Uttarpara Jaykrishna Public Library, Hooghly
Kuhu O Keka
Front matter
No text on this page.
কুহু ও কেকা
দে
১৪৪২
শ্ৰীসত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
এক টাকা
প্রকাশক
শ্রীমণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
ইণ্ডিয়া পাবলিশিং হাউস,
২, কর্ণওয়গুলিস ষ্ট্রীট কলিকাতা
Ullar 15, lakrishna Public Library
2৪১১৩
Accn.N0...
•••.patre...
কান্তিক প্রেস
২০ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট কলিকাতা,
এরিচরণ মায়া দ্বারা মুদ্রিত
এই গ্রন্থের অল্প কয়েকটি কবিতা ভারতী, প্রবাসী,
সাহিত্য, বঙ্গদর্শন এবং আরও দুই একখানি কাগজে ইতি
পূর্বে প্রকাশিত হইয়ছে। বেশীর ভাগ নূতন।
সুবিখ্যাত চিত্রশিল্পী এবং অকৃত্রিম সুহৃদ শ্ৰীযুক্ত
অসিতকুমার হালদার মহাশয় এবারেও আমার পুস্তকখানির
সৌন্দর্য বাড়াইয়াছেন;—প্রচ্ছদপটের পরিকল্পনাটি
তাঁহারই।
;
রাখী পূর্ণিমা
শ্ৰীসত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।
.
.:১৩১৯
No text on this page.
কবি ও বন্ধু
শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচী
করকমলেষু
No text on this page.
সূচী ০৮ ••• দুইসুর জ্যোৎস্না-মদিরা ••• 8 । । । ৭ ০ ০ ০ মদন-মহােৎসবে মধুমাসে গান চার্বাক ও মঞ্জুভাষা ••• সহজিয়া ••• ৮ এ । ০ লীলার ছল ••• ... ০ অবগুণ্ঠিতা ১৭ । লব্ধ-দুর্লভ ••• ... ১৭ প্রিয়-প্রদক্ষিণ ••• ০ ০ ০ তুমি ও আমি ••• ••• ০ ০ ০ ২৪ ২৮ অকারণ পাল্কীর গান মুগ্ধ গ্রীষ্ম-চিত্র ... ০ ০ ০ • ••• ৩৭ • • • সাড়ে চুয়াত্তর গ্রীষ্মের সুর ••। ••• ••• ৪০ 82 ০ ০ ০ { ৪৩ । অন্তঃপুরিকা আনন্দ-দেবতার প্রতি দরদী রিক্তা ৪৫ ৪৬ ০ ০ কনক-ধুতুরা ৪৭ t চাতকের কথা ৪৮ ০ ০ ০ ৫০ • • ••• ' ৫২ ঝােড়াে হাওয়ায় বজ্র কামনা যক্ষের নিবেদন দুর্দিনে ০ ০ ০ ••• ••• ৫০০ ••• ••• বর্ষা নাগ পঞ্চমী ••• ••• ৬২ ৬২ ০ ০ ০ ••• ••• ••• ০০০ রামধনু প্রাবৃটের গান নূতন মানুষ প্রথম হাসি ভাদ্রী ••• ••• ৩ তখন ও এখন •• అని ••• • • ••• কাশ ফুল জোনাকী ফুল-সাঞি ৭০ 92 ৭৪ ৭৫ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০৮। ০ ০ ০ ৮০ ০০০ ৩ জবা ছায়াচ্ছন্ন " ৫০০ • ৮১ a . সৎকারান্তে ০ ০ ০ ••• ৮৩ ছিন্ন মুকুল ৮৪ - ০ ০ ০ ৫ ৮৭ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৮৯ ৫ ••• ভূই চাপা ধূলি মাটি গঙ্গার প্রতি • শােণ নদের প্রতি বারাণসী হিমালয়াষ্টক ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৩০ । ••• ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৯৭ ৯৯ কাঞ্চন শৃঙ্গ এ এ এ ••• ৪ ৫ ৬ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ••• ••• ১১০ মেঘলােকে চূড়ামণি লরে দার্জিলিঙের চিঠি সিংহল সিদ্ধিদাতা ০ ০ ০ ১১১ ••• ১১৭ ৩ . ১১৯ ০ ০ ০ • • • ১২ ০ ০০ 1 ওঙ্কার-ধাম পদ্মার প্রতি পাগলা ঝােরা শূদ্র মেথর ১২৪ ••• : ••• . পথের স্মৃতি দুর্ভিক্ষে ... ১২৮ ••• • ১৩০ সংশয় ১৩২ ••• ১৩৩ । ১৩৪ ১৩৪ ••• হাহাকার শূন্যের পূর্ণতা ১৪ই জ্যৈষ্ঠ শ্মশান-শয্যায় আচাৰ্য হরিনাথ দে সাগর-তর্পণ ঋষি টষ্টয় কবি-প্রশস্তি অর্ঘ্য নিবেদিত ।। ৩ ৭ ১৩৭ . ••• . • ••• ••• ১৪০ ১৪৪ ••• ১৪৫ নফর কুণ্ডু ••• ১৪৬ ••• ১৪৭ দেশবন্ধু জ্যোতিমণ্ডল বিশ্ববন্ধু চৌদ্দ প্রদীপ ••• ••• ১৪৮ . ১৪৯ ••• বন্দরে ১৫২ ০ ০ ছেলের দল ••• ও , ১৫৪ ••• ৫ ০ কালের আলাে আমরা ফুল-শিণি গান ••• ••• ১৫৮ . ••• • ••• ৪ ০ ০ ০ ০ ০ ১৬৪ /০ ০ আমি ভােজ ও পুত্তলিকা নষ্টোদ্ধার কাটা কাপ ০৫। ১৭১ ১৭৩ গান ••• '১৭৪, ৬ ০ ক্ষুদ্রের প্রার্থনা ••• ১৭৫ শীতান্তে . . . ১৭৫ ০ ০ ১৭৭ ১ ও ৫০ সুদূরের যাত্রী E । ••• ১৭৯ ১৭৯ ০ ০ ০ আবার পুনর্নব প্রভাতের নিবেদন পরীক্ষা ১৮০ ০ ০ ০ ৪ । । ••• ১৮১ ০ ০ ০ ১৮৩ ••• পথের পক্ষে যথার্থ সার্থকতা পিপাসী ••• ••• ১৮৪ ১৮৫ ••• ••• ••• ••• ارد ০০ ০ san ১৮৭ ০ ০ ০ সফল অশ্রু প্রার্থনা ভিক্ষা আকিঞ্চন নমস্কার নিশান্তে দেবদর্শন ••• ••• ১৮৯ ••• ১৯৩ । । •.. •••
No text on this page.
و 1 F ما هم
No text on this page.
কুহু ও কেকা
দুই সুর
কোকিল-কালাে কোকিল রচে সুরের ফুলে ফুলঝুরি,
বসন্তে সে ভুলায়ে আনে হাওয়ায় করি’ মন চুরি!
কুম্ফটিকা-কুটিল নভে বুলায় তুলি রঙ্গিলা,
দোলায় তৃণ-বল্লরীতে মঞ্জু ফুল-মঞ্জরী।
বনের যত মনের কথা সেই জেনেছে অন্তরে,
কিশাের কিশলয়ের আশা রি সে সুরে সন্তরে !
শীতের গড়ে পাথর নড়ে-মুহুর্মুহু হয় ঢিলা,
মােচন হ’ল বন্দী যত মুকুল কুহু-মন্তরে!
1
কুহু ও কেকা
•
সুখীর সুখী শিখী সে নাচে হেলায়ে গ্রীবা গৌরবে,
আওয়াজে তার কদম ফোটে,-কানন ভরে সৌরভে
কলাপ মেলি’ করে সে কেলি রৌদ্রে মেহ সঞ্চারি’,
বনায় ছায়া মােহন মায়া উচ্চকিত ঐ রবে ।
দগ্ধ দেশে মুগ্ধ নাচে নয়ন মেথে অর্পিয়া,
মেদুর নভে ধূমল ফণী বেড়ায় যবে দপিয়া !
তমাল পরে নৃত্য করে কুহক কেকা উচ্চারি',
মূচ্ছি’ পড়ে সর্গ শত সত্ৰশিখা তপিয়া।
বনের কুহু, বনের কেকা,কুহক-ভরা যুগ্ম-রাগ,
দেয় গাে বটি নিখিল মাঝে আনন্দেরি যজ্ঞভাগ।
অনাদি সুধা,—অনাদি সােম,-হয় না কেহ বঞ্চিত।
অনাদি সাম, অনাদি ঋক পূর্ণ করে বিশ্ব-যাগ।
মনের কুহু,-মনের কেকা,—অনাদি তারা মূচ্ছ না,
গােপন তার প্রচার, তবু, তুচ্ছ না সে তুচ্ছ না।
গহন-গেহে নিভৃতে রহে নিখিল-হৃদি-সঞ্চিত,
মিলিয়া আছে উহারি মাঝে বর সাথে জ্যোৎসনা।
(
আপনি পড়ে ছন্দে ধরা আপনি তার উদ্বোধন
ক্রৌঞ্চী কাঁদে করুণ কুহু,কবি সে-কেকা,ক্ষুব্ধ মন।
কুহু, ও কেকা
উলসি’ ওঠে গুপ্তক্টোয় সুপ্ত নদী সুড়ঙ্গের,
কল্পলতা মুকুল মেলি’ বিতরে চির গুপ্তধন।
আদিম কুহু, আদিম কেকা,ধরিবে কেবা ছন্দে সে,
জনম যার কামনা লােকে মনের সুগােপন দেশে ;-
ফুটায়ে ফুল, ছুটায়ে হাওয়া, লুটায়ে ফণা ভুজঙ্গের
মিলায়ে দুহু গাহিবে মুহুগাহিবে মহানন্দে সে।
ফুটিতে যাহা ঝরিয়া পড়ে,-গাঁথিবে তারে সঙ্গীতে
কামনা বুঝি কনক-ধুনী সুমেরু চূড়া লঙ্ঘিতে।
মানস-লীনা বাজে যে বীণা শিখিবে তারি মূচ্ছনা,
প্রকাশ যার আকাশ-তটে অযুত শত ভঙ্গীতে।
হৃদয়ে মুহু কোকিল কুহু ময়ূর কেকা রব করে,
গহন প্রাণ কুহর মাঝে স্বপন-ঘেরা গহ্বরে।
ধেয়ানে দেহে আরতি করি’ ফুটাবে মেঘে জ্যোৎসনা
স্মিরিতি সাথে পীরিতি, আজি মন্দ্র-মধু মন্তরে।
কুহু ও কেকা
জ্যোৎস্না-মদির
{
চন্দ্র ঢালিছে তন্দ্রা নম্বনে,
মল্লিক বনে ঢালিছে মায়া ;
ছায়ায় আর্দ্র আলে খানি আজ
আলাে মাখা ফিকে হাল্কা ছায়া।
সুদূর-স্বপন-বিধুর প্রাণ,
উঠিছে মৃদুল মধুর গান,
মৃদুল বাতাসে মৰ্ম্মর ভাষে
উছসি উঠিছে বনের কায়া !
ঘূরিত ফুলের
উতলা গন্ধে,
গাহে অন্তর কত না ছন্দে,
আলােকে ছায়ায় প্রেমে সুষমায়
ভুবনে বুলায় মদির মায়া।
কু
বসন্তের প্রথম উষায়
ফুলদলে জাগাবে বলিয়া
বহিল দক্ষিণ বায়ু; কে আজি সুধায়
মুহুর্মুহু আনন্দে গলিয়া ?-কু?
৪
মধু আলাে, মধুর বাতাস
বুঝি তারৈ করেছে বিল,
ভুলে গেছে দ্বন্দ্ব, দ্বিধা, দুখের আভাস,
তাই সে সুধায় অবিরল—কু?
সে যে আজ মেলেছে গাে পাখা,
দেখেছে গাে সৌন্দৰ্য্য অপার,
হওয়া তারে মাতায়েছে চূত-রেণু-মাখা,
তাই বুঝি পুছে বারম্বার-‘কু?
বিধাতা করেছে তারে কালাে,
নীরব শিশিরে বরষায়,
তবু সে ফেলেছে বেসে জগতেরে ভালো
প্রেমােচ্ছাসে তাই সে সুধায়—কু ?
মদন-মহােৎসবে
বন উপবন আলাে করে অশােক ফুটে আছে,
অশােক ফুলের রূপটি ঠাকুর ! চাইছি তােমার কাছে।
চোখের দাবী মিটলে পরৈ তখন খোঁজে মন,
তাই তাে প্রভু! সবার আগে রূপের আকিঞ্চন।
মল্লিকা ফুল হাসুছে হরি’ হাওয়ার মগজ মন,
মনােহরণ বিদ্যাটি দাও-এ মাের নিবেদন;
মনের ক্ষুধা মিটিয়ে দিতে শক্তি যেন হয়,
নইলে, শুধু রূপের আদর—হয় না সে অক্ষয়।
••
আমের মুকুল জাগছে আকুল ফলের আশা নিয়ে,
সফল কর আমায় ঠাকুর! প্রেমের পরশ দিয়ে
প্রিয় আমার স্নেহের নীড়ে স্নিগ্ধ যেন রয়,
মনের মােহ ফুরিয়ে গেলেও প্রাণের পরিচয়।
গন্ধ-মধু-রূপ-সায়রে ভাছে নীলােৎপল,
নিখুৎ-নধর অটুট-আদর সােহাগ-শতদল ;
রূপে, রীতে, মাধুরীতে অনি হ’তে চাই,
চোখের মনের প্রাণের ক্ষুধা মিটিয়ে যেন যাই।
মল্লিকা ফুল, আমের মুকুল, অশােক, নীলােৎপলে,
ঠাকুর তােমার চরণ পূজি, পূজি নয়ন জলে ;
অরুণ অরবিন্দ সম তরুণ এ হৃদয়,
তােমার বরে কামনা তার সফল যেন হয়।
৬
কুহু ও কেকা
মধুমাসে
যে মাসেতে পুষ্পে মধু,
মধু মধুকরের মুখে,
হিয়া যখন গাওয়ার আগে
• হয়ু গাে মদির অধীর মুখে ;-
আঁখি আকুল অন্বেষণে
ফিরছে যখন বনে বনে,
মুহুর্মুহু কুহু স্বরে
তন্ত্রী দুলে উঠছে বুকে ;-
তখন তুমি দিলে দেখা অমনি
ফুলের বনে ফুলের রাণী রমণী।
অনি বিপুল সুখের ভরে
আকুল আঁখি উঠল ভরে,
পুলক হাসি পাগল বাঁশী
বিদায় দিল মৌন দুখে!
গান
মুখখানি তার পদ্মকলি
ভাতের হাওয়ায় দোদু-দুল !
মুখের স্বপন, বুকের সে ধন,
দুখের আপন সে বুলবুল।
কুহু ও কেকা
ভুবন-ভােল নয়ন দু’টি ..
খোঁজে না ছল, নেয়না' ক্রটি,
ছুটির হাওয়া ছুটিয়ে দেয়,
আপন-ভােলা মধুর ভুল!
উড়াে পাখীর লাগল পরশ
তাইতাে রে মন গেল উড়ে,
কি এক হাওয়া জাগল সরস।
স্বপন-সুখের ভুবন জুড়ে !
তড়িৎ-ভরা মেঘের মতন
হৃদয় জুড়ে জাগল চেতন,
দেবৃত সে কোন্ ছদ্মবেশে
কল্পলতার কাম্য-ফুল!
চার্বাক ও মঞ্জুভাষা।
বনপথে চলেছে চার্বাক,
সূৰ্য্যতাপে স্পন্দিত সে বন;
ক্লান্ত আঁখি, চিন্তিত, নির্বাক,
বিনা কাজে ফিরিছে ভুবন।
হ্রদের দক্ষিণ কূলে ভিড়ি’
শ্যামলেখা শােভিছে শৈবাল,
মরালীর পক্ষে চঞ্চু রাখি
আঁখি মুদে চলেছে মরাল।
কুহু ও কেকা
তীরে তীরে-ধন সারি দিয়ে
দেবদারু গড়েছে প্রাচীর,
বনস্থলী-মধুচক্র ভরি
রশ্মি-মধু ঝরিছে মদির।
চলিয়াছে মর্পাক কিশাের,
কুঞ্চিত, দৃঢ় ওষ্ঠাধর ;
শিশিরের পদ্মকলি সম
রুদ্ধ প্রাণে দ্বন্দ্ব নিরন্তর।
“আজ যদি মঞ্জুভাষা আসে এই পথ দিয়া,
চকিতে আঁচলখানি নেব তার পরশিয়া,
সে যদি জানিতে পারে। সে যদি পালটি চায় !
মাগিয়া লইতে ক্ষমা আমি কি পারিব, হায়!
সে এলে অবশ তনু, কথা না জুয়ায় আর!
কত যেন অপরাধ,—আঁখি নােয় বারবার।
সময় বহিয়া যায়, চলে যায় রূপসী,
রাখিয়া রূপের স্মৃতি ডুবে যায় সে শশী ।
“কে বলে বিধাতা আছে, হায়,
বে বলে সে জগতের পিতা,
পিতা কবে সন্তানে কাঁদায়,
ক্ষুধায় কঁদিলে দেয় তিতা!
পিতা যদি সর্বশক্তিমান
পুত্র কেন তাপের অধীন?
কুহু ও কেকা
?
।
লন
পিতা যদি দয়ার নিধন
পুত্র কেনাকঁদে চিরদিন ?
নাহি-নাহি-নাহি হেন জন,
বিধি নাইনাহিকবিধান
কোন্ ধনী পিতার সংসারে
অনাহারে মরেছে সন্তান ? ।
মােরা যে বিশ্বের পরমাণু
মেহ প্রেম মােদেরাে প্রবল ;
আর যেই ত্রিলােকের পিতা।
গরি প্রাণ পাষাণ-নিশ্চল?
দাসীপুত্র যারা জন্মদাস
ভয়ে ভক্তি জানি তাহাদের,
আজন্ম যে হ’তেছে নিরাশ,
সেও রত তােষামােদে ফের!
ধিক! ধিক! মরণের দাস।
মুখে বল পুত্র অমৃতের!
ছিল দিন,হাসি আসে এবে;
নখে চিরি’ বক্ষ আপনার,
আমিও করেছি লােহদান
লৌহময় পায়ে দেবতার।
বালকের অখল হৃদয়ে
আমিও করেছি আরাধন,
কুহু ও কেকা
ধ্রুব কি প্রদ বুঝি কভু
জানে নাই ভকতি মে।
ফল তার? পদে পদে বাধা
আজ্জম,-বুঝি আমরণ !
মরণের পরে কিবা আর ?
নাহি নাহি-নাহি কোনাে জন
অকস্মাৎ চাহিল চার্বাক
পশ্চিমে পড়েছে হেলে রবি,
রশ্মি-রসে ডুবু ডুবু বন,
আবিভূত বনে বনদেবী !
মঞ্জুভাষা রূপে বনদেবী
শিরে ধরি’ পাষাণ কলস,
আসে ধীরে আশ্রম বাহিরে
গতি ধীর, মন্থর, অলস।
পর্ণরাশি-মৰ্ম্মর-মঞ্জীর
পদতলে মরিছে গুঞ্জরি’ ;
অযতনে কুন্তলে বলে
লগ্ন তার নীবার মঞ্জরী।
লতিকার তন্তু সে অলক,
মঙ্গল-প্রদীপ আঁখি তার ;
পরিপূর্ণ সংযত পুলকে
কপােল সে পুষ্প মহুয়ার।
১১
কুহু ও কেকা
ওষ্ঠে তার জাগ্রত কৌতুক,
অধরেতে সুপ্ত অভিমাম ;
বাহুলতা চন্দনের শাখা,
বর্ণ তার চন্দ্রিকা সমান।
চাহিয়া, সহসা বালা ডাকিল চার্বাকে
“ওগাে! শােনাে শােননা
শুনিনু এনেছ তুমি মৃগ শিশু এক,
আছে কি এখনাে ?”
মন-ভুলে চেয়েছিল মুখপানে তার
বিস্ময়ে চার্বাক,
নীরব হইল বালা; কি দিবে উত্তর
বিষম বিপাক !
কহে শেষে ক্ষীণ হেসে গদগদ বচন
“সুন্দর হরিণ,
চিত্রিত শরীর তার সােনার বরণ ;
যেয়াে একদিন।
আজ যাবে ?” মুখ চেয়ে জিজ্ঞাসে চার্বাক
ভরসা ও ভয়ে ;
মঞ্জুভাষা কহে “না,না, আজ ?—আজ থাক।”
আধেক বিস্ময়ে ।
সহসা সংবরি আপনায়,
কহে বালা চাহি মুখপানে,
?
১২
কুহু ও কেকা
–
শুনিনু মা-হারা মৃগ শিশু
মৃত মৃগী কিরাতের বাড়ে;
ইচ্ছা করে পালিতে হায়,
শিশু সে যে মা-হারা হরিণ ;
পড় তুমি,অবসর না থাকে তােমার,
বলিলে পালিতে পারি আমি সারাদিন।
বল, আমি মা হ’ব তাহার।”
“তাই হাে” কহিল চার্বাক,
“আমার স্নেহের ধনে তব মেহ-ধার
দিয়াে তুমি।” কহি যুবা হইল নিৰ্বাক।
কৌতুকে চাহিয়া মুখপানে
মঞ্জুভাষা মঞ্জুলীলাভরে
চলে গেল মরাল গমনে
জল নিতে ক্রৌঞ্চ-সরােবরে।
আশার বাতাসে করি ভর
ফিরে এল চার্বাক কুটীরে,
ভাষাহীন আশার আবেশে
সুখভরে চুমে মৃগটিরে।
ঠেকেছিল মনােতরী খান্
প্রাণ-নাশা সংশয়-চনায়,
ভাষাহীন আশা পেত্নে আজ
হর্ষে ভেসে চলে পুনরায়।
কুহু ও কেকা
যত কিছু ছিল বলিবার
বলিতে হ’ল যেন বাবা,
বােঝ-সােজা হ’ল মনে মনে,
ধুয়ে গেল যত মাটি মল।
ছিল ঠেকে মনােতরীখান্,
চলিল সে কাহারু ইঙ্গিতে? •
কে গাে তুমি দুজ্ঞেয় মহান্ ?
কে দেবতা এলে আশিষিত?
“এ আনন্দ কে দিলে আমায় ?
আশা-সুখে মন পরিপূর!
এতদিন চিনি নি তােমায় ;
আজ বটে দয়ার ঠাকুর !”
রাত্রি এল ;-শয্যাতলে জাগিয়া চার্বাক,
আশা-সুখে ধন্য মানে জন্ম আপনার ;
নিগুণ মহেশে যেই করিয়াছে হেলা,
আনন্দ-মূর্তিতে হিয়া পূর্ণ আজি তার!
সেই একদিন শুধু জীবনে চার্বাক
নত হয়েছিল নিজে চরণে ধাতার ;
প্রেমের কল্যাণে শুধু সেই একদিন,
সে যে আনন্দের দিন,লে যে প্রত্যাশার।
।
১৪
কুহু ও কেকা
০
সহজিয়া
ফুলের যা’ দিলে বেনাকো ক্ষতি
অথচ আমার লাভ,
আমি চাই সেই সৌরভ,—শুধু
অতনু অতল ভাব।
আমি চাই সেই দূর-হতে-পাওয়া
আমি চাই মধু-মশগুল্ হাওয়া,
চাই
অরূপ আবির্ভাব,
যাহা দিলে তার ক্ষতি নাই, তবু
আমার পরম লাভ।
অন্তরে।
শুধু রূপসীর
বৃন্তটি হ’তে ছিড়িতে না চাই
দিতে নাহি চাই দুখ,
সহজ প্রেমের অমল আমােদে
ভরিয়া উচু বুক!
ঘাঁটিতে না চাই দুনিয়ায় মাটি
তারি মাঝে মিশে রয়েছে যা খাটি,
নিতে হবে সেই পরশ মণির
চুম্বিত সোনাটু,
কারাে কোনাে ক্ষতি হবে না, অথচ
আমার ভরিবে বুক।
কুহু ও কেকা
লীলার ছল
;
আমি যদি চাই, অবগুণ্ঠনে
তুমি মুখখানি ঢা;
নয়ন ফিরালে, তবে, অনিমিখে
কেন গাে চাহিয়া থাক।
এমনি করিয়া চিরদিন কিগাে ।
জড়ায়ে রাখিবে মােরে ?
তবু কাছাকাছি হবেনা ? আমার
জীবন দিবে না ভরে ?
নয়ন তােমার করে অনুনয়,
তুমি দূরে সরে থাক।
লীলায় হেলায় মেঘের মেলায়
রঙীন্ স্বপন আঁক।
পূজা চাও তুমি হৃদয়-প্রাণের
হায় গাে পাষাণ-দেবী ।
তবুও আমায় ধন্য হইতে
দিবে না তােমায় সেবি’!
ফাগুন ফুরায় ফুল ঝরে যায়
ওগগা কৌতুক রাখ,
হৃদয়ের পুরে
পরিচিত সুরে
ডাক গাে বারেক ডাক।
৫
কুহু ও কেকা
অবগুণ্ঠিতা
আমি বসনে ঢেকেছি মুখ।
দেখিতে তােমায় !
দূরে সরে যাই, বুকে
আঁকিতে তােমায় ।
তুমি অভিমান-ভরে ফিরে যেয়াে না,
নিরাশ নয়নে বঁধু তুমি চেয়ে না ;
আমার ভুবন ভরি’
আছ দিবা-বিভাবরী,
আঁখির পুতলি ! হেরি
আঁখিতে তােমায়!
লব্ধ-দুর্লভ
হে মম বাঞ্ছিত নিধি ! সাধনার ধন।
নিঃসঙ্গ এ অন্তরের চির আকিঞ্চন!
করুণ-লােচনা ।
অন্ধ এ মন্দিরে তুমি উদার জোছনা।
মলিন ধূলির কোলে লয়েছ গাে ঠাই,
জোছনারি মত তবু অঙ্গে গ্লানি নাই।
অয়ি ইন্দুলেখা!
অন্তরে পেয়েছি,তােমা, নহি আর একা।
১৭
কুহু ও কেকা
f
••
নহি আর সমুদভ্রান্ত, ক্ষুধিত নয়ানে,
ফিরি নাক’ দেশে দেশে নিস্ফল সন্ধানে ;
হেঅমৃত-ধারা !
উঞ্ছ কটাক্ষের ভিক্ষা হয়ে গেছে সারা।
এসেছ হৃদয়ে তুমি সহজ গৌরবে,
পূর্ণ করি’ দশ দিক মন্দার সৌরভে ;
আমি
মুগ্ধ
চিতে
ফিরেছি নীড়ের কোলে তােমারি ইঙ্গিতে।
আপনি মগন হয়ে গেছি আপনাতে,
ভাবিতেছি নিশিদিন-কী আছে আমাতে।
যাহার সন্ধানে
তুমি এসে ধরা দেছ ? হায়, কে তা জানে
সংসারের মাঝে ছিনু সন্ন্যাসী উদাস,
তুমি সঙ্গে নিয়ে এলে ফুলের নিশ্বাস,
আনিলে চেতনা,
দুখের গদগদ সুখ, সুখের বেদনা ।
ভেবেছিনু জগতের আমি নহি কেহ,
তুমি ভেঙে দিলে ভুল, দিলে তব মেহ,
১৮
কুহু ও কেকা
মৰ্ম্ম পরশিলে,
রুদ্ধ উৎস খুলে গেল, হে সুন্দরশীলে!
আজি মাের সর্ব চিত্ত সার। তনু ভরি,
আনন্দ অমৃত-ধারী ফিরিহে সঞ্চুরি’!
নীরবে নিভৃতে
আমাতে মিশেছ তুমি, অয়ি অনিন্দিতে।
জীবনে এসেছ পূর্ণা! রিক্তা তিথি-শেষে,
মানসী দিয়েছ দেখা মানুষের দেশে,
অয়ি স্বপ্ন সখী,
তােমারি মাধুরী আজ নিখিলে নিরখি।
তুমি সে বালিকা যার চম্পক অঙ্গুলি
লিখিত মেঘের স্তরে চঞ্চল বিজুলি!
যাহার লাগিয়া
জাগিত গাে তন্দ্রাতুর বালকের হিয়া।
শিয়রে সােনার কাঠি ঘুমাইতে তুমি,
মুক্ত দ্বারে রৌদ্র আর জ্যোৎস্না যেত চুমি!
সাগরের তলে
তুমি সে গাঁথিতে মালা মুকুতার ফলে।
কুহু ও কেকা
তােমারি পরশ বহে বসন্ত বাতাস,
বর্ষা-জলােচ্ছাসে ছিল তােমারি নিশ্বাস ।
মুচ্ছিত বৈশাখে
ও লাবণ্য-মণি ছিল চম্পকের সাথে।
তুমি ছিলে অন্ধকারে কালােচুল খুলে;
চালােকে তােমারি অঞ্চল পড়ে দুলে ;
সন্ধ্যা সরোবরে
গন্ধতৃণে গন্ধ রেখে তুমি যেতে স’রে।
স্বপ্নে ছিলে স্বর্গে ছিলে মগ্ন পারিজাতে,
অতনু আভাস ছিলে, ছিলে কল্পনাতে ;
আজ একেবারে
মর্তে এলে মূৰ্ত্তি ধরে আমারি দুয়ারে !
মুগ্ধ মােরে করেছ গাে মুগ্ধ চোখে চাহি,
ধুয়ে মুছে দেছ গ্লানি, তাই সখী গাহি
বন্দনা তােমারি,
তব প্রেমে মণিহার পরেছে ভিখারী।
२०
কুহু ও কেকা
প্রিয়-প্রদক্ষিণ
প্রিয়ার ও তনু অতনু সে কোন্
দেবতার মন্দির।
বন্ধনহীন মন উদাসীর
আলয় সে শান্তির।
তাহারে ঘিরিয়া ঘুরিছে হৃদয়
ঘুরিছে রাত্রিদিন,
উৎসুক সুখে কৌতুকে তারে
করিছে প্রদক্ষিণ ।
ফিরিছে হৃদয় কুন্তলে তার
ফিরিছে কপােলে, চোখে ;
অধরে, উরসে, চরণে পানিতে
ফিরিছে তাম্র-নখে!
ফিরিছে আঙুলে, ফিরিছে জলে,
ফিরিছে ভুরুর তিলে,
ফিরে অবিরাম, কৌতূহলের
অন্তু নাহিক মিলে।
২১
কুহু ও কেকা
ঘুরি গাে যাত্রী দিবস রাত্রি
অনুপ দউল ঘিরে,
নূতন প্রেমের নির্মল-করা
নিৰ্ম্মালি’ ধরি’ শিরে!
কত হাসি কত পুলক-অশ্রু
কবি গো আবিষ্কার,
দৈব প্রসাদে থােলে দেউলের
নূতন নূতন দ্বার!
নূতন প্রণয় নব পরিচয়
নব রাগিণীর গীতি,
কত জনমের মূচ্ছনা তাতে
মূচ্ছিত কত স্মৃতি।
প্রিয়ার দিঠিতে ভােলামন আজ
হয়েছে জাতিস্মর,
দৈব আলােকে ভরেছে দু’চোখ
ভরেছে নীলাম্বর।
প্রিয়ার রূপের অন্ত নাহিরে
নূতন সে ক্ষণে ক্ষণে,
ক্ষণে ক্ষণে তার শােভা নব নব
হেরি বিস্ম মনে!
কুহুও কেকা
উদ্বেল তাই হৃদয়-পরাণ
নাচিছে রাত্রি দিন ;
নিবিড় পরশ আঁখি সনে করে
প্রিয়ারে প্রদক্ষিণ !
তুমি ও আমি
তুমি আমি—আমরা দোঁহে যুক্ত ছিলাম আলিঙ্গনে
ফুল-জনমে;—ছিলাম যখন পাপড়ি-ঘেরা সিংহাসনে ;
আমার ছিল সােনার রেণু, স্নিগ্ধ মধু তােমার হাসে,
তুমি ছিলে মধ্য-কেশর আমি তােমার ছিলাম পাশে।
হঠাৎ কি যে মর্জি হ’ল-হঠাৎ কেমন হ’ল মতি
তফাৎ হয়ে গেলাম দোঁহে,—বিমুখ পরস্পরের প্রতি।
দীর্ঘ দিনের তপস্যাতে কায়মী হ’ল ছাড়াছাড়ি,
আমি ক্ৰমে হ’লাম পুরুষ, তুমি প্রিয় হলে নারী।
তফাৎ হয়েই ফুটুল আঁখি, দেখতে পেলাম পরস্পরে-
ভিতর থেকে টান পড়েছে, বে নাকো থাকলে স’রে ;
‘নাে’ দিয়ে তাই এগিয়ে এক্সাম,-এগিয়ে হটে গেলাম পিছে,
মান অভিমান জাগল পারুণ,-মিলন বাধা বাড়ল মিছে।
কুহু ও কেকা
আজ বিরহের দারুণ দাহে পরস্পরে চাইছি মােরা,
আজ বিধাতার বিড়ম্বনায় জেখের জলে ঝরছে বােরা;
আর মিলনের নেইক আশা মৌমাছিদের ঘটকালিতে,
ভাঙা এ মন জুড়তে এখন হচ্ছে নিতি জোড়-তালিতে।
তফাৎ হয়ে নেইক তৃপ্তি, দু ঠাই হয়ে দুখ মেনেছি,
লাভের মধ্যে, হায় গাে বিধি, হারিয়ে-পাওয়ার স্বাদ জেনেছি ;
হারিয়ে-পাওয়া ! গভীর সে সুখ !—প্রবল সে যে দুখের বাধায়।
বিচিত্র সে নূতন মিত্র!—এক সাথে সে হাসায় কাদায়!
ফুল জনমে অভেদ ছিলাম,যুক্ত ছিলাম আলিঙ্গনে,
আজ আমাদের এই মিলনে সেই কথাটিই জাগছে মনে ;
দূরে সরে দুনিয়া ঘুরে আবার মিলন এই জনমে,
মুক্ত দোহার যুক্ত হৃদয় আজ বিধাতার পায়ে নমে।
অকারণ
=
শূন্য যখন গাঙিনীর তীর,
পথে কেহ নাহি চলে,-
পড়ে নাক দাঁড় খেয় তরণীর
তিমির-মগন জলে।
কুহু ও কেকা
ঘুম-ভরা আঁখি
নীলাম্বরীর অঞ্চল দিয়া
সন্ধ্যা দেয় দৃষ্টি রুধিয়া,
গন্ধ তৃণের বিভােল গন্ধ
বাতাসের কোলে ঢলে ;
করুণে মুরলী বাজে পরপারে,
দীপ জ্বলে নিবে কিনারে কিনারে,
সুখ নীড়ে পাখী
স্বপনে কি যেন বলে ;
তখনি এ হিয়া উঠে উছসিয়া
নয়নে-অশ্রু ছলে।
যবে ঝর ঝরে বারিধারা ঝরে
আর সব রহে চুপ
তরু পল্লবে সঞ্চিত জল
জলে পড়ে-টুপ টুপ,
যবে ঘুমন্ত
কেতকীর শাখে
জড়ায়ে নিভৃতে সুনিবিড় পাকে
গন্ধ-মগন কাল ভুজঙ্গ
শ্বসিয়া খসিয়া উঠে
দাদুরীর ডাকে ভরি’ উঠে বন,
দাপটির ফিরে দস্যু পবন,
নব কদম্ব যূথীর গন্ধ
আকাশ বাতাসে লুটে,-
;
২৫
কুহু ও কেকা
তখনি এহিয়া উঠে উছসিক্স
নয়নে অশ্রু ফুট।
প্রথম শরতে অম্বরে যবে
মেঘ-ডম্বৰু বাজে,
যবে খরশাণ বিধাতার বাণ
ঝলসে গগন মাঝে,
কমল কলিকা শঙ্কিত মনে
রহে নতমুখে মুদিত নয়নে,
তরুণ অরুণ কিরণ স্মরিয়া
ঝুরিয়া ঝুরিয়া মরে,
ব্যাকুল পরাণ খুজে আশ্রয়,
খুজে সে শরণ চাহে সে অভয়,
এ তিন ভুবনে আপনার জনে
খুজি’ মরে সকাতরে,
উছসি উঠিয়া বিরহী এ হিয়া
নয়ন-সলিলে ভরে।
পউষের রাতে কঙ্কাল সম
বিথারি’ রিক্ত শাখা,
কাদে যবে তরু ভিজিয়া শিশিরে
ভস্ম কুহেলি-মাখা।
কুহু ও কেকা
কুকুর তুলে বুক্কন ধ্বনি,
ঘুৎকার করে উলুক অমনি,,
উত্তর বায়ু শীতের প্রতাপ
প্রচারে ভূমণ্ডলে,
দীর্ঘ যামিনী পােহায় জাগিয়া
তপ্ত হিয়ার পরশ মাগিয়া,
পরাণ ক্ষুন্ন নয়ন শূন্য
নিবিড় তিমির তলে,
তখনি এ হিয়া উঠে উছলিয়া,
নয়নে মুকুতা ফলে।
এ কি বিধুরতা হায় রে বিরহী!
কালে কালে নিতি নিতি।
এ কি রে দহন রহি রহি’ রহি’
একি অপরূপ গতি।
এ কি মিছামিছি দুঃখের খেলা,
এ কি মিছামিছি আঁখিজল-ফেলা।
কোন্ বেদনার চির হাহাকার
চিরদিন জাগে প্রাণে!
কোন্ খানে সুরু, কোথা উন্মেষ,
কোযুগে হায় হবে এর শেষ,
কোন্ রাগিণীর ব্যথা ভরা রেশ
২৭
কুহু ও কেকা
ধ্বষিছে সকল গানে।
অকারণে হায় অশ্রু পড়ায়
কোন্ সাগরের টানে।
পাল্কীর গান
পাল্কী চলে!
পাল্কী চলে!
গগন-তলে
আগুণ জ্বলে!
স্তব্ধ গাঁয়ে
আদুল গায়ে
যাচ্ছে কারা
রৌদ্রে সারা!
ময়রা মুদি
চক্ষু মুদি
পাটায় বসে
চুছে ক’সৈ।
দুধের চাছি
শুষছে মাছি,
২০
কুহু ও কেকা
উড়ছে কতক
ভন্ ভনিয়ে।--
আছে কারা
হনহনিয়ে ?
হাটের শেষে
রু বেশে
ঠিক দুপুরে
ধায় হাটুরে ।
কুকুর গুলাে
শুকছে ধূলাে,
ধুকছে কেহ
ক্লান্ত দেহ।
চুছে গরু
দোকান-ঘরে,
আমের গন্ধে
আমােদ করে।
পাল্কী চলে,
পাল্কী চলে
দুকি চালে
মৃত্যু তালে।
২৯
কুহু ও কেকা
ছয় বেহারা,
জোয়ান্ তারা,
গ্রাম ছড়িয়ে
আগ বাড়িয়ে
মাঠে
মার টাটে
তপ্ত তামা,
যায় না থামা,
উঠছে আলে
নাম্ছে গাঢ়ায়,
পাল্কী দোলে
ঢেউয়ের নাড়ায়।
ঢেউয়ের দোলে
অঙ্গ দোলে!
মেঠো জাহাজ
সানে বাড়ে
ছয় বেহারার
চরণ-দাড়ে।
কালা সবুজ
কাজল ধরে
পাটের জমী
ঝিমায় দূরে! ।
কুহু ও কেকা
ধানের জমী
প্রায় সে নেড়া,
মাঠের ধাটে,
কাটার বেড়া !
‘সামাল হেঁকে
চল বেঁকে
ছয় বেহারা,
মর্দ তারা!
জোর হাঁটুনি
খাটুনি ভারি ;
মাঠের শেষে
তালের সারি।
তাকাই
দূরে,
শূন্যে ঘুরে
চিল্ ফুকারে
মাঠের পারে।
গরুর বাথান,
গােয়াল-থানা,
ওই গােয় গায়ের
ওই সীমানা
কুহু ও কেকা
বৈরাগী সে,
কন্তী বঁধা,
ঘরের ফাথে
লেপছে কাদা ;
মটকা থেকে
চাষার ছেলে
দেখুঁছে,—ডাগর
চক্ষু মেলে!
দিচ্ছে চালে
পােয়াল গুছি
বৈরাগীটির
মূৰ্ত্তি শুচি।
৩
পজাপতি
হলুদ বরণ,
শশার ফুলে
রাখছে চরণ।
কার বহুড়ি
বাসন জে?-
পুকুর ঘাটে
ব্যস্ত কাজে ;-
৩২
এলে হাতেই •
হাতের পোছায়
গায়ের মাথার
কাপড় গােছায়।
পাল্কী দেখে
আছে ছুটে
ন্যাংটা থােকা,
মাথায় পুটে !
পােডাের আওয়াজ
যাচ্ছে শােনা ;
খােড়ো ঘরে
চাদের কোণ।
পাঠশালাটি
দোকান-ঘরে,
গুরু মশাই
দোকান করে !
পােড় ভিটের
পাের পরে
৩৩
কুহু ও কেকা শালিক নাচে, ছাগল চরে। গ্রামের শেষে অশথ-তুলে বুনাের ডেরায় চুল্লী জ্বলে ; টাটকা কাঁচা শাল- পাতে উড়ছে ধােয়া ফ্যাক্স প্রতে। গ্রামের সীমা ছাড়িয়ে, ফিরে পাল্কী মাঠে ধীরে আবার মাঠে, তামার টাটে, কেউ ছােটে, কেউ ; কষ্টেহঁটে ; মাঠের মাটি রৌড্রেটে, ৩৪
কুহু ও কেক।
পাঁকী মাঠে
আপন নাটে!
শঙ্খ চিলের,
সঙ্গে, যেচে--
পাল্লা দিয়ে
মেঘ চলেছে।
রসির
তপ্ত রসে
বাতাস সাতার
দেয় হরষে!
গঙ্গা ফড়িং
লাফিয়ে চলে ;
বাঁধের দিকে
সূর্য ঢলে।
পাল্কী চলে রে!
অঙ্গ ঢলে রে!
আর দেরী কত ?
আরাে কত দূর?
“আর দুর কি গাে?
বুড়ে শিবপুর
৩:
ওই আমাদের ।
ওই হাটতলা,
ওরি পেছুখান
ঘােষেদের গােল।
পাল্কী চলে রে,
অঙ্গ টলে রে ;
সূৰ্য ঢলে,
পাল্কী চলে!
মুগ্ধ
ওই রূপে মাের মন ভুলেছে, ভরেছে মন মােহন রূপে।
জেগে তােমায় স্বপন দেখি, তােমার রূপে যাচ্ছি ডুবে !
ওগাে আমার দখিন হাওয়া! অসীম তােমার দক্ষিণতা,
ওগাে আমার তমাল ছায়া ! তপ্ত জনের ঘুচাও ব্যথা;
ওগাে শ্যামল শাঙনী মেঘ। স্বপ্নে তােমায় চায় যে যূথী,
ওগাে আমার গায়ক গুণী! ওগাে আমার গানের পুথি ।
এই গিয়েছ কাছটি থেকে,—ভাবছি ছুটে যাই এখুনি,
বাড়িয়ে-বলা নয় গাে এ নয় ভালবাসার-ভুবকুনি ;
হায় গা বিধির এনিবিধান মিলন-বেলাই অল্প-আয়ু,
শীতের বেলার চেয়েও খাটো,-বইছে তবু দখিন বায়ু।
••
==
কুই ও কেকা
ফুল-জাগানাে দখিন হাওয়া, দি জাগান দক্ষিণ ;
মিলন-মেলা যায় ফুরায়ে, ফুরায় না হয় মনের কথা।
দূরে কেন যায় গাে লােকে,আমি যে চাই থাকতে কাছে,
আনাগােনা ফুরিয়ে দিয়ে কাছে থাকায় দোষ কি আছে?
এসাে কাছে প্রিয় আমার—এস আমার জনম ভরি’ ;
একলা ঘরে এগা! আমি তােমার কথা স্মরণ করি।
আঙ্গুতে তােমায়ু হবেই হবে—অগৌণেতেই আসতে হবে,
জেগে ভাল ফেললে বেসে—স্বপ্নে ভাল বাসতে হবে।
গ্রীষ্ম-চিত্র
;
বৈশাখের খরতাপে মূচ্ছাগত গ্রাম,
ফিরিছে মন্থর বায়ু পাতায় পাতায় ;
মেতেছে আমের মাছি, পেকে ওঠে আম,
মেতেছে ছেলের দল পাড়ায় পাড়ায়।
সশব্দে বাঁশের নামে শির,-
শব্দ করি’ ওঠে পুনরায় ;
শিশুদল আতঙ্কে অস্থির
পথ ছাড়ি’ ছুটিয়া পালায়।
স্তব্ধ হয়ে সারা গ্রাম রহে ক্ষণকাল,
রৌদ্রের বিষম ঝাঁঝে শুষ্ক ডােবা ফাটে।
বাগানে পশিছে গাজী, ঘুমায় রাখাল,
বটের শীতল ছায় বেলা তার কাটে।
।
৩৭
কুহু ওকেকা
পাতা উড়ে ঠেকে গিয়া আলে,
কাক বসে দড়িতে কুয়ার';
তন্দ্রা ফেরে মহাথে মহালে,
ঘরে ঘরে ভেজানাে দুশার।
সাড়ে চুয়াত্তর
।
দূর থেকে আজ ওগাে তােমায় মনের কথা কই,
নূতন খবর নেই কিছু আজ মনের খবর বই
ভাবছি আমি কোথায় তুমি হায় সে কতদূর,
কোথায় সহর কাতা আর কোথায় কুসুমপুর।
জানি কি ভাবছ এখন করছ কিবা কাজ,
কার সাথে বা কইছ কথা ? পরেছ কোন্ সাজ ?
ইচ্ছা করে হাওয়ার ভরে তােমার কাছে যাই,
করছ যে কি পিছন থেকে লুকিয়ে দেখি তাই।
ইচ্ছা করে শুতে তােমার বচন সােহগের,
ইচ্ছা করে—ইচ্ছা করে—ইচ্ছা করে ঢের!
ইচ্ছা করে কত কি যে—সাধ যে জাগে আজ,--
শাদার পরে কালি দিয়ে লিখতে সে পাই লাজ।
কৰে যদি না পড় সে দিনের বেলায় আর
তবে লিখি,—লিতে সে লােভ হচ্ছে যে বারবার।
==
কুহু ও কেকা
হচ্ছে সে লােভ, কিন্তু ওগো!—পড় না এর পর,
আমার চিঠির এইখানে আজ সাড়ে চুয়াত্ত্বর ;
এইখানে শেষ করতে হবে দিনের বেলার পাঠ,
রাতের পড়া রাত্রে হবে, ভাঙলে লােকের হাট।
বাকীটুকু শােনার বেলায় বন্ধ করে ঘর
এলা খুলে দেতে হবে রেখে শেষের পর ;
• সেই গােরনে মনে মনে পােড়ো চিঠির শেষ,
নিদ-মহলে বন্ধু ! আমার আর্জি হবে পেশ।
সেই গােপনের আবরণে, জানাই তােমার পায়,
একটি তােমার চুমার লাগি পরাণ কাঁদে, হায়!
দিয়াে দিয়াে একটি চুমা আমার চিঠির গায়,
প্রদীপ যদি হাসতে থাকে নিবিয়ে দিয়ে তায়।
দাও যদি সে পাবই আমি, পাবই আমি টের,
হাওয়ার আগে হবে বিলি বার্তা হৃদয়ের।
আসবে স্বপন তােমার বেশে মুদলে আঁখির পাত,
কাটবে সারা রাত্রি সুখে বন্ধু ! প্রিয়! নাথ !
দূর থেকে সুর লাগবে বীণায়,জাগবে গাে অন্তর,
আমার চিঠির মাঝখানে তাই সাড়ে চুয়াত্তর।
কুহু ও কেকা
গ্রীষ্মের সুর
২
-
হায় !
বসন্ত ফুরায়!
মুগ্ধ মধু মাধবের গান
ফন্তু সম লুপ্ত আজি, মুহমান প্রাণ।
অশােক নির্মাল্য-শেষ, চম্পা আজি পাণ্ডু হাসি হাসে,
ক্লান্ত কণ্ঠে কোকিলের যেন মুহুর্মুহু কুহুধ্বনি নিবে নিবে আসে!
দিবসের হৈম জ্বালা দীপ্ত দিকে দিকে, উজ্জ্বল-জাজ্জল-অনিমিখ,
নিঃশ্বসিছে নিঃস্ব হাওয়া, হুতাশে মুচ্ছিত দশদিক্!
রৌদ্র আজি রুদ্র ছবি, আকাশ পিঙ্গল,
ফুকারিছে চাতক বিহ্বল,-
খিন্ন পিপাসায় ;
হায়!
হায় !
আনন্দ ধরায়
নাহি আজ আনন্দের লেশ,
চতুর্দিকে ক্রুদ্ধ আঁখি, চারিদিকে ক্লেশ।
সংবর ও মূৰ্ত্তি, ওগাে একচক্র-রথের ঠাকুর।
অগ্নি-চক্ষু অশ্ব তব মূচ্ছি বুঝি পড়ে,—আর সে ছুটাবে কত দূর?
সপ্ত সাগরের বারি সপ্ত অশ্বেতব করিছে শােষণ তৃষ্ণাভরে,
তবু নাহি তৃপ্তি মানে, পিয়ে নদ, নদী, সুরােবরে ;-
পঙ্কিল গল পিয়েংগােস্পদে ও কূপে,
পুষ্পে রস—তাও পিয়ে চুপে!
কৃপ্তি নাহি পায় !
হায় !
সান্ত্বনা কোথায়?
রৌদ্রের সে রুদ্র আলিঙ্গনে
জগতের ধাত্রী ছায়া আছে উষ্ম-মনে ;
আশাহত ক্ষুব্ধ লােক,আকাশের পানে শুধু চায়,
ময়ুরের বই সম ময়ূখের মালা বদ্যুিতেজে চৌদিকে বিছায়।
হতলে, জলে, স্থলে, মিগ্ধ পুষ্পদলে আজ শুধু অগ্নি কণা ক্ষরে,
হাতে মাথে ধূনী জ্বালি’ বসুন্ধরা কৃচ্ছ, ব্রত করে ।
ওঠে না অনিন্দ্য চরু আমােঘ প্রসাদ,
দেবতার মূর্ত আশীৰ্বাদ,
দীর্ঘ দিন যায়,
-
৪১
কুহু ও ক্লেকা
হৃদয় শুকায় !
'হি বল, নহিক সম্বল,
অন্তরে আনন্দ নাই; চক্ষে নাহিজল !
মূক হয়ে আছে মন, দীর্ঘশ্বাসে অবান গান,
বিশ্বত সুখের স্বাদ হৃদি অনুৎসুকধুক ধুক করে । শুধু প্রাণ।
কে করিবে অনুযােগ ? দেবতার কোপ; কোথা বা করিবে অনুযােগ ?
চারিদিকে নিরুৎসাহ, চারিদিকে নিঃস্ব নিরুদ্যােগ !
নাহি বাষ্প বিন্দু নভে,-বরষা সুদুর ;
দগ্ধ দেশ তৃষায় আতুর,
ক্লান্ত চোখে চায় ;
অন্তঃপুরিকা
আর যে আমার সইছে নারে সইছে না আর প্রাণে,
এমন করে কতদিন আর কাটবে কে তা জানে।
দিন গুণে দিন ফুরায় নাকো নিমিষ গণি তাই,
বুকের ভিতর হাঁফিয়ে ওঠে, আফুল চোখে চাই।
যে খাটিতে বস্ত সে জন বসছি সেথায় গিয়ে,
দেখছি খুলে চিঠিটি তার ঘরে দুয়োর দিয়ে ;
১২
কুহু ও কেকা
বেশী আমি পাইনি ও গো পাইনি বেশী আর,
পারে যাবার একটি কড়ি একটি চিঠি তার।
হাসিয়েছিল কোনু কথাতে,হাসছিমনে করে,
দেখতে হঠাৎইচ্ছে হয়েচক্ষু এল ভরে।
শােবার ঘরে করাট এটে ছবিটি তার লিখি,
হয় না কিছু,—সেইটি তবু নয়ন ভরে দেখি।
নানা কাজে ব্যস্ত থাকি, তবুও কেন ছাই,
মনটা ওঠে আকুল হয়ে, উদাস হয়ে যাই
ডানা যদি দিতেন বিধি উড়ে যেতাম চলে,
সকল ব্যথা সইত, মাথা রাখতে পেলে কোলে।
সীতা সতী বুদ্ধিমতী,—প্রণাম করি পায়,
আজ বুঝেছি বনে কি সুখ, কি দুখ অযযাধ্যায়।
।
আনন্দ-দেবতার প্রতি
धन
আমি
আজ
প্রমােদ! পুলক! রভস হে!
মুছেছি অশ্রুধার ;
মুকুল নহে তাে অবশ হে।
নীহার নাহিক আর।
তায়
ধরণী আঁচলে আবর’ গাে !
কালিকার ঝরা ফুল,
৪৩
কুহু ও কেকা
পাখ কাকলি-
কাকলি-কূজনে কুহর’ গাে
নদী , গাহ গাহ কুলুকুল!
পাখী
নদী
শুধু
নীহারে শিহরে ফুলদল।
নীবব পুনৰ্ব্বার!
ভাসাইয়া আনে অবিরল
চিতার ভস্মভার!
আমি
পরি’
আমি
এই
শ্মশানে বাসর রচিব গো
শুষ্ক ফুলেরি হার,
নয়ন উপাড়ি রুধিব গাে
নয়নের বারিধার।
এস
রভস-দেবতা । বঁধুয়া হে!
তুমি
এস সখা একবার,
আমি রাখিব রাখিব রুধিয়া হে।
নয়নের বারিধার।
এই
৪৪
কুহু ও কেকা
मवानो
*(বাউলের সুর)
মনের মরম কেউ বােঝে না !
(এরা) হালে কাঁদে, কঁদলে হাসে !
(আহা) দরদ দিয়ে কেউ দেখে না
(ওগাে) গরজ নিয়ে সবাই আসে।
(যেজন) হিয়ার হাসি কান্না বােঝে
(ওগাে) ছিলাম আমি তারি খোঁজে,
(হায় রে) কাল বেলা ভাঙল মেলা
(তবু) বসেই আছি আসার আশে।
বন্ধু! তােমায় বন্ধ বা কি ?
আড়াল থেকেই মিলাই আঁখি
(আমি) প্রাণের খবর পাইনে চোখে
(শুধু) মুখ-চাওয়া সার দ্বারের পাশে।
(ওগাে) মরমী কেউ মি যদি
(তবে.) বইত উজান জীবন-নদী-
(ওগাে) নিরবধি সেই দরদীর
(মােহন) বাঁশীর সুরে প্রেমােল্লাসে।
=
৪৫
কুহু ও কেকা
রিঙ্গা
(মালিনী ছন্দের অনুকরণে)',
উড়ে চলে গেছে বুবুল
শূন্যময় স্বর্ণ পিঞ্জর ;
ফুরায়ে এসেছে ফান,
যৌবনের জীর্ণ নির্ভর।
রাগিণী সে আজি মন্থর,
উৎসবের কুঞ্জ নির্জন ;
ভেঙে দিবে বুঝি অন্তর
মঞ্জীরের ক্লিষ্ট নিক্কণ ।
ফিরিবে কি হৃদি-বল্লভ
পুষ্পহীন শুষ্ক কুঞ্জে?
জাগিবে কি ফিরে উৎসব
খিন্ন এই পুষ্প পুঞ্জে?
ভাঙনে ভেঙেছে মন্দির
কাঞ্চনের মূর্তি চুর্ণ,
৪৬
কুহু ও কেকা বেলা চলে গেছ সুন্ধির, লাঞ্ছনার পাত্র পূর্ণ। -मुजा কনক- ; কনক-ধুতুরা! কনক-ধুতুরা । পরিপূর তুমি বিষে ও তনু-পাত্রে অতনু-সুষমা উপচি উঠিল কিসে? তুমি অপরূপ ওগগা রূপবতী। অপরূপ তব কথা। মুকুলিত করি’ তুলিছ কেবলি মৃত্যু ও মাদক। উথলি উঠিছে একটি বৃন্তে দুখের সঙ্গে সুখ, মৃত্যু-অভেদ জীবন-মৃত্য! মন করে, উৎসুক। সােনার গেলাসে মুগ্ধ মদিরা!- কর্ণে কী কার জপে ৪৭
কুহু ও কেকা
ফেণগুঞ্জনে মত্তলােচনে।
মৃত্যুর হাসি সপে।
কনক-ধূতুরা! কনক-ধুতুর !
কিসে তুমি পরিপূর?
মুগ্ধ নয়নে আমি তাের পানে
চেয়ে আছি তৃষাতুর।
চাতকের কথা
হে সরসী! তুমি স্বচ্ছ শীতল,-
বলেছে আমায় অনেক পাখী
আমিও তৃষিত, তবু তাের পানে
নারিনু নারিনু ফিরাতে আঁখি !
হায়,
তুমি সুন্দর, তুমি সুবিপুল,
সুলভ তােমার অগাধ বারি,
সমুখে রয়েছ নিশিদিনমান
তবু তে ও জল ছুইতে নারি।
মাের
৪
কুহু ও কেকা
নিয়ত আকাশে আশাথ-চাওয়া,
নিত্য নিয়ত তাঁর জ্বালা,
তাের পরে মাের ফিরিল না মন,
হায় গাে রূপসী সরসীবালা !
-
ওগাে বাধাজল! করি’ কোলাহল
দর্দ রদল বলে তােরে,
হায় : কাকের ভেকের তুমি আরাধ্যা
আমি তােরে সেবি কেমন করে ?
নিন্দা তােমায় করিনে গো আমি,
নাই নাই মনে ঘৃণার কণা ;
খেলা-ছলে হেলা করিনে তােমায়,
পাই নি তেমন কুমন্ত্রণা।
হায়
তৃষ্ণা আমায় দিয়েছেন বিধি,
সে তৃষা ফটীক-জলের তৃষা,
শান্তির আশা সুদুর আমার,
দহন আমার দিবস নিশা।
ওগো
=
আমি
মেঘের রন্ধে করি আনাগােনা,
বিজলীতে জলি’ ফুকারি ত্রাহি’!
৪৯
৪
কুহু ও কেক।
উধাও-ধাওয়ার হঠাৎ-পাওয়ার
চকিত-চাওয়ার তুলনা নাহি।
ওগাে
;
বিধাতা আমায় এমন করেছে,
দুষ্কর ব্রতে করেছে ব্রতী
পুষ্কর মেঘে মজে আছে মন,
নাই সে পুষ্করিণীর প্রতি।
তাই
হে সরসী! তুমি তারার আরসী,
স্বচ্ছ অগাধ আরামে ভরা ;
আকাশে জলের রয়েছে যে দ্রোণী
সেই চাতকের তৃষ্ণা-হরা।
তবু
ঝােড়াে হাওয়ায়
ঝােড়াে হাওয়ায় বােল উঠেছে কোলাহলের সাথ ।
আকাশ জুড়ে অকালে ওই ঘনিয়ে আসে রাত!
আজকে যারা ফিরত ঘরে
হারাল পথ পথের পরে
ধূলায় আঁখি বন্ধ, হ’ল অন্ধ অকস্মাৎ।
কুহু ও কেকা
ডাঙায় গাছের ডাল টুটি, বিষম ডামাডােল,
জলে নায়ের হাল ছুটিছে,—বােক্ রে হরি বােল!
তুর্ণ ছােটে ঘূর্ণি হাওয়া
ফুরায় বুঝি পারে যাওয়া
পান্থ পাখী পার্টে পাখা নিল মাঠের কোল।
;
যােজন জুড়ে মেঘে মেঘে বজ্র-আকর্ষণ,
বহুক হাওয়া ক্ষুরের ধারে,-হ’বে সুবর্ষণ।
গম্ভীরা যে বুকের 'পরে
বসে আছে আড়ম্বরে,
দম্ভটা তার খর্ব হবে,-এ তার নিদর্শন।
ঝােড়াে হাওয়ার রােল শুনে আজ মেতেছে পরাণ।
সাবধানী! তুই আজকে কারে করিস্ রে সাবধান ?
মৃত্যু যে আজ চোখের আগে
নাচে মিলন-অনুরাগে,
বাহুতে তার মিলিয়ে বাহু গাইতে হবে গান।
ঝড়ের তালে নাচবে ধূলি উড়িয়ে ধূসর কেশ।
রুদ্রজটা পড়বে ছিড়েজুড়িয়ে যাবে দেশ।
কুহু ও কেকা
স্বর্গ হতে-গঙ্গা ঝরে
দিবে ভুবন সিগ্ধ করে ;
কুম্ভীরের ওই জিহবা-ালুর ঘুচবে পিঙ্গ বেশ।
জানি আমি অপূৰ্ব্ব ওই রুদ্র গঙ্গাধর,
যেথাই দাহ সুদুঃসহ সেইখানে তার ভর।
দুখের আদি-সুখের নিদান,
তারি বরে দুঃখ-নিধান
মরণ করে অমৃত দান, শিব সে-ভয়ংকর!
ছুটুক না সে রুদ্র মরুৎ, নাই তাে কোনাে ভয়,
চেতনজড়ে না হয় হবে পাগড়ী-বিনিময় ;
নিশ্বাসে যার ঝঞ্চা ছােটে,
প্রশ্বাসে প্রশান্তি ফোটে,
তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে মােরা মরণ করি জয়।
বজ কামনা
হায়
শূন্য জীবন নীরস হৃদয়
নীরব দহনে দহে,
লুপ্ত অশ্রু মরমের তলে
ফ-ধারায় বহে;
আর
কুহু ও কেকা
৭
ওগাে
রুদ্র আকাশ,নিথর বাতাস
অন্ধ হুতাশে ভরে,
বয়ষণ-লােভে বিবশা ধরণী
বজ্র কামনা করে ।
০
কুম্ভীরকের পিঙ্গল তালু
আকাশ পিঙ্গ ছবি,
জিহ্বার মত প্রান্তর ঢালু
রৌদ্রে শুষিছে রবি ;
হায় খাকী রঙে খাক হ’ল দুই আঁখি
দুনিয়াটা গেল খ’রে,
তাই ঘন-বরষণ-লালসে ধরণী
বজ্ৰ কামনা করে।
আজ সুখ নাহি দেহে বিশ্রাম-গেহে
স্বস্তি নাহিক প্রাণে,
আঙার-ধানীর বাষ্প বিড়ােল
খসিছে সকল খানে।
নাই নাই ফুল ফুল, ফলে নি ফসল
ধূ ধূ ধূ তেপান্তরে,
হায় ফলের লালসে বন্ধ্যা ধরণী
বজ্ৰ কামনা করে।
কুহু ও কেকা ৫ ওগাে আর হি মিস্ কবে বহিৰে সলিল ফেনমুখ ফণা তুলি’? ঝিল্ মিল, কবে দুলিবে সখীরে । তাজা অঙ্কুরগুলি ? খালি কোল কবে ভরিবে আবার আর কত দিন পরে? সফলতা লাগি’ মেনে ধরণী বজ্র কামনা করে। ওগাে হায় ওগাে বজ্রের রাজা অস্ত্র তােমার এই ওগাে হান একবার বেগে, ক্ষীণ বাষ্পের দীন উচ্ছাস পরিণত হাে মেঘে ; ঘনায়ে মিলায়ে কর সুনিবিড় তড়িত-জড়িত স্বরে, বধ-ভয় ভুলি’ বন্ধ্যা ধরণী বজ্র-কামনা করে। আজ ওগাে বজ্র-দেবতা বজ্র তে শুধু বধের যন্ত্র. নয় ; ও যে বন্ধ্যা-জনের সন্তাপ-হারী, বন্ধন করে ক্ষয় ; ৫৪
কুহু ও কেক।
ও যে মিলন ঘটায় কাঞ্চন-ডােরে
ধরণী ও অম্বরে
তাই বন্ধ্যা ধরণী মরণ-দোসর
বজ্ৰ কামনা করে।
যক্ষের নিবেদন
( মন্দাক্রান্ত ছন্দের অনুকরণে )
পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নতল, কই গাে কই মেঘ উদয় হও,
সন্ধ্যার তন্দ্রার মূরতি ধরি’ আজ মন্দ্র-মন্থর বচন কও;
সূর্যের রক্তিম নয়নে তুমি মেঘ ! দাও হে কজ্জ্বল পাড়াও ঘুম,
বৃষ্টির চুম্বন বিথারি’ চলে যাও—অঙ্গে হর্ষের পড়ক ধূম।
বৃক্ষের গর্ভেই রয়েছে আজো যেই--আজ নিবাস যার গােপনলােক
সেই সব পল্লব সহসা ফুটিবার হৃষ্ট চেষ্টায় কুসুম হােক;
গ্রীষ্মের হােক্ শেষ, ভরিয়া সানুদেশ স্নিগ্ধ গম্ভীর উঠুক তান,
যক্ষের দুঃখের করহে অবসান, যক্ষ-কান্তার জুড়াও প্রাণ!
শৈলের পইঠায় দাড়ায়ে আজি হায় প্রাণ উধাও ধায় প্রিয়ার পাশ,
মূচ্ছার মন্তর ভরিছে চরাচর, ছায় নিখিল কার আকুল শ্বাস!
ভরপুর অশ্রুর বেদনা-ভারাতুর মৌন কোন্ সুর বাজায় মন,
ঘক্ষের পঞ্জর কাঁপিছে কলেবর, চক্ষে দুঃখের নীলাঞ্জন।
৫৫
কুহু ও কেকা রাত্রির উৎসব জাগালে দিবসেই, তাই তাে তন্দ্রায় ভুবন ছায়, রাত্রির গুণ সব দিনেরে দিলে দান, তাই তাে বিচ্ছেদ দ্বিগুণ, হায় ; ইন্দ্রের দক্ষিণ বাহু সে তুমি দেব! পূজ্য! লও মাের পূজার ফুল, পুষ্কর বংশের চূড়া যে তুমি মেঘ! বন্ধু! দৈবের ঘুচাও ভুল! নিষ্ঠুর যক্ষেশ, নাহিক কৃপালেশ, রাজ্যে আর তাঁর বিচার নেই, আজ্ঞার লঙ্ঘন করিল একে, আর শাস্তি ভুঞ্জা দুজনকেই। হায় মাের কান্তার না ছিল অপরাধ, মিথ্যা সয় সেই কতই ক্লেশ, দুর্ভর বিচ্ছেদ অবলা বুকে বয়, পাংশু কুন্তল, মলিন বেশ। বন্ধুর মুখ চাও, সখা হে সেথা যাও, দুঃখ দুস্তর তরাও ভাই, কল্যাণ-সংবাদ কহিয়াে কানে তার, হায়, বিলম্বের সময় নাই ; বৃন্তের বন্ধন আশাতে বাঁচে মন, হায় গাে, বল তার কতই আর ? বিচ্ছেদ-গ্রীষ্মের তাপেতে সে শুকায়, যাও হে দাও তায় সলি-ধার। নিৰ্ম্মল হােক পথ,শুভ ও নিরাপদ, দূর-সুদুর্গম নিকট হােক, হ্রদ, নদ, নিঝর, নগরী মনােহর, সৌধ সুন্দর জুড়া চোক্ ; চঞ্চল খঞ্জ-নয়না নারীগণ বর্ষামঙ্গল করুক গান, বর্ষার সৌরভ, বলাকা-কলরব, নিত্য উৎসব ভরুক প্রাণ! পুষ্পের তৃষ্ণার করহে অবসান, হােক বিনিঃশেষ যূথীর ক্লেশ, বর্ষায় হায় মেঘ! প্রবাসে নাই সুখ,হায় গাে নাই নাই সুখের লেশ; ' ৫৩
কুহু ও কেকা
যাও ভাই একবার মুছাছে আঁখি তার, প্রাণ বাঁচাও মেঘ! সদয় হও,
“বিদ্যুৎ-বিচ্ছেদ জীবনে না ঘটুক” বন্ধু! বন্ধুর আশিষ লও।
ণ
দুর্দিনে
৮
মলিম আঁচল চক্ষে চাপিয়া
কে তুমি ভুবনে এলে,
অসীম অকূল দুর্ভাবনার
পাংশুল ছায়া মেলে!
হে নীরবচারী, বুঝিতে না পারি
মুখে কেন নাহি ভাষ,
কোন্ অশ্রুর অতলে ডুবিয়া
হিম হয়ে গেছে শ্বাস ?
ছিন্ন-বসন! রিক্ত-ভূষণ !
গভীর-শসন! ওরে!
কেন গুমরিয়া উঠিস্ কঁদিয়া ?
কি বেদনা বল্ মােরে।
বিহ্বল সুর ডাকে দন্দর,
চাতক উড়িয়া বসে ;
মদালস তব মুরতি—সে কোন্
শশাকের মাদক রসে!
৫৭
কুহু ও কেকা
সহসা শিহরি’ চীৎকার কেন
করিলি, রে উন্মাদ,
রুদ্ধ ব্যথার রূঢ় তাড়নার
এই কি আৰ্তনাদ!
ত্রাসে মুদে এল বিশ্বলােকের
আয়ত চোখের পাতা,
আধা শাদা হয়ে গেল শঙ্কায়
বিকচ নীপের মাথা!
অকালে দিনের আলােক হরিয়া
কে এলে গো চুপে চুপে,
বিজুলির হাসি পাণ্ডুর করি’
দেখা দিলে ছায়ারূপে।
আঁচল তােমার তিতিয়া ভূতলে
অশ্রু ঝরিয়া পড়ে,
বেদনায় তরু-বল্লরী-বীথী
এ পাশ ও পাশ নড়ে।
ওগাে দুর্দিন। কে পূজিল তােমা
ভূই-পা ফুল দিয়া ।
চঁদ-আঁকা পাখা দোলায় ময়ুর
বিস্ময়াকুল হিয়া।
৫৮
কুহু ও কেকা
মুচ্ছিত ধরা আঁখি মেলে, তােরে
পাইয়া ব্যথার ব্যথী,
খুলে গেল তার হাজার নেত্র,
ফুটিল হাজার যুথী।
;
ওগো কামচারী! সন্তাপহারী।
অন্তর তুমি জাননা,
বিষাদের বেশে এসে দেখা দাও,
ব্যথিতে বক্ষে টানাে
অশ্রু ঘুচাতে, ব্যথিতের সাথে
অশ্রু মিশাতে হয়,
তুমি তাহা জানাে, বন্ধু পুরাণাে !
দুর্দিন সহৃদয়!
ওগাে দেবতার অশ্রু-প্লাবন !
তােমার পাবন-ধারে
মলিনতা তাপ ঘুচাও মহীর
উর্বর কর তারে ;
নীল পদ্মের,মথিত নীলিমা
ব্যথিত চক্ষে দাও,
ঘন চুম্বন দান কর, ওগো,
বুকে নাও! বুকে নাও!
কুহু ও কেকা
অভয়
=
মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়,
আড়ালে তার সূর্য হাসে।
হারা শশীর হারা হাসি
অন্ধকারেই ফিরে আসে!
দখিন হাওয়ার অমােঘ বরে
রিক্ত শাখাই পুষ্পে ভরে,
সিক্ত যে প্রাণ অশ্রুধারায়
প্রাণের প্রিয় তারি পাশে
বর্ষা
ঐ দেখ গাে আজকে আবার পাগলি জেগেছে,
ছাই মাখা তার মাথার জটায় আকাশ ঢেকেছে।
মলিন হাতে ছুয়েছে সে ছুঁয়েছে সব ঠাই,
পাগল মেয়ের জ্বালায় পরিচ্ছন্ন কিছুই নাই।
মাঠের পারে দাড়িয়েছিল ঈশান কোণেতে,
বিশাল-শাখা পাতায়-ঢাকা শালের বনেতে ;
হঠাৎ হেসে দৌড়ে এসে খেয়ালের কোকে,
ভিজিয়ে দিলে ঘরমুখাে ঐ পায়রা গুলােকে।
৬.
কুহু ও কেকা
বস্ত্রহাতের হাততালি সে বাজিয়ে হেসে চায়,
বুকের ভিতর রক্তধারা নাচিয়ে দিয়ে যায় ;
ভয় দেখিয়ে হাসে আবার ফিফিকিয়ে সে,
আকাশ জুড়ে চিকমিকিয়ে চিমিকিয়ে রে!
}
ময়ুর বলে কে গাে ? এযে আকুল-করা রূপ !
ভেকেরা কয় নাই কোনাে ভয়’, জগৎ রহে চুপ ;
পাগলি হাসে আপন মনে পাগলি কাঁদে হায়,
চুমার মত চোখের ধারা পড়ছে ধরার গায়।
কোন্ মােহিনীর ওড়না সে আজ উড়িয়ে এনেছে,
পূবে হাওয়ায় ঘুরিয়ে আমার অঙ্গে হেনেছে ;
চমকে দেখি চক্ষে মুখে লেগেছে এক রাশ,
ঘুম-পাড়ানাে কেয়ার রেণু, কদম ফুলের বাস!
বাদ হাওয়ায় আজকে আমার পাগলি মেতেছে ;
ছিন্ন কথা সূৰ্য্যশশীর সভায় পেতেছে ।
আপন মনে গান গাহে সে নাই কিছু দৃপাত,
মুগ্ধ জগৎ, মৌন দিব, সংজ্ঞাহারা রাত।
নাগ পঞ্চমী
হায়! প্রতি বৎসরে
হাজার হাজার সােনার মানুষ নাগ-দঃশনে মনে।
সেই নাগে মােরা পূজি !
সর্প-পূজার মন্ত্রের লাগি’ বেদ-সংহিতা খুজি।
নাগপঞ্চমী করি
গ্রন্থিল বাঁকা হিন্তাল-শাখা ধরিতে আমরা ডরি।
দুধকলা দিই সাপে ।
পূজা খেয়ে খল দংশন করে!-মরি গাে মনস্তাপে।
জানিনে কিসে কি হয়,
মৃত্যুরে পূজি’ অমরতা-লাভ,—কিছু বিচিত্র নয়।
রামধনু
পুণ্য আখণ্ডল-ধনু মণ্ডিত কিরণে,
রম্য তুমি জলদের নীল শিলাপটে,
স্ফুরিত প্রসূনে আর প্রদ্যোত রতনে
রচিত ও তনুচ্ছদ ; ধূর্জটির জটে
ধূপছায়া শাটি-পরা জাহ্নবীর মত
মেখমাঝে মূর্তিখানি মনােজ্ঞ তােমার;
কুহু ও কেকা
শ্যাম অঙ্গে রাখী সম শােভন সতত ;
হর্ষ-কলতান বিশ্বে তােল বারম্বার ।
ইন্দ্রধনু তুমি কিহে পুরাণ-বর্ণিত ?
কিম্বা রামধনু নাম যথার্থ তােমার ?
প্রজাবৎসলের কর করি’ অলঙ্কৃত
লভিছ কি আজো তুমি শ্রদ্ধা সবাকার ?
রামধনু! রামরাজ্য অতীতে বিলীন,
তুমি তারি রম্য-স্মৃতি চির-অমলিন।
প্রাবৃটের গান
দাড় গাে তােরা ঘিরিয়া দাড় নীরব নত নেত্রে,
দেবতা আজি জীবন-ধারা বরিষে মরুক্ষেত্রে।
শুনিস্ নে কি ঘর্ঘরিয়া
চলেছে কে ও স্বর্ণ দিয়া,
গগন-পথে বিপুল রথে হেলায়ে হেম বেত্রে !
আবৃত-করা প্রাবৃঢ় এল মেলিয়া মেঘ-পক্ষ,
বিবশা ধরা বিতথ বেশ, শ্বসিছে মুহু বক্ষ।
অজানা ভয়ে অচেনা সুখে
কথাটি কারাে নাহিক মুখে,
পাখীর গেছে বচন হরি’ আঁখির থির লক্ষ্য।
কুহু ও কেকা
বৃহৎ সুখে বৃংহিতে কি দিগগজেরা গর্জে ?
মিলাবে কিও অমরা ধরা আকাশ ভাঙি’ বক্সে ?
ধরণী আছে প্রতীক্ষাতে
অর্ঘ্য ধরি’ স্বিন্ন হাতে,
সূচিত স্বরভঙ্গ তার কেকার রবে ষড়জে!
দাদূরি করে উলুধ্বনি, দেবতা নামে মর্তে,
উণীর হ’ল সুরভি আজি ধূপেরি পরিবর্তে !
যুদ্ধ চলা, বন্ধ খেয়া,
একাকী উকি দ্যায় গাে কেয়া,
আলায়ে মণি জাগিছে ফণী ত্যজিয়া নিজ গর্তে।
দেবতা নামে। পুলকে হের দ্যুলােকে দোলে সিন্ধু ।
রথের ধূলে মলিন হ’ল তপন তারা ইন্দু!
বাদল-বায়ে মন্ত্র পড়ি
বাজায় কেও সাঝের ঘড়ি ?
থাকিতে বেলা। বিধান বিধি মানেনা একবিন্দু।
অন্ধ-করা অন্ধকারে নাহিরে নাহি রন্ধ !
বিরামহারা অধীর ধারা পাগল পারা ছন্দ।
৬৪
কুহু ও কেক।
হাজার-তারা সেতারখানি
বলিছে কিও ডাগর বাণী।
তরল তারে উঠিছে ধ্বনি মেদুর মৃদু মন !
দেবতা চুমে ধরার আঁখি অলক চুমে রুক্ষ!
এলায়ে পড়ে বাদ-মালা—রূপালি জরি সূক্ষ্ম !
চুমিয়া তনু কুসুমি’ তােলে,
হরষ-দোলে পরাণ দোলে !
সেচন করে সফল করে মােচন করে দুঃখ।
দাড়াগাে তােরা রাখীর ডােরা বাঁধিয়া নে গাে ত্ৰস্তে ;
দেবতা আসি’ আশিষ-ধারা বরিষে আজি মন্তে ।
দেখিস্ নে কি নীলাম্বরে
এসেছে করীকুম্ভ-পরে,-
আয়ত চোখে বিজুলি লেখা, উশীর মাখা হস্তে।
নূতন মানুষ
ঝুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে।
দুনিয়াতে আজ নূতন মানুষ!ভুলিয়ে নে রে ভুলিয়ে নে।
দুয়ার পরে আমের মুকুল ,
ঝুলিয়ে দে রে অশােক-বকুল,
দেবতা আসে শিশুর বেশে, হায় রে, মেহের দান সেধে।
৬৫
কুহু ও কেকা
ঝুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে !
নূতন আঁখির সােনার পাতায় সােহাগ-কাজল বুলিয়ে দে।
নূতন আওয়াজ কান্না কাদে।
নূতন আঙুল আঙুল বাঁধে।
নূতন অধর পীযূষ পিয়ে নূতন মায়ার ফাদ কেঁদে!
ঝুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে।
নরম আঁচে সদ্য-দুধের ফেনার রাশি ফুলিয়ে দে।
প্রাচীন দোলার নূতন মালিক
এসেছে ঐ ঐন্দ্রজালিক।
অরাজকের আপনি-রাজা রাখবে হৃদয়-মন বেঁধে!
ঝুলিয়ে দোলা দুলিয়ে দে!
দোনা ঘিরে কঁাকণ কারা বাজায় চামর দুলিয়ে রে।
মরণ-বাচন-মেলার মাঝে
ওই রে শুভ শঙ্খ বাজে,
পুরাণাে দীপ চায় গাে হেসে, নূতন মানুষ চায় কেঁদে ! .
প্রথম হাসি
দোলার ঘরে শুছি গাে আজ নূতন হাসির ধ্বনি।
ফুলঝুরিতে ফুকি হাসির রাশি।
কুহু ও কেক।
রূপার ঘুঙুর জড়িয়ে হাতে বাজায় কে খঞ্জনী !
কাঁদুনে ওই শিখুলে কোথায় হাসি।
পিচকারীতে হালেকেরে গােলাপ-জলের ধারা ?
ঝারার পাখী কয় কি হাসির কথা ?
বরফ-গলা ঝর্ণা যেন জাগল পাগল-পারা!
স্বচ্ছ প্রাণে সরল চঞ্চলতা !
প্রথম হাসির পান সুপারি কে দিল ওর মুখে ?
হাসির কাজল কে পরালে চোখে ?
হাসছে থােকা ! হাসছে একা ! হাছে অতুল সুখে!
এমন হাসি কে শিখালে ওকে ?
কলস্বরে হাছে! ওরে! হাসছে আপন মনে।
দেখহাসি পরীর হাসি দেখে !
খুলেছে আজ হাসির কুলুপ কোন্ কুঠুরির কোণে,
মাণিকে তাই আকাশ গেল ঢেকে !
আনন্দের এই পরম অন্নপ্ৰথম অন্ন—হাসি
কোন্ দেবতা প্রসাদ দিল ওকে ?
কাঁদুনে আজ নূতন করে জন্মেছে রে আসি
জন্মেছে সে হরষহাসি-লােকে।
কুহু ও কেকা
ভাদ্র
টোপর পানায় ভরুল ডােবা নধর লতায় নয়াজুলী,
পূজা-শেষের পুষ্পে পাতায় ঢাৰ যেন কুণ্ডগুলি।
তাজা আতার ক্ষীরের মত পূবে বাতাস লাগছে শীতল,
অতল দীঘির নি-তল জলে সাঁৎরে বেড়ায় কাৎলা-চিতল।
ছাতিম গাছে দোন্না বেঁধে দুছে কাদের মেয়েগুলি,
কেয়া-ফুলের রেণুর সাথে ইশে-গুড়ির কোলাকুলি ;
আকাশ-পাড়ার শ্যাম-সায়রে যায় বলাকা জল সহিতে,
ঝিল্লি বাজায় ঝাঝর, উলু দেয় দাদুরী মন মােহিতে!
ককে ফুলের কুঞ্জবনে অছে আলাে খাগেলাসে,
অভ্র-চিকণ টিকলি জলের ঝলমলিয়ে যায় বাতাসে ;
টোকার টোপর মাথায় দিয়ে নিডেন্ হাতে কে ওই মাঠে ?
গুড়-চালেতে মিলিয়ে কারা ছিটায় গায়ে জলের ঘাটে ?
নলী রাতে চাষার সাথে চষা-ভূঁয়ের হচ্ছে বিয়ে,
হচ্ছে শুভদৃষ্টি বুঝি মেঘের চাদর আড়াল দিয়ে ;
ক’নের মুখে মনের সুখে উঠছে ফুটে শ্যামল হাসি,
চাষার প্রাণে মধুর তানে উঠছে বেজে আশার বাঁশী ।
কুহু ও কেকা
বাঁশের বাঁশী বাজায় কে আজ? কোন্ সে রাখাল মাঠের বাটে ?
অগাধ ঘাসে দাড়িয়ে গাভী ঘাসের নধর অঙ্গ চাটে ।
আজ দোপাটির বাহার দেখে বিজুলী হ’ল বেঙা-পিতল,
কেয়া ফুলের উড়িয়ে ধ্বজা পূবে বাতাস বইছে শীতল।
তখন ও এখন
(রুচিরা)
তখন কেবল ভরিছে গগন নূতন মেঘে,
কদম-কোরক দুলিছে বাদ-বাতাস লেগে ;
বনান্তরের আসিতেছে বাস মধুর মৃছ,
ছড়ায় বাতাস বরিষা-নারীর মুখের সীধু,
তখন কাহার আঁচলে গােপন যূথীর মালা
মধুর মধুর ছড়াইত বাস-কে সেই বালা?
বিপাশ হিয়ার বিনাইত ফাঁস অলক রাশে,
সুদূর সুদূর স্মৃতিখানি তার হিয়ায় ভাসে।
৬০
এখন বিভায় মহামহিমায় আকাশ ভরা,
শরৎ এখন করিছে শাসন বিপুল ধরা
এখন তাহায় চেনা হবে দায় নূতন বেশে,
তরুণ কুমার কোলে আজি তার হাসায় হেসে
কুহু ও কেকা
লুকাও লুকাও লালসা-বিলাস লুকাও ধরা,
বাসর রাতির সাথীটিসে আর না স্থায় ধরা ;
এখন কমল মেলিতেছে দল সলিল মাঝে,
বিলােল চপল বিজুলি এখন লুকায় লাজে।
কিশোের প্রাণের কোথা সে ফেনিল প্রেমের পাঁতি,
কোথায় গাে সেই নব বয়সের নূতন সাথী ;
বিলাস-লীলায় দেখে না সে আর বারেক চাহি,
খেলার পুতুল কোথা পড়ে ?—আজ খবর নাহি ।
পুতুল পরাণ পেয়েছে গাে তার সােহাগ পেয়ে,
নূতন আলােক প্রকাশিছেতাই আনন ছেয়ে !
নুতন দিনের মাঝে পুরাতন লুকায় হেসে,
নূতন দুয়ার দেউলে ফুটাও নিশির শেষে।
“ওগাে”
কিছু বলে ডাকিনেকো তারে,
ডাকতে হলে বলি কেবল ‘ওগাে !
ডাকি তারে হাজারাে দরকারে
জীবন-রণে সেই জেনারল টোগে!!
সন্ধি এবং বিগ্রহেরি মাঝে
মুহুর্মুহু চাই তারে সব কাজে ;
কুহু ও কেক
ডাতে কিন্তু বাধছে সখােধনে,-
ডাকতে গিয়ে এগিয়ে দেখি-No Go
লজ্জা কেমন জোগায় এসে মনে
তাইতাে তারে ডাকি সেরেফ ওগো!
ছলে ছুতায় ডাছি সকাল থেকে
‘চাবিটা কই ? কাগজগুলাে?—ওগাে !
‘পানের ডিবে ?—কোথায় গেলে রেখে ?
হাঁক ডাকেতে ডাকাত আমি রােঘাে।
টাতে সদাই চাই গাে তারে প্রাণে
শব্দ খুঁজে পাইনে অভিধানে,
ভাষার পুজি শূন্য একেবারে,
টাকশালে তার হয় না নূতন যােগও;
মনগড়া নাম চাইরে দিতে তারে,
শেষ-বরাবর কিন্তু বলি ওগাে ।
বলব ভাবি ‘প্রিয়া প্রাণেশ্বরী’
ছেড়ে দিয়ে শুছ ? ‘ওগাে ? ‘হাঁগাে’ ;
বলতে গিয়ে লজ্জাতে হায় মরি
ও সােধন ওদের মানায় নাকো।
ওসব ফেন নেহাৎ থিয়েটারী
যাত্রা-দলের গন্ধ ওতে ভারি,
৭১
কুহু ও কেকা
-
‘ডিয়ার’টাও একটু ইয়ার-ঘেঁষা,
‘পিয়ারা’ সে করবে ওদের খাটো,-
এর তুলনায় ‘ওগাে’ আমার খাসা,
যদিও,মানি—একটু ঈষৎ মাঠো।
ঈষৎ মাঠো এবং ঈষৎ মিঠে
এই আমাদের অনেক দিনের ‘ওগাে’
চাষের ভাতে সদ্য ঘিয়ের ছিটে
মন কাড়িবার মস্ত বড় Rogue ও!
ফুল-শেযে সেই ‘মুখে-মুখের’ ‘ওগাে !”
রােগের শােকের দুঃখ-সুখের ‘ওগাে!
সব বয়সের সকল রসে ঘেরা,
নয় সে মােটেই একপেশে একচোখাে
বাংলা ভাষা সকল ভাষার সেরা
মিগ্ধ মধুর ডাকের সেরা ‘ওগাে’ ।
কাশ ফুল
হােথা
বরষার ঘন-যবনিকা খানি
সহসা গিয়েছে খুলি’,
ঘাসের সায়র ফেনিল করেছে
কাশের মুকুলগুলি।
হেথা
१२
ওই
ভূলি সমতুল শাদা কাশ ফুল
আলাে করে আছে ধূলি,
শারদ জোছনা অমল করিতে
ধরণী ধরেছে তুলি!
যেন
যেন
রাতারাতি সুধা-ধবলিত
করি’ দিবে গাে কাজল মেঘে,
গােপনে স্বপনে তুলি লাখে লাখ
সহসা উঠেছে জেগে ।
তাই
কিছুরাখিবে না পাংশু ধূসর
কিছু রাখিবে না রুখু,
আকাশের চাঁদে বুলাইতে চায়
আপনার রং টুকু!
তারা
তাই
বাতাসের বুকে বুলিছে ধরার
ধৃত-তুলি অঙ্গুলি,
জোছনায় রং ফলাইতে চায়
কাশের ক্ষুদ্র তুলি!
ওগাে
কুহু ও কেকা
জোনাকী
ওই
ও যে
আজ
একটি দু’টি পাতার পরে
একটু’মৃদু আলাে,
দেখতে ভারি নুতন,ওরে—
কেমন লাগে ভালাে ।
আয় জোনাকী বুকটি ভরে
একটু নিয়ে আলাে,
আঁধার রাতি বাদল সাথী
চাদের ভাতি কালো।
যেটুকু তাের দেবার আছে
দিয়ে দে তুই আজ,
তারার মত নাই বা হ’ল,-
তাতেই বা কি লাজ ?
ছােট ?-সে তো ভালই আরো
ছােট বলেই মান ;
দুঃখীজনের ভিক্ষা মুঠি,
দানের সেরা দান !
থাক্ না তারা তপন শশী
থাক না যত আলাে,-
তাদের মােরা করব পূজা,
বাঘ তােরেই ভালাে।
७म
৭৪
D
ফুল-সাঞি
মনে যে সব ইচ্ছা আছে
পূরবে না সে তােমায় দিয়ে,
তাইতে প্রিয়ে। মন করেছি
আরেকটিবার করব বিয়ে।
হাছ কিও? ভাছ মিছে ?
মিথ্যা নয় গাে মিথ্যা নয় ;
মন যা বলে শুতে হবে,
মনের নাম যে মহাশয়।
মন বলেছে ‘বিয়ে কর
কাজেই হবে করতে বিয়ে ;-
এবার কিন্তু ফুলের সঙ্গে,
চছে না আর মানুষ নিয়ে ;
মনের কথা মনই জানে ;
লুকিয়ে কি ফল তােমার কাছে ?
মন সে বড় কেও-কেটা নয়
মনের নিজের মর্জি আছে।
৭৫
;
মন বলেছে বালে ভাল
পুড়তে হবে এক চিতাতে
মৃত্যু আমায় করলে দাবী
মরতে তুমি পারবে সাথে?
পারই যদি ;—তাতেই বা কি?
আইন তােমায় বাঁধবে, প্রিয়ে।
কাজেই দেখ,—যা বলেছি
চলবে নাকো তােমায় দিয়ে।
এবার বিয়ে ফুলের কুলে, .
জ্যোৎস্না-ধারায় অঙ্গ ধুয়ে,
হ’ক সে চাপা কিম্বা গােলাপ
আপত্তি নেই বকুল জুয়ে।
আন্-ঘরে কিশাের কুঁড়ি
মনের গােপন পাজী দেখে,
বাঁদৗর মত আব বেছে
বনের বান্দা-বাজার থেকে।
সােহাগ দিয়ে রাখব ঘিরে,
ঢাব কভু প্রাণের নীড়ে,
৭৬
কুহু ও কেকা
ইচ্ছা হলে তুস্থ শিরে,
ইচ্ছা হলে ফেব্ব ছিড়ে।
।।
মর্জি হলে হাজারটিকে
পরব গলায় গেঁথে মালা,
ঝগড়াঝাটির নেই শঙ্কা
সতীন-কাটার নেইক জ্বালা।
নেইক দ্বন্দ্ব দু’ইচ্ছাতে,
নেইক লােকের নিন্দাভয়।
-হাচ্ছ ? হাস। কিন্তু প্রিয়ে
করব বিয়ে সুনিশ্চয়।
ফুল-সাঞি যে ফকির আছে
ফুলকে তারা ভালবাসে,
তাদের ধারা ধরব এবার,
থাক্ব মগন ফুলের বাসে।
থাক্ ডুবে অগাধ রূপে
কুরূপ কাটা দেখব নাকো ;
ফুল নিয়ে ঘর করব এবার
তােমরা সবাই সুখে থাকো।
৭৭
তার পরে দিন আসবে যখন
মরতে আমি পারব সুখে,
ইতস্ততঃ করবে না ফুল
থাকতে এক শবের বুকে।
ফুল সে আমার সঙ্গে যাবে-
পুড়ব মােরা এক চিতাতে;
দেখি তােরা দেখি সবাই
যেতে সে ঠিক পারবে সাথে।
ভেবেছিলাম প্রথম প্রিয়ে ।
তােমায় এসব বদ্ব নাকো,
লুকিয়ে করে আব বিয়ে
লুকিয়ে হবে সাতটি পাকও।
কিন্তু ছাপা রইল না, হায় ;
মনের কথা—গােপন অতি
বেরিয়ে গেল কথায় কথায়,
কথায় বলে মন-না-মতি।
মনের ভিতর মর্জি আছেন
নবাবী তাঁর অনেক রকম,
৭
কুহু ও কেকা
।
ফুল-শিৰ্ণি
( মুসলমান সাহিত্যিকবৃন্দের অভ্যর্থনার জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ-কর্তৃক
আহুত সভায় কোজাগর পূর্ণিমায় পঠিত।)
গুগগুলু আর গুলাবের বাস
মিলাও ধূপের ধূমে!
সত্যপীরের প্রচার প্রথমে ,
মােদেরি বঙ্গভূমে।
পূর্ণিমা রাতি! পূর্ণ করিয়া
দাও গাে হৃদয় প্রাণ ;
সত্যপীরের হুকুমে মিলেছে
হিন্দু মুসলমান!
পীর পুরাতন,নূর নারায়ণ,
সত্য সে সনাতন ;
হিন্দু মুসলমানের মিলনে
তিনি প্রসন্ন হন্।
তারি ইশারায় মিলিয়াছি মােরা
হৃদয়ে জ্যোত্ম জ্বালি’;
তাহারি পূজায় সাজায়ে এনেছি
ফুল-শিৰ্ণির ডালি।
১২
কুহু ও কেকা
বাঙালীর কবি গাহিছে জগতে মহামিলনের গান,
বিফল নহে এবাঙালী জনম বিফল নহে এ প্রাণ।
ভবিষ্যতের পানে মােরা চাই আশা-ভরা আদে,
বিধাতার কাজ সাধিবে বাঙালী ধাতার আশর্বাদে।
বেতালের মুখে প্রশ্ন যে ছিল আমরা নিয়েছি কেড়ে,
জবাব দিয়েছি জগতের আগে ভাবনা ও ভয় ছেড়ে ;
বাঁচিয়া গিয়েছি সত্যের লাগি’ সৰ্ব্ব করিয়া পণ,
সত্যে প্রণমি থেমেছে মনের অকারণ স্পন্দন।
সাধনা ফলেছে, প্রাণ পাওয়া গেছে জগৎ-প্রাণের হাটে,
সাগরের হাওয়া নিয়ে নিশ্বাসে গম্ভীরা নিশি কাটে ;
শ্মশানের বুকে আমরা রােপণ করেছি পঞ্চবটী,
তাহারি ছায়ায় আমরা মিলাতের শতকোটি।
মণি অতুলন ছিল যে গােপন সৃজনের শতদলে,
ভবিষ্যতের অমর সে বীজ আমাদেরি করতলে ;
অতীতে যাহার হয়েছে সূচনা সে ঘটনা হবে হবে,
বিধাতার বরে ভরিবে ভুবন বাঙালীর গৌরবে।
প্রতিভায় তপে সে ঘটনা হবে, লাগিবে না তার বেশী,
লাগিবে না তাহে বাহুবল কিবা জাগিবে না দ্বেষাদ্বেষি ;
মিলনের মহামন্ত্রে মানবে দীক্ষিত করি’ ধীরে—
মুক্ত হইব দেব-ঋণে মােরা মুক্তবেণীর তীরে।
১৬১
১১
কুহু ও কেক
মনের কথা বলে খুলে
টিটকারী সে করবে জখম।
লুপ্ত যুগের অস্থিগুলাে
গুপ্ত আছে মনের ভিতে,
সভ্যতার এই সৌধতলেই,
বর্তমান এই শতাব্দীতে।
তাই মগজের পােড় কোঠায়
অন্ধকারে ঘুরছে চাবী,
বসছে উঠে গঙ্গাযাত্রী ;-
সহমরণ করছি দাবী।
বাঁচন এই যে সম্প্রতি মন
মগন আছে ফুলের রূপে,
নইলে কিযে ঘটত বিপদ!
বলব তাহা তােমায় চুপে ?
মরণ-দায়ে গেছ বেঁচে;
পালাও প্রিয়ে প্রাণটা নিয়ে ;
ফুল-সাঞিদের মতন আমি
ফুলকে এবার করব বিয়ে।
৭১
কুহু ও কেকা
জবা
আমারে লইয়া খুসী হও তুমি
ওগাে দেবী শবাসনা!
আর খুঁজিয়ােনা মানব-শােণিত
আর তুমি খুজিয়ােনা।
আর মানুষের হৃ-পিণ্ডটা
নিয়ােনা খঙ্গে ছিড়ে,
হাহাকার তুমি তুলােনা গাে আর
সুখের নিভৃত নীড়ে।
এই দেখ আমি উঠেছি ফুটিয়া
উজলি’ পুষ্প-সভা,
ব্যথিত ধরার হৃৎপিণ্ড গাে-
আমি সে রক্তজবা।
তােমার চরণে নিবেদিত আমি
আমি সে তােমার বলি,
• দৃষ্টি-ভােগের রাঙা খপরে
রক্ত-কলিজা কলি।
be
কুহু ও কেকা
আমারে লইয়া খুসী হও ওগাে !
নম দেবী নম নম,
ধরার অর্ঘ্য করিয়া গ্রহণ
ধরার শিশুরে ক্ষম।
ছায়াচ্ছন্ন
ছিন্ন ছায়া ঘনিয়ে এল
ঘুমে নয়ন আলা,
ঘুমাক আহা ঘুমাক তবে
বালা;
হাওয়ার ভরে যায় পরীরা,
ঢেউয়ের ফণায় নিল হীরা,
জড়িয়ে গেল ললাট ঘিরে
নিকুসুমের মালা ।
ঘুমা আহা ঘুমাক তবে
বালা।
তােলে নি আজ বৈকালী ফুল,
ভরে নি আজ থালা,
ছায়ায় ছাওয়া রূপের রসের
ডালা ;
৮১
কুহু ও কেকা গন্ধ তৃণের গহন ঘাসে শিউলি কুঁড়ি ঝিমিয়ে আসে, তন্দ্রা-ভারে পড়ল ভেরে । আঁধারে ডালপালা ! ঘুমা আহা ঘুমাক তবে বালা। শিয়রে থােও সােনার কাঠি সন্ধ্যা-মেঘে ঢালা, খণ্ড চঁাদের দীপখানি হােক জ্বালা ; হাওয়ার মুখে নাই কোনাে বাে- অশথ পাতায় দেয় না সে দোল, আঁধার শুধু কোল ভরেছে, হিমে শীতল-কালা! ঘুমা আহা ঘুমাক্ তবে বালা শুনবে না সে আজ ঝিঝিদের রাত্রি ব্যাপী পালা, দেখবে না গাে বনে জোনাক- জ্বালা ; ৮২
কুহু ও কেক
পর্দাখানি দাও গাে টানি
ঘুমিয়ে গেছে আলাের রাণী,
লুপ্ত-শিখা সােনার প্রদীপ
মৃত্যু-ভুবন আলা
ঘুমিয়ে গেছে ঘুমিয়ে গেছে
বালা।
সৎকারান্তে
রেখে এলাম এলা-যাবার পথের মােড়ে ;
সেই কথাটি জানাই প্রভু! করজোড়ে !
নেহাৎ শিশু নয় সেয়ানা,
অচেনা তার মােল আনা
ভয় যদি পায় নিয়ে তুলে অভয় ক্রোড়ে,
প্রভু আমার ! এলা-চলা পথের মােড়ে।
তােমার পায়ে সঁপে দিয়ে—নির্ভাবনা
নইলে প্রভু! সইত কভু যম-যাতনা ?
যম—নিয়মের ভৃত্য তােমার,
চিতার শিখা অঙ্গুলি তার,
সেই আঙুলে নেয় সে চুনি’ রত্ন-কণা ;
তােমার হাতে সঁপে সে হয় নির্ভাবনা।
-
কুহু ও কেকা
•
সপে গেলাম প্রভু! তােমার চরণ-ছায়ে,
মুক্ত হলাম তােমার দয়ায় সকল দায়ে
ফিরিয়ে তােমার গচ্ছিত ধন
হাল্কা হয়ে গেল জীবন,
মায়ের বুকের রত্ন দিলাম বিশ্ব-মায়ে,
ওগাে প্রভু! সঁপে গেলাম তােমার পায়ে।
•
রেখে গেলাম তুমি-দোসর পথের মােড়ে,
সেই কথাটি জানাই তােমায় করজোড়ে
জানি তুমি নেবেই কোলে,
তবু তােমায় যাচ্ছি বলে,
বিশ্বমায়ে বছি,অবােধ,—নিতে ওরে ;-
দাড়িয়ে তােমার যম-জাঙালের বক্র মােড়ে।
ছিন্ন মুকুল
সব চেয়ে যে ছােটো পীড়ি খানি
সেই খানি আর কেউ রাখে না পেতে,
ছােটো থালায় হয় নাকো ভাত বাড়া,
জল ভরে না ছােট্টো গেলাসেতে;
৪
কুহু ও কেকা
বাড়ীর মধ্যে সব চেয়ে যে ছােটো
খাবার বেলায় কেউ ডাকে না তাকে,
সব চেয়ে যে শৈষে এসেছিল
তারি খাওয়া ঘুচেছে সব আগে।
সব চেয়ে যে অল্পে ছিল খুসী,
খুসী ছিল ঘেঁষাঘেঁষির ঘরে,
সেই গেছে, হায়, হাওয়ার সঙ্গে মিশে
দিয়ে গেছে জায়গা খালি করে ;
ছেড়ে গেছে, পুতুল, পুঁতির মালা,
ছেড়ে গেছে মায়ের কোলের দাবী,
ভয়-তরাসে ছিল যে সব চেয়ে
সেই খুলেছে আঁধার ঘরের চাবী।
চলে গেছে এক চুপে চুপে,
দিনের আলাে গেছে আঁধার করে ;
যাবার বেলা টের পেলে না কেহ
পারলে না কেউ রাখতে তারে ধরে।
চলে গেল,—পড়তে চোখের পাতা,
বিসর্জনের বাজনা শুনে বুঝি ?
হারিয়ে গেল অজানাদের ভিড়ে,
হারিয়ে গেল,—পেলাম না আর খুঁজি।
৮৫
কুহু ও কেকা
হারিয়ে গেছে হারিয়ে গেছে, ওরে!
হারিয়ে গেছে বােবলা সেই বাঁশী,
হারিয়ে গেছে কচি সে মুখখানি
দুধে-ঘােয় কচি দাঁতের হাসি।
আঁচল খুলে হঠাৎ স্রোতের জলে,
ভেসে গেছে শিউলি ফুলের রাশি,
ঢুকেছে হায় শ্মশান ঘরের মাঝে
ঘর ছেড়ে তাই হৃদয় শ্মশান-বাসী।
সব চেয়ে যে ছােটো কাপড়গুলি
সে গুলি কেউ দেয় না মেলে ছাদে,
যে শয্যাটি সবার চেয়ে ছােটো
আকে সেটি শূন্য পড়ে কাদে ;
সব চেয়ে যে শেষে এসেছিল
সেই গিয়েছে সবার আগে স’রে,
ছােট্ট যে জন ছিল রে সব চেয়ে
সেই দিয়েছে সকল শূন্য করে।
কুহু ও কেক।
ভূই পা।
দিনের আলােয় লাগল রে নীল তন্দ্রা-লেখা !
নিবিড় সুখে কী কৌতুকে বাল কেকা !
রসিয়ে রবি-রশ্মি হােথা
পূবে হাওয়ার বইল সেতা,
পাতাল-ঘরের নাগিনী ওই বাইরে একা ।
আজ
কৌতূহলী কেকাধ্বনি মূৰ্ত্তি ধরে!
ফুটল সে ভূই চাপা হয়ে মাটির পরে ।
বিস্ময়েরি বােক্ বেজেছে,
বিনা-ডালেই ফুল সেজেছে !-
লুপ্ত গাছের গােপন মূলে কী মন্তরে।
My
শাওল-বরণ শাওলাতে ছায় কোমল মাটি,
মাটির কোলে পাপড়ি মেলে ধূই চাপাটি।
মগন ছিল পাতাল-তলে
জাগল সে আজ কিসের ছলে ?
ঠেল মাথায় বৃষ্টিধারার রূপার কাঠি।
বুঝি
কুহু ও কেকা
বেরিয়েছে তাই পাতালপুরীর রত্ন-কণা !
লক্ষ-ফণা অনন্তেরি একটি ফণা।
আন্ জনমের নষ্ট
মুকুল,
এই দিনের এই ফুটন্ত ফুল,
যুক্ত সে কোন্ গােপন সূতায়-অদর্শনা।
ওগাে
দিনের আলােয় লাগছে আজি তন্দ্রা চোখে,
নিবিড় নীলে ডুবিয়ে নিল স্বপ্নলােকে।
পাতালপুরীর কুণ্ড হতে
অমৃত কে বহায় স্রোতে !
ওগাে জন্ম-মরণ যুক্ত করে ফুটুল ও কে!
আজকে খালি ফিরে-পাওয়ার বইছে হাওয়া !
নেই কিছু নেই চিরতরেই হারিয়ে-যাওয়া !
হারাণাে ফুল ফুটছে ফিরে
শওল মাটির আঁচল ঘিরে।
ওই মূলের ঘরে মিল যে আছেই—যাবেই পাওয়া ।
কুহু ও কেক। ধুলি জীবনের লীলাক্ষেত্র পুণ্য ধরাতল, প্রতি ধূলিকণা তার পবিত্ৰ নিৰ্ম্মল। মানবের হর্ষ, ব্যথা, মানবের প্রীতি, মানবের আশা, ভয়, সাধনার স্মৃতি, স্পন্দিত করিছে তার প্রত্যেক অণুরে নিত্য নিশিদিনমান; অবিশ্রাম সুরে উঠিছে গুঞ্জন গান অশ্রুত-মধুর- অতীতের প্রতিধ্বনি বিস্মৃত সুদূর! এই যে পথের ধূলি উড়ায় বাতাস মহামানবের ইহা মৌন ইতিহাস ; তীর্থময় মলােক ; প্রতি রেণু তার আনন্দ-গদগদ চির অশ্রু-পারাবার। মাটি এই যে মাটি—এই যে মিঠা—এই যে চির-চমৎকার, চরণে লীন এই যে মলিন-এই যে আধার নিরাধার, এই মাটি গাে এই পৃথিবী—এই যে তৃণ-গুল্মময়, তারার হাটে মাটির ভাটা,—তাই বলে এ তুচ্ছ নয়।
কুহু ও কেকা
মাটি তত নয়জীবন-কাঠি,-কণায় কণায় জীবন তার,
মাটির মাঝে প্রাণের খেলা,—মাটিই প্রাণের পারাবার !
মাটি তাে নয়—মায়ামুকুর—একপিঠে তার লীলার খেল,
আরেকটি দিক অন্ধ-অসাড়, রশ্মিঘাতে অনুম্বেল।
মাটিই আবার মরণ-কাঠি, মাটির কোলে উদয়-লয়,
যে মাটিতে ভাড় গড়ে রে তেই মানুষ মানুষ হয় !
মাটির মাঝে যা’ আছে গাে সূৰ্যেও তার অধিক নেই,
তড়িৎ-সূতার লাটাই মাটি, জীবন-ধারার আধার সেই !
গঙ্গার প্রতি
সঞ্জীবিয়া উভতীর, সঞ্চারিয়া শ্যাম-শস্য-হাসি,
তরঙ্গে সঙ্গীত তুলি’ ছড়াইছ ফেন-পুষ্প-রাশি
অয়ি সুরধুনী-ধারা ! অমােঘ তােমার আশীর্বাদ।
পালিছ সংসার তুমি লােকপাল-বিষ্ণুর-প্রসাদ !
•
রিক্ত ছিল মহী, তারে তব বর করিল উৰ্ব্বর,
কৃতজ্ঞ মানব তাই কীৰ্ত্তি তাের গাহে নিরন্তর
যুগে যুগে ওঠে তাই তােরে ঘিরি’ বেদ-মন্ত্র-গাথা,
ব্ৰহ্ম-কমণ্ডলু-ধারা ! সৰ্ব্বতীর্থময়ী তুমি মাতা!
কুহু ও কেকা
তােরে ঘিরি উর্বরতা, তােরে ঘিরি’ স্তব-উপাসনা,
তােরে ঘিরি’ চিতানল উদ্ধারের খসিছে কামনা ;-
তীরে তীরে প্রেতভূমে ; অয়ি রুদ্র-জটা-নিবাসিনী।
শবেরে করিছ শিব তুমি দেবী অশিব-নাশিনী।
অমল পরশ তাের, বড় স্নিগ্ধ মাগাে তাের কোল,
অন্তকালে ক্লান্ত ভালে বুলাও গাে অমৃত হিল্লোল।
কত জননীর নিধি সঞ্চিত রয়েছে ওই বুকে ;
তােরে সঁপি পুত্রকন্যা, তােরি কোলে ঘুমাইবে সুখে
একদিন তারা সবে ; দেহভার বহে প্রতীক্ষায় ;
আত্মার মিলন স্বর্গে, তাের জলে কায়ে মিলে কায়,
ভস্ম মিলে ভস্ম সনে,-এ মিলন প্রত্যক্ষ সাকার !
যুগে যুগে আমাদের মিলনের তুমি মা আধার।
পৰ্ব্ব রচি তাই মােরা তরি তীরে মিলি বারম্বার,
পরশি তােমারে—অয়ি পিতৃ-পুরুষের-ভস্মাধার!
চক্ষে হেরি শূদ্র দ্বিজ সকলের মিলিত সমাধি,
অয়ি গঙ্গা ভাগীরথী! ভারতের অন্ত, মধ্য, আদি।
১১
কুহু ও কেকা শােণ নদের প্রতি সৈকত-শয্যার পরে সুবিশাল বাহু যেন কার সূচনা করিয়া শুভ ঘুরিয়া উঠিছে বারবার বলদৃপ্ত, কাঞ্চন-বরণ। হে হিরণ্য-বাহু নদ- কোন্ দেবতার তুমি বাহু ? কত ঋদ্ধ জনপদ, কত গ্রাম, কত ক্ষেত্র—সম্পদে দিয়েছ তুমি ভরি’ ; দিয়েছ—দিতেছ আরাে ; নাহি জানি কত কাল ধরি। ; প্রাচীন পাটলিপুত্র—পােষ্য প্রতিপাল্য সে তােমার, মৌৰ্য্যমণি চন্দ্রগুপ্ত গ্রীকরাণী অঙ্কে দিল যার, মৌৰ্য্যবংশ স্থাপয়িতা ; যে বংশের প্রতাপে মলিন সূৰ্য্যবংশধৰ্ম্মাশােক যাহারে পালিল বহুদিন জগতের শ্রেষ্ঠ রাজা। ওগাে শােণ! তােমারি শােণিতে পুষ্ট সে গােবিসিংহ;—গুরু নামে খ্যাত অবনীতে। ওগাে শােণ ! স্বর্ণবাহু! অতীতের মুকুটের সােনা । তােমার ও উৰ্ম্মিজাল—গৌরবের স্বর্ণ-জরি-বােনা। ৯২
কুহু ও কেকা
বারাণসী
;
যাত্রীরা সবে বলিয়া উঠিল—দেখা যায় বারাণসী।
চমকি চাহিনু,—স্বর্গ-সুষমা মর্তে পড়েছে খসি’!
এ পারে সবুজবজুড়ার ক্ষেত, ও পারে পুণ্যপুরী,
দেবের টোপর দেউলে দেউলে কাঁপিছে কিরণ-ঝুরি ;
শারদ দিনের কনক-আলােকে কিবা ছবি ঝলমল,
অযুত যুগের পূজা-উপচার,
-হেম-চম্পকদল !
আধ-চাদখানি রচনা করিয়া গঙ্গা রয়েছে মাঝে,
মেহ-সুশীতল হাওয়াটি লাগায় তপ্ত দিনের কাজে।
জয় জয় বারাণসী।
হিন্দুর হৃদি-গগনের তুমি চির-উজ্জল শশী ।
অগ্নিহােত্রী মিলেছে হেথায় ব্রহ্মবিদের সাথে,
বেদের জ্যোৎস্না-নিশি মিশে গেছে উপনিষদের প্রাতে;
এই সেই কাশী ব্ৰহ্মদত্ত রাজা ছিল এইখানে,
খ্যাত যার নাম শাক্যমুনির জাতকে, গাথায়, গানে
যার রাজত্ব-সময়ে বুদ্ধ জন্মিল বারবার
ন্যায়-ধর্মের মর্যাদা প্রেমে করিতে সমুদ্ধার।
এই সেই কাশী-ভারতবাসীর হৃদয়ের রাজধানী,
এই বারাণসী জাগ্রত-চোখে স্বপন মিলায় আনি’!
-
কুহু ও কেকা
এই পথ দিয়া ভীষ্ম গেছেন ভারত-ধুরন্ধর,-
-কাশী-নরেশের কন্যারা যবে হইল স্বয়ম্বর।
সত্য পালিতে হরিশ্চন্দ্র এই কাশীধামে, হায়,
পুত্র জায়ায় বিক্রয় করি’ বিকাইল আপনায়।
তেজের মূৰ্ত্তি বিশ্বামিত্র সাধনায় করি’ জয়
হেথা লভিলেন তিনটি বিদ্যা, সৃষ্টি, পালন, লয় ;
বিদ্যায় যিনি জ্যোতির পুঞ্জ করিলেন সমাহার,
নূতন
স্বর্গ করিলেন যিনি আপনি আবিষ্কার।
শুদ্ধোদনের স্নেহের দুলাল ত্যজিয়া সিংহাসন
করুণা-ধৰ্ম্ম হেথায় প্রথম করিল প্রবর্তন।
এই বারাণসী কোশল দেবীর বিবাহের যৌতুক,
দেখিতেছি যেন বিম্বিসারের বিস্মিত স্মিতসুখ ।
নৃপতি অশােকে দেখিতেছি চোখে বিহারের পইঠায়,
শ্ৰমণগণের আশীৰ্বচনে প্রাণ মন উথলায়।
সমুখে হাজার স্থপতি মিলিয়া গড়িছে বিরাট স্তুপ,
শত ভাস্কর রচে বুদ্ধের শত জনমের রূপ।
চিক্কণ চারু শিলার ললাটে লিখিছে শিল্পজীবী
ধৰ্ম্মাশােকের মৈত্রীকরুণ অনুশাসনের লিপি।
মহাচীন হ’তে ভক্ত এসেছে মৃগদাব-সারনাথে,
শুপের গাত্র চিত্র করিছে সূক্ষ্ম সােনার পাতে।
জয়! জয়! জয় কাশী।
তুমি এসিয়ার হৃদয়-কেন্দ্র,—মূর্ত ভকতি রাশি।
৯৪
কুহু ও কেকা
এই কাশীধামে ভক্ত তুলসী লিখেছেন রামকথা,-
ভকতি যাহার অপ্রমত্ত প্রভুপদে সংযতা।
এই কাশীধামে জোলাদের ছেলে কবীর রচিল গান,
যাহার দোহায় মিলেছিল দুহু হিন্দু মুসলমান।
এই কাশীধামে বাঙালীর রাজা মরেছে প্রতাপরায়,
যার সাধনায় নবীন জীবন জেগেছিল বাংলায়।
মৃত্যু হেথায় অমৃতের সেতু, শব নাই—শুধু শিব ।
মনে লয় মাের হেথা একদিন মিলিবে নিখিল জীব
আত্মার সাথে হবে আত্মার নবীন আত্মীয়ত,
মিলন-ধৰ্মী মানুষ মিলিবে ; এ নহে স্বপ্নকথা।
জয় কাশী ! জয় ! জয় !
সারা জগতের ভকতি-কেন্দ্র হবে তুমি নিশ্চয়।
;
স্ফটিক শিলার বিপুল বিলাস মাত্র নই তাে তুমি,
আমি জানি তুমি আনন্দ-ধাম ছুঁয়ে আছ মরভূমি ;
আমি জানি তুমি ঢাকিয়াছ হাসি কুটির মসীলেপে,
অমৃত-পাত্র লুকায়ে রেখেছ সময় হয়নি ভেবে ;
তৃষিত জগত খুঁজিতেছে পথ, ডেকে লও, বারাণসী!
পথিকের প্রীতে প্রদীপ জ্বালিয়া কেন আছ দূরে বসি’
মধু-বিদ্যায় বিশ্বমানবে দীক্ষিত কর আজ,
ঘুচাও বিবােধ, দম্ভ ও ক্রোধ, ক্ষতি, ক্ষোভ, ভয়, লাজ।
•
কুহু ও
ও কেকা
সার্থক হােক সকল মানব, জয়ী হােক ভালবাসা,
সঙস্কারের পাষাণ-গুহায় পচুক কৰ্মনাশা।
ব্যাসের প্রয়াস ব্যর্থ সে কভু হবেনাশে একেবারে
সবারেই দিতে হবে গাে মুকতি এ বিপুল সংসারে।
তুমি কি কখনন করিতে পার গাে শুচি অশুচির ভেদ?
তুমি যে জেনেছ চরাচর ব্যাপী চির জনমের বেদ।
স্তম্ব হইতে ব্ৰহ্ম অবধি অভেদ বলেছ তুমি,
ভেদের গণ্ডী তুমি রাখিয়াে না, অয়ি বারাণসী ভূমি!
ঘােষণা করেছ আশ্রয়ে তব ক্ষুধিত রবে না কেহ;-
প্রাণের অন্ন দিবে না কি হয় ? কেবলি পুষিবে দেহ ?
দাও সুধা দাও, পরাণের ক্ষুধা চির-নিবৃত্ত হােক,
বিশ্বনাথের আকাশের তলে মিলুক সকল লােক।
অখিল জনের হৃদয়ে রাজ্য কর তুমি বিস্তার,
সকল নদীর সকল হৃদির হও তুমি পারাবার।
পর যে মন্ত্রে আপনার হয় সে মন্ত্র তুমি জাননা,
বিমুখ বিরূপ জগত-জনেরে মুগ্ধ করিয়া আনাে ;
বিচিত্র মালা কর বিরচন নানা বরণের ফুলে,
অবিরােধে লােক সার্থক হােক পাশাপাশি মিলেজুলে;
দূর ভবিষ্য নিখিল বিশ্ব যে ধনের আশা করে
তুমি বিতরিয়া দাও সে অমৃত জগত জনের করে।
জয়! বারাণসী জয় ।
অভেদ মন্ত্রে জয় কর তুমি জগতের সংশয়।
কুহু ও কেকা
হিমালয়াক
নম নম হিমালয় ।
গিরিরাজ-তুমি, মানচিত্রের মসীর চিহ্র নয় !
বৰ্মা-মেঘের মত গম্ভীর।
দিগবারণের বিপুল শরীর।
অবাধ বাতাস বাধ্য তােমার, তােমারে সে করে ভয়।
নম নম হিমালয় ।
নম নম গিরিরাজ
অযুত ঝােরার মুক্তাঝুরিতে উজ্জ্বল তব সাজ ;
সূত্রবিহীন কুসুমের হার
উল্লাসে শােভে উরসে তােমার ;
মৃদু-পর্ণিকা করিছে অঙ্গে পত্র-রচনা কাজ !
নম নম গিরিরাজ ।
নম মহামহীয়া!
নতশিরে যত গিরি-সামন্ত সম্মান করে দান।
গুহার গৃঢ়তা, ভৃগুর ভ্রুকুটি,
তােমাতে রয়েছে পাশাপাশি ফুটি,
ভীম অৰ্বদ, ভীষণ তুষার গাহিছে প্রলয় গান!
নম মহামহীয়ান।
কুহু ও কেকা
নম নম গিরিবর।
স্থির-তরঙ্গ-ভঙ্গিমাময় দ্বিতীয় রত্নাকর।
শিখরে শিখরে, শিলায় শিলায়,
চপল-চমরী-পুচ্ছ-লীলায়,
সাগর-ফেনের মত সাদা মেঘ নাচিছে নিরন্তর।
নম নম গিরিবর।
নম নম হিমবান্।
মৌনে শুনিছ বিশ্ব-জনের দুঃখ-সুখের গান ;
নিখিল জীবের মঙ্গল-ভার
নিজ মস্তকে বহ অনিবার,
চির-অক্ষয় তুষার তােমার শত চূড়ে শােভমান ;
নম নম হিমবান।
নম নম ধরাধর।
নাগবেণী আর সরল শালেতে মণ্ডিত কলেবর ;
মেঘ উত্তরী’, তুষার কিরীট,
ছত্র আকাশ, ধরা পাদপীঠ
তুমি লভিয়াছ মৃত্যু-ভুবনে চির-অমরতবর!
নম নম ধরাধর।
•
কুহু ও কেকা
নম নম হিমাচল।
কত তপস্বী তব আশ্রয়ে পেয়েছে কাম্যফল ;
সােরে দেছ তুমি নব আনন্দ,
মহামহিমার বিশাল ছন্দ
তােমারে হেরিয়া পরাণ ভরিয়া উছলিছে অবিরল।
নম নম হিমাচল।
অতীত-সাক্ষী নম ।
ক্ষুদ্র কবির ক্ষীণ কল্পনা অক্ষম ভাষা ক্ষম ;
বাল্মীকি যার বন্দনা গান,
কালিদাস যার অন্ত না পান,
সেই মহিমার ছবি আঁকিবার দুরাশা ক্ষম হে মম ;
বিশ্ব-পূজিত নম।
কাঞ্চন শৃঙ্গ
=
কোথা গাে সপ্ত ঋষি কোথা আজ ?
কোথায় অরুন্ধতী ?
শিখরে ফুটেছে সােনার পদ্ম,
এস গাে তুলিবে যদি !
কুহু ও কেকা
প্রত্যুষে সে যে ফুটিয়া, প্রদোষে
নিঃশেষে লয় পায়,
সােনার কাহিনী স্মরিতে একটি
পাড়ি না রহে, হায় !
কে জানে কখন অপ্সরাগণ
সে ফুল চয়ন করে,
সােনালি স্বপন লেগে যায় শুধু
নরের নয়ন পরে।
নিত্য প্রভাতে ফাগুয়া তাের
ওগাে কাঞ্চন-গিরি।
দেব-হস্তের কুঙ্কুম ঝরে
নিত্য তােমারে ঘিরি’!
সােনার অতসী সােনার কমলে
নিত্যই ফুল-দোল!
নিত্যই রাস জ্যোৎস্না-বিলাস।
হরষের হিল্লোল।
নিত্য আবার বিভূতি তােমার
ঝরে গাে জটিল শিরে,
ককনে হিম তুষার-প্রপাত
সর্পের মত ফিরে।
কুহু ও কেকা
;-
দিনে তুমি যেন মূৰ্ত জীবন
রজত-শুভ্র-কায়া,
নিশীথেতুমিই ভীষণ পাংশু
মহা-মরণের ছায়া
আঁধারের পটে যখন তােমার
পাণ্ডু ললাট জাগে,
ভয়-বিস্ফীর নয়নে যখন
তারাগণ চেয়ে থাকে।
তুমি উন্নত দেবতার মত,
উদ্ধত তুমি নহ,
নিগূঢ় নীলের নির্মলতায়
বিরাজিছ অহরহ।
দৃষ্টি আমার ধৌত করিছে
রুচির
তুষার তব,
হৃদয় ভরিছে হরষ-জোয়ার
বিস্ময় নব নব!
এ কি গাে ভক্তি ?—বুঝিতে পারি না ;
ভয় এ তাে নয় নয়,
সকল-পরাণ-উথলানাে এ যে
সনাতন পরিচয়।
কুহু ও কেকা
তােমার আড়ালে বাস করি মোরা
তােমার ছায়ায় থাকি,
তােমাতে করেছে স্বর্গ রচনা
মুগ্ধ মােদের আঁখি ;
ভূলােকের হয়ে দুলােক-কেড়ে
স্বলোক আছ চুমি,
অমর-ধামের যাত্রার পথে
দিব্য-শিবির তুমি ।
নম নম নম কাঞ্চন-গিরি।
তােমারে নমস্কার,
তুমি জানাতেছ অমৃতের স্বাদ
অবনীতে অনিবার।
তােমার চরণে বসিয়া আজিকে
তােমারি আশীর্বাদে
সােনার কমল চয়ন করেছি
সপ্ত ঋষির সাথে।
১০২
কুহু ও কেকা
মেঘলােকে
গিরি-হে আজ প্রথম জাগিয়া
আহা কি দেখিনু চোখে,
মর্ত্যলােকের মানুষ এসেছি
জীবন্তে মেঘলােকে।
গিরির পিছনে গিরি উকি মারে
চূড়ায় লঘে চূড়া,
বিন্ধ্যের মত কত পাহাড়ের
গর্ব করিয়া গুড়া !
তারি মাঝেমাঝে এ কি গাে বিরাজে ?
এ কি ছবি অদভুত!
গিরি-উপাধান সামুতে শয়ান
কোন্ যক্ষের দূত ?
চারি দিকে তার তল্পি যত সে
ছড়ানাে ইতস্তত,
পাশ মােড়া দিয়া ঘুমায় রৌদ্রে
ক্লান্ত জনের মত!
কে জানে কাহার কি বারতা লয়ে
চলেছে কাহার কাছে,
বসনের কোণে না জানি গােপনে
কার চিঠিখানি আছে।
কুহু ও কেকা
সে কি যাবে আজ অলকাপুরীতে
ক্রৌঞ্চদুয়ার পথে ?
তুষার ঘটার জটিল জটায়
লঘিয়া কোনাে মতে ?
কূপ, নদী, নদ, সমুদ্র, হ্রদ
যার যাহা দেয় আছে,
সব রাজস্ব সংগ্রহ করে,
পবনের পাছে পাছে
সে কি আসিয়াছে গিরিরাজ-পদে
করিতে সমর্পণ ?
কিবা, তার শুধু কূটজ ফুলের
জীবন বাঁচানাে পণ!
-
রৌদ্র বাড়িল, নিদ্রা ছাড়িয়া
উঠিল মেঘের দল,
শিখরে শিখরে চরণ রাখিয়া
চলিয়াছে টলমল ;
দেখিতে দেখিতে বিশা’য়ের
এই পাষাণ-যজ্ঞশালে
শত বরণের সহ মেঘ
জুটিল অচির কালে!
!
১৪
কুহু•ও কেকা চমরী-পুচ্ছ কটিতে কাহারে। ময়ূরপুচ্ছ শিরে, ধূমল বসন পরিয়া কেহ বা দাড়াইল সভা ঘিরে! সহসা কুহেলি পড়িল টুটিয়া, অমনি সে গরীয়ান্ উদিল বিপুল হৈম মুকুটে গিরিরাজ হিমবান । গগন-গরাসী প্রলয়ের ঢেউ, আদি প্লাবনের স্মৃতি, প্রাচীন দিনের পাগল ছন্দ, উদ্বেল মহাগীতি, মহান্ মনের উচ্ছাস যেন সফল হয়েছে কাজে, আদি কল্পনা রেখেছে নিশানা সৃষ্টি-পুঁথির মাঝে। নীল আকাশের প্রগাঢ় নীলিমা যেন গাে সবলে চিরি’ ধরার পরশ ঠেলিয়া, গগন- ফুড়িয়া উঠেছে গিরি ।
কুহু ও কেক।
একি মহিমার মহান্ বিকাশ!
আকাশের পটে আঁকা,
অ্যালােকে দুলিছে স্বর্গের জ্যোতি
স্বর্গের স্মৃতি মাখা!
নিখিল ধরার উর্ধে বসিয়া .
শাসিছে পালিছে দেশ,
বজ টুটিছে, বিজুলী ছুটিছে,
নাহি ভ্রুক্ষেপ-লেশ!
আজি দলে দলে গিরিসভাতলে
মেঘ জুটিয়াছে যত,
প্রমথনাথরে ঘিরিয়া ফিরিছে
প্রমথ-দলের মত!
নীরবে চলেছে গিরি প্রধানের
সভার কর্মচয়,
সৃজন, পালনবহু আয়ােজন
ওই সভাতলে হয় ;
কোন্ ক্ষেতে কত বরষণ হবে,
কোন্ মেঘ যাবে কোথা,-
সকলের আগে হয় প্রচারিত
ওইখানে সে বারতা ;
১০৬
কুহু ও কেকা
শিখরে শিখরে তুষার-মুকুরে
ঠিকরে কিরণ-আলা,
মুহূর্তে যায় দেশদেশান্তে
গিরির নির্দেশ মালা !
বার্তা বহিয়া শূন্যের পথে
মেঘ ওঠে একে একে,
রৌদ্র ছায়ার চিত্র বসনে
নানা গিরি বন ঢেকে ;
আমি চেয়ে থাকি অবাক নয়নে
বসি’ পাথরের স্তপে,
সৃষ্টিক্রিয়ার মাঝখানে যেন
পশেছি একেলা চুপে!
হাজার নদের বন্যা-স্রোতের
নিরিহ্ যেখানে রয়,
লক্ষ লােকের দুঃখ সুখের
হয় যেথা নির্ণয়,
মেঘেরা যেখানে দূর হতে শুধু
বৃষ্টি মারে না ছুঁড়ে,
পাশাপাশি হাঁটে মানুষের সাথে,
পড়ে থাকে সানু জুড়ে ;
১০৭
কুহু ও কেকা
কখনাে দাড়ায় ভঙ্গী করিয়া
কীৰ্ত্তনিয়ার মত,
কেহ মৃদঙ্গে করে মৃদু ধ্বনি,
কেহ নৰ্ত্তনে রত ।
কখনাে আবার মেঘের বাহিনী
ধরে গােযােদ্ধ, বেশ,
মৃত্যুতে যেন মর্ত-প্রেতের
কলহ হয়নি শেষ!
কৌতুকে মিহি চাদের সূতার
ওড়না ওড়ায় কেহ,
তারি ভারে তবু পলে পলে যেন
ভাঙিয়া পড়িছে দেহ!
আমি বসে আছি এ সবার মাঝে
এই দূর মেঘলােকে,
নিগূঢ় গােপন বিশ্ব-ব্যাপার
নিরখি চৰ্ম্ম-চোখে !
স্বর্গের ছায়া মর্তে পড়েছে,
শান্ত হয়েছে মন,
নয়নে লেগেছে ধ্যানের সুষমা-
দেবতার অঞ্জন ;
১০
কুল ও কেকা
চক্ষে দেখেছি দেবতার দেশ
দূরে গেছে গ্লানি যত,
মেঘেরও উর্দ্ধে করেছি ভ্রমণ
গ্রহ-তারকার মত!
চূড়ামণি
ডুবেছে সকলি, তবু, শীর্ষ জেগে আছে,
জেগে আছে হিমালয় ; সে তত কারাে কাছে
কোনােদিন ভ্রমেও হয়নি অবনত।
শক, হুণ, মােগল, পাঠান কতশত
আসিয়াছে মুক্তরােধ বন্যা সম, তবু
পারেনি ডুবাতে কেহ কোনােমতে কভু
মহিমা-মণ্ডিত পুণ্য হিমালয় চূড়ে!
কোলাহল করেছে কেবল ফিরে ঘুরে।
পরাজয় স্বীকার করেনি হিমালয় ।
তুষার-উষ্ণীষ তব কলঙ্কিত নয়
চরণধূলায় কারাে, ওগাে পুণ্যভূমি!
সকল গ্লানির উর্দ্ধে বিরাজিছ তুমি,
লয়ে তব ব্ৰহ্মবিদ্যা, তপস্যার বল ;
জগতের চুড়ামণি অটল অচল ।
কুহু ও কেকা
“লরে”
প্রতীচ্য কবির চির সাধনার ধন
তােরে আজি হেরি চক্ষে,-সরেল-পল্লব!
রাজ্যবান রাজা হতে পূজ্য যেইজন
লেই লভে লরেলের মুকুট দুলভ।
•
অন্ধকবি হােমরের ছিলি আঁখি তারা,
দান্তের প্রথমা প্রিয়া ছিলি সখি তুই ;
তােরে পরশিয়া আজি আমি আত্মহারা,
ইচ্ছা করে হে শ্যামাঙ্গী। শিরে তােরে ইথু।
প্রকৃতির প্রাণ-দেওয়া প্রাচীন হাপরে
গঠিত পল্লব তাের শ্যামল-কোমল,-
রসের রসান্ করা ; কবি বিনা পরে
অরসিকে রূপ তাের কি বুঝিবে ? বল্ !
চির-হরিতের গড়া তনু সুকুমার,
চির-নবীনের শিরে আসন তােমার।
দার্জিলিঙের চিঠি
বন্ধু,
আমি এখন বসে আছি সাত-শাে-তলার ঘরে।
বাতাস হেথা মলিন বেশে পশিতে ভয় করে।
ফিরােজা রং আকাশ হেথা মেঘের কুচি তায়,
গরুড় যেন স্বর্গপথে পাখনা ঝেড়ে যায়।
অস্ত রবির আভাস লাগে পূর্ণিমা চাঁদে,
শীর্ণ ঝােরা যক্ষ-নারীর দুঃখেতে কাঁদে।
তবু এখন নাই অলকা নাই সে যক্ষ আর,
মেঘের দৌত্য সমাপ্ত, হায়, কবির কল্পনার।
হঠাৎ এল কুঙ্কুটিকা হাওয়ায় চড়িয়া,
ঘুম-পাহাড়ের বুড়ী দিল মন্ত্র পড়িয়া।
কুহেলিকার কুহকে হায় সৃষ্টি ডুবিল,
ঝাপসা হ’ল কাছের মানুষ দৃষ্টি নিবিল।
ভস্মভূষণ ভােলানাথের অঙ্গ বিভূতি
বিশ্ব পরে ঝরে যেন বিশ্ব-বিস্মৃতি।
সকল গ্লানি যায় ধুয়ে গাে দৈব এই স্নানে,
অরুণ আভা অঙ্গে জাগে আরাম পরাণে।
১১১
কুহু ও কেক
ক্ষণেক পরে আবার ভাঁটা পড়ে কুয়াসায়,
গুল্ম-ঘেরা পাহাড়গুলি আবার দেখা যায় ;
নীল আলােকের আছায়াতে নিলীন তরুম,
‘কাঞ্চি’-মণির দু দুলিয়ে হাল্কা হাওয়া বয় !
মেঘ টুটে, ফের ফুটে ওঠে আকাশ-ভরা নীল,
নীল নয়নের গভীর দিঠি যেথায় খোঁজে মিল
শান্তি হ্রদে সাঁতারি তার মিটে না আশা,
নীল নীড়ে হায় আঁখি-পাখীর আছে কি বাসা ?
এ
;
সাঁতার ভুলে মেঘ চলে আজ লস্করী চালে,
অস্ত রবির সােহাগ তাদের গুমর বাড়ালে।
মেঘের বুকে কিরণ-নারী পিচকারী হানে,
রামধনুকের রঙীন্ মায়া ছড়ায় বিমানে ;
মেঘে মেঘে পান্না চুনীর লাবণ্য লাগে,
আচম্বিতে তুষার গিরি উদ্যত জাগে !
দিব্য-লােকের যবনিকা গেল কি টুটি ?
অপ্সরীদের রঙ্গশালা উঠে কি ফুটি ?
গিরিরাজের গায় বী-টোপর ওই গাে দেখা যায়,
স্বর্ণ-সারে সিঞ্চিত কি স্বর্গ-সুষমায় ।
পায়ের কাছে মৌন আছে পাহাড় লাখে লাখ,
আকাশ-বেঁধা শুভ্র চুড়া করেছে নির্বা!
কুহু ও কেকা নর-চরণ-চিঃ কভু পড়ে নি হােথায়, নাইক শব্দ, বিরাট, স্তব্ধ,-আপন মহিমায় সন্ধ্যা প্রভাত অঙ্গে তাহার আবীর ঢেলে যায়, রুদ্ধগতি বিদ্যুতেরি দীপ্তি জাগে তায়। শিখায় শিখায় আরম্ভ হয় রঙীন মহােৎসব, বিদুর ভূমে রত্ন-ফসল হয় বুঝি সম্ভব। মর্ত্যে যদি আনাগােনা থাকে দেবতার- ওই পাদপীঠ তবে তাদের চরণ রাখিবার। ওই বরফের ক্ষেত্রে হলের আঁচড় পড়ে নাই, ওই মুকুরে সূৰ্য্য, তারা, মুখ দেখে সবাই। হােথায় মেঘের নাট্যশালা, রঙ্গ কুয়াসার, হােথায় বাঁধা পরমায়ু গঙ্গা যমুনার! ওইখানেতে তুষার-নদীর তরঙ্গ নিশ্চল, রশ্মি-রেখার ঘাত-প্রতিঘাত চলছে অবিরল। উচ্চ হতে উচ্চ ওষে মহামহত্তর, নির্মলতার ওই নিকেতন অক্ষয়-ভাস্বর। হয় তাে হলথাই যক্ষপতির অলকানগর, হয় তাে হবে হােথাই শিবের কৈলাস-ভূধর ; রজতগিরি শঙ্করেরি অঙ্কোপরি, হায়, কিরণময়ী গৌরী বুঝি ওই গাে মূরছায়।
কুহু ও কেকা
হয় তাে আদিবুদ্ধ হােথায় সুখাবতীর মাঝে
অবলােকন করেন ভূলােক সাজি’ কিরণ সাজে।
কি হােথা আছে প্রাচীন মানুস সরােবর,
স্বচ্ছশীতল আনন্দ যার তরঙ্গ নিকর।
কবিজনের বাঞ্ছা বুঝি হােথাই পরকাশ
সরস্বতীর শুভ্র মুখের মধুর মৃদুহাস !
লামার মুলুক লাসা কি ওই ঢাকা কুয়াশায় ?
বাংলা দেশের মানুষ যেথা আজো পূজা পায় !
এই বাঙালী পাহাড় ঠেলি উৎসাহ-শিখায়
ঘুচিয়েছিল নিবিড় তমঃ নিজের প্রতিভায়।
এই পথেতে গেছেন তারা দেখেছেন এই সব,
এইখানে উঠেছে তাদের হর্ষ কলরব !
এনি করে স্বর্ণ শৃঙ্গ বিপুল হিমালয়,
আমার মত াঁদের প্রাণেও জাগিয়েছে বিস্ময়।
দেশের লােকের সাড়া পেয়ে আজ কি তাহারা
চেয়ে আছেন মােদের পানে আপনাহারা ?
চোখে পলক নাইক তাদের—পড়ে না ছায়া,
মমতা কি যায়নি তবুঘােচনি মায়া ?
তাই বুঝি হায় ফিরে যেতে ফিবে ফিরে চাই,
কে যেন, হায়, রইল পিছে,-কাহারে হারাই।
১১৪
কুহু ও কেকা
সন্ধ্যা এসে ডুবিয়ে দিল রঙীন চরাচর,
অনিচ্ছাতে রুদ্ধ হ’ল দৃষ্টি অতঃপর।
উঠল সেজে সাঁঝের আলােয় দার্জিলিং পাহাড়,
ফুটুল যেন ভুবন-জোড়া গাঁদাফুলের ঝাড়।
কুঙ্কুটিকায় সাঁঝের আঁধার হ’ল দ্বিগুণ কালাে,
অরুণ-ছটার ছাতা মাথায় হাসে গ্যাসের আলাে।
তখন জ্ঞার বন্ধ করে বন্ধ করে সাসি,
অন্ধ-করা অন্ধকারে স্বপন-সুখে ভাসি।
ঘুমের বুড়ীর মন্ত্র-মােহ অনি তখন খসে,
চেনা মুখের ছবিগুলি ঘিরে ঘিরে বসে।
ঘাের নিশীথে দারুণ শীতে কষ্ট যখন পাই,
ইচ্ছা করে কৃচ্ছসাধন পাহাড় ছেড়ে যাই ;
শিক্ষা-শাসন হেথা ; সেথায় হরষ হিন্দোল,
এযে কঠোর গুরু-গৃহ সে যে মায়ের কোল।
তাই নিশীথে ঘরের কথা জাগে সে সদাই,
মেঠো দেশের মিঠে হাওয়ায় গা মেলিতে চাই।
সংগােপনে শব্দ যােজন করি দু’ চারিটি
সশরীরে যেতে না পাই তাই তাে পাঠাই চিঠি
ভগ্ন স্বাস্থ্য কর্তে আস্ত পড়ছে ভেঙে মন,
ডাক পিয়নের মূৰ্ত্তি ধেয়ান করে সকল ক্ষণ ;
তাই অনুরােধ মাঝে মাঝে পত্র যেন পাই,
চিঠির ভেলায় প্রবাস-পাথর পার করে নাও, ভাই।
১১৫
কুহু ও কেকা
৮
সিংহল
("Young Lochinvar” এর ছন্দে।
সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ কাঞ্চনময় দেশ !
চন্দন যার অঙ্গের বাস, তাম্বুল-বন 'কেশ !
উত্তাল তাল-কুঞ্জের বায়—মন্থর নিশ্বাস !
উজ্জ্বল যার অন্তর, আর উচ্ছল যার হাস!
ওই
যার
অার
ওই শৈশব তার রাক্ষস আর যক্ষের বশ, হায়,
আর যৌবন তার সিংহের বশ,-সিংহল নাম যায় ;
এই বঙ্গের বীজ গ্রোধ প্রায় প্রান্তর তার ছায়,
আজো বঙ্গের বীর সিংহের নাম অন্তর তার গায়।
বঙ্গের শেষ কীৰ্ত্তির দেশ সৌরভময় ধাম।
কাঠ, শঙ্কর যার বল্কল-বাস, সিংহল যার নাম।
মন্দির সব গম্ভীর,—তার বিস্তার ক্রোশ দেড় ;
যার পুষ্কর-মেঘ পুর্ণীর দশ ক্রোশ ঠিক বেড়।
1
ওই ফাল্গুন আর দক্ষিণ বায়—সিংহল তার ঘর,
হায় লুব্ধের প্রায় সিংহল ধায় বঙ্গের অন্তর ;
ছিল সিংহ এই বঙ্গের, হায়, পণ্যের বন্দর,
ওগাে বঙ্গের বীর সিংহল-রাজ-কন্যার হয় বর।
কুহু ও কেক
ওই
সিংহল দ্বীপ সুন্দর, শ্যাম-নিৰ্ম্মল তার রূপ,
কণ্ঠের হার ল’ঙ্গর ফুল, কপূর কেশ-ধূপ ;
কাঞ্চন তা গৌরব, আর মৌক্তিক তার শ্রাণ,
সম্বল তার বুদ্ধের নাম, সম্পদ নিৰ্বাণ।
আর
সিদ্ধিদাতা
( যবদ্বীপের একটি গণেশ মূর্তির ছবি দেখিয়া )
একি তােমার মূর্তি হেরি!—একি হেরি সিদ্ধিদাতা !
হাজার নর-মুণ্ড পরে ঠাকুর! তব আসন পাতা!
হাজার জীবন নষ্ট হ'লে—ব্যর্থ গেলে হাজার জন—
তবে তােমার হয় প্রতিষ্ঠা ?—নির্মিত হয় সিংহাসন ?
তখন তুমি প্রসন্ন হও—তখনি হও আবির্ভাব ?
নইলে পরে ব্যর্থ আশা ? -নইলে
সুদূর
সিদ্ধিলাভ ?
খুলে গেল দৃষ্টি এবার !–ঠাকুর! তােমায় নমস্কার ।
হাড়ের স্তুপে সিদ্ধিদাতার আসন-পাতা ! চমৎকার !
দুর্গমে কে যাত্রা করে যবদ্বীপে করলে জয় !
কত বছর যুদ্ধ হ’ল কতই প্রাণের অপচয় !
হিসাব তাহার নাইক কোথাও; শিল্পী শুধু কল্পনাতে
আভাসখানি রেখে গেছে কঙ্কালের ওই অঙ্কপাতে
;
১১৭
কুহু ও কেকা
গড়ে গেছে পাথর কেটে মূর্তিখানি জীবন্ত,
শবাসনে সিদ্ধিদাতা,-শােকের দহন নিবন্ত।
নৃমুণ্ডেরি স্কুপের পরে জাগল বিপুল জয়ের গাথা,
অভেদ হয়ে দিলেন দেখা সিদ্ধি সনে সিদ্ধিদাতা ।
খর্ব তুমি-স্থূল রকমের, সিদ্ধি—তুমি লম্বােদর ;
তবু তােমায় চায় সকলে, তবু তুমিই মনােহর।
তােমার লাগি বিশ্বামিত্র পীড়া দিল নিখিল জীবে,
যাত্রী ছােটে তােমার লােভে মর্ত্যলােকে আর ত্রিদিবে ;
কারাে হঠাৎ নিবছে বাতি, কারাে মাথায় চত্রু ঘােরে,
কেউ বা লভে জ্ঞানের ভাতি, কেউ বা পথেই যায় গাে মরে।
সিদ্ধি লাগি’ কৰ্ম্মী, জ্ঞানী ছুটছে কবি দিবস নিশা,
কেউ বা লভে স্বর্ণকণা, কেউ বা ধূলায় হারায় দিশা
শিখাও প্রভু! বিঘ্ন বিপদ ফেতে ঠেলে দুঃখ রাতে;
করতে শিখাও কৃচ্ছ সাধন নাম লিখিয়ে খরচ-খাতে,
মরতে শিখাও শুষ্ক মুখে, ফিরতে শিখাও শূন্য হাতেই,
সত্যভানু প্রদীপ্ত যে নৃ-কপালের শুভ্রতাতেই।
পণ্ড পূজা ঠাকুর ! তােমার ক্ষুদ্রচেতা বেনের ঘরে,
উলােভী মূষিকে সে সিদ্ধিদাতার বাহন করে !
তারা তােমত্ম চেনে না, হায়, চেনে নাক সিদ্ধিদাতা,
অভ্রভেদী নৃকঙ্কালে প্রভু! তােমার আসন পাতা।
কুহু ও কেকা
ওঙ্কার-ধাম
(Un Pelerin D'Angkar yal)
ওঙ্কার-ধাম! ওঙ্কার-ধাম !
চিত্ত-চমৎকার!
মু-কাম্বােজে কনকাম্ভোজ
হিন্দুর প্রতিভার !
তােরণে তাহার সপ্তর্ষ
সর্প সে ফণা ধরে,
পৰ্বত সম বিপুল দেউল
মিশরের যশ হরে।
যােজন ব্যাপিয়া পত্তন তার,
বিঁধিয়া নীলাম্বর
পৰ্ব্বতজয়ী গর্বে উঠেছে
দেউল স্তরে স্তর।
গুজে তার সােনার পদ্ম,
চূড়ায় চতুর্থ
নীরব হাস্যে নিরখে চতু-
দিকের দুঃখ সুখ ;
বিরাট মূরতি, আরতি তাহার
জাগায় ভকতি ভয়!
১১৯
কুহু ও কেকা \ দেউল ঘিরিয়া মূৰ্ত্তি-মেখলা, রামায়ণ শিলাময় । রাক্ষস, রথ, হস্তী মহৎ, যুদ্ধের হুড়াহুড়ি, সাগর মথন, দেব অগণন, রয়েছে যােজন জুড়ি’! প্রতি শিলা তার পেয়েছে আকার, শিল্পীর সুপরশে, সারি সারি সারি বুদ্ধ মূরতি মগন ধ্যানের রসে। বিষ হাজার একই দেবতার রেখেছে গাে খুদে খুদে, নির্বাক শিলা নীরবে ঘােষিছে, দেবতা সৰ্ব্বভূতে! শিল্পীর তপে হেথা অঙ্গরা রয়েছে পাথর হয়ে হেম-মুখী প্রেম নদিরেক্ষণা— বহুর সােহা স’য়ে। যােজন জুড়িয়া রয়েছে পাষাণ- স্তম্ভের মহাবন, জুনপদ দশলক্ষ লােকের নামশেষ সে এখন। ক
কুহু ও কেকা
নিবিড় বনের সবুজ আঁধার
দিনে আছে দিক জুড়ে ;
শল্প-শিব একা বিরাজিছে আজ
চতুর্মুখের চূড়ে!
আধেক ভগ্ন ধূলায় মগ্ন
আঙনে মূরতিগুলা,
নাই লােক শুধু বাদুড় পেচক,
পালক এবং ধূলা।
ওঙ্কার-ধাম ! ওঙ্কার ধাম !
নাই—কারাে নাই সাড়া,
ঘন্টার মালা দুলিছে কেবল
বাতাসে পাইয়া নাড়া।
ধ্বংসের দাড়া অশথ শিকড়
পাকড়ি’ ধরিছে আঁটি
তার সাথে ধূলি আর বিস্মৃতি,
শিয়রে মরণ-কাঠি।
ওঙ্কার-ধাম। ওঙ্কার-ধাম।
বিশ্বত তুমি আজ,
জানেনা হিন্দু কীৰ্ত্তি আপন।
হায় নিদারুণ লাজ।
:
১২১
পদ্মার প্রতি
হে পদ্মা ! প্রলয়ঙ্করী ! হে ভীষণ! ভৈরবী সুন্দরী।
হে প্রগ! হে প্রবল।! সমুদ্রের যােগ্য সহচরী
তুমি শুধু; নিবিড় আগ্রহ তার পার গাে সহিতে
একা তুমি; সাগরের প্রিয়তমা অয়ি দুর্বিনীতে ।
;
দিগন্ত বিস্তৃত তব হাস্যের কল্লোল তারি মত
চলিয়াছে তরঙ্গিয়া,—চিরদৃপ্ত, চির-অব্যাহত।
দুর্ণমিত, অসংযত, গূঢ়চারী, গহন-গম্ভীর,
সীমাহীন অবজ্ঞায় ভাঙিয়া চলেছ উভতীর !
রুদ্র সমুদ্রের মত, সমুদ্রেরি মত সমুদার
তােমার বরদ হস্ত বিতরিছে ঐশ্বৰ্য্য-সম্ভার।
উর্বর করিছ মহী, বহিতেছ বাণিজ্যের তরী,
গ্রাসিয়া নগর গ্রাম হাসিতেছে দশদিক ভরি’!
অন্তহীন মূচ্ছনায় আন্দোলিছ আকাশ সঙ্গীতে,
ঝঙ্কারিয়া রুদ্রবীণা,—মিলাইছ ভৈরবে ললিতে।
প্রসন্ন কখনাে তুমি, কভু তুমি একান্ত নিষ্ঠুর ;
দুৰ্বোণ, দুর্গম হায়, চিরদিন দুয়ে-সুদূর।
কুহুও কেকা
শিশুকাল হ’তে তুমি উচ্ছল, দুরন্ত-দুর্বার;
সগর রাজার ভস্ম করিলে না স্পর্শ একবার !
স্বর্গ হতে অবতরি’ ধেয়ে চলে এলে এলােকেশে,
কিরাত-পুলিল-পুণ্ড অনাচারী অন্ত্যজের দেশে ।
বিস্ময়ে বিহ্বল-চিত্ত ভগীরথ ভগ্ন-মনােরথ
বৃথা বাজাইল শঙ্খ, নিলে বেছে তুমি নিজ পথ ;
আৰ্য্যের নৈবেদ্য, বলি, তুচ্ছ করি’ হে বিদ্রোহী নদী।
অনাহূত—অনার্য্যের ঘরে গিয়ে আছ সে অবধি।
সেই হ’তে আছ তুমি সমস্যার মত লােক মাঝে,
ব্যাপৃত সহস্র ভুজ বিপৰ্যয় প্রলয়ের কাজে।
দম্ভ যবে মূর্তি ধরি’ স্তম্ভ ও গুজে দিন রাত
অভ্রভেদী হয়ে ওঠে, তুমি না দেখাও পক্ষপাত
তার প্রতি কোনােদিন ; সিন্ধুসখী! হে সাম্যবাদিনী!
মুখে বলে কীর্তিনাশা, হে কোপনা ! কল্লোলনাদিনী।
ধনী দীনে একাসনে বসায়ে রেখেছ তব তীরে,
সতত সতর্ক তারা অনিশ্চিত পাতার কুটিরে ;
জানে সুপ্তির স্বাদ, জড়তার বারতা না জানে ?
ভাঙনের মুখে বসি’ গাহে গান প্লাবনের তানে,
কুহু ও কেকা
নাহিক বাস্তুর মায়া, মরিতে প্রস্তুত চিরদিনই।
অয়ি স্বাতন্ত্রের ধারা। অয়ি পদ্মা ! অয়ি বিপ্লাবিনী ।
পালা ঝােরা
তােমরা কি কেউ শুনবে নাগাে পাগলা ঝােরার দুঃখ গাথা ?
পাগল বলে কৰ্বে হেলা? কৰ্ব্বে হেলা মৰ্ম্মব্যথা ?
জন্ম আমার হিম-উরসে, কুলে আমার তুল্য নাই,
সিন্ধুনদের সােদর আমি গঙ্গাদিদির পাগল ভাই।
বরফ-মরুর একলা জীবন ভাল আমার লাগত নারে,
লুকিয়ে উকি তাইত দিতাম নীচের দিকে অন্ধকারে ;
সুড়সুড়িয়ে গুড় গুড়িয়ে বেরিয়ে এসে কৌতুহলে
গড় গড়িয়ে গড়িয়ে গেলাম,ছড়িয়ে প’লাম শূন্যতলে।
পিছল পথে নাইক বাধা, পিছনে টান নাইক মােটে,
পাগলা ঝােরার পাগল নাটে নিত্য নূতন সঙ্গী জোটে!
লাফিয়ে পড়ে ধাপে ধাপে, ঝাপিয়ে পড়ে উচ্চ হতে
চড়চড়িয়ে পাহাড় ফেড়ে নৃত্য করে মত্ত স্রোতে,
১২৪
কুহু ও কেক।
তরল ধারায় উড়িয়ে ধূলি, জুড়িয়ে দিয়ে হাওয়ার জ্বালা,
জটার পরে জড়িয়ে নিয়ে বিনিসুতার রামালা ;
একশাে যুগের বনস্পতি,-বাকল-ঝাঝি সকল গায়,
মড়মড়িয়ে উপড়ে ফেলে স্রোতের তালে নাচিয়ে তায়,
গুহার তলে গুমরে কেঁদে, আলােয় হঠাৎ হেসে উঠে,
ঐরাবতের বৈরী হয়ে, কৃষ্ণমৃগের সঙ্গে ছুটে,
স্তব্ধ বিজন যােজন জুড়ে ঝঙ্কাঝড়ের শব্দ করে,
অসাড় প্রাচীন জড় পাহাড়ের কানে মােহন মন্ত্র পড়ে,
পরাণ ভরে নৃত্য করে মত্ত ছিলাম স্বাধীন সুখে,
ছন্দ ছাড়া আজকে আমি যাচ্চি ম'রে মনের দুখে ;
যাচ্চি ম'রে মনের দুখে পূৰ্ব্ব সুখে স্মরণ করে ;
ঝারির মুখে ঝরার মতন শীর্ণ ধারায় পড়ছি ঝরে।
চক্রী মানুষ চক্র ধরে ছিন্ন করে আমার দেহ
ছড়িয়ে দিলে দিগ্বিদিকে, নাইক দয়া, নাইক স্নেহ !
আমি ছিলাম আমার মতন,—পাহাড়-কোলে নির্বিবাদে,
মানুষ ছিল কোন্ সুদূরে—সাধিনি বাদ তাদের সাথে ।
তবুও
শিকল পরিয়ে দিলে রাখলে আমায় বন্দীবেশে,
ক্ষুদ্র মানুষ স্বল্প-আয়ু, আমায় কিনা বাঁধলে শেষে !
কুহু ও কেক
কৌশলে সে, ফাদ কেঁদেছে, পারিনে তায় ছিড়তে বলে,
শীর্ণ হয়ে যাচ্চি, ক্রমে, পড়ছি গ'লে অশ্রুজলে।
আগে আমায় চিত যারা বছে শােনন, -“যায় না চেনা!
বাজবে কবে প্রলয়-বিষাণ?—মুখে আমার উঠছে ফেনা !
বিকল পায়ের শিকলগুলো কতদিন সে থাকবে আরাে ?
রুদ্ৰতালে নাচব কবে? তােমরা কেহ বল্তে পার ?
,
শূদ্র
শূদ্র মহান্ গুরু গরীয়া,
শূদ্র অতুল এ তিন লােকে,
শূদ্র রেখেছে সংসার, ওগাে !
শূদ্রে দেখনা বক্র চোখে।
আদি দেবতার চরণের ধূলি
শূদ্র,—একথা শাস্ত্রে কহে,
আদি দেবতার পদরেণু-কণা
সকল দেবতা মাথায় বহে।
বিধাতার পাদ-পদ্মের রেণু
করিবে শিরােধার্য্য কেবা?
কে সে দর্পিত—কে সে নাস্তিক
শূদ্রে বলে রে করিতে সেবা ?
১২৬
কুহু ও কেক
গঙ্গার ধারা যে পদে উপজে
তাহে উপজিল শূদ্র জাতি,
পাবনী গঙ্গা,-শূদ্র পাবন
পরশ তাহার পুণ্য-সাথী।
শশাধন করিছে ভুবন
তাই তার ঠাই শ্রীপদমূলে,
আপনারে মানী মানিয়া সে কভু
শিয়রে হরির বসে না ভুলে।
শুদ্ধ-সত্ত্ব পাবকের মত
জগতের গ্লানি শূদ্ৰ দহে ;
মহামানবের গতি সে মূৰ্ত্ত,
শূদ্র কখনাে ক্ষুদ্র নহে।
মেথর
কে বলে তােমারে, বন্ধু, অস্পৃশ্য অশুচি?
শুচিতা ফিরিছে সদা তােমারি পিছনে ;
তুমি আছ, গৃহবাসে তাই আছে রুচি,
নহিলে মানুষ বুঝি ফিরে যেত বনে।
১২৭
কুহু ও কেকা
শিশুজ্ঞানে সেবা তুমি করিতেছ সবে,
ঘুচাইছ রাত্রিদিন সৰ্ব্ব ক্লেদ গ্লানি !
ঘৃণার নাহিক কিছু স্নেহের মানবে ;-
হে বর! তুমিই একা জেনেছ সে বাণী ।
নির্বিচারে আবর্জনা বহ অহর্নিশ,
নির্বিকার সদা শুচি তুমি গঙ্গাজল।
নীলকণ্ঠ করেছেন পৃথীরে নিৰ্বিষ ;
আর তুমি ? তুমি তারে করেছ নির্মল।
এস বন্ধু, এস বীর, শক্তি দাও চিতে,
কল্যাণের কৰ্ম্ম করি’ লাঞ্ছনা সহিতে।
পথের স্মৃতি
হাত পেতে বসেছে ভিখারী
রাজপথে মৌন প্রত্যাশায় ;
শাখা মেলি’ শীর্ণ তরু সারি
শূন্যমনে আকাশে তাকায়।
১২
লঘু মেঘ চলে যায় ভেসে,
উপবাসী রহে শাখাদল ;
শাদা মেঘ ভেসে গেল হেসে
পিপাসীরে দিল না সে জল।
ধােয়া ধুতি-রেশমী চাদর
চলে গেল ফিরাইয়া মুখ ;
অনুদার বিলাসী বদর
অভুক্তের বুঝিল না দুখ।
সহসা উড়ায়ে ধূলিজাল
স্নান মেঘ এল বায়ুভরে,
বজ্রকণ্ঠ মূরতি করাল,
সেই শেষে দিল মিগ্ধ করে।
থামাইয়া থার্ড ক্লাশ, গাড়ী
রুক্ষ মূৰ্ত্তি দুঃখী গাড়ােয়ান
গাড়ী হতে নামি’ তাড়াতাড়ি
গরীব গরীবে দিল দান।
১২৯
৯
কুহু, ও কেক।
শাদা মেঘ দেয় না রে জল,
স্নান মেঘ! আয় তােরা আয়,
রিক্ত শাখে হবে ফুল ফল
বিন্দু বিন্দু তােদেরি দয়ায়।
দুর্ভিক্ষে
ক্ষিদের জ্বরে যাচ্ছে মারা, ক্ষিদেয় ঘুরে পড়ছে মরে!
উপর-ওলার মর্জি, বাবা, একে একে যাচ্ছে সরে।
বিকিয়ে গেছে হালের বলদ, দুধুলি গাই বিকিয়ে গেছে,
চালিয়েছিলাম দু’ পাঁচটা দিন কাঁসা পিতল সকল বেচে!
বিকিয়ে গেছে লক্ষ্মী মােহর জনার্দনের রূপার ছাতা,
ভিটার গ্রাহক নাইক গাঁয়ে, তাই আজো সব গুজছে মাথা।
বিকিয়ে গেলাম পেটের দায়ে, পেটের জ্বালা বিষম জ্বালা,
কেড়ে খাবার দিন গিয়েছে, কুড়িয়ে খাবার গেছে পালা ;
কচি ছেলের খেইছি কেড়ে,-কান্নাতে কান দিইনি মােটে,
চোখে কানে যায় কি দেখা ?—ক্ষিদেয় যখন ভিতর ঘোটে ?
কুহু ও কেকা
প্রথম প্রথম লুকিয়ে খেতাম, চোরের মতন হেথা হােথা,
নিজের ক্ষিদেয় ভুলতে হ’ত ছেলে মেয়ের ক্ষিদের কথা !
ঘাস পাতাতে চলবে ক’দিন? ক’দিন ওসব সইবে পেটে ?
শুকিয়ে আসছে ক্ষিদের নাড়ী, কারো নাড়ী দিচ্ছে কেটে
ক্ষিদের জ্বালায় জোয়ান মেয়ে দেছে সেদিন গলায় দড়ি,
ক্ষিদের জ্বরে কচি কঁচা মরছে নিত্যি ঘড়ি ঘড়ি।
শুষছে পড়ে শ্মশান-ভিটায়—শুমূছে পড়ে সারি সারি,
সকল গুলাের মুক্তি হলে নির্ভাবনায় মর্তে পারি।
একে একে হচ্ছে নীরব খড়ের শেষে কঠিন ভূয়ে,
হচ্ছে নীরব—যাচ্ছে ম'রে,-বুঝছি সবি শুয়ে শুয়ে।
বুঝতে পারছি—ওই অবধি-জাতে পাচ্ছি মাত্র এই,
মুখে দেব জল দু ফোটা—তেমন ধারাও শক্তি নেই।
মড়ার লােভে ঢুকূবে কুকুর,ভাবতে ওঠে শিউরে গাটা,
জ্যান্তে পাছে খায় গাে ছিড়ে, ভাবছি এখন সেই কথাটা।
চোখের আগে অকি ওড়ে, গায়ে মুখে বসছে মাছি,
বুঝতেও ঠিক পারছি নাক—মরেছি না বেঁচেই আছি।
১৩)
কুহু ওকেকা
হায় ভগবান! মর্জি তােমার! হায় জগদীশ ! তােমার খুসী!
রাখুলে তুমি রাখতে পার, মারতে পার মারলে কুষি’;-
বাঘের খিদে মিটাও ঠাকুর,“প্রাণ রাখ প্রাণহানি করে ;
মানুষ মরে ক্ষিদেয় জ’রে—হাত গুটিয়ে রইলে সরে !
সংশয়
গ্রহণ-দিনের গহন ছায়ায় গাহন করি’
গগনে উঠিছে শঙ্কার সুর ভুবন ভরি’!
রাহুর গরাসে হিরণ কিরণ হইল সারা,
হায় হায় করে আলাের পিয়াসী নয়ন তারা।
•
যে দিকে তাকাই কেবলি যে ছাই পড়িছে ঝরি’!
ক্লান্ত পরাণ, দিনমান শুধু ভাবিয়া মরি
‘কি হবে গাে’!—কারে সুধাইব, হায়, পাই নে ভাবি,
মধ্য সাগরে ছিদ্র তরণী যায় যে নাবি’!
;
স্থির-নিশ্চিত মৃত্যুর মত আসিছে ঘিরে,
নিশ্বাস হরি’ দৃষ্টি আবরি’ ঘন তিমিরে,
কোথা শাদা পাল ? কই তরী তব ? হে কাণ্ডারী।
লােনা জলে একি মিছে মিশে গেল নয়ন বারি ।
কুহু ও কেক
হাহাকার
•
দুর্ভিক্ষের ভিক্ষুকের মত
কেঁদে কেঁদে ওঠে সে নিয়ত
রােদন উদ্যমে অবসান,
আছে শুধু বদন-ব্যাদান!
আছে বুকে বুভুক্ষার মত
জগতের ক্ষুন্ন খেদ যত,
আছে শুধু যমের যন্ত্রণা
প্রেতলােকে জাগাতে করুণা !
এ সংসার অন্ধকারাগার,
কোনােদিকে মিলে না দুয়ার ;
ক্ষুন্ন প্রাণ, সংক্ষুব্ধ বেদনা,
কেবল পিঞ্জরে আনাগােনা।
এ পিঞ্জর ভাঙ ভগবান,
শােক তাপ হােক্ অবসান ;
এ উৎকট লােদনের শেষ
কর, কর, কর পরমেশ!
কুহু ও কেক।
শূন্যের পূর্ণতা
কৃষ্ণ হতে পাংশু হ'য়ে, ক্ষুদ্র হ’তে ব্যাপ্তি লয়ে
শকুন্তের ছায়া ক্রমে আলােকে মিলায় !
জিজ্ঞাসা সংশয়-শেষে, দগ্ধ রিক্ত চিত্ত দেশে
অনাসক্ত পূর্ণজ্ঞান বিহরে লীলায়।
১৪ই জ্যৈষ্ঠ
(আমার পিতামহ স্বর্গীয় অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়ের
সাংবৎসরিক শ্রদ্ধদিনে রচিত)
অনেক দেছেন যিনি মানবেরে অকৃপণ করে,
ধীশক্তির দাতা বলি’ মুখ্যভাবে ধ্যান তঁার করে
আমাদের এ ভারত ; প্রতিদিন প্রভাতে সন্ধ্যায়
মুখরিত করি দিক শ্রেষ্ঠ সে দানের কথা গায়।
t
সেই শ্রেষ্ঠ বিভূতিতে ছিলে তুমি ভূষিত ধীমান্ !
জ্ঞানাঞ্জনে নেত্র মাজি’ বিশ্ব-দৃশ্য দেখিলে মহান্ !
বিজ্ঞানের তুৰ্য্যনাদে স্তব্ধ করি’ দিলে তুচ্ছ কথা,
সর্ব সঙ্কীর্ণতা ত্যজি’ নিলে বরি’ বিশ্বজনীনতা
১৩৪
কুহু ও কেক।
;
অন্ধ বিশ্বাসের বিষে জর্জরিত এ বঙ্গ-ভুবনে
এনে দিলে জ্ঞানামৃত ; হলে গুরু চক্ষুরুন্মীলনে।
সত্যের করিতে সেবা স্বার্থ, সুখ, স্বাস্থ্য
মিথ্যা সংস্কারের মােহ ক্ষয় করি’ দিলে তিলে তিলে।
অর্ধ পথে থাম নাই সন্ধি করি’ অজ্ঞতার সনে,
সূৰ্য্যকান্ত মণি তুমি পরিপূর অপূৰ্ব কিরণে।
(২)
আজি তব মৃত্যুদিনে, ওগগা পূজ্য ! ওগাে পিতামহ !
এনেছি যে দীন অর্ঘ্য—তুমি সে প্রসন্ন মনে ।
বার্ষিকী এ শ্রাদ্ধে তব পিণ্ডভােজী ডাকিনি ব্রাহ্মণ,
জানি তাহে হইত না, ওগাে জ্ঞানী! তােমার তর্পণ ;
--
অন্তরের শ্রদ্ধা শুধু আমি আজি করি নিবেদন ;-
এই তাে যথার্থ শ্রাদ্ধ—কীর্তি-কথা স্মরণ কীৰ্ত্তন।
সত্য-দেবতার পদে আজ শুধু এই ভিক্ষা চাই,
বুদ্ধেরে পূজিতে যেন রক্তধারে বেদী না ভাসাই ;-
অবতার বলি’ মুখে, যেন, হায়, অজ্ঞতার ফলে
রঘুবীরে না বসাই মৎস্য, কুৰ্ম্ম, বরাহের দলে ;
১৩৫
কুহু ও কেকা
তব প্রিয় কৰ্ম্ম ত্যজি’ যেন তব তর্পণে না বসি’
বিদ্যা তপ বিবর্জিয়া শুধু যেন কৌলীন্য না ঘােষি।
হে আদর্শ জ্ঞানযােগী ! হে জিজ্ঞাসু তব জিজ্ঞাসায়
উদ্বোধিত চিত্ত মাের ;-গরুড় সে জ্ঞান-পিপাসায়।
শ্মশান-শয্যায় আচাৰ্য্য হরিনাথ দে
আজ শ্মশানে বহুিশিথা অভ্রভেদী তীব্র জ্বালা,
আজ শ্মশানে পড়ছে ঝরে উল্কাতরল জ্বালার মালা !
যাচ্ছে : দেশের গর্ব, শ্মশান শুধু হচ্ছে আলা,
যাচ্ছে পুড়ে নূতন করে সেকেন্দ্রিয়ার গ্রন্থশালা।
একটি চিতায় পুড়ছে আজি আচাৰ্য্য আর পুড়ছে লামা,
প্রােফেসার আর পুড়ছে ফুঙি, পুড়ছে শম-উ-উলামা,
পুড়ছে ভট্ট সঙ্গে তারি মৌলবী সে যাচ্ছে পুড়ে,
ত্রিশটি ভাষার বাসাটি হায় ভস্ম হয়ে যাচ্ছে উড়ে
একত্রে আজ পুড়ছে যেন কোকিল, 'কুকু’, বুলবুলেতে,
দাবানলের একটি আঁচে নীড়ের পিঠে পক্ষ পেতে ;
পড়ছে ভেঙে চোখের উপর বর্তমানের বাবি-চুড়া,
দানেশমন্দী তাজ সে দেশের অকালে আজ হচ্ছে গুড়।
কুহ'ও কেকা
আজ শ্মশানে বঙ্গভূমির নিবল উজল একটি তারা,
রইল শুধু নামের স্মৃতি রইল কেবল অশ্রুধারা;
নিবে গেল অমূল্য প্রাণ, নিবে গেল বঘ্নিশিখা,
বঙ্গ ভূমির ললাট পরে রইল আঁকা ভটীকা।
সাগর তর্পণ
বীরসিংহের সিংহশিশু! বিদ্যাসাগর! বীর।
উদ্বেলিত দয়ার সাগর,বীর্যে সুগম্ভীর।
সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয়,
তােমায় দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।
নিঃস্ব হয়ে বিশ্বে এলে, দয়ার অবতার!
কোথাও তবু নােয়াও নি শির জীবনে একবার !
দয়ায় স্নেহে ক্ষুদ্র দেহে বিশাল পারাবার,
সৌম্য মূর্তি তেজের স্মৃৰ্ত্তি চিত্ত-চমৎকার!
নামূলে একা মাথায় নিয়ে মায়ের আশীৰ্বাদ,
করলে পূরণ অনাথ অতুর অকিঞ্চনের সাধ ;
অভাজনে অন্ন দিয়ে বিদ্যা দিয়ে আর
অদৃষ্টেরে ব্যর্থ তুমি করলে বারম্বার।
বিশ বছরে তােমার অভাব পূরণ নাকো, হায়,
বিশ বছরের পুরাণাে শােক নূতন অজো প্রায় ;
তাই তাে আজি অশ্রুধারা ঝরে নিরন্তর ।
কীৰ্ত্তি ঘন মুর্তি তােমার জাগে প্রাণের পর ।
কুহু ও কেক
অরণ-ছিন্ন রাখতে পারি শক্তি তেমন নাই,
প্রাণ প্রতিষ্ঠা নাই যাতে সে মূরৎ নাহি চাই ;
মানুষ খুঁজি তােমার মত,-একটি তেমন লােক,
স্মরণ-চিহু মূর্ত !—যে জন ভুলিয়ে দেবে শােক।
রিক্ত হাতে করবে যে জন যজ্ঞ বিশ্বজিৎ,
রাত্রে স্বপন চিন্তা দিনে দেশের দশের হিত,-
বিপ্ন বাধা তুচ্ছ করে লক্ষ্য রেখে স্থির
তােমার মতন ধন্য হবে,—চাই 8ে এমন বীর।
তেমন মানুষ না পাই যদি খুজু তবে, হায়,
ধূলায় ধূসর বাঁকা চটি ছিল যা’ ওই পায় ;
সেই যে চটি উচে যাহা উঠত এক একবার
শিক্ষা দিতে অহঙ্কুতে শিষ্ট ব্যবহার।
সেই যে চটি–দেশী চটি—বুটের বাড়া ধন,
খুজব তারে, আম্ব তারে, এই আমাদের পণ ;
সােনার পিঁড়েয় রাখব তারে, থাব প্রতীক্ষায়
আনন্দহীন বঙ্গভূমির বিপুল নন্দিগায়।
রাখব তারে স্বদেশ প্রীতির নূতন ভিতের পর,
নজর কারাে লাগবে নাকো, অটুট হবে ঘর।
উচিয়ে মােরা রাখব তারে উচ্চে সবাকার,-
বিদ্যাসাগর বিমুখ হ’ত—অমৰ্যাদায় যার।
শাস্ত্রে যারা শস্ত্র গড়ে হৃদয়বিদারণ,
তর্ক যাদের অফলার তুমুল আন্দোলন ;
৩
:
}
•
কুহু ও কেক।
বিচার যাদের যুক্তিবিহীন অক্ষরে নির্ভর,
সাগরের এই চটি তারা দেখুকু নিরন্তর।
দেখুক, এবং স্মরণ করুক সব্যসাচীর রণ,-
স্মরণ করুক বিধবাদের দুঃখ-মােচন পণ ;
স্মরণ করুক পাণ্ডারূপী গুণ্ডাদিগের হার,
“বাপ মা বিনা দেবতা সাগর মানেই নাকো আর!”
অদ্বিত্বীয় বিদ্যাসাগর ! মৃত্যু-বিজয় নাম,
ঐ নামে হায় লােভ করেছে অনেক ব্যর্থকাম ;
নামের সঙ্গে যুক্ত আছে জীবন-ব্যাপী কাজ,
কাজ দেবে না ? নামটি নেবে?—একি বিষম লাজ।
বাংলা দেশের দেশী মানুষ। বিদ্যাসাগর তীর।
বীরসিংহের সিংহ শিশু! বীর্যে সুগম্ভীর।
সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয়,
চক্ষে দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।
ঋষি টষ্টয়
সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ক্ষোভে ক্ষুন্ন ক্ষুব্ধ ছিল জগজন
অন্ধকূপে বন্দী সম; তুমি খুলে
দিলে বাতায়ন,
ওগো ঋষি রুযিয়ার! মুক্ত রন্ধে স্বর্গের বাতাস
প্রবেশিল অন্ধকূপে ; বিশ্ববাসী বঁচিল নিশ্বাস
কুহু ও কেকা
;
;
ফেলি; এগাে টষ্টয়! বিনাশিলে তুমি মহাভয়
মানবের ; প্রচারিলে পৃথীতলে বিশ্বাসের জয়।
মহাবৈষম্যের মাঝে প্রচারিলে সাম্যের বারতা,
উচ্চারিলে, দ্রষ্টা! তুমি, মহামিলনের পূর্বকথা।
বাণী তব মৃত্যুহীন মৃত্যুময় এ মর্ত্যভুবনে
ওগাে মৃত্যুঞ্জয় কবি! হে মনীষি জাগে,আজি মনে
সিদ্ধার্থের সুপ্ত স্মৃতি, তােমার শুনিয়া করব,
সেই সুর, সেই কথা ; তারি মত-তারি মত সব।
সেই গ! সেই তপ! সেই মহামৈত্রীর বাখান।
বুদ্ধকল্প বিশ্বপ্রেমে বর্তমানে তুমি মহাপ্রাণ ।
কবি-প্রশস্তি
( ঋষি কবি শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহােদয়ের সংবর্ধনা উপলক্ষে রচিত)
বাজাও তুমি সােনার বীণা হে'কবি! নব বঙ্গে ।
মাতাও তুমি, কঁাদাও তুমি, হাসাও তুমি রঙ্গে!
তােমার গানে তােমার সুরে
উঠিছে ধ্বনি ভুবন জুড়ে,
লক্ষ হিয়া গাহিয়া আজি উঠিছে তব সঙ্গে।
১৪
কুছ ও কেকা
কমলে তুমি জাগালে প্রাতে, নিশীথে নিশিগন্ধা,
পূর্ণা তিথি মিলালৈ আনি’ রিক্তা মাঝে না!
যে ফুল ফোটে স্বর্গ বায়ে
আহরি’ দিলে প্রিয়ের পায়ে,
মিলালে আনি’ অনাদি বাণী নবীন মধুচ্ছা!
}
জগৎ-কবি-সভায় মােরা তােমার করি গৰ্ব্ব,
বাঙালী আজি গানের রাজা, বাঙালী নহে খর্ব ।
দর্ভ তব আসন-খানি
অতুল বলি’ লইবে মানি’
হে গুণী তব প্রতিভা-গুণে জগৎ-কবি সৰ্ব্ব।
জীবন-ব্রতে পঞ্চাশতে পড়িল তব অঙ্ক,
বঙ্গ-গৃহ জুড়িয়া আজি ধ্বনিছে শুভ শঙ্খ ;
পান্থ এসে পুষ্প-রথে
পৌছিলে হে অর্ধ পথে,
সারথি তব শুভ্র-গুচি কীৰ্ত্তি অকলঙ্ক।
অর্ধশত শরতে সােনা ঢেলেছ তুমি নিত্য,
অর্ধশত মিলিলে হেন তবে সে পূরে চিত্ত ;
সােনার তরী দিয়েছ ভরি,
তবুও আশা অনেক করি ;
ভরিয়া ঝুলি ভিখারী সম ফিরিয়া চাহি বিত্ত।
১৪১
কুহু ও কেকা
চাতক
৫
! তুমি কত না মেঘে মেখেছ বারি-বিন্দু,
কত না 'ধারে ভরিয়া তুমি তুলেছ চিত-সিন্ধু !
মরাল! তুমি মানস-সরে
ফিরেছ কত হরষ-ভরে,
চকোর তুমি এসেছ ছুয়ে গগন-ভালে ইন্দু।
বঙ্গ-বাণী-কুঞ্জে তুমি আনিলে শুত লগ্ন,
বাজালে বেণু মােহন তানে পরাণ হ’ল্প মগ্ন।
বিষাণ যবে বাজালে, মরি,
গলিয়া শিলা পড়িল ঝরি’
মিশিল স্রোতে বন্ধ ধারা, পাষাণ-কারা ভগ্ন।
গভীর তৰ প্রাণের প্রীতি, বিপুল তব যত্ন,
দিশারি! তুমি দেখাও দিশা, ডুবারি তােলো রত্ন।
যে তানে টলে শেষের ফণা
পেয়েছ তুমি তাহারি কণা,
অমৃত এনে দিয়েছে তেনে,-নহে সে নহে প্রত্ন।
অমৃত এনে দিয়েছে প্রাণে পরাণ-শােষী দুঃখ,
গৌণ যাহা না গণি’ তাহে চিনিয়া নিলে মূখ্য ;
শশাকের রাতে রহিলে ধরে
হিরণময় মৃণাল ডােরে,
রুদ্রে নিলে বরণ করে রসায়ে নিলে রুক্ষ।
১৪২
কুহু ও কেকা
রেখেছ তুমি দৈবী শিখা হৃদয়ে চির-দীপ্ত,
অবিশ্বাসে হতাশ্বাসে জগৎ যবে ক্ষিপ্ত ;
মত্ততারে করেছ ঘৃণা-
চাহনা তবু মুক্তি বিনা,
উজল মনােমুকুর তব হয়নি মসীলিপ্ত।
।
বাজাও রুবি! অলােক বীণা মধুর নব ছন্দে,
হৃদয়-শতদল সে তুমি ফুটাও সুধা গন্ধে ;
যে ভাব ওঠে প্রাণের মাঝে
তােমার গানে সকলি আছে,
তােমার নামে মেতেছে দেশ,—মিলেছে মহানন্দে।
গহন মেঘে বিজলি সম উজলি’ আছ বঙ্গ,
মাতাও কভু কাদাও তুমি হাসাও করি’ রঙ্গ!
সূৰ্য্য সম উজলি’ ভূমি
সপ্ত ঘােড়া ছুটাও তুমি,
তৃপ্ত হ’ল হৃদয়-প্রাণ লভিয়া তব সঙ্গ।
১৪৩
কুহু ও কেকা
অর্ঘ্য
(কবি-সম্বর্ধনা উপলক্ষ্যে সাহিত্য-পরিষদের ছাত্র সভ্যদিগের পক্ষ হইতে প্রদত্ত )
নেতধটি মােরা পাই নাই
খুজে,
বিশ আড়া ধান আনিনি কবি ।
এনেছি কেবল হৃদয়ের প্রতি
বিকচ কমল কোমল ছবি ।
পরগণা লিখে সঁপিতে কবিকে
কৃষ্ণচন্দ্র বঙ্গে নাহি,
আঁখিজলে
শুধু করি’ অভিষেক
দর্ভ আসনে বসাতে চাহি।
জীবনের বহু শূন্য প্রহর
ভরিয়া তুলেছ বীণার তানে,
অন্ধ যামিনী হেসেছে পুলকে,
যে হাসি হাসিতে অন্ধ জানে।
তােমার যােগ্য কি দিব অর্ঘ্য ?
কোথা পাব মােরা ভাবি গাে তাই ;-
জনক রাজার মত কোথা পাব
হিরণ-শৃঙ্গ হাজার গাই !
{
১৪৪
কুহু ও কেকা
ব্ৰহ্মবিদের তুমি বরেণ্য,-
কাব্য-লােকের লােচন রবি !
স্বর্গে বসিয়া আশিষিছে তােমা,
ব্রহ্মবাদিনী বাচকবী।
শ্রদ্ধার সক্ চন্দন আর
অনুরাগ-ধারা এনেছি মােরা,
তােমাব যােগ্য নাহিক অর্ঘ্য,-
তবু লও প্রীতি রাখীর ডাের।
নিবেদিত
প্রসূতি না হয়ে কোলে পেয়েছিল পুত্র যশােমতী ;-
তেমনি তােমারে পেয়ে হৃষ্ট হয়েছিল বঙ্গ অতি,
বিদেশিনী নিবেদিতা! স্বাস্থ্য, সুখ, সম্পদ তেয়াগি”
দীন দেশে ছিলে দীন ভাবে ; দুঃস্থ এ বঙ্গের লাগি
O
সঁপেছিলে সৰ্বধন,কায়, মন, বচন আপন,
ভাবের আবেশ ভরে,—করেছিলে আত্ম-নিবেদন।
ভালবেসে ভারতেরে কাছে এসেছিলে দূর হতে,
দিয়েছিলে স্নিগ্ধ করে অনাবিল মমত্বের স্রোতে।
১৪৫
কুহু ও কেকা
তপস্যার পুণ্য তেজে করেছিলে অসাধ্য-সাধন,
জ্বেলেছিলে স্বর্ণ দীপ অন্ধকারে ; নব উদ্বোধন
করেছিলে জীর্ণ বিমূলে মাতৃরূপা শকতির
মুরিয়া সে সব কথা আজ শুধু চক্ষে বহে নীর।
__
এসেছিলে না ডাকিতে, অকালে চলিয়া গেলে, হায়,
চলে গেলে অল্প-আয়ু দুর্ভাগার সৌভাগ্যের প্রায়,
দেহ রাখি’ শৈল মূলে ;-শঙ্করের অঙ্কে মৃত সতী;
ওগাে দেবতার-দেওয়া ভগিনী মােদের পুণ্যবতী।
নফর কুণ্ডু
•
নফর নফর নয়,-এক মাত্র সেই তাে মনিব
নফরের দুনিয়ায় ; দীন হীন প্রতি জীবে শিব
প্রত্যক্ষ করেছে সেই। নহিলে কি অস্পৃশ্য মেথরে
বিপন্ন দেখিয়া, নিজ প্রাণ দিতে পারে অকাতরে
দুঃস্থের উদ্ধার লাগি’? পঙ্কে সে মানে নি অগৌরব
সে শুধু মানস-চক্ষে দেখেছে গাে বিপন্ন মানব ;
শুনেছে মনের কানে মুমুষু জনের আত্তরব,
অমনি গিয়েছে ভুলে পুত্র, জায়া, পিতা, মা,সব,
গৃহ, গৃহস্থালী-সুখ ; বাষ্প-বিষ-বিহ্বল-গহ্বরে
নেমেছে অকুতােভয়ে ;
—একটি সে জীবনের তরে।
১৪৬
কুহু ও কেকা
একটি প্রাণেরু লাগি’ নিজ প্রাণ দেছে মহাপ্রাণ।
স্বদেশী বিদেশী মিলি’ স্মরে আজি পুণ্য অবদান
নিঃস্ব এই নফরের। নফর আজিকে পুণ্যশ্লোক ;
আলােকিছে মাতৃভূমি শুভ্র তার সুকৃতি-আলােক।
দেশবন্ধু
(স্বর্গীয় রমেশচন্দ্র দত্তের অভ্যর্থনা উপলক্ষে সাহিত্য-পরিষদে গীত)
বন্ধুর ভালে চন্দন-টীকা কণ্ঠে কমল-মালা,
দেশ-বন্ধুর শুভ আগমনে হৃদি-মন্দির আলা !
মাধবে মাধবী-কঙ্কণ বাঁধ বন্ধুর মণিবন্ধে,
লােক-বন্ধুর গৌরব-গাথা গাঁথ মনােরম ছন্দে ;
বেদের সরস্বতী এসেছেন লইয়া বরণডালা,-
ইন্দু-কিরণ-নিন্দিত যার মুকুট-রশ্মি-জ্বালা।
বন্ধুর তরে তােরণ রচনা করেছে নূতন বর্ষ,
নবীন পুষ্পে নব কিশলয়ে ; উথলে নবীন হর্ষ।
বর্ষণ করে লাজ-অঞ্জলি কল্যাণী পুরবালা,
জনবন্ধুর আগমন-পথে লক্ষ কুসুম ঢালা।
১৪৭
কুহু ও কেক
জ্যোতির্মণ্ডল
যাহাদের পুঞ্জ তেজে দীপ্ত আজি বঙ্গের গগন,
বাঙালীর চিত্তপটে তাহাদের একত্র মিলন।
মণ্ডলের মধ্যে রবি মহিমায় করেন বিরাজ,
সৌর জগতের সত্য সাহিত্য-জগতে হের আজ
হয়ে আছে সপ্রমাণ। উদ্ধে তার নিস্পন্দ আলােক,
যগ-যুগন্ধর রাজা আছেন রচিয়া ধ্রুব-লােক ;
আর্ষ-লােক পার্শ্বে তার,—তপঃ ক্লিষ্ট সপ্তর্ষি মণ্ডল,
স্তব্ধ, শান্ত সুগম্ভীর পুরাতন জ্যোতিষ্কের দল,
অক্ষয় সে জ্ঞানযােগী, কৰ্ম্মযােগী বিদ্যার সাগর,-
দূরতায় মন্দীভূত রশ্মি তবু স্পষ্ট সুগােচর।
রবির দক্ষিণভাগে বঙ্কিম বঙ্গের বৃহস্পতি;
বামে মধু শুক্রগ্রহ ;—বিতরিল যেই শুভ্র জ্যোতি
রবি উদয়েরও আগে। শূন্যে শােভে নীহারিকা-সেতু,
উল্কা আছে, গ্রহ আছে, আছে তারা, আছে ধূমকেতু।
১৮
কুহু ও কেকা বিশ্ববন্ধু ( বিশ্ববন্ধু উইলিয়ম্ ষ্টেডের মৃত্যু উপলক্ষে। গ্রহণ-বর্জিত শুচি সূৰ্য্য সম নিত্য নির্নিমেষ নিয়ন্তার নেত্রবিভা পশেছিল ও তব পরাণে ; তাই জান নাই শঙ্কা, তাই তুমি মান নাই ক্লেশ, বিবাদ, বিপদ, বিম্ন ; টল নাই নিন্দা অপমানে। হে তেজস্বী ! অখি-সত্ত্ব! হে তপস্বী! স্বদেশ বিদেশ ভিন্ন নহে তব চোখে ; তােমার নাহিক আত্মপর ; ঘােষণা করেছ তুমি নিত্য সত্য; চিত্ত স্বার্থ-লশ- শূন্য তব চিরদিন; ধৃতব্ৰত তুমি ঋতন্তর। ; “জাতির প্রতিষ্ঠা বাড়ে ন্যায়-নিষ্ঠ শুচি অনুষ্ঠানে” এ তােমার মূলমন্ত্র,-এ তােমার প্রাণের সাধনা ; জয়-ডঙ্কা-নাদে তাই আতঙ্কিত হ’তে তুমি প্রাণে দুৰ্ব্বলের পীড়াভয়ে। বিশ্ব-মানবের আরাধনা, সনাতন ন্যায়-ধৰ্ম্ম, তুমি তার ছিলে পুরােহিত ;- কত অভিচার-মন্ত্র নষ্টবীৰ্য্য তব শঙ্খ রবে। হে বিশ্বাসী! বিশ্ববন্ধু ! ওগাে কৰ্মী উদার-চরিত। নিঃস্ব নিজ্জিতের পক্ষে একা তুমি যুঝেছ গৌরবে। ১৪১
কুহু ও কেকা
হে ধর্মিষ্ঠ ! আত্মনিষ্ঠ! লভিয়াছ সমুদ্র-সমাধি
অন্তে তুমি সমুদার! মানুষের রাজ্যের বাহিরে ;
উর্ধে শুধু নীলাকাশসীমাহীন,অনন্ত, অনাদি,
নিম্নে লীলায়িত নীল উচ্ছসিত চুমা-মিহিরে।
তােমার সমাধি ভঙ্গ করিবে না তরঙ্গ দুর্জয়,
আত্ম-প্রাণ-দানে তব আৰ্তত্রাণ ঘটেছে সুক্ষণে ;
কীৰ্ত্তনীয় তব নাম ; কীৰ্ত্তি তব অমর অক্ষয়,
ক্ষাত্ৰধৰ্ম্ম মূর্ত তুমি, হে যশস্বী ! জীবনে মরণে।
চৌদ্দ প্রদীপ
চৌদ্দ প্রদীপে চৌদ্দ
ভুবন
উজল করি,
বিস্মৃত শত অমা-যামিনীর কাজল হরি ;
পিতৃযানের অজানা আঁধারে আলােক জ্বালি,
আলাের রাখীতে বাঁধি গাে অতীতে,—ঘুচাই কালি !
মৃত্যু গহনে বিস্মৃত জনে স্মরণ করি,
স্মৃতি-লােকে সবে জাগাই পুলকে চিত্ত ভরি।
কল্পনা দিয়ে করি গাে সৃজন কল্প-লতা,
অশ্রু-হিমানী জড়িত আকাশে অতীত-কথা !
কুহু ও কেক
•
চৌদ্দ প্রদীপে সপ্ত ঋষিরে স্মরণ করি,
ত্রিশঙ্কু আয় বিশ্বামিত্রে বরণ করি
অরি অগস্ত্যে-ফেরে নি যে আর যাত্রা করে,
স্মরি গাে বুদ্ধে—জ্ঞানে প্রেমে যার ভুবন ভরে ;
স্মরি পরাশরে-তার রাক্ষস-সত্ৰ-কথা,
স্মরি মৈত্রেয়ী অরুন্ধতীরে পতিব্রতা ;
বাল্মীকি আর কালিদাস কবি জাগিছে মনে,
দোলাইয়া শিখা নমিছে প্রদীপ দ্বৈপায়নে।
ভীষ্মের স্মৃতি উজলিছে দীপ হৃদয়-লােকে,
সাব ভারতের পিতামহ সেই অপুত্রকে।
জাগিছে ভরত সৰ্ব্বদমন ভারত-আদি,
অশােক-প্রতাপ-পৃথী-বিজয়সিংহ-সাথী।
জাগে বিক্রম অভিনব নব-রত্নে ধনী,
যবনী রাণীর বক্ষে জাগিছে মােৰ্য্যমণি
লুপ্ত দিনের বিস্মৃতি-লেপ ঘুচেছে কালাে,
চৌদ্দ প্রদীপে আজিকে চৌদ্দ ভুবন আলাে।
কোলাকুলি আজ তিমিরে দোলায়ে আলাের দোলা !
চৌদ্দ যুগের চৌদ্দ হাজার ঝরােখা খােলা ।
এ পারে প্রদীপ উল্কা ওপারে উলসি’ ওঠে,
পিতৃযানের মাঝখানে আজ বার্তা ছােটে ;
১৫১
কুহু ও কেকা
আনাগােনা আজ জানা যেন যায় আকাশ পরে,
পিতৃগণের পদ-রেণু আজ আঁধারে ঝরে।
আঁধার-পাথারে আকুল হৃদয় পেয়েছে ছাড়া,
চৌদ্দ প্রদীপে চৌদ্দ ভুবনে জেগেছে সাড়া।
বন্দরে
শাস্ত্র-শাসন রইল মাথায়, তর্ক মিছে,নেই ফল ;
বন্দরে ওই দাড়িয়ে জাহাজ, বেরিয়ে পড় বন্ধুদল ।
বাজে কথায় কান দিয়ােনা, কান দিয়ােনা ক্রন্দনে,
দুলতে হবে সিন্ধু-দোলায় বিরাট বুকের স্পন্দনে।
সাগর-পথে যাত্রা-নিষেধ ?—লক্ষ্মীছাড়ার যুক্তি ও,
লক্ষ্মী আছেন সিন্ধুমাঝে-মুক্তাভরা শক্তি ও ;
ফিরব মােরা দশটা দিকে রত্নাকরের বুক চিরে,
রত্ন নেব, মুক্তা নেব, সঙ্গে নেব লক্ষ্মীরে।
বাণিজ্যে সে বসত করে সিন্ধুজলে জন্ম তার,
সাগর সেঁচে আব তারে আন্ধ ঘরে পুনৰ্বার ;
আন্ ঘরে মাথায় করে বিদ্যা মৃত-সঞ্জীবন,
শুক্র ঋষির চরণ-ধূলায় পরব মােরা জ্ঞানাঞ্জন।
১৫২
কুহু ও কেকা
দেবযানীরে রাখব খুসী ব্রহ্মচর্য ছাড়ব না,
আপনজনে ভুলব না রে পরের আদর কাড়বনা ;
জালের কাঠি নিরেট খাঁটি, ছড়িয়ে পড়ে ছত্রাকার,,
মিললে নিধি, জলের তলে থাকবে না সে ছড়িয়ে আর ;-
ঘেঁষে ঘেষে ঘনিয়ে এসে মিলিয়ে দেবে সকল খুঁট,
ধন ঘড়াটি ধরবে আঁটি’ লাখ, আঙুলের লােহার মুঠ !
ছড়িয়ে গিয়ে জগন্মাঝে মি মােরা অন্তরে ;
নূতন করে পড়ব বাঁধা দেশের মাঙ্গ-মন্তরে।
পাজি পুথি রইল মাথায়, জ্ঞানের বাড়া নেই বল,
যৌবনের এই শুভক্ষণে বেরিয়ে পড় বন্ধুদল !
হিন্দু যখন সিন্ধুপারে করলে দখল যবদ্বীপ
কোথায় তখন ভট্টপল্লী কোথায় ছিলেন নবদ্বীপ ?
কোথায় ছিল জাতির তর্ক—অর্কফলার আন্দোলন
যেদিন রুদ্র সমুদ্রেরে বিজয় দিল আলিঙ্গন ?
মেক্সিকোতে হ’ল যেদিন মঠপ্রতিষ্ঠ। রামসীতার
বিধান দিল কোন্ মনীষি ?-খোঁজ রাখে কি পুরাণ তার?
উপ-যােগে দু’দিন আগে হিন্দু যেত সিন্ধু পার,
মিশর, পেরু, রােম, জাপানে ছুটত নিয়ে পণ্যভার ;
কুহু ও কেকা
তাদের ধারা লুপ্ত হবে? থাকবে শুধু পঞ্জিকা ?
ধানের আবাদ উঠিয়ে দিয়ে ফসল হ’ল গঞ্জকা ?
করুক তবে সূক্ষ্ম বিচার শাস্ত্র নিয়ে পণ্ডিতে ;
নিঃস্ব করুক নস্য-ধানী গােময়-লিপ্ত গণ্ডীতে।
চবে না কেউ মােদের নিয়ে ?—সাগরের তত চলছে জল ;
পরের কথা ভাব পরে বেরিয়ে পড় বন্ধুদল।
ছেলের দল
হল্লা করে ছুটির পরে ওই যে যারা যাচ্ছে পথে,
হাল্কা হাসি হাসছে কেবল,-ভাছে যেন আগা স্রোতে,
কেউ বা শিষ্ট, কেউ বা চপল, কেউ বা উগ্র, কেউ বা মিঠে ;
ওই আমাদের ছেলেরা সব,-ভানা যা’ সে’ ওদের পিঠে।
ওই আমাদের চোখের মণি, ওই আমাদের বুকের বল,-
ওই আমাদের অনর প্রদীপ, ওই আমাদের আশার স্থল,
ওই আমাদের নিখাদ সােনা, ওই আমাদের পুণ্যফল,-
আদর্শে যে সত্য মানে—সে ওই মােদের ছেলের দল।
ওরাই ভাল বাতে জানে
দরদ দিয়ে সরল প্রাণে,
প্রাণের হাসি হাতে জানে, খুলতে জানে মনের কল,
ওই যে দুষ্ট, ওই যে চপল,—ওই আমাদের ছেলের দল।
১৫৪
ওরাই রাখে জ্বালিয়ে শিখা বিশ্ববিদ্যা-শিক্ষালয়ে,
অন্নহীনে অন্ন দিতে ভিক্ষা মাগে লক্ষ্মী হয়ে ;
পুরাতনে শ্রদ্ধা রাখে নূতনেরও আদর জানে
ওই আমাদের ছেলেরা সব,-নেইক দ্বিধা ওদের প্রাণে ;
ওই আমাদের ছেলেরা সব—ঘুচিয়ে অগৌরবের রব
দেশ দেশান্তে ছুটছে আজি আতে দেশে জ্ঞান-বিভব
মাকিনে আর জৰ্ম্মনিতে পাচ্ছে তারা তপের ফল,
হিবাচীতে আগুন জ্বেলে শিখছে ওরা কজাকল
হােমের শিখা ওরাই জ্বলে,
জ্ঞানের টীকা ওদের ভালে,
সকল দেশে সকল কালে উৎসাহ-তেজ অচঞ্চল,
ওই আমাদের আশার প্রদীপ, ওই আমাদের ছেলের দল।
মানুষ হয়ে ওরা সবাই অমানুষী শক্তি ধরে,
যুগের আগে এগিয়ে চলে, হাস্যমুখে গর্বভরে ;
প্রয়ােজনের ওজন-মত আয়ােজন সে কৰ্তে পারে,
ভগবানের আশীর্বাদে বইতে পারে সকল ভারে।
ওই আমাদের ছেলেরা সব,-ত্রুটি ওদের অনেক হয়,
মাঝে মাঝে ভুল ঘটে ঢের,কারণ ওরা দেবতা নয় ;
মাঝে মাঝে দাঁড়ায় বেঁকে নিন্দা শুনে অনর্গল,
প্রশংসাতেও হয় গাে কাবু-মনের মতন দেয় না ফল
১৫৫
কুহু ও কেকা
তবু ওরাই আশার খনি,
সবার আগে ওদের গণি,
পদ্মকোষের বজ্ৰমণি ওরাই ধ্রুব সুমঙ্গল ;
আলাদিনের মায়ার প্রদীপ ওই আমাদের ছেলের দল।
কালোের আলাে
কালাের বিভায় পূর্ণ ভুবন কালােরে কে করিস্ ঘৃণা ?
আকাশ-ভরা আলাে বিফল কালাে আঁখির আলাে বিনা।
কালাে ফণীর মাথায় মণি,
সােনার আধার আঁধার খনি;
বাসন্তী রং নয় সে পাখীর বসন্তের যে বাজায় বীণা ;
কালাের গানে পুলক আনে, অসাড় বনে বয় দখিনা ।
কালাে মেঘের বৃষ্টিধারা তৃপ্তি সে দেয় তৃষ্ণ হরে,
কোমল হীরার কমল ফোটে লাে নিশির স্যামসায়রে!
কালাে অলির পরশ পেলে
তবে মুকুল পাপড়ি মেলে,
তবে সে ফুল হয় গাে সফল রােমাঞ্চিত বৃন্ত পরে ;
কালাে মেঘের বাহুর তটে ইন্দ্রধনু বিরাজ করে।
ক
১৫৬
কুহু ও কেকা
সন্ন্যাসী শিব শ্মশান-বাসী,-সংসারী সে কালাের প্রেমে;
কালাে মেয়ের কটাক্ষেরি ভয়ে অসুর আছে থেমে।
দৃপ্ত বলীর শীর্ষ’পরে
কালাের চরণ বিরাজ করে,
পুণ্য-ধারা গঙ্গা হ’ল-সেও তত কালাে চরণ ঘেমে ;
দুৰ্ব্বাদলশ্যামের রূপেরূপের বাজার গেছে নেমে ।
৫
প্রেমের মধুর টেউ উঠেছে কালিন্দীরি কালাে জলে,
মােহন বাঁশীর মালিক যেজন তারেও লােকে কালােই বলে ;
বৃন্দাবনের সেই যে কালাে,
রূপে তাহার ভুবন আলাে,
রাসের মধুর রসের লীলা,-তাও সে কালে তমাল তলে ;
নিবিড় কালাে কালাপানির কালো জলেই মুক্তা ফলে।
কালো ব্যাসের কৃপায় আজো বেঁচে আছে বেদের বাণী,
দ্বৈপায়ন—সেই কৃষ্ণ কবি-শ্রেষ্ঠ কবি তারেই মানি;
কালাে বামুন চাণক্যেরে
আঁটবে কে কুট-নীতির ফেরে?
কাল-অশােক জগৎ-প্রিয়-রাজার সেরা তারে জানি;
হাসী কালাে লােমানেরে মানে আরব আর ইরাণী ।
কুহু ও কেকা
কালাে জামের মতন মিঠেকালাের দেশ এই জম্বুদ্বীপে
কালাের আলাে জ্বলছে আজো, আজো প্রদীপ যায়নি নিবে;
কালাে চোখের গভীর দৃষ্টি
কল্যাণেরি করছে সৃষ্টি,
বিশ্ব-ললাট দীপ্ত-কালাে রিষ্টিনাশা হােমের টিপে,
রক্ত চোখের ঠাণ্ডা কাজল—তৈরী সে এই ম্লান প্রদীপে।
কালাের আলাের নেই তুলনা-কালােরে কী করিস ঘৃণা !
গগন-ভরা তারার মীনা বিফল—চোখের তারা বিনা
কালাে মেঘে জাগায় কেকা,
চাদের বুকেও কৃষ্ণ-লেখা,
বাসন্তী রং নয় সে পাখীর বসন্তের যে বাজায় বীণা,
কালাের গানে জীবন আনে নিথর বনে বয় দখিনা।
আমরা
মুক্তবেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতরে রঙ্গে
আমরা বাঙালী বাস করি সেই তীর্থে—বরদ বঙ্গে;
বাম হাতে যার কলার ফুল,
ডাহিনে মধুক-মালা,
ভালে কাঞ্চন-শৃঙ্গ-মুকুট, কিরণে ভুবন আলা,
১৫৮
কুহু কেকা
কোল-ভরা যার কনক ধান্য, বুকভরা যার মেহ,
চরণে পদ্ম, অতসী অপরাজিতায় ভূষিত দেহ,
সাগর যাহার বন্দনা রচে শত তরঙ্গ ভঙ্গে,
আমরা বাঙালী বাস করি সেই বাঞ্ছিত ভূমি বঙ্গে।
বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া আছি,
আমরা হেলায় নাগেরে খেলাই, নাগেরি মাথায় নাচি।
আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে,
দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে।
আমাদের ছেলে বিজয়সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়
সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্যের পরিচুয় ।
একহাতে মােরা মগেরে রুখেছি, মােগলেরে আর হাতে,
চঁাদ-প্রতাপের হুকুমে হঠিতে হয়েছে দিল্লীনাথে ।
জ্ঞানের নিধান আদিবিদ্বান্ কপিল সাঙ্কার
এই বাঙলার মাটিতে গাঁথিল সূত্রে হীরক-হার।
বাঙালী অতীশ লঘিল গিরি তুষারে ভয়ঙ্কর,
আলিল জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালী দীপঙ্কর।
কিশাের বয়সে পক্ষধরের পক্ষশাতন করি’
বাঙালীর ছেলে ফিরে এল দেশে যশের মুকুট পরি।
বাঙলার রবি জয়দেব কবি কান্ত কোমল পদে
করেছে সুরভি সঙস্কৃতের কাঞ্চন-কোকনদে।
১৫৯
কুহু ও কেকা
স্থপতি মােদের স্থাপনা করেছে ‘বরভূধরের ভিত্তি,
শ্যাম-কাঘােজে ওঙ্কার-ধাম’,—মােদেরি প্রাচীন কীর্তি।
ধেয়ানের ধনে মূর্তি দিয়েছে আমাদের ভাস্কর
বিটুপাল আর ধীমান,—যাদের নাম অবিনশ্বর।
আমাদেরি কোন সুপটু পটুয়া লীলায়িত তুলিকায়
আমাদের পট অক্ষয় করে রেখেছে অজস্তায়।
কীৰ্ত্তনে আর বাউলের গানে আমরা দিয়েছি খুলি
মনের গােপনে নিভৃত ভুবনে দ্বার ছিল যতগুলি।
মন্বন্তরে মরি নি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি,
বাঁচিয়া গিয়েছি বিধির আশিষে অমৃতের টীকা পরি।
দেবতারে মােরা আত্মীয় জানি, আকাশে প্রদীপ জ্বালি,
আমাদেরি এই কুটিরে দেখেছি মানুষের ঠাকুরালি ;
ঘরের ছেলের চক্ষে দেখেছি বিশ্বভূপের ছায়া,
বাঙালীর হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া।
বীর সন্ন্যাসী বিবেকের বাণী ছুটেছে জগৎময়,
বাঙালীর ছেলে ব্যাঘ্ৰে বৃষভে ঘটাবে সমন্বয়।
তপের প্রভাবে বাঙালী সাধক জড়ের পেয়েছে সাড়া,
আমাদের এই নবীন সাধনা শব-সাধনার বাড়া।
বিষম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালী দিয়েছে বিয়া,
মােদের নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া ।
১৬০
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.