া অপ্রস্তুত হইতেন। ( ৫ ) একদিন বৈকালে আমি খিড়কীর বাগান হইতে বাড়া আসিয়া জননীকে দেখিতে পাইলাম না। উপর নাচে সক ল গৃহ অনুসন্ধান করিয়া কোন খানে তাহাকে না দেখিয়া ছাতে উঠিলাম । নরেনের সহিতই বাণার বিয়ে দাও" হঠাৎ জননীর এই কথা আমি শুনিতে পাইলাম। আমারই বিবাহের কথা হইতেছে শুনিয়া আর অগ্রসর হইলাম না, সেইখানে দাঁড়াইয়া শুনিতে লাগিলাম। অনুমানে বুঝি- লাম পিতাও তথায় আছেন। শুনিলাম পিতা বলিলেন—“বীনাপাণির সহিত নরেন্দ্রনাথের বিবাহ হইতে পারে না। আমার একমাত্র কন্যা ধনীর গৃহে বিবাহ দিব, শ্বশুর শ্বাশুড়ী থাকিবে, সাধ আাদ করিবে। নরেন্দ্র ছেলে ভাল হইলেও উহার তিন কুলে কেহ নাই। নরেনের সহিত বীণার বিবাহ দিতে তুমি আর আমায় বলিও না।” মা বলিলেন—“তােমার যখন মত নাই তখন আমি আর কি বলিব। কিন্তু নরেন্দ্রের সহিত বিবাহ হইলে ভালই হইত। উহারা ৪২ কুন্তলীন পুরস্কার। মন্দ ঘর নয়। আমার বড় ইচ্ছা উহার সহিত বীণার বিয়ে দি। নরেন দেখিতে যেমন সুন্দর তেমনি শান্ত। দুইটা পাশও দিয়াছে। আর তাহা হইলে মেয়েকে শ্বশুর বাড়ী পাঠাইতে হইবে না। আমাদের ঐ এক- মাত্র মেয়ে, উহাকে শ্বশুর বাড়ী পাঠাইয়া কি লইয়া সংসারে থাকিব -বলিতে বলিতে মার কথা জড়াইয়া আসিল। অনুমানে বুঝিলাম মা কঁদিয়া ফেলিলেন। বাবা বলিলেন—“মেয়ে শ্বশুর বাড়ী পাঠাইতে কষ্ট হইবে বলিয়) কি হইবে । কন্যা চিরদিন শ্বশুরালয়ে থাকে ইহাই ত পিতা মাতার প্রার্থনা। চিরকাল পিত্রালয়ে থাকে ইহা প্রার্থনায় নহে । তুমি বলি- তেছ নরেন্দ্র ভাল ছেলে। নরেন্দ্র যে সচ্চরিত্র ও বিদ্বান অবশ্য তাহা আমি স্বীকার করি। কিন্তু তাই বলিয়া যে আমার কন্যার সহিত তাহার বিবাহ দিতে হইবে তাহার কোন মানে নাই। আমি উহা অপেক্ষা ভাল ছেলে দেখিয়া বীর বিয়ে দিব। নরেন্দ্রনাথকে আমি পুত্রের ন্যায় স্নেহ করি। উহার যাহাতে ভাল হয় তাহাও আমি করিব । আমি ইচ্ছা করিয়াছি বীণার বিবাহের পরেই একটি সুন্দরী মেয়ে দেখিয়া নরেন্দ্রনাথের বিবাহ দিব । আর আজই কিছু আমি বাবার বিয়ে দিতেছি না। চতুর্দশ বর্ষ উত্তীর্ণ না হইলে বীণার বিবাহ হইতে পারে না। ভাল কথা, সেদিন কলিকাতা হইতে একজন বিখ্যাত জ্যোতিষী আসিয়াছিলেন। আমি তাঁহাকে বীণার অদৃষ্ট গণনা করিতে বলিলাম। তাহাতে তিনিও গণনা করিয়া ঐ কথা বলিলেন'। চতুর্দশ বর্ষে বিবাহ হইলে বীণা নিশ্চয় বিধবা হইবে।” ইহা বলিয়া পিতা গভীর নিশ্বাস ফেলিলেন। বাবার জুতার শব্দে বুঝিলাম তিনি শীঘ্রই নীচে আসিবেন সুতরাং ধরা পড়িবার ভয়ে আমি তাড়াতাড়ি পলায়ন করিলাম। ( ৬ ) জনক জননীর কথা শুনিয়া বুঝিলাম কেন আমার বিবাহ হইতে বিলম্ব হইতেছে। নরেন্দ্রের সহিত আমার বিবাহ হইবে একথা আমি কখন মনে করি নাই, নরেন্দ্রনাথকে ভাল বাসিতাম।
দুর্ভাগ। ৪৩ বটে, কিন্তু সে ভালবাসা অন্য প্রকার। আমি নরেন্দ্রকে ভ্রাতার ন্যায় ভাল বাসিতাম। কিন্তু জননীর মুখে এ কথা শুনিয়া দুই একবার মনে হইয়াছিল ; নরেন্দ্রনাথের সহিত আমার বিবাহ হইলে কি ভাল হয় ? ‘নরেন্দ্রনাথ রূপবান বিদ্বান ও সচ্চরিত্র; এরূপ স্থলে বিবাহ হইলে ভাল হয় বই কি। কিন্তু নরেন্দ্রনাথের সহিত বিবাহ হওয়াটা আমার যেন কেমন কেমনঠেকিল। যাহাকে চিরকাল দাদ। বলিয়া ডাকিয়াছি, দাদার মতনই দেখিয়াছি, তাহার সহিত বিবাহ-ছিঃ ! ( ৭ ) আমি চতুর্দশ বৎসর উত্তীর্ণ হইয়াছি। আমার বিবাহের সব ঠিক হইয়া গিয়াছে। শুনিলাম যিনি আমার স্বামী হইবেন তিনি এম,এ পাশ। আমার ভাবী স্বশুর একজন বড়লোক। বাড়ী কলিকাতায়। বিবাহের কথা শুনিয়া আমার বড় আনন্দ হইল। আমার বিবাহের অার বিলম্ব নাই। পনর দিন মাত্র অবশিষ্ট আছে। বিবাহের জিনিষ পত্ৰ আনিবার জন্য আমার পিতা কলিকাতায় গিয়াছেন। দুই তিন দিন পরে তিনি আবশ্যকীয় দ্রব্য সকল লইয়া প্রত্যাগমন করিবেন। অন্যান্য স্থানহইতে আমাদের আত্মীয়, আমাদের আত্মীয়, কুটুম্ব সকল আসিয়াছেন। আমি পিতা মাতার এক মাত্র সন্তান। কামেই আমার বিবাহে মহা সমারােহ। ( ৮ ) কাল বিবাহ। মা ট্রাঙ্ক পেটার হাত বাক প্রভৃতি সাজাইতে আমার পিতাও তথায় ছিলেন। আমি দাড়াইয়া দেখিতেছিলাম ! দেখিলাম মা দুইটী সুন্দর শিশি আমার বাক্সে রাখিলেন। আমি এসেন্সের অনেক সুন্দর শিশি দেখিয়াছি কিন্তু এমন সুন্দর শিশি দেখি নাই। আমি ব্যগ্র হইয়া মাকে উহার নাম জিজ্ঞাসা করিলাম। আমার কথা শুনিয়া পিতা বলিলেন, ইহার একটা কুন্তলীন—অপরটী এসেন্স দেখােস্; ইহা নূতন উঠিয়াছে। কলিকাতার এইচূ, বস্তু ইহার প্রস্তুতকারক। ইহার সুগন্ধ অতি মনােহর। তাই ছিলেন।
৪৪ কুন্তলীন পুরস্কার। তােমার জন্য আনিয়াছি এই কথা বলিয়া পিতা কুন্তলীন ও দেলখােসের ছিপি খুলিয়া আমায় অনুণে লইতে বলিলেন। আহা কি মনােহর গন্ধ ! সুগন্ধে সে স্থান আমােদিত হইল। আমার আর আমাদের সীমা নাই। যথা সময়ে বর মহা সমারােহ করিয়া বিবাহ করিতে আসিলেন। গোধূলি লগ্নে বিবাহ। খুব সমারােহের সহিত বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াগেল । শুভ দৃষ্টির সময় বর দেখিয়া আমি বড় সন্তুষ্ট হইলাম। বিবাহে নরেন্দ্রনাথ অত্যন্ত উৎসাহের সহিত নানা কায করিয়া- ছিলেন। তাহার যেন খুব অলদ হইয়াছিল। কিন্তু যখন তিনি আমার পিড়ে ধরিয়া সাত পাক ঘুরাইতে ছিলেন, তখন হঠাৎ তার দিকে চাহিয়া দেখি মুখ বড় বিবর্ণ। কে যেন কালী ঢালিয়া দিয়াছে । দেখিয়া আমি চমকিয়া উঠিলাম। সকলে বর কন্যা লইয়া বাসরে যাইতেছে, এমন সময় শুনিলাম নরেন্দ্রনাথ হঠাৎ অচৈতন্য হইয়া গিয়াছেন। শুনিবা মাত্র আমরা তথায় গেলাম। গিয়া দেখি আমার পিতা মাতা তথায় আছেন। নরেন্দ্র অচৈতন্য অবস্থায় বাবার কোলের উপর শুইয়া আছেন। মা বাতাস দিতেছেন। অনেক শু এষার পর তার চৈতন্য হইল। তিনি কিছু অপ্রস্তুত হইয়া বলিলেন, “বড় পরিশ্রম করিয়াছিলাম, গরমের জন্য বােধ হয় এইরূপ হইল। এখন একটু নিদ্রা গেলেই সব ভাল হইয়া যাইবে।” তদনুসারে আমার পিতা একজন ভৃত্য সঙ্গে দিয়া তাহাকে শয়নগৃহে যাইতে বলিলেন নরেন্দ্রনাথ অতৃপ্ত নয়নে একবার আমার দিকে চাহিয়া চলিয়া গেলেন। আমরাও বাসরে গেলাম। পর দিন প্রাতেঃ নরেন্দ্রনাথকে কেহ দেখিতে পাইল না । সকলে মনে করিল কোথায় গিয়াছে এখনই আসিবে। ক্রমে বেলা হইল, তবু নরেন্দ্রের দেখা নাই। পিতা ভাবিত হইয়া নানা স্থানে লােক ‘পাঠাইলেন কিন্তু সকলেই বিফল হইয়া ফিরিয়া আসিল। নরেন্দ্র আসিলেন না, কেহই তার দেখা পাইল না। মা দিতে লাগিলেন। পিতা নিজে অনুস দান করিতে বাহির হইলেন। নরেন্দ্রের
দুর্ভাগা
৪৫
জন্য আমারও বড় কষ্ট হইল। কঁদিতে কাঁদিতে নরেন্দ্রের শয়ন ঘরে
গেলাম। শূন্য গৃহ, নরেন্দ্র নাই। শয্যায় বসিয়া হঠাৎ বালিস তুলিয়া,
দেখি একখানি পত্র আমারই নামে লেখা। ব্যস্ত ভাবে পর খুলিয়া
পড়িলাম—
বীণাপাণি ।
আমি শৈশবে পিতৃ মাতৃহীন হইয়াছিলাম। কিন্তু তােমাদের
বাড়ীতে আমি বড় সুয়ে ছিলাম। আমি মনে মনে একটা দুরাশা
পােষণ করিতে ছিলাম। আমি দুভাগা, আমার সে আশালতা ছিন্ন
হইয়াছে। গৃহবাসে আমার সুখ নাই, তাই গৃহ ত্যাগ করিলাম ।
আমার অনুরােধ তোমরা আমার অ সন্ধান করিও না। আশী-
ৰ্ব্বাদ করি তুমি চিরমুখিনী হইয়া অক্ষর সুথে কালযাপন কর ।
পত্র পড়িয়া মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলাম। চোখের জলে
আমার বুক ভাসিয়া যাইতে লাগিল। আমিও মনে করিলাম—
আহ, নরেন বড় দুর্ভাগা।
মতী সরমা দেবী
মজঃফরপুর ।
পঞ্চম পুরস্কার রঙ্গিয়া। গ্রামের একটী নিভৃত প্রান্তে ক্ষুদ্র বাগবাটা আমাদের বাসস্থান। আমাদের একখানি ক্ষুদ্র একতলা বাড়ী; তাহার সঃখে একটা পুষ্করিণী এবং সেই পুকরির চারিদিকে সুপারি, নারিকেল এবং আম গাছের ঘন শ্রেণা। বাগানের একটা পার পরিষ্কার করিয়া সেখানে দেশ ও বিদেশী ফুলের গাছ লাগাইয়াছিলাম এবং মধ্যস্থলে একটী লতাই আমার চিন্তামন্দির। অন্ন সংস্থানের চেষ্টায় ঘুরিবার আব- গ্যক ছিল না পি তার কোম্পানীর কাগজের সুদেই চলিয়া যাইত। আমি আমার জীবনের অখণ্ড অবসর অধ্যয়ন এবং চিন্তাতে কাটাইয়া দিতে সঙ্কল্প করিয়াছিলাম। প্রতিদিন কাব্যগ্রন্থ লইয়া আমার পুষ্পকুঞ্জে আশ্রয় গ্রহণ করিতাম। কন। ধীরে ধীরে আসিয়া আমার মনকে বিশ্বরাজ্যের কত অনাবিস্কৃত অমরাপুরীতে লইয়া যাইত। কত শকুন্তলা, কত বসন্তসেনা, কত রত্নাবলী, কত মহাশ্বেতা, কত জুলিয়েট, কত মিরা ও আমার সেই ক্ষুদ্র নিকুঞ্জ গৃহখানির চারিদিকে উকি দিত। প্রাণ ভরিয়া কাব্যসুধা পান করিতে করিতে আত্মহারা হইতাম। মেঘমুক্ত আকাশের মধ্য দিয়া পাখী উড়িয়া যাইত-গ্রাম্য পথ দিয়া পথিক সুখ দুঃখের গান গাহিয়া চলিত ; আমার মন চারিদিকের কোলাহল ও ব্যস্ততা উল ওণন করিয়া কোন এক অজানিত দেশে স্বপ্নরাজ্য রচনা করিত । এমনি একটী মধুর ললিতরাগের ধ্বনি লইয়া জীবনের নবউষা জাগরিত হইল। বিশ্বের নিষ্কলঙ্ক সৌন্দর্যমাধুরী আমার জীবন- প্রভাতে ধীরে ধীরে ফুটিয়া উঠিতে লাগিল।
রঙ্গিয়া। ৪৭ তার পর সহসা একদিন চাহিয়া দেখিলাম আমার হদয়-কাননের শত সহস্র কুসুম কাহার নূপুর শব্দে যেন বিকশিত হইয়াছে-কাহার মধুর স্পর্শে যেন স্তবকে স্তবকে অশােক কুরুবক নয়ন মেলিয়াছে। সেদিন সনস্ত বিশ্ব বসন্তের পুলক কম্পনে চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল। মধু কণ্ঠ কোকিল সেদিন মধুর কূজন করিতেছিল; সমস্ত প্রকৃতি কোন এক অজ্ঞাত আনন্দে নেন নাচিয়। উঠিতেছিল। এমনি একটা সুমধুর স্মৃতিজড়িত নির্ণাথে সুকুমারী আসিয়া আমার ঈদয়ে আসন স্থাপন করিল। জংয়। প্লাবনে সমস্ত জগং ভাসিয়া যাইতেছিল—নিশাপের সুপ্ত বক্ষ বাসবাননে আন্দোলিত হইতেছিল—এমনি সময়ে চারি চক্ষুর মিলন হল। হয়, আজ কত দিন পরে জীবনের সে পু: মৃতের কথা মনে পড়িতেছে ! সত্যই কি সেদিন একটা বাড়াবনত ৰাণিকার (কোমল অঙ্গুলি পাশে আমার জীবন তার প্রতি আশা, প্রতি ভরস। মোহন অস্কারে বাজিম। উঠিয়াছিল । কি জানি কি হইয়াছিল ! তবুও যেন মনে ২য় কোন সুখ যেন অতীতের সহিত জড়িত হয়। রহিয়াছে। তাই আজ জীবন-সন্ধায় সেই কনককির মা উনার কথা ভাবিতেছি। কত দিন চলিয়া গিয়াছে ; যে ভাবে জীবন আরম্ভ করিয়াছিলাম সে ভাবে তাহা শেষ করিতে পারিলাম না। মায়ের উজ্জ্বল আলােক নিবিড় ধন ঘটায় আচ্ছন্ন হইয়াছে ; শুধু মাঝে মাঝে সেই অন্ধকার অপসারণ করিয়া আমার সেই হাস্যময়ী সুতি আসিয়া উপস্থিত হয় । আমাদের হৃদয়ে তখন বাসরািগ-রঞ্জিত প্রগাঢ় প্রমাকাঙ্ক্ষা অঙ্কিত ছিল। প্রাণের মধ্যে তখন নবীন সূর্যের সুখস্পশ আলােক অনুভব করিতাম । কি এক অপূর্ব মােহে আমরা সমস্ত বিশ্ব নৃতন সৌন্দর্য্যে ভূষিত দেখিতাম। তখন বুঝি বনদেবী আমাদেরই জন্য কাননে পুষ্পস্তরণ বিতীর্ণ করিত, মন্দ সমীরণ বুঝি আমাদেরই জন্য চম্পক সুগ বহন করিত। জীবনের সেই অভিনব উষা এমনি সুখে 'আরম্ভ হইল। কত সুন্দর পুষ্প বৃক্ষের সহিত আমাদের স্নেহ স্মৃতি ০ ক্ষুদ্র বালিক। ৪৮ কুন্তলীন পুরস্কার। জড়িত হইয়া রহিল—কত শত উপল খণ্ডে আমার সুকুমারীর নাম অঙ্কিত রহিল ! ( ২ ) আমাদের এ আনন্দের সঙ্গিনী ছিল রঙ্গিয়া । তাহার হৃদয়ের অপরিসীম মেহরাশি লইয়া সুকুমারীর পিতৃগৃহ হইতে তাহার সঙ্গে আসিয়াছিল। উত্তর পশ্চিমের কঙ্করময় ভূভাগে জন্ম- গ্রহণ করিলেও তাহার হৃদয় বঙ্গদেশ সুলভ কোমলতায় পূর্ণ ছিল। পিতৃ মাতৃহীন রঙ্গিয়া বাল্যকাল হইতেই সুকুমারীর সঙ্গিনী। সুকুমা- রীর পিতা মাতা রঙ্গিয়াকে কন্যা নিৰ্বিশেষে পালন করিয়াছিলেন ; উভরে এক বৃন্তে দুইটী অপরিস্ফুট কুসুম কোরকের ন্যায় শােভা পাইয়া ছিল। জন্ম জন্মান্তরে বিস্মৃত প্রায় কোনও মেহসুত্রে তাহাদের হৃদয় গাথা হইল কিনা জানি না, কিন্তু যে অপরিসীম স্নেহ, অন্তরের যে দেবভােগ্য সৌথ্য সম্বন্ধে তাহারা পরস্পরকে জড়াইয়া ধরিয়াছিল তাহা এ পৃথিবীর নহে স্বর্গের। রঙ্গিয়া সুকুমারীর হাসি মুখ দেখিলে প্রফুল্লমুখী হইত, আর তাহার মুখে একটু বিষাদ কালিমা দেখিলেই মলিনা হইত। আমাদের মিলনানন্দের মধ্যে সে চঞ্চলা গিরি-নিঝরিনীর ন্যায় হাসিয়া হাসিয়া বেড়াইত। প্রতিদিন সুকুমারীর কেশরাশি “কুন্তলীনে” রঞ্জিত করিয়া দিত, তাহার চূর্ণ কুন্তল “দেলখােসে” সুবাসিত করিত। আম- দের মনে অভিমানের মধ্যে সে অাচিতভাবে প্রণয়ন্তীর অভিনয় করিত ; সুকুমারীকে মনের মত সাজাইত। আড়াল হইতে আমাদের মিলন দেখিত। কিন্তু তাহার এ সকল বাহ্যিক স্নেহ পরিচয় ব্যতীত তাহার হৃদয়ের অন্তঃপুরে নিভৃতে যে সহস্র সহস্র পুষ্প প্রতিদিন মধুর আনন্দ-কিরণপাতে ফুটিয়া উঠিত তাহা লােক চক্ষুর অগােচর হইলেও দুর্লভ এবং আদরণীয়। এইরূপে আমাদের জীবন কাটিতে লাগিল। তখন ভাবিতাম এ সংসার বুঝি কেবল সুখেরই স্থান, এখানে বুঝি কেবল প্রণয়ের অস্ফুট ও কোমলকিপােত কুজন, এখানে বুঝি কেবল অসীম সৌন্দৰ্য্য এবং রঙ্গিয়া । ৪৯ বিশ্বের অনন্তকালব্যাপী সঙ্গীতই নিরন্তর বাজিতেছে । তখন জানি- তাম না যে পৃথিবীর এ মিলনের মধ্যে কেবল একটা করুণ বিরহ- বেদনা জাগিতেছে, তখন জানিতাম না যে অনন্ত জীবন সঙ্গীতের মধ্যে কেবল মরণ ঝঙ্কারই বিরাজ করিতেছে। অবশেমে এমন দিন আসিল নেদিন জীবনের সে ভুল বুঝিলাম । এক শারদীয় পূর্ণিমা রজনীতে আমরা আমাদের ক্ষুদ্র “জলিবােট" খানি সরােবরে ভাসাইয়া দিলাম । শৈবাল বিকীর্ণ সরােবর তলে জোৎস। ঘুনাইয়া পড়িয়াছিল, দাড়ের শব্দে সহসা জাগরিত হইল এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীচিমালায় আরােহন করিয়া চঞ্চল বালিকার মত সরােবর বঙ্গে বিচরণ করিতে লাগিল। আমি দা ড় টানিয়া বােটখানিকে মধ্য সরােবরে লইয়া গেলাম। দাড় ছাড়িয়া দিয়া বসিলাম। সুকুমারী আমার বঙ্গে মাথা রাখিয়া জ্যোৎস্নামধুর গগন পানে তাকাইয়া রহিল। মন্দান্দোলিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গমাল। আমাদের বােটে আঘাত করিতে লাগিল। আমার বক্ষে সুকুমারীর অনিন্দ্য সুন্দর মুখ তাহার উপর চন্দ্রকিরণ ক্রীড়া করিতেছিল, দূরে পাপিয়ার নিশীথ সঙ্গীত মিশাইয়া যাইতেছিল। তীরে কুসুম কুঞ্জে আলো ও ছায়ার শুভ সন্মিলন। সেই আলে৷ সেই ছায়া এব তরঙ্গমালার সেই অকুট ধ্বনিতে সেইখানে এক অপূৰ্ব্ব কবে ব সমাবেশ হইয়াছিল। ধীরে ধীরে সুকুমারী মাথা তুলিয়া বলিল—“প্রিয়তম, আমরা আমাদের জীবন-তরণী কি এমনি মধুর জ্যোৎস্না মধ্যে বাহিয়া লইয়া মাইতে পারিব ?" আমার মনে কি হইতেছিল ? আমি দেখিতেছিলাম এমন মধুর সংসার, এমন মধুর রজনী ঐ দূরাবলম্বী কালো এক পানি মেঘ উহা কি এক মূহুর্তে এই জ্যোংয়। এই আলো নিভাইয়া দিতে পারে না ? সুকুমারী ধীরে ধীরে আবার বলিল—“প্রিয়তম, আমার কি ইচ্ছা হয় বলিব ?” আমি তাহার মুখের পানে তাকাইয়া রহিলাম । সুকুমারী বলিল—“আমার ইচ্ছা হয় এই মধুর দৃশ্যে এমনি সময় এমনি করিয়া তােমার বক্ষে মাথা রাখিয়া মরি।” একটা শােকপূর্ণ হহারব গগন বিদীর্ণ করিয়া চলিয়া গেল। আমার চক্ষে জল আসিল। ৪ কুন্তলীন পুরস্কার। সুকুমারী- আমার চক্ষের জল মুছাইয়া দিয়া বলিল—“ছি প্রিয়তম, কাদি ও না; তােমায় ছাড়িয়া যাইতে কি আমার ইচ্ছা হয় ?” ৩ কিন্তু জানি না সেই রাত্রি হইতেই আমার মন যেন কেমন উদাস হইল । সুকুমারীর প্রতি হাসি প্রতি কথাতে যেন একটা বিষাদের সুর অনুভব করিতাম । মনে হইত আমার হৃদয়ের একটা স্থান যেন অপূর্ণ হইতে চলিয়াছে। সুকুমারীকে সর্বদা চক্ষে চক্ষে রাখিতাম। সুকুমারীও আমার মনের দুশ্চিন্তা দূর করিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিত; কিন্তু সেই পূর্ণিমা রজনীতে আমার হৃদয়ে যে কালিমা পড়ি ছিল তাহ। আর কিছুতেই অপসৃত হইল না। সুখের অবসরে দুঃখের চিন্তা করিতে করিতে পৃথিবীর উপর দিয়া একী বংসরের তরঙ্গ চল না গেল। কোন সুখ সুপ্ত হৃদয়ে বিষাদের জাগর। আসিল, কোন পুষ্পময় উপবন দগ্ধ হইল, কোন মাধবী লতিকা ছিন্ন হইল, তাহা দেখিবার জন্য, বর্ষ-তরঙ্গ থামিল না ; ধীর গতিতে অনন্ত কাল-সাগরে গিয়া মিশিল । বর্ষ শেষে আমি চাহিয়া দেখিলাম আমারও মধুস্বপ্ন ভাঙ্গিয়াছে। পূর্ণ বরষার যৌবন প্লাবন শেষ না হইতে হইতে সুকুমারী শয্যা শায়িনী হইল সুখত ধরণীর বক্ষে শরতের প্রস্ফুট আলােক না পড়িতে পড়িতে আমার সােনার পিঞ্জরের সােনার পাথী সােনার দেশে উড়িয়া গেল। জীবনের মাধুরী লইয়া সুকুমারী চলিয়া গেল। বিবাহ বাসরে যে মূর্তি লইয়া উপস্থিত হইয়াছিল সেই পুস্পময়ী মুক্তি লইয়াই চলিয়া গেল । মৃত্যুর কালিমা তাহার বদন স্পর্শ করিতে পারে নাই। সেই মুখ অম্লান, উজ্জল,–এই পৃথিবী হইতে বিদায় লইবার সময় ও একবার আমার দিকে ফিরাইয়াছিল। যৌবনের পরিপূর্ণ বসন্তে—জীবন- বল্ললীর একটী পল্লব, একটী কুসুম না ঝরিতে ঝরিতে ইহ জগৎ হইতেপ্রিয়তমা অপমৃত হইল। সুকুমারী গেল। এই অনন্ত জগৎ , তাহার মধ্যে আমি একা।
রঙ্গিয়া। এই অনন্ত আলােকময়ী ধরনী ; আমার চক্ষে তাহা অন্ধকার। ভাবিয়াছিলাম সুকুমারী গেলে আর বাচিব না। তবু হায়, বাচিতে হইল—তবু হায়, সংসারের শত শত ক্ষুদ্র কাজের মধ্যে শান্তি অন্বেষণ করিতে হইল। ভগ্ন হৃদ মা রঙ্গিয়া সুকুমারীর শনাগৃহ তেমনি করিয়া সাজাইয়া রাখিল। সুকুমারীর প্রিয় জিনিস গুলি যথা স্থানে সন্নিবেশিত করিল; তাহার বড় আদরের কুন্তলান" ও দেলথােস” তাহার সম্ফ। টেবিলের উপর তেমনি ভাবে স্থাপন করিল। আর যে বাতায়ন পাশে বসিয়া উভয়ে উভয়ের হৃদয়ের কথা বিনিময় করিত, সেই বাতায়ন তলে ধূল্যবলুষ্ঠিত। হইয়া কাদিতে লাগিল । আমি বহুব্যয়ে শয়নগৃহের সম্মুখস্থ উদ্যানে সুকুমারীর একটী মৰ্ম্মর মণ্ডিত সমাধি স্তম্ভ স্থাপন করিলাম। রঙ্গিয়া তাহার চারিদিকে পুষ্প বৃক্ষ রােপণ করিল। আমি আমার দাব দগ্ধ হৃদয় লইয়া এই বিজন গৃহে কিছুতেই বাস করিতে পারিলাম না। আমার শূন্য পুরীর মধ্যে একটা বিষাদ সঙ্গীত অবিরত ধ্বনিত হইত। সুকুমারীর সমাধিস্তম্ভ কেবল জীবনের একটা পুণ্য অবসরের কথা স্মরণ করাইয়া দিত। যেদিকে চাহিতাম সেই দিকেই কেবল বিরহের একটা হাহারব শুনিতে পাইতাম। অনন্ত কালের গতি কেবল অশ্রান্তভাবে চলিতে লাগিল। আবার সেই শরতের প্রথম প্রভাত আসিল শতদল শ্ৰী, গ্লানিধৌত ধরণী আবার শারদ প্রভাতের অরুণ কিরণে হাসিতে লাগিল। সেকালে নিকুঞ্জ, শস্য শীর্ষ, তটিনীর বক্ষ এবং বিহগক সে হাস্য-হিল্লোলে নাচিয়া উঠিল। আমি এই নব শােভাময়ী ধরণীর শােভার মধ্যে আমার সকল দৈন্য, সকল ক্লেশ নিমগ্ন করিবার আশায় বিদেশ ভ্রমণে বহির্গত হইলাম। ( ৪ ) অনেক স্থান ভ্রমণ করিলাম, অনেক স্থানে শান্তি অন্বেষণ করি- লাম ; কোথাও পাইলাম না। কোথায় সেই হিমালয়ের অভ্রভেদী শিখর, কোথায় সেই শ্যামসীমা সাগরবেলা, কোথায় সেই মােগলের কুন্তলীন পুরস্কার। গৌরব ও পতনের ইতিহাস ভূমি, কোথায় রাজপুত বীরের কীৰ্ত্তিস্থল। কোথাও শান্তি পাইলাম না। আবার দেশে ফিরিলাম । গভীর নিশিথে বাসগৃহের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। সমস্ত প্রকৃতি যেন অর্ধ ছায়া এবং অর্ধ আলােকে একখানি অপূর্ব চিত্রপটের মত দেখাইতেছিল। আমি ধীরে ধীরে সুকুমারীর সমাধি স্থম্ভের দিকে অগ্রসর হইলাম। ভাবিলাম, এই জীর্ণ হদনখানি এক বার সুকুমারীর সমাধি পাশে স্থাপন করিয়া শীতল হইব। ধীর পাদবিক্ষেপে চলিলাম। অদূরে পুষ্পবিতানে সুকুমারীর সমাপি- স্তম্ভ ; পাশে চন্দ্রালোকে অসংখ্য ছায়ার সম্পাত-র সেই মন্থর মণ্ডিত স্তম্ভ ধারণ করিয়া কে ঐ আলুলায়িতকেশা রমণামূৰ্তি ? সহসা সেই নৈশ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়! সেই রমণীমনি গাহিয়া উঠিল ; “সইরে না মিটল পিয়াস হামারি।” স্বরের প্রতি লহরীতে যেন কোন অজ্ঞাত হদয়বেদনার ব্যাকুল মৃচ্ছ না কঁদিয়া কঁদিয়া সেই নিশীপ আকাশ ভেদ করিয়া উঠিতে লাগিল। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া সেই সঙ্গীত শুনিতে লাগিলাম। কে গাহিত ছিল তাহা দেখিবার অবসর হয় না। সঙ্গীত গামিলে গায়িকার মুখের পানে অ'ফুট চন্দ্রালােকে চাহিলাম ; দেখিলাম সমাধিস্তম্ভ ধরিয়া দাড়াইয়া রঙ্গিয়া । রঙ্গিয়ার নাম ধরিয়া ডাকিলাম ; রঙ্গিয়া উত্তর না দিয়া আকাশে দুইটী চক্ষু স্থাপন করিয়া ভাস্কর-খােদিতা পাষাণময়ী মূর্তির মত দাড়া- ইয়া রহিল। রঙ্গিয়াকে আবার ডাকিলাম-রঙ্গিয়া আবার গাহিয়া উঠিল—“সইরে না মিটিল পিয়াস হামারি।” বালিকা থামিল ! গগন প্রান্তে চক্ষু তেমনিভাবে স্থাপন করিয়া ভাস্কর-খােদিতা পাষাণময়ী মূর্তির মত দাড়াইয়া রহিল। আমি বালিকার ভাব কিছুই বুঝিতে না পারিয়া আমাদের পুরাতন ভৃত্যকে ডাকিলাম। বিষন্ন বৃদ্ধ আসিয়া বলিল—“রঙ্গিয়া কয়েক দিন পাগল হইয়া গিয়াছে।”
রঙ্গিয়া। ভৃত্যের কথা শুনিয়া আমার চক্ষে জল আসিল। আমি সেই আকাশনিবদ্ধদৃষ্টি বালিকার মুখে এক মহিমা মণ্ডিত দেবীত্ব দেখিলাম। সেই নিস্তব্ধ রজনীতে, সেই অদ্ধস্ফুট আলােকে, সেই মান্দোলিত পুষ্পকু পাশে আমি মূর্তিমতী বিরহব্যথা দেখিলাম। স্পর্ধা করিয়া- ছিলাম আমার মত বুঝি কেহ সুকুমারীকে ভালবাসিতে পারে নাই ; 'আমার সেই গৰ্ব দূর করিবার জন্য বুঝি রঙ্গিয়া মনুষ্য জীবনের অমূল্য- নিবি যে জ্ঞানর ঘ্ন তাহা অন্তর হইতে ছিড়িয়া লইয়া প্রিয়জনকে উপহার (প্রেমের এই আয়-বলিদান দেখিয়া আমার হদয় বিস্ময় ও প্রতিতে উচ্ছ সিত হইল ; আমি ভক্তিপূর্ণ অন্তরে সেই বালিকাকে প্রণাম করিলাম। দিল । আজ ও এই শুন্যপুরীর মধ্যে আমরা দুইটা প্রাণী বাস করিতেছি। প্রভাতে, নিশীথে, প্রদোমে রঙ্গিয়ার কণ্ঠে এবং আমার অন্তরে সেই এক বিরহ রাগিনী বাজিতেছে “সইবে না মিটিল পিয়াস হামারি।” কুলদাকান্ত ঘােষ যােসর “কুসুম কুটার' ভাসলপুর।
মষ্ঠ পুরস্কার ৫ শােভা। অনেক দিন হইল সংবাদ পত্রে একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হইয়াছিল ; বিজ্ঞাপনটী এই— “গত বৈশাখ মাসে রামচন্দ্রপুর গ্রাম হইতে একটী বালিকা হার- ইয়াছে। বালিকার নাম শােভা, বয়স দশ বৎসর, র ফরসা ; গঠন কিছু কৃশ; বালিকার বাম বাহুতে কাটিয়া যাওয়ার একটা ক্ষুদ্র দাগ আছে ; বাঙ্গালা লেখা পড়া কিছু কিছু জানে । যিনি এই বালিকা- টীকে অনুসন্ধান করিয়া দিতে পারিবেন, তিনি পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার পাইবেন। নিম্ন স্বাক্ষরকারীর নিকটে সংবাদ দিতে হইবে। শচীন্দ্রনাথ মিত্র-রামচন্দ্রপুর প্রথম বিজ্ঞাপনের তিন বৎসর পরে, আবার বিজ্ঞাপন দেখা গেল,- “অদ্য তিন বৎসর হইল রামচন্দ্রপুর হইতে শােভা নাম্নী একটী বালিকা হারাইয়া যায়। তদ্বিষয়ে–সালের-মাসের—তারিখের বাগজে, বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বিজ্ঞাপন প্রকাশের কিছুদিন পরে, সেই বালিকার জ্যেষ্ঠ ভাতা, একখানি ডাকের পত্র প্রাপ্ত হন; পত্রে লেখা ছিল জগদীশ্বরের কৃপায় আপনার ভগিনী অতি নিরাপদ স্থানে আছেন। এখন আপনাকে কিছু জানাইতে পারিলাম না, কিছুদিন পরে সমস্ত জানিতে পারিবেন ; ব্যস্ত হইবেন না, যাহা হউক আমরা বিশেষ চেষ্টা করিয়াও বালিকার অন্য কোনও সংবাদ পাই নাই ; বিনীত নিবেদন লেখক যিনিই হউন, অনুগ্রহপূর্বক বালিকার সবিশেষ সংবাদ দিবেন। শ্রীশচীন্দ্রনাথ মিত্র—নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা।”
শােভা। উপরােক্ত বিজ্ঞাপন বাহির হইবার দুই সপ্তাহ পরে, সংবাদ পত্রে আবার বিজ্ঞাপন দেখা গেল, “মাননীয় শচিন্দ্র বাবু, কালিকাপুরের জমিদারদিগের বাটীতে অনুসন্ধান করিলে আপনার বিজ্ঞাপিত রামচন্দ্রপুরের হারানো বালিকা সম্মন্ধে সবিশেষ জানিতে পারিবেন।” এই বেনামী বিজ্ঞাপনে অনেকেই আশ্চর্যান্নিত হইল। পরে যাহা হইল তাহা ক্রমে বলিতেছি। এক দিন সন্ধ্যার সময় দুইটী নবীন যুবা কালিকাপুর জমিদার বাড়ীর সদর দেউড়ীতে আসিয়া বাবুর সহিত সাক্ষাৎ করিবার অভিলাষ জানাইলেন। দরওয়ান তাহাদের কার্ড লইয়া বাবার কাছে গমন করিল এবং কিঞ্চিৎ পরে আসিয়া যুবকদ্বয়কে লইয়া জমিদার বাবুর পড়িবার ঘরে উপস্থিত হইল। জমিদার বাবু একখানি চেয়ারে বসিয়া ‘বেঙ্গলি’ কাগজ পড়িতেছিলেন, দরওয়ান তাহাকে দেখাইয়া দিয়া চলিয়া গেল। কালিকাপুরের প্রাচীন জমিদার রােহিণীকান্ত রায় বাহাদুর প্রায় পাঁচ বৎসর হইল পুরলােক গমন করিয়াছেন ; তাহার একমাত্র পুত্র আশুতােষ রায় বাহাদুরই এখন ‘জমিদার বাবু’। যুবকদ্বয় দেখিলেন জমিদার বাবুর বয়স বাইশ তেইশ বৎসর ; আকৃতি পরম সুন্দর। আশুতােষ বাবু নিজে উঠিয়া, সহাস্য মুখে আগন্তুকদ্বয়কে অভ্যর্থনা করিলেন। প্রথম শিষ্টাচার ও দুই এক কথার পরে আশুতােষ বলিলেন “মহাশয়, আপনাদের মধ্যে যিনি শচীন্দ্র বাবু, তাহাকে বােধ হয় আমি চিনিয়াছি ; আপনিই শচীন্দ্র বাবু ?” বিস্মিত হইয়া শচীন্দ্রনাথ বলি- লেন, “মহাশয় যখন কলিকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়িতেন, তখন আমি কোন কোন দিন আপনাকে দেখিয়াছি—সে অপরিচিতরূপে দূর হইতে দেখিয়াছি , আমি নিজে সিটি কলেজের ছাত্র ; এরূপ স্থলে আপনি আমাকে চিনিতে পারিয়াছেন, ইহা অতি আশ্চৰ্য্য ।” হাসিয়া কুন্তলীন পুরস্কার। আশুতােষ বলিলেন “আপনার মুখ দেখিয়া--আপনার মুখে আপনার ভগিনী শােভার সাদৃশ্য আছে বলি। এত সহজে চিনিলাম।” তখন অন্য কথা ভুলিয়া সোংসুকে, কাতর কণ্ঠে শচীন্দ বলিলেন “মহাশয়, আমার ভগিনী শোভা কোথায় আছে? আমার সঙ্গে আমার পরম বন্ধু যােগেশ বাবু ; উহার কাছে আমার সকল কথাই প্রকাশ্য।” প্রসন্ন মুখে অ শুতােষ বলিলেন “ আপনার ভগিনী আমাদের বাড়ীতেই আছেন, তার মুখেই আপনি তাহার সকল কথা শুনিতে পাইবেন।” তখন চাকরে আলাে লইয়া চলি, তাহার দুই তিন মহল পার হইয়া অন্দর মহলে উপস্থিত হইলেন। - দোতলার উপরে একটী সুন্দর দর ; ঘরের দেয়ালে সবুজ রঙের লতা, পাতা ও সােনালী ফুল ; সে সব এত সুন্দর নে সহসা ঘরটাকে একটী কুঞ্জবন বলিয়া মনে হয় ! সেখানে সেজে আলােত বসিয়া একটী মেয়ে--তাহার বসস কিঞ্চিদধি ক তেরে। বাসর হইবে সে রং ও তুলি দিয়া ছবি আঁকিতেছিল ; সেই ঘরের দরজায় দাড়াইয়া ঝি বলিল “বাবু আর দুজন নােককে সাথে কোরে অনচেন দিদিমণি” বালিকা ব্যস্ত হইয়া তুলি ছাড়িয়া উঠিতেছে, সেই সময়ে শচন্দ্র তাহাকে দেখি- লেন। শচীন্দ্ৰ দেখিলেন, ফুটনােন্মুখ গােলাপ কলিকার মনোহর সৌন্দর্য্যে ফুলবাগান নেন আলো হয়, বালিকার সুকুমার সৌন্দর্যে সে ঘর ও তেমনি আলো হইয়াছে ! শচীন্দ্র মুগ্ধনেত্রে চাহিয়া র হলেন। শচীন্দ্রকে নিতান্তই “ব্যাকুব" দেরা, আশু বাবু বললেন “ঘরে আসুন, শচীন ইনিতো আপনারই সহােদর।” । শচীন্দ্র অবাক ! ঐ কি শচীন্দ্রের সহােদরা? তিন বছরে তিন যুগের পরিবর্তন ? অই কি সেই শােভা?—শচন্দ্র ঘরে ঢুকিবেন কি, তাহার কথা কহিবার ক্ষমতাও যেন চলিয়া গিয়াছে ! দাদাকে দেখিয়া হৃদয়ের পূৰ্ব্বোচ্ছাস ভরে বালিকা বিবশা হইয়া পড়িল; তাহার সাে7 মুখখানি রাঙ্গা হইয়া উঠিল; চোখে জল আসিল, কপিতে কাঁপিতে, ঘামিতে ঘামিতে, সে দাদার পদতলে প্রণাম করিল। বাবু, শোভা। তখন, ভগিনীর প্রণামী লইআর তাহার অ সিক্ত রাঙ্গা মুখখানি দেখিয়া শচীন্দ্রনাথ কাদিয়া ফেলিলেন। শো তার মাথায় হাত বুলাইয়া, তাহার হাত খানি ধরিয়া তিনি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। ভ্রাতা ভগিনাকে অবসর দিয়া আশু বা অন্য সকল লােকদিগকে লইয়া বিদায় লইলেন। অণুজাকে নি নে পাইয়া শচন্দ জিজ্ঞাসা করিলেন "তুমি বাড়ী থেকে চলে এলে কেন শােভ।? এতদিন কোথায় ছিলে ? আর এখনেই বা কি করে এলে ? আবার চোখের জল মুছিয়া, উচ্ছসিত অ“ সনত করিয়া শােভা বলিতে লাগিল “দাদা! সেই সে মা'র শ্রাদ্ধ শেষ ক'রে তুমি কল- কে তায় চলে গেলে, সেই সে আমায় বলে গেলে ‘ছোট মা আমাদের বিনা তা হলেও তুমি তাকে খু। ভক্তি করি। আমাদের দু ভাই বােনর বাপ নাই, মাও মারা গেলেন, এখন ছােট না ভিন্ন কেউ নাই, এই কথা ভেবে ছােট মাকে ভক্তি করবে। এই রকম কোল্লে ও যদি ছােট মা তােমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, তা হলে আমার কাছে তুমি চিটি লিখো, আমি তােমায় কো- কাতায় নিয়ে এক বন্ধুর বাড়ীতে রাখবে।' সে সব কথা আমি কখনই,তেম না ; কিন্তু দাদা, আমি কি কোরবো? ছােট মা ছুতার নতায় আমার মেরে মেরে আধ মার। কোনে। আমি বাসন মাজতেম, দর নিকুহেম, পূটাকে দুধ খাওয়াতেম, তবু ছােট মা বলতেন ‘সনাশি ! শতেক গুয়ারি ! কে বল বসে বসে গিলবি ! আবার বোতেন ‘তাের মা আমার হাড় জ্বালিয়ে গেছে, তুইও তাে সেই রাক্ষসীর সন্তান ! সতীন-কাট। আর কত ভাল হবি!' একদিন পূবের বাড়ীর ক্ষমা পিশী নাকি ছােট মাকে বলেছিলেন ‘ছােট বােট! তাের আক্কেল কি গা ? শােভা অমন শান্ত মেয়ে তবু তুই বাছাকে মারিস্ বকিস্! তাের মত সৎমা'র মুখে আগুন ; আমাদের সেজ বৌ দেখি সতীন পাে, সতীন ঝিদের আপন পেটের ছেলে মেয়ের মত } • ভয়ে কুন্তলীন পুরস্কার। যত্ন, আত্তি করে !’ ছােট মা তাকে বেশী কিছু না বলে বাড়ী এসে আমায় বােল্লেন হতভাগি ! তুই মিটমিটে ডাইন, তাের পেটে এত গুণ ? পাড়ার লােকের কাছে আমার নামে লাগিয়ে বেড়া, আসুক তাের পাড়ায় তােক। আমি কেবল কাঁদতে কাঁদতে বােল্লেম না মা, আমি কারুর কাছে কিছু বলি নাই, অমনি তিনি আরাে রেগে উঠলেন, বােল্লেন ‘বলিনি বটে । এখন তােক বাঁচায় কে দেখি, এই বয়সে তাের এতটা ন্যাকামি ! দেখ, ! আজ ও ন্যাকামি ভেঙ্গে দিচ্ছি।” এই কথা বলে আমায় চড় কিল লাথি মান্তে লাগলেন ; আমার নাক দিয়ে রক্ত পড়তে লাগলো ; ভয়ে আর যাতনায় আমি খুব কেঁদে ফেলেম। অমনি ছােট মা আমার মুখের ভিতর কাপড় পূরে দিয়ে বােলেন ‘ফের যদি তুই চেঁচিয়ে কেঁদে পাড়ার লােক জানা- জানি কোরবি, তবে এখুনি তােকে যমের বাড়ী পাঠাব।' কাঁদতেও পেলেন না। তারপর দিন তােমার কাছে একখানা চিঠি লিখে ডাকে দেবার জন্য রাখা চাকরের হাতে দিলেম। গােপাল দাদা তাই দেখে রামাকে বােল্লেন ও হিজি বিজি লেখা, আমি সেরে ভাল করে দিচ্ছি' এই কথা বােলে তিনি চিঠি খানি নিয়ে ছােট মাকে দেখালেন। আমি তাতে লিখেছিলাম ‘দাদা! ছােট মা আশায় রাত দিন মারেন, আমি এখানে আর থাকবে না, তুমি আমায় কলকাতায় নিয়ে যাও এই লেখা দেখে ছােট মা একে বারে আগুনের মত হয়ে উঠলেন, আমা'য় বােল্লেন ও পােড়া কপালি ! তুই যে বড় সাউখুড়ি কোলি, আ মরি ! পাড়ার লােকের কাছে কিছু বলিনি, এই যে দাদার কাছে আমার নামে লাগিয়ে চিঠি লিখলি কেমন করে ? তাের দাদার যা’ সাধ্যি থাকে করুক না ; থানায় গিয়ে পুলিশ এনে তােদের কি না কোত্তে পারি ! দেখবি তবে? যমের বাড়ী পাঠাব তােকে ? এই সব বােতে বােতে একখানা মাছ কোটা বটী নিয়ে আমার দিকে ছুটলেন। শচীন্দ্র ব্যস্ত হইয়া সশঙ্কিত চিত্তে বলিলেন কি সর্বনাশ! তার পর শােভা, তার পর ?” শােভা বলিতে লাগিল “ আমি তখন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গিইছি ;
শােভা। ০ রামা চাকর তাই সব দেখে ‘মা ঠাকরুণ করেন কি, করেন কি,' বলে আমার হাত ধরে হিড়, হিড় করে টেনে বাড়ীর বাইরে গেল ; তখন আমায় বােল্লে ‘দিদিমনি, এখন পালাও, এর পর মা’ঠাকরুণের রাগ পােড়,লে আমি তােমায় নিয়ে যাব' আমি রামার কথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে নদীর দিকে চোল্লেম।” নিঃশ্বাস ফেলিয়া শচীন্দ্র বলিলেন, তবে রামাই তােমার জীবন রক্ষা কোরেছে। তারপর ? শােভা বলিতে লাগিল তার পরে দেখি নদীর কূলে আম তলায়, একটী বাবু দাড়িয়ে চারিদিক দেখছেন।-ঘাটে একখানি বড় বজরা বাঁধা রয়েছে। আমাকে কাঁদতে দেখে তিনি কাছে ডাকলেন ; তার মিষ্ট কথা শুনে আমিও তার কাছে গেলাম। সে বাবুটিী যখন আমার কান্নার কারণ জিজ্ঞাস। কোল্লেন, তখন আমি সব কথাই তাকে বােলে ফেল্লেম ; তার পরে বােল্লেম আমার দাদা আমায় কলকেতায় নিয়ে যাবেন বলেছিলেন, কিন্তু ছােট মা কখন আমায় মেরে ফেলবেন দাদাকে দেতেও পাব না' বার আমার কথা শুনে চোখ মুছলেন, তার পরে বােলেন ‘তােমার দাদার নাম কি ? তিনি কি করেন?' আমি বােল্লেম ‘দাদার নাম শচীন্দ্রনাথ মিত্র, তিনি বি, এ, পড়েন তখন বাবুটী বােল্লেন ‘আমি তােমার মনের কথা বুঝেছি। আমি এই বজরায় কলকেতায় যাচ্ছি, তুমি আমার সঙ্গে চল, আমি তােমার দাদার কাছে তােমায় পৌছিয়া দিব।' অনেক দিনের পর স্নেহের কথা শুনে আমার প্রাণ জুড়িয়ে গেল। আমি পরমানন্দে তার বজরায় উঠলেম, তার পরে কলকেতায় এলেম। জমিদার বাবুর সঙ্গে আমি সেখানে গিয়া দেখি, জমিদার বাবুর মা সেখানে আছেন। তিনি আমাকে দেখে যার পর নাই সুখী হেলেন । জমিদার বাবু তােমার মেসের ঠিকানায় লােক পাঠাইলেন, কিন্তু তুমি বাসা পরিবর্তন করেছিলে বলে সেসময় তােমায় খুঁজে পেলেন না। এদিকে জমিদার বাবুর মা সব কথা শুনে আমায় নিজের কোলের উপর বসিয়ে বােল্লেন শােভা, আমার একটি মেয়ে ছিল, সে মারা- গিয়াছে ; তুমি এখন আমার সেই মেয়ের মত আমার কাছে থাকো ;
কুন্তলীন পুরস্কার। আর একটু বড় হ'লে তােমার দাদাকে খবর দেব, আমি সে আদর ঠেতে পাল্লেম না।–সম্মত হােলেম। পরদিন তিনি জমিদার বাবুকে বােলে আমাকে লেখা পড়া, সেলাই, ছবি আঁকা, বাজনা ইত্যাদি শেখাবার জন্য তিনজন শিক্ষয়িত্ৰী নিযুক্ত করে দিলেন; আমার জন্য গহনা ও পোষাক এনে দিলেন ; আমি রােগা ছিলেম বলে আমায় কত ওষুধ, পথ্য খাওয়াতে লাগ্লেন, অযত্নে আমার চুল পালা আর কটা ছিল ব'লে কুন্তলীন তেল এনে মাখাতে লাগলেন ; তাই জন্য দেখ দেখি দাদা, এখন আমি কত নােট। সেটা হয়েছি, আর আমার মাথার কতটী চুল হয়েছে !” শোভার আত্মকাহিনী শুনিতে শুনিতে শচীন্দ্রের চক্ষে অনেক বার অ “ আসিয়াছিল ; তাহার শেষের কথাটী শুনিয়া, সেই সরলতা মাখা মুখে বালিকার হাসি দেখিয়া শচীন্দ্র ও হাসিয়া উঠিলেন ; বলিলেন “সত্য কথা শােভা, তােকে আমি প্রথমে চিনিতেই পারি নাই। সে কথা যাক, এখন কথা এই যে জমিদার বাবুরা মানুষ না দেবতা ?” ইহার পরে ও দুই ভাই ভগিনীতে কত প্রয়ােজনীয় ও অপ্রয়ােজনীয় কপা হইতে লাগিল ; তাহারা কতই কাদিল, কতই হাসিল । ; স দার পরে, পাঠাগারে বসিয়া জমীদার আশু বাবু, সংবাদ পত্রের জন্য প্রবন্ধ লিখিতেছেন, শচীন্দ্রনাথ তাহার কাছে, শােভাকে বাড়ীতে লইয়া যাইবার জন্য বিনীত প্রার্থনা করিলেন। আশু, কাগজ কলম, ফেলিয়া, চক্ষু না উঠাইয়া, অম্লান মুখে বলিলেন “আপনার ভগ্নীর অনুস দান জন্য পুরস্কার প্রতি এত আছেন, আমি পুরস্কৃত না হইলে আপনার কথায় সম্মত হইব কেন ?” শচীন্দ্র মৃদু হাসিয়া বলিলেন কর্তব্য পালনের জন্য পুরস্কার কে কবে পাইয়াছে ? আশুতােষ ক্ষণকাল ঠাহার আয়ত নয়ন যুগল শচীন্দ্রের মুখের উপরে রাখিলেন, পরে বলিলেন “তবে বুঝি আপনার হিসাবে যে কর্তব্য পালন করে পুরস্কার যােগা নহে, আর যে অকৰ্ত্তব্য করতে পারে, সেইই পুরস্কার পায় ?” শচন্দ্র হাসিলেন, কি উত্তর দিবেন, ভাবিতে লাগিলেন।
শােভা। ; তখন রচনাটী চাপা দিয়া, দোয়াত কলম সরাইয়া, ‘দেখাে’ সিক্ত রুমালে কপাল মুখ মুছিয়া আশুতােষ বলিতে লাগিলেন “শচীন বাবু । এতদিন ঐশ্বৰ্য্য ভােগে বা সাংসারিক সুখে আমার প্রবৃত্তি ছিল না, আমি ভাবিয়াছিলাম আমার পিতৃমাতৃহীন ভাগিনেয়দিগকে এই সম্পত্তি দান করিয়া, মুক্ত বিহঙ্গের মত আমি ভগবানের সেবা করিয়া বেড়াইব ; সেইজন্য এতদিন বিবাহ করি নাই; কিন্তু আমার মায়ের কাতরতা আর সহিতে পারিতেছি না—আমার মা শােভাকে হার পুত্রবধূ করিবার জন্য পাগল হইয়াছেন, আমার মার সাধ পূর্ণ করুন, তাহাই আমার পুরস্কার।” শুনিয়া শচীন্দ্র আনন্দে অধীর হইলেন, খানিকক্ষণ কথা বলিতে পারিলেন না; তথাপি তিনি আত্ম সম্ভ্রম হারাইলেন না, বলিলেন কালিকাপুরের জমিদার মহাশয়ের সহপক্ষ্মিণী হইবার জন্য অনেক রাজ কন্যা আগ্রহান্বিতা আছেন, দরিদ্র বালিকা শােভার জন্য জমিদার মহাশয় সে গৌরব হারাইবেন কেন?” আশুতােষ বলিলেন “শােভ। দরিদ্র হইলেও দেববাল। ; সে যদি আমার মাতৃদেবীর পুত্রবধূ না হয়, তবে আর কেহই হইবে না, তাহা নিশ্চিত জানিবেন।” শচীন্দ্র আর কি বলিবেন ? ইহার পরদিনই জমিদার বাড়ীতে বিবাহের উৎসব আরম্ভ হইল। যথাকালে শচীন্দ্র, আশুতােষের হস্তে স্নেহের ভগিনী শােভাকে সম্প্রদান করিলেন। বিবাহের সময়ে উভয় পক্ষের বহুতর আত্মীয় কুটুম্ব সমাগত হইয়াছিলেন, কেবল শােভার বিমাতা হিংসার আগুণে পুড়িয়া মরিলেন। আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে শুনিয়াছি, তিনি অনাহারে তিন দিন শয্যাগত থাকিয়া তাহার বামুন ঠাকুর ও ঝিকে বলিয়াছিলেন সে পােড়। মুখীর এত সুখ ঐশ্বর্য হওয়ার চেয়ে আমার মরণ হওয়া ছিল ভাল !” ৪ মানকুমারী বসু, গাড়ি, যশােহর। ';' - সপ্তম পুরস্কার ৫ তবে গহনার বাক্স। আমি ডিটেক্টভ অফিসে প্রবেশ করিবার প্রায় ছয় মাস পরে, একদিন বড় বাবু আফিসের সেই নি ক্ষন কক্ষে আমাকে ডাকিয়া, বর্ধমানের এক ভয়ানক খুনের আমূল পরিজ্ঞাত ঘটনা বিবৃত করিলেন, এবং এই হত্যা সম্বন্ধীয় সমস্ত কাগজ পত্র আমার হাতে দিয়া তৎক্ষণাৎ বর্ধমান যাত্রা করিয়া তথায় গুপ্ত হত্যাকারীর অনুস ৷ান করিবার জন্য আদেশ প্রদান করিলেন। প্রায় তিন সপ্তাহ বন্ধমানে অবস্থান করিলাম, হত্যা স্থানের চারি দিকের অধিবাসিগণের সহিত তংপ্রসঙ্গে অনেক আলাপাদিও করা গেল, কিন্তু হত্যাকারীর বিশেষ কোন সন্ধান পাইলাম না । স্থানীয় পুলিশ ভূষণদাস নামক যে জনৈক হােটেল ওআলাকে এই হত্যা ব্যাপারের সহিত জড়িত বলিয়া যে সন্দেহ করিয়াছিলেন, তাহা আমার নিকট এবং স্থানীয় অধিবাসিদের নিকট বেশ যুক্তি সঙ্গত বলিয়া বােধ হইয়াছিল, তা ছাড়া আমি ভূষণদাসের হােটেল ঘর অনুসন্ধান করিয়া যে তিন খানি গােপনীয় পত্র আবিষ্কার করিয়াছিলাম, তাহার মৰ্ম্মে উক্ত ব্যক্তিই যে প্রকৃত হত্যাকারী তাহাতে আর আমার সন্দেহ ছিল না। কিন্তু বহু চেষ্টা করিয়াও, ভূষণের আবাসস্থান স্থির করিতে পারিলাম না, হত্যাকাণ্ডের দিন হইতে সে নিরুদ্দেশ ! এই প্রকার অবস্থায় তথায় অবস্থান করা বৃথা এবং কষ্টকর বলিয়া বােধ হইতে লাগিল, কিন্তু অর অধিককাল আমায় সেখানে থাকিতে হইল না, • অবিলম্বে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিবার আদেশসহ বড় বাবুর একখানি টেলিগ্রাম পাইলাম। বাঁচা গেল, সেই দিনই পূৰ্ব্বাহে গহনার বাক্স। ; আহাৱাদি সম্পন্ন করিয়া কলিকাতা যাত্রা করিলাম, হত্যাকারীর অনু- সন্ধান এই খানেই শেষ হইয়া গেল। চারিটার সময় কলিকাতায় পৌছিয়া, বাসায় না গিয়াই আমার ত্রিসপ্তাহিক অবিশ্রান্ত পরিশ্রমের ফল, সেই ভূষণদাসের জীর্ণ ও নীরস চিঠি কয়েকখানি সহ একেবারে আফিসে গিয়া উপস্থিত হইলাম, এবং আমার অনুসন্ধানের আমূল বিবরণ বিবৃত করিলাম । আমার কথায় বা বিশেষ বিরক্ত হইয়াছেন বলিয়া বােধ হইল না, তিনি ধীরভাবে বলিলেন,-“বদ্ধমানের হত্যাব্যাপারের শেষ যে এই দাড়াইবে, তাহা প্রথমে পুলিশ রিপাের্ট হইতেই বুঝেছিলুম, তবুও এক বার দেখা গেল। যাহা হউক তুমি এসেছ, বেশ হয়েছে ; কালই তােমাকে দেওঘরে যেতে হবে । আজ কয়েক দিন হ'ল সেখানে বনমালী চৌধূরী নামক জনৈক বড় লােকের বাড়ীতে অনেক টাকার গহনা চুরি হয়ে গেছে ; তার অনুসন্ধানের জন্য একটা লােক পাঠাই- বার জন্য তিনি স্বয়ং আমাকে লিখেছেন। তােমাকেই যেতে হবে।” অবিলম্বেই দেওঘরে যাইতে প্রস্তুত হইলাম। নমস্কার করিয়া বিদায় গ্রহণের পূর্বে বড় বাবু আবার বলিলেন,-“দেখ এই চুরি ব্যাপারটা একটু নূতন রকমের ! বাড়ীর কর্তার বিশ্বাস, তাহার পরিবারস্থ কোন এক ব্যক্তি ইহাতে লিপ্ত, এজন্য তাহাকে লইয়া একটা প্রকাশ্য গােলযােগ করা তাহার অভিপ্রেত নয়। যাহা হউক, তুমি সেখানে গেলেই সব শুনিতে পাইবে, কিন্তু খুব সাবধান।” পরদিন কলিকাতা ত্যাগ করিয়া সন্ধ্যার প্রাক্কালে দেওঘরে পৌছি- লাম। বনমালী চৌধুরীর বাড়ী অনুসন্ধান করিতে বিলম্ব হইল না, সহরে লােকটার বেশ মান প্রতিপত্তি আছে ; শুনিলাম বহুকাল সরকারী আমীনের কার্য করিয়া পেন্স প্রাপ্তির পর তিন চারি বৎসর হইতে তিনি সপরিবারে বৈদ্যনাথে বাস করিতেছেন। নগদ টাকা যথেষ্ট, এবং উচ্চ সুদে কর্জ দিয়া তদ্দারাও প্রচুর আয়ের সংস্থান হয়। স্যার পর বনমালী চৌধুরীর বাটীতে উপস্থিত হইলাম, কিন্তু তখন তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইল না; কর্তা তখনও আহিকের ঘরে ৬৪ কুন্তলীন পুরস্কার। রহিয়াছেন, শুনিলাম বাহিরের ঘরে আসিতে অর্ধ ঘণ্টা বিলম্ব হইবে। দেখিলাম বাসায় লােক জনের সংখ্যা খুব অধিক নয়, একজন খানসামা, একজন বেহারা, একটা মুহুরী আর এক পাচক ব্রাহ্মণ। মুহুরীর নাম শ্যামলাল রায়, লােকটা মিষ্টভাষী, আমাকে প্রথমে দেখিয়াই, অথকৃচ্ছ- তায় তাড়িত ঋণগ্রহণেচ্ছ বিপন্ন ব্যক্তি ঠাহরাইয়াছিলেন, এবং অচিরাং ভূসম্পত্তি বন্দক রাগিয়া আমি কর্তার “মহামহিম” পদবীর প্রসার বৃদ্ধি করিব, আর সঙ্গে সঙ্গে তাহার ও যৎকিঞ্চিং দক্ষিণার ব্যবস্থা করিব, তাহাতে আর তাহার সন্দেহ ছিল না। "গাপনের এই সুযােগ ছাড়িতে পারিলাম না, দুই সহস্র ৪ ; * 'ও! : স. কত্তার সাহায্য প্রার্থনা আমার আগমনের কারণ বলিয়া প্র* করিলাম। লােকটা আমার কথায় বেশ বিশ্বাস করিয়া ফেলিল, এবং আশু কাম্য সিদ্ধির তিনি যে বিশেষ সচেষ্ট থাকিবেন, একথা বলিতেও ছাড়িল না। কৰ্ত্তা বাহিরে আসিলে, একাকী আমি তাহার নিচ্ছ ন কক্ষে গিয়া, বড় বাবু প্রদত্ত আমার নিয়ােগ পত্রখানি দেখাইলাম। তিনি পত্রখানি আগ্রহ সহকারে পাঠ করিয়া ধীরে ধীরে চসমাখানি খুলিয়া বলিলেন,- “সাহেব আপনাকে চুরির অনুসন্ধান করিতে পাঠাইয়াছেন, ভালই। অনুস গান আরম্ভের পূর্বে আপনাকে একটা কথা বলিয়া দেওয়া ভাল বােধ করিতেছি। আজ চারি দিন হ'ল আমার প্রায় পাঁচ হাজার টাকার গহনা চুরি গিয়াছে, কিন্তু এপর্যন্ত একথা গৃহিণী ব্যতীত অপর কাহারও নিকট প্রকাশ করি নাই, কেবল গােপনে পুলিশে একটা সংবাদ দিয়া রাখিয়াছি। আপনি আমার এই ব্যবহারের কথায় হয় ত বিস্মিত হইতেছেন, কিন্তু সব শুনিলে আমার সঙ্কট বুঝিতে পারি- বেন। আমার বিশ্বাস অলঙ্কার গুলি আমার হতভাগ্য ভ্রাতপুত্র রজনী চুরি করিয়াছে। গৃহিণীরও এই মত। হতভাগাকে, পিতার মৃত্যুর পর হতে ছেলের মত পালন করে আসিতেছি, লেখা পড়া শিখায়েছি,-” আমি এইখানে তাহাকে বাধা দিয়া বলিলাম,-“মহাশয়, আপনার ভ্রাতপুত্রের কথা পরে শুনিলেই চলিবে, 'এখন চুরিটা কি প্রকারে হয়ে ছিল, আগে তাহাই বলুন।”
গহনার বাক্স। কর্তা তখন বলিতে লাগিলেন,—“ব্যাপারটা হচ্ছে, সেই চুরির দিন কতক গুলি গহনা বন্ধক রাখিয়া, কয়লা খাদের এক ঠিকাদার আমার নিকট তিন হাজার টাকা ক চ লইয়া গিয়াছিল, গহনা গুলা আমার এই বৈঠকখানা ঘরে একটা বড় হাত বাক্সে রাখিয়াছিলাম, তাড়াতাড়ি বশতঃ লােহার সিন্দুকে তুলিয়া রাখা হয় নাই। এই ঘরে রাত্রিতে কেহই থাকে না, সেই হতভাগা, শুনিলাম সেদিন রাত্রে এখানে ইয়াছিল। প্রাতঃকালে কি রাত্রে কখন সে উঠে গেছে, কেহ জানে না, আমি যথাসময়ে প্রভাতে উঠিয়া আর বাক্স দেখি নাই। চার থে কে তাহা বুঝিতে আর বিলম্ব হইল না, তাই একটা ধরা ও গােলযােগ হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য, বাকট। আমি বাড়ীর মধ্যে রাখিয়াছি বলিয়া প্রকাশ করিয়াছিলাম। এখন যাহাতে বিনা গােলযােগে পরের অলঙ্কার গুলি হস্তগত হয়, তাহার উপায় করুন।” বহু কষ্টে চুরির এই সামান্য ইতিহাস সংগ্রহ করিয়া আপাতত পরিতৃপ্ত থাকিতে হইল, কার কত্তার সহিত আর যাহা কথা হইল, তাহাতে ভ্রাত * রজনীনাগের উদ্দেশে অজস্র গালিবর্ষণ এবং নিজের আকস্মিক গ্ৰহবৈ গুণের জন্য অদৃষ্টের প্রতি ধিক্কার ভিন্ন আমার টেক্ টভি বুদ্ধি প্রয়ােগের উপযােগী কিছু পাওয়া গেল না। যাহা হউক কর্তার বিশেষ অনুরােধে, কার্য শেষ হওয়া পর্যন্ত তাহার বাসাতেই থাকার ব্যবস্থা হইল । আত্মগােপন মানসে আমি যে পণ গ্রহণেচ্ছু জাহ্মণ সন্তান বলিয়া চাকদিগের নিকট পরিচয় দিয়াছিলাম, সে কথাট। কাকে বলিয়া দিলাম। পরদিন প্রাতঃকালে, আবার কৰ্ত্তার সহিত চুরি সন্ধে অনেক কথপােকথন হইল। তাহার ভ্রাতপুত্র ব্যতীত অপর কোনও ব্যক্তির উপর সন্দেহ হয় কি না জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি বলিলেন :—-“আমার পরিবারস্থ মুহুরী, বেহারা, চাকর, ব্রাহ্মণ সকলই বিশ্বাসী পুরাতন ভৃত্য। যে ব্যক্তি এই সর্বনাশ করিয়াছে, আমি বহুপূর্বে তাহার আভাস দিয়াছি। আর কাহারও উপর আমার সন্দেহ নাই।” সেই দিনই, ঘটনার পরিজ্ঞাত বিবরণসহ, বড় বাবুকে একখানি কুন্তলীন পুরস্কার। পত্র লিখিলাম। লােক্টা যখন ভ্রাত পুত্রের উপর এতটা সন্দেহ করি- তেছে, একবার তাহার অবস্থাটা অনুসন্ধান করা ভাল বলিয়া বােধ হইল; শুনিলাম সে বৈদ্যনাথের নিকটেই মধুপুর ষ্টেসনে কি একটা চাকরি করে, কিন্তু হঠাৎ এই কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিতে সাহস হইল না। পত্রোত্তরে বড় বাবুর পরামর্শের অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। পরদিন প্রাতঃকালে, স্নানাহিক সমাপন করিয়া কত্ত। যথারীতি মহাদেব দর্শন করিতে বহির্গত হইলেন এবং আমাকে ও যাইতে অনু- রোধ করিলেন। কিন্তু সেসময়ে আনার মন বড়ই উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িয়াছিল, তা' ছাড়। বড় বাবুর চিঠিও পাইবার সম্ভাবনা ছিল, এই সকল কারণে, কোন প্রকারে কর্তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়া, বাসাতেই থাকিয়া গেলাম । সেদিন কৰ্ত্তা বাহির হয়। আবার কিছুক্ষণ পরেই মুহুরী নই- শয় ও একটা কাজে চলিয়াগেলেন। আমি একল। বৈঠকখানায় বসিয়া আছি, এমন সময় ডাকপিয়ন আসিয়া কতকগুলি পত্র আমার হাতে দিয়া গেল । বড় বাবুর নিকট হইতে পত্র পাইবার সম্ভাবনা ছিল, আমি তাড়াতাড়ি সেই পণ খুঁজিতে লাগিলাম, কিন্তু আমার নানার কোন প এই পাইলাম না। তখন আমি একে একে সেই পত্র গুলির শিরােনামা পাঠ করিতে লাগিলাম, কোন প্রকারে সময় ক্ষেপণ করা ব্যতীত এই কার্যের অপর কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। পত্রগুলির মধ্যে শ্যামলাল রায় মুহুরী মহাশয়ের নামীয় একখানি চিঠি ছিল, তাহার শিরােনামা পড়িবার সময় লেখাটা যেন আমার কোনও পরিচিত লােকের বলিয়া বােধ হইল, ডাকঘরের ছাটা বড় অপরিষ্কার পড়িতে পারিলাম না। হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল, বর্ধমানের হত্যাকারী ভূষণদাসের লেখা কি এই প্রকার নয় ? অনেক নিদ্রাহীন স্তব্ধরাত্রি ভূষণের কয়েকখানি পত্র নাড়াচাড়া করিয়া অতিবাহিত করিয়াছি, তাহার হস্তাক্ষরের প্রত্যেক টা তখনও আমার চক্ষে প্রত্যক্ষবং ছিল। মুহুরী মহাশয়ের পত্রখানি যে সেই ভূষণদাস কর্তৃক লিখিত তাহাতে আর আমার সন্দেহ রহিল না। পত্রগুলি অপ্রয়ােজনীয় বােধে বড় গহনার বাক্স। ৬৭ হিi, সেই এক বাবুকে দিই নাই, সে গুলা আমার পােট মান্টোস্থ একটা জামার পকেটে ছিল। তাড়াতাড় বাক্স হইতে পত্র গুলি বাহির করিয়া তাহার অক্ষ- রের সহিত, মুহুরী মহাশয়ের নামীয় পত্রের শিরােনামার অক্ষরের সহিত মিলাইয়া দেখিলাম অবিকল একই হাতের লেখা ! অপর চিঠি গুল। টেবিলের উপর রাশিয়া, একটা নি জ্জন স্থানে গিয়, সেই পত্রখানি খুব সাবধানের সহিত পড়িলাম। চিঠিখানি যশােহর হইতে প্ররিত, লেখা ছিল :- “কল্যাণবরে,-আমি কিছুদিন হ'তে তামার পg পাইয়া উদ্বিগ্ন আছি। পূজার জিনিষ প লইয়া আসিবে, এবং ছুটতে আসিবার সময় কলিকাতায় * মর্তী মৃণাণিনীর মৃণালিনীর জন্য বহুবাজারের এইচ, नाश्त falfa কুলীন, আর এক শিশি দেণপােস, অবশ্য করিয়া আনিবে ! শতকালে সাহেব বিবির নাচ দেখুত, সে কলিকাতায় যাবে বলছে। সদর রাস্তায়, এইচ, বসুর খুব বড় দোকান। গােবদ্ধন ভাল আছে, ঠাকুরের হইয়াছে। কলিকাতার কাঠগোলায়, তোমার কাকার সহিত একবার করি ও। আমি ভাল আছি। আশার্পাদক * কাকান্ত রায়। পুঃমিনি গাছ লিখতে শিখেছে, কিছুতেই ছাড়লে না, ছাড়লে না, তার হিজিবিজি হাতের লেখা পত্রের সঙ্গে পাঠাইলাম, তুমি আসিলে ভাল লেখা। দেখাইবে। কুন্তলীন ও দেখাে না আনিলে, বড় গেলযােগ বাধাইয়া তুলিবে।” সর কুন্তলীন পুরস্কার। তারপর পত্রের সহিত মােক করা একখ ও পৃথক কাগজে মােটা মােটা অক্ষরে লেখা :- “খ, চ, খ, ক, ক, গ, খ, জ, খ, ক, ঙ, খ, গ, ঙ, জ।” পত্র পাঠ করিয়া প্রায় সকল আশাই নিম্মল হইতে চলিল। কিন্তু ভূষ দাসের হস্তাক্ষরের সহিত চিঠিখানির প্রত্যেক অক্ষরের ঐক্যতা সহজে মন হইতে বিদূরিত হইল না, বিশেষতঃ বালিকাকন্যা মিনির যথেচ্ছা লিখিত আকা বাকা অক্ষর গুলিতেও যেন দুই একটা পাকা হাতের টান দেখিতে পাইলাম । সে যাহা হউক চিঠিখানি, আর সেই ক্ষুদ্র কাগজখ ও অনার নিকটেই থাকিল, মুহুরী মহাশয়ের প্রতি একটু খরদৃষ্টি রাখিলাম, কিন্তু তাহার ব্যবহারে সন্দেহজনক কিছুই দেখা গেল না। আহারাদির পর কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করিয়া, আবার চিঠিখানি লইয়া নাড়াচাড়া করতে লাগিলাম হটাৎ মনে হইল টুর। কাগজে যে কয়েকটী অক্ষর লেখ। আছে, হয়ত তাহার সাহায্যে পত্রখানি পড়িতে হইবে। আশ্চর্যের বিষয় আমার অনুমান ঠিক হইল, এবং এই কয়েকটী কথা তখন পত্রের মধ্যে স্পষ্ট পড়িতে পারিলাম। “আমি জিনিষ লইয়া কলিকাতায় বহুবাজারের দেলথােস বিবির গােবন ঠাকুরের কাঠগােলায় আছি, শীঘ্ন না আসিলে গােলমােগ”। বদ্ধমানের হত্যাকারী ও দেওঘরের চুরীর সহায়ক ভূষণ দাসকে উক্ত পত্রস্থ লুক্কায়িত বাক্যদ্বারা ধৃত করিবার সম্ভাবনা দেখিয়া, আমার মানসিক অবস্থা কি প্রকার হইয়াছিল, পাঠক পাঠিকাগণ অনায়াসেই অনুমান করিতে পারেন। আমি পত্রখানি সাবধানে পকেটস্থ করিয়া, কর্তার নিকট গিয়া বলিলাম,-“আপনার চুরীর বােধহয় একটা কিনারা হইবে, আমাকে এখনই একবার মধুপুরে যাইতে হইবে । কথাটা যেন প্রকাশ না হয়। গােলযােগের আশঙ্কায় আমার প্রকৃত গন্তব্যস্থান যে কলিকাতা তাহা আর প্রকাশ করিলাম না। সাতটার গাড়িতেই না ওয়া স্থির করিলাম, দেখিতে দেখিতে ছয়টা বাজিয়া গেল, আমি কিছু অগ্রেই ষ্টেশনে যাত্রা করিলাম। যাইবার গহনার বাক্স। সময় মুহুরী মহাশয় আমার হটাৎ গমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি বলিলাম যেসকল সম্পত্তি বন্ধক রাখিয়া কর্তা আমাকে টাকা কক্ত দিবেন, তৎসম্বন্ধীয় কাগজপত্র ভূলে বাড়িতে ফেলিয়া আসিয়াছি, কলাই দলিলপত্র লইয়া আবার ফিরিতেছি।" প্রাতঃকালে কলিকাতায় পৌছিয়াই মুচীপাড়া থানার ইনে- স্পেক্টার সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া দশজন পুলিশ কনষ্টেবল্ সঙ্গে লইয়া দেখােস বিবির লেনে উপস্থিত হইলাম ! গােবন ঠাকুরের কাঠগােল। বাহির করিতে বিলম্ব হইল না, ভূষণকে সেনাক্ত করিয়া গ্রেপ্তার করাও সহজে হইয়া গেল, কারণ বর্ধমানে অবস্থান কালীন তাহার আকারাবয়বের বিশেষত্ব গুলি পরিচিত লােকদিগের মুখে শেনিয়। লিখিয়া রাখিয়াছিলাম। প্রথমে দে ওদরের চুরীর ব্যাপারের সকল কথাই ভূষণ অস্বীকার করিয়াছিল, কিন্তু তারপর হাজতে রাখিয়। দুই একটা তাড়। দিবার পর সে সকলই স্বীকার করিল এবং অপহৃত গহনা গুলি ও কাঠগােলাতে পাওয়া গেল। আমার এই অপরাধী ধরিবার আমূল ইতিহাস শুনিয়া বড় বাবু বিশেষ সন্তুষ্ট হইলেন এবং সেই রাত্রেই দে ওরে যাত্রা করিয়া চোৰ্য্য কার্যের সাহায্যকারী সেই মুহরী শ্যামলাল রায়কে গ্রেপ্তার করিবার জন্য আদেশ করিলেন। এই প্রকার অসম্ভাবিত উপায়ে কৃতকাৰ্যতা লাভ করিয়া, শ্রমক্লিষ্ট ক্ষীণ শরীরে যেন চতুগুণ বল প্রাপ্ত হইলাম এবং একজন সাহায্যকারী ইনেস্পেক্টরকে সঙ্গে লইয়া সেই রাত্রেই পুনরায় দেওঘরে যাত্রা করিলাম। পরদিন প্রাতে দশটার সময় দেওঘরে পৌছিয়া, স্থানীয় থানা হইতে কয়েকজন কনেষ্টেবল্ সঙ্গে লইয়া, বনমালী চৌধুরীর বাসায় উপস্থিত হইলাম। শাললাল রায় মুহুরী মহাশয় তখন একজন দোরের সুদের হিসাব করিতেছিলেন ; আমি তাঁহাকে আইন মত অপরাধের কথা বলিয়া গ্রেপ্তার করিলাম। এ কথা কত্তার কর্ণগােচর হইতে অধিক বিলম্ব হইল না। তিনি কত ক গুল। বাজে কথা বলিয়া আমা- দিগকে নিরস্ত করিতে চেষ্টা করিলেন। আমি তাহাকে পার্শের ঘরে ৭০ কুন্তলীন পুরস্কার। লইয়া গিয়া, চুরীর আমূল ইতিহাস বর্ণন করিলাম এবং মুহুরী মহাশয়ের নামীয় সেই চিঠিখানিও দেখাইলাম। বলা বাহুল্য সেই পত্র হইতে কি প্রকারে আমি ভূষণ দাসের সন্ধান পাইয়াছিলাম তাহা তিনি প্রথমে বুঝিতে পারেন নাই। তারপর “খ চ খ ক ক ইত্যাদি” অক্ষরাঙ্কিত সেই কাগজখণ্ডের সাহায্যে যে পত্রখানি পড়িতে হইবে তাহা বুঝাইয়। দিলাম ; বাঙ্গালা বর্ণমালার দ্বিতীয় অক্ষর “খ” এর অর্থ প্রথম ছত্রস্থ দ্বিতীয় শব্দ “আমি” এবং তৎপরবর্তী বর্ণমালার ষষ্ঠ অক্ষর “চ' যে পত্রের দ্বিতীয় ছত্রস্থ ষষ্ঠ শব্দ “জিনিস” বুঝাইতেছে এবং এই প্রকারে যে পত্র পাঠ করিতে হইবে চৌধুরী মহাশকে বেশ বুঝাইয়া দিলাম। কর্তা তখন স্বয়ং পত্রের প্রত্যেক ছত্র হইতে পূর্বোক্ত প্রকারে নির্দিষ্ট শব্দ গুলি বাহির করিয়া পত্র পাঠ করিয়া আমার বুদ্ধির যথেষ্ট প্রশংসা করিলেন । অপরাধী শ্যামলাল রায়কে হাজতে পাঠাইয়া, আমরা সেদিন চৌধুরী মহাশয়ের বিশেষ অনুরোধে দেওঘরে অবস্থান করিলাম। পরদিন কলিকাতায় গিয়া শুনিলাম, বদ্ধমানের হত্যাকারী এবং দেওঘরের চোর ধৃত করার পুরস্কার স্বরূপ, একটী সত্তর টাকা মাহিয়া- নার পদে আমার উন্নতি হইয়াছে । জগদানন্দ রায় কৃষ্ণনগর, নদীয়া।
অষ্টম পুরস্কার ৫ রেলে চুরি। প্রথম পরিচ্ছেদ। p সাড়ে বারটার গাড়ীতে শেয়ালদহ ষ্টেশনে ট্রেনে চড়িলাম। সে। পেসেঞ্জার চিকুতে ঢিকুতে চলিতে লাগিল। গাড়ীতে বসিয়া মনে মনে উত্তরাঞ্চলবাসীদের বুদ্ধির প্রশংসা করিতেছিলাম। সেখানকার কোন এক বুদ্ধিমান জমীদার মহাশয়ের গৃহে এক জন সন্ন্যাসী কপা করিয়া পদধূলি দিয়াছিলেন। সাধু-সেবাপ্রিয় জমীদার দুই দিন কায়- মনােবাক্যে সাধুসেবা করিয়া আপনাকে কৃতার্থ মানিয়েছিলেন। তৃতীয় দিন প্রাতঃকালে দেখা গেল যে সন্ন্যাসী অহিত হইয়াছেন এবং দক্ষিণস্বরূপ জমীদারে কাশ বাটী লইয়া গিয়াছেন। আমার ক ভােগ ছিল, সেইজন্য জমীদার মহাশয়ের বুদ্ধিমত্তার ফল আমাকে ও কিছু ভোগ করিতে হইতেছে, কারণ সেই অন্তাহত সন্ন্যাসী মহাশয়কে খােজ করিবার কাৰ্যটা আমার উপরেই পড়িয়াছিল। সন্ন্যাসী ঠাকুরের চেহারা সম্বন্ধে জমীদার যেরূপ লিখিয়া পাঠাইয়া- ছেন তাহাতে জ্ঞাত হইয়াছি সন্ন্যাসীর বর্ণ সাধুজনােচিত উজ্জল শ্যাম বর্ণ, বুদ্ধি পরিচায়ক প্রশস্ত ললাট, নাসিকা সুবঙ্কিম, চক্ষু ক্ষুদ্র ও উজ্জ্বল, দৃষ্টি তীক্ষ এবং তাহার পৃষ্ঠদেশে একটী অস্ত্রাঘাতের দাগ আছে। অস্ত্রাঘাতের দাগ বােধ হয় তঁাহার পূৰ্ব্বের গুণপনার নিদর্শন হইবে। দাজিলিংমেলে যাইলে সুবিধা ছিল বটে, কিন্তু রাণাঘাটে শ্বশুরালয়ে নামিয়া একবার প্রণয়িণীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া যাইবার ইচ্ছা ছিল। } 2 } १२ কুন্তলীন পুরস্কার। সেইজন্য স্লো ট্রেনে যাইতেছি। রাণাঘাটে এ ট্রেণ ছাড়িয়া দাজিলিং মেলে চড়িব মনস্থ করিয়াছি। কাচড়াপাড়া ষ্টেসনে গাড়ী থামিবামাত্র, দেখিলাম একটী লােক ষ্টেসন মাষ্টারের নিকট কঁদিয়া পড়িল। গােলমাল দেখিয়া আমি গাড়ী হইতে নামিয়া পড়িলাম। দেখিলাম লােকটি অবিশ্রান্ত ক্রন্দন করিতেছে ; তাহার ক্রন্দনের ভাবার্থ সংগ্রহ করা কিছু দুস্কর হইল বটে, কিন্তু অবশেষে বুঝিলাম যে এই লােকটি লাটুদহের জমীদারের নায়েব। কলিকাতা হইতে দশ হাজার টাকার নােট লইয়া একটা জমীদারী কিনিবার জন্য কৃষ্ণনগর অভিমুখে যাইতেছিল। নােট গুলি তাহার গলায় বলান করে িস ব্যাগে ছিল, সেই নােট গুলি সমস্তই চুরি গিয়াছে। সবিশেষ জিজ্ঞাসা করিয়া তাহার নিকট হইতে নিম্নলিখিত বিবরণ সংগ্রহ করলাম - “আমি শেয়ালদহ হইতে যখন গাড়ীতে উঠি তখন চাবিওয়ালাকে কিছু দক্ষিণা দিয়া অপর কেহ কামরায় উঠিতে না পারে এজন্য চাবি বন্ধ করাইয়া লইয়াছিলাম। কিন্তু গাড়ী ছাড়ে ছাড়ে এমন সময় একটা ভদ্র লােক, পকেট হইতে চাবি বাহির করিয়া আমার কামরা খুলিয়া তাহাতে উঠিলেন এবং উঠিয়াই পুনরায় দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। ভদ্র লােকটির সঙ্গে মােট বেশি ছিল না, কেবল একটী মাত্র ছােট চামড়ার ব্যাগ ছিল, সেটি একজন মুটে বহিয়া আনিয়াছিল। বেশ ভূষায় তাহাকে একজন সম্ভ্রান্ত লােক বলিয়া বােধ হইল। তিনি গাড়ীতে উঠিবামাত্র গাড়ী ছাড়িয়া দিল । তখন তিনি যেমন ব্যস্ত হইয়া মুটিয়াকে ব্যাগ হইতে পয়সা বাহির করিয়া দিবেন অমনি তাহার ব্যাগ হইতে একটী শিশি পড়িয়া ভাঙ্গিয়া গেল এবং সুগন্ধে চতুর্দিক আমােদিত হইল। যখন দমদমা ষ্টেসনে গাড়ী থামিল, তখন তিনি দুই খিলি পান কিনিলেন এবং তাহার এক খিলি সুজনােচিত ব্যবহার অনুসারে আমাকে প্রদান করিলেন। আমি তাহার এই ভদ্র ব্যবহারে অতীব প্রীত হইয়া তাহার সহিত কথপােকথনে প্রবৃত্ত হইলাম। “এরূপ কিছুকাল কথােপকথনের পর ট্রেণ যখন বারাকপুর হইতে রেলে চুরি। ছাড়িল তখন আমি সেই ভগ্ন শিশিটির মধ্যস্থ পদার্থের গন্ধে বিমােহিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম – ‘মহাশয় এ শিশিতে কি ছিল ? “তিনি বলিলেন, “সে কি মহাশয় আপনি কুন্তলীন তেলের নাম জানেন না ? কুন্তলীনের জন্যই আজকাল এইডু, বসুর নাম বিখ্যাত হইয়াছে। কিন্তু তাহার এসেন্স দেলথােস যদি আপনি আগ্রাণ করেন তাহা হইলে আপনি ইহা অপেক্ষা ও মােহিত হইবেন।' এই বলিয়া একটা সুন্দর ক্ষুদ্র শিশি পকেট হইতে বাহির করিলেন।'' “আমি অত্যন্ত কোতুহল পরবশ হইয়া বলিলাম, 'মহাশয়, এইটিই কি এসে , দেলখােস।' ‘হ মহাশয়' বলিয়। শিশিট তিনি আমার হাতে দিলেন। আমি ছিপি খুলিয়া নাকের কাছে ধরিলে প্রথম একটী মিষ্ট গন্ধ পাইলাম, কিন্তু সৰ্ব্ব শরীর অবশ হইয়া আসিল, হাত হইতে শিশিটি পড়িয়া যাইতে ছিল তিনি ধরিলেন। তাহার পর কি হইল কিছুই বলিতে পারি না। কাচড়াপাড়ার নিকট আসিয়া যখন আমার চৈতন্য হইল তখন আর সে লোকটাকে দেখিতে পাইলাম না, ব্যাগ খুলিয়া দেখিলাম তাহাতে একখানি নােট ও নাই" এই কথা বলিয়া সেলােকটী বালকের মত ভেউ ভউ করিয়া কান্দিতে লাগিল। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। তাহার নিকট হইতে এইরূপ বিবরণ শুনিয়া সেখানকার দুই এক জন বুদ্ধিমান পুলিশ অফিসার সাব্যস্ত করিলেন যে এই ব্যাটা মনিবের টাকা চুরি করিয়া এ রকম ধূয়া তুলিয়াছে। আমার মত কিন্তু তাহা- দের সহিত মিলিল না। আমি ইত্যবসরে সেই কামরাটির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া দেখিলাম, বাস্তবিক একটী শিশি ভাঙ্গিয়া এক প্রকার গন্ধ তৈল গাড়ীর মেজেয় ঢালিয়া পড়িয়াছে। বিশেষরূপে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিলাম একটী তৈলাক্ত নূতন রবারের জুতার ছাপ গাড়ীর অপর দ্বার পর্যন্ত গিয়াছে। তাহার পর ফুটবাের্ডের উপরও হরকরা সেই কুন্তলীন পুরস্কার। ডাকাতি হইয়া থাকে। কৰ্ত্তা বাবুর আড়তে সেই চোরাই মাল জমা করিয়া লওয়া ও তাহার বিলি বন্দবস্ত করা বাবুর একটি বিশেষ কাৰ্য্য তাহা বুঝিতে পারিলাম। তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাবর বাটীতে একটী কাঠের লেটার বা # ছিল । লেটার বাকে চিঠি রাখিয়া যাইত। বাবু পরে খুলিয়া পড়িতেন। সেই বা হইতে চিঠি চুরি করিয়া পড়া আমার প্রধান কাৰ্য্য হইল। ডিটেকটিভ কৰ্ম্মচারীদিগের চিঠি খুলিয়া পড়িতে বেশী কষ্ট পাইতে হয় না। শীল করা চিঠি গুলি, মদে রুট ভিজাইয়া মােহরের ছাপার প্রতিলিপি তুলিয়া রাখিয়া, খুলিয়া পড়িয়া আবার পূর্বের মত শীল করিয়া দেওয়া যায়। আমি তাহা অপেক্ষাও সহজ উপায় অবলম্বন করিয়াছিলাম। চিঠির খামের এক ধারে একচুল কাগজ কাটিয়া চিঠি- খানি বাহির করিয়া লইতাম। তাহার পর শিরিশ দিয়া এমন জুড়িয়া দিতাম সে কাহারও সাধ্য নাই ধরিতে পারে। যত গুলি চিঠি পড়িয়াছিলাম তাহাতে বিশেষত্ব কিছুই পাই নাই। চার দিনের দিন একখানি চিঠি পড়িয়া মন কিছু সন্দেহ যুক্ত হইল। চিঠি খানি এই :- প্রণাম পূর্বক নিবেদন মিদং চৌধূরী মহাশয় আপনকার কথামত চারি পাঁচ দিন বিলম্ব করিয়া রাজা বাবুর বাগানে যাই। দেখিলাম বাগান ঘাস এবং আগাছায় ও নােটের শাকে ভরিয়া আছে ; আর লেটার খানি বাবুকে দিয়াছি এখানকার নম্বর পঞ্চান্ন। পুকুরের অবস্থা ভাল নাই। আপনি নিয়ম মত চারি পাঁচ দিন বাদে এক এক খানি পত্র অবশ্য অবশ্য করিয়া পাঠাইবেন। যে সকল ইট ভাঙ্গিতে বাকি আছে সে গুলি সমস্ত কলে লইয়া গিয়াছে। এবং কতক ভাঙ্গাও হইয়াছে। নিবেদন ইতি একরম চাঁদ সিং ।
যাহা হউক রেলে চুরি । ৭৭ চিঠিখানির ভাবার্থ বিশেষ কিছুই বােঝা যায়না। নােটের” লেটার” “নগর' এই সমস্ত কথা গুলি দেখিয়া বােধ হইতে লাগিল যে এই চিঠির মধ্যে হারাণ নােট সম্বন্ধে কিছু গাঢ় রহস্য আছে এবং ইহা মনে করিয়া আমি অত্যন্ত মনােতােগের সহিত বারম্বার চিঠির লিখিত শব্দ গুলির পর্যালােচনা করিতে লাগিলাম । সহসা আমার নিকট চিঠি খানির রহস্যোদাটন হইয়া গেল। তখন আমার বিন। মাহিনার চাকরীতে ইস্তফা দিয়। কলিকাত। চলিয়া আসিলাম এবং ডাক বিভাগের কর্তৃপক্ষগণের সহিত পরামর্শ করি। রাজাবাগান ডিবিসনের পিয়নের কার্যে নিষক্ত হইলাম। নিযুক্ত হইবার পরদিনই আমি যাহা আশা করিতেছিলাম তাহা পাইলাম, অর্থাৎ চূচড়া প্রতাপপুর হইতে সাধুচন্দ্র খ। চৌধুরী প্রেরিত করমচাদ সিংহের নামী এক খানি রেজিষ্টারী চিঠি আমার হস্তগত হইল। রেজষ্টারী চিঠি লইয়া আমি ঢার নম্বরের বাটীতে উপস্থিত হইলাম । রেজেষ্টারী চিঠির সংবাদ পাইয়া বাটীর কর্তা বহিপাটীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আমার নিকট হইতে রসিদ খানি চাইয়া সই করিয়া আমার হাতে ফেরৎ দিলেন। আমি দেখিলাম পূৰ্বোল্লিখিত পত্রের লেখা ও এই হাতের লেখা ঠিক এক প্রকার । তখন আমার সঙ্কেতে চারি জন পাহারা ওয়ালা আসিয়া করমচঁাদকে গ্রেপ্তার করিল। তার পর সেই রেজেষ্টারী চিঠি খানির উপর ডেডলেটার আপিসের ছাপ দিয়া একজন সহকারীর দ্বারা প্রতাপপুরে সাধুচন্দ্র পা চৌধুরীর ওখানে পাঠাইয়া দিলাম । ডাক ওয়াল গিয়া খবর দিল সে কলিকাতার একখানি রেজেষ্টারী চিঠি ডে লেটার আফিস ঘুরি। ফেরত আসিয়াছে। চৌধুরী মহাশয় অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া রসিদ খানিতে সই করিয়া ফেরত লইলেন। সেই সময় পুলিশ আসিয়া তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়া ফেলিল এবং পূর্বোক্ত রেজেষ্টারী চিঠি খােলায় তাহার মধ্য হইতে পাঁচ খানি চোরাই নােট বাহির হইল এবং তাহার বাড়ী খানতল্লাসী করায় অপহৃত নােটের আরাে কয়েক খানি পাওয়া গেল।
৭৮ কুন্তলীন পুরস্কার। পূর্বোক্ত করমচাঁদই যে সন্ন্যাসী সাজিয়া ক্যাস বাক্স চুরী করিয়াছিল এবং রেলে নায়েবকে দেলখােসের পরিবর্তে ক্লোরােফর্ম দ্বারা তচেতন করিয়া তাহার ব্যাগ হইতে নােট গুলি চুরি করিয়াছিল তাহাতে আর সন্দেহ রহিল না। * পাঠক গণের স্মরণ থাকিতে পারে পূর্বোক্ত চিঠি খানির "নােটের” ‘লেটার" “নগর” এই তিনটা কথা। হঠাৎ চোখে পড়িয়া আমার মনে প্রথম সন্দেহের উদয় হয়। সেই সময় বিশেষ রূপে লক্ষ্য করিয়া দেখিয়াছিলাম সে এই কয়েকটা কথা ঠিক চারিটা চারিটি কথার অন্তরে আছে। এই ইঙ্গিত অনুসারে পত্রের আরম্ভ হইতে প্রত্যেক পঞ্চম কথা একত্রে পড়িয়া দেখিয়াছিলাম নে কথা গুলি এইরূপ দাড়ায় “চারি রাজাবাগান নােটের লেটার নম্বর নাই পাচ খানি পাঠাও বাকী কলে ভাঙ্গাও" অতএব পত্র লেখক সে এই কথা গুলি লিখিবার জন্যই এরূপ সুকৌশলে বাক্য বিন্যাস করিয়াছিল, তাহাতে আমার আর সন্দেহ ছিল না। বাঙ্গালীর পেটে কোন কথা থাকা বােধ হয় বিধাতার নিয়ম নহে। সেই কারণে হারাণে নােটের যে সিরিয়াল নম্বর নাই, একথা কলিকাতা সহর ময় রাষ্ট্র হইয়াছিল। কাজেই জুয়াচোরদের একথা জানিতে অধিক কষ্ট পাইতে হয় নাই। নায়েব নিস্কৃতি পাইয়া আমার নিকট আসিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলেন । আমি তাহাকে উপদেশ দিল, ম যে যদিও তিনি লাটুদহের জমীদারের নায়েব, কিন্তু তথাপিও রাস্তার প্রত্যেক ভদ্র লােকের সহিত আলাপ করাটা ঠিক হয় নাই। এমতী সরলাবাল। দাসী অমৃতবাজার পত্রিকা অফিস। HD) না, নবম পুরস্কার ৫ আমার কাহিনী। ডেপটাগিরি পরীক্ষা দিয়! ফ ন মাসের একদিন সাস্তের সময় কলিকাতা হইতে বাটা পেছিলাম । আমার বাটী বদ্ধমান জেলা, সুদর পলি গ্রামে। বাটীতে থাকেন খুল্লতাত মহাশয় ও খুড়িমা। আমি ইহাদের সহিত এক পরিবারভুক্ত। 'হারাই বাটার কন্তা ও গিন্নি। আমি শৈশবে পিতৃনান। ভাই ভগ্নি নাই। গুড়। মহাশয় ও অপুক। বার মধ্যে ছেলে সবে ধন আমি নীলমণি। শ। বাপ নর ছেলে। গুলতাত মহাশয় ও গুড়িমা হৃদয়ের সমস্ত গেইটুকু আমার উপর ডালিয়াছিলেন । তাতে আবার এ আদরের অংশীদার কেহ নাই। আমি নেন আলালের ঘরের দুলাল। যখন যাহা চাই খুল্লতাত মহাশয় সাধ; মত মনস্কামনা পূর্ণ করিতে ঐটা করিতেন না। আমার শৈশবের দৌরাত্মে। লােকজন পাড়া প্রতিবেশ ব্যতিব্যস্ত। আমি যেন দ্বিতীয় কৃষ্ণঠাকুর। ননী চুরি মাখন চুরি, দই চুরি গােল চুরি, আম জামের ত কথাই নাই। খুড়া মহাশয়ের নিকট নালিসে কোন প্রতি কার হইত না। কেহ আমার নামে নালিশ করিতে আসিলে তিনি তাহাদিগকে মিষ্ট কথায় তুষ্ট করিয়া দিতেন। ছেলে বেলার একদিনের গল্প বলি। তাহা হইলে আমার দৌদ্দ ও প্রতাপ কতকটা উপলব্ধি করিতে পারিবেন। তখন গ্রামের গুরুমহাশয়ের নিকট পাঠশালে বােধােদয় পড়ি। বৈকালবেলা পাঠশালা বসিয়াছে। পাততাড়ি খুলিয়া ধারাপাত লিখি- তেছি ও পাশের সহপাঠীকে চিষ্টা কাটি বার সুখ তৃপ্তিপূৰ্ব্বক উপভােগ করিতেছি। গুরুমহাশয় অর্ধনিদ্রিতাবস্থায় শিথিল হতে আরামদায়িণী কুন্তলীন পুরস্কার। হুকাদেবীর আরাধনায় নিযুক্ত। এমন সময় আমার ও আমার সহ- পাঠার নামে ওপাড়ার হরি চাটুৰ্যে কর্তৃক নালিশ রুজু হইল। ব্যাপার —খিড়কি পুকুরের পাড়ের আমগাছ হইতে আম চুরি। গুরুমহাশয় বিরক্ত হইলেন ; দেখিতে দেখিতে তিনি রক্তৱর্ণ চক্ষে বিছানায় উঠিয়া বসিলেন। সর্দার পােেরা পর্যন্ত তটস্থ। আমি কিন্তু সম্পূর্ণ নির্ভীক । দিবিজয়ী বীর যেমন শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করিয়া গন্তব্য পথে সসৈন্যে সতেজে চলিয়া যায়, আমি তেমনি নির্ভীক হদয়ে তেমনি বীরের মত সতেজে পাততাড়ির উপর শরের মােটা কলম চালাইতে লাগিলাম। আমি জানিতাম পণ্ডিত মহাশয় সহস্র দোষে ও আমাকে কিছু বলিবেন না। আমাদের বাটী হইতে পণ্ডিত মহাশয়ের অনেক পাওনা। মাসিক মাহিনা-আমার মাহিনা আবার সকল ছেলের চেয়ে বেশী। আমাদের বাড়ীতে বার মাসে তের পাৰ্বন, পূজা পার্বনে কাপড় চোপড় গুরুমহাশয়ের অবশ্যম্ভাবী পাওনা। আমাদের বাড়ী গুরুমহাশয়ের প্রায়ই নিমন্ত্রণ ; হাত পুড়াইয়া রাপিয়া খাইবার দায় হইতে পণ্ডিত মহাশয়ের সেই সব দিন পরিত্রাণ। এসব বাদে, আমার বুদ্ধির গুণে ও হস্তের কসরতে প্রায়ই ভাল তামাক আমাদের বাড়ী হইতে অন্তহিত হইয়া গুরুমহাশয়ের নিকট উপস্থিত হইত। এহেন আমি, আমাকে কি গুরুমহাশয় কিছু বলিতে পারেন ? তায় আবার আমি আদুরে ছেলে। আমায় কিছু বলিলে খুড়া মহাশয় অসন্তুষ্ট হইবেন সেট। পণ্ডিত মহাশয়ের বেশ জ্ঞান ছিল। সুতরাং আমি বেশ বুঝিতে পারি ও বরাবর দেখিয়াছি পণ্ডিত মহাশয়ের নিকট আমার সাতখুন মাপ। নালিশ শুনিয়া পণ্ডিত মহাশয় বলিলেন “রাজু, বলত, বাবা কি হয়েছিল ? সত্যি বল ব;বা, জানত আমি মিছে বল্লে হাড়- গােড় ভেঙ্গে দিব।” পণ্ডিত মহাশয়ের স্বর স্বাভাবিক, শুধু স্বাভাবিক নয়, বরং একটু আদরের । আমি বল্লাম “না, প:ওত মহাশয় আমি যাই নাই, এই শ্যামা আমায় নিয়ে গিয়েছিল। আমার সহপাঠী যাহার গাত্রের উপর এতক্ষণ নথরের ধার পরীক্ষা করিতেছিলাম তাহারই নাম শ্যামসুন্দর ওরফে শ্যামা। বলা বাহুল্য দুই জনই দুপুর আমার কাহিনী। রোদে আম্র সেবন সুখ উপভােগ করিতে গিয়াছিলাম; শ্যামা আমাকে লইয়া যায় নাই, আমিই বরং শ্যামাকে লইয়া গিয়াছিলাম। কিন্তু ভগবানের কি আশ্চয্য মহিমা ! আমি যেই বলিলাম শ্যামা আমাকে লইয়া গিয়াছিল, বাস্ আমি বেকসুর খালাষ। পণ্ডিত মহাশয় তজ্জন করিলেন “বটেরে শ্যামা, রেজোর দোষ কি, তুই ত যত নাটের গুরু।” শ্যামের কোন সাফাই খাটিল না। তাহার পিঠে ঘা কয়েক সপাস হইয়া গেল। পাঠশাল ছুটী হইলে শ্যামা ও আমি শক্তি করিলাম হরি চাটুগেকে জব্দ করিতে হইবে। রাবণ রাজার রাজনীতি “শুভস্য শারং”। আমা- দেরও সেই কথা সেই কাজ। পরদিন রানা ছুতারের করা ত হারাইল। তিন দিনের অনবরত চেষ্টায় ক্ষুদ্র আম বৃক্ষটী ভূমিস্যাং। এমনি বৃদ্ধির জোর ও ভগবানের কোশল, যে কেহই করিতে পারিল না। কিন্তু সকালেই বুঝিল। সেই অবধি একই কখন আমার নামে গুর মহাশয়ের নিকট নালিশ করিতে আসে নাই। এমনি করিয়া আমার দিন গুলি কাটতে লাগিল। চদের কলার ন্যায় দিনে দিনে আমার বয়স বৃদ্ধি হইতে লাগিল। বিশ্ববিদ্যালয় রূপ ভবসমুদ্রে ক্রমে ক্রমে পাড়ি দিতে লাগিলাম। প্রবেশিকা, এলে, বি এ, ল উত্তীর্ণ হইয়া ডেপুটগিরি পরীক্ষা দিলাম । বয়স তেইশ বংসর। এত বয়স হইল, এত পাশ করিলাম, কিন্তু একটি দেশ আমার গেল দমন করিতে আমি কখন শিখি নাই। শৈশব হইতে যখন যাহ চাহিয়াছি তখনই তাহা পাইয়াছি। খুড়া ও খুড়িমা প্রাণপণে অভিলাষ পূর্ণ করিতেন । অপূর্ণ অভিলাষের ব্যথা কখন আমায় ভােগ করিতে হয় নাই। সেই স্বভাব প্রথমেই দৃঢ় হইল। আমার যাহা ইচ্ছা- বুঝিয়াই হউক আর খেয়াল বশেই হউক, ভাল হউক মন্দ হউক—আমার যাহা ইচ্ছ। আমি তাহা করিবই। কোন প্রকার বাধা বিঘ্ন আমি গ্রাহ্য করিব না। বাধা পাইলে বরং আমার আগ্রহ অধিকতর হয় । এই খানেই আমার দোষ। তা দোষ হয় হউক। চাদেও কলঙ্ক আছে, মৃণালেও কন্টক না, প্রবৃত্তি’দ:
৮২ কুন্তলীন পুরস্কার। ডেপুটীগরি পরীক্ষা দিয়া বাট আসিলাম। লােক মুখে আমার এখন প্রশংসা ধরে না। পাড়াগেয়ে লােক, সবাই মনে করে আমি একট। বিদ্যার জাহাজ। নেখানে পাচ জন বসিয়াছে সেইখানেই অাশার কথা ও অামার প্রশংসা। কেহ বলিত, আমি একট। ক্ষণজন্ম ছেলে, এমন ছেলে আর হয় না। শৈশবে, বাল্যে, আমি কখন কাহার নিকট কোন বিষয়ে অসাধারণত্ব দেখাইয়াছিলাম, তাহারই আলােচনা হইত। মেয়ে মহলে ও আমার পশার ভারি। এই সব শুনিয়া খুড়িমা আলাদে আটখানা। ক্রমে অনেক লােক আমার শ্বশুর পদ লাভ করিবার জন্য খুল্লতাত মহাশয়ের উমেদারী করিতে লাগিলেন। শেষে অনেক দেখিয়া শুনিয়া হুগলী জেলার অন্তর্গত একটি গণ্ড গ্রামে একটি পাত্রী মনােনীত হইল। যথা সময়ে মাথায় টোপর ও হাতে সুতা বাধিয়া লােকজন বাদ্য কোলাহল সহিত ভাবী শ্বশুর গৃহে আমি উপস্থিত। বিবাহ হইল। কিন্তু দেনা পাওনা লইয়া শ্বশুরের সহিত খুড়া মহাশয়ের কি একটা গােলযােগ হইয়াছিল। কি গােলযােগ হইয়াছিল, আমি জানি নাই; জানিবার অবকাশও ছিল না। আমি তখন ভাবে বিপাের। আমার কি তথন বাহ্য জ্ঞান আছে ? আধ আলো, আধ ছায়া গােছ একটি অস্পষ্ট সলজ্জ সুন্দর মুখের ( বিবাহিত পাঠক ক্ষমা করবেন, শুভ দৃষ্টির আমার এই অভিজ্ঞতা) অপূৰ্ব্ব মাধুরী আমার তখন হৃদয় আলােড়িত করিতেছিল । পরে শুনিলাম, শ্বশুর মহাশয় খুল্লতাত মহাশয়কে দেন। লইয়া কিঞ্চিং রূঢ় কথা শুনাইয়া দিয়াছিলেন। আমি কথাটায় এমন বিশেষ কিছু মনােযােগ করিলাম না। বিবাহের পর ফুলশয্যা। সেই রাত্রি আমার অর্ধাঙ্গিনীকে প্রাণ ভরিয়া দেখিলাম। যাহা দেখিলাম তাহা এক মুখে বর্ণনা সম্ভবে না। যদি মহাদেবের মত পঞ্চমুখ থাকিত, তাহা হইলে বর্ণনা করিতে পারি- তাম , যদি ব্যাসদেবের ন্যায় বর্ণনা শক্তি থাকিত, যদি গণেশের ন্যায় লেখনীর পটুতা থাকিত, তাহা হইলে কিঞ্চিৎ বৰ্ণনা করিতে পারি- তাম। বাস্তবিক এ বর্ণনা আমার অসাধ্য। ভাবিলাম বুঝি বা কোন ০ আমার কাহিনী। দেবী আমাকে ছলনা করিবার জন্য এ ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়াছেন। { পাঠিকাগণ হাসিবেন না।। অষ্টাহকাল আমাদের বাটীতে থাকিয়া আমার স্ত্রী পিত্রালয়ে চলিল ও সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃদয়টা খালি করিয়া গেল। কিছু ভাল লাগে না। খাওয়া দাওয়া, আমােদ প্রমােদ কিছুতেই সুখ নাই। আমার যেন “জনম অবধি, বিরহে দগধি, এ জীবন হয়ে গেল ছাই"। আমার যখন এই অবস্থা তখন একদিন খবর আসিল আমি ডেপুটী পরীক্ষায় ফেল হইয়াছি। মনটা আরও বেশী খারাপ হইয়া গেল। ক্রমে মাস চারি গত হইল। মনে শান্তি নাই। ইতিমধ্যে শ্বশুর মহাশয় আমাকে লইয়া যাইবার জন্য খুড়া মহাশয়ের নিকট বার দুই চিঠি লিখিয়াছিলেন। খুড়া মহাশয় দুই বারই আপত্তি করিয়াছিলেন। আমাকে ও বিশেষ করিয়া সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন যেন শ্বশুর বাটী যাই। বিবাহের সময়ের দেনা পাওনা উপলক্ষে শ্বশুর মহাশয়ের সেই রূঢ় ব্যবহার গুড়া মহাশয়ের তখনও মনে আছে। কিন্তু আর আমি নিষেধ আজ্ঞা মানিতে পারিতেছি না। মনের অশান্তি দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। বিবাহের পর আট দিনের পরিচয়ে আমার স্ত্রীর সম্বন্ধে যাহা জানিতে পারিয়াছিলাম, তাহাতে বুঝিয়াছিলাম, আমার স্ত্রী সুশিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী ও গুণবতী। মনে হইল, তাহার সহবাসে হয় ত শান্তি পাইব। ঠিক করিলাম শ্বশুরবাড়ী যাইব। কিন্তু যাই কি করিয়া। বাড়ী হইতে যাওয়া ত অসম্ভব। খুল্লতাত মহাশয় ত কিছুতেই যাইতে দিবেন না। আর এহেন মেহময় খুল্লতাত মহাশয়ের প্রকাশ্য বিদ্রোহাচরণ করিয়া শশুরবাড়ী যাইতে কেন বৈকুণ্ঠধাম যাইতেও প্রবৃত্তি নাই। অথচ শ্বশুর বাড়ী যাইতে হইবে। মনের বেগ দমন অসাধ্য। এক মতলব ঠিক করিলাম। বাটী হইতে এক ছুতা করিয়া কলিকাতা আসিলাম। সেখান হইতে একবারে শ্বশুরবাড়ী। মনে দ্বিধা নাই। অবশ্য এখন আমার অজ্ঞাতবাস। বাহিরে, প্ৰশ এখন আমি ৪. ৮৪ কুন্তলীন পুরস্কার। কলিকাতায়। বাটা হইতে চিঠি পত্র আসিতে লাগিল কলিকাতার ঠিকানায়। কলিকাতা হইতে আমার হাতের লেখা উত্তর পর্যন্ত যাওয়ার বন্দোবস্ত হইল। কেমন করিয়া শুনিবেন ? বন্ধু বান্ধবেরা চিঠির ঠিকানা পরিবর্তন করিয়া চিঠি গুলি আমার নিকট পাঠাইয়া দিতেন। আমি আবার উত্তর গুলি তাহাদের নামে কলিকাতায় পাঠাইতাম। তাহারা নুতন খামে সেই উত্তর গুলি ভরিয়া আমার খুড়ার নামে পাঠাইতেন। বুদ্ধির বাহাদুরি নাই কি ? শ্বশুর বাড়ী আসিয়া মনে কতকট। শান্তি পাইলাম। দীর্ঘ বিরহের পর অপূৰ্ব্ব মিলন সুখ উপভােগ করিতে লাগিলাম। যেন উত্তপ্ত ধরণী বারিধারা বর্ষণে শীতল হইল। দিন গুলা আমােদ আচ্চাদে কাটতে লাগিল । তাস পাশ দাবা, দাবা পাশা তাস। দিনের বেলা গল্প 'গুজব। সঙ্গী অনেক গল্প ও নানা প্রকার । খােদ মহারাণা ভিক্টোরিয়া হইতে রাম কামার, বিদ্যাসাগর হইতে একাদশী পাড় যে, অহলাই ও মিস ফ্লোরেন নাইটিঙ্গেল হইতে স্বর্ণবাই ও তেলী বৌ পর্যন্ত আমাদের গল্পের বিষয়ীভূত! আমাদের খেলার আডড। ঠিক নেন অনুসন্ধানের পঞ্চভৌতিক” সভা। একদিন সৌখিন বার সম্বন্ধে কথা উঠিল । পরিদৃশ্যমান সৌখিন বাবুর দৃষ্টান্ত হইতে ক্রমে ক্রমে মনােবিজ্ঞানের নিয়মানুসারে আদশ সৌখিন বাবুর কাল্পনিক নমুনার দিকে সকলের মন ধাবিত হইল। সকলেই আপন আদশকে নিজ নিজ অভিজ্ঞতা অনুসারে মনােমত করিয়া সাজাইলেন । পারে কার্গে- টের জুতা হইতে মস্তকে রেশমী ছাতা পর্যন্ত সকলই হইল। বাদসাহী আতর গােলাপ জল হইতে সাহেবী অডিকলম লাভোর পর্যন্ত আদশ সৌখিন বাবুর গোঁফে ও মাথায় চড়িল। দশাঙ্গুলে হীরকারীয় । সকলের সাজান হইলে পর আমি বলিলাম “ভাই তােমাদের সৌখিন বাবু ‘সৌখিন' হয় নাই। তােমাদের সৌখিন বাবুর ‘দেখােস’ নাই। ইহাতে একজন বলিল “দেলথােস’ আবার এসেন্স, ওসব কলিকাতার জুয়াচুরি”। আমার পােটমেন্টে দেলথােস ছিল। আমি কিছু না বলিয়া পাের্টমেন্ট খুলিৱা দেখােসের শিশিটী আনিলাম। যে ব্যক্তি আমার কাহিনী। দেলথােস জুয়াচুরি বলিয়াছিল তাহার জামায় কিঞ্চিং ঢালিয়া দিলাম । সুগন্ধে ঘর আমােদিত হইল। সকলেই বলিল ইহার গন্ধ খুব মনােরম, সকল রকম এসেন্স অপেক্ষা বেশী। তখন সেই ব্যক্তি কিঞ্চিৎ অ প্রতি হইয়া বলিল “ইহার গন্ধ বেশী হইতে পারে কিন্তু ক্ষণস্থায়ী"। আমি বলিলাম তােমার জামার গন্ধ যদি তিন দিন না থাকে তাহা হইলে পাচ টাক দিব। সে ও ত প বাজি রাখিল। সে সমস্ত দিন জামাটা গায়ে দিয়া রাখিল । তাহার পর দিন জামাটী বালো পুরিয়া ডবল চাবি দেওয়া হইল। তিন দিন পরেও দেলখােসের গন্ধ স্পষ্ট অনুভূত হইল । সুতরাং সে বাজি হারিল । আমি এই টাকার সঙ্গে কিছু দিয়া বন্ধু বান্ধবদিগকে ভােজ দিলাম। দিনের বেলা এই প্রকারে কাটে। র. রহস্য, পোলাপ। বিবাহিত পাঠককে তাহার আর নতুন পরিচয় কি দিব? দিন কয়েক শ্বশুর বাড়ীতে কাটাইয়া কলিকাতায় আসিলাম। তথা হইত বাড়ী। বাড়ী আসিলাম বটে, কিন্তু আসিয়াই দেখি সব গােল। আমার অজ্ঞাতবাস সব প্রকাশ হইয়া গিয়াছে। ধম্মের কল বা সে নড়ে কিনা ! আমাদের স্বগ্রামস্থ একটা লােক কলিকাতা আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে কলিকাতাস্থ বাসায় আসিয়া আমার সম্বন্ধে সমস্তই শুনিয়া গিয়াছেন। তাহার নিকট হইতে খুল্লতাত মহাশয় শুনিয়াছেন। খুল্লতাত মহাশয় আমাকে স্পষ্ট কিছু বলিলেন না। আমি কিন্তু নবমীর পাটার ন্যায় কাপিতেছি। বুঝিলাম আমার এই ব্যবহার তাহার হৃদয়ে আঘাত দিয়াছে। কিন্তু তিনি আমার উপর রাগ করিয়া থাকিবেন কত কাল ? দিন কয়েক পরেই আমার উপর বিরক্তিভাব চলিয়া গিয়া সেই রাগ ভীষণ তর হইয়া শ্বশুর মহাশয়ের উপর পড়িল। এই সময় হইতে আমার ম্যালেরিয়া হইল। অনেক দিন ভূগি- লাম। নানা ঔষধ ডাক্তারি, কবিরাজী, হােমিওপ্যাথী চলিতে লাগিল। শেষ টোটুক। টাটকি ঝাড় ফু পৰ্য্যন্ত ; কিন্তু কিছুতেই ভাল হইল না। তখন একটা কথা উঠিল বৌয়ের পয় ভাল নয়, বৌয়ের দোষে ছেলের ৮৬ কুন্তলীন পুরস্কার। অসুখ। কথাটা প্রথমে মেয়ে মহল হইতে উঠিল। খুড়িমা শুনিলেন, প্রথম প্রথম কথাটায় বড় কান দিতেন না। কিন্তু নানা লােকে নানা ভাবে সৰ্ব্বদা এই কথা উক্তি করার দরুণ ও নানা প্রকার মেয়েলি যুক্তি, তর্ক, দৃষ্টান্তের অবতারণা করাতে তাহার ও এই কথা মনে উদয় হইল। রােগ উপশম না হওয়াতে এই বিশ্বাস ক্রমে তাহার হদয়ে বদ্ধমূল হইল। তিনি আমা গত প্রাণ, তিনি কি আর থাকিতে পারেন ? তিনি খুড়া মহাশয়কে বলিয়া কহিয়া আমার শুভাকাঙ্গায় ( খুড়া মহাশয়ের ও শশুরের উপর রাগ আছে । পাত্রী অনুসন্ধান করাইতে লাগিলেন। আমার বিপদ হইল। পুনরায় বিবাহ করিতে আমার সম্পূর্ণ অনিচ্ছা। আমার স্ত্রীর সহিত আমার কোন মনােমালিন্য নাই। আমার বিশ্বাস—আমার স্ত্রীর মত স্ত্রী নাই। আমি ভাবিতেছি ভগবান কি কোন উপায় করিবেন না। শেষে কি নিতান্তই বিবাহের দিন গুপ্তভাবে গৃহ হইতে পলায়ন করিতে হইবে ? আমি কিন্তু আমার মনোভাব কাহাকেও প্রকাশ করিলাম না । ব্যাপার যখন এই রকম দাঁড়াইয়াছে, তখন একদিন দেখি একটী শিবিকা আসিয়া আমাদের বাটীর দ্বারে লাগিল। শিবিকা হইতে বাহির হইল আমার স্ত্রী। লােক পরম্পরায় আমার শ্বশুর যখন শুনিলেন যে আমার পুনরায় বিবাহের জন্য পাত্রী অনুসন্ধান চলিতেছে, তখন তিনি আকাশ হইতে পড়িলেন। শেষ অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া নিরাভরণা, এক বস্ত্র পরিহিতা তঁাহার কন্যা পাঠাইয়া দিলেন। সঙ্গে কেবল একজন দাসী। এই আমার স্ত্রীর দ্বিরাগমন। খুড়িমাতাঠাকুরাণী আমার স্ত্রীকে মুখে খুব আদর যত্ন করিতে লাগিলেন, কিন্তু সে যত্ন যে আন্তরিক নয় তাহা বুঝা যায়। আমার স্ত্রী প্রাণপনে তাঁহার প্রিয়পাত্রী হইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। প্রাণ- পনে তাহার সেবা, গৃহকর্মে সহায়তা করিতে লাগিল। ক্রমে তাহার প্রতি খুড়িমার মনও কিছু নরম হইল। } আমার কাহিনী। ৮৭ দিন কয়েক পরে আমার শ্বশুর মহাশয় দ্বিরাগমনের সমস্ত সাজ সরঞ্জাম পাঠাইলেন। প্রত্যেক জিনিষই দামী। খুড়া মহাশয় দেখিয়া কিঞ্চিং হাসিলেন। আমার স্ত্রী আমাদের বাটীতে আসার পর বিবাহের কথা আর তেমন প্রকাশ্যভাবে আলােচিত হইত না। যাহা হইত তাহা গােপনে। শেষে এক অত ঘটনা দ্বারা আমার এই ভয়ঙ্কর বিরহান্ত নাটকের অভিনয় হইতে মুক্তি পাইলাম । আমার খুড়িমা একদিকে বেশ মানুষ যেন মাটীর মানুষ। কিন্তু তাহার একটি দোষ ছিল, নিজের নিন্দা তিনি সহ্য করিতে পারিতেন । সে তাহার নিন্দা করিত তিনি তাহার মুখ পর্যন্ত দর্শন করিতেন না। কিছুদিন পূর্ব হইতে, কি কারণে জানি না, তাহার মাথার চুল উঠিয়া যাইতেছিল। অনেক ঔষধপত্র তিনি মাথায় লাগাইলেন, কিছুতেই কিছু হইল না। ক্রমে চুল এখন খাট হইয়া গিয়াছে ও অনেক উঠিয়া গিয়াছে। স্ত্রীলােকের ইহাতে অবশ্য খারাপ দেখায়। প্রতিবেশী কামিনীরা তাঁহার পকেশের কথা লইয়া তাঁহার অসাক্ষাতে অনেক ঠা। বিদপ হাসাহাসি করিত। ইহা তাঁহার সহা হইত না। এইজন্য তিনি তাহাদের উপর চটিয়া নিতান্থ প্রয়ােজনীয় কথা ভিন্ন বাক্যালাপ পর্যন্ত করিতেন না। আমার স্ত্রী একদিন বন্সিল “মা (সে মা বলিত, আমার কাছে এক রকম তেল আছে, তাতে চুল উঠা বন্ধ হয়, নূতন চুল গজায় আর মাথা ঠা া হয়। তুমি ত চুলের আশা একেবারে ছেড়ে দিয়েছ, আমি একবার দেখি। এ তেল নূতন বেরিয়েচে।” এই বলিয়া সে খুড়িমার সকল আপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া কুলীনের শিশি খুলিয়া তাহার মাথায় বেশ করিয়া মাখাইল। সেই দিন হইতে রােজ অবসর পাইলেই সে খুড়িমার মাথায় কুন্তলীন মাখায়। ক্রমে দুই শিশি মাখান হইলে পর (ধন্য আবিষ্কারক) তাহার মাথার চুল ঘন হইতে ও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। আরও দুই শিশি মাখান হইল। তখন চুল প্রায় পূৰ্ব্ববৎ হইল। সকলেই কিছু আশ্চর্যান্বিত হইল।
৮৮
কুন্তলীন পুরস্কার।
এই ঘটনায় খুড়িমা আমার স্ত্রীর প্রতি বিশেম সন্তুষ্ট হইলেন।
সাহ কেহ করিতে পারে নাই, তাহা এই চারি শিশি কুন্তলীন সম্পন্ন
করিল। সেই দিন হইতে আমার পুনৰ্ব্বার বিবাহের প্রসঙ্গ বন্ধ হইল।
কেহ ঐ কথা উগাপন করিলে খুড়িমা বলিতেন “বালাই, বউমা আমার
লক্ষী, আমি কেন শুধু শুধু বৌমাকে সতীনের জ্বালায় জালাব।”
সেই দিন হইতে আমার স্ত্রী ও সেই কাচের শত্য চাবিটা শিশি ভগবানের
অপার দয়ার নিদর্শন বলিয়া পূজা করে ।
এদিকে আমার অসুখ ভাল হইল। এখন আমার স্ত্রী অপয়া,
কৃপয়া নাই। এখন তাহাকে পার কে ? তিনি ঘরের লক্ষী । খুড়িমা
কথায় কথায় বলেন “বউমা আমার ঘরের লক্ষী"। যখন যাহার ভাগ্য
সুপ্রসন্ন হয় তখন এমনিই হয়। ইনি এখন
এসে যুটে বসে
আমার পাওনায় ভাগ বসাইয়াছেন। জন্মাবধি আমি যে মেহ দখল
করিয়া আসিতেছি, তিনি আমার সেই মৌরসী স্বন্ত হইতেও অনেকটা
আমাকে বেদখল করিয়াছেন।
আমাদের ঘরকন্নায় আর কোন গোলযোগ নাই। বেশ সুখে
যাহা ঝগড়া কেবল আমাদের দুজনে, তাহাও আবার সঙ্গে
সঙ্গে মিটিয়া যায় ।
শ্ৰসতশচন্দ্র ঘােম।
আছি ।
দশম পুরস্কার ৫ প্রতিশােধ। গত বৎসর যখন আমার বিবাহের কথা হয় তখন আমি ফাষ্ট আর্টস্ পরীক্ষা দিয়া বাটী আসিয়াছিলাম। বিবাহের পৃকেই আমি আমার ভাৰী পীর রূপ গুণের বিষয় কতকট। শুনিতে পাইলাম। যাহারা বিবাহের সম্বন্ধ করিতে গিয়াছিলেন তাহারা আসিয়া বলিলেন যে “মেয়েটি খুব সুন্দরী না হইলে ও মন্দ নহে এব’ দেখিলে ধীর প্রকৃতি ও শান্ত স্বভাব। বলিয়া বােধ হয়।" “মেয়েটি তত সুন্দরী নয়” এই কথা শুনিয়া পিতাঠাকুর মহাশয় বিবাহে একটু আপত্তি করিলেন ; কিন্তু ত্রয়ােদশ বর্য বয়স্ক। অরক্ষণীয়া কন্যার ভারে প্রপীড়িত এক জন ভদ্রলােকের অনুরােধ ও তৎ প্রদত্ত অর্থ উপঢৌকনাদির লােভ এড়া- ইত না পারিয়া অবশেষে সম্মত হইলেন। শুভ কার্যের দিন স্থির হইল। আরও ভাল করিয়া জানিবার জন্য মাতাঠাকুরাণী একটি বৃদ্ধা স্ত্রীলােককে গােপনে আমার শ্বশুরদের বাড়ী পাঠাইলেন। তাহার মুখে ও সেইরূপ শােনা গেল ; অধিকন্তু সে বলিল “যে মেয়েটির মা নাই, সেই জন্য একটু অভিমানিনা, কিন্তু কার্য কম্মে খুব চালাক।” মাতাঠাকুরাণী তাহাতেই সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি বলিলেন যে “গৃহস্থ ঘরের মেয়ে কায কৰ্ম্ম করতে পাল্লেই হল ; দেখুঁতে চলনসই হওয়াই ভাল, খাস্ পরিদীর মত হওয়া কিছুই নয় ; আর অভিমানিনী, হ’লইবা, আমার ঘরে একলা শ্বাশুড়ীর বৌ হবে কেউ তাকে কিছু ববেও না, তার অভিমান করার কোন কারণ ও থাকবে না।” পিত অর্থ ও অনুরােধের বশীভূত হইয়া, মাতা পুত্রবধুর রূপ গুণের কথা শুনিয়া বিবাহে সম্মতি প্রদান করিলেন; তবে আর কুন্তলীন পুরস্কার। বিবাহের অপেক্ষা কি ? এক অপেক্ষা আমার নিজের মতের,—কিন্তু আমার মত কেহ জিজ্ঞাসা করিলেন না। এই স্থলে বলিয়া রাখি যে প্রথমে বিবাহের নামে মনটা অত্যন্ত স্ফীত হইয়াছিল, কিন্তু এক্ষণে পত্নীর রূপ গুণের কথা শুনিয়া একটু দমিয়া গেল। আমি এন্ট্রান্স পরীক্ষার পর হইতে নানাবিধ নাটক উপন্যাস পাঠ করিয়া হৃদয় মধ্যে সে একটি কল্পিত রমণীমতি স্ত্রীরূপে স্থাপন করিয়াছিলাম তাহার সহিত আমার এই ভাবী প্রণয়িণীর কোন সাদৃশ্য লক্ষিত হইল না। আমি ইংরাজী শিক্ষিত নব্য যুবক, আমার প্রণয়িণী রূপে কবিকল্পিতা কাব্য উপন্যাসের নায়িকাগণের ন্যায় রূপবতী রমণীর আদশ হওয়া আবশ্যক। বিদ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি-বিভূষিতা হইলেও পত্র লিখিবার সময় বঙ্কিম বাবর উপন্যাস ও রবি বাবুর কবিতা হইতে quotation করিতে পারা উচিত; প্রেমে জুলিয়েটের ন্যায় আত্মহারা না হইলেও নেহাং ভীরু স্বভাবা, লজ্জাশীলা, দু হাত ঘােটাটানা পাড়াগাঁয়ে কনেবৌ হইলে চলিবে না। কিন্তু বর্তমান স্থলে রূপের কথা যাহা শুনিলাম তাহাকে ত আমি রূপ বলিয়াই মনে করি না। আর গুণের মধ্যে শুনিলাম “যে কায কৰ্ম্মে খুব চালাক” তাহাতে আমার বিশেষ লাভ কি ? গৃহস্থলীর কার্যে পটু হউক আর নাই হউক তাহাতে আমার কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নাই। তবে শুনিলাম যে “বড় অভিমানিনী”, অন্যের নিকট তাহা দোষের মধ্যে পরিগণিত হইলেও আমি দেখিলাম যে সেইটাই কেবল একমাত্র গুণ'; কেননা কবিদের মতে অভিমান না হইলে দাম্পত্য প্রেমে সুখ হয় না। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। মুহুর্তের পর মূহুৰ্ত্ত, দ ের পর দও, দিনের পর দিন অতিবাহিত হইয়া অবশেষে বিবাহ কাল সমাগত হইল। আমারও চক্ষু কর্ণের বিবাদ মিটিয়া গেল। বুঝিতে পারিলাম আমার পূর্ব অনুন সম্পূর্ণ ভুল হইয়াছে; দেখিলাম যে আমি পত্নীরূপে যে বালিকা রত্নটী লাভ করিয়াছি আমার কল্পনা রচিত আদর্শ রমণী অপেক্ষা অনেক উৎকৃষ্ট প্রতিশােধ। সম্প্রদার্থ শশুর মহাশয় যখন তাহার কন্যার হস্ত আমার হস্তে স্থাপন করিলেন তখন আমার শিরায় শিরায় বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রবাহিত হইল; আমি কেবল যন্ত্রপরিচালিত পুত্তলিকাবং পুরােহিত-মুখ-নিঃসৃত মন্ত্রের পুনরােচ্চারণ করিতে লাগিলাম ; কিন্তু সেই পট্টবসনাবৃতা বালিকাটা আমার নয়ন ও মন সম্পূর্ণ অধিকার করিয়া লইল ; আমি প্রাণ ভরিয়া সেই রূপরাশি দেখিয়া লইলাম। বুঝলাম যে পূৰ্ব্বে সাহা শুনিয়াছি তাহা সমস্তই ভুল ; যাহার। বিবাহের সম্বন্ধ করিতে আসিয়াছিলেন তাহারা হয় মিথ্যাবাদী কিম্বা বিকৃতি মস্তিষ্ক ও স্থূলদৃষ্টি। এখন যাহা দেখিলাম তাহাতে পূৰ্ব সন্দেহ সমস্ত দূরীভূত হইল ; দেখিলাম সে রূপের সীমা নাই, সে রূপের তুলনা নাই। বােধ হয় যেন বিধাতা আদশরূপে প্রথমে সেই বালিকাটীর সৃষ্টি করিয়া তাহারই অনুকরণে পৃথিবীর যাবতীয় সুন্দর পদার্থের সৃষ্টি করিয়াছেন। বুঝিলাম সে রূপ মর জগতের নহে, তাহা স্বর্গীয় সৌরভে পরিপূর্ণ। সে রূপের তুলনা না পাইয়া মনে করিলাম । “তােমারই তুলনা তুমি এ মহীম এলে। তৃতীয় পরিচ্ছেদ। আমার সমুদ্রে পূর্ণ মাত্রায় জোয়ার আসিয়াছে। বিবাহের পর দেনা পাওনা সম্বন্ধে শ্বশুরের সহিত পিতার একটু মনােমালিন্য হওয়ায় ঠিক সময়ে আমার স্ত্রীর বাপের বাটী যাওয়া হইল না ; অপেক্ষাকৃত কিছু অধিক দিন আমাদের বাটীতে থাকিতে হইল। নব দম্পতীর প্রণয়ের সূত্রপাতটী আমাদের বাটীতেই ঘটিয়া গেল। প্রথম আলাপেই কিছু নৃতনত্বের পরিচয় পাইলাম। নব পরিণীতা পত্নীকে বশীভূত করিতে হইলে যে সকল অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়ােজন আমা: স সকল কিছুই প্রয়ােগ করিতে হইল না। আমার স্ত্রী প্রথম হইতে , পরিচিতার ন্যায় আমার সহিত ব্যবহার করিতে লাগিল। আবাদের মধ্যে অনেকে এবিষয়ে তাহাকে নির্লজ্জ মনে করিতে পারেন, কিন্তু আমি তাহাতে লজ্জাশীলতার কোন অভাব দেখিতে পাইলাম না ; তবে দুঃখের মধ্যে এই যে আমি জয়দেবের “বদসি যদি কিঞ্চিদপি” প্রভৃতি ;
৯২ কুন্তলীন পুরস্কার। কয়েকটী শ্লোকের বঙ্গানুবাদ করিয়া অনেক দিন হইতে মুখস্থ করিতে ছিলাম, সেই গুলির কোন সদ্ব্যবহার করিতে পারিলাম না। প্রথম আলাপেই বুঝিতে পারিলাম সে বিধাতা সেই বালিকাটাকে রূপের উপমােণ গুণও দিয়াছেন। তাহার সেই উগল নয়নে চাঞ্চল্য আছে কিন্তু কটাক্ষ নাই, বাক্যে মধূর রসিকতা আছে কিন্তু অশ্লীলতা নাই, হাসিতে সরলতা আছে কিন্তু লজ্জাহীনতা নাই, প্রেমপূণ নিম্মল দয়ে অভিমান আছে কিন্তু সেই অভিমানে গরল নাই। সেই বালিকা যখন তাহার সেই পুষ্পরাশি তৃণ্য কোমল বক্ষস্থল আমার এই শুরু বক্ষের উপর, তাহার জ্যোৎস্না ;ল্য অধর খানি আমার এই পরুষ ওষ্ঠের উপর স্থাপিত করিয়া আমার দিকে অনিমেষ লােচনে তাকাইয়া থাকি, যখন তাহার সেই বুক ভরা প্রম, মুখভরা ভালবাসা, নয়ন ভরা ভক্তি আমার উপর অজস্রবারে বর্ষণ করিত তখন মনে করিতাম এই পৃথিবীতেই স্বর্গ এবং সেই স্বর্গসুখে আমিই কেবল একমাত্র অধিকারী। এইরূপে একটা প্রণয় স্রোতে আমরা আমাদের দুই জনের দুইটী ক্ষুদ্র প্রাণ ভাসাইয়া দিলাম ; মনে করিলাম এ স্রোতের গতিরােধ নাই, এ নদীর তীর নাই, এ প্রণয়ের অন্ত নাই। কিন্তু দেখিলাম, তাহা নহে; দিনের পরে রাত্রি আছে, শুক্ল পক্ষের পর কৃষ্ণ পক্ষ আছে, সুখের পর দুঃখ আছে, মিলনের পর বিচ্ছেদ আছে আমাদেরও প্রণ- য়ের সীমা আছে। দেখিতে দেখিতে কুড়ি ট দিন কুড়িটি মূহুর্তের মত আমার চক্ষুর সম্মুখ দিয়া অন্তহিত হইয়া গেল। ইতিমধ্যে পিতার সহিত গােলযােগ মিটয়া যাওয়ায় শ্বশুর আসিয়া তাহার কন্যাকে আপনাদের বাটীলইয়া গেলেন। আমার সুখ-সমুদ্রের জোয়ার বেলা অতিক্রম করিবার উপক্রম করিয়াছিল ; কিন্তু এই বারে ভাটা আসিল। আমি যে তিমিরে সেই তিমিরেই রহিলাম । চতুর্থ পরিচ্ছেদ। কিছুদিন পরে সংবাদ আসিল যে আমি পরীক্ষায় ফেল হইয়াছি। পরীক্ষায় ফেল হওয়া যে কিরূপ কষ্টের কারণ তাহা আমার ন্যায় ভুক্ত- প্রতিশােধ। ভােগী ভিন্ন অন্য কেহ বুঝিতে পারিবেন না। একে প্রিয়বিরহ, তাহার উপর কাৰ্য্য সিদ্ধির বিঃ এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে পিতার তীব্র ভৎসনা, মাতার মস্পশী আক্ষেপবাণা, বন্ধু বান্ধবের যুণাব্যঞ্জক কটাক্ষপাত, এই সকলে আমার হৃদয়কে জরীভূত করিল। সংসার মরুভূমি তুল বােধ হইল । এই সময়ে ঘটনাক্রমে আমার শ্বশুর আমাকে লইয়া যাইবার জন্য পিতার নিকট লােক পাঠাইলেন। আমার এইরূপ মানসিক অবস্থা দেখিয়া তিনি কোন আপত্তি করিলেন না। আমার আশা হইল যে সংসার মরুর একমাত্র আশ্রয় তরুতলে দাড়াইয়া এই উপ প্রাণ শীতল কিন্তু মানুষ সেখানেই না'ক সুখ দুঃখ ছায়ার ন্যায় তাহার অনুগমন করে। আমি শ্বশুর বাড়ীতে মাইয়া ও পদয়ে শান্তিলাভ করি, পারিলাম না বর অশান্তি দি গুনতর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হল । মনে করিয়:- ছিলাম যে প্রিয়তমার মধূর সম্ভাষণে দয়ের সমস্ত কাল। নির্বাপিত হইবে; কিন্তু এখানে আসিয়া দেখিলাম সে সব বিপরীত। শয়নকালে যখন স্ত্রীর সহিত প্রথম সাক্ষাৎ হইল তখনই দেখলাম . তার (সই সরল সুন্দর মুখখানি নিদার অভিমানের ছায়া দ্বারা আবৃত ; বুঝিলাম আমার পরীক্ষায় অকৃতকার্য তাই তার কারণ। শাহ। হউক আমি কষ্টে আয় সম্বরণ করিয়া তাহার সহিত নানাবিধ কৌতুকে প্রবৃত্ত হইলাম। কিন্তু আমার বাছা বাছ। সমস্ত অস্ত্র গুলিই তাহার দুর্জয় অভিমানরূপ বম্মে ঠেকিয়া ব্যর্থ হইল । সে একটা ছােট খাট দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক আমার প্রতি পঞ্চান্মুখ হইয়া শয়ন যে নিঃশ্বাসে একদিন স্বর্গীয় সৌরভের অং ঘ্রাণ পাইয়াছিলাম অদ্য সেই নিঃশ্বাসে তীব্র ফুংকারের ন্যায় আমার হৃদয়ের অগ্নি দি গুণ বেগে জ্বালাইয়া দিল । শয। আমার পক্ষে কন্টকময় বােধ হইল । বাহিরে উঠিয়া আসিলাম, ছাদের উপর বসিয়া চিস্রোতে দেহ ঢালিয়া দিলাম। ভাবিলাম এই কি সংসার। এত প্রেম, এত ভালবাসা ফি সমস্তই একটা সামান্য আঘাতে ভাঙ্গিয়া পড়িল । পিতার যত্ন, করিল ।
৯৪ কুন্তলীন পুরস্কার। মাতার স্নেহ, পত্নীর প্রেম এ সকল কি কেবল কথার কথা মাত্র। সংসার কি কেবল স্বার্থের ক্রীড়াক্ষেত্র ! মনে করিলাম এই মুহুর্তেই পিতামাতা, স্ত্রী, বন্ধু বান্ধব সমস্ত পরিত্যাগ করিয়া কোন অপরি- চিত অজানা দূরদেশে চলিয়া যাইব, যদি কখন মানুষ হইতে পারি তবেই গৃহে ফিরিব ; নতুবা এই পর্যন্ত । মনে মনে সঙ্কল্প স্থির করিলাম। কিন্তু বিদায়কালে আর এক বার “সেই মুখখানি” দেখিতে ইচ্ছা হইল ; গৃহে প্রবেশ করিয়া প্রদীপের আলােকে সেই নিদ্রিত মুখ খানি দেখিতে লাগিলাম। দেখিলাম নয়নের কোণে তখন ও বিষাদের কালিমা, গওদেশে তখন ও অভিমানের রক্তিম। অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিলাম, কিন্তু দেখিবার সাধ মিটল না। ক্ষণেকের তরে সমস্ত জালা যন্ত্রণা বিস্মৃত হইলাম, কিন্তু পরক্ষণেই স্মৃতি উথলিয়া উঠিল। আলো নির্বাপিত করিয়া বাহিরে আসিলাম। বাহিরে আসিয়া দেখিলাম উষা আগত প্রায় ; আমি আর অপেক্ষা করিতে পারিলাম না ; প্রভাত হইলে আমার সঙ্কল্পে বাধা পড়িতে পারে এই ভাবিয়া তাড়াতাড়ি বাটী হইতে বাহির হইয়া আসিলাম। পঞ্চম পরিচ্ছেদ। সঙ্কল্প রক্ষা করিতে পারিলাম না, প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হইল ; গ্রামের বাহিরে আসিয়া মনে করিলাম যে একবার মায়ের সঙ্গে দেখা না করিয়া যাওয়া ভাল হয় না; এই মনে করিয়া বাটীতে ফিরিয়া আসি- লাম। মধ্যাহ্নকালে, পদব্রজে, পাগলের ন্যায় আসিতে দেখিয়া বাটীর সকলেই বিস্মিত হইলেন। মা আসিয়া তাড়াতাড়ি আমার এরূপভাবে আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি বলিলাম “যে সেখানে ভাল মন টিক্লন। তাই চলে এলাম্”। মা আমার মুখ মুছাইয়া জল খাইতে দিলেন। সন্ধ্যার সময় শ্বশুরমহাশয় আমার অনুসন্ধানের জন্য আমাদের বাটী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আমাকে দেখিয়া তাহার শুক মুখ প্রফুল হইল। বাবাকে বলিলেন “যে কি জানি কি কারণে বাবাজী •• প্রতিশােধ। ১৫ বাটীর কাহাকেও কিছু না বলিয়া চলিয়া আসিয়াছে ; বাটীতে কান্না- হাটী পড়িয়াছে ; আমার সঙ্গে কল্য প্রাতেঃই পুনৰ্ব্বার আমাদের বাটী পাঠাইতে হইবে।” তাহার সঙ্গে যে লােকটী আসিয়াছিল, সে গােপনে আমার হাতে একখানি পত্র দিল, পত্রখানি এইরূপঃ হৃদয় সর্বস্ব আমার অজ্ঞাতসারে তুমি চলিয়া গিয়াছ। বুঝিয়াছি আমার অভিমানই তাহার কারণ। কিন্তু আমার অভিমানের কারণ তুমি নও কিম্বা অন্য কেহ নহে; আমিই আমার অভিমানের কারণ। তবে তােমাকে ও আম হইতে অভিন্ন জানিয়া তােমার উপর সে অভিমান প্রকাশ করিয়াছিলাম। তােমার অভাবে যে আমি কিরূপ আছি তাহা প্রকাশ করিয়া জানাইবার ক্ষমতা নাই; যাহা হউক সকল অপরাধ ক্ষমা করিয়া একবার এখানে আসিবে। সাক্ষাতে সমস্ত বলিব। ইতি চরণাশ্রিতা, মতী চঞ্চলাবাল দাসী। পত্রখানা পড়ি। মনটা বড় চঞ্চল হইল, মনে করিলাম না বলিয়া সমস্ত কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া আসাটা ভাল হয় নাই। এমন সময়ে বাবা আমাকে ডাকিয়া শ্বশুর বাড়ী যাওয়ার সম্বকে আমার মত জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি চুপ করিয়া রহিলাম; তিনি “মোনং সম্মতি লক্ষণং” জানিয়া যাইতে অনুমতি দিলেন। আমি ও পরদিন প্রাতে শ্বশুরের সহিত পুনৰ্ব্বার শ্বশুরবাড়ী আসিলাম। যষ্ঠ পবিচ্ছেদ। আহারান্তে শয্যার উপর অদ্ধশায়িত অবস্থায় কি বলিয়া কথা আরম্ভ করিব ভাবিতেছি, এমন সময়ে সেই মুখখানি আবার আমার দৃষ্টিপথে পতিত হইল। সেই নীল নলিনীর আভাযুক্ত উজ্জ্বল নয়নের ভ্রমর-কৃষ্ণ তায়া দুটি আমার শুস্ক বিবর্ণ চক্ষুর সহিত সন্মিলিত হইল। মনে করিয়াছিলাম আগে বিদায়ের কথা বলিব, কিন্তু তাহা হইল না। মৃদুস্বরে বলিলাম “তােমার সেদিনের অভিমানের কারণ কি?”
কুন্তলীন পুরস্কার। বালিকার দুটি নয়ন কোণে মুক্তাবিন্দু সদৃশ দুটি অশ্রুবিন্দু দেখা দিল। সেই দুইটি অশ্রুবিন্দুই যেন নীরব ভাষায় তাহার সমস্ত মনােভাব ব্যক্ত করিয়া দিল। কিন্তু কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া অবশেষে ধীরে ধীরে বলিতে লাগিল “প্রাণ প্রতিম জানই ত আমি বাল্যকাল হইতে একটু অভিমানিনী, আমি বাবার আদরের মেয়ে ছিলাম ; কেহ কখন কৌতুক করিয়া কোন কথা বলিলে ও তাহা সহ্য করিনাই। তবে সেদিনের অভিমানের কারণ তেমন কিছু গুরতর নহে। দাদা বদ্ধ মান হইতে বড় বোয়ের জন্য এক শিশি সুবাসিত নারিকেল তৈল আনিয়া আলমারীর মধ্যে রাখিয়াছিলেন। আমি তাহা দেখিতে পাইয়া মনে করিলাম সে যখন দাদা আনিয়াছে তখন ইহাতে আমারও অধিকার আছে ; এই মনে করিয়া তাহার খানিকটা আর একটা শিশিতে ঢালিয়া লইবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময়ে বড় বৌ আসিয়া আমার হস্ত হইতে তেলের শিশি কাড়িয়া লইল এবং বলিল “যদি এতই তেল মাখবার সাধ তবে ঠাকুরজামাইকে বলিস্ এনে দেবে।” সেই কথা গুলি আমার হৃদয়ের স্বভাবসিদ্ধ অভিমান আরও বাড়াইয়া দিল, সকল কথা তােমাকে বলিবার জন্য পুজি করি। রাখিয়াছিলাম ; কিন্তু সেদিনে মনের আবেগে বলিতে পারি নাই। কে জানিত যে তাহাতে এইরূপ বিষময় ফল হইবে। যাহাই হউক যদি অপরাধ হইয়া থাকে তবে ক্ষমা করবে।' আমি সেই কথা শুনিয়া আর হাস্য সম্বরণ করিতে পারিলাম না ; বলিলাম “ এরই জন্য এত।' এই বলিয়া কলিকাতাস্থিত কোন বন্ধু কে পত্রপাঠ মাত্র ফেরত ডাকে এক শিশি পদ্মগন্ধ, এক শিশি গােলাপ গন্ধ দুই শিশি কুন্তলীন, একটি দেলথােস ও একটি তাথুলীন পাঠাইয়া দিতে পত্র লিখিলাম । ইহার পরে চারিদিন বেশ আমােদ প্রমােদে কাটিয়া গেল। আমার পূৰ্ব্ব কল্পিত সঙ্কল্প মন হইতে একবারেই অপসারিত হইল এবং পরী- ক্ষায় অকৃতকার্যতাজনিত কষ্টও অনেকটা বিস্মৃত হইলাম । পুরদিন মধ্যাহ্নে আহারান্তে একটি নিভৃত কক্ষে বসিয়া আমরা প্রতিশােধ। স্ত্রীপুরুষে কথােপকথন করিতেছি এমন সময়ে ডাকে কুন্তলীনের পার্শেল আসিয়া পৌছিল। আমি পার্শেল খুলিয়া জিনিষ গুলি আমার স্ত্রীর হাতে দিলাম । সে একটু পদ্মগন্ধ কুন্তলীন লইয়া আমার চুলে মাখাইয়া দিল এবং কঙ্কতিকা সহকারে মস্তকোপরি একখানি দিব্য ইস্ত্রী করা টেরি প্রস্তুত করিল। আমিও খানিকটা গােলাপগন্ধ কুন্তলীন তাহার মাথায় মাখাইয়া দিয়া তাহার শােধ লইলাম ও তাহার নাকের নােলকে একটু দেখাে লাগাইয়া দিলাম । সে কিন্তু গায়ে রাখিল না ; তালীন মিশ্রিত এক টি পান প্রস্তুত করিয়া আমার মুখের মধ্যে পৃরিয়া দিল। আমি পরাজিত হইলাম। কিন্তু তাহার দেখােস সুবাসিত কুল অপর হইতে আমার পান চিবাইবার পরিশ্রমের ফা আদায় করিয়া লইলাম। এমন সময়ে আমাদের পূর্বোক্ত বিলোল কটাক্ষ শালিনী, মরাল- গামিনী বড় বৌ সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া বলিলেন “ ভাই তােমাদের ঘরে পদ্ম ফুলের আর গােলাপ ফুলের বাস আসছে কেন?” আমার স্ত্রী মৃদুহায্য সহকারে বলিল “দেখতে পাচ্ছনা যে তােমার ঠাকুরজামাইট পদ্মফুল আর আমি গােলাপফুল।” এই বলিয়া আমার স্ত্রী দুই টি ভিন্ন রকম শিশিতে ঢালিয়া দুই রকমের কুন্তলীন কিছু কিছু পরিমাণে তাহার হাতে দিল এবং “আর এই নাও দানের দক্ষিণা” এই বলিয়া তাহার মুখে খানিকটা দেখােস মাখাইয়া দিল ও তাম্বলীন মিশ্রিত একটি পান তাহার মুখের মধ্যে পূরিয়া দিল । বড় বো। এই বুঝি সেদিনের প্রতিশােধ ? আমার স্ত্রী। তবে তাই। আমি ইত্যবসরে একটি ছােট রকমের হাসি হাসিয়া লইলাম । বড় বৌ একটু ক্রুদ্ধ স্বরে বলিলেন “যেমন স্ত্রী তেমনি স্বামী”। আমার স্ত্রী একটু মৃদু হাসিয়া উত্তর করিল “তা হবে না কেন?” একামিনীকান্ত রায়। ৮৪নং নিমতাবাঃ ট, কলিকাতা।
১০০ কুন্তলীন পুরস্কার। রাশিতে অবিলম্বেই বিষাদের ছায়া প্রতিফলিত হইল! কোন অপরি- জ্ঞাত রহস্য অচিন্তনীয় ব্যথায় তাহার কোমল হৃদয় অধীর হইয়া পড়িল। ভাবী অমঙ্গলাশঙ্কায় ভীত হইয়া সে মনে মনে বলিয়া উঠিল “ক্ষমা কর, ক্ষমা কর, স্বর্গীয়া দেবী ! আমার প্রতি অ প্রসন্না হইও না। আমি তােমার প্রতি সাধন করিতে ও প্রিয়তমের হৃদয়ে তােমার প্রেম- প্রতিমার স্মৃতি অনুরাগরঞ্জিত রাখিতে আজীবন প্রয়াস পাইব ; এই সুমহং প্রতিজ্ঞ পালনে তুমি আমার সহায়তা করিও।” পুষ্প বুঝি ভাবিতেছিল যে, তাহার পূর্বে যে ব্রততী এই সহকারকে আশ্রয় করিয়া পূর্ণ আনন্দ উপভােগ করিয়াছিলেন, সেই ভাগ্যবতী আজি কোথায় ? নিৰ্মম কাল অকালে সুখ শান্তির ত্রিদিব স্বামীর ক্রোড় হইতে তাহাকে বিচ্যুত করিলেও, তিনি রমণীর অদেয়, জীবনসর্বস্ব পতিধনকে বিস্মৃত হইতে পারিয়াছেন কি না, কে বলিবে ? হয়ত, বিবাহের সময় কোন অনির্দিষ্ট, অদৃশ্য লােক হইতে তাহার প্রেম- বিপ্লাবিত, সকরুণ, সজল আঁখি দুইটি, প্রবােধের প্রেমপূর্ণ মুখখানির প্রতি সতৃষ্ণভাবে তাকাইয়া তাহার প্রতি দারুণ অভিসম্পাত বর্ষণ করিতেছিল ! তাই বুঝি অমূল্য পতিপ্রেমর অপহৃত হইবার ভয়ে সে আতঙ্কিত হইয়া উঠিয়াছিল ? সপত্নীর অভিশাপে, নিয়তিচক্রের আবর্তনে বা বিশ্বনিয়ন্তার অভি- প্রায়ে—যে কোন কারণেই হােক্ পুষ্পের এই অমূলক আশঙ্কা যে অকাট্য সত্যে পরিণত হইতে পারে, তাহার আর বিচিত্র কি ? এদিকে রাত্রি অধিক হওয়ায়, বাসরস্থিত। কামিনীগণ একে একে অপতা হইলে প্রবােধ প্রেমভরে পুষ্পের অবগুণ্ঠন সরাইয়া দিতে গিয়া তাহার অতুলনীয়রূপে বিমুগ্ধ হইয়া গেলেন। অধিকন্তু সেই অনুপম লাবণ্যে দীনতা, পবিত্রতা ও সরলতার সমাবেশ এবং অনিন্দনীয় আনন খানিতে দ্বেষ হিংসার অতীত স্বর্গীয় সদ্ভাবের সম্যক বিকাশ দেখিয়া তাহার প্রাণ আনন্দে পরিপ্লত হইল, হৃদয় আশ্বস্ত হইল। কিন্তু তাহার মুখে চিন্তার সুস্পষ্ট রেখা পর মূহুর্তেই নিরীক্ষণ করিয়া, ব্যথিত হৃদয়ে, সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিলেন “পু ! কি ভাবিতেছ ?”
বিমাতা। ১০১ ; সেই সুমধুর স্পর্শের প্রভাবে, সেই সকরুণ স্বরের অমৃত স্রোতে পুষ্পের চিন্তার তরঙ্গ গুলি নিমেষে ভাসিয়া যাওয়ায়, তাহার অন্তরা- কাশে মেঘমুক্ত শশধরের ন্যায় পুনৰ্ব্বার সুবিমল সুখের সুস্নিগ্ধ আলােক রেখা ফুটিয়া উঠিল ; কিন্তু মুখে একটি কথা ও সরিল না। প্রবােধ সন্দিগ্ধ হইয়া অধিকতর কাতরভাবে বলিলেন “পুষ্প ! তুমি কি এই বিবাহে নিতান্তই অসুখী হইয়াছ ? তােমার চিন্তার বিষয় ক আমাকে জানিতে দিবে না ? পুস্পের প্ৰেমনত বিশাল নয়ন দুটি জলে ভরিয়া আসিল ; সে বহু কষ্টে লজ্জার বাধা অতিক্রম করিয়া অতি সাবধানে অতি ধীরে ধীরে বলিল “ তুমি আর ঐরূপ মনে করিয়া বিষাদিত হইও না। आणि আমার পূজনীয়া, পরলােকগতা ভগিনীর নিকট তাঁহার পরিত্যক্ত গুরুতর দায়িত্ব বহন করিবার উপযুক্ত শক্তি ভিক্ষ। করিতেছিলাম, আর তাঁহার মুতি তােমার হৃদয়ে জীবন্ত রাখিতে যত্নবর্তী থাকিব, এই প্রতিজ্ঞা করিতেছিলাম মাত্র।-আর কিছু নহে।” অমৃতনিয়্যদিনী ভাষায় এই অমর বাৰ্তা শ্রবণ করিয়া প্রবােধের উন্নত, উদার হৃদয় এক অনিৰ্ব্বচনীয় মধুর তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল ; তিনি আবেগভরে পুষ্পের বিকম্পিত পুষ্পপুট-তুল্য ওষ্ঠাধর স্বন করিয়া বলিলেন “পুষ্প ! দয়াময়ের কৃপায় তােমাকে পাইয়াছি ; তুমি আমার নিরাশার অন্ধকারে আশার বর্তিকা জালিয়া দিলে । জগদীশ্বর তােমার সর্ববিধ মঙ্গল করুন।” অতঃপর রজনী প্রভাতের আর অধিক বিলম্ব নাই দেখিয়া নব দম্পতী অগত্যা বিবিধ সুমধুর "প্রেমালাপ স্থগিত রাখিয়া, কুসুম সুবাসিত শুভ্র শয্যায় গাত্র ঢালিয়া দিলেন এবং অনতিবিলম্বেই সুষুপ্তি দেবীর স্নেহ প্রসারিত আরাম- দায়িনী কক্ষে আশ্রয় লাভ করিলেন। পুষ্পের বিবাহের পর দুইটি মধুমাস কালের অতলে নিমজ্জিত হইয়া গিয়াছে। যেদিন প্রভাত সুর্যের কনক কান্তি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শােকাতুর পিতা ও ভূম্যবলুষ্ঠিত জননীর স্নেহপূর্ণ বক্ষঃ হইতে বিচ্ছিন্ন ১০২ কুন্তলীন পুরস্কার। হইয়া উচ্ছসিত অ শ মুছিতে মুছিতে পুষ্প শশুরের অতুল ঐশ্যপূর্ণ, বিচিত্র অালিকায় করুণা ভিখারিণীর ন্যায় প্রবেশ করিয়াছিল--আজি আর সেদিন নাই। এখন সে সংসারের সর্বনয়ী কীরূপে নিরপেক্ষ করুণার বিতরণে সততই মুক্তহস্ত, এবং সুকুমার সৌন্দর্যের সহিত বিবিধ স্বর্গীয় গুণের অপূৰ্ব সংমিশ্রণে গৃহলক্ষ্মীর ন্যায় সমাদৃত। ঐ কা- ন্তিক ভক্তি, নিঃস্বার্থ প্রেম ও প্রগাঢ় স্নেহের মধুর সােগে গৃহিণী হইতে দাস দাসীর হৃদয়ে পর্যন্ত ইহারই মধ্যে এরূপ প্রতিপূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করিয়াছে যে, তার পিত্রালয় গমন-জনিত ক্ষ-অদশন ও সকলেরই মনে এক বিষাদময়ী অতৃপির উদ্রেক করিয়া দেয়। তাহার আনন্দবর্ষী আননখানি নয়ন পথে উপস্থিত হইলেই মাতৃহীন শিশু দুটি সেই স্নেহ-অঙ্ক অধিকার পূর্বক স্বর্গ সুখ অনুভব করে, পরিবারস্থ শােকাতুর ব্যক্তি শান্তিলাভ করে, পীড়িত পীড়ার দারুণ যাতনা বিস্থত হয় এবং বিষাদ-ব্যথিত মলিন মুখে ও ক্ষীণ হাস্যলেখা বিকাশ পায় । কেবল পরিতৃপ্ত হয় না পিসীমার বিদ্বেষপূর্ণ কঠোর সদয় । প্রবােপকে যাদুমন্ত্রে ভুলাইয়া বাছা দুটিকে পর করিয়া দিবার পক্ষে বিশেষ সহায়তা করিবে বলিয়া “বৌমার চাঁদপান মুখ” তাহার চক্ষুশূল হইয়াছে। “যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা'।–সুতরাং পুষ্পের মহত্নের পরিচায়ক প্রত্যেক কার্যাই পিসীমার চক্ষে ঘাের ধূর্ততা ও শঠতাপূর্ণ ভণ্ডামি ভিন্ন অন্য কিছু বলিয়াই প্রতিভাত হয় না। সপত্নী তনয় দুটির প্রতি তাহার অত্যাধিক স্নেহকে পিসীমার “অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ' বলিয়া ধারণা জন্মিয়াছে। শিশু দু টর মধ্যে একট চারি বৎসরের, অপরটির এখনও এক বর্ষ পূর্ণ হয় নাই। এই অপগণ্ড দুধের ছেলেদিগকে স্নেহের কুহকে ভুলাইয়া পাছে মায়াবিনী সৎমা তাহাদিগের কোন অনিষ্ট সাধন করে, এই ভয়ে তিনি ডাকিনী বধূর নিকট হইতে সােণার পুতুলদিগকে সর্বদা দূরে দূরে রাখিতে প্রয়াস পান; কিন্তু মােল আনা অকৃতকার্য হওয়ায় বধুর উপর তাহার আক্রোশ শত গুণ বর্ধিত হয়। অনেক সময়ই এই ধেড়ে বয়স পর্যন্ত তাহাকে আইবুড় রাখার জন্য তিনি তাহার নিরীহ বিমাতা। ১০৩ পিতা মাতার উপর কঠিন মন্তব্য প্রকাশ ও নিরপরাধী চোঁ পুরুষের নরক গমনের বিষয় স্থির সিদ্ধান্ত করিয়া ফেলেন ; এবং প্রায় প্রতি- দিনই দুপুর বেলায় নিজের পছপের পবিত্র ঘরটিতে বসিয়া, অতি সুললিত ভাষায়, সমাগতা মহিলা সাগর সহিত সংমার জটিল চরিত্র ও কুটিল ব্যবহাররূপ মহাশাস্ত্রদ্বয়ের সম্যক সমালােচনায় প্রবৃত্ত হন। পুষ্প ও পিসীমার সকল প্রকার কথার খোটা হাসি মুখে সহ্য করে। কিন্তু সন্ধ্যার প্রাক্কালে, তাহার স্নেহপ্রদীপ্ত বক্ষ; হইতে আবদারস্থ শিশু দুইটিকে যখন পিসীনা বাঘিনীর ন্যায় বিচ্ছিন্ন করিয়া লন, তখনই কেবল সে বিষাদিত মনে, নিতান্থ দুঃখিনীর মত বিরলে বসিয়া তাহা- দিগের করুন চিংকারের সহিত নিজের নীরব অ শ পার। মিশাইয়া থাকে। কৌশলময়ী আত্মগােপন ক্ষমতায় পিসীমার বিষয় প্রবােধচলের সম্পূর্ণ অগােচর রাখিয়া পুষ্প তাহার অপরিসীম আনন্দ অনাহত রাখিয়াছে। বিবাহ বাসরের প্রতিজ্ঞা সুচারুরূপে পান করিয়া সে প্রবােধকে অধিকতর সুখী করছে এইরূপে স্বামীর সহিত একাত্ম হইয়া, মাতৃহীন শিশুদিগের মা হইয়া ও পিসীমার অনাদর বশতঃ অন্যান্য সকলের সমধিক সমাদরের পাত্রী হইয়া পরম সুখে সংসার যাত্রা নির্বাহ করিতে করিতে অদৃষ্টের বিড়ম্বনায় পুষ্প এক অভাবনীয় বিপদে পতিত হইল। ( ৪ ) দুপুর বেলা, চারিদিকে রৌদ্র ঝা ঝা করিতেছে। পরিচারিকা বামীর মা এক মাসের অবসর লইয়া দেশে যাওয়ায় তাহার একাদশ বর্ষীয়া বালিকা বামীর নিকট খােকাকে রাখিয়া খােকার ঝি স্নান করিতে গিয়াছে। শ্রম-বিমুখ বামী স্বীয় জননীর ভুল ক্রমে পরিত্যক্ত আফিংএর কোটাটি খেলিতে দিয়া খােকাকে অনায়াসেই বসাইয়া রাখিয়াছে। দোতালায়, প্রবােধ পালঙ্কোপরি শয়ন পূর্বক বিশ্রাম সুখ অনুভব করিতেছেন এবং পুষ্প নিকটস্থ আলমারি উন্মোচন পূৰ্ব্বক তাহার ১০৪ কুন্তলীন পুরস্কার। আবশ্যকীয় বস্ত্রাদি বাহির করিয়া রাখিতেছে, এমন সময় বড় থােকা কোথা হইতে ছুটিয়া আসিয়া আলমারিস্থিত সুরম্য ও পরিপূর্ণ দেল- খােসের শিশিটির প্রতি সভৃষ্ণ নয়ন যুগল সংস্থাপন পূৰ্ব্বক বলিল “মা আমি ঐ শিশিট নেব।” স্নেহময়ী মাতা একটি মধুর চুম্বনসহ শিশিটি তাহাকে প্রদান করিবামাত্র সে হর্ষোৎফুল্ল হদয়ে সে স্থান পরিত্যাগ করিল । পরক্ষণেই বামী আসিয়া হাজির । সে বড় খােকার অনুরূপ একটি খবয়ের শিশি নিতান্ত ব্যথভাবে প্রার্থনা করায়, সহদরা পুষ্প তদনুরূপ পূর্ণ শিশি আর নাই দেখিয়া, এক বােতল কুন্তলীন বিতরণ পূৰ্ব্বক তাহাকে বিদায় করিল। প্রসষ্ট চিন্তা বানী অনুরাগপূর্ণ অতৃপ্তনয়নে সেই সুনিৰ্ম্মল তৈলপূর্ণ, স্ফটিক পাত্রটির পানে চাহিয়া চাহিয়া ছিপি খুলিয়া ফেলিল এবং স্বীয় কেশদামকে অপূৰ্ব্ব সম্পন্ন করিবার আশায় একটুখানি হাতে ঢালিতে যাইবে, এমন সময় থােকার হাতে আকিংয়ের কোটা আছে সহসা মনে পড়িয়া যাওয়ায় ; জগৎ সংসার বি ত হইয়া কম্পিত হদয়ে ছুটিয়া আপন কক্ষে উপস্থিত হইল ও খােকার কাণ্ড দেখিয়া স্তম্ভিত হইয়া পড়িল ! কিন্তু পরমুহুর্তেই প্রকৃতিস্থ হইয়া প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সহকারে খােকাকে ঘুম পাড়াইয়া সকলের অলক্ষ্যে পিসীমার ঘরে শয়ন করাইয়া রাখিয়া আসিল, এবং নিতান্ত উদ্বিগ্ন ও কাতর চিত্তে হরির নিকট ও মা কালীর নিকট এই ঘাের বিপদ হইতে উদ্ধার করিবার জন্য বিবিধ নসিক করিতে লাগিল। হায় ! বিষম ভয় প্রপীড়িত অবােধ বালিকা এই নিদারুণ কথা সকলের অগােচর রাখিয়া কি মহা অনর্থই না সংঘটন করিল !! এ দিকে বামী বিদায় হইবার পর পুষ্প প্রায় দুই ঘণ্টা যাবং পতির সহিত প্রেমালাপ ও তাহার সেবায় রত থাকিয়া বিপুল আনন্দ সম্ভোগ করিতেছেন, এমন সময় পিসীমার বিকট চিৎকার ও ক্রন্দন ধ্বনি শ্রুত হওয়ায় প্রবােধ আতঙ্কিত হইয়া-এক লক্ষ্যে শয্যাত্যাগ করিয়া বারাণ্ডীতি- মুখে ধাবিত হইলেন, পুষ্প ও কম্পিত হৃদয়ে-পতির অনুগমন করিল।
বিমাতা। ১০৫ ; প্রবােধকে দেখিয়া পিসীমা চীংকার পূৰ্ব্বক বলিলেন “বাবা, সৰ্ব্বনাশ করিয়াছে,রাক্ষুসী সৎমা ছেলেকে বিষ খাওয়াইয়াছে, আর রক্ষা নাই,শীঘ্র ডাক্তার ডাক।” পুষ্প সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া মৃতবং শিশুকে পাগলিনীর ন্যায় পিসীমার ক্রোড় হইতে লইতে যাওয়ায় ; পুত্র মেহেদিশাহারা, বিঘাের মস্তিষ্ক প্রবােধ ভীম পদাঘাতে তাহাকে সুদূরে নিক্ষিপ্ত করিয়া উন্মত্তের মত ডাক্তারের অপেমণে বহির্গত হইলেন । ডাক্তার বাবু আসিয়া, আফি: তুলিয়া ফেলিয়া অনেক কষ্টে এমাত্রা শিশুকে রক্ষা করিলেন । শিশু নয়ন উন্মীলন করিয়াই বাইত মাতার নিকট যাইবার জন্য সুকোমল বাহু দুটী সম্প্রসারণ করিয়া দিল, পুষ্প ও নানাপমান বিত হইয়া শিশুকে বক্ষে ধারণ করিবার জন্য পুনর্পার পাবি ত হইল। কিন্তু হায়! কে শিশুকে দিবে ? সকলেই তীর তিরষ্কার ধিক্কার ও ব্যঙ্গোক্তি সেই হতভাগিনীর অসহায় মস্তকোপরি মুষলধারে বৃষিত হইতে লাগিল । পুষ্পের দিন বামনী কি ভাবে অতিবাহিত হইতে লাগিল, তাহা কবি-কল্পনার অতীত। অ ভাগিনীর মনােব্যথার পরিসীমা নাই। তাহার হর্ষোদ্ভাসিত আননের বিকসিত শতদলসম শােভা বিমলিন হইয়া গিয়াছে, সুচারু অধরের তীরে প্রশান্ত নিৰ্ম্মল হাসির অপরূপ লীলা অপসৃত হইয়াছে, সতত প্রসন্ন নলিন নয়ন দুটি বিষাদ জলদাবৃত হইয়া শ্রবণ ধারায় অঞ নিপতন করিতেছে ও ললিত কোমল দেহ- লতিকাখানি ছিন্ন মৃণালবং ধূলি ধূসরিত হইতেছে ! আহা ! শাখাচ্যুত বিশুদ্ধ পদদলিত কুসুমের ন্যায় কেহ তাহার দিকে ফিরিয়াও চাহিতেছে না। আর সকলই সে অনায়াসে সহ্য করিতে পারে, কিন্তু প্রবােধের অবিশ্বাস ও ঘৃণাই তাহার মর্মান্তিক হইয়াছে ; তাহার ভীষণতাকে শিশু দুটির বিচ্যুতি আরও প্রবল করিয়া তুলিয়াছে। তাহার এই কুন্তলীন পুরস্কার। সমুদ্র সমান অতলস্পর্শী বিপদে বিন্দু প্রমাণ শান্তি-রামজীবন বাবুর সানা ও বামীর সহানুভূতি। রামজীবন বাবুর হৃদয়ে হাঁহার “মা লক্ষ্মীর প্রতি অবিশ্বাস নিমে- ষের জন্য ও স্থান প্রাপ্ত হয় না। বামী ত তাহার নির্দোষীতার বিষয় সম্পূর্ণ অবগত আছে। এই শােচনীয় ঘটনা পুষ্পের পিতা মাতার অগােচর রহিল না। ময়াহত ডেপুটী বাবু লজ্জায় মৃত প্রায় হইয়াও নিজে কন্যাকে লইতে আসিলেন, কিন্তু আদরের দুহিতা পিতার চরণে ধরিয়া সে সাদর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করিল । এদিকে শশুর গৃহের উপেক্ষায় অনাদরে ও অনাহারে অনিদায় এবং নিদারুণ মনােবেদনায় ও দুশ্চিন্তা জালের ভীম নিষ্পেষণে পিষ্ট হইয়া সে সাংঘাতিক পীড়াগ্রস্ত হইল। তখন জীবন্ত পিতা মাতা সেই শীর্ণা সংজ্ঞাহীন। তনয়াকে আপ- নাদের স্নেহ-অঙ্কে লইয়া আসিয়া, তাহাকে রােগমুক্ত করিবার জন্য প্রাণপণ ও সৰ্ব্বস্বপণ করিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইলেন । পুষ্পের পিত্রালয় গমনের চারি পাঁচ দিন পরে বামীর মা দেশ হইতে প্রত্যাগত হইল এবং বৌদিদিমণির অবিশ্বাস্য অত কাহিনী শ্রবণ করিয়া যারপরনাই বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হইল। বামীকে ও নিতান্ত কৃশ ও বিমনা দেখিয়া সে আহারাদির পর গােপনে ডাকিয়া বড় স্নেহ- ভরে কারণ জিজ্ঞাসা করিলে,—পুষ্পের ক্লেশে ও দুঃথে মর্মান্তিক আহত বামী দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া কঁদিয়া উঠিল, এবং থােকার আফিং খাওয়ার রহস্য ভেদ করিয়া পুষ্পের যাতনার কথা বর্ণনা করিল। ভয়াতুরা কন্যার শত কাতরােক্তি ও নিষেধ উপেক্ষা করিয়া আপ- নাদের ইষ্টানিষ্টের বিষয় চিন্তা করিতেও অবকাশ না পাইয়া সেই অশিক্ষিত নীচ জাতীয় বামীর মা তৎক্ষণাৎ প্রবােধের কক্ষ পানে ধাবমান হইল। হতভাগ্য ডেপুটী বাবু পুষ্পকে লইয়া যাইবার পর,রবিবার দিন দুপুর বেলা প্রবােধ আপন নির্জন কক্ষটিতে বসিয়া নিজের দুরদৃষ্টের বিমাতা । ১০৭ বিষয় চিন্তা পূৰ্ব্বক অজস্র অ বিসৰ্জন করিতেছেন, এমন সময়ে বােদ- বিল। বামীর মা তাঁহার সখীন হইয়া মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল এবং বহু আক্ষেপপূর্ণ, বিলাপ সম্বলিত ভূমিকাসহ থােকার আফি খাওয়ার আমল গটনাটি বিবৃত করিল। এক মাস যাবৎ চিন্তা বিকারে সমাচ্ছন্ন, দুব্বল মস্তিষ্ক প্রবােধ এই যুগপং হর্ম বিষাদের গুরুভার সহ্য করিতে অসমর্থ হইয়! সংজ্ঞা বিহীন হইয়া পড়িলেন। মুচ্ছাভঙ্গে প্রবােধ স্নিগ্ধ মধুর বাক্যে বার্মার মাকে অভয় প্রদান পূৰ্ব্বক শ্বশুরালয়াভিমূখে প্রধাবিত হইলেন, এবং অনতিবিলম্বেই পায় উপস্থিত হইয়া সেই কাতর ক্রন্দন নিনাদিত, সম্মভেদী দীর্ঘনিশ্বাস হিল্লোলিত পুষ্পের শয়ন কক্ষে উন্মাদের ন্যায় প্রবিষ্ট হইলেন। হায়! তখন জীবনব্যাপী হাহাকার ব্যতীত প্রবােধের আর সকলই. ফুরাইয়াছে ; তাহার আসিবার ক্ষণ পূলেই পুষ্পের নিষ্কলঙ্ক প্রাণপক্ষী পরম রমণীয় দেহ পিঞ্জর ভগ্নপক এ পাপ পৃথিবীর নিকট চিরবিদায় লইয়া অনন্তের আরামপূর্ণ চরণতলে আশ্রয় লাভ করিবার জন্য বড় আগ্রহের সহিত আনন্দধামের গাী হইয়াছে ! পড়িয়া রহিয়াছে শুধু--অলৌকিক মধুর চরিত্রের সকরুণ সুধাময় সুতি! মতী ক্ষীরােদকুমারী নােম মেদিনীপুর।
দ্বাদশ পুরস্কার ৫ সরােজিনী এফ এ পরীক্ষা দিয়া এক বার বাড়ী যাইয়াছিলাম। তাহার পর বি এ পাস করিয়া মেডিকেল কলেজে প্রবেশ করা অবধি নানা কারণে বাড়ী যাওয়া ঘটে নাই ; কলিকাতায় মেসে থাকিয়া পড়া শুনা করিতে- ছিলাম। এবার বাড়ী হইতে ঘন ঘন চিঠি আসায় আজ পাঁচ বৎসরের পর গ্রীষ্মবকাশে বাড়ী আসিয়াছি। সেরূপ সুখ জীবনে আর কখনও হইবে কিনা জানি না। আজ অনেক দিন হইল সে ঘটনা হইয়া গিয়াছে, তবু এখনও মার আনন্দোৎ- ফুল্ল মুখ, ছােট ছােট ভাই ভগ্নীদের আনন্দ উচ্ছাস যেন চক্ষের সম্মুখে রহিয়াছে। যে প্রবাসী সেই জানে সে সুখ কি নিৰ্ম্মল, কি গভীর। বুঝি বা আমার পক্ষে সে সুখ দ্বিগুণ হইয়াছিল। কেননা তখনও সংসার সাগরের হলাহল আমার ভাগ্যে উঠে নাই, আজীবন কৃত কাৰ্য্যতা ভােগ করিয়া নৈরাশ্য কথামাত্রেই পর্যবসিত ছিল এবং নূতন উদ্যম ও নূতন উৎসাহের দর্পণে পৃথিবীকে স্বর্গ বলিয়াই মনে হইত। বাড়ী আসিয়া সারাদিন পাড়ায় পাড়ায় বেড়াইলাম। যেদিকে দেখি সমস্তই পরিচিত, অথচ পাঁচ বৎসরের অনুপস্থিতি তাহাতে যেন কি এক অনির্বচনীয় মাধুৰ্য্য মাখাইয়া দিয়াছে। বেশ বুঝিতে পারি- লাম শ্বেতকবি যে বলিয়াছিলেন দূরত্বই দৃষ্ট বস্তুকে মনােহর করে তাহা সত্য বটে। এখানেই বলিয়া রাখা ভাল, আমি মনে মনে কবি ও কবিত্বের বড় পক্ষপাতী এবং আমার নিজের মন ও যেন কিঞ্চিৎ কবিত্ব- ভাবাপন্ন, তবে তখন সহপাঠীদের বিদ্রুপের ভয়ে বাহিরে কবিত্ব প্রভৃতি সকলই বিকৃত মস্তিষ্কের ফল বলিয়া হাসিয়া উড়াইয়া দিতাম।
সরােজিনী । এই পাচ বৎসরে গ্রামে পরিবর্তন অনেক হইয়াছে। আমার ঠাকুরদাদা মারা যাওয়ার পর আমাদের বাড়ীতে সন্ধ্যাকালে বৃদ্ধদিগের যে এক বৃহৎ মিটিং হইত তাহা আর হয় না। যাহাদের বালক দেখি- য়াছি তাহাদের গোফের রেখা দি:ছে। আমার সমবয়দিগের মধ্যে কেহ কেহ ঘােরতর সংসারী হইয়া পড়িয়াছেন। চ৫ে, যাহার দৌরাত্মে কাহারও গাছে আম কাঠাল পাকিত না, যে দোর্দ ও প্রতাপে বালক- দিগের উপর রাজত্ব করিত, এখন দেখি সে নিরীহ ভদ্রলােকের মত হুক হাতে তাহার ছয় মাসের মেয়েটিকে কোলে লইয়া দাড়াইয়া আছে। আমিও আর সেই অজাতশ্ম এ বালক নহি। ভূমণ ঠাকুদ্দা তাে চোখে চসমা দিয়া নিরীক্ষণ করিয়াও আমাকে প্রথমে চিনিতে পারেন নাই। পরে পরিচয় পাইয়া বলিলেন “আরে বস বস দাদা, এ কয়দিনে এত বদলে গিয়েছ সে চিনতেই পরা যায় না”। বিহারী খুড়ো তাহার অদৃষ্ট ও তাহার পুত্র হরিশের প্রচুর নিন্দা করিয়া বলিলেন কলকাতায় থাক বাবা, কত সাহের সুদের সঙ্গে আলাপ আছে, হরিশের একটা চাকরী যদি জুটিয়ে দিতে পার।” রাম ভট্টাচার্য্য মহাশয় আমাকে দেখিয়া মহা খুসী হইয়া এক টিপ নস্য লইয়া বলিলেন “আমরা চিরকালই জাত ছিলাম বিলয় সংসারে উন্নতি করিবে। বেশ বেশ বাপু, গ্রামের মুখ উজ্জ্বল কর, ক্রিয়া কান্দ্রে পিতৃপিতামহের লাম রক্ষা কর”। অতি শীঘ্রই আমি গ্রামের মধ্যে “কৃষ্ণ বিষ্ণুর মধ্যে একজন গণ্য হইলাম। গ্রামের মাইনর স্কুলের হেড মাষ্টার মহাশয়ের সন্ত্রম প্রতি পত্তি একেবারে লােপ পাইবার উপক্রম হইল কেননা আমি বর্তমানে তাহাকে কেহই ‘অথরিটি বলিয়া স্বীকার করে না। একদিন আমি বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হইলাম যে আমার গ্রামে পদার্পণের দুই ঘণ্টা পরেই পাড়ার বর্ষিয়সীগণ “বড়য্যেদের সােণার চাঁদ ছেলের বিবাহটা যে অচিরেই কর্তব্য তাহা স্থির করিয়াছেন। সেই খবর পাইয়া আমি (মেসেতে যাহার ‘সাত চড়ে কথা বাহির হয় না বলিয়া কলঙ্ক ছিল সেই আমি) আমাদের বহির্বাটির বােয়াকে বসিয়া পাড়ার বিস্ফারিত ১১০ কুন্তলীন পুরস্কার। লােচন যুবক ও গম্ভীরভাবে মস্তক সঞ্চালনকারী প্রৌঢ়দিগের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া অতি গম্ভীর ভাবে, বিষদ রূপে মিল, ফসেট প্রভৃতি পণ্ডিতগণের মত উদ্দত করিয়া বুঝাইলাম যে আমাদের দেশে পচিশ বৎসর বয়সের পূর্বে বিবাহ করিয়া দুৰ্বল সন্তান উৎপাদন দ্বারা লােক- সংখ্যা ও দেশের দরিদ্রতা বৃদ্ধি করা কিছুতেই উচিত নহে। ইহার পরদিনই আমি যে একজন ভারি বিদ্বান তাহা গ্রামের মধ্যে সিদ্ধান্ত হইয়া গেল। একদিন আমি বাড়ীতে আহার করিতেছি মা কাছে বসিয়া আছেন, এমন সময় দেখি বাটির ও প্রতিবেশীদিগের এক দল বালক বালিকা অদূরে দাড়াইয়া আমার আহার ব্যাপার নিরীক্ষণ করিতেছে। তাহা- দের সহিত আমার ইতিমধ্যেই বেশ আলাপ পরিচয় হইয়া গিয়াছে। আমি কাহাকেও বা মিষ্টবাকে। কাহাকে বা মিষ্টদ্রব্যে আপ্যায়িত করিতেছি এমন সময় মা বলিলেন “দেখ দেখি বিনয়, কেমন মেয়েটি। ‘মেয়ে টি’ শুনিয়াই আমার অকস্মাৎ ংকম্প উপস্থিত হইল। অতি কষ্টে, মা যেদিকে দেখাইলেন সেইদিকে চাহিয়া দেখিলাম এক জোড়া অতি সুন্দর উজ্জ্বল চক্ষু একদৃষ্টে আমার দিকে চাহিয়া আছে । যাহার চক্ষু, তাহার বয়স এগার বৎসরের বােধ হয় অধিক হইবে না, কাজেই আমি সাহস পাইয়া বলিলাম “বেশ মেয়েটি তো, কার মেয়ে মা?” মা বলিলেন ওটি আমাদের হরি মুখুযে, র মেয়ে ; হরি মুখুয্যেকে জান না ? আর জানবেই বা কেমন করে, ওরা আজ পনর বছর বিদেশে ছিল, এই আর অঘ্রাণ মাসে এসেছে। বেশ শিঃ শান্ত মেয়েটি, আমি তােমার সঙ্গে ওর বিয়ের সম্বন্ধ করেছি।' আমার মনে কবিজন সুলভ কোপের উদয় হইল, ভাবিলাম “হাঁ, দশ বৎসরের একটা মেয়ে বিয়ে করে তাকে ‘মানুষ’ করি আর কি ?” মুখে কিছু না বলিয়া নীরবে আহার করিতে লাগিলাম । তাহার পরদিন সকালে আমার কাছে পাড়ার যত ছেলে মেয়ে আসিয়া উপস্থিত হইল। কাহারও ফরমাস “কাগজের নৌকা করে কেহবা আব্দার ধরিলেন “একটা গল্প বল, কেহ বা “হঁ। গল্প • সরােজিনী। •• বলতে বুঝি কত্ত হয় না; তুমি বলো না বিনয় দাদা" বলিয়া আমার কোলে উঠিয়া বসিয়া তাহার যে আমার সহিত বিশেষ বন্ধুত্ব আছে ও তিনি যে আমার দুঃখে দুঃখী তাহা স্পষ্ট প্রমাণ করিলেন। আমি যথাসাধ্য সকলের আজ্ঞা পালন করিতেছি, এমন সময়ে ছােট ভাইটীকে কোলে করিয়া গত কলকার মেয়েটী ধীরে ধীরে উপস্থিত হইল। আমি একটু বিস্মিত হইলাম ; যেখানে বিবাহের কথা হয়, আমাদের দেশের মেয়েরা তাহার ত্রিসীমায় যায় না, তবে কেন এ এখানে উপস্থিত হইল ? ভাবিলাম, বোধ হয় মেয়েটা কিছু বাচাল কি লজ্জাহীনা। আমি আবার মানব চার বিশ্লেষণ করিতে বড় ভাল- বাসিতাম। কথার ছন্দ, দাড়াইবার ভাব, হাত মুখের ভঙ্গি প্রতি দেখিয়া লােকের চরিত্র সদশে মােটামুটি একটা ধারণা স্বতই হইয়া থাকে। মাহার। অাবার যত্ন পূব্বক ঐ বিষয় শিক্ষা করে তাহাদের পক্ষে উহ। বড়ই আমােদজনক। আমি ঠিক করিলাম, মেয়েটা কি রূপ দেখিতে হইবে। এস্থলে একটু অতিরিক্ত কোহল বােধ হওয়াও আশ্চৰ্য্য নহে। আমি ছেলেদের লইয়া খেলা করিতে লাগিলাম, মেয়েটা স্থিরভাবে দাড়াইয়া দেখিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে তার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম “তোমার নাম কি ? অতি ধীরে চক্ষু না নামাই- য়াই সে উত্তর দিল “সরােজিনী”। আমি তাহার মুখের গাখীৰ্য্য দেখিয়া আশ্চৰ্য্য হইলাম। পুনৰ্ব্বার জিজ্ঞাসা করলাম “তোমার ভাইয়ের বয়স কত ? সে বলিল “ এক বংসর।' আমি আর তাহাকে কিছু জিজ্ঞাসা করিলাম ন। সেও আর কিছুক্ষণ দাড়াইয়া চলিয়া গেল। আমি সিদ্ধান্ত করিলাম তাহার লজ্জাহীনতার কারণ বাচালতা নহে—সরলতা। ওয়ার্ড ওয়ার্থের কবিতা মনে পড়িল— সরলা বালিকা—সে লজ্জার কি জানিবে ? আমাদের মেয়েরা সাত বৎসর বয়সেই অকালপক্কতা লাভ করে। সরােজিনী সেরূপ নহে দেখিয়া আমি তাহার উপর সন্তুষ্ট হইলাম। দিন কয়েক মধ্যেই সরােজিনীর সহিত আমার বেশ চেনাশুনা ১১২. কুন্তলীন পুরস্কার। হইয়া গেল। আমার অমত বুঝিয়া মা আর আমার বিবাহের কথা তােলেন নাই। কাজেই সােজ ও আমার মিশিবার বড় বেশী সঙ্কো- চের কারণ ছিল না। সে আমাকে বিনয়দাদ। বলিয়া ডাকিত, আমিও যেমন অন্যান্য ছেলেদের সহিত মিশিতাম সরােজের সঙ্গে তেমনই নিঃসঙ্কোচে মিশিম। সে তৃতীয় ভাগ পর্যন্ত পড়িয়াছে শুনিয়া আমি তাহাকে কিছু কিছু পড়াইতে আরম্ভ করিলাম। আমি দেখিতাম পড়ার সময়ে কিম্বা অন্য কোন সময়ে, তাহাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করিলে সে কখনই কথা কহিত না। প্রথম প্রথম মনে করিতাম সে বড় একটা কিছু বুঝিতে পারে না, সেই জন্য চুপ করিয়া থাকে। কিন্তু দুই চারিবার প্রশ্ন করায় বুঝলাম সে অসাধারণ বুদ্ধিমতী। তাহার বুদ্ধিমত্তা দেখিয়া আমি চমৎকৃত হই তাম; মনে হইত বােধ হয় পুরুষের অপেক্ষা স্ত্রীলােকে যে কোন বিষয় শীঘ্ন আয়ত্ত করতে পারে। আমি আরও লক্ষ্য করিলাম তাহার চক্ষু দুইটি বাস্তবিকই “আত্মার গবাক্ষ” অর্থাৎ তাহার চক্ষু দুইটি দেখিলেই “নিৰ্ম্মল নদী-জল-তলে উপল খণ্ডের ন্যায়” তাহার অন্তরের ভাব স্পষ্ট বুঝা যায় । ক্রমে ক্রমে আমি তাহার গুণাবলীর পরিচয় পাইতে লাগিলাম। দেখিলাম যে তাহার অন্তঃ- করণ দয়াতে গঠিত ও তাহার সহিষ্ণুতা অসাধারণ এবং এই অল্প বয়সেই তাহার মনের দৃঢ়তার বেশ আভাষ পাইলাম। এই সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া আমি তাহার প্রতি কেমন একটু আকৃষ্ট হইলাম । শিক্ষক তঁাহার বুদ্ধিমান ছাত্রের প্রতি যেরূপ আকৃষ্ট হন, বােব হয় তখন আমি সরােজের প্রতি ভিন্নভাবে আকৃষ্ট হই নাই। ক্রমে ছুটি ফুরাইয়া আসিল, আমিও সকলের নিকট বিদায় লইয়া কলিকাতা যাত্রা করিলাম। কলিকাতায় থাকিতে বাড়ী হইতে প্রায়ই চিঠি পাইতাম। চিঠিতে অন্যান্য কথার মধ্যে সরােজিনীর কথাও থাকিত। শুনিতাম তাহার বিবাহের সম্বন্ধ হইতেছে কিন্তু কোথাও উপযুক্ত পাত্র পাওয়া যাইতেছে । সরােজিনীর পিতা হরিপদ মুখােপাধ্যায় নাকি ভারি কুলীন, তিনি তাে আর যাহার তাহার ঘরে কন্যাদান করিতে পারেন না।
সরােজিনী। ১১৩ ? জানাশুনার মধ্যে তাহাদের পালটি ঘর আমাদের গ্রামেই দুইটি আছে। তাহার মধ্যে আমরা একঘর, আর আমার পিসে মহাশয়েরা একঘর। এই দুই বাড়িতে দুইটি বিবাহাে পযুক্ত পাত্র আছে, আমি একটি এবং আমার পিস্তুত ভাই সুশীল আর একটি। সুর্ণীল আমার সমপাঠী তবে অল্পবয়সে লেখা পড়া ছাড়িয়া পশ্চিমে চাকরী করিতেছে। এক বৎসর চলিয়া গেল, তবু সরােজিনীর বিবাহের কোনরূপ স্থিরতা না হওয়ায় আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম। মাঝে মাঝে বড় কষ্ট হইত, যেন আমারই কন্যাদায় উপস্থিত। শেষকালে ঠিক করিলাম সুশীলের সহিত সরাের বিবাহের যােগাড় করিতে হইবে; সুশীল দেখিতে শুনিতেও ভাল বটে, আর বড় ধর। আর কাল বিলম্ব না করিয়া আমি সুশীলকে চিঠি লিখলাম “তােমার সহিত অনেক দিন দেখা শুনা হয় নাই ; যদি পর আগামী পূজায় বাড়ি আসিও। আমি দেশে যাইয়া তোমার সহিত সাক্ষাৎ করব।” সে সম্মত হইল। ক্রমে পূজার দিন নিকটবর্তী হইল, আমি ও বাড়ি যাইবার বন্দোবস্ত করিতে লাগিলাম। সমস্ত জিনিষপত্র কেনা হইয়া যাইলে হঠাৎ মনে পড়িল, সরােজিনীর জন্য কিছু লইতে হইবে। পুনৰ্ব্বার ছুটিয়া বাজারে যাইয়া সরাজের জন্য এক শিশি কুন্তলীন ও সুশীলের জন্য একট। দেলখােস লইলাম । যথাসময়ে বাড়ি পৌছিলাম। পৌছিয়াই আমার বাড়ি আসার কারণ মাকে বলিলাম, শুনিয়া তিনি বড় আদিত হইলেন। তাহার পরদিনই সুশীল আসিয়া পৌছিল। পূজার কয়দিন খুব আমােদেই কাটিয়া গেল। একদিন কাহারও খোঁজ খবর লইবার অবকাশ পাই নাই এবং সুশীলকেও সরােজের সম্বন্ধে কিছু বলা হয় নাই। বিজয়ার দিনে আমি ও সুশীল একসঙ্গে প্রণাম করিতে বাহির হইলাম। এ বাড়ি সেবাড়ি করিয়া ঘুরিয়া শেষকালে হরিপদ মুখাে- পাধায় মহাশয়ের বাটিতে উপস্থিত হইলাম। আমি সরােজের মাকে প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম “আসিয়া পর্যন্ত সরােজিনীকে দেখি নাই কেন ?” সরােজিনীর মা বলিলেন “সে তােমাদের বাড়ি দুবার ১১৪ কুন্তলীন পুরস্কার। গিয়েছিল, কিন্তু তুমি সুশীলের সঙ্গে সব সময়েই থাক বলে সে দেখা করিতে পারে নি। মার আমার সুশীলকে দেখে বড় লজ্জা হয়। হাজার হউক বড় হয়েছে; কিন্তু এমনি পােড়। কপাল যে একটি মনের মত বর জুটল না।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম “সে কোথা ?” তিনি একট। ঘর দেখাইয়া বলিলেন “সে ঐ ঘরে আছে।” আমি সেই ঘরের দিকুে চলিলাম, সুশীল বাহিরে দাঁড়াইয়া গল্প করিতে লাগিল, আমি ঘরের ভিতর বাইতেই অক্ষ টস্বরে “বিনয়দাদা এসেছ ? আমি বলি তুমি আসবে না” বলিয়া সাবরাজিনী আমাকে প্রণাম করিল। আমি কি বলিতে যাইতেছিলাম এমন সময় তাহার মুখের দিকে চাহিয়া মাহা দেখিলাম তাহাতে আর আমার বারণ হইল না। সরােজ সে এত সুন্দর তাহা তাে আগে দেখি নাই। চন্দ্রের আলােকে দেখিলাম সে আর এখন বালিক। নহে। গাম্ভীর্য ও পূর্ণতা তাহার মুখে কি এক নূতন ভাব আনিয়া দিয়াছে, আর সেই চক্ষু দুইটি যেন কি এক মােহময়, করুণ, সুন্দর ভাবে ভাসিতেছে—যেন প্রতি দৃষ্টি আনিছে বহিয়া দূরতর স্বর্গের সন্দেশ। আমি নীরবে সেই লাে ভারাশি দেখিতে লাগিলাম । মনে হইল বুঝি এত সৌন্দৰ্য্য আর কোথাও দেখি নাই। কিয়ৎক্ষণ পরেই লজ্জিত হইয়া অন্যদিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম “আমার পিস্তুত ভাই সুশীল এসেছে তাহাকে দেখেছ ?” সে মুখ নত করিয়া বলিল “হা, কই তুমি কিছু খাওনা।” আমি নাম মাত্র বসিলাম, কি খাইলাম কিছু মনে নাই, তাড়াতাড়ি সরােজকে কুন্তলীনের শিশিটি দিয়া ঘর হইতে বাহির হইলাম। পথে যাইতে যাইতে সুশীল জিজ্ঞাসা করিল “তােমার ভারি ঘাম হয়েছে দেখছি, কই আজ তাে তেমন গরম নয়।” এই বলিয়া সে গল্প জুড়িয়া দিল। সে কি বলিতেছিল আমি কিছুই শুনি নাই, মাঝে মাঝে “হাঁ হু” বলিয়া সাড়া দিতেছিলাম বটে, আর সুশীলের অনবরত কথার জন্য তাহার প্রতি বড় বিরক্ত হইতেছিলাম । সমস্ত রাত্র ভাল নিদ্রা হইল না, কেবল সবরাজের কথাই মনে হইতে লাগিল। ভাবিলাম সরােজকে এতদিন দেখিয়াছি কিন্তু সরােজিনী । এমন ভাবত আমার মনে কখনই হয় নাই। তাহার বিষয় যতই ভাবিতে লাগিলাম, ততই তাহার প্রত্যেক কথা, প্রত্যেক অঙ্গভঙ্গি, মধুর হইতে মধুরতর বােধ হইতে লাগিল। নিদা হইল না, সারা কি এক অদ্ধ জাগরিত সুখবিজড়িত অবস্থায় কাটাইলাম। (मई রা সাহা সাহা দেখিয়াছিলাম, অদ্ধ স্বপ্নের মত তাহাই বারবার দেখিতে লাগিলাম এইরূপে রাত্র কালি । ইহার পর দুই দিন আমি সরেজদের বাড়িতে ঘন ঘন ইতাম। যতবার ইতাম ততবারই আবার যাইতে ইচ্ছা হত। কিন্তু এক দিন আমার চেতনা হইল, ভাবিলাম, করিতেছি কি ? তখন চিতের দুৰ্বলতার জন্য আমার অত্যন্ত আ ত্মগ্লানি উপস্থিত হইল। স্থির করিলাম আর কখনও এরূপ অস্থির চিত্ত হইব না, এবং অতি শীঘই সুশালের সহিত সরাজের বিবাহ স্থির করিব। স্থির করিলাম বটে, কিন্তু সপ্তাহ চলিয়া গেল উহা কার্যে পরিণত হইল না। যত দিন যাইতে লাগিল, ততই আমি স্থ্যৈ হারাইতে লাগিলাম । প্রথম প্রথম আমি সরােজের বাড়ী যাইতাম না, এবং সে আমাদের বাটি আসিলে, পাছে তাহার সহিত দেখা হয়, এই ভয়ে নিজের ঘরে দ্বার বন্ধ করিয়া দিয়া বসিয়া থাকিতাম। মনে করিতাম আমি খুব আত্মসংযম করিতেছি, কিন্তু একদিন বুঝিতে পারিলাম রে দরজা দিয়া বসিয়া থাকাটা তত নিরাপদ নহে। কারণ, আমি দেখি- লাম, ঘরের ভিতর থাকিয়া আমি সরাজের প্রত্যেক কথা একমনে শুনিয়া থাকি, অন্তে কথা কহিলে বিরক্ত হই, সরােজের চুড়ীর কি মলের শব্দে ঠিক করি এইবার সরােজ চলিয়া যাইতেছে, আবার সত্যই গেল কিনা জানিবার জন্য কাণ পাতিয়া থাকি। সেতারে ঝঙ্কার দিলে যেমন সেই সুরে বাধা অন্যান্য সেতার আপনিই বাজিয়া উঠে, সেইরূপ সরােজের অলঙ্কারের শব্দে আমার হৃদয়-তন্ত্রী বাজিয়া উঠিত এবং সেই ঝঙ্কার গ্রামে গ্রামে উঠিয়া তাহার মধুর নিক্কণে আমাকে অভিভূত করিয়া ফেলিত। ব্যাপার কি তাহা বুঝিতে আমার অধিক সময় লাগে নাই।
১১৬ কুন্তলীন পুরস্কার। বুঝিতে পারিয়াছিলাম বলিয়াই আমি আপনার মন দমন করিতে চেষ্টা করিতাম। যদি আমি বলিতাম আমি সােজকে বিবাহ করিব তাহা হইলে তাহার পিতা মাতা এবং আমার মা খুসী বই অসন্তুষ্ট হইতেন । কিন্তু আমার মনে হইত এত লেখাপড়া শিখিয়া নিজের মনের উপর ক্ষমতাহীন হওয়া বড়ই লজ্জার বিষয় এবং সেইজন্য আমি নিজের ব্যবহারের কঠোর সমালােচনা করিতাম। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও সরাে- জের নাম শুনিলে যে আনন্দ হইত, তাহা রােধ করিতে পারিতাম না, তাহার কথা শুনিলে মন সেই দিকে ধাবিত হইত, তাহার সেখানে আসিবার সম্ভবনা থাকিত সে স্থান হইতে চলিয়া আসিবার সময় মনে কষ্ট হইত এবং যদি তাহাকে দেখিতে পাই, এই আশায় একবার চারি দিক দেখিয়া লইতাম। সে মেস্থান দিয়া চলিয়া যাইত, সে স্থান পর্যন্ত পবিত্র মনে করিতাম । এইরূপে দিন পনর কাটিয়া গেল। ইতিপূর্বে আমার নামে অনেক গুলি অভিযােগ আসিয়াছে--প্রথমতঃ মা বলেন আমার খাওয়া দাওয়া একেবারে কমিয়া গিয়াছে, এবং আমি রােগা হইয়া যাইতেছি ; দ্বিতীয়তঃ বন্ধুরা বলেন, আমি তাহাদের সঙ্গে আর ভালরূপে মিশি না, মিশিবই বা কেন, আগে যে তাহাদের সহিত মিশিতাম তাহাই তাহা- দের ভাগ্য ; তৃতীয়তঃ সরােজ বলে আমি আর তাহার সহিত দেখা করিনা ; ইত্যাদি। আমি লজ্জিত হইয়া পূর্বের মত সকলের সহিত মিশিতে লাগিলাম। একদিন হঠাৎ সবরাজের সহিত আমার দেখা হইল। সে আমাকে দেখিয়া, অত্যন্ত আনন্দিত হইয়া, পূৰ্ব্বে যেমন নিঃসঙ্কোচে আমার কাছে আসিত, সেইরূপ আসিয়া কথাবার্তা বলিতে আরম্ভ করিল। আমি কিন্তু মহা বিপদে পড়িলাম; কি বলিব কিছুই খুঁজিয়া পাইলাম । মাটির দিকে চাহিয়া, আমতা আমতা করিয়া দুই একটি কথা বলিয়াই হঠাৎ রণে ভঙ্গ দিয়া সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। সরােজ আশ্চর্য্য হইয়া আমার দিকে চাহিয়া রহিল। আমি বরাবর নিজের ঘরে যাইয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিলাম। মনে ;
সরােজিনী । ১১৭ ; নানারূপ চিন্তা উদয় হইতে লাগিল। আমি বুঝিতে পারিলাম আমার ব্যবহারে সােজ দুঃখিত হইবে। ইহা ভাবিয়া আমারও অত্যন্ত কষ্ট হইল। তাহার পর মনে হইল, কত দিন এইরূপে চাপিয়া থাকিব, এবং তাহাতে ফলই বা কি হইবে? আরও ভাবিলাম আমি যে সরো- জের প্রতি গােপনে এরূপ ভাব পােষণ করিতেছি ইহা কি ভাল? আমি যদি তাহাকে বিবাহই না করিব তবে তাহার প্রতি এরূপ ভাব পােষণ করা কি উচিত? আর সরােজকে বিবাহ করিতে আমার কি বাধা আছে, কেনই বা আমি নির্বোধের ন্যায় শুধু শুধু কষ্ট পাইতেছি। ভাবিয়া চিন্তিয়া শেষ স্থির করিলাম, যেমন করিয়া হউক, লজ্জার মাথা খাইয়া মাকে জানাইব আমি সরােজকে বিবাহ করিব। সেই দিন বৈকালেই আমাদের বাহিরের রােয়াকে বসিয়া আমি কথায় কথায় বলিলাম “আমি মনে করিতাম বিবাহ করাটা উচিত নহে; কিন্তু আর আমার সে মত নাই। দেখুন না কেন, মিল্টন যে এত কঠোর ছিলেন, তিনিও বিবাহকে অত্যন্ত পবিত্র বলিয়া জ্ঞান করিতেন। বাস্তবিকই বিবাহ না করিলে মানুষ অর্ধেক থাকিয়া যায়। আমাদের শাস্ত্রেই ত রহিয়াছে ‘সন্ত্ৰীকো ধৰ্ম্মমাচরেৎ'।” রাত্রে মা আপনিই সরােজের কথা তুলিলেন, বলিলেন “বাবা, তুমি এলে সরােজের বিয়ের জন্যে, কিন্তু তুমি সুশীলের বাপ মাকে এ বিষয়ে কিছু বল নাই কেন ?” আমার বুক ধড়াস ধড়াস করিতে লাগিল, মনে করিলাম এই ত সুযােগ। দুই একবার ঢােক গিলিয়া নিজের কথা বলিতে যাইতেছি, এমন সময় মা আবার বলিলেন “আমি সব ঠিক করেছি; তােমার কিছু ভাবতে হবে না; আর শুনেছ, সরােজ নাকি নিজেই ওর বেগুণফুল আর সইয়ের কাছে স্বীকার করেছে যে সুশীলকেই বিয়ে করবে। ডাগরটি হয়েছে কিনা ?” আমি চারিদিক অন্ধকার দেখিলাম, পড়িয়া যাইবার ভয়ে কিছুক্ষণ দেয়াল ধরিয়া দাড়া- ইয়া সামলাইয়া লইলাম, বলিলাম “বেশ ত এখন সব কথাবার্তা ঠিক হয়ে গেল, আমি কালই পিসে মহাশয়েয় কাছে গিয়ে দিনস্থির করে আসবাে”। এই বলিয়া নিজের ঘরে যাইয়া শয়ন করিলাম। } ১১৮ কুন্তলীন পুরস্কার। আমি সরােজের চরিত্র কিরূপ তাহা বিশেষরূপে জানিতাম। আমি জানিতাম যে তাহার ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞা দুই সমান। সে সুশীলকে যে বিবাহ করিবে বলিয়াছে তাহা সামান্য কারণে বলে নাই আর তাহাকে অন্যমত করান সহজ নহে এবং ঐরূপ চেষ্টা করাও নিতান্ত অন্যায়। আমি নিজের আশা ছাড়িয়া দিলাম, কিন্তু সেই রাত্রে আমি সে মন্থন ভােগ করিয়াছি তাহা ভুক্তভােগী ব্যতীত কে বুঝিবে ? নিরাশা, দুঃখ, অভিমান আমার হৃদয়ে যে শেল বিদ্ধ করিয়াছে তাহার ক্ষতচিহ্ন এখনও মুছিয়া যায় নাই, কখনও যাইবে কি না সন্দেহ। যাতনায় অধীর হইয়া মনকে কতরূপে প্রবােধ দিতে চেষ্টা করিয়াছি। ভাবি- লাম, আমার হৃদয় কত বড়, আমার প্রাণে কত ভালবাসা, আমার কিরূপ শক্তিসামর্থ্য তাহা ‘সে’ কিরূপে বুঝিবে ? সে বাহিরের সৌন্দর্য্য দেখিয়া ভুলিয়াছে। সে আমার উপযুক্ত নহে। আবার মনে করিলাম সে আমাকে ভ্রাতৃভাবে দেখে, আমার তাহাকে ভিন্নভাবে দেখা অন্যায়। সামান্য কারণে এত অস্থির হওয়া নিৰ্ব দ্ধিতার কাৰ্য্য । ভগবান যাহাকে যাহার জন্য করিয়াছেন সে ত তাহারই হইবে আমিও. দুই দিন পরে এ সমস্ত ভুলিয়া যাইয়া সকলের ন্যায় হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইব। এইরূপ কত কি ভাবিলাম, কিছুতেই স্থির হইতে পারিলাম না, ভাবিলাম সুশীল কি আমার মত ভালবাসিতে পারে, না কখন ও সেরূপ পারিবে ? তবে কোন বিচারে সে সরােজকে পাইতে চলিল ? এইরূপ নানা প্রকার চিন্তা করিতে করিতে শেষ রাত্রে একটু নিদ্রাকর্ষণ হইল । কত যে স্বপ্ন দেখিলাম তাহার ইয়ত্তা নাই। কখনও দেখিলাম সরােজকে আমি পড়াইতেছি, কখনও যেন তাহার সহিত কথা কহিতেছি, কখনও আবার সেই বিজয়া দশমীর রাত্রে যেন সয়ােজদের বাড়ী যাইতেছি এমন সময় তাহাদের বাড়ি হইতে বাজনা বাদ্য করিয়া কাহাদের বর বাহির হইল। এক পালকীতে দেখিলাম সুশীল, বুঝিলাম সেই বর। কনের পালকী কাছে আসিলে, চাদের আলাে তাহার মুখে পড়ায় চিনিলাম সরােজ—বিজয়া দশমীর রাত্রে যেরূপ দেখিয়াছিলাম ঠিক সেইরূপ। শেষ কালে যেন আমাকে কে .
সরােজিনী। আসিয়া বলিল সরােজ মরিয়া গিয়াছে ; আমি শােকে অধীর হইয়া কঁদিতেছি এমন সময়ে ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। সরােজ যে সত্য সতা মরে নাই তাহাতে যে কি আনন্দ হইল তাহা বলিতে পারি না। কিন্তু পরক্ষণেই আবার সবরাজের বিবাহের কথা মনে হইলে আবার চারি- দিক শূন্যময় বােধ হইল । অত্যন্ত অসহ্য বােধ হওয়ায় বালিশে মুখ লুকাইয়া অনেকক্ষণ কঁদিলাম । সর্বান্তঃকরণে ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিলাম “দয়াময়, বল দাও।” বােধহয় ভগবান প্রার্থনা শুনিলেন। আমি অনেকটা শান্ত হইলাম । - :- সেই বংসরের অগ্রহায়ণ মাসের ১ ৬শে তারিখে আমাদের গ্রামে বিস্তর ঘটা করিয়া সরােডের বিবাহ হইল। বিবাহের পরে নাকি গ্রামের লােকেরা বলাবলি করিয়াছিল সেই বিবাহে বিনয় বন্দ্যোর মত কেহই খাটে নাই, এবং বিবাহের সভার বিনয়ের অবিরত উচ্চ হানিতে নাকি অনেকে বিরক্ত হইয়াছিলেন । এ বিবাহের দিন কতক পরেই আমি গ্রামের সকলকে বেশ করিয়া বুঝাইয়া দিলাম যে আমি যে ইতিপূর্বে বিবাহের সপথে মত প্রকাশ করিয়াছিলাম, তাহাতে আমার সম্পূর্ণ ভ্রম হইয়াছিল। বিবাহ করা যে একেবারেই উচিত নহে ইহাই আমার অভ্রান্ত মত এবং এই মত অনুসারেই আমি চলিব। এখন পর্যন্ত আমার মত পরিবর্তন হয় নাই। শ্ৰ অপূৰ্ব্বকৃষ্ণ মুখােপাধ্যায়। C/0 Asst. Civil Judge, Cooch Behar.
অতিরিক্ত পুরস্কার ৫
বুদ্ধিমান রাজার স্বৰ্গৰ্যাত্রা।
এম সর্গ।
রাজস ভাতলে বসি রাজা বুদ্ধিমান,
রাজ কাৰ্য্য করিছেন প্রফুল্ল বয়ান।
হেন কালে প্রজাগণ চারিদিক হতে,
প্রণাম করিল আসি রাজচরণেতে।
বলিল একটি ঠক পশেছে নগরে,
নিশি দিন আমা সবে সালাতন করে।
ঠকাইয়া ধন রত্ন সব নিয়ে যায়,
বাচে না প্রজারা প্রভু,
কি হবে উপায় ।
কোন বেশে কবে আসে বুঝিতে না পারি,
কেমনে বুঝিব প্রভু, ঠকের চাতুরী।
শুনিয়া প্রজার মুখে ঠকের কাহিনী,
অস্থির হইল রাজা পরমাদ গণি।
কহে আমি বুদ্ধিমান বুদ্ধে বৃহস্পতি,
মম রাজ্যে ঠক আসে এমন শকতি।
বুদ্ধি-জালে জড়াইয়া ঠকে ধরিব,
কত বুদ্ধি রাখে ঠক সকলি বুঝিব।
মম বুদ্ধি হতে বল কার বুদ্ধি বড়,
কেন ভয় পাও সবে যাহ নিজ ঘর।
এত কহি বুদ্ধিমান মনেতে বিচারি,
নগরে পাহারা দিল দশ পাঁচ কুড়ি।
বুদ্ধিমান রাজার স্বর্গযাত্রা। ১২১ সুরা পানে মত্ত হয়ে পাহারা সকল, নগরের প্রান্তভাগে ঘুমায় কেবল। দ্বিতীয় সর্গ। কৃষ্ণ চতুর্দশী তিথি নিশীথ সময়, অন্ধকারে পথ ঘাট দৃষ্টি নাহি হয়। হেন কালে বুদ্ধিমান নিজ হয়্যতলে, পূজিছেন শিবলিঙ্গ অতি কুতুহলে। চন্দন কুসুম চুয়া কুসুমের হার, ধুপ দীপ নৈবিদ্যাদি নানা উপচার। হেনকালে ঠক এক চিন্তি মনে মনে, ধরিল শিবের মূর্তি পরম যতনে । হরিষে হাড়ের হার গলায় পরিল, ব্যাঘ্ৰ চৰ্ম্ম পরি নিজ বসন ত্যজিল। খড়ি মাটী গুলি অঙ্গে রং ফ লাইল, দর্পণ ধরিয়া ভালে ত্রিনেত্র আকিল । মৃত সর্প স্কন্ধে জড়াইয়া, চলিল রাজার কাছে বলদে চড়িয়া। রাজদ্বারে গিয়া জোরে করে করাঘাত, সে শব্দে রাজার ধ্যান ভাঙ্গিল হঠাৎ। বাহিরে থাকিয়ে ঠক বম্ বম্ করে, রাজা গিয়ে দ্বার খােলে হরিষ অন্তরে। বলদে চড়িয়া ঠক গৃহে প্রবেশিল, আমি শিব আসিয়াছি রাজাকে বলিল। রাজা ভক্তিভাবে চাহি দেখে বার বার, উপাস্য দেবতা শিব সম্মুখে তাহার । আনন্দে অস্থির হয়ে বুদ্ধিমান রাজা, হীরক প্রবাল দিয়ে তারে করে পূজা। দু একটি
১২২
কুন্তলীন পুরস্কার।
ঠক কহে তুমি রাজা ভকত প্রধান,
এ জগতে কেহ নাই তােমার সমান।
তােমায় পূজায় তুষ্ট হইলাম অতি
তাই আজি স্বর্গ ছাড়ি মর্তে মম গতি।
পুণ কৃষ্ণ চতুর্দশী তাতে নিশাকাল,
এ সময়ে সুরলােকে চল মহীপাল ।
মৰ্ত্তবাস তবরাজা পূর্ণ হইল আজ,
আজ তব গতি হবে দেবের সমাজ।
রাজা বলে অধমের গতি মাত্র তুমি,
এখনি তােমার সঙ্গে স্বর্গে যাব আমি।
অধম পাতকী জনে এ তব দয়া,
তােমার চরণে আমি সঁপিলাম কায়া।
ঠক বলে এক কথা শুন তবে রাজা,
স্বশরীরে স্বর্গে যাওয়া নাহি হয় সােজা ।
স্বর্গে যেতে মানবেরা যত কষ্ট পায়,
সে সকল কষ্ট কিন্তু স্পশিবে তােমায় ।
যােড় হাত করি রাজা কহে তবে ধীরে,
কষ্ট বিনে স্বর্গ সুখ কেবা লাভ করে।
ঠক কহে তবে রাজা মুদ নেত্রদ্বয়,
খুলিবে, যখন মম অনুমতি হয়
বাক্যব্যয় না করিয়া চলহ ভূপতি,
বাক্যব্যয়ে হইবে না স্বর্গপুরে গতি।
এই আমি চলিলাম বলদে চড়িয়া,
নীরবে বৈসহ তুমি লাঙ্গুল ধরিয়া।
তৃতীয় সর্গ।
ঠকের ইঙ্গিত পেয়ে চলিল বলদ,
লাঙ্গুল ধরিয়া রাজা ভাবে গদ গদ।
||
বুদ্ধিমান রাজার যাত্রা
চলিল চতুর ঠক কাটা পথ দিয়া,
জর হইল রাজা কণ্টক ফুটিয়া
কত শিমুলের কাটা কত বেল কাটা
ঘটাইল রাষ্ট্র অঙ্গে শােনিতের ঘটা।
কণ্টকে কণ্টকে রাজা হল জর জর,
তবু ও অটল রাজা নাহয় কাতর।
ভাবে এত কষ্ট নয় সুখের কারণ,
কষ্ট বিনে স্বর্গ যেতে পারে কোন দুন।
রহিল কণ্টকে বিধি বসন রাজার,
তথাপি সঙ্কোচ দুঃখ নাহয় রাজার
বুল কাদা মল মুত্র শরীরে ভবিল,
তথাপি ভকত শ্রেষ্ঠ চক্ষু না মেলিল।
ভাবে অনুমতি বিনে মেলিলে নয়ন,
যদি আর নাহি হয় স্বর্গ দরশ।
সঙ্গে করি স্বর্গে শিব না লয়েন যদি,
আমা সম অধমের কি হইবে গতি।
এত ভাবি অতি জোরে নয়ন মুদিয়া,
শিব মুক্তি ধ্যান করে তন্ময় হইয়া।
ব্যথিত বলদ অতি লাঙ্গলের টানে,
আতঙ্কে অস্থির হয়ে ছােটে প্রাণ পনে,
এই ভাবে কিছুক্ষণ করিলে গমন,
রজনীর শেষ ভাগ দিল দরশন।
একটি কলুর গৃহে রাজাকে লইয়া,
কলুর ঘানির পরে দিল উঠাইয়া।
গােটা কত গরু তাতে বাধি আনি দিল,
শিক্ষিত ঘানির গরু ঘুরিতে লাগিল।
কলুর ঘানির শব্দে রাজা পুলকিত,
মনে ভাবে এই বুঝি স্বরগের রথ ।
১২৪
কুন্তলীন পুরস্কার।
ঠক বলে শুন ওহে ভকত প্রধান,
এই রথে স্বর্গ ধামে করিবে প্রয়ান।
চক্ষু না মেলিবে তুমি কথা না কহিবে,
তা হইলে স্বশরীরে স্বর্গ পুরে যাবে।
আমিও তােমার সঙ্গে অন্তরীক্ষে রব,
সময় হইলে ধরি স্বর্গে উঠাইব।
স্বর্গের অনেক পথ এসেছ রাজন,
এই দেখ স্বর্গ গন্ধ মধূর কেমন।
এতবলি তাড়াতাড়ি ঠক চুরামণি,
ঢেলে দিল এক শিশি “কুন্তলীন” আনি।
“কুন্তলীন” সৌরভেতে বিমুগ্ধ রাজন,
ভাবে আছে সম্মুখেতে পারিজাত বন।
সময় বুঝিয়া তবে ঠক পলাইল,
অভ্যাসে ঘানির গরু ঘুরিতে লাগিল।
ঘ্যার ঘ্যার ঘ্যার ঘ্যার ঘানির শবদে,
রাজা ভাবে যাইতেছে রথ স্বর্গ পথে।
এই ভাবে বিভাবরী প্রভাত হইল,
কলুর গৃহের লােক সকল জাগিল !
ঘানির সে শব্দ শুনি আশ্চর্য্য মানিল,
এত ভােরে ঘানি ঘােড়ে গরু কে বাঁধিল।
দেখিতে চলিল সবে হয়ে একত্রিত,
ভয়ানক দৃশ্য হেরি হইল চমকিত।
ঘানি পরে উপবিষ্ট বুদ্ধিমান রাজা,
কোমল শরীরে তার কতরূপ সাজা।
পরনে বসন নাই উলঙ্গ শরীর,
শরীর কন্টকাকীর্ণ বহিছে রুধির।
মল মুত্র মাখা অঙ্গ রাজা বুদ্ধিমান,
নেত্রদ্বয় নিমীলিত প্রফুল্ল বয়ান।
বুদ্ধিমান রাজার যাত্রা।
১২৫
কিসের সুগন্ধ এক কোথাহতে আসে,
সে গন্ধে ভ্রমর ছােটে মনের উল্লাসে ।
সকলে ইহার অর্থ জিজ্ঞাসে রাজার.
নয়ন না মেলে রাজ। উত্তর না পায় ।
তখন সকল লােক বিষন্ন অন্তরে,
সংবাদ কহিল গিয়া মরি গােচরে ।
চতুর্থ সর্গ।
সংবাদ শ্রবনে মন্ত্রী আশ্চর্য্য হইল,
রাজাকে আনিতে লােক পাঠাইয়া দিল।
রাজার অবস্থা হেরি অতি বিপরীত,
দাস দাসী লােক জন হল বিদিত।
কিসে হল এ দুর্দশা জিজ্ঞাসে রাজায়,
তবু বুদ্ধিমান রাজ। উত্তর না দেয়।
অবশেষে লােক জন বিষন্ন অন্তরে,
সংবাদ বলিল গিয়ে মন্ত্রীর গােচরে।
তখন আপনি মন্ত্রী সেই স্থানে গিয়া,
বিস্ময় মানিল অতি রাজাকে দেখিয়া ।
জিজ্ঞাসিল কেন রাজা সিংহাসন ছেড়ে,
বসিয়া রয়েছ কলু,
ঘানির উপরে।
দাস দাসী লােক জন জিজ্ঞাসে তোমায়,
কোন জন কোন রূপ উত্তর না পায়।
হে রাজা নয়ন দুটি মেল একবার,
এই দেখ আমি মন্ত্রী সম্মুখে তােমার,
এমন দুর্দশা তব কে করেছে বল,
এখনি তাহারে আনি দিব প্রতিফল ।
রাজা কহে মন্ত্রী আমি মেলিল নয়ন,
আর না হইবে মম রাগে গমন।
কুন্তলীন পুরস্কার।
স্বৰ্গযাত্ৰা করিয়াছি শুভক্ষণ করি,
তুমি কেন বাদ সাধ করিয়া চাতুরী।
পুন্যফলে স্বশরীরে স্বর্গে যাই আমি,
তাহাতে আসিয়া মন্ত্রী হিংসা কর তুমি।
মন্ত্রী কহে ভাল স্বর্গে চলেছ রাজন,
সকলি বুঝিবে যদি মেল দুনয়ন।
রাজা কহে ঘ্রাণশক্তি হীন মন্ত্রী তুমি,
স্বরগের গন্ধ যায় দশ ক্রোশ ভূমি।
এ গ + কি নাহি যায় তব নাসিকায়,
নিতান্তই মুখ তুমি কি বলিব হায়।
মন্ত্রী ও সে সুসৌরভে মােহিত হইল,
বহু অন্বেষিয়া শিশি বাহির করিল।
কহিল এ “কুন্তলীন” স্বর্গ গন্ধ নয়,
চক্ষু মেলি একবার দেখ সমুদয় ।
ঠকে ঠকাইয়া তােমা এনেছে এখানে,
পরম দয়ালু ঠক মারে নাই প্রাণে।
এত শুনি বুদ্ধিমান নয়ন মেলিল,
ঠকের চাতুরী সব বুঝিতে পারিল।
নিজের অবস্থা দেখি লজ্জিত বিশেষ,
“বুদ্ধিমানের যাত্রা” এইখানে শেষ ।
শ্ৰীমতী অম্বুজাসুন্দরী দাস।
পুরী, উড়িষ্যা।
,
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.