Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Di Bhyalera Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
--ভি ভ্যালে-
শ্রীনৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়,
১৯৩৬ সাল
প্রকাশক
নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়
১নং শ্যামাচরণ দে ষ্ট্রীট,
কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
মৃল্য এক টাকা চার আনা
অদ্বৈত্য প্রেসে,
১৩নং শ্যামাচরণ দে ফ্লাট,
গােপালচন্দ্র নন্দী কক মুদ্রিত।
জাতির এই মুক্তি-সংগ্রামের দিনে অপর জাতির মুক্তি-সাধনার কথা
অন্তরে অভিনব আশা আনিয়া দেয়—তাই আইরিশ-স্বাধীনতা-সংগ্রামের
অগ্নি-ঋষি ডি ভ্যালেরার জীবন-কাহিনী লিখিত হইল।
এই জীবনীর সকল তথ্য David T. Dwane-এর Early Life of
Eamon De Valera 97 Pearas Beaslai 99 Micheal
Collins and the Making of a New Ireland হইতে সংগৃহীত।
এই পুস্তক প্রকাশ করিতে অগ্রজ-প্রতিম দেবেন্দ্রকুমার রায় যে
প্রভূত সহায়তা করিয়াছেন তাহার জন্য তাঁহার নিকট চির-ঋণী হইয়
রহিলাম ।
গ্রন্থকার
১. ১. ২৯
প্রাপ্তিস্থান
গুপ্ত ফ্রেণ্ড এণ্ড কোং
১১ নং কলেজ স্কোয়ার
শ্নায়ুশক্তি লাইব্রেরী
৫ নং কালে ধোয়াব
ডি ভ্যালেরা
“দূরে ঐ দেখা যায়-আয়ারল্যাণ্ডের পাহাড়ের চুড়ায় নূতন ঊষার
প্রথম আলাে,
আয়ারল্যাণ্ডের এই নৃতন উষার হে প্রথম আলাের কণা, অন্তরের
সমস্ত নিরুদ্ধ প্রেম দিয়া তােমার বন্দনা করি।”
লক্
No text on this page.
**
জগতের ইতিহাসে আয়ারল্যাণ্ডের দাবী
ডি ভ্যালেরার জীবনের কথা আরম্ভ করিতে হইলে
আরম্ভ করিতে হয় আয়ারল্যাণ্ডের বাহির হইতে। কারণ ডি
ভ্যালেরা জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন আমেরিকায়, আর তাঁহার
পিতা ছিলেন একজন আসল স্পেনীয় ; অবশ্য তঁাহার মাতা
ছিলেন আয়ারল্যাণ্ডের পল্লীর মেয়ে। ডি ভ্যালেরার,
সঙ্গে যেমন আমেরিকা ও স্পেন এই দুই দেশের একটা
সাক্ষাৎ যােগ আছে, ঠিক সেই রকম আয়ারল্যাণ্ডের পতন
ও অভুত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে প্রধানতঃ এই দুই দেশের
সবিশেষ যােগ আছে। এই যােগ-সূত্রের ইতিহাস না
জানিলে আয়ারল্যাণ্ডের অভ্যুত্থানের স্বরূপ বােঝায় টী
থাকিয়া যায়।
ভ্যালেরার জীবন-কাহিনী লিখিবার প্রারম্ভেই একটা রূঢ়
সত্যের সহিত প্রথমেই মুখােমুখী হইয়া দাড়াইতে হয়।
সত্য আজ জগতের সমস্ত বিজিত জাতির নিরুদ্ধ-প্রজ্ঞার
তিমির-মন্দির-প্রাঙ্গণে বিচারের আশায় মূক হইয়া ঈড়াইয়া
আছে। তাহার নাম ইতিহাসের অবিচার। জগতের
প্রাচীন কাল হইতে আজ পর্যন্ত বিজেতারা এই অবিচার
বিজিত জাতির উপর করিয়া আসিতেছে। বিজিত জাষ্ঠির
ইতিহাস লেখার ভার যদি বিজেতাদের উপর গিয়া পড়ে তাহা হইলে যে কি হয় তাহা আজ ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনা-ধারার সঙ্গে যাঁহারা পরিচিত তাহারাই জানেন। ইতিহাস তখন রাজনৈতিকদের হাতের যন্ত্র হইয়া উঠে। বিজেল ইতিহাসকার রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিজিত জাতির সমগ্র মূর্তিকে পঙ্গ, করিয়া রাখিয়া যায়। কিন্তু চির- কাল দেখা যায় যে, মানুষের গড়া এই অবিচারের বিরুদ্ধে প্রকৃতি গােপনে তঁাহার নজির লুকাইয়া রাখেন—মাটীর নীচে, শিলাস্তম্ভে, পরিব্রাজকের গাথায়। যে সকল মহা- পুরুষ আপনার জাতিগত স্বার্থ ভুলিয়া সভ্যতার মিত্র হিসাবে সেই সব মিথ্যা-কাহিনীর জঞ্জাল দুর করিয়া অতীতকে আবার সত্য-মূৰ্ত্তি দান করেন—তাহারা সৰ্বজাতির নমস্য। ভারতবর্ষের ইতিহাস যেমন মিথ্যায় কলঙ্কিত তেমনি আয়ারল্যাণ্ডের ইতিহাসও বিস্মৃতির ও বিলুপ্তির অন্ধকারে লীন হইতে চলিয়াছিল। অতি প্রাচীনকাল হইতেই আয়ারল্যাণ্ডের রাজনৈতিক ও ধৰ্ম্ম-জীবনের সহিত পশ্চিম য়ুরােপের একটা সুদৃঢ় যােগ ছিল। যেসময় সন্ন্যাসী সেন্ট প্যাটিক আয়ারল্যাণ্ডকে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করিয়া তােলন তাহার কিছু কালের মধ্যে ফ্রান্স ও ইতালীর বিদ্যালয়ে, ধৰ্ম্ম- মন্দিরে মন্দিরে আইরিশ-প্রচারক ও সন্ন্যাসীগণ বিশিষ্ট আসন অধিকার করিয়া বসেন। সুদুর দানুয়ুবের তীর পর্যন্ত আই- রিশ-শিক্ষা ও ধর্মনীতি সেদিন গিয়া পৌছিয়াছিল। সেখানে গিয়া আইরিশরা মঠ রচনা করিয়াছে, বিদ্যালয় গড়িয়া তুলি- য়াছে, তাহাদের ভগ্নাবশেষ আজও কোথাও কোথাও পরিলক্ষিত হয়। তখন আয়ারল্যাণ্ড বিদ্যা ও কলা-শিল্পের জন্য এত প্রসিদ্ধ হইয়া উঠিয়াছিল যে, বৃটেন এবং য়ুরােপের অন্যান্য প্রদেশের সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তানেরা আয়ারল্যাণ্ডে বিদ্যাভ্যাসের জন্য আসিতেন। কিন্তু এই গতি নিরুদ্ধ হইয়াগেল। সভ্যতার চির-শ মধ্যযুগের যাযাবর দস্যুর দল নানা দেশে আপনাদের লােভের অভিযানে মানবসভ্যতার বহু হানি করিয়া গিয়াছে। নরম্যান ও ডেন জলদস্যুরা আসিয়া প্রাচীন গ্যালিক সভ্য- তাকে আঘাত করে এবং তাহার পর প্রতিবাসীদের প্রভুত্বের ফলে আয়ারল্যাণ্ডের অবস্থা যে হীনতায় মগ্ন হইল তাহাতে গ্যালিক সভ্যতার শেষ-স্মৃতি বিলুপ্ত হইয়া যাইতে বসিল। আয়ারল্যাণ্ডের শিক্ষা-দীক্ষার ভগ্ন দেউলের উপর বিজাতির শিক্ষা-মন্দির গড়িয়া উঠিল। “The schools, except those of the usurpers were desecrated ; a price was set on the head of the priest and only the purple heather of the mountain, made beautiful by nature, afforded him and his faithful flock an alter and a place of worship." “অপহরণকারীদের বিদ্যালয়গুলি ছাড়া দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল; আয়ারল্যাণ্ডের ধৰ্ম্ম-মন্দির ভাঙ্গিয়া পড়িল ; তাহার পুরােহিতের মস্তকের জন্য পুরস্কার বিঘােষিত হইল; আয়াল্যাণ্ডের পার্বত্য বন- কুসুমের রক্ত-আবরণের মধ্যে নির্বাসিত হইয়া তাহারা কোনও রকমে মুক্ত-প্রকৃতির অঙ্গণে আপনাদের উপাসনার স্থান করিয়া লইতে বাধ্য হইয়াছিল।” আয়াল্যাণ্ডের সেই নিদারুণ দুর্দিনের সময় তাহার সহিত স্পেনের গভীর আত্মীয়তা স্থাপিত হয়। স্পেনের প্রত্যেক অধিবাসী আয়ারল্যাণ্ডের সেই দুর্দিনের জন্য ক্ষুব্ধ হইয়াছিল এবং স্পেন আপনার ক্রোড়ে বহু নির্বাসিত আইরিশম্যানকে সেদিন অভয় আশ্রয় দিয়াছিল। রাণী এলিজাবেথের সময় যখন আইরিশ ধনীরা ক্যাথােলিক ধর্ম ত্যাগ না করার অপরাধে সমস্ত সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত হইতে বসিয়াছিল, ই # David, T, Dawne.
তখন দুই দুই বার স্পেন সৈন্য দিয়া আয়ারল্যাণ্ডকে সাহায্য আয়ারল্যাণ্ডও স্পেনের এই সহানুভূতির যথাযযাগ্য, সম্মান করিয়া আসিয়াছে। স্পেনের পতাকার নিমে.শত, শত আইরিশ প্রাণত্যাগ করিয়াছে। যখন ইংলণ্ডে ক্যাথাে- লিক ধর্ম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ভাঙ্গিয়া ফেলা হয়, তখন স্পেনের রাজা সালামেনাকায় আইরিশ ধৰ্ম্মযাজক ও শিক্ষক- দের জন্য শিক্ষায়তন ও মন্দির গড়াইয়া দেন। সেগুলি এখনও এই দুই জাতির সদ্ভাবের স্মৃতি চিহ্নরূপে দাড়াইয়া আছে। সেদিন আশ্রয় দিয়া স্পেন আয়ারল্যাণ্ডকে বাঁচাইয়া- ছিল—আজ ডি, ভ্যালেরাকে দিয়া তাহাকে পুনর্জীবন দিল। আয়ারল্যাণ্ডও স্পেনের এই অপূর্ব সহায়তার পূর্ণ প্রতিদান দিতে পারিয়াছে। স্পেনের শাসন-যন্ত্র প্রথম সঙ্ঘবদ্ধ ও সুদৃঢ় করে Generl Henry 0 Donnell-একজন নির্বাসিত আইরিশ। স্পেন কেন, গত যুগের য়ুরােপের অন্যান্য দেশের অভ্যুত্থানেও প্রধান সহায়ক রূপে বহু আইরিশ সন্তান আত্মিদান করিয়াছেন। তঁাহারা অনেকেই সেই সব দেশের গৌরবের ও শাসনের সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়াছিলেন। অপ্রাসঙ্গিক হইলেও কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য তাঁহাদের মাত্র কয়েক জনের নাম নিম্নে দিলাম। L ০ s , স্পেনে General Wall, Prime Minister (প্রধান মন্ত্রী) General D. O Donnell Field Marshall Count O' Reilly (atentat catato) Bernard O'Higgins ( চিলির প্রথম প্রেসিডেন্ট ) ফ্রান্সে Marshall Mac Mohan ( প্রধান সেনাপতি) Lord Clare Lt. General Dillon Major General D' Aroy Brigadier General D'Arcy অস্ট্রিয়ায় Field Marshall Detacy (প্রধান সেনাপতি ) Taffe O' Donell Frady Nagent রুবিষয় Fléld- Marshall Count Peter Lacy ইনি ক্রিমিয়া ও ফিনল্যাণ্ডের কিছু অংশ কষিয়ায় অন্ত ভুক্ত করেন। ১) ত ১) ১১ } ১) ? ১) ০ ১১ Field Marshall Count Browne (প্রধান সেনাপতি) আমেরিকায় First Governor of Illionos (ইলিয়স্ প্রদেশের প্রথম শাসন কর্তা) Massachusetts (মাস চুসেন্ট প্রদেশের প্রথম শাসনকর্তা ) Kansass (কানসাস প্রদেশের প্রথম শাসন কর্তা) Delaware (ডেলাওয়ার প্রদেশের প্রথম শাসন কর্তা) First Mayor of New York ( নিউইয়র্কের প্রথম মেয়র) বর্তমান সিফিন্ আন্দোলন ও আইরিশ রাজনীতির সঙ্গে আমেরিকার খুব ঘনিষ্ঠ যােগ আছে। আমেরিকা ডি ভ্যালেরাকে অর্থ সাহায্য করিয়াছে এবং ডি, ভ্যালেরার জন্ম- ভূমি বলিয়া আয়ারল্যাণ্ডের নিকট শ্রদ্ধার দাবী করিতে পারে। কিন্তু আয়ারল্যাণ্ডও বর্তমান আমেরিকাকে গড়িয়া তুলিতে যতখানি সাহায্য করিয়াছে, এরকম কোন সাহায্য অন্য কোন যায়গায় সম্ভব হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না।
ওয়াশিংটনের সেনাপতিত্বে যুক্ত প্রদেশ প্রতিষ্ঠাকল্পে আমেরিকার যুদ্ধে অর্ধেক সৈন্য ছিল আয়ারল্যাণ্ডবাসী। Cardinal Gibbons 76071, "There is to-day scarcely any American hamlet in which the blood of Milesian is not represented” আজ আমেরিকায় এমন কোন ঘর পাওয়া যাইবে না, যেখানে আইরিশ রক্ত মিশিয়া নাই। আজ আমেরিকা যে অদম্য কর্মশক্তির বলে এবং একনিষ্ঠ পরিশ্রমের ফলে জগতের শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া আছে--তাহার অন্যতম কারণ—তাহাদের ধমনীতে প্রবাহিত আইরিশ রক্ত। প্রেসিডেন্ট উইলসন্ বহুবার তাঁহার আই- রিশ-জন্মে গর্ব অনুভব করিয়া গিয়াছেন। বিগত যুগের যুক্ত- রাষ্ট্র প্রদেশের প্রত্যেক অভ্যুত্থানের সহিত কোনও না কোন আয়ারল্যাণ্ড বাসীর নাম সংযুক্ত। Michael D. O'Brien মহাশয় American Irish Historical Societyর সম্মুখে Irish Firsts in America” বলিয়া এক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ পড়েন। তাহাতে তিনি অসংখ্য উদাহরণ দিয়া দেখাইয়াছেন যে আমেরিকার অধিকাংশ ব্যাপারের সহিত প্রথমেই সাক্ষাৎভাবে আয়ারলাণ্ডের যােগ। নিউইয়র্ক ও বােষ্টনের মত শহরে প্রথম খবরের কাগজ বাহির হয়-- আইরিশম্যানের দ্বারা। যুক্তরাজ্যে প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন
বসান Henry 0 Reilly-একজন আইরিশম্যান। এই
রকম নানা দিকে তিনি দেখাইয়াছেন যে কি গভীররূপে এই
দুই জাতির মধ্যে আত্মীয়তা পরিবর্ধিত হইয়াছে।
আমেরিকা ও আয়ারল্যাণ্ডের মধ্যে এই আত্মীয়তা
আরও সুদৃঢ় হয়—ডি, ভালেরার জনক-জননীর মধ্য দিয়া ।
আমেরিকায় শিশু ভ্যালেরা
১৮৮২ খৃষ্টাব্দে ১০ই অক্টোবর নিউইয়র্ক শহরে ইমন ডি,
ভ্যালেরা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম Vivan
De Valera। পূর্বেই বলিয়াছি তিনি ছিলেন একজন
পাকা স্পেনিয়ার্ড। পিরাণী পৰ্বতের দক্ষিণে চির-চঞ্চল
দুর্দান্ত সন্তানদের জননী Basque
প্রদেশে Vivan
be Valeraর যৌবন অতিবাহিত হয়। ডি ভ্যালেরার
জীবনে যে অসমসাহসিকতার পরিচয় জগৎ বিমুগ্ধ-বিস্ময়ে
পাইয়াছে—তাহার জন্মভূমি স্পেনের এই Basque প্রদেশ।
স্পেনের অধিবাসী চিরকালই অসমসাহসিকতার জন্য বিখ্যাত
এবং এই অসমসাহসিকতা ডি ভ্যালেরা উত্তরাধিকারসূত্রে
তাঁহার স্পেনীয় পিতার নিকট হইতে পান। Vivan De
Valera নিজে একজন শিক্ষিত লােক ছিলেন। স্পেনের
বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু গৌরবের পুরস্কার তিনি যৌবনেই অর্জন
করিয়াছিলেন। তিনি বহুভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু
চিত্রকর হিসাবে তিনি তাহার জীবিকা অর্জন করিতেন। তিনি স্পেনের সঙ্গীতেও স্ব-রচিত নূতন সুর ও গান রাখিয়া গিয়াছেন; তাঁহার প্রদেশে তঁাহার ন্যায় সঙ্গীতজ্ঞ খুব কম লােকই ছিল। ডি ভ্যালেরার মাতার সহিত বিবাহ হইবার পর তিনি আইরিশ ভাষা ও আইরিশ সঙ্গীত শিখিতে আরম্ভ করেন এবং আট মাসের মধ্যে এই দুই বিষয়েই অভিজ্ঞ হইয়া উঠেন। Vivan De Valera আপনার জাতির ইতিহাসের দিকে চাহিয়া আয়ারল্যাণ্ডকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন। এখানে ডি ভ্যালেরার জননীর বিষয় উল্লেখ করা একান্ত প্রয়ােজন। ডি ভ্যালেরার মা Limerck অন্তর্ভূক্ত Bruce শহরে জন্মগ্রহণ করেন। কুমারী অবস্থায় তাহার নাম ছিল, ক্যাথেরিনকোল। তিনিও একজন বিশেষ বিদূষী রমণী ছিলেন। ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে যখন তিনি আয়ার- ল্যাণ্ড পরিত্যাগ করিয়া আমেরিকায় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আসেন, তখন তাঁহার প্রদেশে তাহাকে বিদায় অভিনন্দন দিবার জন্য বিশেষ আয়ােজন হয়। তিনি ভ্রমণ করিতে ভালবাসিতেন। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশে তিনি ভ্রমণ করিয়াছিলেন এবং এই ভ্রমণ কালেই Vivan De Valeraর সহিত তাঁহার পরিচয় ও পরে পরিণয় ঘটে। ১০ wow ডি ভ্যালেরার সূতিকাগৃহকে পরিমণ করিয়া তখন এক প্রবাসী আইরিশম্যানের তিক্ত উদাত্ত বাণী বিঘােষিত হইতেছিল। আমেরিকার প্রত্যেক আইরিশ পল্লীতে তখন মাইকেল ডেভিডের বজ্র-বাণী তারস্বরে স্বদেশের আত্মগ্লানির কথা প্রচার করিতেছিল। আর স্বদেশে তখন জাতির কল্যাণ কামনায় উদ্বুদ্ধ হইয়া পার্ণেল, ডিলােন, সেক্সটন ইংরাজের কারাগার অলঙ্কত করিতেছিলেন। জাতির নিপীড়নের ক্রন্দনের সঙ্গে জাতির ভাগ্যবিধাতা জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকাল হইতেই ডি ভ্যালেরা অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান্। বালক ভ্যালেরা পথ দিয়া সৈনিকের কুচকাওয়াজ দেখিয়া বালক-কালেই কাঁধে একটা কিছু লইয়া ঠিক সৈনিকদের মত সােজা হইয়া কুচকাওয়াজ করিত। পাড়ার ছেলেদের লইয়া দল বাঁধিয়া সৈন্যদের মত সারিসারি পা ফেলিয়া যাত্রা করিত। স্পেন এবং আয়ারল্যাণ্ড—এই দুই জাতিই সমর- প্রিয় ; তাই এই দুই জাতির সংমিশ্রণের ফলস্বরূপ ডি ভ্যালেরার মধ্যে অতি শৈশবকাল হইতেই এই সামরিক প্রবৃত্তি উদগ্র মাত্রায় প্রকট দেখা যায়। ডি ভ্যালেরার বয়স তখন আড়াই কি তিন হইবে। সেই সময়ে তাঁহার জীবনে একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটে। একদিন ১
তাঁহাদের প্রতিবেশী এক ধনী ইংরাজ ভদ্রলােকের সহিত
বালক ভ্যালেরা পাইচারী করিতেছিল। বালককে খুসী
করিবার জন্য ইংরাজ ভদ্রলােকটি ফিরিওয়ালার নিকট হইতে
দুইটি পতাকা কিনিয়া ডি ভ্যালেরার সম্মুখে ধরিলেন।
একটি ইংলণ্ডের আর একটি আমেরিকা আইরিশম্যানদের।
ভদ্রলােকটি মজা দেখিবার জন্য দুইটি দুই হাতে করিয়া
বালককে একটি লইতে বলিলেন। বালক আইরিশম্যানের
পতাকাঢ়ি তুলিয়া লইল দেখিয়া ভদ্রলােকটি অন্য পতাকাটিও
তাহার বুকে গুজিয়া দিলেন। বালক ক্রোধ উন্মত্ত হইয়া
জামা হইতে দ্বিতীয় পতাকা ছুড়িয়া ফেলিল। দূরে এক
নিৰ্বাসিত বৃদ্ধ আইরিশম্যান এই দৃশ্য দেখিয়াছিল।
সে ছুটিয়া আসিয়া বালককে ধরিয়া নৃত্য করিতে লাগিল,
তারপর আপনি লজ্জিত হইয়া আয়ারল্যাণ্ডের নামে
বালককে আশীর্বাদ করিয়া চলিয়া গেল।
এই সামান্য ঘটনা হইতে ডি ভ্যালেরার ভবিষ্যৎ জীবনের
একটা স্পষ্ট সূচনা পাওয়া যায়।
১৮৮৪ সালের প্রথমভাগে ডি ভ্যালেরার পিতা ভয়ানক
অসুখে শয্যাগত হন এবং সেই বৎসরের শেষেই তিনি সেই
কাল-রােগে গতাসু হন। Vivan De Valeraeta
মৃত্যুতে সমস্ত পরিবারের মধ্যে একটা বিষম ভাগ্যবিপৰ্যয়
১২.
সংঘটিত হইল। নিউইয়র্কের মত সহরে অসহায় অবস্থায় শিশু সন্তান লইয়া ডি ভ্যালেরার জননী অকুল সমুদ্রে নিপ- তিত হইলেন। কোনও রকমে তিনি নিউইয়র্কে একটা চাকুরী খুঁজিয়া পাইলেন,কিন্তু বিপদ হইল শিশু ভ্যালেরাকে লইয়া। তিনি চাকরীর জন্য বাহির হইলে কে শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ করে ? জননীর অন্তর শিশুর অসহায় অবস্থার দিকে চাহিয়া কাঁদিয়া উঠিত। কিন্তু কি উপায়। এই সময় ডি ভ্যালেরার জননী খবর পাইলেন যে, ক্যান্টার্কীনিবাসী ডি ভ্যালেরার এক মামা আয়ারল্যাণ্ডে ফিরিয়া যাইতেছেন। এই সংবাদ শুনিয়া ভ্যালেরার জননীও মনস্থ করিলেন যে, এই শিশুকে তাহার মামার সহিত আয়ারল্যাণ্ডে পাঠাইয়া দিবেন । স্বদেশে তখন তাহাদের পৈতৃক ভিটা আগলাইয়া ভ্যালেরার দিদিমা বাঁচিয়া ছিলেন। তাঁহার তত্ত্বাবধানেই শিশু ভ্যালে- রাকে রাখিবার মনস্থ করিলেন। যে লােকটির সহিত শৈশবকালে ভ্যালেরা আমেরিকা পরিত্যাগ করিয়া আয়ারল্যাণ্ডের পুণ্যভূমিতে পদার্পণ করেন—তাহার নাম এডমণ্ড কোল। সম্পর্কে তিনি ভ্যালে- রার মামা। ডি ভ্যালেরা অতি শৈশবেই পিতাকে হারাইয়া- ছিলেন-মাতার সঙ্গ হইতেও নিরুপায়ভাবে বিচ্ছিন্ন হন। তাহার বাল্যকালে এডমণ্ডকোলের স্নেহ ও শিক্ষা-দীক্ষার প্রভাব প্রগাঢ়ভাবে প্রতিফলিত হয়। আটলান্টিক মহাসাগরের উৰ্মিবিক্ষুব্ধ বুকের উপর দিয়া যেদিন এডমণ্ডকোল অসহায় শিশুটির রক্ষণাবেক্ষণের ভার লইয়া আয়ারল্যাণ্ডের বুকে ফিরিয়া আসিতেছিলেন-তখন তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নাই যে, এই অসহায় শিশুই এক অসহায় জাতির ভাগ্যবিধাতা এবং একদিন এই অসহায় শিশুরই বিরুদ্ধে বৃটিশের রাজাজ্ঞা প্রচারিত হইবে যে—“বিচারে ঠিক হইল যে কাল সকালে ছয়টার সময়ই তােমাকে গুলি করিয়া মারিয়া ফেলা হইবে।” অয়ারল্যাণ্ডে বালক ভ্যালেন্না ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে ২০শে এপ্রিল এডমণ্ডকোল আয়ার- ল্যাণ্ডের ভাগ্যবিধাতাকে লইয়া আয়ারল্যাণ্ডে প্রবেশ করেন। ডি ভ্যালেরার জীবনের সঙ্গে আজ যদি মিলাইয়া দেখা যায়—তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, যখন তিনি আয়ার- ল্যাণ্ডে পদার্পণ করেন—তখন তাহার অজ্ঞাতেই তাহাকে বরণ করিয়া লইবার জন্যই যেন আয়ােজন করা ছিল। যে জাহাজে তাঁহারা আসিতেছিলেন, তাহাতে একদল প্রবাসী আইরিশ ঘরে ফিরিয়া আসিতেছিল। বন্দরে জাহাজ লাগিবামাত্র তাহারা দলবদ্ধ হইয়া লকের বিখ্যাত গান গাহিয়া উঠিল— ১৪
“দূরে ঐ দেখা যায় আয়ারল্যাণ্ডের পাহাড়ের চূড়ায়
নূতন ঊষার প্রথম আলাে।
জন্মভূমির স্মিত-আনন আজ উন্মত্ত করে—কে গাে
দেবদূত রাত্রির কালাে যবনিকা টেনে ফেলে দিলে...
আয়ারল্যাণ্ড, আয়ারল্যাণ্ড, মহিমময়ী, কি অপরূপ
আজ তােমার জ্যোতি ! তুমি যেন আজ নব-পরিণীতা বধু!
আয়ারল্যাণ্ডের এই নূতন উষার হে প্রথম আলাের কণা,
আমি অন্তরের সমস্ত নিরুদ্ধ প্রেম দিয়ে তােমার বন্দনা করি।”
গায়কেরা জানিত না যে সেই প্রথম আলাের কণা
একটি তিন বছরের শিশুর রূপ ধরিয়া তাহাদেরই সঙ্গে
ছিল।
এ যেন লােকবুদ্ধির অন্তরালে থাকিয়া ঘটনার অধি-
দেবতার মঙ্গলাচরণ। এ যেন ভ্যালেরার শিশু অন্তরের
সহিত দেশের অন্তরের গােপন আত্মীয়তা স্থাপন।
আয়ারল্যাণ্ডের ব্রুস নগরে শিশু ভ্যালেরাকে তাহার মামা
প্যাট্রিক কোলের নিকট রাখিয়া এডমণ্ডকোল আবার
আমেরিকায় ফিরিয়া যান।
শিশু ভ্যালেরার শিক্ষা-দীক্ষার ভার সমস্ত গিয়া পড়িল
সেই বৃদ্ধ মামাটির উপর। ভ্যালেরার জীবনের উপর এই
বৃদ্ধটির শিক্ষা-দীক্ষার যে কতখানি প্রভাব বলিয়া শেষ করা
যায় না।
ভ্যালেরা অতি শৈশবেই তাঁহার পিতাকে হারাইয়াছিলেন এবং তিন বছর বয়স হইতে না হইতেই মার কোল হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়েন। নীড়-চ্যুত সেই শিশুটির মনের সমস্ত ক্ষুধা এই বৃদ্ধটী পরিতৃপ্ত করেন। যথাসময়ে ভ্যালেরাকে ত্রুরীর জাতীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়া দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ে বালক ভ্যালেরা অতি অল্প- কালের মধ্যে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। বছর তিনেক যাইতে না যাইতেই ভ্যালেরার তীক্ষ্ণ মেধার কথা সমস্ত সহরে রাষ্ট হইয়া পড়িল। তাহার সেই সময়ের এক এক সহপাঠী তাহার ছাত্রাবস্থার বিবরণ দিয়াছেন। অনেক সময় দেখা যাইত যে, ভ্যালেরা তঁাহার নিজের ক্লাসের পড়া-শােনা শেষ করিয়া উপরের-ক্লাসে বসিয়া তাহাদের পড়া- শােনা শুনিতেছেন। যাহা একবার তাঁহার শ্রুতি বাদৃষ্টি- গােচর হইত, তাহা না শিখিয়া বালক ভ্যালেরা নিশ্চিত হইতে পারিত না। স্কুলে যত রকম বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হইত—সে সমস্তই জানিবার জন্য তাহার অদম্য বাসনা ছিল। প্রতিভার এই বহুমুখী ধারা ভ্যালেরা বােধ হয় হার পিতার নিকট হইতে পাইয়াছিলেন। স্কুলে পাঠদ্দশা হইতেই অঙ্ক শাস্ত্রের প্রতি তাহার সবিশেষ ঝোঁক ছিল; এবং ব্রুরীর স্কুল ছাড়িয়া যাইবার কিছু পূর্বে তিনি ঐ বিষয়ে উচু-ক্লাসে ১৬
কয়েক
দিনের জন্য
অধ্যাপনাও করিয়াছিলেন।
বারাে
বৎসর বয়সের পর হইতে বালক ভ্যালেরা লেখা-পড়ার মধ্যে
আরও বেশী করিয়া নিমগ্ন হইলেন। প্রায়ই দেখা যাইত
যে আসন্ন গােধূলির রক্ত-আলােয় ঢুরীর কোনও নির্জন
পথের ধারে এক শিলাগাত্রে বসিয়া ভ্যালেরা এক মনে
অধ্যয়নে
খাবার সময়ও বই না সামনে খােলা
থাকিলে তিনি খাইতে পারিতেন না-এমনি বইএ পাইয়া
বসিয়াছিল। তাঁহার মামা প্যাট্রিক কোল বলেন যে, এই
সময়ে ভ্যালেরা বিপদসঙ্কুল ভ্রমণ-কাহিনীর বই খুব বেশী
পড়িত। নেপােলিয়ানের জীবনী বালকের
জীবনী বালকের সাথী ছিল
বলিলেই হয়। স্কটল্যাণ্ডের বীরপুরুষদের জীবনগাথা
বালকের বড় প্রিয় ছিল এবং স্কটল্যাণ্ডের শেষ-বীর ওয়ালে-
সের বীরত্বপূর্ণ করুণ জীবন-কাহিনী ভ্যালেরার মনকে
আচ্ছন্ন করিয়া রাখে। Alexender Dumaর বই তঁাহার
খুব প্রিয় ছিল ; এমন কি 'Three Musketeersএর একটী
সম্পূর্ণ পরিচ্ছেদ তিনি অনর্গল মুখস্থ বলিয়া যাইতে
পারিতেন।
বালক ভ্যালেরা একটা জিনিষ নিয়মিতভাবে করিতেন।
প্রত্যহ তিনি উপাসনার সময় গির্জায় যাইতেন এবং যতক্ষণ
উপাসনা শেষ না হইত ততক্ষণ বসিয়া থাকিতেন। উপাসনার
১৭
বিষয়ের চেয়ে উপাসনার ভাষা ও বক্তৃতার পদ্ধতির উপর
ভ্যালেরার নজর ছিল বেশী। ভবিষ্যতে ভ্যালেরা অসাধারণ
বক্তা হিসাবে যে খ্যাতি অর্জন করেন--তাহার শিক্ষা এইখানে।
বালক কালে খেলা-ধূলা অধিকাংশ ছেলেরই ভাল লাগে;
ভ্যালেরাও খেলা পাইলে অন্য সমস্ত ভুলিয়া যাইতেন।
ব্রুরী প্রদেশে একটী খেলার খুব প্রচলন ছিল--হাতে করিয়া
পাথর ছোড়া। যাহার পাথর সব চেয়ে দূরে গিয়া পৌছিত
তাহার নাম খেলােয়াড়দের মহলে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে
উচ্চারিত হইত।
এই খেলায় ভ্যালেরা ছিলেন তঁাহার দলের নায়ক।
ফুটবল হইতে আরম্ভ করিয়া সেখানকার সমস্ত খেলায়
ভ্যালেরা ছিলেন পাণ্ডা। ত্রুরী প্রদেশে তঁাহার কৈশােরের
দিনগুলির সহিত একটা আনন্দের ও খেলার স্মৃতি তীব্রভাবে
বিজড়িত হইয়া আছে। সে প্রদেশের সমসাময়িক লােকেরা
আজও স্মরণে রাখে-গ্রামান্তর হইতে খেলা সাঙ্গ করিয়া
গভীর নিশীথে প্রত্যবর্তনকালে বিজয়ীদলের নেতা হিসাবে
ভ্যালেরার বিকট জয়ােল্লাস। সমগ্র ব্রুরী প্রদেশ সেই
জয়ােল্লাসে কঁপিয়া উঠিত।
কিশােরকালের এই খেলার উন্মাদনার বিষয়ে তাঁহার
মামা বলেন যে, অনেক সময় বাড়ীর বিশেষ জরুরী কাজে
০৮
ভ্যালেরাকে গ্রামান্তর হইতে শীঘ্র ফিরিয়া আসিবার জন্য
পাঠান হইত কিন্তু ভ্যালেরার আর দেখা নাই। পথে হয়ত
কোনও খেলার দলের সঙ্গে দেখা হইয়াছে ; কোথায় গেল
বাড়ীর কাজ আর কোথায় পড়িয়া রহিল জিনিষ-পত্তর।
ভ্যালেরার খেলায় এই উন্মত্ততার সুবিধা লইয়া অনেক সময়
তাঁহার বন্ধুরা তাহাকে বিষম ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিত।
খেলায় মাতিয়া গিয়া জিনিষ-পত্তর কোথায় রাখিয়াছেন---
তাহা আর মনে থাকিত না, আর সেই অবসরে কোনও
বন্ধু জিনিষগুলি লুকাইয়া গােপনে তাঁহার বাড়ীতে
পৌছাইয়া দিত। বাড়ীতে প্রচুর তিরস্কার মিলিত ; কিন্তু
তাহাতে কি হয়--আবার দুই এক সপ্তাহ যাইতে না যাইতে
সেই এক ব্যাপার। যে সমস্ত খেলায় বিশেষ খাটুনীর
প্রয়ােজন না থাকিত তাহাতে ভ্যালেরা কখনও যােগদান
করিতেন না। তাঁহার এক খেয়াল ছিল যে, মাটি খুড়িয়া
জল বাহির করা। স্কুলে থিয়েটার হইলে ভ্যালেরা সর্বদাই
এমন সব ভূমিকা অভিনয় করিতেন যাহাতে শক্তির পরিচয়
অথবা বীরত্বব্যঞ্জক কিছু থাকে।
অনেক সময় তাঁহারা দল বাঁধিয়া উৎসের সন্ধানে সহরের
আশে পাশে যাইতেন। সেই সময় তাঁহারা হথরণ, গাছের
মাথার উপৰু ঘণ্টা টাঙ্গাইয়া তলায় একটা দড়ি ঝুলাইয়া
দিতেন এবং একজন একজন করিয়া যখন সেখানে পৌছি-
তেন অমনি বিপুল শব্দে পার্শ্বস্থ গ্রামের শান্তিভঙ্গ করিয়া
ঘণ্টাগুলি আৰ্তনাদ করিয়া উঠিত। ভ্যালেরার রাজনৈতিক
চিরশত্ৰু লয়েড জর্জের বাল্যজীবনেও এই রকম দুষ্টামির
কাহিনী পাওয়া যায়। বালক লয়েড জর্জ পাড়ার সমস্ত
ছেলের দল একত্র করিয়া দ্বিপ্রহরে যখন গৃহস্থেরা বিশ্রাম
করে তখন টিনের কেনাস্তারা বাজাইয়া চলিত।
অনেক
সময় পিছনে গৃহস্থের চাকরেরাও তাড়া করিয়া চলিত।
ক্রমশঃ বালক ভ্যালেরা যখন আপনার প্রতিভার বলে
সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন তখন তাহার মামা
মনস্থ করিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য ভ্যালেরাকে স্থানান্তরে
প্রেরণ করা কর্তব্য।
ছাত্র ও শিক্ষকরূপে ডি ভ্যালের
ভাগ্যগুণে ডি ভ্যালেরার শিক্ষা-দীক্ষার ভার এমন
একজন লােকের উপর পড়িয়াছিল, যিনি সত্য সত্যই একজন
অতি
উদার-চেতা শিক্ষিত লােক ছিলেন। তিনি ডি
ভ্যালেরার মামা প্যাট্রিক কোল। ডি ভ্যালেরা সমস্ত
শিক্ষা-দীক্ষার জন্য তঁাহার মামার নিকট ঋণী।
নিজে সদাহাস্যময় এবং অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন।
চেহারায়ও তিনি ছিলেন সুবিশাল এবং সবিশেষ সুন্দর এবং তাঁহার বিদ্যাবুদ্ধির ফলে সেই প্রদেশে তিনি একজন গণ্য- ব্যক্তি বলিয়া পরিগণিত ছিলেন। তিনি তাঁহার প্রদেশের রাজনীতির সঙ্গেও সঙ্গেও সংযুক্ত ছিলেন। শ্রমিক আন্দোলনের সময় তিনি বহুবার বহু সভায় সভাপতির আসন অলঙ্কত করিয়াছিলেন। প্যাট্রিক কোল মহাশয় বলেন যে, কিশােরকালে ডি ভ্যালেরার কাছে রাজনীতির কোনও তাৰ্থ ছিল না। কোনও রাজনীতিক বচসায় বা কথাবার্তায় কখনও ডি ভ্যালেরাকে কেহ যােগদান করিতে দেখে নাই। বরঞ্চ দেখা গিয়াছে যে, ঘরে যখন কোনও রাজ- নীতিক সমস্যা লইয়া তুমুল আলােচনা চলিতেছে –তখন ডি ভ্যালের। সে ঘর হইতে উঠিয়া অন্য ঘরে বই লইয়া পড়িতে বসিয়াছেন। ত্রুরী প্রদেশে ভ্যালেরার শৈশব ও কৈশাের অতিবাহিত হয়। ব্রুরী ইতিহাস-প্রসিদ্ধ স্থান। এই খানেই দ্বিতীয় শতাব্দীতে Muinster রাজার প্রধান আসন ছিল। ব্রুরীর চারিদিকে পুরাতন দুর্গগুলি চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হইয়া অতীতের ভগ্নস্মৃতির মত পড়িয়া রহিয়াছে। এই সমস্ত ভগ্ন-প্রাচীর দুর্গ- গুলি ডি ভ্যালেরার মনে সর্বদাই জাগিয়া থাকিত এবং স্কুল বা কলেজের অবসরে একাকী প্রায়ই এই সমস্ত নির্জন V দুর্গের চারিদিকে তিনি শীকার করিয়া বেড়াইতেন। প্রত্যেকটী দুর্গের ইতিহাস ডি ভ্যালেরা সংগ্রহ করিয়াছিলেন এবং তাহা তাহার কণ্ঠে কণ্ঠে ফিরিত । দেন। সে যাহা হউক, প্যাট্রিক কোল আর কালবিলম্ব না করিয়া ডি ভ্যালেরাকে Charlevilleর স্কুলে ভর্তি করিয়া স্কুলে অনেকের ধারণা জন্মায় যে, ডি ভ্যালেরা যে প্রকার শান্ত প্রকৃতির ও সাধুভাবাপন্ন, যৌবনে ধর্মযাজকের জীবনই তাহার উপযুক্ত হইবে। Charleville স্কুল হইতে ডি ভ্যালেরার নামে মামার কাছে নিত্য প্রশংসা আসিত। ডি ভ্যালেরা যেখানে থাকিতেন, সেখান হইতে তাহার স্কুল ছ’মাইলের পথ। ট্রেনে যাতায়াত করিতে হইত। সকাল বেলা যাইবার সময় ঠিক সুবিধা মত একখানি ট্রেণ ছিল, সকালে সেই ট্রেণেই স্কুলে যাইতেন ; কিন্তু ফিরিবার সময় সুবিধামত কোনই ট্রেণ ছিল না। কাজে কাজেই বিকেলে স্কুল শেষ হইলে তিনি হাঁটিয়াই বাড়ী ফিরিতেন। কয়েক মাস এই স্কুলে অতিবাহিত করিতে না করিতে ডি ভ্যালেরা ৬০ ষাট পাউণ্ডের অর্থাৎ নয় শত টাকার এক বৃত্তি পান। এখানকার স্কুল ছাড়িয়া ডি ভ্যালেরা ডাবলিন সহরে Blackrock Collegeএ প্রবেশ করেন।
ডি ভ্যালেরার কলেজ জীবন সম্বন্ধে তাহার কলেজের অধ্যক্ষ Rev. N. J. Brennan যাহা বলিয়াছিলেন, তাহাই উদ্ধত করিলে সমস্ত বিষয় অবগত হওয়া যাইবে। “মিঃ ডি ভ্যালেরার কলেজ-জীবন অত্যন্ত গৌরবময় ; এবং তিনি বিশেষ গৌরবের সঙ্গে এই কলেজের অনেক দুরূহ বিষয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতে করিতেই প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করিয়া তাঁহাকে Intermidiate Collegeএ পড়াইতে হইত। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাহার যশ এতদূর বর্ধিত হয় যে বিশ্ববিদ্যা- লয়ের অধ্যয়ন শেষ হইতে না হইতে তাহাকে Rocksell College এ Mathematics ও Physics এর অধ্যাপক করিয়া লওয়া হয়। সেখানে একেবারে তাহাকে Honours Senior Gradeএর ক্লাস লইতে হইল। এবং তঁাহার ছাত্র- দের মধ্যে একজন অঙ্কশাস্ত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থানও অধিকার করিয়াছিল।” ইহা হইতেই বােঝা যায় ডি ভ্যালেরার কলেজ জীবন কিরূপ যশােবিমণ্ডিত ছিল এবং অতি অল্প বয়সেই তিনি শিক্ষক রূপে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। Rockwell College afgustst prom fofa Carysfort Training Collegea অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক হন। তাঁহার অধ্যাপনার গুণে বহু ছাত্র
বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পাইয়াছিল। ছাত্রমহলেও ডি ভ্যালেরার
যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল। কি ক্লাসে, কি খেলার মাঠে ডি
ভ্যালেরা ছাত্রদের অত্যন্ত প্রিয় হইয়া উঠিলেন।
ডি ভ্যালেরা Royal University হইতে অঙ্কশাস্ত্রে
শ্রেষ্ঠ বৃত্তিসহ ডিগ্রী গ্রহণ করেন। কলেজে অধ্যাপনা
করিবার সময়ই তিনি M. A. ডিগ্রীর জন্য University
Collegea যােগদান করিলেন। যদিও ব্যক্তিগত ভাবে
তাঁহার বিদ্যা ও শিক্ষা এম, এ, ডিগ্রীর বহু উর্ধে গিয়াছিল
কিন্তু কলেজের কাজের জন্য তিনি এম, এ, পরীক্ষা দিতে
পারিলেন না।
১৯০৯-১০ সালে তিনি University Collegeএ দর্শন
শাস্ত্রে এম, এ, পড়িতে লাগিলেন। এই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে
নানা বিষয়ে তিনি গবেষণা করিয়া সকলের প্রশংসা ও বিস্ময়
অর্জন করেন। অঙ্কশাস্ত্রে তাহার অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ছিল।
ডি ভ্যালেরা অতি অল্প বয়সে বহু বিদ্যায় বিশেষ
পারদর্শী হন।
তাহার প্রতিভার বহু মুখীধারা দেখিয়া
স্তম্ভিত হইতে হয়। অঙ্কশাস্ত্রে যত রকম বিভাগ থাকিতে
পারে, তাহার অধিকাংশই আয়ত্ত করিয়াছিলেন। তাহা
doo Spectoscopy, Astro-physics, Electro-Optics,
ইত্যাদি দুরূহ বিষয়েও বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করেন।
ইহা ব্যতীত, লাটিন, গ্রীক, ফ্রেঞ্চ, ইত্যাদি নানা ভাষাও ডি, ভ্যালেরা আয়ত্ত করিয়াছিলেন। শিক্ষক হিসাবে ডি ভ্যালেরা অল্প বয়সেই যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। ডাবলিন সহরের যে কোনও কলেজ তাহাকে অধ্যাপকরূপে পাইলে কৃতার্থ মনে করিত। ইহা ছাড়া তাঁহার ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট সম্মান অর্জন করিয়া গিয়াছেন। দেশের আহ্বানে তাহাকে অধ্যাপকের আসন ত্যাগ করিয়া চিরকালের মত দেশের বৃহত্তর জীবনের ধারার সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন করিতে হইল। আয়ারল্যাণ্ডের জীবনের সঙ্গে ডি ভ্যালেরার জীবন এক সূত্রে গাঁথা হইয়া গেল। তিনি যখন চিরকালের জন্য Carysfort Parkএর Training College ত্যাগ করিয়া আসেন, তখন সেই কলেজের প্রিন্সিপাল বলিয়াছিলেন, “১৯০৬ সালের বিপ্লবের আগের সপ্তাহ পর্যন্ত ডি ভ্যালেরা আমাদের মধ্যে ছিলেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য। সমস্ত কলেজের মধ্যে আজ তাহার আদর্শ তাঁহার নামের সহিত আমাদের সম্মুখে রহিল।” কলেজের ছুটীর অধিকাংশ সময়ই ডি ভ্যালেরা তাহার শৈশবের লীলা-নিকেতন ব্রুরী প্রদেশেই কাটাইতেন। শিকার ছিল তার সব চেয়ে প্রিয়। অবসরের অধিকাংশ সময়ই তিনি শিকারে অতিবাহিত করিতেন। বন্দুক হাতে প্রায়ই দেখা যাইত একজন দীর্ঘাকৃতি পুরুষ একাকী পৰ্বত ও ভগ্ন- দুর্গময় বনপথে পরমানন্দে ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন। বন্দুককে তিনি বড় ভাল বাসিতেন। আরব বেদূঈন যেমন তাহার ঘােড়াকে ভালবাসে, ডি ভ্যালেরা সেই রকম বন্দুক ভালবাসিতেন। হাস্যচ্ছল তিনি প্রায়ই বলিতেন বােধহয় শেষকালে সৈনিক হব—তা হলে বন্দুক এত ভাল বাসিব কেন ? অচিরেই ডি ভ্যালেরা আপনার জীবন দিয়া এই সংশয়ের উত্তর দিলেন। দেশের চারিদিকে তখন অশান্তির ধোঁয়। বিদ্রোহের অগ্নি-মূর্তিতে প্রকট হইয়া উঠিতেছিল—সেই বহ্নি-উৎসবে ডি ভ্যালেরা আপনাকে সৰ্ব্ব-কৰ্ম্ম হইতে বিরত করিয়া পূর্ণাহুতি দিলেন। ইষ্টার বিদ্রোহ ও ডি ভ্যালেরা আয়ারল্যাণ্ড কিংবা তাহার কোনও বীরসন্তানের কাহিনী বলিতে হইলেই ইষ্টার-বিদ্রোহের কথা বলিতে হয়। এই বিদ্রোহে সমস্ত জাগ্রত আয়ারল্যাণ্ড মূর্তি ধরিয়া পূর্ণ স্বাধী- নতার জন্য জাগিয়া উঠিয়াছিল। এই ইষ্টার-বিদ্রোহে ও তাহার পরবর্তী গরিলা যুদ্ধে আইরিশ যুবকগণ যে অপূর্ব বীরত্বের ও স্বদেশপ্রীতির নিদর্শন জগতের সম্মুখে ধরিয়া- ছিলেন—তাহা স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরকাল অক্ষয় অক্ষরে লেখা থাকিবে। ইষ্টারের উৎসবের সময় এই বিদ্রোহের উত্থান হয় বলিয়া ইহার নাম ইষ্টার-বিদ্রোহ। ২৪শে এপ্রিল মােমবার ১৯১৬ সালে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয় ; এবং এই ইষ্টার- বিদ্রোহই ডি ভ্যালেরার নামকে প্রত্যেক আয়ারল্যাণ্ডবাসীর প্রাণে পৌছিয়া দিয়াছিল। এই বিদ্রোহে অসংখ্য আইরিশ যুবক অম্লান মুখে জ্ঞাতসারে মৃত্যুকে বরণ করিয়া লয়। অনেক নেতা ধরা পড়েন এবং ফাসির মঞ্চে তাহাদের জীবনের শেষ যবনিকা পড়ে। শ্রমিক নেতা জেমস্ কনােলী নিতান্ত আহত হইয়া বন্দী হন। আহত হইয়া তিনি আর উঠিতে পারিলেন না; তাঁহার জীবনী-লেখক Desmond Ryan তঁাহার মৃত্যুর যে বর্ণনা দিয়াছেন--তাহা সত্যই ভয়াবহ। “Ho died for Ireland on May 12th at dawn in Kilmainham Jail lifted helplessly from a stretcher to a chair.... head falling on one side. ... "Shoot away !" He told his courtmartial, “but I am dying for Ireland !" And shoot away they did.” “কিলমেনহাম জেলে ১২ই s ২৭, মে (১৯১৬) প্রত্যুষেই তিনি আয়ারল্যাণ্ডের জন্য জীবন বিসর্জন করেন। অসহায়ভাবে তাঁহাকে স্ট্রেচার হইতে একখানি চেয়ারে বসান হইল—মাথা ঝুলিয়া পড়িয়াছে....সেই অবস্থায় কোর্ট-মাসেলের উদ্দেশে বলিলেন—“গুলি কর— কিন্তু আমি আয়ারল্যাণ্ডের জন্যই মরিতেছি।” গুলি তাহারা করিলও।” এমনি ভাবে আয়ারল্যান্ডের নাম উচ্চারণ করিতে করিতে কত যুবক সেই বিদ্রোহে আত্মাহুতি দিয়াছিল। এই বিদ্রোহের বিষয় বলিতে গেলে আয়ারল্যাণ্ডের স্বাধীনতার সংগ্রামে ডি ভেলেরার একান্ত সহযোগী নেতাদের কথা আপনা হইতে আসিয়া পড়ে। এই ইষ্টার- বিদ্রোহেই তাহারা অনেকে জীবনের রক্ত-আহবের মাঝে প্রথম মিলিল—জীবনের শেষদিন পর্যন্ত প্রতিদিনের মরণের আশঙ্কার মধ্য দিয়াও তঁাহারা দেশের জন্য মিলিয়াই রহি- লেন; অবশ্য যদিও শেষের দিকে তাঁহারা দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া যান। ( সে অবশ্য আয়ারল্যাণ্ডের কল্যাণ-কামনাতেই) এই সমস্ত সহযাত্রীদের মধ্যে মাইকেল কলিন্স, ম্যাইনি, টম্ কার্টিন, জন ব্রিয়ান্ হােগা ও টিরেসীর নাম করিতেই হয়। ২৮ এই বিদ্রোহের বিষয় বুঝিতে হইলে আয়ারল্যাণ্ডের ভিতরের ইতিহাসের একটী কথা জানা একান্ত প্রয়ােজন। চীনে যেমন দক্ষিণ ও উত্তরের সংঘর্ষ চিরকাল ধরিয়া চীনজাতির অন্তরকে মথিত করিয়া আসিতেছে, সেই রকম আয়ারল্যাণ্ডেও এই উত্তর ও দক্ষিণের বিবাদ, রহিয়াছে, ও এখনও চলিয়াছে। উত্তর আয়ারল্যাণ্ডকে সাধারণতঃ আলষ্টার বলা দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডেই আইরিশ ফ্রি-ষ্টেট স্থাপিত হয়। উত্তর আয়ারল্যাণ্ড ফ্রি-ষ্টেটের অন্তর্ভূক্ত নয়—তাহাদের অন্য শাসন-নীতি। একই দেশে এবং আয়ারল্যাণ্ডের মত ক্ষুদ্র দেশে এই ক্ৰমান্বয় বিবাদের মূল কি? আলষ্টারের অধি- বাসীরা মূল কেলটিক জাতির নয়। ইংরাজের অধীনে আসিয়াও আয়ারল্যাণ্ড স্বাধীনতার জন্য বহুবার বিদ্রোহ করে। তখন ইংলণ্ড হইতে বহু ইংরাজ উত্তর আয়ারল্যাণ্ডে গিয়া উপনিবেশ স্থাপন করে। বর্তমান আলষ্টারবাসিগণ সেই সমস্ত ইংরাজদেরই বংশধর। তাঁহাদের ধর্ম ও জাতীয়তা দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডের ধর্ম ও জাতি হইতে একেবারে আলাদা। উত্তর আয়ারল্যাণ্ড Protestant (প্রােটেষ্টান্ট) ও Anglo Saxon, দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ড রােমান ক্যাথলিক ও কেল্টিক। এই পার্থক্যই তাহাদের দ্বন্দ্বের মূলে রহিয়াছে। কিন্তু ১৯১৩ সালে ইংরাজ প্রধান মন্ত্রী আসকুইথ যখন পালিয়ামেন্টে Home Rule Bill উপস্থিত করেন তখন সহসা আলষ্টার তীব্র প্রতিবাদ করিয়া ইংলণ্ডের বিরুদ্ধে উঠিয়া দাড়াইল। তাহার কারণ, তাহা হইলে দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডও তাহাদের সমকক্ষ হইয়া উঠিবে। এই বিলকে ব্যর্থ করিবার জন্য আলষ্টারবাসী ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডও এই আংশিক স্বাধীনতা চাহে না। কাজেই আয়ারল্যাণ্ডের জীবনে এই প্রথম বাহত উত্তর ও দক্ষিণের উদ্দেশ্যের মিলন ঘটিল—Home Rule Bill উঠাইয়াই দিতে হইবে। আলষ্টারবাসীরা গােপনে বিদেশ হইতে অস্ত্র-শস্ত্র আনাইতে লাগিল। উত্তর আয়ারল্যাণ্ডের এই মূর্তি দেখিয়া দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডও সুবিধা বুঝিল। তখন দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডে আয়ারল্যাণ্ডের পূর্ণ স্বাধীনতার কামনায় বহুলােক নানাভাবে আত্মনিয়ােগ করিয়াছিল। পার্ণেল, ডিলােন প্রভৃতি বিখ্যাত আইরিশ রাজনৈতিকগণ ইংরাজের পার্লিয়ামেন্টে তুমুল আন্দোলন করিতেছেন। আয়ারল্যাণ্ডের অন্যতম মুক্তি দাতা আর্থার গ্রিফিতের স্বাধীনতার ও মুক্তির বাণী তখন সমস্ত আয়ারল্যাণ্ডে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। এই সময় দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডে আয়ারল্যাণ্ডের পূর্ণ-স্বাধীনতার জন্য একদল বিদ্রোহী যুবকও জাগিতেছিল। পিয়াস, কনােলী, নােগার কেসমেন্ট, ম্যাকনীল, ম্যাকডােন, প্লানকেট, রাহেলী-প্রমুখ To
নেতারা সময় উপস্থিত ঠিক করিয়া বিদ্রোহের জন্য সঙ্ঘবদ্ধ
হইবার আয়ােজন করিতে লাগিলেন। ডি ভ্যালেরা আসিয়া
এই দলে যােগদান করিলেন। এই দলের নাম হইল Irish
Republican Party—আইরিশ সাধারণতন্ত্রীদল। এই
দলের সভাপতি হইলেন অধ্যাপক ম্যাকনীল।
এই দলের
দ্বারাই ইষ্টার বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং ইষ্টার-বিদ্রোহ
যে অকৃতকার্য হইল তাহার মূল কারণ অধ্যাপক ম্যাকনীলের
অবিবেচনা।
গােপনে স্বেচ্ছাসেবক দল সংগ্রহ হইতে লাগিল
এবং দেখিতে দেখিতে শত শত মৃত্যুভয়হীন আইরিশ যুবক
আসিয়া এই দলে যােগদান করিল। এই সমস্ত স্বেচ্ছাসেবক
দল ক্রমশঃ প্রকাশ্যভাবে দক্ষিণ আয়ারল্যাণ্ডের পার্কে ও
নানাস্থানে সামরিক নিয়মকানুন-শিক্ষা ও ড্রিল করিতে লাগিল
এবং নেতারা গােপনে বিদেশ হইতে অস্ত্রশস্ত্র আনাইবার চেষ্টা
করিতে লাগিলেন।
এধারে উত্তর আয়ারল্যাণ্ডেও ব্যাপার গুরুতর হইয়া
উঠিতেছিল। উত্তর আয়ারল্যাণ্ডের নেতা Sir Edward
Carson স্যার এওয়ার্ড কাসন প্রকাশ্যভাবে ইংলণ্ডের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আন্দোলন করিতে লাগিলেন ;ফলে ১৯১০
সালে মার্চ মাসে ইংরাজ-গভর্ণমেন্ট সৈন্য পাঠাইয়া এই
বিদ্রোহ দমন করেন। ইহাকে Curragh Mutiny বলা
হয়।
ডি ভ্যালেরা এই সময় সমস্ত প্রাণপণ করিয়া বিপ্লবের
কাজে আত্মনিয়ােগ করেন। ডাবলিন শহরে বিদ্রোহীদের
সৈন্যদল গড়িয়া উঠিতে লাগিল। এই সৈন্যদলের একটী
বিভাগের ভার ডি ভ্যালেরার উপর ছিল। ১৯১৪ সালে ২৬শে
জুলাই শনিবার, জাৰ্মাণী হইতে হাউথ বন্দরে অস্ত্রশস্ত্রপূর্ণ এক
জাহাজ আসিয়া লাগিল। এই জাহাজ হইতে মাল সরাইয়া
আনার ভার ছিল ডি ভ্যালেরার উপর। কেমন করিয়া খবর
পাইয়া, অস্ত্রশস্ত্র লইয়া যখন ডি ভ্যালেরার দল ফিরিয়া
আসিতেছিল, তখন পথে ইংরাজ সৈন্যদের সহিত Bachelor's
walk নামক রাস্তায় তাহাদের সংঘর্ষ বাধিল। সৈন্যেরা
স্বেচ্ছাসেবকদলের কিন্তু কিছুই করিতে পারিল না--তাহারা
যে যাহার পলায়ন করিল--মাঝখান হইতে সেদিন রাস্তায় বহু
নিরীহ ভদ্রলােক গুলির আঘাতে প্রাণত্যাগ করিল।
ব্যাপারে সমস্ত ডাবলিন সহরে হৈ চৈ পড়িয়া গেল।
এধারে আইরিশ স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষে একটী ভীষণ
দুর্ঘটনা ঘটিল।
স্যর রােগার কেসমেন্ট অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের
জন্য আমেরিকা ও জাৰ্মাণী যান। জাৰ্মাণী তখন ইংলণ্ডের
সঙ্গে তুমুল শত্রুতায় মাতিয়াছে। স্যার নােগার কেসমেন্টের
সহিত এক জাহাজ অস্ত্রশস্ত্র জাৰ্মাণী দিয়া দিল। আয়ার- ল্যাণ্ডের তীরের নিকটবর্তী কেরী উপকূলে আসিয়া বৃটীশ রণ- পােত কর্তৃক সে জাহাজ ধরা পড়িল। জাহাজের কাপ্তেনের উপর হুকুম ছিল যে, যদি জাহাজ ইংরাজদের হস্তগত হয়- তাহা হইলে তখনই জাহাজ যেন কামান দিয়া ডুবাইয়া ফেলা হয়, ইংরাজ যেন অস্ত্রশস্ত্র না পায়। হইলও তাই। স্যার রােগার এক সাবমেরিণে পলাইয়া আয়ারল্যাণ্ডের তীরে এক পুরাণাে ভগ্ন দুর্গে ক্লান্ত হইয়া বিশ্রাম করিতেছিলেন। সেই খানেই তিনি ধরা পড়েন এবং বিচারে তঁাহার যাসী হয়। বিপ্লবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম স্যার নােগারের সহিতই ডি- ভ্যালেরার বন্ধুত্ব হয়। সে তাহার অধ্যাপক জীবনের ঘটনা। আইরিশ সাধারণতন্ত্র দলের সভাপতি অধ্যাপক ম্যাক- নীল দলের নেতাদের গতিবিধি লক্ষ্য করিয়া বুঝিলেন যে ইহারা শীঘ্রই বিপ্লবের আয়ােজন করিতেছেন। বৃটিশের সৈন্য সংখ্যার তুলনায় আইরিশ স্বেচ্ছাসেবকবাহিনীদের সংখ্যা ও তাহাদের সংগৃহীত অস্ত্রশস্ত্রের স্বল্পতা বুঝিয়া সভাপতি ম্যাকানীল বিদ্রোহের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিলেন। সভাপতিকে বাদ দিয়া গােপনে প্লানকেট, ডি ভ্যালেরা, পিয়াস, ম্যক ডােনা, প্রভৃতি নেতারা বিদ্রোহের আয়ােজন করিতে লাগিলেন। এবং সম্মুখের ইষ্টার সােমবারেই দিন স্থির করিয়া ফেলিলেন। বিদ্রোহের কয়েকদিন পূর্বেই বিপ্লব নেতারা সমস্ত সহরে সহরে খবর প্রকাশ করিলেন যে, রবিবার (২৩শে এপ্রিল) ডাবলিন সহরে সমস্ত আইরিশ স্বেচ্ছাবাহিনীর একটা মিলিত সভা হইবে এবং সমস্ত সহরময় তাহাদের শােভাযাত্রা বাহির হইবে। কিন্তু ইহা শুধু যুদ্ধের পূর্বের দিনে সৈন্য-একত্রীকরণের একটা ফন্দী মাত্র। সমস্ত স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে সেই খবরও পাঠান হইল। কিন্তু এধারে সভাপতি ম্যাকনীল তাহাদের গােপন ইচ্ছা জানিতে পারিয়া রবিবারে Sunday Independent নামক কাগজে আইরিশ সাধারণতন্ত্রের নেতা হিসাবে এক প্রত্যাদেশ জারী করিলেন যে, বিশেষ কারণে রবিবার দিন প্রস্তাবিত স্বেচ্ছা- সেবক সম্মিলনী হইবে না। পরের দিন সােমবার ২৪শে এপ্রিল (১৯১৬) ডাবলিন সহরে মােটে ৭০০ স্বেচ্ছাসেবক আসিয়া জুটিল। ম্যাকনেলের প্রত্যাদেশ খবরের কাগজে দেখিয়া অনেকেই আসে নাই- প্রাদেশিক স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী কেহই আসিল না। এই মুষ্টিমেয় সৈন্য লইয়া কামানের ও অগণিত সৈন্য মণ্ডলীর বিরুদ্ধে দাড়ানাে যে কতখানি বীরত্বের ও স্বদেশ-প্রেমিকতার পরিচায়ক, তাহা কথায় বলা যায় না। আইরিশ নেতারা 3 কেহই পশ্চাপদ হইলেন না। জননী আয়ারল্যাণ্ডের নামে মৃত্যুপণ করিয়া তাহারা সেইদিন বেলা দশটার সময় ডাব- লিনের পথে প্রকাশ্যভাবে বিদ্রোহ ঘােষণা করিলেন। দেখিতে দেখিতে সমস্ত ডাবলিন শহরে ও সমগ্র দেশের মধ্যে এক ভয়াবহ আতঙ্কের সৃষ্টি হইল । Ring's End gro Mount Street পৰ্যন্ত ডি ভ্যালেরার অধীনে ছিল। এই রাস্তার মধ্যেই ইংরাজের বহু কাৰ্যালয় এবং সংবাদ-বাহনের কেন্দ্রস্থল, G, P, 0. অবস্থিত। ডি ভ্যালেরা এই খণ্ডযুদ্ধে যে অসমসাহসিকতার ও যে অপূৰ্ব নেতৃত্বের উদাহরণ দিয়াছিলেন—তাহার ফলে চিরকালের জন্য ডি ভ্যালেরার নাম আয়ারল্যাণ্ডের নামের সহিত সংযুক্ত রহিয়া গেল। এই অংশেই যুদ্ধ সর্বাপেক্ষা বেশী তীব্র হইয়া উঠে। বােল্যাণ্ড মিল উড়াইয়া দিয়া এবং G.P.0. ধ্বংস করিয়া ডি ভ্যালেরা তাহার চূড়ায় আইরিশ জাতির পতাকা তুলিয়া ধরিলেন। ডি ডি ভ্যালেরার এই খণ্ডযুদ্ধ আরও অদ্ভুত লাগে যখন মনে হয়—তাহার দলে মাত্র এক শত লােক আর ওধারে সমগ্র বৃটিশ-বাহিনী। যখন প্রত্যেক নেতা ধৃত বা পলায়িত তখনও ডি ভ্যালেরা আপনার দল লইয়া যুদ্ধ করিয়া চলিয়াছেন। শেষ যখন সেনাপতির নিকট হইতে ৩০শে এপ্রিল রবিবার আত্মসমর্পণের খবর আসিল তখনও যুবক ডি ভ্যালেরা তাহা বিশ্বাস করেন নাই। কিন্তু সেই অগণিত সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে কতদিন দাড়াইয়া থাকা যায়। সর্বশেষে ডি ভ্যালেরা আত্মসমর্পণ করেন। এখানে প্রসঙ্গত আর একজনের কথা বলা প্রয়ােজনীয়। কারণ ডি ভ্যালেরার সহিত তাঁহার জীবনের একটা ঘনিষ্ঠ যােগ হইয়া যায় ; এবং এই যােগসাধনের ফলেই আইরিশ ফ্রিষ্টেটের উদ্ভব সম্ভব হয়। তাহার নাম মাইকেল কলিন্স। ডি ভ্যালেরা ছিলেন সৈনিক ও জাতির ভাবধারণার প্রতীক, কিন্তু কলিন্স ছিলেন একজন পাকা রাজনীতিক এবং কলা- কৌশলী । কলিন্সের অপূৰ্ব্ব মস্তিষ্কের চালনায় বৃটিশের গুপ্তসভার সমস্ত রহস্য আইরিশ-নেতারা পূৰ্বেই জানিয়া ফেলিত এবং তাহার ফলে ইংরাজ-পুলিশ ও গােয়েন্দা- বিভাগ কিছুতেই এই আইরিশ-নেতাদের সহজে কাবু করিতে পারিতেন না। যখন ইষ্টার-বিপ্লব আরম্ভ হয়, তখন মাই- কেল কলিন্স ও প্লানকেট-আয়ারল্যাণ্ডের দুইজন ভবিষ্যৎ নেতা-G. P. 0. তে চাকরী করিতেন। G. P. 0. আক্রান্ত হইলে তাহারা আসিয়া বিপ্লবীদের সঙ্গে যােগদান করেন। মাইকেল কলিন্সের অপূৰ্ব্ব কলকৌশলের সঙ্গে গঠন- শক্তিও অদ্ভুত ছিল এবং তাঁহার ব্যক্তিগত সাহসের কথা বলা নিম্প্রয়ােজন কারণ এ কথা বলা যায় যে আইরিশ নেতাদের ব্যক্তিগত সাহসের উপরেই আইরিশ ফ্রি-ষ্টেটের ভিত্তি স্থাপিত। মাইকেল কলিন্স আপনার দলের পাঁচজন অসম- সাহসী আইরিশ যুবককে নানা উপায় করিয়া আয়ারলাণ্ডের ডিটেকটিভ বিভাগে ঢােকান এবং সেই পাঁচজনই ক্রমশঃ সেই বিভাগের বেশ উচ্চস্থান অধিকার করে। মাইকেল কলিন্স সমস্ত খবর তাহাদের নিকট হইতে সংগ্রহ করিয়া পূর্বাহ্নেই দলবল লইয়া সাবধান হইতেন। পুলিশ আসিয়া শূন্য বাড়ী দেখিয়া হতাশ হইয়া ফিরিয়া যাইত। যখন সমগ্র আয়ারল্যাণ্ড সৈন্য ও পুলিশ-শাসিত তখনই এক মধ্যরাত্রে ডিটেটিভের মত চেহারা করিয়া বন্ধুদের সাহায্যে মাইকেল কলিন্স একেবারে ডিটেটিভ আফিসের মধ্যে গিয়া হাজির এবং সেই রাত্রে বৃটিশের গতিবিধির সমস্ত প্লানের নকল করিয়া এবং তাহাদের ব্যবহৃত সমস্ত সাঙ্কেতিক কোডের ব্যাখ্যা সংগ্রহ করিয়া চলিয়া আসেন। ইহার ফলে বৃটিশ গুপ্তচর বিভাগকে আয়ারল্যাণ্ডে যে প্রকার লাঞ্ছিত হইতে হইয়াছে—তাহা অবর্ণনীয়। আর একজন আইরিশ যুবকনেতার নাম এখানে করা একান্ত প্রয়ােজন—তঁাহার নাম টেরেন্স ম্যাইনী । মাইকেল কলিন্সের মত তিনিও আয়ারল্যাণ্ডের স্বাধীনতার স্বপ্নকে মূর্তি দেখিয়া যাইতে পারেন নাই কিন্তু তাহার অপূৰ্ব্ব দেশ-প্রেমিক ও আদর্শবাদীতার কথা সমগ্র পৃথিবী চিরকাল স্মরণ করিয়া রাখিবে। ম্যাক্সুইনী এই ইষ্টার বিদ্রোহে যােগদান করেন এবং তার ফলে বন্দী হন। তিনি জীবনে ক্রমান্বয়ে য়বার বী ইয়াছিলেন। কর্ক শহরের মেয়র বীর উম্ ম্যাকারটেনকে যেদিন রাত্রে তাঁহার বাড়ীতে স্ত্রীর সম্মুখে হত্যা করা হইল--তাহার পরের দিন হইতেই ম্যাসুইনী কর্ক শহরের মেয়র হইলেন। ১৯২০ সালে ২৪ শে অক্টোবর তিনি আবার দুই বৎসরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এই যথেচ্ছারিতার বিরুদ্ধে ব্রিক্সটন জেলে মাইনী অনশনব্রত গ্রহণ করিলেন; এবং জগৎ জানে সে প্রবল ইচ্ছাশক্তির কথা । ৭৪ দিন উপবাস থাকিয়া সেই জেলেই মাইনী আয়ারল্যাণ্ডের মুক্তি কামনায় প্রাণত্যাগ করেন। ম্যাকসুইনীর নাম আজ জগতের মহত্তম নামের সহিত উচ্চারিত হয়। আত্মসমর্পণ করিয়াই তাহাদের পরিদর্শক যে ইংরাজ- অফিসার ছিল তাহাকে ডাকিয়া ডি ভ্যালেরা বলিলেন, আমাকে লইয়া তােমরা যাহা ইচ্ছা কর—কিন্তু আমার সহচরদের কোনও অন্যায় ব্যবহার যেন করা না হয়। এ পরাজয়ের সুর নয়—এ যেন বিজয়ের শঙ্খনাদ। ;
বিচারে ডি ভ্যালেরার ফঁাসীর হুকুম হইল। কিন্তু কিছু কাল পর, কোনও রহস্যময় কারণে ফাসীর হুকুম রদ হইয়া সশ্রম কারাবাসের দণ্ড ডি ভ্যালেরার ভাগ্যে জুটিল। কি কারণে এই আশ্চর্য্য পরিবর্তন ঘটিল—তাহা বলা যায় । অনেকে অনুমান করেন যে তিনি মূলতঃ আমেরিকান নাগরিক ভিলেন বলিয়া হয়ত এই পরিবর্তন সংঘটিত হয়। লিউস্ জেলে অন্যান্য বন্দীদের সঙ্গে ডি ভ্যালেরা বন্দীজীবন যাপন করিতে লাগিলেন। এখানে ডি ভ্যালেরার রাজনৈতিক জীবন হইতে একটা কথা বলা প্রয়ােজন। রাজনৈতিক জীবনে মন্ত্রগুপ্তি যে প্রকার প্রয়ােজন--বাক-সিদ্ধ হওয়াও প্রত্যেক নেতার সেই রকম কৰ্ত্তব্য। আমাদের দেশে কলেজ স্কোয়ারের মােড়ে দুইবার পাক দিলেই দেশের রাজনৈতিক মহলের খবরাখবর সবই পাওয়া যায়--অনেক সময় স্বয়ং রাজনৈতিকদের মুখ থেকেই। ডি ভ্যালেরার রাজনৈতিক জীবনের মূল-মন্ত্র ছিল মন্ত্র গুপ্তি। অপ্রয়ােজনীয় কথা তিনি বলিতেনই না। ইষ্টার- বিদ্রোহের পর তাহার এক বিশেষ বন্ধু বলেন যে বিদ্রোহের আগের দিন পর্ষন্ত ডি ভ্যালেরার সহিত একসঙ্গে বসিয়া চা খাইলাম—অথচ সে যে সেই বিদ্রোহেরই একজন প্রধাননে বা তাহার সহিত সংশ্লিষ্ট তাহা জানিতে পারি নাই।
ডি ভ্যালেরা তাহার সঙ্গীদের সহিত লিউইস জেলে কারা- রুদ্ধ রহিলেন। এখানে ডি ভ্যালেরার রাজনৈতিক জীবনের অন্তরালে তাহার গার্হস্থ্য জীবনের পরিচয় দেওয়া প্রয়াে- জনীয়। আইরিশ ভাষা ও সভ্যতার উৎকর্ষের জন্য গ্যালিক লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিখ্যাত সম্মিলন হইতে আইরিশ সাহিত্য নব-কলেবর লইয়া আইরিশ জাতির মনে নবযুগ আনিয়া দিয়াছিল। এইখানে আয়ারল্যাণ্ডের অতীত আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া আইরিশ যুবক-যুবতীরা সম্মিলিত হইতেন এবং পরস্পর পরস্পরের শিক্ষার আদান-প্রদানের মধ্য দিয়া একটা বিরাট শিক্ষার আনন্দ-নিকেতন করিয়া ইহাকে গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। যিনি ফরাসী জানিতেন— তিনি অপরকে তাহা শিখাইতেন—বিনিময়ে তিনি হয়ত তাঁহার জানা অন্য এক ভাষা শিখাইতেন। ডি ভ্যালেরা আই- রিশ ভাষা ভাল রকম তখনও আয়ত্ত করিতে পারেন নাই, প্রাচীন আইরিশ সাহিত্যের ও শিক্ষার সহিত তখনও তাহার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা ঘটিয়া উঠে নাই। জাৰ্মাণ, ফরাসী, গ্রীক, ও ইতালীয়ান ভাষায় ও সাহিত্যে তিনি অগাধ পণ্ডিত ছিলেন। সেই সম্মিলনে একটী বিদুষী আইরিশ মহিলা ছিলেন-তিনি যুবােপ মহাদেশের ভাষাগুলি আয়ত্ত করি- বার জন্য ডি ভ্যালেরার শরণাপন্ন হইলেন। মহিলা টীর ৪০ উঠে। atar Senead ni Fhlannagair. Sinead fu ustrata নিকট জার্মান ভাষা শিখিতেন এবং তাহার বিনিময়ে তিনি ডি ভ্যালেরাকে আয়ারল্যাণ্ডের ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে প্রগাঢ় পরিচয় করাইয়া দিবার ভার লইলেন। সাহিত্যের পরিচয়ের মধ্য দিয়া কখন অজ্ঞাতে তাহাদের দুই জনের হৃদয় পরস্পর পরস্পর পরস্পরকে চিনিয়া লইল এবং এই চেনা- পরিচয়েয় ফলে এক প্রগাঢ় প্রেম দুই জনের মধ্যে জাগিয়া ১৯১০ সালে ডি ভ্যালেরা Sinead’র সহিত পরিণয়- সূত্রে আবদ্ধ হন। এবং পরস্পরের সাহচার্যে ও প্রেমে এই সম্বন্ধ আজীবন মধুর হইয়া আছে। যদিও ডি ভ্যালেরা ইহার পূর্বে অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানে যােগদান করিয়াছিলেন, তথাপি ইষ্টার-বিপ্লবের পর হইতেই তাহার নাম আয়ারল্যাণ্ডবাসীদের হৃদয়ে চির- জাগরূক হইয়া রহিল। ১৯১৭ সালের জুন মাসে সহসা সমস্ত আইরিশ বন্দীদের ছাড়িয়া দেওয়া হয়। সেই সমস্ত গৃহগামী বন্দীদের নেতারূপে ডি ভ্যালেরাকে দেখিয়া আয়ারল্যাণ্ডবাসী বুঝিয়াছিল যে ঐ লােকটীকে আঁয়ার- ল্যাণ্ডের বিশেষ প্রয়ােজন আছে। বহুদিন কারাবাস করার পর বন্দীরা যখন স্বদেশে ফিরিতেছিল তাহাদের মুখে কোথাও কারাগারের ছাপ ছিল না। গভীর উন্মাদনায় বিখ্যাত ৪১ Soldiers Song” “সৈনিকের গান” গাহিতে গাহিতে যখন তাহারা আয়ারল্যাণ্ডে প্রবেশ করিতেছিল তখন মনে হইয়াছিল যেন তাহারা কোনও যুদ্ধ জয় করিয়া আসিতেছে। এধারে ১৯১৬ সালে আকুইথের মন্ত্রীসভা হইতে সহসা লয়েড জর্জের বিদায় গ্রহণ করা এবং তৎপরেই প্রধান মন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া--এই সমস্ত ব্যাপারে তখন ইংলণ্ডের রাজনৈতিক আবহাওয়া রীতিমত সরগরম হইয়া উঠিয়াছিল। লয়েড জর্জ অক্টোবর মাসে মন্ত্রীসভা ত্যাগ করেন—ডিসেম্বর মাসেই বিনা বিচারে যে সমস্ত সিনফিন নেতাদের বন্দী রাখা হইয়াছিল তাহাদের ছাড়িয়া দেওয়া হইল। এবং তাহার দুই এক মাসের মধ্যেই আবার ধর-পাকড় শুরু হইল। ম্যাকসুইনী প্রমুখ বহু নেতাও এই সময় আবার ধৃত দুই- লেন। ইংলণ্ডের প্রধান মন্ত্রী হইয়া লয়েড জর্জ প্রচার করিলেন যে তিনি একটী আইরিশ মন্ত্রণসভা গঠন করিবেন —তাহাতে তিনি আয়ারল্যাণ্ডের বিভিন্ন দলের নেতাদের যােগদান করিতে আহ্বান করিলেন। লয়েড জর্জ সিনফিন নেতাদেরও আহ্বান করিলেন। উদ্দেশ্য——আয়ারল্যাণ্ডের ভবিষ্যৎ শাসন-পদ্ধতির জন্য সর্বদল-সম্মত একটা শাসন- পদ্ধতিগড়িয়া ভােলা। যদি সৰ্ব্বদলের মধ্যে একটা সুযুক্তি- পূর্ণ মিল পাওয়া যায় তাহা হইলে লয়েড জর্জ বৃটিশ ৪২
সাম্রাজ্যের মধ্যে স্বায়ত্ত শাসনের জন্য বৃটিশ পার্লামেন্টে
আয়ারল্যাণ্ডের হইয়। আবেদন করিতে পারেন।
রেডমেন্ট প্রমুখ নেতারা এই মন্ত্রণা সভায় যােগদান
করিলেন। কিন্তু সিনফিন
সিনফিন দলের নেতারা কেহই এই
সভায় যােগদান করিলেন না। Sir F. E. Smith
বলিয়াছিলেন যে সিনফিনরা বুঝিয়াছিল যে মন্ত্রণা-
সভার সাহায্যে ইংরাজ রাজনীতিক আয়ারল্যাণ্ডকে শুধু
কথায় ব্যস্ত করিয়া রাখিয়া তাহার সৈন্যদল যুদ্ধে পাঠাইবার
বন্দোবস্ত করিবে। ford Curzon উপদেশ দিয়া বলিলেন
"A united Ireland, a reconciled Ireland, would
be an important addition to that strength of
British Empire. ) A divided Ireland, a sulky
Ireland, a rebellious Ireland, is a source of
reakness.. কিন্তু যে সমস্ত আইরিশ যুবক সেদিন
জীবণকে পণ করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়াছিল, ইংলণ্ডের
ক্ষতি বা লাভ-লােকসানের অঙ্ক কষিয়া তাহারা চলিত না-
তাই লর্ড কর্জনের কথা তাহাদের অহমিকাকে আরও জাগ্রত
করিয়া তুলিয়াছিল মাত্র। সেই সময় মহাযুদ্ধের অবস্থাও *
সঙ্কটাপন্ন।
মন্ত্রণাসভার অধিবেশন গােপনে বসিল ; প্রেসের লােক- দের সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ করিবার ক্ষমতা ছিল । সিনফিনরা যােগদান না করায় এই সভায় কিছুই ফললাভ হইল না—লয়েড জর্জের বাসনা চরিতার্থ হইল । সেই সময় ৭ই জুন রেডমন্ট মৃত্যুমুখে পতিত হন। রেডমন্টের মৃত্যুতে পূৰ্ব্ব-ক্লেয়ারের সদস্যের পদ শূন্য হয়। ডি ভ্যালেরা তখন জেলে। লয়েড জর্জ মন্ত্রণাসভার সদু- দ্দেশ্য প্রকট করিবার জন্য তাঁহাদের ছাড়িয়া দিবার মনস্থ করিয়াছিলেন। পূৰ্ব্ব-ক্লেয়ার হইতে রেডমন্টের শূন্য আসনের জন্য কারাগারে থাকিয়া ডি ভ্যালেরা দাড়াইলেন। জুন তাঁহাকে ছাড়িয়া দেওয়া হয় এবং সেই দিনই ছিল ভােট গ্রহণের দিন। সােজাসুজী ডি ভ্যালেরা ভােট দিবার স্থলে গিয়া উপস্থিত হইলেন এবং বলা বাহুল্য, ভােটে জয়লাভ করি- (ডি ভ্যালেরা ৫,০১০; লিটন ২,০৩৫ ) কিন্তু কিছুকাল যাইতে না যাইতে আইরিশ গভর্ণমেন্ট ডি ভ্যালেরার নির্বাচনকে ভাল চোখে দেখিলেন না ; বিনা বিচারে ডি ভ্যালেরার পার্শ্বচরেরা বন্দী হইতে লাগিল। এই ব্যাপার যখন খুব ব্যাপক হইয়া উঠিল, তখন ডি ভালে এক সভা আহ্বান করিয়া এক প্রস্তাব উত্থাপন করলেন যে, যুলােপীয় অন্যান্য জাতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিকট এই মর্মে এক ৪৪ লেন।
আবেদন পাঠান হউক যে, আয়ারল্যাণ্ডে বিনাবিচারে লােকদের বন্দী করা হইতেছে এবং দীর্ঘকাল ধরিয়া তাহাদের কারাগারে রাখা হইতছে ; ইহার প্রতিকার আবশ্যক। ডি ভ্যালেরাকে এই সময় হইতে বৃটীশ গভর্ণমেন্ট চিহুিত করিয়া রাখিল। তাঁহার আশে-পাশে চারিদিকে পুলিশ ও ডিটেকটিভ অনবরত ঘুরিতে লাগিল। কোথাও যাইবার পূর্বেই সাঙ্কেতিকে সেখানে পুলিশ-মহলে সংবাদ গিয়া পৌছায়। সাঙ্কেতিক ব্যবস্থা যে সব গ্রামের মধ্যে সুপ্রচলিত হয় নাই সেখানে মাঝে মাঝে এইরূপ ভাবে খবর যাইত। To the Sergent' R. I. C. at-Percel left by 4-15 P. M. train to-day, Please look out for it." “৪-৪৫ মিনিটের গাড়ীতে পার্শ্বেলটী গিয়াছে। অনুসন্ধান করিবে।” D ক্রমশঃ ডি ভ্যালেরার দল আয়ারল্যাণ্ডে অত্যন্ত প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিল এবং আইরিশ গবর্ণমেন্টও সজাগ হইয়া উঠিল। ধরপাকড় তাে প্রতিদিনই চলিতে লাগিল। চীফ সেক্রেটারী মিঃ ডিউক জানাইলেন যে, “আয়ারল্যাণ্ডে একদল যুবক গড়িয়া উঠিতেছে—সংখ্যায় তাহারা দুই লক্ষ হইবে। তাহাদের ব্রটীশ সাম্রাজ্যের শত্ৰু করিয়া গড়িয়া তােলা হই-
তেছে এবং গােপনে গােপনে ইষ্টার-বিদ্রোহের অসম্পূর্ণ
কাজকে সম্পূর্ণ করিবার জন্য রীতিমত অস্ত্রসংগ্রহ হইতেছে।
আয়ারল্যাণ্ডের গ্রামে
গ্রামে যুবকরা সঙ্ঘবদ্ধ হইয়া
ব্যায়ামশিক্ষার আবরণে যুদ্ধের আদব-কায়দা শিখিতেছে।
তাহাদের নেতারা তাহাদের বুঝাইয়া দিয়াছে যেপ্রচুর অস্ত্র
জোগাড়ে আছে এবং প্রয়ােজনের দিন আরও পাওয়া যাইবে।
আর কোথা হইতে এই সমস্ত অস্ত্র আসিল ? আয়ারল্যাণ্ডে
বসিয়া সিনফিনেরা কেনে নাই নিশ্চয়ই! জাৰ্মাণী গােপনে
গােপনে এই সমস্ত অস্ত্র আয়ারল্যাণ্ডে চালান দিতেছে এবং
সেই সমস্ত কার্যে লিপ্ত থাকার দরুণই আইরিশ যুবকদের
বন্দী করিতে হইয়াছে।”
কিন্তু এই বক্ততার ফল মিঃ ডিউক যাহা ভাবিয়াছিলেন,
হইল ঠিক তাহার বিপরীত। এই সমস্ত সংবাদ প্রকাশ্যভাবে
এই প্রকার বিশ্বস্ত-সূত্রে শুনিয়া আয়ারল্যাণ্ডবাসী সেই
সমস্ত বিপ্লবী যুবকদের বড় করিয়া দেখিতে শিখিল ;
তাহারা মনে মনে গর্ব অনুভব করিল যে, আয়ারল্যাণ্ডে এমন
যুবকও আছে যে, যাহারা এত বড় শক্তির বিরুদ্ধে দাড়াইবার
শক্তি ও সাহস রাখে। সেই দলের দলপতিরূপে ডি ভ্যাঙ্গে-
রাকে আয়ারল্যাণ্ডবাসী এক রহস্যময় শ্রদ্ধা দিয়া দেখিতে
লাগিল।
5
৪৭
ইংরাজ রাজনৈতিকরা বুঝিয়াছিলেন যে আয়ারল্যাণ্ডে একটী নূতন লােক আসিয়াছে এবং সে লােক শূন্যগর্ভ কথার বেলুনে উড়িয়া বেড়ায় না। জগতে যে সমস্ত ব্যক্তি কর্ম- সাফল্যের জয়-টীকা পরিয়া আসে—এ তাহাদেরই অন্যতম। ইংরাজ জাতি, অন্তত ইংরাজ রাজনৈতিকগণ ডি ভ্যালেরার শক্তি ও তেজকে মনে মনে স্বীকার করিলেন। লয়েড জর্জ মন্ত্রী হইয়া এই আইরিশ বিদ্রোহীটীকে শান্ত করিবার নানা- রূপ উপায় নির্ধারণ করিতে লাগিলেন কিন্তু কিছুই কাৰ্য- করী হইয়া উঠিল না। ডি ভ্যালেরা তখন আয়ারল্যাণ্ডের নগরে নগরে প্রকাশ্য সভায় স্বাধীনতার বাণী প্রচার করিয়া বেড়াইয়াছিলেন এবং তাহার ফল দেখিতে দেখিতে চারিদিকে ফুটিয়া উঠিতেছিল। লয়েড জর্জ সেই সময় পালিয়ামেন্টে ডি ভ্যালেরার কাৰ্য-প্রণালীর তীব্র প্রতিবাদ করিয়া বলেন “আমি ডি ভ্যালেরার সমস্ত বক্তৃতা পড়িয়াছি, এবং আমি নিঃসন্দেহে বলিতে পারি—বেশ ধীর, স্থির ও শান্তভাবে বিবেচনা করাই ভি ভ্যালেরা আয়ারল্যাণ্ডে প্রকাশ্যভাবে বিপ্লবের বীজ ছড়াইতেছেন। বহুবার বহু সভায়, এমন কি অক্ষরে অক্ষরে ঠিক একই কথায় ডি ভ্যালেরা লােকদের ব্যায়াম ও যুদ্ধের সমস্ত কায়দা, এমন কি গুলি চালান পৰ্যন্ত শিখিতে বলিয়াছেন-কারণ যখন তাহাদের হাতে রাইফেল ৪৭, দেওয়া হইবে তাহারা যেন তখন তাহার সদ্ব্যবহার করিতে পারে। ১৮ মাস আগেকার ঘটনা সরকার এখনও ভুলে নাই; ইষ্টার বিপ্লবের পূৰ্ব্বে ও ঠিক এইরকম বক্তৃতা হইত; লােকদের যুদ্ধ-পদ্ধতি শেখান হইত এবং জাৰ্মাণ রাইফেল ব্যব- হার করিবার কথাও হইত, এমন কি সেবারে জাৰ্মাণী হইতে অস্ত্র কেনাও হইয়াছিল। এই সমস্ত বক্ততাকে উদ্দেশ্যহীন ব্যক্তির প্রলাপ মনে করিয়া সরকার কি আর চুপ করিয়া থাকিতে পারেন? এই বিপ্লব-প্রচেষ্টা সৰ্ব্বতােভাবে দমন করা কর্তব্য। এই সিনফিনেরা হােমরুল চাহে না—তাহারা চায় পূর্ণ স্বাধীনতা--বৃটিশ সাম্রাজ্যের সহিত সকল বন্ধন ছেদন। ইংলণ্ড কোনও অবস্থায় তাহা দিতে পারে না। ডি ভ্যালেরার সমস্ত উক্তির মধ্যে কোথাও কোন দ্ব্যর্থ নাই; অতএব সর- কার এ বিষয়ে আর ক্ষণকালও উদাসীন থাকিতে পারে না।” লয়েড জর্জের এই বক্তৃতা দিবার দুই দিন পরে ২৫শে অক্টোবর সিনফিনদের প্রথম মহাসভার উদ্বোধন হয়। সমগ্র আয়ারল্যাণ্ড হইতে ১৭০০ জন ডেলিগেট এই সভায় যােগ- দান করেন। এই সভার কর্ম-তালিকার মধ্যে একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় ব্যাপার ছিল-সভাপতি-নির্বাচন। সিনফিনের শত্রুদল ভাবিয়াছিলেন এই ব্যাপার লইয়া নিশ্চয়ই তাহাদের মধ্যে দলাদলির সৃষ্টি হইবে। গ্রিফিথ, প্লাঙ্কেট ও ভি s ভ্যালেরা এই তিন জন সভাপতি পদের জন্য দাঁড়ান। দলাদলি অথবা কোনও গােলযােগের কোনও আভাস পাওয়া গেল না। গ্রিফিথ ও প্লাঙ্কেট দুইজনেই স্বেচ্ছায় সভাপতির আসন ত্যাগ করিয়া ডি ভ্যালেরাকে সভাপতির আসনে বসাইলেন। সভাপতি-নিৰ্বাচনের প্রস্তাব স্বয়ং গ্রিফিথই করেন এবং সেই প্রসঙ্গে বলেন, “আয়ারল্যাণ্ডের স্বাধীন . তার সর্বশ্রেষ্ট সৈনিক এই সভার সভাপতি হন এই আমার বাসনা।” মিঃ জিনেল গ্রিফিথের প্রস্তাব অনু- মােদন করিতে উঠিয়া বলিলেন, “আয়ারল্যাণ্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ সৈনিকের জন্য আয়ারল্যাণ্ডের দুইটি মহাপুরুষ যে গৌরবের আসন ত্যাগ করিলেন তাহা তাহাদেরই গৌরবের উপযুক্ত।” এই সভার কাৰ্য শেষ হইতে না হইতেই সমগ্র আয়ার- ল্যাণ্ডের মধ্যে বিদ্যুৎ-প্রবাহে একটা আতঙ্ক ছড়াইয়া পড়িল। যেন কালই আবার বিপ্লব হইবে, কালই আবার আয়ার- ল্যাণ্ডের পথে কামান গৰ্জন করিয়া উঠিবে বৃটীশ পুলিশ-মহলে সাজ-সাজ রব পড়িয়া গেল ; সবাই সন্ত্রস্ত, সবাই আশঙ্কা-সঙ্কুল। ৪ঠ। নভেম্বর নিউব্রিজে ডি ভ্যালেরার বক্তৃতা দিবার কথা ছিল। পুলিশ , এই সন্দেহ করিয়া পূর্বাহ্নেই পূর্বাহ্নেই সৈন্য-সামন্ত লইয়া স্থানটী একেবারে পরিবেষ্টিত করিল। তাহাতে চারিদিকে ৪৯
আরও আতঙ্কের সৃষ্টি হইল। যথাসময়ে গ্রিফিথকে সঙ্গে
লইয়া ডি ভ্যালেরা আসিয়া সভায় বক্তৃতা দিয়া চলিয়া
গেলেন। সৈন্যেরা বন্দুক হাতে করিয়াই বাড়ী ফিরিল।
ডি ভ্যালেরা ও সিনফিন আন্দোলন
পার্সিয়ামেন্টে এবং ইংরাজ-প্রেসে তখন নানাদিক
হইতে প্রশ্ন উঠিতেছিল ডি ভ্যালেরাকে কেন বন্দী করা
হইতেছে না ? কিন্তু ডি ভ্যালেরাকে বন্দী করিবার
কোনও
প্রশস্ত কারণ ইংরাজ রাজনৈতিকরা খুঁজিয়া
পাইতেছিলেন না। এই চঞ্চল স্পেনিয়ার্ড-পুত্রের বক্ততার
মধ্যে এত বড়
রাজনৈতিক স্থিরতা ছিল যে, কোথাও
উচ্ছাসের মুখে তাহা স্পষ্ট বিপ্লবাত্মক হইয়া উঠিত না।
ডি ভ্যালেরার রাজনৈতিক জীবনে গ্যারিবঙীর অসম
সাহসিকতার সহিত উইলসনের রাজনৈতিক প্রতিভার
সম্মিলন হইয়াছিল। তাই ইংরাজ রাজনৈতিকদের ডি-
ভ্যালেরাকে লইয়া বেশ একটু বিপদে পড়িতে হইয়াছিল।
তাঁহার সম্ভাব্য কারাবাসের কথা শুনিয়া ডি ভ্যালেরা বলিয়া-
ছিলেন যে, “আজ আমি যদি জেলে যাই, আমার পরিবর্তে
আমার স্থান দখল করিবার জন্য আরও দশজন আসিবে--
তাহারাও বন্দী হইলে আরও দশজন আসিবে—যতক্ষণ না
দেশের সমস্ত যুবক কারাগার অলঙ্কত
অলঙ্কত করে। তারপর
৫০
যুবকশূন্য আয়ারল্যাণ্ডে বৃদ্ধরা আসিয়া সেই স্থান দখল করিবে।” এই সময় ডি ভ্যালেরার যে সমস্ত বক্ততা কাগজে বাহির হইত, তাহার উপর “Passed by Censor লেখা থাকিত। সাধারণ লােকে তঁাহার বক্ততার আসল রূপ দেখিতে পাইত না। ডি ভ্যালেরার গতিবিধি ও বক্ততা সমস্ত আয়ার- ল্যাণ্ডকে মায়াবলে যেন সজীব করিয়া তুলিতেছিল। এই অসমসাহসিক ব্যক্তিটীর নির্ভীক উক্তি দেশের লােকের মনের মধ্যে সহজে গিয়া বিধিতেছিল। ভ্যালেরা এই সময় বলিয়াছিলেন, “Untill the full acoount is paid to the last penny the Irish people will never be satisfied. We will do our best in our life-time. We will not sell our birth-right for a mess of pottage, and if we do not succeed we will pass on the fight as a sacred duty to those who come after us.“যতক্ষণ আয়ারল্যাণ্ডের ঋণের শেষ পয়সাটী পৰ্য্যন্ত শােধ করিয়া দেওয়া হইতেছে—ততক্ষণ আমরা কিছুতেই সন্তুষ্ট হইব না। আমাদের জীবন দিয়া আমরা আমাদের কর্তব্য করিয়া করিয়া যাইব। টুনাে রুটীর জন্য জীবনসত্ব বেচিতে আমরা প্রস্তুত নই। আমরা যদি অকৃতকাৰ্য হই, তাহাতে ক্ষোভ নাই- সংগ্রামের পবিত্রতম সাধনার ভার আমরা আমাদের পরে যাহারা আসিতেছে—তাহাদের উপর ন্যস্ত করিয়া দিয়া চলিয়া যাইব।” ১৯১৮ সালে যুদ্ধের অবস্থা বিশেষ ঘােরালে হইয়া আসিতেছিল। ইংলণ্ড ও মিলিত-শক্তিদের তখন নূতন সৈন্য প্রয়ােজন। পালিয়ামেন্টে আয়ারল্যাণ্ডে Conscripton আনিবার প্রস্তাব উঠিল। সরকার কিন্তু প্রস্তাবকে পিছাইয়া দিতে লাগিলেন, কেন না বৃটীশ সরকার সন্দেহ করিয়াছিলেন যে এই সময় আয়ারল্যাণ্ডে Conscription জারী করিলে আয়ারল্যাণ্ড ক্ষেপিয়া উঠিবে—এমন কি হয়ত, অস্ত্র-হাতেও প্রতিবাদ করিতে দ্বিরুক্তি করিবে । আয়ারল্যাণ্ডবাসী যাহাতে এই যুদ্ধে যােগদান না করে, তজ্জন্য ডি ভ্যালেরা দেশের মধ্যে অগ্নিগর্ভ বাণী ছড়াইয়া বেড়াইতেছিলেন। ডি ভ্যালেরা প্রকাশ্য সভায় বলিলেন, “ইংলণ্ড ষে আমাদের উপর Conscription জারী করিতে পারে না--শুধু তাই নয়, তাহার তৈরী
=
কোনও আইন আমরা মানিব না সে ভালই হ’ক, আর
মন্দই হক।”
এই যুদ্ধে-যােগদানের বাধ্যতামূলক আইন প্রবর্তনের
ব্যাপার লইয়া আয়ারল্যাণ্ডের রাজনৈতিক আকাশ ঘনঘটাচ্ছন্ন
হইয়া উঠিল। বৃটিশ পার্লিয়ামেন্টের সভ্যরা আয়ারল্যাণ্ডের
উপর Conscription জারী করিবার জন্য জোর তলব করিতে
লাগিলেন, এধারে ডি ভ্যালেরা আয়ারল্যাণ্ডের নগরে
নগরে ভাষার অগ্নিকণা ছড়াইয়া প্রচার করিতে লাগিলেন,
"The ten-foot pikes in their ( Irish Volunteers')
hands are a far greater guarantee they would
not be conscripted than all the eloquence of the
eighty M. P's in the British House of Commons.
--বৃটীশ পার্সিয়ামেন্টের হাউস অফ কমন্সের আশীজন সভ্যের
বক্তৃতার মিলিত শক্তির চেয়ে আমাদের ভলান্টিয়ারদের হাতে
দশফিট লাঠী—ঢের বড় গ্যারান্টি যে আমাদের এই যুদ্ধে
জোর করিয়া যােগদান করান যাইতে পারে না।”
সেন্ট পার্টিকের স্মরণদিনে আয়ারল্যাণ্ডবাসী আনন্দে এক
হইয়া যায়। ঐ দিনে বেলফাষ্ট নগরে এক বিরাট জনসভা
হইবার কথা হয়। ডি ভ্যালেরা ঐ সভায় বক্তৃতা দিবেন এই
ঠিক হয়। পুলিশ এই খবরে সন্ত্রস্ত হইয়া বিপ্লব আশঙ্কা
করিয়া পূরামাত্রায় সজ্জিত হইয়া সেই দিন ঐ সভা ভাঙ্গিয়া দিবার ঠিক করিল। সভার দুই তিন দিন আগে ডি ভ্যালেরা পুলিশের মনােভাবের পরিচয় পাইলেন এবং গােপনে আয়ােজন করিয়া যেদিন সভা হইবার কথা ছিল তাহার আগের দিন মধ্যরাত্রে সভার আয়োেজন করি- লেন। রাত্রে সংঘবদ্ধ সেই বিরাট জনতার সম্মুখে বক্তৃতা দিয়া আপনার কাৰ্য সম্পন্ন করিয়া ডি ভ্যালেরা যখন সভাভঙ্গ করিতেছিলেন সেই সময় পুলিশ আসিয়া পড়ে এবং তাহার ফলে সভার মধ্যে একটা দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়। . উভয় পক্ষের লোেকই জখম হয়। অবশেষে সত্য সত্যই ১৯১৮ সালের ৯ই এপ্রিল লয়েড জর্জ আয়ারল্যাণ্ডের উপর বাধ্যতামূলক সমরে যােগদানের আইন জারী করিলেন। এই আইন জারী করিবার সময় মন্ত্রীপ্রবর বলিলেন, “এই মহাযুদ্ধ যতদূর ইংরাজ সম্পর্কিত, ঠিক ততখানি আয়ারল্যাণ্ডের সঙ্গে ও সম্পৃক্ত; আর আয়ার- ল্যাণ্ডও তাহার প্রতিনিধিদের সম্মতির মধ্য দিয়া এই যুদ্ধে নিজেকে সংযুক্ত করিয়াছে ; অতএব এখন আয়ারল্যাণ্ড যদি যুদ্ধে যােগদান করিতে বিমুখ হয় তাহা হইলে সে অন্যায় করিবে।” এই পরম যুক্তির চরম ফাকি বুঝিতে আয়ারল্যাণ্ড- বাসীর বিশেষ বুদ্ধি খরচ করিতে হইল না। ডি ভ্যালেরা এই আইন জারী হইবার পর প্রকাশ্য সভা আহ্বান করিয়া ইহার বিরুদ্ধে জনমত গড়িয়া তুলিতে লাগিলেন। বক্তৃতায় কোনও অস্বাভাবিক উত্তেজনার লক্ষণ নাই—শূন্যগর্ভ কথার বিদ্যুৎ-স্ফুরণও নাই। ডি ভ্যালেরা অল্প কথায় শান্তভাবে ইংরাজদের জানাইলেন যে—আপনাদের কর্তব্যের ন্যায্যতা পরিপূর্ণ বুঝিয়াই সিনফিনেরা যুদ্ধে যােগদান করিবে —কাহাকেও যুদ্ধে যােগদান করিতে দিবে না। ইংরাজ রাজনৈতিক খুব ভাল রকমই জানেন যে, যে- মেঘে বর্ষন হয় সে গর্জনের তত পক্ষপাতী নয়। ডি ভ্যালেরার কথাবার্তা যতই শান্ত ও গম্ভীর হইয়া আসিতে লাগিল, ডাবলিন প্রাসাদের কর্তারা ততই চঞ্চল হইয়া উঠিতে লাগি- লেন। এধারে ডি ভ্যালেরা সময় বুঝিয়া সমস্ত আইরিশ দলের নেতাদের আহ্বান আহ্বান করিলেন। এই বৈঠকে আয়ার- ল্যাণ্ডের বিভিন্ন নেতারা যােগদান করেন। সিনফিনের পক্ষ হইতে ডি ভ্যালেরা ও গ্রিফিথ ; আইরিশ পাটীর পক্ষ হইতে জন ডিলােন ও জোসেফ ডেভলিন ; ইণ্ডিপেডেন্টের পক্ষ হইতেও ব্রিয়ান ; শ্রমিকদের পক্ষ হইতে উইলিয়াম ও ব্রিয়ান ও অন্যান্য নেতারা যােগদান করেন। অনেকেই ভাবিয়াছিলেন যে এই বিভিন্ন দলের বিভিন্ন নেতাদের মধ্যে নিশ্চয়ই মতান্তর ঘটিবে কিন্তু যখন বিজয়ী বীরের মত ৫৫ ম্যানসন হাউসের দ্বারদেশে দাড়াইয়া ডি ভ্যালেরা প্রচার করিলেন যে আয়ারল্যাণ্ডের সকল দলের সকল নেতা এক যােগে আয়ারল্যাণ্ডবাসীকে এই যুদ্ধে যােগদান করিতে বারণ করিতেছেন সেদিন ম্যানসন হাউসের চারিদিকে লােকে লােকারণ্য হইয়া গিয়াছিল। বিরাট জনতা বিপুল হর্ষে ডি ভ্যালেরাকে জাতির স্বাধীনতার সংগ্রামে সর্বশ্রেষ্ঠ সৈনিক বলিয়া অভিনন্দন করিল। ৮ই এপ্রিল ম্যানসন হাউসে আয়ারল্যাণ্ডের সর্বদলের নেতৃগণের সম্মিলন হয়। ১৮ই মে আয়ারল্যাণ্ডের নূতন রাজ-প্রতিনিধি লর্ড ফ্রেঞ্চ এক বিরাট ইস্তাহার বাহির করেন। এই ইস্তাহারে আইরিশ গভর্ণমেণ্ট আয়ারল্যাণ্ডবাসীদের একটী ভয়ানক ষড়যন্ত্রের খবর জ্ঞাপন করে। প্রচার পত্রে তাহাকে জাৰ্মাণ প্লট বলা হয়। জাৰ্মানগণ বিদ্রোহী আইরিশ নেতাদের সাহায্যে আয়ারল্যাণ্ডের মধ্যে বৃটীশ-ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এই ষড়যন্ত্র চালাইতেছে অতএব এই ষড়যন্ত্র হইতে আয়ার- ল্যাণ্ডের সম্মানকে রক্ষা করিবার জন্য গভর্ণমেন্ট প্রত্যেক আয়ারল্যাণ্ডবাসীর সাহায্য চাহিতেছেন। যে দিন এই প্রচার-পত্র জারী হয় তাহার পূর্বদিন রাত্রিতেই সমগ্র আয়ারল্যাণ্ডের মধ্যে সহসা ধর পাকড়ের মহা ধুমধাম পড়িয়া গেল এবং এক রাত্রির মধ্যে সমস্ত সিন- ফিন-নেতাদের গ্রেফতার করিয়া একেবারে চালান দেওয়া হইল। ডি ভ্যালেরা রাত্রে ডাবলিন হইতে রেলে যাইবার পথে গ্ৰেষ্টোনস্ ষ্টেশনে নামিতেই পুলিশ আসিয়া তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিল। আর্থার গ্রিফিথ, কাউণ্ট প্লাকেট প্রভৃতি সকলেই বিভিন্ন স্থানে সেই রাত্রে বন্দী হন। ইংরাজ রাজনৈতিকগণ হয় ত ভাবিয়াছিলেন যে আয়ারল্যাণ্ডের জনসাধারণের সম্মুখ হইতে এই কয়টা লােককে সরাইয়া লইতে পারিলে আয়ার- ল্যাণ্ড নীরবে যুদ্ধে যােগদান করিবে; কিন্তু এই ধরপাকড়ের ব্যাপারে আইরিশ জনসাধারণ আরও সংক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল সিনফিন দলের লােকেরা আগে হইতেই এই ব্যাপারের জন্য প্রস্তুত ছিল ; তাই তাহারা কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া বন্দী নেতাদের যায়গায় অন্য সভ্যদের মনােনীত করিয়া ম্যানসন হাউসের কাজ পুর্বের মত চালাইতে লাগিল। এই ধর-পাকড়ের ব্যাপারে ইংরাজ সংবাদপত্র মহলে খুব সচকিত আনন্দের লক্ষণ পরিস্ফুট হইয়া উঠিল। Daily Telegraph শুধু কারাবাসে সন্তুষ্ট হইতে না পারিয়া লিখি- 67a, “But it is not enough to deprive these conspirators of the liberty which they have so foully abused." “The Globe” ঘুরাইয়া ইঙ্গিত করিলেন যে এই সমস্ত লােক যদি ইংরাজ হইত, আর এরা যে বিপ্লবী ৫৭ তাহা প্রমাণিত হইয়া যাইত, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ ইহাদের দলপতিকে ফঁসীতে ঝুলান হইত।” এখন কথা হইতেছে—এই “জাৰ্মাণ প্লট” ব্যাপারটা কি ? সরকারী প্রকাশিত কাগজপত্র হইতে এই বিখ্যাত জাৰ্মাণ- প্লটের যে খবর পাওয়া যায় তাহা এই ঃ- “মহাযুদ্ধের প্রারম্ভে ৬ই নভেম্বর ১৯১৪ সালে হার জিমারম্যান আইরিশ নেতা বােগার কেসমেন্টের হইয়া কাউণ্ট বার্ণভােফ এর মধ্যবর্তিতায় আয়ারল্যাণ্ডে খবর পাঠান যে একজন লােককে আয়ারল্যাণ্ডের ভিতরের ব্যাপার বুঝাই- বার জন্য যেন জাৰ্মাণীতে পাঠান হয়। একজন আইরিশ ধাত্রীকে যুদ্ধে বন্দী ও আহত আইরিশদের সেবার জন্য নরওয়ে-স্থিত জাৰ্মাণ লিগেশনের সাহায্যে পাঠান যেন হয়- এই মর্মে কেসমেন্ট আর একটী তার পাঠান। কেসমেন্ট বলিয়া দেন যেএই দুই ব্যক্তির কাহারও নিকট যেন কোনও চিঠিপত্র না থাকে। ১০ই ফেব্রুয়ারী কাউন্ট বার্ণসডােফ আইরিশ নেতা জন ডিভয়ের স্বাক্ষর যুক্ত এক পত্র আমাষ্টার্ডামে স্কাল নামক এক ব্যক্তির ঠিকানায় পাঠান। এই চিঠিতে লেখা ছিল যে আর অপেক্ষা করা যায় না--কারণ শীঘ্রই হয়ত নেতারা বন্দী হইতে পারে। সেই চিঠিতে ডিভয় জানাইয়া দিয়াছিলেন যে, আগামী ইষ্টার শনিবারের দিন বিপ্লরের দিন ধার্য্য .৫৪ হইয়াছে ; অতএব সেইদিনের মধ্যেই যেন লিমারিকে অস্ত্র- শস্ত্রের জাহাজ পাঠান হয়। ৪ঠা মার্চ জাৰ্মাণী হইতে জন জাগাউ খবর পাঠান যে অস্ত্র-শস্ত্র পাঠান হইল, তবে জাহাজ ট্রালি-উপসাগরে থাকিবে। পরের দিন বার্ণস্ডােফ পুনরায় খবর পাঠান যে, যদি সাবমেরিণে করিয়া অস্ত্র-শস্ত্র পাঠান হয় তাহা হইলে সাবমেরিণ নিরাপদে ডাবলিন-উপসাগরে বিজিয়ান হাউস পর্যন্ত জালে তাবরুদ্ধ না হইয়া আসিতে পারে। এই সমস্ত কথাবার্তার অধিকাংশ আয়ারল্যাণ্ড হইতে বেতারে আমেরিকায় যাই—সেখান হইতে বেতারে পুনরায় বার্লিনে যাইত। ১৮ই এপ্রিল আমেরিকা হইতে বার্লিণে তার যায় যে ইষ্টার রবিবার সন্ধ্যাবেলা জাহাজ আসা চাই ; এবং ইংলণ্ডের উপর আকাশ ও সমুদ্রকূল হইতে আক্রমণের ব্যবস্থা করিবার কথাও বলা হয়। ডাবলিনের উপকূলে আসিয়া জাৰ্মাণ জাহাজ ধরা পড়ে। রােগার কেসমেন্ট জাহাজ হইতে পলাইয়া যান কিন্তু ক্লান্ত হইয়া যখন তিনি সমুদ্রের উপকূলে এক ভগ্ন প্রাসাদে বিশ্রাম করিতেছিলেন তখন তিনি ধৃত হন।” এই জাৰ্মাণ-প্লটে লিপ্ত থাকার দরুণ ডি ভ্যালেরা-প্রমুখ সমস্ত সিনফিন নেতাদের বন্দী করা হয়। ডি ড্যালেরাকে প্রথমে আয়ারল্যাণ্ডে বন্দী করিয়া রাখা হয় ; তাহার পর তাহাকে লিঙ্কনের বিখ্যাত কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। কয়েক মাস যাইতে না যাইতে সমস্ত জগৎ সবিস্ময়ে শুনিল যে লিন্কন জেল হইতে ডি ভ্যালেরা নিঃশব্দে পলাইয়া গিয়াছেন—কোথাও তঁাহায় খবর পাওয়া যাইতেছে না। বৃটিশ জেল হইতে ডি ভ্যালেরার পলায়ন বৃটীশের সুদৃঢ়বদ্ধ কারাগার হইতে ডি ভ্যালেরার এই অকস্মাৎ তিরােধানে সমগ্র জগৎ বিস্মিত হইল। আয়ার- ল্যাণ্ড আনন্দ ও বিস্ময়ে স্বদেশের ভাগ্যবিধাতার কল্যাণ কামনা করিল; ইংরাজ রাজপুরুষেরা এই আকস্মিক ব্যাপারে পরাজয়ের তীব্র অপমান বােধ করিলেন। ডি ভ্যালেরার এই রহস্যময় পলায়নে ইংরাজ সংবাদপত্র-মহলে ভীষণ আলােচনা চলিতে লাগিল এবং এই সমস্ত আলােচনা ইংরাজ রাজনৈতিকদের পরাজয়ের দুর্বলতাকে বিশেষভাবে আক্রমণ করিল। ডি ভ্যালেরার এই পলায়নে ইংরাজ রাজনৈতিক, গণ রীতিমত লজ্জা অনুভব করিলেন। ডি ভ্যালেরা শুধু কারাগার হইতে পালাইলেন তাহা নয়, কোথায় গেলেন তাহার ঠিকানা কেহ পাইল না। ইংলণ্ডের সুবিখ্যাত গুপ্তচর- বিভাগও ডি ভ্যালেরার কোন খবর পাইল না। ।
এই অভূতপূৰ্ব্ব এবং আশ্চৰ্য্য পলায়ন-কাহিনী জগতে প্রচারিত হইয়া পড়ায় সকলেরই দৃষ্টি আয়ারল্যাণ্ডের উপর পতিত হইল। জগতের সকল দেশের সংবাদপত্র-মহলে বিষম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হইল এবং দেশ-বিদেশের সংবাদপত্র- প্রতিনিধিরা ডি ভ্যালেরার গতিবিধি সম্বন্ধে তথ্যসংগ্রহের জন্য উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়া গেলেন। তাঁহার সম্বন্ধে প্রত্যেক সংবাদ প্রতিদিন তারযােগে জগতের সর্বত্র প্রচারিত হইতে লাগিল। সতর্ক প্রহরীবেষ্টিত বৃটিশ কারাগার হইতে ডি ভ্যালেরা কিরূপে পলায়ন করিতে সমর্থ হইলেন তাহা বাস্তবিকই বিস্ময়ের কথা। কারাগারে অবস্থানকালে কোন লােকের সহিত তাঁহাকে সাক্ষাৎ করিতে দেওয়া হইত না, এমন কি, নয় মাস তাহার স্ত্রীর সহিতও দেখা করিতে পান নাই। সুতরাং এইরূপ অব স্থায় যে তিনি প্রহরীদের দৃষ্টি এড়াইয়া কিরূপে পলায়ন করিলেন, সে কাহিনী উপন্যাসের রহস্যের মতই বােধ সময় কাটাইবার জন্য আইরিশ বন্দীদের ছবি আঁকিতে দেওয়া হইত এবং তঁাহারা নানারূপ ব্যঙ্গচিত্র আঁকিয়া গৃহে প্রেরণ করিতেন। এইরূপ দুইটি ব্যঙ্গচিত্রের সাহায্যেই ডি ভ্যালেরার পলায়নের পথ পরিষ্কৃত হইয়াছিল। একখানি চিত্রে এক মাতাল স্বগৃহের দরজার নিকট দাড়াইয়া চাবি দিয়া দরজা খুলিতে চেষ্টা করিতেছে এবং তাহার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হইতেছে। ছবির নীচে লেখা “আমিঢুকিতে পারিতেছি না।” অপর একখানি ছবিতে অঙ্কিত ছিল- এক ব্যক্তি কারাগৃহের দরজা চাবি দিয়া খুলিতে চেষ্টা করিতেছে এবং নীচে লেখা ছিল, “আমি বাহির হইতে পারিতেছি না।” ছবি দুইটি আঁকিবার পূর্বে ডি ভ্যালেরা কৌশলে কারাগারের চাবির একটি মােমের ছাঁচ সংগ্রহ করিয়াছিলেন এবং এবং ব্যঙ্গচিত্রে সেইটি অবিকল আঁকিয়া দিয়াছিলেন। বৃটিশ রাজপুরুষদের হস্তে যখন ছবি দুইখানি পড়িল তখন তাহারা ব্যঙ্গচিত্রের কৌতুক উপভােগ করিতে এত ব্যস্ত ছিলেন যে, তাহার মধ্যে যে গূঢ় উদ্দেশ্য নিহিত ছিল তাহা তাঁহাদের চক্ষে ধরা পড়িল না এবং ছবি দুইখানি বিনা বাধায় আয়ারল্যাণ্ডের সিফিন দলের হস্তে পেীছিল। অতিবুদ্ধি ইংরাজ কর্মচারিগণ যে উদ্দেশ্য ধরিতে পারেন নাই ডি ভ্যালেরার বন্ধুদের নিকট তাহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হইল এবং কালবিলম্ব না করিয়া তাহার প্রতিকৃতির অনুরূপ চাবি প্রস্তুত করিয়া একখানি সদ্য-প্রস্তুত পিষ্টকের মধ্যে পুরিয়া লিন্ক জেলের মধ্যে কৌশল-সহকারে প্রেরণ করিলেন। সিফিন, নেতা মাইকেল কলিন্স, এবং হ্যারী বােল্যাণ্ড যথাসময়ে মােটর গাড়ী লইয়া কারাগারের পশ্চাতে অবস্থান করিতেছিলেন, এবং উক্ত চাবির সাহায্যে কারগারের পশ্চাদ্দার খুলিয়া ডি ভ্যালেরা ও তাঁহার সঙ্গীগণ বাহির হইয়া আসিবামাত্র ভঁহাদিগকে ক্ষিপ্র গতিতে পূৰ্ব্ব হইতেই স্থিরীকৃত একস্থানে রাখিয়া আসিলেন। ডি ভ্যালেরা পলায়ন করিয়া কোথায় গেলেন, সে সম্বন্ধে সঠিক সংবাদ কেহ পাইল না। সংবাদ পত্রে নানারূপ অদ্ভুত কাহিনী প্রকাশিত হইতে লাগিল। কেহ বলিল, তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উইলসনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছেন, কেহ বলিল তিনি য়ুরােপে পলাইয়া গিয়াছেন- এইরূপ নানাবিধ অতিরঞ্জিত সংবাদে সংবাদপত্র-মহল বেশ সরগরম হইয়া উঠিল। এদিকে ইংরাজ-রাজপুরুষেরা বাহিরে যদিও কোনও চাঞ্চল্য প্রকাশ করিলেন না এবং যেন কিছুই হয় নাই এইরূপ ভাব দেখাইতে লাগিলেন কিন্তু ভিতরে ভিতরে ডি ভ্যালেরাকে ধরিবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। শত শত গােয়েন্দা তাঁহাকে খুজিয়া বাহির করিবার জন্য ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল এবং পলায়নের
হইল।
প্রত্যেক পথের উপর ক্ষর দৃষ্টি রক্ষিত হইল। সর্বপেক্ষা
উৎসাহ দেখাইতে লাগিলেন লিন্কন, জেলের অধ্যক্ষ।
ভ্যালেরার পলায়নের পথরােধ করিবার নিমিত্ত এবং তাহাকে
ধরিবার জন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। লি-
কনে প্রত্যেক গৃহে একসঙ্গে খানাতল্লাসী হইয়া গেল এবং
আইরিশদিগের বাড়ীগুলির উপর বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হইল।
ডি ভ্যালেরা ও তাঁহার সঙ্গীদের ধরাইয়া দিতে পারিলে
প্রত্যেকের জন্য পাঁচ পাউণ্ড বা পঁচাত্তর টাকা পুরস্কার ঘােষিত
বােধ হয় ডি ভ্যালেরার পলায়নের গুরুত্বটা যাহাতে
সাধারণ লােকের কাছে প্রতীয়মান না হয়—সেই উদ্দেশ্যেই
এইরূপ সামান্য পুরস্কর ঘােষণা করা হইয়াছিল।
লিকন, জেলের অধ্যক্ষ ও শক্তিশালী বৃটিশ গভর্ণমেন্টের
সব চেষ্টা ব্যর্থ হইল। সেই “দীর্ঘকায় ক্ষীণদেহ পিঙ্গলচক্ষু”
লােকটিকে ধরা দূরে থাকুক তাহার কোনও খবরই কেহ
দিতে পারিল না। এই বিষম পরাজয়টিকে ঢাকিবার জন্য
ইংরাজ সরকার তখন সমস্ত ব্যাপারটাকে সামান্য বলিয়া
উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিলেন। তাহারা সহসা অবশিষ্ট
সিনফিন বন্দীদের মুক্তি দিয়া সাধারণকে বুঝাইবার চেষ্টা
করিলেন যে, ডি ভ্যালেরা পলায়ন না করিলেও তাঁহাকে
কয়েক সপ্তাহ পরে ছাড়িয়াই দেওয়া হইত।
৬৪
সিনফিদের মুক্তি দিয়া বৃটিশ রাজপুরুষগণ জগৎ- সমক্ষে নিজেদের উদারতা দেখাইলেন বটে, কিন্তু মনে মনে যথেষ্ট মর্মপীড়া ভােগ করিতে লাগিলেন। যতদিন না য়ুরােপের শান্তিসভায় ক্ষুদ্র পরাধীন দেশসমূহ সম্বন্ধে একটা বুঝাপাড়া হইয়া যায় ততদিন সেই বিদ্রোহী আইরিশ নেতাকে কারাপ্রাচীরের অন্তরালে রাখিতে পারিলেই তঁাহারা নিশ্চিন্ত হইতে পারিতেন। ডি ভ্যালেরার পলায়ন ও নীরব অজ্ঞাতবাসের পর তিনি প্রথম তাহার অস্তিত্ব জানাইলেন দেশবাসীর প্রতি এক নিবে - দন প্রেরণ করিয়া । সিফিদের এক সভায় সমবেত বিদ্রোহীদলের সম্মুখে ঐ নিবেদনপত্র পাঠ করিলেন ফাদার ও ফ্যনাগম। ডিভ্যালেরা লিখিয়াছিলেন—“আমি দেশের কাজ করিবার জন্যই কারাগার হইতে পলায়ন করিয়াছি এবং এখনও সেই কাজই করিতেছি।” ইহার কিছুদিন পরেই ম্যাক্স হাউসে এক সঙ্গীত জলসায় জেল-পলাতক অন্যতম আইরিশ-নেতা সিয়েন ম্যাক্গ্যারির অতর্কিত আবির্ভাব প্রস্থান সৰ্বসাধারণকে সৰ্বসাধারণকে চমৎকৃত করিয়া সকলে বুঝিল ডি-ভ্যালেরা খুব সম্ভব আয়ারল্যাণ্ডে উপনীত হইয়াছেন-ইহা তাহারই সূচনা। এই সময় ইংলণ্ডের ও অন্যান্য দেশের সংবাদপত্রগুলিতে ডি ভ্যালেরার সহিত দিল।
সাক্ষাতের বিবরণী প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হইল। এই বিবরণগুলি সিফিন্ দলের অদ্ভুত কৃতিত্বের পরিচায়ক। যে সময় বৃটিশ গভর্ণমেন্টের সর্বাপেক্ষা সুচতুর গােয়েন্দারা ডি ভ্যালেরার অস্তিত্ব খুজিয়া বাহির করিতে অসমর্থ সেই সময় মার্কি, ফরাসী এমন কি ইংরাজ সংবাদ পত্রেরও প্রতিনিধিগণের সহিত ডি-ভ্যালেরা গােপনে সাক্ষাৎ করিতেছিলেন এবং তাহা এরূপ সুকৌশলে সম্পন্ন হইতেছিল যে ভঁহার আস্তানার সংবাদ কেহই পায় নাই। সূর্যাস্তের পর, অধিকাংশ সময়ে গভীর নিশীথে ডি ভ্যালেরার অনুচরেরা ছদ্মবেশে গােপনে এই সকল প্রতিনিধিদের ডি ভ্যালেরার নিকট দ্রুতগতি মােটরে চড়াইয়া লইয়া যাইত এবং তাঁহারা কোনস্থানে আসিয়াছেন সে সম্বন্ধে কিছুই তাহাদের জানিতে দেওয়া হইত না। সিফিন বন্দীদের যখন ছাড়িয়া দেওয়া হইল, তখন ডি ভ্যালেরা আত্মগােপন করিয়া থাকিবার আর প্রয়ােজন বােধ করিলেন না। ইংরাজ রাজনৈতিকদের মনােভাব বুঝিয়া ডি ভ্যালেরা ভালরকমই বুঝিয়াছিলেন যে, আত্ম- প্রকাশ করিলে বন্দী হইবার আপাততঃ কোনও আশঙ্কা নাই; কারণ বৃটশ রাজনৈতিকগণ উগ্র ব্যবস্থায় সুবিধা হইল ;
দেখিয়া তখন একটু রাশ আয় করিয়া দিয়াছিলেন- যদি তাহাতে সিনফিনদের নরম করিয়া আনা যায়। ১৯১৪ সালে য়ুরােপের রণ-প্রাঙ্গণে লােভের ও লালসার যে বিরাট ধুমাগ্নি জ্বলিয়া উঠিয়াছিল, বহুলােকক্ষয় করিয়া, বহুজাতির সর্বনাশ করিয়া, মানবসভ্যতার সর্বনাশ করিয়া, সে ধূমাগ্নি নির্বাপিত হইয়া আসিল। সেই ভস্মীভূত রণ- প্রাঙ্গণের ধারে বসিয়া মহানগরী প্যারীতে জগতের ভাগ্য- বিধাতাগণের সভা বসিল। এই আন্তর্জাতিক শান্তিসভা জগতের সকল দুঃস্থ জাতির সকল পীড়া উপশম করিবার ভার গ্রহণ করিল; জগতের শক্তিশালী সমস্ত জাতির প্রতিনিধি তাহাতে স্বাক্ষর করিল। কিন্তু এই শান্তিসভা জগতের নির্যাতিত জাতিদের প্রতিনিধি নয়—এ ছিল নিৰ্যাতনকারী- দের সভা ; তাই চীন-গণতন্ত্রের দূত, জাপানের একুশটী অন্যায় দাবী প্রতিরােধ করিতে আসিয়া বিষন্নচিত্তে ফিরিয়া গেল ; তাই আয়ারল্যাণ্ড তেমনি ইংরাজ-প্রভুদের কৃপার উপর পড়িয়া রহিল। প্রেসিডেন্ট উইলসন অবশ্য সমগ্র জগতের সম্মুখে ক্ষুদ্র জাতিগুলির স্বার্থসংরক্ষণের বিষয় খুব জোর গলায় বাণী প্রচার করিতেছিলেন, এমন কি তঁাহার কথায় এই সমস্ত জাতিদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিবার স্পষ্ট অভিপ্রায়ও ছিল।
অবশ্য আইরিশ-নেতারা কিন্তু বেশ ভাল রকমেই জানিতেন, যুক্ত- রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অসহায় জাতিদের স্বাধীনতালাভের পক্ষে যতই সহানুভূতি দেখান না কেন, ইংরাজ সেই কথার উপর নির্ভর করিয়া আয়ারল্যাণ্ডকে কখনই স্বাধীনতা দিবে না তথাপি সমগ্র জগতের সম্মুখে প্রেসিডেন্ট উইলসনের বাণীকে সম্মুখে রাখিয়া অসহায় জাতির পক্ষ হইতে আয়ারল্যাণ্ড আপনাদের স্বাধীনতার বাণী প্রচার করিতে লাগিলেন। উদ্দেশ্য সমগ্র জগতের দৃষ্টিকে আয়ারল্যাণ্ডের সহানুভূতির জন্য যদি ফিরাইতে পারা যায়। সিনফিন-নেতাদের কাৰ্যপদ্ধতি ঠিকই ছিল ; তাহারা বেশ ভালরকমই জানিতেন যে, জাতির মুক্তি জাতির ভিতর হইতেই আসিবে এবং তাহা কখনও কেহ দিবে না বৃটীশ পালিয়ামেণ্ট নয়—প্রেসিডেন্ট উইলসনও নয়—রীতিমত মুক্তি-মূল্য দিয়া সে স্বাধীনতা অর্জন করিতে হইবে। আয়ারল্যাণ্ডের অভ্যন্তরে যখন প্রচারকার্য এমনি চলিতে লাগিল, বৃটীশ রাজনৈতিকগণ পুনরায় তখন রুদ্রমূর্তি পরিগ্রহণ করিলেন। নানারকমের নূতন নূতন আইন করিয়া সিনফিন-আন্দোলনের সমস্ত অভ্যুত্থানকে আইনের দ্বারা দণ্ডনীয় করিয়া তোেলা হইল। সভাসমিতি বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল, সংবাদপত্রসমূহের উপর রীতিমত কড়া পাহারা বসিল। তাহাতেও সিনফিন-নেতাদের উৎসাহের বিন্দুমাত্র অভাব ঘটিল না। সাধারণ বিচারালয়ে শাস্তির স্বল্পতার জন্য কোর্টম্যার্শাল জারী করিয়া টিবিউনালের বিচারে কঠোর দণ্ডাজ্ঞা প্রয়ােগে আইরিশ-নেতাদের দমন করিবার চেষ্টা চলিল ! কিন্তু আইরিশ-জনসাধারণ যতই এমনি ব্যাঘাত পাইতে লাগিল, ততই তাহাদের অন্তরে জাগরণের বিলুপ্ত প্রবৃত্তি- গুলি সজাগ হইয়া উঠিতে লাগিল। অর্ধেক আয়ারল্যাণ্ডের মধ্যে তখন যে বিলুপ্ত শক্তি দুৰ্বার বেগে জাগিয়া উঠিতে- ছিল, তাহা কোনও বিরুদ্ধ শক্তির নিকট মাথা নত করিতে রাজী ছিল না। ট্রিবিউন্যালের আসামীর কাঠগড়ায় দাড়া- ইয়া তাহারা আপনাদের মনে হাসি-ঠাট্টা করিত—বিচার- প্রহসনকে ব্যঙ্গ করিত। কোনও শাস্তির ভয় তাহাদের অন্তরের স্থৈৰ্য্যের সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটাইতে পারিত না। এই সময় সহসা ২২শে মার্চ তারিখে, সিনফিনদলের প্রধান কেন্দ্র হইতে এক ইস্তাহার জারী করা হইল যে, “আগামী বুধবার ২৬শে তারিখে সিনফিনদলের সভাপতি ডি ভ্যালেরা আয়ারল্যাণ্ডে আত্মপ্রকাশ করিবেন। সেইজন্য সমগ্র আয়ারল্যাণ্ড ও ও আইরিশ জাতীয় মহাসভার পক্ষ হইতে তাঁহাকে উক্ত দিন অভিনন্দন করা হইবে। আমরা আশা করি স্বদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের অগ্নি-হােত্ৰী পূজারীর গৃহ-প্রত্যাগমন উপলক্ষে সমগ্র আয়ারল্যাণ্ডবাসী আবাল- বৃদ্ধবনিতা যােগদান করিয়া এই জাতীয় উৎসব সাফল্য মণ্ডিত করিবেন। ডাবলিনের লর্ড মেয়র নগরদ্বারে তাহাকে অভিনন্দন করিয়া ম্যানসন হাউসে লইয়া যাইবেন। সেখানে ডি ভ্যালেরা আইরিশ জাতির ভবিষ্যৎ কৰ্ম্ম-পন্থ। সম্বন্ধে তাঁহার বক্তব্য ও বাণী দেশবাসীকে আপন করিবেন।” মহারাণী ভিক্টোরিয়া যখন ডাবলিনে শুভাগমন করিয়াছিলেন তখন তাহার সম্মানার্থ ডাবলিন নগরের মেয়র নগরের দ্বারপ্রান্তে আসিয়া মহারাণীকে সম্বর্ধনা করেন। সিন- ফিনেরা সেই সম্মানের পুনরাবৃত্তির আয়ােজন করিতে লাগিল। এই আকস্মিক আবির্ভাবের খবর শুনিয়া সমগ্র আয়ার- ল্যাণ্ড আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। নানা স্থানে সভা- সমিতি বসিতে লাগিল। কিন্তু রাজপুরুষগণ এই ব্যাপারের গুরুত্ব বুঝিয়া সমস্ত সভা-সমিতি বন্ধ করিয়া দিলেন এবং শােভাযাত্রা বন্ধ করিবার জন্য নিষেধাজ্ঞা জারী করা হইল। এই সমস্ত ব্যাপারে ডি ভ্যালেরার আবির্ভাব-ক্ষণটির জন্য সকলে আর ও বেশী উদ্গ্রীব হইয়া উঠিল। কিন্তু আবি- র্ভাবের আগের দিন ডি ভালেরা স্বয়ং খবর পাঠাইলেন যে, । ৭০ কোন ও রকম অভিনন্দনের কোন ও প্রয়ােজন নাই। দর্শন উদ্গ্রীব জনতা হতাশ হইয়া গেল। মহাযুদ্ধ অবসান হইয়া যাইবার পর জগতের রাজনীতি- মহলে একটা নূতন রকমের বােঝাপাড়া হইয়া যাওয়া যে নিতান্ত প্রয়ােজনীয় তাহা প্রত্যেক জাতিই প্রাণে প্রাণে অনুভব করিতেছিল। তাই প্রত্যেক জাতির তাই প্রত্যেক জাতির মুখে শান্তির কথা ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। অবশ্য এই সমস্ত শান্তির প্রস্তাবের অন্তরালে যে আন্তরিকতা খুব কমই ছিল তাহা প্রত্যেক জাতিই অন্তরে অন্তরে বুঝিয়াছিল কিন্তু একটা কথা পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছিল যে প্রত্যেক জাতিই এত বেশী রণ-শ্রান্ত যে আন্তরিকতার অভাবে কোন জাতিই বিশেষ ভীত হয় নাই। এই সময় আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতি উইলসন তাহার বিখ্যাত শান্তি-প্রস্তাব লইয়া প্যারী নগরে সর্বজাতি-সম্মিলনের জন্য এক শান্তি-বৈঠকের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রেসিডেন্ট উইলসন তঁাহার শান্তি প্রস্তাবে ক্ষুদ্র ও দুৰ্বল জাতি-সমূহের স্বাধীনতার দাবীকে সম্মান করিয়া এক নূতন আশার বাণী লইয়া আসেন। প্রেসিডেন্ট উইল- সনের আশার বাণী অনেক দুর্বল জাতির অন্তরে একটা আশার ঝলক আনিয়া দিল । সাম্রাজ্যবাদীদের নিকট ৭১ হইতে যে কিছুই পাওয়া যাইতে পারে না তাহা এই সমস্ত দুৰ্বল জাতি খুব ভাল রকমই জানিত কিন্তু দুর্বল ব্যক্তি- দেরই আশা করিবার ক্ষমতা অসীম। তাই আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া নগরের প্রবাসী আইরিশগণ এক বিরাট জাতীয় সম্মিলনীতে ঠিক করেন যে আয়ার- ল্যাণ্ডের দাবী পেশ করিবার জন্য শান্তি-সভায় আয়ারল্যাণ্ডের একজন প্রতিনিধি পাঠান হইবে । সিনফিনেরা খুব ভাল রকমই জানিতেন যে এই সাম্রাজ্য বাদীদের সভায় প্রেসিডেন্ট উইলসনের সমগ্র সদিচ্ছা সত্ত্বেও আয়ারল্যাণ্ডের কোনও স্থান থাকিতে পারে না। শেষ চেষ্টা স্বরূপ আয়ারল্যাণ্ডের প্রতিনিধি করিয়া ডি ভ্যালে- রাকে শান্তি-বৈঠকে পাঠানাের আন্দোলন চলিতে লাগিল। আইরিশ জাতির পক্ষ হইতে ডি ভ্যালেরা, আর্থার গ্রিফিথ ও কাউন্ট পাঙ্কেট প্যারিসের শান্তি-বৈঠকের সভাপতি ক্লেমেন্সুর নিকট এক পত্র পাঠান। এই পত্রের মর্মার্থ হইতেছে, “আইরিশ জাতির পক্ষ হইতে আমরা আপনাকে জানাইতেছি যে আয়ারল্যাণ্ডের পক্ষ হইতে কোনও কথা বলিবার কোনও অধিকার ইংলণ্ডের নাই। সুতরাং আয়ার- ল্যাণ্ডের পক্ষ হইতে বৃটিশ প্রতিনিধি যে কোনও সৰ্তে স্বাক্ষর করুক না কেন, তাহা আয়ারল্যাণ্ডবাসীরা মানিয়া লইবে না। ৭২ আয়ারল্যাণ্ডবাসীরা একমাত্র তাহার জাতির প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরকে স্বীকার করিতে রাজী আছে। সেই জন্য এই পত্র দ্বারা আপনাকে জানাইতেছি যে মিলিত আয়ারল্যাণ্ডের প্রতিনিধি হিসাবে সমগ্র জাতি আমাদের তিনজনকে শান্তি- বৈঠকে জাতির প্রতিনিধি নির্বাচিত করিয়াছে। আমাদের এই সহযােগিতা আশা করি আপনি গ্রহণ করিবেন।” এই পত্রের দুইদিন পরে পুনরায় ঐ তিনজনের স্বাক্ষরে আর একখানি চিঠি শান্তি-বৈঠকের সভাপতির নিকট যায়। তাহার মর্মার্থ হইতেছে, এই শান্তি-বৈঠক যেন সিনফিন প্রতিষ্ঠিত নব আইরিশ শাসন-তন্ত্রকে স্বাধীন জাতি বলিয়া স্বীকার করিয়া লয়। আয়ারল্যাণ্ডবাসীর পক্ষে ইংলণ্ডের শাসনাধিপত্য অসহনীয় হইয়া উঠিয়াছে। শান্তি-বৈঠকের নিয়মাবলী ও প্রেসিডেন্ট উইলসনের বাণী অনুযায়ী আয়ার- ল্যাণ্ডকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া ইংলণ্ডের অবশ্য কর্তব্য। আয়ারল্যাণ্ড প্রভৃতি জাতিদের ন্যায্য দাবীকে অগ্রাহ করিয়া কখনও জগতের শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে না।” আমেরিকার প্রবাসী আইরিশ-নেতাদের শত আবেদন ও ডি ভ্যালেরা-প্রমুখ আইরিশ-নেতাদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও শান্তি-বৈঠকে আয়ারল্যাণ্ডের কোনও স্থান হইল না। অবশ্য ইহার জন্য শুধু ইংলণ্ড দায়ী নয়-য়ুরােপের “চারিটি বৃহৎ ৭৩।
শক্তি” একযােগে এই দাবীর বিরুদ্ধে দাড়ান এবং এই চারি শক্তির মিলিত সম্মতি ব্যতিরেকে প্রতিনিধি-নির্বাচনের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট উইলসন অথবা ক্লেমেনসুরও ছিল না। মিশরের জনগণের প্রতিনিধি জগলুলের যে দশা হইল, আয়ারল্যাণ্ডের প্রতিনিধিদেরও সেই দশা হইল। শান্তি- বৈঠকে তাহাদের কোনও স্থান হইল না। অনেক চেষ্টা-চরিত্রের পর এডওয়ার্ড ডান ও ফ্রাঙ্ক ওয়ালস প্রেসিডেন্ট উইলসনের সহিত শুধু সাক্ষাৎ করিবার অধিকার পাইলেন। অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর তাহারা প্রেসিডেন্ট উইলসনকে কিছুতেই আয়ারল্যাণ্ডের দাবীর বিষয় বুঝাইতে পারিলেন না। এই বিখ্যাত আলােচনার শেষে বিদায়কালে প্রেসিডেন্ট উইলসন বলিয়াছিলেন,—“I wish that you would bear in mind that I come here with very high hopes of carrying out the principles as they are laid down. I did not succeed in getting all I came after. I should say I should say that there was a great deal--10, I will put it this way-there was a lot of things that I hoped but did not get." প্রেসিডেন্ট উইলসনের শেষ কথা কয়টিতে যে অসহায় আন্তরিকতা ফুটিয়া উঠিয়াছিল, তাহাকে সন্দেহ করিবার ৭৪ কিছুই নাই। “আমি অনেক কিছু আশা করিয়া আসিয়া- ছিলাম কিন্তু কিছুই হইল না।” প্রেসিডেন্ট উইলসনের কথার প্রতিধ্বনি জগতের সমস্ত নির্যাতিত জাতিদের মনে বাজিতেছে। তাহারাও অনেক আশা করিয়াছিল কিন্তু আজ তাহারা বেশ ভালরকমই বুঝিয়াছে কোনও শান্তিবৈঠক, কোনও মহাজাতি-সম্মেলন হইতে জগতের শান্তি অথবা নির্যাতিতের কোনও দাবীর পরিপূরণ হইতে পারে না। শান্তি-বৈঠক শুধু শান্তির প্রহসন-মাত্র। আবেদন-নিবেদনের দিক হইতে কোনও কিছু হইবে না বুঝিয়া সিনফিনদলের নেতারা সঘবদ্ধ হইয়া ১৯১৯ সালের ২১শে জানুয়ারী আপনাদের নবগঠিত শাসনতন্ত্র লইয়া এক নূতন ব্যবস্থা-পরিষদের প্রতিষ্ঠা করিলেন। সিনফিন- দের প্রতিষ্ঠিত এই নবগঠিত পার্সিয়ামেন্টের নাম হইল, Dail Ereanu, ২২শে জানুয়ারী উক্ত সভার সর্বপ্রথম অধিবেশনে আইরিশজাতির পূর্ণস্বাধীনতা-জ্ঞাপক এক ঘােষণাপত্র জারী করা হইল। সেই সঙ্গে সঙ্গে এই নব-গঠিত শাসন-তন্ত্রের একটা খসড়াও তৈয়ারী করা হয় এবং জগতের বিভিন্ন জাতিদের নিকট অভিনন্দন-লিপিও প্রেরিত হইল। এd আইরিশ-স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র “যেহেতু আইরিশ-জাতি জন্মগতভাবে স্বাধীন, যেহেতু সাতশাে বৎসর ধরিয়া ক্রমান্বয়ে সে অস্ত্রহাতে বিদেশী শােষণকারীর প্রতিবাদ করিয়া আসিয়াছে, যেহেতু এ দেশে ইংরাজ-শাসনের মূল ভিত্তিই হইতেছে জোরজুলুম ও মিথ্যা চার এবং যেহেতু জাতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইংরাজ আয়ার- ল্যাণ্ডের উপর সামরিক অধিকার বজায় রাখিতে চায়, যেহেতু ১৯১৬ সালে আইরিশ-জাতির পক্ষ হইতে আই- রিশ রিপাবলিকান সৈন্যদের দ্বারা ইষ্টার সােমবার ডাবলিনে আইরিশ গণতন্ত্র বিঘােষিত হইয়াছিল। সেইজন্য আজ প্রাচীন আইরিশ-জাতির উত্তরাধিকারী হিসাবে আমরা আমাদের স্বাধীনতার দাবীকে আইরিশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দ্বারা স্বীকার করি এবং তাহার ও প্রত্যেক আইরিশ তাহার যতদূর সাধ্য এবং যে উপায়েই হউক এই দাবীকে পরিপূরণ করিবার জন্য আমাদের সহায় করিবে। আইরিশ জাতিদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারাই আয়ারল্যাণ্ডের সকল নিয়ম-কানুনও আইন সংঘটিত হইবে । এবং আইরিশ পালিয়ামেণ্ট একমাত্র পালিয়ামেন্ট যাহার নিকট সমগ্র আইরিশ জাতি মাথা নত করিবে। ৫ তাই আমরা দৃঢ়ভাবে ঘােষণা করিতেছে যে, যে কোনও বিদেশী শাসন আয়ারল্যাণ্ডের স্বাধীনতার পক্ষে অন্তরায় এবং সেইজন্য আমরা দাবী জানাইতেছি যেন ইংরাজসৈন্য অচিরে আয়ারল্যাণ্ড পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। আমরা আশা করি যে জগতের সকল স্বাধীন জাতি আমাদের এই স্বাধীনতার উত্থানে সহানুভূতি দেখাইবে এবং আমরা বিশ্বাস করি যে এই স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক শান্তি- স্থাপনের প্রচেষ্টায়ই নিযুক্ত হইবে। যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর একদিন আমাদের প্রপিতামহ- দের দেহে ও অন্তরে যুগ-যুগব্যাপী অনাচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিবার শক্তি দিয়াছিলেন, সেই সংগ্রামের শেষ-সীমায় আসিয়া আমরা যে আহবে মত্ত হইয়াছি, আজ তঁাহারই নাম স্মরণ করিয়া এই প্রার্থনা করি যেন সে সংগ্রামকে স্বাধীনতার স্পর্শ দিয়া জয়যুক্ত করিতে পারি।” সর্বজাতির নিকট অভিবাদনপত্র জগতের সকল জাতিকে আমাদের অভিবাদন জ্ঞাপন করিতেছি। আইরিশ-জাতি ১৯১৯ সালে ২১শে জানুয়ারী তাহার প্রতিনিধি সভায় আয়ারল্যাণ্ডের পূর্ণস্বাধীনতার বাণী ৭৭ ঘােষণা করিল। আইরিশ-জাতির প্রতিনিধিরা আশা করেন জগতের প্রত্যেক স্বাধীন জাতি অতঃপর আয়ার- ল্যাণ্ডকে স্বাধীন বিবেচনা করিয়া তাহার জাতীয়তার সম্মান রাখিবে। জাতি, ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান, শিক্ষা-দীক্ষা সকল দিক দিয়া আয়ারল্যাণ্ড ইংলণ্ড হইতে পৃথক। য়ুরােপের প্রাচীন জাতিদের মধ্যে আয়ারল্যাণ্ড অন্যতম এবং দীর্ঘ সাতটি শতাব্দীর বৈদেশিক অত্যাচারের মধ্য দিয়া সে তাহার আপনার জাতিগত বৈশিষ্ট্যগুলিকে অক্ষুন্ন রাখিয়া আসি- য়াছে। কোনওদিন সে তাহার জাতিগত দাৰীর একটী কণাও বিনা প্রতিবাদে ছাড়িয়া দেয় নাই। ইংরাজ আধি- পত্যের দীর্ঘ শতাব্দী ব্যাপিয়া আয়ারল্যাণ্ড ক্রমান্বয় যে প্রতিবাদ করিয়া আসিতেছিল সে দিন, ১৯১৬ সালে অস্ত্র- হাতে আয়ারল্যাণ্ড তাহার শেষ প্রতিবাদ ঘােষণা করি- যাছে। আন্তর্জাতিকতার দিক হইতে আয়ারল্যাণ্ড আটল্যান্টিক মহাসাগরের দ্বার স্বরূপ। পশ্চিম-প্রান্তে আয়ারল্যাণ্ড য়ুরােপের সর্বশেষ প্রয়ােজনীয় স্থল-ভূমি। পূর্ব ও পশ্চি- মেয় সামুদ্রিক বাণিজ্য-পথের মিলন স্থলে রহিয়াছে আয়ার- শ্যাণ্ড। তাই সমুদ্রের অবাধ অধিকারকে সর্বজাতির মধ্যে 5 পরিব্যাপ্ত রাখিতে হইলে আয়ারল্যাণ্ডের স্বাধীনতার একান্ত প্রয়ােজন। আয়ারল্যাণ্ডের বন্দর কোনও একটী জাতির জয় উন্মুক্ত হইলে চলিবে না—জগতের সকল জাতির পক্ষে সে সমস্ত বন্দর উন্মুক্ত থাকা চাই। আজ এই সমস্ত অতি প্রয়াে- জনীয় বন্দরগুলি শূন্য ও অলস হইয়া পড়িয়া আছে—তাহার কারণ ইংলণ্ড এই সমস্ত বন্দরগুলিকে শুধু তাহাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কেল্লা করিয়া রাখিয়াছে। এই দ্বীপের অপূৰ্ব্ব ভৌগলিক অস্তিত্বকে যুবােপ আমেরিকার প্রভূত কল্যাণে না লাগাইয়া ইংলণ্ড তাহার বিশ্ব-প্রভুত্বের কাজে লাগাইতেছে। এইজন্য এবং অন্যান্য কারণে, স্বাধীনতা ও আত্ম- প্রতিষ্ঠার এই উষা-কালে আয়ারল্যাণ্ড আর কোনও মতে কোনও বৈদেশিক শাসনের নিকট মাথা নত করিবে না। তাই আজ সমগ্র জগতের নিকট সে তাহার ঘােষণা-পত্র পাঠাইতেছে যে ইংরাজ যে ইংরাজ অনাচার ও আইরিশ দাবীর মধ্যে তাহারা বিবেচনা করিয়া যেন আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার সংগ্রামে সহায়তা করে। আয়ারল্যাণ্ড হইতে ভি ভ্যালেরা পলায়ন আইরিশ জাতির হইয়া যখন প্যারিসে বসিয়া প্রেসিডে উইলসনের সঙ্গে মিঃ ওয়াল প্রমুখ নেতারা কথা কাটাকাটি করিতেছিলেন সেই সময় অকস্মাৎ ডি ভ্যালেরা প্রহরী বেষ্টিত আয়ারল্যাণ্ডের সাগর-কূল হইতে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। কেহই জানিল না ডি ভ্যালেরা কোথায় গিয়াছেন। লিনক জেল হইতে পলায়ন অপেক্ষা এই ব্যাপার আরও রহস্যময় লাগে। সমস্ত জগৎ এই অসম- সাহসিক মায়াবী যােদ্ধার দিকে ফিরিয়া চাহিল। আয়ালা- ণ্ডের সমুদ্রোপকূল ঘিরিয়া বৃটিশ রণতরীর বিরাট বাহিনী দিনরাত সতর্ক পাহারা দিতেছে। তাহার মধ্য হইতে সকলের চক্ষেধূলি নিক্ষেপ করিয়া ডি ভ্যালেরা যে প্রস্থান করিবেন তাহা কল্পনাতীত। কিরূপ ভাবে তিনি পলায়ন করিতে সক্ষম হইলেন তাহা লইয়া নানারূপ জল্পনা-কল্পনা চলিতে লাগিল। তিনি সমুদ্রপথে গিয়াছেন কি আকাশপথে পলাইয়াছেন তাহা কেহ বলিতে পারিল না। তাহার গন্তব্যস্থান সম্বন্ধেও নানারূপ মন্তব্য প্রকাশিত হইল। ইংরাজ রাজনৈতিকরা মনে করিলেন যে, তিনি শান্তিসভায় উপস্থিত হইবার জন্য প্যারিসে গিয়াছেন। সকল জল্পনা-কল্পনার শেষ করিয়া দিলেন সিফিন-দলের অন্যতম নেতা হারি বােল্যাণ্ড। ২২শে জুন তারিখে তিনি সংবাদ প্রচার করিলেন যে, ডি ভ্যালেরা নিউইয়র্কে উপস্থিত হইয়াছেন।
ডি ভ্যালেরা আমেরিকায় পদার্পণ করিয়াছেন এই সংবাদ প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সকলে জানিতে পারিল যে জার্মানেরা সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিতে প্রস্তুত হইয়াছে এবং মহাযুদ্ধের যবনিকাপাতের আর বিলম্ব নাই। নিউইয়র্কে উপস্থিত হইয়া ডি ভ্যালেরা ওয়ালডর্ফ এ- টোরিয়া হােটেলে বাসা লইলেন। পঁহুছিবামাত্র তিনি যুক্ত রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশ হইতে আমন্ত্রণ ও সহানুভূতি-জ্ঞাপক পত্র পাইতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে তাহার বাস- স্থানটি কর্ম-কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিল । প্রধান প্রধান সংবাদপত্রগুলি তাহার নিকট প্রতিনিধি প্রেরণ করিতে লাগিল এবং আয়াল্যাণ্ডের অবস্থা সম্বন্ধে তাঁহার অভিমত সংবাদপত্র-স্তম্ভে বিশিষ্ট স্থান পাইতে লাগিল। সুপুরুষ সুগঠিত-দেহ এই আইরিশ-যুবক সহজেই সকলের চিত্ত আকর্ষণ করিল। কারাগারের কষ্ট তাঁহার ললাটে রেখাপাত করিলেও তাহার সৌন্দৰ্য্য সহজে নষ্ট করিতে পারে নাই। বীরত্বব্যঞ্জক মুখশ্রী ও বলিষ্ঠ অঙ্গসৌষ্ঠবে ডি ভ্যালে- রাকে স্বভাবতই প্রিয়দর্শন দেখাইত এবং তাহার অলৌকিক বীরত্বকাহিনী ও ত্যাগের ইতিহাস যাহাদিগকে তাহার দর্শন- লাভে উৎসুক করিয়া তুলিয়াছিল সাক্ষাৎ দর্শনে তাহার ব্যক্তিত্বের মাধুর্যে স্বভাবতঃই তাহারা আকৃষ্ট হইয়া পড়িল।
লেখকের বিবরণ উদ্ধৃত এ সম্বন্ধে এক সংবাদ পত্রের করিয়া দিলাম। “ডি ভ্যালেরাকে দেখিবার পূর্বে আমি কখনও মনে করি নাই, যে তাহাকে আমার এত ভাল লাগিবে। আমি তাঁহার সম্বন্ধে যে কল্পনা পােষণ করিয়াছিলাম তাহা ভূমিসাৎ হইল। আমি তাহার চিত্র দেখিয়া মনে মনে স্থির করিয়াছিলাম যে তিনি কৃশকায় ও অলসগতি, কিন্তু সাক্ষাতে বুঝিতে পারিলাম আমার ধারণা ঠিক নহে। আমার কার্ড পাইবামাত্র তিনি ক্ষিপ্রতার সহিত বাহির হইয়া আসিলেন এবং সহজ আনন্দ- চিত্তে আমার করমর্দন করিলেন। দৈর্ঘ্যে ছয় ফুটের উপর, ঋজুদেহ, ক্ষিপ্রগতি ডি-ভ্যালেরা স্বাস্থ্য ও শক্তির প্রতিকৃতি স্বরূপ। তাঁহার কেশগুলি স্বর্ণের ন্যায় এবং সেরূপ স্বচ্ছ পিঙ্গল সুন্দর চক্ষু আমি কখনও দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় । সুনিৰ্ম্মিত কৃষ্ণবর্ণ পােষাকে সঁহাকে অতি সুন্দর দেখাইতেছিল এবং তাহার স্বভাবের মাধুৰ্য তাহাকে আরও মহিমামণ্ডিত করিয়া তুলিয়াছিল। সরল, দয়ালু, উদারহৃদয় এই আইরিশ-যুবক বাস্তবিকই আমার মনােহরণ করিয়াছিল এবং আমি যদি আয়াল্যাণ্ডের স্বাধীনতার জন্য কিছু নাও করি, তাহা হইলেও ডি-ভ্যালেরার জন্য আমি সব করিতে পারি, এই কথাই তখন আমার মনে হইয়াছিল।” ৮২ ডি ভ্যালেরা আপনার অসামান্য ব্যক্তিত্বের সহায়ে মার্কিন জাতির হৃদয় জয় করিয়া লইয়াছিলেন। তাঁহার বক্তৃতার ফলে আমেরিকানরা শুধু এই ব্যক্তিটীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখিল তাহা নয়—তাহারা প্রাণে প্রাণে আয়ার- ল্যাণ্ডের স্বাধীনতা-সংগ্রামের পবিত্রতা ও প্রয়ােজনীয়তাকেও স্বীকার করিল। ডি ভ্যালেরা আপনার জন্য শ্রদ্ধা কুড়াইতে আমেরিকায় আসেন নাই—তিনি আসিয়াছিলেন নির্যাতিত আয়ারল্যাণ্ডের বেদনার বাহন হইয়া—স্বদেশের বেদনাকে বিদেশীর অন্তরেও জাগরূক করিয়া অসহায় জাতির মুক্তির রাজ-পথকে সুগম করিবার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রদেশ তাঁহাকে সাদরে অভিনন্দন করিল। তাহার অভিনন্দনে তাহার নাম উচ্চারণ করিয়া যে সহস্র জয়ধ্বনি মুখর হইয়া উঠিত, তাহার প্রতিধ্বনিতে এই স্বদেশপ্রেমিক যােদ্ধা মাথা নত করিয়া বলিয়াছিলেন—এ আমার নামের জয়ধ্বনি নয়— এ শুধু আয়ারল্যাণ্ডের জয়গান। আমেরিকার প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ভঁহার জ্ঞান-পাণ্ডিত্যের সম্মানার্থ যখন নানা প্রকারের পদবী দিয়া তাঁহাকে ভূষিত করিতেছিল তখন তেমনি নতমস্তকে শুধু বলিয়াছিলেন, এ সম্মানে শুধু আমার অন্তর বিভূষিত হইল না—এ সম্মান আয়ার- ল্যাণ্ডকেও প্রােজল করিয়া তুলিল। সমস্ত আমেরিকা এই অসমসাহসিক যােদ্ধা ও অসামান্য পণ্ডিতকে জগতের কর্ম ও চিন্তাবীরেদের অন্যতম বলিয়া অন্তরে বরণ করিয়া লইল। আমেরিকায় প্রায় পঞ্চাশ বৎসর ধরিয়া প্রবাসী আই- রিশগণ স্বদেশের মুক্তি কামনার উদ্দেশ্যে বহু দল সংঘটন করেন। এই সমস্ত দলের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল-clan na Gael. জন ডিভয় বহুদিন হইতেই আয়ারল্যাণ্ডের বাণীকে জগতের সম্মুখে তুলিয়া ধরিবার উদ্দেশ্যে আমেরিকায় “Gaelic American” নামক বিখ্যাত পত্রিকা সম্পাদন করিয়া আসিতেছিলেন। এই সমস্ত দলের সাহায্য ব্যক্তি- রেকে আয়ারল্যাণ্ডের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনেক দূর পিছাইয়া যাইত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। প্রচার-কাৰ্য্য ছাড়া ডি ভ্যালেরা একটা গুরুতর কাজের ভার লইয়া আমেরিকায় আসিয়াছিলেন। ডেল আইরিয়ানের পক্ষ হইতে তিনি আমেরিকায় দশলক্ষ মুদ্রার ঋণ সংগ্রহের জন্য আসিয়াছিলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ডি ভ্যালেরা প্রস্তাবিত দশলক্ষ টাকার ঋণ সংগ্রহ করিলেন এবং ব্যাপার বুঝিয়া তিনি ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ এক কোটী টাকায় বাড়াইয়া দিলেন। সামান্য কুলী হইতে ক্রোড়পতি, যে যাহা পারিল, তাহাই দিয়া আয়ারল্যাণ্ডের মুক্তিসংগ্রামের সহায়তা করিল।
সন্ িফ্রান্সিসকোর এক বিরাট সভায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার শ্রোতার সম্মুখে ডি ভ্যালেরা ঘােষণা করিলেন, “আমি আমেরিকার নিকট আসিয়াছি। অন্তর পূর্ণ করিয়া আমেরিকা যাহা আজ দিল তাহাতে আমার চিত্ত পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে। আমি স্বদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অর্থ-সংগ্রহের উদ্দেশ্য লইয়া আসিয়াছি সত্য, কিন্তু তাহা ছাড়া আমি আর এক বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে বহন করিয়া আনি- য়াছি। আমি চাই আমেরিকা যেন নব-প্রতিষ্ঠিত আইরিশ- গণতন্ত্রকে স্বীকার করে। আমাদের জাতির শক্তি ও সম্পদ এত অপ্রচুর নয় যে আমরা নিজের তত্ত্বাবধান নিজে করিতে পারিব না। আজ যদি আমেরিকা সত্য সত্যই আইরিশগণ তন্ত্রকে স্বীকার করে এবং আমি যদি একটী পপনীও না পাই -সে আমার পক্ষে সহস্র গুণে বাঞ্ছিত। আমেরিকার সমস্ত স্বর্ণের চেয়ে আইরিশ-গণতন্ত্রের স্বীকার ঢের মহার্ঘ্য সম্পদ। ডি ভ্যালেরা অবশ্য আমেরিকানদের বুঝাইয়া দিয়াছিলেন যে আয়ারল্যাণ্ডকে সাহায্য করার মধ্যে ইংলণ্ডের দিক হইতে আমেরিকার কোনও আন্তর্জাতিক সমস্যা আসিতেই পারে । আয়ারল্যাণ্ডকে সাহায্য করার মানে ইংলণ্ডের সঙ্গে শত্রুতা করা নয়। আয়ারল্যাণ্ডকে সাহায্য করিলে ইংলণ্ড ? ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ হইবার কোনও সম্ভাবনা নাই। একেত ইংলণ্ড আমেরিকার সহিত যুদ্ধ করিতে কখনই সাহসী হইবে না অপরন্তু যুদ্ধ চালাইতে হইলে অর্থের জন্য ইংলণ্ডকে ত আমেরিকার নিকটেই হাত পাতিতে হইবে সুতরাং যুদ্ধের কথাই আসিতে পারে না। আয়ারল্যাণ্ড আজ সাতশো বৎসর ধরিয়া ক্রমান্বয় ইংরাজ-শাসন হইতে মুক্ত হইবার জন্য সংগ্রাম করিতেছে এবং ইংলণ্ড যদি আয়ার- ল্যাণ্ডকে সে মুক্তি না দেয়, সংগ্রাম চলবেই। আয়ার- ল্যাণ্ডের পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকার করিলেই ইংলণ্ডের সহিত আয়ারল্যাণ্ডের সকল মনােমালিন্য ঘুচিয়া যাইবে এবং আয়ারল্যাণ্ড তখন ইংলণ্ডের প্রতিবন্ধক না হইয়া ইংলণ্ডের সব চেয়ে বড় হিতাকাক্ষী প্রতিবেশী হইবে। আমেরিকা ডি ভ্যালেরার কথাকে মানিয়া লইয়া ছিল। চার্লসটাউন নগরে নাগরিক সম্বর্ধনার উপলক্ষে উক্ত নগরের মেয়র ডি ভ্যালেরাকে উদ্দেশ্য করিয়া জর্জ ওয়াসিংটনের আইরিশ জাতির প্রতি অভিনন্দন-পত্র পুনরায় দান করেন। আয়ারল্যাণ্ডের হে দেশ-প্রেমিকগণ। সকল দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের হে অগ্র-নায়কগণ ! বিপুল আশায় অন্তরকে সুদৃঢ় কর! তােমাদের কামনা আর আমার কামনা এক। তােমার জীবনে তুমি সহস্র অপশের ভাগী হইয়াছ। আমার জীবনেও প্রভু-ভক্তেরা আমাকে লাঞ্ছিত করিয়াছিল। আমি যদি আমার উদ্দেশ্য সফল করিয়া উঠিতে না পারিতাম তাহা হইলে ফাঁসৗর মঞ্চে নিঃসন্দেহ আমার জীবন-লীলা শেষ হইয়া যাইত। কিন্তু আজ আমার শত্রুরাই আমার জয়গান করিতেছে। জয়ের সম্ভাবনাও যখন সুদূর অপসারিত হইয়া গিয়াছে—তখনও আমি আমার উদ্দেশ্যকে লইয়া স্থির হইয়া দাড়াইয়াছিলাম, তাই জয়-লক্ষ্মী একদিন আমার ভালে তাহার বিজয়-টীকা পরাইয়া দিলেন। তােমাদের ও আজ সেই ভাবে অটল হইয়া দাড়াইয়া থাকিতে হইবে।” ডি ভ্যালেরার আমেরিকা-প্রবাস এত ঘটনাবহুল এবং এত আশ্চর্য ফলদায়ক হইয়াছিল যে তাহার সমগ্ৰ কাহিনী বলিতে হইলে একটী পরিপূর্ণ গ্রন্থ হয়। আমেরিকা অবস্থান- কালে তিনি যে সমস্ত সম্মান ও অভ্যর্থনা পাইয়াছিলেন এবং এই সমস্ত সহানুভূতিকে তিনি যে ভাবে আয়ারল্যাণ্ডের কাজে লাগাইয়াছিলেন—তাহার তালিকা দিতে হইলেও একটী গ্রন্থ ভরিয়া যায়। কথিত আছে, ডি ভ্যালেরার বিরুদ্ধে প্রচার-কাৰ্য করিবার জন্য এবং বৃটিশ গভর্ণমেন্টের ব্যবস্থার স্যায্যতা বুঝাইবার জন্য বৃটীশ সংবাদপত্র-মহলের সর্বশ্রেষ্ঠ অধিনায়ক লর্ড নর্থক্লিপ স্বয়ং লক্ষ লক্ষ ডলার সংবাদপত্র-সেবীদের নিকট রাখিয়া আসিয়াছিলেন এবং লর্ড গ্রে ও স্যার অক্ল্যাণ্ড গিডসের মত রাজনৈতিক নেতাগণ বৃটীশ-ব্যবহারের ন্যায্য- তার কথা প্রচার করিবার জন্য আমেরিকায় প্রেরিত হন। দলে দলে বৃটীশ-দূত আমেরিকায় উপস্থিত হয়। কিন্তু ডি ভ্যালেরার অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রভাবে সমস্ত বৃটীশ প্রচারকার্য ভাসিয়া গেল। কোনও কোন জায়গায় বৃটীশ প্রভাবে কোনও কোনও সাংবাদিক ভি ভ্যালে- রার প্রতিবন্ধক হইতে চেষ্টা করিয়াছিল কিন্তু তাহাতে কোনই ফল হয় নাই। একবার এক ঘটনা ঘটে। ডি ভ্যালেরা চালটি প্রদেশে বক্তৃতা দিতে যাইবেন। সেই উপলক্ষে সেখানকার কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে যাইলে সম্পাদকগণ বিজ্ঞাপন গ্রহণ করিলেন না। তখন মাত্র আর চব্বিশ ঘণ্টা দেরী। ডি ভ্যালেরার সঙ্গে যিনি পরিভ্রমণ করিতেন তিনি (Charles P. Sreelay ) ব্যাপার বুঝিয়া তৎক্ষণাৎ নিজে লিখিয়া সেখানকার প্রেস হইতে দশহাজার বিজ্ঞাপনী ছাপাইয়া লইয়া সেই দিনই বিলি করিয়া দিলেন। বিপুল জনসমারােহে পরের দিন সভার অধিবেশন হইল। এই সমস্ত ব্যাপার লক্ষ্য করিয়াই একটী আমেরিকান কাগজ লিখিয়াছিল, انہ “বৃটীশের প্রচারকাৰ্য্যকে মথিত করিয়া ডি ভ্যালেরা সগর্বে প্রচার করিয়া বেড়াইতেছেন। আমেরিকান স্বাধী- নতাও আইরিশ আন্দোলনকে খর্ব করিবার জন্য ইহার পূর্বে এত অধিক বেতনভােগী অথবা অবৈতনিক বৃটীশ-দূত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কখনও আসে নাই। কিন্তু নব- আয়ারল্যাণ্ডের এই শান্ত স্থিত-ধী নেতা সত্য ও ন্যায়ের অমােঘ আবরণে বিমণ্ডিত হইয়া অনায়াসে ও স্বচ্ছন্দে সকল প্রতিরােধকে স্নান করিয়া আগাইয়া চলিয়াছে। তাহার প্রতি পদক্ষেপে মুক্তির নব-নব জ্যোতিষ্ক সমুদ্ভাসিত হইয়া উঠিতেছে।” এই উক্তিতে বােঝা যায় যে, আমেরিকা কি ভাবে ডি ভ্যালেরাকে গ্রহণ করিয়াছিল। সান্যান্সিকোর নাগরিক গণ ডি ভ্যালেরার আগমন উপলক্ষে আইরিশ স্বাধীনতার অগ্রদূত রবার্ট এমেটের এক মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠা করিল। স্বাধীনতাপ্রিয় আমেরিকানগণ স্বাধীনতার আত্মপ্রকাশের নবনব পন্থা বাহির করিতে লাগিল। চারিদিক হইতে এই রকমে ব্যাহত হইয়া বৃটীশ রাজ- নৈতিকগণ এক নূতন ফন্দী বাহির করিলেন। আলষ্টার হইতে একদল আইরিশ-প্রতিনিধি আমেরিকায় পাঠান হইল—তাহাদের উদ্দেশ্য হইল আইরিশ-আন্দোলনের একটা বিভিন্ন স্বরূপ ব্যক্ত করা। তাহারা প্রচার করিতে লাগি- লেন যে আয়ারল্যাণ্ডের সমস্যা ডি ভ্যালেরা যে ভাবে বুঝিয়াছেন তাহা সঠিক নয়। ইহা একান্তই ধর্মসংক্রান্ত ও সামাজিক ব্যাপার—ইহার সহিত আন্তর্জাতিকতার অথবা রাজনীতির কোন বিশেষ যােগ নাই। কিন্তু আমেরিকা তখন ডি ভ্যালেরার অগ্নিবাণীতে দীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে- আলষ্টার-প্রচারকদের দুর্বল বাণী সেই নব-অনুরাগের প্রদীপ্ত আলােকের মধ্যে নিঃশেষে হারাইয়া গেল। সেই সময় ডি ভ্যালেরার গতিবিধি ও তেজোদ্দীপ্ত বাণী শুনিয়া আমেরিকা বেশ বুঝিয়াছিল যে এই ব্যক্তি আয়ার- ল্যাণ্ডের ভাগ্যচক্রকে নিশ্চয়ই ঘুরাইয়া দিবে। সেই সময় ভারত-গৌরব লাল লজপৎ রায় স্বদেশ হইতে নির্বাসিত হইয়া আমেরিকায় ছিলেন। তাহার সহিত ডি ভ্যালেরার সাক্ষাৎ হয়। ডি ভ্যালেরার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হইয়া লালাজী বলিয়াছিলেন, ১৯২৫ সাল নাগাদ আয়ারল্যাণ্ড অপেক্ষা ভারতে সিনফিনদের সংখ্যা ঢের বেশী হইবে। ডি ভ্যালেরার অপূৰ্ব্ব ব্যক্তিত্বের প্রভাব আর একটী ব্যাপারে খুব স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়। Chippawa দ্বীপের আদিম রেড ইণ্ডিয়ান অধিবাসীরাও ডি ভ্যালেরার ব্যক্তিত্বের সম্মােহনে মুগ্ধ হইয়া ডি ভ্যালেরাকে তাহাদের
দ্বীপে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যায় এবং সেখানে জাতির
সর্বোচ্চ সম্মান স্বরূপ তাঁহাকে সেই দ্বীপের সর্ব-প্রধান
নায়কের উপাধিতে বিভূষিত করা হয়।
এই উপলক্ষে সুদূর
গ্রাম হইতে লােকে দুই তিন দিনের পথ হাঁটিয়া আসিয়াছিল।
ডি ভ্যালেরার পূর্বে এই সম্মান একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের
সভাপতি থিয়ােডর রুস্ভেট পাইয়াছিলেন।
চিকাগাে সহরে ডি ভ্যালেরা যখন যান তখন তাহাকে যে
অভূতপূর্ব অভিনন্দন দেওয়া হয়, তাহার বিবরণ কিঞ্চিৎ
উদ্ধত করিয়া দেওয়া হইল।
“লক্ষাধিক লােকের সম্মুখে যখন নব আয়ারল্যাণ্ডের
প্রেসিডেন্ট ডি ভ্যালেরাকে পরিচিত করিয়া দেওয়া হইল
তখন যে বিপুল আনন্দধ্বনি সমুখিত হয় তাহা ক্রমান্বয়
ছাব্বিশ মিনিট ধরিয়া অনুরণিত হয়। ছাব্বিশ মিনিট
ধরিয়া ডি ভ্যালেরাকে বক্তৃতামঞ্চে নির্বাক হইয়া দাঁড়াইয়া
থাকিতে হয়।”
এই আমেরিকা-অবস্থান কালেই ডি ভ্যালেরার নাম
জগতের এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত ছড়াইয়া
পড়িল । নানাজাতির নিকট হইতে তাঁহার অভিনন্দন-পত্র
আসিতে লাগিল। আমেরিকায় থাকিয়া তিনি যাহা
করিয়াছেন তাহাই সফল হইয়া উঠিয়াছে। চঁাদা তুলিতে
আসিলেন, সংগৃহীত অর্থ সম্ভাবনাকেও ছাড়াইয়া গেল।
যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত সৈন্যদের জন্য যখন তিনি হােয়াইট ক্রস
প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিলেন স্বয়ং রােমের পােপ পঞ্চদশ বেনে-
ডিত্ তাহার নামে তিন হাজার পাউণ্ড পাঠাইলেন। তিনি
যখন, জানাইলেন যে আয়ারল্যাণ্ডে বিনাবিচারে আইরিশ
নেতাদের বন্দী করিয়া রাখা হইয়াছে তৎক্ষণাৎ আমেরিকার
সিনেট হইতে ৮৮ জন প্রধান সভ্যের স্বাক্ষর সমেত লয়েড
জর্জের নিকট এক প্রতিবাদ পত্র পাঠান হইল।
কিন্তু এই সমস্ত ব্যাপারের মধ্যে একটী অশান্তির কারণ
ঘটিল।
জন ডিভয় প্রমুখ আমেরিকা আইরিশ নেতারা
ডি ভ্যালেরা নির্দেশিত পথ অনুসরণ করিয়া সাক্ষাৎভাবে
আয়ারল্যাণ্ডের স্বাধীনতাকে স্বীকার করিতে রাজী হইলেন
; তাহার ফলে আইরিশ আমেরিকানদের মধ্যে রীতিমত
মননামালিন্যের সৃষ্টি হইল। ওধারে আয়ারল্যাণ্ডে তখন
নির্যাতনের এক নূতন অধ্যায় আরম্ভ হইয়াছে। আইরিশ
গণতন্ত্রকে সমূলে উচ্ছেদ করিবার জন্য নির্মমভাবে ইংরাজের
“রাক এণ্ড ট্যান” সৈন্যদল সমগ্র দেশের মধ্যে হত্যার
বিভীষিকা আনিয়া দিয়াছে। আইরিশ নেতাদের ধরিয়া
সাধারণ নরঘাতক দস্যু বলিয়া ফঁাসী দেওয়া হইতেছে। ঘরে
ঘরে মৃত্যুর ছায়া আসিয়া পড়িয়াছে। জাতির সেই অসীম
বৃটিশের সমস্ত দুর্দিনের মধ্যে আইরিশজাতির অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা মাইকেল কলিন্স অপূৰ্ব কলা-কৌশলে নিজে গুপ্ত থাকিয়া অভিযান ব্যর্থ করিয়া দিতেছিলেন। মাইকেল কলিন্সকে ধরিবার জন্য সমগ্র আয়ারল্যাণ্ডের মধ্যে গােয়েন্দা ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল কিন্তু কোনও মতে এই মায়াবী লােক- টীকে কোথাও কেহ ধরিতে পারিতেছিল না অথচ সর্বত্রই এই একটী লােকের অসীম বুদ্ধিবৃত্তি ও সামরিক প্রতিভা বৃটীশের সমস্ত আয়ােজনকে বারেবারে ব্যর্থ করিয়া দিতে ছিল। ডি ভ্যালেরা ভাবিলেন যে এই সময় দেশের বাহিরে থাকা আর সমীচিন নয়। জাতির অন্তরে যে দাবানল জ্বলিয়া উঠিয়াছে—তাহারই মধ্যে থাকিয়া সেই অগ্নি-উৎসবে যােগদান করিবার জন্য জীবন পণ করিয়া গােপনেডি ভ্যালেরা পুনরায় আমেরিকা হইতে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। ব্ল্যাক এন্ড ট্যান অত্যাচারের কাহিনী ১৯২০ সালে জুন মাসে আয়ারল্যাণ্ডে ইংরাজ সৈন্য ও আইরিশ গণতান্ত্রিক সৈন্যদলের সাক্ষাৎ সংঘর্ষ বাঁধিল। সমস্ত আয়ারল্যাণ্ড হত্যার বিভীষিকায় ভরিয়া উঠিল। আইরিশ গণতান্ত্রিক অ্যুখানকে বিনষ্ট করিবার জন্য আয়ারল্যান্ডে যে নূতন সৈন্যদল পাঠান হয় তাহাদেরই নাম “Black and Tans এই সৈন্যদলের নাম শুনিলে নিরীহ প্রজারা ভয়ে কঁপিয়া উঠিত। ফরাসী বিপ্লবের “Reign of Terror” এর মত আয়ারল্যাণ্ডে এক অভিনব বিভীষিকার রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হইল। এই সৈন্যদল গঠিত হয় জেলের পুরাতন অপরাধীদের মধ্য হইতে। ( Pearas Beaslai ) এই সৈন্যদল গঠনের জন্যই ঐ সমস্ত জেল কয়েদীদের ছাড়িয়া দেওয়া হয় এবং তাহারা যে নির্মমতার সব চেয়ে বড় পৃষ্ঠপােষক হইতে পারিবে তাহা যে ইংরাজ রাজনৈতিকগণ জানিতেন না তাহা নয়। এই সৈন্যদলের কাৰ্য-পন্থাকে ন্যায়ের ও ধর্মের অনুমােদন আনিয়া দিবার জন্য ডাবলিন কাল হইতে এক- খানি নূতন কাগজও বাহির হইল। তাহার নাম রাখা হইল “Weekly Summary.” এই কাগজের ২৭শে আগষ্ট সংখ্যায় “Black and Tang” সৈন্যদের মহৎ উদ্দেশ্যের একটা জবাবদিহি বাহির হয়। “ব্ল্যাক ও ট্যানরা আসিয়াছে। সৈন্যদের পােষাকের অপেক্ষায় বসিয়া থাকা তাহাদের ঘটিয়া উঠে নাই। তাহাদের একান্ত প্রয়ােজন ছিল তাই তাহারা কালবিলম্ব না করিয়াই আসিয়াছে। তাহারা জানে কি বিপদের মধ্যে তাহারা আসি- য়াছে; কারণ এর পূর্বে বহুবার তাহারা মৃত্যুকে মুখখামুখী S8 দেখিয়াছে। তাহারা তখন মৃত্যুকে ভয় করে নি। তাহারা আজও মৃত্যুকে ভয় করিবে না। তাহারা তাহাদের কাজ করিয়া যাইবে—শান্ত নগরবাসীদের জন্য তাহারা আয়ার- ল্যাণ্ডকে আবার শান্তিপূর্ণ করিয়া দিবে—আর যাহাদের ব্যবসা হইতেছে রাজনৈতিক-আন্দোলন এবং মূলধন হইতেছে হত্যা, সেই সমস্ত আইরিশদের জন্য তাহারা আয়ারল্যাণ্ডকে নরক করিয়া তুলিবে।” এই অপূৰ্ব আদর্শের ও উদ্দেশ্যের কথা ইংরাজী ভাষায় সংবাদপত্রের আকারে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছিল। Black and Tansরা যে তাহাদের উদ্দেশ্য সফল করিয়া- ছিল সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই। কারণ তাহাদের মুখপত্র তাহাদের গৌরবময় কার্যের ফিরিস্তি সপ্তাহ-অন্তে মুদ্রিত করিয়া বাহির করিত। উক্ত কাগজে পরে বাহির হয়—“১৯১৯ সালে ৬ই এবং ১১ই নভেম্বর কিনসেল ও কর্ক সহরকে অংশত বিধ্বস্ত করা হইয়াছে ; ২২শে জানুয়ারী ১৯২০ থারলে সহর সৈন্যদ্বারা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করা হইয়াছে। আবার ১লা, ৭ই মার্চ ও ১ই মে থারলেসকে বিধ্বস্ত করা হয়। পুলিশদের গুলি মারিয়া হত্যা করার নাম যদি যুদ্ধ হয়—এই সমস্ত অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংস কম যুদ্ধ কি ?”
আইরিশ আন্দোলনকে সমূলে উৎপাটন করিবার জন্য
এই সৈন্যদল ব্যতীত আর একটা
নূতন
সৈন্যদল আয়ারল্যাণ্ডে
পাঠান হইল তাহাদের নাম “Auxiliaries”. ডাবলিনের
পথে, বিপথে, গৃহে, গৃহাভ্যন্তরে, দিনে, রাত্রে, জাগরণে ও
নিদ্রায় হত্যা চলিতে লাগিল। “Men were taken out
of their houses at night and shot : In one case a
crippled boy was shot dead because his brother,
a volunteer, could not be found.” (Peras Beaslai)
“রাত্রিকালে লােকদের বাড়ী হইতে বাহির করিয়া আনিয়া
হত্যা করা হইয়াছে। একবার একটী খোঁড়া ছেলেকে গুলি
করিয়া মারিয়া ফেলা হয়, তাহার কারণ তাহার ভাইকে
খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছিল না। স্ত্রী পুরুষ বালক নির্বিশেষে
এই ভীষণ মৃত্যু-যন্ত্রের দ্বারা নিষ্পেষিত হইয়া চলিতেছিল।
জাতির এই ভয়াবহ ও সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় মাইকেল
কলিল তাহার অপূর্ব কলাকৌশলে ও সাহসিকতায় আইরিশ
বাহিনী পরিচালিত করেন। মাইকেল কলিন্স ব্যতীত এই
দুর্দিনে আয়ারল্যাণ্ডকে পরিচালিত করিতে কেহ পারিত কি
না সন্দেহ। তাহার অসামান্য বুদ্ধি-প্রভাবে বৃটীশের গােয়েন্দা
বিভাগের সমস্ত কাৰ্য-পদ্ধতি বারে বারে ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে।
বৃটাশের গােয়েন্দা বিভাগের এত বড় পরাজয় আর কখনও
=
হয় নাই। কোন মতেই কেহ মাইকেল কলিন্সকে খুজিয়া বাহির করিতে পারে নাই অথচ সেই ব্যক্তি সাক্ষাৎ ভাবে তখন আইরিশ-বিপ্লবের সমস্ত কার্য পরিচালনা করিতেছিলেন। মাইকেল কলিঙ্গের অপূৰ্ব বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার কথা - আর এক কাহিনীর বিষয়। যখন আয়ারল্যাণ্ডে এমনি প্রকাশ্যভাবে দিবারাত্র বৃটীশ- সৈন্যদের সহিত আইরিশ ভলান্টিয়ারদের যুদ্ধ চলিতেছে সেই সময় মাইকেল কলিন্স জাতির জাগরণকে আগাইয়া লইয়া চলিবার জন্য প্রস্তাব করিলেন যে, কোনও আইরিশ যেন আর বৃটীশ গভর্ণমেন্টকে করদান না করে । তৎপরিবর্তে তাহারা যেন Dail Breain-কে করদান করে এবং তাহার জন্য Dail Birean জাতিকে সংরক্ষণ ও গঠন করিবার সমস্ত ভার গ্রহণ করিবে। মাইকেল কলিলের এই প্রচার-কার্যের ফলে অধিকাংশ প্রদেশের মধ্যে বৃটীশকে কর-প্রদান বন্ধ হইয়া গেল ; যতদিন না পর্যন্ত পাকাপাকি রকমে আইরিশ ফ্রি-ষ্টেট প্রতিষ্ঠিত হয় ততদিন পর্যন্ত কেহই ইনক-ট্যাক্স দেয় নাই। দক্ষিণ- আয়ারল্যাণ্ডের মধ্যে বৃটীশ শাসনতন্ত্র একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িল। আদালতে জুরীরা আসে না, যাহারা ইংৰাজদের ভয়ে আসিত তাহারা ক্রমশঃ আইরিশ-সেনাদের ভয়ে আসা বন্ধ করিয়া দিল। আদালতের কাজ বন্ধ হইয়া আসিবার উপক্রম হইল। উপক্রম হইল। মাইকেল কলিন্স এই সময় ডাল আয়রিনের অর্থ-সচিব ও আইরিশ রিপাবলিক সৈন্যদের সেনাপতির , কাজ করিতেছিলেন। মাইকেল কলিন্স নূতন করিয়া এক বিপ্লবী গােয়েন্দা-বিভাগও গড়িয়া তােলেন। মাইকেল কলিন্স, ডি ভ্যালেরা প্রমুখ নেতারা যে বারে বারে বৃটীশ গােয়েন্দার চক্ষু এড়াইয়া আয়ারল্যাণ্ডে বাস করিতে পারিয়াছিলেন তাহার সর্ব- প্রধান কারণ অবশ্য দেশবাসীর সহায়তা। দক্ষিণ- আয়ারল্যাণ্ডের প্রত্যেক গৃহস্থ, প্রত্যেক নারী যে যে-রকম ভাবে পারিয়াছে এই আন্দোলনকে সহায়তা করিয়াছে। নিশীথ রাত্রে রাত্রে রক্তাক্ত কলেবরে যখনই কোনও আহত সিনফিন সৈনিক গৃহস্থের দ্বারে কড়া নাড়িয়াছে, মৃত্যু দণ্ডাজ্ঞা সত্ত্বেও গৃহস্থ দরজা খুলিয়া দিতে কুণ্ঠিত হয় আইরিশ-আন্দোলনকে সাফল্য-মণ্ডিত করিয়া তুলিতে আয়ারল্যাণ্ডের বীর-নারীরা যে সাহস ও শক্তির পরিচয় দিয়াছেন তাহা জগতে অতুলনীয় হইয়া থাকিবে। ডি ভ্যালেরা ও লয়েড জর্জ নাই। আয়ারল্যাণ্ডে যখন প্রকাশ্যভাবে যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড চলিতেছিল তখন ডি ভ্যালেরা আর আমেরিকায় থাকিবার প্রয়ােজন বােধ করিলেন না। ডি ভ্যালেরার আমেরিকা পরিত্যাগের সময় বৃটীশ-গগায়েন্দারা অনুক্ষণ তাঁহার অনুসরণ করিয়াছে। যাহাতে আয়ারল্যাণ্ডে নামিবার সময়ই ডি ভ্যালেরাকে পুনরায় বন্দী করিয়া ফেলা হয় তাহার জন্য বৃটিশ গভর্ণমেন্ট গভর্ণমেন্ট যতদূর সজাগ হইবার হইলেন। আয়ারল্যাণ্ডের প্রত্যেক বড় বন্দরে আলাদা পুলিশ নিয়ােজিত হইল ; প্রত্যেক জাহাজ বন্দরে লাগিলেই পূর্ব হইতে প্রস্তুত পুলিশের লােক গিয়া জাহাজ তন্ন তন্ন করিয়া অন্বেষণ করে; কিন্তু এত কড়াকড়ি সত্বেও ইহা রহস্যময় লাগে যে, ডি ভ্যালেরা ২৪শে ডিসেম্বর ১৯২০ সালে আয়ারল্যাণ্ডে পুনরায় নিরাপদে প্রবেশ করিলেন এবং বৃটীশ গােয়েন্দা বিভাগ তাহার গমনাগমনের কোনও তথ্য সংগ্রহ করিতে পারিল না। একমাত্র মাইকেল কলিন্স ডি ভ্যালেরার আগমনের বিষয় জানিতেন। ডি ভ্যালেরাকে বন্দর হইতে লইয়া আসিবার জন্য ছদ্মবেশে মাইকেল কলিন্স অতি প্রত্যুষ- কালে ডাবলিনের রাস্তা দিয়া চলিয়াছেন। পথে গােয়েন্দা বিভাগের একজন উচ্চ কর্মচারীর সঙ্গে দেখা এবং কিছুকাল পরেই তাহার সহিত ঘনিষ্ঠ আলাপ হয়। কর্মচারীটি সারাক্ষণ ধরিয়া কথাবার্তা কহিয়াছে—স্বপ্নেও ভাবিতে পারে নাই যে, এই ব্যক্তিই মাইকেল কলিন্স এবং সেই চলিয়াছে ডি ভ্যালোকে প্রত্যুৰ্গমন করিয়া লইয়া আসিবার দুই বন্ধু নিরাপদে হাঁটিতে হাঁটিতে ডাবলিন শহরের মধ্যে নিরুদ্দেশ হইয়া গেলেন। ওধারে আয়ারল্যাণ্ডের ক্রমবর্ধমান সামরিক-শক্তি দেখিয়া ইংলণ্ডের পক্ষ হইতে লয়েড জর্জ মাইকেল কলিন্স ও অন্যান্য সিনফিন নেতাদের সহিত শান্তির প্রস্তাব দিয়া লােক পাঠাইতেছিলেন। তাহারা সাক্ষাৎভাবে মাইকেল কলিন্সের দেখা পাইত না। মাইকেল কলিন্স মধ্যবর্তী লােকদের সহায়ে লয়েড জর্জের প্রস্তাব পাইতেন। একদিকে যখন লয়েড জর্জের প্রস্তাব তাহার নিকট মধ্যবর্তী ব্যক্তিদের সহায়ে আসিতেছে অন্যদিকে তখন ভঁহার জীবন প্রতি মুহূর্তে বিপন্ন। ডাবলিনের পথে পথে থামের আড়ালে আড়ালে, সারাদিন সাইকেলের উপর এক বাড়ী থেকে আর বাড়ীতে তাঁহার দিন কাটিতেছিল- পায়ের মােজার ভিতর দরকারী কাগজ-পত্র লুকানন। মাইকেল কলিন্স এই সমস্ত রাজনৈতিক প্রস্তাবের গুরুত্ব ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিলেন না; সুচতুর রাজনৈতিক লয়েড জর্জের রাজনৈতিক প্রতিভার সমকক্ষতায় ১০
মাইকেল কলিন্স যে সময় ঈষৎ চঞ্চল হইয়া উঠিতেছিলেন
ঠিক সেই সময় রাজনৈতিক সংগ্রামের যােদ্ধা
ভ্যালেরা আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
পুনরায় ডি ভ্যালেরা Dail Brean-এর সভাপতি
নিৰ্বাচিত হইলেন এবং মাইকেল কলিন্স ডাল আয়রিয়ানের
অর্থ-সচিব হইয়া রহিলেন। যতই দিন যাইতে লাগিল যুদ্ধ
ক্রমশঃ গভীর হইয়া উঠিতে লাগিল। আইরিশ রিপাবলিক
সৈন্যরা পথে, প্রান্তরে, লুকাইয়া থাকিয়া সহসা বৃটীশ সৈন্য
ও কর্মচারীদের উপর আক্রমণ করিয়া তাহাদের বিধ্বস্ত
করিয়া দেয়। প্রতিফলে ইংরাজ সৈন্য নগরের পর নগর
অগ্নিদাহে বিধ্বস্ত করে।
ডি ভ্যালেরা, মাইকেল কলিন্স, ডিব্ৰান প্রমুখ নেতাদের
ব্যক্তিগত সাহসের সহস্ৰ অপূৰ্ব্ব কাহিনী এই সময়কার
সমস্ত ঘটনাকে সমুজ্জ্বল করিয়া আছে। আজ এই সমস্ত
আইরিশ নেতাদের ব্যক্তিগত সাহসের কথা এবং মৃত্যু-ভয়-
হীনতা প্রবাদ-বাক্য হইয়া গিয়াছে। চতুপ্রহর মৃত্যুর মধ্যে
থাকিয়া, মৃত্যুকে তাঁহারা শুধু যে অবজ্ঞা করিতেন তাহা নয়,
মৃত্যু-দেবতাও মুগ্ধ হইয়া এই সমস্ত অসমসাহসিক নেতাদের
মৃত্যুক্ষণগুলিকে আবরণ করিয়া রাখিয়াছিল। নতুবা নিত্য
মৃত্যুর সহিত বাস করিয়া তাঁহারা কি রহস্যময় উপায়ে
০১
যে মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা পাইতেন, তাহা বুঝিয়া উঠা
যায় না।
ডাবলিন শহরে যখন যুদ্ধ বেশ ঘােরালাে হইয়া উঠিয়াছে
সেই সময় একদিন সকাল বেলা মাইকেল কলিন্স তাঁহার
সাইকেল পরিত্যাগ করিয়া একটী মােটরে একজন সঙ্গী লইয়া
ছদ্মবেশে ডাবলিন শহর পরিভ্রমণে বাহির হইয়াছেন।
নগরের সমস্ত প্রবেশপথে বৃটীশ-সৈন্য। পথে যাইবার সময়
মাইকেল কলিন্স দেখিলেন যে, গােয়েন্দাবিভাগের চারজন
কর্মচারী যাইতেছে। তৎক্ষণাৎ অভিবাদন করিয়া কলিন্স
বলিলেন, “কিছু যদি মনে না করেন, এই মােটরেই আপনা-
দের ডাবলিনে পৌছে দি।”
কর্মচারীরা দ্বিরুক্তি না করিয়াই মােটরে উঠিয়া পড়িল।
নগরের প্রবেশপথে সৈন্যরা মােটর ধরিল। পুলিশের লােক
দেখিয়া তৎক্ষণাৎ মােটর ছাড়িয়া দিল।
মাইকেল কলিন্সকে আর বাঁচিতে হইত না।
আয়ারল্যাণ্ডের এই সমস্ত গরিলাযুদ্ধের ব্যাপার যখন
চরমে উঠিতেছিল তখন লয়েড জর্জ আয়ারল্যাণ্ডে শান্তি-
স্থাপনের জন্য সাক্ষাৎভাবে আইরিশ-নেতাদের সহিত শান্তির
সর্তের ব্যবস্থা করিবার উদ্দেশ্যে তাহাদের লণ্ডনে নিমন্ত্রণ
করিলেন। এই ব্যাপারে ইংরাজ রাজনৈতিক লয়েড জর্জ
নতুবা সেদিন
১০২
ডি ভ্যালেরার মধ্যে যে চিঠি-পত্রের আদান-প্রদান হয়, তাহা উভয় পক্ষের অসামান্য রাজনৈতিক প্রতিভার চরম নিদর্শন। ডি ভ্যালেরা এই সমস্ত পত্রের মধ্যবর্তিতায় আয়ারল্যাণ্ডের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার দাবীকে আয়ারল্যাণ্ডের একমাত্র শান্তির সর্ত বলিয়া প্রতিষ্ঠা করিতে চান। এই- খানে আমরা কয়েকখানি চিঠির শুধু মর্মার্থ দিলাম। মহাশয়, রাজা পঞ্চম জর্জ আয়ারল্যাণ্ডে শান্তি-প্রতিষ্ঠার জন্য যে আবেদন করিয়াছেন, বৃটীশ গভর্ণমেন্ট সত্যসত্যই তাহা কাজে পরিণত করিতে চান। সেইজন্য আমি দক্ষিণ-আয়ার- ল্যাণ্ডের সর্বজন-নিৰ্বাচিত প্রতিনিধিরূপে আপনাকে এবং উত্তর-আয়ারল্যাণ্ডের মন্ত্রী স্যার জে ক্রেগকে নিমন্ত্রণ জ্ঞাপন করিয়া জানাইতেছি যে, (১) শান্তির সর্বোত্তম পথ নির্ধারণ করিবার জন্য স্যার জে ক্রেগের সহিত আপনাকে লণ্ডনে এক সভায় যােগদান করিতে হইবে। আপনি ইচ্ছা করিলে আপনার যে-কোনও সহকর্মীদের লইয়া আসিতে পারেন। মেন্ট আপনাদের প্রত্যেকের নিরাপদতার জন্য দায়ী। লয়েড জর্জ ১০৩ ইহার উত্তরে ডি ভ্যালেরা লেখেন, মহাশয়, আপনার পত্র পাইয়াছি। আমি উক্ত সভায় যােগদানের পূৰ্বে এখন যাহাদের পাওয়া যাইতে পারে সেই সমস্ত জাতির প্রতিনিধিদের সহিত পরামর্শ করিতে চাই। যদি ইংলণ্ড আয়ারল্যাণ্ডের একত্ব এবং পূর্ণ-স্বাধীনতা স্বীকার না করে, আমি তাে মিলনের অন্য কোনও পথ খুঁজিয়া পাইতেছি আপনার পত্রের আরও বিশদভাবে উত্তর দিবার পূৰ্ব্বে আমি আমার দেশের রাজনৈতিকদলের যাহারা নভাগ ভঁহাদের (উত্তর-আয়ারল্যাণ্ড) সহিতও পরামর্শ করিতে চাই। ইতি- ড়ি ভ্যালেরা সেই সঙ্গে ডি ভ্যালেরা স্যার জেমস্ প্রমুখ অন্যান্য আইরিশ নেতাদের চিঠি লিখিয়া জানাইলেন যে, “আইরিশ জাতির পক্ষ হইতে আমি লয়েড জর্জের নিকট যে সমস্ত দাবী উপস্থিত করিব, তাহার সহিত সমগ্র আয়ার- ল্যাণ্ডের ভাগ্য যুক্ত থাকায় আমি আপনাদের সহিতও পরামর্শ করিতে চাহি। সেইজন্য আপনাদের নিকট হইতে সাক্ষাৎ ভাবে মতামত শুনিবার জন্য আমি আপনাদিগকে ম্যান্স হাউসে নিমন্ত্রণ করিতেছি। ডি ভ্যালেরা ১০৪ স্যার জেমস ক্রেগ ডাবলিনে ম্যাক্স হাউসে ডি ভ্যালে- রার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিলেন না—তবে তিনি জানাইলেন যে, লণ্ডনে লয়েড জর্জের সভায় ডি ভ্যালেরার সহিত কথােপকথন করিতে পারেন। ৮ই জুলাই গ্রিফিথ ও আয়ারল্যাণ্ডের অন্যান্য রাজ- নৈতিক নেতাদের সহিত পরামর্শ করিয়া ডি ভ্যালেরা লয়েড জর্জের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হইলেন এবং ১১ই জুলাই দ্বি-প্রহর হইতে অস্থায়ী ভাবে দুই দলের সকল প্রকার বিরােধ তুলিয়া লওয়া হইল। সেই দিন ডি ভ্যালেরা লয়েড জর্জকে লিখিয়া জানাইলেন যে, জাতির প্রতি- নিধিদের সহিত পরামর্শ করিয়া তিনি লণ্ডনের সভায় যোেগ- দান করিবেন স্থির করিয়াছেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে ডি ভ্যালেরা আইরিশ জাতির নিকট এক আবেদনে বলিলেন,- - “হে সহযাত্রী নাগরিকগণ, এই যুদ্ধ-বিরতির সময় প্রত্যেক নাগরিক এবং প্রত্যেক সৈন্য যেন মনে রাখেন যে, জাতির আত্মসম্মানের একমাত্র রক্ষক তাহারা। তােমাদের সংযম ও নিয়মনিষ্ঠ। যেন এই কথাই বুঝাইয়া দেয় যে, আমাদের এই সংগ্রাম জাতির মিলিত বাসনার यनि পুনরায় কোনও দিন আমাদের জাতির বিরুদ্ধে বলপ্রয়ােগ Joc হয় তবে যেন সে দিন সেই শক্তির আক্রমণকে প্রতিরােধ করিবার জন্য আমাদের দেহ ও মন সজাগ থাকে।” জগতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিখ্যাত ১০ নং ডাউনিং স্ট্রীটে ডি ভ্যালেরা ও লয়েড জর্জের মিলন হইল। ১৪ই, ১৫ই, ১৮ই এবং ২১শে জুলাই চারদিন ধরিয়া দুই জনের কথাবার্তা চলিল। একুশে একুশে জুলাই খবর বাহির হইল যে, ডি ভ্যালেরা ও লয়েড জর্জের কথােপকথনের ফলে এখনও মিলনের মূল প্রস্তাবগুলি নির্ধারিত হয় নাই। কাল ডি ভ্যালেরা তাহার সহকর্মীদের সহিত পরামর্শ করিবার জন্য পুনরায় আয়ারল্যাণ্ডে যাইবেন এবং সেইখান হইতে ভবিষ্যৎ কার্যপদ্ধতির বিষয়ও জানাইবেন। ডি ভ্যালেরার প্রস্থানের পর লয়েড জর্জ ইংলণ্ডের তরফ হইতে সর্তের মূলভিত্তিগুলি সংবাদপত্রমহলে বিজ্ঞাপিত করেন। এই সমস্ত সৰ্তে বেশ পরিষ্কার করিয়া বলা হইয়াছিল যে, ইংলণ্ডের সহিত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করিয়া আয়ার- ল্যাণ্ডকে পূর্ণ-স্বাধীনতা ইংলণ্ড দিতে পারে না। লয়েড জর্জের ঘােষণাপত্রের উত্তরে ডি ভ্যালেরা যে পত্র লিখিয়া পাঠান তাহার মর্মার্থ হইতেছে যে, “২০শে জুলাই আপনি আমাকে সরে যে সমস্ত নিয়মা- বলী দিয়াছিলেন, আমার সহকর্মীদের সহিত পরামর্শ
করিয়া দেখিলাম যে, সে-সব সৰ্ত্ত আমরা গ্রহণ করিতে পারি
।
“আয়ারল্যাণ্ডের আভ্যন্তরিক অথবা যে কোনও ব্যাপারে
সদা-সর্বদা বিদেশীদের কর্তৃত্বের স্পর্শ আমরা স্বীকার
করিতে বাধ্য নই। আয়ারল্যাণ্ড আজ তাহার নিজের
ভাগ্য নিজের সম্পূর্ণ দায়িত্বে গড়িয়া তুলিবে—কোনও
সাম্রাজ্যবাদী জাতির সহিত মিলনের সূত্রে গ্রথিত হইয়া
সে মানব-অকল্যাণকর যুদ্ধের, সামাজিক বিপর্যয়ের এবং
আর্থিক উৎপীড়নের অংশীদার হইতে রাজী নয়। জগতে
যেমন অন্যান্য ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য আত্ম-মৰ্যাদার সহায়ে
আজও স্বাধীন হইয়া রহিয়াছে, আমরাও ক্ষুদ্র হইলে
সেইরূপ স্বাধীন থাকিব। কোনও দেশ জয় করিবার জন্য
অন্য কোনও জাতির সহিত আমাদের সংঘর্ষ বাঁধিবারও
কোনও সম্ভাবনা নাই। তবে বাণিজ্য ও ব্যবসা-সংক্রান্ত
যে সমস্ত প্রস্তাব সমুখিত হইয়াছে, তাহার বিষয়ে
আমরা যে-কোনও মুহূর্তে সন্ধি করিতে রাজী আছি।”
ইহার উত্তরে লয়েড জর্জ জানান যে-
“আমরা যে সমস্ত সৰ্ত্তে আজ আয়ারল্যাণ্ডের সহিত
মিলিত হইতে যাইতেছি—আয়ারল্যাণ্ডের ইতিহাসে ইহার
পূৰ্বে তাহা আর কখনও হয় নাই। একান্ত সরলভাবে আমরা
১০৭
শান্তির যে সমস্ত প্রস্তাব আনিয়াছি তাহার সীমা উল্লজঘন
করিয়া আমরা যাইতে পারি না।”
যখন ডি ভ্যালেরা লয়েড জর্জের সহিত এই
রকম বচসা চলিতেছিল, তখন ডি ভ্যালেরা প্রকাশ করিলেন
যেন অধিকাংশ সিফিন্ নেতারা আজ কারাগারে বন্দী ;
তাঁহাদের মুক্তি ব্যতীত ডাল আয়রিণের সম্মিলিত সম্মতি
পাইবার কোনও উপায় নাই। ১৬ই আগষ্ট একমাত্র
সিন্ ম্যাককেওন ব্যতীত সমস্ত সিফি-নেতার জেল
হইতে ছাড়িয়া দেওয়া হয়।
আইরিশ গরিলা যুদ্ধের
সময় সেনা-নায়ক সিন্ ম্যাককেওনের অপূৰ্ব্ব বীরত্বে
বৃটীশ-বাহিনীকে বারে বারে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হইতে
হইয়াছিল। হত্যার অপরাধে সিন ম্যাককেওনের ফঁাসীর
হুকুম হইয়াছিল, তাই তাঁহাকে ছাড়িয়া দেওয়া হইল
। ডি ভ্যালেরা এই ব্যাপার দেখিয়া ঘােষণা করিলেন
যে, যতক্ষণ সিনকেও ছাড়িয়া দেওয়া হইতেছে,
ততক্ষণ পৰ্যন্ত তিনি ইংরাজের সহিত আর কোনও
বচসা করিতে রাজী নন। পরের দিনই তাঁহাকে মুক্ত
করিয়া দেওয়া হয়।
১৬ই এবং ১৭ই তারিখের ডাল আয়রিণের সভায়
ডি ভ্যালেরা সমস্ত সিফিন-নেতাদের সম্মুখে শান্তি
১০৮
প্রস্তাবের বিষয় লইয়া দীর্ঘ আলােচনা করেন।
দীর্ঘ আলােচনার পর ঠিক হয় যে, “জাতির প্রতিনিধি
হিসাবে আমরা
এই সমস্ত সৰ্ত্ত কোনও মতে গ্রহণ
করিতে পারি না।”
ডি ভ্যালেরা এই মর্মে লয়েড জর্জকে লিখিয়া
পাঠান,—“আমি পূর্বে আপনার নিকট যে মত ব্যক্ত
করিয়াছিলাম—সৰ্ববাদিসম্মতিক্রমে সেই মতই প্রতিষ্ঠিত
হইয়াছে। পূর্ণ-স্বাধীনতার স্বীকার ব্যতীত আয়ারল্যাণ্ড
কোনও সৰ্তে অথবা প্রস্তাবে সন্ধি করিতে রাজী নয়।
“আমাদের জাতির আত্ম-সম্মান রক্ষার এই চেষ্টাকে
যদি ইংলণ্ড যুদ্ধের কারণ করিয়া লন, আমরা তাহার
জন্য দুঃখিত। আজ আমাদের চারিদিকে যাহারা বঁচিয়া
আছে, তাহাদের প্রতি যেমন আমাদের একটা কর্তব্য
আছে—আমাদের চারি পাশে আমাদেরই আদর্শের জন্য
যে সমস্ত মহাপ্রাণ মরণকে বরণ করিয়া লইয়াছে—
তাহাদেরও প্রতি আমাদের সেই রকম কর্তব্য আছে।
আমরা যুদ্ধ চাহি নাই, যুদ্ধ চাহিও না, কিন্তু যুদ্ধ যদি
আমাদের ঘাড়ের উপর আসিয়া পড়ে, আমরা অবশ্যই
আত্মরক্ষা করিব। এবং এই আত্মরক্ষার কাজ আমরা
এমনি একান্ত আত্ম-নির্ভরের সহিত করিব যে, আত্মরক্ষা
করিতে পারি অথবা নাই পারি, আইরিশ জাতির কোনও
নর ও নারীর সম্ম জাতির জীবন-সত্ত্বকে বেচিবার জন্য
তাহার পর আর বাঁচিয়া থাকিবে না।”
চিঠির মধ্য দিয়া বাদানুবাদ ক্রমশ জটিল হইয়া
উঠিতে লাগিল দেখিয়া ডাল আয়রিনে ঠিক হইল যে,
সর্বের বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করিবার জন্য
লণ্ডনে ডাল আয়রিনের কয়েকজন নির্বাচিত প্রতিনিধি
পাঠান হউক। ডি ভ্যালেরা তাহাতে রাজী হইয়া আর্থার
গ্রিফিথ, মাইকেল কলিন্স প্রমুখ পাঁচজন আইরিশ প্রতি-
নিধিকে লণ্ডনে পাঠাইলেন। নিজে আয়ারল্যাণ্ডে রহিয়া
গেলেন। ডি ভ্যালেরা এই দলের
নেতৃত্ব না করায়
গ্রিফিথ কলিন্সের সহিত মননামালিন্যের প্রথম
সূত্রপাত হয়।
সন্ধি ও মাইকেল কলিন্সর হত্যা
ডি ভ্যালেরা কোনও দিন ভাবিতে পারেন নাই যে,
নিৰ্বাচিত-প্রতিনিধিরা লয়েড জর্জের সৰ্ত্ত মানিয়া লইয়া
আয়ারল্যাণ্ডের পূর্ণ স্বাধীনতার সংগ্রামের আপােষে মিটমাট
করিয়া, ফিরিয়া আসিবেন। ইংলণ্ডে যখন শান্তি-বৈঠকে
আইরিশ-প্রতিনিধিরা শান্তির সর্ত লইয়া বিচার করিতেছিলেন
সেই সময় ডি ভ্যালেরা আইরিশ রিপাবলিক সৈন্যদল
১১০
পরিদর্শন করিতেছিলেন। সন্ধির প্রস্তাবে যেদিন স্বাক্ষর করা হইবে সে দিনও তিনি সন্ধির মূল সূত্রের কথা জানিতে পারিলেন না , এবং তাহার জন্য তাঁহার মনে যে যথেষ্ট আশঙ্কা হইতেছিল না তাহা নয়। যেদিন সন্ধিতে স্বাক্ষর করা হয় সেদিন আয়ারল্যাণ্ডে ডি ভ্যালেরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যা- লয়ের চ্যাসেলার রূপে মহাকবি দান্তের জন্মতিথি উৎসব উপলক্ষে বক্তৃতা দিতেছিলেন। যখন সন্ধির সর্তগুলি তাহার হস্তগত হইল, তিনি সবিস্ময়ে দেখিলেন যে, মাইকেল কলিন্স, গ্রিফিথ প্রমুখ নেতারা আয়ার- ল্যাণ্ডের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবীকে জলাঞ্জলি দিয়া এক মাঝা- মাঝি সৰ্তে স্বাক্ষর করিয়া আসিয়াছেন। এইখানে এই সন্ধির প্রধান সৰ্ত্তগুলির উল্লেখ প্রয়ােজনীয়। (১) বৃটীশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশ যে প্রকারের স্বায়ত্তশাসন উপভােগ করে, সেই রকম বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকিয়া আয়ার- ল্যাণ্ড স্বায়ত্ত শাসনের অধিকারী হইবে। নিজেদের গঠিত পালিয়ামেন্টে দেশের শান্তি ও সুব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আইন কানুন গঠন করিবার সমস্ত অধিকার থাকিবে এবং এই নব গঠিত শাসনতন্ত্র আইরিশ ফ্রি ষ্টেট নামে অভিহিত হইবে।
(২) কানাডা প্রভৃতি দেশে যে ভাবে রাজার
প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় এখানেও ঠিক সেই ভাবে রাজার
প্রতিনিধি নির্বাচিত হইবেন।
(৩) আইরিশ ফ্রি ষ্টেটের প্রত্যেক সভ্যকে সভ্য
হইবার সময় নিম্নলিখিত শপথ গ্রহণ করিতে হইবে।
“সৰ্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করিয়া শপথ করিতেছি যে,
আমি সততভাবে আইরিশ ফ্রি ষ্টেটের কাৰ্য-পদ্ধতিকে
শ্রদ্ধায় স্বীকার করিয়া চলিব এবং যেহেতু আয়ারল্যাণ্ড,
ইংলণ্ড এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য প্রদেশের
সহিত একই নাগরিক সম্বন্ধে সংযুক্ত, সেইজন্য আমি রাজা
পঞ্চম জর্জ এবং তাহার ন্যায়ত উত্তরাধিকারগণের প্রতি
একান্ত বিশ্বস্ত থাকিব।”
(৪) যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্যরকম ব্যবস্থা হইতেছে তত
দিন পর্যন্ত ইংলণ্ডের রাজকীয় সৈন্য আয়ারল্যাণ্ডের উপকূল
সংরক্ষণ করিবে।
উপরি-উক্ত সৰ্ত্ত হইতে ডি ভ্যালেরা স্পষ্টই বুঝিয়া-
ছিলেন যে, এতদিন ধরিয়া আয়ারল্যাণ্ডের পূর্ণ স্বাধীনতার
জন্য এত যে রক্তপাত হইল—এত
যে আইরিশ যুবক
অম্লানবদনে আত্মত্যাগ করিল-সে
পূর্ণ-স্বাধীনতার
১১
দাবীকে আজ লাঞ্ছিত করিয়া আইরিশ-জাতির প্রতিনিধিরা স্বদেশে ফিরিয়া আসিয়াছে। ডি ভ্যালেরার সহিত তাহার আজন্ম সহকর্মীদের বিবাদের সূচনা হইল। ডাল আয়রিনের সভায় স্পষ্টই দুইটা দল হইয়া গেল। এই সময় ডি ভ্যালেরা আইরিশ জাতির নিকট আবেদন করিয়া এক পত্ৰ মুদ্রিত করেন। “আইরিশ জাতির নিকট। “হে আমার স্বদেশবাসী! যে সর্ডে ইংলণ্ডের সহিত সন্ধি হইয়াছে তাহা আপনারা দেখিয়াছেন। গত তিন বৎসর ধরিয়া ক্রমান্বয়ভাবে আইরিশ জাতি যাহা চাহিয়া আসিতে- ছিল আজ এই সৰ্তে স্বাক্ষর করিয়া আয়ারল্যাণ্ড সেই দাবী হইতে বঞ্চিত হইতে চলিয়াছে। এই বিষয়ে বিবেচনা করিবার জন্য বুধবার বেলা ১১টার সময় ডাল আয়রিনের সভা বসিবে। যদিও প্রতিনিধিসভার মধ্যে মনােমালিন্য দেখা দিয়াছে, তথাপি আমি আশা করি, সৈন্যদল ও আই- রিশ জাতি যেন শান্তভাবেই অবস্থান করে।” ১৪ই ডিসেম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়ীতে এই সভার প্রথম অধিবেশন হইল। বিপুল জনসঙ্ঘ এই বাড়ীর চারিদিকে ঘিরিয়া সমস্বরে ডি ভ্যালেরা, গ্রিফি ও কলিন্সের জয়গান গাহিতেছিল। ডাল আয়রিনের এই অধিবেশনে ১১৩ আইরিশ আন্দোলনের সব চেয়ে দুঃখজনক ঘটনার সূত্রপাত হয়। যে দুইজন সহকর্মী এতদিন ধরিয়া একই সাথে মৃত্যুকে তুচ্ছ করিয়া একটা দুর্বল জাতিকে আত্ম-প্রতিষ্ঠার শেষ- সােপানে আনিল—জীবনের মৃত্যুময় দিনগুলি যাহারা তিলে তিলে গাঁথিয়া লইয়াছিল—আজ আইরিশ-সংগ্রামের সেই দুই সৰ্বশ্রেষ্ঠ নেতা, ডি ভ্যালেরা ও মাইকেল কলিন্সের মধ্যে এক বিরাট দ্বন্দ্ব উপস্থিত হইল। ডি ভ্যালেরা সভা সমক্ষে ঘােষণা করিলেন যে, সর্তের মূল ভিত্তির কথা তাঁহাকে না জানাইয়া স্বাক্ষর করাতে মাইকেল কলিন্স প্রমুখ নেতারা আইরিশ জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছেন। মাইকেল কলিন্স বলি- লেন,--“তাহারা জাতির সমস্ত দায়িত্ব লইয়া জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধি হইয়াই লণ্ডনে গিয়াছিলেন সুতরাং জাতিকে লুকাইয়া তাহারা কোনও কাজ করেন নাই। আমি জানি আমাকে বিশ্বাসঘাতক বলিয়া ঘােষণা করা হইতেছে। আমি যদি বিশ্বাসঘাতক হই-আইরিশ জাতি আমার বিচার করিবে। আমাকে বিশ্বাসঘাতক ধরিয়া লইয়া আমার বিরুদ্ধে যে কেহ যে কোনও আচরণ করুক, আমি আজ এইখানে বা অতীতে কোন দিনে, যে আমি শুধু কোনও স্থানে, যে কোনও ভাবে তাঁহার সম্মুখীন হইতে রাজী আছি।” তাহার পর নানাপ্রকারের উত্তেজনার মধ্য দিয়া ডাল আয়রিনের মধ্যে দুইটী দল স্পষ্টই পৃথক হইয়া গেল ; একদল রহিল সৰ্ত্তের স্বপক্ষে, আর একদল রহিল সর্তের বিপক্ষে। সৰ্তের বিপক্ষে বলিতে উঠিয়া ডি ভ্যালেরা বলেন, “বৃটীশ সম্পর্কের সহিত আইরিশ জাতির দাবীর মিল নাই বলিয়াই আমি এই সৰ্তের বিরুদ্ধে। যুদ্ধপ্রিয় নই, আমিও শান্তি চাহি, তাই আমি সৰ্ত্তের বিপক্ষে। এই সৰ্ত্ত গ্রহণ করিলে যুগ যুগ ধরিয়া যে সংঘর্ষ চলিয়া আসিতেছে, আমি জানি যে, েসংঘর্ষের অব- সান হইবে না। তাই আমি এই সর্ডের বিপক্ষে।” সেই দিন ডাল আয়রিনের সভায় আইরিশ নসাধারণ সােৎসুকে দেখিয়াছিল জাতির দুই বাহু পরস্পর পরস্পরকে আঘাত করিতে সমুদ্যত হইয়াছিল জাতিরই একান্ত কল্যাণ কামনা করিয়া। মৃত্যুকে যাহারা জীবনে শতবার তুচ্ছ করিয়াছে তাহাদের নিকট ব্যক্তিগত সুবিধা ও লােভের স্থান ছিল না। এক বিরাট আদর্শের সংঘাত ডাল আয়রিনকে চঞ্চল করিয়া তুলিল। মাইকেল কলিন্স তঁাহার বক্তৃতার শেষে বলিলেন, “আমি আজ আইরিশ জাতির সমক্ষে শপথ করিয়া বলিতেছি আমার জীবনের সমস্ত বাসনা দিয়া আমি আইরিশ জাতির সেবা করিব। আজ আমার সম্বন্ধে আমার বিরুদ্ধবাদীরা যাহা বলিতেছেন, তাঁহাদের সম্বন্ধে সেই কথা কেহ বলিলে আমি কোনও মতে তাহা সহ্য করিব না। আজ আমার বিরুদ্ধে যাহারা দাড়াইয়াছেন, পূর্বে তাঁহাদের যে রকম শ্রদ্ধা করিতাম, আজও আমার সেই শ্রদ্ধাই আছে। ডাল আয়রিনের সভাপতিই জানেন তাহার জন্য আমি কি করিয়াছি।” ডাল আয়রিনের সভায় ভােটে সৰ্ত গৃহীত হইয়া গেল। সর্তের বিরুদ্ধে ৫৭-টী ভােট হয়, সৰ্তের স্বপক্ষে ৬৪-টী ভােট হয়। সাতটী ভােটের আধিক্যে সৰ্ত্ত গৃহীত হইল এবং দক্ষিণ- আয়ারল্যাণ্ডে আইরিশ ফ্রি-ষ্টেট প্রতিষ্ঠিত হইল। ডাল আয়রিনের এই সভার অধিবেশনে ডি ভ্যালেরা পূৰ্ব্ব হইতেই সভাপতির আসন পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। পুন নির্বাচনে আর্থার গ্রিফিথ আইরিশ ফ্রি-ষ্টেটের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হইলেন। সৰ্তের বিপক্ষে ভােট দিবার সময় ডি ভ্যালেরা ভােট না দিয়া রাগিয়া সভা-গৃহ ত্যাগ করিয়া চলিয়া যান। ডি ভ্যালেরা যখন সভা-গৃহ পরিত্যাগ করিয়া যাইতে- ছিলেন তখন মাইকেল কলিন্স উত্তেজিত হইয়া বলিয়া উঠি-
লেন, “আচ্ছা, চলে যাও পরিত্যাগকারীর দল! জাতির
যখন সব চেয়ে বেশী দরকার তখন এমনি করেই ছেড়ে যাবে
যাও।”
১৪ই জানুয়ারী শনিবার আইরিশ জাতির প্রতিনিধিগণ,
যাহারা সর্তের স্বপক্ষে ভােট দিয়াছিলেন, তাঁহারা ম্যানসন
হাউস হইতে ডাবলিন কাসূলে প্রবেশ করিলেন।
এত দিন
ধরিয়া যে ডাবলিন কাল বিদেশী শাসকদের শাসন-কেন্দ্র
ছিল সেদিন তাহা আইরিশ ফ্রি ষ্টেটের শাসন-পরিষদে
পরিণত হইল। শত শত বীরের অম্লান জীবন-আহুতিতে যে
স্বাধীনতার সংগ্রাম এত দিন ধরিয়া চলিতেছিল, তাহার
অবসান হইল।
কিন্তু ইংরাজের সহিত সংঘর্ষ থামিয়া গেল বটে কিন্তু
জাতির অভ্যন্তরে নূতনতর সংঘর্ষ বাঁধিয়া উঠিল। পূর্ণ
স্বাধীনতাকামী আইরিশ দল প্রকাশ্যভাবে বিপ্লব ঘােষণা
করিতে লাগিল এবং পথে ঘাটে পুনরায় ছােট খাটো যুদ্ধ
ঘটিতে লাগিল।
মাইকেল কলিন্স আইরিশ ফি-ষ্টেটের চৌদ্দটী বিভাগের
গুরুভার স্কন্ধে লইয়া নব-গঠিত শাসনতন্ত্র চালাইতে লাগি-
লেন। জাতির এই নব দুর্বিপাকে তাঁহাকে বাধ্য হইয়া
পুনরায় পূর্ণস্বাধীনতাকামীদের গুপ্ত আক্রমণের প্রতিরােধ
১১৭
করিতে হইল। ফলে তাহার জীবন সৰ্ব্বদাই শঙ্কাকুল হইয়া উঠিতে লাগিল। কিন্তু এই নির্ভীক যােদ্ধা মৃত্যুকে উপেক্ষা করিয়া এই বিদ্রোহ দমনের জন্য আত্মনিয়ােগ করিলেন। এপ্রিল মাসের প্রারম্ভ হইতে ডাল আয়রিনের সৈন্যদলের উপর প্রকাশ্যভাবে আক্রমণ চলিতে লাগিল। ডাবলিনের রাস্তা আবার রক্তের স্পর্শে সজীব হইয়া উঠিল। এই আত্মকলহের মধ্যে সব চেয়ে মজার বিষয় যে, পথে যখন রীতিমত যুদ্ধ চলিতেছে তখন প্রত্যেক দলের নেতারা একত্রেই মিলিত ছিলেন। কে এই বিপ্লব চালাই- তেছে, বিপ্লবীরাই বা কোন্ দলভুক্ত তাহা কেহ জানিত না। অধকাংশ সময় গভীর নিশীথের আবরণে এই সমস্ত আক্রমণ সংঘটিত হইত। যখন এই সমস্ত ব্যাপার ঘটিতে- ছিল তখন ডি ভ্যালের ডাল আয়রিনের সভ্যরূপে প্রত্যহই সভায় যাইতেন। আইরিশ ফ্রিষ্টেটের সৈন্যদলের মধ্যে দুইভাগ হইয়া যাওয়ার ফলে এই সংঘর্ষ উপস্থিত হয়। ফিষ্টেটের “Regular” সৈন্যদের সহিত আইরিশ রিপাবলিকদলের “Irregular” সৈন্যদের সংঘর্ষ চলিতে লাগিল। ক্রমশঃ দেখা গেল যে এই যে Irregular সৈন্যদল ফ্রিষ্টেটের সৈন্যদলের অপেক্ষা ঢের বেশী শক্তিশালী হইয়া ১১ উঠিতেছে। মাইকেল কলিন্স আর কালবিলম্ব না করিয়া Regular 6779971 পুনর্গঠনের জন্য মনােনিবেশ করিলেন এবং সেই সময় ডি ভ্যালেরার সহিত মিলিত হইয়া দুইজনার যুক্ত-স্বাক্ষর লইয়া দেশবাসীর নিকট একটী সৈন্যদল গঠন করিবার জন্য আবেদন করিলেন । কিন্তু এই মিলিত আবেদন সত্ত্বেও সংঘর্ষ কমিল না। প্রতিদিনই অবস্থা আরও ভয়াবহ হইয়া আসিতেছিল। এই সময় আইরিশ জাতির সর্বাপেক্ষা ভীষণ বিপদ ঘনাইয়া আসিল। ১২ই আগষ্ট আইরিশ স্বাধীনতার মন্ত্র-প্রচারক ও আইরিশ ফিষ্টেটের প্রথম সভাপতি আর্থার গ্রিফিথ পর- লােক গমন করিলেন। ইহার কিছুদিন পরেই ২১শে আগষ্ট তারিখে আর এক মহা দুর্ঘটনা জাতির সকল অন্তদ্বন্দ্বকে স্তম্ভিত করিয়া দিল। সৈন্যদল পরিদর্শন করিবার জন্য মাইকেল কলিন্স উক্ত দিন মােটরে সফরে বাহির হইয়াছিলেন। তিনি জানিতেন যে, যে-সমস্ত পথ দিয়া তাহাকে যাইতে হইবে তাহার চতুর্দিকে বিপ্লবী সেনারা লুকাইয়া আছে। কিন্তু মৃত্যুভয়হীন সেনাপতি সে বিষয়ে কোনও হৃক্ষেপ করেন নাই। ২২শে আগষ্ট সমস্তজাতি সবিস্ময়ে, শুনিল যে, মাইকেল কলিন্স গুপ্ত সৈন্যদের হস্তে জীবন দিয়াছেন। তঁাহার মৃত্যুর কোন তথ্য আজও বাহির হয় নাই। তবে
Pearas Beaslai লিখিয়াছেন যে, “ইহা বড়ই আশ্চৰ্য্য লাগে
যে, যে-পথ দিয়া সেদিন মাইকেল কলিন্স গিয়াছিলেন সেই
পথে সকাল বেলা ডি ভ্যালেরাকে দেখা গিয়াছিল—ঠিক যে
যায়গায় কলিন্সকে আক্রমণ করা হইয়াছিল
হইয়াছিল তাহারই
নিকট।”
যে যােদ্ধা একদিন জীবন দিয়া জাতিকে প্রতিষ্ঠা করিয়া-
ছিল, মৃত্যু দিয়া সে পুনরায় জাতিকে অন্তদ্বন্দ্ব হইতে মুক্ত
করিয়া গেল। কসগ্রেভ আইরিশ ফি ষ্টেটের দ্বিতীয় সভাপতি
নিযুক্ত হইলেন। মাইকেল কলিন্সের মৃত্যু-ছায়ার তলে
আইরিশ জাতি সকল অন্তদ্বন্দ্ব মুছিয়া ফেলিল।
আইরিশ ফি ষ্টেটের প্রতিষ্ঠিত হইল কিন্তু ডি ভ্যালেরার
পূর্ণ-স্বীধীনতার স্বপ্ন আজও মূর্তি পরিগ্রহণ করে নাই।
পূর্ণ-স্বাধীনতার মুক্তি-মূল্য বুঝি আরও বেশী ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.