Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Misar-kumari Ed.11

Dasgupta,barodaprasanna · 2010/03/19

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মিসর-কুমারী
(পঞ্চাৰু দৃশ্যকাব্য)
মিনার্ভা থিয়েটারে অভিনীত।
বরদাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত প্রণীত ।
( একা সংস্করণ).
শিশির পাবলিশিং হাউস
২২১, কর্নওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
মূল্য ২
টাকা।

পাত্রপাত্রীগণ।
...
সামলেশ
মিসরের প্রধান পুরােহিত ও ধর্মাধিকার।
হারেমহেব
মিসরের ফারাও (সম্রাট)।
রামেশিস
হারেমহেবের ভ্রাতুস্পুত্র, মিসরের যুবরাজ।
জিনাে
জনৈক চিকিৎসক।
আকন
জনৈক ইথিওপিয়ান বা মিসরীয় কাফ্রি।
খারের
আবনের প্রতিবেশীপুত্র (ইথিওপিয়ান)
কাকাতুয়া
জনৈক সেনানী, সৈনিকগণ, কাফ্ৰিযুবকগণ, জনৈক রােগী, দসর্দার,
দ্যগণ, নগরপাল, ভৃত্য, নাগরিকগণ ইত্যাদি।
১০
০ ০
জিনাের ভৃত্য।
। •
নাহরিন
বুল
হারেমহেবের কন্যা।
আবনের পালিতা কন্যা।
জিনাের কন্যা।
বাদীগণ, পরিচারিকা, নর্তকীগণ,
নাগরিকগণ ইত্যাদি।
এই গ্রন্থের সর্বপ্রকার ব্যক্ত
প্রকাশক কর্তৃক সংরক্ষিত

প্রথম সংস্করণের নিবেদন। প্রাচীন মিসর একসায়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান সভ্যতায় জগতের আদর্শস্থানীয় হইয়াছিল। কিন্তু তাহার ইতিহাস আমাদের সুপরিচিত নহে। সেই ইতিহাসের ভিত্তির উপর নাটক রচনা অনেকে হয় তাে দুঃসাহসিক কাৰ্য্য বলিয়া মনে করিবেন। এ বিষয়ে আমার কিন্তু ধারণা, নাট্যামােদী সুধীবৃন্দের রুচি অতি দ্রুত পরিবর্তিত হইতেছে। সুতরাং আমার মনে হয় আমার এ উদ্যম অসাময়িক নহে। নাটক-নাটক; উপন্যাস কিম্বা ইতিহাস নহে। সুতরাং ইহাতে উপন্যাস কিম্বা ইতিহাসের উপাদান-বস্তুর অনুসন্ধান করা সঙ্গত হইবেনা। ইতিহাস ইহার ভিত্তিমাত্র। ইহার গল্পাংশও সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক নহে, কোন ইংরাজী গ্রন্থের ছায়া অবলম্বনে গঠিত। ইতঃপূর্বে একাধিক লেখক প্রায় এইরূপ কাহিনী অবলম্বনে গ্রন্থ রচনাও করিয়াছেন। আমি চেষ্টা করিয়াছি ঐ পুরাতন গল্প লইয়া প্রাচীন মিশরীয় সমাজ ও রীতি-নীতির একখানি নূতন চিত্র অঙ্কিত করিতে। কতদূর কৃতকাৰ্য্য হইয়াছি জানি না। পরিশেষে বক্তব্য এই যে, অভিনয় কালে কাৰ্য-সৌকাৰ্যার্থ ইহার কোন কোন অংশ পরিত্যক্ত, পরিবদ্ধিত ও পরিবর্তিত হইয়া থাকে। সকল নাটকেই ইহা করিতে হয় সুতরাং ইহার আর অন্ত কৈফির নাই। অলমিতিবিস্তারেণ । বিনীত একার।

অধ্যাপক শ্ৰীযুক্ত বাবু মন্মথমােহন বসু, এম, এ, মহাশয় পরম শ্রদ্ধাস্পদেষু। মাষ্টার মহাশয়, যে দিন দীনা ধূলিধূসরিতা মিসর-কুমারী বড় দুঃখে আপনার ঘরে গিয়া দাড়াইয়াছিল, আপনি তাহাকে সাদরে আহ্বান করিয়া লইয়া- ছিলেন। আপনার স্নেহ-যত্নে ও আপ্রাণ চেষ্টায় আজ.. সে, নবজীবন লাভ করিয়াছে। অপরে তাহাকে আজ কি চক্ষে দেখিবে জানি না, তবে আপনি তাহাকে উপেক্ষা করিবেন না এই বিশ্বাসে আপনার জিনিস আপনাকে অৰ্পণ করিয়া আমি ধন্য হইলাম। ইতি- কলিকাতা, বেহাগত- ২৩শে আষাঢ়, ১৩২৬ শ্রীবরদাপ্রস

চিরকুমারী
:::--
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য ।
কর্ণাক নগরের উপকণ্ঠস্থ কাফ্রি-পল্লী
আবন ও নাহরিন।
আকন। নাহরিন, নাহরিন, আমি তাে আর পার্লেম না। খারে
কিছুতেই আমার কথা শুনবে না, কিছুতেই স্বভাব শােধরাবার চেষ্টা
করবে না, দুষ্ট সঙ্গীদের কিছুতেই ছাড়বে না। তাকে নিয়ে আমি বড়
বিপদে পড়েছি।
নাহরিন। খারেব তাে আর ছেলেমানুষটী নয় বাবা, যে পদে পদে
তােমার বিধি-নিষেধ মেনে চলবে। যতদিন সে শিশু ছিল, তাকে বুকে
করে আগলে নিয়ে বেড়িয়েছ। এখন সে বড় হয়েছে, নিজের ভাল
মন বুঝতে শিখেছে, নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে শিখেছে—এখন
আর তা পারবে কেন ? আর সে যদি তােমার কথা নাই শুনতে চায়,
তবে তােমারই বা তার জন্য এত মাথা ব্যথা কেন ?
আবন। কেন তা তুই কি জানবি নাহরিন, তুই কি বুঝবি? আমি

মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক-১ম দৃশ্য। যে তার পিতার কাছে অঙ্গীকারে বদ্ধ হয়ে আছি। সেই বৃদ্ধ মরবার সময় বারেবকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল—“ভাই আমি চল্লেম, তুমি তাে রইলে। তুমি এই হতভাগা ছেলেটাকে দেখো।'—সে আজ দশ বছরের কথা বইতাে নয়। এরই মধ্যে কেমন করে আমি সে কথা ভুলে যাই? আজ যদি খারেব আমার কথা না শশানে, তাই বলে আমি তাকে কেমন করে ত্যাগ করি। নাহরিন। -তাগকরেই কি করবে? সে যদি নিজে তােমায় ত্যাগ করে তবে তুমি কি কর্তে পার ? আবন। কি আর কর্তে পারি ? মানুষ কোন কালেই কিছু কর্তে পারে না। অবস্থার গােলাম ক্ষুদ্র মানুষ,-নসীব তাকে কান ধরে যেখানে টেনে নিয়ে যায় সেখানে যেতে সে বাধ্য, তৰু সে তার অতি ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে চেষ্টা করে। কিন্তু করতে কিছুই পারে না।নাহরিন, আমিও একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব তার মতিগতি ফেরাতে পারি কি না। নাহরিন। আমি বুঝতে পাচ্ছি না বাবা, দুনিয়ায় এত লােক থাকতে তার বাপ তাের হাতে তাকে সপে দিয়ে গেলেন কেন। তার কি আপনার লােক কেউ ছিল না? আবন। তা জানি না। আমি শুধু এই জানি যে উপরে দেবতা আর পৃথিবীতে সে ভিন্ন আমার আপনার বলতে কেউ ছিল না। ছিল রক্তমাংসের গড়া একটা মানুষ, পরের দুঃখে যার প্রাণ গলে যেত-- পরের ব্যথা, পরের বিপদ, পরের বুকের পাষাণ বহন করবার জন্য যে অকাতরে বুক পেতে দিত। সে জানতাে কেমন করে পরকে আপনার করে নিতে হয়। তাই যে দিন আমার ইহকালের যথাসর্বস্ব খুইয়ে, ঝটিকা- হত ক্ষুদ্র জীব পৃথিবীর কোথাও একটু মাথা রাখবার ঠাঁই না পেয়ে তার বারে এসে দাড়িয়েছিলেন, সে আমায় কি দিয়ে রক্ষা করেছিল। নইলে আজ কোথায় থাকতিস তুই আর কোথায় থাকতেম আমি? সে ১ম অঙ্ক,-১ম দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী আমার বড় দুঃখের দিন গেছে। বুঝি তেমন দুঃখ কেউ কখনাে পায় নি-যেন পরম শত্রুও কখনো তেমন অবস্থায় না পড়ে। (নাহরিন, সে আমায় আপনার করে নিয়েছিল, তাই বুঝি সেই মমতার বন আরো দৃঢ় করবার জন্য মরবার সময় পুত্রকে আমার হাতে সঁপে দিয়ে গেছে। নাহরিন। তােমার জীবনে এমন দিন গেছে বাবা, কৈ এ কথা তাে আগে কখনাে বলনি। আবন। বলবার প্রয়ােজন হয় নি, তাই বলি নি। তবে মনে মনে কল্পনা ছিল একদিন তােকে বলব ! আজ কথা তুলেছিস, আজই শােন । আমি বুড়ো হয়েছি, নাহরিন। আবার কবে বলবার সুযােগ হবে কে জানে ? নাহরিন। না বাবা, তােমার যদি বলতে কষ্ট হয় তবে কাজ নেই। আবন। কিছু কষ্ট নয় মা, শােন। যেদিন ফারাও আমিনােফিল তৰ পিতৃপিতামহের কুলদেবতা আমনের মন্দিরের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র থিন্সি নগরীর ধ্বংস করেছিল, চারিদিকে বেড়। আগুন ধরিয়ে দিয়ে শহরময় কান্নার রােল তুলে দিয়েছিল, সেদিন সব চেয়ে বেশী জুলুম হয়েছিল এই অভিশপ্ত কাফ্রি জাতির ওপর; আর তার মধ্যে সব চেয়ে বেশী সহ কওেঁ হয়েছিল এই আবনকে। কেন জানিস ? নাহরিন। কেন বাবা ? আবন। একেতো আমি কাফ্রি, এই মিসরে তাই যথেষ্ট আপরাধ তার উপর তাের মা ছিল মিসর-রমণী। এই কালাে কাফ্রির ঘরে মিসরের তপ্তকাঞ্চন-বরণী সুন্দরী—সে অপরাধের কি ক্ষমা আছে ? মা, মা, সে তুই ধারণা কর্তে পারবি না। যে দেখেনি সে বুঝতে পারবে না। আমার চোখের সম্মুখে তাের মা সেই অত্যাচারের আগুনে প্রাণ দিলে,- আমি পুরুষ, কোন প্রতিকার কর্তে পালে না। শশাকে অপমানে, ঘূণায়, লজ্জায় আমার বুক ভেঙ্গে গেল। . ভাবলেম, আৰি মরব। কিন্তু পার্লেম কৈ? আমার নসীব আমার কান ধরে বাঁচিয়ে মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক-১ম দৃশ্য। - রাখলে। ( যতখানি দুঃখ আমার জন্য ভােলা ছিল তার সবটুকু আমায় ভুগিয়ে ছেড়ে দিলে। নাহরিন। বাবা, বাবা, আবন। শােন মা। তারপর দুঃখের তুফান আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে। বিপদের পর বিপদের ঢেউ এসে আমার বুক থেকে তােকে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমি ছাড়িনি। প্রাণপণে এই বুকের ভিতর তােকে আঁকড়ে ধরে রেখেছি, তবে আজ তুই এত বড় হয়েছিল। (নেপথ্যে চীৎকার-কে আছ—রক্ষা কর, রক্ষা কর খুন কলে-মেরে ফেল্লে।”—হঠাৎ যেন কেহ বিপদগ্রস্তের মুখ চাপিয়া ধরিল ) ওই শােন নাহরিন, ওই শােন। এ খারেবের কাজ। হতভাগা ছেলে মামায় একেবারে পাগল না করে ছাড়বে না। (দ্রুত প্রস্থান) নাহরিন। কি ভয়ানক!—কি নৃশংস। তার বাপ ছিল দেবতা, চবে সে কেন এমন হয় ? আমার বাবার কথা সে কেন শশানে না? আমি তাকে একবার বুঝিয়ে দেখব। ( সংজ্ঞাহীন রামেশিসকে লইয়া অবিনের পুনঃ প্রকেশ ) বাবা, বাবা, খাবে কোথায় ? আৰন। সে তার দলের সঙ্গে চলে গেল। আমি ডাকলেম, এলাে যা সে যেখানে খুশি, আমি আর কি করব ? শােন, আমি একে নিয়ে যাই। মাথায় চোট লেগেছে—দেরি কলে হয় তােত বিপদ नि দিতে পারে। তুই যত শীগগির পারিস গােটাকতক সবুজ ফুলের কুঁড়ি হয়ে আয়। নই নাহরিন। যাও বাবা, আমি এখুনি যাচ্ছি। (রামেশিসের অচেতন দেহ কোলে লইয়া আবনের প্রস্থান- নাহরিনের ভিন্ন দিকে প্রস্থান)--

১ম অঙ্ক,-১ম দৃশ্য।
মিসর-কুমারী
( খারেব ও কতিপয় লগুড়ধারী কাফ্রি-যুবকের প্রবেশ )
খারেব। তুই ঠিক দেখেছিস, এ সেই লােক?
১ম যুবক। হা সর্দার, আমি ঠিক দেখেছি, আমার কোন ভু
হয়নি। এই লােকটাই ক’দিন থেকে আমাদের পেছনে লেগেছে।
আপসােস যে একেবারে খতম করে দিতে পালেম না।
খারেব। হু-ভাই সব, একে কিছুতেই জ্যান্ত ছেড়ে দেওয়া হবে
। আমরা দেবতার নামে শপথ করে ব্রত গ্রহণ করেছি—এ কালসাপের
বংশ যেখানে পাব একেবারে নির্মূল করব।
২য় যুবক। তােমার কি ইচ্ছা সর্দার, এই বুদ্ধের আশ্রয় থেকে তাকে
জোর করে নিয়ে খুন করে ফেলা ?
খারে। হাঁ তাই।
২য় যুবক। না সর্দার, অতটা বাড়াবাড়ি করা ভাল হবে না। হাজা
হােক মানুষ তাে।
পারে। কে মানুষ ?-কিসের মানুষ ? এ মিসরী। মিসরী
যদি মানুষ হয় তবে দুনিয়ায় পশু কে? তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধূ
এই নিরপরাধ কাফ্রিজাতির উপর রাক্ষসের মত জুলুম করে আস
তাদের ধন-প্রাণ-মানকে পশুর মত পদদলিত করে আবর্জনায় যে
দিচ্ছে, তাদের ছেলে-মেয়ে-ঝি-বউকে ধরে নিয়ে গিয়ে নফর ।
বিদেশে বিক্রয় করে আসছে। তারা কোন্ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে মানু
মত ব্যবহার করেছে। তাদের চোখে আমরা মানুষ নই, তারা আমার
চোখে মানুষ হবে কেন? না, না, তােমাদের ইচ্ছা হয় তাদের ক্ষমা ব
পার, কিন্তু আমি করব না?
১ম যুবক। না, না, আমরাও তাদের ক্ষমা করব না। চল তা
নিয়ে গিয়ে খুন করে ফেলি।

মিসর-কুমারী [ ১ম অঞ্চ-২য় দৃশ্য।
বারেব। না, না, অত তাড়াতাড়ি নয়—আর একটু রাত হােক,
রিপর। এখন চল, এখানে দাড়িয়ে আর হল্লা করা ভাল নয়।
( সকলের প্রস্থান )
(নাহরিনের পুষ্পগুচ্ছ লইয়া পুনঃ প্রবেশ)
নাহরিন। সৰ্ব্বনাশ !–এরা একেবারে ক্ষেপে গেছে। বাবার কাছ
কে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে খুন করবে? না, না,-মিসরীরা মন্দ
লে আমরা মন্দ হব কেন? সে আহত, মৃচ্ছিত—শিশুর মত অসহায়।
কে এরা নির্দয়ভাবে হত্যা করবে, আর আমরা চুপ করে থাকব?
|- তা হবে না। তাকে বাঁচাতেই হবে। কিন্তু কেমন করে ?
মন করে তাকে বাঁচাব? যাই বাবাকে বলিগে, দেখি যদি তিনি
কান উপায় কৰ্তে পারেন।
( প্রস্থান)
দ্বতীয় দৃশ্য—মন্দির-প্রাঙ্গণ
মন্দেশ। দুনিয়ার একছত্র সম্রাট, বিশ্বের দেবতা আমন! তােমায়
করি। তােমার পুনরাগমনে তােমার সৃষ্টি আবার হেসে উঠেছে,
'র জ্যোতিতে ওই মরুভূমি আবার উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে, প্রতি
য় তােমার মূর্তি প্রতিফলিত হচ্ছে, তােমার করুণার জীবন্ত প্রতিমা
শালকায় নীলা সােনার মিসরকে ফলে শস্যে পূর্ণ করে নীল
নিয়ে নাচতে নাচতে সাগরের পানে ছুটে যাচ্ছে। তােমার
সম্রাট হারনহেব দেশে আবার শান্তির প্রতিষ্ঠা করেছে। তােমায়
করি। তােমার আশীর্বাদে সম্রাট দীর্ঘজীবী হােন। তার বংশ
(মিসরে রাজত্ব করুক।
}

অঙ্ক-২য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী (জনৈক সেনানীর বেশ ) সেনানী। প্রভু আপনি এখানে, আমি সারা মন্দিরময় খুজে আপনাকে পেয়ে এখানে এসেছি। সামন্দেশ। প্রয়ােজন ? সেনানী। প্রভু বড় বিপদ। কাল রাত্রিতে যুবরাজ রামেশি ছদ্ম- বেশে নগর-ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন, সঙ্গে আমি ছাড়া আর কোন দেহরক্ষক ছিল না। শহরের বাইরে কাফ্রি পল্লীর কাছে কতকগুলি কাফ্রি আমাদের আক্রমণ করে। আমি তাদের বাধা দিলে তাদের মধ্যে কেউ আমার মাথায় আঘাত করে, তাতে আমি মুচ্ছিত হয়ে পড়ি। তারপর কি হয়েছে কিছুই জানি না। যখন আমার মূচ্ছা ঙ্গ হ’ল, দেখলেম রাত্রি প্রায় শেষ হয়েছে। অতি কষ্টে উঠে চারিদিকে যুবরাজের অষ্ণু সকান কলেম, কোথাও তাকে দেখতে পেলেন না। প্রাসাদে এসে শুনলেম তিনি ফেরেন নি। প্রভু, আমার শঙ্কা হচ্ছে, শীঘ্র প্রতিকারের উপায় করুন। ..সামন্দেশ। কি, দুৰ্ব্বত্তদের এতদুর স্পর্ধা। সম্রাটের ভ্রাতুস্পুত্র মিসরের ভাবী অধিপতি যুবরাজ রামেশিসের প্রতি আক্রমণ : আচ্ছা তারা কে,কিছু বুঝতে পার্লে ? সেনানী। ঠিক কিছু বুঝতে পারি নি। তবে আমার বিশ্বাস তারা খারেবের দল। কিছুদিন ধরে তাদের উৎপাতে কাফ্রি-পল্লীর আশে পাশে সন্ধ্যার পর আর লােক চলতে পারে না। তাদের বিরুতে অতি যােগের পর অভিযােগ আসছে, কিন্তু প্রমাণ অভাবে কোন প্রতিকার দচ্ছে না। আমরা-আমি এবং যুবরাজ অনেক দিন ধরে তাদের সম্বন্ধে অনুসন্ধান কচ্ছি। আমার বিশ্বাস তারা যুাজকে চেনে, জেনে শুনে এই কাজ করেছে। সামন্দেশ। আমি তােমার কথায় আশ্চৰ্য্য হচ্ছি। একটা কাফ্রি রুদ্ধে মিসরীর অভিযােগ, তাতে আবার প্রমাণের দরকার কি? মিসরীর মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক,-৩য় দৃশ্য। কথাই যথেষ্ট। যাও, এই মুহুর্তে লােকজন নিয়ে অগ্রসর হও। কাফ্রি পল্লীর প্রতি গৃহে অনুসন্ধান কর,সৰ্ব্বত্র তন্ন তন্ন করে খোঁজ, যেখান থেকে হােক যুবরাজকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। আর সেই দুর্বত্ত খাৱেৰ —তাকে জীবিত কিম্বা মৃত যে অবস্থায়ই হােক বন্দী করে আনবে। সেনানী। যে আজ্ঞে প্রভু। ( প্রস্থানােজাগ) সামন্দেশ। আর শােন। যদি সেই দুৰ্বও খারেবকে ধর্তে না পার, তবে বৃদ্ধ আবনকেই ধরে নিয়ে আসবে। সেই বৃদ্ধ কাফ্রি-পল্লীর মাথা। তাকে পেলে খারেবকে অনায়াসেই পাওয়া যাবে। যাও, আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করে না। ( উভয়ের ভিন্ন দিকে প্রস্থান) ৩য় দৃশ্য—রামেশিসের কক্ষ। রামেশিস একাকী বসিয়াছিলেন। রামেশিস। এ কি স্বপ্ন না ইন্দ্রজাল ?—আমার বেশ মনে পড়ছে আমি কাফ্রিদের আক্রমণে আহত হয়ে মূচ্ছিত হয়েছিলাম। তারপর যখন চেতনা হল দেখলেম পৰ্বত-গহ্বরে পর্ণ-শয্যায় পড়ে আছি। আর সেই শয্যার পার্শ্বে-মরি মরি কি সে মূর্তি। যেন স্বর্গের এক অপূর্ব সুখ- স্বপ্ন দেহ পরিগ্রহ করে ধরায় নেমে এসেছে,-যেন আমনদেবের বিরাট জ্যোতির একটা বিরল রশ্মি অন্ধকারে ফুটে উঠেছে,-যেন তার এক ফোটা জীবন্ত করুণা সজাগ প্রহরীর মত অমার শিয়রে বসে আছে। কি সে উৎকণ্ঠা তার চোখে।-কি স্নেহ তার মুখে আর কি কোমলতা তার করম্পর্শে। সে আমায় সচেতন দেখে কি এক ফোটা ঔষধ খাইয়ে দিলে, তার হাতে সে অমৃতবিন্দু পান করে আমার দেহে যেন নবজীবন ১ম অঙ্ক,5৩য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী সঞ্চার হ’ল-একৃটা তীব্র আনন্দ আমায় ছেয়ে ফেল্লে,-পরমুহূর্তে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। জেগে দেখি প্রাসাদের সম্মুখে পথের ধারে শুয়ে আছি। কে সে দেবী ? তাকে একবার ধন্যবাদ দেবার অবকাশও পেলেম । জানি না তার কণ্ঠস্বর কত মধুর। ( সামন্দেশের প্রবেশ) সামনেশ। বৎস রামেশিস, এখন কেমন বােধ কচ্ছ? রামেশিস। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছি প্রভু, আপনি নিশ্চিন্ত হােন। সামন্দেশ। দেখি তােমার কোথায় আঘাত লেগেছিল।—(মস্তক পরিদর্শন)—আশ্চৰ্য—আঘাতের চিহ্ন পর্যন্ত নেই! বৎস, তুমি কি কিছুই অনুমান কর্তে পাচ্ছ না, এ দু’দিন তুমি কোথায় ছিলে? রামেশিস। কিছুই ধারণা কর্তে পাচ্ছি না। সমগ্র ব্যাপারটা যেন আমার কাছে একটা স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। সামন্দেশ। আচ্ছা সে পৰ্বত-গহ্বর কত দূরে, কোন দিকে তাও কিছু বুঝতে পার্লে না? সে যে পৰ্বত-গহ্বর তাতে কোন সন্দেহ নেই তো? রামেশিস। কিছুই বুঝতে পার্লেম না। বলেছি তাে আমার শুধু এক মুহূর্তের জন্য চেতনা হয়েছিল। তখন রাত্রি। শয্যাপাশ্বে একটি ক্ষীণ প্রদীপ জ্বলছিল, তাতে গহ্বরের অপর প্রান্তের কিছুই দেখা যাচ্ছিল । দেখবার সময়ও বিশেষ পাই নি। আমার পর্ণ-শয্যা ভিন্ন বােধ হয় আর কোন জিনিস সেখানে ছিল না। কিন্তু সে যে কোথায়, কতদূরে তা আমার ধারণার অতীত। আর, না, সে বালিকার কথা একে ফলব না। সামন্দেশ। আর কি? রামেশিস। না, আর কিছু না। সামন্দেশ। আচ্ছা তুমি বিশ্রাম কর। আজ আর কোথাও বেরিও না। রামেশিস। যে আজ্ঞে। (সামনের এমন)

মিসর-কুমারী
[ ১ম অল্প-৩য় মৃত।
রামেশিস। কি সায়া, এমন অসময়ে যে ?
সায়া। তােমার কাছে আসব, তার আবার সময় অসময় কি?
গীত।
আমার এ হিয়াখানি তোমার চরণতলে বিছায়ে
দিয়েছি পথের মাঝে,
জীবনে-মরণে সখা আমি যে তােমারি গাে, জীবন
সঁপেছি তব কাজে।
আমার নয়নকোণে কালাে কাজলের রেখা
ধুয়ে যায় নয়নজলে,
নিতি আসে নিশিথিনী ঘুমের পসরা লয়ে,
নিতি ফিরে যায় বিফলে।
দিনযামিনী মাের পূজায়
ধোনে তােমারি বাণী বাজে,
ভুবন ভরিয়া মাের গগন ছাপিয়া গাে-
তােমারি রূপের জ্যোতি বাজে।
কাটিয়া যায়-
আমি বড়
রামেশিস। সায়া, আমায় একটু একলা থাকতে দাও।
দুৰ্বল, কথা কইতে ইচ্ছা হচ্ছে না।
সায়া। জানি না, আজ কেন তুমি আমার প্রতি এত নির্দয় হচ্ছ।
আমি তত তােমায় কথা কইতে বলিনি, শুধু তােমার কাছে একটু বলতে
চাই। কেন তুমি তা বারণ কচ্ছ? আমি যতবার তােমার কাছে আসছি,
কেন তুমি আমায় তাড়িয়ে দিচ্ছ?
রামেশিস। ছিঃ সায়া, ও কথা মুখে আনতে নেই। তােমায় আমি

১ম অঙ্ক-৩য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী তাড়িয়ে দেব? না সায়া, তা নয়-বৃথা দুঃখ করাে না। জানি না কেন আমার একলা থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। কারুর সংসর্গ আমার ভাল লাগছে না। সায়া। যত একলা থাকবে তত তােমার মন খারাপ হবে। কি এমন ঘটেছে যুবরাজ, যাতে তুমি একেবারে মুষড়ে গেলে? দুদিন বাদে তুমি মিসরের সম্রাট হবে, তখন তােমায় প্রতিদিন শত বিপদ, শত শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ কৰ্তে হবে। এ তুচ্ছ বিষয়ে এতদুর কাতর হওয়া তােমার সাজে । রামেশিস। তুচ্ছ বিষয়। সায়া, সায়া, স্বগত) না, সে বালিকার কথা বলে কাকেও তার চিন্তার অংশ দিতে পারব না। সায়া। কি, বলতে বলতে থামলে কেন? বল কি বলতে যাচ্ছিলে। রামেশিস। না, কিছু না—আমি একটু একলা থাকতে চাই। সায়া। না বল জোর নেই। তােমার যদি ইচ্ছা না হয়, আমি শুনতে চাই না। কিন্তু দোহাই তােমার, তুমি এত বিমর্ষ হয়ে থেকো না। রামেশিস। আমার কিছু ভাল লাগছে না। সায়া। তবে এক কাজ কর। বাবা সিরিয়া থেকে একদল বাণী পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাদের যেমন রূপ, তেমনি কণ্ঠস্বর, তেমনি নৃত কৌশল। আমি তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি, তাদের একটা গান শােন- তােমার প্রাণে ঘূত্তি আসবে, তােমার মলিন মুখে হাসি ফুটবে। রামেশিস। বেশ, তােমার যা ইচ্ছা। ( সায়ার প্রন) এ কিছুতেই আমায় একলা থাকতে দেবে না। দেখি যদি একটা গান শুনে এর হাত থেকে মুক্তি পাই। ।

মিসর-কুমারী
[ ১ম অঙ্ক,-৩ষ নৃত।
( বাদীগণের প্রবেশ)
লীগণ।
গীত।
সে কোনখানে, কোন পরাণের মাঝখানে
শত বসন্ত ছিল ঘুমন্ত, জেগেছে তােমার আবাহনে ?
জ্যোছনা লুটায় চরণে, পরিমল মাখি গায় মৃদুল দখিনে বায়
সােহাগে বহিয়ে যায়,-সখা কোনখানে?
চিরবাঞ্ছিত স্বপনের ছবি দেখেছ-সে কার নয়নে?
খুলেছ কুসুমতার বাঁধন, ভুলেছ বঁধু কেমনে।
রামেশিস। তােমাদের গানে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। তােমরা এখন
যাও, ভূতের হাতে পুরস্কার পাঠিয়ে দিচ্ছি।
( বাদীগণের প্রস্থান)
কিছু ভাল লাগে না। থেকে থেকে তার কথা মনে পড়ছে। কে সে
বালিকা, কোথায় সেই পৰ্বতগহবর, কেমন করে খুঁজে বার করব।
তাকে আমার প্রাণের কৃতজ্ঞতা না জানাতে পার্লে আমি কিছুতেই স্থির
হতে পারব না। সে স্বর্গের দেবী, তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতেই
হৰে-কিন্তু কোথায়, কেমন করে? (ভাবিয়া) হাঁ, তাই করব। আজ
আবার ছদ্মবেশে সেই কাফ্রি-পল্লীর দিকে যাৰ। দেখি দেবতার ইচ্ছায়
মরা আবার আমায় আক্রমণ করে কি না। যদি আমার ভাগ্য প্রসঙ্গ
হয়, যদি তার দর্শনলাভ আমার অদৃষ্টে থাকে, তবে আবার হয়তাে
আহত হয়ে তার আশ্রয়ে গিয়ে পড়তে পারি।

১ম অঞ্চ-৪র্থ দৃশ্য। ]
মিসর-কুমারী
১৭
চতুর্থ দৃশ্য—বৃক্ষতল।
নাহরিন ও খারেব।
D
নাহরিন। খারেব, তুমি অতি হীন, কাপুরুষ। মিসরাদের যদি শাস্তি
দিতে চাও, তবে সবাই মিলে দল বেঁধে তাদের আক্রমণ কর না কেন ?
এমন করে চোরের মত অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে তাদের মাথায় লাঠি মারলে
কি লাভ হবে?
খারেব। দল বেঁধে আক্রমণ করব? কাকে নিয়ে দল বাঁধব ?
আমাদের ভেতর কি আর মানুষ আছে ? সব ভেড়ার পাল। নাহরিন,
আজ যদি আমি মিসরীদের এই দারুণ অত্যাচার দমন করবার জন্য দেশে
দেশে, নগরে নগরে, গ্রামে গ্রামে চেঁচিয়ে মুখে রক্ত উঠে মরে যাই, যদি
প্রত্যেক কাফ্রির দ্বারে দ্বারে ঘুরে সকলের পায়ে ধরে খােশামােদ করি,
তবু একটি প্রাণীও এসে আমার পাশে দাড়াবে না। কাফ্রি সবাই মিলে
এক জোট হয়ে মিসরীদের আক্রমণ করবে নাহরিন?—সে স্বপ্ন কখনাে
সফল হবে না।
নাহরিন। কিন্তু এরূপ হীন দস্যুবৃত্তি অপেক্ষা যে অত্যাচার সওয়া
ভাল।
খারেব। আমিই কি তা বুঝিনি নাররিন? কিন্তু কি করব, আমি
প্রলােভন সম্বরণ করতে পারি না। যেমন সাপ দেখলেই লােকে তার
মাথায় লাঠি না মেরে থাকতে পারে না, তেমনি আমিও মিসরীদের কায়দায়
পেলে অক্ষত দেহে ছেড়ে দিতে পারি না।
নাহরিন। ভাই, মিসরীরা পাপ করে থাকে, তাদের সাজা দেবতা
দেবেন। তােমারআমার তাতে কি অধিকার ?
খারে। আর আমাদের উপর এমন অত্যাচার করবারই বা তাদের
কি অধিকার আছে? শােণিতলােপ পশু অধিকার-অনধিকার বােকে

১৮ মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। , যুক্তি-তর্ক মানে না, যাকে পায় তারই ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে তার রক্ত পান করে। এরাও তেমনি কাফ্রিদের উপর জুলুম করবার সময় ন্যায়াধ্যায় বিচার করে না, ধর্মাধর্ম মানে না, বিবেক হারিয়ে ফেলে, দেবতার অস্তিত্বই ভুলে যায়। এদের দমন করতে এক পশুবল ভিন্ন আমাদের আর কি আছে? নাহরিন। হােক তারা পশু, আমরা তাে মানুষ। আমরা মানুষ হয়ে জন্মেছি, মানুষই থাকব। তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পশু হতে যাব কেন? খারেব, আমার অনুরােধ—তােমায় মানুষ হতে হবে। এই পশুবৃত্তি ত্যাগ করে মানুষের মত, বীরের মত জাতির কল্যাণে আত্ম- কির্জন দিতে হবে। খারেব। আগে বল্লে না কেন, একবার চেষ্টা করে দেখতেম। এখন যে আর সময় নেই। তুমি দেখছ না নাহরিন, আমি মরতে চলেছি? নাহরিন। না, না খারেব, তুমি পালাও। অতি দুরদেশে কোথাও . গিয়ে প্রাণ বাঁচাও। তারপর যেদিন তুমি তারপর যেদিন তুমি মানুষ হয়ে ফিরে আসবে, সেদিন আর কেউ তােমায় মারতে পারবে না। সেদিন মিসরের সমগ্র কাফ্রিজাতি তােমায় দেবতার মত পূজা করবে, তােমার একটি আহানে মিসরী রাক্ষসদের শাস্তি দেবার জন্য দলে দলে, কাতারে কাতারে ছেলে- বুড়াে, স্ত্রী-পুরুষ সবাই ছুটে আসবে। খারে, তুমি ফিরে এসে একদিন এই পতিত জাতির উদ্ধার সাধন করবে, ইথিওপিয়ায় আমাদের প্রাচীন সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবে এই আশায় আমি বুক বেঁধে পথ চেয়ে থাকব। আমায় নিরাশ করাে না ভাই, আমার কথা রাখ,-এখান থেকে পালাও। খারেব। তা হয় না, নাহরিন। আমি বেঁচে থাকলে তােমাদের কি দশা হবে। সরকারী সেপাইরা আমার খোঁজে গােটা শহরটা ওলট- পালট করে ফেলেছে। আজ যদি তারা আমায় খুঁজে না পায়, তবে কাল সেপাই-সান্ত্রীর পঙ্গপাল এসে তােমাদের সর্বনাশ করে দিয়ে ১৯ ১ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য।] মিসর-কুমারী যাবে। হয়তাে ছেলে-বুড়ো সবাইকে ধরে নিয়ে গিয়ে অকাতরে হত্যা করবে। হয়ত পাড়াকে পাড়া আগুন ধরিয়ে ছারেখারে দেবে। নাহরিন। তবু তােমায় বাঁচতে হবে। রেব, তবু তােমায় বাঁচতে হবো আমি বুঝতে পারছি তুমি পশু নও, তুমি কাপুরুষ নও -তুমি মানুষ, তুমি বীর—শুধু পথ খুঁজে নিতে ভুল করেছ। বেঁচে থেকে তােমার সেই ভুল সংশােধন করতে হবে। তােমার প্রাণে জাতির প্রয়ােজন আছে। একটা জাতির জন্য যদি দু’দশটা পরিবারের সর্বনাশ হয়ে যায় যাক, ক্ষতি নেই। তবু তােমায় বাঁচতে হবে। খারেব। তবে তাই হােক। নাহরিন, আমি যাই, আমায় বিদায় দাও। নাহরিন। দাড়াও, আর একটা কথা শােন। বাবার মুখে শুনেছি, মিসরীরা আমার মাকে পুড়িয়ে মেরেছিল। তাদের সেই অপরাধের শাস্তি দেবার ভারও আমি তােমায় দিচ্ছি। আমি নারী অবলা—আমার নিজের কোন শক্তি নেই। আমার হয়ে তােমায় এই কাজ করতে হবে। খারেব। বেশ, আমার সাধ্যমত তোমার আদেশ পালন করব। নাহরিন, তােমায়ও আমার একটা কথা বলবার আছে। অনেকদিন বলি বলি করেও বলতে পারিনি। আমি আমার জন্মভূমি ছেড়ে চলেছি, কোথায় চলেছি জানি না। আবার কবে ফিরব, ফিরব কি-না তাও জানি না। আজ আমায় সে কথা বলতে দাও। ( আবনের প্রবেশ ) আকন। একি খাবে, তুমি এখনাে এখানে দাড়িয়ে আছ শীঘ্র পালাও। একদল সেপাই তােমার খোঁজে এই দিকে আসছে। তাদের এসে পড়বার পূর্বে পালাও। খারেব। এই যাই। যাবার আগে আমি আপনার মনা ভিক্ষা করি। (আপনি-জামার পিতৃতুল্য। আমি মহাপাপী, আপনার নিকট মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। গুরুতর অপরাধ করেছি, আপনার অবাধ্য হয়েছি—আপনি আমার ক্ষমা করুন।) আবন। তুমি না চাইতে আমি তােমায় ক্ষমা করেছি। এখন যাও, আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করাে না। দাড়াও নিজের অঙ্গুলি হইতে একটা আংটি খুলিয়া খারেবের আঙ্গুলে পরাইয়া দিল)। খারেব। এ কি? আবন। সম্রাট সালাটিসের নামাঙ্কিত মন্ত্রপূত অঙ্গুরীয়। যার হাতে থাকবে বিপদে তার ভয় নাই। পারেব। এ আমায় দিচ্ছেন কেন? আবন। তােমার প্রয়ােজন বলে যাও যুবক, আর কথা কইবার সময় নাই।।...' ( খারেবের প্রস্থান-পশ্চাৎ পশ্চাৎ আবন ও নাহরিনের প্রস্থান- . কতিপয় সৈনিকের প্রবেশ ) ১ম সৈনিক। আশ্চর্য্য! খাৱেব যেন একেবারে হাওয়ায় মিশে গেছে। এত চেষ্টা করেও তাকে খুঁজে পেলাম না? সমগ্র শহর তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করলেম, কাফ্রি-পল্লীর প্রতি গৃহে সন্ধান করলেম, তার চিহ্নমাত্র নেই। ভাই সব, এইবার চল, বুড়াে আবনকেই ধরে নিয়ে যাই। সে নিশ্চয়ই খারেবের সংবাদ জানে, শুধু দুষ্টামম করে বলছে না। পিঠে ঘা কতক চাৰুক না পড়লে বুড়ো কুকুর কিছুতেই দারস্ত হবে না। ২য় সৈনিক। ঠিক কথা। ঘা কতক চাৰুক পিঠে পড়লেই বুড়াে হারামজাদা সুড় সুড় করে সব বলে দেবে। (সকলে চলিয়া যাইতেছিল, এমন সময়ে এক ঝুড়ি ফল লইয়া নাহরিনের পুনঃ প্রকেশ ) চয় সৈনিক। ৰাঃ বাঃ, বেশ ছড়িটে তাে। এ কাফ্রি পাড়ার ভেতর

।
১ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী
এমন কঁাচা সােনার মত রং আর এমন পদ্মফুলের মত মুখ, এতো ভারি
আশ্চৰ্য্য।
১ম সৈনিক। তাইতাে, এ যে একেবারে আসমানের চাদ মাটিতে
নেমে এসেছে।
২য় সৈনিক। আহা, কি কথাই বল্লে ভাই। একেবারে প্রাণের
কথা হিচড়ে টেনে নিয়ে বলেছ। বলি ওগাে আসমানের চঁাদ
১ম সৈনিক। তোরা থাম, আমি জিজ্ঞাসা কচ্ছি। বলি ওগাে, তুমি
কাদের মেয়ে গা ? নাম কি ?
নাহরিন। আমি কাফ্রিদের মেয়ে, এই পাড়ায়ই থাকি, নাম
নাহরিন।
২য় সৈনিক। কাফ্রিদের মেয়ে ?—বল কি? কাফ্রির মেয়ের এত
রূপ! আচ্ছা, বলতে পার এ কাচা সােণার মত রং কোথায় চুরি করলে।
নাহরিন। দেবতা দিয়েছেন।
সূয় সৈনিক। নাহরিন—আহা কি মিঠে নাম। তােমার ওই ফলের
চেয়েও মিঠে।
১ম সৈনিক। তােমার ঝুড়ি নামাও, দেখি কি কি ফল আছে।
২য় সৈনিক। আমায় দু’টী ডালিম দেবে গা?
সকলে। হাঃ হাঃ হাঃ-
নাহরিন। আমার ঝুড়িতে তত ডালিম নেই।
সকলে। দেখি দেখি—
( নাহরিন ঝুড়ি নামাইল—প্রথম ব্যতীত প্রত্যেকে এক একটা
ফল লইয়া আস্বাদন করিল )
নাহরিন। (প্রথমের প্রতি ) তুমি নিলে না? এই ফলটী তুমি নাও,
আমি এর দাম চাই না।
২য় সৈনিক। হাঃ হাঃ হাঃ! তােমার নসীব খুলেছে-তােমায়
পছন্দ করেছে।

মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। সকলে। হাঃ হাঃ হাঃ। নাহরিন। আপনারা আমার ফলের দাম দিন, আমার বাজারের বেলা হয়ে যাচ্ছে। ২য় সৈনিক। দাম ?-এই নাও ধর।-(নাহরিন মূল্যের জন্য হাত বাড়াইল, সৈনিক তাহাকে টানিয়া লইল)। সকলে। আহাহা, এদিকে এসাে—এদিকে এগাে-( সকলে মিলিয়া টানাটানি ও হাসাহাসি করিতে লাগিল)। নাহরিন। ছাড় ছাড়—আমায় ছুয়ােনা, ছাড়। ১ম সৈনিক। যাও, তােমরা ভারি দুষ্টু। না গাে তুমি আমার কাছে এসাে।—( নিজের নিকট টানিয়া লইল-নাহরিন হাত ছাড়াইয়া একটু দুরে গিয়া শির উন্নত করিয়া দাড়াইল)। নাহরিন। (ছােরা বাহির করিয়া )—সাবধান কুকুর, যে আর এক পদ অগ্রসর হবে, এই ছুরিকা তার বক্ষে আমূল বিদ্ধ হবে। ছি ছি ছি, তােরা আবার নিজেদের মরদ বলে পরিচয় দিল। এতগুলাে লােক মিলে একটা অসহায় অবলার উপর এই জুলুম কচ্ছিস,অথচ সৈনিকের পরিচ্ছদ তােদের অঙ্গে, কোষে তরবারি। হায়, দেবতা শেবেক ! তুমি কি সত্যসত্যই ঘুমিয়ে পড়েছ, না একেবারে মরে গেছ? তােমার মিশরে আজ তােমার আশ্রিতা অবলার উপর এই অত্যাচার হচ্ছে, আর তুমি তা অনায়াসে চুপ করে দেখছ। এই পাষণ্ডদের শাস্তি দিতে পার না? আকাশ শুদ্ধ এদের মাথায় ভেঙ্গে পড়ে হতভাগ্য মিসরকে একেবারে চুরমার করে মরুভূমির বালুকণায় মিশিয়ে দিতে পার না ? ১ম সৈনিক। বাহবা বাহবা । চমৎকার। আমি হাজার সুন্দরী দেখেছি, কিন্তু এমনটি কখনাে দেখিনি। হােক কাফ্রির মেয়ে, একে নিয়ে জাহান্নাম যেতে হয় তাও স্বীকার, তবু আমি একে ছাড়ব না।.

১ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী (নাহরিন সকলকে নিরুত্তর দেখিয়া ছােরা কোষবদ্ধ করিয়া চলিয়া যাইতেছিল) ১ম সৈনিক। সুন্দরী ফের,-আমি তােমার দাস। নাহরিন। তাের মত কাপুরুষকে আমি পদাঘাত করি। ১ম সৈনিক। তবেরে শয়তানী-(হাত ধরিতে যাইতেছিল, এমন সময় ছদ্মবেশে রামেশিসের প্রবেশ ) রামেশিস। সাবধান! ১ম সৈনিক। কে তুই বৰ্ব্বর, মহামান্য ফারাওয়ের সৈনিককে ভয় দেখাতে আসিস? তাের কি প্রাণের ভয় নেই? ২য় সৈনিক। বলি, তুমি কে বট হে? ১ম সৈনিক। তাই তাে কথা কয় না যে। ২য় সৈনিক। আরে ও কি মজুরী না নিয়ে অমন কথা কইবে নাকি ? এই দেখ আমি কথা কওয়াচ্ছি।-( চপেটাঘাত করিতে উদ্যত হইল) রামেশিস। খবরদার!-(নাহরিনের অলক্ষ্যে সৈনিকগণের দিকে ফিরিয়া বক্ষবস্ত্র ও কৃত্রিম গোঁফ সরাইয়া নিজ স্বরূপ ও পরিচায়ক চিহ্ন দেখাইলে সকলে চমকিত হইয়া পাঁচ হাত পিছাইয়া গেল। ১ম সৈনিক। যুবরাজ। রামেশিস। চুপ-(পুনরায় গোঁফ সংস্থাপিত করিয়া বক্ষ আবৃত করিলেন)-যাও এখান থেকে। ১ম সৈনিক। আজ্ঞে আজ্ঞে রামেশিস। যাও- (সৈনিকগণের প্রস্থান) নাহরিন। আমার এখনাে গা কাপছে। না, আজ আর ফল বেচতে যাব না, ঘরে ফিরে যাই। (ইতস্ততঃ নিক্ষিপ্ত ফল সকল কুড়াইতে লাগিল) २४ মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক-৪র্থ দৃশ্য। রামেশিস। আমনদেব। তােমায় কোটী কোটী প্রণাম। তােমার দয়ায় আমি আবার এ দেবীর দর্শন পেয়েছি। আমার জীবন সার্থক যে, এর এতটুকু উপকারও করতে পেরেছি। কিন্তু এর দয়ার তুলনায় সে কতটুকু ?—সাগরের তুলনায় বারিবিন্দু। কৃতজ্ঞতায় আমার হৃদয় ভরে উঠেছে, শ্রদ্ধায় আমার শির নত হয়ে আসছে, অনির্বচনীয় আনন্দে আমার দেহ রােমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে ।-( প্রকাশ্যে )-দেবি, চল তােমায় ঘরে রেখে আসি। নাহরিন। না, তুমি যাও, আমি একাই যাব। তুমি আমার মান রক্ষা করেছ সেজন্য তােমায় ধন্যবাদ। দেবতা তােমার মঙ্গল ক রামমশিস।-(স্বগত)—কি দুর্ভাগ্য যে, এই অপরূপ সুন্দরী কাফ্রির ঘরে জন্মগ্রহণ করেছে। নাহরিন। না, তুমিও মিসরী, তােমায়ও বিশ্বাস নাই। তুমি আজ আমায় রক্ষা করেছ, হয়তাে কাল আমার সর্বনাশ করবে বলে। তােমরা সব পার। রামেশিস। না, এখন একে পরিচয় দেওয়া হবে না। মিসরীদের প্রতি এর এই অবিশ্বাস কাল-মেঘের মত এর মনকে ছেয়ে রয়েছে, আমার সরল হৃদয়ের উষ্ণ কৃতজ্ঞতা কিছুতে তাকে ছাপিয়ে উঠতে পারবে না। যতক্ষণ না বিশ্বাস লওয়াতে পারি ততক্ষণ আমার পরিচয় এর কাছে গােপন রাখতে হবে। ( প্রকাশ্যে )—তুমি মিসরীদের এত ঘৃণা কর? তুমি কি মিসরী নও? নাহরিন। না। সত্য বটে আমার মা মিসরী ছিলেন, কিন্তু আমার পিতা কাফ্রি। সুতরাং আমিও কাফ্রি। রামেশিস। কেন, তুমি কি তােমার মাতার পরিচয়ে পরিচিত হতে ইচ্ছা কর না? মিসরে তো আজ কাল এমন অনেক লােক আছে, তারা মিরী বলে পরিচয় দেয়।

১ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য।] মিসর-কুমারী নাহরিন। যার ইচ্ছা হয় দিক, আমি দেবনা। আমার পিতা কাফ্রি বলে মিসরীরা আমার মাকে পুড়িয়ে মেরেছিল। যারা আমার বাবার জাতকে এত ঘৃণা করে, আমি কিছুতেই তাদের একজন বলে পরিচয় দিতে পারব না। আমি কাফ্রির ঘরে জন্মেছি, কাফ্রির কোলে মানুষ হয়েছি, কাফ্রি পিতার আশ্রয়ে এত বড় হয়েছি,আমি কাফ্রি। আমি মিসরের ঘৃণিত কাফ্রি। রামেশিস। আমনদেব। আমায় রক্ষা করাে, আমি কিছুতেই ইচ্ছা দমন করতে পারছি না—বাধ্য হয়ে আমায় মিথ্যা বলতে হচ্ছে। ( প্রকাশ্যে )—সুন্দরি, তুমি অনায়াসে আমায় বিশ্বাস করতে পার। আমি মিসরী নই, তােমারই মত কাফ্রি পিতার গৃহে মিসরী মাতার কোলে জন্মেছি। নাহরিন। মিথ্যা কথা। তা যদি হবে, তবে সেপাইরা তােমায় দেখে ভয় পেয়ে চলে গেল কেন ? রামমশিস। সে আমার গুপ্তবিদ্যার বলে। বহুদিন পূর্বে এক সাধু নিকট আমি এক গুপ্ত বিদ্যা লাভ করেছি, সে বিদ্যার শক্তি অসাধারণ। নাহরিন। সত্য ? রামেশিস। সম্পূর্ণ সত্য। নাহরিন। শপথ কর। রামেশিস। শপথ হাঁ, আমি দেবতা শেবেকের নামে শপথ করছি আমি যা বলছি তা সম্পূর্ণ সত্য। নাহরিন। তবে চল, তােমায় আমাদের ঘরে নিয়ে যাই। ( প্রস্থান)

মিসর-কুমারী
[ ১ম অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য।
পঞ্চম দৃশ্য—-মন্দির-প্রাঙ্গণ।
সামন্দেশ ও জনৈক সেনানী
সামনেশ। আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে, তােমরা এখনও সেই দুৰ্বত্ত
খারেবকে ধরে আনতে পারলে না। একটা সামান্য কাফ্রি কুকুর তােমাদের
যুাজ রামেশিসের উপর আক্রমণ করে এতগুলাে সৈনিকের চেষ্টা ব্যর্থ
করছে, এর চেয়ে লজ্জার বিষয় তােমাদের আর কি আছে?
সেনানী। প্রভু, চেষ্টার কোন ত্রুটা হচ্ছে না। কিন্তু সে যে
কোথায় পালিয়েছে কোনই সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তার জন্য শুধু
কাফ্রি পল্পী কেন, সমগ্র কর্ণাক সহর তন্ন তন্ন করে খোঁজ হয়েছে কিন্তু
কোনই ফল হয়নি।
সামন্দেশ। বৃদ্ধ আবনকে জিজ্ঞাসা করেছিলে ?-সে কি বলে ?
সেনানী। বলে সে জানে না।
সামন্দেশ। আরে মূঢ় অকর্মণ্য, তােমরা অনায়াসে তাই বিশ্বাস করছ?
তােমাদের কি ইচ্ছা, সে বলুক—সে অমুক জায়গায় আছে, তােমরা তাকে
থরে নিয়ে গিয়ে হত্যা কর?
সেনানী। আজ্ঞে আজ্ঞে•••
সামন্দেশ। যাও, আমি কোন কথা শুনতে চাই না। সেই বৃদ্ধ
শয়তানকে এই মুহূর্তে ধরে নিয়ে এসাে। হয় সে খাবে কোথায় আছে
বলবে, না হয় নিজে তার হয়ে শাস্তি ভােগ করবে।
সেনানী। তাকে ধরে আনবার জন্য লোেক গেছে।
{ নেপথ্যে ]-
১ম সৈনিক। চল বুড়ো হারামজাদা, তাের নষ্টামম ভাঙছি।
আমাদের সঙ্গে চালাকি বটে? (প্রহার )
আবন। উ হুঃ হু। আর মেরাে না,•••তার চেয়ে একেবারে মেরে
ফেলে, আমার সব অপরাধের শাস্তি হয়ে যাক।

১ম অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য।) মিসর-কুমারী তৃয় সৈনিক। ওঃ ন্যাকামি হচ্ছে। শালাকে গলায় দড়ি বেঁধে হিচড়ে টেনে নিয়ে চল। সামন্দেশ। দেখতাে ব্যাপার কি ? সেনানী। (অগ্রসর হইয়া দেখিয়া ) সেই বুড়াে আবনকে ধরে নিয়ে আসছে। (আবনকে লইয়া সৈন্যগণের প্রবেশ) আবন, তুমি ভুলে যাচ্ছ তুমি প্রভু সামন্দেশের সম্মুখে।-শির নত কর। আবন। শির নত করব ? কেন ? কার সম্মুখে ? এর সমুখে শির নত করব? এ তােমাদের প্রভু হতে পারে, আমার কে? আমার কাছে তােমরাও যা, এও তাই,-অত্যাচারী হিংস্র পশু। এরই অনুচরেরা এই বৃদ্ধ আবনের শ্বেত শ্মশ্রু এবং কেশ উৎপাটন করেছে, পদাঘাতে, মুষ্ট্যাঘাতে, কশাঘাতে তার কাল চামড়ার উপর রক্তের ঢেউ খেলিয়ে দিয়েছে,আর আমি এর কাছে শির নত করব?-না, এত কৃতজ্ঞতা আমার নেই। ১ম সৈনিক। (চপেটাঘাত ) তবে রে বর্বর, বেআদব- আবন। মার, মার, যত পার মার। আর আমি করব না, আর নিষেধ করব না, আর কাকুতি-মিনতি করব না। করে দেখেছি কোন ফল হয়নি। তােমাদের যতটুকু শক্তি ততটুকু করতে তােমরা কসুর কর নি, আর কি করবে? ২য় সৈনিক। কি। (চাবুক উঠাইল) সামশে। ক্ষান্ত হও, অৰুয়ো না। আকন, খাবে কোথায় ? আবন। জানি না। আর জানলেও বলব না। কেন বলব ? তােমরা কি মনে করতােমরা তাকে নিয়ে কি করবে, আমি জানি না ? সে পিতৃমাতৃহীন অনাথ-আমিই তার পিতা-জানলেও বলব না। সামন্দেশ। আবন, আবন, রসনা সংযত করে কথা কও। আমরা তাকে চাই। সে অপরাধী, আমরা তার বিচার করব।

২৮ মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক-৫ম দৃশ্য। আৰন। বিচার? মিসরীর কাছে কাফ্রির বিচার। হাঃ হাঃ হাঃ, এ একটা হাসির কথা বটে । কি বিচার করবে ? তাকে পুড়িয়ে মারবে?-না জ্যান্ত অবস্থায় আগাগােড়া করাত দিয়ে চিরে ফেলবে? তার গায়ের চামড়া খুলে ফেলবে?—এই তাে তােমাদের বিচার ? সকলে। ওঃ! আবন। সামনেশ, সে যদি অপরাধী, তােমরা তার চেয়ে হাজার গুণে অপরাধী। তােমরা এই যে কাফ্রি-জাতির উপর শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে কত অত্যাচার করছ, তার হিসাব রাখ? তোমাদের অপরাধের কাহিনী শুনলে গাছের পাতা ঝরে পড়ে, পাহাড়ের পাথর নড়ে উঠে, মরা মানুষ শত বর্ষের ঘুম থেকে এক মুহূর্তে শিউরে জেগে উঠে। ক তােমাদের এই সব জুলুমের বিরুদ্ধে যদি আমরা একটা মুখের কথা কই, কি একটা আঙ্গুল তুলি, তবেই আমাদের গুরুতর অপরাধ হয়। মনে করাে না, তােমাদের এই সব অপরাধের বিচার নাই। তােমাদেরও দিন বিচার হবে—সেইদিন-ওইখানে তিনি বিচার করবেন। সামলেশ। সে আমি বুঝবে। আবন। বুঝবে? আর কবে বুঝবে? এতদিনে একটা সােজা কথা বুঝেছ কি সামলেশ, যে পৃথিবীতে হীন কেউ নাই, ঘৃণ্য কেউ নাই। বুঝেছ কি ক্ষুদ্র পিপীলিকাও দংশন করতে জানে, ক্ষুদ্র মূষিকও ভীমকায় মহীরুহকে ধরাশায়ী করতে পারে। এই যে তুমি বিনা দোষে এক নীন কাফ্রির প্রতি এত নির্যাতন করছ, হতে পারে এমন দিন আসবে যে দিন এরই কাছে তােমায় দীন ভিখারীর মত করজোড়ে ভিক্ষার্থী হয়ে দাঁড়াতে হবে। বুঝেছ কি?এমন একটা কথা তােমার কল্পনাও কখনাে ধারণা করতে পারে কি সমলো- ১ম অঙ্ক,৫ম দৃশ্য।] মিসর-কুমারী আবন। সামন্দেশ, ভূমি তুলে যাচ্ছ, তুলে যাচ্ছ, তুমি তুমি বুড়াে হয়েছ, তােমার কিারের দিন আসছে। সামন্দেশ। শােন আবন, শােন আবন,তােমার প্রলাপ বাক্য আমি শুনতে চাই । এখন খারেব কোথায় বলবে কি না? আবন। । সামন্দেশ। আমার আদেশ। আবন। তােমার আদেশ আমি মানি না। সামন্দেশ। মহামা ফারাওয়ের আদেশ। আবন। কে ফারাও? কিসের ফারাও? আমি বাঁচি কিম্বা মরি তার কি আসে যায়? তবে কেন সে আমার ফারাও ? সামন্দেশ। কেন ?-যেহেতু আবন। যেহেতু আমি কাফ্রি-কেমন, এইতো? কেন, কাফ্রি কি মানুষ নয় ? তাদের কি সুখ-দুঃখ নাই ? একই আকাশের নীচে, একই সূর্যের উত্তাপে, একই ফলে জলে শঙ্গে কাফ্রি আর মিসরী কি জীবনধারণ করে না? তবে কিসের জন্য তােমাতে আমাতে এত তফাৎ ? তােমার সুখ সুখ, আর আমার সুখ তােমার জুতাের লার মাটি?- তােমার রক্ত রক্ত, আর আমার রক্ত নর্দামার পচা জল? তােমার মাথা মাথা, আর আমার মাথা তােমার লাথি মারবার জায়গা। সামন্দেশ। আবন, আর আমি ধৈৰ্য্য রাখতে পারছি না। এই আমি তােমায় শেষবার জিজ্ঞাসা করছি—খাবে কোথায় ? আবন। আমি বলব না। সামন্দেশ। দুনিয়ার কলঙ্ক, নরকের কুকুর বর্বর কাজি। মিসরের ম্রাট শক্তির অবমাননা করলে তার ফল কি হয়, প্রত্যক্ষ দেখ। যাও, একে যেমন করে নিয়ে এসেছ, তেমনি করে গলায় দড়ি বেযে সমস্ত শহর ঘুরিয়ে আন। তারপর, তারপর একে সিংহের মুখে নিক্ষেপ কর। যাও।

মিসর-কুমারী [ ১ম অৰু-৫ম দৃশ্য।
(সৈন্যগণ আবনকে টানিয়া লইয়া যাইতেছিল, এমন সময়
রানেশিস প্রবেশ পূৰ্ব্বক বাধা দিলেন।)
রামেশিস। ক্ষান্ত হও,প্রভু, আমার একটা ভিক্ষা।
সামন্দেশ। তুমি কি চাও যুবরাজ ?
রামেশিস। এই বৃদ্ধের জীবন আমায় ভিক্ষা দিন।
সামনেশ। এ অন্যায় আবদার-এ হতে পারে না। আমি আদেশ
দিয়েছি, কিছুতেই তার পরিবর্তন হবে না। যাও, নিয়ে যাও।
রামেশিস। একটু অপেক্ষা কর। প্রভু, মিসরের ভাবী ফারাও
নতজানু হয়ে আপনার দয়া ভিক্ষা করছে।
সামন্দেশ। ওঠ যুবরাজ। তােমার ব্যবহারে আমি আশ্চৰ্য্য হচ্ছি।
কেন তুমি এর জীবন ভিক্ষা চাইছ?
রামেশিস। একে দিয়ে আমার কিছু প্রয়ােজন আছে।
সামনেশ। ভাল, আমি এর প্রাণদণ্ড প্রত্যাহার করলেন। কিন্তু
একে ক্ষমা করতে পারি না। এ মিসরের সম্রাট-শক্তি মানতে চায় না।
একে তার ক্ষমতা ভাল করে বুঝিয়ে দিতে হবে। সমগ্ৰ কাফ্রি-পল্লী এর
অপরাধের শাস্তি ভােগ করবে।— সৈনিকগণের প্রতি )-যাও, কাফ্রি
পল্লীর চারিদিকে আগুন ধরিয়ে দাও। আজ সূর্যাস্তের পূর্বেই যেন তার
চিহ্ন অবধি মুছে যায়।
আৰন। না না, তা করাে না। বৃদ্ধ আবনকে যত পার শাস্তি দাও
—তাকে দগ্ধে দন্ধে মার। তার চামড় খুলে নিয়ে তােমার জুতাে তৈরী
কর, তার গায়ের মাংস কেটে নিয়ে তােমার পােয্য কুকুরকে খাওয়াও,
চাদির তারের মত এই পাকা চুল নিয়ে তােমার পাপােষ তৈরি কর,
তবু আমার একের অপরাধে সকলের সাজা দিও না। কাফ্রি বড়
গরীব, তারা দিন-মজুরী করে খায়, তাদের সর্বনাশ করে না। তাদের
মাথা রাখবার ঠাইটুকু পুড়িয়ে দিয়ে তাদের পথে দাড় করিও না। আর

১ম, অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী তুমি, মিসরের ভাবী সম্রাট, এক হীন কাফ্রির জীবনে যে তােমার কি প্রয়ােজন, তা তুমিই জান-আমি বুঝতে পারছি না কিন্তু সে প্রয়ােজন যতই গুরুতর হােক, তার জন্য সমগ্ৰ কাফ্রি-পল্লীর সর্বনাশ করবার তােমার কোন অধিকার নাই। তুমি তােমার দয়া ফিরিয়ে নাও যুবরাজ, আমায় মরতে দাও। সামন্দেশ। বাতুলের প্রলাপ শােনবার আমার অবকাশ নাই। সৈন্ত- গণ, যাও আদেশ পালন কর। একে এখান থেকে বার করে দাও। আবন। (গর্জিয়া উঠিল) সামন্দেশ - সামন্দেশ। যাও।-আচ্ছা,-না, কি বছিলে বল। আবন। বলব ? না, বলব না। ( প্রকাশ্যে )-সামন্দেশ, তুমি আমার জাতির শত্রু। তােমায় আমার কিছু বলবার নাই। সামন্দেশ। তবে দূর হও। সৈন্যগণ - ইঙ্গিত) ১ম সৈনিক। যা তাের প্রাণ নিয়ে এখান থেকে চলে যা। ( ধাক্কা দিতে দিতে বাহির করিয়া দিল—সৈন্যগণের প্রস্থান) রামেশিস। তবু জীবন রক্ষা হয়েছে। নইলে আর নাহরিনের কাছে মুখ দেখাবার উপায় থাকত না। আর আমি কি করব? বৃদ্ধ সামলেশকে আমি বেশ জানি। সে যে একটা কথা রেখেছে এই যথেষ্ট। যাই দেখি বৃদ্ধ কোন দিকে গেল। (প্রন) । সামন্দেশ। এই হতভাগ্য কাফ্রিজাতিটা কি পৃথিবীতে না থাকলেই চলত না? কি প্রয়ােজন আছে এদের জন্মাবার--কি সুখে এরা বেঁচে থাকে? কেন একটা মহামারী এসে ধরিত্রীর বুক থেকে এই কালির দাগ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিয়ে যায় না? হায় পিতা নূট। তুমি মিসরের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হয়েও একি অজ্ঞানের কাজ করে গেছ।-আমি কাফ্রি ক্রীতদাসীর সন্তান, এ দুঃখ কি রাখবার ঠাই আছে? শৈশবে মাতৃহীন, জ্ঞানাবধি আমার গর্ভধারিণী কাফ্রি-মাকে কখনাে দেখিনি। গৃহে তার একখানি ছবি আনার কলকের নিশানা স্বরূপ পিতা বহু মিসর-কুমারী [ ১ম অঙ্ক,-৬ষ্ঠ দৃশ্য। একে রেখে গিয়েছিলেন। সেই ছবি আমার ছােট ভাই জিরাফ নিয়ে পালিয়েছিল। জানিনা সে আজও বেঁচে আছে কি না—সেই ছবি পৃথিবীতে আজও আছে কি না। সেই মূক চিত্ৰই আমার কাল হয়েছে। ভ্রিায় প্রতিদিন সেই চিত্র স্বপ্নে দেখি। আর জাগরণে সর্বদা শঙ্কা হয়, ওই বুঝি কেউ আমার কলঙ্ক-কাহিনী প্রকাশ করে দিয়ে আমায় উন্নতির সর্বোচ্চ শিখর হতে নরকের অন্ধকারময় গহ্বরে নিক্ষেপ করলে। তাইতো আমি আমার মায়ের জাতকে এত ঘৃণা করি। এতে যদি কিছু পাপ হয়, তবে পিতা নূট—সেই পাপ আমার নয়—তােমার। ষষ্ঠ দৃশ্য প্রজ্বলিত কাফ্রি-পল্লী। চতুর্দিক অগ্নিশিখা ও ধুমে সমাচ্ছন্ন। অধিবাসীগণ চীৎকার করিতে করিতে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতেছে। কাহারও বা বস্তু অর্ধ-প্ৰজলিত --কেহ বা অর্ধ-নগ্ন কেহ অচেতন হইয়া পড়িয়া গেল। আবন নাহরিনের অচেতন দেহ অতি কষ্টে বহন করিয়া চৰ্তলের মধ্যে আনয়ন করিল। আর বহিতে পারে না—বৃদ্ধ কাপিতে কাঁপিতে বসিয়া পড়িল। নাহরিন ভূমিতে শায়িতা।-এখন এক দেবতা ভিন্ন পরিত্রাতা নাই-বৃদ্ধ করযােড়ে দেবতার আরাধনা করিতে লাগিল। এমন সময় বেশী রামেশিস আসিয়া নাহরিনের অচেতন দেহ তুলিয়া লইল ও ইজিতে বুকে তাহার অঙ্গে ভর দিয়া উঠিতে বলিল। বৃদ্ধ অতি কষ্টে উঠিয়া এড়াইল।

দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য—মন্দির-প্রাঙ্গণ।
জিনাে, জনৈক রােগী ও কাকাতুয়া।
জিনাে। (রােগীর প্রতি)—বলুন আপনার কি ব্যায়রাম। অতি
সংক্ষেপে বলবেন, কারণ আমার সময় অতি অল্প।
রােগী। যে আজ্ঞে, অতি সংক্ষেপেই বলছি। আমার বােগ অতি
জটিল, এক কথায় বলতে গেলে যাকে লােকে আটপৌরে ভাষায় বলে
পীরিত, সাধু ভাষায় বলে ভালবাসা, আর দলিল দস্তাবেজে বলে প্রেম।
জিনাে। হু। রােগ অতি গুরুতর বটে। আচ্ছা এ বােগ আপনি
কতদিন হল টের পেয়েছেন, অর্থাৎ কত দিন হল বাইরে প্রকাশ
পেয়েছে ?
রােগী। আজ্ঞে, রােগ অতি পুরাতন। আমার যখন বার বৎসর
বয়স, তখন এক প্রতিবেশীর পাঁচ বৎসর বয়স্কা কন্যার প্রেমে পড়ি।
তদবধি রােগ উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পেয়ে আসছে। এখন আমার বয়স প্রায়
যাট। এখন আমার এমন অবস্থা যে, নারী দেখলেই আমার প্রেম করতে
ইচ্ছা হয়—তা সে ঢেঙা, বেঁটে, কাল, গােরা, গােল, চ্যাপ্টা,-যাই
হােক না কেন। এমন কি সময় সময় শ্রমবশতঃ পাড়ার চৌকিদারকেই
আলিঙ্গন করে বসি এবং তার বৃষ্টি আস্বাদন পেলে তবে সে এম
বুঝতে পারি।
জিনাে। আচ্ছা ছেলেবেলা থেকে আপনার পিতা কোনরূপ
চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন নি ?
রােগী। আজ্ঞে, তিনি বিশেষ কিছু প্রতিকার করতে পারেন নি।
যেহেতু তিনি নিজেই এ রােগে অত্যন্ত ভুগেছেন।

৩৪
মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য।
জিনাে। বটে? তারও এ রােগ আছে নাকি?
রােগী। ভয়ঙ্কর আছে।
জিনাে। তা হলে এ রােগ আপনাদের বংশপরম্পরায় বলুন?
রােগী। আজ্ঞে, হাঁ, তা বই আর কি ? আমার পিতার আছে,
আমার আছে, আমার পুত্রেরও দেখা দিয়েছে। আবার চার বৎসরের
একটি কন্যা আছে—লােকে বলছে তারও হবে।
জিনাে। আচ্ছা, এখন আপনার সব চেয়ে বেশী উপসর্গ কি?
বােগী। নিরাশা এবং অশ্রুজল।
জিননা। আচ্ছা, আপনার চিন্তা নাই। আমি আপনার ঔষধের
বস্থা করে দিচ্ছি,-অচিরেই রােগমুক্ত হবেন। শুনুন,
রােগী। আজ্ঞে করুন।
জিননা। ঔষধ এমন কিছু না, আমি আপনাকে একটি উত্তম
প্রেম-পাত্রী প্রদান করছি। আপনি প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে এসে তার
।
সঙ্গে প্রণয়-সম্ভাষণ করবেন।
রােগী। যে আজ্ঞে।
জিনাে। কাকাতুয়া
কাকাতুয়া। কৌ—হুকুম?
জিনাে। হাড়গিলে সুন্দরী।
রােগী। হাড়গিলে সুন্দরী।
জিননা। আজ্ঞে হাঁ, তার নামই ওই।
(কাকাতুয়া পার্শ্বের গৃহের পর্দা কিঞ্চিৎ খুলিয়া ধরিলে
দেখা গেল একটী কঙ্কাল ক্রমাগত হস্ত-পদ প্রসারিত ও
আকুঞ্চিত করিতেছে)
যােগ। ওরে বাবা হাড়গিলে সুন্দরীই ত বটে। মশাই আমার
বােগ সেরে গেছে। আপনার হাড়গিলে সুন্দরীকে ক্ষান্ত হতে বলুন।

བ།
২য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য।] মিসর-কুমারী
ও কি, তবু থামে না যে! না বাবা হাড়গিলে সুন্দরী, দোহাই তােমার
আনায় রেহাই দাও। মশাই মশাই, রক্ষা করুন।
জিননা। আহা ভয় কি ? এক ঘণ্টা বইতাে নয়।
রােগী। এক ঘণ্টা! ওরে বাবা ! এক মুহূর্তে প্রাণ ওষ্ঠাগত।
মশাই, আর নয়। আমার রােগ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এইবার আমার
বাবাকে আর ছেলে-মেয়েকে পাঠিয়ে দি’গে ।
( প্রস্থানােদ্যোগ )
কাকাতুয়া। দর্শনী?
(কাকাতুয়ার হাতে অর্থ প্রদানপূর্বক রােগীর প্রস্থান)
জিনাে। কাকাতুয়া, বাইরের ঘরে যদি আর কোন রােগী থাকে তবে
এ বেলা বিদায় করে দে। বলে দে যেন বিকেলে আসে। আর এই ঘরে
থানা হাজির কর। আমি এখুনি আসছি।
( উভয়ের প্রস্থান )
( গাহিতে গাহিতে বুলার প্রবেশ )
বুলা।
গীত।
কোন অজানা দেশের নীল সরােবরে
ফুটেছিল এক কমলিনী,
রবির কিরণে হাসিয়া, সােহাগ সলিলে ভাসিয়া-
হেলিয়া দুলিয়া করিত রঙ্গ সারাটি দিন সে গরবিনী।
একদিন মৃদু সমীরণ চুরি করি তার হাসিটি,
আমার হৃদয়-দুয়ারে আসিয়া বাজাইল মৃদু বাঁশীটি।
সে সু-লহরে ভাসিয়া ভাসিয়া, আপনার মনে আপনি হাসিয়া
(আমি) লুটায়ে পড়িগাে আপনি।
বুলা। কাকাতুয়া কাকাতুয়া।
কাকাতুয়া। (নেপথ্যে)-কৌ ।

বুলা।
গীত।
মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য।
বুলা। ক্ষিদে পেয়েছে খাবার নিয়ে আয়, অমি বাবাকে ডেকে নিয়ে।
আসবি।
কাকাতুয়া। ( নেপথ্যে)-কৌ।
আচ্ছা, তুই খাবার নিয়ে আয়,-আমি বাবাকে ডেকে
আনছি।
কাকাতুয়া। নেপথ্যে)-কৌ।
( বুলার প্রস্থান )
( কাকাতুয়া নানাপ্রকার খাদ্যসহ একখানি দুজমেজ আনিয়া গৃহের
মধ্যস্থলে স্থাপন করিল ও তৎপার্শ্বে আসন রাখিল )
কাকাতুয়া।
মাথায় ঝুটী কাকাতুয়া-কৌ।
বুঝেছ-কৌ। কৌ। কে ।
কাক ডাকে কা কা কোকিল ডাকে কু,
ঘােড়া ডাকে চি” হি হি হি শেয়াল ডাকে হু-
জোনাকী জ্বলে মিটির মিটির মৌমাছি খায় মৌ
বৌ কথা কও কেঁদে মরে ব্যাচারির হারিয়ে গেছে বৌ।
আমি দেখে শুনে হেসে মরিকে।
জিনাে। (নেপথ্যে ). "কাকাতুয়া-কাকাতুয়া।
কাকাতুয়া। কৌ।
( প্রস্থান )
( খারেলের প্রবেশ )
আরেব। উঃ আর পারি না। একদিন একরাত্রি ক্রমাগত ছুটছি,
পেটে দানা নেই, চোখে ঘুম নেই, একটু বিশ্রামের অবকাশ নেই,-রক্ত
মাংসের দেহে আর কত সয় ? পিছু পিছু সেপাইয়ের দল রক্তপিপাসু
হায়েনার মত ছুটেছে, শেষে নিজেরা না পেরে পেছনে কুকুর লেলিয়ে
দিয়েছে। উঃ কি ভয়ানক কুকুর! মাটি শুকতে শুকতে আসছে
আর বিকট চীৎকার করছে। এখনাে মনে হলে বুক কেঁপে উঠ

২য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য।] মিসর-কুমারী —যা থাকে কপালে, আর পালাব না। ধরা পড়তে হয় এইখানেই পড়ব। কিন্তু এ যে অপরিচিত স্থান,-এ কার গৃহ তাও জানি না। গৃহস্বামী চোর বলে ধরিয়ে দেবে না তাে? দেয় দেবে। মরেছি না মরতে আছি। উঃ, ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। পৃথিবী অন্ধকার দেখছি। দেবতা, তােমরা কি আছ ? যদি থাক, দয়া করে আমায় কিছু খাদ্য প্রদান কর। ( অগ্রসর হইয়া) -এই যে উপাদেয় খাদ্য সজ্জিত রয়েছে। কার কে জানে? যারই হােক, ভাববার অবকাশ নাই। আমি এ লােভ কিছুতেই সম্বরণ করতে পারছি না। (উপবেশনপূর্বক আহার ) আঃ বাঁচলেম। ঘুমে আমার চোখ বুজে আসছে। কোথায় একটু মাথা রাখবার ঠাই পাব? এইখানে একটু ঘুমিয়ে নি’। যখন গৃহস্বামী এসে আমায় চৌকিদারের হাতে সমর্পণ করবেন, তার আগে যেন কেউ এ ঘুম না ভাঙ্গায়। (মেজের উপর পা তুলিয়া দিয়া ঘুমাইয়া পড়িল-জিনন, বুলা ও কাকাতুয়ার প্রবেশ ) জিননা। (খারেবের পায়ের প্রতি নির্দেশ করিয়া)-কাকাতুয়া, এ তুই আমাদের জন্য কি খাবার এনেছিস? এ যে নূতন জিনিস দেখছি। এমন জিনিস যে এর আগে কখনো খেয়েছি এমন তাে মনে হয় না। বুলা। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ-(হাসিয়া গড়াইয়া পড়িল) কাকাতুয়া । এ শালা চোর,-খাবারগুলাে সব চুরি করে খেয়েছে। বুলা। হাঃ হাঃ হাঃ-( উচ্চহান্ত ) জিন। শুধু খাবার চুরি করে নি, একটু ঘুমও চুরি করে ঘুমিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এ কি আশ্চৰ্য। এ অঙ্গুরীয় এ পেলে কোথায়? এ যে সম্রাট সালাটিসের নামাঙ্কিত মন্ত্রপূত অঙ্গুরীয়। পিতা কোথায় কি অবস্থায় সংগ্রহ করেছিলেন জানিনা। মৃত্যর একদিন পূর্বে তিনি নিজে মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য। এই অঙ্গুরীয় ভগ্নী নােরার হাতে পরিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের দুই ভাইকে ডেকে বল্লেন -“তােরা পুরুষ, বিপদের সঙ্গে লড়তে পারিস, - আর নােরা নারী, তার সে শক্তি নাই। তাই এ আংটী আমি নােরাকে দিলেম। এর অদ্ভুত ক্ষমতা, যার হাতে এ অঙ্গুরীয় থাকবে, বিপদে তাৰ ভয় নাই।’-একদিন পরে পিতার মৃত্যু হল। সে আজ কত কালের কথা। তারপর আমরা দু’টী অনাথ ভাই-বােন বড় ভাইয়ের অত্যাচারে বিপদের সাগরে ভেসেছিলেম। সে তার স্বামীর গৃহে গিয়ে কুল পেয়ে ছিল, আর আমি ভাসতে ভাসতে সিরিয়ায় গিয়ে আশ্রয় পেয়েছিলেম। আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। বুলা। বাবা,বাবা,-ও বাবা, জিনাে। কিন্তু না, না, আমার কোন ভুল হয়নি-এতে কোন সন্দেহ নাই। এই তাে সেই দুই সহস্র বৎসরের পুরাতন দুর্বোধ্য এ এবং অর্থহীন চিত্র প্রস্তরফলকে তেমনি খােদা রয়েছে। এ চিত্র একবার দেখলে বিস্তৃত হওয়া অসম্ভব। পিতা বলেছিলেন পৃথিবীতে এর জোড়া নাই। নিশ্চয় এ সেই অঙ্গুরীয়,-কোন সন্দেহ নাই। তাহলে বুলা। বাবা, বাবা, ও বাবা-হাঃ হাঃ হাঃ- জিননা। কোথাকার অসভ্য মেয়ে । ( খারেব চক্ষু মেলিয়া উঠিয়া বসিল ও সম্মুখে কুলা, কাকাতুয়া ও জিনােকে দেখিয়া ত্রস্তভাবে গৃহের এক কোণে গিয়া নতশিরে দাঁড়াইয়া রহিল) জিনাে। যুবক, তুমি কে? ধুবক, উত্তর দাও,তুমি কে? তােমার পরিচয়ে আমার বিশেষ প্রয়ােজন আছে। খারেব। পরিচয় দিলে তাে চিনতে পারবেন না। আমার বাড়ী এ দেশে নয়। জিননা। তােমার বাড়ী কোথায় ?

২য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য।
মিসর-কুমার
খাৱেব। কর্ণাকে।
জিনো। এখানে কি করে এলে ?
খারেব। প্রাণ বাঁচাবার জন্য সরকারী সেপাইদের হাত এড়িয়ে পালিয়ে
এসেছি। আমি ক্ষুধায় বড় কাতর হয়েছিলেন, অনুমতি নেবার অবকাশ
পাইনি, বিনানুমতিতে আপনার খাদ্য আত্মসাৎ করেছি। আপনার গৃহ
আমায় রক্তপিপাসু সৈনিকদের হাত হতে রক্ষা করেছে। আপনার এ ঋণ
আমি জীবনে শােধ করতে পারব না।
জিনাে। ইচ্ছা করলে শোধ করতে পার।
খারেব। কিরূপে?
জিনাে। তােমার হাতের ঐ আংটিটি আমায় দাও।
খারেব। আমার দুর্ভাগ্য, এ অঙ্গুরীয় দেবার উপায় নাই। এ আমার
নয়, আমার একজন পরমাত্মীয় আমার কাছে গচ্ছিত রেখেছেন। এ ন্যস্তধন
হস্তান্তর করবার আমার অধিকার নাই।
জিনাে। একজন তােমার কাছে গচ্ছিত রেখেছেন ? কে তিনি?
পুরুষ কি নারী? তিনি কোথায় থাকেন ? বয়স কত? তার আর
কে আছে ?
খারেব। তিনি পুরুষ।
জিনাে। পুরুষ।
খারেব। তিনি বুদ্ধ, পৃথিবীতে এক কন্যা ছাড়া তাঁর আর কেউ
নাই।
জিনো। তিনি তােমায় এ অঙ্গুরীয় দিলেন কেন ?
খাবে। তিনি আমার পিতৃবন্ধু, আমার বিপদ দেখে তিনি এ অঙ্গুরীয়
আমার আঙ্গুলে পরিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন এ মন্ত্র-পুতঃ। যার হাতে এ
অঙ্গুরীয় থাকে বিপদে তার ভয় বা বিনাশ নাই।
জিননা। তিনি বলেছেন?—তিনি জানেন? তার নাম কি?
খারেব। তাঁর নাম আবন।

৪০
মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক,-২য় দৃশ্য।
জিনাে। আমার অনুমান ঠিক। যুবক, তুমি আমার গৃহে থাকবে?
তােমার ভয় নাই, আমি মিসরী নই, তােমারই স্বজাতি।
খারেব। আপনি দয়া করে আশ্রয় দিলেই থাকি।
জিননা। আমি তােমায় আশ্রয় দিতে পারি এক শর্তে।
খারেব। কি ?
জিনাে। তুমি আমার বিনানুমতিতে আমার গৃহ ত্যাগ করতে
পারবে না।
খারেব। আপনার দয়ার সীমা নাই। আজ হতে আমি আপনার
ক্রীতদাস।
জিনাে। বুলা, আজ হতে এ তাের খেলার সাথী। একে বাগানে
নিয়ে যা। আমরা তিনজনে সেইখানে গাছতলায় বসে খানা খাৰ।
কাকাতুয়া বাগানে আমাদের তিনজনার মত খাবার নিয়ে যা।
বুলা। হাঃ হাঃ হাঃ-
কাকাতুয়া। কৌ।
( জিনাে ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
জিনাে। দেবতা কে বলে তােমরা মিথ্যা? তােমরা আছ-নইলে
কে আমায় এমন করে হাত ধরে পথ দেখিয়ে দিলে? এই পৃথিবীতে যারা
আমার একমাত্র আপনার জন, যাদের দেখবার আশা ইহজীবনের মত
জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন, তাদের সন্ধান পেয়েছি। আজ আমার বড় আনন্দের
দিন।-আজ আমার বড় আনন্দের দিন।
৩
দ্বিতীয় দৃশ্য আবনের গৃহ
নাহরিন ও রামেশিস।
রামেশিস। নাহরিন, নাহরিন, বিশ্বাস কর, সত্য আমি তােমায়
ভালবাসি—বড় ভালবাসি।

৪১ ২য় অঙ্ক,২য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী, নাহরিন। কেন ভালবাস? না, না, তােমায় বারণ করছি, তুমি আমায় ভালবেসাে না-ভালবাসতে বােললা না। আমি ভালবাসতে জানিনা, কখনাে শিখিনি। রামেশিস। নাহরিন, আমি তােমায় ভালবাসতে শেখাব। নাহরিন। আমি শিখবাে না-কি হবে ভালবাসা শিখে ? কাফ্রির মেয়ের আবার ভালবাসা। ওসব বড় মানুষী খেয়াল, গরীবের সাজে না। রামেশিস। নাহরিন, নাহরিন, নাহরিন। শােন তাজবর, একে তুমি ভালবাসা বল ? এ ভালবাসা নয়, এ অত্যাচার, জুলুম। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার মনের উপর তােমার এ অধিকার স্থাপন'এ জুলুম। আমার বিবেক বলে...“তাকে ভালবেসাে না”—অমনি আমার মন সহস্র কণ্ঠে তার প্রতিধ্বনি করে উঠে “কে ভালবাস, ভালবাস; ভালবাস।” আমি প্রাণপণে অবাধ্য মনের টুটি টিপে ধরে তাকে চুপ করিয়ে দিতে চাই, আর সে মাতৃহারা শিশুর মত অসহ বেদনায় রুদ্ধ কণ্ঠে হাহাকার করে ওঠে।-বল তাজবর, একি অত্যাচার নয় ? রামেশিস। মন যা বলে তাই কর না কেন, নাহরিন ? নাহরিন। বিবেকের বিরুদ্ধে ? তা হয় না তাজবর, তার ফল কখনাে ভাল হয় না। রামেশিস নাহরিন, নাহরিন,-(হস্তধারণ ) নাহরিন। ক্ষান্ত হও তাজবর, চুপ কর। তােমার কথায় আমার প্রাণ পাগল হয়ে বুক ভেঙ্গে ছুটে বেরিয়ে আসতে চায়, তােমার স্পর্শে আমার দেহের শিরায় শিরায় আগুনের ঢেউ বয়ে যায়, তােমার আহ্বানে আমায় দুনিয়া ভুলিয়ে দেয়,-কোন এক অজানা অচেনা স্বপ্নলােকের আধ আলাে আধ ছায়ার মধ্যে নিয়ে ফেলে। তাজবর, তাজর, তােমার পায়ে ধরি—আমায় ত্যাগ কর, আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাও। যদি সত্য আমায় ভালবাস, তবে প্রতিজ্ঞা কর, আর কখনাে আমার সম্মুখে এসে দাঁড়াবে না।

કર
৩
মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক,-২য় দৃশ্য।
রামেশিস। তার চেয়ে এই ছুরি নাও, এই বুক পেতে দিচ্চি-একে-
বারে জন্মের মত সব অত্যাচার, সব জুলুমের শেষ করে দাও।
নাহরিন। না, আর পারি না। এ লােভ আর সম্বরণ করতে পারি
না, এ তৃষা আর সইতে পারি না। অন্ধ নয়নের দৃষ্টি পেয়ে হারাতে পারি
। তাজবর, তাজবর, বল তুমি কি চাও? সত্য বল, বেশ করে ভেবে
বল—আমার কাছে তুমি কি চাও?
রামেশিস। নাহরিন, আমি সত্য বলছি আমি তােমায় চাই। যেমন
চাওয়া পৃথিবীতে কেউ কখনাে কাউকে চায়নি, তেমনি চাই—যেমন ভালবাসা
পৃথিবীতে কেউ কখনাে কাউকে বাসেনি, আমি তােমায় তেমনি ভালবাসি।
নাহরিন, তুমি আমার ছও।
নাহরিন। তবে—তবে নাও আমায়। পথের ধুলােয় পড়া একটা
কানাকড়ি—তাকে কুড়িয়ে নাও। তাজবর, তাজবর, তুমি বড় সুন্দর।
আর আমি ক্ষুদ্র এক পতঙ্গ, তােগার রূপের আগুনে ঝলসে গেছি-
আমার পালাবার শক্তি নাই।
রামেশিস। নাহরিন,
আবন। (নেপথ্যে)-নাহরিন নাহরিন।
নাহরিন। ওই বাবা আসছেন,-আমি এখান থেকে যাই।
রামেশিস। চল আমিও যাই।
নাহরিন। না না, এখন নয়। এখন তুমি এইখানে থাক। (প্রস্থান
(একখানি পাখা হস্তে আবনের প্রবেশ )
৩
আবন। কে তুমি যুবক পুত্রের মত আমার সেবা করছ, ভৃত্যের মত
আমার আদেশ পালন করছ, দেবতার মত আমায় সকল বিপদ হতে
পরিত্রাণ করছ? অমার সাহায্য না পেলে আমি কিছুতেই সে দিন সেই
ভয়ঙ্কর অগিচত্রের মধ্য হতে নাহরিনকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারতেম
সা। তোমার দয়ায় আমরা গৃহহীন হয়েও আবার নুতন গৃহ পেয়েছি,

৪ ।
২য় অঙ্ক,-২য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী
তােমারই আনুকূল্যে এক টুকরাে খেতে পাচ্ছি। যুবক, কেমন করে
তােমায় অ স্তরের কৃতজ্ঞতা জানাব ?
রামেশিস। কোন প্রয়ােজন নাই। বলেছি তত আমি পিতৃমাতৃহীন ;
সংসারে আমার আপনার বলতে কেউ নাই। আপনি আমার পিতা...
আমায় সন্তান বলে মনে করবেন।
আবন। দেবতা শেবেক তােমার মঙ্গল করুন। এই বৃদ্ধের আন্তরিক
আশীৰ্বাদ তােমায় সর্বত্র জয়ী করুক। বৎস, একটা বিষয়ে আমার
সন্দেহ ভঞ্জন কর।
রামেশিস। কি?
আবন। তােমার নাম বলছ তাজবর, কিন্তু পরিচয় দিচ্ছ তুমি কাফ্রি
পিতা এবং মিসরী মাতার সন্তান। কাফ্রির গৃহে এরূপ নাম তাে আমি
কখনাে শুনিনি।
রামেশিস। এ আমার মায়ের রাখা নাম, তাই বােধ হয় অনেকটা
মিসরী নামের মত।
আবন। হাঁ তাই সম্ভব।
(নাহরিনের পুনঃ প্রবেশ )
নাহরিন। বাবা, বাবা, শীগগির এসাে।
আবন। কি মা, কি হয়েছে ?
নাহরিন। ফারাওয়ের মেয়ে সায়া রথে করে এই পথ দিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ চাকা ভেঙ্গে গিয়ে রথ অচল হয়েছে। আর এখানকার যত লােক
রাজকন্যা শুনে দেখবার জন্য রথের চারিদিকে ভিড় করে হা করে
তাকিয়ে আছে। তাই সে একটা দাসীকে নিয়ে রথ থেকে নেমে
আমাদের বাড়ীর দিকে আসছে। [ নেপথ্যে স্ত্রী-কঠে—“বাড়ীতে কে
আছ ? ]
ওই এসে পড়েছে।
আবন।মহরিন, তাঁকে সসম্মানে এইখানে নিয়ে আয়।

.৪৪..
মিসর-কুমারী
[ ২য় অঙ্ক, ২য় দৃশ্য।
রামেশিস। সৰ্ব্বনাশ, সায়া এখানে প্রকাশ্যে) সে কি পিতা ?
সে যে আমাদের শত্রু-কন্যা। তাকে সসম্মানে-
আবন। হােক শত্রু-কন্যা। এখন সে বিপদে পড়েছে—তা ছাড়া সে
নারী। নাহরিন।
( নাহরিনের প্রস্থান)
রামেশিস। এখন উপায়? কি করি ?—পালাই। আর এক মুহূর্ত
বিলম্ব করলেই ধরা পড়ব।
( চলিয়া যাইতেছিলেন)
আবন। কোথা যাচ্ছ আজবর ?
রামেশিস। আজ্ঞে-এ-না—এই যাচ্ছি একটু পাশের ঘরে। এখানে
সম্রাট-কন্যা আসছেন, আমার থাকা উচিত নয়।
আবন। কিছু আসে যায় না। সে আমার ঘরে অতিথির মত আসছে।
আমার পুত্রের কাছে তার লজ্জিত হওয়া উচিত নয়।
রামেশিস। আজ্ঞে“আজ্ঞে-এ ঘরটা অত্যন্ত গরম।
আবন। এই নাও (হস্তস্থিত পাখা প্রদান )।
( সায়া, পরিচারিকা ও নাহরিনের প্রবেশ )
এসাে মা রাজরাজেশ্বরী। আমি দরিদ্র কাফ্রি, তুমি আজ ঘটনাচক্রে
বাধ্য হয়ে আমার ঘরে কিয়ৎক্ষণ বিশ্রামের আশায় এসেছ। কিন্তু আমার
দুর্ভাগ্য যে পৃ-তােদৰ-পা রাখার উপযুক্ত নয়। তােমার সম্বর্ধনা করবার
• মত সঙ্গতি আমার নাই।
সায়া। ও কথা বল্লে আমি বড়ই দুঃখিত হব। তােমার গৃহে এসে
আমি সহস্র অপরিচিত দৃষ্টির আক্রমণ হতে রক্ষা পেয়েছি, এই আমি পরম
লাভ বলে মনে করি।
( নাহরিন আসন আনিয়া দিল)
আবন। বােস মা। দরিদ্রের গৃহে যদি দয়া করে এসেছ, তবে
অনুমতি কর, দু' একটী ফল এনে দি। দীন-বুজের আতিথ্য গ্রহণ
করে তাকে অনুগৃহীত কর।

৪৫
২য় অঙ্ক,২য় দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী
সায়া। তােমার সৌজন্যের দান আমি উপেক্ষা করব না। নিয়ে
এসাে।
( আবন চলিয়া যাইতেছিল, দারের নিকট রামেশিস তাহাকে
ধরিয়া চুপি চুপি বলিল)
রামেশিস। আমিও যাই?
আবন। না, তুমি আমার প্রতিনিধি হয়ে এইখানে থাক। নাহরিন,
আমার সঙ্গে আয়। আমরা এখুনি আসছি। আমাদের অপরাক
নিও না La
সায়া। কিছুমাত্রল-তোমূ-স্বচ্ছন্দ্রে যেতে পার।
( আবন ও নাহরিনের প্রস্থান)
পরিচারিকা। হুজুরাইন, হুজুরাইন, ও কে দাড়িয়ে আছে দেখুন
দেখি,-পেছন দিক থেকে দেখতে ঠিক যুবরাজের মত।
সায়া। যুবরাজ? তুই কি বলছিস ? তিনি যে হাওয়া পরিবর্তনের জন্য ।
আজ ক’দিন হল বিদেশে গেছেন, আজও ত ফেরেন নি।
রামেশিস। বিষম সঙ্কট। যদি চিনে ফ্যালে, কলঙ্কের একশেষ হবে।
সায়া। তাইতাে, আশ্চৰ্য্য !-তুই নাম জিজ্ঞাসা করতাে।
পরিচারিকা। প্রভু, আপনার নাম কি?
রামেশিস। কি উত্তর দেব ? কণ্ঠস্বরেই চিনে ফেলবে। চুপ করে
থাকাই নিরাপদ।
পরিচারিকা। হুজুর, মহামান্যা সম্রা-কন্যা জিজ্ঞাসা করছেন,
আপনার নাম কি?-(রামেশিস নিরুত্তরহুজুরাইন, বােধ হয় এর
কোন নাম নেই।
সায়া। আচ্ছা, জিজ্ঞাসা কর দেশ কোথায় ?
পরিচারিকা। প্রভু, আপনার দেশ কোথায়? রাজকুমারী জিজ্ঞাসা”
করছেন, আপনার দেশ কোথায় ?
(রামেশিস অর্থহীন ভাবে আকাশের দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন)

৪৬, মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক,-৩য় দৃশ্য। হুজুরাইন এর কোন দেশ নাই। বােধ হয় ইনি বােধ হয় ইনি গত বর্ষায় বৃষ্টির সঙ্গে আকাশ থেকে মাটিতে পড়েছেন। সায়া। আশ্চৰ্য্য প্রতিকৃতি। সেই নাক, মুখ, চোখ,-সব সেই, পার্থক্য, তার গোঁফ ছিল না। এর তা আছে। ( আবন ও নাহরিনের ফল লইয়া প্রবেশ-সায়া এক টুকরা ফল মুখে দিলেন, অবশিষ্ট আবন পরিচারিকাকে প্রদান করিল- ( ভৃত্যের প্রবেশ ) ভৃত্য। হুজুরাইন, রথের চাকা মেরামত হয়েছে, আপনি আসুন। সায়া। চল। বৃদ্ধ, আমি তা হলে আসি। (সকলের অভিবাদন-সায়া, পরিচারিকা ও ভৃত্যের প্রস্থান) রামেশিস। আমনদেব। তােমায় শত শত প্রণাম। আজ তুমিই আমায় পরিত্রাণ করেছ। আবন। তাজবর, আমি বাইরে যাচ্ছি। যতক্ষণ ফিরে না আসি তুমি ঘরে থেকো, নাহরিনকে দেখাে। রামেসি। যে আজ্ঞে। তৃতীয় দৃশ্য আমনদেবের মন্দির মধ্যস্থ সামন্দেশের কক্ষ। (দেয়ালের গায়ে একখানি বৃহদাকার চিত্র দাঁড় করান আছে। “চিত্রে একটি অনিন্দ্য সুন্দরী নারী-মূর্তি একটি শিশুকে স্তনদান করিতেছে।) সামনেশ। নােফ্রি। নােফ্রি! কথা কও, হাস, আমার মুখপানে চাও, -তখনকার মত আর একবার আমার মুখপানে চাও,তােমাদের চুম্বন, আলিঙ্গনের উষ্ণ মদিরায় আমায় পাগল করে দাও। আমার মেহের নির্মল ৪৭ ২য় অঙ্ক,-৩য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী শুভ্র কুসুমকলিকা আই! তুই কি এনি নিৰ্বাক থাকবি? তাের মুখেও কি আর এ জীবনে সেই স্বর্গের অনাবিল অমিয়ধারার মত আধ আধ কথা শুনতে পাব না? কথা কইতে না পারিস, একবার কি কেঁদে উঠতেও পারিস না? উঃ! জীবন বড় দুৰ্বহ। আমার সুখ শান্তি আশার সূৰ্য্য এদের সঙ্গে সঙ্গে চির অস্তমিত হয়েছে, তাই আজ জীবনের সায়াহ্নে নিরাশ ব্যথার এ গুরুভার আর আমি বইতে পারছি না। আমনদেব! এত দীর্ঘ জীবন আমায় কেন দিয়েছিলে? কেন তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমারও অবসান করে দিলে না ? (নেপথ্যে দ্বারে করাঘাত)-কে ও? সায়া। (নেপথ্যে)-প্রভু, দ্বার খুলুন, আমি সায়া। সামন্দেশ। সায়া দ্বার উন্মােচন)—এমন সময়ে ?—একাকিনী? সায়া। হাঁ প্রভু, আমার বিশেষ কাজ আছে। সামন্দেশ। বল। সায়া। আজ ক’দিন থেকে আমার মন বড় চঞ্চল হয়েছে। আমি কিছুতেই তাকে শান্ত করতে পাচ্ছি না। একটা সন্দেহের ছায়া আমায় ঘিরে ফেলেছে, দিবানিশি কে যেন আমার কানে কানে বলছে—সায়া, হতভাগিনী সায়া, তাের মুখের নিশি পােহায়েছে।” সামন্দেশ। হু, কি হয়েছে খুলে বল। সায়া। কি হয়েছে তাও আমি ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছি না। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখতে গেলে কিছুই হয় নি। কিন্তু আমার মন বলছে যা হবার তা হয়ে গেছে। সামন্দেশ। মনের এ কাতরােক্তি কখনাে নিস্ফল হয় না। থিবিসের সেই ভয়ানক পরিণামের দিনে আমারো মন এমনি করে কেঁদে উঠেছিল। যখন হাতময় প্রভাতে তাদের হাসিমুখ দেখে কাৰ্যান্তরে চলে গেলেন, তখন আমার মন বলেছিল –“সামন্দেশ যাসনে, তাতে কর্ণপাত করিনি। সন্ধ্যার পরে ফিরে এসে কি দেখলেম ? আমনদেবের মন্দির পুড়ে ছাই === ৪৮ মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক-৩য় দৃশ্য। হয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমারও-যাক। যতটুকু পার বল। অপরে না বুঝলেও হয়তাে আমি বুঝতে পারব। সায়া। তবে শুনুন প্রভু, আজ ক’দিন হল যুবরাজ দেশভ্রমণে বেরিয়েছেন। কাউকে সঙ্গে নেন নিছদ্মবেশে একাই গিয়েছেন। সামন্দেশ। তা তাে জানি। তারপর { সায়া। যখন তিনি বিদায় নিয়ে যান, তখনি আমার মনটা কেমন করে উঠেছিল। একবার ইচ্ছা হয়েছিল যেতে বারণ করি, পারলেম না। ছদ্মবেশের কারণ জিজ্ঞাসা করলেম, তিনি বল্লেন, কাদেশে নাকি বিদ্রোহের পক্ষপ দেখা যাচ্ছে, তাও পরিদর্শন করে আসবেন। নগরবাসীদের মনােভাব জানতে হলে ছদ্মবেশ নিতান্ত প্রয়ােজন। তাই আর বারণ করতে পারলেন না। সামন্দেশ। হাঁ তারপর ? সায়া। তারপর কাল প্রাতে রথে করে শহরের বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলেম, হঠাৎ রথের চাকা ভেঙ্গে গিয়ে রথ অচল হয়। রাজকন্যা জেনে দেখবার জন্য গ্রাম্যলােক সব রথের চারিদিকে ভিড় করে দাড়ায়। সে সব অপরিচিত দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে নিকটস্থ এক বৃদ্ধ কাফ্রির গৃহে গিয়ে উঠেছিলেন। দেখলেম এক যুবক, ঠিক যুবরাজের প্রতিকৃতি -নাক, মুখ, চোখ-চাল চলন ভঙ্গি, সব সেই-শুধু পার্থক্য, তার মুখে গোঁফ ছিল। তাই দেখে আমার কেমন সন্দেহ হল, পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেম যুবক কথা কইলে না। শুধু নির্বোধের মত ইতস্ততঃ অঙ্গুলি নির্দেশ করতে লাগল। আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও স্থির হতে পারিনি। এমন অবস্থায় আর কিছুদিন থাকলে থাকলে বােধ হয় আমি পাগল হব। সামন্দেশ। সে গৃহে আর কাউকে দেখলে ? সায়। হা দেখলেম। এক যুবতী অপরূপ সুন্দরী বােধ হয় সেই বুকের কন্যা।

৪৯ ২য় অঙ্ক,-৩য় দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী সামন্দেশ। তাইতাে সায়া, তুমি আমায় ভাবিয়ে দিলে যে। আচ্ছা তােমার আর কিছু বলবার আছে? সায়া। কাল রাত্রিতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি। সামন্দেশ। কি দেখলে ? সায়া। পরিষ্কার কিছু নয়, সব অস্পষ্ট—আবছায়ার মত। দেখলেম একটা গাছের তলায় কাফ্রি-বালিকা ক্রুদ্ধ নয়নে নির্মম প্রস্তর মূর্তির মত দাড়িয়ে আছে, আর আমি—আমি তার পদতলে পড়ে যুবরাজের জীবন ভিক্ষা করচি। প্রভু এর অর্থ কি ? সামন্দেশ। জানি না। হয়তো চেষ্টা করলে নির্ণয় করতে পারি। কিন্তু আমি আপাতত: অপর কোন কাৰ্য্যে নিযুক্ত আছি, আমার অবকাশ নাই। সায়া। (পদতলে পড়িয়া) প্রভু, প্রভু, দয়া করুন, রক্ষা করুন। আপনি এর উপায় না করলে কে করবে ? সামন্দেশ। উপায়। আচ্ছা, সময়ে চেষ্টা করব। এখন তুমি গৃহে যাও। কিন্তু সাবধান, এ স্বপ্নের কথা যেন আর দ্বিতীয় কর্ণে প্রবেশ না করে। তা হলে কিন্তু আর প্রতিকারের উপায় থাকবে না। সায়া। না প্রভু, একথা আমি কাকেও বলব না। কিন্তু আপনি এর উপায় করুন,আমায় রক্ষা করুন, যুবরাজকে রক্ষা করুন। সামন্দেশ। বলেছিতাে সময়ে চেষ্টা করব। তুমি এখন গৃহে যাও। 3

[ ২য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য।
মিসর-কুমারী
চতুর্থ দৃশ্য-নদীতীর
গীত।
নারীগণ।
নীলা। নীলা। নীলা।
করুণা-রূপিণী জননী পুণ্য সলিলা !
স্নেহ-পীযুষ ধার দিগন্তে প্রবাহিত, পুলকে ধরণীয় করে পান,
শ্যামল শস্তে, নিরমল হাতে নিতুই জীবন কর দান ।
কণ্ঠে আশীষ বাণী কলকল তান,
ভুবনমােহিনী জননী গৌরব কিরিটিনী সুচারুশীলা।
নীলা। নীলা। নীলা।
প্রথম প্রভাতে প্রথম জ্যোতি-রেখা অবনীতলে নবলীলা।
পঞ্চম দৃশ্য—নদীতীরস্থ পথিপার্শ্ব।
রামেশিস। না, না, আর এখানে থাকা উচিত নয়। সেদিন সায়া
আমায় সন্দেহ করে গেছে-তারপর থেকে আমার মনে হয়, বৃদ্ধ আবও
আমায় একটু সন্দেহের চোখে দেখছে। হতে পারে এ আমার ভুল
কিন্তু তৰু আর এখানে বিলম্ব করা উচিত নয়। এই বেলা মানে মানে
পালাই। কিন্তু কেমন করে যাব ? নাহরিনের রূপমদিরায় আমি
একেবারে মাতােয়ারা হয়ে পড়েছি, তার প্রণয়ের কঠিন বন্ধনে বাঁধা
পড়েছি,-তাইতাে আমি যাই যাই করেও যেতে পারছি না। কিন্তু
তবু যেতে হবে। মিসরের ভাবী অধিপতি ছদ্মবেশে একটা কাফ্রি ঘরে
কতদিন থাকতে পারে? কাফ্রিকন্যা নাহরিন যতই সুন্দরী হােক, মিসরের
রাজপ্রাসাদে তার স্থান কোথায় ? কিন্তু না কিসের কিন্তু একবার
একটা প্রম করলে কি তা আজীবন বহাল রাখতে হবে ?

২য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। ]
মিসর-কুমারী
(নাহরিনের প্রবেশ )
এই যে নাহরিন। নাহরিন।
নাহরিন। কে, তাজবর ?—তুমি এখানে—কখন এলে?
রামেশিস। আমি অনেকক্ষণ এসেছি। তােমায় একটা কথা বলৰ
বলে অপেক্ষা করছি।
নাহরিন। মিথ্যা কথা। আমি এখানে আসব, তা তুমি জানতে
, আমি নিজেই জানতেম না।
রামেশিস। আমি জানতেম নাহরিন। আমার মন আমায় বলে
দিয়েছিল, এইখানে তােমার দেখা পাব।
নাহরিন। তােমার মন তােমায় বলে দিয়েছিল? এত ভালবাস
তুমি আমায়?
রামেশিস। বাসি।
নাহরিন। তবে আমার ভালবাসায় তুমি তৃপ্ত হচ্ছ না কেন? যে
নাহরিনকে পাবার জন্য একদিন পাগল হয়েছিলে আজ তাকে নিয়ে সুখী
হতে পারছ না কেন ?
রামেশিস। সে কি নাহরিন, কে বল্লে আমি তােমায় নিয়ে সুখী
হইনি।
নাহরিন। তুমি কি মনে কর তাজবর, আমি কিছু বুঝতে পারি না?
-আমি কিছু লক্ষ্য করিনি?
মেশিস। কি বুঝতে পেরেছ নাহরিন, কি লক্ষ্য করেছ?
(বৃক্ষান্তরালে আবনের প্রবেশ )
৩
আবন।(আশ্চৰ্য, এরা গেল কোথায় ? নাহরিন, তাজবর কেউ
ঘরে-নাই।-এই যে এরা এখানে।
নাহরিন। কি লক্ষ্য করেছি। এরই মধ্যে তােমার কত পরিবর্তন
)

মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য।
হয়ে গেছে। তােমার প্রাণের সে উন্মাদনা নাই, তােমার আহ্বানে সে
প্রেমগদগণ সুরের ঝঙ্কার নাই, তােমার আলাপনে সে তন্ময়তা নাই,
মুহূর্তের অদর্শনে সে ব্যাকুলতা নাই। তােমার নয়নে মদিরা নাই, স্পর্শে
প্রাণ নাই,তুমি আছ, কিন্তু সে তাজবর আর নাই। তুমি যেন একটা
স্বপ্ন হতে ধীরে ধীরে জেগে উঠছ, যেন কল্পনার স্বর্গ হতে ধীরে ধীরে
মাটিতে পা বাড়াচ্ছ, যেন কোন দেবী-প্রতিমাকে ধরতে গিয়ে অন্ধকারে
একটা কাঠের পুতুল ধরে ফেলেছ ।
আবন।এ কি !•••এ কথার অর্থ কি ? নাহরিন কি তবে এই
যুবকের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে ?
রাখেশিস। এত কথা তুমি কোথায় শিখলে নাহরিন?
নাহরিন। অবস্থায় পড়ে শিখেছি। যাক, তুমি আমায় কি বলবার
জন্য এখানে অপেক্ষা করছিলে তাই বল।
রামেশিস। নাহরিন, আমায় কিছুদিনের জন্য বিদায় দিতে হবে
অন্যত্র আমার কিছু প্রয়ােজন আছে।
নাহরিন। কোথায় তােমার প্রয়ােজন আছে? কি প্রয়ােজন
আছে ?
রাশিস। তুমি তা শুনে কি করবে? সে কথা এখন আমি তােমায়
কলতে পারব না।
নাহরিন। কেন বলতে পারবে না? আমি তাে শিশু নই। তাজবর,
তুমি দেবতা সাক্ষী করে আমার জীবন-মরণের ভার গ্রহণ করেছ। আমি
যে তােমার ধর্মপত্নী। তােমার ভাল-মন্দ যা কিছু আমার যে শুনবার
অধিকার আছে। আমার কাছে তাে তােমার গােপনীয় কিছু নাই—কিছু
থাকতে নাই।
আবন।(হ, আমারই বুঝবার ভুল। নাহরিন আর তাে বালিকা
নয়-

২য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী
রামেশিস। আমায়
আমায় ক্ষমা কর নাহরিন, আমি সে কথা তােমায়
বলতে পারব না।
নাহরিন। বেশ, তবে এক কাজ কর। তুমি দেবতার নামে শপথ
করে নাহরিনকে গ্রহণ করেছ। তােমার আদেশে সে তােমার চরণে
নিজেকে অঞ্জলি দিয়েছে। কিন্তু এখনো তুমি তার পিতার অনুমতি পাও
নি। এইবার তার পিতার অনুমতি নিয়ে তাকে বিবাহ কর। তারপর
তােমার পত্নীকে তার পিতার নিকট গচ্ছিত রেখে যেখানে যেতে হয়
যাও।
রামেশিস। বিবাহ !–এখন থাক। আমি চলে যাবার পর তুমি
তােমার পিতাকে সব জানিও।
নাহরিন। আমি তা পারব না। এ তােমার কাজ, তুমি সম্পূর্ণ
করে যাও।
রামেশিস। না, না, আমি তা কিছুতেই পারব না।
নাহরিন। কেন পারবে না তৃজর্বর ? পারলে চলবে কেন?
আবন।এ কি আশ্চৰ্য-এ যুবক একে বিবাহ করতে চায় না কেন?
রামেশিস। নাহরিন, আমি মহাপাপী,তােমাদের উভয়কে প্রতারণা
করেছি। আমি কাফ্রি নই, আমি মিসরী।
নাহরিন। অ-না, তা হতে পারে না। তুমি পরিহাস করছ,
আমায় পরীক্ষা করছ।
আবন। মিসরী।-না না, তা হবে না। আমি কিছুতেই নাহরিনকে
এক মিসরী যুবকের হাতে তুলে দিতে পারব না। কিন্তু একি ভীষণ
প্রতারণা।-কি অমানুষিক অত্যাচার। কি করেছি আমরা এই মিসরীদের
যে এরা আমাদের একটু শান্তি কোন মতেই দেবে না।)
রামেশিস। নাহরিন, সত্য আমি মিসরী, কিন্তু কি আসে যায়?
তুমি তাে আমায় ভালবাস। ভেবে দেখ, তােমার মাও মিসরী রমণী
ছিলেন।

৫৪ মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। নাহরিন। তিনি তার প্রায়শ্চিত্ত করেছেন। মিসরীরা তাকে পুড়িয়ে মেরেছে, তা আমি কিছুতেই ভুলতে পারব না। যদি তুমি সত্যই মিসরী হও, তবে তুমি আমার শত্রু। আমি তােমায় কায়মনােবাক্যে ঘৃণা করি। তুমি এই মুহূর্তে আমার সম্মুখ হতে দূর হও। রামেশিস। তবে তাই হােক। নাহরিন, জন্মের মত বিদায়। নাহরিন। নানা, যেও না—দাঁড়াও। তাজবর, তুমি অতি নির্দয়। বােধ হয় তােমার জাতির মধ্যেও তােমার মত নিষ্ঠুর অতি বিরল। পাষাণ ! তােমার প্রাণে কি বিন্দুমাত্র দয়া-মায়া নাই? তুমি একটা হৃদয় নিয়ে এমন করে ছিনিমিনি খেলতে পার? তাকে এমন করে দরিয়ায় ডুবিয়ে দিতে পার ? রামেশিস। কি করব নাহরিন, তােমায় আমায় বিবাহ অসম্ভব। নাহরিন। অসম্ভব। তবে সে কাজে হাত দিয়েছিলে কেন ?- সেদিন নাহরিন নাহরিন খুলে ক্ষেপে উঠেছিলে কেন? কি অধিকার ছিল তােমার এক সরলা অবলার ইহ-পরকাল নষ্ট করবার? রামেশিস। শােন নাহরিন, এক এর উপায় আছে। চল আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই। কেউ জানবে না, কেউ শুনবে না, এমন জায়গায় তােমায় রেখে দেব।—যেখানে তােমার-আমার মিলনে কোন বাধা থাকবে না। 1 আবন। উঃ। আর যে শুনতে পারছি না—আর যে সইতে পারছি না—ছুরিকা কোষমুক্ত করিয়া নিজ বক্ষের সম্মুখে ধরিল-মুহূর্তকাল ভাবিয়া )—কি করব? জীবনদাতা,-না না, এ মিসরী,প্রতারণা করে আমার জাত নষ্ট করেছে, এই বালিকার সর্বনাশ করেছে রামেশিস। কি ভাবছ নাহরিন, এসাে, আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই। আবন। কোথায় যাবে? এই বৃদ্ধের চোখে ধুলাে দিয়ে, তার জাত-কুল ২য় অঙ্ক-৫ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী নষ্ট করে কোথায় পালাবে? দুৰ্বত্ত মিসরী তুমি গুরুতর অপরাধ করেছ, —গুরুতর শাস্তি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হও। (রামেশিসের বুকের উপর ছুরিকা তুলিলে নাহরিন হাত ধরিয়া ফেলিল) নাহরিন। বাবা, বাবা, দয়া কর—ক্ষমা কর আমার মুখ চেয়ে একে ক্ষমা কর। আবন। চুপ কর কলঙ্কিনী। ছি ছি ছি।—কি ঘুণ! কি লজ্জা! আমার কন্যা হয়ে তুই অনায়াসে একটা অজ্ঞাতকুলশীল মিসরীর প্ররােচনায় কুমারীর পবিত্রতা বিসর্জন দিলি-পাপীয়সী ! আগে আমি তােকই হত্যা করব। নাহরিন। বাবা, আমি যাই হই, কলঙ্কিনী নই। আমি এই যুবকের ধর্মপত্নী। আবন। হু-তুমি কি বল মিসরী যুবক ? রামেশিস। না না, নাহরিনকে হত্যা করাে না,-একে বাঁচতে দাও। তুমি এর পিতা-তুমি এর প্রাণ ভিক্ষা দাও। আমি অপরাধী আমাকে তুমি যে শাস্তি ইচ্ছ৷ দিতে পার। কিন্তু একে কিছু বলাে না। আবন। তারপর ? বল, তারপর যদি . আর ..রার থাকে (আমেশিস নিরুত্তর যুবক, যদি আমি নাহরিনকে বাঁচতে দি, তুমি ক” তাকে গ্রহণ করবে? অগিনী বালিকাকে জলে ভাসিয়ে দেৰে না? (রাদেশিস নতশিরে-নি-কি, চুপ করে রইলে যে? তবে তুমি এই বালিকাকে জীবিত দেখতে চাও না? মনে রেখাে, এর মরণ- বাচন তােমার দায়। বল তুমি একে গ্রহণ করবে কি না? রামেশিস। করব। আবন। তবে নতজানু হও। রামেশিস। নতজানু হব কেন ? আবন। তুমি কি জান না, নিসরের আইনে এক মিসরী যুবক মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। কিছুতেই এক কাফ্রি-কন্যাকে গ্রহণ করবার অধিকারী হতে পারে না, যতক্ষণ না সে কাফ্রির ধর্ম অবলম্বন করে ? আমি প্রথমে তােমায় আমার ধর্মে দীক্ষিত করে, পরে আমাদের রীতি অনুসারে তােমার হাতে একে সম্প্রদান করব। যদি আমার কন্যার জীবনে তােমার প্রয়ােজন থাকে, তবে তা তােমায় মূল্য দিয়ে নিতে হবে। তার এক মূল্য -তােমার ধর্ম। রামেশিস। আমার ধর্ম ? আবন। হাঁ, তােমার ধর্ম। নাহরিন। তাজবর, আজ তােমার পরীক্ষা, তােমার প্রেমের পরীক্ষা তােমার মনুষ্যত্বের পরীক্ষা—আর নাহরিনের জীবন-মরণের পরীক্ষা। রামেশিস। তুমি কি বলছ বৃদ্ধ ? নারীর জন্য ধর্ম ত্যাগ করব? ইহকালের জন্য পরকাল হারাব ? তুমি হয় বাতুল, নয় স্বপ্ন দেখছ, স্বপ্নে কথা কইছ। আবন। বেছে নাও যুবক, দুইয়ের এক। তােমার ধর্ম ছাড়বে, কি একে ছাড়বে। রামেশিস। কি বলব বৃদ্ধ, তােমার পক্ক কেশ, পক্ক শশা আমায় বাধা প্রদান করছে। তােমার দুঃখ-দুর্দশায় আমার দয়া হচ্চে। নইলে এই ছুরিকা আমার হাতে থাকতে তুমি আমায় এ কথা বলে এখনাে জীবিত আমার সম্মুখে দাড়িয়ে থাকতে পার? আমার , ধর্ম?—তুমি জান কি বৃদ্ধ, কি অপমান আজ তুমি আমায় করেছ? জান কি বৃদ্ধ, আমি কে? জান কি, তুমি আজ কার সম্মুখে দাড়িয়ে কি কথা উচ্চারণ করেছ ?-( ছদ্মবেশ উন্মােচন)-দেখ বৃদ্ধ, চিনতে পার কি? আবন। কে, যুবরাজ রামেশিস ! (মুহূর্তকাল স্তব্ধ হইয়া রহিলেন, পরে )—যুবরাজ, এই জন্যই কি তুমি আমাদের জীবন রক্ষা করেছিলে- প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ কেন তুমি চাইলে না? আমি হীন কাফ্রি হলেও হাসতে হাসতে তােমার সেবায় তা অর্পণ করতেন। কিন্তু এ তুমি - ২য় অঙ্ক, ৫ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী কি করলে? এমন করে আমার মাথায় কেন বজ্রাঘাত করলে?-এ নির পরাধিনী সরলা বালিকার কেন সৰ্ব্বনাশ করলে ? রামেশিস। শােন বৃদ্ধ, আমি মিসরের যুবরাজ রানেশিস—আমি তােমার কন্যাকে চাই। মনে রেখাে, আজ বাদে কাল এই মিসরের সিংহাসন আমার। আমি তােমার কন্যাকে বিবাহ না করতে পারি, কিন্তু আমি শপথ করচি, আজ যদি তােমার কন্যাকে 'আমায় দান কর, তবে সেই দিন, যেদিন আমি সিংহাসনে বসব, আমি তােমার কন্যাকে মিসরের সর্বেসর্বা অধীশ্বরী করব। অশেষ-সম্পদশালিনী এই মিসর-ভূমি নাহরিনের হস্তে ক্রীড়া কন্দুক হবে। আবন। যুব্বাজ, আমার এক কথা, কিছুতেই তার নড়চড় হবে না। তুমি সুসভ্য মিসরী, তােমার কাছে হয়তো ধৰ্ম্মের চেয়ে সাম্রাজ্য বড় হতে পারে। কিন্তু আমরা হীন কাফ্রি-ধৰ্মই আমাদের জীবন। স্থির জেনাে যুবরাজ, যদি তুমি আমার কন্যাকে জীবিত দেখতে চাও, তবে তােমায় আমার ধর্ম গ্রহণ করতে হবে,-নাহরিনকে যথারীতি বিবাহ করতে হবে। আমার দুর্ভাগ্য, তুমি যুবরাজ, তােমার ক্ষমতা অসীম। তার উপর তুমি একদিন আমাদের জীবন রক্ষা করেছ। কিন্তু তাই বলে যদি তুমি আমার কন্যাকে এরূপভাবে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা কর, তবে আমি তোমায় অভিশাপ দেব— এ why: * এ মেশিস। তােমার অভিশাপকে আমি ভয় করি না। আমি মিসরের যুবরাজ, আমি তােমায় গ্রাহ করি না। নাহরিন, বল তুমি কি বলতে চাও। একটা মুখের কথা। তােমার পিতার ভয় করছ? তার সাধ্য কি আমার ইচ্ছায় বাধা দেয় ? বল, চুপ করে থেকো না (নাহরিন নিরুত্তর)-বল, আমায় বিশ্বাস কর,-আমি সত্য বলছি আমি এখনাে তােমায় ভালবাসি। নাহরিন। ভালবাস, ভালবাস, ভালবাসি,আমার কি ভালবাস?

মিসর-কুমারী [ ২য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। তুমি ভালবাস আমার রূপ, আমার দেহ, আমার যৌবন। নইলে তুমি আমার ব্যথা কেন বােঝ না?)বল যুবরাজ, আমার কি ভালবাস ? এই কাজল পরা চোখ দুটো?—বল, এই মুহূর্তে খুলে দিচ্ছি। আমার এই কাল চুলের গােছা ? বল কেটে দিচ্ছি। আমার হাত, পা, নাক, মুখ, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিজের হাতে কেটে তােমার চরণে ডালি দিতে পারি, আমি তােমায় এত ভালবাসি। তােমার জন্য আমি ধর্ম ছাড়তে পারি, স্বর্ণ ছেড়ে নরককে বরণ করতে পারি, আমি তােমায় এত ভালবাসি। কিন্তু যুবরাজ, তােমার জন্য আমার পিতাকে ছাড়তে পারি না। তার পায়ের খুলাের বিনিময়ে তােমার রাজমুকুট মাথায় করে নিতে পারি না,তার কোলে আমার যে স্থান আছে, তার বিনিময়ে তােমার সাম্রাজ্য আমি কিনতে পারি না। যুবরাজ, তুমি যেথা ইচ্ছা যাও—আমার কোন দুঃখ নাই। বাবা। আমি তােমার অবাধ মেয়ে, কিন্তু তবু তুমি কত ভালবাস আমায় ।-বাবা। বাবা। আমার বাবা। আমার চোখে কে তুমি স্বর্গের চেয়েও উচ্চ, দেবতার চেয়েও মহান। ( আবন ছুরি দূরে নিক্ষেপ করিয়া কন্যাকে টানিয়া লইল) তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য-কক্ষ। রামেশিস ও সায়া। সায়া গীত অতুল। । । সে যে মম মধুমাখা ভুল ! তরুণ অরুণ রাগে সদা জাগে মম আঁখির আগে- আমার সে বিভব বেদনায় গলে যায় প্রাণ, অশ্রু নামিয়া আসে, রুদ্ধ দীরঘ শ্বাসে ভেঙ্গে বুক হয় শতখান- তবু পথ পানে চাই, তবু হাসি, তবু গাহি গান । পুলকে বেড়িয়া রাখি স্মৃতি সে মাধুরী মাখা, পােড় প্রাণ পিয়াসে আকুল। সে যে মাের মধুমাখা ভুল।আমার সে বিভব অতুল ! আমেশিস। সায়া, তােমার সান্ধ্য ভ্রমণের সময় হয়েছে। সায়া। আমি আজ বেড়াতে যাব না, তােমার কাছে থাকব। রামেশিস। সে কি ?কেন বেড়াতে যাবে না? সায়া। তােমার কাছে বসে কাদেশের গল্প শুনব। শুনেছি সে নাকি গরি পুরানাে শহর, কত কি দেখবার জিনিস আছে। সেখানে কি কি দেখে এলে বল। রামেশিস। এখন আমি তােমার কাছে বসে গল্প করতে পারব না। আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি এখন ঘুমুবে।

মিসর-কুমারী [ ৩য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য।
সায়া। বেশ তুমি ঘুমােও, আমি বসে বসে তােমায় হাওয়া
করব।
রামমশিস। না না, তা করলে আমার ঘুম হবে না। কেউ কাছে
বসে হাওয়া করলে আমার ঘুম হয় না।
সায়া। তবে হাওয়া করব না, অমনি চুপ করে বসে থাকব।
রামেশিস। তা হলে যে তােমারি ঘুম পাবে সায়া।
সায়া। ঘুম পায় তােমার পায়ের তলায় ঘুমিয়ে পড়ব।
না, তা করবার দরকার নাই। তুমি একটু বেড়িয়ে
এসাে, ততক্ষণ আমি একটু ঘুমিয়ে নি। তারপর তােমার কাছে বসে
গল্প করব।
সায়া। তার চেয়ে তুমিও চল না কেন? শহরের বাইরে পল্লীর
ঠাণ্ডা হাওয়ায় তােমার শরীর শীতল হবে, মন প্রফুল্ল হবে। তারপর ফিরে
এসে ঘুমিও।
রামেশিস। না সায়া, তুমি একাই যাও।
সায়া। এই তােমার ইচ্ছা?
রামেশিস। হাঁ, এই আমার ইচ্ছা।
সায়া। বেশ, তবে তাই হােক। তােমার যা ইচ্ছা তা কেন না
করব? তুমি যখন বলছ তখন একাই যাব, তাতে কিছু আসে যায় না।
কিন্তু রামেশিস। প্রিয়তমা বুঝলেম বিধিলিপি অখণ্ডনীয়। দেবতার
যা ইচ্ছা তাই হবে। আমার সাধ্য কি তাতে বাধা দি ?
রামেশিস। সায়া, এ তুমি কি বলছ ? কি দেবতার ইচ্ছা?কি
বিধিলিপি?
সায়া। কি দেবতার ইচ্ছা, কি বিধিলিপি, তা তােমায় বলতে
পারব না। দেবতার নিষেধ। বল্পে প্রতিকার হবে না। হায়, সে
অন্ধকারের মত তােমার জীবনের উপর তার কাল ছায়ার যবনিকা বিস্তার
করে দিয়েছে, সুৰ্য্যগ্রহণের রাক্ষসীর মত তার কামনার বিশাল মুখ-গহ্বর
A

৩য় অঙ্ক-১ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী বিস্তার করে তােমায় গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে, তুমি তা বুঝতে পারছ না। তুমি নির্জনে একলা বসে তার কথা ভাবতে চাও, আমি তা দিন। বলে রাগ কর। তুমি কল্পনার কুঞ্জ কুটীরে জাগ্রত বসন্তের সৃষ্টি করে তার সুখ-শয্যা বিছিয়ে দাও, আমি এসে মাঝখানে দাঁড়াই, তােমার স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়, তােমার তা ভাল লাগে না। তুমি সদ্যপ্রসূত বিহগ শিশুর মত কাল-বৈশাখীর মেঘমালার মধ্যে ছুটে গিয়ে দামিনীর চপল হাসিটি ধরতে চাও, আমি বিহগ-জননীর মত পাখা বিস্তার করে তােমার গতিরােধ করি,তুমি বিরক্ত হও। রামেশিস। সায়া, সায়া, তুমি কার কথা বলছ ? কার হাত থেকে তুমি আমায় বাঁচাতে চাও? প্রহেলিকা ছেড়ে দিয়ে স্পষ্ট কথায় বল, আমি? যে কিছুই বুঝতে পারছি না। সায়া। বুঝতে পারছ না কি? যুবরাজ, সত্য বল। তুমি কিছুই। বুঝতে পারছ না ? রামেশিস। আঁ-না। সায়া। শােন। আমি সেই কাফ্রিকুমারীর কথা বলছি। রামেশিস। কাফ্রি-কুমারী ? কে কাফ্রি-কুমারী ?-(স্বগত) সৰ্ব্বনাশ। যা ভয় করেছি তাই। সায়া। কে কাফ্রি-সুন্দরী ?—মিসরের ভাবী ফারাও দেশভ্রমণে বাবার নাম করে যার গৃহে গিয়ে ছদ্মবেশে অতিথি হয়েছিলেন। রামেশিস, রামেশিস, তুমি সমগ্র জগৎকে ফাকি দিতে পার, মুখ ঢেকে দুনিয়ার সম্মুখে দাড়িয়ে রহস্যের ছলে জিজ্ঞাসা করতে পার—বল দেখি আমি কে?” কিন্তু আমার কাছে ?—রামেশিস, সায়া তােমায় ভাল- বাসে,-নিজের প্রাণের ভেতর তােমার মুখচ্ছবি পাষাণের রেখায় একে রেখেছে। সে যদি আজ অন্ধ হয়ে যায়, তৰু হাজার লােকের মাঝখান থেকে তােমায় বেছে বার করতে পারবে।

মিসর-কুমারী [ ৩য় অঙ্কম দৃশ্য।
রামেশিস। আর অস্বীকার করা বৃথা। না, আর একটু দেখি
সায়া, তৰু বুঝতে পারলেম না। আরাে স্পষ্ট করে বল।
সায়া। যুবরাজ, বৃথা চেষ্টা তােমার। তুমি কিছুতেই আমায় ফাকি
দিতে পারবে না। আমি যেমন করে হােক তােমায় তার গ্রাস থেকে
রক্ষা করব। আমার নিজের জন্য নয়, তােমার জন্য আমি তােমায়
বাচাব। রামেশিস একটা হীন কাফ্রি বালিকার জন্য তােমার প্রাণে
প্রেমের দরিয়া উথলে উঠেছে। সেই কাল জলের ভরা জোয়ারে মিসরের
ভাবী গৌরব। আমি তােমায় কিছুতেই ডুবতে দেব না। তারপর যদি
আমায় তােমার প্রয়ােজন না থাকে, তবে আর কখনাে তােমায় বিরক্ত
করতে আসবনা।
রামেশিস। সায়া, সায়া, তুমি আমায় এত ভালবাস?
সায়া। আমি তােমায় এত ভালবাসি।আমি যে তােমারই।
রামেশিস। আমায় ক্ষমা কর সায়া, আমি আমার ভুল বুঝতে
পেরেছি।
সায়া। সত্য বলছ ?
রামেশিস। সত্যি বলছি।
সায়া। তবে চল বেড়াতে যাই।
রামেশিস। চল।
সায়া। আমি বুথ সজ্জিত করতে আদেশ দি’গে ?
রামেশিস। যাও, আমি তােমার পশ্চাতে যাচ্ছি।
সায়া। দেরি করাে না।
(প্রস্থান)
রামেশিস। কে বেশী সুন্দর । সে কি এ? আমি কাকে বেশ
ভালবাসি। তাকে কি একে? একজন তীব্র মদিরার মত দীপ্তিময়ী,
অগ্নিময়ী, রূপময়ী-উন্মাদনার প্রবাহ ছুটিয়ে দিয়ে হৃদয়ে তৃষার সঞ্চার করে,
উমায় দগ্ধ করে তােলে,-আর একজন শীতের হিমানীসিক্ত চন্দ্রিমার মত
শতল মধুর, শান্তিময়ী, তৃপ্তিময়ী—জাগ্রত হৃদয়কে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।

৩য় অঙ্ক,২য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী
একজন আশা, উদ্যম, কর্ম,-আর একজন সন্তোষ, অবসর, নিবৃত্তি।
এক জন আমার,অন্য জুন আমার হয়েও আমার নয়। আমি কাকে
চাই? কাকে বেশী ভালবাসি ?
ভালবাসি ? কাকে রাখি, কাকে ছাড়ি?
আমনদেব। এ আমায় কি বিষম সমস্যায় ফেললে।
(প্রস্থান)
দ্বিতীয় দৃশ্য—বন ভূমি।
দগণ।
২য় দস্য। খাও পিও মজা কর, কুত্তি উড়াও, কিসের পরােয়া ?
১ম দস্য। না বাবা ফুর্তি তেমন জমছে না,কোথায় যেন মস্ত বড়
একটা ফাক হাঁ করে আছে। শুধু ফুর্তি ফুর্তি করে চেঁচালেই তাে আর
চুক্তি করা হয় না।
২য় দস্য। কেন হবে না? আমাদের কিসের অভাব?
একটী শহর লুঠে আসা গেছে, একদিনে ছ'মাসের রােজগার হয়ে গেছে।
আজ ফুৰ্ত্তি হবে না তাে আর কবে হবে ?
১ম দস্য। বলছ তত ভাই ঠিক, কিন্তু—আচ্ছা সর্দারের কি মত?
সর্দার। ঠিক তােমার যা মত-ফুর্তি যেন জমেও জমছে না।
কোথায় যেন মস্ত একটা ফাক রয়ে গেছে, কিন্তু সেটা খুজে পাচ্ছি না যে
বুজিয়ে দি।
৩য় দস্য। আমি বলব সর্দার ?
সকলে। হাঁ হাঁ, বল বল ।
৩য় দ্য। বলব আর কি,আমাদের অভাব হচ্চে মেয়ে মানুষের।
শুধু সরাব কারাবে ফুর্তি জমে? তার সঙ্গে মেয়ে চাই, যেমন ঘুড়ি
উড়াতে হলেই সুতাে চাই, গান গাইতে হলেই গলা চাই, আর নাচতে
হলেই পা চাই।
সর্দার। ঠিক কথা ডাক সব নাচওয়ালীদের। বেটীরা সব খালি

. মিসর-কুমারী [ ৩য় অঙ্ক-২য় দৃশ্য। বসে বসে রাক্ষসের মত গিলবে, আর এমন ফুর্তির দিনে একটু গান গাইবে না। সকলে। (গােলমাল করিয়া) ডাক বেটীদের ডাক নাচওয়ালীদের (নাচওয়ালীগণের প্রবেশ ) নাচওয়ালীগণ। গীত। লুটা দিয়া মােরে যৌবন কি লাখো বাহার মােরে লাখো শিঙার, অব জীন্দগী ক্যায়সে কয়রা গুজার! সিনেমে উঠা তুফান, কিয়া বেচায়েন মেরে দিলাে জান, অব দিল্লগী ছােড়কর দিল লাগাবাে, আবে মেরে দিন্দার। মাের নয়নাে কি পানী, হােটে। কি লাল- প্রীত প্রেমিক স্কুলে কি ডালি - তুঝে দিয়া, হাে হাে পিয়া হামারি ! ভরােসা কিয়া তােহে বিনু আঁধিয়ার, পিয়া, ম্যাঞ, ডুব গিয়া মাঝধার। সার। বাঃ বাঃ চমৎকার। সারাব, কাবাব, আর মেয়ে মানুষ। এই তিন নিয়ে স্বর্গ তৈরী হয়েছে। আমি এই স্বর্গের মালিক। আমার মত আর কে আছে? এই তােরা সব সার বেঁধে দাড়া,-আমি দেখব তােদের ভেতর কে সব চেয়ে সুন্দরী। (টলিতে টলিতে এক একজনের মুখ দেখিতে দেখিতে অগ্রসর হইতে লাগিল ও আপনি অভিমত প্রকাশ করিতে লাগিল) প্যাচামুখী, বেরাল-চোখী, থ্যাবড়া-নাকী, ঘুঘুপাখী না তােরা একটাও মানুষের মত মােস। প্রথমা। আজ্ঞে হুজুর সর্দার। তবে রে পাজী ছুচো মাগী, আমার কথার উপর কথা? নাচওয়ালীগণ। ওরে বাবারো-মেরে ফেল্লেরে-(প্রস্থান) সর্দার। না ভাই, তােমরা সব ফুর্তি কর, আমি যাই একটু গড়াই গে। সকলে। সে কি। কেন ? কেন ?

৩য় অFয় দৃশ্য।
মিস-কুমারী
সর্দার। আর কেন! মনের মত একটা মেয়ে মানুষই যদি আমাদের
আড়ায় নাই-তো, ফুর্তি করব কাকে নিয়ে?
১ম দস্য। আজ্ঞে, এ আড্ডায় না থাকে অন্য আজ্ঞায় আছে। হুজুর
হচ্ছেন একশ’টা আড়ার সর্দার।
২য় দস্য। তাও কি সম্ভব? এখানেই যদি না থাকে তো আর
কোথায় থাকবে ?
৩য় দস্য। হুজুর, আপনার উপযুক্ত মেয়ে মানুষ কি রাস্তায় ঘাটে
পড়ে থাকে ? খুজে নিতে হয় হুজুর, খুজে নিতে হয়।
সর্দার। তা তােমরাই কোন আমার হয়ে একটা খুজে পেতে
আছে।
৩য় দস্য। আজ্ঞে, আমি একটা খুঁজে পেতে ঠিক করে রেখেছি'
হুকুম হলেই নিয়ে আসি।
সর্দার। সে কি রকম বলতাে।
সকলে। হাঁ হাঁ বলতাে।
৩য় ম্য। আজ্ঞে রকম ভাল।
সর্দার। তবু?
৩য় দস্য। আজ্ঞে দেখতে-
সকলে। হ হ—
৩য় দস্যু। এই ঠিক যেন একখানি ছবি।
সকলে। বটে?
অ দস্য। আর গান গায়,
সকলে। হ হ -
২য় দস্যু। এই ঠিক যেন বুলবুল
সকলে। বটে।
৩য় দ্য। আর নাচে
সকলে। হাঁ হাঁ-

সি-কুমারী
| ৩য় অঙ্ক,২য় দশা।
২য় দস্য। এই ঠিক যেন একটা বাদর।
সর্দার। তবে রে শালা---
৩য় দস্য। আজ্ঞে হুজুর, ভুল হয়েছে হুজুর, ভুল হয়েছে-
সকলে। তবে কি ?
৩য় দস্যু। আজ্ঞে এই ঠিক যেন একটা লােটন পায়রা।
সর্দার। তুমি ঠিক বলছ,একচুলও এদিক ওদিক নয় ?
৩য় দস্য। আমি ঠিক বলছি হুজুর-এক
বলছি হুজুর-এক চুলও এদিক ওদিক
সর্দার। তবে আমার সে মেয়ে মানুষ চাই। আজই চাই, এক্ষুণি
চাই, এই রাত্রেই চাই। সে কোথায় থাকে?
৩য় দ্য।
আজ্ঞে বেশ দূরে নয়। কাদে নগরের প্রান্তভাগে
চকিৎসক জিনাের বাড়ীতে।তারই কন্যা।
সর্দার। তবে প্রস্তুত হও, আমরা আজ রাত্রেই সেখানে যাব।
১ম দত্যু। আজ্ঞে, আজ না গিয়ে কাল রাত্রে গেলে ভাল হয় না ।
আজ আমরা সবাই ক্লান্ত।
সর্দার। তা এ আর কাজটা কি?
৩য় দস্যু। হুজুর, একটা রাত্রিতে আর কি এসে যায়। ও কাল
যাওয়াই ঠিক। এতে আর অন্য মত করবেন না। আত্র অনেক সরব
ঢালা গেছে, মাথা বড় কারুরই ঠিক নাই।
সর্দার। তবে তাই। তােমাদের মতেই মত,-কাল যাওয়াই
ঠিক।
সকলে। হাঁ তাই ঠিক।
২য় দত্যু। হুজু, আর এক কথা-
সর্দার। কি ?
২য় দ্য। আজ্ঞে, এ তাে আর আরা মস্ত বড় একটা কাজ করতে
যাচ্ছি না যে, অনেক লােক দল বেঁধে যাব? আমার মতে ৰাছা বাছা

'শু অঙ্ক,-৩য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী আট-দশ জন লােক চোরের মত চুপি চুপি গিয়ে কাজ সেরে আসব। মিছামিছি একটা হৈ হৈ রৈ রৈ করবার কি দরকার? সর্দার। কথাটা মন্দ নয়। আচ্ছা কাল পরামর্শ করে দেখা যাবে। এখন চল, যাহােক করে রাতটা কাটান যাক। সকলে। হা হা, চল চল। ( প্রস্থান) তৃতীয় দৃশ্য -বুলার কক্ষ। খুল। কাল পাখীটা মােরে কেন করে এত জ্বালাতন। দিবারাতি কুহু কুহু ভালতাে লাগেনা মাের, শােনেনা সে করিলে বারণ। আমিতাে আপন মনে ঘুমায়ে আছি গাে ভূমিতলে বিছায়ে আচল,- চুপি চুপি আইল সে অধরে ধরিল মাের স্বরগের সুধামাখা ফল- বারণ করিতে তারে শিহরি উঠি গাে- সে যে মােরে করিল পাগল। তাহে ওই কল পাখী কুহু কুহু কুহু তানে আমারে জ্বালায় অনুক্ষণ : ( খারেবের প্রবেশ) খারেব। একি দিদিমণি? তােমার চোখে কি ঘুম নাই? এস দিন অসুখ থেকে উঠেছ, এখন এমন করে রাত্রি জাগলে আবার অন্ন করবে যে। বুলা। তাইতাে দাদামণি, তোমার চোখে কি ঘুম নাই? এতনি Iৰমনাম। ম } আমার রুগ্ন শয্যার পাশে বসে রাত্রি জেগেছ, এখন একটু না ঘুমুলে এ করবে যে ? বারেব। আহা! আমার কথা ছেড়েই দাও না—আমি ব্যাটাছেলে, অমন দু’চার মাস না ঘুমুলে আমার অসুখ করবে না ! বুলা। তবে আমারও কথা না হয় ছেড়ে দাও। আমি মেয়েছেলে, অমন দু’চার বছর না ঘুমুলেও এ পােড় চোখে ঘুম আসবে না। খাবে। তােমার সঙ্গে কথায় কে পারে বল ? তা দিদিমণি, একটা কথা সত্যি বল দেখি,--তুমি যখন গান গাইছিলে, তখন তােমার চোখ হ'টো অমন ছল ছল কবছিল কেন ? গলাটাও যেন একটু ধরা ধরা বােধ হচ্চিল। তুমি কি ভাবছিলে বল দেখি? বুলা। তাইতাে দাদামণি, তােমার সঙ্গে কথা কে পারবে বল । একটা কথা সত্যি করে বল দেখি, তােমার চোখ দুটো অমন জোনাকীর মত জ্বলছে কেন ? তােমার চুলগুলাে অমন উস্কোখুস্কো কেন? তুমি কি ভাবছিলে বল দেখি? বারেব। আমি ভাবছিলেম --না, আচ্ছ। আগে তুমি বল । তুমি আগে- খারেব। তুমি আগে-- ভুমি আগে খারে। আমি ভাবছিলে একটা কথা। বুলা। আর আমি ভাবছিলেম একখানি মুখ । খারেব। সে মুখখানি কেমন ? সে কথাটা হচ্ছে কি ? বারেব। সে কথাটা হচ্ছে, ইয়ে তােমার গে- বুলা। সে মুখখানি হচ্ছে, ইয়ে তােমার গে— বুলা। বুলা। বুলা। (নেপথ্যে ধরে আঘাত )

৩য় অঙ্ক,-৩য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী
খারেব। তাইতাে, এত রাত্রে দরজায় ধাক্কা মারে কে?
ধুলা। তাইতাে, বাবা ফিরে এলেন নাকি?
খারেব। বাবা ফিরে আসবেন কি ? তিনি তো আজ সকালে কর্ণাৰে
গেলেন, সেখানে কোন আত্মীয়ের সন্ধান পেয়েছেন, তার খোঁজ করতে।
এতদিন তোমার অসুখে যেতে পারেন নি। আজ দু’দিন তুমি একটু
ভাল আছ দেখে, আমার উপর তােমার ভার দিয়ে, খুব সাবধানে থাকতে
বলে গেলেন। তবে এরই মধ্যে ফিরে আসবেন কি ?– পুনরায় কড়া
নাড়ার শব্দ )-ওই আবার
বুলা। তাইতাে, কিছু যে বুঝতে পারচ্ছি না। কাকাতুয়া -
কাকাতুয়া। কৌ।
কেন দিদিমণি ?—( প্রবেশ)
বুলা। দেখ, দেখি, নীচে কে দরজায় ধাক্কা মারছে।
( প্রস্থান)
কাকাতুয়া। কৌ
বুলা। দেখেছিস?কে?
কাকাতুয়া। চিনি না।
তবে কি কোন রােগী বাবার খোঁজে এসেছে? আচ্ছা, বল
দেখি দেখতে কেমন ?
কাকাতুয়া। ষণ্ডা গুণ্ডা কাঠখােট্টা চেহারা, পরণে বাঘের চামড়ায়
পােশাক, হাতে বল্লম, কোমরে তরােয়াল,-এক একটা করে এই রকম
আট-দশটা লােক ঝােপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাে। তারা আমাদের
বাড়ীর চারিদিক ঘিরেছে।
বুলা। ঘিরেছে কি রে ?
কাকাতুয়া। ঘিরেছে মানে এক এক জায়গায় দু'জন একজন করে
যেখানে যেমন দরকার প্রস্তুত হয়ে দাড়িয়ে আছে।
খারেব। তাইতো
কাকাতুয়া। আজ্ঞে আমারও ঐ ‘তাইতো।
বুলা।

মিসর-কুমারী [ ৩য় অ-৩য় দৃষ্ণ
খারেব। কাকাতুয়া, তুই কোন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারিস?
কাকাতুয়া।
।
বুলা। ‘না’।তবে কি করতে পারিস?
কাকাতুয়া। লাফাতে পারি, দৌডুতে পারি,
বুলা। আর এক একবারে পাচ ছ’সের গিলতে পারি-
কাকাতুয়া। তা তাে পারি। কিন্তু ও ব্যাটার যে এক একজন পাঁচ
ই সেরের ঢের বেশী হবে।
খারেব। তুই লাফাতে পারিস ?
কাকাতুয়া। হু।
খারেব। এই দোতলা থেকে এক লাফে আমাদের খিড়কির দেয়াল
টপকাতে পারিস ?
কাকাতুয়া। খুব পারি।
তবে তুই যা, এক লাফে ছুটে গিয়ে একেবারে কোতয়ালকে
বাদ দে।
কাকাতুয়া। কে !
(প্রস্থান)
( কুলার
খাৱেৰ। এই বেলা আমি তৈরী হয়ে নি'। (
প্রতি ধরে
কোন অস্ত্র আছে ?
বুলা। আছে।
বাবা কতকগুলি বিষাক্ত প্রাচীন অস্ত্র সংগ্রহ করে
ছিলেন, সেই সমস্ত বিষের ঔষধ নির্ণয় করবেন বলে। তার মধ্যে একটা
পাথরের বল্লাম, আর একটা পাথরের তরবারি আছে, তােমার কাছে
লাগতে পারে। আর ছাতে এক রাশ পাটকেল আছে, তা আমার
কাজে লাগতে পারে।
খারেব। ব্যাস, তবে আর কি? দিদিমণি, আমি আজ রাত জেগে
বেগে এই কথাই ভাবছিলেম। ভাবছিলেম মানুষ কাকে বলে, কি করলে

৩য় অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। ]
মিসর-কুমারী
মানুষ মানুষ বলে গণ্য হয়। আজ দেবতার আদেশে তােমার জন্য প্রাণ
দিয়ে আমি জগৎকে দেখাব আমি মানুষ হয়েছি।
বুলা। আমিও আজ রাত জেগে জেগে এই কথাই ভাবছিলেম ।
ভাবছিলেম তােমার মুখখানি দেখতে মানুষের মত,-তােমার ভেতরটা
মানুষের মত কিনা জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল। ভাগ্যবশে তা জানবার সুযােগ
বটে গেল।
আজ দেখব তুমি কি ।
পারেব। বেশ, তবে চল। আজ বহু দিন পরে অস্ত্র ধরতে যাচ্ছি--
নূতন উদ্দেশ্য নিয়ে।
এক ছিবে আজ আমার পুনর্জন্ম । আজ তুমি
ছাড়া আপনার জন আর কাউকে নিকটে দেখতে পাচ্ছি না। এসাে,
আজ তুমিই আমার হাতে অস্ত্র তুলে দাও!-(স্বগত)—হায় আজ সে
কোথায়, আর আমি কোথায় ! বুঝি আর তার সঙ্গে দেখা হল না,-বুঝি
আমা হতে তার আশা সফল হল না !
{ বুলা ও খায়েবের প্রস্থান
চতুর্থ দৃশ্য—জিনাের বাটির সম্মুখ ।
সর্দার ও
জনৈক
দম্য
দ। হুজুর, আমি অনেকবার দরজায় ধাক্কা দিয়েছি, কিন্তু কেউ
সাড়া দিলে না। শেষে হয়রান হয়ে আপনাকে ডেকে নিয়ে এলুম।
সর্দার। তাইতাে, এরা কি ঘুমিয়ে আছে, না মরে গেছে। আবার
জোরে ধাক্কা দে। আমার আর ধৈৰ্য্য থাকছে না।
১ম দস্য। হুজুর, আপনার ধৈর্য্য থাকছে না, আমার কিন্তু ভাবি
খটকা লাগছে।
সর্দার। খটকা লাগছে ?-কিসের খটকা? একটা সাধারণ লােকের

१२ মিসর-কুমারী { ৩য় অঙ্ক,- ৪র্থ দৃশ্য। বাড়ী লুঠতে এসে আবার খটকা কিসের? আহা, কি গানই গাইলে- ( সুর করিয়া মৃদু স্বরে)- ‘কালাে হাতীটা কেন আমার মাথার উপর শুড় নাড়ে? তার পা দুটো গােদা গােদা, চেহারাটা অতি যাচ্ছে-তাই। ( হাঁপাতে হাঁপাতে অনৈক দ্যর প্রবেশ) ২য় দস্য। হুজুর, ফড়িংএর মত পাতলা একটা লােক দোতলা থেকে এক লাফে আমার মাথা ডিঙ্গিয়ে একেবারে রাস্তায় পড়ে ছুট দিয়েছে। আমি তার পেছনে পেছনে ছুটেছিলুম, কিন্তু কিছুতেই তাকে ধরতে পারলুম । শীগগির যা হয় উপায় করুন। সর্দার। বটে? তবে এক মুহূর্তও দেরি নয়। ডাক সবাইকে, চোখের পলকটা ফেলতে না ফেলতে কাজ সাফাই করে ঝড়ের মত উধাও হই। বিলম্বে বিপদ ঘটতে পারে। ( প্রথম দস্যু মৃদু মৃদু শিস দিলে সকলে একত্রিত হইল) ভাঙ্গ দরজা। দোরটা একেবারে ভূমিসাৎ করে ফেল। ( সকলের দারে আঘাত ) ১ম দস্য। উঃ কি শক্ত কপাট, যেন লােহা দিয়ে তৈরী ( বলিতে না বলিতে এক খণ্ড বৃহৎ প্রস্তর উপর হইতে তাহার মাথায় পড়িতে সে ভূপতিত হইল) সর্দার। একি, পাথর কোখেকে পড়ল?-দেখছি ভেতরে বাধা দেবার লােক আছে। না, এ রকম করে কোন কাজ হবে না ! দেয়াল হবে। দু’জন দুদিকে দেয়াল বেয়ে উঠতে চেষ্টা কর, আর বাকি সব তীর ছোড়, যেন কেউ উপর থেকে কোন বাধা না দিতে পারে।-(বলিতে না বলিতে উপর হইতে অজস্ব প্রস্তর বৃষ্টি হইতে লাগিল,এত যে, আর কেহ সেখানে দাড়াইতে পারিল না। কয়েক- জন প্রত্যয়ের আঘাতে মূচ্ছিত হইল, অবশিষ্ট পলায়ন করিল )-এখন উপায়? যা হবার হােক, আমি পালাৰ না। (বলিতে না বলিতে এর

৩য় অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। মিসর-কুমারী।
খুপিয়া গেল। সর্দার যেমন ঢাল দ্বারা দেহ আবৃত করিয়া অগ্রসর হইবে,
অমনি গৃহাভ্যন্তর হইতে প্রস্তর নির্মিত এক বৃহৎ বর্শা আসিয়া তাহার
বক্ষে আঘাত করিল )-উঃ বাপ ।
[ নেপথ্যে কলরব-ভয় নাই—ভয় নাই”]
সর্দার। উঃ!-ওই বুঝি কোতােয়াল আমাদের ধরতে আসছে।
না না, ধরা পড়ার চেয়ে এরা ভাল। আর কি হবে বেঁচে?-(কটিব
হইতে ছুরিক বাহির করিয়া নিজ বক্ষে আঘাত করিতে উদ্যত হইল, কুলা
ও খারেব ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিল-বুলা সর্দারের হাত ধরিয়া তাহাকে
আত্মহত্যা হইতে বিরত করিল না না, আমার হাত ছেড়ে দাও-আমি
ধরা দেব না, আমি মরব। আর একটুখানি বাকি আছে, আর একটু
হলেই আমি মরি।—উ। (দেহ এলাইয়া পড়িল )
ধরা দেবে না কি?—তুমি যে আমার হাতে ধরা পড়ে গেছ।
আমি তােমায় সহজে মরতে দেব না। (খারেবের প্রতি)- দাম
এসো এ লােকটাকে ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে যাই। এ বক্কমের মুখে
বিষ আছে। আমি এর চিকিৎসা করব। বাবার কাছে ওষুধ শিখেছি
আজ তার পরখ করব।
খারেব। দিদিমনি, তােমার ইচ্ছাই হুকুম।
( উভয়ে ধরাধরি করিয়া দস্যকে ভিতরে লইয়া গেল••প্রালিত
মশাল হস্তে কাকাতুয়া ও দলবল সহ নগরপালের প্রবেশ)
নগরপাল। ভয় নাই, ভয় নাই, আমি এসে পড়েছি,•••আর ভয় নাই।
কৈ, কোথায় দম্য।
কাকাতুয়া। ভয় নাই, ভয় নাই, আর ভয় নাই,জুর এসে
পড়েছেন। কৈ, কোথায় দশ ?
নগরপাল। কৈ, একটাকেও তাে দেতে পাচ্ছি না।
কাকাতুয়া। তাইতো, কৈ, একটাকেও তাে দেখতে পাচ্ছি না...
বুলা।
ধর।

মিসর-কুমার। [ ৩য় অঙ্গ-৫ম দৃশ্য।
(মশাল দিয়া দেখিয়া )••"এই যে হুজুর, একশালা চিৎ হয়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে।
এই যে আর এক শালা উপুড় হয়ে পড়ে নাক ডাকাচ্ছে। আমলল যা,
এই যে আর একটা।
জনৈক প্রহরী। হুজুর, মিলা মিলা আউর একঠো মিলা।
কাকাতুয়া। যা ব্যাটা নিয়ে যা, কাল সকালে চচ্চড়ী রেধে খাস।
নগরপাল। পাকছড়া, পাকড়াে, গেরেপ্তার করা। হাঃ হাঃ হাঃ,
আমার সারা পেয়েই শালারা মৃচ্ছ। গেছে। কাকাতুয়ার প্রতি)...
তুই ব্যাটাচ্ছেলে হা করে কি দেখছিস? বাড়ী গিয়ে ঘুমাগে যা।
একটা ডাকাতকে
ডাকাতকে গেরেপ্তার করবার ক্ষমতা নাই,ব্যাটা কাপুরুষ
খােকার। যা, আর তােদের ভয় নাই। যদি ব্যাটারা আবার আসে
তো আমায় খবর দিল। আর কাল সকালে একবার কোতােয়ালতে
যাস,••এ ব্যাপারের তদন্ত করতে হবে। চল হে চল, এই ক’ শালাকে
কাধে করে নিয়ে চল। আর এই পাথরগুলাে সব তুলে নিয়ে চল,
( সকলের প্রস্থান)
পঞ্চম দৃশ্য—উদ্যান।
সর্দার একখানি খাটিয়ার উপর শায়িত, পার্শ্বে বুলা
ও পারেব গুয়ান।
কেমন দিদিমণি, এইবার ঠিক হয়েছে তােত?
লা। হাঁ, এইবার ঠিক হয়েছে। আমাদের ঔষধ বেশ কাজ করেছে।
এইবার একটু ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগলেই বােধ হয় সেরে উঠবে।
এখন এইখানে শুয়ে থাক, এইবার ভাই তুমি গিয়ে একটু বিশ্রাম কর।
তােমার কাল সমস্ত রাত্তির ঘুম হয় নি।
পারে। আর তােমারই বুঝি হয়েছে ?
বুলা। না। কিন্তু আমি মেয়ে মানুষ, সেবাই আমার ধর্ম।

৩৪ অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী খারেব। আর আমি পুরুষ, বিপন্ন শত্রুর জীবনবক্ষা আমার ধর্ম। এমন দিন ছিল দিদিমণি, যখন এই খারেব চোরের মত অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে লােকের মাথায় লাঠি মেরেছে,—তাতে সে লােক মরেনি, মুচ্ছিত হয়ে পড়েছে, আর তাকে হত্যা করবার জন্য সে দলবল নিয়ে ছুটেছে। মুচ্ছিত অসহায় শত্রুকে দেখে তার দয়া হয় নি। আজ সে খারেব আর নাই। এক দেবীর উপদেশে, আর এক দেবীর দৃষ্টান্ত তার নবজীবন লাভ হয়েছে। বুলা। বেশ করেছে। এখন এসো, একে ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে। (সর্দারের নিকটে গিয়া)-একি, ঠোট নড়ছে যে-দেখ দেখ বারেব, এর চৈতন্য হচ্ছে। দেবতা মুখ তুলে চেয়েছেন, এই হতভাগ্যের জীবন রক্ষা হয়েছে। সর্দার। (চক্ষু মেলিয়া) একটু জল-আমি-কোথায় ? খারেব। তুমি ঠিক জায়গায় আছ। কথা কয় না, চুপ করে শুয়ে থাক, আমি তােমায় জল এনে দিচ্ছি। (প্রস্থান ) (ৰুলা সস্নেহে দস্তার মাথায় ও ললাটে হাত বুলাইতে লাগিল। সর্দার। তুমি কে?-তােমার হাতখানি কিরম (ফল লইয়া পারেবের পুনঃপ্রবেশ ও দস্যকে জলদান )—আঃ বাঁচলে+তাইতাে, আমি এখানে কি করে এলেম ?আমি বিছানায় শুয়ে কেন ?—আমার কি হয়েছে । ও মনে পড়েছে। আমি জিনাের বাড়ী লুঠতে এসেছিলেম, তার মেয়েকে চুরি করে নেব বলে। তারপর ?-তারপর একটা বর্শা এসে আমার বুকে লাগে—তারপর আর কিছু মনে নাই। বারেব। তারপর এই দেবী তোমার জীবন রক্ষা করেছেন। সর্দার। ইনি কে? খারেব। যাকে তুমি চুরি করে নিতে এসেছিলে। ইনিই বিখ্যাত চিকিৎসক জিনাের কন্যা। সর্দার। আর তুমি কে?

“৭৬
মিসর-কুমারী [ ৩য় অৰু-৫ম ।
খারেব। যে তােমার বুকে বর্শার আঘাত করেছিল।
সার। তােমরা আমায় বাচালে কেন?
খারেব। আমি জানি না। যে বাঁচিয়েছে তাকে জিজানা কর।
সর্দার। তােমরা দু'জনেই আমায় বাঁচিয়েছ। যে হয় বল। আমি
কেন তােমাদের বাড়ী লুঠতে এসেছিলাম তাতে বল্লেম। আমার উতে
সফল হলে কি হত তাতাে বুঝতে পারলে। এইবার বল, তােমরা আমায়
বাচালে কেন ?
খারেব। (অত্যন্ত রূঢ় স্বরে)-তােমার মুণ্ডপাত করব বলে, তােমার
সর্বনাশ করব বলে,-ভদ্রলােকের বাড়ী লুটে, তার মেয়েকে ধরে নিয়ে
যাওয়া যে কত বড় একটা সৎকাজ, তা তােমার সর্বাঙ্গ চিরে মুন টিপে
টিপে বুঝিয়ে দেব বলে।
সর্দার। তবে তা দিচ্ছ না কেন?
খারে। আগে সময় থােক, তবে তাে দেব।
( নেপথ্যে কলরব-বেগে কাকাতুয়ার প্রবেশ)
কাকাতুয়া। দিদিমণি, দাদামণি, সর্বনাশ হয়েছে।
বুল।
কি রে ?-কি হয়েছে ?
কাকাতুয়া। এর দলের কতকগুলাে লােক লাঠি সােটা নিয়ে দোর
গােড়ায় এসে হাজির হয়েছে। চেঁচামেচি করে বলছে—আমাদের
সর্দারকে ফিরিয়ে দে, নইলে তােদের সবাইকে মেরে ফেলব, বাড়ীতে আগুন
ধরিয়ে দেব।
সর্দার। কৈ হে, আমার মুণ্ডপাত করলে না? গা চিরে চিরে সুন
টিপে দিলে না?
খারে। (ক্রোধভরে) আরে দিচ্ছি। সুন অমনি শস্তা কি না,
খুন কিনতে তো আর পয়সা লাগে না।

বুলা।
৩য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী
বুলা। তাইতাে ভাই, কি হবে ?
খারে। এই শালাই যত নষ্টের মূল। (এক খণ্ড প্রস্তর কুঁড়াইয়া
দি শালার দফা শেষ করে।-( সর্দারের মাথায় মারিতে উদ্যত হইয়া )
কি বল দিদিমণি?-মারব?
তা আমি কি জানি? তােমার ইচ্ছা হয় মার।
খারেব। আহা তােমার জীব, তুমি বাঁচিয়েছ, তুমি না বল্লে কি
মারতে পারি?বল, মারব?
বুলা। বেশ, আমি বলছি তুমি মার ।
খারেব। আহা ভাল করে বল না। মারব?-মারি ?
সর্দার। (হাসিয়া) না হে না, মানুষ মারা তােমার কৰ্ম্ম নয়। একটা
মানুষ মারতে যে তিনবার ভাবে, সে কখনাে মানুষ মারতে পারে না।
খারেব। তবে রে শালা, বিছানা থেকে উঠে একটা ঢাল আর বল্লম
নিয়ে দাড়া, দেখি, কেমন আমি মানুষ মাৰ্তে পারি না।
বুলা।
হাঃ হাঃ হাঃ-
সর্দার।
সর্দার। (কাকাতুয়ার প্রতি)—ওহে বাপু, তুমি সেই লাঠি সোটা-
ওয়ালাদের মধ্যে একজনকে গিয়ে বল যে আমি ডাকছি।
কাকাতুয়া। হাঁ, আমার বড় দায় পড়েছে। আমি তার কাছে যাই,
আর অমনি সে আমায়-
সর্দার। না না, তােমার কোন ভয় নাই। আচ্ছা তাদের কাছে
গিয়ে তােমার কাজ নাই। তুমি শুধু দোতলা থেকে এইটি তাদের
দেখাও। সাঙ্কেতিক চিহ্ন প্রদান )-দেখবে সব লােক দূরে সরে
যাবে, একজন শুধু দোয়-গােড়ায় দাঁড়িয়ে থাকবে। তুমি গিয়ে তাকে নিয়ে
আসবে।
কাকাতুয়া। কৌ।
(এন)

৭৮ দশ্য। মিসর-কুমারী [ ৩য় অঞ্চ,-৫ম মৃত। সর্দার। (অতি কষ্টে উঠিয়া বসিয়া )—এখন সত্যি করে বল দেখি, আমায় নিয়ে তােমরা কি করবে? খারেব। তােমার মুণ্ডপাত করব, তােমার সর্বনাশ করব, তােমায় আগুনে পুড়িয়ে মারব, তােমায় জলে ডুবিয়ে মারব, তােমার মাথা নীচু দিকে দিয়ে, পা দুটো এই গাছের ডালে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে মারব। সর্দার। বেশ, বেশ। (জনৈক দসহ কাকাতুয়ার প্রবেশ ) দস্য। সর্দার, সর্দার, তুমি বেঁচে আছ ? সর্দার। হাঁ ভাই, আমি বেঁচে আছি। কার সাধ্য আমায় মারে? ঠিক তাে। কার এত বড় সাহস যে তােমায় মারে। এখন একবার হুকুম করতো, এ ব্যাটাদের একেবারে উচ্ছন্ন দিয়ে যাই। সর্দার। সে এর পরে দেখা যাবে। আজ তােরা যা। আমি বােৰ হয় আজ রাত্রেই এখান থেকে বেরুব। আমি গিয়ে তােদের যা যা করতে হবে বলে দেব। দস্য। ভাের পর্যন্ত যদি তুমি না ফিরে যাও, তবে আবার সকাল বেলা আমরা আসব। সর্দার। এইবার তােমরা কোতােয়ালকে খবর পাঠাও। বুলা। কেন? সর্দার। আমায় ধরিয়ে দেবে না?-আমায় নিয়ে যা হােক একটা কিছু তাে করবে' খারে। তুমি তােমার লােকগুলােকে বিদায় করে দিলে নাকি? সর্দার। দিলুম। আরেব। কেন, ওর কথা মত আমাদের উচ্ছন্ন দিলে না? সর্দার। ভাই, আমি ডাকাত। মানুষের যত কিছু দোষ থাকতে পায়ে, সব আমাতে আছে—নাই শুধু বেইমানি। আর তুমি- বুলা। ৩য় অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী খারেব। আমিও এককালে ছিলুম, তা একরকম ডাকাত ফলের হয়। আর এখন হয়েছি,-আমি এখন কি হয়েছি দিদিমণি? ধূলা। মানুষ। খারেব। সত্যি? সত্যি। খারেব। বেশ, তবে এখন আমরা একে নিয়ে কি করব ? মানুষের যে নিজেদের বাড়ীতে খাচায় করে ডাকাত পােষে, এততা আমার না নাই। বুলা। আমরা একে ছেড়ে দেব। কিন্তু খাবে। ঠিক বলেছ দিদিমণি। ভাই, আমরা তােমায় ছেড়ে দেব। কিন্তু একটা কথা তােমায় স্বীকার করতে হবে—জীবনে আর কখনাে ডাকাতি করবে না। সর্দার। তবে কি করব? বুলা। চাষ-বাস করবে। সার। না, সে আমি পারব না। ছেলে বেলা থেকে এ ধরতে শিখেছি, তাই পারি। লাঙ্গল ধরে চাষ করা, সে আমি পারব না। তবে? খারেব। তবে ? আর শুধুততা আমি নই। আমার অধীনে একটা আতা -অনেক লোেক। সবাই আমার মত। তারাই বা কি করবে? আমিই বা তাদের কি বলব? খারেব। ঠিক হয়েছে। তােমার লােকেরা সব যু করতে পারে তো ? সর্দার। যুদ্ধ করতে পারে তো তাদের মত লড়তে এদেশে কেউ পারে না। নইলে কি মনে কর, লােকে সেধে আমাদের টাকা-পয়সা ধন-দৌলত দিয়ে যায়। বুলা। সর্দার।

মিসর-কুমারী [ ৩য় অঙ্ক,৬ষ্ঠ দৃশ্য।
খারে। তবে আর কি? এস ভাই, তুমিও মানুষ হও। সেই সঙ্গে
তােমার একশ’টা আড়ার সব লােককে একদিনে মানুষ করে ফেল।
সর্দার। কি করতে হবে?
খারে। আমি কাফ্রি। তােমরাও কাফ্রি। আমাদের প্রাচীন
ইথিওপিয়ায় আমাদের লুপ্ত সাম্রাজ্য পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আজ
আমাদের দেশ নাই, ঘর নাই, বাড়ী নাই, কিছু নাই। আমাদের পুরানাে
ভিটের নূতন করে ঘর বাঁধতে হবে। কেমন পারবে?
সর্দার। আলবৎ পারব। এ একটা কাজের মত কাজ,যদি করে
যেতে পারি তবে একটা নাম থাকবে। আর সেই পূণ্যে হয়তাে দস্যর
কলঢেকে যাবে।
বুলা। বারেব, খারেব, তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে? তােমার
একটু মন কেমন করবে না ?
খারেব। তােমাদের ছাড়ব কেন? আমাদের নূতন দেশে তােমাদেরও
নিয়ে যাব।
লা। সে যে অনেক দূরের কথা।
কত দিনে হবে কে জানে,
হবে কি না তাই বা কে বলতে পারে ?
খারেব। নিশ্চয় হবে। এ দেবতার কাজ, দেবতা পথ দেখিয়ে
দিয়েছেন,-এ কাজ না হয়ে যায়? এসাে ভাই, আমরা কর্তব্যপথে
গ্রসর হবার মন্ত্রণা স্থির করি সে।
ষষ্ঠ দৃশ্য—নীলনদের তীর।
(রামেশি ছদ্মবেশে একাকী পদচারণা করিতেছিলেন)
আমেশিস। আশ্চৰ্য্য-এরা দু'জন কোথায় গেল? কাল সকাল
থেকে কোন সন নাই। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারছে না।
যেখানে যেখানে যাবার সম্ভৰ সৰ জায়গায় লােক পাঠালুম, কেউ তাদের

৮১ ৩য় অঙ্ক-৬ষ্ঠ দৃশ্য। মিসর-কুমারী খুজে পেলে না। কে জানে তারা কোথায় গেছে। তার বাপ সেই বৃদ্ধ শয়তান আবনই যত জঞ্জাল ঘটাচ্ছে। বৃদ্ধকে এবার পাই তাে এর সাজা দি। না না, তাকেও ক্ষমা করতে পারি, যদি নাছরিনকে পাই। নাহরিনকে আমার চাই, যেখান থেকে হােক তাকে আমার চাই। ( জনৈক সৈনিকের প্রবেশ ) সৈনিক। প্রভু, আপনি এখানে, আমরা আপনাকে খুজিনি এমন স্থান নাই। রামেশিস। কি প্রয়ােজন ? সৈনিক। সম্রাট সিরিয়া হ'তে ফিরে এসেছেন, আপনাকে স্মরণ করেছেন। আপনি প্রাসাদে চলুন। রামেশিস। আচ্ছা তুমি যাও, আমি পশ্চাতে যাচ্ছি। (অনুচরের প্রস্থান) ম্রাট সিরিয়া হতে ফিরে এসেছেন, আর তাে দেরি করা চলে না। হলে এযাত্রা নাহরিনের সন্ধান স্থগিত রাখতে হয়। কিন্তু -(নেপথ্যে দৃষ্টি করিয়া)-একি আশ্চর্য ! এই যে বৃদ্ধ আন এবং নাহরিন এই দিকেই আসছে— বংশীধ্বনি করিলেন—দুইজন সৈনিকের প্রবেশ ) ওই যে দেখছ একটা বুড়ো আর একটী স্ত্রীলােক এইদিকে আসছে, ওদের ধরে বন্দী করতে হবে। না না, শুধু বুড়ােকে—তাও আমার সম্মুখে নয়, চল অন্তরালে যাই। (রামেশিস ও সৈনিকদ্বয়ের প্রস্থান-আবন ও নাহরিনের প্রবেশ) নাহরিন। বাবা, বাবা আমার জন্য শেষটা তােমায় গৃহ ত্যাগ করতে হল, এ দুঃখ আমার মলেও যাবে না। আমিই তােমার সকল দুর্দশার মূল। আবন। না নাহরিন, তাের কোন দোষ নাই। দেবতার ইচ্ছা, আমরা ক্ষুদ্র মানুষ কি করতে পারি। আমার গৃহ নাহরিন ? আমার গৃহ কোথায়? এ মিসরীর মিসর, এখানে কাফ্রির গৃহ থাকতে পারে না, আমাদের গৃহ ছিল যে দিন আমাদের ইথিওপিয়া ছিল, আমাদের রাজা ছিল, আমাদেরও রাজ্য ছিল, পরাক্রম ছি। আজ কিছু নাই। যদি -- ৩ মিসর-কুমারী [ ৩য় অঙ্ক,-ষষ্ঠ দৃশ্য। আবার সে দিন ফিরে আসে তবেই আমাদের গৃহ হবে, নইলে এত বড় পৃথিবীটার ভেতর কোথাও হীন কাফ্রির জন্য এতটুকু ঠাই নেই। নাহরিন। এখন কোথায় যাবে বাবা? আবন। কোথায় যাব ? এ মিসরে এমন কোন স্থান আছে, যেখানে গেলে তােকে যুবরাজ রামেশিসের অত্যাচার হতে রক্ষা করতে পারব? সে তাের জন্য ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তার হিতাহিত বিচার নাই, লােক-লজ্জার ভয় নাই। ক্রমাগত লােকের পর লােক পাঠিয়ে আমাকে ভয় দেখিয়েছে, প্রলােভন দেখিয়েছে, নানা প্রকারে হস্তগত করবার চেষ্টা করেছে। নাহরিন, যদি লােক-চরিত্রে আমার কিছুমাত্র জ্ঞান থাকে, তবে আমার বিশ্বাস এইবার সে একবার বল প্রকাশ করে দেখবে। নাহরিন। তাইতাে বাবা, এখন উপায়? ( সৈনিকগণের পুনঃ প্রবেশ) ১ম সৈনিক। বৃদ্ধ, তুমি আমাদের বন্দী। আবন। কি অপরাধে আমি তােমাদের বন্দী ? ২য় সৈনিক। আমাদের সঙ্গে চল, যদি ভাগ্যে থাকে জানতে পারবে। আবন। বুঝেছি। নিয়ে চল, কোথায় নিয়ে যাবে। বহুকাল ধরে অদৃষ্টের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছি, আর পারি না। এইবার গা ঢেলে দিয়ে দেখি অদৃষ্ট কোন পথে নিয়ে যায়। নাহরিন, পালা। আর এই নে বক্ষবস্ত্র হইতে কবচ বাহির করিয়া নাহরিনের বাহু-মুলে বাঁধিয়া দিল)-সাবধান প্রাণাত্তেও এ কবচ হস্তচ্যুত করিস নে। থাকে যেন—পৃথিবীতে তাের পক্ষে সবচেয়ে মূল্যবান এই কবচ, হয়তাে এ হতে এক দিন তাের জীবন রক্ষা হতে পারে। যা, আর এক মুহূর্তও দেরি করিস নে। আমার জন্য ভাবিস নে। আমি বুড়ো হয়েছি, আমার মেয়াদ ফুরিয়েছে। তবু যদি বুঝি তুই নিরাপদে আছিস, আমি মুখে মরতে পারব। যা- ৩ মনে ৩য় অঙ্ক-৬ষ্ঠ দৃশ্য। মিসর-কুমারী নাহরিন। বাবা, বাবা, তােমায় ছেড়ে আমি কোথায় যাব বাবা, আমি তােমার মেয়ে, তােমারই শিষ্যা, সম্পদে বিপদে তােনা চরণ তলেই আমার একমাত্র স্থান। তােমায় আমি কিছুতেই ছাড়ব না ( আবনকে আলিঙ্গন )। হয় সৈনিক। ( রূঢ়ভাবে ) সরে যা চুড়ী, আমরা আর দেরি করতে পারছি না। চলে এসাে বৃদ্ধ আবনকে আকর্ষণ ) ( অন্তরালে রামেশিসের পুনঃ প্রবেশ ) নাহরিন। সাবধান বব্বর। এত তেজ,-এত অহঙ্কার ?—আমার কাছ থেকে আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যাবি ? সিংহিনীর বুক থেকে তার স্তন্যপায়ী শিশুকে ছিনিয়ে নিবি ? নিদ্রিত কালফণির শিরে পদাঘাত করবি? দেখি কার এত ক্ষমতা। কার সাহস আছে আয়! (ছুরিকা উদ্যত করিয়া দাড়াইল) রামেশিস। মরি মরি, রূপের লহর বয়ে যাচ্ছে। ভস্মাচ্ছাদিত বহি যেন ফুৎকারে জ্বলে উঠেছে। বর্ষা-প্লাবিত নীলা যেন আকুল তরঙ্গভঙ্গে দুকুল ছাপিয়ে ছুটে যাচ্ছে ! একটা দমকা হাওয়ায় যেন মরুভূমির বানু- রাশি জলস্তম্ভের মত উর্ধ্বে উঠে যাচ্ছে। নাহরিন। (নাহরিন চমকিয়া উঠিল)-তােমার পিতার মুক্তি তােমার হাতে। তুমি শুধু আমার কথা আমি তােমার পিতাকে প্রচুর ঐশ্বর্যের অধিকারী করে দিচ্ছি। নাহরিন। ঐশ্বৰ্য্য?—কি ঐশ্বৰ্য্য তােমার আছে?—কতটুকু ঐশ্বর্যের অধিকারী তুমি, যে, তােমার ইচ্ছার কাছে আমাকে মাথা নােয়াতে হবে? মিসরের যুবরাজ রামেশিস। এই কাফ্রি-কন্যা নাহরিনের মুখপানে চেয়ে কথা কইতে তুমি লজ্জিত হচ্ছ না? এতটুকু ধিক্কার তােমার প্রাণে আসছে না? তােমার কি বিবেক নাই?-মনুষ্যত্ব নাই? তোমার কি- রাদেশিস। নাহরিন, তােমার জন্য আমি অনেক সহ করেছি, তােমারই জন্য আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছি—আর আমি নিজেকে রাখ,

মিসর-কুমারা
ধরে রাখতে পারছি না। আমার কথা রাখ হরিন, নইলে আমায় বাধ্য
=
নাহরিন। কি? বল,বলতে বলতে থামলে কেন?-বল,
বাধ্য হয়ে বল প্রয়ােগ করতে হবে। অবলার উপর বলপ্রয়ােগ না করলে
মিসর-রাজ-সিংহাসনের গৌরব বাড়বে কিসে ? এমন কথা নইলে
মিসরের ভাবী ফারাওয়ের মুখে মানাবে কেন ? বল,—আদেশ দাও,
এই মুহূর্তে এরা আমায শৃঙ্খলিত করুক। যে হাতে হাত দিয়ে একদিন
নাহরিনকে মিনতি করেছিলে, সেই হাতে এরা দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে
যাক।
রামেশিস। তবে আমার দোষ নাই।—রক্ষীগণ,
[তেরে রে রে”-বিকট চীৎকার করিতে করিতে দল বল সহ
খারেবের প্রবেশ—তাহারা রামেশিসের ও তদীয় সৈন্যগণের দিকে বল্লম
উদ্যত করিয়া দাঁড়াইল-রামেশিস ও সৈন্যগণ সাশ্চর্য্যে স্তব্ধ হইয়া রহিল
-নাহরিন যেন রামেশিসকে আবৃত করিবার জন্য তাহার এবং খারেবের
মধ্যস্থলে আসিয়া বাহু প্রসারিত করিয়া দাড়াইল ]
খারেব। কার সাধ্য আমাদের সম্রাজ্ঞীর কেশ স্পর্শ করে?
নাহরিন। কে, খারেব ?
খারেব। হাঁ দিদি, আমি। আমি ফিরে এসেছি।
তােমার হুকুমে
মানুষ হয়ে ফিরে এসেছি। ইথিওপিয়ায় আমাদের প্রাচীন রাজ্য পুন:
প্রতিষ্ঠিত করতে চলেছি। দেবী ! নব জাগরিত কাফ্রি জাতি আজ
তােমাকে ইথিওপিয়ার সম্রাজ্ঞীপে বরণ করছে।

চতুর্থ অই
প্রথম দৃশ্য- জিনাের
বাটীর অভ্যন্তরস্থ কক্ষ।
বুলা, জিনাে ও কাকাতুয়া।
জিনাে। তারপর ধুলা, তারপর ?
বুলা। তারপর আর কি, ডাকাত সর্দার ভাল হয়ে উঠল, আমরা
তাকে ছেড়ে দিলুম। সে বললে-আমরা কি করব ?—আমরা অনেক
লােক, একটা কিছু করা তাে চাই।' অমনি খারেব বললে—তার ভাবনা
কি ? আমি মানুষ হয়েছি, তােমরাও মানুষ হবে চলল।” এই বলে ঢাল
শড়কি নিয়ে হৈ হৈ করে বেরিয়ে পড়ল। বাড়ীর বাইরে গিয়ে একবার
একটু ফিরেও তাকালে না, এত বড় বেইমান। হ্যা বাবা, মানুষ হলেই
কি ঢাল শড়কি নিয়ে বেরুতে হয় ?-না যে বাড়ীতে এদ্দিন থাকা
গেল, তার দিকে একটু ফিরে তাকালেই মানুষ থেকে সদ্য সদ্য বাদর
হয়ে যায় ?
জিনো। ৩া হয়। কিন্তু তাই বলে তুই অমন কচ্ছিস কেন?
বুলা। আমি অমন করব না? তুমি বল কি বাবা! যদ্দিন আমাদের
বাড়ী ছিল, দিদিমণি দিদিমণি বলে ডাকত, আর কি মিষ্টি কথাই
কইত। আর যাবার সময়,- ও, আমার এমন রাগ হচ্ছে তার উপর,
মুখ খু, চোয়াড়, বেইমান,-একবার দেখা পাই তাে গােটাকত কথ
শুনিয়ে দি।
জিনাে। ওরে থাম থাম। যখন তার খাে পাবি, তখন না হয় কথা
শােনাস। এখন মিছি মিছি মেহনৎ করে মরছিস কেন?

৬
মিসর-কুমার [ ৪র্থ অঙ্ক-১ম দৃশ্য।
বুলা। আচ্ছা বাবা, তুমিই বল দেখি, কত বড় বেইমান,-একবার
ফিরে তাকালে না।
জিনাে। তবে তুই একলা একলা বসে বকর বকর কর, আমি
চল্লেম। কাকাতুয়া, দেখছি তাের দিদিমণির ভারি অসুখ করেছে।
তুই কাছে থাক, আমি বাইরে যাই।-(স্বগত)-হায় অদৃষ্ট।
আবার কি নূতন খেলা শুরু করলে ? তােমার পথ তুমিই জান।
(প্রস্থান)
কাকাতুয়া। দিদিমণির অবস্থা দেখছি
দিদিমণির অবস্থা দেখছি নেহাৎই কাহিল। তাইতো,
কি উপায় করা যায় ? নাঃ, কাকাতুয়া ! তাের কিছু মাত্র বুদ্ধিশুদ্ধি নাই।
বুলা। নাঃ, এ যে মহা মুশকিল হল। এমন একটা লােক নাই, যার
কাছে বসে তাকে মনের সাথে দু’টে। গালাগালি দিতে পারি,-যে ই
করে বসে বসে কান পেতে শশানে, আর মাঝে মাঝে সায় দেয়। কি
করি। আমার যে গলা ছেড়ে কাদতে ইচ্ছে হচ্ছে। তাই করব নাকি?
খানিকটা বাবাগাে মাগাে করে চেঁচাব? দুর। তাহলে এক্ষুণি রাজ্যের
লােক এসে জড় হবে। সে দেখতে ভারি বিশ্রী হবে। তার চেয়ে পা
ছড়িয়ে বসে গান গাই।
কাকাতুয়া। তাইতো, দিদিমণির চোখ দুটো যে ছল ছল করছে।
ও জলে একেবারে ভরে গেছে। একটু নাড়া পেলেই শীতকালের
শিশিরের মত ঝর ঝর করে ঝরে পড়বে। তাইতাে কি করি এখন?
একটা কিছু করা যে নেহাৎ দরকার তা বুঝতে পারছি, কিন্তু সেটা যে কি
তা কিছুতেই মাথায় আসছে না। এক ঘটি জল এনে চোখে মুখে ছিটিয়ে
দেব? না একটা পাখা নিয়ে এসে খানিকটা হাওয়া করব? ওরে বাবা,
তাহলে এখুনি তেড়ে মারতে আসবে। উহু, কাকাতুয়ার বুদ্ধিতে কুলুচ্ছে
। দেখি, ধারে কোথাও ছটাক খানেক বুদ্ধি মেলে কিনা।
(প্রস্থান)

৪র্থ অঙ্ক-১ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী সুখনিশি পোহায়েছে, দেউটী নিভিছে গাে, ধ্রুবতারা লুকায়েছে মেঘের কোলে স্বপন ভাঙ্গিয়া গেছে আধ ঘুমঘােরে গাে, হাসিটুকু ধুয়ে গেছে নয়ন জলে। অতি অকরুণ বঁধু মরমে বিধেছে শেল, বেদনা দিয়েছে উপহার,- আমার যা কিছু ছিল সকলি লুঠিয়া নিছে, রেখে গেছে শুধু হাহাকার। কোথায় পরাণ বঁধু, এস ফিরে এসগাে! আমার কুটীরে পথ ভুলে, প্রেম-কুসুমহার বিফলে শুকায়ে যায়, পরহে পরহে গলে। (দুই হাতে মুখ আবৃত করিয়া ফুপাইয়া ফুপাইয়া কাদিতে লাগিল- একখানি ছবি লইয়া কাকাতুয়ার পুনঃপ্রবেশ ) কাকাতুয়া। দিদিমণি, দিদিমণি, ওঠ, মুখ তোেল, দেখ এনেছি—ধরে এনেছি-(ধুলা অর্থহীন দৃষ্টিতে কাকাতুয়ার মুখপানে তাকাইল-কাকাতুয়া ছবিখানি বুলার হাতে দিল)-দেখ, তােমার নিজের গড়া মানুষের ছবি, তােমার নিজের হাতে আঁকা,-বেশ করে কান মলে দাও দেখি। (বুলা উঠিয়া কাকাতুয়ার গালে ঠাস করিয়া চড় মারিল–পরে ছবিখানি চুম্বনপূর্বক বুকে লইয়া ঝড়ের মত বাহির হইয়া গেল।-বাঃ বেশ তো। পুরস্কার দিলে ভাল। আচ্ছা দিদিমণি সবুর কর,-আগে আসল মানুষটাকে খুজে পেতে ধরে আনি, তারপর বােঝা যাবে।

৮৮ মিসর-কুমারী [ ৪র্থ অঙ্ক,Fয় দৃশ্য। দ্বিতীয় দৃশ্যপৰ্বত গহ্বায়। নাহরিন ও খারেব। খারেব। ভগ্নি, এই আমাদের রাজধানী, এই আনাদের দুর্গ, এই আমাদের রাজপ্রাসাদ। যেদিন আবার আমরা সম্পূর্ণ স্বাধীন হব, মিসরীর। আর আমাদের নির্যাতন করতে পারবে না, সেদিন এইখানে আমরা তােমার সিংহাসন স্থাপন করব। এইখানে তুমি রাজদণ্ড ধারণ করে মিসরের সমগ্ৰ কাফ্রিজাতির উপর তােমার ধর্মরাজ্যের অধিকার বিস্তার করবে। ইথিওপিয়ার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তােমাকে কর প্রদান করবে। নাহরিন। সেদিন কবে হবে ভাই? সিংহাসনে বসবার অধিকারী আমি নই, রাজদণ্ড ধারণের শক্তি আমার নাই। দীনা ভিখারিণী আমি, ভিখারিণীই থাকব, কিন্তু তবু ভাই, এমন দিন কবে হবে যেদিন কাফ্রিরা আবার মানুষ বলে গণ্য হবে, তাদের নিজের ঘরে স্বাধীন হয়ে বাস করতে পারবে। খারেব। দেবতার আশীর্বাদে শীঘ্রই সেদিন আসবে। তুমি শুধু আমায় মানুষ করনি ভগ্নী, তােমার একাগ্র আহ্বানে আজ সমগ্ৰ কাফ্রি- জাতির প্রাণে প্রাণে মনুষ্যত্ব সাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা নিজেদের জাতিকে আপন বলে চিনেছে, ভাইয়ের জন্য ভাই প্রাণ দিতে প্রস্তুত হয়েছে। দলে দলে লােক এসে তােমার পতাকার নীচে আত্ম- বিসর্জনের মহামন্ত্র গ্রহণ করছে। মিসরের যেখানে যেখানে কাফ্রির বাস আছে, সেইখানে আমাদের লােক ছুটেছে, বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলকে মহামন্ত্রে দীক্ষা প্রদান করছে। তােমার পিতা নিজে তাদের নেতা। তার দৃষ্টান্তে তার অনুচরগণ প্রাণের মমতা পরিত্যাগ করে সঙ্কল্প সাধনে বদ্ধপরিকর হয়েছে। আর সন্দেহের স্থান নাই-ভগ্নি, শীমই আমাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হবে। দেবতা মুখ তুলে ছেয়েছেন, আর ভয় নাই।

;
৪র্থ অঙ্ক,-২য় দৃশ্য। ]
মিসর-কুমারী
নাহরিন। আমার বাবা কোথায় ভাই ?
খারেব। ঠিক আমি জানিনা, তবে রাজধানী কর্ণাকের নিকটেই
কোথাও আছেন সংবাদ পেয়েছি।
নাহরিন। সে কি ?
খারেব। হ। দিদি, তাই। আমি তাকে সে প্রদেশে যেতে বারণ
করেছিলেম। তিনি শুনলেন না, বল্লেন--যেখানে বিপদের আশঙ্কা বেশ
সেখানে যদি আমি এগিয়ে যেতে সাহস না করি, তবে যারা আমার কথায়
বিশ্বাস করে আমার সঙ্গ নিয়েছে, তারা সাহস করবে কেন? এই মহাকাৰ্য্যে
কাপুরুষের স্থান নাই।
নাহরিন। তাইতাে খারেক, বড় চিন্তার বিষয় হল যে। আমি
জানতেম তিনি নিকটেই কোথাও আছেন।
খারেব। কোন চিন্তা নাই। দেবতা আমাদের সহায়।
নাহরিন। হু'। এদিকে আর কি ব্যবস্থা হয়েছে খারেব ?
খারেব। ব্যবস্থা সব ঠিক হয়ে আছে। আগামী মাসের সপ্তম দিবসে
রাজকুমারী সায়ার সঙ্গে যুবরাজ রামেশিসের বিবাহ। সেই দিন সমগ্র
মিসর আমােদে মত্ত থাকবে, সেই সুযােগে আমরা আমাদের কার্যোদ্ধার
করব।
নাহরিন। কি বল্লে খারেব—যুবরাজ রামমশিসের বিবাহ ?
খারে। হাঁ। কেন তুমি শােন নি? এ সংবাদ তাে এদেশের
আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই জানে।
নাহরিন। যুবরাজ রামেশিসের বিবাহ ? চিন্তামগ্ন হইল)
খারেব। কি ভাবছ দিদি ?
নাহরিন। কৈ, না কিছু ভাবিনি। আগামী মাসের সপ্তম দিবসে
যুবরাজ রামেশিসের বিবাহ ? খারেব, তুমি ঠিক বলছ ?
খারেব। আমি ঠিক বলেছি, ভগ্নী। তােমার কাছে মিথ্যা বল।
কেন ?

মিসর-কুমারী
[ ৪র্থ অঙ্ক,-২য় দৃশ্য।
(বেগে জনৈক কাফ্রি সৈনিকের প্রবেশ )—কি সংবাদ ভাই? -
সৈনিক। ভাই, সর্বনাশ হয়েছে, প্রভু আবনকে মিসরীরা ধরে
নিয়ে গেছে।
1
খারেব।
সে কি ?
নাহরিন।
সৈনিক। আমরা সৈন্য সংগ্রহ করতে করতে একেবারে কর্ণাক শহরের
অতি নিকটে গিয়ে পৌঁছেছিলেম। আমরা প্রভুকে সেদিকে যেতে
অনেক বারণ করেছিলেম, তিনি শুনেন না। তিনি এগিয়ে চললেন,
আমরাও চললুম, তারপর এই বিপদ। সঙ্গে যে যে ছিল সবাই ধরা
পড়েছে, আমি শুধু তারই ইঙ্গিতে কোন প্রকারে পালিয়ে তােমাদের
সংবাদ দিতে এসেছি।
নাহরিন। তুমি সত্য বলছ, মিসররা আমার বাবাকে ধরে নিয়ে
গেছে ?
সৈনিক। দেবী-(শির নতকরণ )
নাহরিন। আচ্ছা তুমি যাও - কাফ্রি সৈনিকের প্রস্থান)-
খারেব, মিসরীরা আমার বাবাকে কি শাস্তি দেবে অনুমান করছ ?
খারেব। স্থির হও দিদি, আমি এই মুহূর্তে তার উদ্ধারে যাত্রা করছি।
তাকে ফিরিয়ে আনতে পারি, আবার ফিরব, না পারি, আমা হতে তােমার
সাম্রাজ্য-স্থাপন হল না। হয়তাে তােমার সঙ্গে এ জীবনে আমার দেখা-শুনা
এই পর্যন্ত।
(প্রস্থানােদ্যোগ )
নাহরিন। খায়েব, বঁড়াও। তুমি এইখানে থাক, আমি আমার
পিতার উদ্ধারে যাব। পারি ভাল, না পারি কাৰু ক্ষতি নাই।
খারেব। নাহরিন, দিদি
নাহদি শােন খারেব, তুমি দেবতার নামে পথ করে যে
মহাব্ৰত গ্রহণ করেছ তা হতে ভ্রষ্ট হয়াে না। একজনের জন্যে একটা

৪র্থ অঙ্ক,-২য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী জাতির কল্যাণ, আশা-ভরসা সব অতল জলে ডুবিয়ে দিও না। আমার কাছে সমগ্র পৃথিবী এক দিকে, আর পিতা অন্যদিকে হলেও, তিনিই বড়, --তার সমান আর কিছুই নাই। কিন্তু তােমাদের কাছে তিনি কে?- পাঁচ জনার মত একজন। খারেব। কিন্তু দিদি- নাহরিন। এতে কোন কিন্তু নাই খারেব। আমার পিতার উদ্ধার আমিই করব। তােমরা শুধু নিজেদের কাজ করে যাও। খারে। তাই বলে তােমায় তো আমরা একলা ছেড়ে দিতে পারি। না। তুমি আমাদের সম্রাজ্ঞী- নাহরিন। না, না খারেব, আমি শুধু আমার বাবার মেয়ে। আমি দীন। ভিখারিণী,-আমায় ছেড়ে দাও ভাই, আমি যাই। খারেব। তবে অনুমতি কর, তােমার সঙ্গে জনকতক রক্ষী দি, তারা ছদ্মবেশে তােমায় অনুসরণ করবে। তােমার সেই মর্মান্তিক শত্রুর কথা বােথ হয় বিস্তৃত হও নি। নাহরিন। খারেব, কথায় কথায় কাল বয়ে যাচ্ছে। আমি চললুম। কিন্তু সাবধান, কেউ যেন আমার সঙ্গে না আসে। তা হলে সব পণ্ড হবে। তুমি, তুমিও আমার সঙ্গে এসাে না আমি বারণ করছি—স্মরণ রেখাে। ( প্রস্থান) খারেব। (মুহূর্তকাল মৌন থাকিয়া) না, এ হতে পারে না। নাহরিন। নাহরিন। ভগ্নি আমার। দেবী আমার। আমি তােমাকে কিছুতেই একলা বিপদের মুখে ছেড়ে দিতে পারি না। আমি এই এক- বার তােমার অবাধ্য হব ছদ্মবেশে তােমার অনুসরণ করব। যে দেবীর করুণায় খারেব আজ মানুষ হয়েছে, জীবন থাকতে খারেব বিপদকে তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে দেবে না। (প্রস্থান) ১২ মিসর-কুমারী [ ৪র্থ অঙ্ক,—৪র্থ দৃশ্য। তৃতীয় দৃশ্যগ্ৰাম্য-পথ । বিরহিণীগণ। সমরিয়া বেদরদা। তােরি নাহিরে বিচার- সুরত দিখায় মুঝে দিবানী বানায়াে রে অবনুঝে রােলাও বেকার। ঝুর ঝুর নয়না কাজর পখারি যায় নিদিয়া না আবে সারি রাতিয়া বট নিরখত দিমুয় গুজরি যায় পিয়াস জ্বলাবে মেরি ছাতিয়া- আবাে সমরিয়া বেদরদা পিয়া হিয়া মেরি করত ফুকার। চতুর্থ দৃশ্য-রাজ-পথ। গােলমাল করিতে করিতে কতিপয় নাগরিকের প্রবেশ। প্রথম। চল হে চল, ছুটে চল। দেরি হলে আর মন্দিরে ঢুকতে পাওয়া যাবে না। তা তাে বটেই। যুবরাজের বে’ রাজকন্যার সঙ্গে, এ কি একটা যে সে ব্যাপার। আহার, বিহার, আমােদ, প্রমােদ, নাচগানের একেবারে চুড়ান্ত বন্দোবস্ত। তৃতীয়। তা আর হবে না? দেখেছ ভিড় হয়েছে কি রকম। পুরুষ, মেয়ে, ছেলে, বুড়ো যে যেখানে ছিল, সবাই একেবারে চারিদিক থেকে ভেঙ্গে পড়েছে। ওঃ, কাতারে কাতারে লােক চলেছে, কানা, খোঁড়া, অ, আতুর-এদের যেন আর শেষ নাই।

৪র্থ অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। মিসর-কুমারী
প্রথম। চল হে, চল চল। দেরি করাে না, দেরি করাে না।
দ্বিতীয়। হাঁ, চল চল।
(নাগরিকগণের প্রস্থান—ছদ্মবেশে কাকাতুয়ার প্রবেশ )
কাকাতুয়া। তাইতাে, খারেবকে যে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।
এদিকে তাকে না পেলে দিদিমণি প্রাণে বাঁচবে না, অতএব তাকে চাই-ই।
কিন্তু কোথায় পাই? আহা তা যদি জানতুমই তাে মিছে এতটা রাস্তা
হেঁটে মরছি কেন? সে যেখানে আছে ঠিক সেইখানে গিয়ে ধরতুম, আর
কানে পাক দিতে দিতেথুড়ি, কাঁধে করে নিয়ে একেবারে দিদিমণির
পায়ের তলায় হাজির করে দিতুম। নাঃ, পা দু'খানি আর চলছে না।
ওইখানে গাছতলায় বসে একটু জিরিয়ে নি।
(গােলমাল করিতে করিতে কতিপয় সৈনিকের প্রবেশ)
১ম সৈনিক। ওঃ, দেশে এতলােকও আছে। শালারা বাড়ীতে
কেউ খেতে পায় না, তাই একদিন নেমন্তন্নের গন্ধ পেয়ে একবার পিপড়ের
পালের মত চলেছে।
২য় সৈনিক। ঠিক বলেছিস ভাই, শালাদের জ্বালায় ভদ্রলােকের পথ
চলবার যাে নাই। দেখছিস ওই একশালা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাঁ করে ভাবছে।
—(কাকাতুয়ার প্রতি)—এই, তুই কে?
১ম সৈনিক। তাের নাম কি ?
২য় সৈনিক। কোথেকে আসছিস?
১ম সৈনিক। কোথায় যাবি?
কাকাতুয়া। ওঃ, খাতির দেখছ !
২য় সৈনিক। কি, চুপ করে রইলি যে? বল।
১ম সৈনিক। চট, পট।
২য় সৈনিক। শীগগির।
১ম সৈনিক। জলদী।

৯৪
মিসর-কুমারী
[ ৪র্থ অঙ্ক-৪র্থ দৃশ্য।
কাকাতুয়া। কি বলব?
২য় সৈনিক। আগে বল কোথেকে আসছিস ?
১ম সৈনিক। আর কোথায় যাবি?
কাকাতুয়া। আমি কাদেশ থেকে আসছি, যাব আমন দেবের মন্দিরে।
গুরু সামলেশের কাছে চিঠি আছে।
১ম সৈনিক। চিঠি আছে ?
২য় সৈনিক। তবে যা যা।
১ম সৈনিক। হাঁ, তবে যা।
যে আজ্ঞে, বাধিত হলেন।
( কাকাতুয়ার প্রস্থান)
কাকাতুয়া।
২য় সৈনিক। চল ভাই, বেলা হল, আর এখানে দাড়িয়ে কি হবে?
আর দেরি করলে হয়তো বে’ দেখা হবে না।
১ম সৈনিক। আরে না না। বে’র এখনাে দেরি আছে। কত
রং বেরংয়ের লােক আসছে, এই কি একটা কম দেখবার জিনিস ? এই
না হয় একটু দেখে যাই।
( ছদ্মবেশে খারেবের প্রবেশ )
খারেব। তাইতাে, নাহরিন কোন্‌দিকে গেল? আমি বরাবর তার
পেছু পেছু আসছি, এইখানে এসে ভিড়ের মধ্যে তাকে হারিয়ে ফেললুম।
হায় উন্মাদিনী। দিশেহারার মত কোথায় চলেছ ? কোনদিকে দৃকপাত
নাই, শুধু চলেছ, আর চলেছ।
( জনৈক সৈনিকের প্রবেশ - খারেবের সহিত ধাক্কা লাগিল—উভয়ে
উভয়ের মুখপানে চাহিল)
৩য় সৈনিক। তুমি কে হে, দিন-দুপুরে পথ দেখতে পাও না?
তাইতাে, মুখখানি যেন চেনা চেনা। হ্যা, কোথায় যেন দেখেছি, কিন্তু

৪র্থ অঙ্ক-৫ম দশ।। ঠাওর হচ্ছে না। দেখি দেখি (কৃত্রিম দাড়ি ধরিয়া টানিলে উহাখালি আপিল)-- আঁ!-( ক্রমশঃ ছদ্মবেশ নােচন) -আঁা তুমি ।-ওয়ে তাই ধর ধর অনেক দিনের ফেরার লােক-ধর-( সকলে খারেবকে ধরিল)- তাইতাে বলি, শালাকে অমন চেনা চেনা বােধ হচ্ছিল কেন । খারেব। না, আর বাধা দিতে চেষ্টা করা বৃথা। ৩য় সৈনিক। চল শালা, চল চল। আজ প্রভু সামলেশের কাছে প্রচুর পারিতােষিক পাওয়া যাবে। (খারেবকে লইয়া সকলের প্রস্থান-কাকাতুয়ার পুনঃ প্রবেশ ) কাকাতুয়া-( বিশেষরূপে নিরীক্ষণ করিয়া) -কৌ । (প্রস্থান) পঞ্চম দৃশ্য—আমনদেবের মন্দির-প্রাঙ্গণ। সামন্দেশ। আর কত সয় ? একটা মানুষের বুক, তাতে কত জ্বালার ঠাই হবে? আমি আর যে বইতে পারছি না। আমনদেব, তুমি তাে সব দেখছ, সবই জানছ, তবে এর প্রতিকার করছ না কেন? এক- দিন যারা আমার জীবন মধুময় করেছিল, সুদূর অতীতের সেই শান্ত প্রভাতে স্বপ্ন-জাগরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমার আধ-ঘুমন্ত চোখের সম্মুখে এই চির-পুরাতন ধরণীকে নূতন সাজে সাজিয়ে দিয়েছিল, কোথায় তারা আজ ? -কত দূরে? বলে দাও প্রভু, কবে তাদের দেখা পাব, আমার এই দীর্ঘ মেয়াদ কবে ফুরােবে, আমার এই ভ্রান্ত ভ্রমণের শেষ কবে হবে?-( নেপথ্যে গীতধ্বনি)-ওই যুবরাজের বিবাহের শােভ যাত্রা আসছে। এখনই প্রাণের জ্বালা প্রাণে চেপে রেখে পৃথিবীর কাজে যােগদান করতে হবে। হায়, তাদের কথা যে নির্বিঘ্নে একটু মিসর-কুমারী [ ৪র্থ অঙ্ক,- ৫ম দৃশ্য। চিন্তা করব তারও অবকাশ নাই। ( সামলেশ অগ্রসর হইয়া সমাগত দিগকে প্রত্যুদগমন করিতে গেলেন—গাহিতে গাহিতে নারীগণের প্রবেশ-তৎপশ্চাৎ বিবাহের শােভাযাত্রা—সৰ্বশেষে হারেমহেব, সায়া ও রামেশিস-তৎপশ্চাৎ জনসম্ম—সঙ্গে নাহরিন)। নারীগণ। গীত। == আমার ভরা কলসী বঁধু খালি করাে না খালি করােনা, খালি করােনা, আমার নূতন সােহাগ বারি গড়িও না ওপারে তুফান বঁধু সঁ সঁ সঁ, এ পারে মিঠি হাওয়া বাহবা বা । ওপারে উঠুক ঢেউ বারণ করােনা কেউ, এ বঁধুয়া জলে ঢেউ দিওনা- ঢেউ দিওনা, ঢেউ দিওনা, মাঝদরিয়ায় তরি ডুবিও না। এ পারে উঠে গান, গুন গুন, মৃদু তান, চিড়িয়া মিঠি বােলে বঁধু বাধা দিওনা, বাধা দিওনা। নাহরিন। আমি এখানে এলুম কেন ? কে যেন পশ্চাৎ হতে তাড়না করতে করতে আমায় এইখানে নিয়ে এলো। আমি পিতার উদ্ধারের চেষ্টায় বেরিয়েছি,কিন্তু এতাে উৎসব ক্ষেত্র, এখানে বেদনার স্থান কোথায় ? অশান্ত প্রাণ 1 স্থির হও। আকাশের দেবতাগণ। কিছুক্ষণের জন্য নাহরিনের কণ্ঠরােধ করে দাও,- যেন কেউ তার ব্যথিত হৃদয়কে সহস্র লৌহশলাকা দ্বারা বিদ্ধ করলেও সে কথাটী কইতে না পারে। আজ সবাই আনন্দে মগ্ন, কারু কথা কেউ শুনছে না। সুতরাং আমােদ শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতেই হবে। হারেমহেব। বস রামেশিস । মা সায়া। আজ তােমাদের ভীবনের এক মহা শুভদিন। যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে, ততদিন তােমাদের সকল সুখ, সকল আশা, সকল কার্যের মধ্য দিয়ে এই দিনের মঙ্গল বাদ্য বেজে উঠবে, এই শুভদিনের পুণ্যস্মৃতি জেগে উঠবে উষার এম আর আগের মত, এর রঙীন আলাে তােমাদের মুখে ছড়িয়ে পড়ে

৪র্থ অ-৫ম দৃশ্য। মিসর কুমারী
নুতন জ্যোতিতে তােমাদের ভূষিত করে দেবে।
ভূষিত করে দেবে। মনে রেখাে, আজ
তােমাদের মিসরই সভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলােকে ধরণীর অন্ধকার
ঘুচিয়ে দিচ্ছে। ব্যাবিলন সিরিয়া ফিনিসিয়া তােমাদেরই আলােকে
উদ্ভাসিত। আজ তােমাদের গৌরব-মুকুটের মধ্যমণি মেমফিস অন্ধকার,
ধকি জনশুন্য, নীলার তীরে আইসিসের পবিত্র মন্দির ধ্বংসপ্রায়।
সকলের স্থান অধিকার করে আছে তােমাদের এই রাজধানী কর্ণাক।
এর গৌরবে তােমাদের গৌরব, মিসরের গৌরব, জগতের গৌরব।
আমি আর কি বলব, আশীর্বাদ করি তােমরা সুখী হও, আমরণ সুখে
থাক। দিনে দিনে তােমাদের গৌরব বর্ধিত হােক।
নারীগণ।
গীত।
মঙ্গল হােক মঙ্গল হােক মঙ্গল হােক মিলন।
জীব জীব জীব-নিত্য অটুট হােক বন্ধন।
পুণ্য-সুখ-শান্তি-তৃপ্তি বিরাজিত ভবনে
শুভ্র জীবন করহ যাপন পুলক-মন্দ-পনে-
চরণতলে বহুক বন্ধু প্রণত ধন্য ধরণী
সন্ততিকুল হউক পূজ্য বিশ্বমুকুটমণি।
হারেমহেব । ( সামন্দেশের প্রতি )•••প্রভু আপনি আশীর্বাদ
করুন এবং আমনদেবকে সাক্ষী করে এদের
করে এদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ
/
সমেন্দেশ। আমি কায়মনােবাক্যে আশীৰ্ব্বাদ করছি, বিশ্বদেবতা
আমনদেবের কৃপায় তােমরা চিরসুখী হও, চিরজয়ী হও, উন্নতির সর্বোচ্চ
শিখরে আরােহণ করে জগতের পূজ্য হও।
স্পাহরিন। নাহরিন। মন্দির দুয়ারে কুকুরী ! চুপ কর, চুপ কর।
পারলি নি। তবে এখান থেকে দূর হয়ে যা। তবু ?তৰুতকে
দাড়া,•••(দুই হন্তে নিজ কন্ঠ চাপিয়া ধরিল )•••

১৮ মিসর-কুমারী [ ৪র্থ অঞ্চ,-৫ম দৃশ্য। সামন্দেশ। রামেশিস। সায়া! এসাে, হাতে হাত দাও। আজ নাহরিন। না, না, ক্ষান্ত হও, ক্ষণকাল অপেক্ষা কর। যদি ও বিশ্ববিশ্রুত ফারাও হারেমহেবের অধিকার হয়, যদি এই মহামান্য ফারাওয়ের সিংহাসন তলে বড় ছােট সকলের সমানভাবে সুবিচার পাবার প্রত্যাশা থাকে, তবে যতক্ষণ না ক্ষুদ্র কাফ্রি-বালিকার এক গুরুতর অভিযােগের মীমাংসা হয় ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা কর। রামেশিস। (স্বগতঃ )-নাহরিন —কি সর্বনাশ! আমার বিরুতে অভিযােগ করতে এসেছে,আর রক্ষা নাই। হারেমহেব। কে কে তুমি বালিকা? মিসরের ফারাও হারেমহেবের ২াথে দাড়িয়ে এমন অসমসাহসিক উদ্ধত বাক্য উচ্চারণ কর ? কি এমন গুরুতর তােমার অভিযােগ যে তােনার মুহুৰ্ত্তমাত্র বিলম্ব সহ্য হয় -যার জন্য তুমি আমার অভীতি শুভকার্যে বাধা দিতে অগ্রসর হও। নাহরিন। সম্রাট, আমার অভিযােগ অতি গুরুতর। কিন্তু তা প্রকাশ করবার আগে আমায় অভয় দিন যে আমি সুবিচার পাব। প্রভু, আমার ধৃষ্টতা মার্জনা হয়, আমি বরাবর অবিচারই পেয়ে আসছি, অবিচার অত্যাচারেই অভ্যস্ত। তাই আজ সম্রাটের সম্মুখে দাড়িয়েও আমার আতঙ্ক দূর হচ্ছে না। সামন্দেশ। সম্রাট, একি ? মিসরের সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তিগণের মধ্যে দাঁড়িয়ে একটা ঘৃণিতা কাফ্রি-বালিকা আমাদের শুভকাৰ্য্যে বা দিতে সাহস করে, আর তুমি তাকে প্রশ্রয় দিতে পার,-এ যে আমার ধারণার অতীত। সম্রাট, শুকার্য্যে এ অমঙ্গল অসহ। যদি আমার সদুপদেশ শােন, তবে এই মুহূর্তে এই অলক্ষণা কাফ্রি-বালিকাকে দূর করে দাও। হারেমহেব। না প্রভু, এ কাফ্রি-বালিকা নয়। একটা বালিকার রূপ ধরে আমার অসংখ্য কাফ্রি-প্রজা আমারই সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমায় ৪র্থ অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য।] মিসর-কুমারী সুবিচারে সন্দেহ প্রকাশ করছে, আমার গর্বে আঘাত দিয়েছে,-আমি সত্যই ফারাও হারেমহেব কিনা তাই প্রশ্ন করছে। মঙ্গল হোক, অমঙ্গল হােক, আমি এর অভিযােগ শুনব এবং বিচার করব। বালিব, আমি তােমায় অভয় দিচ্ছি। তােমার কি অভিযােগ নির্ভয়ে বল। আমি এই অমনদেবের সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করছি, আমি সুবিচার করব। নাহরিন। তবে বলুন সম্রাট, যদি কেউ এক সংসার-জ্ঞানহীনা সরল বালিকাকে প্রেমের প্রলােভনে স্বর্গে তুলে দিয়ে, তার মনঃপ্রাণ উচ্ছিষ্ট করে, তারপর তাকে কলঙ্কের নরকে নিক্ষেপ করে, তবে তার কি সাজা? যদি কোন চক্ষুষ্মান পুরুষ এক অন্ধ নারীকে 'অমৃতের লােভ দেখিয়ে তার মুখে হলাহল তুলে দেয়, তবে তার কি সাজা? হারেমহেব। বালিকা, স্পষ্ট কথায় বল কি তােমার অভিযােগ ? কার বিরুদ্ধে অভিযােগ ? নাহরিন। সম্রাট, বলব,কিন্তু বিচার হবে কি? হারেমহেব। বিচার, বিচার, বিচার,-আমি প্রতিজ্ঞা করছি আমি বিচার করব। এমন কি যদি এই যুবরাজ রামেশিস অপরাধী বলে প্রমাণ হয় তবু তুমি সুবিচার পাবে। বল কি তােমার অভিযােগ ?—কার বিরুদ্ধে তােমার অভিযােগ ? নাহরিন। তবে যা বলেছি তাই আমার অভিযােগ, আর এই যুবরাজ রামেশিসের বিরুদ্ধে আমার অভিযােগ। সামন্দেশ। চুপ কর ঘৃণিতা কুকুরী। এ বিবাহ-সভা, এ বাতুলাগার নয়। সম্রাট, তুমি কি আরও শুনতে চাও? হারেমহেব। বালিকা, তুমি কি বলছ? যুবরাজ রামেশিস অপরাধী? নাহরিন। হাঁ, সম্রাট, আমি সত্য বলছি, ঘুরাজ রামেশিস অপরাধী। আমার—এই দরিদ্র কাফ্রি-বালিকার-শত দুঃখ, শত অশান্তির মধ্যে এতটুকু ক্ষুদ্র সুখ অসহ হয়েছিল কার?-এর। এই পবিত্র কুমারীর শুভ্র অন্তঃকরণে চিরদিনের মত কালী মাখিয়ে দিয়েছে কে। ইনি।

মিসর-কুমারী [ ৪র্থ অ- ৫ম দৃঙ্গ। আমার সুখ-স্বপ্নের মহান স্বৰ্গকে পদদলিত করে এই কোমল বক্ষে নৃশংস ঘাতকের মত ছুরি বসিয়েছে কে?-ইনি। কি সম্রাট, চুপ করে রইলেন যে? আপনি যদি সত্যই ফারাও হারেমহেব হন, তবে আপনার শপথ রক্ষা করুন, সুবিচার করুন। সায়া। এ অসম্ভব, মিথ্যা কথা। কাফ্রিকুমারী, তুমি কি জান না, সম্রাটের সম্মুখে দাড়িয়ে যুববাজের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযােগ করলে কি নাহরিন। জানি—তবু বলছি। সম্রাট-নন্দিনী, আপনার যদি চোখ থাকে দেখুন, যদি কান থাকে শুনুন, যদি হৃদয় থাকে ভাবুন। এক নারীর বিশ্বাস রাখে নি, সে অন্য নারীর বিশ্বাস রাখবে কেন ? যে একের ব্যথা বােঝে নি, অপরের বুঝবে কেন? হারেমহেব। রামেশিস, নতশিরে চুপ করে রইলে যে? এ কথার উত্তরে তােমার কি বলবার আছে বল। নাহরিন। বল—এই আমনদেবের মূর্তির দিকে চেয়ে বল, নিজের বুকে হাত দিয়ে বল, আমার মুখপানে তাকিয়ে বল, তােমার কি বলবার আছে? হারেমহেব। কি, তবু চুপ করে রইলে? রামেশিস, রামেশিস.. তুমি যদি মনে করে থাক যে চুপ করে থেকে আমার বিচার হতে অব্যাহতি পাবে, তবে তুমি ভুল বুঝেছ। সায়া। বল প্রিয়তম, কি এত ভাবছ? বল, বল এ অভিযােগ মিথ্যা। সামন্দেশ। সম্রাট, যুবরাজ ছেলে মানুষ, তােমার ক্রোধ দেখে ভীত হয়েছে, তাই কিছু বলতে পারছে না। তুমি একে আমার কাছে রেখে যাও,-এ আমার কাছে নিশ্চয়ই সত্য কথা বলবে। নাহরিন। কি সম্রাট, বিচার করুন। আপনি শপথ করেছেন, শপথ রক্ষা করুন।

৪র্থ অঙ্ক-৫ম দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী হারেমহেব। রামেশিস, আমার নিকটে এসাে। (রামেশিস আদেশ পালন করিল) রামেশিস, আমি তােমায় এই শেষবার প্রশ্ন করছি, উত্তর দাও। যদি না দাও তবে এই তরবারি দেখছ, এই মুহূর্তে তােমার বুকে অমূল বিদ্ধ হবে। বল, এ বালিকার অভিযােগের বিরুদ্ধে তােমার কি বলবার আছে? কি, তৰু চুপ করে রইলে? তবে রে দুৰ্বত্ত- (সায়া ও নাহরিন ছুটিয়া আসিয়া উভয়ের মধ্যস্থলে দাড়াইল) নাহরিন। সম্রাট, বিচার করুন, হত্যা করবেন না। সায়া। বাবা, বাবা, দয়া করুন, রক্ষা করুন। হারেমহেব। সায়া, যদি এই পামরের জন্য দয়া ভিক্ষা করতে হয়, তবে এই কাফ্রি-বালিকার পায়ে ধরে দয়া ভিক্ষা কর। আমি বুঝেছি এর প্রাণে দয়া আছে। এ যদি ক্ষমা করে তবেই আমি ক্ষমা করব। নইলে আমার ক্ষমা করবার অধিকার নাই। * সামন্দেশ। সম্রাট, তুমি জ্ঞান হারিয়েছ, কি করছ বুঝতে পারছ না। * হারেমহেব। দেখছি তােমরা সকলেই আমার কর্তব্য পথের অন্তরায়। কিন্তু বৃথা চেষ্টা তােমাদের। তােমরা কিছুতেই আমায় বিচলিত করতে পারবে না। আমি সর্বসমক্ষে দেবতার নামে শপথ করেছি। মিসরের ফারাও হারেমহেব কদাচ শপথ ভঙ্গ করে না। রামেশিস, আমি তােমায় আর তিন দিন সময় দিলেম। আজ হতে তৃতীয় দিবসে যদি ধর্মাধিকরণের সমক্ষে তােমার দোষ আলন করতে না পার তবে তােমার প্রাণদণ্ড হবে মনে থাকে যেন। সামন্দেশ। সম্রাট, মিসরেব প্রধান ধর্মাধিকার আমি। আমার সম্মুখে এই অভিযােগের বিচার হবে। তৎপূৰ্বে যুবরাজের মৃত্যুদণ্ড উচ্চারণ করবার তােমার অধিকার নাই। হারেমহেব। উত্তম। কিন্তু প্রভু, স্মরণ রাখবেন বিচারকের চক্ষে ‘মিসরের যুবরাজ আর এক দীন কাফ্রি উভয় সমান। সুতরাং দেবতার

মিসর-কুমারী ( ৪র্থ অঙ্ক-৫ম দৃশ্য।
দিকে চেয়ে ধর্মের দিকে চেয়ে সুবিচার করবেন। রামেশিস, মনে থাকে
যেন আর তিন দিন মাত্র সময়। রক্ষিগণ, এই দুর্বত্তকে বনি করে
কারাগারে নিয়ে যাও।
(দুইজন ক্ষী আদেশ মাত্র উন্মুক্ত তরবারি হস্তে রামেশিসের দুইপার্শ্বে
আসিয়া দাঁড়াইল।)

পঞ্চম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য -নদীতীর। বুলা ও কাকাতুয়া বুলা। আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না কাকাতুয়া। এই এক- খানি ছবির মধ্যে এমন কি আছে, যা দেখে সামলেশ তৎক্ষণাৎ সেই হতভাগ। লক্ষ্মীছাড়াটাকে ছেড়ে দেবে? বাবা তাে তার কত কালের প্যাটা আর তােরঙ্গ খুজে খুজে এই ছবিখানি বার করলেন। কি যত্নেই একে রেখেছিলেন। বাকলের পর বাকল, তারপর পচিশ পরত কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে থেকে যখন একে বার করলেন, আমি মনে করলুম না জানি কি । কাকাতুয়া। তাইতো দিদিমণি, ব্যাপারটা বেশ জমাট বেঁধে উঠছে। কিন্তু বুঝতে বড় একটা আমিও পারছি না। তা বুঝে শুঝে আর কি হবে? বাবা যেমন যেমন বলে দিয়েছেন তেমনি তেমনি করা যাক, পিছে দেখ, লেঙ্গে। ছবিখানা একবার আমার হাতে দাওতাে, একবার কেশ করে হাল মালুম করে নি।-(ছবি লইয়া নিরীক্ষণ করিতে লাগিল ) বুলা। কিন্তু বাবা নিজে এলেন না কেন? এত করে তাকে বললুম, তিনি কিছুতেই গুরু সামলেশের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন না। কেন, সেও তাে একটা মানুষ, ধরে তাে আর আস্তই গিলে ফেলতাে না। না, আমার বাবার উপরও বড় রাগ হচ্ছে। কাকাতুয়া। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ- বুলা। কি রে, হঠাৎ ক্ষেপে গেলি নাকি? কাকাতুয়া। (অঙ্গুলি দ্বারা চিত্রের প্রতি নির্দেশ করিয়া) কৌ অর্থাৎ চেয়ে দেখ। ওঃ এই ভুতুড়ে মাগিটাকে দেখেছ?—কি কালাে।

১০
মিসর-কুমারী ( ৫ম অঙ্ক-১ম দৃশ্য।
আমার চাইতেও কয়েক পোচ বেশী। কিন্তু তার কোলে এই লাল
টুকটুকে ছেলেটা দেখেছ?-ওটা নয়, ওতাে ছেকলে বাঁধা একটা বাঁদর
-এইটেই, দেখেছ ?—যেন একেবারে অমাবস্যায় আকাশে এক
টুকর। চঁাদ। এর মানেটা কি হচ্ছে দিদিমণি? আর এর সঙ্গে গুরু
সামন্দেশের সম্পর্কটাই বা কি?
বুলা। মানে চুলাের ছাই, আর সম্পর্ক ঘােড়ার ডিম। বুড়াে বয়সে
বাবার ভীমরতি ধরেছে। নইলে মানুষ নাকি আবার একটা ছবি দেখে
ভয় পায় ?
কাকাতুয়া। এ মাগীটা দাই কক্ষণাে নয়। তা হলে এমন করে
ছেলের মাথায় হাত বুলােতে পারতনা। নিশ্চয়ই এ ছেলেটার মা।
তাহলে দাঁড়াচ্ছে, কালাে মায়ের গােরা ছেলে। গুরু সামন্দেশের সঙ্গে
সম্পর্ক কি? আঁ, তাই কি? এই যে ছেলেটার কপালে একটা
আঁচিল-বেশ করে মিলিয়ে নিতে হবে। তা যদি হয়, তবে তাে ব্যাস,
কাম ফতে। দিদিমণি, কৌ—অর্থাৎ বুঝে নিয়েছি।
বুলা। কি রে, কি বুঝে নিয়েছিস?
কাকাতুয়া। সে এখন বলবার সময় নাই। তার আসবার সময়
হয়েছে, এখুনি সে সূৰ্য্য প্রণাম করতে আসবে। তুমি সুরু করে দাও।
ওই আসছে—এসে পড়লাে যে। বসে পড়–আঃ সব মাটি করলে-কৌ।
( সামন্দেশের প্রবেশ )
বুলা। লক্ষ্মী আমার, দাদা আমার, ভাই আমার, ছবিখানি দে।
আজকে একদিন না খেলে কিছু এসে যাবে না, এমন তাে কতদিন না
খেয়ে কেটে গেছে, তবু তাে আমরা আজও বেঁচে আছি। কিন্তু ও ছবি
গেলে, যার জন্য আমরা এত কষ্ট করে এতদূর এসেছি, তার কিনারা হবে
।
সামন্দেশ। কতকাল-আরাে কতকাল দুনিয়ায় বেঁচে
বেঁচে থাকতে
হবে। আশা নাই, সুখ নাই, শান্তি নাই—আছে শুধু একটা শঙ্কা-এই

৫ম অঙ্ক-১ম দৃশ্য।] মিসর-কুমারী নিয়ে তবু আমায় দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে হবে। পিতার গণনা অভ্রান্ত। তিনি বলেছিলেন অশীতিবর্ষ বয়সে আমার ছদ্মবেশ মােচন হবে. স্বরূপ প্রকাশিত হবে। এতদিন একথার অর্থ বুঝতে পারি নি, কিন্তু এখন বুঝছি। যত দিন যাচ্ছে ততই একথার অর্থ পরিস্ফুট হয়ে উঠছে। কে কোথা হতে এসে আমার জন্মবৃত্তান্ত, আমার কলঙ্ক-কাহিনী প্রকাশ করে দিয়ে আমায় গৌরবের সর্বোচ্চ শিখর হতে নরকের অন্ধকারাময় গহ্বরে নিক্ষেপ করবে।-কে সে? আমার এমন মর্মান্তিক শত্রু কে আছে? তার কথা কে বিশ্বাস করবে? তার একমাত্র প্রমাণ সেই মূক চিত্র। তা কি আজও তেমনি উজ্জ্বল আছে, না কালের অমােঘ তুলিকাপাতে তার কালিমা রেখা মুছে গেছে ? কাকাতুয়া। ঠিক হয়েছে—আঁচিলটি ঠিক জায়গায় আছে। যায় কোথা? কৌ1-ওরে পােড়ামুখী, আজ যদি না খেয়ে মরি, তবে কাল এ ছবি কার হাতে গেল না গেল তাতে আমাদের কি বয়ে গেল। দে আমায় ছবি, বাজারে গিয়ে বেচে আসি। দু’চার পয়সা যা পাই, আজ তাে খেয়ে বাচি-কাল তখন কিছু পাই, না হয় আবার গিয়ে কিনে নিয়ে আসব। » সামনেশ। কারা এরা? কি এ ছবি? এ কি, আমার বুকের ভিতর সহসা এমন করে উঠল কেন ? না, দেখতে হল। বালিকা, তােমার হাতে ও ছবিখানি কি? একবার দেখতে পাই কি? বুলা। হা, কিন্তু দুর থেকে। কারু হাতে আমি এ ছবি এক মুহূর্তের জন্যও দিতে পারব না। এই দেখা- সামলেশ। সেই চিত্র আজও তেমনি উজ্জ্বল রয়েছে। দেবতা জুটিয়ে দিয়েছেন। যখন একবার সন্ধান পেয়েছি, তখন আর ছাড়া হবে । আঃ বাঁচলেম। বালিকা, ছবিখানি আমাকে দাও, আমি তােমাদের প্রচুর পুরস্কার দেব। কাকাতুয়া। (স্বগত)-এই যে ওষুধ ধরেছে।-(প্রকাশ্যে )

যত টাকা,
মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক-১ম দৃশ্য।
এই, দিয়ে ফেল ছবিখানা। দিবি না? না, তুই ভাল কথার লােক
নােস— ছিনাইয়া আনিতে গেল )-
বুলা। (চীৎকার করিয়া)-ওগাে দোহাই তােমাদের, আমার
ছবিখানি নিও না। আমি দেব না, আমি কিছুতেই দেব না, প্রাণ গেলেও
না-(কাকাতুয়ার হাত কামড়াইয়া দিল )-
কাকাতুয়া। উঃ হুঃ হু। রাক্ষুসীর সঁতে যেন কেউটের বিষ।
সামলেশ। বালিকা, তুমি এ ছবির বিনিময়ে কি চাও?
চাও আমি তােমায় দেব। বল, তুমি কত টাকা চাও ?
বুলা। লাখ টাকা দিলেও না।
সামন্দেশ। বেশ, আমি দু’লাখ দিচ্ছি।
বুলা। দশ লাখেও না-ক্রোড় টাকাতেও না, টাকা দিয়ে এ ছবি
দুনিয়ায় কেউ কিনতে পারবে না।
সামলেশ। তবে?
কাকাতুয়া। ওরে হতভাগী মুখপুড়, এখনাে দিয়ে ফেল। লাখ টাকা
কি মুখের কথা? হাজার গণ্ডায় এক লাখ হয়,-একদিনে আমরা বড়
লােক হয়ে যাব। কি হবে ও ছাই ছবি নিয়ে। আমি তাে ও রকম
হৰি পাঁচ পয়সা দিয়েও কিনি না ।
সামন্দেশ। বালিকা, বল কি হলে তুমি ও ছবি দেবে?
কাকাতুয়া। মশাই, আপনি ও পাগলীর সঙ্গে আর মিছে বকে বকে
মেজাজ খারাপ করবেন না। আপনি আমার সঙ্গে বাজারে চলুন, আমি
ওর চেয়ে ঢের ভাল ছবি পাচ সিকেয় কিনে দিচ্ছি।
সামন্দেশ। চুপ কর। বালিকা, বল তুমি ও ছবির বিনিময়ে কি চাও?
বুলা। আমি চাই—আমার একজন বড় আপনার জন হারিয়ে
গেছে, সে এই শহরের দিকে এসে ছিল আর ফিরে যায় নি। আপনি
দয়া করে এই ছবিখানির বদলে তাকে খুজে এনে দিল। আমি শুনেছি
পৃথিবীতে এমন একজন আছে, যার এ ছবিখানি ভারি দরকার। আপনি

০৭:
মে অ-১ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী
যদি সেই লােক হন, তবে দয়া করে আমার এ উপকার করুন।
যদি আপনি যে লােক না হন, তবে নিজের কাজে যান,-আপনি এ ছবি
কিনতে পারবেন না।
সামনেশ। আশ্চৰ্য্য। বালিকা, এ কথা তােমায় কে বল্পে?
বুলা। আমার বাবা বলেছেন। তিনি যে সওদাগরের কাছে এ
ছবি কিনেছিলেন সে তাকে বলে দিয়েছিল।
সামন্দেশ। সওদাগর ? সওদাগর ? সে কোথায় থাকে ।
বুলা। জানি না। তবে শুনেছি অনেকদিন আগে সিরিয়া দেশে
তার সঙ্গে বাবার দেখা হয়েছিল।
সামলেশ। তােমার বাবা কোথায় ?
বুলা। তিনি রুগ্ন, বাড়ীতেই আছেন।
সামলেশ। দেখতে হল, খুজে দেখতে হল। সমগ্র সিরিয়া পাতি
পাতি করে খুঁজে দেখব সে আজো বেঁচে আছি কি না। বালিকা, আমি
সেই লােক যার এ ছবিখানি দরকার। বল তুমি কাকে হারিয়েছ, তার
নাম কি, আমি খুজে দেখি যদি তাকে কোথাও পাই।
বুলা। তার নাম পাবে।
সামনেশ। খারেব ?-কাফ্রি খারেব ?
বুলা। হাঁ সেই।
সামন্দেশ। বালিকা, সে আমার কাছেই আছে। তােমরা আমার
সঙ্গে চল, আমি তােমার কথিত মূল্যেই এ ছবি কিনব। তােমার হাতে
বারেবকে সমর্পণ করে এ চিত্র আমি গ্রহণ করব।
সত্য বলছেন ?—মহাশয়, আপনার বড় দয়া। দেবতা
আপনাকে আরাে অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখুন, যেন আপনি আমার মত
অনেক ভিখারিণীর প্রাণ বাঁচাতে পারেন।
কাকাতুয়া। (জনাস্তিকে) কৌ।
( সকলের প্রস্থান )
বুলা।

০৮ মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক,২য় দৃশ্য। দ্বিতীয় দৃশ্য—আবনের পরিত্যক্ত গৃহের সন্নিকটস্থ পার্বত্য- ভূমি—পশ্চাতে ক্ষুদ্র নদী বহিয়া যাইতেছে। নাহরিন। এই খানে-এই খানে সেদিন আমার কাফ্রি-জীবনের প্রথম সুপ্রভাত হয়েছিল, আমার জন্মজন্মান্তরের আরাধ্য দেবতা মেঘান্তে নবশারদপ্রভাতের রাঙ্গা রবির মত নবাগে রঞ্জিত এক নূতন ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার সম্মুখে এসে দাড়িয়েছিলেন। এখনাে যেন স্পষ্ট দেখছি এইখানে আমি মৃদুমলয়-তাড়িতা বল্লরীর মত নবযৌবন-ভরে মৃদু মৃদু কাঁপছিলেম, আর তিনি করে কর ধরে একদৃষ্টে আমার মুখপানে তাকিয়ে বলছিলেন -“ভালবাসি ভালবাসি ভালবাসি’-যেন একটা স্বপ্ন আজ ভেঙ্গে গেছে। যাক, তবু এই আমার স্বর্গ। শুনেছি মরুভূমির মরীচিকা-ভ্রান্ত পথিক মৃত্যুকাল উপস্থিত হলে ঘুরতে ঘুরতে তার ভ্রান্তির প্রথম স্থানে ফিরে আসে। আমিও আজ তেমনি এইখানে এসেছি। আমার মরবার সময় হয়েছে, তাই এই ভূমির একটা মাদক আহবান আমার প্রাণের ভিতর প্রতিধ্বনিত হয়ে আমায় চুম্বকের মত এইখানে টেনে এনেছে। রামেশিস। রামেশিস। জানিনা তুমি নাহরিনকে আজ কি মনে করছ। যাই মনে কর, কিছু আসে যায় না। কাল প্রকাশ্য বিচারালয়ে যখন তােমার বিরুদ্ধে অভিযােগ করতে কেউ বেঁচে থাকবে না, যখন নির্লজ্জার মত কেউ চিৎকার করে বলবে না—'সম্রাট, বিচার কর, বিচার কর’-তখন বুঝি তুমি আমায় ঠিক চিনবে। তখন বুঝবে আমি তােমায় কত ভালবাসি। তখন প্রিয়তম, একবার এসে এইখানে দাড়িও, এই ভূমির উপর পা রেখে আকাশকে সম্বোধন করে তারস্বরে বলে ‘নাহরিন। আমি তােমায় ভালবাসি’—শুধু একবার—তাতেই আমি তৃপ্তিলাভ করব-আমার ব্যাকুল আত্মা শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। আর কেন?-এইবার সব শেষ হােক। বাবা। আমি তােমার অভাগিনী ৫ম অঙ্ক,-২য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী । কন্যা, তােমায় রক্ষা করতে পারলেন না। আমার বুক ভেঙ্গে গেছে, এ ভগ্ন প্রাণে আর শক্তি নাই। আমায় ক্ষমা কর বাবা, আমি যাই- (নাহরিন জলে ঝম্পপ্রদান করিতে উদ্যত হইল-সায়ার প্রবেশ) সায়া। নাহরিন, নাহরিন-একি। (হাত ধরিয়া নিরস্ত করিল )। নাহরিন। কে তুমি?—কে তুমি এমন করে পিছু ডেকে আমায় পথ ভুলিয়ে দিলে? সায়া। নাহরিন, আমি তােমার কাছে এসেছি, একটা কথা বলতে এসেছি। নাহরিন। তুমি ।-সম্রাটনন্দিনী সায়া তুমি আমার কাছে একটা কথা বলতে এসেছ । সায়া। নাহরিন, তুমি মরতে যাচ্ছিলে কেন? নাহরিন। সে কথায় তােমার প্রয়ােজন কি? আমি মরতে যাচ্ছি-- লুম কেন তা শুধু আমি জানি। আর কে তা জানৰে কেই বা বুঝবে? যাক তুমি কি বলতে আমার কাছে এসেছিলে তাই বল, আমার বেশী অবকাশ নাই। সায়া। নাহরিন, তুমি যুবরাজকে ক্ষমা কর, তাঁর নামে তুমি যে অভিযােগ করেছ তা প্রত্যাহার কর,তাকে বাঁচতে দাও। নাহরিন। এই কথা ? এই কথা বলতে তুমি আমার কাছে এসেছ? কি প্রয়ােজন ছিল তােমার এত কষ্ট করে খুজে খুজে আমার কাছে আসবার ? এই তত আমি তার উপায় করতে যাচ্ছিলেন, এই বক্ষপিঞ্জর হতে অবরুদ্ধ প্রণবায়ুকে ঝড়ের মত বুছিয়ে দিয়ে, তার পথের ধুলি কঁকরকে উড়িয়ে দিতে যাচ্ছিলেমjতুমি এসেই তাে সব গুলিয়ে, দিলে। সায়া। সে কি। সে যে আত্মহত্যা। নাহরিন। হত্যা নয়, বলি। একে আত্মহত্যা একে আত্মহত্যা ল সম্রাট-কন্যা? ওই আকাশের দিকে চেয়ে দেখ, দিবাশেষ শান্ত সৰিতা পাটে বসেছে- মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক-২য় দৃশ্য। কি গাঢ় রক্তিম রাগ সে প্রতীচির উন্নত সীমন্তে পরিয়ে দিয়েছে } ঐ সূৰ্য্য ডুবে গেলে অমন সুন্দর মুখখানি ম্লান হয়ে যাবে, এই দুঃখে কমলিনী যদি নিজের বুক চিরে রক্ত দিয়ে তার ললাটখানি রাঙ্গা করে রাখতে চায়, তাকে তুমি আত্মহত্যা বলাে না সম্রাট-কন্যা। সায়া। কিন্তু, কিন্তু আমি এ যে বুঝতে পারছি না—তুমি বুজকে এত ভালবাস, অথচ তার বিরুদ্ধে এই অভিযােগ করেছ? নাহরিন। আমার অবস্থা তুমি কেমন করে বুঝবে? এ আমি তােমায় বােঝাতে পারব না,-আমি নিজেকেই ভাল করে বােকাতে পারিনি, তবে এটুকু স্থির বুঝেছি যে, আমি না মরলে যুবরাজের প্রাণ রক্ষা হবে না। সায়া। কেন, তুমি তাকে ক্ষমা করবে। কাল ধর্মাধিকরণের সম্মুখে দাড়িয়ে মুক্তকণ্ঠে বলবে তার বিরুদ্ধে তোমার কোন অভিযােগ নাই। নাহরিন। না, আমি তা পারব না। তার চেয়ে এ টের সােজ।। আমি মন ঠিক করেছি। তুমি যাও সম্রাট-কন্যা আমায় মরতে দাও, এখানে আর মুহূর্তমাত্ৰ বিলম্ব করে না। সায়া। না, আমি কিছুতেই তােমায় একলা ফেলে যাব না—তােমায় মরতে দেব না। নাহরিন। তবে আমার দোষ নাই। আমি তােমায় এই শেষবার বলছি, হয় তুমি এই মুহূর্তে এই স্থান পরিত্যাগ করবে নতুবা যুবরাজের উষ্ণ শােণিতে কাল বধ্যভূমি রঞ্জিত হবে। মনে রেখে এ বাতুলের প্রলাপ নয় - যা আমার ভাগ্যে হয় নি, তা তােমারও ভাগ্যে হবে না। সায়া। বিষম সমস্যা। একদিকে মিসরের ভবিষ্যৎ ফারাও, আমার ইহপরকাল রামেশিস, অন্যদিকে এই প্রাণময়ী কাফ্রি-বালিকা। আমি যদি এখান থেকে চলে যাই তবে এ আত্মহত্যা করবে,-যদি না যাই তবে সে প্রাণ দেবে। এখন আমি কি করি? কিছুই বুঝতে পারছি না।

•ম অঞ্চ-২য় দৃশ্য। মিসর-কুমারী কে আমায় বলে দেবে এখন আমার কর্তব্য কি? ইষ্টদেব। তুমি স্বর্গ হতে আমায় বলে দাও এখন আমি কি করব? নাহরিন। কি, এখনাে দাড়িয়ে রইলে? আর এক মুহূর্ত মাত্র সময়ের মধ্যে বেছে নাও যাবে কি থাকবে—যুবরাজ রামেশিস মরবে, কি কাফ্রি-কন্যা নাহরিন মরবে? তবু পঁড়িয়ে রইলে? তবে থাক, আমি চল্লম। কাল যুবরাজ রামেশিস মরবে, কিন্তু সে দোষ আমার নয়, সে পাপ তােমার। ( নাহরিন চলিয়া যাইতেছিল—সায়া ডাকিল ) , সায়া। নাহরিন, নাহরিন, যেও না, একটা কথা শােন। ধারণ পূৰ্ব্বক ) নাহরিন, দয়া কর, যুবরাজকে ক্ষমা কর, তার প্রাণভিক্ষা দাও। নাহরিন। দয়া, ক্ষমা, প্রাণভিক্ষা-এ সব কি তােমরা আমার কাছে গচ্ছিত রেখেছ ? না আমি দিতে পারব না। এ সব আমার কাছে নাই। আমি দীন হীন কাঙ্গালিনী, মিসরের উচ্ছিষ্টভােজী কুর-শাবক। এ সব বড় বড় দামী জিনিস আমি কোথায় পাব? (তুমি মিসরের রাজ- কন্যা, তােমার প্রাসাদে খোঁজ, তােমার অসংখ্য মণিমাণিক্য খচিত রত্নালঙ্কারের মধ্যে খোজ,হয়তাে এসব জিনিস পেলেও পেতে পার আমার ঘরে, দীন কাফ্রির ঘরে এসব কেউ কখনাে খোঁজে নি, দেখে নি, পায় নি। তুমিও চেয়াে না, পাবে না। (নাহরিন প্রস্থানােতা সায়া তাহার পদতলে পড়িয়া গতিরােধ করিল) সায়া। কেন পাব না বহিন ? আমি যে তােমার ছােট বােন। তােমার স্নেহ, তােমার দয়া, তােমার ভালবাসা, এ যে তােমার কাছে আমার প্রাপ্য। এ হতে তুমি আমায় বঞ্চিত করতে চাও? নাহরিন। দেবী। দিদি আমার। তােমার মত বড় বােনের আশ্রয়ে এসে ছােট বােনটি তােমার ক্ষুগ্নমনে ফিরে যাবে? একটা আব্দার করে তা পাবে না। এতো রীতি নয়। তােমায় দিতে হবে। বল দে?

মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক-৩য় দৃশ্য। নাহরিন। আর পারলেন না। আমার সঙ্কল্প বানের জলে কুটোর মত ভেসে গেল। রাজকুমারী, ওঠ। আমি তােমার কাছে পরাজয় স্বকার করছি। দেবতা তােমার স্বামীকে চিরজীবি করুন। তাকে বলল, নাহরিনের প্রাণের বাধন ছিড়ে গেছে। আর সায়া। আর কি বহিন ? নাহরিন। আর পার যদি, আমার বাবাকে রক্ষা করে। তিনি রাজাদেশে বন্দী হয়েছেন। তােমার পিতার কাছে তার প্রাণভিক্ষা মেগে নিও। সায়। তুমি নিশ্চিন্ত হও, আমি তার প্রাণরক্ষার ভার গ্রহণ করলে। তৃতীয় দৃশ্য কারাগৃহের কক্ষ। পারেব নিমীলিত নয়নে ভূমিতলে উপবিষ্ট। ( সামন্দেশ ও বালকবেশধারিণী বুলার প্রবেশ)। সামন্দেশ। আমি এর প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেম, কাল প্রভাতে এর জীবলীলা শেষ হত। দেবতার ইচ্ছা অন্যরূপ, তাই তুমি এসে মাঝ- খানে দাড়ালে। এ এখন তােমার—তুমি একে নিয়ে যা খুশি করতে পার। ( সামন্দেশের প্রস্থান) খায়েব। কোথায় ছুটে চলেছ উন্মাদিনী ? আলুথালু কেশ, আলুথালু কেশ, প্রােজ্জ্বল নয়নে স্নেহের দীপ্ত হতাশন জেগে উঠেছে, কণ্ঠে ভাষা নাই, দেহে অনুভূতি নাই, হৃদয়ে স্পন্দন নাই, শুধু এক জাগ্রত মহাস্বপ্নের ব্যানে তন্ময় হয়ে ছুটে চলেছ। একটু দাড়াও, একবার ফিরে চাও, একবার প্রাণ ভরে দেখে নি, জীবন সফল করে নি’-- বুলা। খালেব। খারেব-

৫ম অঞ্চ,-৩য় দৃশ্য। 'মিসর-কুমারী
খারেব। আর কতদূর যাবে? আমি যে তােমার বহু পশ্চাতে পড়ে
আছি। নাগাল পাব না তা জানি, তৰ দৃষ্টির বাইরে চলে যাও কেন?
দয়া কর দেবী, একটু দাড়াও
বুলা। খারেব, খারেব, কার ধ্যানে
ডুবে রয়েছ ?-কে সে
দেবী।
খারে। আজ নয়তাে আর কবে হবে? আর তাে সময় নাই।
আমার যে খেলা ফুরুলকাল প্রভাতে এই দেহ ধূলায় লুটাবে, এ প্রাণ
কোথায় থাকবে তাতাে জানি না।
ৰূল। খারেব। খারেব।-(পশ্চাৎ হইতে ধাক্কা দিল)
বারেব। কে তুমি? কি চাও? আমি বেশ আছি, আমায় বিরক্ত
করাে না। যাও।
বুলা। আমি তােমার কারারক্ষক। কাল প্রভাতে গুরু সামলেশের
আদেশে তােমার প্রাণদণ্ড হবে। আমি জানতে এসেছি আজ তােমার
কিছু বলবার আছে কিনা। যদি কিছু প্রার্থনীয় থাকে আমায় বল, আমি
তা পূর্ণ করতে চেষ্টা করব।
খারেব। তুমি ?—আমার কারা-ক্ষক?—তুমি আমার প্রার্থনা পূর্ণ
করবে?
বুলা। হ্যা, আশ্চর্য হচ্ছ যে?
খারেব। না, কিছু না। কর ভাই, আমার প্রার্থনা পূর্ণ কর—আমার
দেবী দর্শন করাও-মরবার আগে তাঁর চরণে বর মেগে নি, যেন আবার
আমি মানুষ হয়ে জন্মাই, যেন পরজন্মে তার দেখা পাই, যেন তার সেবা
করতে পাই।
বুলা। দুত্তোর তাের দেবী। বলি কপচাচ্ছ তাে খুব। একবার
তােমার দেবীর ঠিকানাটা আমায় দিতে পার, তার নাক কান কেটে খেংরা
মারতে মারতে দেশের বার করে দি।

১৪ মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক,-৩য় দৃশ্য। খারেব। (লম্ফ দিয়া উঠিয়া ৰুলার কণ্ঠ চাপিয়া ধরিল)—তবে রে বর্বর, বুলা। আহা, ছাড়ছাড়বড় লাগছে—ছড়-আমি—ওগাে আমি- খারেব। কে তুই?-(সহসা বুলার বেশ পরিবর্তন)-একি, ইন্দ্রজাল না স্বপ্ন ?-লা? বুলা। আর সােহাগে কাজ কি? আমি তাে আর দেবী নই যে তােমার পশুত্বটাকে বেমালুম হজম করে ফেলব। মরণদশা আমার যে তােমার পশুত্বটাকে বেমালুম হজম করে ফেলব। মরণ-দশা আমার যে তােমার মত কাটখােট্টার সঙ্গে পীরিত করতে গেছি। খারে। আমি না জেনে অপরাধ করেছি, আমায় ক্ষমা কর। আমি তাে চলেছি, আর রাগ কেন? তুমি আমায় ক্ষমা কর, আর আমার হয়ে বাবাকে বলল- বুলা। ওঃ, চলেছেন ?-তল্পিতল্পা বেঁধে কোথায় চলেছেন আপনি? চলাটা যেন অমনি পড়ে রয়েছে আর কি? খারেব। তুমি তাে জাননা, গুরু সামন্দেশ আমার প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। কাল প্রভাতে- বুলা। আর কাল প্রভাতে নয়, রাজ রাত্রিতেই। তােমার প্রাণটা নেবার ভার আমার উপর পড়েছে কি না, তাই আমি আসুন আসতে আজ্ঞা হােক’ করতে এসেছি। কাকাতুয়া। (আলোেক-হস্তে কাকাতুয়ার প্রবেশ) কাকাতুয়া। কৌ। বুলা। বেঁধে নিয়ে চলতাে। ওকি, তাের হাতে যে আবার একটা আলাে। আঃ মলাে যা, বাঁধবি কি করে? কাকাতুয়া। আলাে নইলে প্রাণদণ্ড হবে কি করে? অন্ধকারে গলায় ফাসি পরাতে গিয়ে যদি পা দুখানি জড়িয়ে ধর?

ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য।] মিসর-কুমারী
বুল। (চড় মারিতে গেল-কাকাতুয়া চড় এড়াইয়া সরিয়া
দাড়াইল)-তবে রে মুখপােড়া,-নে মস্করা করতে হবে না। চল,
আলাে দেখা। (খারেবের প্রতি)-চল হে চল, তােমার প্রাণদণ্ডের
সময় হয়েছে।
খারেব। তুমি কি বলছ ?-আমি যে বুঝতে পারছি না।
ধুলা। আহা চল না-(গলাধাক্কা)-আর বুঝে কাজ কি?
চল না।
( সকলের প্রস্থান)
চতুর্থ দৃশ্য—বিচারালয়।
বিচারকের আসনে সামন্দেশ—একপার্শ্বে নাহরিন দণ্ডায়মান-অপরপার্শে
রামেশিস উপবিষ্ট-রক্ষীগণ যথাস্থানে দণ্ডায়মান।
সামন্দেশ। নাহরিন, সম্রাট তােমার পিতাকে ক্ষমা করেছেন।
(শৃঙ্খলাবদ্ধ আবনকে লইয়া জনৈক রক্ষীর প্রবেশ)-রক্ষী, এর শৃঙ্খল
মােচর করে দাও- রক্ষী আদেশ পালন )—আবন, তুমি মুক্ত। সম্রাট
তােমাকে এবং তােমার সঙ্গীগণকে ক্ষমা করেছেন।
নাহরিন। সম্রাটের জয় হােক, দেবতা তাকে দীর্ঘজীবী করুন।
(আবন নাহরিনের পাশে আসিয়া দাড়াইল)
আবন। নাহরিন, আমি বুঝতে পারছি না, তুই কি আমাদের উদ্ধার
সাধন করেছিল?
নাহরিন। দেবতা করেছেন বাবা।
Y সামন্দেশ। নাহরিন, এইবার তােনার অভিযােগের বিচার হবে।
নাহরিন। প্রভু, আমি আমার অভিযােগ প্রত্যাহার করছি।
আপনার জয় জয়কার হােক, সম্রাটের গৌরব বর্ধিত হােক, যুবরাজ
দীর্ঘজীবী হােন, আমার কোন অভিযােগ নাই।

মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক-৪র্থ দৃশ্য।
আবন। কিসের অভিযােগ নাহরিন, কিসের প্রত্যাহার । আমি
যে কিছুই বুঝতে পারছি না।
নাহরিন। বাবা, আমি সম্রাটের কাছে যুবরাজের বিরুদ্ধে অভিযােগ
করেছিলাম-মুখ নত করিয়া নখ খুটিতে লাগিল)
আবন। বুঝেছি-কিন্তু এখন তুই এ কি বলছিস ?
সামনেশ। নাহরিন, বেশ করে ভেবে বল, তুমি কি সত্যই তােমার
অভিযােগ প্রত্যাহার করছ ? কোন সন্দেহ নাই? এ ধর্মাধিকরণ
এখানে যা তা বলা চলে না। যা বলবার ধীর চিত্তে ভেবে বল।
আবন। নাহরিন, নাছরিন, এখনাে সময় আছে, এখনাে বুঝে দেখ।
আমার বােধ হয় তাের মতিভ্রম ঘটেছে, যা বলছিস তার অর্থবােধ করতে
পারছি না।
নাহরিন। আমি সত্যই যুবরাজের বিরুদ্ধে আমার অভিযােগ প্রত্যাহার
করছি, কোন সন্দেহ নাই।
wYন
আবন। হায়, “তােকে নিয়ে আমি কি করব। কি জানি কে তােকে
যাদু করেছে, দুই একেবার নিজের সর্বনাশে বদ্ধপরিকর হয়েছিল
বিচারপতি, আমার কন্যা অসুস্থ। এর মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছে। এর
কথা গ্রাহ নয়। এর হয়ে আমি বলছি, যুবরাজ অপরাধী। তঁার যদি
নিজ পক্ষ সমর্থনে কিছু বলবার থাকে তিনি বলুন, নিজের নির্দোষিতা
প্রমাণ করুন।
সামন্দেশ। নাহরিন, আমার কথার উত্তর দাও।
নাহরিন। বিচারপতি, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। আমার মস্তিষ্কের কোন
বিকার ঘটেনি। আমি আমার অভিযােগ প্রত্যাহার করছি।
সামলেশ। তবে তুমি বলতে চাও যুবরাজ নিরপরাধ?
নাহরিন। আমি আমার অভিযােগ প্রত্যাহার করছি,এতে আপনি
ৰা বুবুন, আমার আপত্তি নাই।

এম অৰু-৪র্থ দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী (সামন্দেশ এক মনে কি লিখিতে লাগিলেন) আবন। নাহরিন, বুঝলেম তাের উদ্ধার সাধন দেবতারও দুঃসাধ্য। আমার নিজের জন্য আমার দুঃখ নেই, দুঃখ তাের জন্য। এই যে তুই বুদ্ধিমতী হয়েও..নিজের-দে- নিজে গলা বাড়িয়ে-ছিলি, আজ বুঝলেম, দেবতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানুষের চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। নাহরিন। বাবা, বাবা, সমগ্র পৃথিবী আমায় ত্যাগ করে করুক, বিশ্বজগৎ আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াক, তবু তুমি আমার উপর রাগ করাে না, তুমি আমায় ত্যাগ করাে না। সামলেশ। নাহরিন, আমি তােমায় সম্রাটের সমক্ষে যুবরাজের নামে মিথ্যা অভিযােগ করবার অপরাধে অভিযুক্ত করছি। আর আবন, এর সমর্থন করেছ, তুমিও অপরাধী। তুমি রাজাদেশে মুক্ত হলেও আমি তােমাকে পুনরায় অভিযুক্ত করছি। তােমাদের অপরাধ যেমন গুরুতর, আমার বিচারে তােমাদের দণ্ডও তেমনি গুরুতর হবে। তােমরা মহামান্য ফারাওয়ের সামান্য কাফ্রি-প্রজা হয়ে তার ভ্রাতুস্পুত্র যুবরাজ রামেশিসের জীবনের প্রতি হিংসা করেছ, ধৰ্ম্মাধিকরণের সমক্ষে মিথ্যা বলেছ। এই অপরাধে তােমাদের উভয়কে জীবন্ত তপ্ততৈল-কটাহে নিক্ষেপ করা হবে। রামেশিস। না, না প্রভু, আমি অপরাধী। আমি অপরাধ স্বীকার করছি। সামন্দেশ। যুবরাজ তুমি মুক্ত। তুমি এই মুহূর্তে এইস্থান ত্যাগ করতে পার। নাহরিন। না, না অপরাধ আমি করেছি, আমার শান্তি হােক। আমার পিতা সম্পূর্ণ নিরপরাধ, তাকে কেন দণ্ড দেবে? রামেশিস। ও কি সর্বনাশ করেছি। আমিই এদের মৃত্যুর কারণ। পাপের বােঝা আমার মাথায় এসে পড়ছে। নিরপরাধিনী ১৮ মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক,-৪র্থ দৃশ্য। সরলা বালিকা এই আইনের কুট তর্ক কি বুঝবে? ধৰ্মতঃ আমিই এর বামী। আমি কেন একে সময় থাকতে সতর্ক করে দিলাম না? প্রভু, সামন্দেশ। যুবরাজ, তুমি কি আমার আদেশ শুনতে পাওনি ? তুমি মুক্ত, ইচ্ছা করলে এস্থান ত্যাগ করতে পার কিম্বা এখানে থাকতে পার। কিন্তু সাবধান""তুমি যদি অসংযত ভাবে কথা কও, তবে আমি তােমাকে বিচারালয় ত্যাগ করতে বাধ্য করব। আবন। সামন্দেশ, আমি কখনাে তােমার কাছে দয়া ভিক্ষা করিনি, দয়ার প্রত্যাশাও করিনি। আজ এই বৃদ্ধ বয়সে প্রথমবার এই পক্ককেশ- যুক্ত শির তােমার কাছে নত করছি। সামনেশ, দয়া করে আমায় শাস্তি দাও, এ অবােধ বালিকাকে ক্ষমা কর। এ বালিকা, এর প্রতি নির্ণয় হয়াে না, মনে রেখ একদিন দয়ার প্রয়ােজন তােমারও হবে। সামন্দেশ। আজ এ বালিকা। সেদিন যখন দেবতার সমক্ষে, সম্রাটের সমক্ষে, সমগ্র মিসরের সমক্ষে নির্লজ্জার মত নিজের মিথ্যা কল রচনা করেছিল, তখন এ বৃদ্ধা ছিল। আজ তুমি দয়া ভিক্ষা করছ, কিন্তু ভেবে দেখ দেখি এর অভিযােগ প্রমাণ হলে যুবরাজের কি শান্তি হত। নাহরিন। বিচারপতি, আবনের কন্যা নাহরিন কলঙ্কিনী নয়। কিন্তু সে কথা তােমায় বলে ফল নাই। তুমি বৃদ্ধ, শত নিদাঘের অনল ধারায় তােমার কেশ শুরু হয়েছে, তেমার বক্ষঃ-বিলম্বিত শ তােমার পরিণত বয়সের পরিচয় প্রদান করছে তুমি বার্ধক্যের সম্মান কর, আমার পিতাকে তুমি বাঁচাও। নাহরিন তােমার আদেশে হাসি মুখে ভৗষ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে; মৃত্যুকালে দেবতার কাছে তােমার ইহ-পরকালের মঙ্গল প্রার্থনা করবে। সামনেশ। তােমরা বৃথা পরস্পরের জন্য দয়া ভিক্ষা করছ। মিসরে কাঞ্জির জন্য দয়া এত সুলভ নয়। তােমাদের উভয়কে শান্তি গ্রহণ করতে ম অঙ্ক-৪র্থ দৃশ্য। মির-কুমারী হবে। আমি নিজে দাড়িয়ে থেকে তােমাদের উভয়কে দণ্ড প্রদান করব, —যেন কোন সন্দেহ না থাকে। নাহরিন। না না, এত নিষ্ঠুর তুমি হতে পারবে না। তুমি বিচারক হলেও রক্তমাংসের মানুষ তাে বটে। তােমার প্রাণে একবারে দয়া নাই এ কখনও সম্ভব নয়। দেখ, সিংহের চেয়ে শশাণিতলােলুপ নির্দয় পশু পৃথিবীতে আর নাই। তারাও শিকারকে বৃদ্ধ, দুৰ্বল কিম্বা রুগ্ন দেখলে দয়া করে পরিত্যাগ করে। তুমি কি তাও করবে না? পাহাড়ের গায়েও ঝর্ণা থাকে, মরুভূমির বুকেও ওয়েশিস থাকে, তােমার বুকে দয়া নাই এ হতে পারে না। ভেবে দেখ, তােমার যদি এমনি একটা মেয়ে থাকত, সে যদি তােমার জন্য অপরের পায়ে এমনি করে মাথা খুড়ত, তােমায় বাঁচাবার জন্য এমনি আকুলি বিকুলি করত, তবে সে যতই নিষ্ঠুর হােক, সে কি দয়া না করে থাকতে পারত? তবে তুমি কেন দয়া করবে না? সামলেশ। আমার মেয়ে—আমার মেয়ে -না না, আমি এ কি বলছি। নাহরিন, আমার মেয়ে নেই, ছেলে নেই, কেউ নেই,আমার দয়ামায়াও নেই। আমি জানি না, আমার মেয়ে থাকলে সে এমন অবস্থায় আমার জন্য কি করত, তার প্রাণের ভিতর কি হত। আমি সিংহের চেয়েও নির্দয়, সর্পের চেয়ে কুর, মরুভূমির চেয়েও নীরস, পাহাড়ের চেয়েও কঠিন। আমার কাছে দয়ার প্রত্যাশা করাে না, পাবে না। যার নিজের মেয়ে নাই সে অপরের মেয়ের ব্যথা কেমন করে বুঝবে? আমি দয়া করব না। নাহরিন। করবে না? বেশ। এই আমি তােমার পায়ের তলায় পড়ে রইলু, তােমার পা দুখানি আমার বুকের ভিতর জড়িয়ে ধরে মাখলুম, দেখি কেমন করে তুমি দয়া না করে থাকতে পার। দেখি কেমন করে তুমি আমায় প্রত্যাখ্যান কর। সামন্দেশ। আৰন, তােমার কন্যাকে তুলে নাও,-এই মুহূর্তে তুলে না।

।
মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক-৪র্থ দৃশ্য
আকন। (নাহরিনকে তুলিয়া) নাহরিন, ওঠ। এ মরুভূমিতে
ওয়েশিস নাই, এখানে জল চাইলে কোথায় পাবি? বৃথা চেয়েকে
দুর্বলতা প্রকাশ করি? ***
নাহরিন। বাবা, আমিই তােমার দুর্দশার কারণ
( আবনের বক্ষে লুটাইয়া পড়িয়া কাদিতে লাগিল-আবন তাহার
মন্ডকে হাত বুলাইতে লাগিল)
রামেশিস। প্রভু, আমি মিসরের ভাবী ফারাও, আপনার কাছে এদের
জীবন ভিক্ষা চাই।
সামন্দেশ। সে কি যুবরাজ? তােমরও কি মতিভ্রম ঘটল? এ
সৃণ্য কাফ্রি-তােমার জীবন বিপন্ন করেছিল। এরা বেঁচে থাকলে আবার
হয় তাে কোন দিন কি করে বসবে। এদের কিছুতেই ক্ষমা করা যেতে
পারে না।
রামেশিস। হােক কাফ্রি, হােক আমার জীবনের অন্তরায়, তবু এদের
মা কন।
সামনেশ। না, তা হতে পার না। আমি বিচার করে এদের দণ্ড
দিয়েছি। আমার আদেশ অমান্য করবার অধিকার আমার নিজেরই
নাই।
মেশিস। এ শুধু কথার কথা। আপনি ইচ্ছা করলে সবই হয়।
সামলেশ। (ভাবিয়া) আচ্ছা তুমি যাও।
রামেশিন। আপনার আদেশ শিরােধার্য। আমি আপনার কাছে
এ দুটী জীবন গচ্ছিত রেখে যাচ্ছি।
( প্রস্থান)
সামলেশ। আন, নাহরিন, আমি এক শর্তে তােমাদের জীন
ভিক্ষা দিতে পারি।
আৰন। তুমি এক শর্তে আমাদের জীবন ভিক্ষা দিতে পায়।
নিশ্চয় সে শত পালন আমাদের সাধ্যাতীত।

এম অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য।] মিসর-কুমারী সামলেশ। না, তা নয়। তােমরা ইচ্ছা করলেই তা করতে পার। সে কাৰ্য্য অতি সহজ। নাহরিন। কি? ? ' সামন্দেশ। তোমরা তােমাদের ধর্থ ত্যাগ করে আমাদের ধর্থ আয় কর। ঘৃণিত দেবতা শেবেককে ত্যাগ করে আমনদেবের শরণাগত হও তােমাদের জীবন নিরাপদ হবে। আবন। সামলেশ, তুমি কি এই পশ্মশ্রু বৃদ্ধকে এতই কোমল মনে কর? না সামন্দেশ, এ কন্যার জীবনে আমার প্রয়ােজন নেই। সামন্দেশ। উত্তম। রক্ষিগণ, নিয়ে চল। পঞ্চম দৃশ্য- উদ্যান। বুলা। == গাহিতে গাহিতে ৰুলার প্রবেশ। গীত। পরাণ ভাঙ্গিয়া গেছে, ভেঙ্গে যায় মিছে হাসি খেলা ধীরে ধীরে আঁধার নামিয়া আসে, ফুরায়ে যায় যে বেলা। প্রভাতে নয়ন মেলি নিরখিনু তরুণ তপন, অমনি আপনা ভুলে হৃদয়-দুয়ার খুলে পুলকে করিনু বর- শুনি আশার গান, বিলাইয়া দিমু প্রাণ-সে তাে হায় হলােনা আপন। তবু ওই দূরে শুনি তার আবাহন বাণী, কেমনে করিগাে তারে হেলা। ( খারেবের প্রবেশ) খারে। বুলা- বুলা। চুপ। আমার হাতে তােমার প্রাণদণ্ড হয়েছে। তুমি এখন ককাটা, অতএব তােমার কথা কইবার অধিকার নাই। খারেব। ৰুলা, পরিহাস নয়, আমি সেই কথাই তােমাকে বলতে

মিসর-কুমারী
[ ৫ম অঙ্ক,-৫ম দৃশ্য।
বুলা।
এসেছি। তুমি আমার জীবন রক্ষা করেছ, দয়া করে আমাকে মুক্তি দাও।
যে ধ্রুবতারা আমার অন্ধকারময় জীবন-পথ আলােকিত করে আমায় পথ
দেখিয়ে দিচ্ছিল, যাকে লক্ষ্য করে আমি এই বিপদসঙ্কুল রাজধানীতে এসে
নিজেকে বিপন্ন করেছি, তাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমায় অনুমতি
দাও, আমি আবার তার সন্ধানে যাই।
সে কে গা? সেই দেবী নয়তাে ?
বারেব। তাকে নিয়ে রহস্য করােনা। সত্যই সে দেবী। যদি
তুমি তাকে একবার দেখতে
বুলা। আমারওতাে ছাই ঐ দুঃখু, একবার যে দেখতে পেলুম না-
খারে। (কুদ্ধভাবে দেখতে পেলে কি করতে?
লা। আহা চটো কেন? দেখতে পেলে পূজো করতুম, আর কি
করুম?-(খারে অসন্তুষ্ট ভাবে চুপ করিয়া রহিল )-আচ্ছা দেখ একটা
কথা আমায় বুঝিয়ে বলতে পার?
খারে। কি ?
তুমি তাে সেই
দলবল নিয়ে মানুষ হয়েছি, মানুষ হয়েছি’
-বলে চিৎকার করে বেরিয়ে পড়লে,-তারপর এই দেবীটা এসে
জুটলেন কবে থেকে? ইনি কি আগে থেকেই স্কন্ধে চেপেছিলেন, না
রাস্তার মাঝখানে উড়ে এসে জুড়ে বসলেন? আর তখন যে সব লম্বা
লম্বা কথা কইতে—“ইথিওপিয়া’‘স্বাধীনতা-প্রাচীন সাম্রাজ্য'—সে
সবই বা গেল কোথায়? দেবী কি তােমার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলােকেও
মােলুম হজম করে ফেলেছেন কি?
খারেব। তার উপদেশে আমি মানুষ হয়েছিলেন, তারই উপদেশে
ইথিওপিয়ায় আমাদের প্রাচীন স্বাধীনতা পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছিলেম।
হঠাৎ তার পিতার বিপদের সংবাদ পেয়ে তিনি তার উদ্ধারের চেষ্টায়
চলে গেলেন
কুলা।

৫ম অঙ্ক-৫ম দৃশ্য। মিসর-কুমারী
লা। আর অমনি তুমি লাঠিগাছটা কঁাধে ফেলে দেবসেবার ফিকিরে
বেরিয়ে পড়লে-কেমন এই তাে? সেততা বেশই করেছিলে, তাই বলে
এখন অমন তিড়িং মিড়িং করছ কেন বলতো? এখন আমাদের কাছে
দু’দিন থাক, নিশ্চিন্ত হয়ে দু’দিন খেয়ে দেয়ে গায়ে জোর করে নাও, তার
পরে না হয় আবার তার খােজে বেরিও।
( জিনাের প্রবেশ)
জিনাে। খাৱেব, তুমি সত্য সত্যই মানুষ হয়ে, গুরুতর কর্তব্যের
ভার মাথায় নিয়েছ। সে কৰ্তব্য হতে আমরা কেউ তােমায় বিরত
করব না। কিন্তু তুমি একা,দুঃখে সান্ত্বনা দিতে, বিপদে সাহস দিতে,
সম্পদে সুখী করতে তােমার কেউ নাই। তােমার যে একটী সাথী
চাই।
( কাকাতুয়ার প্রবেশ )
কাকাতুয়া। কৌ1-অর্থাৎ ঠিক কথা।
বারেব। আপনি আমার পিতৃতুল্য, আমায় বলে দিন কি করব।
জিনাে। এই বালিকাকে তুমি বিবাহ কর ।
বুলা। ইশ। বিবাহটা অমনি সস্তা কি না।
খায়েব। (চমকিয়া) বিবাহ।
কাকাতুয়া। কি দাদামণি, আঁৎকে উঠলে যে? তোমায় তো
কোদাল পাড়তেও বলা হচ্ছে না, কাঠ কাটতেও বলা হচ্ছে না, শুধু একটা
বিবাহ, তা এর আর শক্তটা কোনখানে? কোনমতে চোখ কান
বুজে কোৎ করে গিলে ফেলবে বইতে নয়।
বুল। আঃ, কাকাতুয়া থানা। গাে, তােমায় সে সব কিছুই
করতে হবে না। তুমি যেথায় ইচ্ছা যেতে পার। হাই তুলিয়া-আ
আমার বড় ঘুম পাচ্ছে। আমি যাই একটু শুইগে।
জিনাে। বুলা, দাড়া।
খারেব, এই বালিকা-

২৪
মিসর-কুমারী
[ ৫ম অঙ্ক-৫ম দৃশ্য
বুলা। বালিকা বালিকা আবার কে? এখানে বালিকা-টালিকা
কেউ নাই। এসাে বাবা, তোমার খাবার সময় হয়েছে। ( টানিয়া লইয়া
যাইতে চেষ্টা করিল)
পারে। এখন আমি কেমন করে বিবাহ করব?
কাকাতুয়া। যেমন করে সকলে করে।
খারেব। বিবাহ শুধু বন্ধন। আমার এখন সােনার পৃথল পরর
অবকাশ নাই। পদে পদে অামার জীবনের আশঙ্কা বর্তমান। তার
উপর সেচ্ছায় যে তার মাথায় নিয়েছি, তাই বহন করতে আমার সবটুকু
শক্তির প্রয়োজন। তার উপর আর একটা বােঝা চাপিয়ে দিতে পেরে
উঠব কেন?
জিনাে। বােঝা নয় খারেব আমি তােমায় নূতন শক্তি দিচ্ছি।
তুমি স্থির জেনো, আমার ক-তােমার কর্তব্য পালনে সহায়তা করবে-
কখনাে অন্তরায় হবে না।
পারে।
এ যে অবলা-
কাকাতুয়া। বিবাহটা সাধারণতঃ অবলাদের সঙ্গেই হয়ে থাকে।
'তা’তে আর এমন কি অসুবিধা দাদামণি ?
জিনাে।
ভেবে দেখ, খারে, যাকে তুমি দেবী বলে পূজা কর,
সেও নারী।
কাকাতুয়া। না, আমার ভাল লাগছে না। এই সব বকর বকর
বাজে কথা, এর না আছে মাথা, না আছে মুতু। এ সব বলে লাভ কি?
-শােন দাদামণি, এদিকে এসাে। ( টানিয়া বুলার কাছে লইয়া
আসিল -আমি তােমায় একটা সােজা রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি। দেখি
দিদিমণি,-(হাত টানিয়া লইয়া খারেবের সঙ্গে হাত মিলাইয়া দিল)
কৌ-ব্যাস—এখন খােল তাে বাঁধন কার কত জোর ।
(ৰূলা ও খারেব উভয়ে নিরুত্তর হইয়া নতশিরে মহিল)

অ-ই দৃশ্য। মিসর-কুমারী
জিনাে। আমি কায়মনােবাক্যে আশীর্বাদ করছি, তােমরা দীর্ঘজীবী
হও, সুখী হও, পরস্পরের সহায় হও। এসাে, দেবতার আশীর্বাদ গ্রহণ
গ্রহণ করে উভয়ে গন্তব্য পথে অগ্রসর হও।
কাকাতুয়া। কৌ ।
( সকলের প্রস্থান)
ষষ্ঠ দৃশ্য—বধ্যভূমি।
একটা বৃহৎ চুঙ্গির উপর একটা সুবৃহৎ কটাহে তপ্ততৈল ফুটিতেছিল।
রক্ষীগণ যথাস্থানে দণ্ডায়মান।
(সামশে, তৎপশ্চাৎ রী-বেষ্টিত আবন ও নাহরিনের প্রবেশ)
সামলেশ। সমস্ত আয়ােজন প্রস্তুত ?
রক্ষী। হা প্রভু, সবই প্রস্তুত।
আন। সামন্দেশ, তোমার কাছে আমি একবার দয়া ভিক্ষা করেছি,
আর করব না। কারণ, যা তােমার কাছে নাই তা চাওয়া বৃথা। কিন্তু
একটু শিষ্টাচার বােধ হয় তােমার কাছে প্রত্যাশা করতে পারি?
সামন্দেশ। না, আমার কাছে কিছুই নাই।-আচ্ছা তুমি কি চাও?
বল।
আবন। পৃথিবীতে সর্বদেশে সর্বকালে একটা প্রথা আছে যে,
যার প্রতি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয় তার শেষ বাসনা অপূর্ণ থাকে না।
তুমি কি আমার শেষ বাসনা পূর্ণ করতে প্রস্তুত আছ?
সামলেশ। তােমার শেষ ইচ্ছা কি?
আৰন। সামন্দেশ, তুমিও সন্তানের পিতা। অপত্য স্নেহ কি তা
তুমি মর্মে মর্মে জান। তােমার মেয়ে যদি আজ তােমার বুক জুড়ে
থাকত, তবে তুমি সে স্নেহ যেমন অনুভব করতে,আজ সে নাই, বােধ
য় তা আরও তীব্রভাবে অনুভব করছ।

: বল। মিসর-কুমারী [ ৫ম অ-৬ষ্ঠ দৃশ্য। সামন্দেশ। তুমি কি করে জানলে আমি সন্তানের পিতা ? কোথায় কে বলেছে যে আমার কোন কালে সন্তান ছিল ? আবন। আমি জানি। যে করেই হােক আমি জানি। সামলেশ তুমি আমায় জান না, কিন্তু আমি তােমায় বহুকাল ধরে জানি। সামলেশ। কি জান? তুমি আমার সম্বন্ধে কতটুকু জান? আবন। যতটুকুই হােক জানি। এখন তা বলা নিয়োজন। শােন আমি যা বলছিলেম। আমার শেষ বাসন- পূর। আমার দুটা বাসনা আছে, তার একটা পূর্ণ হলেই আমি সুখে মরতে পারি। সামলেশ। আকন। তুমি জানে অজ্ঞানে আমার প্রক্রিযথেষ্ট অত্যাচার করেছ। মৃত্যুকালে কেন আর একটা দাগ দেবে। আমাকে আর কন্যার মৃত্যু দেখিও না। হয় আমাদের এক সঙ্গে ওই তৈল-কটাহে নিক্ষেপ কর, না হয় পৃথক স্থানে আমাদের দণ্ডের ব্যবস্থা কর,-যেন কারু যাতনা কাউকে শুনতে না হয়। আমরা তােমায় আশীর্বাদ করে মরব। সামন্দেশ। বেশ। বেশ। কিন্তু আগে বল তুমি আমার জীবনের কি জান? আবন।আমি বলব না। সামন্দেশ। বেশ, আমিও তােমার বাসনা পূর্ণ করব না। আকন। বেশ, তবে আমার দ্বিতীয় বাসনা শােন। তােমার কিছু উপকার করে যেতে চাই। সামন্দেশ। আমার উপকার? তুমি করবে? আবন। হাঁ তােমার উপকার, আমি করব। আশ্চৰ্য্য হচ্ছ ? সামন্দেশ। ধন্যবাদ। আমি তোমার কাছে কোন উপকার প্রত্যাশা করি না। পৃথিবীতে আমার কিছুই প্রার্থনীয় নাই। আবন। সামন্দেশ,-ভেবে দেখ, বেশ করে চিন্তা কর, পৃথিবীতে আমি মৃত্যুকালে

৫ম অঙ্ক-৬ষ্ঠ দৃশ্য। মিসর-কুমারী
কিছুই কি তােমার প্রার্থনীয় নাই ? এমন কি কিছুই নাই, যা পেলে
হাতে স্বর্ণ পাও।
সামনেশ। যা পেলে আমি হাতে স্বর্ণ পাই ?—এই দুমি,তুমি
-িআবু তুমি কি বলছ ?
সামন্দেশ।' রক্ষিগণ, তোমরা কিছুক্ষণের জন্য স্থানান্তরে যাও।
নিকটেই থেকো, যেন ডাকলেই পাই।
১ম রক্ষী। যে আজ্ঞে প্রভু।
( রক্ষীগণের প্রস্থান)
সামন্দেশ। বল আবন, তুমি কি বলছিলে?
আবন। সামন্দেশ, তুমি কাফ্রিদের এত ঘৃণা কর কেন? তুমি নিজে
কাফ্রি ক্রীতদাসীর সন্তান বলে ?
সামনেশ। সাবধান বর্বর, দ্বিতীয়বার এ কথা উচ্চারণ করলে আমি
তাের জিভ টেনে ছিড়ে ফেলব।
আবন। তাতে আমার বিশেষ কিছু ক্ষতি হবে না, ক্ষতি হৰে
তােমার। আমি আজ যা, তােমায় দিতে চাই, তুমি জীবনে আর তা
পাবে না। আমি ছাড়া কেউ তা দিতে পারবে না।
সামন্দেশ। আবন, আবন, তুমি কে?
আবন। আমি এক বর্বর কাফ্রি। বল সামন্দেশ, পৃথিবীতে তােমার,
কিছু প্রার্থনীয় আছে কিনা? ৪২।
সামন্দেশ। এ-এ-আছে। আমার-না, না, তুমি বল, কি
তুমি আমায় দিতে চাও।
আবন। সামন্দেশ, আমি মরতে বসেছি, তবু তুমি আমার ক্ষুদ্র একটা
বাসনা পূর্ণ করলে না, যাতে পৃথিবীতে কারুর কোন ক্ষতি ছিল না।
ততটুকু হৃদয় তােমার মাই। আর এক কাফ্রির হৃদয় দেখ। তুমি

মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক-৬ষ্ঠ দৃশ্য।
আমার এবং আমার কন্যার ভীষণ মৃত্যুদণ্ড উচ্চারণ করেছ, তার বিনিময়ে
আমি তােমায় এমন কিছু দিয়ে যেতে চাই, যা’ তুমি স্বপ্নেও কারুর কাছে
পাবার আশা কর নি।
সামলেশ। আবন, আবন, আমি আর ধৈৰ্য্য রাখতে পারছি না।
, তুমি আমায় কি দিতে পার?
আৰন। না, তুমি বল তুমি কি চাও? তােমার মুখ থেকে আমি
তােমার প্রার্থনা শুনতে চাই।
সামনেশ। আমি-আমি আমার--পত্নী এবং কন্যা-না না, আমি
বলতে পারছি না, তুমি বল কি তুমি আমায় দিতে চাও।
আবন। তােমার পত্নী জীৰিত নাই, তাকে আর পৃথিবীতে দেখতে
পর তার আশা ত্যাগ কর।
সামলেশ। আমার কন্যা?—সেই দুই বৎসরের শিশু, বর্গের
-বল আবন, সে কি জীবিত আছে। কোথায় সে? কি
কালে তাকে পাব? বল, বল আবন, দেরি করে না। এক মুহূর্ত
আমার কাছে শতাব্দী বলে বােধ হচ্ছে ১ ****
আবন। সামলে অধীর হয়াে না। অধীর হলে তাকে পাবে না।
এখন তুমি প্রার্থী,
আমি দাতা।
তােমার প্রার্থনা পূর্ণ করা না
করা আমার ইচ্ছা। শােন আমি না বলতে চাই। তােমার বাল্যকালের
কথা মনে আছে ?
সামন্দেশ। আছে। কিন্তু তুমি কে? আমার বাল্যকাল সম্বন্ধে
তুমি কি জান? কেমন করে জান?
আবন। তুমি মেফিল নগরে বিশ্ববিদিত জ্ঞানী লুটের গৃহে এক কাফ্রি
জীতাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলে,-কেমন ?
সামলেশ। আশ্চর্য্য। সে বহুদিনের কথা, বিস্তৃতির অতল জলে
ডুবে গেছে। আজ এ মিসরে যে কথা কেউ জানে না, তুমি তা কেমন
কর অনলে।
দেকত?

এ অঞ্চ-৬ষ্ঠ দৃশ্য। মিসর-কুমারী
আবন। শিশুকালে তােমার মাতার মৃত্যু হয়। তােমার বয়ঃক্রম
যখন বিংশ বৎসর, তখন তােমার পিতারও মৃত্যু হয়। সংসারে তুমি,
তােমার হােট ভাই জিরাফ, ভগ্নী নােরা এই অবশিষ্ট ছিল। কেমন না?
সামন্দেশ। আবন, আমি তােমায় আবার জিজ্ঞাসা করছি -তুমি
কে? বল, আমি মিসরের প্রধান পুরােহিত সামলেশ, আমি আদেশ
করছি, তােমায় বলতে হবে।
আবন। বলব না, আমার খুশি ! তুমি আমার কি করবে? তােমার
কাছে আমার কোন প্রত্যাশা নাই-তােমার কাছে আমার ভয়ও নাই।
তােমার ইচ্ছা না হয়, আমার কাহিনী তুমি শুনন না। আমি বলব না।
সামন্দেশ। না, আমি শুনছি, তুমি বল।
আবন। তারপর শােন। তােমার ভগ্নী নােরা টিটাস নামে এক
কাফ্রি যুবককে বিবাহ করেছিল, সেই অপরাধে তুমি তাকে গৃহ হতে
বহিস্কৃত করে দিয়েছিলে। তােমার অত্যাচারে তােমার ছােট ভাই
দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। সে আজ কত কালের কথা সামন্দেশ ?
সামলে । বহুকাল বােধ হয় প্রায় পঞ্চাশ বৎসরের হবে।
তারপর? বল, বল আবন, তাদের কি হল ? তারা কি আজও বেঁচে
আছে?
আবন। তােমার ভাই পালিয়ে সিরিয়ায় গিয়েছিল, সেখান থেকে
কবি চিকিৎসক হয়ে দেশে ফিরে আয়ে। কে আজও বেঁচে আছে।
কাদেশে তার নাম আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার পরিচিত কিন্তু সে আর জিরাফ
নাই, অন্য নাম গ্রহণ করেছে। তাকে খুজে নিও সামন্দেশ।
সামন্দেশ। আমরা ভগ্নী নােরা কোথায়? সে কি আজও বেঁচে
আছে।
আবন। না, যে আগুনে পুড়ে মরেছে। যে আগুনে তোমার
পত্নীর মৃত্যু হয়, সে আগুনে সে পুড়ে মরেছে।
সামন্দেশ। আবন, তুমি কে জানি না। আমার বাল্য-কাহিনী

T মিসর-কুমারী [৫ম অঙ্ক,-৬ষ্ঠ দৃশ্য। তুমি জান দেখছি। কিন্তু তােমার কথায় বিশ্বাস কি ? হয়তাে তুমিও মেফিসে জন্মগ্রহণ করেছিলে, তাই আমাদের সংসারের সব কথা জান। তাই বলে তুমি যা বলবে তাই বিশ্বাস করব কেন? বল আবন, আমি মিনতি করছি, বল তুমি কে? আন। হাঃ হাঃ হাঃ • আমি কে-অন্ধ, বরাবর অ্য। আমি বলব না, তােমার চোখ খুলে দেব না-আমার খুশি। পার চিনে নাও। সামন্দেশ। শােন আবন, আমি তােমার পরিচয় চাই। যদি তুমি পরিচয় দিতে অস্বীকার কর, তবে বুঝৰ তােমার শেষের কথাগুলাে সব মিথ্যা। তা হলে এই মুহূর্তে তােমার কন্যাকে ওই তৈল-কটাহে নিক্ষেপ করবার আদেশ দেব। যদি কন্যার প্রতি তােমার কিছুমাত্র মমতা থাকে তবে বল তুমি কে? আৰন। আমি বলবাে না । ডাক তােমার রক্ষীগণকে। তারা এই মুহূর্তে নাহরিনকে তৈলটাহে নিক্ষেপ করুক, আমার দুঃখ নাই। কিন্তু একটা কথা জেনে রেখাে, তােমার কন্যা এখনও জীবিত। সামন্দেশ। না না, আমার ভুল হয়েছিল। বল আবন, কোথায়? তার জন্যে যদি পৃথিবীর অপর প্রান্তে যেতে হয়, আমি তাও বাব। বল, বল আকন, কোথায় গেলে তাকে পাব ? আবন। শােন সামন্দেশ, যেদিন ফারাও আমিনােফিসের আদেশে থিকি নগরী ভস্মভূপে পরিণত হয়েছিল, আমার অর্ধেক হৃদয় সেই আগুনে ডালি দিয়ে পাগলের মত রাজপথে ছুটে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে দেখলাম তােমার গৃহ তখনও দাউ দাউ করে জ্বলছে। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, সেই ঈষৎ অন্ধকারে তােমার গৃহের অগ্নিশিখা নৈশ আকাশে প্রেতিনীর মশালের মত অস্ফুট আলােকরেখা নিক্ষেপ করছে। দেখে একটু না বাড়িয়ে থাকতে পারলেন না। সহসা আমার পায়ের কাছে এক শিশু মা মা করে কেঁদে উঠল। চেয়ে দেখি ৫ম অঙ্ক,-৬ষ্ঠ দৃশ্য। মিসর-কুমারী এক অনিন্দ্যসুন্দরী মিসরমণীর অর্ধদগ্ধ মৃতদেহ, তার বুকে সিক্ত কম্বলে আবৃত এক দুই বৎসরের শিশু। সামনেশ, তা দেখে আমার দয়া হল। আমি স্বীকার করছি, সেই অসহায় মিসরী বালিকাকে দেখে এই ঘৃণ্য বর্বর কাফ্রির দয়া হল। তাকে বুকে তুলে নিলেম। সেই তােমার কন্যা। সামনেশ আমি তাকে বাঁচিয়েছি,সে আজও বেঁচে আছে। সামলেশ। আবন, বল সে কোথায় ? আবন। বলব না, সব হবে, ঐটা হবে না। আমি কিছুতেই বলব না। সামন্দেশ। বলবে না? বেশ, আমি খুঁজে নেব। পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত খুজব, আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খুজব। আবন। হাঃ হাঃ হাঃ।সামন্দেশ, তুমি বাতুল। কোথায় তুমি তাকে খুঁজে পাবে? সেও তােমায় চেনে না, তুমিও তাকে চেন না। এই বর্বর কাফ্রি না চিনিয়ে দিলে, কেউ কাউকে চিনতে পারবে না। * সামলেশ। (নতজানু হইয়া) আবন, আবন, তােমার পায়ে পড়ি, বল। আজ মিসরের সর্বোচ্চ শির তােমার সম্মুখে নত হচ্ছে। যাকে মিসরের ফারাও পৰ্যন্ত দেবতার মত পূজা করে, সে আজ নতজানু হয়ে তােমার দয়া ভিক্ষা করছে। দয়া কর আবন, বল আমার কন্যা কোথায় ? আবন। হাঃ হাঃ হাঃ কেমন মজা! কেমন চাবুক পড়েছে । এমন প্রতিশােধ কে কবে নিতে পেরেছে। সামন্দেশ, আর আমার দুঃখ নাই। সামনেশ। আবন, বল তুমি আমার কন্যার বিনিময়ে কি চাও ? বনশ্বৰ্য্য, মান, রাজপ্রসাদ, অপ্রতিহত ক্ষমতা -কি চাও? যা চাও তাই দেব। আমি সামন্দেশ, প্রতিজ্ঞা করছি। মিসরের পুরােহিত কখনাে মিথ্যা কথা বলে না। বল আবন, কি চাও?

মিসর-কুমারী
[ ৫ম অঙ্ক, ৬ষ্ঠ দৃশ্য।
আবন। কিছু না। তুমি আমাদের প্রাপ্য দণ্ড দাও। আমরা
তােমার কাছে কিছু চাই না। সেই অসহায় শিশুর প্রতি আমার দয়া
হয়েছিল কিন্তু তােমার প্রতি আমার কিছুমাত্র দয়া হচ্ছে না। অপত্য-স্নেহ
কি তুমি বেশ ভাল করে বােঝ, আর আমরণ তিল তিল করে তুষের
আগুনে পুড়ে মর, এই আমি চাই।
সামন্দেশ। তুমি বলবে না?
আবন। না।
সামন্দেশ। বলবে না ?
আবন। না।
সামন্দেশ।
বলবে না ?
আবন। না, না, না।
সামন্দেশ। তবে রে কাফ্রি কুকুর, তাের এতদুর স্পৰ্ক। মিসরের
পুরােহিত সামলেশ তাের কাছে এত তুচ্ছ ? আমি তােকে বলতে বাধ্য
করব।-তাের সম্মুখে তাের কন্যার চোখ উপড়ে ফেলব, নাক-কান
কেটে ফেলব, তার গায়ের চামড়া খুলে নেব, সর্বাঙ্গে মুখে লবণ
নিক্ষেপ করব। দেখি কেমন তুই বলবি না। আমি তাকে এই শেষবার
জিজ্ঞাসা করছি, বল আমার কন্যা কোথায় ?
আবন। আমি বলব না-কর তােমার যা খুশি।
সামনেশ। বটে, রক্ষিগণ,
আবন। ফরহও। আচ্ছা আমি বলছি। কিন্তু তার আগে এক
প্রতিজ্ঞা কর।
সামন্দেশ। কি ?
আবন। এই প্রতিজ্ঞা কর যে, আমি বলবামাত্র যে মুহূর্তে আমার
কথা শেষ হবে, সেই মুহূর্তে তােমার দ্বিতীয় আদেশের প্রতীক্ষা না করে
তোমার লােকেরা আমার কন্যাকে
তৈল-কটাহে নিক্ষেপ
করবে।

৫ম অঙ্ক,-৬ষ্ঠ দৃশ্য। ] মিসর-কুমারী সামলেশ। সে কি! আবন, তুমি কি পাগল হয়েছ? আবন। হাঁ, তুমি প্রতিজ্ঞা কর।—ই, তােমার ইষ্টদেবতা সূৰ্য্যদেবকে সাক্ষী করে প্রতিজ্ঞা কর । নইলে আমি কিছুই বলব না। সামন্দেশ। আবন, আবন, আমার দোষ নাই, তুমি আমায় বাধ্য আবন। হাঁ, তুমি অঙ্গীকার কর। সামন্দেশ। তবে তাই হােক। আমি স্বীকার করছি। রক্ষিগণ- (রক্ষীগণের প্রবেশ )-এ ব্যক্তি আমায় একটা কথা বলবে। যে মুহূর্তে এর কথা শেষ হবে, সেই মুহূর্তে তােমরা আমার দ্বিতীয় আদেশের প্রতীক্ষা না করে, এই বালিকাকে ওই তৈল-কটাহে নিক্ষেপ করবে। ১ম রক্ষী। যে আজ্ঞে প্রভু। সামলেশ। এইবার বল আকন, আমার কন্যা কোথায়? আবন। ( নাহরিনকে নির্দেশ করিয়া )—এই তােমার কন্যা। ( নাহরিন মুগার মত একবার আবনের প্রতি, একবার সামন্দেশের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেছিল; যেন পূর্বোক্ত কথার অর্থবােধ হয় নাই-লামকেশ তাহাকে আলিঙ্গ করিবার নিমিত্ত ছুটিয়া গেলে আবন বাধা দিল - আবন। ব্যস। সামনেশ, তােমার প্রতিজ্ঞা পালন কর। সামন্দেশ। তােমার কথা যে সত্য তার প্রমাণ। আবন। প্রমাণ ? প্রমাণ তােমার স্বহস্ত-খােদিত তােমার নামাঙ্কিত এই কবচ-( নাহরিনের বাহুমূলে কবচ দেখাইল) সামন্দেশ। (নাহরিনকে বুকে টানিয়া লইয়া) আবন, আ- আবন। সামন্দেশ, তােমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা কর। রক্ষিগণ, তােমাদের কর্তব্য পালন কর। সামলেশ। তা যে হয় না আবন।

মিসর-কুমারী [ ৫ম অঙ্ক, ৬ষ্ঠ ৬ষ্ঠ দৃশ্য। আকন। এখন তা হয় না আবন। কেন হয় না? হতে হবে। যতক্ষণ আমার কন্যা বলে জেনেছিলে, ততক্ষণ তাে বেশ হচ্ছিল। এখন তােমার কন্যা বলে জেনেছ আর তা হয় না। কেমন ? না, আমি তা শুনব না। তুমি দেবতার নামে শপথ করেছ, শপথ রক্ষা কর। মিসরের পুরােহিত সামন্দেশ মিথ্যা কথা বলে না। সামনে। আবন, দয়া কর, আমায় ক্ষমা কর। আবন। এখন দয়া কর, ক্ষমা কর, পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব কর। আমার জন্য, আমার কন্যার জন্য কিছুরই প্রয়ােজন ছিল না। এখন তােমার জন্ঠ, তােমার কন্যার জন্য সব প্রয়ােজন হয়েছে। কেন, মনে নাই, বলেছিলেম একদিন দয়ার প্রয়ােজন তােমারও হবে ? (জিনন, খারে, বুলা ও কাকাতুয়ার প্রবেশ ) জিনাে। দাদা, তুমি আমায় চেন না। আমি তােমার ছােট ভাই জিরাফ। দাদা, এ তুমি কি করছ? এ যে আমাদের টিটাস, হতভাগিনী নােনার স্বামী। আমরা ভাই-বােন আদর করে একে আবন ডাকতেন, তােমরা একে টিটাস বলে জানতে। দাদা, হতভাগিনী নােরার নামে আমি তােমায় অনুরােধ করছি, টিটাস এবং তার কন্যার জীবন দান কর। সামলেশ। জিরাফ । জিরাফ। ভাই। ( আলিঙ্গন )-আমি মহাপাপ, তােমরা সবাই আমায় ক্ষমা কর। এ নাহরিন টিটাসের কন্যা নয়, এ আমার কন্যা। টিটাস মায়ের মত যত্নে একে বাঁচিয়ে রেখেছিল, তাই আমি একে ফিরে পেয়েছি। লা। হাঃ হাঃ হাঃ। জ্যাঠা মশাইয়ের যত কাণ্ড! হ্যা জ্যাঠা মশাই, তােমার কি বুড়াে বয়সে ভীমরতি ধরেছে? বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুই নাই? হাঃ হাঃ হাঃ। কাকাতুয়া। কে!

৫ম অন্ধ,-৬ষ্ঠ দৃশ্য।
মিসর-কুমারী
১৩
(হারেমহেব, রামেশিস ও সায়ার প্রবেশ)
হারেমহেব। প্রভু, প্রভু, একি শুনছি? (তৈল কটাহের প্রতি
নির্দেশ করিয়া) এ কি?
সায়া। (নাহরিনকে আলিঙ্গন করিয়া)-ভগ্নী, এ ত্রুটী, এ এম
আমার। আমি বিচারালয়ে উপস্থিত থাকলে কিছুতেই এ ঘটনা ঘটতে
দিতেম না।
সামন্দেশ। সম্রাট, আমি আমার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছি।
পার যদি তুমি আমায় ক্ষমা কর। রাজকুমারী, তুমি আমার কন্যার তুল্য।
পার যদি তুমিও এ বৃদ্ধকে ক্ষমা কর।
সায়া। পিতা, আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন।
হারেমহেব। নাহরিন, আমরা সকলে তােমাকে মিসরের ভৰি
সাম্রাজ্ঞী বলে বরণ করছি।
নাহরিন। আপনারা সকলে আমাকে ক্ষমা করুন। আমি এ পদের
সম্পূর্ণ অযােগ্যা, এতে আমার কোন অধিকার নাই। আমি দীনা কাফি
কল, এ জীবনে আমার আর কোন পরিচয় নাই।
সামন্দেশ। কেন মা, আর তাে তুমি-
নাহরিন। আমায় ক্ষমা করুন, এ কথা আমি আপনাকে বুঝাতে
পারব না। সম্রাট, অনুমতি করুন, কাফ্রি-কন্যা তার পিতার গৃহে ফিরে
যাক, তার হতভাগ্য পদদলিত কাফ্রি ভাইদের সেবায় তার ক্ষুত্র জীবনের
অবশিষ্ট দিনগুলি নিয়ােজিত করুক।
হারেমহেব। আমি কি তােমার কাফ্রি ভাইদের সুখী করবার জন্য
কিছু করতে পারি ?
নাহরিন। পারেন—অতি সহজে। আপনার একটীমাত্র আদেশের
অপেক্ষা।
হারেমহেব। কি বল নাহরিন, বল, তােমায় অদেয় আমার
কিছুই নাই।

মিসর-কুমারী
[ ৫ম অঙ্ক, ৬ষ্ঠ দৃশ্য।
নাহরিন। মহানুভব ফারাও। তবে আদেশ করুন, আজ হতে এই
মিসরে কাফ্রি আর মিসরীতে কোন প্রভেদ থাকবে না।
হারেমহেব। তাই হােক। আজ হতে সকলের চক্ষে সকল বিষয়ে
কাফ্রি এবং মিসরী দুইটী যমজ ভায়ের মত অভেদ হােক। আর এই
শুভ মিলন যাতে চিরদিন অটুট থাকে, তার জন্য এই দুই দেবী ভবিষ্যৎ
ফারাওয়ের দুই পার্শ্বে সজাগ প্রহরীর মত ব্রিাজ করুক।
(রামেশিসের সহিত সায়া ও নাহরিনের হাত মিলাইয়া দিলেন)
সকলে। সাধু! সাধু।
বারেব। সম্রাট, আমি আপনার কাফ্রি প্রজা। একদিন আপনার
বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন, ভেবেছিলেম তাই বুঝি
মনুষ্যত্ব। কিন্তু আজ আমি আমার এম বুঝতে পেরেছি।. বুঝেছি
স্বাধীনতা অর্থ স্বেচ্ছাচার নয়। তাই আজ আমি দেবতার নামে শপথ
করছি, আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজসেবায় অতিবাহিত করব।
আমি কায়মনােবাক্যে প্রার্থনা করি, মিসরের প্রজাশক্তি এই মিলিত
রাজশক্তির ছত্রছায়াতলে চিরকাল মনুষ্যত্বের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়।
কাকাতুয়া। কৌ।
যবনিকা।
প্রশিশিরকুমার সি, বি, কর্তৃক ২২১ নং কর্নওয়ালিস ধ্রুটস্থ
শিশির প্রিন্টিং ওয়ার্কশ হইতে মুদ্রিত ও শিশির
পাবলিশিং হাউস হইতে প্রকাশিত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Misar-kumari Ed.11

Author
Dasgupta,barodaprasanna
Title
Panchankya Drishyakabya
File name
Misar-kumari Ed.11
Text
OCR done
Citation
1919
Published
2010/03/19
Publisher
Shishir Publishing ,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Benali Plays
Keywords
Dasgupta,Barodaprasanna
DLI number
511220
Barcode
4990010018388.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
z9Z8Ncnu5ys
Download PDF

Misar-kumari Ed.11