Makardah Saraswat Library, Howrah

Dakshin Americay Mas Koyek

Chattopadhyay, Baidyanath · 2009/07/10

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দক্ষিণ আমেৱিকায় মাস কয়েক
শ্ৰীবৈদ্যনাথ চট্টোপাধ্যায়
এম. এ., এফ. আর. জি. এস., এফ.
আর. এস. এ। লওন )
দি বুক কোম্পানি লিমিটেড
৪।৩ বি, কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা

ঐগিরীন্দ্রনাথ মিত্র
৪ ৩বি, কলেজ স্কোয়ার, কচি-ক'
আট আনা
পিন্টর - প্রতচন্দ্র রায়
গৌরাঙ্গ পেস
৫ ও ৬ চিন্তামণি দাস লেন কলকাতৃ

উৎসর্গ
সতী-লােকগতা
মন্দাকিনী দেবীর
১ ; ::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
শাচরণ উদ্দেশ্য
পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার সহিত
অপিত হইল।
শ্রী কৃষ্ণের রাসা,
}
বৈদ্যনাথ
১৩৪৫

No text on this page.

প্রথম পরিচ্ছেদ
“ফেল জীর্ণ চীর পর নবসাজ
আরম্ভ কর জীবনের কাজ।”
বয়স তখন বেশী নয়। সবে যৌবনে পা দিয়াছি। সম্মুখে
সকলই সোনার
হইতেছিল। দেহে
প্রচুর বল-মনে
অদম্য
ঘূর্তি--
পিতার
অফুরন্ত
ঐশ্বর্য মাতার
সীমাহীন বাৎসল্য,
কিন্তু আমার মন এ সকলে যেন
তৃপ্ত নয়—কি যেন চায়—কোথায়
যেন আমাকে ভাসাইয়া লইয়া
যাইতে চায়, বুঝিয়া বুঝিতে-
ছিলাম না। একদিন মনের কথা
ধরা পড়িল। বহুকষ্টে অনেক বলিয়া
দক্ষিণ আমেরিকার ‘আরারা ও কহিয়া না
ববির নিকট
‘প্যারাকুয়েট’ পাখী
হইতে বিদায় লইলাম । তাহারা
কত কাদিলেন—কত কিছু বলিলেন—আমিও যে একেবারে
অচঞ্চল রহিলাম তাহা নয়—কিন্তু আমার মন চলিয়াছে-সকল

২ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক বাধা বন্ধন, মায়া মমতার নিগড় ভেদ করিয়া। সে আমাকে ঠেলিয়া লইয়া চলিল—দূরে-বহুদূরে—বিদেশে কোন বিভূমে ! সেখানে নাই কেহ পরিচিত কোন দিন যাই নাই—কোন দিন সে জায়গা চোখে দেখি নাই। বার বার মনে পড়িতে লাগিল কবির সেই কথা কয়টী “কত তাজানারে জানাইলে তুমি কত ঘরে দিলে ঠাই, দূরকে করিলে নিকট বন্ধু পরকে করিলে ভাই_” তখন বসন্ত কাল। বৃক্ষে বৃক্ষে, লতায় লতায় নব পল্লব- নূতন মুকুল। নিসর্গ-রাণীর সে যেন এক অপরূপ বিলাস—যে দিকে চাওয়া যায় সেই দিকেই শ্যাম-শােভা! লাবণ্য যেন ঝরিয়া পড়িতেছে ! মন উতলা হইল। ষ্ট্যাবরক্ নগরী হইতে ডেমেরারা আসিয়া কুইবাে বনের মধ্য দিয়া ঘুরিয়া কোথায় কি আছে, বিধাতা কত বিচিত্র সৃষ্টিতে এই সুরম্য কাননদ্বয়কে সুসজ্জিত করিয়া রাখিয়াছেন, দেখিয়া, নয়ন সার্থক করিবার জন্য হৃদয়ে এক অদম্য আকাক্ষা জাগ্ৰৎ হইল। দক্ষিণ আমেরিকার সি-ডিভ্যান্টের এক অংশ ডাচ, গায়নার এই বনদ্বয়ের সম্পর্কে কত সুন্দর সুন্দর উপাখ্যানই না শুনিয়াছিলাম ! দেখিয়া, বেড়াইয়া চক্ষু ও মন আজ চরিতার্থ হইবে । এতদিনের এত আকিঞ্চন আজ পূর্ণ হইবে—আমার মন যেন নাচিতে লাগিল। ময়ূর যখন মেঘ দেখিয়া পেখম ধরিয়া নাচে তখন বুঝি তাহার মনে এমনই

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
আনন্দ হয়! ঔরলী বিষ এই বনে পাওয়া যায় এই বিষ যদি
সংগ্রহ করিতে পারি তাহা হইলেও পরম লাভবান হইব, এ
দক্ষিণ আমেরিকার ‘আইরি-গাছ’
আশাও যে মনে উকি-ঝুকি না দিতেছিল এমন নয়। ভ্রমণ
করিতে করিতে যদি পর্তুগীজ গয়নার সীমান্ত দুর্গে পৌঁছিতে পারি
এ ইচ্ছাও মনে রহিল। সেও ত এক কম লাভের ব্যাপার নয়।

৪
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
হাঁটিয়া যাওয়া বড় কষ্টকর। সেই বন-বাদাড়ের মধ্যে
পদব্রজের যাত্রীর বড়ই রৌদ্র ভােগ করিতে হয়। (এ ত গেল
দিনের কথা—রাত্রে মশার উপদ্রবে মাইবার উপায় নাই—
একটুকুও চোখ বুজবার উপায় নাই—সমস্ত শরীরে বসন্তের
দাগের মত দাগ হইয়া যায় ।
-
অশ্বপৃষ্ঠে যাইব? কিন্তু তাহাও ত সম্ভব নয়। কারণ কিছুদূর
পৰ্যন্ত গেলেও আর তেমন রাস্তা নাই। যাওয়া যায় কি করিয়া ?
জলপথে ? সে পথে ও ত বিপ্ন আছে। তবে জল-পথে যাইতে
যাইতে যখন উচ্চ-ভূমির নিকটবর্তী হওয়া যাইবে তখন যদি
হাঁটিয়া সেই উচ্চ-বন্যভূমি অতিক্রম করা যায় বা যেখানে যেখানে
নদী আছে, সেই সেই নদীতে নৌকায় যাওয়া যায়, তাহা হইলেই
সেই বিঘ্ন-সঙ্কুল বনদ্বয়ের মধ্যে প্রমণ সম্ভব। ডেমেরার নদীর
তৃতীয় দ্বীপটী অতিক্রম করিলে আবাদী জমি চোখে পড়ে।
একটির সঙ্গে অপরটীর কোন সংশ্রব নাই। মাঝে •াঝে বন।
আবাদী জমির মধ্যে “লু” নামক স্থানই সর্বশেষ স্থান। এখানে
আকের চাষ হয়। এখানকার কৃষকেরা নিগ্রোজাতীয়। তাহাদিগকে
এইস্থান ত্যাগ করিয়া অন্য জায়গায় যাইবার জন্য আদেশ
দেওয়া হইয়াছে। তাহারা স্থান-ত্যাগ করিয়াছে। দেখিয়া মনে
হইল, কয়েক মাসের মধ্যেই জঙ্গলে সমস্ত জায়গা ঢাকিয়া যাইবে।
হয় ত চাষ-আবাদের কোন চিহও থাকিবে না।
উপরে উঠিলাম—দেখিলাম, সেখানে “এমেলিয়া-ওয়ার্ড”
বলিয়া একটী পান্থশালা রহিয়াছে। জনপ্রাণী নাই--স্থানত্যাগ

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
করিয়া সকলে চলিয়া গিয়াছে। আরও কিঞ্চিৎ দূর অগ্রসর
হইলাম ; এমন কোন স্থান দেখা গেল না যে স্থান দেখিয়া
পথিকের মনে হইতে পারে যে এখানে কোন দিন যাক বা
কফির চাষ ছিল। একেবারে শূন—পতিত-ধূ ধূ বন !
এমেলিয়া-ওয়ার্ড হইতে নদীর উভয় তীরে বনের সারি
চলিয়াছে। নদীর তীর বনে ঢাকা। মধ্যে মধ্যে দুই একটী
কুঁড়ে ঘর দেখা যাইতেছিল। ঐ সকল ঘরে নিগ্রো জাতীয় দুই
চারি জন লােক ছিল। চারিদিকেই শস্যহীন-ভূমি ! এক কাঠুরিয়া
একখানি কুটীর নির্মাণ করিয়াছে এবং তাহার পালিত পশুদের
চরিবার জন্য খানিকটা জমি পরিষ্কার করিয়া লইয়াছে।
আরও অগ্রসর হইতে লাগিলাম। দুই-তিন টা সমভাবে
হাঁটিলাম। সমভূমির পর সমভূমিই চলিয়াছে--আবার পাহাড়ের
ঢালু স্থান ; পাহাড়ের এক একটা অংশ যেন বাড়িয়া—হাত পা
মেলিয়া নদীতে নামিতে চেষ্টা করিতেছে। গাছগুলির দিকে
চোখ পড়িল—দেখিয়া মনে হইল যেন, সেখানে চির-বসন্ত
বিরাজমান। বসন্তের সঙ্গে গ্রীষ্ম ও হেমন্ত যেন মিশিয়া এক
অপূৰ্ব্ব লাবণ্যের হিন্দোল চলিয়াছে ।
পাহাড়ের ঢালু অংশের দিকে চাহিয়া চোখ জুড়াইয়া গেল।
কত রং-বেরংয়ের—কত মনােহর-হরিৎ, পাটল বর্ণের পল্লবে,
পত্রে সুসজ্জিত। প্রকৃতি যেন লীলাচ্ছলে, পাতায় পাতায়
রংয়ের খেলা খেলাইয়াছেন। শাখা ফলভরে অবনত হইয়াছে।
কত বৃহকায় বৃক্ষের বীজ সেই সকল ফলে নিহিত রহিয়াছে !

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক কিছুদূর অগ্রসর হইয়া দেখিলাম, কতকগুলি গাছের মাথায় পাতা নাই। বজ্রের আঘাতে পুড়িয়া, ভস্ম হইয়া, কেশবিহীন ও মুণ্ডিত মস্তক মানুষের মত উহারা দাড়াইয়া আছে। মনে হইতে লাগিল যেন উহারা আমাকে বলিতেছে—ওগো! তুমি ভাবিয়া দেখ, জগতের কিছুই চিরস্থায়ী নয়—কাহারও জীবন ও যৌবন - কাহারও রূপ ও সৌন্দর্য্য চিরকাল সমান থাকে না। আমাদেরও একসময়ে যৌবন ছিল—তুমি যদি আগে আসিতে আমাদের সে সৌন্দৰ্য, সে শােভা, সে লালিত্য, সে মাধুৰ্য্য দেখিয়া বিস্ময়বিস্ফারিতনেত্রে চাহিয়া থাকিতে। আমাদের সে সুখের দিন চলিয়া গিয়াছে। কাহারই বা থাকে বল ? কোথায় সেই যদুপতির অধিকৃত মথুরাপুরী, কোথায় সেই রামচন্দ্রের অযােধ্যা ? দেখ পথিক! যখন আসিয়াছি, আমাদিগকে দেখিতেছ, তখন মনে মনে ভাবিতে ভাবিতে চলিয়া যাও- ‘প্রভাত-অধরে হাসি, সন্ধ্যার মলিন মুখ, উদ্যম ফুরায়ে যায়, ভাঙ্গে আশা, ঘােচে সুখ। ভাবিতে ভাবিতে আরও অগ্রসর হইলাম। দেখিলাম, বড় বড় সব পাহাড়-নদীর ধারে ধারে দাড়াইয়া রহিয়াছে—যেন তৃষিত ও পিপাসার্ত ; জল পানের নিমিত্ত জলে অবতরণ করিতেছে। পাহাড়ের প্রস্তরগুলি মসৃণ। জলের স্রোত অনবরত উহাদের গাত্রে ঘর্ষণ করিতে করিতে উহাদিগকে ছিন্ন-ভিন্ন, বিদীর্ণ ও অসমান করিয়াছে।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
১৫।
আমেরিক
আদিম
৭
বাসী রেড-ইণ্ডিয়ানগণ

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক মধ্যে মধ্যে এক আধটু মাটি—আবার বড় বড় প্রস্তরখণ্ড —দেখিলে কত কথাই না মনে হয়। কফি গাছ যেখানে জন্মিয়াছে সেখানে অনেকগুলিই রহিয়াছে। এইরূপ এক পাহাড়ের উপরে দেখিলাম, 'একজন ফঁড়িদারের বাড়ী। সেই দেশের শাসন কর্তা তাহাকে নিযুক্ত করিয়াছেন। ফঁাড়িদার সেখানকার অধিবাসী ; রেড-ইণ্ডিয়ানদের ( IRed Indian) মধ্যে কে কি করে হা সে জানাইয়া থাকে। সন্দিগ্ধ কোন লােক নদীপথে গমনাগমন করিলে সে তাহা লক্ষ্য করে। এখানে যে সমস্ত রেড-ইণ্ডিয়া আছে তাহারা একত্র হইলেই উৎসব আরম্ভ হয়। নবাগত কেহ উপস্থিত হইবামাত্র পরম বিস্ময়-সহকারে তিনি দেখিতে পাইবেন যে সেই আদিম অধিবাসীরা তাহাদের দেশীয় গীত গাহিয়া নাচিতে থাকে এবং দেশীয় প্রথামত নানা রংয়ে নিজেদের দেহ রঞ্জিত করি সকলের আনন্দ বর্ধন করে। উহারা তীর ছুড়িলে, একটী তীরও ব্যর্থ হয় না। বিষাক্ত সেই তীর তাহাদের তূণীর হইতে বইতে সংলগ্ন হইয়া একবার নিক্ষিপ্ত হইলে আর রক্ষা নাই। লােহিতবর্ণ অসভ্য জাতীয় আদিম অধিবাসী ও আফ্রিকার ঘাের কৃষ্ণবর্ণ অধিবাসীর মত লােকগণকে এই স্থানে সর্বদাই দেখিতে পাওয়া যায়। দিন- রাত উহারা প্রাণ খুলিয়া হাসিতেছে, খেলিতেছে, বেড়াইতেছে ; সজীবতা, সরলতা ও সরসতা যেন উহাদের প্রতি কাৰ্যে-প্রতি কথায়—প্রতি ইঙ্গিতে বিচ্ছুরিত হইতেছে। এই ফাড়ি হইতে আরও দূরে অগ্রসর হইলাম কিন্তু সেখানে

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৯
আর কোন লােকের বসতি দেখিতে পাইলাম না। শ্বেতকায় বা
‘ওয়াক্স-পাম গাছ
সেই অঞ্চলের স্বাধীন নানা বর্ণের লোক কাহার সহিত আর
আমার সাক্ষাৎ ঘটিল না।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক পূর্বে ভাবিয়াছিলাম যে এই সুবৃহৎ বনে না জানি কতই বড় বড় গাছ-গাছড়া দেখিতে পাইব কিন্তু ছয় গজের অপেক্ষা বেশী বেড়ের কোন গাছ আমার চক্ষে পড়িল না। গাছগুলির সেখানে মােটা হইবার উপায় নাই কারণ তাহা হইবার পূর্বেই সেগুলিকে কাটিয়া ফেলা অথবা আগুন দিয়া পােড়ান হইয়া থাকে। আকারে বড় না হইলেও গাছগুলি লম্বায় নিতান্ত অল্প নহে। যদি কোন পথিক বা পৰ্য্যটক, “মােরা” নামক বৃক্ষের গর্বোন্নত অত্যুচ্চ অগ্রভাগ দর্শনের জন্য ক্ষণকাল সেই স্থানে অপেক্ষা না করেন তাহা হইলে তাহার বৃথাই ওখানে যাওয়া—বৃথাই সকল কৌতূহল। মােরার এই অত্যুন্নত শীর্ষদেশের যখন পত্র-সকল বয়ােধৰ্ম্মে ঋলিত হয়—দৈব দুর্ঘটনায় যখন উহাদের অগ্রভাগ শুকাইয়া যায় তখন টোকান ( Toucan ) পাখী ঐ সমস্ত স্থলে বসিয়া কতই না আনন্দ অনুভব করে ; কারণ, এই বিচিত্র পাখী অত উচ্চে বসিয়া থাকিলে শিকারীরা ঐ সময় বন্দুকের গুলি ছুড়িলেও উহা তাহাদের গায়ে লাগে না। কত উচু সেই গাছের মাথা ! বিস্তীর্ণ এই বনের বৃক্ষসমূহ মানুষের কত কাযে লাগে। গাছগুলি যেন বনের সুশােভন অলঙ্কারের মত। এখানকার সব গাছের সম্বন্ধে যদি কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ করিয়াও বলা যায় তাহা হইলে উহাতে একখানি সুবৃহৎ গ্রন্থ হইতে পারে। এখন, “গ্রীণ-হার্ট” বৃক্ষের কথা বলিতেছি। শক্ত-সহজে ভাঙ্গে বা নষ্ট হয় না। “হ্যাকিয়া” গাছ দেখিয়া এই গাছ খুব দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক বিস্মিত হইয়া গেলাম। কি শক্ত কাঠ! দেশে মেহগনী গাছ দেখিয়াছিলাম। এখানে দেখিলাম “দুকালা বালী." মেহগনীর অপেক্ষাও উহা চমৎকার। আবলুস বা ইবনী এবং “লেটার- উড” বলিয়া এক বিচিত্র গাছও দেখিলাম। “লে কাষ্ট” গাছে দক্ষিণ আমেরিকার জাগুয়ার, টেপীর ও হরণড-স্কিমার বার্নিশ, প্রস্তুতের জন্য এক প্রকার ধূনা জাতীয় জিনিষ জন্মে। “অয়াওবা” গাছ হইতে সুরভি ধূপ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যেখানে চাষ আবাদ চলিতেছে সেখানে এই সব গাছ দেখিলাম। আবার সাবা শৈলেও ঐ সমুদয় দেখা গেল। প্রায় সকল স্থানেই নানা

১২
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
জাতীয় কত সুন্দর সুন্দর গাছ ! ডাচ, গায়নার সর্বত্র প্রকৃতিরাণী
গাছ ও লতা পাতা দিয়া সাজাইয়া রাখিয়াছেন। আপেল গাছের
মত “ফিগ” গাছে এক একটা বনের সৃষ্টি করিয়াছে। সেখানে
নানা জাতীয় পাখী বসিয়া, মনের আনন্দে ঐ সকল সুমিষ্ট পক্ক ফল
ভক্ষণ করিতেছে আর গান গাহিতেছে। “বুস্ রােপ” বা দড়িগাছ
নামে এক রকম গাছ দেখিলাম । ঐগুলি দিয়া স্থানীয় লােকেরা
ভারী ভারী কাঠ ঠেলিয়া তোলে বলিয়া শুনিলাম। এ গাছ
ডেমেরারা ভিন্ন অন্যত্র তেমন দেখা যায় না। বড় বড় গাছের
গায়ে মানুষের দেহের মত মােটা মােটা এই গাছগুলি কার্ক-স্কুপের
( Cork-Screw ) মত জড়াইয়া ইহাদের মাথা সেই আশ্রিত
গাছগুলির উপর বাড়াইয়া দিয়াছে। কতকগুলি আবার নীচের
দিকে বট গাছের ঝুরির মত, মাটি পৰ্যন্ত নামিয়াছে। গাছের
নীচে একটাও ঘাস দেখিতে পাইলাম না—একেবারে পরিষ্কার
—কেবলমাত্র দু' একটা ঝােপড়া ও ছােট ছােট গুল্ম। গাছের
পাতা ও মরা গাছ পড়িয়া পচিয়া থাকে এবং এইজন্যই বােধ হয়
এখানকার মাটির উর্বরাশক্তি এত বেশী ।
দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিল। চারিদিকে নানা-
রকমের জানোয়ারের দল। ভীত যে না হইলাম তাহাও নহে,
কিন্তু জানােয়ার দেখিবার কৌতূহল বিশেষ বলবান্ হইল।
মনে
মনে ভাবিতে লাগিলাম—
“অয়ি সন্ধ্যে !
কি
সুন্দর
প্রকৃতি তােমার।
পুণ্য, প্রেম, দয়া, ভক্তি হৃদে প্রবাহিত,
~

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক । ধাবিত মানব প্রাণ স্বর্গ অভিমুখে ; ভীত, ত্রস্ত পরাণেও বাড়ায় সাহস, নিবেদিতে বিভূপদে আকুল কামনা ; নিজগুণে প্রেমময় পূরান বাসনা। কোথায় ছিল এতক্ষণ উহারা লুকাইয়া ? এতক্ষণ দিবালােকে উহাদের সামান্য পদচারণও ত শুনি নাই। তা ধারের জীব উহারা-আঁধারেই আহারীয় সংগ্রহ করে—আঁধারেই এ উহাকে মারিয়া খায়। কি বিকট শব্দ! আমার পরিধেয় বস্ত্র দি বিশেষ- ভাবে পরিধান করিয়া একটী ঘন পত্রপল্লবচ্ছাদিত উচ্চ বৃক্ষে আরােহণ করিয়া উহার শাখায় স্থির হইয়া বসিলাম। আমি সমস্তই দেখিতে লাগিলাম কিন্তু আমাকে কোন জানােয়ারই দেখিতে পাইল না। রাত্রে আর নামিব না--গাছেই রাত্রিবাস করিব –দেখিব কি কি জানােয়ার---কত জানােয়ার যাতায়াত করে —কোটা কি করে । মস্ত বড় একটা সুযােগ পাইলাম বলিয়া মনে হইতে লাগিল। দিনের বেলায় দেখিয়াছিলাম দলে দলে “পেকারী” বা শূকরাকার চতুষ্পদ জন্তু চড়িয়া বেড়াইতেছে। শুনিয়াছিলাম, এই জন্তু দক্ষিণ আমেরিকার নিজস্ব এবং যখন ইহারা এখানকার বনে বাহির হয় তখন এক এক দলে থাকে তিন-চার শত করিয়া । সময় সারা বন খুঁজিয়া তাহারা তাহাদের প্রিয় কোন গাছের বা কোন ফলের বীজ বাহির করে ও মনের আনন্দে ভক্ষণ করে। ঐ অঞ্চলে যে সকল রেড-ইণ্ডিয়ানেরা বাস করে, তাহারা এই ১৪ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক সময় বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করিয়া উহাদিগকে বধ করে। তীরের আঘাতে পেকারীরা কিছুদূর পর্যন্ত--পঞ্চাশ বা একশত পা গিয়া, এদিকে ওদিকে ঘূরিয়া, শেষে পড়িয়া মারা যায়। রেড ইণ্ডিয়ানেরা উহাদের মাংস খায়। লাল রংয়ের বানরের কিচ কিচ, শব্দ অনেকবার শুনিয়াছিলাম। কটা রংয়ের বানর, “বীসা,” “স্যাকা উইঙ্কী” প্রভৃতিকে এক গাছ হইতে অন্য গাছে লাফাইয়া দৌড়াদৌড়ি করিতেও দেখিয়াছিলাম। তাহাদের সেই বিচিত্র গতি ভঙ্গীতে দর্শক-মাত্রই মহা-আনন্দ অনুভব করেন। রেড-ইণ্ডিয়ানগণের নিকট শুনিয়াছিলাম যে ওখানে “পােল্-ক্যাট” বলিয়া এক জাতীয় খেক-শিয়াল আছে ; সেগুলি তাহাদের পালিত মােরগ, হাঁস প্রভৃতির উপর ঘন ঘন আক্রমণ করিয়া যৎপরােনাস্তি বিরক্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করিয়া থাকে। তৎস্থানবাসী রেড-ইণ্ডিয়ানগণ “ওপােসা”, “ওয়ালা”, “স্যালেম- পেন্টা” প্রভৃতি মারিয়া খাইয়া থাকে। লম্বা ও ঝােপড়া লেজওয়ালা ছােট ও বড় “এণ্টবেয়ার”গুলিকে আঁকে ঝাঁকে বন-পিপীলিকা বা “উড-য়্যাণ্টের” বাসার উপর দিনের বেলায় দেখিয়াছিলাম। এগুলিকে অন্য কোথাও দেখা যায় না; ইহারা এখানকারই বিশিষ্ট-প্রাণী। “আরমাডিলােস্”, “পরকুপাই” বা সজারুগুলিকেও আমার কাছ দিয়া ঘূরিতে দেখিয়াছিলাম। এখানে “শ্লথ” বলিয়া এক বিচিত্র জীব দেখিলাম। ইহারা মােটা মােটা পাতা খায়, কি বিশী ইহাদের চেহারা! অষ্টপ্রহর

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
ইহারা করুণস্বরে চীৎকার করিতেছে--কাহারও কোন অনিষ্ট
করে না। ইহাদের চারিটী পাকস্থলী, পায়ে তালু বলিয়া কোন
কিছুই নাই ; পায়ের আঙ্গুলগুলি উহারা স্বতন্ত্রভাবে নাড়িতে পারে
। ইহাদের গায়ের লোমগুলিও চমৎকার—মােটা—দেখিলে
•
শ্লথ,
মনে হয় যেন শীতের বাতাসে কতকগুলি ঘাস মরিয়া পড়িয়া
রহিয়াছে। পা-গুলি ছােট, কোন অঙ্গের সঙ্গে যেন পায়ের কোন
সংস্রব নাই। শুনিয়াছি হাতীর চল্লিশটী পাঁজরা আছে।
এগুলির কিন্তু দেখিলাম ছ'চল্লিশটা পাঁজরা। থাবাগুলি অদ্ভুতভাবে
গঠিত-বেজায় লম্বা লম্বা।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক মনে পড়িতেছিল কতকগুলি অদ্ভুত, নানা বর্ণের পাখীর কথা। প্রকৃতি যেন এই পাখীগুলির দেহে তাহার বর্ণ-সৃষ্টির কৌতূহল পূর্ণ করিয়াছেন। কত রং বেরংয়ের পাখী! স্কারূলে রংয়ের “কার লিউ”, “আরারা”, “ক্রাবিয়ার”, “স্যান্ড পাইপার”, “প্লভার”, “পুরিল”, “ফ্লেমিঙ্গো”, “প্যারাকুয়ে” প্রভৃতি পাখী দেখিয়া কতই না আনন্দ হয় ! ফলের গাছে দেখিলাম “পাই”, “গ্যালিনাসিয়া”, “কলাম্বাইন”, “ল্যাসেরি” ঝাঁকে ঝাঁকে বসিয়া আছে। এক স্থানে দিনের বেলায় ঘূরিতে ঘূরিতে দেখিলাম, একটা ছাগল পড়িয়া রহিয়াছে—একটা বাঘ মারিয়াছে। বােধ হয় কাহারও নিকট হইতে তাড়া পাইয়া ও ছাগলের রক্ত না খাইয়াই বাঘটা মাটির উপর বড় বড় থাবার দাগ রাখিয়া চলিয়া গিয়াছে। কতকগুলি শকুনি আসিয়া দল পাকাইয়া বসিয়া রহিয়াছে—মতলব ঠিক করিতেছে—আর কতকগুলি ছাগলটাকে ছিড়িয়া, ঠোক্রাইয়া খাইতেছে ; বিকট শব্দে সে স্থানটীকে মুখরিত করিয়া তুলিয়াছে—পরস্পর মারামারি করিতেছে— একজনকে তাড়াইয়া অন্যে খাইবে সেইজন্য যেন মহাব্যস্ত। দিনের বেলায়, সেই গভীর অরণ্যে একজন লােকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হইয়াছিল ; সে আমাকে জানাইল যে এখানে এক রকম রক্ত-শোষা বাদুড় বা “ভ্যাম্পায়ার” আছে, সেগুলি নাকি বড় মারাত্মক। সন্ধ্যার আঁধার নামিতে না নামিতেই উহারা গাছের ফাটল হইতে বাহির হইয়া খাদ্যান্বেষণে ধাবিত হয়। নদী ও জলাশয়ের তীরে তীরে ঘূরিয়া বেড়ায়। যে সমস্ত লােক দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ১৭ ঘটনাক্রমে তাহাদের কবলে পতিত হয় তাহার কিছুতেই বুঝিতে পারে না যে কখন এই রক্ত-শোষারা তাহাদের রক্ত শুনিয়াছে-- পােষাক-পরিচ্ছদ রক্তাক্ত হইয়া যায়। কেবল মানুষ কেন, উহাদের হাতে পশুদেরও রক্ষা নাই। এই নৈশ অস্ত্র-চিকিৎসক কি আশ্চর্য দক্ষিণ আমেরিকার রক্ত-শােষা বাদুড় বা ভ্যাম্পায়ার’ হয়। প্রণালীতেই যে রক্ত-শােষণ করে তাহা ভাবিলে বিস্মিত হইতে যে সমস্ত নিদ্রিত জীব-জন্তুর রক্ত উহারা শােযে তাহাদের ঘুম-ভাঙ্গা ত দূরের কথা, আরও গভীরভাবে তাহারা ঘুমাইয়া পড়ে। আমাদের দেশের বাদুড়ের চেয়েও এরা বড়। বড় রক্ত- শােষা ছাড়া আরও একটু ছােট এক জাতীয় রক্ত-শােষা এই ২ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ডেমেরার অঞ্চলে দেখা যায়। পাখা মেলিলে, এক পাখা হইতে আর এক পাখা পৰ্যন্ত উহাদের বিস্তৃতি দুই ফিটের বেশী নয়। সরীসৃপ শ্রেণীর মধ্যে দেখিলাম যে প্রায় সকলগুলিই বড় বড়। পাহাড়ের ফাটলে অথবা জলা জায়গায় সেগুলি বেশী দেখিতে পাওয়া যায়। “ক্যানা-নাম্বার-থি” নামক একটা জায়গায় “র্যাল-স্নে” নামক এক জাতীয় সাপ দেখিলাম। সন্ধ্যার পর গাছের ডালে বসিয়া থাকিবার সময় মনে হইয়াছিল যে এই সাপের একটা যদি এই গাছে উঠে এবং আমাকে কাড়াইয়া দেয় তাহা হইলে কি হইবে? যে রেড-ইণ্ডিয়ানটীর সঙ্গে দিনের বেলায় আলাপ হইয়াছিল সে বলিয়াছিল, ‘ক্যামৌডী’ বলিয়া এক রকম সাপ আছে, সেগুলি ৩০/৪০ ফিট লম্বা। বিষ নাই বটে কিন্তু যে সকল জন্তু-জানােয়ার সেগুলির কাছ দিয়া যাতায়াত করে তাহাদের বড়ই বিঘ্ন জন্মায়। স্প্যানিয়ার্ড’ বলিয়া এক অদ্ভুত চেহারার সাপ আছে ; ‘অরুশােকা’ নামক স্থানে সেগুলি থাকে এবং প্রায় ৭০/৮০ ফিট, লম্বা হয়। বড় বড় জংলি-পশুকে সেগুলি মােচ ডাইয়া মারিয়া ফেলে। এই ভীষণ সাপগুলিকে সকলে নাম দিয়াছে ‘ম্যাটা উনাে’। স্থানীয় ভাষায় এই ম্যাটা উনাের অর্থ হইতেছে, ষাঁড়-মারা’।” ঐ লােকটী “হুইপ” নামে আর একজাতীয় আশ্চৰ্য্য সাপের কথা বলিয়াছিল। সবুজ রংয়ের সে সাপগুলাে, দেখিতে যেন এক একটা প্রবালের মত। প্রবালের উপর কাল ও লাল রংয়ের দাগ দিলে ঐগুলি যেমন দেখিতে হয় ইহাদের পা-ও তদ্রুপ।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ঝােপ হইতে অপর ঝােপে যখন উহারা গড়াইতে গড়াইতে গমনাগমন করে তখন উহাদের হাতে তুলিয়া লওয়া যায়। ইহারা কামড়ায় না বা কোনরূপ অপকারও করে না! মেটে রংয়ের “ল্যাবারি” সাপ আর একটা অদ্ভুত-প্রাণী। মাটির ও সাপের রংয়ে কোনই পার্থক্য বােঝা যায় না। আট ফিট পর্যন্ত এগুলি লম্বা হয়। দংশন করিলে অল্প কয়েক মিনিটেই ইহার বিষক্রিয়া সাঙ্ঘাতিক হইয়া দাড়ায়। “কৌনাকোচী” সাপ বনের রাজার মত নির্ভয়ে বেড়াইয়া বেড়ায়। মানুষ বা পশু তাহাদিগকে দেখিয়া সভয়ে পলায়ন করে। ভয়ানক বিষধর এই সাপগুলি। এগুলিকে সাধারণতঃ চৌদ্দ ফিট পর্যন্ত লম্বা হইতে দেখা যায়। শুনিলাম, নদীর জলে দুই ফিট হইতে বার ফিটু পর্যন্ত লম্বা একজাতীয় সাপ ভাসিয়া বেড়ায় ; জলের উপর উহারা মাথা তুলিয়া, লুকাইয়া থাকিয়া, ঘােরাঘুরি করে এবং ইহাদের নাম “ক্যাম্যান”। দক্ষিণ আমেরিকার এই বিচিত্র প্রাণী-রাজ্যের কথা শুনিয়া হৃদয়ে অনির্বচনীয় আনন্দ লাভ করিয়াছিলাম। এত বিভিষিকাময় স্থানে—রাত্রে কেবলমাত্র গাছের ডালে ঝুলিয়া—প্রতি মুহুর্তে জীবনের আশঙ্কা লইয়াও আমার কৌতুহলী মনে তেমন কোন দুঃখ হয় নাই। সারাদিন ঘুরিয়াছিলাম—সঙ্গেও যথেষ্ট খাদ্য ছিল -খাইয়াছিলামও খুব –রাত্রে ঘুম আসিতে লাগিল, কিন্তু ঘুমাইলে যে কিছুই দেখিতে পাইব না! যতক্ষণ সন্ধ্যা হয় নাই ততক্ষণ অবধি দেখিয়া-শুনিয়া কৌতুহলের অবধি ছিল না। রাত্রে আবার রাত্রিচরদিগকে দেখিব, সে কি কম আনন্দ ! জীবনে

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
ত কতই ঘুমাইয়াছি—যে কয় বৎসর বয়স হইয়াছে তাহার অর্ধেক
গিয়াছে ঘুমে—দেখি নাই সেই সময় কিছুই—আজিকার এই
শুভ-রাত্রেও কি ঘুমাইব ? না-না—তাহা হইবে না। কিন্তু
ঘুম ত বারণ মানে না—চোখ, যে বুজিয়া আসে— চাহিতে
পারিতেছি না—শরীরে এ কি ক্লান্তি !
এমাজন্ নদীর স্রোতে আনীত বৃহং বৃক্ষ ও কুমীর সকল
মনের বলে দেহেও বল আসে—দেহেরও উত্তেজনা জন্মে।
ঘুমাইব না—কিছুতেই ঘুমাইব না বলিয়া দৃঢ়—সুদৃঢ় পণ করিলাম।
নিস্তব্ধ—কোন সাড়া নাই, শব্দ নাই। মনে পড়িতে লাগিল

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ২১ একে একে দিনের সকল দেখা জীব-জন্তু, জানােয়ার, গাছপালা, লতা-পাতার কথা। এই ডেমেরার কি বিচিত্র স্থান । দ্বিপ্রহরে সেই বনের মাঝখানে লােকটীকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলিয়াছিল, “ঐ যে শব্দ শুনিতেছেন—ঐ শব্দ করিতেছে ‘ম্যা’ বা ‘টিনামৌ” । কি সুদীর্ঘ কি বিষাদ-ভরা বাঁশীর করুণ তানের মত সেই ধ্বনি” ! “টোকানের” শব্দ, “পি-পি-ও” পাখীর কর্কশ ডাক মাঝে মাঝে শুনা যাইতেছিল। “ক্যাম্পানেরো”র শব্দে কোন পথিক অন্যমনস্ক থাকিতে পারে না। তিন মাইল দূর হইতে শুনা যায় সেই বিকট-ধ্বনি। গির্জার ঘণ্টার শব্দের মত ৪৫ মিনিট পরে পরে এই বরফের মত শাদা পাখীর কর্কশ কণ্ঠধ্বনি দূর হইতে বায়ু তরঙ্গে ভাসিয়া আসিয়া কাণ ঝাল-পালা করিতেছিল। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, প্রভাতে ছয়টা হইতে নয়টার মধ্যে সব পাখীর চেঁচামেচি শুনিয়াছিলাম; যেন সকলে বনে একটা ডাকাডাকি করিয়া, কে কোথায় কি করিতে যাইবে ঠিক করিয়া লইল। তাহার পর সমস্ত বনের মধ্যে আর তেমন চেঁচামেচি নাই। এগারটা হইতে তিনটার মধ্যে সকল স্থানে দ্বিপ্রহর রজনীর ন্যায় একেবারে গম্ভীর-একেবারে নিস্তব্ধ বােধ করিয়াছিলাম। ক্যাম্পানেরাে আর পি-পি-ওর ডাক ভিন্ন অন্য কোন পাখীর ডাক তখন শুনি নাই। যখনকার কথা বলিতেছি তখন গ্রীষ্মকাল। প্রখর রৌদ্র- প্রখর রৌদ্র-সূৰ্য্যদেব যতই খরতর কিরণ ঢালিতেছিলেন ততই পাখীরা অস্থির হইয়া উঠিতেছিল- শরীরে যেন উহাদের আর সেই তাপ সহ্য হইতেছিল না। সেই ০

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
বনের যে অংশে
=
প্রভাতে উহারা একে একে যথাসম্ভব খাইয়া
ঘন-পাতাওয়ালা গাছপালা—অপেক্ষাকৃত শীতল ছিল সেই অংশে
উড়িয়া, চলিয়া যাইয়া, রৌদ্র হইতে আত্মরক্ষা করিতে চেষ্টা
করিতেছিল ; সন্ধ্যার শীতল বাতাস বহিলে—সূর্যের তেজ
মন্দীভূত হইলে—আবার নিজেদেব বাসায় ফিরিয়া আসিবে।
রক্তশােষা-বাদুড়, “গােট-সাকার” বা ছাগল-শােষক সারাদিন
তাহাদের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন কোটরে বাস করিয়া, অনাহারে
থাকিয়া সন্ধ্যার প্রাক্কালে বাহিরে আসিতেছিল। কত বিচিত্র
রকমের ভকর্ণ বধির হইয়া যাইতেছিল তাহাদের সেই কর্কশ
শব্দে। পেচক, গােট,-সাকার প্রভৃতি সারারাত্রি যেন খাবারের
জন্য কাঁদিয়া বেড়াইতেছিল। কোথায় পাইবে খাদ্য সেই আঁধারে
সেই অরণ্যে ? কিন্তু পেট তাহা শুনে না-খাদ্য যেমন করিয়াই
হউক জোগাড় করিতেই হইবে। যে সব পােকা, মাকড় উড়িয়া
যাইতেছিল অথবা ছােট ছােট সরীসৃপ মাটি দিয়া যাইতেছিল
তাহাদের ধরিয়া উহারা খাইতেছিল—যে কোন উপায়ে উদরপূর্তি
করিতেছিল। কাহাকে মারিয়া কে খায়-কি কাণ্ড !
কিছুক্ষণ পূৰ্বে—বেলা তখন পড়িয়া আসিয়াছিল—শুনিয়া-
ছিলাম সেই রেড মাঙ্গীর বা লাল বানরের করুণ কণ্ঠস্বর। যেন
কতই বিপদে পড়িয়াছে উহার। “হাউটাউ” পাখীর সেই ঘন
বনের অভ্যন্তর দেশ হইতে আগত হাউটাউ, হাউটাউ শব্দ যেন
সন্ধ্যার আরতির ঘণ্টা-ধ্বনির মত কাণে বাজিতেছিল। প্রভাতে
শুনিয়াছিলাম ম্যাম্ পাখীর শব্দ ; “বাের্ট-বি”, “প্যাটাকা”

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
“ম্যারৌরী”র কণ্ঠ-ধ্বনিতে বুঝা যাইতেছিল যে উহারা পূৰ্বাকাশে
উড়িতেছে। স্ব স্ব কণ্ঠস্বরে “প্যারট,” ও “প্যারাকুয়েট” নিজেদের
আগমন-বাৰ্তা ঘােষণা করিতেছিল।
গাছ হইতে শুনিতে লাগিলাম বন্য বিঝির বিকট ও একঘেয়ে
শব্দ। “বেটে-রোরা” সংখ্যায় যে কত তাহার ঠিক ছিল না।
.
গাছের ডালে বসিয়া আছে দক্ষিণ আমেরিকার ‘বাে-বি, মাটিতে শুইয়া
ম্যানেটি, লম্বা-পা ও দীর্ঘ-চঞ্চু জ্যাবিরু এবং গাছের মধ্যে ক্যাপিবার।
এই পােকাগুলি মানুষ, পশু-পাখী প্রভৃতিকে বিশেষ বিরক্ত করিয়া
থাকে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে এখানে:-এই ডেমেরারার
তৃতীয় দ্বীপ পার হইবার পর আর তেমন মশক ও “স্যাৎ ফ্লাই”
দেখা গেল না।

২৪
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
“হেনাকোই”, “রেন”, “থাস” প্রভৃতি পাখীর শৰু শুনিতে
লাগিলাম। কেন যেন আমার মনে সহসা ভগবানের কথা জাগ্রত
হইয়া উঠিল। স্বপ্নবিষ্টর মত বারংবার মনে হইতে লাগিল যেন
পাখীগুলি সেই বিশ্ব-রচয়িতার গুণগান করিতেছে আর আমাকে
বলিতেছে, “তুমিই শুধু রইলে বাকী ?” সেই জন-মানবহীন নিঃসঙ্গ
অরণ্যে ভূচর আমি, বৃক্ষোরোহী হইয়াছি—শূন্যে দোদুল্যমান হইয়া
রহিয়াছি। বিধাতার অপূর্ব রচনা, নানা কৌশল এবং তাহার
সৃষ্ট সেই বিবিধ-বিচিত্র পশু-পক্ষী ও কীট-পতঙ্গ দর্শন করিয়া কত
ভাব-তরঙ্গে যে তরঙ্গায়িত হইতে থাকিলাম তাহার ইয়ত্তা নাই।
মনে পড়িতে লাগিল সেই গানটী -
“দ্বীপ জেগে ওঠে পাথার-জলে তোমার চরণ-ছনে,
নীচে গাঙচিল সিন্ধু-কপােত তােমারি সুরে আনন্দে।
মুকুতা কঁদিছে হার হতে ওগাে তােমার বেণীর বন্ধে,
মলয়ে শুনেছি তােমার বলয়-চুড়ির রিণিঠিনি।
সাগর-সলিল হয়েছে সুনীল তােমার তনুর বর্ণে
তােমার আঁখির আলো ঝলমল দেবদারু-তরু-পর্ণে
ঐ অস্ত-তপন হয়েছে রঙ্গীন তােমার হাসির স্বর্ণে
শঙ্খধবল বেলা ভূমে খেল সাগর-নটিনী।”
গাছের উপর বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছিলাম। চারিদিকে অন্ধকার
-নীচে জানোয়ারের দল কিবি করিতেছে ; গাছে যদি কোনটা
উঠে ? কত রকম সে সব প্রাণী ! জানিনা কাহার হাতে, কখন

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ২৫ * : •• কি ভাবে, প্রাণ যাইবে—কি ভীষণ এ স্থান! সহসা দিল মুখরিত করিয়া ডাকিয়া উঠিল কয়েকটা পেঁচক ; কি বিশ্রী উহাদের গলার শব্দ ! মােটেই ভাল লাগিতেছিল না—এক একবার বেজায় রাগ হইতেছিল--যদি সম্ভব হই, তাহা হইলে তীর ছুড়িয়া মারিয়া ফেলিতাম। হাতে তীর-ধনুক ছিল না ; সেই ‘রেড-ইণ্ডিয়ান্ বন্ধুটীকে যদি বলিতাম সে হয়ত সাথী হইত, তাহা হইলে পেঁচকগুলি এত বিরক্ত করিতে পারিত না; কিন্তু অসহ্য হইলেও আমাকে সহ্য করিতেই হইবে, কোন উপায় নাই। মনে হইল কবি ওভিডের সেই কবিতা। ওভিড, বলিয়াছেন, “এক সময়ে এই পেঁচকদের বড় রূপ ছিল ; রূপের গরবে তাহারা নিন্দা করিয়াছিল অন্য যত সব মানুষকে। পুরাকালের ‘আফ্রিকা ও ‘রেড-ইণ্ডিয়ান্ ক্রীতদাসগণই ছিল এই পেঁচকদের পূর্ব- পুরুষ। তাহাদের অহঙ্কার ও গর্বের জন্য ভগবান তাহাদের এই বিকট-মূর্তি ধারণ করাইয়াছেন এবং সেইজন্য এই বিকট-শব্দে মানুষকে জ্বালাতন করিতেছে। সারারাত ইহারা চীৎকার করে, ‘হুইপ-পুওর-উইল’, ‘উইলী-কাম-গো। কি বিকট শব্দ।” অত্যাচারীদের উপর প্রতিহিংসা লইবার জন্যই যেন এই কর্কশ-কণ্ঠ পেচকগণ সারারাত্রি-চন্দ্রালােকে বসিয়া-তাহাদের বাড়ীর নিকটে এমন বীভৎস চীৎকার করিতে থাকে। তাহা করুক্‌, কিন্তু আমার যে আর সহ্য হইতেছে না। এখন কি করি ? পট পটু করিয়া কাণের কাছ দিয়া উড়িয়া যাইতেছিল আর ডাকিতেছিল দেখিলাম অনেক, শিখিলামও অনেক। পারি ত সময়ান্তরে সব

২৬
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
বলিব।
এক রাত্রে যাহা দেখিলাম, তাহা সারাজীবনেও দেখি
নাই—নানা বিষয়ের এত ভাবনা সারা-জীবনে কখনও ভাবি নাই।
একবার মনে হইল—কেন জানি না—কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সেই
“খাচার পাখীর” গানটা। খাঁচার পাখী ছিলাম আমি, আসিয়াছি
এই মুক্ত পাখীদের কাছে। মিলিতে পারিতেছি না কিছুতেই
ইহাদের সঙ্গে।
অথচ মিলিতে ইচ্ছা হইতেছে-
“দু’জনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারি,
বুঝাতে নারি আপনায়।
দু’জনে একা একা ঝাপটি মারি পাখা
কাতরে কহি, কাছে আয় ॥”
আবার ভাবিতেছিলাম এমন কোন এক স্থানে—এমনই কোন
ভাবে পড়িয়া-রবীন্দ্রনাথ গাহিয়াছিলেন কি না-
=
“আমি একলা চলেছি এ ভবে।
আমার পথের সন্ধান কে কবে ?”
কিন্তু তিনি ত সাহস হারান নাই—আমিই বা কেন হারাইব ?
মনে পড়িল সেই গানের শেষের পংক্তিগুলি-
“ভয় নেই, ভয় নেই,
যাও আপন মনেই,
যেমন, একলা মধুপ ধেয়ে যায়
কেবল ফুলের সৌরভে।”

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
২৭
?
কোনক্রমে রাত্রি প্রভাত হইল। উমার অরুণের অভয় বৃক্ষ-বল্লরী
যেন হাসিয়া উঠিল। প্রভাতী পাখীরা উদ্বোধন সঙ্গীত করিতে
লাগিল। সারারাত্রি ঘুম হয় নাই, কিন্তু শরীরে তেমন গ্লানি,
তেমন জড়তা বােধ হইল না। ধীরে ধীরে—অতি সন্তর্পণে গাছ
হইতে নামিলাম—নীচে কোন জানোয়ার দেখিলাম
দেখিলাম, একজন রেড-ইণ্ডিয়ান্ সেই জায়গায় আসিয়াছে---
কেন যেন ঘুরিয়া বেড়াইতেছে । তাহাকে দেখিয়! মনে বড়ই
আনন্দ হইল।
নিকটে মানুষ নাই বলিয়া জানিতাম ; কিন্তু এত নিকটে,
এত সকাল বেলায় কেমন করিয়া এ এখানে আসিল ? মানুষটীর
চুলের দিকে দৃষ্টি পড়িতেই দেখিতে পাইলাম যেন যত্ন করিয়া
উহা সে বাঁধিয়াছে ; কি দিয়া যেন সে তার সারা গা লাল
রং করিয়াছে। কি চমৎকার মানাইয়াছে ! কাছে গেলাম—সে
কিছু বলিল না—সকৌতুকে দেখিতে লাগিল আমার বেশভূষা,
আমার মূর্তি! তার গায়ের সেই রং হইতে এক প্রকার অতি
মনােহর গন্ধ পাওয়া যাইতেছিল। পরে শুনিয়াছিলাম, হায়াওয়া
( Hayava) দিয়া ঐ গন্ধ করিয়াছে। দেহখানি এইভাবে
চিত্রিত করায় তাহাকে অতি বিচিত্র, সজীব ও সতেজভাবাপন্ন
দেখাইতেছিল! গলায় ছিল নেকলেস। তােমরা হার পর সােনার,
মুক্তার, হীরার—তাহারা পরে নিজেদের হাতের হত্যা করা জংলা
শূকরের
দাতের। সে হাতে আংটি পরিয়াছে ; বাম বাহুতে,
কঁাধে ও কনুইয়ের মাঝখানে পরিয়াছে
এক অদ্ভুত রকমের

২৮ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক অলঙ্কার। তাহারা সন্ধ্যায় নদীতে স্নান করে এবং সকালে রং দিয়া দেহ সাজায়। নিজেদের প্রসাধন তাহারা এভাবেই করিয়া থাকে । সে, কি এক আশ্চর্য্য রকম ইঙ্গিত করিল ; ভয় করিয়া অার কি করিব ? জীবনের মায়া থাকিলে আর কে ওরূপ বনে প্রবেশ করে ? বন দেখিতেই ত গিয়াছি। একটু পরে লােকটীর ইঙ্গিত বুঝিলাম -সে যেন তাহার সঙ্গে যাইতে বলিতেছিল। অনুসরণ করিলাম। হাঁটিতে হাঁটিতে সেই বনের ভিতর প্রবেশ করিলাম। সেখানে দেখিলাম, একখানি জীর্ণ কুটীর—গাছের পাতায় আর লতায় ছাওয়া। সে আমাকে বসিতে ইঙ্গিত করিল। ফল আনিয়া খাইতে দিল। তাহার আতিথ্যে বিস্মিত হইলাম -ভীতও হইলাম। মারিয়া, কাটিয়া খাইবে না ত ? আরও একটী রেড-ইণ্ডিয়ান আসিল-হারও চেহার। অদ্ভুত। সে তাহার হাতে করিয়া লইয়া আসিয়াছিল একটা মােমের বল। বলটী আনিয়া দিল আমার সঙ্গীর হাতে। দেখিলাম, তাহার পরিধেয়খানি শত ছিন্ন। হাতের ধনুটী তৈয়ারী কি যেন একটা ভাল কাঠের—সাদাসিদা—কোন কারুকার্য নাই। লােকটার মুখখানা দেহের অনুপাতে ছােট। কোন কিছুতেই যেন সে ক্ষেপ বা কিছুতেই তাহার যেন কোন মায়া-মমতা ছিল না। এতটুকু যত্ন ছিল না দেহে, পরিধেয়ে, কথায়, চলন-ভঙ্গীতে বা আহারে। মাথার চুলগুলি অতিদীর্ঘ—অত্যন্ত কৃষ্ণবর্ণ--অযত্নে জটায় জটায় গুলফদেশাবধি ছড়াইয়া পড়িয়াছে। দেহে কোনও অনুরাগ নাই —আমার সঙ্গীটীর মত রং দিয়া সে নিজ দেহ চিত্রিত করে নাই।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
সেই লােকটা কিছু চাহিল না বা বলিল না; কিন্তু কি
আশ্চৰ্য, আমার সঙ্গীকে দেখিলাম যে ঐ অদ্ভুত লোকটীকে সে
'বিশেষ যত্ন করিল। বসিতে দিয়াই সে তাহার আহারের জন্য
আনিয়া দিল কয়েকখানা “ক্যাসাভা ব্রেড” (Cassitva bread)
আর কয়েকখানা সিদ্ধ মাছ। দেওয়ামাত্র “প্রাপ্তি মাত্রেণ
ভয়েৎ” নীতির সে অনুসরণ করিল, না জানি তাহার কত
ক্ষুধা পাইয়াছিল! খাওয়া শেষ হইলে, এতটুকুও সে বিলম্ব
করিল না, উঠিয়া চলিয়া গেল। কোন উপকার সে যে পাইল
বা খাইতে দিল বলিয়া কোনরূপ কৃতজ্ঞতার লক্ষণ সে তাহার
কথা-বার্তা, ভাব-ভঙ্গীতে একটুও দেখাইল না। যেন ঔদাসীন্যে
ভরা তাহার প্রাণ--সংসারের সে যেন কোনই ধার ধারে না।
আকার ইঙ্গিতে কথা কহিতে চেষ্টা করিতে লাগিলাম ;
উহাদের ভাব ও ভাযা ইতঃপূৰ্বে কিছু জানিয়া লইয়াছিলাম।
আমার সঙ্গীটীকে আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ লোকটা কে ?
কেনই বা আসিয়াছিল? কেনই বা উদাসীনের মত বসিল,
খাইল আর চলিয়া গেল ?”
সঙ্গী বা হােষ্ট ( host ) মহাশয় বলিলেন, “ও লােকটার
ছেলে বা মেয়ে নাই, এমন কি, একটি বন্ধু-বান্ধবও নাই।
কতদিন আমি উহাকে বলিয়াছি আমার বাড়ী থাকিতে কিন্তু ঐ
সব কথায়, সে একটুকুও কাণ দেয় নাই। বনে বনে ঘোরে
এবং মধুমক্ষিকার যত্ন-নির্মিত মধু-চক্র হইতে মধু লুণ্ঠন করিয়া
পান করে; বনের ফল, মূল খায়। উদ্দাম, অবাধ উহার গতি

৩০
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
বিচিত্র ঔদাসীন্যে ভরা উহার জীবন। দুইটা পাথর ঠুকিয়া বনে
সে জ্বলায় আগুন—শিকার করিয়া জীব-জন্তুর মাংস পােড়াইয়া
খাইয়া সে ঘুরিয়া বেড়ায়। যেদিন কিছু না পায় সেদিন ঘুরিতে ।
ঘুরিতে সামনে যে কুঁড়ে দেখে তাহাতেই সে ঢুকিয়া পড়ে।
লজ্জা নাই—সঙ্কোচ নাই। খাইবার জন্য কখন সে বলে আবার
কখনও না বলিয়াই খাইতে বসিয়া যায়। সকলেই উহার এ
ফল-সমেত কোকো গাছ
স্বভাব জানে। যাহার যাহা সাধ্য সে উহাকে তাহাই খাইতে
দেয়—খাইয়াই সে চলিয়া যায়। প্রতিদিন সে আসে না-হয়ত
মাসে একবার তাহার দেখা পাওয়া যায়। কেন সে এমন করিয়া

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
মনে
বেড়ায় আর কি জন্যই বা সে এমন উদাসীন হইয়া পড়িয়াছে
কেহ তাহা জানে না। বহুদিন ধরিয়া সে এমন নির্লিপ-উন্মাদ
হইয়াও উন্মাদের মত ঘুরিয়া বেড়াইতেছে ! কবে তাহার
এভাবের পরিবর্তন হইবে—কবে সে প্রকৃতিস্থ হইবে—যৌবনে
ত হইল না—বার্ধক্যে তাহার মতির স্থৈর্য আসিবে কিনা
কে জানে ?”
এই স্থানটীর নাম সাইমন্। এই
এই সাইম হইতে দূরবর্তী
একটী প্রস্রবণ পৰ্যন্ত কেবলমাত্র পাঁচটী মনুষ্য-নিবাস দেখিলাম ।
এইগুলি ছিল দুইটী নদীর ধারে আর তিনটী বনের মধ্যে।
একটা মনুষ্য-নিবাসে চারিটী হইতে আটটিী-মাত্র কুটীর।
হইল, এক এক একরের অর্থাৎ প্রায় তিন বিঘার বেশী নয় সেই
স্থানগুলি। এই সব জায়গার জঙ্গল কাটিয়া উহারা বসতি স্থাপন
করিয়াছে। চাহিয়া দেখিলাম, কয়েকটা কোকো, পেঁপে, কাপাস ও
পাহাড়ে কফির গাছ সেই বাড়ীগুলির এদিকে ওদিকে রহিয়াছে।
এখানে হঠাৎ একদিন সেই ঔরলী বিষের (vourali
poison ) অনুসন্ধান পাইয়া বড়ই আনন্দ হইল। কারণ দেশে
উহার সঠিক সংবাদ দিতে পারিলে গভর্ণমেন্ট হইতে বিশেষ
সম্মানিত পুরস্কার পাইব। একটা ওদেশের কুমড়ার মধ্যে উহা
ছিল। একজন রেড-ইণ্ডিয়ান্ বলিল, “ঐ বিষ দিয়া আমি
কতকগুলি বন্য-শূকর ও দুইটা টেপীর (Tapir) মারিয়াছি।”
কুমড়াটা দেখিয়া মনে হইল সত্যসত্যই লােকটা ঐ বিষ ব্যবহার
করিয়াছে। ঔরলী বিষের নামই শুনিয়াছিলাম--কখনও চোখে

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক দেখি নাই—কিন্তু এই মহার্ঘ-বিষের জন্য প্রাণ আকুলি-ব্যাকুলি করিতেছিল। কতদিন ভাবিয়াছি-কতদিন দেখিবার জন্য, কত ব্যগ্র হইয়াছি কিন্তু আজ সম্মুখে সেই বাঞ্ছিত-বস্তু। তন্ময়-চিত্তে বিষ-দর্শন করিতে লাগিলাম। অনেকদিন সাধ্য-সাধনার পর যদি বাঞ্ছিত বস্তু লাভ করা যায় তখন মনে যে কিরূপ আনন্দ হয় তাহা ভুক্তভােগী ভিন্ন অন্য কি করিয়া বুঝিবে ? যে লোকটার বাড়ীতে ঐ বিষ ছিল তাহাকে শীঘ্রই ডাকিয়া আনিলাম এবং অত্যন্ত আদর করিয়া কাছে বসাইলাম! • সঙ্গে অতি উত্তম ও উপাদেয় কতকগুলি মিষ্ট খাবার ছিল, সেগুলি তাহাকে খাইতে দিলাম । সে জন্মেও ওরূপ সুখাদ্য খায় নাই সুতরাং পাইবামাত্র খাইতে আরম্ভ করিল। সে যে কত সুখী হইল তাহা তাহার পরবর্তী কার্যাবলীতে সুস্পষ্ট প্রকাশিত হইল। তাহাকে যাহা করিতে ইঙ্গিত করিলাম সে তাহাই: মহা আনন্দে করিতে লাগিল। একটা কুকুর যাইতেছিল। হঠাৎ আমার মনে হইল এই কুকুরটার উপর বিষের শক্তি পরীক্ষা করিয়া দেখি না কেন। কুকুরটাকে একটা খাদ্য দিলাম। কুকুরটা খাইতে লাগিল। ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিলাম, একটা ঘায়ের মত দাগ কুকুরটার গায়ে দেখা যাইতেছে। কৌশলে ঐ ক্ষত স্থানে একটু ঐ বিষ লাগাইয়া দিবার জন্য সেই রেড-ইণ্ডিয়াকে বলিলাম। সে তাহাই করিল। কি আশ্চর্য্য! তিন-চারি মিনিটের মধ্যে বিষের ক্রিয়া আরম্ভ হইল। কুকুরটা সামনে যাহা কিছু দেখিল তাহাই শুকিতে লাগিল দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ৩৩ ক্ষতের দিকে অত্যন্ত উৎকণ্ঠার সঙ্গে বারংবার তাকাইতে লাগিল। একটু পরেই জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলিতে ফেলিতে হাপাইতে লাগিল এবং মাটিতে পড়িয়া গেল ; আর উঠিতে পারিল না । একবার ‘ঘেউ ঘেউ' করিয়া চেঁচাইয়াই নীরব হইল। কণ্ঠস্বর মৃদু ও অতি দুৰ্বল ; মুহূৰ্ত্ত যাইতে না যাইতেই তাহাও রুদ্ধ হইয়া গেল। চারি পায়ের মধ্যে মাথা গুজিয়া দিয়—একবার একটু ধীরে ধীরে উঠাইয়া কাৎ হইয়া পড়িয়া গেল। চক্ষুদ্বয় স্থির হইয়া গেল—দেহের প্রান্তভাগগুলি এক আধটু নড়িল— আর মাথা উঠাইতে পারিল না। বক্ষের স্পন্দন দ্রুত হইতে লাগিল—থাকিয়া থাকিয়া যেন দ্রুততর বােধ হইল। ক্রমে এক একবার থামিয়া থামিয়া, কিছুকাল পরে হৃদয়ের স্পন্দনমাত্র দুই একবার অনুভূত হইল—সমস্ত দেহ একেবারে নিস্পন্দ, অসাড় হইয়া গেল। পনের মিনিটের মধ্যে কুকুরের সব ফুরাইল। কি আশ্চর্য শক্তি ঐ মহা-বিষের। আমার ব্যাগে প্রচুর খাবার থাকায় কিছু খাইয়া লইলাম। অতিথিপরায়ণ রেড-ইণ্ডিয়ানেরাও কিছু ফল-মূল খাইতে দিল— ফলগুলি বেশ সুস্বাদু। কিঞ্চিৎ পরে পুনরায় যাত্রা করিলাম। এইবারকার যাত্রায় বড় আনন্দ হইল। এতদিনের সাধের সেই বিষ হাতে পাইয়াছি ; যত্ন করিয়া—খুব ভাল করিয়া-বাঁধিয়া লইলাম। বনের পাশ দিয়া পথ। কিন্তু কখন কখন মধ্য দিয়াও গিয়াছে। সেখানে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড এক একটা “ক্রাব, উড” গাছ দেখিলাম। এই পথ দিয়া রেড-ইণ্ডিয়ানেরা তাহাদের নৌকাগুলিকে (Canoe) !

৩৪
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
টানিয়া লইয়া নদীতে ফেলে। ফিরিবার সময় আবার টানিয়া
লইয়া আসে।
সিষ্কারম্যান্
বলিয়া একটী মাতব্বরের বাড়ী দেখিলাম।
ডেমেরারার নদীর অপূর্ব সৌন্দর্য্যে এই স্থানটী অতি মনােরম
বােধ হইতে লাগিল। এখানকার পাহাড়ের তিনটী থাক্‌ যেন ধীরে
ধীরে উপরে উঠিয়াছে। কেহ যেন স্তরে-স্তরে ঐগুলি সাজাইয়া
রাখিয়াছে। কি গম্ভীর, কি জমকালাে সে দৃশ্য ! যাহারা সমভূমিতে
বাস করিতে অভ্যস্ত তাহাদের পক্ষে এই স্থানের বিস্ময়কর
অসমতায় মনে এক অবর্ণনীয় ভাবের উদয় হয়।
শুনিলাম, মে মাসের প্রথম ভাগের মধ্যরাত্রে এক অত্যাশ্চর্য্য,
অনির্দিষ্ট কারণোদ্ভূত উচ্চ-শব্দ শুনা যায়। লোকেরা জানাইল যে,
সে শব্দে মনে হয় যেন কতকগুলি সৈন্যের বাহিনী সেখানে
উপযুপরি গুলি ছুড়িতেছে ।
ক্রমে আমি কুইবােতে (Quibo) পেীছিলাম। গাছে গাছে
এই স্থানটী একেবারে পরিপূর্ণ—সূর্যের কিরণ যেন প্রবেশ করিতে
পারে না। বনে দেখিলাম, দলে দলে মাইসিটিস্, বন্য-শূকর, লােবা
( Lobba ), 477) ( Acoury ), caifa ( Powiss ),
( Maam ), TILT ( Maroudy ), sgttt 11977 ( Wara
cabas) প্রভৃতি বিচরণ করিতেছে। দেখিলাম, হাজার হাজার
পাতা পড়িয়া রহিয়াছে। যেখানে ইচ্ছা পাতা দিয়া ঘর করিয়া
ঘুমাইতে পারা যায়।
কত রকমের গাছ। গাছে গাছে সে বন ভরিয়া রহিয়াছে।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৪
দক্ষিণ আমেরিকার কুইবাের জঙ্গল

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক গ্রী-হার্ট, ওয়ালাবা, পার্পল্-হার্ট, সিলােয়াবালী, সাওয়ারী, বুলেটার, টাউয়রানিরা, মাের। প্রভৃতি গাছ বিরাট দেহ বিস্তার করিয়া দাড়াইয়া আছে। সুদীর্ঘ উহাদের দেহ—এক একটা যেন এক একটা স্তম্ভ-ষাট, সত্তর ফিট্‌ করিয়া উচু। না আছে একটাও গাঁট, না আছে একটাও ডাল। একেবারে মসৃণ। দক্ষিণ আমেরিকার উচ্চ-শব্দকারী বানর ‘মাইসিটি অদূরে দাড়াইয়া রহিয়াছে পার্পল্-হার্ট গাছ। একটাও ছিদ্র নাইকাণ্ড হইতে এতটুকুও রস নিঃসৃত হয় না। কি বিরাট- কি বিশাল সে গাছ! যেন মানুষকে—পথিক-কুলকে ঘৃণাভরে বলিতেছে, “তােমরা ভুলিয়া গিয়াছ পথিকগণ, কে তােমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন—অত ঐশ্বর্যের মালিক করিয়াছেন; কিন্তু আমরা ;

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৩৭
এত ঐশ্বর্যের অধিকারী হইয়াও তাঁহাকে ভুলি নাই। এই
দেখ, প্রার্থনারত হইয়া উৰ্দ্ধাভিমুখে তাহার কপ-ভিক্ষা করিতে
দাড়াইয়া আছি। আমরা তােমাদের মত অকুত বা অহস্কৃত
নই।” গাছগুলির বিষয় ভাবিতে ভাবিতে আমার মনে হইতে
লাগিল যে রবীন্দ্রনাথ ঠিকই বলিয়াছেন—
কেন চেয়ে আছাে গাে মা মুখপানে ।
এরা চাহেনা, তােমারে চাহেনা যে।
আপন মায়েরে নাই জানে !
*
দুঃখ জানায়ে কি হবে জননি ।
নিৰ্ম্মম, চেতনাহীন পাষাণে ?

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ কাঠ- ঠোর ঝাঁকে ভরে গেছে সে বন। ঠোক্রাইয়া, ঠোক্রাইয়া উহারা কঠিন ও লােহার মত নানা গাছ ছিদ্র ছিন্ন ভিন্ন ঠক্ ঠক্ শব্দে দিষ্মণ্ডল ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হইতেছে। যেন কাঠুরিয়ার শত শত কুঠার উঠিতেছে আর পড়িতেছে। কি ভীষণ জায়গায় আসিলাম! কাণে ত কিছুই গাছের ডালে আঠার ফিট লম্বা ‘বােয়া’ শুনিবার উপায় নাই। ঐ দেখ (অজগর) এবং নীচে নয় ফিট লম্বা ‘ব্যাটে-স্নে। মােরা গাছ। কি বিপুল, বিরাট ও সুদৃঢ় ছিল উহার দেহ ; কত উচ্চ ছিল উহার শাখা-প্রশাখা, কত সুন্দর-শােভন ছিল উহার পত্র-পল্লব। আজ কাঠ-ঠোকরার ঠোক্রানিতে একটির উপর আর একটা লুটাইয়া পড়িয়াছে।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক মৎস্য- অনেক দূর অগ্রসর হইয়া গায়নায় পৌছিলাম এখানে। এক প্রকার বিচিত্র মৎস্য দেখিয়া একান্ত বিস্মিত হইলাম গুলির নাম শুনিলাম প্যাকো (Pacou)। ইহার অত্যন্ত পুষ্ট ও অতিশয় সুস্বাদু। বঁড়শী দিয়া কেহ এই মৎস্য ধরিতে পারে না। রেড়-ইণ্ডিয়ানেরা যখন এই মৎস্য ধরিতে যায় তখন সুকৌশলে “ক্র্যাব, উড” গাছের বীজ ছড়াইয়া রাখে। ঐ বীজ খাইতে আসিলে তীর দিয়া উহারা ইহাদের মারিয়া থাকে। আরও অনেক দূর গমন করিয়া দেখিলাম, সেই স্থানটীর নাম ম্যাকৌসিয়া। এখানে নানা-জাতীয় লােকের বাস। ম্যাকোসী- ইণ্ডিয়ানদিগের সহিত কথােপকথনে বড়ই তৃপ্তি লাভ করিলাম। কি সুন্দর, সহজ ও সরল জীবন যাপন করে ইহারা। ব্লো-পাইপ, ( blow-pipe) বা বাক্-নল ব্যবহারে ইহারা সিদ্ধহস্ত। ইহাদের নিকট অনুসন্ধান করিতে করিতে পুনরায় সেই সাতিক উদ্ভিজ্জ বিষ ঔরলী হলাহলের সন্ধান লাভ করিলাম। শিকারের জন্য প্রত্যেকের গৃহে এই ভীষণ বিষ প্রস্তুত করিয়া ইহারা সঞ্চিত রাখে । মৰ্ম্মর-প্রস্তরের পাহাড় দেখিয়া কতই না আনন্দ অনুভব করিলাম। তিন প্রকারের আরা ( Ara) প্রচুর পরিমাণে এখানে প্রাপ্ত হওয়া যায়; সকলের অপেক্ষা যে গাছ দীর্ঘ সেই গাছ হইতে “গা-ইলাষ্টি” নামে এক চমৎকার জিনিষ সকলে সঞ্চয় করিয়া থাকে। এই গাছগুলির কাঠ অনেকটা সাইকামাের (Syeam(ore) কাঠের মত। আঠাগুলি গাছের বলের মধ্যে থাকে এবং উহা কাটিয়া বাহির করিতে হয়। আঠাগুলি দেখিতে সাদা ধবধবে ৪০ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক যেন কতকগুলি দুধের সর । আঠা বাহির হইলে বলের মত করিয়া রাখা হয় ; বাতাস লাগিলে উহা কাল হইয়া যায়। কিন্তু অন্য কোন প্রণালী ( Process ) অবলম্বন না করিলেও ইহা অবিকল “ইণ্ডিয়ান রবার” হইয়া দাঁড়ায়। ম্যাকৌসিয়ার বনে সুন্দর চূড়াওয়ালা পাখী কক-অফ-দি-র (Cock of the rolk ) দেখিলাম। দিনের বেলায় ইহার পাহাড়ের সর্বাধিক আন্ধকার-স্থানে বাস করে। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিলে—সূৰ্যাস্ত হইলে—ইহারা বাহিরে আসিয়া যৎসামান্য আহারীয় সংগ্রহ করে । দেখিলে মনে হয় যেন ইহারা কি ভাবনায় ব্যাকুল রহিয়াছে—কতই না বিমর্ষ ! “হাউটাউ” পাখীর মত অন্য কোন পাখীর সঙ্গে ইহার মেলা-মেশা করে না। একাকী ঘূরিয়া যাহা পায় তাহাই খায়—নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে। এখানকার রেড-ইণ্ডিয়ানেরা কেবলমাত্র ঔরলী বিষ সম্বল করিয়া তাহাদের শিকারের কার্য সমাধা করিয়া থাকে। ইহারা বন্দুক ব্যবহার করে না। দুই-একটী যাহা দেখিলাম তাহা মরিচা ধরিয়া, অবহেলিত অবস্থায় রহিয়াছে। বিষাক্ত যন্ত্র গুলি ঝ ঝক্‌ করিতেছিল। তাহাদের তূণগুলিতে দেখিলাম অসংখ্য বিষাক্ত তীর সুসজ্জিত ও নিত্য-ব্যবহারােপযােগী অবস্থায় রহিয়াছে। ঔরলী বিষ চাহিলাম—অনেক দাম দিতে চাহিলাম, কিন্তু তাহারা দিতে সম্মত হইল না। তাহারা বলিল যে এই বিষ তাহারা ওড়া করিয়া রাখিয়া থাকে—সহজে সংগ্রহ করিতে পারে না নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য বস্তু বলিয়া মনে করে।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৪১
;
একজন সাদা-লােক (white-man) এখানে বাস করিতেন।
এত গভীর বনে কেন তিনি আসিলেন জিজ্ঞাসা করায় জানিতে
পারিলাম যে তাহার স্বজাতির মধ্যে তিনি দারিদ্যের দারুণ
কশাঘাতে নিতান্ত জর্জরিত হন এবং মনে অত্যন্ত আপাত উপস্থিত
হওয়ায় এমন কি, আদরের দেশকে পর্যন্ত পরিত্যাগ করিয়া
এই বিজন অরণ্যে আসিয়া বাস করিতেছিলেন।
গায়নার সর্বাপেক্ষা বৃহৎ পাখী হইতেছে জ্যাবির Jabiru)।
“স্যাভানা” নামক জলা জায়গায় ইহরা চরিয়া বেড়ায়। ইহাদিগকে
গুলি করিয়া মারা অত্যন্ত কঠিন ; প্রায়ই পালাইয়া যায়। যে
জায়গায় এই বৃহৎকায় পাখী থাকে উহা অত্যন্ত নীরব ও নিস্তব্ধ।
নিশীথ রাত্রিতে জ্যাবিরু এবং দুই চারিটী গৃধ্র পাহাড়ের উপর না
থাকিলে নিশ্চয় বলা যাইত যে ইহা প্রাণীহীন-স্থান । অন্য কোন
জীব-জন্তু বা কীট-পতঙ্গ দেখা গেল না। অনেক খুঁজিয়া
দেখিতে পাইলাম যে কেবলমাত্র সাধারণ মাছির চার ভাগের এক
ভাগ অতি ক্ষুদ্র আকৃতির এক জাতীয় পােকা রহিয়াছে ; ইহাদের
কামড় সমুদ্র-সৈকতের মশকাপেক্ষাও বেশী ব্যথাদায়ক ।
এই স্থানে অনেক এরারুট ও মেট গাছ দেখিলাম। পাহাড়ের
নীচে দিয়া বহুদূর অগ্রসর হইলাম। ঘুরিতে ঘুরিতে আমার মনে
হইল যে পশ্চিম দিকে যাইতেছি। অবশেষে আর পথ পাইলাম
না। সম্মুখে জল-পার হইবার উপায় নাই—স তার দেওয়া
ছাড়া আর কোন গতি দেখিলাম না; গাছের ডাল ভাঙ্গিয়া—
মােটা মােটা ঘাস দিয়া বাঁধিয়া একটা “ব্যাট” বা ভেলা তৈয়ার
;

৪২
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
করিলাম। অতিকষ্টে চলিলাম, কিন্তু এত করিয়াও বুঝি রক্ষা নাই
ও কি ভাসিয়া উঠিতেছে জল হইতে ? এক একটা বিশ-ত্রিশ
ফিট লম্বা। দলে দলে কুমীর সারি দিয়া ভাসিয়া যাইতেছে।
কিছুদূর নিরাপদে অগ্রসর হইয়া দেখিলাম যে কয়েক জন
রেড-ইণ্ডিয়ান্ আমারই মত ভাসিয়া চলিয়াছে। খুব ভাল
করিয়া
লক্ষ্য
করিয়া
দেখিলাম,
উহারা সরু
সরু ও
অত্যন্ত
দীর্ঘ এক একটা গাছের
ডাল লইয়া গভীরতা
মাপিতেছে। যেখানে কম
জল সেইখান দিয়া চলিয়াছে।
একজন প্রথমে চলা আরম্ভ করিয়া
একটু একটু অগ্রসর হইলেই
‘মেটু’ গাছের ডাল ও ফল। এই
ফল হইতে রেড-ইণ্ডিয়ানগণ ‘চা’ পিছনে পিছনে অন্য কয়েকজন
প্রস্তুত করিয়া ছবির বর্ণিত নলের সাহস করিয়া রওনা হইতেছে।
দ্বারা টানিয়া পান করিয়া থাকে
সেই ভেলায় আমি
আমি ওপারে
গেলাম। ব্যাগটা আধা-ভিজিয়া যাওয়ায় অল্পক্ষণ রৌদ্রে রাখিয়া

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৪৩
লইলাম ;
শুকাইয়া
পরে দেখিলাম যে কয়েকটা হরিণ
দূরে বড় ও ঘন ঘাসের উপর চরিতেছে । চকিত-চাহনিতে
আমাকে অত দূর হইতে দেখিতেছিল। কি সুন্দর চোখ ওদের !
এক রকম পাখী দেখিলাম, উহাদের নাম “প্ল ভার”। ইহার
কিছুপর আবার কতকগুলি কাল কাল পাখী দেখিলাম, নাম
“কারলিউ”। ঐগুলির পাখায় সাদা সাদা দাগ । ইহারা দেখিতে
সমুদ্র সৈকতের “স্কার-লে” পাখীরই মত; আমার সম্মুখ দিয়া
উড়িয়া যাইতেছিল। অসংখ্য “মভি-হাস” চরিয়া বেড়াইতেছিল।
কতকগুলিকে বহুদূরে উড়িতে দেখিলাম। উহারা আকাশের এত
উচ্চ চাকার মত ঘুরিতেছে যে সেখানে বন্দুকের গুলি পোঁছায়
। দুগ্ধ-ধবল ইগ্রেট, জ্যাবিরা প্রভৃতি পাখী “এটা” ও
“কৌ কোরাইটু” গাছের ডালে বসিয়া ঐ গাছের কলের বীজ
খাইতেছিল। এই সমস্ত গাছে সৰ্ব্বাপেক্ষা বৃহদাকারের টেীকান
পাখী বাস করে। হরিদ্রাবণের সুন্দর চঞ্চুর অগ্রভাগে কাল কাল
দাগ—কি মনােহর ওগুলিকে দেখিতে ।
মাঠের মত এক জায়গায় কিছুক্ষণ ঘুরিয়া বেড়াইলাম।
দেখিলাম, সেখানে শত শত পিপীলিকার বাসা। সেগুলি হলুদ
রংয়ের শক্ত কাদা দিয়া তৈয়ারী এবং আট-নয় ফিট উচ্চ ;
বৃষ্টির আঘাতে বা দারুণ ঘুর্ণী-বাত্যাতেও বুঝি ভাঙ্গেনা।
সৌভাগ্যক্রমে এখানে ঔরলী বিষ পাইলাম । যত জায়গায় যত
ঐ বিষ পাইয়াছিলাম—সমস্ত বিষের অপেক্ষা—এগুলি মারাত্মক।
অনেকটা সঞ্চয় করিলাম।

৪৪ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক অনেক দূরে ছিল পর্তুগীজ, ফ্রন্টিয়ার ফোর্ট, উহা দেখিলাম। দুর্গ টীর নাম “ফোর্ট সেন্ট, জোয়াচীম,” (Fort St Juchim)। তাহার পর “ট্যাকাটে” নামক স্থানে গমন করিলাম। এখানে এক রকম অতি সুন্দর পাখী আমার নয়ন-পথবী হইল। পাখীগুলির নাম শুনিলাম “ট্রেীপীয়ালে” (Troupia.!!! )। কি সুন্দর উহাদের কণ্ঠস্বর। বারংবার শুনিয়াও যেন তৃপ্ত হইতে ছিলাম না, আরও শুনিতে ইচ্ছা হইতেছিল। পর্তুগীজরা ইহাকে গায়নার নাইটিঙ্গেল বলিয়া থাকে। দুর্গের অভ্যন্তর অভ্যন্তর ভাগ দেখিবার জন্য বড় ইচ্ছা ছিল কিন্তু অনুমতি পাইলাম না। রাস্তায় অত্যন্ত বৃষ্টিতে ভিজিয়া জ্বর হইল। কমাণ্ডারের সঙ্গে দেখা হওয়ায়, তিনি দুর্গের কিছুদূরে কয়েক দিনের জন্য থাকিবার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন এবং একদিন দেখা করিতে আসিয়া আমার জ্বর আরও বেশী হইয়াছে দেখিয়া আমাকে দুর্গের মধ্যে লইয়া গেলেন ; অতি ভদ্র ভাষায়, বিনীতভাবে বলিলেন, “আপনি অতিথি, আতিথ্য আমাদের ধৰ্ম্ম-—কিন্তু এ সে স্থান নয়- ডাক্তার নাই এখানে–তবু অামাদের যতদূর সাধ্য যত্নের ত্রুটি হইবে না।” কয়েকদিন পরে কমাণ্ডার মহাশয়ের অশেষ যত্নে ও সুশ্রুষায় এবং পথ্যাদির সুব্যবস্থায় আমার জ্বর ছাড়িল। আমি শরীরে তত দৌর্বল্য অনুভব করিলাম না—উঠিয়া---ঘুরিয়া দুর্গ টী দেখিলাম । পঁয়তাল্লিশ বৎসর পূর্বে “রাও নীগ্রোর স্প্যানিয়ার্ডদের আক্রমণ আশঙ্কায় পৰ্তুগীজেরা এই দুর্গ নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহার

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৪৫
একটু দূরে
পর আর তেমন যত্ন লওয়া, মেরামত বা সংস্কারাদি কিছুই
হয় নাই। দুর্গের সিংহদ্বারটী বন্যার জলে ধ্বসিয়া পড়িয়াছে।
চারিদিকের প্রাচীরগুলি ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। বর্তমান কমাণ্ডার
পুনরায় উহার সংস্কার করিতেছিলেন।
-নদীর তীরে, কমাণ্ডারের বাড়ী, ব্যারাক বা
সৈন্যাবাস, চ্যাপেল বা ভজনালয়। এইগুলি কাদা ও কাকর
দিয়া তৈয়ারী। আরও দুইখানি বাড়ী দেখিলাম ।
এছাড়া অন্য
কোন বাড়ী-ঘর দেখিলাম না। সম্মুখে-দুর্গের চতুর্দিকে বিস্তৃত
শস্য-শ্যামল প্রান্তর—অশ্বাদির আহার্যে পরিপূর্ণ। কতকগুলি
গাভী চরিতেছিল—কি সুন্দর সে গাভীগুলি—প্রচুর দুগ্ধ দান
করে। সেই দুগ্ধ হইতে পগীজেরা প্রচুর “বাটার” ও “চীজ”
সংগ্রহ করিয়া পরম পরিতৃপ্তির সহিত ভােজন করে এবং বিদেশেও
চালান দেয়।
এইরূপে, বহু কষ্টে আমি “পর্তুগীজ, আয়ার্লা ফ্রন্টিয়ারে”
উপনীত হইলাম। ঔরলী বিষ-সংগ্রহের ঔৎসুক্য আমার
কিঞ্চিত্রও হ্রাস হয় নাই। কোথায় আরও পাইব, ইহাই আমার
ছিল একমাত্র চিন্তা। যাহা সংগ্রহ করিয়াছি তাহাও নিতান্ত
অল্প নহে, কিন্তু আশার যে শেষ নাই।
‘ঔরলী বিষ’, ‘ঔরলী বিষ’ অনেক বার বলিয়াছি কিন্তু এ বিষ
কি, এ বিষ দিয়া কি হয় তাহা বলি নাই। আমি কেন এ বিষ
সংগ্রহ করিতেছি তাহা ইতঃপূৰ্বে বলিয়াছি; এখানে এ বিষ সম্বন্ধে
একটু বলিয়া রাখিতেছি, অবশ্য সংক্ষেপে।
৬
;

৪৬
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
এই সাঙ্ঘাতিক ও অসাধারণ ঔরলী বিষ ম্যাকৌসী বলিয়া
রেড-ইণ্ডিয়ানেরা প্রায়ই সঞ্চিত রাখে। ইহারা ডেমরারা ও
কুইবাে-বনের অধিবাসী। ইউরােপীয়দের আডডা হইতে বহুদূরে এই
বনে ইহারা বাস করে। তীর-ধনু ইহাদের প্রধান অস্ত্র। এমেজা
হইতে অরুনকো অবধি দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র সকল বন্য
‘ইউরুমি’ বা পিপীলিকাভুক
--
অসভ্য জাতিরাই
এই বিষ ব্যবহার করিয়া থাকে, কিন্তু
ম্যাকৌসীরা যত এই বিষ সঞ্চিত রাখে তত আর কেহই রাখে না।
রাইও নিগ্রোর নিকবর্ত্তী রেড-ইণ্ডিয়ানগণও ইহার কথা
জ্ঞাত আছে। উহাৱা এই ম্যাকেসীদের নিকট হইতে উহা জয়
করিতে আসিয়া থাকে। ইহার অসামান্য বিষক্রিয়া সম্বন্ধে পূর্বে :

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ৪৭ কিছু কিছু বলিয়াছি। এই দারুণ বিষ বিন্দুমাত্র রক্তের সহিত কোনক্রমে মিশ্রিত হইলে তৎক্ষণাৎ ইহার অত্যাচর্য বিষক্রিয়া আরম্ভ হয়। কেহ কেহ বলেন, মানুষের মত শক্তিশালী কোন জীব- জন্তু বা জানােয়ার ইহার বিষক্রিয়ায় অভিভূত হয় না । প্রথমােক্ত ব্যক্তিগণ ইহার বিষক্রিয়া পরীক্ষা না করিয়াই বিশ্বাস করিয়া লইয়াছে যে ইহা মহা-বিষ। এই সম্বন্ধে একটা গল্প বলিতেছি ; ইহা হইতেই বুঝা যাইবে যে এই বিষ খুব ভালভাবে পরীক্ষা না করিয়া কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া একান্ত কর্তব্য নহে। মনে পড়ে, একদিন আমি একজন রেড-ইণ্ডিয়ানকে এই বিষের ক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করিয়াছিলাম । সে বলিয়াছিল, “আমরা এই বিষ তীরে দিয়া তীর তৈয়ার করিয়া অনেক যুদ্ধ করিয়াছি। একদিন একটী লােককে এই বিষাক্ত শর দিয়া আহত করামাত্র সে মারা পড়ে।” এই বলিয়া সে গল্প করিতে আরম্ভ করিল। আমি সেই রেড়-ইণ্ডিয়ানটীকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “লােকটীর কোন্ অঙ্গে শরটী লাগিয়াছিল ?” সে একটুকুও ইতস্ততঃ না করিয়া আমার কথার উত্তরে বলিল, “কেন বলুন দেখি ? আমার স্পষ্ট মনে আছে, লােকটার দুই কঁাধের মধ্যস্থানে তীরটী লাগিয়াছিল। বিষ যাইয়া প্রবেশ করিল উহার বুকে—তৎক্ষণাৎ লােকটা মরিয়া গেল - ইহাতে আবার কথা কি আছে ?” আমি ভাবিতে লাগিলাম । উহা কি ঐ বিষের ক্রিয়া না বিশেষ অঙ্গে আঘাতের ফল! আমার মনে হইল অস্ত্রাঘাতের ফলেই লোেকটীর জীবনান্ত হইয়াছিল- বিষের ক্রিয়ায় নহে।

৪৮ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক বিষাক্ত তীর ব্যবহার করিতে না জানিলে, যথােপযুক্ত-স্থানে সন্ধান করিতে না পারিলে লোকের মৃত্যু হয় কি না ইহ। স্থিরীকৃত হইল না। শুনিলাম, ভাল বিষ না হইলে মানুষ মারা যায় না। তীরগুলি যদি শুষ্ক রাখা না হয়, বিষের ক্রিয়া তেমন প্রবল হয় না। বর্ষার সময় সঁাৎ-সেঁতে জলবায়ুতে উহার ক্রিয়ার ক্ষুগ্নতা ঘটে। আর একটী সন্দেহাত্মক সন্দেহাত্মক গল্প শুনিলাম। ডেমেরারার। রাজধানী ষ্ট্যাবরকের একজন ভদ্রলােক একটী ঘােড়র উপর এই বিষের ক্রিয়ার পরীক্ষা করিয়াছিলেন। ঘােড়াটী কোনক্রমেই মারা গেল না। কেন মারা গেল না অনুসন্ধান করিতে যাইয়া ভদ্রলােক দেখিয়াছিলেন যে তীরটী ঘোড়ার গায়ে লাগিয়াছিল এবং তীরের অগ্রভাগস্থিত বিষ জমিয়াছিল আঘাতস্থলে—ক্ষতের মুখে রক্তের সহিত ভিতরে মিশে নাই। আরও ভাল করিয়া এই বিষের ক্রিয়া জ্ঞাত হইবার জন্য আমি এই দুর্গম স্থানে—এই ভীষণ অরণ্যে-ঔরলীর উৎপত্তিস্থলে- সৰ্ব্বদা যাহারা উহার ব্যবহার করে তাহাদের নিকট এত কষ্ট করিয়া উপস্থিত হইয়াছিলাম। ঐ স্থানের কোথায়, কিভাবে এই দারুণ বিষ প্রাপ্ত হওয়া যায়—কিভাবে উহা সংগ্রহ করিতে হয়— কিভাবে রাখিতে হয়—কি প্রকার বিষ—কিরূপ কাৰ্যকরী, অকাৰ্য্যকরী এই সমুদয় ব্যাপার বিশেষ জ্ঞাত হইবার কৌতুহল আমার পক্ষে নিতান্ত অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছিল। এত পরিশ্রম ও দুঃসাহসিকতার পর যে কৃতকাৰ্যতা লাভ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ৪৯ করিয়াছিলাম উহা আমার বিশেষ সৌভাগ্যের কথা সন্দেহ নাই। গয়নার সেই দুর্ভেদ্য, দুর্গম, শ্বাপদস, মৃত্যু : প্রাণনাশকর ও আশঙ্কাপূর্ণ সুদীর্ঘ বনে ক্রমে অনাহারে, অর্ধাহারে, অনি প্রায় ভ্রমণ করিয়া একশত আটাশ দিন-রাত্রি কাটাইয়াছিন । ফলে সেই বিষ ও তাহার অদ্ভুত ক্রিয়ার সমস্ত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইয়াছিলাম। এই বিষ রক্তে প্রবিষ্ট না হইলে ইহার বিব-ত্রিয় প্রকাশ পায় না। এই বিষ সম্পর্কে বহু লোকের এই জ্ঞান ছিল। প্রয়ােগ করিবামাত্রই শিরাসমূহে ইহার কিয়া আরম্ভ হয় এবং জীবনীশক্তি নষ্ট করে, কিন্তু কি ভাবে কি হয় তার অনুসন্ধান কেহ করিয়া দেখেন নাই। এই বিষের কিয়দংশ রক্তে প্রবেশ করিলে মৃত্যু যা নিবার্য ইহা অতি সত্য কথা, কিন্তু উহাতে র, বর্ণের কোনই পরিবর্তন হয় না। এইজন্য এই বিষ প্রয়োগে নিহত প্রাণীর রক্ত ও মাংস নিরাপদে ভক্ষণ করা যায়। এই বিষের ক্রিয়া এমন বিচিত্র যে ইহাতে ভিভূত-প্রাণী বিন্দুমাত্রও মৃত্যু-যন্ত্রণা ভােগ করে না—কোনও কষ্ট হয় না। তীরদ্বারা আহত হইবামা এ তীর। গ্রভাগস্থিত বিষ যদি ? গ্যিক্রমে আহত জীবের শােণিতের সহিত বিন্দুমা সংশ্লিষ্ট হইতে পারে তাহা হইলে মুহূর্তে সমস্ত লীলা খেলার অবসান ঘটে। ন: ২য় লো বা যন্ত্রণা—না হয় অপর বিষের মত নানা বিষক্রিয়া অথব বিষহতের দেহের বর্ণের কোন পরিবর্তন বা শিরা-উপশিরার কোন আক্ষেপ।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
ম্যাকেসী-ইণ্ডিয়ানগণ এই বিষ সংগ্রহ করিতে হইলে দুইদিন
বা একদিন পূর্বে তাহাদের গৃহ-সন্নিহিত বনে প্রবেশ করে।
বনে যাইয়া তাহারা খু জিয়া বাহির করে ঔরলী নামক দ্রাক্ষা-
জাতীয় লতা। এই লতার নামানুসারেই বিষের নাম হইয়াছে।
এই লতার
রস এই
বিষের প্রধান উপকরণ। এই লতা
অনেকগুলি সংগৃহীত হইলে উহার একটা খুব তিক্ত মূল তাহারা
খুড়িয়া বাহির করে এবং সেই মূল ঐ লতাগুলি দিয়া জড়াইয়া,
বঁধিয়া লইয়া, আবার বুলবৗ ( Bulbonus) নামক গাছের চারা
( Plant) সংগ্রহ করিতে আরম্ভ করে। ঐ চারা হইতে সবুজ
রংয়ের এক প্রকার চটচটে রস নির্গত হয়। তাহার পর উহারা
একটা ছােট পাত্রে উহা ভরিয়া লয় এবং কাধে করিয়া লইয়া
আসিয়া দুই প্রকার পিপীলিকা সংগ্রহ করিয়া থাকে। ঐ
পিপীলিকাগুলির এক প্রকার খুব বড় ও কালো এবং উহাদের
কামড়ে জ্বর হয়।
ঐ অঞ্চলে এই পিপীলিকা অনেক পাওয়া যায় ।
প্রকার পিপীলিকা অল্প লাল রংয়ের ; উহাদের কামড়ে
বিছুটির মত যন্ত্রণা হয়। এক প্রকার ছােট গাছের চারার নীচে
ইহারা বাস করিয়া থাকে। এই সমস্ত জিনিষ ও প্রাণী সংগ্রহ
করিতে বনে বনে অনেক ঘুরিতে হয় এবং এত কাণ্ড করার পর
সেই রে-ইণ্ডিয়ানগণ গৃহে ফিরিয়া আসে ।
খুব ঝাল “ইণ্ডিয়ান-পিপার” বা মরিচ এই বিষ নির্মাণের
জন্য প্রয়ােজন হয়। এই জাতীয় মরিচ ঐ দেশের লােকের একান্ত
আবশ্যক বলিয়া তাহাদের বাড়ীর চতুঃপার্শ্বে ইহা বপন করিয়া
অন্য

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
রাখে। ইহা ওখানে প্রচুর জন্মিয়া থাকে। ল্যাবারী (abari) ও
কৌন কৌচী (Cou couchi) নামক সাপের চূণ করা বিষ-দন্ত
ঐ সকল দ্রব্যের সহিত মিশ্রিত করা হয়। এই গুলি দেশের লােক
সচরাচর সংগ্রহ করিয়া রাখে—সকলের ঘরেই কিছু না কিছু থাকে ।
এইরূপে সমস্ত উপকরণ সংগৃহীত হইলে, তাহারা ঔরলী
দ্রাক্ষালতা এবং তাহার তিক্ত মূল চাচিয়া লইয়া সূক্ষ্ম বস্ত্র
বা লতার ছাল দিয়া ছাঁকিয়া লয় ; তাহার পর পাতা দিয়া
নিম্মিত এক প্রকার ঝাঝরীর মধ্যে রাখিয়া একটী মাটীর বাসনে
উহা ঢালিয়া দেয় এবং কিছুক্ষণ পরে জল ঢালিতে থাকে।
উহা হইতে যে রস নিঃসৃত হয় তাহা দেখিতে অনেকটা
কফির (Coffee ) মত। যখন প্রচুর পরিমাণে রস সংগৃহীত
হইয়াছে বলিয়া মনে হয় তখন বুবোসের ডাটাগুলিকে পিষিয়া
আবশ্যক মত রস বাহির করা হয় এব ঐ পাত্রে ঢালিয়া দেওয়া
হয়। তাহার পর সাপের দাত, পিপড়া ও মরিচগুলি চূর্ণ করিয়া
উহার মধ্যে তাহারা মিশাইয়া লয়; অগ্নির মৃঃ উত্তাপে গরম
করিতে থাকে এবং একটু বেশী গরম হইলে আবশ্যাকানুরূপ ঔরলীর
রস মিশাইতে থাকে । যে গদি ( Sculn) পড়ে তাহা তাহারা
একটা পাতা দিয়া উঠাইয়া ফেলে । সেই রস ঘন ও পিঙ্গল
রংয়ে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত জ্বাল দেওয়া হয়।
রসের ঐ অবস্থা প্রাপ্তিমাত্র কয়েকটা তীর ঐ
রসে
ভিজাইয়া লইয়া উহার শক্তি পরীক্ষা করা হয়। যদি ইচ্ছানুরূপ
বিষাক্ত হইয়াছে বলিয়া মনে হয় তাহা হইলে তখন উহা

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক কুমড়ার শুষ্ক খোলে অথবা মাটির বাসনে রাখা হয় এবং অত্যন্ত সাবধানে কয়েকটী পাতা দিয়া ঢাকিয়া ফেলা হয়। ইহার পর উহার উপর একখানি হরিণের চামড়া দিয়া খুব শক্ত করিয়া দড়ি বঁধিয়া রাখা হয়। কুটীরের যে স্থান অত্যন্ত শুষ্ক সেই স্থানে উহারা এই ভাওটী রাখিয়া দেয় এবং মধ্যে মধ্যে আগুনের উপর ঝুলাইয়া গরম রাখে । লক্ষ্য রাখিতে হয় যেন ঠাণ্ডা না লাগে। এই বিষ প্রস্তুত নিতান্ত সামান্য ব্যাপার নয়, কারণ উহা করিতে উহাদিগকে অত্যন্ত সদাচারী, পবিত্র ও সতর্ক হইতে হয় । দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার মত পবিত্র ও পুণ্য-কৰ্ম্ম বলিয়া ইহা মনে করিবার নিয়ম। অসভ্য হইলেও সকলেই ইহা যথাযথ প্রতিপালন করিয়া থাকে। সাধারণত: উহারা যে অবস্থায় থাকে সেই অবস্থায় অন্যান্য সব কাৰ্য্য করিতে পারে তেমন কোন সামাজিক বিধি-নিষেধ উহাদের নাই ; কিন্তু এই ঔরলী বিম প্রস্তুত অনেক বিধি-নিষেধ মানিতে হয়—সামাজিক গুরুতর, অবশ্য প্রতিপাল্য নিয়মের মত বহু আচার প্রতিপালন করিতে হয়। কয়েকটি নিয়ম নিম্নে দেওয়া হইল। স্ত্রীলোক বা অল্প-বয়সের কোন মেয়ে বিষ প্রস্তুতের সময় সেই স্থানে উপস্থিত থাকিতে পারিবে না। প্রথা বা সংস্কার এই যে উহারা উপস্থিত থাকিলে 1715 € ( yabayou ) ay এক প্রকার দুষ্ট-প্রেত অনিষ্ট সাধন করিয়া থাকে। যে ঘরের নীচে ঐ বিষ জ্বাল দেওয়া হয়, সেই ঘর যদি অপবিত্র হইয়া

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
যায় তাহা হইলে সে ঘরে আর কিছু করা হয় না; সেই
ঘর অব্যবহাৰ্য্য হয়। যে দিন বিষ প্রস্তুত
করা হয় সেই
দিন যে ব্যক্তি বিষ প্রস্তুত করে সে উপবাস করে। বিষ প্রস্তুত
শেষ না হওয়া পর্যন্ত, সে কিছুই খাইতে পারে না। যে
পাত্রে বিষ দেওয়া হয় সেই পাত্র নূতন হইবে। তাহা না
হইলে বিষের ক্রিয়া তত তীব্ৰ নাও হইতে পারে বলিয়া সকলের
বিশ্বাস । যে ব্যক্তি সেই বিষ জ্বাল দেয় তাহাকে তখন অত্যন্ত
সাবধানে থাকিতে হয় । সে সময় কোন প্রকার যাহাতে
কোন বাষ্প বা গন্ধ তাহার গায়ে, চোখে, মুখে, নাকে না
লাগে সেজন্য বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হয়। এই সমস্ত নিয়ম
ভিন্ন ঘন ঘন হাত ও মুখ ধােয়ার বিশেষ বিবি হাছে।
সাবধান থাকাসত্ত্বেও বিষ প্রস্তুতকারীর কখন বিষ
প্রস্তুতের কয়েক দিনের মধ্যেই শরী, অসুস্থ হয়।
কারণে সকলেই বিষ প্রস্তুত করিতে পারে না।
ইহা অত্যন্ত
ধীরভাবে, অত্যন্ত রহস্যময় ও অত্যন্ত পবিত্র ভ সম্পন্ন হয়।
একজন রেড-ইণ্ডিয়ানকে এই বিষ প্রস্তুত করিয়া দিতে বিশেষ
ভাবে অনুরােধ করায় প্রথমে সে স্বীকার করি কিন্তু পরদিন
আসিয়া জানাইল যে তাহার স্ত্রীর সন্তান
সন্তান সম্ভবন। সুতরাং
সে উহা করিতে পারিবেনা।
কেহ হয়ত, জিজ্ঞাসা করিতে পারেন যে, বিষ নিৰ্মাণ-কার্যে
সমস্ত উপাদানগুলিই প্রয়ােজন কিনা? যতদূর বুঝা যায় ও
পরীক্ষাদ্বারা নির্ণয় করা গিয়াছে তাহাতে বলা চলে যে ঐ দেশে
এই সমস্ত

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক যাহারা ঔরলী বিষ নিৰ্মাণ করে তাহাদের যদি কোন কুসংস্কার থাকিত তাহা হইলে সমস্ত উপাদানগুলি না হইলেও ঐ বিষ দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বহিতকর গাছ ‘বাবসম্ অফ, পেরু (উপরে) ও সাসপেরিলা (নীচে) উত্তমরূপেই প্রস্তুত হইতে পারিত; কিন্তু উহারা নানা কুসংস্কার- বশে যাহা যাহা দেয় তাহা না দিলেই বিষ ভাল হইবে

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
—নানা অমঙ্গল হইবে বলিয়া মনে করে।
কুসংস্কার বর্জন
করিতে কয়জন, কয়টী জাতি পারিয়াছে ? মানুষ মাত্রেরই
হৃদয়ে কুসংস্কার এমন বদ্ধমূল যে কিছুতেই উহা হইতে নিৰ্ম্মক্ত
হইতে পারা যায় না। সকলেরই- সকল জাতির উহা তান্নাধিক
আছে—বিশেষতঃ এই অসভ্য জাতির ত থাকিবারই কথা।
কুসংস্কারের কথা বলিতে কত কথাই না মনে পড়ে। সেই অগষ্টান
এজের ( Augustan Age) কথা ভাবিলে আমরা দেখিতে পাই,
ক্যালিডিয়ার ইক্যাটেশন্স ( Incantations) বা যাদু-মন্ত্রের
ব্যাপারে কুকুরীগুলোকে উপবাসে রাখিয়া উহাদের মাড়ি হইতে
হাড় তুলিয়া লওয়া হইত। নাইট-আউল বা পেঁচার পাখা হইতে
পালক তুলিয়া লওয়া হইত আর মন্ত্র পাঠ চলিত—“ওস এব,
ওর র্যাপটা জেজুনে ক্যানিস্ প্লামামকিউ নন্টারণে গ্লিগিস্।”
এমন কত অদ্ভুত কাণ্ডের কত কথা শুনা যায় ।
তাহার পর ওয়েল্সম্যান, পারসন ইভানসের কথা-সে
উপাখ্যানে শুনা যায়, একটা দৈত্য না দানব তাহার উপর ভারী
রাগিয়া তাহাকে কতই না নিয্যাতন করিয়াছিল। তাহার দোষ
হইয়াছিল যে সে যখন তাহার ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া করিতেছিল
তখন একটা ধোঁয়া দিতে ভুলিয়া গিয়াছিল।
এইবার যে সমুদয় অস্ত্রে ঔরলী বিষ ব্যবহৃত হয় সেই
সমস্ত : অস্ত্র ও যাহাদিগকে ঐ সকল অস্ত্ৰদ্বারা আঘাত করা
হয়, তাহাদের সেই আহত অবস্থায় দৈহিক পরিবর্তনাদি সম্বন্ধে
আলােচনা করা যাইতেছে।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ম্যাকোসিয়ার অধিবাসীরা যখন পাখী শিকার করতে যায় তখন তাহারা কচিৎ তীর ও ধনু লইয়া যায় । সাধারণতঃ ব্লো-পাইপ, (Blow-pipe) লইয়া যায়। এই অসাধারণ মৃত্যু- নল গায়নার সর্বাপেক্ষা আশ্চর্য বস্তু বা অস্ত্র। ম্যাকৌসীতে এই ব্লো-পাইপ, পাওয়া যায় না। এগুলি এই স্থানের দক্ষিণ- পশ্চিম অঞ্চলে রাইও, নিগ্রোর নিকটবর্তী অরণে। উন্মে। অসম্ভব লম্বা এই পাইপ। দশ-বার ফিট এক একটা এই পাইপ, দেখিলে বাস্তবিকই চমৎকৃত হইতে হয়। আগা-গোড়া সমান —কোন জায়গা বেশী চিক্কণ বা মােটা হয় না। এক গাথা। যেমন মােটা তাপর মাথাও ঠিক তেমনই মোটা। সৰ্ব্বাঙ্গ উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের-বাহির ও ভিতরে সমান মসৃণ--একেবারে ফাপা। আগাগােড়া—কোন জায়গায়—একটাও গাটু নাই। স্থানীয় অধিবাসিগণ ইহার নাম বলে “ঔরা” ( Ourulh)। গয়নায় আরও এক রকম বড়-নল বা পাম পাওয়া যায় । সেগুলি ঔরার চেয়েও বড় এবং শক্ত। ইণ্ডিয়ানের ঔরার খােলরূপে ইহাদের ব্যবহার করে। ঔরগুলিকে পামার খোলগুলির মধ্যে ভরিয়া উহারা শিকার করিতে যায়। এই পানাগুলি দেখিতে পিঙ্গল বর্ণের এবং ভালরূপে রং-করা হইয়া থাকে। পাঁচ-ছয় ইঞ্চি পরে পরে একটী করিয়া গাঢ় থাকে। পানগুলিকে এদেশের লােকেরা বলে স্যামৌরা ; ভিতরে যে শাঁস থাকে তাহা অতি সহজেই বাহির করিয়া ফেলা হয়। জলে কয়েকদিন ভিজাইয়া রাখিলেই সেগুলি বাহির করা খুব সহজ হইয়া উঠে।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৫৭
এইরূপে ঔরা ও স্যামেরার সহযােগে গায়ন? সেই দারুণ
মরণাস্ত্র ব্লো-পাইপ তৈয়ারী হয়। যে দিকটায় মুখ দেওয়া থাকে
সেই দিকটায় “সিল্ক-গ্রা” নামে এক রকম ছোট ছোট ঘাসের
দড়ি দিয়া বাঁধা হয়। এইজন্য উহা মুখ হইতে পড়িয়া যায় না।
অন্যদিক অর্থাৎ যে দিক মাটিতে থাকে, সেই দিকের মুখটায়
“একুয়ের।” ফলের বীজ দিয়া থাকে অট।। ।
তীরগুলি হয় নয় হইতে দশ ইঞ্চ লম্বা। কোকোরাইট, নামক
এক প্রকার তাল গাছের পাতা দিয়া এগুলি য়ের হয়।
এই পাতাগুলি বেশ শক্ত আবার সহজে ভাঙ্গা যায়। ইহার
অগ্রভাগ ছাঁচের মত বলিয়া অত্যন্ত সরু ও ধরল । ইহার প্রায়
এক ইঞ্চি পরিমাণ জায়গায় এই বিষ লাগান হয়। তান্যদিক
বেশী শক্ত করিবার জন্য পােড়াইয়া লওয়া হয়। প্রায় দেড়
ইঞ্চি স্থানে লাগান হয় জংলি-লা। এই তুলা লগিনি শিখিতে
বেশ সময় লাগে ও বিশেষ মনােযােগের প্রয়োজন হয়।
তাহার পর হইতেছে তৃণীরের কথা! এই তীর নির্মাণে
রেড-ইণ্ডিয়ানেরা অত্যন্ত পারদর্শী। পাঁচ-ছয় শত তীর এক একটা
তৃণীরে থাকে। উহা বার-চৌদ্দ ইঞ্চ লম্বা করা হয়। বাড়ির
কাযের মত ভিতরটাকে গড়িয়া লইয়া, বাঁশ না দিয়া, কাঠ দিয়া
তাহার উপর মোম দেওয়া হয়। উপরকার বরণী একটী
অখণ্ড বস্ত্র—টেপীরের { T'apir) চামড়া-দিয়া তৈয়ার করা
হয়। মাঝখানে একটী
লুপ,
বা দড়ির ফঁস লাগান হয় এমনভাবে
উহা নির্মিত হয় যে উহার মধ্যে বাহু ও কঁাধ কান যায় ;

৫৮ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক আবশ্যকমত ঝুলাইয়া লইয়া চলা ফেরা করা যায়। প্রান্তদেশে কতকগুলি সিল্ক-গ্রাস বা রেসমী ঘাস ঝুলাইয়া, বঁধিয়া রাখা হয়। পীরাই ( Pirai ) মাছের মাড়ির হাড়ের অর্ধাংশও বাঁধিয়া রাখা হয়। উহাদ্বারা আবশ্যক মত তীরগুলির অগ্রভাগ ঘষিয়া অপেক্ষাকৃত ধারাল করিয়া লওয়া হয়। তুণীরে তীর রাখিবার পূৰ্ব্বে, শিকারীরা দুইটী ভূলার দড়ি দিয়া তীরগুলির উপর-দিকে বাঁধিয়া লয়। এক এক দিকে এক একটা দড়ি থাকে। তৃণের সমান লম্বা একটা লাঠির মত জিনিষের উপরে উহা ভাজ করিয়া লয়। লাঠিটা উপরে থাকে। দুইখণ্ড কাঠ আড়াআড়ি করিয়া দেয়। তৃণ হইতে যখন তীরগুল বাহির করে তখন এই সকল সাবধানতার ফলে তীর হাতে লাগে না। এতদ্ভিন্ন তৃণের সঙ্গে এক রকম ছােট ঝুড়ি থাকে। উহার মধ্যে ওয়াইল্ড কটন বা জংলি-তূলা রাখা হয়। দিয়া আবশ্যকমত তীরের মুখের ধার বাড়াইয়া লওয়া হয়। ম্যাকৌসী ইণ্ডিয়ানের এই রূপে বনে শিকারের জন্য বাহির হয়। কাধে দোলাইয়া দেয় তৃণীর—তাহাতে ভরা থাকে শত শত বিষাক্ত শর হাতে থাকে ব্লো-পাইপ। সৈন্যেরা যেমন করিয়া যুদ্ধে বন্দুক লইয়া সদর্প-পদ-বিক্ষেপে অগ্রসর হয় তেমনি এই পশু-পক্ষী হন্তা ম্যাকৌসী ইণ্ডিয়ান শিকারীরাও মহানন্দে, আশা- ভরা প্রাণে প্রধান খাদ্য বন্য পশু-পক্ষী হত্যার জন্য—মৃগয়ার জন্য--- অগ্রসর হয়। অব্যর্থ তাহাদের সন্ধান--বুকভরা উৎসাহ—দেহে অসীম বল—সুন্দর স্বাস্থ্য ! ঐ কূল দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক নির্ভয়ে—নিঃশঙ্কচিত্তে—অকুতােভয়ে তাহারা বন-মন্থন করিয়া 691916G (Powise), alzatut (Alaroidy), «/?191(\Varaba) প্রভৃতি দুর্দান্ত পশু-পক্ষীকে নিহত করিয়া—স্ব স্ব অপর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহ করিয়া-প্রতিদিন গৃহে প্রত্যাবর্তন করে। ইহা ছাড়া কত যে পাখী মারে তাহার ইয়ত্তা নাই। দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল ‘ফার’ গাছ এই বনের পাখীরা নীচে কেহই বড় বসে না--অনেক উচুতে, অতি দীর্ঘ ও বিশাল ‘ফার’ এবং অন্যান্য বৃক্ষের চূড়ায় ও ডালে— পাতার গুচ্ছের নীচে, অধিকাংশ বসিয়া থাকে; কিন্তু সেখানেও রক্ষা নাই। সুদীর্ঘ ব্লো-পাইপ যন্ত্র-সহযােগে তাহার। মুহূর্তে নিহত হইয়া ধূল্যবলুষ্ঠিত হয়। হয়। তিন শত ফিট, পৰ্য্যন্ত দূরে এই ৬০ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক রেড-ইণ্ডিয়ানদের অমােঘ শর গমন করে। তিন ফিটে এক গজ—দুই হাতে একগজ। এখন অনুমান কর, কত দূলে ইহাদের সেই বিষাক্ত ও মুহূর্তে প্রাণ-নাশকারী তীর যাতায়াত করে। দুই শত হাত উর্ধে অব্যর্থ তীর নিক্ষেপ বড় সহজ নয় অনায়াসে ভ্যাস করা যায় না। শিকারীদের চতুরও অন্ত নাই। উহারা অতি ধীর পদ- বিক্ষেপে--এমন নিঃশব্দে বৃক্ষের নিম্নভাগ দিয়া শিকারের অন্বেষণে গমনাগমন করে যে এতটুকুনও শব্দ হয় না—এমন কি, না হয় শুষ্ক ও পতিত পত্রের বিন্দুমাত্ৰ মৰ্ম্মর শব্দ। পাখীরা বা পশুরা কোন ক্রমেই তাহাদের পদ-শব্দ শুনিতে পায় না—এতই সন্তর্পণে, এতই সাবধানে উহাৱা যাতায়াত করে। শিকারীর কর্ণ সামান্য শব্দেই সকল শুনিতে পার-চক্ষুদ্বয় নিবিড় অন্ধকারে শত শত পত্র-পল্লবের অভ্যন্তরেও শিকার দর্শন করিয়া থাকে। “লিংস” নামক বন বিড়াল যেমন অত্যাশ্চর্য প্রখর দৃষ্টি শক্তির জন্য প্রসিদ্ধ এই শিকারীদের তীর-দৃষ্টিও তেমনই প্রসিদ্ধ। অন্য ব্যাপারে তত চতুরতার ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া না গেলেও শিকারে ইহাদের ঐ গুলির বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায়। যখন তাহারা দেখিতে পায় যে পাখী আছে, • অথচ বসিয়া রহিয়াছে এত উচুতে যে সেখানে তাহাদের ব্লো- পাইপ অথবা তীর পৌছাইবে না তখন তাহারা সেই পাখীর স্বরের অনুকরণ করিয়া নিজেদের দেহ প্রচ্ছন্ন রাখিয়া—ডাকিতে থাকে। সেই ডাকে মূখ পাখী এক ডাল হইতে অন্য ডালে-~-এক গাছ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক হইতে অন্য গাছেউড়িয়া উড়িয়া, বিহ্বলভাবে বসিতে থাকে— মনে করে, বুঝি তাহার সঙ্গী জুটিল । শিকারী নিম্নদেশ হইতে লক্ষ্য করিতে থাকে যে পাখী ব্লো-পাইপের সীমায় অসিয়ছে কিনা, যেখানে বসিয়াছে ততদূর তীর পৌছাইবে কিনা। কোনএম যদি বুঝিতে পারে যে পাখী তাহাদের আয়ত্তে আসিয়াছে তাহ, হইলে মুহূৰ্ত্ত বিলম্ব না করিয়া, তৃণীর হইতে বিষাক্ত তীর বাহির করিয়া ব্লো-পাইপে সংলগ্ন করে এবং সুকৌশলে পাখীর জীবন- লীলার অবসান ঘটায়। কি অব্যর্থ সন্ধান ! নীরবে-নিঃশব্দে তীর ছুটিয়া চলিয়াছে —কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হইতেছে না। পাখীরা শরাহ হইয়া গাছে কিছুকাল বসিয়া থাকে—পড়িয়া যায় না। ম তিন মিনিট তাহাদের ঐ ধৃষ্টতা--তাহাদের ঐ জীবন লইয়া হান! বিয়ের ক্রিয়া আরম্ভ হইবামাত্র -মুহৰ্ত্ত বিলম্ব হয় না অচৈতন্য হইয়া— পদ স্থালিত হইয়া শিকারীর পদতলে উহারা লটাইয়া পড়ে। পরিশ্রান্ত পথিক যেমন হাটিতে হটিতে সমস্ত দেহের অবসন্নত। উপস্থিত হওয়ায় না হাঁটিয়ও পারে না হাটিতেও 1 না-- হাত পা যেন ভাঙ্গিয়া আসিতে থাকে -নিদ্রায় সমস্ত দেহ তচ্ছন্ন হইয়া অসে—ঝিমাইতে থাকে, তেমন করিয়া একবার চোখ মেলিয়া আবার চোখ বুজিয়া --ক্রমে -ক্রমে অসাড় হইয়া---ধললুহিত ও বাহ্যজ্ঞান তিরােহিত অবস্থায় উপনীত হয় ৫লী কিযে শরাহত কিয়ৎক্ষণ পরে জীবন-লীলার উপসংহার করে। কিন্তু আশ্চর্য এই যে ঔরলী বিষে পাখীর মাংস নষ্ট হয় না--বন্দুক বিহঙ্গও ;

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক বা ছুরিকার আঘাতে নিহত পাখীর মাংস যত শীড় নষ্ট হয় তদপেক্ষা অল্প সময়ে ইহা নষ্ট বা অখাদ্যও হয় না। ঔরলী বিষে পাখীদের মাংস ষােল ঘণ্টা পর্যন্ত অবিকৃত থাকিতে দেখা যায়। দেশে যখন বর্ষার প্রাবল্য ঠাণ্ডা আবহাওয়া থাকে তখন বিষুবরেখার সাত ডিগ্রীর মধ্যবর্তী দেশে এত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ও অবিকৃত থাকে; কিন্তু ঐ ষােল ঘণ্টার পরও ঐ মাংসে কোন খারাপ গন্ধ বাহির হয় না—নষ্ট হইবার কোন লক্ষণ দেখা যায় না---আহত স্থানের মাংসে কিঞ্চিং বিবর্ণতা পরিলক্ষিত হয়। রেড-ইণ্ডিয়ানের শিকার হইতে প্রত্যাগত হইয়ং, তাহাদের কঁাধ হইতে ব্লো-পাইপ নামাইয়া, অতি যত্নে ঘরে তুলিয়া রাখে। কখনও কখনও একটু তীৰ্য্যভাবে রাখিয়া দেয়। যাহা হউক, এই ভাবে ব্লো-পাইপ রাখিয়া রেড-ইণ্ডিয়ানেরা বিশ্রাম করুক। আমরা এই অবসরে দেখিয়া লই কেমন করিয়া বড় বড় জানোয়ার—-কি, কি অস্ত্রে উহারা বধ করিয়াছে । প্রথমে দেখা যাক্, উহারা জলা জায়গায় পীকারী, হরিণ, টেপীর প্রভৃতি কেমন করিয়া শিকার করে। শিকার করে ঐ তীর, ধনু দিয়াই—কিন্তু সে তীর ও ধনু স্বতন্ত্র ভাবে নির্মিত হয়। এই ধনু ছয়-সাত ফিট লম্বা সিল্ক-গ্রাহ্ বা রেসমী ঘাসের, দড়িতে ইহার গুণ নির্মিত হয়। গায়নার বনে, জঙ্গলে অনেক প্রকার শক্ত কাঠ পাওয়া যায়। সেগুলি যেমন শক্ত তেমনই স্থিতিস্থাপক-গুণসম্পন্ন । ঐগুলি হইতে অতি চমৎকার, অত্যুৎকৃষ্ট ধনু বা শরাসন নিম্মিত হইয়া থাকে। তীরগুলি চার- দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক পাঁচ ফিট লম্বা করিয়া প্রস্তুত হয়। এক প্রকার হলদে রংয়ের আগাছা হইতে এগুলি নিৰ্মাণ করা হইয়া থাকে । উহাতে একটাও গাঢ় বা জোড়া নাই। গয়নার সৰ্ব্বস্থানে ইহা প্রচুর পরিমাণে জন্মিয়া থাকে। তীরে বিষ লাগাইবার প্রণালী এই যে, বিষের মধ্যে একখান ছােট কাঠ ভিজাইয়া প্রথম এক পোচ, উহাতে লাগান হয়, তাহার পর রৌদ্রে বা আগুনে শুকাইয়া লইয়া আবার এক পেঁচি, বিষ লাগান হয়। আবার শুকাইয়া লইয়া তৃতীয় বার এইরূপ বিষ দেওয়া হয়। কখন কখন চারিবার এইভাবে বিনাক্ত করিয়া লওয়া হইয়া থাকে। পার্শ্বের অপেক্ষা ভিতরের দিকে বেশী সতর্ক হইয়া— বেশী ঘন করিয়া—বিষ মাখান হয়। ফলাগুলি দেখিতে দো-ফলা তরবারীর মত হয়। এই ভীষণ অস্ত্র লইয়া এ অসম্ভব ধূর্ত শিকারীর দল নিঃশব্দে শিকারের অনুসরণ করে। এবার এখান হইতে বেনিজুইলা এবং সেখান হইতে ব্রেজিল যাত্রা করিলাম। সম্মুখে উপস্থিত হইল এক প্রকাণ্ড বন্য শূকরের দল। আমার সঙ্গে ছিল একজন রেড-ইণ্ডিয়ান্। তাহার মাথায় ছিল অত্যন্ত ভারী মােট—সারাদিনের পরিশ্রমে তাহার সর্বশরীর প্রায় অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিল; কিন্তু শিকার দেখিলে উহারা যেন সকলই ভুলিয়া যায়। কোথায় গেল সেই অবসাদ...কোথায় গেল সেই বিমর্ষভাব ? ধনু লইয়া, বিষাক্ত তীর জুড়িয়া মুহুর্তে সে সন্ধান করিল এক টী শূকরকে। নিমেষমধ্যে শূকর ধূল্যবলুষ্ঠিত হইল। বন্য শূকর ৬১ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক গতাসু হইয়া পাদ্দিকে একশত সত্তর পদ পিছাইয়া পড়িয়া গেল। কি আনন্দেই না তাহার সুস্বাদু মাংস সে আহার করিল ঔরলী বিষের বিষক্রিয়ার পরীক্ষা আমার একটা বিশেষ কাম্য বস্তু ছিল । ইতিপূৰ্বে কয়েকবার ইহার বিষক্রিয়া দেখিয়াছি কিন্তু তথাপি ইহার ভীষণতা সম্বন্ধে আমার এসময়ও বিশেসন্দেহ ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার হারকিউলিস বিট ল' বা ৭৮ গাবরে পােকা একজন লােকের একটা তিন পদাঙ্গঠবিশিষ্ট “শ্লথ” ছিল । শ্লথ এক অদ্ভুত জানোয়ার-সহজে মরে না—কিন্তু এই সাংঘাতিক বিষাক্ত শরে সেই সুদ-জীবন জানােয়ার ও তাতি অল্প সময়ের মধ্যে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। সুবৃহৎ জানোয়ারের মধ্যে ইহার ক্রিয়া দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক দেখিতে কৌতূহলী হইয়া আমরা একদিন প্রায় তের মণ ওজনের একটা প্রকাণ্ড যড়কে লম্বা দড়িতে বঁধিয়া ঔরলী বিষে বিষাক্ত তীরদ্বারা আহত করিলাম। চার মিনিটের মধ্যে বিষক্রিয়া আরম্ভ হইল। এক, দুই করিতে করিতে চৌদ্দ মিনিট কাটিয়া গেল, বড়টা মাটি শুকিতে আরম্ভ করিল যেন হাটিতে চেষ্টা করিতে লাগিল ; এক পা কি দুই পা অগ্রসর হইয়াই, হঠাৎ পড়িয়া গেল । মাটিতে মাথা রাখিয়া, চোখে যেন আঁধার দেখিল । ক্রমে একেবারে নিশ্চেষ্ট, নিস্ক্রিয় ও নিঃস্পন্দ হইয়া পড়িল। পা-গুলি কয়েক বার নাড়িল অজ্ঞাতসারে যেন মাথা উঠিল ও পড়িল-যেন সে উঠাইতে নামাইতে চাহিতেছিল না ঘন ঘন শ্বাস ফেলিতে লাগিল—মুখ হইতে ফেনা বাহির হইতে লাগিল—পশ্চাদ্ভাগ শক্ত হইয়া উঠিল। মুহূর্ত-মধ্যে উহার মাথা ও সম্মুখের পা দুইটী নিঃস্পন্দ হইয়া গেল। একটু একটু নড়িতে লাগিল কেবল উহার বুক। শরাঘাতের পঁচিশ মিনিটের মধ্যে যড়টী মারা গেল। সকলেই মাংস আহার করিল। উহা এতটকু ও বিকৃত হয় নাই। ঔরলী সাভঘাতিক বিষ। রক্তের সঙ্গে মিশিবামাত্র সর্বনাশ উপস্থিত করে। কিন্তু ইহার কি কোন প্রতিষেধক নাই ? কেহ কেহ বলেন, আহত জীবকে যদি মুখ পর্যন্ত জাল ডুবাইয়া রাখা যায় তাহা হইলে সে হয়ত বাঁচিতে পারে । কিন্তু তেমন ভাবে পরীক্ষা করিবার সুযোগ ঘটে নাই। আকের রস গলাধঃকরণ করাইতে পারিলে এই উৎকট বিষের জ্বলা প্রশমিত হয় বলিয়া দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক অনেকে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু একটী বয়ঃপ্রাপ্ত, সুন্দর স্বাস্থ্যবান মোরগকে উহা খাওয়াইলেও কোন ফল হয় নাই। ফুসফুসে দীর্ঘকালব্যাপী দুইটি ভস্ত্রা (bellows) দি; বাতাস দিতে পারিলে বিযের প্রতিষেধ হইতে পারে বলিয়া কয়েকজন বলিয়াছেন। কিন্তু সকল সময়ে এই উপায় তাবলম্ব সম্ভবপর নহে। রেড ইণ্ডিয়ানের কোন প্রতিষেধক জানে কিনা অনুসন্ধান করিলাম, কেহই কোন সংবাদ দিতে পারিল না। যদি কেহ জানিত, তাহা হইলে হয়ত উহা সঙ্গে লইয়া শিকর যাইত অথবা এতদিনের সাহচর্যে নিশ্চয়ই আমার নিকট কিত্ব, না কিছু বলিত। তাহাদেরও অনেক সময় এই বিষে প্রাণ যা—তাহারা যদি কিছু জানিত তাহা হইলে কি এত সহজেই এই বিনের কবলে নিপতিত হইত—এই বিষকে এত ভয় করি ? মনে পড়ে, একদিন একজন এরোওয়াক্ ইণ্ডিয়ান ।.\rovack Indian) আমাদের বলিয়াছিল, “চার বৎসর পূর্বে আর একজন বন্ধু যখন মারা যান তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। দুইজনে মিলিয়া শিকারে বাহির হইয়াছিলাম। বন্ধুটার সামনে একটি ‘মাইসিটিস্ বা উচ্চ-শব্দকারী বানর উপস্থিত হইল। "অামাদের দেখিবামাত্র বানরটী ভয়ে একটী উচ্চ-বৃক্ষে আরোহণ করিল। বন্ধু অবিলম্বে একটি বিষাক্ত শর সন্ধান করিলেন। শরটী মাইসিটিসের দেহে না লাগিয়া লক্ষ্য দুষ্ট হইয়া বন্ধুর হাতের ক জীর একটু উপরে আসিয়া বিধিল ; বন্ধু তৎক্ষণাৎ চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “এই আমার শেষ ! ক্রমে তঁাহার কথা

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
জড়াইয়া আসিতে লাগিল। জড়িত কণ্ঠে তিনি বলিতে লাগিলেন,
‘আর এই ধনু আমি বাকাইতে পারিব না। কঁাবে কুলান ছিল
তাহার সেই বিষের বাস্কটি। তিনি তীর ও ধনুসমে; উহা একত্র
করিয়া মাটিতে রাখিলেন এবং ঐগুলির কাছে শুইয়া পড়িলেন।
আমার নিকট হইতে অন্তিম বিদায় গ্রহণ করিলেন তাহার
সব শেষ হইয়া গেল—তিনি আর একটি কথও বলিতে
পারিলেন না।”
ম্যাকেসীয়ার এই বিষাক্ত শর বিদ্ধ যে কোন হতভাগ্য
জীবের পক্ষে সাধারণ প্রতিষেধকের ভরসা নিতান্ত বিড়ম্বনা।
যাহারা গায়নায় থাকেন, তাহাদের নেকেই হয়ত লিবেন,
এই তীরে অাহত হইবামাত্র জীবন রক্ষার উৎকৃষ্ট উপায় হইতেছে,
জলে নিমজ্জিত হওয়া কিংবা আকের রস পৰ্যাপ্ত-পরিমাণে পান
করা, অথবা মুখে যতটুকু রাখা সম্ভব ততটুকু লবণ রাখা।
সকলই ইণ্ডিয়ানদের প্রদত্ত বা কথিত প্রতিষেধক । কিন্তু আমি
অনেক ইণ্ডিয়ানকে বিশেষ ভাবে জিজ্ঞাসা করায় তাহারা বাধে
আমার নিকট বলিয়াছে, “আপনার নিকট মিথ্যা বলিয়া লাভ কি
--দশজনের একজনকেও ইহাতে ভাল হইতে দেখি নাই।”
তাহা হইলে কি কোন উপায়ই নাই ? হাঁ আছে বৈকি।
যদি কিছু থাকে তাহা হইতেছে এই যে, আহত হইবামাত্র আহত
স্থানের চারিদিকে শক্ত করিয়া বাধিয়া ফেলিতে হইবে। বিষ
যেন সে স্থান হইতে একটুও অন্য স্থানে যাইতে না পারে।
তাহার পরই ক্ষিপ্র-হস্তে শাণিত ছুরিকাদ্বারা সেই স্থানটির

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
মাংস কৰ্ত্তন করিয়া তুলিয়া ফেলিতে হইবে এবং সঙ্গে সঙ্গে
বলিতে হইবে—
“কন্টিনিও কালপাম্ ফের কমপেসে প্রিয়াস কুয়াম
ডীরা পার ইনফষ্টান্ স্যারপ্যান্ট কন্টাজিয়া করপাস”
রেড-ইণ্ডিয়ানদের বিশ্বাস যে ঐরূপ করিলে এবং এই মন্ত্র বলিলে
হয় ত আহত ব্যক্তি আরােগ্য হইতে পারে ।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ “হে ভানু ! হে জগৎপিতা আলাের দেবতা জ্যোতির্ময় । গাহি তব জয় গান আজি—জয় আলোকের জয়।” দুইটি উদ্দেশ্য লইয়া ব্রেজিলের দুর্গম অরণ্যে প্রবেশ করিয়া- ছিলাম। করুণাময় ভগবানের কৃপায় আজ আমার চির- আকাক্ষিত ০ উদ্দেশ্য নিরাপদে সফল। হইয়াছে। কাহাকে বলিব সে অনিন ! একটু জ্বর হইয়াছিল ---একটু কষ্ট হইয়াছিল— সাতরাইতে -জানােয়ারের ভয়ে—তাহা হইবে না? জীবন যায় নাই—কোন শ্বাপদের মুখেও ত পড়ি নাই কোন নদীতেও ডুবি নাই। কয়জনে এমন নিৰ্বিপ্নে—এমন অসভ্যজনসঙ্কুল ও হিংস্র জীবজন্তুপূর্ণ ‘টি-ফার্ন’ বা ফার্ন বৃক্ষ ভীষণ ও ভয়ানক স্থান হইতে—প্রাণ লইয়া ঘরে ফিরিতে পারে ? শুধু তাহাই নহে, সমস্ত স্থানে ঘুরিয়া us:

৭০ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক —সমস্ত স্থান দেখিয়া—সেই একান্ত দর্শনীয় বলিয়া যে দুর্গকে মনে করিতাম—যাহা দেখিবার কোন আশা ছিল না। সেই পর্ত্তগীজদের দুর্গ সাদরে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দর্শন করিয়া--তাহার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি—কমাণ্ডার মহোদয়ের অসম্ভব প্রীতি ও যত্নলাভ করিয়া-ঔরলী বিষের সমস্ত তত্ত্ব সঞ্চয় করিয়া—শাতীত মাত্রায় সেই উৎকট : বিষ সংগ্রহ করিয়া আমি দেশে ফিরিব— ইহার অপেক্ষা আর আনন্দ, তৃপ্তি ও সন্তোষের বিষয় আমার কাছে কি থাকিতে পারে ? তখন প্রভাত হইতেছে। নবারুণের লােহিতরা দিগ্বলয় হাসিয়া উঠিয়াছে। পাখীরা শাখীর শাখায় কল- কৃনে স্রষ্টার গুণ-গানে যেন প্রমত্ত হইয়াছে। আমি শুইয়াছিলাম, উঠিলান। মনে মনে শ্রীভগবানকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলাম। যথাসম্ভব প্রাতঃকৃত্য সম্পাদন করিয়া পবিত্র ভাবে বসিয়া মনে মনে বলিতে লাগিলাম— “হে ঈশ্বর। তুমি যে স্থানে আমাকে পরিচালিত করিবে সেই পথ ভিন্ন যে আর আমার পথ নাই ; যে পথ ভাল মনে কর, সেই পথে আমায় লইয়া চল প্রভু !” সম্মুখে উদ্যত ভানু-কি সুন্দর সে আলো! সূর্যের সে আলাে যেন আমায় বলিতেছিল—হে পথিক, আজ তুমিও আলােময় হইয়াছ, অন্ধকার হইতে আলােতে তােমায় লইয়া চলিয়াছি। এত দিনের তােমার সে প্রার্থনা আজ পূর্ণ হইয়াছে। তোমার মনের অন্ধকার আজ দূর হইয়াছে।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৭১
একটী কুকুর আমার সঙ্গ লইল। কুকুরকে দেখিয়া মনে
হইল, এতদিন এখানে কুকুর দেখি নাই কিন্তু ও আজ এখানে
আসিল কোথা হইতে । একদিন শুনিয়াছিলাম যে ৬নিয়াদের
আগমনের পূর্বে এখানে কুকুর মােটেই ছিল না। মনে পড়িল
গয়নার অধিবাসীদের স্পানিয়ার্ড স্মৃতি-রক্ষার প্রচেষ্টার কথা;
স্পানিয়ার্ডের সঙ্গে সঙ্গে যাহা কিছু আনিয়াছিল । রাখিয়া
গিয়াছিল, ইহারা তাহা অবিকল বজায় রাখিয়াছে।
সেই ওয়ারাে, এরোওয়াক্ ও একে (ওয়ে গাছকে এখানকার
ম্যাকৌসী ও ক্যারিব জাতীয় লােকেরা স্পেনদেশের লােকের
মত এ নামেই ডাকিয়া থাকে । উহারা টপি বা হ্যাটকে । Hat)
সম ব্রেরে। (Som brer() ), সার্ট বা যে কোন কাপড়কে কামিজ
( Cuist), জুতাকে জ্যাপাটো ( Zapat) ), চিঠিকে কার্ট।
( Curti ), মােরগকে গ্যালিনা ( (iiullina), বারুদ বা গান
পাউডারকে কভার ( স্প্যানিস্পলভারা), গোলা বারুদকে
বালা (Bala), গাভীকে ভ্যাকা (Vaca), কুকুরকে পেত্রো (1’erro)
প্রভৃতি বলিয়া থাকে।
যাহারা ব্যবসায় বাণিজ্য করিতে এদেশে আসিতে চাহেন,
তাহাদের পক্ষে ইহা একটী প্রকৃষ্ট স্থান সন্দেহ নাই। এমীনের
সন্ধির পূৰ্ব্বে বৃটিশ গভর্ণমেন্ট এস্থান গ্রহণীয় বলিয়া মনে করেন
নাই। বৃটিশ অধিকারে আসিয়া এখন ইহা নানাভাবে, নানা
রাজনৈতিক আবহাওয়ায় বিজড়িত হইয়াছে ও হইতেছে।
একদিকে দেখিয়াছি ও শুনিয়াছি, ব্লগাঞ্জার রাজ-১ ক ট একজন
.11

१२ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক হইয়াছে ; উচ্চাকাঙ্ক্ষী নরপতির প্রতাপে করতলগত হইতেছে—জ্যানেইরােতে তাহার রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইতেছে। ক্যায়েনে তাহার বশীভূত হইয়াছে। ল্যাপ্লাটা স্বাধীন স্বয়ং রাজ্য চালনে সমর্থ বলিয়া মনে করিতেছে । ক্যারাকগণ বিদ্রোহী হইয়াছে। স্যান্টাকো যদি তাহাদের সঙ্গে যােগদান করিত তাহা হইলে তাহাদের সম্মিলিত শক্তি হয়ত অনেক কিছু করিতে পারিত। ডাচ গায়নার প্রতিদিকে অচিন্ত্য- পূর্ব, অত্যদ্ভুত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হইতেছে। এমন রাজ্যে—যে রাজ্য সৰ্বতাে- ভাবে স্বতন্ত্র--যদি গভর্ণ- মেন্ট, সাহায্য করিতেন তাহ। হইলে উন্নতি দেখিতে পাইতাম। বিষুবরেখার ‘রাই ও ক্যারােনির প্রথম জলপ্রপাত অবস্থিত এই বিচিত্র দেশে প্রতি নিয়ত সাগর বায়ু প্রবহমান রহিয়াছে ; অধিকাংশ স্থান ;

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ৭৩ পার্বত্য শােভা ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। বর্ষা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় উদ্ভিদের পক্ষে পরম সহায়তা সাধন করে। সমুদ্র সৈকতাংশ এই সমস্ত প্রাকৃতিক অনুগ্রহ লাভ করিলে ও দক্ষিণ আমেরিকার অভ্যন্তর-ভাগ, অনেকটা তান্য প্রকার। গায়ন ও নী জুয়েলায় কখন বর্ষা। আবার কখনও বা বৃষ্টিহীনতা ঘটিয়া থাকে। সমুদ্রের কোন প্রভাবই এখানে কার্যকরী হইতে পারে না। পর্বতমালা ও ঘন অরণ্যের জন্য সমুদ্র-বায়ু ও সমুদ্রের প্রভাব ঐ সকল স্থানে আবদ্ধ থাকে। যতকাল উত্তর-পূর্ব বায়ু বহমান থাকে, ততকাল বর্ষণহীনতা দেখা যায়। সমস্ত স্থান শুদ্ধ হইয়া উঠে; নির্জীব বলিয়া বােধ হয়। সূর্যের গতি পরিবর্তিত হইলে, বষা আসিলে আবার বৃক্ষ-বল্লরী ও জীব-জন্তু শান্তিলাভ করে । সকল স্থানে আশানুরূপ বৃষ্টি হওয়ার জন্য নব-জীবনের পুলক-স্পন্দন দেখা যায়। সালজার ( Salgar ) নামে স্থানটী, স্যানিলার ( Salvanilla) অতি নিকটে । আমার মনে পড়ে যখন সেখানে যাই তখন যেন এক নূতন রাজ্যে উপস্থিত হইলাম বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। অলােতে, বর্ণ বৈচিত্রে সমস্ত স্থান যেন উচ্ছল--কি যেন কি এক মােহময়—কখনও যেন তেমন স্থান আর দেখি নাই এমনই অনুভব করিতে লাগিলাম। কিন্তু এখানে আছে তেমন সবুজ গাছ, লতা, পাতা, তেমন কোন শ্যাম শােভা—কেবল ধূ ধূ বালুকার খেলা ! সীমাহীন অনন্ত মরুভূমি । সূর্যের প্রখর উত্তাপে সৰ্বাঙ্গ যেন দগ্ধ হইতেছিল। মাঝে মাঝে যেন সৌভাগ্য-পবনের মত এক একটা ঝাপটা বাতাস কোথা ৭৪ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ; হইতে কেমন করিয়া আমার দেহস্পর্শ করিয়া আমাকে ক্ষণকালের জন্য সান্তনা-দান করিতেছিল। এক দিনকার কথা বলিতেছি, দেখিলাম একখানা ষ্টীমার যাইতেছে। সেটা আসিয়া আমার নিকটে থামিল। টিকিট করিয়া ষ্টীমারে উঠিলাম ; ডেকে বসিয়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভােগ করিতে লাগিলাম। আমার মনে হইল যে, এ কোথায় আসলাম। ষ্টীমারের উপ মাপক যন্ত্রের দিকে লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম হাতে ১২৭৫" ফার্ণ-হিট উঠিয়াছে। বালুকাময় সমুদ্র নিকটে এইরূপ বেশী উত্তাপ প্রায়ই থাকে। সুশীতল বায়তে সর্বাঙ্গ পুলকিত হইয়া উঠিল । শান্ত-গভীর জল আর তাহারই পার্শ্বে শ্যামল বনানী। শত শত লতা আকিয়া বাকিয়া পড়িয়াছে গাছের উপর হইতে সেই জলে ; মৃদু পবনে আন্দোলিত হইতেছে, নয়ন জুড়াইয়া গেল। দূরে চাহিয়া দেখিলাম। দৈত্যের দেখিলাম। দৈত্যের মত বৃহৎকায়--এক একটা কুম্ভীর এক এক জায়গায় ভাসিয়া উঠিতেছে। ষ্টীমারের ডেক হইতে যদি কিছু পড়ে বা যদি কোন হতভাগ্য মানুষ জলে পড়িয়া যায়, তাহা হইলে উহারা ধরিয়া খাইবে, এই আশায় বিকট হাঁ করিয়া রহিয়াছে। উহাদের দেখিয়া আমার শরীর শিহরিয়া উঠিল ! তীরে চাহিয়া দেখিলাম যে, শত শত কুম্ভীর বালুকা-রাশির মধ্যদিয়া, হামাগুড়ি দিয়া চলিয়াছে। শিকারীরা রাইফেল তুলিয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইতেছে। একটাকে গুলি করিলেই বাকীগুলি ভীষণ শব্দ করিতে করিতে তীর হইতে বেগে জলে ঝাপাইয়া পড়িতেছে আর তাহাদের সেই সবেগ পতনে জল একান্ত চঞ্চল দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক হইয়া উঠিতেছে। শিকারীদের রাইফেলের গুলি খাইয়া কত যে জলে মরিয়া ভাসিয়া উঠিতেছে তাহার ইয়ত্তা নাই। দ; সদ্য ধরা যাইতেছে না, ছয়-সাত দিন পরে মরিয়া ভাসিয়া উঠে। জলের গাছ--পিষ্টিয়া ও পণ্টেতেরিয়া—উহাদের উপর গজাইয়া থাকে। গাছ উঠিবার কত আগে শকুনি ও গৃধিনীরা আসিয়া মৃত কুমার- গুলির মাংস ছিড়িয়া খাইতে আরম্ভ করে। সেখানে যেন এক হাট বসিয়া যায়। কি বিকট—কর্ণবধির-কারী শব্দ! মাংস- লােলুপগণের কি ভীষণ পক্ষের ধ্বনি-কি ঝগড়া —-কি বিরোধ! কাহাকে তাড়াইয়া কে খাইবে—কিছু ঠিক নাই। জল হইতে কুম্ভীরগুলিকে টানিয়া তুলিতেছে গৃধিনীর দল। তারপর মহানন্দে, উৎসবের মত তাহারা ছিড়িয়া খাইতেছে সেই পচা, দারুণ দুর্গন্ধময় মাংস—বিশালকায় ও সাঙ্ঘাতিক কাটায় ভরা উহাদের দীর্ঘ লেজ ও শিরদাঁড়া। কি ভয়ানক দাত -কি বীভৎস দুত্তি ! ঐ সব দেখিয়া যুগপৎ ঘৃণা ও বিস্ময়ে অভিভূত না হইয়া থাকা যায় না। আমাদের ষ্টীমারের সামান্য একটু গতি পরিবর্তন হইল। দেখিলাম, এরিষ্টো-লােচিয়া বা বার্থওয়াট গাছ। এই গাছগুলি দক্ষিণ আমেরিকার বিচিত্র বস্তু! পরে দেখিলাম ও অরেঞ্জ বা কমলানেবু জাতীয় গাছ। ইহাদের পাতা দেখিতে কি মানুষের হৃদযন্ত্রের মত ; গাছের সঙ্গে সংলগ্ন হইয়া চক্ করে ! ইহাদের এক একটা মুকুল, এক একটা ফুল প্রকাণ্ড ! কি সুন্দর দেখিতে উহাদের। ফুলগুলি এত সুন্দর ও বড় যে দক্ষিণ আমেরিকার উলঙ্গ ছেলেমেয়েরা ঐগুলি দিয়া বিচিত্র ফ্রিজিয়ান ক্যাপের ৭৬ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ( Phrygian Cap) মত টুপি করিয়া মাথায় দেয় । উহার বর্ণ ঘাসের মত, মধ্যে মধ্যে আছে ভায়লেট রং। এখানকার বৃদ্ধ, যক, বৃদ্ধারা মহা আলস্যে দিন কাটায়। গৃহে তেমন আবাবের প্রয়োজন হয় না। ব্লো-পাইপ, দু একটা মাদুর, বঁড়শী, রান্নার ‘এরিষ্টো-লােচিয়া ফুল মাথায় দিয়া রেড-ইণ্ডিয়ান্ ছেলের এমাজন্ নদীর স্রোতে আনীত মৃত কুমীরের মাংস খাইবার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। সস্প্যান, খাইবার জন্য তিনটা পাথর, একটা পুরাতন বন্দুক এই কয়েকটী জিনিষই হইতেছে গৃহস্থালীর প্রধান দ্রব্য। গাছের ফল, ব্রেড -ফুট, তরমুজ, ম্যানিয়ক, ব্যাটাটা এদের প্রধান অহাৰ্য ; মাঝে মাঝে এরা মাছ মারে আর খায়। দেশে যথেষ্ট

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৭৭
ফলমূল পাওয়া যাওয়ায় এদের অন্য কোন পরিশ্রমের প্রয়ােজন হয়
। যেখানে সেখানে কফি জন্মে। অরেঞ্জ বা কমলনেবু গাছে
অজস্র কমলা ফলে। কুমড়াগুলি আপনি জন্মিয়া গাছে গাছে
ঝুলিয়া থাকে! উহা হইতে অধিবাসিদের জলের কুঁজ, থালা
প্রভৃতির কায হইয়া থাকে। এখানে অক গাছ একবার জন্মিলে
কুড়ি-পঁচিশ বৎসর থাকে, সহজে ফুরায় না। এ সকল প্রাকৃতিক
অপর্যাপ্ত দানের উপরে আর কেহ কখনও বেশী বা ভালভাবে
উৎপাদনের চেষ্টা করে না। বয়স্থ লােকেরা কখনও কোন দৈহিক
কাৰ্য্য করে না, যদি কিছু করে তাহা কেবল “আইভরী পাম”
বলিয়া যে ফল আছে উহা কুড়াইয়া আন। ষ্টীমার বা বােটে
যে সব ব্যবসায়ীরা মাঝে মাঝে ব্ৰণ্ডী বা মদ লইয়া আসে তাহা
ভেজিটেবল্ আইভরীর পরিবর্তে ইণ্ডিয়ানেরা গ্রহণ করে।
এখানকার ছেলেমেয়েরা মাটি খায় বলিয়া পাকস্থলীর নানা কঠিন
ব্যাধিতে মধ্যে মধ্যে ভুগিয়া থাকে।
অামরা ক্রমে “হােণ্ডা” নামক স্থানে উপনীত হইলাম ।
এ একটা বড় বন্দর ! চতুঃপাশ্ববর্ত্তী বিবিধ দ্ব্য এখানে আমদানী
ও রপ্তানী হয়। ষ্টীমারে যে সমস্ত জিনিষ ইউরেপ হইতে
আনীত ছিল উহা বোগােটায় চালান দিবার জন্য রাখা হইল।
রপ্তানীর মালের মধ্যে এমব্যালের তামাক বিশের মুল্যবান
বলিয়া শুনিলাম। একজন সাহেব আমাকে বললেন, “তুমি
ডেখিতেছি ভারী জানটে চাচ্চ—শুন টা হ'লে—এই মেইজ,
পট্যাটো, বী, কর্ণ, রাইস্, ব্যানানা, এনীসীড, কটন, সুগার কেন,

৭৮
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
ও
কফি, ভেজিটেবল আইভরী আমরা লইয়ে যাচ্চে-“বুলি ?”
কতকগুলি চমৎকার রং করা কাঠ তিনি দেখাইলেন। একটার
নাম হেমাটক্সীলন ক্যাম্পেচিয়া নাম। মরক্যাট, জেন
জিব্রিল্লো কাঠের হলদে, চীরকা কাঠের সবুজ, ব্যাগলায় নিল্যাকে
ও ট্যাগাল্যাগুয়া কাঠের রং ঘন নীল হয়। ঔষধের গাই যে,
কত দেখিলাম তাহার ইয়ত্তা নাই—কোনটার নাম সাসপেরিলা,
কোনটার নাম কোপােইবা, কোনটার নাম বালস অফ, পেরু।
নানা রকম গন্ধ দ্রব্য তাপিন, ভেনিলা প্রভৃতি দেখিয়া চরিতার্থ
হইলাম ।
ইহার পর গুয়াডনাস্ নামক স্থানে গিয়া উপস্থিত হইয়া,
বাঁশের ঝাড় দেখিয়া একান্ত বিস্মিত হইলাম। এত বঁাশ এক
জায়গায় কখনও দেখি নাই। মাটিতে ভরিয়া রহিয়াছে বন্য
ধ্রুবেরী -মনে হয় কেহ যেন কার্পেট পাতিয়া রাখিয়াছে।
তাহার পর বােগােটার বাজার, একটি দেখিবার মত স্থান।
পথিকেরা শান্ত হইয়া যখন এখানে আসে তখন তাহাদের
বিশ্রামের জন্য “পালি ভসের” বা তাল-জাতীয় বৃক্ষের পাতায়
ছাওয়া কুটীর আছে । এক রকম ব্রেড, বা রুটী পাওয়া যায় ;
সেগুলিকে ক্যারাওয়ে সীডস দিয়া সুগন্ধ করা হয়। বাঁশের
চোঙ্গায় নির্মিত এক প্রকার প্রকাণ্ড বাসনে করিয়া হোষ্টে বা
অতিথিপরায়ণা রমণীগণ সেই সুমিষ্ট খাদ্য পথিকের সম্মুখে আনিয়া
দেন ; গুয়ারাপাে বলিয়া এক রকম
রকম লেমােনেড, অনিয়া
পানীয়স্বরূপ প্রদান করে এবং কুমড়াদ্বারা তৈয়ারী এক রকম

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক সুস্বাদু মদ্যও দেয়। ওগুলি কুমড়ার ফলের অর্ধ শ ফঁাপা করিয়া তৈয়ার হয় । বােগোটার বাগানে তালুর = [{দ হয়, কিন্তু তত ভাল জন্মে না। কপি ও লাল, হলদে, শাদা সরল জন্মে যথেষ্ট। এই সরেলের ফল হয় অবিকল আলুর •ত। সবুজ রংয়ের রসুন, পেঁয়াজ, বীন, এডস্ পলীমনিয়া এলিস, সুমিষ্ট ভেচ, কুমড়া, মারজোরাম, কি উল্যাটে, জাফ্রান, কমলা- নেবু, কলা, আনারস, নারিকেল, সামিয়া এমেরিকানা, পেপে, মেজ, ম্যাটো, পেনিস্ পিপার, ম্যানিয়, ব্যাটাটা প্রভৃতিতে বাজার ভর্তি হইয়া যায়। কত সস্তা এই সমস্ত জিনিষ ! অত্যন্ত সুস্বাদু, উৎকৃষ্ট একটা আনারসের দাম মাত্র এক আন। ভেনী জুয়েলা আবিষ্কার করেন ডাঃ কাল সু চিস। সে হইতেছে ১৮৭৬৭৭ খৃষ্টাব্দের কথা। ভেনী জুয়েলা ও এক অতি বিচিত্র স্থান। ক্যালাবােজোরে কত গল্প শুনিলাম। তাহার পর লানোসের কথা উঠিতে জানিলাম যে, এখানে যখন এষা হয় তখন জলাশয়ের ধারে কোন কোনদিন হঠাৎ মাটির ৭ ফ পিয়া উঠে, এক একটা আগ্নেয়গিরির অ?ৎপাতের মত শব্দ ও শুনা যায়। মাটিগুলি উদ্ধে উৎক্ষিপ্ত হইতে থাকে। দখিবামাত্র লােকজনে ভয়ে পলাইতে আরম্ভ করে। এক রকম অতি বৃহৎ জল-সর্প এবং আঁস্-ওয়ালা কুম্ভীর বহুদিন যাবৎ——সারা গ্রীষ্মকাল গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকে। বর্ষার প্রথম বারিধার! পতিত হইবামাত্র উহারা উথিত হইবার চেষ্টা করে। নদী, •াল প্রভৃতি জলে ভরিয়া যায়। গ্রীষ্মের উত্তাপে নিজ্জিব ও মৃতকক পশু-পক্ষী, দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক কীট-পতঙ্গ সেই দ্বীপের মত চতুর্দিকে জলে জলময় স্থানে, যে যাহাকে পারে মরিয়া খায় । দক্ষিণ আমেরিকার ঘােড়ার শত্রু যে কেবল ভগগুয়ার বা কুম্ভীর তাহা নয়। ইহাদের অপেক্ষাও সাঘাতিক শত্রু তাহাদের আছে। ষ্টেপসের ( Steppes) বা বৃহৎ তনুর ইলেকটি ক ঈল প্রান্তরের মধ্যে ( বেরা ও রাষ্ট্ৰোতে) যে সকল জলা ভূমি আছে সেই সকল স্থানে ইলেটিক ঈল ( Electric Eel ) বলিয়া এক প্রকার ভয়ঙ্কর প্রাণী আছে। উহাদের দেহ অত্যন্ত পিচ্ছিল এবং হলুদ রংয়ের ডেরায় ভূষিত। দেহের প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা উহারা বিদ্যুতের মত তীব্র আঘাত করিতে পারে ; চার হইতে ছয় ফিট পর্যন্ত লম্বা হয়। যত বড় জানোয়ারই হউক না কেন উহাদের সেই নিদারুণ ব্যাটারীর অধীন হইলে আর রক্ষা নাই এই ইলগুলির অত্যাচারে এই স্থান দিয়া দীর্ঘ-কালাবধি কেহ গমনাগমন করিতে সাহসী হয় নাই। এই ঈল শিকার এক আশ্চর্য তামাসা; যাহারা শিকার করে তাহারা সুকৌশলে কতকগুলি দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ৮১ ঘােড়া ও অশ্বতরকে যে সকল জলাশয়ে ঈল গুলি থাকে সেই স্থানে দৌড়াইয়া লইয়া জলমধ্যে নামাইয়া দেয়। উহাদে শব্দে ঈল গুলি কিলবিল করিয়া উঠে। তখন শিকারীরা জলাশয় গুলির চতুর্দিকে নানা অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত হইয়া পােদ্দেশ্যে ত হইয়া থাকে। সাপের মত কুণ্ডলী পাকাইতে পাকাইতে উহ'র জলের তল হইতে মধ্যে উঠিয়া ঘােড়া ও অশ্বতরগুলির বুকে নীচে দিয়া সাঁতার কাটিতে চেষ্টা করিতে থাকে । তাহার । সেই সাঘাতিক আঘাত আরম্ভ হয়। কতকগুলি ঘোড়া ও তাশ • র ঐ তাঘাতেই মারা যায় আর কতকগুলি নাসিক! গচ্ছন করিতে করিতে ইতস্ততঃ ধাবিত হইতে থাকে-ঝুটি ফুলাইয়া, .খ বড় বড় করিয়া, প্রাণভয়ে সবেগে উপরে উঠিতে চেষ্টা করে। তখন রেড-ইণ্ডিয়ানের হাতের বড় বড় বাঁশ দিয়া সেগুলিকে তাড়াইয়া আবার জলে নামাইয়া দেয়। এই ভাবে অনেকক্ষণ যুদ্ধ।ভিনয় হইতে থাকে। ব জগর্ভ মেঘের মত কিছুক্ষণ পরে ঈলেব। শান্ত হইয়া পড়ে। সেই অবস্থায় তাহার জলাশয় ত্যাগ করিতে উদ্যত তখন আর আঘাত করিতে পারে না বা তাহাদের সেই বৈদ্যুতিক শক্তি থাকে না। ঘোড়ার পদাঘাতে জীবন যাইবে ভাবিয়া তীরে উঠিতে আরম্ভ করে। শিকারীরাও টহ! চায় ; তীরে পাইবামা প্রি-হস্তে সুতীক্ষ “হারপুণ” নামক অস্ত্র দ্বারা উহাদিগকে বিদ্ধ করিয়া নিঞ্জীব করিতে থাকে। ঈল মরিয়া গেলে, লম্বা লম্বা কাঠের লাঠি বা বলা দিয়া উপরে উহা ও টানিয়া তােলে। শুনিলাম এক সাহেব, ইণ্ডিয়ানদিগকে ডাকিয়া বেশী দামী হয় ;

৮২
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
মত ;
ঘােড়া ঐ ভাবে জলে ফেলিয়া, না মারিয়া, কম দামের কতকগুলি
গাধা দিয়া ঈল মারিতে বলেন। প্রথমে তাহাৱা সাহেবের কথাই
বুঝিল না, তাহার পর ঘােড়ার বদলে গাধার কথা শুনিয়া এমন
উচ্চ-হাস্য করিতে লাগিল যে সাহেব আর কোনক্রমেই তাহার
উদ্দেশ্য সিদ্ধি করিতে পারিলেন না।
এই ইলেটিক ঈল ছাড়া আরও অনেক ভয়ানক মাছ
দক্ষিণ আমেরিকার এই সমস্ত স্থানে দেখা যায়। এক রকম
মাছ আছে, তাহার নাম “পীগাে সেন্ট্রাস্ ন্যাট্রেবেরী” আর এক
রকম মাছ আছে সেগুলির নাম “ট্রাইগন হীটি কা”। হীগুটিক্স
চ্যাপ টা হয়। উহাদের লেজ গুলি সরু, অগ্রভাগ সূ হুকের
ইচ্ছামাত্র সােজা করিয়া রাখিতে পারে।
এই লােজের
সহায়তায় ইহারা সহসা পথিক ও জীব-জন্তুগণকে আক্রমণ করে ;
বালীর নীচে লুকাইয়া থাকে, কোথায় থাকে, কেহই জানিতে পারে
। ইহারা যে আঘাত করে তাহাতে বিষ বাহির হয় এবং সেই
বিষে অসতর্ক প্রাণীদের মৃত্যু হয়।
আর এক রকম পােকা দেখিতে পাওয়া যায়। সেগুলিকে বলে
“ল্যান্টার্ণ ফ্লাই”। এইগুলি সুরীনাম নামক স্থানে প্রচুর পাওয়া
যায়।
“ওরিনােকো” বলিয়া এক রকম প্রাণী আছে। উহাদের মুখ
হইতে, সন্ধ্যার অন্ধকার নামিয়া আসিতে না আসিতেই, আলাে
জ্বলিতে থাকে। হাজারে হাজারে উহার এক থাকে ও
যেস্থানে থাকে তাহা আলােকে আলোময় হইয়া যায়।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক “স্যাণ্ড, ফ্লী” নামক পােকা, নানা জাতীয় ছােট ছােট পিপড়া, মশা প্রভৃতি এখানে দেখিতে পাওয়া যায়। “পােনের ফ্ল্যাভ্যাটা” নামক এক জাতীয় বড় বড় পিপীলিকার কামড়ে জীব-জন্তু ও মানুষ অজ্ঞান হইয়া যায়। সারাদিন দারুণ বিষে জছেরি। থাকিয়া তাহাদের জ্বর হয়। বিষাক্ত এবং হিংস্রক গিরগিটী, বেঙ, গেকো, স্কোলােপেণ্ডার, বিচ্ছ প্রভৃতি ইতস্ততঃ ঘুরিয়া বেড়ায়। গিরগিটী- গুলির মধ্যে “টি লিওয়ান্” নামক গিরগিটীর স্বভাব বড়ই ভীষণ এবং ইহাদের মাংস খাইতে খুব স্বাদু। এখানে এক প্রকার পাখী দেখিলাম, উহার ন! 'ক্র্যাগ- ড্যানসার'। পৰ্বতের উপত্যকায় ও বনে বনে উহার। চিzণ করে । উহাদের মূর্তি বিকট এবং স্ত্রী-জাতীয়দিগের সন্তোষের জন্য উহারা নাচিয়া থাকে। উহা দেখিয়া হাস্থ্য সংবরণ করা যায় না। ল্যানােসের বন্য-গাভী অনেকটা ডাচদের গাভীর মত । দুধ তত বেশী হয় না, কিন্তু দেখিতে বেশ শক্ত-সমর্থ । লবণাক্ত খাদ্য খাওয়াইলে এই গাভীগুলি অতি অল্পদিন-মধ্যে বেশ মােটা হয়। বন হইতে ভুলাইয়া আনিতে রেড-ইণ্ডিয়ানের উহাদিগকে কৌশলে, ঘাসের সহিত লবণ দেয় এবং উহা পাইলেই সব ভুলিয়া উহারা বশ্যতা স্বীকার করে। মহাভারতে খাণ্ডব বন দাহনের যেরূপ বিরাট ও বিচিত্র গল্প শােনা যায়, এখানেও প্রতিবৎসর তেমনই ভীষণ অগ্নিকাণ্ড হয়। এখানকার অধিবাসীরা শস্যের সারের জন্য, সমস্ত বন-জঙ্গলে, ঘাসে আগুন লাগাইয়া দেয়। কি ভীষণ সে আগুন ! সারা অঞ্চল ওদের ৮৪ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক ঘটে। এমন কি সমস্ত গাছ-পালা, লতা-পাতা পুড়িয়া ভস্ম হয়। অগ্নির সৰ্বভু সেই লেলিহান্ জিহ্বায় ভয় পায় না এমন প্রাণ নাই। জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গ পুড়িয়া ভস্মসাৎ হইতে থাকে-- কাহারও এমন শক্তি নাই যে সে লােহিতবর্ণ দারুণ আগুনের সম্মুখীন হয় । পাখীরা ভয়ে শূন্যে উড়তে থাকে—লক্ষ লক্ষ পুড়িয়: মরে। প্রিয়তম শৰক পুড়িয়া মরিতেছে, মাতা করুণস্বরে চীৎকার করিতেছে—হাহাকারে দিগণ্ডল ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হইতেছে--- ধূয়ায় কিছু চোখে দেখা যাইতেছে না—আশ্নরূঢ় পথিক ঘটনা ক্রমে ঐ অগ্নি-বেষ্টিত স্থলে প্রবিষ্ট হইলে জীবন রক্ষায় সমর্থ হয় । ইহারই মধ্যে আবার বুভুক্ষুর উদরপূর্তির অপূৰু সুযােগ আগুনের ভয়ে কীট-পতঙ্গ গর্তাদি হইতে বাহির হইয়া ইতস্ততঃ ধাবিত হইতেছে। কত পাখী উড়িতে উড়িতে যেখানে তখনও আগুন লাগে নাই.-সেই সমস্ত স্থানে বারংবার উড়ীয়মান হইতেছ ও বিদ্যুদেগে নিমাভিমুখে উৎপতিত হইয়া বিবিধ টিটিকী, গিরগিতা, সর্প, কীট-পতঙ্গ ধরিয়া উর্ধে উত্তোলিত করিয়া, ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ভক্ষণ করিতেছে--গলাধঃকরণ করিতেছে —চপ্পুটে উহাদের জীবন-লীলা শেষ করিতেছে ! কি যে ভয়াবহ–উৎকট রােমাঞ্চকর সে দৃশ্য ! আমরা দুই-তিন জনে মিলিয়া রাইও ক্যারােনী নামক স্থানে উপস্থিত হইলাম ; উহার নিকটেই ছিল বেবি মিয়া পৰ্বত-শ্রেণী। ঐ জায়গাটী ভেনী জুয়েলা ও ব্রিটিশ গায়নার প্রান্তদেশে অবস্থিত। আমরা দেখিলাম, একটা সুন্দর জলপ্রপাত হইতে তরতর করিয়া দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক জল, পাহাড় বাহিয়া নীচে অনবরত পড়িতেছে। এ সময় কবি রবীন্দ্রনাথের “নিঝরের স্বপ্নভঙ্গ” কবিতাটী মনে হইতে লাগিল । নিঝর বলিতেছে--- “আমি ভাঙ্গিৰ পাষাণ কার” পাযানের কারাগার ভাঙ্গিয়া জলপ্রপাত নামিতেছে, অবিশ্রাম কল, ছছ, ঝরুপার করিয়া জল পড়িতেছে। আমাদের চোখ যেন জুড়াইয়া গেল ; শুনিলাম ইহাই রাই ও ক্যারােনীর প্রথম জলপ্রপাত। জলপ্রপাত দেখিয়া আমরা ক্রমে “মানায় পেছিলাম । এখানে প্রকৃতির অপূর্ব তাঙ্গরাগ—আশ্চৰ্য্য, আশচ। হরিদ্বর্ণ বৃক্ষ-বল্লরী দর্শন করিয়া, চোখের যেন আর তৃপি হইতেহিল না। অসংখ্য কফি, তামাক, কোকেয়া, নানা রকম ঔষধের !'-পালা, মসলা, ব্যবহাথ কাঠ প্রভৃতিতে এই স্থানকে কেহ যে সযত্নে সজ্জিত করিয়া রাখিয়াছে। বিশিষ্ট বৃক্ষাদির একজন বিশেষজ্ঞ বলিলেন, “ দেখুন, চায়না বাক, সাসপেরিলা। ভ্যানিলা, কোপ্যাইড, বাস অফ পেরু।” ক্ৰমে নি আরও গাছ দেখাইতে লাগিলেন। যে সকল গ। 2 . তা কখন দেখি নাই, তাহা দেখিতে লাগিলাম । কত রকমের আঠা-যুও {(fum) গাছ ও ক্যাওচ ও নানাজাতীয় অজ্ঞাত গুণশালী কাঠ থরে থরে সেখানে সজ্জিত রহিয়াছে। ঐগুলি দিয়া ঔষধ, তক্তা বা সাজ- সজ্জার কার্য হইয়া থাকে। দেখুন

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
দেখিতে দেখিতে শ্রান্তি ও ক্লান্তি আসায় সমস্ত যেন বিস্মৃত
হইলাম। উত্তরােত্তর নবদৃশ্য, বৃক্ষ-বল্লরী প্রভৃতি দেখিবার জন্য
আমরা আবার অগ্রসর হইতে লাগিলাম। এই সময় যাহারা
পাম্পাস-ঘাস
আমার সঙ্গে ছিলেন তঁাহারা বলিলেন যে, আমার পূর্বে তঁাহারা
একবার এখানে আসিয়াছিলেন। আমি কিন্তু, তত ভাল করিয়া
দেখিয়া উঠিতে পারি নাই।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৮৭
স্থানটীর নাম কুইনডিউ, দেখিলাম “ট্রী ফার্ণ” দিয়া এখানকার
বৃহৎপথ নিম্মিত হইয়াছে। বন্ধুরা বলিলেন, “এই দেখুন সেই
নােয়েটজলী ইন্ দি র্যাভাইন এ সামাপাজ, গাছ।”
বিচিত্র “সেরােজীল এণ্ডীকোলা বা ওয়াক্স-পামের” গাছ
দেখিলাম ; অল্প পরে উচ্চ উপত্যকায় উঠিলাম । এখানে লামা,
কণ্ডর প্রভৃতির অজস্র যাতায়াত দেখিয়া একান্ত বিস্মিত হইলাম।
ভিকুনা নামক এক আশ্চৰ্য্য চঞ্চল ও লাজুক পশু আমাদের
দৃষ্টি-পথবৰ্ত্তী হইল। কি চিক্কন ছােট ছােট ও কুঞ্চিত উহাদের
লােম ! হরিণের মত এই প্রাণীর গতি অতি দ্রুত।
রেড,
ইণ্ডিয়ানের বন্দুক দিয়া উহাদের মারে না।
দিয়া উহাদের মারে না। লাঠি ও লম্বা দড়ি
লইয়া উহাদিগকে শিকার করিতে আরম্ভ করে। বার-চৌক হাত
দূরে দূরে এক একটা লাঠি পুতিয়া, প্রকাণ্ড মাঠে, মাটির দিক
হইতে প্রায় ত্রিশ ইঞ্চি উপরে ঐ দড়ি লাঠিতে লাঠিতে বাঁধিয়া
রাখে। এই রকম করিয়া কখনও কখনও বা এক মাইল, দেড়
মাইল শুনি তাহারা ঘিরিয়া হয় । কয়েকজন স্ত্রীলোক ঐ লাঠি
বা খুঁটিগুলির উপরে চক্চকে নেড়া ঝুলাইয়া দেয়—নেকড়াগুলি
বাতাসে পতপত করিয়া উড়িতে থাকে। নেকড়া ঝুলানো শেষ
হইবামাত্র কতকগুলি লােক ঘােড়ায় উঠিয়া ইতস্তত ঘুরতে
আরম্ভ করে। ভিকুনগুলি এদিকে ওদিকে থাকে এবং ঘােড়ায়
চড়িয়া ঐ লােক গুলি উহাদের তাড়া দিয়া আনিয়া, ঐ বেষ্টিত
স্থানে উপস্থিত করে। ভিকুনাবা অত্যন্ত ভীত হইয়া লাফাইয়া---
ঐ দড়ি বা পতাকাযুক্ত খুঁটির প্রাচীর ভেদ করিয়া দৌড়াইয়া

৮-৮
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
ঐ স্থান তাতিক্রম করিতে সাহসী হয় না। সমস্তগুলি * সিয়া
ঐ স্থানে বাধাপ্রাপ্ত হয় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়ে এই
সুযােগে অন্য কয়েকজন লােক “বোলা” নামক অস্ত্রের সাহায্যে
উহাদের প্রাণ সংহার করিতে থাকে।
বােলা এক অদ্ভুত অস্ত্র।
সীসা বা পাথরের বল থাকে এই
অস্ত্রে এবং উহার একটণ হয় ভারী আর একটা পাতলা। ভিকুনার
স্নায়ু বা শিরা দিয়া ঐগুলি বঁধা হয়। যেদিকে ঐ দড়ির মত
ভিকুনার শিরাগুলি খােলা থাকে সেইদিকে একটার সঙ্গে আর
একটা গাট বা গেরাে দিয়া রাখা হয়। পাতলা বলটী হাতে
লইয়া ঢিল ছোড়া হয়। ঢিল যাইয়া শিকারের গায়ে লাগে।
ঢিল মারিবামাত্র ভারী বলটী নাথার দিকে ঘুরিতে আরম্ভ করে।
কুড়ি বা ত্রিশ হাত দূর হইতে এই বল ছোড়া হয়। শিকারের
গায়ে লাগিয়া, উহা শিকারকে পিছাইয়া জড়াইয়া ফলে।
ভিকুনার পিছনের পায়েই এই অস্ত্র নিক্ষেপ করা হইয়া থাকে ।
গায়ে লাগিবামাত্র, এই অস্ত্র ভিকুনাগুলিকে এমন করিয়া উড়াইয়া
বঁধিয়া ফেলে যে উহাদের আর এক-পা নড়িবার শক্তি
থাকে না। এ যেন নাগ-পাশ। ভিকুন। তখন মাটিতে পড়িয়া
যায়, আর উঠিতে পারে না। এই অস্ত্র নিক্ষেপ কর।
সহজ নয়। বিশেষভাবে অভ্যাস না করিলে হা নিক্ষেপ করা
যায় না—নিক্ষেপ করিলেও কোন ফল হয় না। ঘোড়ার পিঠে
চড়িয়া বােলাস্ নিক্ষেপ আরও কঠিন ! নূতন নূতন, প্রথম
প্রথম, অনেক সময় অনেক অশ্বারােহী বােলাস নিক্ষেপকারী

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
৮৯
যথাযথ শিক্ষার ক্রুটীতে—হস্য-কৌশলের এটাতে---তাহ'। নিজের
ঘােড়াকেই বা নিজ দেহেই এই অস্ত্রের দ্বারা আহত ৫ 'বন্ধ হয়
--তাহাতে ফল হয় সাবাতিক।
বােল দ্বারা আবদ্ধ ভিকনাগুলিকে অনতিবিলাতে হত্যা করা
হয় এবং উপস্থিত সকলকেই উহার মাংস সমভাবে বা করিয়া
দেওয়া হইয়া থাকে ।
গুয়ান্যাকো অত্যন্ত দুর্দান্ত প্রাণী। ভিকুনার সঙ্গে তাড়িত
হইয়া এই কৌশল-জালে আবদ্ধ হইলে উহারা বিন্দুম! ভীত
হয় না। বলপূর্বক দৌড়াইয়া, খুটি সংলঃ দড়ি ছিন্ন ভিন্ন করিয়া
উহার পলায়ন করে। উহাদের দেখাদেখি ভিকুনগুলি : পলাইয়া
যায় । এইজন্য ভিকুনালিকে অনিবার সময় শিকারীরা
গুয়ান্যাকোগুলিকে তাড়াইয়া দেয়।
ভিনগুলিকে হত্যা করিয়াই সমস্ত দড়ি গুটাইয়া তাবার
কয়েক মাইল দূরে ঐ *দি পাতা হয়। এই ভাবে সহকাল
শিকরি চলে।
এক একর (র এইরূপ মৃগয়া ব * করে
পঞ্চাশ-ষাটী ভিকুন। ধরা পড়ে; কখন কখন শতাধি - আবদ্ধ
হয়।
একজন শিকারী আমাকে বলিয়াছিল যে তাহার! দুদিন
পূর্বেই একবার দেড়শাে ভিকুন শিকার করিয়াছেন।
দক্ষিণ আমেরিকার অপর একটি বিচিত্র জন্তু হইতেছে
“আলপাকা” । ভেড়ার মত এই জন্তুগুলি হইতে লোম ও মাংস
পাওয়া যায়। অলিপাকার লােম একটী
মূল্যবান
সামগ্রী।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
ইহাতে অতি সুন্দর কাপড় হয়। স্কটল্যাণ্ড, ও অষ্ট্রেলিয়ায় এই
পশু-পালনের বিশেষ চেষ্টা হইয়াছিল, কিন্তু সম্ভব হয় নাই।
দক্ষিণ আমেরিকার ‘পঙ্গ পাল’
গুয়ান্তাকে। এই স্থানের নানা অঞ্চলে দেখা যায়।
ইহারা
অনেকটা হরিণের মত! পেরুর উত্তর হইতে টেরাডেল কুয়েজো

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক দ্বীপ অবধি স্থানে ইহাদিগকে দেখা যায়। প্যাটাগােনিয়া প্রদেশেও ইহাৱা বাস করিয়া থাকে । কণ্ডর বলিয়া একপ্রকার বৃহকায় গৃঐ এণ্ডিজের ইতস্তত দৃষ্ট হয়। ইহারা পাখা মেলিলে সাত-আট ফিট হয় । গেরুর দক্ষিণে, বিশেষতঃ দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে, সর্বাপেক্ষ। মনােরম ঠাস দেখা যায়। ইহাদের গলাগুলি কালো এবং ঐ গলার সঙ্গে ইহাদের গায়ের ঝক্ঝকে সাদা রংয়ের এমন বিচিত্র সংযোগ যে, দেখিলে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিতে ইচ্ছা করে । এদের পাগুলি পাটল-বর্ণ এবং চক্ষু উজ্জ্বল লােহিত। চীলী ও পেরুতে সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে স্পেনবাসীদের বসবাস যেমন বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছিল, তেমনই পরবর্তী শতাব্দীতে ইউরােপীয়ানদিগেরও এইস্থানে বাস বিপদ-সঙ্কুল হইয়া দাড়ায় । এদেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হইয়া উঠে, উপকূল- ভাগে ইন্টারমিটেট, অর আরম্ভ হয়। জ্বরের ফলে ইউরােপীয়ান্ আর দক্ষিণ আমেরিকায় বাস করিতে পারিতে- ছিলেন না। তখনও কিন্তু বাসস্থানের নিকটেই সিঙ্কোনা বা পেরুভিয়ান্ বার্ক ছিল। সিঙ্কোনা গাছ রুবিয়াসিয়া জাতীয় এক প্রকার গাছ - অনেকটা কফির মত এবং ইউরােপীয় অঞ্চলের উড-রুফের মত। গাছগুলি দেখিতে অতি সুন্দর, লম্বা লম্বা-চারা ও ঝােপড়া খুব কমই দেখা যায় এদের কাণ্ডাংশ বার হইতে আঠার ফিট উচু হয় এবং বেড়ে পঁচিশ হইতে পঁচাত্তর ইঞ্চি হয়। এ গাছের চূড়া বা কন তাহাদের ৯২ দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক অগ্রভাগ অনেক উচু; সাধারণত নব্বই হইতে দেড়শো ফট পর্যন্ত এই গাছগুলি দীর্ঘ হয়। ইহার বড় বড় পাতগুলি প্রশস্ত এবং চকচকে ; ফুলস যুক্ত পাতা ও ছােট পাতার নিশ- সমূহ অতি সুন্দর লােহিতবর্ণ-বিশিষ্ট। ফুলগুলি গোলাপী রংয়ের এবং অনেকটা সাদাটে আভা থাকে। এিশ-চল্লিশ রকমের সিঙ্কোনার গাছ এখানে দেখা যায়। বলিভিয়ার দক্ষিণাংশে ইহার উৎকৃষ্ট হলদে, পেরুতে পিঙ্গল এবং চীনবোব্যাজের চারিদিকে লােহিত বল্কল পাওয়া যায় । নিউ গ্রানাডায় এক রকম তাপেক্ষাকৃত খারাপ শ্রেণীর হলুদ বর্ণের সিঙ্কোনা-বল্কল দেখা নায় । রেড-ইণ্ডিয়ানেরা গাছ কাটিয়া এই বল সংগ্রহ করে। সংগ্রহকারীদিগকে বলে ক্যাচক্যারিল্লেয়ােস্। তাহারা রস *হির করিয়া, শুকাইয়া, বল গুলিকে যথাযােগ্য-ভাবে গ্রহণ করে। একটী গাছ কাটিতে দুইজন লােকের প্রয়োজন হয়। ষাট ফিট চার ফিট ব্যাসবিশিষ্ট এক একটা গাছে প্রায় পা গণ শুকান বাকল হইয়া থাকে। প্রতি বৎসর হাজার হাজার গাছ কাটা হইলেও, গাছ নির্বংশ হইবার আশঙ্কা নাই। উহাদের কর্তিত-কাও হইতে কিছুদিন-মধ্যে আবার হাজার হাজার চারা জন্মিতেছেনূতন বৃক্ষে পরিণত হইতেছে। যেন এই রক্ত-বীজের ঝড়ের ধ্বংস নাই। উত্তরে বসন্তের সঙ্গে সঙ্গে এমাজন নদীর ভীষণ উচ্ছাস আরম্ভ হয়। এই নদীর জল চল্লিশ-পঞ্চাশ ফিট উচু হইয়া উঠিয়া, প্রলয় বেগে দিগ্বিদিকে প্রধাবিত হইতে থাকে। সেই তরঙ্গের ও প্লাবনের তাণ্ডবে বৃক্ষসমূহ ধ্বসিয়া পড়িয়া

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
গমনাগমনের পথ রুদ্ধ হইয়া যায়। পাম গাছ, জ{{:} বের
থে ল্লেটিয়া, চীনা প্রভৃতি বৃক্ষ ইহার তীরে ৮ 'দুল্যমান
অবস্থায় থাকে। ইণ্ডিয়ানেরা ভীত ও শঙ্গিতভাবে অতি সন্তর্পণে
ফুল ও ফলসামে বিশ্ব-হি কর » »া:-গাছ
উহাদের নিম্নভাগ দিয়া তাহাদের হাকা নৌকা ক্য! লইয়া
যাতায়াত করে। কখন যে এই সব গাছ ভাঙ্গিয়া পড়ি: তাহার
কিছুই ঠিক নাই। এ সময় এমাজনের তীরে একটি। ভীষণ
বৃক্ষোৎপাটন লীলা চলিতে থাকে। অসংখ্য ফল ও ফুল শোভিত

৯৪
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
বৃক্ষের কাণ্ড জলে ভাসিতে আরম্ভ করে। নদী দিয়া জল-যানের
চলাচল বিপদসঙ্কুল হইয়া দাঁড়ায়। বেশীদিন এমাজনের এই
রুদ্র-মূর্তি থাকে না, কিন্তু যে কয়দিন থাকে সে কয়দি কি
ভীষণ ! বড় বড় কুম্ভীর জলে ভাসিয়া উঠিতে থাকে। বৃক্ষ-পতনে
উহারা মনে করে যে ঐ বুঝি শিকার আসিল, সুতরাং এই জন্য
জলময় একটা উৎকট আলােড়ন উপস্থিত হয় ।
পাখিী যে কত জাতীয় দেখিলাম, তাহার ইয়ত্তা নাই। অবারা
ও ফ্যান্ নামে দুই প্রকার প্যারাকোয়েট দেখিলাম।
ইরা
বার ইঞ্চি পর্যন্ত দীর্ঘ হয় । এণ্ডিজের সর্বাপেক্ষা উচ্চ শৃঙ্গের
নাম চিমবোরাজো।
এক প্রকার জানোয়ার দেখলাম, উহাদের নাম “ল্যামেটন”।
ইহারা নয় ফিট পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। তিন আঙ্গুল বিশিষ্ট বারের
কথা ইতঃপূৰ্ব্বে বলিয়াছি। এই শ্লথগুলি দেখিতে বিশ্রী !
এক জাতীয় কালো বানর এখানে আছে। উহাদের নাম “ব্ল্যাক
হাটিং মাঙ্কি।” লেজ সহ বাহান্ন ইঞ্চি পর্যন্ত দীর্ঘ হইতে উহাদের
দেখা যায়।
একদিন এমাজন নদীর তীর দিয়া ভ্রমণ করিতেছিলাম।
সহসা এক বিচিত্র পুষ্পের বন যেন চোখের সম্মুখে ভাসিয়া
উঠিল । প্রকাণ্ড ঢালের মত এক একটা গোল পাতা---চার
হইতে ছয় ফিট চওড়া–নদীর জলে ভাসিতেছে। উহা এমাজন
নদীর একটী প্রধান সৌন্দৰ্য্য এবং উহার নাম “ভিক্টোরিয়া
রিজিয়া”।

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
এক রকম গাছ দেখিলাম, উহার নাম “কো-চৌক”; কিন্তু ইহার
পূর্ণ নাম সিফোনিয়া ইলাষ্টিকা। এই গাছগুলি যাট ফি'; পৰ্য্যন্ত
দীর্ঘ এবং কাণ্ডের ব্যাস তিন ফিট পর্যন্ত হয়।
দুগ্ধের মত এই গাছের রস এক অদ্ভুত উপায়ে গাঢ় করা হয়।
ব্যবসায়ীদের নিকট এই রসের বিশেষ প্রসিদ্ধি দেখা যায়।
নয় ফিট লম্বা ল্যামেনে
গাটা-পারচা, কোকোয়া, ভ্যানিলা প্রভৃতি কত মুল্যব গাছ
এখানে দেখিলাম ।
একদিন এক গভীর বনে প্রবেশ করিলাম। হাতে একটী
দু’নলা রিভলভার থাকিলেও ভয় হইতেছিল ! যাহােক এগবানের
কৃপায় নির্বিঘ্নে ঐ বন পার হইলাম। ওখানে দেখিলাম,
ক্যাপিবারা, বোট-বিল, জ্যাবিরু, ম্যানেটি * হরণড-সিম। আর
সাংঘাতিক জাগুয়ার ও টেপীর।
স্পেন-দেশীয় লােকদের নিত্যব্যবহার্য “মে” শব্দটী দক্ষিণ
আমেরিকায়ও বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে। পর্তগীজদের অর্ধেক

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক লােকে ইহা বলে। রাইও গ্রাণ্ডী হইতে দক্ষিণ ৰেজিল অবধি সর্বত্র, প্রভাতের প্রথম উচ্চারিত এই মেট শব্দটি–গৃহে, 'তে, বনে, বাজারে শুনা যায়। মেট গাছ ( Mat() Surul)) কবি ও বাচ্চ গাছের এক সম্মিলিত রূপ। ইহার পাতায় টেইন নামক চায়ের সারাংশ আছে, কিন্তু কঁাচা পাতা চিবাইলে ও রস সেবন করিলে পাকস্থলীতে এক প্রকার বিচিত্র অনুভূতি সঞ্চারিত হয়। ইহার পাতা খাইলে পেটের অসুখ হয়। ইহা এদেশে তাজস্র জন্মে। দক্ষিণ আমেরিকার লােকেরা শুধু ইহার ফল সংগ্রহ করে। মেটু ভদ্রতার এক বস্তু। আমি [দের দেশের পান তামাকের মত, আদর অভ্যর্থনায় ইহা নিত্য ব্যবত হয়। ওখানকার তে (কেরা বলে-- “Vate, greets the coming und speeds the parting guests” মে কেমন করিয়া খায় কৌতুহল পরবশ হইয়া »ি ওসি। করায় শুনিলাম যে রেড -ইণ্ডিয়ান ও নিগ্রোর। আমাদের পানের মতই ইহা চিবাইয়া খায়। গুড়া করিলে তামাকের এত করিয়া ইহাৱা খায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে “মেট স্মোকিং” বা ইহার তামাক খাওয়া বিশেষভাবে প্রচলিত হইয়াছে। সারা বৎসর ধরিয়া ব্রেজিলের ঘরে ঘরে প্রকাণ্ড এক একটা মাটির বাসনে জলসহ এ গুলি ভরিয়া রাখা হয়। এই মেট বা ব্ৰেজিলের চা নাতন জিনিষ নয়। ইহার পূর্ব নাম ছিল “প্যারাগুয়া টি।” দুই শত বৎসর পূর্বেও ইহা

দক্ষিণ আমেরিকায় না। কয়েক
ইউরোপের লােক সেবন করিতেন এবং তখনও ইহার : ল :
ছিল।
বলিভিয়ার লোকদের স্নায়বিক শক্তি বর্ধনে সব-২ পদার্থ
হইতেছে কোকোয়া বা কাকে।। কেকের পাতা এক ন ?
হয় এবং ইহা রৌদ্রে শুকাইয়া যায়। বলিভিয়া ওর:: ভূত
দক্ষিণ আমেরিকার এমাজন নদীর প্রধান সৌন্দর্য্য
“ভিক্টোরিয়া রিজিয়।"
পরিমাণে কোকো উৎপন্ন হয়। শুকাইলে কিঞ্চিৎ সূক্ষ হ।
লাল মরিচের সঙ্গে দেশের লােকেরা চিবাইয়া কেবলমা
রসগুলি গলাধঃকৃত করে ও ছিব ড়া ফেলিয়া দেয়।

৯০-
দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
যাহার। কাডিল্লেরার উচ্চ-ভূমিতে উঠিয়া হাপাইয়া পছন
তাহাদের পক্ষে সেখানে কোকোয়া বা কোকো ভিন্ন ক্লাব
রক্ষা হওয়া কঠিন হইয়া দাঁড়ায়। ঐস্থানে কি ভীষণ শীত।
দারুণ ঠাণ্ডায় দেহ যেন জীভূত হইয়া আসিতে থাকে এবং
বায়ুর অল্পতায় বক্ষঃদেশ সঙ্কুচিত হইয়া বিষম অস্বস্তি উস্থিত
হয়। ঐ সময় কয়েকটি কোকোর পাতা চিবাইলে কতই না আর
বােধ হয়। কুই চোয়ান ইণ্ডিয়ানের।
তুষারাবৃত গিরি-সঙ্কট
অতিক্রম করিতে প্রচুর কোকোর পাতা সঙ্গে না লইয়াই পাবে না।
ইহাতে স্নায়বিক অবসাদ তা ত্যাশ্চর্যরূপে বিদূরিত হয়। কর্যে।
উৎসাহ বৃদ্ধি পায় এবং জড়তা, গ্লানি নষ্ট হইয়া মনে এক অপূর্ব
প্রসন্নতার উদয় হয় । চায়ের মত করিয়া কোকো পান করিলে ও
ইহাতে বেশ সুগন্ধ পাওয়া যায় এবং একটু একটু “ক্যানোমিলের
গন্ধ ও অনুভূত হয় ।
পেরুর রেড-ইণ্ডিয়ানগণ মুখ ভরিয়া কোকো লইয়া পথের দূরত্ব
মাপে। কয়েকটী পাতা চিবাইলে যে শক্তিবর্ধক-গুণ সপরিত
হয় উহা কিয়ৎকালাবধি দেহে ক্রিয়া করিতে থাকে এবং এইভাবে
পর পর পাতা না খাইলে আবার দুর্বলতা দেখা দেয় । নেশার
নির্দিষ্ট সময় অনুসারে এই দূরত্বের
পরিমাণ চালে ।
“হারকিউলিস্ বীটল” দেখিলাম। কি
অদ্ভুত
প্রাণী—দেখিলেই
মনে ভয় বীভৎসতা দেখা দেয়। “বার্ড-স্পাইডার” বা
মাইগেলগুলি সাত ইঞ্চ পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। ছােট ছােট কত পাখী,
কীট উহারা ধরিতেছে ও মারিয়া খাইতেছে । লেজ পৰ্য্যন্ত প্রায়

দক্ষিণ আমেরিকায় মাস কয়েক
সাত ফিট দীর্ঘ “ইউরুমী” দেখিলাম । কি অদ্ভুত कान्ट
চেহারা।
স। ওয়ার, লােকা-ট্রী, হকিরী, সুম্যাক্, রেড, র,
ম্যান-ফার, ম্যাগনোলিয়া, টুলিপ, সুগার ম্যাপল, !”-
গ্রা, ইবী সে প্রভৃতি কত কি, দেখিলাম ।
বড় বা জায়ান্ট-পইন
ফিট লম্বা
একদিন এক ঝাঁক “জায়ান্ট-পেঙ্গুইন”– এক একটা প্রায় কচ
সামনে পড়িল ।
বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছিলাম বিধাতার অপূর্ব লীলা- .কম
এত, অজস্র সৃষ্টি ? কোনটীর সঙ্গে কোনটীর তমন বিশে মন
নাই, অথচ এক হস্তেরই সৃষ্ট সব। একে মারিয়া অন্যকে খাইতেছে,
-একের বিষে অন্যে জর্জরিত-একের প্রীতিতে অন্যের সুস্থতা ।

দক্ষিণ তামেরিকায় মাস কয়েক
কেন তিনি এমন করিয়া অহর্নিশ বিধান করিতেছেন ? লীয়ের
লীলার অবধি নাই-সৃষ্টির বিরাম নাই। একি খেলা!
শনিলাম,
মাত্র তিনশত
মাইল দূরে জুয়ান ১৫জ,
দ্বীপ। সেখানে যাইব কি না ভাবিতেছিলাম এমন সময় লাগত
এক সঙ্গীতের ধ্বনিতে তন্ময় হইয়া গেলাম। উৎকণ হইয় নিতে
লাগিলাম। কে যেন গাহিতেছে—এ যে প্রাণের ভাষা, মনের
কথা—কি সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর, যেন চিনি --শুনিয়াছি--কে ওয়—
কি গায় ? গায়ক গাহিতেছিল--
“অমর কথাটি জানি রবে • মনে,
শুধু মোর গানখানি, তুমি, রেগে ,
নতুন ফাগুন দিনে ভাসায়ে দি..
পুরাণে হরি খে
-শেষ

No text on this page.

No text on this page.

Dakshin Americay Mas Koyek

Author
Chattopadhyay, Baidyanath
Title
Dakshin Americay Mas Koyek
File name
Dakshin Americay Mas Koyek
Text
OCR done
Citation
1938
Published
2009/07/10
Publisher
Girindranath Mitra,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
109
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Other Genres.
Keywords
History of the Americas
DLI number
550664
Barcode
4990010021066.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
zxJhQlYCqGX
Download PDF

Dakshin Americay Mas Koyek