Makardah Saraswat Library, Howrah
Hara-gouri
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শিক্ষা-বিভাগের মহামান্য ডিরেক্টর বাহাদুর কর্তৃক বঙ্গদেশীয় বিদ্যালয়সমূহের
গ্রন্থাগারে রাখিবার ও পুরস্কার দিবার জন্য অনুমােদিত।
-কলিকাতা গেজেট, ২৯১৭৩৭
শ্রীশ্রী
হরগৌরী
শ্ৰভুজঙ্গভূষণ রায়
কাব্যতীর্থ, সাংখ্যতীর্থ
আর. পি. মিত্র এণ্ড স
৬৩, বিডন ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
[ মূল্য ॥• দশ আনা।
প্রকাশক
শ্রীফণীন্দ্রনাথ সরকার
Of Messrs R. P. Mitra & Son
63 Beadon Street, Calcutta.
১৫৪,
১৩৪৩
প্রিন্টার
শ্রীদেবপ্রসাদ মিত্র
এলম প্রেস,
৬৩ নং বিডন স্ট্রীট, কলিকাতা।
উপহার শ্রী
No text on this page.
WAKARCAL - TUWRAH LIBRARY Estd:-1919, প্রস্তাবনা মহাকবি কালিদাস-কৃত ‘কুমার-সম্ভব’ কাব্যের উপাখ্যানাংশ বাঙ্গালা গদ্যে এই পুস্তিকায় সঙ্কলিত হইয়াছে। কবিবর ভারতচন্দ্রের কাব্যের সহিত কুমার-সম্ভবের উপাখ্যানগত কিছু কিছু পার্থক্য আছে, এজন্য আমি উভয় কাব্যকে অবলম্বন না করিয়া, শুধু কুমার-সম্ভবের প্রথম সাত সর্গকেই ইহার উপজীব্য-রূপে গ্রহণ করিয়াছি। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদটী প্রথম সর্গের ২১ ও ৫৩ সংখ্যক শ্লোকদ্বয়ের ভাবার্থ সম্প্রসারিত করিয়া দেওয়া হইয়াছে মাত্র। কবিবর রঙ্গলাল-প্রমুখ কয়েকজন মনস্বীর রচিত কুমার-সম্ভবের পদ্যানুবাদ এবং রবীন্দ্রনাথের মনােরম সমালোচনা বঙ্গ-সাহিত্য- ভাণ্ডারের অতুল সম্পদ। কতিপয় কাব্যানুরাগী লেখকও মহাকবির কাব্য-পরিচয়-প্রসঙ্গে এই উপাখ্যানের সারাংশ স্ব স্ব গ্রন্থে সঙ্কলন করিয়াছেন, তথাপি বাঙ্গালা গম্ব-সাহিত্যে সন্নিবিষ্ট করিয়া ব্যাপকভাবে সংস্কৃত-ভাষানভিজ্ঞ পাঠককে কুমার-সম্ভবের অনুপম সৌন্দর্যের কিঞ্চিত্র উপভােগ করাইবার অভিলাষ আমি পরিহার করিতে পারিলাম না। নৈসর্গিক উপাদানে সকলেই উপাস্য-মূৰ্ত্তি গঠন করিবার অধিকারী। কালিদাসের ‘রঘুবংশা’দি মহাকাব্য হইতে বাঙ্গালায় ‘সীতার বনবাস’ পৰ্যন্ত বহু প্রসিদ্ধ গ্ৰছই পূর্বসূরিগণের প্রসাদে রচিত। সুতরাং আমার এ উদ্যম বিফল হইবে না—ইহাই আশা করি। এই পুস্তক- ( 70 ) পাঠে কাহারও মূল কুমার-সম্ভব পাঠের বাসনা উদ্দীপিত হইলেই আমার পরিশ্রমের চরিতার্থতা। ছন্দ ও অলঙ্কার কাব্যের প্রধান সম্পদ। কথা-সাহিত্য বা গলে তাহা থাকে না ; স্বরূপতঃ উভয়ই ভিন্ন পদার্থ। বৰ্তমান সময়ে ‘কাব্যামৃত-রসাস্বাদ’ করিবার পাঠক বিরল হইলেও, তরুণদের ভিতর গল্পের রসাস্বাদ করিবার প্রবৃত্তি অনেকেরই আছে। কুমার- সম্ভবের দুই একটী সর্গ কদাচিৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যাংশ-স্বরূপ নির্দিষ্ট হইলেও কেবলমাত্র সংস্কৃত-সাহিত্যধ্যিায়ী ব্যতীত ইহার রসাস্বাদে অনেক উচ্চ-শিক্ষিত ব্যক্তিও বঞ্চিত। এজন্য আমার অবলম্বিত অংশে যাহাতে মহাকবির প্রায় সকল ভাবেরই সারাংশ অবিকৃত থাকে, তাহার প্রতি লক্ষ্য রাখা হইয়াছে ; তবে গল্পের আকারে পরিণত করিতে গিয়া কতিপয় স্থলের বহুবিস্তৃত আলঙ্কারিক বর্ণনা আমি অনিচ্ছায় পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছি, কিন্তু অধুনাতন প্রচলিত গ্রাম্য ভাষার ব্যবহারে কবির ভাষার প্রসাদ-গুণ খর্ব করা আদৌ সমীচীন মনে করি নাই। যে যে স্থল ব্যাখ্যা দ্বারা সহজবােধ্য হইতে পারে মনে হইয়াছে, সেই সেই স্থল ভিন্ন কোন অংশ বৃথা পল্লবিত করিতেও চেষ্টা করি নাই। সার বিষয় অনাড়ম্বরে প্রকাশের চেষ্টাতেই ভাষার সৌন্দৰ্য্য রক্ষিত হয়— ‘মিতং চ সারং চ বচো হি বাগ্মিতা। সহৃদয় পাঠকগণ ইহাকে কুমার- সম্ভবের সংক্ষিপ্ত বাঙ্গালা ব্যাখা-ভাবেও গ্রহণ করিতে পারেন। হিমালয়ের বিনয়-সৌজন্য, শিবের ভােগ-সুখে ঔদাসীন্য এবং গৌরীর ব্ৰত-পালনাদিতে কঠোর সংযম, যাহা এখনকার সমাজে বিলুপ্তপ্রায় হইতে চলিয়াছে—মহাকাব্যের অন্তর্নিহিত এই স্বতঃপরিস্ফুট প্রাচীন শিষ্টাচারগুলিকে লােকচক্ষুর বিষয়ীভূত করাই এই পুস্তকের প্রধান উদ্দেশ্য এবং তাহাই সহৃদয় পাঠক-সমীপে উপস্থাপিত করিয়াছি। এজন্য পঞ্চম সর্গ পৰ্যন্ত অনুসরণেই আমার উদ্দেশ্য সফল হইতে পারিত, কিন্তু প্রাচীন প্রথার প্রতি সশ্রদ্ধ হইয়া বিবাহান্তে হর-গৌরীর মিলন পৰ্যন্ত আমি ইহাতে সন্নিবিষ্ট করিয়া দিলাম। এরূপ একখানি মহাকাব্যের সার সঙ্কলন করিতে গিয়া আমার ন্যায় ক্ষুদ্র লেখকের পদে পদে ভ্ৰম-প্রমাদের অধীন হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। পাঠকগণ কৃপা করিয়া নিজগুণে সকল ত্রুটি মার্জনা করিবেন এবং ঐগুলি আমাকে জানাইয়া দিবেন, আমি পরবর্তি-সংস্করণে সংশােধন করিতে যত্নবান্ হইব। গৌরী, পাৰ্ব্বতী, হৈমবতী প্রভৃতি প্রত্যয়াত্মক নাম সচরাচর প্রচলিত থাকিলেও, গিরিরাজকুমারীর মাতৃদত্ত নাম ‘মা’। উমেতি মাত্রা তপসসা নিষিদ্ধা পশ্চাদুমাখ্যাং সুমুখী জগাম।গিরিজা মাতা কর্তৃক তপস্যায় নিবারিত হওয়ার জন্য যৌবনের প্রারম্ভে ঐ নামে অভিহিত হইয়াছিলেন। কিন্তু অন্যত্র দেখিতে পাই, (১ম সর্গ, ৪৩ শ্লোক) কবি তাহার তপস্যায় রত হইবার পূর্ববভি-কালের রূপ বর্ণন করিতে গিয়া বলিয়াছেন—“উমামুখন্তু প্রতিপদ্য লােলা দিসংশ্রয়াং প্রীতিনবাপ লক্ষ্মী। পরবর্তী কবিগণের মতেও তাহার শৈশবেই ‘উমা’ নামকরণ হইয়াছিল ‘গিরি, আর আমি পারি না হে প্রবােধিতে উমারে।'...ইত্যাদি সজন- বিদিত গানে তাহা পরিস্ফুট। এজন্য আমি প্রথম হইতেই ‘উমা’ নাম গ্রহণ করিতে কোনরূপ সংশয় করিলাম না। স্থাবর-জঙ্গমাত্মক-ভেদে হিমালয়ের দুইটী রূপ মহাকবি কল্পনা করিয়াছেন, এই পুস্তকেও তাহাই অনুসৃত হইয়াছে। ১৩২৯ বঙ্গাব্দে এই পুস্তকের প্রথম সাতটী পরিচ্ছেদ ‘উমা’ শীর্ষক ( 1 ) প্রবন্ধাকারে প্রথমে ‘এডুকেশন গেজেটে কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া প্রকাশিত হইয়াছিল। এতদিন ইহা সম্পূর্ণ করিতে পারি নাই। মাদৃশ অকিঞ্চন জনের মনােরথ যে উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে স্বতঃই হৃদয়ে লীন হইয়া থাকে, তাহা ত নূতন কথা নহে। সম্প্রতি কলিকাতার সুপ্রসিদ্ধ এলম প্রেসের স্বত্বাধিকারী শ্ৰীযুক্ত দেবপ্রসাদ মিত্র মহাশয়ের আগ্রহে ইহা সম্পূর্ণ হইয়া প্রতিপাদ্য-বিষয়ানুরূপ ‘হর-গৌরী’ নামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইল। মৌখিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিয়া তাহার প্রতি আমার কর্তব্য শেষ হইবার নহে। বীরভূম জেলার বসােয়া-নিবাসী সুপণ্ডিত বন্ধুবর যুক্ত প্রিয়নাথ কাব্য-পুরাণতীর্থ মহাশয় অনুগ্রহ করিয়া প্রুফ দেখিবার ভার লইয়া ইহার অনেক স্থল পরিশােধন করিয়া দিয়াছেন, এজন্য এই সদাশয়-দ্বয়ের নিকট আমি কৃতজ্ঞ রহিলাম। কিমধিকমিতি। শুত আশ্বিন, ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ। ঝাউদহ ডিউক ইনষ্টিটিউশন, ভুজঙ্গভূষণ শৰ্মা পােঃ ডােমজুড় ( হাওড়া)।
KAKAHDAH- HUWAAH. Etd:-1919, হল্প-গৌরী পুণ্যভূমি ভারতের উত্তরে গিরিরাজ হিমালয় বিরাজ করেন। পৰ্বতগণের মধ্যে ইহার প্রতাপের তুলনা নাই। দেহে যেমন ধরণী-ধারণের বিপুল শক্তি, তেমনি রত্ন, মাণিক্যেও তাহার ভাণ্ডার অফুরন্ত। অমরগণের যখনই যাহা-কিছুর প্রয়ােজন হয়, সে সমস্ত ইনিই দিয়া থাকেন। যজ্ঞের সােমলতাও ইহার নিকট ভিন্ন অন্য কোথাও অনায়াস-লভ্য নয়। নিজ ঐশ্বর্য-বিতরণোগিরিবর সর্বদা মুক্তহস্ত। এইরূপ নানাগুণের আধার বলিয়া বিধাতা তাঁহার যজ্ঞভাগ-প্রাপ্তির ব্যবস্থা করিয়া দিয়া, পৰ্বত- সমূহের আধিপত্য-দ্বারা তাহাকে সম্মানিত করিয়াছেন। মেনকা হিমালয়ের মহিষী। রূপে গুণে ইনি গিরিরাজের অনুরূপ গৃহিণী। কন্যা উমা তাহাদের এক- ; হর-গৌরী মাত্র প্রাণের ধন। মাতাপিতার যত-কিছু আনন্দ-সুখ, তাহা এই কন্যাটীকে লইয়া; যত অপত্য-স্নেহ, সব এই ক্যাটীর উপর। উমার অপরূপ রূপরাশি তাহাদের গৃহখানিকে উজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছে। তাহার গােরােচনরাগ-তুল্য অঙ্গ- লাবণ্য, মৃণাল-নিভ সুকুমার বাহুদু’টী, চম্পক-কলিকার মত করাঙ্গুলি ; কুরঙ্গীর আঁখির সদৃশ আয়ত আঁখি ; মুক্তার তুল্য দন্ত-পঙক্তির আভা দেখিলেই সকলে মােহিত হয় ; হৃদয়ে স্নেহধারা উথলিয়া উঠে একটী কথায় বলিতে হয়, সৌন্দর্যের ষােলকলা উমার দেহখানিকে সর্বপ্রকারে অাশ্রয় করিয়া রহিয়াছে। হিমালয় ও মেনকা কন্যার চন্দ্রানন দেখিয়া সারাটি দিন বড়ই আনন্দে যাপন করেন; নিশায় শয্যাপার্শ্বে বসিয়া কন্যার অপরূপ সুপ্তি- লাবণ্যে মােহিত হন। শুক্লপক্ষের চন্দ্র-লেখার মত কন্যা যত বড় হইতে থাকে, মাতাপিতার আনন্দ ততই উথলিয়া উঠে ; হৃদয়ের আশা-লতা ততই পল্লবিত হয়। ক্ষণেকের তারে প্রাণের ধন কন্যাটীকে না দেখিলে তাহাদের প্রাণ আকুল হয়। উমার অমিয়-মধুর-স্বরে তাহাদের হৃদয় যেন অমৃত-রসে প্লাবিত হইয়া যায়।
হর-গোরী
ক্রমে বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে উমা বালিকাসুলভ চাঞ্চল্যের
সহিত অধিকতর প্রভাবতী হইয়া উঠিল। তাহার কমনীয়
দীর্ঘ চিকুররাজি বেণী-বদ্ধ হইয়া নীলকান্ত মণির আভাকে ও
পরাজয় করিতে লাগিল।
গিরিকুমারী এখন মন্দাকিনীর সৈকতে বসিয়া
সখীদের সঙ্গে মনের আনন্দে পুতুল-খেলা করে। পুতুলেরই
শিব-সতী সাজাইয়া বিবাহ-উৎসবে মত্ত হয়। বাল্যের
এই খেলা-ধূলাতেই তাহার ভাবী জীবনের আভাস দেখা
যাইতে লাগিল। কন্যা কবে গৃহিণীপদে আসীন হইয়া
কোন্ ভাগ্যবানের গৃহ অলঙ্কৃত করিবে—রূপে গুণে
অনুরূপ কোন্ পুরুষবরের করে কন্যাদান করিবেন,
মাতাপিত এ ভাবনাও এক একবার ভাবিয়া থাকেন।
একদিন নারদ : ঋষি নানাস্থানে ভ্রমণ করিতে
করিতে হিমালয়ের রাজধানীতে আসিয়া কথ-প্রসঙ্গে
বলিয়াছিলেন,—“গিরিরাজ, তােমার এই কন্যা সাক্ষাৎ
ঈশ্বরী। ইনি জন্মগ্রহণ করিয়া তােমার কুল পবিত্র
করিয়াছেন। ভগবান শঙ্কর ইহার পতি।”
এই সৌভাগ্যের আশা হৃদয়ে ধরিয়া পৰ্বতরাজের
দিনগুলি বেশ চলিয়া যাইতেছিল।
দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর শঙ্কর নিরতিশয় উন্মনা হইয়া রহিয়াছেন বটে, কিন্তু তাহার মুখকান্তি যােগানন্দ-প্রভায় সর্বক্ষণ উজ্জ্বলই রহিয়াছে ; শশাকের ছায়া পড়িয়া তাহা ম্লান হইয়া যায় নাই। শােক-তাপের অতীত আনন্দময় মহাপুরুষের হৃদয়ে বিষাদ কখনও স্থান পায় না। সতী যে তাহার অসীম বিরাট্ররূপে মানস- নেত্রে উপলব্ধ হইতেছেন। বিশ্বের প্রতি পরমাণুতে তিনি আজ সতীর সত্তা অবলােকন করিতেছেন। ত্রিজগৎ তাহার নিকট সতীময়। শঙ্কর নির্বিকার । কিন্তু হায়! মহেশের কৈলাস-ভবন যে আজ শূন্য ! পশু-পক্ষীও সে স্থানে গমনাগমনে বিরত হইয়াছে। স্থানে স্থানে কীট-পতঙ্গ আশ্রয় লইয়া উহা আবর্জনায় পূর্ণ করিয়া ফেলিয়াছে। তৈজস-পাত্রগুলি বিপর্যস্তভাবে পড়িয়া রহিয়াছে ; মার্জনার অভাবে সেগুলি এখন বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে। এক সতীর অভাবে দশ দিক্ শূন্যময়! হিমাদ্রির হিমকণাসিক্ত পবনও যেন সেথানে দীর্ঘশ্বাস -৪-
হর-গৌরী
মােচন করিতেছে। পিনাকীর ললাটস্থ চন্দ্রলেখার রশ্মিও
মন্দীভূত হইয়া পড়িয়াছে।
সতী নাই; আর প্রভাতে বিল্ববৃক্ষমূলে অজিন আস্তীর্ণ
করিয়া যােগেশের জন্য আর কাহাকেও যােগাসন রচনা
করিতে দেখা যায় না। মধ্যাহ্নে বিদল ও দূৰ্বাক্ষতের
সহিত ধূস্তর কুসুম-যােগে অর্ঘ্য-রচনা করিতেও আর কেহ
ব্যগ্র হয় না। সায়াহ্নে অগুরু-ধূপের দিব্য গন্ধ ও
মঙ্গল শঙ্খধ্বনিও আর তথায় উখিত হয় না।
হায়! অন্নপূর্ণার অভাবে কে-ই বা যথাকালে সুধা-
স্বাদু অন্ন-ব্যঞ্জন দিয়া যতিবরের তৃপ্তি-সাধন করিবে ?
নিরাহারেই মহেশের দিনগুলি চলিয়া যাইতেছে।
নন্দীকেশ্বর-প্রমুখ অনুচরগণ শশাকে ম্রিয়মাণ হইয়া
যথা-তথা দেহ লুণ্ঠিত করিতেছে।
সিংহ এবং বৃষভ
একযােগে অনুক্ষণ শৈল-শিখর কম্পিত করিয়া ভীম
আর্তনাদে গগন বিদীর্ণ করিতেছে।
কৈলাসের সকল স্থানই শ্রীহীন। তথায় কেমন এক
নিঝুম নিরানন্দ-ভাব দেখা দিয়া আসন্ন-প্রলয়ে ধরণীর
রসাতলে যাইবার মত ভয়াবহ দশার সূচনা করিতেছে।
নিত্য উৎসব-ময় স্থানগুলিতে আজ দারুণ হাহাকার !
কোথাও শিঙ্গা-ডমরুর তালে তালে বীণা-মুরজের মধুর
হর-গৌরী নিক্কণ শ্ৰত হয় না। কিন্নর-কিন্নরীদের অমৃতস্রাবী সংগীতও আর শুনা যাইতেছে না। তরু-লতা প্রাণহীন বলিয়া অনুমিত হইতেছে। সতীর সযত্ন-রােপিত আশ্রম- তরুগুলিও আর ফল-ফুলে সুশােভিত নাই। হায়! এককালে যেথায় ছয়টী ঋতুর উপভােগ্য লাে, কুন্দ, কুরবক, শিরীষ, নীপ প্রভৃতি প্রসূন-চয় একযােগে বিকসিত হইয়া অভ্যাগত-জনের প্রাণে আনন্দধারা বর্ষণ করিত, বন্য গুল্ম-লতায় তাহার অনেকাংশ এখন লােকের অগম্য হইয়া উঠিয়াছে। ভ্রমরের গুঞ্জন এবং শিখিকুলের কেকারবে যে-স্থান নিয়ত মুখরিত হইত, তাহা এখন নীরব-নিস্পন্দ ! সেই তমাল-তলের ক্রীড়াভূমি, সেই মাধবীমণ্ডপ--সবই রহিয়াছে বটে, কিন্তু সতীর সখীরা আর সে-দিকে আইসে না। রক্তাশােক আর বিকসিত হয় না, তাহার বৃক্ষমূল সতীর পাদস্পর্শহীন। বকুল-শাখা দীর্ঘকাল অপুষ্প থাকিয়া শুকাইয়া মরিতেছে। সহকার-শাখায় মুকুল উদগত হইয়া আর নব-বসন্তের সূচনাও করে না ; কোকিল-কোকিলার পঞ্চম-তানে কৈলাসের বনভুমিও আর ঝঙ্কৃত হয় না। নন্দা, অলকনন্দা প্রভৃতি স্বর্ণদীদের রাজত-স্রোতঃ ম্লান ; তাহারা। এখন শীর্ণতােয়া।
হর-গােৱী সতীর স্নানীয় উপকরণ ও কুঙ্কুমরাগ তাহাদের পূত ৰারিকে আর সুবাসিত এবং রঞ্জিত করে না। মহাদেব কৈলাস হইতে দূরে হিমাদ্রির এক প্রান্তে গিয়া স্থিমিত-নেত্রে তপস্যায় প্রবৃত্ত হইলেন। শিব-শক্তির মিলন ব্যতীত ত্রিলােকের সকল দেব- কাৰ্য্যই বিফল হইতেছে। মেঘ যথাকালে বারি-বর্ষণে বিরত হওয়ায়, ধরণী শস্যহীনা হইয়াছেন। নদ-নদীর স্রোতঃ মন্দীভূত হইয়া গিয়াছে। কপিলা দুগ্ধধারা- প্রদানে বিমুখ হইয়াছেন। স্নেহ, দয়া, প্রীতি, ভক্তি প্রভৃতি গৃহীর আশ্রম হইতে বিলুপ্তপ্রায়। কোথাও মঙ্গলের চিহ্নমাত্র পরিলক্ষিত হয় না। সর্বত্র অন্নাভাব। পৃথিবীময় হাহাকার পড়িয়াছে ! দান-ধৰ্ম্ম, আতিথেয়তা এবং যজ্ঞাদি সৎকর্মের নামমাত্রও শ্রুত হইতেছে না। স্বর্গপুরে দেবগণের প্রতি তারকাসুরের প্রবল অত্যা- চার চলিয়াছে। মহাশক্তির তিরােধানের সঙ্গে সঙ্গে দেবগণও হতবীৰ্য ; তাহারা সেই প্রবলপ্রতাপ দানবকে ;
হর-গৌরী দমন করিতে সমর্থ হইতেছেন না; তাহার নিরতিশয় পীড়নে সর্বদা সশঙ্ক রহিয়াছেন। তপনদেবকে প্রখর কিরণ সংযত করিতে হইয়াছে। তাহার সহস্ররশ্মি হীন- প্রভ হওয়ায়, জগতের মঙ্গল সাধিত হইতেছে না। তারকের দীর্ঘিকা-সমূহে পদ্মপুষ্প বিকসিত করিবার জন্য অতি সামান্যমাত্র কিরণ তাহার অবশিষ্ট আছে। চন্দ্রও জগতে জ্যোৎস্না-ধারা বিতরণে বিরত প্রায় হইয়াছেন। মহেশ্বরের ললাট-ভূষণ-স্বরূপ একটা মাত্র কলা এখন তাহার আছে ; বাকীগুলি তারক অপহরণ করিয়াছে। পবনের প্রবল বেগ এখন খবৰীভূত ; তাহার আর স্বচ্ছন্দ- গতি নাই। তালবৃন্ত-সঞ্চালনে যতটুকু মৃদু বায়ুর সঞ্চার হইতে পারে, সভয়ে তাহাকে সেইরূপ মৃদুগতি হইতে হইয়াছে। ষড় ঋতু এখন উদ্যান-রক্ষী হইয়া ঐ দুর্ধর্ষ দানবের জন্য পুষ্প-আহরণে ব্রত। রত্নাকর তাহাকে রত্ন-সম্ভার উপহার দিতেছেন। নাগরাজ বাসুকি মাথার মণি দ্বারা তাহার পুরীতে নৈশ অন্ধকার দূর করিতেছেন। দেবরাজ বাসবও নন্দনকানন হইতে কল্পবৃক্ষের পুষ্প- রাশি উপহার দিয়া তাহার পরিতোেষ-সাধনে ব্যস্ত। এমন কি, তাহার নিদ্রাকালে সুরবালাগণকেও চামর-বীজন করিতে হইতেছে।
হর-গৌরী নন্দন-কাননেরও আর তেমন শ্রী নাই। তারক তাহার বৃক্ষগুলিকে দিন দিন ছেদন করিয়া ফেলিতেছে। মেরু-পৰ্বতের অত্যুচ্চ শৃঙ্গটীকে ভাঙ্গিয়া লইয়া সে নিজ প্রাঙ্গণে ক্রীড়া-শৈল প্রস্তুত করিয়াছে। ইন্দ্রের বেগবান্ প্রিয় অশ্ব উচ্চৈঃশ্রবাকে সে বলপূৰ্ব্বক করায়ত্ত করিয়াছে ; আকাশে বিমানপথ রুদ্ধ করিয়া দেবগণের যথেচ্ছ- ভ্রমণেও বাধা দিতেছে। যজ্ঞাদি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান আরম্ভ হইলেই সে সদর্পে আসিয়া অগ্নিমুখ হইতেই যজ্ঞীয় হবি অপহরণ করিয়া লইয়া যাইতেছে । চরম এ অত্যাচার। দেবগণ আর কত সহ্য করিবেন ? সর্বংসহা বসুন্ধরারও ইহা অসহ্য! কিন্তু জগতে কিছুই ত স্থায়ী নয়—ইহারও পরিণাম আছে। ব্রহ্মার বরে প্রবল-প্রতাপ হইলেও অত্যাচারীর দমন আছে। দাহিক-শক্তি যতই তীব্র হউক না কেন, অগ্নিকেও নিৰ্বাপিত করিবার উপায় আছে। ইন্দ্র প্রমুখ দেবগণ ইহার আশু প্ৰতীকারের জন্য ব্ৰহ্মলােকে গমন করিলেন। এ সঙ্কট ব্ৰহ্মার শরণ- গ্রহণ ভিন্ন আর কি উপায় আছে ?
দেবগণ বিরাটু-পুরুষ ব্রহ্মার চরণে প্রণত হইয়া স্তুতি আরম্ভ করিলেন। পদ্মযােনির পদ্মাসন টলিল। ধ্যানে বিরত হইয়া তিনি দেবগণকে সাদর অভ্যর্থনা-সহ কুশল- প্রশ্ন জিজ্ঞাসায় আপ্যায়িত করিলেন। ব্রহ্মা দেখিলেন, দেবগণের মুখমণ্ডলে আর তেমন প্রভা নাই-হিমক্লিষ্ট জ্যোতিষ্কের মত তাহা ম্লান দেখাইতেছে। বাসবের বজ নানাবর্ণের বিচিত্র আভা বিকিরণ করিত, আজ তাহা বিবর্ণ ! মন্ত্রশক্তিতে রুদ্ধবীৰ্য্য সর্পের মত বরুণের নাগপাশও যেন কত নিশ্চেষ্ট—অসার! কুবেরের গদাটীও শাখাশূন্য বৃক্ষের মত ভূমিতে পতিত। যম ত গদা হস্তে করিয়া উদাসপ্রাণে ভূতলে কি লিখিতেছেন। সে গদাও নির্ধাপিত বহ্নির অঙ্গারবৎ নিস্তেজ ! তেজঃ- সম্পদে আদিত্যগণের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপও যে সম্ভব হইত না, সেই তেজ এখন শৈত্যে পরিণত হইয়া দারুণ দশ-বিপর্যয়ের দ্যোতনা করিতেছে। মরুতের গতিও বিপর্যস্ত; বেগও স্তব্ধীভূত। একাদশ রুদ্রের জটাকলাপ
হর-গৌরী
নিম্নগামী হইয়া চন্দ্ররেখান্বিত ললাটকে ঢাকিয়া ফেলিতেছে।
তাহাদের দীর্ঘ হুঙ্কারও আর শুনা যাইতেছে না।
বিস্মিত হইয়া ব্রহ্মা জিজ্ঞাসা করিলেন--“অমরগণ !
তােমরা পরম স্নেহভাজন, তােমাদের মলিন মুখ দেখিয়া
আমার নানা সংশয় জন্মিতেছে। সকলে মিলিয়া আজ
কেন আমার কাছে আসিলে বল। কোন প্রবল শত্রুর
নিকট পরাজিত হইয়াছ কি ? তােমাদের রাজ্যাধিকার কেহ
বলপূৰ্ব্বক কাড়িয়া লয় নাই ত ? জগতের সৃষ্টিই আমার
কাজ, তাহার পালনের ভার ত তােমাদেরই উপর।”
ইন্দ্রের সহস্র-নয়ন তখন বাষ্পচ্ছন্ন ; কণ্ঠবােধ হেতু
তাহার উত্তর দিবার সামর্থ্য হইল না। তিনি বাবির
বৃহস্পতিকে দুঃখের কথা নিবেদন করিতে ইঙ্গিত
করিলেন।
অগ্রসর হইয়া দেবগুরু বিনয়-নম্র-মুখে বলিতে আরম্ভ
করিলেন,
“পিতামহ, আপনি মৰ্ম্মজ্ঞ এবং সর্বজ্ঞ—জীবের
হৃদয়গত পরমাত্মা। আপনার অবিদিত কিছুই নাই।
অন্তর্যামীর নিকট প্রার্থনীয় কি থাকিতে পারে ? যিনি
অশেষ মঙ্গলের নিধান, তাহার কাছে কল্যাণপ্রার্থী
হওয়াও নিপ্রয়ােজন। তবে যখন অনুমতি করিয়াছেন,
হর-গৌরী তখন কিছু নিবেদন করিতেছি। আমাদের দুর্দশার বিষয় যাহা ধারণা করিয়াছেন, তাহাই সত্য। আমাদের অধিকার শত্রুর করায়ত্ত। অন্তশ্চ আপনি যে ইহা পূৰ্বেই বিদিত হইয়াছেন, তাহাতে বিস্মিত হইবার কিছুই নাই। আপনার নিকট বর পাইয়া তারক দানব সপ্ত- লােকে যারপরনাই উৎপীড়ন করিতেছে। দেবগণ স্ব স্ব অধিকারভ্রষ্ট-এখন তাহারই অধীন। সূৰ্য, চন্দ্র, পবন, যম, বরুণ, এমন কি—দেবরাজ ইন্দ্র পর্যন্ত যে আজ তাহার সেবক ! যজ্ঞাদি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান ত দূরের কথা, নির্ভয়ে আমরা এখন বৈধ-ধৰ্ম্মেরও আচরণ করিতে পাই না। স্বর্ণ-প্রসূ দেবভূমির সর্বসম্পন্ দানবে গ্রাস করিতেছে ; হৃতসর্বস্ব আমরা ইহার প্রতীকারের উপায় করিতে পারিলাম না! সান্নিপাতিক বিকারে বীৰ্যবান্ ঔষধও নিষ্ফল হয়, আমাদেরও সন্ধি, বিগ্রহ প্রভৃতি নানা উপায় ব্যর্থ হইয়াছে। পরাজিত অমরগণের এখন মরণই শুভ মনে হইতেছে। তাই প্রার্থনা করি, হে পিতামহ, আপনি এমন একজন সেনানী সৃষ্টি করিয়া দিন, যিনি সমস্ত দেব-সৈন্যের রক্ষক হইবেন; ইন্দ্র যেন তাহার বলে আশু ঐ দুৰ্দর্ষের উচ্ছেদ করিয়া বিজয়ী হইতে পারেন।”
হর-গোরী দয়াদ্র হইয়া ব্রহ্মা গম্ভীরস্বরে বলিলেন—“হঁ, সত্য বটে, তারক দানব আমার বরেই এত দর্পী। তাহার তীব্র তপস্যা-জনিত বিশ্বের ভীতি নিবারণের জন্য তাহাকে বর দিয়া শান্ত করার প্রয়ােজন হইয়াছিল। অপাত্রে অর্পিত দৈব-শক্তির ফল এইরূপই বিরুদ্ধ হয়। তােমরা আরও কিছুকাল অপেক্ষা কর। এখন আমার দ্বারা উহার বিনাশ উচিত হয় না। স্বহস্তে রােপিত ও বর্ধিত করিয়া বিষবৃক্ষকেও যে মারিতে নাই। তােমাদের ঈঙ্গিত সেনানী আমার দ্বারা সৃষ্ট না হইয়া শিব-শক্তির অংশে জন্ম-লাভ করিবেন। পরমজ্যোতিঃ-স্বরূপ মহেশ্বর এখন যােগমগ্ন। গিরিরাজ হিমালয়ের তনয়া উমার সহিত মিলন ঘটাইয়া তােমরা তাহার সমাধি-নিশ্চল মনের গতি সংসারের দিকে প্রত্যাবর্তিত করিতে প্রয়াসী হও। দক্ষ- যজ্ঞে দেহ-বিসর্জনের পর শিবপত্নী হিমালয়কন্যা উমারূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। ইহাদের ভাবী পুত্র কার্তিকেয় দেব-সেনাপতি হইয়া দানব-দলনের জন্য যুদ্ধ করিবেন। তখন বিজয়ী হইতে পারিবে। অতিদর্পের ফলে তারকও বিনষ্ট হইবে।” দেবগণকে শান্ত করিয়া বিদায় দিবার পর ব্রহ্ম। অন্তর্হিত হইলেন।
দিনে দিনে কুমারী-সুলভ চাঞ্চল্য দূরে গিয়া উমার
দেহে কৈশাের-লাবণ্য-বিকাশের সূচনা হইল। অঙ্গকান্তি
অধিকতর কমনীয় হইবার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বজন্মের অর্জিত
জ্ঞান-নিচয় সংস্কার-বশে ধীরে ধীরে তাহাকে আশ্রয়
করিল।
উমা এখন অরুণােদয়ের পূর্বে পুষ্প চয়ন করেন ।
পূজার বেদী সম্মার্জিত করিয়া একাগ্রমনে শিবপূজায় রত
হন। সখীদের সঙ্গে গঙ্গাতীরে গিয়া যােগনগ্ন মহেশ্বরকে
দর্শন করেন। সমিধ, কুশ, পুষ্প, চন্দন, দূৰ্ব্বা প্রভৃতি
পূজার উপকরণ সযত্নে আহরণ করিয়া তাহাকে উপহার
দিয়া আসেন।
গিরিরাজের ইহাতে অপার আনন্দ ! উমা তাহার
ভক্তিমতী কন্যা। ভবেশের করে তাহাকে অর্পণ করিতে
পারিলে তাহার জীবন ধন্য হয়; কুলও পবিত্র হয়।
উমাও মহেশে অনুরাগিণী। কন্যা ভবানী হইবেন, আর
তিনি ত্রিলােচনের নমস্য হইবেন ! অসঙ্গত এ উচ্চা-
ভিলাষ। তথাপি নারদের কথা স্মরণ করিয়া তিনি
===
-১8-
হর-গৌরী
আশান্বিত হন। উমাকে লইয়া গিয়া গিরিশের হস্তে
অৰ্পণ করিতেও তাহার এক এক বার ইচ্ছা হয় ।
কিন্তু সমাধিমগ্ন যােগেশ্বর যদি তাহার প্রার্থনায়
মনােযােগ না দেন, তবে সকল আশা বিফল
হইবে---ক্ষোভের সীমা থাকিবে না।
এজন্য তিনি
মনের গােপন কথা কাহাকেও না বলিয়া উমাকে
সখীদের সঙ্গে গঙ্গাতীরে গিয়া সকল তপস্যার ফলদাতা
শিবের আরাধনা করিতে তানুমতি দিয়াছেন।
হিমাচলের যে স্থানে শঙ্কর তপস্যায় নিরত, তাহা বড়
মনােরম। দেবদারু বৃক্ষনিচয়কে অল্প তাল কম্পিত করিয়া
মৃদু-মন্দ সমীরণ তথায় প্রবাহিত।
জাহ্নবী মৃদুতরঙ্গে
সদা হাস্যময়ী। মৃগ-নাভির সৌরভে সে-স্থানের দশদিক্
আমােদিত—কিন্নর-কিন্নরীর সুললিত গানে মুখরিত ও
প্রীতিপ্রদ।
প্রমথগণ তথায় শিলাজতুব্যাপ্ত শিলাতলে সারাদিন
বসিয়া রহে।
পরিধানে তাহাদের ভূর্জবল্কল ;
সৰ্বাঙ্গ
মনঃশিলার রাগে চিত্রিত এবং কর্ণদ্বয়ে নমেরু-কুসুম
শােভা পায়।
গিরিকুমারী সখীদের সঙ্গে প্রত্যহ এই স্থানে
আসিয়া শিবের দেবদারু-মূলের বেদীটি মার্জনা করিয়া
হর-গৌরী দেন; কুশ-কুসুম, ও গঙ্গাজল আনিয়া দিয়! তাহার যথাে- চিত পরিচৰ্যাও করিয়া থাকেন। ব্ৰহ্মানন্দে বিভাের শঙ্করের চিত্ত নির্বিকার। কিশােরী গৌরীর এই ভক্তিপূর্ণ পরিচর্যার কোনরূপ প্রত্যাহার তিনি করিলেন না। দুৰ্বল-চিত্তেরাই কামিনী-কাঞ্চনের মােহে আত্মহারা হয়, অথবা সংযমের অন্তরায় ভাবিয়া তাহা হইতে দূরে থাকিবার প্রয়াসী হয়। কিন্তু চিত্ত- ক্ষোভের কারণ থাকিতেও যাহারা নির্বিকার থাকিতে পারেন, তাহারাই প্রকৃত ধীর। ভােগে উদাসীন শঙ্করের ভস্ম ও সুবর্ণে সমান জ্ঞান পার্থিব সুখ-সম্পদ তাহার কাছে হেয়। দেব-রাজ্যে তাহার মত ধীর আর কে আছেন ? মন্মথের সাহায্যে ইন্দ্র শিবের সমাধি ভঙ্গে উদ্যত হইয়াছেন। ত্রিলােকের সর্বত্র মন্মথের অব্যাহতগতি ; প্রভাবও তাহার অক্ষুন্ন। যােগ্য সখা বসন্ত তাহার সর্বদা সহচর। কুসুম-ধনু আর পঞ্চ-পুষ্পের পঞ্চ বাণ তাহার —১৬- হর-গেরী অব্যর্থ অস্ত্র। ইহার প্রভাবে তিনি বহুবিজয়ী। তাহার বলেই ইন্দ্রের পদ নিষ্কণ্টক। ইন্দ্ৰত্ব-কামনায় যে-কেহ তপস্যা করিবার উদ্যম করিয়াছে, মদন তখনই তাহা ব্যর্থ করিয়া দিয়াছেন। মদন ভিন্ন ইন্দ্রের তেমন সহায় আর কেহ নাই। কিন্তু দেবরাজ ভাবিলেন না যে, শুধু স্বার্থ- সিদ্ধির আশায় যাহাদের তপস্যা, মদনের শক্তি তাহাদেরই সাধনা পণ্ড করিতে সমর্থ - নিষ্কাম ধীর-পুরুষের নিকট তাঁহার যে নিত্য পরাজয় ! পরাক্রম প্রবল হইলেও তাহা যতাত্মা তপােধনদিগের নিকট তুচ্ছ, যােগেশ্বর শিবের নিকট যে অতিতুচ্ছ, তাহার ত কথাই নাই। স্মরণ করিবামাত্র মদন পুষ্পধনু স্কন্ধে করিয়া সখা বসন্তের সহিত ইন্দ্রের নিকট উপস্থিত হইলেন। তাঁহার ধনুর কোটি নারীগণের প্রা-লতার মত সুন্দর। বসন্তের হস্তে রহিয়াছে তাহার অব্যর্থ একটী বাণ— চুর। দেবগণের মধ্যে মদনের প্রগতা কিছু অধিক। ইন্দ্রের নিকট সমাদরে আসন-গ্রহণের অনুমতি পাইবামাত্র নিঃসঙ্কোচে তিনি বলিতে আরম্ভ করিয়াছেন, “দেবরাজ, অধীনকে স্মরণ করায়, সে কৃতার্থ হইয়াছে। এখন আজ্ঞা প্রদান করিয়া আপনার এই স্মরণ-জনিত অনুগ্রহ বৃদ্ধি করুন—কোন কাৰ্য এক্ষণে
হর-গৌরী
সম্পন্ন করিয়া আপনাকে সুখী করিতে হইবে ? আপনার
কোন্ শত্রুর ধর্ম, অর্থ—দুই-ই আমায় বিনষ্ট করিতে হইবে,
তাহা জানিতে পারিলেই চরিতার্থ হইব।
যদি কোন
অধম ব্যক্তি স্বর্গরাজ্যের অধীশ্বর হইবার জন্য তপস্যার
দ্বারা আপনাকে ক্ষুব্ধ করিয়া থাকে, তবে আমি এই
দণ্ডেই শরাসনে শসন্ধান করিয়া তাহাকে আপনার বশে
আনিব। আর যদি কেহ আপনার অনুমতি ব্যতীত
সংসারমুক্ত হইতে অভিলাষী হইয়া তপস্যায় রত থাকে,
তবে আমি তাহাকে স্ত্রী-জাতির মােহে অভিভূত করিয়া
ভগ্নসঙ্কল্প করিতে অগ্রসর হইব। অনুরাগ আমার বিশ্বস্ত
ইহার সহায়তায় আমিও বিশ্ববিজয়ী। আমি
স্পর্ধা করিয়া একথা বলিতে পারি যে, পরমনীতিজ্ঞ
জনেরও আমার হস্তে নিস্তার নাই। অতএব হে বীর,
আপনি নিশ্চিন্তমনে বিশ্রাম করিতে থাকুন; আপনার
বজুও বিশ্রাম লাভ করুক। জানিবেন, শুধু আপনার
কৃপায় আর সখা বসন্তের সহায়তায় পুষ্পধনুধারী হইয়াও
আমি পিনাকপাণি হরের পর্যন্ত ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটাইতে পারি,
অন্য ধনুর্দ্ধর ত কোন্ ছার!”
একটা আশ্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করিতে করিতে ইন্দ্র
বলিলেন,-
হর-গোরী
“তােমার বল-বীৰ্য্য আমি ত জানি সখা, সেই জন্যই
ত সঙ্কটে পড়িয়া তােমায় স্মরণ করিয়াছি। আমার সহায়
বলিতে এই বজ আর তুমি।
বজ তপােধনদিগের
নিকট নিস্ফল ; তুমি সকল স্থলেই অব্যাহত। আমার
অব্যর্থসন্ধান মহাস্ত্র বলিতে তুমিই আছ। এখন যাহা
যাহা বলিলে, তাহার সমস্তই তােমাতে সম্ভব। বিশেষতঃ
“হরেরও ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটাইতে পারি’--এই কথাতেই আমি
প্রায়ই সফলকাম হইলাম মনে করিতেছি। এখনকার
কাজও তােমার তাই। সে-কথাটি স্বতঃই তােমার মুখ
হইতে বাহির হইয়াছে। তথাপি কাজটি ভাল করিয়া শুন।
এক্ষণে প্রবল শত্রু তারকাসুর আমাদের স্বর্গরাজ্যে কিরূপ
অত্যাচারী হইয়া উঠিয়াছে, দেখিতেছ ত? অমরগণ
বড়ই বিপন্ন। দেব-ভূমিকে নিরাপদ করিবার জন্য
তাহাদের সকল প্রয়াস নিষ্ফল হইয়াছে । এখন তাহারা
দানব-দলন-জন্য শিব-পুত্রকে সেনাপতিরূপে পাইতে
চাহেন। শিব এখন যােগমগ্ন ; পরমতত্ত্বে তাহার চিত্ত
তােমার সম্মােহন-বাণে তঁাহার যােগভঙ্গ কর
এবং হিমাজ্ঞিকন্যা উমা যাহাতে তাহার মনােহারিণী হন,
সে বিষয়ে তুমি সচেষ্ট হও। পূৰ্ব্বজন্মে ইনিই তাহার
পত্নী ছিলেন, এ কথা হরও জানেন ; বিধাতাও আমাদিগকে
লীন।
হর-গৌরী বলিয়া দিয়াছেন। সেই উমা প্রত্যহ পােবনে আসিয়া শিবের পরিচর্যাও করিয়া থাকেন। আমার গুপ্ত- দূতী অপ্সরাদের মুখে ইহা শুনিয়াছি। অতএব এই সুযােগে তথায় গিয়া নিজ কাৰ্য্য সাধন কর। দেবগণ আজ তােমার নিকট প্রার্থী। কাজটীও ত্রিলােকের পক্ষে অতিশয় কল্যাণকর ; অথচ নিষ্ঠুরতার লেশমাত্র ইহাতে নাই।” গর্বে মদনের বক্ষঃ স্ফীত হইয়া উঠিল। ‘আপনার আদেশ মাথায় করিয়া লইলাম'—বলিয়া তিনি সানন্দে সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। দেবরাজ ও তাহার মস্তকে সাদরে হস্তাৰ্পণ করিয়া যথেষ্ট প্রীতি দেখাইতে কিছুমাত্র ত্রুটি করিলেন না। ‘প্রাণপণে আপনার কাৰ্য্য সাধন করিব’—বলিয়া মদন প্রস্থান করিলেন এবং সংযমী মুনিগণের তপস্যার বিরােধী সখা বসন্তকে সঙ্গে লইয়া শিবের যােগাশ্রমের দিকে যাত্রা করিলেন ।
ఎr মহেশ্বরের আশ্রম-সন্নিধানে অকালে বসন্তের প্রাদুর্ভাব দেখা গেল। তপনদেব দক্ষিণায়ন হইতে অকস্মাৎ উত্তরায়ণে যাত্ৰা করিলেন। তখন দক্ষিণদিক্ হইতে মলয়ানিল প্রবাহিত হইতে আরম্ভ হইয়াছে। অশােক- তরুগুলি নব-কিশলয়ে শোভিত হইয়া প্রসূনচয় প্রসব করিতে সংপ্রবৃত্ত। সমগ্র বনভূমি চুত-মুকুলের সুবাসে আমােদিত। নানাস্থানে বিকসিত পলাশপুষ্পে তাহার শােভাও পরমরমণীয় । মদোদ্ধত হরিণেরা পিয়াল-মঞ্জরীর পরাগে দৃষ্টি-হারা হইয়া তখন চারিদিকে ছুটাছুটি করিতেছে। ভ্রমর-ভ্রমরী একই কুসুমদলে বসিয়া একত্র মহানন্দে মধুপানে বিভাের। কৃষ্ণসার, স্পর্শসুখে নিমীলিত-লােচনা মৃগীর গাত্র শৃঙ্গ-দিয়া কয়ন করিয়া দিতে অতিশয় ব্যস্ত। কন্দর্প নিজ পুষ্পময় শরাসনে জ্যা-রােপণ করিয়া রতির সহিত সদর্পে তপােবনে প্রবেশ করিবামাত্র স্ত্রী, পুরুষ-প্রত্যেকে পরস্পর অনুরাগভরে আকৃষ্ট হইয়া
হর-গৌরী
উঠিল। তরুসকল শাখাবাহুর দ্বারা লতার সহিত মিলনা-
বদ্ধ হইল।
আশ্রমে আশ্রমে তাপসগণ প্রকৃতির এই আকস্মিক
পরিবর্তনে চমকিত হইলেন। অসময়ে এই বসন্তের
অভ্যুদয় নিশ্চয় স্থায়ী হইবে না ভাবিয়া যদিও তত বিচলিত
হইলেন না, তথাপি আশু চিত্ত-বিকারের কারণগুলিকে
পরিহার করিতে অধিকতর প্রযত্ন করিতে লাগিলেন।
অসময়ে প্রকৃতির এরূপ বিপরীত লীলা। চারিদিকে
কিন্নর-কিন্নরীর সুশ্রাব্য সংগীতালাপ—কোকিলকুলের
পঞ্চম তান ; আর চূত-মুকুলের সুগন্ধে মুগ্ধ ভ্রমর-নিকরের
মধুর গুঞ্জন।
ত্রিলােচনের ইহাতে ভ্রক্ষেপ নাই। সহস্র
প্রলােভন বা বিপ্ন কখনও সংযমীর সাধনা পণ্ড করিতে
পারে না। সমাধিস্থ থাকিয়া তিনি ব্রহ্মানন্দে বিভোের।
মস্তকে তপস্বীর অভীষ্ট চিহ্ন জটাজাল ; সর্বাঙ্গে বিভূতি
এবং ললাটে চন্দ্রকলা ধারণ করিয়া তিনি যােগপট্রে
সমাসীন।
আশ্রম-প্রান্তস্থ লতা-মণ্ডপের দ্বারে হেমবেত্র-হস্তে
নন্দী দণ্ডায়মান ; প্রমথগণকে ঈষৎ চঞ্চল দেখিয়া ওষ্ঠে
অঙ্গুলি-ক্ষেপণের ইঙ্গিত দ্বারা সতর্ক করিতেছেন।
নন্দীর শাসনে তরুসমূহ নিস্পন্দ ; অলিকুল নিশ্চল
-২২-
হর-গৌরী এবং পক্ষিগণ নীরব হইল। হরিণেরাও ক্রীড়া ছাড়িয়া বেশ শান্ত হইয়া উঠিল। মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র তপােবনটা একখানি চিত্রপটের মত স্থিরভাব ধারণ করিল। উদ্ধত মনােভব বুঝিলেন না যে, তাহার চরমকাল সমুপস্থিত। অথবা বিনাশকালে বুদ্ধি-বিপৰ্যয় কে-ই বা বুঝিতে সমর্থ হয় ? তিনি এখন নন্দীর তীব্র দৃষ্টি অতিক্রম করিয়া সুর-পুন্নাগ বেষ্টিত মহেশের তপস্যা- ক্ষেত্রে নির্ভয়ে অগ্রসর হইয়াছেন। মদন দেখিলেন, দেবদারুমূলে দিব্য বেদীর উপর পিনাকী যােগমগ্ন। তিনি বীরাসনে সমাসীন। তঁাহার ত্রিনয়ন ঈষৎ স্তিমিত হইলেও নিৰ্ব্বাত স্থলের নিষ্কম্প দীপ- শিখার মত প্রভান্বিত। দেহের উদ্ধৃভাগ নিশ্চল। স্কন্ধদ্বয় ঈষৎ অবনমিত। উত্তান হস্তদুইখানি তাহার ফুল অরবিন্দের শােভা ধরিয়া রহিয়াছে। মস্তকের জটাকলাপ ভুজঙ্গ-পাশবদ্ধ। • কর্ণে দ্বিগুণিত অক্ষসূত্র। কুফসার- চর্ম গ্রন্থিবদ্ধ হইয়া স্কন্ধে লম্বমান । অক্ষির জ্ব-বিক্ষেপ তঁাহার একান্ত উদাসীন; কখনও বা নিশ্চল পদ্ম-পঙক্তি ভেদ করিয়া ঈষৎ প্রকাশমান তিনটী নয়নতারা হইতে দিব্যজ্যোতিঃ স্ফুরিত হইয়া নাসাগে প্রতিফলিত হইতেছে। প্রাণায়ামে দেহের পঞ্চ বায়ু রুদ্ধ করিয়া বর্ষণহীন মেঘের হর-গৌরী মত গম্ভীরমূৰ্ত্তি যােগেশ যেন আপনার ধ্যানে আপনি সন্নিবিষ্ট। সমাধি-বশে দেহস্থ নবদ্বারের গতি রুদ্ধ করিয়া আপন আত্মাতেই হয়ত তিনি পরমাত্মাকে প্রত্যক্ষ করিতেছেন। অক্ষুব্ধ-সাগরের মত নিশ্চল সেই মূর্তিখানি দূর হইতে লক্ষ্য করিয়া কন্দর্প স্তম্ভিত হইলেন ; তাহার হস্তদ্বয় শিথিল হওয়ায়, ধনুঃশর ভূতলে পড়িয়া গেল ! এমন সময়ে নবযৌবনে নমিতাঙ্গী, অশােক কর্ণিকার প্রভৃতি বসন্ত-কুসুমে সুসজ্জিত উমা, বালার্ক-বর্ণের এক- খানি সাড়ী পরিয়া মদনের হত-শক্তিকে যেন পুনরুদ্দীপিত করিতে করিতে নবকিশলয়-শােভিতা পল্লবিনী লতাটীর মত, দুইজন সখীর সঙ্গে তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। শ্রোণী হইতে তাহার কেশর-মালার কাঞ্চীদাম পুনঃ পুনঃ স্রস্ত হইয়া যাইতেছে। নিশ্বাসের সৌরভে মুগ্ধ একটী ভ্রমর তাহার বিম্বাধরের নিকট উড়িতে থাকায়, তিনি হস্তধৃত লীলা-কমল-দ্বারা তাহাকে বার বার নিবারণ করিতে প্রবৃত্ত রহিয়াছেন। পার্বতীকে বেশ-ভূষায় এরূপ মনােহারিণী হইয়া আসিতে দেখিয়া মদনের হৃদয়ে নবােদ্যমের সঞ্চার পুনরায় তিনি মহাদেবের চিত্ত জয় করিতে হইল। ২৪ হর-গৌরী সচেষ্ট হইলেন। দুর্ভাগ্য-হেতু বুঝিয়া উঠিতে পারিলেন যে, এরূপ বিভিন্ন-প্রকৃতির স্ত্রী-পুরুষের মিলন কত অস্বাভাবিক। মহেশ্বর তখন পরমজ্যোতিঃ-স্বরূপ পরমাত্মাকে ধ্যানে উপলব্ধি করিতেছিলেন। সেবাভিলাষিণী উমা আশ্রমের দ্বারদেশে আসিবামাত্র তিনি অকস্মাৎ তাহা-হইতে বিরত হইলেন। তাহার বীরাসন শিথিল হইল। ধীরে ধীরে তিনি দেহের রুদ্ধ বায়ু ত্যাগ করিতে লাগিলেন। নন্দী আসিয়া গৌরীর আগমন-সংবাদ নিবেদন করিলে, শঙ্কর তখনি ভঙ্গী-সঙ্কেত-দ্বারা তাহাকে প্রবেশ করাইবার অনুমতি দিলেন। প্রসন্নমুখে গৌরী আসিয়া গিরিশের পদপ্রান্তে প্রণিপাত করিলেন। তাহার সখীরাও প্রণত হইয়া বাসন্তিক পুষ্প-পল্লব উপহার দিল। প্রণাম-কালে গৌরীর কর্ণ-হইতে নবপল্লব এবং তালক-হইতে নবকর্ণিকার- কুসুম বিচ্যুত হইয়া অলক্ষ্যে অর্ঘ্য-স্বরূপ মহেশের চরণ- সমীপে নিপতিত হইল। পশুপতি প্রসন্ন হইয়া ‘অনন্যাসক্ত পতি লাভ কর’-- এই আশীৰ্ব্বাণী দ্বারা তখন গৌরীকে আপ্যায়িত করিলেন । এই আশীর্বাদের ফলে গৌরী উত্তরকালে সফল-মনােরথ
হর-গৌরী
হইতে পারিয়াছিলেন। মহাপুরুষের বাণী কখনই বিফল
হয় না। আশুতােষ প্রসন্ন হইলে আশু অভীষ্ট-সিদ্ধি
হইয়া থাকে। তাই ভারতে আজিও কুমারীগণ অনুরূপ
পতিলাভ-কামনায় নিত্য শিবপূজা-ব্রতের অনুষ্ঠান করিয়া
থাকেন।
উমা মন্দাকিনী-সলিল-জাত পদ্মবীজ রৌদ্রে শুষ্ক
করিয়া আশুতােষের জন্য একগাছি জপের মালা গাঁথিয়া
আনিয়াছিলেন। এই সময় তাহা নিজ তাম্রোজ্জ্বল-করে
ধারণ করিয়া ভক্তিভরে পশুপতির করে অর্পণ করিলেন।
বহ্নিমুখে ধাবমান পতঙ্গের মত ক্ষীণায়ুঃ মদন অনেক
ক্ষণ হইতে শর-সন্ধানের প্রতীক্ষায় মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে চাহিয়া
মৌী আকর্ষণ করিতেছিলেন। পার্বতীর প্রদত্ত মালা-
গাছটী শঙ্কর যেই মুহূর্তে গ্রহণ করিতে উদ্যত হইয়াছেন,
তৎক্ষণাৎ উপযুক্ত অবসর ভাবিয়া, তিনি উভয়ের প্রতি
সম্মােহন বাণ নিক্ষেপ করিয়া দিলেন।
চন্দ্রোদয়ে সমুদ্র যেরূপ চঞ্চল হয়, হরও তেমনি
ধৈৰ্য্য হারাইয়া প্রসন্নমুখে উমার বিম্বাধরের প্রতি তিনটী
নয়ন মেলিয়া সানুরাগ-দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন।
শৈলসুতা তখন ফুল্ল কদম্বপুষ্পের মত পুলকাঙ্গী; লাজে
নতমুখী হইয়া চকিত-নয়নে একদিকে চাহিয়া রহিলেন।
;
হর-গৌরী কিন্তু শঙ্করের এ চিত্ত-বিকার অধিকক্ষণ স্থায়ী হইল । পরক্ষণেই তিনি আবার দৃঢ়চিত্ত হইলেন। জিতেন্দ্রিয় মহাপুরুষগণ সহজেই নিজ ভ্রম বুঝিতে পারেন। সংযমিগণের অগ্রগণ্য পশুপতি এরূপ ইন্দ্রিয়-বিকারের কারণ জানিবার জন্য চকিত-নেত্রে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিতে করিতে দেখিতে পাইলেন, সম্মুখে কন্দর্প নিজ দক্ষিণ অপাঙ্গে মুষ্টি রাখিয়া, বামস্কন্ধ অবনত ও বামপদ- খানি আকুঞ্চিত-ভাবে স্বীয় সুচারু কোদটীকে চক্ৰাৰ্ধা- কারে আকর্ষণ করিতে করিতে যেন তাহাকেই প্রহার করিতে উদ্যত । ধ্যান-ভঙ্গ-হেতু মহেশ্বরের মুখশ্রী বিকট হইয়া উঠিল। ভীম-মূৰ্ত্তি ক্রোধে ভীষণতর হইয়া গেল। গগন- ভেদী হুঙ্কারে শৈলশিখর কম্পিত হইতে লাগিল সহসা ললাটস্থ উদ্ধ নেত্র হইতে অত্যুগ্র অনল-শিখা নির্গত হইয়া সবেগে কলপের দিকে ধাবমান হইল। আকাশে দেবগণ প্রমাদ গণিলেন। “প্রভাে! ক্রোধং সংহর, ক্রোধং সংহর---প্রভাে, ক্রোধ সংবরণ করুন, ক্রোধ সংবরণ করুন”–গগনমণ্ডল প্রতিধ্বনিত করিয়া দেবগণের এই সাগ্রহ প্রার্থনায় তখন দশদিক্ ভরিয়া যাইতেছে। কিন্তু হায়! সে ব্যগ্র প্রার্থনা -২৭
হর-গৌরী
••
ঈশানের শ্রুতিগােচর হইবার পূর্বেই হর-নেত্র-সস্তৃত সেই
প্রচণ্ড বহ্নিশিখা মদন-দেহ নিঃশেষে দগ্ধীভূত করিয়া
মুহূর্ত-মধ্যে ভস্মস্তুপে পরিণত করিয়া ফেলিল।
শিবের তপস্যার যত-কিছু বিপ্ন, সমস্ত দূর হইল বটে,
তথাপি তিনি নারী-সম্পর্ক পরিহার করিবার মানসে
অবিলম্বে তথা হইতে অদৃশ্য হইয়া গেলেন।
গৌরীর অনুপম রূপ-লাবণ্য, মনােরম বেশ-ভূষা-
সকলি ব্যর্থ হইল ; আর ব্যর্থ হইল, পিতা নগাধিরাজের
যত-কিছু উচ্চ আকাঙক্ষা। ভগবান্ মহাদেবকে পতি-
লাভ করিতে হইলে শুধু রূপ-যৌবনে সফলকাম হওয়া
যায় না, গৌরী এতক্ষণে তাহা মর্মে মর্মে বুঝিতে পারি-
লেন। কিন্তু সখীদের সমক্ষে এই প্রকারে অনাদৃত
ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ায়, তাঁহার মুখকান্তি লজ্জায় বিবর্ণ
হইয়া উঠিল। দারুণ অবসাদ আসিয়া যেন তাঁহার
দেহের সমস্ত শক্তি অপহরণ করিয়া লইল। শূন্য-হৃদয়ে
গৃহে ফিরিতে তাহার চরণ উঠিতেছে না। হর-কোপে
মদনের ঐ পরিণাম দেখিয়া ভয়ে তঁাহার চক্ষু মুদ্রিত।
এমন সময় পিতা গিরিরাজ তথায় আসিয়া হাতে ধরিয়া
তাহাকে গৃহে লইয়া চলিলেন। পিতার স্নেহ-স্পর্শে
তনয়ার চিত্তখেদ কিয়ৎপরিমাণে প্রশমিত হইল।
৮ কর্পের ভুবন-মােহন তনুখানি ভস্মস্তুপে পরিণত হইয়াছে, রতির কাছে ইহা এতক্ষণ অজ্ঞাত ছিল। পতি- দেহ দগ্ধ হইবার পূর্বেই রতি মূচ্ছিতা হইয়া ভূতল- শায়িনী হওয়ায়, কোন শােক-দুঃখ অনুভব করিতে পারেন নাই। আহা! তাহার ঐ মূচ্ছা যদি আর না ভাঙ্গিত, তাহা হইলে ত প্রাণ-বল্লভের নিদারুণ বিরহ তাহাকে আর সহ্য করিতে হইত না ; নব-বৈধব্যের সুতীব্র-দহনে তাহাকে জীবন্ত দগ্ধ হইতেও হইত না। কিন্তু বিধির বিধান অন্যরূপ। বিরহ-বেদনা ভােগ করিবার জন্য রতি সচেতন হইলেন। রতি সতৃষ্ণ-নয়নে চারিদিকে চাহিয়া কোথাও তাহার প্রাণারাধ্য মূর্তিখানি দেখিতে পাইলেন না। যাহাকে নিরন্তর দেখিয়াও নয়নের তৃপ্তি হইত না, রতি বুঝিলেন, তাহার সেই নয়নাভিরাম চিরদিনের তরে কোন এক অপরিজ্ঞাত রাজ্যে প্রয়াণ করিয়াছেন। “নাথ! কোথায় তুমি ? জীবিত আছ কি?”—এই বলিতে বলিতে আলুলায়িতকুন্তলা রতি ধূলিমাখা-দেহে -২৯ উঠিল। হর-গৌরী উঠিয়া বসিলেন। দেখিলেন, সম্মুখে ভূমির উপর হর- কোপাগ্নির ভয়াবহ পরিণতি—পুরুষাকৃতি ভস্মরাশি। ভূমিতলে দেহ লুটাইয়া রতি উচ্চৈঃস্বরে কাদিতে কঁদিতে আবার মূচ্ছিতা হইলেন। তাহার গগনভেদী আর্তনাদে সমগ্র বনভূমি বিষাদে ভরিয়া মূচ্ছা-ভাঙ্গের পরে বক্ষে করাঘাত করিয়া সতী মৰ্ম্মভেদী বিলাপ করিতে লাগিলেন। “নাথ, কমনীয় তােমার তনুখানি যে বিলাসীদের উপমার বস্তু ছিল ; সেই দেহের এই দশা। ইহাতেও আমার দেহ দ্বিখণ্ড হইল না! উঃ! নারীজাতি কি কঠিন। ওগাে, এত অল্পক্ষণের ভিতর অভাগীরে ছাড়িয়া কোথায় চলিলে ? আমি তােমার বিরহে কিরূপে বাঁচিয়া রহিব ? “তুমি কখনই আমার কোন অপ্রিয় কর নাই ; আমিও তােমাকে কোন দুঃখ দিই নাই—তবে কেন আমাকে এমন করিয়া কাঁদাইয়া চলিলে ? “আমায় যে তুমি কত ভালবাসিতে; বলিতে—তােমায় সৰ্ব্বদা মনে রাখি।' সে কি কেবল মনরাখা ছলনা মাত্র ? নতুবা তােমার দেহ দগ্ধ হইল, আর আমি বাঁচিয়া রহিলাম! তুমি এইমাত্র পরলােকে গিয়াছ ; এখনই আমাকেও সঙ্গে লও। ; ;
হর-গৌরী ; ') “হায়! এই যে মনােরম নব চূত-কুসুম, যাহার বৃন্ত হরিৎ ও ঈষৎ লােহিতাভ—পুংস্কোকিলের মধুর কূজনে যাহার বিকাশ সূচিত হয়, তাহার দশা এখন কি হইবে ? আর এই যে ভ্রমরগুলিকে তিনি ধনুর জ্যা-রূপে সাজাইতেন, তাহারা যে আমারই মত দুঃখে কাদিতেছে! “ওগাে, আবার তুমি পূর্বের সেই মনােহর বপু ধারণ করিয়া উঠ ; এই মধুরালাপে নিপুণা কোকিলারে দূতী- রূপে যেথায় ইচ্ছা পাঠাও। “কান্ত, তােমার স্বহস্ত-রচিত বাসন্তী কুসুমের মালা যে এখনও আমার অঙ্গে, তােমার মনােজ্ঞ তনুর অদর্শনে তাহা যে বিফল হইল! তুমি স্বর্গে গিয়া সুরসুন্দরীগণ কর্তৃক সংকৃত হইবার পূর্বেই আমি চিতানলে দগ্ধ হইয়া তােমার সঙ্গ লাভ করিব। তােমার অনুগমনে বিলম্ব করা আর আমার উচিত নয়; এখনি যাইব। মন্মথের বিরহে রতি ক্ষণকালও জীবিত ছিল,চিরদিনের তরে এ অপবাদ আমার অসহ্য। “হায় হায় ! অভাগী পরলােকগামী পতিকে অন্তিম- সজ্জায় সাজাইবারও সুযােগ পাইল না! তাহার দেহ ও প্রাণ একযােগে এমনি অতর্কিতে কোথায় বিলীন হইয়া গেল।
হর-গৌরী
“হে দয়িত, মনে পড়িতেছে, তুমি ক্রোড়ে ফুল-ধনুটী
রাখিয়া শর-চালনার সারল্য অভ্যাস করিতে করিতে
স্মিতমুখে সখা বসন্তের সঙ্গে আলাপ করিতে। তখনও
আমার দিকে তােমার দৃষ্টি থাকিত। সেই সহৃদয় সখা
বসন্তই বা এখন কোথায় ? সে যে কুসুম দিয়া তােমার
কামুক বচনা করিয়া দিত! প্রচণ্ড ক্রোধে পিনাকী
তাহাকেও কি সুহৃদের সঙ্গী করিয়াছেন ?”
ধীরে ধীরে বসন্ত সেই দিকেই আসিতেছিলেন।
রতির বিলাপ-বাণী বিষাক্ত শরের মত তাহার হৃদয় বিদ্ধ
করিতেছিল। শােক-বিহ্বল বিধবাকে সান্তনা দিবার জন্য
তিনি রতির সম্মুখীন হইলেন।
আত্মীয়-স্বজন কাছে আসিলে শােকের বেগ শতধা
উচ্ছসিত হয়। বসন্তকে দেখিয়া রতিরও শােক-সিন্ধু
উথলিয়া উঠিল। বসন্তের দিকে চাহিয়া তিনি আবার
বিলাপ করিতে লাগিলেন,
“বসন্ত, কই তােমার সেই সখা ? আর কি দেখিবে ?
দেখ, তােমার সখার দেহের আজ কি পরিণাম! ঐ--
ঐ যে পারাবতের মত ধূসর ভস্মরাশি বাতাসে কণা কণা
বিকীর্ণ হইয়া উড়িয়া যায়—দেখ, ভাল করিয়া
.
দেখ।”
হর-গৌরী
“ওগাে, তােমায় দেখিবার তরে সখা বসন্ত যে কত
উৎসুক, একটা বার দেখা দাও। স্ত্রীর প্রতি পুরুষের
প্রেম না হয় চঞ্চলই হইল, সুহৃদের প্রতি ত তাহা
অটল বটে।”
“হৃদয়েশ্বর ! শরাসনে তােমার ছিল মৃণাল-তন্তুর
গুণ আর পুষ্পশর ! তবু তুমি এই বসন্তের সহায়ে দেবতা,
অসুর—এমন কি, সারা জগৎকে বশে আনিতে পারিয়া-
ছিলে। সেই প্রিয় সুহৃৎ যে তােমায় দেখিতে আসিয়াছে।
দেখা দাও, দেখা দাও।... না, আর আসিবে না বন্ধু,
তােমার সখা বায়ুতাড়িত প্রদীপ-শিখার মত চিরতরে
নিৰ্বাপিত। আমি তার শেষ-বৰ্ত্তি। দেখ, বিরহের
শােকধূম আমার অঙ্গ হইতে নির্গত হইতেছে!
“নিষ্ঠুর বিধি । তােমার এই হত্যা-কাৰ্য্য অপূর্ণ
রাখিলে কেন?
কামদেবকে বিনষ্ট করিলে, আর রতি
এখনও জীবিত রহিল। এ অর্ধ-সমাপ্ত কাৰ্যটুকু এখনও
শেষ করিলে না? হায় ! মদমত্ত হস্তী বৃক্ষ উৎপাটিত
করিবামাত্র, তাহার আশ্রিতা লতাটীরও পতন যে
অনিবার্য হয়, অজ্ঞ বিধাতা কি তাহা বুঝিল না !
“এখন সখা, তুমি প্রকৃত সখার কাৰ্য্য কর। শােকাতুরা
তােমার এই বন্ধুপত্নীকে চিতারােহণ করাইয়া শীঘ্রই পতির
হর-গৌরী সন্নিধানে পাঠাইয়া দাও । চন্দ্র অস্তগত হইলে জ্যোৎস্না থাকে না; মেঘাপগমে বিদ্যুৎও বিলীন হইয়া যায় ; স্ত্রীজাতির যে মৃতপতির অনুসরণ করা একান্ত উচিত—এ বােধ অচেতন পদার্থেরও আছে। আমিও তাই পতির দেহভস্ম সর্বাঙ্গে মাখিয়া নবীন পল্লব-শয্যার মত এখনি জ্বলন্ত চিতায় শয়ন করিব। “বসন্ত, হে প্রিয়দর্শন, আমাদের পুষ্পশয্যা রচনা করিতে তুমি যে কত সাহায্য করিয়াছিলে! এখন যােড়- করে মিনতি করি, আমার তরে চিতা সাজাইয়া দাও; আমি আরােহণ করিয়া সদ্যঃ প্রাণ জুড়াই। পরে আমার অঙ্গে অগ্নিসংযােগ করিয়া দক্ষিণ-বায়ুর বীজনে শীঘ্রই এদেহ দগ্ধ করিও। জান ত, তােমার সখা আমাকে দেখিয়া অল্পক্ষণও থাকিতে পারিতেন না। “আর এক কথা, দহনান্তে আমাদের উদ্দেশে চিতায় এক অঞ্জলি জল দিও। পরলােকে গিয়া সেই জল তােমার সখা আমার সহিত পান করিবেন। পরে পারলৌকিক- কৃত্যের অনুষ্ঠানে তাহার পিণ্ডে কিসলয়-সহ চূত-মঞ্জরী দিতে যেন ভুলিও না। উহা যে তাহার বড়ই প্রিয় ছিল।” ৩৪-
হর-গৌরী
রতির চিতাবােহণের সমস্ত আয়ােজন প্রস্তুত, এমন
সময় এক দৈববাণী শুনিয়া তিনি উহাতে বিরত হইলেন—
“শুন গাে কুসুমআয়ুধপত্নি,
ওগাে ও সতি,
চিরতরে নাহি দুর্লত রবে
তােমার পতি;
বিধি-শাপ-হেতু আশু হ'ল তার
দেহের নাশ,
অচিরে সে পুনঃ লভিবে জীবন
রাখ গাে আশ ।
পরিণীতা হ'লে গিরিরাজ-সুতা
মহেশ্বরে-
নজ পতি, সেই আশুতােষ
শিবের বরে।”
গ্রীষ্মে শুষ্কপ্রায় সরসীতে বৃষ্টিধারা নামিলে সদ্যো-
মরণােম্মুখী শফরী যেরূপ আশান্বিত হয়, দৈববাণীতে
রতির হৃদয়েও সেইরূপ নব-আশার সঞ্চার হইল। পতির
পুনর্জীবনের অপেক্ষায় সতী কোনরূপে প্রাণে বাঁচিয়া
রহিলেন।
শিবের কোপানলে মদনকে ভস্ম হইতে দেখিয়া পাৰ্ব্বতী ভগ্নমনােরথ হইয়াছেন। নিজ রূপ-লাবণ্যে তাহার ধিক্কার জন্মিয়াছে ; উহার জন্য যত মােহ-গৰ্ব্ব, সমস্তই হৃদয় হইতে দূর হইয়াছে। ধিক্ সে রূপ-যৌবনে, যদি তাহাদ্বারা বাঞ্ছিত প্রিয়জনের ভালবাসাই না মিলে। তিনি তপস্যার বলে এই নিস্ফল রূপ-যৌবনকে সফল করিয়া তুলিবেন—এখন এই তাহার সঙ্কল্প। নতুবা শিবের মত পতি, আর তাহার ভালবাসা কি এত সহজে পাওয়া যায় ? গৌরী এবার তপস্যার নিমিত্ত গৃহত্যাগ করিবেন। মাতা মেনকার মন ইহাতে বিধ,দে ভরিয়া উঠিয়াছে। তাহার স্নেহের প্রতিমা কন্যা বনে যাইবেন; সুকুমার তনুখানি তপঃক্লেশে শুষ্ক করিবেন ; পর্ণ-শয্যায় শয়ন করিবেন ; বন্য ফল-মূল ভঁহার ভক্ষ্য হইবে—আর তাহারা গৃহে থাকিয়া উত্তম ভক্ষ্য-পানীয় উপভােগ করিয়া কোমল- শয্যায় বিশ্রাম-সুখে কালাতিপাত করিবেন। মায়ের এণে কি তাহা সহ্য হয় ?
হর-গােৱী কন্যাকে ক্রোড়ে লইয়া মাত এই তপস্যার অভিলাষ হইতে তাহাকে নিবৃত্ত করিবার জন্য নানাবিধ প্রবােধ দিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, “মা, তােমার হৃদয়ের দেবতা ত ঘরেই রহিয়াছেন, ঘরে বসিয়াই তাহার পূজা কর। তােমার এই শিরীষ- কুসুমের মত সুকুমার দেহে তপস্যার ক্লেশ কিরূপে সহ্য হইবে মা?” কিন্তু গিরিজার সাধু সঙ্কল্প অটল। ইষ্টলাভের প্রবল আকাঙক্ষা আর নিম্নগামী জল-প্রবাহ সহজে ত রুদ্ধ হইবার নয়। অভিলাষ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি গৃহ ছাড়িয়া তপস্যা করিবার জন্য সখীর দ্বারা পিতার অনুমতি লইয়া হিংস্র-প্রাণি-শূন্য ময়ূরগণ-পরিবৃত হিমাদ্রির একটী শিখর আশ্রয় করিলেন। উত্তরকালে এই স্থানটী ‘গৌরী-শিখর’ নামে অভিহিত হইয়াছিল। গৌরী কণ্ঠের মুক্তা-হার ও কর্ণের কুণ্ডল ত্যাগ করিয়া বালারুণ-বর্ণের বক্কলকে উত্তরীয় করিলেন; অধরের লাক্ষারাগও মুছিয়া ফেলিলেন। তাঁহার সুন্দর অলক- শােভিত মুখখানি জটাজালে শােতমান হইয়া উঠিল। ত্রিগুণিত মৌঞ্জী মেখলার এই প্রথম ধারণে প্রতিক্ষণে তিনি রােমাঞ্চ-কলেবর হইতে লাগিলেন ; কটিদেশ তাহার ৩৭-
হর-গৌরী
রক্তাভ হইয়া গেল। কুশাঙ্কুর-ছেদনে অঙ্গুলিতে ক্ষত
হইবারও সূচনা হইল। তাহার শয়ন ও উপবেশন
ভূতলেই হইতে লাগিল এবং হস্ত-দুইটাই উপাধান হইল।
প্রত্যহ ঘটে করিয়া জল-সেচনে তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
বৃক্ষগুলিকে পালন করেন। ইহাদের প্রতি তাঁহার
অকৃত্রিম অপত্যস্নেহ জন্মিল। সে স্নেহ এত বেশী যে,
পরে যখন কার্তিকেয়ের জন্ম হয়, তখনও তাহার হ্রাস হয়
নাই।
মৃগের দল অঞ্জলি তরিয়া নীবার-শস্য খাইতে পাইত
বলিয়া নির্ভয়ে তাহার কাছে আসিতে লাগিল।
স্নানান্তে পূজা-হােম সমাপ্ত করিয়া তিনি ভগবান্
শঙ্করের স্তব-পাঠ করিতেন। বয়ঃকনিষ্ঠা হইলেও ঋষিগণ
তাহাকে দেখিতে আসিতেন। পুণ্যশীলগণের বয়সের
অম্লাধিক্য-বিচারের প্রয়ােজন হয় না।
তঁাহার তপােবনে পরস্পর স্বভাববিরােধী প্রাণীরা
হিংসা ভুলিয়া গেল। বৃক্ষগুলি প্রচুর ফল উৎপাদন
করিতে থাকায়, তঁাহার অতিথি-সৎকারের সুবিধা হইল।
পর্ণশালাটীতেও সর্বক্ষণ অগ্নি প্রজ্বলিত থাকিত।
বাস্তবিকই তখন তাহার আশ্ৰমটী সর্বপ্রকারে পবিত্রতার
আধার-স্বরূপ হইয়াছিল।
-৩৮
হর-গৌরী
কিন্তু এরূপ তপস্যায় মনোেরথ-সিদ্ধির কোন লক্ষণই
দেখা গেল না। পরিশেষে পাৰ্বতী আরও উগ্র তপস্যার
আয়ােজন করিলেন। তাহাতে নিজ দেহ-রক্ষার প্রতি
তাহার কোনরূপ লক্ষ্যই রহিল না।
গ্রীষ্মের প্রখর সূৰ্য্য-তাপে যখন ধরণী দগ্ধপ্রায়, তখন
তিনি নিজ যােগাসনের চতুর্দিকে জ্বলন্ত অগ্নি স্থাপন করিয়া
অম্লানবদনে একদৃষ্টিতে সূর্যের দিকে চাহিয়া থাকিতেন
ফলে তাঁহার মুখখানিতে রক্তপদ্মের সুষমা ফুটিয়া উঠিত
বটে, কিন্তু আয়ত নয়নের প্রান্তদেশে কালিমা-রেখাও
অঙ্কিত হইয়া যাইত।
পারণার জন্য তাঁহার ছিল একমাত্র অমৃতময় চন্দ্রকিরণ,
আর অযাচিত বৃষ্টিধারা। বৃক্ষের মতই এ জীবন-ধারণ!
আহা! যিনি কন্দুক-ক্রীড়াতেও ক্লেশ অনুভব করিতেন,
আজ তিনি দারুণ তাপস-ব্ৰতে কোমল শরীর শােষণ
করিতেছেন !
বর্ষাকালে গ্রীষ্মতপ্ত ভূমি যেরূপ বাষ্প উদ্গিরণ করে,
উমাও সেইরূপ পঞ্চাগ্নিতে আপিত হইয়া বর্ষার জলের
সঙ্গে নয়ন-দুইটীতে বাষ্প বিসৰ্জন করিতেন।
প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে অনাবৃত-স্থানেই তাহার অবস্থান
হইত। শয্যা ছিল শিলাতল; তাহাতেই তিনি সারা-
হর-গৌরী
রাত্রি নিযঃ থাকিতেন। গিরি-কুমারীর তপস্যার সাক্ষি
স্বরূপ রজনীও যেন বিদ্যুৎ-আঁখি মেলিয়া এই কঠোর
সাধনা দেখিয়া লইত।
পৌষমাসের শীতের দীর্ঘ রাত্রিতে যখন তুষার-বর্ষণ
হইত, উমা তখন আকণ্ঠ জলে দাড়াইয়া থাকিতেন।
তাহার দেহখানি স্বর্ণ-পদ্মের সহিত উপমার যােগ্য ; যেমনি
পদ্মের মত সুকোমল, তেমনি আবার স্বর্ণের মতই সারবান্।
বৃক্ষের গলিতপত্র মাত্র ভক্ষণ কবিয়া প্রাণধারণ
করিলে, তাহাকে চরম কৃচ্ছসাধন বলা যায়। মহা-
যােগিনী পার্বতী তখন তাহাও ভক্ষণ করেন নাই। তজ্জন্য
পৌরাণিকগণ তাহার ‘অপর্ণা’ নাম রাখিয়াছিলেন, বস্তুতঃ
তিনি মৃণাল-সদৃশ সুকোমল দেহে যে সকল কঠোর নিয়ম
পালন করিয়া তপস্যা করিতেছিলেন, সংযমীর শিরােমণি
কোন এক ঋষির তপঃক্লেশ-সহিষ্ণু দেহেও তাহা সম্ভব
হয় না।
শিব মঙ্গলময়। শিব-কামীকে ভােগ-সুখের
অশিব-কণ্টক সর্বাগ্রে পরিহার করিতে হয়।
১০ একদিন সহসা অজিনধারী, জটাজালে মণ্ডিত-মস্তক এক বচন-কুশল ব্রহ্মচারী তপােবনে আসিয়া পার্বতীর সমক্ষে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার সৌম্য মূর্তিখানি ব্ৰহ্মতেজে জ্বাজ্জ্বল্যমান। মনে হয়, যেন পলাশদণ্ড- হস্তে তিনিই মূর্ত ব্রহ্মচর্যাশ্রম। পাৰ্বতী সসম্মানে তাহার বন্দনা করিলেন। অভ্যাগত ব্যক্তি সমান অবস্থার লােক হইলেও তাহার সমুচিত সমাদর করা সমদর্শীদের কর্তব্য। পাৰ্বতীও তাহার অভ্যর্থনার ত্রুটি করিলেন না। যথাবিধি সৎকৃত হইয়া আগন্তুক কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিবার ছল করিতে করিতে সরল-চক্ষে উমার দিকে চাহিয়া শিষ্টজনােচিত কয়েকটা প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। বলা বাহুল্য, এ সকল প্রশ্নের প্রত্যুত্তর পাইবার কোন আশা বা অপেক্ষা তাঁহার ছিল না। শুধু জিজ্ঞাসা করিয়া মধ্যে মধ্যে স্বমত ব্যক্ত করিতেছেন মাত্র— “ভাল, তপস্বিনি, এখানে তােমার হােমের সমিধ, কুশ প্রচুর মিলে ত? এখানকার জলে স্নান করিয়া বেশ —৪১-
হর-গৌরী
তৃপ্তি হয় কি? নিজ শক্তিমত তপস্যা করিয়া থাক ত ?-
জানিবে, শরীরটীই ধৰ্ম্ম-সাধনের মূল।
“তােমার সলিল-সেচনে এই তরু-লতাগুলির কি
যথাসময়ে পল্লববাগম হয় ? আহা!
কতকাল ওষ্ঠে
লাক্ষা-রাগ নাই, তবু এই লতাগুলির নব-পল্লবের সহিত
তােমার পাটলবর্ণ অধরের বেশ তুলনা হয়।
“ওগো উৎপলাক্ষি ! এই হরিণগুলিকে দেখিয়া
তােমার মন ত বেশ প্রফুল্ল থাকে ?
ইহারা স্নেহবশে
তােমার হাতে দৰ্ভ-তৃণ খাইতে ভালবাসে ত ? ইহাদের
চঞ্চল নয়নের সঙ্গে তােমার নয়নের বেশ সাদৃশ্য আছে।
“প্রবাদ আছে,সৌম্যমূৰ্ত্তি যার, তার নাই
পাপাচার। কথাটী সর্বাংশে সত্য। নতুবা তােমার
বিশুদ্ধ চরিত্রকে আদর্শ করিয়া শত শত তাপস কি
আর স্ব স্ব চরিত্রের উৎকর্ষসাধন করিবার শিক্ষা
পাইতেন ? তােমার এই অনাবিল চরিত্রে পিতা
হিমবান্ এবং তঁাহার কুল যেরূপ পবিত্র হইয়াছেন, বােধ
হয়, সপ্তর্ষিবৃন্দের পূজার নির্মাল্যে শােভিতা মন্দাকিনী-
ধারাতেও তেমন পবিত্র হইতে পারেন নাই।
“সুশীলে, ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম—এই তিনের মধ্যে ধর্মই যে
প্রধান, তাহা তােমার এই তপস্যায় আজ আমার বেশ
-93-
ইচ্ছা
হর-গৌরী
ধারণা হইল। তুমি ত অর্থ আর কাম হৃদয় হইতে
একেবারে দূর করিয়া শুধু ধর্মকেই সার করিয়াছ।
“তােমার কৃত উত্তম সৎকারে আমি পরিতুষ্ট।
এখন আর আমাকে পর মনে করা তােমার উচিত নয় ।
বন্ধুর একটী নাম ‘সাপ্তপদী', তাহা মনে আছে ত?
স্বভাবে আমায় চপল মনে করিতেছ বটে, তবু তোমার
নিকট এই ব্রাহ্মণের বাচালতা অবশ্যই মার্জনীয় হইবে।
আমার, আরও কয়েকটী কথা তােমায় জিজ্ঞাসা
করি। বিশেষ আপত্তি না থাকিলে সদুত্তর দিয়া সুখী
করিবে কি ?
“দেখিতেছি, হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মার কুলে তােমার জন্ম ;
শরীরটীতে ত্রিভুবনের যত শােভা-সম্পদের সমাবেশ ;
বয়সও নবীন ; আর ঐশ্বৰ্য-সুখের ত কথাই নাই।
তবে আর কি আশায় তপস্যা করিতেছ ? অবশ্য দুস্তর
সঙ্কটে পড়িয়া কোন কোন মনস্বিনী মহিলার এরূপ
তপস্যার প্রবৃত্তি দেখা যায় বটে, কিন্তু তােমার সেরূপ
কোন কারণ থাকিতে পারে, এমন ত বােধ হয় না। তুমি
যেরূপ সৌম্যাকৃতি, তাহাতে শােক-তাপ তােমায় স্পর্শ
করিয়াছে বলিয়া যে মনেই হয় না। পিত্রালয়ে অনাদৃতা
হওয়ারও কোন সম্ভাবনা তােমার নাই; অপর কাহারও
-৪৩-
হর-গৌরী
দ্বারা অপমান--সেও ত মণির লােভে ফণীর মস্তকে
হস্তার্পণের মতই তাহার পক্ষে দুঃসাধ্য।
সাপের মাথার মণি
তুলিয়া লইতে ধনি,
প্রসরিয়া কর
বল, কোন্ নর
কবে কোথা হয় আগুসর ?
“তবে কেনই বা এই তরুণ-বয়সে ভূষণ ফেলিয়া দিয়া
বৃদ্ধার যােগ বল্কল-সজ্জা অঙ্গে ধরিয়াছ? বল দেখি,
চন্দ্র-তারকায় সমুজ্জ্বল রজনীর প্রথম সন্ধ্যাতেই যদি
সূর্যোদয় ঘটে, তবে তাহা বিসদৃশ হয় না কি ?
“তােমার এ তপস্যা যদি স্বর্গ-ভােগের আশায়
হয়, তবে এত প্রয়াস বৃথা। তােমার পিতার আবাসটাই
ত স্বর্গ। যদি মনের মত সুরূপ বরে বিবাহ হউক, এই
কামনা থাকে, তবে তাহার জন্য তােমাকে আবার
তপস্যা করিতে হইবে কেন ? রত্ন কখনও কাহারও
সন্ধান করে না; রত্নের সন্ধানই সবাই করে।......
“ও! বুঝেছি, আর বলিতে হইবে না। ঐ যে
বরের নামে তােমার উষ্ণ নিশ্বাস পড়িল ! ইহাতেই
যে আমার বড় সন্দেহ জন্মিতেছে। তােমার কাম্য সেই
;
-88-
হর-গৌরী দুর্লভ পুরুষকে ত জানিলাম না, যাহার জন্য তুমি এত সাধনা করিতেছ ? “মনে হয়, তােমার অভিলষিত সেই যুবা বড়ই কঠিন-হৃদয়, নচেৎ তােমার ঐ গণ্ডদ্বয়, যাহার উপর কণোৎপল শশাভা পাইবার কথা, তাহা যে দোদুল জটাজালে ঢাকিয়া যাইতেছে, ইহা দেখিয়াও তিনি সুস্থির রহিয়াছেন ! “আহা! মুনিজনােচিত কৃচ্ছসাধ্য ব্ৰতানুষ্ঠানে তােমার দেহ কৃশ ; অলঙ্কার-পরিধানের স্থানগুলিতে কালিমা পড়িয়াছে! দেহের কান্তিও দিবাভাগের ক্ষীণ চন্দ্ররেখার মত বিবর্ণ। তােমার এ দশা দেখিয়া কোন সহৃদয় পুরুষ ব্যথিত না হইয়া থাকিতে পারেন ? “বুঝিলাম, তােমার সেই প্রিয়জন নিশ্চয়ই সৌভাগ্য- গর্বে বঞ্চিত, নতুবা আজও তিনি তােমার ঐ নিবিড়- পক্ষ্ম-শােভী নীল নয়নের সম্মুখীন হইতেছেন না ! “তাই বলি, ওগাে পাৰ্বতি, আর কত কালই বা এমন তপস্যা করিবে? আমার ত পূৰ্বাশ্রমের সঞ্চিত কিছু তপস্যা আছে ; তাহারই অর্ধেক ফল আমি স্বেচ্ছায় তােমায় দিতেছি। তপস্যাতে সিদ্ধকাম হওয়া যায়— যদি এই বিশ্বাস তােমার থাকে, তবে তাহা লইয়া -85- ক ইর-গৌরী অনায়াসে তােমার অভীষ্ট . বরটীকে তুমি এখনি পাইতে পার। কিন্তু আমি জানিতে চাই, সেই বিশিষ্ট বরটী কে ?” গৌরী নিজ-মুখে কিছু না বলিয়া প্রত্যুত্তর দিবার জন্য পার্শ্বে উপবিষ্টা এক সখীকে তাহার নিরঞ্জন নয়নের ইঙ্গিতে জানাইয়া দিলেন। মৃদু হাসিয়া সখী তখন পার্বতীর মনের কথাগুলি অবিকল বলিতে আরম্ভ করিয়া দিল— “ওগো সাধুবর, আপনার যদি এতই কুতূহল হইয়া থাকে, তবে শুনুন, কেন ইনি এই সুকোমল-দেহে কঠোর তপস্যায় নিযুক্ত। “রাজকুমারী আমাদের বড় মানিনী কিনা, তাই ইনি অতুল এ-সম্পদের ঈশ্বর—ইন্দ্র, চন্দ্র প্রভৃতি দিপাল- গণকে গণ্য না করিয়া, যিনি মদনকে ভস্ম করিয়াছেন ; রূপ-যৌবনে যিনি মুগ্ধ হইবার পাত্র নহেন, সেই নিষ্কাম পিনাক-পাণি হরকে পতিরূপে পাইবার অভিলাষ করিয়াছেন। “এজন্য পিতৃগৃহে সদ। ইনি উন্মনা হইয়া থাকিতেন। কপালে চন্দন-তিলক সত্ত্বেও ইহার কেশগুলি ধূলায় ধূসরিত হইয়া যাইত।
নাই,
হর-গৌরী
“কখন কখন বাষ্প-গদগদ-কণ্ঠে সেই পিনাকীর
চরিত্র-গাথা স্খলিতস্বরে গাহিয়া গাহিয়৷ বিলাপ করিতেন।
করুণ সেই সঙ্গীতে সখী-স্থানীয় কিন্নররাজ-কন্যাদের
যে ইনি কত কঁদাইয়াছেন, তাহা বলিতে পারি না।
“আবার রাত্রির তিন ভাগ অতীত হইতে যায়, এমন
সময় ক্ষণকালের জন্য সহসা জাগিয়া উঠিয়া, কোথাও কেহ
অথচ ‘হে নীলকণ্ঠ ! তুমি কোথায়? এইরূপ
প্রলাপ করিতে করিতে কাঁদিয়া উঠিতেন।
“কখনও বা নিভৃত-স্থানে শিবের একটী আলেখ্য
স্বহস্তে আঁকিয়া তাহার প্রতি বলিতেন,
‘প্রভু, সর্বজ্ঞ যে তুমি বলে জ্ঞানিগণ--
সকলেরি হৃদি তােমার আসন ;
অভাগী তােমায় সঁপি কায়-মন,
ধ্যেয়ায় আকুল-চিত,
তা’র মনােভাব তােমার হৃদয়ে
কেন তবে অবিদিত ?
—এইরূপ প্রলাপ-বাণীর সঙ্গে সেই চন্দ্রশেখর শিবকে
কত তিরস্কার করিতেও আমরা ইহার মুখে শুনিয়াছি।
“পরে ‘বিনা তপস্যায় ভঁহাকে পাওয়া যায় না’
বুঝিয়া পিতার অনুমতিক্রমে ইনি তপস্যা করিবার জন্য
৪৭-
হর-গৌরী
আমাদের সঙ্গে এই তপােৰনে আসিয়াছেন। ইহার
স্বহস্ত-রােপিত এই বৃক্ষগুলি তপস্যার সাক্ষিরূপে বিদ্যমান।
ইহাতে ফলও ধরিতেছে। কিন্তু হায়! আমাদের
সখীর মনােরথ-সিদ্ধির যে অঙ্কুরও উদগত হইল না।
বিশেষতঃ ইনি তপস্যায় এত ক্ষীণ হইয়া পড়িয়াছেন যে,
আমরা ইহাকে দেখিয়া চক্ষের জল নিবারণ করিতে পারি
। অনাবৃষ্টির পর দেবরাজ ভূরিবর্ষণ দ্বারা শুষ্ক ভূমিকে
যেরূপ অনুগৃহীত করেন, জানি না, সেইরূপ কবে
সেই পরমদুর্লভ পুরুষ আমাদের সখীর প্রতি অনুগ্রহ
করিবেন।”
এই সমস্ত কথা শুনিয়া ব্রহ্মচারী বিন্দুমাত্র সন্তোষ
প্রকাশ করিলেন না; উমার প্রতি সপ্যাণ দৃষ্টিপাত করিয়া
বলিলেন,—“কেমন গৌরি, যাহা শুনিলাম, সমস্ত সত্য,
পরিহাস ?”
গিরিকুমারী তখন অঞ্জলিবদ্ধ করাঙ্গুলীর অগ্রে
স্ফটিকের জপমালাগাছটী জড়াইয়া লজ্জায় ধীরে ধীরে
অতি অল্প-কথায় এই প্রত্যুত্তর দিলেন -
“ওগাে বেদজ্ঞ-চূড়ামণি, সত্যই তাই ; যাহা যাহা
শুনিলেন ; সবই সত্য। আমি উচ্চ পদ পাইবার আকাঙ্ক্ষা
করিয়াছি। এই সামান্য তপস্যা তাহাকে পাইবার যােগ্য
88-
হর-গােরী নয়, তাহাও জানি, কিন্তু কি করিব ? মনােরথের যে অগম্য স্থান নাই।” অবজ্ঞার হাসি হাসিয়া ব্রহ্মচারী আবার বলিতে আরম্ভ করিলেন, “ও! জানি সে মহেশ্বরকে। তুমি আবার তাহাকেই কামনা করিতেই? যত অমঙ্গল আচরণ থাকিতে পারে, তাহার কোনটাই সে করিতে ছাড়ে না। তােমার এ উদ্যম আমার নিকট আদৌ ভাল মনে এজন্য হইল না। “আচ্ছা, বিবাহের সময় মহেশ্বর যখন সর্পজড়িত- হস্তে তােমার মাঙ্গল্য-সূত্র-বদ্ধ কোমল হস্তখানি প্রথম গ্রহণ করিবে, বল দেখি, তুমি তখন কেমন করিয়া তাহা সহ্য করিবে ? ছি! ছি!! একটা অসার বিষয়ে তােমার এ মতি হইল কিরূপে ? “তুমি নিজেই বিবেচনা করিয়া দেখ ত, কোথায় নব-পরিণীতা বধূর কলহংসাঞ্চিত দুকূল শাটী, আর কোথায় রক্ত বিন্দু-সিক্ত গজাজিন ! কি বিসদৃশ সংযােগ ! জানি না, গ্রন্থিবন্ধনই বা কিরূপে হইবে ? “আহা, তােমার অলক্ত-রাগ-রঞ্জিত পদ-দু’টী যে কুসুমাস্তৃত চতুঃশাল-গৃহে শােভা পাইবার যােগ্য ; তাহা –89- ৪ হর-গৌরী কিনা শবের কেশ-পরিব্যাপ্ত প্রেতভূমিতে ন্যস্ত হইবে। অতিবড় শত্রুও যে ইহা অনুমােন করে না। “হায়! হায় !! তােমার হরিচন্দনে লিপ্ত হইবার মত তনুখানি শিবের সঙ্গে চিতা-ভস্মে লিপ্ত হইবে !! আ মরি ! কি ভ্রমই না করিতেছ ? “হা ধিক্ ! বিবাহের পর পিতৃগৃহে যাইবার কালে গজাররাহণের পরিবর্তে তােমায় বৃষারূঢ়া দেখিয়া ভদ্র- লােকে যে উপহাস করিতে ছাড়িবে না, সম্মুখে এও ত কম বিড়ম্বনার কথা নয় ! “উঃ! সেই পিনাকীর ভজনায় জগতের দুইটা উৎকৃষ্ট বস্তুর কি শােচনীয় পরিণাম !--এক অনুপম-কান্তি চন্দ্রকলা; আর লােকের নয়ন-কৌমুদীরূপা তুমি। “ওগাে, দেহ যে তাহার অতি কদাকার—বিরূপাক্ষ জন্মেরও তাহার কোন ঠিক পরিচয় জানা যায় না; আর ধন-সম্পদের কথা ত বলিয়াই কাজ নাই—দিগম্বর ! ইহাই তাহার নিৰ্ধনতার যে যথেষ্ট পরিচয়। এখন বল ত মৃগনয়নে, লােকে বরের যে যে গুণ দেখিতে চাহে, তাহার একটীও কি সেই ত্রিলােচনের আছে ?-না রূপে ; না কুলে ; না ধনে ? “তাই বলিতেছি, এই অসঙ্গত অভিলাষ হইতে হর-গৌরী তােমার চিত্তকে নিবৰ্ত্তিত কর। সেই কুলক্ষণ পুরুষের সহিত তােমার মত সুলক্ষণা কুমারীর বিবাহ হইতেই পারে না। পবিত্র যজ্ঞীয় যুপে যে পূজা হইবার বেদ- বিহিত বিধি, তাহা শ্মশানভূমিতে প্রােথিত শূলের উপর হইতে সাধু-ব্যক্তিগণ কখনই সঙ্গত মনে করেন না।” ১১ ব্রহ্মচারীর এইরূপ নানা প্রতিকূল-বচন শুনিতে শুনিতে পার্বতীর চৈতন্য লােপ পাইবার উপক্রম হইল—অধর কপিতে লাগিল। শিবনিন্দা-জনিত অসহ্য মনঃপীড়ায় ক্রোধেরও উদ্দীপনা হইল ; নয়নের প্রান্তভাগ রক্তাভ হইয়া উঠিল। পাছে ব্রাহ্মণ অতিথির প্রতি তাঁহার মুখ দিয়া কটুক্তি বাহির হইয়া পড়ে, এই ভয়ে ধৈর্য্য অবলম্বন- পূৰ্ব্বক একপার্শ্বে মুখ ফিরাইয়া অবনতমস্তকে গৌরী ঐ কথাগুলির একটী একটী করিয়া প্রতিবাদে হইলেন ,, “ব্রাহ্মণ, যাহারা বিপদের প্রতীকার করিতে ব্যস্ত কিংবা ঐশ্বৰ্যকামী, তাহারাই মাঙ্গল্য বস্তু ধারণ করিবার হর-গৌরী জন্য বৃথা লালায়িত হয় ; যিনি জগতের শরণ্য, নিষ্কাম পুরুষ, তাহার নিকট ঐ সকল ভােগ্য দ্রব্য যে অকিঞ্চিৎ কর। উহা শুধু বৃথা আশায় হৃদয়কে দূষিত করে বৈ ত নয়। “তিনি অকিঞ্চন হইলেও পার্থিব সকল সম্পদের মূল ; শ্মশান-বিহারী হইয়াও ত্রিলোকনাথ এবং ভীমরূপ হইলেও সদা মঙ্গলময় শিব-নামে বিশ্বে অভিহিত হন। সেই পিনাকীর প্রকৃত তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করিবার লােক জগতে কাহাকেও ত দেখি না। “তিনি রত্নমালাতেই বিভূষিত হউন, কিংবা সর্পধারীই হউন--গজাজিনবসন অথবা পট্টবাস-পরিহিতই হউন, মৃতের কপালধারী বা চন্দ্রশেখরই হউন-বিশ্বরূপ সেই মহেশের প্রকৃত রূপ কেহই ধারণা করিতে পারে না ; তিনি যে অবাঙ-মানস-গােচর। “ঠাকুর, চিতাভস্ম যে তাহার দেহ-সম্পর্কে পরম- পবিত্র হইয়া যায়। নহিলে তঁাহার তাণ্ডব-সময়ে ভূমিতে পতিত ঐ ভস্ম ইন্দ্র-প্রমুখ দেবগণ কেনই-বা মস্তকে ধারণ করিয়া আত্মাকে ধন্য মনে করিবেন! চিত-ভস্ম ললাটে ধারণ না করিয়া কেহই যে নিজেকে শিবময় শিবের আরাধনার প্রকৃত অধিকারী মনে করিতেই পারেন না।
হর-গৌরী
“শিব নিঃসম্বল-এ কথা সত্য হইতে পারে, কিন্তু
তিনি যখন বৃষারূঢ় হইয়া গমন করিতে থাকেন, তখন
দেবরাজও যে মদাস্রাবী ঐরাবতের পৃষ্ঠ হইতে অবতরণ
করিয়া মস্তক লুষ্ঠিত করিতে করিতে কল্পতরুর প্রচুর বিকসিত
কুসুমের রাগে তাহার চরণ-দুইখানি অরুণ-বর্ণ করিয়া
দিয়া থাকেন। পার্থিব ধন-সম্পদ যে তাহার নিকট হেয়।
“আপনার চিত্তের বিকার ঘটিয়াছে। তাই মহেশ্বরের
এরূপ নিন্দায় প্রবৃত্ত হইয়া নিজ অশুভকে বরণ
করিতেছেন। শিবকে ছাড়িয়া অশিবের আধার যত
পার্থিব ঐশ্বৰ্য্যকেই বড় ভাবিতেছেন! তবে নিন্দা করিতে
করিতেও একটী সত্যকথা আপনার মুখ হইতে বাহির হইয়া
পড়িয়াছে যে,—“তাহার জন্ম-পরিচয় অজ্ঞাত।' কথাটী
ঠিক। যিনি স্বয়ম্ভু বিধাতারও স্রষ্টা বলিয়া বেদজ্ঞগণ
কর্তৃক কীৰ্ত্তিত, তাহার জন্ম-পরিচয় কিরূপে জানা যাইবে
তিনি অনাদি।
“যাহা হউক, আর বিবাদ করিয়া কোনই ফল নাই।
আপনি যেরূপ শুনিয়াছেন, তিনি না হয় সম্পূর্ণ সেই
রূপই হউন, তাহার বিচারেই বা ফল কি ? আমার মন যে
তাহার ভাবেই একান্ত বিভোের ; আমি যে তাহার চরণেই
আত্ম-নিবেদন করিয়াছি। শুধু তঁহার ধ্যানেই আমার
?
হর-গৌরী
সকল সাধ পূর্ণ হয়। স্বেচ্ছাচারিণীদের লােকাপবাদের
ভয় কোথায়?”
ব্রহ্মচারী হয় ত আবার কিছু বলিবেন, ভাবিয়া গৌরী
সখীর দিকে চাহিয়া বলিলেন,-
“ওগাে, দেখ, ইহার অধর কম্পিত হইতেছে ; বােধ
হয়, আরও কিছু বলিতে চাহেন। একে বারণ কর ;
বারণ কর। মহতের নিন্দা যাহারা করে, তাহারাই শুধু
পাপী নয়, সে-নিন্দা শুনিলেও পাপ হয়।”
“না, এখান হইতে চলিয়া যাই”—বলিয়া উমা যেমন
উঠিতে গিয়াছেন, অমনি ত্বরা-বশতঃ অঙ্গ হইতে তাঁহার
বল্কলের উত্তরীয়খানি পড়িয়া গেল। ছদ্মবেশী মহেশ্বর
তখন স্বরূপ প্রকাশ করিয়া ঈষৎ হাস্যমুখে তঁাহার গমনে
বাধা দিবার জন্য পথ রােধ করিয়া দাড়াইলেন।
চিরারাধ্য দয়িতের দর্শনে গৌরীর দেহে স্বেদ, কম্প,
পুলক প্রভৃতি ভাবাবেশের লক্ষণ প্রকাশ'পাইল। চলিবার
জন্য পদ-বিক্ষেপ করিতেছেন বটে, কিন্তু বন্ধুর পার্বত্য
পথে নদীর গতি যেমন বাধা পায়, সেইরূপ তঁাহার গতি রুদ্ধ
হইল। যাওয়াও হয় না, অথচ লজ্জায় সেখানে থাকিতেও
পারেন না। একদিকে আরাধ্য-দেবের দর্শন-সুখ, অন্য
দিকে নারী-সুলভ লজ্জা!
—৫8-
ত
হর-গৌরী
তখন মহেশ্বর করুণাদ্ৰকণ্ঠে বলিলেন,-
“হে অনবদ্যাঙ্গি, আজ হইতে আমি তােমার ক্রীতদাস
হইলাম। তপস্যার মূল্যে যে তুমি আমায় কিনিয়া লইয়াছ।”
শিবের এই উদার-বাণীতে বিশ্বের জল, স্থল, অন্তরীক্ষ
ব্যাপিয়া কি এক অপূর্ব আনন্দ-শিহরণ প্রকাশ পাইল।
মন্দাকিনীর শীকর-সম্পৃক্ত পবন, তখন যেন বহিয়া বহিয়া
পার্বতীর আপ্যায়নে রত হইল। বৃক্ষরাজি হইতে অজস্র
কুসুম বর্ষিত হইয়া তাহার প্রতি দেবগণের সংবর্ধনা সূচিত
করিল। পক্ষিগণ কাকলী-চ্ছলে তাহার জয়গান করিয়া
এই তপসিদ্ধির শুভবার্তা সর্বত্র প্রচার করিতে প্রবৃত্ত
হইল।
পার্বতী এক্ষণে তপস্যর সকল ক্লেশ বিস্মৃত হইলেন।
সাধনা সফল হইলে আর দুঃখ কি ? দেহে, মনে তখন
নব-বলের সঞ্চার হয়। পার্বতীরও কৃচ্ছসাধন এতদিনে
সফল হইল। ত্যাগ ও সংযমের বলে ঈশ্বরকেও আপনার
করা সুসাধ্য হয় ; • অনাত্মীয় যে আত্মীয় হয়, তাহা ত
সামান্য কথা। যাহা তানায়াসলব্ধ, তাহা কখনও নিজস্ব হয়
। পার্বতীর ব্রত-পালনের পুণ্য-কথা শুনিয়া আমাদের
এই শিক্ষা লাভ হয়। ভারতের প্রাচীন শিক্ষাও তাহাই।
আজিও ভারতীয় আচাৰ্যগণ বিদ্যার্থিগণকে অধ্যয়ন
—৫৫–
হর-গৌরী
করাইবার প্রারম্ভে গৌরীর এই তীব্র তপস্যায় সিদ্ধিলাভের
কথা স্মরণ করাইয়া মঙ্গলাচরণ করিয়া থাকেন—কেন না
তাহারা ভােগ-সুখের কামনা ও বিলাস বিসর্জন দিয়া
বিদ্যা আয়ত্ত করিবার জন্য গৌরীর প্রদর্শিত তীব্র তপস্যার
অনুসরণ করিবে। বিবাহের
দিনে কন্যা-সম্প্রদানের
শুভমুহূর্তের অব্যবহিত পূৰ্বে আজিও পুরমহিলাগণ
কুমারীকে গৌরী-পূজা করাইয়া থাকেন। কারণ, আজি
যাহার হস্তে তাহাকে অর্পণ করা হইবে, তাহাকে আপনার
করিতে বা তাহার প্রীতিলাভ করিতে হইলে, সে-ও গৌরীর
মত আত্ম-সুখের কথা না ভাবিয়া একমনে তাহারই
সেবায় যেন তৎপর হয়। এই ত্যাগই তপস্যা। মহেশ্বর
শিব ভারতের এই উচ্চ আদর্শ অক্ষুন্ন রাখুন।
১। “অবতু বাে গিরিসুতা শশিভৃতঃ প্রিয়তমা।”......
“সা তে ভবতু সুপ্রীতা দেবী শিখরবাসিনী।
উগ্রণ তপসা লন্ধে যয়। পশুপতিঃ পতিঃ ॥”
—চন্দ্রশেখর মহেশ্বরের প্রিয়তমা গৌরী তােমাদিগকে রক্ষা
করুন।••••••
—সেই পৰ্বতশিখরবাসিনী দেবী তােমাদের প্রতি সাতিশয়
প্রীত হউন, যিনি উগ্র তপস্যার দ্বারা পশুপতিকে পতি লাভ
করিয়াছিলেন।
১২ বিশ্বাত্মা মহেশ্বর পার্বতীর অভিলাষ তাহার সখীদের মুখে বিদিত হইয়া হিমালয়ের নিকট পাঠাইবার জন্য জ্যোতির্ময় সপ্তর্ষিকে স্মরণ করিলেন । সূৰ্য্যমণ্ডলের, উর্ধে সপ্তর্ষিমণ্ডলে ইহাদের নিবাস। সহস্ররশ্মি সূৰ্য্যকেও সপ্তাশ্বরথে যাইবার সময় নিজ পতাকা নিম্নমুখী করিয়া ইহাদিগের নিকট সপ্রণাম প্রার্থনা করিতে হয়। ইহারা অমর ; প্রলয়-কালেও বরাহরূপী বিষ্ণুর দম্ভাগ্রে পৃথিবীর সহিত সংলগ্ন ছিলেন। বিধাতার সৃষ্টিকাৰ্য্যের পরও বাকী সৃষ্টিকাৰ্য ইহারাই করিয়াছেন, তাই পৌরাণিকেরা ইহাদের প্রাচীন বিধাতা বলেন। পূৰ্ব্ব-তপস্যার ফল ভােগ করিতে থাকিলেও ইহাদের তপস্যার বিরাম নাই। এই ঋষিগণ বিমানারােহণে আসিয়া মহেশের নিকট উপস্থিত হইলেন; কণ্ঠে তাহাদের মুক্তার মত উজ্জ্বল যজ্ঞসূত্র, পরিধানে সুবর্ণ-বর্ণের বক্কল ; হস্তে রত্নময়ী জপমালা। সঙ্গে ছিলেন মূর্তিমতী তপসিদ্ধির মত বশিষ্ঠ- চরণে নিবদ্ধ-দৃষ্টি অরুন্ধতী । -৫৭
হর-গৌরী
পুণ্যশীল। অরুন্ধতীর সহিত শঙ্কর সপ্তর্ষির যথাযােগ্য
সমাদর করিলেন। স্ত্রী-পুরুষের ভেদ না করিয়া কেবল
চরিত্রেরই পূজা করা মহতের স্বধৰ্ম্ম।
পতিব্র পত্নীই যে ধৰ্ম্ম-সাধনার মূল-সস্ত্রীক
ধৰ্ম্মানুষ্ঠানই যে বিধিসঙ্গত, অরুন্ধতীকে দেখিয়া অবধি
মহাদেব তাহা মনে মনে আলােচনা করিতেছিলেন।
ধৰ্মার্থ পাৰ্বতীকে বিবাহ করার ইচ্ছা তাহার তখন আরও
প্রবল হইয়া উঠিল। তাহার এই ইচ্ছাই হইল তানঙ্গের
পুনর্জীবন-লাভের একমাত্র আশস্থল।
বেদ-বেদাঙ্গবিৎ মুনিগণ সবিনয়ে বলিলেন,-
“মহাদেব, আজ আমাদের বেদপাঠ, হােম এবং
সকল তপস্যাই সফল ; আপনি স্মরণ করিয়াছেন বলিয়া
আমরা কৃতার্থ। আপনাকে হৃদয়ে ধারণ করিতে
পারিলেই ত জীবন সার্থক। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য
অপরিসীম ; যেহেতু ব্রহ্মারও উৎপত্তিস্থল আপনার ঐ
হৃদয়ে আমরা স্থান পাইয়াছি। চন্দ্র-সূৰ্য্য হইতে উচ্চে
আমাদের অধিষ্ঠান হইলেও, আজ আপনার প্রসাদে তাহার
অপেক্ষাও উচ্চ স্থান পাইলাম ।
“আপনার কৃত সৎকার পাইয়া আমরা ধন্য, কেননা
মহৎ-দিগের নিকট আদর পাইলে তবে লােকের নিজ
;
হর-গৌরী গুণের প্রতি প্রত্যয় হয়। আপনার স্বরূপ আমরা কিছুই জানি না। কৃপা করিয়া তাহা বুঝাইয়া দিন ; আর কেনই বা আমাদের আহ্বান করিয়াছেন, তাহারও আজ্ঞা করুন।” মহেশ্বর শুভ্র-দন্তচ্ছটায় ললাটের চন্দ্রকলার ক্ষীণ প্রভা বর্ধিত করিয়া বলিতে লাগিলেন,-- “ঋষিগণ, আমার অষ্টমূৰ্ত্তি কেবল যে পরার্থে নিযুক্ত, তাহা ত আপনারা জানেন। কোন কৰ্ম্মেই আমার স্বার্থসিদ্ধির আকাঙক্ষা নাই। শক্রর অত্যাচার- পীড়িত দেবগণ আজ তৃষ্ণার্ত চাতকের মত আমার পুত্র জন্মিবার আশায় রহিয়াছেন। সেই জন্য আমি হিমাদ্রি- তনয়া উমাকে বিবাহ করিতে অভিলাষ করিয়াছি। আপনারা কৃপাপূর্বক হিমালয়ের রাজধানী ওষধিপ্রস্থে গিয়া তাহার কাছে আমার নিমিত্ত উমাকে প্রার্থনা করুন। সজ্জনেরা সম্বন্ধ করিলে, তাহা বিফল হয় না। উন্নত, সুপ্রতিষ্ঠ, ভূভার-ধারণক্ষম হিমালয়ের সহিত বৈবাহিক- সম্পর্কে আমারও অগৌরব নাই। অতএব আপনারা গমন করুন। সেখানে গিয়া কন্যার জন্য কি কি বলার প্রয়ােজন, সে বিষয়ে আমার কিছুই বলিবার নাই। আপনারাই ত বিধিদাতা; সুজনেরা আপনাদেরই বিধান সৰ্ব্বদা মান্য করেন। আৰ্যা অরুন্ধতীও এই কাৰ্য হর-গৌরী ভাল করিতে পারিবেন। এ সকল কার্যে মহিলাদেরই দক্ষতা অধিক। ওষধিপ্রস্থ হইতে ফিরিবার সময় সম্মুখে এই মহাকোশীপ্রপাতে আমাকে দেখিতে পাইবেন।” ঋষিগণ ওষধিপ্রস্থে যাত্রা করিলেন। ভগবান্ ত্রিলােচনও তথা হইতে গিয়া মহাকোশীপ্রপাতে অবস্থান করিতে লাগিলেন। ১৩ গিরিরাজ হিমালয়ের রাজধানী ‘ওষধিপ্রস্থ গঙ্গা- প্রবাহের নৈসর্গিক পরিখায় সুরক্ষিত। প্রাচীরগুলি তাহার সুরম্য মণি-মাণিক্য-খচিত। ভিতরে ওষধি-লতায় সমুদ্ভাসিত চত্বরগুলিও বেশ সুদৃশ্য। সুগন্ধের আধার গন্ধমাদন গিরি ইহার বাহহাপবন। দেখিলে মনে হয়, ইন্দ্রের অমরাবতী আর কুবেরের অলকার অংশ লইয়াই যেন এই নগর নির্মিত। যক্ষ ও কিন্নরগণ ইহার অধিবাসী; বনদেবীগণ পুর- মহিলা। প্রাসাদগুলি গগনচুম্বী, তাহাতে সংলগ্ন মেঘের ;
হর-গৌরী গুরু-গম্ভীর নির্ঘোষ মুরজ-ধ্বনি বলিয়া ভ্রম হয়। গৃহ- প্রাঙ্গণের কল্পপাদপগুলিতে বিচিত্রবর্ণের বস্ত্র লম্বিত থাকিয়া দূর হইতে অযত্ন-রােপিত পতাকা-শ্রেণীর মতই শোভা পায়। রজনীভাগে স্ফটিক-খচিত হৰ্ম্ম-চূড়ায় তারকার রশ্মি পতিত হইলে, মনে হয়, কে যেন অসংখ্য পুষ্প উপহার দিয়া সমগ্র নগরীকে সাজাইয়া রাখিয়াছে। মেঘাচ্ছন্ন রজনীতে ও্যধি-সমূহ উদ্ভাসিত হইয়া ইহার রাজপথগুলির অন্ধকার নাশ করিয়া থাকে। মহর্ষিবৃন্দ মনােজব রথে আকাশ-পথ দিয়া ধীরে ধীরে ওষধিপ্রস্থে অবতরণ করিলেন। নগরের অনুপম সুষমায় তঁাহারা বিমুগ্ধ হইয়া মনে মনে আলােচনা করিতে লাগিলেন, “আহা! এই ত স্বর্গ ; লােকে কেন আর বৃথা স্বর্গের আশায় পুণ্য-সঞ্চয় করে ? দৌবারিকগণ তখন উৰ্দ্ধদৃষ্টি হইয়া ঋষিগণের অগ্নি- শিখার তুল্য জটাজুট দেখিতে দেখিতে অবাক্ হইয়া রহিল। দূর হইতে হিমালয় তাহাদিগকে দেখিয়া অর্ঘ্য-সহ গুরু-পদক্ষেপে তথায় উপস্থিত হইয়া নতমস্তকে তাহাদের যথােচিত অভ্যর্থনা করিলেন।
হর-গৌরী গিরিরাজের বিশাল দেহ, আজানুলম্বিত বাহু, স্বভাবতঃ পাষাণােপম সুপ্রশস্ত বক্ষঃ এবং গৈরিক-রাগের মত অরুণ ওষ্ঠপুট দেখিয়া ঋষিগণ সহজেই তাহাকে স্থাবরাত্মক হিমালয় বলিয়া চিনিতে পারিলেন। রাজা সেই পুণ্য-শীল ঋষিগণকে প্রণাম করিয়া কুশল- প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে করিতে স্বয়ং পথ দেখাইয়া অন্তঃপুর মধ্যে লইয়া চলিলেন। যথােচিত সৎকৃত হইয়া তাহারা সকলে বেত্রাসনে উপবেশন করিলে, হিমালয় একখানি আসন-গ্রহণ করিয়া কর-যােড়ে বলিতে লাগিলেন, “দেবর্ষিগণ, আজ বিনা-মেঘে বর্ষণ এবং বিনা-পুষ্পে ফলােদয়ের মত সহসা আপনাদের শুভাগমনে এই অধমের প্রতি অসীম অনুগ্রহই প্রকাশ পাইতেছে। অজ্ঞানান্ধ আমি, আপনাদের প্রভাবে এখন জ্ঞানচক্ষু পাইলাম। লৌহসার দেহ আমার কাঞ্চনময় হইল। আমি ভূলােকেই দ্যুলােক দেখিতে পাইলাম। “আপনাদের মত পুণ্যাত্মাদের পদধূলি যেখানে পড়ে, সেই স্থানই ত মহাতীর্থ ! আজ হইতে আমিও জীব- কুল-পাবন তীর্থ-স্বরূপে গণ্য হইলাম। “হে দ্বিজোত্তমগণ, দুইটী বস্তুতে আমি আত্মাকে ।
হর-গৌরী
পবিত্র জ্ঞান করিতেছি—এক মন্দাকিনীর স্রোতধারা ;
আর আপনাদের চরণােদক ।
“আমার স্থাবর, জঙ্গম—উভয় দেহই আজ ধন্য।
স্থাবর-দেহে আপনাদের চরণ-চিহ্ন অঙ্কিত হইল; আর
জঙ্গম-দেহে আপনাদের সেবা করিতে পাইলাম। অসীম
এই আনন্দ যে আমার দিগন্তব্যাপী বিশাল দেহেও
ধরিতেছে না।
“আপনাদের * তেজোময়ী মূর্তির প্রভাবে শুধু যে
আমার গুহাগত তিমির নষ্ট হইল, তাহা নহে; হৃদয়ের
তিমিরও অনেকক্ষণ নাশ হইয়া গিয়াছে। হয় ত শুধু এই
দীনকে পবিত্র করা ব্যতীত আপনাদের শুভাগমনের অন্য
কোন প্রয়ােজন নাই, যদি বা থাকে, তবে এই অধমের
দ্বারা কেন এখনও তাহা সম্পাদিত হইল না! এখন
কি করিতে হইবে, কৃপা করিয়া দাসের প্রতি আদেশ
দানে কৃতার্থ করুন প্রভুর আদেশ পালনই যে ভৃত্যের
একমাত্র চরিতার্থত। রত্ন-মাণিক্যের কথা বলিতে চাহি
—উহা ত অসার বাহ-পদার্থ। স্বয়ং আমি, মহিষী,
আর এই বংশের প্রাণ-প্রতিমা কন্যা—এ তিনের মধ্যে
কাহার দ্বারা আপনাদের কি প্রয়ােজন সাধিত হইতে
পারে, ত্বরায় অনুমতি দিয়া দাসকে কৃতার্থ করুন।”
হর-গৌরী হিমাদ্রির এই বিনয়পূর্ণ বাক্যাবলী গুহায় প্রতিধ্বনিত হওয়ায়, মনে হইল, যেন তিনি কথাগুলি দুইবার আবৃত্তি করিয়া ঋবিদের নিকট সহজেই তাহাদের অভীষ্ট-প্রদানে প্রতিশ্রুত হইলেন। ঋষিদের মধ্যে অতিশয় বাগ্মী অঙ্গিরা তখন প্রত্যুত্তর প্রদান করিলেন, “গিরিরাজ, তােমার শৃঙ্গ আর চিত্ত—দুই-ই সমান উন্নত। এখন যাহা বলিলে, তাহা তােমার মত উদার পুরুষের যােগ্য ত বটেই, বরং উহা অপেক্ষা আরও বেশী-কিছু যদি বলিতে, তাহাও তােমার পক্ষে সম্ভব হইত। লােকে যে তােমায় স্থাবরাত্মক বিষ্ণু বলে, তাহা সম্পূর্ণ সত্য। যেহেতু তােমার কুক্ষি বিষ্ণুরই মত চরাচর জীবের আধার। ত্রিবিক্রম-কালে ত্রিপাদ বিষ্ণুর মহিমা উৰ্দ্ধ, অধঃ এবং পার্শ্ব—সকল দিকে প্রকাশ পাইয়া চরাচর বিশ্বে ব্যাপৃত হইয়াছিল বটে, কিন্তু তােমার মহিমা যে সহজেই সৰ্বব্যাপী। তুমি রসাতল পর্যন্ত বসুন্ধরাকে ধারণ না করিলে অনন্তদেব কি তঁাহার মৃণাল-সুকুমার ফণার উপর তাহাকে বহন করিতে পারিতেন ? দিগন্ত- বিস্তৃত তােমার অমল-কীর্তি, আর সমুদ্র-তরঙ্গে অপ্রতিহত পুণ্যতােয়া এই গঙ্গা প্রভৃতি নদীগুলি অনবরত -৬৪-
হর-গৌরী
নিজ বিশুদ্ধিতে মানব-জাতিকে পবিত্র করিতেছে।
পরমেষ্ঠী বিষ্ণুর পদ-সমুদ্ভবা বলিয়া যেমন শ্লাঘ্যা, তেমনি
তুমিও তাহার উৎপত্তিস্থল বলিয়া বিশেষ শ্লাঘ্য।
যজ্ঞভাগভােজী দেবগণের মধ্যে স্থান পাইয়া তুমি প্রাধান্যে
সুমেরুর
হিরন্ময়
শৃঙ্গকেও খর্ব করিয়া দিয়াছ।
স্থাবর দেহেই যত-কিছু কঠিন, কিন্তু জঙ্গম দেহ
সতত সজ্জনের আরাধনায় নিযুক্ত এবং অবিচল ভক্তিতে
বিনম্র ।
“আমরা যে জন্য আসিয়াছি, তাহা বলিতেছি।
বিষয়টী তােমার পক্ষেই মঙ্গলকর ; আমাদেরও একটা
সদনুষ্ঠানে উপদেশ দেওয়ার জন্য অবশ্য পুণ্য-সঞ্চয়
হইতে পারিবে।
“যিনি সর্ববিধ ঐশ্বৰ্য্যগুণময় হইয়া বিশ্বে ঈশ্বর-নামে
অভিহিত—নিজ অষ্টমূৰ্ত্তিতে সারথির রথ-ধারণের মত
যিনি এই বিশ্ব-সংসার ধারণ করিয়া আছেন—অর্ধচন্দ্র
যাহার শিরােভূষণ—যােগিগণ যাঁহাকে দেহগত পরমাত্মা
বলিয়া ধ্যান করেন মনীষিগণ যাহাকে ভব-ভয়-নাশন
বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন, বিশ্বের সর্বকর্মের সাক্ষী সেই
বরদ মহাদেব পশুপতি তােমার কন্যার পাণিগ্রহণে
অভিলাষী হইয়া আজ আমাদিগকে পাঠাইয়াছেন। এখন
•
—৬৫-
হর-গৌরী তুমি নিজ কন্যাকে তাহার সহিত বিবাহ-সূত্রে সম্মিলিত করিয়া দিয়া সুখী হও। “সৎপাত্রে কন্যাদান করিলে মাতাপিতাকে অসুখী হইতে হয় না। মহেশ্বর ব্রহ্মাণ্ডের পিতা। সুতরাং এই গতিস্থিতিশীল সমগ্র বিশ্বই তােমার কন্যাকে ‘মা’ বলিয়া ডাকিবে। দেবতারা মহেশ্বরকে প্রণাম করিবার পর স্ব স্ব মস্তকের মণির কিরণমালায় তােমার কন্যার পদ- দুইখানি রঞ্জিত করিতে থাকিবেন-আমাদের ইহাই বলিবার কথা। উমা বধু, তুমি দাতা, মহেশ্বর শম্ভু পাত্র ; আর তােমার সম্মুখে এই আমরা প্রার্থী। এ বিবাহে তােমার বংশের অভ্যুদয়ই হইবে। “জান ত, শিব সকলেরই পূজ্য ; সবাই তাঁহার স্তুতি করেন, কিন্তু তাঁহাকে কাহারও স্তব করিতে হয় না—কেহই তাঁহার পূজ্য নয়। তুমি সেই বিশ্বগুরুকে কন্যাদান করিয়া তাঁহারও পূজ্য হইয়া যাও।” দেবর্ষি যখন এই সকল কথা বলিতেছিলেন, তখন লজ্জায় সঙ্কুচিত হইয়া পার্বতী পিতার পার্শ্বে নতমুখে লীলা-পদ্মের পত্র-গণনা করিতেছিলেন। তপস্যায় সিদ্ধি- লাভের পর তিনি এখন পিত্রালয়ে আসিয়াছেন। মাতা- হর-গৌরী পিতা ক্ষণকালও তাঁহাকে চক্ষের অন্তরাল করিতে পারেন না। শিবকে কন্যাদান করিয়া ধন্য হইবার ইচ্ছা হিমালয়ের পূর্ব হইতে থাকিলেও, তিনি পত্নীর অভিমত জানিবার জন্য একবার মেনকার দিকে দৃষ্টি-নিক্ষেপ করিলেন। গৃহস্থদিগকে কন্যা-সম্বন্ধীয় সমস্ত-ব্যাপারেই গৃহিণীর মতের উপরই নির্ভর করিতে হয়। মেনকা পতির অভিলাষ জানিয়া এই বিবাহ-প্রস্তাবে সানন্দে সম্মত হইলেন। পতিব্রতা নারীগণ কদাচ পতির অভীষ্ট-বিষয়ে প্রতিকূল হন না। হিমালয় তখন শিবকে কন্যা-সম্প্রদান করা নিশ্চিত মনে করিয়া মঙ্গলালঙ্কার-ভূষিত উমার হস্ত ধারণ করিয়া বলিলেন- “এস মা, আজ তােমায় বিশ্বরূপ মহেশকে ভিক্ষা- স্বরূপে অৰ্পণ করিব। আজ আমার গৃহি-জনের বাঞ্ছিত ফল লাভ হউক।” পিতার আদেশে উমা ঋষিগণের পদে প্রণাম করিলেন। তখন তাহার কাঞ্চনময় কুণ্ডল কর্ণ হইতে ভূমিতে পড়িয়া গেল।
হর-গৌরী হিমালয় করযােড়ে ঋষিদিগকে বলিলেন—“এই দেখুন, ত্রিলােচনবধু আপনাদিগকে প্রণাম করিতেছে।” অভীষ্ট পূর্ণ হওয়ায়, ঋষিগণ রাজার এই উদার- বচনের বহু প্রশংসা করিয়া আশুফলপ্রদ আশীৰ্বাদ দ্বারা উমাকে সমাদৃত করিলেন। অরুন্ধতীও তাহাকে নিজ ক্রোড়ে বসাইয়া কতই আদর করিতে লাগিলেন। আনন্দাশ্রমুখী মেনকা বিবাহের পর কন্যার পতি-গৃহ- গমন জন্য আসন্ন বিরহ স্মরণ করিয়া আকুলচিত্ত হইয়াছেন দেখিয়া অরুন্ধতী তাহাকে সান্তুন-প্রদান করিয়া ভাবী জামাতার নানা গুণ-কীৰ্ত্তন করিতে লাগিলেন। তিন দিন পরে বিবাহের শুভদিন স্থির হইল। ঋষিগণ বিদায় লইয়া মহেশ্বরকে বিবাহের বিষয় জ্ঞাপন করিবার জন্য বিমান-যােগে নভােমার্গে সমুখিত হইলেন। ১২ গিরিরাজ-গৃহে কন্যার বিবাহােৎসব। স্বজন-বান্ধব সমবেত হওয়ায় তাহার গৃহে আজ বিপুল জনতা। পুর- নারীবর্গ বিবাহের শুভানুষ্ঠানে মহাব্যস্ত। রাজান্তঃপুর এবং হর-গৌরী নাগরিকগণের গৃহসকল মাঙ্গলিক আলিম্পনে অপূর্ব-শ্রী ধারণ করিয়াছে। তােরণে তােরণে সপুষ্প-পল্লব ও মাল্য সন্নদ্ধ, তদুপরি বিচিত্র কৌষেয় পতাকা বায়ুভরে ঈষৎ আন্দোলিত হইতেছে। দ্বারগুলির দুইপার্শ্বে ফল-শাখা- সমন্বিত বারিপূর্ণ মঙ্গলঘট স্থাপিত এবং দেহলী সিদূর- রাগে রঞ্জিত। ঘরে ঘরে উৎসবের শঙ্খ বাজিতেছে। আজ পর্বতপতির অন্তঃপুর আর সমগ্ৰ নগর যেন একই গৃহস্থের অন্তভুক্ত স্থান বলিয়া অনুমিত হইতেছে। নগরের রাজপথগুলি সন্তানক-পুষ্পে সমাকীর্ণ। স্থানে স্থানে সুবর্ণের কারুকার্যমণ্ডিত তােরণশ্রেণী ; তাহার উদ্ধে পুষ্পলতাদি-শােভিত মণ্ডপ; তথা হইতে নানা বাদ্যযন্ত্রের মধুর ধ্বনি এবং প্রাণ-বিনােদন সঙ্গীতের তান উথিত হইতেছে। মনে হইতেছে, যেন ইন্দ্রের অমরাবতী স্থানান্তরিত করিয়া এই গিরিপুরে উপস্থাপিত করা হইয়াছে। পৰ্বতপতির সন্ততির অপ্রতুল নাই, কিন্তু আশু স্বামি-গৃহে যাইবেন বলিয়া উমা আজ জনক-জননীর জীবন-সৰ্বস্ব হইয়া উঠিয়াছেন। বহুকালের পর তাহাকে গৃহে পাইয়া তাহাদের দেহে নবজীবনের সঞ্চার হইয়াছে।
হর-গৌরী পার্বতী এখন পূর্বাভরণগুলি পরিত্যাগ করিয়া শুভ- বিবাহের যােগ্য নব আভরণে ভূষিত হইতেছেন। উত্তম কৌষেয় বসন পরিধানে তাহার দেহকান্তি সমধিক উজ্জল হইয়াছে। 'গুরুজনেরা একে একে তাঁহাকে ক্রোড়ে লইয়া কত শুভাশীষ প্রদান করিতেছেন। আজিকার দিনে গৌরী ভিন্ন যে গৃহে আর কেহই স্নেহের পাত্রী নাই। শুভক্ষণে পুরমহিলাগণ আসিয়া গৌরীর যথােপযুক্ত মঙ্গল-স্নানের আয়ােজন করিতে লাগিলেন। লােভ্ররেণু দিয়া অঙ্গের তৈল অপসারিত করার পর, তাহাতে নানা অঙ্গরাগ-দ্রব্য অভ্যঙ্গ করা হইল এবং মরকত শিলায় রচিত একটী স্নান-গৃহে মঙ্গলবাদ্য-সহকারে তাহার স্নান- ক্রিয়া সম্পাদিত হইল। স্নানান্তে বিশুদ্ধগাত্রী উমা পট্টবস্ত্র পরিধান করিয়া বৃষ্টিধারা-বিধৌত কাশকুসুমে প্রফুল্ল বসুন্ধরার মত শােভা পাইতে লাগিলেন। পতিপরায়ণা কুল-ললনারা তখন তাহাকে চারিটি মণিময়-স্তম্ভের সহিত সংলগ্ন চন্দ্রাতপ-তলস্থ বেদীর উপর দিব্য আসনে বসাইয়া নানাবিধ দ্রব্য-সংযােগে অঙ্গ- প্রসাধনে নিযুক্ত হইলেন।
হর-গৌরী ; •• কেহ কুন্তলরাজির আর্দ্রতা বিনষ্ট করিয়া তাহাতে কুসুম-বিন্যাস ও দূর্বাদলের সহিত পাণ্ডুবর্ণ মধুক- পুষ্পের মাল্য সন্নদ্ধ করিয়া দিতেছেন; কেহ বা তাহার শ্বেত-অগুরু-চর্চিত অঙ্গে গোরােচনা দিয়া পত্রাবলী অঙ্কিত করিতেছেন; কেহ বা তাহার লােচন-দুটীতে অঞ্জন লেপন করিয়া দিতেছেন। এক সহচরী আবার তাহার পদ-দু’টী অলক্তরাগে রঞ্জিত করিতে করিতে পরিহাস করিয়া বলিল,- “সই, তােমার এই অতিসুন্দর চরণ-দু'খানি স্বামী শশাঙ্কশেখরের মস্তকস্থিত চন্দ্রকলা স্পর্শ করুক।” গৌরী মালা ছুড়িয়া তাহাকে তাড়না করিলেন। তারপর কুসুম-ভূষিতা লতাটীর মত নানা বিভূষণে ভূষিত হইয়া পার্বতী মুকুরে নিজ বদন-মণ্ডলের প্রতিবিম্ব দর্শন করিতে করিতে একান্ত হৃষ্টচিত্তে ভগবান্ শশাঙ্ক- শেখরের চরণ-দর্শনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। নারীর বেশ-ভূষা শুধু তাহার আরাধ্য দেবতা পতির সুখের জন্য আত্মসুখের জন্য নহে। পতির প্রীতি-উৎপাদনেই এই বেশভূষার সার্থকতা। জননী মেনকা আনন্দাশ্যপূর্ণ-নয়নে কন্যার মুখখানি কিঞ্চিৎ উন্নমিত করিয়া তাহাতে আর্জ হরিতাল ও হর-গৌরী মনঃশিলা দিয়া শুভ-বিবাহের অনুরূপ তিলক রচনা করিয়া দিলেন। উমার যৌবন-সূচনার দিন হইতেই তিনি অন্তরে যে আশা পােষণ করিয়াছিলেন, আজ তাহা পূর্ণ হইল। আনন্দাতিশয়ে বাষ্পকুল হইয়া তিনি তনয়ার হস্তের যে স্থানে মাঙ্গল্য-সূত্র বাঁধিয়া দিতে হইবে, তাহা লক্ষ্য করিতে পারিলেন না। ধাত্রী আসিয়া তখন অন্য- স্থানে সন্ন্যস্ত সেই মাঙ্গল্য-সূত্র যথাস্থানে বাঁধিয়া দিলেন। কৰ্ত্তব্যপরায়ণ মাতা এইবার । কন্যাকে লইয়া পরমার্চনীয় কুলদেবতাকে প্রণাম করাইলেন; পতিব্রতা নারীগণের একে একে চরণ-বন্দনা করাইয়া তাহাদের আশীৰ্বাদ প্রার্থনা করিলেন। সকলেই ‘পতির অখণ্ড প্রেমের অধিকারিণী হও’-- বলিয়া উমাকে আশীষ প্রদান করিলেন। তাহাদের আশীর্বাদের ফলে পাৰ্ব্বতী অশেষ সৌভাগ্যবতী হইতে পারিয়াছিলেন। পর্বতরাজও যথাযােগ্য শিষ্টাচারে নিজ বাসনা ও ঐশ্বৰ্যানুরূপে সমাগত বন্ধু-বান্ধব ও নিমন্ত্রিত-জনের পরিতােষ সাধন করিতে কোনরূপ ক্রটি করিলেন না; বিনয়াবনত হইয়া সকলকে সভায় লইয়া বর মহাদেবের আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। –৭২- ১৫ মহেশের দ্বিতীয়বার বিবাহ। কৈলাসে বর-যাত্রার আয়ােজন হইতেছে। দেবগণ প্রায় সকলেই সমুপস্থিত। মাতৃকাবৃন্দ ত প্রথম বিবাহেরই উপযােগী নানা প্রসাধন দ্রব্য আনিয়া শঙ্করের সম্মুখে স্থাপিত করিয়াছেন। নিস্পৃহ মহেশ শুধু তাঁহাদের মান-রক্ষার জন্য সেগুলিকে এক এক বার স্পর্শ করিলেন মাত্র। তাঁহার সনাতন বেশই তখন সুন্দর বরবেশ ধারণ করিল। চিত-ভস্ম হইল শুভ্র অঙ্গরাগ ; নর-কপাল হইল মস্তকের চূড়ামণি এবং গজাজিনই তখন দুই প্রান্তে কল- হংস-চিহ্নিত দুকূল-বাসে পরিণত হইল। ললাট-মধ্যগত তাহার তৃতীয় নেত্র—যাহাতে পিঙ্গল তারা চির-সমুজ্জ্বল, তাহা এখন হরিতাল-রাগে অঙ্কিত তিলক-রূপে দৃশ্যমান হইতে লাগিল। সর্পগুলির দেহ শিবাঙ্গের যথাস্থানে রত্নালঙ্কারে পরিণত হইল ; শুধু তাহাদের মণিগুলির ঔজ্জ্বল্য অবিকৃত রহিয়া গেল। আর ললাটের শশিকলা, যাহা হইতে দিবাভাগেও -৭৩-
হর-গৌরী
মরীচি-মালা বিচ্ছুরিত হয়-কলামাত্র বলিয়া যাহা
নিষ্কলঙ্ক—তাহা ত শশাঙ্ক-শেখরেরই শিরােভূষণ, সুতরাং
তাহার মুকুট-ধারণের প্রয়ােজনই রহিল না।
নিখিল বিস্ময়কর পদার্থের মূলাধার ভবেশ এইরূপে
নিজ মহিমাতেই মনােরম
সজ্জিত
হইলেন।
পরে প্রমথগণের আনীত একটী সমুজ্জ্বল খঙ্গে স্বীয়
মুখের প্রতিবিম্ব দর্শন করিয়া তিনি নন্দীর হস্তাবলম্বনে
শার্দল-চৰ্মাবৃত বৃষ-পৃষ্ঠে আরােহণ করিলেন। মাতৃকা-
বৃন্দও স্ব স্ব বাহনে আরূঢ়া হইয়া বরানুগমনে অগ্রসর
হইলেন। তাহাদের পশ্চাতে রহিলেন—কপালাভরণা
কালিকাদেবী।
আদিত্যদেব তখন শিব-শিরে বিশ্বকৰ্মার নির্মিত
নবছত্র ধারণ করিলেন। তাহাতে লম্বিত শ্বেতবর্ণের
কৌষেয় বস্ত্রখণ্ডের উপান্ত-ভাগগুলি বায়ুভরে আন্দোলিত
হইতেছে দেখিয়া মনে হইতে লাগিল, যেন বর শূলপাণির
মস্তকে মন্দাকিনীর বারিধারা নিপতিত হইতেছে। গঙ্গা ও
যমুনা স্ব স্ব নদীরূপ ত্যাগ করিয়া মূর্তিমতী দিব্য-স্ত্রী-রূপে
উভয় পার্শ্বে বলাকা-শুভ্র চামর-বীজনে তাহার সেবায়
প্রবৃত্ত হইয়াছেন।
--৭8-
হর-গৌরী
প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং নারায়ণ তখন শিবের জয়-
ধ্বনি করিতে করিতে তথায় আবিভূত হইলেন। ইন্দ্র,
চন্দ্র প্রভৃতি লােকপালগণও একে একে আসিয়া মিলিত
হইলেন। ঘৃত-সংযােগে বহ্নির তেজঃ যেরূপ বর্ধিত হয়,
ইহাদের আবির্ভাবে মহাদেবের দিব্যজ্যোতিঃ সেইরূপ
অধিকতর বর্ধিত হইল। এক অখণ্ড ভূমারই ত্রিধা মূর্তি
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ; ইহাদের কে জ্যেষ্ঠ, কে-ই বা
কনিষ্ঠ, তাহা আর নিরূপিত হইল না।
লােকপালগণ স্ব স্ব পদ-মর্যাদার যােগ্য বেশ-ভূষা এবং
আত্ম-পরিচায়ক অভিজ্ঞানগুলি বর্জন করিয়া অতি
বিনম্রভাবে নন্দীর নিকট ইঙ্গিতে মহাদেবের দর্শনাভিলাষ
ব্যক্ত করিলেন।
নন্দী তাহাদিগকে প্রভুর
সম্মুখীন করিয়া এই
'দেবেন্দু আসিয়াছেন; ইনি শশধর’—ইত্যাদি ক্রমে
সকলের পরিচয় প্রদান করিলেন। দেবতাগণ করযােড়ে
শঙ্করকে প্রণিপাত করিয়া দণ্ডায়মান রহিলেন।
মহেশ্বর শিরঃ-সঞ্চালনে বিধিকে, সুমধুর আলাপে
বিষ্ণুকে, ঈষৎ হাস্য দ্বারা বাসবকে এবং অন্যান্য দেবগণের
প্রতি প্রীতিপূর্ণ দৃষ্টিপাত করিয়া সকলেরই তৎকালােচিত
সম্মাননা করিলেন।
হর-গৌরী
সপ্তর্ষিবৃন্দ ‘ভগবানের জয় হউক’-এই আশীর্বচন
উচ্চারণ করিতে করিতে তথায় উপস্থিত হইলেন।
ঈষৎ হাস্য-সহকারে তাহাদের অভ্যর্থনা করিয়া
মহাদেব বলিলেন-“এই বিবাহ-যজ্ঞে ত আমি পূর্বেই
আপনাদিগকে পুরােহিত-পদে বরণ করিয়া রাখিয়াছি।”
এইবার ওষধিপ্রস্থ-অভিমুখে বরপক্ষীয়গণের শােভা-
যাত্রা আরম্ভ হইল। বৃষরাজ নিরন্তর শৃঙ্গ কম্পিত করিতে
করিতে গগন-পথে ত্রিপুরারিকে বহন করিয়া লইয়া
যাইতে লাগিল। তাহার গ্রীবা হইতে কাঞ্চনময়ী ঘুণ্টিকার
মধুর শব্দ উখিত হইতেছে। দেবগণ বিমানে আরােহণ
করিয়া চলিয়াছেন। স্ব স্ব বাহনের গতিবেগে মাতৃকাগণের
কর্ণাভরণ দোদুল্যমান হইতেছে। প্রমথগণের কৃত নানা
বিচিত্র বাদ্য-ধ্বনি দেবতাগণের বিমানাগ্রে পৌছিয়া যেন
তাহাদিগকে শিবারাধনায় তৎপর হইতে ইঙ্গিত করিতেছে।
বিশ্বাবসু-প্রমুখ গন্ধৰ্ব্বগণ সুললিতস্বরে ত্রিপুর-বিজয়
গাহিয়া বরযাত্রিগণের প্রাণে সুধাধারা ঢালিয়া দিতেছেন।
ভগবান্ চন্দ্রচূড় ইহা শুনিতে শুনিতে সানন্দে সমস্ত
পথ অতিক্রম করিয়া ওষধিপ্রস্থ-নগর-প্রান্তে উপনীত
হইলেন।
-৭৬-
(CARASWATC MAKARDA - HOWKAH, Estd:-1919. ৮ ; ওষধিপ্রস্থের নাগরিকগণ পরম-কৌতূহলী হইয়া এতক্ষণ নগরের বাহিরে বরের শুভাগমন প্রতীক্ষা করিতেছিল ; এক্ষণে নিজ পারিষদবর্গের সহিত ভগবান্ নীললােহিতকে নিকটবর্তী দেখিয়া সানুরাগ- উৰ্দ্ধদৃষ্টিতে সকলেই তাহাকে দেখিতে লাগিল। রাজ-বন্ধুবর্গ, সামন্ত-পারিষদ বহুমূল্য বস্ত্রাভরণে সুসজ্জিত হইয়া এক একটী গজাররাহণে বরের অভ্যর্থনা করিবার নিমিত্ত সেখানে উপস্থিত হইলেন। গিরিরাজচক্রবর্ত্তী স্বয়ং নগ্নপদে আসিয়া বরযাত্রি- গণের সহিত বর মহাদেবের সাদর অভ্যর্থনা করিলেন। নগরের দ্বার উদ্ঘাটিত হইবামাত্র দেব-পক্ষীয় ও পৰ্বত-পক্ষীয় জনসমূহ দিগন্তব্যাপী তুমুল জয়ধ্বনি করিতে করিতে নগরে প্রবেশ করিতে লাগিল। ত্রিলোেকবন্দ্য মহেশ্বর গিরিবরকে প্রণাম করিলেন। হিমালয় শিবের নিকট আপনাকে নিতান্ত হীন বিবেচনায় লৌকিক এই শিষ্টাচারে একেবারে সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলেন। শিবের অপরিমেয় মহিমাতে তিনি যে পূৰ্ব্ব ৭৭- হর-গৌরী হইতেই তাঁহার প্রতি নতশির হইয়া আছেন, এ জ্ঞান তখন তাহার রহিল না। সৌভাগ্যক্রমে তাহাকে জামাত লাভ করিবার আনন্দে তখন ভূধরজের মুখশ্রী সমুজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তিনি সমাগত দেবগণ ও প্রমথগণ-সহ পশুপতিকে অগ্রে করিয়া নগরে প্রবেশ করিলেন। নগর- পথগুলি তখন পুষ্পকীর্ণ ; চলিতে গেলেই গুলফ নিমজ্জিত হইয়া যাইতেছে। গৃহে গৃহে মঙ্গল-শঙ্খধ্বনিরও বিরাম নাই। পুর-মহিলাগণ শিব-দর্শনের জন্য অতিশয় উৎকণ্ঠিতা হইয়া পূর্ব হইতেই সমস্ত গৃহকর্মে বিরত হইয়াছিলেন। এক্ষণে কেহ কেহ প্রাসাদের ছাদে আরােহণ করিতেছেন ; কেহ কেহ বা বাতায়নের দিকে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হইতেছেন। অত্যন্ত ব্যস্ততার জন্য কোন রমণীর বেণী-বন্ধন শিথিল হইয়া তৎসংলগ্ন মাল্য বিচ্যুত হইয়াছে সেদিকে তাঁহার হৃক্ষেপ নাই। তিনি আলুলায়িত কেশদাম হস্তে ধারণ করিয়াই বহির্দেশের অলিন্দে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। অন্তঃপুরের ভিতর প্রসাধিকা কাহারও পদ অলক্ত- রাগে রঞ্জিত করিতেছিল, রমণী তখন অতিশয় আগ্রহ-হেতু তাহার হস্ত হইতে পদ সরাইয়া লইয়া গবাক্ষর দিকে ৭৮ ; হর-গৌরী চলিয়াছেন ; গবাক্ষ পৰ্যন্ত সমগ্ৰ গৃহতলটী লাক্ষারাগের চরণ-চিহ্নে ভরিয়া যাইতেছে। কোন পুরনারী সবেমাত্র এক নেত্রে অঞ্জন দিয়াছেন, এমন সময় শিবাগমন জানিতে পারিয়া গবাক্ষ-রন্ধে, আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন; তাহার অঞ্জন-পাত্র হস্তেই রহিয়াছে। কোন রমণী কাঞ্চীদামের মুক্তাগুলিকে গ্রথিত করিতেছিলেন; কিন্তু তাহাতে বিরত হইয়া সবেগে পদক্ষেপ করায়, রত্নগুলি ভূমিতে বিকীর্ণ হইয়া গেল ; কেবল সূত্রটী তাঁহার অঙ্গুলিতে বিলগ্ন রহিল, সেই অবস্থায় তিনি বাতায়নের দিকে চলিয়াছেন। ফলতঃ পুরমহিলাগণ সকলেই অনন্যচিত্ত হইয়া শিব- দর্শনের আকাঙক্ষায় অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া পড়িয়াছিলেন। এক্ষণে তাঁহাদের চিরাকাঙিক্ষত সেই চন্দ্রশেখর তােরণ অতিক্রম করিয়া রাজপথে উপনীত হইবামাত্র সকলেই তাঁহাকে সতৃষ্ণ-নয়নে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন একমাত্র দর্শনেন্দ্রিয় ব্যতীত তাঁহাদের অপর ইন্দ্রিয়গুলির ক্রিয়াশক্তি যেন বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। এতই তাহাদের তন্ময়তা ! চন্দ্রশেখরকে দর্শন করিয়া মুগ্ধ পৌর-ললনাগণ তখন
===
হর-গৌরী
পরস্পর কথােপকথন করিয়া তাহার বিষয়ে নানা মন্তব্য
প্রকাশ করিতে লাগিলেন,
“আ মরি মরি! রাজ-জামাতার কিবা মােহন রূপ
লাে! সার্থক অপর্ণার কোমল-দেহে কঠোর তপস্যা।
যে স্ত্রী হঁহার দাসী হইতে পায়, তারই ত জীবন সার্থক ;
যিনি ইহার বামে স্থান পাইবেন, তার সৌভাগ্য যে কত,
তাহা ত বলিয়াই শেষ করা যায় না! আহা! এমন
কমনীয় সৌন্দর্যের আধার এই দু’টী প্রাণের মিলন যদি
বিধাতাপুরুষ না ঘটাইতেন, তবে ইহাদিগকে এত সুন্দর
করিয়া গঠন করিবার জন্য তার যত-কিছু প্রয়াস, সবই
বিফল হইত! ইহার ক্রোধানলে নিশ্চয়ই মদন দগ্ধ হয়
নাই; ইহাকে দেখিয়া লজ্জায় হয় ত তিনি স্বয়ং দেহ
নাশ করিয়া থাকিবেন।”
অপর একস্থানে কোন এক রমণী তাঁহার সখীকে
বলিতেছেন ;
“ও সই, গিরিরাজের বড় ভাগ্যে শিবের সঙ্গে
মনের মত এই সম্বন্ধ জুটিল। ভূধর বলিয়া গৌরবে
চিরদিনের উচ্চ-শির তার আজ আরও কত উচ্চ হইয়া
উঠিল।”
ত্রিলােচন ওষধিপ্রস্থ-বাসিনীদিগের এইরূপ শ্রুতিমধুর
কর-গৌরী আলাপ শুনিতে শুনিতে হিমালয়-গৃহে উপনীত হইলেন। তখন তাহার কেয়ুরােপরি অজস্র লাজ-মুষ্টি বর্ষিত হইতে লাগিল; অন্তঃপুরে আবার মঙ্গল-শঙ্খ বাজিয়া উঠিল। ব্ৰহ্মা পূৰ্বেই আসিয়া একটী প্রকোষ্ঠে সমাসীন হইয়াছেন। চন্দ্রচূড় তখন বিষ্ণুর হস্ত-ধারণে বৃষ হইতে অবতরণ করিয়া তাহার নিকট বরাসনে উপবেশন করিলেন। ইন্দ্র-প্রমুখ সুরবৃন্দ, সপ্তর্ষি-প্রমুখ পরমর্ষি-সঙ্ঘ এবং শিব-পারিষদ প্রমথগণ মহেশ্বরের অনুসরণ করিয়া বিবাহ- সভায় হিমালয়-নিবেদিত যথাযােগ্য আসনে উপবেশন করিলেন। মহেশ্বর তখন যথাবিধি নগেন্দ্র-প্রদত্ত রত্ন-সমন্বিত অর্ঘ্য, মধুপর্ক, এবং দুইখানি নব দুকূল-বস্ত্র মন্ত্রোচ্চারণ করিয়া গ্রহণ করিলেন । অন্তঃপুর-গমনের অধিকারী বিনীত-পুরুষেরা দুকূল-বাস- পরিহিত চন্দ্রশেখরকে বধূরূপিণী গৌরীর নিকট লইয়া গেল। তথায় উমার সহিত মিলনে ত্রিনয়নের নয়ন প্রেমভরে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। শুভক্ষণে বর-বধূ সলজ্জ- নয়নে পরস্পর মুখাবলােকন করিলেন। পরক্ষণেই তাহাদের চক্ষু লজ্জায় সঙ্কুচিত হইয়া উঠিল।
হর-গৌরী
হিমালয় যথাবিধি সম্প্রদান করিলে, অষ্টমূর্তি মহেশ্বর
তখন গৌরীর তাম্রোজ্জ্বল কর সাগ্রহে গ্ৰহণ করিলেন।
হােমাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইল। বর-বধু তিনবার অগ্নি-
প্রদক্ষিণ করিলে, পুরােহিত বধুকে অগ্নিতে লাজাহুতি
প্রদান করাইয়া কহিলেন,
“বংসে, এই অগ্নি তােমার বিবাহ-ক্রিয়ার সাক্ষী
রহিলেন। তুমি অবিচারিতচিত্তে পতি শিবের সহিত
ধৰ্ম্মচৰ্যা করিবে।”
পার্বতী তঁাহার আকৰ্ণ-বিস্তৃত নয়ন প্রসারিত করিয়া
সাহে গুরুদেবের এই উপদেশ শ্রবণ করিলেন।
প্রিয়দর্শন পতি মহেশ্বর ধ্রুব-নক্ষত্র দর্শন করাইলে,
গৌরী তাহার লজ্জাবনত মুখখানি উন্নমিত করিয়া
বলিলেন, “হাঁ, দেখিলাম।”
এইরূপে বিবাহ-কাৰ্য্য সম্পন্ন হইলে পর, দম্পতী
পদ্মাসনাসীন ব্রহ্মাকে প্রণাম করিলেন।
“কল্যাণি ! বীর-প্রসবিনী হও”—বলিয়া ব্রহ্মা গৌরীকে
আশীৰ্বাদ করিলেন। কিন্তু অষ্টমূৰ্ত্তি হরকে কি বলিয়া
আশীষ প্রদান করিবেন, তাহা তিনি স্থির করিতে না
পারিয়া চিন্তান্বিতহৃদয়ে স্তব্ধ হইয়া রহিলেন।
পরে বর-বধু পুষ্প-পল্লবে শােভিত একটী চতুষ্কোণ
হর-গৌরী বেদীর উপর স্বাসনে উপবেশন করিয়া গুরুজনদিগের কৃত আর্দ্র অক্ষত-যােগে আশীর্বাণী গ্রহণ করিলেন। কমলাদেবী তাঁহাদের মস্তকের উপর দীর্ঘ-নালযুক্ত পদ্ম-ছত্র ধারণ করিলেন। তাহার পত্ৰান্ত-লগ্ন জলবিন্দু- গুলি মুক্তাফলের মত শােভা বিকাশ করিল। সরস্বতী দুই প্রকার বাণী-প্রয়ােগ করিয়া দম্পতীর স্তব পাঠ করিলেন—সংস্কৃত-ভাষায় বরেণ্য মহেশ্বরের এবং প্রাকৃত ভাষায় গৌরীর । অপ্সরারা একখানি নানারসপূর্ণ নাটকের যথাযােগ্য রাগ ও হাবভাব-যােগে অভিনয় করিল। বর-বধূ এবং অভ্যাগতগণ তাহা দেখিয়া পরিতৃপ্ত হইলেন। সৰ্বজনের তৃপ্তিতেই বিশ্বাত্মার তৃপ্তি ; হাতেই মঙ্গল। এই উৎসবের দিনে কন্যা-জামাতার শুভ-কামনায় যথােচিত দান, ভুরিভােজ্য ও রঙ্গ-রসাদির দ্বারা আত্মীয়-বান্ধব- নির্বিশেষে সর্বজনের সেবার অনুষ্ঠান হিমালয়ের পক্ষে কোনরূপ অঙ্গহীন হয় নাই। তাহার বিনয়-সৌজন্যে সকলেই আপ্যায়িত হইলেন। এইবার অবসর বুঝিয়া দেবগণ মহাদেবের নিকট স্ব স্ব ‘কিরীট নত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে প্রার্থনা করিলেন ;- “ভগবন্ , কন্দর্পকে পুনরায় মূৰ্ত্তিপরিগ্রহ করিয়া ০
MAKARDAH- HOWRAH!
হর-গৌরী
আপনার সেবা করিবার অনুমতি প্রদানে আমাদের বাসনা
পূর্ণ করুন।”
মহাদেবের হৃদয় তখন ক্রোধশূন্য। দেবগণের
সময়ােচিত প্রার্থনা তিনি ‘তথাস্তু’ বলিয়া সানন্দে পূর্ণ
করিলেন। তাহারাও সফলকাম হইয়া স্ব স্ব ধামে প্রস্থান
করিলেন। হিমালয়ের গৃহাগতগণ ও বিদায় লইলেন।
কন্যার লালন-পালন, শিক্ষাদান, এবং যােগ্য পাত্রে
সম্প্রদান মাতা-পিতার কর্তব্য কৰ্ম্ম ; ইহার সম্পাদনেই
গৃহীর আনন্দ। হিমালয় ও মেনকা তাহা যথাযথরূপে
সম্পাদন করিলেন। এইবার হর-গৌরী কৈলাসে
যাইবেন ; তাহার আয়ােজন হইতেছে। জননী মেনকা
বস্ত্রাঞ্চল দিয়া অশ্রু মুছিতেছেন। হিমালয়ের চিত্ত
কি এক অভূতপূৰ্ব্ব ঔদাষে ভরিয়া উঠিতেছে। জন্মাবধি
স্নেহে লালনপালন করিয়া যাহার শৈশব উত্তীর্ণ হইল
যাহাকে গৃহে সৰ্ব্বক্ষণ দেখিয়াও হৃদয়ের তৃপ্তি হইত না
বিবাহান্তে সেই স্নেহের প্রতিমাটীকে নয়নের অন্তরালে
পাঠাইতে হইতেছে! তপ্ত ইক্ষু-চর্বণের মত সুখ-দুঃখের
মিশ্রণে এই অপূর্ব সংসারভাব বিধাতার এক অপূর্ব
বিধান। মানব আমরা, সকলেই এই বিধানের স্রষ্টা সেই
পরম-পুরুষের চরণেদ্দেশে ভক্তিভরে প্রণত হই।
-88-
Estd:-1919
-
WIAT LILIT
ARLE
২
পৌরাণিক নাম-সমূহের সুচী
পৃষ্ঠা
আদিত্যগণ দ্বাদশ)। অরুণ, সূৰ্য, বেদজ্ঞ, তপন, ইন্দ্র,
রবি, গভস্তি, যম, হিরণ্যরেতাঃ, দিবাকর, মিত্র, বিষ্ণু।
মতান্তরে
“তত্র বিষ্ণুশ্চ শক্রশ্চ অজ্ঞাতে পুনবে হি।
অর্যমা চৈব ধাতা চ ষ্টা পূষা তথৈব চ।
বিবস্বান্ সবিতা চৈব মিত্রো বরুণ এব চ।
অংওভগশ্চাদিতিজ অদিত্য দ্বাদশ স্মৃতাঃ।”
মরুৎ (মারুত )-উনপঞ্চাশৎ বায়ু। কশ্যপপত্নী দিতির
গর্ভজাত বায়ু প্রথমতঃ ইন্দ্র কর্তৃক বজ্র দ্বারা সাত ভাগে
বিভক্ত হয় ; পুনরপি তাঁহার দ্বারা ঐ সাত অংশ অপর
সাত ভাগে বিভক্ত হওয়ায়, সংখ্যায় ৪৯ হইয়াছে।
একাদশ অজৈকপাদ, অহিঃ (বা অহিবুর )
বিরূপাক্ষ, সুরেশ্বর, জয়ন্ত, বহুরূপ, ত্র্যম্বক, অপরাজিত,
বৈবস্বত, সাবিত্র ও হর। মতান্তরে—অজ, একপাদ,
অহিব্রম্ন, পিনাকী, অপরাজিত, ত্র্যম্বক, মহেশ্বর, বৃকপি,
শভু, হর, ও ঈশ্বর।
পবাণ-সম্মােহন, উন্মাদন, শােষণ, তাপন ও স্তম্ভন।
অরবিন্দ, সুশােক, চুত, নবমল্লিকা, রক্তোৎপল—এই পাঁচটী
কামের শর।
পবায়ু—প্রাণ, অপান, সমান, উদান, ব্যান।
ৰীৰাসন-দক্ষিণপাদ বাম উরুর উপর এবং বামপাদ দক্ষিণ
উরুর উপর সংস্থাপন করিয়া উপবেশন।
সপ্তাশ্ব রথ—সূর্যমণ্ডলের সাতটী বর্ণকে সাতটী অশ্ব কল্পনা
করা হয়।
সপ্তর্নি—মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলহ, পুলস্ত্য, ক্রতু, বশিষ্ঠ।
'
( ০. ) ৬৪ १७ অষ্টমূর্তি—ক্ষিতিমূৰ্ত্তি—শৰ্ব্ব, জলমূর্তি—ভব, বহ্নিমূর্তি—রুদ্র, বায়ুমূৰ্ত্তি—উগ্র, আকাশমূর্তি—ভীম, সােমমূর্তি—মহাদেব, সূর্যমূর্তি-ঈশান, যজমানমূর্তি-পশুপতি। ত্রিবিক্রম-বামনাবতারে বলির নিকট ত্রিপাদ-ভূমি প্রার্থনা- ছুলে নারায়ণ তিনটী পদক্ষেপে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল অধিকার করেন। অষ্ট ঐশ্বৰ্য—অণিমা (সূক্ষ), লঘিমা (লঘুত্ব), ব্যাপ্তি ( সৰ্ব্ব- ব্যাপকতা', প্রকাম্য (কামনাপূরণী শক্তি), মহিমা (মহত্ব), ঈশত্ব (সৰ্বনিয়ত্ব), বশিত্ব (ভক্তবতা), কানাবসায়িতা ( সকল কামনার উচ্ছেদসাধনী শক্তি)। সপ্তমাতৃকা “বরাহী বৈষ্ণবী চৈব কৌমারী কাবেরী তথা । ব্রাহ্মী চৈন্দ্ৰী তথা রোদ্রী মাতরঃ সপ্ত কাৰ্তিতঃ॥” লােকপাল-ইন্দ্র, অগ্নি, যম, নৈঋত, বরুণ, বায়ু, কুবের, মহাদেব, ব্রহ্মা, অনন্ত। ভূমা-ব্রহ্ম, পরমাত্মা সৰ্বব্যাপী পুরুষ। গন্ধর্ব—স্বর্গের গায়ক। দেবযােনি-বিশেষ। শিবের নাম—চন্দ্রচূড়, হর, গিরিশ, চন্দ্রশেখর, ঈশান, পশু- পতি, লিলোচন, মহেশ্বর, মহেশ, শশাঙ্কশেখর, পিনাকী, নীললােহিত, আশুতােষ, শঙ্কর, শশিভৃৎ, মহাদেব ইত্যাদি। গৌরীর নাম—উমা, পার্বতী, গৌরী, গিরিজা, হৈমবতী, অপর্ণা ইত্যাদি। মদনের নাম—কদর্প, কামদেব, রতিপতি, মনােভব, অনঙ্গ, মদন, মন্মথ ইত্যাদি।
এই গ্রন্থকারের কৃত বাস-সাম্বত শ্রীমদ্ভাগবতের ‘রাস-পঞ্চাধ্যায় আধুনিক নব নব সরল বাঙ্গালা পদ্যে অনূদিত হইয়া কাব্যাকারে গ্রথিত। ইহা প্রেমের উৎস ; রসের খনি—ভক্তির মন্দাকিনী-ধারা। একত্র কাব্য ও শ্রীভগবানের লীলা-রস আস্বাদনের অপূৰ্ব্ব উপাদান। সৰ্ব্বত্র প্রশংসিত। গীতার ন্যায় নিত্যপাঠ্য। ইহা পাঠ না করিলে আপনার ভক্তি-শাস্ত্র পাঠ অপূর্ণ রহিয়া যাইবে। যিনি পড়িয়াছেন, তিনিই মুগ্ধ হইয়াছেন। কথকতা ও কীর্তনে ইহার আবৃত্তি চলিতেছে। উৎকৃষ্ট এন্টিক কাগজে সুন্দর ছাপা ও সােণালি বঁধন ; মূল্য ॥ আট আনা মাত্র, ডাক মাশুল স্বতন্ত্র। অযাচিত অসংখ্য অভিমত-পত্রের মধ্যে মাত্র কয়েকখানি উদ্ধৃত হইল :- বঙ্গবাসী। -“নানা ছন্দের কবিতায় অনুবাদক রাসলীলার রসতত্ত্ব বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছেন। কবিতাগুলিকে মুলানুগত করিবার দিকে তাহার লক্ষ্য সুস্পষ্ট। মাঝে মাঝে তিনি টিপ্পনীর মত মূলের দুরূহ অংশের যে ব্যাখ্যা দিয়াছেন, তাহা উপযোগীই হইয়াছে। অনেক স্থলে তিনি প্রাচীন কবিদের সমার্থবোধক রচনা উদ্ধত করিয়া যে তুলনার সুযােগ করিয়া দিয়াছেন, তাহাও প্রশংসাৰ্ছ। ভাবুফ ভক্তগণ এই পুস্তকখানি পাঠ করিয়া আনন্দিত হইবেন।” (১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৩)। আনন্দবাজার পত্রিকা।-“শ্রীমদ্ভাগবতের রাসলীলা অধ্যায় লেখক যত্নের সহিত পদ্যে অনুদিত করিয়াছেন। পদ্যগুলি কালােপযােগী ছন্দে রচিত, বুঝিবার পক্ষে ইহা যেমন সহজ হইয়াছে, তেমনই কবিতার রসও ইহাতে রহিয়াছে। যাহারা সংস্কৃত জানেন না, কিংবা ব্যাখ্যা বা বিচারের ( 1 ) অপেক্ষা না রাখিয়া রাস-লীগার সৌন্দৰ্য্য ভােগ করিতে চাহেন, বইটা তাহাদিগকে যথেষ্ট সহায়তা করিবে। পদ্য গুলির মধ্যে মূলের ভাবার্থও ক্ষুন্ন হয় নাই।" (২০ এ বৈশাখ, ১৩৪৩)। হিতবাদী।—“শ্রীমদ্ভাগবতোক্ত শ্রীবাস-পঞ্চাধ্যায়ের নিগূঢ় তত্ব পন্তে অনুবাদ করিয়া সম্যকভাবে প্রকাশ করা বিশেষ কঠিন কাৰ্য –তনুবাদক স্বীকার করেন। স্বেচ্ছা-প্রণােদিত হইয়া সেই কঠিন কার্যের কারগ্রহণে অনুবাদক তাঁহার সাহসিকতারই পরিচয় দিয়াছেন। মূল পাঠের সহিত তুলনা করিয়া দেখিলে মােটের উপর বলা যায়, মূল বার্থ অক্ষা করিবার যথেষ্ট প্রয়াস অনুবাদক করিয়াছেন এবং অনেকাংশে তাহাতে সাফল্য লাভও করিয়াছেন। অনুবাদকের উদ্যম প্রশংসনীয়। ছাপা, কাগজ ও বাধাই ভাল।” –(১লা শ্রাবণ, ১৩৪৩)। প্রবীণ সাহিত্যিক, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গতাষার পরীক্ষক শ্ৰীযুক্ত শিবরতন মিত্র মহাশয়ের অতিমত :- সুপণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত ভুজঙ্গভূষণ রায় কাব্যতীর্থ, সংখ্যতীর্থ মহাশয় কর্তৃক শ্রীশ্রীরাস-পঞ্চাধ্যায়ের পদ্যানুবাদ ‘রাস-রসামৃত গ্রন্থখানি আস্বাদন করিয়া পরিতৃপ্ত হইলাম। রাস-পঞ্চাধ্যায়ের প্রাচীন ও আধুনিক অনেক পদ্যানুবাদ আছে, কিন্তু এরূপ একটি টীকানুবর্তনে রচিত সটীক পদ্যানুবাদের একান্ত অভাব ছিল। পণ্ডিত মহাশ-রচিত এই সরল পদ্যানুবাদ এই অভাব দূর করিতে ভক্তগণ নিত্য-পাঠের জন্য এই গ্রন্থ স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করিতে পারেন। পণ্ডিত মহাশয়ের সাফল্যের জন্য আমরা তাহাকে অভিনন্দিত করিতেছি। ইতি।” (২৯এ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৩)।
( 90 ) বীরভূম, শিউড়ী মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান নিখিল-ভারত-বৈষ্ণব সম্মিলনীর শ্ৰীবৃন্দাবন-অধিবেশনের ভূতপূর্ব সভাপতি শ্ৰীযুক্ত অমিতা- রঞ্জন মুখােপাধ্যায় এম. এ. (সংস্কৃত); বি. এ. ধর্মাচাৰ্য ( কাশী) মহােদয়ের অভিমত :- “পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত ভুজঙ্গভূষণ রায় কাব্য ও সাংখ্যতীর্থ মহাশয়-রচিত ‘রাস রসামৃত’ পড়িয়া সত্যই রসের আস্বাদন পাইলাম। জানি না, চিন্ময় রস কি বস্তু, কিংবা লেখনীতে তাহা ব্যক্ত হওয়া সম্ভব কিনা, তবে লেখকের ভক্তিরস যে এই ক্ষুদ্র পুস্তিকায় অক্ষরে অক্ষরে প্রতিভাত, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। মাদৃশ ভক্ত-কৃপা-পিপাসু অনেককেই যে ইহা এইরূপ আনন্দ দিবে, তাহা নিশ্চিত, ইতি। ভক্তজন-কৃপ-প্রার্থী-অমিতারঞ্জন মুখােপাধ্যায়। (৩৬৬)।” দুমকার প্রাপ্তাবসর ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট রায় সাহেব শ্ৰীযুক্ত যতীন্দ্রনারায়ণ মুখােপাধ্যায় লেখককে লিখিয়াছেন (১৪৩৬) : “আপনার ‘রাস-রসামৃত আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া পরম সন্তোষ লাভ করিলাম। রাস-পঞ্চাধ্যায়ের এ প্রকার সুললিত ও সহজ-ভাষায় পদ্যানুবাদ পূৰ্বে পাঠ করি নাই। অতি মধুর হইয়াছে”। *** মুর্শিদাবাদ, নিমতিতার জমিদার রায় শ্রীযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রনাথ চৌধুরী বাহাদুর গ্রন্থকারকে লিখিয়াছেন ৯১৪৩):- * * * “বৰ্তমান সময়ে ধৰ্ম্ম-গ্রন্থের পাঠক স্বল্প হইলেও আপনার পুস্তকটি অপূৰ্ব্ব রচনা-মাধুর্যে যে কোন পাঠক মাত্রেরই হৃদয় স্পর্শ করিবে। শ্রীভগবানের লীলা-সমূহের মধ্যে রাসলীলা মানবের সহজ-বােধ্য নয়, কিন্তু আপনার বিদ্যা ও পাণ্ডিত্য-গুণে এই জটিল বিষয়টী সহজ ও সরল হইয়া উঠিয়াছে দেখিয়া তৃপ্তিলাভ করিলাম।” * * * ০ য ( বীরভূম, জজকোর্টের উকীল শ্ৰীযুক্ত আশুতােষ চক্রবণ এম. এ., বি. এল. মহাশয়ের অভিমত : ‘রাস-রসামৃত' নামক ক্ষুদ্র গ্রন্থখানি পড়িয়া যারপরনাই প্রতি। করিলাম। গ্রন্থখানি বঙ্গ-সাহিত্যের পুষ্টি-সাধন করিয়াছে বলিলে বিন্দু । অত্যুক্তি হইবে না। *** ভাবে, ভাষায় ও ব্যঞ্জনায় অনুদিত খানিতে মুলের বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রাখিবার আন্তরিকতা পৰ্যবেক্ষণ করিয়া ? প্রীতিলাভ করিয়াছি। *** গ্রন্থখানি পাঠ করিয়া মনে হইবে, পKি: মহাশয় রসামৃত পান করিয়াছেন। যথাস্থানে সন্নিবেশিত টীকা ও বৈষ্ণব কী। গণের আস্বাদ গ্রন্থখানির সৌন্দর্য বর্ধন করিয়াছে।” (৩১২৪২)। সা উঃ বাঁকুড়া, তিলুড়ী কৃপাময়ী উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ের ভূতপূৰ্ব প্ৰব । হেড মাষ্টার শ্রীযুক্ত শ্রীপতিলাল ঘােষ এ. এ. মহাশয় পুস্তকে পাণ্ডুলিপির কিয়দংশ মাত্র দেখিয়া লেখককে প্রশংসাপত্র-দান-প্রসঙ্গে উল্পে, করিয়াছিলেন (২০৩২৮):- শি * “His Bengali version in poetry of some of the difficult slokas of 'Bhagbat goes to show his con prehensive knowledge in the subject and if he continues a in his attempt, the version when completed will surely, of i am confident, be a good acquisition in Bengali literar ture." আর. পি. মিত্ৰ এণ্ড, সুন वि ৬৩ নং বিডন স্ট্রীট, কলিকাতা। প কলিকাতা, ২০৩১১, কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট,-গুরুদাস লাইব্রেরী, ই ৫৭১, কলেজ স্ট্রীট-টুডেন্টস্ লাইব্রেরী, ১৩৩, ক্যানিং স্ট্রীট-সৰ্ব্বমঙ্গ লাইব্রেরী, ১৫, কলেজ স্কোয়ার—গ্রেট, ইষ্টার্ণ লাইব্রেরী প্রভৃতিতেও পাওয়া যায়।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.